📄 আবু মুসলিম খাওলানি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি উপদেশ
[১০৮৬] মুআবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়ান দিমাস্কের মিম্বরে বসা অবস্থায় আবূ মুসলিম খাওলানি তাকে ডেকে বললেন, “হে মুআবিয়া, আপনি কবরসমূহের মধ্য হতে একটি কবর। যদি আপনি কোনো কিছু নিয়ে আসেন, তবে আপনার জন্য কিছু হবে। আর যদি কোনো কিছু না নিয়ে আসেন, তাহলে আপনার জন্য কিছুই হবে না। হে মুআবিয়া, কেবল সম্পদ স্তূপ করে তা বিতরণ করাকেই খেলাফত ভাববেন না। বরং খেলাফত হলো সত্যের ওপর আমল করা, ন্যায়পরায়ণতার সাথে কথা বলা এবং আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে পাকড়াও করা। হে মুআবিয়া, যদি আপনি আরবের কোনো গোত্রের ওপর অবিচার করেন, তবে আপনার অবিচার আপনার ন্যায়পরায়ণতাকে শেষ করে দেবে।”
আবূ মুসলিম তার কথা শেষ করার পর মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, "আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।”
মানুষের সমালোচনা পরিহার করা
[১০৮৭] আবূ মুসলিম খাওলানির কাছে একবার এক ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টের অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, “তুমি যদি মানুষের সমালোচনা করো, তবে তারাও তোমার সমালোচনা করবে। আর যদি তাদের তুমি ছেড়ে দাও, তবুও তারা তোমাকে ছাড়বে না। যদি তুমি তাদের থেকে পলায়ন করো, তারা তোমাকে ধরে ফেলবে।"
সে জানতে চাইল, “তাহলে আমি কী করব?” তিনি বললেন, “অভাবের দিনে তাদেরই তোমার প্রয়োজন হবে।”
সম্পদ জমা করার জন্য নবিজিকে পাঠানো হয়নি
[১০৮৮] আবূ মুসলিম খাওলানি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'সম্পদ জমা করে ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আল্লাহ আমার কাছে ওহি পাঠাননি। বরং তিনি আমার কাছে ওহি পাঠিয়েছেন এই মর্মে :
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُن مِّنَ السَّاجِدِينَ وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
'তুমি তোমার রবের প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করো এবং সাজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর ইয়াকীন (মৃত্যু) না আসা পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদাত করো।”[১৬৭]
কাকের সংবাদ প্রদান করা
[১০৮৯] দিমাশকের কিছু শাইখ থেকে বর্ণিত আছে, "আবূ মুসলিম খাওলানি রোম অঞ্চলে ছিলেন। শাসক সেখানে একটি বাহিনী পাঠিয়ে তাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিলো। কিন্তু তারা দেরি করছে দেখে আবূ মুসলিম খাওলানি চিন্তিত হলেন। তাদের কথা চিন্তা করতে করতে নদীর তীরে তিনি ওযু করছিলেন। হঠাৎ গাছের ওপর একটি কাক এসে তাকে বলল, 'হে আবূ মুসলিম, আপনি কি বাহিনীর কথা ভেবে চিন্তিত?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' কাকটি বলল, 'চিন্তার কিছু নেই। তারা গানীমাত লাভ করে নিরাপদেই আছে। অমুক সময়ে তারা আপনার কাছে এসে পৌঁছবে।' আবূ মুসলিম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কে? আল্লাহ তোমাকে রহম করুন।' সে বলল, 'আমি আরতিয়াঈল। মুমিনদের হৃদয়কে প্রশান্ত করি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “পরবর্তীকালে তারা (সে বাহিনীর লোকজন) তার (কাকের) বলা সময় অনুযায়ী এসেছিল।”
গির্জার পাদরির সালাম জানানো
[১০৯০] মুহাম্মাদ ইবনু শুআইব দিমাশকের কোনো এক শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, "আমরা রোমের অঞ্চল থেকে কাফেলা আকারে ফিরে আসছিলাম। হিমস থেকে দিমাশকের উদ্দেশে রওনা হয়ে আমরা হিমস থেকে চার মাইলের কাছাকাছি একটি মোড় অতিক্রম করলাম রাতের বেলায়। সেখানে গির্জায় থাকা পাদরি (আমাদের কথা) শুনতে পেয়ে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কারা?' আমরা বললাম, 'আমরা দিমাশকের কিছু মানুষ। রোমের এলাকা থেকে এসেছি।' সে বলল, 'তোমরা কি আবূ মুসলিম খাওলানিকে চেনো?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, চিনি।' সে বলল, 'তোমরা যদি তার দেখা পাও, তবে তাকে আমার সালাম দিয়ো। তাকে বলে দিয়ো, আমরা তাকে কিতাবে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গীরূপে পেয়েছি। যদি তোমরা তাকে চিনে থাকো, তবে তাকে জীবিত পাবে না।'
বর্ণনাকারী বলেন, “যখন আমরা গুতা নামক এলাকায় এসে পৌঁছলাম, তখন তার মৃত্যুসংবাদ আমাদের কাছে এসে পৌঁছল।”
দুআ করার সাথে সাথে বৃষ্টি নামা
[১০৯১] সাঈদ ইবনু আবদুল আযীয বলেন, মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যামানায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। তিনি লোকদের সাথে করে বৃষ্টির প্রার্থনার জন্য বের হলেন। যখন লোকেরা মুসল্লার দিকে তাকাল, তখন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আবূ মুসলিমকে বললেন, 'মানুষ যে কী মুসিবতে পতিত হয়েছে, তা তো দেখছেনই। সুতরাং আল্লাহর কাছে দুআ করুন।' তিনি বললেন, 'অযোগ্যতা সত্ত্বেও আমি (দুআ) করব।' তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তার গায়ে ছিল মাথাওয়ালা এক প্রকার ঢিলা কোট। তিনি মাথা থেকে তা খুলে ফেললেন। তারপর বললেন, 'হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে বৃষ্টি চাচ্ছি। নিজেদের পাপের বোঝা সাথে করেই আমরা আপনার কাছে এসেছি। সুতরাং আমাদের নিরাশ করবেন না।”
বর্ণনাকারী বলেন, “লোকেরা ফিরে যেতে-না-যেতেই বৃষ্টি হলো। তখন আবূ মুসলিম বললেন, 'হে আল্লাহ, মুআবিয়া আমাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যে, তার কথা শুনতেই হতো। সুতরাং আপনার কাছে যদি আমার জন্য কোনো কল্যাণ থাকে, তাহলে আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যান।' সেদিন ছিল বুধবার। পরবর্তী বুধবারেই তার মৃত্যু হয়।"
সকল কিছু আল্লাহর কাছে চাওয়া
[১০৯২] মুহাম্মাদ ইবনু শুআইব থেকে বর্ণিত, “নফল সালাতে আবূ মুসলিম খাওলানি দুআ করতেন, হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে রান্না করা খাবার দান করো। হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে রান্না করা খাবার দান করো। হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে তেল দান করো। হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে কাষ্ঠখণ্ড দান করো। এভাবে তার যা ইচ্ছা, সবকিছু তিনি চাইতেন।”
ইবাদাতে সচেষ্ট হওয়া
[১০৯৩] সাঈদ ইবনু আবদুল আযীয বলেন, “আবূ মুসলিম খাওলানি বলেছেন, 'যদি বলা হয়, জাহান্নامকে প্রজ্বলিত করা হবে, তবুও আমি আমার আমলে বৃদ্ধি ঘটাতে পারব না।” [১৬৮]
ভালো কাজ করলে ভালো প্রতিদান পাওয়া যায়
[১০৯৪] উবাইদুল্লাহ ইবনু শুমাইত বলেন, “আমার পিতা বর্ণনা করেছেন, ‘আবৃ মুসলিম খাওলানি ঘুরে ঘুরে ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করছিল। মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আগমন করলে তাকে বলা হলো যে—আবূ মুসলিম ঘুরে ঘুরে ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করছে। তিনি তার কাছে (আসার জন্য) খবর পাঠালেন। তারপর তাকে বললেন, ‘হে আবূ মুসলিম, তুমি কী করছ? তুমি কি ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করছ?’ তিনি বললেন, 'হ্যাঁ'। তারপর আবূ মুসলিম মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি মনোনিবেশ করে বললেন, 'যদি আপনি ভালো কাজ করেন, তবে ভালো প্রতিদান পাবেন। আর যদি মন্দ কাজ করেন, তবে তারও প্রতিদান পাবেন। হে মুআবিয়া, যদি আপনি পুরো বিশ্ববাসীর ওপর ন্যায়বিচার করে পরে একজনের ওপরও জুলুম করেন, তবে আপনার জুলুম আপনার ন্যায়বিচারকে পদানত করবে।”
যিকরকারী শ্রেষ্ঠ
[১০৯৫] আবূ উবাইদাহ ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, "যদি কোনো ব্যক্তি রাস্তার ধারে একটি স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি থলে নিয়ে বসে এবং যে-ই তার পাশ দিয়ে যায় তাকে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করতে থাকে, আর তার অন্যপাশে আরেকজন ‘আল্লাহু আকবার’ যিকর করতে থাকে, তবে যিকরকারীই হবে সর্বোচ্চ নেকি অর্জনকারী।”
পাপ পরিহার করা বেশি সহজ
[১০৯৬] শুরাহবিল ইবনু মুসলিম বলেছেন, “যখন আবূ মুসলিম কোনো ধ্বংসস্থলে আসতেন সেখানে অবস্থান করে বলতেন, হে ধ্বংস্থল, তোমার অধিবাসীরা কোথায়? তারা প্রস্থান করেছে। রয়ে গেছে তাদের কর্মসমূহ। কুপ্রবৃত্তি শেষ হয়ে গেছে। রয়ে গেছে আদম-সন্তানের পাপসমূহ। তাওবা অন্বেষণের তুলনায় পাপ পরিহার করা অনেক বেশি সহজ।”
লম্বা সময় সালাত আদায় করা
[১০৯৭] শুরাহবিল ইবনু মুসলিম খাওলানি থেকে বর্ণিত, "দুই ব্যক্তি আবু মুসলিম খাওলানির সাথে তার বাড়িতে সাক্ষাৎ করতে এল। তার পরিবারের কেউ তাদের জানাল যে, তিনি মাসজিদে আছেন। (তারা গিয়ে) তাকে সালাতে দেখতে পেল। তারা তার সালাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল এবং রাকাত গুনতে লাগল। একজনের গণনায় দেখা গেল তিনি সালাত শেষ করার আগে তিন শ রাকাত পড়েছেন। অন্যজনের গণনায় চার শ রাকাত। তারা তাকে বলল, 'হে আবূ মুসলিম, আমরা আপনার পেছনে বসে অপেক্ষা করছিলাম।' তিনি তাদের বললেন, 'শোনো, যদি আমি তোমাদের অবস্থানের কথা জানতাম, তবে তোমাদের কাছে আসতাম। তোমরা আর আমার সালাত গণনা করার সুযোগ পেতে না। তোমাদের আমি কসম করে বলছি, কিয়ামাত দিবসের জন্য অধিক পরিমাণে সাজদা করা অতি উত্তম।”
তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি
[১০৯৮] কাব বলেন, “আবূ মুসলিম খাওলানি এই উম্মতের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি।”
মুমিনদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা না করা
[১০৯৯] আবূ মুসলিম খাওলানি বলতেন, “মুমিনদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা করা থেকে সাবধান। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ও জবানে সত্যকে স্থাপন করেছেন।"
সাধ্যানুরূপ ইবাদাত করতে চেষ্টা করা
[১১০০] আবদুল্লাহ ইবনু উবায়দ ইবনু উমায়ের তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
تَجِدُ الْمُؤْمِنَ يَجْتَهِدُ فِيمَا يُطِيقُ مُتَلَقِّفًا عَلَى مَا لَا يُطِيقُ
“তুমি দেখবে যে মুমিনরা সাধ্যানুরূপ (ইবাদাত করতে) চেষ্টা করে। আর যা তাদের সাধ্যের বাইরে, এর জন্য তাদের দুঃখ হয়।” [১৬৯]
আল্লাহ দয়ালু ব্যক্তির প্রতিই দয়া করেন
[১১০১] আবূ সালেহ হানাফি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ رَحِيمٌ لَا يَضَعُ رَحْمَتَهُ إِلَّا عَلَى رَحِيمٍ وَلَا يُدْخِلُ الْجَنَّةَ إِلَّا رَحِيمًا
'আল্লাহ তাআলা দয়ালু। তিনি কেবল দয়ালু ব্যক্তির প্রতিই দয়া করেন এবং দয়ালু ব্যক্তিকেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।'
লোকেরা বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা তো আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার- পরিজনের প্রতি দয়াশীল।' তিনি বললেন,
لَيْسَ بِذَلِكَ وَلَكِنْ مَا قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
'এটা নয়। বরং আল্লাহ যা বলেছেন— 'তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবা, ৯: ১২৮) [১৭০]
এই উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণি
[১১০২] বাকর ইবনু সাওয়াদাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
سَيَكُونُ نَشْوُ مِنْ أُمَّتِي يُولَدُونَ فِي النَّعِيمِ وَيَغْذُونَ بِهِ، هِمَّتُهُمْ أَلْوَانُ الطَّعَامِ وَأَلْوَانُ الغِيَابِ يَتَشَدَّقُونَ بِالْقَوْلِ أُولَبِكَ شِرَارُ أُمَّتِي
“অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটা প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা আরাম-আয়েশের ভেতর জন্ম নেবে ও আরাম-আয়েশের ভেতরই প্রতিপালিত হবে। তাদের মূল ভাবনা হবে রং-বেরঙের খাবার-দাবার ও বিভিন্ন ধরনের কাপড়-চোপড়। তারা কথা বলবে আড়ম্বর-সহকারে। এরাই হলো আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণি।”[১৭১]
একটি মূল্যবান হাদীস
[১১০৩] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ ، أَلَا إِنَّ الْمُهَاجِرَ مَنْ هَجَرَ السَّوْءَ، أَلَا إِنَّ الْمُسْلِمَ مَنْ سَلِمَ مِنْهُ جَارُهُ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ رَجُلٌ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَابِقَهُ
“প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে অন্য মুমিনরা নিরাপদ থাকে। শুনে রাখো, মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে পাপ পরিহার করে। প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার প্রতিবেশী তার থেকে নিরাপদ। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, সেই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ নয়।”
একটি কথার জন্য সত্তর বছর জাহান্নামে অবস্থান
[১১০৪] হাসান থেকে বর্ণিত, আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ وَمَا يَدْرِى أَنَّهَا تَبْلُغُ حَيْثُ مَا بَلَغَتْ يَهْوِي بِهَا فِي النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا
"নিশ্চয়ই একজন ব্যক্তি কোনো কথা বলে এবং সে জানেও না যে তা যেখানে পৌঁছার সেখানে পৌঁছবে। (এমনও হতে পারে) এর কারণে সে সত্তর বছর জাহান্নামে অবস্থান করবে।" [১৭২]
নবিজি ঘরের কাজকর্ম করতেন
[১১০৫] ইবনু শিহাব থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের কাজকর্ম করতেন। অধিকাংশ সময় তিনি যা করতেন তা হলো, সেলাই।"
নবিজির কিছু বৈশিষ্ট্য
[১১০৬] হাসান থেকে বর্ণিত, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দরজা লাগিয়ে রাখা হতো না। তার সামনে পর্দা টাঙিয়ে রাখা হতো না। সকাল-সন্ধ্যায় বড় পাত্রে তার কাছে খাবারও আনা হতো না। বরং যে আল্লাহর নবির সাক্ষাতে আসতেন, তিনি তার সাথে দেখা করতে বের হয়ে আসতেন। তিনি মাটিতে বসতেন। তার খাবারও মাটিতে রাখা হতো। তিনি মোটা কাপড় পরিধান করতেন। গাধার ওপর সওয়ার হতেন। বাহনের পেছনে নিজ গোলামকে বসাতেন। সে (অনেক সময় খাবারের পর) তার আঙুল চেটে দিত।”
কল্যাণের সুযোগ গ্রহণ করা
[১১০৭] হাকীম ইবনু উমায়ের থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ فُتِحَ لَهُ بَابٌ مِنَ الْخَيْرِ فَلْيَنْتَهِزْهُ فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَتَى يُغْلَقُ
“যার জন্য কল্যাণের দরজা খোলা হয়েছে, সে যেন সুযোগটি গ্রহণ করে। কারণ, তার জানা নেই কখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।”[১৭৩]
জ্ঞানী ব্যক্তির পরিচয়
[১১০৮] শাদ্দাদ ইবনু আওস থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
"জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর নির্বোধ ও অকর্মণ্য সেই ব্যক্তি, যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল আশা করে।" [১৭৪]
দ্বমরাহ ইবনু হাবীব থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَوَّلُ شَيْءٍ يُرْفَعُ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ الْأَمَانَةُ وَالْخُشُوعُ حَتَّى لَا تَكَادُ تَرَى خَاشِعًا
“এই উম্মতের থেকে সর্বপ্রথম যে জিনিসটি তুলে নেওয়া হবে তা হলো— আমানত ও আল্লাহর ভয়। অবস্থা এমন হবে যে, তুমি প্রায় আল্লাহকে ভয়কারী কোনো ব্যক্তিকে দেখবে না।”
মৃত্যুর স্মরণ না থাকলে অন্তর বিনষ্ট হয়ে যায়
[১১০৯] মালিক ইবনু মিগওয়াল থেকে বর্ণিত, “আমরা জানতে পেরেছি যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলো। তিনি তখন বললেন, 'সে মৃত্যুর কথা কেমন স্মরণ করে?' সাহাবিরা বলল, 'আমরা তাকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে শুনিনি বা সে মৃত্যুর কথা তেমন বেশি স্মরণ করে না।' তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'প্রবৃত্তির ইচ্ছাকে সে কতটুকু পরিহার করে?' সাহাবিরা বলল, 'সে দুনিয়াতে লিপ্ত।' তিনি বললেন, 'সে সেখানে তোমাদের সঙ্গী নয়।" [১৭৫]
বর্ণনাকারী বলেন, “রবী ইবনু আবী রাশেদকে বলা হলো, আপনি কি বসবেন না? তিনি বললেন, 'মৃত্যুর স্মরণ যখন এক মুহূর্তের জন্যও আমার থেকে সরে যায়, তখন আমার অন্তর বিনষ্ট হয়ে পড়ে।' মালিক বলেন, 'তার থেকে অধিক চিন্তাগ্রস্ত কাউকে আমি দেখিনি।”
নবিজির একটি দুআ
[১১১০] হাওশাব থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন এই বলে,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ دُنْيَا تَمْنَعُ خَيْرَ الْعَمَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ حَيَاةٍ تَمْنَعُ خَيْرَ الْمَمَاتِ
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এমন দুনিয়াবি বিষয় থেকে আশ্রয় চাই, যা উত্তম আমলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবং এমন জীবন থেকেও আশ্রয় চাই, যা উত্তম মৃত্যুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”[১৭৬]
যিকরকারীদের পুরস্কার
[১১১১] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا جَلَسَ الْقَوْمُ يَذْكُرُونَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ اللَّهُ لِمَلَا بِكَتِهِ: إِنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ فَجَلِلُوهُمْ بِالرَّحْمَةِ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ: يَا رَبَّنَا إِنَّ فِيهِمْ فُلَانًا قَالَ: هُمُ الْقَوْمُ لَا يَشْقَى بِهِمْ جَلِيسُهُمْ
“যখন মানুষেরা আল্লাহর যিকর করতে বসে, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, 'আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। তাদের আমার রহমত দ্বারা মর্যাদাবান করো।' ফেরেশতারা বলে, 'হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তো অমুক ব্যক্তিও আছে।' তিনি বলেন, 'তারা এমন লোকজন, তাদের সাথে যে বসবে সে দুর্ভাগা হবে না।”[১৭৭]
হাজ্জাজ ইবনু আসওয়াদ বলেন, "হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ক্ষুধার্ত হলে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নয় (স্ত্রীর) ঘরে খবর পাঠানো হলো। দেখা গেল কারও ঘরেই কোনো কাঁচা বা পাকা খেজুর নেই।"
নবিজি চালুনিকৃত আটার তৈরি রুটি খাননি
[১১১২] উরওয়া থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “সেই সত্তার কসম, যিনি মুহাম্মাদকে সত্য নিয়ে পাঠিয়েছেন, তিনি প্রেরিত হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কখনো চালুনি দেখেননি ও চালুনিকৃত (আটার তৈরি) রুটি খাননি।”
উরওয়া বলেন, "আমি জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে আপনারা যব খেতেন?” তিনি বললেন, "আমরা (খাওয়ার সময়) বলতাম, উফ! উফ!"
নবিজির পরিবারের অবস্থা
[১১১৩] আবূ হুরাইরা একবার ইবনুল আখনাসের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা সারীদ ও ভুনা গোশত খাচ্ছিলেন। তারা বললেন, "হে আবূ হুরাইরা, বসুন।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কী খাচ্ছেন?” তারা বলল, “আমরা সারীদ ও ভুনা গোশত খাচ্ছি।” তিনি বললেন, "তোমরা আবুল কাসীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর (মৃত্যুর) পর খাবার-দাবারে মগ্ন হয়ে গেছ।” তারপর তিনি কেঁদে বললেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবারের মাসের পর মাস কেটে যেত, কিন্তু কারও ঘরেই চুলা জ্বলত না। রুটি বানানো হতো না। রান্না হতো না।” তারা জানতে চাইল, “কী দিয়ে তারা জীবনধারণ করতেন?” তিনি বললেন, “পানি ও খেজুর দিয়ে। তার কিছু আনসারি প্রতিবেশী ছিল-আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন-তাদের কিছু দুগ্ধবতী পশু ছিল, তারা সেসব পশুর দুধ তাদের জন্য পাঠাতেন।”
তিনটা জিনিসের হিসাব হবে না
[১১১৪] হাসান বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ثَلَاثُ لَيْسَ عَلَى ابْنِ آدَمَ فِيهَا حِسَابٌ : ثَوْبٌ يُوَارِي بِهِ عَوْرَتَهُ وَطَعَامُ يُقِيمُ صُلْبَهُ وَبَيْتُ يَكِتُهُ فَمَا كَانَ فَوْقَ ذَلِكَ فَعَلَيْهِ فِيهِ حِسَابٌ
"বানী আদমের তিনটা জিনিসের হিসাব হবে না। এমন কাপড়, যা দ্বারা সে লজ্জা নিবারণ করত। এমন খাবার, যা দ্বারা সে মেরুদণ্ড সোজা রাখত। এমন ঘর, যাতে সে আশ্রয় নিত। এর বাইরে অতিরিক্ত যা আছে, সেগুলোর হিসাব হবে।" হবে।" [১৭৮]
বান্দার কল্যাণ বা অকল্যাণ
[১১১৫] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِ خَيْرًا كَفَّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ شَرًّا بَثَّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ فَاقَتَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ
"যখন আল্লাহ কোনো বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন। তার অন্তরে প্রাচুর্যকে ঢেলে দেন। আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তাকে ধ্বংসে নিপতিত করেন এবং দারিদ্র্যকে তার সম্মুখে এনে দেন।" [১৭৯]
জান্নাতবাসীর সংবাদ
[১১১৬] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ
"আমি কি তোমাদের জান্নাতবাসীর সংবাদ দেবো না?" তারা বলল, "অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল।” তিনি বললেন,
كُلُّ ضَعِيفٍ مُسْتَضْعَفٍ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
“প্রত্যেক দুর্বল, নিপীড়িত, দু-খানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এমন ব্যক্তি- যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না-অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে, তিনি তা সত্যে পরিণত করেন।”[১৮০]
জান্নাতের দরজায় দুজন মুমিনের সাক্ষাৎ
[১১১৭] ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
الْتَقَى مُؤْمِنَانِ عَلَى بَابِ الْجَنَّةِ مُؤْمِنٌ غَنِيٌّ وَمُؤْمِنُ فَقِيرُ كَانَا فِي الدُّنْيَا فَأُدْخِلَ الْفَقِيرُ الْجَنَّةَ وَحُبِسَ الْغَنِيُّ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يُحْبَسَ ثُمَّ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَلَقِيَهُ الْفَقِيرُ فَقَالَ : يَا أَخِي مَاذَا حَبَسَكَ؟ وَاللَّهِ لَقَدْ احْتُبِسْتَ حَتَّى خِفْتُ عَلَيْكَ، فَيَقُولُ : أَيْ أَخِي إِنِّي حُبِسْتُ بَعْدَكَ مَحْبِسًا قَطِيعًا كَرِيهًا مَا وَصَلْتُ إِلَيْكَ حَتَّى سَالَ مِنِّي الْعَرَقُ مَا لَوْ وَرَدَ أَلْفُ بَعِيرٍ كُلُّهَا آكِلَةُ حَمْضٍ لَصَدَرَتْ عَنْهَا رِوَاءٌ
“দুজন মুমিনের জান্নাতের দরজায় দেখা হবে। তাদের একজন দুনিয়াতে ধনী ছিল অন্যজন ছিল দরিদ্র। দরিদ্র ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, আর ধনী ব্যক্তিকে-আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা আটকে রেখে-তারপর জান্নাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। দরিদ্র ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাৎ হলে সে জিজ্ঞেস করবে, 'হে ভাই, কেন তোমাকে আটকে রাখা হলো? আল্লাহর কসম, তোমাকে আটকে রাখা হলে আমি তোমার ব্যাপারে আশঙ্কা করেছিলাম।' তখন ধনী লোকটি বলবে, 'ভাই! তোমার পর আমাকে নির্দয় ও নিন্দনীয়ভাবে আটকে রাখা হয়েছিল; তোমার এখানে আসতে আসতে আমার শরীর থেকে এত বেশি ঘাম ঝরেছে-যা এক হাজার তৃষ্ণার্ত উটের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য যথেষ্ট!'” [১৮১]
একজন জান্নাতির বর্ণনা
[১১১৮] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيُذْنِبُ الذَّنْبَ فَيُدْخِلُهُ اللَّهُ بِهِ الْجَنَّةَ
"এমনও হবে যে, বান্দা অপরাধ করবে আর আল্লাহ তাআলা এর কারণেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, কীভাবে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন?” তিনি বললেন,
يَكُونُ نُصْبَ عَيْنِهِ فَارًا تَابِبًا حَتَّى يُدْخِلَهُ ذَنْبُهُ الْجَنَّةَ
“সে তার চোখের সামনে দিয়ে (প্রচণ্ড ভয়ে) তাওবা করতে করতে পলায়ন করবে। অবশেষে তার অপরাধই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।”[১৮২]
আকাশের গর্জনে নবিজির ভীত হওয়া
[১১২৯] সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব বলেন, "আকাশের গর্জন শুনলেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারায় (ভয়ের ভাব) পরিলক্ষিত হতো। অবশেষে যখন বৃষ্টি হতো তখন তার থেকে (ভয়ের ভাবটি) কেটে যেত। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনার চেহারায় আমরা যা দেখলাম (ভীতিকর অবস্থা) তা কী?' তিনি বললেন,
إِنِّي لَا أَدْرِي أُمِرْتُ بِرَحْمَةٍ أَوْ بِعَذَابٍ
'আমি জানি না, আযাবের আদেশ করা হয়েছে নাকি রহমতের (ফলে আযাবের আশঙ্কায় তার চেহারায় ভীতির ছাপ ছড়িয়ে পড়ত)।” [১৮৩]
সবচেয়ে বেশি বিপদে আক্রান্ত হন নবিগণ
[১১২০] উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তার কাপড়ের ওপর হাত রাখলাম। তো কাপড়ের ওপর দিয়েই জ্বরের উষ্ণতা টের পেয়ে বললাম, হে আল্লাহর নবি, আমি আপনার মতো এমন মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হতে কাউকে দেখিনি। তিনি বললেন,
كَذَلِكَ يُضَاعَفُ لَنَا الْأَجْرُ، إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءً الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُونَ وَإِنْ كَانَ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ لَمَنْ يُبْتَلَى بِالْفَقْرِ حَتَّى يَتَدَرَّعَ بِالْعَبَاءَةِ مِنَ الْفَقْرِ، وَإِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ يُسَلَّطُ عَلَيْهِ الْقَمْلُ حَتَّى يَقْتُلَهُ
'এভাবেই আমাদের অতিরিক্ত নেকি দেওয়া হয়। সবচেয়ে বেশি বিপদে আক্রান্ত হন নবিগণ। তারপর সৎলোকেরা। নবিদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও থাকেন যিনি দরিদ্রতায় আক্রান্ত হয়ে অবশেষে দরিদ্রতার পোশাক পরিধান করেন। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন, যার ওপর উকুন চাপিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে তা তাকে মেরেই ফেলে।'” [১৮৪]
জাহান্নামের ভয়ে মৃত্যুবরণ করা
[১১২১] মুহাম্মাদ ইবনু মুতাররিফ বলেন, “আমাকে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বলেছেন যে, একজন আনসারি যুবকের অন্তরে জাহান্নামের ভয় ঢুকে গেলে সে ঘরে বসে পড়ল। তখন নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আগমন করলেন। সে দাঁড়িয়ে গেল এবং নবিজির সাথে কোলাকুলি করল। সে এমনভাবে হিক্কা তুলে কান্না করল যে, তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। তখন নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
جَهَرُوا صَاحِبَكُمْ فَلَذَ خَوْفُ النَّارِ كَبِدَهُ 'তোমার সঙ্গীর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করো। জাহান্নামের ভয় তার অন্তরকে বিদীর্ণ করে ফেলেছে।'” [১৮৫]
যে দুই গুণের কারণে মানুষ জান্নাতে যাবে
[১১২২] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَكْثَرُ مَا يَلِجُ بِهِ الْإِنْسَانُ النَّارَ الْأَجْوَفَانِ: الْفَرْجُ وَالْفَمُ، وَأَكْثَرُ مَا يَلِجُ بِهِ الْإِنْسَانُ الْجَنَّةَ: تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ “অধিকাংশ মানুষ যার কারণে জান্নাতে যাবে, তা দুই ধরনের জিনিস- আল্লাহর ভয় ও সচ্চরিত্র।”[১৮৬]
সর্বশ্রেষ্ঠ মুমিনের পরিচয়
[১১২৩] আসাদ ইবনু ওয়াদাআ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন মুমিন সর্বশ্রেষ্ঠ?” তিনি বললেন,
مُؤْمِنٌ مَغْمُومُ الْقَلْبِ لَيْسَ فِيهِ غِلٌّ وَلَا حَسَدٌ “এমন মুমিন, যার অন্তর চিন্তাযুক্ত। তাতে কোনো ধোঁকা বা হিংসা নেই।”
সাহাবিরা বললেন, “আমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে বলে আমরা জানি না। এরপর মুমিনদের মধ্যে কে উত্তম?”
তিনি বললেন,
الْمُؤْمِنُ الزَّاهِدُ فِي الدُّنْيَا الرَّاغِبُ فِي الْآخِرَةِ
“এমন মুমিন, যে দুনিয়ার হতে বিমুখ ও আখিরাতের প্রতি আগ্রহী।”
এরপর সাহাবিগণ জানতে চাইলেন, “হে আল্লাহর নবি, রাফি ইবনু খাদীজ ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কেউ এমন আছে বলে আমরা জানি না। এরপরে কোন মুমিন শ্রেষ্ঠ?”
তিনি বললেন,
مُؤْمِنُ حَسَنُ الْخُلُقِ
“এমন মুমিন, যার চরিত্র সুন্দর।” [১৮৭]
আমল কাউকে মুক্তি দেবে না
[১১২৪] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَحَدًا مِنْكُمْ لَا يُنْجِيهُ عَمَلُهُ
“তোমাদের মধ্য থেকে কাউকেই তার আমল মুক্তি দেবে না।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, “আপনাকেও না, হে আল্লাহর রাসূল?”
তিনি বললেন,
وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللهُ بِرَحْمَتِهِ وَلَكِنْ اغْدُوا وَرُوحُوا وَشَيْئًا مِنَ الدُّلْجَةِ، الْقَصْدَ الْقَصْدَ تَبْلُغُونَ
“আমাকেও না। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে তার রহমতের দ্বারা আবৃত করে রাখবেন। তোমরা সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশ (ইবাদাতের ভেতর) অতিবাহিত করো। তাহলেই তোমরা কাঙ্ক্ষিত মানযিলে পৌঁছতে পারবে।”[১৮৮]
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তার জন্য আমলের সুযোগ করে দেন
[১১২৫] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ
"যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে আমলের সুযোগ করে দেন।"
সাহাবিরা জানতে চাইল, “হে আল্লাহর রাসূল, কীভাবে আমলের সুযোগ করে দেন?"
তিনি বললেন,
يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ مَوْتِهِ ثُمَّ يَقْبِضُهُ عَلَيْهِ
"তাকে মৃত্যুর পূর্বে ভালো কাজ করার তাওফীক দেন। অতঃপর সেই অবস্থাতেই তাকে মৃত্যু দেন।"[১৮৯]
শ্রেষ্ঠ হওয়ার মাপকাঠি হলো তাকওয়া
[১১২৬] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন শ্রেষ্ঠ সাহাবি অন্য আরেকজনকে তার মায়ের কথা বলে মন্দ কিছু বলল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনলেন। তিনি তখন বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أَنْتَ بِأَفْضَلَ مِمَّنْ تَرَى مِنْ أَحْمَرَ وَلَا أَسْوَدَ إِلَّا أَنْ تَفْضُلَهُمْ بِالتَّقْوَى
“সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তুমি যে লাল বা কালো (মানুষদের) দেখছ তাদের কারও থেকে তুমি উত্তম নও। তোমাদের শ্রেষ্ঠ হওয়া নির্ধারণ হবে তাকওয়ার মাধ্যমে।"[১৯০]
আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য
[১১২৭] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا تَعْدِلُ الدُّنْيَا عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى جَدْيًا مِنَ الْغَنَمِ
“সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য একটা ছাগলছানার সমপরিমাণও নয়।” [১৯১]
অধিক সম্পদ প্রকৃত প্রাচুর্য নয়
[১১২৮] আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তিনি বলেন,
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ إِنَّمَا الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
“অধিক সম্পদ প্রকৃত প্রাচুর্য নয়। প্রকৃত প্রাচুর্য হলো অন্তরের প্রাচুর্য।”[১৯২]
হালাল বস্তু ভক্ষণের গুরুত্ব
[১১২৯] শাদ্দাদ ইবনু আউসের বোন উম্মে আবদুল্লাহ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ইফতারের সময় এক বাটি দুধ পাঠালেন। তখন ছিল লম্বা দিন ও প্রচণ্ড গরমের সময়। যাকে দিয়ে তিনি তা পাঠালেন তাকে নবিজি ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইলেন—সে এই দুধ কোথায় পেয়েছে? তিনি জানালেন, “আমার একটা বকরির দুধ এটি।” তাকে নবিজি আবার ফিরিয়ে দিলেন জিজ্ঞেস করতে, “এই বকরি সে কোথায় পেয়েছে?” তিনি জানালেন, “আমি নিজ সম্পদ দিয়ে তা ক্রয় করেছি।” তখন তিনি তা পান করলেন। পরবর্তী দিন উম্মু আবদুল্লাহ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, লম্বা দিন আর প্রচণ্ড গরমের কারণে সহানুভূতিশীল হয়ে আমি আপনার কাছে ওই দুধটুকু পাঠিয়েছিলাম।” তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
أُمِرَتِ الرُّسُلُ قَبْلِي أَنْ لَا تَأْكُلَ إِلَّا طَيِّبًا وَلَا تَعْمَلَ إِلَّا صَالِحًا
“আমার পূর্ববর্তী রাসূলদের আদেশ করা হয়েছিল, যেন তারা কেবলই হালাল বস্তু ভক্ষণ করে এবং শুধু সৎ কাজই করে।”[১৯৩]
দুনিয়ার নিআমাত
[১১৩০] মাইমুন বলেন, “দুনিয়ার নিআমাতের মধ্যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল স্ত্রী ও হালাল বস্তুই পেয়েছিলেন।”
উত্তম আমল
[১১৩১] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন আমলটি উত্তম?” তিনি বললেন,
تَمُوتُ يَوْمَ تَمُوتُ وَلِسَانُكَ رَطْبُ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ “যেদিন তুমি মারা যাবে, সেদিন এমনভাবে মারা যাবে যে, তোমার জিহ্বা আল্লাহর যিকরের দ্বারা সতেজ থাকে।” [১৯৪]
মানুষ দুনিয়া থেকে দূরে সরবে না
[১১৩২] আতা ইবনু ইয়াসার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,
أَتَتْنِي الدُّنْيَا خَضِرَةً حُلْوَةً وَرَفَعَتْ رَأْسَهَا وَتَزَيَّنَتْ لِي فَقُلْتُ: إِنِّي لَا أُرِيدُكِ فَقَالَتْ: إِنْ انْفَلَتَ مِنِّي لَمْ يَنْفَلِتْ مِنِّي غَيْرُكَ
“দুনিয়া আমার কাছে সবুজাভ ও মিষ্ট হয়ে আগমন করেছে। সে তার মাথা উঁচু করেছে ও আমার জন্য সুসজ্জিত হয়েছে। তখন আমি তাকে বললাম, 'আমি তো তোমাকে চাই না।' সে বলল, 'যদি আপনি আমার থেকে দূরেও সরেন, অন্যরা কিন্তু দূরে সরবে না।'” [১৯৫]
দুনিয়ার ভোগ-বিলাস কাফিরদের জন্য
[১১৩৩] হাসান ইবনু মালিক বলেন, “আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তখন তিনি দড়ি দিয়ে বাঁধা বালির বস্তার খাটের ওপর শুয়ে ছিলেন। তার মাথার নিচে একটা চামড়ার বালিশ। যার ভেতরে শুকনো ঘাস ভরা ছিল। তখন তার কাছে আরও একাধিক সাহাবি এলেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু আগমন করলে তিনি একটু সরে গেলেন। তখন তিনি নবিজির দু-পাশে ও রশির মাঝে কোনো কাপড় না থাকায় পার্শ্বদেশে দড়ির দাগ পড়ে গেছে দেখতে পেলেন। এতে করে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু অশ্রুসজল হলেন। তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'হে উমার, তুমি কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম-আমি কাঁদছি কারণ হলো-আমি খুব ভালো করে জানি যে, আপনি আল্লাহর কাছে পারস্য ও রোম সম্রাটের থেকেও বেশি সম্মানিত। অথচ তারা দুনিয়াতে (আরাম-আয়েশে) যেভাবে জীবন কাটানোর কাটাচ্ছে। আর আপনি আল্লাহর রাসূল হয়েও যে অবস্থায় (দুঃখ-কষ্টে) জীবন কাটাচ্ছেন, তা তো আমি দেখলামই।' রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া হবে আর আমাদের জন্য হবে জান্নাত?' তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বিষয়টি তেমনই।”[১৯৬]
জাহান্নামের সবচেয়ে হালকা শাস্তি
[১১৩৪] নুমান ইবনু বাশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا مَنْ لَهُ نَعْلَانِ وَشِرَاكَانِ مِنْ نَارٍ يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ كَمَا يَغْلِي الْمِرْجَلُ، مَا يَرَى أَنَّ أَحَدًا أَشَدُّ عَذَابًا مِنْهُ وَإِنَّهُ لَأَهْوَنُهُمْ عَذَابًا
“নিশ্চয়ই জাহান্নামের সবচেয়ে হালকা শাস্তি যার হবে, তার জন্য দুইটি আগুনের জুতা ও ফিতা থাকবে। সেগুলোর প্রভাবে তার মগজ (গরমে গলে) টগবগ করতে থাকবে, যেভাবে ডেগচি টগবগ করে থাকে। সে মনে করবে, তার চেয়ে বেশি কঠিন শাস্তি আর কারও হচ্ছে না। অথচ তার শাস্তিটা হলো সবচেয়ে হালকা।” [১৯৭]
দুনিয়ার ভোগ-বিলাস অপছন্দ করা
[১১৩৫] হাসান থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গোশত মাথায় হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কী?' সে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহর বরকত।' তিনি বললেন, 'তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তা আল্লাহর আযাব।' তারপর তিনি বললেন, 'হায় আফসোস! হায় আফসোস!”
কুরআন পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা
[১১৩৬] হাসান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তোমরা কুরআন পড়ো এবং এর মাধ্যমে সেসব লোকদের আগেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। যারা এটি পড়ে, তার মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রার্থনা করবে।”
দুনিয়াবিমুখ ও আখিরাত প্রত্যাশী মানুষের খোঁজ
[১১৩৭] মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কেউ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় দুনিয়াবিমুখ ও আখিরাত প্রত্যাশী মানুষেরা?” তিনি তখন বললেন, "আমি তোমাকে তাদের খোঁজ দিতে পারব না।"
আসেম বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার এক ব্যক্তিকে এমন কথা বলতে শুনে তার হাত ধরে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবূ বাকর ও উমারের কবরের কাছে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, তাদের কথাই তুমি জানতে চাচ্ছ।”
কবর মানুষের বাড়ি
[১১৩৮] হাসান থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু আবুল আস সাকাফি কোনো এক জানাযাতে অবস্থানকালে একটি বিধ্বস্ত কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। সেখানে ওই কবরস্থ ব্যক্তির পরিবারের একজনও ছিল। তিনি বললেন, “হে অমুক।” সে ব্যক্তি তার কাছে আসার পর তিনি বললেন, “সেখানে যাও।” সে বলল, “এটা তো একটা সংকীর্ণ, শুষ্ক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর। সেখানে কোনো খাবার-পানীয় বা স্ত্রীজন নেই।” (এই কথা শুনে) তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম, এটা তোমার বাড়ি।” সে ব্যক্তি বলল, 'আপনি সত্য বলেছেন। তবে শপথ আল্লাহর! আমি এ কবরের কাছে আরেকবার এলে, সেখান থেকে [১৯৮] জিনিসপত্র এখানে নিয়ে আসব।' (তিনি বললেন) 'এমনটি কোরো না' [১৯৯]। [২০০]
সর্বাগ্রে যারা আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে
[১১৩৯] কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أَتَدْرُونَ مَنِ السَّابِقُونَ إِلَى ظِلِّ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
"তোমরা কি জানো কারা সর্বাগ্রে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে?”
সাহাবিরা বলল, “আল্লাহ ও তার রাসূলই সর্বাধিক জ্ঞাত।” তিনি বললেন,
الَّذِينَ إِذَا أُعْطُوا الْحَقَّ قَبِلُوهُ وَإِذَا سُبِلُوهُ بَذَلُوهُ وَحَكَمُوا لِلنَّاسِ كَحُكْمِهِمْ لِأَنْفُسِهِمْ
“যাদের অধিকার দেওয়া হলে, গ্রহণ করে নিত। যখন তা চাওয়া হতো, দান করে দিত। এবং মানুষের জন্য যেমন ফায়সালা করত, নিজেদের জন্যও তেমনটিই করত।” [২০১]
দুনিয়াতে যেমন কর্ম আখিরাতে তেমন ফল হবে
[১১৪০] আবূ উসমান আন-নাহদি থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أَهْلُ الْمَعْرُوفِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمَعْرُوفِ فِي الْآخِرَةِ وَإِنَّ أَهْلَ الْمُنْكَرِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمُنْكَرِ فِي الْآخِرَةِ
“দুনিয়াতে যারা সৎকর্মশীল তারা আখিরাতেও সৎকর্মশীল। আর দুনিয়াতে যারা অসৎকর্মশীল আখিরাতেও তারা অসৎকর্মশীল।”[২০২]
সমাপ্ত
টিকাঃ
[১৬৭] সূরা হিজর, ১৫: ৯৮-৯৯
[১৬৮] অর্থাৎ যত বেশি ইবাদাত তার পক্ষে করা সম্ভব তিনি তা করেন, তার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই আর।-অনুবাদক
[১৬৯] যঈফ। সিলসিলা যঈফা: ২১১৯
[১৭০] যঈফ। সিলসিলা যঈফা: ২৫১৮
[১৭১] সনদ মুরসাল। তবে এর অর্থ অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (মুসনাদ আহমাদ: ৬/২১; ইবনু মাজাহ: ৩৯৩৪)
[১৭২] সনদ যঈফ। তবে এটি সাহাবি আবু হুরাইরা থেকে একাধিক সনদে সহীহভাবে প্রমাণিত। (মুসনাদ আহমদ: ২/৩৭৮; সহীহ মুসলিম: ৮/২২৩)
[১৭৩] সনদ মুরসাল।
[১৭৪] যঈফ। তিরমিযি: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ: ৪২৬০
[১৭৫] যঈফ। মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবা: ৩৪৩২৮
[১৭৬] যঈফ।
[১৭৭] সনদ মুরসাল। তবে এই অর্থে বুখারি-মুসলিমে সহীহ হাদীস রয়েছে।
[১৭৮] সনদ মুরসাল।
[১৭৯] সনদ মুরসাল।
[১৮০] সনদ মুরসাল। তবে মুত্তাসিল সনদে সাহাবি আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে যঈফ সূত্রে এর অনুরূপ বর্ণিত আছে। (মাজমাউয যাওয়াইদ: ১০/২৬৫)
[১৮১] যঈফ। মাজমাউয যাওয়াইদ: ১০/২৬৩
[১৮২] মুরসাল। যঈফুল জামি: ১৫০৩; সিলসিলা যঈফা: ২০৩১
[১৮৩] মুরসাল।
[১৮৪] আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন ইবনু মাজাহ : ৪২৪; হাকিম : ৪/৩০। (দেখুন, সিলসিলা সহীহাহ: ১৪৪)
[১৮৫] যঈফ। তাখরীজুল ইহইয়া: ৪/ ১৮৫
[১৮৬] যঈফ। মুসনাদ আহমাদ: ২/২৬১; ইবনু মাজাহ: ৪২৪৬
[১৮৭] যঈফ। এর সনদে ফারজ ইবনু ফুদালাহ রয়েছেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের দৃষ্টিতে তিনি যঈফ.
[১৮৮] সহীহ। বুখারি: ৬৪৬৩; মুসলিম: ৬৯৭৩
[১৮৯] সনদ সহীহ। মুসনাদ আহমাদ: ১২,০৩৬
[১৯০] সনদ যঈফ।
[১৯১] সনদ মুরসাল।
[১৯২] সহীহ। বুখারি: ৬৪৪৬; মুসলিম: ২৩৮২
[১৯৩] সনদ হাসান। মুস্তাদরাক হাকিম: ৪/১২৫; এর সমর্থনে বেশ কিছু সহীহ হাদীসও রয়েছে।
[১৯৪] যঈফ। আয-যুহদ, ইবনুল মুবারক: ১১৪১
[১৯৫] মুরসাল।
[১৯৬] সনদ সহীহ। মুসনাদ আহমাদ : ১২,৩৫৭; বুখারি: ২৪৬৮; মুসলিম : ১৪৭৯
[১৯৭] সহীহ। মুসনাদ আহমাদ: ৫৯৪২; বুখারি: ১১৫৬২
[১৯৮] অর্থাৎ বর্তমান বাড়ি থেকে।
[১৯৯] অর্থাৎ এমনটি না করে, বরং নেক আমলের মাধ্যমে কবরকে সুখকর বানানোর চেষ্টা করো.
[২০০] দ্রষ্টব্য: ইবনু রজব, আহওয়ালুল কুবুর, পৃ. ২২৩
[২০১] যঈফ। মুসনাদ আহমাদ: ২৪৩৭৯; যঈফুল জামি: ১০১
[২০২] সহীহ。