📄 জাহিলী যুগের রীতিতে মৈত্রী চুক্তি বন্ধকরণ
জাহিলী যুগে চুক্তির মাধ্যমে এক গোত্র অন্য কোন গোত্রের এবং এক ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তির মিত্রে পরিণত হতো। অতঃপর ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্যে সকল ক্ষেত্রে একে অপরকে সমর্থন ও সহায়তা করতো। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অবগত হলেন যে, কোন কোন গোত্র নেতা এবং কিছু নব্য ধনিক ব্যক্তি জাহিলী যুগের সেই মৈত্রী পুনরুজ্জীবিত করেছে। তারা যুদ্ধ, ঝগড়া-বিবাদ তথা প্রতিটি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে- 'ওহে অমুক গোত্র অথবা ওহে মুদার গোত্র! তোমরা তোমাদের মিত্রদের সাহায্যে এগিয়ে এসো'- এ ধরনের জাহিলী যুগের সম্বোধনমূলক ধ্বনি উচ্চারণ করতে শুরু করেছে। আর এ কাজ ছিল ইসলামের সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক রীতি ও ব্যবস্থাপনার বিপরীত একটি জাহিলী রীতি, ব্যবস্থাপনা ও প্রথার পুনরুজ্জীবন। এতে ছিল বহু বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার পূর্বাভাষ। পূর্ববর্তী উমাইয়্যা শাসকরা সম্ভবত অসৎ রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের কু-মতলবে এ জাহিলী প্রথার পুনরুজ্জীবনে প্রশ্রয় দিত। কিন্তু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) এর বিপদের দিকটি ভালোভাবে উপলব্ধি করেন এবং এর প্রতিবিধানের ব্যাপারে স্থায়ী নির্দেশ জারি করেন। তিনি খিলাফতের একজন উচ্চপদস্থ আমলা দাহ্হাক ইবন 'আবদির রহমানকে একটি দীর্ঘ পত্র লেখেন এবং তাতে মুসলিম সমাজকে সত্য-সঠিক পথের বিচ্যুতি থেকে রক্ষার জন্য অনেক দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শ দান করেন। তাতে তিনি মৈত্রী চুক্তির প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি লেখেন:
'আমাকে বলা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে কিছু লোক যুদ্ধে মুদার ও য়ামনীদের সাহায্য ও সহায়তা কামনা করে থাকে। তাদের ধারণা, অন্যদের মুকাবিলায় তারাই তাদের একমাত্র সাহায্য ও সহায়তা দানকারী বন্ধু। আল্লাহর জন্যই সকল তাসবীহ ও হামদ। এটা অত্যন্ত জঘন্য ধরনের অকৃতজ্ঞতা এবং অনুগ্রহের অস্বীকৃতি। ধ্বংস ও লাঞ্ছনার কত না নিকটবর্তী হয়েছে তারা। তারা কি দেখছে না, কী অনুপম শান্তি ও নিরাপত্তা থেকে তারা নিজেদের বঞ্চিত করেছে এবং কেমন একটা নিকৃষ্ট কাজের সংগে জড়িত করেছে? এখন আমি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি যে, হতভাগা তার নিজের ইচ্ছাতেই হতভাগা হয়ে থাকে। আর জাহান্নামও অযথা সৃষ্টি করা হয়নি। ঐসব লোক কি আল্লাহর কালামে একথা শোনেনি: ‘মু'মিনরা পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের পরস্পরের মধ্যে সন্ধি ও সমঝোতা স্থাপন কর এবং আল্লাহকে ভয় কর। এতে করে তোমরা আল্লাহর করুণা প্রাপ্ত হবে।’ তিনি আরো বলেছেন: আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম।'
তিনি দাহ্হাককে আরো লিখলেন:
'আমাকে বলা হয়েছে যে, কিছু লোক জাহিলী যুগের পারস্পরিক মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অথচ রাসূল (সা) এরূপ মিত্রতা ও চুক্তিবদ্ধতা করতে বারণ করেছেন। তিনি বলেছেন: ইসলামে কোন অন্যায় মিত্রতা ও চুক্তিবদ্ধতা নেই। জাহিলী যুগে প্রতিটি চুক্তিবদ্ধ মিত্র অপর চুক্তিবদ্ধ মিত্রের নিকট এই আশা-ভরসা রাখতো যে, সে পারস্পরিক মৈত্রী চুক্তির হক আদায় করবে এবং তা পূরণ করবে- চাই কি তা জুলুম-সর্বস্ব হোক, অন্যায় হোক অথবা তাতে আল্লাহ ও রাসূলের (সা) অবমাননাই হোক। আমি সেইসব লোককে ভীতি প্রদর্শন করছি যারা আমার এই আহ্বান শুনবে এবং যাদের নিকট এই পত্র পৌঁছবে। তারা ইসলাম ছাড়া অন্য কোন আশ্রয় যেন না নেয় এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা) মু'মিনদের পরিত্যাগ করে অপর কাউকে যেন বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করে। এই বিষয়ে আমি পরিষ্কার ভাষায়, বারবার সতর্ক ও সাবধান বাণী উচ্চারণ করছি এবং আমি ঐসব লোকের উপর এমন এক সত্তাকে সাক্ষী মানছি, প্রতিটি প্রাণী যার হাতের মুঠোয়, যিনি প্রতিটি মানুষের জীবন-শিরার চাইতেও নিকটবর্তী।'
তিনি মানসূর ইবন গালিবকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে একটি যুদ্ধে পাঠানোর সময় যে হিদায়াতনামা লিখে দিয়েছিলেন তা থেকেই পরিমাপ করা যায় তাঁর মানসিকতা কি পরিমাণ কুরআনের ছাঁচে গড়ে উঠেছিল এবং তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারা দুনিয়াদার বাদশাহ ও রাজনৈতিক শাসকদের থেকে কতখানি ভিন্নতর ছিল। তিনি মানসূরকে সর্ব অবস্থায় তাকওয়া অবলম্বন করতে বলেছেন। তিনি আরো বলেছেন, দুশমন অপেক্ষা আল্লাহর অবাধ্যতাকেই বেশী ভয় করা উচিত। কারণ, পাপ শত্রুর অপকৌশল ও অপপ্রয়াসের চেয়েও অধিকতর ভয়াবহ ও বিপজ্জনক। আমরা মুসলমানরা শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করি এবং তাদের পাপের কারণেই আমরা তাদের উপর বিজয়ী হই। একথা সত্যি না হলে তাদের সংগে মুকাবিলা করার শক্তি আমাদের নেই। কারণ, তাদের সংখ্যা, তাদের সাজ-সরঞ্জাম অনেক বেশী ও উন্নত। কোন দিক দিয়ে তাদের সামনে আমাদের দাঁড়ানো ও টিকে থাকা সম্ভব নয়। তবে সত্য ও ন্যায়ের দ্বারা আমরা তাদের উপর জয়ী হতে পারি। তাই কারোর শত্রুতাকে নিজের পাপ থেকে বেশী ভয় করার প্রয়োজন নেই। আল্লাহর নিকট আমাদের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে, যেমন আমরা আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে তাঁর সাহায্য কামনা করে থাকি। তারপর তিনি মানসূরকে তাঁর অধীনস্থ সৈনিক ও সঙ্গী-সাথীদের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন, তাদেরকে কোন রকম কষ্ট না দেওয়ার কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, নিজেদের বাহন পশুগুলোর যত্ন নেওয়া, তাদেরকে বিশ্রাম দেওয়া এবং এজন্য পথে থেমে থেমে চলার কথা বলেছেন। কোন জনপদ এবং প্রতিপক্ষ কোন জনগোষ্ঠীর উপর যেন কোন রকম জুলুম-অত্যাচার না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। আর সকল ব্যাপারে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করতে বলেছেন। সবশেষে তিনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন:
'আমি তাকে এই নির্দেশ দিচ্ছি যে, আরব ও অনারবের মধ্যে সেই সব লোকই তাঁর গোয়েন্দা হওয়ার যোগ্য যাদের ইখলাস ও সততার উপর তিনি আস্থাশীল। কারণ যারা অসৎ ও মিথ্যাবাদী তাদের প্রদত্ত তথ্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, যদিও তার কোন কোন কথা সঠিক হয়। প্রতারক ও ধোঁকাবাজ আসলে তোমাদের জন্য নয়, বরং তোমাদের শত্রুপক্ষের গুপ্তচর হিসেবেই কাজ করে থাকে।'
ইসলামী খিলাফতের অনারব অঞ্চলে অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের ওঠা-বসার মধ্যে যাতে প্রত্যেকের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে এবং অতিরিক্ত মেলামেশার ফলে কোন রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি না হয় সেজন্য তিনি অনেক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। অমুসলিমরা যাতে কোনভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে না পারে, কোনভাবে মুসলমানদেরকে অসম্মান করার সুযোগ না পায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য তিনি আঞ্চলিক শাসনকর্তাদেরকে সজাগ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। একবার তিনি সকল আঞ্চলিক কর্মকর্তাদেরকে লিখলেন:
'অতঃপর এই যে, মহিমান্বিত আল্লাহ ইসলাম দ্বারা এর অধিকারীদেরকে সম্মানিত করেছেন, তাদেরকে মর্যাদাবান ও শক্তিশালী করেছেন। তাদের বিরোধীদেরকে করেছেন অপমান ও তুচ্ছ। তাদেরকে বানিয়েছেন মানুষের কল্যাণের জন্য সর্বোত্তম জাতি। অতএব মুসলমানদের কোন বিষয়ের দায়িত্ব তাদের যিম্মীদের হাতে অর্পণ করবেন না। তাহলে তারা তাদের হাত ও মুখের দ্বারা মুসলমানদের উপর দাপট দেখাবে। ফলে আল্লাহ তাদেরকে শক্তিশালী করার পর তারা তাদেরকে অপমান এবং সম্মানিত করার পর হেয় ও লাঞ্ছিত করার সুযোগ পাবে। তারা তাদের ধোঁকা ও প্রতারণার ফাঁদে আবদ্ধ করবে। তাছাড়া তাদের ধোঁকা থেকে নিরাপদও থাকবে না। আল্লাহ বলেছেন: ‘তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের ক্ষতি করার কোন সুযোগই হাতছাড়া করবে না। সবসময় তারা তোমাদের ক্ষতিই কামনা করে।’ ‘তোমরা ইহুদী ও নাসারাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু।’
এ সম্পর্কিত তাঁর আরেকটি ফরমানের ভাষা ছিল নিম্নরূপ:
'যারা অমুসলিম তাদেরকে নির্দেশ দিবে তারা যেন পাগড়ী পরিহার করে, অন্যান্য পোশাক পরে এবং ইসলামের সাথে সাদশ্যপূর্ণ কোন অনুকরণ না করে। আর কোন কাফির তথা অবিশ্বাসীকে কোন মুসলমানের সেবা গ্রহণ করার সুযোগ দেবে না।'
টিকাঃ
২০৯. রিজালুল ফিক্স ওয়াদ দা'ওয়া-১/৫৩-৫৪
২১০. প্রাগুক্ত
২১১. ইবন 'আবদিল হাকাম, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-৮৪
২১২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/১৭১
📄 ‘আকীদা বিষয়ে অহেতুক বিতর্কের অবসান ঘটান
'আকীদা অর্থ দৃঢ় প্রত্যয়, দৃঢ় বিশ্বাস। বিশ্বাসের এই দৃঢ়তা অর্জনের সবচেয়ে বড় উপায় হলো ধর্মীয় রহস্য ও প্রতীকসমূহ নিয়ে বেশী চিন্তা-ভাবনা ও ঘাটাঘাটি না করা। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয ব্যক্তিগতভাবে মাঝে মধ্যে এ ধরনের তর্ক-বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন। যখন তিনি খলীফা হলেন তখন 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ, মূসা ইবন আবী কাছীর ও 'উমার ইবন হামযা আসেন এবং তাঁর সাথে মুরাজিয়াদের "ইরজা" মতবাদটি নিয়ে আলোচনা করেন। উল্লেখ্য যে, "ইরজা” শব্দের অর্থ স্থগিত করা বা রাখা। আর এ থেকেই "মুরজিয়া” শব্দের উদ্ভব হয়েছে। হাশরের দিন আল্লাহর বিচারের পূর্ব পর্যন্ত পাপী মুসলমানদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দান স্থগিত রাখার কথা বলতেন মুরজিয়া চিন্তাবিদগণ। খারিজী ও শিয়া ছিল দু'টি চরমপন্থী চিন্তা-গোষ্ঠী। পক্ষান্তরে মুরজিয়াগণ ছিলেন মধ্যমপন্থী চিন্তা-গোষ্ঠী। যাই হোক, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয "ইরজা" বিষয়ে তাঁদের সাথে একমত পোষণ করেন। তবে তিনি সাধারণভাবে মানুষকে কখনো এমন সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হতে উৎসাহ দিতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁকে এ ধরনের একটি বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, শিশু ও মরুচারী বেদুঈনদের দীন ধারণ কর এবং অন্য সবকিছু ভুলে যাও। তিনি বলতেন, যখন কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে সাধারণ মানুষের সামনে এ ধরনের আলোচনা করতে দেখবে তখন বুঝবে তারা গোমরাহীর ভিত্তি রচনা করছে। ২ ১৩
সে যুগে 'আকীদার ক্ষেত্রে যে সকল নতুন নতুন প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার সৃষ্টি হয় মুহাদ্দিছগণের পরিভাষায় তাকে "আহওয়া” বলা হতো। আসলে তা ছিল পথভ্রষ্টতা ও বিভ্রান্তির নামান্তর। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময়কালে এ জাতীয় জিজ্ঞাসার মধ্যে "কাজা ও কদর"-এর চর্চা বেশী ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ চর্চা আরো তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন মা'বাদ আল-জুহানী ও গায়লান আদ-দিমাল্কীর মত দু'জন চিন্তাবিদ। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সর্বপ্রথম মা'বাদকে তাওবা করান এবং তিনি বাহ্যিকভাবে তাওবা করেনও। ২১৪ এরপর 'উমার সম্ভাব্য সকল প্রক্রিয়ায় এই মতবাদের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া দূর করার চেষ্টা করেন। সে যুগে সব ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও মতামতের প্রচার-প্রসার ও গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতো মুহাদ্দিছ ও ফকীহদের মাধ্যমে। এ কারণে 'উমার তাঁদেরকে এ সকল মতবাদ গ্রহণ না করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন, যাতে এ ব্যাধি গোটা জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। এই লক্ষ্যে একবার তিনি ইমাম মাকহুলকে লেখেন: ২১৫
"গায়লান ও তাঁর অনুসারীরা তাকদীর বিষয়ে যা বলে থাকেন, আপনি তা বলা থেকে বিরত থাকুন।"
'উমারের হস্তক্ষেপে এই বিতর্ক কিছু দিন স্তিমিত থাকলেও তাঁর মৃত্যুর পর আবার তীব্রভাবে মাথাচড়া দিয়ে ওঠে।
বিশ্বাস ও কর্মের সমষ্টির নাম ধর্ম। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময়ে এ দু'টি জিনিসেই মরিচা ধরে গিয়েছিল। 'আকায়েদ শাস্ত্রের কাজা ও কদর তথা তাকদীরের বিষয়টি এতই সূক্ষ্ম যে, সাধারণ মানুষকে যদি সে সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে ইসলামের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সরল বিষয়টি সহসাই মাটিতে পরিণত হবে। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময়ে যখন এই মারাত্মক বিষয়টি দেখা গেল এবং গায়লান আদ-দিমাক্বী এ বিষয়ে তর্ক-বিতর্কের পতাকা উড্ডীন করলেন তখন তিনি তাঁকে পাকড়াও করে তাওবা করান।
তিনি সবসময় মুসলমানদের রক্তপাত এড়িয়ে চলতেন। এ কারণে তাঁর সময়ে বিদ্রোহী খারেজীদের গর্দানও নিরাপত্তা লাভ করে। তবে তাকদীর বিষয়ের তর্ক-বিতর্কের মূলোৎপাটনের উপর তিনি এত অটল ছিলেন যে, এ জাতীয় লোকদের হত্যাকেও তিনি অপরাধ বলে মনে করতেন না। যেমন একবার তিনি আবূ সুহাইলকে প্রশ্ন করেন, কাদরীয়া তথা নিয়তীবাদীদের ব্যাপারে আপনার মত কি?
তিনি বলেন, যদি তাওবা করে ফিরে আসে তাহলে তো ভালো কথা, অন্যথায় তাদের ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা উচিত। 'উমার বললেন, এটাই সঠিক মত, সঠিক সিদ্ধান্ত। ২১৬
টিকাঃ
২১৩. তাবাকাত-৫/২৭৫, জামি'উ বায়ান আল-'ইলম-১৫৩
২১৪. তারীখ আল-খুলাফা'-২৪৪
২১৫. তাবাকাত-৫/২৮৪
২১৬. প্রাগুক্ত-৫/২৮৩
📄 সময়মত নামায আদায়ের প্রতি গুরুত্ব আরোপ
সালাত ও যাকাত একান্তই দু'টি ধর্মীয় বিষয়, কুরআনের বিভিন্ন স্থানে একই সাথে এ দু'টির আলোচনা এসেছে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পূর্বে এ দু'টি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিচালন ও অনুষ্ঠান ব্যবস্থা খুবই নিম্ন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে। সালাতের মূল জিনিস সময়ানুবর্তিতা। তাছাড়া 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মনে করতেন কুরআনের নিম্নের এ আয়াতটিতে সালাত বিনষ্টের যে কথা বলা হয়েছে তার অর্থ সময়মত আদায় না করা। আয়াতটি এই: ২১৭ 'তাদের পরে আসলো অপদার্থ পরবর্তীগণ, তারা সালাত নষ্ট করলো ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করলো। সুতরাং তারা অচিরেই কুকর্মের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।'
বানু উমাইয়্যারা, বিশেষতঃ হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ সালাত আদায়ে সময়ের পাবন্দী একেবারেই ছেড়ে দেয়। এ কারণে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয 'আদী ইবন আরতাতকে একটি চিঠিতে এই বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে লেখেন: ২১৮
'হাজ্জাজের অনুসরণ করবেন না। কারণ, সে সময়মত সালাত আদায় করতো না।'
'আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতীর (রহ) লেখায় জানা যায় যে, উমাইয়্যাদের এই বিদ'আত দূর করার গৌরব অর্জন করেন খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক। আসলে তিনিও এ কাজটি করেন এই 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পরামর্শক্রমে। 'আল্লামা সুয়ূতী সে কথা বলেছেন এভাবে: ২১৯
'এবং সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের অনেক ভালোর একটি ভালো ছিল যে, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর উযীর ও উপদেষ্টার মতো ছিলেন। তিনি কল্যাণমূলক কাজে 'উমারের নির্দেশ মেনে চলতেন। এ কারণে তিনি হাজ্জাজের সকল কর্মকর্তা- কর্মচারীদের অপসারণ করেন, ইরাকের কারাগারের বন্দীদেরকে মুক্তি দেন এবং প্রথম ওয়াকতে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করেন। অথচ বানু উমাইয়্যারা শেষ ওয়াকত পর্যন্ত বিলম্ব করে এই সালাতকে মৃতে পরিণত করে।'
নামায আদায়ের ব্যাপারে মসজিদের ইমামদেরকে নির্দেশ দেন, তারা যেন রাসূলুল্লাহ (সা) যেভাবে নামায আদায় করতেন সেভাবে নামায আদায় করে। তিনি আরো নির্দেশ দেন, মুয়াযযিন যখন ইকামত দেবে তখন মুসল্লীরা যেন কিবলামুখী দাঁড়িয়ে যায় এবং 'ঈদের নামাযে পায়ে হেঁটে যায়। তিনি আঞ্চলিক ওয়ালীদেরকে লেখেন: ২২০
'ঈদের নামাযে যে হেঁটে যেতে সক্ষম সে যেন হেঁটে যায়।' তিনি আরো বলেন, 'ঈদের নামাযে যাওয়ার আগে যেন খেজুর খেয়ে যায়।' ২২১ 'ঈদগাহে যাওয়ার আগে তোমরা খাও।' বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নরদের নির্দেশ দেন: ২২২
'তোমরা সালাতের সময় হলে সকল কাজ পরিত্যাগ করবে। কারণ, যে সালাত বিনষ্ট করবে সে ইসলামের অন্যান্য বিধিবিধান অধিকতর বিনষ্টকারী হবে।'
ব্যক্তিগতভাবেও তিনি মানুষকে সালাত আদায়ের ব্যাপারে সময়ের দিকে মনোযোগী হওয়ার তাকীদ দেন। একবার জনৈক ব্যক্তিকে তিনি মিসর পাঠাতে চান। সে রওয়ানা করতে একটু দেরী করে। লোক পাঠিয়ে তিনি তাকে ডেকে আনেন। সে ভীত-শংকিত অবস্থায় উপস্থিত হলে তিনি বলেন, ভয়ের কিছু নেই। আজ জুম'আ বার। জুম'আর নামায আদায় ব্যতীত এখান থেকে সরবে না। আমি তোমাকে একটি জরুরী কাজে পাঠাচ্ছিলাম। কিন্তু এই তাড়াহুড়ো যেন বিলম্বে নামায আদায়ের প্রতি উৎসাহিত না করে। যারা নামায বিনষ্ট করেছে এবং প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, তারা খুব শীঘ্র পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। তারা কিন্তু নামায একেবারে ত্যাগ করেনি, বরং তারা সময়ের পাবন্দী ছেড়ে দিয়েছিল।
সময়মত সালাত আদায়ের ব্যাপারে নির্দেশই শুধু দেননি, তার বাস্তবায়নও ঘটান। মুয়াযযিনদের বেতন নির্ধারণ করেন। ইবন সা'দ কুছায়িয়র ইবন যায়িদ থেকে বর্ণনা করেছেন: ২২৩
'আমি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালে খুনাসিরায় এসে দেখলাম, তিনি বায়তুল মাল থেকে মুয়াযযিনদের বেতন দিচ্ছেন।' তিনি আল-জাযীরার ওয়ালী 'আদী ইবন 'আদীকে লেখেন: ২২৪
'ঈমান হচ্ছে কিছু ফরয, কিছু বিধিবিধান ও কিছু সুন্নাতের সমষ্টিের নাম। যে ঈমানের এই অংশগুলো পূর্ণ করবে তার ঈমান পূর্ণ হবে। আর ঐগুলো যে পূর্ণ করবে না তার ঈমানও পূর্ণ হবে না। আমি যদি জীবিত থাকি তাহলে ঈমানের এ অংশগুলো আপনাদের সামনে এমন স্পষ্টরূপে তুলে ধরবো যাতে আপনারা তার উপর আমল করতে পারেন। আর যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আপনাদের সংগে থাকার লোভও আমার নেই।' তিনি যেভাবে এই অংশগুলো সংরক্ষণ করেন এবং তার প্রচার-প্রসারে যে পরিমাণ চেষ্টা- সাধনা করেন তা একেবারেই নজীরবিহীন। সে কাহিনী অনেক লম্বা, সংক্ষেপে বলা যায়, ইসলামী চেতনা ও প্রাণসত্তা তাঁর খিলাফতকালের বিশেষ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। ফলে জনসাধারণের মন-মানসিকতায় পরিবর্তন আসে এবং জাতির মেজায ও রুচি নতুনরূপ ধারণ করে। ঐতিহাসিক তাবারীর একটি বর্ণনায় একথার সত্যতা লাভ করা যায়। তিনি 'উমারের খিলাফতকালের এক ব্যক্তির মন্তব্য তুলে ধরেছেন এভাবে: ২২৫
'ওয়ালীদ ছিলেন ভবন ও শিল্প-কারখানার নির্মাতা এবং অধিক ভূ-সম্পত্তির অধিকারী। এ কারণে তাঁর সময়ে মানুষের সাধারণ রুচি এমনই হয়ে গিয়েছিল যে, যখন তারা পরস্পর মিলিত হতো তখন কেবল ভবন ও শিল্প-কারখানা সম্পর্কে আলোচনা করতো। তারপর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন সুলায়মান। তিনি ছিলেন বিয়ে পাগল ও ভোজনবিলাসী মানুষ। এ কারণে তাঁর সময়ে মানুষের পরস্পরের আলোচনার বিষয় ছিল বিয়ে-শাদী ও দাসী। কিন্তু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের যামানায় 'ইবাদাত-বন্দেগী মজলিসী আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করতো, রাতে তুমি কি করেছো, তুমি কতখানি কুরআন মুখস্থ করেছো, তুমি কুরআন কবে খতম করেছিলে, তুমি মাসে কতটি রোযা রাখ ইত্যাদি।'
টিকাঃ
২১৭. সূরা মারয়াম-৫৯
২১৮. ইবনুল জাওযী-৮৬-৮৮
২১৯. তারীখ আল-খুলাফা'-২২৬
২২০. তাহযীব আল-আসমা' ওয়াল লুগাত-২/২২
২২১. তাবাকাত-৫/৩৬২, ৩৬৩, ৩৮৫
২২২. ইবনুল জাওযী-১০২
২২৩. তাবাকাত-৫/৩৬৪
২২৪. ফাতহুল বারী-১/৪৫ (বুখারী: কিতাবুল ঈমান); রিজালুল ফিক্স ওয়াদ দা'ওয়া-১/৫২
২২৫. তারাবী, তারীখ-৩/৯৮
📄 হদ বা শরী‘আত নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ
হদ তথা শরী'আত নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে 'উমারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সালাত ও যাকাত কায়েমের মতো। এ ব্যাপারে তিনি আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের নিকট পাঠানো এক পত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন এভাবে: ২২৬
'আমার নিকট হদ কায়েম করা সালাত ও যাকাত কায়েম করার মতো।' বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকলে সে ক্ষেত্রে হদ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন: ২২৭
'প্রত্যেক সন্দেহের ক্ষেত্রে তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী হদ কায়েম থেকে বিরত থাক। কারণ একজন ওয়ালী বা শাসকের জুলুম ও শাস্তির ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার চেয়ে ক্ষমার ক্ষেত্রে ভুল করা শ্রেয়।'
তাঁর দৃষ্টিতে হদ কায়েম এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, নিজ হাতেও মাঝে মাঝে তা বাস্তবায়ন করেছেন। ‘উবাদা ইবনু নুসায় বর্ণনা করেছেন: ২২২
‘আমি ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযকে মদ পানের শাস্তি হিসেবে এক ব্যক্তিকে মারতে দেখেছি। তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তির দেহের কাপড় খুলে ফেলেন। তারপর আশিটি বেত্রাঘাত করেন। আমি তার দেহের কিছু ত্বক আহত ও কিছু অক্ষত দেখতে পেয়েছি। তারপর তিনি লোকটির উদ্দেশ্যে বলেন: যদি আবার পান করো তাহলে আবার পেটাবো। তারপর কারাগারে আটকে রাখবো- যতদিন না ভালো হবে। সে বললো: হে আমীরুল মু’মিনীন! আমি আল্লাহর নিকট তাওবা করছি যেন আর কখনো এ কাজ না করি। অতঃপর তাকে ছেড়ে দেন।’
হদ কায়েমের ব্যাপারে মিসরের ওয়ালীর নিকট পাঠানো তাঁর একটি পত্রে নিম্নের নির্দেশটিও ছিল: ২২৩
‘একমাত্র আল্লাহ নির্ধারিত কোন হদ ছাড়া সতর্কতামূলক শাস্তির ক্ষেত্রে তিরিশ বেত্রাঘাতের অধিক হবে না।’
পূর্ববর্তী উমাইয়্যা খলীফাদের সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ব্যাপারটি খুবই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। বহু মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এ কারণে তা রোধ করার উদ্দেশ্যে যে কোন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেন। তিনি আঞ্চলিক কর্মকর্তাদেরকে এ নির্দেশও দেন যে, তাঁকে না জানিয়ে যেন কোন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা না হয়। কুফার ওয়ালী আবদুল হামীদ ইবন আবদুর রহমানকে লেখা একটি পত্রে বলেন: ২৩০
'আমাকে না জানিয়ে কারো হাত কাটা বা ফাঁসিতে ঝোলানোর ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করবেন না।'
টিকাঃ
২২৬. তাবাকাত-৫/৩৭৮
২২৭. ইবনুল জাওযী-১২৬; হিলয়াতুল আওলিয়া-৫/৩১১
২২২. (২২৮) তাবাকাত-৫/৩৬৫
২২৩. (২২৯) প্রাগুক্ত-৫/৩৬৫, ৩৮৫
২৩০. তাবারী-৭/৪৭৩-৪৭৪; কিতাবুল আমওয়াল-২৭