📄 সা‘ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ)
হযরত সা'ঈদের ডাক নাম আবূ মুহাম্মাদ। পিতা মুসায়্যিব ইবন হাম্ন কুরায়শ গোত্রের মাখযূমী শাখার সন্তান এবং মা উম্মু সা'ঈদ নামে যিনি পরিচিত, আসলাম গোত্রের হাকীম ইবন উমায়্যার কন্যা।১
হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব ছিলেন সেই সব অতি সম্মানিত ও পবিত্র-আত্মা মহান তাবি'ঈর একজন যাঁরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর পথিকৃৎ ও ইমামের মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁর সম্মানিত পিতা মুসায়্যিব (রা) ও পিতামহ হাযন (রা) উভয়ে ছিলেন সাহাবী। দু'জনই মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) নিয়ম ছিল, জাহিলী যুগে রাখা যে সব নামের মধ্যে কোন মন্দ অর্থ পেতেন, তা পরিবর্তন করে অন্য নাম রাখা। অকল্যাণ ও অশুভ অর্থবহ কোন নাম তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। এ কারণে হাযম্ন (রা) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নামটি পরিবর্তন করে সাহল রাখতে চান। উল্লেখ্য যে, হাযম্ন শব্দটির অর্থ কষ্ট, শোক, দুঃখ, বিষণ্ণতা ইত্যাদি। কিন্তু হযরত হাযম্ন (রা) তখন একজন নও মুসলিম। আজন্ম লালিত বিশ্বাস ও সংস্কার সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলতে পারেননি। তাই তিনি বিনয়ের সাথে 'আরজ করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ নামটি আমার পিতা-মাতার দেওয়া। তাছাড়া এ নামেই আমি সবার কাছে পরিচিত। অনুগ্রহ করে এটি পাল্টাবেন না। রাসূল (সা) তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং পূর্বের নামটি বহাল রাখেন। কিন্তু এ নামের অশুভ পরিণতি এ পরিবারটিকে ভোগ করে যেতে হয়।
পরবর্তীকালে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব বলতেন, দুঃখ-কষ্ট চিরকাল আমাদের পরিবারের নিত্য সঙ্গী হয়ে থেকেছে।২
হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) খিলাফতের দ্বিতীয়, মতান্তরে চতুর্থ বছরে হযরত সা'ঈদ (রহ) জন্মগ্রহণ করেন। একটি বর্ণনা এমনও আছে যে, হযরত 'উমারের (রা) শাহাদাতের দু'বছর পূর্বে তাঁর জন্ম হয়। তবে প্রথম বর্ণনাটি অধিক নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়।৩
হযরত সা'ঈদ (রহ) খিলাফতে রাশিদার শেষ পর্যায়ে একেবারেই অল্প বয়স্ক ছিলেন। তাই তাঁর জীবনে এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা নেই। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালেও তাঁকে কোন দৃশ্যপটে দেখা যায় না। তবে একথা জানা যায় যে, তিনি তখন জ্ঞান অর্জনের পালা শেষ করে তাদরীস ও ইফতা (শিক্ষা ও ফাতওয়া দান)-এর মসনদে আসীন হয়েছেন।৪
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সময়কাল থেকে তাঁর পূর্ণ জীবন বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। আর এ ইতিবৃত্তের সূচনা হয়েছে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সত্য উচ্চারণের মাধ্যমে। সত্য বলার ব্যাপারে তিনি কারো পরোয়া করতেন না। এমন কি খলীফা ও স্বৈরাচারী আমীর উমারার বিরুদ্ধেও তিনি চুপ থাকেননি। আর তাই দেখা যায় তাঁর কর্ম-জীবনের সূচনাতেই খলীফাদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) খিলাফতের দাবী নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন। জাবির ইবন আসওয়াদ তাঁর পক্ষে মদীনা বাসীদের বায়'আত নেওয়ার জন্য আসলেন। তখন সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললেন, যতক্ষণ না কোন এক ব্যক্তির ব্যাপারে মুসলমানদের ঐকমত্য হয় ততক্ষণ কারো হাতে বায়'আত করা উচিত নয়।৫
সে সময় সা'ঈদকে মদীনার বিশিষ্ট বুযর্গ ব্যক্তি গণ্য করা হতো। তাঁর বিরোধিতার অর্থ ছিল মদীনার একটি হাতও বায়'আতের জন্য বাড়ানো হবে না। এ কারণে জাবির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাকে বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু শত নিপীড়ন ও নির্যাতন সত্ত্বেও সত্য বলা থেকে তাঁর মুখ বন্ধ করা যায়নি। বেত্রাঘাতের সময়ও তিনি মুখে সত্যের ঘোষণা দিতে থাকেন। জাবিরের ছিল চার স্ত্রী। একজনকে তিনি তালাক দেন। তাঁর 'ইদ্দাত শেষ হওয়ার আগেই তিনি পঞ্চম বিয়েটি করে ফেলেন। এমন কাজ স্পষ্টতঃই হারাম ছিল। যখন সা'ঈদের পিঠে বেত্রাঘাত চলছিল তখন তিনি বলছিলেন, আল্লাহর কিতাবের হুকুম শোনানো থেকে কেউ আমাকে বিরত রাখতে পারবে না। আল্লাহ বলেছেন: ৬
فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ.
আর যদি তোমরা ভয় কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের হক যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সে সব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর আপনি চতুর্থ স্ত্রীর 'ইদ্দাতকাল অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই পঞ্চম স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন।
খুব শিগগিরই আপনার জন্য একটি খারাপ সময় আসবে। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পর হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) নিহত হন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের সাথে জাবিরের এই অসদাচরণের কথা জানতে পেরেছিলেন। তিনি সা'ঈদের সম্মান ও মর্যাদার কথা জানতেন। এ কারণে তিনি জাবিরকে একটি চিঠি লিখে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন এবং তাঁর সাথে যে কোন রকমের রূঢ় আচরণ থেকে বিরত থাকতে বলেন।৭
'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পরে 'আবদুল মালিক খলীফা হন। তাঁর সাথেও সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের বিরোধ বজায় থাকে। উমাইয়া রাজতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খলীফা মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে যথাক্রমে 'আবদুল মালিক ও তাঁর ভাই 'আবদুল আযীযকে খলীফা মনোনীত করে যান। মারওয়ানের মৃত্যুর পর 'আবদুল মালিকের মনে অসৎ উদ্দেশ্যের উদয় হয়। তিনি তাঁর দুই ছেলে ওয়ালীদ ও সুলায়মানকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যেতে চান। কিন্তু কাবীসা ইবন যুওয়াইব তাঁকে বোঝান যে, এ কাজ করলে আপনার সুনাম নষ্ট হবে। তাই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। কিন্তু 'আবদুল মালিকের সৌভাগ্য যে, কিছু দিন পর 'আবদুল 'আযীয স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
'আবদুল 'আযীযের মৃত্যুর পর 'আবদুল মালিকের ইচ্ছা পূরণের বাধা দূর হয়ে যায়। তিনি নিজের মৃত্যুর পর যথাক্রমে ওয়ালীদ ও সুলায়মানকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে তাঁদের পক্ষে বায়'আত গ্রহণের জন্য বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশের শাসকদের নির্দেশ দেন। মদীনার তৎকালীন ওয়ালী হিশাম ইবন ইসমা'ঈল মদীনাবাসীদের বায়'আত গ্রহণের ধারাবাহিকতায় সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে ডেকে পাঠান। তিনি হিশামকে বলেন, আমি একটু চিন্তা-ভাবনা না করে বায়'আত করতে পারছিনে। মতান্তরে, তিনি একথা বলেন যে, বর্তমান খলীফা 'আবদুল মালিকের জীবদ্দশায় অন্য কারোর বায়'আত করতে পারিনে।৮
হযরত সা'ঈদের এমন স্পষ্ট জবাবে হিশাম ক্ষেপে যান এবং তাঁকে বেত্রাঘাত করেন। তারপর রা'স আছ-ছানিয়্যা- যেখানে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো, অত্যন্ত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাঠিয়ে দেন। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব বুঝেছিলেন, নিশ্চিত তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে। তিনি ফাঁসিতে ঝুলার জন্য প্রস্তুত হয়েও গিয়েছিলেন। ফাঁসিতে ঝুলানোর পরে পরনের কাপড় খুলে গিয়ে সতর উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে ভেবে নীচে জাঙ্গিয়াও পরে নিয়েছিলেন। সম্ভবত রা'স আছ-ছানিয়্যা নিয়ে যাবার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে ভয় দেখানো। এ জন্য সেখানে নিয়ে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। যখন ফিরিয়ে আনা হয় তখন সা'ঈদ প্রশ্ন করেন : আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তারা জবাব দেয়: জেলখানায়। তাঁকে জেলে বন্দী করে রাখা হয়। হিশাম তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের বিবরণ খলীফার দরবারে পাঠিয়ে দেন।৯
জেলে বন্দী অবস্থায় তাঁকে বুঝিয়ে নরম করার চেষ্টা করা হয়। আবু বাকর 'আবদুর রহমান তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, সা'ঈদ আপনি একেবারেই বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছেন। জবাবে তিনি বলেন, আবূ বাকর, আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাঁকে দুনিয়ার সকল শক্তির উপর মহাশক্তি বলে বিশ্বাস করুন। আবূ বাকর হাল ছেড়ে দেননি। তিনি বার বার জেলখানায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে একই কথা বলে তাঁকে নরম করার চেষ্টা করতে থাকেন। সা'ঈদ তাঁকে শেষ জবাব দেন এই বলে: আল্লাহর কসম! আপনার অন্তর ও চোখ, উভয়ের আলো যেতে বসেছে। এমন শক্ত জবাব শুনে আবূ বাকর ফিরে যান। হিশাম আবূ বাকরের নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চান, সা'ঈদ কি মার খাওয়ার পর একটু নরম হয়েছে? আবূ বাকর জবাব দেন, আল্লাহর কসম! তাঁর সাথে আপনার এরূপ আচরণে তিনি আরো শক্ত হয়ে গেছেন। এখন তাঁকে বশে আনার আশা আপনার ত্যাগ করা উচিত।১০
কাবীসা ইবন যুওয়াইব ছিলেন 'আবদুল মালিকের ব্যক্তিগত সচিব। সকল শাহী ডাক প্রথমে তাঁর কাছে আসতো। প্রথমে তিনি সেগুলি পড়তেন, তারপর খলীফা 'আবদুল মালিকের সামনে পেশ করতেন। হিশাম সা'ঈদের সাথে তাঁর আচরণের বিবরণ দিয়ে যে চিঠিটি খলীফার নিকট পাঠান স্বাভাবিকভাবে সেটিও কাবীসার হাতে পড়ে। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমান পরিণামদর্শী মানুষ। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি। এ কারণে হিশামের ফিরিস্তি পাঠ করে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। সাথে সাথে তিনি চিঠিটি নিয়ে 'আবদুল মালিকের নিকট যান এবং তাঁকে বলেন, হিশাম স্বেচ্ছাচারীর মত যা ইচ্ছা তাই করে। ইবন মুসায়্যিবকে এভাবে পেটায় এবং ঢোল-শোহরাত করে তা প্রচার করে। আল্লাহর কসম! এই বাড়াবাড়ি ও কঠোরতার কারণে তিনি আরো শক্ত হয়ে যাবেন। যদি তিনি বায়'আত নাও করেন তাহলেও তাঁর দিক থেকে বিপদের কোন আশঙ্কা নেই। তিনি এমন লোকদের কেউ নন যাঁদের মধ্যে কপটতা আছে অথবা ইসলাম ও মুসলমানদের কোন রকম ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি আহলুস সুন্নাহ্ ওয়াল জামা'আ'র অন্তর্গত একজন মানুষ। আপনি নিজেই সা'ঈদের নিকট হিশামের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে একটি চিঠি লিখুন। 'আবদুল মালিক বললেন, তুমিই আমার পক্ষ থেকে একটি চিঠি লিখে পাঠাও। তাতে একথা স্পষ্ট করে বলে দেবে যে, হিশাম আমার ইচ্ছার বিপরীত কাজ করেছে। এটা তার নিজেরই সিদ্ধান্ত ছিল। কাবীসা তখনই সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে একটি চিঠি লেখেন। তিনি সেটি পাঠ করে মন্তব্য করেন, আমার প্রতি জুলুম করা হয়েছে। তার ও আমার মাঝখানে আল্লাহ আছেন।
সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে চিঠি পাঠানোর পর খলীফা 'আবদুল মালিক হিশামের কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশ ও তাকে তিরস্কার করে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে বেত্রাঘাতের পরিবর্তে তাঁর সাথে সদাচরণ করা উচিত ছিল। আমার ভালো করেই জানা আছে, তাঁর দিক থেকে কোন রকম বিরোধিতা ও বিভেদ সৃষ্টির আশঙ্কা নেই। এ চিঠি পেয়ে হিশাম ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন এবং সা'ঈদকে মুক্তি দেন।
হিশাম তাঁকে বেত্রাঘাত করে যখন জনগণের সম্মুখে এনে দাঁড় করান তখন এক মহিলা সা'ঈদেকে বলে: শায়খ, আপনাকে হেয় ও লাঞ্ছনার স্থলে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি জবাব দেন, না, আমি বরং লাঞ্ছনা থেকে পালিয়েছি।”১১
একবার মুসলিম ইবন 'উকবা সা'ঈদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তখন 'আমর ইবন 'উছমান ও মারওয়ান সাক্ষ্য দেন যে, তিনি একজন পাগল। অতঃপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১২
একথা ঠিক যে খলীফা ওয়ালীদের সাথে হযরত সা'ঈদের বড় রকমের কোন বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। তবে তাঁর সামনে কোন দিন মাথাও নত করেননি।১৩
এটা অবাক হবার মত ব্যাপার যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মত স্বৈরাচারী ও জালিম শাসক, যাঁর নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে সে যুগের উমাইয়্যা শাসনের বিরোধী খুব কম লোকই রেহাই পেয়েছে, সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের সাথে কোন রকম অসদাচরণ করেননি। আর এতে সে যুগের মানুষ দারুণ বিস্ময় প্রকাশ করতো। অনেকে কৌতূহলবশতঃ সা'ঈদকে জিজ্ঞেসও করতেন, এটা কি করে সম্ভব যে, হাজ্জাজ আপনার নিকট কাউকে পাঠাচ্ছে না, আপনার স্থান থেকে আপনাকে অপসারণ করছে না এবং আপনাকে কোন রকম কষ্টও দিচ্ছে না? তিনি জবাব দিতেন, আল্লাহর কসম! আমি নিজেও এর কারণ জানিনে। অবশ্য একটি ঘটনা একবার তাঁর সাথে আমার ঘটেছিল। সে তার পিতার সাথে মসজিদে নামায পড়ছিল। ঠিকমত রুকু-সিজদা হচ্ছিল না। আমি তাকে সতর্ক করার জন্য একমুঠ কঙ্কর তার প্রতি ছুড়ে মারি। মানুষের ধারণা, এরপর থেকে তার নামায ঠিক হয়ে যায়।
খলীফা ওয়ালীদের সময়কালে হিজরী ৯৪ সনে হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তে পুত্র মুহাম্মাদকে দাফন- কাফনের ব্যাপারে ওয়াসীয়াত করেন। তিনি বলেন, লাশের খাটিয়া লাল চাদর দিয়ে ঢাকবে না, গোরস্তানে নেওয়ার সময় আগুন জ্বালাবে না, এমন সব লোক শবানুগামী হবে না যারা আমার এমন সব গুণের কথা বলে বিলাপ করবে যা প্রকৃতপক্ষে আমার মধ্যে নেই। শববাহী খাটিয়া উঠানোর কোন ঘোষণা দেবে না। তা উঠানোর জন্য মাত্র চার ব্যক্তিই যথেষ্ট। কবরের পাশে তাঁবু স্থাপন করবে না।
একেবারে অন্তিম মুহূর্তে নাফি' ইবন জুবায়র পাশে ছিলেন। তিনি মুহাম্মাদকে বললেন বিছানা কিবলামুখী করে দিতে। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তখনও সচেতন ছিলেন। তিনি বলেন, এমনটি করার প্রয়োজন নেই। আমি এই কিবলার উপর জন্মেছি, এর উপরই মরবো এবং ইন্শাআল্লাহ কিয়ামতের দিন এই কিবলার উপরই উঠবো।
কিছুক্ষণ পর অচেতন অবস্থা দেখা দেয়। তখন নাফি' শয্যাটি কিবলামুখী করে দেন। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব আবার চেতনা ফিরে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার শয্যাটি কিবলামুখী করে দিয়েছে কে? কারো জবাব দানে হিম্মত হলো না। কিন্তু তিনি জ্ঞান থাকা অবস্থায় নাফি'কে বলতে শুনেছিলেন। তাই তিনি স্বগতোক্তির মত জবাব দিলেন, নাফি' করে থাকবে। তারপর বললেন : আমি যদি মুসলমান হই তাহলে যে দিকেই মুখ করে মরি না কেন, কিবলামুখীই থাকবো। আর যদি ইসলামী মিল্লাতের উপর না থাকি, আর অন্তর কিবলামুখী না থাকে, তাহলে মুখ কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেওয়াতে কোন লাভ নেই। আমি মুসলমান। যে দিকেই আমার মুখ থাকুক না কেন, তা কিবলামুখীই হবে।
فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ - যেদিকেই তোমরা তোমাদের মুখ ফেরাও না কেন সেদিকেই আল্লাহর মুখমণ্ডল।
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে অল্প কিছু দীনার তাঁর কাছে ছিল। তার জন্য আল্লাহর দরবারে কৈফিয়াত দেন এই বলে : হে আল্লাহ! তুমি ভালো করেই জান, এগুলি আমি আমার লজ্জাস্থান ঢাকা এবং দীনের হিফাজতের উদ্দেশ্যে রেখে দিয়েছিলাম।
এই রোগেই হিজরী ৯৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।১৬ মোট পঁচাত্তর (৭৫) বছর জীবন লাভ করেন। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এ বছর বড় বড় অনেক ফকীহ্ ইনতিকাল হয়। এ কারণে এ বছরকে 'সানাতুল ফুকাহা' (ফকীহদের বছর) বলা হয়। মাকহুল বলেন, সা'ঈদের মৃত্যুর খবর যখন তাঁর নিকট পৌছে তখন মানুষ তা শুনে দাঁড়িয়ে যায়।১৭
হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন যখন নুবুওয়াত ও রিসালাতের পবিত্র অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে সেই সমাপ্তির পর খুব বেশী দিন অতিক্রান্ত হয়নি। মদীনার অলি-গলিতে দু'চারজন ছাড়া অধিকাংশ উঁচু স্তরের সাহাবী তখনো তা'লীম ও তারবিয়্যাতের সুমহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। হযরত সা'ঈদের ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রতি স্বভাবগত তীব্র স্পৃহা। এ কারণে, ঐ সকল মহান ব্যক্তির সাহচর্য, ফয়েজ ও বরকত তাঁকে 'ইলম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের মোহনায় পরিণত করে। এ ব্যাপারে সকল সীরাত লেখক ও রিজাল শাস্ত্রবিদ একমত যে, তিনি তাঁর সময়ে 'ইলম ও 'আমল এবং সামগ্রিকভাবে জ্ঞান, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলী, পূর্ণতা ও উৎকর্ষে একক ও অতুলনীয় ছিলেন। ইমাম নাবাবী লিখেছেন, অগ্রগামিতা, নেতৃত্ব, মহত্ত্ব, জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং অন্যান্য কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে তিনি যে তাঁর সমকালীনদের ডিঙ্গিয়ে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে সকল 'আলিম একমত।
ইবন হিব্বান লিখেছেন, তিনি তাঁর যুগে মদীনার সকল অধিবাসীর নেতা ছিলেন।১৮
ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে ইমাম, শাইখুল ইসলাম ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ বলে উল্লেখ করেছেন। ১৯ ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তাঁর সত্তার মধ্যে হাদীছ, ফিকাহ্, যুহদ, তাকওয়া, 'ইবাদাত তথা সার্বিক জ্ঞান ও কর্মগত পূর্ণতার সমাবেশ ঘটেছিল।২০
'ইবনুল 'ইমাদের বর্ণনায় বুঝা যায় যে, কুরআনের তাফসীরে হযরত সা'ঈদের পূর্ণ পাণ্ডিত্য ও দক্ষতা ছিল। কিন্তু কুরআনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের কারণে মুফাস্সির হিসেবে তিনি তেমন খ্যাতি লাভ করেননি। কুরআনের তাফসীরের ব্যাপারে তিনি এত সতর্ক ও কঠোর ছিলেন যে, কোন আয়াতের তাফসীরের ব্যাপারে কখনো মুখ খোলেননি। কোন আয়াতের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে বলতেন: আমি কুরআনের ব্যাপারে কোন কথা বলবো না। ২১ এমন সীমাহীন সতর্কতা অবলম্বনের কারণে কুরআন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা কতখানি ছিল তা প্রকাশ পায়নি।
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছের ব্যাপারে তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ ও রুচি। মাত্র একটি হাদীছের জন্য বহু রাত ও বহু দিনের পথ সফর করতেন। ২২ তাঁর মধ্যে হাদীছ শোনা ও সংগ্রহ করার যেমন একটা প্রবল উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল, তেমনিভাবে তাঁর জন্মস্থান মদীনা ছিল ইল্মে হাদীছের মূল স্তম্ভ সাহাবায়ে কিরামের পদভারে সর্বদা সরগরম।
হযরত 'উছমান, 'আলী, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, যায়দ ইবন ছাবিত, হাসান ইবন ছাবিত, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবু হুরাইরা, আবু দারদা' আনসারী, আবূ যার আল গিফারী, আবু কাতাদা আনসারী, হাকীম ইবন হিযাম, জুবায়র ইবন মুত'ইম, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা, মিসওয়ার ইবন মাখরামা, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ সা'ঈদ খুদরী, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, মা'মার ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ্ ইবন যায়দ হারিছী, 'আত্তাব ইবন উসায়দ, 'উছমান ইবন আবিল 'আস (রা) সহ আরো অনেক বিশিষ্ট সাহাবীকে তিনি জীবদ্দশায় পান এবং তাঁদের থেকে কুরআন ও হাদীছের জ্ঞান লাভের সুযোগ হাতছাড়া করেননি। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রা), যিনি সর্বাধিক সংখ্যক রাসূলুলুল্লাহর (সা) হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ করেন- তিনি ছিলেন সা'ঈদের শ্বশুর। আর এই সম্পর্কের কারণে তিনি বিশেষভাবে হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে সবচেয়ে বেশী ফয়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হন। আর তাই, তাঁর হাদীছের বেশীর ভাগ হযরত আবূ হুরাইরার (রা) সূত্রে বর্ণিত দেখা যায়। ২৩
হযরত সা'ঈদের (রহ) মেধা এত তীক্ষ্ণ ছিল যে, কোন কথা একবার শ্রুতিগোচর হলে আর কখনো তা ভুলতেন না। চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যেত। ২৪ তাঁর এমন তীক্ষ্ণ মেধা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের পরিধিকে অনেক বাড়িয়ে দেয়।
সে যুগের সকল 'আলিম স্মৃতিতে হাদীছ ধারণ করার তাঁর পূর্ণ ক্ষমতার কথা এক বাক্যে স্বীকার করতেন। মাকহুল ছিলেন সে যুগের একজন ইমাম ও মুহাদ্দিছ। তিনি বলতেন, আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করেছি। কিন্তু সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের মত 'আলিম কোথাও পাইনি। ২৫ ইমাম যাইনুল 'আবিদীন বলতেন, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব ছিলেন অতীত কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বেশী জানা মানুষ। ২৬ 'আলী ইবন আল-মাদীনী বলতেন, আমি তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের মত এত বিশাল জ্ঞানের অধিকারী আর কাউকে জানিনে। ২৭
হাদীছ শাস্ত্র বিশারদদের নিকট হযরত সা'ঈদের বর্ণিত হাদীছের স্থান এত উঁচুতে ছিল যে, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) ও অন্যরা তাঁর মুরসাল হাদীছকেও সহীহ-এর মর্যাদা দান করতেন। ইমাম শাফি'ঈ বলতেন, সা'ঈদের 'মুরসাল' হাদীছসমূহ আমাদের নিকট 'হাসান' হাদীছের সমতুল্য। ২৮ যদিও হযরত 'উমারের (রা) নিকট সা'ঈদের (রহ) হাদীছ শুনার কোন প্রমাণ নেই, তা সত্ত্বেও ইমাম আহমাদ তাঁর সূত্রে সা'ঈদের সরাসরি বর্ণিত হাদীছ দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন। ২৯ ইয়াহইয়া ইবন মু'ঈন হযরত সা'ঈদের (রহ) 'মুরসাল' হাদীছসমূহকে হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) 'মুরসাল'সমূহের উপরও প্রাধান্য দিতেন। 'আলী ইবন আল-মাদীনী বলতেন: কোন মাসআলায় সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের শুধু এতটুকু বলে দেওয়া যে, এ ব্যাপারে হাদীছ বিদ্যমান আছে- যথেষ্ট মনে করা হয়। ৩০
হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের (রহ) পঠন-পাঠনের বিশেষ বিষয় ছিল ফিকাহ্ শাস্ত্র। তিনি তাঁর সময়ের মদীনার সেই সাতজন ফকীহ্ মধ্যে গণ্য হতেন যাঁরা ছিলেন এই শাস্ত্রের ইমাম। ৩২ শুধু তাঁদের মধ্যে নয় বরং গোটা তাবি'ঈ জামা'আতের মধ্যে তাঁর স্থান ও মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চে। ইবন হিব্বানের বর্ণনা এ রকম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তাঁর সময়ে মদীনাবাসীদের নেতা ছিলেন এবং ফাতওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল তাঁদের সবার উপরে। তাঁকে 'ফকীহ্ আল-ফুকাহা' (ফকীহদের ফকীহ্) বলা হতো। কাতাদা (রহ) বলতেন, আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের চেয়ে বেশী হালাল ও হারাম জানা ব্যক্তি কাউকে দেখিনি। সুলায়মান ইবন মূসার বর্ণনা এ রকম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব ছিলেন 'আফকাহুত তাবি'ঈন' (তাবি'ঈদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ্)। মদীনার বাইরে থেকে ফিকাহ্ শাস্ত্রের যে সব ছাত্র মদীনায় আসতো তাদেরকে সোজা তাঁর বাড়ীটি দেখিয়ে দেওয়া হতো। মায়মূন ইবন মাহরান বর্ণনা করেছেন, আমি যখন মদীনায় গেলাম এবং সেখানকার সবচেয়ে বড় ফকীহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম তখন লোকেরা আমাকে সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিল। 'আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবন আসলাম বর্ণনা করেছেন, চার 'আবদুল্লাহ- 'আবদুল্লাহ্ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা)- এর পরে ইসলামী বিশ্বে ফিকার পদটি মাওয়ালীদের দখলে চলে যায়। মক্কার ফকীহ ছিলেন 'আতা', ইয়ামানের তাউস, ইয়ামামার ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীর, বসরার হাসান আল-বসরী, কৃষ্ণার ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, শামের মাকহুল এবং খুরাসানের 'আতা' খুরাসানী। কেবল মদীনার পদটি একজন কুরায়শী অর্থাৎ সা'ঈদের অধিকারে ছিল।
হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব যদিও হযরত রাসূলে কারীম (সা) ও হযরত আবু বাকরের (রা) যুগটি পাননি এবং হযরত 'উমার ফারুকের খিলাফতকালে ছিলেন অল্প বয়স্ক, তা সত্ত্বেও নিজের চেষ্টা-সাধনার দ্বারা তাঁদের সকলের বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত সমূহের সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। তিনি নিজেই বলতেন, এখন রাসূল (সা), আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ আমার চেয়ে বেশী জানা কোন লোক নেই। বিশেষভাবে 'উমারের (রা) বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পর্কে বেশী অভিজ্ঞ ছিলেন। এ কারণে তাঁকে 'রাবিয়াতু 'উমার' বলা হতো। হযরত 'উমারের (রা) বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের পরিধি এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল যে, হযরত 'উমারের (রা) পুত্র 'আবদুল্লাহ- যিনি তাঁর জ্ঞান-গরিমার জন্য 'হাবরুল উম্মাহ' নামে খ্যাত ছিলেন, নিজের পিতার কোন কোন বিষয় ও অবস্থা তাঁর নিকট থেকে জেনে নিতেন। ফিকাহ্ শাস্ত্রে হযরত 'উমারের (রা) স্থান ও মর্যাদা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর সময়ে অসংখ্য নতুন সমস্যার উদ্ভব হয় এবং তিনি তার সমাধান দান করেন। এসব সমাধান ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব সবচেয়ে বেশী জানতেন। তেমনি হযরত 'উছমানের (রা) ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পর্কে তিনি ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। ইমাম যুহরী বলতেন:
كَانَ أَعْلَمَ بِقَضَاءِ عُمَرَ وَعُثْمَانَ
- তিনি 'উমার ও 'উছমানের ফায়সালা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।
তাঁর এ সব বৈশিষ্ট্য ও ব্যাপকতা শুধু তাবি'ঈ কেন, সাহাবীদের মধ্যেও খুঁজে বের করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। এ কারণে সাহাবীদের যুগেই তিনি ইফতার মসনদ অলঙ্কৃত করেন। অনেক বড় বড় ও উঁচু স্তরের সাহাবী তাঁর এ যোগ্যতার কথা স্বীকার করতেন।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার বলতেন, আল্লাহর কসম! তিনি মুফতীদের মধ্যে একজন। ৩৯ মাঝে মাঝে তিনি তাঁর নিকট আগত ফাতওয়া জিজ্ঞাসাকারীদেরকে সা'ঈদের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর নিকট কোন একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো। তিনি তাকে বললেন, তুমি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের কাছে যাও। তারপর তিনি যে জবাব দেন, আমাকে একটু জানিয়ে যাবে। লোকটি তার নির্দেশ পালন করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) সা'ঈদের জবাব শুনে মন্তব্য করেন, আমি কি তোমাদেরকে বলি না যে, তিনি 'আলিমদেরই একজন। ৪০ ইমাম আয-যুহরী বলেন, বংশ বিদ্যার জ্ঞান অর্জনের জন্য ইবন সু'বারের মজলিসে বসতাম। একদিন আমি তাঁর কাছে ফিকাহ বিষয়ের একটি মাসয়ালা জানতে চাইলাম। তিনি আমাকে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের কাছে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন। ৪১ ইমাম যুহরী ও ইমাম মাকহুলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: আনপারা যাঁদের থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফাকীহ কে? তাঁরা জবাব দেন: সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব। ৪২
হযরত সা'ঈদের সমকালীন বড় বড় 'আলিম ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈগণ তাঁর যোগ্যতা ও পূর্ণতার স্বীকৃতি দান করেছেন। তাঁরা তাঁদের নিকট আসা বহু জটিল মাসয়ালার সমাধানের জন্য তাঁর সাহায্য নিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে তাঁর থেকে উপকৃত হওয়ার উপদেশ দিতেন। হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) মত বিশাল ব্যক্তিও যখন কোন মাসয়ালার সমাধান বের করতে সমস্যায় পড়তেন তখন তাঁর কাছে লিখে পাঠাতেন। ৪৩ ইবন শিহাব আয-যুহরী বর্ণনা করেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবন ছা'লাবা আমাকে এই উপদেশ দেন যে, যদি তুমি ফিকাহ্ অর্জন করতে চাও তাহলে এই শায়খের (সাঈদ ইবন মুসায়্যিব) পিছু লও। ৪৪
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করা ব্যতীত কোন সিদ্ধান্ত দিতেন না। তিনি তাঁকে এত বেশী তা'জীম করতেন যে, কোন কিছু জানার প্রয়োজন হলে তাঁকে ডেকে পাঠানো সমীচীন মনে করতেন না, বরং লোক পাঠিয়ে জেনে নিতেন। তিনি বলতেন, মদীনায় এমন কোন 'আলিম নেই যিনি তাঁর 'ইলমসহ 'আমার নিকট আসেননি। শুধু ইবন মুসায়িয়বের 'ইলম আমার কাছে আনা হয়, তাঁকে আসার কষ্ট দিইনা।৪৫ একবার তিনি এক ব্যক্তিকে ইবন মুসায়িয়বের নিকট কোন একটি মাসয়ালার সিদ্ধান্ত জানার জন্য পাঠান। লোকটি তাঁকেই সংগে করে তাঁর দরবারে হাজির হন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে দেখা মাত্র বলে ওঠেন, সে ভুল করে আপনাকে আসার কষ্ট দিয়েছে। আমি তো তাকে শুধু আপনার নিকট থেকে সমাধানটি জেনে আসার জন্য পাঠিয়েছিলাম।৪৬
হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের (রহ) শিষ্য-শাগরিদের বেষ্টনী অত্যন্ত প্রশস্ত। তাঁর কয়েকজন বিশেষ বিখ্যাত শাগরিদের নাম এখানে দেওয়া হলো: সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, যুহরী, কাতাদা, শুরায়ক ইবন আবী-নুমায়র, আবুয যানাদ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, 'আমর ইবন মুররা, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী, দাউদ ইবন আবী হিন্দা, তারিক ইবন 'আবদির রহমান, 'আবদুল হামীদ ইবন জুবায়র, শু'বা, 'আবদুল খালিক ইবন সালামা, 'আবদুল মাজীদ ইবন সুহায়ল, 'আমর ইবন মুসলিম, ইমাম বাকির, ইবন মুনকাদির, হাশিম ইবন হাশিম ইবন 'উতবা, ইউনুস ইবন ইউসুফ ও আরো অনেকে।৪৭
হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) তৎকালীন আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বংশবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। 'আল্লামা আল-জাহিজ বলেছেন: 'এই উম্মাতের শ্রেষ্ঠতম বংশ বিদ্যাবিশারদ হলেন আবূ বাকর (রা)। তারপর যথাক্রমে 'উমার (রা), জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব ও তাঁর পুত্র মুহাম্মাদ।' তিনি মানুষকে এ বিদ্যা শিক্ষাও দিতেন।৪৮
আরবী ভাষায় তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। তিনি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির ভাষা জ্ঞান সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেছেন। একবার কেউ একজন তাঁকে প্রশ্ন করলো আচ্ছা বলুন তো, সবচেয়ে বেশী শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষী কে? বললেন রাসূলুল্লাহ (সা)। লোকটি বললো: না, আমি তাঁর বিষয়ে জানতে চাচ্ছিনে। জানতে চাচ্ছি, আপনার সমকালীনদের মধ্যে কে? বললেন: মু'আবিয়া, তাঁর পুত্র, সা'ঈদ আল-আشদাক ও তাঁর পুত্র 'আমর ইবন সা'ঈদ। আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র তাঁদের পরের স্তরের। তবে তাঁর কথায় তেমন সম্মোহনী শক্তি নেই।৪৯
হযরত সা'ঈদ ছিলেন একজন নির্ভেজাল সম্মানিত দীনী ব্যক্তিত্ব। তা সত্ত্বেও একজন কাব্য-রসিক ব্যক্তি ছিলেন। কবিতা আবৃত্তি শুনার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। এটাকে তিনি তাকওয়া-পরহিযগারীর পরিপন্থী কাজ বলে মনে করতেন না। আল-আসমা'ঈ বলেছেন: একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো, 'ইরাকে কিছু তাপস লোক এমন আছেন যাঁরা কবিতা শুনা ও কাব্যচর্চা করা খারাপ মনে করেন। তিনি মন্তব্য করলেন, তাঁরা অনারব তপস্য-সংস্কৃতি ধারণ করেছেন। তিনি নিজে কবিতা রচনা করতেন না, তবে কবিতা শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন: আবূ বাকর (রা) একজন কবি ছিলেন। 'উমার (রা) ও 'আলী (রা)- উভয়ে কবি ছিলেন। 'আলী (রা) এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবি। ৫২
স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন বড় বিশেষজ্ঞ। এই শাস্ত্রের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রায় স্বভাবগত। এ শাস্ত্রের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) কন্যা হযরত আসমা'র কাছ থেকে। আর তিনি অর্জন করেন তাঁর মহান পিতার থেকে। ৫৩
স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাঁর ভীষণ খ্যাতি ছিল এবং অসংখ্য মানুষ তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য তাঁর কাছে আসতো। যখন কোন ব্যক্তি তাঁর নিকট কোন স্বপ্ন বর্ণনা করতো, তিনি তা শুনার পর প্রথমেই বলতেন, তুমি ভালো স্বপ্ন দেখেছো। ৫৪ এখানে কয়েকটি স্বপ্ন ও তার তা'বীর বর্ণনা করা হলো:
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) ও খলীফা 'আবদুল মালিকের মধ্যে সংঘাত- সংঘর্ষের সময়কালে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললো, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, 'আবদুল মালিককে আমি চিৎ করে ফেললাম। তারপর উপুড় করে তাঁর পিঠে চারটি পেরেক মেরে দিলাম। এ স্বপ্নের কথা শুনে তিনি লোকটিকে বললেন, তুমি নিজে স্বপ্ন দেখনি। লোকটি বললো, আমিই দেখেছি। তখন সা'ঈদ (রহ) বললেন, যদি তুমি সত্য কথাটি না বল তাহলে আমিই বলে দিচ্ছি। তখন লোকটি স্বীকার করলো যে, সে নয় বরং 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) স্বপ্নটি দেখেছেন এবং ব্যাখ্যা জানার জন্য তাকে পাঠিয়েছেন। সা'ঈদ (রহ) বললেন: তুমি যদি স্বপ্নটি সঠিকভাবে বর্ণনা করে থাক তাহলে 'আবদুল মালিক 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে হত্যা করবে এবং তাঁর বংশধারা থেকে চারজন খলীফা হবে।
আরেক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে, 'আবদুল মালিক চারবার মসজিদে নববীর সামনে পেশাব করেছেন। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) তার এই ব্যাখ্যা দেন যে, 'আবদুল মালিকের বংশ থেকে চারজন খলীফা হবে। এই দুইটি স্বপ্নের ব্যাখ্যাই সত্যে পরিণত হয়। 'আবদুল মালিকের সাথে সংঘর্ষে ইবন যুবায়র নিহত হন। 'আবদুল মালিকের চার ছেলে ওয়ালীদ, সুলায়মান, ইয়াযীদ (২য়) ও হিশাম খলীফা হন। ৫৫
আবুল হাসান আল-মাদায়িনী বলেন: খলীফা 'আবদুল মালিক একবার স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর স্ত্রী 'আয়িশা বিনত হিশাম তাঁর মাথা বিশ টুকরো করে ফেলেছেন। ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। স্বপ্নটির ব্যাখ্যা জানার জন্য সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়্যিবের নিকট লোক পাঠালেন। এই 'আয়িশা ছিলেন নির্বোধ মহিলা। সা'ঈদ বললেন: একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিবে এবং সেই সন্তান বিশ বছরের জন্য দেশের রাজা হবে। এ ব্যাখ্যা সত্যে পরিণত হয়েছিল। আয়িশার গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন 'আবদুল মালিকের পুত্র হিশাম। ৫৬
শুরায়ক ইবন নুমায়র একবার বর্ণনা করলেন যে, আমি দেখলাম, আমার একটি দাঁত আমার হাতে খসে পড়লো এবং সেটাকে মাটিতে পুঁতে রাখলাম। সা'ঈদ (রহ) তার ব্যাখ্যা দিলেন যে, তোমার খান্দানের মধ্যে তোমার সমবয়সী কোন ব্যক্তির মৃত্যু হবে এবং তুমি তাকে দাফন করবে। আরেক ব্যক্তি একবার বর্ণনা করলো যে, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার নিজের হাতে আমি পেশাব করছি। সা'ঈদ ব্যাখ্যায় বললেন, তোমার স্ত্রী তোমার মাহরিম (নিকট আত্মীয়- যাকে বিয়ে করা বৈধ নয়)। অনুসন্ধানের পর দেখা গেল, লোকটির স্ত্রী তার দুধ বোন। মুসলিম আল-খায়্যাত বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি তার স্বপ্নের বর্ণনায় বললো, একটি কবুতর মসজিদের মিনারের উপর এসে বসে পড়লো। ব্যাখ্যায় তিনি বললেন, হাজ্জাজ, জা'ফর ইবন আবী তালিবের (রা) পৌত্রীকে বিয়ে করবেন। আরেক ব্যক্তি তার স্বপ্নের বর্ণনা দেয়, সে দেখে একটি ছাগল মদীনার ছানিয়্যাতুল বিদা থেকে দৌড়ে এসে বলতে থাকে- আমাকে জবাই কর। আমাকে জবাই কর, আমি জবাই করলাম। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) ব্যাখ্যায় বললেন, ইবন সালা' মৃত্যু বরণ করবে। ইবন সালা' মদীনার মওয়ালীদের একজন ছিলেন।
'আবদুর রহমান ইবন সায়িব বর্ণনা করেছেন। ফাহম গোত্রের এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে, সে আগুনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) ব্যাখ্যা দিলেন যে, তুমি মৃত্যুর পূর্বে সমুদ্র ভ্রমণ করবে এবং তোমার মৃত্যু হবে হত্যার মাধ্যমে। 'আবদুর রহমান বলেন, সত্যিই লোকটি সমুদ্র ভ্রমণ করে এবং ভ্রমণকালে মরতে মরতে বেঁচে যায়। তারপর 'কুদায়দ'-এর যুদ্ধে সে নিহত হয়।
হুসাইন ইবন 'উবাইদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। আমার একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমার কোন সন্তান হলো না। একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, কে যেন আমার কোলে একটি ডিম ছুঁড়ে দিল। আমি সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়ি্যবের (রহ) নিকট স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি বললেন, ঐ ডিমটি একটি অনারব মুরগীর ডিম। তুমি কোন অনারব মেয়েকে বিয়ে কর। একথার পর আমি একটি অনারব দাসীকে বিয়ে করি। তারই গর্ভে আমার এক ছেলের জন্ম হয়।
একবার এক ব্যক্তি বর্ণনা করলো, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি ছায়ায় বসে আছি। তারপর উঠে রোদে গেলাম। হযরত সা'ঈদ এর ব্যাখ্যায় বললেন, আল্লাহর কসম! যদি তোমার এ স্বপ্ন সত্য হয় তাহলে তুমি ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে। এ কথা শুনে লোকটি তার বর্ণনা ঠিক করে বলে, আমাকে জোর করে রোদে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আমি সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে আসি। তখন হযরত সা'ঈদ তাঁর পূর্ব ব্যাখ্যার সাথে একথাটি যোগ করেন- 'কাফির হওয়ার জন্য তোমার উপর চাপ প্রয়োগ করা হবে।' লোকটি খলীফা 'আবদুল মালিকের খিলাফতকালে কোন একটি যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর হাতে বন্দী হয় এবং চাপের মুখে ইসলাম ত্যাগ করে। পরে মুক্তি পেয়ে মদীনায় ফিরে আসে। ঘটনাটি সে নিজেই বর্ণনা করতো। এসব স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যার কথা ইবন সা'দ তাঁর তাবাকাতে বর্ণনা করেছেন।
হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়ি্যবের (রহ) কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণী
তিনি বলতেন, শয়তান যখন কোন কাজের ব্যাপারে কোন মানুষের নিকট থেকে হতাশ হয়ে যায় তখন সে কোন নারীর মাধ্যমে তা সম্পন্ন করে। আমি আমার নম্স-এর ব্যাপারে নারীকে বেশী ভয় করি। উপস্থিত লোকেরা বললো, আবূ মুহাম্মাদ! আপনার মত বয়োবৃদ্ধ মানুষের তো নারীর প্রতি কোন আকর্ষণ থাকার কথা নয়। তাছাড়া কোন নারীও আপনার প্রতি কোন রকম আকর্ষণ বোধ করবে না। তাহলে ভয় কিসের? বললেন, তা সত্ত্বেও আমি যা কিছু তোমাদেরকে বলছি, সেটাই হলো বাস্তবতা। ৫৭
তিনি বলতেন, বান্দার জন্য তার নম্স-এর সবচেয়ে বড় সম্মান করা হলো আল্লাহর আনুগত্য করা, আর তার সবচেয়ে বড় অবমাননা হলো আল্লাহর নাফরমানী করা। এ দুনিয়া এমন এক মরীচিকা যার দিকে প্রত্যেকে ঝুঁকে যায়, যাকে অন্যায়ভাবে সকলে অর্জন করতে চায়, অন্যায়ের মাধ্যমে পেতে চায় এবং অনুপযুক্ত স্থানে তা ব্যয় করে। দুনিয়ার ধন-সম্পদের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই- যদি না তা নিজের দীন ও আত্মসম্মানের রক্ষণাবেক্ষণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে অর্জিত হয়। জুলমের সহায়ক ও সহযোগীকে যখনই দেখবে, ঘৃণা করবে। যাতে তোমার ভালো কাজগুলো নষ্ট হয়ে না যায়।
তিনি বলতেন, সব মানুষ তার সব কর্ম সম্পাদন করে আল্লাহর আশ্রয় ও তত্ত্বাবধানে। আল্লাহ যখন কাউকে হেয় ও অপমান করতে চান তখন তাকে স্বীয় আশ্রয় ও তত্ত্বাবধান থেকে বের করে দেন। ফলে মানুষের মধ্যে তার গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে যায়।
কোন ভদ্র মানুষ, কোন 'আলিম এবং কোন পূর্ণ মানব এমন নেই যার মধ্যে কিছু না কিছু ত্রুটি নেই। তবে তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ এমন আছেন যাঁদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা উচিত নয়। আর তাঁরা হলেন ঐসব লোক যাঁদের ভালো কাজ তাঁদের মন্দ কাজের চেয়ে বেশী। তাঁদের এ ভালো কাজের জন্য তাঁদের মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করা উচিত। ৫৮
হযরত সা'ঈদের (রহ) দাস 'বারদ' একবার তাঁর মনিবের নিকট কিছু মানুষের 'ইবাদাত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বললেন: মানুষ জুহ্ থেকে 'আসর পর্যন্ত একাধারে 'ইবাদাত করতে থাকে। হযরত সা'ঈদ (রহ) বললেন, আল্লাহর কসম! এটা 'ইবাদাত নয়। তুমি কি জান 'ইবাদাত কাকে বলে? 'ইবাদাত বলে, আল্লাহর আদেশসমূহের ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা করা ও তাঁর নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকাকে। ৫৯
হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) যেমন জ্ঞানগত পূর্ণতার অধিকারী ছিলেন, তেমনিভাবে উন্নত নৈতিকতা, চারিত্রিক গুণাবলী ও যোগ্যতারও অধিকারী ছিলেন। 'ইলম ও 'আমল- জ্ঞান ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে তাঁর ছিল সমান কর্তৃত্ব। তিনি ছিলেন একজন উঁচু মানের 'আবিদ ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষ। ইবন খালিকান লিখেছেন, ফিকাহ্, হাদীছ, দীনদারী, তাকওয়া-পরহিযগারী, 'ইবাদাত তথা সব ধরনের মহত্ত্ব ও গুণাবলীতে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈদের অন্তর্গত। ৬০ ইমাম নাবাবী লিখেছেন, তাঁর জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব এবং তাঁর দীনী মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের সকল 'আলিমের মতামত ও মন্তব্যের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। ৬১
তিনি জামা'আতে নামায আদায়ের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। একাধারে চল্লিশ বছর, মতান্তরে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এক ওয়াকত নামাযও জামা'আত ছাড়া আদায় করেননি। কখনো এমন সময়ে মসজিদে আসার ঘটনা ঘটেনি যখন লোকেরা নামায শেষ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। জামা'আতের প্রথম কাতারে সব সময় নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, পঞ্চাশ বছর যাবত নামাযের মধ্যে অন্য কারো পশ্চাদ্দেশের উপর আমার দৃষ্টি পড়ার কোন সুযোগ হয়নি। ৬২
রাজনৈতিক হৈ-হাঙ্গামা ও বিপর্যয়- বিশৃঙ্খলার সময় যখন ঘর থেকে বের হওয়া মোটেই নিরাপদ ছিল না, তখনও তিনি মসজিদ ছাড়েননি। মদীনার ইতিহাসে 'হাররা'র বিশৃঙ্খলা একটি বিখ্যাত ঘটনা। এ ঘটনা ইয়াযীদ ও 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) বিরোধের সময়কালে সংঘটিত হয়। মদীনাবাসীরা যখন ইয়াযীদের আনুগত্য ত্যাগ করে 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পক্ষে 'আবদুল্লাহ ইবন হানজালাকে তাঁদের ওয়ালী বলে ঘোষণা দেয়, তখন ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা ঘেরাও করে একাধারে তিন দিন পর্যন্ত মদীনায় পাইকারীভাবে গণহত্যা চালায় এবং লুটপাট করে। এমন ভীতিকর ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় কেউ ঘরের বাইরে পা রাখতে সাহস করতো না। মদীনার মসজিদগুলো একেবারে জনশূন্য হয়ে থাকতো। এমন ভয়াবহ ও ভীতিকর সময়েও হযরত সা'ঈদ (রহ) মসজিদে যাওয়া থেকে একদিনও বিরত থাকেননি। তিনি মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। বানু উমাইয়্যারা তাঁকে দেখে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলতো, তোমরা এই বৃদ্ধকে একটু দেখ। এমন অবস্থায়ও তিনি মসজিদ ছাড়ছেন না।
জামা'আতের সাথে নামায আদায় করার প্রবল ইচ্ছার কারণে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও এমন স্থানে যেতেন না যেখানে জামা'আতের সাথে নামায আদায়ের ব্যবস্থা থাকতো না। তাঁর চোখে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। লোকেরা তাঁকে মদীনার বাইরে 'আকীক' চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কারণ, সেখানকার সবুজ পরিবেশ তাঁর চোখের জন্য উপকারী হতে পারে। তিনি বললেন, সকালের ফজরের নামাযের জামা'আতে অংশগ্রহণের কি হবে?
ইবন শিহাব যুহরী বর্ণনা করেছেন। একবার আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের (রহ) সামনে পল্লী এলাকার সৌন্দর্য এবং সেখানকার চমৎকার জীবনাচারের আলোচনা করে তাঁকে বললাম, আপনি যদি কিছু দিনের জন্য সেখানে গিয়ে থাকতেন তাহলে ভালো হতো। তিনি বললেন, আমার রাত্রিকালীন নামাযের জামা'আতে উপস্থিতির কি হবে?
হযরত সা'ঈদের (রহ) 'ইবাদাতের মূল সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সেই সময় তিনি আত্মসমালোচনা করতেন। প্রত্যেক রাতে তিনি নিজের নফসকে সম্বোধন করে বলতেন, ওহে যাবতীয় মন্দ ও খারাপের উৎস, ওঠো, তোমাকে আমি ঐ উটের মত বিধ্বস্ত করে ছাড়বো যে পরিশ্রান্ত ও দুর্বলতার জন্য চলার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। একথা বলে তিনি তাহাজ্জুদ নামাযে নিমগ্ন হয়ে যেতেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত নামায আদায় করে চলতেন। রাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দু'টি পা ফুলে যেত। সকালে আবার নফসকে সম্বোধন করে বলতেন : তোমাকে এ কাজেরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এ কাজের জন্যই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, পঞ্চাশ, মতান্তরে চল্লিশ বছর যাবত 'ঈশার নামাযের ওজুতে ফজরের নামায আদায় করেছেন।
নিষিদ্ধ দিনগুলি ছাড়া তিনি সারা বছর রোযা রাখতেন। মাগরিবের সময় বাড়ী থেকে কিছু পানীয় পাঠিয়ে দেওয়া হতো তা দিয়েই মসজিদে ইফতার সেরে নিতেন।
প্রায় প্রত্যেক বছরই হজ্জ আদায় করতেন। কিছু কিছু বর্ণনা মতে তাঁর হজ্জের মোট সংখ্যা পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বানু উমাইয়্যাদের সাথে মতপার্থক্য ও বিরোধের কারণে কিছুদিনের জন্য তারা তাঁকে হজ্জ আদায় থেকে বিরত রাখেন। 'আলী ইবন যায়দ একবার তাঁকে বলেন, আপনার সম্প্রদায়ের ধারণা, আপনাকে হজ্জ আদায়ে এ জন্য বাধা দেওয়া হয়েছিল যে, আপনি আপনার নিজের উপর এটা আবশ্যিক করে নিয়ে ছিলেন যে, যখনই কা'বা দেখবেন তখনই মারওয়ান বংশের জন্য বদদু'আ করবেন। তিনি বললেন, একথা সত্য নয়। তবে আমি প্রত্যেক নামাযের সময় তাদের জন্য বদদু'আ করে থাকি। সারা জীবনে একটি হজ্জ বা একটি 'উমরা ফরজ। কিন্তু আমি বিশটিরও বেশী হজ্জ আদায় করেছি। তোমাদের সমাজে এমন বহু মানুষ আছে, যারা নিজেদেরকে ভীষণ দীনদার বলে মনে করে থাকে। তারা হজ্জ ও 'উমরা করে মারা যায়। কিন্তু তাদের হজ্জ হয় না। আমি তো নফল হজ্জ ও 'উমরা অপেক্ষা জুম'আর নামাযের বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
কুরআন পাকের তিলাওয়াত কখনো বাদ যেত না। সফরের অবস্থায়ও বাহনের পিঠে বসে তিলাওয়াত করতেন। তিনি সকল সম্মানীয় ব্যক্তি ও বস্তুর খুবই তা'জীম ও সম্মান করতেন। নবী-রাসূলদের প্রতি এত বেশী ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল যে, তাঁদের নামে নিজের ছেলেদের নাম রাখা বেয়াদবী মনে করতেন। কুরআন ও মসজিদের প্রতি এত সম্মান দেখাতেন যে শব্দ দু'টির ক্ষুদ্র অর্থ বুঝানোর জন্য রূপান্তরও মনঃপূত ছিল না। ইবন হারমালা বর্ণনা করেছেন, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) বলতেন, তোমরা مُصْحَف و مَسْجِد (ছোট মসজিদ, ছোট কুরআন) বলবে না। আল্লাহ যে জিনিসকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তাকে সম্মান কর। আল্লাহ যে জিনিসকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তা শ্রেষ্ঠ এবং ভালো।
অসুস্থ অবস্থায়ও হাদীছ বর্ণনার সময় শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে যেতেন। একবার কোন এক ব্যক্তি তাঁর অসুস্থ অবস্থায় তাঁর নিকট একটি হাদীছ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি শুয়ে ছিলেন, হঠাৎ উঠে বসলেন। প্রশ্নকারী বললেন, আমি চাচ্ছিলাম আপনার কোন কষ্ট না হোক। তিনি বললেন, আমি শুয়ে শুয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ বর্ণনা করা খারাপ মনে করি।
স্বভাব-চরিত্র ও আদত-অভ্যাসে তিনি ছিলেন সাহাবায়ে কিরামের অনুরূপ। বহু বড় বড় সাহাবী তাঁর স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের তারিফ করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলতেন, যদি রাসূল (সা) তাঁকে দেখতেন, খুশী হতেন। স্বভাবগত ভাবেই তিনি ছিলেন খুবই কোমল মনের ও নির্বিরোধ প্রকৃতির মানুষ। মতবিরোধ, যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব-ফাসাদ খুবই অপছন্দ ছিল। 'ইমরান ইবন 'আবদিল্লাহ খুযা'ঈ বর্ণনা করেছেন, সা'ঈদ ইবন আল মুসায়্যিব (রহ) কারো সাথে ঝগড়া করতেন না। কেউ যদি তাঁর চাদরটি কেড়ে নিতে চাইতো তাহলে তিনি তা স্বেচ্ছায় তার দিকে ছুড়ে দিতেন। শরীয়াতের নিষিদ্ধ বিষয়ের ব্যাপারে এত বেশী সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, শিশুদের খেলাধুলোর প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। নিজের মেয়েকে হাতির দাঁতের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলতে দিতেন না। তিনি গলায় তাবীজ ঝুলানোকে কোন দোষ মনে করতেন না। একবার তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: لا بأس এতে কোন দোষ নেই।
তবে সত্য বলার ব্যাপারে তাঁর এ কোমল স্বভাব রুক্ষ ও কঠোর রূপ ধারণ করতো। ইমাম আয-যাহাবী বলেছেন, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব খুবই সত্যভাষী ছিলেন। সত্য বলার প্রয়োজন হলে তিনি কখনো চুপ থাকতেন না। বানু উমাইয়্যার সমালোচনায় তাঁর ভাষার তরবারি সবসময় কোষমুক্ত থাকতো। তাদের সমালোচনায় কখনো তিনি বিরত থাকতেন না। মুত্তালিব ইবন সায়িব বর্ণনা করেছেন, একবার আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের সাথে বাজারে বসে ছিলাম। এমন সময় বানু উমাইয়্যার এক আদালী সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কি বানু উমাইয়্যার ডাকবাহক? সে বললো: হাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন : তাদেরকে তুমি কেমন দেখে এসেছো? বললো: ভালো অবস্থায়। সা'ঈদ বললেন : তারা তো মানুষকে অভুক্ত রেখে কুত্তার পেট ভরায়। একথা শুনে ডাকবাহক ভীষণ ক্ষেপে গেল। আমি তাকে কোন রকম বুঝিয়ে বিদায় করে দিই। তারপর সা'ঈদকে বললাম, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি কেন এভাবে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছেন? সা'ঈদ বললেন : ওরে নির্বোধ, চুপ কর। আল্লাহর কসম! যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহর অধিকারসমূহ সংরক্ষণ করবো ততক্ষণ তিনি আমাকে তাদের হাতের মুঠোয় তুলে দেবেন না। ৬৭
হযরত সা'ঈদের (রহ) খলীফা ও আমীরদের প্রতি মুখাপেক্ষীহীনতার ভাব তাঁদেরকে উপেক্ষার স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি একাধিক উমাইয়্যা খলীফার যুগ লাভ করেন। কিন্তু তাদের কারো সামনে মাথা নোয়াননি। শুধু তাই নয়, বরং তাদের কাকেও সাক্ষাৎ দেওয়াও প্রয়োজন বোধ করেননি। খলীফা 'আবদুল মালিকের সাথে তাঁর এ রকম কয়েকটি ঘটনার কথাই ইতিহাসে পাওয়া যায়। যাতে তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 'আবদুল মালিক তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তিনি তাঁকে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকার করতেন। একবার খলীফা 'আবদুল মালিক মদীনায় গেলেন। তিনি মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়ে মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সা'ঈদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তাঁকে লোক মারফত ডেকে পাঠালেন। 'আবদুল মালিকের লোক সা'ঈদের নিকট গিয়ে বললো, আমীরুল মু'মিনীন দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চান। জবাবে সা'ঈদ বললেন : আমার কাছে আমীরুল মু'মিনীনের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি আমার কাছে আমীরুল মু'মিনীনের কোন প্রয়োজন থেকেও থাকে তাহলে তা পূরণ হবার নয়। লোকটি ফিরে গিয়ে 'আবদুল মালিককে তাঁর জবাবটি জানিয়ে দিল। তিনি আবার লোকটিকে সা'ঈদের নিকট একই কথা বলে পাঠালেন। তবে বলে দিলেন, যদি তিনি না আসতে চান জোর করে আনবে না। লোকটি আবার গেল এবং একই জবাব পেল। লোকটি বললো, যদি আমীরুল মু'مিনীনের নিষেধ না থাকতো তাহলে আমি তোমার মাথা কেটে নিয়ে যেতাম। তিনি বার বার তোমাকে ডাকছেন, আর তুমি এভাবে প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছ। সা'ঈদ বললেন, যদি তিনি আমার সাথে কোন ভালো আচরণের ইচ্ছা করে থাকেন তাহলে আমি তা তোমাকে দান করলাম। আর যদি তাঁর অন্য কোন ইচ্ছা থেকে থাকে তাহলে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিশেষ বৈঠক থেকে উঠবো না যতক্ষণ না তিনি যা করতে চান তা করে ফেলেন। 'আবদুল মালিকের পাঠানো সেই লোকটি ফিরে গিয়ে তাঁকে সা'ঈদের সব কথা জানিয়ে দিল। 'আবদুল মালিক মন্তব্য করলেন : আল্লাহ আবু মুহাম্মাদের প্রতি দয়া করুন! তাঁর কঠোরতা বেড়েই চলেছে। ৬
একবার খলীফা 'আবদুল মালিক মদীনা আসলেন। একদিন রাতের বেলা তাঁর চোখে মোটেই ঘুম আসছিল না। তিনি তাঁর এক নিরাপত্তা রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন: তুমি মসজিদে গিয়ে দেখ তো মদীনার কোন কাহিনী বলিয়ে লোক পাও কিনা। পেলে নিয়ে আসবে। নিরাপত্তা রক্ষী মসজিদে গেল। কিন্তু এত গভীর রাতে কিসসা-কাহিনী বলার লোক থাকবে কেন। হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) মসজিদের এক কোণে বসে যিকির ও দু'আ-ইসতিগফারে মশগুল ছিলেন। রক্ষীটি সা'ঈদকে চিনতো না। সে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং হাতের ইশারায় তাঁকে ডাকলো। কিন্তু তিনি কোন প্রকার সাড়া না দিয়ে নিজের জায়গায় বসে রইলেন। রক্ষী মনে করলো, এ ব্যক্তি ইচ্ছা করে তার ইশারায় সাড়া দিচ্ছে না। সে আরো একটু নিকটে গিয়ে ইশারা করলো এবং বললো, আমি তোমাকে ইশারা করেছি, তুমি দেখতে পাওনি? সা'ঈদ (রহ) বললেন: তুমি তোমার প্রয়োজনের কথা বল। রক্ষী বললো: আমীরুল মু'مিনীনের চোখ খুলে গেছে। তিনি আমাকে হুকুম করেছেন: কোন কথা বলার লোক নিয়ে এসো। এ কারণে তোমাকে যেতে হবে। সা'ঈদ বললেন: তিনি কি আমাকে ডেকেছেন? রক্ষী বললো: না। তিনি বলেছেন: তুমি যেয়ে দেখ, শহরের কোন কিসসা-কাহিনী বলার লোক যদি পাও নিয়ে এসো। আমি তোমার চেয়ে উপযুক্ত কোন লোক পাইনি। একথা শুনে সা'ঈদ বললেন: তুমি ফিরে গিয়ে আমীরুল মু'মিনينকে বলে দাও যে, আমি তাঁর গল্প-কাহিনী বলা লোক নই। এমন জবাব শুনে রক্ষী মনে করলো, এ হয়তো কোন পাগল হবে। এ কারণে সে ফিরে গেল এবং 'আবদুল মালিককে বললো, মসজিদে শুধু এক বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। আমি তাঁকে ইশারা করলাম, কিন্তু সে তার স্থান থেকে একটুও নড়লো না। তারপর আমি তার নিকটে গিয়ে বললাম, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে পাঠিয়েছেন, কোন কাহিনী বলিয়ে লোক নিয়ে যাওয়ার জন্য। লোকটি জবাব দিল তুমি যেয়ে আমীরুল মু'মিনীনকে বল, আমি তাঁর গল্প-কাহিনী বলার লোক নই। 'আবদুল মালিক তাঁর স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। এ কারণে ঘটনাটি শুনে তিনি বলে ওঠেন: এ তো সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব। তাঁকে ছেড়ে দাও।
তিনি খলীফা 'আবদুল মালিককে এত শক্ত জবাব দিতেন যা একজন সাধারণ মানুষকেও দেওয়া যায় না। একবার 'আবদুল মালিক তাঁকে বললেন: আবূ মুহাম্মাদ! এখন আমার অবস্থা এমন হয়েছে যে, যদি কিছু ভালো কাজ করি তাহলে তাতে খুশী অনুভব করি না। আর খারাপ কাজ করলেও তাতে দুঃখ অনুভব করি না। তিনি বললেন: এখন আপনার অন্তর একেবারেই মরে গেছে।
খলীফা 'আবদুল মালিক-এর পরে তাঁর পুত্র ওয়ালীদের সাথেও হযরত সা'ঈদের (রহ) কর্মধারা একই রকম ছিল। মসজিদে নববীর পুনর্নির্মাণ ও প্রশস্তকরণের পর যখন ওয়ালীদ পরিদর্শনে এলেন তখন মসজিদের অভ্যন্তরের সব মানুষকে বের করে দেওয়া হয়। সা'ঈদ ইবনে মুসায়্যিব (রহ) মসজিদের এক কোণে বসা ছিলেন। তাঁকে উঠানোর হিম্মত কারো হয়নি। এক ব্যক্তি শুধু এতটুকু বলে যে, এ সময় যদি আপনি একটু সরে যেতেন! তিনি জবাব দেন, আমার ওঠার যে সময় আছে তার আগে আমি উঠবো না।
তারপর তাঁর কাছে আবেদন জানানো হলো, ঠিক আছে উঠবেন না, তবে অন্ততঃ এতটুকু করুন যে, যখন আমীরুল মু'মিনীন এদিক দিয়ে যাবেন তখন সালাম দেওয়ার জন্য একটু উঠে দাঁড়াবেন। বললেন: আল্লাহর কসম! আমি তার জন্য উঠে দাঁড়াতে পারিনে।
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা ওয়ালীদকে মসজিদ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। তিনি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিবের (রহ) মর্যাদা ও তাঁর স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এ কারণে তিনি সা'ঈদকে ওয়ালীদের দৃষ্টির আড়ালে রাখার জন্য এদিক সেদিক ঘোরাতে থাকেন। কিন্তু ওয়ালীদ কিবলার দিকে তাকাতেই এক সময় সা'ঈদের উপর দৃষ্টি পড়ে। ওয়ালীদ জিজ্ঞেস করেন: এই বৃদ্ধ কে? সা'ঈদ তো নয়? 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয জবাব দিলেন: হাঁ, তিনিই। তারপর তাঁর পক্ষ থেকে কৈফিয়াত দিতে গিয়ে তাঁর বিভিন্ন অসুবিধার কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন: এখন তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন ও চোখে কম দেখেন। যদি তিনি আপনাকে চিনতে পারতেন তাহলে সালাম দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেন। ওয়ালীদ বললেন: হাঁ, আমি তাঁর অবস্থা সম্পর্কে অবগত। আমি নিজেই তাঁর কাছে যাচ্ছি। অতঃপর ওয়ালীদ এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে তাঁর কাছে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন: শায়খ, আপনার শরীর কেমন আছে? শায়খ নিজের জায়গায় বসে বসেই জবাব দিলেন: আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি। তবে এতটুকু সৌজন্য বজায় রাখলেন যে, ওয়ালীদের কুশলও জিজ্ঞেস করলেন। এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পর ওয়ালীদ একথা বলতে বলতে ফিরে যান যে, এ হলো পুরাতন স্মৃতি।
হযরত সা'ঈদ (রহ) শরী'আতের হুকুম-আহকামের ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন, তবে কারো গোপন পাপের কথা প্রকাশ করা মোটেই পছন্দ করতেন না। এ ব্যাপারে অন্যদেরকেও গোপন করার নির্দেশ দিতেন। ইবন হারমালা বর্ণনা করেছেন, একদিন আমি প্রত্যুষে ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এক ব্যক্তিকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাই। আমি তাকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে আমার ঘরে নিয়ে আসি। এরপর সা'ঈদের সাথে আমার দেখা হয়। তাঁর কাছে আমি জানতে চাইলাম, এক ব্যক্তি কোন এক ব্যক্তিকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পেল, এ অবস্থায় সে কি করবে? তাকে কি বিচারে সোপর্দ করে তার উপর হদ জারী করাবে? সা'ঈদ বললেন: তুমি যদি তাকে তোমার কাপড় দিয়ে ঢাকতে পার তাহলে ঢেকে দাও। একথা শুনে আমি ঘরে ফিরে এলাম। তখন লোকটির নেশার ঘোর কেটে গেছে। আমাকে দেখামাত্রই তার চেহারায় লজ্জা ও অনুশোচনার ভাব ফুটে ওঠে। আমি তাকে বললাম: তোমার লজ্জা হয় না? সকালে তোমাকে যদি এ অবস্থায় গ্রেফতার করে নিয়ে যেত এবং তোমার উপর হদ জারী করা হতো তাহলে মানুষের দৃষ্টিতে তোমার মর্যাদা কোথায় নেমে যেত? তোমার জীবদ্দশায় তোমার মৃত্যু হতো। তোমার সাক্ষ্য পর্যন্ত গ্রহণ করা হতো না। আমার এ উপদেশ শুনে লোকটি বললো আল্লাহর কসম! ভবিষ্যতে আমি এমন কাজ আর করবো না। এই গোপন রাখার ফল এই হলো যে, সে চিরদিনের জন্য তাওবা করে নিল। ৭০
হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) মেয়ের বিয়ের ঘটনাটি আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, দারিদ্রপ্রীতি, আড়ম্বরহীনতা প্রভৃতি দিক থেকে অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। তাঁর মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী ও সুশিক্ষিতা। খলীফা 'আবদুল মালিক তাকে পুত্রবধূ করার প্রস্তাব পাঠান। সা'ঈদ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। 'আবদুল মালিক খুব চাপ প্রয়োগ করেন এবং নানা ধরনের কঠোরতার আশ্রয় নেন। কিন্তু সা'ঈদ (রহ) প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ওপর অটল থাকেন। কিছুদিন পর তিনি কুরায়শ বংশের এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র ব্যক্তির সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেন। সেই ব্যক্তির নাম ছিল আবূ বিদা'আ।
এই ঘটনাটি আবূ বিদা'আ নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) নিকট নিয়মিত যাতায়াত করতাম। একবার কিছুদিন বিরতির পর গেলাম। সা'ঈদ প্রশ্ন করলেন: এতদিন কোথায় ছিলে? আমি বললাম: আমার স্ত্রীর মৃত্যু হওয়ায় উপস্থিত হতে পারিনি। তিনি বললেন: আমাকে সংবাদ দাওনি কেন, আমিও কাফন-দাফনে অংশগ্রহণ করতাম। কিছুক্ষণ পর আমি যখন উঠতে গেলাম তখন তিনি বললেন, তুমি কি দ্বিতীয় বিয়ের কোন ব্যবস্থা করেছো? আমি বললাম আমি একজন রিক্ত-নিঃস্ব সামান্য আয়ের মানুষ। আমার সাথে কে তার মেয়ের বিয়ে দেবে?
তিনি বললেন: আমি দেব। তুমি প্রস্তুতি নাও। আমি বললাম: খুবই আনন্দের বিষয়। হযরত সা'ঈদ (রহ) দুই অথবা তিন দিরহাম দেন মাহরের বিনিময়ে আমার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে পড়িয়ে দেন। আমি সেখান থেকে যখন উঠলাম তখন খুশীর আতিশয্যে কি করবো তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। বাড়ীতে ফিরে এসে বউকে ঘরে তুলে আনার জন্য ধার-দেনার চিন্তা-ভাবনায় পড়ে গেলাম।
সন্ধ্যার সময় সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব মেয়েকে তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য বললেন। দু' রাক'আত নামায তিনি নিজে পড়লেন এবং দু রাক'আত নামায মেয়ের দ্বারা পড়ালেন। তারপর তাকে সংগে করে আমার বাড়ীতে উপস্থিত হলেন। আমি তখন রোযা ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ কেউ দরজায় টোকা দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম কে? জবাব দিল: সা'ঈদ। আমি চিন্তা করতে লাগলাম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তো তাঁর নিজের বাড়ী এবং মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যান না। তাহলে এ সা'ঈদ কে? উঠে দরজা খুলে দেখি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব। তাকে দেখে আমি বললাম, আপনি কষ্ট করে এসেছেন কেন। আমাকে ডেকে পাঠালেই তো পারতেন। তিনি বললেন: না, আমাকে তোমার কাছে আসা উচিত ছিল। আমি বললাম বলুন, কি করতে হবে। বললেন: তুমি একা আছো আর এদিকে তোমার স্ত্রীও আছে। আমার মনে হলো, তুমি একাকী রাত কাটাবে কেন। এ কারণে স্ত্রীকে সংগে করে নিয়ে এসেছি। সে তার পিতার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি তাকে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার স্ত্রী লজ্জায় সংকুচিত হয়ে পড়লো। আমিও ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর আমি ঘরের ছাদে উঠে চিৎকার করে প্রতিবেশীদেরকে জানিয়ে দিলাম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তাঁর মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি আমার স্ত্রীকে আমার বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেছেন। আমার মা রীতি অনুযায়ী তিন দিন পর্যন্ত নতুন বউকে সাজ-গোছ করালেন। সাজ-গোছের পর আমি তাকে দেখলাম। সে ছিল খুবই সুন্দরী, কুরআনের হাফিজা, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের 'আলিমা এবং স্বামীর অধিকার সচেতন এক মহিলা। ৭১
হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) একজন তাপস ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষ ছিলেন- একথা সত্য। তবে দুনিয়াকে এত পরিমাণ ত্যাগ করা পছন্দ করতেন না যাতে একজন মানুষ তার মান-সম্মান বজায় রাখতে এবং সমাজের অন্যদের সাথে ভদ্রভাবে ওঠা-বসা করতে পারে না। আর এ কারণে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসার মত একটি পবিত্র পেশা গ্রহণ করেন। যয়তুনের তেলের ব্যবসা করতেন। ৭২
জীবনের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ভাতা পেতেন। কিন্তু পরে তা গ্রহণ করা ছেড়ে দেন। তাঁর ভাতার তিরিশ হাজার দিরহামেরও বেশী অর্থ বাইতুল মালে জমা ছিল। এ অর্থ গ্রহণ করার জন্য বহুবার তাকিদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে বার বার অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলতেন, যতক্ষণ আল্লাহ আমার ও বানু মারওয়ানের মধ্যে কোন ফায়সালা না করেন ততক্ষণ আমার এ অর্থের কোন প্রয়োজন নেই। ৭৩
শেষ জীবনে তাঁর দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, যা কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতো, আবার কখনো দাড়িতে খিজাব লাগাতেন। গোঁফ কখনো চিকন, আবার কখনো পুরো করে ছাঁটতেন। পোশাক-পরিচ্ছদে তাঁর বিশেষ কোন রুচি ছিল না। তবে সাধারণভাবে একটু ভালো পোশাক পরতেন। সাদা পোশাক বেশী পছন্দ ছিল। পাগড়ী কালো হতো। তবে মাঝে মাঝে সাদা পাগড়ীও পরতেন। কখনো কখনো তাজ তথা মুকুটের মত উঁচু টুপি ব্যবহার করতেন। কাঁধের উপর চাদর ব্যবহার করতেন, তাতে কাতানের কারুকাজ করা আঁচল থাকতো। মাঝে মাঝে সূক্ষ্ম রেশমের চাদরও পরতেন। পাজামা, জামা, লুঙ্গি, মোজা ইত্যাদিও পরতেন। ৭৪
হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নিম্নের চরণটি আবৃত্তি করেন:
هو الموت لامنجي من الموت والذي + نحاذر بعد الموت أنكى وافظع
- এই সেই মৃত্যু যে মৃত্যুর থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। আর মৃত্যুর পরে যে জিনিসের আমরা ভয় করি তা অতি মারাত্মক ও ভয়াবহ।
তারপর তিনি এই দু'আ করেন: 'হে আল্লাহ আমার পদস্খলনকে কম করে দেখুন, ভুল- ত্রুটিকে ক্ষমা করে দিন, আপনি আপনার জ্ঞান ও বিচক্ষণতা দ্বারা সেই ব্যক্তির মূর্খতা ও বর্বরতাকে ঢেকে দিন যে আপনার নিকট ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু আশা করে না এবং শুধু আপনার উপরই সে নির্ভর করে। আপনার ক্ষমা অতি ব্যাপক। হে আমার রব! ভুল-ভ্রান্তির অধিকারী বান্দার জন্য আপনি ছাড়া পালানোর কোন স্থান নেই।' দাউদ ইবন আবী হিন্দা বলেন, মু'আবিয়ার (রা) এই শেষ উক্তিগুলির কথা শুনে সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়্যিব মন্তব্য করেন: 'তিনি বাধ্য হয়ে সেই সত্তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন যাঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমি আশা করি আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবেন।' ৭৫
ইবন শিহাব আয-যুহরী বলেন, আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে বললাম: 'উছমান (রা) কিভাবে নিহত হলেন তা কি আমাকে একটু বলবেন? মানুষের ও তাঁর ভূমিকা কী ছিলো? মুহাম্মাদ (সা)-এর সাহাবীরা তাঁকে এভাবে লাঞ্ছিত করলেন কেন? তিনি বললেন: তিনি অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছেন। যারা তাঁকে হত্যা করেছে তারা জালিম। আর যারা তাঁকে লাঞ্ছিত করেছে তারা মাজুর, অক্ষম। আমি প্রশ্ন করলাম: তা কিভাবে? তারপর তিনি 'উছমান (রা) হত্যার প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন। ৭৬
টিকাঃ
১. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৬২
২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৩০১; তাবাকাত-৫/৮৮
৩. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৮; সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৪
৪. তাবাকাত-৫/৯০
৫. প্রাগুক্ত
৬. সূরা আন-নিসা-৩
৭. তাবাকাত-৫/৯০
৮. প্রাগুক্ত-৫/৯২-৯৩; আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/৪২১
৯. তাবাকাত-৫/৯৪
১০. প্রাগুক্ত-৫/৯৩-৯৪; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৭১-১৭২
১১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৬৯
১২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৬
১৩. তাবাকাত-৫/৯৫
১৪. সূরা আল-বাকারা-১১৫
১৫. তাঁর মৃত্যু-সন সম্পর্কে মতপার্থক্য আছে। আল-হায়ছাম ইবন 'আদী, সা'ঈদ ইবন 'উফায়র, ইবন নুমায়র প্রমুখ ব্যক্তিরা হি. ৯৪ সনের কথা বলেছেন। কাতাদা হি. ৮৯, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান ৯১, দামরা ৯২ এবং আলী আল-মাদানী ও ইবন মা'ঈন ১০৫ সনের কথা বলেছেন। হাকেম বলেছেন, হাদীছের অধিকাংশ ইমাম শেষোক্ত মতের উপর। ইমাম আয-যাহাবী বলেছেন, হি. ৯৪ সনের মতটি সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী। (ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৬)
১৬. তাবাকাত-৫/১০৫-১০৬
১৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৫
১৮. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২২০
১৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৬
২০. শাযারাতুয যাহাব-১/১০৩
২১. তাবাকাত-৫/১০১
২২. প্রাগুক্ত-৫/৮৯; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৫
২৩. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৫; তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪; তাহযীবুল আসমা'-১/২২; সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৫
২৪. তাবাকাত-৫/৯০
২৫. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৪
২৬. তাবাকাত-৫/৫০
২৭. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
২৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৪
২৯. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৬
৩০. প্রাগুক্ত-৪/৮৫
৩১. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
৩২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৫; আ'লামুল মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৫
৩৩. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
৩৪. তাবাকাত-৫/৯০
৩৫. শাযারাতুয যাহাব-১/১০০
৩৬. প্রাগুক্ত-১/৮৯
৩৭. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪
৩৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৫
৩৯. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪
৪০. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৩৭৫
৪১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৯৮
৪২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৫
৪৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৫
৪৪. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪
৪৫. তাবাকাত-৫/৯০
৪৬. প্রাগুক্ত
৪৭. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৫; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৫
৪৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩১৮, ৩২০, ৩২৮, ৩৫৬
৪৯. প্রাগুক্ত-১/৩১৪
৫০. প্রাগুক্ত-১/২০২
৫১. তাবাকাত-৫/৬৮
৫২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/২৮৩
৫৩. তাবাকাত-৫/৯১
৫৪. প্রাগুক্ত-৫/৯২
৫৫. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৮
৫৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৪৬
৫৭. তাবাকাত-৫/১০০; সিফাতুল সাফওয়া-২/৪৪
৫৮. সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৫
৫৯. তাবাকাত-৫/১০০
৬০. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬২; তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৭
৬১. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
৬২. তাবাকাত-৫/৯৭; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬২
৬৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৪
৬৪. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬২
৬৫. সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৪
৬৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৬/২৭৪
৬৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৫
৬৮. তাবাকাত-৫/৯৫
৬৯. প্রাগুক্ত-৫/৯৩-৯৪; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৭১-১৭২
৭০. প্রাগুক্ত-৫/১০১
৭১. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬৭
৭২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৭
৭৩. প্রাগুক্ত-১/৯৫
৭৪. প্রাগুক্ত-১/১০০
৭৫. আল-ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৮০
৭৬. প্রাগুক্ত-৪/২৮৭-২৯২
📄 সা‘ঈদ ইবন জুবায়র আল-ওয়ালিবী (রহ)
প্রখ্যাত তাবি'ঈ সা'ঈদ ইবন জুবায়রের ডাক নাম ছিল আবূ 'আবদিল্লাহ, মতান্তরে আবূ মুহাম্মাদ। পিতা জুবায়র ইবন হিশাম আল-কুফী আল-আসাদী আল-ওয়ালিবী। বানু ওয়ালিবার সাথে চুক্তিবদ্ধ থাকা অথবা তাদের সাথে দাসত্বের সম্পর্ক থাকার কারণে তাঁকে আল-ওয়ালিবী বলা হতো।১ যে সকল মহান তাবি'ঈ 'ইলম ও আমলের সমাবেশ স্থল বলে বিবেচিত ছিলেন তিনি তাঁদের একজন。
সা'ঈদের (রহ) জীবনের যাত্রা দাসত্বের মধ্য দিয়ে হলেও সীমাহীন সাধনা ও প্রতিভা বলে তাবি'ঈ 'আলিমকুলের শিরোমণিতে পরিণত হন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে একজন ক্বারী, ফাক্বীহ্ ও শ্রেষ্ঠ 'আলিম বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাবাবী তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন:
كان سعيد من كبار أئمة التابعين ومتقدميهم في التفسير والحديث والفقه والعبادة والورع وغيرها من صفات أهل الخير.
সা'ঈদ তাবি'ঈদের শ্রেষ্ঠ ইমামদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। তাফসীর, হাদীছ, ফিক্বাহ্, 'ইবাদাত, যুহ্দ ও তাক্বওয়া, তথা সৎ মানুষদের সকল উৎকর্ষতায় তাবি'ঈদের নেতৃত্বস্থানীয় ছিলেন।
আশ'আছ ইবন ইসহাক বলেন: সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে একজন মস্তবড় 'আলিম বলা হতো।
সা'ঈদের যখন বুদ্ধি হয় তখন শ্রেষ্ঠ সাহাবায়ে কিরামের বড় একটি সংখ্যা দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। তবুও সেই সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ক্ষুদ্র একটি দল, যেমন: 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা), আবু সা'ঈদ খুদরী (রা), আবূ হুরাইরা (রা), 'আইশা সিদ্দীকা (রা), আনাস ইবন মালিক (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল (রা), আবূ মাসউদ (রা), প্রমুখ 'আলিম সাহাবী তখনো জীবিত ছিলেন। তিনি তাঁদের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করেন। বিশেষ করে হাবরুল উম্মাহ্ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাসের (রা) জ্ঞানের সাগর থেকে সর্বাধিক ফায়দা হাসিল করেন। একদল বিখ্যাত তাবি'ঈর নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। যেমন: জা'ফার ইবন আবী মুগীরা, আবূ বিশর জা'ফার ইবন ইয়াস, আয়্যব, আল-আ'মাশ, 'আতা' ইবন সায়িব ও আরো অনেকে।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাসের হালকায়ে দারসের পরিধি এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল যে, সেখানে তাফসীর, হাদীছ, ফিকাহ্, ফারাইজ, সাহিত্য, রচনা, কাব্য ও কবিতা, মোটকথা সব ধরনের জ্ঞান ও শাস্ত্রের সাগর যেন উথলে উঠতো।৭ সা'ঈদ ইবন জুবায়র এই সীমাহীন অথৈ সাগর থেকে সর্বাধিক পরিতৃপ্ত হন। অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতার সাথে এই হালকায়ে দারসে তিনি শরীক হতেন। সেখানে তাঁর জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতি ছিল এ রকম যে, বাইরের প্রশ্নকারীরা ইবনুল 'আব্বাসকে (রা) যে সব প্রশ্ন করতো, যে সব মাসআলা জিজ্ঞেস করতো এবং ইবনুল 'আব্বাস যে সব জবাব দিতেন, সা'ঈদ চুপচাপ বসে তা শুনতেন। মাঝে মাঝে নিজেও কিছু প্রশ্ন করতেন। এসব প্রশ্নের মধ্যে হাদীছও থাকতো এবং ফিকাহ্ মাসাইলও থাকতো। কিন্তু তা লেখার ব্যাপারে ইবনুল 'আব্বাসের (রা) বারণ ছিল। এ কারণে কিছু দিন যাবত ইবন জুবায়র শুনে মুখস্থ করে রাখতেন। তবে মনে হয়, তিনি পরে লেখার অনুমতি লাভ করেন এবং লেখা আরম্ভ করেন। কোন কোন দিন এত বেশী মাসআলা উপস্থাপিত হতো যে, লিখতে লিখতে তাঁর কাগজ শেষ হয়ে যেত এবং কাপড় ও অস্ত্রশস্ত্রের উপর লেখার প্রয়োজন দেখা দিত। ঘটনাক্রমে এমনও কোন কোনদিন হতো যে, কোন প্রশ্নকারী এলো না, সেদিন একটি হাদীছও লেখার সুযোগ হতো না। সেদিন খালি হাতে ফিরে আসতেন।৯
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাসের (রা) পরে তিনি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) থেকে সবচেয়ে বেশী ফায়দা হাসিল করেন। সা'ঈদ ইবন জুবায়রের কৃষ্ণা অবস্থান কাল পর্যন্ত, যখন তিনি নিজেই মুফতীর স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছিলেন, ইবন 'উমার (রা) থেকে জ্ঞান অর্জন ও 'ইলমী ফায়দা হাসিলের ধারাবাহিকতা বিদ্যমান ছিল। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন, যখন কোন বিশেষ মাসআলায় কৃষ্ণার 'আলিমগণের মতবিরোধ হতো, তখন আমি তা লিখে নিতাম এবং ইবন 'উমারের (রা) নিকট জিজ্ঞেস করতাম। এ সব মহান ব্যক্তির কল্যাণ ও বরকতে তিনি কুরআন, তাফসীর, হাদীছ, ফিকাহ্, ফারাইজ তথা সমস্ত দীনী 'ইলমের সাগরে পরিণত হন। ১০
তিনি কুরআনের একজন ভালো কারী ছিলেন। তারজী”-এর সাথে কিরআত করতেন। কিন্তু গানের সুরে তিলাওয়াত করা তাঁর ভীষণ অপছন্দ ছিল।১১ আবু শিহাব বর্ণনা করেছেন। রমাদান মাসে সা'ঈদ ইবন জুবায়র আমাদের নামায পড়াতেন। তিনি 'তারজী" করে কিরআত পড়তেন। মাঝে মাঝে একই আয়াত দুইবার করে পাঠ করতেন। 'আতা' ইবন আস-সায়িব বলেন: একদিন সা'ঈদ ইবন জুবায়র এক ব্যক্তিকে বললেন: আমার পরে তোমরা এ কি নতুন জিনিস চালু করেছো? লোকটি বললো: আপনার পরে তো আমরা নতুন তেমন কিছু চালু করিনি। তিনি বললেন: এই অন্ধ লোকটি ও ইবনুস সায়কল তোমাদেরকে গানের সুরে কুরআন শেখায়। ১৪ সব মশহুর কিরআতের তিনি ছিলেন একজন 'আলিম। ইসমা'ঈল ইবন 'আবদিল মালিক বর্ণনা করেন, সা'ঈদ রমাদান মাসে আমাদের ইমামতি করতেন। নিয়ম ছিল এক রাতে 'আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) কিরআত অনুযায়ী কুরআন শোনাতেন, আরেক রাতে শোনাতেন যায়দ ইবন ছাবিতের (রা) কিরআত অনুযায়ী। এভাবে পালাক্রমে প্রতি রাতে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রসিদ্ধ কারীদের কিরআত শোনাতেন। ১৫
কিরআত ও তাফসীর এ দুই শাস্ত্রের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন এ শাস্ত্রদ্বয়ের ইমাম হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট থেকে। আয়াতের শানে নুযূল এবং তার তাফসীর ও তাবীলের প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। যখন তাঁর সামনে কোন আয়াত পাঠ করা হতো তিনি তার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা বলে দিতেন। আবূ ইউনুস বর্ণনা করেন, একবার আমি সা'ঈদ ইবন জুবায়রের সামনে এ আয়াত :
إِلَّا الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِالْدَانِ"
পাঠ করলাম। তখন তিনি বললেন, এ আয়াতে যাদের কথা বলা হয়েছে তাঁরা ছিলেন মক্কার কিছু মজলুম মানুষ। আমি বললাম, আমি এমন লোকদেরই (অর্থাৎ হাজ্জাজের জুলুমের শিকার) নিকট থেকে এসেছি। সা'ঈদ বললেন, ভাতিজা! আমরা তাদের বিরুদ্ধে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু কি আর করা যাবে, আল্লাহর মর্জি তো এটাই। ১৭ আ'মাশ বর্ণনা করেন, সা'ঈদ ইবন জুবায়র- إِنَّ أَرْضِي وَاسِعَةً -এ আয়াতের তাফসীরে বলতেন যে, এর অর্থ হলো, যখন কোথাও পাপ কাজ অনুষ্ঠিত হয় তখন সেখান থেকে বের হয়ে যাও।
তিনি তাফসীরের দারসও দিতেন। ইবন ইয়াস বর্ণনা করেন, 'আযরাহ তাফসীরের বই (সম্ভবত হাতে লেখা কপি) এবং দোয়াত নিয়ে সা'ঈদ ইবন জুবায়রের নিকট যেতেন। ১৯ কিন্তু কোন কোন বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, তিনি তাফসীর লিখে রাখা পছন্দ করতেন না। একবার এক ব্যক্তি তার নিজের জন্য তাফসীর লিখে রাখার অনুমতি দানের আবেদন জানান। তিনি বললেন, তাফসীর লিখে রাখার পরিবর্তে আমার এটাই পছন্দ যে, আমার একটি পাশ অবশ হয়ে যাক। ২০
তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছ তাবি'ঈদের একজন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, সাহাবীদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা), আনাস ইবন মালিক (রা), আবূ সা'ঈদ খুদরী (রা), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা), আবূ মাস'উদ আল-বাদরী (রা), 'আইশা সিদ্দীকা (রা), 'আদী ইবন হাতিম (রা) প্রমুখের নিকট হাদীছ শোনেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাসের (রা) হালকায়ে দারস থেকে বেশী উপকৃত হন। অন্যদের তুলনায় তাঁর মেধা ও ধারণ ক্ষমতা বেশী হবার কারণে হযরত ইবনুল 'আব্বাস (রা) তাঁকে বেশী স্নেহ করতেন এবং তাঁর শিক্ষার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা দূর করার উদ্দেশ্যে কখনো কখনো পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর থেকে তিনি হাদীছ শুনতেন। মুজাহিদ বলেন, একবার ইবনুল 'আব্বাস (রা) ইবন জুবায়রকে বললেন, কিছু হাদীছ শোনাও। ইবন জুবায়র অতি বিনয়ের সাথে বললেন, আপনার উপস্থিতিতে আমি হাদীছ শুনাই কেমন করে। ইবনুল 'আব্বাস (রা) বললেন, এটাও আল্লাহর এক বিশেষ করুণা যে, তুমি আমার সামনে হাদীছ বর্ণনা করছো। যদি সঠিক বর্ণনা কর তাহলে ভালো। আর যদি ভুল কর তাহলে আমি ঠিক করে দিব। ২১
বানু বিদা'আর মুআযযিন বর্ণনা করেন। আমি একবার হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাসের (রা) কাছে গিয়ে দেখলাম তিনি রেশমের গদির উপর ঠেস দিয়ে বসে আছেন এবং সা'ঈদ ইবন জুবায়র তাঁর গায়ের কাছে বসা। ইবনুল 'আব্বাস (রা) তাঁকে বলছেন, তুমি আমার কাছ থেকে বহু হাদীছ মুখস্থ করেছো। আমি দেখবো, তুমি তা কিভাবে বর্ণনা কর। ২২
ইবন জুবায়রের প্রতি হযরত ইবনুল 'আব্বাসের (রা) এমন মনোযোগী হবার কারণেই তিনি হাদীছের হাফিজদের ইমাম ও নেতায় পরিণত হন। তাঁর বর্ণিত হাদীছের একটি বড় অংশই ইবনুল 'আব্বাসের সূত্রে বর্ণিত। এর দ্বারাই হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর স্থান কোন পর্যায়ে তা অনুমান করা যায়।
ফকীহ্ গোষ্ঠীর মধ্যেও তিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। এ শাস্ত্রের জ্ঞানও তিনি অর্জন করেন হযরত ইবনুল 'আব্বাস (রা) থেকে। এ শাস্ত্রে তিনি এত পূর্ণতা অর্জন করেন যে, তৎকালীন ফিকাহ্ কেন্দ্র বলে পরিচিত কৃষ্ণার তাবি'ঈ মুফতীদের এক অন্যতম ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।২৩ কিছু দিন কৃষ্ণার কাজীর পদও অলংকৃত করেন। পরে কৃষ্ণার কাজী আবূ বুরদা ইবন আবী মূসা আশ'আরীর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ২৪ কিছু দিন 'আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাসউদের সেক্রেটারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৫ 'ইলম ও ইফতার কেন্দ্র ভূমি মক্কায় যখন আসতেন তখন সেখানেও ফাতওয়ার কাজে নিয়োজিত থাকতেন। ২৬ হযরত 'আবদুল্লাহ ইবনুল 'আব্বাসের (রা) ইবন জুবায়রের ফাতওয়ার উপর এত আস্থা ছিল যে, কুফার কোন লোক যদি তাঁর নিকট কোন ফাতওয়া চাইতে আসতো তাহলে তিনি তাকে বলতেন, তোমাদের ওখানে কি সা'ঈদ ইবন জুবায়র নেই?২৭ তালাক সংক্রান্ত মাসআলায় তিনি একজন বড় বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন: ২৮
أعلم التابعين بالإطلاق سعيد بن جبير -'তাবি'ঈদের মধ্যে তালাক বিষয়ে সবচেয়ে বেশী জানা ব্যক্তি সা'ঈদ ইবন জুবায়র।'
অংকে তিনি বেশ পাকা ছিলেন। এ কারণে ফারায়িজ (দায়ভাগ) শাস্ত্রে তাঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি ছিল। তাঁর সময়ের বড় বড় সাহাবী ফারায়িজ সম্পর্কে তাঁদের নিকট জানতে আসা লোকদেরকে ইবন জুবায়রের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। একবার হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারের (রা) নিকট ফারায়িজ সম্পর্কে জানার জন্য এক ব্যক্তি এলো। তিনি সেই ব্যক্তিকে বলেন, তুমি ইবন জুবায়রের নিকট যাও। সে আমার চেয়ে বেশী হিসাব-নিকাশ জানে। সে তোমাকে তাই বলে দিবে যা নির্ধারিত আছে। ২৯ তিনি যখন মদীনায় যেতেন তখন সেখানকার 'আলিমরা তাঁর নিকট ফারায়িজ শিখতেন। 'আলী ইবন হুসায়ন বর্ণনা করেছেন, যখন সা'ঈদ ইবন যুবায়র আমাদের এখান দিয়ে যেতেন তখন আমরা তাঁর নিকট ফারায়িজ এবং এমন সব কথা জিজ্ঞেস করতম যা দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে বেশ উপকৃত করতেন।৩০
মোটকথা সা'ঈদ ইবন জুবায়রের ব্যক্তিসত্তাটি ছিল বহু জ্ঞান ও শাস্ত্রের সমাহার। যার কিছু কিছু করে সবটুকু ধারণ করতেন সেই যুগের বহু জ্ঞানী ব্যক্তি। কিন্তু ইবন জুবায়র এককভাবে তাঁদের সব জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। খসীফ বর্ণনা করেছেন, তালাকের মাসআলার সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব। হজ্জে ছিলেন 'আতা', হালাল-হারামে তাউস, তাফসীর শাস্ত্রে মুজাহিদ এবং এসব জ্ঞানের সমাহার ছিল সা'ঈদ ইবন জুবায়রের একক ব্যক্তিসত্তা। ৩১
তিনি জ্ঞানের এমন একটি উৎস ছিলেন যার প্রয়োজন অনুভব করতেন সেই যুগের সব শ্রেণীর 'আলিমগণ। মায়মুন ইবন মাহরান বর্ণনা করেছেন যে, সা'ঈদ ইবন যুবায়র যখন ইনতিকাল করেন তখন ধরাপৃষ্ঠে এমন কোন ব্যক্তি ছিল না যে তাঁর জ্ঞানের প্রয়োজন অনুভব করতো না। ৩২
ইমাম বুখারী তাঁর তারীখে উল্লেখ করেছেন যে, সুফয়ান ছাওরী জ্ঞানের ক্ষেত্রে সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে ইবরাহীম আন-নাখা'ঈর উপর প্রাধান্য দিতেন। ৩৩ কুফাবাসীদের কেউ যখন হযরত ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট কোন মাসআ'লা জানতে আসতো তিনি তাকে বলতেন: কেন, তোমাদের মধ্যে কি সা'ঈদ ইবন জুবায়র নেই?৩৪
সা'ঈদ ইবন জুবায়র তাঁর এই বিশাল জ্ঞান ও বিভিন্ন শাস্ত্রের পাণ্ডিত্য শুধু নিজের মধ্যে পুঞ্জিভূত করে রাখেননি, বরং যতটুকু সম্ভব অন্যদেরকেও তাদ্বারা উপকৃত হবার সুযোগ দিয়েছেন। হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে তাঁর কিছু অদূরদর্শী সঙ্গী-সাথী তাঁকে তিরস্কার করতেন। জবাবে তিনি তাঁদেরকে বলতেন, এ জ্ঞান কবরে নিয়ে যাবার চেয়ে তোমাদের নিকট এবং তোমাদের সঙ্গী-সাথীদের নিকট বর্ণনা করা আমার বেশী পছন্দনীয়।৩৫
তাঁর ছাত্র-শাগরিদের পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক ও বিস্তৃত। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম : 'আবদুল মালিক, 'আবদুল্লাহ, ইয়া'লা ইবন হাকীম, ইয়া'লা ইবন মুসলিম, আবূ ইসহাক সুবায়'ঈ, আবুয যুবায়র মাক্কী, আদাম ইবন সুলায়মান, আশ'আছ ইবন আবীশ শা'ছা', যার ইবন 'আবদিল্লাহ মুরাহহিবী, সালিম আল-আফতাস, সালামা ইবন কুহায়ল, তালহা ইবন মুসাররিফ, 'আতা' ইবন সাইব প্রমুখ।৩৬
জ্ঞান বিতরণের ক্ষেত্রে তাঁর এ উদারতা ঐসব লোকদের জন্য ছিল যাঁরা সেই জ্ঞানের মর্যাদা দিত। অন্যথায় অযোগ্য ব্যক্তিদের নিকট তিনি তাঁর জ্ঞানকে লুকিয়ে রাখতেন। মুহাম্মাদ ইবন হাবীব বর্ণনা করেছেন। সা'ঈদ ইবন জুবায়র ইসফাহানে অবস্থানকালে মানুষ যখন তাঁর নিকট হাদীছ সম্পর্কে জানতে চাইতো, বলতেন না। কিন্তু যখন কৃষ্ণা আসলেন তখন তাঁর উদারতার স্রোত জারি হয়ে গেল। লোকেরা প্রশ্ন করলো, আবু মুহাম্মাদ, কি ব্যাপার! আপনি ইসফাহানে হাদীছ বর্ণনা করতেন না, অথচ কূফায় এসে বর্ণনা করছেন? তিনি জবাব দিলেন, নিজের পণ্য সেখানেই উপস্থাপন কর যেখানে তার মর্যাদার সমঝদার লোক থাকে। মোটকথা, উলুবনে মুক্তো না ছড়ানোর যে কথাটি বলা হয় তিনি তাই বলতেন।
'ইবাদত, যুহদ ও তাকওয়ার তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। এ ব্যাপারে তাবি'ঈদের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল অতি উঁচুতে। খাওফে খোদা বা আল্লাহভীতি তাঁর অন্তরে এত দৃঢ়মূল হয়েছিল যে, সবসময় তাঁর চোখ দু'টি অশ্রুসিক্ত থাকতো। রাতের অন্ধকারে যেটি ছিল তাঁর ইবাদাত ও মা'শুকের সাথে একান্ত সংলাপের সময়, অস্থিরভাবে কাঁদতেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর দৃষ্টিশক্তি কমে গিয়েছিল এবং দু'চোখ বেয়ে সবসময় পানি ঝরতে থাকতো। ৩৭
তাঁর নামায ছিল একাগ্রতা এবং খুশু-খুজুর বাস্তব রূপ। কখনো কখনো এক রাক'আতে পুরো কুরআন শেষ করতেন। ভয়ঙ্কর শাস্তি ও 'আযাবের আয়াতগুলো বারবার আওড়াতেন। সা'ঈদ ইবন 'উবায়দ বর্ণনা করেছেন। আমি সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে নামাযে ইমামতির অবস্থায় এ আয়াতটি-৩৮ إِذِ الْأَغْلَالُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَاسِلَ يَسْحَبُوْنَ فِي الْحَمِيمِ.
বার বার আওড়াতে শুনেছি। কুসাম ইবন আয়্যুব বলেন, আমি তাঁকে এ আয়াত-৪০ .واتقوا يوما ترجعون فيه إلي الله বিশ বারের অধিক আওড়াতে শুনেছি।৪১ সুবহে সাদিক থেকে ফজরের নামায পর্যন্ত যিকরে মশগুল থাকতেন। এ সময় কেবল আল্লাহর যিকর ছাড়া কারো সাথে কোন কথা বলতেন না। ৪২
রমজান মাসে তাঁর সব ধরনের 'ইবাদাতের মাত্রা বেড়ে যেত। মাগরিব থেকে 'ঈশা পর্যন্ত সময়টুকু সাধারণত রোযাদারদের একটু আরাম ও বিশ্রামের সময় বলে মনে করা হয়, তা তিনি কুরআন তিলাওয়াতের মধ্যে কাটিয়ে দিতেন।৪৩ রমজানে কখনো কখনো এক বৈঠকে পুরো কুরআন খতম করতেন। ৪৪ তিনি তাঁর গোত্রের মসজিদে ই'তিকাফ করতেন। ৪৫
তিনি কতবার হজ্জ আদায় করেছিলেন তাঁর সঠিক সংখ্যা বলা যায় না। তবে বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা এতটুকু জানা যায় যে, তিনি অধিকাংশ হজ্জ আদায় করতেন এবং তীব্র আবেগ ও উৎসাহের কারণে কৃষ্ণা থেকেই ইহরাম বেঁধে বের হতেন। মক্কায় অবস্থানকালে বেশী বেশী তাওয়াফ করতেন। ৪৬
কুরআন তিলাওয়াতের ব্যাপারে তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ ও আসক্তি। সাধারণত দুই রাতে কুরআন খতম করতেন। কেবল সফর এবং অসুস্থ অবস্থায় এই অভ্যাসের তারতম্য দেখা যেত। একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, আমি কা'বার অভ্যন্তরে এক রাকআতে পূর্ণ কুরআন পাঠ করেছি। ৪৭
তিনি নিজেকে অসম্ভব তুচ্ছ ও হেয় মনে করতেন। এ কারণে কোন পাপাচারীকে তার পাপ কাজের ব্যাপারে সতর্ক করতে লজ্জা বোধ করতেন। তিনি বলতেন, আমি কোন ব্যক্তিকে কোন পাপ কাজ করতে দেখি, কিন্তু আমার নিজের দৃষ্টিতে আমি এতই তুচ্ছ যে, অন্যকে সতর্ক করতে আমার দারুণ লজ্জা হয়। ৪৮
কারো গীবাত করা এবং কারো গীবাত শোনা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। মুসলিম আল-বিত্তীন বলেন, সা'ঈদ তাঁর সামনে কাউকে কারো গীবাত করতে দিতেন না। গীবাতকারীকে বলতেন, যা কিছু তোমার বলার থাকে সেই ব্যক্তির মুখের উপর বলো।৪৯
তাঁর নিকট 'ইবাদাতের এক ভিন্ন অর্থ ছিল। শুধু নামায, রোযা ও তাসবীহ-তাহলীলকে তিনি 'ইবাদাত বলে জানতেন না। বরং তার একটি বিশেষ ও ব্যাপকতর অর্থ আছে। তিনি মনে করতেন, আনুগত্য হলো বড় ইবাদাত। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে, সেই যাকির। আর যে আল্লাহর অবাধ্যতা করে সে যাকির নয়। তা সে যতই তাসবীহ পাঠ বা কুরআন তিলাওয়াত করুক না কেন। কোন এক ব্যক্তি একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, সবচেয়ে বড় 'ইবাদাতকারী ব্যক্তি কে? বললেন, যে ব্যক্তি পাপ করার পর তাওবা করেছে এবং যখন তার পাপের কথা স্মরণ হয়েছে তখন তার বিপরীতে নিজের 'আমলকে অতি তুচ্ছ মনে করেছে। ৫০
তিনি 'উলামায়ে সূ' বা অসৎ 'আলিমদেরকে মুসলিম উম্মার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক বলে মনে করতেন। হিলাল ইবন জানাব একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, মানুষের ধ্বংস ও বিপর্যয় কোথা থেকে হবে? বলেন, তাদের 'আলিমদের থেকেই। ৫১
সা'ঈদ ইবন জুবায়র জীবনের একটি দীর্ঘ সময় মদীনায় ছিলেন। তারপর সেখান থেকে অন্যত্র চলে যান। কিছু দিন ইরাকের বিভিন্ন শহরে ঘোরাফেরা করেন। পরে কৃষ্ণায় বসতি স্থাপন করেন। ৫২ কৃষ্ণায় অবস্থানকালে কিছু দিন তথাকার কাজী 'আবদুল্লাহ ইবন 'উতবা ইবন মাস'উদ এবং কিছু দিন আবু বুরদা ইবন আবূ মূসা আল-আশ'আরীর সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন। ৫৩
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ তাঁকে অত্যন্ত সমীহ করতেন। তাঁর প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনও করতেন। তাঁকে কৃষ্ণার জামে' মসজিদের ইমাম নিযুক্ত করেন। কৃষ্ণার কাজী হিসেবেও নিয়োগ দেন। কিন্তু কাজীকে অবশ্যই আরব বংশোদ্ভূত হতে হবে- কুফাবাসীদের এমন দাবীর প্রেক্ষিতে তাঁকে সরিয়ে আবূ বুরদা ইবন আবূ মূসা আল- আশ'আরীকে তাঁর স্থলে নিয়োগ দেন। তবে হাজ্জাজ আবূ বুরদাকে বলে দেন, তিনি যেন ইবন জুবায়রের সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ না করেন। ৫৪
তাঁর সাথে হাজ্জাজের এত সদয় ব্যবহার সত্ত্বেও তিনি বিন্দুমাত্র তাঁর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। এ কারণে ইবনুল আশ'আছ হাজ্জাজের বিরুদ্ধে যখন বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেন, ইবনু জুবায়র তাঁর সঙ্গী হয়ে যান।
খলীফা আবদুল মালিকের খিলাফতকালে সীসতানের শাসক রাতবীলের আচরণ বিদ্রোহের পর্যায়ে চলে যায়। মাঝে মাঝে তিনি খাজনা দেওয়া বন্ধ করে দিতেন। এ কারণে হাজ্জাজ তাঁকে শায়েস্তা করার জন্য 'উবায়দুল্লাহ ইবন আবী বাকরাকে নির্দেশ দেন। 'উবায়দুল্লাহ হিজরী ৯ সনে সীসতানে অভিযান পরিচালনা করে অনেক দূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। কিন্তু পেছনের নিরাপত্তা বিধানের কথা ভুলে যান। এ জন্য রাতবীল তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। তাদের জীবন ও অর্থের দারুণ ক্ষয়ক্ষতি হয়। তারা ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এ পরাজয় হাজ্জাজকে ভীষণ আহত করে। তিনি আবার মুহাম্মাদ ইবন 'আবদির রহমান ইবন আশ'আছকে চল্লিশ হাজার সৈন্য দিয়ে অভিযানের নির্দেশ দেন। আর এ বাহিনীর বেতন- ভাতার অর্থ বণ্টনের দায়িত্ব দেন সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে। ইবনুল আশ'আছ রাতবীল শাসিত অঞ্চলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তথাকার বহু এলাকা পদানত করেন এবং এক বছরের জন্য অগ্রাভিযান বন্ধ করে দিয়ে হাজ্জাজকে অবহিত করেন। হাজ্জাজ রাতবীলের উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন। এ কারণে তিনি ইবনুল আশ'আছকে লিখলেন, এটা কোন আরাম-আয়েশের সময় নয়। আমার এ নির্দেশ পৌঁছার সাথে সাথে অভিযান শুরু করবে। আর তুমি যদি অপারগ হও তাহলে বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব তোমার ভাতিজা ইসহাকের হাতে অর্পণ করবে।
ইবনুল আশ'আছ মুসলিম বাহিনীর স্বার্থেই অগ্রাভিযান বন্ধ করেছিলেন। তাই তিনি হাজ্জাজের এমন কঠোর নির্দেশে ক্ষেপে যান। তিনি রাতবীলের সাথে সন্ধি করে হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে দেন। তাঁর বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য ছিল ইরাকের। তারা আগে থেকেই হাজ্জাজের জুলুম-অত্যাচারে ক্ষেপে ছিল। এখন সুযোগ পেয়ে তারাও ইবনুল আশ'আছের সহযোগী হয়ে গেল। ধীরে ধীরে হাজ্জাজের বিরোধিতা খলীফা আবদুল মালিকের বিরোধিতার রূপ নিলো। ইবন জুবায়রও ইবনুল আশ'আছের সহযোগী হলেন। ইবনুল আশ'আছ সীসতান থেকে ইরাকে পৌঁছলেন। তাঁকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হাজ্জাজ সসৈন্যে বের হলেন। কয়েক মাস সংঘর্ষ চললো। ইবনুল আশ'আছ ইরাকের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেন। হাজ্জাজের সাথে এই বিরোধিতায় কুফার বহু 'আলিম ও কারী ইবনুল আশ'আছকে সহযোগিতা করেন। ইবন জুবায়র ছিলেন এই দলটির নেতা। তিনি রণক্ষেত্রে সৈনিকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। বানু উমাইয়্যা ও হাজ্জাজের জুলুম-নির্যাতন মূলক শাসন, তাদের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ড, আল্লাহর বান্দাদের উপর অত্যাচার-উৎপীড়ন, নামায আদায়ে বিলম্বকরণ এবং মুসলমানদেরকে হেয় ও অপমান করার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তাদেরকে আহ্বান জানাতেন। ৫৫
হাজ্জাজবিরোধী এমন তীব্র আবেগ ও উত্তেজনার সময়ও তিনি সত্য থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুৎ হতেন না। যাবারকান আসাদী নামক একজন দাসের মনিব ছিল হাজ্জাজের পক্ষে। আর দাসটি ছিল হাজ্জাজের বিপক্ষে। দাসটি ইবন জুবায়রের নিকট জানতে চায় যে, এমতাবস্থায় সে যদি ইবনুল আশ'আছের পক্ষে যোগদান করে যুদ্ধে মারা যায় তাহলে আল্লাহর দরবারে এ জন্যে তাকে কোন জবাবদিহি করতে হবে কিনা। ইবন জুবায়র তাকে জবাব দিলেন: তুমি যুদ্ধ করবে না। তোমার মনিব যদি উপস্থিত থাকতো তাহলে তাকে সংগে নিয়ে হাজ্জাজের পক্ষে যুদ্ধ করতে। ৫৬
হাজ্জাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম দিকে ইবনুল আশ'আছের শক্তি ও ক্ষমতা দৃঢ় ছিল এবং ইরাকের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করতে সক্ষমও হন। কিন্তু তিনি হাজ্জাজের এই বিরোধিতায় রাষ্ট্রকেও জড়িয়ে ফেলেন। এ কারণে দীর্ঘদিন তাঁর মুকাবিলায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে 'দিয়ারে জামাজিম'-এর যুদ্ধে ইবনুল আশ'আছের শোচনীয় পরাজয় হয় এবং তাঁর শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। তিনি পালিয়ে সীসতানে চলে যান।
ইবনুল আশ'আছের পরাজয়ের পর ইবন জুবায়র মক্কায় চলে যান। মক্কার তৎকালীন ওয়ালী খালিদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল কাসরী তাঁকে গ্রেফতার করে হাজ্জাজের নিকট পাঠিয়ে দেন।
তাঁর গ্রেফতারের ঘটনাটিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইবনুল আশ'আছের বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবার পর সা'ঈদ (রহ) পালিয়ে মক্কায় চলে আসেন এবং সেখানে আত্মীয়-বন্ধুদের আশ্রয়ে অবস্থান করতে থাকেন। এ সময় বানু উমাইয়্যাদের পক্ষ থেকে খালিদ ইবন 'আবদুল্লাহ আল-কাসরী ওয়ালীর দায়িত্ব নিয়ে মক্কায় আসেন। তাঁর জুলুম-অত্যাচার ও দুষ্কর্মের কথা মানুষের জানা ছিল। এ কারণে সা'ঈদের বন্ধুরা তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তাঁদের কেউ কেউ সা'ঈদের কাছে এসে বলেন: খালিদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-কাসরী ওয়ালীর দায়িত্ব নিয়ে মক্কায় এসেছেন। তাঁর হাত থেকে আপনার নিরাপত্তার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। আমাদের অনুরোধ আপনি খুব তাড়াতাড়ি এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যান। জবাবে তিনি বলেন: আল্লাহর কসম! আমি একবার পালিয়ে আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয়েছি। এখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার এ স্থানেই আমি অবস্থান করবো। আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই হোক।
মানুষের ধারণা সত্যে পরিণত হলো। খালিদ সা'ঈদ ইবন জুবায়রের অবস্থানের কথা জানতে পেয়ে তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য একটি বাহিনী পাঠান। তাঁরা সা'ঈদের বাড়ীতে যায় এবং তাঁকে গ্রেফতার করে সবার সামনে প্রকাশ্যে হাত-পায়ে লোহার বেড়ী পরায়। তারপর তারা তাঁকে হাজ্জাজের নিকট যেতে হবে বলে জানায়। তিনি স্থির ও প্রশান্ত চিত্তে সব কিছু মেনে নেন।
তারপর তিনি উপস্থিত আত্মীয়-বন্ধুদের লক্ষ্য করে বলেন: এই জালিমের হাতেই আমি নিহত হবো। একবার এক রাতে আমি ও আমার দু'বন্ধু 'ইবাদাত ও দু'আর মধ্যে ছিলাম। আমরা অত্যন্ত বিনয় ও একাগ্রতার সাথে এই দু'আ করেছিলাম: 'হে আল্লাহ! আমাদেরকে শাহাদাত দান করুন!' আমার সেই বন্ধুদ্বয়কে আল্লাহ এরই মধ্যে শাহাদাত দান করেছেন। একমাত্র আমি এখনো তার প্রতীক্ষায় আছি।
তাঁর এই কথার মাঝখানে তাঁর ছোট্ট মেয়েটি ছুটে এসে দেখতে পায়, পিতার হাতে-পায়ে বেড়ী বাঁধা এবং সৈন্যরা তাঁকে টানা-হেঁচড়া করছে। অবুঝ মেয়েটি তাঁর আব্বুকে জড়িয়ে ধরে হাউ-মাউ করে কাঁদতে থাকে। তিনি অত্যন্ত দরদের সাথে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে সরিয়ে দিয়ে বলেন: আমার কলিজার টুকরো মেয়ে তোমার মাকে বলবে: ইনশা'আল্লাহ জান্নাতে তাঁর সাথে আমার আবার দেখা হবে। এরপর তিনি সৈনিকদের সাথে চলতে থাকেন।
হাজ্জাজের সামনে বন্দীদের উপস্থিত করা হলো। বন্দীদের মধ্যে ছিলেন 'আমির আশ-শা'বী, মুতাররিফ ইবন 'আবদিল্লাহ আশ-শিখীর ও সা'ঈদ ইবন জুবায়রের (রহ) মত প্রখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ। শা'বী ও মুতাররিফ ক্ষেত্র বিশেষে চাতুরি ও কৌশল অবলম্বনকে দোষের কিছু মনে করতেন না। কিন্তু সা'ঈদ ইবন জুবায়র (রহ) কোন অবস্থায়ই ছল-চাতুরি পছন্দ করতেন না। বন্দীদের পৌছার পূর্বেই হাজ্জাজের নিকট খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ানের এই মর্মে একটি চিঠি পৌঁছে যে, বন্দীদের মধ্যে যারা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে 'কুফর' বলে স্বীকার করবে তাদেরকে মুক্তি দিবে। আর যারা মনে করবে যে, বিদ্রোহে অংশগ্রহণের পরেও তারা মু'মিন আছে তাদেরকে হত্যা করবে। শা'বী ও মুতাররিফকে হাজ্জাজের সামনে হাজির করা হলে তাঁরা দু'জন সরাসরি কুফরী কাজ করেছেন বলে স্বীকার না করলেও বাকচাতুরির মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হাজ্জাজের দাবীকে অনেকটা মেনে নেন। ফলে হাজ্জাজ তাদের দু'জনকে মুক্তি দেন। সবশেষে সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে হাজির করা হয়। ৫৮
হাজ্জাজ সা'ঈদ ইবন জুবায়রের নিকট পর্যুদস্ত হয়েছিলেন। এ কারণে তাঁকে দেখা মাত্র তাঁর মাথায় রক্ত উঠে যায়। তখন দু'জনের মধ্যে নিম্নোক্ত ধরনের সংলাপ হয়:
হাজ্জাজ: আপনার নাম?
ইবন জুবায়র : সা'ঈদ ইবন জুবায়র। (উল্লেখ্য যে, সা'ঈদ অর্থ সৌভাগ্যবান, আর জুবায়র অর্থ ভাঙ্গা হাড় জোড়াদানকারী)
হাজ্জাজ : না, আপনার নাম বরং এর বিপরীত 'শাকী ইবন কুসায়র' হওয়া উচিত। (শাকী অর্থ হতভাগা, আর কুসায়র অর্থ হাড় ভঙ্গকারী)
ইবন জুবায়র: আমার মা আমার নামের ব্যাপারে আপনার চেয়েও বেশী জানতেন।
হাজ্জাজ: আপনার মা ছিলেন একজন হতভাগীনী এবং আপনিও একজন হতভাগা।
ইবন জুবায়র: অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল অন্য এক সত্তারই আছে।
হাজ্জাজ: আমি আপনার পার্থিব জীবনকে দাউ দাউ করে জ্বলা আগুনে পরিণত করে দেব।
ইবন জুবায়র: আমার যদি এমন বিশ্বাস হতো যে, এটা আপনার ক্ষমতার আওতায় আছে তাহলে আমি আপনাকে আমার মা'বুদ (উপাস্য) বানিয়ে নিতাম।
হাজ্জাজ: মুহাম্মাদ (সা)-এর ব্যাপারে আপনার কিরূপ ধারণা?
ইবন জুবায়র: তিনি সঠিক পথের দিশারী নেতা এবং রহমতের নবী।
হাজ্জাজ : 'আলী ও 'উছমানের (রা) ব্যাপারে আপনার মতামত কি? তাঁরা জান্নাতে আছেন না জাহান্নামে?
ইবন জুবায়র: সেখানে যদি আমার যাওয়া হতো এবং তাঁদেরকে স্বচক্ষে দেখতে পেতাম তাহলে তাঁদের সম্পর্কে বলতে পারতাম (অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর আমি কেমন করে দেব?)।
হাজ্জাজ: খলীফাদের ব্যাপারে আপনার মতামত কি?
ইবন জুবায়র: আমি তাঁদের মুখপাত্র নই।
হাজ্জাজ: তাঁদের মধ্যে কাকে আপনি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করেন?
ইবন জুবায়র: যিনি আমার স্রষ্টার নিকট বেশী পছন্দনীয়।
হাজ্জাজ: স্রষ্টার নিকট কে সবচেয়ে বেশী পছন্দনীয়?
ইবন জুবায়র: এ জ্ঞান তো কেবল সেই সত্তারই আছে যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন।
হাজ্জাজ: 'আবদুল মালিকের ব্যাপারে আপনার রায় কি?
ইবন জুবায়র আপনি এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আমাকে কি জিজ্ঞেস করছেন যার পাপসমূহের একটি পাপ হলো আপনার বিদ্যমানতা।
হাজ্জাজ আপনি কি ইবনুল আশ'আছের সাথে বিদ্রোহে শরিক হওয়াকে কুফরী কাজ বলে বিশ্বাস করেন?
ইবন জুবায়র আমি যেদিন থেকে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি, সেদিন থেকে আর কখনো কুফরী কাজ করিনি।
হাজ্জাজ: আপনি হাসেন না কেন?
ইবন জুবায়র : সে কেমন করে হাসতে পারে যাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর সেই মাটিকে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
হাজ্জাজ : তাহলে আমরা বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের সময় হাসি কেন?
ইবন জুবায়র : সবার অন্তর এক রকম হয় না।
হাজ্জাজ : আপনি কখনো বিনোদনের সাজ-সরঞ্জাম দেখেছেন?
এ প্রশ্নের পর হাজ্জাজ সেতার ও বাঁশি বাজানোর নির্দেশ দেন। সেই সুর শুনে ইবন জুবায়র কেঁদে ফেলেন। হাজ্জাজ বললেন : এখানে কান্নার এমন কি হলো। সুর তো চিত্তবিনোদনের জিনিস। ইবন জুবায়র বললেন : না, তা হবে কেন। এ তো বিষাদের করুণ অভিব্যক্তি। বাঁশির সুর আমাকে সেই মহা প্রলয়ের দিনটির কথা স্মরণ করে দিয়েছে যেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে। আর একথাও মনে করে দিয়েছে যে, এ বাঁশিটি কোন গাছের একটি টুকরো, যা হয়তো অন্যায়ভাবে কাটা হয়েছে। আর এর তারগুলিও কোন বকরী-পাঁঠার শিরা-উপশিরা, যেগুলিকে কিয়ামতের দিন আবার জীবিত করা হবে। একথা শুনে হাজ্জাজ বললেন : সা'ঈদ, তোমার অবস্থার জন্য আফসোস হয়। সা'ঈদ বললেন : এমন ব্যক্তি আফসোসের যোগ্য কেমন করে হতে পারেন যাকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে ঢুকানো হয়েছে? এরপর আবার নিম্নোক্ত সংলাপ শুরু হয়:
হাজ্জাজ : আমি কি আপনাকে কৃষ্ণার ইমাম বানাইনি?
ইবন জুবায়র : হাঁ, বানিয়েছিলেন।
হাজ্জাজ : আমি কি আপনাকে কৃষ্ণার কাজীর পদে নিয়োগ দিইনি? তারপর যখন কৃফাবাসীরা এ নিয়োগের বিরোধিতা করে দাবী করলো যে, কৃষ্ণার কাজীকে একজন আরব বংশোদ্ভূত ব্যক্তি হতে হবে, তখন আমি আবূ বুরদাকে কাজী নিয়োগ করি। তবে তাঁকে একথাও বলে দিই, তিনি যেন আপনার সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ না করেন।
ইবন জুবায়র : হাঁ, আপনার কথা ঠিক।
হাজ্জাজ : আমি কি আপনাকে আমার বিশেষ পারিষদবর্গের অন্তর্ভুক্ত করিনি? অথচ অন্যরা সবাই ছিল আরবের বিখ্যাত গোত্রপতি।
ইবন জুবায়র : হাঁ, একথাও ঠিক।
হাজ্জাজ : আমি কি আপনাকে এক লাখ নগদ অর্থ দরিদ্র লোকদের মধ্যে বণ্টনের জন্য দিইনি এবং তার কোন হিসাবও নিইনি?
ইবন জুবায়র : হাঁ, দিয়েছেন।
হাজ্জাজ : আমার এত অনুগ্রহের পরেও আমার বিরুদ্ধাচরণের জন্য আপনাকে কিসে উদ্বুদ্ধ করলো?
ইবন জুবায়র : আমার গলায় ইবনুল আশ'আছের বাই'আতের বেড়ী ছিল।
হাজ্জাজ : আল্লাহর একজন দুশমনের বাই'আতের প্রতি এত আনুগত্য, আর আমীরুল মু'মিনীনের বাই'আত ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের কথা ভুলে গেলেন? আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে হত্যা করে জাহান্নামে না পাঠিয়ে এ স্থান ত্যাগ করবো না। বলুন, আপনি কিভাবে মরতে ইচ্ছা করেন। জাল্লাদ আপনার সামনে উপস্থিত।
ইবন জুবায়র: আল্লাহর কসম! আপনি দুনিয়াতে আমাকে যেভাবে হত্যা করবেন, আল্লাহ আখিরাতে আপনাকে সেভাবে হত্যা করবেন। আপনিই বেছে নিন, আমাকে কিভাবে হত্যা করবেন।
হাজ্জাজ: আপনি কি চান, আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিই?
ইবন জুবায়র: যদি আপনি ক্ষমা করেন, তবে তা হবে আল্লাহর পক্ষ থেকেই (সেটা আপনার কোন করুণা হবে না)।
হাজ্জাজ: আমি আপনাকে হত্যা করবো।
ইবন জুবায়র: আল্লাহ তা'আলা আমার জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সে পর্যন্ত অবশ্যই পৌঁছাতে হবে। যদি আমার সে সময় এসে থাকে তা হলে তা তো একটি স্থিরকৃত বিষয়। তা থেকে পালানোর কোন উপায় নেই। আর যদি বেঁচে যাই তা হলে তাও আল্লাহর হাতে।
উপরোক্ত সংলাপের পর হাজ্জাজ জাল্লাদকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ শুনে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন কাঁদতে আরম্ভ করলেন। ইবন জুবায়র তাকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কাঁদছো কেন? লোকটি বললো: আপনার হত্যার নির্দেশ শুনে। বললেন: এজন্য কাঁদার কোন প্রয়োজন নেই। এ ঘটনা তো সেই অনাদি কাল থেকে আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তারপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করেন:
مَا أَصَابَ مِنْ مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا .
এমন কোন বিপদ নেই যা পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের উপর আপতিত হয়, আর আমরা তা সৃষ্টি করার পূর্বে একটি কিতাবে (অর্থাৎ ভাগ্যলিপিতে) লিখে রাখিনি।
বধ্যভূমিতে যাবার পূর্ব মুহূর্তে তিনি ছেলেকে দেখার জন্য ডাকলেন। সে এসে কাঁদতে লাগলো। তিনি তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি কাঁদছো কেন? সাতান্ন বছরের বেশী তোমার পিতার জীবনই ছিল না। তাহলে কাঁদার কি কারণ থাকতে পারে।
অতঃপর তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও দৃঢ়তার সাথে হাসতে হাসতে বধ্যভূমির দিকে চলতে থাকেন। হাজ্জাজকে বলা হলো যে, এ সময়ও ইবন জুবায়রের ঠোঁটে হাসি শোভা পাচ্ছে। হাজ্জাজ তাঁকে আবার ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞেস করলেন: আপনি হাসছিলেন কেন?
ইবন জুবায়র বললেন: আল্লাহর মুকাবিলায় আপনার দুঃসাহস এবং আপনার মুকাবিলায় তাঁর ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখে।
তাঁর এ জবাব শুনে হাজ্জাজ নিজের সামনেই হত্যার চামড়া বিছানোর নির্দেশ দিলেন এবং হত্যারও ইঙ্গিত করলেন। ইবন জুবায়র বললেন: দু'রাক'আত নামায আদায়ের সুযোগ দিন। হাজ্জাজ বললেন: যদি পূর্ব দিকে মুখ করে পড়তে পারেন তাহলে দেওয়া যেতে পারে। বললেন: কোন পরোয়া নেই। তারপর পাঠ করেন এ আয়াত:
أَيْنَمَا تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ.
- যে দিকেই তোমরা তোমাদের মুখ ফেরাও সে দিকেই আল্লাহর মুখমণ্ডল বিদ্যমান।
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ.
- আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখ ফিরালাম সেই সত্তার দিকে যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরিক (অংশীবাদী)-দের অন্তর্ভুক্ত নই।৬০
তারপর হাজ্জাজ তাঁকে মাথা নিচু করার নির্দেশ দিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় ও আনুগত্যের সাথে মাথা নিচু করে পাঠ করলেন:
مِنْهَا خَلَقْنَاكُمْ وَفِيْهَا نُعِيدُكُمْ وَمِنْهَا نُخْرِجُكُمْ تَارَةً أُخْرَي.
- আমি এই মাটি থেকেই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, আবার সেই মাটিতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব। তারপর সেই মাটি থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করবো।
তারপর কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে দু'আ করেন: 'হে আল্লাহ! আমার হত্যার পর তাঁকে আর কাউকে হত্যার ক্ষমতা ও সুযোগ দেবেন না।' জাল্লাদ কোষমুক্ত তরবারি হাতে প্রস্তুত ছিল। হাজ্জাজের নির্দেশের পর হঠাৎ তরবারি ঝলকে উঠলো এবং একজন সত্যের সৈনিকের মাথা মাটিতে তড়পাতে লাগলো। মাটিতে পড়ার পর তাঁর মুখের সর্বশেষ উচ্চারণ ছিল 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু'। এ হৃদয় বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয় হিজরী ৯৪ সনের শা'বান মাসে। তখন ইবন জুবায়রের বয়স হয়েছিল ৫৭, মতান্তরে ৪৯ বছর। অনেকে বলেছেন, ইবরাহীম আত-তায়মী, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ, সা'ঈদ ইবন জুবায়র একই বছর মারা যান। আর সেটা ছিল হিজরী ৯৫ সন। ওয়াসিতে তাকে দাফন করা হয়। হাজ্জাজের দারোয়ান বলেছেন, আমি সা'ঈদ ইবন জুবায়রের মাথা কাটার পর মাটিতে পড়ে তড়পাতে তড়পাতে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' পাঠ করতে দেখেছি।" ইমাম নাবাবী বলেছেন, হাজ্জাজ ঠাণ্ডা মাথায় এবং অন্যায়ভাবে সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে হত্যা করেন। ৬২ সা'ঈদ ইবন জুবায়রের (রহ) ব্যক্তিত্ব এত বিশাল ছিল যে, তৎকালীন সকল বড় তাবি'ঈ তাঁর শাহাদাতের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। হযরত হাসান বাসরী (রহ) বলেন: 'হে আল্লাহ! আপনি ছাকীফ গোত্রের এ পাপাচারী (হাজ্জাজ) থেকে বদলা নিন। আল্লাহর কসম! ধরা পৃষ্ঠের সকল অধিবাসীও যদি তাঁর হত্যায় অংশগ্রহণ করতো তাহলেও আল্লাহ তাদের সকলকে নিম্নমুখী করে জাহান্নামে ফেলতেন। ৬৩
সা'ঈদ ইবন জুবায়রের (রহ) গায়ের রং ছিল কালো। মাথার চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে গিয়েছিল। খিজাব লাগানো পছন্দ ছিল না। এক ব্যক্তি কালো খিজাব লাগানোর ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করে। তিনি বলেন: আল্লাহ তাঁর বান্দার চেহারা নূর দ্বারা আলোকিত করেন, আর বান্দা তা কালো খিজাব দ্বারা অন্ধকার করে দেয়। ৬৪
সা'ঈদ ইবন জুবায়রের (রহ) বদ-দু'আ ব্যর্থ হয়নি। অন্যায়ভাবে ঝরানো তাঁর রক্ত তৎপর হয়ে ওঠে। তাঁর নিহত হবার পরেই হাজ্জাজ মস্তিষ্কের কঠিন রোগে আক্রান্ত হন এবং শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়তেন। তখন দেখতেন যে, ইবন জুবায়র (রহ) তাঁর কাপড় ধরে তাঁকে জিজ্ঞেস করছেন, 'ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই আমাকে কোন অপরাধে হত্যা করেছিস?' এ দুঃস্বপ্ন দেখে ভীত-চকিত অবস্থায় উঠে বসে পড়তেন। তারপর আপন মনে বলতে থাকতেন, সা'ঈদের সাথে আমার সম্পর্ক কি? এই মাথা খারাপ অবস্থায় হাজ্জাজ হিজরী ৯৫ সনে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে স্বৈরাচারী হাজ্জাজের জীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটে। ইবন জুবায়রের (রহ) হত্যার পর কোন মানুষের প্রাণনাশের সুযোগ আল্লাহ তাকে আর দেননি। ৬৫
হাজ্জাজের মৃত্যুর পর এক ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখে। সে হাজ্জাজকে জিজ্ঞেস করে : আল্লাহ তোমার সাথে কিরূপ আচরণ করছেন? হাজ্জাজ বলেন আমার নির্দেশে নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির বদলায় আমাকে একবার করে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু সা'ঈদ ইবন জুবায়রের (রহ) বদলায় হয়েছে সত্ত্বরবার। ৬৬
তিনি আরো বলেন, আমি এখন অপেক্ষায় আছি, একজন একেশ্বরবাদী যা কিছুর অপেক্ষায় থাকে, তার। ৬৭
'আবদুল্লাহ, মুহাম্মাদ ও 'আবদুল মালিক- এ তিন ছেলে তিনি রেখে যান। ৬৮
টিকাঃ
১. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
৩. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
৪. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৬
৫. তাহাযীব আত-তাহযীব-৪/১১; ইবন খাল্লিকান: ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭১
৬. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৬
৭. আল-হাকিম: আল-মুস্তাদরিক-৩/৫৩৮
৮. ইবন সা'দ: আত-তাবাকাত-৬/২৫৭
৯. প্রাগুক্ত-৬/২৫৮
১০. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
১১. আত-তাবাকাত-৬/২৬
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. প্রাগুক্ত
১৫. ইবন খাল্লিকান-২/৩৭১
১৬. সূরা আন-নিসা'-৯৮
১৭. আত-তাবাকাত-৬/২৬২
১৮. সূরা আল-আনকাবৃত-৫৬
১৯. আত-তাবাকাত-৬/২৬৬
২০. ইবন খাল্লিকান-২/৩৭২; ড. হাসান ইবরাহীম হাসান: তারীখ আল-ইসলাম-১/৫০৩
২১. আত-তাবাকাত-৬/২৫৬; তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
২২. আত-তাবাকাত-৬/২৫৭
২৩. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
২৪. ইবন কুতায়বা: আল-মা'আরিফ-১৯৭; ইবনুল জাওযীর সিফাতুস সাফওয়া-৩/৪৩; আ'লাম আল-মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৮
২৫. ইবন 'আবদি রাব্বিহি: আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/১৬৭, ১৬৯
২৬. ইবন খাল্লিকান-১/২০৪
২৭. আত-তাবাকাত-৬/২৫৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৬; তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
২৮. শাযারাতুয যাহাব-১/১০৮
২৯. আত-তাবাকাত-৬/২৫৮; তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
৩০. আত-তাবাকাত-৬/২৫৮
৩১. ইবন খাল্লিকান-১/২০৫
৩২. বুখারী, তারীখুল কাবীর
৩৩. প্রাগুক্ত
৩৪. আত-তাবাকাত-৬/২৫৭
৩৫. প্রাগুক্ত-৬/২৬০
৩৬. তাহযীবুত তাহযীব-৪/১২; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৬
৩৭. সিফাতুস সাফওয়া-১/১৫০; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৬
৩৮. সূরা আল-মু'মিন-৩৮
৩৯. আত-তাবাকাত-৬/২৬০
৪০. সূরা আল-বাকারা-৩৮
৪১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৬
৪২. সিফাতুস সাফওয়া-১/১৫১
৪৩. আত-তাবাকাত-৬/২৫৯
৪৪. ইবন খাল্লিকান-১/২০৫
৪৫. আত-তাবাকাত-৬/২৬০
৪৬. প্রাগুক্ত-৬/২৬৪
৪৭. প্রাগুক্ত-৬/২৫৯
৪৮. সিফাতুস সাফওয়া-১/১৫১
৪৯. আত-তাবাকাত-৬/২৬৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৭
৫০. সিফাতুস সাফওয়া-১/১৫১
৫১. আত-তাবাকাত-৬/২৬২
৫২. ইবন খাল্লিকান-১/২০৫
৫৩. তাহযীবুত তাহযীব-৪/১৩
৫৪. ইবন খাল্লিকান-১/২০৫
৫৫. আত-তাবাকাত-৬/২৬৫
৫৬. প্রাগুক্ত-৬/২৬৬
৫৭. কৃষ্ণা থেকে সাত ফারসাখ দূরে অবস্থিত একটি স্থান। (আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/১৭৬)
৫৮. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/১৭৬, ৪৬৪; ৫/৫৪
৫৯. সূরা আল-হাদীদ-২২
৬০. সূরা আল-আন'আম-৯
৬১. সা'ঈদ ইবন যুবায়রের সাথে হাজ্জাজের আচরণ ও তাঁর হত্যার ঘটনাটি রিজাল শাস্ত্রের প্রায় সকল গ্রন্থে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। আর তা সাজালে আমাদের এ বর্ণনার রূপ লাভ করে। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ইবন খাল্লিকান, খ.২, পৃ. ৩৭২-৩৭৪; শাযারাতুয যাহাব-খ.১ পৃ. ১০৯-১১০; আত-তাবাকাত, খ. ৬, পৃ. ২৬৩-২৬৬; আল-ইকদ আল-ফারীদ, খ.৫, পৃ. ৫৪; তাযকিরাতুল হুফফাজ, খ.১, পৃ. ৭৬-৭৭. তাহযীবুল কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল, খ.২, পৃ-২৩২; আয-যাহাবী; তারীখ আল-ইসলাম, খ. ৩. পৃ. ৩২৮।
৬২. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৬
৬৩. ইবন খাল্লিকান-২/৩৭৪
৬৪. আত-তাবাকাত-৬/২৬৭
৬৫. ইবন খাল্লিকান-২/৩৭৩
৬৬. প্রাগুক্ত-২/৩৭৪
৬৭. আল-ইদ অল-ফারীদ-৫/৫৬
৬৮. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২১৭
📄 সালিম ইবন ‘আবদিল্লাহ (রা)
সালিম একজন বিখ্যাত তাবি'ঈ। ডাক নাম আবূ 'উমার, 'উমায়র বা আবূ 'আবদিল্লাহ।১ তাঁর পিতা হযরত ফারূকে আ'জাম 'উমার (রা)-এর সুযোগ্য সন্তান হযরত 'আবদুল্লাহ (রা)। পিতৃকুলের মত তাঁর মাতৃকুলও অত্যন্ত অভিজাত। খলীফা হযরত 'উমারের (রা) খিলাফতকালে শাহেনশাহে ইরান ইয়াযদিগিরদের যে কন্যারা বন্দী হয়ে মদীনা এসেছিলেন তাঁদেরই একজনকে হযরত 'আবদুল্লাহকে দান করা হয়েছিল। তাঁরই গর্ভে সালিমের জন্ম হয়। এভাবে তাঁর ধমনীতে ইরানের শাহী খান্দানের রক্তও প্রবাহিত ছিল। হযরত উছমানের (রা) খিলাফতকালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা একজন উম্মু ওলাদ।
উল্লেখ্য যে, শেষ পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগিরদ-এর তিন কন্যা যুদ্ধবন্দী হিসেবে মদীনায় আসেন। সমতা ও সাম্যের প্রতীক খলীফা 'উমার (রা) নিয়ম অনুযায়ী তাঁদেরকে দাসী হিসেবে বিক্রীর উদ্যোগ নেন। দুঃখ ও হতাশায় তখন কন্যাদের দু'চোখ থেকে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতে থাকে। আর তা দেখে হযরত 'আলীর (রা) অন্তর বিগলিত হয়। তিনি শাহেনশাহে ইরানের কন্যাদেরকে যথাযথ মর্যাদা দানের জন্য তৎপর হন। তিনি খলীফা 'উমারকে (রা) বলেন, সাধারণ যুদ্ধবন্দী মহিলাদের মত এই তিন সম্রাট কন্যার সাথে একই আচরণ করা ঠিক হবে না। অতঃপর আলী (রা) ও অন্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শের পর কুরায়শ বংশের সম্মানীয় তিন যুবকের হাতে তিনজনকে তুলে দেওয়া হয়। সেই তিন যুবক হলেন : হুসায়ন ইবন 'আলী (রা), মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর (রা) ও আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা)। পরবর্তীতে এই তিন বোন তিনজন বিখ্যাত সন্তানের গর্বিত মা হন। প্রথমজন হলেন 'আলী যয়নুল 'আবিদীনের গর্বিত মা। দ্বিতীয়জন জন্ম দেন কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবী বকরকে (রা)। এই কাসিম ছিলেন মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফকীহ্ অন্যতম। আর তৃতীয়জন হলেন সালিম ইবন 'আবদিল্লাহর (রা) সম্মানিতা জননী।
সালিমের পিতা হযরত 'আবদুল্লাহ (রা) ঐসব ব্যক্তিদের একজন যাঁরা ছিলেন 'ইলম ও 'আমল এবং যুহৃদ ও তাকওয়ার বাস্তব প্রতীক। তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে সালিমও পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে গড়ে ওঠেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত যে, 'উমারের (রা) সাথে সাদৃশ্য ছিল 'আবদুল্লাহর। আর 'আবদুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে তাঁর সাথে বেশী সাদৃশ্য ছিল সালিমের। এভাবে সালিম ছিলেন যেন তাঁর দাদা 'উমার ফারুকের (রা) বাস্তব প্রতিকৃতি।
সালিম মদীনার ঐসব তাবি'ঈর অন্তর্ভুক্ত যাঁরা ছিলেন 'ইলম ও 'আমল উভয় ক্ষেত্রের অধিপতি। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন, তিনি ছিলেন ফকীহ্, হুজ্জাত এবং ঐ সকল বিশেষ 'আলেমের অন্তর্গত যাঁদের সত্তায় 'ইলম ও 'আমলের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁকে একজন ইমাম, যাহিদ (দুনিয়া বিরাগী), হাফিজ, মদীনার মুফতী, কুরায়শ বংশীয় ইত্যাদি বলেও উল্লেখ করেছেন। ইমাম নাবাবী লিখেছেন, সালিমের ইমামত, মহত্ব, বৈরাগ্য, আল্লাহভীতি ও অত্যুচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে সবাই একমত।৭ ইবন খাল্লিকান তাঁকে মদীনার অন্যতম ফকীহ্ এবং তাবি'ঈ, 'আলিম ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গের নেতা বলেছেন।
তাফসীর, হাদীছ, ফিকাহ্ তথা সব শাস্ত্রে তাঁর সমান দক্ষতা ও পারদর্শিতা ছিল, কিন্তু অত্যধিক সতর্কতা অবলম্বনের কারণে কুরআন পাকের তাফসীর বর্ণনা করতেন না।৯ আর এজন্য মুফাস্সির হিসেবে তিনি কোন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেননি।
হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) ছিলেন হাদীছের এক শ্রেষ্ঠ স্তম্ভ। সালিম বেশীর ভাগ হাদীছ তাঁর নিকট থেকেই শুনেছেন। ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ বলেন: আমি সালিমকে প্রশ্ন করলাম: আপনি কি আপনার পিতা 'আবদুল্লাহর নিকট থেকে কোন হাদীছ শুনেছেন? বললেন: একবার নয়। এক শো বারেরও বেশী শুনেছি।১০ তাছাড়া আরো অনেক উঁচুস্তরের সাহাবী, যেমন: আবূ হুরাইরা (রা), আবূ আইউব আল-আনসারী (রা), উম্মুল মু'মিনীন 'আইশা সিদ্দীকা (রা), যায়িদ ইবন খাত্তাব, আবু লুবাবা, রাফি' ইবন খাদীজ সাফীনা, আবূ রাফি' (রা) প্রমুখ থেকে হাদীছের জ্ঞান লাভ করেন।১১ এসব মহান ব্যক্তিদের ফয়েজ ও বরকতে তাঁর জ্ঞানের পরিধি সীমাহীন বিস্তার লাভ করে। ইবন সা'দ লিখেছেন, সালিম ছিলেন নির্ভরযোগ্য, বহু হাদীছের ধারক এবং অত্যুচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি।১২
সালিমের নিকট থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন এবং বর্ণনা করেছেন তাঁদের সংখ্যা অনেক। তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন: 'আমর ইবন দীনার, ইমাম যুহরী, মূসা ইবন 'উকবা, হুমায়দ আত-তাবীল, সালিহ ইবন কাইসান, 'উবাইদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন হাফ্স, আবূ ওয়াকিদ আল লায়ছী, 'আসিম ইবন 'আবদিল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবন আবী বাক্স, হানজালা ইবন আবী সুফয়ান, আবূ কিলাবা জুরমী ও আরো অনেকে। এসব শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ মুহাদ্দিছ ছিলেন তাঁর ছাত্র।১৩
হযরত সালিমের জ্ঞান চর্চার বিশেষ ক্ষেত্র ছিল ফিকাহ্ শাস্ত্র। এ শাস্ত্রে তিনি ইমামের মর্যাদা অর্জন করেন। কোন কোন ইমাম, যাঁদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন মুবারাকও আছেন, তাঁকে মদীনার বিখ্যাত সাতজন ফকীহ্ মধ্যে গণ্য করতেন। ১৪ সাতজন ফকীহ্ নির্ধারণে মতপার্থক্য আছে। বিভিন্ন ব্যক্তি নিজ নিজ চিন্তা ও দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন জনের নাম বলেছেন। যাই হোক না কেন, এই তালিকার মধ্যে সালিমের নামটিও উচ্চারিত হয়েছে। ফিকাহ্ শাস্ত্রে তাঁর যোগ্যতা ও উৎকর্ষতার সবচেয়ে বড় সনদ এই যে, মদীনার ফাতওয়া দানকারী দলটির তিনিও একজন বিশেষ সদস্য ছিলেন।১৫ তাঁদের মতামতের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে কোন কাজীই সিদ্ধান্ত দান করতেন না।১৬
হযরত সালিমের মধ্যে যে পরিমাণ জ্ঞান ছিল সেই পরিমাণ 'আমলও ছিল। ইমাম মালিক (রহ) বলতেন, সালিমের যুগে যুহৃদ ও তাকওয়ায় এবং মহত্ব ও মর্যাদায় তাঁর চেয়ে বেশী পূর্বসূরীদের সাথে সাদৃশ্যের অধিকারী কেউ ছিলেন না।১৭ ইমাম নাবাবী, ইমাম আয- যাহাবীসহ অন্যান্য সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁর যুহৃদ ও তাকওয়া এবং ইলল্ম ও 'আমলের ব্যাপারে একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন।
'আকীদা-বিশ্বাসে তিনি সত্যনিষ্ঠ পূর্বসূরীদের সাদামাটা ও নির্ভেজাল বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন। সুতরাং পরবর্তীকালে 'আকীদার ব্যাপারে যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয় তিনি তা ভীষণ ঘৃণা করতেন। কাদরিয়া গোষ্ঠী, যারা তাকদীরের উপর ভিত্তি করে ভালো ও মন্দের বিশ্বাস করতো তাদের প্রতি তিনি অভিশাপ দিতেন।১৮
তিনি প্রতিটি ব্যাপার ও বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যে কথার মধ্যে মিথ্যার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকতো তা পছন্দ করতেন না। তাঁর সময়ে 'সাতগজী' বলে একটি কাপড় প্রসিদ্ধ ছিল। আসলে তা সাত গজের চেয়ে কিছু কম হতো। কিন্তু 'সাতগজী' বলেই তা প্রচলিত ছিল। মারওয়ান ইবন যুবায়র বর্ণনা করেছেন: একবার সালিম কাপড় কিনতে আসলেন। আমি তাঁর সামনে 'সাতগজী' মেলে দিলাম। সেটি সাত গজের চেয়ে একটু কম ছিল। তিনি বললেন, তুমি তো সাত গজ বলেছিলে। আমি বললাম, আমরা এটাকে 'সাতগজী' বলে থাকি। তিনি বললেন, মিথ্যা এভাবেই হয়ে থাকে।১৯
একজন মুসলমানের রক্ত হযরত সালিমের নিকট এত সম্মানের ছিল যে, কোন অপরাধী মুসলমানের উপরও তিনি হাত উঠাতেন না। একবার জালিম হাজ্জাজ তাঁকে এমন এক ব্যক্তিকে হত্যার নির্দেশ দেয়, যে হযরত উছমানের হত্যার অন্যতম সাহায্যকারী ছিল। তিনি তলোয়ার হাতে করে অপরাধীর দিকে এগিয়ে যান। নিকটে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি মুসলমান? সে উত্তর দেয়, হাঁ, আমি মুসলমান। কিন্তু আপনাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে তা পালন করুন। তিনি আবার তাকে প্রশ্ন করেন, তুমি কি আজ সকালে ফজরের নামায আদায় করেছো? সে উত্তর দিল, হাঁ, আদায় করেছি। এ কথা শুনে সালিম ফিরে যান এবং হাজ্জাজের সামনে তলোয়ার ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেন, এ ব্যক্তি মুসলমান। আজ সকাল পর্যন্ত সে নামায আদায় করেছে। আর রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে সকালের নামায আদায় করেছে সে আল্লাহর হিফাজত ও নিরাপত্তায় এসে গেছে। হাজ্জাজ বললো, আমরা তো তার সকালের নামাযের জন্য হত্যা করছিনে, বরং এ জন্য হত্যা করছি যে, সে 'উছমানের (রা) হত্যাকারীদের একজন সাহায্যকারী ছিল। সালিম বললেন, এ জন্য আরো মানুষ বর্তমান আছে যারা 'উছমানের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার আমাদের চেয়েও বেশী হকদার। সালিমের পিতা হযরত 'আবদুল্লাহ (রা) এ ঘটনা শুনে মন্তব্য করেন, সালিম বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। ২০
তিনি এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট নিজের প্রয়োজনের কথা বলা পছন্দ করতেন না। খলীফা ও আমীর-উমারাদের ধন-দৌলত এবং তাঁদের দান-খয়রাতের ব্যাপারে এত উদাসীন ও বেপরোয়া ছিলেন যে, তাদের অনেকের আবেদন ও অনুরোধের পরেও কখনো কোন ইচ্ছা প্রকাশ করতেন না। খলীফা সুলায়মান মতান্তরে হিশাম ইবন 'আবদুল মালিক ছিলেন তাঁর একজন গুণমুগ্ধ ব্যক্তি। তিনি সালিমকে অতিরিক্ত সম্মান করতেন। তিনি মাঝে মধ্যে অতি সাধারণ মোটা ছেঁড়া কাপড় পরে নির্দ্বিধায় তাঁর দরবারে ঢুকে যেতেন। আর এ অবস্থায় খলীফা তাঁকে সংগে করে এক সাথে খলীফার আসনে গিয়ে বসতেন। ২১ একবার তিনি হজ্জে যান। কা'বার আঙ্গিনায় খলীফা হিশাম/সুলায়মানের সাথে দেখা হয়। খলীফা তাঁর নিকট আবেদন করেন, আপনার যা যা প্রয়োজন আমাকে বলুন। তিনি বললেন, আল্লাহর ঘরের মধ্যে অন্য কারো কাছে কিছুই চাইবো না। ২২
কা'বার আঙ্গিনা থেকে বের হওয়ার পর খলীফা তাঁকে বললেন, এবার আপনার প্রয়োজনের কথা একটু বলুন। বললেন দুনিয়ার প্রয়োজন না আখিরাতের? খলীফা বললেন: দুনিয়ার প্রয়োজনের কথাই বলুন। বললেন: এই দুনিয়ার যিনি মালিক তাঁর কাছেই তো আমি কিছু চাইনি। আর যে এর কোন কিছুর মালিক নয় তার কাছে কি চাইবো? ২৩
একবার 'আরাফার দিনে তিনি এক ব্যক্তিকে মানুষের নিকট সাহায্য চাইতে দেখে বললেন: ওরে নির্বোধ! আজকের দিনে তুই অল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে চাইছিস? ২৪
আশ'আব বলেন: সালিম আমাকে বলেছেন, তুমি এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে কিছু চাইবে না।২৫
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) যখন মদীনার ওয়ালী ছিলেন তখন হযরত সালিম (রহ) তাঁর দরবারে যাওয়া-আসা করতেন। সেখানে একবার তাঁর সাথে আরব কবি দুকায়ম ইবন আর-রাজা'র পরিচয় হয়। পরবর্তীকালে 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয (রহ) খলীফা হওয়ার পর সালিম ও মুহাম্মাদ ইবন কা'বকে দরবারে ডেকে পাঠান। তাঁরা উপস্থিত হলে খলীফা বলেন: আপনারা আমাকে কিছু উপদেশ দিন। সালিম বললেন: আপনি মানুষকে পিতা, পুত্র ও ভ্রাতা জ্ঞান করবেন। তারপর পিতার সেবা ও ভ্রাতার নিরাপত্তা বিধান করবেন। আর পুত্রের প্রতি স্নেহপরায়ণ হবেন। ২৬
হযরত সালিমের ওয়াজ-নসীহত ছিল খুবই চিত্তাকার্ষক ও প্রভাব সৃষ্টিকারী। একবার 'উমার ইবন 'আবদুল 'আযীয (রহ) তাঁকে লিখলেন, আপনি আমাকে 'উমার ইবন আল- খাত্তাবের (রা) কিছু সিদ্ধান্ত লিখে পাঠান। জবাবে তিনি লিখে পাঠান, 'উমার, সেইসব বাদশাহকে স্মরণ করুন যাদের সেইসব চোখ অন্ধকার হয়ে গেছে যা কখনো দেখার স্বাদ থেকে তৃপ্ত হতো না। সেইসব পেট ফেটে গেছে যা প্রাসাদের অঢেল সম্পদ দ্বারা কখনো পরিতৃপ্ত হতো না। আজ তারা যমীনের টিলার নীচে মৃত পড়ে আছে। যদি তারা আমাদের জনপদের নিকটবর্তী হতো তাহলে তাদের সেই দেহের দুর্গন্ধ আমাদের বিরক্তি ও কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াতো। ২৭
হযরত 'আবদুল্লাহ (রা) তাঁর মহান পিতা হযরত 'উমার ফারুকের (রা) মত খুব কমই স্নেহ-মমতার আতিশয্য দেখাতেন। কিন্তু পুত্র সালিমের চারিত্রিক গুণাবলী ও উৎকর্ষতার কারণে তাঁর প্রতি আবেগের তীব্রতা ছিল একটু বাড়াবাড়ি রকমের। সালিমের বয়স যখন প্রৌঢ়ত্বে পৌছে যায় তখনো 'আবদুল্লাহ (রা) তাঁকে স্নেহ-মমতার প্রাবল্যে চুমা দিতেন। তিনি বলতেন, তোমরা কি অবাক হও না এই দেখে যে, একজন বৃদ্ধ তাঁর প্রৌঢ় ছেলেকে চুমা দেয়? যাঁরা তাঁর এমন পক্ষপাতমূলক স্নেহ-মমতার সমালোচনা করতো তাদের জবাবে তিনি নিম্নের চরণটি আবৃত্তি করতেন। ২৮
يَلُوْمُوْنَنِي فِي سَالِمٍ وَأَلُوْمُهُمْ # وَحِلْدَةُ بَيْنَ الْعَيْنِ وَالْأَلْفِ سَالِمٌ -মানুষ আমাকে সালিমের ব্যাপারে তিরস্কার করে এবং আমিও তাদের তিরস্কার করি। সালিম চোখ ও নাকের মধ্যবর্তী ত্বকের মত আমার প্রিয়।
সালিমের জীবন যাপন প্রণালী ছিল অতি সহজ ও সাধারণ। কৃত্রিম লৌকিকতা, ভনিতার লেশমাত্র তাতে ছিল না। ইমাম যাহাবী লিখেছেন, তাঁর জীবন ছিল শুষ্ক কাটখোট্টা ও অতি সাদামাটা। বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের জন্য সব সময় মোটা পশমের পোশাক পরতেন। মাইমূন ইবন সাহ্রান বলেন, তিনি তাঁর পিতার মতই ছিলেন। বিলাসিতা ও সৌখিনতার লেশমাত্র তাঁর মধ্যে ছিল না। আর্থিক স্বাচ্ছন্দ ও সচ্ছলতাও তাঁর ছিল না। বর্ণিত আছে, বাজারে কেনাবেচা করতেন। নিজ হাতে সব কাজও করতেন। ২৯ হানজালা বলেন, আমি সালিমকে বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করতে দেখেছি। তাঁর সমসাময়িক অন্য একজন তাবি'ঈ আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ পরতেন রেশম ও পশম মিশ্রিত এক প্রকার পোশাক, আর তিনি পরতেন মোটা পশমী পোশাক; দু'জন মদীনার একই মজলিস ও মসজিদে বসতেন। কেউ কাউকে কোন ব্যাপারে হেয় ও তুচ্ছ জ্ঞান করতেন না। ৩০ তিনি কুরবানীর পশুর চামড়ার তৈরী পোশাকও পরতেন। ৩১ বাম হাতের আঙ্গুলে রূপোর আংটি ধারণ করতেন এবং তাতে তাঁর নামটি অংকিত থাকতো। জামা ও চাদর পরতেন। জামাটি পায়ের নলার মাঝ বরাবর লম্বা ছিল। টুপি ও পাগড়ী পরতেন। পাগড়ীর এক মাথা পিছন দিকে এক বিঘত বা তার কিছু বেশী ছেড়ে রাখতেন। ৩২
তিনি যে পোশাক পরতেন তার মূল্য হতো মাত্র দুই দিরহাম। ৩৩ শুকনো রুটি ও যয়তুনের তেল ছিল তাঁর প্রধান খাদ্য। তাঁর দাদা হযরত ফারূক আ'জমের (রা) জীবনও ছিল এমন। তিনি গোশত খুব কম খেতেন। মানুষকে গোশত বেশী খেতে নিষেধ করতেন। বলতেন, গোশত কম খাবে। কারণ, তার মধ্যে মদের মতই তেজী ভাব আছে। ৩৪
এমন অতি সাধারণ খাবার খাওয়া সত্ত্বেও তাঁর শরীর ছিল খুবই পুষ্ট ও সজীব। একবার হজ্জের মওসুমে যখন দেহে শুধু ইহরামের পোশাক থাকে, তাঁর দেহের এমন সজীবতা দেখে খলীফা হিশাম তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কী খান? তিনি বলেন, রুটি ও যয়তুনের তেল। তিনি আবার প্রশ্ন করেন, এ খাবার কিভাবে খাওয়া হয়? তিনি বলেন, এগুলো আমি ঢেকে রেখে দিই এবং ক্ষিদে অনুভব করলে তখন খেয়ে নিই। আর কখনো গোশত পেলে তাও খাই। ৩৫
হযরত সালিম বৃদ্ধ বয়সে হিজরী ১০৬ মতান্তরে ১০৭ ও ১০৮ সনের জিলহজ্জ মাসে মদীনায় ইনতিকাল করেন। ৩৬ হিশাম ইবন 'আবদুল মালিক হজ্জ আদায় শেষে তখন মদীনায় অবস্থান করছিলেন। তিনিই জানাযার নামায পড়ান। মানুষের এত ভিড় হয় যে, বাকী'র ময়দানে জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। ৩৭
তিনি কয়েকজন সন্তান রেখে যান। তাঁরা হলেন: 'উমার, 'আবূ বাকর, 'আবদুল্লাহ, 'আসিম, জা'ফর, 'আবদুল 'আযীয, ফাতিমা, হাফসা ও 'আবাদা। শেষ বয়সে তাঁর মাথার চুল ও দাড়ি সাদা হয়ে যায়।
হযরত সালিম (রহ) যে বছর মারা যান খলীফা হিশাম ইবন 'আবদিল মালিক সে বছর হজ্জের সফরে মদীনায় যান। মদীনা পৌঁছে এক ব্যক্তিকে বললেন দেখ তো মসজিদে কে আছে। সে বললো একটি লম্বা কালো মানুষ আছে। হিশাম বললেন: তিনিই সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ। তাঁকে ডেকে আন। লোকটি সালিমের নিকট গিয়ে বললো: আমীরুল মু'মিনীন আপনাকে ডেকেছেন, চলুন। তবে আপনি ইচ্ছা করলে লোক পাঠিয়ে আপনার অন্য পরিধেয় বস্ত্র আনিয়ে নিতে পারেন। সালিম বললেন আপনার অকল্যাণ হোক! আমি এক চাদর ও এক জামা পরে আল্লাহর যিয়ারতে এসেছি। এ অবস্থায় আমি যাব হিশামের কাছে? যাই হোক, তিনি হিশামের কাছে যান এবং হিশাম তাঁকে দশ হাজার মুদ্রা উপহার দেন। এরপর হিশাম মদীনা থেকে মক্কায় যান এবং হজ্জ আদায় করেন। হজ্জ শেষ করে তিনি আবার মদীনায় যান। সেখানে পৌঁছে জানতে পান যে, সালিম (রহ) কঠিন মৃত্যু-যন্ত্রণা ভোগ করছেন। হিশাম তাঁকে দেখতে যান এবং তাঁর অবস্থা কেমন তা জিজ্ঞেস করেন, এরপর সালিম (রহ) মারা যান এবং হিশাম তাঁর জানাযার নামায পড়ান। নামাযের পর তিনি মন্তব্য করেন: আমার হজ্জ অথবা সালিমের জানাযার নামায পড়া এ দু'টির কোনটির জন্য আমি বেশী খুশী তা বলতে পারবো না।৪০
খলীফা 'আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান একবার হজ্জের সময় হাজ্জাজকে লিখলেন: হজ্জের নিয়মাবলীর ব্যাপারে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমারকে (রা) অনুসরণ করবে। আরাফার দিনের আগের রাতে হাজ্জাজ গেলেন 'আবদুল্লাহ (রা) ও তাঁর ছেলে সালিমের নিকট। সালিম তাঁকে বললেন আজ যদি আপনি সুন্নাত অনুসরণ করতে চান তাহলে খুতবা সংক্ষেপ করে তাড়াতাড়ি নামায পড়বেন। কথাটি হাজ্জাজের মনোপূত হলো না, তিনি 'আবদুল্লাহর (রা) দিকে তাকালেন। 'আবদুল্লাহ (রা) বললেন: সে ঠিক বলেছে। ৪১
ইমাম আল-আসমা'ঈ বলেন: অধিকাংশ মদীনাবাসী দাসীদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতো না। অথচ এই দাসীদের পেটেই জন্ম নিয়েছেন 'আলী ইবন আল-হুসাইন, আল- কাসিম ইবন মুহাম্মাদ ও সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ। আর তাঁরা ফিকাহ্, 'ইলম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে সকল মদীনাবাসীকে অতিক্রম করে গেছেন। তারপর মানুষ দাসীদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। ৪২
টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৮; তাবাকাত-৫/১৯৫
২. তাহযীবুত তাহযীব-৩/৪৩৮
৩. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৫৮। কোন দাসী সন্তানের মা হলে ইসলামের পরিভাষায় 'উম্মু ওলাদ' বলা হয়। এমন দাসীকে ক্রয়-বিক্রয়, দান বা এ জাতীয় কোনভাবে হস্তাস্তর করা বৈধ নয়।
৪. তাবাকাত-৫/১৯৬; তারীখ ইবন আসাকির-৭/১৩
৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৮
৬. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৫৮
৭. তাহযীবুল আসমা'-১/৩৭
৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৪৯
৯. তাবাকাত-৫/২০০
১০. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৫৮, তারীখ ইবন 'আসাকির-৭/১৪
১১. তাহযীবুত তাহযীব-৩/৪৩৭
১২. তাবাকাত-৫/১৯৮
১৩. তাহযীবুত তাহযীব-৩/৪৩৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৫৯
১৪. তাহযীবুল আসমা'-১/২০৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬১
১৫. আ'লাম আল মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৫
১৬. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬১
১৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৯
১৮. তাবাকাত-৫/২০০
১৯. প্রাগুক্ত-৫/১৯৯
২০. তাবাকাত-৫/১৯৫; তারীখ ইবন 'আসাকির-৭/১৫; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬৬
২১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৯
২২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৫০; আল-বায়ান ওয়াত তাবঈন-৩/১২৭
২৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৫১; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬৬
২৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/২৮০
২৫. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬৩
২৬. আল-'ইকদ আল ফারীদ-১/৪০; ২/৮৫
২৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৫০
২৮. সিফাতুস সাফওয়া-২/৫০; তাবাকাত-৫/১৯৫; আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৪৩৭; ৫/২৮৭
২৯. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৫০
৩০. সিফাতুস সাফওয়া-২/৫১
৩১. আল-'ইকদ আল ফারীদ-২/৩৭৩; ৬/২২৬; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা'-৪/৪৫৯
৩২. আল-'ইকদ আল ফারীদ-৬/২০১
৩৩. তাবাকাত-৫/১৯৬, ১৯৭; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬৪
৩৪. সিফাতুস সাফওয়া-২/৫১; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৮৯
৩৫. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৪৯
৩৬. সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬৩; তাবাকাত-৫/২০০; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৪৯
৩৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৮৯
৩৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৪৭; তাবাকাত-৫/১৯৮; সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা-৪/৪৬৫
৩৯. তাবাকাত-৫/১৯৫
৪০. আল 'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৪৬-৪৪৭
৪১. প্রাগুক্ত-৫/৩৫
৪২. প্রাগুক্ত-৬/১২৮; তারীখ ইবন 'আসাকির-৭/১৪
📄 তাউস ইবন কায়সান (রহ)
আবূ 'আবদির রহমান তাউস ইবন কায়সান ছিলেন বুহায়র ইবন রীসান-এর দাস। কোন কোন বর্ণনা মতে তাঁর আসল নাম যাকওয়ান, আর তাউস তাঁর উপাধি। তাঁর পিতা কায়সান ছিলেন অনারব বংশোদ্ভূত। তিনি আলে হামদান-এর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে ইয়ামনের 'জানাদ' শহরে বসতি স্থাপন করেন। তাউস ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ।
'আল্লামা নাবাবী লিখেছেন, তাউস ছিলেন জ্ঞানী, মর্যাদাবান ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত মানুষ। তাঁর মহাত্ম্য, মর্যাদা, পাণ্ডিত্য, যোগ্যতা ও স্মৃতি শক্তির ব্যাপারে সবাই একমত।১ ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন:
তিনি ছিলেন একজন ইমাম এবং 'ইলম ও 'আমলের দিক দিয়ে ছিলেন খ্যাতিমান 'আলিমদের একজন।২
তিনি হাদীছের একজন বড় হাফেজ ছিলেন। তাঁর স্মৃতিতে ধারণকৃত হাদীছ 'আলীমদের নিকট স্বীকৃত ছিল। তিনি পঞ্চাশ জন সাহাবীর দর্শন লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। তাঁদের মধ্যে 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, যায়দ ইবন আরকাম, যায়দ ইবন ছাবিত, আবূ হুরায়রা, 'আয়িশা সিদ্দীকা, সুরাকা ইবন মালিক, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা, জাবির (রা) প্রমুখ সাহাবীর জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে জ্ঞানের তৃষ্ণা নিবারণ করেন। হাবরুল উম্মাহ্ 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ থেকে বিশেষভাবে জ্ঞান অর্জন করেন। ফিকাহ শাস্ত্রে প্রচণ্ড দখল ছিল। ইবন খাল্লিকান লিখেছেন:
كان فقيها جليل القدر رفيع الذكر.
'তিনি ছিলেন সুমহান মর্যাদার ও সুউচ্চ খ্যাতির অধিকারী একজন ফকীহ্।'
তাঁর শিষ্য-শাগরিদের গণ্ডি অনেক প্রশস্ত। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বিখ্যাত ছাত্রের নাম: ছেলে 'আবদুল্লাহ, ওয়াহাব ইবন মায়সারাহ্, হাবীব ইবন আবী ছাবিত, সাম ইবন 'উতায়বা, হাসান ইবন মুসলিম, সুলায়মান ইবন মুসা, 'আবদুল করীম জাযারী, আবদুল মালিক ইবন মায়সারা, 'আমর ইবন শু'আয়ব, 'আমর ইবন দীনার, 'আমর ইবন মুসলিম, কায়স ইবন সা'দ, মুজাহিদ, লায়ছ, আবূ সুলায়ম, হিশাম ও আরো অনেকে।
জ্ঞান-গরিমার দিক দিয়ে তিনি তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে পরিগণিত হতেন। ইবন 'উয়ায়না বর্ণনা করেছেন। আমি 'আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা যাঁদের সাথে ইবন 'আব্বাসের (রা) নিকট যেতেন তাঁরা কারা? বললেন: 'আতা ও তাঁর দলের সাথে। আমি বললাম: আর তাউস? বললেন তিনি যেতেন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে।৭
তাঁর সমকালীন সকল 'আলিম তাঁর গভীর জ্ঞানের স্বীকৃতি দিতেন। 'আমর ইবন দীনার বলতেন, আমি তাউসের সমকক্ষ কোন ব্যক্তিকে দেখিনি। অনেকে বলতেন, তাউস হলেন ইয়ামনের ইবন সীরীন। সা'ঈদ ইবন আবী সীরীন বর্ণনা করেছেন কায়স ইবন সা'দ বলতেন, তাউস হলেন আমাদের এখানের ইবন সীরীন। কোন কোন 'আলিম তাঁকে হযরত সা'ঈদ ইবন জুবায়রের (রা) সমকক্ষ বলে মনে করতেন। 'উছমান দারিমী বর্ণনা করেছেন, আমি ইবন মু'ঈনকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তাউসকে বেশী পছন্দ করেন, না সা'ঈদ ইবন জুবায়রকে? কিন্তু তিনি কাউকে প্রাধান্য দেননি।১০
হযরত তাউস যে পরিমাণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ঠিক সেই পরিমাণ 'আমলও তাঁর মধ্যে ছিল। ইবন হিব্বান বর্ণনা করেছেন, তিনি ইয়ামনের বিখ্যাত 'আবিদ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন।১১ অতিরিক্ত ইবাদাতের কারণে কপালে সিজদার দাগ পড়ে গিয়েছিল। মৃত্যু শয্যায়ও দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতেন। ১২ চল্লিশ বার হজ্জ আদায় করেন। ১৩ কা'বা তাওয়াফের সময় নীরব থাকতেন। কারো কোন কথার জবাব দিতেন না। বলতেনঃ তাওয়াফ হচ্ছে নামায। ১৪
তিনি তাঁর সাধ্যমত আল্লাহর রাস্তায় অর্থ-সম্পদ ব্যয় করতেন। একবার একজন শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তির জরিমানার অর্থ পরিশোধ করে তাঁকে কয়েদখানা থেকে মুক্ত করেন।
দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব ও তার চাওয়া-পাওয়ার বাসনা থেকে একেবারেই মুখপেক্ষীহীন ছিলেন। কখনো দুনিয়ার সুখ-সম্পদ প্রাপ্তির কামনা করেননি। সব সময় এই দু'আ করতেন: 'হে আল্লাহ! আমাকে তুমি অর্থ-বিত্ত ও সন্তান-সন্ততি থেকে বঞ্চিত রাখ এবং তার পরিবর্তে ঈমান ও 'আমলের ঐশ্বর্য দান কর।" শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তি এবং বিত্তশালীদেরকে তিনি সব সময় এড়িয়ে চলতেন। তাদেরকে কখনো ভালো মনে করতেন না। ইবন 'উয়ায়না বর্ণনা করেছেন। তিন ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা সরকার ও সরকারী কর্মকর্তাদের এড়িয়ে চলতেন। সাহাবী আবূ যার আল-গিফারী তাঁর যুগে এবং তাউস ও ছাওরী তাঁদের নিজ নিজ সময়ে।১৬ তিনি বলতেন, বিত্তশালী অভিজাত শ্রেণী থেকে বেশী মন্দ আর কাউকে দেখিনি।১৭
তাউস ইবন কায়সানের জন্মভূমি ইয়ামনের ওয়ালী ছিলেন সে সময় স্বৈরাচারী হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের ভাই মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ। হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ হিজাযে হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে (রা) হত্যার মাধ্যমে তাঁর আন্দোলনকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি সুসংহত করে ইয়ামনে তাঁর ভাইকে ওয়ালীর দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। ভাই হাজ্জাজের বহু দোষ মুহাম্মাদের মধ্যেও ছিল। কিন্তু তাঁর মধ্যে ভালো গুণও কিছু ছিল। একবার শীতকালের এক সকালে তাউস ইবন কায়সান গেলেন মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফের নিকট। সংগে ছিলেন ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ্। তাঁরা সবাই নিজ নিজ আসনে স্থির হয়ে বসার পর মুহাম্মাদকে লক্ষ্য করে তাউস ওয়া'আজ-নসীহত করতে শুরু করলেন। বহু মানুষ তাঁদের সামনে বসা ছিল। তখন বেশ ঠাণ্ডাও ছিল। মুহাম্মাদ তাঁর চাকরকে ডেকে বললেন: ওহে তুমি একটি 'তায়লাসান' নিয়ে এসে এই তাউসের দু'কাঁধের উপর বিছিয়ে দাও। চাকরটি একটি অতি সুন্দর 'তায়লাসান' নিয়ে এসে তাউসের দু'কাঁধের উপর বিছিয়ে দেয়। তাউস ওয়া'আজ করা অবস্থায় কাঁধটি একটু দুলিয়ে আস্তে করে তায়লাসানটি ফেলে দেন। ওয়াহাব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু প্রত্যক্ষ করলেন। মুহাম্মাদ খুবই অপমান বোধ করলেন। রাগে-ক্ষোভে তাঁর চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। তারপর তাউস ও তাঁর সঙ্গী-ওয়াহাব যখন মজলিস থেকে উঠে চলা শুরু করলেন তখন ওয়াহাব তাউসকে বললেন: আপনার তায়লাসানের প্রয়োজন না থাকলেও মানুষকে মুহাম্মাদের ক্রোধ থেকে বাঁচানোর জন্য তখন সেটি নিয়ে নেওয়া উচিৎ ছিল। আর খুব বেশী হলে আপনি সেটি বিক্রি করে তার মূল্য গরিব- মিসকীনদের মধ্যে বিলি করে দিতে পারতেন। তাউস বললেন: হাঁ, আপনি যা বলেছেন, তা ঠিক। তবে আমার যদি এমন আশঙ্কা না থাকতো যে, আমার পরে 'আলিমরা বলবে- আমরাও গ্রহণ করবো যেমন তাউস গ্রহণ করেছেন। তারপর তারা যা কিছু গ্রহণ করবে তা আপনার কথা মত দান করবে না। অর্থাৎ তারা আমার কাজকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করে আমীর-উমারাদের নিকট থেকে হাদীয়া-তোহফা গ্রহণ করবে। ২০
মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ এ অপমান ভুললেন না। তিনি তাউসকে উচিত শিক্ষা দিতে চাইলেন। তিনি একটি সূক্ষ্ম চাল চাললেন। সাতশো স্বর্ণমুদ্রা একটি থলেতে ভরলেন। তারপর তাঁর অতি বিশ্বস্ত ও কাছের একজন চালাক-চতুর লোককে বললেন: তুমি এই থলেটি তাউসের নিকট নিয়ে যাবে এবং বিভিন্ন বাহানায় তাঁকে এটি গ্রহণ করতে রাজী করাবে। যদি তা পার তাহলে তুমি হবে আমার অতি কাছের লোক এবং তোমার বেতন-ভাতা আমি বাড়িয়ে দিব। থলেটি হাতে নিয়ে লোকটি বের হলো। সান'আ'র নিকটবর্তী 'আল-জানাদ' নামক যে পল্লীতে তাউস থাকতেন, লোকটি সেখানে উপস্থিত হলো।
সালাম, কুশল বিনিময় ও আলাপচারিতার মাধ্যমে লোকটি তাউসের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেললো। এক পর্যায়ে সে বললো: জনাব, এই থলের এই জিনিসগুলো আমীর আপনার খরচের জন্য পাঠিয়েছেন। তাউস বললেন: এগুলো আমার প্রয়োজন নেই। লোকটি নানা কৌশলে তাঁকে রাজী করাতে চাইলো। বহু যুক্তি-তর্ক দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। লোকটি একটি সুযোগ খুঁজছিল। এক সময় সে তাউসের অমনোযোগিতার সুযোগে জানালার ফাঁক দিয়ে থলেটি ঘরের মধ্যে ছুড়ে মারে। তারপর সে ফিরে গিয়ে আমীরকে বলে: তাউস থলেটি গ্রহণ করেছেন। মুহাম্মাদ তো মনে মনে দারুণ খুশী হলেন। কিন্তু তখন চুপ থাকলেন। কয়েক দিন কেটে গেল। তারপর একদিন তাঁর পারিষদবর্গের মধ্য থেকে দু'ব্যক্তিকে তাউসের নিকট পাঠালেন। তাদের সাথে গেল আগের সেই লোকটি, যে থলে নিয়ে গিয়েছিল। মুহাম্মাদ তাদেরকে নির্দেশ দিলেন: তোমরা তাঁকে একথা বলবে- আমীরের দূতটি সে দিন ভুল করে থলেটি আপনাকে দিয়ে গেছে। আসলে সেটি আরেকজনকে দেওয়ার জন্য পাঠিয়ে ছিলেন। আমরা সেটি ফেরত নিয়ে প্রকৃত মালিককে দেওয়ার জন্য এসেছি।
তাউস বললেন: ফেরত দিব কি? আমি তো আমীরের কোন অর্থই গ্রহণ করিনি। ঐ দু'ব্যক্তি জোর দিয়ে বললো না, আপনি গ্রহণ করেছেন। তাউস তখন থলেটি যে নিয়ে এসেছিল তার দিকে ফিরে বললেন: আমি কি আপনার কাছ থেকে কোন কিছু গ্রহণ করেছিলাম? লোকটি ভয়ে কেঁপে উঠলো। বললো: না। আমি আপনার অমনোযোগিতার সুযোগে থলেটি জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরের মধ্যে ছুড়ে মেরেছিলাম। তাউস বললেন: এই সেই জানালা। আপনারা সেখানে দেখতে পারেন। লোক দু'টি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে থলেটি যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে। শুধু মাকড়সা তার উপর একটি জাল বুনেছে। তারা থলেটি নিয়ে আমীর মুহাম্মাদের কাছে ফিরে গেল।
আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফের এই ধৃষ্টতার বদলা নেন অন্যভাবে। আর তা তাউসসহ বহু মানুষের সামনে। সেটা কিভাবে ঘটেছিল তা তাউসের জবানীতেই শোনা যাক:
তাউস বলেন, আমি যখন মক্কায় হজ্জের উদ্দেশ্যে কা'বার তাওয়াফ করছিলাম তখন হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ লোক মারফত আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর ঘরে প্রবেশ করতেই তিনি আমাকে 'মারহাবান, আহলান ওয়া সাহলান' বলে স্বাগতম জানিয়ে তাঁর কাছেই বসালেন। নিজ হাতে বালিশ এগিয়ে দিয়ে ঠেস দিয়ে আরাম করে বসার জন্য বললেন। তারপর হজ্জের বিভিন্ন মাসয়ালা যা তাঁর জানা ছিল না, সে সম্পর্কে আমাকে প্রশ্ন করতে লাগলেন। আমরা যখন এই আলোচনার মধ্যে আছি, তখন কা'বা তাওয়াফরত এক ব্যক্তির 'তালবিয়া' পাঠের ধ্বনি হাজ্জাজের কানে গেল। লোকটি একটু উঁচুস্বরে তালবিয়া উচ্চারণ করছিল। সেই ধ্বনিতে ছিল অন্তরকে ধাক্কা দেয় এমন একটি সুরের ঝঙ্কার। হাজ্জাজ লোকটিকে ডেকে আনার জন্য বললেন। লোকটি আসার পরে তাঁদের মধ্যে নিম্নরূপ কথাবার্তা হয়:
হাজ্জাজ: আপনি কোন গোত্রের লোক?
লোকটি: মুসলমানদের একজন।
হাজ্জাজ: আমি এটা জানতে চাইনি। তোমার মাতৃভূমি কোনটি তা জানতে চেয়েছি।
লোকটি: ইয়ামানের অধিবাসী।
হাজ্জাজ: তোমাদের আমীরকে (মুহাম্মাদ) কেমন দেখে এসেছো?
লোকটি: আমি দেখে এসেছি, তিনি একজন বিশাল দেহের অধিকারী, সুন্দর পোশাক পরিধানকারী, দক্ষ অশ্বারোহী এবং অসংখ্য মানুষকে স্বাগতম জানাচ্ছেন ও বিদায় দিচ্ছেন।
হাজ্জাজ: আমি তোমার কাছে এসব জানতে চাইনি।
লোকটি: তাহলে আপনি কী জানতে চেয়েছেন?
হাজ্জাজ: আমি জানতে চেয়েছি, তোমাদের মধ্যে তার জীবনধারা কেমন?
লোকটি আমি তাঁকে ছেড়ে এসেছি একজন ভীষণ অত্যাচারী, সৃষ্টির বাধ্য ও স্রষ্টার অবাধ্য মানুষ হিসেবে।
একথা শুনে পারিষদবর্গের সামনে লজ্জায় হাজ্জাজের মুখমণ্ডল লাল হয়ে গেল। তিনি লোকটিকে বললেন: তুমি যা কিছু বললে তা বলতে কে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে? আমার কাছে তার স্থান কোন পর্যায়ের তা কি তুমি জান না? লোকটি বললো: আপনার কাছে তাঁর যে স্থান, তার চেয়ে অধিক সম্মানীয় আল্লাহর কাছে আমার যে স্থান, তাকি আপনি দেখছেন না? আমি এসেছি আল্লাহর ঘরের আঙ্গিনায়, তাঁর নবীকে স্বীকার করি এবং তাঁর দীনের দাবীসমূহ পূরণ করি।
তারপর হাজ্জাজ চুপ হয়ে যান। কোন জবাব দানের আর চেষ্টা করলেন না। তাউস বলেন: তারপর লোকটি দেরী না করে যাবার জন্য উঠে পড়লো এবং কোন রকম অনুমতি নেওয়া-দেওয়ার পরোয়া না করে দ্রুত চলে গেল। আমিও তার পিছনে পিছনে চললাম এবং মনে মনে বললাম 'লোকটি নেককার, তাকে অনুসরণ কর। তাকে ধর।' আমি তাকে অনুসরণ করলাম। তাকে এ অবস্থায় পেলাম যে, সে কা'বার চত্বরে এসে কা'বার গিলাফ ধরে মুখটা কা'বার দেওয়ালে ঠেকিয়ে বলছে:
"হে আল্লাহ! আমি তোমার উপর অটল আছি এবং তোমার বাহুতলে আশ্রয় চাচ্ছি। হে আল্লাহ! তুমি তোমার দান-অনুগ্রহের উপর আমার নির্ভরতা দাও, তোমার তত্ত্বাবধানের প্রতি আমার সন্তুষ্টি দাও, নিকৃষ্ট ধরনের কৃপণদের কৃপণতা থেকে আমাকে মুক্তি দাও এবং নিজেকে প্রাধান্য দানকারীদের কর্তৃত্বে যা কিছু তা থেকে মুখাপেক্ষীহীন কর। হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটবর্তী প্রশস্ততা, তোমার অনাদি কাল ব্যাপী শুভ ও কল্যাণ এবং তোমার সুন্দরতম অভ্যাস কামনা করি। ইয়া রাব্বাল 'আলামীন!"
তারপর মানুষের একটি প্রবল ভীড়ের ধাক্কা তাকে সরিয়ে আমার দৃষ্টির আড়ালে নিয়ে গেল। আমি ধরে নিলাম, আমি আর তার সাক্ষাৎ পাব না। কিন্তু 'আরাফা'র দিনের সন্ধ্যায় মানুষ যখন মুযদালাফার দিকে যাচ্ছে তখন আবার তার দেখা পেলাম। আমি তার কাছে এগিয়ে গিয়ে শুনলাম, সে বলছে:
“হে আল্লাহ! যদি তুমি আমার হজ্জ, আমার কষ্ট-ক্লান্তি, আমার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কবুল না কর, তাহলে আমার এসব কিছু কবুল না করার বিনিময়ে আমার উপর অপতিত বিপদ- মুসীবতের প্রতিদান থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না।"
তারপর সে মানুষের ভীড়ের মধ্যে পড়ে যায় এবং অন্ধকারে আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আমি যখন তাকে ফিরে পাওয়ার আশা ত্যাগ করলাম তখন আল্লাহর কাছে এই বলে দু'আ করলাম হে আল্লাহ! তুমি তার ও আমার দু'আ কবুল কর, তার ও আমার আশা পূরণ কর এবং আমার ও তার পা সুদৃঢ় রাখ, সেই দিন, যে দিন সকল পা পিছলে যাবে। আর হাওজে কাওছারের পাশে তাকে ও আমাকে একত্র করো। ইয়া আকরামাল আকরামীন। ২২
একবার মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ কিছু দিনের জন্য তাউসকে তাহসীলদার হিসেবে নিয়োগ করেন। এই দায়িত্বের সাথে তাঁর মত ব্যক্তির কী-ই বা সম্পর্ক হতে পারে? এ দায়িত্ব তিনি যে ভাবে পালন করতেন তার একটি বর্ণনা তিনি নিজে দিয়েছেন। ইবরাহীম ইবন আয়সারা তাঁকে প্রশ্ন করলো তাহসীলদারের দায়িত্ব পালনকালে আপনি কি করতেন? বললেন: খাজনা-ট্যাক্স যাদের বকেয়া পড়েছিল, তাদেরকে বলতাম আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করুন! তিনি তোমাদেরকে যা কিছু দান করেছেন তা থেকে শরী'আতের হক আদায় করে তা পাক-সাফ করে ফেল। একথা বলার পর যদি তারা বকেয়া খাজনা দিয়ে দিত তাহলে তা নিয়ে নিতাম। অন্যথায় তাদেরকে আর ডাকতামও না। ২০
একবার খলীফা সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিক হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। একটা গভীর আবেগভরা অন্তর নিয়ে কা'বার আঙ্গিনায় বসে আছেন। হঠাৎ তাঁর দেহরক্ষীর দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন আমাদেরকে দীনের তত্ত্বজ্ঞান দিতে পারেন এবং মহান আল্লাহর এই মহান দিনে আমাদেরকে কিছু উপদেশ বাণী শোনাতে পারেন এমন একজন 'আলিমের খোঁজ কর।
রক্ষীটি হজ্জ উপলক্ষে আগত মানুষের ভীড়ের দিকে চলে গেল এবং তাদেরকে আমীরুল মু'মিনীনের উদ্দেশ্যের কথা বললো। তাকে এক ব্যক্তির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হলো: এই যে, ইনি হলেন তাউস ইবন কায়সান। তিনি এ যুগের ফকীহদের নেতা এবং আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সত্যভাষী। আপনি তাঁর কাছেই যান।
রক্ষীটি এক পা দু'পা করে তাউসের কাছে গেলেন। তাঁকে বললেন: ওহে শায়খ, আপনি আমীরুল মু'মিনীনের ডাকে একটু সাড়া দিন। তাউস কোন রকম ইতস্তত: ভাব না করে রাজী হলেন। কারণ, তিনি বুঝতেন, আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীদের দা'ওয়াত দানের কোন সুযোগই হাতছাড়া করা উচিত নয়। সব সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করা উচিত। তিনি আরো বিশ্বাস করতেন, শাসন কর্তৃত্বের ব্যক্তিদের ত্যাড়ামি ও বক্রতা সোজা করা, তাদেরকে জুলুম-অত্যাচার থেকে বিরত রাখা এবং তাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করার উদ্দেশ্যে যে কথা বলা হয়, তাই হচ্ছে সবচেয়ে ভালো কথা।
তাউস রক্ষীর সংগে চললেন। আমীরুল মু'মিনীনের নিকট उपस्थित হয়ে তাঁকে সালাম দিলেন ও কুশল জিজ্ঞেস করলেন। খলীফা সুন্দরভাবে জবাব দিয়ে সম্মানের সাথে তাঁকে কাছে বসালেন। তারপর হজ্জের নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান সম্পর্কে যা জানার প্রয়োজন মনে করলেন তা জিজ্ঞেস করলেন এবং অত্যন্ত ভক্তি, শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে কান লাগিয়ে সব কথা শুনলেন।
তাউস বলেন: আমি যখন বুঝতে পারলাম, আমীরুল মু'মিনীনের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে এবং তাঁর আর প্রশ্ন করার কিছু নেই তখন আমি মনে মনে বললাম: ওহে তাউস! এ এমন একটা মজলিস, যে মজলিস সম্পর্কে আল্লাহ তোমাকে জিজ্ঞেস করবেন। তারপর আমি আমীরুল মু'মিনীনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললাম: হে আমীরুল মু'মিনীন! জাহান্নামের অভ্যন্তরে একটি কূপের উপর থেকে একটি পাথর ফেলে দিলে সত্তর বছর গড়ানোর পর তার তলায় গিয়ে পৌঁছবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি কি জানেন আল্লাহ তা'আলা জাহান্নামের কূপ কাদের জন্য তৈরী করেছেন? তিনি কোন রকম ভাবা-চিন্তা ছাড়াই বলে উঠলেন: না, আমার জানা নেই। আল্লাহ আপনার অকল্যাণ করুন! কাদের জন্য তৈরী করেছেন বলুন।
আমি তখন বললাম: কূপটি আল্লাহ তাদের জন্য তৈরী করেছেন যাদেরকে তিনি মানুষের উপর কর্তৃত্ব দান করেছেন, অতঃপর তারা জুলুম-অত্যাচার করেছে।
আমার এ কথা শোনার সাথে সাথে সুলায়মানের উপর যেন বজ্রপাত হলো। আমার মনে হলো তাঁর পাঁজর ভেদ করে প্রাণটি যেন বেরিয়ে যাবে। তিনি কাঁদতে আরম্ভ করলেন। সেই নিঃশব্দ কান্নায় তাঁর অন্তরের তন্ত্রীগুলো ছিন্ন হয়ে মৃত্যু বরণ করবেন বলে আমার মনে হলো। এ অবস্থায় আমি তাঁকে রেখে চলে আসি। আমি যখন আসি তিনি তখন বার বার বলছিলেন: আল্লাহ আপনার ভালো প্রতিদান দিন। ২৪
'উমার ইবন 'আবদিল আযীয খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে একবার তাউসকে বলেনঃ আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা আমীরুল মু'মিনীন সুলায়মান ইবন 'আবদিল মালিককে বলুন। তিনি সোজা বলে দিলেন, আমার কোন প্রয়োজন নেই। ২৫
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। একদিন লোক মারফত তাউসকে বলে পাঠালেন: ওহে আবূ আবদির রহমান! আমাকে কিছু উপদেশ দিন।
তাউস এক লাইনের একটি চিঠি লিখলেন। লাইনটি হলো এই: إِذَا أَرَدْتَ أَنْ يَكُوْنَ عَمَلُكَ خَيْرًا كُلُّهُ، فَاسْتَعْمِلْ أَهْلَ الْخَيْرِ، وَالسَّلَامُ. যদি আপনি চান আপনার সব কাজ ভালো হোক, তাহলে ভালো লোকদেরকে নিয়োগ করুন। ওয়াস-সালাম!
চিঠিটি পড়ে 'উমার মন্তব্য করেন: উপদেশের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। কথাটি দু'বার উচ্চারণ করেন। ২৬
হযরত তাউস (রহ) একশো অথবা তার চেয়ে কিছু বেশী বছর জীবন লাভ করেছিলেন। তবে তার বার্ধক্য তাঁর মেধার স্বচ্ছতা, চিন্তার সূক্ষ্মতা ও তাৎক্ষণিক জবাব দানের ক্ষমতার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারেনি। 'আবদুল্লাহ আশ-শামী নামক এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। আমি তাউসের নিকট থেকে কিছু শেখার জন্য তাঁর গৃহে গেলাম। আমি তাঁকে চিনতাম না। দরজায় টোকা দিতে একজন অতি বৃদ্ধ ব্যক্তি বেরিয়ে এলেন। আমি তাঁকে সালাম দিয়ে বললাম আপনিই কি তাউস ইবন কায়সান? বললেন: না, আমি তাঁর ছেলে। বললাম আপনি যদি তাঁর ছেলে হন, তাহলে নিশ্চয় আপনার পিতা বার্ধক্যের ভারে একেবারে বোধসোধ হারিয়ে ফেলেছেন। আমি তাঁর জ্ঞান থেকে কিছু অর্জনের উদ্দেশ্যে বহু দূর থেকে এসেছি। বললেন: আল্লাহ আপনার অকল্যাণ করুন! আল্লাহর কিতাবের বাহকেরা কখনো বোধসোধ হারায় না। ভিতরে আসুন।
আমি ঘরে ঢুকে তাউসকে সালাম করলাম। তারপর বললাম আপনার জ্ঞানভাণ্ডার থেকে কিছু অর্জন এবং আপনার কিছু উপদেশ বাণী শোনার উদ্দেশ্যে আমি এসেছি। বললেন: প্রশ্ন করুন। তবে সংক্ষেপ করবেন। বললাম: আমার সাধ্য অনুযায়ী সংক্ষেপ করবো- ইনশাআল্লাহ। তিনি বললেন: আপনি কি তাওরাত, যাবুর, ইনজীল ও আল কুরআনের সার কথা শুনতে চান? বললাম: হাঁ, তা বলুন।
বললেন: আল্লাহকে এমনভাবে ভয় করুন যে তার চেয়ে ভীতিপ্রদ অন্য কিছু আপনার কাছে থাকবে না। আর তাঁর প্রতি এমন আশাবাদী থাকবেন যে, তাঁকে আপনার ভয়ের চেয়েও সে আশা প্রবল হবে। মানুষের জন্য তাই পছন্দ করুন যা নিজের জন্য পছন্দ করেন।
হযরত তাউস আল্লাহর কালামের দ্বারা কোন রকম আর্থিক সুবিধা লাভ করাকে ভীষণ খারাপ এবং কুরআনের সম্মান পরিপন্থী কাজ বলে মনে করতেন।
একবার কিছু লোকের কুরআন মজীদের হাদীয়া গ্রহণ করতে শুনে তিনি 'ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করেন।
তিনি যুবকদের নিত্য-নতুন চাল-চলন ও রং-ঢং মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার কা'বার তাওয়াফের সময় কিছু কুরাইশ যুবকের স্বাচ্ছন্দময় নতুন স্টাইলের পোশাক দেখে তাদেরকে ভীষণ তিরস্কার করেন। তাদেরকে বলেন: তোমরা এমন পোশাক পরেছো যা তোমাদের বাপ-দাদারা কখনো পরেননি। আর এমন ভঙ্গিতে চলছো যে নর্তকীরাও তেমন চলতে পারে না।
তিনি 'ঈদের দিনে নির্মল আনন্দ-উল্লাস করা প্রয়োজন মনে করতেন। এ দিন বাড়ীর সব মহিলা, এমন কি দাসী-বাঁদীদের হাতে-পায়ে মেহেদী লাগানোর তাকিদ দিতেন। বলতেন : আজ 'ঈদের দিন। তোমরা এটা কর।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি প্রায় প্রতি বছর হজ্জ আদায় করতেন। শেষ বয়সেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ আবেগ-আগ্রহকে অতি সুন্দরভাবে কবুল করেছেন। হিজরী ১০৬ সনের জিলহাজ্জ মাসের দশ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি তাঁর জীবনের ৪০তম হজ্জ আদায়কালে 'আরাফাত থেকে মুযদালিফায় রওয়ানা হন। মুযদালিফায় পৌঁছে মাগরিব ও 'ঈশার নামায আদায়ের পর একটু বিশ্রামের জন্য মাটিতে একটু পাশ দেন। এ অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এভাবে চিরদিনের জন্য তিনি পবিত্র ভূমিতে থেকে যান। সূর্যোদয়ের পর দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হলো; কিন্তু মানুষের অসম্ভব ভীড়ের কারণে মরদেহ সরানো সম্ভব হলো না। অবশেষে মক্কার আমীর ইবরাহীম ইবন হিশাম আল-মাখযূমী কাফন-দাফনের ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে পুলিশ পাঠান। জানাযায় অসংখ্য মানুষের সমাগম হয়। ভীড়ের চোটে মানুষের কাপড়-চোপড় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। অনেকের হাত-পা ভেঙ্গে যায়। জানাযায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তৎকালীন খলীফাতুল মুসলিমীন হিশাম ইবন 'আবদিল মালিকও ছিলেন। ৩৭
প্রখ্যাত তাবি'ঈ 'আতা' হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: আমি মনে করি তাউস জান্নাতের অধিকারীদের একজন। ৩৮
তাউস বলতেন: সত্যনিষ্ঠ কথা সাদাকা বা দানস্বরূপ। ৩৯ তিনি আরো বলতেন: চটকানো আটার জন্য যতটুকু লবণের প্রয়োজন হয়, দুনিয়ায় ততটুকুই যথেষ্ট। ৪০
'আবদুল্লাহ বলতেন: আমার পিতা বাহনের পিঠে আরোহণ করার সময় পাঠ করতেন:৪১ اللهم لك الحمد ، هذا من فضلك، ونعمتك علينا فلك الحمد ربنا سبحان الذي سخر لنا هذا وما كنا له مقرنين.
হে আল্লাহ! সকল প্রশংসা আপনার। এটা আমাদের প্রতি আপনার অনুগ্রহ ও দান। সুতরাং হে আমাদের প্রভু! সকল প্রশংসা আপনার। 'তিনি কতনা পবিত্র, যিনি এই বাহনকে আমাদের বশীভূত করে দিয়েছেন এবং আমরা একে বশীভূত করতে সক্ষম ছিলাম না।'
তিনি বজ্রপাতের শব্দ শুনে বলতেন: ৪২ سُبْحَانَ مَنْ سَبِّحْتَ لَهُ তিনি কত না পবিত্র যাঁর তাসবীহ তুমি পাঠ করছো।
'আবদুল্লাহ বলেন, তিনি আরো বলতেন: একজন মানুষের অধিকারে যেসব ধন-সম্পদ থাকে তা ব্যয় করার ক্ষেত্রে কৃপণতা করাকে বলে- الْبُخْلُ। আর কোন মানুষ যদি অন্যের ধন-সম্পদ অবৈধ পথে তার অধিকারে চলে আসার কামনা করে তাহলে তাকে বলে- الشح ৪৩
হযরত রাসূলে কারীম (সা) প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ নামাযের সময় যে দু'আটি পাঠ করতেন তাউস সেটি হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাসের (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। দু'আটি এই: اللهم لك الحمد أنت الحق ، وقولك الحق ، ووعدك الحق، ولقاؤك الحق، والجنة حق، والنار حق، والساعة حق، ومحمد حق، والنبيون حق.
اللَّهُمَّ لَكَ أَسْلَمْتُ وَبِكَ آمَنْتُ، وَعَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ، وَإِلَيْكَ أَنَبْتُ، وَبِكَ خَاصَمْتُ، وَإِلَيْكَ حَاكَمْتُ ، فَاغْفِرْ لِي مَا قَدَّمْتُ وَتَأَخَّرْتُ، وَأَسْرَرْتُ وَمَا أَعْلَنْتُ، أَنْتَ الْمُقَدِّمُ وَأَنْتَ الْمُؤْخِّرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ ، لَاحَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِكَ. (متفق عليه)
হে আল্লাহ, সকল প্রশংসা আপনার। আপনি সত্য, আপনার বাণী সত্য, আপনার অঙ্গীকার সত্য, আপনার সাক্ষাৎ সত্য, জান্নাত সত্য, জাহান্নাম সত্য, কিয়ামত সত্য, মুহাম্মাদ সত্য এবং সকল নবী সত্য।
হে আল্লাহ, আমি আপনার নিকট আত্মসমর্পণ করেছি, আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনার উপর ভরসা করেছি, আপনার দিকে ফিরে এসেছি, আপনার সাথে বিবাদ করেছি এবং আপনার কাছে বিচার দিয়েছি। সুতরাং আপনি আমার আগে-পিছের গোপন ও প্রকাশ্য সকল পাপ ক্ষমা করে দিন।
আপনি প্রথম, আপনি শেষ, আপনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আপনি ছাড়া কোন কৌশল, আপনি ছাড়া কোন শক্তি নেই। (متفق عليه)
টিকাঃ
১. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২৫১
২. শাযারাতুয যাহাব-১/১৩৩; সিফাতুস সাফওয়া-২/১৬০
৩. তাহযীবুল আসমা'-১/২৫১
৪. তাহযীবুত তাহযীব-৫/৯; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯০
৫. ওয়াফয়াতুল আ'য়ান-১/২৩৩
৬. তাহযীবুত তাহযীব-৫/৯; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯০
৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৩৩
৮. তাহযীবুল আসমা'-১/২৫১
৯. তাবাকাত ইবন সা'দ-৫/৩৯৪
১০. তাহযীবুত তাহযীব-৫/৯
১১. প্রাগুক্ত
১২. তাবাকাত-৫/৩৯৩, ৩৯৫
১৩. তাহযীবুত তাহযীব-৫/৯
১৪. তাবাকাত-৫/৩৯৩
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. তাহযীবুত তাহযীব-৫/১০
১৭. তাবাকাত-৫/৩৯৩
১৮. ওয়াহাব ইবন মুনাবিহ্ পারশ্য বংশোদ্ভূত একজন বিখ্যাত তাবি'ঈ। প্রাচীন আরব ও আহলি কিতাবদের ইতিহাসে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন।
১৯. 'তায়লাসান' একপ্রকার অতি মূল্যবান সবুজ চাদরকে বলা হয়। সাধারণত: অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা ব্যবহার করে থাকে।
২০. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন, ২৮২-২৮৩
২১. প্রাগুক্ত-২৮৩-২৮৫
২২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/৪২৩-৪২৪; প্রাগুক্ত-২৮৫-২৮৮
২৩. তাবাকাত-৫/৩৯৪
২৪. সওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন-২৮৯-২৯১
২৫. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬৮
২৬. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৩৩
২৭. সূরা লাহাব-১; রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা আবু লাহাব মক্কার অংশীবাদীদের অন্যতম নেতা ছিল। সে এবং তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহকে (সা) ভীষণ কষ্ট দিয়েছে।
২৮. সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন-২৯৪
২৯. হিলয়াতুল আওলিয়া' লি আবীন'আয়ম-৪/১৬
৩০. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬৭
৩১. হিলয়াতুল আওলিয়া-৪/১৩; সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন-২৯৬
৩২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৩৩
৩৩. হিলয়াতুল আওলিয়া-৪/১১; সুওয়ারুন মিন হায়াতিত তাবি'ঈন-২৯৮
৩৪. তাবাকাত-৫/৩৯৫
৩৫. প্রাগুক্ত
৩৬. প্রাগুক্ত-৫/৩৯৩
৩৭. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৩৩৩; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৯০
৩৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১০
৩৯. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৫৮
৪০. প্রাগুক্ত-৩/২৮৯
৪১. হিলয়াতুল আওলিয়া-৪/৫
৪২. 'আসরুত তাবি'ঈন-৩৬৬
৪৩. হিলয়াতুল আওলিয়া-৪/৬