📄 ‘উমার ইবন ‘আবদিল ‘আযীযের (রহ) সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড
ধর্ম, রাজনীতি, নৈতিকতা, সভ্যতা-সংসৃতি তথা বিশ্বের যাবতীয় ব্যবস্থাপনায় যখন মরিচা পড়ে যায় তখন আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন তা পরিষ্কারের জন্য একজন মুজাদ্দিদ তথা সংস্কারক সৃষ্টি করেন, যিনি যাবতীয় ব্যবস্থাপনার উপর পুঞ্জিভূত আবর্জনা সাফ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অবস্থায় বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে উপস্থাপন করেন।
সুলায়মান ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকাল পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসের শত বর্ষ পূর্ণ হয়ে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে ইসলামের ধর্ম, রাজনীতি, নৈতিকতা, সভ্যতা-সংসৃতি, মোটকথা জীবনের প্রতিটি ব্যবস্থাপনায় মরিচা পড়ে যায়। এ সকল বিষয়ের তাজদীদ ও ইসলাহের (সংস্কার ও সংশোধন) জন্য একজন মুজাদ্দিদের (সংস্কারক) প্রয়োজন ছিল। আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী (রহ) মিসরের মানুষ। তাই তাঁর বড় গর্ব এ জন্য যে, মিসরের মাটি সর্বপ্রথম 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দ্বারা মুজাদ্দিদের এই প্রয়োজন পূর্ণ করেছেন। শুধু তাই নয় তার পরেও একাধারে কয়েক শতক পর্যন্ত মিসরের মাটি এ প্রয়োজন পূর্ণ করতে থাকে। তিনি লিখেছেন: ১৩৮
"এ এক রহস্য যে, কয়েক শতকের সূচনায় যে সংস্কারকগণ জন্ম গ্রহণ করেছেন তাঁরা সকলে মিসরবাসী। প্রথম শতকে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয, দ্বিতীয় শতকে ইমাম আশ-শাফি'ঈ, সপ্তম শতকে ইবন দাকীক আল-'ঈদ এবং অষ্টম শতকে আল- বালকীনী (রহ)।"
তবে কালের অগ্রগামিতা ছাড়াও আরো অনেক দিক দিয়ে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) অন্যদেরকে অতিক্রম করে গেছেন। অন্যদের কর্মকাণ্ড যেখানে কেবল ধর্মীয় বিষয় ও গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) একজন খলীফা হওয়ার কারণে ধর্ম, নৈতিকতা, রাজনীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ণ ক্ষমতা ছিল। তাই তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সংশোধন ও সংস্কার করেন।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি কথা, কর্ম ও আচরণের দ্বারা এ কথা মানুষকে জানিয়ে দেন যে, তাঁর কর্ম পদ্ধতি হবে কিতাবুল্লাহ, সুন্নাতু রাসূলিল্লাহ (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদীনের কর্ম-পদ্ধতির ভিত্তিতে। এ কথা তিনি একটি উন্মুক্ত পত্রে মানুষকে জানিয়ে দেন এবং প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের নিকট পাঠিয়ে তা জনসাধারণকে পাঠ করে শোনাতে নির্দেশ দেন। একবার জুম'আর খুতবায় তিনি বলেন: ১৩৯
'আপনারা জেনে রাখুন, রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর দু'সঙ্গী যা কিছু চালু করেছেন তাই দীন। আমরা তা থেকে গ্রহণ করবো এবং সেখানেই বিরত থাকবো। তাঁদের দু'জন ছাড়া অন্যরা যা কিছু চালু করেছেন সে ব্যাপারে আমরা চিন্তা-ভাবনা করবো।'
আরেকবার তিনি বলেন: ১৪০
'রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর পরে তাঁর খলীফাগণ অনেক রীতি-পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন চালু করেছেন। সেগুলো গ্রহণ করা আল্লাহর কিতাবের সত্যায়ন ও আল্লাহর আনুগত্যের বাস্তবায়নের নামান্তর। সেগুলো পরিবর্তন-পরিবর্ধনের অধিকার কারো নেই। যে ব্যক্তি সেগুলোর বিরুদ্ধাচরণ করেছে তার প্রতি সদয় দৃষ্টিতে দেখার কোন সুযোগ নেই। যে ব্যক্তি অনুসরণ করবে সে সৎ পথপ্রাপ্ত হবে, যে সেগুলোর আলোকে দেখতে চাইবে, দেখতে পাবে। যে বিরোধিতা করবে এবং ঈমানদারদের পথের বিপরীত পথ অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাকে সেই দিকে ফিরিয়ে দিবেন যেদিকে সে ফিরে গেছে। পরিণামে তাকে জাহান্নামে ঢুকিয়ে দেবেন। জাহান্নাম অতি নিকৃষ্ট ঠিকানা।'
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেই শৈশবে যখন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মায়ের সাথে মদীনায় থাকতেন, মায়ের হাত ধরে নানা হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট যেতেন তখন ঘরে ফিরে এসে মাকে বলতেন, মা! আমি মামার মত ('আবদুল্লাহ ইবন 'উমার রা.) হতে চাই। মা আদর করে বলতেন, তুমি তাই হবে। তাই তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেই মদীনায় অবস্থানরত মামা সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ (মায়ের চাচাতো ভাই)-কে লিখলেন:
'আমার জন্য আপনি 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের জীবন ও কর্ম পদ্ধতি লিখে পাঠান যাতে আমি তা অনুসরণ করতে পারি।'
সালিম বললেন, আপনি তা অনুসরণ করতে পারবেননা। 'উমার জানতে চাইলেন, কেন আমি অনুসরণ করতে পারবো না? জবাবে সালিম লেখেন: ১৪১
'যদি আপনি তা অনুসরণ করতে পারেন, আপনি 'উমারের চেয়েও উত্তম মানুষে পরিণত হবেন। কারণ, 'উমার তাঁর কল্যাণমূলক কাজে অসংখ্য সহযোগী পেয়েছিলেন, কিন্তু আপনি তা পাবেন না।'
হয়তো তিনি 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) চেয়ে উত্তম হতে পারেননি, তবে ইতিহাস সাক্ষী, তিনি জীবন যাপনে ও খিলাফত পরিচালনায় 'উমারের (রা) যথার্থ অনুসারী হতে পেরেছিলেন। এখানে অতি সংক্ষেপে তাঁর কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ডের বর্ণনা উপস্থাপন করা হলো।
টিকাঃ
১৩৮. হুসনুল মুহাদারা-১/১৩৫
১৩৯. 'আবদুস সাত্তার আশ-শায়খ, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ), -২০৩
১৪০. প্রাগুক্ত
১৪১. তাবাকাত-৫/২৫২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-৮/২০০ সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৫/১২৭
📄 খিলাফতকে শূরা পদ্ধতিতে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) যদিও খলীফা নির্বাচন সংক্রান্ত ইসলামের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি এবং পূর্ববর্তী খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের অসীয়াত মত এই পবিত্র আমানত ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিকের হাতে অর্পণ করেন, তথাপি তিনি এই স্বৈরতান্ত্রিক পদ্ধতিকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করতেন। তার একান্ত ইচ্ছা ছিল খিলাফতকে শূরা পদ্ধতিতে ফিরিয়ে নেওয়ার, কিন্তু এত বড় মৌলিক পরিবর্তন করা তাঁর একার সাধ্য সীমার মধ্যে ছিল না। কারণ, নীতিগতভাবে তখন শাহী খান্দানে উত্তরাধিকার সূত্রের রাজতন্ত্র স্বীকৃত হয়ে গিয়েছিল এবং মুসলিম জনসাধারণও তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তাছাড়া তিনি এই পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট সময়ও পাননি।
তবে তিনি রাজতন্ত্রের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য দূর করার সিদ্ধান্ত নেন। এ লক্ষ্যে রাজকীয় দাপট, শক্তির প্রদর্শন ও সকল প্রকার বিকৃতি দূর করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, মাত্র তিরিশ মাসে রাষ্ট্রের প্রতিটি শাখা ও ক্ষেত্রে রাজতন্ত্রের ষাট বছরের পুঞ্জিভূত সকল আবর্জনা, প্রভাব ও চিহ্ন একেবারেই পরিষ্কার করে ফেলেন।
ইসলামের ইতিহাসে ব্যক্তিগত পসন্দের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রথম খলীফা ইয়াযীদ। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে খলীফা বলে স্বীকার করতেন না। একবার জনৈক ব্যক্তি তাঁর সামনে ইয়াযীদকে আমীরুল মু'মিনীন বলায় তিনি তাঁকে বিশটি চাবুক মারেন। ১৪২
সন্তানদের মধ্যে আবদুল মালিক ছিল তাঁর সর্বাধিক প্রিয়পাত্র। এই প্রিয়তম সন্তান মারা গেলে তাঁর প্রশংসায় কিছু কথা মুখ থেকে বের হলে মাসলামা বললেন, হে আমীরুল মু'মিনীন! যদি সে বেঁচে থাকতো তাহলে আপনি কি তাঁকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করতেন? বললেন না। মাসলামা বললেন: কেন? আপনি তো তার খুবই প্রশংসা করেন। বললেন: আমার ভয় হয়, পিতৃ-বাৎসল্য তার ব্যাপারে আমাকে বিপথগামী না করে ফেলে। ১৪৩
ব্যক্তিগত পসন্দ ও মতামতের ভিত্তিতে খলীফা নির্বাচনের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া আরো নানভাবে দৃশ্যমান হতো। যেমন গোটা শাহী খান্দান অস্বাভাবিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। খলীফাদের পক্ষ থেকে তারা নানা রকম বিশেষ ভাতা ও আর্থিক সুবিধা লাভ করতো। তাদেরকে জাতীয় সকল ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখা হতো। খলীফাদের ছিল জনসাধারণের উপর বিশেষ মর্যাদা। এমনকি নামাযের পরে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করার মত তাঁদের প্রতিও পাঠ করা হতো। মানুষ বিশেষ ভঙ্গিতে তাঁদেরকে সালাম করতো। তাঁরা যখন চলতেন তখন বিশেষ পতাকাবাহী, ঘোষক ও দেহরক্ষী সংগে সংগে চলতো। কোন জানাযায় অংশগ্রহণ করলে তাঁদের জন্য এক বিশেষ ধরনের চাদর বিছানো হতো। কিন্তু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খলীফা হওয়ার সাথে সাথে এসব রীতি-পদ্ধতি দূর করে সকলকে একই কাতারে নিয়ে আসেন। সুতরাং বেতন-ভাতা বণ্টনে এমন সমতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করেন যে, যারা বিশেষ সম্মান ও সুবিধা লাভে অভ্যস্ত ছিল তারা তাঁর থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যায়।
একবার তো গোটা মারওয়ান খান্দানের লোকেরা একজোট হয়ে তাঁর নিকট আসে এবং তাদের পূর্বের প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত্তিতে তাঁকে তিরস্কারমূলক ভাষায় বলে, আপনার পূর্ববর্তী খলীফাগণ আমাদেরকে যে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখতেন, আপনি তা একেবারেই উপেক্ষা করছেন। তিনি তাদেরকে বলেন যদি তোমরা আগামীতে এমন দাবী নিয়ে আস তাহলে আমি সোজা মদীনায় চলে যাব এবং এই খিলাফতকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির উপর ছেড়ে দেব। 'উ'য়াইমিশ অর্থাৎ কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা) এই খিলাফত পরিচালনার অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি। তাঁর নামটি আমার স্মরণ আছে। ১৪৪
সাধারণ মানুষের চাইতে শাহী খান্দানের লোকেরা যে সম্মান, মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতো সে সম্পর্কে তিনি আবু বকর ইবন হাযমকে লেখেন যে, সাধারণ সরকারী সমাবেশে খলীফার খান্দানের লোক বলে কাউকে কারো উপর প্রাধান্য দিবেন না। আমার দৃষ্টিতে তারা সকলে অন্য সব মুসলমানের সমান মর্যাদার অধিকারী। ১৪৫ একবার তাঁর নিজের এজলাসে একটি মোকদ্দমার একটি পক্ষ হিসেবে শ্যালক মাসলামা ইবন 'আবদিল মালিক উপস্থিত হন এবং দরবারের একটি সম্মানজনক আসনে বসে পড়েন। 'উমার তাঁকে সে আসন থেকে উঠে তার প্রতিপক্ষের সাথে বসার নির্দেশ দেন। তাকে আরো বলেন, যদি তার সাথে বসতে সংকোচ বোধ কর তাহলে উকিল নিয়োগ করে বেরিয়ে যাও। ১৪৬
নামায শেষে খলীফার প্রতি যে দরূদ-সালাম পেশের প্রথা চালু হয়েছিল তা বন্ধ করার লক্ষ্যে আল-জাযীরার ওয়ালীকে লেখেন যে, ওয়ায-নসীহতকারী যে সকল লোক এই বিদ'আত চালু করেছে তাদেরকে বলে দিন, দরূদ কেবল হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জন্যই পেশ করতে হবে এবং দু'আ করতে হবে সকল মুসলমানের জন্য। আর অন্য সকল কাজ-কর্ম পরিত্যাগ করতে হবে। ১৪৭
নিজের সম্পর্কে লেখেন যে, বিশেষভাবে আমার জন্য যেন দু'আ করা না হয়; বরং সে দু'আ হবে সকল মুসলমান নারী-পুরুষের জন্য। যদি আমার জন্যই করতে হয় তাহলে আমিও তো তাদের অন্তর্ভুক্ত। একবার জনৈক ব্যক্তি বিশেষভাবে তাঁকে সালাম করে। তিনি তাকে বলেন, সালাম করবে সাধারণভাবে। ১৪৮
খলীফাদের সাথে দায়িত্বশীল পুলিশ-কর্মকর্তা ও পতাকাবাহীদের চলার প্রথা চালু করেন যিয়াদ। হযরত আমীর মু'আবিয়া (রা) স্বীয় নিরাপত্তার জন্য সর্বপ্রথম দেহরক্ষী নিয়োগ করেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সম্পূর্ণভাবে এই প্রথা বিলোপ করেন। তিনি যখন তাঁর পূর্বসূরী খলীফা সুলায়মানের কাফন-দাফন শেষ করে খলীফা হিসেবে চলতে শুরু করেন তখন তাঁর দেহরক্ষী নিযা হাতে নিয়ে সাথে সাথে চলতে আরম্ভ করে। কিন্তু তিনি সামনে থেকে তাঁকে সরিয়ে দেন এবং বলেন, আমার এর কোন প্রয়োজন নেই। আমি তো অন্য সকল মুসলমানের মতই একজন মানুষ। তিনি সকলের সাথে পাশাপাশি চলে মসজিদে যান এবং স্বীয় খিলাফতের ঘোষণা দেন। ১৪৯
শাহী প্রাসাদে খলীফাদের জন্য বিশেষভাবে যে বিছানা পাতা হতো তা বিক্রি করে সে অর্থ বায়তুল মালে জমা করেন। জানাযায় অংশগ্রহণের সময় খলীফাদের জন্য অন্য সাধারণ মুসলমানদের থেকে পৃথক করে যে চাদর বিছানো হতো, যখন একটি জানাযায় তাঁর জন্য বিছানো হয়, তিনি তা পা দিয়ে গুটিয়ে রেখে বসে পড়েন। ১৫০
টিকাঃ
১৪২. তারীখ আল-খুলাফা'-২০৯
১৪৩. প্রাগুক্ত-২৪০
১৪৪. তাবাকাত-৫/২৫৩
১৪৫. প্রাগুক্ত-৫/২৫২
১৪৬. ইবনুল জাওযী-৭৩
১৪৭. প্রাগুক্ত-২৩৬
১৪৮. তাবাকাত-৫/২৭৮, ২৮৩
১৪৯. ইবনুল জাওযী-৫৩
১৫০. প্রাগুক্ত-৫৭
📄 বায়তুল মালের আয়ের সংশোধন
উমাইয়্যা শাসন আমলে বায়তুল মালে আয়-ব্যয়ের মধ্যে মাত্রা ছাড়া অনিয়ম ও অসামঞ্জস্য ছিল। আয়ের ক্ষেত্রে বৈধ-অবৈধ কোন বিবেচনায় আনা হতো না। বিবিধ প্রকার অবৈধ আয়ের দ্বারা রাষ্ট্রীয় কোষাগার, যাকে বায়তুল মাল বলা হয়, ভরে ফেলা হতো। তেমনিভাবে অবৈধ পন্থায় তা ব্যয়ও করা হতো। যে বায়তুল মাল হলো দেশের জনগণের সম্পদ তা একান্ত ব্যক্তিগত কোষাগারে পরিণত হয়। এর সিংহ ভাগ ব্যয় হতো খলীফাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও জীবিকার জন্য। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এ সকল অনিয়মের প্রতিবিধান করেন।
শাহী খান্দানের যাবতীয় বিশেষ ভাতা বন্ধ করে দেন। শাহী মহলের যাবতীয় ডেকোরেশনের বরাদ্দও বাতিল করেন। তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারী আঁস্তাবলের কর্মকর্তা আঁস্তাবলের পশুর জন্য অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানায়। তিনি বলেন, পশুগুলো বিক্রি করে সেই অর্থ বায়তুল মালে জমা দেওয়া হোক। আমার খচ্চরটি আমার জন্য যথেষ্ট। ১৫১
তিনি রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে বদলে দেন। পার্থিব রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তে 'খিলাফত 'আলা মিনহাজ আন-নুবুওয়াত' (নবুওয়াতের পদ্ধতিতে খিলাফত)-এ রূপান্তর ঘটান। তাঁর গোটা খিলাফতকালটাই ছিল এই একটি বাক্যের বাস্তব ব্যাখ্যা। তিনি রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ও স্বার্থের বিপরীতে সব সময় দীন, দীনের মূলনীতি ও নৈতিকতাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। দীনের প্রচার-প্রতিষ্ঠা ও জনগণের সুখ-সুবিধার বিপরীতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিকে কখনো গ্রাহ্যের মধ্যে আনেননি। একবার একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে তিনি লেখেন: ১৫২
'আল্লাহর কসম! আমি চাই সকল মানুষ মুসলমান হয়ে যাক এবং জিযিয়া খাতের আয় বন্ধ হওয়ার কারণে তুমি, আমি উভয়ে হাল চালিয়ে নিজ হাতের উপার্জন দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করি।'
খারাজ, জিযিয়া এবং বিভিন্ন ট্যাক্সই হলো ইসলামী রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস। এগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার উপরই নির্ভর করে দেশ ও সরকার উভয়ের স্থায়িত্ব, প্রাচুর্য ও সচ্ছলতা। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতকালের পূর্বে উল্লিখিত বিষয়গুলোর ব্যবস্থাপনা এতই নিম্নমানের হয়ে পড়েছিল যে, তা জনগণের উপর জবরদস্তী চাপিয়ে দেওয়ার জিনিসে পরিণত হয়। উদাহরণ স্বরূপ:
১. ইসলামে জিযিয়া কেবল অমুসলিমদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এ কারণে কোন খৃস্টান, ইহুদী বা অন্য কোন ধর্মের লোক ইসলাম গ্রহণ করলে তার উপর থেকে জিযিয়া রহিত হয়ে যেত। কিন্তু হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ এই পার্থক্য সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। তিনি নও মুসলিমদের নিকট থেকেও জিযিয়া আদায় করতেন। ১৫৩
২. নওরোয ও মারজান ছিল পারস্যবাসীর তাহ্ওয়ার বা আনন্দ-উৎসব। এর রীতি-প্রথার অনুসরণ কেবল পারসিকরাই করতে পারতো। কিন্তু হযরত মু'আবিয়া (রা) এ উপলক্ষ্যে তাদের নিকট থেকে মোটা অংকের অর্থ, যার পরিমাণ এক কোটি দিরহাম ছিল, উপহার স্বরূপ গ্রহণ করতে আরম্ভ করেন। ১৫৪
৩. হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের ভাই মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ যখন ইয়ামনের গভর্ণর নিযুক্ত হন তখন তিনি তথাকার অধিবাসীদের উপর ভীষণ নির্যাতন চালান এবং তাদের উপর এক প্রকার নতুন ট্যাক্স ধার্য করেন। ১৫৫
৪. ফুরাতে কিছু খারাজী ভূমি ছিল। যখন সেখানকার অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে এবং কিছু ভূমি অন্যদের থেকে হাত-বদল হয়ে মুসলমানদের অধিকারে আসে তখন নিয়ম অনুযায়ী এ সকল ভূমি 'উশরী ভূমিতে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাজ্জাজ তাঁর শাসনকালে তাদের নিকট থেকেও খারাজ আদায় করেছেন। ১৫৬
৫. জনসাধারণের উপর বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্স ধার্য করা হয়। মুদ্রা তৈরির উপর ট্যাক্স, রূপো গলানোর জন্য ট্যাক্স, দলিল ও আবেদন পত্র লেখালেখির উপর ট্যাক্স, দোকানের উপর ট্যাক্স, বিয়ে শাদীর জন্য ট্যাক্স, মোটকথা, জীবনের জন্য প্রয়োজন এমন কোন জিনিসই ট্যাক্সের আওতার বাইরে ছিল না। আর এ সকল ট্যাক্স মাসিক হিসেবে আদায় করা হতো। এজন্য এই অর্থকে 'মালে হিলালী' বা নতুন চাঁদের অর্থ বলা হতো। ১৫৭
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয খিলাফতের মসনদে আসীন হওয়ার পর দেখতে পেলেন যে, এমন কিছু আয় বায়তুল মালে জমা হয় যা শরী'আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ। আর কিছু আছে যা জনসাধারণের উপর বোঝা স্বরূপ। তিনি এ ধরনের আয় বন্ধের নির্দেশ দেন।
বায়তুল মালের আমদানী বৃদ্ধির লক্ষ্যে হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ নও-মুসলিমদের থেকেও জিযিয়া কর আদায় করতো। 'উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ফরমান জারী করেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করবে তাদের থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে না। এ ব্যাপারে তিনি হায়্যান ইবন শুরাইহকে যে পত্রটি লেখেন তা নিম্নরূপ: ১৫৮
'যিম্মীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের জিযিয়া রহিত করুন। কারণ, আল্লাহ তাবারাক ওয়া তা'আলা বলেছেন: 'যদি তারা তাওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' তিনি আরো বলেছেন: 'যাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনেনা ও শেষ দিনেও বিশ্বাস করে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম গণ্য করে না এবং সত্য দীন অনুসরণ করে না; তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যে পর্যন্ত না তারা নত হয়ে স্বহস্তে জিযিয়া দেয়।'
এই নির্দেশের পর অমুসলিমরা এত ব্যাপক হারে মুসলমান হতে শুরু করে যে, জিযিয়া রাজস্বে বিশাল ঘাটতি দেখা দেয়। হায়্যান ইবন শুরাইহ খলীফাকে জানালেন, ব্যাপক হারে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করায় রাজস্বে ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং আমাকে ঋণ নিয়ে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। ১৫৯
এই পত্রের জবাবে খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অত্যন্ত কঠোর ভাষায় যে জবাবটি দেন তা নিম্নরূপ: ১৬০
'অতঃপর এই যে, আপনার পত্র পেয়েছি, আপনার দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত থাকা সত্ত্বেও আমি আপনাকে মিসরের সেনাবাহিনীর দায়িত্ব প্রদান করেছি। আমি আমার দূতকে নির্দেশ দিয়েছি, সে যেন আপনার মাথায় বিশটি বেত্রাঘাত করে। যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের জিযিয়া রহিত করুন। আল্লাহ আপনার সিদ্ধান্তকে খারাপ করুন। আল্লাহ মুহাম্মাদকে (সা) পথ প্রদর্শক হিসেবে পাঠিয়েছেন, তাহসীলদার হিসেবে নয়।'
হীরার ওয়ালী 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমানের অনুরূপ একটি পত্রের জবাবে তিনি লেখেন: ১৬১
'হীরার অধিবাসীদের মধ্যে যে সকল ইহুদী, খৃস্টান ও অগ্নি উপাসক ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং যাদের উপর বিরাট অংকের জিযিয়া ধার্য ছিল, তাদের সম্পর্কে আপনি জানতে চেয়েছেন এবং তাদের নিকট থেকে জিযিয়া গ্রহণের অনুমতিও চেয়েছেন। শুনুন, মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ মুহাম্মাদকে (সা) ইসলামের দিকে আহ্বানকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন, ট্যাক্স কালেক্টর হিসেবে পাঠাননি। অতএব, ঐ সকল ধর্মাবলম্বীদের যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের উপর তাদের সম্পদের যাকাত প্রযোজ্য। তাদের উপর জিযিয়া প্রযোজ্য নয়। তাদের কোন রক্ত সম্পর্কীয় কেউ থাকলে সে তাদের উত্তরাধিকার লাভ করবে এবং মুসলমানদের অনুরূপ তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকবে। আর যদি কোন উত্তরাধিকারী না থাকে তাহলে তাদের পরিত্যক্ত সম্পদ বায়তুল মালে জমা হবে, যা মুসলমানদের মধ্যে বণ্টিত হবে। ওয়াস সালাম।'
আল-জাররাহ সম্পর্কে যখন তিনি জানতে পারলেন যে, তিনি নও-মুসলিমদের নিকট থেকে জিযিয়া আদায় করছেন তখন তাঁকে বরখাস্ত করেন। ১৬২ নও-মুসলিমদের উপর ধার্যকৃত জিযিয়া রহিতকরণের ব্যাপারে তিনি এত জোর দেন যে, একবার তিনি এক আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে লেখেন, যদি একজন যিম্মীর নিকট থেকে গৃহীত জিযিয়া ওযনের জন্য পাল্লায় রাখা হয়েছে, এমতাবস্থায় সে ইসলাম গ্রহণ করে তাহলেও তার জিযিয়া ফেরত দেওয়া হোক। তাঁর কথা ছিল বছর পূর্ণ হওয়ার একদিন আগেও যদি কোন যিম্মী ইসলাম গ্রহণ করে তাহলেও তাঁর কাছ থেকে সে বছরের জিযিয়া গ্রহণ করা যাবে না। ১৬৩
নওরোয ও আনন্দ-উৎসবের উপহার-উপঢৌকন সম্পর্কে তিনি নির্দেশ দেন, এসব উপহার-উপঢৌকনের কোন জিনিস যেন তাঁর নিকট পাঠানো না হয়।
হাজ্জাজের ভাই মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ ইয়ামনবাসীদের উপর যে নতুন খাজনা-ট্যাক্স ধার্য করেছিলেন তিনি তা রহিত করে তাদের উপর কেবল 'উশর ধার্য করেন।
ফুরাতের তীরে বসবাসকারী মুসলমানদের যে সকল ভূমিকে হাজ্জাজ দ্বিতীয়বার খারাজী ভূমির অন্তর্ভুক্ত করেন, তিনি তা বাতিল করে 'উশরী ভূমির অধিভুক্ত করেন।
জনগণের উপর ধার্যকৃত সকল অযৌক্তিক খাজনা-ট্যাক্স তিনি রহিত করার ঘোষণা দেন। আরবী ভাষায় এ জাতীয় ট্যাক্সকে 'মুক্ত' বলে। এ কারণে তিনি বলতেন, এ সকল অন্যায় ট্যাক্স 'মুক্ত' নয়, বরং একে 'বাখস' বলা সঙ্গত, যে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
'তোমরা লোকদেরকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিও না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে বেড়িও না।' ১৬৪
খারাজের ব্যাপারে তিনি 'আবদুল হামীদ ইবন 'আবদির রহমানকে যে পত্রটি লেখেন সেটি কাজী আবু ইউসুফ হুবহু বর্ণনা করেছেন। উক্ত পত্রে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কর্ম পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে বিধৃত হয়েছে। ১৬৫
'ভূমি জরীপ করুন। অনাবাদী ভূমির বোঝা আবাদী ভূমির উপর এবং আবাদী ভূমির ভার অনাবাদী ভূমির উপর চাপাবেন না। অনাবাদী ভূমি জরীপ করুন। তাতে যদি কিছু উৎপাদন ক্ষমতা থাকে তাহলে সেই অনুপাতে খারাজ ধার্য করুন। এ ধরনের ভূমির পরিচর্যা করুন, যাতে তা পূর্ণ আবাদী ভূমিতে পরিণত হয়। যে সকল আবাদী ভূমিতে কোন ফসল হয় না তা থেকে কোন খারাজ নিবেন না। কোন ভূমিতে উৎপাদন কম হলে খারাজ আদায়ের ক্ষেত্রে মালিকের সাথে সদয় আচরণ করবেন। খারাজের ক্ষেত্রে কেবল সাত প্রকার ওযনযোগ্য জিনিস গ্রহণ করবেন, তার মধ্যে সোনা থাকবে না। যারা সোনা- রূপা গলায় তাদের থেকে ট্যাক্স, ঈদ ও আনন্দ উৎসবের উপঢৌকন, দলিল- দস্তাবেজ লেখক ও মুহুরী থেকে এবং বাড়ী-ঘর, বিয়ে শাদী ইত্যাদি থেকে কোন ট্যাক্স নেওয়া যাবে না। কোন যিম্মী মুসলমান হলে তার উপর কোন খারাজ নেই।'
ফসল ভালো হোক কিংবা মন্দ হোক, য়ামনের রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট হার নির্ধারিত ছিল। এতে কৃষকদের ভীষণ কষ্ট হতো। বিষয়টি য়ামনের তৎকালীন ওয়ালী 'উরওয়া ইবন মুহাম্মাদ খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লিখে জানালেন। জবাবে 'উমার তাঁকে লিখলেন: ১৬৬
'অতঃপর এই যে, আপনি আপনার পত্রে উল্লেখ করেছেন য়ামনে গিয়ে আপনি দেখতে পেয়েছেন যে, সেখানের অধিবাসীদের উপর নির্দিষ্টভাবে খারাজ বা খাজনা ধার্য করা আছে। জিযিয়ার মত তা তাদের কাঁধের উপর চেপে বসে আছে। ফসল হোক বা না হোক, বাঁচুক বা মরুক সর্ব অবস্থায় তারা তা পরিশোধ করতে বাধ্য। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন অতি পবিত্র। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন অতি পবিত্র। আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন অতি পবিত্র। অতএব, যে অন্যায়কে তুমি অপছন্দ কর তা ছেড়ে দাও, এমনকি যে সত্যকে তুমি পছন্দ কর তারও কিছু। অতঃপর নতুন করে সত্যকে আমার ও তোমার পক্ষ থেকে বাস্তবায়িত কর। এতে যদি আমাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং গোটা য়ামন থেকে অতি সামান্য কিছুই আসুক না কেন তাতে কোন পরোয়া নেই। আল্লাহ জানেন, আমি ভীষণ খুশি হই যখন আমাদের কাজ হয় সত্যের অনুকূলে। ওয়াস-সালাম!'
তিনি স্থল ও সমুদ্র পথ খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং সকল প্রকার বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা ও কঠোর বিধি-নিষেধ রহিত করেন। তিনি বলেন: ১৬৭
'আর সমুদ্রের ব্যাপারে আমাদের মত হলো, সাগর-পথ স্থল পথের মতই। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন : 'আল্লাহই তো সমুদ্রকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তাঁর আদেশে তাতে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে ও যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পার এবং যেন তোমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।' সমুদ্র পথে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে চায় আল্লাহ তাদের অনুমতি দিয়েছেন। আমরা এর মধ্যে প্রতিবন্ধক হতে চাই না। কারণ, আল্লাহ জল ও স্থল উভয়কে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তারা সেখানে রুজি-রিযিকের সন্ধান করতে পারে। সুতরাং আমরা কিভাবে আল্লাহর বান্দাহগণ ও তাদের জীবিকার মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারি?'
পূর্ববর্তী খলীফাদের সময় ধার্যকৃত যাবতীয় 'উশর ও কর তিনি কমিয়ে দেন। তিনি নিয়ম চালু করেন, কেউ বাৎসরিক কর-খাজনা পরিশোধ করলে তাকে একটি পরিশোধ-পত্র দেওয়া হবে। তিনি বিধান জারি করেন: ১৬৮
'মুসলমানদের সম্পদের যাকাত দিতে হবে। কেউ সে যাকাত বায়তুল মালে জমা দিলে তাকে একটি দায় মুক্তি-পত্র দেওয়া হবে। সেই বছরের জন্য তার সেই সম্পদের উপর আর কোন ট্যাক্স-কর ধার্য হবে না।'
টিকাঃ
১৫১. তারীখ আল-খিলাফা'-২৩০
১৫২. তারীখ আল-'আরাব-২৮৪, ২৮৬
১৫৩. তারীখ আল-মাকরীযী-৭৭-৭৮
১৫৪. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/২৫
১৫৫. ফুতূহ আল-বুলদান-৮০
১৫৬. প্রাগুক্ত-৩৭৫
১৫৭. কিতাবুল খারাজ-৪৯
১৫৮. জামহারাতু রাসায়িল আল-'আরাব-২/২৯৫
১৫৯. প্রাগুক্ত-২/২৯৫-২৯৬
১৬০. প্রাগুক্ত
১৬১. কিতাবুল খারাজ-১৩১
১৬২. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩৬২
১৬৩. তাবাকাত-৫/২৬২
১৬৪. তাবাকাত-৫/২৮৩; তারখী আল-মাকরীযী-১/১০৩
১৬৫. কিতাবুল খারাজ-৮৬
১৬৬. ইবনুল জাওযী-১২৬; তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/৩০৬
১৬৭. ইবনুল জাওযী-৯৯; রিজালুল ফিক্স ওয়াদ-দা'ওয়া-৪৫
১৬৮. ইবনুল জাওযী-৯৮
📄 যাকাত ও সাদাকা
যদিও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের খিলাফতের এই বরকত ছিল যে মানুষ যখন তাঁর খলীফা হওয়ার খবর পেল তখন তারা স্বেচ্ছায় খুব দ্রুত সাদাকায়ে ফিতর আদায় করতে আরম্ভ করলো। এমনকি তাঁর একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা লিখলেন যে, প্রচুর সাদাকায়ে ফিতর জমা হয়ে গেছে। কি করতে হবে সে ব্যাপারে আপনি অবহিত করুন। তা সত্ত্বেও তিনি মানুষকে যথাযথভাবে যাকাত-সাদাকা আদায়ের ব্যাপারে তীব্রভাবে উৎসাহিত করতেন। একবার খুনাসিরায় 'ঈদের একদিন পূর্বে জুম'আর খুতবা দেন। তাতে তিনি মানুষকে সাদাকায়ে ফিতর আদায়ের ব্যাপারে প্রচণ্ড তাকিদ ও উৎসাহ দেন। খুতবায় তিনি বলেন, যে ব্যক্তি যাকাত দেয় না তার নামায কবুল হয় না। মানুষ আটা, ছাতু নিয়ে আসতো, আর তিনি তা গ্রহণ করতেন।
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ যাকাত ব্যবস্থার সর্বনাশ করে ফেলেন। যাকাতের শরী'আত নির্ধারিত আয়-ব্যয়ের যে খাত ছিল হাজ্জাজ তার অনুসরণ একেবারেই ত্যাগ করেন। এ কারণে তিনি আঞ্চলিক কর্মকর্তাদেরকে হাজ্জাজের অনুসরণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেন। একবার হাজ্জাজ সম্পর্কে 'আদী ইবন আরতাতকে একটি দীর্ঘ পত্র লেখেন। তাতে তিনি লেখেন: ১৬৯
'নামাযের ব্যাপারে আমি আপনাকে হাজ্জাজের অনুকরণ থেকে বিরত থাকতে বলছি। কারণ, সে সময়মত সালাত আদায় করতো না। তেমনিভাবে যাকাতের ব্যাপারেও তাকে অনুসরণ করতে নিষেধ করছি। কারণ, সে যেমন অন্যায়ভাবে যাকাত আদায় করতো তেমনি বে-মাওকা খরচও করতো। তার এসব কাজ থেকে দূরে থাকুন। তার অনুকরণের ব্যাপারে সতর্ক হোন। মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ তার থেকে মানুষকে স্বস্তি দিয়েছেন এবং জনগণ ও দেশকে তার অনিষ্ট থেকে পবিত্র করেছেন। ওয়াস সালাম!'
একবার তিনি জানতে পারলেন যে, 'আদী ইবন আরতাত মদ থেকেও 'উশর আদায় করছেন। তাঁকে লিখলেন, বায়তুল মালে কেবল হালাল মাল ঢোকান। ১৭০
আঞ্চলিক ওয়ালীদেরকে তিনি সাদাকায়ে ফিতরের ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন এভাবে: ১৭১
'তোমাদের পূর্বে যারা সেখানে আছে তাদেরকে নির্দেশ দাও, তাদের স্বাধীন-দাস, ছোট- বড়, নারী-পুরুষ কেউই রমাদানের সাদাকায়ে ফিতর আদায় থেকে রেহাই পাবে না। প্রত্যেকের জন্য দুই মুদ গম অথবা এক সা' খোরমা অথবা এর মূল্য অর্ধ দিরহাম। ভাতা প্রাপ্তদের ভাতা থেকে তাদের নিজেদের ও পরিবার-পরিজনদের সাদাকা কেটে রাখা হবে। আর সাদাকা সংগ্রহের জন্য দু'জন বিশ্বস্ত লোক নিয়োগ কর। যারা সংগ্রহ করবে, অতঃপর স্থায়ীভাবে বসবাসকারী মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করবে। তবে পল্লীবাসী বেদুঈনদের মধ্যে বণ্টন করবে না।'
এ সকল সংস্কারমূলক কাজ করার সাথে সাথে এ বিষয়েও সতর্ক ছিলেন, যেন কোনভাবেই যাকাত-সাদাকা আদায়ে কোন অন্যায় করা না হয়। প্রথমদিকে বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রধান প্রধান সড়কে বসে যাকাত আদায় করা হতো, কিন্তু যখন জানতে পারলেন, এ পদ্ধতিতে মানুষ নানাভাবে ফায়দা উঠাচ্ছে তখন তা বাতিল করেন এবং তার পরিবর্তে প্রত্যেক শহর ও জনপদে একজন করে যাকাত-সাদাকা আদায়কারী নিয়োগ দেন। ১৭২
রাজস্ব খাতে এত উদারতা প্রদর্শন ও ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের সময় যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় হতো তা রীতিমত বিস্ময়কর। তাঁর সময়ের সাথে হাজ্জাজের অত্যাচার-উৎপীড়নমূলক সময়ের কোন তুলনাই চলে না। 'উমার নিজেই গর্বের সাথে বলতেন, হাজ্জাজের উপর আল্লাহর লা'নত! তার না ছিল কোন ধর্মীয় যোগ্যতা, আর না ছিল পার্থিব যোগ্যতা। হযরত 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) ইরাক থেকে ১০ কোটি ৮০ লাখ দিরহাম, যিয়াদ ১০ কোটি ২৫ লাখ দিরহাম আদায় করতেন। হাজ্জাজ জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও সেখান থেকে মাত্র দু'কোটি আশি লাখ আদায় করতে সক্ষম হয়। সে কৃষকদেরকে বিশ লাখ দিরহাম ঋণ দেয় এবং এক কোটি ষাট লাখ দিরহাম আদায় করে। কিন্তু ইরাক যখন আমার অধীনে আসে তখন আমি সেখান থেকে দশ কোটি চব্বিশ লাখ দিরহাম আদায় করি। আমি যদি বেঁচে থাকি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সময়ের চাইতেও বেশী আদায় করবো। ১৭৩
টিকাঃ
১৬৯. ইবনুল জাওযী-৮৬-৮৮; জামহারাতু রাসায়িল আল-'আরাব-২/৩৭১
১৭০. তাবাকাত-৫/২৮০
১৭১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/১৭১
১৭২. তাবাকাত-৫/২৮৩
১৭৩. আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১২৪