📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 খলীফা সুলায়মান ইবন ‘আবদিল মালিকের মৃত্যু ও ‘উমারের খলীফা হিসেবে মনোনয়ন লাভ

📄 খলীফা সুলায়মান ইবন ‘আবদিল মালিকের মৃত্যু ও ‘উমারের খলীফা হিসেবে মনোনয়ন লাভ


'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) স্বীয় গুণ-বৈশিষ্ট্য ও সৎ স্বভাবের জন্য তাঁর খান্দানের সকল সদস্যের অত্যন্ত প্রীতিভাজন ব্যক্তি ছিলেন। বিশেষতঃ খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের তাঁর উপর এত আস্থা ও নির্ভরতা ছিল যে, তিনি তাঁকে মন্ত্রী ও উপদেষ্টার মর্যাদা দান করেন। তিনি সকল ভালো কাজ 'উমারের পরামর্শ মতো করতেন। মূলতঃ তাঁর সকল জনকল্যাণ ও সংস্কারমূলক কাজ 'উমারের পরামর্শ ও প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়। এমনকি হিজরী ৯৬ সনে সুলায়মান খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণকালে 'উমার তাঁর পক্ষে দিমাঙ্কবাসীর বাই'আত গ্রহণ করেন। খলীফা 'আবদুল মালিক যখন সুলায়মানকে খিলাফতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে যাচ্ছিলেন তখন 'উমারই নির্ভীকচিত্তে তার প্রতিবাদ করেন। তাই সবকিছু মিলিয়ে খলীফা সুলায়মানের ছিল তাঁর উপর দৃঢ় আস্থা ও নির্ভরতা। এ কারণে তাঁর পরে যাঁরা খলীফাপদের অধিকারী ও যোগ্য বিবেচিত হতে পারতেন তাঁদের মধ্যে 'উমারও ছিলেন অন্যতম। তাই সীল- মোহরকৃত সম্পূর্ণ অজ্ঞাতনামা পরবর্তী খলীফার অঙ্গীকার পত্রের উপর খলীফা সুলায়মান যখন সকলের বাই'আত গ্রহণ করেন তখন 'উমারের সন্দেহ হয় যে, এই অঙ্গীকার পত্রের মধ্যে তার নিজের নামটি নেই তো? অবশেষে তাঁর সেই সন্দেহ সত্যে পরিণত হয়।
খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের বয়স্ক সন্তানদের মধ্যে ছিলেন কেবল আয়্যব নামে এক পুত্র। অন্যরা সকলে ছিল ছোট। সুলায়মান পরবর্তী খলীফা হিসেবে তাঁকেই মনোনীত করেন। কিন্তু সুলায়মানের পূর্বেই তিনি মারা যান। অতঃপর তাঁর সন্তানদের অন্য কেউই খিলাফতের দায়িত্ব লাভের উপযুক্ত ছিল না। হিজরী ৯৯ সনের সফর মাসের প্রথম জুম'আর দিন খলীফা সুলায়মান 'দাবিক' নামক স্থানে ছিলেন। দাবিক হলো হলবের নিকটবর্তী একটি সেনা ছাউনী, রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় বানু উমাইয়্যারা সেখানে অবস্থান করতো। এ সময় সুলায়মান তাঁর ভাই মাসলামা ইবন 'আবদিল মালিকের নেতৃত্বে একটি বিশাল বাহিনী কনস্টান্টিনোপল অভিযানে পাঠান। সংগে তাঁর খান্দানের বিপুল সংখ্যক সদস্যও ছিলেন। এখানে অবস্থানকালে তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। জীবন সম্পর্কে যখন হতাশ হয়ে পড়েন তখন পরবর্তী খলীফা মনোনীত করার ইরাদা করেন। কিন্তু কাকে করবেন? পুত্র সন্তানদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক তো কেউ নেই। অগত্যা জীবিত সন্তানদের মধ্যে অপ্রাপ্ত বয়স্ক জ্যেষ্ঠ পুত্রকে খলীফা মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় প্রখ্যাত তাবি'ঈ রাজা' ইবন হায়ওয়া ও 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। উল্লেখ্য যে, হযরত রাজা' ছিলেন খলীফা সুলায়মানের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও উপদেষ্টা। তাই তিনি রাজা'কে বলেন: আমার ছেলেটিকে খিলাফতের পোশাক 'আবা ও চাদর পরিয়ে আমার সামনে হাজির করুন। তাকে আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিয়ে উপস্থিত করা হলো। দেখলেন, সে একেবারেই ছোট। যে পোশাক সে পরেছে তা বইতে পারছে না, মাটিতে টেনে চলছে। তিনি রাজা'কে আবার বললেন: তাঁর কাধে তরবারি ঝুলিয়ে আমার সামনে হাজির করুন। তাই করা হলো। দেখলেন, সে তা বহনের উপযুক্ত নয়। তখন তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় নিম্নের চরণটি:
'আমার সন্তানরা সকলে ছোট্ট শিশু। সেই ব্যক্তিই সফলকাম যার বড় সন্তান- সন্ততি রয়েছে।'
পাশেই বসা 'উমার বলে উঠলেন: ৮৪
'নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে যে পবিত্রতা অর্জন করে এবং তার প্রতিপালকের নাম স্মরণ করে ও সালাত কায়েম করে।'
অপর একটি বর্ণনায় রয়েছে, খলীফা সুলায়মানের পুত্র আয়্যব জীবিত ছিল। তবে তখনো খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের মতো বয়স তাঁর হয়নি। এ প্রসঙ্গে রাজা' ইবন হায়ওয়া বলেছেন, দাবিকে সুলায়মান যখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী তখন একদিন আমি তাঁর নিকট গেলাম। দেখলাম, তিনি কি যেন লিখছেন। বললাম: আমীরুল মু'মিনীন! কি করছেন? জবাব দিলেন: আমি আমার পুত্র আয়্যবকে খলীফা মনোনীত করার অঙ্গীকার পত্র লিখছি। আমি তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললাম: আমীরুল মু'মিনীন! পরবর্তী খলীফা এমন একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে বানিয়ে যান যার কারণে আপনি কবরেও নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে থাকতে পারবেন। সুলায়মান বললেন: এ আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, বিষয়টি আমি আরো একটু ভেবে দেখবো। এ ব্যাপারে আল্লাহর নিকট ইসতিখারা বা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য তাওফীক কামান করবো। এরপর তিনি দু'দিন গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তার পর পূর্বের লেখা অঙ্গীকার পত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। তারপর রাজা'কে ডেকে জিজ্ঞেস করেন আমার আরেক পুত্র দাউদের ব্যাপারে আপনার মত কি? রাজা' বললেন সে তো বর্তমানে কনস্টান্টিনোপলে, জীবিত আছে কি মারা গেছে তা আমাদের জানা নেই। সুলায়মান বললেন: তাহলে এই খলীফা মনোনয়নের ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কি? রাজা' বললেন: প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক তো আপনি। আপনি কারো নাম বলুন, আমি ভেবে দেখবো। সুলায়মান বললেন:
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের ব্যাপারে আপনার ধারণা কি? অপর একটি বর্ণনায় এসেছে, 'উমারের নামটি রাজা'ই উচ্চারণ করেন। যাই হোক, রাজা' বললেন, আমি মনে করি তিনি একজন জ্ঞানী ও ভালো মুসলমান। সুলায়মান বললেন, আল্লাহর কসম! সে এমনই। কিন্তু আমি যদি 'আবদুল মালিকের সন্তানদের একেবারে উপেক্ষা করে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে খলীফা মনোনীত করে যাই তাহলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে। যদি তার পরে 'আবদুল মালিকের কোন ছেলের নাম প্রস্তাব না করে যাই তাহলে তারা তাঁকে খিলাফতের মসনদে আসীন হতেই দেবে না। এ কারণে আমি 'উমারের পরে খলীফা হিসেবে ইয়াযীদের নাম মনোনীত করে যাচ্ছি। তিনি আরো বলেন : 'আমি অবশ্যই এমন একটি অঙ্গীকার পত্র লিখে যাবো যেখানে শয়তানের কোন অংশ থাকবে না।' ৮৬ এতে তারা শান্ত থাকবে এবং তাকে মেনে নেবে। রাজা'ও তাঁর সাথে একমত পোষণ করেন। এরপর সুলায়মান নিজ হাতে এ অসীয়ত নামা লেখেন: ৮৭
'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। এই লেখা আল্লাহর বান্দাহ্ সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক, আমীরুল মু'মিনীনের পক্ষ থেকে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের জন্য। আমি আমার পরে তাঁকে খলীফা বানালাম এবং তার পরে খলীফা মনোনীত করলাম ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিককে। আপনারা তার কথা শুনুন, আনুগত্য করুন এবং আল্লাহকে ভয় করুন। মতবিরোধ সৃষ্টি করবেন না, তাহলে সুযোগ সন্ধানীরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে।'
ইবন কুতায়বা সংকলিত এই অঙ্গীকার পত্রটি একটু দীর্ঘ ও ভিন্ন প্রকৃতির। তার শেষ প্যারাটি নিম্নরূপ:৮৮
“আমার সেনাবাহিনী, প্রজা সাধারণ, বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাধারণ জনগণ এবং আল্লাহ যাদের খিলাফতের দায়িত্ব আমাকে দান করেছেন, তাদের সকলের জন্য সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি আমার চাচাতো ভাই 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে আমি আমার পরবর্তী খলীফা হিসেবে মনোনীত করলাম। আমি তার জাহিরী ও বাতিনী, প্রকাশ্য ও গোপন উভয় অবস্থা পরীক্ষা করেছি। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেছি, তাঁর রিজামন্দী ও রহমত কামনা করেছি। তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসেবে ইয়াযীদ ইবন 'আবদিল মালিককে মনোনীত করেছি। আমি 'উমারের মধ্যে কেবল ভালো ছাড়া খারাপ কিছু দেখিনি। আমার ছোট-বড় সকল সন্তানকে 'উমারের যিম্মাদারীতে রেখে গেলাম। তিনি তাদেরকে কেবল সত্য-সঠিক পথে পরিচালিত করবেন। তাদের জন্য এবং সকল মু'মিন-মুসলমানদের জন্য কেবল আল্লাহ আমার প্রতিনিধি। তিনিই দয়াময়, করুণাময়, আপনাদের প্রতি আমার সালাম ও আল্লাহর রহমত। কেউ আমার এ অঙ্গীকার অস্বীকার ও বিরোধিতা করলে তরবারি দ্বারা তাকে সোজা করা হবে। আশা করি কেউ বিরোধিতা করবে না। আর কেউ করলে সে হবে পথভ্রষ্ট এবং মানুষকে বিপথে পরিচালনাকারী। তাকে তাওবা করতে বলা হবে। যদি করে, তবে ভালো। অন্যথায় তরবারি দ্বারা সোজা করা হবে। আল্লাহর নিকটই সাহায্য চাওয়া হয়। আল্লাহ ছাড়া নেই কোন শক্তি, নেই কোন ক্ষমতা।”
অঙ্গীকার পত্র লেখার পর তাতে সীল-মোহর করেন। তারপর খান্দানের সকলকে একত্রিত করেন। রাজা'কে নির্দেশ দেন, এই অঙ্গীকার পত্রটি নিয়ে তিনি খান্দানের সমবেত লোকদের নিকট যাবেন এবং তাদেরকে বলবেন, খলীফার এই সীল মোহরকৃত অঙ্গীকার পত্রে যাকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করেছেন তারা যেন তাঁর আনুগত্যের শপথ তথা বাই'আত করেন। রাজা' খলীফার নির্দেশ পালন করেন। সমবেত সকলে সমস্বরে ('আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম') বলে ইতিবাচক সায় দেন। তারপর তাঁদের আবেদনের প্রেক্ষিতে খলীফা সুলায়মানের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি দান করা হয়। তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করলে সুলায়মান রাজা'র হাতে থাকা অঙ্গীকার পত্রটির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: 'এর মধ্যে আমি যাকে খলীফা বানিয়েছি তার প্রতি বাই'আত কর এবং তার আনুগত্য কর।' সুলায়মান একথা বলার পর দ্বিতীয়বার প্রত্যেকের নিকট থেকে পৃথক পৃথকভাবে বাই'আত গ্রহণ করা হয়।
'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের প্রবল ধারণা ছিল, সুলায়মান তাঁকেই খলীফা মনোনীত করেছেন। তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালনে মোটেই ইচ্ছুক ছিলেন না। এ কারণে তিনি একাকী রাজা'ের নিকট গিয়ে বলেন: আমার প্রতি সুলায়মানের যে পরিমাণ স্নেহ-মমতা আছে এবং আমাকে যে রকম অনুগ্রহ দেখিয়েছেন তাতে আমার ধারণা হয়, তিনি আমাকেই খলীফা মনোনীত করেছেন। যদি এমন হয় তাহলে আমাকে আগে ভাগেই বলে দিন যাতে আমি ঘোষণা দেওয়ার পূর্বেই অব্যাহতি নিয়ে নিতে পারি। কিন্তু রাজা' তা জানাতে অস্বীকার করেন। 'উমার ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে যান। হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকও ঠিক একই রকম আবেদন জানান রাজা'র নিকট। কিন্তু রাজা' তাকেও একই জবাব দেন।
খলীফা মনোনয়নের পর্ব শেষ হওয়ার পরেই সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক ইনতিকাল করেন। রাজা' অত্যন্ত দায়িত্ব ও সতর্কতার সাথে সুলায়মানের মনোনয়ন পত্রের বিষয়বস্তু এবং তাঁর মৃত্যুর কথা গোপন রাখলেন। তিনি দ্বিতীয়বার দাবিকের জামে' মসজিদে শাহী খান্দানের সদস্যদের সমবেত করেন। তারপর সকলকে লক্ষ্য করে বলেন: আমীরুল মু'মিনীনের এই মনোনয়ন পত্রে যাঁর নাম আছে তাঁর প্রতি আপনারা দ্বিতীয়বার বাই'আত করুন। উপস্থিত সদস্যদের অনেকে বললেন: আমরা তো একবার বাই'আত করেছি, আবার কেন? এর কোন প্রয়োজন আছে কি? রাজা' বললেন: এটা আমীরুল মু'মিনীনের নির্দেশ।
তারা এক এক করে সীল-মোহরকৃত অঙ্গীকার পত্রে উল্লেখিত অজ্ঞাত খলীফার প্রতি বাই'আত করলেন। এভাবে রাজা' তাঁদের বাই'আত নিশ্চিত করে খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিকের মৃত্যুর ঘোষণা দেন। তারপর সেই মনোনয়ন পত্রটি খুলে সকলের সামনে পাঠ করে শোনান। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নাম শুনেই সদ্য প্রয়াত খলীফা সুলায়মানের ছোট ভাই হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক বলে উঠলেন: আমরা কখনো তাঁর বাই'আত করবো না। রাজা' উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন: চুপ করে বাই'আত করে নাও, নইলে ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে। তারপর রাজা' 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের হাত ধরে মিম্বরের উপর বসিয়ে দেন। অপ্রত্যাশিতভাবে এই বিশাল দায়িত্বের বোঝা কাঁধে অর্পিত হওয়ায় তাঁর মুখ থেকে তখন উচ্চারিত হয় : ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন। আর এদিকে হিশাম রাজা'র এক ধমক খেয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বঞ্চিত হওয়ার দুঃখে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন পাঠ করতে করতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের দিকে এগিয়ে যান এবং তাঁর হাতে বাই'আত করেন। তারপর সুলায়মানের কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। নতুন খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁর জানাযার নামায পড়ান।৯১
আল-মাদায়িনী বলেন: 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয হিজরী ৯৯ সনের সফর মাসের ১১ তারিখ (দশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর) শুক্রবার খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ৯২
ইয়া'কূব ইবন দাউদ আছ-ছাকাফী বলেন: 'উমারের খিলাফতের মনোনয়ন পত্র যখন পাঠ করা হয়েছিল তখন তিনি মজলিসের এক কোণে বসা ছিলেন। ছাকীফ গোত্রের সালিম নামক এক ব্যক্তি- যিনি 'উমারের এক মামা- তাঁকে কাঁধ ধরে দাঁড় করিয়ে দেন। 'উমার তখন বলেন: আল্লাহর কসম! আমি এ চাইনি। এর দ্বারা দুনিয়া আমার কাছ থেকে কিছুই পাবে না। ৯৩
খিলাফতের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পূর্ণ সচেতন ছিলেন। যদি খলীফা হিসেবে তাঁর নাম মনোনয়নের সময় তিনি কোনভাবে জানতে পারতেন তাহলে তখনই অস্বীকৃতি ও অপারগতা প্রকাশ করতে পারতেন। যেমন, বর্ণিত হয়েছে যে, 'উমার রাজা' ইবন হায়ওয়াকে কসম দিয়ে বলেছিলেন, খিলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনয়নের ব্যাপারে সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক যদি আমার নাম উচ্চারণ করেন তাহলে আপনি তাকে বিরত রাখবেন। আর আমার নাম যদি উচ্চারিত না হয়, আপনি মোটেই উচ্চারণ করবেন না। ৯৪ যাই হোক, এখন তো এ বোঝা ঘাড়ে চেপে বসেছে। তবুও তিনি এর থেকে অব্যাহতি লাভের শেষ চেষ্টা করে দেখতে চান। তিনি জনগণকে মসজিদে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলেন এবং নিজে মসজিদে প্রবেশ করে মিম্বরের উপর বসলেন। তারপর সমবেত জনমণ্ডলীকে লক্ষ্য করে নিম্নের এই সংক্ষিপ্ত ভাষণটি দান করেন: ৯৫
'ওহে জনমণ্ডলী! আমার ইচ্ছা, মতামত এবং সাধারণ মুসলমানদের সাথে কোন রকম পরামর্শ ছাড়াই আমাকে খিলাফতের এই দায়িত্বের পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। এ কারণে আমার বাই'আতের যে বেড়ী আপনাদের গলায় পরানো হয়েছে তা আমি নিজেই খুলে নিলাম। এখন আপনারা নিজেদের জন্য অন্য কাউকে খলীফা মনোনীত করুন।'
আবূ বিশর আল-খুরাসানী বলেন: খলীফা হিসেবে 'উমারের নাম ঘোষিত হওয়ার পর তিনি যে ভাষণ দেন তাতে একথাও বলেন: “ওহে জনমণ্ডলী! আল্লাহর কসম! আমি প্রকাশ্যে বা গোপনে কখনো আল্লাহর নিকট এ দায়িত্ব কামনা করিনি। যে জিনিস আমি সব সময় অপছন্দ করেছি, এখন সেই দায়িত্ব আমার কাঁধে চেপে বসেছে।” ৯৬ জনতার মধ্য থেকে সা'ঈদ ইবন 'আবদিল মালিক বললেন: আপনার অপছন্দের কথা প্রকাশের ব্যাপারে খুব তাড়াহুড়ো করছেন। আপনি কি চান মতবিরোধ সৃষ্টি হোক এবং মানুষ পরস্পর খুনোখুনি করুক? অন্য এক ব্যক্তি বললেন: সুবহানাল্লাহ! আবু বকর, 'উমার, 'উছমান ও 'আলী (রা) এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁদের কেউ তো এমন কথা বলেননি, অথচ 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এখন তাই বলছেন!
তাঁর ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে জনতা সমস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে, আমরা আপনাকে খলীফা নির্বাচন করেছি এবং আপনার পরিচালিত খিলাফতেই আমরা রাজি। আল্লাহর নাম নিয়ে আপনি কাজ শুরু করুন।
যখন তাঁর বিশ্বাস হলো, তাঁর খলীফা হওয়ার ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই তখন তিনি সমবেত জনমণ্ডলীর উদ্দেশ্যে নিম্নের ভাষণটি দান করেন: ৯৭
'ওহে জনমণ্ডলী! আমি আপনাদের আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। প্রতিটি জিনিসের শেষ কথা হলো আল্লাহ-ভীতি। আল্লাহ ভীতির কোন শেষ নেই। আপনারা প্রত্যেকেই আখিরাতের জন্য কাজ করুন। যে ব্যক্তি আখিরাতের জন্য কাজ করে আল্লাহ তার দুনিয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আপনারা নিজেদের ভিতরকে সংশোধন করুন, আল্লাহ আপনাদের বাহিরকে সংশোধন করবেন। বেশী করে মৃত্যুকে স্মরণ করুন এবং তার আসার পূর্বেই ভালো রকম প্রস্তুতি নিন। কারণ, মৃত্যু সকল স্বাদ-আস্বাদনকে ধ্বংস করে দেয়। যে ব্যক্তি তার ও আদমের (আ) মাঝখানের তার সকল পিতৃপুরুষকে জীবিত পিতার ন্যায় স্মরণ না করে সে মূলত মৃত্যুর গভীরে ডুবে আছে। এই উম্মাত না তার রবের ব্যাপারে, না নবীর (সা) এবং না কিতাবের ব্যাপারে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। বরং তারা দীনার ও দিরহামের ব্যাপারে বিভক্ত হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি কাউকে অন্যায়ভাবে কোন কিছু দিব না, তেমনি ন্যায়ভাবে কাউকে কিছু দান করা থেকে বিরত থাকবো না। আমি পুঞ্জিভূতকারী নই। আমাকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সেভাবে যেখানে যা কিছু রাখার, রাখবো।
ওহে জনমণ্ডলী! আমার পূর্বে আপনারা এমন অনেক শাসক পেয়েছেন যাদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য নানাভাবে তাদের প্রীতি ও ভালোবাসা লাভের চেষ্টা করতেন। জেনে রাখুন, স্রষ্টার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। যে আল্লাহর আনুগত্য করে তার আনুগত্য করা ওয়াজিব। আর যে আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার আনুগত্য করা যাবে না। আপনাদের ব্যাপারে যতক্ষণ আমি আল্লাহর আনুগত্য করবো ততক্ষণ আপনারা আমার আনুগত্য করবেন। যখন আমি আল্লাহর নাফরমানি করবো তখন আপনাদের জন্য আমার আনুগত্য জরুরী নয়। আমার কথা এতটুকুই। মহান আল্লাহর নিকট আমার ও আপনাদের মাগফিরাত কামনা করছি।'
কোন কোন বর্ণনায় তাঁর সেই ভাষণটি নিম্নরূপ এসেছে: তিনি মিম্বরের উপর উঠে সর্বপ্রথম আল্লাহর হামদ ও ছানা এবং নবীর (সা) প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করেন। তারপর বলেন:
'আম্মা বাদ। ওহে জনমণ্ডলী! আপনাদের নবীর (সা) পরে কোন নবী নেই এবং তাঁর উপর যে কিতাব নাযিল হয়েছে তার পরে আর কোন কিতাব নেই। আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে যা কিছু হালাল করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হালাল, আর তাঁর নবীর (সা) মাধ্যমে যা কিছু হারাম করেছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত হারাম থাকবে। আমি নিজে কোন সিদ্ধান্ত দানকারী নই, বরং আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নকারী। আমি নতুন কিছু উদ্ভাবনকারী নই, বরং একজন অনুসরণকারী মাত্র। শুনে রাখুন, আল্লাহর নাফরমানির ক্ষেত্রে কারো আনুগত্য লাভের অধিকার নেই। শুনে রাখুন! আমি আপনাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নই। আমি আপনাদের মত একজন সাধারণ মানুষ। তবে আল্লাহ আমার উপর সবচেয়ে ভারী বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। ওহে জনমণ্ডলী! ফরযসমূহ আদায় করা এবং হারামসমূহ পরহেয করা সর্বোত্তম ইবাদাত এবং আমার কথা এতটুকুই। আমার নিজের ও আপনাদের সকলের জন্য মহান আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করি।' ৯৮
এখানে দিমাকে এ সবকিছু ঘটে যাচ্ছে, কিন্তু 'আবদুল 'আযীয ইবন আল-ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক দূরে কোথাও থাকায় কিছুই জানতে পারেননি। এ কারণে সুলায়মানের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিকট থেকে নিজের জন্য বাই'আত গ্রহণ করেন এবং দিমাক্কের দিকে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে সুলায়মানের অসীয়াত এবং 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীতের বাই'আতের সকল ঘটনা অবগত হলেন। এরপর তিনি সোজা তাঁর নিকট উপস্থিত হন। নিজের জন্য তাঁর বাই'আত গ্রহণের কথা 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের নিকট আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। এ কারণে তিনি 'আবদুল 'আযীযকে বললেন, আমি জেনেছি, আপনি নিজের জন্য বাই'আত গ্রহণ করে দিমাকে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। 'আবদুল 'আযীয বললেন: সুলায়মান যে আপনাকে খলীফা মনোনীত করে গেছেন সে কথা আমার জানা ছিল না। এ জন্য আমি শঙ্কিত হয়েছিলাম, জনগণ কোষাগারে লুটপাট না চালায়। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বললেন: জনগণ যদি আপনার হাতে বাই'আত করতো এবং আপনি খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করতেন তাহলে আমি আপনার সাথে বিবাদে লিপ্ত হতাম না। আমি আমার ঘরে চুপচাপ বসে থাকতাম। 'আবদুল 'আযীয বললেন, আপনি থাকতে অন্য কেউ খলীফা হওয়াকে আমি পছন্দই করতাম না। আমি আপনার হাতে বাই'আত করে ফেলেছি। ৯৯

টিকাঃ
৮৩. তারীখ আল-ইয়া'কুবী-২/২৯৩
৮৪. সূরা আল-আ'লা-১৪
৮৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩০; আবুল হাসান 'আলী আন-নাদবী, রিজালুল ফিক্স ওয়াদ- দা'ওয়াহ্-১/৪০
৮৬. ইবন 'আবদিল হাকাম, সীরাতু 'উমার-২৯-৩০; রিজালুল ফিক্স ওয়াদ-দা'ওয়াহ্-১/৪০
৮৭. তাবাকাত-৫/৪০৭; তাবারী, তারীখ-৮/১২৯; আল-কামিল ফিত-তারীখ-৫/৩৯; 'আবদুল মুন'ইম আল-হাশিমী-১৮৩
৮৮. ইবন কুতায়বা, আল-ইমামা ওয়াস-সিয়াসা-২/৮০; আল-কালকাশান্দী, সুবহুল আ'শা-৯/৩৬০; আহমাদ যাকী সাফওয়াত, জাম্হারাতু রাসায়িল আল-'আরাব-২/২৬৫-২৬৭
৮৯. আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৪০
৯০. 'আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-২০
৯১. আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৪১; 'আসরুত তাবি'ঈন-১৮৩
৯২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩২
৯৩. প্রাগুক্ত-৪/৪৩৩
৯৪. ইবন 'আবদিল হাকাম, সীরাতু 'উমার-৩০
৯৫. তাবাকাত-৫/৩৩৮; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২০৩
৯৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৩৩
৯৭. তাবাকাত-৫/৩৩৮; সিফাতুস সাফওয়া-২/১১৪-১১৫; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২০২-২০৩
৯৮. আল-মাস'উদী, মুরূজ আয-যাহাব-২/১৬৮; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২০৪, ২০৫
৯৯. তাবারী, তারীখ-৪/৬১; আল-কামিল ফিত তারীখ-৫/৪১; তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/৩১০

ফন্ট সাইজ
15px
17px