📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 হাসান আল-বসরী (রহ)

📄 হাসান আল-বসরী (রহ)


হযরত হাসান (রহ)-এর ডাক নাম আবূ সা'ঈদ। পিতার নাম ইয়াসার। জ্ঞানগত পূর্ণতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী তাবি'ঈদের পুরোধা এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের দিক দিয়ে ছিলেন ওলীকুল শিরোমণি।
হযরত হাসান আল-বসরীর পিতা ইয়াসার ছিলেন দাস। তাঁর দাসত্বের ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনা এ রকম যে, তাঁর পিতা ছিলেন দক্ষিণ ইরাকের মায়সানের বন্দীদের একজন। আনাস ইবন মালিকের ফুফু রুবায়' বিন্ত নাদার তাঁকে খরীদ করে মুক্তি দেন। দ্বিতীয় বর্ণনাটি এ রকম, তাঁর পিতা-মাতা উভয়ে ছিলেন বানু নাজ্জার তথা এক আনসারীর দাস-দাসী। তিনি তাঁদেরকে তাঁর স্ত্রীর মাহরের বিনিময়ে বানু সালামাকে দান করেন। আর বানু সালামা তাঁদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। তৃতীয় একটি বর্ণনা এ রকম যে, তাঁর পিতা ছিলেন হযরত যায়িদ ইবন ছাবিতের দাস, আর মাতা খায়রাহ্ ছিলেন উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু সালামার (রা) দাসী। তবে এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, ইয়াসার ও তাঁর স্ত্রী উভয়ে ছিলেন দাস-দাসী।১ আর এই তৃতীয় বর্ণনাটি সর্বাধিক সঠিক ও গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়।
হযরত হাসান আল-বসরী হিজরী ২১ খ্রীষ্টাব্দ ৬২৪ সনে হযরত ফারূকে আ'জমের (রা) খিলাফতকালের দুই বছর বাকী থাকতে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন।২ উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু সালামার (রা) সাথে তাঁর মায়ের দাসত্বের সম্পর্ক থাকায় তিনি যে সৌভাগ্য লাভ করেন তা খুব কম ভাগ্যবান ব্যক্তিই লাভ করতে পেরেছেন। সা'ঈদ নামে হযরত হাসানের এক বড় ভাই ছিলেন। তিনি হিঃ ১০০ সনে ইনতিকাল করেন।
উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মু সালামার (রা) নিকট সংবাদবাহক এ সুখবর নিয়ে এলো যে, তাঁর দাসী 'খায়রা' একটি পুত্র সন্তান জন্ম দিয়েছে। উম্মুল মু'মিনীনের (রা) অন্তর খুশীতে ভরে গেল এবং তাঁর গম্ভীর মুখমণ্ডল দীপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। তিনি সাথে সাথে লোক পাঠালেন, সদ্যজাত শিশু ও তার মাকে নিয়ে আসার জন্য, যাতে শিশুর মা সুস্থ হয়ে উঠা পর্যন্ত তাঁর কাছে থাকতে পারে। উল্লেখ্য যে, 'খায়রা' ছিল উম্মুল মু'মিনীনের অতিপ্রিয় দাসী। তিনি তার সন্তান প্রসবের এ খবরটি পাওয়ার জন্য খুবই উদগ্রীব ছিলেন। তাই তার পুত্র সন্তান প্রসবের খবর শুনে মা ও সন্তানকে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই 'খায়রা' তার সদ্যজাত শিশুকে কোলে করে উম্মুল মু'মিনীনের নিকট চলে আসলো। শিশুটির উপর চোখ পড়তেই তার প্রতি উম্মুল মু'মিনীনের অন্তরে গভীর মায়ার সৃষ্টি হয় এবং প্রশান্তিতে অন্তরটি ভরে যায়। শিশুটির ছিল মায়াবী ও সবার দৃষ্টিকাড়া সুন্দর চেহারা। যে দেখতো তারই অন্তরে শিশুটির জন্য মায়া-মমতা সৃষ্টি হয়ে যেত। উম্মুল মু'মিনীন (রা) 'খায়রা'কে জিজ্ঞেস করলেন: বাচ্চার নাম রেখেছো? বললো: আম্মা, এখনো নাম রাখা হয়নি। আপনি রাখবেন তাই আমরা কিছু চিন্তা করিনি। তিনি বললেন: আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণার উপর ভরসা করে আমি এর নাম রাখছি আল-হাসান। তারপর তিনি হাত তুলে শিশুর কল্যাণের জন্য দু'আ করেন।
আল-হাসানের জন্মগ্রহণের এ আনন্দ কেবল উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামার (রা) গৃহেই সীমিত থাকেনি, বরং এ আনন্দে মদীনার আরো একটি গৃহ অংশগ্রহণ করে। সে গৃহটি ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) কাতিবে ওহী (ওহী লেখক) মহান সাহাবী হযরত যায়দ ইবন ছাবিতের (রা)। কারণ, শিশু হাসানের পিতা ইয়াসার ছিলেন হযরত যায়দের সবচেয়ে বেশী সম্মানিত ও প্রিয় ব্যক্তি।
এই শিশু আল-হাসান ইবন ইয়াসার- যিনি পরবর্তীকালে হাসান আল বসরী নামে প্রসিদ্ধ হন, রাসূলুল্লাহর (সা) একটি পরিবারে, তাঁর অন্যতম বেগম হিন্দা বিন্ত সুহায়ল, উরফে উম্মু সালামার (রা) ঘরে লালিত-পালিত হয়ে বেড়ে ওঠেন। উম্মু সালামা (রা) ছিলেন বুদ্ধি, দৃঢ়তা ও মর্যাদার দিক দিয়ে তৎকালীন 'আরবের মধ্যে সর্বাধিক পূর্ণতার অধিকারিণী। রাসূলুল্লাহর (সা) বেগমদের মধ্যে বিদ্যা ও হাদীছ বর্ণনার দিক দিয়ে হযরত 'আয়িশার (রা) পরেই যাঁর স্থান। যাঁর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) তিনশো সাতাশিটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া সেই জাহিলী 'আরব সমাজে যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন মহিলা কিছু লিখতে-পড়তে জানতেন, তিনি তাঁদেরই একজন।
উম্মুল মু'মিনীন উম্মু সালামার (রা) সাথে শিশু হাসানের সম্পর্কের এখানেই শেষ নয়। সম্পর্ক মাতৃত্বের পর্যায়ে চলে যায়। শিশু হাসানের মা উম্মুল মু'মিনীনের এটা-ওটা কাজের জন্য এদিক ওদিক গেলে তিনি যখন কান্না জুড়ে দিতেন তখন উম্মুল মু'মিনীন তাঁকে থামানোর জন্য মায়ের আদরে কোলে নিয়ে নিজের পবিত্র স্তনের বোঁটা তাঁর মুখে পুরে দিতেন। শিশু হাসান উম্মুল মু'মিনীনের বুকের পবিত্র দুধ পান করে পরিতৃপ্ত হতেন এবং কান্না থামিয়ে দিতেন। এভাবে হযরত উম্মু সালামা (রা) দুই দিক দিয়ে হযরত হাসানের মা হন: কুরআন ঘোষিত বিশ্বের সকল ঈমানদার ব্যক্তিদের মা এবং দুধ মা।
হযরত উম্মু সালামার ঘরের শিশু হবার সুবাদে অন্যান্য উন্মুহাতুল মু'মিনীনের (রা) আদর ও স্নেহ লাভে ধন্য হন এবং চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত সবার ঘরে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ লাভ করেন। তারপর তিনি পিতার সাথে বসরায় চলে যান এবং সেখানেই বসতি স্থাপন করেন। এ কারণে তাঁকে আল-বসরী বল হয়।
হযরত হাসানের পিতা-মাতা উভয়ে দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। তারপর এই পরিবারটি 'ওয়াদি আল-কুরা'তে বসবাস করতো। মাঝে মাঝে তারা মদীনায় আসতো। হাসানের মা শুধুমাত্র উম্মু সালামার (রা) সাথেই যোগাযোগ রাখতেন না, বরং তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বেগমদের সকলের কাছেই যেতেন। মায়ের সাথে শিশু হাসানও তাঁদের কাছে আসা-যাওয়া করতেন। সুতরাং দু'জনই তাঁদের আলো এবং নুবুওয়াত ও রিসালাতের আলো থেকে অনেক কিছু অর্জন করেন। মা তাঁর ছেলেকে এ অর্জনে সাহায্যও করেন। ফলে তিনি আরবী ভাষার উপর চমৎকার দক্ষতা অর্জন করেন। মা খায়রা উম্মু সালামার (রা) সূত্রে রাসূলুল্লাহর (সা) অনেক হাদীছ বর্ণনা করতেন। তিনি তাঁর অনেক উপদেশের মধ্যে এসব হাদীছ মানুষকে শোনাতেন। আর এর একটা গভীর প্রভাব পড়ে তাঁর দুই ছেলে হাসান ও সা'ঈদের উপর। হাসান শৈশব থেকেই জামি' মসজিদে যাওয়া-আসা শুরু করেন। আর এর মধ্য দিয়ে কুরআন হিফজ করেন ও লেখা শিখে ফেলেন। তারপর মদীনার অলি-গলিতে রিসালাত ও নুবুওয়াতের যে ফয়েজ ও বরকতের প্লাবন তখন বয়ে চলেছিল তা থেকে অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করতে আরম্ভ করেন।
হযরত 'আলীর (রা) খিলাফতকালে পৌঁছে আমরা দেখতে পাই এ পরিবারটি তার মাতৃভূমিতে ফিরে যাচ্ছে এবং বসরায় বসতি স্থাপন করছে। আমরা আরো দেখতে পাই হাসান, তাঁর সময়ের বিচিত্রমুখী ঘটনাবলীতে অংশগ্রহণ সযত্নে এড়িয়ে চলছেন। বিভিন্ন ঘটনা ও ফিত্না-বিশৃঙ্খলায় কোনভাবে অংশগ্রহণ না করার নীতি ও পন্থাকে তিনি আজীবন আঁকড়ে থাকেন। সূক্ষ্ম ও সঠিক অর্থে তিনি দীনের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেন। আল-কুরআনের পঠন-পাঠন, হাদীছের বর্ণনা এবং ইসলামী বিধি-বিধানের ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণে তিনি তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। আমরা এটাও দেখি যে, হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতের ব্যাপারে হযরত হাসান (রা) সহ উম্মাতের ঐকমত্যের পর খিলাফতের পূর্বাঞ্চলে প্রেরিত বাহিনীর সাথে তিনিও যোগ দিচ্ছেন। খুরাসের কোন কোন ওয়ালীর সেক্রেটারী হিসেবেও কাজ করছেন। সেখানে প্রায় দশ বছর কাটানোর পর বসরায় ফিরে আসেন। হিজরী ১১০ সনে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই বসরাতেই অবস্থান করেন। তারপর তিনি দীনী বিষয়ে পঠন-পাঠনে একনিষ্ঠভাবে মনোযোগী হন। সে সময়ে বসরার এমন কোন জ্ঞানকেন্দ্র ছিল না যেখান থেকে তিনি জ্ঞান অর্জন করেননি। অল্প দিনের মধ্যে তিনি একজন বড় ওয়া'ইজ তথা ধর্মীয় বক্তা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। বসরার যুবক শ্রেণীর মানুষ তাঁর প্রতি এমন আগ্রহী হয়ে ওঠে যে, তার কোন তুলনা খুঁজে পাওয়া যায় না। হাজ্জাজের সময়ে তিনি বসরার সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী ও বক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বয়ান ও বাগ্মিতায় তাঁর মত দ্বিতীয় আর কেউ ছিলেন না।
হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) যে সময় জন্মগ্রহণ করেন তখন সাহাবায়ে কিরামের বিশাল একটি সংখ্যা বিদ্যমান ছিলেন। আর এমন স্থানে তিনি বেড়ে ওঠেন যার প্রতিটি অলি-গলি ছিল মহানবীর (সা) জ্ঞানের ভাণ্ডার। সর্বোপরি তিনি এমন সব মহান ব্যক্তির সুহবত ও সাহচর্য লাভ করেন যাঁরা ছিলেন ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত নমুনা এবং নবীর (সা) আখলাক ও নৈতিকতার বাস্তব রূপ। ফলে তাঁর গোটা জীবন জ্ঞান ও কর্ম, মহত্ত্ব ও পূর্ণতা, তাকওয়া ও খোদাভীরুতার মত যাবতীয় নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীতে পূর্ণ হয়ে যায়। ইবন সা'দ লিখেছেন: ৫
كان الحسن جامعًا، عالما عاليا رفيعا فقيها مأمونا عابدا ناسكا، كبير العلم فصيحا جميلا وسيفاً.
-হাসান বসরী ছিলেন বহু পূর্ণতার সমাবেশ, উঁচু স্তরের 'আলিম, সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি, ভুল-ভ্রান্তি থেকে মুক্ত ফকীহ্, পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি নির্মোহ 'আবিদ, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী, স্পষ্ট ও প্রাঞ্জলভাষী সুদর্শন এক পুরুষ। মোট কথা, বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ যোগ্যতা ও উৎকর্ষের পূর্ণরূপ ছিলেন তিনি। ইমাম আয-যাহাবী লিখেছেন: ৬
حافظ، علامة من بحور العلم، فقيه النفس، كبير الشان، عديم النظير، مليح التذكير، بليغ الموعظة، رأس في أنواع الخير.
- তিনি ছিলেন হাদীছের হাফিজ, জ্ঞানের সাগর, ফকীহ্, বিশাল কর্মকাণ্ডের অধিকারী, অতুলনীয়, চমৎকার উপদেশ দানকারী, বাগ্মী-বক্তা এবং বহু রকম কল্যাণকর কাজের নেতা।
'আল্লামা নাবাবী লিখেছেন: তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত 'আলিম। তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে সবাই একমত।' ইমাম আয-যাহাবী হাদীছ গ্রন্থাবদ্ধকারীদের তৃতীয় স্তর (তাবকা), যাকে তিনি তাবি'ঈদের মধ্যম স্তর বলেছেন, হাসান আল-বসরীকে (রহ) তার প্রধান পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৭
তাঁর সময়ের সকল জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তি তাঁর সুউচ্চ মর্যাদার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। ইমাম শা'বী বলতেন, আমি এই দেশের (ইরাকে) অন্য কাউকে তাঁর চেয়ে ভালো পাইনি। কাতাদা মানুষকে এই বলে উপদেশ দিতেন, তোমরা হাসান বসরীর অনুসরণ করবে। আমি মতামত ও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ তাঁর চেয়ে বেশী আর কাউকে দেখিনে। আ'মাশ বলতেন, হাসান জ্ঞান সংরক্ষণ করতেন এবং তা বলতেন। ইমাম বাকির বলতেন, হাসানের কথা আম্বিয়ায়ে কিরামের (আ) কথার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
গালিব আল-কাত্তান বলতেন, তাঁর যুগের 'আলিমদের উপর হাসানের এ শ্রেষ্ঠত্ব ছিল পাখীদের মধ্যে চড়ুই পাখীর উপর বাজপাখীর শ্রেষ্ঠত্বের মত। কেউ যদি সে যুগের সবচেয়ে বড় 'আলিমকে দেখতে চায় সে যেন হাসানকে দেখে। 'আমর ইবন মুররা বলতেন, হাসান ও মুহাম্মাদ- এই দুই শায়খের কারণে আমার বসরাবাসীদের প্রতি ঈর্ষা হয়। ইউনুস ইবন 'উবায়দুল্লাহ ও হুমায়দ আত-তাবীল বলতেন, আমি বহু ফকীহকে দেখেছি, কিন্তু হাসানের চেয়ে পূর্ণ ব্যক্তিত্বের আর কাউকে পাইনি। 'আতা' ইবন আবী রাবাহ মানুষকে উপদেশ দিতেন, তোমরা তোমাদের মসলা-মাসায়িলের ব্যাপারে হাসানের কাছে যাও। তিনি একজন অনেক বড় 'আলিম, ইমাম ও নেতা। ইমাম মালিক বলতেন, তোমরা হাসানের নিকট মসলা-মাসায়িল জিজ্ঞেস করবে। কারণ তিনি জ্ঞান সংরক্ষণ করেছেন, আর আমরা ভুলে গেছি। অনেকে তো এমন কথাও বলতেন, হাসান যদি পূর্ণ বয়সের সময় সাহাবীদের যুগ লাভ করতেন তাহলে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উঁচু স্তরের সাহাবীরা তাঁর মুখাপেক্ষী হতেন।"
যদিও হাসানের মধ্যে বহু জ্ঞানের সমাবেশ ঘটেছিল তা সত্ত্বেও তাঁর জীবনের বেশীর ভাগ সময় অতিবাহিত হয়েছে ইবাদাত-বন্দেগী ও আধ্যাত্মিক সাধনার কর্মকাণ্ডে। এ কারণে তাঁর রূহানী মর্যাদার তুলনায় তাঁর 'ইলমী যোগ্যতার খুব কম বিবরণ পাওয়া যায়। তা সত্ত্বেও যতটুকু পাওয়া যায় তদদ্বারা তাঁর বিভিন্ন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্যের প্রমাণ লাভ করা যায়। তাফসীর, ফিকাহ্, হাদীছ তথা সকল দীনী জ্ঞানে তাঁর সমান পারদর্শিতা ছিল।
আল-কুরআনের মুফাসসির বা ভাষ্যকার হিসেবে তিনি তেমন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেননি। তবে অত্যন্ত পরিশ্রম করে তাফসীরের জ্ঞান অর্জন করেন। মাত্র বারো বছর বয়সে কুরআনের হাফিজ হন। আবূ বকর আল-হিন্দীর বর্ণনা যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এক একটি সূরার তাফসীর, তাবীল, শানে নুযূল ইত্যাদি বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন শেষ না হতো তিনি সামনে এগুতেন না। তাঁর এ অধ্যবসায় তাঁকে কুরআনের একজন বড় 'আলিম বানিয়ে দেয় এবং তিনি তাফসীরের দারসও দিতেন।"
ইমাম আয-যাহাবী যে বলেছেন, তিনি মহাজ্ঞানী ও জ্ঞানের সাগর ছিলেন," এ দ্বারাই তাঁর হাদীছ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তির আন্দাজ করা যায়। হাদীছের জ্ঞান তিনি যে সব মহান ব্যক্তির নিকট থেকে অর্জন করেন তাঁরা সকলে ছিলেন এ শাস্ত্রের এক একজন স্তম্ভস্বরূপ। সাহাবীদের মধ্যে 'উছমান (রা), 'আলী (রা), আবূ মূসা আল-আশ'আরী (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (রা), 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস (রা), আনাস ইবন মালিক (রা), জাবির ইবন মু'আবিয়া (রা), মা'কাল ইবন ইয়াসার (রা), আবূ বাকরা (রা), সামুরা ইবন জুনদুব (রা), মুগীরা ইবন শু'বা (রা), 'আমর ইবন তাগলিব (রা), 'ইমরান ইবন হুসাইন ও জুনদুব আল-বাজালী থেকে সরাসরি এবং 'উমার ইবন আল-খাত্তাব, উবাই ইবন কা'ব (রা), সা'দ ইবন 'উবাদা, 'আম্মার ইবন ইয়াসির (রা), 'উছমান ইবন আবিল 'আস (রা) এবং মা'কাল ইবন সিনান থেকে পরোক্ষভাবে হাদীছের জ্ঞান অর্জন করেন। তাছাড়া উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের বিরাট একটি দলের নিকট থেকেও হাদীছ শোনেন। ১৩
যতদূর জানা যায়, সম্ভবত তাঁর বিশেষ কোন হালকায়ে দারস ছিল না। আর এটা তিনি পছন্দও করতেন না। অনেকটা বাধ্য হয়ে তিনি হাদীছ বর্ণনা করতেন। তিনি বলতেন, "আল্লাহ যদি জ্ঞানী ব্যক্তিদের থেকে অঙ্গীকার না নিয়ে থাকতেন তাহলে আমি তোমাদের সব জিজ্ঞাসার জবাবে হাদীছ বর্ণনা করতাম না। "১৪
কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব এমন ছিল যে, মানুষ তাঁর পিছু ছাড়তো না। অধিকাংশ জ্ঞানপিপাসু মানুষ তাঁর সামনে হাজির হয়ে উপকৃত হতেন। তিনি যেখানে যেতেন সেখানে মানুষের ভিড় জমে যেত। সে সময় মদীনার পরে মক্কা ছিল জ্ঞানের দ্বিতীয় কেন্দ্রস্থল। তিনি সেখানে গেলেও মানুষের ভিড় জমে যেত। মক্কাবাসীরা তাঁকে মঞ্চে বসিয়ে হাদীছ শুনতো। শ্রোতাদের মধ্যে মুজাহিদ, 'আতা' ও তাউসের (রহ) মত লোকেরাও থাকতেন। তাঁরা সবাই বলাবলি করতেন, আমরা এ ব্যক্তির মত দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি।"
রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে উচ্চারিত শব্দ ও বাক্যে হাদীছ বর্ণনা করা অতি জরুরী বলে মনে করতেন না। বরং ভাব ও অর্থ বর্ণনাকে যথেষ্ট মনে করতেন। হাদীছের পরিভাষায় যাকে 'রিওয়ায়াত বিল মা'না' বলা হয়। তাঁর বেশীর ভাগ বর্ণনা 'রিওয়ায়াত বিল মা'না' হতো। অনেক সময় একই হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দের পার্থক্য ও কম-বেশী হয়ে যেত। তবে ভাব ও অর্থের কোন তারতম্য হতো না। ১৫ ইমাম আল-আসমা'ঈ বলেন, আমি ইবন 'আওনকে বলতে শুনেছি: আমি ছয়জনকে পেয়েছি যাঁদের মধ্যে তিনজন শব্দ ও বর্ণসহ বর্ণনার ব্যাপারে ভীষণ কঠোর ছিলেন। আর অপর তিনজন ভাব ও অর্থ বর্ণনার অনুমতি দিতেন। প্রথম তিনজন হলেন : আল-কাসিম ইবন মুহাম্মাদ, রাজা' ইবন হায়ওয়া ও মুহাম্মাদ ইবন সীরীন। আর শেষোক্ত তিনজন হলেন: আল-হাসান, শা'বী ও ইবরাহীম আ'ন-নাখা'ঈ। ১৭
হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন সত্ত্বেও তাঁর শিষ্য-শাগরিদের গণ্ডি ও পরিধি ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। এখানে তাঁর কয়েকজন বিখ্যাত ছাত্রের নাম উল্লেখ করা হলো : হুমায়দ আত-তাবীল, য়াযীদ ইবন আবী মারয়াম, কাতাদা, বাকর ইবন 'আবদিল্লাহ মুযনী, জারীর ইবন আবী হাযিম, আবু আশহাব, রাবী' ইবন সাবীহ, সা'ঈদ ইবন জারীরী, সা'দ ইবন ইবরাহীম, সাম্মাক ইবন হারব, ইবন 'আদন, খালিদ আল- হায্যা, 'আতা' ইবন সাইব, 'উছমান আল-বাত্তি, কুরর। ইবন খালিদ, মুবারাক ইবন ফুদালা, ইয়া'লা ইবন যিয়াদ, হিশাম ইবন হাসান, ইউনুস ইবন 'উবায়দ, মানসূর ইবন যাদান, সা'ঈদ ইবন বিলাল, মুজাহিদ, 'আতা' ইবন আবী রাবাহ, তাউস (রহ) ও আরো অনেকে। ১৮
তিনি ছিলেন ফিকাহ্ শাস্ত্রের একজন ইমাম এবং বসরার 'মুফতীয়ে আ'জম (সর্বশ্রেষ্ঠ মুফতী)। কাতাদা বলেছেন, হাসান হালাল ও হারামের সবচেয়ে বড় 'আলিম ছিলেন।" আইউব বলেছেন, আমার চোখ হাসানের চেয়ে বড় কোন ফকীহকে দেখেনি। রাবী ইবন আনাস বলেছেন, আমি পুরো দশ বছর হাসানের নিকট যাওয়া-আসা করেছি এবং সব সময় তাঁর নিকট থেকে নতুন নতুন মাসআলা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছি।২০
কিছু বর্ণনায় জানা যায়, তিনি হাদীছ ও ফিকাহ্ বিষয়ে, কিছু বইও লিখেছিলেন। ইবন আবী লায়লা 'ঈসা ইবন মূসার সূত্রে বলেন: হাসান ছিলেন বসরার ফকীহ্।২১
এই ইজতিহাদ ও গবেষণার জন্য গবেষকসুলভ জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। সুতরাং যে সব বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডারে কোন রিওয়ায়াত না থাকতো, সে ক্ষেত্রে তিনি কিয়াস ও ইজতিহাদের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত দিতেন। একবার আবূ সালামা ইবন 'আবদির রহমান তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি যে সব মাসআলায় মানুষকে ফাতওয়া দেন, তার সব ক্ষেত্রে কি আপনার নিকট কোন 'রিওয়ায়াত' থাকে? বললেন: আল্লাহর কসম! সব ক্ষেত্রে থাকে না। তবে আমার মতামত ও সিদ্ধান্ত প্রশ্নকারীদের সিদ্ধান্তের চেয়ে তাদের জন্য ভালো হয়ে থাকে।
শুদ্ধ ও সঠিক হওয়ার ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত ও মতামত সিদ্ধান্ত দানকারী সাহাবাদের সমমান ও পর্যায়ের হতো। আবু কাতাদা মানুষকে মসলা-মাসাইল জানার জন্য হাসানের নিকট যাওয়ার কথা বলতেন। তিনি বলতেন আল্লাহর কসম! আমি তার সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশী অন্য কারো সিদ্ধান্তকে 'উমার ইবন আল-খাত্তাবের (রা) সিদ্ধান্তের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখিনি। কোন কোন বিজ্ঞ 'আলিম তো এমন কথাও বলেছেন, হাসানের যদি সাহাবায়ে কিরামের যুগে জ্ঞান-বুদ্ধির বয়স হতো, তাহলে তাঁরা তাঁর মতামত ও সিদ্ধান্তের মুখাপেক্ষী হতেন। ২২
তিনি ইসলামী জ্ঞান ছাড়াও ভাষা ও সাহিত্যের একজন বড় বিশেষজ্ঞ এবং বিশুদ্ধ, স্পষ্ট ও প্রাঞ্জলভাষী ব্যক্তি ছিলেন। ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তিনি বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষিতায় রা'উবা ইবন 'আজাজের সমকক্ষ ছিলেন। তার বাগ্মিতাপূর্ণ বক্তৃতা- ভাষণ শুনে কোন কোন আরব ব্যক্তি মন্তব্য করতো তিনি বিশুদ্ধ ও স্পষ্টভাষিতায় একজন নির্ভরযোগ্য আরব। ২৪
উমায়্যা যুগের শ্রেষ্ঠ দুই আরব কবি জারীর ও ফারাযদাক। দুই জনের মধ্যে ভীষণ দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ছিল। ফারাযদাক সব সময় হাসান আল-বসরীর মজলিসে উঠাবসা করতেন। আর জারীর বসতেন ইবন সীরীনের (রহ) মজলিসে। তাঁরা দুইজন এই দুই কবির কবিতা শুনতেন। ২৫
প্রখ্যাত ভাষাবিদ আবূ 'আমর ইবন আল-'আলা' বলেছেন: ২৬ لم أرقرويين أفصح من الحسن والحجاج -'আমি আল-হাসান আল-বসরী ও হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ অপেক্ষা অধিকতর স্পষ্ট ও শুদ্ধভাষী দুইজন গ্রামবাসীকে দেখিনি।'
তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হলো, এ দুইজনের মধ্যে কে বেশী শুদ্ধভাষী? বললেন: হাসান। ইমাম আল-গাযালী (রহ) বলেছেন: ২৭ وكان الحسن البصرى أشبه الناس كلاما بكلام الأنبياء، وأقربهم هديا من الصحابة، وكان غاية في الفصاحة. -'মানুষের মধ্যে হাসান আল-বসরী ছিলেন কথার দিক দিয়ে নবীদের কথার সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ এবং হিদায়াতের দিক দিয়ে সাহাবীদের বেশী নিকটবর্তী। তাছাড়া ভাষার শুদ্ধতায় ও স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি ছিলেন একজন চূড়ান্ত পর্যায়ের মানুষ।'
তিনি ভুল আরবী বলা মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো: আমাদের একজন ইমাম আছেন যিনি কুরআন পাঠে ভুল করেন। বললেন: তাকে বিদায় করে দাও। কারণ, স্বর-ধ্বনি হলো কথার অলঙ্কার।
একবার এক ব্যক্তি তাঁকে- 'ইয়া আবূ সা'ঈদ' বলে ডাক দেয়। (শুদ্ধ হবে ইয়া আবা সা'ঈদ) তিনি বললেন: দীনার-দিরহামের চিন্তা তোমাকে- ইয়া আবা সা'ঈদ বলা থেকে বিরত রেখেছে। ২৮
জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাহচর্য এবং তাঁদের সাথে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, বিতর্ক ও চিন্তা-অনুধ্যান তাঁর খুবই প্রিয় ছিল। একবার কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তি সাক্ষাতের জন্য আসলেন। কথায় কথায় দুপুর হয়ে গেল। শুধু দুপুর নয়, বরং দুপুরও গড়িয়ে গেল। তখন তাঁর ছেলে এসে অতিথিদের বললেন, আপনারা আমার পিতার উপর অনেক বড় বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন। তাঁকে একটু বিশ্রাম নিতে দিন। এখনো পর্যন্ত তিনি কিছু খাননি। তিনি ছেলের কথা শুনে তাকে ধমক দিয়ে বললেন, তাঁদের দর্শনের চেয়ে বেশী আমার চোখের প্রশান্তির জন্য আর কোন কিছু নেই। যখন দুইজন মুসলমান পরস্পর মিলিত হতেন, তাঁরা একে অপরকে হাদীছ শোনাতেন, আল্লাহর যিকর ও তাহমীদ-তাকদীস করতেন। এমন কি তাঁদের দুপুরের বিশ্রামের কোন সময় ও সুযোগ হতো না। ২৯
তিনি মনে করতেন, একজন মানুষ শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই তাকে প্রকৃত জ্ঞানী বলা যায় না। বরং প্রকৃত জ্ঞানী হওয়ার জন্য বহুবিধ শর্ত আছে। একবার মাতারুল ওযাররাক তাঁর কাছে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করে বললেন, অন্য ফকীরা তো আপনার বিরুদ্ধাচরণ করেন। তিনি বললেন, তোমার মা তোমাকে কাঁদাক! তুমি কি কখনো ফকীহ্ দেখেছো এবং ফকীহ্ কাকে বলে তা জান? ফকীহ্ তিনি, যিনি পার্থিব সুখ-সম্পদের প্রতি বিমুখ, খোদাভীরু, নিজের চেয়ে উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তির প্রতি বেপরোয়া, নিজের চেয়ে নিচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিকে নিয়ে হাসি-তামাসা করেন না এবং আল্লাহ তাঁকে যে জ্ঞান দান করেছেন তা দ্বারা তুচ্ছ পার্থিব সুখ-সুবিধা পেতে চান না। ৩০
তিনি কুরআনের ধারক-বাহকদেরকে তিনটি ভাগে ভাগ করতেন। বলতেন, এক ব্যক্তি কুরআনকে পণ্যের মত এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে যায় এবং বিনিময়ে মানুষের নিকট থেকে অর্থ-সম্পদ পেতে চায়। আরেক ব্যক্তি কুরআনের বর্ণসমূহ মুখস্থ করে, কিন্তু তার সীমা-সরহদের কোন পরোয়া করে না। তার বিনিময়ে শাসক শ্রেণীর নিকট থেকে সুযোগ-সুবিধা লাভ করে, দেশবাসীর অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেয়। এ জাতীয় কুরআনের বাহকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। আর তৃতীয় এক ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে, তার ঔষধ তার নিজের অন্তরের রোগের উপর প্রয়োগ করে, রাত জাগে, তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, খোদাভীতি ও আত্মমর্যাদাবোধের পরিচ্ছদ অঙ্গে ধারণ করে এবং অন্তরে ব্যথা-বেদনা অনুভব করে। আল্লাহর কসম! এ জাতীয় কুরআনের বাহকের সংখ্যা লাল দিয়াশলাইয়ের সংখ্যার চেয়েও কম। তাঁদের বরকতেই আল্লাহ বৃষ্টি দেন, বিজয় দান করেন এবং বালা- মুসীবত দূর করেন। ৩১
হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) একজন বাগ্মী, বাকপটু ও মিষ্টভাষী মানুষ ছিলেন। তিনি যখন কথা বলতেন তখন মুখ দিয়ে যেন মুক্তো ঝরে পড়তো। বিখ্যাত আরব পণ্ডিত আল-জাহিজ বলেছেন: ৩২ 'হাসান ছিলেন একজন দুনিয়া বিরাগী 'আবিদ, বড় মাপের 'আলিম, তুখোড় বক্তা ও ভালো কাহিনী বলিয়ে মানুষ।' তিনি অনেক বাগ্মী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বলেছেন, 'আমরা হাসান আল-বসরীর চেয়ে বড় কোন বক্তাকে জানিনে।৩৩
সে যুগে বসরায় একদল খোদাভীরু 'আবিদ লোক ছিলেন, যারা জীবন যাপনে ছিলেন অতি সাধারণ। বাঁশ জাতীয় এক প্রকার গাছ দিয়ে তৈরি সাধারণ ঘরে বসবাস করতেন। বক্তৃতা-ভাষণের মাধ্যমে তারা মানুষকে উপদেশ দিতেন। হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ বলেন
أخطب الناس صاحب العمامة السوداء بين أخصاص البصرة، إذا شاء خطب وإذا شاء سكت.
'বসরায় বাঁশের ঘরে বসবাসকারীদের মধ্যে এই কালো পাগড়ীধারী (হাসান) হলেন সবচেয়ে বড় খতীব। তিনি যখন ইচ্ছা ভাষণ দেন, আর যখন ইচ্ছা চুপ থাকেন।' তিনি যখন আখিরাতের বর্ণনা করতেন কিংবা সাহাবায়ে কিরামের যুগের চিত্র তুলে ধরতেন তখন চোখ দিয়ে তাঁর অশ্রুর বন্যা বয়ে যেত।
জ্ঞানের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যাপকতা সম্পর্কে ছাবিত ইবন কুররার অভিমত এ রকম: 'তিনি স্বীয় 'ইলম ও তাকওয়া, যুহৃদ ও পরহেযগারী, পরমুখাপেক্ষীহীনতা ও দৃঢ় মনোবল, সৌন্দর্য ও পবিত্রতা, অনুধাবন শক্তি ও 'ইলমে মা'রিফাতের দিক দিয়ে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত ছিলেন।
নানা ধরনের লোক সমবেত হতো এবং সবাই সমানভাবে তাঁর উপদেশ থেকে উপকৃত হতো। একই মজলিসে তাঁর নিকট থেকে কেউ হাদীছের জ্ঞান অর্জন করছেন, কেউ তাফসীর শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করছেন, কেউ 'ইলমে ফিকাহ্র দারস গ্রহণ করছেন, কেউ ফাতওয়া জিজ্ঞেস করছেন, বিচার-আচারের নিয়ম-কানুন শিখছেন এবং কেউ ওয়াজ শুনছেন। তিনি ছিলেন যেন এক মহা সমুদ্র যাকে উত্তাল তরঙ্গ সর্বদা আন্দোলিত করছে। তিনি যেন এক উজ্জ্বল প্রদীপ যা মজলিসকে আলোকিত করছে। আমর বিন মা'রূফ ওয়া নাহি 'আনিল মুনকার তথা ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ-এর ক্ষেত্রে তাঁর কর্মধারা, বাকপটুতা এবং শাসকমণ্ডলী ও আমীর-উমারাদের সামনে তাঁর মর্যাদা পূর্ণ ভাষায় সত্য প্রকাশ্যের ঘটনাবলী ভুলবার মত নয়।'৩৫
তিনি কেবল বাগ্মী ও কামালিয়াতের অধিকারীই ছিলেন না, একজন হৃদয়বান ব্যক্তিও ছিলেন। তিনি যা কিছু বলতেন তা তার অন্তরের গভীরতম স্থান থেকেই বের হতো। আর তাই অন্যের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলতো। তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ শুনে শ্রোতার সর্বাঙ্গে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো। আর এ কারণে বসরা থেকে কৃষ্ণা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় অনেক বড় বড় 'আলিম ও শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও তাঁর দারসের হালকা মানুষকে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণ করতো। আর এর মূল কারণ হলো কালামে নুবুওয়াতের সাথে তাঁর কথার গভীর মিল।
মানুষ তাঁর ব্যক্তিত্ব দ্বারা ছিল অভিভূত এবং তাঁকে উম্মাতে মুহাম্মাদিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মধ্যে গণ্য করতো। তৃতীয় শতাব্দীর অমুসলিম দার্শনিক ছাবিত বিন কুৱাহ্-এর মন্তব্য হচ্ছে, উম্মাতে মুহাম্মাদিয়ার যে কয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের উপর অন্যান্য উম্মার ঈর্ষা করা উচিত, তাঁদের মধ্যে হাসান আল-বসরী (রহ) অন্যতম। মক্কা আল-মুকাররামা সব সময়ই ইসলামী বিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। সেখানে সকল শাস্ত্রের জ্ঞানী ব্যক্তিদের সমাগম ঘটে, কিন্তু মক্কার অধিবাসীরাও হাসান আল-বসরীর জ্ঞানের গভীরতা দেখে এবং তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ শুনে বিস্ময়ের সাথে বলেছে: আমরা তাঁর মত কোন লোক আর দেখিনি।
জাহিরী 'ইলমে যদিও হাসান আল-বসরী তাঁর সময়ে শায়খুল ইসলামের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, তবে তাঁর গর্ব ও গৌরব এবং খ্যাতির মূল ভিত্তি এটাই ছিল না। বরং 'ইরফান ও হাকীকাত ছিল তাঁর আসল ও প্রকৃত শাস্ত্র। তাঁর সত্তাটি তাসাউফের উৎস এবং 'ইলমে বাতিনের মূল ঝর্নাধারা। তাসাউফের সকল নদী এই উৎস থেকেই প্রবাহিত হয়েছে। সুতরাং তাসাউফের অধিকাংশ বড় বড় সিলসিলা তাঁরই মাধ্যমে হযরত 'আলী (রা) পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। এভাবে তাঁরই মাধ্যমে যেন দুনিয়াতে এ নূরের দরিয়া বহমান রয়েছে।
হযরত 'আলী (রা) থেকে তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি মুহাদ্দিছদের নিকট প্রমাণিত নয়। তবে 'ইলমে তাসাউফের ইমামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) হযরত 'আলী (রা) থেকেই রূহানী ফয়েজপ্রাপ্ত ছিলেন। হযরত শাহ ওয়ালী আল্লাহ (রহ) লিখেছেন, "তরীকতের ইমামদের মতে হাসান আল-বসরী নিশ্চিতভাবে হযরত 'আলীর (রা) সাথে সম্পৃক্ত। মুহাদ্দিছীন কিরামের নিকট এ সম্পর্ক প্রমাণিত নয়। তবে শায়খ আহমাদ কাসতাশী তাঁর 'ইকদুল ফারীদ ফী সালাসিলি আহলিত তাওহীদ' গ্রন্থে একটি আলোচনায় তাসাউফপন্থীদের সমর্থন করেছেন।” অন্য এক স্থানে তিনি লিখেছেন, সূফীরা এ ব্যাপারে একমত যে, হাসান আল-বসরী (রহ) হযরত 'আলীর (রা) নিকট থেকে ফয়েজ লাভ করেছেন।
প্রথম পর্বের ও পরবর্তী কালের সকল সূফী হযরত হাসান আল-বসরীকে এই নূরানী সিলসিলার উৎসধারা এবং 'শায়খুশ শুয়ূখ' (শায়খদের শায়খ) বলে গণ্য করেন। তাঁর বাণী দ্বারা তাঁরা প্রমাণ উপস্থাপন করেন। সূফীদের আলোচনায় তাঁর নামটি তালিকার শীর্ষস্থানে থাকে। তাঁর সকল বাণী ও কথা তাসাউফ শিক্ষার পাঠ্যসূচী হিসেবে গণ্য করা হয়। শায়খ ফরীদ উদ্দীন 'আত্তার, শায়খ 'আলী ইবন 'উছমান হাজবীরী (মৃত্যু ৪৬৫হি.), শায়খ আবু নাসর সাররাজ (মৃত্যু ৩৭০ হি.), শায়খ শিহাবুদ্দীন সুহ্রাওয়ার্দি (রহ) প্রমুখ সূফী তাঁদের নিজ নিজ বক্তব্য ও লেখায় হযরত হাসান আল-বসরীর কথাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
হযরত হাসান আল-বসরী আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গুণাবলীতে পূর্ণতা অর্জন করেন। তিনি ছিলেন যুব্জ ও তাকওয়ার বাস্তব প্রতিকৃতি এবং নৈতিক গুণাবলীর জীবন্ত চিত্র। তিনি যদিও নুবুওয়াত ও রিসালাতের পবিত্র যুগ দেখার সুযোগ পাননি এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুহৃত লাভের গৌরব অর্জন করতে পারেননি, তবুও তাঁর চরিত্র ও নৈতিকতা যেন সেই পবিত্র ছাঁচে ঢালাই করে গড়ে তোলা হয়। তাবি'ঈদের দলে তাঁর চেয়ে বেশী আর কারো জীবন রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের জীবনের অনুরূপ ছিল না। তাঁর প্রতিটি আচরণে সাহাবীদের আচার-আচরণের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতো। উঁচু স্তরের তাবি'ঈগণও একথা অকপটে স্বীকার করেছেন। হযরত আবূ বুরদা, যিনি ছিলেন একজন উঁচু স্তরের তাবি'ঈ, বলতেন, আমি সাহাবীদের দলের বাইরের কোন লোককে হাসানের চেয়ে বেশী রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখিনি। ইমাম শা'বী সত্তর জন সাহাবীকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আর এ সৌভাগ্যে সম্ভবত তিনি হাসান আল-বসরী থেকেও এগিয়ে ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্রতি সীমাহীন সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখাতেন। একবার ইমাম শা'বীর ছেলে প্রশ্ন করলো, আব্বা! আমি দেখি, আপনি এই শায়খ (হাসান)-এর সাথে যেমন আচরণ করেন, তেমন আচরণ আর কারো সাথে করেন না। এর কারণ কি? তিনি বললেন: বেটা, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সত্তর জন সাহাবীকে দেখেছি। কিন্তু হাসানের চেয়ে অন্য কাউকে তাঁদের মত দেখিনি।
হৃদয়ের দুঃখ-বেদনাই হলো আধ্যাত্মিকতার উৎস। সেখান থেকেই উৎসারিত হয় যাবতীয় 'ইবাদাত-বন্দেগী, তাকওয়া-পরহেযগারী, আত্মসংযমের অনুশীলনী ইত্যাদির মত নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলী। হযরত হাসানের অন্তরটি সব সময় এত বেদনাবিধুর থাকতো যে, তার থেকে ব্যথার সুর ছাড়া আর কিছুই ধ্বনিত হতো না। ইউনুস বলেন, তাঁর উপর সব সময় একটা বেদনা ও বিষণ্ণতার ছাপ লেগে থাকতো। তাঁর ঠোঁট হাসি যে কি জিনিস তা জানতো না। তিনি বলতেন, মু'মিনের হাসি হলো তার উদাসীনতার ফল। বেশী হাসলে অন্তর মরে যায়। তিনি কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে অস্থিরভাবে কাঁদতেন।
তাঁর মধ্যে এত বেশী পরিমাণে খোদাভীতি সৃষ্টি হয় যে, প্রতিটি মুহূর্ত ভীত-শংকিত থাকতেন। ইউনুস ইবন 'উবায়দ বলেন, হাসান যখন আসতেন, মনে হতো তাঁর কোন অতি প্রিয়জনকে কবরে দাফন করে আসছেন। আর যখন বসতেন তখন মনে হতো তিনি এমন একজন কয়েদী যাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যখন জাহান্নামের আলোচনা করতেন তখন মনে হতো তা কেবল তাঁর জন্যই তৈরী করা হয়েছে।
হযরত হাসান আল-বসরীর জীবনের পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবটুক যুহদ ও তাকওয়ার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। তাঁর সত্তাটি ছিল 'ইবাদাত-বন্দেগী ও রূহানী রিয়াদাত বা আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুশীলননের বাস্তব প্রতিকৃতি। হাজ্জাজ আল-আসওয়াদ বলেন, এক ব্যক্তি কামনা করতো, যদি সে হাসানের যুহদ, ইবন সীরীনের তাকওয়া, 'আমির ইবন 'আবদি কায়সের 'ইবাদাত এবং সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের ফিকাহ্র জ্ঞান অর্জন করতে পারতো! লোকেরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর দেখতে পেল, এক হাসানের মধ্যে এসব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটেছে। তাঁর মজলিস-মাহফিলে এক আখিরাত ছাড়া আর কোন কিছুর আলোচনা হতো না। আশ'আছ বর্ণনা করেছেন, যখন আমরা হাসানের কাছে যেতাম তখন আমাদের কাছে না দুনিয়ার কোন খবর জিজ্ঞেস করা হতো, আর না দুনিয়ার কোন খবর দেওয়া হতো। কেবল আখিরাতের আলোচনাই চলতো। আল-'উতবা বলেন, আমি আমার শায়খদের বলতে শুনেছি: তাবি'ঈদের আট ব্যক্তি পর্যন্ত এসে যুহৃদ (তপস্যা ও বৈরাগ্য) শেষ হয়েছে। তাঁরা হলেন: 'আমির ইবন 'আবদিল কায়স, আল-হাসান ইবন আবিল হাসান আল-বসরী, হারিম ইবন হায়‍্যান, আবু মুসলিম আল-খাওলানী, উওয়ায়স আল-কারানী, আর-রাবী' ইবন খুছায়ম, মাসরূক ইবন আল-আজদা' ও আল-আসওয়াদ ইবন য়াযীদ। ৪১
ফরজ ও সুন্নাত ছাড়া তাঁর বিশেষ 'ইবাদাতসমূহ সম্পূর্ণ গোপনে ও নির্জনে হতো। সে সময় তিনি ভিন্ন এক জগতে অবস্থান করতেন। হুমায়দ বলেন, একবার আমরা যখন মক্কায় ছিলাম তখন শা'বী হাসানের সাথে একান্তে সাক্ষাতের ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। আমি তাঁর ইচ্ছার কথা হাসানকে জানালাম। তিনি বললেন, যখন ইচ্ছা, আসুক। দেখা হবে। কথামত একদিন তিনি আসলেন। আমি দরজায় হাজির ছিলাম। আমি তাঁকে জানালাম, এখন হাসান ঘরে একাকী আছেন। আপনি ভিতরে যান। কিন্তু একা ভিতরে যাওয়ার সাহস তাঁর হলো না। এ কারণে, আমাকেও সাথে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সুতরাং আমিও সাথে চললাম। যখন আমরা ভিতরে প্রবেশ করলাম তখন হাসান কিবলামুখী হয়ে এক বিস্ময়কর ভঙ্গি ও অবস্থায় উচ্চারণ করে চলেছেন: ওহে বানী আদম, তুমি কিছু ছিলেনা, তোমাকে অস্তিত্ব দান করা হয়েছে। তুমি চেয়েছো, তোমাকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন তোমার পালা এসেছে, তোমার কাছে চাওয়া হয়েছে, তখন তুমি অস্বীকার করে বসেছো। আফসোস! তুমি কত বড় খারাপ কাজ করেছো। একথা বলতে বলতে তিনি অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। তারপর আবার চেতনা ফিরে পেয়ে একই বাক্যগুলি আবার আওড়াচ্ছিলেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে শা'বী আমাকে বললেন, ফিরে চলো। এখন শায়খ ভিন্ন জগতে আছেন।
খালিদ ইবন সাফওয়ানের নিকট হাসান আল-বসরী (রহ) সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন: হাসানের বাহির ভিতরের সাথে এবং ভিতর বাইরের সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল। তিনি অন্যকে যা কিছু করার জন্য বলতেন নিজে তা সবচেয়ে বেশী 'আমল করতেন। দুনিয়ার যা কিছু মানুষের হাতে, সে ব্যাপারে তিনি মুখাপেক্ষীহীন। আর দীনের যা কিছু তাঁর কাছে আছে সে ব্যাপারে মানুষ তাঁর মুখাপেক্ষী। ৪২
তাঁর কাছে যুহদ ও তাকওয়া কেবল মৌখিক দাবী এবং বাহ্যিক বেশ-ভূষার নাম নয়। বরং তার মূল প্রাণসত্তা হলো 'আমল ও ইখলাস। তিনি বলতেন, মানুষ মুখে যা কিছু বলে তার কিছু যদি করতো, তাহলে তা তার জন্য মর্যাদার কাজ হতো। আর যদি করার চেয়ে বেশী বলে, তাহলে তা হবে তার জন্য লজ্জার বিষয়। তাঁর গোটা জীবনই ছিল কর্মের বাস্তব নমুনা। আবু বাকর আল-হুযালী বলেন, তিনি যতক্ষণ নিজে কোন কাজ না করতেন ততক্ষণ অন্যকে করার জন্য বলতেন না। আর যতক্ষণ কোন কাজ নিজে ছেড়ে না দিতেন, অন্যকে তা থেকে বিরত থাকার কথা বলতেন না। কোন এক ব্যক্তি ইউনুস ইবন 'উবায়দের কাছে প্রশ্ন করে : তুমি এমন কাউকে কি জান যিনি হাসান আল-বসরীর মত এত 'আমল করেন! তিনি বলেন : এত 'আমল তো দূরের কথা, এমন কোন ব্যক্তিকেও আমি জানিনে যিনি মুখে হাসানের মত কথা বলেন। ৪৩
ইখলাস ছাড়া শুধু হালকায় বসে যিকর-আযকার করা এবং ছিঁড়া মোটা কাপড় পরাকে তিনি ধোঁকাবাজি বলে মনে করতেন। তিনি বলতেন, আমাদের হালকায় বহু লোক বসে। কিন্তু তাদের অনেকের উদ্দেশ্য থাকে পার্থিব সুখ-সুবিধা প্রাপ্তি। একবার তাঁর সামনে মোটা পোশাক পরার আলোচনা উঠলে তিনি বলেন, এ ধরনের লোকেরা তাদের অন্তরের গভীরে অহংকারের প্রতিমা লুকিয়ে রাখে, আর প্রকাশ্য পোশাক-আশাকে বিনয়ী ও স্বল্পে তুষ্টি ভাব প্রকাশ করে। এমন মোটা পোশাকের চেয়ে মূল্যবান পোশাক পরা অনেক শ্রেয়। ৪৪
মোটা ও কমদামী পোশাকের ধোঁকা থেকে বাঁচার জন্য মাঝে মধ্যে তিনি মূল্যবান পোশাকও পরতেন। কুলছুম ইবন জাওশান বলেন, একবার হাসান দামী জোব্বা গায়ে দিয়ে চাদর ঝুলিয়ে বাইরে গেলেন। তাঁকে এ পোশাকে দেখে এক ব্যক্তি বললো, আপনার মত মানুষের গায়ে এ পোশাক মানায় না। তিনি বললেন, তোমরা জান না যে, দোযখীদের বড় একটি অংশ কমদামী মোটা পশমী পোশাক পরিধানকারীরাই হবে।
মানুষের সবচেয়ে বড় দুশমন তার 'নাক্স' নিজে। সে তাকে আত্মতুষ্টি, রিয়াকারি, অহংকার ইত্যাদি ধোঁকার জালে আবদ্ধ করে ধ্বংস করে দেয়। হযরত হাসান আল-বসরী এই ধোঁকা এবং চাকচিক্যময় মরীচিকার ব্যাপার নিয়ে সব সময় ভীষণ ভীত থাকতেন এবং উঠতে বসতে এই দু'আ করতেন: 'হে আল্লাহ, শিক্ক, অহমিকা, কপটতা, রিয়া, ধোঁকাবাজি, খ্যাতি ও প্রচারের ইচ্ছা এবং আমার দীনের ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় থেকে আমাদের অন্তরগুলিকে দীনের উপর স্থির ও অটল রাখ এবং সত্য-সঠিক ইসলামকে আমাদের দীন বানিয়ে দাও। তিনি বলতেন, নাফসের স্বভাব হলো কামনা-বাসনার প্রতি ঝোঁক প্রবণতা, তোমরা যিকরের সাহায্যে তা পরিশুদ্ধ কর। ৪৫
তিনি সাধারণ মানুষের ভক্তি ও ভালোবাসাকেও একটি পরীক্ষা বলে মনে করতেন। কারণ, তাতে যে ব্যক্তিকে অতিরিক্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখানো হয় তার মনে অহংকার জন্ম নিতে পারে। আর তাতে তার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই তিনি অহেতুক ভক্তি-শ্রদ্ধা দেখানো পছন্দ করতেন না।
নাফসের ধোঁকা ও আত্ম-অহমিকার হাত থেকে বাঁচার জন্য তিনি নিজের প্রশংসা শোনা একেবারেই পছন্দ করতেন না। সা'ঈদ ইবন মুহাম্মাদ আছ-ছাকাফী বলেন, যদি কেউ হাসানের সামনে তাঁর প্রশংসা করতো, তা হলে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট হতেন। আর যদি মানুষ তাঁর জন্য দু'আ করতো, তিনি দারুণ সন্তুষ্ট হতেন। তিনি মনে করতেন, একজন উপদেশ দানকারীর উপদেশের প্রভাব ও কার্যকারিতা নির্ভর করে তার নিজের অন্তরের নিষ্ঠা ও পরিশুদ্ধির উপর। অপরিচ্ছন্ন অন্তর নিয়ে কাউকে উপদেশ দান করলে তা শ্রোতার মনে কোন রেখাপাত করে না। একবার এক ব্যক্তি হযরত হাসানের (রহ) উপস্থিতিতে মন গলে যায়, উপদেশমূলক এমন অনেক কথা বললেন। হাসান মনোযোগ সহকারে লোকটির কথা শুনলেন। কিন্তু তিনি তাঁর অন্তর নরম হওয়ার মত কিছুই অনুভব করলেন না। তখন তিনি লোকটিকে বললেন: হয় আমাদের মধ্যে কোন মন্দ আছে, নয়তো আছে তোমার মধ্যে। ৪৬
এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি তাঁর যুগের দুনিয়া বিরাগী লোকদের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ব্যাপকভাবে এ দুনিয়াতে যুহদ ও তাকওয়া অবলম্বনের আহ্বান জানাতেন। তবে প্রচলিত অর্থে তিনি কোন সূফী ছিলেন না। আসলে তাসাউফ ও যুহদ দু'টি ভিন্ন জিনিস। তবে সূফীরা যাহিদ হয়ে থাকেন। তবে সব যাহিদ ব্যক্তি সূফী হন না। তাসাউফ ও সূফী মতবাদের উৎপত্তি তো হাসান আল-বসরীর (রহ) যুগের বেশ পরে। আর একথাই বলেছেন বিশিষ্ট মিশরীয় পণ্ডিত ডঃ শাওকী দায়ফ। ৪৭
যুহদ ও তাকওয়া বা দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার প্রতি উদাসীনতা ও খোদাভীরুতার জন্য তাঁর সময়কালের লোকেরা যেমন তাঁকে অনেক উঁচু স্তরের ব্যক্তি বলে মনে করেছে, তেমনিভাবে পরবর্তীকালের পৃথিবীর মানুষ তাঁকে তেমনই বিশ্বাস করেছে। তাঁর এ যুহ্দ ও তাকওয়ায় কোন রকম ভনিতা ও কৃত্রিমতার লেশমাত্র ছিল না। এর ভিত্তি ছিল সম্পূর্ণ ইসলামী আদব-আখলাকের উপর। নুবুওয়াতের কেন্দ্রভূমি মদীনায় অবস্থিত তার প্রকৃত উৎস থেকে তিনি তা আহরণ করেন। পরবর্তীকালের প্রত্যেকটি ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদেরকে তাঁরই অনুসারী বলে দাবী করেছে। তাদের 'আকীদা- বিশ্বাসকে তাঁরই 'আকীদা-বিশ্বাস বলে মনে করেছে। যেমন জাবরিয়‍্যা সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন বলতো, তিনি মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন, জগতের সবকিছুই আল্লাহর ইচ্ছায় হয়ে থাকে। তেমনিভাবে কাদরিয়‍্যা সম্প্রদায় দাবী করতো যে, তিনি ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রবক্তা ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ তাঁর কর্মে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আর সূফীরা তো তাঁকে তাদের ইমামের স্থান দান করেন।
পরস্পর বিরোধী বর্ণনা বিচার-বিশ্লেষণ করে অনেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, তিনি ছিলেন একজন কাদরী। কারণ, তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি এমন বিশ্বাস পোষণ করে যে, সব ধরনের পাপ আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে, কিয়ামতের দিন সে কালো মুখ নিয়ে উঠবে। আর তিনি যদি জাবরিয়‍্যা সম্প্রদায়ের বিশ্বাসে বিশ্বাসী হতেন তাহলে মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের 'আকীদা-বিশ্বাসে বিশ্বাসী 'আব্বাসী যুগের প্রখ্যাত লেখক আল-জাহিজ তাঁর ভূয়ষী প্রশংসা করতেন না। তাঁর 'আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন' গ্রন্থে যেখানেই হাসান আল-বসরীর নামটি এসেছে, অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে খুব বড় করে উল্লেখ করেছেন। একথাও বর্ণিত হয়েছে যে, একবার হাজ্জাজ বিন ইউসুফ 'কদর' সম্পর্কে হযরত হাসানের (রহ) মতামত জানতে চেয়ে তাঁকে একটি চিঠি লেখেন। তিনি সে চিঠির যে জবাব দেন তাতে ইচ্ছার স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার করা আল্লাহর জন্য অপরিহার্য- যা তিনি বিশ্বাস করতেন, লেখেন। খলীফা আবদুল মালিকের নিকট পাঠানো অপর একটি চিঠিতে একই ভাব ব্যক্ত করেন বলে বলা হয়েছে। ৪৮
কিছু কিছু বর্ণনা দ্বারা একথা বুঝা যায় যে, হযরত হাসান আল-বসরী 'কাদরিয়‍্যা' মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু একথা সঠিক নয়। সম্ভবত এমন প্রচারের কারণ এই যে, উঁচু স্তরের তাবি'ঈদের অনেকে এ ব্যাপারে এত কঠোর ছিলেন যে, কাদরিয়‍্যাদের অনেকের সাথে মেলামেশাও পছন্দ করতেন না। আর তিনি তাদের সাথে মেলামেশা ও উঠাবসায় কোন দোষ মনে করতেন না। তাঁদের সাথে খোলামেলা আলোচনাও করতেন। ৪৯ তাঁর এ উদারতার কারণে কোন কোন অনভিজ্ঞ লোক তাঁকে কাদরিয়‍্যাদের বিশ্বাসের প্রতি সম্পৃক্ত করে দিয়েছে। অথচ তিনি এমন বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। 'উমার বলেন, কাদরিয়‍্যারা হাসানের নিকট আসা-যাওয়া করতো। তবে তাদের ধ্যান-ধারণা পরস্পরের বিপরীতে ছিল। হাসান বলতেন, আদমের সন্তানেরা! তোমরা আল্লাহকে নারাজ করে কোন মানুষের খুশী অর্জন করবে না। আল্লাহর নাফরমানীর ব্যাপারে কারো আনুগত্য করবে না, আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কোন মানুষের প্রশংসা করবে না। যে জিনিস আল্লাহ তোমাকে দেননি তার জন্য কোন মানুষকে তিরস্কার করবে না। আল্লাহ মাখলুকাতকে সৃষ্টি করেছেন এবং নিজের সৃষ্টি করার নীতির উপর চলছেন। কোন ব্যক্তি যদি ধারণা করে যে, সে তার লোভের দ্বারা রিযিক বৃদ্ধি করতে পারে, তাহলে সে তার জীবনকাল বৃদ্ধি করে, তার দেহের রং পরিবর্তন করে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে কিছু সংযোজন করে তার সত্যতা প্রমাণ করুক। যখন এমনটি হবার নয় তখন বুঝা যায় মানুষের কোন কর্তৃত্ব নেই। সবকিছু আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চলছে।
আসল কথা হলো, তাঁর কিছু দ্ব্যর্থবোধক অস্পষ্ট কথার ভুল অর্থ করা হয়েছে। যদি কোনভাবেই কাদরিয়‍্যাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন তাহলে পরবর্তীকালে তা থেকে প্রত্যাবর্তন করেছেন। ইমাম আল-আসমা'ঈ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হাসান এক পর্যায়ে কদর-এর কিছু অংশের উপর আলোচনা করতেন। কিন্তু পরে তা থেকে ফিরে আসেন। কাজী 'আতা' ইবন ইয়াসার ছিলেন একজন কাদারী। তাঁর বাগ্মিতাও ছিল জাদুর মত ক্রিয়াশীল। তিনি এবং সা'ঈদ জুহানী হাসানের নিকট আসতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর কাছে প্রশ্ন করতেন। তাঁরা বলতেন, আবু সা'ঈদ! এই শাসকরা মুসলমানদের রক্ত প্রবাহিত করে, তাদের ধন-সম্পদ কেড়ে নেয়, আর বলে এসব কাজ আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী হচ্ছে। হাসান একথা শুনে বলতেন, আল্লাহর এই দুশমনেরা মিথ্যাবাদী। এ জাতীয় কিছু ঘটনার দ্বারা কিছু লোক তাঁকে কাদারী বলে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। ১ অথচ এ একটি বিশেষ ঘটনা ছিল, কাদরের 'আকীদার সাথে যার কোন সম্পর্ক নেই।
মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের প্রধান পুরুষ ও প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল ইবন 'আতা ছিলেন হাসান আল-বসরীর (রহ) অন্যতম ছাত্র। একবার হাসান আল-বসরীকে (রহ) কাবীরা গোনাহ্ বা মারাত্মক পাপের অধিকারী ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। অর্থাৎ পরকালে তার অবস্থান কোথায় হবে- জান্নাত না জাহান্নামে? তিনি জবাব দিতে কিছুক্ষণ দেরী করলেন। এই দেরী দ্বারা সম্ভবত তিনি এটাই বুঝাচ্ছিলেন যে, সেটা নির্ভর করবে আল্লাহর ফয়সালা ও মর্জির উপর। কিন্তু তাঁর ছাত্র ওয়াসিল ইবন 'আতা প্রশ্নটির চূড়ান্ত জবাব দিয়ে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে, কাবীরা গোনাহকারীর অবস্থান হলো দুইটি অবস্থার মধ্যবর্তী একটি 'পর্যায়ে। সে পূর্ণ মু'মিন নয়। কারণ সে ঈমানের বিষয়সমূহের অন্তত কোন একটি বাদ দিয়েছে। তেমনিভাবে সে পূর্ণ কাফিরও নয়। কারণ, এখনো সে ঈমানের আনুসঙ্গিক বহু কর্ম সম্পাদন করে থাকে। তবে সে ফাসিক। সুতরাং সে 'ফিস্ক'-এর পর্যায়ে আছে, যা ঈমান ও কুফর-এর মধ্যবর্তী একটি পর্যায়। সুতরাং এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা যাবে না এবং আখিরাতে সে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি স্থানে অবস্থান করবে। হাসান আল-বসরীর (রহ) যে সকল ছাত্র ওয়াসিলের এই মতকে গ্রহণ করে, তিনি তাদেরকে হাসানের দারসের মজলিস থেকে সরিয়ে নিয়ে মসজিদের এক কোণে বসান এবং তাদের সামনে নিজের মতটি ব্যাখ্যা করতে থাকেন। যারা সেদিন ওয়াসিলকে অনুসরণ করে তাদের লক্ষ্য করে হাসান আল- বসরী (রহ) বলেন: إِعْتَزَلَ عَنَّا - সে আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছে। আর সেই থেকে ওয়াসিলের বিরুদ্ধবাদীরা ওয়াসিল ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি 'আল-মু'তাযিলা' নামটি আরোপ করে। ৫২
হযরত হাসান আল-বসরীর শিরা-উপশিরার রক্ত সর্বদা জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর জন্য টগবগ করতো। যদিও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ছাড়া তাঁর জিহাদে অংশগ্রহণের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না, তবে সীরাত বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত যে, শৈশব থেকে তাঁর অন্তরে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর তীব্র বাসনা বিদ্যমান ছিল এবং তিনি বুদ্ধি- জ্ঞান হওয়ার পর জিহাদকে নিজের জীবনের বিশেষ 'আমল বা কর্ম হিসেবে গ্রহণ করেন। ৫৩
কোন কোন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি তাঁর সময়ে সংঘটিত অধিকাংশ জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। তবে কাবুল, আন্দাকান ও উজবেকিস্তানের অভিযান ছাড়া অন্যান্য অভিযানের ব্যাপারে বিশেষ কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। সম্ভবত এর কারণ এই যে, তিনি ছিলেন একজন নীরব কর্মী মানুষ। খ্যাতি ও প্রচার ছিল তাঁর খুবই অপ্রিয়। তাঁর জিহাদে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য হতো আল্লাহ্র সন্তুষ্টি। এ জন্য একজন সাধারণ সিপাহী হিসেবে সৈন্য-বাহিনীতে যোগদান করতেন। আর এ ধরনের সাধারণ সিপাহীদের বিবরণ ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে বিশেষ একটা স্থান পায় না।
হযরত হাসান (রহ) যে একজন সাহসী পুরুষ ছিলেন সে কথা অনেকেই বলেছেন। ইমাম আয-যাহাবী (হি. ৭৪৮/খ্রী. ১৩৪৭) বলেছেন:
" كان أحد الشجعان الموصوفين يذكر مع قطرى بن الفجاءة."
-হাসান ছিলেন নন্দিত সাহসী বীরদের একজন- কাতারী ইবন আল-ফুজায়ার সাথে যার নামটি স্মরণ করা হয়। উল্লেখ্য যে, কাতারী ছিলেন উমাইয়্যা যুগের একজন বিখ্যাত খারিজী নেতা।
অত্যাচারী শাসক এবং স্বৈরাচারী আমীর-উমারার মুখোমুখি সত্যের ঘোষণা দান এবং আমর বিল মা'রূফ ও নাহি আনিল মুনকার ছিল উম্মাতের সত্যনিষ্ঠ মানুষের চিরকালীন বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তবে এক্ষেত্রে হাসান আল-বসরীর কর্মপদ্ধতি ছিল ভিন্ন ধরনের। তিনি তাদের বিপরীতে নীরব থাকা উত্তম মনে করতেন। 'আম্মারা ইবন মাহরান বলেন, একবার লোকেরা হাসান আল-বসরীকে বললো, আপনি শাসকদের নিকট গিয়ে তাঁদেরকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করেন না কেন? জবাব দিলেন, একজন মু'মিনের তার আত্মাকে হেয় করা উচিত নয়। এ যুগের আমীরদের তলোয়ার আমাদের জিহ্বাকে অতিক্রম করে গেছে। যখন আমরা তাঁদের সাথে কথা বলি তখন তাঁরা আমাদেরকে জবাব দেয় তলোয়ার দিয়ে। এ অবস্থায় তিনি জুলুমের তরবারির মুকাবিলায় তাওবার ঢাল ব্যবহারের উপদেশ দিতেন। আবু মালিক বলেন, হাসানকে যখন বলা হতো, আপনি ময়দানে নেমে এই অবস্থার পরিবর্তন করেন না কেন? বলতেন, আল্লাহ্ তরবারির সাহায্যে নয়, বরং তাওবার সাহায্যে পরিবর্তন করেন। তিনি বলতেন, যখন মানুষকে তাদের শাসকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের বিপদ-মুসীবতে ফেলা হয়, আর তারা ধৈর্য ধারণ করে, তখন আল্লাহ তাদেরকে খুব তাড়াতাড়ি সেই মুসীবত থেকে মুক্ত করেন। তবে যারা তরবারি কোষমুক্ত করে এবং তার উপর নির্ভর করতে আরম্ভ করে, আল্লাহর কসম! কখনো তার ভালো ফলাফল বের হয় না।
এ কারণে তিনি সব সময় যাবতীয় হৈ-হাঙ্গামা, বিশৃঙ্খলা ও বিপ্লব থেকে দূরে থাকতেন। উমায়‍্যাদের শাসনকালে অনেক বড় বড় বিপ্লব ও বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী তাদের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কিন্তু হযরত হাসান আল- বসরী নিজের নীতির ভিত্তিতে তার কোনটিতে অংশগ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয়, তিনি অন্যদেরকেও তাদের খপ্পরে পড়া থেকে বিরত রাখতেন। খলীফা 'আবদুল মালিকের সময় যখন ইবনুল আশ'আছ এবং ইয়াযীদ ইবন আবদুল মালিকের সময় ইবনুল মুহাল্লাব বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেন তখন কিছু মানুষ হাসান আল-বসরীকে জিজ্ঞেস করলো, এই ফিতনা ও বিশৃঙ্খলায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে আপনার মত কি? বললেন, দুই দলের কোনটির সাথে যোগ দেবে না। একজন শামী ব্যক্তি প্রশ্ন করে বসলো, আমীরুল মু'মিনীনের সাথেও কি যোগ দেওয়া যাবে না? তিনি শামী ব্যক্তিকে হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে পূর্বে উচ্চারিত বাক্যটি আবার উচ্চারণ করে বললেন, হাঁ, আমীরুল মু'মিনীনের সাথেও না। ৪
ইবনুল আশ'আছ হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বিশাল একটি দল, যার মধ্যে কিছু উঁচুস্তরের তাবি'ঈও ছিলেন, তাঁর পক্ষ অবলম্বন করে। 'উকবা ইবন আবদুল গাফির, আবুল জাওযা' ও আবদুল্লাহ ইবন গালিবের মত কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করলেন: আবু সা'ঈদ এমন খোদাদ্রোহী, যে অন্যায়ভাবে মানুষের রক্ত প্রবাহিত করে, অবৈধভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করে, নামায ত্যাগ করে, এমন এমন করে- তার সাথে লড়াই করার ব্যাপারে আপনার মত কি?
বললেন, আমার মতে লড়াই করা উচিত নয়। কারণ, সে যদি আল্লাহর 'আযাব হয়ে থাকে তাহলে তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে হঠাতে পারবে না। আর যদি বিপদ-মুসীবত হয়ে থাকে তাহলে ধৈর্য ধারণ করা উচিত। যতক্ষণ না আল্লাহ নিজেই তার ফায়সালা করেন। আল্লাহ বড় ফায়সালাকারী।
ইবনুল আশ'আছের বিপ্লব ও বিদ্রোহের সময়কালে হযরত হাসান আল-বসরী নিজেই বড় ধরনের মুসীবতে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোন রকম নিজকে বিপদমুক্ত করেন। তিনি এত বিশাল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যে, শুধু বসরা কেন, গোটা ইরাকে তাঁর বিরাট প্রভাব ছিল। ইবনুল আশ'আছের বিপ্লব থেকে তাঁর দূরে থাকার কারণে বহু সতর্ক মানুষ তাঁকে সাহায্য না করে দূরে সরে থাকতো। এ কারণে লোকেরা ইবনুল আশ'আছকে বললো, আপনি যদি চান যে, যেভাবে মানুষ উটের যুদ্ধে 'আয়িশার (রা) উটের পাশে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, সেভাবে আপনার জন্য যুদ্ধ করুক তাহলে যে কোন ভাবে হাসানকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে চলুন। এ পরামর্শের পর ইবনুল আশ'আহ তাঁকে জোর-জবরদস্তি সহকারে নিয়ে যান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে তিনি তো গেলেন। কিন্তু মানুষের দৃষ্টি যেই না তাঁর থেকে একটু উদাসীন হয়েছে, অমনি তিনি জীবন বাজি রেখে একটি নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর সাঁতার কেটে কোন রকম জীবন বাঁচিয়ে সেখান থেকে চলে আসেন।
সেই সময় সা'ঈদ ইবন আবিল হাসান নামে এক ব্যক্তি- যিনি হাজ্জাজের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং মানুষকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতেন, হাসান আল-বসরীর নিকট জানতে চাইলেন, আমরা না আমীরুল মু'মিনীনের আনুগত্য ত্যাগ করেছি, আর না তাঁকে সিংহাসন থেকে নামিয়ে আনতে চাচ্ছি। আমরা বরং কেবল এ কারণে আমীরুল মু'মিনীনের উপর বিরক্ত যে, তিনি হাজ্জাজের মত একজন জালিম ব্যক্তিকে শাসক বানিয়েছেন। এমতাবস্থায় আপনার মতামত কি? আর শামবাসীদের ব্যাপারেও বা আপনার ধারণা কি? তিনি হামদ ও ছানা পেশের পর বলেন: ওহে জনগণ! আল্লাহ হাজ্জাজকে শাস্তি হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে তরবারির সাহায্যে আল্লাহর শাস্তি র মুকাবিলা করবে না। বরং ধৈর্য, সহনশীলতা ও নীরবতা অবলম্বন কর।... আর আল্লাহর দরবারে অন্তরের প্রশান্তি ও বিনীত ভাব দ্বারা কাজ করবে। আপনারা শামীদের ব্যাপারে আমার মত জানতে চেয়েছেন। আমার ধারণা যে, হাজ্জাজ দুনিয়ার কিছু তাজা গ্রাসের বিনিময়ে তাদের দ্বারা কাজ করাতে পারেন। ৫৬
হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী শাসকদের জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে নীরব থাকেননি। যখনই তিনি নিজের মতামত, সিদ্ধান্ত ও ধ্যান-ধারণা প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছেন তখনই নির্ভীক চিত্তে সঠিক কথা বলে দিয়েছেন। এ বিষয়ে অনেক ঘটনা ও তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায়। ইয়াযীদ ইবন 'আবদুল মালিকের সময়ে 'উমার ইবন হুবায়রা খুরাসান ও 'ইরাকের ওয়ালী নিযুক্ত হন। তিনি 'ইরাকে এসে তথাকার শ্রেষ্ঠ 'আলিম, যেমন : হাসান আল-বসরী, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন এবং ইমাম শা'বীকে ডেকে ফাতওয়া জিজ্ঞেস করার ভঙ্গিতে তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেন: ইয়াযীদ আল্লাহর খলীফা। আল্লাহ তাঁকে বান্দাদের উপর তাঁর প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন। আল্লাহ তাঁর নিকট থেকে নিজের আনুগত্য এবং আমাদের (আমীরদের) থেকে ইয়াযীদের আদেশ-নিষেধের বাস্তবায়নের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন। আপনাদের জানা আছে যে, তিনি আমাকে ওয়ালী নিয়োগ করেছেন এবং আমার নিকট বিভিন্ন আদেশ-নিষেধ পাঠান। আমি তা কার্যকর করে থাকি। এ অবস্থায় এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি?
ইবন সীরীন ও শা'বী তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য অনেকটা পরোক্ষভাবে জবাব দিলেন। হাসান একেবারেই চুপচাপ ছিলেন। সবশেষে ইবন হুবায়রা তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। তিনি জবাব দিলেন এভাবে: 'ওহে ইবন হুবায়রা, ইয়াযীদের ব্যাপারে আপনি আল্লাহকে ভয় করুন, আল্লাহর ব্যাপারে ইয়াযীদকে ভয় করবেন না। আল্লাহ আপনাকে ইয়াযীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন। কিন্তু সে আপনাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচাতে পারবে না। সে সময় খুবই নিকটে যখন আল্লাহ আপনার নিকট এমন ফেরেশতা পাঠাবেন যে আপনাকে রাষ্ট্রীয় পদ থেকে নামিয়ে এবং প্রাসাদের প্রশস্ততা থেকে বের করে কবরের সংকীর্ণতার মধ্যে নিক্ষেপ করবেন। সে সময় কেবল আপনার কর্ম ছাড়া আর কেউ আপনাকে উদ্ধার করতে পারবে না।
আল্লাহ তাঁর দীন এবং তাঁর বান্দাদের সাহায্যের জন্য বাদশাহ ও বাদশাহী বানিয়েছেন। এ কারণে আল্লাহর দেয়া বাদশাহীর বদৌলতে আপনারা আল্লাহর দীন এবং তাঁর বান্দাদের ঘাড়ের উপর চেপে বসবেন না। আল্লাহর অবাধ্যতার ব্যাপারে কোন সৃষ্টির আনুগত্য করা উচিত নয়। সুতরাং ইয়াযীদ যা লিখেছেন তা আল্লাহর কিতাবের সাথে মিলান। যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে পালন করুন। আর যদি আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হয়, পালন করবেন না। কারণ, ইয়াযীদের চেয়ে আল্লাহ এবং ইয়াযীদের চিঠির চেয়ে আল্লাহর কিতাব আপনার নিকট অগ্রগণ্য। হাসানের (রহ) এ বক্তব্য শুনে ইবন হুবায়রা তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে থাপ্পড় মেরে বলেন: কা'বার প্রভুর শপথ! এই শায়খ আমাকে সত্য কথা বলেছেন। তারপর তিনি অঝোরে কাঁদতে থাকেন। এরপর তিনি হাসানকে (রহ) চার হাজার ও অন্যদেরকে দুই হাজার করে দিরহাম দানের নির্দেশ দেন। হাসান তাঁর দিরহামগুলি দরিদ্র লোকদের মধ্যে বিলি করে দেন। ৫৭
তিনি তিন ধরনের মানুষের সমালোচনাকে গীবত বলে মনে করতেন না। ১. প্রকাশ্য পাপাচারে লিপ্ত ফাসিক, ২. অত্যাচারী শাসক, ৩. বিদ'আতী ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে তার বিদ'আত ত্যাগ করে। ৫৮
হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ জুম'আর খুতবা এত দীর্ঘ করতেন যে, সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে যেত। শ্রোতারা যখন বিরক্ত হয়ে বার বার সূর্যের দিকে তাকাতো তখন তিনি তাদেরকে ধমক দিতেন এবং মনোযোগ সহকারে তাঁর বক্তব্য না শোনার জন্য তিরস্কার করতেন। হাসান আল-বসরী (রহ) হাজ্জাজের এরূপ আচরণের কঠোর ভাষায় নিন্দা করতেন। একবার তিনি হাজ্জাজ সম্পর্কে বলেন: 'এই ক্ষীণ ও দুর্বল দৃষ্টির ক্ষুদ্র লোকটির কর্মকাণ্ড কতনা বিস্ময়ের! সে এসে আমাদের দীনের ব্যাপারে আমাদেরকে পরীক্ষায় ফেলেছে, সে মিম্বরে উঠে খুতবা দিয়ে থাকে, আর লোকেরা সূর্যের দিকে তাকায়। সে বলে: তোমাদের কী হয়েছে, তোমরা সূর্যের দিকে তাকাও কেন? আল্লাহর কসম! আমরা সূর্যের জন্য নামায পড়ি না। আমরা নামায পড়ি সূর্যের প্রভুর জন্য। তোমরা কেন বলো না: হে আল্লাহর দুশমন, নিশ্চয় আল্লাহর রাতের কিছু অধিকার আছে যা তিনি দিনের বেলা কবুল করেন না। তেমনিভাবে আছে দিনের বেলার কিছু অধিকার যা তিনি রাতে কবুল করেন না।... এমন কথা তারা কেমন করে উচ্চারণ করবে? তাদের প্রত্যেকের মাথার উপর যে তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন করে তাগড়া জোয়ান সৈনিক। আর একবার তিনি হাজ্জাজের একটি ভাষণ শুনে মন্তব্য করেন: এর জন্য দুর্ভাগ্য। আল্লাহর ব্যাপারে সে কতনা ধোঁকার মধ্যে আছে। হাজ্জাজের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। একবার ইয়াযীদ আর-রাক্কাশী হাসান আল-বসরীর (রহ) মজলিসে বললেন: আমি হাজ্জাজের ভালো আশা করি। হাসান (রহ) বলে উঠলেন: আমি আশা করি আল্লাহ তোমার আশার বিপরীত কাজ করবেন।
বর্ণিত হয়েছে যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ ওয়াসিত নগরে একটি 'আলিশান বাড়ী তৈরী করেন। নির্মাণ কাজ শেষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণীর বহু মানুষকে আমন্ত্রণ জানান। হাসান আল-বসরীকেও (রহ) আমন্ত্রণ জানানো হলো। সেখানে জনসমাগম হবে এবং উপদেশমূলক কিছু কথা বলা যাবে- হযরত হাসান (রহ) এ সুযোগ হারাতে চাইলেন না। তিনি যথাসময়ে উপস্থিত হলেন। দেখলেন, অসংখ্য আমন্ত্রিত মানুষ ঘুরে-ফিরে বাড়ীটি দেখছে এবং তার নির্মাণ-শৈলী, কারুকাজ, মনোরম সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছে। তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং নিজেকে প্রস্তুত করে সমবেত জনতাকে সম্বোধন করে ভাষণ দিতে আরম্ভ করলেন। ভাষণটির কিছু অংশ নিম্নরূপ:
'সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের। পৃথিবীর রাজা-বাদশারা সবসময় নিজেদের সম্মান ও মর্যাদাকে দেখে, আর আমরা প্রতিদিন তাদের মধ্যে একটি করে উপদেশ ও অভিজ্ঞতা পেয়ে থাকি। তাদের অনেকে প্রাসাদ নির্মাণ করে, কারুকাজ করে, সুদৃশ্য ও কোমল বিছানায় সুসজ্জিত করে। উৎকৃষ্ট ও মনোরম পোশাক-পরিচ্ছদ ও উন্নত জাতের বাহনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তারপর লোভী-পারিষদবর্গ, নরকের শয্যাসঙ্গিনী ও অসৎ সহচররা তাকে সবসময় ঘিরে থাকে। আর সে বলে: ওহে তোমরা দেখ, আমি কী তৈরী করেছি! ওহে বিভ্রান্ত ব্যক্তি, আমরা দেখেছি। ওহে নিকৃষ্ট পাপাচারী, তারা কী ছিল? আসমানের অধিবাসীরা তোমার প্রতি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, আর দুনিয়ার অধিবাসীরা তোমাকে অভিশাপ দিয়েছে। তুমি অস্থায়ী ঘরকে বানিয়েছো, আর চিরস্থায়ী ঘরকে ধ্বংস করেছো, ধোঁকার জগতে তুমি ধোঁকা খেয়েছো। সুতরাং প্রতিফল লাভের জগতে অবশ্যই হেয় ও অপমানিত হবে। তিনি এভাবে বলে চলেছেন। এমন সময় শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন হাজ্জাজের প্রতিশোধের ভয়ে ভীত হয়ে বললো : ওহে আবু সা'ঈদ, থামুন, আপনি থামুন। যথেষ্ট হয়েছে। তারপর তিনি একথা বলতে বলতে বেরিয়ে যান : নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আলিমদের নিকট থেকে এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, তাঁরা যেন মানুষের নিকট আল্লাহর বিধান বর্ণনা করেন এবং তা যেন গোপন না রাখেন।'
হযরত হাসানের এ বক্তব্য হাজ্জাজের কানে গেল। তিনি রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্য থেকে শামের অধিবাসীদের ডেকে একত্র করলেন। তারপর তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন : ওহে শামের অধিবাসীগণ, তোমাদের উপস্থিতিতে বসরার একজন দাস আমাকে গালাগালি করলো, আর তোমরা তার কোন প্রতিবাদ করলে না? তারপর হাজ্জাজ হযরত হাসানকে (রহ) তাঁর দরবারে হাজির করার নির্দেশ দিলেন। তিনি ঠোঁট নেড়ে অস্ফুট স্বরে বিড় বিড় করে কিছু আওড়াতে আওড়াতে হাজ্জাজের নিকট উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে হাজ্জাজ বলে উঠলেন : ওহে আবু সা'ঈদ, আপনি যা কিছু বলেছেন, তা বলার সময় আমার ইমারাতের (শাসন কর্তৃত্বের) কোন হক কি আপনার উপর ছিল না? হযরত হাসান (রহ) জবাবে বললেন : হে আমীর! আল্লাহ আপনার প্রতি সদয় হোন! নিশ্চয় যে ব্যক্তি আপনাকে ভয় দেখিয়ে আপনার নিরাপত্তার বিশ্বাসকে শঙ্কাগ্রস্ত করে তুলেছেন, তিনি আপনার অধিকতর মঙ্গল আকাংখী ঐ ব্যক্তির থেকে যে আপনাকে নিরাপত্তার বাণী শুনায়। আপনি যা ধারণা করেছেন, আমার উদ্দেশ্য তা ছিল না। এখন আপনার হাতে দুইটি বিষয় আছে : ক্ষমা ও শান্তি। আপনি প্রথমটি করুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা করুন। তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম মুখপাত্র। তাঁর এ কথায় হাজ্জাজ লজ্জিত হন এবং যথেষ্ট হাদিয়া-তোহফা দিয়ে সম্মানের সাথে তাঁকে বিদায় করেন।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হযরত হাসান (রহ) প্রবেশের পর হাজ্জাজ তাঁকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলেন: এখানে, আমার কাছে বসুন। বসার পর হাজ্জাজ প্রশ্ন করেন: 'আলী ও 'উছমান সম্পর্কে আপনি কি বলে থাকেন? হাসান বললেন: আমি বলে থাকি আমার চেয়ে ভালো ব্যক্তির সেই কথাটি যা তিনি আপনার চেয়ে মন্দ এক ব্যক্তির নিকট বলেছিলেন। ফির'আওন মূসাকে (আ) বলেছিল: ৬৩
فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الأُولَى؟ قَالَ : عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي فِي كِتَابِ لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى.
অতঃপর সেই পূর্ববর্তী লোকদের অবস্থা কি? মূসা বললেন: তাদের জ্ঞান আমার পালনকর্তার কাছে একখানি গ্রন্থে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা হারিয়ে ফেলেন না এবং ভুলেও যান না。
'আলী ও 'উছমান (রা) সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। হাজ্জাজ বললেন: আবু সা'ঈদ, সত্যি আপনি 'আলিমদের নেতা। একথা বলার পর তিনি মূল্যবান সুগন্ধি ও 'আতর আনান এবং হযরত হাসানের (রহ) দাড়িতে নিজ হাতে মাখিয়ে দেন। তারপর সম্মানের সাথে তাঁকে বিদায় দেন। তিনি যখন হাজ্জাজের দরবার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন তখন দারোয়ান তাঁর পিছনে কিছুদূর যেয়ে বলে: আবু সা'ঈদ, হাজ্জাজ আপনার সাথে যে আচরণ করেছেন, আপনাকে ডেকে আনার উদ্দেশ্য কিন্তু তাঁর ভিন্ন ছিল। আপনি যখন হাজ্জাজের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন সেখানে উন্মুক্ত তরবারি হাতে জাল্লাদ দাঁড়িয়ে ছিল এবং মাথা কাটার জন্য চামড়াও বিছানো ছিল। আমার প্রশ্ন হলো, আপনি হাজ্জাজের সামনে উপস্থিত হওয়ার সময় ঠোঁট নেড়ে নেড়ে কি আওড়াচ্ছিলেন? বললেন: আমি বলছিলাম: ৬৪
يَا عُدَّتِي عند كربتي و يا صاحبي عند شِدَّتِي، ويا ولي نعمتي، وَيَا إلهي وإله آبائي إبراهيم واسحاق ويعقوب ارزقنى مودته، واصرف عنى أذاه.،
-'আমার বিপদের সময় হে আমার সাজ-সরঞ্জাম, আমার কষ্টকর ও দুঃসহ সময়ে হে আমার বন্ধু, হে আমার দান ও অনুগ্রহের মালিক, হে আমার ইলাহ এবং আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুবের (আ) ইলাহ! আপনি আমাকে তার ভালোবাসা দান করুন এবং তার শাস্তি থেকে আমাকে বাঁচান।' আমার প্রভু আমার কথা শুনেছেন।
বসরায় মারওয়ান ইবন আল-মুহাল্লাব মানুষকে শামীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উৎসাহ দিতেন। আর হাসান আল-বসরী সে সময় তাঁর আহ্বানে সাড়া দিতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন: ওহে মানুষ! তোমরা তোমাদের ঘরে অবস্থান কর, তোমাদের হাতকে গুটিয়ে রাখ এবং তোমাদের প্রভু আল্লাহকে ভয় কর। অস্থায়ী দুনিয়া এবং তার ভিতরের অতি তুচ্ছ জিনিস যার অধিকারীরা কেউ স্থায়ী নয়, তার প্রতি লোভের বশবর্তী হয়ে তোমরা একে অপরকে হত্যা করো না। এই দুনিয়াদার লোকেরা যা কিছু অর্জন করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি খুশী নন। জেনে রাখ, ফিতনা যখন দেখা দেয় তখন তার অধিকাংশ শিকার হয় বাগ্মী বক্তাগণ, কবিরা, নির্বোধ ব্যক্তিবর্গ এবং অহংকারী ও ভবঘুরে লোকেরা। একমাত্র অজ্ঞাত-অপরিচিত এবং অতি পরিচিত আল্লাহভীরু লোকেরা তা থেকে নিরাপদ থাকে। তোমাদের মধ্যে যারা গোপনে অপরিচিত অবস্থায় আছে তাদের উচিত সত্যকে আঁকড়ে থাকা এবং এই দুনিয়া নিয়ে মানুষ যে ঝগড়া-বিবাদ করছে তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখা। তাদের সত্য-প্রীতির জন্য আল্লাহ তাদরেকে মর্যাদা দান করবেন। আর তোমাদের প্রসিদ্ধ ভদ্রজনেরা- যারা তাদেরই সমগোত্রীয় লোকদের দুনিয়া নিয়ে দ্বন্দ্ব-ফাসাদ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে, আল্লাহ তাঁদেরকে হিদায়াত দান করবেন, বড় রকমের প্রতিদান দিবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট তারা সম্মানিত হবে। ৬৫
হযরত হাসানের (রহ) এসব কথা মারওয়ান ইবন আল-মুহাল্লাবের কানে গেল। তিনি জনগণকে সমবেত করে তাদের উদ্দেশ্যে বললেন: 'আমি জেনেছি, এই গর্বিত, পথভ্রষ্ট বৃদ্ধ (হাসান) মানুষকে আমার আহ্বানে সাড়া দিতে বারণ করছে। আল্লাহর কসম! তাঁর প্রতিবেশী যদি তাঁর ঘরের একটি বাঁশ খুলে নেয় তাহলে তাঁর নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। আমাদের কল্যাণ আমরা চাইবো, আমাদের উপর যে অত্যাচার-উৎপীড়ন চালানো হয় তার প্রতিবাদ আমরা করবো, তাতে কি তিনি আমার ও আমার শহরবাসীর বিরুদ্ধাচরণ করবেন? আল্লাহর কসম! হয় তিনি আমাদের আলোচনা এবং বসরার উবুল্লায় ও ফুরাতের তীরে বসবাসকারী নিম্ন শ্রেণীর লোক- যারা আমাদের কেউ নয়, তাদেরকে আমাদের পাশে সমবেত করা থেকে বিরত থাকবেন, না হয় আমি তাঁকে শক্ত লোহার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবো।' মারওয়ানের এ কথা হযরত হাসানের (রহ) কানে গেলে তিনি বললেন : আল্লাহর কসম! তার ইচ্ছা ও কামনা দ্বারা আল্লাহ আমাকে সম্মানিত করলে আমি অপছন্দ করবো না। লোকেরা বললো মারওয়ান যদি আপনার বিরুদ্ধে লড়তে চায়, আর আপনিও যদি তাই চান তাহলে আপনাকে আমরা রক্ষা করবো। হযরত হাসান (রহ) তাদেরকে বললেন তাহলে তো আমি আপনাদেরকে যা করতে নিষেধ করে থাকি, তারই বিরুদ্ধাচরণ করা হবে। আমি আপনাদেরকে অন্যদের সাথে মিলে একে অপরকে হত্যা না করতে বলে থাকি। আর আমিই এখন আমার সাথে যোগ দিয়ে একে অপরকে হত্যা করার জন্য আপনাদেরকে আহ্বান জানাবো? মারওয়ানের বিরুদ্ধে হযরত হাসান (রহ) তাঁর বক্তব্য বন্ধ করেননি। মারওয়ানও আর বেশী বাড়াবাড়ি করেননি। ৬৬
আন-নাদার ইবন 'আমরের যখন বসরার ওয়ালী তখন একদিন তিনি হাসান আল-বসরীকে (রহ) বলেন : ওহে আবু সা'ঈদ! আল্লাহ তা'আলা তো এই দুনিয়া এবং তার মধ্যে যত সৌন্দর্য ও ভোগের বস্তু আছে সবই তাঁর বান্দার জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি বলেছেন: ৬৭
كلوا واشربوا ولا تسرفوا إنه لا يحب المسرفين.
-তোমরা খাও, পান কর। অপচয় করো না। কারণ, তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। তিনি আরো বলেছেন: ৬৮
قل من حرم زينة الله التي أخرج لعباده والطيبات من الرزق، قل هي للذين امنوا في الحياة الدنيا.
-আপনি বলুন: আল্লাহর সাজ-সজ্জাকে- যা তিনি বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্যবস্তুসমূহকে কে হারাম করেছে? আপনি বলুন: এসব অনুগ্রহ আসলে পার্থিব জীবনে মুমিনদের জন্য।
জবাবে হাসান (রহ) বললেন: ওহে জনাব, আল্লাহকে ভয় করুন। যে কামনা-বাসনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আপনি আপনার অন্তরে প্রাধান্য দিচ্ছেন তা ত্যাগ করুন। কারণ, তা আপনাকে ধ্বংস করে ছাড়বে। না দুনিয়া, আর না আখিরাতের কল্যাণ কাউকে তার ইচ্ছা অনুযায়ী দেয়া হয়। ইহকাল ও পরকাল এই দুইটি ভিন্ন জগত। যে এখানে কাজ করবে সে তা লাভ করবে। আর সে এখানে তার জন্য নির্ধারিত অংশটুকুই পাবে। আর যে কাজ না করবে সে ইহ ও পরকাল উভয় জগতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আল্লাহ সুবহানাহু নবী মুহাম্মাদকে (সা) নির্বাচন করেন এবং তাঁকে রিসালাত দান করে গোটা সৃষ্টি জগতের প্রতি রাসূল হিসেবে পাঠান। তাঁর প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেন। দুনিয়াতে তাঁর জন্য কিছু সীমা নির্ধারণ করে দেন এবং এখানে তাঁর জীবনকালও বেঁধে দেন। তারপর আল্লাহ বলেন:
لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة. -নিশ্চয় তোমাদের জন্য আছে আল্লাহর রাসূলের জীবনের মধ্যে উত্তম আদর্শ।
-আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমরা যেন তাঁর আদেশ মেনে চলি, তাঁর পথ অনুসরণ করি, তাঁর সুন্নাতের উপর 'আমল করি। আমরা যতটুকু তা করতে পারবো, মনে করবো, তা সম্ভব হয়েছে সেই আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহে। আর যতটুকু করতে অপারগ হবো, তার জন্য আল্লাহর সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করবো। আর এটাই আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ। আর আশা-আকাঙ্ক্ষা, তার মধ্যে যেমন কোন কল্যাণ নেই, তেমনি নেই তাদের মধ্যেও যারা আশা-আকাঙ্ক্ষা হৃদয়ে পোষণ করে।
আন-নাদার বললেন : ওহে আবু সা'ঈদ! আমরা যে জীবনের মধ্যে আছি, সে অবস্থায় আমরা আমাদের প্রতিপালককে ভালোবাসবো।
হাসান (রহ) বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে একদল লোক এমন কথাই বলেছিল। আল্লাহ তখন এ আয়াতটি নাযিল করেন: ৭০
قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْنِیْ یُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ.
-(হে মুহাম্মাদ) আপনি তাদেরকে বলুন, যদি তোমরা আল্লাহ ভালোবাস তাহলে আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।
আল্লাহ সুবহানাহু তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণকে ভালোবাসার চিহ্ণ ও প্রমাণ হিসেবে, আর যারা তাঁর বিরোধী হবে তাদেরকে মিথ্যাবাদী ঘোষণা করেছেন। সুতরাং ওহে জনাব, আল্লাহকে ভয় করুন। আল্লাহর কসম! আপনার পূর্বে বহু জাতিকে আমি আপনার অবস্থানে দেখেছি। তারা সুউচ্চ গম্বুজ তৈরী করেছে, উন্নত জাতের বাহন পশু তাদেরকে খুশী করেছে, মানুষকে দেখানোর জন্য গর্বভরে দীর্ঘ আঁচল টেনে চলেছে, প্রাসাদ নির্মাণ করেছে, ভালো জিনিসগুলো নিজেরা বেছে নিয়েছে, পোশাক-পরিচ্ছদে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করেছে, কিন্তু একদিন তাদের ক্ষমতা থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, দুনিয়ায় যা কিছু তারা জমা করেছিল, সবই ছেড়ে যেতে হয়েছে। তাদেরকে তাদের মহাপ্রভুর সামনে হাজির হতে হয়েছে। তাদের কর্ম তাদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। শেষ বিচারের দিন তাদের ধ্বংস অনিবার্য। সেদিন তাদের অবস্থা হবে এরূপ: ৭১
يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ.
-যেদিন মানুষ পালাবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে। তার মা, বাবা, স্ত্রী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে। ৭২
আর একদিন তিনি আন-নাদার ইবন 'আমরের দরবারে উপস্থিত হয়ে নিম্নের উপদেশমূলক কথাগুলো বলেন:
ওহে আমীর! আল্লাহ আপনার সহায় হোন! সেই ব্যক্তি আপনার বন্ধু যে দীনের ব্যাপারে আপনাকে উপদেশ দেয়, আপনার দোষ দেখিয়ে দেয় এবং আপনাকে সত্য-সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়। আর সেই ব্যক্তি আপনার শত্রু যে আপনাকে ধোঁকা দেয় এবং আপনার প্রশংসা করে। ওহে আমীর! আল্লাহকে ভয় করুন! সত্য-সঠিক পথ, জীবনাচার, প্রকাশ্য ও গোপন সর্বক্ষেত্রে আপনি আপনার জাতির বিরুদ্ধাচরণ করছেন। তা সত্ত্বেও আপনি আশার পিছনে ছুটছেন এবং ওজর ও কৈফিয়ত তৈরি করছেন। আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করুন! মানুষ দু'ধরনের: দুনিয়ার অন্বেষণকারী ও আখিরাতের অন্বেষণকারী। আল্লাহর কসম! আখিরাতের অন্বেষণকারী তার অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পেয়ে গেছে এবং প্রশান্তিতে আছে। আর অন্য দলটি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত অবস্থায় ধ্বংস হয়ে গেছে। অতএব, হে আমীর! আপনি ক্ষণস্থায়ী জীবনের অন্বেষণ এবং চিরস্থায়ী জীবন পরিত্যাগের মাধ্যমে দুর্ভাগ্য ডেকে আনবেন না। তাহলে পরিণতিতে আপনাকে লজ্জা ও অনুশোচনায় জর্জরিত হতে হবে। শুনুন, একজন জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন:
'সেইসব রাজা-বাদশারা কোথায় যারা তাদের অংশের ব্যাপারে উদাসীন ছিল। আর এ অবস্থায় সাকী তাদেরকে মৃত্যুর পিয়ালা পান করিয়েছে?'
আমি বৃদ্ধির পর ঘাটতির এবং সত্য-সঠিক পথ প্রাপ্তির পর পথভ্রষ্টতার ব্যাপারে আল্লাহর পানাহ্ চাই। ওহে আমীর! কোন একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষের একটি কথা আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি বলতেন: 'একজন মানুষের ধোঁকা ও প্রতারণার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে কোন প্রতারকের বিশ্বাসভাজন হবে এবং তার কর্মকাণ্ডের সহায়ক হবে। ৭৩
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের (রহ) খিলাফতকাল ছিল হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) জীবনের সবচেয়ে বেশী আনন্দময় সময়। কারণ, তিনিও ছিলেন একজন দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ যাহিদ খলীফা। হযরত হাসান মাঝে মাঝে তাঁর দরবারে যেতেন এবং তাঁকে উপদেশ দিতেন। তাঁর সময়ে কিছু দিনের জন্য হযরত হাসান বিচারকের পদও অলংকৃত করেন। উভয়ের মধ্যে সব সময় পত্র যোগাযোগ হতো। ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে তাঁদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পত্র সংরক্ষিত রয়েছে। ৭৪ 'উমার ইবন 'আবদিল আযীয খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর হযরত হাসানকে লিখলেন:
'এ দায়িত্ব দিয়ে আমাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে। আমাকে সাহায্য করতে পারে এমন কিছু সাহায্যকারী আমার জন্য দেখুন।' জবাবে হযরত হাসান (রহ) লিখলেন: 'দুনিয়াদার লোক- তা তাদেরকে তো আপনি চাচ্ছেন না। আর আখিরাতমুখী মানুষ- তা তারা তো আপনাকে চাইবে না। সুতরাং আপনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করুন।'৭৫
খলীফা 'উমার ইবন 'আবদিল আযীযের (রহ) পুত্র আবদুল মালিকের ইনতিকালের পর হযরত হাসান (রহ) খলীফাকে সমবেদনা জানিয়ে একটি পত্র লেখেন। পত্রে কবিতার এই চরণটিও উল্লেখ করেন: ৭৬
وَعُوِّضْتَ أَجْرًا مِنْ فَقِيْدٍ فَلَا يَكُنْ + فَقِيدُكَ لَآيَأْتِي وَأَجْرُكَ يَذْهَبُ .
মৃতের বিনিময়ে আপনাকে প্রতিদান দেয়া হয়েছে। সুতরাং এমন যেন না হয় যে, আপনার মৃত ছেলেও ফিরে এলো না এবং আপনার প্রতিদানও চলে গেল।
হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর ন্যায়পরায়ণ শাসকের গুণাবলী কি তা জানতে চেয়ে হযরত হাসানকে (রহ) একটি পত্র লেখেন। জবাবে হযরত হাসান (রহ) খলীফাকে যে পত্রটি লেখেন তাতে ন্যায়পরায়ণ শাসকের একটি পরিচিতি তুলে ধরেন। পত্রটির কিছু অংশ নিম্নরূপ: ৭৭
'হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি জেনে রাখুন, আল্লাহ তা'আলা ন্যায়পরায়ণ শাসককে প্রত্যেক ঝোঁকপ্রবণ মানুষের জন্য অবলম্বন, প্রত্যেক অত্যাচারীর জন্য সত্য-সঠিক পথ, প্রত্যেক বিনষ্ট ও বিকৃত মানুষের জন্য সংশোধন, প্রত্যেক দুর্বলের জন্য শক্তি, প্রত্যেক অত্যাচারিতের জন্য সুবিচার এবং প্রত্যেক দুঃখিতজনের আশ্রয়স্থল করে দিয়েছেন। হে আমীরুল মু'মিনীন! ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন সেই রাখালের মত যে তার উটের প্রতি দয়াশীল, উটগুলোকে উৎকৃষ্ট চারণভূমিতে চরায়, বিপজ্জনক চারণভূমি থেকে রক্ষা করে, হিংস্র জীব-জন্তু থেকে আগলে রাখে এবং ঠাণ্ডা-গরমের কষ্ট থেকে রক্ষা করে। হে আমীরুল মু'মিনীন! ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন সেই পিতার মত যিনি তাঁর সন্তানদের প্রতি স্নেহপ্রবণ। তাদের শৈশব কালে আদর-স্নেহ দিয়ে লালন-পালন করেন, বড় হলে শিক্ষা দান করেন। জীবনকালে তাদের জন্য আয় করেন এবং মৃত্যুর পরেও তাদের খরচের জন্য সঞ্চয় করে রেখে যান। হে আমীরুল মু'মিনীন! ন্যায়পরায়ণ শাসক হলেন সেই স্নেহময়ী মায়ের মত যিনি তাঁর সন্তানকে পেটে ধারণ করার ও দুধ পান করানোর কষ্ট স্বীকার করেন, শৈশবে লালন-পালন করেন, সন্তান জেগে থাকলে তিনিও জেগে রাত কাটান, সন্তান ঘুমালে তিনিও ঘুমান, সন্তানকে কখনো দুধ পান করান, আবার কখনো দুধ পান থেকে বিরত রাখেন, সন্তানের সুস্থতায় উৎফুল্ল হন এবং অসুস্থতায় বিমর্ষ হয়ে পড়েন। হে আমীরুল মু'মিনীন! ন্যায়পরায়ণ শাসক আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে দণ্ডায়মান। তিনি আল্লাহর কথা শোনেন, বান্দাদের শোনান, তিনি আল্লাহকে দেখেন, তাদেরকে দেখান, তিনি আল্লাহর আনুগত্য করেন এবং তাদেরকে সেদিকে চালিত করেন। অতএব, হে আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহ আপনাকে যা কিছুর অধিকারী করেছেন সে সব বিষয়ে আপনি সেই দাসের মত হবেন না যার নিকট তার মনিব কোন কিছু গচ্ছিত রেখেছে, তার অর্থ-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও পরিবার-পরিজনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন, অতঃপর সে অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করে পরিবার-পরিজনকে বিতাড়িত করেছে। ফলে তারা বিত্তহীন হয়ে পড়েছে।
হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি মৃত্যু ও তার পরবর্তী অবস্থা এবং সেখানে আপনার লোক-লস্কর ও সাহায্যকারীর স্বল্পতার কথা স্মরণ করুন। আপনি মৃত্যু ও তার পরবর্তী মহা ভীতিকর অবস্থার জন্য পাথেয় প্রস্তুত করুন। হে আমীরুল মু'মিনীন! জেনে রাখুন, আপনি যে বাড়ীতে আছেন, সেটি ছাড়াও আপনার অন্য একটি বাড়ী আছে। সেখানে আপনার অবস্থান হবে অনেক দীর্ঘ। আপনার আত্মীয়-বন্ধুরা আপনাকে একাকী কবরের গর্ভে রেখে আপনার থেকে পৃথক হয়ে যাবে। আপনি সেই দিনের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করুন যে দিন কেউ আপনার সংগী হবে না। যে দিন মানুষ তার ভাই, মাতা-পিতা, স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে পালিয়ে যাবে। হে আমীরুল মু'মিনীন! আপনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করুন যখন কবরে যা আছে তা উত্থিত হবে এবং অন্তরে যা আছে তা প্রকাশ করা হবে। তখন সকল গোপন রহস্য প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর গ্রন্থ ছোট-বড় কিছুই উপেক্ষা করছে না। সবই লিখে রাখছে। অতএব হে আমীরুল মু'মিনীন! মৃত্যুর আগমন এবং আশা- আরজু বিচ্ছিন্ন হওয়ার পূর্বে আপনি সুযোগের ব্যবহার করুন। আপনি আল্লাহর বান্দাদেরকে জাহিলী আইন ও রীতি-পদ্ধতিতে শাসন করবেন না। আপনি তাদের সাথে অত্যাচারী শাসকদের মত আচরণ করবেন না। তাদের উপর ক্ষমতাগর্বী ও অহঙ্কারীদের মত প্রভুত্ব কায়েম করবেন না।'
একবার তিনি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযের (রহ) এক পত্রের জবাবে তাঁকে উপদেশ দেন এভাবে: ৭৮ 'এ দুনিয়া হচ্ছে স্বপ্ন, আর আখিরাত হচ্ছে বাস্তব। মৃত্যু এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থা। আমরা আছি স্বপ্নের ঘোরের মধ্যে। যে ব্যক্তি নিজের কৃতকর্মের হিসাব করেছে সে লাভবান হয়েছে, আর যে উদাসীন থেকেছে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে পরিণতির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে সে মুক্তি লাভ করেছে। যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। যে ধৈর্য ধরেছে, সফলকাম হয়েছে। যে ভয় করেছে, নিরাপদ থেকেছে। যে চিন্তা করেছে, দেখেছে। যে দেখেছে, বুঝেছে। যে বুঝেছে, জেনেছে। যে জেনেছে, 'আমল করেছে। আপনার যখনই পদস্খলন হবে, ফিরে আসবেন। যখন অনুতপ্ত হবেন, চলা শুরু করবেন। যখন কোন কিছু জানা না থাকে, জিজ্ঞেস করবেন। যখন রেগে যাবেন, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। মনে রাখবেন, নিজের নক্সকে সব সময় অনুগত রাখাই হলো সবচেয়ে ভালো কাজ।'
হাসান আল-বসরী (রহ) বিশ্বাস করতেন, হযরত 'উছমান ইবন 'আফফান (রা) অন্যায়ভাবে নিহত হন। তিনি একথাও বিশ্বাস করতেন যে, সিফফীন যুদ্ধের পরে 'আলী ইবন আবী তালিব (রা) ও মু'আবিয়া ইবন আবী সুফয়ানের মধ্যের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য শালিস নিয়োগ সঠিক ছিল না। তাঁর মতে খিলাফতের প্রকৃত অধিকারীর শালিস মেনে না নেয়াটাই উচিত ছিল। ৭৯
এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললো: আবূ সা'ঈদ! লোকেরা ধারণা করে, আপনি নাকি 'আলীর (রা) প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেন? একথা শুনে তিনি এত কাঁদলেন যে চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তারপর বললেন: 'আলী (রা) ছিলেন আল্লাহর শত্রুদের প্রতি নিক্ষিপ্ত তাঁর একটি সঠিক তীর। এই উম্মাতের রাব্বানী বা আল্লাহ ওয়ালা মানুষ, অনেক মর্যাদার অধিকারী এবং রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট-আত্মীয়। আল্লাহর আদেশের ব‍্যাপারে উদাসীন ও নিদ্রিত থাকতেন না, আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে বিতৃষ্ণ ও বীতস্পৃহ হতেন না, আল্লাহর অর্থও আত্মসাৎ করতেন না। আল-কুরআন তার সিদ্ধান্ত সমূহ দান করেছে, আর তিনি তা বাস্তবায়নে সফলকাম হন।৮০
সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাঁর একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে। একবার তাঁর উপস্থিতিতে সাহাবায়ে কিরাম প্রসঙ্গে আলোচনা উঠলো। তিনি বললেন: ৮১ رَحِمَ اللهُ ، شَهِدُوا وَغِبْنَا ، وَعَمِلُوا وَجَهَلْنَا ، فَمَا اجْتَمَعُوْا عَلَيْهِ اتَّبَعْنَا، وَمَا اخْتَلَفُوْا فِيْهِ وَقَفْنَا.
আল্লাহ তাঁদের প্রতি অনুগ্রহ ও করুণা বর্ষণ করুন। তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন, (উপস্থিত থেকেছেন) আমরা অনুপস্থিত ছিলাম। ঐকমত্য পোষণ করেছেন আমরা তা অনুসরণ করেছি। আর যা কিছুর ব্যাপারে মতপার্থক্য করেছেন, আমরা সেখানে থেমে গিয়েছি।
মুহাম্মাদ ইবন য়াযীদ বলেছেন। আবূ সা'ঈদ আল-হাসান আল-বসরী শাসক শ্রেণীকে অপছন্দ করতেন। তাঁদের মতের সাথে একমত হতেন না। তাঁর মজলিসে 'উছমানের (রা) প্রসঙ্গ উঠলে তাঁর প্রতি তিনবার আল্লাহর রহমত কামনা করতেন। আর যারা তাঁকে হত্যা করেছে তাদেরকে তিন বার লা'নাত (অভিশাপ) দিতেন। তিনি বলতেন, আমরা যদি তাদরেকে লা'নাত না দেই তাহলে আমাদেরকে লা'নাত দেয়া হবে। তারপর 'আলীর (রা) প্রসঙ্গ উঠলে বলতেন তিনি ছিলেন সব সময় সফলকাম, আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্ত মানুষ। ৮২
অহেতুক ও বাজে কথা তিনি খুব কম বলতেন। তাঁর বেশীরভাগ কথা ও আলোচনা হতো জ্ঞান ও উপদেশমূলক।৮৩
বিশুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে তিনি মানুষকে উপদেশ দান করতেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক রহস্যাবলী ও বিধি-নিষেধ স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন। তাঁর গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বাণীসমূহের কিছু এখানে উপস্থাপন করা হলো:৮৪
১. অন্তরমাঝে যে সব কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হয় এবং দূর হয়ে যায়, তা সব শয়তানের পক্ষ থেকে। এ সব কুমন্ত্রণা দূর করার জন্য আল্লাহর যিকর ও কুরআন তিলাওয়াতের সাহায্য নেয়া উচিত। আর যে সব কুমন্ত্রণা সৃষ্টি হয়ে স্থায়ী হয়ে যায়, বুঝতে হবে তা নফসের পক্ষ থেকে। আর তা দূর করার জন্য নামায, রোযা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সাহায্য নেয়া উচিত।
২. আল্লাহ যে বান্দার কল্যাণ চান তাঁকে পরিবার-পরিজনের বন্ধন ও ভালোবাসার মধ্যে জড়িত করেন না।
৩. বিনীত ও বিনম্র হওয়ার শর্ত এই যে, ঘর থেকে বেরিয়ে যার সাথে দেখা হবে তাকে নিজের চেয়ে ভালো ও বড় মনে করবে।
৪. বান্দা যখন পাপ করার পর তাওবা করে তখন তা আল্লাহর সাথে তার নৈকট্য বৃদ্ধি করে দেয়।
৫. এক ব্যক্তি হযরত হাসানের (রহ) নিকট তার অন্তর কঠোর ও শক্ত হওয়ার অভিযোগ করলো। তিনি তাকে বললেন, তুমি তোমার অন্তরকে যিক্র ও ফিকরের বিভিন্ন স্তরে উন্নীত কর।
৬. মৃত ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হয় তারই পরিবার-পরিজন। কারণ, তারা তার জন্য কান্নাকাটি করে। অথচ এর পরিবর্তে মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা কি তাদের জন্য সহজ হতো না?
৭. এক ব্যক্তির সাথে শত্রুতার বিনিময়ে হাজার মানুষের বন্ধুত্বও ক্রয় করো না।
৮. লালসা একজন 'আলিমকে হেয় ও অপমান করে।
৯. মানুষের প্রকাশ্যে নিজের নফসের নিন্দে মন্দ করা মূলত: তার প্রশংসা করারই নামান্তর।
১০. নিজের ভাইয়ের সম্মান করবে। তাহলে তাদের সাথে তোমার ভালোবাসার সম্পর্ক চিরকাল অটুট থাকবে।
১১. যদি নিজের মৃত্যুর চলাফেরার প্রতি আদম সন্তানের দৃষ্টি থাকতো তাহলে তার ধোঁকাবাজ আশা তার দুশমন হয়ে যেত।
১২. যে ব্যক্তি তার বিনয়ীভাবের জন্য পশমের মোটা পোশাক পরে, আল্লাহ তার দৃষ্টি ও অন্তরের আলো বাড়িয়ে দেন। আর যে লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে পরে, তাকে খোদাদ্রোহীদের সাথে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
১৩. হায়, আমি যদি এমন কোন খাবার খেতে পেতাম যা পেটে গিয়ে ইটে পরিণত হয়ে যেত! কারণ, আমি শুনেছি, ইট পানিতে তিন শো বছর পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে।
১৪. একবার তাঁর সামনে আলোচনা হচ্ছিল যে, ফকীহ্ এমন এমন কথা বলেন। তিনি বললেন, তোমরা কখনো ফকীহ্ দেখেছো কি? ফকীহ্ তিনি যিনি দুনিয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখেন, দীনের ব্যাপারে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হন এবং সব সময় আল্লাহ রাব্বুল 'আলামীনের ইবাদাতে নিমগ্ন থাকেন।
১৫. তিনি আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলতেন, যে ব্যক্তি অর্থ-সম্পদ ও সোনাকে সম্মান দিয়েছে, আল্লাহ তাকে হেয় ও অপমান করেছেন।
১৬. জ্ঞানী ব্যক্তিদের জিহ্বা তাদের অন্তরের পিছনে থাকে। যখন সে কিছু বলতে চায় তখন প্রথমে অন্তরের সাথে পরামর্শ করে। যদি সে কথায় তার কোন উপকার থাকে তাহলে বলে। অন্যথায় থেমে যায়। আর মূর্খ ব্যক্তির অন্তর থাকে তার জিহ্বার একেবারে আগায়। সে তার অন্তরের সাথে কোন পরামর্শ করে না। জিহ্বায় যা আসে তাই বক বক করে বলে যায়। তার পক্ষে হোক বা বিপক্ষে।
১৭. প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া হচ্ছে তোমাদের বাহন। যদি তোমরা তার পিঠে আরোহী হয়ে যাও সে তোমাদেরকে বহন করবে। আর সে যদি তোমাদের পিঠে আরোহী হয় তাহলে তোমাদের ধ্বংস করে ছাড়বে।
১৮. যদি তোমরা কোন ব্যক্তির সাথে শত্রুতা করতে চাও তাহলে প্রথমে তার উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখ। যদি সে আল্লাহর বাধ্য ও অনুগত হয় তাহলে এ কাজ থেকে দূরে থাক। কারণ, আল্লাহ কখনো তাকে তোমাদের আয়ত্তে দেবেন না। তোমাদের জন্য একাকীও তাকে ছেড়ে দেবেন না। আর যদি সে আল্লাহর না ফরমান বান্দা হয় তাহলে তোমাদের তার সাথে শত্রুতার কোন প্রয়োজনই নেই। নিজেদের নফসকে অহেতুক এ শত্রুতায় জড়িয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত করো না। কারণ, সে নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহর সাথে শত্রুতাই তার ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট।
১৯. যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে তার সাথে বন্ধুত্ব করা তোমাদের জন্য জরুরী। কারণ, যে ব্যক্তি সৎ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষকে ভালোবাসে, সে যেন আল্লাহকেই ভালোবাসে।
২০. আমি এমন কোন ব্যক্তিকে দেখিনি যে দুনিয়া চেয়েছে এবং সে আখিরাত পেয়েছে। এর বিপরীতে যে আখিরাত চায় সে দুনিয়াও পেয়ে যায়। তাহলে এমন জিনিস কেন চাওয়া হবে না যাতে দুইটি জিনিসই পাওয়া যায়?
২১. ইসলাম এই যে, তুমি তোমার অন্তর আল্লাহর নিকট অর্পণ করবে এবং প্রত্যেক মুসলিম তোমার হাত থেকে নিরাপদ থাকবে।
২২. তিনি বলতেন, দুনিয়ার সব মানুষের যদি প্রচুর বুদ্ধি থাকতো তাহলে দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যেত।
তাঁর মতে মানুষ তিন প্রকারের। এক প্রকারের মানুষ খাদ্যের মত যা সবার প্রয়োজনে আসে। আর এক প্রকারের মানুষ হলো ঔষধের মত- মাঝে মাঝে যার প্রয়োজন পড়ে। তৃতীয় প্রকারের মানুষ হলো রোগের মত। কোন দিন যার কোন প্রয়োজন কেউ বোধ করে না।
২৩. তিনি বলতেন : মন্দের মূল তিনটি এবং শাখা ছয়টি। মূল তিনটি হলো: হিংসা- বিদ্বেষ, লোভ-লালসা এবং দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা। আর শাখা ছয়টি হলো: নিদ্রা, পেট ভরে খাওয়া, আরাম-আয়েশ, নেতৃত্ব, প্রশংসা পাওয়া ও গর্ব- অহংকারের প্রতি আকর্ষণ ও ভালোবাসা।
২৪. তাঁর মতে, একজন মানুষ 'আলিম হলেই 'আবিদ হয় না। কখনো কোন মানুষ 'আলিম হয়, কিন্তু 'আবিদ হয় না। এ দু'টি ভিন্ন জিনিস। দু'টিকে পৃথকভাবে অর্জন করতে হয়। তাই অনেক সময় অনেক নির্বোধ ও স্বল্পবুদ্ধির মানুষও বড় 'আবিদ হয়ে থাকেন। কথাটি অন্যভাবেও বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলতেন: একজন মানুষ কখনো 'আবিদ হয়, কিন্তু বুদ্ধিমান হয় না। আবার কখনো একজন মানুষ 'আবিদ ও বুদ্ধিমান- দু'টিই হয়, কিন্তু জ্ঞানী হয় না।
২৫. তিনি বলতেন : জ্ঞান দুই প্রকার। অন্তরে অর্জিত জ্ঞান ও জিহ্বায় অবস্থিত জ্ঞান। প্রথম প্রকারের জ্ঞানই কল্যাণকর। আর দ্বিতীয় প্রকারের জ্ঞান আল্লাহর বান্দাদের উপর তাঁর সাক্ষ্য-প্রমাণ।
হযরত হাসান (রহ) তাঁর সংগী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবদের প্রয়োজনের প্রতি সব সময় সতর্ক থাকতেন। তিনি বলতেন: এক বছরের 'ইবাদতের চেয়ে আমার কোন ভাইয়ের একটি প্রয়োজন পূরণ করা আমার নিকট বেশী প্রিয়।৮৫
তিনি আমীর-উমারাদের প্রদত্ত হাদীয়া-তোহফা গ্রহণ করতেন। হিশাম ইবন হাসান বলেন : আমি নিশানা দেয়া চার কোণা বিশিষ্ট একটি কালো কাপড়ের উপর হাসানকে নামায আদায় করতে দেখেছি। মাসলামা ইবন 'আবদিল মালিক সেই কাপড়টি তাঁকে হাদীয়া দেন। ৮৬
তিনি ছিলেন বিনয় ও নম্রতার প্রতীক। ভদ্রতা, ও শিষ্টাচারিতার বাস্তব নমুনা। ইমাম আল-আসমা'ঈ বর্ণনা করেছেন। 'উছমান আশ-শাহহাম একদিন হাসানের (রহ) দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ডাকালেন : ওহে আবূ সা'ঈদ! তিনি সাড়া দিলেন এই বলে : ওহে জনাব, আমি আপনার সামনে হাজির। তিনি বললেন: আমার আহ্বানে এমনভাবে সাড়া দিচ্ছেন? হাসান বললেন : আমি আমার চাকর-বাকরের ডাকেও এমনভাবে সাড়া দিয়ে থাকি। ৮৭
কারো সংগে দেখা হলে তার সাথে সালাম বিনিময়ের পূর্বে ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করা তিনি পছন্দ করতেন না। আবূ বাকর ইবন আবী শায়বা বলেন: হাসান, ইবরাহীম ও মায়মূন ইবন মাহ্রান- কোন ব্যক্তি আস্-সালাম না বলা পর্যন্ত 'আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন'- এ জাতীয় কথা বলা মোটেই পছন্দ করতেন না। ৮৮
ইবন 'আবদি রাব্বিহি বলেছেন, অসাধারণ প্রতিভা, ফিকাহ্ শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান এবং অতুলনীয় যুহদ ও তাকওয়ার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হাসান আল-বসরী (রহ) তাঁর জীবনে এক পর্যায়ে খুরাসানে আর-রাবী' ইবন যিয়াদ আল-হারিছীর সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করেন। তারপর হযরত 'উমার ইবন 'আবদুল 'আযীয (রহ) তাঁকে বসরার কাজী নিয়োগ করেন। এ সময় জনৈক ব্যক্তি 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীযকে প্রশ্ন করে: বসরার কাজী হিসেবে কাকে নিয়োগ দিলেন? তিনি বললেন: আমি তাবি'ঈদের নেতা আল-হাসান ইবন আবিল হাসান আল-বসরীকে বসরার কাজী নিয়োগ করেছি।৮৯
এভাবে তিনি হযরত হাসান আল-বসরীকে তাবি'ঈদের নেতা বলে উল্লেখ করেছেন।
হযরত হাসান ছিলেন নন্দিত সাহসী বীরদের একজন। বীরত্ব ও সাহসিকতায় উমাইয়্যা যুগের বিখ্যাত খারিজী নেতা কাতারী ইবন ফুজাআর সাথে তাঁর নামটি স্মরণ করা হয়।১০
হযরত হাসানের (রহ) ওয়াজ-নসীহতের ভিত্তি ছিল আল-কুরআন, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ এবং সাহাবায়ে কিরামের জীবন ও কর্ম। বিশেষতঃ 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) জীবন। তিনি 'উমারের (রা) বহু কথা ও উপদেশ বাণী বর্ণনা করেছেন। ১১
তিনি তাঁর ওয়াজ-নসীহতে সব সময় মানুষকে এই দুনিয়া ও এর ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসিতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাতেন। পরকালের জীবন এবং সেখানে পাপীরা যে শাস্তি ভোগ করবে তা স্মরণ করিয়ে দিতেন। তাকওয়া ও 'আমলে সালিহ-এর প্রতি উৎসাহ দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ, যাঁরা দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করে আখিরাত কামনা করেছেন, তাঁদেরকে অনুসরণের আহ্বান জানাতেন। তিনি বলতেন: তাঁরা ছিলেন আঙ্গুর গাছের মত, যার পাতা সুন্দর এবং ফল সুমিষ্ট। আল-জাহিজ তাঁর বহু উপদেশ বাণী সংকলন করেছেন। এখানে তাঁর একটি ওয়াজের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো: ৯২
'ওহে আদমের সন্তান! তুমি তোমার দুনিয়াকে আখিরাতের বিনিময়ে বিক্রি করে দাও। তাহলে দু'টিতেই লাভবান হবে। দুনিয়ার বিনিময়ে আখিরাতকে বিক্রি করো না, আর তা করলে দু'টিতেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওহে আদমের সন্তান! যখন তুমি কাউকে কোন ভালো কাজ করতে দেখবে তখন তুমি তার প্রতিযোগিতা করবে। আর যদি কাউকে কোন খারাপ কাজের মধ্যে দেখ তাহলে তার প্রতিযোগিতার ইচ্ছা করবে না। এখানে অবস্থান অল্পদিনের, আর সেখানের অবস্থান অতি দীর্ঘ। আল্লাহর কসম! জেনে রাখ, তোমাদের এই উম্মাতের পর আর কোন উম্মাত নেই। আর তোমাদের নবীর পরে অন্য কোন নবী নেই এবং তোমাদের কিতাবের পরে আর কোন কিতাব নেই। তোমরা মানুষকে চালনা করছো, আর সময় বা কাল তোমাদেরকে চালিত করছে। যিনি মুহাম্মাদের (সা) সাক্ষাৎ লাভ করেছেন, দেখেছেন যে, তিনি প্রতিদিনের প্রয়োজন পূরণের জন্য সকাল-সন্ধ্যা কাজ করেছেন। তিনি ইটের উপর ইটও যেমন রাখেননি, তেমনি বাঁশের উপর বাঁশও রাখেননি। তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের জীবনের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
এ পৃথিবীর বহু জাতি ও সম্প্রদায় তাঁর জীবনের প্রতি অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং তাঁর রব বা প্রভু যে জন্য তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট, তা তারা ঘৃণা করেছে। তাই আল্লাহ তাদেরকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে ধ্বংস করেছেন।
ওহে আদমের সন্তানেরা! তোমরা জেনে রাখ, যে দিন তোমরা মায়ের পেট থেকে পড়েছো, সেদিন থেকেই তোমাদের নির্ধারিত আয়ু কমছে। আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি করুণা করুন, যে দেখে, তারপর চিন্তা করে। চিন্তা করে, তারপর উপদেশ গ্রহণ করে। দেখে, তারপর ধৈর্য ধরে। অনেক জাতি-গোষ্ঠী দেখে, কিন্তু ধৈর্য ধারণ করে না, ভয়- ভীতি তাদের অন্তরকে নিয়ে যায়। তারা যা চায় তা পায়নি এবং যা ছেড়ে এসেছে সেখানে আর ফিরে যায়নি।
ওহে আদমের সন্তান! তোমরা আল্লাহর এ বাণী স্মরণ কর: ৯৪
وكل انسان الزمناه طائره في عنقه ونخرج له يوم القيامة كتابا يلقاه منشورا ، اقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا.
- আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি। কিয়ামতের দিন বের করে দেখাবো তাকে একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে। পাঠ কর তুমি তোমার কিতাব। আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমিই যথেষ্ট।
তোমরা দুনিয়ার স্বচ্ছতাকে গ্রহণ কর এবং পঙ্কিলতাকে বর্জন কর। যা পঙ্কিল হয় তা স্বচ্ছ নয়, আর যা স্বচ্ছ হয় তা পঙ্কিল নয়। যা তোমাদেরকে সন্দেহ-সংশয়ে ফেলে তা ছেড়ে দাও- সেই পর্যন্ত যা তোমাদেরকে সন্দেহে ফেলে না। অনৈতিকতার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, আলিমদের সংখ্যা কমে গেছে, সুন্নাহর বিলুপ্তি ঘটেছে এবং বিদ'আত ছড়িয়ে পড়েছে। আমি এমন সব লোকের সঙ্গ পেয়েছি যাঁদের সাহচর্য চোখের পুত্তলি ও অন্তরের স্বচ্ছতা ছাড়া আর কিছু ছিল না। আল্লাহ তোমাদের জন্য যা কিছু হারাম করেছেন তা তোমরা যতটুকু পরিহার করে চলো, তাঁরা তার চেয়ে বেশী পরিহার করে চলতেন আল্লাহ তাঁদের জন্য যা কিছু হালাল করেছেন, তা। তোমরা উত্তর ঠিক করে রেখ। কারণ, তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি সেই যে তার নিজের মত ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার দীনকে গ্রহণ করে না। বরং তার প্রভুর পক্ষ থেকে যেভাবে এসেছে সেভাবে গ্রহণ করে। যে দুনিয়ার প্রশংসা করেছে, সে আখিরাতের নিন্দামন্দ করেছে। আল্লাহর সাক্ষাৎকে কেবল সেই ব্যক্তি অপছন্দ করে যে তাঁর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে অবস্থানকে পছন্দ করেছে।'
হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) ওয়াজ ছিল সাহাবীদের ওয়াজ-নসীহতের ন্যায় সহজ সরল ও আকর্ষণীয়। তাতে দুনিয়ার অনিত্যতা, জীবনের অবিশ্বস্ততা, আখিরাতের গুরুত্ব, ঈমান ও 'আমলের শিক্ষা, তাকওয়া ও খোদাভীতির প্রশিক্ষণ এবং নাফসের ফেরেব ও ধোঁকার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকতো। যে যুগে মানুষের কাঁধের উপর বস্তুবাদের মারাত্মক দানব ভর করেছিল, মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) বিধি-বিধান সম্পর্কে গাফিল হয়ে পড়েছিল এবং সাধারণ মানুষ, এমন কি বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিও ধন-দৌলত, সুখ-সম্ভোগ ও ভোগ-বিলাসিতার সয়লাবে খড়কুটোর ন্যায় ভেসে যাচ্ছিল, সে যুগে এরূপ ওয়াজ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজনও ছিল। যেহেতু তিনি সাহাবায়ে কিরামের (রা) যুগ নিজ চোখে দেখেছিলেন, তাঁদের সুহৃত ও সাহচর্যের ফয়েয ও বরকত লাভে ধন্য হয়েছিলেন, তারপর উমায়‍্যাদের স্বৈরাচারী শাসনও দেখেছিলেন, তাই তাঁর ওয়াজ-নসীহতে অধিকাংশ সময় বিরাট আবেগ ও দরদের সাথে সাহাবায়ে কিরামের (রা.) ঈমানী অবস্থা এবং 'আমল-আখলাকের বৈশিষ্ট্যগুলোর চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যেত। যখন তিনি তাঁর দেখা দুটো যুগের তুলনা করতেন তখন তাঁর দরদী অন্তরে দারুণ আবেগ সৃষ্টি হতো। ফলে তাঁর বর্ণনা অব্যর্থ তীরে পরিণত হতো। তাঁর ওয়াজসমূহ শুধু হৃদয়গ্রাহী ও চিত্তাকর্ষকই ছিল না; বরং তা ছিল সে যুগের বাকপটুতা, আলংকারিক ভাষা ও উন্নতমানের সাহিত্যেরও নমুনা। একবার তিনি তাঁর এক ওয়াজে সে যুগের অধিবাসীদের অবস্থার পর্যালোচনা এবং সাহাবায়ে কিরামের (রা) আদর্শ চরিত্রের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:
'হায় আফসোস! আশা-আকাংখা ও কল্পনা-বিলাসী পরিকল্পনা মানুষকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মুখে বড় বড় কথা আছে, কিন্তু কাজে নেই। 'ইলম ও মা'রিফাত আছে, কিন্তু তার দাবী পূরণ করবার জন্য ধৈর্য নেই। ঈমান আছে, কিন্তু য়াকীন নেই। আমার কী হয়েছে, আমি মানুষ দেখি, তবে কোন বুদ্ধিমান মানুষ পাই না। লোকেরা প্রবেশ করে, অতঃপর তারা বের হয়ে যায়। তারা সবকিছু জানে, তারপর তা অস্বীকার করে। প্রথমে তারা একটি বস্তুকে হারাম করে, তারপর তাকেই আবার হালাল করে নেয়। তোমাদের দীন ও ধর্ম তোমাদের মুখের একটি মিষ্টি-মধুর উচ্চারণ ছাড়া আর কিছু নয়। যদি প্রশ্ন করা হয়, হিসাব-নিকাশের দিনে তুমি বিশ্বাসী? জবাব দেয়, হাঁ। শেষ বিচার দিনের মালিকের কসম! সে মিথ্যা বলে। মু'মিনের আখলাক ও চরিত্র এই যে, দীনের ক্ষেত্রে সে হবে শক্ত, ঈমানে হবে পাকাপোক্ত। তার থাকবে 'ইলম'-এর সাথে 'হিলম' (বিচক্ষণতা) এবং হিলম-এর সাথে 'ইলম। সে হবে বুদ্ধিমান, তবে নম্র প্রকৃতির। সংযম তার দারিদ্র ও অভাব-অনটনকে ঢেকে দেবে। ধনী হয়ে গেলেও মধ্যমপন্থা সে কখনো পরিত্যাগ করবে না। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সে মিতাচারী, বিপর্যস্ত মানুষের প্রতি দয়ালু ও দানশীল, অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে দরাজ হস্ত, উদার মন এবং ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে জোর তৎপর ও অনড়।'
এভাবে এ বক্তৃতায় তিনি মু'মিনের চরিত্রের গুণ-বৈশিষ্ট্য অতি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।
প্রায় অধিকাংশ ওয়াজের পর তিনি বলতেন: এই ওয়াজ ও নসীহতের ভিতর তো কোন জিনিসের ঘাটতি নেই, তবে অন্তরের মধ্যেও প্রাণ স্পন্দন থাকতে হবে। ১৬
হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) একবার রমাদান মাসে একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা হাসাহাসি করছিল, তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: 'ওহে লোকেরা! আল্লাহ তা'আলা রমাদান মাসকে তাঁর সৃষ্টির জন্য প্রতিযোগিতার ময়দান করে দিয়েছেন। যেখানে তারা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের জন্য প্রতিয়োগিতা করবে। একটি দল অগ্রগামী হয়েছে। সুতরাং তারা সফলকাম হয়েছে। আরেকটি দল পিছনে পড়ে গেছে। সুতরাং তারা ব্যর্থ হয়েছে। আজকের দিনে অহেতুক হাসি-তামাশায় লিপ্ত ব্যক্তিদের দেখে অবাক হতে হয়, যে দিন প্রতিযোগিতায় অগ্রগামীরা সফলকাম হচ্ছে, আর পশ্চাৎগামীরা ব্যর্থ হচ্ছে। ওহে, আল্লাহর কসম! দৃষ্টির পর্দা যদি উঠে যেত তাহলে সৎকর্মশীলকে তার সৎকাজ এবং অসৎকর্মশীলকে তার অসৎকাজ ব্যস্ত করে রাখতো।
তিনি বলতেন: ওহে আদমের সন্তান! তুমি তোমার নির্ধারিত জীবনকাল অতিক্রম করতে পারবে না। তোমার সব আশা-আকাংখাও পূর্ণ করতে পারবে না। তোমার নির্ধারিত রিযক লাভেও ব্যর্থ হবে না। নির্ধারিত রিযকের বাইরে অতিরিক্ত রিযকও তোমাকে দেয়া হবে না। তাহলে তুমি কিসের জন্য জীবনপাত করছো?'৯৮
'আব্বাসীয় যুগের প্রখ্যাত লেখক আল-জাহিজের 'আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন', ইবন কুতায়বার "উয়ূন আল-আখবার', ইবন 'আবদি রাব্বিহি-এর 'আল-'ইকদ আল- ফারীদ'সহ বিভিন্ন বিখ্যাত গ্রন্থে হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) প্রচুর ওয়াজ-নসীহত ও বাণী সংকলিত রয়েছে। আস-সাররাজের 'আল-লুম'আ' ও আবূ নু'আয়মের 'হিলয়াতুল আওলিয়া' গ্রন্থসহ বহু প্রাচীন গ্রন্থে তাঁর জীবনী আলোচিত হয়েছে। ইমাম আল-গাযালী তাঁর 'ইহয়া'উ 'উলূম আদ-দীন' গ্রন্থে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে বার বার তাঁর নাম ও বাণী উল্লেখ করেছেন।
হাসান আল-বসরীর ব্যক্তিত্ব এবং দা'ঈ হিসেবে তাঁর যোগ্যতা
হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) মধ্যে আল্লাহ তা'আলা সেই সব যোগ্যতারই সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন যা সেই যুগের বিশেষ অবস্থায় দীন ও ধর্মের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং দীনী দা'ওয়াত কার্যকর করার জন্য খুবই জরুরী ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে সামগ্রিকতা, হৃদয়গ্রাহিতা এবং পরিপূর্ণতার সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি দীনের ক্ষেত্রে পূর্ণ পাণ্ডিত্য এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। উন্নত ও উঁচু স্তরের মুফাস্সির এবং নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছ ছিলেন। তাঁকে বাদ দিয়ে সে যুগে ইজতিহাদ ও সংস্কারমূলক কাজ আঞ্জাম দেয়া সম্ভব হতো না। সাহাবায়ে কিরামের (রা) একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি পেয়েছিলেন এবং সে যুগটিকে তিনি খুব ভালোমতই অধ্যয়ন করেছিলেন। মুসলমানদের জীবনে এবং ইসলামী সমাজে যে সব পরিবর্তন ঘটেছিল তিনি সে সবের উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তিনি তাঁর যুগের সমাজ এবং সমাজের প্রতিটি শ্রেণীর জীবন-যিন্দেগী সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন। সমাজের বৈশিষ্ট্যাবলী এবং তার রোগব্যাধি সম্পর্কেও একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ন্যায় ওয়াকিফহাল ছিলেন।
হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) দা'ওয়াত ও ইসলাহী (আহ্বান ও সংস্কার) কর্মকাণ্ডের শক্তি ও প্রভাবের মধ্যে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি জীবনের এক একটি দিক পাকড়াও করেছেন এবং সমাজের আসল রোগ কোথায় তা খতিয়ে দেখেছেন। তাঁর যুগে আরো অনেক ওয়া'ইজ ও দা'ঈ ছিলেন, কিন্তু তৎকালীন সমাজ যেভাবে তাঁর দা'ওয়াতকে গ্রহণ করেছিল সেভাবে অন্য কারো দা'ওয়াতকে গ্রহণ করেনি। এর কারণ, তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ ও দারস থেকে সে যুগের বিগড়ে যাওয়া সমাজের উপর সরাসরি চপেটাঘাত পড়তো। যেমন, তিনি নিফাকের স্বরূপ বর্ণনা করতেন, মুনাফিকদের চরিত্র ও অভ্যাসসমূহ স্পষ্ট করে তুলে ধরতেন। কারণ, তিনি দেখেছিলেন সে যুগের শাসক শ্রেণী, সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যে অগ্রগামী ব্যক্তিবর্গ এবং সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল সদস্যদের জীবনে কিভাবে তার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। তিনি আখিরাত বিস্মৃতি এবং পার্থিব কামনা-বাসনা ও লোভ-লালসার প্রাবল্যের নিন্দা করতেন। সে যুগের অনেক লোকই এই সংক্রামক রোগের শিকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি মৃত্যু ও তার পরবর্তী অনন্ত জীবনের ছবি আঁকতেন এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে শ্রোতার চোখের সামনে তা তুলে ধরতেন। ক্ষমতাশীল ও প্রচুর বিত্ত-বৈভবের অধিকারী লোকদের এমন একটি শ্রেণী সে সময়ে গড়ে উঠেছিল যারা মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে একেবারে উদাসীন হয়ে পড়েছিল।
মোট কথা, তাঁর দা'ওয়াত, ওয়াজ-নসীহত ও সংস্কারমূলক দাস সে যুগের মন-মানস ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সংগে এতই সংঘাত ও সংঘর্ষশীল ছিল যে, তৎকালীন সমাজের পক্ষে তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা কিংবা সম্পর্কচ্যুত হয়ে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। তাই অধিকহারে লোক তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ শুনতো এবং তাদের পাপক্লিষ্ট মনে দাগ-কাটতো। তিনি তাঁর বক্তৃতা ও হালকায়ে দারস থেকে দীন ও ঈমানের দিকে মানুষকে আহ্বান জানাতেন এবং নিজের সাহচর্য ও 'আমল দ্বারা তাদের আত্মাকেও প্রশিক্ষণ দিতেন। ষাট বছরের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি এই দা'ওয়াতী কার্যক্রম ও সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। আর এতে ঈমান, ইসলাম ও 'আমলের বাস্তব সত্য লাভ করে ধন্য হয়েছে অগণিত মানুষ। 'আওয়াম ইবন হাওশাব বলেন হাসান (রহ) ষাট বছর পর্যন্ত স্বীয় কাওমের মধ্যে সেই কাজটি করেছেন যা আম্বিয়ায়ে কিরাম নিজ নিজ উম্মাতের মধ্যে করতেন।১৯
আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিদের অনেকে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার আগেই আল্লাহ ইশারা-ইঙ্গিতে দুনিয়াবাসীকে তা জানিয়ে দেন। খোদ কুরআন পাকেই রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের ইঙ্গিত দান করা হয়েছিল। কোন কোন ব্যক্তি স্বপ্নের মাধ্যমে হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) ওফাতের ইশারা লাভ করেছিলেন। তাঁর ওফাতের অল্প কিছু দিন পূর্বে এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে, একটি পাখী মসজিদের সবচেয়ে সুন্দর পাথরটি উঠিয়ে নিয়ে গেছে। সে যুগে স্বপ্নের সবচেয়ে বিখ্যাত তা'বীর (ব্যাখ্যা) কারী ছিলেন হযরত ইবন সীরীন। তিনি এ স্বপ্নের তা'বীর করেন এই বলে যে, হাসান (রহ) ইনতিকাল করবেন।১০০
এই স্বপ্নের অল্প কিছু দিন পরেই হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। অসুস্থতার মধ্যে তিনি বলতেন, "হায়, মানুষ যদি তার সুস্থতার সময় অসুস্থতার সময়ের জন্য কিছু রেখে দিত।" জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে তিনি ছেলেকে তাঁর রচনাবলী একত্র করার নির্দেশ দিলেন। ছেলে নির্দেশ পালন করলেন। তারপর চাকরকে চুলা জ্বালাতে বললেন। তারপর সেই আগুনে নিজের সমস্ত রচনাবলী নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলেন। শুধুমাত্র একখানি গ্রন্থ বাকী রাখলেন। ১০১ সম্ভবত: এটি পবিত্র কুরআন বিষয়ক ছিল। কুরআনের সম্মানেই এটি রেখে দেন।
জীবনের একেবারে প্রান্তবেলায় লেখককে ডেকে তিনি লেখালেন : হাসান একথা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে,
لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ. - আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর রাসুল। আর যে মরণকালে অন্তরের সাথে এই সাক্ষ্য দিয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। ১০২
এই সব প্রস্তুতির পর হিজরী ১১০/খ্রীষ্টাব্দ ৭২৮ সনের এক জুম'আর দিনের রাতে আখিরাতের পথে যাত্রা করেন। ১০৩ বিখ্যাত তাবি'ঈ মুহাদ্দিছ হযরত আইউব ও হযরত হুমায়দ আত-তাবীল (রহ) তাঁকে গোসল দেন।১০৪ দ্বিতীয় দিন জুম'আর নামাযের পর জানাযার নামায পড়া হয়। জানাযায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমে। লাশ দাফনের জন্য বসরার সব মানুষ গোরস্তানে চলে যায়। ফলে শহর একেবারেই শূন্য হয়ে যায় এবং ঐ দিন বসরার জামে' মসজিদে 'আসরের নামায আদায়ের জন্য কোন নামাযী ছিল না। ফলে সেদিন মসজিদে 'আসরের নামাযের জামা'আত হতে পারেনি। ১০৫ তিনি ৮৮ বছর জীবিত ছিলেন। ১০৬
হযরত হাসান আল-বসরী (রহ) আভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের সাথে বাহ্যিক রূপ ও সৌন্দর্যও লাভ করেছিলেন। দৈহিকভাবে তিনি দারুণ সুন্দর ছিলেন। ১০৭ এই সৌন্দর্যের সাথে আল্লাহ তাঁর মধ্যে দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও ভীতির ভাবও দান করেছিলেন। যে কোন মজলিসে বা মাহফিলে তিনি বসতেন না কেন, সবার মধ্যে মানুষের দৃষ্টি তাঁর উপর গিয়ে পড়তো। 'আসিম আহওয়াল বর্ণনা করেছেন। একবার তিনি বসরা যাবার সময় ইমাম শা'বীকে জিজ্ঞেস করলেন, সেখানে কি আপনার কোন প্রয়োজন আছে? শা'বী বললেন, হাসানকে আমার সালাম পৌঁছে দেবে। 'আসিম বললেন, আমি তো তাঁকে চিনি না। শা'বী তাঁকে এই চিহ বলে দিলেন যে, বসরায় প্রবেশ করার পর সবচেয়ে সুন্দর যে লোকটি তোমার নজরে পড়বে এবং যাঁকে দেখে তোমার অন্তরে সবচেয়ে বেশী সম্ভ্রমমূলক ভীতি সৃষ্টি হবে, তাঁকেই সালাম পৌছাবে। এই চিহে র উপর ভিত্তি করে শা'বী সালাম পাঠান, আর 'আসিম ঠিকভাবেই হাসান আল-বসরীকে চিনে ফেলেন। ১০৮
তিনি ছিলেন সুদর্শন মানুষ। দৈহিক সৌন্দর্যের সাথে পোশাক-পরিচ্ছদও হতো খুবই সুন্দর। অতি মূল্যবান ও সুন্দর কাপড় ব্যবহার করতেন। বড় বড় মজলিস-মাহফিলে যাওয়ার জন্য ভালো কাপড় ও পোশাক আনাতেন। শাতা'র কাতান, ইয়ামনের চাদর এবং ফুল করা চাদর ব্যবহার করতেন। জুব্বা, চাদর এবং পাগড়ী ছিল তাঁর মূল পোশাক। মাথায় পাগড়ী ছাড়া ঘর থেকে বের হতেন না।

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭১; আল-আ'লাম-২/২২৬
২. ড. 'উমার ফাররূখ : তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী- ১/৬৪৫
৩. ড. রা'ফাত আল-বাশা: সুওয়ারুন মিন হায়াত আত-তাবি'ঈন- ২/৬-১১
৪. ড. শাওকী দায়ফ তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী- ২/৪৪৬
৫. তাবাকাত- ৭/১১৪
৬. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৭২
৭. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত- ১/১৬১
৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭১
৯. দ্র. তাবাকাত- ৭/১১৪; হাসান আল-বসরীর জীবনী।
১০. শাজারাতুয যাহাব- ১/১৩৭
১১. তাহযীব আত-তাহযীব- ২/২৬৪
১২. তাযকিরাতুল হুফফাজ- ১/৬২
১৩. প্রাগুক্ত- ১/৬১; তাহযীব আত-তাহযীব- ২/২৬৪
১৪. তাবাকাত- ৭/১১৭
১৫. প্রাগুক্ত
১৬. প্রাগুক্ত
১৭. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ২/৩২২
১৮. তাহযীব আত-তাহযীব- ২/২২৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৭১
১৯. তাবাকাত- ৭/১১৮
২০. তাহযীব আত-তাহযীব- ২/২৬৫; বুতরুস আল-বুসতানী দাইরাতুল মা'আরিফ- ৭/৪৪
২১. আল-'ইদ আল-ফারীদ- ৩/৪১৫
২২. তাবাকাত- ৭/১১৮
২৩. শাজারাতুয যাহাব- ১/১৩৮
২৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ১/২০৫
২৫. আল-'ইক্দ আল-ফারীদ- ৫/৩৮৩; ৬/১২৫
২৬. ইবন খাল্লিকান: ওয়াফায়াতুল আ'য়ান- ২/৭০; বুতরুস আল-বুসতানী-৭/৪৪; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন- ১/১৬৩
২৭. ইহইয়া'উ 'উলুম আদ-দীন- ১/১৬৮; আল-আ'লাম- ১/১০৬
২৮. আল-'ইদ আল-ফারীদ- ২/৪৭৯-৪৮০
২৯. তাবাকাত- ৭/১১৯
৩০. প্রাগুক্ত
৩১. আল-ইব্দ আল-ফারীদ- ২/২৪০
৩২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩০৮, ৩৬৭
৩৩. প্রাগুক্ত-১/৩৫৪
৩৪. প্রাগুক্ত-১/৩৯৮; ২/২৮৬
৩৫. তারীখে দা'ওয়াত ও 'আযীমাত, (বাংলা অনু.)-১/৪৬-৪৭
৩৬. ইবনুল জাওযী: আল-হাসান আল-বসরী-৬৯-৭০
৩৭. ইনতিবাহুন ফী সালাসিলি আওলিয়াইল্লাহ, ১৮, ৩১
৩৮. তাযকিরাতুল আওলিয়া-১/৩২৪
৩৯. তাবাকাত-৭/১৮
৪০. শাযারাতুয যাহাব-১/১৩৮
৪১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৭১
৪২. প্রাগুক্ত-২/২৩০
৪৩. শাযারাতুয যাহাব-১/১৩৭
৪৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৫৩; 'উয়ূন আল-আখবার-২/৩৭২
৪৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৪১; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/২৯৭
৪৬. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৪/২৯
৪৭. ডঃ শাওকী দায়ফ, তারীখ আল-আদাব-২/৪৭
৪৮. প্রাগুক্ত-২/৪৮
৪৯. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৩৭৭, ৩৮৬-৩৮৭
৫০. তাবাকাত-৭/১২৭
৫১. শাযারাতুয যাহাব-১/১৩৮
৫২. আবদুল কাহির আল-বাগদাদীঃ আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক, পৃ. ৯৭-৯৮; ডঃ 'উমার ফাররূখ: তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-১/৬৪৬
৫৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭১
৫৪. তাবাকাত-৭/১১৮-১১৯
৫৫. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/৫০
৫৬. তাবাকাত-৭/১১৮-১২০
৫৭. ইবন খাল্লিকান: ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/১২৮; ইবন কুতায়বা: 'উয়ূন আল-আখবার-২/৩৪৩; ইবন আবিল হাদীদ: শারহু নাহজিল বালাগা-৪/৫৯
৫৮. আল-'ইদ আল-ফারীদ-২/৩৩৭
৫৯. ড. আবদুল জলীল শালবী আল-খিতাবা ওয়া ই'দাদ আল-খাতীব, পৃ. ২৬৭
৬০. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/১২৪
৬১. প্রাগুক্ত-৫/৪৯
৬২. দক্ষিণ ইরাকে দাজলা ও ফুরাতের মধ্যবর্তী স্থানের একটি শহর। হাজ্জাজ এ শহরটি পত্তন করেন এবং এখানেই মৃত্যুবরণ করেন। (জামহারাতু খুতাবিল আরাব-২/৪৯৪)
৬৩. সূরা ত্বাহা-৫১
৬৪. ইবনুল জাওযী: আল-হাসান আল-বাসরী, পৃ. ৫০; আস-সায়্যিদ আল-মুরতাদা কিতাবুল আমালী, ১/১১২
৬৫. তারীখ আত-তাবারী-৮/১৫৩
৬৬. প্রাগুক্ত-৮/৫১৩
৬৭. সূরা আল-আ'রাফ-৩১
৬৮. প্রাগুক্ত-৩২
৬৯. সূরা আল-আহযাব-২১
৭০. সূরা আলে 'ইমরান-৩১
৭১. সূরা 'আবাসা-৩৪
৭২. ইবনুল জাওযী: আল-হাসান আল-বাসরী, পৃ. ৫০-৫১
৭৩. জামহারাতু খুতাবিল 'আরাব-২/৪৯৪
৭৪. আল'-ইকদ আল-ফারীদ-১/৩৪; ৩/১৫০; জামহারাতু খুতাবিল 'আরাব-২/৪৯৫-৪৯৮; ইবনুল জাওযী: সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১২১
৭৫. আল-আ'লাম-২/১০৬
৭৬. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/৩০৩, ৩১১
৭৭. প্রাগুক্ত-১/৩৪; আল-হাসান আল-বাসরী-৫৬
৭৮. আল-ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৫১
৭৯. 'উমার ফাররূখ: তারীখ আল-আদাব-১/৬৪৫
৮০. আবু 'আলী আল-কালী আল-আমালী-৩/১৯৪; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/৫৪; আল-'ইকদ- ২/২২৯
৮১. আল-'ইকদ-২/২৩০
৮২. প্রাগুক্ত-২/২৩৫
৮৩. শাযারাতুয যাহাব-১/১৩৮
৮৪. দ্র: সিফাতুস সাফওয়া-৪/১২৬; আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২২০, ২২২, ২২৭, ২৪০, ২৪৪, ২৯৩, ৩২২, ২৫৯; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৭২, ২৪২; ৩/১৩২-১৩৭; জামহারাতু খুতাবিল 'আরাব- ২/৪৯৯
৮৫. আল-'ইকদ-১/২৩৪
৮৬. প্রাগুক্ত-১/২৭৪
৮৭. আল'-ইকদ আল-ফারীদ-১/৩৪; ৩/১৫০; জামহারাতু খুতাবিল 'আরাব-২/৪৯৫-৪৯৮; ইবনুল জাওযী: সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১২১
৮৮. আল-আ'লাম-২/১০৬
৮৯. আল'-ইকদ আল-ফারীদ-১/৩৪; ৩/১৫০; জামহারাতু খুতাবিল 'আরাব-২/৪৯৫-৪৯৮; ইবনুল জাওযী: সীরাতু 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয-১২১
৯০. আল-আ'লাম-২/১০৬
৯১. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/৩০৩, ৩১১
৯২. প্রাগুক্ত-১/৩৪; আল-হাসান আল-বাসরী-৫৬
৯৩. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৫১
৯৪. 'উমার ফাররূখ: তারীখ আল-আদাব-১/৬৪৫
৯৫. আবূ 'আলী আল-কালী: আল-আমালী-৩/১৯৪; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/৫৪; আল-'ইকদ- ২/২২৯
৯৬. আল-'ইকদ-২/২৩০
৯৭. প্রাগুক্ত-২/২৩৫
৯৮. শাযারাতুয যাহাব-১/১৩৮
৯৯. দ্র: সিফাতুস সাফওয়া-৪/১২৬; আল-ইব্দ আল-ফারীদ-২/২২০, ২২২, ২২৭, ২৪০, ২৪৪, ২৯৩, ৩২২, ২৫৯; আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/১৭২, ২৪২; ৩/১৩২-১৩৭; জামহারাতু খুতাবিল 'আরাব- ২/৪৯৯
১০০. আল-ইকদ-১/২৩৪
১০১. প্রাগুক্ত-১/২৭৪
১০২. প্রাগুক্ত-২/৪২৬
১০৩. প্রাগুক্ত-২/৪৩৪
১০৪. প্রাগুক্ত-৪/১৬৭, ১৬৯
১০৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭১
১০৬. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৩৭
১০৭. ড: শাওকী দায়ফ: তারীখুল আদাব-২/৪৪৭
১০৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-৩/১৩২; 'উয়ূন আল-আখবার-২/৪৪

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ আত-তায়মী (রহ)

📄 ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ আত-তায়মী (রহ)


ইবরাহীম আত-তায়মীর ডাকনাম আবূ আসমা। পিতা ইয়াযীদ ইবন শারীক আত-তায়মী। পিতা-পুত্র উভয়ে ছিলেন কুফার ভোগ-বিলাস বিমুখ তাপস শ্রেণীর তাবি'ঈদের অন্তর্ভুক্ত। সম্মান ও মর্যাদার দিক দিয়ে ইবরাহীম বিশেষ কোন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন না। তবে কুফার বা 'আমল 'আলিমদের মধ্যে গণ্য হতেন।১ ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে হাদীছের হাফিজদের মধ্যে গণ্য করেছেন এবং তাঁর 'তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ' গ্রন্থে তৃতীয় স্তরে তাঁর নামটি সন্নিবেশ করেছেন।২
ইবরাহীম আত-তায়মীর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল যুহদ ও তাকওয়া। তাঁর পিতা ইয়াযীদও ছিলেন একজন বিখ্যাত 'আবিদ ও দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ স্বভাবের মানুষ। তিনি অনেক সম্পদ অর্জন করেন, কিন্তু ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেননি। এমনকি তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদেও ঐশ্বর্যের কোন ছাপ পড়তে পারেনি। একবার ছেলে ইবরাহীম পিতার গায়ে একটি অতি সাধারণ তুলোর জামা দেখে, যার হাতাটা কব্জি পর্যন্ত ছিল, বলেন, আব্বা আপনি একটু ভালো পোশাক কেন পরেন না? জবাবে তিনি বলেন, বেটা, যখন আমি বসরা থেকে এসেছিলাম, তখন বহু ভালো পোশাক তৈরি করেছি। কিন্তু তাতে আমার আনন্দে, আমার চিত্তের উৎফুল্লতায় কোন বৃদ্ধি ঘটেনি। আর তা দ্বিতীয়বার লাভ করার ইচ্ছাও আমার মধ্যে জাগেনি। আমি এটা চাই যে, যে পবিত্র লুকমাটি আমি আহার করি সেটি আমার সবচেয়ে অপ্রিয় ব্যক্তির মুখে থাক। কারণ, আমি আবু দারদার (রা) মুখ থেকে শুনেছি, দুনিয়াতে এক দিরহামের অধিকারী ব্যক্তির চেয়ে দুই দিরহামের অধিকারী ব্যক্তির নিকট থেকে বেশী হিসাব নেয়া হবে।৩
পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি উদাসীন পিতার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কল্যাণে ইবরাহীম শৈশব থেকেই দুনিয়ার সুখ-ঐশ্বর্যের প্রতি বিমুখ হয়ে যুহদ ও 'ইবাদাতের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। তাই পরবর্তীকালে তিনি তাঁর সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'আবিদের মধ্যে পরিগণিত হন। ইবন হিব্বান বলেছেন: তিনি ছিলেন একজন 'আবিদ ব্যক্তি এবং একাধারে অনেক দিন ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করার উপর ক্ষমতাবান।৪ ইবন হাজারও একথা বলেছেন।৫ আল-আ'মাশ বলেন: আমি ইবরাহীম আত্-তায়মীকে বলতে শুনেছি যে, তিনি একাধারে তিরিশ দিন না খেয়ে থাকতে পারেন।৬ 'ইবাদাতের প্রতি তিনি এত গুরুত্ব দিতেন যে, ফরজ নামাযের জামা'আতে কখনো তাঁর প্রথম তাকবীর তথা তাকবীর তাহরীমা ছুটে যেত না। আর যারা এ ব্যাপারে উদাসীন থাকতো তাদের সম্পর্কে তিনি বলতেন, প্রথম তাকবীরের ব্যাপারে যাদেরকে তোমরা উদাসীন দেখবে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। ৭ তিনি এত একাগ্রচিত্তে নামায আদায় করতেন যেন তাঁর ইহজাগতিক সব চিন্তা ও অনুভূতি লোপ পেতো। আল-আ'মাশ বলেন, তিনি যখন সিজদারত অবস্থায় থাকতেন তখন পাখী উড়ে এসে তাঁর পিঠের উপর বসতো এবং ঠোঁট দিয়ে ঠোকর মারতো। ৮ তিনি একাধারে দুই মাস রোযা রাখতেন এবং এ সময়কালে প্রতিদিন শুধু একটি আঙ্গুর দ্বারা ইফতার করতেন। এ ছাড়া আর কিছুই খেতেন না।৯
'ইবাদাতে এত গভীর নিমগ্নতা এবং দুনিয়ার প্রতি এমন চরম উপেক্ষা সত্ত্বেও একে তিনি যথেষ্ট মনে করতেন না। তিনি বলতেন, আমি যখন আমার কথা ও কাজের মধ্যে তুলনা করি তখন আমার মিথ্যাবাদী হওয়ার ভয় দেখা দেয়। ১০
তিনি ছিলেন আত্মত্যাগ ও আত্মদানের বাস্তব নিদর্শন। অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে আত্মত্যাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হন। তাঁর এমন আত্মত্যাগের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত অন্য কোথাও পাওয়া দুষ্কর। বিখ্যাত 'আলিম তাবি'ঈ ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ছিলেন তাঁর সমসাময়িক মানুষ। আর এই ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ছিলেন স্বৈরাচারী ও জালিম শাসক হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের দুশমন। হাজ্জাজ তাঁকে ধরার জন্য তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন। সরকারী বাহিনী ইবরাহীম আন-নাখা'ঈকে খুঁজতে থাকে। ইবরাহীম আন-নাখা'ঈর প্রতি হাজ্জাজের দুশমনীর কথা ইবরাহীম আত-তায়মীর জানা ছিল। একদিন পুলিশ আন-নাখা'ঈর খোঁজে ইবরাহীম আত্-তায়মীর বাড়িতে হানা দেয়। তারা আন-নাখা'ঈকে চিনতো না। তারা জিজ্ঞেস করলো ইবরাহীম কে? আত্-তায়মী বললেন। আমি ইবরাহীম। তিনি জানতেন, তারা ইবরাহীম আন-নাখা'ঈকে তালাশ করছে। কিন্তু তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে, এ আশঙ্কায় তাঁকে বাঁচানোর জন্য নিজের সঠিক পরিচয় গোপন রাখেন। পুলিশ আন-নাখা'ঈ মনে করে ইবরাহীম আত্-তায়মীকে হাজ্জাজের কাছে নিয়ে যায়। হাজ্জাজ তাঁকে দীমাস জেলখানায় বন্দী করে রাখার নির্দেশ দেন। এ জেলখানাটি হাজ্জাজ তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের উপর নির্যাতনের জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করেন। এটাকে বন্দীশালা না বলে মৃত্যুর ঠিকানা বলাই অধিক সঙ্গত।
সেখানে ঠাণ্ডা-গরম ও রোদ বৃষ্টি থেকে বাঁচার কোন ব্যবস্থা ছিল না। তারপর একই শৃঙ্খলে দুই কয়েদী বেঁধে রাখার ব্যবস্থা ছিল। এই মাত্রাছাড়া যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি ভোগের কারণে অল্পদিনের মধ্যে তাঁর মুখমণ্ডলের রং পাল্টে যায়। তাঁর মা একদিন তাঁকে দেখতে যান, কিন্তু ছেলে ইবরাহীম আত্-তায়মী কথা না বলা পর্যন্ত তাঁকে চিন্তে পারেননি। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এ নির্যাতন সহ্য করতে থাকেন। অবশেষে একদিন এই বন্দীদশায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর রাতে হাজ্জাজ স্বপ্নে দেখেন যে, শহরে আজ একজন জান্নাতী ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। সকালে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, জেলখানায় ইবরাহীম আত্-তায়মী মৃত্যুবরণ করেছেন। একথা শুনে তিনি মন্তব্য করেন, মনে হচ্ছে স্বপ্নটি ছিল একটি শয়তানী ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা)। অতঃপর হাজ্জাজের নির্দেশে ইবরাহীম আত্-তায়মীর মৃতদেহটি ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। ১১ খলীফা ইবন খায়্যাত তাঁর তারীখে হিজরী ৯৩ সনে যে সকল মনীষী মৃত্যুবরণ করেছেন তাঁদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, 'ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ আত-তায়মী ওয়াসিতে হাজ্জাজের বন্দীশালায় মৃত্যুবরণ করেন।' মুগলাতায় বলেছেন, 'হাজ্জাজ, ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ আত-তায়মী ও ইবরাহীম আন-নাখা'ঈকে খুঁজছিলেন। আন-নাখা'ঈ আত্মগোপন করলেও আত-তায়মী করেননি। তাঁকে জেলে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়।' অবশ্য ড. বাশার 'আওয়াদ মা'রূফ বলেছেন, তাঁর মৃত্যু সংক্রান্ত যত বর্ণনা পাওয়া যায় তা পর্যালোচনা করলে বুঝা যায়, হাজ্জাজ তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেননি, বরং জেলখানায় অন্য কোন কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ১২
আবূ দাউদ বলেছেন, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ হয়নি। ১৩ তাঁর মৃত্যু সন নিয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের একটু মতভেদ আছে। আল-আজরী বলেন: আমি আবূ দাউদকে বলতে শুনেছি যে, ইবরাহীম, হাজ্জাজ ও সা'ঈদ ইবন যুবাইর একই বছর মারা যান। আর সেই সনটি হলো হিজরী ৯৫। ১৪ ইমাম আয-যাহাবী বলেছেন, তিনি আনাস ইবন মালিক (রা)-এর আগে মারা যান। আর সেটা হলো হিজরী ৯২ সন। ১৫ আল-ওয়াকিদী বলেছেন, তিনি হিজরী ৯৪ সনে মারা গেছেন। ১৬
ইবরাহীম আত-তায়মী আনাস ইবন মালিক (রা), তাঁর পিতা ইয়াযীদ ইবন শারীক আত-তায়মী, আল-হারিস ইবন সুওয়াইদ, 'আমর ইবন মায়মুন আল-আওদী' 'আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা ও উম্মুল মু'মিনীন 'আয়িশার (রা) সূত্রে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তবে 'আয়িশার (রা) সূত্রে তাঁর বর্ণিত হাদীছ মুরসাল শ্রেণীর। ১৭ কারণ, তিনি সরাসরি 'আয়িশার (রা) নিকট থেকে হাদীছ শোনেননি। একথা বলেছেন ইমাম আবূ দাউদ ও ইমাম তিরমিযী। দারুকুতনী বলেছেন, তিনি হাফসা ও 'আয়িশা (রা) থেকে হাদীছ শোনার সুযোগ পাননি। কারণ, তিনি তাঁদের দুই জনের যুগ লাভ করেননি। ১৮
আর তাঁর থেকে যাঁরা হাদীছ শুনেছেন ও বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা হলেন: বায়ান ইবন বিশর, আল-হাকাম ইবন 'উতাইবা, যুবাইদ ইবন আল-হারিস, মুসলিম আল-বিত্তীন, ইউনুস ইবন 'উবাইদ ও আরো অনেকে। ১৯ হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর স্থান নিরূপণ করতে গিয়ে রিজাল শাস্ত্রবিদগণ অভিন্ন মতে পৌছতে পারেননি। ইবন মু'ঈন, আবু যুরা'আ, ও ইমাম জাহাবী তাঁকে ছিকা' (বিশ্বস্ত) বলেছেন। আবূ হাতিম বলেছেন, তাঁর থেকে হাদীছ গ্রহণ করা যায়। ইবন হিব্বান তাঁকে তাঁর আস-ছিকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ২০ অনেকে তাঁকে হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে 'তাদলীস' করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। আল-কারাবীসী বলেছেন, যায়দ ইবন ওয়াহাব থেকে তিনি যা বর্ণনা করেছেন, তার অধিকাংশ মুদাল্লাস। ২১
ইবরাহীম আত-তায়মী বিভিন্ন ধরনের কিস্সা-কাহিনী ও ইতিহাসের ঘটনাবলী বলে মানুষকে ও'আজ নসীহত করতেন। ২২ তাঁর এমন কিছু কথা আছে যা অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ। যেমন তিনি বলতেন, মানুষের জন্য জ্ঞানের ফলাফলের মধ্যে খোদাভীতি এবং মূর্খতার ফলাফলের মধ্যে নিজের কর্মের উপর গর্ব ও অহংকার যথেষ্ট। লোভ মানুষকে খারাপ কাজের জন্য উৎসাহিত করে। ২৩
ইবরাহীম আত-তায়মী তাঁর দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি উদাসীন জীবনে লাল রঙের বিশেষ ধরনের কাপড় ও পোশাক ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। 'আওয়াম ইবন হাওশাব বলেন : 'আমি ইবরাহীম আত-তায়মীর গায়ে লাল চাদর দেখেছি। আমি তাঁর ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখেছি লাল কাপড়-চোপড় এবং লাল পর্দা।' ২৪

টিকাঃ
১. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩; তাকরীব আত-তাহযীব-১/৭৫
২. দ্র. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; জীবনী নং ৬৮।
৩. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৬/২৮৬
৪. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
৫. তাহযীবুল কামাল ফী-আসমা' আর-রিজাল-২/২৩২
৬. প্রাগুক্ত-১/২৩৩; তাযকিরাতুল-হুফ্ফাজ-১/৭৩
৭. শা'রানী, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, পৃ: ৩৬
৮. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
৯. আশ-শা'রানী, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ১/৩৬; তাবিঈন, পৃ. ২
১০. তাবাকাত ইবন সা'দ-৬/২৮৫
১১. প্রাগুক্ত; তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
১২. তাহযীবুল কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/২৩৩
১৩. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
১৪. তাহযীবুল কামাল ফী আসমা' আর-রিজাল-২/২৩৩
১৫. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
১৬. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
১৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; তাহযীবুল কামাল-২/২৩২
১৮. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪; মীযানুল ই'তিদাল-১/৭৪
১৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৩; তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
২০. প্রাগুক্ত
২১. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৫৪
২২. ড. শাওকী দায়ফ, তারীখ আল-আদাব আল-'আরাবী-২/৪৩৫
২৩. শা'রানী, তাবাকাত-১/৩৬
২৪. ইবন সা'দ, তাবাকাত-৬/২৮৫

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ আন-নাখা‘ঈ (রহ)

📄 ইবরাহীম ইবন ইয়াযীদ আন-নাখা‘ঈ (রহ)


ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ (রহ) কুফার বিশিষ্ট তাবি'ঈ ফকীহদের একজন। তাঁর ডাকনাম আবূ 'ইমরান ও আবু 'আম্মার এবং পিতার নাম ইয়াযীদ ইবন আসওয়াদ আন-নাখা'ঈ। আন-নাখা' ইয়ামনের মাযহিজের একটি বড় গোত্রের নাম। আন-নাখা' ছিল মূলত জাসার ইবন 'আমর ইবন 'উল্লাহ্ ইবন খালিদ ইবন উদাদ-এর উপাধি। আন-নাখা' অর্থ দূরে সরে যাওয়া, বিচ্ছিন্ন হওয়া। যেহেতু তিনি তাঁর মূল গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দূরে সরে যান, তাই এ উপাধি লাভ করেন। তাঁর সাথে আরো বহু মানুষ গোত্রের আদি বাসস্থান থেকে বেরিয়ে যায়। একথা ইবনুল কালবী তাঁর 'জামহারাতু আন নাসাব' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ১ ইবরাহীম এ গোত্রের সন্তান তাই তাঁকে আন-নাখা'ঈ বলা হয়। এ শাখা গোত্রটি কুফায় বসবাস করতো। তাঁর মা আল-আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ ও 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদের বোন মূলায়কা বিন্ত ইয়াযীদ। ২ ইবরাহীমের জন্মসন হি. ৪৬/খ্রী. ৬৬৬।
ইবরাহীমের গোত্র আন-নাখা' হিজরী ১১ সনে আরতাত ইবন শুরাহীল ও আল-আরকাম আল-জুহায়শ নামক দু'ব্যক্তিকে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পাঠায়। তাঁরা মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করেন। রাসূল (সা) তাঁদেরকে ইসলামের দা'ওয়াত দেন এবং তাঁরা বিনা দ্বিধায় ও বিনা প্রশ্নে সে দা'ওয়াত কবুল করেন। সেখানে তাঁরা তাঁদের গোটা গোত্রের পক্ষ থেকে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) হাতে বায়'আত করেন। রাসূল (সা) তাঁদের এমন সুন্দর আচরণে ভীষণ খুশী হন। তিনি তাঁদের দু'জনকে প্রশ্ন করেন: তোমাদের গোত্রে তোমাদের মত লোক আরো আছে কি? তাঁরা বলেন:
ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আমাদের পিছনে এমন সত্তর (৭০) জন লোক রেখে এসেছি যাঁদের প্রত্যেকেই আমাদের দু'জনের চেয়ে ভালো। তখন রাসূল (সা) তাঁদের জন্য এই দু'আ করেন : হে আল্লাহ! নাখা' গোত্রে বরকত ও সমৃদ্ধি দান করুন! উল্লেখ্য যে, এই আরতাত ও তাঁর ভাই দুরায়দ (রা) কাদেসিয়ার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। ৩
রাসূলুল্লাহর (সা) এই দু'আ কবুল হয়। এই দু'আর বরকতে এই নাখা' গোত্রে অনেক বড় বড় 'আলিম, মুহাদ্দিছ ও ফকীহর জন্ম হয়।
ইবরাহীমের পরিবারটি ছিল 'ইলম ও 'আমলের পরিবার। চাচা 'আলকামা ও মামা আল আসওয়াদ- দু'জনই ছিলেন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ। তাঁদেরই তত্ত্বাবধানে তিনি বেড়ে ওঠেন। 'আলকামার দারসে হাদীছের পরিধি এত বিস্তৃত ছিল যে, মুহাম্মাদ ইবন সীরীনের মত বিখ্যাত মুহাদ্দিছও তাতে অংশগ্রহণ করতেন। ইবরাহীমও এই হালকায়ে দারস থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। তাছাড়া চাচা ও মামার মাধ্যমে তখনকার অনেক বড় বড় ব্যক্তি ও মনীষীর বৈঠকে বসা ও মেলামেশার সুযোগ তিনি লাভ করেন। শৈশবে তিনি উম্মুল মু'মিনীন হযরত 'আয়িশার (রা) নিকট আসা-যাওয়া করতেন। আবু মা'শার বর্ণনা করেছেন, ইবরাহীম রাসূলুল্লাহর (সা) কোন কোন বেগমের ('আয়িশার রা.) নিকট আসা-যাওয়া করতেন। ৫ আবু আয়্যুব তাঁর এ বর্ণনার প্রতিবাদ করে বলেন, তা কেমন করে সম্ভব। জবাবে তিনি বলেন, শৈশবে বালিগ হবার আগে তিনি চাচা 'আলকামা ও মামা আসওয়াদের সাথে হজ্জে যেতেন। আর ঐ দুইজনের ছিল হযরত 'আয়িশার (রা) প্রতি গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধা। হযরত 'আয়িশার (রা) মজলিসে তাঁদের আসা-যাওয়া ছিল। ৬ যদিও হযরত 'আয়িশার মুখ থেকে ইবরাহীমের হাদীছ শুনার কোন প্রমাণ নেই, তবুও তাঁর মত উঁচু স্তরের ব্যক্তিত্বের মজলিসে শরীক হওয়া কল্যাণ ও সৌভাগ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট ছিল। আহমাদ ইবন 'আবদিল্লাহ আল-'ইজলী বলেন: তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) কোন সাহাবী থেকে হাদীছ বর্ণনা করেননি। তবে তিনি সাহাবীদের একটি দলকে লাভ করেছেন। 'আয়িশাকে (রা) দেখেছেন। তাঁর সময়ে তিনি ও শা'বী কুফাবাসীদের ফকীহ্ ছিলেন। ৭ ইমাম আয-যাহাবী বলেন, তিনি যায়দ ইবন আরকাম ও অন্য সাহাবীদের দেখেছেন। তবে কোন সাহাবী থেকে হাদীছ শোনেননি। ৮
এ সব মহান ব্যক্তিদের সুহবত ও সাহচর্য ইবরাহীমকে জ্ঞানের সাগরে পরিণত করে। তিনি তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ 'আলিমদের মধ্যে পরিগণিত হন। ইমাম নাবাবী লিখেছেন, তাঁর মহত্ব ও মর্যাদা এবং দীনের তত্ত্বজ্ঞানের পূর্ণতার ব্যাপারে সবাই একমত। আবূ যুর'আ নাখা'ঈ বলেন, তিনি ছিলেন ইসলামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। ৯ হাদীছ ও ফিকাহ্ উভয় শাস্ত্রে তাঁর ছিল সমান পারদর্শিতা। ইবন খাল্লিকান তাঁকে ফকীহ্ ও বিখ্যাত ইমামদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন। ১০
তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ হাফিজে হাদীছের একজন। ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে দ্বিতীয় তাবকার হাফিজে হাদীছের মধ্যে গণ্য করেছেন। হাদীছের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন তাঁর দুই মামা আসওয়াদ ও 'আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ এবং মাসরূক, 'আলকামা, আবু মা'মার, হাম্মাম ইবন হারিছ, কাজী শুরায়হ, সাহম ইবন মিনজাব প্রমুখের ন্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিছদের নিকট থেকে। হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর শিষ্য শাগরিদদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হলেন: আ'মাশ, মানসূর, ইবন 'আওন, যুবায়র আল-ইয়ামানী, হাম্মাদ ইবন সুলায়মান, মুগীরা ইবন মাকসাম আদ-দাব্বী ও আরো অনেকে। ১১
হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর জানার পরিধি ছিল সীমাহীন। আ'মাশ বলতেন, আমি যখনই ইবরাহীমের নিকট কোন হাদীছ বর্ণনা করেছি, তখনই তিনি সেই হাদীছের ব্যাপারে অতিরিক্ত তথ্য দিয়ে আমার জানার পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছেন। ১২ ইবন মু'ঈন ইমাম শা'বীর মুরসাল বর্ণনায় চেয়ে ইবরাহীমের মুরসাল হাদীছসমূহকে বেশী পছন্দ করতেন। ১৩ হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে মূল শব্দের বর্ণনার প্রয়োজনীয়তা তিনি স্বীকার করতেন না। রিওয়ায়াত বিল মা'না বা অর্থ ও ভাবের বর্ণনাকে তিনি যথেষ্ট মনে করতেন। ১৪ আবু উসামা আল- অমাশের সূত্রে বলেন:
كان إبراهيم صيرفي الحديث .
ইবরাহীম ছিলেন হাদীছের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী বিশেষজ্ঞ। ১৫ তবে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি আরোপ করে হাদীছ বর্ণনার ব্যাপারে তিনি অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। মারফু' হাদীছ তাঁর স্মৃতিতে থাকা সত্ত্বেও তিনি তা বর্ণনা করতেন না। আবু হাশিম বর্ণনা করেছেন। আমি ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহর (সা) কোন হাদীছ কি আপনার নিকট পৌঁছেনি? সেগুলি আমাদেরকে শোনালে আমরা বর্ণনা করতে পারতাম। তিনি জবাব দিলেন, কেন পৌঁছুবে না। তবে 'উমার, 'আবদুল্লাহ, 'আলকামা ও আসওয়াদ থেকে বর্ণনা করা আমার জন্য সহজ মনে করি।১৬
ফিকাহ্ ছিল ইবরাহীমের বিশেষ শাস্ত্র। এ শাস্ত্রের তিনি ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ ও ইমাম। এ শাস্ত্রে তাঁর দক্ষতার ব্যাপারে সবাই একমত। ১৭ 'আল্লামা যাহাবী তাঁকে ইরাকের ফকীহ্ এবং ইমাম নাওবী কৃষ্ণার ফকীহ্ বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম শা'বী ইবরাহীমের মৃত্যুর সময় বলেন, তিনি নিজের চেয়ে বড় কোন 'আলিম এবং বড় কোন ফকীহ্ রেখে যাননি। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হাসান বসরী ও ইবন সীরীনও কি নয়? শা'বী জবাব দিলেন, শুধু হাসান বসরী ও ইবন সীরীন কেন, বসরা, কৃষ্ণা, হিজায ও শামে কেউ নেই। ১৮ তাঁর সময়ের অনেক বড় বড় 'আলিম ফিকহী মাসআলার প্রশ্নকারীদেরকে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিতেন। সা'ঈদ ইবনে জুবাইরের নিকট কেউ কোন ফাতওয়া জিজ্ঞেস করতে আসলে তিনি বলতেন, ইবরাহীমের বর্তমানে আমার নিকট জিজ্ঞেস করছো? ১৯ আবূ ওয়াইলের নিকট কোন ফাতওয়া জিজ্ঞেসকারী এলে তিনি তাকে ইবরাহীমের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। তাকে একথাও বলে দিতেন যে, তাঁর জবাবটি আমাকে জানিয়ে যাবে। ২০ ইবন হাজার বলেন:
তিনি ছিলেন একজন ফকীহ্ ও নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিছ। তবে তাঁর থেকে বহু মুরসাল হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ২১
শা'বী, ইবরাহীম ও আবুদ দুহা মসজিদে বসে হাদীছ বিষয়ে আলোচনা করতেন। যখন তাঁদের কাছে কোন বিষয়ে হাদীছ না থাকতো, তাঁরা ইবরাহীমের দিকে তাকাতেন। ২২ তাঁর এত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর জ্ঞানের প্রকাশ ও প্রচার হোক তা পছন্দ করতেন না। এ কারণে কেউ কিছু জিজ্ঞেস না করলে নিজের থেকে কোন জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন না। ২৩ প্রশ্ন করলেও প্রথমত ভড়কে যেতেন। যুবায়দ বলেছেন, আমি যখনই কোন বিষয় সম্পর্কে ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করেছি তখনই তাঁর চেহারায় একটা বিরক্তির ছাপ লক্ষ্য করেছি। ২৪
এর একটা বড় কারণ এই ছিল যে, জ্ঞানের একটা মস্ত বড় জিম্মাদারী অনুভব করতেন। তিনি বলতেন, এমন এক সময় ছিল, মানুষ যখন কুরআনের তাফসীর করতে ভয় করতো। আর এখন এমন হয়েছে যে, কারো ইচ্ছা হলেই মুফাস্সির হয়ে যাচ্ছে। আমার এটাই বেশি পছন্দ যে, জ্ঞানের ব্যাপারে আমি মুখ থেকে একটি শব্দও উচ্চারণ না করি। যে সময়ে আমি ফকীহ্ হয়েছি, এটি খুব বাজে সময়। ২৫ আমি এমন সব লোককেও দেখেছি, যারা ভরা মজলিস-মাহফিলেও তাঁদের সবচেয়ে বেশী জানা হাদীছগুলোও বর্ণনা করতেন না।
মূলত এই জিম্মাদারী ও সতর্কতার কারণে বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব দানের ব্যাপারে সীমাহীন সতর্কতা অবলম্বন করতেন। আ'মাশ বলেন, একবার আমি ইবরাহীমকে বললাম, আমি আপনার নিকট কয়েকটি মাসআলা জিজ্ঞেস করতে চাই। বললেন এ আমার মোটেই পছন্দ নয় যে, কোন বিষয়ে আমি বলি যে, এটা এমন, অথচ সেটা তার বিপরীত। ২৬
তাঁর জ্ঞানের প্রচারবিমুখ হবার দ্বিতীয় কারণ এ হতে পারে যে, তিনি খ্যাতি ও লোক দেখানো ভাবকে খুবই ঘৃণা করতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, যে ব্যক্তি মানুষকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে মুখ থেকে একটি শব্দও উচ্চারণ করে সে তাঁরই বদৌলতে সোজা জাহান্নামে গিয়ে পড়বে। এর জন্য তাঁর প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ উদ্দেশ্য হবার কোন প্রয়োজন নেই। ২৭
ইবন খাল্লিকান বলেন, ইবরাহীমের সাথে কোন লোক সাক্ষাৎ করতে চাইলে, সাক্ষাৎ দান পছন্দ করতেন না। দাসী বলে দিতেন তাঁর সাথে মসজিদে সাক্ষাৎ করুন। অনেক সময় তিনি তাঁর ছাত্র, সঙ্গী-সাথী ও বাড়ির লোকদের বলে দিতেন, আমি কোথায় আছি, কেউ যদি তোমাদের কাছে জানতে চায়, তোমরা তাকে বলে দিবে, আমরা জানিনে। আর এটা কোন মিথ্যা হবে না। কারণ, আমার স্থান থেকে বেরিয়ে যাবার পর আমি কোথায় আছি তাতো তোমাদের জানা থাকেনা। ২৮
তবে সীমাহীন সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি নিজ থেকে তাঁর 'ইলমের প্রচার-প্রসারের দ্বার রুদ্ধ করে দেননি। তিনি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাবে মাসআলা বলতেন। আর এ জন্য একটি সময় নির্ধারণ করে দেন যখন ইচ্ছুক প্রত্যেকেই মাসআলা জিজ্ঞেস করতে পারতো। তখন তিনি জবাব দিতেন। হাসান ইবন 'উবায়দুল্লাহ বলেন, একবার আমি ইবরাহীমকে বললাম, আপনি আমাদের নিকট হাদীছ বর্ণনা করবেন না? তিনি বললেন, তোমরা চাও যে আমি অমুকের মত হয়ে যাই। তুমি যা বলছো তাই যদি তোমাদের ইচ্ছা হয় তাহলে গোত্রের মসজিদে চলে এসো। সেখানে যখন কোন ব্যক্তি কিছু জিজ্ঞেস করবে, তোমরাও জবাবটি জেনে যাবে। ২৯
ইসলামের প্রথম পর্বের অনেক ইমাম মুজতাহিদ জ্ঞানকে গ্রন্থাবদ্ধ করণের পক্ষপাতী ছিলেন না। তাঁরা স্মৃতিতে ধারণ ও সংরক্ষণ করতেন। ইবরাহীমেরও তাঁদের মত লেখার চেয়ে স্মৃতির উপর আস্থা ছিল বেশী। তিনি লিখতেন না। ফুদায়ল বলেন, আমি একবার ইবরাহীমকে বললাম যে, আমি অনেক মাসআলা খাতায় লিখেছিলাম। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমার নিকট থেকে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন। জবাবে তিনি বললেন, মানুষ যখন কোন কিছু লিখে নেয় তখন ঐ লেখার উপরই তাঁর সবটুকু আস্থা এসে যায়। আর মানুষ যখন জ্ঞানের সন্ধান করে তখন আল্লাহ তাকে প্রয়োজন মত দান করেন। ৩০
এই অগাধ 'ইলমের সাথে সাথে তাঁর মধ্যে 'আমলও ছিল। তিনি তাঁর 'ইল্ম অনুযায়ী 'আমল করতেন। তিনি ছিলেন চূড়ান্ত পর্যায়ের একজন 'আবিদ ও যাহিদ ব্যক্তি। খোদাভীতির চরম রূপ তাঁর মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। পার্থিব ভোগ-বিলাসিতার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে উঠেছিলেন। রাতের নির্জনতায় মানুষের চোখের আড়ালে আল্লাহর 'ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। তালহা বলেন, মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে ইবরাহীম ভালো একটি নতুন কাপড় পরে সুগন্ধি গায়ে লাগিয়ে মসজিদে চলে যেতেন। সকাল পর্যন্ত সেখানে থাকতেন। সকালে রাতের সুন্দর পরিচ্ছদ খুলে আবার সাধারণ পোশাক পরতেন। ৩১
এভাবে সারারাত 'ইবাদাতে নিমগ্ন থাকার কারণে তার দেহ একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে যেত। আ'মাশ বর্ণনা করেছেন, ইবরাহীম অধিকাংশ সময় নামায শেষ করে আমাদের কাছে আসতেন। অপরাহ্ন পর্যন্ত মনে হতো তিনি যেন অসুস্থ। একদিন পর পর তিনি নিয়মিত . রোযা রাখতেন। ৩২
ঈমান ও 'আকীদার ব্যাপারে পূর্বসূরীদের 'আকীদা-বিশ্বাস থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়া তিনি মোটেই বরদাশত করতেন না। মুরজিয়াদের 'আকীদা তেমন কোন মারাত্মক বিষয় ছিল না। অনেক খ্যাতিমান তাবি'ঈ এ মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু ইবরাহীম ছিলেন এর ঘোর বিরোধী। তিনি বলতেন, এটা একটি বিদ'আত। তোমরা সব সময় এর থেকে দূরে থাকবে। মুরজিয়াদের সাথে উঠাবসা করবে না। যারা মুরজিয়াদের মতবাদে বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী হতো তাদেরকে তাঁর নিকট আসতে বারণ করতেন। ৩৩
উম্মাতের সৎ ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দু'আর দরখাস্ত করার ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। সাহাবী ও তাবি'ঈরাও একে অপরের কাছে দু'আর আবেদন করেছেন এবং তাঁরা দু'আও করেছেন। কিন্তু এ কাজটি কিছু বিদ'আতের পথ খুলে দেয় এবং সাধারণ মানুষের 'আকীদায় দুর্বলতা সৃষ্টি করে। এ কারণে, ইবরাহীম এ কাজকে অপছন্দ করতেন। একবার এক ব্যক্তি এসে বললো, আবু 'ইমরান, আপনি একটু দু'আ করুন যেন আল্লাহ আমাকে রোগ থেকে মুক্তি দেন।
লোকটির এ ধরনের আবেদনকে তিনি মোটেই পছন্দ করলেন না। তিনি লোকটিকে বললেন, একবার এক ব্যক্তি হুযায়ফার (রা) নিকট তার মাগফিরাতের জন্য দু'আর আবেদন করে। হুযায়ফা দু'আর পরিবর্তে বলেন, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা না করুন। এ কথা শুনেই লোকটি হুযায়ফা থেকে দূরে সরে যায়। কিছুক্ষণ পর হুযায়ফা লোকটিকে ডেকে তার জন্য দু'আ করেন এই বলে, আল্লাহ যেন তোমাকে হুযায়ফার স্থানে প্রবেশ করান। এ দু'আর পর তিনি লোকটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি খুশী হয়েছো? তোমাদের মধ্য থেকে কিছু কিছু মানুষ কোন ব্যক্তি বিশেষের নিকট এই বিশ্বাস নিয়ে যায় যে, সে আল্লাহর নৈকট্য লাভের সকল স্তর অতিক্রম করে এক উঁচু মর্যাদার ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে। তাকে এ ঘটনা শুনিয়ে তিনি সুন্নাতের কিছু আলোচনা করে তা অনুসরণের আদেশ দেন এবং বিদ'আতের আলোচনা করে তার প্রতি তাঁর অনীহার কথা প্রকাশ করেন। ৩৪
তবে ছোট ছোট ব্যাপারে তিনি তেমন কঠোর হতেন না এবং কঠোর হওয়া পছন্দও করতেন না। একদিন দুই ব্যক্তি তাঁর নিকট আসে। একজনের মাথার চুল ছেড়ে দেওয়া এবং অন্যজনের বটা। কারকাদ সান্‌ন্জী ইবরাহীমকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আবু 'ইমরান, ঐ ব্যক্তির চুল খোলা রাখতে এবং ঐ ব্যক্তিকে চুল বটতে বারণ করবেন না?
ইবরাহীম বললেন, একথা আমার বুঝে আসে না যে, তোমাদের মধ্যে বানু আসাদের কঠোরতা সৃষ্টি হয়ে গেছে, না বানু তামীমের নিষ্ঠুরতা? ৩৫
সাহাবায়ে কিরামের পরস্পরের বিভেদ, ঝগড়া ও মত পার্থক্যের সমালোচনা, সে বিষয়ে মতামত প্রকাশ এবং কোন একপক্ষ অবলম্বন করাকে তিনি ভীষণ অপছন্দ করতেন। এ ব্যাপারে তিনি চুপ থাকা সমীচীন মনে করতেন। তাঁর এক শাগরিদ হযরত 'উসমান (রা) ও 'আলী (রা)-এর বিবাদ সম্পর্কে একবার তাঁকে প্রশ্ন করে। জবাবে তিনি শুধু বলেন, আমি না সাবাঈ, আর না মুরজী। আর একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বলে, আবু বাকর (রা) ও 'উমারের (রা) তুলনায় 'আলী (রা) আমার নিকট বেশী প্রিয়। তিনি তাকে বলেন, একথা 'আলী (রা) শুনলে তোমাকে শাস্তি দিতেন। যদি তোমার এ ধরনের কথা বলতেই হয় তাহলে আমার কাছে বসবেনা। তিনি বলতেন, 'উসমানের (রা) চেয়ে 'আলীর (রা) প্রতি আমার মুহাব্বত বেশী। তবে আকাশ থেকে আমি মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাই তাও ভালো, কিন্তু এ আমি কল্পনাও করবো না যে, 'উসমানের (রা) প্রতি আমার অন্তরে কোন রকম খারাপ ধারণা পোষণ করি। ৩৬
তিনি তাঁর এত মহত্ব ও উঁচু মর্যাদা সত্ত্বেও খুবই চুপচাপ ও একাকী থাকতেন। অতি সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। লোক-লৌকিকতার কোন পরোয়া করতেন না। তাঁর মধ্যে বিনয় ও নম্রতার অবস্থা এমন ছিল যে, ঠেস দিয়ে বসাও তিনি পছন্দ করতেন না। ৩৭ কখনো কখনো সাওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে অন্য মানুষের বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিতেন। আ'মাশ বর্ণনা করেন যে, আমি অনেক সময় ইবরাহীমকে অন্যের বোঝা মাথায় উঠানো অবস্থায় দেখেছি। তিনি বলতেন, আমি সাওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে এমনটি করে থাকি। ৩৮
তাঁর এহেন বিনয় ও নম্র ভাব প্রকাশ সত্ত্বেও মানুষের অন্তরে তাঁর প্রতি একটা সম্ভ্রম মিশ্রিত ভীতি বিরাজমান থাকতো। মুগীরা বলেন, আমরা শাসক শ্রেণীর আমীর-উমারাদের মত ইবরাহীমকে ভয় করতাম। ৩৯
দেশের শাসন কর্তৃত্বে যথা ওয়ালী ও আমীর-উমারাদের সাথে ইবরাহീমের সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তাঁদের পরস্পরের মধ্যে মাঝে মাঝে উপহার-উপঢৌকন বিনিময় হতো। বেশীরভাগ বিশিষ্ট আমীরগণ তাঁর সেবায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করতেন। ৪০ শাসক শ্রেণীর হাদীয়া তোহফা গ্রহণে তিনি কোন রকম দোষ মনে করতেন না। তিনি বরং এটাকে খারাপ মনে করতেন যে, আল্লাহ কাকেও কিছু দান করেন, আর সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। তবে তিনি শুধু গ্রহণ করতেন না, তাদেরকে দিতেনও। আল-হাসান ইবন 'আমর বলেন: তিনি হাঁস কিনে ঘিয়ে ভেজে আমীরদের নিকট পাঠাতেন। ৪১
তবে তিনি অত্যাচারী ও উৎপীড়ক আমীর-উমারার ভীষণ বিরোধী ছিলেন। এ কারণে স্বৈরাচারী হাজ্জাজের সাথে কোনদিন আপোষ করেননি। হাজ্জাজ ছিলেন তাঁর চরম দুশমন। তিনি হাজ্জাজের কঠোর সমালোচনা করতেন। তাঁর উপর অভিশাপ দিতেও দোষের কিছু মনে করতেন না। একবার এক ব্যক্তি হাজ্জাজ এবং তাঁর মত অন্য জালিমের উপর লা'নাত বা অভিশাপ দানের ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করে। জবাবে তিনি বলেন, আল্লাহ নিজেই তো বলেছেন :৪২ أَلا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ .
-'ওহে জেনে রাখ, অত্যাচারী উৎপীড়কদের উপর আল্লাহর অভিশাপ।' হাজ্জাজের মৃত্যুর পর তিনি এত খুশী হন যে, সিজদায় লুটিয়ে পড়েন এবং চোখ থেকে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ৪৩
তিনি হাজ্জাজকে গালি দিতেন এবং বলতেন, হাজ্জাজের নির্দেশে একজন মানুষ অন্ধ হলে তাই তার যুলমের জন্য যথেষ্ট। ৪৪
হাজ্জাজের মৃত্যুর কয়েক মাস পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জীবনের অন্তিম সময়ে তিনি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন। লোকেরা তাঁর এমন অস্থিরতার কারণ জিজ্ঞেস করলো। বললেন, এর চেয়ে মারাত্মক সময় আর কোনটি আছে যখন আল্লাহর দূত জান্নাত অথবা জাহান্নামের পয়গাম নিয়ে উপস্থিত হবে? আমি এই পয়গামের বিপরীতে কিয়ামত পর্যন্ত বর্তমান অবস্থায় বিদ্যমান থাকতে পছন্দ করি। ৪৫ এই অসুস্থতায় হিজরী ৯৫ সনের শেষ অথবা ৯৬ সনের প্রথম দিকে তিনি ইনতিকাল করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ঊনপঞ্চাশ বা পঞ্চাশ বছর অথবা তার চেয়ে কিছু বেশী। ৪৬ হাজ্জাজের ভয়ে আত্মগোপন করে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে একথা বলেছেন আহমাদ আল-'ইজলী। ৪৭
পোশাক-পরিচ্ছদে তিনি খুব পরিপাটি থাকতেন। মূল্যবান রঙ্গীন পোশাক পরতেন। জাফরানী ও লাল পোশাক পরাকে কোন দোষ মনে করতেন না। শীতের মওসুমে খেঁক- শিয়ালের চামড়ার পোশাক পরতেন। খেঁকশিয়ালের চামড়ার টুপি মাথায় দিতেন। পাগড়ী পরতেন। লোহার আংটি ডান হাতের আঙ্গুলে পরতেন। ৪৮ ইমাম শা'রানী বলেছেন, তিনি নিজেকে গোপন করার জন্য রঙ্গীন পোশাক পরতেন। যাতে এটা বুঝা না যায় যে, তিনি কারীদের কেউ, না দুনিয়াদার লোকদের কেউ।৪৯
তিনি অনেক জ্ঞানগর্ভ ও উপদেশমূলক কথা বলতেন। যেমন তিনি বলতেন: ১. একজন মানুষ চল্লিশ বছর পর্যন্ত যে স্বভাবের উপর বিদ্যমান থাকে, পরে তা আর পরিবর্তন করতে পারে না। ৫০ ২. ঈমানের পরে একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ করা।
এ কারণে অসুস্থতার কথা বলাও তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন, যখন রোগীর নিকট তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয় তখন তার উচিত প্রথমে ভালো বলা, তারপর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করা। কারণ, কষ্টের কথা বলাও ধৈর্যের পরিপন্থী কাজ।
৩. একজন মানুষের জন্য এতটুকু পাপই যথেষ্ট যে, মানুষ দীন অথবা দুনিয়ার কোন ব্যাপারে তার প্রতি আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। ৫১
৪. তিনি বলেছেন, অতিরিক্ত কথা ও অতিরিক্ত সম্পদে মানুষ ধ্বংস হয়। ৫২
৫. তিনি আরো বলেছেন, ওজর ও কৈফিয়াত দান থেকে দূরে থাক। কারণ, তা মিথ্যাকে মিশিয়ে দেয়। ৫৩
৬. একবার তিনি মানসূর ইবন মু'তামিরকে (মৃ. হি. ১৩২) বলেনঃ বোকার মত প্রশ্ন করবে এবং বুদ্ধিমানের মত মনে রাখবে। ৫৪ তিনি খুব নির্বিরোধ মানুষ ছিলেন। তিনি বলেছেন: আমি কখনো কারো সাথে ঝগড়া করিনি। ৫৫
ইবরাহীম তাঁর ঘরে খুরমা রাখা পছন্দ করতেন। কোন ব্যক্তি তাঁর ঘরে এলে, কোন কিছু না থাকলে, বাড়ির লোকদের বলতেন, আমাদেরকে খুরমা দাও। কোন ভিক্ষুক এলে কিছু না থাকলে তাকে খুরমা দিবে। ৫৬
ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ কুরআন বুঝে পড়ার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললো যে, সে প্রতি তিন দিনে কুরআন শেষ করে। তিনি তাকে বললেন: তুমি যদি ত্রিশ দিনে শেষ করতে এবং জানতে যে তুমি কি জিনিস পড়ছো তা হলেই ভালো হতো। তিনি তাঁর ছাত্র-শিষ্য ও সঙ্গী-সাথী এবং অনুরাগীদেরকে ভদ্রতা ও শিষ্টাচারিতা শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন: তোমরা যখন কারো বাড়িতে যাবে তখন বাড়িওয়ালা যেখানে বসায় সেখানে বসবে। আবূ বাকর ইবন আবী শায়বা বলেন: আল-হাসান, ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ ও মায়মুন ইবন মাহরান-এ তিনজন কোন ব্যক্তি কাউকে সালাম দেয়ার আগে 'আল্লাহ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখুন' বলা ভীষণ অপছন্দ করতেন। ৫৭
তিনি অস্বাভাবিক কোন ঘটনা বা বস্তুতে তেমন বিশ্বাস করতেন না। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি সেই ব্যক্তি সম্পর্কে কি বলেন যে রাতের অন্ধকারে আলো দেখে? তিনি বলেন: সে আলো শয়তানের পক্ষ থেকে। এমন আলো যদি ভালো কোন কিছু হতো তাহলে তা বদরবাসীদেরকে দেখানো হতো। বাকিয়্যা বলেন: ইবরাহীম আমাকে বলেন: তুমি লেজ হও, মাথা হয়োনা। কারণ, মাথা ধ্বংস হয়, লেজ বেঁচে যায়। ৫৮

টিকাঃ
১. ইবন খাল্লিকান: ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৫-২৬
২. তাহযীব আল-কামাল-ফী আসমা' আর-রিজাল-২/২৩৪; আল-আ'লাম-১/৮০
৩. আসরুত তাবি'ঈন-৪৯২
৪. ইবন সা'দ তাবাকাত-৬/২৭০
৫. ইবন খাল্লিকান-১/২৫; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৪; সিফাতুস সাফওয়া-৩/৪৭
৬. তাবাকাত-৬/২৭১
৭. তাহযীবুল কামাল-২/২৩৭
৮. মীযানুল 'ইতিদাল ফী নাকদির রিজাল-১/৭৪
৯. তাহযীবুল আসমা'-১/১০৪
১০. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৫
১১. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৭৭; তাহযীবুল কামাল-২/২৩৫-২৩৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৪
১২. তাবাকাত-৬/১৮৯
১৩. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৭৭
১৪. তাবাকাত-৬/১৯০
১৫. তাহযীবুল কামাল-২/২৩৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩ আবু নু'আয়ম: আল-হিলয়া-৪/২২০
১৬. তাবাকাত-৬/২৭২
১৭. তাহযীবুল আসমা'-১/১০৪
১৮. প্রাগুক্ত-১/১০২; তাহযীবুল কামাল-২/২৩৮
১৯. তাবাকাত-৬/২৭০
২০. প্রাগুক্ত-৬/২৭২
২১. তাকরীব আত্-তাহযীব-১/৪৬
২২. তাহযীবুল কামাল-২/২৩৮; আবু হাতিম : আল-জারহু ওয়াত তা'দীল-১/১৪৪
২৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭২
২৪. তাবাকাত-৬/২৭১
২৫. শা'রানীঃ আত্-তাবাকাত আল-কুবরা-১/৩৬
২৬. ইবন সা'দ: তাবাকাত-৬/১৯০
২৭. শা'রানী-১/৩৬
২৮. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৫
২৯. তাবাকাত-৬/২৭০
৩০. প্রাগুক্ত-৬/২৭২
৩১. প্রাগুক্ত-৬/২৭৬
৩২. প্রাগুক্ত-৬/২৭৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৪
৩৩. তাবাকাত-৬/২৭৩-২৭৪
৩৪. প্রাগুক্ত-৬/২৭৬
৩৫. প্রাগুক্ত
৩৬. প্রাগুক্ত-৬/২৭৫
৩৭. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৭৭; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৬৪
৩৮. তাহযীবুত তাহযীব-১/১৯৪; তাবাকাত-৬/২৭৮
৩৯. তাবাকাত-৬/২৭২, তাকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৪
৪০. তাবাকাত-৬/২৭৭
৪১. প্রাগুক্ত-৬/২৭৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৪২. তাবাকাত-৬/২৭৯
৪৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৪
৪৪. তাবাকাত-৬/২৭৮-২৭৯
৪৫. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/২৫
৪৬. তাকুরীবুত তাহযীব-১/৪৬; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৭৪; তাবাকাত-৬/২৮৪
৪৭. তাহযীবুল কামাল-২৩৭, ২৪০
৪৮. তাবাকাত-৬/২৮০-২৮১
৪৯. তাবাকাতে শা'রানী-১/৩৬
৫০. তাবাকাত-৬/২৭৭; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৭৩
৫১. তাবাকাতে শা'রানী-১/৩৬
৫২. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-'১/২৫০, ২৯৯ প্রাগুক্ত-১/১১২; 'উদ্বুন আল-আখবার-৩/১০১
৫৩. প্রাগুক্ত-১/১৯২; 'উয়ুন আল-আখবার-৩/১০১
৫৪. আল-বায়ান ওরাত তাবয়ীন-১/২৫০, ২৯৯
৫৫. তাবাকাত-৬/২৭৩
৫৬. প্রাগুক্ত-৬/১৯০; ২৭৫
৫৭. ইবন 'আবদি রাব্বিহি: আল-ইদ আল-ফারীদ-২/২২৯, ২৩৪, ২৩৯
৫৮. প্রাগুক্ত-৩/১৯৮, ২০১

📘 তাবিঈদের জীবনকথা 📄 সা‘ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ)

📄 সা‘ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ)


হযরত সা'ঈদের ডাক নাম আবূ মুহাম্মাদ। পিতা মুসায়্যিব ইবন হাম্‌ন কুরায়শ গোত্রের মাখযূমী শাখার সন্তান এবং মা উম্মু সা'ঈদ নামে যিনি পরিচিত, আসলাম গোত্রের হাকীম ইবন উমায়্যার কন্যা।১

হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব ছিলেন সেই সব অতি সম্মানিত ও পবিত্র-আত্মা মহান তাবি'ঈর একজন যাঁরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান ও কর্মের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর পথিকৃৎ ও ইমামের মর্যাদা লাভ করেছেন। তাঁর সম্মানিত পিতা মুসায়্যিব (রা) ও পিতামহ হাযন (রা) উভয়ে ছিলেন সাহাবী। দু'জনই মক্কা বিজয়ের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) নিয়ম ছিল, জাহিলী যুগে রাখা যে সব নামের মধ্যে কোন মন্দ অর্থ পেতেন, তা পরিবর্তন করে অন্য নাম রাখা। অকল্যাণ ও অশুভ অর্থবহ কোন নাম তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। এ কারণে হাযম্ন (রা) ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নামটি পরিবর্তন করে সাহল রাখতে চান। উল্লেখ্য যে, হাযম্ন শব্দটির অর্থ কষ্ট, শোক, দুঃখ, বিষণ্ণতা ইত্যাদি। কিন্তু হযরত হাযম্ন (রা) তখন একজন নও মুসলিম। আজন্ম লালিত বিশ্বাস ও সংস্কার সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলতে পারেননি। তাই তিনি বিনয়ের সাথে 'আরজ করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ নামটি আমার পিতা-মাতার দেওয়া। তাছাড়া এ নামেই আমি সবার কাছে পরিচিত। অনুগ্রহ করে এটি পাল্টাবেন না। রাসূল (সা) তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং পূর্বের নামটি বহাল রাখেন। কিন্তু এ নামের অশুভ পরিণতি এ পরিবারটিকে ভোগ করে যেতে হয়।

পরবর্তীকালে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব বলতেন, দুঃখ-কষ্ট চিরকাল আমাদের পরিবারের নিত্য সঙ্গী হয়ে থেকেছে।২

হযরত 'উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) খিলাফতের দ্বিতীয়, মতান্তরে চতুর্থ বছরে হযরত সা'ঈদ (রহ) জন্মগ্রহণ করেন। একটি বর্ণনা এমনও আছে যে, হযরত 'উমারের (রা) শাহাদাতের দু'বছর পূর্বে তাঁর জন্ম হয়। তবে প্রথম বর্ণনাটি অধিক নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়।৩

হযরত সা'ঈদ (রহ) খিলাফতে রাশিদার শেষ পর্যায়ে একেবারেই অল্প বয়স্ক ছিলেন। তাই তাঁর জীবনে এ সময়ের উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা নেই। হযরত মু'আবিয়ার (রা) খিলাফতকালেও তাঁকে কোন দৃশ্যপটে দেখা যায় না। তবে একথা জানা যায় যে, তিনি তখন জ্ঞান অর্জনের পালা শেষ করে তাদরীস ও ইফতা (শিক্ষা ও ফাতওয়া দান)-এর মসনদে আসীন হয়েছেন।৪

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) সময়কাল থেকে তাঁর পূর্ণ জীবন বৃত্তান্ত পাওয়া যায়। আর এ ইতিবৃত্তের সূচনা হয়েছে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সত্য উচ্চারণের মাধ্যমে। সত্য বলার ব্যাপারে তিনি কারো পরোয়া করতেন না। এমন কি খলীফা ও স্বৈরাচারী আমীর উমারার বিরুদ্ধেও তিনি চুপ থাকেননি। আর তাই দেখা যায় তাঁর কর্ম-জীবনের সূচনাতেই খলীফাদের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) খিলাফতের দাবী নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন। জাবির ইবন আসওয়াদ তাঁর পক্ষে মদীনা বাসীদের বায়'আত নেওয়ার জন্য আসলেন। তখন সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললেন, যতক্ষণ না কোন এক ব্যক্তির ব্যাপারে মুসলমানদের ঐকমত্য হয় ততক্ষণ কারো হাতে বায়'আত করা উচিত নয়।৫

সে সময় সা'ঈদকে মদীনার বিশিষ্ট বুযর্গ ব্যক্তি গণ্য করা হতো। তাঁর বিরোধিতার অর্থ ছিল মদীনার একটি হাতও বায়'আতের জন্য বাড়ানো হবে না। এ কারণে জাবির রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাকে বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু শত নিপীড়ন ও নির্যাতন সত্ত্বেও সত্য বলা থেকে তাঁর মুখ বন্ধ করা যায়নি। বেত্রাঘাতের সময়ও তিনি মুখে সত্যের ঘোষণা দিতে থাকেন। জাবিরের ছিল চার স্ত্রী। একজনকে তিনি তালাক দেন। তাঁর 'ইদ্দাত শেষ হওয়ার আগেই তিনি পঞ্চম বিয়েটি করে ফেলেন। এমন কাজ স্পষ্টতঃই হারাম ছিল। যখন সা'ঈদের পিঠে বেত্রাঘাত চলছিল তখন তিনি বলছিলেন, আল্লাহর কিতাবের হুকুম শোনানো থেকে কেউ আমাকে বিরত রাখতে পারবে না। আল্লাহ বলেছেন: ৬
فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ.
আর যদি তোমরা ভয় কর যে, ইয়াতীম মেয়েদের হক যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সে সব মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর আপনি চতুর্থ স্ত্রীর 'ইদ্দাতকাল অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই পঞ্চম স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন।

খুব শিগগিরই আপনার জন্য একটি খারাপ সময় আসবে। এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পর হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) নিহত হন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের সাথে জাবিরের এই অসদাচরণের কথা জানতে পেরেছিলেন। তিনি সা'ঈদের সম্মান ও মর্যাদার কথা জানতেন। এ কারণে তিনি জাবিরকে একটি চিঠি লিখে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন এবং তাঁর সাথে যে কোন রকমের রূঢ় আচরণ থেকে বিরত থাকতে বলেন।৭

'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পরে 'আবদুল মালিক খলীফা হন। তাঁর সাথেও সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের বিরোধ বজায় থাকে। উমাইয়া রাজতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খলীফা মারওয়ান ইবন হাকাম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে যথাক্রমে 'আবদুল মালিক ও তাঁর ভাই 'আবদুল আযীযকে খলীফা মনোনীত করে যান। মারওয়ানের মৃত্যুর পর 'আবদুল মালিকের মনে অসৎ উদ্দেশ্যের উদয় হয়। তিনি তাঁর দুই ছেলে ওয়ালীদ ও সুলায়মানকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যেতে চান। কিন্তু কাবীসা ইবন যুওয়াইব তাঁকে বোঝান যে, এ কাজ করলে আপনার সুনাম নষ্ট হবে। তাই তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। কিন্তু 'আবদুল মালিকের সৌভাগ্য যে, কিছু দিন পর 'আবদুল 'আযীয স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

'আবদুল 'আযীযের মৃত্যুর পর 'আবদুল মালিকের ইচ্ছা পূরণের বাধা দূর হয়ে যায়। তিনি নিজের মৃত্যুর পর যথাক্রমে ওয়ালীদ ও সুলায়মানকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে তাঁদের পক্ষে বায়'আত গ্রহণের জন্য বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রদেশের শাসকদের নির্দেশ দেন। মদীনার তৎকালীন ওয়ালী হিশাম ইবন ইসমা'ঈল মদীনাবাসীদের বায়'আত গ্রহণের ধারাবাহিকতায় সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে ডেকে পাঠান। তিনি হিশামকে বলেন, আমি একটু চিন্তা-ভাবনা না করে বায়'আত করতে পারছিনে। মতান্তরে, তিনি একথা বলেন যে, বর্তমান খলীফা 'আবদুল মালিকের জীবদ্দশায় অন্য কারোর বায়'আত করতে পারিনে।৮

হযরত সা'ঈদের এমন স্পষ্ট জবাবে হিশাম ক্ষেপে যান এবং তাঁকে বেত্রাঘাত করেন। তারপর রা'স আছ-ছানিয়্যা- যেখানে অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো, অত্যন্ত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে পাঠিয়ে দেন। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব বুঝেছিলেন, নিশ্চিত তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হবে। তিনি ফাঁসিতে ঝুলার জন্য প্রস্তুত হয়েও গিয়েছিলেন। ফাঁসিতে ঝুলানোর পরে পরনের কাপড় খুলে গিয়ে সতর উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে ভেবে নীচে জাঙ্গিয়াও পরে নিয়েছিলেন। সম্ভবত রা'স আছ-ছানিয়‍্যা নিয়ে যাবার উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে ভয় দেখানো। এ জন্য সেখানে নিয়ে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। যখন ফিরিয়ে আনা হয় তখন সা'ঈদ প্রশ্ন করেন : আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? তারা জবাব দেয়: জেলখানায়। তাঁকে জেলে বন্দী করে রাখা হয়। হিশাম তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের বিবরণ খলীফার দরবারে পাঠিয়ে দেন।৯

জেলে বন্দী অবস্থায় তাঁকে বুঝিয়ে নরম করার চেষ্টা করা হয়। আবু বাকর 'আবদুর রহমান তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বলেন, সা'ঈদ আপনি একেবারেই বোধ-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছেন। জবাবে তিনি বলেন, আবূ বাকর, আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাঁকে দুনিয়ার সকল শক্তির উপর মহাশক্তি বলে বিশ্বাস করুন। আবূ বাকর হাল ছেড়ে দেননি। তিনি বার বার জেলখানায় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে একই কথা বলে তাঁকে নরম করার চেষ্টা করতে থাকেন। সা'ঈদ তাঁকে শেষ জবাব দেন এই বলে: আল্লাহর কসম! আপনার অন্তর ও চোখ, উভয়ের আলো যেতে বসেছে। এমন শক্ত জবাব শুনে আবূ বাকর ফিরে যান। হিশাম আবূ বাকরের নিকট লোক পাঠিয়ে জানতে চান, সা'ঈদ কি মার খাওয়ার পর একটু নরম হয়েছে? আবূ বাকর জবাব দেন, আল্লাহর কসম! তাঁর সাথে আপনার এরূপ আচরণে তিনি আরো শক্ত হয়ে গেছেন। এখন তাঁকে বশে আনার আশা আপনার ত্যাগ করা উচিত।১০

কাবীসা ইবন যুওয়াইব ছিলেন 'আবদুল মালিকের ব্যক্তিগত সচিব। সকল শাহী ডাক প্রথমে তাঁর কাছে আসতো। প্রথমে তিনি সেগুলি পড়তেন, তারপর খলীফা 'আবদুল মালিকের সামনে পেশ করতেন। হিশাম সা'ঈদের সাথে তাঁর আচরণের বিবরণ দিয়ে যে চিঠিটি খলীফার নিকট পাঠান স্বাভাবিকভাবে সেটিও কাবীসার হাতে পড়ে। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিমান পরিণামদর্শী মানুষ। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি। এ কারণে হিশামের ফিরিস্তি পাঠ করে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। সাথে সাথে তিনি চিঠিটি নিয়ে 'আবদুল মালিকের নিকট যান এবং তাঁকে বলেন, হিশাম স্বেচ্ছাচারীর মত যা ইচ্ছা তাই করে। ইবন মুসায়্যিবকে এভাবে পেটায় এবং ঢোল-শোহরাত করে তা প্রচার করে। আল্লাহর কসম! এই বাড়াবাড়ি ও কঠোরতার কারণে তিনি আরো শক্ত হয়ে যাবেন। যদি তিনি বায়'আত নাও করেন তাহলেও তাঁর দিক থেকে বিপদের কোন আশঙ্কা নেই। তিনি এমন লোকদের কেউ নন যাঁদের মধ্যে কপটতা আছে অথবা ইসলাম ও মুসলমানদের কোন রকম ক্ষতির কারণ হতে পারে। তিনি আহলুস সুন্নাহ্ ওয়াল জামা'আ'র অন্তর্গত একজন মানুষ। আপনি নিজেই সা'ঈদের নিকট হিশামের আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে একটি চিঠি লিখুন। 'আবদুল মালিক বললেন, তুমিই আমার পক্ষ থেকে একটি চিঠি লিখে পাঠাও। তাতে একথা স্পষ্ট করে বলে দেবে যে, হিশাম আমার ইচ্ছার বিপরীত কাজ করেছে। এটা তার নিজেরই সিদ্ধান্ত ছিল। কাবীসা তখনই সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে একটি চিঠি লেখেন। তিনি সেটি পাঠ করে মন্তব্য করেন, আমার প্রতি জুলুম করা হয়েছে। তার ও আমার মাঝখানে আল্লাহ আছেন।

সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে চিঠি পাঠানোর পর খলীফা 'আবদুল মালিক হিশামের কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশ ও তাকে তিরস্কার করে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে বেত্রাঘাতের পরিবর্তে তাঁর সাথে সদাচরণ করা উচিত ছিল। আমার ভালো করেই জানা আছে, তাঁর দিক থেকে কোন রকম বিরোধিতা ও বিভেদ সৃষ্টির আশঙ্কা নেই। এ চিঠি পেয়ে হিশাম ভীষণ লজ্জিত ও অনুতপ্ত হন এবং সা'ঈদকে মুক্তি দেন।

হিশাম তাঁকে বেত্রাঘাত করে যখন জনগণের সম্মুখে এনে দাঁড় করান তখন এক মহিলা সা'ঈদেকে বলে: শায়খ, আপনাকে হেয় ও লাঞ্ছনার স্থলে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি জবাব দেন, না, আমি বরং লাঞ্ছনা থেকে পালিয়েছি।”১১

একবার মুসলিম ইবন 'উকবা সা'ঈদকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। তখন 'আমর ইবন 'উছমান ও মারওয়ান সাক্ষ্য দেন যে, তিনি একজন পাগল। অতঃপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ১২

একথা ঠিক যে খলীফা ওয়ালীদের সাথে হযরত সা'ঈদের বড় রকমের কোন বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। তবে তাঁর সামনে কোন দিন মাথাও নত করেননি।১৩

এটা অবাক হবার মত ব্যাপার যে, হাজ্জাজ ইবন ইউসুফের মত স্বৈরাচারী ও জালিম শাসক, যাঁর নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে সে যুগের উমাইয়্যা শাসনের বিরোধী খুব কম লোকই রেহাই পেয়েছে, সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের সাথে কোন রকম অসদাচরণ করেননি। আর এতে সে যুগের মানুষ দারুণ বিস্ময় প্রকাশ করতো। অনেকে কৌতূহলবশতঃ সা'ঈদকে জিজ্ঞেসও করতেন, এটা কি করে সম্ভব যে, হাজ্জাজ আপনার নিকট কাউকে পাঠাচ্ছে না, আপনার স্থান থেকে আপনাকে অপসারণ করছে না এবং আপনাকে কোন রকম কষ্টও দিচ্ছে না? তিনি জবাব দিতেন, আল্লাহর কসম! আমি নিজেও এর কারণ জানিনে। অবশ্য একটি ঘটনা একবার তাঁর সাথে আমার ঘটেছিল। সে তার পিতার সাথে মসজিদে নামায পড়ছিল। ঠিকমত রুকু-সিজদা হচ্ছিল না। আমি তাকে সতর্ক করার জন্য একমুঠ কঙ্কর তার প্রতি ছুড়ে মারি। মানুষের ধারণা, এরপর থেকে তার নামায ঠিক হয়ে যায়।

খলীফা ওয়ালীদের সময়কালে হিজরী ৯৪ সনে হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) অন্তিম রোগে আক্রান্ত হন। জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তে পুত্র মুহাম্মাদকে দাফন- কাফনের ব্যাপারে ওয়াসীয়াত করেন। তিনি বলেন, লাশের খাটিয়া লাল চাদর দিয়ে ঢাকবে না, গোরস্তানে নেওয়ার সময় আগুন জ্বালাবে না, এমন সব লোক শবানুগামী হবে না যারা আমার এমন সব গুণের কথা বলে বিলাপ করবে যা প্রকৃতপক্ষে আমার মধ্যে নেই। শববাহী খাটিয়া উঠানোর কোন ঘোষণা দেবে না। তা উঠানোর জন্য মাত্র চার ব্যক্তিই যথেষ্ট। কবরের পাশে তাঁবু স্থাপন করবে না।

একেবারে অন্তিম মুহূর্তে নাফি' ইবন জুবায়র পাশে ছিলেন। তিনি মুহাম্মাদকে বললেন বিছানা কিবলামুখী করে দিতে। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তখনও সচেতন ছিলেন। তিনি বলেন, এমনটি করার প্রয়োজন নেই। আমি এই কিবলার উপর জন্মেছি, এর উপরই মরবো এবং ইন্‌শাআল্লাহ কিয়ামতের দিন এই কিবলার উপরই উঠবো।

কিছুক্ষণ পর অচেতন অবস্থা দেখা দেয়। তখন নাফি' শয্যাটি কিবলামুখী করে দেন। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব আবার চেতনা ফিরে পেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার শয্যাটি কিবলামুখী করে দিয়েছে কে? কারো জবাব দানে হিম্মত হলো না। কিন্তু তিনি জ্ঞান থাকা অবস্থায় নাফি'কে বলতে শুনেছিলেন। তাই তিনি স্বগতোক্তির মত জবাব দিলেন, নাফি' করে থাকবে। তারপর বললেন : আমি যদি মুসলমান হই তাহলে যে দিকেই মুখ করে মরি না কেন, কিবলামুখীই থাকবো। আর যদি ইসলামী মিল্লাতের উপর না থাকি, আর অন্তর কিবলামুখী না থাকে, তাহলে মুখ কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেওয়াতে কোন লাভ নেই। আমি মুসলমান। যে দিকেই আমার মুখ থাকুক না কেন, তা কিবলামুখীই হবে।

فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ - যেদিকেই তোমরা তোমাদের মুখ ফেরাও না কেন সেদিকেই আল্লাহর মুখমণ্ডল।

মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে অল্প কিছু দীনার তাঁর কাছে ছিল। তার জন্য আল্লাহর দরবারে কৈফিয়াত দেন এই বলে : হে আল্লাহ! তুমি ভালো করেই জান, এগুলি আমি আমার লজ্জাস্থান ঢাকা এবং দীনের হিফাজতের উদ্দেশ্যে রেখে দিয়েছিলাম।

এই রোগেই হিজরী ৯৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।১৬ মোট পঁচাত্তর (৭৫) বছর জীবন লাভ করেন। বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, এ বছর বড় বড় অনেক ফকীহ্ ইনতিকাল হয়। এ কারণে এ বছরকে 'সানাতুল ফুকাহা' (ফকীহদের বছর) বলা হয়। মাকহুল বলেন, সা'ঈদের মৃত্যুর খবর যখন তাঁর নিকট পৌছে তখন মানুষ তা শুনে দাঁড়িয়ে যায়।১৭

হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন যখন নুবুওয়াত ও রিসালাতের পবিত্র অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে সেই সমাপ্তির পর খুব বেশী দিন অতিক্রান্ত হয়নি। মদীনার অলি-গলিতে দু'চারজন ছাড়া অধিকাংশ উঁচু স্তরের সাহাবী তখনো তা'লীম ও তারবিয়্যাতের সুমহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। হযরত সা'ঈদের ছিল জ্ঞান অর্জনের প্রতি স্বভাবগত তীব্র স্পৃহা। এ কারণে, ঐ সকল মহান ব্যক্তির সাহচর্য, ফয়েজ ও বরকত তাঁকে 'ইলম ও 'আমল তথা জ্ঞান ও কর্মের মোহনায় পরিণত করে। এ ব্যাপারে সকল সীরাত লেখক ও রিজাল শাস্ত্রবিদ একমত যে, তিনি তাঁর সময়ে 'ইলম ও 'আমল এবং সামগ্রিকভাবে জ্ঞান, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলী, পূর্ণতা ও উৎকর্ষে একক ও অতুলনীয় ছিলেন। ইমাম নাবাবী লিখেছেন, অগ্রগামিতা, নেতৃত্ব, মহত্ত্ব, জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং অন্যান্য কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে তিনি যে তাঁর সমকালীনদের ডিঙ্গিয়ে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে সকল 'আলিম একমত।

ইবন হিব্বান লিখেছেন, তিনি তাঁর যুগে মদীনার সকল অধিবাসীর নেতা ছিলেন।১৮

ইমাম আয-যাহাবী তাঁকে ইমাম, শাইখুল ইসলাম ও শ্রেষ্ঠ তাবি'ঈ বলে উল্লেখ করেছেন। ১৯ ইবনুল 'ইমাদ আল-হাম্বলী লিখেছেন, তাঁর সত্তার মধ্যে হাদীছ, ফিকাহ্, যুহদ, তাকওয়া, 'ইবাদাত তথা সার্বিক জ্ঞান ও কর্মগত পূর্ণতার সমাবেশ ঘটেছিল।২০

'ইবনুল 'ইমাদের বর্ণনায় বুঝা যায় যে, কুরআনের তাফসীরে হযরত সা'ঈদের পূর্ণ পাণ্ডিত্য ও দক্ষতা ছিল। কিন্তু কুরআনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের কারণে মুফাস্সির হিসেবে তিনি তেমন খ্যাতি লাভ করেননি। কুরআনের তাফসীরের ব্যাপারে তিনি এত সতর্ক ও কঠোর ছিলেন যে, কোন আয়াতের তাফসীরের ব্যাপারে কখনো মুখ খোলেননি। কোন আয়াতের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করা হলে বলতেন: আমি কুরআনের ব্যাপারে কোন কথা বলবো না। ২১ এমন সীমাহীন সতর্কতা অবলম্বনের কারণে কুরআন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা কতখানি ছিল তা প্রকাশ পায়নি।

রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছের ব্যাপারে তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ ও রুচি। মাত্র একটি হাদীছের জন্য বহু রাত ও বহু দিনের পথ সফর করতেন। ২২ তাঁর মধ্যে হাদীছ শোনা ও সংগ্রহ করার যেমন একটা প্রবল উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল, তেমনিভাবে তাঁর জন্মস্থান মদীনা ছিল ইল্মে হাদীছের মূল স্তম্ভ সাহাবায়ে কিরামের পদভারে সর্বদা সরগরম।

হযরত 'উছমান, 'আলী, সা'দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার, ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, যায়দ ইবন ছাবিত, হাসান ইবন ছাবিত, আবূ মূসা আল-আশ'আরী, আবু হুরাইরা, আবু দারদা' আনসারী, আবূ যার আল গিফারী, আবু কাতাদা আনসারী, হাকীম ইবন হিযাম, জুবায়র ইবন মুত'ইম, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র, সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা, মিসওয়ার ইবন মাখরামা, জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ, আবূ সা'ঈদ খুদরী, মু'আবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, মা'মার ইবন 'আবদিল্লাহ, 'আবদুল্লাহ্ ইবন যায়দ হারিছী, 'আত্তাব ইবন উসায়দ, 'উছমান ইবন আবিল 'আস (রা) সহ আরো অনেক বিশিষ্ট সাহাবীকে তিনি জীবদ্দশায় পান এবং তাঁদের থেকে কুরআন ও হাদীছের জ্ঞান লাভের সুযোগ হাতছাড়া করেননি। বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ হুরাইরা (রা), যিনি সর্বাধিক সংখ্যক রাসূলুলুল্লাহর (সা) হাদীছ স্মৃতিতে ধারণ করেন- তিনি ছিলেন সা'ঈদের শ্বশুর। আর এই সম্পর্কের কারণে তিনি বিশেষভাবে হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে সবচেয়ে বেশী ফয়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হন। আর তাই, তাঁর হাদীছের বেশীর ভাগ হযরত আবূ হুরাইরার (রা) সূত্রে বর্ণিত দেখা যায়। ২৩

হযরত সা'ঈদের (রহ) মেধা এত তীক্ষ্ণ ছিল যে, কোন কথা একবার শ্রুতিগোচর হলে আর কখনো তা ভুলতেন না। চিরদিনের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যেত। ২৪ তাঁর এমন তীক্ষ্ণ মেধা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর জ্ঞানের পরিধিকে অনেক বাড়িয়ে দেয়।

সে যুগের সকল 'আলিম স্মৃতিতে হাদীছ ধারণ করার তাঁর পূর্ণ ক্ষমতার কথা এক বাক্যে স্বীকার করতেন। মাকহুল ছিলেন সে যুগের একজন ইমাম ও মুহাদ্দিছ। তিনি বলতেন, আমি জ্ঞানের অন্বেষণে গোটা পৃথিবী ভ্রমণ করেছি। কিন্তু সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের মত 'আলিম কোথাও পাইনি। ২৫ ইমাম যাইনুল 'আবিদীন বলতেন, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব ছিলেন অতীত কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বেশী জানা মানুষ। ২৬ 'আলী ইবন আল-মাদীনী বলতেন, আমি তাবি'ঈদের মধ্যে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের মত এত বিশাল জ্ঞানের অধিকারী আর কাউকে জানিনে। ২৭

হাদীছ শাস্ত্র বিশারদদের নিকট হযরত সা'ঈদের বর্ণিত হাদীছের স্থান এত উঁচুতে ছিল যে, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) ও অন্যরা তাঁর মুরসাল হাদীছকেও সহীহ-এর মর্যাদা দান করতেন। ইমাম শাফি'ঈ বলতেন, সা'ঈদের 'মুরসাল' হাদীছসমূহ আমাদের নিকট 'হাসান' হাদীছের সমতুল্য। ২৮ যদিও হযরত 'উমারের (রা) নিকট সা'ঈদের (রহ) হাদীছ শুনার কোন প্রমাণ নেই, তা সত্ত্বেও ইমাম আহমাদ তাঁর সূত্রে সা'ঈদের সরাসরি বর্ণিত হাদীছ দলীল হিসেবে গ্রহণ করতেন। ২৯ ইয়াহইয়া ইবন মু'ঈন হযরত সা'ঈদের (রহ) 'মুরসাল' হাদীছসমূহকে হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) 'মুরসাল'সমূহের উপরও প্রাধান্য দিতেন। 'আলী ইবন আল-মাদীনী বলতেন: কোন মাসআলায় সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের শুধু এতটুকু বলে দেওয়া যে, এ ব্যাপারে হাদীছ বিদ্যমান আছে- যথেষ্ট মনে করা হয়। ৩০

হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের (রহ) পঠন-পাঠনের বিশেষ বিষয় ছিল ফিকাহ্ শাস্ত্র। তিনি তাঁর সময়ের মদীনার সেই সাতজন ফকীহ্ মধ্যে গণ্য হতেন যাঁরা ছিলেন এই শাস্ত্রের ইমাম। ৩২ শুধু তাঁদের মধ্যে নয় বরং গোটা তাবি'ঈ জামা'আতের মধ্যে তাঁর স্থান ও মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চে। ইবন হিব্বানের বর্ণনা এ রকম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তাঁর সময়ে মদীনাবাসীদের নেতা ছিলেন এবং ফাতওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্থান ছিল তাঁদের সবার উপরে। তাঁকে 'ফকীহ্ আল-ফুকাহা' (ফকীহদের ফকীহ্) বলা হতো। কাতাদা (রহ) বলতেন, আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের চেয়ে বেশী হালাল ও হারাম জানা ব্যক্তি কাউকে দেখিনি। সুলায়মান ইবন মূসার বর্ণনা এ রকম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব ছিলেন 'আফকাহুত তাবি'ঈন' (তাবি'ঈদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ্)। মদীনার বাইরে থেকে ফিকাহ্ শাস্ত্রের যে সব ছাত্র মদীনায় আসতো তাদেরকে সোজা তাঁর বাড়ীটি দেখিয়ে দেওয়া হতো। মায়মূন ইবন মাহরান বর্ণনা করেছেন, আমি যখন মদীনায় গেলাম এবং সেখানকার সবচেয়ে বড় ফকীহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম তখন লোকেরা আমাকে সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিল। 'আবদুর রহমান ইবন যায়দ ইবন আসলাম বর্ণনা করেছেন, চার 'আবদুল্লাহ- 'আবদুল্লাহ্ ইবন 'উমার, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস, 'আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস, 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা)- এর পরে ইসলামী বিশ্বে ফিকার পদটি মাওয়ালীদের দখলে চলে যায়। মক্কার ফকীহ ছিলেন 'আতা', ইয়ামানের তাউস, ইয়ামামার ইয়াহইয়া ইবন আবী কাছীর, বসরার হাসান আল-বসরী, কৃষ্ণার ইবরাহীম আন-নাখা'ঈ, শামের মাকহুল এবং খুরাসানের 'আতা' খুরাসানী। কেবল মদীনার পদটি একজন কুরায়শী অর্থাৎ সা'ঈদের অধিকারে ছিল।

হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব যদিও হযরত রাসূলে কারীম (সা) ও হযরত আবু বাকরের (রা) যুগটি পাননি এবং হযরত 'উমার ফারুকের খিলাফতকালে ছিলেন অল্প বয়স্ক, তা সত্ত্বেও নিজের চেষ্টা-সাধনার দ্বারা তাঁদের সকলের বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্ত সমূহের সবচেয়ে বড় বিশেষজ্ঞে পরিণত হন। তিনি নিজেই বলতেন, এখন রাসূল (সা), আবূ বাকর ও 'উমারের (রা) ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ আমার চেয়ে বেশী জানা কোন লোক নেই। বিশেষভাবে 'উমারের (রা) বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পর্কে বেশী অভিজ্ঞ ছিলেন। এ কারণে তাঁকে 'রাবিয়াতু 'উমার' বলা হতো। হযরত 'উমারের (রা) বিচার-ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের পরিধি এত ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল যে, হযরত 'উমারের (রা) পুত্র 'আবদুল্লাহ- যিনি তাঁর জ্ঞান-গরিমার জন্য 'হাবরুল উম্মাহ' নামে খ্যাত ছিলেন, নিজের পিতার কোন কোন বিষয় ও অবস্থা তাঁর নিকট থেকে জেনে নিতেন। ফিকাহ্ শাস্ত্রে হযরত 'উমারের (রা) স্থান ও মর্যাদা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর সময়ে অসংখ্য নতুন সমস্যার উদ্ভব হয় এবং তিনি তার সমাধান দান করেন। এসব সমাধান ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব সবচেয়ে বেশী জানতেন। তেমনি হযরত 'উছমানের (রা) ফায়সালা ও সিদ্ধান্তসমূহ সম্পর্কে তিনি ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। ইমাম যুহরী বলতেন:
كَانَ أَعْلَمَ بِقَضَاءِ عُمَرَ وَعُثْمَانَ
- তিনি 'উমার ও 'উছমানের ফায়সালা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন।

তাঁর এ সব বৈশিষ্ট্য ও ব্যাপকতা শুধু তাবি'ঈ কেন, সাহাবীদের মধ্যেও খুঁজে বের করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। এ কারণে সাহাবীদের যুগেই তিনি ইফতার মসনদ অলঙ্কৃত করেন। অনেক বড় বড় ও উঁচু স্তরের সাহাবী তাঁর এ যোগ্যতার কথা স্বীকার করতেন।

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার বলতেন, আল্লাহর কসম! তিনি মুফতীদের মধ্যে একজন। ৩৯ মাঝে মাঝে তিনি তাঁর নিকট আগত ফাতওয়া জিজ্ঞাসাকারীদেরকে সা'ঈদের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। একবার এক ব্যক্তি তাঁর নিকট কোন একটি মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো। তিনি তাকে বললেন, তুমি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের কাছে যাও। তারপর তিনি যে জবাব দেন, আমাকে একটু জানিয়ে যাবে। লোকটি তার নির্দেশ পালন করেন। 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) সা'ঈদের জবাব শুনে মন্তব্য করেন, আমি কি তোমাদেরকে বলি না যে, তিনি 'আলিমদেরই একজন। ৪০ ইমাম আয-যুহরী বলেন, বংশ বিদ্যার জ্ঞান অর্জনের জন্য ইবন সু'বারের মজলিসে বসতাম। একদিন আমি তাঁর কাছে ফিকাহ বিষয়ের একটি মাসয়ালা জানতে চাইলাম। তিনি আমাকে সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের কাছে যাওয়ার ইঙ্গিত করলেন। ৪১ ইমাম যুহরী ও ইমাম মাকহুলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল: আনপারা যাঁদের থেকে জ্ঞান আহরণ করেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফাকীহ কে? তাঁরা জবাব দেন: সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব। ৪২

হযরত সা'ঈদের সমকালীন বড় বড় 'আলিম ও উঁচু স্তরের তাবি'ঈগণ তাঁর যোগ্যতা ও পূর্ণতার স্বীকৃতি দান করেছেন। তাঁরা তাঁদের নিকট আসা বহু জটিল মাসয়ালার সমাধানের জন্য তাঁর সাহায্য নিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে তাঁর থেকে উপকৃত হওয়ার উপদেশ দিতেন। হযরত হাসান আল-বসরীর (রহ) মত বিশাল ব্যক্তিও যখন কোন মাসয়ালার সমাধান বের করতে সমস্যায় পড়তেন তখন তাঁর কাছে লিখে পাঠাতেন। ৪৩ ইবন শিহাব আয-যুহরী বর্ণনা করেছেন, 'আবদুল্লাহ ইবন ছা'লাবা আমাকে এই উপদেশ দেন যে, যদি তুমি ফিকাহ্ অর্জন করতে চাও তাহলে এই শায়খের (সাঈদ ইবন মুসায়্যিব) পিছু লও। ৪৪

হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করা ব্যতীত কোন সিদ্ধান্ত দিতেন না। তিনি তাঁকে এত বেশী তা'জীম করতেন যে, কোন কিছু জানার প্রয়োজন হলে তাঁকে ডেকে পাঠানো সমীচীন মনে করতেন না, বরং লোক পাঠিয়ে জেনে নিতেন। তিনি বলতেন, মদীনায় এমন কোন 'আলিম নেই যিনি তাঁর 'ইলমসহ 'আমার নিকট আসেননি। শুধু ইবন মুসায়িয়বের 'ইলম আমার কাছে আনা হয়, তাঁকে আসার কষ্ট দিইনা।৪৫ একবার তিনি এক ব্যক্তিকে ইবন মুসায়িয়বের নিকট কোন একটি মাসয়ালার সিদ্ধান্ত জানার জন্য পাঠান। লোকটি তাঁকেই সংগে করে তাঁর দরবারে হাজির হন। 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয তাঁকে দেখা মাত্র বলে ওঠেন, সে ভুল করে আপনাকে আসার কষ্ট দিয়েছে। আমি তো তাকে শুধু আপনার নিকট থেকে সমাধানটি জেনে আসার জন্য পাঠিয়েছিলাম।৪৬

হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের (রহ) শিষ্য-শাগরিদের বেষ্টনী অত্যন্ত প্রশস্ত। তাঁর কয়েকজন বিশেষ বিখ্যাত শাগরিদের নাম এখানে দেওয়া হলো: সালিম ইবন 'আবদিল্লাহ ইবন 'উমার, যুহরী, কাতাদা, শুরায়ক ইবন আবী-নুমায়র, আবুয যানাদ, সা'ঈদ ইবন ইবরাহীম, 'আমর ইবন মুররা, ইয়াহইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী, দাউদ ইবন আবী হিন্দা, তারিক ইবন 'আবদির রহমান, 'আবদুল হামীদ ইবন জুবায়র, শু'বা, 'আবদুল খালিক ইবন সালামা, 'আবদুল মাজীদ ইবন সুহায়ল, 'আমর ইবন মুসলিম, ইমাম বাকির, ইবন মুনকাদির, হাশিম ইবন হাশিম ইবন 'উতবা, ইউনুস ইবন ইউসুফ ও আরো অনেকে।৪৭

হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) তৎকালীন আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বংশবিদ্যা বিশারদ ছিলেন। 'আল্লামা আল-জাহিজ বলেছেন: 'এই উম্মাতের শ্রেষ্ঠতম বংশ বিদ্যাবিশারদ হলেন আবূ বাকর (রা)। তারপর যথাক্রমে 'উমার (রা), জুবায়র ইবন মুত'ইম (রা), সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব ও তাঁর পুত্র মুহাম্মাদ।' তিনি মানুষকে এ বিদ্যা শিক্ষাও দিতেন।৪৮

আরবী ভাষায় তাঁর প্রচণ্ড দখল ছিল। তিনি অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির ভাষা জ্ঞান সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেছেন। একবার কেউ একজন তাঁকে প্রশ্ন করলো আচ্ছা বলুন তো, সবচেয়ে বেশী শুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ভাষী কে? বললেন রাসূলুল্লাহ (সা)। লোকটি বললো: না, আমি তাঁর বিষয়ে জানতে চাচ্ছিনে। জানতে চাচ্ছি, আপনার সমকালীনদের মধ্যে কে? বললেন: মু'আবিয়া, তাঁর পুত্র, সা'ঈদ আল-আشদাক ও তাঁর পুত্র 'আমর ইবন সা'ঈদ। আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়র তাঁদের পরের স্তরের। তবে তাঁর কথায় তেমন সম্মোহনী শক্তি নেই।৪৯

হযরত সা'ঈদ ছিলেন একজন নির্ভেজাল সম্মানিত দীনী ব্যক্তিত্ব। তা সত্ত্বেও একজন কাব্য-রসিক ব্যক্তি ছিলেন। কবিতা আবৃত্তি শুনার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। এটাকে তিনি তাকওয়া-পরহিযগারীর পরিপন্থী কাজ বলে মনে করতেন না। আল-আসমা'ঈ বলেছেন: একবার এক ব্যক্তি তাঁকে বললো, 'ইরাকে কিছু তাপস লোক এমন আছেন যাঁরা কবিতা শুনা ও কাব্যচর্চা করা খারাপ মনে করেন। তিনি মন্তব্য করলেন, তাঁরা অনারব তপস্য-সংস্কৃতি ধারণ করেছেন। তিনি নিজে কবিতা রচনা করতেন না, তবে কবিতা শুনতে পছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন: আবূ বাকর (রা) একজন কবি ছিলেন। 'উমার (রা) ও 'আলী (রা)- উভয়ে কবি ছিলেন। 'আলী (রা) এই তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবি। ৫২

স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন বড় বিশেষজ্ঞ। এই শাস্ত্রের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল প্রায় স্বভাবগত। এ শাস্ত্রের জ্ঞান তিনি অর্জন করেন হযরত আবূ বাকর সিদ্দীকের (রা) কন্যা হযরত আসমা'র কাছ থেকে। আর তিনি অর্জন করেন তাঁর মহান পিতার থেকে। ৫৩

স্বপ্নের তা'বীর বা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তাঁর ভীষণ খ্যাতি ছিল এবং অসংখ্য মানুষ তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানার জন্য তাঁর কাছে আসতো। যখন কোন ব্যক্তি তাঁর নিকট কোন স্বপ্ন বর্ণনা করতো, তিনি তা শুনার পর প্রথমেই বলতেন, তুমি ভালো স্বপ্ন দেখেছো। ৫৪ এখানে কয়েকটি স্বপ্ন ও তার তা'বীর বর্ণনা করা হলো:

হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) ও খলীফা 'আবদুল মালিকের মধ্যে সংঘাত- সংঘর্ষের সময়কালে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললো, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, 'আবদুল মালিককে আমি চিৎ করে ফেললাম। তারপর উপুড় করে তাঁর পিঠে চারটি পেরেক মেরে দিলাম। এ স্বপ্নের কথা শুনে তিনি লোকটিকে বললেন, তুমি নিজে স্বপ্ন দেখনি। লোকটি বললো, আমিই দেখেছি। তখন সা'ঈদ (রহ) বললেন, যদি তুমি সত্য কথাটি না বল তাহলে আমিই বলে দিচ্ছি। তখন লোকটি স্বীকার করলো যে, সে নয় বরং 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়র (রা) স্বপ্নটি দেখেছেন এবং ব্যাখ্যা জানার জন্য তাকে পাঠিয়েছেন। সা'ঈদ (রহ) বললেন: তুমি যদি স্বপ্নটি সঠিকভাবে বর্ণনা করে থাক তাহলে 'আবদুল মালিক 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রকে হত্যা করবে এবং তাঁর বংশধারা থেকে চারজন খলীফা হবে।

আরেক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে, 'আবদুল মালিক চারবার মসজিদে নববীর সামনে পেশাব করেছেন। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) তার এই ব্যাখ্যা দেন যে, 'আবদুল মালিকের বংশ থেকে চারজন খলীফা হবে। এই দুইটি স্বপ্নের ব্যাখ্যাই সত্যে পরিণত হয়। 'আবদুল মালিকের সাথে সংঘর্ষে ইবন যুবায়র নিহত হন। 'আবদুল মালিকের চার ছেলে ওয়ালীদ, সুলায়মান, ইয়াযীদ (২য়) ও হিশাম খলীফা হন। ৫৫

আবুল হাসান আল-মাদায়িনী বলেন: খলীফা 'আবদুল মালিক একবার স্বপ্নে দেখেন যে, তাঁর স্ত্রী 'আয়িশা বিনত হিশাম তাঁর মাথা বিশ টুকরো করে ফেলেছেন। ঘুম ভেঙ্গে যাবার পর ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। স্বপ্নটির ব্যাখ্যা জানার জন্য সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়্যিবের নিকট লোক পাঠালেন। এই 'আয়িশা ছিলেন নির্বোধ মহিলা। সা'ঈদ বললেন: একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিবে এবং সেই সন্তান বিশ বছরের জন্য দেশের রাজা হবে। এ ব্যাখ্যা সত্যে পরিণত হয়েছিল। আয়িশার গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন 'আবদুল মালিকের পুত্র হিশাম। ৫৬

শুরায়ক ইবন নুমায়র একবার বর্ণনা করলেন যে, আমি দেখলাম, আমার একটি দাঁত আমার হাতে খসে পড়লো এবং সেটাকে মাটিতে পুঁতে রাখলাম। সা'ঈদ (রহ) তার ব্যাখ্যা দিলেন যে, তোমার খান্দানের মধ্যে তোমার সমবয়সী কোন ব্যক্তির মৃত্যু হবে এবং তুমি তাকে দাফন করবে। আরেক ব্যক্তি একবার বর্ণনা করলো যে, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার নিজের হাতে আমি পেশাব করছি। সা'ঈদ ব্যাখ্যায় বললেন, তোমার স্ত্রী তোমার মাহরিম (নিকট আত্মীয়- যাকে বিয়ে করা বৈধ নয়)। অনুসন্ধানের পর দেখা গেল, লোকটির স্ত্রী তার দুধ বোন। মুসলিম আল-খায়্যাত বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি তার স্বপ্নের বর্ণনায় বললো, একটি কবুতর মসজিদের মিনারের উপর এসে বসে পড়লো। ব্যাখ্যায় তিনি বললেন, হাজ্জাজ, জা'ফর ইবন আবী তালিবের (রা) পৌত্রীকে বিয়ে করবেন। আরেক ব্যক্তি তার স্বপ্নের বর্ণনা দেয়, সে দেখে একটি ছাগল মদীনার ছানিয়্যাতুল বিদা থেকে দৌড়ে এসে বলতে থাকে- আমাকে জবাই কর। আমাকে জবাই কর, আমি জবাই করলাম। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) ব্যাখ্যায় বললেন, ইবন সালা' মৃত্যু বরণ করবে। ইবন সালা' মদীনার মওয়ালীদের একজন ছিলেন।

'আবদুর রহমান ইবন সায়িব বর্ণনা করেছেন। ফাহম গোত্রের এক ব্যক্তি স্বপ্নে দেখে যে, সে আগুনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) ব্যাখ্যা দিলেন যে, তুমি মৃত্যুর পূর্বে সমুদ্র ভ্রমণ করবে এবং তোমার মৃত্যু হবে হত্যার মাধ্যমে। 'আবদুর রহমান বলেন, সত্যিই লোকটি সমুদ্র ভ্রমণ করে এবং ভ্রমণকালে মরতে মরতে বেঁচে যায়। তারপর 'কুদায়দ'-এর যুদ্ধে সে নিহত হয়।

হুসাইন ইবন 'উবাইদুল্লাহ বর্ণনা করেছেন। আমার একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমার কোন সন্তান হলো না। একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, কে যেন আমার কোলে একটি ডিম ছুঁড়ে দিল। আমি সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়ি‍্যবের (রহ) নিকট স্বপ্নের কথা বললাম। তিনি বললেন, ঐ ডিমটি একটি অনারব মুরগীর ডিম। তুমি কোন অনারব মেয়েকে বিয়ে কর। একথার পর আমি একটি অনারব দাসীকে বিয়ে করি। তারই গর্ভে আমার এক ছেলের জন্ম হয়।

একবার এক ব্যক্তি বর্ণনা করলো, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি ছায়ায় বসে আছি। তারপর উঠে রোদে গেলাম। হযরত সা'ঈদ এর ব্যাখ্যায় বললেন, আল্লাহর কসম! যদি তোমার এ স্বপ্ন সত্য হয় তাহলে তুমি ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে। এ কথা শুনে লোকটি তার বর্ণনা ঠিক করে বলে, আমাকে জোর করে রোদে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আমি সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে আসি। তখন হযরত সা'ঈদ তাঁর পূর্ব ব্যাখ্যার সাথে একথাটি যোগ করেন- 'কাফির হওয়ার জন্য তোমার উপর চাপ প্রয়োগ করা হবে।' লোকটি খলীফা 'আবদুল মালিকের খিলাফতকালে কোন একটি যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর হাতে বন্দী হয় এবং চাপের মুখে ইসলাম ত্যাগ করে। পরে মুক্তি পেয়ে মদীনায় ফিরে আসে। ঘটনাটি সে নিজেই বর্ণনা করতো। এসব স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যার কথা ইবন সা'দ তাঁর তাবাকাতে বর্ণনা করেছেন।

হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়ি‍্যবের (রহ) কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণী
তিনি বলতেন, শয়তান যখন কোন কাজের ব্যাপারে কোন মানুষের নিকট থেকে হতাশ হয়ে যায় তখন সে কোন নারীর মাধ্যমে তা সম্পন্ন করে। আমি আমার নম্স-এর ব্যাপারে নারীকে বেশী ভয় করি। উপস্থিত লোকেরা বললো, আবূ মুহাম্মাদ! আপনার মত বয়োবৃদ্ধ মানুষের তো নারীর প্রতি কোন আকর্ষণ থাকার কথা নয়। তাছাড়া কোন নারীও আপনার প্রতি কোন রকম আকর্ষণ বোধ করবে না। তাহলে ভয় কিসের? বললেন, তা সত্ত্বেও আমি যা কিছু তোমাদেরকে বলছি, সেটাই হলো বাস্তবতা। ৫৭

তিনি বলতেন, বান্দার জন্য তার নম্স-এর সবচেয়ে বড় সম্মান করা হলো আল্লাহর আনুগত্য করা, আর তার সবচেয়ে বড় অবমাননা হলো আল্লাহর নাফরমানী করা। এ দুনিয়া এমন এক মরীচিকা যার দিকে প্রত্যেকে ঝুঁকে যায়, যাকে অন্যায়ভাবে সকলে অর্জন করতে চায়, অন্যায়ের মাধ্যমে পেতে চায় এবং অনুপযুক্ত স্থানে তা ব্যয় করে। দুনিয়ার ধন-সম্পদের মধ্যে কোন কল্যাণ নেই- যদি না তা নিজের দীন ও আত্মসম্মানের রক্ষণাবেক্ষণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে অর্জিত হয়। জুলমের সহায়ক ও সহযোগীকে যখনই দেখবে, ঘৃণা করবে। যাতে তোমার ভালো কাজগুলো নষ্ট হয়ে না যায়।

তিনি বলতেন, সব মানুষ তার সব কর্ম সম্পাদন করে আল্লাহর আশ্রয় ও তত্ত্বাবধানে। আল্লাহ যখন কাউকে হেয় ও অপমান করতে চান তখন তাকে স্বীয় আশ্রয় ও তত্ত্বাবধান থেকে বের করে দেন। ফলে মানুষের মধ্যে তার গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে যায়।

কোন ভদ্র মানুষ, কোন 'আলিম এবং কোন পূর্ণ মানব এমন নেই যার মধ্যে কিছু না কিছু ত্রুটি নেই। তবে তাঁদের মধ্যে কিছু মানুষ এমন আছেন যাঁদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করা উচিত নয়। আর তাঁরা হলেন ঐসব লোক যাঁদের ভালো কাজ তাঁদের মন্দ কাজের চেয়ে বেশী। তাঁদের এ ভালো কাজের জন্য তাঁদের মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করা উচিত। ৫৮

হযরত সা'ঈদের (রহ) দাস 'বারদ' একবার তাঁর মনিবের নিকট কিছু মানুষের 'ইবাদাত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বললেন: মানুষ জুহ্ থেকে 'আসর পর্যন্ত একাধারে 'ইবাদাত করতে থাকে। হযরত সা'ঈদ (রহ) বললেন, আল্লাহর কসম! এটা 'ইবাদাত নয়। তুমি কি জান 'ইবাদাত কাকে বলে? 'ইবাদাত বলে, আল্লাহর আদেশসমূহের ব্যাপারে চিন্তা- ভাবনা করা ও তাঁর নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকাকে। ৫৯

হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) যেমন জ্ঞানগত পূর্ণতার অধিকারী ছিলেন, তেমনিভাবে উন্নত নৈতিকতা, চারিত্রিক গুণাবলী ও যোগ্যতারও অধিকারী ছিলেন। 'ইলম ও 'আমল- জ্ঞান ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে তাঁর ছিল সমান কর্তৃত্ব। তিনি ছিলেন একজন উঁচু মানের 'আবিদ ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষ। ইবন খালিকান লিখেছেন, ফিকাহ্, হাদীছ, দীনদারী, তাকওয়া-পরহিযগারী, 'ইবাদাত তথা সব ধরনের মহত্ত্ব ও গুণাবলীতে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয় তাবি'ঈদের অন্তর্গত। ৬০ ইমাম নাবাবী লিখেছেন, তাঁর জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব এবং তাঁর দীনী মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের সকল 'আলিমের মতামত ও মন্তব্যের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। ৬১

তিনি জামা'আতে নামায আদায়ের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। একাধারে চল্লিশ বছর, মতান্তরে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এক ওয়াকত নামাযও জামা'আত ছাড়া আদায় করেননি। কখনো এমন সময়ে মসজিদে আসার ঘটনা ঘটেনি যখন লোকেরা নামায শেষ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। জামা'আতের প্রথম কাতারে সব সময় নামায আদায় করতেন। তিনি বলতেন, পঞ্চাশ বছর যাবত নামাযের মধ্যে অন্য কারো পশ্চাদ্দেশের উপর আমার দৃষ্টি পড়ার কোন সুযোগ হয়নি। ৬২

রাজনৈতিক হৈ-হাঙ্গামা ও বিপর্যয়- বিশৃঙ্খলার সময় যখন ঘর থেকে বের হওয়া মোটেই নিরাপদ ছিল না, তখনও তিনি মসজিদ ছাড়েননি। মদীনার ইতিহাসে 'হাররা'র বিশৃঙ্খলা একটি বিখ্যাত ঘটনা। এ ঘটনা ইয়াযীদ ও 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) বিরোধের সময়কালে সংঘটিত হয়। মদীনাবাসীরা যখন ইয়াযীদের আনুগত্য ত্যাগ করে 'আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের (রা) পক্ষে 'আবদুল্লাহ ইবন হানজালাকে তাঁদের ওয়ালী বলে ঘোষণা দেয়, তখন ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা ঘেরাও করে একাধারে তিন দিন পর্যন্ত মদীনায় পাইকারীভাবে গণহত্যা চালায় এবং লুটপাট করে। এমন ভীতিকর ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় কেউ ঘরের বাইরে পা রাখতে সাহস করতো না। মদীনার মসজিদগুলো একেবারে জনশূন্য হয়ে থাকতো। এমন ভয়াবহ ও ভীতিকর সময়েও হযরত সা'ঈদ (রহ) মসজিদে যাওয়া থেকে একদিনও বিরত থাকেননি। তিনি মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করতেন। বানু উমাইয়্যারা তাঁকে দেখে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলতো, তোমরা এই বৃদ্ধকে একটু দেখ। এমন অবস্থায়ও তিনি মসজিদ ছাড়ছেন না।

জামা'আতের সাথে নামায আদায় করার প্রবল ইচ্ছার কারণে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও এমন স্থানে যেতেন না যেখানে জামা'আতের সাথে নামায আদায়ের ব্যবস্থা থাকতো না। তাঁর চোখে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। লোকেরা তাঁকে মদীনার বাইরে 'আকীক' চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কারণ, সেখানকার সবুজ পরিবেশ তাঁর চোখের জন্য উপকারী হতে পারে। তিনি বললেন, সকালের ফজরের নামাযের জামা'আতে অংশগ্রহণের কি হবে?

ইবন শিহাব যুহরী বর্ণনা করেছেন। একবার আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবের (রহ) সামনে পল্লী এলাকার সৌন্দর্য এবং সেখানকার চমৎকার জীবনাচারের আলোচনা করে তাঁকে বললাম, আপনি যদি কিছু দিনের জন্য সেখানে গিয়ে থাকতেন তাহলে ভালো হতো। তিনি বললেন, আমার রাত্রিকালীন নামাযের জামা'আতে উপস্থিতির কি হবে?

হযরত সা'ঈদের (রহ) 'ইবাদাতের মূল সময় ছিল রাতের অন্ধকার। সেই সময় তিনি আত্মসমালোচনা করতেন। প্রত্যেক রাতে তিনি নিজের নফসকে সম্বোধন করে বলতেন, ওহে যাবতীয় মন্দ ও খারাপের উৎস, ওঠো, তোমাকে আমি ঐ উটের মত বিধ্বস্ত করে ছাড়বো যে পরিশ্রান্ত ও দুর্বলতার জন্য চলার সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। একথা বলে তিনি তাহাজ্জুদ নামাযে নিমগ্ন হয়ে যেতেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত নামায আদায় করে চলতেন। রাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তাঁর দু'টি পা ফুলে যেত। সকালে আবার নফসকে সম্বোধন করে বলতেন : তোমাকে এ কাজেরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এ কাজের জন্যই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্ণিত হয়েছে, পঞ্চাশ, মতান্তরে চল্লিশ বছর যাবত 'ঈশার নামাযের ওজুতে ফজরের নামায আদায় করেছেন।

নিষিদ্ধ দিনগুলি ছাড়া তিনি সারা বছর রোযা রাখতেন। মাগরিবের সময় বাড়ী থেকে কিছু পানীয় পাঠিয়ে দেওয়া হতো তা দিয়েই মসজিদে ইফতার সেরে নিতেন।

প্রায় প্রত্যেক বছরই হজ্জ আদায় করতেন। কিছু কিছু বর্ণনা মতে তাঁর হজ্জের মোট সংখ্যা পঞ্চাশে পৌঁছেছে। বানু উমাইয়্যাদের সাথে মতপার্থক্য ও বিরোধের কারণে কিছুদিনের জন্য তারা তাঁকে হজ্জ আদায় থেকে বিরত রাখেন। 'আলী ইবন যায়দ একবার তাঁকে বলেন, আপনার সম্প্রদায়ের ধারণা, আপনাকে হজ্জ আদায়ে এ জন্য বাধা দেওয়া হয়েছিল যে, আপনি আপনার নিজের উপর এটা আবশ্যিক করে নিয়ে ছিলেন যে, যখনই কা'বা দেখবেন তখনই মারওয়ান বংশের জন্য বদদু'আ করবেন। তিনি বললেন, একথা সত্য নয়। তবে আমি প্রত্যেক নামাযের সময় তাদের জন্য বদদু'আ করে থাকি। সারা জীবনে একটি হজ্জ বা একটি 'উমরা ফরজ। কিন্তু আমি বিশটিরও বেশী হজ্জ আদায় করেছি। তোমাদের সমাজে এমন বহু মানুষ আছে, যারা নিজেদেরকে ভীষণ দীনদার বলে মনে করে থাকে। তারা হজ্জ ও 'উমরা করে মারা যায়। কিন্তু তাদের হজ্জ হয় না। আমি তো নফল হজ্জ ও 'উমরা অপেক্ষা জুম'আর নামাযের বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

কুরআন পাকের তিলাওয়াত কখনো বাদ যেত না। সফরের অবস্থায়ও বাহনের পিঠে বসে তিলাওয়াত করতেন। তিনি সকল সম্মানীয় ব্যক্তি ও বস্তুর খুবই তা'জীম ও সম্মান করতেন। নবী-রাসূলদের প্রতি এত বেশী ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল যে, তাঁদের নামে নিজের ছেলেদের নাম রাখা বেয়াদবী মনে করতেন। কুরআন ও মসজিদের প্রতি এত সম্মান দেখাতেন যে শব্দ দু'টির ক্ষুদ্র অর্থ বুঝানোর জন্য রূপান্তরও মনঃপূত ছিল না। ইবন হারমালা বর্ণনা করেছেন, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব (রহ) বলতেন, তোমরা مُصْحَف و مَسْجِد (ছোট মসজিদ, ছোট কুরআন) বলবে না। আল্লাহ যে জিনিসকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তাকে সম্মান কর। আল্লাহ যে জিনিসকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তা শ্রেষ্ঠ এবং ভালো।

অসুস্থ অবস্থায়ও হাদীছ বর্ণনার সময় শোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে যেতেন। একবার কোন এক ব্যক্তি তাঁর অসুস্থ অবস্থায় তাঁর নিকট একটি হাদীছ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি শুয়ে ছিলেন, হঠাৎ উঠে বসলেন। প্রশ্নকারী বললেন, আমি চাচ্ছিলাম আপনার কোন কষ্ট না হোক। তিনি বললেন, আমি শুয়ে শুয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীছ বর্ণনা করা খারাপ মনে করি।

স্বভাব-চরিত্র ও আদত-অভ্যাসে তিনি ছিলেন সাহাবায়ে কিরামের অনুরূপ। বহু বড় বড় সাহাবী তাঁর স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের তারিফ করেছেন। হযরত 'আবদুল্লাহ ইবন 'উমার (রা) বলতেন, যদি রাসূল (সা) তাঁকে দেখতেন, খুশী হতেন। স্বভাবগত ভাবেই তিনি ছিলেন খুবই কোমল মনের ও নির্বিরোধ প্রকৃতির মানুষ। মতবিরোধ, যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব-ফাসাদ খুবই অপছন্দ ছিল। 'ইমরান ইবন 'আবদিল্লাহ খুযা'ঈ বর্ণনা করেছেন, সা'ঈদ ইবন আল মুসায়্যিব (রহ) কারো সাথে ঝগড়া করতেন না। কেউ যদি তাঁর চাদরটি কেড়ে নিতে চাইতো তাহলে তিনি তা স্বেচ্ছায় তার দিকে ছুড়ে দিতেন। শরীয়াতের নিষিদ্ধ বিষয়ের ব্যাপারে এত বেশী সতর্কতা অবলম্বন করতেন যে, শিশুদের খেলাধুলোর প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। নিজের মেয়েকে হাতির দাঁতের তৈরি পুতুল নিয়ে খেলতে দিতেন না। তিনি গলায় তাবীজ ঝুলানোকে কোন দোষ মনে করতেন না। একবার তাঁকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: لا بأس এতে কোন দোষ নেই।

তবে সত্য বলার ব্যাপারে তাঁর এ কোমল স্বভাব রুক্ষ ও কঠোর রূপ ধারণ করতো। ইমাম আয-যাহাবী বলেছেন, সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব খুবই সত্যভাষী ছিলেন। সত্য বলার প্রয়োজন হলে তিনি কখনো চুপ থাকতেন না। বানু উমাইয়্যার সমালোচনায় তাঁর ভাষার তরবারি সবসময় কোষমুক্ত থাকতো। তাদের সমালোচনায় কখনো তিনি বিরত থাকতেন না। মুত্তালিব ইবন সায়িব বর্ণনা করেছেন, একবার আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়িয়বের সাথে বাজারে বসে ছিলাম। এমন সময় বানু উমাইয়‍্যার এক আদালী সে পথ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কি বানু উমাইয়‍্যার ডাকবাহক? সে বললো: হাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন : তাদেরকে তুমি কেমন দেখে এসেছো? বললো: ভালো অবস্থায়। সা'ঈদ বললেন : তারা তো মানুষকে অভুক্ত রেখে কুত্তার পেট ভরায়। একথা শুনে ডাকবাহক ভীষণ ক্ষেপে গেল। আমি তাকে কোন রকম বুঝিয়ে বিদায় করে দিই। তারপর সা'ঈদকে বললাম, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি কেন এভাবে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছেন? সা'ঈদ বললেন : ওরে নির্বোধ, চুপ কর। আল্লাহর কসম! যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আল্লাহর অধিকারসমূহ সংরক্ষণ করবো ততক্ষণ তিনি আমাকে তাদের হাতের মুঠোয় তুলে দেবেন না। ৬৭

হযরত সা'ঈদের (রহ) খলীফা ও আমীরদের প্রতি মুখাপেক্ষীহীনতার ভাব তাঁদেরকে উপেক্ষার স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি একাধিক উমাইয়্যা খলীফার যুগ লাভ করেন। কিন্তু তাদের কারো সামনে মাথা নোয়াননি। শুধু তাই নয়, বরং তাদের কাকেও সাক্ষাৎ দেওয়াও প্রয়োজন বোধ করেননি। খলীফা 'আবদুল মালিকের সাথে তাঁর এ রকম কয়েকটি ঘটনার কথাই ইতিহাসে পাওয়া যায়। যাতে তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্বের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। 'আবদুল মালিক তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তিনি তাঁকে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকার করতেন। একবার খলীফা 'আবদুল মালিক মদীনায় গেলেন। তিনি মসজিদে নববীর দরজায় দাঁড়িয়ে মসজিদের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সা'ঈদের সাথে সাক্ষাতের জন্য তাঁকে লোক মারফত ডেকে পাঠালেন। 'আবদুল মালিকের লোক সা'ঈদের নিকট গিয়ে বললো, আমীরুল মু'মিনীন দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার সাথে কিছু কথা বলতে চান। জবাবে সা'ঈদ বললেন : আমার কাছে আমীরুল মু'মিনীনের কোন প্রয়োজন নেই। আর যদি আমার কাছে আমীরুল মু'মিনীনের কোন প্রয়োজন থেকেও থাকে তাহলে তা পূরণ হবার নয়। লোকটি ফিরে গিয়ে 'আবদুল মালিককে তাঁর জবাবটি জানিয়ে দিল। তিনি আবার লোকটিকে সা'ঈদের নিকট একই কথা বলে পাঠালেন। তবে বলে দিলেন, যদি তিনি না আসতে চান জোর করে আনবে না। লোকটি আবার গেল এবং একই জবাব পেল। লোকটি বললো, যদি আমীরুল মু'مিনীনের নিষেধ না থাকতো তাহলে আমি তোমার মাথা কেটে নিয়ে যেতাম। তিনি বার বার তোমাকে ডাকছেন, আর তুমি এভাবে প্রত্যাখ্যান করে যাচ্ছ। সা'ঈদ বললেন, যদি তিনি আমার সাথে কোন ভালো আচরণের ইচ্ছা করে থাকেন তাহলে আমি তা তোমাকে দান করলাম। আর যদি তাঁর অন্য কোন ইচ্ছা থেকে থাকে তাহলে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিশেষ বৈঠক থেকে উঠবো না যতক্ষণ না তিনি যা করতে চান তা করে ফেলেন। 'আবদুল মালিকের পাঠানো সেই লোকটি ফিরে গিয়ে তাঁকে সা'ঈদের সব কথা জানিয়ে দিল। 'আবদুল মালিক মন্তব্য করলেন : আল্লাহ আবু মুহাম্মাদের প্রতি দয়া করুন! তাঁর কঠোরতা বেড়েই চলেছে। ৬

একবার খলীফা 'আবদুল মালিক মদীনা আসলেন। একদিন রাতের বেলা তাঁর চোখে মোটেই ঘুম আসছিল না। তিনি তাঁর এক নিরাপত্তা রক্ষীকে নির্দেশ দিলেন: তুমি মসজিদে গিয়ে দেখ তো মদীনার কোন কাহিনী বলিয়ে লোক পাও কিনা। পেলে নিয়ে আসবে। নিরাপত্তা রক্ষী মসজিদে গেল। কিন্তু এত গভীর রাতে কিসসা-কাহিনী বলার লোক থাকবে কেন। হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) মসজিদের এক কোণে বসে যিকির ও দু'আ-ইসতিগফারে মশগুল ছিলেন। রক্ষীটি সা'ঈদকে চিনতো না। সে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো এবং হাতের ইশারায় তাঁকে ডাকলো। কিন্তু তিনি কোন প্রকার সাড়া না দিয়ে নিজের জায়গায় বসে রইলেন। রক্ষী মনে করলো, এ ব্যক্তি ইচ্ছা করে তার ইশারায় সাড়া দিচ্ছে না। সে আরো একটু নিকটে গিয়ে ইশারা করলো এবং বললো, আমি তোমাকে ইশারা করেছি, তুমি দেখতে পাওনি? সা'ঈদ (রহ) বললেন: তুমি তোমার প্রয়োজনের কথা বল। রক্ষী বললো: আমীরুল মু'مিনীনের চোখ খুলে গেছে। তিনি আমাকে হুকুম করেছেন: কোন কথা বলার লোক নিয়ে এসো। এ কারণে তোমাকে যেতে হবে। সা'ঈদ বললেন: তিনি কি আমাকে ডেকেছেন? রক্ষী বললো: না। তিনি বলেছেন: তুমি যেয়ে দেখ, শহরের কোন কিসসা-কাহিনী বলার লোক যদি পাও নিয়ে এসো। আমি তোমার চেয়ে উপযুক্ত কোন লোক পাইনি। একথা শুনে সা'ঈদ বললেন: তুমি ফিরে গিয়ে আমীরুল মু'মিনينকে বলে দাও যে, আমি তাঁর গল্প-কাহিনী বলা লোক নই। এমন জবাব শুনে রক্ষী মনে করলো, এ হয়তো কোন পাগল হবে। এ কারণে সে ফিরে গেল এবং 'আবদুল মালিককে বললো, মসজিদে শুধু এক বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। আমি তাঁকে ইশারা করলাম, কিন্তু সে তার স্থান থেকে একটুও নড়লো না। তারপর আমি তার নিকটে গিয়ে বললাম, আমীরুল মু'মিনীন আমাকে পাঠিয়েছেন, কোন কাহিনী বলিয়ে লোক নিয়ে যাওয়ার জন্য। লোকটি জবাব দিল তুমি যেয়ে আমীরুল মু'মিনীনকে বল, আমি তাঁর গল্প-কাহিনী বলার লোক নই। 'আবদুল মালিক তাঁর স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবহিত ছিলেন। এ কারণে ঘটনাটি শুনে তিনি বলে ওঠেন: এ তো সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব। তাঁকে ছেড়ে দাও।

তিনি খলীফা 'আবদুল মালিককে এত শক্ত জবাব দিতেন যা একজন সাধারণ মানুষকেও দেওয়া যায় না। একবার 'আবদুল মালিক তাঁকে বললেন: আবূ মুহাম্মাদ! এখন আমার অবস্থা এমন হয়েছে যে, যদি কিছু ভালো কাজ করি তাহলে তাতে খুশী অনুভব করি না। আর খারাপ কাজ করলেও তাতে দুঃখ অনুভব করি না। তিনি বললেন: এখন আপনার অন্তর একেবারেই মরে গেছে।

খলীফা 'আবদুল মালিক-এর পরে তাঁর পুত্র ওয়ালীদের সাথেও হযরত সা'ঈদের (রহ) কর্মধারা একই রকম ছিল। মসজিদে নববীর পুনর্নির্মাণ ও প্রশস্তকরণের পর যখন ওয়ালীদ পরিদর্শনে এলেন তখন মসজিদের অভ্যন্তরের সব মানুষকে বের করে দেওয়া হয়। সা'ঈদ ইবনে মুসায়্যিব (রহ) মসজিদের এক কোণে বসা ছিলেন। তাঁকে উঠানোর হিম্মত কারো হয়নি। এক ব্যক্তি শুধু এতটুকু বলে যে, এ সময় যদি আপনি একটু সরে যেতেন! তিনি জবাব দেন, আমার ওঠার যে সময় আছে তার আগে আমি উঠবো না।

তারপর তাঁর কাছে আবেদন জানানো হলো, ঠিক আছে উঠবেন না, তবে অন্ততঃ এতটুকু করুন যে, যখন আমীরুল মু'মিনীন এদিক দিয়ে যাবেন তখন সালাম দেওয়ার জন্য একটু উঠে দাঁড়াবেন। বললেন: আল্লাহর কসম! আমি তার জন্য উঠে দাঁড়াতে পারিনে।

হযরত 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয (রহ) খলীফা ওয়ালীদকে মসজিদ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন। তিনি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিবের (রহ) মর্যাদা ও তাঁর স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এ কারণে তিনি সা'ঈদকে ওয়ালীদের দৃষ্টির আড়ালে রাখার জন্য এদিক সেদিক ঘোরাতে থাকেন। কিন্তু ওয়ালীদ কিবলার দিকে তাকাতেই এক সময় সা'ঈদের উপর দৃষ্টি পড়ে। ওয়ালীদ জিজ্ঞেস করেন: এই বৃদ্ধ কে? সা'ঈদ তো নয়? 'উমার ইবন 'আবদিল 'আযীয জবাব দিলেন: হাঁ, তিনিই। তারপর তাঁর পক্ষ থেকে কৈফিয়াত দিতে গিয়ে তাঁর বিভিন্ন অসুবিধার কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন: এখন তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন ও চোখে কম দেখেন। যদি তিনি আপনাকে চিনতে পারতেন তাহলে সালাম দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতেন। ওয়ালীদ বললেন: হাঁ, আমি তাঁর অবস্থা সম্পর্কে অবগত। আমি নিজেই তাঁর কাছে যাচ্ছি। অতঃপর ওয়ালীদ এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে তাঁর কাছে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন: শায়খ, আপনার শরীর কেমন আছে? শায়খ নিজের জায়গায় বসে বসেই জবাব দিলেন: আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি। তবে এতটুকু সৌজন্য বজায় রাখলেন যে, ওয়ালীদের কুশলও জিজ্ঞেস করলেন। এই সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের পর ওয়ালীদ একথা বলতে বলতে ফিরে যান যে, এ হলো পুরাতন স্মৃতি।

হযরত সা'ঈদ (রহ) শরী'আতের হুকুম-আহকামের ব্যাপারে খুবই কঠোর ছিলেন, তবে কারো গোপন পাপের কথা প্রকাশ করা মোটেই পছন্দ করতেন না। এ ব্যাপারে অন্যদেরকেও গোপন করার নির্দেশ দিতেন। ইবন হারমালা বর্ণনা করেছেন, একদিন আমি প্রত্যুষে ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এক ব্যক্তিকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাই। আমি তাকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে আমার ঘরে নিয়ে আসি। এরপর সা'ঈদের সাথে আমার দেখা হয়। তাঁর কাছে আমি জানতে চাইলাম, এক ব্যক্তি কোন এক ব্যক্তিকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পেল, এ অবস্থায় সে কি করবে? তাকে কি বিচারে সোপর্দ করে তার উপর হদ জারী করাবে? সা'ঈদ বললেন: তুমি যদি তাকে তোমার কাপড় দিয়ে ঢাকতে পার তাহলে ঢেকে দাও। একথা শুনে আমি ঘরে ফিরে এলাম। তখন লোকটির নেশার ঘোর কেটে গেছে। আমাকে দেখামাত্রই তার চেহারায় লজ্জা ও অনুশোচনার ভাব ফুটে ওঠে। আমি তাকে বললাম: তোমার লজ্জা হয় না? সকালে তোমাকে যদি এ অবস্থায় গ্রেফতার করে নিয়ে যেত এবং তোমার উপর হদ জারী করা হতো তাহলে মানুষের দৃষ্টিতে তোমার মর্যাদা কোথায় নেমে যেত? তোমার জীবদ্দশায় তোমার মৃত্যু হতো। তোমার সাক্ষ্য পর্যন্ত গ্রহণ করা হতো না। আমার এ উপদেশ শুনে লোকটি বললো আল্লাহর কসম! ভবিষ্যতে আমি এমন কাজ আর করবো না। এই গোপন রাখার ফল এই হলো যে, সে চিরদিনের জন্য তাওবা করে নিল। ৭০

হযরত সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) মেয়ের বিয়ের ঘটনাটি আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, দারিদ্রপ্রীতি, আড়ম্বরহীনতা প্রভৃতি দিক থেকে অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। তাঁর মেয়েটি ছিল খুবই সুন্দরী ও সুশিক্ষিতা। খলীফা 'আবদুল মালিক তাকে পুত্রবধূ করার প্রস্তাব পাঠান। সা'ঈদ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। 'আবদুল মালিক খুব চাপ প্রয়োগ করেন এবং নানা ধরনের কঠোরতার আশ্রয় নেন। কিন্তু সা'ঈদ (রহ) প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ওপর অটল থাকেন। কিছুদিন পর তিনি কুরায়শ বংশের এক অতি সাধারণ ও দরিদ্র ব্যক্তির সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে দেন। সেই ব্যক্তির নাম ছিল আবূ বিদা'আ।

এই ঘটনাটি আবূ বিদা'আ নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়িয়বের (রহ) নিকট নিয়মিত যাতায়াত করতাম। একবার কিছুদিন বিরতির পর গেলাম। সা'ঈদ প্রশ্ন করলেন: এতদিন কোথায় ছিলে? আমি বললাম: আমার স্ত্রীর মৃত্যু হওয়ায় উপস্থিত হতে পারিনি। তিনি বললেন: আমাকে সংবাদ দাওনি কেন, আমিও কাফন-দাফনে অংশগ্রহণ করতাম। কিছুক্ষণ পর আমি যখন উঠতে গেলাম তখন তিনি বললেন, তুমি কি দ্বিতীয় বিয়ের কোন ব্যবস্থা করেছো? আমি বললাম আমি একজন রিক্ত-নিঃস্ব সামান্য আয়ের মানুষ। আমার সাথে কে তার মেয়ের বিয়ে দেবে?

তিনি বললেন: আমি দেব। তুমি প্রস্তুতি নাও। আমি বললাম: খুবই আনন্দের বিষয়। হযরত সা'ঈদ (রহ) দুই অথবা তিন দিরহাম দেন মাহরের বিনিময়ে আমার সাথে তাঁর মেয়ের বিয়ে পড়িয়ে দেন। আমি সেখান থেকে যখন উঠলাম তখন খুশীর আতিশয্যে কি করবো তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। বাড়ীতে ফিরে এসে বউকে ঘরে তুলে আনার জন্য ধার-দেনার চিন্তা-ভাবনায় পড়ে গেলাম।

সন্ধ্যার সময় সা'ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব মেয়েকে তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য বললেন। দু' রাক'আত নামায তিনি নিজে পড়লেন এবং দু রাক'আত নামায মেয়ের দ্বারা পড়ালেন। তারপর তাকে সংগে করে আমার বাড়ীতে উপস্থিত হলেন। আমি তখন রোযা ইফতারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ কেউ দরজায় টোকা দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম কে? জবাব দিল: সা'ঈদ। আমি চিন্তা করতে লাগলাম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তো তাঁর নিজের বাড়ী এবং মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যান না। তাহলে এ সা'ঈদ কে? উঠে দরজা খুলে দেখি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব। তাকে দেখে আমি বললাম, আপনি কষ্ট করে এসেছেন কেন। আমাকে ডেকে পাঠালেই তো পারতেন। তিনি বললেন: না, আমাকে তোমার কাছে আসা উচিত ছিল। আমি বললাম বলুন, কি করতে হবে। বললেন: তুমি একা আছো আর এদিকে তোমার স্ত্রীও আছে। আমার মনে হলো, তুমি একাকী রাত কাটাবে কেন। এ কারণে স্ত্রীকে সংগে করে নিয়ে এসেছি। সে তার পিতার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। তিনি তাকে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাহির থেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার স্ত্রী লজ্জায় সংকুচিত হয়ে পড়লো। আমিও ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর আমি ঘরের ছাদে উঠে চিৎকার করে প্রতিবেশীদেরকে জানিয়ে দিলাম যে, সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব তাঁর মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছেন এবং তিনি আমার স্ত্রীকে আমার বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেছেন। আমার মা রীতি অনুযায়ী তিন দিন পর্যন্ত নতুন বউকে সাজ-গোছ করালেন। সাজ-গোছের পর আমি তাকে দেখলাম। সে ছিল খুবই সুন্দরী, কুরআনের হাফিজা, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের 'আলিমা এবং স্বামীর অধিকার সচেতন এক মহিলা। ৭১

হযরত সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিব (রহ) একজন তাপস ও দুনিয়ার ভোগ-বিলাস বিমুখ মানুষ ছিলেন- একথা সত্য। তবে দুনিয়াকে এত পরিমাণ ত্যাগ করা পছন্দ করতেন না যাতে একজন মানুষ তার মান-সম্মান বজায় রাখতে এবং সমাজের অন্যদের সাথে ভদ্রভাবে ওঠা-বসা করতে পারে না। আর এ কারণে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসার মত একটি পবিত্র পেশা গ্রহণ করেন। যয়তুনের তেলের ব্যবসা করতেন। ৭২

জীবনের এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় ভাতা পেতেন। কিন্তু পরে তা গ্রহণ করা ছেড়ে দেন। তাঁর ভাতার তিরিশ হাজার দিরহামেরও বেশী অর্থ বাইতুল মালে জমা ছিল। এ অর্থ গ্রহণ করার জন্য বহুবার তাকিদ দেওয়া হয়েছে কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে বার বার অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি বলতেন, যতক্ষণ আল্লাহ আমার ও বানু মারওয়ানের মধ্যে কোন ফায়সালা না করেন ততক্ষণ আমার এ অর্থের কোন প্রয়োজন নেই। ৭৩

শেষ জীবনে তাঁর দাড়ি ও মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল, যা কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতো, আবার কখনো দাড়িতে খিজাব লাগাতেন। গোঁফ কখনো চিকন, আবার কখনো পুরো করে ছাঁটতেন। পোশাক-পরিচ্ছদে তাঁর বিশেষ কোন রুচি ছিল না। তবে সাধারণভাবে একটু ভালো পোশাক পরতেন। সাদা পোশাক বেশী পছন্দ ছিল। পাগড়ী কালো হতো। তবে মাঝে মাঝে সাদা পাগড়ীও পরতেন। কখনো কখনো তাজ তথা মুকুটের মত উঁচু টুপি ব্যবহার করতেন। কাঁধের উপর চাদর ব্যবহার করতেন, তাতে কাতানের কারুকাজ করা আঁচল থাকতো। মাঝে মাঝে সূক্ষ্ম রেশমের চাদরও পরতেন। পাজামা, জামা, লুঙ্গি, মোজা ইত্যাদিও পরতেন। ৭৪

হযরত মু'আবিয়া (রা) তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে নিম্নের চরণটি আবৃত্তি করেন:
هو الموت لامنجي من الموت والذي + نحاذر بعد الموت أنكى وافظع
- এই সেই মৃত্যু যে মৃত্যুর থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই। আর মৃত্যুর পরে যে জিনিসের আমরা ভয় করি তা অতি মারাত্মক ও ভয়াবহ।

তারপর তিনি এই দু'আ করেন: 'হে আল্লাহ আমার পদস্খলনকে কম করে দেখুন, ভুল- ত্রুটিকে ক্ষমা করে দিন, আপনি আপনার জ্ঞান ও বিচক্ষণতা দ্বারা সেই ব্যক্তির মূর্খতা ও বর্বরতাকে ঢেকে দিন যে আপনার নিকট ছাড়া অন্য কারো কাছে কিছু আশা করে না এবং শুধু আপনার উপরই সে নির্ভর করে। আপনার ক্ষমা অতি ব্যাপক। হে আমার রব! ভুল-ভ্রান্তির অধিকারী বান্দার জন্য আপনি ছাড়া পালানোর কোন স্থান নেই।' দাউদ ইবন আবী হিন্দা বলেন, মু'আবিয়ার (রা) এই শেষ উক্তিগুলির কথা শুনে সা'ঈদ ইবন আল- মুসায়্যিব মন্তব্য করেন: 'তিনি বাধ্য হয়ে সেই সত্তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন যাঁর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমি আশা করি আল্লাহ তাঁর প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবেন।' ৭৫

ইবন শিহাব আয-যুহরী বলেন, আমি সা'ঈদ ইবন মুসায়্যিবকে বললাম: 'উছমান (রা) কিভাবে নিহত হলেন তা কি আমাকে একটু বলবেন? মানুষের ও তাঁর ভূমিকা কী ছিলো? মুহাম্মাদ (সা)-এর সাহাবীরা তাঁকে এভাবে লাঞ্ছিত করলেন কেন? তিনি বললেন: তিনি অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছেন। যারা তাঁকে হত্যা করেছে তারা জালিম। আর যারা তাঁকে লাঞ্ছিত করেছে তারা মাজুর, অক্ষম। আমি প্রশ্ন করলাম: তা কিভাবে? তারপর তিনি 'উছমান (রা) হত্যার প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করলেন। ৭৬

টিকাঃ
১. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৬২
২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-২/৩০১; তাবাকাত-৫/৮৮
৩. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৮; সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৪; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৪
৪. তাবাকাত-৫/৯০
৫. প্রাগুক্ত
৬. সূরা আন-নিসা-৩
৭. তাবাকাত-৫/৯০
৮. প্রাগুক্ত-৫/৯২-৯৩; আল-'ইদ আল-ফারীদ-৪/৪২১
৯. তাবাকাত-৫/৯৪
১০. প্রাগুক্ত-৫/৯৩-৯৪; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৭১-১৭২
১১. আল-'ইদ আল-ফারীদ-৩/১৬৯
১২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৭; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৬
১৩. তাবাকাত-৫/৯৫
১৪. সূরা আল-বাকারা-১১৫
১৫. তাঁর মৃত্যু-সন সম্পর্কে মতপার্থক্য আছে। আল-হায়ছাম ইবন 'আদী, সা'ঈদ ইবন 'উফায়র, ইবন নুমায়র প্রমুখ ব্যক্তিরা হি. ৯৪ সনের কথা বলেছেন। কাতাদা হি. ৮৯, ইয়াহইয়া আল-কাত্তান ৯১, দামরা ৯২ এবং আলী আল-মাদানী ও ইবন মা'ঈন ১০৫ সনের কথা বলেছেন। হাকেম বলেছেন, হাদীছের অধিকাংশ ইমাম শেষোক্ত মতের উপর। ইমাম আয-যাহাবী বলেছেন, হি. ৯৪ সনের মতটি সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী। (ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৮; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৬)
১৬. তাবাকাত-৫/১০৫-১০৬
১৭. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৫
১৮. তাহযীবুল আসমা' ওয়াল লুগাত-১/২২০
১৯. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৬
২০. শাযারাতুয যাহাব-১/১০৩
২১. তাবাকাত-৫/১০১
২২. প্রাগুক্ত-৫/৮৯; তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৫
২৩. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৫; তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪; তাহযীবুল আসমা'-১/২২; সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৫
২৪. তাবাকাত-৫/৯০
২৫. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৪
২৬. তাবাকাত-৫/৫০
২৭. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
২৮. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৪
২৯. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৬
৩০. প্রাগুক্ত-৪/৮৫
৩১. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
৩২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৫; আ'লামুল মুওয়াক্কি 'ঈন-১/২৫
৩৩. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
৩৪. তাবাকাত-৫/৯০
৩৫. শাযারাতুয যাহাব-১/১০০
৩৬. প্রাগুক্ত-১/৮৯
৩৭. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪
৩৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/৫৫
৩৯. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪
৪০. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-১/৩৭৫
৪১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-২/৯৮
৪২. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৫
৪৩. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৫
৪৪. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৪
৪৫. তাবাকাত-৫/৯০
৪৬. প্রাগুক্ত
৪৭. তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৫; তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৫৫
৪৮. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন-১/৩১৮, ৩২০, ৩২৮, ৩৫৬
৪৯. প্রাগুক্ত-১/৩১৪
৫০. প্রাগুক্ত-১/২০২
৫১. তাবাকাত-৫/৬৮
৫২. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৫/২৮৩
৫৩. তাবাকাত-৫/৯১
৫৪. প্রাগুক্ত-৫/৯২
৫৫. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/৩৭৮
৫৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৪/৪৪৬
৫৭. তাবাকাত-৫/১০০; সিফাতুল সাফওয়া-২/৪৪
৫৮. সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৫
৫৯. তাবাকাত-৫/১০০
৬০. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬২; তাহযীবুত তাহযীব-৪/৮৭
৬১. তাহযীবুল আসমা'-১/২২০
৬২. তাবাকাত-৫/৯৭; ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬২
৬৩. সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৪
৬৪. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬২
৬৫. সিফাতুস সাফওয়া-২/৪৪
৬৬. আল-'ইকদ আল-ফারীদ-৬/২৭৪
৬৭. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৫
৬৮. তাবাকাত-৫/৯৫
৬৯. প্রাগুক্ত-৫/৯৩-৯৪; হিলয়াতুল আওলিয়া-২/১৭১-১৭২
৭০. প্রাগুক্ত-৫/১০১
৭১. ওয়াফায়াতুল আ'য়ান-২/২৬৭
৭২. তাযকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৭
৭৩. প্রাগুক্ত-১/৯৫
৭৪. প্রাগুক্ত-১/১০০
৭৫. আল-ইকদ আল-ফারীদ-৩/১৮০
৭৬. প্রাগুক্ত-৪/২৮৭-২৯২

ফন্ট সাইজ
15px
17px