📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 যেভাবে মারওয়ান খিলাফত লাভ করলেন

📄 যেভাবে মারওয়ান খিলাফত লাভ করলেন


মু'আবিয়া ইবন ইয়াযীদের মৃত্যুর পর উমাইয়্যা খান্দানের শাসনের যখন অবসান হতে চলছিল তখন দিমাশকে দাহ্হাক ইবন কায়স ছিলেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সমর্থক ও সহযোগী । 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) তখন মক্কায় পৃথক খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেছেন । দাহ্হাকের মতো শামের আরো কিছু আমীর 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সহযোগী ছিলেন । এ অবস্থা দেখে মারওয়ান এবং তার মতো আরো কিছু উমাইয়‍্যা নেতৃবৃন্দ দিমাঙ্ক থেকে হিজাযের উদ্দশ্যে বের হন । এ খবর পেয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ পথিমধ্যে তাঁদের সাথে দেখা করেন । তিনি মারওয়ানের নিকট জানতে চান, তাঁর গন্তব্য কোন দিকে? মারওয়ান বলেন, তিনি মক্কায় যাচ্ছেন 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের হাতে বাই'আতের উদ্দেশ্যে । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তাঁকে তিরস্কার করেন এই ভাষায় :

"সুবহানাল্লাহ! আপনি আবূ খুবায়বের হাতে বাই'আত করার জন্য রাজি হয়ে গেলেন? অথচ আপনিই তো 'আবদু মান্নাফের বংশধরদের নেতা । তাঁর চেয়ে খিলাফতের অধিকার আপনারই বেশী ।"

'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ সেই ব্যক্তি যে ইয়াযীদের সন্তুষ্টির জন্য হযরত হুসাইনকে (রা) শহীদ করেছিল, রাসূলুল্লাহর (সা) বংশধরদের বুক ঝাঝরা করেছিল এবং তাদের গলা কেটেছিল । হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) সম্পর্কে বিদ্রূপের ভঙ্গিতে যে কথা উচ্চারণ করেছিল তাতে তার কুৎসিত মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা করা যায় । যে মারওয়ান ছিল সাহাবায়ে কিরাম তথা সত্যনিষ্ঠ মানুষদের দুশমন তাকেই সে খিলাফতের অধিকতর আহল ও যোগ্য মনে করলো । অথচ 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) স্থান ছিল ইমাম হুসাইন ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) পরে তাকওয়া-পরহেযগারী, উন্নত নৈতিকতা ও কর্মকাণ্ডের দিক দিয়ে সকল মানুষের উপরে । তিনি ছিলেন 'আশারা-ই- মুবাশারার অন্যতম সদস্য হযরত যুবায়রের (রা) পুত্র, উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) ভাগ্নে এবং হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্র । হযরত আসমা' বিনত আবী বকর (রা) তাঁর মা ।

যাই হোক, মারওয়ান তার কথায় গুরুত্ব দেন এবং তাঁকে প্রশ্ন করেন : আপনি কি করতে বলেন?

'আবদুল্লাহ বললো : দিমাঙ্কে ফিরে চলুন এবং মানুষকে আপনার খিলাফতের দাবীর কথা বলুন । আমি সাহায্য করবো ।

এমন কথা 'আমর ইবন সা'ঈদও বললো । এই 'আমর ছিল ইয়ামনী আরবগোষ্ঠীর নেতা । সে মারওয়ানকে পরামর্শ দিল ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার বিধবা স্ত্রী, তরুণ যুবক খালিদের মাকে বিয়ে করার জন্য যাতে খালিদ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় ।

এই তিনজনের মধ্যে একটি চুক্তি হলো । তিনজন আবার ফিরে গেলেন । ইবন যিয়াদ দিমাশকের "বাবুল ফারাবীস" নামক স্থানে অবস্থান নিয়ে দাহ্হাক ইবন কায়সের সাথে সাক্ষাৎ করলো । তাঁর হাতে চুমু খেয়ে তাঁর বংশ-আভিজাত্য ও কৌলিন্যের প্রশংসা করলো । নানা কথার পর চলে গেল । দ্বিতীয় দিন আবার সে দাহ্হাকের নিকট গেল এবং আগের দিনের মত তোষামোদীমূলক কথা বলে ফিরে গেল । তৃতীয় দিন আবার গেল এবং দাহ্হাকের সাথে একান্তে মিলিত হলো । সে বিস্ময় প্রকাশ করে দাহ্হাককে বললো, আপনি যে কুরায়শ নেতা 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সমর্থক ও সহযোগী, তাঁর চেয়ে তো আপনি নিজে এই পদের বেশী উপযুক্ত এবং জনগণের নিকট তাঁর চেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য ।

ইবন যিয়াদ ছিল ভীষণ কৌশলী ও মিষ্টভাষী মানুষ । সে দাহ্হাক ইবন কায়সের মতো একজন সরল ও সাদাসিধে সৈনিককে সহজে নিজের প্রতারণার ফাঁদে আটকে ফেললো । সে দাহ্হাককে 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পরিবর্তে নিজের জন্য মানুষের নিকট থেকে বাই'আত গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করলো । কিছু লোক তাঁর হাতে বাই'আত করলো । কিন্তু জনগণের অধিকাংশ যাঁরা 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সমর্থক ছিল তারা দাহ্হাকের উপর ক্ষেপে গেল ।

ইবন যিয়াদের চাতুর্য দাহ্হাকের মতো এত বড় সামরিক শক্তিকে বিক্ষিপ্ত করে দিল । সে তাঁকে আবার দিমাশক ছেড়ে বাইরে কোথাও শিবির স্থাপনের এবং সেখানে পৌঁছে সাধারণ সৈনিক ও শহরের জনসাধারণকে নিজের দিকে আহ্বান জানাতে পরামর্শ দিল । দাহ্হাক তার এ পরামর্শও মেনে নিলেন । তিনি দিমাশক থেকে বেরিয়ে 'মারজ"-এ শিবির স্থাপন করলেন । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ কিন্তু শহর ছাড়লো না । সে সেখানে অবস্থান করে শহরের উঁচু স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে মারওয়ানের দলে ভিড়ানোর কাজটি সমাধা করলো ।

সেই সময় মারওয়ান ও উমাইয়্যা খান্দানের লোকেরা তাদমীরে ছিলেন । ইয়াযীদের পুত্র খালিদ ও তার মা ছিলেন আল-জাবিয়াতে । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ দূত মারফত মারওয়ানকে লিখলেন তিনি যেন উমাইয়্যা খান্দানের লোকদের সমবেত করে দ্রুত নিজের খিলাফতের জন্য বাই'আত গ্রহণ করেন এবং আল-জাবিয়াতে পৌঁছে খালিদের মাকে বিয়ে করেন ।

ইবন যিয়াদের নির্দেশ মতো মারওয়ান কাজ করলেন । প্রথমে তিনি বানু উমাইয়্যাদের নিকট থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন । তারপর আল-জাবিয়াতে আসেন । সেখানে খালিদ তাঁর একজন বড় হিতাকাঙ্খী খালু হাস্সান ইবন মালিকের নিকট থাকতেন । মারওয়ান আল-জাবিয়াতে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত হাস্সান মানুষকে খালিদ ইবন ইয়াযীদের হাতে বাই'আতের জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন । কিন্তু মারওয়ান বানু উমাইয়্যাদের বড় একটি দলকে সঙ্গে করে আল-জাবিয়াতে পৌঁছালে হাসানের সিদ্ধান্ত বদলে যায় । তিনি মারওয়ানের ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর বাই'আত গ্রহণ করেন । তাঁর বাই'আত গ্রহণের পরই জনগণ মারওয়ানকে খলীফা হিসেবে মেনে নেয় । আর এভাবে আল-হাকাম ইবন আবিল 'আসের পুত্রের জন্য খিলাফতের পথ সহজ হয়ে যায় । তিনি আল-জাবিয়াতে জনগণের নিকট থেকে নিজের জন্য বাই'আত গ্রহণের পরই খালিদের মাকে বিয়ে করেন ।

এদিকে আল-জাবিয়াতে জনগণ মারওয়ানের হাতে বাই'আত করছে, আর ওদিকে সেই দিন ইবন যিয়াদ দিমাশকবাসীদের নিকট থেকে মারওয়ানের জন্য বাই'আত গ্রহণ করে । তারপর সে মারওয়ানকে লিখে জানায় যে, তিনি যেন 'মারজে রাহিত"-এ অবস্থানরত দাহহাকের দিকে অগ্রসর হন ।

মারওয়ান ও ইবন যিয়াদ বিভিন্নভাবে শক্তি সঞ্চয় করে দাহ্হাকের মুকাবিলার জন্য "মারজে রাহিত” এ উপস্থিত হন । একাধারে বিশ দিন প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দাহ্হাক ও তাঁর সাহসী সঙ্গীদের নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তা শেষ হয় । দাহ্হাকের জীবিত সৈনিকরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় । ইয়ায়ীদের মৃত্যুর পর উমাইয়্যা শাসনের যে পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছিল তা "মারজে রাহিত"-এর যুদ্ধের মাধ্যমে আবার তাদের হাতে ফিরে আসে । বিজয়ীর বেশে মারওয়ান দিমাশকে প্রবেশ করলেন এবং মু'আবিয়ার (রা) সিংহাসনে বসলেন । তিনি মু'আবিয়ার (রা) পদাঙ্ক অনুসরণ করে বায়তুল মালের দরজা খুলে দেন এবং অর্থের বিনিময়ে মানুষের সমর্থন ও আনুগত্য ক্রয় করেন ।

বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এ সেই মারওয়ান যাকে হযরত 'উছমান (রা), আমীর মু'আবিয়া (রা) ও ইয়াযীদের সময়ে সৃষ্টি জগতের অভিশপ্ত মনে করা হতো, যাকে মদীনার লোকেরা ফিতনা বা ঝগড়া-বিবাদের দ্বার বলতো, তিনি "খলীফাতুল্লাহ 'আলা আল-আরদ" বা পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফার পদে অধিষ্ঠিত হলেন । তিনি নিজেই জর্দানে পৌঁছে বিস্ময়ের সাথে বলেন : মনে হয় আল্লাহ তা'আলা খিলাফত আমাদের ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন ।

সত্যি, আল্লাহ খিলাফত তাঁর জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ, 'আমর ইবন সা'ঈদ এবং হাসান ইবন মালিকের মতো চতুর, বিচক্ষণ ও উচ্চাভিলাষী রাজনীতিবিদগণ তাঁর পাশে সমবেত হয়ে তাঁর ভাগ্যকে আরো উজ্জ্বল ও সহজ করে তোলেন । মারওয়ানকে আর যাঁরা সাহায্য করেন তাঁদের মধ্যে তাঁর দুই পুত্র আবদুল মালিক ও 'আবদুল 'আযীযও ছিলেন ।

মারওয়ানের জন্ম মক্কায় এবং মৃত্যু শামে ৬৩ বছর বয়সে হিজরী ৬৫ সনের রমাদান মাসে । মোট নয় মাস আঠারো দিন খিলাফতের মসনদে আসীন ছিলেন । মৃত্যুর পূর্বে তিনি দুই পুত্র 'আবদুল মালিক ও 'আবদুল আযীযকে যথাক্রমে খলীফা মনোনীত করে যান । 'আবদুল মালিক বড় ছিলেন । এ কারণে তাঁকে প্রথম এবং ছোট 'আবদুল আযীযকে দ্বিতীয় স্থানে রাখেন । মৃত্যুর সময় আবদুল মালিক পিতার কাছে ছিলেন, আর 'আবদুল আযীয ছিলেন সুদূর মিসরে ।

টিকাঃ
১৪. তাবাকাত-৫/২৬
১৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৩৯৭
১৬. তাবাকাত-৫/২৬
১৭. তাবাকাত-৫/২৭
১৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৩৯৮

মু'আবিয়া ইবন ইয়াযীদের মৃত্যুর পর উমাইয়্যা খান্দানের শাসনের যখন অবসান হতে চলছিল তখন দিমাশকে দাহ্হাক ইবন কায়স ছিলেন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সমর্থক ও সহযোগী । 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) তখন মক্কায় পৃথক খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেছেন । দাহ্হাকের মতো শামের আরো কিছু আমীর 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সহযোগী ছিলেন । এ অবস্থা দেখে মারওয়ান এবং তার মতো আরো কিছু উমাইয়‍্যা নেতৃবৃন্দ দিমাঙ্ক থেকে হিজাযের উদ্দশ্যে বের হন । এ খবর পেয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ পথিমধ্যে তাঁদের সাথে দেখা করেন । তিনি মারওয়ানের নিকট জানতে চান, তাঁর গন্তব্য কোন দিকে? মারওয়ান বলেন, তিনি মক্কায় যাচ্ছেন 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের হাতে বাই'আতের উদ্দেশ্যে । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ তাঁকে তিরস্কার করেন এই ভাষায় :

"সুবহানাল্লাহ! আপনি আবূ খুবায়বের হাতে বাই'আত করার জন্য রাজি হয়ে গেলেন? অথচ আপনিই তো 'আবদু মান্নাফের বংশধরদের নেতা । তাঁর চেয়ে খিলাফতের অধিকার আপনারই বেশী ।"

'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ সেই ব্যক্তি যে ইয়াযীদের সন্তুষ্টির জন্য হযরত হুসাইনকে (রা) শহীদ করেছিল, রাসূলুল্লাহর (সা) বংশধরদের বুক ঝাঝরা করেছিল এবং তাদের গলা কেটেছিল । হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) সম্পর্কে বিদ্রূপের ভঙ্গিতে যে কথা উচ্চারণ করেছিল তাতে তার কুৎসিত মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা করা যায় । যে মারওয়ান ছিল সাহাবায়ে কিরাম তথা সত্যনিষ্ঠ মানুষদের দুশমন তাকেই সে খিলাফতের অধিকতর আহল ও যোগ্য মনে করলো । অথচ 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) স্থান ছিল ইমাম হুসাইন ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) পরে তাকওয়া-পরহেযগারী, উন্নত নৈতিকতা ও কর্মকাণ্ডের দিক দিয়ে সকল মানুষের উপরে । তিনি ছিলেন 'আশারা-ই- মুবাশারার অন্যতম সদস্য হযরত যুবায়রের (রা) পুত্র, উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) ভাগ্নে এবং হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) দৌহিত্র । হযরত আসমা' বিনত আবী বকর (রা) তাঁর মা ।

যাই হোক, মারওয়ান তার কথায় গুরুত্ব দেন এবং তাঁকে প্রশ্ন করেন : আপনি কি করতে বলেন?

'আবদুল্লাহ বললো : দিমাঙ্কে ফিরে চলুন এবং মানুষকে আপনার খিলাফতের দাবীর কথা বলুন । আমি সাহায্য করবো ।

এমন কথা 'আমর ইবন সা'ঈদও বললো । এই 'আমর ছিল ইয়ামনী আরবগোষ্ঠীর নেতা । সে মারওয়ানকে পরামর্শ দিল ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার বিধবা স্ত্রী, তরুণ যুবক খালিদের মাকে বিয়ে করার জন্য যাতে খালিদ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় ।

এই তিনজনের মধ্যে একটি চুক্তি হলো । তিনজন আবার ফিরে গেলেন । ইবন যিয়াদ দিমাশকের "বাবুল ফারাবীস" নামক স্থানে অবস্থান নিয়ে দাহ্হাক ইবন কায়সের সাথে সাক্ষাৎ করলো । তাঁর হাতে চুমু খেয়ে তাঁর বংশ-আভিজাত্য ও কৌলিন্যের প্রশংসা করলো । নানা কথার পর চলে গেল । দ্বিতীয় দিন আবার সে দাহ্হাকের নিকট গেল এবং আগের দিনের মত তোষামোদীমূলক কথা বলে ফিরে গেল । তৃতীয় দিন আবার গেল এবং দাহ্হাকের সাথে একান্তে মিলিত হলো । সে বিস্ময় প্রকাশ করে দাহ্হাককে বললো, আপনি যে কুরায়শ নেতা 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সমর্থক ও সহযোগী, তাঁর চেয়ে তো আপনি নিজে এই পদের বেশী উপযুক্ত এবং জনগণের নিকট তাঁর চেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য ।

ইবন যিয়াদ ছিল ভীষণ কৌশলী ও মিষ্টভাষী মানুষ । সে দাহ্হাক ইবন কায়সের মতো একজন সরল ও সাদাসিধে সৈনিককে সহজে নিজের প্রতারণার ফাঁদে আটকে ফেললো । সে দাহ্হাককে 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পরিবর্তে নিজের জন্য মানুষের নিকট থেকে বাই'আত গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করলো । কিছু লোক তাঁর হাতে বাই'আত করলো । কিন্তু জনগণের অধিকাংশ যাঁরা 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সমর্থক ছিল তারা দাহ্হাকের উপর ক্ষেপে গেল ।

ইবন যিয়াদের চাতুর্য দাহ্হাকের মতো এত বড় সামরিক শক্তিকে বিক্ষিপ্ত করে দিল । সে তাঁকে আবার দিমাশক ছেড়ে বাইরে কোথাও শিবির স্থাপনের এবং সেখানে পৌঁছে সাধারণ সৈনিক ও শহরের জনসাধারণকে নিজের দিকে আহ্বান জানাতে পরামর্শ দিল । দাহ্হাক তার এ পরামর্শও মেনে নিলেন । তিনি দিমাশক থেকে বেরিয়ে 'মারজ"-এ শিবির স্থাপন করলেন । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ কিন্তু শহর ছাড়লো না । সে সেখানে অবস্থান করে শহরের উঁচু স্তরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে মারওয়ানের দলে ভিড়ানোর কাজটি সমাধা করলো ।

সেই সময় মারওয়ান ও উমাইয়্যা খান্দানের লোকেরা তাদমীরে ছিলেন । ইয়াযীদের পুত্র খালিদ ও তার মা ছিলেন আল-জাবিয়াতে । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ দূত মারফত মারওয়ানকে লিখলেন তিনি যেন উমাইয়্যা খান্দানের লোকদের সমবেত করে দ্রুত নিজের খিলাফতের জন্য বাই'আত গ্রহণ করেন এবং আল-জাবিয়াতে পৌঁছে খালিদের মাকে বিয়ে করেন ।

ইবন যিয়াদের নির্দেশ মতো মারওয়ান কাজ করলেন । প্রথমে তিনি বানু উমাইয়্যাদের নিকট থেকে বাই'আত গ্রহণ করেন । তারপর আল-জাবিয়াতে আসেন । সেখানে খালিদ তাঁর একজন বড় হিতাকাঙ্খী খালু হাস্সান ইবন মালিকের নিকট থাকতেন । মারওয়ান আল-জাবিয়াতে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত হাস্সান মানুষকে খালিদ ইবন ইয়াযীদের হাতে বাই'আতের জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন । কিন্তু মারওয়ান বানু উমাইয়্যাদের বড় একটি দলকে সঙ্গে করে আল-জাবিয়াতে পৌঁছালে হাসানের সিদ্ধান্ত বদলে যায় । তিনি মারওয়ানের ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর বাই'আত গ্রহণ করেন । তাঁর বাই'আত গ্রহণের পরই জনগণ মারওয়ানকে খলীফা হিসেবে মেনে নেয় । আর এভাবে আল-হাকাম ইবন আবিল 'আসের পুত্রের জন্য খিলাফতের পথ সহজ হয়ে যায় । তিনি আল-জাবিয়াতে জনগণের নিকট থেকে নিজের জন্য বাই'আত গ্রহণের পরই খালিদের মাকে বিয়ে করেন ।

এদিকে আল-জাবিয়াতে জনগণ মারওয়ানের হাতে বাই'আত করছে, আর ওদিকে সেই দিন ইবন যিয়াদ দিমাশকবাসীদের নিকট থেকে মারওয়ানের জন্য বাই'আত গ্রহণ করে । তারপর সে মারওয়ানকে লিখে জানায় যে, তিনি যেন 'মারজে রাহিত"-এ অবস্থানরত দাহহাকের দিকে অগ্রসর হন ।

মারওয়ান ও ইবন যিয়াদ বিভিন্নভাবে শক্তি সঞ্চয় করে দাহ্হাকের মুকাবিলার জন্য "মারজে রাহিত” এ উপস্থিত হন । একাধারে বিশ দিন প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দাহ্হাক ও তাঁর সাহসী সঙ্গীদের নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে তা শেষ হয় । দাহ্হাকের জীবিত সৈনিকরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় । ইয়ায়ীদের মৃত্যুর পর উমাইয়্যা শাসনের যে পরিসমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছিল তা "মারজে রাহিত"-এর যুদ্ধের মাধ্যমে আবার তাদের হাতে ফিরে আসে । বিজয়ীর বেশে মারওয়ান দিমাশকে প্রবেশ করলেন এবং মু'আবিয়ার (রা) সিংহাসনে বসলেন । তিনি মু'আবিয়ার (রা) পদাঙ্ক অনুসরণ করে বায়তুল মালের দরজা খুলে দেন এবং অর্থের বিনিময়ে মানুষের সমর্থন ও আনুগত্য ক্রয় করেন ।

বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এ সেই মারওয়ান যাকে হযরত 'উছমান (রা), আমীর মু'আবিয়া (রা) ও ইয়াযীদের সময়ে সৃষ্টি জগতের অভিশপ্ত মনে করা হতো, যাকে মদীনার লোকেরা ফিতনা বা ঝগড়া-বিবাদের দ্বার বলতো, তিনি "খলীফাতুল্লাহ 'আলা আল-আরদ" বা পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফার পদে অধিষ্ঠিত হলেন । তিনি নিজেই জর্দানে পৌঁছে বিস্ময়ের সাথে বলেন : মনে হয় আল্লাহ তা'আলা খিলাফত আমাদের ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন ।

সত্যি, আল্লাহ খিলাফত তাঁর জন্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন । 'আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ, 'আমর ইবন সা'ঈদ এবং হাসান ইবন মালিকের মতো চতুর, বিচক্ষণ ও উচ্চাভিলাষী রাজনীতিবিদগণ তাঁর পাশে সমবেত হয়ে তাঁর ভাগ্যকে আরো উজ্জ্বল ও সহজ করে তোলেন । মারওয়ানকে আর যাঁরা সাহায্য করেন তাঁদের মধ্যে তাঁর দুই পুত্র আবদুল মালিক ও 'আবদুল 'আযীযও ছিলেন ।

মারওয়ানের জন্ম মক্কায় এবং মৃত্যু শামে ৬৩ বছর বয়সে হিজরী ৬৫ সনের রমাদান মাসে । মোট নয় মাস আঠারো দিন খিলাফতের মসনদে আসীন ছিলেন । মৃত্যুর পূর্বে তিনি দুই পুত্র 'আবদুল মালিক ও 'আবদুল আযীযকে যথাক্রমে খলীফা মনোনীত করে যান । 'আবদুল মালিক বড় ছিলেন । এ কারণে তাঁকে প্রথম এবং ছোট 'আবদুল আযীযকে দ্বিতীয় স্থানে রাখেন । মৃত্যুর সময় আবদুল মালিক পিতার কাছে ছিলেন, আর 'আবদুল আযীয ছিলেন সুদূর মিসরে ।

টিকাঃ
১৪. তাবাকাত-৫/২৬
১৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৩৯৭
১৬. তাবাকাত-৫/২৬
১৭. তাবাকাত-৫/২৭
১৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৩৯৮

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আবদুল ‘আযীযের পরিচয়

📄 ‘আবদুল ‘আযীযের পরিচয়


হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পিতা 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান উমাইয়্যা খান্দানের একজন বিশিষ্ট ভাগ্যবান ব্যক্তি । তাঁর নিজের বর্ণনা : "মাসলামা ইবনে মাখলাদ মিসরের ওয়ালী থাকাকালীন আমি সেখানে যাই । আমার অন্তরে তখন কয়েকটি বাসনা জাগে । পরবর্তীকালে তা সবই পূর্ণ হয় । সেই বাসনাগুলো হলো : ১. আমি যেন মিসরের ওয়ালী হই, ২. মাসলামার দুই স্ত্রীই যেন আমার স্ত্রী হয়, ৩. কায়স ইবন কুলাইব যেন আমার হাজিব বা নিরাপত্তা রক্ষী হয় ।" আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল ইচ্ছাই পূর্ণ করেছেন । মাসলামার দুই স্ত্রীই তাঁর স্ত্রী হয়েছে, কায়স ইবন কুলাইব তাঁর হাজিব হয়েছে এবং বিশ বছর দশ মাস একাধারে মিসরের ওয়ালী থেকেছেন । ঐতিহাসিকদের মতে ইসলামের ইতিহাসে আর কোন ব্যক্তি কোথাও এত দীর্ঘ সময় ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেননি ।

হিজরী ৬৫ সনে তিনি মিসরে ওয়ালীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ব্যাপারটি ঘটে এভাবে : 'আবদুর রহমান ইবন জাহদাম, যিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পক্ষ থেকে মিসরের ওয়ালী ছিলেন, মিসরের ঐ সকল খারিজীদেরকে যাঁরা মক্কায় 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সমর্থক ও সাহায্যকারী ছিল, তাদের ঐক্যবদ্ধ করে "তাহকীম” বা সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবী জানায় । আর সে সময় মিসরে বানু উমাইয়‍্যাদের সমর্থক লোকেরা তাঁর হাতে বাই'আত করে । এরপর হিজরী ৬৪ সনের যুলকা'দা মাসে 'আবদুল 'আযীযের পিতা মারওয়ান ইবন হাকাম সিরিয়ায় জনগণের নিকট থেকে নিজের হাতে বাই'আত নেন । মিসরের মানুষ প্রকাশ্যে ইবন জাহদামের পক্ষে ছিল, তবে গোপনে তাঁদের সমর্থন ছিল মারওয়ানের প্রতি । এ কারণে মিসরবাসী তাঁকে মিসরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় । মারওয়ান তাঁর উঁচু পর্যায়ের আমলা ও সহযোগীদের একটি বড় দল নিয়ে মিসরের দিকে যাত্রা করেন । অন্যদিকে পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে একটি বাহিনীসহ আয়লায় পাঠান । ইবন জাহদাম মুকাবিলার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন । আকদার ইবন হাম্মাম আল-লাখমীর নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ সমুদ্র পথে শামের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন । স্থল পথে যুদ্ধের জন্যও দু'টি বাহিনী পাঠান । তাঁর একটি উদ্দেশ্য ছিল 'আবদুল 'আযীযকে আয়লায় ঢুকতে না দেওয়া । এই বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন যুহাইর ইবন কায়স । তিনি বুসাক নামক স্থানে 'আবদুল 'আযীযের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং পরাজয় বরণ করেন । ইবন জাহদাম নিজে "আইনু শামস" নামক স্থানে মারওয়ানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন । দুই দিনের প্রচণ্ড যুদ্ধে দু'পক্ষের বহু লোক হতাহত হয় । অবশেষে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবন জাহদাম ও মারওয়ানের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দেয় । আপোষের পর হিজরী ৬৫ সনের জুমাদা আল-উলা মাসে মারওয়ান মিসরে প্রবেশ করেন এবং ফিলফিল নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন । কিন্তু তাঁর তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ এমনভাবে অবস্থান মেনে নিতে পারলো না । তাই তিনি বললেন, খলীফা এমন শহরে অবস্থান করতে পারেন না যেখানে কোন প্রাসাদ নেই । অতঃপর তাঁর নির্দেশে 'কাসরুল বায়দা' নির্মাণ করা হয় । তিনি জনগণের ভাতা চালু করেন । একমাত্র মু'আফির গোত্র ছাড়া সমগ্র মিসরবাসী তাঁর খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করে । তিনি সর্বমোট দুই মাস মিসরে অবস্থান করেন । হিজরী ৬৫ সনের রজব মাসে তিনি পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে মিসরের ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে দিমাক্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । বিদায় বেলায় 'আবদুল 'আযীয বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! এমন একটি দেশ যেখানে আমার কোন আত্মীয়-বন্ধু নেই, আমি থাকবো কেমন করে? তখন মারওয়ান পুত্রকে উদ্দেশ্য করে নিম্নের উপদেশগুলো দান করেন :

"আমার প্রিয় ছেলে! তুমি তোমার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখবে । সকাল বেলায় তোমার নিকট তাদের যদি কোন দাবী থাকে তা পূরণ করতে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেরী করবে না । তেমনিভাবে সন্ধ্যায় যদি কোন দাবী থাকে, সকাল পর্যন্ত তা দেরী করবে না । তাদের অধিকার যথাসময়ে প্রদান করবে । এতে তাদের আনুগত্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে । তোমার প্রজাদের নিকট তোমার কোন মিথ্যা যেন প্রকাশ না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে । তোমার কোন মিথ্যা যদি তাদের নিকট প্রকাশ পায় তাহলে তারা তোমার সত্যকেও বিশ্বাস করবে না । তোমার পারিষদবর্গ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে । তারপরেও যদি কোন বিষয় তোমার নিকট স্পষ্ট না হয় তাহলে আমাকে লিখবে । ইনশাআল্লাহ আমার মতামত যথাসময়ে তোমার নিকট পৌছে যাবে । তোমার প্রজাদের কারো প্রতি যদি তোমার রাগ হয় তাহলে সেই রাগের মুহূর্তে তাকে পাকড়াও করবে না । তোমার রাগ শান্ত হওয়া পর্যন্ত তার শাস্তি স্থগিত রাখবে । তারপর তুমি ঠাণ্ডা মেজাজে প্রশান্ত অবস্থায় তাকে তোমার যা ইচ্ছা শাস্তি দিবে । কারণ, যে ব্যক্তি প্রথম কারাগার বানিয়েছেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ধৈর্যশীল । তারপর তুমি দৃষ্টি দিবে অভিজাত বংশীয়, দীনদার ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের প্রতি । তাঁরা অবশ্যই তোমার সংগী-সাথী ও পারিষদবর্গ হবে । সব রকম উদারতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাদের মর্যাদা ও স্থান নিরূপণ করবে । আমার বক্তব্য এতটুকু । তোমার উপর আমি আল্লাহকে প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যাচ্ছি ।" এছাড়া তিনি 'আবদুল 'আযীযকে আরো কিছু উপদেশ দান করেন । মিসর ত্যাগের পূর্বে বিশরকে 'আবদুল 'আযীযের সহকারী এবং মূসা ইবন নুসাইরকে তাঁর মন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিয়োগের ঘোষণা দেন ।

মারওয়ান মিসর থেকে দিমাকে ফিরে মাত্র দু'মাস জীবিত ছিলেন । অতঃপর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র 'আবদুল মালিক খলীফা হন । তিনি 'আবদুল 'আযীযকে তাঁর ওয়ালীর পদে বহাল রাখেন । 'আবদুল 'আযীয তাঁর শাসন আমলে মিসরে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেন । হিজরী ৬৭ সনে একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণ করেন । হিজরী ৭০ সনে মিসরে “তা'উন” (প্লেগ) মহামারী আকারে দেখা দিলে তিনি হুলওয়ানে চলে যান এবং সেখানে স্থায়ী হন । সেখানে একাধিক প্রাসাদ ও মসজিদসহ আঙ্গুর ও খেজুরের বহু বাগান তৈরি করেন । হিজরী ৭৭ সনে কায়রোর পুরাতন মসজিদটি ভেঙ্গে চতুর্দিকে আরো সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণ করেন । হিজরী ৬৯ সনে সেখানে দু'টি পুল তৈরি করে তার উপর নিজের নামটি খোদাই করেন । কবি 'উবায়দুল্লাহ ইবন কায়স আর রুকায়‍্যাত (মৃ. ৭৫ হি.)-এর একটি কবিতায় 'আবদুল 'আযীযের কর্মকাণ্ডের একটি চমৎকার চিত্র বিধৃত হয়েছে ।

"তা'রীফ” নামক এক প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালু করেন । আর তা হলো 'আরাফার দিন 'আসরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা । তিনি জ্ঞানী-গুণীদের অধিকার প্রদান এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অত্যন্ত উদারতার সাথে বহাল রাখেন । মিসরের কাজী 'আবদুর রহমান ইবন হুজায়রা আল-খাওলানীর ভাতা নির্ধারণ করেন বার্ষিক এক হাজার দীনার । আবুল খায়র মারছাদ আল-ইয়াযনীকে তিনি নিজে ডেকে তাঁর নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া নিতেন । মিসরের 'আলিম-'উলামা, জ্ঞানী- গুণী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন আহার করতেন । এক হাজার খাঞ্জা খাবার নিজের বাসস্থানের পাশে এবং অন্যত্র আরো এক শো খাঞ্জা খাবার প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হতো । প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও শীত মওসুমের শুরুতে কম আয়ের মানুষ ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে ঠাণ্ডা-গরমের কাপড় বিতরণ করতেন । বিধবা, ইয়াতীম ও দুঃস্থদের জন্য প্রতিদিনের ভাতা চালু করেন । মোটকথা অভাবীদের অভাব দূরীকরণের জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালান ।

কবিগণের সান্নিধ্য তাঁর খুব প্রিয় ছিল । এত উদার হস্তে কবিদের দান করতেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর কোন কোন কবি কবিতা চর্চা ছেড়ে দেন । বিশেষ করে কবি কুছায়্যির ও নুসাইবকে এত অর্থ দান করেন যে কেউ কখনো কোন কবিকে সে পরিমাণ অর্থ দেয়নি । কবি কুছায়িয়রকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি এখন কবিতা বলেন না কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন : 'আবদুল 'আযীযের পরে আর কার নিকট তেমন প্রতিদানের আশা করা যায়?

তিনি কেবল একজন উদার দানশীল ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং জনসাধারণের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে মিসরের কৃষি ব্যবস্থারও সংস্কার করেন । সরকারী উদ্যোগে অনেক ফলের বাগান করেন এবং পতিত জমি আবাদ করার জন্য কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করেন । মিসরের সরকারী পতিত ভূমি আবাদ করার জন্য মূল আরব থেকে কৃষিজীবী লোকদের এনে তাদেরকে ভূমি পত্তন দেন । তিনি 'আলিম-'উলামার ভাতা নির্ধারণ করেন । জ্ঞানের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে বহু বিদ্যালয় ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন । এমনকি নিজের প্রাসাদেও একটি মাদরাসা চালু করেন । ইবন কাছীর 'আবদুল 'আযীযের মৃত্যু প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে নিম্নের মন্তব্যটি করেন :

"আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান ছিলেন উদার, দানশীল, প্রশংসিত সৎ আমীরদের একজন ।"
হিজরী ৮৬ সনে ১৪ই জুমাদা আল-উলা সোমবার 'আবদুল 'আযীয হুলওয়ানে ইনতিকাল করেন এবং ফুসতাতে তাঁকে দাফন করা হয় । মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় এই কথাগুলো : "হায়! আমি যদি উল্লেখযোগ্য কিছু না হতাম! হায়! আমি যদি হতাম ধুলিকণা অথবা হতাম হিজাযের কোন অখ্যাত রাখাল ।" আরবের বহু কবি তাঁর মৃত্যুর পর মরছিয়া লিখেছেন ।

টিকাঃ
২৯. 'আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১
৩০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৪২; আহমাদ-যাকী সাফওয়াত, জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/১৯১
৩১. সুয়ূতী, হুসনুল মুহাদারা-২/২০৪; আল-কিন্দী, কিতাবু উলাতি মিসর (বৈরূত)-১৮৫
৩২. মু'জাম আল-বুলদান-২/২৯৩, ২৯৪; 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১৪
৩৩. হুস্ন আল-মুহাদারা-১/১১৮
৩৪. 'আবদুস সালাম, নাদবী-৯
৩৫. হুম্ন আল-মুহাদারা-২/২৪০
৩৬. আল-বিদায়া ওয়ন নিহায়া-৮/৫৮
৩৭. কিতাবু উলাতি মিসর-১৫৮

হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের পিতা 'আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান উমাইয়্যা খান্দানের একজন বিশিষ্ট ভাগ্যবান ব্যক্তি । তাঁর নিজের বর্ণনা : "মাসলামা ইবনে মাখলাদ মিসরের ওয়ালী থাকাকালীন আমি সেখানে যাই । আমার অন্তরে তখন কয়েকটি বাসনা জাগে । পরবর্তীকালে তা সবই পূর্ণ হয় । সেই বাসনাগুলো হলো : ১. আমি যেন মিসরের ওয়ালী হই, ২. মাসলামার দুই স্ত্রীই যেন আমার স্ত্রী হয়, ৩. কায়স ইবন কুলাইব যেন আমার হাজিব বা নিরাপত্তা রক্ষী হয় ।" আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল ইচ্ছাই পূর্ণ করেছেন । মাসলামার দুই স্ত্রীই তাঁর স্ত্রী হয়েছে, কায়স ইবন কুলাইব তাঁর হাজিব হয়েছে এবং বিশ বছর দশ মাস একাধারে মিসরের ওয়ালী থেকেছেন । ঐতিহাসিকদের মতে ইসলামের ইতিহাসে আর কোন ব্যক্তি কোথাও এত দীর্ঘ সময় ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেননি ।

হিজরী ৬৫ সনে তিনি মিসরে ওয়ালীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন । ব্যাপারটি ঘটে এভাবে : 'আবদুর রহমান ইবন জাহদাম, যিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পক্ষ থেকে মিসরের ওয়ালী ছিলেন, মিসরের ঐ সকল খারিজীদেরকে যাঁরা মক্কায় 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের সমর্থক ও সাহায্যকারী ছিল, তাদের ঐক্যবদ্ধ করে "তাহকীম” বা সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির দাবী জানায় । আর সে সময় মিসরে বানু উমাইয়‍্যাদের সমর্থক লোকেরা তাঁর হাতে বাই'আত করে । এরপর হিজরী ৬৪ সনের যুলকা'দা মাসে 'আবদুল 'আযীযের পিতা মারওয়ান ইবন হাকাম সিরিয়ায় জনগণের নিকট থেকে নিজের হাতে বাই'আত নেন । মিসরের মানুষ প্রকাশ্যে ইবন জাহদামের পক্ষে ছিল, তবে গোপনে তাঁদের সমর্থন ছিল মারওয়ানের প্রতি । এ কারণে মিসরবাসী তাঁকে মিসরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায় । মারওয়ান তাঁর উঁচু পর্যায়ের আমলা ও সহযোগীদের একটি বড় দল নিয়ে মিসরের দিকে যাত্রা করেন । অন্যদিকে পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে একটি বাহিনীসহ আয়লায় পাঠান । ইবন জাহদাম মুকাবিলার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন । আকদার ইবন হাম্মাম আল-লাখমীর নেতৃত্বে কয়েকটি যুদ্ধ জাহাজ সমুদ্র পথে শামের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেন । স্থল পথে যুদ্ধের জন্যও দু'টি বাহিনী পাঠান । তাঁর একটি উদ্দেশ্য ছিল 'আবদুল 'আযীযকে আয়লায় ঢুকতে না দেওয়া । এই বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন যুহাইর ইবন কায়স । তিনি বুসাক নামক স্থানে 'আবদুল 'আযীযের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং পরাজয় বরণ করেন । ইবন জাহদাম নিজে "আইনু শামস" নামক স্থানে মারওয়ানের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন । দুই দিনের প্রচণ্ড যুদ্ধে দু'পক্ষের বহু লোক হতাহত হয় । অবশেষে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবন জাহদাম ও মারওয়ানের মধ্যে আপোষ- মীমাংসা করে দেয় । আপোষের পর হিজরী ৬৫ সনের জুমাদা আল-উলা মাসে মারওয়ান মিসরে প্রবেশ করেন এবং ফিলফিল নামক স্থানে অবস্থান করতে থাকেন । কিন্তু তাঁর তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ এমনভাবে অবস্থান মেনে নিতে পারলো না । তাই তিনি বললেন, খলীফা এমন শহরে অবস্থান করতে পারেন না যেখানে কোন প্রাসাদ নেই । অতঃপর তাঁর নির্দেশে 'কাসরুল বায়দা' নির্মাণ করা হয় । তিনি জনগণের ভাতা চালু করেন । একমাত্র মু'আফির গোত্র ছাড়া সমগ্র মিসরবাসী তাঁর খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করে । তিনি সর্বমোট দুই মাস মিসরে অবস্থান করেন । হিজরী ৬৫ সনের রজব মাসে তিনি পুত্র 'আবদুল 'আযীযকে মিসরের ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে দিমাক্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । বিদায় বেলায় 'আবদুল 'আযীয বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! এমন একটি দেশ যেখানে আমার কোন আত্মীয়-বন্ধু নেই, আমি থাকবো কেমন করে? তখন মারওয়ান পুত্রকে উদ্দেশ্য করে নিম্নের উপদেশগুলো দান করেন :

"আমার প্রিয় ছেলে! তুমি তোমার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের প্রতি দৃষ্টি রাখবে । সকাল বেলায় তোমার নিকট তাদের যদি কোন দাবী থাকে তা পূরণ করতে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেরী করবে না । তেমনিভাবে সন্ধ্যায় যদি কোন দাবী থাকে, সকাল পর্যন্ত তা দেরী করবে না । তাদের অধিকার যথাসময়ে প্রদান করবে । এতে তাদের আনুগত্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে । তোমার প্রজাদের নিকট তোমার কোন মিথ্যা যেন প্রকাশ না পায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে । তোমার কোন মিথ্যা যদি তাদের নিকট প্রকাশ পায় তাহলে তারা তোমার সত্যকেও বিশ্বাস করবে না । তোমার পারিষদবর্গ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে । তারপরেও যদি কোন বিষয় তোমার নিকট স্পষ্ট না হয় তাহলে আমাকে লিখবে । ইনশাআল্লাহ আমার মতামত যথাসময়ে তোমার নিকট পৌছে যাবে । তোমার প্রজাদের কারো প্রতি যদি তোমার রাগ হয় তাহলে সেই রাগের মুহূর্তে তাকে পাকড়াও করবে না । তোমার রাগ শান্ত হওয়া পর্যন্ত তার শাস্তি স্থগিত রাখবে । তারপর তুমি ঠাণ্ডা মেজাজে প্রশান্ত অবস্থায় তাকে তোমার যা ইচ্ছা শাস্তি দিবে । কারণ, যে ব্যক্তি প্রথম কারাগার বানিয়েছেন তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ধৈর্যশীল । তারপর তুমি দৃষ্টি দিবে অভিজাত বংশীয়, দীনদার ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের প্রতি । তাঁরা অবশ্যই তোমার সংগী-সাথী ও পারিষদবর্গ হবে । সব রকম উদারতা ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাদের মর্যাদা ও স্থান নিরূপণ করবে । আমার বক্তব্য এতটুকু । তোমার উপর আমি আল্লাহকে প্রতিনিধি হিসেবে রেখে যাচ্ছি ।" এছাড়া তিনি 'আবদুল 'আযীযকে আরো কিছু উপদেশ দান করেন । মিসর ত্যাগের পূর্বে বিশরকে 'আবদুল 'আযীযের সহকারী এবং মূসা ইবন নুসাইরকে তাঁর মন্ত্রী ও উপদেষ্টা নিয়োগের ঘোষণা দেন ।

মারওয়ান মিসর থেকে দিমাকে ফিরে মাত্র দু'মাস জীবিত ছিলেন । অতঃপর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র 'আবদুল মালিক খলীফা হন । তিনি 'আবদুল 'আযীযকে তাঁর ওয়ালীর পদে বহাল রাখেন । 'আবদুল 'আযীয তাঁর শাসন আমলে মিসরে অনেক উল্লেখযোগ্য কাজ করেন । হিজরী ৬৭ সনে একটি দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ নির্মাণ করেন । হিজরী ৭০ সনে মিসরে “তা'উন” (প্লেগ) মহামারী আকারে দেখা দিলে তিনি হুলওয়ানে চলে যান এবং সেখানে স্থায়ী হন । সেখানে একাধিক প্রাসাদ ও মসজিদসহ আঙ্গুর ও খেজুরের বহু বাগান তৈরি করেন । হিজরী ৭৭ সনে কায়রোর পুরাতন মসজিদটি ভেঙ্গে চতুর্দিকে আরো সম্প্রসারণ করে পুনঃনির্মাণ করেন । হিজরী ৬৯ সনে সেখানে দু'টি পুল তৈরি করে তার উপর নিজের নামটি খোদাই করেন । কবি 'উবায়দুল্লাহ ইবন কায়স আর রুকায়‍্যাত (মৃ. ৭৫ হি.)-এর একটি কবিতায় 'আবদুল 'আযীযের কর্মকাণ্ডের একটি চমৎকার চিত্র বিধৃত হয়েছে ।

"তা'রীফ” নামক এক প্রকার ধর্মীয় অনুষ্ঠান চালু করেন । আর তা হলো 'আরাফার দিন 'আসরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা । তিনি জ্ঞানী-গুণীদের অধিকার প্রদান এবং তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অত্যন্ত উদারতার সাথে বহাল রাখেন । মিসরের কাজী 'আবদুর রহমান ইবন হুজায়রা আল-খাওলানীর ভাতা নির্ধারণ করেন বার্ষিক এক হাজার দীনার । আবুল খায়র মারছাদ আল-ইয়াযনীকে তিনি নিজে ডেকে তাঁর নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ফাতওয়া নিতেন । মিসরের 'আলিম-'উলামা, জ্ঞানী- গুণী এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন আহার করতেন । এক হাজার খাঞ্জা খাবার নিজের বাসস্থানের পাশে এবং অন্যত্র আরো এক শো খাঞ্জা খাবার প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হতো । প্রতি বছর গ্রীষ্ম ও শীত মওসুমের শুরুতে কম আয়ের মানুষ ও অভাবগ্রস্তদের মধ্যে ঠাণ্ডা-গরমের কাপড় বিতরণ করতেন । বিধবা, ইয়াতীম ও দুঃস্থদের জন্য প্রতিদিনের ভাতা চালু করেন । মোটকথা অভাবীদের অভাব দূরীকরণের জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা চালান ।

কবিগণের সান্নিধ্য তাঁর খুব প্রিয় ছিল । এত উদার হস্তে কবিদের দান করতেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর কোন কোন কবি কবিতা চর্চা ছেড়ে দেন । বিশেষ করে কবি কুছায়্যির ও নুসাইবকে এত অর্থ দান করেন যে কেউ কখনো কোন কবিকে সে পরিমাণ অর্থ দেয়নি । কবি কুছায়িয়রকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি এখন কবিতা বলেন না কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন : 'আবদুল 'আযীযের পরে আর কার নিকট তেমন প্রতিদানের আশা করা যায়?

তিনি কেবল একজন উদার দানশীল ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং জনসাধারণের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে মিসরের কৃষি ব্যবস্থারও সংস্কার করেন । সরকারী উদ্যোগে অনেক ফলের বাগান করেন এবং পতিত জমি আবাদ করার জন্য কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করেন । মিসরের সরকারী পতিত ভূমি আবাদ করার জন্য মূল আরব থেকে কৃষিজীবী লোকদের এনে তাদেরকে ভূমি পত্তন দেন । তিনি 'আলিম-'উলামার ভাতা নির্ধারণ করেন । জ্ঞানের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে বহু বিদ্যালয় ও খানকা প্রতিষ্ঠা করেন । এমনকি নিজের প্রাসাদেও একটি মাদরাসা চালু করেন । ইবন কাছীর 'আবদুল 'আযীযের মৃত্যু প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে নিম্নের মন্তব্যটি করেন :

"আবদুল 'আযীয ইবন মারওয়ান ছিলেন উদার, দানশীল, প্রশংসিত সৎ আমীরদের একজন ।"
হিজরী ৮৬ সনে ১৪ই জুমাদা আল-উলা সোমবার 'আবদুল 'আযীয হুলওয়ানে ইনতিকাল করেন এবং ফুসতাতে তাঁকে দাফন করা হয় । মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হয় এই কথাগুলো : "হায়! আমি যদি উল্লেখযোগ্য কিছু না হতাম! হায়! আমি যদি হতাম ধুলিকণা অথবা হতাম হিজাযের কোন অখ্যাত রাখাল ।" আরবের বহু কবি তাঁর মৃত্যুর পর মরছিয়া লিখেছেন ।

টিকাঃ
২৯. 'আবদুস সালাম নাদবী, সীরাতে 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১
৩০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৪২; আহমাদ-যাকী সাফওয়াত, জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/১৯১
৩১. সুয়ূতী, হুসনুল মুহাদারা-২/২০৪; আল-কিন্দী, কিতাবু উলাতি মিসর (বৈরূত)-১৮৫
৩২. মু'জাম আল-বুলদান-২/২৯৩, ২৯৪; 'আলী ফা'উর, সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১৪
৩৩. হুস্ন আল-মুহাদারা-১/১১৮
৩৪. 'আবদুস সালাম, নাদবী-৯
৩৫. হুম্ন আল-মুহাদারা-২/২৪০
৩৬. আল-বিদায়া ওয়ন নিহায়া-৮/৫৮
৩৭. কিতাবু উলাতি মিসর-১৫৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px