📄 মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার সুফল
[৯৮৭] মুজাহিদ বলেছেন, “কোনো এক বান্দার ব্যাপারে জাহান্নামে যাবার আদেশ দেওয়া হলে, জাহান্নাম লাফিয়ে উঠবে। তার কাছে জানতে চাওয়া হবে, 'কী ব্যাপার, তোমার আবার কী হলো?' সে তখন বলবে, 'এই ব্যক্তি তো আমার থেকে রীতিমতো আশ্রয় প্রার্থনা করত।' তখন তাকে বলা হবে, 'ঠিক আছে। তাকে চলে যেতে দাও।'”
দুনিয়া থেকে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ
[৯৮৮] মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا “তুমি তোমার দুনিয়ার অংশের কথা ভুলে যেয়ো না।”[১৫১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “আল্লাহর আনুগত্য করার মাধ্যমে দুনিয়াতেই তুমি তোমার আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করে নাও।”
সত্যিকার ফকীহ-এর পরিচয়
[৯৮৯] মুজাহিদ বলেছেন, “সত্যিকার ফকীহ হলেন তিনি, যিনি আল্লাহ তাআলাকে ভয় করেন।”
আল্লাহমুখী হওয়া
[৯৯০] মুজাহিদ বলেছেন, "নিশ্চয়ই বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার প্রতি মনোনিবেশ করে তখন আল্লাহ তাআলাও মুমিনদের অন্তর তার দিকে ঘুরিয়ে দেন।”
হালাল উপার্জনে লজ্জাবোধ না করা
[৯৯১] মুজাহিদ বলেছেন, "যে ব্যক্তি হালাল উপার্জনে লজ্জাবোধ করে না, তার খরচের (ভার) হালকা হয়ে আসে। নিজেকে সে প্রশান্তি দিতে পারে এবং তার অহংবোধ কমে আসে।"
নির্জন অবস্থায় নিজের পাপের কথা স্মরণ করা
[৯৯২] ইউনুস ইবনু খাব্বাব বলেন, “মুজাহিদ—তিনি আমার ভাই হন—আমাকে বলেছেন, 'আমি কি তোমাকে আল-আওয়াব আল-হাফীজ সম্পর্কে সংবাদ দেবো না?' আমি বললাম, 'জি হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'সে হচ্ছে ওই ব্যক্তি, যে নির্জন অবস্থায় নিজের পাপের কথা স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে।"
একজন ব্যক্তির জাহান্নাম থেকে মুক্তি
[৯৯৩] মুজাহিদ বলেছেন, "কিয়ামাতের দিন একজন বান্দার ব্যাপারে জাহান্নামের আদেশ করা হবে। সে বলবে, 'আমার তো এমনটা ধারণা ছিল না।' আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেন, 'তোমার ধারণা কী ছিল?' সে বলবে, '(আমার) ধারণা ছিল আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন।' তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তাকে ছেড়ে দাও।”
ঈশার সালাতের পর চার রাকাত সালাত
[৯৯৪] আমাশ থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ বলেছেন, "ঈশার সালাতের পর চার রাকাত সালাত আদায় করা, কদরের রাতে সমসংখ্যক সালাতের সমকক্ষ গণ্য করা হয়।" [১৫২]
নিজেকে খাটো করা
[৯৯৫] মুজাহিদ বলেছেন, “যে নিজেকে সম্মানিত করে, সে দ্বীনকে খাটো করে। আর যে নিজেকে খাটো করে, সে দ্বীনকে সম্মানিত করে।”[১৫৩]
টিকাঃ
[১৫১] সূরা কাসাস, ২৮: ৭৭
[১৫২] ইসনাদে দুর্বল বর্ণনাকারী আছেন (হাইসামি, মাজমা: ২/৪০)।
[১৫৩] অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রে নিজের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মানুষ দরকার হলে দ্বীনের অসম্মান ঘটায়। আবার এর বিপরীত দ্বীনের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেকে অসম্মানিত ও খাটো করার প্রয়োজন দেখা দেয়।-অনুবাদক
📄 উবায়দ ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
আল্লাহকে লজ্জা করা
[৯৯৬] উবায়দ ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ থেকে জনৈক শ্রবণকারী বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, "তোমরা মানুষকে লজ্জা করার তুলনায় আল্লাহকে লজ্জা করাকে প্রাধান্য দাও।"
আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন
[৯৯৭] আবু সুফিয়ান বলেন, "উবায়দ ইবনু উমায়র বলেছেন, 'আল্লাহ যার কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দ্বীনের বুঝ দান করেন। এবং তার অন্তরে হেদায়াতের অনুপ্রেরণা দান করেন।"
বর্তমান যুগের মুজতাহিদ
[৯৯৮] মুজাহিদ বলেন, “উবায়দ ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'বর্তমান যুগের মুজতাহিদ অতীতকালের খেলোয়ারের মতো।”
আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম আমল
[৯৯৯] আবূ নাওফিল বলেন, “উবায়দ ইবনু উমায়র বলেছেন, 'যদি তোমরা সম্পদ খরচ করতে কৃপণতা করো, শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে ভয় পাও এবং রাত্রি জাগরণ কষ্টসাধ্য মনে করো, তবে তোমরা অধিক পরিমাণে সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি বলো। ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ—এটি স্বর্ণ-রুপার-দুটি পাহাড় অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম।”
হাবীব ইবনু আবী সাবিত বলেন, “উবায়দ ইবনু উমায়র বলেছেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে বান্দার প্রয়োজন থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহরও বান্দার প্রতি মনোযোগ থাকবে।”
শীতকালে রাতে বেশি সালাত পড়া যায়
[১০০০] মুজাহিদ বলেন, “উবায়দ ইবনু উমায়র আল-লাইসি শীতকাল এলে বলতেন, 'হে কুরআন-প্রেমিকরা, যখন শীতকাল আসে তখন তোমাদের সালাতের জন্য রাত দীর্ঘ এবং সাওমের জন্য দিন খাটো হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা আমলে নিমগ্ন হও। যদি তোমরা রাত্রে ইবাদাত করতে না পারো, শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে ভীত থাকো এবং সম্পদ খরচ করতে কৃপণতা করো, তবে অধিক পরিমাণ আল্লাহর যিকর করো।”
যখন আল্লাহ কারিকে অপছন্দ করেন
[১০০১] আবদুল কারীম ইবনু উমাইয়া বলেন, “উবায়দ ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা কারিকে অপছন্দ করেন, যখন সে অধিক পোশাক পরিধান করে, অধিক আরোহণ করে এবং অধিক যাতায়াত করে। [১৫৪]
দান করা অপচয় নয়
[১০০২] উসমান ইবনু আসওয়াদ বলেন, “মুজাহিদ বলেছেন, 'কোনো ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে উহুদ পরিমাণ সম্পদ খরচ করলেও, সে অপচয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।"
আল্লাহর কাছে বরকত কামনা করা
[১০০৩] সুফিয়ান বলেন, "তিনি বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন, আল্লাহ আমাদের মৃত্যুতে বরকত দান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এবং জীবনেও।” [১৫৫]
গুনাহ হলে ইস্তিগফার করা
[১০০৪] মালেক ইবনু মিগওয়াল বলেন, “আমি আবূ ইয়াহইয়াকে বলতে শুনেছি, আমি মুজাহিদের নিকট গুনাহের অভিযোগ ব্যক্ত করলে তিনি বললেন, 'তুমি কেন ইস্তিগফার করছ না!"
উত্তম ব্যক্তির পরিচয়
[১০০৫] আবূ যুরআ ইবনু আমর ইবনু জারীর বলেন, "যে দুই ব্যক্তি একে অপরকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে, তাদের উভয়ের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে অপরকে অধিক ভালোবাসে।”
অভাবে পড়লে তাওবা করা
[১০০৬] হারেস ইবনু কায়েস আল-জুফি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বলেন, “যখন কারও দুনিয়াবি কোনো বিষয়ের প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন তার কর্তব্য হলো তাওবা করা। আর যখন পরকালীন কোনো বিষয়ের প্রয়োজন দেখা দেবে, তখন তার কর্তব্য হলো আশা করা।"
তিনি তাকে লুঙ্গি কিনে দিলেন
[১০০৭] হাফস ইবনু গিয়াস রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ মুজাম্মি আত-তাইমি রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছেঁড়া লুঙ্গি পরে আসলেন। তাই তিনি চার দিরহাম নিয়ে সুফিয়ান সাওরিকে দিয়ে বললেন, 'আপনি (এই দিরহামগুলো দিয়ে আরেকটি নতুন) লুঙ্গি ক্রয় করুন।' সুফিয়ান বললেন, 'আমার প্রয়োজন নেই।' মুজাম্মি বললেন, 'ঠিকই বলেছেন। আপনার প্রয়োজন নেই। তবে আমার ঠিকই প্রয়োজন আছে।' তারপর তিনি তা নিলেন ও একটি লুঙ্গি কিনে আনলেন সেটি দিয়ে। বর্ণনাকারী বলেন, সুফিয়ান বলতেন, 'মুজাম্মি আমাকে কাপড় দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।' তিনি আরও বলতেন, 'আমার যে আমলের সাথে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না তা হলো—মুজাম্মির প্রতি পোষণ করা আমার ভালোবাসা।”
সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের মজলিস
[১০০৮] রবী ইবনু ইয়াজিদ বলেন, “আবূ ইদরীস আল-খাওলানি বলেছেন, 'মাসজিদ হলো সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের মজলিস।”
যার জন্য আল্লাহ যথেষ্ট হয়ে যাবেন
[১০০৯] রবী ইবনু ইয়াজিদ বলেন, “আবূ ইদরীস বলেছেন, 'যে ব্যক্তি তার সকল চিন্তা-ভাবনাকে একটি চিন্তা-ভাবনায় (আখিরাতের চিন্তা-ভাবনায়) পরিণত করবে, আল্লাহ তার সকল দুঃখ-কষ্টের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবেন। আর যে ব্যক্তির প্রত্যেক বিষয়ে (অর্থাৎ দ্বীন-দুনিয়ার সব বিষয়ে) চিন্তা-ভাবনায় মগ্ন হবে, সে কোথায় ধ্বংস হবে আল্লাহ তার পরোয়া করবেন না।"
মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্যে হাদীস শেখা
[১০১০] আবূ ইদরীস আল-খাওলানি বলেন, “যে ব্যক্তি মানুষের অন্তর আকৃষ্ট করার জন্যে হাদীসশাস্ত্র শিখবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।"
অনুগ্রহকে ঋণ মনে করা
[১০১১] ইবরাহীম ইবনু আদহাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি আল্লাহ ও নিজের মাঝে কোনো অনুগ্রহকারী নিযুক্ত কোরো না। তোমার প্রতি অন্যদের অনুগ্রহকে ঋণ মনে কোরো।”[১৫৬]
খ্যাতিলোভী ব্যক্তির অবস্থা
[১০১২] ইবরাহীম ইবনু আদহাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি খ্যাতি পেতে ভালোবাসে, সে আল্লাহকে সত্যায়ন করে না।”
সন্তানের প্রতি কিছু উপদেশ
[১০১৩] আলি ইবনু ইয়াজিদ ইবনু জুদআন বলেন, “একজন আনসারি ব্যক্তির কাছে মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি তার ছেলেকে ডেকে বললেন, 'প্রিয় বৎস, তোমাকে আমি কিছু উপদেশ দিচ্ছি। তুমি তা মুখস্থ করে নাও। কারণ, তুমি যদি আমার থেকে তা মনে না রাখো, তাহলে অন্যদের থেকে তা আর মনে রাখার সুযোগ পাবে না। আল্লাহকে ভয় করো। যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয়, গতকালের চেয়ে আজ এবং আজকের চেয়ে আগামীকাল তুমি বেশি ভালো হবে, তবে তা-ই করো। লোভ থেকে দূরে থাকো। কারণ, তা হলো উপস্থিত দরিদ্রতা। নিরাশ হওয়া থেকেও সাবধান থাকো। কারণ, যে বিষয়েই তুমি নিরাশ হও না কেন, আল্লাহ তা থেকে তোমাকে মুক্ত করতে সক্ষম। যেসব বিষয়ে আপত্তি করা হয়, তা থেকেও সাবধান থাকো। কারণ, কল্যাণকর বিষয়ে কোনো আপত্তি গ্রহণীয় নয়। যদি কোনো আদম-সন্তানের পদস্খলন হয়—তবে সেই ব্যক্তি তুমি না হওয়ার কারণে—আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো। যখন সালাতের জন্য প্রস্তুত হবে তখন এমনভাবে সালাত আদায় করবে, যেন এটিই তোমার জীবনের শেষ সালাত। এর পরে আর তুমি সালাত পড়তে পারবে না।”
নিজের দ্বীনকে বিক্রি না করা
[১০১৪] রজা ইবনু আবূ সালামাহ বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, ইবনু মুহাইরিয কিছু কেনার জন্য একজন কাপড়-বিক্রেতার কাছে গেলেন। এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'একে চেনো? সে হলো ইবনু মুহাইরিয।' (এটা শুনে) তিনি দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, 'আমরা এখানে পয়সা দিয়ে কিনতে এসেছি, নিজেদের দ্বীন দিয়ে নয়।”
বিনম্র লোকের পরিচয়
[১০১৫] আমর ইবনু আউসম বলেন, “বিনম্র তারা, যারা অন্যের প্রতি জুলুম করে না। আর যখন তাদের প্রতি জুলুম করা হয়, তখন তারা জয়ী হয় না।" [১৫৭]
সৎলোকের পরিচয়
[১০১৬] সুফিয়ান ইবনু উয়ায়না বলেছেন, “হাসানকে 'আবরার' বা সৎলোক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছে। উত্তরে তিনি বলেছেন, 'যারা একটি ছোট্ট পিঁপড়াকেও কষ্ট দেয় না।"
অহংকার করলে আল্লাহ অপদস্থ করেন
[১০১৭] মুজাহিদ নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুরসাল সূত্রে বর্ণনা করেছেন, "প্রত্যেক আদম-সন্তানেরই মাথার অগ্রভাগের কেশগুচ্ছ ধরে রাখে একজন ফেরেশতা। যখন সে অহংকার করে, তখন আল্লাহ তাআলা (সেই ফেরেশতার মাধ্যমে) তাকে অপদস্থ করেন। আরও একজন ফেরেশতা তার মাথা ধরে রাখে, যখন সে বিনয়ী হয় তখন আল্লাহ (সেই ফেরেশতার মাধ্যমে) তার মর্যাদা বুলন্দ করেন।”
আয়াতের উদ্দেশ্য
[১০১৮] মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ "তোমরা আল্লাহর নিকট তার অনুগ্রহ চাও।”[১৫৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, "এখানে দুনিয়া উদ্দেশ্য নয়।”
যিকরকারী সালাতে থাকার মতোই
[১০১৯] হেলাল ইবনু আবূ উবায়দা বলেন, “মানুষের অন্তর যতক্ষণ আল্লাহর যিকর করে, ততক্ষণ সে যেন সালাতেই থাকে; যদিও সে বাজারে অবস্থান করে। আর যদি দুটি ঠোঁট নাড়িয়ে যিকর করে, তবে তো তা আরও উত্তম।”
যার সম্পদ বেশি তার কষ্ট বেশি
[১০২০] আমর ইবনু কায়েস বলেন, “ওয়ালীদ ইবনু কায়েস বলেছেন, 'যার অর্থসম্পদ বেশি তার কষ্ট-ক্লান্তি বেশি। যার কষ্ট-ক্লান্তি বেশি তার শয়তান বেশি। যার শয়তান বেশি তার হিসেব-নিকাশ হবে কঠিন।”
ধৈর্যশীলদের প্রতিদান
[১০২১] আবূ হাম্মাম ওয়ালীদ ইবনু কায়েস আস্-সুকুনি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ “নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের বিনা হিসাবে তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে।” [১৫৯]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, "তাদের হাতের কোষ ভরে দেওয়া হবে।”
রাতের বেলায় সালাতের জন্য ডাকতেন
[১০২২] ইবনু জাবের বলেন, “আমরা আতা আল-খুরাসানি রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করতাম। তিনি রাত্র জেগে সালাত আদায় করতেন। যখন অর্ধরাত কিংবা রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়ে যেত তখন তিনি তাঁবুর ভেতর থেকে আমাদের শুনিয়ে এভাবে ডাকতে থাকতেন—হে আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজিদ। হে ইয়াজিদ ইবনু ইয়াজিদ। হে হিশাম ইবনুল গায। হে অমুকের ছেলে অমুক। তোমরা ঘুম থেকে ওঠো। ওযু করে সালাত আদায় করো। এই রাতের সালাত এবং এই দিনের সাওম এসব পূঁজ পান ও লৌহ কর্তন অপেক্ষা অধিকতর সহজ। অতঃপর তিনি বলতেন, 'দ্রুত করো। আরও দ্রুত করো।' তারপর তিনি সালাতে মনোনিবেশ করতেন।"
আল্লাহর ভয়ে সব সময়ই ক্রন্দন করা
[১০২৩] ইবনু জাবের বলেন, “আমি ইয়াজিদ ইবনু মারসাদকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কী ব্যাপার, আমি আপনার চোখ শুকাতে দেখি না?' তিনি বললেন, 'তা জেনে তুমি কী করবে?' আমি বললাম, 'আশা করি, আল্লাহ আমাকে এর দ্বারা উপকৃত করবেন।' তিনি বললেন, “হে ভাই, আল্লাহ তাআলা আমাকে ধমক দিয়েছেন যদি আমি তার অবাধ্যতা করি, তাহলে তিনি আমাকে আগুনের কারাগারে বন্দী করবেন। আল্লাহর কসম, যদি তিনি আমাকে গোসলখানায় বন্দী করারও ধমক দিতেন, তবুও আমার চোখ শুকাত না। (অর্থাৎ আল্লাহর ভয়ে অশ্রুসজল থাকত।) আমি তাকে বললাম, 'নির্জন অবস্থায়ও কি আপনি এমনই থাকেন?' তিনি বললেন, 'এটা জেনে তুমি কী করবে?' আমি বললাম, 'আল্লাহ হয়তো আমাকে এর দ্বারা উপকৃত করবেন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি যখন আমার পরিবারের কাছে থাকি তখনো আমার এই অবস্থা হয় এবং আমার ইচ্ছার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমার সামনে খাবার রাখা হয়, তখন এই অবস্থা হবার কারণে আমার খাবারের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। এমনকি আমার স্ত্রী ও সন্তানরা কাঁদতে থাকে। তারা ঠিক জানেও না, কেন আমরা কাঁদছি। অনেক সময় এই বিষয়টি আমার স্ত্রীকে কষ্টে ফেলে দেয়। তখন সে বলে, হায়, দুনিয়ার জীবনে একি দীর্ঘ দুঃখ আপনার সঙ্গী হলো! আপনার সাথে তো আমার চোখটাও প্রশান্তি পাচ্ছে না।”
অধিক পরিমাণে তাকবীর
[১০২৪] ইবনু জাবের বলেন, “আবূ মুসলিম আল-খাওলানি উচ্চৈঃস্বরে অধিক পরিমাণে তাকবীর বলতেন। এমনকি শিশুদের সাথে থাকা অবস্থায়ও। তিনি বলতেন, ‘তুমি এমনভাবে আল্লাহর যিকর করো, যেন জাহেলরা দেখে মনে করে তুমি একজন পাগল'।”
হারানো জিনিস ফিরে পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা
[১০২৫] হুমাইদ ইবনু হিলাল বা অন্য কারও থেকে বর্ণিত, “আবূ মুসলিম খাওলানি একবার দজলা নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে স্রোতের প্রবাহে এক টুকরা কাঠ ভেসে যাচ্ছিল। তিনি পানির ওপর দিয়ে হেঁটে চলে গেলেন। তারপর তিনি তার সাথি দের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমরা কি তোমাদের কোনো জিনিস হারিয়েছ? যদি হারিয়ে থাকো, তাহলে তা ফিরে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো'।”
কুরআনকে বিক্রি না করা
[১০২৬] শাইবান ইবনু আবী শাইবাহ বলেন, “আমি সাল্লাম ইবনু মিসকিনকে বলতে শুনেছি, যদি আমাকে এই স্তম্ভ সমপরিমাণ স্বর্ণও দেয়া হয়, তবুও আমি কুরআন বিক্রি করব না।”
চল্লিশ বছর যাবৎ জামাতে সালাত আদায়
[১০২৭] ইমরান থেকে বর্ণিত, “সাঈদ ইবনু মূসাইয়িবের চল্লিশ বছর যাবৎ জামাতে সালাত ছুটেনি। এবং (সবার শেষে মাসজিদ থেকে বের হবার দরুন) লোকদের পৃষ্ঠদেশের দিকে তিনি তাকিয়েও দেখেননি। লোকেরাও মাসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় কখনো তার সাক্ষাৎ পায়নি।”
আযানের আগে মাসজিদে যাওয়া
[১০২৮] আবূ সাহল উসমান ইবনু হাকীম বলেন, “আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, ত্রিশ বছর যাবৎ আমি মাসজিদে থাকা অবস্থায় মুআযযিন আযান দিয়েছে।”
মাছির চেয়েও তুচ্ছ জীবন
[১০২৯] ইমরান ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু তালহা বলেন, "আমার মনে হয় সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব আল্লাহর সামনে নিজের জীবনকে মাছির চেয়েও তুচ্ছ মনে করেন।”
বাইয়াত প্রদানে অসম্মত হওয়া
[১০৩০] ইমরান ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, "আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের পরবর্তী শাসক ওয়ালীদ ইবনু সুলাইমানের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করার জন্য সাঈদ ইবনুল মূসাইয়িবকে ডাকা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, 'যতদিন দিবারাত্রি পরিবর্তন হবে, তত দিন আমি দুজনের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করব না।' তাঁকে বলা হলো, 'তুমি এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো এবং আরেক দরজা দিয়ে বের হও।' তিনি বলেন, 'আল্লাহর কসম, কোনো মানুষ আমার পদাঙ্ক অনুসণ করবে না।”
বর্ণনাকারী বলেন, "অতঃপর তারা তাকে এক শ বেত্রাঘাত করেছে এবং শক্ত পোশাক পরিধান করিয়েছে।”
মক্কায় অবস্থানের গুরুত্ব
[১০৩১] ওলীদ ইবনু মুগীরাহ বলেন, "সাঈদ ইবনুল মূসাইয়িব আমাকে বলেছেন, 'তুমি একাকিত্বকে গ্রহণ করে নাও। কেননা, তা ইবাদাত। তুমি (মক্কার) হারামের আশপাশে থাকবে। যদি ভালো কিছু হওয়ার থাকে, তবে তা হারামেই হবে। আর যদি মন্দ কিছু হয়ে থাকে, তবে হারামের বাইরের অংশে হবে। কারণ, আমি জানতে পেরেছি যে, মক্কাবাসী বা মক্কায় যারা বসবাস করে, তারা কোনোদিন ধ্বংস হবে না; যতদিন না হারাম তাদের কাছে হারামের বাইরের অন্যান্য সাধারণ জায়গার মতো না হয়ে যায়।”
শাসকের ডাকে সাড়া না দেওয়া
[১০৩২] মায়মুন ইবনু মিহরান বর্ণনা করেন যে, “একবার আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান মদীনায় এলেন। দুপুরে ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তিনি তার দারোয়ানকে বললেন, 'দেখো, মাসজিদে কোনো যুবক আছে কি না?' দারোয়ান যুবকের খোঁজে বের হয়ে সেখানে সাঈদ ইবনুল মূসাইয়িবকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেল না। সে আঙুল দিয়ে ইশারা করে তাকে আসতে বলল। কিন্তু সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব নড়লেন না। অতঃপর দারোয়ান এসে বলল, 'তুমি কি দেখোনি, আমি তোমাকে ইশারা করে আসতে বলেছিলাম?' তিনি বললেন, 'তোমার কী প্রয়োজন?' সে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে আমাকে বলেছেন, দেখো, মাসজিদে কোনো যুবক আছে কি না?' সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব বললেন, 'আমি তার (প্রশাসনের) কোনো লোক নই।' দারোয়ান আবদুল মালিকের নিকট গিয়ে বলল, 'মসজিদে একজন শাইখ পেয়ে তাঁকে ইশারা করে আসতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি ওঠেননি। তারপর বলেছি, আমিরুল মুমিনিন আমাকে বলেছেন— দেখো, কোনো যুবক দেখতে পাও কি না? তখন তিনি বলেছেন, আমি আমিরুল মুমিনিনের লোক নই।' আবদুল মালিক বললেন, 'তিনি হলেন সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব। তাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দাও।”
চল্লিশবার হাজ্জ করা
[১০৩৩] ইবনু হারমালা বর্ণনা করেন, "আমি সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িবকে বলতে শুনেছি, আমি চল্লিশবার হাজ্জ করেছি।”
আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা
[১০৩৪] উমার ইবনু যর বলেন, "একবার আমার সাথে রবী ইবনু আবী রাশেদ-এর সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমার হাত ধরে একটি নির্জন জায়গায় নিয়ে গেলেন। অতঃপর বললেন, 'হে আবূ যর, যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তার সন্তুষ্টি কামনা করল, সে তার নিকট অতি মহান একটি বিষয় কামনা করল।"
মকবুল দুআর সময়
[১০৩৫] খালেদ বলেন, "মকবুল দুআ হলো— অথবা তিনি বলেছেন— যে ব্যক্তি মকবুল দুআ করতে চায়, সে যেন সাজদার সময় হস্তদ্বয় উল্টিয়ে দুআ করে।”
পৃথিবীতে আল্লাহর পাত্র
[১০৩৬] খালেদ ইবনু মা'দান বলেন, “নিশ্চয় পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার কিছু (পছন্দের) পাত্র আছে। তার নিকট সর্বাধিক প্রিয়পাত্র হলো, যা গুণগতভাবে কোমল ও পরিচ্ছন্ন হয়। পৃথিবীতে আল্লাহর (পছন্দনীয়) পাত্র হলো তার সৎ বান্দাদের অন্তর।”
কল্যাণের পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়া
[১০৩৭] খালেদ ইবনু মা'দান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “যখন তোমাদের কারও জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দেওয়া হয়, তখন সে যেন দ্রুত সেদিকে অগ্রসর হয়। কেননা, সে জানে না, কখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।"
সৎকর্মের প্রতি উৎসাহ
[১০৩৮] বেলাল ইবনু সা'দ বলেন, "আমি লোকজনকে দেখেছি— তারা সৎকর্ম তথা সালাত, যাকাত, মঙ্গলজনক কাজ, সৎ কাজের আদেশ ও গর্হিত কাজ থেকে নিষেধ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন। আর এখন তোমরা কেয়াস ও যুক্তির প্রতি উৎসাহ প্রদান করো।”
সকল গুনাহই আল্লাহর নাফরমানি
[১০৩৯] আওযায়ি বর্ণনা করেন, “আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, তুমি ছোট গুনাহের প্রতি লক্ষ্য কোরো না; বরং তুমি লক্ষ্য করো কার নাফরমানি করছ?”
এক ধরনের অসতর্কতা
[১০৪০] আওযায়ি বর্ণনা করেন, “আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই সৎকর্মের কথা স্মরণ রাখা ও পাপের কথা ভুলে যাওয়াটা এক ধরনের অসতর্কতা।”
দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাওয়া
[১০৪১] আওযায়ি বর্ণনা করেন, বেলাল ইবনু সা'দ বলেন, “গুনাহের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়াবিমুখ করে রাখেন আর আমরা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাই।”
মুসলমান তার ভাইয়ের জন্য আয়নাস্বরূপ
[১০৪২] ইয়াজিদ ইবনু জাবির থেকে বর্ণিত, "বেলাল ইবনু সা'দ বলেন, 'আমি জানতে পেরেছি যে, মুসলমান তার ভাইয়ের জন্য আয়নাস্বরূপ। আয়না কি আমার কোনো বিষয়কে সন্দেহপূর্ণ মনে করে?”
গোপনে আল্লাহর শত্রু না হওয়া
[১০৪৩] আওযায়ি বলেন, “আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, তুমি প্রকাশ্যে আল্লাহর বন্ধু আর গোপনে তার শত্রু হোয়ো না।
দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া গুনাহ
[১০৪৪] আওযায়ি বলেন, “আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর কসম! গুনাহের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়াবিমুখ রাখেন আর আমরা দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাই; ফলে তোমাদের মধ্যকার দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিরা হয়ে যায় দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট, আর আলেমরা হয়ে যায় জাহেল, অধিক ইবাদাতকারীরা হয়ে যায় স্বল্প ইবাদাতকারী।”
আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া
[১০৪৫] আওযায়ি বলেছেন, “আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, তোমার যে ভাই তোমার সাথে সাক্ষাৎ করে তোমাকে আল্লাহ প্রদত্ত সুখ-শান্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সে ওই ভাই অপেক্ষা উত্তম, যে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করলে তোমাকে একটি দীনার দান করে।"
নিশ্চিহ্ন করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি
[১০৪৬] আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজিদ ইবনু তামীম বলেছেন, "আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, হে চিরস্থায়ী জগতের অধিবাসী। হে পরকাল নিবাসী। তোমাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। তোমরা কেবল এক জগৎ থেকে অন্য জগতে স্থানান্তরিত হবে। যেভাবে তোমরা মেরুদণ্ড থেকে গর্ভাশয়ে, গর্ভাশয় থেকে দুনিয়াতে, দুনিয়া থেকে কবরে, কবর থেকে মাওকিফ তথা অবস্থানস্থলে ও মাওকিফ থেকে চিরস্থায়ী জগতে স্থানান্তরিত হও।"
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা
[১০৪৭] ইবনু জাবের বলেছেন, "আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, যখন আমি আবূ সা'দ-এর নিকট উপস্থিত হলাম, তিনি বললেন, 'হে আমার প্রিয় বৎস, তোমার সন্তানেরা কোথায়?' তিনি বলেন, 'আমি আমার স্ত্রীকে (তাদের নিয়ে আসতে) বললাম। তারপর তাদের সাদা পোশাক পরিয়ে তার কাছে নিয়ে এলাম। তিনি তাদের চুমু খেলেন এবং ঘ্রাণ নিলেন। অতঃপর বললেন, হে আল্লাহ, আমি তাদের ব্যাপারে তোমার কাছে কুফুরি, অন্ধত্বের গোমরাহি, নারী ও বানী আদমের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।”
দিনে হাসিখুসি থেকে রাতে ইবাদাতে মগ্ন হওয়া
[১০৪৮] আওযায়ি বর্ণনা করেন, "বেলাল ইবনু সা'দ বলেন, 'আমি লোকজনকে দেখেছি, তারা (দিনের বেলায়) বিভিন্ন কাজে কঠিন (পরিশ্রমী) হয় এবং একে অপরের সাথে হাসাহাসি করে। কিন্তু রাত্রি এলে তারা ইবাদাতগুজার হয়ে যায়।”
অনেক প্রফুল্ল মানুষ প্রতারিত
[১০৪৯] আওযায়ি বলেন, “আমি বেলাল ইবনু সা'দকে বলতে শুনেছি, অনেক প্রফুল্ল মানুষ প্রতারিত এবং সে তা বুঝতেও পারছে না। পানাহার ও হাসাহাসি করছে। অথচ তার ব্যাপারে আল্লাহর ইলমে এই সিদ্ধান্ত অবধারিত হয়ে আছে যে, সে হবে জাহান্নামের ইন্ধন।”
নির্বোধদের কাছে হেকমতপূর্ণ কথা না বলা
[১০৫০] সুলাইমান ইবনু সুমায়ের বলেন, “আমি কাসীর ইবনু মুররাহকে বলতে শুনেছি, তুমি নির্বোধদের কাছে হেকমতপূর্ণ কথা বোলো না। তাহলে তারা তোমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে। বিচক্ষণ লোকদের সামনে অবাস্তব কথা বোলো না, তাহলে তারা তোমাকে অপছন্দ করবে। ইলমের যোগ্য লোকদের ইলম থেকে বাধা দিয়ো না, তাহলে তুমি গুনাহগার হবে। অযোগ্যদের কাছে তা বর্ণনা কোরো না, তাহলে তুমি জাহেল হয়ে যাবে। নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার ইলমের হক রয়েছে, যেভাবে তোমার ওপর তোমার মালের হক রয়েছে।”
এতিম ও বিধবাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা
[১০৫১] দহহাক ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আযরাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তিনি জুমুআর দিন খুতবা শেষ করে যখন মিম্বর থেকে নামার ইচ্ছা করতেন তখন বলতেন,
الله الله فيمن لا أحد له الا الله الله الله فى يتاماكم الله الله في أراملكم
'তোমরা এতিম ও বিধবাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এবং যার আল্লাহ ছাড়া কেউ নেই, তার ব্যাপারেও আল্লাহকে ভয় করো।”
উত্তম নিআমাত
[১০৫২] রাশদে ইবনু আবূ রাশেদ বলেন, “ইয়াজিদ ইবনু মায়সারাহ বলতেন, 'শোকর-সংবলিত নিআমাত ও ধৈর্য-সংবলিত বিপদ এবং আনুগত্যের দরুন আপতিত বিপদ, ক্ষতিকর হয় না। আল্লাহর আনুগত্য তার নাফরমানির দরুন আগত নিআমাত অপেক্ষা উত্তম।”
ইলম হবে সাজসজ্জার বস্তু!
[১০৫৩] হাবীব ইবনু উবায় আর-রহাবি বলেন, “তোমরা ইলম শিখে তা উপলব্ধি করো এবং তার দ্বারা উপকৃত হও। সাজসজ্জা গ্রহণের উদ্দেশ্যে তা শিখো না। কেননা, অদূরভবিষ্যতে যদি তোমরা বেঁচে থাকো তবে দেখবে, আলেমরা ইলমকে সাজসজ্জার বস্তু হিসেবে গ্রহণ করবে যেভাবে কাপড়ের মালিক তার কাপড়কে সাজসজ্জার জন্য গ্রহণ করে থাকে।"
দুটি চক্ষুকে আগুন স্পর্শ করবে না
[১০৫৪] মাকহুল বলেন, "দুটি চক্ষুকে আগুন স্পর্শ করবে না। এমন চক্ষু, যা আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে। আরেকটি হলো এমন চক্ষু, যা মুসলমানদের পাহারায় জাগ্রত থাকে।" [১৬০]
যার পাপ কম তার দিল নরম হয়ে থাকে
[১০৫৫] মাকহুল আদ-দিমাশকি বলেন, “সবচেয়ে নরম দিলের অধিকারী ওই ব্যক্তি, যার পাপ সবচেয়ে কম।"
মুমিনরা লাগাম পরানো উটের ন্যায় নিরাপদ
[১০৫৬] মাকহুল বলেন, "মুমিনরা হলো সহজ-সরল লাগাম পরানো উটের ন্যায় নিরাপদ। যদি তুমি তাকে টেনে নাও সে অনুগামী হবে। আর যদি তাকে বসাও তবে সে বসে যাবে।" [১৬১]
আল্লাহর অনুগ্রহ
[১০৫৭] জাফর থেকে বর্ণিত, সালেহ ইবনু মিসমার বলেন, "দুনিয়ার যেসব জিনিস নিয়ে গিয়ে আমাদের ওপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেন, তা দুনিয়ার ওই অনুগ্রহ থেকে উত্তম, যা তিনি আমাদের দিয়ে থাকেন।"
আল্লাহ-প্রেমিকরা দুনিয়া থেকে সরে থাকে
[১০৫৮] মুহাম্মাদ ইবনু ফদল বলেন, "আমি ইবনু শুবরুমাকে এই কবিতার অনুকরণ করতে দেখেছি,
حتى متى أنت في دنياك مشتغل وعامل الله عن دنياه مشغول
"আর কতকাল তুমি ব্যস্ত রবে তোমার এই দুনিয়া নিয়ে? অথচ আল্লাহ-প্রেমিকরা তো এই দুনিয়া থেকে নিজেদের রাখে সরিয়ে।”
বিপদে আক্রান্ত হওয়াটাও আল্লাহর নিআমাত
[১০৫৯] ইসমাঈল বিন যারবি বলেন, "আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে বলতে শুনেছি, আমার সঙ্গীদের বিপদ লেগেই থাকত। একপর্যায়ে আমার মনে হলো, আমাকে আল্লাহর কোনো প্রয়োজনই নেই, নয়তো তিনি আমাকেও বিপদ দিতেন।”
হৃদয়ের শাঁস
[১০৬০] ইসমাঈল ইবনু যারবি বলেন, “আমি সাঈদ ইবনু ফুযাইরকে বলতে শুনেছি, উমার ইবনু সাবিত বলেন, 'আবূ মূসার কাছে কুরআনের একটি কপি ছিল। তিনি একে হৃদয়ের শাঁস বলতেন।”
মাজীদ
[১০৬১] লাইস থেকে বর্ণিত, মুজাহিদ বলেন, “আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর একটি কুরআনের কপি ছিল, তিনি একে মাজীদ বলতেন।”
ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া
[১০৬২] মাহান বলেন, "তুমি যখন এমন কোনো ঘরে প্রবেশ করবে, যেখানে কেউ নেই তখন এই কথা বলবে,
السلام علينا من ربنا 'আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
পাপ করার পর নিজের আমলকে তুচ্ছ মনে করা
[১০৬৩] জাফর থেকে বর্ণিত, একবার সাঈদকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কে সবচেয়ে বড় ইবাদাতকারী?” তিনি বললেন, "সেই ব্যক্তি, যে পাপ করার পর—যখনই তা স্মরণ হয়—তখনই নিজের আমলকে খুবই তুচ্ছ মনে করে।"
ওলীদের কষ্ট দিলে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হোন
[১০৬৪] জাফর থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনু জুবায়ের বলেন, “বানী ইসরাঈলের কোনো এক শাসকের আমলে একবার অনাবৃষ্টি দেখা দিলো। মানুষজন বৃষ্টির প্রার্থনার জন্য বের হয়ে এল। একজন বলল, 'যদি আমাদের বৃষ্টি দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা তাঁকে (আল্লাহকে) ক্রোধান্বিত করব।' অন্যরা জানতে চাইল, 'কীভাবে ক্রোধান্বিত করবে? কীসের মাধ্যমে ক্রোধান্বিত করবে?' সে বলল, 'তার ওলীদের হত্যা করব।' তখন তাদের জন্য বৃষ্টি বর্ষিত হলো।”[১৬২]
তাকে সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব থেকেও শ্রেষ্ঠ মনে করা হতো
[১০৬৫] হুমাইদ আল-আরাজ থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনু জুবায়েরের এক ছেলে তার কাছে এলে তিনি বললেন, "আমার কাছে তার সবচেয়ে ভালো অবস্থা হলো, সে মারা যাবে আর আমি তা সওয়াবের কারণ বলে মনে করব।" ইবনু উআইনা বলেন, "ইবনু আইয়ুব বলেছেন, 'তারা তাকে সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব থেকেও বেশি শ্রেষ্ঠ মনে করতেন।"
শিশুসুলভ আচরণ
[১০৬৬] ইবরাহীম বলেছেন, "যুবকের শিশুসুলভ আচরণ তারা (সাহাবিরা) পছন্দ করতেন।"
মৃত্যুর সময় কষ্ট পাওয়াকে পছন্দনীয় মনে করা
[১০৬৭] ইবরাহীম ইবনু মুহাজির বলেন, "ইবরাহীম বলেছেন, 'তারা (সাহাবিরা) মৃত্যুর সময় অসুস্থ ব্যক্তির কষ্ট পাওয়াকে পছন্দনীয় মনে করতেন।”
[১০৬৮] মানসূর থেকে বর্ণিত, “ইবরাহীম মৃত্যুযন্ত্রণাকে পছন্দ করতেন।”
মাটির শীতলতার কথা মনে পড়া
[১০৬৯] খালাফ ইবনু হাওশাব থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম বলেছেন, "আমি যতবারই এই আয়াত তিলাওয়াত করেছি, ততবারই আমার মাটির শীতলতার কথা মনে পড়েছে। তারপর তিনি এই আয়াতটি পড়লেন :
وَحِيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ
'তাদের ও তাদের কাঙ্ক্ষিত বস্তুর মাঝে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে।” [১৬৩]
কিছু উপদেশ
[১০৭০] উমার ইবনু আবদুল মালিক বলেন, "রোম অঞ্চলে সেনাবাহিনীর পেছনের অংশে ইবনু মুহাইরিযের সাথে এক ব্যক্তির সাক্ষাৎ হলো। বিদায়ের মুহূর্ত এলে ইবনু মুহাইরিয তাকে বললেন, 'আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি বললেন, 'কয়েকটি কাজ করা সম্ভব হলে, করবে। তুমি (সবাইকে) চিনবে কিন্তু কেউ তোমাকে চিনবে না। তুমি প্রশ্ন করবে, কিন্তু তোমাকে প্রশ্ন করা হবে না। তুমি হাঁটবে, কিন্তু তোমার কাছে হেঁটে আসা হবে না।”
পিতার সামনে সামনে না হাঁটা
[১০৭১] আলি ইবনু তলক বলেন, “আমি ইবনু মুহাইরিযকে বলতে শুনেছি, যে তার পিতার সামনে সামনে হাঁটল, সে তার বাবার অবাধ্যতা করল। তবে যদি তার সামনে দিয়ে রাস্তা থেকে কাঁটা সরিয়ে দেবার জন্য হাঁটে, সেটা ভিন্ন। যে তার বাবার নাম বা উপনাম ধরে ডাকল, সে তার অবাধ্যতা করল। তার উচিত এভাবে বলা—হে আমার বাবা।"
জালেমের ওপর বদদুআ খুব দ্রুত নিপতিত হয়
[১০৭২] মুসলিম ইবনু ইয়াসার থেকে বর্ণিত, “তিনি শুনতে পেলেন, এক ব্যক্তি অপর এমন এক ব্যক্তির জন্য বদদুআ করছে, যে তার ওপর অবিচার করেছে। তখন তিনি তাকে বললেন, 'জালেমকে তার জুলুমের হাতেই ছেড়ে দাও। কারণ, তোমার বদদুআ খুব দ্রুত তার ওপর নিপতিত হবে। যদি না কোনো আমলের কারণে সে (এর থেকে) নিষ্কৃতি না পায়। যোগ্য ব্যক্তিরা এমনটা করে না।”
নাসীহাত-সংবলিত পত্র
[১০৭৩] রজা ইবনু আবূ সালামা বলেন, “ইবনু মুহাইরিয নাসীহাত-সংবলিত পত্র নিয়ে আবদুল মালিকের কাছে এসে সেটা তাকে পড়ে শোনাল। তারপর সেটা তার হাতে আর ধরে রাখতে পারেননি।"
প্রশংসা করলে তিনি রাগ করতেন
[১০৭৪] আবূ আমর শায়বানি বলেন, “ইবনু মুহাইরিযের সামনে কেউ প্রশংসা করলে তিনি রাগ করে বলতেন, 'তোমার কী জ্ঞান আছে? তুমি কী জানো?”
রেশমি কাপড় অপছন্দনীয়
[১০৭৫] রজা ইবনু সালামাহ বলেন, “ইবনু মুহাইরিয বলেছেন, 'রেশমি কাপড় পরিধান করার তুলনায় আমার চর্মে শ্বেতরোগ হওয়াটা আমি বেশি পছন্দ করি।'”
আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেওয়ার লাভ
[১০৭৬] ইবনু মুহাইরিয বলেন, “যে ব্যক্তি এক রাত আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দিলো, প্রতিটি মানুষ ও প্রাণীর বিনিময়ে তাকে এক কিরাত এক কিরাত করে (নেকি) প্রদান করা হবে।" [১৬৪]
দাসীর কারণে ঘর ছেড়ে চলে যাওয়া
[১০৭৭] আবূ যুরআ বলেন, "আবদুল মালিক একজন দাসীকে ইবনু মুহাইরিযের কাছে পাঠালেন। তিনি তার ঘর ছেড়ে চলে যান এবং সেখানে আর প্রবেশ করেননি। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি কি ইবনু মুহাইরিযকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'কেন?' তারা বলল, 'সেই দাসীর কারণে (এমনটা বললাম), যাকে আপনি তার কাছে পাঠিয়েছিলেন।' তারপর আবদুল মালিক লোক পাঠিয়ে সেই দাসীকে ফেরত নিয়ে আসেন।"
ঘাস কেটে অর্থ উপার্জন করা
[১০৭৮] রজা ইবনু আবূ সালামা বলেন, "ইবনু মুহাইরিয যখন জিহাদে বের হতেন, তখন সবচেয়ে পছন্দনীয় খরচপাতি তিনি (জোগাড় করতেন) জানোয়ারের ঘাসে। (অর্থাৎ ঘাস কেটে অর্থ উপার্জন করে, সেটা দিয়ে নিজের খরচপাতি চালাতে তিনি বেশি পছন্দ করতেন)।”
খাটো লুঙ্গি পরিধান করতে অস্বীকৃতি জানানো
[১০৭৯] রজা ইবনু জামীল আল-আইলি বলেন, “যখন পিতার পরে ওলীদ ও সুলাইমানের জন্য বাইয়াতের ব্যাপারে মদীনাতে নির্দেশনা পাঠানো হলো, তখন আবদুর রহমান ইবনু আবদুল কারি সাঈদ ইবনু মূসাইয়িবকে বললেন, 'আমি তোমাকে তিনটি বিষয়ের পরামর্শ দিচ্ছি।' তিনি বললেন, 'কী সেটা?' তিনি বললেন, 'তুমি আপন জায়গা থেকে সরে যাবে। কারণ, তুমি এমন স্থানে অবস্থান করছ, যেখানে হিশাম ইবনু ইসমাঈল তোমাকে দেখতে পায়। অথবা তুমি উমরা করতে বেরিয়ে পড়বে।' তিনি বললেন, 'আমি নিজ সম্পদ ও শ্রম এমন কাজে ব্যয় করতে পারব না, যাতে নিয়ত নেই। তৃতীয় বিষয়টি কী?' তিনি বললেন, 'তুমি বাইয়াত করে নেবে।' তিনি বললেন, 'আচ্ছা, আল্লাহ যদি আপনার চোখের মতো অন্তরকেও অন্ধ করে দেন, তাতে আমার কী!'"
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি ছিলেন অন্ধ। রজা বলেন, 'তারপর হিশাম তাকে বাইয়াতের জন্য ডাকল। তিনি অস্বীকার করলেন। সে আবদুল মালিকের কাছে এই বিষয়ে পত্র লিখল। আবদুল মালিক তাকে জানাল, তোমার আর সাঈদের কী হলো? তার থেকে তো আমরা অপছন্দনীয় কিছু পাচ্ছি না। যদি তুমি কিছু করতেই চাও তবে তাকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করো। এবং খাটো লুঙ্গি পরিধান করাও। অতঃপর তাকে মানুষের জন্য বন্দী করে রাখো। রজা বলেন, 'মদীনাতে যেসব আইলির বাসিন্দা পুলিশের চাকুরিতে ছিল তারা আমাকে বলেছে—আমরা জানতাম তিনি ছোট লুঙ্গি পরবেন না। তাই তাকে বললাম, 'হে আবু মুহাম্মাদ, আপনি তা পরে নিন। নইলে এর পরিণতি হবে হত্যা।' তিনি তখন তা পরিধান করলেন। যখন তাকে প্রহার করা হলো, তিনি বুঝলেন যে আমরা তাকে ধোঁকা দিয়েছি। তাই তিনি বললেন, 'হে আইলাবাসীরা, যদি হত্যা করবে বলে আমার মনে না হতো, তবে আমি কখনোই তা পরিধান করতাম না।”
বান্দার মাধ্যমে সম্মান না চাওয়া
[১০৮০] সাঈদ ইবনু মূসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি উমার ইবনুল খাত্তাবকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,
مَنِ اعْتَزَّ بِالْعَبْدِ أَذَلَّهُ اللَّهُ
'যে বান্দার মাধ্যমে সম্মান লাভ করতে চায় আল্লাহ তাকে অসম্মানিত করেন।" [১৬৫]
মৃত্যুর স্মরণ আনন্দ ও হিংসাকে দূর করে
[১০৮১] রজা ইবনু হায়ওয়া বলেন, “মানুষ যত বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, তত বেশি আনন্দ ও হিংসাকে পরিহার করে।”
মেহমানকে সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য খাওয়ানো
[১০৮২] ইসমাঈল ইবনু সাঈদ বলেন, “আমি হাইয়া আল-উরানির কাছে আসলাম। তিনি এক পাত্র কাঁচা খেজুর ও গুঁড়া লবণ দিলেন। তারপর বললেন, 'খাও। যদি ঘরে এর চেয়ে ভালো কিছু থাকত, তাহলে তোমাকে তা খাওয়াতাম।' তারপর তিনি বললেন, 'আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, তোমার কাছে তোমার মুসলিম ভাই আগমন করলে, তাকে তোমার ঘরের সর্বোৎকৃষ্ট খাবার খাওয়াও। যদি সে সাওম পালনকারী হয়, তবে তাকে তেল মাখিয়ে দাও।”
নিরাপত্তা ও সুস্থতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে
[১০৮৩] শাবি বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ
'সেদিন তোমাদের স্বাচ্ছন্দ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।'[১৬৬]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, '(এই স্বাচ্ছন্দ্য হলো) নিরাপত্তা ও সুস্থতা।”
স্বাচ্ছন্দ্য ও ঐশ্বর্যর ব্যাখ্যা
[১০৮৪] রাশেদ ইবনু সাঈদ থেকে বর্ণিত, তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, "স্বাচ্ছন্দ্য কী?” তিনি বললেন, "আত্মিক প্রশান্তি।” আবার জিজ্ঞেস করা হলো, "ঐশ্বর্য কী?” তিনি বললেন, "শারীরিক সুস্থতা।”
আল্লাহ যাকে দ্বীনের নিআমাত দান করেন
[১০৮৫] মুজাহিদ বলেন, "উবায়েদ ইবনু উমায়ের বলেছেন, 'দুনিয়ার অন্বেষী হোক বা না হোক, আল্লাহ তাআলা সবাইকেই তা দান করেন। কিন্তু দ্বীন দান করেন কেবল তাকে, যে দ্বীনকে ভালোবাসে। যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে ঈমানের দৌলত দান করেন। যে ব্যক্তি শত্রুর সাথে লড়াই করতে ভয় করে, রাত্রে জেগে থাকতে শঙ্কাবোধ করে এবং সম্পদ খরচ করতে কৃপণতা করে, সে যেন বেশি বেশি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ে।”
আবূ আবদুর রহমানকে 'যবীহ' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “অধিকাংশ হাদীস ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর কথাই বলে। আমার পিতাও এই মতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট ছিলেন।”
টিকাঃ
[১৫৪] خراج ولاج -এর মানে হলো কোথাও অধিক পরিমাণে আসা-যাওয়া করা। (দ্রষ্টব্য: তাজুল আরূস)
[১৫৫] বর্ণনাটি মুরসাল। কারণ সুফিয়ান সাওরী রাহিমাহুল্লাহ সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ পাননি। তাই এর সনদে বিচ্ছিন্নতা আছে।
[১৫৬] অর্থাৎ মাখলুকের কোনো অনুগ্রহ গ্রহণ কোরো না। বরং নিজের সকল প্রয়োজনের জন্য আল্লাহর দ্বারস্থ হও।-অনুবাদক
[১৫৭] পাল্টা প্রতিশোধ নিয়ে বিজয় লাভ করে না।-অনুবাদক
[১৫৮] সূরা নিসা, ৪: ৩২
[১৫৯] সূরা যুমার, ৩৯ : ১০
[১৬০] এটি মারফু হাদীস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, সনদ সহীহ; সহীহুল জামি: ৪১১৩
[১৬১] সনদ হাসান। সহীহুল জামি: ৬৬৬৯
[১৬২] এই ঘটনা দ্বারা মূলত সৃষ্টিজীবের অবাধ্যতা ও দুঃসাহস এবং তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞতা সত্ত্বেও তাদের ওপর আল্লাহর ধৈর্য ও সহনশীলতা বোঝানো উদ্দেশ্য। নইলে কার এমন সাধ্য আছে যে আল্লাহকে এভাবে ক্রোধান্বিত করবে!-অনুবাদক
[১৬৩] সূরা সাবা, ৩৪ : ৫৪
[১৬৪] কিরাত একটা পরিমাপের নাম।-অনুবাদক
[১৬৫] সনদ যঈফ। হিলইয়াতুল আউলিয়া : ২/১৭৪; সিলসিলা যঈফা : ২১২০
[১৬৬] সূরা তাকাসুর, ১০২:৮
📄 আবু মুসলিম খাওলানি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি উপদেশ
[১০৮৬] মুআবিয়া ইবনু আবূ সুফিয়ান দিমাস্কের মিম্বরে বসা অবস্থায় আবূ মুসলিম খাওলানি তাকে ডেকে বললেন, “হে মুআবিয়া, আপনি কবরসমূহের মধ্য হতে একটি কবর। যদি আপনি কোনো কিছু নিয়ে আসেন, তবে আপনার জন্য কিছু হবে। আর যদি কোনো কিছু না নিয়ে আসেন, তাহলে আপনার জন্য কিছুই হবে না। হে মুআবিয়া, কেবল সম্পদ স্তূপ করে তা বিতরণ করাকেই খেলাফত ভাববেন না। বরং খেলাফত হলো সত্যের ওপর আমল করা, ন্যায়পরায়ণতার সাথে কথা বলা এবং আল্লাহর ব্যাপারে মানুষকে পাকড়াও করা। হে মুআবিয়া, যদি আপনি আরবের কোনো গোত্রের ওপর অবিচার করেন, তবে আপনার অবিচার আপনার ন্যায়পরায়ণতাকে শেষ করে দেবে।”
আবূ মুসলিম তার কথা শেষ করার পর মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, "আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।”
মানুষের সমালোচনা পরিহার করা
[১০৮৭] আবূ মুসলিম খাওলানির কাছে একবার এক ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টের অভিযোগ করল। তিনি তাকে বললেন, “তুমি যদি মানুষের সমালোচনা করো, তবে তারাও তোমার সমালোচনা করবে। আর যদি তাদের তুমি ছেড়ে দাও, তবুও তারা তোমাকে ছাড়বে না। যদি তুমি তাদের থেকে পলায়ন করো, তারা তোমাকে ধরে ফেলবে।"
সে জানতে চাইল, “তাহলে আমি কী করব?” তিনি বললেন, “অভাবের দিনে তাদেরই তোমার প্রয়োজন হবে।”
সম্পদ জমা করার জন্য নবিজিকে পাঠানো হয়নি
[১০৮৮] আবূ মুসলিম খাওলানি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'সম্পদ জমা করে ব্যবসায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য আল্লাহ আমার কাছে ওহি পাঠাননি। বরং তিনি আমার কাছে ওহি পাঠিয়েছেন এই মর্মে :
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَكُن مِّنَ السَّاجِدِينَ وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ
'তুমি তোমার রবের প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করো এবং সাজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও। আর ইয়াকীন (মৃত্যু) না আসা পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদাত করো।”[১৬৭]
কাকের সংবাদ প্রদান করা
[১০৮৯] দিমাশকের কিছু শাইখ থেকে বর্ণিত আছে, "আবূ মুসলিম খাওলানি রোম অঞ্চলে ছিলেন। শাসক সেখানে একটি বাহিনী পাঠিয়ে তাদের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিলো। কিন্তু তারা দেরি করছে দেখে আবূ মুসলিম খাওলানি চিন্তিত হলেন। তাদের কথা চিন্তা করতে করতে নদীর তীরে তিনি ওযু করছিলেন। হঠাৎ গাছের ওপর একটি কাক এসে তাকে বলল, 'হে আবূ মুসলিম, আপনি কি বাহিনীর কথা ভেবে চিন্তিত?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' কাকটি বলল, 'চিন্তার কিছু নেই। তারা গানীমাত লাভ করে নিরাপদেই আছে। অমুক সময়ে তারা আপনার কাছে এসে পৌঁছবে।' আবূ মুসলিম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কে? আল্লাহ তোমাকে রহম করুন।' সে বলল, 'আমি আরতিয়াঈল। মুমিনদের হৃদয়কে প্রশান্ত করি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “পরবর্তীকালে তারা (সে বাহিনীর লোকজন) তার (কাকের) বলা সময় অনুযায়ী এসেছিল।”
গির্জার পাদরির সালাম জানানো
[১০৯০] মুহাম্মাদ ইবনু শুআইব দিমাশকের কোনো এক শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, "আমরা রোমের অঞ্চল থেকে কাফেলা আকারে ফিরে আসছিলাম। হিমস থেকে দিমাশকের উদ্দেশে রওনা হয়ে আমরা হিমস থেকে চার মাইলের কাছাকাছি একটি মোড় অতিক্রম করলাম রাতের বেলায়। সেখানে গির্জায় থাকা পাদরি (আমাদের কথা) শুনতে পেয়ে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কারা?' আমরা বললাম, 'আমরা দিমাশকের কিছু মানুষ। রোমের এলাকা থেকে এসেছি।' সে বলল, 'তোমরা কি আবূ মুসলিম খাওলানিকে চেনো?' আমরা বললাম, 'হ্যাঁ, চিনি।' সে বলল, 'তোমরা যদি তার দেখা পাও, তবে তাকে আমার সালাম দিয়ো। তাকে বলে দিয়ো, আমরা তাকে কিতাবে ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গীরূপে পেয়েছি। যদি তোমরা তাকে চিনে থাকো, তবে তাকে জীবিত পাবে না।'
বর্ণনাকারী বলেন, “যখন আমরা গুতা নামক এলাকায় এসে পৌঁছলাম, তখন তার মৃত্যুসংবাদ আমাদের কাছে এসে পৌঁছল।”
দুআ করার সাথে সাথে বৃষ্টি নামা
[১০৯১] সাঈদ ইবনু আবদুল আযীয বলেন, মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যামানায় একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। তিনি লোকদের সাথে করে বৃষ্টির প্রার্থনার জন্য বের হলেন। যখন লোকেরা মুসল্লার দিকে তাকাল, তখন মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আবূ মুসলিমকে বললেন, 'মানুষ যে কী মুসিবতে পতিত হয়েছে, তা তো দেখছেনই। সুতরাং আল্লাহর কাছে দুআ করুন।' তিনি বললেন, 'অযোগ্যতা সত্ত্বেও আমি (দুআ) করব।' তারপর তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তার গায়ে ছিল মাথাওয়ালা এক প্রকার ঢিলা কোট। তিনি মাথা থেকে তা খুলে ফেললেন। তারপর বললেন, 'হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে বৃষ্টি চাচ্ছি। নিজেদের পাপের বোঝা সাথে করেই আমরা আপনার কাছে এসেছি। সুতরাং আমাদের নিরাশ করবেন না।”
বর্ণনাকারী বলেন, “লোকেরা ফিরে যেতে-না-যেতেই বৃষ্টি হলো। তখন আবূ মুসলিম বললেন, 'হে আল্লাহ, মুআবিয়া আমাকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছে যে, তার কথা শুনতেই হতো। সুতরাং আপনার কাছে যদি আমার জন্য কোনো কল্যাণ থাকে, তাহলে আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যান।' সেদিন ছিল বুধবার। পরবর্তী বুধবারেই তার মৃত্যু হয়।"
সকল কিছু আল্লাহর কাছে চাওয়া
[১০৯২] মুহাম্মাদ ইবনু শুআইব থেকে বর্ণিত, “নফল সালাতে আবূ মুসলিম খাওলানি দুআ করতেন, হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে রান্না করা খাবার দান করো। হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে রান্না করা খাবার দান করো। হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে তেল দান করো। হে আল্লাহ, আবূ মুসলিমকে কাষ্ঠখণ্ড দান করো। এভাবে তার যা ইচ্ছা, সবকিছু তিনি চাইতেন।”
ইবাদাতে সচেষ্ট হওয়া
[১০৯৩] সাঈদ ইবনু আবদুল আযীয বলেন, “আবূ মুসলিম খাওলানি বলেছেন, 'যদি বলা হয়, জাহান্নامকে প্রজ্বলিত করা হবে, তবুও আমি আমার আমলে বৃদ্ধি ঘটাতে পারব না।” [১৬৮]
ভালো কাজ করলে ভালো প্রতিদান পাওয়া যায়
[১০৯৪] উবাইদুল্লাহ ইবনু শুমাইত বলেন, “আমার পিতা বর্ণনা করেছেন, ‘আবৃ মুসলিম খাওলানি ঘুরে ঘুরে ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করছিল। মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আগমন করলে তাকে বলা হলো যে—আবূ মুসলিম ঘুরে ঘুরে ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করছে। তিনি তার কাছে (আসার জন্য) খবর পাঠালেন। তারপর তাকে বললেন, ‘হে আবূ মুসলিম, তুমি কী করছ? তুমি কি ইসলামের মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা করছ?’ তিনি বললেন, 'হ্যাঁ'। তারপর আবূ মুসলিম মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি মনোনিবেশ করে বললেন, 'যদি আপনি ভালো কাজ করেন, তবে ভালো প্রতিদান পাবেন। আর যদি মন্দ কাজ করেন, তবে তারও প্রতিদান পাবেন। হে মুআবিয়া, যদি আপনি পুরো বিশ্ববাসীর ওপর ন্যায়বিচার করে পরে একজনের ওপরও জুলুম করেন, তবে আপনার জুলুম আপনার ন্যায়বিচারকে পদানত করবে।”
যিকরকারী শ্রেষ্ঠ
[১০৯৫] আবূ উবাইদাহ ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, "যদি কোনো ব্যক্তি রাস্তার ধারে একটি স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি থলে নিয়ে বসে এবং যে-ই তার পাশ দিয়ে যায় তাকে একটি করে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করতে থাকে, আর তার অন্যপাশে আরেকজন ‘আল্লাহু আকবার’ যিকর করতে থাকে, তবে যিকরকারীই হবে সর্বোচ্চ নেকি অর্জনকারী।”
পাপ পরিহার করা বেশি সহজ
[১০৯৬] শুরাহবিল ইবনু মুসলিম বলেছেন, “যখন আবূ মুসলিম কোনো ধ্বংসস্থলে আসতেন সেখানে অবস্থান করে বলতেন, হে ধ্বংস্থল, তোমার অধিবাসীরা কোথায়? তারা প্রস্থান করেছে। রয়ে গেছে তাদের কর্মসমূহ। কুপ্রবৃত্তি শেষ হয়ে গেছে। রয়ে গেছে আদম-সন্তানের পাপসমূহ। তাওবা অন্বেষণের তুলনায় পাপ পরিহার করা অনেক বেশি সহজ।”
লম্বা সময় সালাত আদায় করা
[১০৯৭] শুরাহবিল ইবনু মুসলিম খাওলানি থেকে বর্ণিত, "দুই ব্যক্তি আবু মুসলিম খাওলানির সাথে তার বাড়িতে সাক্ষাৎ করতে এল। তার পরিবারের কেউ তাদের জানাল যে, তিনি মাসজিদে আছেন। (তারা গিয়ে) তাকে সালাতে দেখতে পেল। তারা তার সালাত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগল এবং রাকাত গুনতে লাগল। একজনের গণনায় দেখা গেল তিনি সালাত শেষ করার আগে তিন শ রাকাত পড়েছেন। অন্যজনের গণনায় চার শ রাকাত। তারা তাকে বলল, 'হে আবূ মুসলিম, আমরা আপনার পেছনে বসে অপেক্ষা করছিলাম।' তিনি তাদের বললেন, 'শোনো, যদি আমি তোমাদের অবস্থানের কথা জানতাম, তবে তোমাদের কাছে আসতাম। তোমরা আর আমার সালাত গণনা করার সুযোগ পেতে না। তোমাদের আমি কসম করে বলছি, কিয়ামাত দিবসের জন্য অধিক পরিমাণে সাজদা করা অতি উত্তম।”
তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি
[১০৯৮] কাব বলেন, “আবূ মুসলিম খাওলানি এই উম্মতের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি।”
মুমিনদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা না করা
[১০৯৯] আবূ মুসলিম খাওলানি বলতেন, “মুমিনদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা করা থেকে সাবধান। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ও জবানে সত্যকে স্থাপন করেছেন।"
সাধ্যানুরূপ ইবাদাত করতে চেষ্টা করা
[১১০০] আবদুল্লাহ ইবনু উবায়দ ইবনু উমায়ের তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
تَجِدُ الْمُؤْمِنَ يَجْتَهِدُ فِيمَا يُطِيقُ مُتَلَقِّفًا عَلَى مَا لَا يُطِيقُ
“তুমি দেখবে যে মুমিনরা সাধ্যানুরূপ (ইবাদাত করতে) চেষ্টা করে। আর যা তাদের সাধ্যের বাইরে, এর জন্য তাদের দুঃখ হয়।” [১৬৯]
আল্লাহ দয়ালু ব্যক্তির প্রতিই দয়া করেন
[১১০১] আবূ সালেহ হানাফি বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ رَحِيمٌ لَا يَضَعُ رَحْمَتَهُ إِلَّا عَلَى رَحِيمٍ وَلَا يُدْخِلُ الْجَنَّةَ إِلَّا رَحِيمًا
'আল্লাহ তাআলা দয়ালু। তিনি কেবল দয়ালু ব্যক্তির প্রতিই দয়া করেন এবং দয়ালু ব্যক্তিকেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।'
লোকেরা বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা তো আমাদের ধন-সম্পদ ও পরিবার- পরিজনের প্রতি দয়াশীল।' তিনি বললেন,
لَيْسَ بِذَلِكَ وَلَكِنْ مَا قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
'এটা নয়। বরং আল্লাহ যা বলেছেন— 'তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা তাওবা, ৯: ১২৮) [১৭০]
এই উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণি
[১১০২] বাকর ইবনু সাওয়াদাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
سَيَكُونُ نَشْوُ مِنْ أُمَّتِي يُولَدُونَ فِي النَّعِيمِ وَيَغْذُونَ بِهِ، هِمَّتُهُمْ أَلْوَانُ الطَّعَامِ وَأَلْوَانُ الغِيَابِ يَتَشَدَّقُونَ بِالْقَوْلِ أُولَبِكَ شِرَارُ أُمَّتِي
“অচিরেই আমার উম্মতের মধ্যে এমন একটা প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যারা আরাম-আয়েশের ভেতর জন্ম নেবে ও আরাম-আয়েশের ভেতরই প্রতিপালিত হবে। তাদের মূল ভাবনা হবে রং-বেরঙের খাবার-দাবার ও বিভিন্ন ধরনের কাপড়-চোপড়। তারা কথা বলবে আড়ম্বর-সহকারে। এরাই হলো আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণি।”[১৭১]
একটি মূল্যবান হাদীস
[১১০৩] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ مَنْ أَمِنَهُ النَّاسُ ، أَلَا إِنَّ الْمُهَاجِرَ مَنْ هَجَرَ السَّوْءَ، أَلَا إِنَّ الْمُسْلِمَ مَنْ سَلِمَ مِنْهُ جَارُهُ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ رَجُلٌ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَابِقَهُ
“প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে অন্য মুমিনরা নিরাপদ থাকে। শুনে রাখো, মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে পাপ পরিহার করে। প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার প্রতিবেশী তার থেকে নিরাপদ। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, সেই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অনিষ্টতা থেকে নিরাপদ নয়।”
একটি কথার জন্য সত্তর বছর জাহান্নামে অবস্থান
[১১০৪] হাসান থেকে বর্ণিত, আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
إِنَّ الرَّجُلَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ وَمَا يَدْرِى أَنَّهَا تَبْلُغُ حَيْثُ مَا بَلَغَتْ يَهْوِي بِهَا فِي النَّارِ سَبْعِينَ خَرِيفًا
"নিশ্চয়ই একজন ব্যক্তি কোনো কথা বলে এবং সে জানেও না যে তা যেখানে পৌঁছার সেখানে পৌঁছবে। (এমনও হতে পারে) এর কারণে সে সত্তর বছর জাহান্নামে অবস্থান করবে।" [১৭২]
নবিজি ঘরের কাজকর্ম করতেন
[১১০৫] ইবনু শিহাব থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের কাজকর্ম করতেন। অধিকাংশ সময় তিনি যা করতেন তা হলো, সেলাই।"
নবিজির কিছু বৈশিষ্ট্য
[১১০৬] হাসান থেকে বর্ণিত, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে দরজা লাগিয়ে রাখা হতো না। তার সামনে পর্দা টাঙিয়ে রাখা হতো না। সকাল-সন্ধ্যায় বড় পাত্রে তার কাছে খাবারও আনা হতো না। বরং যে আল্লাহর নবির সাক্ষাতে আসতেন, তিনি তার সাথে দেখা করতে বের হয়ে আসতেন। তিনি মাটিতে বসতেন। তার খাবারও মাটিতে রাখা হতো। তিনি মোটা কাপড় পরিধান করতেন। গাধার ওপর সওয়ার হতেন। বাহনের পেছনে নিজ গোলামকে বসাতেন। সে (অনেক সময় খাবারের পর) তার আঙুল চেটে দিত।”
কল্যাণের সুযোগ গ্রহণ করা
[১১০৭] হাকীম ইবনু উমায়ের থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ فُتِحَ لَهُ بَابٌ مِنَ الْخَيْرِ فَلْيَنْتَهِزْهُ فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي مَتَى يُغْلَقُ
“যার জন্য কল্যাণের দরজা খোলা হয়েছে, সে যেন সুযোগটি গ্রহণ করে। কারণ, তার জানা নেই কখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।”[১৭৩]
জ্ঞানী ব্যক্তির পরিচয়
[১১০৮] শাদ্দাদ ইবনু আওস থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
الْكَيْسُ مَنْ دَانَ نَفْسَهُ وَعَمِلَ لِمَا بَعْدَ الْمَوْتِ، وَالْعَاجِزُ مَنْ أَتْبَعَ نَفْسَهُ هَوَاهَا وَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
"জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে। আর নির্বোধ ও অকর্মণ্য সেই ব্যক্তি, যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল আশা করে।" [১৭৪]
দ্বমরাহ ইবনু হাবীব থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَوَّلُ شَيْءٍ يُرْفَعُ مِنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ الْأَمَانَةُ وَالْخُشُوعُ حَتَّى لَا تَكَادُ تَرَى خَاشِعًا
“এই উম্মতের থেকে সর্বপ্রথম যে জিনিসটি তুলে নেওয়া হবে তা হলো— আমানত ও আল্লাহর ভয়। অবস্থা এমন হবে যে, তুমি প্রায় আল্লাহকে ভয়কারী কোনো ব্যক্তিকে দেখবে না।”
মৃত্যুর স্মরণ না থাকলে অন্তর বিনষ্ট হয়ে যায়
[১১০৯] মালিক ইবনু মিগওয়াল থেকে বর্ণিত, “আমরা জানতে পেরেছি যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলো। তিনি তখন বললেন, 'সে মৃত্যুর কথা কেমন স্মরণ করে?' সাহাবিরা বলল, 'আমরা তাকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করতে শুনিনি বা সে মৃত্যুর কথা তেমন বেশি স্মরণ করে না।' তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'প্রবৃত্তির ইচ্ছাকে সে কতটুকু পরিহার করে?' সাহাবিরা বলল, 'সে দুনিয়াতে লিপ্ত।' তিনি বললেন, 'সে সেখানে তোমাদের সঙ্গী নয়।" [১৭৫]
বর্ণনাকারী বলেন, “রবী ইবনু আবী রাশেদকে বলা হলো, আপনি কি বসবেন না? তিনি বললেন, 'মৃত্যুর স্মরণ যখন এক মুহূর্তের জন্যও আমার থেকে সরে যায়, তখন আমার অন্তর বিনষ্ট হয়ে পড়ে।' মালিক বলেন, 'তার থেকে অধিক চিন্তাগ্রস্ত কাউকে আমি দেখিনি।”
নবিজির একটি দুআ
[১১১০] হাওশাব থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন এই বলে,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ دُنْيَا تَمْنَعُ خَيْرَ الْعَمَلِ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ حَيَاةٍ تَمْنَعُ خَيْرَ الْمَمَاتِ
“হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে এমন দুনিয়াবি বিষয় থেকে আশ্রয় চাই, যা উত্তম আমলের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এবং এমন জীবন থেকেও আশ্রয় চাই, যা উত্তম মৃত্যুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।”[১৭৬]
যিকরকারীদের পুরস্কার
[১১১১] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا جَلَسَ الْقَوْمُ يَذْكُرُونَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَالَ اللَّهُ لِمَلَا بِكَتِهِ: إِنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ فَجَلِلُوهُمْ بِالرَّحْمَةِ قَالَتِ الْمَلَائِكَةُ: يَا رَبَّنَا إِنَّ فِيهِمْ فُلَانًا قَالَ: هُمُ الْقَوْمُ لَا يَشْقَى بِهِمْ جَلِيسُهُمْ
“যখন মানুষেরা আল্লাহর যিকর করতে বসে, তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বলেন, 'আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। তাদের আমার রহমত দ্বারা মর্যাদাবান করো।' ফেরেশতারা বলে, 'হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তো অমুক ব্যক্তিও আছে।' তিনি বলেন, 'তারা এমন লোকজন, তাদের সাথে যে বসবে সে দুর্ভাগা হবে না।”[১৭৭]
হাজ্জাজ ইবনু আসওয়াদ বলেন, "হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা ক্ষুধার্ত হলে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নয় (স্ত্রীর) ঘরে খবর পাঠানো হলো। দেখা গেল কারও ঘরেই কোনো কাঁচা বা পাকা খেজুর নেই।"
নবিজি চালুনিকৃত আটার তৈরি রুটি খাননি
[১১১২] উরওয়া থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, “সেই সত্তার কসম, যিনি মুহাম্মাদকে সত্য নিয়ে পাঠিয়েছেন, তিনি প্রেরিত হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কখনো চালুনি দেখেননি ও চালুনিকৃত (আটার তৈরি) রুটি খাননি।”
উরওয়া বলেন, "আমি জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে আপনারা যব খেতেন?” তিনি বললেন, "আমরা (খাওয়ার সময়) বলতাম, উফ! উফ!"
নবিজির পরিবারের অবস্থা
[১১১৩] আবূ হুরাইরা একবার ইবনুল আখনাসের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তারা সারীদ ও ভুনা গোশত খাচ্ছিলেন। তারা বললেন, "হে আবূ হুরাইরা, বসুন।" তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "আপনারা কী খাচ্ছেন?” তারা বলল, “আমরা সারীদ ও ভুনা গোশত খাচ্ছি।” তিনি বললেন, "তোমরা আবুল কাসীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর (মৃত্যুর) পর খাবার-দাবারে মগ্ন হয়ে গেছ।” তারপর তিনি কেঁদে বললেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবারের মাসের পর মাস কেটে যেত, কিন্তু কারও ঘরেই চুলা জ্বলত না। রুটি বানানো হতো না। রান্না হতো না।” তারা জানতে চাইল, “কী দিয়ে তারা জীবনধারণ করতেন?” তিনি বললেন, “পানি ও খেজুর দিয়ে। তার কিছু আনসারি প্রতিবেশী ছিল-আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন-তাদের কিছু দুগ্ধবতী পশু ছিল, তারা সেসব পশুর দুধ তাদের জন্য পাঠাতেন।”
তিনটা জিনিসের হিসাব হবে না
[১১১৪] হাসান বলেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ثَلَاثُ لَيْسَ عَلَى ابْنِ آدَمَ فِيهَا حِسَابٌ : ثَوْبٌ يُوَارِي بِهِ عَوْرَتَهُ وَطَعَامُ يُقِيمُ صُلْبَهُ وَبَيْتُ يَكِتُهُ فَمَا كَانَ فَوْقَ ذَلِكَ فَعَلَيْهِ فِيهِ حِسَابٌ
"বানী আদমের তিনটা জিনিসের হিসাব হবে না। এমন কাপড়, যা দ্বারা সে লজ্জা নিবারণ করত। এমন খাবার, যা দ্বারা সে মেরুদণ্ড সোজা রাখত। এমন ঘর, যাতে সে আশ্রয় নিত। এর বাইরে অতিরিক্ত যা আছে, সেগুলোর হিসাব হবে।" হবে।" [১৭৮]
বান্দার কল্যাণ বা অকল্যাণ
[১১১৫] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِ خَيْرًا كَفَّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ، وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ شَرًّا بَثَّ عَلَيْهِ ضَيْعَتَهُ وَجَعَلَ فَاقَتَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ
"যখন আল্লাহ কোনো বান্দার কল্যাণ চান তখন তাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেন। তার অন্তরে প্রাচুর্যকে ঢেলে দেন। আর যখন কোনো বান্দার অকল্যাণ চান, তখন তাকে ধ্বংসে নিপতিত করেন এবং দারিদ্র্যকে তার সম্মুখে এনে দেন।" [১৭৯]
জান্নাতবাসীর সংবাদ
[১১১৬] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَهْلِ الْجَنَّةِ
"আমি কি তোমাদের জান্নাতবাসীর সংবাদ দেবো না?" তারা বলল, "অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসূল।” তিনি বললেন,
كُلُّ ضَعِيفٍ مُسْتَضْعَفٍ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ
“প্রত্যেক দুর্বল, নিপীড়িত, দু-খানা পুরাতন কাপড় পরিহিত এমন ব্যক্তি- যার প্রতি লোকেরা দৃষ্টিপাত করে না-অথচ সে আল্লাহর নামে শপথ করে ওয়াদা করলে, তিনি তা সত্যে পরিণত করেন।”[১৮০]
জান্নাতের দরজায় দুজন মুমিনের সাক্ষাৎ
[১১১৭] ইবনু আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
الْتَقَى مُؤْمِنَانِ عَلَى بَابِ الْجَنَّةِ مُؤْمِنٌ غَنِيٌّ وَمُؤْمِنُ فَقِيرُ كَانَا فِي الدُّنْيَا فَأُدْخِلَ الْفَقِيرُ الْجَنَّةَ وَحُبِسَ الْغَنِيُّ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يُحْبَسَ ثُمَّ أُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَلَقِيَهُ الْفَقِيرُ فَقَالَ : يَا أَخِي مَاذَا حَبَسَكَ؟ وَاللَّهِ لَقَدْ احْتُبِسْتَ حَتَّى خِفْتُ عَلَيْكَ، فَيَقُولُ : أَيْ أَخِي إِنِّي حُبِسْتُ بَعْدَكَ مَحْبِسًا قَطِيعًا كَرِيهًا مَا وَصَلْتُ إِلَيْكَ حَتَّى سَالَ مِنِّي الْعَرَقُ مَا لَوْ وَرَدَ أَلْفُ بَعِيرٍ كُلُّهَا آكِلَةُ حَمْضٍ لَصَدَرَتْ عَنْهَا رِوَاءٌ
“দুজন মুমিনের জান্নাতের দরজায় দেখা হবে। তাদের একজন দুনিয়াতে ধনী ছিল অন্যজন ছিল দরিদ্র। দরিদ্র ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, আর ধনী ব্যক্তিকে-আল্লাহর যতদিন ইচ্ছা আটকে রেখে-তারপর জান্নাতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে। দরিদ্র ব্যক্তির সাথে তার সাক্ষাৎ হলে সে জিজ্ঞেস করবে, 'হে ভাই, কেন তোমাকে আটকে রাখা হলো? আল্লাহর কসম, তোমাকে আটকে রাখা হলে আমি তোমার ব্যাপারে আশঙ্কা করেছিলাম।' তখন ধনী লোকটি বলবে, 'ভাই! তোমার পর আমাকে নির্দয় ও নিন্দনীয়ভাবে আটকে রাখা হয়েছিল; তোমার এখানে আসতে আসতে আমার শরীর থেকে এত বেশি ঘাম ঝরেছে-যা এক হাজার তৃষ্ণার্ত উটের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য যথেষ্ট!'” [১৮১]
একজন জান্নাতির বর্ণনা
[১১১৮] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الْعَبْدَ لَيُذْنِبُ الذَّنْبَ فَيُدْخِلُهُ اللَّهُ بِهِ الْجَنَّةَ
"এমনও হবে যে, বান্দা অপরাধ করবে আর আল্লাহ তাআলা এর কারণেই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, কীভাবে তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন?” তিনি বললেন,
يَكُونُ نُصْبَ عَيْنِهِ فَارًا تَابِبًا حَتَّى يُدْخِلَهُ ذَنْبُهُ الْجَنَّةَ
“সে তার চোখের সামনে দিয়ে (প্রচণ্ড ভয়ে) তাওবা করতে করতে পলায়ন করবে। অবশেষে তার অপরাধই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।”[১৮২]
আকাশের গর্জনে নবিজির ভীত হওয়া
[১১২৯] সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব বলেন, "আকাশের গর্জন শুনলেই রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেহারায় (ভয়ের ভাব) পরিলক্ষিত হতো। অবশেষে যখন বৃষ্টি হতো তখন তার থেকে (ভয়ের ভাবটি) কেটে যেত। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনার চেহারায় আমরা যা দেখলাম (ভীতিকর অবস্থা) তা কী?' তিনি বললেন,
إِنِّي لَا أَدْرِي أُمِرْتُ بِرَحْمَةٍ أَوْ بِعَذَابٍ
'আমি জানি না, আযাবের আদেশ করা হয়েছে নাকি রহমতের (ফলে আযাবের আশঙ্কায় তার চেহারায় ভীতির ছাপ ছড়িয়ে পড়ত)।” [১৮৩]
সবচেয়ে বেশি বিপদে আক্রান্ত হন নবিগণ
[১১২০] উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। আমি তার কাপড়ের ওপর হাত রাখলাম। তো কাপড়ের ওপর দিয়েই জ্বরের উষ্ণতা টের পেয়ে বললাম, হে আল্লাহর নবি, আমি আপনার মতো এমন মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হতে কাউকে দেখিনি। তিনি বললেন,
كَذَلِكَ يُضَاعَفُ لَنَا الْأَجْرُ، إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ بَلَاءً الْأَنْبِيَاءُ ثُمَّ الصَّالِحُونَ وَإِنْ كَانَ مِنَ الْأَنْبِيَاءِ لَمَنْ يُبْتَلَى بِالْفَقْرِ حَتَّى يَتَدَرَّعَ بِالْعَبَاءَةِ مِنَ الْفَقْرِ، وَإِنْ كَانَ مِنْهُمْ مَنْ يُسَلَّطُ عَلَيْهِ الْقَمْلُ حَتَّى يَقْتُلَهُ
'এভাবেই আমাদের অতিরিক্ত নেকি দেওয়া হয়। সবচেয়ে বেশি বিপদে আক্রান্ত হন নবিগণ। তারপর সৎলোকেরা। নবিদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও থাকেন যিনি দরিদ্রতায় আক্রান্ত হয়ে অবশেষে দরিদ্রতার পোশাক পরিধান করেন। তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছেন, যার ওপর উকুন চাপিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে তা তাকে মেরেই ফেলে।'” [১৮৪]
জাহান্নামের ভয়ে মৃত্যুবরণ করা
[১১২১] মুহাম্মাদ ইবনু মুতাররিফ বলেন, “আমাকে একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বলেছেন যে, একজন আনসারি যুবকের অন্তরে জাহান্নামের ভয় ঢুকে গেলে সে ঘরে বসে পড়ল। তখন নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছে আগমন করলেন। সে দাঁড়িয়ে গেল এবং নবিজির সাথে কোলাকুলি করল। সে এমনভাবে হিক্কা তুলে কান্না করল যে, তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। তখন নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
جَهَرُوا صَاحِبَكُمْ فَلَذَ خَوْفُ النَّارِ كَبِدَهُ 'তোমার সঙ্গীর কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করো। জাহান্নামের ভয় তার অন্তরকে বিদীর্ণ করে ফেলেছে।'” [১৮৫]
যে দুই গুণের কারণে মানুষ জান্নাতে যাবে
[১১২২] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
أَكْثَرُ مَا يَلِجُ بِهِ الْإِنْسَانُ النَّارَ الْأَجْوَفَانِ: الْفَرْجُ وَالْفَمُ، وَأَكْثَرُ مَا يَلِجُ بِهِ الْإِنْسَانُ الْجَنَّةَ: تَقْوَى اللَّهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ “অধিকাংশ মানুষ যার কারণে জান্নাতে যাবে, তা দুই ধরনের জিনিস- আল্লাহর ভয় ও সচ্চরিত্র।”[১৮৬]
সর্বশ্রেষ্ঠ মুমিনের পরিচয়
[১১২৩] আসাদ ইবনু ওয়াদাআ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন মুমিন সর্বশ্রেষ্ঠ?” তিনি বললেন,
مُؤْمِنٌ مَغْمُومُ الْقَلْبِ لَيْسَ فِيهِ غِلٌّ وَلَا حَسَدٌ “এমন মুমিন, যার অন্তর চিন্তাযুক্ত। তাতে কোনো ধোঁকা বা হিংসা নেই।”
সাহাবিরা বললেন, “আমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে বলে আমরা জানি না। এরপর মুমিনদের মধ্যে কে উত্তম?”
তিনি বললেন,
الْمُؤْمِنُ الزَّاهِدُ فِي الدُّنْيَا الرَّاغِبُ فِي الْآخِرَةِ
“এমন মুমিন, যে দুনিয়ার হতে বিমুখ ও আখিরাতের প্রতি আগ্রহী।”
এরপর সাহাবিগণ জানতে চাইলেন, “হে আল্লাহর নবি, রাফি ইবনু খাদীজ ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কেউ এমন আছে বলে আমরা জানি না। এরপরে কোন মুমিন শ্রেষ্ঠ?”
তিনি বললেন,
مُؤْمِنُ حَسَنُ الْخُلُقِ
“এমন মুমিন, যার চরিত্র সুন্দর।” [১৮৭]
আমল কাউকে মুক্তি দেবে না
[১১২৪] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ أَحَدًا مِنْكُمْ لَا يُنْجِيهُ عَمَلُهُ
“তোমাদের মধ্য থেকে কাউকেই তার আমল মুক্তি দেবে না।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করল, “আপনাকেও না, হে আল্লাহর রাসূল?”
তিনি বললেন,
وَلَا أَنَا إِلَّا أَنْ يَتَغَمَّدَنِي اللهُ بِرَحْمَتِهِ وَلَكِنْ اغْدُوا وَرُوحُوا وَشَيْئًا مِنَ الدُّلْجَةِ، الْقَصْدَ الْقَصْدَ تَبْلُغُونَ
“আমাকেও না। তবে আল্লাহ তাআলা আমাকে তার রহমতের দ্বারা আবৃত করে রাখবেন। তোমরা সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশ (ইবাদাতের ভেতর) অতিবাহিত করো। তাহলেই তোমরা কাঙ্ক্ষিত মানযিলে পৌঁছতে পারবে।”[১৮৮]
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তার জন্য আমলের সুযোগ করে দেন
[১১২৫] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدٍ خَيْرًا اسْتَعْمَلَهُ
"যখন আল্লাহ তাআলা কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে আমলের সুযোগ করে দেন।"
সাহাবিরা জানতে চাইল, “হে আল্লাহর রাসূল, কীভাবে আমলের সুযোগ করে দেন?"
তিনি বললেন,
يُوَفِّقُهُ لِعَمَلٍ صَالِحٍ قَبْلَ مَوْتِهِ ثُمَّ يَقْبِضُهُ عَلَيْهِ
"তাকে মৃত্যুর পূর্বে ভালো কাজ করার তাওফীক দেন। অতঃপর সেই অবস্থাতেই তাকে মৃত্যু দেন।"[১৮৯]
শ্রেষ্ঠ হওয়ার মাপকাঠি হলো তাকওয়া
[১১২৬] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একজন শ্রেষ্ঠ সাহাবি অন্য আরেকজনকে তার মায়ের কথা বলে মন্দ কিছু বলল। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা শুনলেন। তিনি তখন বললেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا أَنْتَ بِأَفْضَلَ مِمَّنْ تَرَى مِنْ أَحْمَرَ وَلَا أَسْوَدَ إِلَّا أَنْ تَفْضُلَهُمْ بِالتَّقْوَى
“সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তুমি যে লাল বা কালো (মানুষদের) দেখছ তাদের কারও থেকে তুমি উত্তম নও। তোমাদের শ্রেষ্ঠ হওয়া নির্ধারণ হবে তাকওয়ার মাধ্যমে।"[১৯০]
আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য
[১১২৭] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا تَعْدِلُ الدُّنْيَا عِنْدَ اللَّهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى جَدْيًا مِنَ الْغَنَمِ
“সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আল্লাহর কাছে দুনিয়ার মূল্য একটা ছাগলছানার সমপরিমাণও নয়।” [১৯১]
অধিক সম্পদ প্রকৃত প্রাচুর্য নয়
[১১২৮] আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিত, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তিনি বলেন,
لَيْسَ الْغِنَى عَنْ كَثْرَةِ الْعَرَضِ إِنَّمَا الْغِنَى غِنَى النَّفْسِ
“অধিক সম্পদ প্রকৃত প্রাচুর্য নয়। প্রকৃত প্রাচুর্য হলো অন্তরের প্রাচুর্য।”[১৯২]
হালাল বস্তু ভক্ষণের গুরুত্ব
[১১২৯] শাদ্দাদ ইবনু আউসের বোন উম্মে আবদুল্লাহ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে ইফতারের সময় এক বাটি দুধ পাঠালেন। তখন ছিল লম্বা দিন ও প্রচণ্ড গরমের সময়। যাকে দিয়ে তিনি তা পাঠালেন তাকে নবিজি ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইলেন—সে এই দুধ কোথায় পেয়েছে? তিনি জানালেন, “আমার একটা বকরির দুধ এটি।” তাকে নবিজি আবার ফিরিয়ে দিলেন জিজ্ঞেস করতে, “এই বকরি সে কোথায় পেয়েছে?” তিনি জানালেন, “আমি নিজ সম্পদ দিয়ে তা ক্রয় করেছি।” তখন তিনি তা পান করলেন। পরবর্তী দিন উম্মু আবদুল্লাহ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, লম্বা দিন আর প্রচণ্ড গরমের কারণে সহানুভূতিশীল হয়ে আমি আপনার কাছে ওই দুধটুকু পাঠিয়েছিলাম।” তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
أُمِرَتِ الرُّسُلُ قَبْلِي أَنْ لَا تَأْكُلَ إِلَّا طَيِّبًا وَلَا تَعْمَلَ إِلَّا صَالِحًا
“আমার পূর্ববর্তী রাসূলদের আদেশ করা হয়েছিল, যেন তারা কেবলই হালাল বস্তু ভক্ষণ করে এবং শুধু সৎ কাজই করে।”[১৯৩]
দুনিয়ার নিআমাত
[১১৩০] মাইমুন বলেন, “দুনিয়ার নিআমাতের মধ্যে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেবল স্ত্রী ও হালাল বস্তুই পেয়েছিলেন।”
উত্তম আমল
[১১৩১] হাসান থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন আমলটি উত্তম?” তিনি বললেন,
تَمُوتُ يَوْمَ تَمُوتُ وَلِسَانُكَ رَطْبُ مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ “যেদিন তুমি মারা যাবে, সেদিন এমনভাবে মারা যাবে যে, তোমার জিহ্বা আল্লাহর যিকরের দ্বারা সতেজ থাকে।” [১৯৪]
মানুষ দুনিয়া থেকে দূরে সরবে না
[১১৩২] আতা ইবনু ইয়াসার রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,
أَتَتْنِي الدُّنْيَا خَضِرَةً حُلْوَةً وَرَفَعَتْ رَأْسَهَا وَتَزَيَّنَتْ لِي فَقُلْتُ: إِنِّي لَا أُرِيدُكِ فَقَالَتْ: إِنْ انْفَلَتَ مِنِّي لَمْ يَنْفَلِتْ مِنِّي غَيْرُكَ
“দুনিয়া আমার কাছে সবুজাভ ও মিষ্ট হয়ে আগমন করেছে। সে তার মাথা উঁচু করেছে ও আমার জন্য সুসজ্জিত হয়েছে। তখন আমি তাকে বললাম, 'আমি তো তোমাকে চাই না।' সে বলল, 'যদি আপনি আমার থেকে দূরেও সরেন, অন্যরা কিন্তু দূরে সরবে না।'” [১৯৫]
দুনিয়ার ভোগ-বিলাস কাফিরদের জন্য
[১১৩৩] হাসান ইবনু মালিক বলেন, “আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এলাম। তখন তিনি দড়ি দিয়ে বাঁধা বালির বস্তার খাটের ওপর শুয়ে ছিলেন। তার মাথার নিচে একটা চামড়ার বালিশ। যার ভেতরে শুকনো ঘাস ভরা ছিল। তখন তার কাছে আরও একাধিক সাহাবি এলেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু আগমন করলে তিনি একটু সরে গেলেন। তখন তিনি নবিজির দু-পাশে ও রশির মাঝে কোনো কাপড় না থাকায় পার্শ্বদেশে দড়ির দাগ পড়ে গেছে দেখতে পেলেন। এতে করে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু অশ্রুসজল হলেন। তখন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, 'হে উমার, তুমি কাঁদছ কেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম-আমি কাঁদছি কারণ হলো-আমি খুব ভালো করে জানি যে, আপনি আল্লাহর কাছে পারস্য ও রোম সম্রাটের থেকেও বেশি সম্মানিত। অথচ তারা দুনিয়াতে (আরাম-আয়েশে) যেভাবে জীবন কাটানোর কাটাচ্ছে। আর আপনি আল্লাহর রাসূল হয়েও যে অবস্থায় (দুঃখ-কষ্টে) জীবন কাটাচ্ছেন, তা তো আমি দেখলামই।' রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া হবে আর আমাদের জন্য হবে জান্নাত?' তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বিষয়টি তেমনই।”[১৯৬]
জাহান্নামের সবচেয়ে হালকা শাস্তি
[১১৩৪] নুমান ইবনু বাশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ أَهْوَنَ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا مَنْ لَهُ نَعْلَانِ وَشِرَاكَانِ مِنْ نَارٍ يَغْلِي مِنْهُمَا دِمَاغُهُ كَمَا يَغْلِي الْمِرْجَلُ، مَا يَرَى أَنَّ أَحَدًا أَشَدُّ عَذَابًا مِنْهُ وَإِنَّهُ لَأَهْوَنُهُمْ عَذَابًا
“নিশ্চয়ই জাহান্নামের সবচেয়ে হালকা শাস্তি যার হবে, তার জন্য দুইটি আগুনের জুতা ও ফিতা থাকবে। সেগুলোর প্রভাবে তার মগজ (গরমে গলে) টগবগ করতে থাকবে, যেভাবে ডেগচি টগবগ করে থাকে। সে মনে করবে, তার চেয়ে বেশি কঠিন শাস্তি আর কারও হচ্ছে না। অথচ তার শাস্তিটা হলো সবচেয়ে হালকা।” [১৯৭]
দুনিয়ার ভোগ-বিলাস অপছন্দ করা
[১১৩৫] হাসান থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গোশত মাথায় হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে এল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কী?' সে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহর বরকত।' তিনি বললেন, 'তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তা আল্লাহর আযাব।' তারপর তিনি বললেন, 'হায় আফসোস! হায় আফসোস!”
কুরআন পড়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা
[১১৩৬] হাসান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তোমরা কুরআন পড়ো এবং এর মাধ্যমে সেসব লোকদের আগেই আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। যারা এটি পড়ে, তার মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রার্থনা করবে।”
দুনিয়াবিমুখ ও আখিরাত প্রত্যাশী মানুষের খোঁজ
[১১৩৭] মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কেউ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় দুনিয়াবিমুখ ও আখিরাত প্রত্যাশী মানুষেরা?” তিনি তখন বললেন, "আমি তোমাকে তাদের খোঁজ দিতে পারব না।"
আসেম বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার এক ব্যক্তিকে এমন কথা বলতে শুনে তার হাত ধরে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবূ বাকর ও উমারের কবরের কাছে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, তাদের কথাই তুমি জানতে চাচ্ছ।”
কবর মানুষের বাড়ি
[১১৩৮] হাসান থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু আবুল আস সাকাফি কোনো এক জানাযাতে অবস্থানকালে একটি বিধ্বস্ত কবরের পাশে গিয়ে বসলেন। সেখানে ওই কবরস্থ ব্যক্তির পরিবারের একজনও ছিল। তিনি বললেন, “হে অমুক।” সে ব্যক্তি তার কাছে আসার পর তিনি বললেন, “সেখানে যাও।” সে বলল, “এটা তো একটা সংকীর্ণ, শুষ্ক ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর। সেখানে কোনো খাবার-পানীয় বা স্ত্রীজন নেই।” (এই কথা শুনে) তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম, এটা তোমার বাড়ি।” সে ব্যক্তি বলল, 'আপনি সত্য বলেছেন। তবে শপথ আল্লাহর! আমি এ কবরের কাছে আরেকবার এলে, সেখান থেকে [১৯৮] জিনিসপত্র এখানে নিয়ে আসব।' (তিনি বললেন) 'এমনটি কোরো না' [১৯৯]। [২০০]
সর্বাগ্রে যারা আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে
[১১৩৯] কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أَتَدْرُونَ مَنِ السَّابِقُونَ إِلَى ظِلِّ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
"তোমরা কি জানো কারা সর্বাগ্রে আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া পাবে?”
সাহাবিরা বলল, “আল্লাহ ও তার রাসূলই সর্বাধিক জ্ঞাত।” তিনি বললেন,
الَّذِينَ إِذَا أُعْطُوا الْحَقَّ قَبِلُوهُ وَإِذَا سُبِلُوهُ بَذَلُوهُ وَحَكَمُوا لِلنَّاسِ كَحُكْمِهِمْ لِأَنْفُسِهِمْ
“যাদের অধিকার দেওয়া হলে, গ্রহণ করে নিত। যখন তা চাওয়া হতো, দান করে দিত। এবং মানুষের জন্য যেমন ফায়সালা করত, নিজেদের জন্যও তেমনটিই করত।” [২০১]
দুনিয়াতে যেমন কর্ম আখিরাতে তেমন ফল হবে
[১১৪০] আবূ উসমান আন-নাহদি থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
أَهْلُ الْمَعْرُوفِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمَعْرُوفِ فِي الْآخِرَةِ وَإِنَّ أَهْلَ الْمُنْكَرِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمُنْكَرِ فِي الْآخِرَةِ
“দুনিয়াতে যারা সৎকর্মশীল তারা আখিরাতেও সৎকর্মশীল। আর দুনিয়াতে যারা অসৎকর্মশীল আখিরাতেও তারা অসৎকর্মশীল।”[২০২]
সমাপ্ত
টিকাঃ
[১৬৭] সূরা হিজর, ১৫: ৯৮-৯৯
[১৬৮] অর্থাৎ যত বেশি ইবাদাত তার পক্ষে করা সম্ভব তিনি তা করেন, তার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই আর।-অনুবাদক
[১৬৯] যঈফ। সিলসিলা যঈফা: ২১১৯
[১৭০] যঈফ। সিলসিলা যঈফা: ২৫১৮
[১৭১] সনদ মুরসাল। তবে এর অর্থ অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (মুসনাদ আহমাদ: ৬/২১; ইবনু মাজাহ: ৩৯৩৪)
[১৭২] সনদ যঈফ। তবে এটি সাহাবি আবু হুরাইরা থেকে একাধিক সনদে সহীহভাবে প্রমাণিত। (মুসনাদ আহমদ: ২/৩৭৮; সহীহ মুসলিম: ৮/২২৩)
[১৭৩] সনদ মুরসাল।
[১৭৪] যঈফ। তিরমিযি: ২৪৫৯; ইবনু মাজাহ: ৪২৬০
[১৭৫] যঈফ। মুসান্নাফ ইবনু আবী শাইবা: ৩৪৩২৮
[১৭৬] যঈফ।
[১৭৭] সনদ মুরসাল। তবে এই অর্থে বুখারি-মুসলিমে সহীহ হাদীস রয়েছে।
[১৭৮] সনদ মুরসাল।
[১৭৯] সনদ মুরসাল।
[১৮০] সনদ মুরসাল। তবে মুত্তাসিল সনদে সাহাবি আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে যঈফ সূত্রে এর অনুরূপ বর্ণিত আছে। (মাজমাউয যাওয়াইদ: ১০/২৬৫)
[১৮১] যঈফ। মাজমাউয যাওয়াইদ: ১০/২৬৩
[১৮২] মুরসাল। যঈফুল জামি: ১৫০৩; সিলসিলা যঈফা: ২০৩১
[১৮৩] মুরসাল।
[১৮৪] আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন ইবনু মাজাহ : ৪২৪; হাকিম : ৪/৩০। (দেখুন, সিলসিলা সহীহাহ: ১৪৪)
[১৮৫] যঈফ। তাখরীজুল ইহইয়া: ৪/ ১৮৫
[১৮৬] যঈফ। মুসনাদ আহমাদ: ২/২৬১; ইবনু মাজাহ: ৪২৪৬
[১৮৭] যঈফ। এর সনদে ফারজ ইবনু ফুদালাহ রয়েছেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের দৃষ্টিতে তিনি যঈফ.
[১৮৮] সহীহ। বুখারি: ৬৪৬৩; মুসলিম: ৬৯৭৩
[১৮৯] সনদ সহীহ। মুসনাদ আহমাদ: ১২,০৩৬
[১৯০] সনদ যঈফ।
[১৯১] সনদ মুরসাল।
[১৯২] সহীহ। বুখারি: ৬৪৪৬; মুসলিম: ২৩৮২
[১৯৩] সনদ হাসান। মুস্তাদরাক হাকিম: ৪/১২৫; এর সমর্থনে বেশ কিছু সহীহ হাদীসও রয়েছে।
[১৯৪] যঈফ। আয-যুহদ, ইবনুল মুবারক: ১১৪১
[১৯৫] মুরসাল।
[১৯৬] সনদ সহীহ। মুসনাদ আহমাদ : ১২,৩৫৭; বুখারি: ২৪৬৮; মুসলিম : ১৪৭৯
[১৯৭] সহীহ। মুসনাদ আহমাদ: ৫৯৪২; বুখারি: ১১৫৬২
[১৯৮] অর্থাৎ বর্তমান বাড়ি থেকে।
[১৯৯] অর্থাৎ এমনটি না করে, বরং নেক আমলের মাধ্যমে কবরকে সুখকর বানানোর চেষ্টা করো.
[২০০] দ্রষ্টব্য: ইবনু রজব, আহওয়ালুল কুবুর, পৃ. ২২৩
[২০১] যঈফ। মুসনাদ আহমাদ: ২৪৩৭৯; যঈফুল জামি: ১০১
[২০২] সহীহ。