📄 আসেম ইবনু হুরাইরা রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
আযান শেষের পঠিত বাক্য
[৮৮০] ফুজাইল ইবনু আবী রুফাইদা বলেন, "আসেম ইবনু হুবাইরা রাহিমাহুল্লাহ— তিনি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শাগরেদ ছিলেন— আমাকে বললেন, 'যখন তুমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে আযান থেকে ফারেগ হবে তখন বোলো, আমিও মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত'।”
তবলা ভাঙতে চাইলেন
[৮৮১] মুগীরা বলেন, “আসেম ইবনু হুবাইরা একটি তবলা বা দফ দেখলেন। সেটা তার মালিকের কাছ থেকে নিয়ে তা ফুটো করে দিতে চাইলেন। কিন্তু সক্ষম হলেন না। তিনি বললেন, 'শয়তান আমাকে এতটা ক্লান্ত করেনি যতটা ক্লান্ত করেছে এটি (দফটি)।”
মানুষের জাহান্নাম থেকে উত্তরণ
[৮৮২] আবূ মায়সারা বলেন, “আসিম তার বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তখন তিনি বললেন, 'আমার মা যদি আমাকে জন্ম না দিত!' তখন তার স্ত্রী তাকে বলল, 'আল্লাহ তাআলা কি আপনাকে ইসলামের পথে পরিচালিত করেননি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, কিন্তু আমাদের জানানো হয়েছে যে, আমরা জাহান্নামে উপনীত হব। কিন্তু সেখান থেকে যে আমাদের উত্তরণ হবে, তা জানানো হয়নি'।”
রাতের নফল সালাত গোপনে আদায় করা
[৮৮৩] আমাশ বলেছেন, “আবদুর রহমান ইবনু আবী লাইলা সালাত আদায় করতেন। যখন কোনো প্রবেশকারী প্রবেশ করত, তখন তিনি আপন বিছানায় ঘুমিয়ে পড়তেন।”
লোক দেখানো তিলাওয়াত কোনো কাজে আসবে না
[৮৮৪] আবূ বাকর বর্ণনা করেছেন, আসেম বলেছেন, “আমাকে আবূ ওয়ায়েল জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি জানো, আমাদের যুগের কারিদের আমি কীসের সাথে তুলনা করি?' আমি বললাম, 'কীসের সাথে?' তিনি জানালেন, 'আমি তাদের এমন ব্যক্তির সাথে তুলনা করি, যে তার বকরিকে পুষ্ট করে। তারপর যখন তাকে যবেহ করে, তখন তাকে অপরিশোধিত আবর্জনারূপে দেখতে পায়। অথবা এমন লোকের সঙ্গে তুলনা করি, যে রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে তা পারদের মধ্যে নিক্ষেপ করে। এরপর তা বের করে এনে ভেঙে দেখে তা তামায় পরিণত হয়ে গেছে।” [১৩৪]
চুলের জায়গা থেকেও মৃত্যু আসবে
[৮৮৫] ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِنْ كُلِّ مَكَانٍ “সর্বদিক থেকে মৃত্যু তার কাছে আসবে।”[১৩৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “এমনকি চুলের জায়গা থেকেও।”
একটি দুআ
[৮৮৬] ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ দুআ করতেন এই বলে, “হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তোমার কিতাব ও তোমার নবি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে রক্ষা করো সত্য বিষয়ে মতপার্থক্য থেকে, তোমার পক্ষ থেকে আসা হিদায়াত ছাড়া প্রবৃত্তির অনুসরণ করা থেকে, ভ্রষ্টতার পথ থেকে, সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকে, বক্রতা-সংশয় ও বিবাদ থেকে।"
সঠিক কথা বলা
[৮৮৭] আকতাল বলেন, “আমি ইবরাহীম নাখঈকে বলতে শুনেছি, ইবরাহীম তাইমির মতো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সঠিক বলার লোক আর নেই। আমি আশা করি, তিনি নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন।”
ক্রোধদমনকারী ও ধৈর্যশীল হবার পুরস্কার
[৮৮৮] আওয়াম হাওশাব থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "স্বপ্নে দেখলাম আমি যেন একটা নদীর ধারে আসলাম। আমাকে বলা হলো- ক্রোধদমনকারী ও ধৈর্যশীল হবার কারণে তুমি যা ইচ্ছা নিজে (এখান থেকে) পান করো ও অন্যকে পান করাও।"
তিনি মুক্তির আশা করতেন
[৮৮৯] ফিরাস আল-মুকতিব আবু ইসহাককে বলেছেন, “আমি শাবিকে বলতে শুনেছি, আশা করি, আমি সামান্য বিষয়ের কারণে মুক্তি পাব।”
দুনিয়াবি কথাকে অপছন্দ করা
[৮৯০] মালিক ইবনু আবী ফারওয়া বলেন, “আমরা আবদুল্লাহ ইবনু আবী হুযাইলের মজলিসে বসতাম। যদি কোনো মানুষ এসে দুনিয়াবি কথাবার্তা বলতে থাকত, তখন তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহর বান্দা, আমরা তো এসবের জন্য বসিনি'।”
গুনাহের প্রতি অসন্তোষ
[৮৯১] আবূ সিনান বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু আবিল হুযাইল একবার তার গুনাহের অভিযোগ করলেন। তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'হে আবুল মুগীরা, তুমি কি মুত্তাকী নও?' তারপর সে বলল, 'হে আল্লাহ, তোমার এই বান্দা তোমার নৈকট্য অর্জন করতে চায়। নিশ্চয়ই আমি (গুনাহের প্রতি) তার অসন্তোষের সাক্ষ্য দিচ্ছি'।”
মালাকুল মাওত ফেরেশতার অপেক্ষা
[৮৯২] ইমরান বলেন, “আমি ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে তাকে দেখার জন্য আসলাম। তিনি কেঁদে দিলেন। আমি তাকে বললাম, হে আবূ ইমরান, কিসে তোমাকে কাঁদাল? তিনি বললেন, 'আমি মালাকুল মাওত ফেরেশতার অপেক্ষা করছি। অথচ আমার জানা নেই, তিনি আমাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবেন না জাহান্নামের দুঃসংবাদ'।”
নফল ইবাদাত গোপনে করা
[৮৯৩] আমাশ বলেন, “আমি ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তিনি তখন কুরআন পড়ছিলেন। এক ব্যক্তি তার কাছে আসার অনুমতি চাইলে তিনি কুরআনটা ঢেকে নিলেন। তারপর বললেন, 'এই ব্যক্তি যেন আমাকে সর্বক্ষণ তা পড়তে না দেখে (তাই কুরআনটা ঢেকে নিয়েছি)'।”
সাহাবিদের পরিপূর্ণ অনুসরণ
[৮৯৪] আমাশ থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমি এমন লোকদের পেয়েছি—যদি আমি জানতে পারি যে, তাদের কেউ ওজু করেছে শুধু নখের ওপর— তবুও আমি এর ব্যতিক্রম করব না।”[১৩৬]
কারও জানাযা পড়ার পর ব্যথিত থাকা
[৮৯৫] মুহাম্মাদ ইবনু সুকাহ থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম বলেছেন, "তাদের (সাহাবিদের) মধ্যে কারও জানাযা হলে কয়েক দিন যাবৎ তারা ব্যথিত হয়ে থাকতেন, যার প্রভাব তাদের ভেতর দেখা যেত।”
জানাযায় উপস্থিত হওয়া
[৮৯৬] আমাশ বলেন, “আমরা জানাযায় এমন অবস্থায় উপস্থিত হতাম যে, আমাদের জানা থাকত না আমাদের মধ্যে কে লোকদের দুঃখে শোক প্রকাশ করবে।”
আল্লাহকে ভয় করা
[৮৯৭] ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ “যে তার প্রভুর সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করবে তার জন্য রয়েছে দুই জান্নাত।”[১৩৭] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবরাহীম বলেছেন, "সে যখন গুনাহের দিকে ধাবিত হয়, তখন আল্লাহর ভয়ে বিরত থাকে।”
নিজেকে জ্ঞানী বলে পরিচিত করাতে অনাগ্রহ
[৮৯৮] মানসূর থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম বলেছেন, "আমাকে এমন জিনিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, যার ব্যাপারে আমি জানি। (প্রভুত্তরে) 'আল্লাহই অধিক অবগত'- এমনটা বলে দেওয়া থেকে আমাকে বাধা দেয় কেবল এই বিষয়টি যে—লোকেরা আমাকে বড় জ্ঞানী মনে করে বসতে পারে।"
জান্নাত নয়তো জাহান্নাম
[৮৯৯] মুহাম্মাদ ইবনু সুকাহ বলেন, “ইবরাহীম নাখঈ বলতেন, 'আমরা যখন কোনো জানাযায় উপস্থিত হই অথবা মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে শুনি, তখন কিছুদিন তা (মৃত্যুর আলোচনা) আমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকে। কারণ, আমরা জানি যে, সেই ব্যক্তির ওপর এমন বিষয় আপতিত হয়েছে, যা তাকে হয়তো জান্নাতে নয়তো জাহান্নামে পৌঁছে দেবে।' তিনি আরও বলেন, 'তোমরা তো জানাযায় দুনিয়াবি কথাবার্তায় লিপ্ত থাকো।”
কারও সাথে প্রতারণা করতে অপছন্দ করা
[৯০০] ফুজাইল ইবনু গযওয়ান থেকে বর্ণিত, তালহাকে বলা হলো, "যদি আপনি খাদ্য বিক্রি করতেন, তাহলে তাতে লাভবান হতেন!” তিনি উত্তরে বললেন, "আমার অন্তরে মুসলিমদের বিষয়ে কোনো প্রতারণা আছে—আল্লাহ তাআলার এমন কিছু জানাটা আমি পছন্দ করি না।"
আমরা ভালো লোক
[৯০1] জুরাইরি বলেন, “কুফার একজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তোমরা কি সৎলোক?' উত্তরে সে বলল, 'আমি জানি না সৎলোক কারা। তবে (আমরা) ভালো লোক।"
উত্তম বস্তু
[৯০২] ওকী বলেন, "সুফিয়ান বলেছেন, 'আমার জানামতে কথা বলার চেয়ে আশঙ্কাজনক আর কিছু নেই। এবং আল্লাহর কাছে থাকা অপেক্ষা উত্তম কোনো বস্তু নেই।”
চল্লিশ বছর কুরআনের দারস
[৯০৩] আবদুর রহমান ইবনু হুমাইদ বলেন, "আমি আবূ ইসহাককে বলতে শুনেছি, আবূ আবদুল্লাহ সুলামী চল্লিশ বছর মাসজিদে কুরআন পড়িয়েছেন।”
সর্বোত্তম ব্যক্তি
[৯০৪] উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ
"নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো ওই ব্যক্তি, যে কুরআন শিখে ও শেখায়।" [১৩৮]
বাহ্য রাদিয়াল্লাহু আনহু তার হাদীসে বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো ওই ব্যক্তি, যে কুরআন শিখে ও শেখায়।”
মুহাম্মাদ ইবনু জাফর ও হাজ্জাজ তাদের হাদীসে বলেছেন, "আবু আবদুর রহমান সুলামী জানিয়েছেন, এই হাদীসটিই আমাকে (কুরআন শিক্ষাদানের) আসরে বসিয়েছে।”
ফজরের সালাতের সময় প্রফুল্লিত হওয়া
[৯০৫] শিমর থেকে বর্ণিত, আবূ আবদুর রহমান আমার হাত ধরে আমাকে বললেন, "সালাত আদায়ে তুমি কেমন শক্তি পাও?” আমি তখন আল্লাহর ইচ্ছায় আমার যে দুর্বলতা আছে তা উল্লেখ করলাম। তখন তিনি বললেন, “আমিও তোমার মতো ঈশার সালাত আদায় করতাম। তারপর আরও সালাত পড়তে থাকতাম। যখন ফজরের সালাত আদায় করতাম তখন প্রথম অবস্থার মতো প্রফুল্লিত হয়ে যেতাম।”
ঈমানের প্রকৃত অবস্থায় পৌঁছা
[৯০৬] হাকাম থেকে বর্ণিত, ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, “মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের প্রকৃত অবস্থায় পৌঁছতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজেকে সত্যবাদী জানা সত্ত্বেও তর্ক-বিবাদ পরিহার করবে ও হাসি-তামাশার ক্ষেত্রে মিথ্যা পরিহার করবে।”
নিজেকে চিনে নেওয়া
[৯০৭] আবূ দাউদ হাফারি বলেন, “আমি সুফিয়ানকে বলতে শুনেছি, যখন তুমি নিজেকে চিনে ফেলতে পারবে, তখন মানুষেরা কী বলল না বলল, তাতে তোমার কিছু যায় আসে না।”
অকল্যাণকর কাজ বিদায় হওয়া
[৯০৮] আওন ইবনু আবদুল্লাহ আবূ ইসহাককে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার (কোন ইবাদাতটি আগের মতোই) বাকি আছে হে আবূ ইসহাক?” তিনি বললেন, “এক রাকাতে সূরা বাকারা পড়াটা এখনো রয়ে গেছে।” তখন তিনি বললেন, “তোমার কল্যাণকর কাজ রয়ে গেছে আর অকল্যাণকর কাজ বিদায় নিয়েছে।”
জান্নাতের উপযোগী কাজ করা
[১০৯] আবদুল্লাহ ইবনু ইদরীস বলেন, “আমি আমার চাচাকে বলতে শুনেছি, কুরদুস (নামক এক ব্যক্তি) হাজ্জাজের শাসনামলে আমাদের কিচ্ছা-কাহিনি শোনাত। তিনি বলতেন, 'নিশ্চয়ই জান্নাতের উপযোগী কাজ না করলে কখনো জান্নাত লাভ করা যাবে না। দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা তোমরা (জান্নাতের) আগ্রহকে খাঁটি করো। সব সময় নেক কাজে লিপ্ত থাকো। আল্লাহর সাথে বিশুদ্ধচিত্তে ও উন্নত আমল নিয়ে সাক্ষাৎ করো।' তিনি বেশি বেশি বলতেন, 'যে (আল্লাহকে) ভয় করে, সে (জান্নাতে) প্রবেশ করবে। যে (আল্লাহকে) ভয় করে, সে (জান্নাতে) প্রবেশ করবে।”
চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে যাওয়া
[৯১০] আবদুর রহমান ইবনু হাফস কুরাশি বলেন, “আলি ইবনু হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ যখন (সালাতের জন্য) ওজু করতেন, তখন তার (চেহারা) হলুদ আকার ধারণ করত। তার স্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনার এমন হয় কেন?' তিনি বললেন, 'তোমরা জানো না, আমি কার সামনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি?”
প্রিয় আমল
[৯১১] ইবনু উয়াইনা বলেন, “মুহাম্মাদ ইবনু মুনকাদিরকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন আমলটি আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি জানালেন, 'মুমিন বান্দাকে আনন্দ দেওয়া।' পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার (কোন ভালো কাজটি) বহাল আছে? তিনি জানালেন, '(দ্বীনি) ভাইদের প্রাধান্য দেওয়া।”
ভালো-খারাপ অবস্থায় করণীয়
[৯১২] আমর ইবনু দীনার বলেন, “মুহাম্মাদ ইবনু আলি বলেছেন, 'তুমি ভালো অবস্থায় আল্লাহর কাছে দুআ করো। তারপর কখনো যদি খারাপ কোনো অবস্থায় পতিত হও, তখন তিনি যা পছন্দ করেন তাতে তার অবাধ্যতা কোরো না।”
মানুষ পাল্টে গেছে
[৯১৩] সফওয়ান ইবনু সুলাইম থেকে বর্ণিত, আবূ মুসলিম খাওলানি বলেছেন, “আগে মানুষেরা কাঁটামুক্ত পাতার ন্যায় ছিল। তারা এখন পাতাহীন কাঁটা হয়ে গিয়েছে। যদি তুমি তাদের গালি দাও, তারাও তোমাকে গালি দেবে। যদি তুমি তাদের সমালোচনা করো, তারাও তোমার সমালোচনা করবে। যদি তুমি তাদের ছেড়ে দাও, তবে তারা তোমাকে ছাড়বে না (আঘাত করতে ঠিকই উদ্যত হবে)।”
অল্প কিছুই বাকি আছে
[৯১৪] উমারা থেকে বর্ণিত, ইয়াজিদ ইবনু মুআবিয়া নাখঈ বলেছেন, “নিশ্চয়ই দুনিয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে অল্প করে। সুতরাং তাতে কেবল অল্প থেকে অল্পই বাকি আছে।"
মুমিনের সাথে মুমিনের সম্পর্ক
[৯১৫] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْمُؤْمِنُ مِنَ الْمُؤْمِنِ بَمَنْزِلَةِ الرَّأْسِ مِنَ الْجَسَدِ
“একজন মুমিনের সাথে অপর মুমিনের সম্পর্ক মাথার সাথে শরীরের সম্পর্কের ন্যায়।" [১৩৯]
সে জন্যই একজন মুমিন অন্য মুমিনদের কষ্টে আক্রান্ত হতে দেখলে ব্যথিত হয়।
দ্বীনি ভাইদের জন্য উত্তম খাবারের ব্যবস্থা করা
[৯১৬] আবূ উসামা বলেন, আমাশ বলেছেন, “আমরা খায়সামার কাছে আগমন করতাম। তিনি খাটের তল থেকে আমাদের জন্য খবীছ ও মিষ্টান্নভর্তি ঝুড়ি বের করে বলতেন, 'কেবল তোমাদের জন্যই আমি এগুলো তৈরি করেছি।”
অনুগ্রহের বিষয়গুলো হিসেব করাটাও এক ধরনের কৃতজ্ঞতা
[৯১৭] সাঈদ ইবনু আমির বলেন, “জুরাইরি সফর থেকে ফিরে এলে তার ভাইয়েরা তার কাছে এসে সালাম দিলো। সফরে আল্লাহ তাকে যেসব সুখকর বিষয়ের সম্মুখীন করেছেন, তিনি তাদের তা জানালেন আর কষ্টকর বিষয়গুলো চেপে গেলেন। তিনি খুব সুন্দর ও চমৎকারভাবে তাদের সামনে বিষয়গুলো উপস্থাপন করার পর বললেন, 'বলা হয়ে থাকে যে, অনুগ্রহের বিষয়গুলো হিসেব করাটাও এক ধরনের কৃতজ্ঞতা।”
কৃতজ্ঞতা আদায়
[৯১৮] জাযীরা গোত্রের কোনো এক ব্যক্তি কায়েস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, "যিনি তোমার ওপর অনুগ্রহ করেছে, তার কৃতজ্ঞতা আদায় করো। আর যিনি তোমার কৃতজ্ঞতা আদায় করেছেন, তাকে অনুগ্রহ করো।”
তিনি তার জমিন ফিরিয়ে দিলেন
[৯১৯] আবূ মুআবিয়া গলাবি এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেছেন, “এক ব্যক্তি সুলাইমান ইবনু আবদুল মালিককে ডাক দিলো। তখন তিনি মিম্বরে বসে ছিলেন। ডাক দিয়ে সে বলল, 'হে সুলাইমান, আল্লাহকে ভয় করো এবং ঘোষণার দিবসকে স্মরণ করো।' তখন তিনি ক্রোধান্বিত হয়ে মিম্বর ছেড়ে নিচে নেমে এলেন এবং লোকটিকে ডেকে বললেন, 'আমি সুলাইমান। ঘোষণার দিবস আবার কোনটি?' লোকটি তখন (কুরআনের এই আয়াতটি) শোনাল:
فَأَذَّنَ مُؤَذِّنُ بَيْنَهُمْ أَن لَّعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
'তাদের মাঝে একজন ঘোষক ঘোষণা করবে যে, জালেমদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত।'[১৪০]
সুলাইমান জিজ্ঞেস করল, 'আমি তোমার ওপর কী জুলুম করলাম?' সে বলল, 'আপনার দায়িত্বশীল নিয়োজিত ব্যক্তি আমার জমিন ছিনিয়ে নিয়েছে।' তিনি বললেন, 'তিনি তখন নিয়োজিত ব্যক্তির কাছে পত্র লিখলেন এই মর্মে যে—তুমি তার জমিন, সাথে আমার জমিনও তাকে দিয়ে দাও।”
কয়েকটি উপদেশ
[৯২০] আবূ মুআবিয়া গলাবি বলেন, “মক্কায় সফর করার প্রাক্কালে এক ব্যক্তি হিশামকে বলল, 'তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ দিচ্ছি। সময়মতো সালাত আদায় করবে। তোমাকে যেহেতু সালাত আদায় করতেই হবে, তাই এমনভাবে আদায় করো যা তোমার উপকারে আসবে। তুমি তোমার সঙ্গীদলের কুকুর হোয়ো না। কারণ, প্রত্যেক সঙ্গীদলের একটি কুকুর থাকে, যা তাদের পেছনে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। যদি কুকুরটি কল্যাণকর হয়, তাহলে তারা তার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। আর যদি কুকুরটি তাদের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে তারা তাকে রশি দিয়ে বেঁধে পেছনে ফেলে রাখে। সুতরাং তুমি সঙ্গীদলের কুকুর হওয়া থেকে সাবধানে থেকো।”
জাহান্নামের নিশ্বাস
[৯২১] লাইস ইবনু সাআদ বলেন, “উবাইদুল্লাহ ইবনু আবী জাফর বলেছেন, নিশ্চয়ই জাহান্নাম এমন এক নিশ্বাস ফেলবে, যার ফলে অত্যাচারীদের অন্তর বিদীর্ণ হয়ে যাবে। তারপর আরেকটি নিশ্বাস ফেলবে, যার ফলে তারা ভূপৃষ্ঠ থেকে উড়ে গিয়ে উল্টোমুখী হয়ে জাহান্নামে পতিত হবে।"
ইলম অর্জনের বিভিন্ন ধাপ
[৯২২] মুহাম্মাদ ইবনু নসর হারেসি বলেন, “বলা হতো—ইলমের শুরু হলো নীরব থাকা। তারপর কান পেতে শোনা। তারপর তা মুখস্থ করে নেওয়া। তারপর এর ওপর আমল করা। তারপর তা প্রচার করা।"
আল্লাহ তাআলা সর্বাবস্থায় ক্ষমা করার অধিকার রাখেন
[৯২৩] মুহাম্মাদ ইবনু নদর আল-হারেসি هُوَ أَهْلُ التَّقْوَى وَأَهْلُ الْمَغْفِرَةِ “তিনি তাকওয়ার যোগ্য ও ক্ষমা করার অধিকারী।”[১৪১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতেন, “আল্লাহ বলেন, 'আমার বান্দা আমাকে ভয় করবে, আমি এর যোগ্য। যদি সে তা নাও করে, তবুও আমি তাকে ক্ষমা করার অধিকার রাখি।”
মাসজিদ একটি শক্তিশালী দুর্গ
[৯২৪] আবদুর রহমান ইবনু মুগাফফাল কোনো এক সাহাবি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “মাসজিদ শয়তানের (কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার) শক্তিশালী দুর্গ।”
মৃত্যুর সময় কালিমা পড়লেন
[৯২৫] হাম্মাদ ইবনু যায়দ বলেন, “আমি সালাম আবুল মুনযিরের কাছে এলাম। তখন তিনি তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছিলেন। তাকে কালেমার তালকীন করা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি (কালেমা পড়তে) বিলম্ব করছিলেন। বিষয়টি আমাকে চিন্তায় ফেলে দিলো। ঠিক তখনই একজন মুআযযিন মাসজিদের মিনারে আযান দিলো—আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ—আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তখন সালাম বলে উঠল, 'আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি যা চান আসমান-জমিনে কেবল তা-ই হয়।' এরপর তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।"
আল্লাহকে ভয় করার পুরস্কার
[৯২৬] উবাইদুল্লাহ ইবনু আবূ বাকর ইবনু আনাস বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন: أَخْرِجُوا مِنَ النَّارِ مَنْ ذَكَرَنِي يَوْمًا أَوْ خَافَنِي فِي مَقَامٍ 'যে আমাকে এক দিনও স্মরণ করেছে বা কোনো এক জায়গাতেও আমাকে ভয় করেছে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনো।” [১৪২]
মৃত্যু কামনাকারীকে ভর্ৎসনা
[৯২৭] ইবনু জুরাইজ বলেন, “আমি আতাকে বললাম, ইনি ইউসুফ ইবনু মাহাক। তিনি মৃত্যু কামনা করেন।' তখন তিনি ভর্ৎসনা করে বললেন, 'সে কি জানে, সে কীসের তামান্না করছে!”
নিজে আমল না করার পরিণাম
[৯২৮] ইবনু আবী খালেদ থেকে বর্ণিত, শাবি বলেন, “জান্নাতের মধ্যে জান্নাতবাসীরা কিছু জাহান্নামীদের ওপর থেকে দেখে বলবে, 'কী ব্যাপার! তোমরা জাহান্নামে কেন? তোমরা আমাদের যা শিক্ষা দিতে, আমরা তো সে অনুযায়ীই আমল করতাম।' তারা জবাব দেবে, 'আমরা তোমাদের শিক্ষা দিলেও নিজেরা আমল করতাম না।”
কাঁদতে কাঁদতে মৃত্যু
[৯২৯] এক মহিলা আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলল, “আমার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কবর উন্মুক্ত করে দিন।” তিনি তা উন্মুক্ত করে দিলেন। (কবর দেখার পর) মহিলাটি (এত বেশি) কাঁদল যে, একপর্যায়ে মৃত্যুমুখে পতিত হলো।
কৃপণতার জন্য আফসোস প্রকাশ
[৯৩০] ইবরাহীম ইবনু আবী আবলাহ বলেন, “আমি উম্মুল বানীনকে—যিনি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ -এর বোন-বলতে শুনেছি, 'কৃপণতার জন্য আফসোস। আল্লাহর কসম, যদি এটি কোনো রাস্তা হতো তবে আমি তাতে হাঁটতাম না। আর যদি এটি কোনো পোশাক হতো, তবে আমি তা পরতাম না।”
চুলের কিছু অংশ ছাঁটা
[৯৩১] হাফস ইবনু হুমাইদ বলেন, “জিয়াদ ইবনু হুদাইর আমাকে বলেন, 'তুমি তোমার চুল থেকে (কিছু অংশ) ছাঁটো। কারণ, তাতে ফিতনা রয়েছে।' জিয়াদ আমাদের আরও বলতেন, 'আল্লাহর কাছে চাও। কারণ, যে তার কাছে চায় না, তিনি তার ওপর রাগ করেন।"
এক ব্যক্তি জিয়াদ ইবনু হুদাইরের কাছে এসে বলল, "আমি অমুক অমুক অঞ্চল ভ্রমণ করতে চাই।” তিনি বললেন, “তুমি আল্লাহর যিকরের মাধ্যমে নিজের পথ পাড়ি দাও।”
মানুষজনের সাথে মেলামেশা করতে অনীহা প্রকাশ
[৯৩২] আবূ যামরাহ থেকে বর্ণিত, জিয়াদ ইবনু হুদাইর বলেছেন, “হায়, যদি আমি লোহানির্মিত একটি সংরক্ষিত স্থানে থাকতাম। সেখানে আমার সাথে কেবল এমন জিনিস থাকত, যা আমার জন্য কল্যাণকর। আমি কারও সাথে কথা বলতাম না, আর কেউও আমার সাথে কথা বলত না। এমতাবস্থায় আল্লাহর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়ে যেত।"
টিকাঃ
[১৩৪] অর্থাৎ কুরআন তিলাওয়াত তাদের কোনো কাজে আসে না। লাভের তুলনায় ক্ষতির কারণ বেশি হয়。
[১৩৫] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ১৭
[১৩৬] তিনি সাহাবায়ে কেরাম ও প্রবীণ তাবিয়িদের ব্যাপারে এ কথা বলছেন যে, 'তাদের ব্যাপারে আমি এতটাই আশ্বস্ত যে, যদি তারা ওজুতে পুরো হাত ধৌত না করে শুধু নখ ধৌত করত, তবুও আমি তাদের অনুসরণ করতাম।'-অনুবাদক
[১৩৭] সূরা রহমান, ৫৫:৪৬
[১৩৮] সহীহ, বুখারি: ৫০২৭; তিরমিযি: ২৯০৮
[১৩৯] সহীহ, মুসনাদ আহমাদ: ৪/২৭১; সিলসিলা সহীহা: ১১৩৭
[১৪০] সূরা আরাফ, ৭:৪৪
[১৪১] সূরা মুদ্দাসসির, ৭৪ : ৫৬
[১৪২] যঈফ, তিরমিযি: ২৫৯৪; হাকিম: ১/৭০; যঈফুল জামি: ৬৪৩৬
📄 সাঈদ ইবনু জুবায়ের রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
কাঁদতে কাঁদতে দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া
[৯৩৩] কাসিম থেকে বর্ণিত, “সাঈদ ইবনু জুবায়ের এত বেশি কাঁদতেন যে, একপর্যায়ে তার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।”
দুই রাতে একবার কুরআন খতম
[৯৩৪] আবদুল মালিক ইবনু আবী সুলাইমান সাঈদ ইবনু জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন যে, “তিনি দুই রাতে একবার করে কুরআন খতম করতেন।”
দুইবার সফর
[৯৩৫] হিলাল ইবনু জানাব বলেন, “রজব মাসের কিছুদিন অতিক্রান্ত হবার পর আমি সাঈদ ইবনু জুবায়ের সাথে একদিন বের হলাম। তিনি কুফা থেকে উমরার উদ্দেশ্যে ইহরাম করেছিলেন। তারপর উমরা থেকে ফিরে এসে যিলকদ মাসের মাঝামাঝি সময়ে আবার হাজ্জের উদ্দেশ্যে ইহরাম করলেন। তিনি প্রতিবছর দুইবার সফরে বের হতেন। একবার হাজ্জের জন্য, আরেকবার উমরার জন্য।"
এক রাকাতে পুরো কুরআন তিলাওয়াত
[৯৩৬] হিলাল ইবনু ইয়াসাফ বলেন, “সাঈদ ইবনু জুবায়ের কাবাতে প্রবেশ করলেন, তারপর এক রাকাতে পুরো কুরআন পড়ে ফেললেন।”
একটি আয়াত বিশবারেরও অধিক পুনরাবৃত্তি
[৯৩৭] কাসিম ইবনু আবূ আইয়ুব বলেন, “আমি সাঈদ ইবনু জুবায়েরকে নিম্নোক্ত আয়াতটি বিশবারেরও অধিক পুনরাবৃত্তি করতে শুনেছি :
وَاتَّقُوا يَوْمًا تُرْجَعُونَ فِيهِ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ تُوَفَّى كُلُّ نَفْسٍ مَّا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ
‘তোমরা সেদিনকে ভয় করো, যেদিন আল্লাহর দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন করানো হবে। তারপর প্রত্যেকের যা কৃতকর্ম আছে, তা পুরোপুরি প্রদান করা হবে। কাউকে কোনোরূপ জুলুম করা হবে না।”[১৪৩]
মানুষ পাপ করতে চায়
[৯৩৮] সাঈদ ইবনু জুবায়ের يُرِيدُ الْإِنسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ “মানুষ চায় ভবিষ্যতেও পাপাচার করতে।”[১৪৪] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “সে বলবে—অচিরেই আমি তাওবা করব।”
জালিমদের কর্মে সন্তুষ্ট না হওয়া
[৯৩৯] সাঈদ ইবনু জুবায়ের وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا “আর যারা জুলুম করেছে, তোমরা তাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ো না।”[১৪৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “তোমরা তাদের কর্মে সন্তুষ্ট হোয়ো না।”
অন্তর নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
[৯৪০] সুফিয়ান একজন ব্যক্তি থেকে, তিনি সাঈদ ইবনু জুবায়ের থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, “যদি আমার অন্তর মৃত্যু-ভাবনা থেকে কখনো মুক্ত হয় তখন আমার আশঙ্কা হয় যে, না জানি আমার অন্তর নষ্ট হয়ে গেল!”
দুনিয়ার স্বাদ আস্বাদনে অস্থিরতা তৈরি হওয়া
[৯৪১] বুকাইর ইবনু আতীক বলেন, “আমি সাঈদ ইবনু জুবায়েরের কাছে কিছু মধুভর্তি একটি পাত্র নিয়ে আসলাম। তিনি তা পান করলেন। তারপর বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এটি আমার মধ্যে প্রশান্তি পাবে না।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন পাবে না?’ তিনি জানালেন, ‘কারণ আমি তা পান করে স্বাদ আস্বাদন করেছি।’”[১৪৬]
দুনিয়া খুবই সামান্য সময়ের নাম
[৯৪২] হিশাম থেকে বর্ণিত, সাঈদ ইবনু জুবায়ের বলেছেন, “দুনিয়া হলো আখেরাতের সপ্তাহসমূহের মধ্য হতে একটি সপ্তাহ মাত্র।”
আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা
[৯৪৩] আমাশ থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম ডান দিকে থুতু নিক্ষেপ করে বলেছেন, “আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”
সর্বাবস্থায় আল্লাহর শুকরিয়া আদায়
[৯৪৪] হিশাম ইবনে উরওয়াহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলতেন, “আমার সাথে আল্লাহর আচরণ কতই-না চমৎকার। তিনি আমার থেকে একটা (অঙ্গ) নিয়েছেন কিন্তু বাকি তিনটা রেখে দিয়েছেন।"
ক্যান্সারের কারণে তার হাঁটুর দিক থেকে একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল।
আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ সম্মানিত
[৯৪৫] হিশাম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ আল্লাহর জন্য কোনো কিছু করে, তখন সে যেন এমন কিছু না করে, যা কোনো সম্মানিত ব্যক্তির করতে তার লজ্জাবোধ হয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ সম্মানিত এবং তা পাওয়ার সবচেয়ে বড় হকদার।”
সালাতের মাধ্যমে সবকিছু চাওয়া
[৯৪৬] মালিক ইবনু আনাস বলেন, “উরওয়া এক ব্যক্তিকে দেখল, সে খুব দ্রুত সালাত আদায় করেছে। তিনি তাকে ডেকে বললেন, 'তোমার তো মহান প্রভু আল্লাহর দরবারে কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই! আমি তো সালাতের মধ্যে আল্লাহর কাছে (সবকিছু) চাই। এমনকি লবণের জন্যও তার কাছে প্রার্থনা করি।”
চল্লিশ বছর সাওম রাখা
[৯৪৭] হিশাম ইবনু উরওয়াহ বলেন, 'আমার পিতা ত্রিশ বা চল্লিশ বছর সাওম রেখেছেন। ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আযহার দিনগুলো ছাড়া বাকি দিনগুলোতে কখনো সাওম ছাড়া থাকতেননি। এমনকি যেদিন তার মৃত্যু হয় সেদিনও তিনি সাওম অবস্থায় ছিলেন।”
টিকাঃ
[১৪৩] সূরা বাকারা, ২: ২৮১
[১৪৪] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫: ৫
[১৪৫] সূরা হুদ, ১১: ১১৩
[১৪৬] অর্থাৎ দুনিয়ার স্বাদ আস্বাদন করলে তাঁর ভেতরে প্রশান্তি বিদূরিত হয়ে অস্থিরতা চলে আসত। তাই মধু পান করার পর তিনি সেদিকে ইঙ্গিত করেই কথাটি বলেছেন।-অনুবাদক
📄 ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
[১৪] মূল গ্রন্থে এটি সাঈদ ইবনু জুবায়েরের অধ্যায়ের অধীনে এসেছে। আলাদা ব্যক্তি হওয়ায় তা স্বতন্ত্র অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হলো। -অনুবাদক
নিজের দোষের প্রতি লক্ষ রাখা
[১৪] ইবনু মুনাব্বিহ বলেন, “যে ব্যক্তি অন্যের দোষ না দেখে নিজের দোষের প্রতি লক্ষ করে, তার জন্য সুসংবাদ। আর সুসংবাদ সে ব্যক্তির জন্য—যে নিজের বাসস্থান না থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, দরিদ্র ও দুঃখী লোকদের প্রতি সদয় হয়, পাপমুক্ত সঙ্গিত অর্থসম্পদ থেকে সদকা করে, আলেম-উলামা ও ধৈর্যবান ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা করে, সুন্নাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং বিদআত থেকে দূরে থাকে।”
দ্বীন মানার সহায়ক
[১৫] জাফর থেকে বর্ণিত, ওয়াহাইব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন, “দ্বীন মানার সবচেয়ে সহায়ক গুণ হচ্ছে দুনিয়াবিমুখতা। আর একে সবচেয়ে দ্রুত বিভেদনকারী হচ্ছে প্রবৃত্তির অনুসরণ করা। প্রবৃত্তির অনুসরণের অন্যতম দাবি হলো, দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া। আর দুনিয়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হওয়া থেকে সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি আকর্ষণ থেকে আল্লাহর ক্রোধের কারণ হারাম বস্তুকে হালাল মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। আর আল্লাহর ক্রোধ এমন এক অসুখ, যার ভিন্ন কোনো ওষুধ নেই। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়ে যায়, তাহলে অন্য কোনো অসুখই কোনো ধরনের ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। সুতরাং যে ব্যক্তি তার প্রতিপালক আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চায়, সে যেন নিজেকে (প্রবৃত্তির অনুসরণ না করার মাধ্যমে) অসন্তুষ্ট করে। কারণ, যে নিজেকে অসন্তুষ্ট করে না, সে স্বীয় প্রতিপালককে সন্তুষ্ট করতে পারে না। যে ব্যক্তি দ্বীনের কোনো কিছু অপছন্দ হলেই তা ছুড়ে ফেলে দেয়, অচিরেই দেখা যাবে তার কাছে দ্বীনের কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না।”
আমলহীন দায়ীর অবস্থা
[৯৫০] সিমাক ইবনু ফদল বলেন, “আমি ওয়াহহবকে বলতে শুনেছি, আমলহীন দায়ী ধনুকহীন (তির) নিক্ষেপকারীর ন্যায়।”
ইলমের স্বেচ্ছাচারিতা
[৯৫১] আবদুল মালিক ইবনু হুনাইফ বলেন, "আমি ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহকে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই ইলমেরও কিছু স্বেচ্ছাচারিতা আছে, যেমন ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। [১৪৮]
মানুষের সাথে মেলামেশা করেও তাকওয়াবান থাকা
[৯৫২] উমার ইবনু আবদুর রহমান বলেছেন, "লোকেরা ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহের কাছে বানী ইসরাঈলের ইবাদাত ও পর্যটন সম্পর্কে আলোচনা করলে তিনি বললেন, 'যে মানুষের সাথে মেলামেশা করে তাকওয়াবান থাকতে পারে এবং মানুষের কষ্টদানের ওপর ধৈর্যধারণ করতে পারে, সে-ই হচ্ছে আমার কাছে বেশি মর্যাদাবান।”
ধনীদের জান্নাতে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য
[৯৫৩] তাইমি ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ থেকে বর্ণনা করেন, "সুইয়ের ছিদ্রে উটের প্রবেশ করা ধনীদের জান্নাতে প্রবেশ করার চেয়েও সহজ।" [১৪৯]
আল্লাহ তাআলার বুদ্ধিমান বান্দা
[৯৫৪] সুলাইমান ইবনু উআইনা বলেন, "আমরা ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহকে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহ তাআলার কোনো বান্দাই ওই বুদ্ধিমান ব্যক্তির মতো নয়, যে ঘর থেকে বের হয়ে যাকেই দেখে নিজেকে সে তার থেকে নিম্নস্তরের মনে করে। অহংকার তার থেকে নিরাপদ থাকে। কল্যাণ তার থেকে প্রত্যাশা করা যায়। সে পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করে। পরবর্তীদের জন্য আদর্শ হয়ে থাকে। এমনকি ছোট থাকা মর্যাদা পাওয়ার চেয়ে তার কাছে অধিক প্রিয় হয়ে থাকে। দরিদ্রতা তার কাছে ধনাঢ্যতা থেকে বেশি পছন্দনীয় হয়। নিজের বেশি আমলকেও তার কাছে কম মনে হয়। অন্যের কম আমলকেও তার কাছে বেশি মনে হয়। তার জীবনযাপন হয় সামান্য খাবারের ওপর নির্ভর করে। আপন প্রয়োজন উপার্জনে সে বিরক্ত হয় না। হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট থেকে দরিদ্রতাকে বরণ করে নেওয়া তার কাছে অধিক প্রিয় হয় হারাম উপার্জনের ধনাঢ্যতা থেকে। আল্লাহর অনুগত হয়ে অভাবকে মেনে নেওয়া তার কাছে বেশি প্রিয় হয় আল্লাহর অবাধ্য হয়ে প্রাচুর্যে মেতে থাকা থেকে।” তারপর তিনি বলেন, দশম বৈশিষ্ট্য—যার মাধ্যমে বান্দার মর্যাদা ও স্মরণ সমুন্নত হয়—হলো, ঘর থেকে বের হওয়ার পর যে ব্যক্তিই তার মুখোমুখি হয়, তাকেই সে নিজের চেয়ে বড় মনে করে।'
অহংকারের আলামত
[৯৫৫] ওয়াহহবের ছেলে তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “তাওরাতে লিপিবদ্ধ আছে, অহংকারের আলামত হলো—কোনো ভাই তাকে ডাক দিলে তার ডাকে সাড়া না দেওয়া, আপন জীবনের কসম করে তা পুরা না করা, তার কাছে খাবার নিয়ে আসা হলে এই কথা বলা যে, খাবারটি ভালো নয়। যে ব্যক্তি খাবারের কারণে আল্লাহর প্রশংসা করে সে তার শুকরিয়া আদায় করে।"
সুখকে বিপদ মনে করা
[৯৫৬] উসমান ইবনু মারদাওয়াইহি বলেন, "আমি ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ ও সাঈদ ইবনু জুবায়েরের সাথে আরাফার দিন ইবনে আমারের পাহাড়ের কাছে অবস্থান করছিলাম। ওয়াহহব সাঈদ ইবনু জুবায়েরকে বলল, 'হে আবূ আবদুল্লাহ, আপনি আর কত দিন হাজ্জাজের চোখ ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকবেন?' তিনি বললেন, 'আমার স্ত্রী গর্ভবতী থাকাবস্থায় আমি বের হয়ে এসেছি। তারপর তার গর্ভস্থ সন্তানের জন্ম হয়েছে।' তখন ওয়হাব বললেন, 'নিশ্চয়ই আপনাদের পূর্ববর্তীদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে, তারা সেটাকে সুখ হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর সুখের মুখোমুখি হলে সেটাকে বিপদ হিসেবে বিবেচনা করতেন।"
মুনাফিকের স্বভাব
[৯৫৭] আওন আল-আরাবি বলেছেন, “মুনাফিকের স্বভাব হলো, সে প্রশংসা পেতে ভালোবাসে এবং নিন্দা অপছন্দ করে।"
[৯৫৮] ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন, "মুনাফিকের আলামত হলো, সে নিন্দাকে অপছন্দ করে আর প্রশংসা পেতে ভালোবাসে।"
শয়তানের কাছে প্রিয় ব্যক্তি
[৯৫৯] ইবরাহীম ইবনু হাজ্জাজ বলেন, “আমি ওয়াহহবকে বলতে শুনেছি, শয়তানের কাছে আদম-সন্তানদের মধ্যে অতিভোজক ও অতিনিদ্রালু ব্যক্তি থেকে বেশি প্রিয় আর কেউ নেই।"
মুমিনের বিপদ
[৯৬০] ওয়াহহব থেকে বর্ণিত আছে, “মুমিনের জন্য বিপদাপদ চতুষ্পদ জন্তুর বেড়ির ন্যায়।”
কিয়ামাতের দিন পাহাড়ের চিৎকার
[৯৬১] রবাহ বলেন, "ওয়াহহব থেকে আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে, তিনি বলেছেন, 'যখন পাহাড়কে চলমান করা হবে এবং সে জাহান্নামের আওয়াজ, ক্রোধ, কর্কশধ্বনি ও শ্বাসগ্রহণের শব্দ শুনতে পাবে, তখন পাহাড় মহিলাদের ন্যায় চিৎকার করবে। তারপর পরস্পর ধাক্কা খেয়ে তার ওপরভাগ শেষভাগের ওপর ফিরে আসবে।”
প্রতিদান ও বিনিময় না দেওয়া
[৯৬২] বাক্কার বলেন, আমি ওয়াহহবকে বলতে শুনেছি, “প্রতিদান ও বিনিময় না দেওয়াটাও এক ধরনের ব্যয়কুণ্ঠতা।”
ইবাদাতগুজারের শক্তি বৃদ্ধি পায়
[৯৬৩] মুহাম্মাদ ইবনু জুহাদাহ বলেন, “ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ বলেছেন, 'যে ইবাদাতগুজার হয়, তার শক্তি বৃদ্ধি পায়। আর যে অলসতা করে, তার দুর্গতি বৃদ্ধি পায়।”
আল্লাহর ওলীদের অবস্থা
[৯৬৪] সাঈদ ইবনু জুবায়ের ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তার সঙ্গীকে বললেন, “চলো আমরা কাছে যাই।” তারপর তিনি তার কাছে এলেন এবং তার ওপর হাজ্জাজের প্রয়োগ করা কঠোরতা ও তাকে বিতাড়িত করার অভিযোগ জানালেন। তখন ওয়াহব তাকে বললেন, "যখন আল্লাহর ওলীদের সাথে কঠোরতার আচরণ করা হয়, তখন তারা প্রত্যাশার আলো দেখেন। আর যখন তাদের সাথে নমনীয়তার আচরণ করা হয়, তখন তারা আতঙ্কিত হন।”
তিনটি বিষয় থেকে সাবধান থাকা
[৯৬৫] সমাদ ইবনু মাকিল থেকে বর্ণিত, “তিনি ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহকে মিম্বরে দাঁড়িয়ে মানুষদের খুতবা দিতে শুনেছেন এই বলে-তোমরা আমার থেকে তিনটি বিষয় স্মরণ রাখো। অনুসৃত প্রবৃত্তি থেকে সাবধান থাকবে, অসৎ সঙ্গী থেকে সতর্ক থাকবে, নিজের মতামতের ওপর মুগ্ধ হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে।”
কয়েকটি বিষয় শিক্ষা দিলেন
[৯৬৬] আবদুস সমাদ বলেন, “তিনি ওয়াহহবকে তার কোনো এক সঙ্গীকে বলতে শুনেছেন, আমি কি তোমাকে এমন চিকিৎসাবিদ্যা শেখাব না, যাতে চিকিৎসককে নিন্দায় না পড়তে হয়? এমন ফিকহ শেখাব না, যাতে ফকীহকে ভর্ৎসনার ভাগীদার না হতে হয়? এমন বিচক্ষণতা শেখাব না, যাতে বিচক্ষণ ব্যক্তিকে কোনো তিরস্কারের মুখোমুখি না হতে হয়? সে উত্তরে বলল, 'হ্যাঁ, অবশ্যই হে আবূ আবদুল্লাহ।' তখন তিনি বললেন, 'যে চিকিৎসাবিদ্যায় চিকিৎসককে নিন্দায় পড়তে হবে না তা হলো, খাওয়ার শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া এবং শেষে তার প্রশংসা করা। আর যে ফিকহের মধ্যে ফকীহকে ভর্ৎসনার ভাগীদার হতে হবে না তা হলো, কোনো কিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, জানা থাকলে উত্তর দেওয়া; নয়তো বলে দেওয়া যে, আমি জানি না। আর যে বিচক্ষণতার ক্ষেত্রে তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয় না তা হলো, বেশি বেশি চুপচাপ থাকা, যতক্ষণ না কোনো বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।”
নফসের অবস্থা অনুযায়ী প্রার্থনা কবুল করা হয়
[৯৬৭] আবদুল হামীদ ওয়াহহব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “পূর্ববর্তী যুগের এক ব্যক্তি কিছুকাল ইবাদাত-বন্দেগি করে আল্লাহর কাছে কোনো প্রয়োজন প্রার্থনা করল। সে সত্তরটি শনিবার সিয়ামে কাটিয়ে দিলো। প্রতি শনিবারে এগারোটি করে খেজুর খেতো। তারপর আল্লাহর কাছে কোনো প্রয়োজন চাওয়ার পরও তিনি তা দিলেন না। তখন সে নিজের প্রতি মনোনিবেশ করে বলল, 'হে আমার নফস, তোমার অবস্থানুযায়ী আমাকে দান করা হয়। যদি তোমার কাছে কল্যাণকর কিছু থাকত, তাহলে অবশ্যই তোমার প্রয়োজনীয় বস্তু দিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু তোমার কাছে তো কল্যাণকর কিছু নেই।' ঠিক তখনই একজন ফেরেশতা তার কাছে অবতরণ করে তাকে জানাল, 'হে আদম-সন্তান, এই যে সময়টাতে তুমি নিজে নিজেকে দোষ দিচ্ছ, সে সময়টা তোমার অতীতের সমস্ত ইবাদাত অপেক্ষা উত্তম। তুমি যে প্রয়োজন প্রার্থনা করেছিলে, আল্লাহ তাআলা তা তোমাকে দিয়ে দিয়েছেন।”
কিয়ামাতের সময় সমুদ্র অগ্নিতে উত্তাল হবে
[৯৬৮] ইমরান আবুল হুযাইল শুনেছেন, وَإِذَا الْبِحَارُ سُجَّرَتْ "যখন সমুদ্র উত্তাল হবে।”[১০০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ওয়াহহাব বলেছেন, “সমুদ্র অগ্নিতে উত্তাল হবে।”
টিকাঃ
[১৪৮] অর্থাৎ সম্পদশালী হলে যেমন অনেক সময় মানুষ স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, অহংকারে আক্রান্ত হয় তেমনি ইলমের অধিকারী হলেও অনেক সময় এই ধরনের অবস্থা হয়ে থাকে।-অনুবাদক
[১৪৯] অর্থাৎ ধনীদের জান্নাতে যাওয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যেহেতু ধন-সম্পদ বেশি হবার কারণে তাদের হিসাব-নিকাশও বেশি, আবার তাদের গুনাহের পরিমাণও হয় অধিক।-অনুবাদক
📄 তাউস রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
আমীরের হাদিয়া গ্রহণ করেননি
[৯৬৯] নোমান ইবনু যুবায়ের সানআনি জানিয়েছেন, “মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ অথবা আইয়ুব ইবনু ইয়াহইয়া তাউসের কাছে পাঁচ শ বা সাত শ দীনার পাঠাল। যার মাধ্যমে পাঠাল তাকে তিনি বলে দিলেন, 'যদি তিনি তোমার থেকে তা গ্রহণ করেন, তবে আমীর তোমাকে (উন্নত) বস্ত্র দান করবেন এবং তোমার প্রতি আরও আনুগ্রহ করবেন।' সে দীনারগুলো নিয়ে তাউসের কাছে উপস্থিত হয়ে তাকে বলল, 'হে তাউস, এখানে কিছু খরচপাতি রয়েছে যা আমীর আপনার জন্য তা পাঠিয়েছেন।' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমার এসবের কোনো দরকার নেই।' সে তাকে এগুলো গ্রহণ করে নিতে বলল। কিন্তু তাউস রাহিমাহুল্লাহ তাতে সম্মত হলেন না। তিনি দীনারগুলো ঘরের জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেললেন। অতঃপর দূত সেখান থেকে প্রস্থান করে জানাল, তাউস রাহিমাহুল্লাহ দীনারগুলো গ্রহণ করেছেন। কিছুদিন যাবার পর তাউসের এমন কিছু কর্মকাণ্ডের সংবাদ আমীরের কানে এল যা তার পছন্দ হলো না। তিনি সংবাদ পাঠালেন যেন তার প্রদত্ত সম্পদগুলো ফিরিয়ে আনা হয়। তাউসের কাছে আমীরের দূত এসে বলল, 'আমীর যে সম্পদ আপনাকে দিয়েছিলেন তা ফেরত দিন।' তিনি জানালেন, 'সেই সম্পদের কিছুই আমি গ্রহণ করিনি।' দূত ফিরে গিয়ে এই সংবাদ জানাল। তারপর জানা গেল তিনি সত্য কথাই বলেছেন। তারপর যে ব্যক্তিকে দিয়ে সম্পদগুলো পাঠানো হয়েছিল, তাকে খোঁজ করা হলো। তাকে সংবাদ জানানোর পর সে এসে বলল, 'হে আবূ আবদুর রহমান (তাউসের উপনাম), আমি না তোমার কাছে সম্পদগুলো নিয়ে এসেছিলাম?' তিনি জানালেন, 'আমি কি তোমার থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করেছিলাম?' সে বলল, 'না।' তিনি বললেন, 'তুমি কি জানো, আমি তা কোথায় রেখেছি?' সে বলল, 'হ্যাঁ জানি। ওই জানালাতে।' তিনি বললেন, 'যাও, আমি যেখানে রেখেছি, সেখানটাতে গিয়ে দেখো।' এরপর সে তার হাত বাড়িয়ে দেখে সেখানে থলের ভেতর সেই সম্পদগুলো পড়ে আছে। মাকড়সা তার ওপর এত দিনে বাসা বেঁধে ফেলেছে। তারপর লোকটি সেগুলো নিয়ে আমীরের কাছে চলে গেল।”
দুই পথে মাসজিদে যেতেন
[৯৭০] আবদুল্লাহ ইবনে বিশর বলেন, “তাউস রাহিমাহুল্লাহ ইয়ামানির মাসজিদে যাবার দুটি পথ ছিল। একটা বাজারের ভেতর দিয়ে, অন্যটা আরেক জায়গা দিয়ে। তিনি একবার একটা দিয়ে গমন করতেন, অন্যবার আরেকটা দিয়ে। বাজারের পথ দিয়ে যাবার সময় যদি ভুনা করা মাথা দেখতে পেতেন, তাহলে সে রাত্রে আর তিনি খাবার খেতেন না।”
সম্পদ-সন্তান থেকে দূরে থাকার দুআ
[৯৭১] সাঈদ বলেন, 'তাউস রাহিমাহুল্লাহ এই বলে দুআ করতেন, হে আল্লাহ, আমাকে সম্পদ ও সন্তান থেকে বঞ্চিত রাখো।”
সাহরির সময় জেগে থাকা
[৯৭২] মিসআর এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, “সাহরির সময় তাউস রাহিমাহুল্লাহ একজন লোকের কাছে আসলেন। অন্যরা জানাল সে ঘুমিয়ে আছে। তিনি তখন বললেন, 'আমি সাহরির সময় কাউকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখিনি।”
শাসকের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
[৯৭৩] সুফিয়ান ইবনু উআইনা বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ তাউস রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, 'আপনি আপনার প্রয়োজনের কথা আমিরুল মুমিনিন সুলাইমান ইবনু আবদুল মালিককে জানান।' তাউস রাহিমাহুল্লাহ তাকে উত্তরে বললেন, 'তাকে জানানোর মতো কোনো প্রয়োজন আমার নেই।' (কথাটা শুনে) উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ কেমন যেন অবাক হলেন।”
ঈমান ও আমল দান করার দুআ
[৯৭৪] সুফিয়ান এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, "তাউস রাহিমাহুল্লাহ এই বলে দুআ করতেন, হে আল্লাহ, আমাকে ঈমান ও আমল দান করুন এবং সম্পদ ও সন্তান থেকে বঞ্চিত রাখুন।”
হাজ্জাজের সামনে দুঃসাহস
[৯৭৫] আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মাদ তাইমি বলেন, “আমি একজন শাইখকে অন্য আরেক ব্যক্তি থেকে বলতে শুনেছি যে, তাউস রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি হিজর নামক জায়গায় ছিলাম। হঠাৎ সেখানে হাজ্জাজের আগমন হলো। এমতাবস্থায় সেখান দিয়ে এমন এক ব্যক্তি যাচ্ছিল, যার মধ্যে গ্রাম্য বেশভূষা ছিল। হাজ্জাজ তাকে জিজ্ঞেস করল, 'কোত্থেকে এসেছ?' সে জানাল, ইয়ামান থেকে। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল, ‘মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফকে কেমন দেখে এসেছ?’ সে বলল, 'বেশ মোটাতাজা ও হৃষ্টপুষ্ট। যেমনটা দেখলে আপনি খুশিই হবেন।' হাজ্জাজ বলল, 'আরে তোমার কাছে আমি এটা জানতে চাইনি।' সে বলল, 'তাহলে কী জানতে চেয়েছেন?' হাজ্জাজ বলল, 'তার চরিত্র সম্পর্কে জানতে চেয়েছি।' এবার সে ব্যক্তি জানাল, 'তাকে আমি চরম অত্যাচারীরূপে দেখে এসেছি।' হাজ্জাজ জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কি জানো না যে, সে আমার ভাই?' সে ব্যক্তি বলল, 'আপনি কি আপনার ভাইকে আল্লাহর কাছে আমার চেয়েও বেশি পরাক্রমশালী মনে করেন?' তাউস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এই দৃশ্যের মতো নয়ন জুড়ানো দৃশ্য আমার চোখে আর পড়েনি। ওই ব্যক্তি (এই কথা বলার পর) বেঁচে গেল। হাজ্জাজ তাকে আর কিছুই করল না।”
জামা না নিয়েই চলে গেলেন
[৯৭৬] আবদুর রাজ্জাক তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, “তাউস রাহিমাহুল্লাহ মেঘময় ঠান্ডা সকালে সালাত আদায় করতেন। একবার মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ অথবা আবূ আইয়ুব ইবনু ইয়াহইয়া সদলবলে তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি সাজদা অবস্থায় ছিলেন। সে সবুজ রঙের এক বিশেষ পোশাক আনার জন্য বলে, তা তার ওপর রেখে দিলো। তাউস রাহিমাহুল্লাহ নিজ প্রয়োজনের কথা (আল্লাহর কাছে বলা) শেষ করার আগ পর্যন্ত মাথা উঠালেন না। তারপর তিনি সালাম ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখলেন তার গায়ের ওপর সবুজ রঙের সেই পোশাক। তিনি কিছুটা কেঁপে উঠলেন এবং সেদিকে আর ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা বাড়ি ফিরে গেলেন।"
অসুস্থের সেবা করা
[৯৭৭] মামার বলেন, “একবার তাউস রাহিমাহুল্লাহ তার একজন অসুস্থ বন্ধুর কাছে (সেবা করার জন্য এত দীর্ঘ সময়) অবস্থান করছিলেন যে, একপর্যায়ে হাজ্জও তার হাতছাড়া হয়ে যায়।”
দায়িত্বশীল ব্যক্তির খানা ভক্ষণ না করা
[৯৭৮] শাম্মা আল-আক্কী বলেন, “তাউস রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বলেছেন, 'ঈশার সালাত আদায় করার পর আরও তিন (রাকাত) পড়ো। আর কখনো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির খানা ভক্ষণ করবে না।"
নেক বান্দাদের হাজ্জ
[৯৭৯] লাইস ইবনে সাদ তাউস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “নেক বান্দাদের হাজ্জ সওয়ারির ওপর হয়ে থাকে।"
শেষ রাত জেগে কাটানো
[৯৮۰] দাউদ ইবনু ইবরাহীম বলেন, "একবার একটা সিংহ রাত্রিবেলায় রাস্তায় লোকদের আটকে রাখল। মানুষেরা একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করতে লাগল। সাহরির সময় সিংহটি তাদের রেখে চলে গেল। তখন সবাই ডানে-বামে (ছড়িয়ে-ছিটিয়ে) অবস্থান নিয়ে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল। কিন্তু তাউস রাহিমাহুল্লাহ দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে লাগলেন। কেউ একজন তাকে বলল, 'সেই রাত হবার পর থেকে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন!' তিনি জবাব দিলেন, 'সাহরির সময় কি কেউ ঘুমায়!’"
দুআয় রোনাজারি
[৯৮১] ইবনু আবী রওয়াদ বলেন, “তাউস রাহিমাহুল্লাহ এবং তার কিছু সাথি-সঙ্গী আসরের সালাত আদায় করার পর কেবলামুখী হয়ে বসতেন। তারপর কারও সাথে কোনো কথা না বলে দুআয় রোনাজারি করতে থাকতেন।”
সালাতে দুই শ আয়াত তিলাওয়াত
[৯৮২] ইবনু জুরাইজ বলেন, “তাউস রাহিমাহুল্লাহ বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে যাবার পরও সালাতে দাঁড়িয়ে সূরা বাকারার দুই শ আয়াত তিলাওয়াত করতেন। তার থেকে এর ব্যত্যয় পাওয়া যেত না এবং তিনি নাড়াচাড়াও করতেন না।”
আরাফার সন্ধ্যায় নিজেকে একাকী রাখা
[৯৮৩] উমার ইবনু ওয়ারদ বলেন, “আতা আমাকে বলেছেন, 'যদি আরাফার সন্ধ্যায় তুমি নিজেকে একাকী রাখতে সক্ষম হও তবে তা কোরো।”
অন্যকে উপদেশ দিয়ে নিজে আমল না করার পরিণতি
[৯৮৪] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি বলেন, "আমি জানতে পেরেছি-যাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তাদের কেউ কেউ নিজের পেটের আঁত টেনে বের করবে, তা নিয়ে ঘুরতে থাকবে যেভাবে চাক্কি ঘুরতে থাকে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, 'তুমি কি সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে না?' সে বলবে, 'হ্যাঁ, আমি সৎ কাজের আদেশ করতাম বটে কিন্তু পরে নিজেই তার বিপরীতটা করতাম। এমনিভাবে অসৎ কাজ থেকেও নিষেধ করতাম বটে কিন্তু পরে নিজেই তাতে লিপ্ত হতাম।"
নিজের ইলম দ্বারা উপকৃত না হওয়ার পরিণতি
[৯৮৫] মানসুর ইবনে যাজান বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, এক ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, তার দুর্গন্ধে জাহান্নামীদের খুব কষ্ট হতে থাকবে। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, 'তোমার ধ্বংস হোক, তুমি কি এমন কাজ করতে? আমরা যে দুরবস্থায় আছি সেটাই তো আমাদের সহ্য হয় না। তার ওপর আবার তোমার দুর্গন্ধের জ্বালায় অতিষ্ঠ হচ্ছি।' সে তখন জানাবে, 'আমি (দুনিয়াতে) আলেম ছিলাম কিন্তু নিজের ইলম দ্বারা উপকৃত হইনি।”
জাহান্নামের আশ্রয় প্রার্থনা
[৯৮৬] ইমরান আল-কসীর বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, জাহান্নামে এমন একটা উপত্যকা রয়েছে, খোদ জাহান্নাম যার থেকে দিনে চার শ’ বার আশ্রয় প্রার্থনা করে। কারণ, তার আশঙ্কা হয়, তাকে সেখানে পাঠানো হবে আর সেই উপত্যকা তাকে খেয়ে ফেলবে। সেই উপত্যকাটি তৈরি করা হয়েছে লৌকিকতায় আক্রান্ত কারিদের জন্য।"