📄 ‘আতা ইবন আবী রাবাহ (রহ)
বিখ্যাত মুহাদ্দিছ তাবি'ঈ হযরত 'আতা'র (রহ) পিতার নাম আবু রাবাহ আসলাম। ইয়ামানের জানাদ একটি রত্নগর্ভা স্থান বলে খ্যাত। হযরত 'উসমানের (রা) খিলাফতকালের সূচনাপর্বে, মতান্তরে খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালের শেষের দিকে এই জানাদে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং মক্কায় বেড়ে ওঠেন। আলে আবী মায়সারা ইবন খুছায়ম আল-ফিত্রীর মাওলা বা আযাদকৃত দাস ছিলেন। ডাকনাম ছিল আবূ মুহাম্মাদ। সীরাত বিশেষজ্ঞরা তাঁকে শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করেছেন। তিনি ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, শুদ্ধ ও মিষ্টভাষী এবং অগাধ জ্ঞানের অধিকারী এক মনীষী।
'আতা তাঁর শৈশবকালেই রাত-দিনের সবটুকু সময়কে তিনভাগে ভাগ করে নেন। এক ভাগে স্বীয় মনিবের সেবা ও তার প্রয়োজনীয় কাজ-কর্ম সম্পাদন করতেন। আরেক ভাগ প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদাতে ব্যয় করতেন। আরেক ভাগ জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্ধারণ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) যেসব 'আলিম সাহাবী সে সময় জীবিত ছিলেন, তিনি নিয়মিতভাবে তাঁদের নিকট যাতায়াত করতেন। জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর এমন প্রবল আগ্রহ দেখে মনিব তাঁর প্রতি সদয় হন। তিনি মনে করেন, তাঁকে সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে তিনি একজন বড় 'আলিম হবেন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণে বিশেষ অবদান রাখতে পারবেন। এমন একটি মহৎ চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি 'আতাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন। আর তখন থেকেই মসজিদুল হারামকে তিনি আবাসস্থল বানিয়ে নেন। সেখানে বিশ্রাম নেন, সেখানের কোন দরসের হালকায় বসে জ্ঞান আহরণ করেন এবং সেখানেই আল্লাহর 'ইবাদাতে মগ্ন হয়ে পড়েন।
সুউচ্চ মর্যাদা, পার্থিব ভোগ-বিলাস বিমুখতা এবং আল্লাহর প্রতি শক্ত ঈমান ও ভীতির দিক দিয়ে তিনি ছিলেন প্রথম স্তরের তাবি'ঈদের অন্যতম। ইবন হাজার 'আসকালানী বলেন, তিনি ফিকাহ্, অন্যান্য জ্ঞান, তাকওয়া-পরহিযগারী এবং মহত্ব ও মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের মধ্যে পরিগণিত। তিনি একজন নির্ভরযোগ্য ইমাম ও বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষ ছিলেন। ইমাম নাওবী বলেন, তিনি মক্কার মুফতী এবং বিখ্যাত ইমামদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। অনেক বড় বড় ইমাম তাঁর অগাধ জ্ঞানের স্বীকৃতি দান করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল বলেন, জ্ঞানের ভাণ্ডার আল্লাহ তাঁকে দান করেন যাঁকে তিনি ভালোবাসেন। জ্ঞান যদি কারো সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হতো তাহলে উচ্চবংশ, মতান্তরে নবীর (সা) বংশই তার অগ্রাধিকারী হতো। কিন্তু 'আতা' ছিলেন হাবশী দাস, ইয়াযীদ ইবন আবী হাবীব ছিলেন নাওবী, আল-হাসান আল-বসরী ও ইবন সীরীন ছিলেন দাস। ইমাম যাহাবী তাকে মক্কার মুফতী, মুহাদ্দিছ ও নেতৃস্থানীয় 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন। ইবন আবী লায়লা তাঁকে মক্কার ফকীহ্ বলেছেন।
হযরত 'আতা' সম্পর্কে একবার মক্কাবাসীদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল : তোমাদের মধ্যে 'আতা' ইবন আবী রাবাহ কেমন ছিলেন? তারা বলেছিল : তিনি ছিলেন সুস্থতার মত, না হারানো পর্যন্ত যার গুরুত্ব বুঝা যায় না। ইমাম আল-আওযা'ঈ বলতেন, 'আতা' যখন ইনতিকাল করেন তখন তিনি মানুষের নিকট ধরাপৃষ্ঠের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি দুইশো সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেন। 'আবদুর রহমান ইবন মাহদী বলেন: আমি মক্কায় 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, ইরাকে মুহাম্মাদ ইবন সীরীন ও শামে রাজা' ইবন হায়ওয়া—এ তিনজনের মত আর কাউকে দেখিনি। সালামা ইবন কুহায়ন বলতেন, আমি 'আতা', তাউস ও মুজাহিদ ছাড়া এমন কাউকে দেখিনি যে তাঁর জ্ঞানের দ্বারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করেছেন। সা'ঈদ ইবন আবী 'আরুবা বলতেন:
إذا اجتمع أربعة لم أبال بمن خالفهم الحسن وسعيد بن المسيب وإبراهيم وعطاء، هؤلاء أئمة الأنصار.
'আল-হাসান আল-বসরী, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, 'আতা' ইবন আবী-রাবাহ- এ চারজন যখন কোন বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন তখন কেউ তাঁদের বিরোধিতা করলে আমি তার পরোয়া করিনে। এঁরা হলেন আনসারদের ইমাম।'
কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সকল ইসলামী জ্ঞানে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। হাদীছের বিখ্যাত হাফিজদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে প্রথম স্তরের হুফ্ফাজে হাদীছের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। ইবন সা'দ তাঁকে 'কাছীরুল হাদীছ' বা বহু হাদীছের ধারক বলে উল্লেখ করেছেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি প্রায় দু'শো মহান সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন এবং তাঁদের অনেকের নিকট থেকে হাদীছ শুনার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। যে সকল মহান সাহাবীর নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন এবং যাঁদের সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র (রা), মু'আবিয়া (রা), উসামা ইবন যায়দ (রা), জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা), যায়দ ইবন আরকাম (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন সায়িব আল-মাখযূমী (রা), 'আকীল ইবন আবী তালিব (রা), 'আমর ইবন আবী সালামা (রা), রাফি' ইবন খাদীজ (রা), আবুদ দারদা' (রা), আবু সা'ঈদ আল-খুদরী (রা), আবূ হুরাইরা (রা), উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশা (রা) ও উম্মু হানী (রা)।
অনেক তাবি'ঈর নিকট থেকেও তিনি হাদীছ শুনেন। আবূ সালিহ্ আস সাম্মান, সালিম ইবন শাওয়াল, সাফওয়ান ইবন ইয়া'লা ইবন উমাইয়্যা, 'উবায়দ ইবন 'উমায়র, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, ইবন আবী মুলায়কা, 'ইমাদ ইবন আবী 'আম্মার, আবুয যুবায়র, মূসা ইবন আনাস, হাবীব ইবন আবী ছাবিত প্রমুখ তাবি'ঈ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
তাঁর থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেন এবং হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন তাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ। বিশেষ কয়েকজনের নাম এই: আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, যুহরী, মুজাহিদ, আইউব আস- সিখতিয়ানী, আ'মাশ, আওয়াযা'ঈ, ইবন জুরায়জ, আবুয যুবায়র, হাকাম ইবন 'উতবা, আবু হানীফা, হুসায়ম আল-মু'আল্লিম, হাম্মাম ইবন ইয়াহইয়া, জারীর ইবন হাযিম, 'আমর ইবন দীনার, মালিক ইবন দীনার, কাতাদা ও আরো অনেকে।
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছের এত সম্মান দিতেন যে, হাদীছ আলোচনার মাঝখানে কথা বলা দারুণ অপছন্দ করতেন। কেউ কথা বললে ভীষণ ক্ষুব্ধ হতেন। মু'আয ইবন সা'ঈদ আল- আ'ওয়ার বর্ণনা করেন। একদিন আমরা 'আতা'র নিকট বসা ছিলাম। এক ব্যক্তি হাদীছ বর্ণনা করলো। অন্য এক ব্যক্তি মাঝখানে কিছু বলে উঠলো। 'আতা' ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন: এটা কেমন নৈতিকতা, কেমন স্বভাব। আল্লাহর কসম! মানুষ এ জন্য হাদীছ বর্ণনা করে যেন তা দ্বারা জ্ঞান অর্জিত হয়। যদি কেউ কোন হাদীছ বর্ণনা করে- যদিও সে হাদীছটি আমার কাছ থেকেই শুনেছে, আমি তা চুপচাপ এমনভাবে শুনে যাই যেন বর্ণনাকারী মনে করে এটি আমি এই প্রথম শুনছি। এর পূর্বে হাদীছটি আর কখনো শুনিনি। 'আমর ইবন 'আসিম বলেন, আমি 'আতা'র এ কথাটি 'আবদুল্লাহ ইবন মুবারাকের নিকট বর্ণনা করলে তিনি শুনে বললেন, আমি যতক্ষণ না নিজে গিয়ে এই মেহেদীর মুখ থেকে কথাটি নিজ কানে শুনবো, আমার পায়ের জুতো খুলবোনা। তিনি যেমন রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ বর্ণনা করতেন তেমনি হুবহু তা অনুসরণও করতেন। ইমাম শাফি'ঈ (রহ) বলেছেন :
ليس في التابعين أحد أكثر اتباعا للحديث من عطاء
- তাবি'ঈদের মধ্যে 'আতা'র চেয়ে বেশী হাদীছের অনুসরণকারী দ্বিতীয় কেউ নেই। ইমাম বাকির লোকদের বলতেন, যতটুকু সম্ভব তোমরা 'আতা' থেকে হাদীছ গ্রহণ কর।
অন্যান্য শাস্ত্রে বিচরণ থাকলেও তাঁর বিশেষ শাস্ত্র ছিল ফিকাহ্। তাঁর ফিকাহর জ্ঞানের ব্যাপারে সকল মুহাদ্দিছ, ফকীহ্ ও ইমাম একমত। ইবন হাজার লিখেছেন, ফিকাহতে তিনি নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈদের মধ্যে ছিলেন। রাবী'আ, যিনি নিজেই একজন বড় ফকীহ্ ছিলেন, বলতেন, ফাতওয়ার ক্ষেত্রে 'আতা' ছিলেন সকল মক্কাবাসীর উপরে। মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল্লাহ আদ দীবাজ বলতেন, আমি 'আতা'র চেয়ে কোন ভালো মুফতী দেখিনি। তাঁর মজলিসে আল্লাহর যিক্র বন্ধ হতো না। কোন প্রশ্ন করা হলে সুন্দর জবাব দিতেন। ইমাম আবূ হানীফা বলতেন, আমি 'আতা'র চেয়ে ভালো আর কাউকে পাইনি। অনেক বড় বড় সাহাবী পর্যন্ত তাঁর ফিকাহর জ্ঞানের স্বীকৃতি দান করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) ও হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) যখন মক্কায় যেতেন এবং বিভিন্ন মাসআলা সম্পর্কে জানার জন্য মানুষ তাঁদের নিকট ভিড় করতো তখন তাঁরা বলতেন: ওহে মক্কাবাসী। তোমাদের এখানে 'আতা' বর্তমান থাকতে তোমরা আমার কাছে ভিড় করেছো? ইমাম আছ-ছাওরী বর্ণনা করেছেন। একবার 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার মক্কায় আসলেন। মানুষ বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞেস করার জন্য ভিড় করলো। তিনি লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন: তোমাদের মধ্যে 'আতা' থাকতে তোমরা আমার জন্য প্রশ্নসমূহ জমা করে রাখ?
তাঁর সময়ে মক্কার ইফতার মসনদের অলঙ্কার হিসেবে মাত্র দুই ব্যক্তি গণ্য হতেন। একজন তিনি এবং অন্যজন মুজাহিদ। তবে দুইজনের মধ্যে প্রাধান্য ছিল তাঁর। ইবন খাল্লিকান বলেছেন, সে যুগের মক্কার ফাতওয়া তাঁদের দুইজনের নিকট গিয়ে শেষ হয়েছে। রাবী'আ বলেছেন, ফাতওয়ার ক্ষেত্রে 'আতা' মক্কাবাসীদের সকলকে ডিঙ্গিয়ে গেছেন।
তাঁর এত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ফাতওয়া দানের ব্যাপারে দারুণ সতর্ক ছিলেন। কখনো কোন মাসআলায় নিজের মত প্রকাশ করতেন না। কোন মাসআলায় যদি কুরআন-হাদীছের কোন দলীল প্রমাণ তাঁর জানা না থাকতো তিনি সাফ বলে দিতেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। 'আবদুল 'আযীয ইবন রাফী' বলেন, একবার 'আতা'র নিকট একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো। তিনি জবাব দিলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। লোকেরা বললো, আপনার মতের ভিত্তিতেই জবাব দিন না কেন? তিনি বললেন, আল্লাহর সামনে আমার লজ্জা হয় এই ভেবে যে, তাঁর যমীনে আমার সিদ্ধান্তের অনুসরণ করা হবে।
তবে একজন ফকীহ ও মুফতীকে নিজস্ব মতামত ও সিদ্ধান্ত অবশ্যই দান করতে হয়। তিনি সবসময় নিজের মতামত ব্যক্ত করার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারেন না। এ কারণে 'আতা' যখন কিয়াস বা অনুসিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফাতওয়া দিতেন তখন তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন। ইবন জুরায়জ বলেন, 'আতা' যখন কোন বিষয় বর্ণনা করতেন তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম এটা 'ইলম না সিদ্ধান্ত? যদি তিনি হাদীছের ভিত্তিতে বলতেন তাহলে তা যেমন বলে দিতেন, তেমনিভাবে কিয়াস ও সিদ্ধান্ত হলে তাও উল্লেখ করতেন।
হজ্জের আহকাম ও বিধি-বিধানের তিনি একজন সুবিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। ইমাম মুহাম্মাদ আল-বাকির বলতেন, হজ্জের বিষয়ে 'আতা'র চেয়ে বেশি জানা লোক কেউ আর বেঁচে নেই। উমাইয়্যা শাসনকালে হজ্জের সময় ঘোষণা দেওয়া হতো যে, হজ্জের মাসআলার ব্যাপারে 'আতা' ইবন আবী রাবাহ ছাড়া আর কেউ ফাতওয়া দিতে পারবে না। কাতাদা বলতেন, হজ্জের বিধি-বিধান 'আতা' সবচেয়ে বেশী জানেন। ইবনুল জাওযী বর্ণনা করেছেন : উমাইয়্যা খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক একবার তাঁর দুই ছেলেকে সংগে নিয়ে 'আতা'র নিকট যান। তিনি তখন নামাযে দাঁড়িয়ে। তাঁরা পাশে বসলেন। নামায শেষ করে তিনি পাশে বসা খলীফার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। তাঁরা হজ্জের বিধি-বিধান ও রীতি পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। 'আতা' তাঁদের দিকে মুখ না ঘুরিয়ে পিছনে রেখেই সব প্রশ্নের জবাব দিলেন। প্রশ্নোত্তর শেষ হলে সুলায়মান তাঁর দুই ছেলেকে বললেন : ওঠো, আমরা জ্ঞান অর্জনের জন্য এখানে এসেছি। এই কালো দাসের নিকট আমাদের এ অপমান আমি কখনো ভুলবো না।
এরপর খলীফা তাঁর পুত্রদ্বয়কে সংগে নিয়ে সাফা-মারওয়ার মাঝখানে সা'ঈর উদ্দেশ্যে চললেন। চলার পথে তাঁরা শুনতে পেলেন, ঘোষকরা ঘোষণা করছে, 'ওহে মুসলিম জনগণ। হজ্জের মওসুমে এখানে একমাত্র 'আতা ইবন আবী রাবাহ ছাড়া আর কেউ জনগণের মধ্যে ফাতওয়া দিতে পারবে না। তাঁকে পাওয়া না গেলে 'আবদুল্লাহ ইবন আবী নাজীহ ফাতওয়া দিবেন।' এ ঘোষণা শুনে খলীফার এক পুত্র পিতার দিকে তাকিয়ে বললেন : আমীরুল মু'মিনীনের একজন ওয়ালী এ ঘোষণা কিভাবে দিতে পারেন যে, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ ছাড়া আর কেউ ফাতওয়া দিতে পারবে না? তা ছাড়া আমরা এমন লোকের নিকট ফাতওয়া জিজ্ঞেস করতে কেনই বা গেলাম যিনি খলীফাকে কোন আমলই দিলেন না- যথাযথ সম্মান প্রদর্শন তো দূরের কথা।
খলীফা সুলায়মান তাঁর ছেলেকে বললেন: বেটা! এই যাঁকে তুমি দেখলে, যাঁর সামনে আমাদেরকে এমন অপদস্ত হতে হলো, তিনি 'আতা' ইবন আবী রাবাহ। মসজিদুল হারামের তিনি মুফতী। এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) উত্তরাধিকারী। তারপর তিনি আরো বলেন: 'বেটা। জ্ঞান অর্জন কর। জ্ঞানের দ্বারাই নীচ লোকেরা সম্মানীয় হয়, উদাসীনরা সতর্ক হয় এবং দাসেরা রাজাদের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়।' উল্লেখ্য যে, 'আতা ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ দাস।
অতি সাধারণ শ্রেণীর মানুষ যাদের হজ্জের মওসুমে তাঁকে দেখার, তাঁর সাথে থাকার এবং তাঁর খিদমত করার সুযোগ ঘটতো তারাও হজ্জের মাসলা-মাসাইলে অভিজ্ঞ হয়ে যেত। এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা আছে। ইমাম আবু হানীফা বলতেন, হজ্জের সময় একজন নাপিত, যে 'আতা'-কে দেখেছিল, আমাকে পাঁচটি স্থানে হজ্জের বিধান শিখিয়েছেন। মাথার চুল মুড়ানোর আগে আমি দাম-দস্তুর ঠিক করতে চাইলাম। সে বললো, 'ইবাদাতে কোন শর্ত করা যায় চিহ্নিত করা যায় না। বসে যান, হাজামত শেষ হোক। আমি সোজা কিবলার দিকে মুখ না করে একটু বেঁকে বসলাম। সে কিবলামুখী হয়ে বসতে ইঙ্গিত করলো। আমি বাম দিক থেকে মাথা মুড়াতে চাইলাম। সে বললো, ডান দিক ঘুরান। আমি ডান দিক ঘুরিয়ে দিলাম, সে মুড়াতে লাগলো। আমি চুপচাপ বসে থাকলাম। সে বললো, তাকবীর পাঠ করতে থাকুন। হাজামত শেষ হলে আমি যাবার জন্য উঠলাম। সে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছেন? আমি বললাম, আমার আবাসস্থলে। সে বললো, প্রথমে দুই রাকা'আত নামায আদায় করুন, তারপর যান। আমার ধারণা হলো, এই নাপিতের এ রকম মাসআলা জানার কথা নয়- যদি না সে অন্য কারো নিকট থেকে জেনে থাকে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি আমাকে যে কথাগুলি শিখালে, তা কোথা থেকে শিখেছো? সে বললো, আমি 'আতা' ইবন আবী রাবাহকে এমন করতে দেখেছি।
'আতা'র মধ্যে 'ইলমের সাথে সাথে 'আমলও ছিল। যুহদ ও তাকওয়ার দিক দিয়ে তাবি'ঈনের মধ্যে তিনি বিশেষ স্থানের অধিকারী ছিলেন। ইবন হাজার লিখেছেন যে, 'ইলম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন তাবি'ঈদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন, জ্ঞান, পার্থিব সুখ-ঐশ্বর্যের প্রতি বৈরাগ্য ও আল্লাহর 'ইবাদাত-বন্দেগীর ক্ষেত্রে 'আতা'র গুণ-বৈশিষ্ট্য অনেক।
'আতা'র ঈমান ছিল অতি উঁচু স্তরের। এ সম্পর্কে 'আবদুর রহমান বলেন, গোটা মক্কাবাসীর ঈমান সম্মিলিতভাবে 'আতা'র ঈমানের সমান ছিল না।
তাঁর 'ইবাদাত-বন্দেগীর অবস্থা ইবন জুরায়জের একটি মন্তব্য দ্বারা অনুমান করা যায়। তিনি বলেন, বিশ বছর মসজিদ ছিল 'আতা'র বিছানা।
প্রতি রাতে তাহাজ্জুদে দুইশ' অথবা তার চেয়ে বেশী আয়াত তিলাওয়াত করতেন। বেশী 'ইবাদাতের কারণে কপালে সিজদার দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কোন একটি মুহূর্ত তাঁর আল্লাহর স্মরণ ছাড়া কাটতো না। 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন 'উছমান বর্ণনা করেছেন, আমি 'আতা'র চেয়ে ভালো কোন মুফতী দেখিনি। তাঁর মজলিসে সব সময় আল্লাহর স্মরণ চলতে থাকতো এবং লোকেরা জ্ঞানের আলোচনা ও তর্ক-বাহাহ করতো। 'আতা' যখন কিছু বলতেন অথবা কোন প্রশ্ন করা হতো, খুব সুন্দরভাবে জবাব দিতেন।
তিনি মক্কায় অবস্থান করতেন। এ কারণে কোন বছরই তাঁর হজ্জ বাদ পড়তো না। তিনি সত্তর বার হজ্জ আদায় করেছেন বলে জানা যায়। হাদীছ অনুসরণের ব্যাপারে অত্যধিক যত্নবান ছিলেন। ইমাম শাফি'ঈ বলেন, তাবি'ঈদের মধ্যে 'আতা'র চেয়ে বেশি হাদীছের অনুসারী কেউ ছিলেন না।
নির্জনবাসের প্রতি তাঁর স্বভাবগত ঝোঁক ছিল। মানুষের সাথে বেশী মেলামেশা পছন্দ করতেন না। দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতেন। যখন কেউ ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইতো, জিজ্ঞেস করতেন সে কি উদ্দেশ্যে এসেছে। আগন্তুক যদি বলতো, আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছি। জবাবে তিনি বলতেন, আমার মত মানুষের সাথে সাক্ষাৎ কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তারপর বলতেন, এ যুগটা কেমন নোংরা হয়ে গেছে যে, আমার মত মানুষের সাথে সাক্ষাতের জন্য আসা হয়। কিন্তু আল্লাহর যিক্র হয় এমন ভালো মজলিস তাঁর প্রিয় ছিল। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি এমন কোন মজলিসে বসে যেখানে আল্লাহর যিক্র হয়, আল্লাহ এই মজলিসকে তাঁর দশটি বাতিল মজলিসের কাফ্ফারা বানিয়ে দেন। যখন কোন মজলিসে বসতেন তখন বেশীরভাগ সময় চুপচাপ থাকতেন। ইসমা'ঈল ইবন উমাইয়্যা বলেন, 'আতা' সাধারণতঃ চুপচাপ থাকতেন। যখন কোন কিছু বলতেন তখন আমাদের মনে হতো তাঁর উপর কোন ইলহাম হচ্ছে।
হযরত 'আতা' (রহ) বলতেন: তোমাদের পূর্ববর্তীরা অহেতুক কথা পছন্দ করতেন না। আল্লাহর কিতাব থেকে যা কিছু পাঠ করা হয়, আমর বিল মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার এবং জীবন জীবিকার প্রয়োজনে যেসব কথা বলা হয়, তা ছাড়া আর সবই তাঁরা অহেতুক কথা বলে মনে করেছেন। তোমাদের ডান ও বাম পাশে যে দুইজন কাতিব ফিরিশতা তোমাদের মুখ থেকে বের হওয়া সব কথা লিখে রাখছেন তা কি তোমরা অস্বীকার কর? তোমাদের কি শরম হয় না, তাতে এমন সব কথা লেখা থাকবে যা তোমাদের দীন ও দুনিয়ার সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত নয়, আর সেই দফতর তোমাদের সামনে মেলে ধরা হবে?
'উছমান ইবন 'আতা আল-খুরাসানী বর্ণনা করেছেন। একবার আমি আমার পিতার সাথে খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হলাম। আমরা যখন দিমাক্কের কাছাকাছি তখন একটি কালো গাধার উপর আরোহী এক বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। তাঁর গায়ে মোটা কাপড়ের জীর্ণশীর্ণ একটি জোব্বা, মাথার সাথে লেপ্টে থাকা একটি টুপি মাথায় এবং তার জিনের পা দানি দু'টি কাঠের। তাঁর এমন বিচিত্র অবস্থা দেখে আমার হাসি পেল। আমি পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম: এই বৃদ্ধ কে? তিনি ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে বললেন: চুপ কর। ইনি হিজাযের ফকীহদের নেতা 'আতা' ইবন আবী রাবাহ। তিনি যখন আমাদের কাছাকাছি এলেন তখন আমার পিতা তাঁর খচ্চরের পিঠ থেকে এবং তিনি তাঁর গাধার পিঠ থেকে নামলেন। তারপর উভয়ে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করলেন। তারপর দু'জন নিজ নিজ বাহনের পিঠে উঠলেন এবং দিমাকে হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকের প্রাসাদের দরজায় উপস্থিত হলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁরা ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পেলেন। তাঁরা বের হয়ে আসার পর আমি আমার পিতার নিকট ভিতরের ঘটনাবলী জানতে চাইলাম। তিনি বললেন: হিশাম যখন জানতে পেলেন, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ দরজায় অপেক্ষা করছেন তখন খুব তাড়াতাড়ি তাঁকে ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিলেন। আল্লাহর কসম! আমি তাঁরই কল্যাণে ভিতরে ঢোকার সুযোগ লাভ করেছি। হিশাম 'আতা'কে দেখেই বলতে লাগলেন:
মারহাবান, মারহাবান- এখানে, এখানে আসুন! এখানে, এখানে বসুন। তারপর তাঁকে ধরে নিজের আসনে এমনভাবে বসালেন যে, হিশাম ও 'আতা'র হাঁটু দু'টি একটি অপরটিকে স্পর্শ করছিল। সেই মজলিসে তখন খিলাফতের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ কোন বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। তাঁরা সবাই 'আতা'র উপস্থিতিতে চুপ হয়ে গেলেন।
একটু স্থির হয়ে বসার পর হিশাম 'আতা'কে লক্ষ্য করে বললেন: আবূ মুহাম্মাদ! আপনার প্রয়োজনের কথা একটু বলুন!
'আতা': হে আমীরুল মু'মিনীন! হারামায়নের (মক্কা-মদীনা) আধাবাসীরা হলো আল্লাহর আহল ও তাঁর রাসূলের প্রতিবেশী। তাঁদের বেতন-ভাতা আপনি বণ্টন করুন! হিশাম বললেন: হাঁ। তারপর তিনি তাঁর সেক্রেটারীকে মক্কা-মদীনার অধিবাসীদের ভাতা বণ্টনের বিষয়টি নোট করে নিতে আদেশ করেন। তারপর তিনি 'আতা'কে লক্ষ্য করে আবার বলেন : আবূ মুহাম্মাদ! আর কোন প্রয়োজন আছে কি?
'আতা': আমীরুল মু'মিনীন! হিজায ও নাজদের অধিবাসীরা হলো আরবের মূল, ইসলামের নেতা ও পরিচালক। বায়তুল মালে জমা হওয়া তাদের উদ্বৃত্ত সম্পদ তাদের মধ্যে বণ্টন করা হোক। হিশাম এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে তাঁর সেক্রেটারীকে নোট করে নিতে বললেন। তারপর আবার বললেন: আবূ মুহাম্মাদ। আপনার আর কোন কথা আছে কি?
'আতা': হাঁ, আছে! আমাদের সীমান্ত রক্ষীরা শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। তারা সেখান থেকে সরে এলে অথবা ধ্বংস হলে শত্রুরা মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করবে। সুতরাং আপনি তাদের বেতন-ভাতা তাদের নিকট পৌঁছে দিবেন।
খলীফা তাঁর প্রস্তাব মেনে নিয়ে সেক্রেটারীকে বিষয়টি লিখে রাখার নির্দেশ দেন। তারপর খলীফা আবার জানতে চান: আবূ মুহাম্মাদ! আর কোন প্রয়োজনীয় কথা আছে কি?
'আতা': হাঁ, আছে। হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার খিলাফতের যিম্মীদের উপর তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবেন না। তাদের নিকট থেকে যে জিযিয়া আদায় করা হয়, তাই হচ্ছে আপনাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা। খলীফা তাঁর সেক্রেটারীকে বললেন: লিখ, যিম্মীদের উপর তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপানো যাবে না।
খলীফা আবার জিজ্ঞেস করলেন: আবু মুহাম্মাদ! আপনার আর কোন কথা আছে কি?
বললেন: হাঁ, আছে। হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনার নিজের ব্যাপারে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। জেনে রাখুন, আপনাকে একাকী সৃষ্টি করা হয়েছে। আপনি একাকী মৃত্যুবরণ করবেন। আপনাকে একাকী উঠানো হবে এবং এককভাবে আপনার হিসাব নেওয়া হবে। আল্লাহর কসম! আপনার প্রিয়জনদের কেউ আপনার সাথে থাকবে না। একথা শোনার পর হিশাম ডুকরে কেঁদে উঠে মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যান।
'আতা' আল-খুরাসানী বলেন: হিশামকে সেই অবস্থায় রেখে 'আতা ইবন আবী রাবাহ উঠে পড়েন এবং আমিও তাঁর সাথে উঠি। যখন আমরা সদর দরজার কাছাকাছি ঠিক সেই সময় একটি লোক একটি থলে হাতে করে পিছন দিক থেকে আমাদের কাছে ছুটে আসে। আমি জানিনে তার মধ্যে কি আছে। লোকটি 'আতা' ইবন আবী রাবাহকে বলে: আমীরুল মু'মিনীন এই থলেটি আপনার নিকট পাঠিয়েছেন।
তিনি বলেন: অসম্ভব। তারপর এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন: وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرِ إِنَّ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ
- আমি তোমাদের কাছে এর কোন প্রতিদান চাইনা। আমার প্রতিদান দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের।
আল্লাহর কসম। তিনি খলীফার নিকট প্রবেশ করে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে কোন কিছু পানাহার তো দূরের কথা এক ফোঁটা পানিও পান করেননি। একদিন আল-হাসান আল-বসরী (রহ) তাঁর এক মজলিসে বললেন: মুনাফিকের ব্যাপারে তিনটি জিনিস জেনে নাও। ১. যদি কথা বলে, মিথ্যা বলে। ২. তাঁর নিকট কোন কিছু গচ্ছিত রাখলে আস্থা ভঙ্গ করে। ৩. অঙ্গীকার করলে পালন করে না। একথা হযরত 'আতা'র (রহ) কানে গেলে বললেন: য়া'কূবের (আ) ছেলেদের মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য ছিল। তারা তাঁকে মিথ্যা বলেছে, আমানাতে খিয়ানাত করেছে এবং তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে নুবুওয়াত দিয়েছেন। হযরত আল-হাসান একথা শুনে উচ্চারণ করেন:
فَوْقَ كُلِّ ذِي عِلْمٍ عَلِيمٌ . প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির উপর রয়েছে এক জ্ঞানীজন।
ইমাম আল-আসমা'ঈ বলেন: 'আতা' (রহ) তাঁর দু'আর মধ্যে বলতেন: হে আল্লাহ দুনিয়াতে আমার অজানা অচেনা স্থানে মরণকালে আমার কষ্টের সময় এবং কবরে আমার একাকীত্বের সময় আমার প্রতি দয়া ও করুণা করুন।
হযরত 'আতা' (রহ) ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, এক চক্ষুহীন, শ্বাসকষ্টের রোগী, পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক ল্যাংড়া মানুষ। পরবর্তীকালে তিনি একেবারেই অন্ধ হয়ে যান। সুলায়মান ইবন রাফী' বলেন : আমি একবার মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম মানুষ এক ব্যক্তিকে ঘিরে জড়ো হয়ে আছে। পরে দেখতে পেলাম 'আতা' ইবন আবী রাবাহ বসে আছেন। একটি কালো কাকের মত তাঁকে দেখাচ্ছে। তাঁর মা বারাকাও ছিলেন একজন কৃষ্ণাঙ্গী।
ইমাম আয-যাহাবী বলেছেন, সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী ১১৪ সনের রমাদান মাসে তিনি মক্কায় ইস্তিকাল করেন। অনেকে হিজরী ১১৫ সনের কথাও বলেছেন। তিনি একশো বছর জীবন লাভ করেন- একথা ইবন আবী লায়লা বলেছেন। তবে ৮৮ বছরের কথাও বলা হয়েছে।
টিকাঃ
১. তাবাকাত-৫/৪৬৭
২. ইবন খাল্লিকান: ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬১; সিফাতুস সাফওয়া-২/১১৯
৩. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
৫. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিঈন-১৩
৬. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২০৩
৭. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩
৮. সিফাতুস সাফওয়া-২/১১৯
৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
১০. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/৪১৬
১১. প্রাগুক্ত-২/২৩১, ৩/১৬৯
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮; তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩
১৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৫১, টীকা-২,
১৪. আল-ইকদ আল-ফারীদ-২/২৩১
১৫. তাবাকাত-৫/৪৬৭
১৬. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩
১৭. তাবাকাত-৫.৪৫৭, তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
১৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬১; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯৮, তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩
১৯. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬১; তাহযীবুত তাহযীব-৪/১৯৯; সিফাতুস সাফওয়া-২/১২১; তাহযীবুল আসমা'
২০. তাবাকাত-৫/৪৬৯; সিফাতুস সাফওয়া-২/১২১
২১. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩
২২. প্রাগুক্ত-১/৩৩৪
২৩. তাহযীবুত তাহযীব-৪/২০৩
২৪. প্রাগুক্ত-৭/২০১
২৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
২৯. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬১
৩০. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৪
৩১. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২০৩
৩২. তাবাকাত-৫/৩২৫
৩৩. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
৩৪. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৪
৩৫. তাবাকাত-৫/৪৬৭
৩৬. সিফাতুস সাফওয়া-২/১১৯
৩৭. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিঈন-১১-১২
৩৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬১-২৬২
৩৯. তাহযীবুত তাহযীব-৭/২০৩
৪০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১৯৮
৪১. তাবাকাত-৫/৩৪৬
৪২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১৯৮; তাহযীবুত তাহযীব-৭/২০২
৪৩. তাবাকাত-৫/৩৪৬
৪৪. প্রাগুক্ত-৫/৩৪৫
৪৫. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/৩৩৩; ওয়াফাযাতুল আ'রান-৩/২৬৩
৪৬. মুখতাসার সিফাতুস সাফওয়া-১৮৫
৪৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮; তাহযীবুল আসমা'-১/৩৩৪
৪৮. সিফাতুস সাফওয়া-২/১২০
৪৯. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবিঈন-১৮-২১; আল-'ইকদ আছ-ছামীন ফী তারীখ আল- বালাদ আল-আমীন-৬/৮৯-৯০
৫০. সূরা ইউসুফ-৭৬
৫১. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬২
৫২. আল-ইকদ আল-ফারীদ-৩/২২১
৫৩. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬২
৫৪. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২৩১; ৩/১৬৯
৫৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৯৮
৫৬. সিফাতুস সাফওয়া-২/১২১; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-৩/২৬২
📄 মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম ইবন শিহাব আয-যুহরী (রহ)
ইতিহাসে তিনি ইবন শিহাব আয-যুহরী বা ইমাম যুহরী নামে খ্যাত। তিনি হিজরী ৫০ সনে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিচয় এ রকম : আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন মুসলিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন শিহাব ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন হারিছ ইবন যুহরাহ্ ইবন কিলাব ইবন মুরাহ্ আল-কুরাশী। তাঁর আসল নাম মুহাম্মাদ, ডাক নাম আবু বকর এবং পিতার নাম মুসলিম ছিল। তবে তিনি তাঁর পিতামহ ইবন শিহাব ও গোত্র বানু যুহরার প্রতি আরোপিত হয়ে ইবন শিহাব আয-যুহরী নামে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন। পিতামহ 'আবদুল্লাহ ইবন শিহাব ইসলামের সূচনা পর্বে অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবৃন্দের মত হযরত রাসূলে কারীমের কট্টর দুশমন ছিলেন। ঐতিহাসিক বদর ও উহুদ যুদ্ধে মক্কার পৌত্তলিক বাহিনীর সাথে তিনিও ইসলামকে সমূলে উৎপাটনের উদ্দেশ্যে যোগদান করেছিলেন। উহুদ যুদ্ধের সেই সব অত্যুৎসাহী পৌত্তলিক সৈনিকদের একজন ছিলেন যারা রাসূলুল্লাহকে (সা) হত্যা করার অথবা নিজেরা যুদ্ধ করে নিহত হওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তৃতীয় খলীফা হযরত 'উছমানের (রা) খিলাফতকালে মক্কায় ইনতিকাল করেন। যুহরীর পিতা মুসলিম ছিলেন একজন সংগ্রামী মুসলমান। তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) বায়'আত করেন এবং বানু উমাইয়্যাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হন।
ইসলামের এমন কট্টর দুশমনের বংশে মুহাম্মাদ ইবন মুসলিমের জন্ম হয়। ইসলামের জন্য তাঁর যে অবদান ইতিহাস তা কোনদিন ভুলতে পারবে না। তিনি ছিলেন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রথম পর্বের গুটি কয়েক মনীষীর একজন যাঁরা ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার সূচনা করেন। আর যার আলোতে পরবর্তীকালে গোটা মুসলিম জাহান আলোকিত হয়ে ওঠে।
জ্ঞানগত উৎকর্ষের দিক দিয়ে ইবন শিহাবের সমকালীন অন্য কেউ তাঁর সমকক্ষ ছিল না। তাঁর মধ্যে জ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা ছিল স্বভাবগত। তাঁর মেধা, ধীশক্তি ও মুখস্থ শক্তি ছিল অতুলনীয়। এত প্রখর মেধাবী ছিলেন যে, কোন মাসআলা দু'বার বুঝার প্রয়োজন পড়তো না। আর মুখস্থ শক্তি এত প্রবল ছিল যে, একবার যে কথা শুনতেন তা অন্তরে খোদাই হয়ে যেত। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার কোন প্রয়োজন হতো না। তাঁর মুখস্থ শক্তির একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত হলো, মাত্র আশি দিনে পুরো কুরআন মুখস্থ করেন। সারা জীবনে মাত্র একবার একটি হাদীছের ব্যাপারে একটু সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কিন্তু জিজ্ঞেস করার পর বুঝলেন, যেভাবে সেটি তাঁর মুখস্থ ছিল, তা তেমনই। তিনি নিজেই বলতেন, আমি আমার অন্তর মাঝে কখনো কোন কিছু গচ্ছিত রাখলে তা আর কখনো ভুলিনি।
এমন অতুলনীয় মেধা ও মুখস্থ ক্ষমতার সাথে তাঁর আগ্রহ, সন্ধান ও জিজ্ঞাসার অবস্থা এমন ছিল যে, জ্ঞান ও শাস্ত্রের এমন কোন খামার ছিল না যার শস্য তিনি আহরণ করেননি। আট বছর যাবত মদীনার ইমাম সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের (রহ) সান্নিধ্যে ছিলেন। এ সময়ে মদীনার প্রতিটি অলি-গলি ছিল জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা ও শাস্ত্রের কেন্দ্র স্বরূপ। এখানকার প্রত্যেক নারী-পুরুষ ও শিশু-যুবক-বৃদ্ধ ছিল একেকটি স্বতন্ত্র শিক্ষা কেন্দ্র। ইবন শিহাব মদীনার প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে সবার কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন। আবুয যানাদ বর্ণনা করেছেন। আমরা যুন্ত্রীর সাথে 'আলিমদের বাড়ী বাড়ী চক্কর মারতাম। যুন্ত্রীর সাথে থাকতো লেখার উপকরণ। তিনি যা কিছু শুনতেন সাথে সাথে লিখে ফেলতেন। তাঁর এমন কর্মকাণ্ডে তাঁর সঙ্গী-সাথীরা তাঁকে নিয়ে হাসা-হাসি ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতো। তিনি তা মোটেই আমলে আনতেন না। ফলে তিনি হিজরী প্রথম শতক শেষ হওয়ার আগেই পূর্বসূরীদের সুন্নাহ্র সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তাই বলা হয়েছে, তিনি না জন্মালে সুন্নাহ্ অনেক কিছুই হারিয়ে যেত। তিনি সাহল ইবন সা'দ (রা), আনাস ইবন মালিক (রা) ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) মুখ থেকে হাদীছ শুনেছেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) সূত্রে তিনটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। মক্কায় 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) যখন মারা যান তখন ইবন শিহাবের বয়স মাত্র সতেরো বছর। জ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসার কারণে তিনি তাঁর উস্তাদ ও শায়খদেরকে সীমাহীন ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতেন। মদীনার সাত ফকীহ্র অন্যতম 'উরওয়া ইবন যুবায়র ছিলেন তাঁর একজন শিক্ষক। তাঁর সম্পর্কে তিনি নিজে বলেছেন: 'আমি 'উরওয়ার বাড়ীর দরজায় এসে বসে থাকতাম। অপেক্ষা করে আবার ফিরে যেতাম। বাড়ীর ভিতরে ঢুকতাম না। আমি ইচ্ছা করলে ঢুকতে পারতাম। তাঁর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে ঢুকিনি। তাঁর আরেকজন শিক্ষক 'উবাইদুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ- যিনি মদীনার সাত ফকীর অন্যতম, তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য তাঁর খাদিম হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলতেন: আমি 'উবাইদুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহর সেবা করেছি। আমি তাঁর জন্য মিষ্টি পানি আনতাম। আমি তাঁর দরজায় এসে সংকেত দিলে তিনি দাসীকে জিজ্ঞেস করতেন দেখ তো দরজায় কে? সে তাঁকে বলতো আপনার দাস আল- আ'মাশ। দাসী আমাকে তাঁর একজন দাস মনে করতো।
জ্ঞান চর্চার মজলিসসমূহে তিনি সবার আগে যেতেন। কোন বাছ-বিচার না করে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার নিকট থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন। মসজিদের নির্ধারিত মজলিস থেকে বের হওয়ার পর মদীনার অলি-গলিতে ঘুরে ঘুরে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবার কাছে যা কিছু শুনতেন, লিখে নিতেন। সা'দ ইবন ইবরাহীম বর্ণনা করেছেন, আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, যুহরী বিদ্যায় আপনাদের সবাইকে ডিঙ্গিয়ে গেলেন কিভাবে? জবাবে তিনি বললেন, জ্ঞান চর্চার মজলিসসমূহে তিনি সবার আগে আসতেন। তারপর সেখান থেকে উঠে আনসারদের বাড়ী বাড়ী যেতেন। শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ-নারী ও পুরুষ এমন কেউ বাকী থাকতো না যাদের কাছে থেকে কিছু না কিছু তিনি অর্জন করতেন না। এমনকি পর্দানশীন মহিলাদের নিকটও যেতেন।
কখনো কোন বিদুষী মহিলার সন্ধান পেলে মোটেই দেরী না করে তাঁর কাছে পৌছে যেতেন। তিনি নিজেই একটি ঘটনার কথা বর্ণনা করেছেন। একবার কাসিম ইবন মুহাম্মাদ আমাকে বললেন, তোমার তো জ্ঞানের প্রতি ভীষণ লোভ আছে। তাই আমি তোমাকে জ্ঞানের একটি ভাণ্ডারের ঠিকানা বলে দিচ্ছি। আমি বললাম, অবশ্যই বলুন। কাসিম বললেন, 'আবদুর রহমানের মেয়ের কাছে যাও। তিনি উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হয়েছেন। অতঃপর আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং সত্যিই তাঁকে জ্ঞানের সাগর দেখতে পেলাম।
তাঁর জ্ঞানের আগ্রহ ও রুচি ছিল ব্যাপক। বিশেষ কোন জ্ঞান ও শাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তিনি সব ধরনের জ্ঞান সমান আগ্রহ নিয়ে অর্জন করতেন। আর যা কিছু শুনতেন, লিখে রাখতেন। আবুয যানাদ বলেছেন, আমরা শুধু হারাম-হালালের মাসআলাসমূহ লিখতাম, আর তিনি যা কিছু শুনতেন, লিখে নিতেন। পরবর্তী জীবনে যখন প্রয়োজন অনুভব করেছি তখন বুঝেছি, তিনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় 'আলিম।
জ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও রুচির এমন ব্যাপকতার কারণে তিনি সকল প্রকার জ্ঞানে সমান পারদর্শিতা অর্জন করেন। যে শাস্ত্রের উপর তিনি আলোচনা করতেন, মনে হতো এটাই তার বিশেষ শাস্ত্র। লায়ছ বর্ণনা করেছেন। আমি যুহরীর চেয়ে বেশী ও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিত্বকে দেখিনি। যখন তিনি 'তারগীব' তথা উৎসাহ- উদ্দীপনা বিষয়ের আলোচনা করতেন তখন মনে হতো তিনি এই বিষয়ের বড় 'আলিম। যখন আরব জাতি ও আরবদের বংশ বিদ্যা বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিতেন তখন মনে হতো এটাই তাঁর বিশেষ বিষয়। আর যখন কুরআন ও সুন্নাতের উপর আলোচনা করতেন তখন মনে হতো এটাই তাঁর বিশেষ শাস্ত্র। মা'মার বলেছেন, যে যে শাস্ত্র তিনি পড়াশুনা করেছেন তাতে অন্য কাউকে তাঁর সমকক্ষ হওয়ার সুযোগ রাখেননি।
তিনি কুরআনের একজন বড় হাফেজ ছিলেন এবং এই কুরআন হিফজ সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও জানার পরিধি এত বিস্তৃত ছিল যে, মনে হতো 'কালামুল্লাহ' বা আল্লাহর কালাম যেন তাঁর বিশেষভাবে অধীত বিষয়। নাফি'- যিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট প্রশিক্ষণ লাভ করেছিলেন, তিনিও যুহরীকে কুরআন শুনিয়েছিলেন।
সকল বিষয় ও শাস্ত্রে যদিও তাঁর সমান পারদর্শিতা ছিল, তবে তাঁর বিশেষ অধীত বিষয় ছিল হাদীছ ও সুন্নাহ্। এ ক্ষেত্রে তাঁর যে প্রবল আগ্রহ ও বিশেষ রুচি ছিল এবং যে পরিমাণ চেষ্টা ও সাধনা তিনি করেছেন তার কিছু বর্ণনা পূর্বে এসে গেছে। তিনি তাঁর যুগের সকল ইমাম ও বড় 'আলিমের সব জ্ঞান আত্মস্থ করে ফেলেন। ইবন মাদীনী বলেছেন, হিজাযে সকল বিশ্বস্ত ব্যক্তির সব জ্ঞান যুহরী ও 'আমর ইবন দীনারে মধ্যে বিভক্ত ছিল। তাঁর বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা দু'হাজার দু' শো পর্যন্ত পৌঁছেছে। আবু দাউদ বলেছেন, তাঁর হাদীছের সংখ্যা দু'হাজার দু' শো পঞ্চাশ।
সুনানে রাসূল ও সুনানে সাহাবার প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ ছিল। মদীনার সকল সুনান তিনি লিখে ফেলেন। সালিহ ইবন কায়সান বলেন, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি যুহরীর সঙ্গে ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমাদের সকল সুনান লিখে নেওয়া উচিত। অতএব, আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সকল সুনান লিখে ফেললাম। 'সুনানে রাসূল' লেখার পর তিনি বললেন, এবার সাহাবীদের 'সুনান' লেখা উচিত। কিন্তু সাহাবীদের 'সুনান' আমরা লিখলাম না, আর তিনি লিখে ফেললেন। ফলে তিনি সফলকাম হলেন, আর আমরা সুযোগ নষ্ট করলাম। উল্লেখ্য যে, 'সুনান' অর্থ প্রথা-পদ্ধতি, রীতি-নীতি, পথ-পন্থা ইত্যাদি।
মদীনার সুনানে রাসূল ও সুনানে সাহাবা ইমাম যুহরীর কল্যাণেই সংরক্ষিত হয়েছে। ইমাম শাফি'ঈ (রহ) বলতেন, যদি যুহরী না থাকতেন তাহলে মদীনার যাবতীয় সুনান হারিয়ে যেত। তিনি তাঁর যুগে সুনানের সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন- এ ব্যাপারে সবাই একমত। হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয বলতেন, এখন ইবন শিহাবের চেয়ে বেশী অতীতের 'সুন্নাহ্' জানা ব্যক্তি দ্বিতীয় কেউ নেই।
তিনি এমন মেধা লাভ করেছিলেন যে, যা কিছু অর্জন করেছিলেন সবই সংরক্ষিত ছিল। তিনি নিজে বলতেন, আমি আমার সিনায় যে জ্ঞানই আমানত রেখেছি সেটা ভোলেনি। আর স্মৃতি শক্তির এমন অবস্থা ছিল যে, একবারেই শত শত হাদীছ শুনাতেন। তারপর যদি পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন পড়তো, একটি হরফেরও পরিবর্তন-পরিবর্ধন হতো না।
একবার খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক তাঁর কোন এক ছেলের দ্বারা যুহরীর নিকট থেকে হাদীছ লিখে নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। যুহরী রাজী হন এবং তাঁর ছেলেকে চার শো হাদীছ লিখিয়ে দেন। এক মাস পরে হিশাম পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে বললেন, আমার সেই সংগ্রহের কপিটি হারিয়ে গেছে। তিনি আবার লিখিয়ে দেন। পরে দু'টি কপি মিলিয়ে দেখা হয় এবং তাতে একটি হরফেরও গরমিল ছিল না। ঐ হাদীছ ও সুনান ছাড়াও যা কিছু তাঁর সিনায় রক্ষিত থেকে যায় তার সংখ্যাও দু' হাজারের উপরে ছিল। মোটকথা, হাদীছে তাঁর স্থান ছিল অতি উচ্চে। ইমাম নাওবী লিখেছেন, তাঁর কৃতিত্ব, গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর স্মৃতিশক্তির উৎকর্ষতা এত যে তা গণনার বাইরে।
তিনি খুব বেশী পরিমাণে হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ, সংরক্ষণ ও বর্ণনা করেছেন, এটাই সবটুকু নয়; বরং সে সব হাদীছের ধরন, অবস্থা ও গ্রহণের মাপকাঠি ইত্যাদি দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশী উৎকর্ষমণ্ডিত ছিল। যুহরীর বর্ণনার স্থান ও মর্যাদা সে যুগের বহু রাবীর কথায় অনুমান করা যায়। 'আমর ইবন দীনার, যিনি নিজেই একজন বড় মুহাদ্দিছ ছিলেন, বলতেন, আমি যুহরীর চেয়ে ভালো কোন মুহাদ্দিছ দেখিনি। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল এবং ইসহাক ইবন রাহবীয়ার এ রকম মত ছিল যে, যে হাদীছগুলো তিনি সালিম- 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার- রাসূলুল্লাহ (সা)- এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন, সেগুলো সর্বাধিক বিশুদ্ধ হাদীছ।
ইমাম যুহরী যেহেতু ব্যাপকভাবে হাদীছ শুনেছেন এবং সংগ্রহ করেছেন, এজন্য তাঁর শায়খ বা শিক্ষকমণ্ডলীর গণ্ডি অত্যন্ত প্রশস্ত। তাঁদের মধ্যে বহু বিদুষী মহিলাও ছিলেন। তাঁর সময়ের সাহাবীগণ এবং বড় তাবি'ঈদের এমন কেউ ছিলেন না যাঁদের নিকট থেকে তিনি জ্ঞান আহরণ করেননি। সাহাবীদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন জা'ফার (রা), রাবী'আ ইবন 'আব্বাদ (রা), মাসউদ ইবন মাখরামা (রা), আনাস ইবন মালিক (রা), সাহল ইবন সা'দ (রা), সায়িব ইবন ইয়াযীদ (রা), শাবীব (রা), আবু জামীলা 'আবদুর রহমান ইবন আযহার (রা), মাহমুদ ইবন রাবী' (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন ছা'লাবা (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমির ইবন রাবী'আ (রা), আবু উমামা (রা), সা'দ ইবন সাহল (রা), আবুত তুফায়লরা প্রমুখ এবং উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব, মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফকীহ্ ও আরো অনেকে। যাঁদের তালিকা অনেক দীর্ঘ।
যুহ্রীর ব্যক্তিসত্তাটি ছিল জ্ঞান পিপাসুদের কেন্দ্র স্বরূপ। তাঁর হালকায়ে দারসে শত মানুষের ভীড় জমতো। এ কারণে তাঁর ছাত্রসংখ্যা হিসাবের ঊর্ধ্বে। হাদীছের কয়েকজন বিখ্যাত ছাত্র হলেন: 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয, 'আমর ইবন দীনার, সালিহ ইবন কায়সান, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী, আইউর সুখতিয়ানী, 'আবদুল্লাহ ইবন মুসলিম যুহরী, ইমাম আওযা'ঈ, ইবন জুরায়জ, মুহাম্মাদ ইবন 'আলী ইবন হুসায়ন, মুহাম্মাদ ইবন মুনকাদির, মানসূর ইবন মু'তামির, মূসা ইবন 'উকবা, হিশাম ইবন 'উরওয়া, ইমাম মালিক, মু'আম্মার আয-যুবায়দী, ইবন আবী যী'ব, লায়ছ, ইসহাক ইবন ইয়াহইয়া কালবী, বাকর ইবন ওয়ায়িল ও আরো অনেকে।
ফিকাহ্ বিষয়েও তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহ্র সকল জ্ঞান তাঁর সিনায় সংরক্ষিত ছিল। এই সাত ফকীহ্ হলেন সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, 'উরওয়া ইবন যুবায়র, আবূ বকর ইবন 'আবদির রহমান ইবন আল-হারিছ, 'উবায়দুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ, খারিজা ইবন যায়িদ ইবন ছাবিত, সুলায়মান ইবন ইয়াসার ও আল- কাসিম ইবন মুহাম্মাদ। তাছাড়া এ সময়ের সকল ফকীহ্র সকল জ্ঞানের উত্তরাধিকারীও ছিলেন। জা'ফার ইবন রাবী'আ বর্ণনা করেছেন। আমি 'আররাক ইবন মালিককে জিজ্ঞেস করলাম, মদীনায় সবচেয়ে বড় ফকীহ্ কে? তিনি বললেন: সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব, 'উরওয়া ও 'আবদুল্লাহ ইবন 'আবদিল্লাহ। এ নামগুলো উচ্চারণ করার পর বললেন: আমার মতে যুহরী তাঁদের সবার চেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন। একথা এজন্য বলছি যে, তিনি তাঁদের সবার জ্ঞান নিজের জ্ঞানের সাথে যোগ করেছিলেন।
যুরী ফিকাহ্ বিষয়ে জ্ঞান লাভের ব্যাপারে বলেছেন, 'ছোট বেলায় আমি এমনভাবে বেড়ে উঠি যে, আমার কোন অর্থ-সম্পদ ছিল না এবং আমি কোন দিওয়ানেও ছিলাম না। আমি আমার গোত্রের বংশবিদ্যা শিখতাম 'আবদুল্লাহ ইবন ছা'লাবা ইবন সু'আয়র- এর নিকট। তিনি ছিলেন এ বিষয়ের বড় 'আলিম ও আমার গোত্রের ভাগিনা। একদিন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে তালাক সম্পর্কিত একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করে। তিনি অজ্ঞতা প্রকাশ করে তাঁকে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের নিকট যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করেন। আমি মনে মনে বললাম, আমি এই বৃদ্ধের সাথে আর থাকবো না যে কিনা বলে- রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর মাথা 'মাসেহ' করেছেন, অথচ সেটা কি তা তিনি জানেন না? অতঃপর আমি প্রশ্নকারীর সাথে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিবের নিকট গেলাম। ইবন ছা'লাবাকে ছেড়ে দিলাম। তারপর আমি বসেছি 'উরওয়া ইবন আয-যুবায়র, 'উবায়দুল্লাহ ও আবূ বকর আবদুর রহমান প্রমুখের নিকট। তার পরেই না আমি ফকীহ্ হয়েছি।
ইসলামী ফিকাহ্ শাস্ত্রের ইতিহাস অত্যন্ত গর্বের সাথে যুহরীর নামটি স্মরণ করে। হিজরী দ্বিতীয় শতকের অনেক প্রতিভাবান ফকীহ্র জন্ম হয় তাঁরই হাতে। যাঁরা জ্ঞানের প্রসার ঘটান, ইফতার মসনদে আসীন হন এবং অনেক ফিকাহ্ বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেন। তাঁর এসব ছাত্র যাঁরা মুসলিম উম্মাহ্র ফকীহ্ হিসেবে পরবর্তীকালে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খ্যাতিমান হলেন: মালিক ইবন আনাস, আন- নু'মান ইবন ছাবিত, 'আবদুর রহমান ইবন 'আমর আল-আওযা'ঈ, আল-লাইছ ইবন সা'দ, 'আবদুল মালিক ইবন জুরায়জ ও সুফইয়ান ইবন 'উয়ায়না।
ফিকাহ্ বিষয়ে তাঁর এই সীমাহীন যোগ্যতার কারণে তিনি মদীনার ইফতার মসনদেও সমাসীন হন। তাঁর ফাতওয়ার সংখ্যা এত বেশী ছিল যে, মুহাম্মাদ ইবন নূহ তা ফিক্হী তারতীব অনুসারে বিশাল তিন খণ্ডে সাজান。
আর মাগাযী শাস্ত্রের তো তিনি ইমাম ছিলেন। তাঁর পূর্বে আর কেউ মাগাযীর প্রতি তেমন বিশেষ গুরুত্ব দেননি। ইসলামের ইতিহাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি মাগাযীর উপর স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেন। ইমাম সুহায়লীর বর্ণনা অনুযায়ী এটা ছিল এই শাস্ত্রের উপর লেখা প্রথম গ্রন্থ। তাঁর দ্বারাই মাগাযী ও সীরাতের প্রতি মানুষের একটা বিশেষ আগ্রহ ও রুচির সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে ইয়া'কূব ইবন ইবরাহীম, মুহাম্মাদ ইবন সালিহ, 'আবদুর রহমান ইবন 'আবদিল 'আযীয, মূসা ইবন 'উকবা এবং মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক এই শাস্ত্রকে পূর্ণতায় পৌঁছে দিয়েছেন। বিশেষ করে শেষের দু'জন এ শাস্ত্রে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে অমর হয়ে আছেন।
সে যুগের সকল জ্ঞানী, গুণী ও বিজ্ঞজনদের নিকট ইবন শিহাব যুহরীর একটা স্বীকৃতি, সম্মান ও মর্যাদা ছিল। আইউব সিখতিয়ানী বলতেন, আমি যুহরীর চেয়ে বড় 'আলিম দেখিনি। একজন প্রশ্ন করলো, হাসান বসরীকেও না? তিনি সেই একই কথা আবার বললেন: আমি যুহ্রীর চেয়ে বড় কাউকে পাইনি। জ্ঞান অর্জনের জন্য মাকহুল গোটা মুসলিম জাহান চষে বেড়িয়েছিলেন এবং ইসলামী খিলাফতের প্রতিটি অঞ্চলের শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের সান্নিধ্যে গিয়েছিলেন। তাঁকে একবার একজন প্রশ্ন করলো আপনি সবচেয়ে বড় কোন 'আলিমের সান্নিধ্য পেয়েছেন? তিনি জবাব দিলেন ইবন শিহাব যুহরী। ইমাম মালিক বলতেন, পৃথিবীতে যুহীর কোন দৃষ্টান্ত ছিল না।
সা'দ ইবরাহীম তো এতখানি বাড়িয়ে বলতেন যে, আমার তো মনে হয় রাসূলুল্লাহর (সা) পরে যুত্রীর মত এত জ্ঞান আর কারো মধ্যে ছিল না। পরবর্তীকালে তিনি যখন মদীনায় আসতেন তখন তথাকার মুহাদ্দিছগণ হাদীছ বর্ণনা এবং মুফতীগণ ফাতওয়া দান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতেন। তাঁর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তাঁরা এ কাজ করতেন। তাঁদের অনেকে তাঁর মজলিসে গিয়ে বসতেন এবং তাঁর বয়ান শুনতেন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীন যুহরীকে যে দয়া ও মহানুভবতার সাথে জ্ঞান দান করেছিলেন, তিনিও তেমনি মহানুভবতার সাথে সেই জ্ঞান বন্টন এবং প্রচার-প্রসারে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তিনি বলতেন, জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে কেউ আমার মত এত কষ্ট স্বীকার করেনি, ঠিক তেমনি তার প্রচার-প্রসারেও। তাঁর শিষ্য-শাগরিদদের দীর্ঘ তালিকা দেখলে জ্ঞানের সেবায় তাঁর অবদান কিছুমাত্র অনুমান করা যায়।
তাঁর সারাটি জীবন জ্ঞানের সাগরে নিমজ্জিত ছিল। জ্ঞান আহরণ ও বিতরণ ছাড়া তাঁর আর কোন ধ্যান ও ধান্দা ছিল না। জ্ঞান চর্চায় গভীরভাবে নিমগ্ন থাকায় দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস, এমনকি স্ত্রী থেকেও উদাসীন হয়ে যেতেন। যখন ঘরে ফিরতেন তখনও পুস্তক ও কাগজ-পত্রের স্তূপে হারিয়ে যেতেন। একদিন তাঁর স্ত্রী তো বিরক্ত হয়ে বলেই ফেললেন: আল্লাহর কসম! এসব বই পুস্তক আমার জন্য তিন সতীনের চেয়েও বেশী পীড়াদায়ক।
'আবদুল মালিক, 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয সহ যে ছয়জন উমাইয়্যা খলীফার যুগ তিনি লাভ করেন তাঁদের সকলের সাথে গভীর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তাঁর জীবনের শুরু হয় খলীফা 'আবদুল মালিকের সময়। 'আবদুল মালিক প্রথম সাক্ষাতে যুহরীকে 'উরওয়া ইবন যুবায়রের সাহচর্য অবলম্বনের প্রতি ইঙ্গিত দেন। আর সেখান থেকে তিনি 'উরওয়ার মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেননি। 'আবদুল মালিক নিজেই একজন বড় জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। প্রকৃত জ্ঞানীর মর্যাদাও দিতেন। যদি খিলাফতের মসনদ তাঁর জীবন ধারাকে পাল্টে না দিত তাহলে তিনিও একজন অতি মর্যাদাবান 'আলিম তাবি'ঈ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করতেন। ইমাম শা'বী খলীফা 'আবদুল মালিকের জ্ঞান-গরিমার প্রতি এতখানি মুগ্ধ ছিলেন যে, তাঁকে বলতে শোনা যেত: আমি যত লোকের সংগে মিশেছি একমাত্র 'আবদুল মালিক ছাড়া সবার চেয়ে নিজেকে উত্তম পেয়েছি। 'আবদুল মালিকের উপস্থিতিতে যখনই আমি কোন হাদীছ বর্ণনা অথবা কবিতা আবৃত্তি করতাম, তিনি তাতে আরো কিছু যোগ করে দিতেন।
যুহরী সর্ব প্রথম ৮০ হিজরীতে তিরিশ বছর বয়সে দিমাশকে 'আবদুল মালিকের নিকট যান। 'আবদুল মালিক যুহরীর জ্ঞান-গরিমা দ্বারা দারুণভাবে মুগ্ধ হন। যুহরী ঋণগ্রস্ত ছিলেন। 'আবদুল মালিক তাঁর সকল ঋণ পরিশোধ করে দেন। এই ঋণ পরিশোধ ছাড়াও তাঁর প্রতি আরো বহু ভালো আচরণ করেন। যুহরীকে তিনি দিমাশকের কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। এই সম্পর্কের মাধ্যমে যুহরী দিমাশকে স্থায়ীভাবে থেকে যান এবং 'আবদুল মালিকের সাথেই থাকতেন। 'উমাইয়্যা খলীফাদের মধ্যে 'আবদুল মালিকের পরে 'উমার ইবন 'আবদুল 'আযীয আরেকজন জ্ঞানী ব্যক্তি এবং জ্ঞানীদের সত্যিকার মর্যাদা দানকারী। তিনি যুহরীকে খুবই সম্মান করতেন এবং যুহরীর বিশ্বাস ও মতের সাথে একমত ছিলেন। তিনি খিলাফতের প্রতিটি অঞ্চলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, সবাই যেন ইবন শিহাবের অনুসরণ করে। কারণ, অতীত সুন্নাহ্ তথা প্রাচীন রীতি- নীতি ও পন্থা-পদ্ধতি তাঁর চেয়ে বেশী জানা লোক আর কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়।
'আবদুল মালিকের মৃত্যুর পর যুহরী তাঁর ছেলে হিশামের সাথে থাকেন। পরে হিশামের ছেলের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। হিশামের উপরও তাঁর দারুণ প্রভাব ছিল। হিশাম তাঁকে খুব মানতেনও। তিনি যুহরীর হাজার হাজার দিরহাম ঋণ পরিশোধ করে দেন। হিশামের সাথে তাঁর অনেক দরবারি কথাবার্তা ও তাৎক্ষণিক উত্তর দানের অনেক চিত্তাকর্ষক ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে。
একদিন আবুয যানাদ ও যুহরী হিশামের দরবারে বসে আছেন। হিশাম যুহরীকে প্রশ্ন করলেন, মদীনাবাসীদের ভাতা কোন মাসে বণ্টন করা হতো? যুহরী জানেন না বলে অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। হিশাম এবার আবুয যানাদকে প্রশ্নটি করলেন। আবুয যানাদ বললেন : মুহাররাম মাসে। তাঁর এ জবাব শুনে হিশাম যুহরীকে লক্ষ্য করে বললেন: এই জ্ঞান আপনার আজ অর্জিত হলো। যুহরী তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, আমীরুল মু'মিনীনের মজলিস এমনই যে, তার থেকে জ্ঞান বৃদ্ধির সুযোগ লাভ করা যায়।
উদারতা ও মহানুভবতা যুত্রীর চরিত্রের এক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য ছিল। বিত্ত-বৈভবের কোন মূল্য তাঁর কাছে ছিল না। 'আমর ইবন দীনার বলেছেন, যুহরীর দৃষ্টিতে দিরহাম ও দীনার যতখানি গুরুত্বহীন ছিল ততখানি আর কারো দৃষ্টিতে ছিল না। তিনি দিরহাম-দীনারকে উটের লেদার চেয়ে বেশী কিছু মনে করতেন না। অর্থ-সম্পদের প্রতি তাঁর এমন মানসিকতার কারণে দু'হাতে তা বিলাতেন এবং বার বার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। খলীফা 'আবদুল মালিক ও খলীফা হিশাম বারবার তাঁর ঋণ পরিশোধ করেছেন। কিন্তু তাঁর মাত্রা ছাড়া দানশীলতা তাঁকে সব সময় ঋণগ্রস্ত করে রেখেছে। ওয়ালীদ ইবন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছেন, আমি একবার যুহরীকে বললাম, আবু বকর। আপনার মধ্যে ঋণ গ্রহণ করার শুধু একটি দোষ। তিনি জবাব দিলেন, আমার ঋণই বা এমন কি! সব মিলে মোট চল্লিশ হাজার দিরহামের মত হবে। আমার চারটি দাস আছে, তাদের প্রত্যেকে চল্লিশ হাজারের চেয়ে উত্তম। আর আমার উত্তরাধিকারী আছে শুধু আমার এক পৌত্র। আমার ইচ্ছা তো এই যে, আমার মীরাছ বা উত্তরাধিকারই কিছু না থাকুক।
তাঁর ছাত্র লাইছ ইবন সা'দ বলতেন: 'আমি যাঁদেরকে দেখেছি তাদের মধ্যে ইবন শিহাব সবচেয়ে বেশী দানশীল ব্যক্তি। যে কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি কিছু না কিছু তাকে দিতেন। আর কোন কিছুই দেওয়ার মত না থাকলে চাকর-বাকরদের নিকট থেকে ধার নিতেন। আর এটাকে খারাপ কিছু মনে করতেন না।' লাইছ আরো বলেছেন, দেওয়ার মত কিছু না থাকলে তাঁর চেহারার রং পাল্টে যেত। তিনি সাহায্য প্রার্থীকে বলতেন, 'তোমার জন্য সুসংবাদ! খুব শিগগির আল্লাহ তোমাকে কল্যাণ দান করবেন।' তিনি মানুষকে আহার ও পান করিয়ে আনন্দ পেতেন। তাঁর রাতের হালকাতে যারা বসতো তাদেরকে তিনি মধুর শরবত পান করাতেন। মধুর শরবত পান চলতো, আর হাদীছ ও মাগাযী শোনা ও বর্ণনা অব্যাহত থাকতো। যখন তিনি দেখতেন, তাঁর মজলিসের কেউ ঘুমাচ্ছে, তাকে বলতেন, তুমি তো কুরাইশদের গল্প বলিয়ে লোকদের মত হতে পারবে না, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন : " سَامِرًا تَهْجُرُوْنَ - অহংকার করে এ বিষয়ে অর্থহীন গল্প-গুজব করে যেতে।
তিনি নিজের পোশাক-আশাক ও খাদ্য-খাবারের প্রতি যত্নবান থাকতেন। উঁচু মুকুট সদৃশ হলুদ রংয়ের টুপি মাথায় পরতেন এবং হলুদ রংয়ের একটি উন্নত মানের চাদর গায়ে দিতেন। নরম এবং চমৎকার একটি গদি ও বালিশ ব্যবহার করতেন।
শামের তৎকালীন বিখ্যাত ফকীহ্ রাজা' ইবন হায়ওয়া তাঁর এভাবে ঋণ করে দান করা ও মানুষকে খাওয়ানোর ব্যাপারে প্রায়ই বকাবকি করতেন। একবার ইবন শিহাব তাঁর কাছে এমনটি আর করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন। একদিন রাজা' ইবন হায়ওয়া তাঁর বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। দেখেন, মানুষের জন্য খাবার তৈরী করা হয়েছে এবং দস্তর খাওয়ানে মধুর ভাণ্ডও রাখা হয়েছে। রাজা তিরস্কারের সুরে বললেন: আমরা কি এর উপর একমত হয়েছিলাম? ইবন শিহাব হাসতে হাসতে বললেন : আসুন, দানশীল ব্যক্তিকে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আদব শেখাতে পারে না। তাঁর সঙ্গী-সাথী ও ছাত্র-শিষ্যদের কেউ যদি তাঁর খাবার খেতে অস্বীকার করতো তাহলে তিনি দশ দিন তাঁকে কোন হাদীছ শোনাতেন না। কেউ তাঁর এমন দানশীলতা ও অতিথি সেবার সমালোচনা করলে বলতেন: যে কল্যাণ তালাশ করে সে অকল্যাণ থেকে দূরে থাকে। তিনি তাঁর শিষ্য-শাগরিদ ও আত্মীয়-বন্ধুদেরকে এমন ব্যক্তিত্ব অর্জনের উপদেশ দিতেন যাতে দানশীলতা ও মহানুভবতা বিদ্যমান থাকে। তিনি বলতেন: মানুষের তালাশকৃত জিনিসের মধ্যে ব্যক্তিত্বের চেয়ে ভালো কিছু নেই। সে সাহচর্যের মধ্যে ভালো কিছু নেই এবং বুদ্ধি- বিবেকও কোন কিছু লাভ করে না তা পরিহার করা ব্যক্তিত্বেরই অংশ। তার সাথে কথা বলার চেয়ে তাকে পরিহার করাই ভালো।
ইমাম মালিক (রহ) তাঁর একজন ছাত্র। তিনি তাঁর শায়খ ও উস্তাদ সম্পর্কে অনেক কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: এই জ্ঞান হলো দীন, সুতরাং এ দীন কার নিকট থেকে গ্রহণ করছো তা লক্ষ্য রাখবে। আমি মসজিদে (মসজিদে নবাবী) সত্তর (৭০) জন এমন লোক পেয়েছি যাঁরা 'কালা রাসূলুল্লাহ (সা)' বলে হাদীছ বর্ণনা করেন। তাঁদের যে কোন একজনকে যদি কোন কোষাগারের দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাঁরা বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতেন। আমি তাঁদের থেকে কোন কিছুই গ্রহণ করিনি। কারণ, তাঁদের থেকে জ্ঞান অর্জনের মত লোক তারা নন। কিন্তু যুহরী আমাদের এখানে আসতেন এবং তিনি একজন যুবক, তা সত্ত্বেও তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর দরজায় মানুষের প্রবল ভীড় জমে যেত।
লাইছ ইবন সা'দও তাঁর একজন ছাত্র। তিনি বলেছেন: আমি একবার এক সফরে ইবন শিহাব যুন্ত্রীর সঙ্গে ছিলাম। তিনি 'আশূরার দিন রোযা রাখলেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হলোঃ আপনি সফরে রামাদান মাসে রোযা ভেঙ্গে ফেলেন, কিন্তু আশূরার দিন রোযা রাখলেন কেন? তিনি বললেন: রামাদান মাসে সফরে ভেঙ্গে ফেলা রোযা অন্য সময় আদায় করার বিধান আছে। কিন্তু আশূরার রোযার তা নেই। এ দিনে না রাখলে তা ছুটে যাবে।
তিনি জ্ঞানী-গুণীদের প্রতি দারুণ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁর ভদ্রতা ও সৌজন্যবোধও ছিল প্রখর। একবার মদীনার বিখ্যাত ফকীহ্ ও মুহাদ্দিছ রাবীআ'তুর রায় মদীনার মসজিদে হাদীছ ও ফিকাহ্র দারস দিচ্ছেন। এমন সময় কেউ একজন খবর দিল: ইবন শিহাব যুহরী এই মাত্র শাম থেকে মদীনায় পৌঁছেছেন। রাবী'আ সঙ্গে সঙ্গে দারসের মজলিস ভেঙ্গে দিয়ে যুত্রীর কাছে ছুটে গেলেন এবং তাঁর হাত মুঠ করে ধরে 'মারহাবান, আহ্লান ওয়া সাহ্হ্লান' বলে তাঁকে মদীনার অতিথিখানায় নিয়ে গেলেন। তারপর দু'জনের মধ্যে 'আসর পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা হলো। 'আসরের সময় তাঁরা যখন বের হবেন তখন একজন আরেকজনের প্রতি যে মন্তব্য করেন তা নিম্নরূপ:
রাবী'আ বলেন: ইবন শিহাব, আমার ধারণা আপনি জ্ঞানের যে স্তরে পৌঁছেছেন সেখানে আর কেউ পৌছুতে পারেনি। উত্তরে ইবন শিহাব বললেন: মদীনায় আপনার মত লোক আছে আমি ধারণা করিনি。
যুহরীর মজলিসের অসাধারণ ছাত্ররাও তাঁদের ভুল ও অমনোযোগিতার জন্য অনেক সময় উস্তাদ যুহরীর তিরস্কার লাভ করতেন। সে তিরস্কার হতো এ ধরনের 'তোমরা জ্ঞান চর্চা ছেড়ে দিয়ে ফুটো মশকের মত হয়ে গেছো। অর্জন কর, কিন্তু ধরে রাখতে পার না। আল্লাহর কসম! তোমরা কখনো কল্যাণের নাগাল পাবে না।' উস্তাদের এমন তিরস্কারে ছাত্রদের মধ্যে অনেক সময় হাসির রোল পড়ে যেত। উস্তাদও ছাত্রদের বিরক্তি ও অন্যমনস্কতা দূর করার জন্য একটু সহজ ভঙ্গিতে বলতেন: এসো আমরা কিছু কবিতা আবৃত্তি করি ও অন্য কথা বলি। কারণ, কানেরও ক্লান্তি দূর করা উচিত।
'ইল্ম, সুন্নাহ্ ও মাগাযীতে পরিপূর্ণ দীর্ঘ জীবন লাভের পর এই মহান জ্ঞান সাধক হিজরী ১২৪ সনে ইহলোক ত্যাগ করে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল সত্তর (৭০) বছরের উপরে। শাম ও ফিলিস্তীনের সীমান্তবর্তী 'শাগাব' নামক গ্রামে তাঁর মৃত্যু হয়। মানুষ যাতে চলাচলের পথে তাঁর জন্য দু'আ করতে পারে সে জন্য একটি প্রধান সড়কের পাশে দাফন করার জন্য আত্মীয়-বন্ধুদের বলে যান। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
যুহরী থেকে এ রকম একটা কথা বর্ণিত আছে যে, কেউ যদি কোন বিদেশ-বিভুঁইয়ে যায় এবং সেখানের কিছু মাটি সেখানের পানিতে গুলিয়ে পান করে তাহলে সে তথাকার মহামারী রোগ থেকে সুস্থ থাকবে।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
২. ওফায়াতুল আ'য়ান-১/৪৫১
৩. 'আসরুত তাবি'ঈন-১২০; আল-ইসাবা-২/৩২৫
৪. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৮
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
৬. সিয়ারু আ'লাম আল-নুবালা-৫/৩৩
৭. প্রাগুক্ত; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
৮. 'আসরুত তাবি'ঈন-১২৪
৯. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৯
১০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৯
১১. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৮; সিয়ারু আ'লাম আল-নুবালা'-৫/৩৩
১২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
১৩. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৯
১৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
১৫. প্রাগুক্ত-১/১১০
১৬. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৭
১৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১১
১৮. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৮
১৯. তাহযীবুল আসমা'-১/৯১
২০. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০৮
২১. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৮
২২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৮
২৩. তাহযীবুল আসমা'-১/৯১
২৪. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৮
২৫. তাহযীবুল আসমা'-১/৯১
২৬. প্রাগুক্ত; তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৬; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
২৭. তাহযীবুল আসমা'-১/৯১
২৮. ওয়াফাতুল আ'য়ান-১/৪৫১
২৯. 'আসরুত তাবি'ঈন-১২১
৩০. তাহযীবুত তাহযীব-৯/৪৪৮
৩১. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবাসা-৫/৩৩০
৩২. 'আসরুত তাবি'ঈন-১৩৩
৩৩. আ'লাম আল-মুওয়াক্কা'ঈন-১/২৬
৩৪. তাহযীব আল-আসমা'-১/৯১
৩৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৩৬. তাহযীব আল-আসমা'-১/৯২
৩৭. আসরুত তাবি'ঈন-১২৭, ১২৯
৩৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৩৯. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৪৫১
৪০. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/১৪৩
৪১. তারীক আল-খুলাফা'লিস সুয়ূতী-২১৬
৪২. আল-ইকদ আল-ফারীদ-৩/৩৮৫-৩৮৭
৪৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ১/১০৯
৪৪. ওয়াফায়াতুর আ'য়ান-১/৪৫২
৪৫. প্রাগুক্ত-১/৪৫১
৪৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১০৯
৪৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৪৫১
৪৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/১১১
৪৯. সূরা আল-মু'মিনূন-৬৭
৫০. 'আসরুত তাবি'ঈন-১২৮
৫১. প্রাগুক্ত
৫২. প্রাগুক্ত-১৩১
৫৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নূবালা-৫/৩৪৩
৫৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৩৪৪
৫৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নূবালা-৫/৩৪৪
৫৬. 'আসরুত তাবি'ঈন-১৩৩
৫৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৬/২৫১
📄 ‘আমির ইবন শুরাহীল আশ-শা‘বী (রহ)
'আমির-এর ডাক নাম আবু 'উমার। আর পিতার নাম কোন কোন গ্রন্থে 'শুরাহীল', আবার কিছু গ্রন্থে 'শুরাহাবীল' লেখা হয়েছে। গোত্রের প্রতি সম্পৃক্ত করার জন্য আশ- শা'বী বলা হয়েছে। এ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিতির কারণে এটা তাঁর 'লকব' বা উপাধির রূপ ধারণ করেছে। তিনি ইয়ামানের প্রাচীন গোত্র হিময়ার শাখার সন্তান। এই খান্দানে হাসান ইবন 'আমর নামে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ইয়ামানের 'যু আশ-শা'বায়ন' নামক একটি পাহাড়ী উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুর পর তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়। এ কারণে তিনি নিজে 'যু আশ-শা'বায়ন' নামে প্রসিদ্ধ হন। তার পর থেকে তাঁর বংশধারার মধ্যে যে শাখাটি কৃষ্ণায় আবাসন গড়ে তোলে তাদেরকে বলা হয় শা'বী। 'আমির ছিলেন এই শাখার সন্তান। যে শাখাটি শামে বসতি স্থাপন করে তারা 'শা'বানী' নামে পরিচিত লাভ করে। যে শাখাটি ইয়ামানে থেকে যায় তাদেরকে বলা হয় 'যী শা'বায়ন'। আর যে শাখাটি পশ্চিম আফ্রিকায় চলে যায় তাদেরকে 'আল- উশা'ঊব' বলা হয়। এই সবগুলো শাখার ঊর্ধ্বতন পুরুষ হলেন হাসান ইবন 'আমর।
'আমির আশ-শা'বীর জন্মসন সম্পর্কে একটু মতপার্থক্য আছে। তিনি নিজে দাবী করেছেন যে, তাঁর জন্ম জাল্লা' যুদ্ধের বছর। অর্থাৎ হিজরী ১৭ সন। আরেকটি বর্ণনা এ রকম আছে যে, জাল্লা' যুদ্ধে তাঁর মা যুদ্ধবন্দী হিসেবে মুসলমানদের অধিকারে আসেন এবং ভাগে তাঁর পিতা শুরাহীলের অংশে পড়েন। এই হিসেবে হিজরী ১৯ সনে তাঁর জন্ম। তখন হযরত 'উমারের খিলাফতের ষষ্ঠ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।
অতি দুর্বল ও ক্ষুদ্রাকৃতি নিয়ে যমজ সন্তান হিসেবে তাঁর জন্ম। তিনি বলতেন, 'আমি মায়ের পেটেই ঠেলা-ধাক্কার মধ্যে পড়েছি। এ কারণে স্বাভাবিক বৃদ্ধির সুযোগ পাননি। কিন্তু পরবর্তী জীবনে বিদ্যা-বুদ্ধি, ধৈর্য, বিচক্ষণতা, স্মৃতিশক্তি, বোধশক্তি ও অন্যান্য প্রতিভায় না তাঁর সেই যমজ ভাই, আর না অন্য কেউ ঠেলা-ধাক্কায় তাঁর সামনে টিকতে পেরেছে। তিনি হন তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান ব্যক্তি।
শা'বী কৃফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তবে তাঁর অন্তরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ও বেশী ভালোবাসা ছিল মদীনা মুনাওয়ারার প্রতি। তাই তিনি সময় ও সুযোগ পেলেই সেখানে অবস্থানকারী রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের সাক্ষাৎ ও তাঁদের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে সেখানে ছুটে যেতেন। আর সাহাবায়ে কিরামও তখন কৃষ্ণায় যেতেন। কারণ, তখন কৃষ্ণা ছিল জিহাদে গমন ও প্রত্যাগমনের কেন্দ্রস্থল স্বরূপ। কৃফাতেও তখন বহু সাহাবী বসবাস করতেন। তাই রাসূলুল্লাহর (সা) পাঁচশো মহান সাহাবীকে দেখার সৌভাগ্য তিনি লাভ করেন। তাঁদের মধ্যে আটচল্লিশ জনের নিকট থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। 'হাবরুল উম্মাত' (উম্মাতের মহাপণ্ডিত) খ্যাত হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) সান্নিধ্যে একধারে আট-দশ মাস্, অবস্থান করে তাঁর জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। এসব মহান ব্যক্তিদের উদারতায় তিনি তাঁর যুগের ইমামের মর্যাদা লাভ করেন。
বিভিন্ন শাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান ও পাণ্ডিত্য ছিল যে তাঁর যুগের মানুষ তাঁকে ইমামের মর্যাদা দান করে। ইমাম যাত্রী তাঁকে ইমাম, হাফেজে হাদীছ, ফকীহ্ ও আস্থাভাজন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর তাযকিরাতুল হুফফাজ গ্রন্থের শিরোনাম দিয়েছেন- الشعبى علامة التابعين - শা'বী তাবি'ঈদের মহাজ্ঞানী বলে। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী তাঁকে لإإِمَامُ الْحَبْرُ الْعَلَامَةُ।' .. ইমাম, মহাপণ্ডিত, মহাজ্ঞানী, বলেছেন। সেকালে প্রচলিত সকল শাস্ত্রে তাঁর সমান দখল ছিল। আবূ ইসহাক আল-হিবাল বলেছেন, শা'বী সকল শাস্ত্রের জ্ঞানে তাঁর যুগে একক ও অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কুরআন, হাদীছ, ফিকাহ, মাগাযী, অংকশাস্ত্র, সাহিত্য ও কবিতা, মোটকথা প্রতিটি অঙ্গনে তাঁর সমান দখল ও বিচরণ ছিল।
আল-কুরআনের শ্রেষ্ঠ কারী (পাঠক) ছিলেন। তাঁকে কারীদের নেতা বলা হতো। তাফসীরেও তাঁর পূর্ণ ব্যুৎপত্তি ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের কারণে মুফাস্স্সির (কুরআন-ভাষ্যকার) হিসেবে তেমন খ্যাতি লাভ করেননি। তাফসীরুল কুরআনের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। সবার জন্য একাজ বৈধ মনে করতেন না। যাকারিয়া ইবন আবী যায়দ বর্ণনা করেছেন যে, শা'বী যখন আবূ সালিহ-এর নিকট যেতেন তখন তাঁর কান ধরে বলতেন, তুমি কুরআন পড়না, আর তার তাফসীর করে থাক? তিনি তাঁর যুগের একজন বড় মুফাস্সির সুদ্দী-এর ভীষণ সমালোচনা করতেন। একবার তাঁকে বলা হলো, সুদ্দীতো কুরআন বিষয়ক বিভিন্ন জ্ঞানে বেশ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। তিনি বললেন না, বরং সে কুরআন বিষয়ক মূর্খতার বেশ কিছু অংশ অর্জন করেছে।
তিনি হাদীছের অত্যুচ্চ সম্মানের অধিকারী হাফেজ ছিলেন। শুধু তাই না, সে যুগের হাদীছ শাস্ত্রের ইমাম ছিলেন। তিনি সাহাবায়ে কিরাম ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের বড়রকম একটি সংখ্যার নিকট থেকে হাদীছ শুনেছিলেন। যে সকল সাহাবীর নিকট হাদীছ শুনেছিলেন তাঁদের কয়েকজনের নাম এখানে দেওয়া হলো:
হযরত 'আলী (রা), সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা), সা'ঈদ ইবন যায়দ (রা), যায়দ ইবন ছাবিত (রা), কায়স ইবন 'উবাদা (রা), কারাজ ইবন কা'ব (রা), 'উবাদা ইবন সামিত (রা), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা), আবূ মাস'ঊদ আনসারী (রা), আবু হুরাইরা (রা), মুগীরা ইবন শু'বা (রা), নু'মান ইবন বাশীর (রা), আবু ছা'লাবা খুশানী (রা), জারীর ইবন 'আবদিল্লাহ আল-বাজালী (রা), বুরাইদা ইবন হাসীব (রা), বারা' ইবন 'আযিব (রা), মু'আবিয়া (রা), জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা), জাবির ইবন সামুরা (রা), হারিছ ইবন মালিক (রা), হাবশী ইবন জানাদা (রা), হুসাইন ইবন 'আলী (রা), যায়দ ইবন আরকাম (রা), দাহ্হাক ইবন কায়স (রা), সামুরা ইবন জুনদুব (রা), 'আমির ইবন শাহ্ (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মৃতী' (রা), 'আবদুর রহমান ইবন সামুরা (রা), 'আদী ইবন হাতিম (রা), 'উরওয়া ইবন জা'দ আল-জারিকী (রা), 'উরওয়া ইবন মুদাররাস (রা), 'আমর ইবন উমাইয়্যা (রা), 'আমর ইবন হুরায়ছ (রা), 'ইমরান ইবন হুসাইন (রা), 'আওফ ইবন মালিক (রা), 'আয়্যাদ আল-আশ'আরী (রা), কা'ব ইবন 'আজরাহ্ (রা), মুহাম্মাদ ইবন সায়ফী (রা), মিকদাম ইবন মা'দিকারিব (রা), ওয়াবিসা ইবন মা'বাদ (রা), আবু জুবায়র ইবন দাহ্হাক (রা), আবূ সুরায়হা গিফারী (রা), আবূ সা'ঈদ আল খুদরী (রা) এবং মহিলা সাহাবীদের মধ্যে উম্মু সালামা (রা), মাইমূনা বিন্ত হারিছ (রা), আসমা' বিন্ত উনাইস (রা), ফাতিমা বিন্ত কাইস (রা), উম্মু হানী (রা), 'আয়িশা (রা) প্রমুখের নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। এসব সাহাবী থেকে তাঁর বর্ণিত অনেক হাদীছ 'মুরসাল'। অর্থাৎ সাহাবীর নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন।
হাদীছের প্রতি তাঁর এক বিশেষ আগ্রহ ও রুচি ছিল। হাদীছের জ্ঞান অর্জনের জন্য ভীষণ কষ্ট স্বীকার করেছেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে জানতে চাইলো, আচ্ছা, এত জ্ঞান আপনি কোথা থেকে কিভাবে অর্জন করলেন? জবাব দি:ে আত্মনির্ভরতা দূর করে, দেশ- বিদেশে ভ্রমণ করে, জড়বস্তুর ধৈর্যের মত ধৈর্যধারণ করে এবং কাকের মত প্রত্যূষে উঠে।
শা'বী ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধা, প্রখর স্মৃতিশক্তি, সজাগ অন্তকরণ এবং সূক্ষ্ম বোধশক্তির অধিকারী মানুষ। স্মৃতিতে ধারণ ক্ষমতা ও মুখস্থ শক্তিতে তিনি ছিলেন একজন কিংবদন্তীর মানুষ। স্মরণ শক্তি এত প্রখর ছিল যে, কখনো কাগজ, কলম ও দোয়াতের প্রয়োজন হতো না। একবার যে হাদীছ শুনতেন তা বুকের মাঝে সংরক্ষিত হয়ে যেত। তিনি নিজেই দাবী করতেন যে, আমি কখনো সাদা কাগজ লিখে কালো করিনি। অর্থাৎ কখনো লিখিনি। কেউ কোন হাদীছ বর্ণনা করলে আমার স্মৃতিতে তা গেঁথে যায়। কারো কোন কথা একবার শুনলে তার পুনরাবৃত্তি আমি মোটেই পছন্দ করিনে। শা'বী ও যুহরী বলতেন: আমরা কোন হাদীছ একবার শোনার পর কখনো তা দ্বিতীয়বার বলার জন্য অনুরোধ জানাইনি।
তিনি জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞানচর্চার প্রতি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। জ্ঞান অর্জনের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিতে এবং সব বাধা অতিক্রম করতে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন। তিনি বলতেন: যদি কেউ শামের এক প্রান্ত থেকে ইয়ামানের অপর প্রান্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করে, তারপর তার ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে আসবে এমন একটি মাত্র কথা মুখস্থ করে, তাহলে আমি মনে করি তার এ ভ্রমণ ব্যর্থ হয়নি। তিনি আরো বলতেন, আমি যখনই আমার মত কোন ব্যক্তিকে দেখেছি এবং আমার চেয়ে বেশী জানা কোন লোকের সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছি, তখনই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেছি।
তবে অন্যদের থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ গ্রহণের ব্যাপারে বড় সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কেবল তাঁদের নিকট থেকেই হাদীছ গ্রহণ করতেন যাঁরা জ্ঞানের সাথে সাথে বুদ্ধি ও খোদাভীতির অলঙ্কারে সজ্জিত হতেন। এ ব্যাপারে তাঁর নীতি হলো, জ্ঞান সেই ব্যক্তির থেকে অর্জন করা উচিত যার মধ্যে যুহদ ও 'ইবাদাত এবং বুদ্ধি ও জ্ঞান দু'টোই বিদ্যমান থাকে। শুধু বুদ্ধি অথবা শুধু 'ইবাদাত যার মধ্যে আছে তিনি জ্ঞানের স্বরূপ ও প্রকৃতি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন না। তিনি বলতেন, আজকাল আমি এমন সব লোকের নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করতে দেখি যাদের না বুদ্ধি আছে, আর না আছে 'ইবাদাত। হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের পরিধি অতি বিস্তৃত ছিল। তিনি তাঁর জীবনের এক পর্যায়ে বলতেন, আমি বিশ বছরের মধ্যে কারো মুখে এমন কোন নতুন হাদীছ শুনিনি যে সম্পর্কে আমি বর্ণনাকারী অপেক্ষা বেশী জ্ঞান রাখিনে। হিজায, বসরা ও কৃষ্ণা ছিল সে সময় হাদীছ চর্চার কেন্দ্রস্থল। 'আসিম আল-আহওয়াল বলেন: আমি কৃষ্ণা, বসরা ও হিজাযের মুহাদ্দিছদের বর্ণিত হাদীছের শা'বীর চেয়ে বড় কোন হাফিজ কাউকে দেখিনি। সুনান-এরও তিনি একজন বড় 'আলিম ছিলেন। মাকহুল বলেছেন, আমি শা'বীর চেয়ে সুনান-এর বড় কোন 'আলিম দেখিনি। ইবন আবী লায়লা বলতেন: শা'বী ছিলেন হাদীছের এবং ইবরাহীম ছিলেন কিয়াসের ধারক-বাহক।
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর এত ব্যাপক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজে হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। বেশী হাদীছ বর্ণনা করা মোটেই পছন্দ করতেন না। বলতেন, আমাদের সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরীরা হাদীছ বর্ণনা করা খারাপ মনে করতেন। যদি একথা আমার আগে জানা থাকতো, যা আমি পরে জেনেছি, তাহলে আমি শুধু মুহাদ্দিছদের সর্বসম্মতভাবে বর্ণিত হাদীছগুলো বর্ণনা করতাম।
তবে তিনি 'রিওয়ায়াত বিল মা'না' (অর্থ ও ভাব বর্ণনা)-কে এ সতর্কতার পরিপন্থী বলে মনে করতেন না। অন্য কথায়, হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে হুবহু শ্রুত শব্দে বর্ণনা করতে হবে, তিনি এমনটি মনে করতেন না। ইবন 'আওন বর্ণনা করেছেন, শা'বী হাদীছ 'রিওয়ায়াত বিল মা'না' করতেন।
'মাগাযী' শব্দটি 'গাযওয়া' শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ যুদ্ধ-বিগ্রহ। মুসলমানদের যুদ্ধ- বিগ্রহ, বিশেষতঃ ইসলামের প্রথম পর্বের যুদ্ধ-বিগ্রহ বিষয়ক জ্ঞানকে 'মাগাযী' বলে। পরবর্তীকালে এটি একটি বিশেষ শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ইমাম শা'বী এ শাস্ত্রেরও একজন শীর্ষ স্থানীয় 'আলিম ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর মক্কা, মদীনা, বসরা, কৃফাসহ ইসলামী খিলাফতের কেন্দ্রসমূহে 'মাগাযী' চর্চার বড় বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান ছিল মসজিদ ভিত্তিক কোন বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গকে কেন্দ্র করে। কৃষ্ণার জামে' মসজিদে শা'বীকে কেন্দ্র করে 'মাগাযী' চর্চার একটি 'হালকা' বা বেষ্টনী গড়ে ওঠে। মানুষ তাঁকে ঘিরে বসে যেত এবং তিনি তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবায়ে কিরামের (রা) যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনাবলী শুনাতেন। বহু সাহাবী তখন জীবিত ছিলেন। এই 'হালকা'র পাশ দিয়ে তাঁরা আসা-যাওয়াও করতেন। এমনকি অনেক সাহাবী এমন ছিলেন যাঁরা এসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাঁরাও তাঁর অনুপম বর্ণনা শুনে তাঁর জ্ঞান ও বর্ণনার তারীফ করতেন। একদিন তিনি 'মাগাযী' বর্ণনা করছেন। এমন সময় হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শা'বীর বর্ণনা শুনে মুগ্ধ হন এবং মন্তব্য করেন: সে যেসব মাগাযী'র কথা বর্ণনা করছে তার অনেকগুলোতে আমি অংশগ্রহণ করে নিজ চোখে দেখেছি, নিজ কানে শুনেছি, তা সত্ত্বেও সে আমার চেয়ে ভালো বর্ণনাকারী।
শা'বী ছিলেন জাহিলী ও ইসলামী যুগের আরবের বিভিন্ন ঘটনা ও ইতিহাসের একজন পারদর্শী। তাঁর পারদর্শিতার বহু কথা ইতিহাসের পাতায় পাওয়া যায়। একটি ঘটনার কথা তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন:
একবার দু'জন লোক পরস্পর গর্ব ও গৌরবের দাবী করতে করতে আমার নিকট আসে। তাদের একজন বানু 'আমির ও অন্যজন বানু আসাদ গোত্রের লোক। 'আমির গোত্রের লোকটি তার প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে ফেলে এবং তার কাপড় ধরে টানতে টানতে আমার দিকে নিয়ে আসে। আসাদ গোত্রের লোকটি তখন হেয় ও অপমানিত অবস্থায় অনুনয়- বিনয় করে বলতে থাকে আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও।
জবাবে 'আমির গোত্রের লোকটি বলছিল : আল্লাহর কসম! শা'বী আমাদের দু'জনের মধ্যে ফায়সালা না করা পর্যন্ত আমি তোমাকে ছাড়বো না। আমি 'আমির গোত্রের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললাম : তুমি তোমার প্রতিপক্ষকে ছেড়ে দাও। আমি তোমাদের দু'জনের মধ্যে ফায়সালা করছি। এরপর আমি আসাদ গোত্রের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললাম : কি ব্যাপার, তার সামনে তোমাকে এত দুর্বল ও পরাভূত দেখছি কেন? অথচ তোমাদের রয়েছে এমন ছয়টি গর্ব ও গৌরবের বিষয় যা আরবের আর কোন গোত্রের নেই। যেমন :
১. তোমাদের মধ্যে এমন এক মহিয়ষী মহিলা ছিলেন যাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান সেরা মানব মুহাম্মাদ ইবন 'আবদিল্লাহ (সা) এবং আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আকাশের উপর থেকে তাঁদের দু'জনকে বিয়ে দেন। আর তাঁদের মধ্যে দূত হিসেবে কাজ করেন জিবরীল (আ)। সেই মহিলা হলেন উম্মুল মু'মিনীন যায়নাব বিন্ত জাহশ (রা)। এই সম্মান ও গৌরব কেবল তোমার গোত্রের আছে। আরবের অন্য কোন গোত্রের নেই।
২. তোমাদের মধ্যে জান্নাতের অধিবাসী এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি এই মাটির পৃথিবীতে চলাফেরা করতেন। তিনি “উকাশা ইবন মিহসান'। এটাও তোমাদের একটা গৌরবের বিষয়- যা আর কোন মানবগোষ্ঠীর নেই。
৩. ইসলামের প্রথম পতাকা তোমাদের এক ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ব্যক্তিটি হলেন 'আবদুল্লাহ ইবন জাহ্শ (রা)।
৪. ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বন্টনকৃত গণীমতের মাল ছিল 'আবদুল্লাহ ইবন জাহ্শ কর্তৃক দখলকৃত গণীমত।
৫. 'বাই'আতুর রিদওয়ান'- এ প্রথম বাই'আতকারী ব্যক্তিটি ছিলেন তোমাদেরই এক ব্যক্তি। তোমাদের গোত্রের আবূ সিনান ইবন ওয়াহাব (রা) সেদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বলেন :
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন বাই'আত করবো। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রশ্ন করলেন : কিসের উপর? তিনি জবাব দিলেন : আপনার মধ্যে যা আছে। রাসূল (সা) আবার প্রশ্ন করলেন : আমার মধ্যে কি আছে? বললেন : বিজয় অথবা শাহাদাত। রাসূল (সা) বললেন : হাঁ, ঠিক বলেছো। তারপর তাঁর বাই'আত গ্রহণ করেন। তারপর লোকেরা আবু সিনানের (রা) বাই'আতের উপর বাই'আত করতে আরম্ভ করে।
৬. বদরের দিন মুহাজির যোদ্ধাদের এক সপ্তমাংশ ছিল তোমার গোত্র বানু আসাদের লোক।
এসব কথা শুনে 'আমির গোত্রের লোকটি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, এ ক্ষেত্রে শা'বীর উদ্দেশ্য ছিল একজন দুর্বল পরাভূত ব্যক্তিকে শক্তিমান বিজয়ীর বিরুদ্ধে সাহায্য করা। সেদিন 'আমির গোত্রের লোকটিকে পরাভূত ও লাঞ্ছিত দেখলে তার গোত্রেরও অনেক গৌরব গাঁথা তিনি শুনাতে পারতেন।
সেকালে প্রচলিত সকল প্রকার জ্ঞান ও শাস্ত্রে তাঁর সমান অধিকার থাকলেও ফিকাহ্ ছিল তাঁর বিশেষভাবে অধিত বিষয়। এ শাস্ত্রে তাঁর স্থান এত উঁচুতে ছিল যে, সে যুগে তাঁকে সবচেয়ে বড় ফকীহ্ বলে গণ্য করা হতো। আবূ হুসাইন বলতেন: আমি শা'বীর চেয়ে বড় ফকীহ্ কাউকে দেখিনি। কোন কোন 'আলিম তো তাঁকে তাঁর যুগের সকল ইমামের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করতেন। আবূ মিজলায় বলতেন, আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব, তাউস, 'আতা', হাসান আল-বসরী, ইবন সীরীন- এঁদের কাউকে শা'বীর চেয়ে উঁচু স্তরের ফকীহ্ দেখিনি।
ইবরাহীম আন-নাখ'ঈ, যিনি নিজে একজন খুব বড় ফকীহ্, শা'বীর ফিকাহ্র জ্ঞানের প্রতি এত আস্থাশীল ছিলেন যে, কোন মাসআলার সমাধান তাঁর জানা না থাকলে প্রশ্নকারীকে শা'বীর নিকট পাঠিয়ে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলো। তিনি অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। এমন সময় নিকটেই শা'বীকে যেতে দেখলেন। তিনি প্রশ্নকারীকে বললেন, এই যে শায়খ যাচ্ছেন তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। আর তিনি যে জবাব দেন তা আমাকে একটু জানিয়ে যাবে। প্রশ্নকারী লোকটি শা'বীকে মাসআলাটি জিজ্ঞেস করলো। তিনিও অজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। আন- নাখা'ঈ শা'বীর এ জবাব শুনে মন্তব্য করেন, আল্লাহর কসম! এই হচ্ছে ফিক্হ। একেই বলে 'আলিম।
ফিকাহ্ শাস্ত্রে শা'বীর পরিপূর্ণতা এতখানি ছিল যে, সাহাবায়ে কিরাম, যাঁরা ছিলেন নবীর (সা) 'ইল্ম ও মা'রিফাতের প্রকৃত উত্তরাধিকারী, তাঁদের বর্তমানে তিনি ইফতার মত গুরুত্বপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত হন। আবূ বকর আল-হুযালী বলেন। ইবন সীরীন আমাকে বললেন, তুমি শা'বীর সাহচর্য অবলম্বন করবে। কারণ, সাহাবীদের বিরাট একটি সংখ্যার বর্তমানে আমি তাঁকে ফাতওয়া দিতে দেখেছি।
হাদীছের মত ফিকাহতেও তিনি ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। আর এ কারণে, সাধারণতঃ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। সালত ইবন বাহরাম বলেন, জ্ঞানে শা'বীর সমকক্ষ এমন কোন ব্যক্তিকে আমি শা'বীর চেয়ে- 'আমি জানিনে'- কথাটি বেশী বলতে দেখিনি। ইবন 'আওন বলেন, শা'বীর নিকট যখন কোন মাসআলা আসতো, তিনি যথাসম্ভব উত্তর এড়িয়ে যেতেন। আর ইবরাহীম উত্তর দিয়েই চলতেন। তিনি আরো বলেন, শা'বী ছিলেন স্বভাবগতভাবে বহির্মুখী, আর ইবরাহীম ছিলেন অন্তর্মুখী। কিন্তু যখন দু'জনের সামনে কোন ফাতওয়ার বিষয় এসে যেত তখন উভয়ের স্বভাব পাল্টে যেত। শা'বী সংযত হয়ে যেতেন, আর ইবরাহীমের মুখ খুলে যেত।
যাই হোক না কেন, তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট 'আলিম এবং উঁচু স্তরের একজন ফকীহ্। কুফার ইফতা'র পদেও অধিষ্ঠিত ছিলেন। অসংখ্য মানুষের কেন্দ্রবিন্দুও ছিলেন তিনি। তাই সব সময় 'জানিনে' বলে পার পেতেন না। অনেক মাসআলার জবাব দিতেই হতো। তবে এতটুকু সতর্কতা সব সময় অবলম্বন করতেন যে, তাঁর জবাবের ভিত্তি হতো কুরআন ও হাদীছ। নিজের মতামতের কোন গুরুত্বই দিতেন না। একবার তাঁকে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলো। আর সেই ব্যাপারে তাঁর কোন হাদীছ জানা ছিল না। তাই জবাব দানে অপারগতা প্রকাশ করলেন। এক ব্যক্তি বললো, আপনি আপনার মতামত ব্যক্ত করুন। বললেন, আমার মতামত দিয়ে কি করবে? তার উপর প্রস্রাব কর।
তিনি বলতেন, আমরা ফকীহ্ নই। তবে আমরা হাদীছ শুনেছি, তাই বর্ণনা করে থাকি। প্রকৃত ফকীহ্ তো তাঁরা, যাঁরা যাকিছু জানে তা আমল করে। একবার কোন এক ব্যক্তি তাঁকে সম্বোধন করে এভাবে : ওহে ফকীহ্ 'আলিম, আমার প্রশ্নের জবাব দিন। তিনি বলেন : তোমার জন্য দুঃখ হয়। আমি যা নই তা বলে আমাকে ফুলিও না। ফকীহ্ তো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর হারামকৃত বস্তু থেকে দূরে থাকে, আর 'আলিম সেই ব্যক্তি যে আল্লাহকে ভয় করে। আমি এর কোনটিতে পড়ি?
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করলো। তিনি জবাব দিলেন এভাবে : এ মাসআলায় 'উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এরকম বলেছেন, 'আলী (রা) এরকম, বলেছেন। প্রশ্নকারী বললো আবূ 'আমর! আপনি কি বলেন? তিনি একটু লাজুকভাবে হেসে দিয়ে বলেন: 'উমার ও 'আলীর (রা) কথা শোনার পর আমার কথা দিয়ে তুমি কী করবে?
শরী'আতের বিষয়সমূহে তিনি মাযহাব ও 'আকীদাগত দিক দিয়েই শুধু কিয়াসকে খারাপ জানতেন না, বরং বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতেও সে কথা বলতেন。
একবার তিনি আবূ বকর আল-হুযালীকে এর রহস্য বুঝানোর জন্য তাঁকে প্রশ্ন করেন: আচ্ছা, যদি আহনাফ ইবন কায়স এবং তাঁর সাথে একটি শিশুকে হত্যা করা হয় তাহলে দু'জনের দিয়াত (রক্তমূল্য) কি সমান হবে, না আহনাফের বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার জন্য তাঁর দিয়াত বেশী হবে? আবু বকর জবাব দিলেন: সমান হবে। শা'বী বললেন: তাহলে কিয়াসের কোন ভিত্তি নেই। কারণ, কিয়াসের দাবী এটাই ছিল যে, আহনাফের দিয়াত বেশী হোক। উল্লেখ্য যে, আহনাফ একজন সর্বগুণে গুণান্বিত অতি বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান তাবি'ঈ ছিলেন।
এত বিশাল জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর দায়িত্ব অনুভূতি এত প্রবল ছিল যে, তিনি আফসোসের সুরে বলতেন : হায়! যদি আমাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হতো, আমাকে যদি আমার 'ইলমের জবাবদিহী করতে না হতো এবং আমাকে যদি এর কোন বিনিময়ও দেওয়া না হতো! দাউদ ইবন ইয়ায়ীদ বলেন, আমি শা'বীকে বলতে শুনেছি : যদি আমি নিরানব্বইটি প্রশ্নের সঠিক জবাব দিই, আর একটি মাত্র জবাবে ভুল করি, তাহলে মানুষ আমাকে সেই একটিতেই ধরে বসবে।
দীনী-'ইলমের অধিকারী 'আলিমরা সাধারণত অংক শাস্ত্রের মত জ্ঞানের প্রতি তেমন আগ্রহী হননা। তবে শা'বী এ শাস্ত্রেরও একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। এ শাস্ত্রের জ্ঞান তিনি হারিছ আল-আ'ওয়ারের নিকট থেকে অর্জন করেন।
অংকে দক্ষতার কারণে ফারায়েজ শাস্ত্রেও তার পূর্ণ অধিকার ছিল। এ শাস্ত্রটি তিনি সম্ভবত 'আলীর (রা) নিকট থেকে শিখেছিলেন। অনেকে মনে করেন, 'আলীর (রা) থেকে সরাসরি নয়, বরং তাঁর বাণী থেকে তিনি এটা বের করেন।
শা'বীর মধ্যে কাব্যরুচিও ছিল। প্রাচীন আরবের কবিদের কবিতার হাজার হাজার শ্লোক তাঁর মুখস্থ ছিল। তিনি দাবী করতেন, আমি যদি ইচ্ছা করি তাহলে একাধারে একমাস পর্যন্ত কবিতা শুনাতে পারি এবং কোন কবিতার পুনরাবৃত্তি হবে না। তিনি নিজেও কবিতা রচনা করতেন। কাব্যশাস্ত্রে তাঁর এত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বলতেন, আমি যেসব জ্ঞান অর্জন করেছি, তার মধ্যে কবিতার জ্ঞানই সবচেয়ে কম। তিনি মসজিদে কবিতা পাঠের আসর বসাতেন। ইবন আবী লায়লা বলেন : আমি শা'বীকে লাল চাদর ও হলুদ পায়জামা পরে মসজিদে কবিতা আবৃত্তি করতে দেখেছি।
সাহাবায়ে কিরামের বর্তমানেই 'হালকায়ে দারস' চালু হয়ে গিয়েছিল। ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন, আমি যখন কৃষ্ণায় আসি তখন শা'বীর 'হালকায়ে দারস' চালু ছিল এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের বিশাল একটি সংখ্যা তখনও বর্তমান ছিলেন। তাঁর হালকায়ে দারসে বেশী লোকের উপস্থিতি পছন্দ করতেন না। বলতেন হালকা বেশী বড় হয়ে গেলে কোলাহলের স্থানে পরিণত হয়।
যে সকল মসজিদের হালকায়ে দারসে শোরগোল হতো সেগুলো ছেড়ে দিতেন। সালিহ ইবন কাইসান বলেন, একবার আমি ও শা'বী দু'জন হাত ধরাধরি করে হেলতে দুলতে মসজিদে পৌঁছলাম। সেখানে হাম্মাদের (রহ) মাজমা' ছিল এবং শোরগোল হচ্ছিল। শা'বী সেই শোরগোল শুনে বললেন, আল্লাহর কসম! এই হাটুরে লোকেরা এই মসজিদটিকে বিরক্তিকর করে তুলেছে। একথা বলে তিনি ফিরে চললেন।
তাঁর ছাত্র-শিষ্যের পরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত। যেহেতু তিনি ছিলেন বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী, তাই সকল শাস্ত্রে তাঁর শিষ্য-শাগরিদের সংখ্যাও অনেক। এখানে কেবল হাদীছ শাস্ত্রের কয়েকজন বিখ্যাত ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো: আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, সা'ঈদ ইবন 'আমর ইবন আশওয়া', ইসমা'ঈল ইবন আবী খালিদ, বায়ান ইবন বিশর, হুসাইন ইবন 'আবদির রহমান, দাউদ ইবন আবী হিন্দা, যুবায়দ আল-ইয়ামানী, যাকারিয়া ইবন আবী যায়িদা, সা'ঈদ ইবন মাসরূক, সালামা ইবন কুহায়ল, আবূ ইসহাক শাইবানী, আ'মাশ, মানসূর, মুগীরা, সাম্মাক ইবন হারব, আসিম আল-আহওয়াল, আবুয যানাদ, ইবন 'আওন, 'আবদুল মালিক ইবন সা'ঈদ, 'আওন ইবন 'আবদিল্লাহ, কাতাদা, মুজালিদ ইবন সা'ঈদ, মাতরাব ইবন তুরায়ফ, আবূ হায়্যান আত-তায়মী ও আরো অনেকে।
সে যুগের সকল বড় 'আলিম ও ইমামের নিকট তাঁর পাণ্ডিত্য স্বীকৃত ছিল। সবাই তাঁকে মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। হাসান আল-বসরী তাঁকে বহু জ্ঞানের আধার বলতেন। সে যুগের বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী চারজনের একজন ছিলেন তিনি। ইমাম যুহরী বলতেন: 'আলিম চারজন। মদীনায় সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব, কূফায় 'আমির আশ- শা'বী, বসরায় হাসান আল-বসরী এবং শামে মাকহুল। ইবন 'উয়াইনা বলেন, লোকেরা বলতো, ইবন 'আব্বাস, শা'বী ও ছাওরী- এ তিনজনের প্রত্যেকেই তাঁদের আপন আপন যুগে অপ্রতিদ্বন্দ্বী 'আলিম ছিলেন। আল-জাহিজ শা'বীর নামটি মু'আল্লিমদের (শিক্ষক) নামের মধ্যে উল্লেখ করেছেন।
জীবনের প্রথম দিকে তিনি শি'আ মতাবলম্বী ছিলেন। কিন্তু তাদের কাজ-কর্ম, চিন্তা- চেতনা এবং তাদের ভারসাম্যহীন কথাবার্তা দেখে-শুনে তাদের মতবাদ থেকে তাওবা করেন। তাদের নিন্দা-মন্দও করতে থাকেন। তবে আহলি সুন্নাতের 'আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণ করার পরেও সাধারণ মযহাব পরিবর্তনকারীদের মত মধ্যপন্থার বাইরে যাননি। তিনি বলতেন, সত্যনিষ্ঠ মু'মিন এবং সত্যনিষ্ঠ বানু হাশিমকে বন্ধু বানাবে। তবে শী'আ হবে না। আর যে জিনিস তোমাদের জ্ঞানের মধ্যে নেই, সে ক্ষেত্রে ভালোর আশা রেখ। তবে মুরজিয়া হয়োনা। এই বিশ্বাস রেখ যে, তোমাদের সব ভালো কাজ আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়, আর সব খারাপ কাজ তোমাদের কু-প্রবৃত্তি থেকে হয়। তবে কখনো কাদরিয়া হবে না। যাকেই তোমরা ভালো কাজ করতে দেখবে তাকে বন্ধু ভাববে।
ইমাম শা'বীর যুগে কট্টরপন্থী শি'আ রাফিজী গ্রুপের উৎপাত ও দৌরাত্ম্য দারুণ বেড়ে গিয়েছিল। তারা আবূ বকর ও 'উমারের (রা) খিলাফত সঠিক নয় বলে তা প্রত্যাখ্যান করতো এবং 'আলীকে (রা) 'উছমানের (রা) উপর প্রাধান্য দিত। শি'আদের অন্যান্য দল ও গোষ্ঠী এই রাফিজীদের মত এত চরমপন্থী ছিল না। ইমাম শা'বী রাফিজীদেরকে ভীষণ ঘৃণা করতেন এবং প্রকাশ্যে তাদের মত ও বিশ্বাসের কঠোর সমালোচনা করতেন।
মালিক ইবন মু'আবিয়া বলেন, একবার আমি ও শা'বী রাফিজী সম্প্রদায় সম্পর্কে আলোচনা করছিলাম। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বলেন: হে মালিক! আমি যদি চাই যে, রাফিজীদের সকল সদস্য আমার দাসে পরিণত হোক এবং তারা আমার ঘর-বাড়ী সোনা দিয়ে ভরে দিক, আর তার বিনিময়ে আমি তাদের পক্ষে 'আলীর (রা) প্রতি ছোট্ট একটি মিথ্যা আরোপ করি, তাহলে তারা তাতে রাজী হয়ে যাবে। কিন্তু আমি, আল্লাহর কসম! কখনো 'আলীর (রা) প্রতি কোন মিথ্যা আরোপ করবো না। মালিক! আমি প্রবৃত্তির অনুসারী সব দল-গোষ্ঠীর চিন্তা-বিশ্বাস অধ্যয়ন করেছি, কিন্তু রাফিজীদের মত নির্বোধ কোন সম্প্রদায়কে দেখিনি। তারা জন্তু-জানোয়ার হলে গাধা হতো, আর পাখী হলে হতো মর্দা শকুন। আমি তোমাকে প্রবৃত্তির অনুসারী সকল পথভ্রষ্টদের থেকে সতর্ক থাকতে বলি। আর এদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হচ্ছে রাফিজী। তারা এই উম্মাতের ইয়াহূদী। তারা ইসলামকে হিংসা করে যেমন ইয়াহূদীরা করে খ্রীষ্ট ধর্মকে। তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অথবা আল্লাহর ভয়ে ইসলামে ঢোকেনি। বরং মুসলমানদের প্রতি ক্রোধ ও শত্রুতাবশত ইসলামে ঢুকেছে। 'আলী ইবন আবী তালিব (রা) তাদের অনেককে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছেন এবং অনেককে বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে তাড়িয়ে দিয়েছেন। যেমন: 'আবদুল্লাহ ইবন সাবাকে সাবাতে, 'আবদুল্লাহ ইবন সাবাবকে আল-জাযুরে এবং আবুল কারাওয়াসকে অন্যত্র তাড়িয়ে দেন। কারণ, রাফিজীদের কর্মকাণ্ড ইয়াহূদীদের কর্মকাণ্ডের মতই। ইয়াহুদীরা বলে থাকে, রাজত্ব কেবল দাউদের বংশধারার মধ্যেই থাকবে। আর রাফিজীরা বলে, খিলাফত কেবল 'আলী ইবন আবী তালিবের (রা) বংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। ইয়াহুদীরা বলে, প্রতীক্ষিত আল-মাসীহর আবির্ভাব পর্যন্ত কোন জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ নেই। তখন আসমান থেকে একজন ঘোষক ঘোষণা দিবে। আর রাফিজীরা বলে ইমাম আল-মাহদীর আগমনের আগ পর্যন্ত কোন জিহাদ নেই। তখনও আসমান থেকে ঘোষণা দেওয়া হবে। ইয়াহুদীরা আকাশের তারকারাজি স্পষ্টভাবে দেখা না যাওয়া পর্যন্ত মাগরিবের নামায দেরী করে। রাফিজীরাও তাই করে। ইয়াহুদীরা তিন তালাককে কিছুই মনে করে না, রাফিজীরাও তাই করে। ইয়াহুদীরা মহিলাদের জন্য ইদ্দাতের প্রয়োজন মনে করে না। রাফিজীরাও তাদের মত একই রকম বিশ্বাস করে। ইয়াহুদীরা প্রতিটি মুসলমানের রক্ত ঝরানো বৈধ মনে করে। রাফিজীরাও তাই করে। ইয়াহুদীরা তাওরাত জ্বালিয়ে দিয়েছে। রাফিজীরাও কুরআন জ্বালিয়েছে। ইয়াহুদীরা জিবরীলকে (আ) ঘৃণা করে এবং বলে, সে ফিরিশতাদের মধ্যে আমাদের একমাত্র শত্রু। তেমনিভাবে রাফিজীরা বলে: জিবরীল ওহী আলীর নিকট না পৌঁছিয়ে ভুল করে মুহাম্মাদের নিকট পৌছিয়েছে। ইয়াহুদীরা উটের গোশত খায়না, রাফিজীরাও খায় না। দু'টি বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে ইয়াহুদী ও নাসারাদের শ্রেষ্ঠত্ব আছে রাফিজীদের উপর। যেমন : কোন ইয়াহুদীকে যদি প্রশ্ন করা হয় তোমাদের মিল্লাতের সবচেয়ে ভালো মানুষ কারা? উত্তর দিবে: মূসার (আ) সঙ্গী-সাথীরা। আর একই প্রশ্ন কোন নাসারাকে করলে বলবে: 'ঈসার (আ) সঙ্গী-সাথীরা। আর যদি রাফিজীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় : তোমাদের মিল্লাতের সবচেয়ে খারাপ মানুষ কারা? বলবে: মুহাম্মাদের (সা) সাহাবীরা। আল্লাহ তাঁদের জন্য মাগফিরাত কামনার আদেশ করেছেন, আর এই রাফিজীরা তাঁদেরকে গালি দেয়। কিয়ামত পর্যন্ত তাদের মাথার উপর তরবারি খোলা থাকবে। তাদের পা কখনো দৃঢ় হবে না, তাদের পতাকাও কোন দিন উড়বে না, তারা কখনো ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না, এবং তারা সব সময় বিভেদ-বিভক্তিতে লিপ্ত থাকবে। তারা যখনই যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিবে, আল্লাহ তা নিভিয়ে দিবেন।
তিনি সে যুগের জটিল রাজনৈতিক বিতর্ক, যথা: 'উছমানের (রা) হত্যাকাণ্ড, 'আলী-মু'আবিয়ার (রা) দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং 'আলীর (রা) হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা থেকে বিরত থাকতেন। একবার তাঁর এক সঙ্গী তাঁকে প্রশ্ন করলেন: আবূ 'আমর! এই দু' ব্যক্তির বিষয় নিয়ে মানুষ যেসব কথা বলে সে ব্যাপারে আপনি কি বলেন? তিনি প্রশ্ন করলেন: আপনি কোন দু'ব্যক্তির কথা বলছেন? সঙ্গীটি বললেন: 'উছমান ও 'আলী (রা)। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! কিয়ামতের দিন আমি 'উছমান অথবা 'আলীর (রা) বিতর্কে জড়াতে চাইনে।
শা'বী এত বড় জ্ঞানী ও মর্যাদাবান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও অতি সাধারণ কোন মানুষের নিকটে শিক্ষণীয় কিছু থাকলে কখনো উপেক্ষা করতেন না। একজন মরুচারী বেদুঈন নিয়মিতভাবে তাঁর মজলিসে উপস্থিত থাকতো। কিন্তু সে কোন কথা বলতো না। চুপ করে শা'বী ও অন্যদের কথা শুনতো। একদিন শা'বী তাঁকে প্রশ্ন করলেন: আচ্ছা, তুমি কোন কথা বল না কেন? লোকটি বললো: আমি চুপ থাকি নিরাপদ থাকার জন্য, আর শুনি জানার জন্য। একজন মানুষের কানের অংশটি তার নিজের দিকে ফিরে আসে, আর তার জিহ্বার অংশটি অন্যের দিকে চলে যায়। বেদুঈন লোকটির এই উক্তিটি তিনি সারা জীবন আওড়িয়ে গেছেন।
শা'বী ছিলেন স্বভাবগতভাবে কোমল প্রকৃতির এবং ধৈর্যশীল। হাসান আল-বসরী (রহ) বলতেন, আল্লাহর কসম! শা'বী ছিলেন একজন জ্ঞানী ও ধৈর্যশীল প্রকৃতির মানুষ।
তিনি নিজের তিনটি গুণের কথা এভাবে বলেছেন: 'আমি কখনো এমন কোন জিনিস লাভের জন্য নিজের স্থান থেকে উঠিনি যার দিকে মানুষ তাকায়। আমার নিজের কোন দাস বা চাকর-বাকরকে কখনো মারিনি। আমার যে কোন আত্মীয়-বন্ধু ঋণ অবস্থায় মারা গেছে, আমি তার ঋণ পরিশোধ করেছি।'
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে খুব খারাপ ও অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে। তিনি কোন প্রত্যুত্তর না করে শুধু এতটুকু বলেন! তোমার কথায় যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক তাহলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আর যদি মিথ্যাবাদী হও তাহলে আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। একবার কৃষ্ণার আমীর 'উমার ইবন হুবাইরা একদল লোককে গ্রেফতার করেন। তিনি নিজে আমীরের সাথে দেখা করে বলেন: আপনি যদি অন্যায় ও অসত্যের ভিত্তিতে তাদেরকে গ্রেফতার করে থাকেন তাহলে সত্য তাদেরকে বের করে আনবে। আর যদি সত্যের ভিত্তিতে গ্রেফতার করে থাকেন তাহলে আপনার ক্ষমা তাদেরকে বেষ্টন করবে। তাঁর এমন চমৎকার উপস্থাপনায় আমীর দারুণ খুশী হন এবং তাঁর সম্মানে গ্রেফতারকৃত সকলকে মুক্তি দেন।
জ্ঞানের সাগর হওয়া সত্ত্বেও তিনি একজন হাসি-খুশী স্বভাবের দারুণ রসিক ও কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন। ইবন খাল্লিকান তাঁকে 'মায্যাহ' বা অতিরিক্ত কৌতুককারী বলে উল্লেখ করেছেন। হাস্য-রসিকতার উপাদান তাঁর স্বভাবে এত পরিমাণে ছিল যে, কথায় কথায় হাস্য-রসের সৃষ্টি করে মানুষকে হাসাতেন। তাঁর হাস্য-রসের অনেক কথা বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলো: আচ্ছা, ইবলীসের স্ত্রীর নাম কি? জবাবে তিনি বললেন, তার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম না। তাই আমার জানা নেই।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করলো, ব্যভিচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান কি তিনজনের মধ্যে (পিতা, মাতা ও সন্তান) সবচেয়ে বেশী খারাপ? জবাবে তিনি বললেন: যদি তাই হতো তাহলে ঐ সন্তান পেটে থাকতেই তার মাকে সংগেসার (প্রস্তারাঘাতে হত্যা) করা হতো। উল্লেখ্য যে, ব্যভিচারিণীর পেটে সন্তান থাকলে সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত তার সকল শাস্তি স্থগিত রাখার বিধান রয়েছে। একবার তিনি তাঁর স্ত্রীর সাথে বসে কথা বলছেন। এমন সময় হঠাৎ এক ব্যক্তি সেখানে এসে প্রশ্ন করলো: আপনাদের দু'জনের মধ্যে শা'বী কে? তিনি স্ত্রীর দিকে ইঙ্গিত করেন।
'আমর ইবন সা'ঈদ বর্ণনা করেছেন। আমি একবার শা'বীকে বললাম, আপনি আমার নিকট একটি হাদীছ বর্ণনা করেছিলেন। আমি সেটি এখন ভুলতে বসেছি। তিনি বললেন : কিছু অংশ বললে আমি বুঝতে পারবো সেটি কোন হাদীছ। আমি বললাম, কিছুই মনে নেই। শা'বী একটি হাদীছ শুনিয়ে বললেন, এটা না তো? বললাম: না। তিনি আরেকটি হাদীছ শুনিয়ে বললেন, সম্ভবত এটা হবে। আমি বললাম, এটাও না। অবশেষে তিনি একটি প্রেম সংগীতের একটি শ্লোক আবৃত্তি করে বলেন: সম্ভবত এটা হবে।
একবার ইরাকের আমীর হাজ্জাজ শা'বীকে প্রশ্ন করলেন : كم عطاءك في السنة বছরে আপনার ভাতা কত? এখানে মূলতঃ في السنة - কথাটি বলা ঠিক নয়। এ কারণে শা'বীও ভুল উত্তর দেন এবং ألفين বলেন। অর্থাৎ দু'হাজার। অথচ الفين এর স্থলে الفان বলা উচিত ছিল। তাঁর উত্তর শুনে হাজ্জাজ নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং কথাটি ঠিক করে বলেন : كم عطاؤك؟। এবার শা'বী الفان - বলেন। এবার হাজ্জাজ শা'বীকে বলেন, আপনি প্রথমে ভুল আরবীতে উত্তর দিলেন কেন? জবাবে তিনি বলেন, আমীর ভুল করেছিলেন। যখন আমীর ঠিক করে বলেন, তখন আমিও ঠিক করে বলেছি। আমীর ভুল বলবেন আর আমি শুদ্ধ বলবো, এমনটি হওয়ার তো সুযোগ ছিল না। হাজ্জাজ তাঁর কথায় দারুণ খুশী হন এবং তাঁকে পুরস্কৃত করেন।
একবার শা'বী তাঁর মজলিসে বসে শিষ্য-শাগরিদ ও বন্ধুদের সাথে ফিকাহ বিষয়ে আলোচনা করছেন। এক বৃদ্ধ শা'বীর পাশে অনেকক্ষণ বসে আছেন। এক সময় একটু ফাঁক পেয়ে শা'বীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন : আমি আমার নিতম্বে একটা ফোঁড়া হয়েছে বলে মনে করছি। এটাতে শিঙ্গা লাগানোর ব্যাপারে আপনি কি মনে করেন? সাথে সাথে শা'বী বলে ওঠেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي حَوَّلَنَا مِنَ الْفِقْهِ إِلَى الْحِجَامَةِ. সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাদেরকে ফিকাহ্ থেকে শিঙ্গার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
একবার তিনি এক দর্জিকে কৌতুক করে বলেন, আমার কাছে ভাঙ্গা প্রেম-প্রীতি আছে আপনি কি সেটা সেলাই করতে পারেন? দর্জিও ছিল তাৎক্ষণিক জবাব দানে পারঙ্গম। সে বলে, যদি আপনার কাছে বাতাসের সূতা থাকে তাহলে সেলাই করা যাবে।
السلام عليكم ورحمة الله - সালাম দেন। এক ব্যক্তি তাঁর এমন কাজের প্রতিবাদ জানায়। তিনি জবাব দেন এই বলে : যদি তার উপর আল্লাহর রহমত না হতো তাহলে সে ধ্বংস হয়ে যেত। তাহলে আমার رحمة الله বলাতে ভুল কোথায়?
তাঁর সমকালীনদের মধ্যে যাঁদের সাথে বেশী খোলামেলা ও অন্তরঙ্গতা ছিল হাস্য-রসিকতা করে তাদেরকে অস্থির করে তুলতেন। এ কারণে বন্ধুদের অনেকে তাঁর কাছে যেতেই ভয় করতেন। হাফস ইবন গিয়াছ একবার একটি মাসআলায় নিশ্চিত হওয়ার ব্যাপারে আল-আ'মাশকে বললেন, আপনি শা'বীর নিকট যাচ্ছেন না কেন? বললেন, আমি তাঁর কাছে কিভাবে যাব। তিনি আমাকে দেখা মাত্র ঠাট্টা করা আরম্ভ করেন। আমাকে বলবেন, তোমার যে চেহারা, এ কি কোন 'আলিমের চেহারা? এতো কোন তাঁতীর চেহারা, কিন্তু আমি যদি ইবরাহিমের নিকট যাই, তিনি আমাকে যথেষ্ট সম্মান ও সমাদর করেন।
উমাইয়্যা শাসনকালে শা'বীকে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত এবং জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবায় নিয়োজিত দেখা যায়। হাজ্জাজ তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। তাঁর বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেন, তাঁকে তাঁর গোত্রের নেতা বানান এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসাবে খলীফা আবদুল মালিকের দরবারে পাঠান। একবার সিজিস্তানের ওয়ালী রাতবীলের নিকট দূত হিসেবে পাঠান। সেখানে তিনি প্রচুর সম্মান ও উপহার-উপঢৌকন লাভ করেন।
'আবদুল মলিক ইবন মারওয়ান মুসলিম খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবন ইউসুফকে লিখলেন: 'দীন ও দুনিয়ার জন্য উপযুক্ত এমন একজন লোক আমার কাছে পাঠান যাকে আমি আমার সঙ্গী ও কথা বলার লোক হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।' হাজ্জাজ শা'বীকে পাঠালেন। আস্তে আস্তে তিনি খলীফার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে পরিগণিত হন। জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহে খলীফা তাঁর জ্ঞান ও মতামত থেকে উপকৃত হতে থাকেন। বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাদের নিকট তাঁর দূত হিসেবেও পাঠাতে থাকেন। একবার খলীফা তাঁকে দূত হিসেবে রোমান সম্রাট জাস্টিনিয়ানের নিকট পাঠান। তিনি রোমান সম্রাটের দরবারে পৌঁছে খলীফার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সম্রাট তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা ও প্রখর বুদ্ধিমত্তা দেখে অভিভূত হন এবং তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতা, জোরালো বাকপটুতা ও তাৎক্ষণিক প্রত্যুত্তর ক্ষমতা তাঁকে বিস্মিত করে। শা'বীর দূতিয়ালী শেষ হওয়ার পর সম্রাট বিদেশী দূতদের সাথে তাঁর স্বাভাবিক আচরণের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে তাঁকে আরো কিছু দিন নিজের কাছে রেখে দেন। কিছু দিন সম্রাটের সাথে কাটানোর পর তিনি দিমাশকে ফেরার অনুমতি দানের জন্য সম্রাটকে বার বার অনুরোধ জানাতে থাকেন। একদিন রোমান সম্রাট তাঁকে প্রশ্ন করলেন: আপনি আপনাদের দেশের রাজপরিবারের একজন সদস্য? জবাবে তিনি বললেন: না। আমি আমার দেশের সাধারণ মুসলমান নাগরিকদের একজন। একদিন সম্রাট তাঁকে দেশে ফেরার অনুমতি দিলেন। যাত্রাকালে তাঁকে বললেন: দেশে ফিরে আপনি যখন আপনার বন্ধুকে (আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান) আপনার দূতিয়ালীর সব কথা জানাবেন তখন তাঁকে এই চিঠিটি দিবেন।
শা'বী দিমাকে ফিরে এসে খলীফার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং জাস্টিনিয়ানের দরবারে যা কিছু শুনেছেন ও দেখেছেন তার বর্ণনা দিলেন। খলীফা তাঁকে যেসব প্রশ্ন করলেন তারও জবাব দিলেন। তারপর উঠার সময় খলীফাকে বললেন: আমীরুল মু'মিনীন, রোমান সম্রাট আপনাকে এই চিঠিটি দিয়েছেন। একথা বলে চিঠিটি খলীফার হাতে দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
খলীফা চিঠিটি পড়ার পর চাকরদের বললেন: শা'বীকে ফিরিয়ে আন। তারা তাঁকে ফিরিয়ে খলীফার কাছে নিয়ে গেল। তিনি শা'বীকে বললেন: আচ্ছা, এই চিঠির বিষয়বস্তু কি আপনার জানা আছে? শা'বী বললেন: আমীরুল মু'মিনীন, আমার জানা নেই। খলীফা বললেন: রোমান সম্রাট আমাকে লিখেছেন: আমি আরবদের ব্যাপারে বিস্মিত হয়েছি যে, তারা এই যুবক ছাড়া অন্য এক ব্যক্তিকে তাদের রাজা বানালো কিভাবে?
শা'বী খুব দ্রুত বললেন: আপনাকে দেখেননি, তাই একথা বলেছেন। দেখলে আর এমন কথা বলতেন না। আর আমি এই চিঠির মর্ম আগে জানতে পারলে নিয়ে আসতাম না। খলীফা শা'বীকে লক্ষ্য করে বললেন: রোমান সম্রাট চিঠিতে একথা লিখলেন কেন, তাকি জানেন? শা'বী জবাব দিলেন, আমীরুল মু'মিনীন, আমি জানিনে। খলীফা বললেন: তিনি এই লেখার দ্বারা আপনার প্রতি আমাকে ঈর্ষান্বিত করে তুলতে চেয়েছেন। ফলে আমি আপনাকে হত্যা করে আপনার থেকে মুক্ত হই, তাই বুঝাতে চেয়েছেন। একথা রোমান সম্রাটের কাছে পৌঁছলে তিনি মন্তব্য করেন: তাঁর পিতার সর্বনাশ হোক! আমি এছাড়া আর কিছুই বুঝাতে চাইনি।
উমাইয়্যা শাসকদের সাথে তাঁর এ সম্পর্ক বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। হাজ্জাজ ও 'আবদুল মালিকের বিরুদ্ধে ইবনুল আশ'আছের বিদ্রোহের সময় তিনি ইবনুল আশ'আছকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেন। এই ঘটনা সম্পর্কে তিনি নিজে বর্ণনা করেছেন যে, হাজ্জাজ আমাকে আমার গোত্রের, তথা গোটা হামাদান এলাকার দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন। আমার বেতনও নির্ধারণ করে দেন। ইবনুল আশ'আছের বিদ্রোহ ও সংঘাত-সংঘর্ষ পর্যন্ত তাঁর নিকট আমার একটা স্থান ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ইবনুল আশ'আছের বিদ্রোহ ও বিপ্লবের এক পর্যায়ে কূফার কারীদের (কুরআনের পাঠ বিশেষজ্ঞ) পক্ষ থেকে কিছু লোক আমার কাছে এসে বলেন: আপনি হলেন কারীদের নেতা। আপনি আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁরা এত পীড়াপীড়ি করলেন যে, আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম। রণক্ষেত্রে সৈন্যদের সারির মধ্যে দাঁড়িয়ে হাজ্জাজের দোষ-ত্রুটি ও অপকর্মের বর্ণনা করে সৈন্যদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ক্ষেপিয়ে তুলতাম।
'দিয়ারে জামাজিম' যুদ্ধে ইবনুল আশ'আছের শোচনীয় পরাজয় হয় এবং তাঁর বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এ সময় শা'বী আত্মগোপন করেন। একটি বর্ণনা এমন আছে যে, তিনি হাজ্জাজের ঘাতক বাহিনীর ভয়ে একাধারে নয় মাস ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন। নয় মাস পরে কুতাইবা ইবন মুসলিম খুরাসানে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন এবং মানুষকে তাঁর বাহিনীতে যোগদানে উৎসাহিত করার জন্য ঘোষণা দেন যে, কোন ব্যক্তি এই বাহিনীতে ভর্তি হলে তার অতীতের সকল অপরাধ ক্ষমা করা হবে। এই ঘোষণার পর শা'বী কুতাইবার এই বাহিনীতে যোগ দেন। তিনি ফারগানা পৌঁছলেন। কুতাইবা তাঁকে চিনতেন না। একদিন কুতাইবা সৈনিকদের একটি সাধারণ মজলিসে বসে আছেন। তখন শা'বী তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে জ্ঞান চর্চার সাথে নিজের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়ে বলেন, এ ব্যাপারে আমি আপনার সেবায় লাগতে পারি। কুতাইবা প্রশ্ন করলেন, আপনি কে? কুতাইবা শা'বীকে চাক্ষুস না দেখলেও নামে চিনতেন। এ কারণে, শা'বী তাঁর প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। কুতাইবাও আর তা জানার জন্য বেশী পীড়াপীড়ি করলেন না। তাঁর অগ্রাভিযানের বিস্তারিত খবর মাঝে মাঝে লিখে হাজ্জাজকে জানাতে হতো। তখন তিনি শা'বীকে তার একটা খসড়া তৈরীর নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, খসড়া তৈরীর প্রয়োজন নেই। তিনি সেখানে বসেই মৌখিক ডিকটেশন দিয়ে সুন্দর একটা রিপোর্ট লিখিয়ে দেন। এই রিপোর্ট কুতাইবার খুব পছন্দ হয়। বিনিময়ে তিনি শা'বীকে একটি খচ্চর ও দামী চাদর উপহার দেন। এরপর থেকে খুব সম্মান ও মর্যাদার সাথে তাঁর দিনগুলো কাটতে থাকে। কুতাইবা তাঁকে সাথে নিয়ে একই দস্তরখানায় বসে রাতের খাবার খেতেন。
শা'বীর রচনা-রীতির সাথে হাজ্জাজ পরিচিত ছিলেন। কুতাইবার পাঠানো রিপোর্টটি দেখে তিনি সহজেই বুঝতে পারলেন যে, এর লেখক শা'বী ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। তাই তিনি সেই মুহূর্তে কুতাইবাকে লিখলেন যে, তোমার এই রিপোর্টের লেখক শা'বী। তাঁকে এখনই গ্রেফতার কর। যদি তিনি পালিয়ে যান তাহলে তোমাকে পদচ্যুত করে তোমার হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে দিব। হাজ্জাজের এ আদেশ পাঠ করে কুতাইবা শা'বীকে বললেন, আপনি এখনো আমার কাছে অপরিচিত। আপনি সম্পূর্ণ স্বাধীন। আপনি যেখানে যেতে চান, চলে যান। আমি হাজ্জাজের সামনে যত রকমের কসম খাওয়ার প্রয়োজন হয়, কসম খাব। শা'বী বললেন, আমি যেখানেই চলে যাই না কেন, আমার মত মানুষ গোপন থাকতে পারে না। কুতাইবা বললেন, কি করলে ভালো হবে সেটা আপনিই ভালো বুঝবেন। মোটকথা, শা'বীর আত্মগোপনের অস্বীকৃতির প্রেক্ষিতে কুতাইবা তাঁকে হাজ্জাজের নিকট পাঠিয়ে দেন। ওয়াসিত নগরের কাছাকাছি পৌঁছে তাঁর হাত-পায়ে বেড়ী লাগানো হয়। কৃষ্ণা পৌঁছার পর ইয়াযীদ ইবন আবূ মুসলিম তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। তিনি তাঁকে বলেন, আবূ 'আমর! যখন আপনাকে হাজ্জাজের সামনে উপস্থাপন করা হবে তখন আপনি তাঁর সাথে এভাবে আচরণ করবেন এবং এই এই কথা বলবেন আশা করা যায় আপনার জীবন বেঁচে যাবে। অতঃপর বেড়ী বাঁধা অবস্থায় তাঁকে হাজ্জাজের সামনে হাজির করা হয়।
অপর একটি বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে এসেছে 'দিয়ারে জামাজিম' যুদ্ধের পর শা'বী দীর্ঘদিন যাবত আত্মগোপন করে থাকেন। এ অবস্থায় তিনি ইয়াযীদ ইবন আবূ মুসলিমকে লেখেন যে, আপনি হাজ্জাজের সাথে আমার একটা আপোসরফার ব্যবস্থা করুন। জবাবে তিনি বলেন, আমার এত দুঃসাহস নেই। আমার পরামর্শ হলো, আপনি নিজেই চলে আসুন এবং সাধারণ মানুষের সাথে বৈঠকের সময় হঠাৎ আমীরের সামনে উপস্থিত হয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আমি এতটুকু অঙ্গীকার করছি যে, আপনি যে কোন বিষয় ও ব্যাপারে আমাকে সাক্ষী মানলে আপনাকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য দিব।
শা'বী এই পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। একদিন হঠাৎ হাজ্জাজের সামনে উপস্থিত হন। হাজ্জাজ দেখেই বলে ওঠেন- ভাই শা'বী যে! তারপর হাজ্জাজ তাঁর সামনে তাঁর প্রতি কৃত অতীতের সকল অনুগ্রহ ও অনুকম্পার কথা একটি একটি করে গুনতে থাকেন। আর শা'বীও সব কথা স্বীকার করে চলেন। শেষে হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করেন, আপনি 'আদুওউর রহমান অর্থাৎ রহমানের শত্রু (আবদুর রহমান ইবন আশ'আছ)-এর সংগে গেলেন কেন? শা'বী নিজের ভুল স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করেন। হাজ্জাজ তাঁকে ক্ষমা করে দেন।
হযরত 'উমার ইবন 'আবদুল 'আযীযের (রা) খিলাফতকালে কুফার ওয়ালী ইবন হুবাইরা শা'বীকে কাজী নিয়োগ করেন। ইবন হুবাইরা তাঁকে নৈশ আলাপের সঙ্গী করতে চান। শা'বী বলেন: আমাকে হয় বিচার কাজ অথবা নৈশ আলাপ- যে কোন একটির দায়িত্ব দিন।
হিজরী ১০৩, মতান্তরে ১০৪ সনে তিনি আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। অনেকের মতে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল সাতাত্তর (৭৭) বছর। তবে সাতাত্তর বছরের এ মতটি সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ, তিনি নিজেই বলতেন, আমি হিজরী ১৭ সনে সংঘটিত জাল্লা' যুদ্ধের বছর জন্মগ্রহণ করি। হিজরী ১০৩ অথবা ১০৪ সনে মৃত্যুবরণ করলে তিনি আশি বছরের ঊর্ধ্বে জীবন লাভ করেছিলেন। আর একথাই বলেছেন, ডক্টর আবদুর রহমান রা'ফাত আল-বাশা। তাঁর মৃত্যুর খবর হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) নিকট পৌঁছলে তিনি মন্তব্য করেন : 'আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া করুন! তিনি ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী এবং সীমাহীন ধৈর্যশীল এক মানুষ ছিলেন। তিনি ইসলামের এক বিশেষ মর্যাদার স্থানে অবস্থান করছেন।
শা'বী যখন কাজী তখন একদিন তাঁর দরবারে একজন পুরুষ ও তার স্ত্রী তাদের ঝগড়া- কলহের নিষ্পত্তির জন্য এলো। স্ত্রী ছিল পরমা সুন্দরী। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করলো। স্ত্রী তার বক্তব্যের সপক্ষে শক্তিশালী যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করলো। শা'বী স্বামীকে বললেন : তোমার স্ত্রীর যুক্তি-প্রমাণ খণ্ডন করার মত তোমার কোন কিছু আছে কি? লোকটি তখন নিম্নের শ্লোকগুলো আবৃত্তি করতে আরম্ভ করলো:
فُتِنَ الشَّعْبِيُّ لَمَّا رَفَعَ الطَّرْفَ إِلَيْهَا فَتَنَتْهُ بِدَلال بِخَطَّيْ حَاجِبَيْهَا قَالَ لِلْجِلْوَازِ قَرَّبْ بها وَاحْضُرْ شَاهِدَيْهَا فَقَضَى جَوْرًا على الخصم وَلَمْ يَقْضِ عَلَيْهَا كَيْفَ لَو أَبْصَرَ مِنْهَا نَحْرَهَا أَوْسَاعِدَيْهَا سَاجِدًا بَيْنَ يَدَيْهَا. لَصَبَا حَتَّى تَرَاهُ
- শা'বী যখন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করেছে, মুগ্ধ হয়ে গেছে। - সে তাকে আকৃষ্ট করেছে তার দু'ভুরুর দু'টি রেখার মন-ভোলানো সঞ্চালন দ্বারা। - তিনি পুলিশকে বলেন, মহিলাকে নিকটে নিয়ে এসো এবং তার দু' সাক্ষীকে উপস্থিত কর। - তিনি মহিলার বিরুদ্ধে রায় না দিয়ে তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রায় দিলেন। - তিনি যদি তার বুক ও বাহু দু'খানি দেখতেন তাহলে কি করতেন? - তিনি তার প্রতি এত প্রেমাসক্ত হয়ে পড়তেন যে, তুমি তাঁকে মহিলার সামনে সিজদাবনত অবস্থায় দেখতে পেতে।
শা'বী বলেছেন, এ ঘটনার পর একবার আমি খলীফা আবদুল মালিকের নিকট গেলাম। তিনি আমাকে দেখা মাত্র একটু হেসে দিয়ে এই কবিতার প্রথম শ্লোকটি আবৃত্তি করে আমাকে প্রশ্ন করেন : এই শ্লোকগুলোর আবৃত্তিকারীর সাথে আপনি কেমন আচরণ করেছিলেন। আমি বললাম : হে আমীরুল মু'মিনীন! এজলাসের মধ্যে আমার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং আমার প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার কারণে আমি তাকে বেত্রাঘাতের শাস্তি দিয়েছি। খলীফা মন্তব্য করলেন: আপনি ঠিক কাজটি করেছেন。
শা'বীর বহু উপদেশমূলক বাণী বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকতে দেয়া যায়। যেমন তিনি বলতেন: দুনিয়াও আমাদের দৃষ্টান্ত আমি এই ছাড়া আর কিছু দেখি না, যেমন কবি কুছায়িয়র ইবন 'আয্যাহ্ বলেছেন: أسين بِنَا أَو أَحْسِنِي لَأَمَلُوْمَةً + لَدَيْنَا وَلَا مَقْلِيَّةً إِنْ تَقَلْتِ. আমাদের সাথে খারাপ অথবা ভালো আচরণ যাই কর না কেন, আমরা তিরস্কার করবো না। আর তুমি ঘৃণা করলেও আমরা ঘৃণা করবো না।"
তিনি বলতেন, সত্য ও সততাকে সব সময় ধারণ করবে। যেখানে দেখবে এতে তোমার ক্ষতি হচ্ছে, আসলে তাতে তোমার লাভ হবে। আর মিথ্যাকে সব সময় পরিহার করবে। কোথাও হয়তো দেখবে মিথ্যা বলাতে তোমার লাভ হচ্ছে, আসলে তা তোমার ক্ষতি করবে।
আশ-শা'বী অনেক উপদেশমূলক প্রতীকী গল্প-কাহিনীও বলতেন। ইমাম আল-আসমা'ঈ বলেন: শা'বী বলতেন, বনী ইসরাইলে একজন মূর্খ 'আবিদ ব্যক্তি ছিল। সে দুনিয়ার সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে একটি গির্জায় বৈরাগ্য জীবন যাপন করতো। তার একটি গাধা ছিল। গাধাটি গির্জার চত্বরে চরতো, আর সে গির্জায় বসে বসে পাহারা দিত। একদিন দেখে গাধাটি চরছে, তখন সে আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে বলতে থাকে হে আমার প্রতিপালক! তোমার যদি একটা গাধা থাকতো তাহলে আমি আমার গাধার সাথে সেটি চরাতে পারতাম। তাতে আমার কোন কষ্ট হতোনা। একথা সে যুগে তাদের সম্প্রদায়ে যে নবী ছিলেন তাঁর কানে গেল। তিনি 'আবিদের প্রতি খুব বিরক্ত হলেন। আল্লাহ তা'আলা তখন নবীকে ওহীর মাধ্যমে বললেন, তাকে তার অবস্থায় ছেড়ে দাও। প্রত্যেকটি মানুষকে তার বুদ্ধি অনুযায়ী প্রতিদান দেওয়া হবে।
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮০; সিয়ারুত তাবি'ঈন-২১০
২. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮۴; তাবাকাত-৬/১৮২
৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৭২
৪. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২৩১; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮০
৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৬৭
৬. তাবাকাত-৬/১৭২
৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৯
৮. শাজারাত আয-যাহাব-১/১২৬
৯. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৬৯
১০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৫
১১. প্রাগুক্ত-১/৮৩
১২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/২১৯
১৩. তাবাকাত-৬/১৭৩
১৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৪২
১৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮২
১৯. প্রাগুক্ত-১/৮৮
২০. প্রাগুক্ত-১/৮৫
২১. তাবাকাত-৬/১৭৭
২২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮২
২৩. প্রাগুক্ত-১/৮৩
২৪. তাবাকাত-৬/১৭৪
২৫. তাহযীব আত-তাহযীব-৫/৬৬; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৭৪
২৬. 'উকাশা ইবন মিহসান (রা) একজন বিশিষ্ট সাহাবী। যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রথম খলীফার সময়কালে সংঘটিত রিদ্দার যুদ্ধে শহীদ হন। (আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৮)
২৭. 'আবদুল্লাহ ইবন জাহ্শ (রা) সামরিক অভিযানে নেতৃত্বদানকারী একজন সাহাবী। উম্মুল মু'মিনীন হযরত যয়নাব বিন্ত জাহশের (রা) ভাই।
২৮. হিজরী ৬ষ্ঠ সনে হুদায়বিয়াতে সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের পূর্বে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে এ বাই'আত অনুষ্ঠিত হয়।
২৯. সওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৭৪-১৭৬
৩০. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮১, ৮৭
৩১. তাবাকাত-৬/১৭৪; আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/২১৭
৩২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮১
৩৩. তাবাকাত-৬/১৭৪;
৩৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৫
৩৫. তাবাকাত-৬/১৭৪
৩৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৫
৩৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/২২০
৪৪. তাবাকাত-৬/১৭৫, ১৭৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮২
৪৫. তাহযীবুত তাহযীব-৫/৬৬
৪৬. প্রাগুক্ত-৫/৬৭
৪৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৪২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮২
৪৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৫১
৪৯. তাবাকাত-৬/১৭৩
৫০. 'রাফিজী' শব্দটি আরবী "رفض" শব্দ থেকে নির্গত, যার অর্থ পরিত্যাগ করা, প্রত্যাখ্যান করা। যেহেতু এই দলের লোকেরা আবূ বাক্স (রা) ও 'উমারকে (রা) এবং তাঁদের দু'জনের খিলাফতকে যাঁরা সঠিক বলে মানেন, তাঁদের সকলকে পরিত্যাগ ও প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাই তাদেরকে রাফিজী বলা হয়। (আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-২/৪০৪)
৫১. প্রাগুক্ত-২/৪০৯-৪১০
৫২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৯৪
৫৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৮১
৫৪. প্রাগুক্ত-২/২৭৮; শাযারাত আয-যাহাব-১/৭৮
৫৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/২৮৩
৫৬. 'উয়ূন আল-আখবার-১/২৬১-২৬২
৫৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৩০২
৫৮. প্রাগুক্ত-২/১৯৬, ১৯৭, ১৯৯
৫৯. প্রাগুক্ত-২/৬৩; 'উয়ূন আল-আখবার-২/১০
৬০. আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২৮৩
৬১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৯৩
৬২. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৬/৩৩৫
৬৩. 'উমার ফাররূখ-১/৩৪৬
৬৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৯৮
৬৫. প্রাগুক্ত-১/২০২, ২/৭৬; আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/২৭৯, ৪/৪১৫
৬৬. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৮৮
৬৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮২
৬৮. তাবাকাত-৬/১৭৩
৬৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৭০. প্রাগুক্ত-১/৮৪-৮৫
৭১. আল-'ইকদ আল ফারীদ-২/১৭৭, ৫/৩২, ৫৫; জামহারাতু খুতাব আল-'আরাব-২/৩৪৪
৭২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৮
৭৩. প্রাগুক্ত-১/৮৪
৭৪. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১৮২
৭৫. ইমাম আছ-ছা'আলিবী এই ঘটনাটি তাঁর 'আত-তামহীল ওয়াল মুহাদারা' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং কবিতাটি আল-মুতাওয়াক্কিল আল-লায়ছীর প্রতি আরোপ করেছেন। (আল-'ইদ আল-ফারীদ-১/৯১, টীকা-৯)
৭৬. প্রাগুক্ত-১/৯১-৯২
৭৭. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৭৬; 'উয়ুন আল-আখবার-২/৭০৪
৭৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৯৯
৭৯. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৬/১৬৪
📄 কাজী শুরায়হ (রহ)
আবূ উমাইয়্যা শুরায়হ-এর পিতার নাম আল-হারিছ ইবন কায়স। তাঁর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ মারতা' ইবন কিন্দাহ্। তাই তিনি কিন্দী হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর নসবনামার উপরের দিকের কিছু নামের ব্যাপারে কিছুটা মতপার্থক্য আছে। একটি বর্ণনা এমনও আছে যে, শুরায়হ আরব বংশজাত ছিলেন না। বরং তিনি ঐসব অনারব খান্দানের লোক ছিলেন যারা কিন্দাহ্র সাথে মৈত্রীচুক্তি করে ইয়ামনে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে।
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবদ্দশায় হযরত শুরায়হ-এর জন্ম হয়। কোন কোন বর্ণনা মতে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। কিন্তু এসব বর্ণনা সঠিক নয়। সেই সময়ে তিনি মুসলমান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তবে হযরত রাসূলে পাকের দীদার লাভের পরম সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত থেকে যান। আল্লামা ইবন হাজার আল-'আসকালানী একথাই বলেছেন। তিনি লিখেছেন, চার খলীফার যুগে শুরায়হ-এর জীবনের অনেক তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এমন কোন ঘটনা দেখা যায় না যা দ্বারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর সাক্ষাৎ প্রমাণিত হয়। ইবন সা'দ, ইবন 'আবদিল বার সহ আরো অনেক সীরাত বিশেষজ্ঞ এমন কথাই বলেছেন। তাঁরা শুরায়হকে তাবি'ঈদের মধ্যে গণ্য করেছেন। তবে তাবি'ঈদের মধ্যে তিনি ছিলেন বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসে একজন বিখ্যাত কাজী।
হযরত শুরায়হ (রহ) রাসূলুল্লাহর (সা) বহু সাহাবীর সাক্ষাৎ ও সাহচর্য লাভ করেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন স্বভাবগতভাবে তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। এ কারণে জ্ঞানের দিক দিয়ে তিনি তাঁর সমকালীনদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার স্থান লাভ করেন। ইমাম নাওবী বলেন : শুরায়হর মেধা, বিশ্বস্ততা, দীনদারী, মহত্ত্ব ও মর্যাদা এবং তাঁর বর্ণনাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সবাই একমত। হাফেজ সাফি'উদ্দীন খাযরাজী লিখেছেন যে, তিনি ছিলেন অতি মর্যাদাবান ও তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন 'আলিমদের একজন।
সেকালে বসরায় বহু খ্যাতিমান হাফেজে হাদীছ ছিলেন। তিনিও ছিলেন তাঁদের একজন। হযরত 'উমার, 'আলী, 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ, যায়দ ইবন ছাবিত (রা) প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবীর নিকট থেকে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। ইমাম শা'বী, আবূ ওয়ায়িল কায়স ইবন আবী হাযিম, ইবন সীরীন, 'আবদুল 'আযীয ইবন রাফী', মুজাহিদ ইবন জুবায়র, 'আতা' ইবন সায়িব, আনাস ইবন সীরীন, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ (রহ)-এর মত ইমামগণ ছিলেন তাঁর হাদীছের ছাত্র।
হযরত শুরায়হ যদিও হাদীছের হাফেজ ছিলেন তথাপি তাঁর পঠন-পাঠনের বিশেষ শাস্ত্র ছিল ফিকাহ্। ইমাম যাহাবী, ইবন হাজার ও অন্যরা ফিকাহকে তাঁর বিশেষ শাস্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর নামের সাথে 'ফকীহ্' উপাধিটি লিখেছেন। তিনি ফিকাহ্ শাস্ত্রের কেন্দ্রস্থল কূফার ইফতা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
হাদীছ ও ফিকাহ্ শাস্ত্র ছাড়াও তৎকালীন আরবে বহুল প্রচলিত ইলমে কিয়াফা (হস্তরেখা বিদ্যা) ও কাব্য শাস্ত্রে তাঁর বুৎপত্তি ছিল। কাব্য শাস্ত্রে তাঁর বুৎপত্তি এত পরিমাণ ছিল যে, একবার তিনি তাঁর একটি বিচারের রায় কবিতায় দান করেন। ঘটনাটি এই রকম। এক মহিলার স্বামী একটি পুত্র সন্তান রেখে মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর সে দ্বিতীয় বিয়ে করে। সে ছেলেকে নিজের কাছে আটকে রাখে এবং তার অভিভাবকত্বের দাবীতে অটল থাকে। আর মহিলার শ্বাশুড়ী অর্থাৎ ছেলেটির দাদীর দাবী ছিল, যেহেতু ছেলের মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, তাই ছেলের অভিভাবকত্ব সে পেতে পারে না। দাদী তার দাবী একটি কবিতায় এভাবে উপস্থাপন করে:
يا أبا أمية أتيناك اتاك ابنى وأماه تزوجت فها تيه وأنت المرأ نأتيه وكلتا نا نفديه ولا يذهب بك التيه فلو كنت تایمت مما نازعتني فيه ألا يا ايها القاضي هذه قصتى فيه
আবূ উমাইয়্যা! আমরা ন্যায়বিচার লাভের উদ্দেশ্যে আপনার নিকট এসেছি। আপনি এমন এক ব্যক্তি যাঁর নিকট আমরা এসে থাকি।
আমার পুত্র (পৌত্র) ও তার মা আপনার নিকট এসেছে এবং আমরা উভয়ে তার জন্য উৎসর্গকৃত।
(পুত্রবধূকে লক্ষ্য করে) যখন তুমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছো তখন ছেলেকে আমার নিকট দিয়ে দাও। বাড়াবাড়ি করো না।
দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের পর তুমি তার ব্যাপারে আমার সাথে বিবাদ করছো কেন?
(কাজী সাহেবকে লক্ষ্য করে) ওহে কাজী, ছেলের ব্যাপারে আমাদের দুইজনের কাহিনী এটাই।
পুত্রবধূ শ্বাশুড়ীর দাবীর প্রেক্ষিতে নিম্নের এ জবাব দেয়:
يا ايها القاضي قد قالت لك الجده وقولا فاسمتع منى اعزى لنفسي عن ابنى ولا تبطرنى رده وكبدى حملت كبده فلما كان في حجري يتيما ضائعا وحده تزوجت رجاء والخير من يكفينى فقده ومن يكفل لى رفده. ومن يظهرلى وده
ওহে কাজী! দাদী অর্থাৎ আমার শ্বাশুড়ী আপনাকে তাঁর কথা বলেছেন। এখন আমার কিছু কথাও আপনি শুনুন এবং তা প্রত্যাখ্যান করবেন না। আমি আমার ছেলের দ্বারা নিজের অন্তরকে সান্ত্বনা দেই। আমি সব সময় তার কলিজার সাথে আমার কলিজা লাগিয়ে রাখি। বৈধব্য জীবনে আমার কোলে একাকীত্বের কারণে তার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশংকা ছিল, এ কারণে তার কল্যাণ এবং তার তত্ত্বাবধানের উদ্দেশ্যে আমি এমন এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছি যে তাকে ধ্বংস হতে দেবে না এবং তার অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
যেহেতু শ্বাশুড়ী ও পুত্রবধূ দু'জনই কবিতায় তাদের দাবী ও বক্তব্য উপস্থাপন করে। এ কারণে কাজী শুরায়হও কবিতায় তাঁর রায় ঘোষণা করেন। তিনি বলেন:
قد فهم القاضي ما قلتما بقضاء بين بينكما وقضى بينكما ثم فصل وعلى القاضي جهد أن عقل وخذى ابنك من ذات العلل قال لجده بيني بالصبي انها لوصبرت كان لها قبل دعواها تبغيها البدل
তোমরা দু'জন যা কিছু বলেছো কাজী তা বুঝতে পেরেছেন এবং তোমাদের দু'জনের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফায়সালা দান করেছেন। যদি কাজী বুদ্ধিমান হন তাহলে সত্য উদঘাটনের জন্য তাঁর চেষ্টা করা ফরজ। তিনি দাদীকে বলছেন, ছেলেকে এই বাহানার আশ্রয় গ্রহণকারী মার নিকট থেকে নিয়ে পৃথক হয়ে যাও। যদি সে দ্বিতীয় বিয়ে না করতো, ছেলে তার কাছেই থাকতো।
বর্ণিত হয়েছে, কাজী শুরায়হর দশ বছর বয়সী একটি ছেলে খেলাধুলার প্রতি ভীষণ আসক্ত ছিল। ফলে পড়া-লেখার প্রতি ছিল দারুণ অমনোযোগী। একদিন সে স্কুল থেকে পালিয়ে কুকুর নিয়ে খেলতে শুরু করে। বাড়ীতে ফিরে এলে জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কি নামায পড়েছো? সে জবাব দেয় : না। তখন কাজী সাহেব কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে যান। ছেলেকে কিভাবে শিক্ষা দিতে হবে সে কথা কবিতায় সুন্দর করে তুলে ধরেন।
একজন কাজীর জন্য যেসব গুণ ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয় তার সবই শুরায়হর সত্তায় পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধাবী, বিচক্ষণ, চালাক ও ভীষণ সমঝ-বুঝের অধিকারী মানুষ। জটিল থেকে জটিলতর এবং মারাত্মক প্রতারণামূলক বিষয়েরও একেবারে গভীরে গিয়ে সত্য বের করে আনতেন। এসব গুণ তাঁর মধ্যে বিচার-ফায়সালার চূড়ান্ত যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল। হযরত রাসূলে কারীম (সা) যে 'আলীর (রা) প্রশংসায় বলেছেন : أَقضَاهُمْ عَلَى তাদের মধ্যে 'আলী সবচেয়ে বড় কাজী। সেই 'আলী (রা) শুরায়হর সম্পর্কে বলেছেন- أقضى القرب - তিনি আরবের সবচেয়ে বড় কাজী।
কাজী হিসেবে নিয়োগ লাভের পূর্বেই তিনি বিচার কার্যের যোগ্যতা ও দক্ষতার জন্য প্রসিদ্ধি অর্জন করে ফেলেছিলেন। মানুষ তাদের বিভিন্ন বিবদমান বিষয়ে তাকে সালিশ নিয়োগ করতো। আর এরই প্রেক্ষিতে হযরত 'উমার (রা) তাঁর রায় দেখে তাঁকে কৃফার কাজী নিয়োগ করেন। ঘটনাটি এ রকম : হযরত 'উমার (রা) এক ব্যক্তির নিকট থেকে এই শর্তে একটি ঘোড়া ক্রয় করলেন যে, ঘোড়ার চলন ও আচরণ পরীক্ষা করে পছন্দ হলে নিবেন, অন্যথায় ফেরত দিবেন। তারপর পরীক্ষার জন্য তিনি ঘোড়াটিকে একজন দক্ষ সোয়ারীর হাতে দেন। সোয়ারী চালানোর সময় হোঁচট খেয়ে ঘোড়াটি দাগী হয়ে যায়। হযরত 'উমার (রা) ঘোড়াটি ফেরত দিতে চান, কিন্তু ঘোড়ার মালিক তা ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে উভয়ের মধ্যে বিবাদ দেখা দেয়। অবশেষে শুরায়হকে সালিশ মানা হয়। তিনি এই রায় দেন যে, যদি ঘোড়ার মালিকের অনুমতি নিয়ে সোয়ারী করা হয়ে থাকে তাহলে ঘোড়া ফেরত দেওয়া যেতে পারে, অন্যথায় নয়।
অপর একটি বর্ণনায় ঘটনাটি এভাবে এসেছে যে, পরীক্ষামূলক চালনার সময় ঘোড়াটি মারা যায়। এ অবস্থায় হযরত 'উমার (রা) মৃত ঘোড়টি মালিককে ফেরত দিতে চান। এতে বিবাদ দেখা দেয়। মীমাংসার জন্য শুরায়হ সালিশ মনোনীত হন। তিনি রায় দেন এভাবে : যা ক্রয় করা হয়েছে তা নিতে হবে, অথবা যে অবস্থায় গ্রহণ করা হয়েছে সেই অবস্থায় ফেরত দিতে হবে। এই রায়ের পর 'উমার (রা) মন্তব্য করেন : 'বিচার তো একেই বলে। সঠিক সিদ্ধান্ত, যার মধ্যে কোন ভুল-ভ্রান্তি নেই।' এই বিচারের পর হযরত 'উমার (রা) তাঁকে কৃষ্ণার কাজী নিয়োগ করেন।
ইমাম শা'বী বলেন: 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) নিয়োগকৃত ইরাকের প্রথম কাজী ছিলেন সালমান ইবন রাব'আ আল-বাহিলী। তিনি কাদিসিয়া যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং তথাকার কাজী হন। তারপর তাঁকে মাদায়েনের কাজী নিয়োগ করা হয়। কিছু দিন পর 'উমার (রা) তাঁকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে আবূ কুররা আল-কিন্দীকে নিয়োগ করেন। তারপর কৃষ্ণা শহরের পত্তন হলে আবূ কুররা হন তথাকার কাজী। তারপর 'উমার (রা) শুরায়হ ইবন আল-হারিছ আল-কিন্দীকে আবূ কুররার স্থলে কাজী হিসেবে নিয়োগ দেন। তারপর ষাট বছর যাবত সেখানে তিনি কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। মাখঝানে এক বছরের জন্য যিয়াদ তাঁকে বসরায় পাঠান এবং তাঁর স্থলে মাসরূক ইবন আল-আজদা' কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। শুরায়হ ফিরে এলে আবার তাঁকে কৃষ্ণার কাজী নিয়োগ করা হয় এবং 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সংঘাত-সংঘর্ষ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কৃষ্ণা আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) নিয়ন্ত্রণাধীন থাকার সময় তিনি স্বেচ্ছায় কাজীর দায়িত্ব হতে অব্যাহতি নেন। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) অন্য এক ব্যক্তিকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন এবং তিনি তিন বছর কৃষ্ণার বিচার কাজ পরিচালনা করেন। ইবন যুবায়র (রা) নিহত হওয়ার পর শুরায়হ আবার কূফার কাজী হন। তিনি কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এ সময় একদিন এক ব্যক্তি পথে কাজী শুরায়হর সঙ্গে দেখা করে বললো: আল্লাহর কসম! আবূ উমাইয়্যা, আপনি অন্যায়ভাবে বিচার করছেন। তিনি জানতে চাইলেন কিভাবে? লোকটি বললো: আপনার বয়স অনেক হয়েছে, আপনার বুদ্ধি-জ্ঞানে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে এবং আপনার ছেলে ঘুষ খায়। সুরায়হ বললেন: ঠিক আছে, তোমার পরে আমাকে আর কেউ একথা বলতে পারবে না। এপর হাজ্জাজের নিকট আসেন এবং বলেন: আল্লাহর কসম! আমি আর বিচারকের দায়িত্ব পালন করবো না। হাজ্জাজ বললেন: আপনার স্থলে অন্য এক ব্যক্তিকে নির্বাচন করে না দেওয়া পর্যন্ত আমি আপনাকে অব্যাহতি দেব না। শুরায়হ বললেন: আপনি আবূ বুরদা ইবন আবী মূসাকে নিয়োগ করুন। তিনি একজন ভদ্র ও পরিচ্ছন্ন মানুষ। হাজ্জাজ তাঁকে শুরায়হর স্থলে নিয়োগ করেন এবং তাঁর সহযোগী ও সেক্রেটারী হিসেবে নিয়োগ করেন সা'ঈদ ইবন যুবায়রকে।
কাজী শুরায়হ এমন যোগ্যতা, দক্ষতা, চমৎকার পদ্ধতি ও আমানতাদীর সাথে তাঁর এ দায়িত্ব পালন করেন যে, হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকাল থেকে নিয়ে উমাইয়্যা খলীফা 'আবদুল মালিকের সময়কাল পর্যন্ত একাধারে প্রায় ষাট বছর যাবত কাজীর পদে বহাল থাকেন। এ দীর্ঘ সময়ে অনেক বড় বড় বিপ্লব ও ঘটনাবলী সংঘটিত হয়, খিলাফতে রাশেদার সোনালী যুগের সমাপ্তির পর উমাইয়্যা রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, উমাইয়্যা শাসক ও 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। মোটকথা, গোটা ইসলামী দুনিয়ায় এক বিপ্লব ঘটে যায়। এত কিছু সত্ত্বেও শুরায়হ যথারীতি কাজীর পদে বহাল থাকেন। 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) ও 'আবদুল মালিকের মধ্যে যুদ্ধের সময় মাত্র কয়েকটি বছরের জন্য নিজেকে বিচার কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।
খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি কাজী শুরায়হকে একটি দিকনির্দেশনামূলক চিঠি লেখেন। তাতে তিনি বলেন: 'বিচার কাজ চলাকালে কারো প্রতি ইঙ্গিত করবে না, কারো প্রতি ভ্রুকুটি করবে না, কারো ক্ষতি করবে না, কোন কিছু ক্রয়-বিক্রয় করবে না, এবং উত্তেজিত অবস্থায় বিচার কাজে বসবে না।
একজন কাজীর সবচেয়ে বড় কর্তব্য এবং সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, তিনি বিচারের ক্ষেত্রে বাইরের ও ভিতরের কোন প্রকার প্রভাবে প্রভাবিত হবেন না এবং কোন অবস্থাতেই সত্য ও ন্যায় বিচার থেকে দূরে ছিটকে পড়বেন না। শুরায়হর মধ্যে এ গুণ এত পরিমাণ ছিল যে, তিনি আইন, সত্য ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে কারো পরোয়া করতেন না- তা সে যত বড় ক্ষমতাধর ব্যক্তিই হোক না কেন। একজন অতি সাধারণ মানুষের সাথে আমীরুল মু'মিনীন 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) বিবাদে তিনি যে ঐতিহাসিক রায়টি দান করেছিলেন তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। যদি তাঁর ছেলেও আইনের আওতায় পড়ে যেত, তাকেও কোন রকম রেহাই দিতেন না। একবার তাঁর এক ছেলে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিনদার হয়। উক্ত ব্যক্তি জামিন পেয়ে ফেরার হয়ে যায়। কাজী শুরায়হ তার জামিনদার নিজের ছেলেকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়ে দেন। একবার তাঁর আর্দালী এক ব্যক্তিকে চাবুক মারে। বিচারে তিনি প্রহৃত ব্যক্তির দ্বারা তাকে সমপরিমাণ চাবুক মারান।
একবার তাঁর খান্দানের এক ব্যক্তি অপর এক ব্যক্তির উপর একটু নির্যাতন চালায়। তিনি তাঁকে গ্রেফতার করে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখার নির্দেশ দেন। যখন তিনি বিচার কাজ শেষ করে উঠতে যাচ্ছেন তখন সেই অভিযুক্ত লোকটি তাঁকে কিছু কথা বলতে চায়। জবাবে তিনি বলেন, আমাকে কিছু বলার এবং তোমার কথা শোনার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, আমি তোমাকে গ্রেফতার করিনি, বরং সত্য ও ন্যায়বিচার তোমাকে গ্রেফতার করেছে।
হযরত শুরায়হ-এর এই 'আদল ও ইনসাফ কোন সাধারণ ব্যাপার ছিল না। তাঁর জীবনের এমন বহু ঘটনা আছে যার কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তাঁর এক ছেলে এবং অন্য এক ব্যক্তির মধ্যে কোন একটি অধিকারের ব্যাপারে বিবাদ ছিল। ছেলে পিতাকে বিষয়টি অবহিত করে বলে, আপনি যদি মনে করেন রায় আমার পক্ষে আসবে তাহলে আমি মামলা দায়ের করি, অন্যথায় চুপ থাকি। শুরায়হ মামলাটির গুণগত দিক নিয়ে গভীরভাবে ভাবার পর ছেলেকে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁর এজলাসে যখন মামলাটি উঠেলো, তিনি ছেলের বিপক্ষে রায় দিলেন। আদালত থেকে ঘরে ফেরার পর ছেলে পিতাকে বললো, যদি আমি পূর্বেই আপনার সাথে পরামর্শ না করতাম তাহলে আপনার বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ থাকতো না। কিন্তু মামলা দায়েরের পরামর্শ দিয়ে আপনি আমাকে অপমান করেছেন। শুরায়হ বললেন, আমার ছেলে! দুনিয়ার সব মানুষের চেয়ে তুমি আমার সবচেয়ে বেশী প্রিয়। কিন্তু তোমার চেয়ে মহান আল্লাহ আমার অধিক প্রিয়। যখন তুমি আমার সাথে পরামর্শ করলে তখন মামলার ধরন দেখে বুঝলাম রায় তোমার বিপক্ষে যাবে। যদি আমি তখন তা তোমার কাছে প্রকাশ করে দিতাম তাহলে তুমি তাদের সাথে আপোষ-মীমাংসা করে নিতে। আর এতে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতো।
তিনি বাদী-বিবাদীকে একই দৃষ্টিতে দেখতেন। কাউকে কারো উপর কোন রকম প্রাধান্য দিতেন না। একবার আল-আশ'আছ ইবন কায়স গেলেন কাজী শুরায়হ-এর এজলাসে। কাজী সাহেব তাঁকে আমাদের শায়খ, আমাদের দীক্ষাগুরু, আমাদের নেতা ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করে মারহাবান, আহ্বান ও সাহলান বলে অত্যন্ত তা'জীমের সাথে ডেকে নিজের পাশে বসালেন। তাঁরা দু'জন পাশাপাশি বসে কথা বলছেন, এমন সময় একজন সাধারণ মানুষ উপস্থিত হলো এবং আল-আশ'আছের বিরুদ্ধে তার উপর অত্যাচারের অভিযোগ এনে কাজীর নিকট বিচার চাইলো। কাজী সাহেব একটু আগেই যাঁকে পরম সম্মানের সাথে কাছে বসিয়ে হাসি মুখে আলাপ করছিলেন, তিনি এখন ভিন্ন রূপ ধারণ করলেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আল-আশ'আছকে নির্দেশ দিলেন: এখান থেকে উঠুন। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীর আসনের পাশাপাশি বসুন এবং তাঁর সাথে কথা বলুন। আল-আশ'আছ বললেন: আমি বরং এখানে বসেই তার সাথে কথা বলি। এবার কাজী সাহেব আরো কঠিন হলেন। বললেন: আপনি অবশ্যই উঠবেন, নয়তো আপনাকে উঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিব। আল-আশ'আছ বললেন: আপনি নিজেকে যে পরিমাণ বড় মনে করছেন তা খুব দুঃখজনক। শুরায়হ বললেন: সেটাকে কি আপনি আপনার সতীন বলে ভাবছেন? আল-আশ'আছ না। শুরায়হ আমি দেখছি, আপনি অন্যের উপর আল্লাহর অনুগ্রহকে দেখতে পান, কিন্তু আপনার নিজের প্রতি তাঁর অনুগ্রহকে দেখতে পান না।
মানব ইতিহাসের কোন যুগেই মিথ্যা সাক্ষ্যদান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। আর বন্ধ হওয়া সম্ভবও নয়। তবে কাজী শুরায়হ মানুষকে নৈতিকতায় উদ্বুদ্ধ করে মিথ্যা সাক্ষ্যদান বন্ধ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। সাক্ষীদেরকে বুঝিয়ে মিথ্যা সাক্ষ্যদান থেকে বিরত রাখতেন। যদি বুঝাতে ব্যর্থ হতেন তাহলে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই রায় দিতেন। কারণ, সাক্ষ্যের বিপরীতে কাজীর ব্যক্তিগত জানার কোন গুরুত্ব নেই।
ইবন সীরীন বর্ণনা করেছেন। ঘটনার সাক্ষীর ব্যাপারে যখন শুরায়র-এর সন্দেহ হতো, কিন্তু তার বাহ্যিক সত্যবাদিতার ব্যাপারে কোন রকম প্রশ্ন তোলা যেতনা, তখন তিনি প্রথমে সাক্ষীদেরকে বলতেন, আমি তোমাদেরকে ডেকে আনিনি। তোমরা ইচ্ছা করলে ফিরে যেতে পার। আমি বাধা দিব না। তোমাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই এই মামলার রায় হবে। তোমাদের সাক্ষ্যের দরুন আমি দায়মুক্ত হয়ে যাই। তবে তোমরাও নিজেদেরকে বাঁচাও। কিন্তু বুঝানোর পরেও যদি সাক্ষী মিথ্যা সাক্ষ্যদানে বিরত না হতো তাহলে তিনি তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রায় দিতেন। কারণ, কোন কাজী কোন সাক্ষীকে সাক্ষ্যদানে বিরত রাখতে পারেন না। তবে তিনি বিবাদী পক্ষকে বলে দিতেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, এই বিবদমান বিষয় বা ঘটনায় তোমরা হচ্ছো উৎপীড়ক। কিন্তু আমি আমার বিশ্বাস ও ধারণার উপর ভিত্তি করে বিচার-ফায়সালা করতে পারিনে। বরং সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আমি ফায়সালা করতে বাধ্য। তবে এ সত্য অটুট থাকবে যে, যে জিনিস আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন, আমার ফায়সালা তা হালাল করতে পারে না।
হাদীছে নিকট আত্মীয়ের সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে কোন রকম নিষেধাজ্ঞা নেই। এ কারণে আত্মীয়ের মোকাদ্দামায় অন্য কোন বিশ্বস্ত আত্মীয়ের সাক্ষ্য গ্রহণের ব্যাপারে কোন আইনগত বাধা নেই। ইবন আবী শায়বা বলেন, কাজী শুরায়হ কোন ব্যক্তির জন্য তার নিকট আত্মীয়ের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা দেন। তিনি এ আইন তৈরী করেন যে, পিতার জন্যে পুত্রের, পুত্রের জন্য পিতার, স্বামীর জন্য স্ত্রীর, স্ত্রীর জন্য স্বামীর, দাসের জন্য মনিবের, মনিবের জন্য দাসের এবং পারিশ্রমিকের বিনিময়ে নিয়োগকৃত ব্যক্তির সাক্ষ্য নিয়োগকারীর জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই মৌল নীতির উপর তিনি এত অটল ছিলেন যে, একটি মামলায় তিনি হযরত 'আলীর (রা) পক্ষে হযরত ইমাম হাসানের সাক্ষ্যও প্রত্যাখ্যান করেন। একবার হযরত 'আলীর (রা) একটি ঢাল কোথাও হারিয়ে যায় এবং একজন জিম্মী তা খুঁজে পায়। হযরত 'আলী (রা) শুরায়হ-এর আদালতে মামলা দায়ের করেন। কাজী সাহেব জিম্মীকে বললেন, ঢালটির ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? সে বললো, ঢালটি যে আমার তার প্রমাণ এই যে, সেটি আমার হাতে বিদ্যমান। কাজী শুরায়হ 'আলীকে (রা) বললেন, ঢালটি যে পড়ে গিয়েছিল তার কোন সাক্ষী কি আছে? তিনি সাক্ষী হিসেবে পুত্র হাসান (রা) ও দাস কানবারকে উপস্থাপন করেন। শুরায়হ বললেন, কানবারের সাক্ষ্য তো আমি গ্রহণ করছি, তবে হাসানের (রা) সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করছি। হযরত 'আলী (রা) তখন বললেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণী শোনেননি:
الْحَسَنَ وَالْحُسَيْنُ سَيِّدَا شَبَابِ أَهْلِ الْجَنَّةِ. আল-হাসান ও আল-হুসায়ন জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা।
শুরায়হ বললেন: শুনেছি। তবে পিতার জন্য পুত্রের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য মনে করিনে। এই রায়কে 'আলী (রা) মেনে নেন। ঢালটি ইয়াহুদী জিম্মীকে দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত ইয়াহুদীকে এত মুগ্ধ করে যে, সে নিজেই স্বীকার করে ঢালটি 'আলীর (রা)। সে আরো বলে, আপনাদের দীন সত্য। মুসলমানদের কাজী তাদের আমীরুল মু'মিনীনের বিরুদ্ধে রায় দেন, আর তিনি বিনাবাক্যে মাথা নত করে তা মেনে নেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর সত্য রাসূল ছিলেন। ইয়াহুদীর এভাবে ইসলাম গ্রহণে হযরত 'আলী (রা) এত খুশী হন যে, ঢালটি তাকে উপহার স্বরূপ দান করেন। এর কিছুদিন পরেই খারিজীদের সাথে হযরত 'আলীর (রা) যুদ্ধ হয়। নাহ্রাওয়ানের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে এই নওমুসলিম লোকটি 'আলীর (রা) পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন।
কাজী শুরায়হ-এর পূর্বে ইসলামী 'আদালতে গোপন তদন্তের রীতি চালু ছিল না। তিনিই সর্বপ্রথম তা চালু করেন। যেহেতু এটা ছিল একটি নতুন পদ্ধতি, এ কারণে লোকেরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বলে, আপনি এ বিদ'আত চালু করলেন কেন? অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বাকর ও 'উমারের (রা) খিলাফতকালে যা চালু ছিল না, এমন নতুন জিনিস চালু করলেন কেন? জবাবে তিনি বললেন: মানুষ যখন নতুন নতুন কথা চালু করেছে তখন আমিও নতুন রীতি চালু করেছি। অর্থাৎ যখন নতুন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তখন আমাকেও নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়েছে।
কাজী শুরায়হ প্রমাণকে শপথের চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। শুধু শপথকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। বরং সাক্ষ্য-প্রমাণের সাথে সাথে শপথও নিতেন। একটি মোকাদ্দামায় একজন বাদী তার প্রতিপক্ষের শপথ নেওয়ায়, তারপর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। শুরায়হ বললেন, ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী মিথ্যা শপথের চেয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
বাদীকে প্রমাণ উপস্থাপনের এবং বিবাদীর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দান করা প্রতিটি আদালতের অপরিহার্য কর্তব্য। কাজী শুরায়হ এই দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি এত বেশী যত্নবান ছিলেন যে, মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পরও যদি উভয় পক্ষ কিছু বলতে চাইতো, তিনি তাদের বলার সুযোগ দিতেন। আহনাফ ইবন কায়স বলেন, একবার আমি শুরায়হ-এর 'আদালতে যাই। দেখলাম, তিনি এক ব্যক্তির বিপক্ষে রায় ঘোষণা করলেন। সাথে সাথে সে বলে উঠলো, এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিবেন না। আমার আরো কিছু বক্তব্য আছে। শুরায়হ তাকে বলার সুযোগ দিলেন। তার বক্তব্য শেষ হলে তিনি বললেন, তুমি অনেক অহেতুক কথা বলেছো। তুমি যা কিছু বলেছো তার সপক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন কর।
তিনি নিজের রায়ের বিরুদ্ধে আপীল শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতেন। তিনি বলতেন, কেউ আমার কোন রায়ের বিরুদ্ধে দাবী উত্থাপন করলে, আমার সে রায় ততক্ষণ পর্যন্ত বহাল থাকবে যতক্ষণ না সে তার দাবীর সপক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে। মোটকথা, সত্য আমার সিদ্ধান্তের বিপরীতে হলেও সেটাই সত্য।
অত্যন্ত নির্ভীকভাবে বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। বাদী-বিবাদী কোন পক্ষকেই কিছুমাত্র প্রাধান্য দিতেন না। কোন পক্ষকেই প্রশ্নবানে ক্ষত-বিক্ষত করতে মোটেই কার্পণ্য করতেন না এবং কোন পক্ষকেই বিশেষ কোন পয়েন্ট স্মরণ করিয়ে দিতেন না।
বিচার কাজে তিনি দারুণ গোপনীয়তা অবলম্বন করতেন। কোন কার্য-বিবরণী কারো কাছে প্রকাশ করতেন না। একবার তার ছেলে তার একটি মামলার ব্যাপারে তাঁকে কিছু প্রশ্ন করে। জবাবে তিনি বলেন, তুমি কি চাও, আমি তোমাকে তোমার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলি?
বিচার কাজে বংশীয় প্রথা-পদ্ধতির কোন গুরুত্ব দিতেন না। একবার একটি মোকাদ্দামায় এক পক্ষ বললো যে, আমাদের বংশীয় রীতি এটা। তিনি বললেন, তোমাদের বংশীয় রীতি-পদ্ধতি তোমাদের বাড়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। মোকাদ্দামায় দালাল নিয়োগের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। এমন দালালদের তিনি 'আদালত থেকে বের করে দিতেন। মানুষকে তাদের থেকে দূরে থাকার জন্য পরামর্শ দিতেন।
সভ্য যুগে ঘুষ উপহার-উপঢৌকনের রূপ ধারণ করে থাকে। আর এর থেকে মুক্ত থাকা খুবই কষ্টকর ব্যাপার। এ কারণে, শুরায়হ উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করলেও ঘুষ থেকে মুক্ত থাকার জন্য সাথে সাথে পাল্টা উপহারও দিয়ে দিতেন।
ঘর থেকে 'আদালতে যাওয়ার সময় এই কথাগুলো উচ্চারণ করতেন: 'অতি শীঘ্র অত্যাচারী সেই অংশকে জেনে যাবে যা সে কম করেছে। অত্যাচারীর শাস্তির এবং অত্যাচারিতের সাহায্যের প্রতীক্ষা করা উচিত।' ক্ষুধা ও রাগের অবস্থায় বিচার কাজ পরিচালনা করতেন না। এমন অবস্থায় এজলাস থেকে উঠে যেতেন।
সাধারণতঃ 'আদালতের বিচারকগণ সব মানুষকে খুশী রাখতে পারেন না। সাধারণভাবে তাদের রায়ের বিরুদ্ধে কোন না কোন পক্ষের অভিযোগ অবশ্যই থাকে। কিন্তু কাজী শুরায়হ-এর বিচার-ফায়সালায় জনগণ নিশ্চিন্ত থাকতো। জাবির ইবন যিয়াদ বর্ণনা করেছেন, শুরায়হ আমাদের এখানে বসরায় প্রায় এক বছর কাজী ছিলেন। এই অল্প সময়ে তিনি এমন তুলনাহীন বিচার-ফায়সালা করেন যে, তাঁর পূর্বের ও পরের ইতিহাসে যার কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না।
তাঁর সকল বিচার-ফায়সালা এত জ্ঞানগর্ভ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ হতো যে, তাঁর 'আদালত ফকীহদের দারসগাহ্ বা শিক্ষায়তনে পরিণত হয়। অনেক বড় বড় 'আলিম ফিকাহ্ বিষয়ক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যে তাঁর ফায়সালা শোনা ও দেখার জন্য 'আদালতে আসতেন। সেকালে মাকহুল (রহ) ছিলেন একজন অতি বড় 'আলিম। তিনি বলেছেন, আমি ছয় মাস যাবত শুরায়হ-এর 'আদালতে গিয়েছি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। তাঁর কাছে অনেক প্রশ্ন করতাম। তাঁর বিচার-ফায়সালা আমার জন্য অনেক শিক্ষণীয় হতো।
যেহেতু তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও মেধাবী, তাই বাদী-বিবাদীর বাহ্যিক অবস্থা দেখে ধোঁকায় পড়তেন না। একবার একজন মহিলা তাঁর এজলাসে একজন পুরুষের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করলো। 'আদালতে সে গলা সপ্তমে চড়িয়ে কান্না শুরু করে দেয়। ইমাম শা'বীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি শুরায়হকে লক্ষ্য করে বলেন, মনে হচ্ছে, মহিলাটি অত্যাচারিত। শুরায়হ বললেন, কান্না অত্যাচারিত হওয়ার প্রমাণ নয়। ইউসুফ (আ)-এর ভায়েরাও কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে এসেছিলেন।
জ্ঞানগত পূর্ণতার সাথে সাথে তিনি উন্নতমানের নৈতিক গুণাবলীতে বিভূষিত ছিলেন। বড় দীনদার এবং 'আবিদ ব্যক্তি ছিলেন। বিচার-ফায়সালার কঠিন দায়িত্ব ও ব্যস্ততা সত্ত্বেও যথেষ্ট সময় তাঁর 'ইবাদাতে অতিবাহিত হতো। তাঁর দাস আবূ তালহা বর্ণনা করেছেন, সকালে ফজরের নামায পড়ে ঘরে ফেরার পর দরজা বন্ধ করে প্রায় অর্ধেক দিন নফল 'ইবাদাতে মগ্ন থাকতেন।
তিনি ছিলেন খুব হাসিখুশী মেজাজের ও বিনীত স্বভাবের। সবাইকে তিনি প্রথমে সালাম দিতেন। কাসিম বর্ণনা করেছেন, সালাম দানের ব্যাপারে কেউ শুরায়হ-এর অগ্রগামী হতে পারেনি। 'ঈসা ইবন হারিছ বলেন, আমি সবসময় তাঁর আগেই সালাম দেওয়ার চেষ্টা করতাম, কিন্তু কখনো কামিয়াব হতে পারিনি। অধিকাংশ সময় পথে আমরা মুখোমুখি হতাম। আমি অপেক্ষায় থাকতাম, এখনই সালাম করবো, কিন্তু আমার আগেই তিনি 'আস-সালামু 'আলাইকুম' বলে দিতেন।
তিনি ফিতনা-ফাসাদ ও ঝগড়া-বিবাদ মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর জীবনে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, বছরের পর বছর 'আবদুল মালিক ও 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) দ্বন্দ্ব-সংঘাত তাঁর সামনেই বিদ্যমান ছিল- যার শিখা থেকে- খুব কম মানুষই নিরাপদ থাকতে পেরেছে, কিন্তু তিনি এর সবকিছু থেকে নিজেকে বাঁচাতে সক্ষম হন। এই বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার সময় কয়েক বছরের জন্য কাজীর পদ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেন। এতে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে তিনি এতখানি সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, এই বিশৃঙ্খলা ও হাঙ্গামার অবস্থা সম্পর্কে কারো কাছে কিছু জানতেও চাইতেন না। মানুষও এসব বিষয়ের প্রতি তাঁর অনীহার ভাব দেখে তাঁর সাথে এ নিয়ে কোন রকম আলোচনাও করতো না।
তিনি সবসময় অন্যের আরাম ও সুখ-শান্তির প্রতি যত্নবান থাকতেন। নিজের জন্য অন্য কাউকে সামান্য কষ্ট দেওয়াও পছন্দ করতেন না। নিজের বাড়ীর সব নর্দমা ও পয়ঃপ্রণালী বাড়ীর সীমানার ভিতর দিয়েই দিতেন, যাতে তাঁর পানিতে অন্যের কষ্ট না হয়। অন্যের আরাম-আয়েশের প্রতি এত বাড়াবাড়ি রকমের সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, তাঁর বাড়ীর কোন সদস্যের মৃত্যু হলেও অন্যের শান্তি ভঙ্গ হতে পারে এই ধারণায় কাউকে কোন খবর না দিয়েই রাতের মধ্যে দাফন করে দিতেন। নিজের এক সন্তানের মৃত্যুর পর কাউকে না জানিয়ে দাফন করে দেন।
তিনি ছিলেন একজন কৌতুকপ্রিয় ও প্রফুল্লচিত্তের মানুষ। মাঝে মধ্যে গুরুগম্ভীর পরিবেশেও তাঁর কৌতুক ও রসিকতার ফল্গুধারা বয়ে যেত। একবার 'আদী ইবন আরতাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসার জন্য তাঁর নিকট আসলেন। উভয়ের মধ্যে যে সংলাপটি হয় তা নিম্নরূপ:
'আদী- আমি আপনার সামনে কিছু কথা উপস্থাপন করতে চাই।
শুরায়হ- বলুন, আমি শোনার জন্য প্রস্তুত।
'আদী- আমি শামে অবস্থানকারী।
শুরায়হ- এত দূরের মানুষ!
'আদী- আমি আপনাদের এখানে বিয়ে করেছি।
শুরায়হ- আপনার বিয়ে কল্যাণময় হোক!
'আদী- আমি আমার স্ত্রীকে সংগে নিয়ে যেতে চাই।
শুরায়হ- স্বামী তাঁর স্ত্রীর অধিকারী এবং তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে স্বাধীন।
'আদী- কিন্তু সে তার নিজের বাড়ীতে থাকার শর্ত করেছিল।
শুরায়হ- তাহলে শর্ত পূরণ করা উচিত।
'আদী- আপনি আমাদের এ সমস্যার একটা ফায়সালা করে দিন।
শুরায়হ- ফায়সালা করে দিয়েছি।
'আদী- কার বিরুদ্ধে?
শুরায়হ- তোমার মার ছেলের বিপক্ষে (অর্থাৎ তোমার)।
'আদী- কার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে?
শুরায়হ- তোমার মামার বোনের ছেলের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে (অর্থাৎ তোমার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে)। কারণ, 'আদী তো নিজেই স্বীকার করেছিল যে, স্ত্রীর সাথে তার বাড়ীতেই বসবাস করার শর্তে বিয়ে করেছে।
একবার এক বেদুঈন তাঁকে প্রশ্ন করলো: আপনি কোন খান্দানের লোক? জবাবে তিনি বললেন: আমি সেই সব লোকদের একজন, আল্লাহ তা'আলা যাদেরকে ইসলামের পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। এ জবাব শোনার পর বেদুঈন তাঁর নিকট থেকে উঠে চলে গেল এবং লোকদের বলতে লাগলো যে, তোমাদের এ কাজী তাঁর নিজের খান্দানের নামটি পর্যন্ত বলতে পারেন না। অন্য একটি বর্ণনায় একথাও এসেছে যে, বেদুঈন লোকদের বলতে লাগলো, তোমরা তো আমাকে একজন দাসের নিকট পাঠিয়েছিলে। সাধারণতঃ দাস শ্রেণী ও তাদের মত যাদের উল্লেখ করার মত বংশ-গৌরব নেই তারা ইসলামের প্রতি নিজেদেরকে সম্বন্ধ ও সম্পৃক্ত করতো।
কাজী শুরায়হ ও ইবন যিয়াদের মধ্যে দারুণ মত বিরোধ ছিল। ইবন যিয়াদ একবার 'তা'উন' রোগে আক্রান্ত হন। ডান হাতে রোগটির প্রকোপ বেশী দেখা দেয় এবং পচন ধরে। চিকিৎসকগণ তাঁর হাতটি কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়। তিনি শুরায়হ-এর সাথে পরামর্শ করলেন। শুরায়হ চিকিৎসকদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে হাত কাটতে নিষেধ করলেন। যাই হোক, কিছুটা তাঁর পরামর্শে এবং কিছুটা ভয়ে হাত কাটা থেকে বিরত থাকলেন। ফলে তার বিষক্রিয়া সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি মারা যান। লোকে কাজী শুরায়হকে এই বলে তিরস্কার করতে লাগে যে, তাঁর সাথে আপনার দুশমনীর কারণেই আপনি তাঁর হাতটি কাটতে বারণ করেন। আর এ কারণেই তিনি মারা গেলেন। তিনি তাদেরকে জবাব দিলেন এই বলে: একজন পরামর্শক সব সময় আস্থাভাজনই হয়ে থাকেন। আমি যদি তাঁর কল্যাণকামী না হতাম তাহলে এটাই চাইতাম যে, একদিন তাঁর হাত কাটা যাক, একদিন পা কাটা যাক। এভাবে প্রতিদিন তাঁর দেহের একটি না একটি অঙ্গ কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হতো।
যিয়াদ ইবন আবীহ্ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কাজী শুরায়হ তাঁকে দেখতে গেলেন। ফিরে এলে মাসরূক ইবন আল-আজদা' তাঁর কাছে একটি লোক পাঠালেন যিয়াদের অবস্থা জানার জন্য। লোকটি জিজ্ঞেস করলো: আপনি আমীরকে কেমন দেখে এলেন? শুরায়হ বললেন: দেখে এলাম, তিনি আদেশ করছেন ও নিষেধ করছেন। মাসরূক একথা শুনে বললেন: শুরায়হ সব সময় বাঁকা কথা বলেন। তিনি আবারও লোকদের তাঁর কাছে পাঠালেন। তখন শুরায়হ বললেন: আমি দেখে এলাম, তিনি অন্তিম উপদেশ লেখার নির্দেশ দিচ্ছেন এবং কাঁদতে নিষেধ করছেন।
সুফইয়ান আছ-ছাওরী বলেন: এক ব্যক্তি একবার কাজী শুরায়হ-র এজলাসে এসে একটি বিড়ালের মালিকানার ব্যাপারে ফায়সালা চাইলো। বিড়ালটি যে তার সে ব্যাপারে কাজী প্রমাণ পেশ করতে বললেন। লোকটি বললো: যে বিড়ালটি আমার বাড়ীতে জন্মেছে তার কোন প্রমাণ আমি দিতে পারবো না। কাজী বললেন: বেশ তাহলে তুমি বিড়ালটি নিয়ে তার মার কাছে ছেড়ে দাও। যদি সেটা সেখানে থাকে এবং তার মা দুধ পান করায় তাহলে তোমার বিড়াল। আর যদি সেটা জোরে ডাকতে থাকে, লোম ফোলাতে থাকে তাহলে সেটা তোমার বিড়াল নয়।
তাকদীরে তাঁর ছিল প্রবল বিশ্বাস। একবার কৃষ্ণায় ‘তা’উন’-এর মহামারি দেখা দেয়। তাঁর বন্ধু ভয়ে কৃষ্ণা ছেড়ে নাজফে চলে যান। শুরায়হ তাকে লেখেন: যে স্থান আপনি ছেড়ে গেছেন তা আপনার মৃত্যুকে নিকটবর্তী করতো না এবং আপনার জীবনের দিনগুলিও ছিনিয়ে নিত না। আর যে স্থানে আপনি আশ্রয় নিয়েছেন তা এমন এক সত্তার মুঠোর মধ্যে রয়েছে যাঁকে কোন কামনা-বাসনা অক্ষম ও অপারগ করতে পারে না এবং কোন পলায়নই তার থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয় না। আপনি ও আমরা সবাই একই বাদশার বিছানায় অবস্থান করছি। নাজফও এক মহাক্ষমতাশালীর অধিকারে আছে যা খুব শীঘ্র প্রকাশ পাবে।
তিনি সবসময় মানুষকে সৎ উপদেশ দিতেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর কাছে ছোট-বড় ও আপন-পর কোন ভেদাভেদ ছিল না। জনৈক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, একদিন শুরায়হ আমার কিছু দুঃখের কথা আমার এক বন্ধুর নিকট বর্ণনা করতে শুনতে পেলেন। তিনি আমার একটি হাত ধরে এক পাশে নিয়ে গেলেন এবং বললেন: ভাতিজা, এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নিজের দুঃখের কথা বলবে না। কারণ, তুমি যার কাছে তোমার দুঃখ-কষ্টের কথা বলছো সে হয় তোমার বন্ধু হবে, না হয় শত্রু। বন্ধু হলে সে তোমার দুঃখের কথা শুনে ব্যথিত হবে, আর শত্রু হলে উৎফুল্ল হবে। তারপর বললেন: তুমি আমার এই চোখটির দিকে তাকাও। আঙ্গুল দিয়ে তাঁর একটি চোখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন: আল্লাহর কসম, পনেরো বছর যাবত আমি এ চোখটি দ্বারা না কোন মানুষকে দেখতে পাই, আর না কোন পথ-ঘাট। কিন্তু এই মুহূর্তে কেবল তুমি ছাড়া এ পর্যন্ত আর কাউকে এ কথাটি বলিনি। তুমি কি আল্লাহর সেই সত্যনিষ্ঠ বান্দাটির কথা শোননি:
إنما أشكو بثي وحزني إلى الله আমি তো আমার দুঃখ ও অস্থিরতা আল্লাহর সামনেই পেশ করছি। সুতরাং একমাত্র আল্লাহকেই তুমি তোমার যাবতীয় শেকায়েত ও অভিযোগের কেন্দ্র বানাও।
একবার তাঁর 'আদালতে এক ব্যক্তি এক সাক্ষীকে ডাক দেয়- যার নাম ছিল রাবী'আ। সে উত্তর দিল না। লোকটি উত্তেজিত হয়ে জোরগলায় তাকে কাফির' বলে ডাক দিল। এবার সে সাড়া দিল। কাজী শুরায়হ দৃশ্যটি উপভোগ করছিলেন। তিনি এবার কৌতুক করে সাক্ষীর প্রতি এই দোষ আরোপ করলেন যে, তুমি নিজেই 'কুফর' (আল্লাহকে না মানা) স্বীকার করে নিয়েছো। এ কারণে তোমার সাক্ষ্য গ্রহণ করা যায় না।
শেষ জীবনে বার্ধক্যের দরুন দুর্বল হয়ে পড়েন এবং কাজীর পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের অল্প কিছুদিন পর রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বাঁচার আর আশা থাকলো না। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে আত্মীয়-পরিজনদেরকে এই অসীয়াতগুলো করেন:
১. ঝুলন্ত কবর খুঁড়বে। ২. মৃত্যু ও জানাযার খবর কাউকে দিবে না। ৩. বিলাপ করবে না। ৪. লাশ ধীরে ধীরে বহন করবে। ৫. কবর চাদর দিয়ে ঢাকবে না। এ কথাগুলো বলার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স এক শো বছর অতিক্রম করেছিল। মৃত্যু সন নিয়ে মতপার্থক্য আছে। হিজরী ৭৬ সন থেকে ৭৯ সনের মধ্যে তাঁর ইনতিকাল হয়।
তিনি মাকুন্দা ছিলেন। পাঁচ শো দিরহাম মাসিক ভাতা পেতেন। ইমাম আয-যাহাবীর মতে তিনি এক শো বিশ বছর জীবিত ছিলেন এবং হিজরী ৭৮, মতান্তরে ৮০ সনে মৃত্যুবরণ করেন।
কাজী শুরায়হ-এর আংটিতে (সীল) খোদাই করা ছিল এই কথাটি- 'الخاتم خير من الظن' - সীল-মোহর সন্দেহের চেয়ে ভালো।
টিকাঃ
১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৬১, টীকা-১; সিফাতুস সাফওয়া-৩/২০
২. আল-ইসাবা ফী তাময়ীয আস-সাহাবা-২/২০২
৩. আল-ইসতী'আব-২/৬৭
৪. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৪
৫. তাহযীব আল-কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-৬/৬৫
৬. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৯
৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫১
৮. আ'লাম আল-মুওয়াক্কা'ঈন-১/২৭
৯. তাবাকাত-৬/৯০; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১৫
১০. তাবাকাত-৬/৯৪
১১. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১২১-১২২
১২. আল-ইসতী 'আব-২/৬৭
১৩. তাহযীব আল-আসমা'-১/২৪৩
১৪. কিতাবুল আওয়ায়িল, আল-বাব আস-সাবি'-যিব্রুল কুজাত।
১৫. তাবাকাত-৬/৯১; সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১২
১৬. 'উয়ুন আল-আখবার-১/১০১
১৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
১৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/১৫০
১৯. তাবাকাত-৬/৯২, ৯৫
২০. প্রাগুক্ত-৬/৯৩
২১. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৭/১১৮
২২. আল-ইদ আল-ফারীদ-১/৯০; ৪/২৬, ৪৮
২৩. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৯
২৪. শাযারাত আয-যাহাব-১/৮৫
২৫. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৪-১১৭
২৬. তাবাকাত-৬/৯৪
২৭. প্রাগুক্ত-৬/৯৩, ৯৪, ৯৫, ৯৭
২৮. আল-'ইব্দ আল-ফারীদ-১/৮৯; 'উয়ূন আল-আখবার-১/৬৬
২৯. তাহযীব আল-আসমা'-১/২২৪
৩০. তাবাকাত-৬/৯৭, ৯৮; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
৩১. 'উয়ূন আল-আখবার-২/৫৯৭
৩২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৯
৩৩. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/۹৮; আল-'ইন্দ আল-ফারীদ-১/৯০; ৩/১০; 'উয়ূন আল-আখবার-১/৩৬৬
৩৪. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
৩৫. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৪৬৭; 'উয়ূন আল-আখবার-২/৫৯৭
৩৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-১/৯১
৩৭. প্রাগুক্ত-৩/১৯৩; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/২০৩
৩৮. সূরা ইউসুফ-৮৬
৩৯. সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন-১১৯-১২০
৪০. তাবাকাত-৬/৯৯
৪১. প্রাগুক্ত-৬/৯৫; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২২৪
৪২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৯
৪৩. 'উয়ুন আল-আখবার-১/৩৪৯