📄 ‘আবদুল ‘আযীযের পরিচয়
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পিতা 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান উমাইয়্যা খান্দানের একজন বিশিষ্ট ভাগ্যবান ব্যক্তি । তাঁর নিজের বর্ণনা : "মাসলামা ইবনে মাখলাদ মিসরের ওয়ালী থাকাকালীন আমি সেখানে যাই । আমার অন্তরে তখন কয়েকটি বাসনা জাগে । পরবর্তীকালে তা সবই পূর্ণ হয় । সেই বাসনাগুলো হলো : ১. আমি যেন মিসরের ওয়ালী হই, ২. মাসলামার দুই স্ত্রীই যেন আমার স্ত্রী হয়, ৩. কায়স ইবন কুলাইব যেন আমার হাজিব বা নিরাপত্তা রক্ষী হয় ।" আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল ইচ্ছাই পূর্ণ করেছেন । মাসলামার দুই স্ত্রীই তাঁর স্ত্রী হয়েছে, কায়স ইবন কুলাইব তাঁর হাজিব হয়েছে এবং বিশ বছর দশ মাস একাধারে মিসরের ওয়ালী থেকেছেন । ঐতিহাসিকদের মতে ইসলামের ইতিহাসে আর কোন ব্যক্তি কোথাও এত দীর্ঘ সময় ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেননি ।
হিজরী ৬৫ সনে তিনি মিসরে ওয়ালীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ব্যাপারটি ঘটে এভাবে : 'আবদুর রহমান ইবন জাহদাম, যিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পক্ষ থেকে মিসরের ওয়ালী ছিলেন, মিসরের ঐ সকল খারিজীদেরকে যাঁরা মক্কায় 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সমর্থক ও সাহায্যকারী ছিল, তাদের ঐক্যবদ্ধ করে "তাহকীম” বা সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবী জানায় । আর সে সময় মিসরে বানু উমাইয়্যাদের সমর্থক লোকেরা তাঁর হাতে বাই'আত করে । এরপর হিজরী ৬৪ সনের যুলকা'দা মাসে 'আবদুল 'আযীযের পিতা মারওয়ান ইবন হাকাম সিরিয়ায় জনগণের নিকট থেকে নিজের হাতে বাই'আত নেন । মিসরের মানুষ প্রকাশ্যে ইবন জাহদামের পক্ষে ছিল, তবে গোপনে তাঁদের সমর্থন ছিল মারওয়ানের প্রতি । এ কারণে মিসরবাসী তাঁকে মিসরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় । মারওয়ান তাঁর উঁচু পর্যায়ের আমলা ও সহযোগীদের একটি বড় দল নিয়ে মিসরের দিকে যাত্রা করেন । অন্যদিকে পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে একটি বাহিনীসহ আয়লায় পাঠান । ইবন জাহদাম মুকাবিলার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন । আকদার ইবন হাম্মাম আল-লাখমীর নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ সমুদ্র পথে শামের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন । স্থল পথে যুদ্ধের জন্যও দু'টি বাহিনী পাঠান । তাঁর একটি উদ্দেশ্য ছিল 'আবদুল 'আযীযকে আয়লায় ঢুকতে না দেওয়া । এই বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন যুহাইর ইবন কায়স । তিনি বুসাক নামক স্থানে 'আবদুল 'আযীযের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং পরাজয় বরণ করেন । ইবন জাহদাম নিজে "আইনু শামস" নামক স্থানে মারওয়ানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন । দুই দিনের প্রচণ্ড যুদ্ধে দু'পক্ষের বহু লোক হতাহত হয় । অবশেষে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবন জাহদাম ও মারওয়ানের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দেয় । আপোষের পর হিজরী ৬৫ সনের জুমাদা আল-উলা মাসে মারওয়ান মিসরে প্রবেশ করেন এবং ফিলফিল নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন । কিন্তু তাঁর তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ এমনভাবে অবস্থান মেনে নিতে পারলো না । তাই তিনি বললেন, খলীফা এমন শহরে অবস্থান করতে পারেন না যেখানে কোন প্রাসাদ নেই । অতঃপর তাঁর নির্দেশে 'কাসরুল বায়দা' নির্মাণ করা হয় । তিনি জনগণের ভাতা চালু করেন । একমাত্র মু'আফির গোত্র ছাড়া সমগ্র মিসরবাসী তাঁর খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করে । তিনি সর্বমোট দুই মাস মিসরে অবস্থান করেন । হিজরী ৬৫ সনের রজব মাসে তিনি পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে মিসরের ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে দিমাক্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । বিদায় বেলায় 'আবদুল 'আযীয বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! এমন একটি দেশ যেখানে আমার কোন আত্মীয়-বন্ধু নেই, আমি থাকবো কেমন করে? তখন মারওয়ান পুত্রকে উদ্দেশ্য করে নিম্নের উপদেশগুলো দান করেন :
"আমার প্রিয় ছেলে! তুমি তোমার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখবে । সকাল বেলায় তোমার নিকট তাদের যদি কোন দাবী থাকে তা পূরণ করতে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেরী করবে না । তেমনিভাবে সন্ধ্যায় যদি কোন দাবী থাকে, সকাল পর্যন্ত তা দেরী করবে না । তাদের অধিকার যথাসময়ে প্রদান করবে । এতে তাদের আনুগত্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে । তোমার প্রজাদের নিকট তোমার কোন মিথ্যা যেন প্রকাশ না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে । তোমার কোন মিথ্যা যদি তাদের নিকট প্রকাশ পায় তাহলে তারা তোমার সত্যকেও বিশ্বাস করবে না । তোমার পারিষদবর্গ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে । তারপরেও যদি কোন বিষয় তোমার নিকট স্পষ্ট না হয় তাহলে আমাকে লিখবে । ইনশাআল্লাহ আমার মতামত যথাসময়ে তোমার নিকট পৌছে যাবে । তোমার প্রজাদের কারো প্রতি যদি তোমার রাগ হয় তাহলে সেই রাগের মুহূর্তে তাকে পাকড়াও করবে না । তোমার রাগ শান্ত হওয়া পর্যন্ত তার শাস্তি স্থগিত রাখবে । তারপর তুমি ঠাণ্ডা মেজাজে প্রশান্ত অবস্থায় তাকে তোমার যা ইচ্ছা শাস্তি দিবে । কারণ, যে ব্যক্তি প্রথম কারাগার বানিয়েছেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ধৈর্যশীল । তারপর তুমি দৃষ্টি দিবে অভিজাত বংশীয়, দীনদার ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের প্রতি । তাঁরা অবশ্যই তোমার সংগী-সাথী ও পারিষদবর্গ হবে । সব রকম উদারতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাদের মর্যাদা ও স্থান নিরূপণ করবে । আমার বক্তব্য এতটুকু । তোমার উপর আমি আল্লাহকে প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যাচ্ছি ।" এছাড়া তিনি 'আবদুল 'আযীযকে আরো কিছু উপদেশ দান করেন । মিসর ত্যাগের পূর্বে বিশরকে 'আবদুল 'আযীযের সহকারী এবং মূসা ইবন নুসাইরকে তাঁর মন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিয়োগের ঘোষণা দেন ।
মারওয়ান মিসর থেকে দিমাকে ফিরে মাত্র দু'মাস জীবিত ছিলেন । অতঃপর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র 'আবদুল মালিক খলীফা হন । তিনি 'আবদুল 'আযীযকে তাঁর ওয়ালীর পদে বহাল রাখেন । 'আবদুল 'আযীয তাঁর শাসন আমলে মিসরে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেন । হিজরী ৬৭ সনে একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণ করেন । হিজরী ৭০ সনে মিসরে “তা'উন” (প্লেগ) মহামারী আকারে দেখা দিলে তিনি হুলওয়ানে চলে যান এবং সেখানে স্থায়ী হন । সেখানে একাধিক প্রাসাদ ও মসজিদসহ আঙ্গুর ও খেজুরের বহু বাগান তৈরি করেন । হিজরী ৭৭ সনে কায়রোর পুরাতন মসজিদটি ভেঙ্গে চতুর্দিকে আরো সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণ করেন । হিজরী ৬৯ সনে সেখানে দু'টি পুল তৈরি করে তার উপর নিজের নামটি খোদাই করেন । কবি 'উবায়দুল্লাহ ইবন কায়স আর রুকায়্যাত (মৃ. ৭৫ হি.)-এর একটি কবিতায় 'আবদুল 'আযীযের কর্মকাণ্ডের একটি চমৎকার চিত্র বিধৃত হয়েছে ।
"তা'রীফ” নামক এক প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালু করেন । আর তা হলো 'আরাফার দিন 'আসরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা । তিনি জ্ঞানী-গুণীদের অধিকার প্রদান এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অত্যন্ত উদারতার সাথে বহাল রাখেন । মিসরের কাজী 'আবদুর রহমান ইবন হুজায়রা আল-খাওলানীর ভাতা নির্ধারণ করেন বার্ষিক এক হাজার দীনার । আবুল খায়র মারছাদ আল-ইয়াযনীকে তিনি নিজে ডেকে তাঁর নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া নিতেন । মিসরের 'আলিম-'উলামা, জ্ঞানী- গুণী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন আহার করতেন । এক হাজার খাঞ্জা খাবার নিজের বাসস্থানের পাশে এবং অন্যত্র আরো এক শো খাঞ্জা খাবার প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হতো । প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও শীত মওসুমের শুরুতে কম আয়ের মানুষ ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে ঠাণ্ডা-গরমের কাপড় বিতরণ করতেন । বিধবা, ইয়াতীম ও দুঃস্থদের জন্য প্রতিদিনের ভাতা চালু করেন । মোটকথা অভাবীদের অভাব দূরীকরণের জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালান ।
কবিগণের সান্নিধ্য তাঁর খুব প্রিয় ছিল । এত উদার হস্তে কবিদের দান করতেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর কোন কোন কবি কবিতা চর্চা ছেড়ে দেন । বিশেষ করে কবি কুছায়্যির ও নুসাইবকে এত অর্থ দান করেন যে কেউ কখনো কোন কবিকে সে পরিমাণ অর্থ দেয়নি । কবি কুছায়িয়রকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি এখন কবিতা বলেন না কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন : 'আবদুল 'আযীযের পরে আর কার নিকট তেমন প্রতিদানের আশা করা যায়?
তিনি কেবল একজন উদার দানশীল ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং জনসাধারণের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে মিসরের কৃষি ব্যবস্থারও সংস্কার করেন । সরকারী উদ্যোগে অনেক ফলের বাগান করেন এবং পতিত জমি আবাদ করার জন্য কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করেন । মিসরের সরকারী পতিত ভূমি আবাদ করার জন্য মূল আরব থেকে কৃষিজীবী লোকদের এনে তাদেরকে ভূমি পত্তন দেন । তিনি 'আলিম-'উলামার ভাতা নির্ধারণ করেন । জ্ঞানের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে বহু বিদ্যালয় ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন । এমনকি নিজের প্রাসাদেও একটি মাদরাসা চালু করেন । ইবন কাছীর 'আবদুল 'আযীযের মৃত্যু প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে নিম্নের মন্তব্যটি করেন :
"আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান ছিলেন উদার, দানশীল, প্রশংসিত সৎ আমীরদের একজন ।"
হিজরী ৮৬ সনে ১৪ই জুমাদা আল-উলা সোমবার 'আবদুল 'আযীয হুলওয়ানে ইনতিকাল করেন এবং ফুসতাতে তাঁকে দাফন করা হয় । মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় এই কথাগুলো : "হায়! আমি যদি উল্লেখযোগ্য কিছু না হতাম! হায়! আমি যদি হতাম ধুলিকণা অথবা হতাম হিজাযের কোন অখ্যাত রাখাল ।" আরবের বহু কবি তাঁর মৃত্যুর পর মরছিয়া লিখেছেন ।
টিকাঃ
২৯. 'আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১
৩০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৪২; আহমাদ-যাকী সাফওয়াত, জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/১৯১
৩১. সুয়ূতী, হুসনুল মুহাদারা-২/২০৪; আল-কিন্দী, কিতাবু উলাতি মিসর (বৈরূত)-১৮৫
৩২. মু'জাম আল-বুলদান-২/২৯৩, ২৯৪; 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১৪
৩৩. হুস্ন আল-মুহাদারা-১/১১৮
৩৪. 'আবদুস সালাম, নাদবী-৯
৩৫. হুম্ন আল-মুহাদারা-২/২৪০
৩৬. আল-বিদায়া ওয়ন নিহায়া-৮/৫৮
৩৭. কিতাবু উলাতি মিসর-১৫৮
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পিতা 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান উমাইয়্যা খান্দানের একজন বিশিষ্ট ভাগ্যবান ব্যক্তি । তাঁর নিজের বর্ণনা : "মাসলামা ইবনে মাখলাদ মিসরের ওয়ালী থাকাকালীন আমি সেখানে যাই । আমার অন্তরে তখন কয়েকটি বাসনা জাগে । পরবর্তীকালে তা সবই পূর্ণ হয় । সেই বাসনাগুলো হলো : ১. আমি যেন মিসরের ওয়ালী হই, ২. মাসলামার দুই স্ত্রীই যেন আমার স্ত্রী হয়, ৩. কায়স ইবন কুলাইব যেন আমার হাজিব বা নিরাপত্তা রক্ষী হয় ।" আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল ইচ্ছাই পূর্ণ করেছেন । মাসলামার দুই স্ত্রীই তাঁর স্ত্রী হয়েছে, কায়স ইবন কুলাইব তাঁর হাজিব হয়েছে এবং বিশ বছর দশ মাস একাধারে মিসরের ওয়ালী থেকেছেন । ঐতিহাসিকদের মতে ইসলামের ইতিহাসে আর কোন ব্যক্তি কোথাও এত দীর্ঘ সময় ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেননি ।
হিজরী ৬৫ সনে তিনি মিসরে ওয়ালীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ব্যাপারটি ঘটে এভাবে : 'আবদুর রহমান ইবন জাহদাম, যিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পক্ষ থেকে মিসরের ওয়ালী ছিলেন, মিসরের ঐ সকল খারিজীদেরকে যাঁরা মক্কায় 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সমর্থক ও সাহায্যকারী ছিল, তাদের ঐক্যবদ্ধ করে "তাহকীম” বা সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবী জানায় । আর সে সময় মিসরে বানু উমাইয়্যাদের সমর্থক লোকেরা তাঁর হাতে বাই'আত করে । এরপর হিজরী ৬৪ সনের যুলকা'দা মাসে 'আবদুল 'আযীযের পিতা মারওয়ান ইবন হাকাম সিরিয়ায় জনগণের নিকট থেকে নিজের হাতে বাই'আত নেন । মিসরের মানুষ প্রকাশ্যে ইবন জাহদামের পক্ষে ছিল, তবে গোপনে তাঁদের সমর্থন ছিল মারওয়ানের প্রতি । এ কারণে মিসরবাসী তাঁকে মিসরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় । মারওয়ান তাঁর উঁচু পর্যায়ের আমলা ও সহযোগীদের একটি বড় দল নিয়ে মিসরের দিকে যাত্রা করেন । অন্যদিকে পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে একটি বাহিনীসহ আয়লায় পাঠান । ইবন জাহদাম মুকাবিলার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন । আকদার ইবন হাম্মাম আল-লাখমীর নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ সমুদ্র পথে শামের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন । স্থল পথে যুদ্ধের জন্যও দু'টি বাহিনী পাঠান । তাঁর একটি উদ্দেশ্য ছিল 'আবদুল 'আযীযকে আয়লায় ঢুকতে না দেওয়া । এই বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন যুহাইর ইবন কায়স । তিনি বুসাক নামক স্থানে 'আবদুল 'আযীযের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং পরাজয় বরণ করেন । ইবন জাহদাম নিজে "আইনু শামস" নামক স্থানে মারওয়ানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন । দুই দিনের প্রচণ্ড যুদ্ধে দু'পক্ষের বহু লোক হতাহত হয় । অবশেষে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবন জাহদাম ও মারওয়ানের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দেয় । আপোষের পর হিজরী ৬৫ সনের জুমাদা আল-উলা মাসে মারওয়ান মিসরে প্রবেশ করেন এবং ফিলফিল নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন । কিন্তু তাঁর তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ এমনভাবে অবস্থান মেনে নিতে পারলো না । তাই তিনি বললেন, খলীফা এমন শহরে অবস্থান করতে পারেন না যেখানে কোন প্রাসাদ নেই । অতঃপর তাঁর নির্দেশে 'কাসরুল বায়দা' নির্মাণ করা হয় । তিনি জনগণের ভাতা চালু করেন । একমাত্র মু'আফির গোত্র ছাড়া সমগ্র মিসরবাসী তাঁর খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করে । তিনি সর্বমোট দুই মাস মিসরে অবস্থান করেন । হিজরী ৬৫ সনের রজব মাসে তিনি পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে মিসরের ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে দিমাক্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । বিদায় বেলায় 'আবদুল 'আযীয বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! এমন একটি দেশ যেখানে আমার কোন আত্মীয়-বন্ধু নেই, আমি থাকবো কেমন করে? তখন মারওয়ান পুত্রকে উদ্দেশ্য করে নিম্নের উপদেশগুলো দান করেন :
"আমার প্রিয় ছেলে! তুমি তোমার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখবে । সকাল বেলায় তোমার নিকট তাদের যদি কোন দাবী থাকে তা পূরণ করতে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেরী করবে না । তেমনিভাবে সন্ধ্যায় যদি কোন দাবী থাকে, সকাল পর্যন্ত তা দেরী করবে না । তাদের অধিকার যথাসময়ে প্রদান করবে । এতে তাদের আনুগত্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে । তোমার প্রজাদের নিকট তোমার কোন মিথ্যা যেন প্রকাশ না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে । তোমার কোন মিথ্যা যদি তাদের নিকট প্রকাশ পায় তাহলে তারা তোমার সত্যকেও বিশ্বাস করবে না । তোমার পারিষদবর্গ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে । তারপরেও যদি কোন বিষয় তোমার নিকট স্পষ্ট না হয় তাহলে আমাকে লিখবে । ইনশাআল্লাহ আমার মতামত যথাসময়ে তোমার নিকট পৌছে যাবে । তোমার প্রজাদের কারো প্রতি যদি তোমার রাগ হয় তাহলে সেই রাগের মুহূর্তে তাকে পাকড়াও করবে না । তোমার রাগ শান্ত হওয়া পর্যন্ত তার শাস্তি স্থগিত রাখবে । তারপর তুমি ঠাণ্ডা মেজাজে প্রশান্ত অবস্থায় তাকে তোমার যা ইচ্ছা শাস্তি দিবে । কারণ, যে ব্যক্তি প্রথম কারাগার বানিয়েছেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ধৈর্যশীল । তারপর তুমি দৃষ্টি দিবে অভিজাত বংশীয়, দীনদার ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের প্রতি । তাঁরা অবশ্যই তোমার সংগী-সাথী ও পারিষদবর্গ হবে । সব রকম উদারতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাদের মর্যাদা ও স্থান নিরূপণ করবে । আমার বক্তব্য এতটুকু । তোমার উপর আমি আল্লাহকে প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যাচ্ছি ।" এছাড়া তিনি 'আবদুল 'আযীযকে আরো কিছু উপদেশ দান করেন । মিসর ত্যাগের পূর্বে বিশরকে 'আবদুল 'আযীযের সহকারী এবং মূসা ইবন নুসাইরকে তাঁর মন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিয়োগের ঘোষণা দেন ।
মারওয়ান মিসর থেকে দিমাকে ফিরে মাত্র দু'মাস জীবিত ছিলেন । অতঃপর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র 'আবদুল মালিক খলীফা হন । তিনি 'আবদুল 'আযীযকে তাঁর ওয়ালীর পদে বহাল রাখেন । 'আবদুল 'আযীয তাঁর শাসন আমলে মিসরে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেন । হিজরী ৬৭ সনে একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণ করেন । হিজরী ৭০ সনে মিসরে “তা'উন” (প্লেগ) মহামারী আকারে দেখা দিলে তিনি হুলওয়ানে চলে যান এবং সেখানে স্থায়ী হন । সেখানে একাধিক প্রাসাদ ও মসজিদসহ আঙ্গুর ও খেজুরের বহু বাগান তৈরি করেন । হিজরী ৭৭ সনে কায়রোর পুরাতন মসজিদটি ভেঙ্গে চতুর্দিকে আরো সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণ করেন । হিজরী ৬৯ সনে সেখানে দু'টি পুল তৈরি করে তার উপর নিজের নামটি খোদাই করেন । কবি 'উবায়দুল্লাহ ইবন কায়স আর রুকায়্যাত (মৃ. ৭৫ হি.)-এর একটি কবিতায় 'আবদুল 'আযীযের কর্মকাণ্ডের একটি চমৎকার চিত্র বিধৃত হয়েছে ।
"তা'রীফ” নামক এক প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালু করেন । আর তা হলো 'আরাফার দিন 'আসরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা । তিনি জ্ঞানী-গুণীদের অধিকার প্রদান এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অত্যন্ত উদারতার সাথে বহাল রাখেন । মিসরের কাজী 'আবদুর রহমান ইবন হুজায়রা আল-খাওলানীর ভাতা নির্ধারণ করেন বার্ষিক এক হাজার দীনার । আবুল খায়র মারছাদ আল-ইয়াযনীকে তিনি নিজে ডেকে তাঁর নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া নিতেন । মিসরের 'আলিম-'উলামা, জ্ঞানী- গুণী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন আহার করতেন । এক হাজার খাঞ্জা খাবার নিজের বাসস্থানের পাশে এবং অন্যত্র আরো এক শো খাঞ্জা খাবার প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হতো । প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও শীত মওসুমের শুরুতে কম আয়ের মানুষ ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে ঠাণ্ডা-গরমের কাপড় বিতরণ করতেন । বিধবা, ইয়াতীম ও দুঃস্থদের জন্য প্রতিদিনের ভাতা চালু করেন । মোটকথা অভাবীদের অভাব দূরীকরণের জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালান ।
কবিগণের সান্নিধ্য তাঁর খুব প্রিয় ছিল । এত উদার হস্তে কবিদের দান করতেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর কোন কোন কবি কবিতা চর্চা ছেড়ে দেন । বিশেষ করে কবি কুছায়্যির ও নুসাইবকে এত অর্থ দান করেন যে কেউ কখনো কোন কবিকে সে পরিমাণ অর্থ দেয়নি । কবি কুছায়িয়রকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি এখন কবিতা বলেন না কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন : 'আবদুল 'আযীযের পরে আর কার নিকট তেমন প্রতিদানের আশা করা যায়?
তিনি কেবল একজন উদার দানশীল ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং জনসাধারণের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে মিসরের কৃষি ব্যবস্থারও সংস্কার করেন । সরকারী উদ্যোগে অনেক ফলের বাগান করেন এবং পতিত জমি আবাদ করার জন্য কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করেন । মিসরের সরকারী পতিত ভূমি আবাদ করার জন্য মূল আরব থেকে কৃষিজীবী লোকদের এনে তাদেরকে ভূমি পত্তন দেন । তিনি 'আলিম-'উলামার ভাতা নির্ধারণ করেন । জ্ঞানের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে বহু বিদ্যালয় ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন । এমনকি নিজের প্রাসাদেও একটি মাদরাসা চালু করেন । ইবন কাছীর 'আবদুল 'আযীযের মৃত্যু প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে নিম্নের মন্তব্যটি করেন :
"আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান ছিলেন উদার, দানশীল, প্রশংসিত সৎ আমীরদের একজন ।"
হিজরী ৮৬ সনে ১৪ই জুমাদা আল-উলা সোমবার 'আবদুল 'আযীয হুলওয়ানে ইনতিকাল করেন এবং ফুসতাতে তাঁকে দাফন করা হয় । মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় এই কথাগুলো : "হায়! আমি যদি উল্লেখযোগ্য কিছু না হতাম! হায়! আমি যদি হতাম ধুলিকণা অথবা হতাম হিজাযের কোন অখ্যাত রাখাল ।" আরবের বহু কবি তাঁর মৃত্যুর পর মরছিয়া লিখেছেন ।
টিকাঃ
২৯. 'আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১
৩০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৪২; আহমাদ-যাকী সাফওয়াত, জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/১৯১
৩১. সুয়ূতী, হুসনুল মুহাদারা-২/২০৪; আল-কিন্দী, কিতাবু উলাতি মিসর (বৈরূত)-১৮৫
৩২. মু'জাম আল-বুলদান-২/২৯৩, ২৯৪; 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১৪
৩৩. হুস্ন আল-মুহাদারা-১/১১৮
৩৪. 'আবদুস সালাম, নাদবী-৯
৩৫. হুম্ন আল-মুহাদারা-২/২৪০
৩৬. আল-বিদায়া ওয়ন নিহায়া-৮/৫৮
৩৭. কিতাবু উলাতি মিসর-১৫৮