📄 মাসরূক ইবন আল-আজদা‘ (রহ)
হযরত মাসরূকের ডাক নাম আবূ 'আয়িশা। তাঁর পিতার নাম আল-আজদা'। এটা ছিল তাঁর জন্মের পর পিতা-মাতা প্রদত্ত নাম। ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁর পিতার নাম হয় 'আবদুর রহমান। তিনি ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত খান্দান হামাদানের একজন নেতা এবং আরবের অন্যতম খ্যাতিমান পুরুষ 'আমর ইবন মা'দিকারিব-এর প্রীতিভাজন ব্যক্তি। ইমাম যুহরী মাসরূককে 'আমরের ভাগ্নে বলে উল্লেখ করেছেন।
মাসরূক জাহিলী ও ইসলামী দু'যুগই পেয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (সা)-এর রিসালাতের সময়কালেও তিনি বর্তমান ছিলেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা সে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনকি তাঁর অতি আপনজন 'আমর ইবন মা'দিকারিব (রা) মদীনায় এসে হযরত রাসূলের কারীমের (সা) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু মাসরূকের দুর্ভাগ্য যে, এ সময় ইসলাম গ্রহণ থেকে তিনি বঞ্চিত থেকে যান। তিনি কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফাতকালে তিনি মুসলমান হন বলে কিছু কিছু বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়। ইবন সা'দের তাবাকাতে মাসরূকের নিজের এ রকম একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, 'আমি আবূ বকরের (রা) পিছনে নামায পড়েছি।'
হযরত 'উমার ফারুকের (রা) খিলাফতকালে মাসরূককে দৃশ্যপটে দেখা যায়। সে সময় একবার ইয়ামনী প্রতিনিধি দলের সাথে মদীনায় আসেন। হযরত 'উমার (রা) তাঁর পরিচয় জানতে চান। তিনি বলেন: আমি মাসরূক ইবন আল-আজদা'। 'উমার (রা) বলেন: আল-আজদা' তো শয়তানের নাম। এখন থেকে আপনি হবেন মাসরূক ইবন 'আবদির রহমান। আর এখান থেকেই তাঁর পিতার নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। এ রকম একটি বর্ণনাও আছে যে, হযরত 'উমার (রা) তাঁকে নয়, বরং তাঁর পিতাকে নাম জিজ্ঞেস করে আজদা'-এর স্থলে 'আবদুর রহমান নামটি প্রস্তাব করেন। যাই হোক না কেন, এ দু'টি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে পিতা-পুত্র দু'জনই মদীনায় এসেছিলেন। এ রকম একটি বর্ণনাও আছে যে, শিশু অবস্থায় তিনি চুরি হয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে পাওয়া যায়। তাই তাঁর নাম হয় 'মাসরূক'। যার অর্থ চুরি হয়ে যাওয়া।
মাসরূক ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত অশ্বারোহীদের অন্যতম ব্যক্তি। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি তাঁর তিন ভাই- 'আবদুল্লাহ, আবূ বকর ও মুনতাশার-এর সাথে বিখ্যাত কাদেসিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তাঁর তিন ভাই শাহাদাত লাভ করেন। আর অস্ত্র চালাতে চালাতে মাসরূকের হাত অবশ হয়ে যায় এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। এ আঘাতের চিহ সারা জীবন বিদ্যমান ছিল। যেহেতু এই চিহ টি ছিল তাঁর সাহস, বীরত্ব ও জীবন বাজি রাখার একটি সনদ, তাই এটাকে তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন এবং এটা মুছে যাওয়া মোটেই আশা করতেন না।
তবে তাঁর এ বীরত্ব ও বাহাদুরী ছিল ইসলামের সেবায় এবং ইসলাম বিরোধী শক্তির মুকাবিলায়। মুসলমানদের গৃহযুদ্ধে তাঁর তরবারি সবসময় কোষবদ্ধই ছিল। হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালের কোন বিদ্রোহ ও বিশৃংঙ্খলায় কোনভাবেই অংশগ্রহণ করেননি। ইসলামের একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে তিনি নিজের শহর কূফার অধিবাসীদের মদীনাবাসীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য সব সময় উৎসাহিত করতেন।
হযরত 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর যখন উটের যুদ্ধের তোড়াজোড় শুরু হয়ে যায় এবং সমর্থন ও সাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে হযরত 'আলী (রা) যখন হযরত হাসান (রা) ও 'আম্মার ইবন ইয়াসিরকে (রা) কুফায় পাঠান তখন এই মাসরূক সর্বপ্রথম তাঁদের সাথে মিলিত হন। তিনি 'আম্মার ইবন ইয়াসিরকে (রা) জিজ্ঞেস করেন: 'আবুল ইয়াকজান! আপনারা 'উছমানকে (রা) কোন কারণে শহীদ করেন? তিনি বলেন: আমার ইজ্জত আবরু নিয়ে টানাটানি ও আমাকে পিটুনির কারণে।
মাসরূক বলেন: আল্লাহর কসম! আপনারা যতখানি ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন তার চেয়ে বেশী বদলা নিয়ে ফেলেছেন। যদি আপনারা ধৈর্য ধরতেন, তাহলে সেটাই আপনাদের জন্য ভালো ছিল।'
উটের যুদ্ধের মাধ্যমে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়, সিফফীন যুদ্ধ পর্যন্ত তা চলমান ছিল। মাসরূক এর একটিতেও অংশগ্রহণ করেননি। হযরত 'আলীর (রা) সমর্থকদের বড় কেন্দ্র ছিল কৃষ্ণা। এখানে অবস্থান করে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখা ভীষণ কঠিন ব্যাপার ছিল। এ কারণে এ সময় তিনি কৃষ্ণা ছেড়ে কাযবীন চলে যান।
শা'বী বর্ণনা করেছেন, কোন একটি যুদ্ধেও মাসরূক 'আলীর (রা) সাথে ছিলেন না। পরবর্তীকালে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতো যে, আপনি 'আলীর (রা) সাথে ছিলেন না কেন? তিনি বলতেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, ধরে নাও আমরা একে অপরের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছি এবং উভয় পক্ষ অস্ত্র হাতে একে অপরকে হত্যা করে চলেছি, আর সেই সময় তোমাদের চোখের সামনে আসমানের কোন দরজা খুলে গেল এবং সেখান থেকে কোন ফেরেশতা বেরিয়ে এসে মুখোমুখি দু'টি সারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضِ مِّنْكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ، إِنَّ اللَّهَ بِكُمْ رَحِيمًا .
‘ওহে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ-সম্পদ খেয়ো না। তবে তোমাদের পরস্পরের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে খেতে পার। আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।’
তাহলে তার এ বলা উভয় পক্ষকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবে কিনা? লোকেরা জবাব দিত : নিশ্চয় বিরত রাখবে। তখন তিনি বলতেন, আল্লাহর কসম! তোমাদের জানা উচিত যে, আসমানের দরজা খোলা হয়েছে এবং সেখান থেকে একজন ফিরিশতা এসে তোমাদের নবীকে এ নির্দেশ শুনিয়ে গেছেন। আর তা মাসহাফে বিদ্যমান আছে এবং তা অন্য কিছু দ্বারা রহিত করা হয়নি।
‘আমির থেকে অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। মাসরূক আমাকে বললেন, যখন মু'মিনদের দু'টি দল পরস্পরের সাথে লড়াই করার জন্য মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, আর তখন আসমান থেকে কোন ফিরিশতা আত্মপ্রকাশ করে চিৎকার করে বলে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بِالْبَاطِلِ الخ
তখন তোমার কি ধারণা? তারা যুদ্ধ করবে, না যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে? আমি বললাম: তারা যদি অনুভূতিহীন জড় পাথর না হয় তাহলে অবশ্যই রণেভঙ্গ দেবে। আমার এ জবাব শুনে তিনি বললেন, আল্লাহর এক আসমানী বন্ধু উপরোক্ত নির্দেশ নিয়ে ধরাপৃষ্ঠে আল্লাহর আর এক বন্ধুর নিকট অবতরণ করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ যুদ্ধ থেকে বিরত হয়নি। অথচ না দেখে ঈমান আনা দেখার পর ঈমান আনার চেয়ে ভালো। আরেকটি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি শুধু নিজেই এ গৃহযুদ্ধ থেকে দূরে ছিলেন না, বরং মুসলিম জনগণকে বিরত রাখার জন্য সিফ্ফীনের যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্তও গিয়েছিলেন। তিনি বিবাদমান দু'টি দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উপরোক্ত উপদেশমূলক কথা শুনিয়ে তাদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সঠিক কথা এটাই যে, তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং কোনভাবেই সিফ্ফীনের রণক্ষেত্রে যাননি।
উমাইয়্যা খিলাফতকালে তিনি কিছুদিনের জন্য কাযী ছিলেন। হিজরী ৬৩ সনে তিনি ‘ওয়াসিত’ নামক স্থানে অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সারাটি জীবন তিনি এই নির্ভরতাকে আঁকড়ে থাকেন। পার্থিব ধন-সম্পদ তাঁর জীবনকে কখনো কলুষিত করতে পারেনি। বিচারকের দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি কোন পারিশ্রমিক নিতেন না। এ জন্য কাফনের কাপড় পর্যন্ত কেনার পয়সা তাঁর ঘরে ছিল না। শা'বী বলেছেন, মাসরূক মৃত্যুর সময় কাফনের কাপড় কেনার মত অর্থও রেখে যাননি। তার জন্য তিনি ঋণ করার অসীয়াত করে যান। তবে একথাও বলে যান যে, কৃষি পেশার লোক এবং রাখালদের থেকে নিবে না। বরং যারা গৃহপালিত প্রাণী পালন করে, অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করে তাদের থেকে নিবে। একেবারে শেষ নিঃশ্বাসের আগে তিনি আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের দরবারে এভাবে দু'আ করেন: 'হে আল্লাহ! আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবূ বকর (রা) ও 'উমারের (রা) সুন্নাতের পরিপন্থী কোন পথ ও পদ্ধতির উপর মরছি না। আল্লাহ, তোমার কসম! আমি আমার তরবারিটি ছাড়া কোন মানুষের নিকট কোন সোনা-রূপো রেখে যাচ্ছি না। এর দ্বারাই আমার কাফন-দাফন করবে।' এ কথা দ্বারা সম্ভবতঃ তিনি তরবারিটি বিক্রি করে কাফনের অর্থ সংগ্রহের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন।
এসব অসীয়াত তথা অন্তিম উপদেশবাণী দান করার পর তিনি ওয়াসিত-এ হিজরী ৬৩ সনে ইনতিকাল করেন। সেখানেই দাফন করা হয়।
তাঁকে তাবি'ঈ 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের তীব্র বাসনা দেখা যায়। শা'বী বর্ণনা করেছেন, মাসরূকের চেয়ে জ্ঞান অন্বেষণকারী আর কেউ ছিল না। সৌভাগ্যবশতঃ তিনি হযরত 'আয়িশার (রা) মত স্নেহময়ী বিদুষী মা লাভ করেছিলেন। তিনি মাসরূককে ছেলের মত দেখতেন এবং ছেলের মত স্নেহ করতেন। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। কিন্তু এসব বর্ণনা ঠিক নয়। তবে তিনি মাসরূককে অতি বেশী স্নেহ করতেন এবং তাঁকে 'আমার ছেলে' বলে ডাকতেন। মাসরূক যখন হযরত 'আয়িশার (রা) দরবারে উপস্থিত হতেন তখন তিনি তাঁকে মধুর শরবত পান করাতেন। একবার মাসরূক কয়েকজন লোক সংগে করে হযরত 'আয়িশার (রা) কাছে আসেন। তিনি বাড়ীর লোকদের নির্দেশ দেন, আমার ছেলেদের জন্য মধুর শরবত বানাও। হযরত 'আয়িশা (রা) ছাড়াও মাসরূক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি ইবন মাস'উদের (রা) যোগ্যতম ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন। ইবন মাদাইনী বলেছেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) ছাত্র-সঙ্গীদের মধ্যে মাসরূকের উপর অন্য কাউকে প্রাধান্য ও গুরুত্ব দিই না।
মাসরূকের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সাধনা এবং উপরে উল্লেখিত মহান দু'ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সাহচর্য তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ 'আলিমে পরিণত করে। ইমাম যাত্রী তাঁকে একজন ফকীহ্ ও শ্রেষ্ঠ 'আলিম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর মহত্ব, বিশ্বস্ততা, মর্যাদা এবং ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সবাই একমত। মুররা তো বলতেন, 'হামাদান গোত্রের কোন নারী মাসরূকের মত দ্বিতীয় কোন সন্তান জন্ম দিতে পারেনি।
হাদীছ ও সুন্নাহতে মাসরূকের জ্ঞান অনেক গভীর ও ব্যাপক ছিল। এ জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন সরাসরি বহু উঁচু স্তরের সাহাবীর নিকট থেকে। যেমন: হযরত 'আয়িশা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবূ বকর (রা), 'উমার (রা), 'উছমান (রা), 'আলী (রা), মু'আয ইবন জাবাল (রা), উবাই ইবন কা'ব (রা), যায়েদ ইবন ছাবিত (রা), খাব্বাব ইবন আরাত (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা), মুগীরা ইবন শু'বা (রা) ও আরো অনেকে। হাদীছের সাথে সাথে তিনি সুন্নাহ্ও শিক্ষা দিতেন।
ফিকাহ্ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এ শাস্ত্রে তিনি ইমাম ও ইজতিহাদের মর্যাদা ও যোগ্যতা লাভ করেন। তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সেইসব শিষ্য- শাগরিদদের মধ্যে ছিলেন যাঁদের কাজই ছিল দারস ও ইফতা (শিক্ষা ও ফাতওয়া দান)। বিচার কাজে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাযী শুরায়হ অনেক সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। শা'বীর মতে ফাতওয়ার ক্ষেত্রে মাসরূক কাযী শুরায়হ-এরও উপরে ছিলেন। কাযী শুরায়হ তাঁর পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করতেন। কিন্তু মাসরূকের তাঁর পরামর্শের প্রয়োজন পড়তো না।
ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর এই বিশেষ যোগ্যতার কারণে বিচার-ফায়সালায় ছিল তাঁর বিশেষ ঝোঁক ও রুচি। এ কাজ তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি যে একজন যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন তার প্রমাণ হলো কাযী শুরায়হ তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। উমাইয়্যা খিলাফতকালে তিনি কিছুদিনের জন্য কাযীর দায়িত্ব পালনও করেন। বিচার-ফায়সালায় তাঁর এত বেশী আগ্রহ ছিল যে, তিনি বলতেন, আমার কাছে একটি বিবাদে সত্য-সঠিক ফায়সালা করা এক বছর 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' (আল্লাহর পথে জিহাদ) থেকে বেশী পছন্দ।
'ইলমের সাথে সাথে মাসরূকের মধ্যে 'আমলও ছিল। তিনি উন্নত নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। যাবতীয় নৈতিক গুণের উৎস হলো খোদাভীতি। তিনি খাওফে খোদা বা খোদাভীতিকে প্রকৃত জ্ঞান বলে বিশ্বাস করতেন। আর তার বিপরীতে 'আমল বা কর্মের অহঙ্কারকে মূর্খতা জ্ঞান করতেন। তিনি বলতেন: 'মানুষের জন্য এই জ্ঞান যথেষ্ট যে, সে আল্লাহকে ভয় করে। আর নিজের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করাটাই মূর্খতা।'
তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞান আহরণের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও আবেগ পোষণ করতেন। ইমাম শা'বী তাঁর এমন একটি ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন যা দ্বারা তাঁর আগ্রহের তীব্রতা অনুমান করা যায়। তিনি বলেছেন: মাসরূক একবার বসরায় এক ব্যক্তির কাছে গেলেন একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য। কিন্তু তাঁর কাছে তেমন কোন জ্ঞান লাভ করতে পারলেন না। সেখান থেকে তাঁকে বলা হলো, আমাদের এখানে শামের এক ব্যক্তি আসেন তাঁর কাছে এ সম্পর্কিত জ্ঞান আছে। সেখান থেকে মাসরূক সেই ব্যক্তির খোঁজে শামের পথ ধরেন। প্রিয় পাঠক! বসরা থেকে শাম নিকটের কোন দূরত্ব ছিল না। এ ছিল বহু দিন ও বহু কষ্টের পথ। একটি মাত্র আয়াত সম্পর্কে জানার জন্য তিনি এ পথ পাড়ি দিয়েছেন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি সীমাহীন আগ্রহ ও শক্ত অঙ্গীকার ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়।
তিনি একজন বড় 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। ইবাদাতের কঠিন অনুশীলন করতেন। ক্রমাগতভাবে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা দু'টি ফুলে যেত। বছরের বিশেষ বিশেষ সময় তাঁর ইবাদাত অত্যধিক বেড়ে যেত। কোথাও 'তাউন'-এর মহামারী দেখা দিলে তিনি নির্জন স্থানে গিয়ে 'ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। অনেকে সন্দেহ করতো তিনি হয়তো তা'উন-এর ভয়ে লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আসলে তা নয়। তাঁর উদ্দেশ্য হতো একাগ্র চিত্তে 'ইবাদাতে নিমগ্ন থাকা। আনাস ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন, আমরা জানতে পেলাম যে, মাসরূক তা'ঊন থেকে পালাতেন। কিন্তু মুহাম্মাদ একথা বিশ্বাস করলেন না। তিনি বললেন, বিষয়টি তাঁর স্ত্রীর নিকট জিজ্ঞেস করা উচিত। আমরা একদিন তাঁর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! ব্যাপারটি তা নয়। তিনি কখনো 'তা'উন' থেকে পালাতেন না। তবে যখন তা'ঊন-এর মহামারি দেখা দিত, তিনি বলতেন, এই যিক্র ও আমলের দিনগুলোতে আমি চাই নিরিবিলিতে 'ইবাদাত করতে। তারপর তিনি শুধুমাত্র 'ইবাদাতের জন্য নির্জনতা অবলম্বন করতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজের উপর এত কঠিন কাজ চাপিয়ে দিতেন যে, অনেক সময় আমি তা দেখে তাঁর পিছনে বসে কাঁদতে শুরু করতাম। হজ্জের সময় যতদিন মক্কায় থাকতেন, সিজদার মধ্যেই ঘুমের কাজ সেরে নিতেন। মাসরূকের স্ত্রীর নাম ছিল ফায়রূয। একবার তিনি যখন দেখলেন মাসরূক একাধারে রোযা রেখেই চলেছেন তখন তিরস্কারের সুরে বললেন: মাসরূক! আপনি ছাড়া আর কেউ কি আল্লাহর 'ইবাদাত করে না? জাহান্নাম কি কেবল আপনার জন্য তৈরী করা হয়েছে? জবাবে মাসরূক বললেন: ফায়রূয! জান্নাতের সন্ধানকারী ব্যক্তি ক্লান্ত হয় না, আর জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী ঘুমায় না।
তিনি নিজের নফসের মুহাসাবা বা আত্ম সমালোচনা এবং পাপ স্মরণ করে তার জন্য ইসতিগফার করা অত্যন্ত জরুরী মনে করতেন। তিনি বলতেন, মানুষের জন্য এমনসব মজলিস থাকা উচিত যেখানে বসে তারা নিজেদের পাপকে স্মরণ করে আল্লাহর নিকট ইসতিগফার করতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোন মূল্যই ছিল না। তিনি দুনিয়াকে ময়লা-আবর্জনার চেয়ে বেশী কিছু মনে করতেন না। একদিন তিনি তাঁর এক ভাতিজার হাত ধরে একটি ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থানে নিয়ে যান। তাকে বলেন, আমি তোমাকে দুনিয়া ফি তা দেখাচ্ছি। দেখ, এই হচ্ছে দুনিয়া। এসব কিছু খেয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, পরে পুরানো ও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, এর পিঠে আরোহণ করে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আর এর জন্য কত না রক্ত ঝরিয়েছে, আল্লাহর হারামকে হালাল করেছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
আর এ কারণে দুনিয়ার প্রতি তাঁর অন্তর কখনো ঝোঁকেনি এবং পার্থিব কোন জিনিসের প্রতিও তাঁর কোন আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়র ছিলেন তাঁর সম- চিন্তা ও সম-মতের মানুষ। তাঁদের মধ্যে অনেক রহস্যময় ও গূঢ় কথাবার্তা হতো। ইবন যুবায়র বলেছেন, মাসরূক একদিন আমাকে বললেন, সা'ঈদ! এখন এমন আর কোন জিনিস নেই যার প্রতি অন্তরের আকর্ষণ থাকতে পারে। শুধু এটাই আছে যে, নিজের চেহারাকে ধুলি মলিন করি।
দুনিয়ার প্রতি তাঁর এমন বীতস্পৃহ ভাবের কারণে দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব থেকে সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। বহু মানুষ তাঁর প্রয়োজন পূরণ করতে এবং তাঁর সেবায় নিয়োজিত হতে চাইতো, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতেন না। একবার খালিদ ইবন উসায়দ তাঁর নিকট তিরিশ হাজার দিরহাম পাঠালেন। তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফেরত দিলেন। তাঁর আত্মীয়-বন্ধুরা তাঁকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করলেন যে, আপনি গ্রহণ করে তা সাদাকা করে দিন। আত্মীয়-বন্ধুদের দান করুন এবং অন্য সব ভালো কাজে লাগান। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে রাজী করাতে পারলেন না।
এই তীব্র আত্ম-নির্ভরতা ও অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষীহীনতা কখনো কখনো তাঁকে পরিবারসহ অভুক্ত অবস্থার মধ্যে ফেলে দিত। এমতাবস্থায়ও তাঁর প্রগাঢ় আল্লাহ- নির্ভরতায় কোন রকম ফাটল ধরতো না। একদিন ঘরে খাবার মত কিছুই ছিল না। স্ত্রী জানান দিলেন, 'আয়িশার বাপ, আজ আপনার ছেলে-মেয়েদের খাবার মত ঘরে কিছু নেই। একথা শুনে মাসরূক একটু হেসে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! তিনি অবশ্যই তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করবেন।
এত অল্পে তুষ্টি ও আল্লাহ নির্ভরতার ভিতর দিয়েও তিনি ছিলেন একজন দরাজদিল দানশীল ব্যক্তি। কোন সময় কোনভাবে হাতে কিছু পয়সা-কড়ি এলেই সাথে সাথে আল্লাহর ওয়াস্তে বিলিয়ে দিতেন। সায়িব ইবন আকরা'র সাথে এক মেয়ের বিয়ে দেন। সায়িব শ্বশুরের হাতে দশ হাজার দিরহামের মত মোটা একটি অংক তুলে দেন। তিনি তার সবই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ, গরিব-দুঃখী মানুষ ও দাসমুক্তি প্রভৃতি খাতে ব্যয় করেন।
তিনি সব রকম কথা ও কাজে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নৌকা বা জাহাজে যদি উঠার প্রয়োজন হতো তাহলে উঠার সময় একটি ইট হাতে নিয়ে উঠতেন। নামাযের সময় তার উপর সিজদা করতেন। কারো কোন কাজ যদি তাঁর কথায় বা সুপারিশে হতো তিনি তার কাছ থেকে কোন উপহার-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। একবার একটি ব্যাপারে কোন এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন। লোকটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ তাঁকে একটি দাসী দান করতে চান। তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। লোকটিকে তিনি বলেন, তোমার মন-মানসিকতা এমন তা যদি আগে আমি জানতাম তাহলে তোমার জন্য কখনো সুপারিশ করতাম না। যতটুকু সুপারিশ করেছি, তাতো করেই ফেলেছি। এখন যতটুকু প্রয়োজন বাকী আছে আমি তার জন্য আর কোন কিছুই বলবো না। আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) মুখ থেকে শুনেছি। যে ব্যক্তি কারো হক আদায় করে দেওয়া, অথবা যুলুম-অত্যাচার বন্ধ করার জন্য কারো কাছে সুপারিশ করে, আর তার বিনিময়ে যদি তাকে উপহার-উপঢৌকন দেওয়া হয় এবং সুপারিশকারী তা গ্রহণ করে তাহলে সেই উপহার-উপঢৌকন তার জন্য হারাম হবে।
'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ একবার কূফায় এসে জিজ্ঞেস করলেন : সবচেয়ে ভালো মানুষ কে? লোকেরা বললো : মাসরূক ইবন আল-আজদা'।
ইমাম আল-আসমা'ঈ ইবন 'আওনের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইবন 'আওনের শিক্ষকরা বলাবলি করতেন যে, তাবি'ঈদের আট ব্যক্তি পর্যন্ত এসে যুহদ তথা খোদাভীতি ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাঁরা হলেন : 'আমির ইবন 'আবদিল কায়স, আল-হাসান ইবন আবিল হাসান আল-বসরী, হারিম ইবন হায়্যান, আবু মুসলিম আল-খাওলানী, উওয়ায়িস আল-কারানী, আর-রাবী' ইবন খুছায়ম, মাসরূক ইবন আল-আজদা' ও আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৯
২. তাবাকাত-৫/৩৮২
৩. আবূ দাউদ-৪৯৫৭; মুসনাদে আহমাদ-১/৩১; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৩০১
৪. তাবাকাত-৬/৫০
৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৬২-
৬. তাবাকাত-৬/৫২
৭. আল-কামিল ফিত তারীখ-৩/১২৭
৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৫
৯. প্রাগুক্ত-৩/২৩০
১০. সূরা আন-নিসা'-২৯
১১. তাবাকাত-৬/ ৫১-৫২
১২. প্রাগুক্ত-৬/৫৫
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৯
১৪. তাহযীবুল আসমা'-১/৮৮
১৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ/১৪৯; তারীখু ইবন 'আসাকির-৬/২১০
১৬. তাবাকাত-৬/৫২
১৭. তাযকিরাতুল হুফফ্ফাজ-১/৪২
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাহযীবুল আসমা'-১/৮৮
২০. তাবাকাত-৬/৫২
২১. তাহযীবতু তাহযীব-১০/১১০
২২. প্রাগুক্ত-১০/১১১
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৩
২৪. প্রাগুক্ত-১/৪৯
২৫. তাবাকাত-৬/৫৫
২৬. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৬৪
২৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৯৫
২৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৬৩
২৯. তাবাকাত-৬/৫৪
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৯
৩১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৬৮
৩২. তাবাকাত-৬/৫৫
৩৩. প্রাগুক্ত-৬/৫৩, ৫৪
৩৪. প্রাগুক্ত-৬/৫৩
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/৫৩
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/৫৪
৩৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭০
৩৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৭১
📄 মুহাম্মাদ ইবন সীরীন (রহ)
বিখ্যাত তাবি'ঈ মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের ডাকনাম আবূ বকর। পিতা সীরীন ছিলেন ইরাকের 'জারজারায়া'র অধিবাসী', তামা-পিতলের একজন দক্ষ কারিগর। হাড়ি-পাতিল তৈরীর পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। 'আইনুত্ তামার-এ তাঁর দোকান ছিল। 'আইনুত তামার-এর যুদ্ধে আরো অনেক অনারবের সাথে সীরীনও মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং ভাগের সময় কোন এক মুজাহিদের অংশে পড়েন। পরে তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) দাসে পরিণত হন। অনেকে ধারণা করেছেন, তিনি ভাগের সময় আনাসের (রা) অংশে পড়ে থাকবেন, অথবা আনাস পরে অন্য কোন মুজাহিদের নিকট থেকে তাঁকে কিনে নেন। যাই হোক, সীরীন হযরত আনাসের একজন দাস ছিলেন। সেহেতু তিনি একজন দক্ষ ধাতব কারিগর ছিলেন, তাই প্রচুর অর্থ রোজগার করতেন। মনিব আনাসের (রা) সাথে মুকাতাবা বা মুক্তির চুক্তি করেন। আনাসকে (রা)। তিনি বিশ অথবা চল্লিশ হাজার দিরহাম দেন এবং বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন।
সীরীন দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের পর তামা-পিতল শিল্পের কাজে আরো মনোযোগী হন। আয়-রোগজার আরো বেড়ে যায়। অল্প দিনের মধ্যে প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে যান। এবার তিনি দীনের বাকী অংশ পূরণ করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) 'সাফিয়্যা' নাম্নী একদাসী ছিল। সাফিয়্যা ছিলেন সুন্দরী, বুদ্ধিমতি, চালাক-চতুর ও চমৎকার গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারিনী এক যুবতী। তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও মার্জিত ভদ্র আচরণ তাঁকে মদীনার সব শ্রেণীর মহিলার প্রিয়পাত্রী করে তোলে। মদীনার যে মহিলাই তাঁর সাথে পরিচিত হতো, তাঁকে ভালোবাসতো। তখন পর্যন্ত জীবিত উম্মাহাতুল মু'মিনীন তথা রাসূলুল্লাহর (সা) বেগমগণ, বিশেষতঃ উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) অতি আদরের পাত্রী ছিলেন। সীরীন তাঁর জীবন-সঙ্গীনী হিসাবে এই সাফিয়্যাকে নির্বাচন করেন।
সীরীনের পক্ষ থেকে হযরত আবু বকরের (রা) পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব গেল। সাফিয়্যা এ পরিবারের দাসী হলেও তাঁকে তাঁরা মেয়ের মত করে মানুষ করেছেন। তাঁরা পাত্রের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে আরম্ভ করলেন। তাঁরা সীরীনের আগের মনিব আনাস ইবন মালিকের নিকট আসলেন। তাঁর কাছে সীরীনের স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আনাস (রা) সাফিয়্যার মনিব পরিবারকে বললেন, আপনারা সাফিয়্যাকে সীরীনের হাতে তুলে দিতে ভয় করবেন না। আমি তাঁকে সঠিক দীনদার, অতি চরিত্রবান এবং যথেষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেখেছি। খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ তাঁকে 'আইনুত তামার যুদ্ধে বন্দী করার পর সে চল্লিশ জন বন্দীর সাথে মদীনায় আসে। আর তখন থেকেই সে আমার সাথে ছিল। সাফিয়্যার পরিবার রাজী হয়ে গেল। এমন একটি চমৎকার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয় যে, মদীনার খুব কম মেয়ের বিয়েতে তেমন হতে দেখা গেছে। বিরাট সংখ্যক সাহাবী (রা) এই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বদরী সাহাবী ছিলেন আঠারো জন। তাঁদের শুভ ও কল্যাণ কামনা করে দু'আ করেন কাতিবে ওহী হযরত উবাই ইবন কা'ব (রা)। কনেকে সাজ-গোজ করিয়ে স্বামী-গৃহে পাঠান তিন জন উম্মাহাতুল মু'মিনীন। এই শুভ ও মঙ্গলময় বিয়ের মাধ্যমে যে পরিবারটি গড়ে ওঠে সেখানে খলীফা হযরত উছমানের খিলাফতের শেষের দিকে হিজরী ৩৩ সনে মুহাম্মাদ ইবন সীরীন জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি হন একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈ।
হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) ব্যক্তিত্বটি এমনই ছিল যে, যে কেউ তাঁর কাছে সামান্য কিছু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ পেয়েছে সে 'ইলম ও 'আমলের একজন বড় উত্তরাধিকারী হয়ে গেছে। ইবন সীরীনের সৌভাগ্য যে, এই মহান সাহাবীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ দিন থাকার সুযোগ লাভ করেন। আনাস ইবন মালিক ছাড়াও তিনি হযরত আবূ হুরাইরার (রা) সুহবতের সুযোগও বেশীমাত্রায় গ্রহণ করেন। তাঁকে আবূ হুরাইরার (রা) শিষ্য-সাগরিদদের মধ্যে গণ্য করা হয়। তিনি তাবি'ঈ শিরোমণি হযরত হাসান বসরীর (রা) সাহচর্যেও দীর্ঘদিন কাটান। এই সব মহান ব্যক্তির সাহচর্যের কল্যাণে তিনি 'ইলম ও 'আমলের এক বাস্তব প্রতিকৃতিতে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন :
كان ثقة مأمونا عاليا رفيعا فقيها إماما كثير العلم ورعا.
তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত, আস্থাভাজন, অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম, ফকীহ, বহু জ্ঞানের আধার ও খোদাভীরু মানুষ।
ইমাম যাহবী লিখেছেন :
كان فقيها إماما غزير العلم ثقةً ثبتًا علامة التفسير رأسا في الورع .
- তিনি ছিলেন একজন ফকীহ্, ইমাম, বহু জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিশ্বস্ত, সুদৃঢ়, তাফসীর শাস্ত্রের মহাজ্ঞানী ও খোদাভীরুতার প্রধান।
সে যুগের প্রায় সকল শাস্ত্রে তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তিনি তাফসীর, হাদীছ, ফিকাহ্, স্বপ্নের তা'বীর ইত্যাদি শাস্ত্রসমূহের ইমাম ছিলেন। ইবন সীরীন ছিলেন হযরত আনাসের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, হযরত আবূ হুরাইরার (রা) বিশেষ শাগরিদ এবং হযরত হাসান আল বসরীর (রহ) মজলিসে বসা মানুষ। তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন 'ইলমে হাদীছের এক একজন দিকপাল। তাছাড়া আরো বহু সাহাবীর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁদের কয়েকজন হলেন: যায়িদ ইবন ছাবিত (রা), হুযাইফা ইবন ইয়ামান (রা), ইবন 'উমার, ইবন 'আব্বাস, হাসান ইবন 'আলী (রা), জুনদুব ইবন 'আবদিল্লাহ (রা), রাফি' ইবন খাদীজ (রা), সুলাইমান ইবন 'আমির (রা), সামুরা ইবন জুনদুব (রা), 'উছমান ইবন আবিল 'আস (রা), 'ইমরান ইবন হুসাইন (রা), কা'ব ইবন 'আজরাহ্ (রা), মু'আবিয়া (রা), আবূ দারদা' (রা), আবু সা'ঈদ খুদরী (রা), আবূ কাতাদা আনসারী (রা), আবূ বাকর ছাকাফী (রা), উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), ও আরো অনেকে।
তাবি'ঈদের বড় একটি দলের নিকট থেকেও তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁদের বিশিষ্ট কয়েকজন হলেন: 'আকরামা, শুরাইহ, হুমাইদ ইবন 'আবদির রহমান হিময়ারী, 'আবদুল্লাহ ইবন শাকীক, 'আবদুর রহমান ইবন আবী বাকরাহ্, কায়স ইবন 'আব্বাদ, মুসলিম ইবন ইয়াসার, ইউনুস ইবন জুবায়র, 'আমর ইবন ওয়াহাব, ইয়াহইয়া ইবন আবী ইসহাক হাদরামী, খালিদ আল-হাযরা' প্রমুখ। এ সব ব্যক্তির সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর তাঁদের কল্যাণে তিনি হাদীছ শাস্ত্রের জ্ঞানের সাগরে পরিণত হন। ইবন সা'দ, ইমাম যাহ্বী, ইমাম নাওবী ও ইবন হাজার তাঁকে 'ইমামুল হাদীছ' বলে উল্লেখ করেছেন।
এত ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাদীছ শোনা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রকমের সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি সাধারণ স্তরের মানুষের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন ও হাদীছ শোনা ও গ্রহণ করা এই সতর্কতা পরিপন্থী কাজ বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, জ্ঞান হচ্ছে দীন। এ কারণে তা গ্রহণের পূর্বে ভালো রকম পরখ করে নাও যে, তা কার নিকট থেকে গ্রহণ করছো।
হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, তিনি যে শব্দ শায়খের নিকট থেকে শুনেছেন হুবহু সেই শব্দে বর্ণনা করতেন। শুধু ভাব ও অর্থ বর্ণনা যথেষ্ট মনে করতেন না। এত সাবধানতার সাথে হাদীছ বর্ণনা করতেন যে, মনে হতো কোন জিনিস তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছেন। অথবা কোন কিছুর ভয় করছেন। আর এই সাবধানতার কারণে তিনি হাদীছ লেখাও পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, বই থেকে দূরে থাক। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা বই এর কারণেই পথ ভ্রষ্ট হয়েছে। আমি যদি কোন জিনিসকে বই বানাতাম, তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) পত্রাবলীকে বানাতাম।
তবে হাদীছ মুখস্থ করার জন্য, এই শর্তে লেখা বৈধ মনে করতেন যে, মুখস্থ করার পরে আবার নষ্ট করে ফেলা হবে। বর্ণনা ও হাদীছ লেখা প্রসঙ্গে একটি মূল্যবান কথা তিনি বলতেন যে, কথা বলছে এমন কোন ব্যক্তি যদি জানে যে, জবাবদিহিতার জন্য তার সবকথা লেখা হচ্ছে, তাহলে সে কথা বলা কম করে দেবে। তাঁর একথার অর্থ হলো, সাধারণ কথাবার্তার ক্ষেত্রে একজন কথা বলতে থাকা মানুষ যদি জবাবদিহিতার ভয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে, তাহলে হাদীছের লেখালেখির ক্ষেত্রে তো অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, এর ভুল-ত্রুটিতে আরো বেশী ধর-পাকড় করা হবে। আর লেখালেখির ভুল- ত্রুটি চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে।
হাদীছ বর্ণনায় তাঁর এই সাবধানতার কারণে হাদীছ বিশেষজ্ঞদের নিকট তিনি একজন অতি বড় সত্যবাদী এবং তাঁর বর্ণিত হাদীছ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃত। হিশাম ইবন হাসসান বলতেন, আমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী ইবন সীরীনকে পেয়েছি। হাদীছের অনেক বড় বড় ইমাম এ শাস্ত্রের উৎসাহী ছাত্রদেরকে ইবন সীরীনের সাথে সংযুক্ত থাকতে উপদেশ দিতেন। শু'আয়ব ইবন হাবহাব বলতেন, শা'বী আমাদেরকে ইবন সীরীনের আঁচল ধরে থাকতে উপদেশ দিতেন।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর ছাত্র-শাগরিদের সংখ্যা বিপুল। ইমাম শা'বী, ছাবিত, খলিদ আল-খাদ্দাদ, দাউদ ইবন আবী হিন্দা, ইবন 'আওন, জারীর ইবন হাযিম, 'আসিম আল আহওয়াল, কাতাদা, সুলাইমান আত-তাইমী, মালিক ইবন দীনার, ইমাম আওযা'ঈ, কুররাহ্ ইবন খালিদ, হিশাম ইবন হাসান, আবূ হিলাল আর-রাসিবী প্রমুখ তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ।
ফিকাহ্ শাস্ত্রেও তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। তিনি যে তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ ফকীহদের একজন ছিলেন এ ব্যাপারে সবাই একমত। ইবন সা'দ, হাফেজ যাহ্বী, ইমাম নাওবী, ইবন হাজার প্রমুখ পণ্ডিতগণ ফিকাহ শাস্ত্রে তিনি যে ইমাম ছিলেন তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবন হিব্বান বলেন, ইবন সীরীন ছিলেন একজন ফকীহ, মর্যাদাবান হাফেজ ও দক্ষ ব্যক্তিত্ব।
ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর উৎকর্ষতার ভিত্তিতে বিচার-ফায়সালায়ও তিনি দক্ষ ছিলেন। 'উছমান আল-বাত্তি বলেন, এ অঞ্চলে ইবন সীরীনের চেয়ে বড় কোন বিচার-ফায়সালার 'আলিম ছিলেন না। বিচার-ফায়সালায় তার দক্ষতার কারণে তাঁকে কাজীর পদটি গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। এই পদে তাঁকে জোর করে নিয়োগ দেওয়া হবে ভেবে ভয়ে শামে পালিয়ে যান। অনেক দিন পালিয়ে থাকার পর আবার মদীনায় ফিরে আসেন।
বিভিন্ন মাসআলার জবাব ও ফাতওয়া দান কালে তিনি অতিরিক্ত সাবধানতা অথবা ভয়ের কারণে হতবুদ্ধি হয়ে পড়তেন। তখন তাঁর অবস্থা একেবারে পাল্টে যেত। আশ'আছ বলেছেন, আমরা যখন ইবন সীরীনের কাছে বসতাম, তিনি কথাও বলতেন, হাসতেনও, কুশলও জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু যেই না তাঁর কাছে ফিকাহর কোন মাসআলা, অথবা হারাম-হালাল বিষয়ক কোন কথা জানতে চাওয়া হতো অমনি তাঁর রূপ পাল্টে যেত। আর এটা বুঝাই যেত না যে, একটু আগে এই ব্যক্তি হাসিমুখে কথা বলছিলেন। ইবন 'আওন বলেছেন, একবার আমি একটি মাসআলায় ইবন সীরীনের শরণাপন্ন হলাম। জবাবে তিনি বললেন : আমি একথা বলছি যে, এতে কোন অসুবিধে নেই; বরং আমি এতে কোন অসুবিধে বুঝতে পারছিনে।
তাঁর যুগের অনেক বড় বড় 'আলিম ও বিশেষজ্ঞ তাঁকেই তাদের সময়ের শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানী মনে করতেন। ইবন 'আওন বলতেন, গোটা পৃথিবীতে তিন ব্যক্তির জুড়ি মেলা কষ্টসাধ্য। ইরাকে ইবন সীরীনের, হিজাযে কাসিম ইবন মুহাম্মাদের এবং শামে রাজা' ইবন হায়ওয়ার। আর এই তিনজনের মধ্যে ইবন সীরীন ছিলেন বসরার সবচেয়ে বড় খোদাভীরু ফকীহ, জ্ঞানী, দক্ষ হাফিজ এবং স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যাকার। ইবন 'আওন আরো বলতেন: আমার দু'চোখ ইবন সীরীন, আল কাসিম ও রাজা' ইবন হায়ওয়ার সমকক্ষ কাউকে দেখেনি।
ইবন সীরীনের জাত বা সত্তাটি ছিল 'ইলম ও 'আমলের সন্ধিস্থল। তাঁর মধ্যে যে পরিমাণ 'ইলম ছিল, ঠিক সেই পরিমাণ 'আমলও ছিল। তিনি তাঁর যুগের একজন বড় 'আবিদ ও খোদাভীরু বুযর্গ ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন, তিনি বহু জ্ঞানের ভাণ্ডার ও খোদাভীরু ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম আয-যাহ্বী লিখেছেন, তিনি খোদাভীরুদের নেতা ছিলেন। খতীব আল-বাগদাদী বলেছেন, তিনি ছিলেন খোদাভীরু ফকীহদের একজন। আল-'ইজলী বলেছেন, আমি কাউকে খোদাভীরুতায় তাঁর চেয়ে বড় ফকীহ্ এবং ফিকায় তাঁর চেয়ে বড় খোদাভীরু দেখিনি। ইবন সীরীন বলতেন, খোদাভীরুতা খুবই সহজ জিনিস। একব্যক্তি একবার প্রশ্ন করলো, সেটা কেমন করে? বললেন, যে জিনিসে সন্দেহ হবে তা পরিহার করবে।
একদিন এক যুবক ইবন সীরীনের ঘরে বসে আছে। এক সময় সে ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে : জনাব, এই যে একটি ইট আরেকটি ইটের চেয়ে উঁচু- এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন? ইবন সীরীন বললেন : ভাতিজা! বেশী দেখা বেশী কথার জন্ম দেয়। ইবন সীরীনের তাকওয়া-খোদাভীতি সেকালে প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। লোকেরা দৃষ্টান্ত হিসেবে তা উল্লেখ করতো। যেমন একজন কবি বলেছেন :
فأنت بالليل ذئب لاحريم له + وبالنهار على سَمْتِ ابن سِيرِينَ .
- রাতের বেলা তুমি একজন নেকড়ে- যার কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। আর দিনের বেলা ইবন সীরীনের মত খোদাভীরু।
ইবন সীরীন বলতেন, আমি কখনো কোন কিছুর জন্য কারো প্রতি হিংসা করিনি। স্বভাবগতভাবে তিনি প্রফুল্লমুখ ও হাসি-খুশী মেজাজের ছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তর খোদাভীতিতে পূর্ণ ছিল। ইউনুস বর্ণনা করেছেন, ইবন সীরীন হাসিমুখ ও ঠাট্টা-কৌতুক প্রিয় মানুষ ছিলেন। কিন্তু অন্তরের কোমলতা ও খোদাভীতির এমন অবস্থা ছিল যে, প্রকাশ্যে তাঁর ঠোঁট দু'টি তো হাসতো; কিন্তু নির্জন ও একাকীত্বের সময় তাঁর চোখ দু'টো অশ্রু-ভেজা থাকতো।
হিশাম ইবন হাসান বলেছেন, একবার আমরা কিছু লোক ইবন সীরীনের গৃহে অবস্থান করছিলাম। দিনের বেলায় তাঁকে হাসি-খুশী দেখতাম এবং রাতের অন্ধকারে তাঁর কান্নার আওয়ায শুনতে পেতাম। মৃত্যুর আলোচনার সময় তাঁর উপর মৃত্যুর মত অবস্থার সৃষ্টি হতো। যুহাইর আল-আকতা 'বর্ণনা করেছেন। ইবন সীরীন যখন মৃত্যুর কথা আলোচনা- করতেন তখন তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন মারা যেত। সেকালে একথা বলা হতো যে, 'ফিকাহতে হাসান আল বসরী, তাকওয়া-খোদাভীতিতে ইবন সীরীন, বুদ্ধি-জ্ঞানে মুতারিফ ও মুখস্থ শক্তিতে কাতাদা।'
'আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তিনি পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সরল-সোজা ও কলুষমুক্ত 'আকীদার অনুসারী। এ ক্ষেত্রে যুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নতুনত্ব মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর যুগের 'কদর' তথা নিয়তিবাদের চর্চা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি এটাকে খুবই অপছন্দ করতেন। তিনি এর কোন আলোচনা বা কথা শোনা সহ্য করতে পারতেন না। ইবন 'আওন বলেছেন, একবার এক ব্যক্তি ইবন সীরীনের নিকট এসে 'কদর' সম্পর্কিত কিছু কথা বলে। তিনি তার জবাবে এ আয়াতটি পাঠ করেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ .
- আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন- যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।
এ আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে তিনি নিজের কানে আংগুল ঢুকিয়ে বন্ধ করে লোকটিকে বলেন, হয় তুমি আমার নিকট থেকে উঠে চলে যাও, নয়তো আমি চলে যাচ্ছি। তাঁর এমন চরম বিতৃষ্ণ ভাব দেখে লোকটি উঠে চলে যায়। তার যাওয়ার পরে ইবন সীরীন বলেন, আমার অন্তর আমার ক্ষমতার মধ্যে নেই। আমার ভয় হচ্ছিল, সে আমার অন্তরে এমন কোন ধারণা ঢুকিয়ে না দেয় যা দূর করার ক্ষমতা আমার হবে না। আর তাই আমার জন্য এটাই সঙ্গত ছিল যে, আমি তার কোন কথাই শুনবো না।
আরেকবার তাঁর নিকট এক বেদুইন আসে এবং বিভিন্ন মত ও পথ বিষয়ক কিছু প্রশ্ন করতে থাকে। তিনি তাঁর প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন। কোন এক ব্যক্তি তাকে বললো, 'কদর' বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস কর না। সে বললো: আবু বকর। কদর বিষয়ে আপনার মত কি? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন: এ প্রশ্ন তোমাকে কে শিখিয়ে দিয়েছে? তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, কারো উপর শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই। তবে যদি কোন ব্যক্তি নিজে তার আনুগত্য মেনে নেয় সে তাকে ধ্বংস করে ছাড়ে।
ইবন সীরীনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল 'ইবাদাত। তিনি বড় কঠিন 'ইবাদাত করতেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন তিনি 'ইলম ও 'ইবাদাত উভয় ক্ষেত্রে চরম উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। প্রতি রাতে সাত পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। যদি কোন রাতে কিছু পড়তে বাকী থেকে যেত তাহলে তা দিনে পড়ে নিতেন। একাকী থাকার সময় তাসবীহ পাঠে নিমগ্ন থাকতেন। ঘুমানোর পূর্বে নিজের অন্তরকে আল্লাহর যিক্স-এর দিকে ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে সারাটি রাত যেন তাঁর 'ইবাদতে কাটতো। ইবন সীরীনের বাড়ীর সীমানার মধ্যে একটি মসজিদ ছিল। সেখানে শিশুদেরও যাওয়ার অনুমতি ছিল না। একদিন পর পর রোযা রাখতেন। আর এ ব্যাপারে এত কঠোরতা অবলম্বন করতেন যে, রোযার দিনটি ইয়াওমুশ শাক বা সন্দেহের দিন হলেও সন্দেহের কারণে রোযা ছাড়তেন না। ছোটখাট 'ইবাদাতের ক্ষেত্রেও তাঁর আচরণ ছিল একটু বাড়াবাড়ি মাত্রার। ওজু করার সময় পায়ের গোছা পর্যন্ত ধুতেন। যাকাত আদায়ের ব্যাপারে এত গুরুত্ব দিতেন যে, যাকাতের অর্থ বণ্টন না করে 'ঈদের নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হতেন না। ইবন 'আওন বর্ণনা করেছেন, আমাদের এমন কখনো হয়নি যে, আমরা 'ঈদের দিন ইবন সীরীনের বাড়ী গিয়েছি, আর তিনি আমাদেরকে খুবাইস (এক প্রকার খাবার) অথবা ফালুদা খাওয়াননি। তিনি যাকাত আদায় ব্যতীত 'ঈদের নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হতেন না। প্রথমে যাকাতের অর্থ পৃথক করে মহল্লার জামে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। তারপর 'ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে বের হতেন।
তিনি আল্লাহর নিদর্শন ও প্রতীকসমূহের খুব সম্মান করতেন। কুরআন তিলাওয়াতের মাঝখানে কথা বলা মোটেই পছন্দ করতেন না। নিজের কাপড় দিয়ে মসজিদ সাফ করতেন।
আল্লাহর আদেশ তো তিনি কঠোরভাবে মেনে চলতেন। আর নিষেধ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ছিলেন আরো কঠোর। সন্দেহযুক্ত বিষয়ও এত পরিমাণ পরিহার করে চলতেন যে, তার জন্য বড় রকমের আর্থিক ক্ষতিও মেনে নিতেন। তাঁর ছেলে বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা এক খণ্ড ভূমি খরিদ করেন এবং তার খাজনাও আদায় করেন। সেই ভূমিতে প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর ছিল। কিছু লোক আঙ্গুরের রস বের করতে চাইলো। ইবন সীরীন তাদেরকে নিষেধ করলেন এবং তা এমনি বিক্রি করতে বললেন। লোকেরা বললো: এ আঙ্গুর এভাবে বিক্রি করা যায় না। তিনি বললেন, তাহলে শুকিয়ে মনাক্কা বানিয়ে বিক্রি কর। লোকেরা বললো: এ জাতীয় আঙ্গুরের মানাক্কা হয় না। তিনি বললেন: যখন কোনভাবে বিক্রি করা যায় না তখন রস বানানোর চেয়ে এগুলো নষ্ট করে ফেলাই ভালো। এরপর তিনি সব আঙ্গুর পানিতে ফেলে দেন।
ব্যবসা-বাণিজ্য এমন এক পেশা যাতে হারাম-হালালের ব্যাপারে বেশী সতর্কতা অবলম্বন অনেক সময় বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন করে তোলে। ইবন সীরীন জীবিকার জন্য পেশা হিসেবে ব্যবসাকে বেছে নেন। জীবনের প্রথম পর্বে জ্ঞান অর্জন শেষ করে দ্বিতীয় পর্ব যখন আরম্ভ করেন তখন প্রত্যেকটি দিনকে সমান দু'ভাগে ভাগ করেন। এক ভাগ জ্ঞান চর্চা, জ্ঞান বিতরণ ও 'ইবাদাত, আর এক ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য তথা জীবিকা অর্জন। প্রত্যুষে তিনি বসরার জামে মসজিদে চলে যেতেন। ফজরের নামায আদায়ের পর দুপুরের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত সেখানে নিজে শিখতেন ও অন্যদেরকে শেখাতেন। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে বেচাকেনার জন্য বাজারে চলে যেতেন। আর রাতের আঁধারে বিশ্বচরাচর যখন ঢেকে যেত তিনি তখন নিজের ইবাদাতখানায় ঢুকে যেতেন। অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে কুরআনের নির্ধারিত অংশ পাঠে নিমগ্ন হতেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভয়ে সারা রাত অস্থিরভাবে কাঁদতেন। তাঁর এ কান্না শুনে পরিবারের লোকজন ও নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের তাঁর প্রতি দয়া হতো এবং তাদের অন্তরও বিগলিত হয়ে যেত। বেচাকেনার উদ্দেশ্যে তিনি যখন বাজারে ঘুরতেন তখন মানুষকে উপদেশ দিতে ভুলতেন না। অন্যদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। কিসে আল্লাহর সন্তুষ্টি তাও বলে দিতেন। ছোট-খাট ঝগড়া-বিবাদও ফায়সালা করতেন।
তিনি জীবিকার জন্য ব্যবসাকে বেছে নেন এবং হালাল-হারামের ব্যাপারে অতিরিক্ত সাবধানতার কারণে মাঝে মধ্যে বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়েন। কিন্তু তিনি হাসিমুখে তা মেনে নেন। তবুও সন্দেহযুক্ত জিনিস স্পর্শ করেননি। একবার তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে কিছু পণ্য খরিদ করেন। সেই পণ্য বিক্রি করে আশি হাজার দিরহাম লাভ হয়। কিন্তু কোন কারণে তার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয় যে, এই বেচাকেনায় সুদের মিশ্রণ ঘটলো কিনা। মূলতঃ এই বেচাকেনায় কোনভাবেই সুদের মিশ্রণ ঘটেনি। তা সত্ত্বেও তিনি কেবল সন্দেহের কারণে লাভের একটি দিরহামও গ্রহণ করেননি।
কোন কোন সময় তো এই অতিরিক্ত সাবধানতার জন্য কারাদণ্ডের শাস্তিও ভোগ করতে' হয়েছে। তবুও তিনি সন্দেহযুক্ত অর্থ গ্রহণ করেননি। একবার তিনি চল্লিশ হাজার দিরহামের পণ্য খরিদ করেন, পরে তিনি এই পণ্যের ব্যাপারে এমন কিছু কথা জানতে পারেন যা তিনি মোটেই পছন্দ করেন না। এ কারণে তিনি পণ্যের গোটা চালানটাই দান করে দেন। ফলে মহাজনকে মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় তাঁকে কারাদন্ড ভোগ করতে হয়।
ঘটনাটি এভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, একবার তিনি বাকীতে চল্লিশহাজার দিরহামের যয়তুন তেল খরিদ করেন। একটি পিপা খোলার পরে তাতে একটি পঁচা বিগলিত ইঁদুর দেখতে পান। তিনি আপন মনে বললেন: সব তেল তো একই গুদামে এক স্থানে ছিল। এই অপবিত্র বস্তুটির নাপাক করা তেল তো অন্য পিপাতেও ভরা হতে পারে। আর আমি যদি এ নাপাক তেল বিক্রেতাকে ফেরত দিই তাহলে সে হয়তো আবার বাজারে বিক্রি করবে। তাই তিনি নিজের দীনদারীকে প্রাধান্য দেন। সব পিপার তেল মাটিতে ঢেলে নষ্ট করে ফেলেন। এ কাজ তাঁর জন্য এক বিরাট আর্থিক ক্ষতি ছিল। মহাজন পণ্যের মূল্য অথবা পণ্য ফেরত চাইলো। কিন্তু তিনি পণ্যের মূল্য বাবদ এত অর্থ দিবেন কোথা থেকে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কাজীর আদালত পর্যন্ত গড়ালো। কাজী তাঁকে অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘদিন যাবত কারাগারে বন্দী জীবনযাপন করেন।
তিনি যে স্তরের 'আলিম ছিলেন তাতে সামান্য একটু চেষ্টা করলে কারাগারে না গিয়েও পারতেন। তিনি বিত্তশালী কোন ব্যক্তির অথবা শাসকের দ্বারস্থ হতে পারতেন এবং তাদের দ্বারা নিজের এই ঋণের বোঝা হালকা করাতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে ছোট না করে নিজের আদর্শের উপর অটল থাকেন।
তিনি যখন কোন পণ্য বিক্রি করতেন তখন ক্রেতাকে তা ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখাতেন। ক্রেতা রাজী হয়ে গেলে ক্রয়-বিক্রয়ের উপর মানুষকে সাক্ষী বানাতেন। তাঁর বেচাকেনার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর সমকালীন এক ব্যক্তি মাইমূন ইবনে মাহরান। তিনি বলেছেন, আমি কিছু কাপড় কেনার জন্য কৃষ্ণায় গেলাম। সেখানে ইবন সীরীনের দোকানে পৌছলাম। যখন আমি কোন কাপড় পছন্দ করতাম এবং দরদাম করে কেনার সিদ্ধান্ত নিতাম তখন তিনি আমাকে তিন বার জিজ্ঞেস করতেন: আপনি কি এটা কিনতে রাজি হয়েছেন? আমি বলতাম: হাঁ, রাজি। এতেও তিনি সন্তুষ্ট হতেন না। বরং দু'জন মানুষকে ডেকে সাক্ষী বানাতেন। এসব পর্যায় অতিক্রম করার পর বলতেন: এখন পণ্য নিয়ে যান। তিনি হিজাযী দিরহামে কেনা-বেচা করতেন না। আমি তাঁর এমন তাকওয়া ও সাবধানতা দেখে আমার যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস সব সময় তাঁর দোকান থেকেই কিনতাম। এমন কি কাপড় বাঁধার সামান্য জিনিসও তাঁর কাছ থেকেই নিতাম।
সে যুগে পরিমাপের পাত্র ও বাটখারার পরিমাণে কমবেশী থাকতো। তাই তিনি যখন কারো নিকট থেকে কোনকিছু ধার-কর্জ নিতেন তখন প্রচলিত পরিমাপ পাত্র ও বাটখারার পরিবর্তে অন্য কোন জিনিস দিয়ে মেপে নিতেন। তারপর যে জিনিস দিয়ে মাপতেন সেটি সীল- মোহর করে সংরক্ষণ করতেন। তারপর সেই জিনিস ফেরত দানের সময় সেই সীল করা নির্দিষ্ট জিনিস দিয়ে মেপে ফেরত দিতেন। আর বলতেন, ওজন কম-বেশী হয়ে থাকে।
ব্যবসায়িক লেন-দেনের ধারাবাহিকতায় অধিকাংশ সময় তাঁর হাতে জাল মুদ্রা এসে যেত। জাল মুদ্রায় যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তিনি এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। জাল মুদ্রা তাঁর হাতে এলে তা অন্য কারো হাতে পৌঁছার সুযোগ দিতেন না। সবই নষ্ট করে ফেলতেন। ইবন 'আওন বলেছেন, যখন ইবন সীরীনের নিকট জাল মুদ্রা আসতো, তিনি তা দিয়ে কোন কিছু কিনতেন না। তাই তাঁর মৃত্যুর সময় দেখা গেল এ জাতীয় পাঁচশো অকেজো মুদ্রা তাঁর নিকট জমা হয়ে আছে।
তিনি মানুষকে হালাল উপার্জনের কথা বলতেন। তিনি বলতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য হালাল রুযি নির্ধারিত হয়ে আছে, তোমরা তাই তালাশ কর। তোমরা হারাম উপায়ে অর্জন করলেও যা তোমাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে তার চেয়ে বেশী পাবে না। অন্যকে হারাম অর্থ থেকে বাঁচানোর জন্য এতখানি করতেন যে, যদি কেউ তাঁর নিকট থেকে অবৈধভাবে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করতো তিনি তাকে হারাম অর্থ থেকে বাঁচানোর জন্য কসম পর্যন্ত খেয়ে বসতেন।
দীনের হাকীকত ও গূঢ় রহস্যের সূক্ষ্ম বুঝ ও হারাম-হালালের ব্যাপারে তাঁর সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি মাঝে মাঝে তাঁকে এমন সব অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করাতো, যা দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। যেমন, একবার এক ব্যক্তি এসে দাবী করলো যে, সে তাঁর কাছে দু'টি দিরহাম পায়। দাবীটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। এ কারণে তিনি লোকটির দাবী মানতে অস্বীকার করেন। লোকটি তখন বললো, তাহলে আপনি হলফ করে বলুন। সে ধারণা করেছিল যে, মাত্র দু'টি দিরহামের জন্য তাঁর মত মানুষ হলফ করবেন না। ইবন সীরীন বললেন: হাঁ, আমি হলফ করবো। এ কথা বলে তিনি হলফ করেন। তখন লোকেরা তাঁকে বললো: হে আবু বকর। আপনি মাত্র দু'টি দিরহামের জন্য হলফ করছেন? অথচ সামান্য সন্দেহের কারণে গতকাল আপনি চল্লিশ হাজারের দাবী ত্যাগ করলেন। আর সে ক্ষেত্রে কেবল আপনি ছাড়া আর কেউই সন্দেহ পোষণ করছিল না। তিনি বললেন: হাঁ, আমি হলফ করবো। কারণ, আমি তাকে হারাম খাওয়াতে চাই না। আর আমি জানি এটা তার সম্পূর্ণ হারাম উপার্জন হবে। আমি জেনে- বুঝে তাকে হারাম খাওয়াতে পারিনে।
হারাম থেকে সাবধানতার কারণে সম্ভবতঃ তিনি শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী আমীর-উমরাদের উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করতেন না। একবার হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের (রা) মত মহান ব্যক্তি হাসান বসরী (রহ) ও তাঁর নিকট কিছু উপহার পাঠান। হাসান বসরী গ্রহণ করেন, কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি।
খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা থেকে এত পরিমাণ দূরে থাকতেন যে, যে সব বৈধ সুবিধার মধ্যে বিন্দুমাত্র খিয়ানতের ধারণা হতে পারে, শুধু সতর্কতা বশতঃ সে সব সুবিধা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। যেমন, যখন তিনি দীর্ঘদিন জেলখানায় বন্দী ছিলেন তখন তাঁর দীনদারী, খোদাভীতি ও 'ইবাদত-বন্দেগীর অবস্থা দেখে জেলার তাঁর একজন ভক্তে পরিণত হন। একদিন তিনি ইবন সীরীনকে বললেন: শায়খ! রাতে গোপনে আপনি বাড়ী চলে যান, পরিবারের লোকদের সাথে রাত কাটান, তারপর সকাল হওয়ার সাথে সাথে আমার কাছে ফিরে আসুন। আপনার মুক্তি পর্যন্ত এভাবে করতে থাকুন। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! এ কাজ আমি করতে পারবো না। জেলার বললেন: আল্লাহ আপনাকে হিদায়াত করুন। কেন পারবেন না? তিনি বললেন: শাসন কর্তৃত্বের অধিকারীর সাথে খিয়ানতে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারবো না।
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) মৃত্যু শয্যায় ওসীয়াত করে গিয়েছিলেন যে, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন যেন তাঁকে গোসল দেন, কাফন পরান এবং জানাযার নামায পড়ান। হযরত আনাস (রা) মারা গেলেন। ঘটনাক্রমে ইবন সীরীন তখন জেলখানায় বন্দী। লোকেরা শহরের শাসকের নিকট ছুটে গেল এবং তাঁকে হযরত আনাসের (রা) অন্তিম ইচ্ছার কথা জানিয়ে ইবন সীরীনের মুক্তির অনুরোধ জানালো। যাতে তিনি হযরত আনাসের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন। শাসক অনুমতি দিলেন। কিন্তু ইবন সীরীন জেল থেকে বের হতে রাজী হলেন না। তিনি বললেন: আমি একজন পাওনাদারের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে না পারার কারণে জেলে বন্দী আছি। তাঁর অনুমতি না আনা পর্যন্ত আমি জেল থেকে বের হবো না। লোকেরা পাওনাদারের কাছে ছুটে গেল এবং তার অনুমতি নিয়ে এলো। এবার তিনি জেল থেকে বের হলেন। হযরত আনাসকে (রা) গোসল দিলেন, কাফন পরালেন এবং তাঁর জানাযার নামায পড়ালেন। তারপর আবার জেলে ফিরে গেলেন। পরিবারের কারো সাথে দেখা করলেন না।
তিনি খ্যাতি ও প্রচার-বিমুখ মানুষ ছিলেন। আর এই খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে বাঁচার জন্য কোন সাধারণ মজলিস-মাহফিলেও যোগদান করতেন না। তিনি বলতেন: আমি শুধু খ্যাতির ভয়ে আপনাদের জলসাগুলোতে আসিনে। মানুষের দৃষ্টিকাড়ে এমন সব কর্ম ও বৈশিষ্ট্য থেকে তিনি সযত্নে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। অধিকাংশ সময় নামাযের ইমামতির জন্য নিজের চেয়ে কম মর্যাদার লোককে সামনে এগিয়ে দিতেন। ইবন 'আওন বলেন, ইবন হুবাইরার বিদ্রোহের সময় আমিও ইবন সীরীনের সাথে বের হই। নামাযের সময় হলে তিনি আমাকে নামায পড়ানোর নির্দেশ দিলেন। আমি তাঁর আদেশ পালন করলাম। তবে নামায পড়ানোর পর আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো বলে থাকেন যে, নামায সেই ব্যক্তির পড়ানো উচিত যার কুরআন বেশী মুখস্থ আছে। তিনি বললেন, আমার এটা ভালো মনে হয় না যে, আমি নামায পড়ানোর জন্য সামনে এগিয়ে যাই, আর মানুষ এটা বলুক যে, মুহাম্মদ মানুষের নামাযের ইমামতি করেন।
ইবন সীরীন তাঁর মায়ের বড় অনুগত ছিলেন। মন-প্রাণ দিয়ে তাঁর সেবা করতেন। মা কিসে খুশী হন, সব সময় সে দিকে লক্ষ্য রাখতেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার এ বাণীর উপর অক্ষরে অক্ষরে 'আমল করতেন। وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرُ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أَفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا.
তোমার পালনকর্তা আদেশ করছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বলোনা এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বলো তাদেরকে শিষ্টচারপূর্ণ কথা।
মাকে তিনি কী পরিমাণ ভালোবাসতেন এবং মায়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি কতটুকু যত্নবান ছিলেন তার একটা চিত্র পাওয়া যায় তাঁর বোন হাফসা বিন্ত সীরীনের একটি বর্ণনায়। তিনি বলেন, আমার মা ছিলেন হিজাযের মেয়ে। তিনি রঙ্গীন ও উৎকৃষ্টমানের মিহি কাপড় পছন্দ করতেন। ইবন সীরীন মায়ের এ পছন্দকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। যখনই তাঁর জন্য কাপড় কিনতেন তখন কেবল কাপড়ের মসৃণতার প্রতি দৃষ্টি দিতেন, কতখানি টেকসই সে দিকে মোটেও খেয়াল করতেন না। 'ঈদের জন্য ইবন সীরীন নিজে মায়ের কাপড় রং করতেন। আমি কখনো তাকে মার সামনে জোর গলায় কথা বলতে শুনিনি। যখন কথা বলতেন, এত আস্তে বলতেন যেন কোন গোপন কথা বলছেন। ইবন 'আওন বলেছেন, ইবন সীরীন যখন তাঁর মার সামনে থাকতেন তখন তাঁর গলার আওয়ায এত ক্ষীণ হতো যে, কোন অপরিচিত লোক সে সময় তাকে দেখলে রোগাক্রান্ত বলে মনে করতো।
তিনি নিজেকে খুবই তুচ্ছ মনে করতেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার জন্য বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য পছন্দ করতেন না। সুতরাং কাউকে তাঁর সাথে সাথে চলার অনুমতি দিতেন না। যদি কেউ তাঁর সাথে চলতে চাইতো, তাকে তিনি বলতেন, যদি তুমি বিনা প্রয়োজনে চলতে থাক, তাহলে ফিরে যাও। তিনি বলতেন, পাপাচারে যদি দুর্গন্ধ থাকতো তাহলে আমার পাপের দুর্গন্ধের কারণে কোন মানুষ আমার কাছে ঘেঁষতে পারতো না।
এত বিনয় ও নম্রতা সত্ত্বেও তিনি একজন দুঃসাহসী ব্যক্তি ছিলেন। অনেক বড় বড় বিপদ ও ভীতিকে কোন পাত্তাই দিতেন না। আবূ কিলাবা বলতেন, মুহাম্মাদের সমান শক্তি ও সাহস রাখে কে? তিনি নিযার ফলার উপরও উঠে পড়তেন। বড় সাফ দিলের মানুষ ছিলেন। কখনো কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, আমি ভালো-মন্দ কারো প্রতি হিংসা করিনে। মোটকথা, ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার তিনি এক পূর্ণ মডেল ছিলেন। আবূ 'আওয়ানা বলেছেন, ইবন সীরীনকে দেখে আল্লাহর কথা স্মরণ হতো।
ইবন সীরীনের এসব চারিত্রিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য বড় বড় সাহাবী ও তাবি'ঈদেরকে এত পরিমাণ মুগ্ধ করেছিল যে তাঁদের অনেকে তাঁর দ্বারা নিজেদের জানাযার নামায পড়ানোকে বড় বরকতের কাজ বলে মনে করেছিলেন। তাই তাঁদের মৃত্যুর আগে তাঁকে দিয়ে কাফন- দাফন ও জানাযার জন্য অসীয়ত করে গিয়েছিলেন। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ইবন 'আওন বর্ণনা করেছেন, হযরত হাসান আল বসরীর আত্মগোপনকালে তাঁর এক মেয়ের ইনতিকাল হয়। আমি গোপনে তাকে সংবাদ পৌছালাম। আমার ধারণা ছিল তিনি আমাকে জানাযার নামায পড়ানোর নির্দেশ দিবেন। কিন্তু তিনি আমাকে করণীয় অনেক কাজের কথা বলার পর ইবন সীরীন দ্বারা জানাযার নামায পড়ানোর আদেশ দেন।
হিজরী ১১০ সনে তিনি অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। শেষ জীবনে চল্লিশ হাজার দিরহাম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ জন্য বড় চিন্তিত ছিলেন। ছেলে 'আবদুল্লাহ তাঁর সব ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিয়ে তাকে চিন্তামুক্ত করেন। তিনি ছেলের কল্যাণ কামনা করে দু'আ করেন। মৃত্যুর পূর্বে উপদেশ দেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, পরস্পর মিলেমিশে থাকবে। যদি ঈমানদার হওয়ার দাবী কর তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য একটি দীন নির্বাচন করেছেন, তার উপরেই মরবে। তোমরা দীনের ক্ষেত্রে আনসারদের ভাই ও তাদের মাওলা (আযাদকৃত দাস) হিসেবে থাকবে। সততা ও পবিত্রতা ব্যভিচার ও মিথ্যা থেকে ভালো। এ সব অসীয়াত করার পর জুম'আর দিন ইনতিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স আশি বছরের উপর ছিল। অনেকে সাতাত্তর বছরের কথা বলেছেন। ইমাম যাহবী বলেছেন, তিনি হাসান আল-বসরীর মৃত্যুর ১০০ দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তিরিশজন সন্তানের জনক ছিলেন। তবে মৃত্যুর সময় একমাত্র ছেলে আবদুল্লাহ ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না। তিনি ভালো পোশাক পরতেন, চুলে মেহেদীর খেজাব লাগাতেন। গোঁফ হালকা করে ছাঁটতেন।
সে যুগের একজন বিখ্যাত মহিলা 'আবিদ হাফসা বিনত রাশিদ। তিনি বলেছেন, মারওয়ান আল-মাহমালী নামে আমাদের একজন প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি আল্লাহ-রাসূলের বড় অনুগত এবং একজন বড় 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মারা গেলেন। আমরা বড় শোকাভিভূত হয়ে পড়লাম। এ অবস্থায় আমি একদিন তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি প্রশ্ন করলাম আবূ আবদিল্লাহ। আপনার রব আপনার সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? বললেন: আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। বললাম, তারপর আর কি করেছেন? বললেন: আমাকে ডান পাশের লোকদের কাছে উঠানো হয়েছে। বললাম তারপর? বললেন: আমাকে পূর্ববর্তী লোকদের কাছে নেওয়া হয়েছে। বললাম সেখানে আর কাকে দেখেছেন? বললেন: হাসান আল-বসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকে দেখেছি।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবন সীরীন একজন বড় ধরনের স্বপ্নের ব্যাখ্যাকার ছিলেন। ইতিহাস ও রিজাল শাস্ত্রের গ্রন্থাবলীতে তাঁর ব্যাখ্যা সম্বলিত অনেক স্বপ্নের কথা জানা যায়। এখানে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো।
একদিন এক ব্যক্তি এসে বললো, আমি স্বপ্নে দেখলাম একটি কবুতর একটি মুক্তা গিলে ফেললো। তারপর মুক্তাটি আগের চেয়ে বড় হয়ে বেরিয়ে এলো। আরেকটি কবুতর একটি মুক্তা গিলে ফেললো। তারপর সেটি পূর্বের চেয়ে ছোট হয়ে বেরিয়ে এলো। তৃতীয় আরেকটি কবুতর একটি মুক্তা গিললো এবং সেটি পূর্বের মত একই আকারে বেরিয়ে এলো।
ইবন সীরীন বললেন: প্রথম কবুতরটি হলেন হাসান আল বসরী, তিনি হাদীছ শোনেন। তারপর সুন্দর করে বর্ণনা করেন এবং ওয়াজের মধ্যে ব্যাখ্যা করেন। আর যে কবুতরটির মধ্যে মুক্তা ছোট হয়ে যায়, সে আমি, আমি হাদীছ শুনি, কিন্তু কিছু বাদ দিই। আর তৃতীয়টি হলো কাতাদা, তিনি হাদীছ যাঁরা সবচেয়ে বেশী মুখস্থ রাখতে পারেন তাঁদের একজন।
একবার এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি স্বপ্নে দেখলাম আমার মাথার উপরে যেন একটি স্বর্ণের মুকুট শোভা পাচ্ছে।
ইবনে সীরীন বললেন: আপনি আল্লাহকে ভয় করুন! আপনার পিতা প্রবাসে আছেন। সেখানে তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন। তিনি চাচ্ছেন আপনি তাঁকে নিয়ে আসুন। লোকটি তখন একটি চিঠি বের করে বলে, এই যে আমার পিতার চিঠি। এতে লিখেছেন, তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন, বিদেশ-বিভূঁইয়ে আছেন এবং তাঁকে নিয়ে আসার জন্য বলেছেন।
একদিন এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি দেখলাম, আমি রক্ত প্রস্রাব করছি। ব্যাখ্যায় ইবন সীরীন বললেন: তুমি তোমার স্ত্রীর মাসিক অবস্থায় উপগত হয়ে থাক। সে বললো: ঠিক বলেছেন। তিনি বললেন: আল্লাহকে ভয় কর। আরেকবার এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি যেন কোন ক্ষেত চাষ করছি; কিন্তু তাতে কোন চারা গজাচ্ছে না। বললেন: তুমি স্ত্রী উপগত অবস্থায় 'আযল করে থাক। লোকটি বললো: ঠিক।
একদিন এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি দেখলাম, জাওয়া নক্ষত্র ছুরাইয়্যা নক্ষত্রের আগে চলে গেছে। তিনি বললেন: এই হাসান আল বসরী আমার আগে মারা যাবেন। তারপর আমি তাঁর অনুসরণ করবো। তিনি আমার চেয়ে উঁচু মর্যাদার।
একবার এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি যেন দেখলাম, আমার হাতে পানি ভর্তি একটি কাঁচের পেয়ালা। পেয়ালাটি পড়ে ভেঙ্গে গেল; কিন্তু পানি থেকে গেল। তিনি লোকটিকে বললেন: আল্লাহকে ভয় কর। আসলে তুমি কিছুই দেখনি। লোকটি বললো, সুবহানাল্লাহ। আমি যা বলেছি তাই দেখেছি। তিনি বললেন: কেউ মিথ্যা বললে তার দায়িত্ব আমার নয়। তোমার স্ত্রী খুব শিগগীর সন্তান প্রসব করে মারা যাবে। কিন্তু তার সদ্য প্রসূত ছেলেটি বেঁচে থাকবে। লোকটি বেরিয়ে গিয়ে বললো: আল্লাহর কসম! আমি কিছুই দেখিনি। অল্প কিছু দিনের মধ্যে তার স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে মারা যায়।
'আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম আল-মূরূযী ছিলেন ইবন সীরীনের সমকালীন বসরার একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি ইবন সীরীনের মজলিসে উঠা-বসা করতাম। এক সময় তা ছেড়ে দিয়ে গোপনে খারিজীদের 'ইবাদিয়্যা' সম্প্রদায়ের সাথে উঠা-বসা শুরু করি। একদিন আমি স্বপ্নে দেখি, আমি এমন সব লোকদের সাথে আছি যারা রাসূলুল্লাহর (সা) মরদেহ বহন করছে। আমি ইবন সীরীনের নিকট আসলাম এবং আমার স্বপ্নের কথা তাঁকে বললাম। তিনি বললেন: আপনার কি হয়েছে যে, আপনি এসব লোকদের সাথে বসেন যাঁরা নবী (সা) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা দাফন করতে চায়?
এভাবে বহু.স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যার কথা পাওয়া যায়। ইমাম যাহবী বলেছেন, ইবন সীরীন থেকে স্বপ্নের তা'বীরের ব্যাপারে অনেক আশ্চর্যজনক কথা বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক দীর্ঘ। এ ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছিলেন।
এতবড় জ্ঞানী ও 'আবিদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি একজন রসিক মানুষ ছিলেন। তবে তাঁর সে রসিকতা সীমা লংঘন করতো না।
হিশাম ইবন হাসান বলেন, একবার এক ব্যক্তি ইবন সীরীনের নিকট এসে বললো: আমি যে স্বপ্নটি দেখেছি সে সম্পর্কে আপনি কি বলেন? তিনি জিজ্ঞেস করলেন: স্বপ্নটি কি? লোকটি বললো, আমি দেখলাম, আমি একটি ছাগল পেয়েছি এবং তা বিক্রি করে আট দিরহাম পাচ্ছি। বিক্রির সময় আমি জেগে গেলাম। দু'চোখ খুলে কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি আবার চোখ বন্ধ করে আমার দু'হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং বললাম: চার দিরহামই দাও। কিন্তু কিছুই দিল না। তার কথা শুনে ইবন সীরীন বললেন: সম্ভবত: ক্রেতারা তোমার ছাগলের কোন দোষের কথা জেনে সরে পড়েছে। লোকটি বললোঃ আপনি যা বললেন সম্ভবতঃ তাই হবে। আসলে লোকটি ছিল একটু নির্বোধ ধরনের, তাই ইবন সীরীনও তাকে সেই রকম জবাব দিয়েছিলেন।
একবার গালিব নামক এক ব্যক্তি ইবন সীরীনের নিকট হিশাম ইবনে হাসান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: তিনি তো গতকাল মারা গেছেন। আপনি জানেন না? কথাটি শুনে গালিব দুঃখের সাথে "ইন্না লিল্লাহ" পাঠ করলেন। ইবন সীরীন তাঁর ব্যথিত চেহারা দেখে পাঠ করলেন:
الله يتوفى الأنفس حين موتها والتي لم تمت في منامها
- আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে।
ইবন সীরীনের মজলিসটি হতো সব সময় শুভ, কল্যাণ ও উপদেশের মজলিস। সেখানে তাঁর উপস্থিতিতে কেউ কারো সম্পর্কে কোন খারাপ কথা বললে তিনি খুব দ্রুত সেই ব্যক্তির কোন ভালো কিছু জানা থাকলে তা আলোচনা করে সবাইকে শুনিয়ে দিতেন। উমাইয়্যা যুগের অত্যন্ত প্রতাপশালী স্বৈরাচারী গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মৃত্যুর পর তিনি একদিন শুনতে পেলেন, এক ব্যক্তি তাঁকে গালি দিচ্ছে। তিনি লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন : ভাতিজা, চুপ কর। হাজ্জাজ তাঁর পরোয়ারদিগারের নিকট চলে গেছেন। তুমি যখন আল্লাহ রাব্বুল 'ইজ্জাতের সামনে উপস্থিত হবে তখন দেখবে, এ দুনিয়াতে যে সব ছোট ছোট পাপ করেছো তা হাজ্জাজের বড় বড় পাপের চেয়েও মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে। তোমাদের দু'জনের অবস্থাই হবে সেদিন ভিন্ন- যা নিয়ে প্রত্যেকেই ব্যস্ত থাকবে। ভাতিজা! জেনে রাখ, মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন হাজ্জাজ যাদের উপর জুলুম করেছেন তাদের পক্ষ থেকে হাজ্জাজের নিকট থেকে বদলা নিবেন। ঠিক তেমনিভাবে হাজ্জাজের প্রতি যারা জুলুম করেছে, আল্লাহ হাজ্জাজের জন্য তাদের থেকে বদলা নিবেন। সুতরাং আজকের পর থেকে কারো গালি দেওয়ার কাজে নিজেকে কখনো জড়িত করোনা। আরেকবার এক ব্যক্তি সফরে রওয়ানা হওয়ার আগে তাঁর সাথে দেখা করতে এলো। তিনি তাকে বললেন: ভাতিজা সব সময় আল্লাহকে ভয় করবে। যতদূর সম্ভব হালাল পথে রোজগার করবে। আর জানবে যে, হারাম পথে তুমি যতই চেষ্টা কর, তোমার জন্য নির্ধারিত অংশের বেশী তুমি লাভ করতে পারবে না।
বানু উমাইয়্যার অনেক আঞ্চলিক গভর্নর ও শাসকদের সাথে ইবন সীরীনের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। মাঝে মাঝে তাঁদের দরবারে যেতেন এবং সুযোগমত তাঁদেরকে আল্লাহ-রাসূলের কথা শুনিয়ে উপদেশ দিতেন। একবার বানু উমাইয়্যার একজন উঁচুস্তরের গভর্নর 'উমার ইবন হুবায়রা আল-ফায়ারী লোক মারফত ইবন সীরীনকে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য ডেকে পাঠালেন। তিনি এক ভাতিজাকে সংগে নিয়ে ইবন হুবায়রার দরবারে গেলেন। ইবন হুবায়রা তাঁকে গভীর সম্মান ও আন্তরিকতার সাথে স্বাগতম জানিয়ে নিজের আসনের পাশে বসালেন। তারপর দীর্ঘক্ষণ তাঁর সাথে দীন ও দুনিয়ার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন।
এক পর্যায়ে ইবন হুবায়রা তাঁকে প্রশ্ন করলেন : ওহে আবূ বকর! আপনি আপনার শহরবাসীদেরকে কেমন রেখে এসেছেন? বললেন: আমি যখন তাদেরকে ছেড়ে এসেছি তখন জুলুম-অত্যাচার তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আর আপনি তাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। পাশে বসা তাঁর ভাতিজা তাঁর কাঁধে টোকা দিয়ে তাঁকে একটু সংযত করতে চাইলেন। এতে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে গেলেন। তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি তুমি নও, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি আমি। নিশ্চয় এ আমার একটি সাক্ষ্য।
মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেছেন: وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ أَثِمٌ قَلْبُهُ আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করোনা। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে।
মজলিস যথারীতি শেষ হলো। 'উমার ইবন হুবায়را যেভাবে সম্মান ও আবেগের সাথে ইবন সীরীনকে স্বাগতম জানিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে বিদায় দিলেন। তারপর তিন হাজার দীনার ভর্তি একটি থলে লোক মারফত ইবন সীরীনের কাছে পাঠালেন। কিন্তু তিনি গ্রহণ করলেন না। তাঁর ভাতিজা প্রশ্ন করলেন: আমীরের উপহার আপনি গ্রহণ করলেন না কেন? বললেন: আমার প্রতি একটি ভাল ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি এ উপহার আমাকে দিয়েছেন। তাঁর ধারণা মত আমি যদি ভালো মানুষ হই তাহলে আমার তা গ্রহণ করা উচিত নয়। আর যদি আমি তাঁর ধারণার অনুরূপ মানুষ না হই, তাহলে তো তা গ্রহণ করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৯
২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান- ১/৪৫৩
৩. তাবাকাত- ৭/১৪০; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন- ১২৬
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৯
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২১৫; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৪৫১
৬. তাবাকাত-৭/১৪০
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
৮. তাহযীব আল-আসমা'- ১/৮২
৯. তাহযীব আত-তাহযীব- ৯/২১৪; তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮
১০. তাবাকাত- ৭/১৪১
১১. প্রাগুক্ত- ৭/১৪১,১৪৩; সিয়ারু তাবি'ঈন-৪৩৬
১২. তাহযীব আত- তাহযীব-৯/২১৪
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব- ৯/২১৪
১৫. প্রাগুক্ত-৯/২১৬
১৬. তাবাকাত- ৭/১৪৩
১৭. শাযারাত আয-যাহাব- ১/১৩৯
১৮. তাবাকাত- ৭/১৪২
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব- ৯/২১৬
২০. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮
২১. তাবাকাত- ৭/১৪০
২২. তাহযীব আল আসমা'- ১/৮৩
২৩. তাবাকাত- ৭/১৪২
২৪. শাযারাত আয-যাহাব- ১/১৩৯
২৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ১/১৯২; ৩/১৭৩
২৬. প্রাগুক্ত- ৩/১২৫
২৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
২৮. তাহযীব আল-আসমা'- ১/৮৪
২৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
৩০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ১/২৪২
৩১. সূরা আন-নাহল- ৯০
৩২. তাবাকাত- ৭/১৪৩
৩৩. প্রাগুক্ত- ৭/১৪৪
৩৪. শাযারাত আয-যাহাব- ১/১৩৯
৩৫. তাবাকাত- ৭/১৪৫,১৪৬,১৪৮
৩৬. প্রাগুক্ত- ৭/১৪৪. ১৪৭
৩৭. সুওয়ারুল মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১২৮
৩৮. তাবাকাত-৭/১৪৫
৩৯. প্রাগুক্ত- ৭/১৪৪
৪০. তাহযীব আল-আসমা' ১/৮৪; হিলয়াতুল আওলিয়া- ২/২৬৯-২৭১
৪১. তাবাকাত- ৭/১৪৬; ৭/২০২
৪২. প্রাগুক্ত-৭/১৪৭
৪৩. 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৫৫
৪৪. তাবাকাত- ৭/১৪৬
৪৫. তাহযীব আল- আসমা'- ১/৮৪
৪৬. তাবাকাত- ৭/১৪৭
৪৭. তাহযীব আল- আসমা'- ১/৮৪
৪৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান- ১/৪৫৩
৪৯. তাবাকাত-৭/১৪৮
৫০. সূরা বানী ইসরাইল- ২৩
৫১. তারীখু ইবন 'আসাকির- ৫/২২৩
৫২. মুখতাসার সিফাতুস সাফওয়া- ১৫০
৫৩. তাবাকাত- ৭/১৪৩,১৪৪
৫৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮
৫৫. তাবাকাত- ৭/১৪৮
৫৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮; 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৬১; সুওয়ারুল মিন হায়াত আত- তাবি'ঈন- ১৩৩
৫৭. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত- তাবিঈন-১৩৪
৫৮. তারীখু ইবন 'আসাকির- ৫/২২৭
৫৯. হিলয়াতুল আওলিয়া- ২/২৭৭, ২৭৮
৬০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'- ৪/৬১৭
৬১. 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৫৬
৬২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'- ৪/৬১৮
৬৩. আল 'ইদ আল ফারীদ-৬/১৬৪
৬৪. 'উয়ুন আল-আখবার- ১/৩৬৫
৬৫. সূরা আয-যুমার-৪২
৬৬. সূওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৩০; 'আসরুত তাবি'ঈন-১৫৯
৬৭. সূরা- আল বাকারা- ২৮৩
৬৮. সুওয়ারুন মিন হায়াত তাবি'ঈন- ১৩১; 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৫২-১৫৩
📄 আল-আহনাফ ইবন কায়স (রহ)
আল-আহনাফের ভালো নাম সাখর, মতান্তরে দাহহাক। উপনাম আবূ বাহর। আরবের বিখ্যাত তামীম গোত্রের একটি শাখা-গোত্রের নাম বানু সা'দ। হিজরাতের তিন বছর পূর্বে ৬১৯ খ্রীস্টাব্দে এই গোত্রে তাঁর জন্ম। পিতার নাম কায়স ইবন মু'আবিয়া। আবূ বাহর সাখরের দু'টি পা জন্মগতভাবেই খোঁড়া ছিল। এ কারণে 'আল-আহনাফ' উপাধিটি কপালে জুটে যায়। যার অর্থ খণ্ড, ল্যাংড়া, খোঁড়া ইত্যাদি। তাছাড়া তাঁর দেহে আরো অনেক অস্বাভাবিকতা ছিল। এত কুশ্রী ও কদাকার ছিলেন যে, মানুষ প্রথম দৃষ্টিতেই তাঁকে তুচ্ছ ও হেয় জ্ঞান করতো। তবে নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের যাবতীয় গুণ-বৈশিষ্ট্যের পূর্ণ সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল। যেমন: প্রখর বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা, ব্যক্তিত্ব, দৃঢ় আত্মবিশ্বাস, মত প্রকাশের সৎসাহস, প্রবল বাগ্মিতা ও বাকপটুতা ইত্যাদি। তাঁর পিতা কায়স যেমন তাঁর গোত্রের প্রথম স্তরের কোন লোক ছিলেন না তেমনি একেবারে শেষ স্তরেরও ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন মধ্যম স্তরের মানুষ। বর্তমান সৌদি আরবের 'নাজদ' প্রদেশের 'আল-য়ামামা'-এর পশ্চিমাঞ্চলে ছিল তাঁর গোত্রের আদি বাসস্থান। আর সেখানেই আল-আহনাফের জন্ম হয়। মতান্তরে বসরায় তাঁর জন্ম এবং সেখানেই এতিম অবস্থায় তিনি বেড়ে ওঠেন। তিনি খুব অল্প বয়সে পিতৃহারা হন। বানু মাযিন তাঁর পিতাকে হত্যা করে।
আহনাফ রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকাল লাভ করেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলীর বর্ণনা মতে রিসালাতের যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁরই চেষ্টায় তাঁর গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। তবে অন্য রিজাল শাস্ত্রবিদদের বর্ণনা এর বিপরীতে দেখা যায়। ইবন সা'দ তাঁর জীবনী 'তাবি'ঈন'-এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ইবন 'আবদিল বার সতর্কতামূলকভাবে সাহাবীদের মধ্যে তাঁর জীবনী উল্লেখ করেছেন। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনকাল পেয়েছিলেন। তবে রাসূলে পাকের দীদারের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকেন। তাই তাঁকে তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করেন। হাফেজ ইবন হাজার লিখেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) যুগ লাভ করেন, কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করেননি।
যে বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় যে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ইসলাম গ্রহণ করেন তা হলো, রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনের শেষ ভাগে ইসলামী দা'ওয়াত প্রসারের লক্ষ্যে আল- আহনাফের গোত্র বানু সা'দে একজন সাহাবীকে পাঠান। তিনি বানু সা'দের লোকদের সমবেত করে তাদের সামনে ইসলামের বাণী তুলে ধরেন এবং তাদেরকে ঈমান আনার আহ্বান জানান। লোকেরা চুপ থাকলো এবং একজন আরেকজনের দিকে তাকাতে লাগলো। কিশোর আহনাফও সেই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর গোত্রের নেতা ও সাধারণ লোকদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের ভাব লক্ষ্য করে দাঁড়িয়ে যান এবং তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন : হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! আমি আপনাদের মধ্যে দ্বিধা- দ্বন্দ্বের ভাব লক্ষ্য করছি কেন? আপনারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে এক পা এগোচ্ছেন তো আরেক পা পিছাচ্ছেন কেন? আল্লাহর কসম! এই আগন্তুক আপনাদের জন্য শুভ ও কল্যাণের বাণী বহন করে নিয়ে এসেছেন। তিনি আপনাদেরকে উত্তম মূল্যবোধ ও নৈতিকতার দিকে আহ্বান জানাচ্ছেন এবং ক্ষতিকর উপাদান থেকে বিরত থাকতে বলছেন। আল্লাহর কসম! আমরা ভালো কথা ছাড়া তাঁর মুখ থেকে আর কিছু শুনিনি। সুতরাং আপনারা এই সত্যের আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিন। আপনারা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভ করে সফলকাম হবেন। তাঁর কথার পর তাঁর গোত্রের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর তাঁর গোত্রের প্রবীণরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু বয়স কম হওয়ার কারণে আল-আহনাফকে নেওয়া হয়নি। ফলে তিনি সাহাবী হওয়ার মর্যাদা ও গৌরব থেকে বঞ্চিত থেকে যান।
আল-আহনাফ বলেন: আমি 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর খিলাফতকালে একদিন কা'বা তাওয়াফ করছি। তখন আমার পূর্ব পরিচিত এক ব্যক্তির সাথে দেখা হলো। তিনি আমার একটি হাত মুট করে ধরে বললেন: আমি কি আপনাকে একটা সুসংবাদ দিব? বললাম: হাঁ, দিন। বললেন : আপনার কি সেই কথা স্মরণ আছে, যেদিন আমি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিনিধি হিসেবে আপনাদের গোত্রে ইসলামের দা'ওয়াত পৌছানোর জন্য গিয়েছিলাম এবং সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে আমার বক্তব্য তুলে ধরার পর আপনি কি বলেছিলেন? বললাম : হাঁ, স্মরণ আছে। তিনি বললেন : সেদিন আমি আপনাদের ওখান থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে ফিরে তাঁকে আপনার ভূমিকা ও বক্তব্যের কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন : 'হে আল্লাহ, তুমি আল-আহনাফের সকল পাপ ক্ষমা করে দাও।' এরপর আল-আহনাফ আজীবন বলতেন: 'কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহর (সা) এই দু'আর চেয়ে বড় আশাব্যাঞ্জক কোন 'আমল আমার নেই।'
কিন্তু প্রথমতঃ এ বর্ণনাটি সত্য কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। আর সত্য বলে মেনে নিলেও এতে তাঁর ইসলাম গ্রহণ প্রমাণিত হয় না। শুধু এতটুক জানা যায় যে, তিনি একজন সত্যের অনুসারী জ্ঞানী লোক ছিলেন এবং অন্তরে সত্য গ্রহণ করার শক্তি ও সাহস ছিল। আর রাসূলুল্লাহর (সা) দু'আ তাঁর ইসলাম গ্রহণের প্রমাণ নয়। তাঁর এ দু'আ ছিল আহনাফের সত্যকে চেনা ও জানার জন্য। আর যদি ধরেও নেওয়া হয় যে, তিনি সে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহকে দেখা, তাঁর সাহচর্য লাভ করা এ বর্ণনা দ্বারা মোটেই প্রমাণ হয় না। আর সাহাবী হওয়ার জন্য দেখা ও সাক্ষাৎ অপরিহার্য। তবে ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই সত্যকে চেনা এবং তাঁর জন্য রাসূলুল্লাহর (সা) দু'আ করা এ মোটেই কম মর্যাদার ব্যাপার নয়। বিভিন্ন তথ্য দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, তিনি প্রথম খলীফার খিলাফতকালের কোন এক সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। নিম্নের এ ঘটনা দ্বারা সে কথা প্রমাণিত হয়।
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) ইনতিকালের পর জাযীরাতুল আরবে ভণ্ড নবী মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের উৎপাত শুরু হয়। সে নিজেকে একজন নবী বলে দাবী করে ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অনেকে তার সাথে যোগ দেয়। ফলে তার কর্মকাণ্ড ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য একটি মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি করে। একদিন আল-আহনাফ তাঁর চাচা আল-মুতাশাম্মাসকে সংগে করে মুসায়লামার সাথে সাক্ষাৎ ও তার কথা শোনার জন্য যান। আল-আহনাফ তখন একজন তরুণ। মুসায়লামার সাথে দেখা করে ফেরার পথে চাচা আল-মুতাশাম্মাস তাঁকে প্রশ্ন করলেন:
- আহনাফ, লোকটিকে কেমন দেখলে?
আল-আহনাফ : লোকটিকে অসত্যের অনুসারী বলে মনে হলো। সে আল্লাহ ও মানুষের প্রতি মিথ্যা আরোপ করছে।
চাচা একটু কৌতুক করে তাঁকে বললেন: তুমি তাকে মিথ্যাবাদী বলছো, একথা আমি যদি তাকে বলে দিই, তুমি ভয় পাবে না?
বললেন: সে সময় আমি তার সামনেই একথার ব্যাপারে আপনার শপথ নিব যে, আপনিও কি আমার মত তাকে মিথ্যাবাদী বলেন না? অতঃপর চাচা-ভাতিজা দু'জনই হেসে দেন। দু'জন ইসলামের উপর অটল থাকেন।
এ সময় (হিঃ ১১/খ্রীঃ ৬৩৩) তাঁর গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, কিন্তু তিনি তাঁর গোত্রকে অনুসরণ করেননি। তাঁর গোত্রের সাথে মিলে মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধও করেননি। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি প্রথম মদীনায় আসেন। তখন তাঁর বয়স বিশ বছর। বানু তামীম সম্পর্কে হযরত 'উমারের (রা) একটা খারাপ ধারণা ছিল। এজন্য প্রায়ই তিনি নিন্দামন্দ করতেন। একবার আহনাফের উপস্থিতিতে বানু তামীমের কোন প্রসঙ্গে আলোচনা উঠলো। 'উমার (রা) তাঁর অভ্যাস মত তাদের নিন্দামন্দ করলেন। সাথে সাথে আহনাফ দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কিছু বলার জন্য অনুমতি চাইলেন। খলীফা অনুমতি দিলেন। আহনাফ বললেন: আপনি কোন ব্যতিক্রম ছাড়া গোটা বানু তামীমের নিন্দা করেছেন। অথচ তারাও সাধারণ মানুষের মত। তাদের মধ্যেও ভালো-মন্দ সব ধরনের মানুষ আছে। হযরত 'উমার (রা) এমন সত্য উচ্চারণ শুনে বলেন: তুমি সত্য বলেছো। তারপর তিনি বানু তামীমের কিছু গুণের কথা বলে পূর্বের উচ্চারিত তাদের নিন্দার ক্ষতিপূরণ করেন। আহনাফের পরে তাঁরই গোত্রের 'হাত্তাত' নামের আরেক ব্যক্তি কিছু বলতে চায়। কিন্তু 'উমার (রা) তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের নেতা তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন।
যদিও হযরত 'উমার (রা) আহনাফের নীতিগত কথার কারণে তাঁর বক্তব্য মেনে নেন, তবে তাঁর গোত্রের প্রতি 'উমারের (রা) খারাপ ধারণা বিদ্যমান ছিল। এ কারণে সতর্কতামূলকভাবে আহনাফের জীবন সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভের উদ্দেশ্যে তাঁকে খলীফা এক বছরের জন্য মদীনায় নিজের সাথে রেখে দেন। পরীক্ষার পর তিনি আহনাফকে বলেন, আমি এক বছর যাবত তোমাকে পরীক্ষা করেছি। আমি তোমার মধ্যে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু দেখিনি। তোমার বাহ্যিক আচরণ ভালো। আমি আশা করি তোমার ভিতরটাও ভালো হবে। আমি তোমার সাথে এমন আচরণ এজন্য করেছিলাম যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে একথা বলে সতর্ক করে গেছেন যে, এই উম্মাতের ধ্বংস বাকপটু মুনাফিকদের হাতেই হবে।
এই পরীক্ষার পর হযরত 'উমারের (রা) যখন আহনাফের উপর দৃঢ় আস্থা সৃষ্টি হলো তখন তাঁকে তাঁর জন্মভূমি বসরায় ফেরত পাঠালেন। আর সেই সাথে বসরার তৎকালীন ওয়ালী আবূ মূসা আল-আশ'আরীকে (রা) তাঁকে সংগে রাখার, তাঁর সাথে পরামর্শ করার এবং তাঁর পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করার জন্য বলে পাঠান। আহনাফ বসরার একজন নেতা ছিলেন। হযরত 'উমারের (রা) এই নির্দেশের পরে প্রতিদিন তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
সেই সময় পারস্য অভিযান চলছিল। বসরায় ফিরে যাওয়ার পর আহনাফ এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। সুতরাং হিজরী ১৭ সনে পারস্য অভিযানে তাঁকে দেখা যায়।
আহনাফ ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল মানুষ। এ কারণে গোত্রীয় ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিনিধিত্বের সময় তাঁর নামটি তালিকার প্রথমে দেখা যেত এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে গোত্রীয় প্রতিনিধির দায়িত্ব তাঁরই উপর অর্পিত হতো। আর তাই এই সময় বসরার একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে মদীনায় খলীফার দরবারে আসেন। খলীফা হযরত 'উমার (রা) বসরাবাসীদের বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রয়োজনসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, আহনাফ তাদের প্রয়োজন ও অভিযোগসমূহ তুলে ধরে চমৎকার একটি বক্তৃতা দেন। তাঁর এ বক্তৃতায় হযরত 'উমার খুবই মুগ্ধ হন এবং মন্তব্য করেন: আল্লাহর কসম! ইনি একজন নেতা। কথাটি দু'বার বলেন। সেখানে উপস্থিত যায়দ ইবন জাবালার সহ্য হলো না। তিনি বললেন: আমীরুল মু'মিনীন! সে তেমন নয়। তার মা তো বাহিলী গোত্রের। 'উমার (রা) বললেন : সে যদি সত্য বলে থাকে তাহলে সে তোমার চেয়ে ভালো। তারপর খলীফা তাঁকে পারস্যের কিসরা সাম্রাজ্যের কিছু বিজিত অঞ্চলের কর্তৃত্ব দান করেন। তিনি বসরার ওয়ালীকে লেখেন: শাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে আহনাফের সাথে পরামর্শ করবে এবং সেই মত কাজ করবে। আহওয়ায বিজয়ের পর বিখ্যাত ইরানী জেনারেল হুরমুযান- যিনি খুযিস্তান যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন, তাঁকে মদীনায় নিয়ে আসেন আহনাফ।
সে সময় ইরাক বিজয় সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। তবে ইরানের উপর ব্যাপক সামরিক অভিযান তখনো চালানো হয়নি। ইরানের বিজিত অঞ্চল বার বার বিদ্রোহ ঘোষণা করতো। সেই সময় ইরানে যুদ্ধরত সৈনিকদের একটি প্রতিনিধি দল মদীনায় খলীফার দরবারে আসে। হযরত 'উমার (রা) তাদের কাছে জানতে চাইলেন, এই ইরানীরা বার বার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে কেন? মনে হয় মুসলমানরা তাদের উপর উৎপীড়ন চালায়। প্রতিনিধি দল খলীফার কথার প্রতিবাদ করলো। কিন্তু কেউ হযরত 'উমারের (রা) প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারলো না। আহনাফের মেধা ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তিনি এই প্রশ্নের গভীরে চলে যান এবং বলেন: 'আমীরুল মু'মিনীন, ইরানের মধ্যভাগে সামরিক অভিযান বন্ধ করে দিয়েছেন এবং ইরানী সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী মুকুট ও সিংহাসনসহ বিদ্যমান আছেন। যতদিন তিনি এভাবে বিদ্যমান থাকবেন, ইরানীরা তাঁর সহযোগিতায় বার বার বিদ্রোহ করতে থাকবে। কারণ, একই দেশে দুইটি সরকার এক সাথে চলতে পারে না। ইরানের শাহানশাহ সবসময় ইরানীদেরকে বিদ্রোহের উস্কানি দেয়। এ কারণে যতদিন পর্যন্ত আমরা ইরানের অভ্যন্তর ভাগে সামরিক অভিযান চালিয়ে তাঁকে শেষ করে দিতে না পারবো ততদিন ইরানীদের এরূপ আচরণ অব্যাহত থাকবে। যখন তারা নিজেদের সরকারের ব্যাপারে একেবারে হতাশ হয়ে যাবে তখন শান্ত হবে।' হযরত 'উমার (রা) আহনাফের বক্তব্য শুনে মন্তব্য করেন: তুমি সত্য বলেছো। তারপর তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালানোর জন্য তৎপরতা শুরু করেন এবং প্রতিটি প্রদেশের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠান। শাহানশাহে ইরান ইয়াযদিগিরদ তখন খুরাসানে অবস্থান করছিলেন। যেহেতু আহনাফ খলীফাকে তাঁর মূলোৎপাটনের পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং মেধা ও বুদ্ধির দিক দিয়ে তিনি এ কাজের জন্য সবচেয়ে বেশী যোগ্য ছিলেন, তাই খুরাসান অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব খলীফা তাঁরই উপর ন্যস্ত করেন। হিজরী ২১ সনে তিনি খুরাসানের দিকে অগ্রসর হন এবং তাবসীন হয়ে হিরাতে পৌঁছেন। এর বিজয় সম্পন্ন করে মারবে শাহজাহান- যেখানে ইয়াযদিগিরদ অবস্থান করছিলেন- এর দিকে যাত্রা করেন। তাঁর অগ্রাভিযানের সংবাদ শুনে ইয়াযদিগিরদ মারব আর-রোয চলে যান এবং সেখানে পৌঁছে তিনি চীনের খাকান বংশীয় শাসক ও অন্যান্য সীমান্ত অঞ্চলীয় শাসকদের নিকট সাহায্যের আবেদন জানিয়ে পত্র লেখেন। ইয়াযদিগিরদের মারব আর-রোয যাবার পর আহনাফ মারবে শাহজাহানে হারিছা ইবন নু'মান আল-বাহিলীকে রেখে মারবের দিকে অগ্রসর হন। তাঁর অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে ইয়াযদিগিরদ সেখান থেকে পালিয়ে বলখে পৌঁছেন। এই আবর্তনমূলক দৌড়-ঝাঁপের মধ্যে কৃষ্ণা থেকে সেনা-সাহায্য এসে পৌঁছে। আহনাফ তাদেরকে সাথে নিয়ে বলখের উপর আক্রমণ করেন। ইয়াযদিগিরদ পরাজিত হয়ে পালিয়ে নদী অতিক্রম করে সীমান্তবর্তী খাকান শাসনাধীন অঞ্চলে চলে যান। তারপর আহনাফ খুরাসানের সকল অঞ্চলে তাঁর সৈন্য ছড়িয়ে দেন। খুরাসানবাসীরা তাদেরকে কোনভাবেই বাধা দিতে পারেনি। এভাবে নিশাপুর থেকে তুখারিস্তান পর্যন্ত গোটা অঞ্চল বিনা যুদ্ধে বিজিত হয়। আহনাফ মারব আর-রোয ফিরে আসেন এবং খলীফা হযরত 'উমারকে (রা) বিজয়ের সুসংবাদ জানিয়ে পত্র পাঠান। খলীফা ইরানের বাইরে বিজিত অঞ্চলের পরিধি বাড়াতে ইচ্ছুক ছিলেন না, তাই তাঁকে সামনে অগ্রসর হতে বারণ করেন।
এদিকে ইয়াযদিগিরদের চীনের সীমান্ত অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণের পর চীন সম্রাট খাকান তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাঁকে সাহায্য করার জন্য একটি শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে খুরাসান পৌঁছেন। তারপর সেখান থেকে সোজা বলখের দিকে যাত্রা করেন। বলখের ইসলামী বাহিনী আহনাফের সাথে মারব আর-রোয প্রত্যাবর্তন করেছিল। এ কারণে ইয়াযদিগিরদ ও খাকান উভয়ে বলখ হয়ে মারবের দিকে অগ্রসর হন। ইয়াযদিগিরদ মারবে শাহজাহান- যেখানে তাঁর কোষাগার ছিল, চলে যান। আহনাফের সাথে সেখানে তাঁর সংঘর্ষ হয়। আহনাফ পাহাড়ের পাদদেশে সৈন্য সমাবেশ করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত সকাল-সন্ধ্যা খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলতে থাকে। একদিন আহনাফ নিজেই ময়দানে আসেন। খাকানের বাহিনী থেকে একজন তুর্কি বীর সৈনিক হাতে তবলা ও ঢোল পিটাতে পিটাতে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে আহনাফ আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। তারপর দু'জন বীর সৈনিক একের পর এক আহনাফের সাথে লড়বার জন্যে এগিয়ে আসে। আহনাফের তরবারির আঘাতে তাদের দু'জনেরই বীরত্বের নেশা চিরদিনের জন্য মিটে যায়। এরপর গোটা তুর্কি বাহিনী মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তুমুল সংঘর্ষ শুরু হয়। খাকান তাঁর বাহিনীর অগণিত লাশের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। তাঁর বোধোদয় হয়। তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলেন। ইয়াযদিগিদরকে সাহায্য করার মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত কোন লাভ ছিল না। তাছাড়া তিনি বুঝতে পারেন, মুসলমানদেরকে পরাভূত করাও কোন সহজ কাজ নয়। তাই তিনি ইয়াযদিগিরদকে বলেন, অনেক দিন হয় আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি, এ যুদ্ধে আমাদের অনেক বীর সৈনিকও প্রাণ হারিয়েছে, আর এই সংঘাত-সংঘর্ষে আমাদের বিশেষ কোন লাভও নেই, তাই আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই। এরপর তিনি তাঁর বাহিনীকে সবকিছু গুটিয়ে দেশের দিকে যাত্রার নির্দেশ দেন।
ইয়াযদিগিরদ মারবে শাহজাহানে ছিলেন। খাকানের ফিরে যাবার সংবাদ পেয়ে তিনি সাহস হারিয়ে ফেলেন এবং কোষাগারের যাবতীয় ধন-সম্পদ তুর্কিস্তান সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ইরানীরা তা জানতে পেরে তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে। তারা ইয়াযদিগিরদকে বলে, তুর্কীদের কোন দীন-ধর্ম নেই। তাদের ওয়াদা-অঙ্গীকার পালনের কোন জ্ঞান-অভিজ্ঞতাও আমাদের নেই। আর যাই হোক, মুসলমানদের একটি ধর্ম আছে। তারা অঙ্গীকার পালনকারীও বটে। তাই, যদি আপনাকে দেশই ছাড়তে হয় তাহলে মুসলমানদের সাথে শান্তিচুক্তি করে নিন। কিন্তু ইয়াযদিগিরদ এই পরামর্শ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। ইরানীরা যখন দেখলো তাদের দেশের ধন-সম্পদ অন্য দেশে পাচার হতে যাচ্ছে তখন তারা মরণপণ যুদ্ধ করে তা ছিনিয়ে নেয়। ইয়াযদিগিরদ তাঁর নিজ প্রজাদের নিকট পরাজিত হয়ে তুর্কিস্তানে পালিয়ে যান। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালের শেষ পর্যন্ত খাকানের অতিথি হিসেবে সেখানে বসবাস করেন।
ইয়াযদিগিরদের তুর্কিস্তানে চলে যাবার পর ইরানীদের শেষ অবলম্বন ভেঙ্গে পড়ে। তারা হতাশ হয়ে আহনাফের সাথে সন্ধি করে এবং ইয়াযদিগিরদের যাবতীয় ধন-ভাণ্ডার আহনাফের হাতে তুলে দেয়। আহনাফ তাদের সাথে এমন ভদ্রোচিত আচরণ করেন যে, এতদিন পর্যন্ত মুসলমানদের শাসন থেকে বঞ্চিত থাকার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করতে থাকে।
ইরানীদের সাথে এই সন্ধিচুক্তির পর আহনাফ খলীফা 'উমারকে (রা) বিজয়ের সংবাদ পাঠান এবং সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের উদ্দেশ্যে উদ্দীপনাময় এক ভাষণ দেন। আজও মুসলমানদের জন্য সেই ভাষণটি শিক্ষণীয় হতে পারে। ভাষণটি ছিল নিম্নরূপ: 'মুসলিম ভাইয়েরা! আজ মাজুসী (অগ্নিউপাসক)-দের সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তাদের অধিকারে তাদের সাম্রাজ্যের এক খণ্ড ভূমিও আজ আর নেই। আজ তারা কোনভাবেই আর মুসলমানদের কোন রকম ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। আজ আল্লাহ তাদের ভূমি, তাদের সাম্রাজ্য এবং তাদের দেশবাসী জনগণের অধিকারী তোমাদেরকে করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষার জন্য। যদি তোমরা পাল্টে যাও তাহলে আল্লাহ তোমাদের স্থলে অন্য জাতিকে এনে বসাবেন। আমার ভয় হয়, মুসলমানরা নিজেদের হাতেই নিজেরা ধ্বংস না হয়।
হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফাতকালে ইরানে ফের যখন বিদ্রোহ হয় এবং খুরাসান মুসলিম শাসন কর্তৃত্ব থেকে বেরিয়ে যায় তখন এই আহনাফই সামরিক অভিযান চালিয়ে আবার তা মুসলিম শাসনের অধীনে ফিরিয়ে আনেন।
মোটকথা, তিনি খলীফা 'উমারের (রা) ইনতিকালের পূর্বে হিজরী ২১ সনে (খ্রী. ৬২৪) একটি বিজয়ী বাহিনীর সাথে পারস্যে যান। হিজরী ২১ সনে নিহাওয়ান্দ, অতঃপর কুম ও কাশান বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমিরের অগ্রবর্তী বাহিনীর সদস্য হিসেবে খুরাসান তথা হিরাত, মারব, মারব আর-রোয, বল্থ প্রভৃতি অঞ্চল বিজয়ে অবদান রাখেন। তারপর জায়হুন-সায়হুন নদী অতিক্রম করে মধ্য এশীয় অঞ্চলে ঢুকে পড়েন। খলীফা হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে সামারকান্দ বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে তিনি একটি চোখ হারান।
হযরত 'উছমান (রা)-এর শাহাদাতের পর আহনাফ হযরত 'আলীকে (রা) খলীফা মেনে নিয়ে তাঁর হাতে বাই'আত করেন। কিন্তু উটের যুদ্ধে কোন পক্ষে যোগদান করেননি। এ সম্পর্কে পরবর্তীকালে তিনি নিজেই বলেছেন:
'সে সময় আমি হজ্জের উদ্দেশ্যে সফরে ছিলাম। মদীনায় এসে তালহা ও যুবায়রের (রা) সাথে দেখা করে বললাম: এই ব্যক্তিকে ('উছমান) আমি তো নিহত ব্যক্তি রূপে দেখতে পাচ্ছি। এঁর পরে আপনাদের দু'জনের পছন্দনীয় এমন এক ব্যক্তির নাম বলুন যাঁর হাতে আমি বাই'আত করবো। তাঁরা বললেন: আমরা 'আলীর কথা বলবো। বললাম: যাঁর কথা আপনারা বলছেন তাঁর প্রতি কি আপনারা সন্তষ্ট? তাঁরা বললেন: হাঁ। আহনাফ বলেন: এরপর আমি মক্কায় গেলাম। আমরা সেখানে থাকতেই 'উছমানের (রা) হত্যার সংবাদ পেলাম। সে সময় মক্কাতে উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশাও (রা) ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম: আপনি এখন কার হাতে আমাকে বাই'আত করতে বলছেন? বললেন: 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) হাতে। বললাম: যাঁর হাতে আমাকে বাই'আত করতে আদেশ করছেন তাঁর প্রতি কি আপনি সন্তুষ্ট? বললেন: হাঁ। আহনাফ বলেন: তারপর আমি মদীনায় যাই এবং 'আলীর (রা) হাতে বাই'আত করি। অতঃপর আমি বসরায় ফিরে যাই। আমি দেখলাম, ব্যাপারটি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এরপর আমরা দেখলাম, 'আয়িশা, তালহা ও যুবায়র (রা) তাঁদের বাহিনী নিয়ে আসলেন এবং বসরার উপকণ্ঠ 'আল-খুরায়বা' নামক স্থানে শিবির স্থাপন করলেন।
আহনাফ বলেন: আমি মানুষের কাছে তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলাম। বললো: তাঁরা বলছেন, 'উছমান অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছেন। তাই তাঁর রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য তাঁরা আপনার সাহায্য চেয়েছেন। আমি এমন একটি মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হলাম যা আর কখনো হইনি। কারণ, এ তিন ব্যক্তি- যাঁদের মধ্যে একজন উম্মুল মু'মিনীন ও আরেকজন রাসূলুল্লাহর (সা) হাওয়ারী- তাঁদেরকে অপমান করা খুবই কঠিন কাজ। অন্যদিকে তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) যে চাচাতো ভাইয়ের হাতে আমাকে বাই'আত করার আদেশ করেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তাঁদেরই সাথে যুদ্ধ করা আরো কঠিন কাজ। আমি তাঁদের কাছে গেলাম। তাঁরা বললেন: 'উছমানকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সুতরাং আপনি তাঁর রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য উচ্চকণ্ঠ হোন। আমি তখন উম্মুল মু'মিনীনকে বললাম আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে 'আলীর হাতে বাই'আত করতে বলেননি? বললেন: হাঁ, বলেছি। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তারপর আমি তালহা ও যুবায়রকেও একই কথা বললাম এবং তারা একই জবাব দিলেন। আমি তাঁদেরকে বললাম: আল্লাহর কসম! যতক্ষণ উম্মুল মু'মিনীন আপনাদের সাথে আছেন, আমি আপনাদের বিরুদ্ধে লড়বো না। ঠিক তেমনি রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই 'আলীর (রা) বিরুদ্ধেও লড়বো না। আমাকে আপনারা তিনটি পন্থার যে কোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিন। (১) আমাকে অনারব কোন দেশে যাওয়ার সুযোগ দিন। সেখানে আল্লাহ আমার জন্য যা ফয়সালা করেন তাই হবে।
(২) আমাকে মক্কায় যেতে দিন। আমি সেখানে চুপচাপ অবস্থান করবো। (৩) অথবা মক্কার আশেপাশে কোথাও থাকার অনুমতি দিন। তাঁরা বললেন: আমরা ভেবে দেখে আপনাকে জানাবো। তাঁরা পরামর্শ করলেন। তাঁরা ভাবলেন, 'আমাকে অনারব ভূমিতে যেতে দিলে আরো অনেকে আমার সাথে মিলিত হবে। মক্কায় যেতে দিলে কুরায়শদের মধ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবো এবং তাঁদের সব খবর কুরায়শদেরকে জানিয়ে দিব। তার চেয়ে বরং বসরা থেকে দু' ফারসাখ দূরে 'আল-জালহা' নামক স্থানে নজরবন্দী অবস্থায় রেখে দেওয়া সমীচীন হবে। তাঁর সাথে বানু তামীমের ছয় হাজার যোদ্ধাও সেখানে চলে যাবে।' এভাবে উটের যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন।
হযরত 'আলী ও হযরত মু'আবিয়ার (রা) মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষ আরম্ভ হলে আহনাফের সত্যের সন্ধান লাভকারী তরবারি কোষবদ্ধ থাকতে পারেনি। তিনি 'আলীর (রা) সাহায্যে এগিয়ে আসেন এবং বসরাবাসীদেরকে 'আলীর (রা) সাহায্যের জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। সিফীনে তিনি 'আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধ করেন। এ কথাও বর্ণিত আছে যে, তিনি এক পর্যায়ে 'আলীর (রা) দল ত্যাগকারী খারেজীদের দলেও ছিলেন। কিন্তু একথা সঠিক নয় বলে বিভিন্ন তথ্যে প্রমাণিত হয়।
সিফফীন যুদ্ধের সমাপ্তির পর দ্বন্দ্ব নিসরনের জন্য যখন তাহকীম বা শালিসীর বিষয়টি সামনে এলো এবং 'আলীর (রা) পক্ষে আবূ মূসা আল-আশ'আরীর (রা) নামটি প্রস্তাব করা হলো তখন আহনাফ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি 'আলীকে (রা) বলেন, আপনাকে 'আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ কূটনীতিকের ('আমর ইবন আল-'আস) সাথে বোঝাপড়া করতে হচ্ছে। আমি আবূ মূসাকে (রা) ভালো করেই জানি। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য মোটেই উপযুক্ত ব্যক্তি নন। এ কাজের জন্য অত্যন্ত চালাক ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির প্রয়োজন। সম্ভব হলে আপনি আমাকে আপনার পক্ষের প্রতিনিধি নিয়োগ করুন। আর এ কাজের জন্য সাহাবী হওয়া একান্ত জরুরী হলে আপনি অন্য কোন সাহাবীকে নির্বাচন করুন এবং আমাকে তাঁর উপদেষ্টা নিয়োগ করুন।
কিন্তু ইরাকীদের সিদ্ধান্ত আবূ মূসার (রা) পক্ষে ছিল। এ কারণে হযরত 'আলী (রা) আহনাফের সৎ ও মূল্যবান পরামর্শ কাজে লাগাতে পারেননি। সিফফীন যুদ্ধের পরে খারিজীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার সময়েও তিনি হযরত 'আলী (রা) সাথে ছিলেন। এ যুদ্ধে তিনি কয়েক হাজার বসরাবাসী যোদ্ধাকে সংগে নিয়ে যান।
হযরত 'আলীর (রা) শাহাদাতের পরে হযরত মু'আবিয়াকে (রা) খলীফা হিসেবে তিনি মেনে নেন। তবে তখনো স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ ও সত্য উচ্চারণের উপর অটল থাকেন। আমীর মু'আবিয়ার (রা) যৌক্তিক ও অযৌক্তিক সব ইচ্ছার সামনে মাথানত করেননি। বরং তাঁর কাছে মু'আবিয়ার (রা) যেসব কাজ যৌক্তিক বলে মনে হয়নি, সে ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাহসের সাথে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। মু'আবিয়া (রা) যখন তাঁর পুত্র ইয়াযীদকে খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দানের সিদ্ধান্ত নেন তখন পরামর্শের জন্য গোটা খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিনিধিদের রাজধানীতে তলব করেন। বসরার প্রতিনিধি দলের সাথে আহনাফও দিমাশকে যান। মু'আবিয়া (রা) ইয়াযীদকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করার ব্যাপারে আহনাফের মতামত জানতে চান। খলীফার দরবারে সমবেত বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা নিজেদের মতামত ব্যক্ত করে খলীফার দরবারে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। এক পর্যায়ে মু'আবিয়া (রা) বলে ওঠেন: আহনাফ কোথায়? তিনি সাড়া দিলে মু'আবিয়া বলেন: আপনি কোন কথা বলছেন না যে? আহনাফ উঠলেন এবং একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বললেন: আল্লাহ আমীরুল মু'মিনীনের মঙ্গল করুন! আমি যদি আপনাকে সত্য কথা বলি আপনি অসন্তুষ্ট হবেন, আর যদি মিথ্যা বলি তাহলে অসন্তুষ্ট হবেন আল্লাহ। আল্লাহর অসন্তুষ্টির চেয়ে আমীরুল মু'মিনীনের অসন্তুষ্টি আমাদের জন্য অতি সহজ ও সহনীয়। মু'আবিয়া বলেন: আপনি সত্য বলেছেন। তারপর আহনাফ বলেন: জনগণ নিকট অতীতে একটি খারাপ সময় অতিবাহিত করে একটি ভালো সময় অতিক্রম করছে। আমীরুল মু'মিনীনের ছেলে ইয়াযীদ উত্তম উত্তরাধিকারী। আপনি তাঁকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে চাচ্ছেন। কিন্তু আপনি এমন বার্দ্ধক্যে পৌছেননি যে এখনই মারা যাবেন, অথবা এমন রোগে আক্রান্ত হননি যে বাঁচার আশা নেই। আপনি উটরূপী কালের দুধ দোহন করেছেন, বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। আপনিই ভেবে দেখুন, কার উপর আপনি খিলাফতের দায়িত্ব দিয়ে যেতে চান, কাকে খলীফা হিসেবে মনোনীত করতে চান। যারা আপনাকে নির্দেশ দেয়, কিন্তু পথ বাতলে দেয় না, পরামর্শ দেয়, কিন্তু আপনার দিকে লক্ষ্য করে না, আপনি এমন লোকদের কথায় কান দিবেন না। জনগণ কি চায়, আপনি সে বিষয়ে অধিক সচেতন এবং তাদের আনুগত্যের ব্যাপারে আপনি অধিক জ্ঞানী। তবে হিজায ও ইরাকের অধিবাসীরা এটা মানবে না। তারা হাসান ইবন 'আলীর (রা) জীবদ্দশায় ইয়াযীদের হাতে বাই'আত করবে না।
আহনাফের এ সংক্ষিপ্ত ভাষণের পর দাহহাক ইবন কায়স উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে যান। আহনাফের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন এবং ইরাকবাসীদেরকে আমীরুল মু'মিনীনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তারপর আহনাফ আবার উঠে দাঁড়ান এবং আল্লাহর হামদ ও ছানা পেশের পর বলেন: 'হে আমীরুল মু'মিনীন! আমরা আপনাকে কুরায়শদের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছি। আপনাকে আমরা সবচেয়ে বেশী তীক্ষ্ণধী, শক্ত অঙ্গীকারকারী ও অঙ্গীকার পালনকারী পেয়েছি। আপনি জানেন, ইরাক আপনি জোরপূর্বক জয় করেননি এবং মারপিট করেও তার উপর প্রভুত্ব অর্জন করেননি। আপনার একথা জানা আছে, হাসান ইবন 'আলীকে (রা) আল্লাহর একটি অঙ্গীকার আপনি দান করেছেন। আর তা হলো, আপনার পরে তিনিই লাভ করবেন খিলাফতের দায়িত্বভার। সে অঙ্গীকার পূরণ করলে আপনি হবেন অঙ্গীকার পূরণকারী। আর যদি অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন, জেনে রাখবেন, হাসানের পিছনে আছে, বহুসংখ্যক উন্নতমানের অশ্ব, সবল ও শক্ত বাহু ও তীক্ষ্ণ তরবারি। যদি আপনি প্রতারণার হাত এক বিঘত তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেন তাহলে তাঁর পিছনে আপনি দেখতে পাবেন দু' বাহু পরিমাণ সাহায্য। আপনি নিশ্চয় জানেন, ইরাকবাসীরা আপনাকে ঘৃণা করার পর থেকে আর কখনো ভালোবাসেনি, তেমনিভাবে 'আলী ও হাসানকে (রা) ভালোবাসার পর থেকে আর কখনো ঘৃণা করেনি। আল্লাহর কসম! ইরাকীদের নিকট 'আলী (রা) অপেক্ষা হাসান (রা) অধিকতর প্রিয়।'
আহনাফের বক্তব্য শেষ হলে যথাক্রমে 'আবদুর রহমান ইবন 'উছমান আছ-ছাকাফী, মু'আবিয়া ও ইয়াযীদ ইবন আল-مुकاني' উঠে দাঁড়ান ও সংক্ষিপ্ত ভাষণ দান করেন। তারপর আহনাফ আবার উঠে দাঁড়ান এবং নিম্নের ভাষণটি দান করেন:
يا أمير المؤمنين : أنت أعلمنا بيزيد في ليله ونهاره، وسره وعلانيته، ومدخله ومخرجه، فإن كنت تعلمه الله رضا ولهذه الأمة، فلا تشاور الناس فيه، وإن كنت تعلم منه غير ذلك ، فلا تزوده الدنيا وأنت صائر إلى الآخرة، فإنه ليس لك من الآخرة إلا ماطاب ، واعلم أنه لاحجة لك عند الله إن قدمت يزيد على الحسن والحسين، وأنت تعلم من "هما" وإلى ماهما، وإنما علينا أن نقول : سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ المصير.
- হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি ইয়াযীদের দিন-রাত্রির, গোপন-প্রকাশ্যের ও ভিতর- বাইরের খবর আমাদের চেয়ে বেশী রাখেন। যদি আপনি তাঁকে আল্লাহ ও এই উম্মাতের জন্য বেশী পছন্দনীয় মনে করেন তাহলে এ ব্যাপারে কোন মানুষের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন নেই। আর যদি আপনি এর বিপরীত কিছু জানেন তাহলে তার ঘাড়ে দুনিয়ার বোঝা চাপিয়ে আখিরাতের দিকে পাড়ি জমাবেন না। কারণ, আখিরাতে ভালো ছাড়া কোন কিছুই আপনার কাজে আসবে না। আর আপনি জেনে রাখুন, হাসান ও হুসায়নের (রা) উপর ইয়াযীদকে প্রাধান্য দিলে আল্লাহর কাছে আপনি কোন যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেননা। আপনি জানেন, তাঁরা দু'জন কে এবং তাঁদের পরিণতিই বা কী হতে যাচ্ছে। আমরা শুধু এতটুকুই বলতে পারি : 'আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। হে আমাদের পরোয়ারদিগার আপনি আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আপনিই আমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল।'
"আল-'ইকদ আল-ফারীদ" গ্রন্থকার ইবন 'আবদি রাব্বিহি বলেন: আহনাফের বক্তব্যের পর মানুষ সমাবেশ থেকে উঠে এদিক সেদিক চলে যায়। তারা তখন আহনাফের কথাই আলোচনা করছিল।। অতঃপর মানুষ ইয়াযীদ ইবন মু'আবিয়ার খলীফা হবার বিষয়ে বাই'আত গ্রহণ করে। সে সময় এক ব্যক্তিকে যখন বাই'আতের জন্য ডাকা হলো, সে বললো:
- 'হে আল্লাহ! আমি মু'আবিয়ার অনিষ্ট থেকে পানাহ্ চাই।'
সাথে সাথে মু'আবিয়া (রা) বলে ওঠেন:
اللهم أعوذ بك من شر معاوية.
تَعَوَّدُ مِن شَرِّ نَفْسِكَ، فإنه أَشَرُّ عليكَ وبايع.
- 'তুমি তোমার অন্তরের অনিষ্ট থেকে পানাহ্ চাও। কারণ, তা তোমার জন্য অধিকতর ক্ষতিকর। আর তুমি বাই'আত কর।'
লোকটি তখন বললো : 'আমি বাই'আত করছি। তবে আমি এ বাই'আতকে পছন্দ করিনে।' মু'আবিয়া (রা) তখন এ আয়াতটি পাঠ করেন:
فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيْهِ خَيْرًا كَثِيرًا.
'হতে পারে তোমরা কোন জিনিস অপছন্দ কর, আর আল্লাহ তার মধ্যে অনেক কল্যাণ নিহিত রাখেন।
তবে ইবন কুতায়বা বলেন, একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, আহনাফ ও অন্যদের এসব বক্তৃতা-ভাষণের পর মু'আবিয়া (রা) তাঁর পুত্র ইয়াযীদের বাই'আতের ব্যাপারে আল্লাহর দরবারে ইসতিখারা করেন। অতঃপর বিষয়টি কিছু দিনের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত রাখেন। তারপর হিজরী ৫০ সনে তিনি মক্কায় এলে মক্কাবাসীরা তাঁর সাথে দেখা করতে আসে। তিনি তাঁর বাসভবনে একটু সুস্থির হয়ে বসার পর 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফর ইবন আবী তালিব, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে (রা) ডেকে পাঠান। তাঁরা উপস্থিত হলে মু'আবিয়া (রা) দারোয়ানকে নির্দেশ দেন, এই লোকগুলো ভিতর থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কাউকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেবে না। অতঃপর রুদ্ধদ্বার গৃহে মু'আবিয়া (রা) তাঁদের সাথে মতবিনিময় করেন। তারপর তিনি মক্কা ত্যাগ করেন এবং হিজরী ৫১ সন পর্যন্ত ইয়াযীদের বাই'আতের বিষয়টি নিয়ে আর কোন উচ্চবাচ্য করেননি। ইবন কুতায়বা বলেন, হিজরী ৫১ সনে হযরত হাসানের (রা) ওফাতের অল্প কিছুদিন পর মু'আবিয়া (রা) ইয়াযীদের জন্য শামবাসীদের বাই'আত গ্রহণ করেন এবং খিলাফতের সকল অঞ্চলে তাঁর বাই'আত গ্রহণের নির্দেশ দেন।
আহনাফের সত্যপ্রীতি ও স্পষ্টভাষিতার কারণে হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও সমাদর করতেন। অনেক বড় বড় আঞ্চলিক শাসক ও কর্মকর্তাকে তাঁর ইঙ্গিতে বরখাস্ত করতেন। 'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ ছিলেন হযরত মু'আবিয়ার (রা) একজন অতি বিশ্বস্ত ব্যক্তি। উমাইয়্যা শাসনকে যাঁরা একটি মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন। কিন্তু তাঁর কর্মপদ্ধতি আহনাফের পছন্দ ছিল না। হিজরী ৫৯ সনে 'উবায়দুল্লাহ আহনাফসহ কৃষ্ণার একদল বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সংগে করে শামে হযরত মু'আবিয়ার (রা) দরবারে আসেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) যথারীতি গভীর আবেগ ও আন্তরিকতার সাথে আহনাফকে স্বাগতম জানান এবং তাঁকে নিজের সাথে শাহী আসনে নিয়ে বসেন। বসরার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা 'উবায়দুল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মু'আবিয়ার (রা) সামনে তাঁর খুবই প্রশংসা করে। আহনাফের মত ছিল তাঁদের সবার বিপরীত। এ কারণে তিনি সম্পূর্ণ চুপ করে বসে থাকলেন।
হযরত মু'আবিয়া (রা) প্রশ্ন করলেন: আবু বাহর! আপনি কিছু বলছেন না কেন? তিনি জবাব দিলেন: আমি বললে এই প্রতিনিধি দলের সবার বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। তাঁর একথা শুনে হযরত মু'আবিয়া (রা) তখনই 'উবায়দুল্লাহকে বরখাস্ত করেন। তিনি আগত বসরাবাসীদেরকে তাদের পছন্দমত একজন ওয়ালীর নাম প্রস্তাব করতে আহ্বান জানান। তারা প্রত্যেকেই হযরত মু'আবিয়াকে (রা) খুশী করার উদ্দেশ্যে উমাইয়্যা খান্দান ও শামীদের মধ্য থেকে কারো নাম প্রস্তাব করে। আহনাফ তখনও চুপ ছিলেন। কারো নাম প্রস্তাব করলেন না। হযরত মু'আবিয়া (রা) প্রস্তাবকারীদের নিকট জানতে চান, আপনারা কাকে নির্বাচন করলেন? যেহেতু তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী প্রস্তাব করেছিল, তাই কোন এক ব্যক্তির ব্যাপারে একমত হতে পারেনি। আহনাফ একেবারেই চুপ ছিলেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) বললেন, আপনি কিছু বলুন। তিনি এই প্রস্ত াবকারীদের রূপ-প্রকৃতি দেখছিলেন। তাই তিনি মু'আবিয়াকে (রা) বললেন, যদি আপনি আপনার খান্দানের মধ্য থেকে কাউকে ওয়ালী বানাতে চান তাহলে আমি বরখাস্তকৃত 'উবায়দুল্লাহকেই অগ্রাধিকার দিব। আর যদি অন্য কোন ব্যক্তিকে বানাতে চান তাহলে সেটা আপনার ইচ্ছা ও মর্জি। তাঁর একথা শুনে মু'আবিয়া (রা) 'উবায়দুল্লাহকে তাঁর স্বপদে বহাল করেন। তারপর আহনাফকে উপেক্ষা করার জন্য তিনি 'উবায়দুল্লাহকে ভীষণ তিরস্কার করেন এবং ভবিষ্যতে তাঁর সাথে ভালো আচরণ করার প্রতি তাকিদ দেন।
আল-আহনাফ একবার খলীফা হযরত মু'আবিয়ার (রা) দরবারে গেলেন। খলীফা তাঁকে নিজের পাশে বিছানার উপর বসতে ইঙ্গিত করলেন। কিন্তু তিনি সেখানে না বসে মাটিতে বসলেন। খলীফা তখন প্রশ্ন করলেন : আহনাফ, আপনি বিছানায় বসলেন না কেন? আহনাফ বললেন: আমীরুল মু'মিনীন! কায়স ইবন 'আসিম আল-মিনকারী তাঁর ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমি মূলতঃ তাই পালন করি। তিনি বলেছিলেন : 'রাজা-বাদশাদের নিকট এমন কিছু লুকোবে না যাতে পরে তোমাকে পস্তাতে হয়। তোমাকে ভুলে যায় এমন ভাবেও তাদেরকে ছেড়ে আসবে না। তাঁদের পাশে একই বিছানায় বা একই গদীর উপর বসবে না। এমন দূরত্বে বসবে যাতে তাঁদের ও তোমার মাঝে এক অথবা দু'জন মানুষ বসার জায়গা থাকে। কারণ, হতে পারে তোমাদের এ বৈঠক চলাকালে এমন কোন বেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এসে গেল এবং তার জন্য তোমাকে স্থান ছেড়ে দিতে হলো। আর তেমন হলে আগন্তুক ব্যক্তিটির মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, আর তোমার হবে মর্যাদাহানি।' অতএব, হে আমীরুল মু'মিনীন, বসার জন্য এ স্থানই আমার উপযোগী। হতে পারে আমাদের এ বৈঠকে আপনার পাশে বসার বেশী উপযুক্ত লোক এসে যেতে পারেন। খলীফা তখন মন্তব্য করেন: 'বানু তামীমকে জ্ঞান ও বিজ্ঞতা দান করা হয়েছে। আর সেই সাথে দান করা হয়েছে অলঙ্কারমণ্ডিত কথামালা।'
একবার আহনাফ বসরার একটি প্রতিনিধি দলের সাথে মু'আবিয়ার (রা) দরবারে গেলেন। তাঁর সাথে নামির ইবন কুতবাও ছিলেন। নামিরের গায়ে ছিল কৃষ্ণার কাতওয়ান নামক স্থানের 'আবা', আর আহনাফের গায়ে ছিল পশমের মোটা পোশাক। তাঁরা দু'জন মু'আবিয়ার (রা) সামনে দাঁড়ালে তিনি অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাঁদের দিকে তাকালেন। নামির তা বুঝতে পেরে বললেন : ওহে আমীরুল মু'মিনীন! 'আবা' আপনার সাথে কথা বলবে না। 'আবা'র মধ্যের মানুষটি আপনার সাথে কথা বলবেন। মু'আবিয়া (রা) ইশারায় তাঁকে বসতে বললেন। তারপর আহনাফের দিকে তাকিয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলেন। আহনাফ বললেন:
يا أمير المؤمنين، أهل البصرة عدد يسير وعظم كسير مع تتابع من المحول، واتصال من الذحول، فالمكثر فيها قد أطرق ، والمقل قد أملق، وبلغ منه المخنق، فإن رأى أمير المؤمنين أن يُنْعِشَ الفقير، ويُجبر الكسير ويسهل العسير ويصفح عن الذحول ويراوى المحول ويأمر بالعطاء ليكشف البلاء ويزيل اللأواء، وإن السيد من يعم ولا يَخُص ومن يدعو الجفلي ولا يدعو النقرى، إن أحسن إليه شكر وإن أسئ إليه غفر، ثم يكون من وراء ذلك لرعيته عمادا، يدفع عنهم الملمات ويكشف عنه المعضلات. فقال له معاوية : هاهنا يا أبا بحر، ثم تلا : "وَلَتَعْرِفَنَّهُمْ فِي لَحْنِ الْقَوْلِ."
হে আমীরুল মু'মিনীন! বসরাবাসী সংখ্যায় অল্প এবং ক্রমাগত দুর্ভিক্ষ ও ধারাবাহিক রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণে ভগ্ন অস্থিবিশিষ্ট হয়ে গেছে। সেখানকার বিত্তশালীদের দৃষ্টি নত হয়ে গেছে এবং বিত্তহীনরা একেবারেই হত-দরিদ্র হয়ে পড়েছে। তারা কণ্ঠরোধ হবার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। আমীরুল মু'মিনীন চাইলে এই দরিদ্রদের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে, ভাঙ্গা হাঁড়ের জোড়া লাগাতে, কঠিনকে সহজ, অভাব-দারিদ্রকে দূরীভূত, রক্ত- বদলার চিকিৎসা ও দানের নির্দেশ দিতে পারেন। তাহলে এই দুর্যোগ ও এই কঠিন সময় দূর হবে। নিশ্চয় নেতা তিনিই হন যার দান-অনুগ্রহ হয় সবার জন্য, বিশেষ কারো জন্য নয়। যাঁর আহ্বান হয় সবার জন্য, বিশেষ কারো জন্য নয়। যদি তাঁর প্রতি কোন অনুগ্রহ করা হয়, তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, আর যদি কোন খারাপ কিছু করা হয়, তিনি ক্ষমা করে দেন। তাছাড়া তিনি তাঁর অধীনস্তদের জন্য হন স্তম্ভস্বরূপ। তাদের বিপদ-মুসীবত প্রতিহত করেন এবং যাবতীয় জটিলতা দূর করেন। অতঃপর মু'আবিয়া (রা) আহনাফকে বলেন: আবূ বাহর, এখানে। তারপর তিনি সূরা মুহাম্মাদ-এর ৩০নং আয়াতটি পাঠ করেন।
'আপনি অবশ্যই তাদেরকে কথার ভঙ্গিতে চিনতে পারবেন।' তিনি আরো বলেন: ওহে আবূ বাহর, যথেষ্ট হয়েছে। আপনি উপস্থিত ও অনুপস্থিত সবার জন্য একাই যথেষ্ট।
একদিন মু'আবিয়া (রা) বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে বসে আছেন। আহনাফও তাঁদের মধ্যে একজন। এমন সময় শামের এক ব্যক্তি সেখানে এলো এবং দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলো। তাঁর বক্তৃতার শেষ কথাটি ছিল "আলীর (রা) প্রতি লা'নাত বা অভিশাপ"। উপস্থিত লোকেরা চোখ তুলে লোকটির প্রতি তাকালো। কিন্তু আহনাফ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! লোকটি এই মাত্র কী বললো? নিশ্চয় 'আলীকে (রা) অভিশাপ দানের প্রতি আপনার সম্মতি আছে তাই সে অভিশাপ দিয়েছে। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। 'আলীকে ছেড়ে দিন। তিনি তো আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। তিনি তাঁর কর্ম নিয়ে একাকী কবরে চলে গেছেন। আল্লাহর কসম! যতটুকু আমরা জানি, তিনি তাঁর সঙ্গীদের অতিক্রম করে গেছেন। তিনি ছিলেন পুতঃপবিত্র চরিত্রের, স্বচ্ছ অন্তঃকরণের ও বিরাট মুসীবতগ্রস্ত মানুষ।'
এতটুকু বলার পর মু'আবিয়া (রা) বলে উঠলেন: হে আহনাফ! আপনি ধুলোবালি থেকে বাঁচার জন্য চোখ বন্ধ করে রেখেছেন। তাই আপনি যা দেখেননি তাই বলছেন। আল্লাহর কসম! আপনি অবশ্যই মিম্বরের উপর উঠবেন এবং ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, অবশ্যই তাঁকে অভিশাপ দিবেন। আহনাফ বললেন: যদি আপনি ক্ষমা করেন তাহলে তো ভালো, আর যদি অভিশাপ দেওয়ার জন্য আমাকে জোর-জবরদস্তি করেন, তাহলে আল্লাহর কসম! আমার ঠোঁট দিয়ে তা বের হবে না। মু'আবিয়া বললেন: উঠুন, মিম্বরের উপর যান। আহনাফ বললেন : আল্লাহর কসম! আমি কথা ও কাজে আপনার প্রতি ন্যায়বিচার করবো। মু'আবিয়া বললেন : আমার প্রতি ন্যায়বিচার করলে আপনি কথা বলতে পারবেন না। আহনাফ বললেন : আমি মিম্বরে উঠে আল্লাহর হামদ ও ছানা ও রাসূলের প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করবো। তারপর বলবো : ওহে জনগণ! মু'আবিয়া আমাকে 'আলীর প্রতি অভিশাপ দানের নির্দেশ দিয়েছেন। আপনারা জেনে রাখুন, 'আলী ও মু'আবিয়া দু'জন মতবিরোধ সৃষ্টি করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই দাবী করেছেন, প্রতিপক্ষ তাঁর ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। আমি যখন দু'আ করি, আপনারা সবাই আমীন বলবেন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি করুণা বর্ষণ করুন। তারপর আমি বলবো :
হে আল্লাহ! আপনি, আপনার ফেরেশতা মণ্ডলী, নবীগণ ও সমস্ত সৃষ্টি জগত এঁদের দু'জনের মধ্যে যে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন তাঁর প্রতি ও তাঁর দলের প্রতি অভিশাপ দিন। আপনারা সবাই আমীন বলুন। আল্লাহ আপনাদের প্রতি করুণা করুন। হে মু'আবিয়া, আমি এর একটি হরফও কম-বেশী করবো না। তাতে যদি আমার জীবনও চলে যায়। মু'আবিয়া বললেন : ওহে আবূ বাহর! তাহলে আমি আপনাকে ক্ষমা করছি।
আহনাফ সিফফীন যুদ্ধে 'আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন। 'আলীর (রা) পরে মু'আবিয়া (রা) যখন খলীফা হলেন তখন একদিন আহনাফ তাঁর কাছে গেলেন। মু'আবিয়া (রা) আহনাফকে লক্ষ্য করে বললেন : আহনাফ! আল্লাহর কসম, আমি সিফফীনের দিনগুলোর কথা স্মরণ করতে চাইনে। তবে কিয়ামত পর্যন্ত সেই ব্যথা আত্মার অন্তরে বিদ্যমান থাকবে।
জবাবে আহনাফ বললেন : হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি সব বিষয় পিছনের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে চান কেন? আল্লাহর কসম! যে অন্তঃকরণগুলো দ্বারা আমরা আপনাকে ঘৃণা করেছিলাম তা আমাদের পাঁজরের মধ্যে এবং যে তরবারিগুলো দ্বারা আমরা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলাম, সেগুলো আমাদের কাঁধে বিদ্যমান আছে। আপনি ধোঁকা ও প্রতারণার এক বিঘত লম্বা করলে আমরা দু'বাহু পরিমাণ তার চেয়ে খারাপ জিনিস লম্বা করবো। আপনি ইচ্ছা করলে আমাদের অন্তরের এই পঙ্কিলতা আপনার ধৈর্য ও বিচক্ষণতার স্বচ্ছতার দ্বারা পরিচ্ছন্ন করতে পারেন। মু'আবিয়া বললেন: আমি তাই করবো। তারপর আহনাফ উঠে বের হয়ে গেলেন। মু'আবিয়ার (রা) বোন উম্মুল হাকাম পর্দার পিছনে দাঁড়িয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন। তিনি বললেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! এই লোকটি কে, যে আপনাকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে গেল? বললেন: এ সেই ব্যক্তি যে রেগে গেলে বানু তামীমের এক লাখ মানুষ রেগে যায়- অথচ তাঁরা জানে না কী জন্য তারা রেগে যাচ্ছে। এ হচ্ছে আল-আহনাফ ইবন কায়স- বানু তামীমের নেতা এবং আরবের একজন বিজয়ী বীর।
একবার হযরত মু'আবিয়া (রা) লোক পাঠিয়ে আনহাফকে দরবারে ডেকে আনলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন : ওহে আবু বাহর, সন্তানের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? বললেন : আমীরুল মু'মিনীন! তারা আমাদের হৃদয়ের ভালোবাসা ও পিছনে ঠেস দেওয়ার স্তম্ভ। আমরা তাদের জন্য সমতল ভূমি ও ছায়াদানকারী আকাশ। তারা যদি চায়, দিয়ে দিন, আর যদি রেগে যায়, খুশী করুন। তাহলে তারা তাদের ভালোবাসা আপনাকে দিবে। তাদের প্রতি কঠোর হবেন না। যদি কঠোর হন, তাহলে তারা আপনার জীবনকে নিরানন্দ করে ছাড়বে এবং আপনার মৃত্যুকে ভালোবাসবে। মু'আবিয়া বললেন : আল্লাহর কসম, হে আহনাফ! আপনি আমার অন্তরের কথা বলছেন। ইয়াযীদের উপর রাগে আমার অন্তর ভরে আছে। আপনি তা দূর করে দিয়েছেন। অতঃপর আহনাফ চলে গেলেন। মু'আবিয়া (রা) তাঁকে দেওয়ার জন্য দু'লাখ দিরহাম ও দু'শো কাপড় ইয়াযীদের কাছে পাঠালেন। ইয়াযীদ সেখান থেকে অর্ধেক নিজের জন্য রেখে দিয়ে অবশিষ্ট অর্ধেক আহনাফের নিকট পাঠিয়ে দিলেন।
হযরম মু'আবিয়ার (রা) ওফাতের পর আহনাফ ইয়াযীদের খিলাফত মেনে নেন। হযরত ইমাম হুসায়ন (রা) যখন খিলাফতের দাবী নিয়ে ইয়াযীদের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড়ান তখন তিনি আহনাফের সাহায্য চেয়ে চিঠি লেখেন। তবে যতটুকু জানা যায় তাতে মনে হয় তিনি ইমামের আহ্বানে সাড়া দেননি। তিনি ইয়াযীদের বাই'আতের উপর অটল ছিলেন। ইয়াযীদের মৃত্যুর পর যখন উমাইয়্যা খিলাফতের অভ্যন্তরে বিপ্লব ঘটে যায় এবং ইরাক থেকে উমাইয়্যা শাসন এক রকম উঠে যায়, তখন আহনাফ বসরাবাসীদের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। এরই প্রেক্ষিতে তাঁর গোত্র বানু তামীম ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে কিছু ঝগড়া- বিবাদের সৃষ্টি হয় এবং কিছুটা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রূপ নেয়। আহনাফের চেষ্টায় তার নিষ্পত্তি হয়। তারপর ইরাক যখন হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) অধীনে চলে যায় তখন আহনাফ তাঁর সহযোগী হয়ে যান। তাঁর সময়েও আহনাফের পূর্বের সম্মান ও মর্যাদা বহাল থাকে। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) ওয়ালীরা সবসময় তাঁর সাথে যোগাযোগ ও পরামর্শ করতেন এবং সেই মত কাজ করতেন। ইরাকে যখন খারিজীদের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং তা বসরা পর্যন্ত গিয়ে পৌছে তখন আহনাফেরই উৎসাহে বিখ্যাত সেনানায়ক মহাব ইবন আবী সুফরাকে খারিজীদেরকে দমনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) খিলাফতকালে মুখতার আছ-ছাকাফী যখন ইরাক দখলের চেষ্টা চালায় তখন আহনাফ ইবন যুবায়রকে (রা) সাহায্যের অংশ হিসেবে মুখতারের প্রতিনিধি মুছান্নাকে ইরাক থেকে বের করে দেন। তারপরও ধীরে ধীরে যখন ইরাকে মুখতারের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন তিনি ইবন যুবায়রের (রা) ভাই মুস'আব ইবন যুবায়রের (রা) সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুখতারের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
এ সময় 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) মূল প্রতিদ্বন্দ্বী উমাইয়্যা খলীফা আবদুল মালিক আহনাফকে তাঁর পক্ষে ভেড়ানোর জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি উমাইয়্যাদের ঘোরতর বিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। এ কারণে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় তাঁর জবাব দেন। তিনি বলেন, ইবন যারকা' আমাকে শামীদের সাথে বন্ধুত্বের আহ্বান জানাচ্ছে। আল্লাহর কসম! আমি চাই আমার ও তাঁর মধ্যে আগুনের পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে যাক। যাতে তাদের মানুষ এদিকে না আসতে পারে, আর আমার লোক সেদিকে না যেতে পারে।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) ভাই কুফার ওয়ালী মুস'আব ইবন যুবায়রের সাথে আহনাফের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তিনি মুস'আবের সাথে সাক্ষাৎ করতে কৃফায় যান এবং সেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলীর বর্ণনা মতে হিজরী ৭২ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। অনেকে বলেছেন, হিজরী প্রথম শতকের সাত-এর দশকের শেষ দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
শিক্ষা ও জ্ঞানের দিক দিয়ে আহনাফ তাঁর যুগে বিশেষ কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন না। তবে বিশিষ্ট সাহাবীদের সাহচর্যের সুযোগ লাভে ধন্য হয়েছিলেন। এ কারণে জ্ঞানের জগতের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না এ কথা বলা যাবে না। 'উমার (রা), 'আলী (রা), 'উছমান (রা), সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন সা'দ (রা), আবূ যার (রা) প্রমুখ মহান সাহাবীর মুখ থেকে তিনি হাদীছ শোনেন এবং তাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেন। তাবি'ঈদের মধ্যে যাঁরা তাঁর নিকট থেকে হাদীছ শুনে বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে হাসান বসরী, আবুল 'আলা' ইবন শিখীর, তালাক ইবন হাবীব প্রমুখ সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। আরবী কবিতায়ও তাঁর ভীষণ দখল ছিল। মু'আবিয়া (রা) মাঝে মাঝে কবিতা নিয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করতেন।
জ্ঞান ও শিক্ষার জগতের তিনি তেমন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি না হলেও তাঁর সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষেত্র ছিল কণ্টকাকীর্ণ রাজনীতির ময়দান। তিনি তাঁর সময়ের বড় বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, চিন্তাশীল ও মহাজ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে মানুষের ধারণা ছিল, কোন মানব গোষ্ঠীতে আহনাফের চেয়ে ভদ্র মানুষ দেখা যায় না। তাঁর মৃত্যুর পর মুস'আর ইবন যুবায়র (রা) মন্তব্য করেন, আজ বিচক্ষণতা ও সঠিক সিদ্ধান্তের সমাপ্তি ঘটলো। বিভিন্ন উক্তি ও বাণীর মধ্যে তাঁর বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়। এসব উক্তি ও বাণীর কিছু কিছু প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। তাঁর হিলল্ম (প্রজ্ঞা) মু'আবিয়ার (রা) 'হিলম-এর সাথে তুলনা করা হতো এবং তা প্রবাদতুল্য ছিল। এ কারণেই 'আহলাম মিন আল- আহনাফ' উক্তিটির প্রচলন হয়।
সাধারণভাবে দেখা যায়, অসাধারণ বুদ্ধি, জ্ঞান ও চিন্তা-অনুধ্যানের সাথে যুহদ ও তাকওয়া এবং 'ইবাদত-বন্দেগীর সহ-অবস্থান খুব কম হয়। কিন্তু আহনাফ সে স্তরের চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন, ঠিক একই রকম যুহদ ও তাকওয়াও তাঁর মধ্যে ছিল। তাঁর 'ইবাদত-বন্দেগীর বিশেষ সময় ছিল রাতের অন্ধকার। পৃথিবীর সব মানুষ যখন ভোগ- বিলাস ও সুখ-স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেত তখন তিনি রাব্বুল 'আলামীনের দরবারে বিনয়াবনত হয়ে দাসত্বের ঘোষণা দিতেন। রাতের অন্ধকারে মুহাসাবায়ে নফস বা আত্মসমালোচনা করতেন। নিজের কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করতেন।
আল-আহনাফ ছিলেন একজন বড় ধরনের 'আবিদ ব্যক্তি। খুব বেশী বেশী সালাত আদায়কারী ও সাওম পালনকারী। দুনিয়ায় মানুষের হাতে যা আছে তেমন সবকিছুর প্রতি তিনি ছিলেন নির্মোহ ও নিরাসক্ত। রাতের অন্ধকার নেমে এলে বাতি জ্বালিয়ে পাশেই রাখতেন। তারপর নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। আল্লাহর গজব ও আজাবের ভয়ে রোগগ্রস্ত মানুষের মত প্রলাপ বকতেন এবং পুত্রহারা পিতার মত হাউমাউ করে কাঁদতেন। যখনই তিনি নিজের কোন পাপের কথা, অথবা নিজের কোন দোষের কথা বুঝতে পারতেন তখনই নিজের একটি আঙ্গুল বাতির আগুনের একেবারে কাছে নিয়ে বলতেন: হে আহনাফ! আগুনের পোড়ার এ কষ্ট অনুভব কর। অমুক দিন অমুক কাজটি করতে কে তোমাকে উৎসাহিত করেছিল? ওহে আহনাফ! তোমার ধ্বংস হোক! আজ এই বাতির শিখার গরম যদি তুমি সহ্য করতে না পার তাহলে আগামীকাল জাহান্নামের অগ্নিশিখার তাপ সহ্য করবে কিভাবে? আর কিভাবেই বা তখন ধৈর্য ধারণ করবে? হে আল্লাহ, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কারণ, তুমি তার উপযুক্ত। আর যদি আমাকে শান্তি দাও তাহলে আমি তারই উপযুক্ত।
বার্দ্ধক্যের দুর্বলতার সময় যখন সিয়াম পালনের শক্তি যেতে বসেছিল তখন একদিন যায়দ নামের এক ব্যক্তি তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসে বলেন, আপনি খুবই শক্তিহীন হয়ে পড়েছেন এবং রোযা আপনাকে আরো দুর্বল করে ফেলবে। জবাবে তিনি বলেন, আমি আমার এই দেহকে একটি দীর্ঘ সফরের জন্য প্রস্তুত করছি।
কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও আকর্ষণ। কখনো একাকী হলেই কুরআন খুলে বসে যেতেন। এত সব 'ইবাদত-বন্দেগীর উপরও তাঁর পূর্ণ আস্থা ছিল না। তাই তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করতেন এই বলে : হে আল্লাহ! যদি তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও তাহলে সেটা হবে তোমার করুণা। আর যদি আমাকে শাস্তি দাও, তাহলে আমি তা লাভ করার যোগ্য।
তাহারাত বা পাক-পবিত্রতার ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন যে, তীব্র থেকে তীব্রতর ঠাণ্ডার মওসুমেও তায়াম্মুম করতেন না। বরফ জমা ঠাণ্ডা পানিও ব্যবহার করতেন। খুরাসান অভিযানকালে এক রাতে গোসলের প্রয়োজন দেখা দেয়। ঠাণ্ডার মওসুম ছিল, খুরাসানের সেই রাতটি ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডার। আহনাফ কোন চাকর-বাকর বা সৈনিকের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালেন না। তিনি তখনই একাকী নির্জন রাতে পানির সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তায় ছিল কাঁটা ওয়ালা ঝোপ-ঝাড়। তিনি সেগুলো পায়ে মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যান। কাঁটার খোঁচায় তার পা দু'টো রক্তে ভিজে যায়। শেষমেষ, একটি বরফপিণ্ডের গোঁড়ায় পৌঁছেন এবং সেখান থেকে বরফ ভেঙ্গে বরফ মিশ্রিত পানি দিয়ে সেখানে গোসল করেন।
তিনি অত্যন্ত সত্যভাষী ও সত্যপ্রিয় মানুষ ছিলেন। শাসক ও আমীর-উমারার সামনেও তাঁর জিহ্বা সত্য প্রকাশে বিরত থাকতো না। ইয়াযীদের বাই'আতের বিষয়ে তাঁর স্পষ্টবাদিতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকবার কোন এক বিতর্কিত বিষয়ে তাঁকে চুপ থাকতে দেখে হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁকে বলেন: আবূ বাহর! আপনিও কিছু বলুন। তিনি মুখ খুললেন। বললেন: আমি আর কী বলবো। যদি মিথ্যা বলি তাহলে আল্লাহর ভয়। আর যদি সত্য উচ্চারণ করি তাহলে আপনাদের ভয়।
ধৈর্য ও সহনশীলতা ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। 'আল্লামা ইবন হাজার লিখেছেন, তাঁর গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক। তাঁর বিচক্ষণতা ছিল প্রবাদতুল্য। কিন্তু তিনি সব সময় বিনয়ের সাথে বলতেন, প্রকৃতপক্ষে আমি কোন বিচক্ষণ ব্যক্তি নই। বরং বিচক্ষণতার ভান করি।
আহনাফের এমন কিছু মূলনীতি ছিল যা প্রত্যেক মানুষের জন্য অনুসরণযোগ্য। তিনি বলতেন, আমি তিনটি কাজ করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করে থাকি। সময় হয়ে গেলে নামায আদায়ে, মৃত ব্যক্তির লাশ দাফনে এবং পাত্র পাওয়া গেলে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে।
আল-আহনাফ একজন দক্ষ ও সাহসী যোদ্ধা ছিলেন, তাঁর দক্ষতা ও সাহসিকতার অনেক কাহিনী ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়। মুহাম্মাদ ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন। খলীফা 'উমার ইবন আল-খাত্তাব (রা) আল-আহনাফ ইবন কায়সকে একটি বাহিনী সহকারে খুরাসানে পাঠালেন। একদিন রাতে শত্রু বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে আল-আহনাফের বাহিনীকে চার ভাগে বিভক্ত করে ফেলে। তারপর শত্রু বাহিনী রণ দামামা বাজাতে বাজাতে তাঁর বাহিনীর উপর হামলা চালায়। মুসলিম বাহিনী ভীত-শঙ্কিত হয়ে পড়লো। এ অবস্থায় আল-আহনাফ কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে ঘোড়ার উপর চড়ে বসলেন এবং দামামার শব্দ যেদিক থেকে আসছিল, কবিতার একটি শ্লোক গুন গুন করে আওড়াতে আওড়াতে সেদিকে চললেন। তারপর যে সৈনিকটি দামামা বাজাচ্ছিল হঠাৎ তার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। দামামার শব্দ থেমে যাওয়ায় শত্রু বাহিনী প্রমাদ গোনে এবং ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় এদিক সেদিক পালাতে আরম্ভ করে। তারপর অন্য একটি অশ্বারোহী বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে ধরাশায়ী করে ফেলেন। এসবই কিন্তু আল-আহনাফ একা করেন। তারপর তাঁর সৈন্যরা এগিয়ে আসে এবং শত্রু বাহিনী পালাতে থাকে। তখন আল-আহনাফের বাহিনী তাদেরকে ধাওয়া করে হত্যা করতে থাকে। এ অভিযানে তিনি যে শহরটি জয় করেন তার নাম 'মারব আর-রোয'।
আল-আহনাফ ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল মানুষ। তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতা তৎকালীন আরবে প্রবাদে পরিণত হয়। তাঁর ধৈর্যের অনেক গল্প-কাহিনী আরব ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। যেমন একবার 'আমর ইবন আল-আহ্লাম তাঁকে অশ্লীল ভাষায় অশালীন গালিগালাজ করার জন্য এক ব্যক্তিকে উৎসাহিত করলো। লোকটি তাঁকে তাঁর মান-সম্মানের উপর আঘাত করে নোংরা ভাষায় লাগি দিতে থাকলো। কিন্তু আহনাফ নীরবে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে গালি শুনতে লাগলেন। একটি কথারও জবাব দিলেন না। লোকটি যখন দেখলো, তিনি তার কথায় কোন রকম বাধা দিচ্ছেন না এবং কোন প্রত্যুত্তরও করছেন না তখন সে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দাঁত দিয়ে কামড়াতে কামড়াতে বলতে লাগলো : হায়রে দুঃখ! আল্লাহর কসম! আমি তাঁর কাছে এত তুচ্ছ ও হেয় যে, আমার এ অশালীন গালির কোন উত্তর দেওয়া প্রয়োজন বোধ করছেন না।
আরেকবার তিনি বসরার একটি নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এমন সময় একটি লোক কোথা থেকে এসে তাঁর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তাঁকে অশালীন ভাষায় গালাগালি করতে লাগলো। তিনি চুপ করে পথ চলতে লাগলেন। যখন তারা মানুষের কাছাকাছি এসে পৌঁছলেন তখন তিনি লোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন: ভাতিজা, তোমার গালির যদি আরো কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে তাহলে তাড়াতাড়ি বলে ফেল। তা না হলে আমার গোত্রের লোকেরা শুনে ফেললে তোমার পরিণতি মোটেই ভালো হবে না।
একবার জনৈক ব্যক্তি আহনাফকে প্রশ্ন করলো: আপনি এমন ধৈর্য ও সহনশীলতা কার কাছ থেকে শিখলেন? বললেন: কায়স ইবন ‘আসীম আল-মিনকারীর কাছ থেকে। একদিন আমি তাঁকে দেখলাম, তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে গোত্রের লোকদের সাথে কথা বলছেন। এমন সময় হাত পিছন দিক থেকে বাঁধা এক ব্যক্তি ও একজন নিহত ব্যক্তির লাশ আনা হলো। তাঁকে বলা হলো: আপনার এই ভাতিজা আপনার এই ছেলেকে হত্যা করেছে। আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর স্থান থেকে একটুও নড়লেন না এবং কথা বলাও বন্ধ করলেন না। এক সময় কথা শেষ করে ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললেন: ভাতিজা! পাপ করেছো এবং তোমার নিজের ধনুক দিয়ে নিজের প্রতি তাঁর নিক্ষেপ করেছো। তোমার চাচাতো ভাইকে তুমি হত্যা করেছো। তারপর তিনি নিজের আরেক ছেলেকে বললেন: যাও, তোমার ভাইকে কবর দাও, তোমার চাচাতো ভাইয়ের বাঁধন খুলে দাও এবং নিহত ছেলের রুগ্নস্য হিসেবে তার মাকে এক শো উট দিয়ে দাও।
একবার এক ব্যক্তি আহনাফকে প্রশ্ন করলো: আপনার গোত্রের নেতৃত্ব আপনি লাভ করলেন কিভাবে— আপনি তো তাদের সবচেয়ে মর্যাদাবান ঘরের লোক নন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সুদর্শন নন এবং আচার-আচরণ ও নৈতিকতায় তাদের মধ্যে উত্তমও নন? উত্তরে আহনাফ বললেন: ভাতিজা! তোমার মধ্যে যা আছে তার বিপরীত জিনিস দ্বারা। লোকটি প্রশ্ন করলো: সেটা কি? বললেন: তোমার এমন সব বিষয় যা আমার কোন প্রয়োজন নেই তা পরিহার দ্বারা। যেমন আমার যে বিষয় তোমার কোন প্রয়োজন নেই তা নিয়ে তুমি মাথা ঘামাচ্ছো।
ইবনুল ‘ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তিনি নেতৃস্থানীয় তাবিঈন্দের মধ্যে ছিলেন। তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধির উপমা দেওয়া হতো। হাসান বসরী (রহ) বলতেন, আমি কোন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে ভদ্র লোকটিকে আহনাফের চেয়ে বেশী ভালো পাইনি। তিনি একাধিক খলীফার শাসনকাল পেয়েছেন। তাঁদের কোন একজন খলীফা জনৈক ব্যক্তির কাছে আহনাফের গুণাবলী জানতে চান। জবাবে লোকটি বলে, যদি আপনি একটি গুণ শুনতে চান, আমি — তাই বলবো। আর দু'টি শুনতে চাইলে দু'টি এবং তিনটি চাইলে তিনটি গুণ বলবো। খলীফা বললেন, তুমি দু'টি বলো। তখন লোকটি বললো, তিনি ভালো করতেন, ভালোকে পছন্দ করতেন। মন্দ থেকে দূরে থাকতেন এবং মন্দকে ঘৃণা করতেন। খলীফা বললেন, আচ্ছা তুমি তাঁর তিনটি গুণ বলো। লোকটি বললো, তিনি কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। কারো উপর বাড়াবাড়ি ও যুলুম করতেন না এবং কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেন না। খলীফা বললেন, তাঁর একটি গুণের কথা বলো। সে বললো, তিনি তাঁর নিজের উপর সবচেয়ে বড় শাসক ছিলেন।
আহনাফ বলতেন: যখনই কোন বিষয়ে কেউ আমার সাথে পাল্লা দিয়েছে, আমি তিনটি পদ্ধতিতে তাকে হারিয়ে দিয়েছি। (১) সে যদি আমার চেয়ে উপরের স্তরের হয় তাহলে আমি তার মর্যাদা সম্পর্কে অবগত হয়েছি। (২) আমার চেয়ে নীচের স্তরের হলে আমি আমার নিজকে সম্মান করেছি। (৩) আর আমার সমকক্ষ হলে নিজেকে তার উপর প্রাধান্য দিয়েছি।
খালিদ ইবন সাফওয়ান বলেছেন: আল-আহনাফ মর্যাদা থেকে পালাতেন, আর মর্যাদা তাঁর পিছু ধাওয়া করতো। আল-আসমা'ঈ বলেছেন, একবার আল-আহনাফ ও আল- মুনযির ইবন আল-জারূদ মু'আবিয়ার (রা) দরবারে যান। আল-মুনযির ভিতরে যাওয়া- আসা করতেন লাগলো; কিন্তু আহনাফ দরবারের শেষ প্রান্তে মোটা পশমের চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে থাকেন। যখনই আল-মুনযির এদিক ওদিক যাচ্ছিল, লোকেরা বলাবলি করছিল যে, ইনিই আল-আহনাফ। এক সময় আল-মুনযির বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করলো: মনে হচ্ছে আমি যেন এই শায়খ (আল-আহনাফ)-এর অলঙ্কারে পরিণত হয়েছি।
তাঁর গোত্রের ফারগানা বিন্ত আওস ইবন হাজার নাম্মী এক মহিলা একবার আল- আহনাফের করবের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, কবরের কাছাকাছি তাঁর বাহনটি দাঁড় করিয়ে মৃত আহনাফকে লক্ষ্য করে যে কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন তাতে আল-আহনাফের সত্যিকার সম্মান ও মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন: 'নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। কাফনে জড়িয়ে কবরে রক্ষিত আবূ বাহরের প্রতি আল্লাহ দয়া ও করুণা করুন! সেই সত্তার শপথ, যিনি আপনার বিচ্ছেদ দ্বারা আমাদেরকে পরীক্ষা করেছেন এবং আপনার মৃত্যুর দিনে আমাদেরকে তা জানিয়েছেন। আপনি জীবনকালে প্রশংসিত হয়েছেন এবং মৃত্যুর পরেও আপনি মানুষের স্মরণে আছেন। আপনি ছিলেন দারুণ বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান, মহান শান্তিপ্রিয়, উঁচু স্তম্ভ, হিংসার আগুন নির্বাপনকারী ও নারীর সম্ভ্রম রক্ষাকারী ব্যক্তি। আপনি সভা-সমাবেশে অত্যন্ত ভদ্র, বিধবা ও অসহায় লোকদের প্রতি সহানুভূতিশীল, মানুষের অতি নিকটবর্তী, তাদের মধ্যে অতি সাধারণ- যদিও আপনি তাঁদের নেতা। খলীফা ও আমীর-উমারাদের দরবারে আপনি প্রতিনিধি দলের নেতা। তাঁরা আপনার কথার শ্রোতা ও আপনার সিদ্ধান্তে র অনুসরণকারী; এরপর তিনি চলে যান।
তিনি বলতেন : কারো মধ্যে চারটি গুণ থাকলে সে পূর্ণ মানুষে পরিণত হয়। আর যার মধ্যে চারটির একটি থাকে সে তার কাওম বা সম্প্রদায়ের অন্যতম কর্মশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। (১) দীন- যা তাকে পরিচালিত করে। (২) বুদ্ধিমত্তা- যা তাকে ঠিক পথে চালায়। (৩) বংশ মর্যাদা- যা তাকে পঙ্কিলতা থেকে রক্ষা করে। (৪) লজ্জা-শরম- যা সে সব সময় অবলম্বন করে。
তিনি আরো বলতেন : একজন প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি চারটি অবস্থার মধ্যে থাকে। (১) আরেকজন ঈমানদার তাকে হিংসা করে। (২) একজন মুনাফিক (কপট ধার্মিক) তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। (৩) কাফির তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। (৪) শয়তান তাকে বিপথে চালিত করার চেষ্টা করে。
তিনি বলতেন : মিথ্যাবাদীর কোন ব্যক্তিত্ব নেই। কৃপণের কোন নেতৃত্ব নেই এবং অসচ্চরিত্র ব্যক্তির কোন খোদাভীতি নেই।
তিনি আরো বলতেন : নিরানন্দ ব্যক্তির কোন বন্ধু নেই, মিথ্যাবাদীর কোন কথার ঠিক নেই, হিংসুকের কোন শান্তি নেই।
তিনি বলতেন: আমি ধৈর্যকে বহু মানুষের চেয়ে বেশী সাহায্যকারী পেয়েছি।
খুরাসানে অবস্থানকালে একবার আল-আহনাফ বানু তামীমকে উদ্দেশ্য করে একটি ভাষণ দেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপ:
'ওহে বানু তামীম, তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাস তাহলে তোমাদের নেতৃত্ব অটুট থাকবে, তোমাদের অর্থ-বিত্ত একে অপরের জন্য ব্যয় কর, তাহলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকবে, তোমরা তোমাদের পেট ও যৌনাঙ্গের বিরুদ্ধে জিহাদের দ্বারা জিহাদের সূচনা কর, তাহলে তোমাদের দীন ঠিক থাকবে, আর কোন কিছু আত্মসাৎ করবে না। তাহলে তোমাদের জিহাদ পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকবে।
একবার আহনাফকে প্রশ্ন করা হলো : সবচেয়ে ভালো পানীয় কী? বললেন : মদ। প্রশ্ন করা হলো : কিভাবে জানলেন? বললেন : আমি দেখেছি, যাদের জন্য এটা হালাল আছে তারা এটা ছেড়ে অন্যটার দিকে যায় না। আর যাদের জন্য এটা হারাম, তারা এর চারপাশে শুধু ঘুর ঘুর করে।
তিনি বলতেন: আরবরা ততদিন পর্যন্ত আরব থাকবে যতদিন তারা পাগড়ী পরবে, তরবারি কাঁধে ঝোলাবে, সহনশীলতাকে অপমান বলে গণ্য করবে না এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানকে হেয় কাজ বলে মনে করবে না।
আল-আহনাফ ছিলেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী কঠোর মানুষ। তিনি বলতেন, যার একটি কথা শুনে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে সে বহু কথা শোনে। একবার এক ব্যক্তি তাঁর সামনে 'হায়া' বা লজ্জার বেশ প্রশংসা করে। তার কথা শেষ হলে আল- আহনাফ বললেন: এটা শেষ পর্যন্ত দুর্বলতার রূপ নেয়। আর একটা ভালো কখনো একটা মন্দের কারণ হতে পারে না। আমরা বরং বলি: একটি নির্ধারিত পরিমাণের নাম 'হায়া'। আর পরিমাণের বেশী হয়ে গেলে তাকে তুমি যা ইচ্ছা নাম দিতে পার। এমনিভাবে দানশীলতা, বিচক্ষণতা, ভীরুতা, বীরত্ব, কৃপণতা ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে একথা প্রযোজ্য।
হযরত 'উমার (রা) একবার আল-আহনাফকে লক্ষ্য করে বলেন: যার হাসি বেশী হয় তার গাম্ভীর্য কমে যায়। কেউ কোন কিছু বেশী করলে সে নামে সে পরিচিত হয়। যার মধ্যে কৌতুক ও হাস্য-রসিকতা বেশী হয়ে গেছে তার পতন ঘটেছে। যার বেশী পতন ঘটেছে তার তাকাওয়া বা খোদাভীরুতা কমে গেছে। যার খোদাভীরুতা কমে গেছে তার লজ্জা-শরম চলে গেছে। আর যারা লজ্জা-শরম চলে গেছে তার 'কলব' বা অন্তঃকরণের মৃত্যু ঘটেছে।
টিকাঃ
১. ড: 'উমার ফাররূখ, তারীখ আল-আদাব আল-আরাবী-১/৩৪৪; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৫৯
২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৬
৩. ড: শাওকী দায়ফ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-২/৪৩১
৪. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৪
৫. শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৬. আল-ইসতী'আব-১/৫৫
৭. তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৯১
৮. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৪
৯. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৭/৬৬; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৬০-৪৬১
১০. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৬২
১১. ড: 'উমার ফাররুখ-১/৩৪৪
১২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৫৪
১৩. প্রাগুক্ত-১/২৩৭; তাবাকাত-৭/৬৬; উসুদুল গাবা-১/৫৫
১৪. আল-কামিল ফিত-তারীখ-২/৪২
১৫. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/৬২
১৬. সিয়ারুত তাবি'ঈন-১৫১
১৭. আল-কামিল ফিত-তারীখ-২/৪৩০-৪৪
১৮. প্রাগুক্ত-৩/২৬-২৯
১৯. প্রাগুক্ত-৩/৯৬-৯۹
২০. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৫
২১. আল'ইন্দ আল-ফারীদ-৪/৩১৯-৩২০
২২. ড: 'উমার ফাররুখ-১/৩৪৫
২৩. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৩/২৮৪
২৪. ড: 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৫
২৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-১/৫৯; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২৪২
২৬. জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২৪৩; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৫৮
২৭. 'উয়ুন আল-আখবার-২/৬০৮; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-৪/৩৭০; আল-ইমামা ওয়াস সিয়াসা-১/১২১
২৮. সূরা আন-নিসা'-১৯
২৯. জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/২৪৬
৩০. প্রাগুক্ত-২/২৪৬-২৪৯
৩১. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৩/৪৩১
৩২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৫৪; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪২৯
৩৩. আহমাদ আল-হাশিমী, যাহরুল আদাব-১/৫৭; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/৩৬৩-৩৬৪
৩৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৮৮
৩৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/২৮-২৯; নিহায়াতুল আরিব-৭/২৩৭
৩৬. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৩০; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-২/১১৮
৩৭. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪৩৭
৩৮. তারীখ আত-তাবারী-৮/৩১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৬৮
৩৯. আল-কামিল ফিত তারীখ-৪/২০০
৪০. তাবাকাত-৭/৬৮
৪১. প্রাগুক্ত-৭/৬৯; শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৪২. ড: শাওকী দায়ফ-২/৪৩৩
৪৩. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/৪৬২; তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৯১
৪৪. তাবাকাত-৭/৬৭; তাহযীব আত-তাহযীব-১/১৯১
৪৫. আল-জাহিজ, কিতাব আল-হায়ওয়ান-২/৭২; আল-মায়দানী, মাজমা' আল-আমছাল-১/২২৯-২৩০; আল- বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/৭৯
৪৬. তাবাকাত-৭/৬৭
৪৭. প্রাগুক্ত-৭/৬৭, ৬৮
৪৮. তারাকাত-৭/৬৭; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-২/২৭৭
৪৯. 'উয়ুন আল-আখবার-১/২০৯
৫০. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-৪৬৫
৬১. উস্দুল আল-গাবাহ-১/৩০১
৬২. প্রাগুক্ত-১/৩০৩
৬৩. আল-ইকদ আল-ফারীদ-২/২৮৬
৫৪. প্রাগুক্ত-২/২৭৮; শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৫৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/২৮৩
৫৬. 'উয়ূন আল-আখবার-১/২৬১-২৬২
৫৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৩০২
৫৮. প্রাগুক্ত-২/১৯৬, ১৯৭, ১৯৯
৫৯. প্রাগুক্ত-২/৬৩; 'উয়ূন আল-আখবার-২/১০
৬০. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২৮৩
৬১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৯৩
৬২. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৬/৩৩৫
৬৩. 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৬
৬৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৯৮
৬৫. প্রাগুক্ত-১/২০২, ২/৭৬; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/২৭৯, ৪/৪১৫
৬৬. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৮
📄 উওয়াইস ইবন ‘আমির আল-কারানী (রহ)
হযরত উওয়াইস ইবন 'আমির আল-কারানীর জন্মস্থান ইয়ামন। তিনি তথাকার মুরাদ গোত্রের সন্তান ছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে না দেখেই 'খায়রুত তাবিঈন' (তাবিঈদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো) বলে উল্লেখ করেন। তাঁর পিতার নাম 'আমির ইবন জাযআ। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় তিনি একজন পূর্ণ বয়স্ক ও ঈমানদার মানুষ হিসেবে বিদ্যমান থাকলেও নবী কারীমের (সা) সাথে মুখোমুখি সাক্ষাতের সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থেকে যান। চোখের দেখা না হলেও তিনি রাসূলে খোদার 'ইল্ক ও মুহাব্বতে একেবারে বিভোর হয়ে পড়েন। তাঁর এ 'ইল্ক ও মুহাব্বত প্রবাদতুল্য হয়ে যায় এবং তিনি জগতের সকল রাসূল-প্রেমীদের নেতায় পরিণত হন। আসলে জাহিরী জগত ও বাতিনী জগত দু'টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। জাহিরী জগতের নিয়ম-কানুন বাতিনী জগতের ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য। 'ইল্ক ও মুহাব্বত সম্পূর্ণ বাতিনী বিষয়। এর জন্য চাক্ষুস দেখা-সাক্ষাতের কোন প্রয়োজন পড়ে না। দূরত্ব ও প্রতিবন্ধকতা এ ক্ষেত্রে কোন বিষয় নয়। বাতিনী বন্ধন হাজার মাইলের দূরত্বকেও নৈকট্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে। এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা ও আকর্ষণের শক্তিই হলো মূল বিষয়। যেমন, সূর্য কোটি কোটি মাইল দূর থেকেও এ পৃথিবীর প্রতিটি অণু-পরমাণুকে আলোড়িত ও আলোকিত করে, শিশির বিন্দু উড়ে এসে সূর্যের তাপে নিজেকে বিলীন করে দেয় এবং বাগিচার ফুল বহু দূর থেকে বিভিন্ন পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকাকে সুরভিত করে তোলে। একই নিয়মে হযরত উওয়াইসও মাদানী সূর্যের কিরণে আলোকিত হয়ে ওঠেন এবং মদীনার বসন্ত ফুলের সৌরভে সুরভিত হয়ে পড়েন। এ কারণে তিনি ইয়ামনে অবস্থান করলেও তাঁর প্রেম-প্রবাহ মদীনা পর্যন্ত বহমান ছিল।
এ কোন কবিত্ব নয়; বরং বাস্তব সত্য। তাই হযরত রাসূলে কারীম (সা) এই না দেখা 'ইল্ক ও মুহাব্বতের পতঙ্গের আলামত ও চিহ্ন একটি একটি করে হযরত 'উমারকে (রা) বলে যান। সাহীহ মুসলিমে এসেছে: 'সর্বোত্তম তাবিঈ মুরাদ গোত্রের এক ব্যক্তি। তাঁর নাম উওয়াইস। সে ইয়ামনে তোমাদের সাহায্যে আসবে। তার শরীরে শ্বেতীর দাগ আছে। এ দাগ সবটুকু মুছে গিয়ে এক দিরহাম পরিমাণ অবশিষ্ট আছে। তার মাও জীবিত আছে। সে তার সেবা করে। যখন সে আল্লাহর নামে কসম করে তখন তা পূর্ণ করে। যদি তুমি তার দু'আয়ে মাগফিরাত (ক্ষমার জন্য দু'আ) অর্জন করতে পার তাহলে তা করবে।
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) এ বর্ণনার পর থেকে হযরত 'উমার (রা) সব সময় উওয়াইসের সন্ধানে ছিলেন। অতঃপর তাঁর খিলাফতকালে যখন ইয়ামন থেকে একটি প্রতিনিধিদল এলো, তিনি তার অভ্যাস অনুযায়ী তাদেরকে প্রশ্ন করলেন: আপনাদের মধ্যে কি উওয়াইস ইবন 'আমির আছেন? তারা বললো: হ্যাঁ, আছেন। তারপর উমার (রা) খুঁজতে খুঁজতে ইয়ামনে উওয়াইসের কাছে পৌঁছেন। তাঁকে প্রশ্ন করেন: আচ্ছা, আপনি উওয়াইস ইবন 'আমির? তিনি বললেন: হাঁ।
'উমার (রা) জিজ্ঞেস করলেন: আপনার মা কি বেঁচে আছেন? বললেন: হাঁ। এই পরিচয়টুকু জানার পর হযরত 'উমার (রা) তাঁকে বললেন: রাসূলুল্লাহ (সা) বলে গেছেন, তোমার নিকট ইয়ামনীদের সাহায্যের সাথে মুরাদ ও কারন গোত্রদ্বয়ের এক ব্যক্তি উওয়াইস ইবন 'আমির আসবে, যার শরীরে শ্বেতীর দাগ থাকবে। তবে এক দিরহাম পরিমাণ ছাড়া সবটুকু মুছে যাবে। তার মা থাকবে এবং তার সাথে সে সদাচরণ করবে। যখন সে আল্লাহর নামে কসম খায় তখন সে তা পূর্ণ করে। যদি তুমি তার দু'আয়ে মাগফিরাত নিতে পার তবে তা নিবে। আপনি আমার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করুন।
উওয়াইস বললেন: হে আমীরুল মুমিনীন! আমার মত মানুষ আপনার মাগফিরাত কামনা করে দু'আ করবে? 'উমার আবার তাঁকে দু'আ করার অনুরোধ করেন। উওয়াইস বলেন: হে আল্লাহ, আপনি 'উমার ইবনুল খাত্তাবকে ক্ষমা করে দিন। 'উমার বলেন: আজ থেকে আপনি আমার ভাই। আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন না। তারপর 'উমার (রা) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন: আপনি কোথায় যেতে চান? বললেন: কুফায়। 'উমার (রা) বললেন! আমি কুফার ওয়ালীকে আপনার ব্যাপারে লিখে জানিয়ে দিচ্ছি। উওয়াইস বললেন: তার কোন প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা আমার বেশী প্রিয়।
এ ঘটনার এক বছর পর কুফার একজন সম্মানিত ব্যক্তি হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসলেন। হযরত 'উমার (রা) তাঁর নিকট উওয়াইসের বিষয়ে জানতে চাইলেন। তিনি জানালেন, উওয়াইস নিতান্ত দরিদ্র অবস্থায় একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন। হযরত 'উমার (রা) তখন সেই ব্যক্তির নিকট উওয়াইস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) বাণী বর্ণনা করলেন। এই ব্যক্তি কুফায় ফিরে গেলেন এবং উওয়াইসের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর নিকট দু'আয়ে মাগফিরাত প্রার্থনা করেন। জবাবে তিনি বললেন, আপনি একটি পবিত্র সফর থেকে সবেমাত্র ফিরে এসেছেন, তাই আপনিই আমার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করুন। তারপর তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, 'উমারের (রা) সাথে কি আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে? লোকটি বললেন: হাঁ। এই সংলাপের পর উওয়াইস সেই লোকটির জন্য দু'আ করেন।
হযরত উওয়াইস (রহ) নিজেকে দুনিয়াবাসীর চোখ থেকে লুকোবার জন্য খুবই দীন- হীনভাবে থাকতেন। অধিকাংশ সময় সম্পূর্ণ শরীর ঢাকার জন্য সবটুকু কাপড় তাঁর গায়ে থাকতো না। নগ্নদেহ দেখে মানুষ তাঁর দেহ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিত। স্থূল দৃষ্টির সাধারণ মানুষ তাঁর বাহ্যিক অবস্থা দেখে তাঁকে নিয়ে হাসি-তামাশা করতো এবং তাঁকে নানাভাবে বিরক্ত করতো।
তবে সূক্ষ্মদৃষ্টির মানুষের দৃষ্টি থেকে তিনি লুকোতে পারেননি। তাঁর রূহানিয়্যাতের সুরভিতে মোহিত হয়ে মানুষ পাগলের মত তাঁর নিকট ছুটে এসেছে। হারাম ইবন হায়্যান (রহ) ছিলেন তাঁরই সমকালীন একজন সত্যিকার অন্তরবিশিষ্ট তাবি'ঈ। তাঁর ও উওয়াইসের মাঝে একটি চিত্তাকর্ষক ঘটনার কথা খোদ হারামই বর্ণনা করেছেন, যা সত্যিই শোনার উপযুক্ত।
তিনি বলেন, আমি উওয়াইস কারানীর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়ে কুফা গেলাম। তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে ফুরাতের তীরে পৌঁছলাম। সেখানে দেখলাম একটি লোক দুপুরের সময় একাকী বসে ওজু করছে এবং কাপড় ধুচ্ছে। আমি উওয়াইসের গুণ-বৈশিষ্ট্যের কথা শুনেছিলাম। এ কারণে খুব তাড়াতাড়ি তাকে চিনে ফেললাম। তিনি ছিলেন স্থূলদেহী ও গৌর বর্ণের। লোমশ শরীর, মাথা মুড়ানো, ঘন দাড়ি বিশিষ্ট মানুষ। পশমের একটি মোটা পায়জামা ও একটি চাদর শরীরে শোভা পেত। চেহারা ছিল একটু বড় ও ভীতিপ্রদ। নিকটে পৌঁছে আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি জবাব দিলেন এবং আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন। আমি মুসাফাহা (করমর্দন) করার জন্য হাত বাড়ালাম। তিনি মুসাফাহা করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন— তিনি আবার একথাটি উচ্চারণ করলেন। আমি বললাম, উওয়াইস! আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন এবং আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনার এ কি অবস্থা হয়েছে। 'ইল্ক ও মুহাব্বতের চূড়ান্ত পরিণতিতে তাঁর বাহ্যিক অবস্থা দেখে আমার চোখ থেকে অশ্রু বের হয়ে আসে। আমাকে কাঁদতে দেখে তিনিও কাঁদতে লাগলেন। তারপর আমাকে বললেন, হারাম ইবন হায়্যান! আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন। আমার ভাই, আপনি কেমন আছেন? আপনাকে আমার ঠিকানা কে বলেছেন? আমি বললাম: আল্লাহ। আমার এ জবাব শুনে তিনি বললেন:
لا إله إلا الله سبحان ربنا إن كان وعد ربنا لمفعولا حين سماني.
- এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই। আমাদের প্রভু কতনা পবিত্র। আমাদের প্রভু যদি অঙ্গীকার করেন তা অবশ্যই পূর্ণ করেন।
হারাম ইবন হায়্যান বলেন যে, এর পূর্বে আর কখনো আমি তাঁকে দেখিনি এবং তিনিও আমাকে দেখেননি। এ কারণে আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম: আপনি আমার ও আমার পিতার নাম কিভাবে জানলেন? আল্লাহর কসম! আজকের পূর্বে আমি আর কোথাও কখনো আপনাকে দেখিনি। বললেন: মহাজ্ঞানী সত্তা আমাকে জানিয়েছেন। যখন আপনার অন্তর আমার অন্তরের সাথে কথা বলেছে তখনই আমার রূহ আপনার রূহকে চিনে ফেলেছে। চলাফেরাকারী জীবিতদের মত রূহদেরও জীবন থাকে। মু'মিনরা কখনো একসাথে মেলামেশা না করলেও, পরস্পর পরিচিত না হলেও এবং একজন আরেকজনের সাথে কথাবার্তা বলার সুযোগ না হলেও সবাই একজন আরেকজনের সাথে চেনে-জানে। আল্লাহর এই রূহের মাধ্যমে একে অপরের সাথে কথা বলে— তা সে একজন আরেকজনের থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন।
আমি আরজ করলাম, আপনি কি রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে কোন হাদীছ শুনেছেন? শুনে থাকলে একটু বর্ণনা করুন, আমি আপনার কাছ থেকে শুনে তা মুখস্থ করে নিই। বললেন- আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) পেয়েছি। তবে তাঁকে দেখা ও সাহচর্যের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারিনি। হাঁ, যাঁরা তাঁকে দেখেছেন, আমি তাদেরকে দেখেছি এবং আপনাদের মত আমার কাছেও তাঁর হাদীছ পৌঁছেছে। কিন্তু আমি মুহাদ্দিছ, কাজী অথবা মুফতী হবো— এ উদ্দেশ্যে নিজের জন্য এ দ্বার উন্মুক্ত করতে চাইনে। আমার নিজের নফসের অনেক কাজ আছে। তাঁর এ জবাব শুনে আমি আবার আরজ করলাম, তাহলে আমাকে কুরআনের কিছু আয়াত শুনিয়ে দিন। আপনার মুখ থেকে কুরআন শোনার বড় ইচ্ছা আমার। আমি আল্লাহর জন্যই আপনাকে ভালোবাসি। আমার জন্য দু'আ করুন এবং কিছু উপদেশ দিন, যা আমি চিরদিন মনে রাখবো। আমার এ আবেদন শুনে তিনি আমার হাত মুঠ করে ধরেন এবং أعوذ بالله من الشيطان الرجيم - পাঠ করে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করেন।
তারপর বলতে লাগলেন: আমার প্রভুর স্মরণ অতি উঁচু, তাঁর বাণী সবচেয়ে বেশী সত্য, সবচেয়ে বেশী সত্যকথা তাঁর কথা, সবচেয়ে বেশী ভালো কথা তাঁর কথা। এই কথাগুলো বলে তিনি- "وما خلقنا السماوات والأرض وهو العزيز الرحيم" -থেকে - "وما خلقنا السماوات والأرض পর্যন্ত তিলাওয়াত করে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে একেবারে চুপ হয়ে যান। আমি মনে করলাম তিনি চেতনা হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আমাকে বললেন, হারাম ইবন হায়্যান: তোমার পিতা মারা গেছেন, খুব শীগগীর তোমাকেও মরতে হবে। আবূ হায়্যান মারা গেছেন, তার জন্য জান্নাত অথবা জাহান্নাম। ইবন হায়্যান! নূহ ও ইবরাহীম খলীলুর রহমান (আ) মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। মূসা নাজিয়্যুর রহমান মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। দাউদ খলীফাতুর রহমান মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। মুহাম্মাদ রাসূলুর রহমান মারা গেছেন। ইবন হায়্যান। আবূ বকর খলীফাতুল মুসলিমীন মারা গেছেন। ইবন হায়্যান! আমার ভাই 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) মারা গেছেন। একথা বলার পর তিনি 'হায় 'উমার! বলে চিৎকার দিয়ে ওঠেন এবং তাঁর প্রতি আল্লাহর রহমত কামনা করে দু'আ করেন। হযরত 'উমার ফারুক (রা) তখন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। আর তখন ছিল তার খিলাফাতের শেষ দিক। এ কারণে আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন। 'উমার ইবনুল খাত্তাব তো জীবিত আছেন। বললেন, হ্যাঁ! আমি যা কিছু বলেছি তা যদি ঠিক মত বুঝে থাক তাহলে তুমি জেনে যাবে যে আমরা মৃতদের মধ্যেই পরিগণিত। যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
তারপর তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) উপর দরূদ ও সালাম পাঠ করলেন এবং সংক্ষিপ্ত দু'আ করার পর বললেন: হারাম ইবনে হায়্যান, আল্লাহর কিতাব, উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ এবং নবীর (সা) উপর দরূদ ও সালাম— এগুলোর ব্যাপারে আমার অসীয়াত থাকলো। আমি আমার মৃত্যু সংবাদ দিয়েছি, তোমারও মৃত্যু সংবাদ দিয়েছি। আগামীতে সব সময় মৃত্যুকে স্মরণ রাখবে। একটি মুহূর্তও মৃত্যু থেকে উদাসীন হবে না। ফিরে গিয়ে তোমার গোত্রের লোকদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভয় দেখাবে। সব সময় নিজ দীনের লোকদেরকে উপদেশ দেবে এবং নিজের জন্য চেষ্টা করবে। সাবধান! জামা'আত বা দলছুট হবে না। এমন না হয় যে তোমার অজান্তে তোমার দীন ছুটে যায় এবং কিয়ামতে তোমাকে জাহান্নামের আগুনের মুখোমুখি হতে হয়। তারপর বললেন, হে আল্লাহ। এ ব্যক্তির ধারণা যে, সে তোমার জন্যই আমাকে ভালোবাসে, তোমার জন্যই আমার সাথে সাক্ষাৎ করেছে। হে আল্লাহ! তাই তুমি জান্নাতে তার চেহারাটা আমাকে চিনিয়ে দিও এবং দারুস সালামে তার সাথে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দিও, সে দুনিয়াতে যেখানেই থাকুক না কেন তোমার হিফাজতে রেখ, তার ঘর-বাড়ী, ক্ষেত-খামার তাঁর কর্তৃত্বে রেখ। দুনিয়ার এ সংক্ষিপ্ত জীবনে তাকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে রেখ এবং দুনিয়ার যতটুকু তার জন্য নির্ধারিত আছে সেটুকু তার জন্য সহজলভ্য করে দাও। তোমার দান ও অনুগ্রহের ব্যাপারে তাকে কৃতজ্ঞ বানিয়ে দাও এবং তাকে ভালো প্রতিদান দাও। এই দু'আ করার পর তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হারাম ইবন হায়্যান, এখন আমি তোমাকে আল্লাহর জিম্মায় সুপর্দ করছি। আস- সালামু আলায়কুম। আজকের পর আর যেন তোমাকে না দেখি। আমি প্রচার পছন্দ করিনে। নির্জনতা ও একাকীত্বই আমার বন্ধু। যতদিন আমি দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে জীবিত থাকবো চূড়ান্ত রকমের ব্যথা ও বেদনাগ্রস্ত অবস্থায় থাকবো। এ কারণে আগামীতে তুমি আর কিছু আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। এবং আমাকে খোঁজও করবে না। তোমার স্মৃতি আমার অন্তরে সব সময় থাকবে। কিন্তু এরপর না আমি তোমাকে দেখবো, আর না তুমি আমাকে দেখতে পাবে। আমাকে মনে রাখবে, আমার জন্য দু'আ করবে। আমিও ইনশা'আল্লাহ তোমাকে স্মরণে রাখবো এবং তোমার কল্যাণ কামনা করে দু'আ করবো।
এরপর তিনি একদিকে চলতে শুরু করেন। আমিও তাঁর সাথে চলতে লাগলাম। কিন্তু তিনি এতে রাজী হলেন না। এরপর আমরা দু'জনই কাঁদতে কাঁদতে একজন আরেকজন থেকে পৃথক হয়ে গেলাম। আমি এক দৃষ্টিতে তার চলার পানে তাকিয়ে থাকলাম। এক সময় তিনি দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন। এরপর আমি তাঁকে অনেক খুঁজেছি, বহু মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কোন ভাবেই তার সন্ধান পাইনি। আল্লাহ তাঁর প্রতি করুণা বর্ষণ করুন এবং তাঁকে ক্ষমা করুন। এই সাক্ষাতের পর থেকে এমন কোন সপ্তাহ যায় না যাতে এক দু'বার আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখিনি।
উওয়াইস আল কারানীকে দুনিয়া যতদিন চিনতে পারেনি ততদিন পর্যন্ত তাঁকে দুনিয়াবাসীদের মধ্যে দেখা যেত। কিন্তু যখনই তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে তখন থেকে তিনি মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে এমনভাবে চলে যান যে কেউ আর তাঁর সাক্ষাৎ পায়নি। এরপর সিস্ফীন যুদ্ধে তাঁর শহীদ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়ার বড় বাসনা তার ছিল। আর এর জন্য সব সময় আল্লাহর দরবারে দু'আ করতেন। সিম্ফীন যুদ্ধে আল্লাহ পাক তাঁর সে বাসনা পূর্ণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি হযরত আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করেন।
তিনি জীবনকালে সব সময় দুআ করতেন:
اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً تُوجِبُ لِي الْجَنَّةَ وَالرِّزْقَ
হে আল্লাহ তুমি আমাকে এমন শাহাদাত দান কর যা আমার জন্য জান্নাত ও রিযিক ওয়াজিব করে দিবে।
হযরত উওয়াইস (রহ) যদিও একজন তাবি'ঈ ছিলেন এবং সব রকম মহত্ত্ব, মর্যাদা ও পূর্ণতার সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল, তথাপি বাহ্যিক জ্ঞানে শীর্ষ জ্ঞানীদের তালিকায় কোথাও তাঁর নামটি পাওয়া যায় না। এমন কি একটি হাদীছের বর্ণনাও করেছেন বলে কোথাও দেখা যায় না। তাই বলে এমন সিদ্ধান্তে পৌছা ঠিক হবে না যে, জাহিরী 'ইলমের সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক ছিল না। মূলতঃ তাঁর সত্তায় বাতিনী ও জাহিরী 'ইলমের সমাবেশ ঘটেছিল। জাহিরী 'ইলমের প্রচার ও প্রসারে তাঁর কোন অবদান না থাকার দু'টি কারণ থাকতে পারে। প্রথমতঃ অন্তর পরিশুদ্ধ করণ ও আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুশীলনে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পর 'ইলমে জাহিরীর চর্চায় সময় ব্যয় করা তাঁর পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়তঃ তিনি ছিলেন ভীষণ প্রচার-বিমুখ মানুষ। নাম-কাম ও খ্যাতির প্রতি ছিলেন নিরাসক্ত। কাজী, মুফতী, মুহাদ্দিছ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত হওয়া তিনি দারুণ অপছন্দ করতেন। একবার কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, আমার কাছে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ ঠিক সেভাবে পৌঁছেছে যে ভাবে পৌঁছেছে আপনাদের নিকট। কিন্তু আমি নিজের উপর তার দ্বার উন্মুক্ত করে মুহাদ্দিছ, কাজী ও মুফতী হওয়া মোটেই পছন্দ করিনে। অন্তরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করার বহু কাজ আমার আছে। তিনি বলতেন, আমি খ্যাতি ও প্রচার মোটেই পছন্দ করিনে। একাকীত্ব ও নির্জনতা আমার অতি প্রিয়। জাহিরী 'ইলমের পদ ও পদবী গ্রহণ করলে খ্যাতি থেকে তিনি বাঁচতে পারতেন না, তেমনিভাবে একাকীত্বও বজায় থাকতো না। আর এ কারণে তিনি নিজের জন্য 'ইলমের এ শাখার দ্বার একেবারেই রুদ্ধ করে দেন।
তাঁর কামালাতের উৎস ও ঝর্নাধারা কাগজের পাতার পরিবর্তে ছিল অন্তরের পাতা। তাঁর মহান সত্তাই ছিল 'ইলমে বাতিনের উৎস ধারা। তাবি'ঈদের মধ্যে হযরত হাসান বসরীর (রহ) পরে তিনিই হলেন তাসাউফের একক কেন্দ্র। পরবর্তীকালের সূফী-সাধকদের অনেকের সিলসিলা বা সূত্রের ধারাবাহিকতা তাঁর পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছেছে।
তিনি আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে রাতের পর রাত কাটিয়ে দিতেন। নিয়ম ছিল, একরাত নামাযে দাঁড়িয়ে, দ্বিতীয় রাত রুকু অবস্থায় এবং তৃতীয় রাত সিজদা অবস্থায় কাটিয়ে দিতেন। বেশীর ভাগ সময় রাতের সাথে দিনও ইবাদাতে কেটে যেত। রাবী' ইবন খায়ছাম বর্ণনা করেছেন। তিনি একদিন ওয়াইসের সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে দেখেন, তিনি ফজরের নামাযে মশগুল আছেন। নামাযের পর তাসবীহ-তাহলীল থেকে ফারেগ হওয়ার প্রতীক্ষায় থাকলেন। প্রতীক্ষার সময় বাড়তে বাড়তে জুহরের নামাযের সময় হয়ে গেল। তারপর জুহর থেকে 'আসর এবং 'আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত একই অবস্থায় কাটিয়ে দিলেন। রাবী' ধারণা করলেন, মাগরিবের পরে হয়তো তিনি আহার করার জন্য বের হবেন। কিন্তু ঈশা পর্যন্ত তাসবীহ-তাহলীলে নিমগ্ন থাকলেন। তারপর আবার ঈশা থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত একই অবস্থা বিদ্যমান থাকলো। দ্বিতীয় দিন ফজরের নামাযের পর তার একটু ঘুমের ভাব হলো। কিন্তু তিনি সাথে সাথে সতর্ক হয়ে গেলেন এবং দু'আ করলেন, হে আল্লাহ! আমি নিদ্রাকাতর চোখ এবং অতৃপ্ত পেট থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তাঁর এ অবস্থা দেখে রাবী বললেন, আমি, যতটুকু দেখেছি, তাই আমার জন্য যথেষ্ট।
সবসময় তিনি রোযা রাখতেন। অনেক সময় এমন হতো যে, ইফতার করার মত কিছুই থাকতো না। তখন খেজুরের বিচি খুঁটে সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন এবং তাই দিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য সামান্য কিছু কিনে আহার করতেন। যদি দু'একটি শুকনো খেজুর পেতেন, তাও ইফতারির জন্য রেখে দিতেন। খেজুর যদি কিছু বেশী পরিমাণে পেতেন তখন বিচি বিক্রি করার অর্থ গরীব-মিসকীনদেরকে দান করে দিতেন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় তাঁর নিকট যা কিছু খাদ্য-খাবার ও কাপড়-চোপড় থাকতো সবই দান করে দিতেন। তারপর এই বলে দু'আ করতেন- হে আল্লাহ! যারা অনাহারে মারা গেছে এবং যারা বস্ত্রহীন অবস্থায় মারা গেছে তাদের ব্যাপারে আমাকে পাকড়াও করবেন না। সতর ঢাকার মত কাপড় না থাকায় মাঝে মাঝে জুমআর নামাযেও যেতে পারতেন না।
কৃষ্ণায় যিক্র আযকারের একটি 'হালকা' ছিল। সেই হালকায় বহু 'সালিক' তথা আধ্যাত্মিক পন্থীরা সমবেত হতেন। উওয়াইসও সেখানে অংশগ্রহণ করতেন। উসাইদ ইবন জাবির বর্ণনা করেছেন। আমরা কিছু লোক কৃষ্ণায় যিক্র ও আমলের একটি হালকায় সমবেত হতাম। উওয়াইসও আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করতেন। এই হালকায় উওয়াইসের যিকর সবার অন্তরের উপর সবচেয়ে বেশী প্রভাব ফেলতো। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, এই যিক্র ও 'আমল ছিল নামায ও কুরআন তিলাওয়াত।
তাঁর দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ও নির্মোহ ভাব এমন পর্যায়ের ছিল যে, বাড়ী-ঘর, লেবাস-পোশাক, পানাহার, তথা পার্থিব যাবতীয় প্রয়োজন ও দাবী থেকে সব সময় মুক্ত ছিলেন। অতি সাধারণ একটি ভাঙ্গাচোরা ঘরে থাকতেন। পানাহারের অবস্থা এমন ছিল যে, কখনো উট চরিয়ে, আবার কখনো খেজুরের বিচি খুঁটে বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে বেঁচে থাকার মত খাবার সংগ্রহ করতেন। হযরত উমারও এমন যুহদ অবলম্বন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু করেননি। পোশাকের মধ্যে থাকতো পশমের একটি মোটা চাদর ও লুঙ্গি। অনেক সময় চাদরও থাকতো না। নগ্নদেহ দেখে মানুষ তাঁকে চাদর দিত। তিনি এই বলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতেন: 'হে আল্লাহ! আমি আমার ক্ষুধার্ত পেট ও নগ্ন দেহের জন্য তোমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমার দেহে যে পোশাক আছে এবং আমার পেটে যে খাদ্য আছে তাছাড়া আমার কাছে আর কিছুই নেই।
তাঁর এমন মজযুব বা ঐশী প্রেমে বেহুঁশ অবস্থা দেখে লোকেরা তাঁকে ভুল বুঝতো এবং পথ চলার সময় তাঁকে নানাভাবে বিরক্ত করতো। একবার কাপড় সংগ্রহ করতে না পারার কারণে হালকায়ে যিকর থেকে অনুপস্থিত থাকলেন। তাঁর হালকার সাথী উসাইদ ইবন জাবির ভাবলেন, হয়তো তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি তাঁর বাড়ীতে গিয়ে বললেন, আপনি আমাদেরকে ছেড়ে দিলেন কেন? তিনি জবাব দিলেন: আমার গায়ে দেওয়ার মত চাদর ছিল না। তাই আমি যেতে পারিনি। উসাইদ বর্ণনা করেছেন, তাঁর একথা শোনার পর আমি আমার চাদরটি তাঁকে দিই। কিন্তু তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেন: আমি যদি এই চাদর গায়ে জড়িয়ে বাইরে যাই তাহলে আমার গোত্রের লোকেরা বলবে, এই কপট ধার্মিক লোকটিকে তোমরা দেখ, সে একজন লোকের পিছু নিয়ে তাকে ধোঁকা দিয়ে তার চাদরটি হাতিয়ে নিয়েছে। তাঁর এত সব কথা ও আপত্তি সত্ত্বেও আমি প্রায় জোর করে আমার চাদরটি তাঁকে দিয়ে দিই। তাঁকে বলি এটি গায়ে দিয়ে আমার সাথে চলুন দেখি কে কি বলে। আমার এমন পীড়াপীড়িতে তিনি চাদরটি গায়ে জড়িয়ে আমার সাথে বের হলেন। যেই না আমরা একটি জন-সমাবেশ অতিক্রম করছি, অমনি তারা বলে উঠলো, তোমরা এই কপট ধার্মিককে দেখ, সে একটি লোকের পিছু নিয়ে তার চাদরটি বাগিয়ে নিয়েছে। আমি কথাটি শোনামাত্র তাদেরকে লক্ষ্য করে বললাম, তোমাদের এমন কথা বলতে লজ্জা হয় না? আল্লাহর কসম! আমি যখন তাঁকে এ চাদর দিতে চেয়েছি, তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। মোটকথা, তিনি তাঁর বাহ্যিক অবস্থার কারণে মানুষের ঠাট্টা- বিদ্রূপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেন। আর হাসিমুখে তা সহ্য করতেন।
আধ্যাত্মিক সাধনার একটি স্তরের নাম 'ফানা'। 'ফানা' অর্থ পরম সত্তায় বিলীন হওয়া। তিনি এই 'ফানা'র এমন পর্যায়ে ছিলেন যেখানে বিন্দুমাত্র খ্যাতি, প্রচার ও দুনিয়াদার লোকদের সাথে মেলামেশার কোন সুযোগ নেই। এ কারণে খ্যাতি ও প্রচার থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। খলীফা হযরত 'উমার (রা) একবার ইচ্ছা করলেন, কুফার ওয়ালীকে চিঠি লিখে তাঁর পরিচয় জানিয়ে দিয়ে তাঁর সাথে সদাচরণের নির্দেশ দেন। কিন্তু উওয়াইস তাতে রাজী হননি। তিনি উমারকে (রা) বলেন- আমি অতি সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করি। মানুষের সাথে মেলামেশাতে ভয় পেতেন। কিন্তু তার এ আত্মগোপন অবস্থা বেশি দিন বজায় থাকেনি। তাঁর রূহানিয়াতের খোশবু আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। দিন দিন মানুষের আগ্রহ তাঁর প্রতি বাড়তে থাকে। উসাইদ ইবন জাবির বর্ণনা করেছেন। আমার এক সাথী আমাকে উওয়াইসের নিকট নিয়ে যায়। তিনি দু'রাকআত নামায শেষ করে আমাদের প্রতি মনোযোগ দেন। তিনি বলেন, আমার সাথে আপনাদের আচরণও বেশ আজব ধরনের। আপনারা সবসময় আমার পিছনে লেগে থাকেন কেন? আমি একজন দুর্বল মানুষ। আমার অনেক প্রয়োজনীয় কাজ আছে, যা আমি আপনাদের কারণে সম্পন্ন করতে পারিনে। আপনারা এমন করবেন না। আল্লাহ আপনাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করুন। আপনাদের কারো কোন প্রয়োজন আমার কাছে যদি হয় তাহলে ঈশার নামাযের সময় সাক্ষাৎ করবেন। এই মজলিসে তিন ধরনের মানুষ এসে থাকে। বুদ্ধিমান ঈমানদার, নির্বোধ ঈমানদার ও কপট ধার্মিক (মুনাফিক)। এই তিন ধরনের মানুষের দৃষ্টান্ত হলো বৃক্ষ ও বৃষ্টির মত। যদি সবুজ-শ্যামল তরতাজা ও ফলবান বৃক্ষের উপর বৃষ্টি হয় তাহলে তার সজীবতা ও সৌন্দর্য আরো বেড়ে যায়। কিন্তু সজীব অথচ ফলহীন, এমন বৃক্ষের উপর বৃষ্টি হলে তার শাখা ও পাতায় সৌন্দর্য সৃষ্টি হয় এবং তা ফল দিতে আরম্ভ করে। আর যদি শুকনো ঘাস ও দুর্বল শাখার উপর বৃষ্টি হয় তাহলে তা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এই উপমাটি দিয়ে তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন:
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ ۙ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا
আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মু'মিনদের জন্য রহমত। যালিমদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।
খলীফা হযরত 'উমার (রা) উওয়াইস আল কারানীকে খুব বেশী বেশী স্মরণ করতেন। একবার তিনি মিনায় মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলেন: হে কারানবাসী, আপনাদের মধ্যে কি উওয়াইস আছেন? একজন বয়স্ক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যান এবং বলেন: হে আমীরুল মু'মিনীন! তিনি তো একজন পাগল। নির্জনস্থানে একাকী বাস করেন। তিনি কারো সাথে মিশতে চান না, আর কেউ তার সাথে মিশতে চায় না। 'উমার (রা) বললেন: আমি তাঁর কথাই বলছি। আপনারা ফিরে গিয়ে তাঁকে খুঁজে বের করবেন এবং তাঁকে আমার এবং রাসূলুল্লাহর সালাম পৌঁছে দিবেন।
আমীরুল মু'মিনীনের একথা উওয়াইসের কানে পৌঁছালে তিনি বলেন: আমীরুল মু'মিনীন আমাকে পরিচিত করে দিয়েছেন, আমার নামটি ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহুম্মা সাল্লি 'আলা মুহাম্মাদ, ওয়া 'আলা আলিহি। আস্-সালামু 'আলা রাসূলিল্লাহ। তারপর তিনি মুখ নীচু করে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন।
তাঁর সীমাহীন একাকীত্ব ও নির্জনতা-প্রিয়তা তাঁকে আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ)-এর দায়িত্ব থেকে কখনো উদাসীন ও অমনোযোগী করতে পারেনি। এ দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি অনেক সময় অনেকের শত্রুতে পরিণত হতেন। আবুল আহওয়াস নামক জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। তার এক বন্ধু তাকে বলেছেন, মুরাদ গোত্রের এক ব্যক্তি উওয়াইসের নিকট যায় এবং সালাম বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করে, উওয়াইস, কেমন আছেন? তিনি বলেন, আল-হামদু লিল্লাহ। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করে, আপনার সাথে কালচক্রের আচরণ কেমন?
তিনি বলেন, এই প্রশ্ন এমন ব্যক্তিকে করছো যার সন্ধ্যার পর সকাল লাভ করার বিশ্বাস নেই এবং সকালের পর সন্ধ্যা পাওয়ার কোন আশা নেই। আমার মুরাদ গোত্রের ভাই! মৃত্যু কোন ব্যক্তির জন্য আনন্দের কোন স্থান অবশিষ্ট রাখেনি। আমার মুরাদ গোত্রের ভাই! আল্লাহর পরিচয় মু'মিনের জন্য সোনা-রূপোর কোন মূল্যই অবশিষ্ট রাখেনি। আমার মুরাদ গোত্রের ভাই! মু'মিন ব্যক্তির আল্লাহর ফরজ আদায়ের কারণে কোন বন্ধু থাকে না। আল্লাহর কসম! যেহেতু আমরা মানুষকে ভালো কাজের শিক্ষা দিই এবং খারাপ করতে বারণ করি, তাই তারা আমাদেরকে শত্রু ভেবে বসেছে। আর এতে তাদের পাপাচারী সহযোগী জুটে গেছে। যারা আমাদের প্রতি নানা রকম বানোয়াট দোষারোপ করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাদের এ আচরণ আমাকে সত্য বলা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
তিনি অখ্যাত ও অপরিচিত থাকার উদ্দেশ্যে খুব কমই জনসমক্ষে বের হতেন। তবে জিহাদের সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে কখনো কখনো নির্জনতা থেকে বেরিয়ে আসতেন। যদিও সহীহ মুসলিমে এর বিস্তারিত বিবরণ নেই, তবে অনুমান তথা দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, হযরত 'উমারের (রা) সাথে ইয়ামনের সাহায্যের ব্যাপারে তাঁর যে সাক্ষাৎ হয়, তা নিশ্চিতভাবে এই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় হয়ে থাকবে। তাছাড়া আল-ইসাবার একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি আযারবাইজানের যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে সালামা ছিলেন আযারবাইজান যুদ্ধের সৈনিক। তিনি বলেছেন: 'উমার ইবনুল খাত্তাবের সময়ে আমরা আযারবাইজান যুদ্ধ করি। আমাদের সাথে উওয়াইস আল কারানীও ছিলেন। যুদ্ধ শেষে ফেরার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেক চিকিৎসা করার পরও তাকে আর বাঁচানো গেল না। তিনি মারা গেলেন। আমরা তাঁকে কবর দিলাম। কিন্তু পরে আর তার কবরের কোন চিহ্ন থাকলো না। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায়, তিনি আলীর (রা) খিলাফত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন এবং সিফ্ফীন যুদ্ধে আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করে শহীদ হন।
পার্থিব আত্মীয়-সম্পর্কের মধ্যে উওয়াইসের শুধু এক মা ছিলেন। তাঁর সেবাকে তিনি সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য ও ইবাদাত মনে করতেন। তিনি একা হয়ে যাবেন, এই চিন্তায় হজ্জ আদায় করেননি। তাঁরই কারণে হযরত রাসূলে পাকের দীদার থেকে মাহরূম থেকে যান। মায়ের ইনতিকালের পর হজ্জ আদায় করার সুযোগ আসে কিন্তু তখন তিনি একজন কপর্দকশূন্য মানুষ। তাঁর কিছু শুভানুধ্যায়ী হজ্জের সফরের যাবতীয় ব্যবস্থা করায় তিনি হজ্জ আদায় করেন।
তিনি বলতেন, আল্লাহর কাজে এমনভাবে থাকবে যেন তুমি সব মানুষকে হত্যা করে ফেলেছো। অসাক্ষাতে কারো জন্য দু'আ করা তার সাথে সাক্ষাৎ করার চেয়ে ভালো। কারণ, সাক্ষাতের মধ্যে লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে।
তাবি'ঈদের মধ্যে উওয়াইস আল কারানীর এমন বিশেষ কিছু ফবীলত ও মর্যাদা আছে যা অন্য কারো নেই। তাঁর সবচেয়ে বড় সম্মান ও মর্যাদা হলো হযরত হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে 'খায়রুত তাবি'ঈন' (তাবি'ঈদের মধ্যে উত্তম) বলে অভিহিত করেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন আবী আওফা বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলতেন, আমার উম্মাতের এক ব্যক্তির সুপারিশে বানু তামীমের বিপুল সংখ্যক মানুষ জান্নাতে যাবে। হাসান মনে করেন, সেই ব্যক্তিটি হলেন উওয়াইস আল কারানী। যদিও এই বর্ণনাটি তেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তবুও এ দ্বারা হযরত উওয়াইসের মর্যাদা অনুমান করা যায়।
'খায়রুত তাবি'ঈন'-এর এত সব মহত্ত্ব, মর্যাদা, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার বর্ণনা সত্ত্বেও এমন কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়, যা দ্বারা তাঁর অস্তিত্বটাই সন্দেহজনক হয়ে যায়। এই সব গুণাবলীতে ভূষিত উওয়াইস নামের কোন তাবি'ঈ আদৌ ছিলেন? যেমন: ইবন 'আদী বর্ণনা করেছেন, ইমাম মালিক তাঁর অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতেন। সাম'আনী বর্ণনা করেছেন, ইবন হিব্বান বলতেন, আমাদের কোন কোন বন্ধু তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করতেন। সাম'আনী এ রকম কথাও বর্ণনা করেছেন যে, ইবন হিব্বান বলতেন, আমাদের বুখারীর নিকট তাঁর সম্পর্কের বর্ণনাগুলোর সনদ সন্দেহযুক্ত।
কিন্তু অন্যসব মুহাদ্দিছ মনে করেন, হাদীছ ও তাবাকাত গ্রন্থাবলীর এত সব বর্ণনার বিপরীতে এই মুষ্টিমেয় কিছু দুর্বল বর্ণনার কোন স্থান ও মর্যাদাই থাকতে পারে না। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখার মত আছে। প্রথমত: যে সব বর্ণনা দ্বারা উওয়াইস কারানীর অস্তিত্বই সন্দেহজনক হয়ে উঠে, সেগুলোর মান ও মূল্য কি? দ্বিতীয়তঃ সেগুলো যদি বিশুদ্ধও হয় তাহলে তদ্দ্বারা তাঁর বিদ্যমান না থাকার সিদ্ধান্তে পৌঁছা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তৃতীয়তঃ এর বিপরীতের উলামা, মুহাদ্দিছ ও তাবাকাতের বর্ণনাসমূহের জবাব কি হবে?
বর্ণনার মূল্যমানের দিক দিয়ে এ জাতীয় সকল বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। হাফেজ ইবন হাজার ও সাম'আনী যদিও এ বর্ণনাগুলো সংকলন করেছেন, তবে তার কোন সনদ তারা দেননি। তাই হাদীছ পর্যালোচনার রীতি-পদ্ধতি অনুযায়ী তা মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়। আর যদি বিশুদ্ধ ধরেও নেওয়া যায় তাহলেও সেগুলো দ্বারা উওয়াইস আল কারানীর অস্তিত্বহীনতার সিদ্ধান্তে পৌঁছা ঠিক নয়। কারণ, যাঁরা তাঁর অস্তিত্বের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেছেন তা এই ভিত্তিতে করেছেন যে, তাঁরা সেই যুগে তাঁর নাম শোনেননি, অথবা তাঁর জীবনের কোন অবস্থার কথা জানতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা জানেননি বা জানতে পারেননি, একথা দ্বারা তিনি ছিলেন না একথা প্রমাণিত হয় না।
নীতিগতভাবে সেইসব মানুষের অবস্থার কথা লোকে জানতে পারে যাঁরা বিশেষ কোন অবস্থানে থাকেন। যাঁরা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে একেবারে নীরবে জীবন কাটিয়ে দেন তাদের কথা মানুষ জানতে পারে না। এমন কি সাহাবীদের সম্পর্কে এ দাবী করা যায় না যে, প্রত্যেকটি সাহাবী সম্পর্কে সেই যুগের লোকেরা জানতো, অথবা তাঁদের জীবনী সেই যুগে লেখা হয়েছিল। সাধারণত সেই সব সাহাবীর জীবন কথা জানা যায় যাঁরা শিক্ষা অথবা সরকারী কাজে কিছু অবদান রেখেছেন, অথবা হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে কোথাও তাঁর নামটি এসে গেছে। কোন কোন সাহাবীর তো শুধু নামই জানা যায়- জীবনের কোন কথাই জানা যায় না। তাই যদি হয় সাহাবীদের অবস্থা, তাহলে একজন অখ্যাত তাবি'ঈর অবস্থা কি হতে পারে?
এই নীতির ভিত্তিতে উওয়াইস আল কারানীর জীবনের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে। তাঁর জীবনী থেকে যেমন জানা যায় যে, তিনি দুনিয়ার যাবতীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে নিজেকে সব সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে লুকিয়ে রাখেন। কেউ তাঁকে মুফতী, মুহাদ্দিছ, কাজী বলবে এবং মানুষ তাঁর প্রতি মনোযোগী হবে, এই ভয়ে তিনি এমনভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন যে, বিশেষ কিছু লোক ছাড়া তাঁর অঞ্চলের লোকেরাও তাঁকে জানতো না। আর যাঁরা তাঁকে চিনতো-জানতো তাঁরাও তাঁকে এক ভিন্ন স্বভাব-প্রকৃতির মানুষ বলে জানতো। শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাজের সাথে যেহেতু তিনি কোনভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না, একারণে 'আলিম-উলামা তাঁর সম্পর্কে জানতেন না বা জানার কোন প্রয়োজন বোধ করেননি।
যাই হোক, তাঁর ব্যক্তিত্ব একেবারে গোপন থাকার মত ছিল না। এ কারণে অনেক বিশেষ ব্যক্তির নিকট তাঁর জীবনের স্বরূপ প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল। পূর্বে আমরা তা আলোচনা করেছি। আমরা যখন তাবাকাত ও হাদীছের গ্রন্থসমূহে দৃষ্টিপাত করি তখন 'সাহীহ মুসলিম'-এর মত গ্রন্থেও তাঁর ফযীলত ও মর্যাদার কথা পাই। তাবাকাত ও রিজাল (চরিত অভিধান) শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহের চেয়ে হাদীছের গ্রন্থাবলীতে তার কথা বেশী এসেছে। মুসনাদে আহমাদ, সাহীহ মুসলিম, দালাইলে বায়হাকী, হিলয়াতুল আওলিয়া (আবু নু'আয়ম), মুসতাদরিকে হাকিম ইত্যাদি হাদীছের গ্রন্থে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে। হাফেজ ইবন হাজার-এর বেশীরভাগ সূত্রের উল্লেখ করেছেন তাঁর আল-ইসাবা গ্রন্থে। সম্ভবত এর বাইরে আরো বহু গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা এসে থাকবে। তবে তাবাকাত ও রিজালের গ্রন্থাবলীতে তাঁর আলোচনা কম হওয়ার কারণ হলো, সাধারণতঃ এসব গ্রন্থে এমন সব ব্যক্তির জীবন-বৃত্তান্ত স্থান পায় যাঁরা শিক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোন কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাবাকাতে ইবন সা'দ, আল-ইসাবা, উসুদুল গাবা, হিলয়াতুল আওলিয়া, তারীখে ইবন 'আসাকির, তাহযীব, মীয়ানুল ই'তিদাল এবং এ জাতীয় আরো অনেক গ্রন্থে তাঁর জীবনকথা কম-বেশী এসেছে। আর যে সকল 'আলিম তাঁর অস্তিত্বের অস্বীকারমূলক বর্ণনা নকল করেছেন তাঁদের নিজেদেরই সেইসব বর্ণনার উপর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না। তারাও উওয়াইস আল কারানীর ব্যক্তিত্বকে স্বীকার করতেন।
যেমন ইবন হাজার ইমাম মালিকের অস্বীকৃতিমূলক বর্ণনা নকল করার পর লিখেছেন যে, তাঁর পরিচিতি এবং বিবরণ এত যে তাঁর অস্তিত্ব বিষয়ে সন্দেহ ও সংশয়ের কোন অবকাশ নেই।
আল 'উতবী বলেছেন, আমি আমার শায়খদের বলতে শুনেছি: তাবি'ঈদের আটজনের কাছে 'যুহদ' (আল্লাহ ভীতি ও দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্তি) চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেছে। তাঁরা হলেন: 'আমির ইবন 'আবদিল কুদ্দুস, আল- হাসান আল বসরী, হারাম ইবন হায়্যান, আবূ মুসলিম আল খাওলানী, উওয়াইস আল কারানী, রাবী' ইবন খুছায়ম, মাসরূক ইবন আল-আজদা' ও আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ।
টিকাঃ
১. হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৩৩-৩৩৪
২. আল ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা- ১/১১৫
৩. সাহীহ মুসলিম: কিতাবু ফাদাইল আস-সাহাবা- (২৫৪২); মুসনাদে আহমাদ- ১/৩৮; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৩৩- ৩৩৪
৪. প্রাগুক্ত; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা- ৪/২২-২৩; 'আসরুত তাবি'ঈন- ৪৪৫; আল-'ইদ আল ফারীদ- ৩/৩৯৮
৫. তাবাকাত- ৬/১১২-১১৪
৬. সূরা আদ-দুখান- ৩৮-৪২
৭. হায়াতুল আওলিয়া- ২/৮৭; 'আসরুত তাবি'ঈন- ২৪১-২৪৩
৮. আল ইসাবা- ১/১১৭
৯. তারীখু ইবন 'আসাকির- ৩/১৭৩
১০. তাযকিরাতুল আওলিয়া'- ৪৩
১১. হলয়াতুল আওলিয়া'- ২/৮৭
১২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা- ৪/৩০
১৩. মুসতাদরিকে হাকিম- ৩/৪০৪,৪০৮
১৪. তাবাকাত-৬/১১৩
১৫. মুসতাদরিক-৩/৪০৬
১৬. প্রাগুক্ত-৩/৪০৫
১৭. প্রাগুক্ত-৩/৪০৪
১৮. আল ইসাবা- ১/১১৭
১৯. সূরা আল-ইসরা'- ৮২
২০. আসরুত তাবি'ঈন- ২৪৬
২১. প্রাগুক্ত- ২৪৩-২৪৪; মুসতাদরিক- ৩/৪০৬
২২. আল-ইসাবা- ১/১১৭
২৩. আল- বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ৩/১৯৩, টীকা-১০; 'আসরুত তাবি'ঈন- ২৪৭
২৪. মুসতারিক- ৩/৪০৭
২৫. সিফাতুস সাফওয়া- ১/২৩৭
২৬. আল-ইসাবা- ১/১১৭; আল-ইন্দ আল-ফারীদ-৩/৩৯৮
২৭. আল ইসাবা- ১/১১৫-১১৭
২৮. সিয়ারুত তাবি'ঈন- ৪৮
২৯. আল-'ইদ আল-ফারীদ- ৩/১৭১