📄 আল-আহনাফ ইবন কায়স (রহ)
আল-আহনাফের ভালো নাম সাখর, মতান্তরে দাহহাক। উপনাম আবূ বাহর। আরবের বিখ্যাত তামীম গোত্রের একটি শাখা-গোত্রের নাম বানু সা'দ। হিজরাতের তিন বছর পূর্বে ৬১৯ খ্রীস্টাব্দে এই গোত্রে তাঁর জন্ম। পিতার নাম কায়স ইবন মু'আবিয়া। আবূ বাহর সাখরের দু'টি পা জন্মগতভাবেই খোঁড়া ছিল। এ কারণে 'আল-আহনাফ' উপাধিটি কপালে জুটে যায়। যার অর্থ খণ্ড, ল্যাংড়া, খোঁড়া ইত্যাদি। তাছাড়া তাঁর দেহে আরো অনেক অস্বাভাবিকতা ছিল। এত কুশ্রী ও কদাকার ছিলেন যে, মানুষ প্রথম দৃষ্টিতেই তাঁকে তুচ্ছ ও হেয় জ্ঞান করতো। তবে নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল। যেমন: প্রখর বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, ব্যক্তিত্ব, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, মত প্রকাশের সৎসাহস, প্রবল বাগ্মিতা ও বাকপটুতা ইত্যাদি। তাঁর পিতা কায়স যেমন তাঁর গোত্রের প্রথম স্তরের কোন লোক ছিলেন না তেমনি একেবারে শেষ স্তরেরও ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মধ্যম স্তরের মানুষ। বর্তমান সৌদি আরবের 'নাজদ' প্রদেশের 'আল-য়ামামা'-এর পশ্চিমাঞ্চলে ছিল তাঁর গোত্রের আদি বাসস্থান। আর সেখানেই আল-আহনাফের জন্ম হয়। মতান্তরে বসরায় তাঁর জন্ম এবং সেখানেই এতিম অবস্থায় তিনি বেড়ে ওঠেন। তিনি খুব অল্প বয়সে পিতৃহারা হন। বানু মাযিন তাঁর পিতাকে হত্যা করে।
আহনাফ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকাল লাভ করেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলীর বর্ণনা মতে রিসালাতের যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁরই চেষ্টায় তাঁর গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। তবে অন্য রিজাল শাস্ত্রবিদদের বর্ণনা এর বিপরীতে দেখা যায়। ইবন সা'দ তাঁর জীবনী 'তাবি'ঈন'-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ইবন 'আবদিল বার সতর্কতামূলকভাবে সাহাবীদের মধ্যে তাঁর জীবনী উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনকাল পেয়েছিলেন। তবে রাসূলে পাকের দীদারের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকেন। তাই তাঁকে তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করেন। হাফেজ ইবন হাজার লিখেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ লাভ করেন, কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করেননি।
যে বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় যে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণ করেন তা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনের শেষ ভাগে ইসলামী দা'ওয়াত প্রসারের লক্ষ্যে আল- আহনাফের গোত্র বানু সা'দে একজন সাহাবীকে পাঠান। তিনি বানু সা'দের লোকদের সমবেত করে তাদের সামনে ইসলামের বাণী তুলে ধরেন এবং তাদেরকে ঈমান আনার আহ্বান জানান। লোকেরা চুপ থাকলো এবং একজন আরেকজনের দিকে তাকাতে লাগলো। কিশোর আহনাফও সেই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর গোত্রের নেতা ও সাধারণ লোকদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভাব লক্ষ্য করে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন : হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! আমি আপনাদের মধ্যে দ্বিধা- দ্বন্দ্বের ভাব লক্ষ্য করছি কেন? আপনারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক পা এগোচ্ছেন তো আরেক পা পিছাচ্ছেন কেন? আল্লাহর কসম! এই আগন্তুক আপনাদের জন্য শুভ ও কল্যাণের বাণী বহন করে নিয়ে এসেছেন। তিনি আপনাদেরকে উত্তম মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন এবং ক্ষতিকর উপাদান থেকে বিরত থাকতে বলছেন। আল্লাহর কসম! আমরা ভালো কথা ছাড়া তাঁর মুখ থেকে আর কিছু শুনিনি। সুতরাং আপনারা এই সত্যের আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিন। আপনারা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করে সফলকাম হবেন। তাঁর কথার পর তাঁর গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর তাঁর গোত্রের প্রবীণরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু বয়স কম হওয়ার কারণে আল-আহনাফকে নেওয়া হয়নি। ফলে তিনি সাহাবী হওয়ার মর্যাদা ও গৌরব থেকে বঞ্চিত থেকে যান।
আল-আহনাফ বলেন: আমি 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর খিলাফতকালে একদিন কা'বা তাওয়াফ করছি। তখন আমার পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো। তিনি আমার একটি হাত মুট করে ধরে বললেন: আমি কি আপনাকে একটা সুসংবাদ দিব? বললাম: হাঁ, দিন। বললেন : আপনার কি সেই কথা স্মরণ আছে, যেদিন আমি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত পৌছানোর জন্য গিয়েছিলাম এবং সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য তুলে ধরার পর আপনি কি বলেছিলেন? বললাম : হাঁ, স্মরণ আছে। তিনি বললেন : সেদিন আমি আপনাদের ওখান থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে ফিরে তাঁকে আপনার ভূমিকা ও বক্তব্যের কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন : 'হে আল্লাহ, তুমি আল-আহনাফের সকল পাপ ক্ষমা করে দাও।' এরপর আল-আহনাফ আজীবন বলতেন: 'কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহর (সা) এই দু'আর চেয়ে বড় আশাব্যাঞ্জক কোন 'আমল আমার নেই।'
কিন্তু প্রথমতঃ এ বর্ণনাটি সত্য কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। আর সত্য বলে মেনে নিলেও এতে তাঁর ইসলাম গ্রহণ প্রমাণিত হয় না। শুধু এতটুক জানা যায় যে, তিনি একজন সত্যের অনুসারী জ্ঞানী লোক ছিলেন এবং অন্তরে সত্য গ্রহণ করার শক্তি ও সাহস ছিল। আর রাসূলুল্লাহর (সা) দু'আ তাঁর ইসলাম গ্রহণের প্রমাণ নয়। তাঁর এ দু'আ ছিল আহনাফের সত্যকে চেনা ও জানার জন্য। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, তিনি সে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহকে দেখা, তাঁর সাহচর্য লাভ করা এ বর্ণনা দ্বারা মোটেই প্রমাণ হয় না। আর সাহাবী হওয়ার জন্য দেখা ও সাক্ষাৎ অপরিহার্য। তবে ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই সত্যকে চেনা এবং তাঁর জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) দু'আ করা এ মোটেই কম মর্যাদার ব্যাপার নয়। বিভিন্ন তথ্য দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তিনি প্রথম খলীফার খিলাফতকালের কোন এক সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। নিম্নের এ ঘটনা দ্বারা সে কথা প্রমাণিত হয়।
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর জাযীরাতুল আরবে ভণ্ড নবী মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের উৎপাত শুরু হয়। সে নিজেকে একজন নবী বলে দাবী করে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অনেকে তার সাথে যোগ দেয়। ফলে তার কর্মকাণ্ড ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য একটি মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি করে। একদিন আল-আহনাফ তাঁর চাচা আল-মুতাশাম্মাসকে সংগে করে মুসায়লামার সাথে সাক্ষাৎ ও তার কথা শোনার জন্য যান। আল-আহনাফ তখন একজন তরুণ। মুসায়লামার সাথে দেখা করে ফেরার পথে চাচা আল-মুতাশাম্মাস তাঁকে প্রশ্ন করলেন:
- আহনাফ, লোকটিকে কেমন দেখলে?
আল-আহনাফ : লোকটিকে অসত্যের অনুসারী বলে মনে হলো। সে আল্লাহ ও মানুষের প্রতি মিথ্যা আরোপ করছে।
চাচা একটু কৌতুক করে তাঁকে বললেন: তুমি তাকে মিথ্যাবাদী বলছো, একথা আমি যদি তাকে বলে দিই, তুমি ভয় পাবে না?
বললেন: সে সময় আমি তার সামনেই একথার ব্যাপারে আপনার শপথ নিব যে, আপনিও কি আমার মত তাকে মিথ্যাবাদী বলেন না? অতঃপর চাচা-ভাতিজা দু'জনই হেসে দেন। দু'জন ইসলামের উপর অটল থাকেন।
এ সময় (হিঃ ১১/খ্রীঃ ৬৩৩) তাঁর গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, কিন্তু তিনি তাঁর গোত্রকে অনুসরণ করেননি। তাঁর গোত্রের সাথে মিলে মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধও করেননি। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি প্রথম মদীনায় আসেন। তখন তাঁর বয়স বিশ বছর। বানু তামীম সম্পর্কে হযরত 'উমারের (রা) একটা খারাপ ধারণা ছিল। এজন্য প্রায়ই তিনি নিন্দামন্দ করতেন। একবার আহনাফের উপস্থিতিতে বানু তামীমের কোন প্রসঙ্গে আলোচনা উঠলো। 'উমার (রা) তাঁর অভ্যাস মত তাদের নিন্দামন্দ করলেন। সাথে সাথে আহনাফ দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কিছু বলার জন্য অনুমতি চাইলেন। খলীফা অনুমতি দিলেন। আহনাফ বললেন: আপনি কোন ব্যতিক্রম ছাড়া গোটা বানু তামীমের নিন্দা করেছেন। অথচ তারাও সাধারণ মানুষের মত। তাদের মধ্যেও ভালো-মন্দ সব ধরনের মানুষ আছে। হযরত 'উমার (রা) এমন সত্য উচ্চারণ শুনে বলেন: তুমি সত্য বলেছো। তারপর তিনি বানু তামীমের কিছু গুণের কথা বলে পূর্বের উচ্চারিত তাদের নিন্দার ক্ষতিপূরণ করেন। আহনাফের পরে তাঁরই গোত্রের 'হাত্তাত' নামের আরেক ব্যক্তি কিছু বলতে চায়। কিন্তু 'উমার (রা) তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের নেতা তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন।
যদিও হযরত 'উমার (রা) আহনাফের নীতিগত কথার কারণে তাঁর বক্তব্য মেনে নেন, তবে তাঁর গোত্রের প্রতি 'উমারের (রা) খারাপ ধারণা বিদ্যমান ছিল। এ কারণে সতর্কতামূলকভাবে আহনাফের জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে তাঁকে খলীফা এক বছরের জন্য মদীনায় নিজের সাথে রেখে দেন। পরীক্ষার পর তিনি আহনাফকে বলেন, আমি এক বছর যাবত তোমাকে পরীক্ষা করেছি। আমি তোমার মধ্যে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু দেখিনি। তোমার বাহ্যিক আচরণ ভালো। আমি আশা করি তোমার ভিতরটাও ভালো হবে। আমি তোমার সাথে এমন আচরণ এজন্য করেছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে একথা বলে সতর্ক করে গেছেন যে, এই উম্মাতের ধ্বংস বাকপটু মুনাফিকদের হাতেই হবে।
এই পরীক্ষার পর হযরত 'উমারের (রা) যখন আহনাফের উপর দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি হলো তখন তাঁকে তাঁর জন্মভূমি বসরায় ফেরত পাঠালেন। আর সেই সাথে বসরার তৎকালীন ওয়ালী আবূ মূসা আল-আশ'আরীকে (রা) তাঁকে সংগে রাখার, তাঁর সাথে পরামর্শ করার এবং তাঁর পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার জন্য বলে পাঠান। আহনাফ বসরার একজন নেতা ছিলেন। হযরত 'উমারের (রা) এই নির্দেশের পরে প্রতিদিন তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সেই সময় পারস্য অভিযান চলছিল। বসরায় ফিরে যাওয়ার পর আহনাফ এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। সুতরাং হিজরী ১৭ সনে পারস্য অভিযানে তাঁকে দেখা যায়।
আহনাফ ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল মানুষ। এ কারণে গোত্রীয় ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের সময় তাঁর নামটি তালিকার প্রথমে দেখা যেত এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে গোত্রীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব তাঁরই উপর অর্পিত হতো। আর তাই এই সময় বসরার একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে মদীনায় খলীফার দরবারে আসেন। খলীফা হযরত 'উমার (রা) বসরাবাসীদের বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রয়োজনসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, আহনাফ তাদের প্রয়োজন ও অভিযোগসমূহ তুলে ধরে চমৎকার একটি বক্তৃতা দেন। তাঁর এ বক্তৃতায় হযরত 'উমার খুবই মুগ্ধ হন এবং মন্তব্য করেন: আল্লাহর কসম! ইনি একজন নেতা। কথাটি দু'বার বলেন। সেখানে উপস্থিত যায়দ ইবন জাবালার সহ্য হলো না। তিনি বললেন: আমীরুল মু'মিনীন! সে তেমন নয়। তার মা তো বাহিলী গোত্রের। 'উমার (রা) বললেন : সে যদি সত্য বলে থাকে তাহলে সে তোমার চেয়ে ভালো। তারপর খলীফা তাঁকে পারস্যের কিসরা সাম্রাজ্যের কিছু বিজিত অঞ্চলের কর্তৃত্ব দান করেন। তিনি বসরার ওয়ালীকে লেখেন: শাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে আহনাফের সাথে পরামর্শ করবে এবং সেই মত কাজ করবে। আহওয়ায বিজয়ের পর বিখ্যাত ইরানী জেনারেল হুরমুযান- যিনি খুযিস্তান যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন, তাঁকে মদীনায় নিয়ে আসেন আহনাফ।
সে সময় ইরাক বিজয় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। তবে ইরানের উপর ব্যাপক সামরিক অভিযান তখনো চালানো হয়নি। ইরানের বিজিত অঞ্চল বার বার বিদ্রোহ ঘোষণা করতো। সেই সময় ইরানে যুদ্ধরত সৈনিকদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় খলীফার দরবারে আসে। হযরত 'উমার (রা) তাদের কাছে জানতে চাইলেন, এই ইরানীরা বার বার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে কেন? মনে হয় মুসলমানরা তাদের উপর উৎপীড়ন চালায়। প্রতিনিধি দল খলীফার কথার প্রতিবাদ করলো। কিন্তু কেউ হযরত 'উমারের (রা) প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারলো না। আহনাফের মেধা ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তিনি এই প্রশ্নের গভীরে চলে যান এবং বলেন: 'আমীরুল মু'মিনীন, ইরানের মধ্যভাগে সামরিক অভিযান বন্ধ করে দিয়েছেন এবং ইরানী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মুকুট ও সিংহাসনসহ বিদ্যমান আছেন। যতদিন তিনি এভাবে বিদ্যমান থাকবেন, ইরানীরা তাঁর সহযোগিতায় বার বার বিদ্রোহ করতে থাকবে। কারণ, একই দেশে দুইটি সরকার এক সাথে চলতে পারে না। ইরানের শাহানশাহ সবসময় ইরানীদেরকে বিদ্রোহের উস্কানি দেয়। এ কারণে যতদিন পর্যন্ত আমরা ইরানের অভ্যন্তর ভাগে সামরিক অভিযান চালিয়ে তাঁকে শেষ করে দিতে না পারবো ততদিন ইরানীদের এরূপ আচরণ অব্যাহত থাকবে। যখন তারা নিজেদের সরকারের ব্যাপারে একেবারে হতাশ হয়ে যাবে তখন শান্ত হবে।' হযরত 'উমার (রা) আহনাফের বক্তব্য শুনে মন্তব্য করেন: তুমি সত্য বলেছো। তারপর তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর জন্য তৎপরতা শুরু করেন এবং প্রতিটি প্রদেশের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠান। শাহানশাহে ইরান ইয়াযদিগিরদ তখন খুরাসানে অবস্থান করছিলেন। যেহেতু আহনাফ খলীফাকে তাঁর মূলোৎপাটনের পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং মেধা ও বুদ্ধির দিক দিয়ে তিনি এ কাজের জন্য সবচেয়ে বেশী যোগ্য ছিলেন, তাই খুরাসান অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব খলীফা তাঁরই উপর ন্যস্ত করেন। হিজরী ২১ সনে তিনি খুরাসানের দিকে অগ্রসর হন এবং তাবসীন হয়ে হিরাতে পৌঁছেন। এর বিজয় সম্পন্ন করে মারবে শাহজাহান- যেখানে ইয়াযদিগিরদ অবস্থান করছিলেন- এর দিকে যাত্রা করেন। তাঁর অগ্রাভিযানের সংবাদ শুনে ইয়াযদিগিরদ মারব আর-রোয চলে যান এবং সেখানে পৌঁছে তিনি চীনের খাকান বংশীয় শাসক ও অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলীয় শাসকদের নিকট সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পত্র লেখেন। ইয়াযদিগিরদের মারব আর-রোয যাবার পর আহনাফ মারবে শাহজাহানে হারিছা ইবন নু'মান আল-বাহিলীকে রেখে মারবের দিকে অগ্রসর হন। তাঁর অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে ইয়াযদিগিরদ সেখান থেকে পালিয়ে বলখে পৌঁছেন। এই আবর্তনমূলক দৌড়-ঝাঁপের মধ্যে কৃষ্ণা থেকে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছে। আহনাফ তাদেরকে সাথে নিয়ে বলখের উপর আক্রমণ করেন। ইয়াযদিগিরদ পরাজিত হয়ে পালিয়ে নদী অতিক্রম করে সীমান্তবর্তী খাকান শাসনাধীন অঞ্চলে চলে যান। তারপর আহনাফ খুরাসানের সকল অঞ্চলে তাঁর সৈন্য ছড়িয়ে দেন। খুরাসানবাসীরা তাদেরকে কোনভাবেই বাধা দিতে পারেনি। এভাবে নিশাপুর থেকে তুখারিস্তান পর্যন্ত গোটা অঞ্চল বিনা যুদ্ধে বিজিত হয়। আহনাফ মারব আর-রোয ফিরে আসেন এবং খলীফা হযরত 'উমারকে (রা) বিজয়ের সুসংবাদ জানিয়ে পত্র পাঠান। খলীফা ইরানের বাইরে বিজিত অঞ্চলের পরিধি বাড়াতে ইচ্ছুক ছিলেন না, তাই তাঁকে সামনে অগ্রসর হতে বারণ করেন।
এদিকে ইয়াযদিগিরদের চীনের সীমান্ত অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণের পর চীন সম্রাট খাকান তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাঁকে সাহায্য করার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে খুরাসান পৌঁছেন। তারপর সেখান থেকে সোজা বলখের দিকে যাত্রা করেন। বলখের ইসলামী বাহিনী আহনাফের সাথে মারব আর-রোয প্রত্যাবর্তন করেছিল। এ কারণে ইয়াযদিগিরদ ও খাকান উভয়ে বলখ হয়ে মারবের দিকে অগ্রসর হন। ইয়াযদিগিরদ মারবে শাহজাহান- যেখানে তাঁর কোষাগার ছিল, চলে যান। আহনাফের সাথে সেখানে তাঁর সংঘর্ষ হয়। আহনাফ পাহাড়ের পাদদেশে সৈন্য সমাবেশ করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত সকাল-সন্ধ্যা খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতে থাকে। একদিন আহনাফ নিজেই ময়দানে আসেন। খাকানের বাহিনী থেকে একজন তুর্কি বীর সৈনিক হাতে তবলা ও ঢোল পিটাতে পিটাতে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে আহনাফ আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। তারপর দু'জন বীর সৈনিক একের পর এক আহনাফের সাথে লড়বার জন্যে এগিয়ে আসে। আহনাফের তরবারির আঘাতে তাদের দু'জনেরই বীরত্বের নেশা চিরদিনের জন্য মিটে যায়। এরপর গোটা তুর্কি বাহিনী মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। খাকান তাঁর বাহিনীর অগণিত লাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। তাঁর বোধোদয় হয়। তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেন। ইয়াযদিগিদরকে সাহায্য করার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত কোন লাভ ছিল না। তাছাড়া তিনি বুঝতে পারেন, মুসলমানদেরকে পরাভূত করাও কোন সহজ কাজ নয়। তাই তিনি ইয়াযদিগিরদকে বলেন, অনেক দিন হয় আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি, এ যুদ্ধে আমাদের অনেক বীর সৈনিকও প্রাণ হারিয়েছে, আর এই সংঘাত-সংঘর্ষে আমাদের বিশেষ কোন লাভও নেই, তাই আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই। এরপর তিনি তাঁর বাহিনীকে সবকিছু গুটিয়ে দেশের দিকে যাত্রার নির্দেশ দেন।
ইয়াযদিগিরদ মারবে শাহজাহানে ছিলেন। খাকানের ফিরে যাবার সংবাদ পেয়ে তিনি সাহস হারিয়ে ফেলেন এবং কোষাগারের যাবতীয় ধন-সম্পদ তুর্কিস্তান সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ইরানীরা তা জানতে পেরে তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে। তারা ইয়াযদিগিরদকে বলে, তুর্কীদের কোন দীন-ধর্ম নেই। তাদের ওয়াদা-অঙ্গীকার পালনের কোন জ্ঞান-অভিজ্ঞতাও আমাদের নেই। আর যাই হোক, মুসলমানদের একটি ধর্ম আছে। তারা অঙ্গীকার পালনকারীও বটে। তাই, যদি আপনাকে দেশই ছাড়তে হয় তাহলে মুসলমানদের সাথে শান্তিচুক্তি করে নিন। কিন্তু ইয়াযদিগিরদ এই পরামর্শ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। ইরানীরা যখন দেখলো তাদের দেশের ধন-সম্পদ অন্য দেশে পাচার হতে যাচ্ছে তখন তারা মরণপণ যুদ্ধ করে তা ছিনিয়ে নেয়। ইয়াযদিগিরদ তাঁর নিজ প্রজাদের নিকট পরাজিত হয়ে তুর্কিস্তানে পালিয়ে যান। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালের শেষ পর্যন্ত খাকানের অতিথি হিসেবে সেখানে বসবাস করেন।
ইয়াযদিগিরদের তুর্কিস্তানে চলে যাবার পর ইরানীদের শেষ অবলম্বন ভেঙ্গে পড়ে। তারা হতাশ হয়ে আহনাফের সাথে সন্ধি করে এবং ইয়াযদিগিরদের যাবতীয় ধন-ভাণ্ডার আহনাফের হাতে তুলে দেয়। আহনাফ তাদের সাথে এমন ভদ্রোচিত আচরণ করেন যে, এতদিন পর্যন্ত মুসলমানদের শাসন থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে।
ইরানীদের সাথে এই সন্ধিচুক্তির পর আহনাফ খলীফা 'উমারকে (রা) বিজয়ের সংবাদ পাঠান এবং সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে উদ্দীপনাময় এক ভাষণ দেন। আজও মুসলমানদের জন্য সেই ভাষণটি শিক্ষণীয় হতে পারে। ভাষণটি ছিল নিম্নরূপ: 'মুসলিম ভাইয়েরা! আজ মাজুসী (অগ্নিউপাসক)-দের সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তাদের অধিকারে তাদের সাম্রাজ্যের এক খণ্ড ভূমিও আজ আর নেই। আজ তারা কোনভাবেই আর মুসলমানদের কোন রকম ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। আজ আল্লাহ তাদের ভূমি, তাদের সাম্রাজ্য এবং তাদের দেশবাসী জনগণের অধিকারী তোমাদেরকে করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষার জন্য। যদি তোমরা পাল্টে যাও তাহলে আল্লাহ তোমাদের স্থলে অন্য জাতিকে এনে বসাবেন। আমার ভয় হয়, মুসলমানরা নিজেদের হাতেই নিজেরা ধ্বংস না হয়।
হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফাতকালে ইরানে ফের যখন বিদ্রোহ হয় এবং খুরাসান মুসলিম শাসন কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে যায় তখন এই আহনাফই সামরিক অভিযান চালিয়ে আবার তা মুসলিম শাসনের অধীনে ফিরিয়ে আনেন।
মোটকথা, তিনি খলীফা 'উমারের (রা) ইনতিকালের পূর্বে হিজরী ২১ সনে (খ্রী. ৬২৪) একটি বিজয়ী বাহিনীর সাথে পারস্যে যান। হিজরী ২১ সনে নিহাওয়ান্দ, অতঃপর কুম ও কাশান বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমিরের অগ্রবর্তী বাহিনীর সদস্য হিসেবে খুরাসান তথা হিরাত, মারব, মারব আর-রোয, বল্থ প্রভৃতি অঞ্চল বিজয়ে অবদান রাখেন। তারপর জায়হুন-সায়হুন নদী অতিক্রম করে মধ্য এশীয় অঞ্চলে ঢুকে পড়েন। খলীফা হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে সামারকান্দ বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে তিনি একটি চোখ হারান।
হযরত 'উছমান (রা)-এর শাহাদাতের পর আহনাফ হযরত 'আলীকে (রা) খলীফা মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করেন। কিন্তু উটের যুদ্ধে কোন পক্ষে যোগদান করেননি। এ সম্পর্কে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই বলেছেন:
'সে সময় আমি হজ্জের উদ্দেশ্যে সফরে ছিলাম। মদীনায় এসে তালহা ও যুবায়রের (রা) সাথে দেখা করে বললাম: এই ব্যক্তিকে ('উছমান) আমি তো নিহত ব্যক্তি রূপে দেখতে পাচ্ছি। এঁর পরে আপনাদের দু'জনের পছন্দনীয় এমন এক ব্যক্তির নাম বলুন যাঁর হাতে আমি বাই'আত করবো। তাঁরা বললেন: আমরা 'আলীর কথা বলবো। বললাম: যাঁর কথা আপনারা বলছেন তাঁর প্রতি কি আপনারা সন্তষ্ট? তাঁরা বললেন: হাঁ। আহনাফ বলেন: এরপর আমি মক্কায় গেলাম। আমরা সেখানে থাকতেই 'উছমানের (রা) হত্যার সংবাদ পেলাম। সে সময় মক্কাতে উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশাও (রা) ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আপনি এখন কার হাতে আমাকে বাই'আত করতে বলছেন? বললেন: 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) হাতে। বললাম: যাঁর হাতে আমাকে বাই'আত করতে আদেশ করছেন তাঁর প্রতি কি আপনি সন্তুষ্ট? বললেন: হাঁ। আহনাফ বলেন: তারপর আমি মদীনায় যাই এবং 'আলীর (রা) হাতে বাই'আত করি। অতঃপর আমি বসরায় ফিরে যাই। আমি দেখলাম, ব্যাপারটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এরপর আমরা দেখলাম, 'আয়িশা, তালহা ও যুবায়র (রা) তাঁদের বাহিনী নিয়ে আসলেন এবং বসরার উপকণ্ঠ 'আল-খুরায়বা' নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন।
আহনাফ বলেন: আমি মানুষের কাছে তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলাম। বললো: তাঁরা বলছেন, 'উছমান অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছেন। তাই তাঁর রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য তাঁরা আপনার সাহায্য চেয়েছেন। আমি এমন একটি মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হলাম যা আর কখনো হইনি। কারণ, এ তিন ব্যক্তি- যাঁদের মধ্যে একজন উম্মুল মু'মিনীন ও আরেকজন রাসূলুল্লাহর (সা) হাওয়ারী- তাঁদেরকে অপমান করা খুবই কঠিন কাজ। অন্যদিকে তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) যে চাচাতো ভাইয়ের হাতে আমাকে বাই'আত করার আদেশ করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তাঁদেরই সাথে যুদ্ধ করা আরো কঠিন কাজ। আমি তাঁদের কাছে গেলাম। তাঁরা বললেন: 'উছমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং আপনি তাঁর রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য উচ্চকণ্ঠ হোন। আমি তখন উম্মুল মু'মিনীনকে বললাম আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে 'আলীর হাতে বাই'আত করতে বলেননি? বললেন: হাঁ, বলেছি। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তারপর আমি তালহা ও যুবায়রকেও একই কথা বললাম এবং তারা একই জবাব দিলেন। আমি তাঁদেরকে বললাম: আল্লাহর কসম! যতক্ষণ উম্মুল মু'মিনীন আপনাদের সাথে আছেন, আমি আপনাদের বিরুদ্ধে লড়বো না। ঠিক তেমনি রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই 'আলীর (রা) বিরুদ্ধেও লড়বো না। আমাকে আপনারা তিনটি পন্থার যে কোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিন। (১) আমাকে অনারব কোন দেশে যাওয়ার সুযোগ দিন। সেখানে আল্লাহ আমার জন্য যা ফয়সালা করেন তাই হবে।
(২) আমাকে মক্কায় যেতে দিন। আমি সেখানে চুপচাপ অবস্থান করবো। (৩) অথবা মক্কার আশেপাশে কোথাও থাকার অনুমতি দিন। তাঁরা বললেন: আমরা ভেবে দেখে আপনাকে জানাবো। তাঁরা পরামর্শ করলেন। তাঁরা ভাবলেন, 'আমাকে অনারব ভূমিতে যেতে দিলে আরো অনেকে আমার সাথে মিলিত হবে। মক্কায় যেতে দিলে কুরায়শদের মধ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবো এবং তাঁদের সব খবর কুরায়শদেরকে জানিয়ে দিব। তার চেয়ে বরং বসরা থেকে দু' ফারসাখ দূরে 'আল-জালহা' নামক স্থানে নজরবন্দী অবস্থায় রেখে দেওয়া সমীচীন হবে। তাঁর সাথে বানু তামীমের ছয় হাজার যোদ্ধাও সেখানে চলে যাবে।' এভাবে উটের যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন।
হযরত 'আলী ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষ আরম্ভ হলে আহনাফের সত্যের সন্ধান লাভকারী তরবারি কোষবদ্ধ থাকতে পারেনি। তিনি 'আলীর (রা) সাহায্যে এগিয়ে আসেন এবং বসরাবাসীদেরকে 'আলীর (রা) সাহায্যের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। সিফীনে তিনি 'আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধ করেন। এ কথাও বর্ণিত আছে যে, তিনি এক পর্যায়ে 'আলীর (রা) দল ত্যাগকারী খারেজীদের দলেও ছিলেন। কিন্তু একথা সঠিক নয় বলে বিভিন্ন তথ্যে প্রমাণিত হয়।
সিফফীন যুদ্ধের সমাপ্তির পর দ্বন্দ্ব নিসরনের জন্য যখন তাহকীম বা শালিসীর বিষয়টি সামনে এলো এবং 'আলীর (রা) পক্ষে আবূ মূসা আল-আশ'আরীর (রা) নামটি প্রস্তাব করা হলো তখন আহনাফ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি 'আলীকে (রা) বলেন, আপনাকে 'আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ কূটনীতিকের ('আমর ইবন আল-'আস) সাথে বোঝাপড়া করতে হচ্ছে। আমি আবূ মূসাকে (রা) ভালো করেই জানি। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মোটেই উপযুক্ত ব্যক্তি নন। এ কাজের জন্য অত্যন্ত চালাক ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির প্রয়োজন। সম্ভব হলে আপনি আমাকে আপনার পক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগ করুন। আর এ কাজের জন্য সাহাবী হওয়া একান্ত জরুরী হলে আপনি অন্য কোন সাহাবীকে নির্বাচন করুন এবং আমাকে তাঁর উপদেষ্টা নিয়োগ করুন।
কিন্তু ইরাকীদের সিদ্ধান্ত আবূ মূসার (রা) পক্ষে ছিল। এ কারণে হযরত 'আলী (রা) আহনাফের সৎ ও মূল্যবান পরামর্শ কাজে লাগাতে পারেননি। সিফফীন যুদ্ধের পরে খারিজীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার সময়েও তিনি হযরত 'আলী (রা) সাথে ছিলেন। এ যুদ্ধে তিনি কয়েক হাজার বসরাবাসী যোদ্ধাকে সংগে নিয়ে যান।
হযরত 'আলীর (রা) শাহাদাতের পরে হযরত মু'আবিয়াকে (রা) খলীফা হিসেবে তিনি মেনে নেন। তবে তখনো স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও সত্য উচ্চারণের উপর অটল থাকেন। আমীর মু'আবিয়ার (রা) যৌক্তিক ও অযৌক্তিক সব ইচ্ছার সামনে মাথানত করেননি। বরং তাঁর কাছে মু'আবিয়ার (রা) যেসব কাজ যৌক্তিক বলে মনে হয়নি, সে ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাহসের সাথে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। মু'আবিয়া (রা) যখন তাঁর পুত্র ইয়াযীদকে খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দানের সিদ্ধান্ত নেন তখন পরামর্শের জন্য গোটা খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের রাজধানীতে তলব করেন। বসরার প্রতিনিধি দলের সাথে আহনাফও দিমাশকে যান। মু'আবিয়া (রা) ইয়াযীদকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করার ব্যাপারে আহনাফের মতামত জানতে চান। খলীফার দরবারে সমবেত বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা নিজেদের মতামত ব্যক্ত করে খলীফার দরবারে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এক পর্যায়ে মু'আবিয়া (রা) বলে ওঠেন: আহনাফ কোথায়? তিনি সাড়া দিলে মু'আবিয়া বলেন: আপনি কোন কথা বলছেন না যে? আহনাফ উঠলেন এবং একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বললেন: আল্লাহ আমীরুল মু'মিনীনের মঙ্গল করুন! আমি যদি আপনাকে সত্য কথা বলি আপনি অসন্তুষ্ট হবেন, আর যদি মিথ্যা বলি তাহলে অসন্তুষ্ট হবেন আল্লাহ। আল্লাহর অসন্তুষ্টির চেয়ে আমীরুল মু'মিনীনের অসন্তুষ্টি আমাদের জন্য অতি সহজ ও সহনীয়। মু'আবিয়া বলেন: আপনি সত্য বলেছেন। তারপর আহনাফ বলেন: জনগণ নিকট অতীতে একটি খারাপ সময় অতিবাহিত করে একটি ভালো সময় অতিক্রম করছে। আমীরুল মু'মিনীনের ছেলে ইয়াযীদ উত্তম উত্তরাধিকারী। আপনি তাঁকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে চাচ্ছেন। কিন্তু আপনি এমন বার্দ্ধক্যে পৌছেননি যে এখনই মারা যাবেন, অথবা এমন রোগে আক্রান্ত হননি যে বাঁচার আশা নেই। আপনি উটরূপী কালের দুধ দোহন করেছেন, বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। আপনিই ভেবে দেখুন, কার উপর আপনি খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে যেতে চান, কাকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করতে চান। যারা আপনাকে নির্দেশ দেয়, কিন্তু পথ বাতলে দেয় না, পরামর্শ দেয়, কিন্তু আপনার দিকে লক্ষ্য করে না, আপনি এমন লোকদের কথায় কান দিবেন না। জনগণ কি চায়, আপনি সে বিষয়ে অধিক সচেতন এবং তাদের আনুগত্যের ব্যাপারে আপনি অধিক জ্ঞানী। তবে হিজায ও ইরাকের অধিবাসীরা এটা মানবে না। তারা হাসান ইবন 'আলীর (রা) জীবদ্দশায় ইয়াযীদের হাতে বাই'আত করবে না।
আহনাফের এ সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর দাহহাক ইবন কায়স উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে যান। আহনাফের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন এবং ইরাকবাসীদেরকে আমীরুল মু'মিনীনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তারপর আহনাফ আবার উঠে দাঁড়ান এবং আল্লাহর হামদ ও ছানা পেশের পর বলেন: 'হে আমীরুল মু'মিনীন! আমরা আপনাকে কুরায়শদের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছি। আপনাকে আমরা সবচেয়ে বেশী তীক্ষ্ণধী, শক্ত অঙ্গীকারকারী ও অঙ্গীকার পালনকারী পেয়েছি। আপনি জানেন, ইরাক আপনি জোরপূর্বক জয় করেননি এবং মারপিট করেও তার উপর প্রভুত্ব অর্জন করেননি। আপনার একথা জানা আছে, হাসান ইবন 'আলীকে (রা) আল্লাহর একটি অঙ্গীকার আপনি দান করেছেন। আর তা হলো, আপনার পরে তিনিই লাভ করবেন খিলাফতের দায়িত্বভার। সে অঙ্গীকার পূরণ করলে আপনি হবেন অঙ্গীকার পূরণকারী। আর যদি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন, জেনে রাখবেন, হাসানের পিছনে আছে, বহুসংখ্যক উন্নতমানের অশ্ব, সবল ও শক্ত বাহু ও তীক্ষ্ণ তরবারি। যদি আপনি প্রতারণার হাত এক বিঘত তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেন তাহলে তাঁর পিছনে আপনি দেখতে পাবেন দু' বাহু পরিমাণ সাহায্য। আপনি নিশ্চয় জানেন, ইরাকবাসীরা আপনাকে ঘৃণা করার পর থেকে আর কখনো ভালোবাসেনি, তেমনিভাবে 'আলী ও হাসানকে (রা) ভালোবাসার পর থেকে আর কখনো ঘৃণা করেনি। আল্লাহর কসম! ইরাকীদের নিকট 'আলী (রা) অপেক্ষা হাসান (রা) অধিকতর প্রিয়।'
আহনাফের বক্তব্য শেষ হলে যথাক্রমে 'আবদুর রহমান ইবন 'উছমান আছ-ছাকাফী, মু'আবিয়া ও ইয়াযীদ ইবন আল-مुकاني' উঠে দাঁড়ান ও সংক্ষিপ্ত ভাষণ দান করেন। তারপর আহনাফ আবার উঠে দাঁড়ান এবং নিম্নের ভাষণটি দান করেন:
يا أمير المؤمنين : أنت أعلمنا بيزيد في ليله ونهاره، وسره وعلانيته، ومدخله ومخرجه، فإن كنت تعلمه الله رضا ولهذه الأمة، فلا تشاور الناس فيه، وإن كنت تعلم منه غير ذلك ، فلا تزوده الدنيا وأنت صائر إلى الآخرة، فإنه ليس لك من الآخرة إلا ماطاب ، واعلم أنه لاحجة لك عند الله إن قدمت يزيد على الحسن والحسين، وأنت تعلم من "هما" وإلى ماهما، وإنما علينا أن نقول : سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ المصير.
- হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি ইয়াযীদের দিন-রাত্রির, গোপন-প্রকাশ্যের ও ভিতর- বাইরের খবর আমাদের চেয়ে বেশী রাখেন। যদি আপনি তাঁকে আল্লাহ ও এই উম্মাতের জন্য বেশী পছন্দনীয় মনে করেন তাহলে এ ব্যাপারে কোন মানুষের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন নেই। আর যদি আপনি এর বিপরীত কিছু জানেন তাহলে তার ঘাড়ে দুনিয়ার বোঝা চাপিয়ে আখিরাতের দিকে পাড়ি জমাবেন না। কারণ, আখিরাতে ভালো ছাড়া কোন কিছুই আপনার কাজে আসবে না। আর আপনি জেনে রাখুন, হাসান ও হুসায়নের (রা) উপর ইয়াযীদকে প্রাধান্য দিলে আল্লাহর কাছে আপনি কোন যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেননা। আপনি জানেন, তাঁরা দু'জন কে এবং তাঁদের পরিণতিই বা কী হতে যাচ্ছে। আমরা শুধু এতটুকুই বলতে পারি : 'আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। হে আমাদের পরোয়ারদিগার আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আপনিই আমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল।'
"আল-'ইকদ আল-ফারীদ" গ্রন্থকার ইবন 'আবদি রাব্বিহি বলেন: আহনাফের বক্তব্যের পর মানুষ সমাবেশ থেকে উঠে এদিক সেদিক চলে যায়। তারা তখন আহনাফের কথাই আলোচনা করছিল।। অতঃপর মানুষ ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার খলীফা হবার বিষয়ে বাই'আত গ্রহণ করে। সে সময় এক ব্যক্তিকে যখন বাই'আতের জন্য ডাকা হলো, সে বললো:
- 'হে আল্লাহ! আমি মু'আবিয়ার অনিষ্ট থেকে পানাহ্ চাই।'
সাথে সাথে মু'আবিয়া (রা) বলে ওঠেন:
اللهم أعوذ بك من شر معاوية.
تَعَوَّدُ مِن شَرِّ نَفْسِكَ، فإنه أَشَرُّ عليكَ وبايع.
- 'তুমি তোমার অন্তরের অনিষ্ট থেকে পানাহ্ চাও। কারণ, তা তোমার জন্য অধিকতর ক্ষতিকর। আর তুমি বাই'আত কর।'
লোকটি তখন বললো : 'আমি বাই'আত করছি। তবে আমি এ বাই'আতকে পছন্দ করিনে।' মু'আবিয়া (রা) তখন এ আয়াতটি পাঠ করেন:
فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا كَثِيرًا.
'হতে পারে তোমরা কোন জিনিস অপছন্দ কর, আর আল্লাহ তার মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রাখেন।
তবে ইবন কুতায়বা বলেন, একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আহনাফ ও অন্যদের এসব বক্তৃতা-ভাষণের পর মু'আবিয়া (রা) তাঁর পুত্র ইয়াযীদের বাই'আতের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে ইসতিখারা করেন। অতঃপর বিষয়টি কিছু দিনের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত রাখেন। তারপর হিজরী ৫০ সনে তিনি মক্কায় এলে মক্কাবাসীরা তাঁর সাথে দেখা করতে আসে। তিনি তাঁর বাসভবনে একটু সুস্থির হয়ে বসার পর 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফর ইবন আবী তালিব, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে (রা) ডেকে পাঠান। তাঁরা উপস্থিত হলে মু'আবিয়া (রা) দারোয়ানকে নির্দেশ দেন, এই লোকগুলো ভিতর থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেবে না। অতঃপর রুদ্ধদ্বার গৃহে মু'আবিয়া (রা) তাঁদের সাথে মতবিনিময় করেন। তারপর তিনি মক্কা ত্যাগ করেন এবং হিজরী ৫১ সন পর্যন্ত ইয়াযীদের বাই'আতের বিষয়টি নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য করেননি। ইবন কুতায়বা বলেন, হিজরী ৫১ সনে হযরত হাসানের (রা) ওফাতের অল্প কিছুদিন পর মু'আবিয়া (রা) ইয়াযীদের জন্য শামবাসীদের বাই'আত গ্রহণ করেন এবং খিলাফতের সকল অঞ্চলে তাঁর বাই'আত গ্রহণের নির্দেশ দেন।
আহনাফের সত্যপ্রীতি ও স্পষ্টভাষিতার কারণে হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও সমাদর করতেন। অনেক বড় বড় আঞ্চলিক শাসক ও কর্মকর্তাকে তাঁর ইঙ্গিতে বরখাস্ত করতেন। 'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ ছিলেন হযরত মু'আবিয়ার (রা) একজন অতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি। উমাইয়্যা শাসনকে যাঁরা একটি মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন। কিন্তু তাঁর কর্মপদ্ধতি আহনাফের পছন্দ ছিল না। হিজরী ৫৯ সনে 'উবায়দুল্লাহ আহনাফসহ কৃষ্ণার একদল বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সংগে করে শামে হযরত মু'আবিয়ার (রা) দরবারে আসেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) যথারীতি গভীর আবেগ ও আন্তরিকতার সাথে আহনাফকে স্বাগতম জানান এবং তাঁকে নিজের সাথে শাহী আসনে নিয়ে বসেন। বসরার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা 'উবায়দুল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মু'আবিয়ার (রা) সামনে তাঁর খুবই প্রশংসা করে। আহনাফের মত ছিল তাঁদের সবার বিপরীত। এ কারণে তিনি সম্পূর্ণ চুপ করে বসে থাকলেন।
হযরত মু'আবিয়া (রা) প্রশ্ন করলেন: আবু বাহর! আপনি কিছু বলছেন না কেন? তিনি জবাব দিলেন: আমি বললে এই প্রতিনিধি দলের সবার বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। তাঁর একথা শুনে হযরত মু'আবিয়া (রা) তখনই 'উবায়দুল্লাহকে বরখাস্ত করেন। তিনি আগত বসরাবাসীদেরকে তাদের পছন্দমত একজন ওয়ালীর নাম প্রস্তাব করতে আহ্বান জানান। তারা প্রত্যেকেই হযরত মু'আবিয়াকে (রা) খুশী করার উদ্দেশ্যে উমাইয়্যা খান্দান ও শামীদের মধ্য থেকে কারো নাম প্রস্তাব করে। আহনাফ তখনও চুপ ছিলেন। কারো নাম প্রস্তাব করলেন না। হযরত মু'আবিয়া (রা) প্রস্তাবকারীদের নিকট জানতে চান, আপনারা কাকে নির্বাচন করলেন? যেহেতু তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী প্রস্তাব করেছিল, তাই কোন এক ব্যক্তির ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। আহনাফ একেবারেই চুপ ছিলেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) বললেন, আপনি কিছু বলুন। তিনি এই প্রস্ত াবকারীদের রূপ-প্রকৃতি দেখছিলেন। তাই তিনি মু'আবিয়াকে (রা) বললেন, যদি আপনি আপনার খান্দানের মধ্য থেকে কাউকে ওয়ালী বানাতে চান তাহলে আমি বরখাস্তকৃত 'উবায়দুল্লাহকেই অগ্রাধিকার দিব। আর যদি অন্য কোন ব্যক্তিকে বানাতে চান তাহলে সেটা আপনার ইচ্ছা ও মর্জি। তাঁর একথা শুনে মু'আবিয়া (রা) 'উবায়দুল্লাহকে তাঁর স্বপদে বহাল করেন। তারপর আহনাফকে উপেক্ষা করার জন্য তিনি 'উবায়দুল্লাহকে ভীষণ তিরস্কার করেন এবং ভবিষ্যতে তাঁর সাথে ভালো আচরণ করার প্রতি তাকিদ দেন।
আল-আহনাফ একবার খলীফা হযরত মু'আবিয়ার (রা) দরবারে গেলেন। খলীফা তাঁকে নিজের পাশে বিছানার উপর বসতে ইঙ্গিত করলেন। কিন্তু তিনি সেখানে না বসে মাটিতে বসলেন। খলীফা তখন প্রশ্ন করলেন : আহনাফ, আপনি বিছানায় বসলেন না কেন? আহনাফ বললেন: আমীরুল মু'মিনীন! কায়স ইবন 'আসিম আল-মিনকারী তাঁর ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমি মূলতঃ তাই পালন করি। তিনি বলেছিলেন : 'রাজা-বাদশাদের নিকট এমন কিছু লুকোবে না যাতে পরে তোমাকে পস্তাতে হয়। তোমাকে ভুলে যায় এমন ভাবেও তাদেরকে ছেড়ে আসবে না। তাঁদের পাশে একই বিছানায় বা একই গদীর উপর বসবে না। এমন দূরত্বে বসবে যাতে তাঁদের ও তোমার মাঝে এক অথবা দু'জন মানুষ বসার জায়গা থাকে। কারণ, হতে পারে তোমাদের এ বৈঠক চলাকালে এমন কোন বেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এসে গেল এবং তার জন্য তোমাকে স্থান ছেড়ে দিতে হলো। আর তেমন হলে আগন্তুক ব্যক্তিটির মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, আর তোমার হবে মর্যাদাহানি।' অতএব, হে আমীরুল মু'মিনীন, বসার জন্য এ স্থানই আমার উপযোগী। হতে পারে আমাদের এ বৈঠকে আপনার পাশে বসার বেশী উপযুক্ত লোক এসে যেতে পারেন। খলীফা তখন মন্তব্য করেন: 'বানু তামীমকে জ্ঞান ও বিজ্ঞতা দান করা হয়েছে। আর সেই সাথে দান করা হয়েছে অলঙ্কারমণ্ডিত কথামালা।'
একবার আহনাফ বসরার একটি প্রতিনিধি দলের সাথে মু'আবিয়ার (রা) দরবারে গেলেন। তাঁর সাথে নামির ইবন কুতবাও ছিলেন। নামিরের গায়ে ছিল কৃষ্ণার কাতওয়ান নামক স্থানের 'আবা', আর আহনাফের গায়ে ছিল পশমের মোটা পোশাক। তাঁরা দু'জন মু'আবিয়ার (রা) সামনে দাঁড়ালে তিনি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে তাকালেন। নামির তা বুঝতে পেরে বললেন : ওহে আমীরুল মু'মিনীন! 'আবা' আপনার সাথে কথা বলবে না। 'আবা'র মধ্যের মানুষটি আপনার সাথে কথা বলবেন। মু'আবিয়া (রা) ইশারায় তাঁকে বসতে বললেন। তারপর আহনাফের দিকে তাকিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলেন। আহনাফ বললেন:
يا أمير المؤمنين، أهل البصرة عدد يسير وعظم كسير مع تتابع من المحول، واتصال من الذحول، فالمكثر فيها قد أطرق ، والمقل قد أملق، وبلغ منه المخنق، فإن رأى أمير المؤمنين أن يُنْعِشَ الفقير، ويُجبر الكسير ويسهل العسير ويصفح عن الذحول ويراوى المحول ويأمر بالعطاء ليكشف البلاء ويزيل اللأواء، وإن السيد من يعم ولا يَخُص ومن يدعو الجفلي ولا يدعو النقرى، إن أحسن إليه شكر وإن أسئ إليه غفر، ثم يكون من وراء ذلك لرعيته عمادا، يدفع عنهم الملمات ويكشف عنه المعضلات. فقال له معاوية : هاهنا يا أبا بحر، ثم تلا : "وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ."
হে আমীরুল মু'মিনীন! বসরাবাসী সংখ্যায় অল্প এবং ক্রমাগত দুর্ভিক্ষ ও ধারাবাহিক রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণে ভগ্ন অস্থিবিশিষ্ট হয়ে গেছে। সেখানকার বিত্তশালীদের দৃষ্টি নত হয়ে গেছে এবং বিত্তহীনরা একেবারেই হত-দরিদ্র হয়ে পড়েছে। তারা কণ্ঠরোধ হবার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। আমীরুল মু'মিনীন চাইলে এই দরিদ্রদের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে, ভাঙ্গা হাঁড়ের জোড়া লাগাতে, কঠিনকে সহজ, অভাব-দারিদ্রকে দূরীভূত, রক্ত- বদলার চিকিৎসা ও দানের নির্দেশ দিতে পারেন। তাহলে এই দুর্যোগ ও এই কঠিন সময় দূর হবে। নিশ্চয় নেতা তিনিই হন যার দান-অনুগ্রহ হয় সবার জন্য, বিশেষ কারো জন্য নয়। যাঁর আহ্বান হয় সবার জন্য, বিশেষ কারো জন্য নয়। যদি তাঁর প্রতি কোন অনুগ্রহ করা হয়, তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, আর যদি কোন খারাপ কিছু করা হয়, তিনি ক্ষমা করে দেন। তাছাড়া তিনি তাঁর অধীনস্তদের জন্য হন স্তম্ভস্বরূপ। তাদের বিপদ-মুসীবত প্রতিহত করেন এবং যাবতীয় জটিলতা দূর করেন। অতঃপর মু'আবিয়া (রা) আহনাফকে বলেন: আবূ বাহর, এখানে। তারপর তিনি সূরা মুহাম্মাদ-এর ৩০নং আয়াতটি পাঠ করেন।
'আপনি অবশ্যই তাদেরকে কথার ভঙ্গিতে চিনতে পারবেন।' তিনি আরো বলেন: ওহে আবূ বাহর, যথেষ্ট হয়েছে। আপনি উপস্থিত ও অনুপস্থিত সবার জন্য একাই যথেষ্ট।
একদিন মু'আবিয়া (রা) বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে বসে আছেন। আহনাফও তাঁদের মধ্যে একজন। এমন সময় শামের এক ব্যক্তি সেখানে এলো এবং দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলো। তাঁর বক্তৃতার শেষ কথাটি ছিল "আলীর (রা) প্রতি লা'নাত বা অভিশাপ"। উপস্থিত লোকেরা চোখ তুলে লোকটির প্রতি তাকালো। কিন্তু আহনাফ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! লোকটি এই মাত্র কী বললো? নিশ্চয় 'আলীকে (রা) অভিশাপ দানের প্রতি আপনার সম্মতি আছে তাই সে অভিশাপ দিয়েছে। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। 'আলীকে ছেড়ে দিন। তিনি তো আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। তিনি তাঁর কর্ম নিয়ে একাকী কবরে চলে গেছেন। আল্লাহর কসম! যতটুকু আমরা জানি, তিনি তাঁর সঙ্গীদের অতিক্রম করে গেছেন। তিনি ছিলেন পুতঃপবিত্র চরিত্রের, স্বচ্ছ অন্তঃকরণের ও বিরাট মুসীবতগ্রস্ত মানুষ।'
এতটুকু বলার পর মু'আবিয়া (রা) বলে উঠলেন: হে আহনাফ! আপনি ধুলোবালি থেকে বাঁচার জন্য চোখ বন্ধ করে রেখেছেন। তাই আপনি যা দেখেননি তাই বলছেন। আল্লাহর কসম! আপনি অবশ্যই মিম্বরের উপর উঠবেন এবং ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, অবশ্যই তাঁকে অভিশাপ দিবেন। আহনাফ বললেন: যদি আপনি ক্ষমা করেন তাহলে তো ভালো, আর যদি অভিশাপ দেওয়ার জন্য আমাকে জোর-জবরদস্তি করেন, তাহলে আল্লাহর কসম! আমার ঠোঁট দিয়ে তা বের হবে না। মু'আবিয়া বললেন: উঠুন, মিম্বরের উপর যান। আহনাফ বললেন : আল্লাহর কসম! আমি কথা ও কাজে আপনার প্রতি ন্যায়বিচার করবো। মু'আবিয়া বললেন : আমার প্রতি ন্যায়বিচার করলে আপনি কথা বলতে পারবেন না। আহনাফ বললেন : আমি মিম্বরে উঠে আল্লাহর হামদ ও ছানা ও রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করবো। তারপর বলবো : ওহে জনগণ! মু'আবিয়া আমাকে 'আলীর প্রতি অভিশাপ দানের নির্দেশ দিয়েছেন। আপনারা জেনে রাখুন, 'আলী ও মু'আবিয়া দু'জন মতবিরোধ সৃষ্টি করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই দাবী করেছেন, প্রতিপক্ষ তাঁর ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আমি যখন দু'আ করি, আপনারা সবাই আমীন বলবেন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। তারপর আমি বলবো :
হে আল্লাহ! আপনি, আপনার ফেরেশতা মণ্ডলী, নবীগণ ও সমস্ত সৃষ্টি জগত এঁদের দু'জনের মধ্যে যে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন তাঁর প্রতি ও তাঁর দলের প্রতি অভিশাপ দিন। আপনারা সবাই আমীন বলুন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি করুণা করুন। হে মু'আবিয়া, আমি এর একটি হরফও কম-বেশী করবো না। তাতে যদি আমার জীবনও চলে যায়। মু'আবিয়া বললেন : ওহে আবূ বাহর! তাহলে আমি আপনাকে ক্ষমা করছি।
আহনাফ সিফফীন যুদ্ধে 'আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন। 'আলীর (রা) পরে মু'আবিয়া (রা) যখন খলীফা হলেন তখন একদিন আহনাফ তাঁর কাছে গেলেন। মু'আবিয়া (রা) আহনাফকে লক্ষ্য করে বললেন : আহনাফ! আল্লাহর কসম, আমি সিফফীনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে চাইনে। তবে কিয়ামত পর্যন্ত সেই ব্যথা আত্মার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে।
জবাবে আহনাফ বললেন : হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি সব বিষয় পিছনের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চান কেন? আল্লাহর কসম! যে অন্তঃকরণগুলো দ্বারা আমরা আপনাকে ঘৃণা করেছিলাম তা আমাদের পাঁজরের মধ্যে এবং যে তরবারিগুলো দ্বারা আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম, সেগুলো আমাদের কাঁধে বিদ্যমান আছে। আপনি ধোঁকা ও প্রতারণার এক বিঘত লম্বা করলে আমরা দু'বাহু পরিমাণ তার চেয়ে খারাপ জিনিস লম্বা করবো। আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের অন্তরের এই পঙ্কিলতা আপনার ধৈর্য ও বিচক্ষণতার স্বচ্ছতার দ্বারা পরিচ্ছন্ন করতে পারেন। মু'আবিয়া বললেন: আমি তাই করবো। তারপর আহনাফ উঠে বের হয়ে গেলেন। মু'আবিয়ার (রা) বোন উম্মুল হাকাম পর্দার পিছনে দাঁড়িয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। তিনি বললেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! এই লোকটি কে, যে আপনাকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে গেল? বললেন: এ সেই ব্যক্তি যে রেগে গেলে বানু তামীমের এক লাখ মানুষ রেগে যায়- অথচ তাঁরা জানে না কী জন্য তারা রেগে যাচ্ছে। এ হচ্ছে আল-আহনাফ ইবন কায়স- বানু তামীমের নেতা এবং আরবের একজন বিজয়ী বীর।
একবার হযরত মু'আবিয়া (রা) লোক পাঠিয়ে আনহাফকে দরবারে ডেকে আনলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন : ওহে আবু বাহর, সন্তানের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! তারা আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসা ও পিছনে ঠেস দেওয়ার স্তম্ভ। আমরা তাদের জন্য সমতল ভূমি ও ছায়াদানকারী আকাশ। তারা যদি চায়, দিয়ে দিন, আর যদি রেগে যায়, খুশী করুন। তাহলে তারা তাদের ভালোবাসা আপনাকে দিবে। তাদের প্রতি কঠোর হবেন না। যদি কঠোর হন, তাহলে তারা আপনার জীবনকে নিরানন্দ করে ছাড়বে এবং আপনার মৃত্যুকে ভালোবাসবে। মু'আবিয়া বললেন : আল্লাহর কসম, হে আহনাফ! আপনি আমার অন্তরের কথা বলছেন। ইয়াযীদের উপর রাগে আমার অন্তর ভরে আছে। আপনি তা দূর করে দিয়েছেন। অতঃপর আহনাফ চলে গেলেন। মু'আবিয়া (রা) তাঁকে দেওয়ার জন্য দু'লাখ দিরহাম ও দু'শো কাপড় ইয়াযীদের কাছে পাঠালেন। ইয়াযীদ সেখান থেকে অর্ধেক নিজের জন্য রেখে দিয়ে অবশিষ্ট অর্ধেক আহনাফের নিকট পাঠিয়ে দিলেন।
হযরম মু'আবিয়ার (রা) ওফাতের পর আহনাফ ইয়াযীদের খিলাফত মেনে নেন। হযরত ইমাম হুসায়ন (রা) যখন খিলাফতের দাবী নিয়ে ইয়াযীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড়ান তখন তিনি আহনাফের সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। তবে যতটুকু জানা যায় তাতে মনে হয় তিনি ইমামের আহ্বানে সাড়া দেননি। তিনি ইয়াযীদের বাই'আতের উপর অটল ছিলেন। ইয়াযীদের মৃত্যুর পর যখন উমাইয়্যা খিলাফতের অভ্যন্তরে বিপ্লব ঘটে যায় এবং ইরাক থেকে উমাইয়্যা শাসন এক রকম উঠে যায়, তখন আহনাফ বসরাবাসীদের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। এরই প্রেক্ষিতে তাঁর গোত্র বানু তামীম ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে কিছু ঝগড়া- বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং কিছুটা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রূপ নেয়। আহনাফের চেষ্টায় তার নিষ্পত্তি হয়। তারপর ইরাক যখন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) অধীনে চলে যায় তখন আহনাফ তাঁর সহযোগী হয়ে যান। তাঁর সময়েও আহনাফের পূর্বের সম্মান ও মর্যাদা বহাল থাকে। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) ওয়ালীরা সবসময় তাঁর সাথে যোগাযোগ ও পরামর্শ করতেন এবং সেই মত কাজ করতেন। ইরাকে যখন খারিজীদের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং তা বসরা পর্যন্ত গিয়ে পৌছে তখন আহনাফেরই উৎসাহে বিখ্যাত সেনানায়ক মহাব ইবন আবী সুফরাকে খারিজীদেরকে দমনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) খিলাফতকালে মুখতার আছ-ছাকাফী যখন ইরাক দখলের চেষ্টা চালায় তখন আহনাফ ইবন যুবায়রকে (রা) সাহায্যের অংশ হিসেবে মুখতারের প্রতিনিধি মুছান্নাকে ইরাক থেকে বের করে দেন। তারপরও ধীরে ধীরে যখন ইরাকে মুখতারের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন তিনি ইবন যুবায়রের (রা) ভাই মুস'আব ইবন যুবায়রের (রা) সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুখতারের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
এ সময় 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) মূল প্রতিদ্বন্দ্বী উমাইয়্যা খলীফা আবদুল মালিক আহনাফকে তাঁর পক্ষে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি উমাইয়্যাদের ঘোরতর বিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। এ কারণে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাঁর জবাব দেন। তিনি বলেন, ইবন যারকা' আমাকে শামীদের সাথে বন্ধুত্বের আহ্বান জানাচ্ছে। আল্লাহর কসম! আমি চাই আমার ও তাঁর মধ্যে আগুনের পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে যাক। যাতে তাদের মানুষ এদিকে না আসতে পারে, আর আমার লোক সেদিকে না যেতে পারে।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) ভাই কুফার ওয়ালী মুস'আব ইবন যুবায়রের সাথে আহনাফের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি মুস'আবের সাথে সাক্ষাৎ করতে কৃফায় যান এবং সেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলীর বর্ণনা মতে হিজরী ৭২ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। অনেকে বলেছেন, হিজরী প্রথম শতকের সাত-এর দশকের শেষ দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
শিক্ষা ও জ্ঞানের দিক দিয়ে আহনাফ তাঁর যুগে বিশেষ কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তবে বিশিষ্ট সাহাবীদের সাহচর্যের সুযোগ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। এ কারণে জ্ঞানের জগতের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না এ কথা বলা যাবে না। 'উমার (রা), 'আলী (রা), 'উছমান (রা), সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন সা'দ (রা), আবূ যার (রা) প্রমুখ মহান সাহাবীর মুখ থেকে তিনি হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। তাবি'ঈদের মধ্যে যাঁরা তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে হাসান বসরী, আবুল 'আলা' ইবন শিখীর, তালাক ইবন হাবীব প্রমুখ সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। আরবী কবিতায়ও তাঁর ভীষণ দখল ছিল। মু'আবিয়া (রা) মাঝে মাঝে কবিতা নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতেন।
জ্ঞান ও শিক্ষার জগতের তিনি তেমন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি না হলেও তাঁর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্র ছিল কণ্টকাকীর্ণ রাজনীতির ময়দান। তিনি তাঁর সময়ের বড় বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, চিন্তাশীল ও মহাজ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল, কোন মানব গোষ্ঠীতে আহনাফের চেয়ে ভদ্র মানুষ দেখা যায় না। তাঁর মৃত্যুর পর মুস'আর ইবন যুবায়র (রা) মন্তব্য করেন, আজ বিচক্ষণতা ও সঠিক সিদ্ধান্তের সমাপ্তি ঘটলো। বিভিন্ন উক্তি ও বাণীর মধ্যে তাঁর বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়। এসব উক্তি ও বাণীর কিছু কিছু প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। তাঁর হিলল্ম (প্রজ্ঞা) মু'আবিয়ার (রা) 'হিলম-এর সাথে তুলনা করা হতো এবং তা প্রবাদতুল্য ছিল। এ কারণেই 'আহলাম মিন আল- আহনাফ' উক্তিটির প্রচলন হয়।
সাধারণভাবে দেখা যায়, অসাধারণ বুদ্ধি, জ্ঞান ও চিন্তা-অনুধ্যানের সাথে যুহদ ও তাকওয়া এবং 'ইবাদত-বন্দেগীর সহ-অবস্থান খুব কম হয়। কিন্তু আহনাফ সে স্তরের চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন, ঠিক একই রকম যুহদ ও তাকওয়াও তাঁর মধ্যে ছিল। তাঁর 'ইবাদত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। পৃথিবীর সব মানুষ যখন ভোগ- বিলাস ও সুখ-স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেত তখন তিনি রাব্বুল 'আলামীনের দরবারে বিনয়াবনত হয়ে দাসত্বের ঘোষণা দিতেন। রাতের অন্ধকারে মুহাসাবায়ে নফস বা আত্মসমালোচনা করতেন। নিজের কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করতেন।
আল-আহনাফ ছিলেন একজন বড় ধরনের 'আবিদ ব্যক্তি। খুব বেশী বেশী সালাত আদায়কারী ও সাওম পালনকারী। দুনিয়ায় মানুষের হাতে যা আছে তেমন সবকিছুর প্রতি তিনি ছিলেন নির্মোহ ও নিরাসক্ত। রাতের অন্ধকার নেমে এলে বাতি জ্বালিয়ে পাশেই রাখতেন। তারপর নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। আল্লাহর গজব ও আজাবের ভয়ে রোগগ্রস্ত মানুষের মত প্রলাপ বকতেন এবং পুত্রহারা পিতার মত হাউমাউ করে কাঁদতেন। যখনই তিনি নিজের কোন পাপের কথা, অথবা নিজের কোন দোষের কথা বুঝতে পারতেন তখনই নিজের একটি আঙ্গুল বাতির আগুনের একেবারে কাছে নিয়ে বলতেন: হে আহনাফ! আগুনের পোড়ার এ কষ্ট অনুভব কর। অমুক দিন অমুক কাজটি করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছিল? ওহে আহনাফ! তোমার ধ্বংস হোক! আজ এই বাতির শিখার গরম যদি তুমি সহ্য করতে না পার তাহলে আগামীকাল জাহান্নামের অগ্নিশিখার তাপ সহ্য করবে কিভাবে? আর কিভাবেই বা তখন ধৈর্য ধারণ করবে? হে আল্লাহ, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কারণ, তুমি তার উপযুক্ত। আর যদি আমাকে শান্তি দাও তাহলে আমি তারই উপযুক্ত।
বার্দ্ধক্যের দুর্বলতার সময় যখন সিয়াম পালনের শক্তি যেতে বসেছিল তখন একদিন যায়দ নামের এক ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে বলেন, আপনি খুবই শক্তিহীন হয়ে পড়েছেন এবং রোযা আপনাকে আরো দুর্বল করে ফেলবে। জবাবে তিনি বলেন, আমি আমার এই দেহকে একটি দীর্ঘ সফরের জন্য প্রস্তুত করছি।
কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ। কখনো একাকী হলেই কুরআন খুলে বসে যেতেন। এত সব 'ইবাদত-বন্দেগীর উপরও তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল না। তাই তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করতেন এই বলে : হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও তাহলে সেটা হবে তোমার করুণা। আর যদি আমাকে শাস্তি দাও, তাহলে আমি তা লাভ করার যোগ্য।
তাহারাত বা পাক-পবিত্রতার ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন যে, তীব্র থেকে তীব্রতর ঠাণ্ডার মওসুমেও তায়াম্মুম করতেন না। বরফ জমা ঠাণ্ডা পানিও ব্যবহার করতেন। খুরাসান অভিযানকালে এক রাতে গোসলের প্রয়োজন দেখা দেয়। ঠাণ্ডার মওসুম ছিল, খুরাসানের সেই রাতটি ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডার। আহনাফ কোন চাকর-বাকর বা সৈনিকের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালেন না। তিনি তখনই একাকী নির্জন রাতে পানির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তায় ছিল কাঁটা ওয়ালা ঝোপ-ঝাড়। তিনি সেগুলো পায়ে মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যান। কাঁটার খোঁচায় তার পা দু'টো রক্তে ভিজে যায়। শেষমেষ, একটি বরফপিণ্ডের গোঁড়ায় পৌঁছেন এবং সেখান থেকে বরফ ভেঙ্গে বরফ মিশ্রিত পানি দিয়ে সেখানে গোসল করেন।
তিনি অত্যন্ত সত্যভাষী ও সত্যপ্রিয় মানুষ ছিলেন। শাসক ও আমীর-উমারার সামনেও তাঁর জিহ্বা সত্য প্রকাশে বিরত থাকতো না। ইয়াযীদের বাই'আতের বিষয়ে তাঁর স্পষ্টবাদিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকবার কোন এক বিতর্কিত বিষয়ে তাঁকে চুপ থাকতে দেখে হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁকে বলেন: আবূ বাহর! আপনিও কিছু বলুন। তিনি মুখ খুললেন। বললেন: আমি আর কী বলবো। যদি মিথ্যা বলি তাহলে আল্লাহর ভয়। আর যদি সত্য উচ্চারণ করি তাহলে আপনাদের ভয়।
ধৈর্য ও সহনশীলতা ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। 'আল্লামা ইবন হাজার লিখেছেন, তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তাঁর বিচক্ষণতা ছিল প্রবাদতুল্য। কিন্তু তিনি সব সময় বিনয়ের সাথে বলতেন, প্রকৃতপক্ষে আমি কোন বিচক্ষণ ব্যক্তি নই। বরং বিচক্ষণতার ভান করি।
আহনাফের এমন কিছু মূলনীতি ছিল যা প্রত্যেক মানুষের জন্য অনুসরণযোগ্য। তিনি বলতেন, আমি তিনটি কাজ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করে থাকি। সময় হয়ে গেলে নামায আদায়ে, মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে এবং পাত্র পাওয়া গেলে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে।
আল-আহনাফ একজন দক্ষ ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, তাঁর দক্ষতা ও সাহসিকতার অনেক কাহিনী ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন। খলীফা 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) আল-আহনাফ ইবন কায়সকে একটি বাহিনী সহকারে খুরাসানে পাঠালেন। একদিন রাতে শত্রু বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে আল-আহনাফের বাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। তারপর শত্রু বাহিনী রণ দামামা বাজাতে বাজাতে তাঁর বাহিনীর উপর হামলা চালায়। মুসলিম বাহিনী ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়লো। এ অবস্থায় আল-আহনাফ কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে ঘোড়ার উপর চড়ে বসলেন এবং দামামার শব্দ যেদিক থেকে আসছিল, কবিতার একটি শ্লোক গুন গুন করে আওড়াতে আওড়াতে সেদিকে চললেন। তারপর যে সৈনিকটি দামামা বাজাচ্ছিল হঠাৎ তার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। দামামার শব্দ থেমে যাওয়ায় শত্রু বাহিনী প্রমাদ গোনে এবং ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় এদিক সেদিক পালাতে আরম্ভ করে। তারপর অন্য একটি অশ্বারোহী বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে ধরাশায়ী করে ফেলেন। এসবই কিন্তু আল-আহনাফ একা করেন। তারপর তাঁর সৈন্যরা এগিয়ে আসে এবং শত্রু বাহিনী পালাতে থাকে। তখন আল-আহনাফের বাহিনী তাদেরকে ধাওয়া করে হত্যা করতে থাকে। এ অভিযানে তিনি যে শহরটি জয় করেন তার নাম 'মারব আর-রোয'।
আল-আহনাফ ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল মানুষ। তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতা তৎকালীন আরবে প্রবাদে পরিণত হয়। তাঁর ধৈর্যের অনেক গল্প-কাহিনী আরব ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। যেমন একবার 'আমর ইবন আল-আহ্লাম তাঁকে অশ্লীল ভাষায় অশালীন গালিগালাজ করার জন্য এক ব্যক্তিকে উৎসাহিত করলো। লোকটি তাঁকে তাঁর মান-সম্মানের উপর আঘাত করে নোংরা ভাষায় লাগি দিতে থাকলো। কিন্তু আহনাফ নীরবে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে গালি শুনতে লাগলেন। একটি কথারও জবাব দিলেন না। লোকটি যখন দেখলো, তিনি তার কথায় কোন রকম বাধা দিচ্ছেন না এবং কোন প্রত্যুত্তরও করছেন না তখন সে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দাঁত দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে বলতে লাগলো : হায়রে দুঃখ! আল্লাহর কসম! আমি তাঁর কাছে এত তুচ্ছ ও হেয় যে, আমার এ অশালীন গালির কোন উত্তর দেওয়া প্রয়োজন বোধ করছেন না।
আরেকবার তিনি বসরার একটি নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এমন সময় একটি লোক কোথা থেকে এসে তাঁর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগালি করতে লাগলো। তিনি চুপ করে পথ চলতে লাগলেন। যখন তারা মানুষের কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন তখন তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন: ভাতিজা, তোমার গালির যদি আরো কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে তাহলে তাড়াতাড়ি বলে ফেল। তা না হলে আমার গোত্রের লোকেরা শুনে ফেললে তোমার পরিণতি মোটেই ভালো হবে না।
একবার জনৈক ব্যক্তি আহনাফকে প্রশ্ন করলো: আপনি এমন ধৈর্য ও সহনশীলতা কার কাছ থেকে শিখলেন? বললেন: কায়স ইবন ‘আসীম আল-মিনকারীর কাছ থেকে। একদিন আমি তাঁকে দেখলাম, তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে গোত্রের লোকদের সাথে কথা বলছেন। এমন সময় হাত পিছন দিক থেকে বাঁধা এক ব্যক্তি ও একজন নিহত ব্যক্তির লাশ আনা হলো। তাঁকে বলা হলো: আপনার এই ভাতিজা আপনার এই ছেলেকে হত্যা করেছে। আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর স্থান থেকে একটুও নড়লেন না এবং কথা বলাও বন্ধ করলেন না। এক সময় কথা শেষ করে ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললেন: ভাতিজা! পাপ করেছো এবং তোমার নিজের ধনুক দিয়ে নিজের প্রতি তাঁর নিক্ষেপ করেছো। তোমার চাচাতো ভাইকে তুমি হত্যা করেছো। তারপর তিনি নিজের আরেক ছেলেকে বললেন: যাও, তোমার ভাইকে কবর দাও, তোমার চাচাতো ভাইয়ের বাঁধন খুলে দাও এবং নিহত ছেলের রুগ্নস্য হিসেবে তার মাকে এক শো উট দিয়ে দাও।
একবার এক ব্যক্তি আহনাফকে প্রশ্ন করলো: আপনার গোত্রের নেতৃত্ব আপনি লাভ করলেন কিভাবে— আপনি তো তাদের সবচেয়ে মর্যাদাবান ঘরের লোক নন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সুদর্শন নন এবং আচার-আচরণ ও নৈতিকতায় তাদের মধ্যে উত্তমও নন? উত্তরে আহনাফ বললেন: ভাতিজা! তোমার মধ্যে যা আছে তার বিপরীত জিনিস দ্বারা। লোকটি প্রশ্ন করলো: সেটা কি? বললেন: তোমার এমন সব বিষয় যা আমার কোন প্রয়োজন নেই তা পরিহার দ্বারা। যেমন আমার যে বিষয় তোমার কোন প্রয়োজন নেই তা নিয়ে তুমি মাথা ঘামাচ্ছো।
ইবনুল ‘ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তিনি নেতৃস্থানীয় তাবিঈন্দের মধ্যে ছিলেন। তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধির উপমা দেওয়া হতো। হাসান বসরী (রহ) বলতেন, আমি কোন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ভদ্র লোকটিকে আহনাফের চেয়ে বেশী ভালো পাইনি। তিনি একাধিক খলীফার শাসনকাল পেয়েছেন। তাঁদের কোন একজন খলীফা জনৈক ব্যক্তির কাছে আহনাফের গুণাবলী জানতে চান। জবাবে লোকটি বলে, যদি আপনি একটি গুণ শুনতে চান, আমি — তাই বলবো। আর দু'টি শুনতে চাইলে দু'টি এবং তিনটি চাইলে তিনটি গুণ বলবো। খলীফা বললেন, তুমি দু'টি বলো। তখন লোকটি বললো, তিনি ভালো করতেন, ভালোকে পছন্দ করতেন। মন্দ থেকে দূরে থাকতেন এবং মন্দকে ঘৃণা করতেন। খলীফা বললেন, আচ্ছা তুমি তাঁর তিনটি গুণ বলো। লোকটি বললো, তিনি কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। কারো উপর বাড়াবাড়ি ও যুলুম করতেন না এবং কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেন না। খলীফা বললেন, তাঁর একটি গুণের কথা বলো। সে বললো, তিনি তাঁর নিজের উপর সবচেয়ে বড় শাসক ছিলেন।
আহনাফ বলতেন: যখনই কোন বিষয়ে কেউ আমার সাথে পাল্লা দিয়েছে, আমি তিনটি পদ্ধতিতে তাকে হারিয়ে দিয়েছি। (১) সে যদি আমার চেয়ে উপরের স্তরের হয় তাহলে আমি তার মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। (২) আমার চেয়ে নীচের স্তরের হলে আমি আমার নিজকে সম্মান করেছি। (৩) আর আমার সমকক্ষ হলে নিজেকে তার উপর প্রাধান্য দিয়েছি।
খালিদ ইবন সাফওয়ান বলেছেন: আল-আহনাফ মর্যাদা থেকে পালাতেন, আর মর্যাদা তাঁর পিছু ধাওয়া করতো। আল-আসমা'ঈ বলেছেন, একবার আল-আহনাফ ও আল- মুনযির ইবন আল-জারূদ মু'আবিয়ার (রা) দরবারে যান। আল-মুনযির ভিতরে যাওয়া- আসা করতেন লাগলো; কিন্তু আহনাফ দরবারের শেষ প্রান্তে মোটা পশমের চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে থাকেন। যখনই আল-মুনযির এদিক ওদিক যাচ্ছিল, লোকেরা বলাবলি করছিল যে, ইনিই আল-আহনাফ। এক সময় আল-মুনযির বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করলো: মনে হচ্ছে আমি যেন এই শায়খ (আল-আহনাফ)-এর অলঙ্কারে পরিণত হয়েছি।
তাঁর গোত্রের ফারগানা বিন্ত আওস ইবন হাজার নাম্মী এক মহিলা একবার আল- আহনাফের করবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, কবরের কাছাকাছি তাঁর বাহনটি দাঁড় করিয়ে মৃত আহনাফকে লক্ষ্য করে যে কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন তাতে আল-আহনাফের সত্যিকার সম্মান ও মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন: 'নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। কাফনে জড়িয়ে কবরে রক্ষিত আবূ বাহরের প্রতি আল্লাহ দয়া ও করুণা করুন! সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনার বিচ্ছেদ দ্বারা আমাদেরকে পরীক্ষা করেছেন এবং আপনার মৃত্যুর দিনে আমাদেরকে তা জানিয়েছেন। আপনি জীবনকালে প্রশংসিত হয়েছেন এবং মৃত্যুর পরেও আপনি মানুষের স্মরণে আছেন। আপনি ছিলেন দারুণ বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান, মহান শান্তিপ্রিয়, উঁচু স্তম্ভ, হিংসার আগুন নির্বাপনকারী ও নারীর সম্ভ্রম রক্ষাকারী ব্যক্তি। আপনি সভা-সমাবেশে অত্যন্ত ভদ্র, বিধবা ও অসহায় লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল, মানুষের অতি নিকটবর্তী, তাদের মধ্যে অতি সাধারণ- যদিও আপনি তাঁদের নেতা। খলীফা ও আমীর-উমারাদের দরবারে আপনি প্রতিনিধি দলের নেতা। তাঁরা আপনার কথার শ্রোতা ও আপনার সিদ্ধান্তে র অনুসরণকারী; এরপর তিনি চলে যান।
তিনি বলতেন : কারো মধ্যে চারটি গুণ থাকলে সে পূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। আর যার মধ্যে চারটির একটি থাকে সে তার কাওম বা সম্প্রদায়ের অন্যতম কর্মশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। (১) দীন- যা তাকে পরিচালিত করে। (২) বুদ্ধিমত্তা- যা তাকে ঠিক পথে চালায়। (৩) বংশ মর্যাদা- যা তাকে পঙ্কিলতা থেকে রক্ষা করে। (৪) লজ্জা-শরম- যা সে সব সময় অবলম্বন করে。
তিনি আরো বলতেন : একজন প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি চারটি অবস্থার মধ্যে থাকে। (১) আরেকজন ঈমানদার তাকে হিংসা করে। (২) একজন মুনাফিক (কপট ধার্মিক) তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। (৩) কাফির তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। (৪) শয়তান তাকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা করে。
তিনি বলতেন : মিথ্যাবাদীর কোন ব্যক্তিত্ব নেই। কৃপণের কোন নেতৃত্ব নেই এবং অসচ্চরিত্র ব্যক্তির কোন খোদাভীতি নেই।
তিনি আরো বলতেন : নিরানন্দ ব্যক্তির কোন বন্ধু নেই, মিথ্যাবাদীর কোন কথার ঠিক নেই, হিংসুকের কোন শান্তি নেই।
তিনি বলতেন: আমি ধৈর্যকে বহু মানুষের চেয়ে বেশী সাহায্যকারী পেয়েছি।
খুরাসানে অবস্থানকালে একবার আল-আহনাফ বানু তামীমকে উদ্দেশ্য করে একটি ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ:
'ওহে বানু তামীম, তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাস তাহলে তোমাদের নেতৃত্ব অটুট থাকবে, তোমাদের অর্থ-বিত্ত একে অপরের জন্য ব্যয় কর, তাহলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে, তোমরা তোমাদের পেট ও যৌনাঙ্গের বিরুদ্ধে জিহাদের দ্বারা জিহাদের সূচনা কর, তাহলে তোমাদের দীন ঠিক থাকবে, আর কোন কিছু আত্মসাৎ করবে না। তাহলে তোমাদের জিহাদ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকবে।
একবার আহনাফকে প্রশ্ন করা হলো : সবচেয়ে ভালো পানীয় কী? বললেন : মদ। প্রশ্ন করা হলো : কিভাবে জানলেন? বললেন : আমি দেখেছি, যাদের জন্য এটা হালাল আছে তারা এটা ছেড়ে অন্যটার দিকে যায় না। আর যাদের জন্য এটা হারাম, তারা এর চারপাশে শুধু ঘুর ঘুর করে।
তিনি বলতেন: আরবরা ততদিন পর্যন্ত আরব থাকবে যতদিন তারা পাগড়ী পরবে, তরবারি কাঁধে ঝোলাবে, সহনশীলতাকে অপমান বলে গণ্য করবে না এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানকে হেয় কাজ বলে মনে করবে না।
আল-আহনাফ ছিলেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী কঠোর মানুষ। তিনি বলতেন, যার একটি কথা শুনে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে সে বহু কথা শোনে। একবার এক ব্যক্তি তাঁর সামনে 'হায়া' বা লজ্জার বেশ প্রশংসা করে। তার কথা শেষ হলে আল- আহনাফ বললেন: এটা শেষ পর্যন্ত দুর্বলতার রূপ নেয়। আর একটা ভালো কখনো একটা মন্দের কারণ হতে পারে না। আমরা বরং বলি: একটি নির্ধারিত পরিমাণের নাম 'হায়া'। আর পরিমাণের বেশী হয়ে গেলে তাকে তুমি যা ইচ্ছা নাম দিতে পার। এমনিভাবে দানশীলতা, বিচক্ষণতা, ভীরুতা, বীরত্ব, কৃপণতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য।
হযরত 'উমার (রা) একবার আল-আহনাফকে লক্ষ্য করে বলেন: যার হাসি বেশী হয় তার গাম্ভীর্য কমে যায়। কেউ কোন কিছু বেশী করলে সে নামে সে পরিচিত হয়। যার মধ্যে কৌতুক ও হাস্য-রসিকতা বেশী হয়ে গেছে তার পতন ঘটেছে। যার বেশী পতন ঘটেছে তার তাকাওয়া বা খোদাভীরুতা কমে গেছে। যার খোদাভীরুতা কমে গেছে তার লজ্জা-শরম চলে গেছে। আর যারা লজ্জা-শরম চলে গেছে তার 'কলব' বা অন্তঃকরণের মৃত্যু ঘটেছে।
টিকাঃ
১. ড: 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-আরাবী-১/৩৪৪; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৫৯
২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৬
৩. ড: শাওকী দায়ফ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-২/৪৩১
৪. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৪
৫. শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৬. আল-ইসতী'আব-১/৫৫
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৯১
৮. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৪
৯. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৭/৬৬; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৬০-৪৬১
১০. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৬২
১১. ড: 'উমার ফাররুখ-১/৩৪৪
১২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৫৪
১৩. প্রাগুক্ত-১/২৩৭; তাবাকাত-৭/৬৬; উসুদুল গাবা-১/৫৫
১৪. আল-কামিল ফিত-তারীখ-২/৪২
১৫. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/৬২
১৬. সিয়ারুত তাবি'ঈন-১৫১
১৭. আল-কামিল ফিত-তারীখ-২/৪৩০-৪৪
১৮. প্রাগুক্ত-৩/২৬-২৯
১৯. প্রাগুক্ত-৩/৯৬-৯۹
২০. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৫
২১. আল'ইন্দ আল-ফারীদ-৪/৩১৯-৩২০
২২. ড: 'উমার ফাররুখ-১/৩৪৫
২৩. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৩/২৮৪
২৪. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৫
২৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-১/৫৯; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২৪২
২৬. জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২৪৩; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৫৮
২৭. 'উয়ুন আল-আখবার-২/৬০৮; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-৪/৩৭০; আল-ইমামা ওয়াস সিয়াসা-১/১২১
২৮. সূরা আন-নিসা'-১৯
২৯. জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২৪৬
৩০. প্রাগুক্ত-২/২৪৬-২৪৯
৩১. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৩/৪৩১
৩২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৪; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪২৯
৩৩. আহমাদ আল-হাশিমী, যাহরুল আদাব-১/৫৭; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/৩৬৩-৩৬৪
৩৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৮৮
৩৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/২৮-২৯; নিহায়াতুল আরিব-৭/২৩৭
৩৬. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৩০; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-২/১১৮
৩৭. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪৩৭
৩৮. তারীখ আত-তাবারী-৮/৩১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৬৮
৩৯. আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/২০০
৪০. তাবাকাত-৭/৬৮
৪১. প্রাগুক্ত-৭/৬৯; শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৪২. ড: শাওকী দায়ফ-২/৪৩৩
৪৩. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/৪৬২; তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৯১
৪৪. তাবাকাত-৭/৬৭; তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৯১
৪৫. আল-জাহিজ, কিতাব আল-হায়ওয়ান-২/৭২; আল-মায়দানী, মাজমা' আল-আমছাল-১/২২৯-২৩০; আল- বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/৭৯
৪৬. তাবাকাত-৭/৬৭
৪৭. প্রাগুক্ত-৭/৬৭, ৬৮
৪৮. তারাকাত-৭/৬৭; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-২/২৭৭
৪৯. 'উয়ুন আল-আখবার-১/২০৯
৫০. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৬৫
৬১. উস্দুল আল-গাবাহ-১/৩০১
৬২. প্রাগুক্ত-১/৩০৩
৬৩. আল-ইকদ আল-ফারীদ-২/২৮৬
৫৪. প্রাগুক্ত-২/২৭৮; শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৫৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/২৮৩
৫৬. 'উয়ূন আল-আখবার-১/২৬১-২৬২
৫৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৩০২
৫৮. প্রাগুক্ত-২/১৯৬, ১৯৭, ১৯৯
৫৯. প্রাগুক্ত-২/৬৩; 'উয়ূন আল-আখবার-২/১০
৬০. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২৮৩
৬১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৯৩
৬২. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৬/৩৩৫
৬৩. 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৬
৬৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৯৮
৬৫. প্রাগুক্ত-১/২০২, ২/৭৬; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/২৭৯, ৪/৪১৫
৬৬. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৮
📄 উওয়াইস ইবন ‘আমির আল-কারানী (রহ)
হযরত উওয়াইস ইবন 'আমির আল-কারানীর জন্মস্থান ইয়ামন। তিনি তথাকার মুরাদ গোত্রের সন্তান ছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে না দেখেই 'খায়রুত তাবিঈন' (তাবিঈদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো) বলে উল্লেখ করেন। তাঁর পিতার নাম 'আমির ইবন জাযআ। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তিনি একজন পূর্ণ বয়স্ক ও ঈমানদার মানুষ হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও নবী কারীমের (সা) সাথে মুখোমুখি সাক্ষাতের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থেকে যান। চোখের দেখা না হলেও তিনি রাসূলে খোদার 'ইল্ক ও মুহাব্বতে একেবারে বিভোর হয়ে পড়েন। তাঁর এ 'ইল্ক ও মুহাব্বত প্রবাদতুল্য হয়ে যায় এবং তিনি জগতের সকল রাসূল-প্রেমীদের নেতায় পরিণত হন। আসলে জাহিরী জগত ও বাতিনী জগত দু'টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জাহিরী জগতের নিয়ম-কানুন বাতিনী জগতের ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য। 'ইল্ক ও মুহাব্বত সম্পূর্ণ বাতিনী বিষয়। এর জন্য চাক্ষুস দেখা-সাক্ষাতের কোন প্রয়োজন পড়ে না। দূরত্ব ও প্রতিবন্ধকতা এ ক্ষেত্রে কোন বিষয় নয়। বাতিনী বন্ধন হাজার মাইলের দূরত্বকেও নৈকট্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা ও আকর্ষণের শক্তিই হলো মূল বিষয়। যেমন, সূর্য কোটি কোটি মাইল দূর থেকেও এ পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণুকে আলোড়িত ও আলোকিত করে, শিশির বিন্দু উড়ে এসে সূর্যের তাপে নিজেকে বিলীন করে দেয় এবং বাগিচার ফুল বহু দূর থেকে বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকাকে সুরভিত করে তোলে। একই নিয়মে হযরত উওয়াইসও মাদানী সূর্যের কিরণে আলোকিত হয়ে ওঠেন এবং মদীনার বসন্ত ফুলের সৌরভে সুরভিত হয়ে পড়েন। এ কারণে তিনি ইয়ামনে অবস্থান করলেও তাঁর প্রেম-প্রবাহ মদীনা পর্যন্ত বহমান ছিল।
এ কোন কবিত্ব নয়; বরং বাস্তব সত্য। তাই হযরত রাসূলে কারীম (সা) এই না দেখা 'ইল্ক ও মুহাব্বতের পতঙ্গের আলামত ও চিহ্ন একটি একটি করে হযরত 'উমারকে (রা) বলে যান। সাহীহ মুসলিমে এসেছে: 'সর্বোত্তম তাবিঈ মুরাদ গোত্রের এক ব্যক্তি। তাঁর নাম উওয়াইস। সে ইয়ামনে তোমাদের সাহায্যে আসবে। তার শরীরে শ্বেতীর দাগ আছে। এ দাগ সবটুকু মুছে গিয়ে এক দিরহাম পরিমাণ অবশিষ্ট আছে। তার মাও জীবিত আছে। সে তার সেবা করে। যখন সে আল্লাহর নামে কসম করে তখন তা পূর্ণ করে। যদি তুমি তার দু'আয়ে মাগফিরাত (ক্ষমার জন্য দু'আ) অর্জন করতে পার তাহলে তা করবে।
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) এ বর্ণনার পর থেকে হযরত 'উমার (রা) সব সময় উওয়াইসের সন্ধানে ছিলেন। অতঃপর তাঁর খিলাফতকালে যখন ইয়ামন থেকে একটি প্রতিনিধিদল এলো, তিনি তার অভ্যাস অনুযায়ী তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: আপনাদের মধ্যে কি উওয়াইস ইবন 'আমির আছেন? তারা বললো: হ্যাঁ, আছেন। তারপর উমার (রা) খুঁজতে খুঁজতে ইয়ামনে উওয়াইসের কাছে পৌঁছেন। তাঁকে প্রশ্ন করেন: আচ্ছা, আপনি উওয়াইস ইবন 'আমির? তিনি বললেন: হাঁ।
'উমার (রা) জিজ্ঞেস করলেন: আপনার মা কি বেঁচে আছেন? বললেন: হাঁ। এই পরিচয়টুকু জানার পর হযরত 'উমার (রা) তাঁকে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) বলে গেছেন, তোমার নিকট ইয়ামনীদের সাহায্যের সাথে মুরাদ ও কারন গোত্রদ্বয়ের এক ব্যক্তি উওয়াইস ইবন 'আমির আসবে, যার শরীরে শ্বেতীর দাগ থাকবে। তবে এক দিরহাম পরিমাণ ছাড়া সবটুকু মুছে যাবে। তার মা থাকবে এবং তার সাথে সে সদাচরণ করবে। যখন সে আল্লাহর নামে কসম খায় তখন সে তা পূর্ণ করে। যদি তুমি তার দু'আয়ে মাগফিরাত নিতে পার তবে তা নিবে। আপনি আমার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করুন।
উওয়াইস বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন! আমার মত মানুষ আপনার মাগফিরাত কামনা করে দু'আ করবে? 'উমার আবার তাঁকে দু'আ করার অনুরোধ করেন। উওয়াইস বলেন: হে আল্লাহ, আপনি 'উমার ইবনুল খাত্তাবকে ক্ষমা করে দিন। 'উমার বলেন: আজ থেকে আপনি আমার ভাই। আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না। তারপর 'উমার (রা) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: আপনি কোথায় যেতে চান? বললেন: কুফায়। 'উমার (রা) বললেন! আমি কুফার ওয়ালীকে আপনার ব্যাপারে লিখে জানিয়ে দিচ্ছি। উওয়াইস বললেন: তার কোন প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা আমার বেশী প্রিয়।
এ ঘটনার এক বছর পর কুফার একজন সম্মানিত ব্যক্তি হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসলেন। হযরত 'উমার (রা) তাঁর নিকট উওয়াইসের বিষয়ে জানতে চাইলেন। তিনি জানালেন, উওয়াইস নিতান্ত দরিদ্র অবস্থায় একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন। হযরত 'উমার (রা) তখন সেই ব্যক্তির নিকট উওয়াইস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) বাণী বর্ণনা করলেন। এই ব্যক্তি কুফায় ফিরে গেলেন এবং উওয়াইসের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর নিকট দু'আয়ে মাগফিরাত প্রার্থনা করেন। জবাবে তিনি বললেন, আপনি একটি পবিত্র সফর থেকে সবেমাত্র ফিরে এসেছেন, তাই আপনিই আমার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করুন। তারপর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'উমারের (রা) সাথে কি আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে? লোকটি বললেন: হাঁ। এই সংলাপের পর উওয়াইস সেই লোকটির জন্য দু'আ করেন।
হযরত উওয়াইস (রহ) নিজেকে দুনিয়াবাসীর চোখ থেকে লুকোবার জন্য খুবই দীন- হীনভাবে থাকতেন। অধিকাংশ সময় সম্পূর্ণ শরীর ঢাকার জন্য সবটুকু কাপড় তাঁর গায়ে থাকতো না। নগ্নদেহ দেখে মানুষ তাঁর দেহ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিত। স্থূল দৃষ্টির সাধারণ মানুষ তাঁর বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাঁকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতো এবং তাঁকে নানাভাবে বিরক্ত করতো।
তবে সূক্ষ্মদৃষ্টির মানুষের দৃষ্টি থেকে তিনি লুকোতে পারেননি। তাঁর রূহানিয়্যাতের সুরভিতে মোহিত হয়ে মানুষ পাগলের মত তাঁর নিকট ছুটে এসেছে। হারাম ইবন হায়্যান (রহ) ছিলেন তাঁরই সমকালীন একজন সত্যিকার অন্তরবিশিষ্ট তাবি'ঈ। তাঁর ও উওয়াইসের মাঝে একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনার কথা খোদ হারামই বর্ণনা করেছেন, যা সত্যিই শোনার উপযুক্ত।
তিনি বলেন, আমি উওয়াইস কারানীর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়ে কুফা গেলাম। তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ফুরাতের তীরে পৌঁছলাম। সেখানে দেখলাম একটি লোক দুপুরের সময় একাকী বসে ওজু করছে এবং কাপড় ধুচ্ছে। আমি উওয়াইসের গুণ-বৈশিষ্ট্যের কথা শুনেছিলাম। এ কারণে খুব তাড়াতাড়ি তাকে চিনে ফেললাম। তিনি ছিলেন স্থূলদেহী ও গৌর বর্ণের। লোমশ শরীর, মাথা মুড়ানো, ঘন দাড়ি বিশিষ্ট মানুষ। পশমের একটি মোটা পায়জামা ও একটি চাদর শরীরে শোভা পেত। চেহারা ছিল একটু বড় ও ভীতিপ্রদ। নিকটে পৌঁছে আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন। আমি মুসাফাহা (করমর্দন) করার জন্য হাত বাড়ালাম। তিনি মুসাফাহা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন— তিনি আবার একথাটি উচ্চারণ করলেন। আমি বললাম, উওয়াইস! আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন এবং আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনার এ কি অবস্থা হয়েছে। 'ইল্ক ও মুহাব্বতের চূড়ান্ত পরিণতিতে তাঁর বাহ্যিক অবস্থা দেখে আমার চোখ থেকে অশ্রু বের হয়ে আসে। আমাকে কাঁদতে দেখে তিনিও কাঁদতে লাগলেন। তারপর আমাকে বললেন, হারাম ইবন হায়্যান! আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন। আমার ভাই, আপনি কেমন আছেন? আপনাকে আমার ঠিকানা কে বলেছেন? আমি বললাম: আল্লাহ। আমার এ জবাব শুনে তিনি বললেন:
لا إله إلا الله سبحان ربنا إن كان وعد ربنا لمفعولا حين سماني.
- এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই। আমাদের প্রভু কতনা পবিত্র। আমাদের প্রভু যদি অঙ্গীকার করেন তা অবশ্যই পূর্ণ করেন।
হারাম ইবন হায়্যান বলেন যে, এর পূর্বে আর কখনো আমি তাঁকে দেখিনি এবং তিনিও আমাকে দেখেননি। এ কারণে আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম: আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কিভাবে জানলেন? আল্লাহর কসম! আজকের পূর্বে আমি আর কোথাও কখনো আপনাকে দেখিনি। বললেন: মহাজ্ঞানী সত্তা আমাকে জানিয়েছেন। যখন আপনার অন্তর আমার অন্তরের সাথে কথা বলেছে তখনই আমার রূহ আপনার রূহকে চিনে ফেলেছে। চলাফেরাকারী জীবিতদের মত রূহদেরও জীবন থাকে। মু'মিনরা কখনো একসাথে মেলামেশা না করলেও, পরস্পর পরিচিত না হলেও এবং একজন আরেকজনের সাথে কথাবার্তা বলার সুযোগ না হলেও সবাই একজন আরেকজনের সাথে চেনে-জানে। আল্লাহর এই রূহের মাধ্যমে একে অপরের সাথে কথা বলে— তা সে একজন আরেকজনের থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন।
আমি আরজ করলাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে কোন হাদীছ শুনেছেন? শুনে থাকলে একটু বর্ণনা করুন, আমি আপনার কাছ থেকে শুনে তা মুখস্থ করে নিই। বললেন- আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) পেয়েছি। তবে তাঁকে দেখা ও সাহচর্যের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারিনি। হাঁ, যাঁরা তাঁকে দেখেছেন, আমি তাদেরকে দেখেছি এবং আপনাদের মত আমার কাছেও তাঁর হাদীছ পৌঁছেছে। কিন্তু আমি মুহাদ্দিছ, কাজী অথবা মুফতী হবো— এ উদ্দেশ্যে নিজের জন্য এ দ্বার উন্মুক্ত করতে চাইনে। আমার নিজের নফসের অনেক কাজ আছে। তাঁর এ জবাব শুনে আমি আবার আরজ করলাম, তাহলে আমাকে কুরআনের কিছু আয়াত শুনিয়ে দিন। আপনার মুখ থেকে কুরআন শোনার বড় ইচ্ছা আমার। আমি আল্লাহর জন্যই আপনাকে ভালোবাসি। আমার জন্য দু'আ করুন এবং কিছু উপদেশ দিন, যা আমি চিরদিন মনে রাখবো। আমার এ আবেদন শুনে তিনি আমার হাত মুঠ করে ধরেন এবং أعوذ بالله من الشيطان الرجيم - পাঠ করে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন।
তারপর বলতে লাগলেন: আমার প্রভুর স্মরণ অতি উঁচু, তাঁর বাণী সবচেয়ে বেশী সত্য, সবচেয়ে বেশী সত্যকথা তাঁর কথা, সবচেয়ে বেশী ভালো কথা তাঁর কথা। এই কথাগুলো বলে তিনি- "وما خلقنا السماوات والأرض وهو العزيز الرحيم" -থেকে - "وما خلقنا السماوات والأرض পর্যন্ত তিলাওয়াত করে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে একেবারে চুপ হয়ে যান। আমি মনে করলাম তিনি চেতনা হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আমাকে বললেন, হারাম ইবন হায়্যান: তোমার পিতা মারা গেছেন, খুব শীগগীর তোমাকেও মরতে হবে। আবূ হায়্যান মারা গেছেন, তার জন্য জান্নাত অথবা জাহান্নাম। ইবন হায়্যান! নূহ ও ইবরাহীম খলীলুর রহমান (আ) মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। মূসা নাজিয়্যুর রহমান মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। দাউদ খলীফাতুর রহমান মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। মুহাম্মাদ রাসূলুর রহমান মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। আবূ বকর খলীফাতুল মুসলিমীন মারা গেছেন। ইবন হায়্যান! আমার ভাই 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) মারা গেছেন। একথা বলার পর তিনি 'হায় 'উমার! বলে চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর রহমত কামনা করে দু'আ করেন। হযরত 'উমার ফারুক (রা) তখন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। আর তখন ছিল তার খিলাফাতের শেষ দিক। এ কারণে আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব তো জীবিত আছেন। বললেন, হ্যাঁ! আমি যা কিছু বলেছি তা যদি ঠিক মত বুঝে থাক তাহলে তুমি জেনে যাবে যে আমরা মৃতদের মধ্যেই পরিগণিত। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
তারপর তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) উপর দরূদ ও সালাম পাঠ করলেন এবং সংক্ষিপ্ত দু'আ করার পর বললেন: হারাম ইবনে হায়্যান, আল্লাহর কিতাব, উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ এবং নবীর (সা) উপর দরূদ ও সালাম— এগুলোর ব্যাপারে আমার অসীয়াত থাকলো। আমি আমার মৃত্যু সংবাদ দিয়েছি, তোমারও মৃত্যু সংবাদ দিয়েছি। আগামীতে সব সময় মৃত্যুকে স্মরণ রাখবে। একটি মুহূর্তও মৃত্যু থেকে উদাসীন হবে না। ফিরে গিয়ে তোমার গোত্রের লোকদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভয় দেখাবে। সব সময় নিজ দীনের লোকদেরকে উপদেশ দেবে এবং নিজের জন্য চেষ্টা করবে। সাবধান! জামা'আত বা দলছুট হবে না। এমন না হয় যে তোমার অজান্তে তোমার দীন ছুটে যায় এবং কিয়ামতে তোমাকে জাহান্নামের আগুনের মুখোমুখি হতে হয়। তারপর বললেন, হে আল্লাহ। এ ব্যক্তির ধারণা যে, সে তোমার জন্যই আমাকে ভালোবাসে, তোমার জন্যই আমার সাথে সাক্ষাৎ করেছে। হে আল্লাহ! তাই তুমি জান্নাতে তার চেহারাটা আমাকে চিনিয়ে দিও এবং দারুস সালামে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দিও, সে দুনিয়াতে যেখানেই থাকুক না কেন তোমার হিফাজতে রেখ, তার ঘর-বাড়ী, ক্ষেত-খামার তাঁর কর্তৃত্বে রেখ। দুনিয়ার এ সংক্ষিপ্ত জীবনে তাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রেখ এবং দুনিয়ার যতটুকু তার জন্য নির্ধারিত আছে সেটুকু তার জন্য সহজলভ্য করে দাও। তোমার দান ও অনুগ্রহের ব্যাপারে তাকে কৃতজ্ঞ বানিয়ে দাও এবং তাকে ভালো প্রতিদান দাও। এই দু'আ করার পর তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হারাম ইবন হায়্যান, এখন আমি তোমাকে আল্লাহর জিম্মায় সুপর্দ করছি। আস- সালামু আলায়কুম। আজকের পর আর যেন তোমাকে না দেখি। আমি প্রচার পছন্দ করিনে। নির্জনতা ও একাকীত্বই আমার বন্ধু। যতদিন আমি দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে জীবিত থাকবো চূড়ান্ত রকমের ব্যথা ও বেদনাগ্রস্ত অবস্থায় থাকবো। এ কারণে আগামীতে তুমি আর কিছু আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। এবং আমাকে খোঁজও করবে না। তোমার স্মৃতি আমার অন্তরে সব সময় থাকবে। কিন্তু এরপর না আমি তোমাকে দেখবো, আর না তুমি আমাকে দেখতে পাবে। আমাকে মনে রাখবে, আমার জন্য দু'আ করবে। আমিও ইনশা'আল্লাহ তোমাকে স্মরণে রাখবো এবং তোমার কল্যাণ কামনা করে দু'আ করবো।
এরপর তিনি একদিকে চলতে শুরু করেন। আমিও তাঁর সাথে চলতে লাগলাম। কিন্তু তিনি এতে রাজী হলেন না। এরপর আমরা দু'জনই কাঁদতে কাঁদতে একজন আরেকজন থেকে পৃথক হয়ে গেলাম। আমি এক দৃষ্টিতে তার চলার পানে তাকিয়ে থাকলাম। এক সময় তিনি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। এরপর আমি তাঁকে অনেক খুঁজেছি, বহু মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কোন ভাবেই তার সন্ধান পাইনি। আল্লাহ তাঁর প্রতি করুণা বর্ষণ করুন এবং তাঁকে ক্ষমা করুন। এই সাক্ষাতের পর থেকে এমন কোন সপ্তাহ যায় না যাতে এক দু'বার আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখিনি।
উওয়াইস আল কারানীকে দুনিয়া যতদিন চিনতে পারেনি ততদিন পর্যন্ত তাঁকে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে দেখা যেত। কিন্তু যখনই তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে তখন থেকে তিনি মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে এমনভাবে চলে যান যে কেউ আর তাঁর সাক্ষাৎ পায়নি। এরপর সিস্ফীন যুদ্ধে তাঁর শহীদ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার বড় বাসনা তার ছিল। আর এর জন্য সব সময় আল্লাহর দরবারে দু'আ করতেন। সিম্ফীন যুদ্ধে আল্লাহ পাক তাঁর সে বাসনা পূর্ণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি হযরত আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন।
তিনি জীবনকালে সব সময় দুআ করতেন:
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً تُوجِبُ لِي الْجَنَّةَ وَالرِّزْقَ
হে আল্লাহ তুমি আমাকে এমন শাহাদাত দান কর যা আমার জন্য জান্নাত ও রিযিক ওয়াজিব করে দিবে।
হযরত উওয়াইস (রহ) যদিও একজন তাবি'ঈ ছিলেন এবং সব রকম মহত্ত্ব, মর্যাদা ও পূর্ণতার সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল, তথাপি বাহ্যিক জ্ঞানে শীর্ষ জ্ঞানীদের তালিকায় কোথাও তাঁর নামটি পাওয়া যায় না। এমন কি একটি হাদীছের বর্ণনাও করেছেন বলে কোথাও দেখা যায় না। তাই বলে এমন সিদ্ধান্তে পৌছা ঠিক হবে না যে, জাহিরী 'ইলমের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। মূলতঃ তাঁর সত্তায় বাতিনী ও জাহিরী 'ইলমের সমাবেশ ঘটেছিল। জাহিরী 'ইলমের প্রচার ও প্রসারে তাঁর কোন অবদান না থাকার দু'টি কারণ থাকতে পারে। প্রথমতঃ অন্তর পরিশুদ্ধ করণ ও আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুশীলনে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পর 'ইলমে জাহিরীর চর্চায় সময় ব্যয় করা তাঁর পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়তঃ তিনি ছিলেন ভীষণ প্রচার-বিমুখ মানুষ। নাম-কাম ও খ্যাতির প্রতি ছিলেন নিরাসক্ত। কাজী, মুফতী, মুহাদ্দিছ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত হওয়া তিনি দারুণ অপছন্দ করতেন। একবার কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, আমার কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ ঠিক সেভাবে পৌঁছেছে যে ভাবে পৌঁছেছে আপনাদের নিকট। কিন্তু আমি নিজের উপর তার দ্বার উন্মুক্ত করে মুহাদ্দিছ, কাজী ও মুফতী হওয়া মোটেই পছন্দ করিনে। অন্তরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করার বহু কাজ আমার আছে। তিনি বলতেন, আমি খ্যাতি ও প্রচার মোটেই পছন্দ করিনে। একাকীত্ব ও নির্জনতা আমার অতি প্রিয়। জাহিরী 'ইলমের পদ ও পদবী গ্রহণ করলে খ্যাতি থেকে তিনি বাঁচতে পারতেন না, তেমনিভাবে একাকীত্বও বজায় থাকতো না। আর এ কারণে তিনি নিজের জন্য 'ইলমের এ শাখার দ্বার একেবারেই রুদ্ধ করে দেন।
তাঁর কামালাতের উৎস ও ঝর্নাধারা কাগজের পাতার পরিবর্তে ছিল অন্তরের পাতা। তাঁর মহান সত্তাই ছিল 'ইলমে বাতিনের উৎস ধারা। তাবি'ঈদের মধ্যে হযরত হাসান বসরীর (রহ) পরে তিনিই হলেন তাসাউফের একক কেন্দ্র। পরবর্তীকালের সূফী-সাধকদের অনেকের সিলসিলা বা সূত্রের ধারাবাহিকতা তাঁর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে।
তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে রাতের পর রাত কাটিয়ে দিতেন। নিয়ম ছিল, একরাত নামাযে দাঁড়িয়ে, দ্বিতীয় রাত রুকু অবস্থায় এবং তৃতীয় রাত সিজদা অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। বেশীর ভাগ সময় রাতের সাথে দিনও ইবাদাতে কেটে যেত। রাবী' ইবন খায়ছাম বর্ণনা করেছেন। তিনি একদিন ওয়াইসের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন, তিনি ফজরের নামাযে মশগুল আছেন। নামাযের পর তাসবীহ-তাহলীল থেকে ফারেগ হওয়ার প্রতীক্ষায় থাকলেন। প্রতীক্ষার সময় বাড়তে বাড়তে জুহরের নামাযের সময় হয়ে গেল। তারপর জুহর থেকে 'আসর এবং 'আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একই অবস্থায় কাটিয়ে দিলেন। রাবী' ধারণা করলেন, মাগরিবের পরে হয়তো তিনি আহার করার জন্য বের হবেন। কিন্তু ঈশা পর্যন্ত তাসবীহ-তাহলীলে নিমগ্ন থাকলেন। তারপর আবার ঈশা থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত একই অবস্থা বিদ্যমান থাকলো। দ্বিতীয় দিন ফজরের নামাযের পর তার একটু ঘুমের ভাব হলো। কিন্তু তিনি সাথে সাথে সতর্ক হয়ে গেলেন এবং দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! আমি নিদ্রাকাতর চোখ এবং অতৃপ্ত পেট থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাঁর এ অবস্থা দেখে রাবী বললেন, আমি, যতটুকু দেখেছি, তাই আমার জন্য যথেষ্ট।
সবসময় তিনি রোযা রাখতেন। অনেক সময় এমন হতো যে, ইফতার করার মত কিছুই থাকতো না। তখন খেজুরের বিচি খুঁটে সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন এবং তাই দিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য সামান্য কিছু কিনে আহার করতেন। যদি দু'একটি শুকনো খেজুর পেতেন, তাও ইফতারির জন্য রেখে দিতেন। খেজুর যদি কিছু বেশী পরিমাণে পেতেন তখন বিচি বিক্রি করার অর্থ গরীব-মিসকীনদেরকে দান করে দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁর নিকট যা কিছু খাদ্য-খাবার ও কাপড়-চোপড় থাকতো সবই দান করে দিতেন। তারপর এই বলে দু'আ করতেন- হে আল্লাহ! যারা অনাহারে মারা গেছে এবং যারা বস্ত্রহীন অবস্থায় মারা গেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে পাকড়াও করবেন না। সতর ঢাকার মত কাপড় না থাকায় মাঝে মাঝে জুমআর নামাযেও যেতে পারতেন না।
কৃষ্ণায় যিক্র আযকারের একটি 'হালকা' ছিল। সেই হালকায় বহু 'সালিক' তথা আধ্যাত্মিক পন্থীরা সমবেত হতেন। উওয়াইসও সেখানে অংশগ্রহণ করতেন। উসাইদ ইবন জাবির বর্ণনা করেছেন। আমরা কিছু লোক কৃষ্ণায় যিক্র ও আমলের একটি হালকায় সমবেত হতাম। উওয়াইসও আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতেন। এই হালকায় উওয়াইসের যিকর সবার অন্তরের উপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলতো। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, এই যিক্র ও 'আমল ছিল নামায ও কুরআন তিলাওয়াত।
তাঁর দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ও নির্মোহ ভাব এমন পর্যায়ের ছিল যে, বাড়ী-ঘর, লেবাস-পোশাক, পানাহার, তথা পার্থিব যাবতীয় প্রয়োজন ও দাবী থেকে সব সময় মুক্ত ছিলেন। অতি সাধারণ একটি ভাঙ্গাচোরা ঘরে থাকতেন। পানাহারের অবস্থা এমন ছিল যে, কখনো উট চরিয়ে, আবার কখনো খেজুরের বিচি খুঁটে বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে বেঁচে থাকার মত খাবার সংগ্রহ করতেন। হযরত উমারও এমন যুহদ অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু করেননি। পোশাকের মধ্যে থাকতো পশমের একটি মোটা চাদর ও লুঙ্গি। অনেক সময় চাদরও থাকতো না। নগ্নদেহ দেখে মানুষ তাঁকে চাদর দিত। তিনি এই বলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতেন: 'হে আল্লাহ! আমি আমার ক্ষুধার্ত পেট ও নগ্ন দেহের জন্য তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমার দেহে যে পোশাক আছে এবং আমার পেটে যে খাদ্য আছে তাছাড়া আমার কাছে আর কিছুই নেই।
তাঁর এমন মজযুব বা ঐশী প্রেমে বেহুঁশ অবস্থা দেখে লোকেরা তাঁকে ভুল বুঝতো এবং পথ চলার সময় তাঁকে নানাভাবে বিরক্ত করতো। একবার কাপড় সংগ্রহ করতে না পারার কারণে হালকায়ে যিকর থেকে অনুপস্থিত থাকলেন। তাঁর হালকার সাথী উসাইদ ইবন জাবির ভাবলেন, হয়তো তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি তাঁর বাড়ীতে গিয়ে বললেন, আপনি আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন কেন? তিনি জবাব দিলেন: আমার গায়ে দেওয়ার মত চাদর ছিল না। তাই আমি যেতে পারিনি। উসাইদ বর্ণনা করেছেন, তাঁর একথা শোনার পর আমি আমার চাদরটি তাঁকে দিই। কিন্তু তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন: আমি যদি এই চাদর গায়ে জড়িয়ে বাইরে যাই তাহলে আমার গোত্রের লোকেরা বলবে, এই কপট ধার্মিক লোকটিকে তোমরা দেখ, সে একজন লোকের পিছু নিয়ে তাকে ধোঁকা দিয়ে তার চাদরটি হাতিয়ে নিয়েছে। তাঁর এত সব কথা ও আপত্তি সত্ত্বেও আমি প্রায় জোর করে আমার চাদরটি তাঁকে দিয়ে দিই। তাঁকে বলি এটি গায়ে দিয়ে আমার সাথে চলুন দেখি কে কি বলে। আমার এমন পীড়াপীড়িতে তিনি চাদরটি গায়ে জড়িয়ে আমার সাথে বের হলেন। যেই না আমরা একটি জন-সমাবেশ অতিক্রম করছি, অমনি তারা বলে উঠলো, তোমরা এই কপট ধার্মিককে দেখ, সে একটি লোকের পিছু নিয়ে তার চাদরটি বাগিয়ে নিয়েছে। আমি কথাটি শোনামাত্র তাদেরকে লক্ষ্য করে বললাম, তোমাদের এমন কথা বলতে লজ্জা হয় না? আল্লাহর কসম! আমি যখন তাঁকে এ চাদর দিতে চেয়েছি, তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। মোটকথা, তিনি তাঁর বাহ্যিক অবস্থার কারণে মানুষের ঠাট্টা- বিদ্রূপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেন। আর হাসিমুখে তা সহ্য করতেন।
আধ্যাত্মিক সাধনার একটি স্তরের নাম 'ফানা'। 'ফানা' অর্থ পরম সত্তায় বিলীন হওয়া। তিনি এই 'ফানা'র এমন পর্যায়ে ছিলেন যেখানে বিন্দুমাত্র খ্যাতি, প্রচার ও দুনিয়াদার লোকদের সাথে মেলামেশার কোন সুযোগ নেই। এ কারণে খ্যাতি ও প্রচার থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। খলীফা হযরত 'উমার (রা) একবার ইচ্ছা করলেন, কুফার ওয়ালীকে চিঠি লিখে তাঁর পরিচয় জানিয়ে দিয়ে তাঁর সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেন। কিন্তু উওয়াইস তাতে রাজী হননি। তিনি উমারকে (রা) বলেন- আমি অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করি। মানুষের সাথে মেলামেশাতে ভয় পেতেন। কিন্তু তার এ আত্মগোপন অবস্থা বেশি দিন বজায় থাকেনি। তাঁর রূহানিয়াতের খোশবু আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। দিন দিন মানুষের আগ্রহ তাঁর প্রতি বাড়তে থাকে। উসাইদ ইবন জাবির বর্ণনা করেছেন। আমার এক সাথী আমাকে উওয়াইসের নিকট নিয়ে যায়। তিনি দু'রাকআত নামায শেষ করে আমাদের প্রতি মনোযোগ দেন। তিনি বলেন, আমার সাথে আপনাদের আচরণও বেশ আজব ধরনের। আপনারা সবসময় আমার পিছনে লেগে থাকেন কেন? আমি একজন দুর্বল মানুষ। আমার অনেক প্রয়োজনীয় কাজ আছে, যা আমি আপনাদের কারণে সম্পন্ন করতে পারিনে। আপনারা এমন করবেন না। আল্লাহ আপনাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করুন। আপনাদের কারো কোন প্রয়োজন আমার কাছে যদি হয় তাহলে ঈশার নামাযের সময় সাক্ষাৎ করবেন। এই মজলিসে তিন ধরনের মানুষ এসে থাকে। বুদ্ধিমান ঈমানদার, নির্বোধ ঈমানদার ও কপট ধার্মিক (মুনাফিক)। এই তিন ধরনের মানুষের দৃষ্টান্ত হলো বৃক্ষ ও বৃষ্টির মত। যদি সবুজ-শ্যামল তরতাজা ও ফলবান বৃক্ষের উপর বৃষ্টি হয় তাহলে তার সজীবতা ও সৌন্দর্য আরো বেড়ে যায়। কিন্তু সজীব অথচ ফলহীন, এমন বৃক্ষের উপর বৃষ্টি হলে তার শাখা ও পাতায় সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় এবং তা ফল দিতে আরম্ভ করে। আর যদি শুকনো ঘাস ও দুর্বল শাখার উপর বৃষ্টি হয় তাহলে তা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এই উপমাটি দিয়ে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ ۙ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا
আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মু'মিনদের জন্য রহমত। যালিমদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।
খলীফা হযরত 'উমার (রা) উওয়াইস আল কারানীকে খুব বেশী বেশী স্মরণ করতেন। একবার তিনি মিনায় মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলেন: হে কারানবাসী, আপনাদের মধ্যে কি উওয়াইস আছেন? একজন বয়স্ক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যান এবং বলেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! তিনি তো একজন পাগল। নির্জনস্থানে একাকী বাস করেন। তিনি কারো সাথে মিশতে চান না, আর কেউ তার সাথে মিশতে চায় না। 'উমার (রা) বললেন: আমি তাঁর কথাই বলছি। আপনারা ফিরে গিয়ে তাঁকে খুঁজে বের করবেন এবং তাঁকে আমার এবং রাসূলুল্লাহর সালাম পৌঁছে দিবেন।
আমীরুল মু'মিনীনের একথা উওয়াইসের কানে পৌঁছালে তিনি বলেন: আমীরুল মু'মিনীন আমাকে পরিচিত করে দিয়েছেন, আমার নামটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহুম্মা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ, ওয়া 'আলা আলিহি। আস্-সালামু 'আলা রাসূলিল্লাহ। তারপর তিনি মুখ নীচু করে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন।
তাঁর সীমাহীন একাকীত্ব ও নির্জনতা-প্রিয়তা তাঁকে আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ)-এর দায়িত্ব থেকে কখনো উদাসীন ও অমনোযোগী করতে পারেনি। এ দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি অনেক সময় অনেকের শত্রুতে পরিণত হতেন। আবুল আহওয়াস নামক জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। তার এক বন্ধু তাকে বলেছেন, মুরাদ গোত্রের এক ব্যক্তি উওয়াইসের নিকট যায় এবং সালাম বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করে, উওয়াইস, কেমন আছেন? তিনি বলেন, আল-হামদু লিল্লাহ। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করে, আপনার সাথে কালচক্রের আচরণ কেমন?
তিনি বলেন, এই প্রশ্ন এমন ব্যক্তিকে করছো যার সন্ধ্যার পর সকাল লাভ করার বিশ্বাস নেই এবং সকালের পর সন্ধ্যা পাওয়ার কোন আশা নেই। আমার মুরাদ গোত্রের ভাই! মৃত্যু কোন ব্যক্তির জন্য আনন্দের কোন স্থান অবশিষ্ট রাখেনি। আমার মুরাদ গোত্রের ভাই! আল্লাহর পরিচয় মু'মিনের জন্য সোনা-রূপোর কোন মূল্যই অবশিষ্ট রাখেনি। আমার মুরাদ গোত্রের ভাই! মু'মিন ব্যক্তির আল্লাহর ফরজ আদায়ের কারণে কোন বন্ধু থাকে না। আল্লাহর কসম! যেহেতু আমরা মানুষকে ভালো কাজের শিক্ষা দিই এবং খারাপ করতে বারণ করি, তাই তারা আমাদেরকে শত্রু ভেবে বসেছে। আর এতে তাদের পাপাচারী সহযোগী জুটে গেছে। যারা আমাদের প্রতি নানা রকম বানোয়াট দোষারোপ করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের এ আচরণ আমাকে সত্য বলা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
তিনি অখ্যাত ও অপরিচিত থাকার উদ্দেশ্যে খুব কমই জনসমক্ষে বের হতেন। তবে জিহাদের সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে কখনো কখনো নির্জনতা থেকে বেরিয়ে আসতেন। যদিও সহীহ মুসলিমে এর বিস্তারিত বিবরণ নেই, তবে অনুমান তথা দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, হযরত 'উমারের (রা) সাথে ইয়ামনের সাহায্যের ব্যাপারে তাঁর যে সাক্ষাৎ হয়, তা নিশ্চিতভাবে এই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় হয়ে থাকবে। তাছাড়া আল-ইসাবার একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি আযারবাইজানের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে সালামা ছিলেন আযারবাইজান যুদ্ধের সৈনিক। তিনি বলেছেন: 'উমার ইবনুল খাত্তাবের সময়ে আমরা আযারবাইজান যুদ্ধ করি। আমাদের সাথে উওয়াইস আল কারানীও ছিলেন। যুদ্ধ শেষে ফেরার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক চিকিৎসা করার পরও তাকে আর বাঁচানো গেল না। তিনি মারা গেলেন। আমরা তাঁকে কবর দিলাম। কিন্তু পরে আর তার কবরের কোন চিহ্ন থাকলো না। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায়, তিনি আলীর (রা) খিলাফত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং সিফ্ফীন যুদ্ধে আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করে শহীদ হন।
পার্থিব আত্মীয়-সম্পর্কের মধ্যে উওয়াইসের শুধু এক মা ছিলেন। তাঁর সেবাকে তিনি সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য ও ইবাদাত মনে করতেন। তিনি একা হয়ে যাবেন, এই চিন্তায় হজ্জ আদায় করেননি। তাঁরই কারণে হযরত রাসূলে পাকের দীদার থেকে মাহরূম থেকে যান। মায়ের ইনতিকালের পর হজ্জ আদায় করার সুযোগ আসে কিন্তু তখন তিনি একজন কপর্দকশূন্য মানুষ। তাঁর কিছু শুভানুধ্যায়ী হজ্জের সফরের যাবতীয় ব্যবস্থা করায় তিনি হজ্জ আদায় করেন।
তিনি বলতেন, আল্লাহর কাজে এমনভাবে থাকবে যেন তুমি সব মানুষকে হত্যা করে ফেলেছো। অসাক্ষাতে কারো জন্য দু'আ করা তার সাথে সাক্ষাৎ করার চেয়ে ভালো। কারণ, সাক্ষাতের মধ্যে লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে।
তাবি'ঈদের মধ্যে উওয়াইস আল কারানীর এমন বিশেষ কিছু ফবীলত ও মর্যাদা আছে যা অন্য কারো নেই। তাঁর সবচেয়ে বড় সম্মান ও মর্যাদা হলো হযরত হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে 'খায়রুত তাবি'ঈন' (তাবি'ঈদের মধ্যে উত্তম) বলে অভিহিত করেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন আবী আওফা বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন, আমার উম্মাতের এক ব্যক্তির সুপারিশে বানু তামীমের বিপুল সংখ্যক মানুষ জান্নাতে যাবে। হাসান মনে করেন, সেই ব্যক্তিটি হলেন উওয়াইস আল কারানী। যদিও এই বর্ণনাটি তেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও এ দ্বারা হযরত উওয়াইসের মর্যাদা অনুমান করা যায়।
'খায়রুত তাবি'ঈন'-এর এত সব মহত্ত্ব, মর্যাদা, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার বর্ণনা সত্ত্বেও এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা দ্বারা তাঁর অস্তিত্বটাই সন্দেহজনক হয়ে যায়। এই সব গুণাবলীতে ভূষিত উওয়াইস নামের কোন তাবি'ঈ আদৌ ছিলেন? যেমন: ইবন 'আদী বর্ণনা করেছেন, ইমাম মালিক তাঁর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতেন। সাম'আনী বর্ণনা করেছেন, ইবন হিব্বান বলতেন, আমাদের কোন কোন বন্ধু তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করতেন। সাম'আনী এ রকম কথাও বর্ণনা করেছেন যে, ইবন হিব্বান বলতেন, আমাদের বুখারীর নিকট তাঁর সম্পর্কের বর্ণনাগুলোর সনদ সন্দেহযুক্ত।
কিন্তু অন্যসব মুহাদ্দিছ মনে করেন, হাদীছ ও তাবাকাত গ্রন্থাবলীর এত সব বর্ণনার বিপরীতে এই মুষ্টিমেয় কিছু দুর্বল বর্ণনার কোন স্থান ও মর্যাদাই থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখার মত আছে। প্রথমত: যে সব বর্ণনা দ্বারা উওয়াইস কারানীর অস্তিত্বই সন্দেহজনক হয়ে উঠে, সেগুলোর মান ও মূল্য কি? দ্বিতীয়তঃ সেগুলো যদি বিশুদ্ধও হয় তাহলে তদ্দ্বারা তাঁর বিদ্যমান না থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তৃতীয়তঃ এর বিপরীতের উলামা, মুহাদ্দিছ ও তাবাকাতের বর্ণনাসমূহের জবাব কি হবে?
বর্ণনার মূল্যমানের দিক দিয়ে এ জাতীয় সকল বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। হাফেজ ইবন হাজার ও সাম'আনী যদিও এ বর্ণনাগুলো সংকলন করেছেন, তবে তার কোন সনদ তারা দেননি। তাই হাদীছ পর্যালোচনার রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী তা মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়। আর যদি বিশুদ্ধ ধরেও নেওয়া যায় তাহলেও সেগুলো দ্বারা উওয়াইস আল কারানীর অস্তিত্বহীনতার সিদ্ধান্তে পৌঁছা ঠিক নয়। কারণ, যাঁরা তাঁর অস্তিত্বের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন তা এই ভিত্তিতে করেছেন যে, তাঁরা সেই যুগে তাঁর নাম শোনেননি, অথবা তাঁর জীবনের কোন অবস্থার কথা জানতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা জানেননি বা জানতে পারেননি, একথা দ্বারা তিনি ছিলেন না একথা প্রমাণিত হয় না।
নীতিগতভাবে সেইসব মানুষের অবস্থার কথা লোকে জানতে পারে যাঁরা বিশেষ কোন অবস্থানে থাকেন। যাঁরা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে একেবারে নীরবে জীবন কাটিয়ে দেন তাদের কথা মানুষ জানতে পারে না। এমন কি সাহাবীদের সম্পর্কে এ দাবী করা যায় না যে, প্রত্যেকটি সাহাবী সম্পর্কে সেই যুগের লোকেরা জানতো, অথবা তাঁদের জীবনী সেই যুগে লেখা হয়েছিল। সাধারণত সেই সব সাহাবীর জীবন কথা জানা যায় যাঁরা শিক্ষা অথবা সরকারী কাজে কিছু অবদান রেখেছেন, অথবা হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোথাও তাঁর নামটি এসে গেছে। কোন কোন সাহাবীর তো শুধু নামই জানা যায়- জীবনের কোন কথাই জানা যায় না। তাই যদি হয় সাহাবীদের অবস্থা, তাহলে একজন অখ্যাত তাবি'ঈর অবস্থা কি হতে পারে?
এই নীতির ভিত্তিতে উওয়াইস আল কারানীর জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে। তাঁর জীবনী থেকে যেমন জানা যায় যে, তিনি দুনিয়ার যাবতীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজেকে সব সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখেন। কেউ তাঁকে মুফতী, মুহাদ্দিছ, কাজী বলবে এবং মানুষ তাঁর প্রতি মনোযোগী হবে, এই ভয়ে তিনি এমনভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন যে, বিশেষ কিছু লোক ছাড়া তাঁর অঞ্চলের লোকেরাও তাঁকে জানতো না। আর যাঁরা তাঁকে চিনতো-জানতো তাঁরাও তাঁকে এক ভিন্ন স্বভাব-প্রকৃতির মানুষ বলে জানতো। শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাজের সাথে যেহেতু তিনি কোনভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না, একারণে 'আলিম-উলামা তাঁর সম্পর্কে জানতেন না বা জানার কোন প্রয়োজন বোধ করেননি।
যাই হোক, তাঁর ব্যক্তিত্ব একেবারে গোপন থাকার মত ছিল না। এ কারণে অনেক বিশেষ ব্যক্তির নিকট তাঁর জীবনের স্বরূপ প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল। পূর্বে আমরা তা আলোচনা করেছি। আমরা যখন তাবাকাত ও হাদীছের গ্রন্থসমূহে দৃষ্টিপাত করি তখন 'সাহীহ মুসলিম'-এর মত গ্রন্থেও তাঁর ফযীলত ও মর্যাদার কথা পাই। তাবাকাত ও রিজাল (চরিত অভিধান) শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহের চেয়ে হাদীছের গ্রন্থাবলীতে তার কথা বেশী এসেছে। মুসনাদে আহমাদ, সাহীহ মুসলিম, দালাইলে বায়হাকী, হিলয়াতুল আওলিয়া (আবু নু'আয়ম), মুসতাদরিকে হাকিম ইত্যাদি হাদীছের গ্রন্থে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। হাফেজ ইবন হাজার-এর বেশীরভাগ সূত্রের উল্লেখ করেছেন তাঁর আল-ইসাবা গ্রন্থে। সম্ভবত এর বাইরে আরো বহু গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা এসে থাকবে। তবে তাবাকাত ও রিজালের গ্রন্থাবলীতে তাঁর আলোচনা কম হওয়ার কারণ হলো, সাধারণতঃ এসব গ্রন্থে এমন সব ব্যক্তির জীবন-বৃত্তান্ত স্থান পায় যাঁরা শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাবাকাতে ইবন সা'দ, আল-ইসাবা, উসুদুল গাবা, হিলয়াতুল আওলিয়া, তারীখে ইবন 'আসাকির, তাহযীব, মীয়ানুল ই'তিদাল এবং এ জাতীয় আরো অনেক গ্রন্থে তাঁর জীবনকথা কম-বেশী এসেছে। আর যে সকল 'আলিম তাঁর অস্তিত্বের অস্বীকারমূলক বর্ণনা নকল করেছেন তাঁদের নিজেদেরই সেইসব বর্ণনার উপর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না। তারাও উওয়াইস আল কারানীর ব্যক্তিত্বকে স্বীকার করতেন।
যেমন ইবন হাজার ইমাম মালিকের অস্বীকৃতিমূলক বর্ণনা নকল করার পর লিখেছেন যে, তাঁর পরিচিতি এবং বিবরণ এত যে তাঁর অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দেহ ও সংশয়ের কোন অবকাশ নেই।
আল 'উতবী বলেছেন, আমি আমার শায়খদের বলতে শুনেছি: তাবি'ঈদের আটজনের কাছে 'যুহদ' (আল্লাহ ভীতি ও দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি) চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছে। তাঁরা হলেন: 'আমির ইবন 'আবদিল কুদ্দুস, আল- হাসান আল বসরী, হারাম ইবন হায়্যান, আবূ মুসলিম আল খাওলানী, উওয়াইস আল কারানী, রাবী' ইবন খুছায়ম, মাসরূক ইবন আল-আজদা' ও আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ।
টিকাঃ
১. হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৩৩-৩৩৪
২. আল ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা- ১/১১৫
৩. সাহীহ মুসলিম: কিতাবু ফাদাইল আস-সাহাবা- (২৫৪২); মুসনাদে আহমাদ- ১/৩৮; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৩৩- ৩৩৪
৪. প্রাগুক্ত; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা- ৪/২২-২৩; 'আসরুত তাবি'ঈন- ৪৪৫; আল-'ইদ আল ফারীদ- ৩/৩৯৮
৫. তাবাকাত- ৬/১১২-১১৪
৬. সূরা আদ-দুখান- ৩৮-৪২
৭. হায়াতুল আওলিয়া- ২/৮৭; 'আসরুত তাবি'ঈন- ২৪১-২৪৩
৮. আল ইসাবা- ১/১১৭
৯. তারীখু ইবন 'আসাকির- ৩/১৭৩
১০. তাযকিরাতুল আওলিয়া'- ৪৩
১১. হলয়াতুল আওলিয়া'- ২/৮৭
১২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা- ৪/৩০
১৩. মুসতাদরিকে হাকিম- ৩/৪০৪,৪০৮
১৪. তাবাকাত-৬/১১৩
১৫. মুসতাদরিক-৩/৪০৬
১৬. প্রাগুক্ত-৩/৪০৫
১৭. প্রাগুক্ত-৩/৪০৪
১৮. আল ইসাবা- ১/১১৭
১৯. সূরা আল-ইসরা'- ৮২
২০. আসরুত তাবি'ঈন- ২৪৬
২১. প্রাগুক্ত- ২৪৩-২৪৪; মুসতাদরিক- ৩/৪০৬
২২. আল-ইসাবা- ১/১১৭
২৩. আল- বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ৩/১৯৩, টীকা-১০; 'আসরুত তাবি'ঈন- ২৪৭
২৪. মুসতারিক- ৩/৪০৭
২৫. সিফাতুস সাফওয়া- ১/২৩৭
২৬. আল-ইসাবা- ১/১১৭; আল-ইন্দ আল-ফারীদ-৩/৩৯৮
২৭. আল ইসাবা- ১/১১৫-১১৭
২৮. সিয়ারুত তাবি'ঈন- ৪৮
২৯. আল-'ইদ আল-ফারীদ- ৩/১৭১
📄 সালামা ইবন দীনার (রহ)
হযরত সালামার (রহ) ডাক নাম ছিল আবূ হাযিম। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন অনারব। পিতা দীনার ছিলেন ইরানী এবং মাতা ছিলেন রোমান। আল-আসওয়াদ ইবন সুফইয়ান আল-মাখযূমীর দাস ছিলেন। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁকে মাখযূমী বলা হতো। ইতিহাসে তিনি আবূ হাযিম আল-আ'রাজ নামেও পরিচিত।
পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকে যদিও তিনি অনারব বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবুও ইসলামের সাম্য ও সমতার কল্যাণে মদীনার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং একজন তাপস ও ভোগ- বিলাস বিমুখ 'আলিমে পরিগণিত হন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন : "الواعظ الزاهد عالم المدينة وشيخها" - তিনি একজন দুনিয়া-বিরাগী উপদেশদানকারী, মদীনার 'আলিম ও শায়খ। ইমাম নাওবী বলেছেন: তাঁর বিশ্বস্ততা, মহত্ব ও প্রশংসায় সকলে একমত।
তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন : "كان ثقة كثير الحديث" - তিনি ছিলেন বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণকারী বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সাহল ইবন সা'দ আস-সা'ইদী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তবে বহু মুহাদ্দিছ মনে করেন শেষোক্ত দুই সাহাবীর নিকট থেকে তাঁর সরাসরি হাদীছ শোনা প্রমাণিত নয়। বিপুল সংখ্যক বিখ্যাত তাবি'ঈর নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এখানে তাঁর কয়েকজন তাবি'ঈ শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হলো :
উমামা ইবন সাহল ইবন হুনায়ফ, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী কাতাদা, নু'মান ইবন আবী 'আয়্যাশ, ইয়াযীদ ইবন রূমান, 'উবায়দুল্লাহ ইবন মুকাসিম, আবূ ইবরাহীম ইবন 'আবদির রহমান, না'জা ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ সালিহ আল-সাম্মান, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, ইবন মুনকাদির ও আরো অনেকে।
তাঁর ছাত্র ও শাগরিদদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো: যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন ইসহাক, ইবন 'আজলান, ইবন আবী জি'ব, মালিক, হাম্মাদ, সুফইয়ান, সুলায়মান ইবন হিলাল, সা'ঈদ ইবন আবী হিলাল, 'আমর ইবন 'আলী, আবূ গাসসান আল-মাদানী, হিশাম ইবন সা'ঈদ, উহায়ব ইবন খালিদ, আবূ সাখর হুমায়দ ইবন যিয়াদ আল-খাররাত, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, মুহাম্মাদ ইবন জা'ফার ইবন আবী কাছীর, আফলাহ ইবন সুলায়মান আন-নামিরী প্রমুখ।
ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর পূর্ণ দখল ছিল। তিনি ছিলেন মদীনার একজন বিখ্যাত ফকীহ্। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী ও অন্যরা তাঁকে ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি স্বভাবগত ফকীহ্ ছিলেন। তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়পদ ফকীহ্ ও উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি। ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞানের প্রমাণ এই যে, তিনি মদীনাতুর রাসূলের একজন কাজী ছিলেন।
মদীনায় তিনি মানুষকে ও'য়াজ-নসীহতের দায়িত্বও পালন করতেন। 'ইবাদাত-বন্দেগীর দিক দিয়ে তিনি মদীনার বড় বড় 'আবিদ ব্যক্তিদের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি মদীনার 'আবিদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী, ইবন হাজার ও আরো অনেকে তাঁর নামের সাথে 'যাহিদ' (দুনিয়া-বিরাগী) শব্দটি লিখেছেন। মোটকথা, সব দিক দিয়ে মহান তাবি'ঈ স্তরের মধ্যে তিনি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।
আল-জাহিজ (মৃ. হি. ২৫৫) তাঁর 'আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন' গ্রন্থে বিখ্যাত তাপস ও দুনিয়া-বিরাগী মানুষ যাঁরা বয়ান ও বাগ্মিতায়ও পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের নামের সাথে তাঁর নামটিও উল্লেখ করেছেন।
আমীর-উমারা ও শাসক শ্রেণী থেকে সবসময় দূরে থাকতেন। কখনো কোন প্রয়োজনে তাঁদের কাছে ঘেঁষতেন না। একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক ইমাম যুহরীর মাধ্যমে তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠান। তিনি যুহরীকে বলেন, যদি সুলায়মানের আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকে তাহলে তাঁকেই আমার কাছে আসা উচিত। আমার তো তাঁর কাছে কোন প্রয়োজন নেই।
ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলীর পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার সাথে সাথে যথেষ্ট জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবন আসলাম বলেন, আমি এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিনি যার কথা আবূ হাযিমের কথার চেয়ে বেশী বিজ্ঞতাপূর্ণ। ইবন খুযায়মা বলেন, উপদেশমূলক কথাবার্তায় তাঁর সময়ে আর কেউ তাঁর মত ছিলেন না। তাঁর এমন অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী পাওয়া যায় যা দ্বারা তাঁর বিজ্ঞতার অনুমান করা যায়।
তিনি বলতেন, এমন সব কাজ যার কারণে মরণই শ্রেয় মনে হয় তা পরিহার কর। তারপর যখনই মৃত্যু আসুক তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যে বান্দা তার নিজের ও তার প্রভুর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ যথাযথভাবে পালন করে এবং সম্পর্কসমূহ ভালোমত বজায় রাখে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার সব সম্পর্ক ঠিক রাখেন। আর যে বান্দা তার ও আল্লাহর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালনে অবহেলা করে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার পারস্পরিক দায়িত্বসমূহ পালনের ব্যাপারে অবহেলার ভাব সৃষ্টি করে দেন। এক সত্তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা একাধিক ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেয়ে অনেক সহজ কাজ। অর্থাৎ এক আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে গোটা পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ভালো হয়ে যাবে। একবার খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারি? বললেন: এটা খুবই সহজ কাজ। প্রত্যেকটি জিনিস বৈধ পন্থায় গ্রহণ করুন এবং বৈধ খাতসমূহে তা ব্যয় করুন। হিশাম বললেন, এ কাজ সেই ব্যক্তিই করতে পারেন যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বাঁচার ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছেন। তিনি বললেন: আর এ কারণে জিন ও মানুষে জাহান্নাম ভরে যাবে। তিনি বলতেন:
যে আমলের কারণে তুমি মৃত্যুকে অপছন্দ কর সে আমল ছেড়ে দাও। তারপর তোমার মৃত্যু যখনই আসুক তোমার কোন ক্ষতি হবে না।
তিনি বলতেন: আমরা সবাই তাওবা না করা পর্যন্ত মরতে চাই না। আর আমরা না মরা পর্যন্ত তাওবা করি না। খলীফা আবদুল মালিকের অন্তিম সময় যখন উপস্থিত, তখন দেখলেন একজন ধোপা হাত দিয়ে কাপড় কচলাচ্ছে। খলীফার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো 'হায়! আমি যদি একজন ধোপা হতাম এবং প্রতিদিন যা উপার্জন করতাম তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম।' একথা আবূ হাযিমকে শোনানো হলে তিনি বলে ওঠেন: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁদেরকে মরণকালে সেই আশা-আরজু দান করেছেন যার মধ্যে আমরা সবসময় আছি। মরণকালে আমরা জীবনকালে তারা যে অবস্থায় আছে তা কামনা করবো না।
তিনি বললেন: দুনিয়া বহু জাতি-গোষ্ঠীকে ধোঁকা দিয়েছে। তারা এ দুনিয়াতে অন্যায় ও অপকর্ম করেছে। যখন মৃত্যু এসে গেছে তখন তারা তাদের সবকিছু এমন লোকদের জন্যে ছেড়ে গেছে যারা তাদের কোন প্রশংসা করেনি এবং এমন সত্তার কাছে চলে গেছে যিনি তাদের কোন ওজর-কৈফিয়াত শুনবেন না। আমরা তাদের উত্তরাধিকারী হয়েছি। সুতরাং আমাদের উচিত হবে, তাদের যে জিনিসগুলো আমরা অপছন্দ করি তা থেকে দূরে থাকা এবং যা পছন্দ করি তা 'আমল করা।
একবার তিনি কোন এক প্রয়োজনে তৎকালীন শাসকের নিকট যান এবং এভাবে নিজের কথা তুলে ধরেন: একটি প্রয়োজনে আমি আপনার নিকট এসেছি এবং সেই প্রয়োজনের কথাটি পূর্বেই আল্লাহকে জানিয়েছি। এখন আল্লাহ যদি তা পূরণের জন্য আপনাকে অনুমতি দেন তাহলে আপনি পূরণ করুন। আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। আর তিনি যদি পূরণের অনুমতি না দেন, আপনি পূরণ করবেন না এবং সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাকে মাজুর বা অপারগ মনে করবো।'
একবার তিনি ফলের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। ফল দেখে তিনি বললেন : তোমার সাথে আমার দেখা হবে জান্নাতে। আরেকবার তিনি গোশতের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। কসাইরা বললো : আবূ হাযিম, ভালো গোশত আছে, কিছু খরিদ করুন। বললেন : আমার কাছে কেনার মত পয়সা নেই। তারা বললো: পয়সা আপনি পরে দিবেন। তিনি বললেন: গোশত আমি পরেই খাব।
হিজরী ৯৭ সনে উমাইয়্যা খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক মদীনার মসজিদে নববীতে নামায আদায় এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাম পেশের উদ্দেশ্যে দিমাশক থেকে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করেন। বহু কারী, মুহাদ্দিছ, ফকীহ্, 'আলিম, আমীর- উমারা ও সেনাকর্মকর্তা তাঁর সফরসঙ্গী হন। মদীনায় পৌছে একটু স্থির হবার পর সেখানকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ জনগণ তাঁকে সালাম ও স্বাগতম জানানোর জন্যে উপস্থিত হলো। কিন্তু সালামা ইবন দীনার, যিনি হলেন মদীনার কাজী, সর্বজনমান্য 'আলিম, ও নির্ভরযোগ্য ইমাম, গেলেন না। সুলায়মান ইবন 'আবিদল মালিক তাঁর নিকট আগত লোকদের সাথে সাক্ষাৎ দান ও কুশল বিনিময় শেষ করলেন। তারপর তিনি তাঁর কিছু সঙ্গী-সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: খনিজ পদার্থে যেমন মরিচা পড়ে তেমনি মানুষের অন্তরেও মরিচা পড়ে যদি না তাকে কেউ উপদেশ দিয়ে তার মরিচা সাফ করে। তারা বললো: আমীরুল মু'মিনীন ঠিক কথাই বলেছেন।
সুলায়মান বললেন: মদীনাতে কি এমন কোন লোক নেই, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, আমাদেরকে উপদেশ দান করতে পারেন? লোকেরা বললো: হাঁ, আমীরুল মু'মিনীন, আবূ হাযিম আল-আ'রাজ আছেন। তিনি জানতে চাইলেন আবূ হাযিম আল-আ'রাজ কে?
তারা বললো: সালামা ইবন দীনার- মদীনার 'আলিম ও ইমাম এবং যেসব তাবি'ঈ বিপুল সংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন তাঁদেরই একজন। সুলায়মান বললেন: তাহলে তাঁকেই আমার কাছে নিয়ে এসো। তবে খুব সম্মানের সাথে আনবে। লোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে খলীফার নিকট যাওয়ার জন্য বললো। তিনি রাজী হলেন।
সালামা খলীফার দরবারে উপস্থিত হলে খলীফা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে নিজের কাছে বসালেন। তখন সেখানে ইবন শিহাব যুহরীও (রহ) বসা ছিলেন। তারপর খলীফা একটি অভিযোগের সুরে তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন:
- আবূ হাযিম! এ কেমন উপেক্ষা?
- আমীরুল মু'মিনীন! আমার মধ্যে আপনি কি ধরনের উপেক্ষা লক্ষ্য করলেন?
- বহু মানুষ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, অথচ আপনি আসলেন না!
- উপেক্ষা তো হয় পরিচয়ের পর। আপনি তো এর আগে আমাকে চিনতেন না, আর আমিও এর পূর্বে আপনাকে কখনো দেখিনি। তাহলে আমার দিক থেকে উপেক্ষা হলো কিভাবে?
খলীফা তখন তাঁর সঙ্গী-সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন: শায়খ তাঁর কৈফিয়াত দানে ঠিক করেছেন, আর খলীফা তাঁর প্রতি অভিযোগ করে ভুল করেছে। তারপর তিনি আবূ হাযিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন:
- ওহে আবূ হাযিম, আমার অন্তর মাঝে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জমা হয়ে আছে, আমি তা আপনার নিকট ব্যক্ত করতে চাই।
- আমীরুল মু'মিনীন, বলুন। আল্লাহ সাহায্যকারী।
- ওহে আবূ হাযিম, আমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করি কেন?
- এ জন্য যে, আমরা দুনিয়াকে আবাসস্থল বানিয়েছি এবং আখিরাতকে বিধ্বস্ত করেছি। তাই আবাসস্থল ছেড়ে বিধ্বস্ত ভূমিতে যেতে অপছন্দ করি।
- আপনি সত্য বলেছেন। তারপর তিনি বললেন: আবূ হাযিম, আমি যদি জানতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার কি পাওনা আছে?
- আপনি আপনার কর্মকে আল্লাহর কিতাবের কাছে উপস্থাপন করুন, জানতে পারবেন।
- আল্লাহর কিতাব কোথায় পাব?
- আপনি তা পাবেন আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে:
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ.
- সৎকর্মশীলরা থাকবে জান্নাতে এবং দুষ্কর্মীরা থাকবে জাহান্নামে।
খলীফা বললেন: তাহলে আল্লাহর যে রহমতের কথা বলা হয় তা কোথায়?
আবূ হাযিম বললেন:
إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
- নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।
খলীফা- হায়, আমি যদি জানতে পারতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার আগমন কেমন হবে?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের আগমন হবে একজন প্রবাসীর তার পরিবারে ফিরে আসার মত। আর একজন অসৎকর্মশীলের আগমন হবে একজন পালিয়ে যাওয়া দাসের মত যাকে ধরে টেনে-হেঁচড়ে আবার তার মনিবের কাছে আনা হয়।
এরপর খলীফা কেঁদে দিলেন। সে কান্নার আওয়াজ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠলো। তারপর একটু সুস্থির হয়ে বললেন: আবু হাযিম, এর থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কি?
আবূ হাযিম- আপনারা আপনাদের ভিতরের গর্ব-অহঙ্কারের মলিনতা দূর করে আত্মমর্যাদাবোধের পরিচ্ছদ ধারণ করুন।
খলীফা- আর এই যে অর্থ-বিত্ত এ ক্ষেত্রে খোদাভীতির পথ কি?
আবূ হাযিম- যদি তা সঠিকভাবে অর্জন করেন, সঠিকভাবে রক্ষা করেন, সমভাবে বণ্টন করেন এবং এ ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সেটাই হবে খোদাভীতি।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমাকে বলুন তো, সবচেয়ে ভালো মানুষ কে?
আবূ হাযিম- আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী খোদাভীরু মানুষ।
খলীফা- আবূ হাযিম, বলুন তো সবচেয়ে ভালো কথা কোনটি?
আবূ হাযিম- যদি কোন ব্যক্তি কাউকে ভয় করে অথবা কারো নিকট কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করে এবং তার মুখের উপর যদি সত্য কথাটি বলে দেয় তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো কথা।
খলীফা- আবূ হাযিম, কোন দু'আ সবচেয়ে বেশী তাড়াতাড়ি কবুল হয়?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের দু'আ সৎকর্মশীলদের জন্য।
খলীফা- সবচেয়ে ভালো সাদাকা (দান) কোনটি?
আবূ হাযিম- একজন স্বল্পবিত্তের মানুষ একজন হত-দরিদ্র মানুষের হাতে যা কিছু তুলে দেয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো দান। যদি না তার পেছনে খোঁটা অথবা কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য হয়।
খলীফা- সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের সুযোগ পেয়ে তা বাস্তবায়ন করে এবং মানুষকে তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, সেই সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান।
খলীফা- তাহলে সবচেয়ে বেশী নির্বোধ কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি তার বন্ধুর ইচ্ছা অনুযায়ী চলে এবং সেই বন্ধুটিও একজন অত্যাচারী। তখন সে মূলতঃ তার আখিরাতকে অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি কি আমাদেরকে সঙ্গ দিতে পারেন? আপনি আমাদের থেকে কিছু গ্রহণ করবেন এবং আমরা আপনার থেকে কিছু গ্রহণ করবো।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, তা সম্ভব নয়।
খলীফা- কেন?
আবূ হাযিম- আমার ভয় হয়, আমি আপনাদের উপর একটু নির্ভরশীল হয়ে পড়ি কিনা। আর তাহলে আল্লাহ আমাকে বেশী করে দুনিয়ার কষ্ট ও আখিরাতের শাস্তি দিবেন。
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা আমার কাছে একটু ব্যক্ত করুন।
এবার আবূ হাযিম কোন জবাব না দিয়ে চুপ থাকলেন। তারপর বললেন: আপনার চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান সত্তার নিকট আমি তা পেশ করেছি। তিনি সেই প্রয়োজনের যতটুকু আমাকে দেন হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করি। আর যতটুকু না দেন, আমি খুশী থাকি।
খলীফা আবার বললেন: আবূ হাযিম, আমার কাছে আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা একটু বলুন, যেভাবেই হোক আমি তা পূরণ করবো।
আবু হাযিম- আমার প্রয়োজন এই যে, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান এবং জান্নাতে প্রবেশ করান।
খলীফা- আবূ হাযিম, সেটাতো আমার কাজ নয়।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, এছাড়া আমার তো আর কোন প্রয়োজন নেই।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমার জন্য দু'আ করুন।
আবূ হাযিম- হে আল্লাহ, সুলায়মান যদি আপনার প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথকে সহজ করে দিন। আর যদি তিনি আপনার শত্রুদের একজন হন তাহলে তাঁকে সংশোধন করে দিন এবং আপনি যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন সেদিকে চলার পথ তাঁকে দেখিয়ে দিন।
এ দু'আ শুনে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো : আপনি আমীরুল মু'মিনীনের দরবারে ঢোকার পর থেকে যা কিছু বলেছেন তার মধ্যে এ দু'আটি হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আপনি মুসলমানদের খলীফাকে আল্লাহর দুশমনদের মধ্যে গণ্য করে তাঁকে কষ্ট দিয়েছেন। জবাবে আবূ হাযিম বললেন: আপনার কথা ঠিক নয়। বরং আপনি যা বললেন সেটাই নিকৃষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলা 'আলিমদের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তারা যেন সত্য কথা বলেন।
আল্লাহ বলেন : لَتُبَيِّنَنُهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ
অবশ্যই তোমরা তা মানুষের কাছে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।
একথা বলার পর তিনি আমীরুল মু'মিনীনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমাদের পূর্বে পৃথিবীর যে সব জাতি-গোষ্ঠী অতিক্রান্ত হয়েছে তারা ততদিন শুভ ও কল্যাণের মধ্যে থেকেছে যতদিন তাদের শাসকগণ তাঁদের 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁদের নিকট গিয়েছেন। তারপর এমন এক নির্বোধ শ্রেণীর লোকের উদ্ভব হয় যারা জ্ঞান অর্জন করে। অতঃপর তার বিনিময়ে পার্থিব কিছু প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তা নিয়ে শাসকদের দরবারে উপস্থিত হয়। ফলে শাসকরা 'আলিমদের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি হারিয়ে ফেলে। সুতরাং তারা বিফল ও ব্যর্থ হয়েছে এবং আল্লাহর কাছেও হেয় ও অপমানিত হয়েছে। 'আলিমরা যদি শাসকদের নিকট যা আছে তার প্রতি অনাসক্তি ও বীতস্পৃহা দেখায় তাহলে শাসকরা তাদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়। কিন্তু 'আলিমরা যখনই শাসকদের নিকট যা কিছু আছে তার প্রতি আসক্ত হয়েছে, তখনই তাঁরা 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি নিরাসক্ত হয়েছে এবং তাঁদেরকে হেয় ও অপমান করেছে।
খলীফা- আপনি সত্য বলেছেন। আমাকে আরো একটু উপদেশ বাণী শোনান। আমি এমন কাউকে দেখিনি, আপনার চেয়ে জ্ঞান ও বিজ্ঞতা যার মুখের অধিক নিকটবর্তী।
আবু হাযিম বললেন, যদি আপনি বাস্তবায়নকারী লোক হন তাহলে এ পর্যন্ত আমি যা কিছু বলেছি তাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর যদি তা না হন তাহলে এমন ধনুক থেকে তীর নিক্ষেপ করা আমার উচিত হবে না যাতে ছিলা নেই।
খলীফা বললেন: আবূ হাযিম, আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনি আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন।
আবূ হাযিম বললেন: হাঁ, আপনাকে খুব সংক্ষিপ্ত কয়েকটি উপদেশমূলক কথা বলছি:- আপনার মহামহিম প্রভুকে অতি বড় করে দেখুন। আর যেখানে আপনাকে তিনি যেতে নিষেধ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে পান এবং যেখানে যেতে আদেশ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে না পান- এ ব্যাপারে তাঁকে আপনি পবিত্র ঘোষণা করুন। আর একথা জেনে রাখুন, এই শাসন কর্তৃত্ব আপনার পূর্ববর্তী একজনের মৃত্যুর পরেই কেবল আপনার হাতে এসেছে। সুতরাং আপনার হাত থেকে সেভাবেই চলে যাবে যেভাবে আপনি লাভ করেছেন।
একথা বলার পর তিনি সালাম দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হন। খলীফা তখন বললেন:
- আল্লাহ আপনার মত উপদেশ দানকারী 'আলিমকে ভালো প্রতিদান দিন।
আবূ হাযিম খলীফার নিকট থেকে উঠে বাড়ীতে পৌছার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দীনার ভর্তি একটি থলে নিয়ে খলীফার লোক হাজির হলো। সাথে একটি ছোট্ট চিঠিও নিয়ে এসেছে। তাতে লেখা আছে : 'এগুলো আপনি খরচ করুন। এ রকম আরো অনেক কিছুই আপনি আমার কাছ থেকে পাবেন।'
আবূ হাযিম দীনার ভর্তি থলেটি ফেরত পাঠালেন একথা বলে : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা হাসি-তামাশা এবং আপনার কাছে আমার এই ফিরিয়ে দেওয়া অহেতুক ও অসার হওয়ার ব্যাপারে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। হে আমীরুল মু'মিনীন, যে জিনিস আমি আপনার কাছে থাকা পছন্দ করিনে তা আমার কাছে থাকবে, সেটা আমি কিভাবে পছন্দ করতে পারি? হে আমীরুল মু'মিনীন, এই দীনার যদি আপনার সাথে সাক্ষাতের সময় যেসব কথা আমি আপনাকে বলেছি তার বিনিময়ে হয় তাহলে আমার অসহায় অবস্থায় আমার জন্য মৃত জীব-জন্তু ও শূকরের গোশত এর চেয়ে বেশী হালাল হবে। আর এগুলো যদি বায়তুল মালে আমার অধিকারের অংশ হয় তাহলে এ অধিকারে কি আমার ও অন্যসব লোকদের মধ্যে সমতা বিধান করা হয়েছে?
আবু হাযিম সালামার বাড়ীটি ছিল জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, সৎকর্ম ও কল্যাণের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য একটি সুস্বাদু পানির ঝর্নাস্বরূপ। আত্মীয়, বন্ধু, ভক্ত ও শিক্ষার্থী সবাই সমানভাবে সেখানে ভীড় জমাতো। একবার 'আবদুর রহমান ইবন জারীর তাঁর ছেলেকে সংগে করে আবূ হাযিমের বাড়ীতে গেলেন এবং দু'জনই তাঁর পাশে বসলেন। তারপর তাঁরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাঁর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে দু'আ করলেন। আবু হাযিম তাঁদের সালামের জবাব দিয়ে তাঁদেরকে স্বাগত জানালেন। তারপর তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা আরম্ভ হলো। 'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবু হাযিম, আমরা অন্তরের জাগরণ দ্বারা কিভাবে উপকৃত হই?
আবূ হাযিম: অন্তর পরিশুদ্ধির সময় সকল কবীরা গুনাহ মাফ করা হয়। বান্দা যখন পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে বিজয়ী হয়। 'আবদুর রহমান, একথা ভুলে যেও না যে, দুনিয়ার অতি সামান্য জিনিস আমাদেরকে আখিরাতের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত রাখে। আর যেসব অর্থ-সম্পদ আমাদেরকে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকটবর্তী করে না তা সবই আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধ বলে জানবে। ছেলে বললো: আয়াদের শায়খ তথা মাননীয় ব্যক্তি অনেক। আমরা কার অনুসরণ করবো?
আবূ হাযিম: আমার প্রিয় ছেলে, তুমি সেই ব্যক্তির অনুসরণ করবে যে গোপন বিষয় প্রকাশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ও পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, জীবনের শুরুতেই নিজেকে সংশোধন করে এবং সংশোধনের কাজটি বার্দ্ধক্যে করবে বলে অপেক্ষা করে না। ছেলে, তুমি জেনে রাখ, সূর্য উদিত হয় এমন প্রত্যেকটি দিনে একজন তালিবে 'ইলম (জ্ঞান অন্বেষণকারী)-এর অন্তর মাঝে তার প্রবৃত্তি ও জ্ঞান মুখোমুখি হয় এবং দু'জন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তির মত পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যদি তার জ্ঞান তার প্রবৃত্তিকে পরাজিত করতে পারে তাহলে সেদিনটি তার বড় লাভের দিন হয়ে থাকে। আর যদি তার প্রবৃত্তি তার জ্ঞানকে পরাজিত করে তাহলে সেটি তার বড় ক্ষতির দিন হয়ে থাকে।
'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবূ হাযিম, আপনি প্রায়ই আমাদেরকে শোকর (কৃতজ্ঞতা)-এর ব্যাপারে উৎহাসিত করে থাকেন। এই শোকর-এর প্রকৃতি ও গূঢ় রহস্য কি?
আবূ হাযিম- আমাদের দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর শোকর-এর একটি হক বা অধিকার আছে।
আবদুর রহমান প্রশ্ন করলেন: দু' চোখের শোকর কি?
আবূ হাযিম- যদি আপনি তাদের দ্বারা ভালো কিছু দেখেন, প্রকাশ করবেন। আর খারাপ কিছু দেখলে গোপন করবেন।
আবদুর রহমান- দু'কানের শোকর কি?
আবূ হাযিম- তাদের দ্বারা ভালো কিছু শুনলে মনে রাখবেন। আর খারাপ কিছু শুনলে ভুলে যাবেন।
আবদুর রহমান- দু'হাতের শোকর কি?
আবূ হাযিম- আপনার যা নয়, তাদের দ্বারা তা ধরবেন না। আর তাদের দ্বারা আল্লাহর কোন হক বা অধিকারে বাধা দিবেন না। ওহে আবদুর রহমান, একথা স্মরণ রাখবেন যে, যে ব্যক্তি তার শোকর বা কৃতজ্ঞতা কেবল জিহ্বার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং তার সাথে তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তরের সবটুকু অংশীদার করে না, তার দৃষ্টান্ত হলো সেই ব্যক্তির মত যার একটি চাদর আছে, কিন্তু তার সবটুকু গায়ে না জড়িয়ে শুধু একটি পাশ গায়ে জড়ায়। ফলে সেটি তাকে গরম ও ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারে না।
একবার সালামা ইবন দীনার আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মুসলিম মুজাহিদদের সাথে বের হলেন। মুজাহিদদের এ বাহিনীটি রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য যাচ্ছিল। তারা তাদের গন্তব্য স্থলের কাছাকাছি পৌছে শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে একটু বিশ্রাম করে নিতে চাইলো। এই বাহিনীতে বানু উমাইয়্যার একজন আমীর বা শাসক ছিলেন। এই বিশ্রামকালীন সময়ে তিনি আবু হাযিমের কাছে একজন লোক পাঠালেন। তিনি লোকটিকে বলে দিলেন, তুমি আবূ হাযিমের নিকট গিয়ে এই কথাটি বলবে: হাদীছ ও ফিকাহ্ মাসলা-মাসায়িল বলার জন্য আমীর আপনাকে একটু ডেকে পাঠিয়েছেন।
একথা শোনার সাথে সাথে আবূ হাযিম লিখলেন: 'হে আমীর, আমি এমন সব জ্ঞানী ব্যক্তির সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভ করেছি যাঁরা কখনো দীনকে দুনিয়াদার ব্যক্তির কাছে বয়ে নিয়ে যাননি। আমি মনে করি না যে, যারা এমন কাজ করবে তাদের প্রথম ব্যক্তি আপনি আমাকে বানাতে চান। আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকলে আপনি নিজেই আসুন। ওয়াস্ সালামু 'আলায়কা ওয়া 'আলা মান মা'আকা- আপনার প্রতি ও আপনার সাথে যারা আছে তাদের সবার প্রতি সালাম।'
আমীর চিঠিটি পড়ে তাঁর কাছে গেলেন, কুশল বিনিময় করলেন এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির দু'আ করে বললেন: আবূ হাযিম, আপনি যা লিখেছেন তার সাথে আমি একমত। এ চিঠির মাধ্যমে আপনি আমাদের মধ্যে আপনার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে ফেলেছেন। এখন আপনি আমাদেরকে কিছু উপদেশ দান করুন। আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন।
আবূ হাযিম তাঁকে অনেক উপদেশ দিলেন। তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার কিছু এ রকম: শুনুন! যা আখিরাতে আপনার সাথে থাকুক বলে আপনি চান, দুনিয়াতে তা পেতে লোভ করুন। আর সেখানে যা আপনার সাথে থাকা আপনি অপছন্দ করেন, এখানেই তার প্রতি নিরাসক্ত হোন। ওহে আমীর, জেনে রাখুন, মিথ্যা ও অসত্য যদি আপনার প্রিয় হয় এবং আপনার দ্বারা প্রচলিত হয় তাহলে কপট লোকেরা ও বাতিলপন্থীরা আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং আপনার পাশে ভীড় করবে। আর যদি সত্য আপনার প্রিয় হয় এবং আপনি তা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সৎকর্মশীলরা আপনার পাশে সমবেত হবে এবং আপনাকে সত্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। সুতরাং আপনি এ দু'টির যেটি আপনার ভালো লাগে, বেছে নিন।
হিজরী ১৪০ সনে অথবা তার পরে আবূ হাযিমের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে প্রশ্ন করলো : আবূ হাযিম, আপনি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছেন? বললেন : দুনিয়ার যা কিছু আমি লাভ করেছি তার মন্দ থেকে যদি আমি মুক্তি পাই তাহলে যা কিছু সরিয়ে ও গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা আমাকে ক্ষতি করবে না। তারপর তিনি নিম্নের এ আয়াতটি বার বার আবৃত্তি করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন:
إن الذين امنوا وعملوا الصالحات سيجعل لهم الرحمن ودا .
- যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালবাসা দেবেন।
টিকাঃ
১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৪
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
৩. তাহযীবুল আসমা/-২/২০৮
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৫. প্রাগুক্ত-৪/১৪৩; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৩
৬. তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৯. প্রাগুক্ত
১০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৩
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
১২. শাযারাত আয-যাহাব-১/২০৮; তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
১৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৩৯; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৯
১৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৬৪, ১৯১
১৬. প্রাগুক্ত-৩/১২৮
১৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/২৪৩
১৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৬
১৯. সূরা আল-ইনফিতার-১৩-১৪
২০. সূরা আল-আ'রাফ-৫৬
২১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৬৩; 'উয়ুন আল-আখবার-২/৩৭০; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৪২; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিয়ীন-১৮২-১৯২; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩-৩৪৭
২২. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯২-১৯৪; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩
২৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৮৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৪
২৪. প্রাগুক্ত
২৫. সূরা মারয়াম-৯৬
২৬. সুওয়ারুন নিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯৬
হযরত সালামার (রহ) ডাক নাম ছিল আবূ হাযিম। বংশগতভাবে তিনি ছিলেন অনারব। পিতা দীনার ছিলেন ইরানী এবং মাতা ছিলেন রোমান। আল-আসওয়াদ ইবন সুফইয়ান আল-মাখযূমীর দাস ছিলেন। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁকে মাখযূমী বলা হতো। ইতিহাসে তিনি আবূ হাযিম আল-আ'রাজ নামেও পরিচিত।
পিতা-মাতা উভয়ের দিক থেকে যদিও তিনি অনারব বংশোদ্ভূত ছিলেন, তবুও ইসলামের সাম্য ও সমতার কল্যাণে মদীনার শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং একজন তাপস ও ভোগ- বিলাস বিমুখ 'আলিমে পরিগণিত হন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন : "الواعظ الزاهد عالم المدينة وشيخها" - তিনি একজন দুনিয়া-বিরাগী উপদেশদানকারী, মদীনার 'আলিম ও শায়খ। ইমাম নাওবী বলেছেন: তাঁর বিশ্বস্ততা, মহত্ব ও প্রশংসায় সকলে একমত।
তিনি হাদীছের একজন বড় হাফিজ ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন : "كان ثقة كثير الحديث" - তিনি ছিলেন বহু হাদীছ স্মৃতিতে ধারণকারী বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সাহল ইবন সা'দ আস-সা'ইদী, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শোনেন। তবে বহু মুহাদ্দিছ মনে করেন শেষোক্ত দুই সাহাবীর নিকট থেকে তাঁর সরাসরি হাদীছ শোনা প্রমাণিত নয়। বিপুল সংখ্যক বিখ্যাত তাবি'ঈর নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং তাঁদের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এখানে তাঁর কয়েকজন তাবি'ঈ শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হলো :
উমামা ইবন সাহল ইবন হুনায়ফ, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন যুবায়র, 'আবদুল্লাহ ইবন আবী কাতাদা, নু'মান ইবন আবী 'আয়্যাশ, ইয়াযীদ ইবন রূমান, 'উবায়দুল্লাহ ইবন মুকাসিম, আবূ ইবরাহীম ইবন 'আবদির রহমান, না'জা ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ সালিহ আল-সাম্মান, আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান, ইবন মুনকাদির ও আরো অনেকে।
তাঁর ছাত্র ও শাগরিদদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলো: যুহরী, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন ইসহাক, ইবন 'আজলান, ইবন আবী জি'ব, মালিক, হাম্মাদ, সুফইয়ান, সুলায়মান ইবন হিলাল, সা'ঈদ ইবন আবী হিলাল, 'আমর ইবন 'আলী, আবূ গাসসান আল-মাদানী, হিশাম ইবন সা'ঈদ, উহায়ব ইবন খালিদ, আবূ সাখর হুমায়দ ইবন যিয়াদ আল-খাররাত, উসামা ইবন যায়দ লায়ছী, মুহাম্মাদ ইবন জা'ফার ইবন আবী কাছীর, আফলাহ ইবন সুলায়মান আন-নামিরী প্রমুখ।
ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর পূর্ণ দখল ছিল। তিনি ছিলেন মদীনার একজন বিখ্যাত ফকীহ্। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী ও অন্যরা তাঁকে ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তিনি স্বভাবগত ফকীহ্ ছিলেন। তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তিনি ছিলেন একজন দৃঢ়পদ ফকীহ্ ও উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি। ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর গভীর জ্ঞানের প্রমাণ এই যে, তিনি মদীনাতুর রাসূলের একজন কাজী ছিলেন।
মদীনায় তিনি মানুষকে ও'য়াজ-নসীহতের দায়িত্বও পালন করতেন। 'ইবাদাত-বন্দেগীর দিক দিয়ে তিনি মদীনার বড় বড় 'আবিদ ব্যক্তিদের মধ্যে পরিগণিত ছিলেন। ইবন হিব্বান বলেন, তিনি মদীনার 'আবিদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। ইমাম যাহাবী, ইমাম নাওবী, ইবন হাজার ও আরো অনেকে তাঁর নামের সাথে 'যাহিদ' (দুনিয়া-বিরাগী) শব্দটি লিখেছেন। মোটকথা, সব দিক দিয়ে মহান তাবি'ঈ স্তরের মধ্যে তিনি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।
আল-জাহিজ (মৃ. হি. ২৫৫) তাঁর 'আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন' গ্রন্থে বিখ্যাত তাপস ও দুনিয়া-বিরাগী মানুষ যাঁরা বয়ান ও বাগ্মিতায়ও পারদর্শী ছিলেন, তাঁদের নামের সাথে তাঁর নামটিও উল্লেখ করেছেন।
আমীর-উমারা ও শাসক শ্রেণী থেকে সবসময় দূরে থাকতেন। কখনো কোন প্রয়োজনে তাঁদের কাছে ঘেঁষতেন না। একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক ইমাম যুহরীর মাধ্যমে তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠান। তিনি যুহরীকে বলেন, যদি সুলায়মানের আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকে তাহলে তাঁকেই আমার কাছে আসা উচিত। আমার তো তাঁর কাছে কোন প্রয়োজন নেই।
ধর্মীয় ও নৈতিক গুণাবলীর পূর্ণতা ও উৎকর্ষতার সাথে সাথে যথেষ্ট জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবন আসলাম বলেন, আমি এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিনি যার কথা আবূ হাযিমের কথার চেয়ে বেশী বিজ্ঞতাপূর্ণ। ইবন খুযায়মা বলেন, উপদেশমূলক কথাবার্তায় তাঁর সময়ে আর কেউ তাঁর মত ছিলেন না। তাঁর এমন অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী পাওয়া যায় যা দ্বারা তাঁর বিজ্ঞতার অনুমান করা যায়।
তিনি বলতেন, এমন সব কাজ যার কারণে মরণই শ্রেয় মনে হয় তা পরিহার কর। তারপর যখনই মৃত্যু আসুক তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যে বান্দা তার নিজের ও তার প্রভুর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ যথাযথভাবে পালন করে এবং সম্পর্কসমূহ ভালোমত বজায় রাখে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার সব সম্পর্ক ঠিক রাখেন। আর যে বান্দা তার ও আল্লাহর মাঝের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালনে অবহেলা করে আল্লাহ অন্য বান্দাদের সাথে তার পারস্পরিক দায়িত্বসমূহ পালনের ব্যাপারে অবহেলার ভাব সৃষ্টি করে দেন। এক সত্তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা একাধিক ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার চেয়ে অনেক সহজ কাজ। অর্থাৎ এক আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে গোটা পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ভালো হয়ে যাবে। একবার খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারি? বললেন: এটা খুবই সহজ কাজ। প্রত্যেকটি জিনিস বৈধ পন্থায় গ্রহণ করুন এবং বৈধ খাতসমূহে তা ব্যয় করুন। হিশাম বললেন, এ কাজ সেই ব্যক্তিই করতে পারেন যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা থেকে বাঁচার ব্যাপারে আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছেন। তিনি বললেন: আর এ কারণে জিন ও মানুষে জাহান্নাম ভরে যাবে। তিনি বলতেন:
যে আমলের কারণে তুমি মৃত্যুকে অপছন্দ কর সে আমল ছেড়ে দাও। তারপর তোমার মৃত্যু যখনই আসুক তোমার কোন ক্ষতি হবে না।
তিনি বলতেন: আমরা সবাই তাওবা না করা পর্যন্ত মরতে চাই না। আর আমরা না মরা পর্যন্ত তাওবা করি না। খলীফা আবদুল মালিকের অন্তিম সময় যখন উপস্থিত, তখন দেখলেন একজন ধোপা হাত দিয়ে কাপড় কচলাচ্ছে। খলীফার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো 'হায়! আমি যদি একজন ধোপা হতাম এবং প্রতিদিন যা উপার্জন করতাম তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতাম।' একথা আবূ হাযিমকে শোনানো হলে তিনি বলে ওঠেন: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁদেরকে মরণকালে সেই আশা-আরজু দান করেছেন যার মধ্যে আমরা সবসময় আছি। মরণকালে আমরা জীবনকালে তারা যে অবস্থায় আছে তা কামনা করবো না।
তিনি বললেন: দুনিয়া বহু জাতি-গোষ্ঠীকে ধোঁকা দিয়েছে। তারা এ দুনিয়াতে অন্যায় ও অপকর্ম করেছে। যখন মৃত্যু এসে গেছে তখন তারা তাদের সবকিছু এমন লোকদের জন্যে ছেড়ে গেছে যারা তাদের কোন প্রশংসা করেনি এবং এমন সত্তার কাছে চলে গেছে যিনি তাদের কোন ওজর-কৈফিয়াত শুনবেন না। আমরা তাদের উত্তরাধিকারী হয়েছি। সুতরাং আমাদের উচিত হবে, তাদের যে জিনিসগুলো আমরা অপছন্দ করি তা থেকে দূরে থাকা এবং যা পছন্দ করি তা 'আমল করা।
একবার তিনি কোন এক প্রয়োজনে তৎকালীন শাসকের নিকট যান এবং এভাবে নিজের কথা তুলে ধরেন: একটি প্রয়োজনে আমি আপনার নিকট এসেছি এবং সেই প্রয়োজনের কথাটি পূর্বেই আল্লাহকে জানিয়েছি। এখন আল্লাহ যদি তা পূরণের জন্য আপনাকে অনুমতি দেন তাহলে আপনি পূরণ করুন। আমরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। আর তিনি যদি পূরণের অনুমতি না দেন, আপনি পূরণ করবেন না এবং সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাকে মাজুর বা অপারগ মনে করবো।'
একবার তিনি ফলের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। ফল দেখে তিনি বললেন : তোমার সাথে আমার দেখা হবে জান্নাতে। আরেকবার তিনি গোশতের বাজার দিয়ে যাচ্ছেন। কসাইরা বললো : আবূ হাযিম, ভালো গোশত আছে, কিছু খরিদ করুন। বললেন : আমার কাছে কেনার মত পয়সা নেই। তারা বললো: পয়সা আপনি পরে দিবেন। তিনি বললেন: গোশত আমি পরেই খাব।
হিজরী ৯৭ সনে উমাইয়্যা খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক মদীনার মসজিদে নববীতে নামায আদায় এবং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি সালাম পেশের উদ্দেশ্যে দিমাশক থেকে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করেন। বহু কারী, মুহাদ্দিছ, ফকীহ্, 'আলিম, আমীর- উমারা ও সেনাকর্মকর্তা তাঁর সফরসঙ্গী হন। মদীনায় পৌছে একটু স্থির হবার পর সেখানকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ জনগণ তাঁকে সালাম ও স্বাগতম জানানোর জন্যে উপস্থিত হলো। কিন্তু সালামা ইবন দীনার, যিনি হলেন মদীনার কাজী, সর্বজনমান্য 'আলিম, ও নির্ভরযোগ্য ইমাম, গেলেন না। সুলায়মান ইবন 'আবিদল মালিক তাঁর নিকট আগত লোকদের সাথে সাক্ষাৎ দান ও কুশল বিনিময় শেষ করলেন। তারপর তিনি তাঁর কিছু সঙ্গী-সাথীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: খনিজ পদার্থে যেমন মরিচা পড়ে তেমনি মানুষের অন্তরেও মরিচা পড়ে যদি না তাকে কেউ উপদেশ দিয়ে তার মরিচা সাফ করে। তারা বললো: আমীরুল মু'মিনীন ঠিক কথাই বলেছেন।
সুলায়মান বললেন: মদীনাতে কি এমন কোন লোক নেই, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বেশ কিছু সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, আমাদেরকে উপদেশ দান করতে পারেন? লোকেরা বললো: হাঁ, আমীরুল মু'মিনীন, আবূ হাযিম আল-আ'রাজ আছেন। তিনি জানতে চাইলেন আবূ হাযিম আল-আ'রাজ কে?
তারা বললো: সালামা ইবন দীনার- মদীনার 'আলিম ও ইমাম এবং যেসব তাবি'ঈ বিপুল সংখ্যক সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন তাঁদেরই একজন। সুলায়মান বললেন: তাহলে তাঁকেই আমার কাছে নিয়ে এসো। তবে খুব সম্মানের সাথে আনবে। লোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে খলীফার নিকট যাওয়ার জন্য বললো। তিনি রাজী হলেন।
সালামা খলীফার দরবারে উপস্থিত হলে খলীফা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে নিজের কাছে বসালেন। তখন সেখানে ইবন শিহাব যুহরীও (রহ) বসা ছিলেন। তারপর খলীফা একটি অভিযোগের সুরে তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন:
- আবূ হাযিম! এ কেমন উপেক্ষা?
- আমীরুল মু'মিনীন! আমার মধ্যে আপনি কি ধরনের উপেক্ষা লক্ষ্য করলেন?
- বহু মানুষ আমার সাথে দেখা করতে এসেছে, অথচ আপনি আসলেন না!
- উপেক্ষা তো হয় পরিচয়ের পর। আপনি তো এর আগে আমাকে চিনতেন না, আর আমিও এর পূর্বে আপনাকে কখনো দেখিনি। তাহলে আমার দিক থেকে উপেক্ষা হলো কিভাবে?
খলীফা তখন তাঁর সঙ্গী-সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন: শায়খ তাঁর কৈফিয়াত দানে ঠিক করেছেন, আর খলীফা তাঁর প্রতি অভিযোগ করে ভুল করেছে। তারপর তিনি আবূ হাযিমের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন:
- ওহে আবূ হাযিম, আমার অন্তর মাঝে কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জমা হয়ে আছে, আমি তা আপনার নিকট ব্যক্ত করতে চাই।
- আমীরুল মু'মিনীন, বলুন। আল্লাহ সাহায্যকারী।
- ওহে আবূ হাযিম, আমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করি কেন?
- এ জন্য যে, আমরা দুনিয়াকে আবাসস্থল বানিয়েছি এবং আখিরাতকে বিধ্বস্ত করেছি। তাই আবাসস্থল ছেড়ে বিধ্বস্ত ভূমিতে যেতে অপছন্দ করি।
- আপনি সত্য বলেছেন। তারপর তিনি বললেন: আবূ হাযিম, আমি যদি জানতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার কি পাওনা আছে?
- আপনি আপনার কর্মকে আল্লাহর কিতাবের কাছে উপস্থাপন করুন, জানতে পারবেন।
- আল্লাহর কিতাব কোথায় পাব?
- আপনি তা পাবেন আল্লাহর এই বাণীর মধ্যে:
إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ.
- সৎকর্মশীলরা থাকবে জান্নাতে এবং দুষ্কর্মীরা থাকবে জাহান্নামে।
খলীফা বললেন: তাহলে আল্লাহর যে রহমতের কথা বলা হয় তা কোথায়?
আবূ হাযিম বললেন:
إِنَّ رَحْمَةَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِنَ الْمُحْسِنِينَ.
- নিশ্চয় আল্লাহর করুণা সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।
খলীফা- হায়, আমি যদি জানতে পারতাম, আগামীকাল আল্লাহর কাছে আমার আগমন কেমন হবে?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের আগমন হবে একজন প্রবাসীর তার পরিবারে ফিরে আসার মত। আর একজন অসৎকর্মশীলের আগমন হবে একজন পালিয়ে যাওয়া দাসের মত যাকে ধরে টেনে-হেঁচড়ে আবার তার মনিবের কাছে আনা হয়।
এরপর খলীফা কেঁদে দিলেন। সে কান্নার আওয়াজ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠলো। তারপর একটু সুস্থির হয়ে বললেন: আবু হাযিম, এর থেকে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কি?
আবূ হাযিম- আপনারা আপনাদের ভিতরের গর্ব-অহঙ্কারের মলিনতা দূর করে আত্মমর্যাদাবোধের পরিচ্ছদ ধারণ করুন।
খলীফা- আর এই যে অর্থ-বিত্ত এ ক্ষেত্রে খোদাভীতির পথ কি?
আবূ হাযিম- যদি তা সঠিকভাবে অর্জন করেন, সঠিকভাবে রক্ষা করেন, সমভাবে বণ্টন করেন এবং এ ক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সেটাই হবে খোদাভীতি।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমাকে বলুন তো, সবচেয়ে ভালো মানুষ কে?
আবূ হাযিম- আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী খোদাভীরু মানুষ।
খলীফা- আবূ হাযিম, বলুন তো সবচেয়ে ভালো কথা কোনটি?
আবূ হাযিম- যদি কোন ব্যক্তি কাউকে ভয় করে অথবা কারো নিকট কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা করে এবং তার মুখের উপর যদি সত্য কথাটি বলে দেয় তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো কথা।
খলীফা- আবূ হাযিম, কোন দু'আ সবচেয়ে বেশী তাড়াতাড়ি কবুল হয়?
আবূ হাযিম- সৎকর্মশীলদের দু'আ সৎকর্মশীলদের জন্য।
খলীফা- সবচেয়ে ভালো সাদাকা (দান) কোনটি?
আবূ হাযিম- একজন স্বল্পবিত্তের মানুষ একজন হত-দরিদ্র মানুষের হাতে যা কিছু তুলে দেয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো দান। যদি না তার পেছনে খোঁটা অথবা কষ্ট দেওয়া উদ্দেশ্য হয়।
খলীফা- সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের সুযোগ পেয়ে তা বাস্তবায়ন করে এবং মানুষকে তা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে, সেই সবচেয়ে বেশী বুদ্ধিমান।
খলীফা- তাহলে সবচেয়ে বেশী নির্বোধ কে?
আবূ হাযিম- যে ব্যক্তি তার বন্ধুর ইচ্ছা অনুযায়ী চলে এবং সেই বন্ধুটিও একজন অত্যাচারী। তখন সে মূলতঃ তার আখিরাতকে অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি কি আমাদেরকে সঙ্গ দিতে পারেন? আপনি আমাদের থেকে কিছু গ্রহণ করবেন এবং আমরা আপনার থেকে কিছু গ্রহণ করবো।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, তা সম্ভব নয়।
খলীফা- কেন?
আবূ হাযিম- আমার ভয় হয়, আমি আপনাদের উপর একটু নির্ভরশীল হয়ে পড়ি কিনা। আর তাহলে আল্লাহ আমাকে বেশী করে দুনিয়ার কষ্ট ও আখিরাতের শাস্তি দিবেন。
খলীফা- আবূ হাযিম, আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা আমার কাছে একটু ব্যক্ত করুন।
এবার আবূ হাযিম কোন জবাব না দিয়ে চুপ থাকলেন। তারপর বললেন: আপনার চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান সত্তার নিকট আমি তা পেশ করেছি। তিনি সেই প্রয়োজনের যতটুকু আমাকে দেন হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করি। আর যতটুকু না দেন, আমি খুশী থাকি।
খলীফা আবার বললেন: আবূ হাযিম, আমার কাছে আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা একটু বলুন, যেভাবেই হোক আমি তা পূরণ করবো।
আবু হাযিম- আমার প্রয়োজন এই যে, আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান এবং জান্নাতে প্রবেশ করান।
খলীফা- আবূ হাযিম, সেটাতো আমার কাজ নয়।
আবূ হাযিম- আমীরুল মু'মিনীন, এছাড়া আমার তো আর কোন প্রয়োজন নেই।
খলীফা- আবূ হাযিম, আমার জন্য দু'আ করুন।
আবূ হাযিম- হে আল্লাহ, সুলায়মান যদি আপনার প্রিয় বান্দাদের একজন হয়ে থাকেন তাহলে আপনি তার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের পথকে সহজ করে দিন। আর যদি তিনি আপনার শত্রুদের একজন হন তাহলে তাঁকে সংশোধন করে দিন এবং আপনি যা ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন সেদিকে চলার পথ তাঁকে দেখিয়ে দিন।
এ দু'আ শুনে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো : আপনি আমীরুল মু'মিনীনের দরবারে ঢোকার পর থেকে যা কিছু বলেছেন তার মধ্যে এ দু'আটি হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। আপনি মুসলমানদের খলীফাকে আল্লাহর দুশমনদের মধ্যে গণ্য করে তাঁকে কষ্ট দিয়েছেন। জবাবে আবূ হাযিম বললেন: আপনার কথা ঠিক নয়। বরং আপনি যা বললেন সেটাই নিকৃষ্ট কথা। আল্লাহ তা'আলা 'আলিমদের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তারা যেন সত্য কথা বলেন।
আল্লাহ বলেন : لَتُبَيِّنَنُهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ
অবশ্যই তোমরা তা মানুষের কাছে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।
একথা বলার পর তিনি আমীরুল মু'মিনীনের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমাদের পূর্বে পৃথিবীর যে সব জাতি-গোষ্ঠী অতিক্রান্ত হয়েছে তারা ততদিন শুভ ও কল্যাণের মধ্যে থেকেছে যতদিন তাদের শাসকগণ তাঁদের 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁদের নিকট গিয়েছেন। তারপর এমন এক নির্বোধ শ্রেণীর লোকের উদ্ভব হয় যারা জ্ঞান অর্জন করে। অতঃপর তার বিনিময়ে পার্থিব কিছু প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে তা নিয়ে শাসকদের দরবারে উপস্থিত হয়। ফলে শাসকরা 'আলিমদের প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি হারিয়ে ফেলে। সুতরাং তারা বিফল ও ব্যর্থ হয়েছে এবং আল্লাহর কাছেও হেয় ও অপমানিত হয়েছে। 'আলিমরা যদি শাসকদের নিকট যা আছে তার প্রতি অনাসক্তি ও বীতস্পৃহা দেখায় তাহলে শাসকরা তাদের জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়। কিন্তু 'আলিমরা যখনই শাসকদের নিকট যা কিছু আছে তার প্রতি আসক্ত হয়েছে, তখনই তাঁরা 'আলিমদের জ্ঞানের প্রতি নিরাসক্ত হয়েছে এবং তাঁদেরকে হেয় ও অপমান করেছে।
খলীফা- আপনি সত্য বলেছেন। আমাকে আরো একটু উপদেশ বাণী শোনান। আমি এমন কাউকে দেখিনি, আপনার চেয়ে জ্ঞান ও বিজ্ঞতা যার মুখের অধিক নিকটবর্তী।
আবু হাযিম বললেন, যদি আপনি বাস্তবায়নকারী লোক হন তাহলে এ পর্যন্ত আমি যা কিছু বলেছি তাই আপনার জন্য যথেষ্ট। আর যদি তা না হন তাহলে এমন ধনুক থেকে তীর নিক্ষেপ করা আমার উচিত হবে না যাতে ছিলা নেই।
খলীফা বললেন: আবূ হাযিম, আমি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনি আমাকে আরো কিছু উপদেশ দিন।
আবূ হাযিম বললেন: হাঁ, আপনাকে খুব সংক্ষিপ্ত কয়েকটি উপদেশমূলক কথা বলছি:- আপনার মহামহিম প্রভুকে অতি বড় করে দেখুন। আর যেখানে আপনাকে তিনি যেতে নিষেধ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে পান এবং যেখানে যেতে আদেশ করেছেন সেখানে তিনি আপনাকে দেখতে না পান- এ ব্যাপারে তাঁকে আপনি পবিত্র ঘোষণা করুন। আর একথা জেনে রাখুন, এই শাসন কর্তৃত্ব আপনার পূর্ববর্তী একজনের মৃত্যুর পরেই কেবল আপনার হাতে এসেছে। সুতরাং আপনার হাত থেকে সেভাবেই চলে যাবে যেভাবে আপনি লাভ করেছেন।
একথা বলার পর তিনি সালাম দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হন। খলীফা তখন বললেন:
- আল্লাহ আপনার মত উপদেশ দানকারী 'আলিমকে ভালো প্রতিদান দিন।
আবূ হাযিম খলীফার নিকট থেকে উঠে বাড়ীতে পৌছার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে দীনার ভর্তি একটি থলে নিয়ে খলীফার লোক হাজির হলো। সাথে একটি ছোট্ট চিঠিও নিয়ে এসেছে। তাতে লেখা আছে : 'এগুলো আপনি খরচ করুন। এ রকম আরো অনেক কিছুই আপনি আমার কাছ থেকে পাবেন।'
আবূ হাযিম দীনার ভর্তি থলেটি ফেরত পাঠালেন একথা বলে : হে আমীরুল মু'মিনীন, আমার কাছে আপনার প্রত্যাশা হাসি-তামাশা এবং আপনার কাছে আমার এই ফিরিয়ে দেওয়া অহেতুক ও অসার হওয়ার ব্যাপারে আমি আল্লাহর আশ্রয় চাই। হে আমীরুল মু'মিনীন, যে জিনিস আমি আপনার কাছে থাকা পছন্দ করিনে তা আমার কাছে থাকবে, সেটা আমি কিভাবে পছন্দ করতে পারি? হে আমীরুল মু'মিনীন, এই দীনার যদি আপনার সাথে সাক্ষাতের সময় যেসব কথা আমি আপনাকে বলেছি তার বিনিময়ে হয় তাহলে আমার অসহায় অবস্থায় আমার জন্য মৃত জীব-জন্তু ও শূকরের গোশত এর চেয়ে বেশী হালাল হবে। আর এগুলো যদি বায়তুল মালে আমার অধিকারের অংশ হয় তাহলে এ অধিকারে কি আমার ও অন্যসব লোকদের মধ্যে সমতা বিধান করা হয়েছে?
আবু হাযিম সালামার বাড়ীটি ছিল জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, সৎকর্ম ও কল্যাণের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য একটি সুস্বাদু পানির ঝর্নাস্বরূপ। আত্মীয়, বন্ধু, ভক্ত ও শিক্ষার্থী সবাই সমানভাবে সেখানে ভীড় জমাতো। একবার 'আবদুর রহমান ইবন জারীর তাঁর ছেলেকে সংগে করে আবূ হাযিমের বাড়ীতে গেলেন এবং দু'জনই তাঁর পাশে বসলেন। তারপর তাঁরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাঁর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে দু'আ করলেন। আবু হাযিম তাঁদের সালামের জবাব দিয়ে তাঁদেরকে স্বাগত জানালেন। তারপর তাঁদের মধ্যে কথাবার্তা আরম্ভ হলো। 'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবু হাযিম, আমরা অন্তরের জাগরণ দ্বারা কিভাবে উপকৃত হই?
আবূ হাযিম: অন্তর পরিশুদ্ধির সময় সকল কবীরা গুনাহ মাফ করা হয়। বান্দা যখন পাপ কাজ ছেড়ে দেওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় তখন সে বিজয়ী হয়। 'আবদুর রহমান, একথা ভুলে যেও না যে, দুনিয়ার অতি সামান্য জিনিস আমাদেরকে আখিরাতের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত রাখে। আর যেসব অর্থ-সম্পদ আমাদেরকে মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের নিকটবর্তী করে না তা সবই আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধ বলে জানবে। ছেলে বললো: আয়াদের শায়খ তথা মাননীয় ব্যক্তি অনেক। আমরা কার অনুসরণ করবো?
আবূ হাযিম: আমার প্রিয় ছেলে, তুমি সেই ব্যক্তির অনুসরণ করবে যে গোপন বিষয় প্রকাশের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি ও পঙ্কিলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে, জীবনের শুরুতেই নিজেকে সংশোধন করে এবং সংশোধনের কাজটি বার্দ্ধক্যে করবে বলে অপেক্ষা করে না। ছেলে, তুমি জেনে রাখ, সূর্য উদিত হয় এমন প্রত্যেকটি দিনে একজন তালিবে 'ইলম (জ্ঞান অন্বেষণকারী)-এর অন্তর মাঝে তার প্রবৃত্তি ও জ্ঞান মুখোমুখি হয় এবং দু'জন প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তির মত পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যদি তার জ্ঞান তার প্রবৃত্তিকে পরাজিত করতে পারে তাহলে সেদিনটি তার বড় লাভের দিন হয়ে থাকে। আর যদি তার প্রবৃত্তি তার জ্ঞানকে পরাজিত করে তাহলে সেটি তার বড় ক্ষতির দিন হয়ে থাকে।
'আবদুর রহমান ইবন জারীর বললেন: আবূ হাযিম, আপনি প্রায়ই আমাদেরকে শোকর (কৃতজ্ঞতা)-এর ব্যাপারে উৎহাসিত করে থাকেন। এই শোকর-এর প্রকৃতি ও গূঢ় রহস্য কি?
আবূ হাযিম- আমাদের দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর শোকর-এর একটি হক বা অধিকার আছে।
আবদুর রহমান প্রশ্ন করলেন: দু' চোখের শোকর কি?
আবূ হাযিম- যদি আপনি তাদের দ্বারা ভালো কিছু দেখেন, প্রকাশ করবেন। আর খারাপ কিছু দেখলে গোপন করবেন।
আবদুর রহমান- দু'কানের শোকর কি?
আবূ হাযিম- তাদের দ্বারা ভালো কিছু শুনলে মনে রাখবেন। আর খারাপ কিছু শুনলে ভুলে যাবেন।
আবদুর রহমান- দু'হাতের শোকর কি?
আবূ হাযিম- আপনার যা নয়, তাদের দ্বারা তা ধরবেন না। আর তাদের দ্বারা আল্লাহর কোন হক বা অধিকারে বাধা দিবেন না। ওহে আবদুর রহমান, একথা স্মরণ রাখবেন যে, যে ব্যক্তি তার শোকর বা কৃতজ্ঞতা কেবল জিহ্বার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে এবং তার সাথে তার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তরের সবটুকু অংশীদার করে না, তার দৃষ্টান্ত হলো সেই ব্যক্তির মত যার একটি চাদর আছে, কিন্তু তার সবটুকু গায়ে না জড়িয়ে শুধু একটি পাশ গায়ে জড়ায়। ফলে সেটি তাকে গরম ও ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে পারে না।
একবার সালামা ইবন দীনার আল্লাহর পথে জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মুসলিম মুজাহিদদের সাথে বের হলেন। মুজাহিদদের এ বাহিনীটি রোমান বাহিনীর সাথে যুদ্ধের জন্য যাচ্ছিল। তারা তাদের গন্তব্য স্থলের কাছাকাছি পৌছে শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হওয়া ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে একটু বিশ্রাম করে নিতে চাইলো। এই বাহিনীতে বানু উমাইয়্যার একজন আমীর বা শাসক ছিলেন। এই বিশ্রামকালীন সময়ে তিনি আবু হাযিমের কাছে একজন লোক পাঠালেন। তিনি লোকটিকে বলে দিলেন, তুমি আবূ হাযিমের নিকট গিয়ে এই কথাটি বলবে: হাদীছ ও ফিকাহ্ মাসলা-মাসায়িল বলার জন্য আমীর আপনাকে একটু ডেকে পাঠিয়েছেন।
একথা শোনার সাথে সাথে আবূ হাযিম লিখলেন: 'হে আমীর, আমি এমন সব জ্ঞানী ব্যক্তির সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভ করেছি যাঁরা কখনো দীনকে দুনিয়াদার ব্যক্তির কাছে বয়ে নিয়ে যাননি। আমি মনে করি না যে, যারা এমন কাজ করবে তাদের প্রথম ব্যক্তি আপনি আমাকে বানাতে চান। আমার কাছে কোন প্রয়োজন থাকলে আপনি নিজেই আসুন। ওয়াস্ সালামু 'আলায়কা ওয়া 'আলা মান মা'আকা- আপনার প্রতি ও আপনার সাথে যারা আছে তাদের সবার প্রতি সালাম।'
আমীর চিঠিটি পড়ে তাঁর কাছে গেলেন, কুশল বিনিময় করলেন এবং তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির দু'আ করে বললেন: আবূ হাযিম, আপনি যা লিখেছেন তার সাথে আমি একমত। এ চিঠির মাধ্যমে আপনি আমাদের মধ্যে আপনার সম্মান ও মর্যাদা আরো বৃদ্ধি করে ফেলেছেন। এখন আপনি আমাদেরকে কিছু উপদেশ দান করুন। আমাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দিন।
আবূ হাযিম তাঁকে অনেক উপদেশ দিলেন। তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার কিছু এ রকম: শুনুন! যা আখিরাতে আপনার সাথে থাকুক বলে আপনি চান, দুনিয়াতে তা পেতে লোভ করুন। আর সেখানে যা আপনার সাথে থাকা আপনি অপছন্দ করেন, এখানেই তার প্রতি নিরাসক্ত হোন। ওহে আমীর, জেনে রাখুন, মিথ্যা ও অসত্য যদি আপনার প্রিয় হয় এবং আপনার দ্বারা প্রচলিত হয় তাহলে কপট লোকেরা ও বাতিলপন্থীরা আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং আপনার পাশে ভীড় করবে। আর যদি সত্য আপনার প্রিয় হয় এবং আপনি তা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে সৎকর্মশীলরা আপনার পাশে সমবেত হবে এবং আপনাকে সত্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে। সুতরাং আপনি এ দু'টির যেটি আপনার ভালো লাগে, বেছে নিন।
হিজরী ১৪০ সনে অথবা তার পরে আবূ হাযিমের মৃত্যু হয়। তাঁর জীবনসন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তাঁর বন্ধুরা তাঁকে প্রশ্ন করলো : আবূ হাযিম, আপনি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছেন? বললেন : দুনিয়ার যা কিছু আমি লাভ করেছি তার মন্দ থেকে যদি আমি মুক্তি পাই তাহলে যা কিছু সরিয়ে ও গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা আমাকে ক্ষতি করবে না। তারপর তিনি নিম্নের এ আয়াতটি বার বার আবৃত্তি করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন:
إن الذين امنوا وعملوا الصالحات سيجعل لهم الرحمن ودا .
- যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, তাদেরকে দয়াময় আল্লাহ ভালবাসা দেবেন।
টিকাঃ
১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৪
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
৩. তাহযীবুল আসমা/-২/২০৮
৪. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৫. প্রাগুক্ত-৪/১৪৩; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৩
৬. তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১৩৩
৮. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
৯. প্রাগুক্ত
১০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩৬৩
১১. তাহযীব আত-তাহযীব-৪/১৪৪
১২. শাযারাত আয-যাহাব-১/২০৮; তাহযীব আল-আসমা'-২/২০৮
১৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৩৯; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১৯
১৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৯
১৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৬৪, ১৯১
১৬. প্রাগুক্ত-৩/১২৮
১৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/২৪৩
১৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৬
১৯. সূরা আল-ইনফিতার-১৩-১৪
২০. সূরা আল-আ'রাফ-৫৬
২১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৬৩; 'উয়ুন আল-আখবার-২/৩৭০; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৪২; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিয়ীন-১৮২-১৯২; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩-৩৪৭
২২. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯২-১৯৪; 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৪৩
২৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৮৮; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৩৪
২৪. প্রাগুক্ত
২৫. সূরা মারয়াম-৯৬
২৬. সুওয়ারুন নিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৯৬
📄 রাবী‘ ইবন খুছায়ম (রহ)
আবূ ইয়াযীদ রাবী' ইবন খুছায়ম বংশগত দিক দিয়ে আরবের ছা'লাবা গোত্রের একটি শাখা গোত্র ছাওর-এর সন্তান। পিতার নাম খুছায়ম ইবন 'আ'ইশ। যে সকল তাবি'ঈ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকাল পেয়েছিলেন, কিন্তু সাহাবীর মর্যাদা লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যান, রাবী' তাঁদের একজন। তিনি সাহাবী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলেও সে যুগের বহুবিধ কল্যাণ লাভে ধন্য হন। জ্ঞান ও কর্ম এবং দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা ও খোদাভীতির দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ। ইমাম যাত্রী বলেছেন, যে আটজন দুনিয়া বিরাগী তাপস রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ লাভ করেন রাবী' তাঁদের একজন। তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান তাবি'ঈ। তবে তাঁর জ্ঞানের আলোকে নিষ্প্রভ করে দেয় তার দুনিয়া বিমুখতা ও খোদাভীতির জ্যোতি। এ কারণে তিনি 'ইলমের চেয়ে তাকওয়ার মাধ্যমে বেশী প্রসিদ্ধ। জ্ঞানগত উৎকর্ষ তিনি যতটুকু অর্জন করেছিলেন তাতে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে বিশেষ স্থানের অধিকারীই ছিলেন। এমন একটা সময় তিনি লাভ করেন যখন 'আলিম সাহাবীদের বড় একটি দল বিদ্যমান ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে বিশেষভাবে 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) ও আবূ আইউব আল-আনসারীর নিকট জ্ঞান অর্জন করেন। এ দু'জনের মধ্যে আবার 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট থেকে বেশী ফায়দা লাভ করেন। তাঁর সাথে রাবী'র এত গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে, যতক্ষণ তিনি 'আবদুল্লাহর (রা) নিকট থাকতেন এবং দু'জনের একান্ত আলোচনা শেষ না হতো ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেত না। ইবন মাস'উদ (রা) তাঁর গুণাবলী ও আভ্যন্তরীণ উৎকর্ষে এত মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি প্রায়ই বলতেন, আবূ ইয়াযীদ! রাসূলুল্লাহ (সা) যদি তোমাকে দেখতেন, দারুণ ভালোবাসতেন। আমি যখন তোমাকে দেখি তখন আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাহচর্য এমন ছিল যে, অতি সাধারণ মানুষকেও একজন বড় 'আলিমে পরিণত করে দিয়েছে। রাবী' ছিলেন স্বভাবগতভাবে একজন সত্যনিষ্ঠ এবং অসম্ভব যোগ্য ব্যক্তি। এ কারণে তিনি ইবন মাস'উদের (রা) জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা বেশী উপকার লাভ করেন。
কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সব ধরনের জ্ঞানে তাঁর পারদর্শিতা ছিল। বাস্তব দিক দিয়ে কুরআনের সাথে তাঁর সবচেয়ে বেশী সম্পর্ক ছিল। কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং কুরআনের আয়াত দ্বারা যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনে তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। সকল ওয়াজ-নসীহত ও বক্তৃতা-ভাষণে অত্যন্ত সার্থকভাবে কুরআনের আয়াত উপস্থাপন করতেন।
তিনি সবসময় কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি হয়তো মাসহাফ হাতে কুরআন তিলাওয়াত করছেন, তখন হঠাৎ কোন লোক এসে গেল। তিনি মাসহাফটি তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলতেন যাতে আগম্ভক লোকটি তা না দেখতে পারে।
সাধারণতঃ তাঁর ও'য়াজ-নসীহত হতো কুরআনের উদ্ধৃতি সহকারে নিম্নরূপ: হে আল্লাহর বান্দারা! সবসময় ভালো কথা বলবে, ভালো কাজ করবে, ভালো স্বভাবের উপর থাকবে, নিজের জীবনকালকে বেশী বলে মনে করবে না, নিজের অন্তরকে কঠিন করে তুলবে না এবং সেইসব লোকের মত হবে না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না।
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُوْنَ. তোমরা সেইসব লোকের মত হয়ো না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না। হে আল্লাহর বান্দারা! যদি তোমরা ভালো কাজ কর, তাহলে তা ক্রমাগতভাবে করতে থাকবে। কারণ সেদিন খুব শিগগির এসে যাবে যখন তোমরা এ অনুশোচনা করতে থাকবে যে, হায় আফসোস! এই ভালো কাজ যদি আরো বেশী করতাম! যদি তোমার দ্বারা খারাপ কিছু ঘটে যায় তাহলেও ভালো কাজ করবে। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ - ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ * ভালো কাজ মন্দ কাজকে দূর করে দেয়। আর এ হলো উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ তাঁর কিতাবের মাধ্যমে যে জ্ঞান তোমাদেরকে দান করেছেন, সে জন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যে জ্ঞান তোমাদেরকে দেননি; বরং নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন, সেই জ্ঞানে পারদর্শীদের জন্য তা ছেড়ে দাও। কোন কৃত্রিমতার আশ্রয় নিও না। আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ لِلْعَالَمِينَ، وَلَتَعْلَمُنَّ نَبَأَهُ بَعْدَ حِينَ. হে নবী! আপনি বলে দিন, আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না। আর আমি কোন কৃতিত্রমতাশ্রয়ীদের অন্তর্গত লোক নই। আর এই কুরআন বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ। আর এমন এক সময় আসবে যখন তার প্রকৃত অবস্থা অবশ্যই তোমরা জানবে।
হাদীছের ক্ষেত্রে ইমাম যাত্রী তাঁকে ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবু আইউব আল-আনসারী (রা), 'আমর ইবন মায়মূন (রা), 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। আর ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, ইমাম শা'বী, মুনযির ছাওরী, হিলাল ইবন ইয়াসাফ, বাকর ইবন মা'ইয প্রমুখের মত বিখ্যাত তাবি'ঈগণ তাঁর ছাত্র ছিলেন। গ্রহণযোগ্যতার দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনার কি স্থান ছিল তা এই শাস্ত্রের বিভিন্ন মনীষীর মন্তব্য দ্বারা অনুমান করা যায়। যেমন, ইমাম শা'বী বলতেন: রাবী' সত্যবাদিতার খনি। আর ইবন মু'ঈন বলতেন, রাবী'র মত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু ঘাঁটাঘাঁটির কোন প্রয়োজন নেই।
ফকীহ্ হিসেবে রাবী' যদিও তেমন খ্যাতি অর্জন করেননি, তবে তাঁর ফিকাহ্ বিষয়ে পারদর্শিতার জন্য এ সনদ যথেষ্ট যে, তিনি ছিলেন সেই ফকীহুল উম্মাত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র, যাঁর ফাতওয়ার উপর ইরাকী ফিকাহ্ ভিত্তিশীল। তবে পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, তাঁর সীমাহীন যুহৃদ ও তাকওয়া তথা দুনিয়াত্যাগী মনোভাব ও খোদাভীতির তাঁর সব যোগ্যতাকে ম্লান করে দিয়েছে।
সাধারণতঃ দেখা যায় প্রতিটি খান্দানের এমন কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকে যা কম-বেশী তার সদস্যদের মধ্যে পাওয়া যায়। কোন খান্দান জ্ঞান ও বিভিন্ন শাস্ত্রে এবং কোন খান্দান যুহদ ও তাকওয়া এবং অন্য কোন বিশেষ গুণের জন্য বিশিষ্ট হয়ে থাকে। রাবী'র খান্দান বানু ছাওর ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। শাবরামা বলেন, আমি কৃষ্ণায় বান্ ছাওরের চেয়ে বেশী ফকীহ্ ও 'ইবাদাত-বন্দেগী করা বুযর্গ মানুষ আর কোন খান্দানে দেখিনি। আবূ বকর আয-যুবায়দী তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করতেন যে, 'আমি ছাওরী ও 'আরানী গোত্রদ্বয়ের চেয়ে বেশী মসজিদে অবস্থানকারী মানুষ অন্য কোন খান্দানে দেখিনি।
রাবী' ছিলেন এমন একটি 'ইবাদাত-বন্দেগী করা খান্দানের সদস্য, যে খান্দান দীনী ও রূহানী সম্পূর্ণতায় অন্য সবার চেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি কেবল তাঁর খান্দানের মধ্যে নন, বরং গোটা তাবি'ঈ জামা'আতের সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই মুষ্টিমেয় তাবি'ঈদের অন্যতম যাঁরা যুহদ ও তাকওয়ার দিক দিয়ে গোটা তাবি'ঈ সমাজের শীর্ষে ছিলেন। তাঁর যুহৃদ ও তাকওয়া এবং 'ইবাদাত-বন্দেগীর ব্যাপারে সকল 'আলেম ও লেখক একমত। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' তাঁর দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খোদাভীরু ছিলেন। আবু 'উবায়দা বলেন, আমি রাবী'র চেয়ে বেশী ভালো 'ইবাদাতকারী আর কাউকে দেখিনি। ইবন হাজার আল- 'আসকালানী লিখেছেন, রাবী'র যুহৃদ এবং তাঁর 'ইবাদাত এত প্রসিদ্ধ যে, সে বিষয়ে কিছু লেখার কোন প্রয়োজন নেই।
সকল ভালো কাজের মূল উৎস হলো আল্লাহর ভয়। রাবী'র মধ্যে আল্লাহর ভয় এত প্রবল ছিল যে, কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। দোযখের 'আযাবের অতি সাধারণ পার্থিব নমুনা দেখেও তিনি বেহুঁশ হয়ে যেতেন। আ'মাশ বর্ণনা করেছেন: একবার রাবী' কামারের ভাটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভাটিতে জ্বলন্ত লোহা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
আরেকবারের একটি ঘটনা তাঁর বন্ধুদের একটি দল বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, একদিন আমরা 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে রাবী' ইবন খুছায়মও ছিলেন। আমরা ফুরাত নদীর তীরে পৌঁছলাম। সেখানে চুন বানানোর একটি ভাটির পাশ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। তখন চুন বানানোর জন্য সেই ভাটিতে পাথর ফেলা হচ্ছিল। তাতে দাউ দাউ করে প্রচণ্ড গর্জন সহকারে আগুন জ্বলছিল এবং তার লেলিহান শিখা বহু উঁচুতে উঠে যাচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে রাবী' থমকে দাঁড়িয়ে যান এবং ভীষণ কাঁপতে শুরু করেন। এ অবস্থায় তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতে থাকেন:
إِذَا رَأَتْهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا ، وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقاً مُقَرَّ نِينَ دَعَوْا هنالك ثُبُورًا .
আগুন যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার। যখন এক শিকলে কয়েকজন বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা সেখানে মৃত্যুকে ডাকবে।
তারপর তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। আমরা তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং দীর্ঘক্ষণ সেবার পর তিনি হুঁশ ফিরে পান। আমরা তাঁকে নিয়ে তাঁর বাড়ীতে পৌছে দিই।
'ইবাদাত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারীর ভিতর দিয়েই রাবী' তাঁর জীবন শুরু করেন। শৈশব-কৈশোরেও সীমাহীন খোদাভীতি তাঁর মধ্যে বিরাজমান ছিল। এত অল্প- বয়সেও 'ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত কাটিয়ে দিতেন। আল্লাহর আযাবের ভয়ে কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে পড়তেন। তাঁর সম্মানিতা মা ঘুমিয়ে পড়তেন। এক ঘুম পর গভীর রাতে জেগে দেখতেন তাঁর কিশোর ছেলেটি তখনো জায়নামাযে দাঁড়িয়ে অথবা একাগ্রচিত্তে মুনাজাতে নিমগ্ন। মা ডেকে বলতেন: রাবী' তুমি এখনো ঘুমাওনি? তিনি বলতেন: মা, সেই ব্যক্তি কেমন করে রাতের অন্ধকারে ঘুমাতে পারে যে জবাবদিহিতার ভয় করে? ছেলের জবাব শুনে বৃদ্ধ মায়ের চোখের পানিতে দু'গাল ভিজে যেত। তিনি প্রাণ ভরে ছেলের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতেন।
রাবী' যুবক হলেন। আর সাথে সাথে তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারী এবং আল্লাহভীতিও যৌবন পেল। মানুষ যখন রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকতো, আল্লাহর ভয়ে রাবী'র কান্না- কাটিও তীব্রতা লাভ করতো। তাঁর এমন বিচলিত ও অস্থির অবস্থা দেখে মায়ের অন্তর ব্যথায় ভরে যেত। ছেলে সম্পর্কে নানা রকম দুশ্চিন্তা তাঁর মনে ভর করতো। এক সময় তিনি ছেলেকে ডেকে বলতেন:
- বেটা তোমার কি হয়েছে? মনে হচ্ছে তুমি কোন অপরাধ করে বসেছো? কোন মানুষকে খুন করেছো?
বলতেন: হাঁ, মা আমি মানুষ খুন করেছি। অস্থিরভাবে মা জানতে চাইতেন: বেটা, কাকে খুন করেছো? আমাকে বল। তাহলে আমরা নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদেরকে খুশী করে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবো। আল্লাহর কসম! নিহতের পরিবারের লোকেরা যদি তোমার এ কান্নাকাটি ও রাত জাগার কথা জানতে পারে তাহলে অবশ্যই তারা তোমার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবে।
তিনি বলতেন: আপনি কাকেও কিছু বলবেন না। আমি আমার নিজকে হত্যা করেছি। আমার নিজকে আমি পাপের দ্বারা হত্যা করেছি।
পরবর্তীকালে রাবী'র ছেলে বড় হয়ে যখন দেখতো, বাবা সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেন তখন সে মাঝে মাঝে বাবার ঘরে ঢুকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতো: আব্বা! যথেষ্ট হয়েছে। এখন কি একটু ঘুমোবেন? তিনি জবাব দিতেন: আমার ছেলে! সেই ব্যক্তি কেমন করে ঘুমোতে পারে যে তার প্রভুর শাস্তির ভয় করে।
রাবী'র 'ইবাদাত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সারা রাত 'ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন। উপদেশমূলক আয়াত পাঠ করতেন। তা দ্বারা এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়তেন যে একই আয়াত বার বার পাঠ করতে করতে সকাল হয়ে যেত। তাঁর দাস নুসায়র ইবান যা'লুক বর্ণনা করেছেন। রাবী' রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদ নামায পড়ার সময় যখন নিম্নের এ আয়াতে পৌঁছতেন তখন তা বার বার তিলাওয়াত করতে করতে সকাল হয়ে যেত।
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيَّاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ.
যারা খারাপ কাজ করেছে তারা কি এ ধারণা করে যে, আমরা তাদেরকে সেই লোকদের সমান করে দেব যারা ভালো কাজ করেছে? যাদের জীবন ও মরণ সমান। তারা কতই না খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়।
'আবদুর রহমান ইবন 'আজলান বলেছেন। একদিন আমি রাবী'র ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি যখন মনে করলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাযের মধ্যে উপরের আয়াতটি তিনি বার বার তিলাওয়াত করেন। আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। জামা'আতের সাথে নামায আদায়ের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। কখনো জামা'আত ছাড়তেন না। শেষ জীবনে চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। তখনো জামা'আত তরক হতো না। অন্যের সাহায্যে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে মসজিদে পৌঁছতেন। আবূ হায়্যান তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করেছেন। রাবী' পঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেন। তবে নামাযের জন্য হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে অথবা অন্যের সাহায্যে মসজিদে যেতেন। লোকেরা বলতো, আবু ইয়াযীদ! আপনি তো এখন মা'জুর। এ অবস্থায় ঘরে নামায আদায়েরও অনুমতি আছে। জবাব দিতেন : حَيَّ عَلَى الصَّلواة এবং حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ শোনার পর যতদূর সম্ভব সাড়া দেওয়া উচিত। তা সে হামাগুড়ি দিয়েই হোক না কেন।
রাবী' একজন নির্জন-নিরিবিলির 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। আর এ কারণে খিলাফতে রাশেদার সময়ে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কোথাও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায় না। তবে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য নির্জন-নিরিবিলি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেন। তাঁর এই জিহাদ এমন নির্ভেজাল আল্লাহর জন্য হতো যে, মালে গনীমত মোটেই স্পর্শ করতেন না। ভাগে যা কিছু পেতেন তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে ফেলতেন। 'আবদি খায়র নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। আমি একবার একটি যুদ্ধে রাবী'র সঙ্গী ছিলাম। এ যুদ্ধে গনীমতের অংশে তিনি বহু দাস এবং গৃহপালিত জন্তু লাভ করেন। কিছুদিন পর কোন কারণে আমাকে আবার তাঁর কাছে যেতে হয়। তখন তাঁর কাছে সেই গনীমতের মালের কোন কিছুই দেখতে না পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম: সেই দাস ও জীবজন্তুগুলোর কি হয়েছে? তিনি কোন জবাব দিলেন না। আমি যখন আবার জিজ্ঞেস করলাম তখন বললেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ.
তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর।
ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে খরচ করা ছিল তাঁর বিশেষ গুণ। মিষ্টি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ কারণে কোন সায়িল এলে তিনি তার হাতে একটি চিনির দলা তুলে দিতেন। লোকেরা যখন বলতো, এর চেয়ে তো তার রুটির প্রয়োজন বেশী। জবাবে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন: وَيُطْعِمُوْنَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا. - তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাবার দান করে।
তিনি বলতেন : 'মানুষকে ভালো খাবার খাওয়াবে, নতুন কাপড় পরাবে এবং সুস্থ-সবল দাস মুক্ত করবে।'
অভাবী-প্রতিবেশীদেরকে তিনি ভালো ভালো খাবার পাকিয়ে খাওয়াতেন। মুনযির ছাওরী বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী' তাঁর বাড়ীর লোকদেরকে 'খুবায়স' নামক এক প্রকার খাবার তৈরী করতে বলেন। যেহেতু তিনি কখনো নিজের জন্য কোন কিছুর আবদার করতেন না। এ কারণে তাঁর বেগম সাহেবা অতি যত্ন সহকারে 'খুবায়স' তৈরী করেন। তাঁর প্রতিবেশীদের মধ্যে এক উন্মাদ ব্যক্তিও ছিল। তিনি সেই 'খুবায়স' নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তুলে তাকে খাওয়ান। উন্মাদ লোকটির মুখ থেকে সব সময় লালা ঝরতো। তিনি যখন তাকে খাইয়ে ঘরে ফিরে আসেন তখন বেগম সাহেবা বললেন, আমি এত কষ্ট করে এবং এত যত্ন সহকারে খাবারগুলো তৈরী করলাম, আর আপনি এমন এক লোককে খাইয়ে এলেন যে এটাও বুঝতে অক্ষম যে, সে কি খেয়েছে। তিনি জবাব দিলেন: আল্লাহ তো জানেন।" তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ * তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর। আর তোমরা যা কিছু খরচ করবে, আল্লাহ তা জানেন।
রাবী'র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল 'আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার' বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। যদিও তিনি একজন নীরব ও নির্জনতা প্রিয় মানুষ ছিলেন, তবে আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার-এর জন্য নির্জনতা ছেড়ে বেরিয়ে এসে নীরবতা ঝেড়ে ফেলতেন। তাঁর কাছে যাঁরা আসতেন তাদের তিনি বলতেন, তোমরা ভালো কথা বলবে এবং নিজেরা ভালো কথার উপর 'আমল করবে, সবসময় ভালোর উপর থাকবে। আর যতদূর সম্ভব বেশী বেশী নেক কাজ করবে এবং খারাপ কাজ কমিয়ে দেবে। নিজের অন্তরকে কঠোর করবে না। তোমার জীবনকাল এত দীর্ঘ নয়। সেইসব লোকের মত হবে না যারা মুখে তো বলে, আমরা শুনেছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শুনে না।
কেউ যদি তাঁকে কিছু উপদেশ শোনাতে বলতো, তিনি তাঁকে কুরআনের কিছু হুকুম-আহকাম লিখে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে বলে। তিনি কিছু কাগজ চেয়ে নিয়ে সূরা আল-আন'আমের এ আয়াতটি লিখে দেন:
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ... عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ
লোকটি বললো, আমি আপনার নিকট এজন্য এসেছিলাম যে, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দেবেন। বললেন: হাঁ, এর উপর 'আমল কর।
তাকওয়া-পরহিযগারীর গর্ব ও ঔদ্ধত্য থেকে রাবী' সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও কখনো পাপীদের সম্পর্কে তাঁর জিহ্বা থেকে কোন খারাপ কথা বের হতো না। নাসর ইবন যা'লুক বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি রাবী'র নিকট জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোন মানুষকে খারাপ বলেন না কেন? বললেন আল্লাহর কসম। আমি আমার নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। অন্যকে খারাপ বলবো কেমন করে? মানুষের এ বিস্ময়কর অবস্থা যে, সে অন্যের পাপের ব্যাপারে তো আল্লাহকে ভয় করে; কিন্তু নিজের পাপের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না।
রাবী' আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুসরণের ব্যাপারে ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। ছোট ছোট ও অতি সাধারণ কথা ও কাজে তিনি এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, কোন মানুষের চিন্তা ও কল্পনাও সেদিকে যেত না। বাকর ইবন মা'ইয বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী'র ছোট্ট একটি মেয়ে বললো, আব্বা! আমি খেলতে যাচ্ছি। তিনি বললেন: যাও, ভালো কথা বলো। ছোট্ট বাচ্চা। তাঁর এ কথার অর্থ কেমন করে বুঝবে? লোকেরা রাবী'কে বললো: আপনি এই শিশুকে খেলতে যেতে দেন না কে? বললেন: আমি এটা চাই না, আমার আজকের আমলনামায় এ কথা লেখা হোক যে, আমি খেলার নির্দেশ দিয়েছি।
তিনি সকল কাজ নিজ হাতে করতেন। বাড়ীর পায়খানাও নিজ হাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। একবার এক ব্যক্তি বললো, এ কাজের জন্য তো অন্য মানুষ আছে। বললেন, আমি বাড়ীর কাজ-কর্মেও অংশীদার হতে চাই। তাঁর চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ীভাব দেখে তাঁর শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলতেন, তোমাকে দেখে আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। কখনো কোন অবস্থাতেই তাঁর মুখ থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী কোন কথা উচ্চারিত হতো না। কারো দ্বারা কষ্ট পেলেও তার জন্য দু'আ করতেন। একদিন মসজিদে মুসল্লীদের ভীষণ ভীড় ছিল। যখন জামা'আত আরম্ভ হতে যাচ্ছিল এবং ধীরে ধীরে লোকেরা সামনে এগুচ্ছিল, ঠিক সে সময় রাবী'র পিছনের লোকটি তাঁকে বলে, সামনে এগোন। কিন্তু অত্যধিক ভীড়ের কারণে তিনি সামনে এগুতে পারছিলেন না। লোকটি রেগে গিয়ে পিছন থেকে রাবী'র ঘাড়ে খোঁচা দেয়। তিনি ব্যথা পান এবং একথা বলতে থাকেন : আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। লোকটি চোখ উঁচু করে রাবী'কে দেখতে পেয়ে এত লজ্জিত হয় যে, কাঁদতে শুরু করে।
তিনি সব সময় একাকী থাকা পছন্দ করতেন। কোথাও আসা-যাওয়া করতেন না। কোন অনুষ্ঠান ও সমাবেশে বসাও পছন্দ করতেন না। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' বিবেক-বুদ্ধি হওয়ার পর না কোন মজলিসে বসেছেন, আর না কোন প্রধান সড়কে গেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, আমি এটা পছন্দ করতাম না যে, কোন স্থানে যাই, আর সেখানে এমন কিছু দেখি যাতে আমাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়, আর আমি সাক্ষ্য দিতে না পারি, কোন অভাবী মানুষকে দেখি, আর তার কোন সাহায্য করতে না পারি, অথবা কোন মজলুমকে দেখি ও তার কোন উপকারে আসতে না পারি।
বাড়ীতেও তিনি সব সময় চুপচাপ থাকতেন। খুব কম কথা বলতেন। কোন বাজে কথা তার মুখে কখনো উচ্চারিত হতো না। এক ব্যক্তি, যিনি রাবী'র সাহচর্যে বিশ বছর কাটান, বর্ণনা করেছেন যে, আমি তাঁর সাহচর্যে বিশ বছরের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, এ সময়ে আমি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত এমন কোন কথা শুনিনি যার সমালোচনা হতে পারে। একই ব্যক্তি আরো বলেছেন, আমি বিশ বছরে রাবী'র মুখ থেকে ভালো কথা ছাড়া অন্য কোন কথা বের হতে শুনিনি। তামীম গোত্রের আরেক ব্যক্তি বলেছেন, আমি দু'বছর যাবত রাবী'র সাথে বসেছি। এর মধ্যে তিনি আমার কাছে মানুষের পার্থিব অবস্থা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করেননি। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন, তোমাদের মহল্লায় কয়টি মসজিদ আছে? অন্যদেরকেও তিনি বাজে কথা বলতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন, তোমরা কম কথা বলবে। তবে এই নয়টি ক্ষেত্রে বেশী বলতে দোষ নেই:
১. তাহলীল : لا إله إلا الله
২. তাকবীর : الله اكبر
৩. তাসবীহ : سبحان الله
৪. তাহমীদ : الحمد لله
৫. কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে দু'আ করা
৬. খারাপ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা
৭. আমর বিল মা'রূফ
৮. নাহি 'আনিল মুনকার
৯. কুরআন তিলাওয়াত।
তিনি আরো বলতেন : মানুষকে ভালো কথা বলা শেখাবে, খারাপ কথা বলা থেকে তাদেরকে বিরত রাখবে। কুরআন তিলাওয়াত করবে, আল্লাহর কাছে কল্যাণের জন্য দু'আ করবে এবং অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাহায্য চাইবে।
রাবী' যদিও চুপচাপ ও একাকী থাকতেন, তবুও ফুলের সুবাস ও সূর্যের আলো যেমন আবদ্ধ করে রাখা যায় না, তেমনিভাবে তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকেনি। তাঁর চরিত্রের সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর চরিত্র-মাধুর্য দ্বারা মানুষ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। শাফীক বর্ণনা করেছেন, একবার আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) কয়েকজন ছাত্রের সাথে রাবী'র সংগে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। পথে এক ব্যক্তি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? আমরা বললাম: রাবী'র সংগে দেখা করার জন্য। লোকটি বললো : আপনারা এমন এক ব্যক্তির কাছে যাচ্ছেন, যিনি কোন কথা বললে মিথ্যা বলেন না, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করেন না এবং তাঁর কাছে কোন কিছু আমানত রাখলে খিয়ানত করেন না।
কোন মানুষের সমকালীনদের স্বীকৃতিই হলো তার মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। রাবী'র সমকালীন লোকেরা তাঁর প্রতি এত মুগ্ধ ছিলেন যে, কেউ কোনভাবে তাঁর চেয়ে নিজেকে বড় ভাবা পছন্দ করতো না। একবার এক ব্যক্তি আবূ ওয়াইলকে প্রশ্ন করে : আপনি বড় না রাবী'? জবাবে তিনি বলেন: আমি বয়সে তাঁর চেয়ে বড়, তবে তিনি বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় আমার চেয়ে বড়।
তিনি যেমন কম কথা বলতেন, তেমনি কোন বিতর্কেও জড়ানো পছন্দ করতেন না। একবার তাঁর এক আত্মীয় দেখা করতে এলো। কথার ফাঁকে এক সময় লোকটি বললো: আবু ইয়াযীদ! হুসায়ন ইবন ফাতিমা (রা) নিহত হয়েছেন। তিনি বললেন: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন- নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
قُلِ اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمْ بَيْنَ عِبَادِكَ فِي مَا كَانُوا فِيْهِ يَخْتَلِفُوْنَ *
বলুন, হে আল্লাহ, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করতো।
রাবী'র এ কথায় লোকটি সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে প্রশ্ন করলো : তাঁর হত্যার ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
বললেন : আমি বলি তাঁদেরকে আল্লাহরই কাছে ফিরে যেতে হবে এবং তাঁদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহই করবেন। আল-জাহিজ বলেন : 'ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে রাবী' কোন কথা বলতেন না এবং কোন কথা শুনতেনও না। '
একবার এক ব্যক্তি বললেন: আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দেবেন। বললেন: তোমার জ্ঞানের পরিধির মধ্যে যা কিছু আছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আর যা কিছু জ্ঞান তোমার নেই, তা যিনি জানেন সেই সত্তার নিকট তা সোপর্দ কর। তোমাদের কেউ যেন না বলে: 'হে আল্লাহ, আমি তোমার দিকে ফিরে এসেছি।' তারপর যদি সে ফিরে না আসে তাহলে সেটা হবে মিথ্যা, তাই সে যেন বলে: 'হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতি ফিরে আসুন!' তাহলে এটা হবে দু'আ।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো: আমি দীর্ঘ দিন যাবত আপনার সাথে আছি, এর মধ্যে একদিনও আপনাকে কবিতার কোন উদ্ধৃতি দিতে শুনলাম না। অথচ আপনার সঙ্গী- সাথীদের অনেককে আমি কবিতার উদ্ধৃতি দিতে শুনেছি। বললেন: যা কিছু তোমরা এখানে বলবে তা সবই লেখা হবে এবং সেখানে তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে।
তারপর উপস্থিত সবার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন: তোমরা বেশী করে মৃত্যুকে স্মরণ কর। কারণ, সে তোমাদের থেকে অনুপস্থিত পর্যবেক্ষণকারী। আর অনুপস্থিত ব্যক্তির দূরে অবস্থানের মেয়াদ দীর্ঘ হয়ে গেলে তার ফেরার সময়ও নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তারপর কিছুক্ষণ অঝোরে কাঁদলেন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন: সেই সময় তুমি কি করবে যখন এ অবস্থা হবে:
إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكًّا. وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا، وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ. يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى **
যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং আপনার পালনকর্তা ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন। সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে?
তিনি বলতেন, আমার যদি দু'টি মন থাকতো তাহলে একটা কোথাও আটকে গেলে অন্যটি তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু আমার তো একটি মাত্র মন। সেটা যদি আমি অন্য কোথাও আটকে ফেলি তাহলে তাকে ছাড়াবে কে?
কেউ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করতো : রাবী'! আজ আপনার সকালটি কি অবস্থায় হলো? বলতেন: দুর্বল পাপী অবস্থার মধ্যে আমার সকাল হয়েছে। এরপর নির্ধারিত রিযিক খাবো এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকবো।
তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর উপর নির্ভরতার প্রকৃত রহস্য এই যে, কোন কাজে আপ্রাণ চেষ্টা করে তার সফলতা ও ব্যর্থতা আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। কিন্তু তাওয়াক্কুলের আরো একটা উঁচু ধাপ আছে। যার অধিকারী কেবল আল্লাহর একান্ত বিশেষ ব্যক্তিরা হয়ে থাকেন। আর তা হলো, কোন কাজ সম্পন্ন করার জন্য দুনিয়ার উপায়-উপকরণের কোন রকম সাহায্য-সহায়তা না নিয়ে সবকিছু আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। রাবী' তাওয়াক্কুলের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন। জীবন-মরণের মুখোমুখি অবস্থায়ও তিনি পার্থিব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতেন না। প্যারালাইসিসের মত কষ্টদায়ক রোগে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু কোন রকম চিকিৎসা গ্রহণ করতেন না। লোকেরা বলতো: ইস! আপনি যদি চিকিৎসা করাতেন! বলতেন: 'আদ, ছামূদ ও আসহাবে রাস- সব জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা অতিক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যবর্তী সময়ে আরো জাতি-গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল। তাদের মধ্যে চিকিৎসকও ছিল। কিন্তু আজ না সেই চিকিৎসক বেঁচে আছে, আর না যাদেরকে চিকিৎসা করা হয়েছে, তারা।
এই চরম আল্লাহ নির্ভরতার ফল এই দাঁড়ালো যে, তাঁর প্যারালাইসিস রোগ শেষ পর্যন্ত অন্তিম রোগে পরিণত হলো। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি সবার সামনে এ স্বীকৃতি দান করেন যে, আমি আমার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী মানছি, তিনি তাঁর নেক বান্দাদের সাক্ষ্য, তাদের প্রতিদান ও বদলা দানের জন্য যথেষ্ট। আমি আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, দীনে ইসলাম, মুহাম্মাদ (সা)-এর নবুওয়াত, রিসালাত এবং কুরআনের ইমামতের ব্যাপারে রাজি। আমি নিজের সত্তা, আর ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে যে আমার অনুসরণ করে, একথার উপর রাজি যে, আমরা সকলে 'আবিদীনের দলের মধ্যে থেকে আল্লাহর 'ইবাদাত করবো, আল্লাহর হামদকারীদের মধ্যে তাঁর হামদ করবো। মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করবো। স্বীকৃতি দানের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে যখন তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে তখন পাশে বসা মেয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন: মেয়ে, তুমি কাঁদছো কেন? কল্যাণ তোমার পিতার সামনে উপস্থিত।
তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ৬১, ৬৩ ও ৬৪ সনের কথা বলা হয়েছে। 'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ তখন কুফার ওয়ালী এবং ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া (রা) মুসলিম জাহানের খলীফা।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৫৮
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৪২
৩. তাবাকাত-৬/১২৭
৪. 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১১; সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
৫. সূরা আল-আনফাল-৩
৬. সূরা হুদ-৯
৭. সূরা সাদ-৫
৮. তাবাকাত-৬/১২৮
৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১০. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২০৮
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১২. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৩. তাবাকাত-৬/১৩৩
১৪. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮
১৬. তাবাকাত-৬/১২৭
১৭. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৮. তাবাকাত-৬/১৩১
১৯. সিফাতুস সাফওয়া-৩/৬২; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১১২
২০. সূরা আল-ফুরকান-১২-১৩
২১. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬০-৬১
২২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৬০
২৩. তাবাকাত-৬/১৩০
২৪. সূরা আল-জাছিয়া-২
২৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
২৬. তাবাকাত-৬/১৩২
২৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩৩
২৮. প্রাগুক্ত-৬/১৩১
২৯. সূরা আদ-দাহর-৮
৩০. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়ীন-৩/১৫৮
৩১. তাবাকাত-৬/১৩১
৩২. সূরা আলে 'ইমরান-৯২
৩৩. সূরা আল-আন'আম-১৫১
৩৪. তাবাকাত-৬/১৩০
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/১২৯
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/১২৭
৩৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩০
৩৮. প্রাগুক্ত-৬/১২৯; আল-বায়ান-৩/১৪৬
৩৯. আল-'ইক্বদ আল-ফারীদ-৩/১৫০
৪০. তাবাকাত-৬/১২৯
৪১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪২৪
৪২. সূরা আয-যুমার-৪৬
৪৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১০৫
৪৪. সূরা আল-ফাজর-২১-২৩
৪৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৫৭-৫৯
৪৬. আল-'ইক্দ আল-ফারীদ-৩/১৭৯
৪৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৭৪
৪৮. তাবাকাত-৬/১৩০
৪৯. প্রাগুক্ত-৬/১৩৪
৫০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮; সিফাতুষ সাফওয়া-৩/৩১; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১৯
আবূ ইয়াযীদ রাবী' ইবন খুছায়ম বংশগত দিক দিয়ে আরবের ছা'লাবা গোত্রের একটি শাখা গোত্র ছাওর-এর সন্তান। পিতার নাম খুছায়ম ইবন 'আ'ইশ। যে সকল তাবি'ঈ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকাল পেয়েছিলেন, কিন্তু সাহাবীর মর্যাদা লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যান, রাবী' তাঁদের একজন। তিনি সাহাবী হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে গেলেও সে যুগের বহুবিধ কল্যাণ লাভে ধন্য হন। জ্ঞান ও কর্ম এবং দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা ও খোদাভীতির দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবি'ঈ। ইমাম যাত্রী বলেছেন, যে আটজন দুনিয়া বিরাগী তাপস রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ লাভ করেন রাবী' তাঁদের একজন। তিনি ছিলেন একজন বিদ্বান তাবি'ঈ। তবে তাঁর জ্ঞানের আলোকে নিষ্প্রভ করে দেয় তার দুনিয়া বিমুখতা ও খোদাভীতির জ্যোতি। এ কারণে তিনি 'ইলমের চেয়ে তাকওয়ার মাধ্যমে বেশী প্রসিদ্ধ। জ্ঞানগত উৎকর্ষ তিনি যতটুকু অর্জন করেছিলেন তাতে তাঁর সমকালীনদের মধ্যে বিশেষ স্থানের অধিকারীই ছিলেন। এমন একটা সময় তিনি লাভ করেন যখন 'আলিম সাহাবীদের বড় একটি দল বিদ্যমান ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামের (রা) মধ্যে বিশেষভাবে 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) ও আবূ আইউব আল-আনসারীর নিকট জ্ঞান অর্জন করেন। এ দু'জনের মধ্যে আবার 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট থেকে বেশী ফায়দা লাভ করেন। তাঁর সাথে রাবী'র এত গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে, যতক্ষণ তিনি 'আবদুল্লাহর (রা) নিকট থাকতেন এবং দু'জনের একান্ত আলোচনা শেষ না হতো ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ ভিতরে ঢোকার অনুমতি পেত না। ইবন মাস'উদ (রা) তাঁর গুণাবলী ও আভ্যন্তরীণ উৎকর্ষে এত মুগ্ধ ছিলেন যে, তিনি প্রায়ই বলতেন, আবূ ইয়াযীদ! রাসূলুল্লাহ (সা) যদি তোমাকে দেখতেন, দারুণ ভালোবাসতেন। আমি যখন তোমাকে দেখি তখন আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাহচর্য এমন ছিল যে, অতি সাধারণ মানুষকেও একজন বড় 'আলিমে পরিণত করে দিয়েছে। রাবী' ছিলেন স্বভাবগতভাবে একজন সত্যনিষ্ঠ এবং অসম্ভব যোগ্য ব্যক্তি। এ কারণে তিনি ইবন মাস'উদের (রা) জ্ঞান ভাণ্ডার দ্বারা বেশী উপকার লাভ করেন。
কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সব ধরনের জ্ঞানে তাঁর পারদর্শিতা ছিল। বাস্তব দিক দিয়ে কুরআনের সাথে তাঁর সবচেয়ে বেশী সম্পর্ক ছিল। কুরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং কুরআনের আয়াত দ্বারা যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনে তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। সকল ওয়াজ-নসীহত ও বক্তৃতা-ভাষণে অত্যন্ত সার্থকভাবে কুরআনের আয়াত উপস্থাপন করতেন।
তিনি সবসময় কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি হয়তো মাসহাফ হাতে কুরআন তিলাওয়াত করছেন, তখন হঠাৎ কোন লোক এসে গেল। তিনি মাসহাফটি তাড়াতাড়ি লুকিয়ে ফেলতেন যাতে আগম্ভক লোকটি তা না দেখতে পারে।
সাধারণতঃ তাঁর ও'য়াজ-নসীহত হতো কুরআনের উদ্ধৃতি সহকারে নিম্নরূপ: হে আল্লাহর বান্দারা! সবসময় ভালো কথা বলবে, ভালো কাজ করবে, ভালো স্বভাবের উপর থাকবে, নিজের জীবনকালকে বেশী বলে মনে করবে না, নিজের অন্তরকে কঠিন করে তুলবে না এবং সেইসব লোকের মত হবে না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না।
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُوْنَ. তোমরা সেইসব লোকের মত হয়ো না যারা বলে আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না। হে আল্লাহর বান্দারা! যদি তোমরা ভালো কাজ কর, তাহলে তা ক্রমাগতভাবে করতে থাকবে। কারণ সেদিন খুব শিগগির এসে যাবে যখন তোমরা এ অনুশোচনা করতে থাকবে যে, হায় আফসোস! এই ভালো কাজ যদি আরো বেশী করতাম! যদি তোমার দ্বারা খারাপ কিছু ঘটে যায় তাহলেও ভালো কাজ করবে। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ - ذَلِكَ ذِكْرَى لِلذَّاكِرِينَ * ভালো কাজ মন্দ কাজকে দূর করে দেয়। আর এ হলো উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য উপদেশ।
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ তাঁর কিতাবের মাধ্যমে যে জ্ঞান তোমাদেরকে দান করেছেন, সে জন্য তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আর যে জ্ঞান তোমাদেরকে দেননি; বরং নিজের জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন, সেই জ্ঞানে পারদর্শীদের জন্য তা ছেড়ে দাও। কোন কৃত্রিমতার আশ্রয় নিও না। আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُتَكَلِّفِينَ، إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرُ لِلْعَالَمِينَ، وَلَتَعْلَمُنَّ نَبَأَهُ بَعْدَ حِينَ. হে নবী! আপনি বলে দিন, আমি এর জন্য তোমাদের নিকট কোন প্রতিদান চাই না। আর আমি কোন কৃতিত্রমতাশ্রয়ীদের অন্তর্গত লোক নই। আর এই কুরআন বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ। আর এমন এক সময় আসবে যখন তার প্রকৃত অবস্থা অবশ্যই তোমরা জানবে।
হাদীছের ক্ষেত্রে ইমাম যাত্রী তাঁকে ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবু আইউব আল-আনসারী (রা), 'আমর ইবন মায়মূন (রা), 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা (রা) প্রমুখ সাহাবীর নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। আর ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, ইমাম শা'বী, মুনযির ছাওরী, হিলাল ইবন ইয়াসাফ, বাকর ইবন মা'ইয প্রমুখের মত বিখ্যাত তাবি'ঈগণ তাঁর ছাত্র ছিলেন। গ্রহণযোগ্যতার দিক দিয়ে তাঁর বর্ণনার কি স্থান ছিল তা এই শাস্ত্রের বিভিন্ন মনীষীর মন্তব্য দ্বারা অনুমান করা যায়। যেমন, ইমাম শা'বী বলতেন: রাবী' সত্যবাদিতার খনি। আর ইবন মু'ঈন বলতেন, রাবী'র মত ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কিছু ঘাঁটাঘাঁটির কোন প্রয়োজন নেই।
ফকীহ্ হিসেবে রাবী' যদিও তেমন খ্যাতি অর্জন করেননি, তবে তাঁর ফিকাহ্ বিষয়ে পারদর্শিতার জন্য এ সনদ যথেষ্ট যে, তিনি ছিলেন সেই ফকীহুল উম্মাত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এবং তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র, যাঁর ফাতওয়ার উপর ইরাকী ফিকাহ্ ভিত্তিশীল। তবে পূর্বে যেমন বলা হয়েছে, তাঁর সীমাহীন যুহৃদ ও তাকওয়া তথা দুনিয়াত্যাগী মনোভাব ও খোদাভীতির তাঁর সব যোগ্যতাকে ম্লান করে দিয়েছে।
সাধারণতঃ দেখা যায় প্রতিটি খান্দানের এমন কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকে যা কম-বেশী তার সদস্যদের মধ্যে পাওয়া যায়। কোন খান্দান জ্ঞান ও বিভিন্ন শাস্ত্রে এবং কোন খান্দান যুহদ ও তাকওয়া এবং অন্য কোন বিশেষ গুণের জন্য বিশিষ্ট হয়ে থাকে। রাবী'র খান্দান বানু ছাওর ইবাদাত-বন্দেগীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। শাবরামা বলেন, আমি কৃষ্ণায় বান্ ছাওরের চেয়ে বেশী ফকীহ্ ও 'ইবাদাত-বন্দেগী করা বুযর্গ মানুষ আর কোন খান্দানে দেখিনি। আবূ বকর আয-যুবায়দী তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করতেন যে, 'আমি ছাওরী ও 'আরানী গোত্রদ্বয়ের চেয়ে বেশী মসজিদে অবস্থানকারী মানুষ অন্য কোন খান্দানে দেখিনি।
রাবী' ছিলেন এমন একটি 'ইবাদাত-বন্দেগী করা খান্দানের সদস্য, যে খান্দান দীনী ও রূহানী সম্পূর্ণতায় অন্য সবার চেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি কেবল তাঁর খান্দানের মধ্যে নন, বরং গোটা তাবি'ঈ জামা'আতের সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন সেই মুষ্টিমেয় তাবি'ঈদের অন্যতম যাঁরা যুহদ ও তাকওয়ার দিক দিয়ে গোটা তাবি'ঈ সমাজের শীর্ষে ছিলেন। তাঁর যুহৃদ ও তাকওয়া এবং 'ইবাদাত-বন্দেগীর ব্যাপারে সকল 'আলেম ও লেখক একমত। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' তাঁর দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খোদাভীরু ছিলেন। আবু 'উবায়দা বলেন, আমি রাবী'র চেয়ে বেশী ভালো 'ইবাদাতকারী আর কাউকে দেখিনি। ইবন হাজার আল- 'আসকালানী লিখেছেন, রাবী'র যুহৃদ এবং তাঁর 'ইবাদাত এত প্রসিদ্ধ যে, সে বিষয়ে কিছু লেখার কোন প্রয়োজন নেই।
সকল ভালো কাজের মূল উৎস হলো আল্লাহর ভয়। রাবী'র মধ্যে আল্লাহর ভয় এত প্রবল ছিল যে, কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত। দোযখের 'আযাবের অতি সাধারণ পার্থিব নমুনা দেখেও তিনি বেহুঁশ হয়ে যেতেন। আ'মাশ বর্ণনা করেছেন: একবার রাবী' কামারের ভাটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভাটিতে জ্বলন্ত লোহা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
আরেকবারের একটি ঘটনা তাঁর বন্ধুদের একটি দল বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেন, একদিন আমরা 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে রাবী' ইবন খুছায়মও ছিলেন। আমরা ফুরাত নদীর তীরে পৌঁছলাম। সেখানে চুন বানানোর একটি ভাটির পাশ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। তখন চুন বানানোর জন্য সেই ভাটিতে পাথর ফেলা হচ্ছিল। তাতে দাউ দাউ করে প্রচণ্ড গর্জন সহকারে আগুন জ্বলছিল এবং তার লেলিহান শিখা বহু উঁচুতে উঠে যাচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে রাবী' থমকে দাঁড়িয়ে যান এবং ভীষণ কাঁপতে শুরু করেন। এ অবস্থায় তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতে থাকেন:
إِذَا رَأَتْهُمْ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا ، وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقاً مُقَرَّ نِينَ دَعَوْا هنالك ثُبُورًا .
আগুন যখন দূর থেকে তাদেরকে দেখবে, তখন তারা শুনতে পাবে তার গর্জন ও হুঙ্কার। যখন এক শিকলে কয়েকজন বাঁধা অবস্থায় জাহান্নামের কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা সেখানে মৃত্যুকে ডাকবে।
তারপর তিনি বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। আমরা তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং দীর্ঘক্ষণ সেবার পর তিনি হুঁশ ফিরে পান। আমরা তাঁকে নিয়ে তাঁর বাড়ীতে পৌছে দিই।
'ইবাদাত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারীর ভিতর দিয়েই রাবী' তাঁর জীবন শুরু করেন। শৈশব-কৈশোরেও সীমাহীন খোদাভীতি তাঁর মধ্যে বিরাজমান ছিল। এত অল্প- বয়সেও 'ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে রাত কাটিয়ে দিতেন। আল্লাহর আযাবের ভয়ে কেঁদে-কেটে অস্থির হয়ে পড়তেন। তাঁর সম্মানিতা মা ঘুমিয়ে পড়তেন। এক ঘুম পর গভীর রাতে জেগে দেখতেন তাঁর কিশোর ছেলেটি তখনো জায়নামাযে দাঁড়িয়ে অথবা একাগ্রচিত্তে মুনাজাতে নিমগ্ন। মা ডেকে বলতেন: রাবী' তুমি এখনো ঘুমাওনি? তিনি বলতেন: মা, সেই ব্যক্তি কেমন করে রাতের অন্ধকারে ঘুমাতে পারে যে জবাবদিহিতার ভয় করে? ছেলের জবাব শুনে বৃদ্ধ মায়ের চোখের পানিতে দু'গাল ভিজে যেত। তিনি প্রাণ ভরে ছেলের কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর দরবারে দু'আ করতেন।
রাবী' যুবক হলেন। আর সাথে সাথে তাঁর তাকওয়া-পরহেযগারী এবং আল্লাহভীতিও যৌবন পেল। মানুষ যখন রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকতো, আল্লাহর ভয়ে রাবী'র কান্না- কাটিও তীব্রতা লাভ করতো। তাঁর এমন বিচলিত ও অস্থির অবস্থা দেখে মায়ের অন্তর ব্যথায় ভরে যেত। ছেলে সম্পর্কে নানা রকম দুশ্চিন্তা তাঁর মনে ভর করতো। এক সময় তিনি ছেলেকে ডেকে বলতেন:
- বেটা তোমার কি হয়েছে? মনে হচ্ছে তুমি কোন অপরাধ করে বসেছো? কোন মানুষকে খুন করেছো?
বলতেন: হাঁ, মা আমি মানুষ খুন করেছি। অস্থিরভাবে মা জানতে চাইতেন: বেটা, কাকে খুন করেছো? আমাকে বল। তাহলে আমরা নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদেরকে খুশী করে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারবো। আল্লাহর কসম! নিহতের পরিবারের লোকেরা যদি তোমার এ কান্নাকাটি ও রাত জাগার কথা জানতে পারে তাহলে অবশ্যই তারা তোমার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবে।
তিনি বলতেন: আপনি কাকেও কিছু বলবেন না। আমি আমার নিজকে হত্যা করেছি। আমার নিজকে আমি পাপের দ্বারা হত্যা করেছি।
পরবর্তীকালে রাবী'র ছেলে বড় হয়ে যখন দেখতো, বাবা সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দেন তখন সে মাঝে মাঝে বাবার ঘরে ঢুকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতো: আব্বা! যথেষ্ট হয়েছে। এখন কি একটু ঘুমোবেন? তিনি জবাব দিতেন: আমার ছেলে! সেই ব্যক্তি কেমন করে ঘুমোতে পারে যে তার প্রভুর শাস্তির ভয় করে।
রাবী'র 'ইবাদাত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সারা রাত 'ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন। উপদেশমূলক আয়াত পাঠ করতেন। তা দ্বারা এত বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়তেন যে একই আয়াত বার বার পাঠ করতে করতে সকাল হয়ে যেত। তাঁর দাস নুসায়র ইবান যা'লুক বর্ণনা করেছেন। রাবী' রাতের অন্ধকারে তাহাজ্জুদ নামায পড়ার সময় যখন নিম্নের এ আয়াতে পৌঁছতেন তখন তা বার বার তিলাওয়াত করতে করতে সকাল হয়ে যেত।
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيَّاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ.
যারা খারাপ কাজ করেছে তারা কি এ ধারণা করে যে, আমরা তাদেরকে সেই লোকদের সমান করে দেব যারা ভালো কাজ করেছে? যাদের জীবন ও মরণ সমান। তারা কতই না খারাপ সিদ্ধান্ত নেয়।
'আবদুর রহমান ইবন 'আজলান বলেছেন। একদিন আমি রাবী'র ঘরে রাত্রি যাপন করি। তিনি যখন মনে করলেন, আমি ঘুমিয়ে পড়েছি, তখন নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাযের মধ্যে উপরের আয়াতটি তিনি বার বার তিলাওয়াত করেন। আর তাঁর দু'চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইতে থাকে। জামা'আতের সাথে নামায আদায়ের ব্যাপারে ভীষণ সতর্ক ছিলেন। কখনো জামা'আত ছাড়তেন না। শেষ জীবনে চলতে ফিরতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। তখনো জামা'আত তরক হতো না। অন্যের সাহায্যে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে মসজিদে পৌঁছতেন। আবূ হায়্যান তাঁর পিতার কথা বর্ণনা করেছেন। রাবী' পঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেন। তবে নামাযের জন্য হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে অথবা অন্যের সাহায্যে মসজিদে যেতেন। লোকেরা বলতো, আবু ইয়াযীদ! আপনি তো এখন মা'জুর। এ অবস্থায় ঘরে নামায আদায়েরও অনুমতি আছে। জবাব দিতেন : حَيَّ عَلَى الصَّلواة এবং حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ শোনার পর যতদূর সম্ভব সাড়া দেওয়া উচিত। তা সে হামাগুড়ি দিয়েই হোক না কেন।
রাবী' একজন নির্জন-নিরিবিলির 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। আর এ কারণে খিলাফতে রাশেদার সময়ে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কোথাও তাঁর উপস্থিতি দেখা যায় না। তবে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য নির্জন-নিরিবিলি থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেন। তাঁর এই জিহাদ এমন নির্ভেজাল আল্লাহর জন্য হতো যে, মালে গনীমত মোটেই স্পর্শ করতেন না। ভাগে যা কিছু পেতেন তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে ফেলতেন। 'আবদি খায়র নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। আমি একবার একটি যুদ্ধে রাবী'র সঙ্গী ছিলাম। এ যুদ্ধে গনীমতের অংশে তিনি বহু দাস এবং গৃহপালিত জন্তু লাভ করেন। কিছুদিন পর কোন কারণে আমাকে আবার তাঁর কাছে যেতে হয়। তখন তাঁর কাছে সেই গনীমতের মালের কোন কিছুই দেখতে না পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম: সেই দাস ও জীবজন্তুগুলোর কি হয়েছে? তিনি কোন জবাব দিলেন না। আমি যখন আবার জিজ্ঞেস করলাম তখন বললেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ.
তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর।
ইনফাক ফী সাবীলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে খরচ করা ছিল তাঁর বিশেষ গুণ। মিষ্টি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ কারণে কোন সায়িল এলে তিনি তার হাতে একটি চিনির দলা তুলে দিতেন। লোকেরা যখন বলতো, এর চেয়ে তো তার রুটির প্রয়োজন বেশী। জবাবে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন: وَيُطْعِمُوْنَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِيْنًا وَيَتِيْمًا وَأَسِيرًا. - তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতীম ও বন্দীকে খাবার দান করে।
তিনি বলতেন : 'মানুষকে ভালো খাবার খাওয়াবে, নতুন কাপড় পরাবে এবং সুস্থ-সবল দাস মুক্ত করবে।'
অভাবী-প্রতিবেশীদেরকে তিনি ভালো ভালো খাবার পাকিয়ে খাওয়াতেন। মুনযির ছাওরী বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী' তাঁর বাড়ীর লোকদেরকে 'খুবায়স' নামক এক প্রকার খাবার তৈরী করতে বলেন। যেহেতু তিনি কখনো নিজের জন্য কোন কিছুর আবদার করতেন না। এ কারণে তাঁর বেগম সাহেবা অতি যত্ন সহকারে 'খুবায়স' তৈরী করেন। তাঁর প্রতিবেশীদের মধ্যে এক উন্মাদ ব্যক্তিও ছিল। তিনি সেই 'খুবায়স' নিয়ে গিয়ে নিজ হাতে তুলে তাকে খাওয়ান। উন্মাদ লোকটির মুখ থেকে সব সময় লালা ঝরতো। তিনি যখন তাকে খাইয়ে ঘরে ফিরে আসেন তখন বেগম সাহেবা বললেন, আমি এত কষ্ট করে এবং এত যত্ন সহকারে খাবারগুলো তৈরী করলাম, আর আপনি এমন এক লোককে খাইয়ে এলেন যে এটাও বুঝতে অক্ষম যে, সে কি খেয়েছে। তিনি জবাব দিলেন: আল্লাহ তো জানেন।" তারপর তিনি তিলাওয়াত করেন: لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّوْنَ، وَمَا تُنْفِقُوا مِنْ شَيْءٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ * তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাস তা থেকে খরচ কর। আর তোমরা যা কিছু খরচ করবে, আল্লাহ তা জানেন।
রাবী'র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল 'আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার' বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ। যদিও তিনি একজন নীরব ও নির্জনতা প্রিয় মানুষ ছিলেন, তবে আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার-এর জন্য নির্জনতা ছেড়ে বেরিয়ে এসে নীরবতা ঝেড়ে ফেলতেন। তাঁর কাছে যাঁরা আসতেন তাদের তিনি বলতেন, তোমরা ভালো কথা বলবে এবং নিজেরা ভালো কথার উপর 'আমল করবে, সবসময় ভালোর উপর থাকবে। আর যতদূর সম্ভব বেশী বেশী নেক কাজ করবে এবং খারাপ কাজ কমিয়ে দেবে। নিজের অন্তরকে কঠোর করবে না। তোমার জীবনকাল এত দীর্ঘ নয়। সেইসব লোকের মত হবে না যারা মুখে তো বলে, আমরা শুনেছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা শুনে না।
কেউ যদি তাঁকে কিছু উপদেশ শোনাতে বলতো, তিনি তাঁকে কুরআনের কিছু হুকুম-আহকাম লিখে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে কিছু উপদেশ দিতে বলে। তিনি কিছু কাগজ চেয়ে নিয়ে সূরা আল-আন'আমের এ আয়াতটি লিখে দেন:
قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ... عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ
লোকটি বললো, আমি আপনার নিকট এজন্য এসেছিলাম যে, আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দেবেন। বললেন: হাঁ, এর উপর 'আমল কর।
তাকওয়া-পরহিযগারীর গর্ব ও ঔদ্ধত্য থেকে রাবী' সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তাকওয়ার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করা সত্ত্বেও কখনো পাপীদের সম্পর্কে তাঁর জিহ্বা থেকে কোন খারাপ কথা বের হতো না। নাসর ইবন যা'লুক বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি রাবী'র নিকট জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোন মানুষকে খারাপ বলেন না কেন? বললেন আল্লাহর কসম। আমি আমার নিজের ব্যাপারে নিশ্চিত নই। অন্যকে খারাপ বলবো কেমন করে? মানুষের এ বিস্ময়কর অবস্থা যে, সে অন্যের পাপের ব্যাপারে তো আল্লাহকে ভয় করে; কিন্তু নিজের পাপের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না।
রাবী' আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অনুসরণের ব্যাপারে ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। ছোট ছোট ও অতি সাধারণ কথা ও কাজে তিনি এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, কোন মানুষের চিন্তা ও কল্পনাও সেদিকে যেত না। বাকর ইবন মা'ইয বর্ণনা করেছেন। একবার রাবী'র ছোট্ট একটি মেয়ে বললো, আব্বা! আমি খেলতে যাচ্ছি। তিনি বললেন: যাও, ভালো কথা বলো। ছোট্ট বাচ্চা। তাঁর এ কথার অর্থ কেমন করে বুঝবে? লোকেরা রাবী'কে বললো: আপনি এই শিশুকে খেলতে যেতে দেন না কে? বললেন: আমি এটা চাই না, আমার আজকের আমলনামায় এ কথা লেখা হোক যে, আমি খেলার নির্দেশ দিয়েছি।
তিনি সকল কাজ নিজ হাতে করতেন। বাড়ীর পায়খানাও নিজ হাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। একবার এক ব্যক্তি বললো, এ কাজের জন্য তো অন্য মানুষ আছে। বললেন, আমি বাড়ীর কাজ-কর্মেও অংশীদার হতে চাই। তাঁর চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ীভাব দেখে তাঁর শিক্ষক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) বলতেন, তোমাকে দেখে আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়। কখনো কোন অবস্থাতেই তাঁর মুখ থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী কোন কথা উচ্চারিত হতো না। কারো দ্বারা কষ্ট পেলেও তার জন্য দু'আ করতেন। একদিন মসজিদে মুসল্লীদের ভীষণ ভীড় ছিল। যখন জামা'আত আরম্ভ হতে যাচ্ছিল এবং ধীরে ধীরে লোকেরা সামনে এগুচ্ছিল, ঠিক সে সময় রাবী'র পিছনের লোকটি তাঁকে বলে, সামনে এগোন। কিন্তু অত্যধিক ভীড়ের কারণে তিনি সামনে এগুতে পারছিলেন না। লোকটি রেগে গিয়ে পিছন থেকে রাবী'র ঘাড়ে খোঁচা দেয়। তিনি ব্যথা পান এবং একথা বলতে থাকেন : আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন, আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। লোকটি চোখ উঁচু করে রাবী'কে দেখতে পেয়ে এত লজ্জিত হয় যে, কাঁদতে শুরু করে।
তিনি সব সময় একাকী থাকা পছন্দ করতেন। কোথাও আসা-যাওয়া করতেন না। কোন অনুষ্ঠান ও সমাবেশে বসাও পছন্দ করতেন না। ইমাম শা'বী বলেন, রাবী' বিবেক-বুদ্ধি হওয়ার পর না কোন মজলিসে বসেছেন, আর না কোন প্রধান সড়কে গেছেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলতেন, আমি এটা পছন্দ করতাম না যে, কোন স্থানে যাই, আর সেখানে এমন কিছু দেখি যাতে আমাকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ডাকা হয়, আর আমি সাক্ষ্য দিতে না পারি, কোন অভাবী মানুষকে দেখি, আর তার কোন সাহায্য করতে না পারি, অথবা কোন মজলুমকে দেখি ও তার কোন উপকারে আসতে না পারি।
বাড়ীতেও তিনি সব সময় চুপচাপ থাকতেন। খুব কম কথা বলতেন। কোন বাজে কথা তার মুখে কখনো উচ্চারিত হতো না। এক ব্যক্তি, যিনি রাবী'র সাহচর্যে বিশ বছর কাটান, বর্ণনা করেছেন যে, আমি তাঁর সাহচর্যে বিশ বছরের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, এ সময়ে আমি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত এমন কোন কথা শুনিনি যার সমালোচনা হতে পারে। একই ব্যক্তি আরো বলেছেন, আমি বিশ বছরে রাবী'র মুখ থেকে ভালো কথা ছাড়া অন্য কোন কথা বের হতে শুনিনি। তামীম গোত্রের আরেক ব্যক্তি বলেছেন, আমি দু'বছর যাবত রাবী'র সাথে বসেছি। এর মধ্যে তিনি আমার কাছে মানুষের পার্থিব অবস্থা সম্পর্কে কোন প্রশ্ন করেননি। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন, তোমাদের মহল্লায় কয়টি মসজিদ আছে? অন্যদেরকেও তিনি বাজে কথা বলতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন, তোমরা কম কথা বলবে। তবে এই নয়টি ক্ষেত্রে বেশী বলতে দোষ নেই:
১. তাহলীল : لا إله إلا الله
২. তাকবীর : الله اكبر
৩. তাসবীহ : سبحان الله
৪. তাহমীদ : الحمد لله
৫. কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে দু'আ করা
৬. খারাপ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা
৭. আমর বিল মা'রূফ
৮. নাহি 'আনিল মুনকার
৯. কুরআন তিলাওয়াত।
তিনি আরো বলতেন : মানুষকে ভালো কথা বলা শেখাবে, খারাপ কথা বলা থেকে তাদেরকে বিরত রাখবে। কুরআন তিলাওয়াত করবে, আল্লাহর কাছে কল্যাণের জন্য দু'আ করবে এবং অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সাহায্য চাইবে।
রাবী' যদিও চুপচাপ ও একাকী থাকতেন, তবুও ফুলের সুবাস ও সূর্যের আলো যেমন আবদ্ধ করে রাখা যায় না, তেমনিভাবে তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য মানুষের দৃষ্টির আড়ালে থাকেনি। তাঁর চরিত্রের সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর চরিত্র-মাধুর্য দ্বারা মানুষ দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়ে। শাফীক বর্ণনা করেছেন, একবার আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) কয়েকজন ছাত্রের সাথে রাবী'র সংগে সাক্ষাতের জন্য গেলাম। পথে এক ব্যক্তি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? আমরা বললাম: রাবী'র সংগে দেখা করার জন্য। লোকটি বললো : আপনারা এমন এক ব্যক্তির কাছে যাচ্ছেন, যিনি কোন কথা বললে মিথ্যা বলেন না, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করেন না এবং তাঁর কাছে কোন কিছু আমানত রাখলে খিয়ানত করেন না।
কোন মানুষের সমকালীনদের স্বীকৃতিই হলো তার মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। রাবী'র সমকালীন লোকেরা তাঁর প্রতি এত মুগ্ধ ছিলেন যে, কেউ কোনভাবে তাঁর চেয়ে নিজেকে বড় ভাবা পছন্দ করতো না। একবার এক ব্যক্তি আবূ ওয়াইলকে প্রশ্ন করে : আপনি বড় না রাবী'? জবাবে তিনি বলেন: আমি বয়সে তাঁর চেয়ে বড়, তবে তিনি বুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় আমার চেয়ে বড়।
তিনি যেমন কম কথা বলতেন, তেমনি কোন বিতর্কেও জড়ানো পছন্দ করতেন না। একবার তাঁর এক আত্মীয় দেখা করতে এলো। কথার ফাঁকে এক সময় লোকটি বললো: আবু ইয়াযীদ! হুসায়ন ইবন ফাতিমা (রা) নিহত হয়েছেন। তিনি বললেন: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি'উন- নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই কাছে আমরা ফিরে যাব। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন:
قُلِ اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمْ بَيْنَ عِبَادِكَ فِي مَا كَانُوا فِيْهِ يَخْتَلِفُوْنَ *
বলুন, হে আল্লাহ, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী! আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন, যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করতো।
রাবী'র এ কথায় লোকটি সন্তুষ্ট হতে পারলো না। সে প্রশ্ন করলো : তাঁর হত্যার ব্যাপারে আপনি কি বলেন?
বললেন : আমি বলি তাঁদেরকে আল্লাহরই কাছে ফিরে যেতে হবে এবং তাঁদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহই করবেন। আল-জাহিজ বলেন : 'ফিতনা-ফাসাদ সম্পর্কে রাবী' কোন কথা বলতেন না এবং কোন কথা শুনতেনও না। '
একবার এক ব্যক্তি বললেন: আপনি আমাকে কিছু উপদেশ দিন, আল্লাহ আপনাকে ভালো প্রতিদান দেবেন। বললেন: তোমার জ্ঞানের পরিধির মধ্যে যা কিছু আছে, সে ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আর যা কিছু জ্ঞান তোমার নেই, তা যিনি জানেন সেই সত্তার নিকট তা সোপর্দ কর। তোমাদের কেউ যেন না বলে: 'হে আল্লাহ, আমি তোমার দিকে ফিরে এসেছি।' তারপর যদি সে ফিরে না আসে তাহলে সেটা হবে মিথ্যা, তাই সে যেন বলে: 'হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতি ফিরে আসুন!' তাহলে এটা হবে দু'আ।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো: আমি দীর্ঘ দিন যাবত আপনার সাথে আছি, এর মধ্যে একদিনও আপনাকে কবিতার কোন উদ্ধৃতি দিতে শুনলাম না। অথচ আপনার সঙ্গী- সাথীদের অনেককে আমি কবিতার উদ্ধৃতি দিতে শুনেছি। বললেন: যা কিছু তোমরা এখানে বলবে তা সবই লেখা হবে এবং সেখানে তোমাদেরকে পাঠ করে শুনানো হবে।
তারপর উপস্থিত সবার প্রতি দৃষ্টিপাত করে বললেন: তোমরা বেশী করে মৃত্যুকে স্মরণ কর। কারণ, সে তোমাদের থেকে অনুপস্থিত পর্যবেক্ষণকারী। আর অনুপস্থিত ব্যক্তির দূরে অবস্থানের মেয়াদ দীর্ঘ হয়ে গেলে তার ফেরার সময়ও নিকটবর্তী হয়ে পড়ে। তারপর কিছুক্ষণ অঝোরে কাঁদলেন। কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে বললেন: সেই সময় তুমি কি করবে যখন এ অবস্থা হবে:
إِذَا دُكَّتِ الْأَرْضُ دَكًّا. وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا، وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ. يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى **
যখন পৃথিবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে এবং আপনার পালনকর্তা ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হবেন। সেদিন জাহান্নামকে আনা হবে। সেদিন মানুষ স্মরণ করবে, কিন্তু এই স্মরণ তার কি কাজে আসবে?
তিনি বলতেন, আমার যদি দু'টি মন থাকতো তাহলে একটা কোথাও আটকে গেলে অন্যটি তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতো। কিন্তু আমার তো একটি মাত্র মন। সেটা যদি আমি অন্য কোথাও আটকে ফেলি তাহলে তাকে ছাড়াবে কে?
কেউ যদি তাঁকে জিজ্ঞেস করতো : রাবী'! আজ আপনার সকালটি কি অবস্থায় হলো? বলতেন: দুর্বল পাপী অবস্থার মধ্যে আমার সকাল হয়েছে। এরপর নির্ধারিত রিযিক খাবো এবং মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকবো।
তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহর উপর নির্ভরতার প্রকৃত রহস্য এই যে, কোন কাজে আপ্রাণ চেষ্টা করে তার সফলতা ও ব্যর্থতা আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। কিন্তু তাওয়াক্কুলের আরো একটা উঁচু ধাপ আছে। যার অধিকারী কেবল আল্লাহর একান্ত বিশেষ ব্যক্তিরা হয়ে থাকেন। আর তা হলো, কোন কাজ সম্পন্ন করার জন্য দুনিয়ার উপায়-উপকরণের কোন রকম সাহায্য-সহায়তা না নিয়ে সবকিছু আল্লাহর হাওয়ালা করে দেওয়া। রাবী' তাওয়াক্কুলের এই চূড়ান্ত পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন। জীবন-মরণের মুখোমুখি অবস্থায়ও তিনি পার্থিব উপায়-উপকরণ অবলম্বন করতেন না। প্যারালাইসিসের মত কষ্টদায়ক রোগে আক্রান্ত ছিলেন, কিন্তু কোন রকম চিকিৎসা গ্রহণ করতেন না। লোকেরা বলতো: ইস! আপনি যদি চিকিৎসা করাতেন! বলতেন: 'আদ, ছামূদ ও আসহাবে রাস- সব জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা অতিক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যবর্তী সময়ে আরো জাতি-গোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল। তাদের মধ্যে চিকিৎসকও ছিল। কিন্তু আজ না সেই চিকিৎসক বেঁচে আছে, আর না যাদেরকে চিকিৎসা করা হয়েছে, তারা।
এই চরম আল্লাহ নির্ভরতার ফল এই দাঁড়ালো যে, তাঁর প্যারালাইসিস রোগ শেষ পর্যন্ত অন্তিম রোগে পরিণত হলো। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি সবার সামনে এ স্বীকৃতি দান করেন যে, আমি আমার নিজের উপর আল্লাহকে সাক্ষী মানছি, তিনি তাঁর নেক বান্দাদের সাক্ষ্য, তাদের প্রতিদান ও বদলা দানের জন্য যথেষ্ট। আমি আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, দীনে ইসলাম, মুহাম্মাদ (সা)-এর নবুওয়াত, রিসালাত এবং কুরআনের ইমামতের ব্যাপারে রাজি। আমি নিজের সত্তা, আর ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে যে আমার অনুসরণ করে, একথার উপর রাজি যে, আমরা সকলে 'আবিদীনের দলের মধ্যে থেকে আল্লাহর 'ইবাদাত করবো, আল্লাহর হামদকারীদের মধ্যে তাঁর হামদ করবো। মুসলমানদের কল্যাণ কামনা করবো। স্বীকৃতি দানের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে যখন তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে তখন পাশে বসা মেয়ে কাঁদতে আরম্ভ করে। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন: মেয়ে, তুমি কাঁদছো কেন? কল্যাণ তোমার পিতার সামনে উপস্থিত।
তাঁর মৃত্যুসন নিয়ে একটু মতপার্থক্য আছে। হিজরী ৬১, ৬৩ ও ৬৪ সনের কথা বলা হয়েছে। 'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ তখন কুফার ওয়ালী এবং ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়া (রা) মুসলিম জাহানের খলীফা।
টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৫৮
২. তাহযীব আত-তাহযীব-৩/২৪২
৩. তাবাকাত-৬/১২৭
৪. 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১১; সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
৫. সূরা আল-আনফাল-৩
৬. সূরা হুদ-৯
৭. সূরা সাদ-৫
৮. তাবাকাত-৬/১২৮
৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১০. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২০৮
১১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৭
১২. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৩. তাবাকাত-৬/১৩৩
১৪. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮
১৬. তাবাকাত-৬/১২৭
১৭. তাহযীবুত তাহযীব-৩/২৪২
১৮. তাবাকাত-৬/১৩১
১৯. সিফাতুস সাফওয়া-৩/৬২; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১১২
২০. সূরা আল-ফুরকান-১২-১৩
২১. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬০-৬১
২২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/২৬০
২৩. তাবাকাত-৬/১৩০
২৪. সূরা আল-জাছিয়া-২
২৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৬২
২৬. তাবাকাত-৬/১৩২
২৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩৩
২৮. প্রাগুক্ত-৬/১৩১
২৯. সূরা আদ-দাহর-৮
৩০. আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়ীন-৩/১৫৮
৩১. তাবাকাত-৬/১৩১
৩২. সূরা আলে 'ইমরান-৯২
৩৩. সূরা আল-আন'আম-১৫১
৩৪. তাবাকাত-৬/১৩০
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/১২৯
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/১২৭
৩৭. প্রাগুক্ত-৬/১৩০
৩৮. প্রাগুক্ত-৬/১২৯; আল-বায়ান-৩/১৪৬
৩৯. আল-'ইক্বদ আল-ফারীদ-৩/১৫০
৪০. তাবাকাত-৬/১২৯
৪১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪২৪
৪২. সূরা আয-যুমার-৪৬
৪৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১০৫
৪৪. সূরা আল-ফাজর-২১-২৩
৪৫. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ৫৭-৫৯
৪৬. আল-'ইক্দ আল-ফারীদ-৩/১৭৯
৪৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৭৪
৪৮. তাবাকাত-৬/১৩০
৪৯. প্রাগুক্ত-৬/১৩৪
৫০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৮; সিফাতুষ সাফওয়া-৩/৩১; 'আসরুত তাবি'ঈন, ২১৯