📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আমির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রহ)

📄 ‘আমির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রহ)


'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর দু'টি ডাক নাম পাওয়া যায়। আবূ 'আবদিল্লাহ ও 'আবূ 'আমর। আরবের বিখ্যাত বানু তামীম গোত্রের সন্তান। বসরার অধিবাসী ছিলেন। তিনি একজন অতি বিশ্বস্ত 'আবিদ তাবি'ঈ। কা'ব আল-আহবার তাঁকে দেখে মন্তব্য করেছিলেন: ইনি এই উম্মাতের রাহিব বা সন্যাসী। তৎকালীন আরবের একজন বিখ্যাত কারী। মানুষকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিতেন। তাঁর পিতার নাম 'আবদুল্লাহ। কোন কোন বর্ণনায় 'আবদু কায়সও এসেছে।

তিনি বসরায় বেড়ে ওঠেন। বসরা ছিল একটি নতুন অভিজাত শহর। বিত্ত-বৈভবে যেমন শহরটি ঝলমল করতো তেমনি জ্ঞানী-গুণীদের পদচারণায় মুখর থাকতো। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ছিলেন তখন বসরার ওয়ালী, ইমাম ও সেনাধ্যক্ষ। এই আবূ মূসার (রা) কাছেই 'আমির শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ছায়ার মত আবূ মুসাকে (রা) অনুসরণ করেন। তাঁর নিকট থেকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা) সুন্নাহ্র জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর সূত্রে হাদীছও বর্ণনা করেন। হযরত আবূ মূসা আল- আশ'আরীর (রা) কল্যাণে তিনি ফকীহ্ মর্যাদা লাভ করেন।

মহান তাবি'ঈদের উজ্জ্বল ও সাধারণ গুণ-বৈশিষ্ট্য বলতে যা বুঝায় তাহলো তাঁদের 'ইলম ও 'আমল এবং খিদমতে 'ইলম ও দীন। অন্য কথায়, গোটা তাবি'ঈ প্রজন্মের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞান অর্জন করা, অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করা, জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটানো এবং স্বধর্মের সেবা করা। এসব গুণ তাবি'ঈদের প্রত্যেকের মধ্যে কমবেশী দেখা যায়। তবে তাঁদের মধ্যে ছোট্ট একটি দল এমনও ছিলেন যাঁরা কেবল দুনিয়ার যাবতীয় ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকেননি, বরং জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার পর শুধু 'ইবাদাত-বন্দেগী ও তাযকিয়ায়ে রূহ বা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধিকে নিজেদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানিয়ে নেন। 'আমিরও এই পবিত্র দলটির একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। এ রূপটি তাঁর মধ্যে এত প্রবল ছিল যে, তাঁর প্রতিটি কর্ম ও আচরণে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর কোন কর্মই এই চেতনা থেকে মুক্ত ছিল না। তাঁর জীবনের অন্যান্য অবস্থাকে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ও নির্লোভ ভাব ও খোদাভীতি থেকে পৃথক করে দেখানো খুবই কঠিন। বলা হয়েছে যে, তিনি নিজের উপর প্রত্যেকটি দিন ও রাতে এক হাজার রাক'আত নামায ফরজ করে নিয়েছিলেন।

আল-জাহিজ তাপস ও পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষদের যে তালিকা দিয়েছেন তার প্রথমে এই 'আমিরের নামটি স্থান পেয়েছে।

খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত 'উমার ফারুকের (রা) পরামর্শ ও নির্দেশে মহান সাহাবায়ে কিরাম ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈগণ হিজরী ১৪ সনে 'বসরা' নগরী পত্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

এই নতুন শহরে তাঁরা পার্শ্ববর্তী পারস্যে যুদ্ধ-বিজয়ী মুসলিম সৈনিকদের জন্য সেনানিবাস, দা'ওয়াত ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বান) ও আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীর চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন শহরের পত্তন হলো। আরব উপ-দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল- নাজদ, হিজায, ইয়ামন থেকে মানুষ এই শহরে এসে বসতি স্থাপন করতে আরম্ভ করলো, যাতে এটি মুসলমানদের অন্যতম দুর্গে পরিণত হতে পারে। নাজদের বানু তামীমের যুবক 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ আত-তামীমী আল-আনসারীও সেই বসতি স্থাপনকারীদের একজন। 'আমির তখন একজন প্রাণ-চঞ্চল, পরিচ্ছন্ন অন্তঃকরণ ও দীপ্তিমান মুখমণ্ডলের এক নব্য যুবক। বসরা একটি নতুন শহর হলেও মুসলমানদের অন্যান্য শহরের তুলনায় বেশী অর্থ-বিত্তের ছড়াছড়ি ছিল। কারণ, বিজয়ী সৈন্যদের মাধ্যমে এখানে প্রচুর গনীমতের মাল ও স্বর্ণ-রৌপ্যের সরবরাহ হতো।

কিন্তু তামীম গোত্রের এই যুবক 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এসব কিছু ছিল না। মানুষের হাতে যা কিছু আছে তার প্রতি তিনি নির্মোহ ও নিস্কাম স্বভাবের এবং আল্লাহর হাতে যা কিছু আছে তা পেতে দারুণ আগ্রহী। দুনিয়া ও তার চাকচিক্য ও জৌলুসের প্রতি একেবারেই উদাসীন এবং আল্লাহ ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের প্রতি সীমাহীন প্রত্যাশী।

এ সময় বসরার প্রধান পুরুষ ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম মহান সাহাবী হযরত আবু মূসা আল-আশ'আরী (রা)। তিনি এই শহর ও এই অঞ্চলের ওয়ালী, এখান থেকে বিভিন্ন দিকে প্রেরিত মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি, শহরবাসীর ইমাম, শিক্ষক এবং আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী প্রধান দা'ঈ। 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ আবু মূসা আল-আশ'আরীর (রা) যুদ্ধ ও শান্তি এবং ভ্রমণ ও বাড়ীতে অবস্থান সর্ব অবস্থায় তাঁর সুহবত বা সাহচর্য অবলম্বন করেন। তিনি তাঁর নিকট কিতাবুল্লাহর পাঠ ও জ্ঞান তেমনভাবে লাভ করেন যেমন নবী মুহাম্মাদের (সা) উপর নাযিল হয়েছিল। তাঁর নিকট থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) বহু হাদীছ লাভ করেন এবং যা তিনি তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছেই তিনি আল্লাহর দীনের গভীর তত্ত্ব জ্ঞান লাভ করে ফকীর মর্যাদা অর্জন করেন। যতটুকু সম্ভব জ্ঞান অর্জনের দ্বারা নিজেকে উৎকর্ষমণ্ডিত করার পর তিনি তাঁর জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন: ১. একাংশ শিক্ষা মজলিসে অতিবাহিত করতেন। তাতে তিনি বসরার জামে' মসজিদে মানুষকে কুরআন শিক্ষা দিতেন। ২. একটি অংশ জিহাদের ময়দানে কাটাতেন। প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বিজয়ীদের বেশে গাজী হিসেবে ফিরে এসেছেন। ৩. আরেকটি অংশ তিনি কাটিয়েছেন লোক-চক্ষুর অন্তরালে 'ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে। নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা দু'টি ফুলে গেছে। এ তিনটি বিষয় ছাড়া আর কোন কিছু তাঁর জীবনকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। তাই মানুষ তাঁকে বলতো 'বসরার 'আবিদ ও জাহিদ' অর্থাৎ বসরার তাপস ও সন্ন্যাসী।

বসরার জনৈক ব্যক্তি 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর জীবনের একটি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন।

একবার আমি একটি কাফেলার সাথে, যার মধ্যে 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহও ছিলেন, ভ্রমণ করছিলাম। সারা দিন চলার পর যখন রাত হয়ে গেল তখন একটি জলাশয়ের পাশে জঙ্গলের মধ্যে যাত্রাবিরতি করলাম। 'আমির তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে ঘোড়াটিকে লম্বা করে একটি গাছে বাঁধলেন। তারপর ঘোড়াটার পেট ভরার মত কিছু ঘাস ও লতাপাতা ছিঁড়ে-কেটে এনে তার সামনে ছড়িয়ে দিলেন। তারপর সবার দৃষ্টির আড়ালে গভীর জঙ্গলে চলে গেলেন। আমি মনে মনে বললাম: আল্লাহর কসম! আমাকে অবশ্যই তাঁর অনুসরণ করতে হবে এবং দেখতে হবে এই রাতের অন্ধকারে গভীর জঙ্গলে তিনি কি করেন। যেতে যেতে তিনি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে বৃক্ষ-বেষ্টিত একটি টিলায় গিয়ে থামলেন। তারপর কিবলামুখী হয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার জীবনে এত সুন্দর, পরিপূর্ণ ও বিনীত ভাবের নামায আর দেখিনি। আল্লাহ যতক্ষণ চাইলেন, তিনি নামায পড়লেন। তারপর একাগ্রচিত্তে আল্লাহর দরবারে দু'আ ও মুনাজাত করতে লাগলেন। সেই মুনাজাতে তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার কিছু এ রকম: 'ইয়া ইলাহী! আপনি আপনার আদেশ দ্বারা আমাকে সৃষ্টি করেছেন, এই পৃথিবীর বিপদ-মুসীবতে আপনার ইচ্ছায় আমাকে রেখে দিয়েছেন। তারপর আমাকে বলেছেন: নিজেকে শক্ত রাখ। হে মহাশক্তিশালী! আপনি যদি অনুগ্রহ করে আমাকে শক্ত না করেন, আমি শক্ত হবো কি করে? ইয়া ইলাহী! আপনি জানেন, যাবতীয় সুখ-ঐশ্বর্যসহ যদি গোটা দুনিয়া আমার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তারপর আপনার সন্তুষ্টির বিনিময়ে কেউ যদি তা চায়, আমি তাকে তা দিয়ে দিব।

ইয়া ইলাহী আমি আপনাকে এত গভীরভাবে ভালোবাসি যা আমার উপর আপতিত বালা-মুসীবতকে সহজ করে দিয়েছে এবং আমার জন্য যা আপনি নির্ধারণ করেছেন তাই আমাকে সন্তুষ্টি দান করেছে। আপনার প্রতি আমার এ ভালোবাসা বিদ্যমান থাকলে আমার সকাল-সন্ধ্যা কেমন কাটলো তাতে আমার কোন পরোয়া নেই।'

বসরার লোকটি বলেছেন: তারপর আমার একটু তন্দ্রা ভাব এলো এবং এক সময় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর আমি জাগলাম। দেখলাম, 'আমির সেই একই অবস্থায় নামায, দু'আ ও মুনাজাতের মধ্যে আছেন। এভাবে সুবহে সাদিক হয়ে গেল। ফজরের ফরজ নামায আদায় করলেন। তারপর এভাবে দু'আ করতে লাগলেন: 'হে আল্লাহ! এখন প্রভাত হয়েছে। মানুষের চলাচল শুরু হবে, তারা আপনার অনুগ্রহ ও রুযি-রেষেকের সন্ধান করবে। তাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু প্রয়োজন আছে। আপনার নিকট 'আমিরের প্রয়োজন হলো, আপনি তার যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দিন। ইয়া আকরামাল আকরামীন! আপনি আমার ও তাদের সবার প্রয়োজনসমূহ পূরণ করে দিন। হে আল্লাহ! আপনার নিকট আমি তিনটি জিনিস চেয়েছি। দু'টি দিয়েছেন, একটি দেননি। হে আল্লাহ! আপনি সেটা আমাকে দিন। যাতে আমি আপনার 'ইবাদাত করতে পারি, যেমন আমি ভালোবাসি ও আমি চাই।'

তারপর তিনি বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ান এবং আমার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে। তিনি বুঝতে পারেন, আমি সারা রাত বসে বসে তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। তিনি ভীষণ ভীত-কম্পিত হয়ে পড়লেন। অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন : ওহে বসরী ভাই! মনে হচ্ছে আপনি সারা রাত আমাকে পাহারা দিয়েছেন।

বললাম: হাঁ।

বললেন: আপনি আমার যা কিছু দেখেছেন, গোপন রাখুন, আল্লাহ আপনার কাজ ও কথা গোপন রাখবেন।

আমি বললাম: আপনি যে তিনটি জিনিস আপনার পরোয়ারদিগারের নিকট চেয়েছিলেন, সেই তিনটি জিনিস কি, তা হয় আপনি আমাকে বলবেন, নয়তো আমি আপনার যে আমল প্রত্যক্ষ করেছি তা মানুষের মধ্যে প্রচার করে দিব।

বললেন: আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন! আপনি একাজ করবেন না।

বললাম: আমি আপনাকে যা বলেছি, যদি তা করেন তাহলে বলবো না।

আমার অনমনীয়তা দেখে তিনি বললেন: যদি আপনি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে এই অঙ্গীকার করেন যে, অন্য কারো নিকট আপনি প্রকাশ করবেন না তাহলে আমি আপনাকে বলতে পারি।

বললাম: আমি আল্লাহর নামে দৃঢ় অঙ্গীকার করছি যে, আপনার জীবদ্দশায় কারো কাছে আপনার এ গোপন কথা প্রকাশ করবো না।

তিনি বললেন: আমার দীনের ব্যাপারে নারীর চেয়ে বেশী ভীতি ও আশঙ্কাজনক আমার কাছে আর কিছু নেই। তাই আমি আমার পরোয়ারদিগারের নিকট প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন আমার অন্তর থেকে নারীর প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা দূর করে দেন। তিনি আমার এ দু'আ কবুল করেছেন। ফলে আমি এখন এমন হয়ে গেছি যে, কোন নারীকে দেখলাম না কোন প্রাচীর, তাতে আমার কোন পরোয়া নেই।

বললাম: এতো একটি গেল। দ্বিতীয়টি কি?

বললেন: দ্বিতীয়টি হলো, আমি আমার পরোয়ারদিগারের নিকট চেয়েছি যে, আমি যেন একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কাকেও ভয় না করি। আমার এ চাওয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। এখন আমি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আসমান-যমীনের আর কোন কিছুকেই ভয় করিনে।

বললাম: তৃতীয়টি কি?

বললেন: আমার পরোয়ারদিগারের নিকট আমার তৃতীয় চাওয়া ছিল, তিনি যেন আমার চোখের ঘুম দূর করে দেন। তাহলে আমি রাত-দিন আমার ইচ্ছা মত তাঁর 'ইবাদাত করতে পারবো। কিন্তু তিনি আমার এ চাওয়া পূরণ করেননি।

তাঁর একথা শুনে আমি বললাম : আপনার নিজের প্রতি একটু দয়া করুন। আপনার রাত কাটে নামাযে দাঁড়িয়ে আর দিন কাটে রোযা রেখে। আপনি যা করছেন তার থেকে অনেক কম করেও জান্নাত পাওয়া যাবে। আর আপনি যতখানি সতর্কতা অবলম্বন করছেন তার থেকে অনেক কম সতর্ক হয়েও জাহান্নাম থেকে বাঁচা যাবে।

আমার একথা শুনে বললেন: আমার ভয় হয়, আমি সেখানে লজ্জিত হই কিনা। যেখানে লজ্জা ও অনুশোচনা কোন কাজে আসবে না। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই 'ইবাদাতের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবো। যদি আমি নাজাত ও মুক্তি পাই, তাহলে সেটা হবে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে। আর যদি আমি জাহান্নামে যাই, তাহলে সেটা হবে আমারই ত্রুটির কারণে।

তারপর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। লোকটি বললো: হে আমার ইসলামী ভাই! আপনি কাঁদছেন কেন? বললেন: আমি তোমাদের দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণের কারণে কাঁদছিনে। আমি কাঁদছি, প্রচণ্ড গরমের দিনে দুপুরের পিপাসা ও শীতের রাতে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার স্বল্পতার জন্য।

এ ঘটনার পর 'আমির তাঁর ঘরে ফিরে গেলেন। একদিন ভাতা বণ্টন ও বাইতুল মাল দফতরের একজন কর্মচারী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। 'আমিরের জন্য নির্ধারিত সরকারী ভাতা ছিল। ইসলামী রাষ্ট্র 'উলামা ও ফকীহদের যে ভাতা দিত, এ ছিল সেই ভাতা। সরকারী কর্মচারীটি বললো: ওহে 'আমির, আপনি দফতরে চলুন এবং ভাতা গ্রহণ করুন। 'আমির গেলেন এবং ভাতার অর্থ গ্রহণ করে তাঁর গায়ের চাদরের এক কোণে ঢেলে বাড়ীর পথে বের হলেন। পথে গরিব, মিসকীন, অভাবী, সায়িল যাকেই পেলেন কাপড়ের মধ্যে হাত দিয়ে মুঠ ভরে উঠিয়ে তাকে দিলেন। এভাবে দিতে দিতে বাড়ী পৌঁছলেন। পরিবারের লোকদের সামনে সব মুদ্রা ঢেলে দিলেন। তাঁরা একটি একটি করে গুণে দেখলেন, ভাতা দফতর থেকে যে পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছিলেন তা ঠিকই আছে। একটি মুদ্রাও কম নেই।

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ কেবল একজন দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ এবং রাতের অন্ধকারে নির্জনে-নিরিবিলিতে আল্লাহর 'ইবাদাতকারী ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং দিনের বেলায় একজন দক্ষ অশ্বারোহী যোদ্ধাও ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় যখনই আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ডাক দেওয়া হয়েছে, সেই ডাকে প্রথম সাড়া দানকারী সব সময় তিনি থেকেছেন। তিনি যখন কোন মুজাহিদ বাহিনীর সাথে জিহাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন তখন ব্যতিক্রমধর্মী একটি কাজ করতেন। মুজাহিদদের মধ্য থেকে বেছে বেছে একটি দলকে নির্বাচন করতেন নিজের সহযোদ্ধা হিসেবে। তারপর তাঁরা যখন একসঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য একমত হতেন তখন তিনি তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন: ওহে ভায়েরা আমার! আমি আপনাদের সঙ্গী হতে ইচ্ছুক, যদি আপনারা আমাকে তিনটি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁরা জানতে চাইতেন, সেই তিনটি বিষয় কি কি? তিনি বলতেন:

প্রথমত: আমি হবো আপনাদের সেবক। এই সেবার কাজে আপনাদের কেউ কখনো আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবেন না।

দ্বিতীয়তঃ আমি হবো আপনাদের মুআযযিন। এ ব্যাপারে কেউ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবেন না।

তৃতীয়তঃ আমার সাধ্যমত আপনাদের জন্য আমাকে খরচ করার অধিকার দিতে হবে। যদি তাঁরা তাঁকে এ তিনটি ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিতেন তাহলে তিনি তাঁদের দলে থাকতেন। কেউ দ্বিমত পোষণ করলে তিনি অন্য দল খুঁজে তাদের সাথে বের হতেন।

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর জিহাদ ছিল নির্ভেজাল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আসমা' ইবন 'উবায়দ বর্ণনা করেছেন। 'আমির একবার একটি যুদ্ধে গেলেন। সেই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এক বড় নেতার একটি মেয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলো। তখনকার রীতি অনুযায়ী শত্রু পক্ষের বন্দী মেয়েদেরকে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো। সৈনিক 'আমিরকে এই বন্দী মেয়েটিকে দেওয়ার জন্য তার একটি বর্ণনা তাঁর কাছে দেওয়া হলো। 'আমির সেই বর্ণনা শুনে বললেন, আমিও তো একজন পুরুষ, এ মেয়েটি আমাকে দেওয়া হোক। তাঁর এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে বাহিনীর সদস্যরা সানন্দে দাসীটিকে তাঁর হাতে অর্পণ করলো। তিনি যখন মেয়েটির মনিব হয়ে গেলেন তখন তাকে বললেন: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাকে এ বন্দী দশা ও দাসত্ব থেকে মুক্তি দিলাম। তুমি এখন মুক্ত, স্বাধীন। তাঁর সঙ্গী-সাথীরা বললেন, আপনি তাকে মুক্ত না করে অন্য কোন দাসীকে মুক্তি দিতে পারতেন। বললেন: আমি আমার পরোয়ারদিগারের নিকট ভালো প্রতিদান চাই। 'আমিরের অভ্যাস ছিল, জিহাদের পথে চলাকালে পালাক্রমে অন্য মুজাহিদদেরকে নিজের বাহনের পিঠে চড়ানো।

'আমির ছিলেন সেই সব মুজাহিদের একজন যাঁরা যুদ্ধের ভীতিপ্রদ মারাত্মক পর্যায়ে দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন এবং লোভ-লালসার পর্যায়ে নিজেদেরকে একেবারে গুটিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। অন্য কথায়, তিনি নির্ভিকভাবে নিজের জীবনের পরোয়া না করে শত্রু-সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন; কিন্তু গনীমত সংগ্রহ, বণ্টন ও গ্রহণের ব্যাপারে একেবারেই নিস্পৃহ ও উদাসীন থাকেন, যা তাঁর সঙ্গীদের অনেকেই পারেন না। সেনাপতি সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) ঐতিহাসিক কাদেসিয়া যুদ্ধের পর মাদায়েন দখল করে শাহান শাহ্ ইরানের প্রাসাদে প্রবেশ করেন। তিনি 'আমর ইবন মুকাররিনকে (রা) নির্দেশ দেন গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ শত্রু-সম্পদ একত্র করার জন্য। যাতে তার এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালে পাঠিয়ে অবশিষ্টগুলো মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করতে পারেন। নির্দেশ মত জমা করা হলো অঢেল সম্পদ এবং এতসব মূল্যবান জিনিসপত্র যার বর্ণনা দুঃসাধ্য। এখানে অসংখ্য ঝুড়ি ভর্তি পারস্য সম্রাটদের ব্যবহার্য সোনা-রূপোর থালা- বাসন, ওখানে মূল্যবান কাঠের অসংখ্য বাক্স ভর্তি রাজ-পরিবারের সদস্যদের কাপড়- চোপড় এবং সোনা ও মণি-মুক্তার অলঙ্কারাদি। আবার এখানে রয়েছে মহিলাদের সাজ- সজ্জার জিনিস ও মূল্যবান সুগন্ধিতে ভরা অসংখ্য পাত্র, আবার ওদিকে আছে অসংখ্য বাক্স ভর্তি পারস্য সম্রাট, তাঁদের বীর যোদ্ধা ও সৈনিকদের ব্যবহার্য অগণিত মূল্যবান যোদ্ধাস্ত্র।

সেনাপতি সা'দ (রা) নির্বাচিত সৈনিকরা যখন উন্মুক্ত স্থানে সকল সৈনিকের সামনে এসব গনীমতের মাল বিভিন্নভাবে হিসাব-নিকাশ করছেন ঠিক সে সময় উস্কে-খুসকো ও ধূলিমলিন চেহারার একটি লোক খুব বড় আকারের ও ভারী ওজনের একটি পাত্র দু'হাতে উঁচু করে এনে হাজির করলো। সবাই সেটা নেড়ে চেড়ে ভালো করে দেখলো। তারা বুঝলো এমন পাত্র তারা আর পায়নি। খোলার পর দেখতে পেল সেটি মণি-মুক্তা ও হীরা-জহরতে ঠাসা। উপস্থিত সবাই এবার লোকটিকে প্রশ্ন করলো: এই মহা মূল্যবান সম্পদ তুমি কোথায় পেলে? লোকটি বললো: অমুক যুদ্ধে অমুক স্থানে। তারা আবার প্রশ্ন করলো: এর থেকে কি কিছু নিয়েছো? সে বললো: আল্লাহ আপনাদেরকে হিদায়াত করুন। আল্লাহর কসম! এই পাত্রটি এবং এর ভিতরের যা কিছু পারস্য সম্রাটদের, সবই আমার নিকট আমার একটি নখের আগার সমমানের নয়। এটি যদি মুসলমানদের বাইয়তুল মালে জমা না হতো তাহলে আমি এটি মাটি থেকে উঠিয়ে এভাবে আপনাদের কাছে আসতাম না।

এবার লোকেরা প্রশ্ন করলো: আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন! আপনি কে? লোকটি বললো: আল্লাহর কসম! আমি আপনাদের বা অন্য কারো নিকট আমার পরিচয় দিব না। যাতে আপনারা বা অন্য কেউ আমার কোন রকম প্রশংসা করতে না পারেন। একথা বলে লোকটি চলে গেল। তখন সেখানে উপস্থিত লোকেরা তাদের একজনকে বললো তাকে অনুসরণ করে তথ্য নিয়ে আসার জন্য। এই লোকটি তার অজান্তে অনুসরণ করে তার অন্য সাথীদের নিকট উপস্থিত হলো এবং তাদের নিকট এর পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। তারা বললো: তুমি চেন না? ইনি তো বসরার 'আবিদ 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ।

খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে সর্বপ্রথম তাঁকে মাদায়িন অভিযানে দেখা যায়। অন্য কোন অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি অধিকাংশ অভিযানে অংশগ্রহণ করতেন। কাতাদা বলেছেন, 'আমির যখন যুদ্ধে যেতেন এবং পথে কোন জঙ্গল পড়তো, আর তাঁকে যদি বলা হতো এখানে বাঘের ভয় আছে, জবাবে তিনি বলতেন, আল্লাহকে মুখ দেখাতে আমার লজ্জা হয় যে, আমি তাঁকে ছাড়াও অন্য কাউকে ভয় করি।

খলীফা হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ সৃষ্টি হয় তার বড় কেন্দ্র ছিল তিনটি- বসরা, কুফা ও মিসর। এই বিপ্লব-বিদ্রোহের অগ্নিশিখার বেষ্টনীতে কিছু উঁচু স্তরের সাহাবীও এসে যান। 'আমিরের আবাসস্থল ছিল বসরা। এই ফিতনা-ফাসাদে তিনি যুক্ত না থাকলেও নিজেকে তিনি এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পারেননি। এক পর্যায়ে তিনি 'উছমান (রা) বিরোধীদের ফাঁদে আটকে যান এবং তাদের সঙ্গী হয়ে পড়েন। একবার বসরাবাসীরা তাদের প্রতিনিধি ও মুখপাত্র হিসেবে তাঁকে খলীফা 'উছমানের (রা) নিকট পাঠায়। তিনি মদীনায় যেয়ে খলীফার সামনে খোলামেলাভাবে নিজের চিন্তা-ভাবনার কথা প্রকাশ করেন। যেমন তিনি বলেন, 'মুসলমানদের একটি দল আপনার কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা জেনেছে, করণীয় নয় এমন কিছু কাজ আপনার দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং ভবিষ্যতের জন্য তাওবা করুন।' সে সময় পর্যন্ত হযরত 'উছমান (রা) 'আমিরের প্রকৃত অবস্থা ও পরিচয় জ্ঞাত ছিলেন না।

এ কারণে তিনি তাঁর কথা শুনে বলেন, 'ওহে লোকেরা! তোমরা এ লোকটিকে দেখ। অতি সামান্য বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি এসেছেন। লোকেরা তাঁকে একজন 'কারী' (কুরআন পাঠক) মনে করে। অথচ তিনি জানেন না যে, আল্লাহ কোথায়?' 'আমির খলীফার এ কথা শুনে কুরআনের এ আয়াতটি উচ্চারণ করেন : ،إِنَّ رَبَّكَ لبالمِرْصَادِ নিশ্চয় তোমার পরোয়ারদিগার অপেক্ষায় আছেন।' তারপর বলেন, আল্লাহর কসম! আমি ভালো করেই জানি, তিনি অবাধ্যদের অপেক্ষায় আছেন। খলীফার সাথে এ উত্তপ্ত সংলাপের পর 'আমির বসরায় ফিরে আসেন।

তৎকালীন খলীফার সাথে 'আমিরের এই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছাড়াও কিছু দীনী অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। অথবা বলা চলে, তাঁর প্রতি আরোপ করা হতো। যেমন: তিনি বিয়ে করেন না, গোস্ত খান না, নিজকে হযরত ইবরাহীমের (আ) চেয়ে ভালো অথবা সমান মনে করেন, ওয়ালী বা শাসনকর্তার বাড়ীর দরজা মাড়ান না ইত্যাদি। সরকারের সাথে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধ আগেই হয়েছিল। এ কারণে তাঁর কিছু বিরোধী লোক তাঁর এ সব আচরণ বসরার তৎকালীন ওয়ালীর গোচরীভূত করে। তিনি আবার বিষয়টি হযরত 'উছমানকে (রা) অবহিত করেন। খলীফার দফতর থেকে তদন্তের নির্দেশ আসে এবং সত্য প্রমাণিত হলে তাঁকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার আদেশ দেয়।

খলীফার দফতর থেকে এ নির্দেশ আসার পর বসরার ওয়ালী 'আমিরকে ডেকে পাঠান। তিনি উপস্থিত হলে ওয়ালী তাঁকে বলেন, আপনার প্রতি যেসব অভিযোগ আরোপ করা হয়, তা তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আমীরুল মু'মিনীন 'উছমান (রা)।

'আমির বললেন: আমার প্রতি কি কি অভিযোগ আরোপ করা হয়? ওয়ালী তাঁকে অভিযোগগুলো শোনান। 'আমির তখন একটি একটি করে জবাব দিতে থাকেন। তিনি বলেন, আমি বিয়ে এ জন্য করিনে যে, স্ত্রী হলে সন্তান হবে। আর তাতে দুনিয়া আমার অন্তরে গেড়ে বসবে। আর তা আল্লাহর যিক্র থেকে আমাকে বিরত রাখবে। তবে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। আর গোস্ত এজন্য খাই না যে, আমি যে এলাকায় বসবাস করি সেখানে মাজুসীদের (আগুন ও সূর্যের উপাসক) বাস। বাজারে যে গোস্ত বিক্রি হয় তা আল্লাহর নামে যবেহ হয় কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারিনে। তাই গোস্ত খাইনে। তবে হালাল গোস্ত পেলে খাই। আর হযরত ইবরাহীমের (আ) চেয়ে ভালো বলে মনে করার যে অভিযোগ আরোপ করা হয়েছে, তার জবাব এই ছাড়া আর কিছু দেব না যে, আমার একান্ত ইচ্ছা, আমি যদি তাঁর পায়ের ধুলো হতে পারতাম, আর পায়ের সাথে লেগে জান্নাতে চলে যেতাম! আর ওয়ালী ও শাসন কর্তৃত্বের অধিকারীদের বাড়ীর দরজা মাড়াই না বলে যে অভিযোগ, তার জবাব এই যে, তাঁদের দরজায় সব সময় অভাবী ও সাহায্য প্রার্থীদের ভীড় থাকে। আমি তাদের কেউ নই। তাই আমি তাঁদের সুযোগ নষ্ট করতে চাইনে। আপনারা তাদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনুন এবং তা পূরণ করুন। আর আপনাদের নিকট যাদের কোন প্রয়োজন নেই তাদেরকে তাদের অবস্থায় থাকতে দিন।

'আমিরের বক্তব্য খলীফা হযরত 'উছমানকে (রা) জানানো হলো। তিনি তাতে আনুগত্যের পরিপন্থী, অথবা সুন্নাহ্ ও ঐক্য বিরোধী কোন কিছু পেলেন না। কিন্তু প্রচারকারীদের অপপ্রচার এতে থামলো না। তারা 'আমিরকে ঘিরে অনেক কথা প্রচার ও বলাবলি করতে লাগলো। ফলে তাঁর সমর্থক ও বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের উপক্রম হলো। ফলে 'উছমান (রা) তাঁকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার আদেশ দেন। অন্যদিকে তথাকার ওয়ালী মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানকে (রা) নির্দেশ দেন তাঁকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করার ও তাঁর প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়ার জন্য। পরবর্তীকালে 'উছমানের (রা) হত্যাকারীরা তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করে তার মধ্যে বসরা থেকে 'আমিরের বহিষ্কারের অভিযোগটিও ছিল।

যে দিন 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ বসরা ত্যাগ করে শামের দিকে যাত্রার জন্য ঘর থেকে বের হলেন সেদিন তাঁর অসংখ্য ছাত্র, আত্মীয়-বন্ধু ও গুণমুগ্ধ ব্যক্তি তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তারা তাঁকে বসরার উপকণ্ঠে 'মিবরাদ' পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। তাদের থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বক্ষণে 'আমির বলেন: আমি হাত তুলে দু'আ করছি, আপনারা আমার দু'আর উপর আমীন বলবেন। উপস্থিত সবাই ঘাড় উঁচু করে তাঁকে দেখতে লাগলো। সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। তিনি দু'হাত উঠিয়ে নিম্নের দু'আটি করেন।

اللَّهُمَّ مَنْ وَشَى بِي ، وَكَذَّبَ عَلَيَّ وَأَخْرَجَنِي مِنْ مِصْرِى (بَلَدِي) وَمُزَّقَ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَانِي، فَأَكْثِرْ مَالَهُ، وَأَصَحَ حِسْمَهُ وَأَطِلْ عُمْرَهُ.

- 'হে আল্লাহ! যে আমার নামে কুৎসা রটনা করেছে, আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে, আমাকে আমার শহর থেকে বের করে দিয়েছে এবং আমাকে ও আমার আত্মীয়-বন্ধুদের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করেছে, তুমি তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে দাও, তার শরীর সুস্থ করে দাও এবং তার জীবনকাল দীর্ঘ করে দাও।' এ দু'আ পাঠের পর তিনি বাহনের মুখ শামের দিক করে চালিত করেন। শামে পৌঁছার পর হযরত মু'আবিয়া (রা) অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাঁকে গ্রহণ করেন এবং তাঁর থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করেন। সেবার জন্য একজন দাসী নিয়োগ করে তাকে নির্দেশ দেন, তাঁর রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টার অবস্থা ও ব্যস্ততা সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য। শামে আসার পরও 'আমিরের অভ্যাস ও কাজের কোন পরিবর্তন হলো না। তিনি নিয়মিতভাবে প্রতিদিন প্রত্যুষে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন এবং ফিরতেন রাতের অন্ধকারে। আমীর মু'আবিয়া তাঁর জন্য খাবার পাঠাতেন, কিন্তু তিনি তা স্পর্শও করতেন না। কোথা থেকে রুটির একটি টুকরো নিয়ে আসতেন। তাই কিছু পানিতে গুলিয়ে উপর থেকে সেই পানি পান করে 'ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। সারাটি রাত 'ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন। দাসী আমীর মু'আবিয়াকে (রা) সবকথা জানালেন। আর তিনি খলীফা 'উছমানকে (রা) সবকথা লিখে পাঠালেন। খলীফা 'আমিরের আসল রূপ অবগত হয়ে তাঁর সাথে সম্পর্ক ভালো করার এবং দশটি দাস ও দশটি বাহনের পশু দেওয়ার জন্য আমীর মু'আবিয়াকে (রা) নির্দেশ দিলেন। আমীর মু'আবিয়া (রা) খলীফার নির্দেশের কথা 'আমিরকে জানালেন। জবাবে 'আমির বললেন: এক শয়তান আগে থেকেই ঘাড়ে চেপে বসে আছে। তার বোঝা এত কম নয় যে দশটি দাসের বোঝা বহন করবো। একটি খচ্চর আমার আছে, বাহনের জন্য তাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত বাহনের জন্য কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয় করি। আর আমীরের সম্মান ও নৈকট্য লাভ, তা এতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

'আমিরের প্রকৃত অবস্থা জানার পর হযরত মু'আবিয়া (রা) একদিন তাঁকে বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে বসরায় ফিরে যেতে পারেন। তিনি বললেন, আমি এমন শহরে আর ফিরে যাব না যার অধিবাসীরা আমার সাথে এমন আচরণ করেছে। 'আমির শামে থেকে যান এবং বাকী জীবন সেখানে কাটিয়ে দেন। তবে তাঁর গতিবিধির উপর থেকে সরকারি বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করা হলে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে চলে যান। মাঝে মাঝে হযরত মু'আবিয়ার (রা) সাথে দেখা-সাক্ষাতের জন্য আসতেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) সব সময় তাঁর প্রয়োজনের কথা জিজ্ঞেস করতেন, আর তিনি জবাব দিতেন, আমার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। তবে হযরত মু'আবিয়া (রা) যখন বেশী পীড়াপীড়ি শুরু করলেন তখন তিনি আবদারের সুরে বললেন: শামের ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে রোযার তীব্রতা ও পিপাসার মাধুর্য যেতে বসেছে। আপনি পারলে এই স্থানকে বসরার মত গরম করে দিন।

'আমিরের মত মুক্ত, স্বাধীন ও বেপরোয়া মানুষের জন্য স্বদেশ ও বিদেশ সবই সমান। স্বদেশ বসরার জন্য তাঁর বিশেষ কোন টান ও বন্ধন ছিল না। তারপর শামের মত পবিত্র ও নবী-রাসূলদের বিচরণভূমি তিনি লাভ করেন। এ কারণে স্বদেশের সাথে যতটুকু সম্পর্ক ছিল তাও ছিন্ন করে ফেলেন। প্রথমে যখন শামে যান তখন বসরা ও তথাকার জ্ঞানী-গুণী ও 'ইলমী-মজলিসের প্রতি একটা টান অনুভব করতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো, আপনি তো বসরায় ফিরে যেতে পারেন। বললেন: আল্লাহর কসম! সেটা আমার শহর। সেই শহর যেখানে আমি হিজরাত করেছিলাম, সেখানে আমি কুরআন শিখেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীকালে বসরা ও বসরার অধিবাসী, সব পিছুটান ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একাগ্রচিত্তে 'ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে যান। বসরা থেকে কোন ব্যক্তি শামে এলে এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি খুব একটা উৎফুল্ল হতেন না। কাজী 'উবায়দুল্লাহ ইবন হাসান বর্ণনা করেছেন। একবার আমি শামে গেলাম। 'আমিরের সাথে দেখা করার জন্য তাঁর খোঁজ করলাম। জানতে পেলাম যে, তিনি এক বৃদ্ধার সাথে দেখা করার জন্য মাঝে মাঝে তার ওখানে আসেন। আমি সেই বৃদ্ধার কাছে গেলাম। তিনি একটি পাহাড় দেখিয়ে বললেন, 'আমির এই পাহাড়ের নীচে রাত-দিন নামায-রোযায় মশগুল থাকেন। তুমি দেখা করতে চাইলে ইফতারের সময় যেও। তখন তিনি দেখা দেবেন। বৃদ্ধার কথা মত আমি ইফতারের সময় সেই পাহাড়ের নীচে গেলাম। 'আমির সেখানে ছিলেন। আমি সালাম করলাম। তিনি শুধু এমন এক ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করলেন যার সাথে মাত্র একদিন আগে এই শামে আমার দেখা হয়েছে। নিজের দেশ ও দেশের কোন মানুষের কথা কিছুই জানতে চাইলেন না। এটাও জানতে চাইলেন না যে, কে বেঁচে আছে, আর কে মারা গেছে? তাঁর সাথে কিছু খেতে বলার সৌজন্যও দেখালেন না। এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখে আমি তাঁকে বললাম আপনার মধ্যে অদ্ভুত আচরণ লক্ষ্য করছি। বললেন: কি? বললাম: দীর্ঘদিন হলো আপনি আমাদের থেকে দূরে আছেন। কিন্তু আপনি আমাদের কারো সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেন না। আর যাও জানতে চাইলেন, তা এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে যার সাথে মাত্র একদিন আগে আমার দেখা হয়েছে। বললেন: আমি তোমাকে সুস্থ দেখেছি। তাই তোমার সম্পর্কে প্রশ্ন করা প্রয়োজন মনে করিনি। বললাম আমি সদ্য দেশ থেকে এসেছি। আপনি একথা জানতে চাননি, কে মারা গেছে, আর কে বেঁচে আছে?

বললেন: এমন লোকের সম্পর্কে কী জিজ্ঞেস করবো যারা মারা গেছে। তারা শেষ হয়ে গেছে। আর যারা মারা যায়নি তারা খুব শিগগিরই মারা যাবে। বললাম: আপনি আমাকে আপনার সাথে খেতে বলার সৌজন্যও দেখালেন না। বললেন: আমি জানতাম, তুমি খুব ভালো খাবার খেয়ে থাক। এ কারণে, এই শুকনো রুটি তোমাকে কিভাবে খেতে বলি?"

'আমির 'ইবাদাত, আধ্যাত্মিক সাধনা, দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা, খোদাভীতি এবং প্রবৃত্তি দমনের সাধনায় এমন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যেখানে পার্থিব মন-ভোলানো এবং আরাম-আয়েশের কোন কিছুর অবকাশ ছিল না। তিনি প্রবৃত্তির দমন ও আধ্যাত্মিক সাধনাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। এক সময় তিনি বলতেন, যদি সম্ভব হয় তাহলে আমি জীবনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবো। তিনি তাঁর এই ইচ্ছাকে এমন সফলভাবে পূর্ণ করেন যে দুনিয়ার যাবতীয় সুখ-সম্পদ ও আনন্দ-ফুর্তি যা তাঁর এই ইচ্ছা পূরণে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারতো, সবই পরিহার করেন। তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করতেন, 'আমার অন্তর থেকে নারীর ইচ্ছা ও লোভ দূর করে দিন। এ জিনিস আমার জীবনের জন্য সবচেয়ে বেশী মারাত্মক। একমাত্র আপনার ভয় ছাড়া আর কারো ভয়-ভীতি থেকে আমার অন্তরকে পরিষ্কার করে দিন। আমার চোখ থেকে ঘুম দূর করে দিন, যাতে রাত-দিন সব সময় আমার ইচ্ছা মত আপনার 'ইবাদাত করতে পারি।' আল্লাহ তাঁর প্রথম দু'টি দু'আ কবুল করেন কিন্তু দীর্ঘ দিন যাবত ঘুমকে আয়ত্তে আনতে পারেননি।

তিনি ঘুম ও ক্ষুধাকে আয়ত্তে আনতে না পারলেও আজীবন এ দু'টিকে পরাভূত করে রাখার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। তিনি ঘুম দূর করার এবং ক্ষুধা ভুলে থাকার এই পন্থা বের করেন যে, রাত জেগে আল্লাহর 'ইবাদাত করতেন, আর দিনে রোযা রেখে ঘুমোতেন। শামে অবস্থানকালে সারা দিন রোযা রেখে এবং সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতেন। আহার ছিল শুকনো রুটি যা পানিতে ভিজিয়ে খেয়ে নিতেন। এই চূড়ান্ত রকমের চেষ্টা-সাধনা ও অনুশীলন তাঁর দেহকে এত ক্ষীণ ও দুর্বল করে ফেলেছিল যে, তাঁকে দেখে মানুষের দয়া হতো।

এভাবে তাঁর প্রবৃত্তি দমনের চূড়ান্ত সীমা 'রাহবানিয়াত' বা বৈরাগ্যবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়। তাঁর যুগের লোকেরাও তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিল। সরকারী তদন্তের মুখোমুখিও তাঁকে হতে হয়েছিল। তখন তিনি যেসব উত্তর দিয়েছিলেন তা দ্বারা তাঁর প্রতি মানুষের যেসব সন্দেহ-সংশয় দেখা দিয়েছিল তা অনেকখানি দূর হয়ে যায়। একবার এক ব্যক্তি তাঁর এমন কৌমার্য ব্রতের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে তাঁকে এ আয়াতটি শোনান:

قَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً .
- 'আমি আপনার পূর্বে অনেক রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করেছি।'

অর্থাৎ নবী-রাসূলগণ, যাঁরা ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী বান্দা-তাঁরা যদি স্ত্রী ও সন্তান পরিহার না করে থাকেন তাহলে একজন সাধারণ মানুষের জন্য তা কিভাবে বৈধ হতে পারে? 'আমির কুরআনের নিম্নের আয়াতটি দ্বারাই তার জবাব দেন :

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ *
• 'আমি মানুষ ও জিনকে কেবল আমার 'ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।'

আরেকবার এক ব্যক্তি তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করলো : আপনি বিয়ে-শাদী করেন না কেন? তিনি এর একটা মনস্তাত্ত্বিক জবাব দেন। বলেন: আমার মধ্যে না কামাগ্নি ও ভোগ স্পৃহা আছে, আর না আছে আমার ধন-সম্পদ। এমতাবস্থায় আমি কেন একজন মুসলিম মহিলাকে ধোঁকা দিব?

একবার বসরার আমীর 'আমিরকে বললেন, আমীরুল মু'মিনীন 'উছমান (রা) আমাকে বলেছেন, আমি যেন আপনাকে বিয়ে করতে বলি, আর আপনি বিয়ে করলে বাইতুল মাল থেকে আপনার মাহর আদায় করে দিই। অতএব, আপনি আপনার পছন্দমত কাউকে বিয়ে করুন। 'বাইতুল মাল' থেকে মাহর আদায় করা হবে।

'আমির একটু হেসে বললেন: আমি পয়গাম দিয়েই রেখেছি। ওয়ালী বললেন: কাকে? 'আমির বললেন: যে আমার সামান্য ছেঁড়া-ফাটা কাপড় ও সামান্য শুকনো খেজুর গ্রহণ করতে রাজী হয়। তারপর তিনি পাশে বসা লোকদের দিকে ফিরে বলেন: আমি আপনাদেরকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি, আপনারা উত্তর দিন। আপনাদের প্রত্যেকের অন্তরে তার পরিবারের জন্য একটি অংশ আছে না? তারা বললেন: হাঁ, আছে। তিনি প্রশ্ন করলেন : সন্তানদের জন্য ভালোবাসা আছে না? তাঁরা বললেন: হাঁ, আছে। এবার 'আমির বললেন: যাঁর হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ! পরিবার ও সন্তান আমাকে আল্লাহর যিক্র থেকে বিরত রাখুক, তার চেয়ে বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে আমার পাঁজর ক্ষত-বিক্ষত করা হোক, আমার বেশী পছন্দনীয়। আল্লাহর কসম! আমি আমার জীবনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য রাখবো।

'আমিরের বসরায় অবস্থানকালে তাঁর অত্যধিক ও অস্বাভাবিক 'ইবাদাত-বন্দেগীর অবস্থা দেখে একদিন কিছু লোক তাঁকে বললো : আপনার দেহেরও আপনার উপর হক বা অধিকার আছে। একথা শুনে 'আমির নিজের 'নফস'-কে সম্বোধন করে বলেন: আল্লাহর কসম! 'তোমাকে শুধু আল্লাহর 'ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি তোমার দ্বারা এত বেশী 'আমল করাবো যে শয্যার আরাম তোমাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না।' তারপর তিনি শহর থেকে বেরিয়ে 'ওয়াদী আস-সিবা' (হিংস্র জন্তু- জানোয়ারের উপত্যকা) চলে যান। সেখানে তিনি 'হামামা' নামক একজন হাবশী 'আবিদকে দেখতে পেলেন। এখানে উপত্যকার একটি স্থানে তিনি নামায পড়তেন, আর অন্য প্রান্তে 'ইবাদাতে মশগুল থাকতেন হামামা। একাধারে চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ তাঁর নিজের স্থান থেকে সরতেন না। চল্লিশ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর 'আমির গেলেন হামামার কাছে। তাঁকে প্রশ্ন করলেন: আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন! আপনি কে?

হামামা: আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দিন।

'আমিরের বার বার পীড়াপীড়িতে তিনি বলেন: আমি হামামা। 'আমির বললেন: যে হামামার কথা আমি শুনেছি, তিনি যদি আপনি হন তাহলে এ পৃথিবীতে এখন আপনার চেয়ে বড় 'ইবাদাতকারী দ্বিতীয় কেউ নেই। আচ্ছা, আমাকে একটু বলুন তো সবচেয়ে ভালো অভ্যাস কি?

হামামা: আমার 'আমল খুবই সীমিত। যদি না ফরজ নামায থাকতো- যাতে কিয়াম ও সিজদা আছে, তাহলে আমি আমার গোটা জীবনই রুকুতে এবং চেহারা মাটিতে ঠেকিয়ে কাটিয়ে দিতাম।

হামামা এবার জানতে চাইলেন: তা ভাই আপনার পরিচয়টা কি?
'আমির: আমি 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ।

হামামা: আপনি যদি সেই 'আমির হন যার কথা আমাকে বলা হয়েছে, তাহলে আপনি ধরাপৃষ্ঠে সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী ব্যক্তি। আচ্ছা, আপনি বলুন সবচেয়ে ভালো অভ্যাস কি?

'আমির বললেন: আমার 'আমলও সীমিত এবং ত্রুটিপূর্ণ। তবে একটি জিনিস আমার অন্তরে আল্লাহর ভীতিকে বড় করে দিয়েছে। ফলে আমি এখন তাঁকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করিনে।

হামামা: সেই জিনিসটা কি?
'আমির তখন এ আয়াতটি পাঠ করেন:

ذلِكَ يَوْمَ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ ..

'তা এমন এক দিন, যেদিন সব মানুষই সমবেত হবে এবং সে দিনটি যে হাজিরার দিন।' এ সময় হঠাৎ একটি হিংস্র জন্তু তাদেরকে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে খেয়ে ফেলার উপক্রম করলো।
'আমির জন্তর তর্জন-গর্জ‌নকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে উপরোক্ত আয়াতটি বার বার আওড়াতে লাগলেন। হামামা বললেন: ওহে 'আমির! এই মারাত্মক বিপদ কি আপনি লক্ষ্য করছেন না?

'আমির: মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনকে ছাড়া অন্য কিছুকে ভয় করতে আমার লজ্জা হয়। আমি আল্লাহকে এত গভীরভাবে ভালোবাসি যে তা আমার সব বালা-মুসীবতকে সহজ করে দিয়েছে। আমার মধ্যে তাঁর ভালোবাসা থাকতে আমার সকাল-সন্ধ্যা কেমন কাটলো সে ব্যাপারে আমার কোন পরোয়া নেই।

আমর বিল মা'রূফ ও নাহি 'আনিল মুনকার বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে তাঁর জিহ্বার তরবারি সব সময় কোষমুক্ত থাকতো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধি-বিধান লংঘিত হতে দেখলে তিনি ক্রোধে, উত্তেজনায় ফেটে পড়তেন। একবার তিনি আল্লাহর তাসবীহ ও তাহমীদ পাঠ ও শুকরিয়া আদায় করতে করতে রাস্তা দিয়ে চলছেন। এমন সময় দেখতে পেলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য পুলিশ অন্য এক ব্যক্তির গলা এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে যে, লোকটির দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর মধ্যে আরেকজন পুলিশ তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। দু'জনে মিলে জোর-জবরদস্তী লোকটিকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। 'আমির লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে শুনতে পেল, সে চিৎকার করে বলছে: ওহে মুসলিমগণ, আমাকে বাঁচান! আমি একজন অমুসলিম যিম্মী, আমাকে বাঁচান! 'আমির তাঁর কাছে গিয়ে বললেন: ওহে, আপনার কাছে কি জিযিয়া পাওনা আছে? লোকটি বললো: না। আমি সব পরিশোধ করেছি। আপনি আমাকে এই পুলিশের হাত থেকে বাঁচান। এবার 'আমির পুলিশের প্রতি তাকিয়ে বললেন: তাকে ছেড়ে দিন। পুলিশ তাঁর কথায় কান না দিয়ে বললো: আমরা তাকে ছাড়বো না। তাকে বসরায় পুলিশ বাহিনীর প্রধানের উদ্যানে যেতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন করতে হবে। 'আমির যিম্মী লোকটিকে বললেন: তুমি তাদের সাথে গিয়ে তারা যা বলছে তা শুনছো না কেন? লোকটি বললো: আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার কাঁধে অনেকগুলো শিশু সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের জীবিকার জন্য আমাকে কাজ করতে হয়। এ কাজ করলে আমি আমার সন্তানদের জীবিকার জন্য কাজ করতে পারিনে। কারণ, এদের কাজে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এবার 'আমির পুলিশের লোকটিকে নির্দেশ দিলেন : তাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু পুলিশ সে নির্দেশ মানলো না। 'আমির এবার পুলিশকে লক্ষ্য করে বললেন : ওহে, তুমি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের (সা) অঙ্গীকার ভঙ্গ করছো? আল্লাহর কসম! আমি জীবিত থাকতে তুমি মুহাম্মাদের (সা) অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারবে না। তারপর 'আমির পুলিশটির হাত থেকে জোর করে লোকটি ছিনিয়ে নেন এবং তাকে ছেড়ে দিয়ে বলেন : তোমার পরিবারের লোকদের জীবিকার অন্বেষণে চলে যাও।

বসরার ওয়ালী, যিনি পুলিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন, তাঁর কাছে এ সংবাদ পৌঁছানো হয়। 'আমিরের একাজকে সরকার-বিরোধী কর্মতৎপরতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আমীর-উমারা ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের প্রতি তাঁর উদাসীন ও বেপরোয়া ভাব অসন্তুষ্টির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি ঐসব লোকদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশাও পছন্দ করতেন না। তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছিল তার মধ্যে আমীর-উমারা ও শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা না করার অভিযোগও ছিল। তার জবাবে তিনি একথা বলেছিলেন যে, আপনাদের কাছে সব সময় অভাবী ও প্রয়োজনীয় কাজের লোকদের ভীড় জমে থাকে। আপনারা তাদের প্রয়োজন পূরণ করুন। আর আপনাদের কাছে যাদের কোন প্রয়োজন নেই তাদেরকে নিজ নিজ অবস্থায় থাকতে দিন। তিনি খলীফা ও আমীর-উমারা কাউকে ভয় ও পরোয়া করতেন না।

হযরত 'উছমানের (রা) সামনে তিনি যে সাহস ও নির্ভিকতার সাথে অকপটে নিজের চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার কথা প্রকাশ করেন তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে বসরার কারীদের একটি প্রতিনিধিদল শামে পাঠানো হয়। তাতে 'আমিরও ছিলেন। মুদারিব ইবন হায়্যান, যিনি প্রতিনিধিদলটি পাঠিয়েছিলেন, একদিন আমীর মু'আবিয়াকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন: আমরা কারীদের যে দলটি পাঠিয়েছিলাম তাদের কেমন দেখলেন? তিনি জবাব দিলেন: একজন ছাড়া বাকী সবাই মিথ্যা প্রশংসা করে ও বেশী কথা বলে। মিথ্যা নিয়ে আসে এবং আস্থাহীনতা নিয়ে ফিরে যায়। শুধু এক ব্যক্তি স্বাভাবিক মানুষ ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আমীরুল মু'মিনীন! সেই লোকটি কে? বললেন: 'আমির

যদি কোন আমীর অথবা সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা কখনো নিজেই তাঁর কাছে আসতেন তখন তাঁর সাথেও তিনি একই রকম আচরণ করতেন। একবার কোন এক যুদ্ধে গেছেন। পথে যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। 'আমির একটি গীর্জার সীমানায় ঢুকে পড়েন এবং একজন লোককে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দেন, কেউ যেন ভিতরে প্রবেশ না করে। কিছুক্ষণ পর সেই লোকটি এসে বলেন, আমীর ভিতরে আসার অনুমতি চাচ্ছেন। আমীরকে তিনি ভিতরে ডেকে নেন এবং তাঁকে বলেন: আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে দুনিয়ার প্রতি প্রলুব্ধ করবেন না এবং আখিরাতকে আমার কাছে ছোট করে দেখাবেন না।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, 'আমিরের অবস্থান যে জগতে ছিল সেখানে পার্থিব কোন প্রকার বন্ধন, সম্পর্ক ও রীতি-পদ্ধতির কোন বালাই ছিল না। এ কারণে, শুধু আমীর-উমারা কেন কারো সাথে কোন রকম বন্ধন ও সম্পর্ক তাঁর ছিল না। দুনিয়ায় তাঁর কেবল মুতাররিফ বসরীর সাথে অন্তরের সম্পর্ক ছিল। আর মহিলাদের মধ্যে একজন অতি সাধারণ ছাগলের রাখাল মহিলার প্রতি তাঁর অন্তরে দয়া ও সমবেদনার উদ্রেক হয়। কিন্তু তাঁর সাথে কোন রকম সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই মহিলাটি মারা যায়। মুতাররিফের সাথে তাঁর অপ্রকৃতিস্থ বা দিওয়ানা ধরনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি বসরা ত্যাগের সময় তাঁর নিকট থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য এক রাতে কয়েকবার মুতাররিফের গৃহে যান। প্রত্যেক বারই তিনি মুতাররিফকে বলেন: 'আমার বাবা-মা তোমার জন্য কোরবান হোক! আল্লাহর কসম! তোমার ভালোবাসা আমাকে বার বার তোমার কাছে নিয়ে আসছে।

আর মহিলাটির ঘটনা এই রকম। একজন অতি গরিব ও 'আবিদা মহিলা কয়েকজন বেদুইন লোকের ছাগল চরাতো। সে তাদের সব রকমের নির্যাতন সহ্য করতো। 'আমিরের সাথে তাঁর গুণের দিক দিয়ে অনেক মিল থাকায় লোকেরা 'আমিরকে বলতো, অমুক মহিলা আপনার স্ত্রী এবং সে একজন জান্নাতী মহিলা। 'আমির তার সন্ধানে বের হলেন। সে মহিলার জীবন ছিল এই রকম যে, সারাদিন অসভ্য ও বর্বর বেদুইনদের ছাগল চরাতো। দিন শেষে যখন ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ী ফিরতো তখন বেদুইনরা গালাগালির মাধ্যমে তাকে স্বাগতম জানাতো। আর সামনে শুকনো রুটির দু'টি টুকরো ছুঁড়ে মারতো। সে তা কুড়িয়ে নিয়ে একটি টুকরো বাড়ীর লোকদের দিত। সারাদিন সে রোযা রাখতো। তাই দ্বিতীয় টুকরোটি দিয়ে সে সন্ধ্যায় ইফতার করতো। 'আমির তাকে খুঁজে বের করেন। যখন সে ছাগল চরানোর জন্য বেরিয়ে যায় তখন 'আমিরও সংগে যান। এক স্থানে পৌঁছে সেই মহিলা ছাগলগুলো ছেড়ে দিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যায়। 'আমির তাকে বললেন, তোমার কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলতে পার। সে বললো: আমার কোন প্রয়োজনই নেই। 'আমির যখন বেশী পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন তখন সে বললো, আমার শুধু এতটুকু ইচ্ছা যে, আমি যদি দুই টুকরো সাদা কাপড় পেতাম যা আমার কাফনের কাজে আসতো। 'আমির তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বেদুইনরা তোমাকে গালি দেয় কেন? সে উত্তর দিল : এতে আমি আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করি। এই সংলাপের পর 'আমির তার মনিবদের নিকট যান এবং তাদেরকে প্রশ্ন করেন তোমরা এই মহিলাকে গালি দাও কেন? তারা উত্তর দিল: আমরা যদি এমনটি না করি তাহলে সে আমাদের কাজের উপযুক্ত থাকবে না। 'আমির বললেন: তোমরা ওকে আমাদের কাছে বিক্রী করে দাও। তারা বললো: যত মূল্যই দাও না কেন আমরা তাকে আমাদের থেকে পৃথক করবো না। এ উত্তর শুনে 'আমির ফিরে যান এবং মহিলার ইচ্ছা অনুযায়ী দুই প্রস্থ কাপড় সংগ্রহ করে তার কাছে যান। কিন্তু কী অবাক ব্যাপার! সেই মহিলা তখন এই দুনিয়া ছেড়ে পরলোকে যাত্রা করেছে। 'আমির তার মনিবদের অনুমতি নিয়ে তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। এভাবে এ দুনিয়ায় 'আমিরের একজন মহিলার সাথে সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তা শেষ হয়।

'আমির একজন বড় মাপের দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। মুজাহিদদেরকে আর্থিক সাহায্য দানের বিষয় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। দু'হাজার দিরহাম ভাতা পেতেন। সেই ভাতা যখনই পেতেন তখন গরিব-মিসকীন যাকে পথে পেতেন তাদের মধ্যে বিলাতে বিলাতে ঘরে ফিরতেন।

বসরা ত্যাগের পর 'আমির আর কোন দিন বসরায় ফিরে আসেননি। মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের প্রথম কিবলা 'বাইতুল মাকদিস'কে কেন্দ্র করে তার আশে-পাশে বসবাস করতে থাকেন। আমীর মু'আবিয়া (রা), যিনি ছিলেন তৎকালীন শামের ওয়ালী এবং পরবর্তীকালে মুসলিম জাহানের খলীফা, তাঁর প্রতি সীমাহীন সম্মান প্রদর্শন করতেন। সব সময় তাঁর খোঁজ-খবর রাখতেন। দিনের পর দিন পেরিয়ে বহু বছর গড়িয়ে গেল।

'আমিরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে চললো। অবশেষে তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যা নিলেন। রোগের তীব্রতা বেড়ে গেল। তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও গুণমুগ্ধরা বুঝতে পারলেন এ তাঁর অন্তিম রোগ। তাঁরা তাঁকে দেখার জন্য গেলেন। তাঁদেরকে দেখে তিনি কান্না শুরু করলেন। অশ্রু গড়িয়ে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। একজন বললেন: 'আমির! আপনি তো একজন নেক্কার, দুনিয়া বিরাগী, খোদাভীরু 'আবিদ মানুষ ছিলেন। আপনি এভাবে কাঁদছেন কেন? 'আমির বললেন: আল্লাহর কসম! আমি দুনিয়ার প্রতি লোভের বশবর্তী হয়ে অথবা মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছিনে। আমি কাঁদছি দীর্ঘ ভ্রমণ ও স্বল্প পাথেয়-এর কথা চিন্তা করে। ঊর্ধ্বে আরোহণ ও নিম্নে পতনের মাঝ দিয়ে আমার জীবন কেটেছে। এরপর আছে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। আমি জানিনে কোথায় হবে আমার ঠিকানা। একথা বলতে বলতে তাঁর রূহটি তাঁর সর্বোচ্চ বান্ধবের নিকট পৌছে গেল। তখন হযরত মু'আবিয়ার (রা) শাসনকাল। বাইতুল মাকদিসে তাঁকে দাফন করা হয়।

'আমির-এর সম্পর্কে এক ব্যক্তির একটি স্বপ্ন উল্লেখ করার মত। এ স্বপ্নের দ্বারা তাঁর আধ্যাত্মিকতা কোন স্তরের ছিল তা অনুমান করা যায়। সা'ঈদ নামের এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। একবার এক ব্যক্তি স্বপ্নে নবীর (সা) অপরূপ সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেন। সেই ব্যক্তি আবেদন জানায়: হুজুর! আমার গুনাহ মাফের জন্য দু'আ করুন। তিনি বলেন: তোমাদের জন্য 'আমির দু'আ করছেন। সেই ব্যক্তি 'আমিরের নিকট এই স্বপ্ন বর্ণনা করলে তিনি প্রবল আবেগে এত বিগলিত হয়ে যান যে, তাঁর কণ্ঠরোধ হবার উপক্রম হয়।

হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ছিলেন 'আমিরের অতি শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক। শিক্ষক তাঁর প্রিয় ছাত্রের সব গতিবিধি ও কাজকর্মের প্রতি সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। মাঝে মধ্যে প্রয়োজন হলে জরুরী নির্দেশনাও দিতেন। একবার তিনি একটি চিঠিতে 'আমিরকে লেখেন: অতঃপর এই যে, আমি একটি বিষয়ে তোমার অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম, এখন আমি জানতে পেরেছি যে, তুমি তা পরিবর্তন করে ফেলেছো। যদি তুমি সেই অঙ্গীকারের উপর থেকে থাক তাহলে আল্লাহকে ভয় কর এবং তার উপর অটল থাক। আর তাই যদি সত্য হয় যা আমি শুনেছি, তাহলে আল্লাহকে ভয় কর এবং সেই অঙ্গীকারে ফিরে আস।

'উতবী বলেছেন, আমাদের শিক্ষকরা বলতেন: যুহৃদ ও 'ইবাদাত আটজন তাবি'ঈর মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেই আটজনের একজন হলেন 'আমির।

একবার 'আমিরকে বলা হলো, আপনি একটু দুনিয়ার পরিচয় দিন। বললেন: দুনিয়া হলো মৃত্যুর মা, সুদৃঢ়ের ভঙ্গকারী, দান ও অনুগ্রহ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশী এবং তার মধ্যে যা আছে সবই এক অজানার দিকে ধাবমান।

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ বলতেন: 'কথা যখন অন্তর থেকে বের হয় তখন তা অন্তরে পড়ে। আর যখন জিহ্বা থেকে বের হয় তখন তা কানের ছিদ্র অতিক্রম করে না।'

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহকে একবার বলা হলো: মানুষ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? বললেন: আমি তার সম্পর্কে কি বলবো যে ক্ষুধার্ত হলে বিনয়ী ও বাধ্য হয়, আর পেট ভরলে বিদ্রোহী হয়।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/১০৫; আল ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাবারা-৩/৮৫
২. আল-ইসাবা-৩/৮৫
৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৬৩, ৩/১৯৪
৪. তাবাকাত-৭/৭৫; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৪-২৮
৫. তারীখু ইবন 'আসাকির-৩/২০৭; 'আসরুত তাবি'ঈন-২২৬
৬. তাবাকাত-৭/৭৮
৭. প্রাগুক্ত
৮. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৮/৩১
৯. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৪/১১৭; আল-ইসাবা-৩/৮৬
১০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৩৬-২৩৭; ৩/১৪২-১৪৩
১১. তাবাকাত-৭/১০৩-১০৭; তারীখুল ইবন 'আসাকির-৩/৩৬৮-৩৭০
১২. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/২৮৩
১৩. তারীখু ইবন 'আসাকির-৩/৩৬৮-৩৬৯; সিয়ারু আ'লাম আন্-নুবালা'-৪/১৮-১৯
১৪. আল-ইসাবা-৩/৮৫
১৫. তাবাকাত-৭/৭৭-৭৮
১৬. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৪/১১৫
১৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৩২
১৮. তাবাকাত-৭/৭৮-৭৯
১৯. প্রাগুক্ত-৭/৭৫-৭৬
২০. প্রাগুক্ত-৭/৭৭,৮০
২১. সূরা আর-রা'দু-৩৮
২২. সূরা আয-যারিয়াত-৫২
২৩. তাবাকাত-৭/৭৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/১৭
২৪. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৩২
২৫. সূরা হুদ-১০৩
২৬. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৮۹; 'আসরুত তাবি'ঈন-২২৩-২২৪
২৭. তাবাকাত-৭/৭৪; তারীখু ইবন 'আসাকির-৩/৩৬৮-৩৭
২৮. তাবাকাত-৭/৭৪
২৯. প্রাগুক্ত-৭/৭৮
৩০. প্রাগুক্ত-৭/৭৭
৩১. প্রাগুক্ত-৭/৮০
৩২. প্রাগুক্ত-৭/৭৪
৩৩. সিফাতুস সাফওয়া-৩/২১১
৩৪. আল-ইসাবা-৩/৮৬; 'আসরুত তাবি'ঈন-২৩৩
৩৫. তাবাকাত-৭/৮০
৩৬. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৫১
৩৭. প্রাগুক্ত-৩/১৭১
৩৮. প্রাগুক্ত-৩/১৭২
৩৯. কিতাবুল হায়ওয়ান-৪/২১০; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৮৩; ৪/২৯
৪০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৬৯

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আলকামা ইবন কায়স (রহ)

📄 ‘আলকামা ইবন কায়স (রহ)


আবূ শিল্ 'আলকামা ছিলেন বিখ্যাত তাবি'ঈ মুহাদ্দিছ ইবরাহীম আন-নাখা'ঈর মামা এবং আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদের চাচা। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞান, চারিত্রিক উৎকর্ষ, পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখতা ও খোদাভীতির দিক দিয়ে বিশিষ্ট তাবি'ঈদের অন্তর্গত ছিলেন। ইমাম আয-যাহবী তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: তিনি কৃষ্ণার বড় ফকীহ্, 'আলিম, কারী, ইমাম, হাফেজ, মুজাবিবদ ও মুজতাহিদ।

তিনি এমন এক যুগ লাভ করেন যেখানে বহু বড় সাহাবীর সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান। হযরত 'উমার (রা), 'আলী মুরতাদা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান (রা), সালমান আল-ফারেসী (রা), আবূ মাসউদ আল-বাদরী (রা), আবুদ্ দারদা' (রা) প্রমুখ উঁচু স্তরের সাহাবায়ে কিরাম তখন বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তবে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে বিশেষভাবে উপকার লাভ করেন। তিনি 'আলকামাকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা দেন। আসওয়াদ বলেন: 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) 'আলকামাকে যেভাবে কুরআন শিক্ষা দিতেন, ঠিক সেইভাবে তাশাহ্হুদও শিক্ষা দিতেন।' তাঁর এমন বিশেষ মনোযোগ ও অনুগ্রহে 'আলকামা দ্বিতীয় ইবন মাস'উদে (রা) পরিণত হন। ইবন মাস'ঊদ (রা) নিজেই বলতেন, আমি যত কিছু পড়েছি ও জেনেছি, তা সবই 'আলকামা পড়েছে ও জেনেছে। তাঁর জ্ঞানগত যোগ্যতা ও উৎকর্ষের ব্যাপারে সকল 'আলিম ও মুহাদ্দিছ একমত। ইমাম যাহাবী লিখেছেন: তিনি একজন ফকীহ্ ও শ্রেষ্ঠ ইমাম। ইমাম নাওবী বলেছেন: 'আলকামা একজন উঁচু স্তরের, সুমহান মর্যাদার এবং সম্পূর্ণতার অধিকারী ফকীহ্ ছিলেন।

কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সকল জ্ঞানে 'আলকামার সমান দক্ষতা ছিল। কুরআনের শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন হযরত ইবন মাস'উদের (রা) নিকট। ইমাম যাহ্বী লিখেছেন: وَجَوْدَ الْقُرْآنَ عَلَى ابْنِ مَسْعُودٍ - বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করা শিখেছিলেন ইবন মাস'উদের নিকট। ইবন মাসউদ (রা) নিজে মাঝে মাঝে নিজের পাঠের শুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য 'আলকামাকে কুরআন পাঠ করে শুনাতেন। 'আলকামা বর্ণনা করেছেন। একবার ইবন মাস'উদ আমাকে বললেন, তুমি সূরা আল বাকারায় আমার ভুল ধরবে। একথা বলে তিনি আমাকে সূরা আল বাকারা পাঠ করে শুনিয়ে জানতে চাইলেন: আমার কিছু ছুটে যায়নি তো? আমি বললাম: একটি হরফ ছুটে গেছে। তিনি নিজেই বললেন: অমুক হরফ। আমি বললাম: হাঁ।

তিনি চমৎকার কণ্ঠ ও মিষ্টি আওয়াজের মানুষ ছিলেন। এ কারণে ইবন মাস'উদ (রা) 'তারতীল' (স্পষ্ট ও সুমধুর সুর) করে কুরআন পাঠ করার জন্য তাঁকে বলতেন। তিনি নিজেই বলতেন, আল্লাহ আমাকে মিষ্টি গলা দিয়েছিলেন। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) আমার দ্বারা কুরআন পাঠ করিয়ে শুনতেন, আর বলতেন, আমার মা-বাবা তোমার প্রতি কুরবান হোক! একটু মিষ্টি সুরে পাঠ কর। আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) একথা বলতে শুনেছি যে, মিষ্টি ধ্বনি কুরআনের ভূষণ।

তিনি একজন শ্রেষ্ঠ হাফেজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম যাহাবী তাঁকে হাদীছের হাফেজ ও লেখকদের দ্বিতীয় স্তরে স্থান দিয়েছেন। স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। কোন জিনিস একবার মুখস্থ করে নিলে তা যেন বইয়ের মত সংরক্ষিত হয়ে যেত। তিনি নিজে বলতেন : যে জিনিস আমি আমার যৌবনে মুখস্থ করেছি তা এখন এমনভাবে পাঠ করি যেন কাগজে লেখা কোন জিনিস দেখে দেখে পাঠ করছি। এমন এক অসাধারণ স্মৃতি শক্তি নিয়ে তিনি হযরত 'উমার (রা), 'উছমান (রা), 'আলী (রা), সা'দ (রা), হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান (রা), আবুদ দারদা' (রা), আবূ মাস'উদ (রা), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা), খাব্বাব ইবন আল-আরাত (রা), খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ (রা), মা'কাল ইবন সিনান (রা), উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ 'আলিম সাহাবীদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। এই মহান ব্যক্তিবর্গের বদান্যতায় তিনি হাদীছের একজন অতি বড় হাফেজে পরিণত হন। ইবন সা'দ তাঁকে বহু হাদীছের ধারক এবং ইমাম যাত্রী শ্রেষ্ঠ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। ইয়াহইয়া ইবন আল-ইয়ামান তাঁর ছেলেকে বলতেন, হাদীছের ইমাম চারজন। তাঁরা হলেন যথাক্রমে: 'আবদুল্লাহ, 'আলকামা, ইবরাহীম এবং তুমি দাউদ।

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) হাদীছের বেশীর ভাগ অংশ, বরং বলা চলে প্রায় সবই 'আলকামা তাঁর বুকের মধ্যে ধারণ করেন।

এত বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মুহাদ্দিছ হিসেবে পরিচিত হওয়া এবং সেই সূত্রে মান-মর্যাদার উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া তাঁর পছন্দনীয় ছিল না। হযরত ইবন মাস'উদের ইনতিকালের পর লোকেরা তাঁর নিকট আবেদন জানালো যে, এখন আপনি তাঁর স্থলে মানুষকে সুন্নাহ্ তা'লীম দিতে বসুন। তিনি জবাবে বললেন: তোমরা কি চাও মানুষ আমার পিছে পিছে চলুক?

হাদীছে তাঁর শিষ্য-শাগরিদের পরিধি অনেক বিস্তৃত। 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ, ইবরাহীম ইবন সা'দ, ইমাম শা'বী, আবু কাতাদা নাখা'ঈ, শাকীক ইবন সালামা ইবন কুহায়ল, কায়স ইবন রূমী, কাসিম ইবন মুখায়মারা, আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, ইয়াহইয়া ইবন ওয়াছছাব, আবুদ দুহা মুসলিম প্রমুখ খ্যাতিমান মুহাদ্দিছ ছিলেন তাঁর ছাত্র। ছাত্রদের মধ্যে তাঁর ভাগিনা ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ এবং ভাতিজা আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফিকাহ্ জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন ফকীহুল উম্মাত হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট। এ কারণে এ শাস্ত্রেও তিনি ইমামাত ও ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখতেন। আল্লামা যাহ্বী লিখেছেন : كَانَ فَقِيْهَا إِمَامًا بَارِعًا তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ইমাম, ফকীহ। ইমাম নাওবী তাঁকে পূর্ণতার অধিকারী ফকীহ বলেছেন।

জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও প্রশস্ততার দিক দিয়ে 'আলকামা ছিলেন হযরত ইবন মাস'উদের (রা) বিশিষ্ট ছাত্রদের একজন। ইবন মাদায়িনী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) জ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধারক-বাহক ছিলেন 'আলকামা, আসওয়াদ, 'উবায়দা ও হারিছ। তাঁদের মধ্যে 'আলকামা ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। ইবরাহীম বর্ণনা করেছেন, ইবন মাস'উদের ছয়জন ছাত্র মানুষকে সুন্নাতের তা'লীম দিতেন। তাঁদের মধ্যে 'আলকামা ও আসওয়াদ- এ দু'জনও ছিলেন। আবুল হুযায়ল জিজ্ঞেস করলেন, তা এ দু'জনের মধ্যে ভালো কে ছিলেন? তিনি 'আলকামার নামটি উচ্চারণ করলেন। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) নিজেই তো এ সনদ দান করেন যে, আমি যা কিছু পড়েছি, জেনেছি, তা সবকিছু 'আলকামা পড়ে ও জানে। এটাইতো 'আলকামার জ্ঞানের প্রশস্ততার সবচেয়ে বড় সনদ।

'আলকামার জ্ঞানগত পূর্ণতা এত স্বীকৃত ছিল যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের অনেকে তাঁর থেকে জ্ঞান লাভ করতেন। আর এটা একজন তাবি'ঈর জন্য অতি বড় সম্মান ও গৌরবের বিষয়। আবূ জাবয়ান বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) একাধিক সাহাবীকে 'আলকামার নিকট বিভিন্ন মাস'আলা জিজ্ঞেস করতে দেখেছি। তাঁরা তাঁর নিকট ফাতওয়াও জিজ্ঞেস করতেন।

অভ্যাস, স্বভাব-চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতায় তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে পাকের সত্তার অনুরূপ। ইবরাহীম বলেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্রে নবী কারীমের (সা) মত ছিলেন। আর 'আলকামা ছিলেন ইবন মাস'উদের (রা) মত। এভাবে 'আলকামা যেন রাসূলুল্লাহর (সা) অনুরূপ ছিলেন। অভ্যাস ও স্বভাব-বৈশিষ্ট্যে 'আলকামা ও ইবন মাস'উদের এত পরিমাণ মিল যে, যারা ইবন মাস'উদকে (রা) দেখেনি তারা 'আলকামার জীবন ও কর্মকে দেখে ইবন মাস'উদকে (রা) মনের আয়নায় কল্পনা করতে পারতো। এই মিল কেবল 'ইলম ও বাহ্যিক চাল-চলন ও স্বভাব-চরিত্রের মধ্যে সীমিত ছিল না, বরং 'আমলেও তাঁর ইবন মাস'উদের (রা) সাথে পূর্ণ সাদৃশ্য ছিল। এ কারণে তিনি "উলামা' রাব্বানিয়‍্যীন' বা আল্লাহ ওয়ালা 'আলিমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম যাবী লিখেছেন, তিনি সৎকর্মশীল ও খোদাভীরু লোক ছিলেন।

আল-কুরআনের সাথে তাঁর এক অস্বাভাবিক সম্পর্ক ও হৃদ্যতা ছিল। সাধারণতঃ পাঁচ দিনে তিনি একবার সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ শেষ করতেন। কখনো কখনো এক রাতেই সম্পূর্ণ কুরআন পড়ে ফেলতেন। ইবরাহীম বলেছেন, 'আলকামা একবার মক্কায় গেলেন। রাতে তিনি তাওয়াফ শুরু করলেন। প্রথম সাত চক্করে 'তিওয়াল' সূরা পাঠ শেষ করেন। দ্বিতীয় সাত চক্করে 'মি'ইন', তৃতীয় সাত চক্করে 'মাছানী' এবং চতুর্থ সাত চক্করে বাকী সূরা পাঠ শেষ করেন। এভাবে এক রাতে তাওয়াফ অবস্থায় সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত শেষ করেন।

কুরআনের সাথে তাঁর এত গভীর সম্পর্কের কারণে সব সময় তাঁর মুখ থেকে কুরআনের আয়াত বহমান থাকতো। প্রতিটি কাজ শুরু করার সময় যেখানে যে আয়াতটি প্রযোজ্য সেটি পাঠ করতেন। যেমন খাওয়ার সময় হলে স্ত্রীর নিকট খাবার চাইতেন এ আয়াত পাঠ করে: فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيًّا "তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।"

ঘোড়ায় চড়ার সময় জিনে পা রাখার মুহূর্তে তাঁর জিহ্বা থেকে বের হতো এ আয়াত: الْحَمْدُ لِلَّهِ، سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ .
"সকল প্রশংসা আল্লাহর। 'পবিত্র তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন এবং আমরা এদেরকে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমরা অবশ্যই আমাদের পালনকর্তার দিকে ফিরে যাব।"

জ্ঞান চর্চার সাথে সাথে জিহাদের প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনাও তাঁর মধ্যে ছিল। হিজরী ৩২ সনে আমীর মু'আবিয়ার (রা) সাথে তিনি কনস্টান্টিনোপল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ব্যাপারে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) একটি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। এ বাহিনীর সবাই সে বিজয়ের অংশীদার ও সাক্ষী হওয়ার জন্য শাহাদাতের প্রবল প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিলেন। মু'দিদ নামক একজন মুজাহিদ একটি কিল্লার উপর আক্রমণ করার সময় মাথায় বাঁধার জন্য 'আলকামার একটি চাদর চেয়ে নেন। এ মুজাহিদ শহীদ হন এবং 'আলকামার চাদরটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়।

'আলকামা এ চাদরটিকে অত্যন্ত মঙ্গলময় বলে মনে করতেন। সেটি কাঁধে ঝুলিয়ে জুম'আর নামাযে যেতেন এবং বলতেন, আমি এটি এজন্য কাঁধে ঝুলাই যে, এতে মু'দিদের খুনের স্পর্শ আছে।

তিনি খ্যাতি ও প্রচারকে খুব ভয় করতেন। এর থেকে দূরে থাকার জন্য পঠন-পাঠন কার্যক্রমের বিশেষ স্থানে বসা মোটেই পছন্দ করতেন না। 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন যে, আমরা 'আলকামাকে অনুরোধ করলাম, আপনি মসজিদে নামায পড় ন এবং নামাযের পর একটু বসুন। তাহলে আপনার কাছে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পারতাম। বললেন, এটা আমি পছন্দ করি না যে, মানুষ ইশারা করে বলুক- ইনি 'আলকামা। একদিন জুম'আর নামায আদায়ের জন্য মসজিদে গেলেন। ইমাম তখন খুতবা দিচ্ছেন। লোকেরা তাঁকে মসজিদের ভিতরে প্রবেশের জন্য অনুরোধ করলো। কিন্তু তিনি সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে দরজায় বসে পড়লেন।

আমীর-উমারা এবং রাষ্ট্রের উঁচু পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের প্রতি শুধু বেপরোয়া এবং তাঁদের থেকে দূরেই থাকতেন না, বরং তাঁদের সাথে মেলামেশা, উঠাবসা এবং তাঁদের নিকট যাতায়াত করাকেও নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর মনে করতেন। একবার লোকেরা বললো, আপনি আমীর-উমারার দরবারে যাতায়াত করুন। তাহলে তাঁরা আপনার প্রকৃত অবস্থা অবগত হবে এবং মর্যাদা বুঝবে। বললেন, আমি তাঁদের থেকে যত কথা দূর করবো এবং যত জিনিসের স্বল্পতা ঘটাবো তাঁরা তার চেয়ে বেশী জিনিস আমার মধ্য থেকে কম করে দেবে। অর্থাৎ আমি তাঁদের থেকে যে পরিমাণ দোষ-ত্রুটি দূর করবো, তার চেয়ে বেশী ভালো জিনিস আমার থেকে তাঁরা দূর করে দেবে। তিনি কেবল নিজে আমীর- উমারার সাথে মেলামেশা করতেন না, বরং অন্যদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতেন। আবু ওয়ায়িল বর্ণনা করেছেন। যখন বসরা ও কুফা দু'টি অঞ্চলই ইবন জিয়াদের শাসনাধীনে দেওয়া হয় তখন একবার তিনি আমাকে বললেন, তুমিও আমার সাথে একটু চলো। আমি গেলাম এবং 'আলকামার কাছে আমীর-উমারা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ঐ লোকদের থেকে তোমার যা অর্জন হবে তার চেয়ে বেশী জিনিস তারা তোমার থেকে নিয়ে নিবে। কোন প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবেও তিনি আমীরদের দরবারে যাওয়া পছন্দ করতেন না। একবার হযরত আমীর মু'আবিয়ার (রা) দরবারে যাবে, এমন একটি প্রতিনিধিদলের তালিকায় তাঁর নামটিও লিখে দেওয়া হয়। তিনি তা জানার সাথে সাথে আবু বুরদাকে লেখেন, আমার নামটি তালিকা থেকে বাদ দিন।

'আলকামা হিজরী ৬২ সনে কুফায় ইনতিকাল করেন। অন্তিম রোগ শয্যায় অসীয়াত করেন যে, আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে কালেমা তাইয়্যিবার তালকীন করবে যাতে আমার জিহ্বার শেষ উচ্চারণ হয়- لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ - এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, যাঁর কোন শরীক নেই। আমার মৃত্যুর খবর কাকেও পৌঁছাবে না। যাতে জাহিলী যুগের মত প্রচারের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। দ্রুত দাফন করবে। বিলাপকারিণী মহিলারা যেন লাশের অনুগামী না হয়।

টিকাঃ
১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৬
২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫৩
৩. তাবাকাত-৬/৫৯; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫৮
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪১
৫. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৪২
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
৭. তাবাকাত-৬/৬০
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
১০. তাবাকাত-৬/৫৮
১১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
১৩. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪৭৭
১৪. তাবাকাত-৬/৬০
১৫. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৭; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৮
১৭. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৪২
১৮. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৭
১৯. প্রাগুক্ত
২০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪১
২১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৭; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৩৮
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
২৩. তাবাকাত-৬/৬০; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৫৭
২৪. তাবাকাত-৬/৫৯
২৫. সূরা আন-নিসা'-৪
২৬. তাবাকাত-৬/৫৭, ৫৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৫৩
২৭. সূরা আয-যুখরুফ-১৩
২৮. ইবনুল আছীর: আল-কামিল ফিত তারীখ-৩/১০৩
২৯. তাবাকাত-৬/৫৯
৩০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫৮
৩১. তাবাকাত-৬/৫৯
৩২. প্রাগুক্ত
৩৩. প্রাগুক্ত-৬/৬০; হিলয়াতুল আওলিয়া'-২/১০১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মাসরূক ইবন আল-আজদা‘ (রহ)

📄 মাসরূক ইবন আল-আজদা‘ (রহ)


হযরত মাসরূকের ডাক নাম আবূ 'আয়িশা। তাঁর পিতার নাম আল-আজদা'। এটা ছিল তাঁর জন্মের পর পিতা-মাতা প্রদত্ত নাম। ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁর পিতার নাম হয় 'আবদুর রহমান। তিনি ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত খান্দান হামাদানের একজন নেতা এবং আরবের অন্যতম খ্যাতিমান পুরুষ 'আমর ইবন মা'দিকারিব-এর প্রীতিভাজন ব্যক্তি। ইমাম যুহরী মাসরূককে 'আমরের ভাগ্নে বলে উল্লেখ করেছেন।

মাসরূক জাহিলী ও ইসলামী দু'যুগই পেয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (সা)-এর রিসালাতের সময়কালেও তিনি বর্তমান ছিলেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা সে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনকি তাঁর অতি আপনজন 'আমর ইবন মা'দিকারিব (রা) মদীনায় এসে হযরত রাসূলের কারীমের (সা) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু মাসরূকের দুর্ভাগ্য যে, এ সময় ইসলাম গ্রহণ থেকে তিনি বঞ্চিত থেকে যান। তিনি কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফাতকালে তিনি মুসলমান হন বলে কিছু কিছু বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়। ইবন সা'দের তাবাকাতে মাসরূকের নিজের এ রকম একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, 'আমি আবূ বকরের (রা) পিছনে নামায পড়েছি।'

হযরত 'উমার ফারুকের (রা) খিলাফতকালে মাসরূককে দৃশ্যপটে দেখা যায়। সে সময় একবার ইয়ামনী প্রতিনিধি দলের সাথে মদীনায় আসেন। হযরত 'উমার (রা) তাঁর পরিচয় জানতে চান। তিনি বলেন: আমি মাসরূক ইবন আল-আজদা'। 'উমার (রা) বলেন: আল-আজদা' তো শয়তানের নাম। এখন থেকে আপনি হবেন মাসরূক ইবন 'আবদির রহমান। আর এখান থেকেই তাঁর পিতার নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। এ রকম একটি বর্ণনাও আছে যে, হযরত 'উমার (রা) তাঁকে নয়, বরং তাঁর পিতাকে নাম জিজ্ঞেস করে আজদা'-এর স্থলে 'আবদুর রহমান নামটি প্রস্তাব করেন। যাই হোক না কেন, এ দু'টি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে পিতা-পুত্র দু'জনই মদীনায় এসেছিলেন। এ রকম একটি বর্ণনাও আছে যে, শিশু অবস্থায় তিনি চুরি হয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে পাওয়া যায়। তাই তাঁর নাম হয় 'মাসরূক'। যার অর্থ চুরি হয়ে যাওয়া।

মাসরূক ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত অশ্বারোহীদের অন্যতম ব্যক্তি। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি তাঁর তিন ভাই- 'আবদুল্লাহ, আবূ বকর ও মুনতাশার-এর সাথে বিখ্যাত কাদেসিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তাঁর তিন ভাই শাহাদাত লাভ করেন। আর অস্ত্র চালাতে চালাতে মাসরূকের হাত অবশ হয়ে যায় এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। এ আঘাতের চিহ সারা জীবন বিদ্যমান ছিল। যেহেতু এই চিহ টি ছিল তাঁর সাহস, বীরত্ব ও জীবন বাজি রাখার একটি সনদ, তাই এটাকে তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন এবং এটা মুছে যাওয়া মোটেই আশা করতেন না।

তবে তাঁর এ বীরত্ব ও বাহাদুরী ছিল ইসলামের সেবায় এবং ইসলাম বিরোধী শক্তির মুকাবিলায়। মুসলমানদের গৃহযুদ্ধে তাঁর তরবারি সবসময় কোষবদ্ধই ছিল। হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালের কোন বিদ্রোহ ও বিশৃংঙ্খলায় কোনভাবেই অংশগ্রহণ করেননি। ইসলামের একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে তিনি নিজের শহর কূফার অধিবাসীদের মদীনাবাসীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য সব সময় উৎসাহিত করতেন।

হযরত 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর যখন উটের যুদ্ধের তোড়াজোড় শুরু হয়ে যায় এবং সমর্থন ও সাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে হযরত 'আলী (রা) যখন হযরত হাসান (রা) ও 'আম্মার ইবন ইয়াসিরকে (রা) কুফায় পাঠান তখন এই মাসরূক সর্বপ্রথম তাঁদের সাথে মিলিত হন। তিনি 'আম্মার ইবন ইয়াসিরকে (রা) জিজ্ঞেস করেন: 'আবুল ইয়াকজান! আপনারা 'উছমানকে (রা) কোন কারণে শহীদ করেন? তিনি বলেন: আমার ইজ্জত আবরু নিয়ে টানাটানি ও আমাকে পিটুনির কারণে।

মাসরূক বলেন: আল্লাহর কসম! আপনারা যতখানি ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন তার চেয়ে বেশী বদলা নিয়ে ফেলেছেন। যদি আপনারা ধৈর্য ধরতেন, তাহলে সেটাই আপনাদের জন্য ভালো ছিল।'

উটের যুদ্ধের মাধ্যমে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়, সিফফীন যুদ্ধ পর্যন্ত তা চলমান ছিল। মাসরূক এর একটিতেও অংশগ্রহণ করেননি। হযরত 'আলীর (রা) সমর্থকদের বড় কেন্দ্র ছিল কৃষ্ণা। এখানে অবস্থান করে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখা ভীষণ কঠিন ব্যাপার ছিল। এ কারণে এ সময় তিনি কৃষ্ণা ছেড়ে কাযবীন চলে যান।

শা'বী বর্ণনা করেছেন, কোন একটি যুদ্ধেও মাসরূক 'আলীর (রা) সাথে ছিলেন না। পরবর্তীকালে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতো যে, আপনি 'আলীর (রা) সাথে ছিলেন না কেন? তিনি বলতেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, ধরে নাও আমরা একে অপরের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছি এবং উভয় পক্ষ অস্ত্র হাতে একে অপরকে হত্যা করে চলেছি, আর সেই সময় তোমাদের চোখের সামনে আসমানের কোন দরজা খুলে গেল এবং সেখান থেকে কোন ফেরেশতা বেরিয়ে এসে মুখোমুখি দু'টি সারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضِ مِّنْكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ، إِنَّ اللَّهَ بِكُمْ رَحِيمًا .
‘ওহে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ-সম্পদ খেয়ো না। তবে তোমাদের পরস্পরের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে খেতে পার। আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।’
তাহলে তার এ বলা উভয় পক্ষকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবে কিনা? লোকেরা জবাব দিত : নিশ্চয় বিরত রাখবে। তখন তিনি বলতেন, আল্লাহর কসম! তোমাদের জানা উচিত যে, আসমানের দরজা খোলা হয়েছে এবং সেখান থেকে একজন ফিরিশতা এসে তোমাদের নবীকে এ নির্দেশ শুনিয়ে গেছেন। আর তা মাসহাফে বিদ্যমান আছে এবং তা অন্য কিছু দ্বারা রহিত করা হয়নি।

‘আমির থেকে অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। মাসরূক আমাকে বললেন, যখন মু'মিনদের দু'টি দল পরস্পরের সাথে লড়াই করার জন্য মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, আর তখন আসমান থেকে কোন ফিরিশতা আত্মপ্রকাশ করে চিৎকার করে বলে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بِالْبَاطِلِ الخ
তখন তোমার কি ধারণা? তারা যুদ্ধ করবে, না যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে? আমি বললাম: তারা যদি অনুভূতিহীন জড় পাথর না হয় তাহলে অবশ্যই রণেভঙ্গ দেবে। আমার এ জবাব শুনে তিনি বললেন, আল্লাহর এক আসমানী বন্ধু উপরোক্ত নির্দেশ নিয়ে ধরাপৃষ্ঠে আল্লাহর আর এক বন্ধুর নিকট অবতরণ করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ যুদ্ধ থেকে বিরত হয়নি। অথচ না দেখে ঈমান আনা দেখার পর ঈমান আনার চেয়ে ভালো। আরেকটি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি শুধু নিজেই এ গৃহযুদ্ধ থেকে দূরে ছিলেন না, বরং মুসলিম জনগণকে বিরত রাখার জন্য সিফ্ফীনের যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্তও গিয়েছিলেন। তিনি বিবাদমান দু'টি দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উপরোক্ত উপদেশমূলক কথা শুনিয়ে তাদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সঠিক কথা এটাই যে, তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং কোনভাবেই সিফ্ফীনের রণক্ষেত্রে যাননি।

উমাইয়্যা খিলাফতকালে তিনি কিছুদিনের জন্য কাযী ছিলেন। হিজরী ৬৩ সনে তিনি ‘ওয়াসিত’ নামক স্থানে অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সারাটি জীবন তিনি এই নির্ভরতাকে আঁকড়ে থাকেন। পার্থিব ধন-সম্পদ তাঁর জীবনকে কখনো কলুষিত করতে পারেনি। বিচারকের দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি কোন পারিশ্রমিক নিতেন না। এ জন্য কাফনের কাপড় পর্যন্ত কেনার পয়সা তাঁর ঘরে ছিল না। শা'বী বলেছেন, মাসরূক মৃত্যুর সময় কাফনের কাপড় কেনার মত অর্থও রেখে যাননি। তার জন্য তিনি ঋণ করার অসীয়াত করে যান। তবে একথাও বলে যান যে, কৃষি পেশার লোক এবং রাখালদের থেকে নিবে না। বরং যারা গৃহপালিত প্রাণী পালন করে, অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করে তাদের থেকে নিবে। একেবারে শেষ নিঃশ্বাসের আগে তিনি আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের দরবারে এভাবে দু'আ করেন: 'হে আল্লাহ! আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবূ বকর (রা) ও 'উমারের (রা) সুন্নাতের পরিপন্থী কোন পথ ও পদ্ধতির উপর মরছি না। আল্লাহ, তোমার কসম! আমি আমার তরবারিটি ছাড়া কোন মানুষের নিকট কোন সোনা-রূপো রেখে যাচ্ছি না। এর দ্বারাই আমার কাফন-দাফন করবে।' এ কথা দ্বারা সম্ভবতঃ তিনি তরবারিটি বিক্রি করে কাফনের অর্থ সংগ্রহের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন।

এসব অসীয়াত তথা অন্তিম উপদেশবাণী দান করার পর তিনি ওয়াসিত-এ হিজরী ৬৩ সনে ইনতিকাল করেন। সেখানেই দাফন করা হয়।

তাঁকে তাবি'ঈ 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের তীব্র বাসনা দেখা যায়। শা'বী বর্ণনা করেছেন, মাসরূকের চেয়ে জ্ঞান অন্বেষণকারী আর কেউ ছিল না। সৌভাগ্যবশতঃ তিনি হযরত 'আয়িশার (রা) মত স্নেহময়ী বিদুষী মা লাভ করেছিলেন। তিনি মাসরূককে ছেলের মত দেখতেন এবং ছেলের মত স্নেহ করতেন। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। কিন্তু এসব বর্ণনা ঠিক নয়। তবে তিনি মাসরূককে অতি বেশী স্নেহ করতেন এবং তাঁকে 'আমার ছেলে' বলে ডাকতেন। মাসরূক যখন হযরত 'আয়িশার (রা) দরবারে উপস্থিত হতেন তখন তিনি তাঁকে মধুর শরবত পান করাতেন। একবার মাসরূক কয়েকজন লোক সংগে করে হযরত 'আয়িশার (রা) কাছে আসেন। তিনি বাড়ীর লোকদের নির্দেশ দেন, আমার ছেলেদের জন্য মধুর শরবত বানাও। হযরত 'আয়িশা (রা) ছাড়াও মাসরূক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি ইবন মাস'উদের (রা) যোগ্যতম ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন। ইবন মাদাইনী বলেছেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) ছাত্র-সঙ্গীদের মধ্যে মাসরূকের উপর অন্য কাউকে প্রাধান্য ও গুরুত্ব দিই না।

মাসরূকের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সাধনা এবং উপরে উল্লেখিত মহান দু'ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সাহচর্য তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ 'আলিমে পরিণত করে। ইমাম যাত্রী তাঁকে একজন ফকীহ্ ও শ্রেষ্ঠ 'আলিম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর মহত্ব, বিশ্বস্ততা, মর্যাদা এবং ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সবাই একমত। মুররা তো বলতেন, 'হামাদান গোত্রের কোন নারী মাসরূকের মত দ্বিতীয় কোন সন্তান জন্ম দিতে পারেনি।

হাদীছ ও সুন্নাহতে মাসরূকের জ্ঞান অনেক গভীর ও ব্যাপক ছিল। এ জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন সরাসরি বহু উঁচু স্তরের সাহাবীর নিকট থেকে। যেমন: হযরত 'আয়িশা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবূ বকর (রা), 'উমার (রা), 'উছমান (রা), 'আলী (রা), মু'আয ইবন জাবাল (রা), উবাই ইবন কা'ব (রা), যায়েদ ইবন ছাবিত (রা), খাব্বাব ইবন আরাত (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা), মুগীরা ইবন শু'বা (রা) ও আরো অনেকে। হাদীছের সাথে সাথে তিনি সুন্নাহ্ও শিক্ষা দিতেন।

ফিকাহ্ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এ শাস্ত্রে তিনি ইমাম ও ইজতিহাদের মর্যাদা ও যোগ্যতা লাভ করেন। তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সেইসব শিষ্য- শাগরিদদের মধ্যে ছিলেন যাঁদের কাজই ছিল দারস ও ইফতা (শিক্ষা ও ফাতওয়া দান)। বিচার কাজে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাযী শুরায়হ অনেক সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। শা'বীর মতে ফাতওয়ার ক্ষেত্রে মাসরূক কাযী শুরায়হ-এরও উপরে ছিলেন। কাযী শুরায়হ তাঁর পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করতেন। কিন্তু মাসরূকের তাঁর পরামর্শের প্রয়োজন পড়তো না।

ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর এই বিশেষ যোগ্যতার কারণে বিচার-ফায়সালায় ছিল তাঁর বিশেষ ঝোঁক ও রুচি। এ কাজ তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি যে একজন যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন তার প্রমাণ হলো কাযী শুরায়হ তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। উমাইয়্যা খিলাফতকালে তিনি কিছুদিনের জন্য কাযীর দায়িত্ব পালনও করেন। বিচার-ফায়সালায় তাঁর এত বেশী আগ্রহ ছিল যে, তিনি বলতেন, আমার কাছে একটি বিবাদে সত্য-সঠিক ফায়সালা করা এক বছর 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' (আল্লাহর পথে জিহাদ) থেকে বেশী পছন্দ।

'ইলমের সাথে সাথে মাসরূকের মধ্যে 'আমলও ছিল। তিনি উন্নত নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। যাবতীয় নৈতিক গুণের উৎস হলো খোদাভীতি। তিনি খাওফে খোদা বা খোদাভীতিকে প্রকৃত জ্ঞান বলে বিশ্বাস করতেন। আর তার বিপরীতে 'আমল বা কর্মের অহঙ্কারকে মূর্খতা জ্ঞান করতেন। তিনি বলতেন: 'মানুষের জন্য এই জ্ঞান যথেষ্ট যে, সে আল্লাহকে ভয় করে। আর নিজের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করাটাই মূর্খতা।'

তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞান আহরণের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও আবেগ পোষণ করতেন। ইমাম শা'বী তাঁর এমন একটি ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন যা দ্বারা তাঁর আগ্রহের তীব্রতা অনুমান করা যায়। তিনি বলেছেন: মাসরূক একবার বসরায় এক ব্যক্তির কাছে গেলেন একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য। কিন্তু তাঁর কাছে তেমন কোন জ্ঞান লাভ করতে পারলেন না। সেখান থেকে তাঁকে বলা হলো, আমাদের এখানে শামের এক ব্যক্তি আসেন তাঁর কাছে এ সম্পর্কিত জ্ঞান আছে। সেখান থেকে মাসরূক সেই ব্যক্তির খোঁজে শামের পথ ধরেন। প্রিয় পাঠক! বসরা থেকে শাম নিকটের কোন দূরত্ব ছিল না। এ ছিল বহু দিন ও বহু কষ্টের পথ। একটি মাত্র আয়াত সম্পর্কে জানার জন্য তিনি এ পথ পাড়ি দিয়েছেন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি সীমাহীন আগ্রহ ও শক্ত অঙ্গীকার ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়।

তিনি একজন বড় 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। ইবাদাতের কঠিন অনুশীলন করতেন। ক্রমাগতভাবে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা দু'টি ফুলে যেত। বছরের বিশেষ বিশেষ সময় তাঁর ইবাদাত অত্যধিক বেড়ে যেত। কোথাও 'তাউন'-এর মহামারী দেখা দিলে তিনি নির্জন স্থানে গিয়ে 'ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। অনেকে সন্দেহ করতো তিনি হয়তো তা'উন-এর ভয়ে লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আসলে তা নয়। তাঁর উদ্দেশ্য হতো একাগ্র চিত্তে 'ইবাদাতে নিমগ্ন থাকা। আনাস ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন, আমরা জানতে পেলাম যে, মাসরূক তা'ঊন থেকে পালাতেন। কিন্তু মুহাম্মাদ একথা বিশ্বাস করলেন না। তিনি বললেন, বিষয়টি তাঁর স্ত্রীর নিকট জিজ্ঞেস করা উচিত। আমরা একদিন তাঁর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! ব্যাপারটি তা নয়। তিনি কখনো 'তা'উন' থেকে পালাতেন না। তবে যখন তা'ঊন-এর মহামারি দেখা দিত, তিনি বলতেন, এই যিক্র ও আমলের দিনগুলোতে আমি চাই নিরিবিলিতে 'ইবাদাত করতে। তারপর তিনি শুধুমাত্র 'ইবাদাতের জন্য নির্জনতা অবলম্বন করতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজের উপর এত কঠিন কাজ চাপিয়ে দিতেন যে, অনেক সময় আমি তা দেখে তাঁর পিছনে বসে কাঁদতে শুরু করতাম। হজ্জের সময় যতদিন মক্কায় থাকতেন, সিজদার মধ্যেই ঘুমের কাজ সেরে নিতেন। মাসরূকের স্ত্রীর নাম ছিল ফায়রূয। একবার তিনি যখন দেখলেন মাসরূক একাধারে রোযা রেখেই চলেছেন তখন তিরস্কারের সুরে বললেন: মাসরূক! আপনি ছাড়া আর কেউ কি আল্লাহর 'ইবাদাত করে না? জাহান্নাম কি কেবল আপনার জন্য তৈরী করা হয়েছে? জবাবে মাসরূক বললেন: ফায়রূয! জান্নাতের সন্ধানকারী ব্যক্তি ক্লান্ত হয় না, আর জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী ঘুমায় না।

তিনি নিজের নফসের মুহাসাবা বা আত্ম সমালোচনা এবং পাপ স্মরণ করে তার জন্য ইসতিগফার করা অত্যন্ত জরুরী মনে করতেন। তিনি বলতেন, মানুষের জন্য এমনসব মজলিস থাকা উচিত যেখানে বসে তারা নিজেদের পাপকে স্মরণ করে আল্লাহর নিকট ইসতিগফার করতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোন মূল্যই ছিল না। তিনি দুনিয়াকে ময়লা-আবর্জনার চেয়ে বেশী কিছু মনে করতেন না। একদিন তিনি তাঁর এক ভাতিজার হাত ধরে একটি ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থানে নিয়ে যান। তাকে বলেন, আমি তোমাকে দুনিয়া ফি তা দেখাচ্ছি। দেখ, এই হচ্ছে দুনিয়া। এসব কিছু খেয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, পরে পুরানো ও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, এর পিঠে আরোহণ করে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আর এর জন্য কত না রক্ত ঝরিয়েছে, আল্লাহর হারামকে হালাল করেছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

আর এ কারণে দুনিয়ার প্রতি তাঁর অন্তর কখনো ঝোঁকেনি এবং পার্থিব কোন জিনিসের প্রতিও তাঁর কোন আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়র ছিলেন তাঁর সম- চিন্তা ও সম-মতের মানুষ। তাঁদের মধ্যে অনেক রহস্যময় ও গূঢ় কথাবার্তা হতো। ইবন যুবায়র বলেছেন, মাসরূক একদিন আমাকে বললেন, সা'ঈদ! এখন এমন আর কোন জিনিস নেই যার প্রতি অন্তরের আকর্ষণ থাকতে পারে। শুধু এটাই আছে যে, নিজের চেহারাকে ধুলি মলিন করি।

দুনিয়ার প্রতি তাঁর এমন বীতস্পৃহ ভাবের কারণে দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব থেকে সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। বহু মানুষ তাঁর প্রয়োজন পূরণ করতে এবং তাঁর সেবায় নিয়োজিত হতে চাইতো, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতেন না। একবার খালিদ ইবন উসায়দ তাঁর নিকট তিরিশ হাজার দিরহাম পাঠালেন। তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফেরত দিলেন। তাঁর আত্মীয়-বন্ধুরা তাঁকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করলেন যে, আপনি গ্রহণ করে তা সাদাকা করে দিন। আত্মীয়-বন্ধুদের দান করুন এবং অন্য সব ভালো কাজে লাগান। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে রাজী করাতে পারলেন না।

এই তীব্র আত্ম-নির্ভরতা ও অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষীহীনতা কখনো কখনো তাঁকে পরিবারসহ অভুক্ত অবস্থার মধ্যে ফেলে দিত। এমতাবস্থায়ও তাঁর প্রগাঢ় আল্লাহ- নির্ভরতায় কোন রকম ফাটল ধরতো না। একদিন ঘরে খাবার মত কিছুই ছিল না। স্ত্রী জানান দিলেন, 'আয়িশার বাপ, আজ আপনার ছেলে-মেয়েদের খাবার মত ঘরে কিছু নেই। একথা শুনে মাসরূক একটু হেসে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! তিনি অবশ্যই তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করবেন।

এত অল্পে তুষ্টি ও আল্লাহ নির্ভরতার ভিতর দিয়েও তিনি ছিলেন একজন দরাজদিল দানশীল ব্যক্তি। কোন সময় কোনভাবে হাতে কিছু পয়সা-কড়ি এলেই সাথে সাথে আল্লাহর ওয়াস্তে বিলিয়ে দিতেন। সায়িব ইবন আকরা'র সাথে এক মেয়ের বিয়ে দেন। সায়িব শ্বশুরের হাতে দশ হাজার দিরহামের মত মোটা একটি অংক তুলে দেন। তিনি তার সবই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ, গরিব-দুঃখী মানুষ ও দাসমুক্তি প্রভৃতি খাতে ব্যয় করেন।

তিনি সব রকম কথা ও কাজে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নৌকা বা জাহাজে যদি উঠার প্রয়োজন হতো তাহলে উঠার সময় একটি ইট হাতে নিয়ে উঠতেন। নামাযের সময় তার উপর সিজদা করতেন। কারো কোন কাজ যদি তাঁর কথায় বা সুপারিশে হতো তিনি তার কাছ থেকে কোন উপহার-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। একবার একটি ব্যাপারে কোন এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন। লোকটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ তাঁকে একটি দাসী দান করতে চান। তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। লোকটিকে তিনি বলেন, তোমার মন-মানসিকতা এমন তা যদি আগে আমি জানতাম তাহলে তোমার জন্য কখনো সুপারিশ করতাম না। যতটুকু সুপারিশ করেছি, তাতো করেই ফেলেছি। এখন যতটুকু প্রয়োজন বাকী আছে আমি তার জন্য আর কোন কিছুই বলবো না। আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) মুখ থেকে শুনেছি। যে ব্যক্তি কারো হক আদায় করে দেওয়া, অথবা যুলুম-অত্যাচার বন্ধ করার জন্য কারো কাছে সুপারিশ করে, আর তার বিনিময়ে যদি তাকে উপহার-উপঢৌকন দেওয়া হয় এবং সুপারিশকারী তা গ্রহণ করে তাহলে সেই উপহার-উপঢৌকন তার জন্য হারাম হবে।

'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ একবার কূফায় এসে জিজ্ঞেস করলেন : সবচেয়ে ভালো মানুষ কে? লোকেরা বললো : মাসরূক ইবন আল-আজদা'।

ইমাম আল-আসমা'ঈ ইবন 'আওনের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইবন 'আওনের শিক্ষকরা বলাবলি করতেন যে, তাবি'ঈদের আট ব্যক্তি পর্যন্ত এসে যুহদ তথা খোদাভীতি ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাঁরা হলেন : 'আমির ইবন 'আবদিল কায়স, আল-হাসান ইবন আবিল হাসান আল-বসরী, হারিম ইবন হায়্যান, আবু মুসলিম আল-খাওলানী, উওয়ায়িস আল-কারানী, আর-রাবী' ইবন খুছায়ম, মাসরূক ইবন আল-আজদা' ও আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৯
২. তাবাকাত-৫/৩৮২
৩. আবূ দাউদ-৪৯৫৭; মুসনাদে আহমাদ-১/৩১; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৩০১
৪. তাবাকাত-৬/৫০
৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৬২-
৬. তাবাকাত-৬/৫২
৭. আল-কামিল ফিত তারীখ-৩/১২৭
৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৫
৯. প্রাগুক্ত-৩/২৩০
১০. সূরা আন-নিসা'-২৯
১১. তাবাকাত-৬/ ৫১-৫২
১২. প্রাগুক্ত-৬/৫৫
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৯
১৪. তাহযীবুল আসমা'-১/৮৮
১৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ/১৪৯; তারীখু ইবন 'আসাকির-৬/২১০
১৬. তাবাকাত-৬/৫২
১৭. তাযকিরাতুল হুফফ্ফাজ-১/৪২
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাহযীবুল আসমা'-১/৮৮
২০. তাবাকাত-৬/৫২
২১. তাহযীবতু তাহযীব-১০/১১০
২২. প্রাগুক্ত-১০/১১১
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৩
২৪. প্রাগুক্ত-১/৪৯
২৫. তাবাকাত-৬/৫৫
২৬. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৬৪
২৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৯৫
২৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৬৩
২৯. তাবাকাত-৬/৫৪
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৯
৩১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৬৮
৩২. তাবাকাত-৬/৫৫
৩৩. প্রাগুক্ত-৬/৫৩, ৫৪
৩৪. প্রাগুক্ত-৬/৫৩
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/৫৩
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/৫৪
৩৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭০
৩৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৭১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মুহাম্মাদ ইবন সীরীন (রহ)

📄 মুহাম্মাদ ইবন সীরীন (রহ)


বিখ্যাত তাবি'ঈ মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের ডাকনাম আবূ বকর। পিতা সীরীন ছিলেন ইরাকের 'জারজারায়া'র অধিবাসী', তামা-পিতলের একজন দক্ষ কারিগর। হাড়ি-পাতিল তৈরীর পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। 'আইনুত্ তামার-এ তাঁর দোকান ছিল। 'আইনুত তামার-এর যুদ্ধে আরো অনেক অনারবের সাথে সীরীনও মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং ভাগের সময় কোন এক মুজাহিদের অংশে পড়েন। পরে তিনি প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) দাসে পরিণত হন। অনেকে ধারণা করেছেন, তিনি ভাগের সময় আনাসের (রা) অংশে পড়ে থাকবেন, অথবা আনাস পরে অন্য কোন মুজাহিদের নিকট থেকে তাঁকে কিনে নেন। যাই হোক, সীরীন হযরত আনাসের একজন দাস ছিলেন। সেহেতু তিনি একজন দক্ষ ধাতব কারিগর ছিলেন, তাই প্রচুর অর্থ রোজগার করতেন। মনিব আনাসের (রা) সাথে মুকাতাবা বা মুক্তির চুক্তি করেন। আনাসকে (রা)। তিনি বিশ অথবা চল্লিশ হাজার দিরহাম দেন এবং বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন।

সীরীন দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভের পর তামা-পিতল শিল্পের কাজে আরো মনোযোগী হন। আয়-রোগজার আরো বেড়ে যায়। অল্প দিনের মধ্যে প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে যান। এবার তিনি দীনের বাকী অংশ পূরণ করার উদ্দেশ্যে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) 'সাফিয়্যা' নাম্নী একদাসী ছিল। সাফিয়্যা ছিলেন সুন্দরী, বুদ্ধিমতি, চালাক-চতুর ও চমৎকার গুণ-বৈশিষ্ট্যের অধিকারিনী এক যুবতী। তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও মার্জিত ভদ্র আচরণ তাঁকে মদীনার সব শ্রেণীর মহিলার প্রিয়পাত্রী করে তোলে। মদীনার যে মহিলাই তাঁর সাথে পরিচিত হতো, তাঁকে ভালোবাসতো। তখন পর্যন্ত জীবিত উম্মাহাতুল মু'মিনীন তথা রাসূলুল্লাহর (সা) বেগমগণ, বিশেষতঃ উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) অতি আদরের পাত্রী ছিলেন। সীরীন তাঁর জীবন-সঙ্গীনী হিসাবে এই সাফিয়‍্যাকে নির্বাচন করেন।

সীরীনের পক্ষ থেকে হযরত আবু বকরের (রা) পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব গেল। সাফিয়্যা এ পরিবারের দাসী হলেও তাঁকে তাঁরা মেয়ের মত করে মানুষ করেছেন। তাঁরা পাত্রের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে আরম্ভ করলেন। তাঁরা সীরীনের আগের মনিব আনাস ইবন মালিকের নিকট আসলেন। তাঁর কাছে সীরীনের স্বভাব-চরিত্র, আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আনাস (রা) সাফিয়্যার মনিব পরিবারকে বললেন, আপনারা সাফিয়্যাকে সীরীনের হাতে তুলে দিতে ভয় করবেন না। আমি তাঁকে সঠিক দীনদার, অতি চরিত্রবান এবং যথেষ্ট ব্যক্তিত্বের অধিকারী দেখেছি। খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ তাঁকে 'আইনুত তামার যুদ্ধে বন্দী করার পর সে চল্লিশ জন বন্দীর সাথে মদীনায় আসে। আর তখন থেকেই সে আমার সাথে ছিল। সাফিয়‍্যার পরিবার রাজী হয়ে গেল। এমন একটি চমৎকার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয় যে, মদীনার খুব কম মেয়ের বিয়েতে তেমন হতে দেখা গেছে। বিরাট সংখ্যক সাহাবী (রা) এই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে বদরী সাহাবী ছিলেন আঠারো জন। তাঁদের শুভ ও কল্যাণ কামনা করে দু'আ করেন কাতিবে ওহী হযরত উবাই ইবন কা'ব (রা)। কনেকে সাজ-গোজ করিয়ে স্বামী-গৃহে পাঠান তিন জন উম্মাহাতুল মু'মিনীন। এই শুভ ও মঙ্গলময় বিয়ের মাধ্যমে যে পরিবারটি গড়ে ওঠে সেখানে খলীফা হযরত উছমানের খিলাফতের শেষের দিকে হিজরী ৩৩ সনে মুহাম্মাদ ইবন সীরীন জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি হন একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আলিম তাবি'ঈ।

হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) ব্যক্তিত্বটি এমনই ছিল যে, যে কেউ তাঁর কাছে সামান্য কিছু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ পেয়েছে সে 'ইলম ও 'আমলের একজন বড় উত্তরাধিকারী হয়ে গেছে। ইবন সীরীনের সৌভাগ্য যে, এই মহান সাহাবীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ দিন থাকার সুযোগ লাভ করেন। আনাস ইবন মালিক ছাড়াও তিনি হযরত আবূ হুরাইরার (রা) সুহবতের সুযোগও বেশীমাত্রায় গ্রহণ করেন। তাঁকে আবূ হুরাইরার (রা) শিষ্য-সাগরিদদের মধ্যে গণ্য করা হয়। তিনি তাবি'ঈ শিরোমণি হযরত হাসান বসরীর (রা) সাহচর্যেও দীর্ঘদিন কাটান। এই সব মহান ব্যক্তির সাহচর্যের কল্যাণে তিনি 'ইলম ও 'আমলের এক বাস্তব প্রতিকৃতিতে পরিণত হন। ইবন সা'দ লিখেছেন :
كان ثقة مأمونا عاليا رفيعا فقيها إماما كثير العلم ورعا.
তিনি ছিলেন একজন বিশ্বস্ত, আস্থাভাজন, অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ইমাম, ফকীহ, বহু জ্ঞানের আধার ও খোদাভীরু মানুষ।

ইমাম যাহবী লিখেছেন :
كان فقيها إماما غزير العلم ثقةً ثبتًا علامة التفسير رأسا في الورع .
- তিনি ছিলেন একজন ফকীহ্, ইমাম, বহু জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিশ্বস্ত, সুদৃঢ়, তাফসীর শাস্ত্রের মহাজ্ঞানী ও খোদাভীরুতার প্রধান।

সে যুগের প্রায় সকল শাস্ত্রে তাঁর সমান দক্ষতা ছিল। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তিনি তাফসীর, হাদীছ, ফিকাহ্, স্বপ্নের তা'বীর ইত্যাদি শাস্ত্রসমূহের ইমাম ছিলেন। ইবন সীরীন ছিলেন হযরত আনাসের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, হযরত আবূ হুরাইরার (রা) বিশেষ শাগরিদ এবং হযরত হাসান আল বসরীর (রহ) মজলিসে বসা মানুষ। তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন 'ইলমে হাদীছের এক একজন দিকপাল। তাছাড়া আরো বহু সাহাবীর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁদের কয়েকজন হলেন: যায়িদ ইবন ছাবিত (রা), হুযাইফা ইবন ইয়ামান (রা), ইবন 'উমার, ইবন 'আব্বাস, হাসান ইবন 'আলী (রা), জুনদুব ইবন 'আবদিল্লাহ (রা), রাফি' ইবন খাদীজ (রা), সুলাইমান ইবন 'আমির (রা), সামুরা ইবন জুনদুব (রা), 'উছমান ইবন আবিল 'আস (রা), 'ইমরান ইবন হুসাইন (রা), কা'ব ইবন 'আজরাহ্ (রা), মু'আবিয়া (রা), আবূ দারদা' (রা), আবু সা'ঈদ খুদরী (রা), আবূ কাতাদা আনসারী (রা), আবূ বাকর ছাকাফী (রা), উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), ও আরো অনেকে।

তাবি'ঈদের বড় একটি দলের নিকট থেকেও তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁদের বিশিষ্ট কয়েকজন হলেন: 'আকরামা, শুরাইহ, হুমাইদ ইবন 'আবদির রহমান হিময়ারী, 'আবদুল্লাহ ইবন শাকীক, 'আবদুর রহমান ইবন আবী বাকরাহ্, কায়স ইবন 'আব্বাদ, মুসলিম ইবন ইয়াসার, ইউনুস ইবন জুবায়র, 'আমর ইবন ওয়াহাব, ইয়াহইয়া ইবন আবী ইসহাক হাদরামী, খালিদ আল-হাযরা' প্রমুখ। এ সব ব্যক্তির সূত্রে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। আর তাঁদের কল্যাণে তিনি হাদীছ শাস্ত্রের জ্ঞানের সাগরে পরিণত হন। ইবন সা'দ, ইমাম যাহ্বী, ইমাম নাওবী ও ইবন হাজার তাঁকে 'ইমামুল হাদীছ' বলে উল্লেখ করেছেন।

এত ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি হাদীছ শোনা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত রকমের সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তিনি সাধারণ স্তরের মানুষের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন ও হাদীছ শোনা ও গ্রহণ করা এই সতর্কতা পরিপন্থী কাজ বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, জ্ঞান হচ্ছে দীন। এ কারণে তা গ্রহণের পূর্বে ভালো রকম পরখ করে নাও যে, তা কার নিকট থেকে গ্রহণ করছো।

হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে এত সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, তিনি যে শব্দ শায়খের নিকট থেকে শুনেছেন হুবহু সেই শব্দে বর্ণনা করতেন। শুধু ভাব ও অর্থ বর্ণনা যথেষ্ট মনে করতেন না। এত সাবধানতার সাথে হাদীছ বর্ণনা করতেন যে, মনে হতো কোন জিনিস তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছেন। অথবা কোন কিছুর ভয় করছেন। আর এই সাবধানতার কারণে তিনি হাদীছ লেখাও পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, বই থেকে দূরে থাক। তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা বই এর কারণেই পথ ভ্রষ্ট হয়েছে। আমি যদি কোন জিনিসকে বই বানাতাম, তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) পত্রাবলীকে বানাতাম।

তবে হাদীছ মুখস্থ করার জন্য, এই শর্তে লেখা বৈধ মনে করতেন যে, মুখস্থ করার পরে আবার নষ্ট করে ফেলা হবে। বর্ণনা ও হাদীছ লেখা প্রসঙ্গে একটি মূল্যবান কথা তিনি বলতেন যে, কথা বলছে এমন কোন ব্যক্তি যদি জানে যে, জবাবদিহিতার জন্য তার সবকথা লেখা হচ্ছে, তাহলে সে কথা বলা কম করে দেবে। তাঁর একথার অর্থ হলো, সাধারণ কথাবার্তার ক্ষেত্রে একজন কথা বলতে থাকা মানুষ যদি জবাবদিহিতার ভয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে, তাহলে হাদীছের লেখালেখির ক্ষেত্রে তো অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, এর ভুল-ত্রুটিতে আরো বেশী ধর-পাকড় করা হবে। আর লেখালেখির ভুল- ত্রুটি চিরস্থায়ী রূপ লাভ করে।

হাদীছ বর্ণনায় তাঁর এই সাবধানতার কারণে হাদীছ বিশেষজ্ঞদের নিকট তিনি একজন অতি বড় সত্যবাদী এবং তাঁর বর্ণিত হাদীছ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃত। হিশাম ইবন হাসসান বলতেন, আমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী ইবন সীরীনকে পেয়েছি। হাদীছের অনেক বড় বড় ইমাম এ শাস্ত্রের উৎসাহী ছাত্রদেরকে ইবন সীরীনের সাথে সংযুক্ত থাকতে উপদেশ দিতেন। শু'আয়ব ইবন হাবহাব বলতেন, শা'বী আমাদেরকে ইবন সীরীনের আঁচল ধরে থাকতে উপদেশ দিতেন।

হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর ছাত্র-শাগরিদের সংখ্যা বিপুল। ইমাম শা'বী, ছাবিত, খলিদ আল-খাদ্দাদ, দাউদ ইবন আবী হিন্দা, ইবন 'আওন, জারীর ইবন হাযিম, 'আসিম আল আহওয়াল, কাতাদা, সুলাইমান আত-তাইমী, মালিক ইবন দীনার, ইমাম আওযা'ঈ, কুররাহ্ ইবন খালিদ, হিশাম ইবন হাসান, আবূ হিলাল আর-রাসিবী প্রমুখ তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ।

ফিকাহ্ শাস্ত্রেও তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। তিনি যে তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ ফকীহদের একজন ছিলেন এ ব্যাপারে সবাই একমত। ইবন সা'দ, হাফেজ যাহ্বী, ইমাম নাওবী, ইবন হাজার প্রমুখ পণ্ডিতগণ ফিকাহ শাস্ত্রে তিনি যে ইমাম ছিলেন তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইবন হিব্বান বলেন, ইবন সীরীন ছিলেন একজন ফকীহ, মর্যাদাবান হাফেজ ও দক্ষ ব্যক্তিত্ব।

ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর উৎকর্ষতার ভিত্তিতে বিচার-ফায়সালায়ও তিনি দক্ষ ছিলেন। 'উছমান আল-বাত্তি বলেন, এ অঞ্চলে ইবন সীরীনের চেয়ে বড় কোন বিচার-ফায়সালার 'আলিম ছিলেন না। বিচার-ফায়সালায় তার দক্ষতার কারণে তাঁকে কাজীর পদটি গ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। এই পদে তাঁকে জোর করে নিয়োগ দেওয়া হবে ভেবে ভয়ে শামে পালিয়ে যান। অনেক দিন পালিয়ে থাকার পর আবার মদীনায় ফিরে আসেন।

বিভিন্ন মাসআলার জবাব ও ফাতওয়া দান কালে তিনি অতিরিক্ত সাবধানতা অথবা ভয়ের কারণে হতবুদ্ধি হয়ে পড়তেন। তখন তাঁর অবস্থা একেবারে পাল্টে যেত। আশ'আছ বলেছেন, আমরা যখন ইবন সীরীনের কাছে বসতাম, তিনি কথাও বলতেন, হাসতেনও, কুশলও জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু যেই না তাঁর কাছে ফিকাহর কোন মাসআলা, অথবা হারাম-হালাল বিষয়ক কোন কথা জানতে চাওয়া হতো অমনি তাঁর রূপ পাল্টে যেত। আর এটা বুঝাই যেত না যে, একটু আগে এই ব্যক্তি হাসিমুখে কথা বলছিলেন। ইবন 'আওন বলেছেন, একবার আমি একটি মাসআলায় ইবন সীরীনের শরণাপন্ন হলাম। জবাবে তিনি বললেন : আমি একথা বলছি যে, এতে কোন অসুবিধে নেই; বরং আমি এতে কোন অসুবিধে বুঝতে পারছিনে।

তাঁর যুগের অনেক বড় বড় 'আলিম ও বিশেষজ্ঞ তাঁকেই তাদের সময়ের শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানী মনে করতেন। ইবন 'আওন বলতেন, গোটা পৃথিবীতে তিন ব্যক্তির জুড়ি মেলা কষ্টসাধ্য। ইরাকে ইবন সীরীনের, হিজাযে কাসিম ইবন মুহাম্মাদের এবং শামে রাজা' ইবন হায়ওয়ার। আর এই তিনজনের মধ্যে ইবন সীরীন ছিলেন বসরার সবচেয়ে বড় খোদাভীরু ফকীহ, জ্ঞানী, দক্ষ হাফিজ এবং স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যাকার। ইবন 'আওন আরো বলতেন: আমার দু'চোখ ইবন সীরীন, আল কাসিম ও রাজা' ইবন হায়ওয়ার সমকক্ষ কাউকে দেখেনি।

ইবন সীরীনের জাত বা সত্তাটি ছিল 'ইলম ও 'আমলের সন্ধিস্থল। তাঁর মধ্যে যে পরিমাণ 'ইলম ছিল, ঠিক সেই পরিমাণ 'আমলও ছিল। তিনি তাঁর যুগের একজন বড় 'আবিদ ও খোদাভীরু বুযর্গ ছিলেন। ইবন সা'দ লিখেছেন, তিনি বহু জ্ঞানের ভাণ্ডার ও খোদাভীরু ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম আয-যাহ্বী লিখেছেন, তিনি খোদাভীরুদের নেতা ছিলেন। খতীব আল-বাগদাদী বলেছেন, তিনি ছিলেন খোদাভীরু ফকীহদের একজন। আল-'ইজলী বলেছেন, আমি কাউকে খোদাভীরুতায় তাঁর চেয়ে বড় ফকীহ্ এবং ফিকায় তাঁর চেয়ে বড় খোদাভীরু দেখিনি। ইবন সীরীন বলতেন, খোদাভীরুতা খুবই সহজ জিনিস। একব্যক্তি একবার প্রশ্ন করলো, সেটা কেমন করে? বললেন, যে জিনিসে সন্দেহ হবে তা পরিহার করবে।

একদিন এক যুবক ইবন সীরীনের ঘরে বসে আছে। এক সময় সে ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে বলে : জনাব, এই যে একটি ইট আরেকটি ইটের চেয়ে উঁচু- এ ব্যাপারে আপনি কি বলেন? ইবন সীরীন বললেন : ভাতিজা! বেশী দেখা বেশী কথার জন্ম দেয়। ইবন সীরীনের তাকওয়া-খোদাভীতি সেকালে প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। লোকেরা দৃষ্টান্ত হিসেবে তা উল্লেখ করতো। যেমন একজন কবি বলেছেন :
فأنت بالليل ذئب لاحريم له + وبالنهار على سَمْتِ ابن سِيرِينَ .

- রাতের বেলা তুমি একজন নেকড়ে- যার কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। আর দিনের বেলা ইবন সীরীনের মত খোদাভীরু।

ইবন সীরীন বলতেন, আমি কখনো কোন কিছুর জন্য কারো প্রতি হিংসা করিনি। স্বভাবগতভাবে তিনি প্রফুল্লমুখ ও হাসি-খুশী মেজাজের ছিলেন। কিন্তু তাঁর অন্তর খোদাভীতিতে পূর্ণ ছিল। ইউনুস বর্ণনা করেছেন, ইবন সীরীন হাসিমুখ ও ঠাট্টা-কৌতুক প্রিয় মানুষ ছিলেন। কিন্তু অন্তরের কোমলতা ও খোদাভীতির এমন অবস্থা ছিল যে, প্রকাশ্যে তাঁর ঠোঁট দু'টি তো হাসতো; কিন্তু নির্জন ও একাকীত্বের সময় তাঁর চোখ দু'টো অশ্রু-ভেজা থাকতো।

হিশাম ইবন হাসান বলেছেন, একবার আমরা কিছু লোক ইবন সীরীনের গৃহে অবস্থান করছিলাম। দিনের বেলায় তাঁকে হাসি-খুশী দেখতাম এবং রাতের অন্ধকারে তাঁর কান্নার আওয়ায শুনতে পেতাম। মৃত্যুর আলোচনার সময় তাঁর উপর মৃত্যুর মত অবস্থার সৃষ্টি হতো। যুহাইর আল-আকতা 'বর্ণনা করেছেন। ইবন সীরীন যখন মৃত্যুর কথা আলোচনা- করতেন তখন তার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন মারা যেত। সেকালে একথা বলা হতো যে, 'ফিকাহতে হাসান আল বসরী, তাকওয়া-খোদাভীতিতে ইবন সীরীন, বুদ্ধি-জ্ঞানে মুতারিফ ও মুখস্থ শক্তিতে কাতাদা।'

'আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তিনি পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সরল-সোজা ও কলুষমুক্ত 'আকীদার অনুসারী। এ ক্ষেত্রে যুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নতুনত্ব মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর যুগের 'কদর' তথা নিয়তিবাদের চর্চা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি এটাকে খুবই অপছন্দ করতেন। তিনি এর কোন আলোচনা বা কথা শোনা সহ্য করতে পারতেন না। ইবন 'আওন বলেছেন, একবার এক ব্যক্তি ইবন সীরীনের নিকট এসে 'কদর' সম্পর্কিত কিছু কথা বলে। তিনি তার জবাবে এ আয়াতটি পাঠ করেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ .
- আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার আদেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসঙ্গত কাজ এবং অবাধ্যতা করতে বারণ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন- যাতে তোমরা স্মরণ রাখ।

এ আয়াতটি পাঠ করে শুনিয়ে তিনি নিজের কানে আংগুল ঢুকিয়ে বন্ধ করে লোকটিকে বলেন, হয় তুমি আমার নিকট থেকে উঠে চলে যাও, নয়তো আমি চলে যাচ্ছি। তাঁর এমন চরম বিতৃষ্ণ ভাব দেখে লোকটি উঠে চলে যায়। তার যাওয়ার পরে ইবন সীরীন বলেন, আমার অন্তর আমার ক্ষমতার মধ্যে নেই। আমার ভয় হচ্ছিল, সে আমার অন্তরে এমন কোন ধারণা ঢুকিয়ে না দেয় যা দূর করার ক্ষমতা আমার হবে না। আর তাই আমার জন্য এটাই সঙ্গত ছিল যে, আমি তার কোন কথাই শুনবো না।

আরেকবার তাঁর নিকট এক বেদুইন আসে এবং বিভিন্ন মত ও পথ বিষয়ক কিছু প্রশ্ন করতে থাকে। তিনি তাঁর প্রশ্নের জবাব দিতে থাকেন। কোন এক ব্যক্তি তাকে বললো, 'কদর' বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস কর না। সে বললো: আবু বকর। কদর বিষয়ে আপনার মত কি? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন: এ প্রশ্ন তোমাকে কে শিখিয়ে দিয়েছে? তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন, কারো উপর শয়তানের কোন ক্ষমতা নেই। তবে যদি কোন ব্যক্তি নিজে তার আনুগত্য মেনে নেয় সে তাকে ধ্বংস করে ছাড়ে।

ইবন সীরীনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল 'ইবাদাত। তিনি বড় কঠিন 'ইবাদাত করতেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন তিনি 'ইলম ও 'ইবাদাত উভয় ক্ষেত্রে চরম উৎকর্ষ অর্জন করেছিলেন। প্রতি রাতে সাত পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন। যদি কোন রাতে কিছু পড়তে বাকী থেকে যেত তাহলে তা দিনে পড়ে নিতেন। একাকী থাকার সময় তাসবীহ পাঠে নিমগ্ন থাকতেন। ঘুমানোর পূর্বে নিজের অন্তরকে আল্লাহর যিক্স-এর দিকে ফিরিয়ে নিতেন। এভাবে সারাটি রাত যেন তাঁর 'ইবাদতে কাটতো। ইবন সীরীনের বাড়ীর সীমানার মধ্যে একটি মসজিদ ছিল। সেখানে শিশুদেরও যাওয়ার অনুমতি ছিল না। একদিন পর পর রোযা রাখতেন। আর এ ব্যাপারে এত কঠোরতা অবলম্বন করতেন যে, রোযার দিনটি ইয়াওমুশ শাক বা সন্দেহের দিন হলেও সন্দেহের কারণে রোযা ছাড়তেন না। ছোটখাট 'ইবাদাতের ক্ষেত্রেও তাঁর আচরণ ছিল একটু বাড়াবাড়ি মাত্রার। ওজু করার সময় পায়ের গোছা পর্যন্ত ধুতেন। যাকাত আদায়ের ব্যাপারে এত গুরুত্ব দিতেন যে, যাকাতের অর্থ বণ্টন না করে 'ঈদের নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হতেন না। ইবন 'আওন বর্ণনা করেছেন, আমাদের এমন কখনো হয়নি যে, আমরা 'ঈদের দিন ইবন সীরীনের বাড়ী গিয়েছি, আর তিনি আমাদেরকে খুবাইস (এক প্রকার খাবার) অথবা ফালুদা খাওয়াননি। তিনি যাকাত আদায় ব্যতীত 'ঈদের নামাযের জন্য ঘর থেকে বের হতেন না। প্রথমে যাকাতের অর্থ পৃথক করে মহল্লার জামে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন। তারপর 'ঈদের নামাযের উদ্দেশ্যে বের হতেন।

তিনি আল্লাহর নিদর্শন ও প্রতীকসমূহের খুব সম্মান করতেন। কুরআন তিলাওয়াতের মাঝখানে কথা বলা মোটেই পছন্দ করতেন না। নিজের কাপড় দিয়ে মসজিদ সাফ করতেন।

আল্লাহর আদেশ তো তিনি কঠোরভাবে মেনে চলতেন। আর নিষেধ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ছিলেন আরো কঠোর। সন্দেহযুক্ত বিষয়ও এত পরিমাণ পরিহার করে চলতেন যে, তার জন্য বড় রকমের আর্থিক ক্ষতিও মেনে নিতেন। তাঁর ছেলে বাক্কার ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন, তাঁর পিতা এক খণ্ড ভূমি খরিদ করেন এবং তার খাজনাও আদায় করেন। সেই ভূমিতে প্রচুর পরিমাণে আঙ্গুর ছিল। কিছু লোক আঙ্গুরের রস বের করতে চাইলো। ইবন সীরীন তাদেরকে নিষেধ করলেন এবং তা এমনি বিক্রি করতে বললেন। লোকেরা বললো: এ আঙ্গুর এভাবে বিক্রি করা যায় না। তিনি বললেন, তাহলে শুকিয়ে মনাক্কা বানিয়ে বিক্রি কর। লোকেরা বললো: এ জাতীয় আঙ্গুরের মানাক্কা হয় না। তিনি বললেন: যখন কোনভাবে বিক্রি করা যায় না তখন রস বানানোর চেয়ে এগুলো নষ্ট করে ফেলাই ভালো। এরপর তিনি সব আঙ্গুর পানিতে ফেলে দেন।

ব্যবসা-বাণিজ্য এমন এক পেশা যাতে হারাম-হালালের ব্যাপারে বেশী সতর্কতা অবলম্বন অনেক সময় বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন করে তোলে। ইবন সীরীন জীবিকার জন্য পেশা হিসেবে ব্যবসাকে বেছে নেন। জীবনের প্রথম পর্বে জ্ঞান অর্জন শেষ করে দ্বিতীয় পর্ব যখন আরম্ভ করেন তখন প্রত্যেকটি দিনকে সমান দু'ভাগে ভাগ করেন। এক ভাগ জ্ঞান চর্চা, জ্ঞান বিতরণ ও 'ইবাদাত, আর এক ভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য তথা জীবিকা অর্জন। প্রত্যুষে তিনি বসরার জামে মসজিদে চলে যেতেন। ফজরের নামায আদায়ের পর দুপুরের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত সেখানে নিজে শিখতেন ও অন্যদেরকে শেখাতেন। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে বেচাকেনার জন্য বাজারে চলে যেতেন। আর রাতের আঁধারে বিশ্বচরাচর যখন ঢেকে যেত তিনি তখন নিজের ইবাদাতখানায় ঢুকে যেতেন। অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে কুরআনের নির্ধারিত অংশ পাঠে নিমগ্ন হতেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ভয়ে সারা রাত অস্থিরভাবে কাঁদতেন। তাঁর এ কান্না শুনে পরিবারের লোকজন ও নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের তাঁর প্রতি দয়া হতো এবং তাদের অন্তরও বিগলিত হয়ে যেত। বেচাকেনার উদ্দেশ্যে তিনি যখন বাজারে ঘুরতেন তখন মানুষকে উপদেশ দিতে ভুলতেন না। অন্যদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। কিসে আল্লাহর সন্তুষ্টি তাও বলে দিতেন। ছোট-খাট ঝগড়া-বিবাদও ফায়সালা করতেন।

তিনি জীবিকার জন্য ব্যবসাকে বেছে নেন এবং হালাল-হারামের ব্যাপারে অতিরিক্ত সাবধানতার কারণে মাঝে মধ্যে বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়েন। কিন্তু তিনি হাসিমুখে তা মেনে নেন। তবুও সন্দেহযুক্ত জিনিস স্পর্শ করেননি। একবার তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে কিছু পণ্য খরিদ করেন। সেই পণ্য বিক্রি করে আশি হাজার দিরহাম লাভ হয়। কিন্তু কোন কারণে তার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয় যে, এই বেচাকেনায় সুদের মিশ্রণ ঘটলো কিনা। মূলতঃ এই বেচাকেনায় কোনভাবেই সুদের মিশ্রণ ঘটেনি। তা সত্ত্বেও তিনি কেবল সন্দেহের কারণে লাভের একটি দিরহামও গ্রহণ করেননি।

কোন কোন সময় তো এই অতিরিক্ত সাবধানতার জন্য কারাদণ্ডের শাস্তিও ভোগ করতে' হয়েছে। তবুও তিনি সন্দেহযুক্ত অর্থ গ্রহণ করেননি। একবার তিনি চল্লিশ হাজার দিরহামের পণ্য খরিদ করেন, পরে তিনি এই পণ্যের ব্যাপারে এমন কিছু কথা জানতে পারেন যা তিনি মোটেই পছন্দ করেন না। এ কারণে তিনি পণ্যের গোটা চালানটাই দান করে দেন। ফলে মহাজনকে মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় তাঁকে কারাদন্ড ভোগ করতে হয়।

ঘটনাটি এভাবেও বর্ণিত হয়েছে যে, একবার তিনি বাকীতে চল্লিশহাজার দিরহামের যয়তুন তেল খরিদ করেন। একটি পিপা খোলার পরে তাতে একটি পঁচা বিগলিত ইঁদুর দেখতে পান। তিনি আপন মনে বললেন: সব তেল তো একই গুদামে এক স্থানে ছিল। এই অপবিত্র বস্তুটির নাপাক করা তেল তো অন্য পিপাতেও ভরা হতে পারে। আর আমি যদি এ নাপাক তেল বিক্রেতাকে ফেরত দিই তাহলে সে হয়তো আবার বাজারে বিক্রি করবে। তাই তিনি নিজের দীনদারীকে প্রাধান্য দেন। সব পিপার তেল মাটিতে ঢেলে নষ্ট করে ফেলেন। এ কাজ তাঁর জন্য এক বিরাট আর্থিক ক্ষতি ছিল। মহাজন পণ্যের মূল্য অথবা পণ্য ফেরত চাইলো। কিন্তু তিনি পণ্যের মূল্য বাবদ এত অর্থ দিবেন কোথা থেকে। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কাজীর আদালত পর্যন্ত গড়ালো। কাজী তাঁকে অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত কারাদণ্ডের আদেশ দেন। দীর্ঘদিন যাবত কারাগারে বন্দী জীবনযাপন করেন।

তিনি যে স্তরের 'আলিম ছিলেন তাতে সামান্য একটু চেষ্টা করলে কারাগারে না গিয়েও পারতেন। তিনি বিত্তশালী কোন ব্যক্তির অথবা শাসকের দ্বারস্থ হতে পারতেন এবং তাদের দ্বারা নিজের এই ঋণের বোঝা হালকা করাতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেকে ছোট না করে নিজের আদর্শের উপর অটল থাকেন।

তিনি যখন কোন পণ্য বিক্রি করতেন তখন ক্রেতাকে তা ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখাতেন। ক্রেতা রাজী হয়ে গেলে ক্রয়-বিক্রয়ের উপর মানুষকে সাক্ষী বানাতেন। তাঁর বেচাকেনার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর সমকালীন এক ব্যক্তি মাইমূন ইবনে মাহরান। তিনি বলেছেন, আমি কিছু কাপড় কেনার জন্য কৃষ্ণায় গেলাম। সেখানে ইবন সীরীনের দোকানে পৌছলাম। যখন আমি কোন কাপড় পছন্দ করতাম এবং দরদাম করে কেনার সিদ্ধান্ত নিতাম তখন তিনি আমাকে তিন বার জিজ্ঞেস করতেন: আপনি কি এটা কিনতে রাজি হয়েছেন? আমি বলতাম: হাঁ, রাজি। এতেও তিনি সন্তুষ্ট হতেন না। বরং দু'জন মানুষকে ডেকে সাক্ষী বানাতেন। এসব পর্যায় অতিক্রম করার পর বলতেন: এখন পণ্য নিয়ে যান। তিনি হিজাযী দিরহামে কেনা-বেচা করতেন না। আমি তাঁর এমন তাকওয়া ও সাবধানতা দেখে আমার যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিস সব সময় তাঁর দোকান থেকেই কিনতাম। এমন কি কাপড় বাঁধার সামান্য জিনিসও তাঁর কাছ থেকেই নিতাম।

সে যুগে পরিমাপের পাত্র ও বাটখারার পরিমাণে কমবেশী থাকতো। তাই তিনি যখন কারো নিকট থেকে কোনকিছু ধার-কর্জ নিতেন তখন প্রচলিত পরিমাপ পাত্র ও বাটখারার পরিবর্তে অন্য কোন জিনিস দিয়ে মেপে নিতেন। তারপর যে জিনিস দিয়ে মাপতেন সেটি সীল- মোহর করে সংরক্ষণ করতেন। তারপর সেই জিনিস ফেরত দানের সময় সেই সীল করা নির্দিষ্ট জিনিস দিয়ে মেপে ফেরত দিতেন। আর বলতেন, ওজন কম-বেশী হয়ে থাকে।

ব্যবসায়িক লেন-দেনের ধারাবাহিকতায় অধিকাংশ সময় তাঁর হাতে জাল মুদ্রা এসে যেত। জাল মুদ্রায় যে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই তিনি এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। জাল মুদ্রা তাঁর হাতে এলে তা অন্য কারো হাতে পৌঁছার সুযোগ দিতেন না। সবই নষ্ট করে ফেলতেন। ইবন 'আওন বলেছেন, যখন ইবন সীরীনের নিকট জাল মুদ্রা আসতো, তিনি তা দিয়ে কোন কিছু কিনতেন না। তাই তাঁর মৃত্যুর সময় দেখা গেল এ জাতীয় পাঁচশো অকেজো মুদ্রা তাঁর নিকট জমা হয়ে আছে।

তিনি মানুষকে হালাল উপার্জনের কথা বলতেন। তিনি বলতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য হালাল রুযি নির্ধারিত হয়ে আছে, তোমরা তাই তালাশ কর। তোমরা হারাম উপায়ে অর্জন করলেও যা তোমাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে আছে তার চেয়ে বেশী পাবে না। অন্যকে হারাম অর্থ থেকে বাঁচানোর জন্য এতখানি করতেন যে, যদি কেউ তাঁর নিকট থেকে অবৈধভাবে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করতো তিনি তাকে হারাম অর্থ থেকে বাঁচানোর জন্য কসম পর্যন্ত খেয়ে বসতেন।

দীনের হাকীকত ও গূঢ় রহস্যের সূক্ষ্ম বুঝ ও হারাম-হালালের ব্যাপারে তাঁর সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি মাঝে মাঝে তাঁকে এমন সব অবস্থার মুখোমুখি দাঁড় করাতো, যা দেখে মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। যেমন, একবার এক ব্যক্তি এসে দাবী করলো যে, সে তাঁর কাছে দু'টি দিরহাম পায়। দাবীটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। এ কারণে তিনি লোকটির দাবী মানতে অস্বীকার করেন। লোকটি তখন বললো, তাহলে আপনি হলফ করে বলুন। সে ধারণা করেছিল যে, মাত্র দু'টি দিরহামের জন্য তাঁর মত মানুষ হলফ করবেন না। ইবন সীরীন বললেন: হাঁ, আমি হলফ করবো। এ কথা বলে তিনি হলফ করেন। তখন লোকেরা তাঁকে বললো: হে আবু বকর। আপনি মাত্র দু'টি দিরহামের জন্য হলফ করছেন? অথচ সামান্য সন্দেহের কারণে গতকাল আপনি চল্লিশ হাজারের দাবী ত্যাগ করলেন। আর সে ক্ষেত্রে কেবল আপনি ছাড়া আর কেউই সন্দেহ পোষণ করছিল না। তিনি বললেন: হাঁ, আমি হলফ করবো। কারণ, আমি তাকে হারাম খাওয়াতে চাই না। আর আমি জানি এটা তার সম্পূর্ণ হারাম উপার্জন হবে। আমি জেনে- বুঝে তাকে হারাম খাওয়াতে পারিনে।

হারাম থেকে সাবধানতার কারণে সম্ভবতঃ তিনি শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী আমীর-উমরাদের উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করতেন না। একবার হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের (রা) মত মহান ব্যক্তি হাসান বসরী (রহ) ও তাঁর নিকট কিছু উপহার পাঠান। হাসান বসরী গ্রহণ করেন, কিন্তু তিনি গ্রহণ করেননি।

খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা থেকে এত পরিমাণ দূরে থাকতেন যে, যে সব বৈধ সুবিধার মধ্যে বিন্দুমাত্র খিয়ানতের ধারণা হতে পারে, শুধু সতর্কতা বশতঃ সে সব সুবিধা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতেন। যেমন, যখন তিনি দীর্ঘদিন জেলখানায় বন্দী ছিলেন তখন তাঁর দীনদারী, খোদাভীতি ও 'ইবাদত-বন্দেগীর অবস্থা দেখে জেলার তাঁর একজন ভক্তে পরিণত হন। একদিন তিনি ইবন সীরীনকে বললেন: শায়খ! রাতে গোপনে আপনি বাড়ী চলে যান, পরিবারের লোকদের সাথে রাত কাটান, তারপর সকাল হওয়ার সাথে সাথে আমার কাছে ফিরে আসুন। আপনার মুক্তি পর্যন্ত এভাবে করতে থাকুন। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! এ কাজ আমি করতে পারবো না। জেলার বললেন: আল্লাহ আপনাকে হিদায়াত করুন। কেন পারবেন না? তিনি বললেন: শাসন কর্তৃত্বের অধিকারীর সাথে খিয়ানতে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারবো না।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) মৃত্যু শয্যায় ওসীয়াত করে গিয়েছিলেন যে, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন যেন তাঁকে গোসল দেন, কাফন পরান এবং জানাযার নামায পড়ান। হযরত আনাস (রা) মারা গেলেন। ঘটনাক্রমে ইবন সীরীন তখন জেলখানায় বন্দী। লোকেরা শহরের শাসকের নিকট ছুটে গেল এবং তাঁকে হযরত আনাসের (রা) অন্তিম ইচ্ছার কথা জানিয়ে ইবন সীরীনের মুক্তির অনুরোধ জানালো। যাতে তিনি হযরত আনাসের অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করতে পারেন। শাসক অনুমতি দিলেন। কিন্তু ইবন সীরীন জেল থেকে বের হতে রাজী হলেন না। তিনি বললেন: আমি একজন পাওনাদারের পাওনা অর্থ পরিশোধ করতে না পারার কারণে জেলে বন্দী আছি। তাঁর অনুমতি না আনা পর্যন্ত আমি জেল থেকে বের হবো না। লোকেরা পাওনাদারের কাছে ছুটে গেল এবং তার অনুমতি নিয়ে এলো। এবার তিনি জেল থেকে বের হলেন। হযরত আনাসকে (রা) গোসল দিলেন, কাফন পরালেন এবং তাঁর জানাযার নামায পড়ালেন। তারপর আবার জেলে ফিরে গেলেন। পরিবারের কারো সাথে দেখা করলেন না।

তিনি খ্যাতি ও প্রচার-বিমুখ মানুষ ছিলেন। আর এই খ্যাতির বিড়ম্বনা থেকে বাঁচার জন্য কোন সাধারণ মজলিস-মাহফিলেও যোগদান করতেন না। তিনি বলতেন: আমি শুধু খ্যাতির ভয়ে আপনাদের জলসাগুলোতে আসিনে। মানুষের দৃষ্টিকাড়ে এমন সব কর্ম ও বৈশিষ্ট্য থেকে তিনি সযত্নে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। অধিকাংশ সময় নামাযের ইমামতির জন্য নিজের চেয়ে কম মর্যাদার লোককে সামনে এগিয়ে দিতেন। ইবন 'আওন বলেন, ইবন হুবাইরার বিদ্রোহের সময় আমিও ইবন সীরীনের সাথে বের হই। নামাযের সময় হলে তিনি আমাকে নামায পড়ানোর নির্দেশ দিলেন। আমি তাঁর আদেশ পালন করলাম। তবে নামায পড়ানোর পর আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো বলে থাকেন যে, নামায সেই ব্যক্তির পড়ানো উচিত যার কুরআন বেশী মুখস্থ আছে। তিনি বললেন, আমার এটা ভালো মনে হয় না যে, আমি নামায পড়ানোর জন্য সামনে এগিয়ে যাই, আর মানুষ এটা বলুক যে, মুহাম্মদ মানুষের নামাযের ইমামতি করেন।

ইবন সীরীন তাঁর মায়ের বড় অনুগত ছিলেন। মন-প্রাণ দিয়ে তাঁর সেবা করতেন। মা কিসে খুশী হন, সব সময় সে দিকে লক্ষ্য রাখতেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার এ বাণীর উপর অক্ষরে অক্ষরে 'আমল করতেন। وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرُ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أَفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيمًا.
তোমার পালনকর্তা আদেশ করছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উহ' শব্দটিও বলোনা এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বলো তাদেরকে শিষ্টচারপূর্ণ কথা।

মাকে তিনি কী পরিমাণ ভালোবাসতেন এবং মায়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি কতটুকু যত্নবান ছিলেন তার একটা চিত্র পাওয়া যায় তাঁর বোন হাফসা বিন্ত সীরীনের একটি বর্ণনায়। তিনি বলেন, আমার মা ছিলেন হিজাযের মেয়ে। তিনি রঙ্গীন ও উৎকৃষ্টমানের মিহি কাপড় পছন্দ করতেন। ইবন সীরীন মায়ের এ পছন্দকে খুবই গুরুত্ব দিতেন। যখনই তাঁর জন্য কাপড় কিনতেন তখন কেবল কাপড়ের মসৃণতার প্রতি দৃষ্টি দিতেন, কতখানি টেকসই সে দিকে মোটেও খেয়াল করতেন না। 'ঈদের জন্য ইবন সীরীন নিজে মায়ের কাপড় রং করতেন। আমি কখনো তাকে মার সামনে জোর গলায় কথা বলতে শুনিনি। যখন কথা বলতেন, এত আস্তে বলতেন যেন কোন গোপন কথা বলছেন। ইবন 'আওন বলেছেন, ইবন সীরীন যখন তাঁর মার সামনে থাকতেন তখন তাঁর গলার আওয়ায এত ক্ষীণ হতো যে, কোন অপরিচিত লোক সে সময় তাকে দেখলে রোগাক্রান্ত বলে মনে করতো।

তিনি নিজেকে খুবই তুচ্ছ মনে করতেন। নিজের ব্যক্তিসত্তার জন্য বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্য পছন্দ করতেন না। সুতরাং কাউকে তাঁর সাথে সাথে চলার অনুমতি দিতেন না। যদি কেউ তাঁর সাথে চলতে চাইতো, তাকে তিনি বলতেন, যদি তুমি বিনা প্রয়োজনে চলতে থাক, তাহলে ফিরে যাও। তিনি বলতেন, পাপাচারে যদি দুর্গন্ধ থাকতো তাহলে আমার পাপের দুর্গন্ধের কারণে কোন মানুষ আমার কাছে ঘেঁষতে পারতো না।

এত বিনয় ও নম্রতা সত্ত্বেও তিনি একজন দুঃসাহসী ব্যক্তি ছিলেন। অনেক বড় বড় বিপদ ও ভীতিকে কোন পাত্তাই দিতেন না। আবূ কিলাবা বলতেন, মুহাম্মাদের সমান শক্তি ও সাহস রাখে কে? তিনি নিযার ফলার উপরও উঠে পড়তেন। বড় সাফ দিলের মানুষ ছিলেন। কখনো কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করতেন না। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, আমি ভালো-মন্দ কারো প্রতি হিংসা করিনে। মোটকথা, ধর্ম ও নীতি-নৈতিকতার তিনি এক পূর্ণ মডেল ছিলেন। আবূ 'আওয়ানা বলেছেন, ইবন সীরীনকে দেখে আল্লাহর কথা স্মরণ হতো।

ইবন সীরীনের এসব চারিত্রিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য বড় বড় সাহাবী ও তাবি'ঈদেরকে এত পরিমাণ মুগ্ধ করেছিল যে তাঁদের অনেকে তাঁর দ্বারা নিজেদের জানাযার নামায পড়ানোকে বড় বরকতের কাজ বলে মনে করেছিলেন। তাই তাঁদের মৃত্যুর আগে তাঁকে দিয়ে কাফন- দাফন ও জানাযার জন্য অসীয়ত করে গিয়েছিলেন। যেমন হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ইবন 'আওন বর্ণনা করেছেন, হযরত হাসান আল বসরীর আত্মগোপনকালে তাঁর এক মেয়ের ইনতিকাল হয়। আমি গোপনে তাকে সংবাদ পৌছালাম। আমার ধারণা ছিল তিনি আমাকে জানাযার নামায পড়ানোর নির্দেশ দিবেন। কিন্তু তিনি আমাকে করণীয় অনেক কাজের কথা বলার পর ইবন সীরীন দ্বারা জানাযার নামায পড়ানোর আদেশ দেন।

হিজরী ১১০ সনে তিনি অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। শেষ জীবনে চল্লিশ হাজার দিরহাম ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ জন্য বড় চিন্তিত ছিলেন। ছেলে 'আবদুল্লাহ তাঁর সব ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিয়ে তাকে চিন্তামুক্ত করেন। তিনি ছেলের কল্যাণ কামনা করে দু'আ করেন। মৃত্যুর পূর্বে উপদেশ দেন, তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে, পরস্পর মিলেমিশে থাকবে। যদি ঈমানদার হওয়ার দাবী কর তাহলে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য একটি দীন নির্বাচন করেছেন, তার উপরেই মরবে। তোমরা দীনের ক্ষেত্রে আনসারদের ভাই ও তাদের মাওলা (আযাদকৃত দাস) হিসেবে থাকবে। সততা ও পবিত্রতা ব্যভিচার ও মিথ্যা থেকে ভালো। এ সব অসীয়াত করার পর জুম'আর দিন ইনতিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স আশি বছরের উপর ছিল। অনেকে সাতাত্তর বছরের কথা বলেছেন। ইমাম যাহবী বলেছেন, তিনি হাসান আল-বসরীর মৃত্যুর ১০০ দিন পর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তিরিশজন সন্তানের জনক ছিলেন। তবে মৃত্যুর সময় একমাত্র ছেলে আবদুল্লাহ ছাড়া আর কেউ জীবিত ছিলেন না। তিনি ভালো পোশাক পরতেন, চুলে মেহেদীর খেজাব লাগাতেন। গোঁফ হালকা করে ছাঁটতেন।

সে যুগের একজন বিখ্যাত মহিলা 'আবিদ হাফসা বিনত রাশিদ। তিনি বলেছেন, মারওয়ান আল-মাহমালী নামে আমাদের একজন প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি আল্লাহ-রাসূলের বড় অনুগত এবং একজন বড় 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মারা গেলেন। আমরা বড় শোকাভিভূত হয়ে পড়লাম। এ অবস্থায় আমি একদিন তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি প্রশ্ন করলাম আবূ আবদিল্লাহ। আপনার রব আপনার সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন? বললেন: আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। বললাম, তারপর আর কি করেছেন? বললেন: আমাকে ডান পাশের লোকদের কাছে উঠানো হয়েছে। বললাম তারপর? বললেন: আমাকে পূর্ববর্তী লোকদের কাছে নেওয়া হয়েছে। বললাম সেখানে আর কাকে দেখেছেন? বললেন: হাসান আল-বসরী ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীনকে দেখেছি।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইবন সীরীন একজন বড় ধরনের স্বপ্নের ব্যাখ্যাকার ছিলেন। ইতিহাস ও রিজাল শাস্ত্রের গ্রন্থাবলীতে তাঁর ব্যাখ্যা সম্বলিত অনেক স্বপ্নের কথা জানা যায়। এখানে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো।

একদিন এক ব্যক্তি এসে বললো, আমি স্বপ্নে দেখলাম একটি কবুতর একটি মুক্তা গিলে ফেললো। তারপর মুক্তাটি আগের চেয়ে বড় হয়ে বেরিয়ে এলো। আরেকটি কবুতর একটি মুক্তা গিলে ফেললো। তারপর সেটি পূর্বের চেয়ে ছোট হয়ে বেরিয়ে এলো। তৃতীয় আরেকটি কবুতর একটি মুক্তা গিললো এবং সেটি পূর্বের মত একই আকারে বেরিয়ে এলো।

ইবন সীরীন বললেন: প্রথম কবুতরটি হলেন হাসান আল বসরী, তিনি হাদীছ শোনেন। তারপর সুন্দর করে বর্ণনা করেন এবং ওয়াজের মধ্যে ব্যাখ্যা করেন। আর যে কবুতরটির মধ্যে মুক্তা ছোট হয়ে যায়, সে আমি, আমি হাদীছ শুনি, কিন্তু কিছু বাদ দিই। আর তৃতীয়টি হলো কাতাদা, তিনি হাদীছ যাঁরা সবচেয়ে বেশী মুখস্থ রাখতে পারেন তাঁদের একজন।

একবার এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি স্বপ্নে দেখলাম আমার মাথার উপরে যেন একটি স্বর্ণের মুকুট শোভা পাচ্ছে।

ইবনে সীরীন বললেন: আপনি আল্লাহকে ভয় করুন! আপনার পিতা প্রবাসে আছেন। সেখানে তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন। তিনি চাচ্ছেন আপনি তাঁকে নিয়ে আসুন। লোকটি তখন একটি চিঠি বের করে বলে, এই যে আমার পিতার চিঠি। এতে লিখেছেন, তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন, বিদেশ-বিভূঁইয়ে আছেন এবং তাঁকে নিয়ে আসার জন্য বলেছেন।

একদিন এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি দেখলাম, আমি রক্ত প্রস্রাব করছি। ব্যাখ্যায় ইবন সীরীন বললেন: তুমি তোমার স্ত্রীর মাসিক অবস্থায় উপগত হয়ে থাক। সে বললো: ঠিক বলেছেন। তিনি বললেন: আল্লাহকে ভয় কর। আরেকবার এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমি যেন কোন ক্ষেত চাষ করছি; কিন্তু তাতে কোন চারা গজাচ্ছে না। বললেন: তুমি স্ত্রী উপগত অবস্থায় 'আযল করে থাক। লোকটি বললো: ঠিক।

একদিন এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি দেখলাম, জাওয়া নক্ষত্র ছুরাইয়্যা নক্ষত্রের আগে চলে গেছে। তিনি বললেন: এই হাসান আল বসরী আমার আগে মারা যাবেন। তারপর আমি তাঁর অনুসরণ করবো। তিনি আমার চেয়ে উঁচু মর্যাদার।

একবার এক ব্যক্তি এসে বললো: আমি যেন দেখলাম, আমার হাতে পানি ভর্তি একটি কাঁচের পেয়ালা। পেয়ালাটি পড়ে ভেঙ্গে গেল; কিন্তু পানি থেকে গেল। তিনি লোকটিকে বললেন: আল্লাহকে ভয় কর। আসলে তুমি কিছুই দেখনি। লোকটি বললো, সুবহানাল্লাহ। আমি যা বলেছি তাই দেখেছি। তিনি বললেন: কেউ মিথ্যা বললে তার দায়িত্ব আমার নয়। তোমার স্ত্রী খুব শিগগীর সন্তান প্রসব করে মারা যাবে। কিন্তু তার সদ্য প্রসূত ছেলেটি বেঁচে থাকবে। লোকটি বেরিয়ে গিয়ে বললো: আল্লাহর কসম! আমি কিছুই দেখিনি। অল্প কিছু দিনের মধ্যে তার স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে মারা যায়।

'আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম আল-মূরূযী ছিলেন ইবন সীরীনের সমকালীন বসরার একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। তিনি বলেন, আমি ইবন সীরীনের মজলিসে উঠা-বসা করতাম। এক সময় তা ছেড়ে দিয়ে গোপনে খারিজীদের 'ইবাদিয়‍্যা' সম্প্রদায়ের সাথে উঠা-বসা শুরু করি। একদিন আমি স্বপ্নে দেখি, আমি এমন সব লোকদের সাথে আছি যারা রাসূলুল্লাহর (সা) মরদেহ বহন করছে। আমি ইবন সীরীনের নিকট আসলাম এবং আমার স্বপ্নের কথা তাঁকে বললাম। তিনি বললেন: আপনার কি হয়েছে যে, আপনি এসব লোকদের সাথে বসেন যাঁরা নবী (সা) যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা দাফন করতে চায়?

এভাবে বহু.স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যার কথা পাওয়া যায়। ইমাম যাহবী বলেছেন, ইবন সীরীন থেকে স্বপ্নের তা'বীরের ব্যাপারে অনেক আশ্চর্যজনক কথা বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক দীর্ঘ। এ ক্ষেত্রে তিনি আল্লাহর সাহায্য লাভ করেছিলেন।

এতবড় জ্ঞানী ও 'আবিদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি একজন রসিক মানুষ ছিলেন। তবে তাঁর সে রসিকতা সীমা লংঘন করতো না।

হিশাম ইবন হাসান বলেন, একবার এক ব্যক্তি ইবন সীরীনের নিকট এসে বললো: আমি যে স্বপ্নটি দেখেছি সে সম্পর্কে আপনি কি বলেন? তিনি জিজ্ঞেস করলেন: স্বপ্নটি কি? লোকটি বললো, আমি দেখলাম, আমি একটি ছাগল পেয়েছি এবং তা বিক্রি করে আট দিরহাম পাচ্ছি। বিক্রির সময় আমি জেগে গেলাম। দু'চোখ খুলে কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি আবার চোখ বন্ধ করে আমার দু'হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং বললাম: চার দিরহামই দাও। কিন্তু কিছুই দিল না। তার কথা শুনে ইবন সীরীন বললেন: সম্ভবত: ক্রেতারা তোমার ছাগলের কোন দোষের কথা জেনে সরে পড়েছে। লোকটি বললোঃ আপনি যা বললেন সম্ভবতঃ তাই হবে। আসলে লোকটি ছিল একটু নির্বোধ ধরনের, তাই ইবন সীরীনও তাকে সেই রকম জবাব দিয়েছিলেন।

একবার গালিব নামক এক ব্যক্তি ইবন সীরীনের নিকট হিশাম ইবনে হাসান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন: তিনি তো গতকাল মারা গেছেন। আপনি জানেন না? কথাটি শুনে গালিব দুঃখের সাথে "ইন্না লিল্লাহ" পাঠ করলেন। ইবন সীরীন তাঁর ব্যথিত চেহারা দেখে পাঠ করলেন:
الله يتوفى الأنفس حين موتها والتي لم تمت في منامها
- আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যে মরে না, তার নিদ্রাকালে।

ইবন সীরীনের মজলিসটি হতো সব সময় শুভ, কল্যাণ ও উপদেশের মজলিস। সেখানে তাঁর উপস্থিতিতে কেউ কারো সম্পর্কে কোন খারাপ কথা বললে তিনি খুব দ্রুত সেই ব্যক্তির কোন ভালো কিছু জানা থাকলে তা আলোচনা করে সবাইকে শুনিয়ে দিতেন। উমাইয়্যা যুগের অত্যন্ত প্রতাপশালী স্বৈরাচারী গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মৃত্যুর পর তিনি একদিন শুনতে পেলেন, এক ব্যক্তি তাঁকে গালি দিচ্ছে। তিনি লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন : ভাতিজা, চুপ কর। হাজ্জাজ তাঁর পরোয়ারদিগারের নিকট চলে গেছেন। তুমি যখন আল্লাহ রাব্বুল 'ইজ্জাতের সামনে উপস্থিত হবে তখন দেখবে, এ দুনিয়াতে যে সব ছোট ছোট পাপ করেছো তা হাজ্জাজের বড় বড় পাপের চেয়েও মারাত্মক হয়ে দেখা দিয়েছে। তোমাদের দু'জনের অবস্থাই হবে সেদিন ভিন্ন- যা নিয়ে প্রত্যেকেই ব্যস্ত থাকবে। ভাতিজা! জেনে রাখ, মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন হাজ্জাজ যাদের উপর জুলুম করেছেন তাদের পক্ষ থেকে হাজ্জাজের নিকট থেকে বদলা নিবেন। ঠিক তেমনিভাবে হাজ্জাজের প্রতি যারা জুলুম করেছে, আল্লাহ হাজ্জাজের জন্য তাদের থেকে বদলা নিবেন। সুতরাং আজকের পর থেকে কারো গালি দেওয়ার কাজে নিজেকে কখনো জড়িত করোনা। আরেকবার এক ব্যক্তি সফরে রওয়ানা হওয়ার আগে তাঁর সাথে দেখা করতে এলো। তিনি তাকে বললেন: ভাতিজা সব সময় আল্লাহকে ভয় করবে। যতদূর সম্ভব হালাল পথে রোজগার করবে। আর জানবে যে, হারাম পথে তুমি যতই চেষ্টা কর, তোমার জন্য নির্ধারিত অংশের বেশী তুমি লাভ করতে পারবে না।

বানু উমাইয়‍্যার অনেক আঞ্চলিক গভর্নর ও শাসকদের সাথে ইবন সীরীনের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। মাঝে মাঝে তাঁদের দরবারে যেতেন এবং সুযোগমত তাঁদেরকে আল্লাহ-রাসূলের কথা শুনিয়ে উপদেশ দিতেন। একবার বানু উমাইয়‍্যার একজন উঁচুস্তরের গভর্নর 'উমার ইবন হুবায়রা আল-ফায়ারী লোক মারফত ইবন সীরীনকে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য ডেকে পাঠালেন। তিনি এক ভাতিজাকে সংগে নিয়ে ইবন হুবায়রার দরবারে গেলেন। ইবন হুবায়রা তাঁকে গভীর সম্মান ও আন্তরিকতার সাথে স্বাগতম জানিয়ে নিজের আসনের পাশে বসালেন। তারপর দীর্ঘক্ষণ তাঁর সাথে দীন ও দুনিয়ার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলেন।

এক পর্যায়ে ইবন হুবায়রা তাঁকে প্রশ্ন করলেন : ওহে আবূ বকর! আপনি আপনার শহরবাসীদেরকে কেমন রেখে এসেছেন? বললেন: আমি যখন তাদেরকে ছেড়ে এসেছি তখন জুলুম-অত্যাচার তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। আর আপনি তাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। পাশে বসা তাঁর ভাতিজা তাঁর কাঁধে টোকা দিয়ে তাঁকে একটু সংযত করতে চাইলেন। এতে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে গেলেন। তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি তুমি নও, জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি আমি। নিশ্চয় এ আমার একটি সাক্ষ্য।

মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন বলেছেন: وَمَنْ يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ أَثِمٌ قَلْبُهُ আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করোনা। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে।

মজলিস যথারীতি শেষ হলো। 'উমার ইবন হুবায়را যেভাবে সম্মান ও আবেগের সাথে ইবন সীরীনকে স্বাগতম জানিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে বিদায় দিলেন। তারপর তিন হাজার দীনার ভর্তি একটি থলে লোক মারফত ইবন সীরীনের কাছে পাঠালেন। কিন্তু তিনি গ্রহণ করলেন না। তাঁর ভাতিজা প্রশ্ন করলেন: আমীরের উপহার আপনি গ্রহণ করলেন না কেন? বললেন: আমার প্রতি একটি ভাল ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি এ উপহার আমাকে দিয়েছেন। তাঁর ধারণা মত আমি যদি ভালো মানুষ হই তাহলে আমার তা গ্রহণ করা উচিত নয়। আর যদি আমি তাঁর ধারণার অনুরূপ মানুষ না হই, তাহলে তো তা গ্রহণ করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৯
২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান- ১/৪৫৩
৩. তাবাকাত- ৭/১৪০; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন- ১২৬
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৯
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-১/২১৫; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৪৫১
৬. তাবাকাত-৭/১৪০
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
৮. তাহযীব আল-আসমা'- ১/৮২
৯. তাহযীব আত-তাহযীব- ৯/২১৪; তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮
১০. তাবাকাত- ৭/১৪১
১১. প্রাগুক্ত- ৭/১৪১,১৪৩; সিয়ারু তাবি'ঈন-৪৩৬
১২. তাহযীব আত- তাহযীব-৯/২১৪
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
১৪. তাহযীব আত-তাহযীব- ৯/২১৪
১৫. প্রাগুক্ত-৯/২১৬
১৬. তাবাকাত- ৭/১৪৩
১৭. শাযারাত আয-যাহাব- ১/১৩৯
১৮. তাবাকাত- ৭/১৪২
১৯. তাহযীব আত-তাহযীব- ৯/২১৬
২০. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮
২১. তাবাকাত- ৭/১৪০
২২. তাহযীব আল আসমা'- ১/৮৩
২৩. তাবাকাত- ৭/১৪২
২৪. শাযারাত আয-যাহাব- ১/১৩৯
২৫. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ১/১৯২; ৩/১৭৩
২৬. প্রাগুক্ত- ৩/১২৫
২৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
২৮. তাহযীব আল-আসমা'- ১/৮৪
২৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭৮
৩০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ১/২৪২
৩১. সূরা আন-নাহল- ৯০
৩২. তাবাকাত- ৭/১৪৩
৩৩. প্রাগুক্ত- ৭/১৪৪
৩৪. শাযারাত আয-যাহাব- ১/১৩৯
৩৫. তাবাকাত- ৭/১৪৫,১৪৬,১৪৮
৩৬. প্রাগুক্ত- ৭/১৪৪. ১৪৭
৩৭. সুওয়ারুল মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১২৮
৩৮. তাবাকাত-৭/১৪৫
৩৯. প্রাগুক্ত- ৭/১৪৪
৪০. তাহযীব আল-আসমা' ১/৮৪; হিলয়াতুল আওলিয়া- ২/২৬৯-২৭১
৪১. তাবাকাত- ৭/১৪৬; ৭/২০২
৪২. প্রাগুক্ত-৭/১৪৭
৪৩. 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৫৫
৪৪. তাবাকাত- ৭/১৪৬
৪৫. তাহযীব আল- আসমা'- ১/৮৪
৪৬. তাবাকাত- ৭/১৪৭
৪৭. তাহযীব আল- আসমা'- ১/৮৪
৪৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান- ১/৪৫৩
৪৯. তাবাকাত-৭/১৪৮
৫০. সূরা বানী ইসরাইল- ২৩
৫১. তারীখু ইবন 'আসাকির- ৫/২২৩
৫২. মুখতাসার সিফাতুস সাফওয়া- ১৫০
৫৩. তাবাকাত- ৭/১৪৩,১৪৪
৫৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮
৫৫. তাবাকাত- ৭/১৪৮
৫৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭৮; 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৬১; সুওয়ারুল মিন হায়াত আত- তাবি'ঈন- ১৩৩
৫৭. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত- তাবিঈন-১৩৪
৫৮. তারীখু ইবন 'আসাকির- ৫/২২৭
৫৯. হিলয়াতুল আওলিয়া- ২/২৭৭, ২৭৮
৬০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'- ৪/৬১৭
৬১. 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৫৬
৬২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'- ৪/৬১৮
৬৩. আল 'ইদ আল ফারীদ-৬/১৬৪
৬৪. 'উয়ুন আল-আখবার- ১/৩৬৫
৬৫. সূরা আয-যুমার-৪২
৬৬. সূওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৩০; 'আসরুত তাবি'ঈন-১৫৯
৬৭. সূরা- আল বাকারা- ২৮৩
৬৮. সুওয়ারুন মিন হায়াত তাবি'ঈন- ১৩১; 'আসরুত তাবি'ঈন- ১৫২-১৫৩

ফন্ট সাইজ
15px
17px