📄 আমীরুল হজ্জের দায়িত্ব পালন
খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল থেকে এ রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল যে, খলীফা নিজে আমীরুল হজ্জ হতেন এবং জনগণকে তাঁর সাথে হজ্জ আদায়ে নেতৃত্ব দিতেন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনার ওয়ালী থাকাকালে বেশ কয়েকবার এ পবিত্র দায়িত্ব পালন করেন। হিজরী ৮৭, ৮৯, ৯০, ৯২ ও ৯৩ সনে তাঁর নেতৃত্বে হজ্জ অনুষ্ঠিত হয়। হিজরী ৯৭ সনে খলীফা সুলায়মান হজ্জ আদায় করেন। মদীনা থেকে মক্কা যাওয়ার সময় 'উমার তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন। কাফেলা রাবিগে অবস্থানকালে আকাশে প্রবল মেঘ, বিদ্যুতের ঝলকানি ও প্রচণ্ড বজ্রের শব্দে সুলায়মান ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তখন 'উমার তাঁকে বলেন: كيف العذاب؟ - هذه الرحمة، فكيف العذاب؟ - এই যদি হয় রহমত (করুণা, দয়া) তাহলে আযাব (শাস্তি) কেমন?
টিকাঃ
৬৪. তারীখ আল-ইয়া'কূবী-২/২৯৩
📄 মসজিদে নববীর নির্মাণ
খুলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফতকালেই মসজিদে নববীর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন শুরু হয়ে গিয়েছিল, বিশেষতঃ হযরত 'উছমান (রা) এটিকে খুবই জাঁকজমকপূর্ণ করে তুলেছিলেন। তাঁর পরে হযরত 'আলীর (রা) সময় থেকে খলীফা 'আবদুল মালিকের সময় পর্যন্ত কোন খলীফা এই মসজিদের ব্যাপারে কোন রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। অবশ্য খলীফা 'আবদুল মালিক একবার সম্প্রসারণের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মদীনাবাসীদের অস্বীকৃতির কারণে সম্ভব হয়নি। খলীফা ওয়ালীদ ইবন 'আবদিল মালিক এ ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং তিনি মসজিদটিকে সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো ও শৈলীতে নির্মাণ করতে চান। দিমাক্কের জামি' মসজিদ নির্মাণ শেষ করে তিনি হিজরী ৮৮ সনে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে লিখলেন, মসজিদে নববী নতুন করে নির্মাণ করতে হবে এবং এর আশে পাশে আযওয়াজে মুতাহ্হারাত অর্থাৎ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পূতঃপবিত্র বেগমদের যে সকল হুজরা ও অন্যান্য বাড়ী-ঘর আছে অর্থের বিনিময়ে সেগুলো অধিগ্রহণ করে মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খলীফার এ আদেশ বাস্তবায়ন করেন।
খলীফা ওয়ালীদ মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ বিষয়ে 'উমারকে যে দিক নির্দেশনামূলক পত্র দেন তার কিছু অংশ নিম্নে উদ্ধৃত হলো: ৬৬
'সম্ভব হলে কিবলাকে (মিহরাবকে) সামনে এগিয়ে নিবে। তোমার মামাদের অবস্থানের কারণে তুমি তা পারবে। তারা তোমার বিরোধিতা করবে না। আর কেউ বাধ সাধলে ন্যায্য মূল্য দিয়ে রাজি করাবে এবং ভেঙ্গে তাদের মূল্য দিয়ে দিবে। এ ব্যাপারে তোমার জন্য 'উমার ও 'উছমানের (রা) মধ্যে দৃষ্টান্ত রয়েছে।'
পত্র পেয়ে 'উমার মসজিদের আশে-পাশের বাড়ী-ঘরের মালিকদের ডেকে খলীফার পত্রটি পাঠ করে শোনান। তারা অর্থের বিনিময়ে নিজেদের মালিকানা ছেড়ে দিতে রাজি হয়। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয পুরাতন মসজিদ, উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ ও আশে-পাশের বাড়ী-ঘর ভাংতে আরম্ভ করেন। তখন তাঁর সংগে ছিলেন কাসিম, সালিম, আবূ বকর ইবন 'আবদির রহমান (রহ) প্রমুখ মদীনার বিশিষ্ট ফকীহগণ। তাঁরা সকলে 'উম্মাহাতুল মু'মিনীনের হুজরাসমূহ মসজিদের মধ্যে ঢুকিয়ে নতুন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন।
হিজরী ৮৮ সনে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং তখনই খলীফা ওয়ালীদ রোমান সম্রাটকে একটি পত্রে এই বলে অনুরোধ করেন যে, আমরা আমাদের নবীর মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করেছি, আপনারা আমাদের সাহায্য করুন। পত্র পেয়ে রোমান সম্রাট এক লাখ মিছকাল স্বর্ণ, এক শো কারিগর ও চল্লিশটি উট বোঝাই মার্বেল পাথর পাঠান।৬৭ ওয়ালীদ মাদায়েনের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে মার্বেল পাথর খোঁজারও নির্দেশ দেন। এভাবে যখন সকল উপকরণ সংগ্রহ শেষ হয় তখন 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এত গুরুত্বের সাথে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন যে, কারুকার্যের এক একজন কারিগরকে ৩০ দিরহাম পর্যন্ত তার একটি কাজের জন্য পুরস্কার দিতেন।
ইতোপূর্বে যদিও মসজিদে নববীর বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন হয়েছিল, কিন্তু গম্বুজ ও মিহরাবের দিকে তখনও কেউ দৃষ্টি দেননি। এটা উদ্ভাবনের গৌরব 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয অর্জন করেন। তিনি মসজিদের চার কোণে মিহরাব তৈরি করান এবং পানির নালাগুলো তৈরি করান কাঁচ দ্বারা। ফলে তা এক দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে পরিণত হয়। ৬৮
হিজরী ৮৮ সনে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং তা শেষ হয় হিজরী ৯০ সনে।
হিজরী ৯১ সনে খলীফা ওয়ালীদ হজ্জ আদায় এবং সেই সাথে নবনির্মিত মদীনার মসজিদ পরিদর্শনের পরিকল্পনা করেন। তিনি মদীনার কাছাকাছি পৌঁছলে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয মদীনার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে তাঁকে স্বাগতম জানান। খলীফা ওয়ালীদ মসজিদে প্রবেশ করে ঘুরে ঘুরে দেখতে আরম্ভ করেন। মূল মসজিদের ছাদের দিকে দৃষ্টি পড়তেই 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে বলেন, গোটা মসজিদের ছাদ এমনভাবে করলেন না কেন?
বললেন: খরচ অনেক বেশী পড়তো। কেবল কিবলার দিকের দেওয়াল এবং দুই ছাদের মধ্যবর্তী স্থানের জন্য পঁয়তাল্লিশ হাজার (৪৫০০০) দীনার ব্যয় হয়েছে। ৭০
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের কর্ম দক্ষতায় খলীফা ওয়ালীদ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। ৭৩
টিকাঃ
৬৬. আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/৫৩২
৬৭. প্রাগুক্ত-৫/৫৩২; তাবারী, তারীখ-৫/২২৩
৬৮. ইবন তুগরী বারদী, আন-নুজম আয-যাহিরা-১/৬৭, ২১৫; খুলাসাতুল ওয়াফা-১৩৯-১৪০
৭০. খুলাসাতুল ওয়াফা-১৪০
৭৩. তাবি'ঈন-৩২০
📄 ফোয়ারা
ওয়ালীদের নির্দেশে তিনি মসজিদের সাথে একটি ফোয়ারাও নির্মাণ করেন। হজ্জের সময় মসজিদ পরিদর্শনকালে ওয়ালীদ এই ফোয়ারা ও পানির সংরক্ষণাগার দেখে দারুণ খুশী হন। এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি অনেক কর্মচারী নিয়োগ দেন এবং মসজিদের মুসল্লীদের এখান থেকে পানি পান করানোর নির্দেশও দেন।৭১
প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আর তা হলো, প্রখ্যাত তাবি'ঈ হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) মধ্যে ছিল স্বৈরাচারী উমাইয়্যা খলীফা ও আমীর-উমারাদের প্রতি একটা উপেক্ষার ভাব। তিনি একাধিক উমাইয়্যা খলীফার যুগ লাভ করেন। তাঁদের কারো সামনে মাথা নোয়াননি। শুধু তাই নয়, বরং তাঁদের কাউকে সাক্ষাৎ দেওয়াও প্রয়োজন বোধ করেননি। খলীফা 'আবদুল মালিকের সাথে তাঁর এ রকম কয়েকটি ঘটনার কথাই ইতিহাসে পাওয়া যায়। 'আবদুল মালিকের পরে তাঁর পুত্র আল-ওয়ালীদের সাথেও হযরত সা'ঈদের (রহ) কর্মধারা একই রকম ছিল।
মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণ ও প্রশস্তকরণের পর যখন ওয়ালীদ পরিদর্শনে এলেন তখন মসজিদের অভ্যন্তরের সব মানুষকে বের করে দেওয়া হয়। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) মসজিদের এক কোণে বসা ছিলেন। তাঁকে উঠানোর হিম্মত কারো হলো না। এক ব্যক্তি শুধু এতটুকু বলেন যে, এ সময় যদি আপনি একটু সরে যেতেন। তিনি জবাব দিলেন, আমার ওঠার যে সময় আছে তার আগে আমি উঠবো না।
তারপর আবার আবেদন জানানো হলো, ঠিক আছে উঠবেন না, তবে অন্ততঃ এতটুকু করুন যে, যখন আমীরুল মু'মিনীন এদিক দিয়ে যাবেন তখন সালাম দেওয়ার জন্য একটু উঠে দাঁড়াবেন। বললেন: আল্লাহর কসম! আমি তাঁর জন্য উঠে দাঁড়াতে পারি না।
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা ওয়ালীদকে মসজিদ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। তিনি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের (রহ) মর্যাদা এবং তাঁর বেয়াড়া স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এ কারণে তিনি কোন রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে সা'ঈদকে ওয়ালীদের দৃষ্টির আড়ালে রাখার জন্য এদিক ওদিক ঘোরাতে থাকেন। এক সময় ওয়ালীদ কিবলার দিকে তাকাতেই সা'ঈদের উপর দৃষ্টি পড়ে। ওয়ালীদ জিজ্ঞেস করেন: এই বৃদ্ধ কে? সা'ঈদ তো নয়? 'উমার জবাব দিলেন: হাঁ, তিনিই। তারপর 'উমার তাঁর পক্ষ থেকে কৈফিয়াত দিতে গিয়ে তাঁর বিভিন্ন অসুবিধার কথা বলতে আরম্ভ করেন। তিনি বললেন: এখন তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন এবং চোখেও কম দেখেন। যদি তিনি আপনাকে চিনতে পারতেন তাহলে সালাম দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেন। ওয়ালীদ বললেন! হাঁ, আমি তাঁর অবস্থা সম্পর্কে অবগত। আমি নিজেই তাঁর নিকট যাচ্ছি। এরপর ওয়ালীদ এদিক সেদিক ঘুরে তাঁর নিকট গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন: শায়খ, আপনার শরীর কেমন আছে? সা'ঈদ (রহ) নিজের জায়গায় বসে বসেই জবাব দিলেন: আল-হামদু লিল্লাহ! ভালো আছি। তবে এতটুকু সৌজন্য বজায় রাখলেন যে, ওয়ালীদের কুশলও জিজ্ঞেস করলেন। এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পর ওয়ালীদ এ কথা বলতে বলতে ফিরে যান যে, এ হলো পুরাতন স্মৃতি। ৭২
টিকাঃ
৭১. আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/৫৩৩
৭২. প্রাগুক্ত-৪/৫৫৪-৫৫৫; আন-নুজুম আয-যাহিরা-১/২২৩; ড. মুহাম্মদ আবদুল মা'বুদ, তাবি'ঈদের জীবন কথা-১/৯৭-৯৮
📄 ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ
'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) হিজরী ৮৭ সন থেকে ৯৩ সন পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মদীনা, মক্কা ও তায়িফের ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে হিজরী ৯৩ সনে এ পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।
ওয়ালীর পদ থেকে তাঁকে অপসারণ বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগের বিভিন্ন কারণ বিভিন্ন জনে উল্লেখ করেছেন। সে রকম তিনটি কারণ এখানে উল্লেখ করা হলো। হতে পারে এর যে কোন একটি অথবা সবগুলো কারণে তাঁকে এ পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়।
১. 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) ওয়ালী হিসেবে তাঁর নিয়োগের সময় শর্ত আরোপ করেছিলেন যে, পূর্ববর্তী উমাইয়্যা খলীফাদের মতো জনগণের উপর জুলুম-নির্যাতনের জন্য তাঁর উপর কোন রকম চাপ প্রয়োগ করা হবে না। কিন্তু বানু উমাইয়্যাদের পক্ষে এ শর্ত পূরণ করা মোটেই সম্ভব ছিল না। ইবনুল জাওযী (রহ) তাঁর 'সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পুত্র হযরত খুবায়ব (রহ) ছিলেন বানু উমাইয়্যাদের একজন প্রবল প্রতিপক্ষ। হিজরী ৯৩ সনে খলীফা ওয়ালীদ 'উমারকে নির্দেশ দেন খুবায়বকে বন্দী করে তাঁর উপর নির্যাতন চালানোর জন্য। খলীফার নির্দেশ পালন করতে গিয়ে তাঁকে বন্দী করে এক শো, মতান্তরে পঞ্চাশটি চাবুক মারা হয়, প্রবল শীতের মধ্যে তাঁর মাথায় ঠাণ্ডা পানি ঢালা হয় এবং একাধারে দুই দিন তাঁকে মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এমন কঠোর শাস্তি ভোগ করার পর তাঁর আপনজনেরা তাঁকে বাড়ীর নিয়ে যায় এবং তিনি মারা যান। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তার অবস্থা জানার জন্য মাজেশূনকে খুবায়বের বাড়ীতে পাঠান। লোকেরা তাঁর মুখমণ্ডলের উপর থেকে চাদর উল্টিয়ে দেয় এবং তিনি তাঁকে মৃত দেখতে পান। মাজেশূন বলেন, ফিরে এসে দেখি, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয এত অস্থির হয়ে পড়েছেন যে একবার উঠেন তো আবার দাঁড়িয়ে যান। খুবায়বের মৃত্যুর কথা শোনানো হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তারপর ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন উচ্চারণ করতে করতে উঠে দাঁড়ান এবং ওয়ালীর পদ থেকে ইস্তেফা দেন। মূলতঃ এ ছিল একটা বাড়াবাড়ি রকমের জুলুম এবং স্পষ্টতঃই শরী'আত পরিপন্থী শাস্তি। ওয়ালী হিসেবে যা তিনি করতে বাধ্য হন। এ অপরাধমূলক কাজের জন্য তিনি ভীষণ অনুতপ্ত হন এবং তাঁর মধ্যে আল্লাহভীতি প্রবলভাবে শিকড় গেড়ে বসে। ৭৭
খুবায়বের মৃত্যুকে তিনি নিজের বড় ধরনের অপরাধমূলক কাজ বলে সারা জীবন বিশ্বাস করতেন। এ জন্য পরবর্তীকালে তিনি যখন কোন ভালো কাজ করতেন এবং সঙ্গী-সাথীরা তাঁকে বড় প্রতিদানের কথা বলতেন তখন তাঁর জবাব ছিল এ রকম: ৭৮
'তা কিভাবে সম্ভব, যখন খুবায়ব পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে?'
২. খলীফা ওয়ালীদ তাঁর ভাই সুলায়মানকে বাদ দিয়ে তাঁর ছেলেকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করতে চাইলেন। অথচ তাঁদের পিতা খলীফা 'আবদুল মালিক পর্যায়ক্রমে তাঁর ছেলেদেরকে খলীফা মনোনীত করে জনগণের থেকে বাই'আত নিয়ে যান। ওয়ালীদদের এই অন্যায় সিদ্ধান্তে খিলাফতের অধিকাংশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজ পরিবারের সদস্যবৃন্দ ও দেশের সম্মানীয় ব্যক্তিবর্গ কেউ ইচ্ছায় কেউ অনিচ্ছায় ও ভয়ে সায় দেয়। কিন্তু 'উমার বেঁকে বসলেন। তিনি এমন ব্যক্তিকে ত্যাগ করতে অস্বীকার করলেন যার প্রতি বাই'আত করা হয়েছে। তিনি কারো সমালোচনা, খলীফার ক্রোধ, শাস্তি অথবা মৃত্যুর ভয় না করে খলীফার উদ্দেশ্যে বললেন:
'আমাদের ঘাড়ে তো বাই'আতের বেড়ী রয়েছে।' এতেই তিনি খলীফার ক্রোধের পাত্রে পরিণত হন এবং তাঁর জীবনের আশঙ্কা দেখা দেয়। তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে একটি কক্ষে ঢুকিয়ে কাঁদা-মাটি দিয়ে তার সকল দরজা-জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে দম বন্ধ হয়ে মারা যান। রাজ পরিবারের কিছু ব্যক্তির সুপারিশে সেবার প্রাণে রক্ষা পান। তবে ওয়ালীদ তাঁকে মদীনার ওয়ালীর পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে দূরে সরিয়ে দেন।
৩. হিজরী ৯৩ সনে ওয়ালীদ 'উমারকে হিজায ও মদীনার ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করেন। এর কারণ হলো, 'উমার ইরাকের ওয়ালী হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের ইরাকীদের উপর মাত্রা ছাড়া জুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতন-নিষ্পেষণের কথা জানিয়ে খলীফা ওয়ালীদকে চিঠি লেখেন। একথা হাজ্জাজ জানতে পেয়ে খলীফাকে লেখেন: 'আমার এখানকার রক্ত প্রবাহিতকারী ও বিভেদ সৃষ্টিকারীগণ, যারা ইরাক থেকে পালিয়েছে তারা মক্কা ও মদীনায় আশ্রয় লাভ করেছে। এ একটা দুর্বলতা।' ওয়ালীদ মক্কা ও মদীনায় কাকে ওয়ালীর দায়িত্ব দেওয়া যায় সে ব্যাপারে হাজ্জাজের পরামর্শ চাইলেন। হাজ্জাজ খালিদ ইবন 'আবদিল্লাহ ও 'উছমান ইবন হায়্যানের নাম প্রস্তাব করে পাঠালেন। এ প্রস্তাব অনুসারে ওয়ালীদ 'উমারকে অপসারণ করে খালিদকে মক্কায় এবং 'উছমানকে মদীনায় নিয়োগ দান করেন। দায়িত্ব বুঝে দিয়ে 'উমার (রহ) মদীনা ত্যাগ করেন। মদীনা ত্যাগ করার সময় তিনি একথাগুলো বলেন:
'আমার ভয় হচ্ছে, মদীনা যাদেরকে বিতাড়িত করেছে আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হই কিনা। একথা দ্বারা তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণীর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন: মদীনা তার মন্দ ও অনিষ্টকে দূর করে দেবে।'
টিকাঃ
৭৭. ইবনুল জাওযী, সীরাতু 'উমার-৩৪-৩৫; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া-৯/৮৭; খিলাফত ও মুলুকিয়াত-১৮৭
৭৮. 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার-৩১