📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 কাজী শুরায়হ (রহ)

📄 কাজী শুরায়হ (রহ)


আবূ উমাইয়্যা শুরায়হ-এর পিতার নাম আল-হারিছ ইবন কায়স। তাঁর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ মারতা' ইবন কিন্দাহ্। তাই তিনি কিন্দী হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর নসবনামার উপরের দিকের কিছু নামের ব্যাপারে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। একটি বর্ণনা এমনও আছে যে, শুরায়হ আরব বংশজাত ছিলেন না। বরং তিনি ঐসব অনারব খান্দানের লোক ছিলেন যারা কিন্দাহ্র সাথে মৈত্রীচুক্তি করে ইয়ামনে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় হযরত শুরায়হ-এর জন্ম হয়। কোন কোন বর্ণনা মতে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। কিন্তু এসব বর্ণনা সঠিক নয়। সেই সময়ে তিনি মুসলমান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে হযরত রাসূলে পাকের দীদার লাভের পরম সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থেকে যান। আল্লামা ইবন হাজার আল-'আসকালানী একথাই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, চার খলীফার যুগে শুরায়হ-এর জীবনের অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এমন কোন ঘটনা দেখা যায় না যা দ্বারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ প্রমাণিত হয়। ইবন সা'দ, ইবন 'আবদিল বার সহ আরো অনেক সীরাত বিশেষজ্ঞ এমন কথাই বলেছেন। তাঁরা শুরায়হকে তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করেছেন। তবে তাবি'ঈদের মধ্যে তিনি ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে একজন বিখ্যাত কাজী।

হযরত শুরায়হ (রহ) রাসূলুল্লাহর (সা) বহু সাহাবীর সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভ করেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন স্বভাবগতভাবে তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। এ কারণে জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি তাঁর সমকালীনদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার স্থান লাভ করেন। ইমাম নাওবী বলেন : শুরায়হর মেধা, বিশ্বস্ততা, দীনদারী, মহত্ত্ব ও মর্যাদা এবং তাঁর বর্ণনাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সবাই একমত। হাফেজ সাফি'উদ্দীন খাযরাজী লিখেছেন যে, তিনি ছিলেন অতি মর্যাদাবান ও তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন 'আলিমদের একজন।

সেকালে বসরায় বহু খ্যাতিমান হাফেজে হাদীছ ছিলেন। তিনিও ছিলেন তাঁদের একজন। হযরত 'উমার, 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, যায়দ ইবন ছাবিত (রা) প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবীর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। ইমাম শা'বী, আবূ ওয়ায়িল কায়স ইবন আবী হাযিম, ইবন সীরীন, 'আবদুল 'আযীয ইবন রাফী', মুজাহিদ ইবন জুবায়র, 'আতা' ইবন সায়িব, আনাস ইবন সীরীন, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ (রহ)-এর মত ইমামগণ ছিলেন তাঁর হাদীছের ছাত্র।

হযরত শুরায়হ যদিও হাদীছের হাফেজ ছিলেন তথাপি তাঁর পঠন-পাঠনের বিশেষ শাস্ত্র ছিল ফিকাহ্। ইমাম যাহাবী, ইবন হাজার ও অন্যরা ফিকাহকে তাঁর বিশেষ শাস্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর নামের সাথে 'ফকীহ্' উপাধিটি লিখেছেন। তিনি ফিকাহ্ শাস্ত্রের কেন্দ্রস্থল কূফার ইফতা পরিষদের সদস্য ছিলেন।

হাদীছ ও ফিকাহ্ শাস্ত্র ছাড়াও তৎকালীন আরবে বহুল প্রচলিত ইলমে কিয়াফা (হস্তরেখা বিদ্যা) ও কাব্য শাস্ত্রে তাঁর বুৎপত্তি ছিল। কাব্য শাস্ত্রে তাঁর বুৎপত্তি এত পরিমাণ ছিল যে, একবার তিনি তাঁর একটি বিচারের রায় কবিতায় দান করেন। ঘটনাটি এই রকম। এক মহিলার স্বামী একটি পুত্র সন্তান রেখে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। সে ছেলেকে নিজের কাছে আটকে রাখে এবং তার অভিভাবকত্বের দাবীতে অটল থাকে। আর মহিলার শ্বাশুড়ী অর্থাৎ ছেলেটির দাদীর দাবী ছিল, যেহেতু ছেলের মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, তাই ছেলের অভিভাবকত্ব সে পেতে পারে না। দাদী তার দাবী একটি কবিতায় এভাবে উপস্থাপন করে:

يا أبا أمية أتيناك اتاك ابنى وأماه تزوجت فها تيه وأنت المرأ نأتيه وكلتا نا نفديه ولا يذهب بك التيه فلو كنت تایمت مما نازعتني فيه ألا يا ايها القاضي هذه قصتى فيه

আবূ উমাইয়‍্যা! আমরা ন্যায়বিচার লাভের উদ্দেশ্যে আপনার নিকট এসেছি। আপনি এমন এক ব্যক্তি যাঁর নিকট আমরা এসে থাকি।
আমার পুত্র (পৌত্র) ও তার মা আপনার নিকট এসেছে এবং আমরা উভয়ে তার জন্য উৎসর্গকৃত।
(পুত্রবধূকে লক্ষ্য করে) যখন তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছো তখন ছেলেকে আমার নিকট দিয়ে দাও। বাড়াবাড়ি করো না।
দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের পর তুমি তার ব্যাপারে আমার সাথে বিবাদ করছো কেন?
(কাজী সাহেবকে লক্ষ্য করে) ওহে কাজী, ছেলের ব্যাপারে আমাদের দুইজনের কাহিনী এটাই।

পুত্রবধূ শ্বাশুড়ীর দাবীর প্রেক্ষিতে নিম্নের এ জবাব দেয়:

يا ايها القاضي قد قالت لك الجده وقولا فاسمتع منى اعزى لنفسي عن ابنى ولا تبطرنى رده وكبدى حملت كبده فلما كان في حجري يتيما ضائعا وحده تزوجت رجاء والخير من يكفينى فقده ومن يكفل لى رفده. ومن يظهرلى وده

ওহে কাজী! দাদী অর্থাৎ আমার শ্বাশুড়ী আপনাকে তাঁর কথা বলেছেন। এখন আমার কিছু কথাও আপনি শুনুন এবং তা প্রত্যাখ্যান করবেন না। আমি আমার ছেলের দ্বারা নিজের অন্তরকে সান্ত্বনা দেই। আমি সব সময় তার কলিজার সাথে আমার কলিজা লাগিয়ে রাখি। বৈধব্য জীবনে আমার কোলে একাকীত্বের কারণে তার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল, এ কারণে তার কল্যাণ এবং তার তত্ত্বাবধানের উদ্দেশ্যে আমি এমন এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছি যে তাকে ধ্বংস হতে দেবে না এবং তার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

যেহেতু শ্বাশুড়ী ও পুত্রবধূ দু'জনই কবিতায় তাদের দাবী ও বক্তব্য উপস্থাপন করে। এ কারণে কাজী শুরায়হও কবিতায় তাঁর রায় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন:

قد فهم القاضي ما قلتما بقضاء بين بينكما وقضى بينكما ثم فصل وعلى القاضي جهد أن عقل وخذى ابنك من ذات العلل قال لجده بيني بالصبي انها لوصبرت كان لها قبل دعواها تبغيها البدل

তোমরা দু'জন যা কিছু বলেছো কাজী তা বুঝতে পেরেছেন এবং তোমাদের দু'জনের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফায়সালা দান করেছেন। যদি কাজী বুদ্ধিমান হন তাহলে সত্য উদঘাটনের জন্য তাঁর চেষ্টা করা ফরজ। তিনি দাদীকে বলছেন, ছেলেকে এই বাহানার আশ্রয় গ্রহণকারী মার নিকট থেকে নিয়ে পৃথক হয়ে যাও। যদি সে দ্বিতীয় বিয়ে না করতো, ছেলে তার কাছেই থাকতো।

বর্ণিত হয়েছে, কাজী শুরায়হর দশ বছর বয়সী একটি ছেলে খেলাধুলার প্রতি ভীষণ আসক্ত ছিল। ফলে পড়া-লেখার প্রতি ছিল দারুণ অমনোযোগী। একদিন সে স্কুল থেকে পালিয়ে কুকুর নিয়ে খেলতে শুরু করে। বাড়ীতে ফিরে এলে জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কি নামায পড়েছো? সে জবাব দেয় : না। তখন কাজী সাহেব কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে যান। ছেলেকে কিভাবে শিক্ষা দিতে হবে সে কথা কবিতায় সুন্দর করে তুলে ধরেন।

একজন কাজীর জন্য যেসব গুণ ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয় তার সবই শুরায়হর সত্তায় পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধাবী, বিচক্ষণ, চালাক ও ভীষণ সমঝ-বুঝের অধিকারী মানুষ। জটিল থেকে জটিলতর এবং মারাত্মক প্রতারণামূলক বিষয়েরও একেবারে গভীরে গিয়ে সত্য বের করে আনতেন। এসব গুণ তাঁর মধ্যে বিচার-ফায়সালার চূড়ান্ত যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল। হযরত রাসূলে কারীম (সা) যে 'আলীর (রা) প্রশংসায় বলেছেন : أَقضَاهُمْ عَلَى তাদের মধ্যে 'আলী সবচেয়ে বড় কাজী। সেই 'আলী (রা) শুরায়হর সম্পর্কে বলেছেন- أقضى القرب - তিনি আরবের সবচেয়ে বড় কাজী।

কাজী হিসেবে নিয়োগ লাভের পূর্বেই তিনি বিচার কার্যের যোগ্যতা ও দক্ষতার জন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করে ফেলেছিলেন। মানুষ তাদের বিভিন্ন বিবদমান বিষয়ে তাকে সালিশ নিয়োগ করতো। আর এরই প্রেক্ষিতে হযরত 'উমার (রা) তাঁর রায় দেখে তাঁকে কৃফার কাজী নিয়োগ করেন। ঘটনাটি এ রকম : হযরত 'উমার (রা) এক ব্যক্তির নিকট থেকে এই শর্তে একটি ঘোড়া ক্রয় করলেন যে, ঘোড়ার চলন ও আচরণ পরীক্ষা করে পছন্দ হলে নিবেন, অন্যথায় ফেরত দিবেন। তারপর পরীক্ষার জন্য তিনি ঘোড়াটিকে একজন দক্ষ সোয়ারীর হাতে দেন। সোয়ারী চালানোর সময় হোঁচট খেয়ে ঘোড়াটি দাগী হয়ে যায়। হযরত 'উমার (রা) ঘোড়াটি ফেরত দিতে চান, কিন্তু ঘোড়ার মালিক তা ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে উভয়ের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়। অবশেষে শুরায়হকে সালিশ মানা হয়। তিনি এই রায় দেন যে, যদি ঘোড়ার মালিকের অনুমতি নিয়ে সোয়ারী করা হয়ে থাকে তাহলে ঘোড়া ফেরত দেওয়া যেতে পারে, অন্যথায় নয়।

অপর একটি বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে এসেছে যে, পরীক্ষামূলক চালনার সময় ঘোড়াটি মারা যায়। এ অবস্থায় হযরত 'উমার (রা) মৃত ঘোড়টি মালিককে ফেরত দিতে চান। এতে বিবাদ দেখা দেয়। মীমাংসার জন্য শুরায়হ সালিশ মনোনীত হন। তিনি রায় দেন এভাবে : যা ক্রয় করা হয়েছে তা নিতে হবে, অথবা যে অবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে সেই অবস্থায় ফেরত দিতে হবে। এই রায়ের পর 'উমার (রা) মন্তব্য করেন : 'বিচার তো একেই বলে। সঠিক সিদ্ধান্ত, যার মধ্যে কোন ভুল-ভ্রান্তি নেই।' এই বিচারের পর হযরত 'উমার (রা) তাঁকে কৃষ্ণার কাজী নিয়োগ করেন।

ইমাম শা'বী বলেন: 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) নিয়োগকৃত ইরাকের প্রথম কাজী ছিলেন সালমান ইবন রাব'আ আল-বাহিলী। তিনি কাদিসিয়া যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং তথাকার কাজী হন। তারপর তাঁকে মাদায়েনের কাজী নিয়োগ করা হয়। কিছু দিন পর 'উমার (রা) তাঁকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে আবূ কুররা আল-কিন্দীকে নিয়োগ করেন। তারপর কৃষ্ণা শহরের পত্তন হলে আবূ কুররা হন তথাকার কাজী। তারপর 'উমার (রা) শুরায়হ ইবন আল-হারিছ আল-কিন্দীকে আবূ কুররার স্থলে কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। তারপর ষাট বছর যাবত সেখানে তিনি কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। মাখঝানে এক বছরের জন্য যিয়াদ তাঁকে বসরায় পাঠান এবং তাঁর স্থলে মাসরূক ইবন আল-আজদা' কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। শুরায়হ ফিরে এলে আবার তাঁকে কৃষ্ণার কাজী নিয়োগ করা হয় এবং 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সংঘাত-সংঘর্ষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কৃষ্ণা আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) নিয়ন্ত্রণাধীন থাকার সময় তিনি স্বেচ্ছায় কাজীর দায়িত্ব হতে অব্যাহতি নেন। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) অন্য এক ব্যক্তিকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন এবং তিনি তিন বছর কৃষ্ণার বিচার কাজ পরিচালনা করেন। ইবন যুবায়র (রা) নিহত হওয়ার পর শুরায়হ আবার কূফার কাজী হন। তিনি কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এ সময় একদিন এক ব্যক্তি পথে কাজী শুরায়হর সঙ্গে দেখা করে বললো: আল্লাহর কসম! আবূ উমাইয়‍্যা, আপনি অন্যায়ভাবে বিচার করছেন। তিনি জানতে চাইলেন কিভাবে? লোকটি বললো: আপনার বয়স অনেক হয়েছে, আপনার বুদ্ধি-জ্ঞানে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে এবং আপনার ছেলে ঘুষ খায়। সুরায়হ বললেন: ঠিক আছে, তোমার পরে আমাকে আর কেউ একথা বলতে পারবে না। এপর হাজ্জাজের নিকট আসেন এবং বলেন: আল্লাহর কসম! আমি আর বিচারকের দায়িত্ব পালন করবো না। হাজ্জাজ বললেন: আপনার স্থলে অন্য এক ব্যক্তিকে নির্বাচন করে না দেওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে অব্যাহতি দেব না। শুরায়হ বললেন: আপনি আবূ বুরদা ইবন আবী মূসাকে নিয়োগ করুন। তিনি একজন ভদ্র ও পরিচ্ছন্ন মানুষ। হাজ্জাজ তাঁকে শুরায়হর স্থলে নিয়োগ করেন এবং তাঁর সহযোগী ও সেক্রেটারী হিসেবে নিয়োগ করেন সা'ঈদ ইবন যুবায়রকে।

কাজী শুরায়হ এমন যোগ্যতা, দক্ষতা, চমৎকার পদ্ধতি ও আমানতাদীর সাথে তাঁর এ দায়িত্ব পালন করেন যে, হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকাল থেকে নিয়ে উমাইয়্যা খলীফা 'আবদুল মালিকের সময়কাল পর্যন্ত একাধারে প্রায় ষাট বছর যাবত কাজীর পদে বহাল থাকেন। এ দীর্ঘ সময়ে অনেক বড় বড় বিপ্লব ও ঘটনাবলী সংঘটিত হয়, খিলাফতে রাশেদার সোনালী যুগের সমাপ্তির পর উমাইয়্যা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, উমাইয়্যা শাসক ও 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। মোটকথা, গোটা ইসলামী দুনিয়ায় এক বিপ্লব ঘটে যায়। এত কিছু সত্ত্বেও শুরায়হ যথারীতি কাজীর পদে বহাল থাকেন। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) ও 'আবদুল মালিকের মধ্যে যুদ্ধের সময় মাত্র কয়েকটি বছরের জন্য নিজেকে বিচার কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।

খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি কাজী শুরায়হকে একটি দিকনির্দেশনামূলক চিঠি লেখেন। তাতে তিনি বলেন: 'বিচার কাজ চলাকালে কারো প্রতি ইঙ্গিত করবে না, কারো প্রতি ভ্রুকুটি করবে না, কারো ক্ষতি করবে না, কোন কিছু ক্রয়-বিক্রয় করবে না, এবং উত্তেজিত অবস্থায় বিচার কাজে বসবে না।

একজন কাজীর সবচেয়ে বড় কর্তব্য এবং সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, তিনি বিচারের ক্ষেত্রে বাইরের ও ভিতরের কোন প্রকার প্রভাবে প্রভাবিত হবেন না এবং কোন অবস্থাতেই সত্য ও ন্যায় বিচার থেকে দূরে ছিটকে পড়বেন না। শুরায়হর মধ্যে এ গুণ এত পরিমাণ ছিল যে, তিনি আইন, সত্য ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কারো পরোয়া করতেন না- তা সে যত বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক না কেন। একজন অতি সাধারণ মানুষের সাথে আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) বিবাদে তিনি যে ঐতিহাসিক রায়টি দান করেছিলেন তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। যদি তাঁর ছেলেও আইনের আওতায় পড়ে যেত, তাকেও কোন রকম রেহাই দিতেন না। একবার তাঁর এক ছেলে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিনদার হয়। উক্ত ব্যক্তি জামিন পেয়ে ফেরার হয়ে যায়। কাজী শুরায়হ তার জামিনদার নিজের ছেলেকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেন। একবার তাঁর আর্দালী এক ব্যক্তিকে চাবুক মারে। বিচারে তিনি প্রহৃত ব্যক্তির দ্বারা তাকে সমপরিমাণ চাবুক মারান।

একবার তাঁর খান্দানের এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির উপর একটু নির্যাতন চালায়। তিনি তাঁকে গ্রেফতার করে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেন। যখন তিনি বিচার কাজ শেষ করে উঠতে যাচ্ছেন তখন সেই অভিযুক্ত লোকটি তাঁকে কিছু কথা বলতে চায়। জবাবে তিনি বলেন, আমাকে কিছু বলার এবং তোমার কথা শোনার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, আমি তোমাকে গ্রেফতার করিনি, বরং সত্য ও ন্যায়বিচার তোমাকে গ্রেফতার করেছে।

হযরত শুরায়হ-এর এই 'আদল ও ইনসাফ কোন সাধারণ ব্যাপার ছিল না। তাঁর জীবনের এমন বহু ঘটনা আছে যার কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তাঁর এক ছেলে এবং অন্য এক ব্যক্তির মধ্যে কোন একটি অধিকারের ব্যাপারে বিবাদ ছিল। ছেলে পিতাকে বিষয়টি অবহিত করে বলে, আপনি যদি মনে করেন রায় আমার পক্ষে আসবে তাহলে আমি মামলা দায়ের করি, অন্যথায় চুপ থাকি। শুরায়হ মামলাটির গুণগত দিক নিয়ে গভীরভাবে ভাবার পর ছেলেকে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁর এজলাসে যখন মামলাটি উঠেলো, তিনি ছেলের বিপক্ষে রায় দিলেন। আদালত থেকে ঘরে ফেরার পর ছেলে পিতাকে বললো, যদি আমি পূর্বেই আপনার সাথে পরামর্শ না করতাম তাহলে আপনার বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ থাকতো না। কিন্তু মামলা দায়েরের পরামর্শ দিয়ে আপনি আমাকে অপমান করেছেন। শুরায়হ বললেন, আমার ছেলে! দুনিয়ার সব মানুষের চেয়ে তুমি আমার সবচেয়ে বেশী প্রিয়। কিন্তু তোমার চেয়ে মহান আল্লাহ আমার অধিক প্রিয়। যখন তুমি আমার সাথে পরামর্শ করলে তখন মামলার ধরন দেখে বুঝলাম রায় তোমার বিপক্ষে যাবে। যদি আমি তখন তা তোমার কাছে প্রকাশ করে দিতাম তাহলে তুমি তাদের সাথে আপোষ-মীমাংসা করে নিতে। আর এতে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতো।

তিনি বাদী-বিবাদীকে একই দৃষ্টিতে দেখতেন। কাউকে কারো উপর কোন রকম প্রাধান্য দিতেন না। একবার আল-আশ'আছ ইবন কায়স গেলেন কাজী শুরায়হ-এর এজলাসে। কাজী সাহেব তাঁকে আমাদের শায়খ, আমাদের দীক্ষাগুরু, আমাদের নেতা ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে মারহাবান, আহ্বান ও সাহলান বলে অত্যন্ত তা'জীমের সাথে ডেকে নিজের পাশে বসালেন। তাঁরা দু'জন পাশাপাশি বসে কথা বলছেন, এমন সময় একজন সাধারণ মানুষ উপস্থিত হলো এবং আল-আশ'আছের বিরুদ্ধে তার উপর অত্যাচারের অভিযোগ এনে কাজীর নিকট বিচার চাইলো। কাজী সাহেব একটু আগেই যাঁকে পরম সম্মানের সাথে কাছে বসিয়ে হাসি মুখে আলাপ করছিলেন, তিনি এখন ভিন্ন রূপ ধারণ করলেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল-আশ'আছকে নির্দেশ দিলেন: এখান থেকে উঠুন। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর আসনের পাশাপাশি বসুন এবং তাঁর সাথে কথা বলুন। আল-আশ'আছ বললেন: আমি বরং এখানে বসেই তার সাথে কথা বলি। এবার কাজী সাহেব আরো কঠিন হলেন। বললেন: আপনি অবশ্যই উঠবেন, নয়তো আপনাকে উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিব। আল-আশ'আছ বললেন: আপনি নিজেকে যে পরিমাণ বড় মনে করছেন তা খুব দুঃখজনক। শুরায়হ বললেন: সেটাকে কি আপনি আপনার সতীন বলে ভাবছেন? আল-আশ'আছ না। শুরায়হ আমি দেখছি, আপনি অন্যের উপর আল্লাহর অনুগ্রহকে দেখতে পান, কিন্তু আপনার নিজের প্রতি তাঁর অনুগ্রহকে দেখতে পান না।

মানব ইতিহাসের কোন যুগেই মিথ্যা সাক্ষ্যদান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। আর বন্ধ হওয়া সম্ভবও নয়। তবে কাজী শুরায়হ মানুষকে নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ করে মিথ্যা সাক্ষ্যদান বন্ধ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। সাক্ষীদেরকে বুঝিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্যদান থেকে বিরত রাখতেন। যদি বুঝাতে ব্যর্থ হতেন তাহলে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই রায় দিতেন। কারণ, সাক্ষ্যের বিপরীতে কাজীর ব্যক্তিগত জানার কোন গুরুত্ব নেই।

ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন। ঘটনার সাক্ষীর ব্যাপারে যখন শুরায়র-এর সন্দেহ হতো, কিন্তু তার বাহ্যিক সত্যবাদিতার ব্যাপারে কোন রকম প্রশ্ন তোলা যেতনা, তখন তিনি প্রথমে সাক্ষীদেরকে বলতেন, আমি তোমাদেরকে ডেকে আনিনি। তোমরা ইচ্ছা করলে ফিরে যেতে পার। আমি বাধা দিব না। তোমাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই এই মামলার রায় হবে। তোমাদের সাক্ষ্যের দরুন আমি দায়মুক্ত হয়ে যাই। তবে তোমরাও নিজেদেরকে বাঁচাও। কিন্তু বুঝানোর পরেও যদি সাক্ষী মিথ্যা সাক্ষ্যদানে বিরত না হতো তাহলে তিনি তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় দিতেন। কারণ, কোন কাজী কোন সাক্ষীকে সাক্ষ্যদানে বিরত রাখতে পারেন না। তবে তিনি বিবাদী পক্ষকে বলে দিতেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, এই বিবদমান বিষয় বা ঘটনায় তোমরা হচ্ছো উৎপীড়ক। কিন্তু আমি আমার বিশ্বাস ও ধারণার উপর ভিত্তি করে বিচার-ফায়সালা করতে পারিনে। বরং সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আমি ফায়সালা করতে বাধ্য। তবে এ সত্য অটুট থাকবে যে, যে জিনিস আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন, আমার ফায়সালা তা হালাল করতে পারে না।

হাদীছে নিকট আত্মীয়ের সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে কোন রকম নিষেধাজ্ঞা নেই। এ কারণে আত্মীয়ের মোকাদ্দামায় অন্য কোন বিশ্বস্ত আত্মীয়ের সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে কোন আইনগত বাধা নেই। ইবন আবী শায়বা বলেন, কাজী শুরায়হ কোন ব্যক্তির জন্য তার নিকট আত্মীয়ের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা দেন। তিনি এ আইন তৈরী করেন যে, পিতার জন্যে পুত্রের, পুত্রের জন্য পিতার, স্বামীর জন্য স্ত্রীর, স্ত্রীর জন্য স্বামীর, দাসের জন্য মনিবের, মনিবের জন্য দাসের এবং পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিয়োগকৃত ব্যক্তির সাক্ষ্য নিয়োগকারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই মৌল নীতির উপর তিনি এত অটল ছিলেন যে, একটি মামলায় তিনি হযরত 'আলীর (রা) পক্ষে হযরত ইমাম হাসানের সাক্ষ্যও প্রত্যাখ্যান করেন। একবার হযরত 'আলীর (রা) একটি ঢাল কোথাও হারিয়ে যায় এবং একজন জিম্মী তা খুঁজে পায়। হযরত 'আলী (রা) শুরায়হ-এর আদালতে মামলা দায়ের করেন। কাজী সাহেব জিম্মীকে বললেন, ঢালটির ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? সে বললো, ঢালটি যে আমার তার প্রমাণ এই যে, সেটি আমার হাতে বিদ্যমান। কাজী শুরায়হ 'আলীকে (রা) বললেন, ঢালটি যে পড়ে গিয়েছিল তার কোন সাক্ষী কি আছে? তিনি সাক্ষী হিসেবে পুত্র হাসান (রা) ও দাস কানবারকে উপস্থাপন করেন। শুরায়হ বললেন, কানবারের সাক্ষ্য তো আমি গ্রহণ করছি, তবে হাসানের (রা) সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করছি। হযরত 'আলী (রা) তখন বললেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণী শোনেননি:

الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الْجَنَّةِ. আল-হাসান ও আল-হুসায়ন জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা।

শুরায়হ বললেন: শুনেছি। তবে পিতার জন্য পুত্রের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য মনে করিনে। এই রায়কে 'আলী (রা) মেনে নেন। ঢালটি ইয়াহুদী জিম্মীকে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত ইয়াহুদীকে এত মুগ্ধ করে যে, সে নিজেই স্বীকার করে ঢালটি 'আলীর (রা)। সে আরো বলে, আপনাদের দীন সত্য। মুসলমানদের কাজী তাদের আমীরুল মু'মিনীনের বিরুদ্ধে রায় দেন, আর তিনি বিনাবাক্যে মাথা নত করে তা মেনে নেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর সত্য রাসূল ছিলেন। ইয়াহুদীর এভাবে ইসলাম গ্রহণে হযরত 'আলী (রা) এত খুশী হন যে, ঢালটি তাকে উপহার স্বরূপ দান করেন। এর কিছুদিন পরেই খারিজীদের সাথে হযরত 'আলীর (রা) যুদ্ধ হয়। নাহ্রাওয়ানের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে এই নওমুসলিম লোকটি 'আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন।

কাজী শুরায়হ-এর পূর্বে ইসলামী 'আদালতে গোপন তদন্তের রীতি চালু ছিল না। তিনিই সর্বপ্রথম তা চালু করেন। যেহেতু এটা ছিল একটি নতুন পদ্ধতি, এ কারণে লোকেরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলে, আপনি এ বিদ'আত চালু করলেন কেন? অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বাকর ও 'উমারের (রা) খিলাফতকালে যা চালু ছিল না, এমন নতুন জিনিস চালু করলেন কেন? জবাবে তিনি বললেন: মানুষ যখন নতুন নতুন কথা চালু করেছে তখন আমিও নতুন রীতি চালু করেছি। অর্থাৎ যখন নতুন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তখন আমাকেও নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়েছে।

কাজী শুরায়হ প্রমাণকে শপথের চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। শুধু শপথকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। বরং সাক্ষ্য-প্রমাণের সাথে সাথে শপথও নিতেন। একটি মোকাদ্দামায় একজন বাদী তার প্রতিপক্ষের শপথ নেওয়ায়, তারপর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। শুরায়হ বললেন, ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী মিথ্যা শপথের চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।

বাদীকে প্রমাণ উপস্থাপনের এবং বিবাদীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দান করা প্রতিটি আদালতের অপরিহার্য কর্তব্য। কাজী শুরায়হ এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি এত বেশী যত্নবান ছিলেন যে, মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পরও যদি উভয় পক্ষ কিছু বলতে চাইতো, তিনি তাদের বলার সুযোগ দিতেন। আহনাফ ইবন কায়স বলেন, একবার আমি শুরায়হ-এর 'আদালতে যাই। দেখলাম, তিনি এক ব্যক্তির বিপক্ষে রায় ঘোষণা করলেন। সাথে সাথে সে বলে উঠলো, এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিবেন না। আমার আরো কিছু বক্তব্য আছে। শুরায়হ তাকে বলার সুযোগ দিলেন। তার বক্তব্য শেষ হলে তিনি বললেন, তুমি অনেক অহেতুক কথা বলেছো। তুমি যা কিছু বলেছো তার সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন কর।

তিনি নিজের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতেন। তিনি বলতেন, কেউ আমার কোন রায়ের বিরুদ্ধে দাবী উত্থাপন করলে, আমার সে রায় ততক্ষণ পর্যন্ত বহাল থাকবে যতক্ষণ না সে তার দাবীর সপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। মোটকথা, সত্য আমার সিদ্ধান্তের বিপরীতে হলেও সেটাই সত্য।

অত্যন্ত নির্ভীকভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। বাদী-বিবাদী কোন পক্ষকেই কিছুমাত্র প্রাধান্য দিতেন না। কোন পক্ষকেই প্রশ্নবানে ক্ষত-বিক্ষত করতে মোটেই কার্পণ্য করতেন না এবং কোন পক্ষকেই বিশেষ কোন পয়েন্ট স্মরণ করিয়ে দিতেন না।

বিচার কাজে তিনি দারুণ গোপনীয়তা অবলম্বন করতেন। কোন কার্য-বিবরণী কারো কাছে প্রকাশ করতেন না। একবার তার ছেলে তার একটি মামলার ব্যাপারে তাঁকে কিছু প্রশ্ন করে। জবাবে তিনি বলেন, তুমি কি চাও, আমি তোমাকে তোমার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলি?

বিচার কাজে বংশীয় প্রথা-পদ্ধতির কোন গুরুত্ব দিতেন না। একবার একটি মোকাদ্দামায় এক পক্ষ বললো যে, আমাদের বংশীয় রীতি এটা। তিনি বললেন, তোমাদের বংশীয় রীতি-পদ্ধতি তোমাদের বাড়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। মোকাদ্দামায় দালাল নিয়োগের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। এমন দালালদের তিনি 'আদালত থেকে বের করে দিতেন। মানুষকে তাদের থেকে দূরে থাকার জন্য পরামর্শ দিতেন।

সভ্য যুগে ঘুষ উপহার-উপঢৌকনের রূপ ধারণ করে থাকে। আর এর থেকে মুক্ত থাকা খুবই কষ্টকর ব্যাপার। এ কারণে, শুরায়হ উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করলেও ঘুষ থেকে মুক্ত থাকার জন্য সাথে সাথে পাল্টা উপহারও দিয়ে দিতেন।

ঘর থেকে 'আদালতে যাওয়ার সময় এই কথাগুলো উচ্চারণ করতেন: 'অতি শীঘ্র অত্যাচারী সেই অংশকে জেনে যাবে যা সে কম করেছে। অত্যাচারীর শাস্তির এবং অত্যাচারিতের সাহায্যের প্রতীক্ষা করা উচিত।' ক্ষুধা ও রাগের অবস্থায় বিচার কাজ পরিচালনা করতেন না। এমন অবস্থায় এজলাস থেকে উঠে যেতেন।

সাধারণতঃ 'আদালতের বিচারকগণ সব মানুষকে খুশী রাখতে পারেন না। সাধারণভাবে তাদের রায়ের বিরুদ্ধে কোন না কোন পক্ষের অভিযোগ অবশ্যই থাকে। কিন্তু কাজী শুরায়হ-এর বিচার-ফায়সালায় জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। জাবির ইবন যিয়াদ বর্ণনা করেছেন, শুরায়হ আমাদের এখানে বসরায় প্রায় এক বছর কাজী ছিলেন। এই অল্প সময়ে তিনি এমন তুলনাহীন বিচার-ফায়সালা করেন যে, তাঁর পূর্বের ও পরের ইতিহাসে যার কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।

তাঁর সকল বিচার-ফায়সালা এত জ্ঞানগর্ভ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ হতো যে, তাঁর 'আদালত ফকীহদের দারসগাহ্ বা শিক্ষায়তনে পরিণত হয়। অনেক বড় বড় 'আলিম ফিকাহ্ বিষয়ক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে তাঁর ফায়সালা শোনা ও দেখার জন্য 'আদালতে আসতেন। সেকালে মাকহুল (রহ) ছিলেন একজন অতি বড় 'আলিম। তিনি বলেছেন, আমি ছয় মাস যাবত শুরায়হ-এর 'আদালতে গিয়েছি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। তাঁর কাছে অনেক প্রশ্ন করতাম। তাঁর বিচার-ফায়সালা আমার জন্য অনেক শিক্ষণীয় হতো।

যেহেতু তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও মেধাবী, তাই বাদী-বিবাদীর বাহ্যিক অবস্থা দেখে ধোঁকায় পড়তেন না। একবার একজন মহিলা তাঁর এজলাসে একজন পুরুষের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করলো। 'আদালতে সে গলা সপ্তমে চড়িয়ে কান্না শুরু করে দেয়। ইমাম শা'বীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি শুরায়হকে লক্ষ্য করে বলেন, মনে হচ্ছে, মহিলাটি অত্যাচারিত। শুরায়হ বললেন, কান্না অত্যাচারিত হওয়ার প্রমাণ নয়। ইউসুফ (আ)-এর ভায়েরাও কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে এসেছিলেন।

জ্ঞানগত পূর্ণতার সাথে সাথে তিনি উন্নতমানের নৈতিক গুণাবলীতে বিভূষিত ছিলেন। বড় দীনদার এবং 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। বিচার-ফায়সালার কঠিন দায়িত্ব ও ব্যস্ততা সত্ত্বেও যথেষ্ট সময় তাঁর 'ইবাদাতে অতিবাহিত হতো। তাঁর দাস আবূ তালহা বর্ণনা করেছেন, সকালে ফজরের নামায পড়ে ঘরে ফেরার পর দরজা বন্ধ করে প্রায় অর্ধেক দিন নফল 'ইবাদাতে মগ্ন থাকতেন।

তিনি ছিলেন খুব হাসিখুশী মেজাজের ও বিনীত স্বভাবের। সবাইকে তিনি প্রথমে সালাম দিতেন। কাসিম বর্ণনা করেছেন, সালাম দানের ব্যাপারে কেউ শুরায়হ-এর অগ্রগামী হতে পারেনি। 'ঈসা ইবন হারিছ বলেন, আমি সবসময় তাঁর আগেই সালাম দেওয়ার চেষ্টা করতাম, কিন্তু কখনো কামিয়াব হতে পারিনি। অধিকাংশ সময় পথে আমরা মুখোমুখি হতাম। আমি অপেক্ষায় থাকতাম, এখনই সালাম করবো, কিন্তু আমার আগেই তিনি 'আস-সালামু 'আলাইকুম' বলে দিতেন।

তিনি ফিতনা-ফাসাদ ও ঝগড়া-বিবাদ মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর জীবনে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, বছরের পর বছর 'আবদুল মালিক ও 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাঁর সামনেই বিদ্যমান ছিল- যার শিখা থেকে- খুব কম মানুষই নিরাপদ থাকতে পেরেছে, কিন্তু তিনি এর সবকিছু থেকে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হন। এই বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার সময় কয়েক বছরের জন্য কাজীর পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেন। এতে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে তিনি এতখানি সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, এই বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামার অবস্থা সম্পর্কে কারো কাছে কিছু জানতেও চাইতেন না। মানুষও এসব বিষয়ের প্রতি তাঁর অনীহার ভাব দেখে তাঁর সাথে এ নিয়ে কোন রকম আলোচনাও করতো না।

তিনি সবসময় অন্যের আরাম ও সুখ-শান্তির প্রতি যত্নবান থাকতেন। নিজের জন্য অন্য কাউকে সামান্য কষ্ট দেওয়াও পছন্দ করতেন না। নিজের বাড়ীর সব নর্দমা ও পয়ঃপ্রণালী বাড়ীর সীমানার ভিতর দিয়েই দিতেন, যাতে তাঁর পানিতে অন্যের কষ্ট না হয়। অন্যের আরাম-আয়েশের প্রতি এত বাড়াবাড়ি রকমের সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, তাঁর বাড়ীর কোন সদস্যের মৃত্যু হলেও অন্যের শান্তি ভঙ্গ হতে পারে এই ধারণায় কাউকে কোন খবর না দিয়েই রাতের মধ্যে দাফন করে দিতেন। নিজের এক সন্তানের মৃত্যুর পর কাউকে না জানিয়ে দাফন করে দেন।

তিনি ছিলেন একজন কৌতুকপ্রিয় ও প্রফুল্লচিত্তের মানুষ। মাঝে মধ্যে গুরুগম্ভীর পরিবেশেও তাঁর কৌতুক ও রসিকতার ফল্গুধারা বয়ে যেত। একবার 'আদী ইবন আরতাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসার জন্য তাঁর নিকট আসলেন। উভয়ের মধ্যে যে সংলাপটি হয় তা নিম্নরূপ:

'আদী- আমি আপনার সামনে কিছু কথা উপস্থাপন করতে চাই।
শুরায়হ- বলুন, আমি শোনার জন্য প্রস্তুত।
'আদী- আমি শামে অবস্থানকারী।
শুরায়হ- এত দূরের মানুষ!
'আদী- আমি আপনাদের এখানে বিয়ে করেছি।
শুরায়হ- আপনার বিয়ে কল্যাণময় হোক!
'আদী- আমি আমার স্ত্রীকে সংগে নিয়ে যেতে চাই।
শুরায়হ- স্বামী তাঁর স্ত্রীর অধিকারী এবং তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে স্বাধীন।
'আদী- কিন্তু সে তার নিজের বাড়ীতে থাকার শর্ত করেছিল।
শুরায়হ- তাহলে শর্ত পূরণ করা উচিত।
'আদী- আপনি আমাদের এ সমস্যার একটা ফায়সালা করে দিন।
শুরায়হ- ফায়সালা করে দিয়েছি।
'আদী- কার বিরুদ্ধে?
শুরায়হ- তোমার মার ছেলের বিপক্ষে (অর্থাৎ তোমার)।
'আদী- কার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে?
শুরায়হ- তোমার মামার বোনের ছেলের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে (অর্থাৎ তোমার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে)। কারণ, 'আদী তো নিজেই স্বীকার করেছিল যে, স্ত্রীর সাথে তার বাড়ীতেই বসবাস করার শর্তে বিয়ে করেছে।

একবার এক বেদুঈন তাঁকে প্রশ্ন করলো: আপনি কোন খান্দানের লোক? জবাবে তিনি বললেন: আমি সেই সব লোকদের একজন, আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে ইসলামের পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। এ জবাব শোনার পর বেদুঈন তাঁর নিকট থেকে উঠে চলে গেল এবং লোকদের বলতে লাগলো যে, তোমাদের এ কাজী তাঁর নিজের খান্দানের নামটি পর্যন্ত বলতে পারেন না। অন্য একটি বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, বেদুঈন লোকদের বলতে লাগলো, তোমরা তো আমাকে একজন দাসের নিকট পাঠিয়েছিলে। সাধারণতঃ দাস শ্রেণী ও তাদের মত যাদের উল্লেখ করার মত বংশ-গৌরব নেই তারা ইসলামের প্রতি নিজেদেরকে সম্বন্ধ ও সম্পৃক্ত করতো।

কাজী শুরায়হ ও ইবন যিয়াদের মধ্যে দারুণ মত বিরোধ ছিল। ইবন যিয়াদ একবার 'তা'উন' রোগে আক্রান্ত হন। ডান হাতে রোগটির প্রকোপ বেশী দেখা দেয় এবং পচন ধরে। চিকিৎসকগণ তাঁর হাতটি কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়। তিনি শুরায়হ-এর সাথে পরামর্শ করলেন। শুরায়হ চিকিৎসকদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে হাত কাটতে নিষেধ করলেন। যাই হোক, কিছুটা তাঁর পরামর্শে এবং কিছুটা ভয়ে হাত কাটা থেকে বিরত থাকলেন। ফলে তার বিষক্রিয়া সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি মারা যান। লোকে কাজী শুরায়হকে এই বলে তিরস্কার করতে লাগে যে, তাঁর সাথে আপনার দুশমনীর কারণেই আপনি তাঁর হাতটি কাটতে বারণ করেন। আর এ কারণেই তিনি মারা গেলেন। তিনি তাদেরকে জবাব দিলেন এই বলে: একজন পরামর্শক সব সময় আস্থাভাজনই হয়ে থাকেন। আমি যদি তাঁর কল্যাণকামী না হতাম তাহলে এটাই চাইতাম যে, একদিন তাঁর হাত কাটা যাক, একদিন পা কাটা যাক। এভাবে প্রতিদিন তাঁর দেহের একটি না একটি অঙ্গ কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো।

যিয়াদ ইবন আবীহ্ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কাজী শুরায়হ তাঁকে দেখতে গেলেন। ফিরে এলে মাসরূক ইবন আল-আজদা' তাঁর কাছে একটি লোক পাঠালেন যিয়াদের অবস্থা জানার জন্য। লোকটি জিজ্ঞেস করলো: আপনি আমীরকে কেমন দেখে এলেন? শুরায়হ বললেন: দেখে এলাম, তিনি আদেশ করছেন ও নিষেধ করছেন। মাসরূক একথা শুনে বললেন: শুরায়হ সব সময় বাঁকা কথা বলেন। তিনি আবারও লোকদের তাঁর কাছে পাঠালেন। তখন শুরায়হ বললেন: আমি দেখে এলাম, তিনি অন্তিম উপদেশ লেখার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং কাঁদতে নিষেধ করছেন।

সুফইয়ান আছ-ছাওরী বলেন: এক ব্যক্তি একবার কাজী শুরায়হ-র এজলাসে এসে একটি বিড়ালের মালিকানার ব্যাপারে ফায়সালা চাইলো। বিড়ালটি যে তার সে ব্যাপারে কাজী প্রমাণ পেশ করতে বললেন। লোকটি বললো: যে বিড়ালটি আমার বাড়ীতে জন্মেছে তার কোন প্রমাণ আমি দিতে পারবো না। কাজী বললেন: বেশ তাহলে তুমি বিড়ালটি নিয়ে তার মার কাছে ছেড়ে দাও। যদি সেটা সেখানে থাকে এবং তার মা দুধ পান করায় তাহলে তোমার বিড়াল। আর যদি সেটা জোরে ডাকতে থাকে, লোম ফোলাতে থাকে তাহলে সেটা তোমার বিড়াল নয়।

তাকদীরে তাঁর ছিল প্রবল বিশ্বাস। একবার কৃষ্ণায় ‘তা’উন’-এর মহামারি দেখা দেয়। তাঁর বন্ধু ভয়ে কৃষ্ণা ছেড়ে নাজফে চলে যান। শুরায়হ তাকে লেখেন: যে স্থান আপনি ছেড়ে গেছেন তা আপনার মৃত্যুকে নিকটবর্তী করতো না এবং আপনার জীবনের দিনগুলিও ছিনিয়ে নিত না। আর যে স্থানে আপনি আশ্রয় নিয়েছেন তা এমন এক সত্তার মুঠোর মধ্যে রয়েছে যাঁকে কোন কামনা-বাসনা অক্ষম ও অপারগ করতে পারে না এবং কোন পলায়নই তার থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয় না। আপনি ও আমরা সবাই একই বাদশার বিছানায় অবস্থান করছি। নাজফও এক মহাক্ষমতাশালীর অধিকারে আছে যা খুব শীঘ্র প্রকাশ পাবে।

তিনি সবসময় মানুষকে সৎ উপদেশ দিতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর কাছে ছোট-বড় ও আপন-পর কোন ভেদাভেদ ছিল না। জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, একদিন শুরায়হ আমার কিছু দুঃখের কথা আমার এক বন্ধুর নিকট বর্ণনা করতে শুনতে পেলেন। তিনি আমার একটি হাত ধরে এক পাশে নিয়ে গেলেন এবং বললেন: ভাতিজা, এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নিজের দুঃখের কথা বলবে না। কারণ, তুমি যার কাছে তোমার দুঃখ-কষ্টের কথা বলছো সে হয় তোমার বন্ধু হবে, না হয় শত্রু। বন্ধু হলে সে তোমার দুঃখের কথা শুনে ব্যথিত হবে, আর শত্রু হলে উৎফুল্ল হবে। তারপর বললেন: তুমি আমার এই চোখটির দিকে তাকাও। আঙ্গুল দিয়ে তাঁর একটি চোখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন: আল্লাহর কসম, পনেরো বছর যাবত আমি এ চোখটি দ্বারা না কোন মানুষকে দেখতে পাই, আর না কোন পথ-ঘাট। কিন্তু এই মুহূর্তে কেবল তুমি ছাড়া এ পর্যন্ত আর কাউকে এ কথাটি বলিনি। তুমি কি আল্লাহর সেই সত্যনিষ্ঠ বান্দাটির কথা শোননি:
إنما أشكو بثي وحزني إلى الله আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সামনেই পেশ করছি। সুতরাং একমাত্র আল্লাহকেই তুমি তোমার যাবতীয় শেকায়েত ও অভিযোগের কেন্দ্র বানাও।

একবার তাঁর 'আদালতে এক ব্যক্তি এক সাক্ষীকে ডাক দেয়- যার নাম ছিল রাবী'আ। সে উত্তর দিল না। লোকটি উত্তেজিত হয়ে জোরগলায় তাকে কাফির' বলে ডাক দিল। এবার সে সাড়া দিল। কাজী শুরায়হ দৃশ্যটি উপভোগ করছিলেন। তিনি এবার কৌতুক করে সাক্ষীর প্রতি এই দোষ আরোপ করলেন যে, তুমি নিজেই 'কুফর' (আল্লাহকে না মানা) স্বীকার করে নিয়েছো। এ কারণে তোমার সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায় না।

শেষ জীবনে বার্ধক্যের দরুন দুর্বল হয়ে পড়েন এবং কাজীর পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের অল্প কিছুদিন পর রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বাঁচার আর আশা থাকলো না। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আত্মীয়-পরিজনদেরকে এই অসীয়াতগুলো করেন:
১. ঝুলন্ত কবর খুঁড়বে। ২. মৃত্যু ও জানাযার খবর কাউকে দিবে না। ৩. বিলাপ করবে না। ৪. লাশ ধীরে ধীরে বহন করবে। ৫. কবর চাদর দিয়ে ঢাকবে না। এ কথাগুলো বলার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স এক শো বছর অতিক্রম করেছিল। মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। হিজরী ৭৬ সন থেকে ৭৯ সনের মধ্যে তাঁর ইনতিকাল হয়।

তিনি মাকুন্দা ছিলেন। পাঁচ শো দিরহাম মাসিক ভাতা পেতেন। ইমাম আয-যাহাবীর মতে তিনি এক শো বিশ বছর জীবিত ছিলেন এবং হিজরী ৭৮, মতান্তরে ৮০ সনে মৃত্যুবরণ করেন।

কাজী শুরায়হ-এর আংটিতে (সীল) খোদাই করা ছিল এই কথাটি- 'الخاتم خير من الظن' - সীল-মোহর সন্দেহের চেয়ে ভালো।

টিকাঃ
১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৬১, টীকা-১; সিফাতুস সাফওয়া-৩/২০
২. আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-২/২০২
৩. আল-ইসতী'আব-২/৬৭
৪. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৪
৫. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৬/৬৫
৬. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৯
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫১
৮. আ'লাম আল-মুওয়াক্কা'ঈন-১/২৭
৯. তাবাকাত-৬/৯০; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১৫
১০. তাবাকাত-৬/৯৪
১১. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১২১-১২২
১২. আল-ইসতী 'আব-২/৬৭
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৩
১৪. কিতাবুল আওয়ায়িল, আল-বাব আস-সাবি'-যিব্রুল কুজাত।
১৫. তাবাকাত-৬/৯১; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১২
১৬. 'উয়ুন আল-আখবার-১/১০১
১৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
১৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৫০
১৯. তাবাকাত-৬/৯২, ৯৫
২০. প্রাগুক্ত-৬/৯৩
২১. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৭/১১৮
২২. আল-ইদ আল-ফারীদ-১/৯০; ৪/২৬, ৪৮
২৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৯
২৪. শাযারাত আয-যাহাব-১/৮৫
২৫. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৪-১১৭
২৬. তাবাকাত-৬/৯৪
২৭. প্রাগুক্ত-৬/৯৩, ৯৪, ৯৫, ৯৭
২৮. আল-'ইব্দ আল-ফারীদ-১/৮৯; 'উয়ূন আল-আখবার-১/৬৬
২৯. তাহযীব আল-আসমা'-১/২২৪
৩০. তাবাকাত-৬/৯৭, ৯৮; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
৩১. 'উয়ূন আল-আখবার-২/৫৯৭
৩২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৯
৩৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/۹৮; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-১/৯০; ৩/১০; 'উয়ূন আল-আখবার-১/৩৬৬
৩৪. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
৩৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪৬৭; 'উয়ূন আল-আখবার-২/৫৯৭
৩৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৯১
৩৭. প্রাগুক্ত-৩/১৯৩; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/২০৩
৩৮. সূরা ইউসুফ-৮৬
৩৯. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৯-১২০
৪০. তাবাকাত-৬/৯৯
৪১. প্রাগুক্ত-৬/৯৫; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
৪২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৯
৪৩. 'উয়ুন আল-আখবার-১/৩৪৯

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আমির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রহ)

📄 ‘আমির ইবন ‘আবদিল্লাহ (রহ)


'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর দু'টি ডাক নাম পাওয়া যায়। আবূ 'আবদিল্লাহ ও 'আবূ 'আমর। আরবের বিখ্যাত বানু তামীম গোত্রের সন্তান। বসরার অধিবাসী ছিলেন। তিনি একজন অতি বিশ্বস্ত 'আবিদ তাবি'ঈ। কা'ব আল-আহবার তাঁকে দেখে মন্তব্য করেছিলেন: ইনি এই উম্মাতের রাহিব বা সন্যাসী। তৎকালীন আরবের একজন বিখ্যাত কারী। মানুষকে কুরআন পাঠ শিক্ষা দিতেন। তাঁর পিতার নাম 'আবদুল্লাহ। কোন কোন বর্ণনায় 'আবদু কায়সও এসেছে।

তিনি বসরায় বেড়ে ওঠেন। বসরা ছিল একটি নতুন অভিজাত শহর। বিত্ত-বৈভবে যেমন শহরটি ঝলমল করতো তেমনি জ্ঞানী-গুণীদের পদচারণায় মুখর থাকতো। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ছিলেন তখন বসরার ওয়ালী, ইমাম ও সেনাধ্যক্ষ। এই আবূ মূসার (রা) কাছেই 'আমির শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ছায়ার মত আবূ মুসাকে (রা) অনুসরণ করেন। তাঁর নিকট থেকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা) সুন্নাহ্র জ্ঞান অর্জন করেন। তাঁর সূত্রে হাদীছও বর্ণনা করেন। হযরত আবূ মূসা আল- আশ'আরীর (রা) কল্যাণে তিনি ফকীহ্ মর্যাদা লাভ করেন।

মহান তাবি'ঈদের উজ্জ্বল ও সাধারণ গুণ-বৈশিষ্ট্য বলতে যা বুঝায় তাহলো তাঁদের 'ইলম ও 'আমল এবং খিদমতে 'ইলম ও দীন। অন্য কথায়, গোটা তাবি'ঈ প্রজন্মের সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল জ্ঞান অর্জন করা, অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করা, জ্ঞানের প্রচার-প্রসার ঘটানো এবং স্বধর্মের সেবা করা। এসব গুণ তাবি'ঈদের প্রত্যেকের মধ্যে কমবেশী দেখা যায়। তবে তাঁদের মধ্যে ছোট্ট একটি দল এমনও ছিলেন যাঁরা কেবল দুনিয়ার যাবতীয় ঝক্কি-ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকেননি, বরং জ্ঞানের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হওয়ার পর শুধু 'ইবাদাত-বন্দেগী ও তাযকিয়ায়ে রূহ বা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধিকে নিজেদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানিয়ে নেন। 'আমিরও এই পবিত্র দলটির একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। এ রূপটি তাঁর মধ্যে এত প্রবল ছিল যে, তাঁর প্রতিটি কর্ম ও আচরণে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর কোন কর্মই এই চেতনা থেকে মুক্ত ছিল না। তাঁর জীবনের অন্যান্য অবস্থাকে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ও নির্লোভ ভাব ও খোদাভীতি থেকে পৃথক করে দেখানো খুবই কঠিন। বলা হয়েছে যে, তিনি নিজের উপর প্রত্যেকটি দিন ও রাতে এক হাজার রাক'আত নামায ফরজ করে নিয়েছিলেন।

আল-জাহিজ তাপস ও পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষদের যে তালিকা দিয়েছেন তার প্রথমে এই 'আমিরের নামটি স্থান পেয়েছে।

খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত 'উমার ফারুকের (রা) পরামর্শ ও নির্দেশে মহান সাহাবায়ে কিরাম ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈগণ হিজরী ১৪ সনে 'বসরা' নগরী পত্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

এই নতুন শহরে তাঁরা পার্শ্ববর্তী পারস্যে যুদ্ধ-বিজয়ী মুসলিম সৈনিকদের জন্য সেনানিবাস, দা'ওয়াত ইলাল্লাহ (আল্লাহর দিকে আহ্বান) ও আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীর চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন। নতুন শহরের পত্তন হলো। আরব উপ-দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল- নাজদ, হিজায, ইয়ামন থেকে মানুষ এই শহরে এসে বসতি স্থাপন করতে আরম্ভ করলো, যাতে এটি মুসলমানদের অন্যতম দুর্গে পরিণত হতে পারে। নাজদের বানু তামীমের যুবক 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ আত-তামীমী আল-আনসারীও সেই বসতি স্থাপনকারীদের একজন। 'আমির তখন একজন প্রাণ-চঞ্চল, পরিচ্ছন্ন অন্তঃকরণ ও দীপ্তিমান মুখমণ্ডলের এক নব্য যুবক। বসরা একটি নতুন শহর হলেও মুসলমানদের অন্যান্য শহরের তুলনায় বেশী অর্থ-বিত্তের ছড়াছড়ি ছিল। কারণ, বিজয়ী সৈন্যদের মাধ্যমে এখানে প্রচুর গনীমতের মাল ও স্বর্ণ-রৌপ্যের সরবরাহ হতো।

কিন্তু তামীম গোত্রের এই যুবক 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এসব কিছু ছিল না। মানুষের হাতে যা কিছু আছে তার প্রতি তিনি নির্মোহ ও নিস্কাম স্বভাবের এবং আল্লাহর হাতে যা কিছু আছে তা পেতে দারুণ আগ্রহী। দুনিয়া ও তার চাকচিক্য ও জৌলুসের প্রতি একেবারেই উদাসীন এবং আল্লাহ ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের প্রতি সীমাহীন প্রত্যাশী।

এ সময় বসরার প্রধান পুরুষ ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম মহান সাহাবী হযরত আবু মূসা আল-আশ'আরী (রা)। তিনি এই শহর ও এই অঞ্চলের ওয়ালী, এখান থেকে বিভিন্ন দিকে প্রেরিত মুসলিম মুজাহিদ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি, শহরবাসীর ইমাম, শিক্ষক এবং আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী প্রধান দা'ঈ। 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ আবু মূসা আল-আশ'আরীর (রা) যুদ্ধ ও শান্তি এবং ভ্রমণ ও বাড়ীতে অবস্থান সর্ব অবস্থায় তাঁর সুহবত বা সাহচর্য অবলম্বন করেন। তিনি তাঁর নিকট কিতাবুল্লাহর পাঠ ও জ্ঞান তেমনভাবে লাভ করেন যেমন নবী মুহাম্মাদের (সা) উপর নাযিল হয়েছিল। তাঁর নিকট থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) বহু হাদীছ লাভ করেন এবং যা তিনি তাঁর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছেই তিনি আল্লাহর দীনের গভীর তত্ত্ব জ্ঞান লাভ করে ফকীর মর্যাদা অর্জন করেন। যতটুকু সম্ভব জ্ঞান অর্জনের দ্বারা নিজেকে উৎকর্ষমণ্ডিত করার পর তিনি তাঁর জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেন: ১. একাংশ শিক্ষা মজলিসে অতিবাহিত করতেন। তাতে তিনি বসরার জামে' মসজিদে মানুষকে কুরআন শিক্ষা দিতেন। ২. একটি অংশ জিহাদের ময়দানে কাটাতেন। প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বিজয়ীদের বেশে গাজী হিসেবে ফিরে এসেছেন। ৩. আরেকটি অংশ তিনি কাটিয়েছেন লোক-চক্ষুর অন্তরালে 'ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে। নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পা দু'টি ফুলে গেছে। এ তিনটি বিষয় ছাড়া আর কোন কিছু তাঁর জীবনকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। তাই মানুষ তাঁকে বলতো 'বসরার 'আবিদ ও জাহিদ' অর্থাৎ বসরার তাপস ও সন্ন্যাসী।

বসরার জনৈক ব্যক্তি 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর জীবনের একটি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন।

একবার আমি একটি কাফেলার সাথে, যার মধ্যে 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহও ছিলেন, ভ্রমণ করছিলাম। সারা দিন চলার পর যখন রাত হয়ে গেল তখন একটি জলাশয়ের পাশে জঙ্গলের মধ্যে যাত্রাবিরতি করলাম। 'আমির তাঁর জিনিসপত্র গুছিয়ে ঘোড়াটিকে লম্বা করে একটি গাছে বাঁধলেন। তারপর ঘোড়াটার পেট ভরার মত কিছু ঘাস ও লতাপাতা ছিঁড়ে-কেটে এনে তার সামনে ছড়িয়ে দিলেন। তারপর সবার দৃষ্টির আড়ালে গভীর জঙ্গলে চলে গেলেন। আমি মনে মনে বললাম: আল্লাহর কসম! আমাকে অবশ্যই তাঁর অনুসরণ করতে হবে এবং দেখতে হবে এই রাতের অন্ধকারে গভীর জঙ্গলে তিনি কি করেন। যেতে যেতে তিনি মানুষের দৃষ্টির আড়ালে বৃক্ষ-বেষ্টিত একটি টিলায় গিয়ে থামলেন। তারপর কিবলামুখী হয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমি আমার জীবনে এত সুন্দর, পরিপূর্ণ ও বিনীত ভাবের নামায আর দেখিনি। আল্লাহ যতক্ষণ চাইলেন, তিনি নামায পড়লেন। তারপর একাগ্রচিত্তে আল্লাহর দরবারে দু'আ ও মুনাজাত করতে লাগলেন। সেই মুনাজাতে তিনি যেসব কথা বলেছিলেন তার কিছু এ রকম: 'ইয়া ইলাহী! আপনি আপনার আদেশ দ্বারা আমাকে সৃষ্টি করেছেন, এই পৃথিবীর বিপদ-মুসীবতে আপনার ইচ্ছায় আমাকে রেখে দিয়েছেন। তারপর আমাকে বলেছেন: নিজেকে শক্ত রাখ। হে মহাশক্তিশালী! আপনি যদি অনুগ্রহ করে আমাকে শক্ত না করেন, আমি শক্ত হবো কি করে? ইয়া ইলাহী! আপনি জানেন, যাবতীয় সুখ-ঐশ্বর্যসহ যদি গোটা দুনিয়া আমার হাতে তুলে দেওয়া হয়, তারপর আপনার সন্তুষ্টির বিনিময়ে কেউ যদি তা চায়, আমি তাকে তা দিয়ে দিব।

ইয়া ইলাহী আমি আপনাকে এত গভীরভাবে ভালোবাসি যা আমার উপর আপতিত বালা-মুসীবতকে সহজ করে দিয়েছে এবং আমার জন্য যা আপনি নির্ধারণ করেছেন তাই আমাকে সন্তুষ্টি দান করেছে। আপনার প্রতি আমার এ ভালোবাসা বিদ্যমান থাকলে আমার সকাল-সন্ধ্যা কেমন কাটলো তাতে আমার কোন পরোয়া নেই।'

বসরার লোকটি বলেছেন: তারপর আমার একটু তন্দ্রা ভাব এলো এবং এক সময় আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। তারপর আমি জাগলাম। দেখলাম, 'আমির সেই একই অবস্থায় নামায, দু'আ ও মুনাজাতের মধ্যে আছেন। এভাবে সুবহে সাদিক হয়ে গেল। ফজরের ফরজ নামায আদায় করলেন। তারপর এভাবে দু'আ করতে লাগলেন: 'হে আল্লাহ! এখন প্রভাত হয়েছে। মানুষের চলাচল শুরু হবে, তারা আপনার অনুগ্রহ ও রুযি-রেষেকের সন্ধান করবে। তাদের প্রত্যেকের কিছু না কিছু প্রয়োজন আছে। আপনার নিকট 'আমিরের প্রয়োজন হলো, আপনি তার যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দিন। ইয়া আকরামাল আকরামীন! আপনি আমার ও তাদের সবার প্রয়োজনসমূহ পূরণ করে দিন। হে আল্লাহ! আপনার নিকট আমি তিনটি জিনিস চেয়েছি। দু'টি দিয়েছেন, একটি দেননি। হে আল্লাহ! আপনি সেটা আমাকে দিন। যাতে আমি আপনার 'ইবাদাত করতে পারি, যেমন আমি ভালোবাসি ও আমি চাই।'

তারপর তিনি বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ান এবং আমার উপর তাঁর দৃষ্টি পড়ে। তিনি বুঝতে পারেন, আমি সারা রাত বসে বসে তাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। তিনি ভীষণ ভীত-কম্পিত হয়ে পড়লেন। অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললেন : ওহে বসরী ভাই! মনে হচ্ছে আপনি সারা রাত আমাকে পাহারা দিয়েছেন।

বললাম: হাঁ।

বললেন: আপনি আমার যা কিছু দেখেছেন, গোপন রাখুন, আল্লাহ আপনার কাজ ও কথা গোপন রাখবেন।

আমি বললাম: আপনি যে তিনটি জিনিস আপনার পরোয়ারদিগারের নিকট চেয়েছিলেন, সেই তিনটি জিনিস কি, তা হয় আপনি আমাকে বলবেন, নয়তো আমি আপনার যে আমল প্রত্যক্ষ করেছি তা মানুষের মধ্যে প্রচার করে দিব।

বললেন: আল্লাহ আপনার প্রতি করুণা করুন! আপনি একাজ করবেন না।

বললাম: আমি আপনাকে যা বলেছি, যদি তা করেন তাহলে বলবো না।

আমার অনমনীয়তা দেখে তিনি বললেন: যদি আপনি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে এই অঙ্গীকার করেন যে, অন্য কারো নিকট আপনি প্রকাশ করবেন না তাহলে আমি আপনাকে বলতে পারি।

বললাম: আমি আল্লাহর নামে দৃঢ় অঙ্গীকার করছি যে, আপনার জীবদ্দশায় কারো কাছে আপনার এ গোপন কথা প্রকাশ করবো না।

তিনি বললেন: আমার দীনের ব্যাপারে নারীর চেয়ে বেশী ভীতি ও আশঙ্কাজনক আমার কাছে আর কিছু নেই। তাই আমি আমার পরোয়ারদিগারের নিকট প্রার্থনা করেছি, তিনি যেন আমার অন্তর থেকে নারীর প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা দূর করে দেন। তিনি আমার এ দু'আ কবুল করেছেন। ফলে আমি এখন এমন হয়ে গেছি যে, কোন নারীকে দেখলাম না কোন প্রাচীর, তাতে আমার কোন পরোয়া নেই।

বললাম: এতো একটি গেল। দ্বিতীয়টি কি?

বললেন: দ্বিতীয়টি হলো, আমি আমার পরোয়ারদিগারের নিকট চেয়েছি যে, আমি যেন একমাত্র তাঁকে ছাড়া আর কাকেও ভয় না করি। আমার এ চাওয়া আল্লাহ কবুল করেছেন। এখন আমি একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আসমান-যমীনের আর কোন কিছুকেই ভয় করিনে।

বললাম: তৃতীয়টি কি?

বললেন: আমার পরোয়ারদিগারের নিকট আমার তৃতীয় চাওয়া ছিল, তিনি যেন আমার চোখের ঘুম দূর করে দেন। তাহলে আমি রাত-দিন আমার ইচ্ছা মত তাঁর 'ইবাদাত করতে পারবো। কিন্তু তিনি আমার এ চাওয়া পূরণ করেননি।

তাঁর একথা শুনে আমি বললাম : আপনার নিজের প্রতি একটু দয়া করুন। আপনার রাত কাটে নামাযে দাঁড়িয়ে আর দিন কাটে রোযা রেখে। আপনি যা করছেন তার থেকে অনেক কম করেও জান্নাত পাওয়া যাবে। আর আপনি যতখানি সতর্কতা অবলম্বন করছেন তার থেকে অনেক কম সতর্ক হয়েও জাহান্নাম থেকে বাঁচা যাবে।

আমার একথা শুনে বললেন: আমার ভয় হয়, আমি সেখানে লজ্জিত হই কিনা। যেখানে লজ্জা ও অনুশোচনা কোন কাজে আসবে না। আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই 'ইবাদাতের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবো। যদি আমি নাজাত ও মুক্তি পাই, তাহলে সেটা হবে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে। আর যদি আমি জাহান্নামে যাই, তাহলে সেটা হবে আমারই ত্রুটির কারণে।

তারপর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। লোকটি বললো: হে আমার ইসলামী ভাই! আপনি কাঁদছেন কেন? বললেন: আমি তোমাদের দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণের কারণে কাঁদছিনে। আমি কাঁদছি, প্রচণ্ড গরমের দিনে দুপুরের পিপাসা ও শীতের রাতে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার স্বল্পতার জন্য।

এ ঘটনার পর 'আমির তাঁর ঘরে ফিরে গেলেন। একদিন ভাতা বণ্টন ও বাইতুল মাল দফতরের একজন কর্মচারী তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। 'আমিরের জন্য নির্ধারিত সরকারী ভাতা ছিল। ইসলামী রাষ্ট্র 'উলামা ও ফকীহদের যে ভাতা দিত, এ ছিল সেই ভাতা। সরকারী কর্মচারীটি বললো: ওহে 'আমির, আপনি দফতরে চলুন এবং ভাতা গ্রহণ করুন। 'আমির গেলেন এবং ভাতার অর্থ গ্রহণ করে তাঁর গায়ের চাদরের এক কোণে ঢেলে বাড়ীর পথে বের হলেন। পথে গরিব, মিসকীন, অভাবী, সায়িল যাকেই পেলেন কাপড়ের মধ্যে হাত দিয়ে মুঠ ভরে উঠিয়ে তাকে দিলেন। এভাবে দিতে দিতে বাড়ী পৌঁছলেন। পরিবারের লোকদের সামনে সব মুদ্রা ঢেলে দিলেন। তাঁরা একটি একটি করে গুণে দেখলেন, ভাতা দফতর থেকে যে পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছিলেন তা ঠিকই আছে। একটি মুদ্রাও কম নেই।

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ কেবল একজন দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ এবং রাতের অন্ধকারে নির্জনে-নিরিবিলিতে আল্লাহর 'ইবাদাতকারী ব্যক্তিই ছিলেন না, বরং দিনের বেলায় একজন দক্ষ অশ্বারোহী যোদ্ধাও ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় যখনই আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ডাক দেওয়া হয়েছে, সেই ডাকে প্রথম সাড়া দানকারী সব সময় তিনি থেকেছেন। তিনি যখন কোন মুজাহিদ বাহিনীর সাথে জিহাদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেন তখন ব্যতিক্রমধর্মী একটি কাজ করতেন। মুজাহিদদের মধ্য থেকে বেছে বেছে একটি দলকে নির্বাচন করতেন নিজের সহযোদ্ধা হিসেবে। তারপর তাঁরা যখন একসঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য একমত হতেন তখন তিনি তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলতেন: ওহে ভায়েরা আমার! আমি আপনাদের সঙ্গী হতে ইচ্ছুক, যদি আপনারা আমাকে তিনটি বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁরা জানতে চাইতেন, সেই তিনটি বিষয় কি কি? তিনি বলতেন:

প্রথমত: আমি হবো আপনাদের সেবক। এই সেবার কাজে আপনাদের কেউ কখনো আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবেন না।

দ্বিতীয়তঃ আমি হবো আপনাদের মুআযযিন। এ ব্যাপারে কেউ আমার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবেন না।

তৃতীয়তঃ আমার সাধ্যমত আপনাদের জন্য আমাকে খরচ করার অধিকার দিতে হবে। যদি তাঁরা তাঁকে এ তিনটি ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিতেন তাহলে তিনি তাঁদের দলে থাকতেন। কেউ দ্বিমত পোষণ করলে তিনি অন্য দল খুঁজে তাদের সাথে বের হতেন।

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহর জিহাদ ছিল নির্ভেজাল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আসমা' ইবন 'উবায়দ বর্ণনা করেছেন। 'আমির একবার একটি যুদ্ধে গেলেন। সেই যুদ্ধে শত্রুপক্ষের এক বড় নেতার একটি মেয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হলো। তখনকার রীতি অনুযায়ী শত্রু পক্ষের বন্দী মেয়েদেরকে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো। সৈনিক 'আমিরকে এই বন্দী মেয়েটিকে দেওয়ার জন্য তার একটি বর্ণনা তাঁর কাছে দেওয়া হলো। 'আমির সেই বর্ণনা শুনে বললেন, আমিও তো একজন পুরুষ, এ মেয়েটি আমাকে দেওয়া হোক। তাঁর এমন অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবে বাহিনীর সদস্যরা সানন্দে দাসীটিকে তাঁর হাতে অর্পণ করলো। তিনি যখন মেয়েটির মনিব হয়ে গেলেন তখন তাকে বললেন: আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তোমাকে এ বন্দী দশা ও দাসত্ব থেকে মুক্তি দিলাম। তুমি এখন মুক্ত, স্বাধীন। তাঁর সঙ্গী-সাথীরা বললেন, আপনি তাকে মুক্ত না করে অন্য কোন দাসীকে মুক্তি দিতে পারতেন। বললেন: আমি আমার পরোয়ারদিগারের নিকট ভালো প্রতিদান চাই। 'আমিরের অভ্যাস ছিল, জিহাদের পথে চলাকালে পালাক্রমে অন্য মুজাহিদদেরকে নিজের বাহনের পিঠে চড়ানো।

'আমির ছিলেন সেই সব মুজাহিদের একজন যাঁরা যুদ্ধের ভীতিপ্রদ মারাত্মক পর্যায়ে দুঃসাহসী হয়ে ওঠেন এবং লোভ-লালসার পর্যায়ে নিজেদেরকে একেবারে গুটিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। অন্য কথায়, তিনি নির্ভিকভাবে নিজের জীবনের পরোয়া না করে শত্রু-সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন; কিন্তু গনীমত সংগ্রহ, বণ্টন ও গ্রহণের ব্যাপারে একেবারেই নিস্পৃহ ও উদাসীন থাকেন, যা তাঁর সঙ্গীদের অনেকেই পারেন না। সেনাপতি সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা) ঐতিহাসিক কাদেসিয়া যুদ্ধের পর মাদায়েন দখল করে শাহান শাহ্ ইরানের প্রাসাদে প্রবেশ করেন। তিনি 'আমর ইবন মুকাররিনকে (রা) নির্দেশ দেন গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ শত্রু-সম্পদ একত্র করার জন্য। যাতে তার এক-পঞ্চমাংশ বায়তুল মালে পাঠিয়ে অবশিষ্টগুলো মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করতে পারেন। নির্দেশ মত জমা করা হলো অঢেল সম্পদ এবং এতসব মূল্যবান জিনিসপত্র যার বর্ণনা দুঃসাধ্য। এখানে অসংখ্য ঝুড়ি ভর্তি পারস্য সম্রাটদের ব্যবহার্য সোনা-রূপোর থালা- বাসন, ওখানে মূল্যবান কাঠের অসংখ্য বাক্স ভর্তি রাজ-পরিবারের সদস্যদের কাপড়- চোপড় এবং সোনা ও মণি-মুক্তার অলঙ্কারাদি। আবার এখানে রয়েছে মহিলাদের সাজ- সজ্জার জিনিস ও মূল্যবান সুগন্ধিতে ভরা অসংখ্য পাত্র, আবার ওদিকে আছে অসংখ্য বাক্স ভর্তি পারস্য সম্রাট, তাঁদের বীর যোদ্ধা ও সৈনিকদের ব্যবহার্য অগণিত মূল্যবান যোদ্ধাস্ত্র।

সেনাপতি সা'দ (রা) নির্বাচিত সৈনিকরা যখন উন্মুক্ত স্থানে সকল সৈনিকের সামনে এসব গনীমতের মাল বিভিন্নভাবে হিসাব-নিকাশ করছেন ঠিক সে সময় উস্কে-খুসকো ও ধূলিমলিন চেহারার একটি লোক খুব বড় আকারের ও ভারী ওজনের একটি পাত্র দু'হাতে উঁচু করে এনে হাজির করলো। সবাই সেটা নেড়ে চেড়ে ভালো করে দেখলো। তারা বুঝলো এমন পাত্র তারা আর পায়নি। খোলার পর দেখতে পেল সেটি মণি-মুক্তা ও হীরা-জহরতে ঠাসা। উপস্থিত সবাই এবার লোকটিকে প্রশ্ন করলো: এই মহা মূল্যবান সম্পদ তুমি কোথায় পেলে? লোকটি বললো: অমুক যুদ্ধে অমুক স্থানে। তারা আবার প্রশ্ন করলো: এর থেকে কি কিছু নিয়েছো? সে বললো: আল্লাহ আপনাদেরকে হিদায়াত করুন। আল্লাহর কসম! এই পাত্রটি এবং এর ভিতরের যা কিছু পারস্য সম্রাটদের, সবই আমার নিকট আমার একটি নখের আগার সমমানের নয়। এটি যদি মুসলমানদের বাইয়তুল মালে জমা না হতো তাহলে আমি এটি মাটি থেকে উঠিয়ে এভাবে আপনাদের কাছে আসতাম না।

এবার লোকেরা প্রশ্ন করলো: আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন! আপনি কে? লোকটি বললো: আল্লাহর কসম! আমি আপনাদের বা অন্য কারো নিকট আমার পরিচয় দিব না। যাতে আপনারা বা অন্য কেউ আমার কোন রকম প্রশংসা করতে না পারেন। একথা বলে লোকটি চলে গেল। তখন সেখানে উপস্থিত লোকেরা তাদের একজনকে বললো তাকে অনুসরণ করে তথ্য নিয়ে আসার জন্য। এই লোকটি তার অজান্তে অনুসরণ করে তার অন্য সাথীদের নিকট উপস্থিত হলো এবং তাদের নিকট এর পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। তারা বললো: তুমি চেন না? ইনি তো বসরার 'আবিদ 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ।

খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে সর্বপ্রথম তাঁকে মাদায়িন অভিযানে দেখা যায়। অন্য কোন অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি অধিকাংশ অভিযানে অংশগ্রহণ করতেন। কাতাদা বলেছেন, 'আমির যখন যুদ্ধে যেতেন এবং পথে কোন জঙ্গল পড়তো, আর তাঁকে যদি বলা হতো এখানে বাঘের ভয় আছে, জবাবে তিনি বলতেন, আল্লাহকে মুখ দেখাতে আমার লজ্জা হয় যে, আমি তাঁকে ছাড়াও অন্য কাউকে ভয় করি।

খলীফা হযরত 'উছমানের (রা) বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ ও বিক্ষোভ সৃষ্টি হয় তার বড় কেন্দ্র ছিল তিনটি- বসরা, কুফা ও মিসর। এই বিপ্লব-বিদ্রোহের অগ্নিশিখার বেষ্টনীতে কিছু উঁচু স্তরের সাহাবীও এসে যান। 'আমিরের আবাসস্থল ছিল বসরা। এই ফিতনা-ফাসাদে তিনি যুক্ত না থাকলেও নিজেকে তিনি এ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখতে পারেননি। এক পর্যায়ে তিনি 'উছমান (রা) বিরোধীদের ফাঁদে আটকে যান এবং তাদের সঙ্গী হয়ে পড়েন। একবার বসরাবাসীরা তাদের প্রতিনিধি ও মুখপাত্র হিসেবে তাঁকে খলীফা 'উছমানের (রা) নিকট পাঠায়। তিনি মদীনায় যেয়ে খলীফার সামনে খোলামেলাভাবে নিজের চিন্তা-ভাবনার কথা প্রকাশ করেন। যেমন তিনি বলেন, 'মুসলমানদের একটি দল আপনার কর্মচারীদের পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা জেনেছে, করণীয় নয় এমন কিছু কাজ আপনার দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং ভবিষ্যতের জন্য তাওবা করুন।' সে সময় পর্যন্ত হযরত 'উছমান (রা) 'আমিরের প্রকৃত অবস্থা ও পরিচয় জ্ঞাত ছিলেন না।

এ কারণে তিনি তাঁর কথা শুনে বলেন, 'ওহে লোকেরা! তোমরা এ লোকটিকে দেখ। অতি সামান্য বিষয়ে কথা বলার জন্য তিনি এসেছেন। লোকেরা তাঁকে একজন 'কারী' (কুরআন পাঠক) মনে করে। অথচ তিনি জানেন না যে, আল্লাহ কোথায়?' 'আমির খলীফার এ কথা শুনে কুরআনের এ আয়াতটি উচ্চারণ করেন : ،إِنَّ رَبَّكَ لبالمِرْصَادِ নিশ্চয় তোমার পরোয়ারদিগার অপেক্ষায় আছেন।' তারপর বলেন, আল্লাহর কসম! আমি ভালো করেই জানি, তিনি অবাধ্যদের অপেক্ষায় আছেন। খলীফার সাথে এ উত্তপ্ত সংলাপের পর 'আমির বসরায় ফিরে আসেন।

তৎকালীন খলীফার সাথে 'আমিরের এই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ছাড়াও কিছু দীনী অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। অথবা বলা চলে, তাঁর প্রতি আরোপ করা হতো। যেমন: তিনি বিয়ে করেন না, গোস্ত খান না, নিজকে হযরত ইবরাহীমের (আ) চেয়ে ভালো অথবা সমান মনে করেন, ওয়ালী বা শাসনকর্তার বাড়ীর দরজা মাড়ান না ইত্যাদি। সরকারের সাথে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধ আগেই হয়েছিল। এ কারণে তাঁর কিছু বিরোধী লোক তাঁর এ সব আচরণ বসরার তৎকালীন ওয়ালীর গোচরীভূত করে। তিনি আবার বিষয়টি হযরত 'উছমানকে (রা) অবহিত করেন। খলীফার দফতর থেকে তদন্তের নির্দেশ আসে এবং সত্য প্রমাণিত হলে তাঁকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার আদেশ দেয়।

খলীফার দফতর থেকে এ নির্দেশ আসার পর বসরার ওয়ালী 'আমিরকে ডেকে পাঠান। তিনি উপস্থিত হলে ওয়ালী তাঁকে বলেন, আপনার প্রতি যেসব অভিযোগ আরোপ করা হয়, তা তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আমীরুল মু'মিনীন 'উছমান (রা)।

'আমির বললেন: আমার প্রতি কি কি অভিযোগ আরোপ করা হয়? ওয়ালী তাঁকে অভিযোগগুলো শোনান। 'আমির তখন একটি একটি করে জবাব দিতে থাকেন। তিনি বলেন, আমি বিয়ে এ জন্য করিনে যে, স্ত্রী হলে সন্তান হবে। আর তাতে দুনিয়া আমার অন্তরে গেড়ে বসবে। আর তা আল্লাহর যিক্র থেকে আমাকে বিরত রাখবে। তবে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। আর গোস্ত এজন্য খাই না যে, আমি যে এলাকায় বসবাস করি সেখানে মাজুসীদের (আগুন ও সূর্যের উপাসক) বাস। বাজারে যে গোস্ত বিক্রি হয় তা আল্লাহর নামে যবেহ হয় কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারিনে। তাই গোস্ত খাইনে। তবে হালাল গোস্ত পেলে খাই। আর হযরত ইবরাহীমের (আ) চেয়ে ভালো বলে মনে করার যে অভিযোগ আরোপ করা হয়েছে, তার জবাব এই ছাড়া আর কিছু দেব না যে, আমার একান্ত ইচ্ছা, আমি যদি তাঁর পায়ের ধুলো হতে পারতাম, আর পায়ের সাথে লেগে জান্নাতে চলে যেতাম! আর ওয়ালী ও শাসন কর্তৃত্বের অধিকারীদের বাড়ীর দরজা মাড়াই না বলে যে অভিযোগ, তার জবাব এই যে, তাঁদের দরজায় সব সময় অভাবী ও সাহায্য প্রার্থীদের ভীড় থাকে। আমি তাদের কেউ নই। তাই আমি তাঁদের সুযোগ নষ্ট করতে চাইনে। আপনারা তাদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনুন এবং তা পূরণ করুন। আর আপনাদের নিকট যাদের কোন প্রয়োজন নেই তাদেরকে তাদের অবস্থায় থাকতে দিন।

'আমিরের বক্তব্য খলীফা হযরত 'উছমানকে (রা) জানানো হলো। তিনি তাতে আনুগত্যের পরিপন্থী, অথবা সুন্নাহ্ ও ঐক্য বিরোধী কোন কিছু পেলেন না। কিন্তু প্রচারকারীদের অপপ্রচার এতে থামলো না। তারা 'আমিরকে ঘিরে অনেক কথা প্রচার ও বলাবলি করতে লাগলো। ফলে তাঁর সমর্থক ও বিরুদ্ধবাদীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষের উপক্রম হলো। ফলে 'উছমান (রা) তাঁকে শামে পাঠিয়ে দেওয়ার এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার আদেশ দেন। অন্যদিকে তথাকার ওয়ালী মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানকে (রা) নির্দেশ দেন তাঁকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করার ও তাঁর প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়ার জন্য। পরবর্তীকালে 'উছমানের (রা) হত্যাকারীরা তাঁর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করে তার মধ্যে বসরা থেকে 'আমিরের বহিষ্কারের অভিযোগটিও ছিল।

যে দিন 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ বসরা ত্যাগ করে শামের দিকে যাত্রার জন্য ঘর থেকে বের হলেন সেদিন তাঁর অসংখ্য ছাত্র, আত্মীয়-বন্ধু ও গুণমুগ্ধ ব্যক্তি তাঁকে বিদায় দেওয়ার জন্য রাস্তায় বেরিয়ে আসে। তারা তাঁকে বসরার উপকণ্ঠে 'মিবরাদ' পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। তাদের থেকে বিদায় নেওয়ার পূর্বক্ষণে 'আমির বলেন: আমি হাত তুলে দু'আ করছি, আপনারা আমার দু'আর উপর আমীন বলবেন। উপস্থিত সবাই ঘাড় উঁচু করে তাঁকে দেখতে লাগলো। সবাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। তিনি দু'হাত উঠিয়ে নিম্নের দু'আটি করেন।

اللَّهُمَّ مَنْ وَشَى بِي ، وَكَذَّبَ عَلَيَّ وَأَخْرَجَنِي مِنْ مِصْرِى (بَلَدِي) وَمُزَّقَ بَيْنِي وَبَيْنَ إِخْوَانِي، فَأَكْثِرْ مَالَهُ، وَأَصَحَ حِسْمَهُ وَأَطِلْ عُمْرَهُ.

- 'হে আল্লাহ! যে আমার নামে কুৎসা রটনা করেছে, আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছে, আমাকে আমার শহর থেকে বের করে দিয়েছে এবং আমাকে ও আমার আত্মীয়-বন্ধুদের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করেছে, তুমি তার ধন-সম্পদ বৃদ্ধি করে দাও, তার শরীর সুস্থ করে দাও এবং তার জীবনকাল দীর্ঘ করে দাও।' এ দু'আ পাঠের পর তিনি বাহনের মুখ শামের দিক করে চালিত করেন। শামে পৌঁছার পর হযরত মু'আবিয়া (রা) অত্যন্ত সম্মানের সাথে তাঁকে গ্রহণ করেন এবং তাঁর থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত করেন। সেবার জন্য একজন দাসী নিয়োগ করে তাকে নির্দেশ দেন, তাঁর রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টার অবস্থা ও ব্যস্ততা সম্পর্কে নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য। শামে আসার পরও 'আমিরের অভ্যাস ও কাজের কোন পরিবর্তন হলো না। তিনি নিয়মিতভাবে প্রতিদিন প্রত্যুষে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন এবং ফিরতেন রাতের অন্ধকারে। আমীর মু'আবিয়া তাঁর জন্য খাবার পাঠাতেন, কিন্তু তিনি তা স্পর্শও করতেন না। কোথা থেকে রুটির একটি টুকরো নিয়ে আসতেন। তাই কিছু পানিতে গুলিয়ে উপর থেকে সেই পানি পান করে 'ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে যেতেন। সারাটি রাত 'ইবাদাতে কাটিয়ে দিতেন। দাসী আমীর মু'আবিয়াকে (রা) সবকথা জানালেন। আর তিনি খলীফা 'উছমানকে (রা) সবকথা লিখে পাঠালেন। খলীফা 'আমিরের আসল রূপ অবগত হয়ে তাঁর সাথে সম্পর্ক ভালো করার এবং দশটি দাস ও দশটি বাহনের পশু দেওয়ার জন্য আমীর মু'আবিয়াকে (রা) নির্দেশ দিলেন। আমীর মু'আবিয়া (রা) খলীফার নির্দেশের কথা 'আমিরকে জানালেন। জবাবে 'আমির বললেন: এক শয়তান আগে থেকেই ঘাড়ে চেপে বসে আছে। তার বোঝা এত কম নয় যে দশটি দাসের বোঝা বহন করবো। একটি খচ্চর আমার আছে, বাহনের জন্য তাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত বাহনের জন্য কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয় করি। আর আমীরের সম্মান ও নৈকট্য লাভ, তা এতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

'আমিরের প্রকৃত অবস্থা জানার পর হযরত মু'আবিয়া (রা) একদিন তাঁকে বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে বসরায় ফিরে যেতে পারেন। তিনি বললেন, আমি এমন শহরে আর ফিরে যাব না যার অধিবাসীরা আমার সাথে এমন আচরণ করেছে। 'আমির শামে থেকে যান এবং বাকী জীবন সেখানে কাটিয়ে দেন। তবে তাঁর গতিবিধির উপর থেকে সরকারি বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করা হলে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে চলে যান। মাঝে মাঝে হযরত মু'আবিয়ার (রা) সাথে দেখা-সাক্ষাতের জন্য আসতেন। হযরত মু'আবিয়া (রা) সব সময় তাঁর প্রয়োজনের কথা জিজ্ঞেস করতেন, আর তিনি জবাব দিতেন, আমার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। তবে হযরত মু'আবিয়া (রা) যখন বেশী পীড়াপীড়ি শুরু করলেন তখন তিনি আবদারের সুরে বললেন: শামের ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে রোযার তীব্রতা ও পিপাসার মাধুর্য যেতে বসেছে। আপনি পারলে এই স্থানকে বসরার মত গরম করে দিন।

'আমিরের মত মুক্ত, স্বাধীন ও বেপরোয়া মানুষের জন্য স্বদেশ ও বিদেশ সবই সমান। স্বদেশ বসরার জন্য তাঁর বিশেষ কোন টান ও বন্ধন ছিল না। তারপর শামের মত পবিত্র ও নবী-রাসূলদের বিচরণভূমি তিনি লাভ করেন। এ কারণে স্বদেশের সাথে যতটুকু সম্পর্ক ছিল তাও ছিন্ন করে ফেলেন। প্রথমে যখন শামে যান তখন বসরা ও তথাকার জ্ঞানী-গুণী ও 'ইলমী-মজলিসের প্রতি একটা টান অনুভব করতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো, আপনি তো বসরায় ফিরে যেতে পারেন। বললেন: আল্লাহর কসম! সেটা আমার শহর। সেই শহর যেখানে আমি হিজরাত করেছিলাম, সেখানে আমি কুরআন শিখেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীকালে বসরা ও বসরার অধিবাসী, সব পিছুটান ঝেড়ে ফেলে দিয়ে একাগ্রচিত্তে 'ইবাদাতে নিমগ্ন হয়ে যান। বসরা থেকে কোন ব্যক্তি শামে এলে এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি খুব একটা উৎফুল্ল হতেন না। কাজী 'উবায়দুল্লাহ ইবন হাসান বর্ণনা করেছেন। একবার আমি শামে গেলাম। 'আমিরের সাথে দেখা করার জন্য তাঁর খোঁজ করলাম। জানতে পেলাম যে, তিনি এক বৃদ্ধার সাথে দেখা করার জন্য মাঝে মাঝে তার ওখানে আসেন। আমি সেই বৃদ্ধার কাছে গেলাম। তিনি একটি পাহাড় দেখিয়ে বললেন, 'আমির এই পাহাড়ের নীচে রাত-দিন নামায-রোযায় মশগুল থাকেন। তুমি দেখা করতে চাইলে ইফতারের সময় যেও। তখন তিনি দেখা দেবেন। বৃদ্ধার কথা মত আমি ইফতারের সময় সেই পাহাড়ের নীচে গেলাম। 'আমির সেখানে ছিলেন। আমি সালাম করলাম। তিনি শুধু এমন এক ব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করলেন যার সাথে মাত্র একদিন আগে এই শামে আমার দেখা হয়েছে। নিজের দেশ ও দেশের কোন মানুষের কথা কিছুই জানতে চাইলেন না। এটাও জানতে চাইলেন না যে, কে বেঁচে আছে, আর কে মারা গেছে? তাঁর সাথে কিছু খেতে বলার সৌজন্যও দেখালেন না। এমন অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখে আমি তাঁকে বললাম আপনার মধ্যে অদ্ভুত আচরণ লক্ষ্য করছি। বললেন: কি? বললাম: দীর্ঘদিন হলো আপনি আমাদের থেকে দূরে আছেন। কিন্তু আপনি আমাদের কারো সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেন না। আর যাও জানতে চাইলেন, তা এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে যার সাথে মাত্র একদিন আগে আমার দেখা হয়েছে। বললেন: আমি তোমাকে সুস্থ দেখেছি। তাই তোমার সম্পর্কে প্রশ্ন করা প্রয়োজন মনে করিনি। বললাম আমি সদ্য দেশ থেকে এসেছি। আপনি একথা জানতে চাননি, কে মারা গেছে, আর কে বেঁচে আছে?

বললেন: এমন লোকের সম্পর্কে কী জিজ্ঞেস করবো যারা মারা গেছে। তারা শেষ হয়ে গেছে। আর যারা মারা যায়নি তারা খুব শিগগিরই মারা যাবে। বললাম: আপনি আমাকে আপনার সাথে খেতে বলার সৌজন্যও দেখালেন না। বললেন: আমি জানতাম, তুমি খুব ভালো খাবার খেয়ে থাক। এ কারণে, এই শুকনো রুটি তোমাকে কিভাবে খেতে বলি?"

'আমির 'ইবাদাত, আধ্যাত্মিক সাধনা, দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতা, খোদাভীতি এবং প্রবৃত্তি দমনের সাধনায় এমন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন যেখানে পার্থিব মন-ভোলানো এবং আরাম-আয়েশের কোন কিছুর অবকাশ ছিল না। তিনি প্রবৃত্তির দমন ও আধ্যাত্মিক সাধনাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। এক সময় তিনি বলতেন, যদি সম্ভব হয় তাহলে আমি জীবনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য নির্ধারণ করবো। তিনি তাঁর এই ইচ্ছাকে এমন সফলভাবে পূর্ণ করেন যে দুনিয়ার যাবতীয় সুখ-সম্পদ ও আনন্দ-ফুর্তি যা তাঁর এই ইচ্ছা পূরণে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারতো, সবই পরিহার করেন। তিনি আল্লাহর কাছে দু'আ করতেন, 'আমার অন্তর থেকে নারীর ইচ্ছা ও লোভ দূর করে দিন। এ জিনিস আমার জীবনের জন্য সবচেয়ে বেশী মারাত্মক। একমাত্র আপনার ভয় ছাড়া আর কারো ভয়-ভীতি থেকে আমার অন্তরকে পরিষ্কার করে দিন। আমার চোখ থেকে ঘুম দূর করে দিন, যাতে রাত-দিন সব সময় আমার ইচ্ছা মত আপনার 'ইবাদাত করতে পারি।' আল্লাহ তাঁর প্রথম দু'টি দু'আ কবুল করেন কিন্তু দীর্ঘ দিন যাবত ঘুমকে আয়ত্তে আনতে পারেননি।

তিনি ঘুম ও ক্ষুধাকে আয়ত্তে আনতে না পারলেও আজীবন এ দু'টিকে পরাভূত করে রাখার জন্য চেষ্টা করে গেছেন। তিনি ঘুম দূর করার এবং ক্ষুধা ভুলে থাকার এই পন্থা বের করেন যে, রাত জেগে আল্লাহর 'ইবাদাত করতেন, আর দিনে রোযা রেখে ঘুমোতেন। শামে অবস্থানকালে সারা দিন রোযা রেখে এবং সারা রাত নামাযে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতেন। আহার ছিল শুকনো রুটি যা পানিতে ভিজিয়ে খেয়ে নিতেন। এই চূড়ান্ত রকমের চেষ্টা-সাধনা ও অনুশীলন তাঁর দেহকে এত ক্ষীণ ও দুর্বল করে ফেলেছিল যে, তাঁকে দেখে মানুষের দয়া হতো।

এভাবে তাঁর প্রবৃত্তি দমনের চূড়ান্ত সীমা 'রাহবানিয়াত' বা বৈরাগ্যবাদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে হয়। তাঁর যুগের লোকেরাও তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিল। সরকারী তদন্তের মুখোমুখিও তাঁকে হতে হয়েছিল। তখন তিনি যেসব উত্তর দিয়েছিলেন তা দ্বারা তাঁর প্রতি মানুষের যেসব সন্দেহ-সংশয় দেখা দিয়েছিল তা অনেকখানি দূর হয়ে যায়। একবার এক ব্যক্তি তাঁর এমন কৌমার্য ব্রতের বিরুদ্ধে দলিল হিসেবে তাঁকে এ আয়াতটি শোনান:

قَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً .
- 'আমি আপনার পূর্বে অনেক রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করেছি।'

অর্থাৎ নবী-রাসূলগণ, যাঁরা ছিলেন আল্লাহর সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী বান্দা-তাঁরা যদি স্ত্রী ও সন্তান পরিহার না করে থাকেন তাহলে একজন সাধারণ মানুষের জন্য তা কিভাবে বৈধ হতে পারে? 'আমির কুরআনের নিম্নের আয়াতটি দ্বারাই তার জবাব দেন :

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونَ *
• 'আমি মানুষ ও জিনকে কেবল আমার 'ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।'

আরেকবার এক ব্যক্তি তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করলো : আপনি বিয়ে-শাদী করেন না কেন? তিনি এর একটা মনস্তাত্ত্বিক জবাব দেন। বলেন: আমার মধ্যে না কামাগ্নি ও ভোগ স্পৃহা আছে, আর না আছে আমার ধন-সম্পদ। এমতাবস্থায় আমি কেন একজন মুসলিম মহিলাকে ধোঁকা দিব?

একবার বসরার আমীর 'আমিরকে বললেন, আমীরুল মু'মিনীন 'উছমান (রা) আমাকে বলেছেন, আমি যেন আপনাকে বিয়ে করতে বলি, আর আপনি বিয়ে করলে বাইতুল মাল থেকে আপনার মাহর আদায় করে দিই। অতএব, আপনি আপনার পছন্দমত কাউকে বিয়ে করুন। 'বাইতুল মাল' থেকে মাহর আদায় করা হবে।

'আমির একটু হেসে বললেন: আমি পয়গাম দিয়েই রেখেছি। ওয়ালী বললেন: কাকে? 'আমির বললেন: যে আমার সামান্য ছেঁড়া-ফাটা কাপড় ও সামান্য শুকনো খেজুর গ্রহণ করতে রাজী হয়। তারপর তিনি পাশে বসা লোকদের দিকে ফিরে বলেন: আমি আপনাদেরকে কয়েকটি প্রশ্ন করছি, আপনারা উত্তর দিন। আপনাদের প্রত্যেকের অন্তরে তার পরিবারের জন্য একটি অংশ আছে না? তারা বললেন: হাঁ, আছে। তিনি প্রশ্ন করলেন : সন্তানদের জন্য ভালোবাসা আছে না? তাঁরা বললেন: হাঁ, আছে। এবার 'আমির বললেন: যাঁর হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ! পরিবার ও সন্তান আমাকে আল্লাহর যিক্র থেকে বিরত রাখুক, তার চেয়ে বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে আমার পাঁজর ক্ষত-বিক্ষত করা হোক, আমার বেশী পছন্দনীয়। আল্লাহর কসম! আমি আমার জীবনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য রাখবো।

'আমিরের বসরায় অবস্থানকালে তাঁর অত্যধিক ও অস্বাভাবিক 'ইবাদাত-বন্দেগীর অবস্থা দেখে একদিন কিছু লোক তাঁকে বললো : আপনার দেহেরও আপনার উপর হক বা অধিকার আছে। একথা শুনে 'আমির নিজের 'নফস'-কে সম্বোধন করে বলেন: আল্লাহর কসম! 'তোমাকে শুধু আল্লাহর 'ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহর কসম! আমি তোমার দ্বারা এত বেশী 'আমল করাবো যে শয্যার আরাম তোমাকে স্পর্শ করার সুযোগ পাবে না।' তারপর তিনি শহর থেকে বেরিয়ে 'ওয়াদী আস-সিবা' (হিংস্র জন্তু- জানোয়ারের উপত্যকা) চলে যান। সেখানে তিনি 'হামামা' নামক একজন হাবশী 'আবিদকে দেখতে পেলেন। এখানে উপত্যকার একটি স্থানে তিনি নামায পড়তেন, আর অন্য প্রান্তে 'ইবাদাতে মশগুল থাকতেন হামামা। একাধারে চল্লিশ দিন চল্লিশ রাত পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ তাঁর নিজের স্থান থেকে সরতেন না। চল্লিশ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পর 'আমির গেলেন হামামার কাছে। তাঁকে প্রশ্ন করলেন: আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন! আপনি কে?

হামামা: আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দিন।

'আমিরের বার বার পীড়াপীড়িতে তিনি বলেন: আমি হামামা। 'আমির বললেন: যে হামামার কথা আমি শুনেছি, তিনি যদি আপনি হন তাহলে এ পৃথিবীতে এখন আপনার চেয়ে বড় 'ইবাদাতকারী দ্বিতীয় কেউ নেই। আচ্ছা, আমাকে একটু বলুন তো সবচেয়ে ভালো অভ্যাস কি?

হামামা: আমার 'আমল খুবই সীমিত। যদি না ফরজ নামায থাকতো- যাতে কিয়াম ও সিজদা আছে, তাহলে আমি আমার গোটা জীবনই রুকুতে এবং চেহারা মাটিতে ঠেকিয়ে কাটিয়ে দিতাম।

হামামা এবার জানতে চাইলেন: তা ভাই আপনার পরিচয়টা কি?
'আমির: আমি 'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ।

হামামা: আপনি যদি সেই 'আমির হন যার কথা আমাকে বলা হয়েছে, তাহলে আপনি ধরাপৃষ্ঠে সবচেয়ে বেশী 'ইবাদাতকারী ব্যক্তি। আচ্ছা, আপনি বলুন সবচেয়ে ভালো অভ্যাস কি?

'আমির বললেন: আমার 'আমলও সীমিত এবং ত্রুটিপূর্ণ। তবে একটি জিনিস আমার অন্তরে আল্লাহর ভীতিকে বড় করে দিয়েছে। ফলে আমি এখন তাঁকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করিনে।

হামামা: সেই জিনিসটা কি?
'আমির তখন এ আয়াতটি পাঠ করেন:

ذلِكَ يَوْمَ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ ..

'তা এমন এক দিন, যেদিন সব মানুষই সমবেত হবে এবং সে দিনটি যে হাজিরার দিন।' এ সময় হঠাৎ একটি হিংস্র জন্তু তাদেরকে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে খেয়ে ফেলার উপক্রম করলো।
'আমির জন্তর তর্জন-গর্জ‌নকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে উপরোক্ত আয়াতটি বার বার আওড়াতে লাগলেন। হামামা বললেন: ওহে 'আমির! এই মারাত্মক বিপদ কি আপনি লক্ষ্য করছেন না?

'আমির: মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনকে ছাড়া অন্য কিছুকে ভয় করতে আমার লজ্জা হয়। আমি আল্লাহকে এত গভীরভাবে ভালোবাসি যে তা আমার সব বালা-মুসীবতকে সহজ করে দিয়েছে। আমার মধ্যে তাঁর ভালোবাসা থাকতে আমার সকাল-সন্ধ্যা কেমন কাটলো সে ব্যাপারে আমার কোন পরোয়া নেই।

আমর বিল মা'রূফ ও নাহি 'আনিল মুনকার বা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ক্ষেত্রে তাঁর জিহ্বার তরবারি সব সময় কোষমুক্ত থাকতো। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধি-বিধান লংঘিত হতে দেখলে তিনি ক্রোধে, উত্তেজনায় ফেটে পড়তেন। একবার তিনি আল্লাহর তাসবীহ ও তাহমীদ পাঠ ও শুকরিয়া আদায় করতে করতে রাস্তা দিয়ে চলছেন। এমন সময় দেখতে পেলেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য পুলিশ অন্য এক ব্যক্তির গলা এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে যে, লোকটির দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এর মধ্যে আরেকজন পুলিশ তার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। দু'জনে মিলে জোর-জবরদস্তী লোকটিকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। 'আমির লোকটির দিকে এগিয়ে গিয়ে শুনতে পেল, সে চিৎকার করে বলছে: ওহে মুসলিমগণ, আমাকে বাঁচান! আমি একজন অমুসলিম যিম্মী, আমাকে বাঁচান! 'আমির তাঁর কাছে গিয়ে বললেন: ওহে, আপনার কাছে কি জিযিয়া পাওনা আছে? লোকটি বললো: না। আমি সব পরিশোধ করেছি। আপনি আমাকে এই পুলিশের হাত থেকে বাঁচান। এবার 'আমির পুলিশের প্রতি তাকিয়ে বললেন: তাকে ছেড়ে দিন। পুলিশ তাঁর কথায় কান না দিয়ে বললো: আমরা তাকে ছাড়বো না। তাকে বসরায় পুলিশ বাহিনীর প্রধানের উদ্যানে যেতে হবে এবং পরিচ্ছন্ন করতে হবে। 'আমির যিম্মী লোকটিকে বললেন: তুমি তাদের সাথে গিয়ে তারা যা বলছে তা শুনছো না কেন? লোকটি বললো: আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার কাঁধে অনেকগুলো শিশু সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের জীবিকার জন্য আমাকে কাজ করতে হয়। এ কাজ করলে আমি আমার সন্তানদের জীবিকার জন্য কাজ করতে পারিনে। কারণ, এদের কাজে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এবার 'আমির পুলিশের লোকটিকে নির্দেশ দিলেন : তাকে ছেড়ে দাও। কিন্তু পুলিশ সে নির্দেশ মানলো না। 'আমির এবার পুলিশকে লক্ষ্য করে বললেন : ওহে, তুমি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের (সা) অঙ্গীকার ভঙ্গ করছো? আল্লাহর কসম! আমি জীবিত থাকতে তুমি মুহাম্মাদের (সা) অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারবে না। তারপর 'আমির পুলিশটির হাত থেকে জোর করে লোকটি ছিনিয়ে নেন এবং তাকে ছেড়ে দিয়ে বলেন : তোমার পরিবারের লোকদের জীবিকার অন্বেষণে চলে যাও।

বসরার ওয়ালী, যিনি পুলিশ বাহিনীর প্রধান ছিলেন, তাঁর কাছে এ সংবাদ পৌঁছানো হয়। 'আমিরের একাজকে সরকার-বিরোধী কর্মতৎপরতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

আমীর-উমারা ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের প্রতি তাঁর উদাসীন ও বেপরোয়া ভাব অসন্তুষ্টির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি ঐসব লোকদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশাও পছন্দ করতেন না। তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছিল তার মধ্যে আমীর-উমারা ও শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা না করার অভিযোগও ছিল। তার জবাবে তিনি একথা বলেছিলেন যে, আপনাদের কাছে সব সময় অভাবী ও প্রয়োজনীয় কাজের লোকদের ভীড় জমে থাকে। আপনারা তাদের প্রয়োজন পূরণ করুন। আর আপনাদের কাছে যাদের কোন প্রয়োজন নেই তাদেরকে নিজ নিজ অবস্থায় থাকতে দিন। তিনি খলীফা ও আমীর-উমারা কাউকে ভয় ও পরোয়া করতেন না।

হযরত 'উছমানের (রা) সামনে তিনি যে সাহস ও নির্ভিকতার সাথে অকপটে নিজের চিন্তা ও ধ্যান-ধারণার কথা প্রকাশ করেন তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালে বসরার কারীদের একটি প্রতিনিধিদল শামে পাঠানো হয়। তাতে 'আমিরও ছিলেন। মুদারিব ইবন হায়্যান, যিনি প্রতিনিধিদলটি পাঠিয়েছিলেন, একদিন আমীর মু'আবিয়াকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন: আমরা কারীদের যে দলটি পাঠিয়েছিলাম তাদের কেমন দেখলেন? তিনি জবাব দিলেন: একজন ছাড়া বাকী সবাই মিথ্যা প্রশংসা করে ও বেশী কথা বলে। মিথ্যা নিয়ে আসে এবং আস্থাহীনতা নিয়ে ফিরে যায়। শুধু এক ব্যক্তি স্বাভাবিক মানুষ ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আমীরুল মু'মিনীন! সেই লোকটি কে? বললেন: 'আমির

যদি কোন আমীর অথবা সরকারী পদস্থ কর্মকর্তা কখনো নিজেই তাঁর কাছে আসতেন তখন তাঁর সাথেও তিনি একই রকম আচরণ করতেন। একবার কোন এক যুদ্ধে গেছেন। পথে যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। 'আমির একটি গীর্জার সীমানায় ঢুকে পড়েন এবং একজন লোককে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নির্দেশ দেন, কেউ যেন ভিতরে প্রবেশ না করে। কিছুক্ষণ পর সেই লোকটি এসে বলেন, আমীর ভিতরে আসার অনুমতি চাচ্ছেন। আমীরকে তিনি ভিতরে ডেকে নেন এবং তাঁকে বলেন: আমি আপনাকে আল্লাহর নামে কসম দিয়ে বলছি, আপনি আমাকে দুনিয়ার প্রতি প্রলুব্ধ করবেন না এবং আখিরাতকে আমার কাছে ছোট করে দেখাবেন না।

প্রকৃত বাস্তবতা এই যে, 'আমিরের অবস্থান যে জগতে ছিল সেখানে পার্থিব কোন প্রকার বন্ধন, সম্পর্ক ও রীতি-পদ্ধতির কোন বালাই ছিল না। এ কারণে, শুধু আমীর-উমারা কেন কারো সাথে কোন রকম বন্ধন ও সম্পর্ক তাঁর ছিল না। দুনিয়ায় তাঁর কেবল মুতাররিফ বসরীর সাথে অন্তরের সম্পর্ক ছিল। আর মহিলাদের মধ্যে একজন অতি সাধারণ ছাগলের রাখাল মহিলার প্রতি তাঁর অন্তরে দয়া ও সমবেদনার উদ্রেক হয়। কিন্তু তাঁর সাথে কোন রকম সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই মহিলাটি মারা যায়। মুতাররিফের সাথে তাঁর অপ্রকৃতিস্থ বা দিওয়ানা ধরনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাই তিনি বসরা ত্যাগের সময় তাঁর নিকট থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য এক রাতে কয়েকবার মুতাররিফের গৃহে যান। প্রত্যেক বারই তিনি মুতাররিফকে বলেন: 'আমার বাবা-মা তোমার জন্য কোরবান হোক! আল্লাহর কসম! তোমার ভালোবাসা আমাকে বার বার তোমার কাছে নিয়ে আসছে।

আর মহিলাটির ঘটনা এই রকম। একজন অতি গরিব ও 'আবিদা মহিলা কয়েকজন বেদুইন লোকের ছাগল চরাতো। সে তাদের সব রকমের নির্যাতন সহ্য করতো। 'আমিরের সাথে তাঁর গুণের দিক দিয়ে অনেক মিল থাকায় লোকেরা 'আমিরকে বলতো, অমুক মহিলা আপনার স্ত্রী এবং সে একজন জান্নাতী মহিলা। 'আমির তার সন্ধানে বের হলেন। সে মহিলার জীবন ছিল এই রকম যে, সারাদিন অসভ্য ও বর্বর বেদুইনদের ছাগল চরাতো। দিন শেষে যখন ছাগলের পাল নিয়ে বাড়ী ফিরতো তখন বেদুইনরা গালাগালির মাধ্যমে তাকে স্বাগতম জানাতো। আর সামনে শুকনো রুটির দু'টি টুকরো ছুঁড়ে মারতো। সে তা কুড়িয়ে নিয়ে একটি টুকরো বাড়ীর লোকদের দিত। সারাদিন সে রোযা রাখতো। তাই দ্বিতীয় টুকরোটি দিয়ে সে সন্ধ্যায় ইফতার করতো। 'আমির তাকে খুঁজে বের করেন। যখন সে ছাগল চরানোর জন্য বেরিয়ে যায় তখন 'আমিরও সংগে যান। এক স্থানে পৌঁছে সেই মহিলা ছাগলগুলো ছেড়ে দিয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে যায়। 'আমির তাকে বললেন, তোমার কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমাকে বলতে পার। সে বললো: আমার কোন প্রয়োজনই নেই। 'আমির যখন বেশী পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন তখন সে বললো, আমার শুধু এতটুকু ইচ্ছা যে, আমি যদি দুই টুকরো সাদা কাপড় পেতাম যা আমার কাফনের কাজে আসতো। 'আমির তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এই বেদুইনরা তোমাকে গালি দেয় কেন? সে উত্তর দিল : এতে আমি আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করি। এই সংলাপের পর 'আমির তার মনিবদের নিকট যান এবং তাদেরকে প্রশ্ন করেন তোমরা এই মহিলাকে গালি দাও কেন? তারা উত্তর দিল: আমরা যদি এমনটি না করি তাহলে সে আমাদের কাজের উপযুক্ত থাকবে না। 'আমির বললেন: তোমরা ওকে আমাদের কাছে বিক্রী করে দাও। তারা বললো: যত মূল্যই দাও না কেন আমরা তাকে আমাদের থেকে পৃথক করবো না। এ উত্তর শুনে 'আমির ফিরে যান এবং মহিলার ইচ্ছা অনুযায়ী দুই প্রস্থ কাপড় সংগ্রহ করে তার কাছে যান। কিন্তু কী অবাক ব্যাপার! সেই মহিলা তখন এই দুনিয়া ছেড়ে পরলোকে যাত্রা করেছে। 'আমির তার মনিবদের অনুমতি নিয়ে তার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। এভাবে এ দুনিয়ায় 'আমিরের একজন মহিলার সাথে সহমর্মিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তা শেষ হয়।

'আমির একজন বড় মাপের দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। মুজাহিদদেরকে আর্থিক সাহায্য দানের বিষয় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। দু'হাজার দিরহাম ভাতা পেতেন। সেই ভাতা যখনই পেতেন তখন গরিব-মিসকীন যাকে পথে পেতেন তাদের মধ্যে বিলাতে বিলাতে ঘরে ফিরতেন।

বসরা ত্যাগের পর 'আমির আর কোন দিন বসরায় ফিরে আসেননি। মৃত্যু পর্যন্ত ইসলামের প্রথম কিবলা 'বাইতুল মাকদিস'কে কেন্দ্র করে তার আশে-পাশে বসবাস করতে থাকেন। আমীর মু'আবিয়া (রা), যিনি ছিলেন তৎকালীন শামের ওয়ালী এবং পরবর্তীকালে মুসলিম জাহানের খলীফা, তাঁর প্রতি সীমাহীন সম্মান প্রদর্শন করতেন। সব সময় তাঁর খোঁজ-খবর রাখতেন। দিনের পর দিন পেরিয়ে বহু বছর গড়িয়ে গেল।

'আমিরের শক্তি নিঃশেষ হয়ে চললো। অবশেষে তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যা নিলেন। রোগের তীব্রতা বেড়ে গেল। তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও গুণমুগ্ধরা বুঝতে পারলেন এ তাঁর অন্তিম রোগ। তাঁরা তাঁকে দেখার জন্য গেলেন। তাঁদেরকে দেখে তিনি কান্না শুরু করলেন। অশ্রু গড়িয়ে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। একজন বললেন: 'আমির! আপনি তো একজন নেক্কার, দুনিয়া বিরাগী, খোদাভীরু 'আবিদ মানুষ ছিলেন। আপনি এভাবে কাঁদছেন কেন? 'আমির বললেন: আল্লাহর কসম! আমি দুনিয়ার প্রতি লোভের বশবর্তী হয়ে অথবা মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছিনে। আমি কাঁদছি দীর্ঘ ভ্রমণ ও স্বল্প পাথেয়-এর কথা চিন্তা করে। ঊর্ধ্বে আরোহণ ও নিম্নে পতনের মাঝ দিয়ে আমার জীবন কেটেছে। এরপর আছে জান্নাত অথবা জাহান্নাম। আমি জানিনে কোথায় হবে আমার ঠিকানা। একথা বলতে বলতে তাঁর রূহটি তাঁর সর্বোচ্চ বান্ধবের নিকট পৌছে গেল। তখন হযরত মু'আবিয়ার (রা) শাসনকাল। বাইতুল মাকদিসে তাঁকে দাফন করা হয়।

'আমির-এর সম্পর্কে এক ব্যক্তির একটি স্বপ্ন উল্লেখ করার মত। এ স্বপ্নের দ্বারা তাঁর আধ্যাত্মিকতা কোন স্তরের ছিল তা অনুমান করা যায়। সা'ঈদ নামের এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। একবার এক ব্যক্তি স্বপ্নে নবীর (সা) অপরূপ সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করেন। সেই ব্যক্তি আবেদন জানায়: হুজুর! আমার গুনাহ মাফের জন্য দু'আ করুন। তিনি বলেন: তোমাদের জন্য 'আমির দু'আ করছেন। সেই ব্যক্তি 'আমিরের নিকট এই স্বপ্ন বর্ণনা করলে তিনি প্রবল আবেগে এত বিগলিত হয়ে যান যে, তাঁর কণ্ঠরোধ হবার উপক্রম হয়।

হযরত আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা) ছিলেন 'আমিরের অতি শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক। শিক্ষক তাঁর প্রিয় ছাত্রের সব গতিবিধি ও কাজকর্মের প্রতি সব সময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। মাঝে মধ্যে প্রয়োজন হলে জরুরী নির্দেশনাও দিতেন। একবার তিনি একটি চিঠিতে 'আমিরকে লেখেন: অতঃপর এই যে, আমি একটি বিষয়ে তোমার অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম, এখন আমি জানতে পেরেছি যে, তুমি তা পরিবর্তন করে ফেলেছো। যদি তুমি সেই অঙ্গীকারের উপর থেকে থাক তাহলে আল্লাহকে ভয় কর এবং তার উপর অটল থাক। আর তাই যদি সত্য হয় যা আমি শুনেছি, তাহলে আল্লাহকে ভয় কর এবং সেই অঙ্গীকারে ফিরে আস।

'উতবী বলেছেন, আমাদের শিক্ষকরা বলতেন: যুহৃদ ও 'ইবাদাত আটজন তাবি'ঈর মধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সেই আটজনের একজন হলেন 'আমির।

একবার 'আমিরকে বলা হলো, আপনি একটু দুনিয়ার পরিচয় দিন। বললেন: দুনিয়া হলো মৃত্যুর মা, সুদৃঢ়ের ভঙ্গকারী, দান ও অনুগ্রহ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশী এবং তার মধ্যে যা আছে সবই এক অজানার দিকে ধাবমান।

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহ বলতেন: 'কথা যখন অন্তর থেকে বের হয় তখন তা অন্তরে পড়ে। আর যখন জিহ্বা থেকে বের হয় তখন তা কানের ছিদ্র অতিক্রম করে না।'

'আমির ইবন 'আবদিল্লাহকে একবার বলা হলো: মানুষ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? বললেন: আমি তার সম্পর্কে কি বলবো যে ক্ষুধার্ত হলে বিনয়ী ও বাধ্য হয়, আর পেট ভরলে বিদ্রোহী হয়।

টিকাঃ
১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/১০৫; আল ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাবারা-৩/৮৫
২. আল-ইসাবা-৩/৮৫
৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৬৩, ৩/১৯৪
৪. তাবাকাত-৭/৭৫; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৪-২৮
৫. তারীখু ইবন 'আসাকির-৩/২০৭; 'আসরুত তাবি'ঈন-২২৬
৬. তাবাকাত-৭/৭৮
৭. প্রাগুক্ত
৮. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-২৮/৩১
৯. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৪/১১৭; আল-ইসাবা-৩/৮৬
১০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৩৬-২৩৭; ৩/১৪২-১৪৩
১১. তাবাকাত-৭/১০৩-১০৭; তারীখুল ইবন 'আসাকির-৩/৩৬৮-৩৭০
১২. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/২৮৩
১৩. তারীখু ইবন 'আসাকির-৩/৩৬৮-৩৬৯; সিয়ারু আ'লাম আন্-নুবালা'-৪/১৮-১৯
১৪. আল-ইসাবা-৩/৮৫
১৫. তাবাকাত-৭/৭৭-৭৮
১৬. আল-কামিল ফিত-তারীখ-৪/১১৫
১৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৩২
১৮. তাবাকাত-৭/৭৮-৭৯
১৯. প্রাগুক্ত-৭/৭৫-৭৬
২০. প্রাগুক্ত-৭/৭৭,৮০
২১. সূরা আর-রা'দু-৩৮
২২. সূরা আয-যারিয়াত-৫২
২৩. তাবাকাত-৭/৭৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/১৭
২৪. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৩২
২৫. সূরা হুদ-১০৩
২৬. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৮۹; 'আসরুত তাবি'ঈন-২২৩-২২৪
২৭. তাবাকাত-৭/৭৪; তারীখু ইবন 'আসাকির-৩/৩৬৮-৩৭
২৮. তাবাকাত-৭/৭৪
২৯. প্রাগুক্ত-৭/৭৮
৩০. প্রাগুক্ত-৭/৭৭
৩১. প্রাগুক্ত-৭/৮০
৩২. প্রাগুক্ত-৭/৭৪
৩৩. সিফাতুস সাফওয়া-৩/২১১
৩৪. আল-ইসাবা-৩/৮৬; 'আসরুত তাবি'ঈন-২৩৩
৩৫. তাবাকাত-৭/৮০
৩৬. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৫১
৩৭. প্রাগুক্ত-৩/১৭১
৩৮. প্রাগুক্ত-৩/১৭২
৩৯. কিতাবুল হায়ওয়ান-৪/২১০; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৮৩; ৪/২৯
৪০. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৬৯

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ‘আলকামা ইবন কায়স (রহ)

📄 ‘আলকামা ইবন কায়স (রহ)


আবূ শিল্ 'আলকামা ছিলেন বিখ্যাত তাবি'ঈ মুহাদ্দিছ ইবরাহীম আন-নাখা'ঈর মামা এবং আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদের চাচা। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন। জ্ঞান, চারিত্রিক উৎকর্ষ, পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখতা ও খোদাভীতির দিক দিয়ে বিশিষ্ট তাবি'ঈদের অন্তর্গত ছিলেন। ইমাম আয-যাহবী তাঁর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে: তিনি কৃষ্ণার বড় ফকীহ্, 'আলিম, কারী, ইমাম, হাফেজ, মুজাবিবদ ও মুজতাহিদ।

তিনি এমন এক যুগ লাভ করেন যেখানে বহু বড় সাহাবীর সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান। হযরত 'উমার (রা), 'আলী মুরতাদা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান (রা), সালমান আল-ফারেসী (রা), আবূ মাসউদ আল-বাদরী (রা), আবুদ্ দারদা' (রা) প্রমুখ উঁচু স্তরের সাহাবায়ে কিরাম তখন বিদ্যমান ছিলেন। তাঁদের নিকট থেকে তিনি হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনাও করেছেন। তবে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে বিশেষভাবে উপকার লাভ করেন। তিনি 'আলকামাকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা দেন। আসওয়াদ বলেন: 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) 'আলকামাকে যেভাবে কুরআন শিক্ষা দিতেন, ঠিক সেইভাবে তাশাহ্হুদও শিক্ষা দিতেন।' তাঁর এমন বিশেষ মনোযোগ ও অনুগ্রহে 'আলকামা দ্বিতীয় ইবন মাস'উদে (রা) পরিণত হন। ইবন মাস'ঊদ (রা) নিজেই বলতেন, আমি যত কিছু পড়েছি ও জেনেছি, তা সবই 'আলকামা পড়েছে ও জেনেছে। তাঁর জ্ঞানগত যোগ্যতা ও উৎকর্ষের ব্যাপারে সকল 'আলিম ও মুহাদ্দিছ একমত। ইমাম যাহাবী লিখেছেন: তিনি একজন ফকীহ্ ও শ্রেষ্ঠ ইমাম। ইমাম নাওবী বলেছেন: 'আলকামা একজন উঁচু স্তরের, সুমহান মর্যাদার এবং সম্পূর্ণতার অধিকারী ফকীহ্ ছিলেন।

কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সকল জ্ঞানে 'আলকামার সমান দক্ষতা ছিল। কুরআনের শিক্ষা তিনি পেয়েছিলেন হযরত ইবন মাস'উদের (রা) নিকট। ইমাম যাহ্বী লিখেছেন: وَجَوْدَ الْقُرْآنَ عَلَى ابْنِ مَسْعُودٍ - বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করা শিখেছিলেন ইবন মাস'উদের নিকট। ইবন মাসউদ (রা) নিজে মাঝে মাঝে নিজের পাঠের শুদ্ধতা পরীক্ষার জন্য 'আলকামাকে কুরআন পাঠ করে শুনাতেন। 'আলকামা বর্ণনা করেছেন। একবার ইবন মাস'উদ আমাকে বললেন, তুমি সূরা আল বাকারায় আমার ভুল ধরবে। একথা বলে তিনি আমাকে সূরা আল বাকারা পাঠ করে শুনিয়ে জানতে চাইলেন: আমার কিছু ছুটে যায়নি তো? আমি বললাম: একটি হরফ ছুটে গেছে। তিনি নিজেই বললেন: অমুক হরফ। আমি বললাম: হাঁ।

তিনি চমৎকার কণ্ঠ ও মিষ্টি আওয়াজের মানুষ ছিলেন। এ কারণে ইবন মাস'উদ (রা) 'তারতীল' (স্পষ্ট ও সুমধুর সুর) করে কুরআন পাঠ করার জন্য তাঁকে বলতেন। তিনি নিজেই বলতেন, আল্লাহ আমাকে মিষ্টি গলা দিয়েছিলেন। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) আমার দ্বারা কুরআন পাঠ করিয়ে শুনতেন, আর বলতেন, আমার মা-বাবা তোমার প্রতি কুরবান হোক! একটু মিষ্টি সুরে পাঠ কর। আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) একথা বলতে শুনেছি যে, মিষ্টি ধ্বনি কুরআনের ভূষণ।

তিনি একজন শ্রেষ্ঠ হাফেজে হাদীছ ছিলেন। ইমাম যাহাবী তাঁকে হাদীছের হাফেজ ও লেখকদের দ্বিতীয় স্তরে স্থান দিয়েছেন। স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। কোন জিনিস একবার মুখস্থ করে নিলে তা যেন বইয়ের মত সংরক্ষিত হয়ে যেত। তিনি নিজে বলতেন : যে জিনিস আমি আমার যৌবনে মুখস্থ করেছি তা এখন এমনভাবে পাঠ করি যেন কাগজে লেখা কোন জিনিস দেখে দেখে পাঠ করছি। এমন এক অসাধারণ স্মৃতি শক্তি নিয়ে তিনি হযরত 'উমার (রা), 'উছমান (রা), 'আলী (রা), সা'দ (রা), হুযায়ফা ইবন আল-ইয়ামান (রা), আবুদ দারদা' (রা), আবূ মাস'উদ (রা), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা), খাব্বাব ইবন আল-আরাত (রা), খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ (রা), মা'কাল ইবন সিনান (রা), উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) প্রমুখের মত শ্রেষ্ঠ 'আলিম সাহাবীদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। এই মহান ব্যক্তিবর্গের বদান্যতায় তিনি হাদীছের একজন অতি বড় হাফেজে পরিণত হন। ইবন সা'দ তাঁকে বহু হাদীছের ধারক এবং ইমাম যাত্রী শ্রেষ্ঠ ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। ইয়াহইয়া ইবন আল-ইয়ামান তাঁর ছেলেকে বলতেন, হাদীছের ইমাম চারজন। তাঁরা হলেন যথাক্রমে: 'আবদুল্লাহ, 'আলকামা, ইবরাহীম এবং তুমি দাউদ।

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) হাদীছের বেশীর ভাগ অংশ, বরং বলা চলে প্রায় সবই 'আলকামা তাঁর বুকের মধ্যে ধারণ করেন।

এত বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মুহাদ্দিছ হিসেবে পরিচিত হওয়া এবং সেই সূত্রে মান-মর্যাদার উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া তাঁর পছন্দনীয় ছিল না। হযরত ইবন মাস'উদের ইনতিকালের পর লোকেরা তাঁর নিকট আবেদন জানালো যে, এখন আপনি তাঁর স্থলে মানুষকে সুন্নাহ্ তা'লীম দিতে বসুন। তিনি জবাবে বললেন: তোমরা কি চাও মানুষ আমার পিছে পিছে চলুক?

হাদীছে তাঁর শিষ্য-শাগরিদের পরিধি অনেক বিস্তৃত। 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ, ইবরাহীম ইবন সা'দ, ইমাম শা'বী, আবু কাতাদা নাখা'ঈ, শাকীক ইবন সালামা ইবন কুহায়ল, কায়স ইবন রূমী, কাসিম ইবন মুখায়মারা, আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, ইয়াহইয়া ইবন ওয়াছছাব, আবুদ দুহা মুসলিম প্রমুখ খ্যাতিমান মুহাদ্দিছ ছিলেন তাঁর ছাত্র। ছাত্রদের মধ্যে তাঁর ভাগিনা ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ এবং ভাতিজা আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফিকাহ্ জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন ফকীহুল উম্মাত হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) নিকট। এ কারণে এ শাস্ত্রেও তিনি ইমামাত ও ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখতেন। আল্লামা যাহ্বী লিখেছেন : كَانَ فَقِيْهَا إِمَامًا بَارِعًا তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ইমাম, ফকীহ। ইমাম নাওবী তাঁকে পূর্ণতার অধিকারী ফকীহ বলেছেন।

জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও প্রশস্ততার দিক দিয়ে 'আলকামা ছিলেন হযরত ইবন মাস'উদের (রা) বিশিষ্ট ছাত্রদের একজন। ইবন মাদায়িনী বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) জ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধারক-বাহক ছিলেন 'আলকামা, আসওয়াদ, 'উবায়দা ও হারিছ। তাঁদের মধ্যে 'আলকামা ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী। ইবরাহীম বর্ণনা করেছেন, ইবন মাস'উদের ছয়জন ছাত্র মানুষকে সুন্নাতের তা'লীম দিতেন। তাঁদের মধ্যে 'আলকামা ও আসওয়াদ- এ দু'জনও ছিলেন। আবুল হুযায়ল জিজ্ঞেস করলেন, তা এ দু'জনের মধ্যে ভালো কে ছিলেন? তিনি 'আলকামার নামটি উচ্চারণ করলেন। 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) নিজেই তো এ সনদ দান করেন যে, আমি যা কিছু পড়েছি, জেনেছি, তা সবকিছু 'আলকামা পড়ে ও জানে। এটাইতো 'আলকামার জ্ঞানের প্রশস্ততার সবচেয়ে বড় সনদ।

'আলকামার জ্ঞানগত পূর্ণতা এত স্বীকৃত ছিল যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের অনেকে তাঁর থেকে জ্ঞান লাভ করতেন। আর এটা একজন তাবি'ঈর জন্য অতি বড় সম্মান ও গৌরবের বিষয়। আবূ জাবয়ান বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) একাধিক সাহাবীকে 'আলকামার নিকট বিভিন্ন মাস'আলা জিজ্ঞেস করতে দেখেছি। তাঁরা তাঁর নিকট ফাতওয়াও জিজ্ঞেস করতেন।

অভ্যাস, স্বভাব-চরিত্র ও নীতি-নৈতিকতায় তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে পাকের সত্তার অনুরূপ। ইবরাহীম বলেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা) চাল-চলন, স্বভাব-চরিত্রে নবী কারীমের (সা) মত ছিলেন। আর 'আলকামা ছিলেন ইবন মাস'উদের (রা) মত। এভাবে 'আলকামা যেন রাসূলুল্লাহর (সা) অনুরূপ ছিলেন। অভ্যাস ও স্বভাব-বৈশিষ্ট্যে 'আলকামা ও ইবন মাস'উদের এত পরিমাণ মিল যে, যারা ইবন মাস'উদকে (রা) দেখেনি তারা 'আলকামার জীবন ও কর্মকে দেখে ইবন মাস'উদকে (রা) মনের আয়নায় কল্পনা করতে পারতো। এই মিল কেবল 'ইলম ও বাহ্যিক চাল-চলন ও স্বভাব-চরিত্রের মধ্যে সীমিত ছিল না, বরং 'আমলেও তাঁর ইবন মাস'উদের (রা) সাথে পূর্ণ সাদৃশ্য ছিল। এ কারণে তিনি "উলামা' রাব্বানিয়‍্যীন' বা আল্লাহ ওয়ালা 'আলিমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম যাবী লিখেছেন, তিনি সৎকর্মশীল ও খোদাভীরু লোক ছিলেন।

আল-কুরআনের সাথে তাঁর এক অস্বাভাবিক সম্পর্ক ও হৃদ্যতা ছিল। সাধারণতঃ পাঁচ দিনে তিনি একবার সম্পূর্ণ কুরআন পাঠ শেষ করতেন। কখনো কখনো এক রাতেই সম্পূর্ণ কুরআন পড়ে ফেলতেন। ইবরাহীম বলেছেন, 'আলকামা একবার মক্কায় গেলেন। রাতে তিনি তাওয়াফ শুরু করলেন। প্রথম সাত চক্করে 'তিওয়াল' সূরা পাঠ শেষ করেন। দ্বিতীয় সাত চক্করে 'মি'ইন', তৃতীয় সাত চক্করে 'মাছানী' এবং চতুর্থ সাত চক্করে বাকী সূরা পাঠ শেষ করেন। এভাবে এক রাতে তাওয়াফ অবস্থায় সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত শেষ করেন।

কুরআনের সাথে তাঁর এত গভীর সম্পর্কের কারণে সব সময় তাঁর মুখ থেকে কুরআনের আয়াত বহমান থাকতো। প্রতিটি কাজ শুরু করার সময় যেখানে যে আয়াতটি প্রযোজ্য সেটি পাঠ করতেন। যেমন খাওয়ার সময় হলে স্ত্রীর নিকট খাবার চাইতেন এ আয়াত পাঠ করে: فَإِنْ طِبْنَ لَكُمْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ نَفْسًا فَكُلُوهُ هَنِيئًا مَرِيًّا "তারা যদি খুশী হয়ে তা থেকে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর।"

ঘোড়ায় চড়ার সময় জিনে পা রাখার মুহূর্তে তাঁর জিহ্বা থেকে বের হতো এ আয়াত: الْحَمْدُ لِلَّهِ، سُبْحَانَ الَّذِي سَخَّرَ لَنَا هُذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِينَ وَإِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُونَ .
"সকল প্রশংসা আল্লাহর। 'পবিত্র তিনি, যিনি এদেরকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন এবং আমরা এদেরকে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না। আমরা অবশ্যই আমাদের পালনকর্তার দিকে ফিরে যাব।"

জ্ঞান চর্চার সাথে সাথে জিহাদের প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনাও তাঁর মধ্যে ছিল। হিজরী ৩২ সনে আমীর মু'আবিয়ার (রা) সাথে তিনি কনস্টান্টিনোপল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের ব্যাপারে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) একটি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। এ বাহিনীর সবাই সে বিজয়ের অংশীদার ও সাক্ষী হওয়ার জন্য শাহাদাতের প্রবল প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিলেন। মু'দিদ নামক একজন মুজাহিদ একটি কিল্লার উপর আক্রমণ করার সময় মাথায় বাঁধার জন্য 'আলকামার একটি চাদর চেয়ে নেন। এ মুজাহিদ শহীদ হন এবং 'আলকামার চাদরটি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়।

'আলকামা এ চাদরটিকে অত্যন্ত মঙ্গলময় বলে মনে করতেন। সেটি কাঁধে ঝুলিয়ে জুম'আর নামাযে যেতেন এবং বলতেন, আমি এটি এজন্য কাঁধে ঝুলাই যে, এতে মু'দিদের খুনের স্পর্শ আছে।

তিনি খ্যাতি ও প্রচারকে খুব ভয় করতেন। এর থেকে দূরে থাকার জন্য পঠন-পাঠন কার্যক্রমের বিশেষ স্থানে বসা মোটেই পছন্দ করতেন না। 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ বর্ণনা করেছেন যে, আমরা 'আলকামাকে অনুরোধ করলাম, আপনি মসজিদে নামায পড় ন এবং নামাযের পর একটু বসুন। তাহলে আপনার কাছে বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পারতাম। বললেন, এটা আমি পছন্দ করি না যে, মানুষ ইশারা করে বলুক- ইনি 'আলকামা। একদিন জুম'আর নামায আদায়ের জন্য মসজিদে গেলেন। ইমাম তখন খুতবা দিচ্ছেন। লোকেরা তাঁকে মসজিদের ভিতরে প্রবেশের জন্য অনুরোধ করলো। কিন্তু তিনি সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে দরজায় বসে পড়লেন।

আমীর-উমারা এবং রাষ্ট্রের উঁচু পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের প্রতি শুধু বেপরোয়া এবং তাঁদের থেকে দূরেই থাকতেন না, বরং তাঁদের সাথে মেলামেশা, উঠাবসা এবং তাঁদের নিকট যাতায়াত করাকেও নৈতিকতার জন্য ক্ষতিকর মনে করতেন। একবার লোকেরা বললো, আপনি আমীর-উমারার দরবারে যাতায়াত করুন। তাহলে তাঁরা আপনার প্রকৃত অবস্থা অবগত হবে এবং মর্যাদা বুঝবে। বললেন, আমি তাঁদের থেকে যত কথা দূর করবো এবং যত জিনিসের স্বল্পতা ঘটাবো তাঁরা তার চেয়ে বেশী জিনিস আমার মধ্য থেকে কম করে দেবে। অর্থাৎ আমি তাঁদের থেকে যে পরিমাণ দোষ-ত্রুটি দূর করবো, তার চেয়ে বেশী ভালো জিনিস আমার থেকে তাঁরা দূর করে দেবে। তিনি কেবল নিজে আমীর- উমারার সাথে মেলামেশা করতেন না, বরং অন্যদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতেন। আবু ওয়ায়িল বর্ণনা করেছেন। যখন বসরা ও কুফা দু'টি অঞ্চলই ইবন জিয়াদের শাসনাধীনে দেওয়া হয় তখন একবার তিনি আমাকে বললেন, তুমিও আমার সাথে একটু চলো। আমি গেলাম এবং 'আলকামার কাছে আমীর-উমারা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, ঐ লোকদের থেকে তোমার যা অর্জন হবে তার চেয়ে বেশী জিনিস তারা তোমার থেকে নিয়ে নিবে। কোন প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবেও তিনি আমীরদের দরবারে যাওয়া পছন্দ করতেন না। একবার হযরত আমীর মু'আবিয়ার (রা) দরবারে যাবে, এমন একটি প্রতিনিধিদলের তালিকায় তাঁর নামটিও লিখে দেওয়া হয়। তিনি তা জানার সাথে সাথে আবু বুরদাকে লেখেন, আমার নামটি তালিকা থেকে বাদ দিন।

'আলকামা হিজরী ৬২ সনে কুফায় ইনতিকাল করেন। অন্তিম রোগ শয্যায় অসীয়াত করেন যে, আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে কালেমা তাইয়্যিবার তালকীন করবে যাতে আমার জিহ্বার শেষ উচ্চারণ হয়- لَا إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ - এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, যাঁর কোন শরীক নেই। আমার মৃত্যুর খবর কাকেও পৌঁছাবে না। যাতে জাহিলী যুগের মত প্রচারের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। দ্রুত দাফন করবে। বিলাপকারিণী মহিলারা যেন লাশের অনুগামী না হয়।

টিকাঃ
১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৬
২. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫৩
৩. তাবাকাত-৬/৫৯; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫৮
৪. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪১
৫. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৪২
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
৭. তাবাকাত-৬/৬০
৮. প্রাগুক্ত
৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
১০. তাবাকাত-৬/৫৮
১১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৬
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
১৩. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪৭৭
১৪. তাবাকাত-৬/৬০
১৫. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৭; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৮
১৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৮
১৭. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৪২
১৮. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৭
১৯. প্রাগুক্ত
২০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪১
২১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২৭৭; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৩৮
২২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৮
২৩. তাবাকাত-৬/৬০; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৫৭
২৪. তাবাকাত-৬/৫৯
২৫. সূরা আন-নিসা'-৪
২৬. তাবাকাত-৬/৫৭, ৫৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৫৩
২৭. সূরা আয-যুখরুফ-১৩
২৮. ইবনুল আছীর: আল-কামিল ফিত তারীখ-৩/১০৩
২৯. তাবাকাত-৬/৫৯
৩০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৫৮
৩১. তাবাকাত-৬/৫৯
৩২. প্রাগুক্ত
৩৩. প্রাগুক্ত-৬/৬০; হিলয়াতুল আওলিয়া'-২/১০১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 মাসরূক ইবন আল-আজদা‘ (রহ)

📄 মাসরূক ইবন আল-আজদা‘ (রহ)


হযরত মাসরূকের ডাক নাম আবূ 'আয়িশা। তাঁর পিতার নাম আল-আজদা'। এটা ছিল তাঁর জন্মের পর পিতা-মাতা প্রদত্ত নাম। ইসলাম গ্রহণ করার পর তাঁর পিতার নাম হয় 'আবদুর রহমান। তিনি ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত খান্দান হামাদানের একজন নেতা এবং আরবের অন্যতম খ্যাতিমান পুরুষ 'আমর ইবন মা'দিকারিব-এর প্রীতিভাজন ব্যক্তি। ইমাম যুহরী মাসরূককে 'আমরের ভাগ্নে বলে উল্লেখ করেছেন।

মাসরূক জাহিলী ও ইসলামী দু'যুগই পেয়েছিলেন। মুহাম্মাদ (সা)-এর রিসালাতের সময়কালেও তিনি বর্তমান ছিলেন। তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা সে সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। এমনকি তাঁর অতি আপনজন 'আমর ইবন মা'দিকারিব (রা) মদীনায় এসে হযরত রাসূলের কারীমের (সা) হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু মাসরূকের দুর্ভাগ্য যে, এ সময় ইসলাম গ্রহণ থেকে তিনি বঞ্চিত থেকে যান। তিনি কখন ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। হযরত আবূ বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফাতকালে তিনি মুসলমান হন বলে কিছু কিছু বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়। ইবন সা'দের তাবাকাতে মাসরূকের নিজের এ রকম একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, 'আমি আবূ বকরের (রা) পিছনে নামায পড়েছি।'

হযরত 'উমার ফারুকের (রা) খিলাফতকালে মাসরূককে দৃশ্যপটে দেখা যায়। সে সময় একবার ইয়ামনী প্রতিনিধি দলের সাথে মদীনায় আসেন। হযরত 'উমার (রা) তাঁর পরিচয় জানতে চান। তিনি বলেন: আমি মাসরূক ইবন আল-আজদা'। 'উমার (রা) বলেন: আল-আজদা' তো শয়তানের নাম। এখন থেকে আপনি হবেন মাসরূক ইবন 'আবদির রহমান। আর এখান থেকেই তাঁর পিতার নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। এ রকম একটি বর্ণনাও আছে যে, হযরত 'উমার (রা) তাঁকে নয়, বরং তাঁর পিতাকে নাম জিজ্ঞেস করে আজদা'-এর স্থলে 'আবদুর রহমান নামটি প্রস্তাব করেন। যাই হোক না কেন, এ দু'টি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) খিলাফতকালে পিতা-পুত্র দু'জনই মদীনায় এসেছিলেন। এ রকম একটি বর্ণনাও আছে যে, শিশু অবস্থায় তিনি চুরি হয়ে গিয়েছিলেন এবং পরে পাওয়া যায়। তাই তাঁর নাম হয় 'মাসরূক'। যার অর্থ চুরি হয়ে যাওয়া।

মাসরূক ছিলেন ইয়ামনের বিখ্যাত অশ্বারোহীদের অন্যতম ব্যক্তি। হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি তাঁর তিন ভাই- 'আবদুল্লাহ, আবূ বকর ও মুনতাশার-এর সাথে বিখ্যাত কাদেসিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তাঁর তিন ভাই শাহাদাত লাভ করেন। আর অস্ত্র চালাতে চালাতে মাসরূকের হাত অবশ হয়ে যায় এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। এ আঘাতের চিহ সারা জীবন বিদ্যমান ছিল। যেহেতু এই চিহ টি ছিল তাঁর সাহস, বীরত্ব ও জীবন বাজি রাখার একটি সনদ, তাই এটাকে তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন এবং এটা মুছে যাওয়া মোটেই আশা করতেন না।

তবে তাঁর এ বীরত্ব ও বাহাদুরী ছিল ইসলামের সেবায় এবং ইসলাম বিরোধী শক্তির মুকাবিলায়। মুসলমানদের গৃহযুদ্ধে তাঁর তরবারি সবসময় কোষবদ্ধই ছিল। হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালের কোন বিদ্রোহ ও বিশৃংঙ্খলায় কোনভাবেই অংশগ্রহণ করেননি। ইসলামের একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে তিনি নিজের শহর কূফার অধিবাসীদের মদীনাবাসীদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য সব সময় উৎসাহিত করতেন।

হযরত 'উছমানের (রা) শাহাদাতের পর যখন উটের যুদ্ধের তোড়াজোড় শুরু হয়ে যায় এবং সমর্থন ও সাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে হযরত 'আলী (রা) যখন হযরত হাসান (রা) ও 'আম্মার ইবন ইয়াসিরকে (রা) কুফায় পাঠান তখন এই মাসরূক সর্বপ্রথম তাঁদের সাথে মিলিত হন। তিনি 'আম্মার ইবন ইয়াসিরকে (রা) জিজ্ঞেস করেন: 'আবুল ইয়াকজান! আপনারা 'উছমানকে (রা) কোন কারণে শহীদ করেন? তিনি বলেন: আমার ইজ্জত আবরু নিয়ে টানাটানি ও আমাকে পিটুনির কারণে।

মাসরূক বলেন: আল্লাহর কসম! আপনারা যতখানি ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন তার চেয়ে বেশী বদলা নিয়ে ফেলেছেন। যদি আপনারা ধৈর্য ধরতেন, তাহলে সেটাই আপনাদের জন্য ভালো ছিল।'

উটের যুদ্ধের মাধ্যমে যে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়, সিফফীন যুদ্ধ পর্যন্ত তা চলমান ছিল। মাসরূক এর একটিতেও অংশগ্রহণ করেননি। হযরত 'আলীর (রা) সমর্থকদের বড় কেন্দ্র ছিল কৃষ্ণা। এখানে অবস্থান করে নিজেকে নিরপেক্ষ রাখা ভীষণ কঠিন ব্যাপার ছিল। এ কারণে এ সময় তিনি কৃষ্ণা ছেড়ে কাযবীন চলে যান।

শা'বী বর্ণনা করেছেন, কোন একটি যুদ্ধেও মাসরূক 'আলীর (রা) সাথে ছিলেন না। পরবর্তীকালে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতো যে, আপনি 'আলীর (রা) সাথে ছিলেন না কেন? তিনি বলতেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, ধরে নাও আমরা একে অপরের মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছি এবং উভয় পক্ষ অস্ত্র হাতে একে অপরকে হত্যা করে চলেছি, আর সেই সময় তোমাদের চোখের সামনে আসমানের কোন দরজা খুলে গেল এবং সেখান থেকে কোন ফেরেশতা বেরিয়ে এসে মুখোমুখি দু'টি সারির মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضِ مِّنْكُمْ وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ، إِنَّ اللَّهَ بِكُمْ رَحِيمًا .
‘ওহে ঈমানদার লোকেরা! তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের অর্থ-সম্পদ খেয়ো না। তবে তোমাদের পরস্পরের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে খেতে পার। আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।’
তাহলে তার এ বলা উভয় পক্ষকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখবে কিনা? লোকেরা জবাব দিত : নিশ্চয় বিরত রাখবে। তখন তিনি বলতেন, আল্লাহর কসম! তোমাদের জানা উচিত যে, আসমানের দরজা খোলা হয়েছে এবং সেখান থেকে একজন ফিরিশতা এসে তোমাদের নবীকে এ নির্দেশ শুনিয়ে গেছেন। আর তা মাসহাফে বিদ্যমান আছে এবং তা অন্য কিছু দ্বারা রহিত করা হয়নি।

‘আমির থেকে অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। মাসরূক আমাকে বললেন, যখন মু'মিনদের দু'টি দল পরস্পরের সাথে লড়াই করার জন্য মুখোমুখি সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, আর তখন আসমান থেকে কোন ফিরিশতা আত্মপ্রকাশ করে চিৎকার করে বলে: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بِالْبَاطِلِ الخ
তখন তোমার কি ধারণা? তারা যুদ্ধ করবে, না যুদ্ধ থেকে বিরত থাকবে? আমি বললাম: তারা যদি অনুভূতিহীন জড় পাথর না হয় তাহলে অবশ্যই রণেভঙ্গ দেবে। আমার এ জবাব শুনে তিনি বললেন, আল্লাহর এক আসমানী বন্ধু উপরোক্ত নির্দেশ নিয়ে ধরাপৃষ্ঠে আল্লাহর আর এক বন্ধুর নিকট অবতরণ করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষ যুদ্ধ থেকে বিরত হয়নি। অথচ না দেখে ঈমান আনা দেখার পর ঈমান আনার চেয়ে ভালো। আরেকটি বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি শুধু নিজেই এ গৃহযুদ্ধ থেকে দূরে ছিলেন না, বরং মুসলিম জনগণকে বিরত রাখার জন্য সিফ্ফীনের যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্তও গিয়েছিলেন। তিনি বিবাদমান দু'টি দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উপরোক্ত উপদেশমূলক কথা শুনিয়ে তাদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সঠিক কথা এটাই যে, তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি এবং কোনভাবেই সিফ্ফীনের রণক্ষেত্রে যাননি।

উমাইয়্যা খিলাফতকালে তিনি কিছুদিনের জন্য কাযী ছিলেন। হিজরী ৬৩ সনে তিনি ‘ওয়াসিত’ নামক স্থানে অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। আল্লাহর প্রতি অকৃত্রিম তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সারাটি জীবন তিনি এই নির্ভরতাকে আঁকড়ে থাকেন। পার্থিব ধন-সম্পদ তাঁর জীবনকে কখনো কলুষিত করতে পারেনি। বিচারকের দায়িত্ব পালনের সময়ও তিনি কোন পারিশ্রমিক নিতেন না। এ জন্য কাফনের কাপড় পর্যন্ত কেনার পয়সা তাঁর ঘরে ছিল না। শা'বী বলেছেন, মাসরূক মৃত্যুর সময় কাফনের কাপড় কেনার মত অর্থও রেখে যাননি। তার জন্য তিনি ঋণ করার অসীয়াত করে যান। তবে একথাও বলে যান যে, কৃষি পেশার লোক এবং রাখালদের থেকে নিবে না। বরং যারা গৃহপালিত প্রাণী পালন করে, অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য করে তাদের থেকে নিবে। একেবারে শেষ নিঃশ্বাসের আগে তিনি আল্লাহ রাব্বুল আ'লামীনের দরবারে এভাবে দু'আ করেন: 'হে আল্লাহ! আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এবং আবূ বকর (রা) ও 'উমারের (রা) সুন্নাতের পরিপন্থী কোন পথ ও পদ্ধতির উপর মরছি না। আল্লাহ, তোমার কসম! আমি আমার তরবারিটি ছাড়া কোন মানুষের নিকট কোন সোনা-রূপো রেখে যাচ্ছি না। এর দ্বারাই আমার কাফন-দাফন করবে।' এ কথা দ্বারা সম্ভবতঃ তিনি তরবারিটি বিক্রি করে কাফনের অর্থ সংগ্রহের প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন।

এসব অসীয়াত তথা অন্তিম উপদেশবাণী দান করার পর তিনি ওয়াসিত-এ হিজরী ৬৩ সনে ইনতিকাল করেন। সেখানেই দাফন করা হয়।

তাঁকে তাবি'ঈ 'আলিমদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের তীব্র বাসনা দেখা যায়। শা'বী বর্ণনা করেছেন, মাসরূকের চেয়ে জ্ঞান অন্বেষণকারী আর কেউ ছিল না। সৌভাগ্যবশতঃ তিনি হযরত 'আয়িশার (রা) মত স্নেহময়ী বিদুষী মা লাভ করেছিলেন। তিনি মাসরূককে ছেলের মত দেখতেন এবং ছেলের মত স্নেহ করতেন। কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি তাঁকে পুত্ররূপে গ্রহণ করেন। কিন্তু এসব বর্ণনা ঠিক নয়। তবে তিনি মাসরূককে অতি বেশী স্নেহ করতেন এবং তাঁকে 'আমার ছেলে' বলে ডাকতেন। মাসরূক যখন হযরত 'আয়িশার (রা) দরবারে উপস্থিত হতেন তখন তিনি তাঁকে মধুর শরবত পান করাতেন। একবার মাসরূক কয়েকজন লোক সংগে করে হযরত 'আয়িশার (রা) কাছে আসেন। তিনি বাড়ীর লোকদের নির্দেশ দেন, আমার ছেলেদের জন্য মধুর শরবত বানাও। হযরত 'আয়িশা (রা) ছাড়াও মাসরূক হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। তিনি ইবন মাস'উদের (রা) যোগ্যতম ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন। ইবন মাদাইনী বলেছেন, আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) ছাত্র-সঙ্গীদের মধ্যে মাসরূকের উপর অন্য কাউকে প্রাধান্য ও গুরুত্ব দিই না।

মাসরূকের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সাধনা এবং উপরে উল্লেখিত মহান দু'ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সাহচর্য তাঁকে একজন শ্রেষ্ঠ 'আলিমে পরিণত করে। ইমাম যাত্রী তাঁকে একজন ফকীহ্ ও শ্রেষ্ঠ 'আলিম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর মহত্ব, বিশ্বস্ততা, মর্যাদা এবং ইমাম হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে সবাই একমত। মুররা তো বলতেন, 'হামাদান গোত্রের কোন নারী মাসরূকের মত দ্বিতীয় কোন সন্তান জন্ম দিতে পারেনি।

হাদীছ ও সুন্নাহতে মাসরূকের জ্ঞান অনেক গভীর ও ব্যাপক ছিল। এ জ্ঞান তিনি অর্জন করেছিলেন সরাসরি বহু উঁচু স্তরের সাহাবীর নিকট থেকে। যেমন: হযরত 'আয়িশা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা), আবূ বকর (রা), 'উমার (রা), 'উছমান (রা), 'আলী (রা), মু'আয ইবন জাবাল (রা), উবাই ইবন কা'ব (রা), যায়েদ ইবন ছাবিত (রা), খাব্বাব ইবন আরাত (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা), মুগীরা ইবন শু'বা (রা) ও আরো অনেকে। হাদীছের সাথে সাথে তিনি সুন্নাহ্ও শিক্ষা দিতেন।

ফিকাহ্ ছিল তাঁর বিশেষ অধীত বিষয়। এ শাস্ত্রে তিনি ইমাম ও ইজতিহাদের মর্যাদা ও যোগ্যতা লাভ করেন। তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) সেইসব শিষ্য- শাগরিদদের মধ্যে ছিলেন যাঁদের কাজই ছিল দারস ও ইফতা (শিক্ষা ও ফাতওয়া দান)। বিচার কাজে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাযী শুরায়হ অনেক সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। শা'বীর মতে ফাতওয়ার ক্ষেত্রে মাসরূক কাযী শুরায়হ-এরও উপরে ছিলেন। কাযী শুরায়হ তাঁর পরামর্শ ও মতামত গ্রহণ করতেন। কিন্তু মাসরূকের তাঁর পরামর্শের প্রয়োজন পড়তো না।

ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর এই বিশেষ যোগ্যতার কারণে বিচার-ফায়সালায় ছিল তাঁর বিশেষ ঝোঁক ও রুচি। এ কাজ তাঁর খুব প্রিয় ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি যে একজন যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন তার প্রমাণ হলো কাযী শুরায়হ তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। উমাইয়্যা খিলাফতকালে তিনি কিছুদিনের জন্য কাযীর দায়িত্ব পালনও করেন। বিচার-ফায়সালায় তাঁর এত বেশী আগ্রহ ছিল যে, তিনি বলতেন, আমার কাছে একটি বিবাদে সত্য-সঠিক ফায়সালা করা এক বছর 'জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ' (আল্লাহর পথে জিহাদ) থেকে বেশী পছন্দ।

'ইলমের সাথে সাথে মাসরূকের মধ্যে 'আমলও ছিল। তিনি উন্নত নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন। যাবতীয় নৈতিক গুণের উৎস হলো খোদাভীতি। তিনি খাওফে খোদা বা খোদাভীতিকে প্রকৃত জ্ঞান বলে বিশ্বাস করতেন। আর তার বিপরীতে 'আমল বা কর্মের অহঙ্কারকে মূর্খতা জ্ঞান করতেন। তিনি বলতেন: 'মানুষের জন্য এই জ্ঞান যথেষ্ট যে, সে আল্লাহকে ভয় করে। আর নিজের জ্ঞান নিয়ে গর্ব করাটাই মূর্খতা।'

তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞান আহরণের প্রতি তীব্র আগ্রহ ও আবেগ পোষণ করতেন। ইমাম শা'বী তাঁর এমন একটি ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন যা দ্বারা তাঁর আগ্রহের তীব্রতা অনুমান করা যায়। তিনি বলেছেন: মাসরূক একবার বসরায় এক ব্যক্তির কাছে গেলেন একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য। কিন্তু তাঁর কাছে তেমন কোন জ্ঞান লাভ করতে পারলেন না। সেখান থেকে তাঁকে বলা হলো, আমাদের এখানে শামের এক ব্যক্তি আসেন তাঁর কাছে এ সম্পর্কিত জ্ঞান আছে। সেখান থেকে মাসরূক সেই ব্যক্তির খোঁজে শামের পথ ধরেন। প্রিয় পাঠক! বসরা থেকে শাম নিকটের কোন দূরত্ব ছিল না। এ ছিল বহু দিন ও বহু কষ্টের পথ। একটি মাত্র আয়াত সম্পর্কে জানার জন্য তিনি এ পথ পাড়ি দিয়েছেন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি সীমাহীন আগ্রহ ও শক্ত অঙ্গীকার ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়।

তিনি একজন বড় 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। ইবাদাতের কঠিন অনুশীলন করতেন। ক্রমাগতভাবে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা দু'টি ফুলে যেত। বছরের বিশেষ বিশেষ সময় তাঁর ইবাদাত অত্যধিক বেড়ে যেত। কোথাও 'তাউন'-এর মহামারী দেখা দিলে তিনি নির্জন স্থানে গিয়ে 'ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। অনেকে সন্দেহ করতো তিনি হয়তো তা'উন-এর ভয়ে লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। আসলে তা নয়। তাঁর উদ্দেশ্য হতো একাগ্র চিত্তে 'ইবাদাতে নিমগ্ন থাকা। আনাস ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন, আমরা জানতে পেলাম যে, মাসরূক তা'ঊন থেকে পালাতেন। কিন্তু মুহাম্মাদ একথা বিশ্বাস করলেন না। তিনি বললেন, বিষয়টি তাঁর স্ত্রীর নিকট জিজ্ঞেস করা উচিত। আমরা একদিন তাঁর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! ব্যাপারটি তা নয়। তিনি কখনো 'তা'উন' থেকে পালাতেন না। তবে যখন তা'ঊন-এর মহামারি দেখা দিত, তিনি বলতেন, এই যিক্র ও আমলের দিনগুলোতে আমি চাই নিরিবিলিতে 'ইবাদাত করতে। তারপর তিনি শুধুমাত্র 'ইবাদাতের জন্য নির্জনতা অবলম্বন করতেন। মাঝে মাঝে তিনি নিজের উপর এত কঠিন কাজ চাপিয়ে দিতেন যে, অনেক সময় আমি তা দেখে তাঁর পিছনে বসে কাঁদতে শুরু করতাম। হজ্জের সময় যতদিন মক্কায় থাকতেন, সিজদার মধ্যেই ঘুমের কাজ সেরে নিতেন। মাসরূকের স্ত্রীর নাম ছিল ফায়রূয। একবার তিনি যখন দেখলেন মাসরূক একাধারে রোযা রেখেই চলেছেন তখন তিরস্কারের সুরে বললেন: মাসরূক! আপনি ছাড়া আর কেউ কি আল্লাহর 'ইবাদাত করে না? জাহান্নাম কি কেবল আপনার জন্য তৈরী করা হয়েছে? জবাবে মাসরূক বললেন: ফায়রূয! জান্নাতের সন্ধানকারী ব্যক্তি ক্লান্ত হয় না, আর জাহান্নাম থেকে পলায়নকারী ঘুমায় না।

তিনি নিজের নফসের মুহাসাবা বা আত্ম সমালোচনা এবং পাপ স্মরণ করে তার জন্য ইসতিগফার করা অত্যন্ত জরুরী মনে করতেন। তিনি বলতেন, মানুষের জন্য এমনসব মজলিস থাকা উচিত যেখানে বসে তারা নিজেদের পাপকে স্মরণ করে আল্লাহর নিকট ইসতিগফার করতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে দুনিয়ার কোন মূল্যই ছিল না। তিনি দুনিয়াকে ময়লা-আবর্জনার চেয়ে বেশী কিছু মনে করতেন না। একদিন তিনি তাঁর এক ভাতিজার হাত ধরে একটি ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থানে নিয়ে যান। তাকে বলেন, আমি তোমাকে দুনিয়া ফি তা দেখাচ্ছি। দেখ, এই হচ্ছে দুনিয়া। এসব কিছু খেয়ে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, পরে পুরানো ও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে, এর পিঠে আরোহণ করে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। আর এর জন্য কত না রক্ত ঝরিয়েছে, আল্লাহর হারামকে হালাল করেছে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।

আর এ কারণে দুনিয়ার প্রতি তাঁর অন্তর কখনো ঝোঁকেনি এবং পার্থিব কোন জিনিসের প্রতিও তাঁর কোন আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়র ছিলেন তাঁর সম- চিন্তা ও সম-মতের মানুষ। তাঁদের মধ্যে অনেক রহস্যময় ও গূঢ় কথাবার্তা হতো। ইবন যুবায়র বলেছেন, মাসরূক একদিন আমাকে বললেন, সা'ঈদ! এখন এমন আর কোন জিনিস নেই যার প্রতি অন্তরের আকর্ষণ থাকতে পারে। শুধু এটাই আছে যে, নিজের চেহারাকে ধুলি মলিন করি।

দুনিয়ার প্রতি তাঁর এমন বীতস্পৃহ ভাবের কারণে দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব থেকে সব সময় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন। বহু মানুষ তাঁর প্রয়োজন পূরণ করতে এবং তাঁর সেবায় নিয়োজিত হতে চাইতো, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতেন না। একবার খালিদ ইবন উসায়দ তাঁর নিকট তিরিশ হাজার দিরহাম পাঠালেন। তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফেরত দিলেন। তাঁর আত্মীয়-বন্ধুরা তাঁকে এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করলেন যে, আপনি গ্রহণ করে তা সাদাকা করে দিন। আত্মীয়-বন্ধুদের দান করুন এবং অন্য সব ভালো কাজে লাগান। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে রাজী করাতে পারলেন না।

এই তীব্র আত্ম-নির্ভরতা ও অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষীহীনতা কখনো কখনো তাঁকে পরিবারসহ অভুক্ত অবস্থার মধ্যে ফেলে দিত। এমতাবস্থায়ও তাঁর প্রগাঢ় আল্লাহ- নির্ভরতায় কোন রকম ফাটল ধরতো না। একদিন ঘরে খাবার মত কিছুই ছিল না। স্ত্রী জানান দিলেন, 'আয়িশার বাপ, আজ আপনার ছেলে-মেয়েদের খাবার মত ঘরে কিছু নেই। একথা শুনে মাসরূক একটু হেসে দিলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! তিনি অবশ্যই তাদের রিযিকের ব্যবস্থা করবেন।

এত অল্পে তুষ্টি ও আল্লাহ নির্ভরতার ভিতর দিয়েও তিনি ছিলেন একজন দরাজদিল দানশীল ব্যক্তি। কোন সময় কোনভাবে হাতে কিছু পয়সা-কড়ি এলেই সাথে সাথে আল্লাহর ওয়াস্তে বিলিয়ে দিতেন। সায়িব ইবন আকরা'র সাথে এক মেয়ের বিয়ে দেন। সায়িব শ্বশুরের হাতে দশ হাজার দিরহামের মত মোটা একটি অংক তুলে দেন। তিনি তার সবই জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ, গরিব-দুঃখী মানুষ ও দাসমুক্তি প্রভৃতি খাতে ব্যয় করেন।

তিনি সব রকম কথা ও কাজে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। নৌকা বা জাহাজে যদি উঠার প্রয়োজন হতো তাহলে উঠার সময় একটি ইট হাতে নিয়ে উঠতেন। নামাযের সময় তার উপর সিজদা করতেন। কারো কোন কাজ যদি তাঁর কথায় বা সুপারিশে হতো তিনি তার কাছ থেকে কোন উপহার-উপঢৌকনও গ্রহণ করতেন না। একবার একটি ব্যাপারে কোন এক ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করেন। লোকটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ স্বরূপ তাঁকে একটি দাসী দান করতে চান। তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। লোকটিকে তিনি বলেন, তোমার মন-মানসিকতা এমন তা যদি আগে আমি জানতাম তাহলে তোমার জন্য কখনো সুপারিশ করতাম না। যতটুকু সুপারিশ করেছি, তাতো করেই ফেলেছি। এখন যতটুকু প্রয়োজন বাকী আছে আমি তার জন্য আর কোন কিছুই বলবো না। আমি 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদের (রা) মুখ থেকে শুনেছি। যে ব্যক্তি কারো হক আদায় করে দেওয়া, অথবা যুলুম-অত্যাচার বন্ধ করার জন্য কারো কাছে সুপারিশ করে, আর তার বিনিময়ে যদি তাকে উপহার-উপঢৌকন দেওয়া হয় এবং সুপারিশকারী তা গ্রহণ করে তাহলে সেই উপহার-উপঢৌকন তার জন্য হারাম হবে।

'উবায়দুল্লাহ ইবন যিয়াদ একবার কূফায় এসে জিজ্ঞেস করলেন : সবচেয়ে ভালো মানুষ কে? লোকেরা বললো : মাসরূক ইবন আল-আজদা'।

ইমাম আল-আসমা'ঈ ইবন 'আওনের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইবন 'আওনের শিক্ষকরা বলাবলি করতেন যে, তাবি'ঈদের আট ব্যক্তি পর্যন্ত এসে যুহদ তথা খোদাভীতি ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ ভাব চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাঁরা হলেন : 'আমির ইবন 'আবদিল কায়স, আল-হাসান ইবন আবিল হাসান আল-বসরী, হারিম ইবন হায়্যান, আবু মুসলিম আল-খাওলানী, উওয়ায়িস আল-কারানী, আর-রাবী' ইবন খুছায়ম, মাসরূক ইবন আল-আজদা' ও আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৯
২. তাবাকাত-৫/৩৮২
৩. আবূ দাউদ-৪৯৫৭; মুসনাদে আহমাদ-১/৩১; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৩০১
৪. তাবাকাত-৬/৫০
৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৬২-
৬. তাবাকাত-৬/৫২
৭. আল-কামিল ফিত তারীখ-৩/১২৭
৮. প্রাগুক্ত-৩/১৮৫
৯. প্রাগুক্ত-৩/২৩০
১০. সূরা আন-নিসা'-২৯
১১. তাবাকাত-৬/ ৫১-৫২
১২. প্রাগুক্ত-৬/৫৫
১৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৯
১৪. তাহযীবুল আসমা'-১/৮৮
১৫. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ/১৪৯; তারীখু ইবন 'আসাকির-৬/২১০
১৬. তাবাকাত-৬/৫২
১৭. তাযকিরাতুল হুফফ্ফাজ-১/৪২
১৮. প্রাগুক্ত
১৯. তাহযীবুল আসমা'-১/৮৮
২০. তাবাকাত-৬/৫২
২১. তাহযীবতু তাহযীব-১০/১১০
২২. প্রাগুক্ত-১০/১১১
২৩. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৩
২৪. প্রাগুক্ত-১/৪৯
২৫. তাবাকাত-৬/৫৫
২৬. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৬৪
২৭. হিলয়াতুল আওলিয়া-২/৯৫
২৮. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৬৩
২৯. তাবাকাত-৬/৫৪
৩০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৪৯
৩১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৬৮
৩২. তাবাকাত-৬/৫৫
৩৩. প্রাগুক্ত-৬/৫৩, ৫৪
৩৪. প্রাগুক্ত-৬/৫৩
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/৫৩
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/৫৪
৩৭. 'আসরুত তাবি'ঈন-২৭০
৩৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৭১

ফন্ট সাইজ
15px
17px