📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা

📄 আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা


কোন ঘটনার যথার্থতার সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো তার সম্পর্কে অতিরঞ্জিত নানা কথা ছড়িয়ে পড়া। 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের 'আদল-ইনসাফের ঘটনাবলী এই মাপকাঠির ভিত্তিতে ঠিকভাবেই উৎরে যায়। কবিরা যখন তাঁদের কবিতায় কোন রাজা- বাদশার 'আদল-ইনসাফের অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে তখন বলে, তার সময়ে নেকড়ে ও মেষ একসাথে পানি পান করে। কখনো এর চেয়ে আরো একটু বাড়িয়ে বলা হয় "নেকড়ে মেষ পালের রাখালী করে।" হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় এই অতিরঞ্জন বাস্তবরূপ লাভ করে এবং সে সম্পর্কে বহু বানোয়াট ও অতিরঞ্জিত কাহিনীর সৃষ্টি হয়। যেমন মূসা ইবন 'আয়ান বলেছেন, আমরা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে ছাগল চরাতাম। নেকড়েও আমাদের সাথে চরতো। কিন্তু এক রাতে নেকড়ে একটি ছাগলকে আক্রমণ করে বসে। তখন আমি বললাম, নিশ্চয় সেই সৎ লোকটি মারা গেছেন। পরে দেখা গেল বাস্তবে সেই রাতে 'উমার ইনতিকাল করেছেন। ২৫৪

এখন আমাদের ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে বলতে হবে এই অতিরঞ্জনের মধ্যে সত্য ও বাস্তবতার পরিমাণ কতটুকু? 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালের পূর্বে : ১. জনসাধারণের অর্থ-সম্পদ জোর করে অন্যায়ভাবে দখল করে নেওয়া হয়েছিল। ২. বিশ্ব মুসলিমের পরম প্রিয় বানু হাশিমের সকল অধিকার হরণ করা হয়েছিল। ৩. চরম খুনী ও রক্ত পিপাসু সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল। ৪. নিতান্ত ধারণা ও সন্দেহের ভিত্তিতে মানুষকে শাস্তি দেওয়া হতো এবং পুরুষের বদলে নারীদেরকে গ্রেফতার করা হতো। ৫. কোন রকম পারিশ্রমিক ছাড়াই জনগণকে বেগার খাটানো হতো।

'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খিলাফতের মসনদে আসীন হয়েই এই সকল অন্যায়- অবিচারের মূলোৎপাটন করে আদল-ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ঐতিহাসিক ইয়া'কুবী লিখেছেন: ২৫৫
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয নিজ খান্দানের কর্ম পদ্ধতিকে বদলে দেন এবং তাঁর নাম দেন জুলুম-অত্যাচার। তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের লেখেন যে, মানুষ আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে সেইসব অসৎ কর্মকর্তাদের কারণে যারা খুব কমই সত্য-সততা, কোমলতা ও উপকারের পথ ও পন্থা অনুসরণ করেছে, বিপদ, কঠোরতা ও জুলুম-অত্যাচারে নিপতিত হয়েছে। আর তারা তাদের উপর খারাপ রীতি-পদ্ধতি চালু করেছে।'

এ কারণে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর সর্বপ্রথম জনসাধারণের অধিকারের প্রতি মনোযোগ দেন এবং অন্যায়ভাবে জোর-জবরদস্তী দখলকৃত সকল সম্পদ তাঁর প্রকৃত মালিককে ফেরত দেন।

টিকাঃ
২৫৪. ইবনুল জাওযী-৭০; 'আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয-১৭০
২৫৫. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩০৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 বানূ হাশিমের প্রতি বিদ্বেষ দূরীকরণ ও তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা

📄 বানূ হাশিমের প্রতি বিদ্বেষ দূরীকরণ ও তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা


হযরত নবী কারীমের (সা) বংশ বানু হাশিমের অধিকার হরণের সূচনা হয় হযরত আমীর মু'আবিয়ার (রা) সময় থেকে। ফাদাক- যা ছিল হযরত রাসূলে কারীমের (সা) একান্ত অধিকারভুক্ত এবং যার আয় থেকে তিনি বানু হাশিমকে সাহায্য করতেন, সেটা হযরত মু'আবিয়া (রা) মারওয়ানকে দান করেন। ২৫৬ খুমুস (যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক পঞ্চমাংশ), যা ছিল বানু হাশিমের একক অধিকারের, তাও তিনি কেড়ে নেন। তবে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পূর্বে ওয়ালীদ ও সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের, যখন তাঁরা খিলাফতের মসনদে আসীন ছিলেন, এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু তাঁরা উভয়ে বানু হাশিমের এ অধিকার ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেন। তাই তিনি খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণের পরই এ ব্যাপারে উদ্যোগী হন এবং নিজের অতীত পরামর্শকে বাস্তবায়িত করেন। ফাদাকের ব্যাপারে আবূ বকর ইবন হাযমকে লেখেন; অনুসন্ধানের পর জানা গেছে ফাদাকের আয় ভোগ করা আমার জন্য বৈধ নয়। এ ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্ত হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) সময়কালে, আবু বকর, 'উমার ও 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে তা যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় ফিরিয়ে দিই। পরে যা কিছু হয়েছে তা পরিহার করি। খুমুসের ব্যাপারেও তিনি অনুসন্ধান করেন এবং আবূ বকর ইবন হাযমের নিকট পাঁচ হাজার দীনারসহ একটি পত্র পাঠান। পত্রে তিনি লেখেন: এর সঙ্গে আরো পাঁচ হাজার যোগ করে বানু হাশিমের নারী-পুরুষ, ছোট- বড় সকলের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করুন। যদিও এতে যায়দ ইবন হাসান ভীষণ অসন্তুষ্ট হন এবং মন্তব্য করেন : আমাদেরকে বান্দী-দাসীদের সমান করা হয়েছে। কিন্তু 'উমার তার কোন পরোয়া করেননি।

'আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন 'আকীলের একটি বর্ণনা আছে যে, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয প্রথমবারের মত কিছু অর্থ নবী-খান্দানের মধ্যে বণ্টন করেন। তাঁতে নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু সকলে সমানভাবে অংশীদার ছিল। প্রত্যেকে তিন হাজার দীনার করে লাভ করেছিল। তিনি একটি পত্রে একথাও লিখে পাঠান যে, আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে আপনাদের সব অধিকারই ফিরিয়ে দেব।

নবী-খান্দানের উপর তাঁর এ অনুগ্রহের বিরাট প্রভাব পড়ে। তাঁরা তাঁর প্রবল সমর্থকে পরিণত হন। যেমন, একদিন 'আলী ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) ও আবূ জা'ফার ইবন 'আলী বসে আছেন। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের দুর্নাম করতে আরম্ভ করে। তাঁরা তাকে 'উমারের নিন্দা-মন্দ করতে নিষেধ করেন এবং বলেন আমীর মু'আবিয়ার (রা) সময় থেকে আজ পর্যন্ত আমরা "খুমুস” থেকে বঞ্চিত ছিলাম। কিন্তু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয 'আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের মধ্যে তা বণ্টন করেছেন।

হযরত ফাতিমা বিনত হুসাইন (রা) একটি পত্র লেখেন। তাতে তিনি বলেন, আমীরুল মু'মিনীন খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণে আমাদের জন্য যে অর্থ পাঠিয়েছেন এবং আমাদের মধ্যে যা বণ্টিত হয়েছে আল্লাহ তা'আলা সেজন্য আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন। আমাদের প্রতি জুলুম করা হচ্ছিল এবং আমাদের প্রতি ইনসাফ করা আপনার দায়িত্ব ছিল। হে আমীরুল মু'মিনীন! নবী-খান্দানের যাদের চাকর ছিল না তারা এখন চাকর রাখতে পেরেছে, যাদের কাপড় ছিল না, তারা কাপড় পেয়েছে, আর যাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য অর্থ ছিল না তারা সে অর্থ পেয়েছে।

হযরত ফাতিমা বিনত হুসায়নের (রা) এ পত্র নিয়ে 'উমারের নিকট এলে তিনি দারুণ খুশী হন। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং পত্র-বাহক দূতকে দশ দীনার বখশীশ হিসেবে দান করেন। দূতকে বিদায় দেওয়ার সময় তার হাতে আরো পঞ্চাশ দীনার ও একটি পত্র ধরিয়ে দিয়ে বলেন, এগুলো ফাতিমাকে দিবে। পত্রে তিনি ফাতিমাকে লেখেন, এই দীনারগুলো আপনার প্রয়োজনে ব্যয় করুন।

তিনি আহলি বায়তের লোকদের অত্যন্ত সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখতেন। একবার তাঁর মজলিসে ফাতিমা বিনত আল-হুসায়নের (রা) আলোচনা উঠলো। যখন কেউ একজন বললো, ফাতিমা মন্দ কাজ করা তো দূরের কথা, মন্দ কি তাও তিনি জানেন না। সাথে সাথে উমার মন্তব্য করলেন, মন্দ না জানাই মন্দ থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ২৫৭

উমাইয়্যা খান্দানের হাতে খিলাফতের দায়িত্বভার আসার পর থেকে জুম'আর খুতবায় আমীরুল মু'মিনীন হযরত 'আলীর (রা) প্রতি লা'নত তথা অভিশাপ দানের যে রীতি চলে আসছিল 'উমার তা পরিহার করার এবং তদস্থলে আল-কুরআনের নিম্নের আয়াতটি পাঠ করার নির্দেশ দেন: ২৫৮
'আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালংঘন, তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।' ২৫৯

অনেকে বলেন, 'আলীর (রা) ব্যাপারে 'উমার তাঁর পিতা 'আবদুল 'আযীযের পথ অনুসরণ করেন। তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি 'আলীকে (রা) অভিশাপ দিতেন না। খুতবা দানের সময় 'আলীর (রা) প্রসঙ্গ এলে তো তো করে তোৎলামির ভান করতেন। একদিন 'উমার তাঁর পিতার এমন আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন : বেটা! 'আলী সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি, জনগণ যদি ততটুকু জানে তাহলে তারা আমাদেরকে ছেড়ে তাঁর সন্তানদের দিকেই চলে যাবে। সম্ভবতঃ পিতার এ কথায় পুত্র 'উমার দারুণ প্রভাবিত হন। ২৬০

নবী-খান্দানের প্রতি 'উমারের এমন উদার ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণে জনসাধারণ দারুণ খুশী হয়। মানুষ তাঁর এ কাজকে একটি মহৎ কাজ বলে বিবেচনা করে এবং তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে পড়ে। সেকালের আরব কবিগণও তাঁদের কবিতায় তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিখ্যাত কবি কুছায়্যির 'আয্যা (মৃ. হি. ১০৫/খ্রী. ৭২৩) তাঁর একটি কবিতায় বলেন:
'আপনাকে খিলাফতের দায়িত্ব দেওয়া হলো, আলীকে গালি দিলেন না, সৃষ্টি জগতের কাউকে ভয় দেখালেন না এবং কোন অপরাধীর কথাও মানলেন না। আপনি স্পষ্ট সত্য উচ্চারণ করলেন। আর আপনি তো কথার মাধ্যমে সত্য-সঠিক পথের নিদর্শনাবলী ব্যাখ্যা করেন। আপনি আপনার কর্মের দ্বারা কথাকে সত্যে পরিণত করলেন। ফলে প্রত্যেকটি মুসলমান সন্তুষ্ট হলো। জেনে রাখুন, একজন যুবকের সত্য থেকে বিচ্যুতির পর যেভাবে ধারালো ও সোজা করার যন্ত্র দিয়ে তীর সোজা ও ধারালো করা হয় তেমনি তার জন্য একটু প্রচেষ্টাই যথেষ্ট।'
কবি কুছায়িয়র 'উমারকে এ কবিতাটি শোনালে তিনি মন্তব্য করেন : إِذَا أَفْلَحْنَا তাহলে আমরা সফল হয়েছি। ২৬১

টিকাঃ
২৫৬. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩৬৬
২৫৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১২
২৫৮. ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৬০৪
২৫৯. সূরা আন-নামল: ৯০
২৬০. ড. হাসান ইবরাহীম হাসান, তারীখ আল-ইসলাম-১/৩৩০
২৬১. আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৪২-৪৩; ড. 'উমার ফাররূখ, তারীখ-১/৬২০

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 অত্যাচারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে বরখাস্তকরণ

📄 অত্যাচারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে বরখাস্তকরণ


অন্যায়ভাবে জোর-জবরদস্তী দখলকৃত সম্পদ ফেরত দান ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আদল- ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ করার পর তার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক কাজ ছিল কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জুলুম-অত্যাচারের প্রতিবিধান করা। অবশ্য তাঁর পরামর্শ মত খলীফা সুলায়মানের সময়কালেই বহুলাংশে এর প্রতিবিধান হয়ে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও কিছু প্রভাব বিদ্যমান ছিল। উমাইয়্যা শাসনকালে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ, তার গোটা খান্দান এবং তার অধীনের কর্মকর্তারা ছিল সবচেয়ে বেশী বেপরোয়া ও জঘন্য ধরনের অত্যাচারী-উৎপীড়ক।

খলীফা 'আবদুল মালিক ও তাঁর পুত্র আল-ওয়ালীদের খিলাফতকালের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মত চরম অত্যাচারীর দীর্ঘ বিশ বছর যাবত গভর্ণর থাকা। কিরাত শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম 'আসিম ইবন আবী আন-নাজুদ (রহ) বলেন : 'আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজসমূহের মধ্যে এমন কোন কাজ ছিল না যা সে করেনি।' 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) বলতেন: 'যদি দুনিয়ার সকল জাতি-গোষ্ঠী পাপাচারের প্রতিযোগিতা করে এবং নিজেদের সকল কপট পাপাচারীকে এনে দাঁড় করায় তাহলে আমরা কেবল হাজ্জাজকে দাঁড় করিয়ে তাদের সকলের উপর জয় লাভ করতে পারবো।' ২৬২ তার সময়ে আদালতের বিচার- ফয়সালা ছাড়া বন্দী অবস্থায় যাদের হত্যা করা হয়েছে, বলা হয়, কেবল তাদের সংখ্যা এক লাখ বিশ হাজার। যখন সে মারা যায় তখন তার কারাগারে আশি হাজার নির্দোষ মানুষ বন্দী ছিল যাদেরকে কখনো আদালতে হাজির করা হয়নি। ২৬৩ হাজ্জাজের মৃত্যুর খবর শুনে 'উমার সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তিনি আল্লাহর নিকট দু'আ করতেন, হাজ্জাজের মৃত্যু যেন তার বিছানায় হয়, যাতে আখিরাতে সে কঠিন শাস্তি লাভ করে।

হাজ্জাজের মৃত্যুর পর মানুষ শোক প্রকাশের জন্য খলীফা ওয়ালীদের নিকট আসে। তারা তাদের শোক প্রকাশ ও হাজ্জাজের প্রশংসায় অনেক কথা বলে। সেখানে 'উমার উপস্থিত ছিলেন। ওয়ালীদ তাঁর দিকে তাকালেন যাতে মানুষে যা বলছে সেও যেন তেমন কিছু বলে। 'উমার বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! হাজ্জাজ আমাদের মধ্যকার একজন মানুষই ছিল। ২৬৪

খলীফা আল-ওয়ালীদ ইবন আবদিল মালিকের দরবারে একবার 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের উপস্থিতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ালী, বিশেষতঃ হাজ্জাজের জুলুম-অত্যাচারের প্রসঙ্গ ওঠে। 'উমার তখন বললেন: ২৬৫
'ইরাকে হাজ্জাজ, শামে ওয়ালীদ, মিসরে কুররা ইবন শারীক, মদীনায় 'উছমান ইবন হায়‍্যান, মক্কায় খালিদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাসারী- ইয়া আল্লাহ! জুলুম-অত্যাচারে এ দুনিয়া ভরে গেছে, তুমি মানুষকে শান্তি দাও।'

'আল্লাহ 'উমারের দু'আ কবুল করেন। এর এক মাসের মধ্যে হাজ্জাজ ও কুররা মৃত্যুবরণ করে, তার অল্প কিছু দিন পর মারা যায় আল-ওয়ালীদ। অতঃপর 'উছমান ও খালিদকে বরখাস্ত করা হয়।' অপর একটি বর্ণনায় ইয়ামনে মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফের কথাও এসেছে। ২৬৬

'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) এই জুলুম-অত্যাচার নির্মূল করার দিকে মনোযোগী হওয়ার পর হাজ্জাজের গোটা খান্দানকে ইয়ামনে নির্বাসন দেন। তারপর সেখানের ওয়ালীকে লেখেন যে, তোমাদের নিকট ঐ বংশের খান্দানকে- যেটি আরবের নিকৃষ্ট খান্দান, পাঠালাম। তাদেরকে একস্থানে থাকার সুযোগ না দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাও। তিনি হাজ্জাজের নিজ গোত্রের লোক অথবা যারা তার অধীনে কোন কাজ করেছে তাদেরকে সবরকম রাষ্ট্রীয় অধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার নির্দেশ দেন। ২৬৭

টিকাঃ
২৬২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/৪৯
২৬৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/২, ৮৩, ৯১, ১২৮, ১২৯, ১৩১, ১৩৮; আল-কামিল ফিত তারীখ- ৪/২৯, ১৩৩; খিলাফত ও মুলুকিয়াত-১৮৬
২৬৪. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/৫৫, ৫৭
২৬৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৯/৮৯; খিলাফত ও মুলুকিয়াত-১৮৭
২৬৬. আল-কামিল ফিল লুগা ওয়াল আদাব-১/৮৭, ১২৩
২৬৭. ইবনুল জাওযী-১১৪

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দমন নীতি বন্ধকরণ

📄 আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দমন নীতি বন্ধকরণ


উমাইয়‍্যা শাসন আমলে ভুল ধারণা ও সন্দেহবশতঃ ধরপাকড় ও শাস্তিদান খুব সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। ইসলামের দৃষ্টিতে যা ছিল মারাত্মক জুলুম। ঐতিহাসিক ইয়া'কূবীর বর্ণনা মতে খলীফা ওয়ালীদ এমন অপকর্মের সূচনা করেন এবং শুধুমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে বহু অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি দেন। তাবারীর মতে যিয়াদই সর্বপ্রথম এমন অপকর্ম চালু করেন। যাই হোক না কেন, এই জুলুমের সূচনা হয় 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের খিলাফতকালের পূর্বে এবং অসংখ্য মানুষকে কেবল সন্দেহমূলক অপরাধের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়। 'উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর এ রকম শাস্তিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও সুন্নাতের পরিপন্থী বলে সিদ্ধান্ত দান করেন। তিনি এ জাতীয় শাস্তিদান সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন।

মুসেলে চুরি-ছ্যাঁচড়ামির ঘটনা খুব বেশী পরিমাণে ঘটছিল। তাই সেখানকার ওয়ালী ইয়াহইয়া আল-গাসসানী খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লিখলেন যে, সন্দেহের ভিত্তিতে ধরপাকড় করে শাস্তি দেওয়া না হলে এসব চুরি-ছ্যাঁচড়ামি বন্ধ হবে না। জবাবে 'উমার লিখলেন, কেবল আইনসম্মত সাক্ষী-প্রমাণের ভিত্তিতে ধর-পাকড় ও শাস্তি দিবেন। সত্য যদি তাদের সংশোধন করতে না পারে তাহলে আল্লাহ সংশোধন না করুন।

একবার আঞ্চলিক কর্মকর্তা 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমান 'উমারকে লিখলেন: এক ব্যক্তি আপনাকে গালি দিয়েছে। আমি তাকে হত্যা করতে চাই। 'উমার লিখলেন: যদি আপনি তাকে হত্যা করেন, আমি আপনাকে গ্রেফতার করবো। কারণ, একমাত্র নবীকে (সা) গালি দেওয়া ছাড়া কাউকে গালির কারণে হত্যা করা যায় না।

আরেকজন কর্মকর্তা 'উমারকে লিখলেন আমরা একজন জাদুকরকে পানিতে ফেলে দিই। কিন্তু সে পানির উপরে ভেসে থাকে। তার ব্যাপারে আপনি সিদ্ধান্ত দিন। 'উমার লিখলেন: পানির সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। তার বিরুদ্ধে সাক্ষী-প্রমাণ থাকে তো পাকড়াও করুন, অন্যথায় ছেড়ে দিন।

একবার খুরাসানের ওয়ালী আল-জাররাহ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-হাকামী লিখলেন: খুরাসানের লোকদের অভ্যাস-আচরণ অত্যন্ত খারাপ। কেবল চাবুক ও অসি ছাড়া আর কোন কিছু তাদেরকে সংশোধন করতে পারবে না। আমীরুল মু’মিনীন সমীচীন মনে করলে অনুমতি দান করবেন। জবাবে 'উমার (রহ) লিখলেন: আপনার চিঠি পেয়েছি। আপনি যে লিখেছেন, খুরাসানবাসীদেরকে চাবুক ও অসি ছাড়া আর কোন কিছু সংশোধন করতে পারবে না, একথা একদম ভুল। তাদেরকে সত্য ও ন্যায়বিচার সংশোধন করতে পারে। আর আপনি তাই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিন। তিনি আঞ্চলিক শাসনকর্তাদের এ নির্দেশও দেন যে, আমার অনুমতি ছাড়া কোন অপরাধীকে হাত কাটার শাস্তি দিবে না।

টিকাঃ
২৬৮. তারীখ আল-ইয়া’কূবী-২/৩৪৮
২৬৯. তারীখ আল-খুলাফা'-২৩৮
২৭০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩৬
২৭১. প্রাগুক্ত-৪/৪৩৩, ৪৩৭; ৫/২৬৬
২৭২. তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৩; আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/১৫৮, ১৬৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px