📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 সালামা ইবন দীনার (রহ)

📄 সালামা ইবন দীনার (রহ)


হযরত সালামার (রহ) ডাক নাম ছিল আবূ হাযিম। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন অনারব। পিতা দীনার ছিলেন ইরানী এবং মাতা ছিলেন রোমান। আল-আসওয়াদ ইবন সুফইয়ান আল-মাখযূমীর দাস ছিলেন। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁকে মাখযূমী বলা হতো। ইতিহাসে তিনি আবূ হাযিম আল-আ'রাজ নামেও পরিচিত।

পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকে যদিও তিনি অনারব বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবুও ইসলামের সাম্য ও সমতার কল্যাণে মদীনার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং একজন তাপস ও ভোগ- বিলাস বিমুখ 'আলিমে পরিগণিত হন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন : "الواعظ الزاهد عالم المدينة وشيخها" - তিনি একজন দুনিয়া-বিরাগী উপদেশদানকারী, মদীনার 'আলিম ও শায়খ। ইমাম নাওবী বলেছেন: তাঁর বিশ্বস্ততা, মহত্ব ও প্রশংসায় সকলে একমত।

তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন : "كان ثقة كثير الحديث" - তিনি ছিলেন বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণকারী বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সাহল ইবন সা'দ আস-সা'ইদী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তবে বহু মুহাদ্দিছ মনে করেন শেষোক্ত দুই সাহাবীর নিকট থেকে তাঁর সরাসরি হাদীছ শোনা প্রমাণিত নয়। বিপুল সংখ্যক বিখ্যাত তাবি'ঈর নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এখানে তাঁর কয়েকজন তাবি'ঈ শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হলো :

উমামা ইবন সাহল ইবন হুনায়ফ, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী কাতাদা, নু'মান ইবন আবী 'আয়‍্যাশ, ইয়াযীদ ইবন রূমান, 'উবায়দুল্লাহ ইবন মুকাসিম, আবূ ইবরাহীম ইবন 'আবদির রহমান, না'জা ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ সালিহ আল-সাম্মান, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, ইবন মুনকাদির ও আরো অনেকে।

তাঁর ছাত্র ও শাগরিদদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো: যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন ইসহাক, ইবন 'আজলান, ইবন আবী জি'ব, মালিক, হাম্মাদ, সুফইয়ান, সুলায়মান ইবন হিলাল, সা'ঈদ ইবন আবী হিলাল, 'আমর ইবন 'আলী, আবূ গাসসান আল-মাদানী, হিশাম ইবন সা'ঈদ, উহায়ব ইবন খালিদ, আবূ সাখর হুমায়দ ইবন যিয়াদ আল-খাররাত, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, মুহাম্মাদ ইবন জা'ফার ইবন আবী কাছীর, আফলাহ ইবন সুলায়মান আন-নামিরী প্রমুখ।

ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর পূর্ণ দখল ছিল। তিনি ছিলেন মদীনার একজন বিখ্যাত ফকীহ্। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী ও অন্যরা তাঁকে ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি স্বভাবগত ফকীহ্ ছিলেন। তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়পদ ফকীহ্ ও উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি। ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞানের প্রমাণ এই যে, তিনি মদীনাতুর রাসূলের একজন কাজী ছিলেন।

মদীনায় তিনি মানুষকে ও'য়াজ-নসীহতের দায়িত্বও পালন করতেন। 'ইবাদাত-বন্দেগীর দিক দিয়ে তিনি মদীনার বড় বড় 'আবিদ ব্যক্তিদের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি মদীনার 'আবিদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী, ইবন হাজার ও আরো অনেকে তাঁর নামের সাথে 'যাহিদ' (দুনিয়া-বিরাগী) শব্দটি লিখেছেন। মোটকথা, সব দিক দিয়ে মহান তাবি'ঈ স্তরের মধ্যে তিনি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।

আল-জাহিজ (মৃ. হি. ২৫৫) তাঁর 'আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন' গ্রন্থে বিখ্যাত তাপস ও দুনিয়া-বিরাগী মানুষ যাঁরা বয়ান ও বাগ্মিতায়ও পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের নামের সাথে তাঁর নামটিও উল্লেখ করেছেন।

আমীর-উমারা ও শাসক শ্রেণী থেকে সবসময় দূরে থাকতেন। কখনো কোন প্রয়োজনে তাঁদের কাছে ঘেঁষতেন না। একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক ইমাম যুহরীর মাধ্যমে তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠান। তিনি যুহরীকে বলেন, যদি সুলায়মানের আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকে তাহলে তাঁকেই আমার কাছে আসা উচিত। আমার তো তাঁর কাছে কোন প্রয়োজন নেই।

ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলীর পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার সাথে সাথে যথেষ্ট জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবন আসলাম বলেন, আমি এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিনি যার কথা আবূ হাযিমের কথার চেয়ে বেশী বিজ্ঞতাপূর্ণ। ইবন খুযায়মা বলেন, উপদেশমূলক কথাবার্তায় তাঁর সময়ে আর কেউ তাঁর মত ছিলেন না। তাঁর এমন অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী পাওয়া যায় যা দ্বারা তাঁর বিজ্ঞতার অনুমান করা যায়।

তিনি বলতেন, এমন সব কাজ যার কারণে মরণই শ্রেয় মনে হয় তা পরিহার কর। তারপর যখনই মৃত্যু আসুক তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যে বান্দা তার নিজের ও তার প্রভুর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ যথাযথভাবে পালন করে এবং সম্পর্কসমূহ ভালোমত বজায় রাখে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার সব সম্পর্ক ঠিক রাখেন। আর যে বান্দা তার ও আল্লাহর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালনে অবহেলা করে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার পারস্পরিক দায়িত্বসমূহ পালনের ব্যাপারে অবহেলার ভাব সৃষ্টি করে দেন। এক সত্তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা একাধিক ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেয়ে অনেক সহজ কাজ। অর্থাৎ এক আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে গোটা পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ভালো হয়ে যাবে। একবার খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারি? বললেন: এটা খুবই সহজ কাজ। প্রত্যেকটি জিনিস বৈধ পন্থায় গ্রহণ করুন এবং বৈধ খাতসমূহে তা ব্যয় করুন। হিশাম বললেন, এ কাজ সেই ব্যক্তিই করতে পারেন যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বাঁচার ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছেন। তিনি বললেন: আর এ কারণে জিন ও মানুষে জাহান্নাম ভরে যাবে। তিনি বলতেন:

যে আমলের কারণে তুমি মৃত্যুকে অপছন্দ কর সে আমল ছেড়ে দাও। তারপর তোমার মৃত্যু যখনই আসুক তোমার কোন ক্ষতি হবে না।

তিনি বলতেন: আমরা সবাই তাওবা না করা পর্যন্ত মরতে চাই না। আর আমরা না মরা পর্যন্ত তাওবা করি না। খলীফা আবদুল মালিকের অন্তিম সময় যখন উপস্থিত, তখন দেখলেন একজন ধোপা হাত দিয়ে কাপড় কচলাচ্ছে। খলীফার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো 'হায়! আমি যদি একজন ধোপা হতাম এবং প্রতিদিন যা উপার্জন করতাম তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম।' একথা আবূ হাযিমকে শোনানো হলে তিনি বলে ওঠেন: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁদেরকে মরণকালে সেই আশা-আরজু দান করেছেন যার মধ্যে আমরা সবসময় আছি। মরণকালে আমরা জীবনকালে তারা যে অবস্থায় আছে তা কামনা করবো না।

তিনি বললেন: দুনিয়া বহু জাতি-গোষ্ঠীকে ধোঁকা দিয়েছে। তারা এ দুনিয়াতে অন্যায় ও অপকর্ম করেছে। যখন মৃত্যু এসে গেছে তখন তারা তাদের সবকিছু এমন লোকদের জন্যে ছেড়ে গেছে যারা তাদের কোন প্রশংসা করেনি এবং এমন সত্তার কাছে চলে গেছে যিনি তাদের কোন ওজর-কৈফিয়াত শুনবেন না। আমরা তাদের উত্তরাধিকারী হয়েছি। সুতরাং আমাদের উচিত হবে, তাদের যে জিনিসগুলো আমরা অপছন্দ করি তা থেকে দূরে থাকা এবং যা পছন্দ করি তা 'আমল করা।

একবার তিনি কোন এক প্রয়োজনে তৎকালীন শাসকের নিকট যান এবং এভাবে নিজের কথা তুলে ধরেন: একটি প্রয়োজনে আমি আপনার নিকট এসেছি এবং সেই প্রয়োজনের কথাটি পূর্বেই আল্লাহকে জানিয়েছি। এখন আল্লাহ যদি তা পূরণের জন্য আপনাকে অনুমতি দেন তাহলে আপনি পূরণ করুন। আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। আর তিনি যদি পূরণের অনুমতি না দেন, আপনি পূরণ করবেন না এবং সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাকে মাজুর বা অপারগ মনে করবো।'

একবার তিনি ফলের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। ফল দেখে তিনি বললেন : তোমার সাথে আমার দেখা হবে জান্নাতে। আরেকবার তিনি গোশতের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। কসাইরা বললো : আবূ হাযিম, ভালো গোশত আছে, কিছু খরিদ করুন। বললেন : আমার কাছে কেনার মত পয়সা নেই। তারা বললো: পয়সা আপনি পরে দিবেন। তিনি বললেন: গোশত আমি পরেই খাব।

হিজরী ৯৭ সনে উমাইয়‍্যা খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক মদীনার মসজিদে নববীতে নামায আদায় এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাম পেশের উদ্দেশ্যে দিমাশক থেকে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করেন। বহু কারী, মুহাদ্দিছ, ফকীহ্, 'আলিম, আমীর- উমারা ও সেনাকর্মকর্তা তাঁর সফরসঙ্গী হন। মদীনায় পৌছে একটু স্থির হবার পর সেখানকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ জনগণ তাঁকে সালাম ও স্বাগতম জানানোর জন্যে উপস্থিত হলো। কিন্তু সালামা ইবন দীনার, যিনি হলেন মদীনার কাজী, সর্বজনমান্য 'আলিম, ও নির্ভরযোগ্য ইমাম, গেলেন না। সুলায়মান ইবন 'আবিদল মালিক তাঁর নিকট আগত লোকদের সাথে সাক্ষাৎ দান ও কুশল বিনিময় শেষ করলেন। তারপর তিনি তাঁর কিছু সঙ্গী-সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: খনিজ পদার্থে যেমন মরিচা পড়ে তেমনি মানুষের অন্তরেও মরিচা পড়ে যদি না তাকে কেউ উপদেশ দিয়ে তার মরিচা সাফ করে। তারা বললো: আমীরুল মু'মিনীন ঠিক কথাই বলেছেন।

সুলায়মান বললেন: মদীনাতে কি এমন কোন লোক নেই, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, আমাদেরকে উপদেশ দান করতে পারেন? লোকেরা বললো: হাঁ, আমীরুল মু'মিনীন, আবূ হাযিম আল-আ'রাজ আছেন। তিনি জানতে চাইলেন আবূ হাযিম আল-আ'রাজ কে?

তারা বললো: সালামা ইবন দীনার- মদীনার 'আলিম ও ইমাম এবং যেসব তাবি'ঈ বিপুল সংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন তাঁদেরই একজন। সুলায়মান বললেন: তাহলে তাঁকেই আমার কাছে নিয়ে এসো। তবে খুব সম্মানের সাথে আনবে। লোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে খলীফার নিকট যাওয়ার জন্য বললো। তিনি রাজী হলেন।

সালামা খলীফার দরবারে উপস্থিত হলে খলীফা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে নিজের কাছে বসালেন। তখন সেখানে ইবন শিহাব যুহরীও (রহ) বসা ছিলেন। তারপর খলীফা একটি অভিযোগের সুরে তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন:
- আবূ হাযিম! এ কেমন উপেক্ষা?
- আমীরুল মু'মিনীন! আমার মধ্যে আপনি কি ধরনের উপেক্ষা লক্ষ্য করলেন?
- বহু মানুষ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, অথচ আপনি আসলেন না!
- উপেক্ষা তো হয় পরিচয়ের পর। আপনি তো এর আগে আমাকে চিনতেন না, আর আমিও এর পূর্বে আপনাকে কখনো দেখিনি। তাহলে আমার দিক থেকে উপেক্ষা হলো কিভাবে?

খলীফা তখন তাঁর সঙ্গী-সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন: শায়খ তাঁর কৈফিয়াত দানে ঠিক করেছেন, আর খলীফা তাঁর প্রতি অভিযোগ করে ভুল করেছে। তারপর তিনি আবূ হাযিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন:
- ওহে আবূ হাযিম, আমার অন্তর মাঝে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জমা হয়ে আছে, আমি তা আপনার নিকট ব্যক্ত করতে চাই।
- আমীরুল মু'মিনীন, বলুন। আল্লাহ সাহায্যকারী।
- ওহে আবূ হাযিম, আমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করি কেন?
- এ জন্য যে, আমরা দুনিয়াকে আবাসস্থল বানিয়েছি এবং আখিরাতকে বিধ্বস্ত করেছি। তাই আবাসস্থল ছেড়ে বিধ্বস্ত ভূমিতে যেতে অপছন্দ করি।
- আপনি সত্য বলেছেন। তারপর তিনি বললেন: আবূ হাযিম, আমি যদি জানতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার কি পাওনা আছে?
- আপনি আপনার কর্মকে আল্লাহর কিতাবের কাছে উপস্থাপন করুন, জানতে পারবেন।
- আল্লাহর কিতাব কোথায় পাব?
- আপনি তা পাবেন আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে:
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ.
- সৎকর্মশীলরা থাকবে জান্নাতে এবং দুষ্কর্মীরা থাকবে জাহান্নামে।
খলীফা বললেন: তাহলে আল্লাহর যে রহমতের কথা বলা হয় তা কোথায়?
আবূ হাযিম বললেন:
إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
- নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।
খলীফা- হায়, আমি যদি জানতে পারতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার আগমন কেমন হবে?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের আগমন হবে একজন প্রবাসীর তার পরিবারে ফিরে আসার মত। আর একজন অসৎকর্মশীলের আগমন হবে একজন পালিয়ে যাওয়া দাসের মত যাকে ধরে টেনে-হেঁচড়ে আবার তার মনিবের কাছে আনা হয়।

এরপর খলীফা কেঁদে দিলেন। সে কান্নার আওয়াজ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠলো। তারপর একটু সুস্থির হয়ে বললেন: আবু হাযিম, এর থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কি?
আবূ হাযিম- আপনারা আপনাদের ভিতরের গর্ব-অহঙ্কারের মলিনতা দূর করে আত্মমর্যাদাবোধের পরিচ্ছদ ধারণ করুন।
খলীফা- আর এই যে অর্থ-বিত্ত এ ক্ষেত্রে খোদাভীতির পথ কি?
আবূ হাযিম- যদি তা সঠিকভাবে অর্জন করেন, সঠিকভাবে রক্ষা করেন, সমভাবে বণ্টন করেন এবং এ ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সেটাই হবে খোদাভীতি।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমাকে বলুন তো, সবচেয়ে ভালো মানুষ কে?
আবূ হাযিম- আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী খোদাভীরু মানুষ।
খলীফা- আবূ হাযিম, বলুন তো সবচেয়ে ভালো কথা কোনটি?
আবূ হাযিম- যদি কোন ব্যক্তি কাউকে ভয় করে অথবা কারো নিকট কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করে এবং তার মুখের উপর যদি সত্য কথাটি বলে দেয় তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো কথা।
খলীফা- আবূ হাযিম, কোন দু'আ সবচেয়ে বেশী তাড়াতাড়ি কবুল হয়?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের দু'আ সৎকর্মশীলদের জন্য।
খলীফা- সবচেয়ে ভালো সাদাকা (দান) কোনটি?
আবূ হাযিম- একজন স্বল্পবিত্তের মানুষ একজন হত-দরিদ্র মানুষের হাতে যা কিছু তুলে দেয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো দান। যদি না তার পেছনে খোঁটা অথবা কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য হয়।
খলীফা- সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের সুযোগ পেয়ে তা বাস্তবায়ন করে এবং মানুষকে তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, সেই সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান।
খলীফা- তাহলে সবচেয়ে বেশী নির্বোধ কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি তার বন্ধুর ইচ্ছা অনুযায়ী চলে এবং সেই বন্ধুটিও একজন অত্যাচারী। তখন সে মূলতঃ তার আখিরাতকে অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি কি আমাদেরকে সঙ্গ দিতে পারেন? আপনি আমাদের থেকে কিছু গ্রহণ করবেন এবং আমরা আপনার থেকে কিছু গ্রহণ করবো।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, তা সম্ভব নয়।
খলীফা- কেন?
আবূ হাযিম- আমার ভয় হয়, আমি আপনাদের উপর একটু নির্ভরশীল হয়ে পড়ি কিনা। আর তাহলে আল্লাহ আমাকে বেশী করে দুনিয়ার কষ্ট ও আখিরাতের শাস্তি দিবেন。
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা আমার কাছে একটু ব্যক্ত করুন।
এবার আবূ হাযিম কোন জবাব না দিয়ে চুপ থাকলেন। তারপর বললেন: আপনার চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান সত্তার নিকট আমি তা পেশ করেছি। তিনি সেই প্রয়োজনের যতটুকু আমাকে দেন হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করি। আর যতটুকু না দেন, আমি খুশী থাকি।
খলীফা আবার বললেন: আবূ হাযিম, আমার কাছে আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা একটু বলুন, যেভাবেই হোক আমি তা পূরণ করবো।
আবু হাযিম- আমার প্রয়োজন এই যে, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান এবং জান্নাতে প্রবেশ করান।
খলীফা- আবূ হাযিম, সেটাতো আমার কাজ নয়।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, এছাড়া আমার তো আর কোন প্রয়োজন নেই।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমার জন্য দু'আ করুন।
আবূ হাযিম- হে আল্লাহ, সুলায়মান যদি আপনার প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথকে সহজ করে দিন। আর যদি তিনি আপনার শত্রুদের একজন হন তাহলে তাঁকে সংশোধন করে দিন এবং আপনি যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন সেদিকে চলার পথ তাঁকে দেখিয়ে দিন।

এ দু'আ শুনে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো : আপনি আমীরুল মু'মিনীনের দরবারে ঢোকার পর থেকে যা কিছু বলেছেন তার মধ্যে এ দু'আটি হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আপনি মুসলমানদের খলীফাকে আল্লাহর দুশমনদের মধ্যে গণ্য করে তাঁকে কষ্ট দিয়েছেন। জবাবে আবূ হাযিম বললেন: আপনার কথা ঠিক নয়। বরং আপনি যা বললেন সেটাই নিকৃষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলা 'আলিমদের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তারা যেন সত্য কথা বলেন।

আল্লাহ বলেন : لَتُبَيِّنَنُهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ
অবশ্যই তোমরা তা মানুষের কাছে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।

একথা বলার পর তিনি আমীরুল মু'মিনীনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমাদের পূর্বে পৃথিবীর যে সব জাতি-গোষ্ঠী অতিক্রান্ত হয়েছে তারা ততদিন শুভ ও কল্যাণের মধ্যে থেকেছে যতদিন তাদের শাসকগণ তাঁদের 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁদের নিকট গিয়েছেন। তারপর এমন এক নির্বোধ শ্রেণীর লোকের উদ্ভব হয় যারা জ্ঞান অর্জন করে। অতঃপর তার বিনিময়ে পার্থিব কিছু প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তা নিয়ে শাসকদের দরবারে উপস্থিত হয়। ফলে শাসকরা 'আলিমদের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি হারিয়ে ফেলে। সুতরাং তারা বিফল ও ব্যর্থ হয়েছে এবং আল্লাহর কাছেও হেয় ও অপমানিত হয়েছে। 'আলিমরা যদি শাসকদের নিকট যা আছে তার প্রতি অনাসক্তি ও বীতস্পৃহা দেখায় তাহলে শাসকরা তাদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়। কিন্তু 'আলিমরা যখনই শাসকদের নিকট যা কিছু আছে তার প্রতি আসক্ত হয়েছে, তখনই তাঁরা 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি নিরাসক্ত হয়েছে এবং তাঁদেরকে হেয় ও অপমান করেছে।

খলীফা- আপনি সত্য বলেছেন। আমাকে আরো একটু উপদেশ বাণী শোনান। আমি এমন কাউকে দেখিনি, আপনার চেয়ে জ্ঞান ও বিজ্ঞতা যার মুখের অধিক নিকটবর্তী।

আবু হাযিম বললেন, যদি আপনি বাস্তবায়নকারী লোক হন তাহলে এ পর্যন্ত আমি যা কিছু বলেছি তাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর যদি তা না হন তাহলে এমন ধনুক থেকে তীর নিক্ষেপ করা আমার উচিত হবে না যাতে ছিলা নেই।

খলীফা বললেন: আবূ হাযিম, আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনি আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন।

আবূ হাযিম বললেন: হাঁ, আপনাকে খুব সংক্ষিপ্ত কয়েকটি উপদেশমূলক কথা বলছি:- আপনার মহামহিম প্রভুকে অতি বড় করে দেখুন। আর যেখানে আপনাকে তিনি যেতে নিষেধ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে পান এবং যেখানে যেতে আদেশ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে না পান- এ ব্যাপারে তাঁকে আপনি পবিত্র ঘোষণা করুন। আর একথা জেনে রাখুন, এই শাসন কর্তৃত্ব আপনার পূর্ববর্তী একজনের মৃত্যুর পরেই কেবল আপনার হাতে এসেছে। সুতরাং আপনার হাত থেকে সেভাবেই চলে যাবে যেভাবে আপনি লাভ করেছেন।

একথা বলার পর তিনি সালাম দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হন। খলীফা তখন বললেন:
- আল্লাহ আপনার মত উপদেশ দানকারী 'আলিমকে ভালো প্রতিদান দিন।

আবূ হাযিম খলীফার নিকট থেকে উঠে বাড়ীতে পৌছার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দীনার ভর্তি একটি থলে নিয়ে খলীফার লোক হাজির হলো। সাথে একটি ছোট্ট চিঠিও নিয়ে এসেছে। তাতে লেখা আছে : 'এগুলো আপনি খরচ করুন। এ রকম আরো অনেক কিছুই আপনি আমার কাছ থেকে পাবেন।'

আবূ হাযিম দীনার ভর্তি থলেটি ফেরত পাঠালেন একথা বলে : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা হাসি-তামাশা এবং আপনার কাছে আমার এই ফিরিয়ে দেওয়া অহেতুক ও অসার হওয়ার ব্যাপারে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। হে আমীরুল মু'মিনীন, যে জিনিস আমি আপনার কাছে থাকা পছন্দ করিনে তা আমার কাছে থাকবে, সেটা আমি কিভাবে পছন্দ করতে পারি? হে আমীরুল মু'মিনীন, এই দীনার যদি আপনার সাথে সাক্ষাতের সময় যেসব কথা আমি আপনাকে বলেছি তার বিনিময়ে হয় তাহলে আমার অসহায় অবস্থায় আমার জন্য মৃত জীব-জন্তু ও শূকরের গোশত এর চেয়ে বেশী হালাল হবে। আর এগুলো যদি বায়তুল মালে আমার অধিকারের অংশ হয় তাহলে এ অধিকারে কি আমার ও অন্যসব লোকদের মধ্যে সমতা বিধান করা হয়েছে?

আবু হাযিম সালামার বাড়ীটি ছিল জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, সৎকর্ম ও কল্যাণের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য একটি সুস্বাদু পানির ঝর্নাস্বরূপ। আত্মীয়, বন্ধু, ভক্ত ও শিক্ষার্থী সবাই সমানভাবে সেখানে ভীড় জমাতো। একবার 'আবদুর রহমান ইবন জারীর তাঁর ছেলেকে সংগে করে আবূ হাযিমের বাড়ীতে গেলেন এবং দু'জনই তাঁর পাশে বসলেন। তারপর তাঁরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাঁর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে দু'আ করলেন। আবু হাযিম তাঁদের সালামের জবাব দিয়ে তাঁদেরকে স্বাগত জানালেন। তারপর তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা আরম্ভ হলো। 'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবু হাযিম, আমরা অন্তরের জাগরণ দ্বারা কিভাবে উপকৃত হই?

আবূ হাযিম: অন্তর পরিশুদ্ধির সময় সকল কবীরা গুনাহ মাফ করা হয়। বান্দা যখন পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে বিজয়ী হয়। 'আবদুর রহমান, একথা ভুলে যেও না যে, দুনিয়ার অতি সামান্য জিনিস আমাদেরকে আখিরাতের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত রাখে। আর যেসব অর্থ-সম্পদ আমাদেরকে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকটবর্তী করে না তা সবই আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধ বলে জানবে। ছেলে বললো: আয়াদের শায়খ তথা মাননীয় ব্যক্তি অনেক। আমরা কার অনুসরণ করবো?

আবূ হাযিম: আমার প্রিয় ছেলে, তুমি সেই ব্যক্তির অনুসরণ করবে যে গোপন বিষয় প্রকাশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ও পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, জীবনের শুরুতেই নিজেকে সংশোধন করে এবং সংশোধনের কাজটি বার্দ্ধক্যে করবে বলে অপেক্ষা করে না। ছেলে, তুমি জেনে রাখ, সূর্য উদিত হয় এমন প্রত্যেকটি দিনে একজন তালিবে 'ইলম (জ্ঞান অন্বেষণকারী)-এর অন্তর মাঝে তার প্রবৃত্তি ও জ্ঞান মুখোমুখি হয় এবং দু'জন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তির মত পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যদি তার জ্ঞান তার প্রবৃত্তিকে পরাজিত করতে পারে তাহলে সেদিনটি তার বড় লাভের দিন হয়ে থাকে। আর যদি তার প্রবৃত্তি তার জ্ঞানকে পরাজিত করে তাহলে সেটি তার বড় ক্ষতির দিন হয়ে থাকে।

'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবূ হাযিম, আপনি প্রায়ই আমাদেরকে শোকর (কৃতজ্ঞতা)-এর ব্যাপারে উৎহাসিত করে থাকেন। এই শোকর-এর প্রকৃতি ও গূঢ় রহস্য কি?

আবূ হাযিম- আমাদের দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর শোকর-এর একটি হক বা অধিকার আছে।
আবদুর রহমান প্রশ্ন করলেন: দু' চোখের শোকর কি?
আবূ হাযিম- যদি আপনি তাদের দ্বারা ভালো কিছু দেখেন, প্রকাশ করবেন। আর খারাপ কিছু দেখলে গোপন করবেন।
আবদুর রহমান- দু'কানের শোকর কি?
আবূ হাযিম- তাদের দ্বারা ভালো কিছু শুনলে মনে রাখবেন। আর খারাপ কিছু শুনলে ভুলে যাবেন।
আবদুর রহমান- দু'হাতের শোকর কি?
আবূ হাযিম- আপনার যা নয়, তাদের দ্বারা তা ধরবেন না। আর তাদের দ্বারা আল্লাহর কোন হক বা অধিকারে বাধা দিবেন না। ওহে আবদুর রহমান, একথা স্মরণ রাখবেন যে, যে ব্যক্তি তার শোকর বা কৃতজ্ঞতা কেবল জিহ্বার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং তার সাথে তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তরের সবটুকু অংশীদার করে না, তার দৃষ্টান্ত হলো সেই ব্যক্তির মত যার একটি চাদর আছে, কিন্তু তার সবটুকু গায়ে না জড়িয়ে শুধু একটি পাশ গায়ে জড়ায়। ফলে সেটি তাকে গরম ও ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারে না।

একবার সালামা ইবন দীনার আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মুসলিম মুজাহিদদের সাথে বের হলেন। মুজাহিদদের এ বাহিনীটি রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য যাচ্ছিল। তারা তাদের গন্তব্য স্থলের কাছাকাছি পৌছে শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে একটু বিশ্রাম করে নিতে চাইলো। এই বাহিনীতে বানু উমাইয়্যার একজন আমীর বা শাসক ছিলেন। এই বিশ্রামকালীন সময়ে তিনি আবু হাযিমের কাছে একজন লোক পাঠালেন। তিনি লোকটিকে বলে দিলেন, তুমি আবূ হাযিমের নিকট গিয়ে এই কথাটি বলবে: হাদীছ ও ফিকাহ্ মাসলা-মাসায়িল বলার জন্য আমীর আপনাকে একটু ডেকে পাঠিয়েছেন।

একথা শোনার সাথে সাথে আবূ হাযিম লিখলেন: 'হে আমীর, আমি এমন সব জ্ঞানী ব্যক্তির সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভ করেছি যাঁরা কখনো দীনকে দুনিয়াদার ব্যক্তির কাছে বয়ে নিয়ে যাননি। আমি মনে করি না যে, যারা এমন কাজ করবে তাদের প্রথম ব্যক্তি আপনি আমাকে বানাতে চান। আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকলে আপনি নিজেই আসুন। ওয়াস্ সালামু 'আলায়কা ওয়া 'আলা মান মা'আকা- আপনার প্রতি ও আপনার সাথে যারা আছে তাদের সবার প্রতি সালাম।'

আমীর চিঠিটি পড়ে তাঁর কাছে গেলেন, কুশল বিনিময় করলেন এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির দু'আ করে বললেন: আবূ হাযিম, আপনি যা লিখেছেন তার সাথে আমি একমত। এ চিঠির মাধ্যমে আপনি আমাদের মধ্যে আপনার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে ফেলেছেন। এখন আপনি আমাদেরকে কিছু উপদেশ দান করুন। আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন।

আবূ হাযিম তাঁকে অনেক উপদেশ দিলেন। তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার কিছু এ রকম: শুনুন! যা আখিরাতে আপনার সাথে থাকুক বলে আপনি চান, দুনিয়াতে তা পেতে লোভ করুন। আর সেখানে যা আপনার সাথে থাকা আপনি অপছন্দ করেন, এখানেই তার প্রতি নিরাসক্ত হোন। ওহে আমীর, জেনে রাখুন, মিথ্যা ও অসত্য যদি আপনার প্রিয় হয় এবং আপনার দ্বারা প্রচলিত হয় তাহলে কপট লোকেরা ও বাতিলপন্থীরা আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং আপনার পাশে ভীড় করবে। আর যদি সত্য আপনার প্রিয় হয় এবং আপনি তা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সৎকর্মশীলরা আপনার পাশে সমবেত হবে এবং আপনাকে সত্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। সুতরাং আপনি এ দু'টির যেটি আপনার ভালো লাগে, বেছে নিন।

হিজরী ১৪০ সনে অথবা তার পরে আবূ হাযিমের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে প্রশ্ন করলো : আবূ হাযিম, আপনি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছেন? বললেন : দুনিয়ার যা কিছু আমি লাভ করেছি তার মন্দ থেকে যদি আমি মুক্তি পাই তাহলে যা কিছু সরিয়ে ও গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা আমাকে ক্ষতি করবে না। তারপর তিনি নিম্নের এ আয়াতটি বার বার আবৃত্তি করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন:

إن الذين امنوا وعملوا الصالحات سيجعل لهم الرحمن ودا .
- যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালবাসা দেবেন।

টিকাঃ
১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৪
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
৩. তাহযীবুল আসমা/-২/২০৮
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৫. প্রাগুক্ত-৪/১৪৩; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৩
৬. তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৯. প্রাগুক্ত
১০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৩
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
১২. শাযারাত আয-যাহাব-১/২০৮; তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
১৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৩৯; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৯
১৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৬৪, ১৯১
১৬. প্রাগুক্ত-৩/১২৮
১৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/২৪৩
১৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৬
১৯. সূরা আল-ইনফিতার-১৩-১৪
২০. সূরা আল-আ'রাফ-৫৬
২১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৬৩; 'উয়ুন আল-আখবার-২/৩৭০; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৪২; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিয়ীন-১৮২-১৯২; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩-৩৪৭
২২. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯২-১৯৪; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩
২৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৮৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৪
২৪. প্রাগুক্ত
২৫. সূরা মারয়াম-৯৬
২৬. সুওয়ারুন নিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯৬

হযরত সালামার (রহ) ডাক নাম ছিল আবূ হাযিম। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন অনারব। পিতা দীনার ছিলেন ইরানী এবং মাতা ছিলেন রোমান। আল-আসওয়াদ ইবন সুফইয়ান আল-মাখযূমীর দাস ছিলেন। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁকে মাখযূমী বলা হতো। ইতিহাসে তিনি আবূ হাযিম আল-আ'রাজ নামেও পরিচিত।

পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকে যদিও তিনি অনারব বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবুও ইসলামের সাম্য ও সমতার কল্যাণে মদীনার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং একজন তাপস ও ভোগ- বিলাস বিমুখ 'আলিমে পরিগণিত হন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন : "الواعظ الزاهد عالم المدينة وشيخها" - তিনি একজন দুনিয়া-বিরাগী উপদেশদানকারী, মদীনার 'আলিম ও শায়খ। ইমাম নাওবী বলেছেন: তাঁর বিশ্বস্ততা, মহত্ব ও প্রশংসায় সকলে একমত।

তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন : "كان ثقة كثير الحديث" - তিনি ছিলেন বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণকারী বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সাহল ইবন সা'দ আস-সা'ইদী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তবে বহু মুহাদ্দিছ মনে করেন শেষোক্ত দুই সাহাবীর নিকট থেকে তাঁর সরাসরি হাদীছ শোনা প্রমাণিত নয়। বিপুল সংখ্যক বিখ্যাত তাবি'ঈর নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এখানে তাঁর কয়েকজন তাবি'ঈ শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হলো :

উমামা ইবন সাহল ইবন হুনায়ফ, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী কাতাদা, নু'মান ইবন আবী 'আয়‍্যাশ, ইয়াযীদ ইবন রূমান, 'উবায়দুল্লাহ ইবন মুকাসিম, আবূ ইবরাহীম ইবন 'আবদির রহমান, না'জা ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ সালিহ আল-সাম্মান, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, ইবন মুনকাদির ও আরো অনেকে।

তাঁর ছাত্র ও শাগরিদদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো: যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন ইসহাক, ইবন 'আজলান, ইবন আবী জি'ব, মালিক, হাম্মাদ, সুফইয়ান, সুলায়মান ইবন হিলাল, সা'ঈদ ইবন আবী হিলাল, 'আমর ইবন 'আলী, আবূ গাসসান আল-মাদানী, হিশাম ইবন সা'ঈদ, উহায়ব ইবন খালিদ, আবূ সাখর হুমায়দ ইবন যিয়াদ আল-খাররাত, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, মুহাম্মাদ ইবন জা'ফার ইবন আবী কাছীর, আফলাহ ইবন সুলায়মান আন-নামিরী প্রমুখ।

ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর পূর্ণ দখল ছিল। তিনি ছিলেন মদীনার একজন বিখ্যাত ফকীহ্। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী ও অন্যরা তাঁকে ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি স্বভাবগত ফকীহ্ ছিলেন। তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়পদ ফকীহ্ ও উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি। ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞানের প্রমাণ এই যে, তিনি মদীনাতুর রাসূলের একজন কাজী ছিলেন।

মদীনায় তিনি মানুষকে ও'য়াজ-নসীহতের দায়িত্বও পালন করতেন। 'ইবাদাত-বন্দেগীর দিক দিয়ে তিনি মদীনার বড় বড় 'আবিদ ব্যক্তিদের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি মদীনার 'আবিদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী, ইবন হাজার ও আরো অনেকে তাঁর নামের সাথে 'যাহিদ' (দুনিয়া-বিরাগী) শব্দটি লিখেছেন। মোটকথা, সব দিক দিয়ে মহান তাবি'ঈ স্তরের মধ্যে তিনি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।

আল-জাহিজ (মৃ. হি. ২৫৫) তাঁর 'আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন' গ্রন্থে বিখ্যাত তাপস ও দুনিয়া-বিরাগী মানুষ যাঁরা বয়ান ও বাগ্মিতায়ও পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের নামের সাথে তাঁর নামটিও উল্লেখ করেছেন।

আমীর-উমারা ও শাসক শ্রেণী থেকে সবসময় দূরে থাকতেন। কখনো কোন প্রয়োজনে তাঁদের কাছে ঘেঁষতেন না। একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক ইমাম যুহরীর মাধ্যমে তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠান। তিনি যুহরীকে বলেন, যদি সুলায়মানের আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকে তাহলে তাঁকেই আমার কাছে আসা উচিত। আমার তো তাঁর কাছে কোন প্রয়োজন নেই।

ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলীর পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার সাথে সাথে যথেষ্ট জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবন আসলাম বলেন, আমি এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিনি যার কথা আবূ হাযিমের কথার চেয়ে বেশী বিজ্ঞতাপূর্ণ। ইবন খুযায়মা বলেন, উপদেশমূলক কথাবার্তায় তাঁর সময়ে আর কেউ তাঁর মত ছিলেন না। তাঁর এমন অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী পাওয়া যায় যা দ্বারা তাঁর বিজ্ঞতার অনুমান করা যায়।

তিনি বলতেন, এমন সব কাজ যার কারণে মরণই শ্রেয় মনে হয় তা পরিহার কর। তারপর যখনই মৃত্যু আসুক তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যে বান্দা তার নিজের ও তার প্রভুর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ যথাযথভাবে পালন করে এবং সম্পর্কসমূহ ভালোমত বজায় রাখে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার সব সম্পর্ক ঠিক রাখেন। আর যে বান্দা তার ও আল্লাহর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালনে অবহেলা করে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার পারস্পরিক দায়িত্বসমূহ পালনের ব্যাপারে অবহেলার ভাব সৃষ্টি করে দেন। এক সত্তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা একাধিক ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেয়ে অনেক সহজ কাজ। অর্থাৎ এক আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে গোটা পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ভালো হয়ে যাবে। একবার খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারি? বললেন: এটা খুবই সহজ কাজ। প্রত্যেকটি জিনিস বৈধ পন্থায় গ্রহণ করুন এবং বৈধ খাতসমূহে তা ব্যয় করুন। হিশাম বললেন, এ কাজ সেই ব্যক্তিই করতে পারেন যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বাঁচার ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছেন। তিনি বললেন: আর এ কারণে জিন ও মানুষে জাহান্নাম ভরে যাবে। তিনি বলতেন:

যে আমলের কারণে তুমি মৃত্যুকে অপছন্দ কর সে আমল ছেড়ে দাও। তারপর তোমার মৃত্যু যখনই আসুক তোমার কোন ক্ষতি হবে না।

তিনি বলতেন: আমরা সবাই তাওবা না করা পর্যন্ত মরতে চাই না। আর আমরা না মরা পর্যন্ত তাওবা করি না। খলীফা আবদুল মালিকের অন্তিম সময় যখন উপস্থিত, তখন দেখলেন একজন ধোপা হাত দিয়ে কাপড় কচলাচ্ছে। খলীফার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো 'হায়! আমি যদি একজন ধোপা হতাম এবং প্রতিদিন যা উপার্জন করতাম তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম।' একথা আবূ হাযিমকে শোনানো হলে তিনি বলে ওঠেন: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁদেরকে মরণকালে সেই আশা-আরজু দান করেছেন যার মধ্যে আমরা সবসময় আছি। মরণকালে আমরা জীবনকালে তারা যে অবস্থায় আছে তা কামনা করবো না।

তিনি বললেন: দুনিয়া বহু জাতি-গোষ্ঠীকে ধোঁকা দিয়েছে। তারা এ দুনিয়াতে অন্যায় ও অপকর্ম করেছে। যখন মৃত্যু এসে গেছে তখন তারা তাদের সবকিছু এমন লোকদের জন্যে ছেড়ে গেছে যারা তাদের কোন প্রশংসা করেনি এবং এমন সত্তার কাছে চলে গেছে যিনি তাদের কোন ওজর-কৈফিয়াত শুনবেন না। আমরা তাদের উত্তরাধিকারী হয়েছি। সুতরাং আমাদের উচিত হবে, তাদের যে জিনিসগুলো আমরা অপছন্দ করি তা থেকে দূরে থাকা এবং যা পছন্দ করি তা 'আমল করা।

একবার তিনি কোন এক প্রয়োজনে তৎকালীন শাসকের নিকট যান এবং এভাবে নিজের কথা তুলে ধরেন: একটি প্রয়োজনে আমি আপনার নিকট এসেছি এবং সেই প্রয়োজনের কথাটি পূর্বেই আল্লাহকে জানিয়েছি। এখন আল্লাহ যদি তা পূরণের জন্য আপনাকে অনুমতি দেন তাহলে আপনি পূরণ করুন। আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। আর তিনি যদি পূরণের অনুমতি না দেন, আপনি পূরণ করবেন না এবং সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাকে মাজুর বা অপারগ মনে করবো।'

একবার তিনি ফলের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। ফল দেখে তিনি বললেন : তোমার সাথে আমার দেখা হবে জান্নাতে। আরেকবার তিনি গোশতের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। কসাইরা বললো : আবূ হাযিম, ভালো গোশত আছে, কিছু খরিদ করুন। বললেন : আমার কাছে কেনার মত পয়সা নেই। তারা বললো: পয়সা আপনি পরে দিবেন। তিনি বললেন: গোশত আমি পরেই খাব।

হিজরী ৯৭ সনে উমাইয়‍্যা খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক মদীনার মসজিদে নববীতে নামায আদায় এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাম পেশের উদ্দেশ্যে দিমাশক থেকে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করেন। বহু কারী, মুহাদ্দিছ, ফকীহ্, 'আলিম, আমীর- উমারা ও সেনাকর্মকর্তা তাঁর সফরসঙ্গী হন। মদীনায় পৌছে একটু স্থির হবার পর সেখানকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ জনগণ তাঁকে সালাম ও স্বাগতম জানানোর জন্যে উপস্থিত হলো। কিন্তু সালামা ইবন দীনার, যিনি হলেন মদীনার কাজী, সর্বজনমান্য 'আলিম, ও নির্ভরযোগ্য ইমাম, গেলেন না। সুলায়মান ইবন 'আবিদল মালিক তাঁর নিকট আগত লোকদের সাথে সাক্ষাৎ দান ও কুশল বিনিময় শেষ করলেন। তারপর তিনি তাঁর কিছু সঙ্গী-সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: খনিজ পদার্থে যেমন মরিচা পড়ে তেমনি মানুষের অন্তরেও মরিচা পড়ে যদি না তাকে কেউ উপদেশ দিয়ে তার মরিচা সাফ করে। তারা বললো: আমীরুল মু'মিনীন ঠিক কথাই বলেছেন।

সুলায়মান বললেন: মদীনাতে কি এমন কোন লোক নেই, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, আমাদেরকে উপদেশ দান করতে পারেন? লোকেরা বললো: হাঁ, আমীরুল মু'মিনীন, আবূ হাযিম আল-আ'রাজ আছেন। তিনি জানতে চাইলেন আবূ হাযিম আল-আ'রাজ কে?

তারা বললো: সালামা ইবন দীনার- মদীনার 'আলিম ও ইমাম এবং যেসব তাবি'ঈ বিপুল সংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন তাঁদেরই একজন। সুলায়মান বললেন: তাহলে তাঁকেই আমার কাছে নিয়ে এসো। তবে খুব সম্মানের সাথে আনবে। লোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে খলীফার নিকট যাওয়ার জন্য বললো। তিনি রাজী হলেন।

সালামা খলীফার দরবারে উপস্থিত হলে খলীফা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে নিজের কাছে বসালেন। তখন সেখানে ইবন শিহাব যুহরীও (রহ) বসা ছিলেন। তারপর খলীফা একটি অভিযোগের সুরে তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন:
- আবূ হাযিম! এ কেমন উপেক্ষা?
- আমীরুল মু'মিনীন! আমার মধ্যে আপনি কি ধরনের উপেক্ষা লক্ষ্য করলেন?
- বহু মানুষ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, অথচ আপনি আসলেন না!
- উপেক্ষা তো হয় পরিচয়ের পর। আপনি তো এর আগে আমাকে চিনতেন না, আর আমিও এর পূর্বে আপনাকে কখনো দেখিনি। তাহলে আমার দিক থেকে উপেক্ষা হলো কিভাবে?

খলীফা তখন তাঁর সঙ্গী-সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন: শায়খ তাঁর কৈফিয়াত দানে ঠিক করেছেন, আর খলীফা তাঁর প্রতি অভিযোগ করে ভুল করেছে। তারপর তিনি আবূ হাযিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন:
- ওহে আবূ হাযিম, আমার অন্তর মাঝে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জমা হয়ে আছে, আমি তা আপনার নিকট ব্যক্ত করতে চাই।
- আমীরুল মু'মিনীন, বলুন। আল্লাহ সাহায্যকারী।
- ওহে আবূ হাযিম, আমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করি কেন?
- এ জন্য যে, আমরা দুনিয়াকে আবাসস্থল বানিয়েছি এবং আখিরাতকে বিধ্বস্ত করেছি। তাই আবাসস্থল ছেড়ে বিধ্বস্ত ভূমিতে যেতে অপছন্দ করি।
- আপনি সত্য বলেছেন। তারপর তিনি বললেন: আবূ হাযিম, আমি যদি জানতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার কি পাওনা আছে?
- আপনি আপনার কর্মকে আল্লাহর কিতাবের কাছে উপস্থাপন করুন, জানতে পারবেন।
- আল্লাহর কিতাব কোথায় পাব?
- আপনি তা পাবেন আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে:
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ.
- সৎকর্মশীলরা থাকবে জান্নাতে এবং দুষ্কর্মীরা থাকবে জাহান্নামে।
খলীফা বললেন: তাহলে আল্লাহর যে রহমতের কথা বলা হয় তা কোথায়?
আবূ হাযিম বললেন:
إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
- নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।
খলীফা- হায়, আমি যদি জানতে পারতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার আগমন কেমন হবে?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের আগমন হবে একজন প্রবাসীর তার পরিবারে ফিরে আসার মত। আর একজন অসৎকর্মশীলের আগমন হবে একজন পালিয়ে যাওয়া দাসের মত যাকে ধরে টেনে-হেঁচড়ে আবার তার মনিবের কাছে আনা হয়।

এরপর খলীফা কেঁদে দিলেন। সে কান্নার আওয়াজ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠলো। তারপর একটু সুস্থির হয়ে বললেন: আবু হাযিম, এর থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কি?
আবূ হাযিম- আপনারা আপনাদের ভিতরের গর্ব-অহঙ্কারের মলিনতা দূর করে আত্মমর্যাদাবোধের পরিচ্ছদ ধারণ করুন।
খলীফা- আর এই যে অর্থ-বিত্ত এ ক্ষেত্রে খোদাভীতির পথ কি?
আবূ হাযিম- যদি তা সঠিকভাবে অর্জন করেন, সঠিকভাবে রক্ষা করেন, সমভাবে বণ্টন করেন এবং এ ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সেটাই হবে খোদাভীতি।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমাকে বলুন তো, সবচেয়ে ভালো মানুষ কে?
আবূ হাযিম- আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী খোদাভীরু মানুষ।
খলীফা- আবূ হাযিম, বলুন তো সবচেয়ে ভালো কথা কোনটি?
আবূ হাযিম- যদি কোন ব্যক্তি কাউকে ভয় করে অথবা কারো নিকট কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করে এবং তার মুখের উপর যদি সত্য কথাটি বলে দেয় তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো কথা।
খলীফা- আবূ হাযিম, কোন দু'আ সবচেয়ে বেশী তাড়াতাড়ি কবুল হয়?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের দু'আ সৎকর্মশীলদের জন্য।
খলীফা- সবচেয়ে ভালো সাদাকা (দান) কোনটি?
আবূ হাযিম- একজন স্বল্পবিত্তের মানুষ একজন হত-দরিদ্র মানুষের হাতে যা কিছু তুলে দেয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো দান। যদি না তার পেছনে খোঁটা অথবা কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য হয়।
খলীফা- সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের সুযোগ পেয়ে তা বাস্তবায়ন করে এবং মানুষকে তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, সেই সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান।
খলীফা- তাহলে সবচেয়ে বেশী নির্বোধ কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি তার বন্ধুর ইচ্ছা অনুযায়ী চলে এবং সেই বন্ধুটিও একজন অত্যাচারী। তখন সে মূলতঃ তার আখিরাতকে অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি কি আমাদেরকে সঙ্গ দিতে পারেন? আপনি আমাদের থেকে কিছু গ্রহণ করবেন এবং আমরা আপনার থেকে কিছু গ্রহণ করবো।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, তা সম্ভব নয়।
খলীফা- কেন?
আবূ হাযিম- আমার ভয় হয়, আমি আপনাদের উপর একটু নির্ভরশীল হয়ে পড়ি কিনা। আর তাহলে আল্লাহ আমাকে বেশী করে দুনিয়ার কষ্ট ও আখিরাতের শাস্তি দিবেন。
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা আমার কাছে একটু ব্যক্ত করুন।
এবার আবূ হাযিম কোন জবাব না দিয়ে চুপ থাকলেন। তারপর বললেন: আপনার চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান সত্তার নিকট আমি তা পেশ করেছি। তিনি সেই প্রয়োজনের যতটুকু আমাকে দেন হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করি। আর যতটুকু না দেন, আমি খুশী থাকি।
খলীফা আবার বললেন: আবূ হাযিম, আমার কাছে আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা একটু বলুন, যেভাবেই হোক আমি তা পূরণ করবো।
আবু হাযিম- আমার প্রয়োজন এই যে, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান এবং জান্নাতে প্রবেশ করান।
খলীফা- আবূ হাযিম, সেটাতো আমার কাজ নয়।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, এছাড়া আমার তো আর কোন প্রয়োজন নেই।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমার জন্য দু'আ করুন।
আবূ হাযিম- হে আল্লাহ, সুলায়মান যদি আপনার প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথকে সহজ করে দিন। আর যদি তিনি আপনার শত্রুদের একজন হন তাহলে তাঁকে সংশোধন করে দিন এবং আপনি যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন সেদিকে চলার পথ তাঁকে দেখিয়ে দিন।

এ দু'আ শুনে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো : আপনি আমীরুল মু'মিনীনের দরবারে ঢোকার পর থেকে যা কিছু বলেছেন তার মধ্যে এ দু'আটি হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আপনি মুসলমানদের খলীফাকে আল্লাহর দুশমনদের মধ্যে গণ্য করে তাঁকে কষ্ট দিয়েছেন। জবাবে আবূ হাযিম বললেন: আপনার কথা ঠিক নয়। বরং আপনি যা বললেন সেটাই নিকৃষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলা 'আলিমদের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তারা যেন সত্য কথা বলেন।

আল্লাহ বলেন : لَتُبَيِّنَنُهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ
অবশ্যই তোমরা তা মানুষের কাছে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।

একথা বলার পর তিনি আমীরুল মু'মিনীনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমাদের পূর্বে পৃথিবীর যে সব জাতি-গোষ্ঠী অতিক্রান্ত হয়েছে তারা ততদিন শুভ ও কল্যাণের মধ্যে থেকেছে যতদিন তাদের শাসকগণ তাঁদের 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁদের নিকট গিয়েছেন। তারপর এমন এক নির্বোধ শ্রেণীর লোকের উদ্ভব হয় যারা জ্ঞান অর্জন করে। অতঃপর তার বিনিময়ে পার্থিব কিছু প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তা নিয়ে শাসকদের দরবারে উপস্থিত হয়। ফলে শাসকরা 'আলিমদের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি হারিয়ে ফেলে। সুতরাং তারা বিফল ও ব্যর্থ হয়েছে এবং আল্লাহর কাছেও হেয় ও অপমানিত হয়েছে। 'আলিমরা যদি শাসকদের নিকট যা আছে তার প্রতি অনাসক্তি ও বীতস্পৃহা দেখায় তাহলে শাসকরা তাদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়। কিন্তু 'আলিমরা যখনই শাসকদের নিকট যা কিছু আছে তার প্রতি আসক্ত হয়েছে, তখনই তাঁরা 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি নিরাসক্ত হয়েছে এবং তাঁদেরকে হেয় ও অপমান করেছে।

খলীফা- আপনি সত্য বলেছেন। আমাকে আরো একটু উপদেশ বাণী শোনান। আমি এমন কাউকে দেখিনি, আপনার চেয়ে জ্ঞান ও বিজ্ঞতা যার মুখের অধিক নিকটবর্তী।

আবু হাযিম বললেন, যদি আপনি বাস্তবায়নকারী লোক হন তাহলে এ পর্যন্ত আমি যা কিছু বলেছি তাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর যদি তা না হন তাহলে এমন ধনুক থেকে তীর নিক্ষেপ করা আমার উচিত হবে না যাতে ছিলা নেই।

খলীফা বললেন: আবূ হাযিম, আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনি আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন।

আবূ হাযিম বললেন: হাঁ, আপনাকে খুব সংক্ষিপ্ত কয়েকটি উপদেশমূলক কথা বলছি:- আপনার মহামহিম প্রভুকে অতি বড় করে দেখুন। আর যেখানে আপনাকে তিনি যেতে নিষেধ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে পান এবং যেখানে যেতে আদেশ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে না পান- এ ব্যাপারে তাঁকে আপনি পবিত্র ঘোষণা করুন। আর একথা জেনে রাখুন, এই শাসন কর্তৃত্ব আপনার পূর্ববর্তী একজনের মৃত্যুর পরেই কেবল আপনার হাতে এসেছে। সুতরাং আপনার হাত থেকে সেভাবেই চলে যাবে যেভাবে আপনি লাভ করেছেন।

একথা বলার পর তিনি সালাম দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হন। খলীফা তখন বললেন:
- আল্লাহ আপনার মত উপদেশ দানকারী 'আলিমকে ভালো প্রতিদান দিন।

আবূ হাযিম খলীফার নিকট থেকে উঠে বাড়ীতে পৌছার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দীনার ভর্তি একটি থলে নিয়ে খলীফার লোক হাজির হলো। সাথে একটি ছোট্ট চিঠিও নিয়ে এসেছে। তাতে লেখা আছে : 'এগুলো আপনি খরচ করুন। এ রকম আরো অনেক কিছুই আপনি আমার কাছ থেকে পাবেন।'

আবূ হাযিম দীনার ভর্তি থলেটি ফেরত পাঠালেন একথা বলে : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা হাসি-তামাশা এবং আপনার কাছে আমার এই ফিরিয়ে দেওয়া অহেতুক ও অসার হওয়ার ব্যাপারে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। হে আমীরুল মু'মিনীন, যে জিনিস আমি আপনার কাছে থাকা পছন্দ করিনে তা আমার কাছে থাকবে, সেটা আমি কিভাবে পছন্দ করতে পারি? হে আমীরুল মু'মিনীন, এই দীনার যদি আপনার সাথে সাক্ষাতের সময় যেসব কথা আমি আপনাকে বলেছি তার বিনিময়ে হয় তাহলে আমার অসহায় অবস্থায় আমার জন্য মৃত জীব-জন্তু ও শূকরের গোশত এর চেয়ে বেশী হালাল হবে। আর এগুলো যদি বায়তুল মালে আমার অধিকারের অংশ হয় তাহলে এ অধিকারে কি আমার ও অন্যসব লোকদের মধ্যে সমতা বিধান করা হয়েছে?

আবু হাযিম সালামার বাড়ীটি ছিল জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, সৎকর্ম ও কল্যাণের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য একটি সুস্বাদু পানির ঝর্নাস্বরূপ। আত্মীয়, বন্ধু, ভক্ত ও শিক্ষার্থী সবাই সমানভাবে সেখানে ভীড় জমাতো। একবার 'আবদুর রহমান ইবন জারীর তাঁর ছেলেকে সংগে করে আবূ হাযিমের বাড়ীতে গেলেন এবং দু'জনই তাঁর পাশে বসলেন। তারপর তাঁরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাঁর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে দু'আ করলেন। আবু হাযিম তাঁদের সালামের জবাব দিয়ে তাঁদেরকে স্বাগত জানালেন। তারপর তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা আরম্ভ হলো। 'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবু হাযিম, আমরা অন্তরের জাগরণ দ্বারা কিভাবে উপকৃত হই?

আবূ হাযিম: অন্তর পরিশুদ্ধির সময় সকল কবীরা গুনাহ মাফ করা হয়। বান্দা যখন পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে বিজয়ী হয়। 'আবদুর রহমান, একথা ভুলে যেও না যে, দুনিয়ার অতি সামান্য জিনিস আমাদেরকে আখিরাতের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত রাখে। আর যেসব অর্থ-সম্পদ আমাদেরকে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকটবর্তী করে না তা সবই আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধ বলে জানবে। ছেলে বললো: আয়াদের শায়খ তথা মাননীয় ব্যক্তি অনেক। আমরা কার অনুসরণ করবো?

আবূ হাযিম: আমার প্রিয় ছেলে, তুমি সেই ব্যক্তির অনুসরণ করবে যে গোপন বিষয় প্রকাশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ও পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, জীবনের শুরুতেই নিজেকে সংশোধন করে এবং সংশোধনের কাজটি বার্দ্ধক্যে করবে বলে অপেক্ষা করে না। ছেলে, তুমি জেনে রাখ, সূর্য উদিত হয় এমন প্রত্যেকটি দিনে একজন তালিবে 'ইলম (জ্ঞান অন্বেষণকারী)-এর অন্তর মাঝে তার প্রবৃত্তি ও জ্ঞান মুখোমুখি হয় এবং দু'জন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তির মত পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যদি তার জ্ঞান তার প্রবৃত্তিকে পরাজিত করতে পারে তাহলে সেদিনটি তার বড় লাভের দিন হয়ে থাকে। আর যদি তার প্রবৃত্তি তার জ্ঞানকে পরাজিত করে তাহলে সেটি তার বড় ক্ষতির দিন হয়ে থাকে।

'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবূ হাযিম, আপনি প্রায়ই আমাদেরকে শোকর (কৃতজ্ঞতা)-এর ব্যাপারে উৎহাসিত করে থাকেন। এই শোকর-এর প্রকৃতি ও গূঢ় রহস্য কি?

আবূ হাযিম- আমাদের দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর শোকর-এর একটি হক বা অধিকার আছে।
আবদুর রহমান প্রশ্ন করলেন: দু' চোখের শোকর কি?
আবূ হাযিম- যদি আপনি তাদের দ্বারা ভালো কিছু দেখেন, প্রকাশ করবেন। আর খারাপ কিছু দেখলে গোপন করবেন।
আবদুর রহমান- দু'কানের শোকর কি?
আবূ হাযিম- তাদের দ্বারা ভালো কিছু শুনলে মনে রাখবেন। আর খারাপ কিছু শুনলে ভুলে যাবেন।
আবদুর রহমান- দু'হাতের শোকর কি?
আবূ হাযিম- আপনার যা নয়, তাদের দ্বারা তা ধরবেন না। আর তাদের দ্বারা আল্লাহর কোন হক বা অধিকারে বাধা দিবেন না। ওহে আবদুর রহমান, একথা স্মরণ রাখবেন যে, যে ব্যক্তি তার শোকর বা কৃতজ্ঞতা কেবল জিহ্বার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং তার সাথে তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তরের সবটুকু অংশীদার করে না, তার দৃষ্টান্ত হলো সেই ব্যক্তির মত যার একটি চাদর আছে, কিন্তু তার সবটুকু গায়ে না জড়িয়ে শুধু একটি পাশ গায়ে জড়ায়। ফলে সেটি তাকে গরম ও ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারে না।

একবার সালামা ইবন দীনার আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মুসলিম মুজাহিদদের সাথে বের হলেন। মুজাহিদদের এ বাহিনীটি রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য যাচ্ছিল। তারা তাদের গন্তব্য স্থলের কাছাকাছি পৌছে শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে একটু বিশ্রাম করে নিতে চাইলো। এই বাহিনীতে বানু উমাইয়্যার একজন আমীর বা শাসক ছিলেন। এই বিশ্রামকালীন সময়ে তিনি আবু হাযিমের কাছে একজন লোক পাঠালেন। তিনি লোকটিকে বলে দিলেন, তুমি আবূ হাযিমের নিকট গিয়ে এই কথাটি বলবে: হাদীছ ও ফিকাহ্ মাসলা-মাসায়িল বলার জন্য আমীর আপনাকে একটু ডেকে পাঠিয়েছেন।

একথা শোনার সাথে সাথে আবূ হাযিম লিখলেন: 'হে আমীর, আমি এমন সব জ্ঞানী ব্যক্তির সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভ করেছি যাঁরা কখনো দীনকে দুনিয়াদার ব্যক্তির কাছে বয়ে নিয়ে যাননি। আমি মনে করি না যে, যারা এমন কাজ করবে তাদের প্রথম ব্যক্তি আপনি আমাকে বানাতে চান। আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকলে আপনি নিজেই আসুন। ওয়াস্ সালামু 'আলায়কা ওয়া 'আলা মান মা'আকা- আপনার প্রতি ও আপনার সাথে যারা আছে তাদের সবার প্রতি সালাম।'

আমীর চিঠিটি পড়ে তাঁর কাছে গেলেন, কুশল বিনিময় করলেন এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির দু'আ করে বললেন: আবূ হাযিম, আপনি যা লিখেছেন তার সাথে আমি একমত। এ চিঠির মাধ্যমে আপনি আমাদের মধ্যে আপনার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে ফেলেছেন। এখন আপনি আমাদেরকে কিছু উপদেশ দান করুন। আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন।

আবূ হাযিম তাঁকে অনেক উপদেশ দিলেন। তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার কিছু এ রকম: শুনুন! যা আখিরাতে আপনার সাথে থাকুক বলে আপনি চান, দুনিয়াতে তা পেতে লোভ করুন। আর সেখানে যা আপনার সাথে থাকা আপনি অপছন্দ করেন, এখানেই তার প্রতি নিরাসক্ত হোন। ওহে আমীর, জেনে রাখুন, মিথ্যা ও অসত্য যদি আপনার প্রিয় হয় এবং আপনার দ্বারা প্রচলিত হয় তাহলে কপট লোকেরা ও বাতিলপন্থীরা আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং আপনার পাশে ভীড় করবে। আর যদি সত্য আপনার প্রিয় হয় এবং আপনি তা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সৎকর্মশীলরা আপনার পাশে সমবেত হবে এবং আপনাকে সত্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। সুতরাং আপনি এ দু'টির যেটি আপনার ভালো লাগে, বেছে নিন।

হিজরী ১৪০ সনে অথবা তার পরে আবূ হাযিমের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে প্রশ্ন করলো : আবূ হাযিম, আপনি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছেন? বললেন : দুনিয়ার যা কিছু আমি লাভ করেছি তার মন্দ থেকে যদি আমি মুক্তি পাই তাহলে যা কিছু সরিয়ে ও গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা আমাকে ক্ষতি করবে না। তারপর তিনি নিম্নের এ আয়াতটি বার বার আবৃত্তি করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন:

إن الذين امنوا وعملوا الصالحات سيجعل لهم الرحمن ودا .
- যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালবাসা দেবেন।

টিকাঃ
১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৪
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
৩. তাহযীবুল আসমা/-২/২০৮
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৫. প্রাগুক্ত-৪/১৪৩; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৩
৬. তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৯. প্রাগুক্ত
১০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৩
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
১২. শাযারাত আয-যাহাব-১/২০৮; তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
১৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৩৯; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৯
১৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৬৪, ১৯১
১৬. প্রাগুক্ত-৩/১২৮
১৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/২৪৩
১৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৬
১৯. সূরা আল-ইনফিতার-১৩-১৪
২০. সূরা আল-আ'রাফ-৫৬
২১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৬৩; 'উয়ুন আল-আখবার-২/৩৭০; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৪২; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিয়ীন-১৮২-১৯২; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩-৩৪৭
২২. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯২-১৯৪; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩
২৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৮৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৪
২৪. প্রাগুক্ত
২৫. সূরা মারয়াম-৯৬
২৬. সুওয়ারুন নিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯৬

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 রাবী‘ ইবন খুছায়ম (রহ)

📄 রাবী‘ ইবন খুছায়ম (রহ)


আবূ ইয়াযীদ রাবী' ইবন খুছায়ম বংশগত দিক দিয়ে আরবের ছা'লাবা গোত্রের একটি শাখা গোত্র ছাওর-এর সন্তান। পিতার নাম খুছায়ম ইবন 'আ'ইশ। যে সকল তাবি'ঈ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকাল পেয়েছিলেন, কিন্তু সাহাবীর মর্যাদা লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যান, রাবী' তাঁদের একজন। তিনি সাহাবী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলেও সে যুগের বহুবিধ কল্যাণ লাভে ধন্য হন। জ্ঞান ও কর্ম এবং দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা ও খোদাভীতির দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ। ইমাম যাত্রী বলেছেন, যে আটজন দুনিয়া বিরাগী তাপস রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ লাভ করেন রাবী' তাঁদের একজন। তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান তাবি'ঈ। তবে তাঁর জ্ঞানের আলোকে নিষ্প্রভ করে দেয় তার দুনিয়া বিমুখতা ও খোদাভীতির জ্যোতি। এ কারণে তিনি 'ইলমের চেয়ে তাকওয়ার মাধ্যমে বেশী প্রসিদ্ধ। জ্ঞানগত উৎকর্ষ তিনি যতটুকু অর্জন করেছিলেন তাতে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে বিশেষ স্থানের অধিকারীই ছিলেন। এমন একটা সময় তিনি লাভ করেন যখন 'আলিম সাহাবীদের বড় একটি দল বিদ্যমান ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে বিশেষভাবে 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) ও আবূ আইউব আল-আনসারীর নিকট জ্ঞান অর্জন করেন। এ দু'জনের মধ্যে আবার 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট থেকে বেশী ফায়দা লাভ করেন। তাঁর সাথে রাবী'র এত গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে, যতক্ষণ তিনি 'আবদুল্লাহর (রা) নিকট থাকতেন এবং দু'জনের একান্ত আলোচনা শেষ না হতো ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেত না। ইবন মাস'উদ (রা) তাঁর গুণাবলী ও আভ্যন্তরীণ উৎকর্ষে এত মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি প্রায়ই বলতেন, আবূ ইয়াযীদ! রাসূলুল্লাহ (সা) যদি তোমাকে দেখতেন, দারুণ ভালোবাসতেন। আমি যখন তোমাকে দেখি তখন আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাহচর্য এমন ছিল যে, অতি সাধারণ মানুষকেও একজন বড় 'আলিমে পরিণত করে দিয়েছে। রাবী' ছিলেন স্বভাবগতভাবে একজন সত্যনিষ্ঠ এবং অসম্ভব যোগ্য ব্যক্তি। এ কারণে তিনি ইবন মাস'উদের (রা) জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা বেশী উপকার লাভ করেন。

কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সব ধরনের জ্ঞানে তাঁর পারদর্শিতা ছিল। বাস্তব দিক দিয়ে কুরআনের সাথে তাঁর সবচেয়ে বেশী সম্পর্ক ছিল। কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং কুরআনের আয়াত দ্বারা যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনে তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। সকল ওয়াজ-নসীহত ও বক্তৃতা-ভাষণে অত্যন্ত সার্থকভাবে কুরআনের আয়াত উপস্থাপন করতেন।

তিনি সবসময় কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি হয়তো মাসহাফ হাতে কুরআন তিলাওয়াত করছেন, তখন হঠাৎ কোন লোক এসে গেল। তিনি মাসহাফটি তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলতেন যাতে আগম্ভক লোকটি তা না দেখতে পারে।

সাধারণতঃ তাঁর ও'য়াজ-নসীহত হতো কুরআনের উদ্ধৃতি সহকারে নিম্নরূপ: হে আল্লাহর বান্দারা! সবসময় ভালো কথা বলবে, ভালো কাজ করবে, ভালো স্বভাবের উপর থাকবে, নিজের জীবনকালকে বেশী বলে মনে করবে না, নিজের অন্তরকে কঠিন করে তুলবে না এবং সেইসব লোকের মত হবে না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না।

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُوْنَ. তোমরা সেইসব লোকের মত হয়ো না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না। হে আল্লাহর বান্দারা! যদি তোমরা ভালো কাজ কর, তাহলে তা ক্রমাগতভাবে করতে থাকবে। কারণ সেদিন খুব শিগগির এসে যাবে যখন তোমরা এ অনুশোচনা করতে থাকবে যে, হায় আফসোস! এই ভালো কাজ যদি আরো বেশী করতাম! যদি তোমার দ্বারা খারাপ কিছু ঘটে যায় তাহলেও ভালো কাজ করবে। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ - ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ * ভালো কাজ মন্দ কাজকে দূর করে দেয়। আর এ হলো উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ তাঁর কিতাবের মাধ্যমে যে জ্ঞান তোমাদেরকে দান করেছেন, সে জন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যে জ্ঞান তোমাদেরকে দেননি; বরং নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন, সেই জ্ঞানে পারদর্শীদের জন্য তা ছেড়ে দাও। কোন কৃত্রিমতার আশ্রয় নিও না। আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ لِلْعَالَمِينَ، وَلَتَعْلَمُنَّ نَبَأَهُ بَعْدَ حِينَ. হে নবী! আপনি বলে দিন, আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না। আর আমি কোন কৃতিত্রমতাশ্রয়ীদের অন্তর্গত লোক নই। আর এই কুরআন বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ। আর এমন এক সময় আসবে যখন তার প্রকৃত অবস্থা অবশ্যই তোমরা জানবে।

হাদীছের ক্ষেত্রে ইমাম যাত্রী তাঁকে ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবু আইউব আল-আনসারী (রা), 'আমর ইবন মায়মূন (রা), 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। আর ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, ইমাম শা'বী, মুনযির ছাওরী, হিলাল ইবন ইয়াসাফ, বাকর ইবন মা'ইয প্রমুখের মত বিখ্যাত তাবি'ঈগণ তাঁর ছাত্র ছিলেন। গ্রহণযোগ্যতার দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনার কি স্থান ছিল তা এই শাস্ত্রের বিভিন্ন মনীষীর মন্তব্য দ্বারা অনুমান করা যায়। যেমন, ইমাম শা'বী বলতেন: রাবী' সত্যবাদিতার খনি। আর ইবন মু'ঈন বলতেন, রাবী'র মত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু ঘাঁটাঘাঁটির কোন প্রয়োজন নেই।

ফকীহ্ হিসেবে রাবী' যদিও তেমন খ্যাতি অর্জন করেননি, তবে তাঁর ফিকাহ্ বিষয়ে পারদর্শিতার জন্য এ সনদ যথেষ্ট যে, তিনি ছিলেন সেই ফকীহুল উম্মাত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র, যাঁর ফাতওয়ার উপর ইরাকী ফিকাহ্ ভিত্তিশীল। তবে পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, তাঁর সীমাহীন যুহৃদ ও তাকওয়া তথা দুনিয়াত্যাগী মনোভাব ও খোদাভীতির তাঁর সব যোগ্যতাকে ম্লান করে দিয়েছে।

সাধারণতঃ দেখা যায় প্রতিটি খান্দানের এমন কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকে যা কম-বেশী তার সদস্যদের মধ্যে পাওয়া যায়। কোন খান্দান জ্ঞান ও বিভিন্ন শাস্ত্রে এবং কোন খান্দান যুহদ ও তাকওয়া এবং অন্য কোন বিশেষ গুণের জন্য বিশিষ্ট হয়ে থাকে। রাবী'র খান্দান বানু ছাওর ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। শাবরামা বলেন, আমি কৃষ্ণায় বান্ ছাওরের চেয়ে বেশী ফকীহ্ ও 'ইবাদাত-বন্দেগী করা বুযর্গ মানুষ আর কোন খান্দানে দেখিনি। আবূ বকর আয-যুবায়দী তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করতেন যে, 'আমি ছাওরী ও 'আরানী গোত্রদ্বয়ের চেয়ে বেশী মসজিদে অবস্থানকারী মানুষ অন্য কোন খান্দানে দেখিনি।

রাবী' ছিলেন এমন একটি 'ইবাদাত-বন্দেগী করা খান্দানের সদস্য, যে খান্দান দীনী ও রূহানী সম্পূর্ণতায় অন্য সবার চেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি কেবল তাঁর খান্দানের মধ্যে নন, বরং গোটা তাবি'ঈ জামা'আতের সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই মুষ্টিমেয় তাবি'ঈদের অন্যতম যাঁরা যুহদ ও তাকওয়ার দিক দিয়ে গোটা তাবি'ঈ সমাজের শীর্ষে ছিলেন। তাঁর যুহৃদ ও তাকওয়া এবং 'ইবাদাত-বন্দেগীর ব্যাপারে সকল 'আলেম ও লেখক একমত। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' তাঁর দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খোদাভীরু ছিলেন। আবু 'উবায়দা বলেন, আমি রাবী'র চেয়ে বেশী ভালো 'ইবাদাতকারী আর কাউকে দেখিনি। ইবন হাজার আল- 'আসকালানী লিখেছেন, রাবী'র যুহৃদ এবং তাঁর 'ইবাদাত এত প্রসিদ্ধ যে, সে বিষয়ে কিছু লেখার কোন প্রয়োজন নেই।

সকল ভালো কাজের মূল উৎস হলো আল্লাহর ভয়। রাবী'র মধ্যে আল্লাহর ভয় এত প্রবল ছিল যে, কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। দোযখের 'আযাবের অতি সাধারণ পার্থিব নমুনা দেখেও তিনি বেহুঁশ হয়ে যেতেন। আ'মাশ বর্ণনা করেছেন: একবার রাবী' কামারের ভাটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভাটিতে জ্বলন্ত লোহা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

আরেকবারের একটি ঘটনা তাঁর বন্ধুদের একটি দল বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, একদিন আমরা 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে রাবী' ইবন খুছায়মও ছিলেন। আমরা ফুরাত নদীর তীরে পৌঁছলাম। সেখানে চুন বানানোর একটি ভাটির পাশ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। তখন চুন বানানোর জন্য সেই ভাটিতে পাথর ফেলা হচ্ছিল। তাতে দাউ দাউ করে প্রচণ্ড গর্জন সহকারে আগুন জ্বলছিল এবং তার লেলিহান শিখা বহু উঁচুতে উঠে যাচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে রাবী' থমকে দাঁড়িয়ে যান এবং ভীষণ কাঁপতে শুরু করেন। এ অবস্থায় তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতে থাকেন:

إِذَا رَأَتْهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا ، وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقاً مُقَرَّ نِينَ دَعَوْا هنالك ثُبُورًا .

আগুন যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার। যখন এক শিকলে কয়েকজন বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা সেখানে মৃত্যুকে ডাকবে।

তারপর তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। আমরা তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং দীর্ঘক্ষণ সেবার পর তিনি হুঁশ ফিরে পান। আমরা তাঁকে নিয়ে তাঁর বাড়ীতে পৌছে দিই।

'ইবাদাত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারীর ভিতর দিয়েই রাবী' তাঁর জীবন শুরু করেন। শৈশব-কৈশোরেও সীমাহীন খোদাভীতি তাঁর মধ্যে বিরাজমান ছিল। এত অল্প- বয়সেও 'ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত কাটিয়ে দিতেন। আল্লাহর আযাবের ভয়ে কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে পড়তেন। তাঁর সম্মানিতা মা ঘুমিয়ে পড়তেন। এক ঘুম পর গভীর রাতে জেগে দেখতেন তাঁর কিশোর ছেলেটি তখনো জায়নামাযে দাঁড়িয়ে অথবা একাগ্রচিত্তে মুনাজাতে নিমগ্ন। মা ডেকে বলতেন: রাবী' তুমি এখনো ঘুমাওনি? তিনি বলতেন: মা, সেই ব্যক্তি কেমন করে রাতের অন্ধকারে ঘুমাতে পারে যে জবাবদিহিতার ভয় করে? ছেলের জবাব শুনে বৃদ্ধ মায়ের চোখের পানিতে দু'গাল ভিজে যেত। তিনি প্রাণ ভরে ছেলের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতেন।

রাবী' যুবক হলেন। আর সাথে সাথে তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারী এবং আল্লাহভীতিও যৌবন পেল। মানুষ যখন রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকতো, আল্লাহর ভয়ে রাবী'র কান্না- কাটিও তীব্রতা লাভ করতো। তাঁর এমন বিচলিত ও অস্থির অবস্থা দেখে মায়ের অন্তর ব্যথায় ভরে যেত। ছেলে সম্পর্কে নানা রকম দুশ্চিন্তা তাঁর মনে ভর করতো। এক সময় তিনি ছেলেকে ডেকে বলতেন:
- বেটা তোমার কি হয়েছে? মনে হচ্ছে তুমি কোন অপরাধ করে বসেছো? কোন মানুষকে খুন করেছো?
বলতেন: হাঁ, মা আমি মানুষ খুন করেছি। অস্থিরভাবে মা জানতে চাইতেন: বেটা, কাকে খুন করেছো? আমাকে বল। তাহলে আমরা নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদেরকে খুশী করে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবো। আল্লাহর কসম! নিহতের পরিবারের লোকেরা যদি তোমার এ কান্নাকাটি ও রাত জাগার কথা জানতে পারে তাহলে অবশ্যই তারা তোমার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবে।
তিনি বলতেন: আপনি কাকেও কিছু বলবেন না। আমি আমার নিজকে হত্যা করেছি। আমার নিজকে আমি পাপের দ্বারা হত্যা করেছি।

পরবর্তীকালে রাবী'র ছেলে বড় হয়ে যখন দেখতো, বাবা সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেন তখন সে মাঝে মাঝে বাবার ঘরে ঢুকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতো: আব্বা! যথেষ্ট হয়েছে। এখন কি একটু ঘুমোবেন? তিনি জবাব দিতেন: আমার ছেলে! সেই ব্যক্তি কেমন করে ঘুমোতে পারে যে তার প্রভুর শাস্তির ভয় করে।

রাবী'র 'ইবাদাত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সারা রাত 'ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন। উপদেশমূলক আয়াত পাঠ করতেন। তা দ্বারা এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়তেন যে একই আয়াত বার বার পাঠ করতে করতে সকাল হয়ে যেত। তাঁর দাস নুসায়র ইবান যা'লুক বর্ণনা করেছেন। রাবী' রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদ নামায পড়ার সময় যখন নিম্নের এ আয়াতে পৌঁছতেন তখন তা বার বার তিলাওয়াত করতে করতে সকাল হয়ে যেত।

أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيَّاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ.
যারা খারাপ কাজ করেছে তারা কি এ ধারণা করে যে, আমরা তাদেরকে সেই লোকদের সমান করে দেব যারা ভালো কাজ করেছে? যাদের জীবন ও মরণ সমান। তারা কতই না খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়।

'আবদুর রহমান ইবন 'আজলান বলেছেন। একদিন আমি রাবী'র ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি যখন মনে করলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাযের মধ্যে উপরের আয়াতটি তিনি বার বার তিলাওয়াত করেন। আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। জামা'আতের সাথে নামায আদায়ের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। কখনো জামা'আত ছাড়তেন না। শেষ জীবনে চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। তখনো জামা'আত তরক হতো না। অন্যের সাহায্যে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে মসজিদে পৌঁছতেন। আবূ হায়্যান তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করেছেন। রাবী' পঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেন। তবে নামাযের জন্য হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে অথবা অন্যের সাহায্যে মসজিদে যেতেন। লোকেরা বলতো, আবু ইয়াযীদ! আপনি তো এখন মা'জুর। এ অবস্থায় ঘরে নামায আদায়েরও অনুমতি আছে। জবাব দিতেন : حَيَّ عَلَى الصَّلواة এবং حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ শোনার পর যতদূর সম্ভব সাড়া দেওয়া উচিত। তা সে হামাগুড়ি দিয়েই হোক না কেন।

রাবী' একজন নির্জন-নিরিবিলির 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। আর এ কারণে খিলাফতে রাশেদার সময়ে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কোথাও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায় না। তবে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য নির্জন-নিরিবিলি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেন। তাঁর এই জিহাদ এমন নির্ভেজাল আল্লাহর জন্য হতো যে, মালে গনীমত মোটেই স্পর্শ করতেন না। ভাগে যা কিছু পেতেন তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে ফেলতেন। 'আবদি খায়র নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। আমি একবার একটি যুদ্ধে রাবী'র সঙ্গী ছিলাম। এ যুদ্ধে গনীমতের অংশে তিনি বহু দাস এবং গৃহপালিত জন্তু লাভ করেন। কিছুদিন পর কোন কারণে আমাকে আবার তাঁর কাছে যেতে হয়। তখন তাঁর কাছে সেই গনীমতের মালের কোন কিছুই দেখতে না পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম: সেই দাস ও জীবজন্তুগুলোর কি হয়েছে? তিনি কোন জবাব দিলেন না। আমি যখন আবার জিজ্ঞেস করলাম তখন বললেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ.
তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর।

ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে খরচ করা ছিল তাঁর বিশেষ গুণ। মিষ্টি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ কারণে কোন সায়িল এলে তিনি তার হাতে একটি চিনির দলা তুলে দিতেন। লোকেরা যখন বলতো, এর চেয়ে তো তার রুটির প্রয়োজন বেশী। জবাবে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন: وَيُطْعِمُوْنَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا. - তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাবার দান করে।

তিনি বলতেন : 'মানুষকে ভালো খাবার খাওয়াবে, নতুন কাপড় পরাবে এবং সুস্থ-সবল দাস মুক্ত করবে।'

অভাবী-প্রতিবেশীদেরকে তিনি ভালো ভালো খাবার পাকিয়ে খাওয়াতেন। মুনযির ছাওরী বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী' তাঁর বাড়ীর লোকদেরকে 'খুবায়স' নামক এক প্রকার খাবার তৈরী করতে বলেন। যেহেতু তিনি কখনো নিজের জন্য কোন কিছুর আবদার করতেন না। এ কারণে তাঁর বেগম সাহেবা অতি যত্ন সহকারে 'খুবায়স' তৈরী করেন। তাঁর প্রতিবেশীদের মধ্যে এক উন্মাদ ব্যক্তিও ছিল। তিনি সেই 'খুবায়স' নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তুলে তাকে খাওয়ান। উন্মাদ লোকটির মুখ থেকে সব সময় লালা ঝরতো। তিনি যখন তাকে খাইয়ে ঘরে ফিরে আসেন তখন বেগম সাহেবা বললেন, আমি এত কষ্ট করে এবং এত যত্ন সহকারে খাবারগুলো তৈরী করলাম, আর আপনি এমন এক লোককে খাইয়ে এলেন যে এটাও বুঝতে অক্ষম যে, সে কি খেয়েছে। তিনি জবাব দিলেন: আল্লাহ তো জানেন।" তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ * তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর। আর তোমরা যা কিছু খরচ করবে, আল্লাহ তা জানেন।

রাবী'র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল 'আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার' বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। যদিও তিনি একজন নীরব ও নির্জনতা প্রিয় মানুষ ছিলেন, তবে আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার-এর জন্য নির্জনতা ছেড়ে বেরিয়ে এসে নীরবতা ঝেড়ে ফেলতেন। তাঁর কাছে যাঁরা আসতেন তাদের তিনি বলতেন, তোমরা ভালো কথা বলবে এবং নিজেরা ভালো কথার উপর 'আমল করবে, সবসময় ভালোর উপর থাকবে। আর যতদূর সম্ভব বেশী বেশী নেক কাজ করবে এবং খারাপ কাজ কমিয়ে দেবে। নিজের অন্তরকে কঠোর করবে না। তোমার জীবনকাল এত দীর্ঘ নয়। সেইসব লোকের মত হবে না যারা মুখে তো বলে, আমরা শুনেছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শুনে না।

কেউ যদি তাঁকে কিছু উপদেশ শোনাতে বলতো, তিনি তাঁকে কুরআনের কিছু হুকুম-আহকাম লিখে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে বলে। তিনি কিছু কাগজ চেয়ে নিয়ে সূরা আল-আন'আমের এ আয়াতটি লিখে দেন:
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ... عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ
লোকটি বললো, আমি আপনার নিকট এজন্য এসেছিলাম যে, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দেবেন। বললেন: হাঁ, এর উপর 'আমল কর।

তাকওয়া-পরহিযগারীর গর্ব ও ঔদ্ধত্য থেকে রাবী' সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও কখনো পাপীদের সম্পর্কে তাঁর জিহ্বা থেকে কোন খারাপ কথা বের হতো না। নাসর ইবন যা'লুক বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি রাবী'র নিকট জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোন মানুষকে খারাপ বলেন না কেন? বললেন আল্লাহর কসম। আমি আমার নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। অন্যকে খারাপ বলবো কেমন করে? মানুষের এ বিস্ময়কর অবস্থা যে, সে অন্যের পাপের ব্যাপারে তো আল্লাহকে ভয় করে; কিন্তু নিজের পাপের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না।

রাবী' আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুসরণের ব্যাপারে ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। ছোট ছোট ও অতি সাধারণ কথা ও কাজে তিনি এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, কোন মানুষের চিন্তা ও কল্পনাও সেদিকে যেত না। বাকর ইবন মা'ইয বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী'র ছোট্ট একটি মেয়ে বললো, আব্বা! আমি খেলতে যাচ্ছি। তিনি বললেন: যাও, ভালো কথা বলো। ছোট্ট বাচ্চা। তাঁর এ কথার অর্থ কেমন করে বুঝবে? লোকেরা রাবী'কে বললো: আপনি এই শিশুকে খেলতে যেতে দেন না কে? বললেন: আমি এটা চাই না, আমার আজকের আমলনামায় এ কথা লেখা হোক যে, আমি খেলার নির্দেশ দিয়েছি।

তিনি সকল কাজ নিজ হাতে করতেন। বাড়ীর পায়খানাও নিজ হাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। একবার এক ব্যক্তি বললো, এ কাজের জন্য তো অন্য মানুষ আছে। বললেন, আমি বাড়ীর কাজ-কর্মেও অংশীদার হতে চাই। তাঁর চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ীভাব দেখে তাঁর শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলতেন, তোমাকে দেখে আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। কখনো কোন অবস্থাতেই তাঁর মুখ থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী কোন কথা উচ্চারিত হতো না। কারো দ্বারা কষ্ট পেলেও তার জন্য দু'আ করতেন। একদিন মসজিদে মুসল্লীদের ভীষণ ভীড় ছিল। যখন জামা'আত আরম্ভ হতে যাচ্ছিল এবং ধীরে ধীরে লোকেরা সামনে এগুচ্ছিল, ঠিক সে সময় রাবী'র পিছনের লোকটি তাঁকে বলে, সামনে এগোন। কিন্তু অত্যধিক ভীড়ের কারণে তিনি সামনে এগুতে পারছিলেন না। লোকটি রেগে গিয়ে পিছন থেকে রাবী'র ঘাড়ে খোঁচা দেয়। তিনি ব্যথা পান এবং একথা বলতে থাকেন : আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। লোকটি চোখ উঁচু করে রাবী'কে দেখতে পেয়ে এত লজ্জিত হয় যে, কাঁদতে শুরু করে।

তিনি সব সময় একাকী থাকা পছন্দ করতেন। কোথাও আসা-যাওয়া করতেন না। কোন অনুষ্ঠান ও সমাবেশে বসাও পছন্দ করতেন না। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' বিবেক-বুদ্ধি হওয়ার পর না কোন মজলিসে বসেছেন, আর না কোন প্রধান সড়কে গেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, আমি এটা পছন্দ করতাম না যে, কোন স্থানে যাই, আর সেখানে এমন কিছু দেখি যাতে আমাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়, আর আমি সাক্ষ্য দিতে না পারি, কোন অভাবী মানুষকে দেখি, আর তার কোন সাহায্য করতে না পারি, অথবা কোন মজলুমকে দেখি ও তার কোন উপকারে আসতে না পারি।

বাড়ীতেও তিনি সব সময় চুপচাপ থাকতেন। খুব কম কথা বলতেন। কোন বাজে কথা তার মুখে কখনো উচ্চারিত হতো না। এক ব্যক্তি, যিনি রাবী'র সাহচর্যে বিশ বছর কাটান, বর্ণনা করেছেন যে, আমি তাঁর সাহচর্যে বিশ বছরের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, এ সময়ে আমি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত এমন কোন কথা শুনিনি যার সমালোচনা হতে পারে। একই ব্যক্তি আরো বলেছেন, আমি বিশ বছরে রাবী'র মুখ থেকে ভালো কথা ছাড়া অন্য কোন কথা বের হতে শুনিনি। তামীম গোত্রের আরেক ব্যক্তি বলেছেন, আমি দু'বছর যাবত রাবী'র সাথে বসেছি। এর মধ্যে তিনি আমার কাছে মানুষের পার্থিব অবস্থা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করেননি। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন, তোমাদের মহল্লায় কয়টি মসজিদ আছে? অন্যদেরকেও তিনি বাজে কথা বলতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন, তোমরা কম কথা বলবে। তবে এই নয়টি ক্ষেত্রে বেশী বলতে দোষ নেই:

১. তাহলীল : لا إله إلا الله
২. তাকবীর : الله اكبر
৩. তাসবীহ : سبحان الله
৪. তাহমীদ : الحمد لله
৫. কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে দু'আ করা
৬. খারাপ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা
৭. আমর বিল মা'রূফ
৮. নাহি 'আনিল মুনকার
৯. কুরআন তিলাওয়াত।

তিনি আরো বলতেন : মানুষকে ভালো কথা বলা শেখাবে, খারাপ কথা বলা থেকে তাদেরকে বিরত রাখবে। কুরআন তিলাওয়াত করবে, আল্লাহর কাছে কল্যাণের জন্য দু'আ করবে এবং অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাহায্য চাইবে।

রাবী' যদিও চুপচাপ ও একাকী থাকতেন, তবুও ফুলের সুবাস ও সূর্যের আলো যেমন আবদ্ধ করে রাখা যায় না, তেমনিভাবে তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকেনি। তাঁর চরিত্রের সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর চরিত্র-মাধুর্য দ্বারা মানুষ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। শাফীক বর্ণনা করেছেন, একবার আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) কয়েকজন ছাত্রের সাথে রাবী'র সংগে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। পথে এক ব্যক্তি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? আমরা বললাম: রাবী'র সংগে দেখা করার জন্য। লোকটি বললো : আপনারা এমন এক ব্যক্তির কাছে যাচ্ছেন, যিনি কোন কথা বললে মিথ্যা বলেন না, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করেন না এবং তাঁর কাছে কোন কিছু আমানত রাখলে খিয়ানত করেন না।

কোন মানুষের সমকালীনদের স্বীকৃতিই হলো তার মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। রাবী'র সমকালীন লোকেরা তাঁর প্রতি এত মুগ্ধ ছিলেন যে, কেউ কোনভাবে তাঁর চেয়ে নিজেকে বড় ভাবা পছন্দ করতো না। একবার এক ব্যক্তি আবূ ওয়াইলকে প্রশ্ন করে : আপনি বড় না রাবী'? জবাবে তিনি বলেন: আমি বয়সে তাঁর চেয়ে বড়, তবে তিনি বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় আমার চেয়ে বড়।

তিনি যেমন কম কথা বলতেন, তেমনি কোন বিতর্কেও জড়ানো পছন্দ করতেন না। একবার তাঁর এক আত্মীয় দেখা করতে এলো। কথার ফাঁকে এক সময় লোকটি বললো: আবু ইয়াযীদ! হুসায়ন ইবন ফাতিমা (রা) নিহত হয়েছেন। তিনি বললেন: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন- নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
قُلِ اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمْ بَيْنَ عِبَادِكَ فِي مَا كَانُوا فِيْهِ يَخْتَلِفُوْنَ *
বলুন, হে আল্লাহ, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করতো।

রাবী'র এ কথায় লোকটি সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে প্রশ্ন করলো : তাঁর হত্যার ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
বললেন : আমি বলি তাঁদেরকে আল্লাহরই কাছে ফিরে যেতে হবে এবং তাঁদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহই করবেন। আল-জাহিজ বলেন : 'ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে রাবী' কোন কথা বলতেন না এবং কোন কথা শুনতেনও না। '

একবার এক ব্যক্তি বললেন: আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দেবেন। বললেন: তোমার জ্ঞানের পরিধির মধ্যে যা কিছু আছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আর যা কিছু জ্ঞান তোমার নেই, তা যিনি জানেন সেই সত্তার নিকট তা সোপর্দ কর। তোমাদের কেউ যেন না বলে: 'হে আল্লাহ, আমি তোমার দিকে ফিরে এসেছি।' তারপর যদি সে ফিরে না আসে তাহলে সেটা হবে মিথ্যা, তাই সে যেন বলে: 'হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতি ফিরে আসুন!' তাহলে এটা হবে দু'আ।

একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো: আমি দীর্ঘ দিন যাবত আপনার সাথে আছি, এর মধ্যে একদিনও আপনাকে কবিতার কোন উদ্ধৃতি দিতে শুনলাম না। অথচ আপনার সঙ্গী- সাথীদের অনেককে আমি কবিতার উদ্ধৃতি দিতে শুনেছি। বললেন: যা কিছু তোমরা এখানে বলবে তা সবই লেখা হবে এবং সেখানে তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে।

তারপর উপস্থিত সবার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন: তোমরা বেশী করে মৃত্যুকে স্মরণ কর। কারণ, সে তোমাদের থেকে অনুপস্থিত পর্যবেক্ষণকারী। আর অনুপস্থিত ব্যক্তির দূরে অবস্থানের মেয়াদ দীর্ঘ হয়ে গেলে তার ফেরার সময়ও নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তারপর কিছুক্ষণ অঝোরে কাঁদলেন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন: সেই সময় তুমি কি করবে যখন এ অবস্থা হবে:
إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكًّا. وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا، وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ. يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى **
যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং আপনার পালনকর্তা ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন। সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে?

তিনি বলতেন, আমার যদি দু'টি মন থাকতো তাহলে একটা কোথাও আটকে গেলে অন্যটি তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু আমার তো একটি মাত্র মন। সেটা যদি আমি অন্য কোথাও আটকে ফেলি তাহলে তাকে ছাড়াবে কে?

কেউ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করতো : রাবী'! আজ আপনার সকালটি কি অবস্থায় হলো? বলতেন: দুর্বল পাপী অবস্থার মধ্যে আমার সকাল হয়েছে। এরপর নির্ধারিত রিযিক খাবো এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকবো।

তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর উপর নির্ভরতার প্রকৃত রহস্য এই যে, কোন কাজে আপ্রাণ চেষ্টা করে তার সফলতা ও ব্যর্থতা আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। কিন্তু তাওয়াক্কুলের আরো একটা উঁচু ধাপ আছে। যার অধিকারী কেবল আল্লাহর একান্ত বিশেষ ব্যক্তিরা হয়ে থাকেন। আর তা হলো, কোন কাজ সম্পন্ন করার জন্য দুনিয়ার উপায়-উপকরণের কোন রকম সাহায্য-সহায়তা না নিয়ে সবকিছু আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। রাবী' তাওয়াক্কুলের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন। জীবন-মরণের মুখোমুখি অবস্থায়ও তিনি পার্থিব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতেন না। প্যারালাইসিসের মত কষ্টদায়ক রোগে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু কোন রকম চিকিৎসা গ্রহণ করতেন না। লোকেরা বলতো: ইস! আপনি যদি চিকিৎসা করাতেন! বলতেন: 'আদ, ছামূদ ও আসহাবে রাস- সব জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা অতিক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যবর্তী সময়ে আরো জাতি-গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল। তাদের মধ্যে চিকিৎসকও ছিল। কিন্তু আজ না সেই চিকিৎসক বেঁচে আছে, আর না যাদেরকে চিকিৎসা করা হয়েছে, তারা।

এই চরম আল্লাহ নির্ভরতার ফল এই দাঁড়ালো যে, তাঁর প্যারালাইসিস রোগ শেষ পর্যন্ত অন্তিম রোগে পরিণত হলো। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি সবার সামনে এ স্বীকৃতি দান করেন যে, আমি আমার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী মানছি, তিনি তাঁর নেক বান্দাদের সাক্ষ্য, তাদের প্রতিদান ও বদলা দানের জন্য যথেষ্ট। আমি আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, দীনে ইসলাম, মুহাম্মাদ (সা)-এর নবুওয়াত, রিসালাত এবং কুরআনের ইমামতের ব্যাপারে রাজি। আমি নিজের সত্তা, আর ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে যে আমার অনুসরণ করে, একথার উপর রাজি যে, আমরা সকলে 'আবিদীনের দলের মধ্যে থেকে আল্লাহর 'ইবাদাত করবো, আল্লাহর হামদকারীদের মধ্যে তাঁর হামদ করবো। মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করবো। স্বীকৃতি দানের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে যখন তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে তখন পাশে বসা মেয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন: মেয়ে, তুমি কাঁদছো কেন? কল্যাণ তোমার পিতার সামনে উপস্থিত।

তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ৬১, ৬৩ ও ৬৪ সনের কথা বলা হয়েছে। 'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ তখন কুফার ওয়ালী এবং ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া (রা) মুসলিম জাহানের খলীফা।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৫৮
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৪২
৩. তাবাকাত-৬/১২৭
৪. 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১১; সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
৫. সূরা আল-আনফাল-৩
৬. সূরা হুদ-৯
৭. সূরা সাদ-৫
৮. তাবাকাত-৬/১২৮
৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১০. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২০৮
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১২. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৩. তাবাকাত-৬/১৩৩
১৪. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮
১৬. তাবাকাত-৬/১২৭
১৭. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৮. তাবাকাত-৬/১৩১
১৯. সিফাতুস সাফওয়া-৩/৬২; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১১২
২০. সূরা আল-ফুরকান-১২-১৩
২১. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬০-৬১
২২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৬০
২৩. তাবাকাত-৬/১৩০
২৪. সূরা আল-জাছিয়া-২
২৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
২৬. তাবাকাত-৬/১৩২
২৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩৩
২৮. প্রাগুক্ত-৬/১৩১
২৯. সূরা আদ-দাহর-৮
৩০. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়ীন-৩/১৫৮
৩১. তাবাকাত-৬/১৩১
৩২. সূরা আলে 'ইমরান-৯২
৩৩. সূরা আল-আন'আম-১৫১
৩৪. তাবাকাত-৬/১৩০
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/১২৯
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/১২৭
৩৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩০
৩৮. প্রাগুক্ত-৬/১২৯; আল-বায়ান-৩/১৪৬
৩৯. আল-'ইক্বদ আল-ফারীদ-৩/১৫০
৪০. তাবাকাত-৬/১২৯
৪১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪২৪
৪২. সূরা আয-যুমার-৪৬
৪৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১০৫
৪৪. সূরা আল-ফাজর-২১-২৩
৪৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৫৭-৫৯
৪৬. আল-'ইক্দ আল-ফারীদ-৩/১৭৯
৪৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৭৪
৪৮. তাবাকাত-৬/১৩০
৪৯. প্রাগুক্ত-৬/১৩৪
৫০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮; সিফাতুষ সাফওয়া-৩/৩১; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১৯

আবূ ইয়াযীদ রাবী' ইবন খুছায়ম বংশগত দিক দিয়ে আরবের ছা'লাবা গোত্রের একটি শাখা গোত্র ছাওর-এর সন্তান। পিতার নাম খুছায়ম ইবন 'আ'ইশ। যে সকল তাবি'ঈ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকাল পেয়েছিলেন, কিন্তু সাহাবীর মর্যাদা লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যান, রাবী' তাঁদের একজন। তিনি সাহাবী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলেও সে যুগের বহুবিধ কল্যাণ লাভে ধন্য হন। জ্ঞান ও কর্ম এবং দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা ও খোদাভীতির দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ। ইমাম যাত্রী বলেছেন, যে আটজন দুনিয়া বিরাগী তাপস রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ লাভ করেন রাবী' তাঁদের একজন। তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান তাবি'ঈ। তবে তাঁর জ্ঞানের আলোকে নিষ্প্রভ করে দেয় তার দুনিয়া বিমুখতা ও খোদাভীতির জ্যোতি। এ কারণে তিনি 'ইলমের চেয়ে তাকওয়ার মাধ্যমে বেশী প্রসিদ্ধ। জ্ঞানগত উৎকর্ষ তিনি যতটুকু অর্জন করেছিলেন তাতে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে বিশেষ স্থানের অধিকারীই ছিলেন। এমন একটা সময় তিনি লাভ করেন যখন 'আলিম সাহাবীদের বড় একটি দল বিদ্যমান ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে বিশেষভাবে 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) ও আবূ আইউব আল-আনসারীর নিকট জ্ঞান অর্জন করেন। এ দু'জনের মধ্যে আবার 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট থেকে বেশী ফায়দা লাভ করেন। তাঁর সাথে রাবী'র এত গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে, যতক্ষণ তিনি 'আবদুল্লাহর (রা) নিকট থাকতেন এবং দু'জনের একান্ত আলোচনা শেষ না হতো ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেত না। ইবন মাস'উদ (রা) তাঁর গুণাবলী ও আভ্যন্তরীণ উৎকর্ষে এত মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি প্রায়ই বলতেন, আবূ ইয়াযীদ! রাসূলুল্লাহ (সা) যদি তোমাকে দেখতেন, দারুণ ভালোবাসতেন। আমি যখন তোমাকে দেখি তখন আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাহচর্য এমন ছিল যে, অতি সাধারণ মানুষকেও একজন বড় 'আলিমে পরিণত করে দিয়েছে। রাবী' ছিলেন স্বভাবগতভাবে একজন সত্যনিষ্ঠ এবং অসম্ভব যোগ্য ব্যক্তি। এ কারণে তিনি ইবন মাস'উদের (রা) জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা বেশী উপকার লাভ করেন。

কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সব ধরনের জ্ঞানে তাঁর পারদর্শিতা ছিল। বাস্তব দিক দিয়ে কুরআনের সাথে তাঁর সবচেয়ে বেশী সম্পর্ক ছিল। কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং কুরআনের আয়াত দ্বারা যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনে তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। সকল ওয়াজ-নসীহত ও বক্তৃতা-ভাষণে অত্যন্ত সার্থকভাবে কুরআনের আয়াত উপস্থাপন করতেন।

তিনি সবসময় কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি হয়তো মাসহাফ হাতে কুরআন তিলাওয়াত করছেন, তখন হঠাৎ কোন লোক এসে গেল। তিনি মাসহাফটি তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলতেন যাতে আগম্ভক লোকটি তা না দেখতে পারে।

সাধারণতঃ তাঁর ও'য়াজ-নসীহত হতো কুরআনের উদ্ধৃতি সহকারে নিম্নরূপ: হে আল্লাহর বান্দারা! সবসময় ভালো কথা বলবে, ভালো কাজ করবে, ভালো স্বভাবের উপর থাকবে, নিজের জীবনকালকে বেশী বলে মনে করবে না, নিজের অন্তরকে কঠিন করে তুলবে না এবং সেইসব লোকের মত হবে না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না।

وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُوْنَ. তোমরা সেইসব লোকের মত হয়ো না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না। হে আল্লাহর বান্দারা! যদি তোমরা ভালো কাজ কর, তাহলে তা ক্রমাগতভাবে করতে থাকবে। কারণ সেদিন খুব শিগগির এসে যাবে যখন তোমরা এ অনুশোচনা করতে থাকবে যে, হায় আফসোস! এই ভালো কাজ যদি আরো বেশী করতাম! যদি তোমার দ্বারা খারাপ কিছু ঘটে যায় তাহলেও ভালো কাজ করবে। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ - ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ * ভালো কাজ মন্দ কাজকে দূর করে দেয়। আর এ হলো উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ তাঁর কিতাবের মাধ্যমে যে জ্ঞান তোমাদেরকে দান করেছেন, সে জন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যে জ্ঞান তোমাদেরকে দেননি; বরং নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন, সেই জ্ঞানে পারদর্শীদের জন্য তা ছেড়ে দাও। কোন কৃত্রিমতার আশ্রয় নিও না। আল্লাহ বলেছেন:

قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ لِلْعَالَمِينَ، وَلَتَعْلَمُنَّ نَبَأَهُ بَعْدَ حِينَ. হে নবী! আপনি বলে দিন, আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না। আর আমি কোন কৃতিত্রমতাশ্রয়ীদের অন্তর্গত লোক নই। আর এই কুরআন বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ। আর এমন এক সময় আসবে যখন তার প্রকৃত অবস্থা অবশ্যই তোমরা জানবে।

হাদীছের ক্ষেত্রে ইমাম যাত্রী তাঁকে ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবু আইউব আল-আনসারী (রা), 'আমর ইবন মায়মূন (রা), 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। আর ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, ইমাম শা'বী, মুনযির ছাওরী, হিলাল ইবন ইয়াসাফ, বাকর ইবন মা'ইয প্রমুখের মত বিখ্যাত তাবি'ঈগণ তাঁর ছাত্র ছিলেন। গ্রহণযোগ্যতার দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনার কি স্থান ছিল তা এই শাস্ত্রের বিভিন্ন মনীষীর মন্তব্য দ্বারা অনুমান করা যায়। যেমন, ইমাম শা'বী বলতেন: রাবী' সত্যবাদিতার খনি। আর ইবন মু'ঈন বলতেন, রাবী'র মত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু ঘাঁটাঘাঁটির কোন প্রয়োজন নেই।

ফকীহ্ হিসেবে রাবী' যদিও তেমন খ্যাতি অর্জন করেননি, তবে তাঁর ফিকাহ্ বিষয়ে পারদর্শিতার জন্য এ সনদ যথেষ্ট যে, তিনি ছিলেন সেই ফকীহুল উম্মাত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র, যাঁর ফাতওয়ার উপর ইরাকী ফিকাহ্ ভিত্তিশীল। তবে পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, তাঁর সীমাহীন যুহৃদ ও তাকওয়া তথা দুনিয়াত্যাগী মনোভাব ও খোদাভীতির তাঁর সব যোগ্যতাকে ম্লান করে দিয়েছে।

সাধারণতঃ দেখা যায় প্রতিটি খান্দানের এমন কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকে যা কম-বেশী তার সদস্যদের মধ্যে পাওয়া যায়। কোন খান্দান জ্ঞান ও বিভিন্ন শাস্ত্রে এবং কোন খান্দান যুহদ ও তাকওয়া এবং অন্য কোন বিশেষ গুণের জন্য বিশিষ্ট হয়ে থাকে। রাবী'র খান্দান বানু ছাওর ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। শাবরামা বলেন, আমি কৃষ্ণায় বান্ ছাওরের চেয়ে বেশী ফকীহ্ ও 'ইবাদাত-বন্দেগী করা বুযর্গ মানুষ আর কোন খান্দানে দেখিনি। আবূ বকর আয-যুবায়দী তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করতেন যে, 'আমি ছাওরী ও 'আরানী গোত্রদ্বয়ের চেয়ে বেশী মসজিদে অবস্থানকারী মানুষ অন্য কোন খান্দানে দেখিনি।

রাবী' ছিলেন এমন একটি 'ইবাদাত-বন্দেগী করা খান্দানের সদস্য, যে খান্দান দীনী ও রূহানী সম্পূর্ণতায় অন্য সবার চেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি কেবল তাঁর খান্দানের মধ্যে নন, বরং গোটা তাবি'ঈ জামা'আতের সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই মুষ্টিমেয় তাবি'ঈদের অন্যতম যাঁরা যুহদ ও তাকওয়ার দিক দিয়ে গোটা তাবি'ঈ সমাজের শীর্ষে ছিলেন। তাঁর যুহৃদ ও তাকওয়া এবং 'ইবাদাত-বন্দেগীর ব্যাপারে সকল 'আলেম ও লেখক একমত। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' তাঁর দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খোদাভীরু ছিলেন। আবু 'উবায়দা বলেন, আমি রাবী'র চেয়ে বেশী ভালো 'ইবাদাতকারী আর কাউকে দেখিনি। ইবন হাজার আল- 'আসকালানী লিখেছেন, রাবী'র যুহৃদ এবং তাঁর 'ইবাদাত এত প্রসিদ্ধ যে, সে বিষয়ে কিছু লেখার কোন প্রয়োজন নেই।

সকল ভালো কাজের মূল উৎস হলো আল্লাহর ভয়। রাবী'র মধ্যে আল্লাহর ভয় এত প্রবল ছিল যে, কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। দোযখের 'আযাবের অতি সাধারণ পার্থিব নমুনা দেখেও তিনি বেহুঁশ হয়ে যেতেন। আ'মাশ বর্ণনা করেছেন: একবার রাবী' কামারের ভাটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভাটিতে জ্বলন্ত লোহা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

আরেকবারের একটি ঘটনা তাঁর বন্ধুদের একটি দল বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, একদিন আমরা 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে রাবী' ইবন খুছায়মও ছিলেন। আমরা ফুরাত নদীর তীরে পৌঁছলাম। সেখানে চুন বানানোর একটি ভাটির পাশ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। তখন চুন বানানোর জন্য সেই ভাটিতে পাথর ফেলা হচ্ছিল। তাতে দাউ দাউ করে প্রচণ্ড গর্জন সহকারে আগুন জ্বলছিল এবং তার লেলিহান শিখা বহু উঁচুতে উঠে যাচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে রাবী' থমকে দাঁড়িয়ে যান এবং ভীষণ কাঁপতে শুরু করেন। এ অবস্থায় তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতে থাকেন:

إِذَا رَأَتْهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا ، وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقاً مُقَرَّ نِينَ دَعَوْا هنالك ثُبُورًا .

আগুন যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার। যখন এক শিকলে কয়েকজন বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা সেখানে মৃত্যুকে ডাকবে।

তারপর তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। আমরা তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং দীর্ঘক্ষণ সেবার পর তিনি হুঁশ ফিরে পান। আমরা তাঁকে নিয়ে তাঁর বাড়ীতে পৌছে দিই।

'ইবাদাত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারীর ভিতর দিয়েই রাবী' তাঁর জীবন শুরু করেন। শৈশব-কৈশোরেও সীমাহীন খোদাভীতি তাঁর মধ্যে বিরাজমান ছিল। এত অল্প- বয়সেও 'ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত কাটিয়ে দিতেন। আল্লাহর আযাবের ভয়ে কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে পড়তেন। তাঁর সম্মানিতা মা ঘুমিয়ে পড়তেন। এক ঘুম পর গভীর রাতে জেগে দেখতেন তাঁর কিশোর ছেলেটি তখনো জায়নামাযে দাঁড়িয়ে অথবা একাগ্রচিত্তে মুনাজাতে নিমগ্ন। মা ডেকে বলতেন: রাবী' তুমি এখনো ঘুমাওনি? তিনি বলতেন: মা, সেই ব্যক্তি কেমন করে রাতের অন্ধকারে ঘুমাতে পারে যে জবাবদিহিতার ভয় করে? ছেলের জবাব শুনে বৃদ্ধ মায়ের চোখের পানিতে দু'গাল ভিজে যেত। তিনি প্রাণ ভরে ছেলের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতেন।

রাবী' যুবক হলেন। আর সাথে সাথে তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারী এবং আল্লাহভীতিও যৌবন পেল। মানুষ যখন রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকতো, আল্লাহর ভয়ে রাবী'র কান্না- কাটিও তীব্রতা লাভ করতো। তাঁর এমন বিচলিত ও অস্থির অবস্থা দেখে মায়ের অন্তর ব্যথায় ভরে যেত। ছেলে সম্পর্কে নানা রকম দুশ্চিন্তা তাঁর মনে ভর করতো। এক সময় তিনি ছেলেকে ডেকে বলতেন:
- বেটা তোমার কি হয়েছে? মনে হচ্ছে তুমি কোন অপরাধ করে বসেছো? কোন মানুষকে খুন করেছো?
বলতেন: হাঁ, মা আমি মানুষ খুন করেছি। অস্থিরভাবে মা জানতে চাইতেন: বেটা, কাকে খুন করেছো? আমাকে বল। তাহলে আমরা নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদেরকে খুশী করে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবো। আল্লাহর কসম! নিহতের পরিবারের লোকেরা যদি তোমার এ কান্নাকাটি ও রাত জাগার কথা জানতে পারে তাহলে অবশ্যই তারা তোমার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবে।
তিনি বলতেন: আপনি কাকেও কিছু বলবেন না। আমি আমার নিজকে হত্যা করেছি। আমার নিজকে আমি পাপের দ্বারা হত্যা করেছি।

পরবর্তীকালে রাবী'র ছেলে বড় হয়ে যখন দেখতো, বাবা সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেন তখন সে মাঝে মাঝে বাবার ঘরে ঢুকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতো: আব্বা! যথেষ্ট হয়েছে। এখন কি একটু ঘুমোবেন? তিনি জবাব দিতেন: আমার ছেলে! সেই ব্যক্তি কেমন করে ঘুমোতে পারে যে তার প্রভুর শাস্তির ভয় করে।

রাবী'র 'ইবাদাত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সারা রাত 'ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন। উপদেশমূলক আয়াত পাঠ করতেন। তা দ্বারা এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়তেন যে একই আয়াত বার বার পাঠ করতে করতে সকাল হয়ে যেত। তাঁর দাস নুসায়র ইবান যা'লুক বর্ণনা করেছেন। রাবী' রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদ নামায পড়ার সময় যখন নিম্নের এ আয়াতে পৌঁছতেন তখন তা বার বার তিলাওয়াত করতে করতে সকাল হয়ে যেত।

أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيَّاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ.
যারা খারাপ কাজ করেছে তারা কি এ ধারণা করে যে, আমরা তাদেরকে সেই লোকদের সমান করে দেব যারা ভালো কাজ করেছে? যাদের জীবন ও মরণ সমান। তারা কতই না খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়।

'আবদুর রহমান ইবন 'আজলান বলেছেন। একদিন আমি রাবী'র ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি যখন মনে করলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাযের মধ্যে উপরের আয়াতটি তিনি বার বার তিলাওয়াত করেন। আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। জামা'আতের সাথে নামায আদায়ের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। কখনো জামা'আত ছাড়তেন না। শেষ জীবনে চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। তখনো জামা'আত তরক হতো না। অন্যের সাহায্যে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে মসজিদে পৌঁছতেন। আবূ হায়্যান তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করেছেন। রাবী' পঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেন। তবে নামাযের জন্য হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে অথবা অন্যের সাহায্যে মসজিদে যেতেন। লোকেরা বলতো, আবু ইয়াযীদ! আপনি তো এখন মা'জুর। এ অবস্থায় ঘরে নামায আদায়েরও অনুমতি আছে। জবাব দিতেন : حَيَّ عَلَى الصَّلواة এবং حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ শোনার পর যতদূর সম্ভব সাড়া দেওয়া উচিত। তা সে হামাগুড়ি দিয়েই হোক না কেন।

রাবী' একজন নির্জন-নিরিবিলির 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। আর এ কারণে খিলাফতে রাশেদার সময়ে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কোথাও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায় না। তবে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য নির্জন-নিরিবিলি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেন। তাঁর এই জিহাদ এমন নির্ভেজাল আল্লাহর জন্য হতো যে, মালে গনীমত মোটেই স্পর্শ করতেন না। ভাগে যা কিছু পেতেন তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে ফেলতেন। 'আবদি খায়র নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। আমি একবার একটি যুদ্ধে রাবী'র সঙ্গী ছিলাম। এ যুদ্ধে গনীমতের অংশে তিনি বহু দাস এবং গৃহপালিত জন্তু লাভ করেন। কিছুদিন পর কোন কারণে আমাকে আবার তাঁর কাছে যেতে হয়। তখন তাঁর কাছে সেই গনীমতের মালের কোন কিছুই দেখতে না পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম: সেই দাস ও জীবজন্তুগুলোর কি হয়েছে? তিনি কোন জবাব দিলেন না। আমি যখন আবার জিজ্ঞেস করলাম তখন বললেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ.
তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর।

ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে খরচ করা ছিল তাঁর বিশেষ গুণ। মিষ্টি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ কারণে কোন সায়িল এলে তিনি তার হাতে একটি চিনির দলা তুলে দিতেন। লোকেরা যখন বলতো, এর চেয়ে তো তার রুটির প্রয়োজন বেশী। জবাবে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন: وَيُطْعِمُوْنَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا. - তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাবার দান করে।

তিনি বলতেন : 'মানুষকে ভালো খাবার খাওয়াবে, নতুন কাপড় পরাবে এবং সুস্থ-সবল দাস মুক্ত করবে।'

অভাবী-প্রতিবেশীদেরকে তিনি ভালো ভালো খাবার পাকিয়ে খাওয়াতেন। মুনযির ছাওরী বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী' তাঁর বাড়ীর লোকদেরকে 'খুবায়স' নামক এক প্রকার খাবার তৈরী করতে বলেন। যেহেতু তিনি কখনো নিজের জন্য কোন কিছুর আবদার করতেন না। এ কারণে তাঁর বেগম সাহেবা অতি যত্ন সহকারে 'খুবায়স' তৈরী করেন। তাঁর প্রতিবেশীদের মধ্যে এক উন্মাদ ব্যক্তিও ছিল। তিনি সেই 'খুবায়স' নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তুলে তাকে খাওয়ান। উন্মাদ লোকটির মুখ থেকে সব সময় লালা ঝরতো। তিনি যখন তাকে খাইয়ে ঘরে ফিরে আসেন তখন বেগম সাহেবা বললেন, আমি এত কষ্ট করে এবং এত যত্ন সহকারে খাবারগুলো তৈরী করলাম, আর আপনি এমন এক লোককে খাইয়ে এলেন যে এটাও বুঝতে অক্ষম যে, সে কি খেয়েছে। তিনি জবাব দিলেন: আল্লাহ তো জানেন।" তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ * তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর। আর তোমরা যা কিছু খরচ করবে, আল্লাহ তা জানেন।

রাবী'র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল 'আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার' বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। যদিও তিনি একজন নীরব ও নির্জনতা প্রিয় মানুষ ছিলেন, তবে আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার-এর জন্য নির্জনতা ছেড়ে বেরিয়ে এসে নীরবতা ঝেড়ে ফেলতেন। তাঁর কাছে যাঁরা আসতেন তাদের তিনি বলতেন, তোমরা ভালো কথা বলবে এবং নিজেরা ভালো কথার উপর 'আমল করবে, সবসময় ভালোর উপর থাকবে। আর যতদূর সম্ভব বেশী বেশী নেক কাজ করবে এবং খারাপ কাজ কমিয়ে দেবে। নিজের অন্তরকে কঠোর করবে না। তোমার জীবনকাল এত দীর্ঘ নয়। সেইসব লোকের মত হবে না যারা মুখে তো বলে, আমরা শুনেছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শুনে না।

কেউ যদি তাঁকে কিছু উপদেশ শোনাতে বলতো, তিনি তাঁকে কুরআনের কিছু হুকুম-আহকাম লিখে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে বলে। তিনি কিছু কাগজ চেয়ে নিয়ে সূরা আল-আন'আমের এ আয়াতটি লিখে দেন:
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ... عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ
লোকটি বললো, আমি আপনার নিকট এজন্য এসেছিলাম যে, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দেবেন। বললেন: হাঁ, এর উপর 'আমল কর।

তাকওয়া-পরহিযগারীর গর্ব ও ঔদ্ধত্য থেকে রাবী' সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও কখনো পাপীদের সম্পর্কে তাঁর জিহ্বা থেকে কোন খারাপ কথা বের হতো না। নাসর ইবন যা'লুক বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি রাবী'র নিকট জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোন মানুষকে খারাপ বলেন না কেন? বললেন আল্লাহর কসম। আমি আমার নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। অন্যকে খারাপ বলবো কেমন করে? মানুষের এ বিস্ময়কর অবস্থা যে, সে অন্যের পাপের ব্যাপারে তো আল্লাহকে ভয় করে; কিন্তু নিজের পাপের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না।

রাবী' আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুসরণের ব্যাপারে ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। ছোট ছোট ও অতি সাধারণ কথা ও কাজে তিনি এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, কোন মানুষের চিন্তা ও কল্পনাও সেদিকে যেত না। বাকর ইবন মা'ইয বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী'র ছোট্ট একটি মেয়ে বললো, আব্বা! আমি খেলতে যাচ্ছি। তিনি বললেন: যাও, ভালো কথা বলো। ছোট্ট বাচ্চা। তাঁর এ কথার অর্থ কেমন করে বুঝবে? লোকেরা রাবী'কে বললো: আপনি এই শিশুকে খেলতে যেতে দেন না কে? বললেন: আমি এটা চাই না, আমার আজকের আমলনামায় এ কথা লেখা হোক যে, আমি খেলার নির্দেশ দিয়েছি।

তিনি সকল কাজ নিজ হাতে করতেন। বাড়ীর পায়খানাও নিজ হাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। একবার এক ব্যক্তি বললো, এ কাজের জন্য তো অন্য মানুষ আছে। বললেন, আমি বাড়ীর কাজ-কর্মেও অংশীদার হতে চাই। তাঁর চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ীভাব দেখে তাঁর শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলতেন, তোমাকে দেখে আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। কখনো কোন অবস্থাতেই তাঁর মুখ থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী কোন কথা উচ্চারিত হতো না। কারো দ্বারা কষ্ট পেলেও তার জন্য দু'আ করতেন। একদিন মসজিদে মুসল্লীদের ভীষণ ভীড় ছিল। যখন জামা'আত আরম্ভ হতে যাচ্ছিল এবং ধীরে ধীরে লোকেরা সামনে এগুচ্ছিল, ঠিক সে সময় রাবী'র পিছনের লোকটি তাঁকে বলে, সামনে এগোন। কিন্তু অত্যধিক ভীড়ের কারণে তিনি সামনে এগুতে পারছিলেন না। লোকটি রেগে গিয়ে পিছন থেকে রাবী'র ঘাড়ে খোঁচা দেয়। তিনি ব্যথা পান এবং একথা বলতে থাকেন : আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। লোকটি চোখ উঁচু করে রাবী'কে দেখতে পেয়ে এত লজ্জিত হয় যে, কাঁদতে শুরু করে।

তিনি সব সময় একাকী থাকা পছন্দ করতেন। কোথাও আসা-যাওয়া করতেন না। কোন অনুষ্ঠান ও সমাবেশে বসাও পছন্দ করতেন না। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' বিবেক-বুদ্ধি হওয়ার পর না কোন মজলিসে বসেছেন, আর না কোন প্রধান সড়কে গেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, আমি এটা পছন্দ করতাম না যে, কোন স্থানে যাই, আর সেখানে এমন কিছু দেখি যাতে আমাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়, আর আমি সাক্ষ্য দিতে না পারি, কোন অভাবী মানুষকে দেখি, আর তার কোন সাহায্য করতে না পারি, অথবা কোন মজলুমকে দেখি ও তার কোন উপকারে আসতে না পারি।

বাড়ীতেও তিনি সব সময় চুপচাপ থাকতেন। খুব কম কথা বলতেন। কোন বাজে কথা তার মুখে কখনো উচ্চারিত হতো না। এক ব্যক্তি, যিনি রাবী'র সাহচর্যে বিশ বছর কাটান, বর্ণনা করেছেন যে, আমি তাঁর সাহচর্যে বিশ বছরের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, এ সময়ে আমি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত এমন কোন কথা শুনিনি যার সমালোচনা হতে পারে। একই ব্যক্তি আরো বলেছেন, আমি বিশ বছরে রাবী'র মুখ থেকে ভালো কথা ছাড়া অন্য কোন কথা বের হতে শুনিনি। তামীম গোত্রের আরেক ব্যক্তি বলেছেন, আমি দু'বছর যাবত রাবী'র সাথে বসেছি। এর মধ্যে তিনি আমার কাছে মানুষের পার্থিব অবস্থা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করেননি। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন, তোমাদের মহল্লায় কয়টি মসজিদ আছে? অন্যদেরকেও তিনি বাজে কথা বলতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন, তোমরা কম কথা বলবে। তবে এই নয়টি ক্ষেত্রে বেশী বলতে দোষ নেই:

১. তাহলীল : لا إله إلا الله
২. তাকবীর : الله اكبر
৩. তাসবীহ : سبحان الله
৪. তাহমীদ : الحمد لله
৫. কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে দু'আ করা
৬. খারাপ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা
৭. আমর বিল মা'রূফ
৮. নাহি 'আনিল মুনকার
৯. কুরআন তিলাওয়াত।

তিনি আরো বলতেন : মানুষকে ভালো কথা বলা শেখাবে, খারাপ কথা বলা থেকে তাদেরকে বিরত রাখবে। কুরআন তিলাওয়াত করবে, আল্লাহর কাছে কল্যাণের জন্য দু'আ করবে এবং অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাহায্য চাইবে।

রাবী' যদিও চুপচাপ ও একাকী থাকতেন, তবুও ফুলের সুবাস ও সূর্যের আলো যেমন আবদ্ধ করে রাখা যায় না, তেমনিভাবে তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকেনি। তাঁর চরিত্রের সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর চরিত্র-মাধুর্য দ্বারা মানুষ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। শাফীক বর্ণনা করেছেন, একবার আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) কয়েকজন ছাত্রের সাথে রাবী'র সংগে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। পথে এক ব্যক্তি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? আমরা বললাম: রাবী'র সংগে দেখা করার জন্য। লোকটি বললো : আপনারা এমন এক ব্যক্তির কাছে যাচ্ছেন, যিনি কোন কথা বললে মিথ্যা বলেন না, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করেন না এবং তাঁর কাছে কোন কিছু আমানত রাখলে খিয়ানত করেন না।

কোন মানুষের সমকালীনদের স্বীকৃতিই হলো তার মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। রাবী'র সমকালীন লোকেরা তাঁর প্রতি এত মুগ্ধ ছিলেন যে, কেউ কোনভাবে তাঁর চেয়ে নিজেকে বড় ভাবা পছন্দ করতো না। একবার এক ব্যক্তি আবূ ওয়াইলকে প্রশ্ন করে : আপনি বড় না রাবী'? জবাবে তিনি বলেন: আমি বয়সে তাঁর চেয়ে বড়, তবে তিনি বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় আমার চেয়ে বড়।

তিনি যেমন কম কথা বলতেন, তেমনি কোন বিতর্কেও জড়ানো পছন্দ করতেন না। একবার তাঁর এক আত্মীয় দেখা করতে এলো। কথার ফাঁকে এক সময় লোকটি বললো: আবু ইয়াযীদ! হুসায়ন ইবন ফাতিমা (রা) নিহত হয়েছেন। তিনি বললেন: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন- নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
قُلِ اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمْ بَيْنَ عِبَادِكَ فِي مَا كَانُوا فِيْهِ يَخْتَلِفُوْنَ *
বলুন, হে আল্লাহ, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করতো।

রাবী'র এ কথায় লোকটি সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে প্রশ্ন করলো : তাঁর হত্যার ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
বললেন : আমি বলি তাঁদেরকে আল্লাহরই কাছে ফিরে যেতে হবে এবং তাঁদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহই করবেন। আল-জাহিজ বলেন : 'ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে রাবী' কোন কথা বলতেন না এবং কোন কথা শুনতেনও না। '

একবার এক ব্যক্তি বললেন: আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দেবেন। বললেন: তোমার জ্ঞানের পরিধির মধ্যে যা কিছু আছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আর যা কিছু জ্ঞান তোমার নেই, তা যিনি জানেন সেই সত্তার নিকট তা সোপর্দ কর। তোমাদের কেউ যেন না বলে: 'হে আল্লাহ, আমি তোমার দিকে ফিরে এসেছি।' তারপর যদি সে ফিরে না আসে তাহলে সেটা হবে মিথ্যা, তাই সে যেন বলে: 'হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতি ফিরে আসুন!' তাহলে এটা হবে দু'আ।

একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো: আমি দীর্ঘ দিন যাবত আপনার সাথে আছি, এর মধ্যে একদিনও আপনাকে কবিতার কোন উদ্ধৃতি দিতে শুনলাম না। অথচ আপনার সঙ্গী- সাথীদের অনেককে আমি কবিতার উদ্ধৃতি দিতে শুনেছি। বললেন: যা কিছু তোমরা এখানে বলবে তা সবই লেখা হবে এবং সেখানে তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে।

তারপর উপস্থিত সবার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন: তোমরা বেশী করে মৃত্যুকে স্মরণ কর। কারণ, সে তোমাদের থেকে অনুপস্থিত পর্যবেক্ষণকারী। আর অনুপস্থিত ব্যক্তির দূরে অবস্থানের মেয়াদ দীর্ঘ হয়ে গেলে তার ফেরার সময়ও নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তারপর কিছুক্ষণ অঝোরে কাঁদলেন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন: সেই সময় তুমি কি করবে যখন এ অবস্থা হবে:
إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكًّا. وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا، وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ. يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى **
যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং আপনার পালনকর্তা ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন। সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে?

তিনি বলতেন, আমার যদি দু'টি মন থাকতো তাহলে একটা কোথাও আটকে গেলে অন্যটি তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু আমার তো একটি মাত্র মন। সেটা যদি আমি অন্য কোথাও আটকে ফেলি তাহলে তাকে ছাড়াবে কে?

কেউ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করতো : রাবী'! আজ আপনার সকালটি কি অবস্থায় হলো? বলতেন: দুর্বল পাপী অবস্থার মধ্যে আমার সকাল হয়েছে। এরপর নির্ধারিত রিযিক খাবো এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকবো।

তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর উপর নির্ভরতার প্রকৃত রহস্য এই যে, কোন কাজে আপ্রাণ চেষ্টা করে তার সফলতা ও ব্যর্থতা আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। কিন্তু তাওয়াক্কুলের আরো একটা উঁচু ধাপ আছে। যার অধিকারী কেবল আল্লাহর একান্ত বিশেষ ব্যক্তিরা হয়ে থাকেন। আর তা হলো, কোন কাজ সম্পন্ন করার জন্য দুনিয়ার উপায়-উপকরণের কোন রকম সাহায্য-সহায়তা না নিয়ে সবকিছু আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। রাবী' তাওয়াক্কুলের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন। জীবন-মরণের মুখোমুখি অবস্থায়ও তিনি পার্থিব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতেন না। প্যারালাইসিসের মত কষ্টদায়ক রোগে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু কোন রকম চিকিৎসা গ্রহণ করতেন না। লোকেরা বলতো: ইস! আপনি যদি চিকিৎসা করাতেন! বলতেন: 'আদ, ছামূদ ও আসহাবে রাস- সব জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা অতিক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যবর্তী সময়ে আরো জাতি-গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল। তাদের মধ্যে চিকিৎসকও ছিল। কিন্তু আজ না সেই চিকিৎসক বেঁচে আছে, আর না যাদেরকে চিকিৎসা করা হয়েছে, তারা।

এই চরম আল্লাহ নির্ভরতার ফল এই দাঁড়ালো যে, তাঁর প্যারালাইসিস রোগ শেষ পর্যন্ত অন্তিম রোগে পরিণত হলো। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি সবার সামনে এ স্বীকৃতি দান করেন যে, আমি আমার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী মানছি, তিনি তাঁর নেক বান্দাদের সাক্ষ্য, তাদের প্রতিদান ও বদলা দানের জন্য যথেষ্ট। আমি আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, দীনে ইসলাম, মুহাম্মাদ (সা)-এর নবুওয়াত, রিসালাত এবং কুরআনের ইমামতের ব্যাপারে রাজি। আমি নিজের সত্তা, আর ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে যে আমার অনুসরণ করে, একথার উপর রাজি যে, আমরা সকলে 'আবিদীনের দলের মধ্যে থেকে আল্লাহর 'ইবাদাত করবো, আল্লাহর হামদকারীদের মধ্যে তাঁর হামদ করবো। মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করবো। স্বীকৃতি দানের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে যখন তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে তখন পাশে বসা মেয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন: মেয়ে, তুমি কাঁদছো কেন? কল্যাণ তোমার পিতার সামনে উপস্থিত।

তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ৬১, ৬৩ ও ৬৪ সনের কথা বলা হয়েছে। 'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ তখন কুফার ওয়ালী এবং ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া (রা) মুসলিম জাহানের খলীফা।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৫৮
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৪২
৩. তাবাকাত-৬/১২৭
৪. 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১১; সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
৫. সূরা আল-আনফাল-৩
৬. সূরা হুদ-৯
৭. সূরা সাদ-৫
৮. তাবাকাত-৬/১২৮
৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১০. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২০৮
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১২. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৩. তাবাকাত-৬/১৩৩
১৪. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮
১৬. তাবাকাত-৬/১২৭
১৭. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৮. তাবাকাত-৬/১৩১
১৯. সিফাতুস সাফওয়া-৩/৬২; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১১২
২০. সূরা আল-ফুরকান-১২-১৩
২১. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬০-৬১
২২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৬০
২৩. তাবাকাত-৬/১৩০
২৪. সূরা আল-জাছিয়া-২
২৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
২৬. তাবাকাত-৬/১৩২
২৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩৩
২৮. প্রাগুক্ত-৬/১৩১
২৯. সূরা আদ-দাহর-৮
৩০. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়ীন-৩/১৫৮
৩১. তাবাকাত-৬/১৩১
৩২. সূরা আলে 'ইমরান-৯২
৩৩. সূরা আল-আন'আম-১৫১
৩৪. তাবাকাত-৬/১৩০
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/১২৯
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/১২৭
৩৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩০
৩৮. প্রাগুক্ত-৬/১২৯; আল-বায়ান-৩/১৪৬
৩৯. আল-'ইক্বদ আল-ফারীদ-৩/১৫০
৪০. তাবাকাত-৬/১২৯
৪১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪২৪
৪২. সূরা আয-যুমার-৪৬
৪৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১০৫
৪৪. সূরা আল-ফাজর-২১-২৩
৪৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৫৭-৫৯
৪৬. আল-'ইক্দ আল-ফারীদ-৩/১৭৯
৪৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৭৪
৪৮. তাবাকাত-৬/১৩০
৪৯. প্রাগুক্ত-৬/১৩৪
৫০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮; সিফাতুষ সাফওয়া-৩/৩১; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px