📄 আমর ইবনু উতবা রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
শহীদের প্রতি ভালোবাসা
[৮২৩] আলকামা বলেন, "আমরা একবার যুদ্ধে বের হলাম। তখন আমাদের সাথে ছিল আসওয়াদ, আমর ইবনু উতবাহ, মিদাদ। যখন আমরা সীদানের পানির স্থানে আসলাম-আমাদের আমীর ছিলেন উতবাহ ইবনু ফারকাদ-তখন তার ছেলে আমর ইবনু উতবাহ বললেন, 'যদি আপনারা তার কাছে অবতরণ করেন, তবে সে আপনাদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করবে। হতে পারে (আতিথেয়তা করতে গিয়ে) সে কারও ওপর জুলুম করে ফেলবে। তাই যদি আপনারা চান, তবে আমরা এই গাছের ছায়াতেই বিশ্রাম নেব এবং নিজেদের রুটির খণ্ডিত টুকরো থেকে ভক্ষণ করব।' অতঃপর আমরা ফিরে এলাম এবং (তার কথা অনুযায়ী) করলাম। যখন আমরা ভূমিতে আসলাম, তখন আমর ইবনু উতবা একটি সাদা জুব্বা ছিঁড়ে গায়ে দিলো। তারপর বলল, 'আল্লাহর কসম, এর ওপর রক্ত গড়িয়ে পড়া বেশি সুন্দর (দেখাবে)।' তারপর তার প্রতি (তির) নিক্ষিপ্ত হলো। আমি দেখলাম সে যে জায়গা ধরে রেখেছে, সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এরপর সে মৃত্যুবরণ করল। পরবর্তী দিন আমরা ভোরের শীতলতার মধ্যে রওনা হলাম। আমি মিদাদকে আমার চাদর দিয়ে দিলাম। সে তা পরে নিল। ইবনুল দাওরাকি বলেন, 'সে তা পাগড়ি হিসেবে পরিধান করল। তারপর তার প্রতিও (তির) নিক্ষিপ্ত হলো। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, এটা অনেক ছোট। আর আল্লাহ তাআলা ছোট জিনিসের মধ্যে বরকত দান করেন।' সেই আঘাতের কারণে তারও মৃত্যু হলো। পরবর্তীকালে আলকামা সেই চাদর পরিধান করে বলতেন, 'এতে মিদাদের রক্ত দেখে তার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়।”
জিহাদের জন্য কেনা ঘোড়ার প্রতি কদমে নেকি
[৮২৪] আমাশ বলেন, “আলকামা ইবনু কায়েস, আমর ইবনু উতবা ও মিদাদ বালানযার অভিযানে বের হলেন। তখন আমর ইবনু উতবা (জিহাদের জন্য) চার হাজার দিরহাম দিয়ে একটা ঘোড়া কিনলেন। অন্যরা তাকে বলল, 'তুমি খুব বেশি দাম দিয়ে ফেলেছ।' তিনি বললেন, 'আমি চাই যে, সে প্রতি কদম উঠাবে ও ফেলবে তার বিনিময়ে আমাকে এক দিরহাম এক দিরহাম করে দেওয়া হবে।”
সাজদা করা এবং নৈকট্যবান হওয়া
[৮২৫] উতবা ইবনু ফারকাদ আবদুল্লাহ ইবনু রবীআকে বললেন, “হে আবদুল্লাহ, তুমি কি আমাকে—তোমার ভাতিজার ব্যাপারে আমি যে কাজ করছি—তাতে সহায়তা করবে না?” আবদুল্লাহ বললেন, “হে আমর, তুমি আপন পিতার আনুগত্য করো।” তারপর তিনি মিদাদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি তাদের সাথে বসে আছেন। তখন তাকে বললেন, “তুমি তাদের অনুগত হোয়ো না। সাজদা করো এবং নৈকট্যবান হও। আমাশ কেন সাজদা করেননি?” আমর বললেন, "হে আমার পিতা, আমি একজন গোলাম। যে কিনা নিজের মুক্তির জন্য কাজ করে।” তখন উতবা কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, “হে আমার ছেলে, আমি তোমাকে দুভাবে ভালোবাসি। একটা হলো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। অন্যটা হলো পুত্রের প্রতি পিতার ভালোবাসা।” আমর বলল, “হে আমার পিতা, আপনি আমার কাছে এত সম্পদ নিয়ে এসেছেন, যা সত্তর হাজারের মতো হবে। যদি আপনি তা আমার কাছে চান, তবে তা-ই হবে। আপনি তা গ্রহণ করে নিন। অন্যথায় আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমি তা খরচ করব।” বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি সবটুকু খরচ করেছিলেন। এমনকি একটা দিরহামও আর বাকি থাকেনি।”
বিয়ের প্রতি অনীহা
[৮২৬] সিরীন থেকে বর্ণিত, “উতবা ইবনু ফারকাদ তার ছেলে আমরের কাছে বিবাহের প্রস্তাব পেশ করল। সে তা নাকচ করে দিলো। তখন তিনি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে গিয়ে অভিযোগ জানালেন। উসমান তার ছেলে আমর ইবনু উতবার কাছে এই মর্মে লিখে পাঠালেন, যেন সে যাতে তার কাছে উপস্থিত হয়। (উপস্থিত হবার পর) উসমান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাকে বিবাহ করতে কিসে বারণ করল? অথচ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবূ বাকর ও উমার বিবাহ করেছেন। এবং আমরাও তাদের থেকে যা (উপকার) পাবার পাচ্ছি।' আমর তাকে উত্তর দিলো, 'হে আমিরুল মুমিনিন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমলের মতো এবং আবূ বাকর, উমার ও আপনার আমলের মতো আমল কে করতে পারবে?' সে যখন তাকে এই কথা বলল তখন তিনি তাকে বললেন, 'ঠিক আছে তুমি চলে যাও। যদি তোমার মন চায় তবে বিয়ে কোরো। আর যদি মন না চায় তবে কোরো না।”
কবরের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি
[৮২৭] ঈসা ইবনু উমার বলেন, "আমর ইবনু উতবা ইবনু ফারকাদ রাতের বেলায় তার ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন। তারপর কয়েকটি কবরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে কবরবাসী, আমলনামা গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমল তুলে নেওয়া হয়েছে।' তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং সকাল হওয়া পর্যন্ত দুই পা সোজা করে অবস্থান করলেন। এরপর ফিরে গিয়ে ফজরের সালাতে অংশগ্রহণ করলেন।”
মেঘমালা তাকে ছায়া দিত
[৮২৮] আলি ইবনু সালেহ বলেন, “আমর ইবনু উতবা তার সঙ্গীদের বাহনগুলো চরাতেন আর মেঘমালা তাকে ছায়া দিত।”
হিংস্র প্রাণী তাকে পাহারা দিত
[৮২৯] আলি ইবনু সালেহ বলেন, “আমর ইবনু উতবা সালাত আদায় করতেন আর হিংস্র প্রাণী তাকে পাহারা দিত।”
আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করতেন না
[৮৩০] আমর ইবনু উতবার একজন আযাদকৃত দাস বলেন, “একদিন গরমের সময়ে আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে আমর ইবনু উতবাকে খুঁজতে খুঁজতে পাহাড়ের ওপর তার দেখা পেলাম। তখন তিনি সাজদারত ছিলেন আর মেঘ তাকে ছায়া দিচ্ছিল। আমরা যখন যুদ্ধে বের হতাম, তখন তার সালাতের আধিক্যতার কারণে আমাদের পাহারা দিতে হতো না। (কারণ, রাত জেগে তিনি সালাত আদায় করতেন।) একরাতে তাকে দেখলাম সালাত আদায় করছেন। তখন আমরা সিংহের গর্জন শুনে পালিয়ে গেলাম। কিন্তু তিনি সরে না গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে থাকেন। আমরা তাকে বললাম, ‘আপনি কি সিংহকে ভয় করেন না?’ তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহকে বাদ দিয়ে সিংহকে ভয় পেতে লজ্জাবোধ করি।”
তিনটি প্রার্থনা
[৮৩১] আমাশ থেকে বর্ণিত, আমর ইবনু উতবা ইবনু ফারকাদ বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে তিনটা জিনিস চেয়েছি। তিনি আমাকে দুটা দিয়েছেন, আমি এখন তৃতীয়টা পাওয়ার অপেক্ষা করছি। তার কাছে আমি প্রার্থনা করেছি, যাতে করে তিনি আমাকে দুনিয়াবিমুখ বানিয়ে দেন। তাই দুনিয়ার কী এল আর কী গেল, তাতে আমি ভ্রুক্ষেপ করি না। তার কাছে আমি আবেদন করেছিলাম—যাতে তিনি আমাকে সালাতে দণ্ডায়মান থাকার মতো শক্তি দান করেন। তিনি আমাকে তা দিয়েছেন। আরেকটা হলো আমি তার কাছে শহীদ হওয়ার নিবেদন করেছি। এখন তারই প্রতীক্ষায় আছি।”
সিংহও তাকে সমীহ করত
[৮৩২] মুহাম্মাদ বলেন, “আমি যাদের সাহচর্যে থেকেছি তাদের মধ্যে আমর ইবনু উতবা এমন ব্যক্তি, যে সব সময়ই অনুসরণীয়। এক রাতে তিনি তাঁবুতে সালাত আদায় করছিলেন আর তার সঙ্গী তাঁবুর বাইরে সালাত আদায় করছিল। ইত্যবসরে একটি সিংহ এসে তার সঙ্গীর কেবলার সামনে দিয়ে অতিক্রম করে গেল। কিন্তু সে সরে যায়নি। এরপর সিংহটি তাঁবুর কাছে এসে আমরের পায়ের কাছে গুটিয়ে বসল। যখন তিনি সাজদা করতে চাইলেন, তখন সিংহটি সরে গিয়ে তার সাজদার স্থানে এসে জড়সড় হয়ে বসল। তখন তিনি (ওই অবস্থায়) সাজদা করলেন। অথবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি গলা খাঁকারি দিলেন। সন্দেহটা হয়েছে বর্ণনাকারী বিশরের। তারপর সকাল হলে আমরের সঙ্গী তার কাছে এসে জানাল যে, তার সামনে দিয়ে সিংহটি অতিক্রম করেছিল কিন্তু সে সরে যায়নি। সে ভেবেছিল সিংহটি হয়তো কিছু একটা করে বসবে। তখন আমরও তার পায়ে থাকা সিংহটির চিহ্ন তাকে দেখালেন এবং সিংহটি যা করেছে সে বিষয়ে তাকে জানালেন।”
মেঘ তাকে ছায়া দিত
[৮৩৩] হাওত ইবনু রাফে থেকে বর্ণিত, আমর ইবনু উতবাহ তার সঙ্গীদের কাছে শর্ত করলেন যে, তিনি তাদের খাদেম হবেন। বর্ণনাকারী বলেন, "একদিন গরমের ভেতর তিনি চারণভূমিতে বের হলেন। তখন তার একজন সঙ্গী তার কাছে আগমন করে দেখতে পেল যে, মেঘমালা তাকে ছায়া দিচ্ছে আর তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন বিশর বললেন, 'হে আমর।' তারপর আমর তাকে ধরলেন, যেন তিনি এই বিষয়ে কাউকে কিছু না জানান।"
বিবাহের প্রতি অনাগ্রহ
[৮৩৪] মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু উতবাহ ইবনু ফারকাদ থেকে বর্ণিত, একবার তার পিতামাতা তাকে বিবাহ দেওয়ার ইচ্ছা করলেন, কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। তখন তারা উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সহায়তা নিলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার, তুমি বিয়ে করতে চাচ্ছ না কেন? অথচ নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে করেছেন, আবূ বাকর, উমার বিয়ে করেছেন। আমি নিজে বিয়ে করেছি।” তিনি উত্তর দিলেন, “আপনাদের মতো আমল করার সাধ্য কি আর আমার আছে!” উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!” তারপর তিনি তার চেহারা ঘুরিয়ে হাত দিয়ে ঢেকে ফেললেন। ঠিক যেভাবে কেউ অপছন্দনীয় কিছু দেখলে করে থাকে। (এভাবেই) বর্ণনাকারী উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতিক্রিয়ার অবস্থা ব্যক্ত করেছেন। যখন তারা তাকে খুব পীড়াপীড়ি করল তখন তিনি বললেন, “ঠিক আছে, আমি বিয়ে করব।” জারীরের কন্যাকে তার বিয়ের প্রস্তাব জানানো হলো। তিনি বললেন, "আমি মেয়ের সাথে কথা না বলে বিয়ে করব না।” তারা বলল, “ঠিক আছে তা-ই হোক।”
আবুল হাসান বলেন, “এই ঘটনার ব্যাপারে আমাকে ফাহদ ইবনু আওফ বর্ণনা করেছেন বিশর ইবনু মুফাদদলের সূত্রে, তিনি সালামা ইবনু আলকামা থেকে, তিনি মুহাম্মাদ থেকে। অতঃপর তারা জারীরের কন্যাকে নিয়ে এল। তিনি তাকে বললেন, 'দেখো, আমার তো স্ত্রীর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার পিতামাতা বিয়ের জন্য খুব পীড়াপীড়ি করছেন। তো তাদের কাছে তোমার চাহিদা অনুপাতে খাদ্য-বস্ত্র তুমি পাবে।' মেয়ে বলল, 'ঠিক আছে আমি সন্তুষ্ট।'”
বর্ণনাকারী বলেন, “যখন তারা (বিয়ের পর মেয়েকে) নিয়ে রাতের বেলা তার কাছে এল, তখন তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। মেয়েটিও তার পেছনে দাঁড়িয়ে সকাল হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করতে লাগল। (পরের দিন) সকালটা তিনি শুরু করলেন সাওম পালনকারী অবস্থায়। তো স্ত্রীও তা-ই করল।”
বর্ণনাকারী বলেন, “আমর বললেন, 'যদি আমি সময় নেই, তবে তার অবস্থা আমার জন্য (বেশি পরিমাণে ইবাদাতের ক্ষেত্রে) বাধা হয়ে দাঁড়াবে।' তখন তার পিতামাতা তাকে বললেন, 'আমরা সন্তানের আশায় তোমাকে বিয়ে দিয়েছি, এসবের জন্য নয়। সুতরাং তুমি তাকে তালাক দাও।' তিনি তাকে তালাক দিলেন। তারপর আরেকটি মেয়ের জন্য তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া হলো। তিনি বললেন, 'আমি কথা না বলে কোনো মেয়েকে বিবাহ করব না।' পিতামাতা মেয়েকে তার কাছে নিয়ে এলেন। তাকেও তিনি সে রকম কথা বললেন, যা জারীরের মেয়েকে বলেছিলেন। তারপর কিছুকাল অতিবাহিত হলো। একদিন তিনি শুয়ে ছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ঘুমে। পরিবারের একজন মহিলা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, 'হে অমুক, কী ব্যাপার তোমার এখনো সন্তান হচ্ছে না। তুমি অক্ষম নাকি?' সে উত্তর দিলো, 'স্বামীহীনা কারও কি সন্তান হয়?' এই কথা শুনতে পেয়ে আমর তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার পিতামাতা তাকে বিদায় দিলেন।"
শাহাদাতের তামান্না কবুল হওয়া
[৮৩৫] সুদ্দী বলেন, “আমর ইবনু উতবার চাচাতো ভাই আমার কাছে বর্ণনা করে বলেছেন যে, আমরা (জিহাদে বের হয়ে) একটি চমৎকার উদ্যানে অবতরণ করলাম। তখন আমর ইবনু উতবা বলল, 'এই উদ্যানটি কত সুন্দর! এখানের সময়টা কতই-না চমৎকার হতো যদি কোনো আহ্বানকারী আহ্বান করে বলত, 'হে আল্লাহর ঘোড়সওয়ারি, তুমি আরোহণ করো।' অতঃপর এই কথা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। সর্বপ্রথম তারই মৃত্যু হয়। মৃত অবস্থায় তাকে পেয়ে নিয়ে আসা হলো এবং সেই স্থানে তাকে দাফন করা হলো”
📄 আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
নবিজির সাথে প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ
[৮৩৬] খলাফ ইবনু আয়ান বলেন, “যখন বাকর ইবনু ওয়ায়েলের প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'কুস ইবনু সায়েদাহ আল-ইয়াদি কী করেছে?' তারা জানাল, 'সে তো মারা গেছে হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'আমি যেন উটের ওপর বসা উকাযের বাজারে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছি আর সে বলছে—হে লোকসকল, তোমরা একত্র হয়ে আমি যা বলছি শোনো এবং তা মনে রাখো। যে বেঁচে আছে সে মারা যাবে, আর যে মারা যাবে সে বঞ্চিত হবে। প্রত্যেক যা কিছু ঘটার তা ঘটবেই। বিছানা বিছানো হয়ে গেছে। ছাদ তুলে নেওয়া হয়েছে। তারকা ছুটোছুটি করছে। সমুদ্র আরও গভীর হচ্ছে। আসমানে আছে সংবাদ আর জমিনে আছে অনেক শিক্ষার উপকরণ। আল্লাহর কসম, তোমরা যে ধর্মে রয়েছে আল্লাহর তারচেয়ে বেশি পছন্দনীয় একটি দ্বীন রয়েছে।” [১২৯]
বর্ণনাকারী বলেন, “তারপর তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, তখন কওমের এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি একটি কবিতা আবৃত্তি করব।' তারপর সে তাদের আবৃত্তি করে শোনাল,
فِي الذَّاهِبِينَ الْأَوَّلِينَ ... مِنَ الْقُرُونِ لَنَا بَصَائِرُ لَمَّا رَأَيْتُ مَوَارِدًا لِلْمَوْ ... تِ لَيْسَ لَهَا مَصَادِرُ لَا يَرْجِعُ الْمَاضِي إِلَى ... وَلَا مِنَ الْبَاقِينَ غَابِرُ أَيْقَنْتُ أَنِّي لَا مَحَالَةً ... حَيْثُ صَارَ الْقَوْمُ صَائِرُ
যুগে যুগে যারা গত হয়েছে তাদের থেকে আমাদের আছে অনেক কিছু শিখবার।
যখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, কোনো উপায় নেই মৃত্যুর পথ থেকে বাঁচবার। অতীত আমার কাছে ফিরে আসবে না কভু, বেঁচে রবে না বাদবাকি মানুষেরা। দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে আমার—অবশ্যই আমি উপনীত হব সেথায়, যেথায় গমন করেছে লোকেরা।”
অধিক সাজদাকারীদের চেহারা শুভ্র হবে
[৮৩৭] মুজাহিদ থেকে বর্ণিত,
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ
“তাদের পরিচয় হলো তাদের চেহারায় সাজদা-চিহ্ন থাকে।” [১৩০] তিনি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “দুনিয়াতে বেশি বেশি সাজদা করার কারণে কিয়ামাতের দিন তাদের চেহারা শুভ্র হবে।”
সন্তানের জন্য দুআ
[৮৩৮] সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা বলেন, “যখন যর ইবনু উমার ইবনু যর মারা গেলেন তখন উমার ইবনু যর বললেন, ‘ওহে যার, তোমার শোকে আমরা এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, তোমার (কবরে কী হবে সেই) ব্যাপারে আমরা দুশ্চিন্তা করার সময় পাইনি। হায়! (কবরে) তুমি কী বলেছ, আর তোমাকে কী বলা হয়েছে তা যদি জানতে পারতাম! হে আল্লাহ, আমার অধিকার আদায় করতে গিয়ে যরের যেটুকু ঘাটতি হয়েছে, আমি তা তাকে দিয়ে দিলাম; তোমার দায়িত্ব পালনে তার যেটুকু ঘাটতি হয়েছে, তুমি তাকে সেটুকু মাফ করে দাও।
সুফিয়ান বলেন, উমার ইবনু যর আয়াতটি পড়তেন :
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
“বিচারদিনের মালিক।” [১৩১]
সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে আফসোস করা
[৮৩৯] আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু আবী দাহরাশ যখন ফজরের সময় আগত হতে দেখতেন, তখন ব্যথিত হতেন। (কারণ, জীবনের একটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেল)। তিনি বলতেন, "আমি এখন মানুষের সাথে আছি। কিন্তু আমার জানা নেই নিজের জন্য আমি কী অর্জন করলাম।" উসমান ইবনু আবী দাহরাশ বলেন, “আমি প্রত্যেক সালাতের পরেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি-তাতে যে কমতি হয়েছে এর জন্য।”
মৃত্যুই যেন ইফতার হয়
[৮৪০] মুসলিম ইবনু জাফর বলেন, “আমি মুহাম্মাদ বিন বিশরকে বলতে শুনেছি যে-দুনিয়া থেকে সাওম রেখে (বিদায় গ্রহণ করো)। মৃত্যুই যেন হয় তোমার ইফতার। কষ্ট প্রলম্বিত হওয়ার ভয়ে ওষুধ খেতে থাকা আপন ক্ষতের চিকিৎসাকারীর ন্যায় হও। এর মাধ্যমে তুমি দীর্ঘ প্রশান্তি লাভ করবে।”[১৩২]
মৃত্যুর আলোচনা শুনে মারা গেলেন
[৮৪১] আবুল মুগীরা বলেন, “আমরা রমাদান মাসের কোনো এক রাতে উমার ইবনু যরের মজলিসে ছিলাম। যরের পুত্র তখন আলোচনা করল এবং মৃত্যুর উপস্থিত হওয়ার কথা এবং মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির কাছে আগমন করা রহমত ও আযাবের ফেরেশতার কথা আলোচনা করল। একজন যুবক (তা শুনে) লাফ দিয়ে উঠল এবং চিৎকার করতে করতে ও তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।”
ভাড়াটে লোকের কান্না
[৮৪২] ইবনুস সাম্মাক বলেন, “যর তার পিতা উমার ইবনু যরকে বলল, 'আলোচকদের কী হলো যে, তারা আলোচনা করলে কেউ কাঁদে না। কিন্তু যখনই আপনি আলোচনা করেন তখন এখান-সেখান থেকে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে?' তিনি বললেন, 'হে আমার ছেলে, ভাড়াটে ক্রন্দনকারীর ক্রন্দন কখনো সন্তানহারা মায়ের ক্রন্দনের মতো হয় না।”
নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করা
[৮৪৩] আবূ হাইয়ান তাইমি বলেন, “আমি ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যখনই আমি আমার কথাকে কাজের সামনে পেশ করেছি, তখনই আশঙ্কা হয়েছে যে, আমি মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন হব।”
টিকাঃ
[১২৯] সনদ যঈফ। বাইহাকি, দালায়িলুন নাবুওয়াতি, ২/১০১; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/৬২৩
[১৩০] সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৯
[১৩১] সূরা ফাতিহা, ১: ৩
[১৩২] অর্থাৎ দুনিয়াতে ইবাদাতের কষ্ট করে গেলে আখেরাতে জান্নাতে দীর্ঘ সুখ লাভ করবে।-অনুবাদক
📄 আবু ওয়ায়েল রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
তিনি পাখির মতো আন্দোলিত হচ্ছিলেন
[৮৪৪] মুগীরা বলেন, “আবূ ওয়ায়েলের ঘরে একবার ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ যিকর করছিলেন। তখন আবূ ওয়ায়েল যেন পাখির আন্দোলিত হওয়ার ন্যায় আন্দোলিত হলেন।”
তার কারণে আল্লাহ আযাব দিতেন না
[৮৪৫] আবূ মিসার থেকে বর্ণিত, ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “প্রত্যেক জনপদে এমন একজন ব্যক্তি থাকেন, যিনি সেই জনপদের অধিবাসীদের পক্ষ থেকে (আল্লাহর আযাব) প্রতিহত হওয়ার কারণ হন। আমি আশা করি আবূ ওয়ায়েল তাদেরই একজন।"
আল্লাহর পথে লড়াইকারী সন্তান
[৮৪৬] আবু জাফর থেকে বর্ণিত, আবূ ওয়ায়েল বলেন, "এক হাজার সন্তানের চেয়েও এমন এক সন্তানই আমার কাছে অধিক প্রিয়, যে আল্লাহর পথে লড়াই করবে।"
জিহাদের জন্য সর্বস্ব দান
[৮৪৭] আসেম থেকে বর্ণিত, "আবু ওয়ায়েলের একটি বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘর ছিল। তিনি নিজে ও তার ঘোড়া সেখানে থাকত। যখন তিনি জিহাদে যেতেন, তখন তা ভেঙে (বাঁশ-বেড়া) দান করে দিতেন। যখন ফিরে আসতেন তখন নতুন করে তা আবার নির্মাণ করতেন।"
আমলের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন করা
[৮৪৮] মনসুর থেকে বর্ণিত, وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ “তার কাছে অসীলা তালাশ করো।”[১৩৩] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আবু ওয়ায়েল বলেন, "আমলের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জন করা।”
আল্লাহর আনুগত্য করার গুরুত্ব
[৮৪৯] আমাশ থেকে বর্ণিত, আমাকে শাকীক বললেন, “হে সুলাইমান, আল্লাহর কসম, যদি আমরা আল্লাহর আনুগত্য করতাম তবে তিনি আমাদের সাথে ভিন্ন আচরণ করতেন না। অর্থাৎ আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতেন।”
কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে দুআ
[৮৫০] আসেম থেকে বর্ণিত, "আবূ ওয়ায়েল যখন ঈশা পড়ে বের হতেন তখন নিজ কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে বলতেন, হে আল্লাহ, যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করেন, তবে আপন অনুগ্রহেই আমাকে করবেন। আর যদি আমাকে শাস্তি দেন তবে জুলুম করা ছাড়াই শাস্তি দেবেন। আমি তা প্রতিহত করতে অক্ষম।”
ঘটনা শুনে কাঁদা
[৮৫১] মারূফ ইবনু ওয়াসেল বলেন, "আমি ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ-কে ঘটনা বর্ণনা করতে দেখেছি। তার সাথে আবূ ওয়ায়েল ছিল। তিনি (তা শুনে) কাঁদছিলেন।”
ঈমানহীন লোকদের সমাবেশস্থল
[৮৫২] আসেম থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি আবূ ওয়ায়েলকে বলল, 'কিছু লোক বলে থাকে, আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।' তিনি বললেন, 'আপনার জীবনের শপথ! নিশ্চয়ই জাহান্নাম হবে ঈমানহীন লোকদের সমাবেশস্থল।”
বিদআত পরিহার করা
[৮৫৩] আবুল বুখতারি থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে খবর দিলো যে, কিছু লোক মাগরিবের পর মাসজিদে বসেছে। তাদের মধ্যে একজন বলছে, এত এত বার আল্লাহু আকবার পড়ো। এত এত বার সুবহানাল্লাহ পড়ো। এত এত বার আলহামদুলিল্লাহ পড়ো। তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তারা এমনটা বলেছে?' সে বলল, 'হ্যাঁ বলেছে।' তিনি তাকে বললেন, 'এরপর যখন তাদের এমনটা করতে দেখবে, তখন আমার কাছে এসে তাদের মজলিসের সংবাদটা দিয়ো। (পরবর্তীকালে সংবাদ পেয়ে) তিনি একপ্রকার ঢিলা পোশাক পরে এসে তাদের কাছে বসলেন। যখন শুনলেন তারা তা বলছে, তখনই উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ছিলেন খুবই কঠিন প্রকৃতির মানুষ। তিনি বললেন, 'আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ। যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই সেই সত্তার কসম, তোমরা অন্ধকারাচ্ছন্ন বিদআত নিয়ে এসেছ। আমাদের ইলম মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের চেয়ে বেশি নয়।' আমর ইবনু উতবা বলেন, 'হে আবু আবদুর রহমান, আমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করি।' তিনি বললেন, 'তোমাদের কর্তব্য হলো (সঠিক) পথ আঁকড়ে ধরা। তোমরা তা মজবুত করে ধরে রাখো। আল্লাহর কসম, যদি তোমরা তা করতে তবে অনেক দূর এগিয়ে যেতে। যদি তোমরা ডান-বাম অবলম্বন করো, তবে অনেক বেশি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।”
কাজির কাছ থেকে কিছু নিতে অনীহা
[৮৫৪] আসেম থেকে বর্ণিত, তিনি তার দাসীকে বলতেন, “হে বারাকাহ, যদি তোমার কাছে আমার ছেলে ইয়াহইয়া কোনো কিছু নিয়ে আসে তুমি তা গ্রহণ করবে না। আর যদি আমার সঙ্গীরা কিছু নিয়ে আসে তবে তা গ্রহণ করবে।” তার ছেলে ইয়াহইয়া ছিলেন কিনাসার কাজি।
সালাত আদায়ের সময় ফুঁপিয়ে কাঁদতেন
[৮৫৫] আসেম বলেন, “আবূ ওয়ায়েল যখন তার ঘরে সালাত আদায় করতেন তখন খুব ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন। যদি তাকে পুরো দুনিয়া দিয়ে দেওয়া হতো এর বিনিময়ে যে, তার (এই অবস্থা) কেউ দেখবে তবুও তিনি তাতে রাজি হতেন না।”
আল্লাহ যেকোনো গোনাহ মাফ করে দিতে পারেন
[৮৫৬] আমাশ বলেন, "আমি শাকীককে বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ, যদি আপনি আমাদের আপনার কাছে দুর্ভাগাদের (তালিকাতে) অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন, তাহলে তা মুছে দিয়ে আমাদের সৌভাগ্যশালীদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আর যদি আমাদের সৌভাগ্যশালীদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন তবে তাকে সুদৃঢ় রাখেন। কারণ, আপনি তো যা ইচ্ছা তা মুছে দিতে পারেন, আবার বহালও রাখতে পারেন। আপনার কাছেই রয়েছে মূল তালিকা।”
তিনি দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে জীর্ণদেহী হয়েছিলেন
[৮৫৭] আবূ হাইয়ান তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “লোকেরা সুআইদ ইবনু শোবার কাছে আগমন করল। সে সময় তিনি পাখির একটি বাচ্চার ন্যায় বিছানায় শায়িত ছিলেন। (অর্থাৎ দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে জীর্ণদেহের হয়ে পড়েছিলেন।) তার স্ত্রী তাকে ডেকে বলছে, 'আমার পরিবার আপনার জন্য কুরবান হোক। আমি কি আপনাকে খাবার খাওয়াইনি? আমি কি আপনাকে পান করাইনি?' তিনি তখন ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, 'অসুখ দীর্ঘ হয়েছে। (বিছানায়) পড়ে থাকা প্রলম্বিত হয়েছে। আমি চাই না, এর কারণে আমার (নেকি) নখের মাথা পরিমাণও হ্রাস করা হোক।”
সুস্থির সাজদা
[৮৫৮] আনবাস ইবনু উকবাহ বলেন, “তিনি সাজদা করলে চড়ুইপাখি তার পিঠে এসে বসতো। কেমন যেন তিনি একটি দেয়ালখণ্ড।”
খুসাইমিনের ওসিয়ত
[৮৫৯] সুফিয়ান এক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন যে, “খুসাইমিন ওসিয়ত করেছিলেন যে, তাকে যেন স্বজাতির সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তিদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।”
মৃত্যু তো একদিন না একদিন আসবেই
[৮৬০] মুহাম্মাদ ইবনু খালেদ যব্বী বলেন, “আমি জানি না কীভাবে খায়সামা ইবনু আবদুর রহমান ইবনু আবূ সাবরতা কুরআন তিলাওয়াত করে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তারপর অসুস্থতা বেড়ে গেলে তার স্ত্রী তার কাছে এসে সামনে বসে কেঁদে দিলো। তিনি তাকে বললেন, 'তুমি কাঁদছ কেন? মৃত্যু তো একদিন-না-একদিন আসবেই।' স্ত্রী বলল, 'আপনার মৃত্যুর পর অন্য কোনো পুরুষ গ্রহণ করা আমার জন্য হারাম।' তখন খায়সামা তাকে বললেন, 'আমি এসব কিছুই তোমার কাছে চাই না। আমি কেবল এক ব্যক্তির ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করছি, সে হলো আমার ভাই মুহাম্মাদ ইবনু আবদুর রহমান। সে একজন পাপী ব্যক্তি। মদ পান করে থাকে। আমার ঘরে এক-তৃতীয়াংশ (সময়) কুরআন তিলাওয়াত হওয়ার পর তাতে কারও মদ পান করাটা আমি অপছন্দ করছি।”
ব্যবসায় লাভ করে তিনি আনন্দিত হননি
[৮৬১] ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ তার পিতা ইয়াজিদ ইবনু শারীক থেকে বর্ণনা করেন যে, “তিনি একবার বসরা থেকে চার হাজার (মুদ্রা) দিয়ে কিছু দাস ক্রয় করলেন। তারা তার জন্য একটি বাড়ি বানিয়ে দিলো। তারপর তিনি তাদের চার হাজার (মুদ্রা) লাভে বিক্রি করে দিলেন। ইবরাহীম বলেন, আমি তাকে বললাম, 'বাবা, আপনি যদি আবার বসরা গিয়ে সে রকম কিছু (দাস) ক্রয় করে তাদের মাধ্যমে লাভবান হতেন।' তিনি উত্তরে বললেন, 'হে আমার ছেলে, কেন তুমি আমাকে তা বললে? আল্লাহর কসম, যখন আমি তা লাভ করেছিলাম, তখন আনন্দিত হইনি। আমি ভাবছি না যে পুনরায় (বসরা) গিয়ে সে রকম লাভ করব।”
শেখার প্রতি আগ্রহ
[৮৬২] আবুল বুখতারি তাঈ বলেছেন, “যাদের আমি শেখাব ওদের কাছে অবস্থান করার তুলনায়, যাদের কাছ থেকে আমি শিখতে পারব তাদের কাছে অবস্থান করাটা বেশি পছন্দ করি।"
অধিক ইবাদাতে শুকিয়ে যাওয়া
[৮৬৩] নযর ইবনু ইসমাঈল এমন একজন থেকে বর্ণনা করেন, যিনি তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ প্রতিদিন সাত শ রাকাত সালাত আদায় করতেন। লোকেরা বলত, “তিনি তার পরিবারের লোকদের মধ্যে সবচেয়ে কম পরিশ্রমী।”
বর্ণনাকারী বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, তিনি (ইবাদাতে অধিক পরিশ্রম করার কারণে শুকিয়ে) হাড্ডিসার অবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। লোকেরা বলত, 'আসওয়াদের পরিবার জান্নাতের অধিবাসী।"
ভালো কাজে দেরি না করা
[৮৬৪] হারেস ইবনু কায়স বলেন, "যদি তুমি আখেরাতের কাজে থাকো, তবে তাতে অবস্থান করো। আর যদি দুনিয়ার কাজে থাকো, তবে সরে আসো। যদি ভালো কিছুর ইচ্ছা করো তবে (তা বাস্তবায়নে) দেরি কোরো না। যদি সালাত আদায়কালে শয়তান তোমার কাছে এসে বলে। নিশ্চয়ই তুমি আমাকে দেখছ, তখন তুমি সালাতকে আরও দীর্ঘায়িত করো।”
তিনি সাজদায় কান্না করতেন
[৮৬৫] আসেম বলেন, "যর ছিলেন আবূ ওয়ায়েল থেকেও বয়সে বড়। যখন তারা উভয়ে বসতেন আবূ ওয়ায়েল যরের সাথে কোনো কথা বলতেন না।”
বর্ণনাকারী বলেন, “ঘরে একাকী অবস্থানকালে সাজদা অবস্থায় আমি আবূ ওয়ায়েলকে বলতে শুনেছি, হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন। হে আমার রব, আমাকে মাফ করে দিন। কেননা, যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করে দেন, তবে আপন দয়ায় আমাকে ক্ষমা করবেন। আর যদি আমাকে শাস্তি দেন, তবে জুলুম না করেই আপনি আমাকে শাস্তি দেবেন। আমি তা প্রতিহত করতে অক্ষম। তারপর আমি শুনলাম তিনি সন্তানহারা মায়ের মতো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে খুব কাঁদলেন। কেউ তাকে কাঁদতে দেখবে এর বিনিময়ে যদি তাকে (পুরো দুনিয়া) দিয়ে দেওয়া হতো, তবুও তিনি রাজি হতেন না।"
অপরিচিত গৃহবাসীগণের হালাল রুটির ব্যবস্থা করা
[৮৬৬] আমাশ থেকে বর্ণিত, আবূ ওয়ায়েল বলেন, “নিশ্চয়ই যেসব পরিবারের লোকেরা তাদের দস্তরখানাতে হালাল রুটির ব্যবস্থা করে তারা হলো গুরাবা।
টিকাঃ
[১৩৩] সূরা মায়েদা, ৫: ৩৫
📄 আব্দুর রহমান ইবনু আসওয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
রাতভর সালাত আদায় করলেন
[৮৬৭] মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক বলেন, “আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ মদীনাতে আমাদের কাছে আগমন করলেন। তিনি তখন পায়ের অসুস্থায় ভুগছিলেন। তিনি সকাল হওয়া পর্যন্ত এক পায়ে ভর করে রাতভর সালাত আদায় করলেন এবং এক ওজুতে আমাদের ঈশা ও ফজরের সালাত পড়ালেন।”
দিনভর সালাতে মগ্ন থাকতেন
[৮৬৮] খালেদ সুলাইম ইবনু আদয়ানের ছেলের থেকে বর্ণনা করেন যে, "আমাদের সঙ্গীরা বর্ণনা করেন, আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ মাসজিদে ফরজ সালাত আদায় করতেন, তারপর নিজ ঘরে প্রবেশ করে দিনভর সালাতে মগ্ন থাকতেন।”
সাওম অবস্থায় পানিতে দুই পা চুবিয়ে রাখতেন
[৮৬৯] হাসান ইবনু আবদুল্লাহ বলেন, “আমি আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদকে দেখেছি, সাওম অবস্থায় পানিতে দু-পা চুবিয়ে রাখতেন। (যাতে গরমের কারণে কষ্ট কম হয়।)।”
জান্নাতে মুকুট পরিধান করার আমল
[৮৭০] আবূ বাকর ইবনু আমের বাজালি থেকে বর্ণিত, আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ বলেন, “যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করবে, জান্নাতে তাকে মুকুট পরিধান করানো হবে।"
প্রভুর সাথে সাক্ষাৎ
[৮৭১] যুবায়েদ বলেন, “আমি আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদের সাথে যখনই সাক্ষাৎ করেছি তখনই তিনি বলেছেন, 'তোমাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাৎকে (আমলের মাধ্যমে) সহজ করো।”
ঈশার পর চার রাকাত সালাত
[৮৭২] মুহারিব ইবনু দিসার থেকে বর্ণিত, আবদুর রহমান ইবনু দিসার বলেন, “যে ব্যক্তি ঈশার পর চার রাকাত (নফল) সালাত আদায় করবে, সে সালাত লাইলাতুল কদরে তা আদায় করার মতোই হবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি তা কার থেকে শুনেছেন?” তিনি বললেন, “যদি তেমনটি হয়, তবে তো ঠিকই আছে। অন্যথায় তা তো ভালো কাজই।”
লম্বা সময় তিনি সাওম রাখতেন
[৮৭৩] হিলাল ইবনু খাব্বাব বলেন, “আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ, উকবাহ ও হাশেমের পিতা সাঈদ কুফা থেকে হাজ্জ করতেন। তারপর তারা সাওম রাখা শুরু করতেন। রওনা হবার পর থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত—মধ্যিখানে বিরতি দিতেন না কোনো।”
একজন কারাবন্দীর ঘটনা
[৮৭৪] ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবূ সুলাইমান বলেন, “আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদের কাছে কিছু সম্পদ আমানত রাখা হলো। হাজ্জাজ সেই ব্যক্তির সম্পদ তালাশ করল। তাকে জানানো হলো, আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদের কাছে তা গচ্ছিত আছে। সে তখন কুফার গভর্নরের কাছে এই মর্মে সংবাদ পাঠাল যে, আবদুর রহমানকে যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে তা-ই করল। আবদুর রহমান যখন হাজ্জাজের কাছে এল, তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ?’ তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয় না আমীর আমার নাম না জেনেই আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।’ হাজ্জাজ বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিকই। আপনার কাছে অমুকের কী আছে?’ তিনি বললেন, ‘দুই পাত্রভর্তি রৌপ্যমুদ্রা।’ হাজ্জাজ বলল, ‘এ ছাড়া আর কিছু?’ তিনি বললেন, ‘না।’ হাজ্জাজ পুনরায় জিজ্ঞেস করল, ‘আল্লাহ—যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, তিনি দৃশ্য-অদৃশ্য সকল কিছু সম্পর্কে অবগত—অমুকের এই দুই পাত্রভর্তি রৌপ্যমুদ্রা ছাড়া আর কিছু আপনার কাছে নেই?’ তিনি বললেন, ‘আমার রবের প্রশংসা করে বলছি, আমীরকে মিথ্যা বলিনি আমি।’ হাজ্জাজ বলল, ‘সে যে কসম করেছিল (সেটা গুরুত্বহীন কারণ, সে কসম করে) যখন তার কসম করতে মন চায়।’ তিনি বললেন, ‘আমার রবের প্রশংসা করি। সে আমীরকে যেমন বলেছিল, ব্যাপারটা তেমনই। আমার কাছে তার অন্য কোনো সম্পদ নেই।’ হাজ্জাজ বলল, ‘তার পক্ষ হয়ে বলা আপনার এই কথাগুলো অগ্রহণযোগ্য। তোমরা তাকে কারাগারে নিয়ে যাও।’"
বর্ণনাকারী বলেন, “তাকে কারাগারে বন্দী করা হলো। সেখানে শামদেশের একজন ইবাদাতগুজার ব্যক্তিও ছিলেন। তিনি এমন দৃশ্য দেখলেন যা ইতঃপূর্বে কখনো দেখেননি। যদি এমন সময়ে হতো—যখন সালাত আদায় করা যায়—তখন তিনি দাঁড়িয়ে নফল সালাত আদায় করতেন। আর যদি এমন সময় হতো—যখন সালাত আদায় করা যায় না—তখন তিনি একাকী বসে আল্লাহ তাআলার যিকর করতেন।
কিছুকাল পরে শামের ব্যক্তিটি অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন সে বলল, ‘আমি যখন স্বীয় রবের সাথে সাক্ষাৎ করব তখন তাকে বলব যে, এই সৎ লোকটির কারাগারে আসার (বৈধ কোনো) কারণ আমি জানি না। মনে হয় সে জুলুমের শিকার।’ তারপর সে আবদুর রহমানের কাছে খবর পাঠাল। (তিনি এলে) সে তাকে বলল, ‘হাজ্জাজ কে, সেটা তো আপনি জানেনই। আমি আপনার (মুক্তির) ব্যবস্থা করে দিচ্ছি এই শর্তে যে—আপনি আমার সাথে এই অঙ্গীকার করবেন—যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে এই অসুস্থতা থেকে মুক্তি দান করেন, তাহলে আপনি আবার কারাগারে ফিরে আসবেন এবং আল্লাহ আপনার মুক্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া পর্যন্ত এখানেই অবস্থান করবেন। আর যদি আমি মারা যাই, তাহলে তো আপনি মুক্তিই পেয়ে গেলেন। (আপনাকে আর ফিরে আসতে হবে না।) আমি চাই না যে, আপনি আমার জন্য কসম করবেন।’ তখন আবদুর রহমান তাকে বললেন, ‘ঠিক আছে, তা-ই হোক।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তারপর তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করে দুই মহিলার মাঝ দিয়ে বের হয়ে এলেন। তিনি হাঁটছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি এক ব্যক্তির সম্মুখীন হলেন, যে নিজের খচ্চরে চড়ে যাচ্ছিল। তার কাছে পৌঁছার পর তাকে বললেন, ‘আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ তারপর সে (খচ্চর থেকে) নেমে বলল, ‘আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি এতে চড়ে বসুন।’ দুই মহিলার একজন বলে উঠল, ‘আমরা তো স্ত্রীলোক। আমরা নিজেদের একটা প্রয়োজনে এসেছি। আপনি-ই আপনার বাহনে চড়ে বসুন। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।’ সে বলল, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনার ওপর আমি গোয়েন্দাগিরি করছি না।”
বর্ণনাকারী বলেন, “যখন আবদুর রহমান বুঝতে পারলেন যে, সে টের পেয়ে গেছে তখন তিনি চড়ে বসলেন এবং নিজ ঘরে চলে গেলেন। ওদিকে কারাবন্দী শামের সেই ব্যক্তিরও মৃত্যু হলো।”
বর্ণনাকারী বলেন, “আমরা এক বছর পর্যন্ত সেই খচ্চরটি দেখলাম। এমন কারও দেখা পেলাম না, যিনি তা চেনেন।"
বাইতুল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকা
[৮৭৫] আবূ নুআইম থেকে বর্ণিত, আবদুর রহমান ইবনু আসওয়াদ বলেছেন, “বাইতুল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকাও ইবাদাত।”