📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 উআইস কারনি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 উআইস কারনি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


তাকে দুটি কাপড় দান করলেন
[৭৭৭] কায়েস ইবনু উসাইর ইবনু আমর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আমি উআইস কারনিকে বস্ত্রহীনতার কারণে দুইটি কাপড় দান করেছি।”

নবিজির সুসংবাদ
[৭৭৮] মুহারিব ইবনু দীসার বলেছেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَأْتِيَ مَسْجِدَهُ أَوْ مُصَلَّاهُ مِنَ الْعُرْيِ، يَحْجِزُهُ إِيمَانُهُ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ، مِنْهُمْ أُوَيْسُ الْقَرَنِيُّ وَفُرَاتُ بْنُ حَيَّانَ الْعِجْلِحُ
'নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, যে মাসজিদে বা সালাতের জায়গায় বস্ত্রহীনতার কারণে আসতে পারবে না। তার ঈমান মানুষের কাছে (কিছু) চাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মধ্যে উআইস কারনি ও ফুরাত ইবনু হাইয়ান ইজলি রয়েছে." [১১৫]

উআইস কারনি রাহিমাহুল্লাহ-এর বিস্তারিত বিবরণ
[৭৭৯] উসাইর ইবনু জাবের বলেন, “তিনি কুফায় হাদীস বর্ণনা করতেন। একবার তিনি আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করা যখন শেষ করলেন তখন বললেন, 'তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল।' কিছু লোক রয়ে গেল তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল, সে এমন কথা বলছিল আমি কাউকে সে রকম কথা বলতে শুনিনি। তাই তার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মাল। আমি তাকে অগ্রসর করলাম। সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমরা কি লোকটিকে চেনো? যে আমাদের সাথে এমন এমন (জায়গায়) বসেছে?' তখন তাদের একজন বলল, 'হ্যাঁ, আমি তাকে চিনি। তিনি হলেন উআইস কারনি।' তিনি জানতে চাইলেন, 'তুমি কি তার ঘর চেনো?' সে বলল, 'জি, চিনি।' তিনি বলেন, তারপর আমি তার সাথে উনার ঘরে গেলাম। দরজায় ধাক্কা দেবার পর তিনি বের হয়ে এলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে ভাই, কিসে তোমাকে আমাদের কাছে আসা থেকে আটক রেখেছে?' তিনি জানালেন, 'বস্ত্রহীনতা।' তার সঙ্গীরা তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করত এবং তাকে কষ্ট দিত। আমি বললাম, 'এই চাদরটি নিন এবং তা পরিধান করুন।' তিনি বললেন, 'এমনটি কোরো না। তারা যদি আমার গায়ে এই বস্ত্র দেখে, তো আমাকে কষ্ট দেবে।' আমি তার সঙ্গে থাকলাম যতক্ষণ না তিনি তা পরিধান করছেন। এরপর তিনি লোকদের সামনে বের হয়ে এলেন। তারা বলল, 'এই চাদরটি কার থেকে সে মেরে দিয়েছে বলে আপনাদের মনে হয়?' (এমন কথা শ্রবণ করে) তিনি ফিরে এসে তা খুলে ফেললেন এবং বললেন, দেখলেন তো?”
উসাইর বলেন, “আমি তখন মজলিসে উপস্থিত হলাম এবং (লোকদের উদ্দেশ্য করে) বললাম, তোমরা তার থেকে কী চাচ্ছ? তাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ? লোকটি একসময় বস্ত্রহীন অবস্থায় থাকে, অন্য সময় তাকে কেউ বস্ত্র দিয়ে থাকে।” এভাবে আমি তাদের শক্ত ভাষায় কিছু কথা শুনিয়ে দিলাম।”
তারপর তিনি বলেছেন, “কুফাবাসী কিছু লোক একবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে আগমন করল। বিদ্রুপ করা হতো এমন এক ব্যক্তিও (তাদের সাথে) আগমন করল। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের মধ্যে করন গোত্রের কেউ কি আছে?' (এই কথা শুনে) সেই লোকটি এগিয়ে এল। তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ رَجُلًا يَأْتِيكُمْ مِنَ الْيَمَنِ يُقَالُ لَهُ أُوَيْسٌ لَا يَدَعُ بِالْيَمَنِ غَيْرَ أُمَّ لَهُ وَقَدْ كَانَ بِهِ بَيَاضُ فَدَعَا اللَّهَ فَأَذْهَبَهُ إِلَّا مِثْلَ مَوْضِعِ الدِّينَارِ أَوِ الدِّرْهَمِ، فَمَنْ لَقِيَهُ مِنْكُمْ فَأْمُرُوهُ فَلْيَسْتَغْفِرْ لَكُمْ
'উআইস নামে এক ব্যক্তি ইয়ামান থেকে তোমাদের কাছে আগমন করবে। ইয়ামানে তার মাকে ছাড়া আর কোনো কিছু সে রেখে আসবে না। তার শ্বেতরোগ ছিল। সে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিল, তখন তিনি এক স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া অন্য সব ভালো করে দিলেন। তোমাদের মধ্য হতে যাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে তারা যেন তার কাছ থেকে ক্ষমার দুআ করিয়ে নেয়।' [১১৬]
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি কোত্থেকে এসেছেন?' তিনি বললেন, 'ইয়ামান থেকে।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার নাম কী?' তিনি জানালেন, 'উআইস।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়ামানে আপনি কাকে রেখে এসেছেন?' তিনি বললেন, 'আমার মাকে।' তারপর জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কি শ্বেতরোগ ছিল? আল্লাহর কাছে দুআ করার ফলে যা তিনি ভালো করে দিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমার জন্য ক্ষমার দুআ করুন।' উআইস বললেন, 'আমার মতো ব্যক্তি আপনার মতো ব্যক্তির জন্য দুআ করবে হে আমিরুল মুমিনিন!' তারপর তিনি তার জন্য দুআ করলেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না হে ভাই।”
বর্ণনাকারী বলেন, “এক ব্যক্তি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলল, 'আমাদের মাঝে একজন ব্যক্তি আছেন হে আমিরুল মুমিনিন, যাকে উআইস বলে ডাকা হয়। আমরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে থাকি।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তার সাথে সাক্ষাৎ করো। তবে মনে হয় না তুমি তাকে গিয়ে পাবে।' তারপর সেই ব্যক্তি রওনা হয়ে পরিবারের কাছে পৌঁছার আগেই উআইসের দেখা পেল। উআইস তাকে বললেন, 'তোমার স্বভাব তো এমন নয়। কী হয়েছে বলো?' সে জানাল, 'আমি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তোমার ব্যাপারে এই এই বলতে শুনেছি। সুতরাং তুমি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো হে উআইস।' তিনি বললেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তা করব না, যতক্ষণ না তুমি অঙ্গীকার করবে যে, ভবিষ্যতে আমাকে নিয়ে আর হাসাহাসি করবে না। আর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে যা শুনেছ সে বিষয়ে কাউকে জানাবে না।' তারপর তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।"

সালাতের মধ্যে শয়তানের ধোঁকা
[৭৮০] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি বলেন, “উআইস এক ব্যক্তিকে দেখল সালাত আদায় করছে কেবল উঠে আর বসে। তিনি তাকে বললেন, 'কী ব্যাপার?' সে বলল, 'আমি দাঁড়ালে শয়তান আমার কাছে এসে বলে, তুমি তো আমাকে দেখেছ। সুতরাং বসে পড়ো। তারপর আমার মন সালাতের দিকে ধাবিত হলে আমি দাঁড়িয়ে যাই। তখন শয়তান আবার আমাকে বলে, তুমি তো আমাকে দেখেছ। সুতরাং বসে পড়ো।' তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি যখন নির্জনে থাকো তখনো কি এভাবে সালাত আদায় করো?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি তাকে বললেন, 'সালাত আদায় করে যেতে থাকো।' তারপর আমি আর তাকে দেখিনি।”

তার সুপারিশে বহু লোক জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসবে
[৭৮১] হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, "রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لَيَخْرُجَنَّ مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَةِ رَجُلٍ مَا هُوَ نَبِيٌّ أَكْثَرُ مِنْ رَبِيعَةً وَمُضَرَ
'এক ব্যক্তির সুপারিশে-যিনি নবি নন-জাহান্নাম থেকে মুদার ও রবীআ গোত্রের চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ বের হয়ে আসবে।” [১১৭]
হাসান বলেন, সাহাবারা বলতেন, “সেই ব্যক্তি হয়তো উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু অথবা উআইস কারনি।”

তিনি ছিলেন করন গোত্রের
[৭৮২] সাসা বুন মুআবিয়া বলেন, “উআইস ইবনু আমের কারনি ছিলেন করন গোত্রের এক ব্যক্তি। তিনি তাবিয়ি ও কুফার অধিবাসী ছিলেন। তার শ্বেতরোগ হয়েছিল। তিনি তখন আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেছিলেন, যেন তার থেকে এই রোগ দূর করে দেন তিনি। ফলে আল্লাহ তা দূর করে দেন। তারপর দিনি দুআ করেন, হে আল্লাহ, আমার শরীরে এমন কিছু আলামত রেখে দাও, যার মাধ্যমে আমি আমাকে দেওয়া তোমার নিআমাতের কথা স্মরণ রাখতে পারি। তখন আল্লাহ তার শরীরে এমন কিছু বহাল রাখেন (সামান্য শ্বেত অংশ) যার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নিআমাতের কথা স্মরণ করতে পারেন। তিনি জামে মাসজিদে যাবার খুব পাবন্দি করতেন। তার একজন চাচাতো ভাই ছিল। সে সুলতানের সঙ্গে থাকত সব সময়। সে যখন তাকে ধনীদের সাথে দেখত তখন বলত, 'এ তো কেবল তাদের (সম্পদ) আত্মসাৎ করতে চায়।' আর যখন দরিদ্রদের সাথে দেখত তখন বলত, 'সে কেবল তাদের ধোঁকা দিতে চায়।' আর উআইস তার চাচাতো ভাইয়ের ব্যাপারে ভালো ভিন্ন অন্য কিছু বলতেন না। তিনি যখন তার পাশ দিয়ে যেতেন তখন নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। যাতে করে তার কারণে তাকে গুনাহে লিপ্ত হতে না হয়। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফা থেকে গমনকারী দলকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'তোমরা কি উআইস ইবনু আমের কারনিকে চেনো?' তারা বলল, 'না, চিনি না।' তারপর তার কাছে কুফা থেকে অন্য আরেকটা দল এল। যাদের মধ্যে উআইস কারনির সেই চাচাতো ভাই-ও ছিল। তিনি তাদেরও জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি উআইস ইবনু আমের কারনিকে চেনো?' তার চাচাতো ভাই উত্তর দিলো, 'সে তো আমার চাচাতো ভাই। লোক সুবিধার না সে। তার বিষয়ে আপনি তেমন কিছুই জানেন না, হে আমিরুল মুমিনিন।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'তোমার ধ্বংস হোক! তুমি যখন তার কাছে যাবে, তখন তাকে আমার সালাম পৌঁছে দিয়ো। এবং তাকে বোলো, যেন তিনি আমার কাছে আগমন করেন।'
তার চাচাতো ভাই কুফায় এসেই সফরের জামা-কাপড় পাল্টানোর আগেই উআইসের কাছে গিয়ে দেখল তিনি মাসজিদে আছেন। সে তাকে বলল, 'চাচাতো ভাই, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন হে আমার চাচার সন্তান।' এবার সে-ও বলল, 'আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন হে উআইস ইবনু আমের। আমিরুল মুমিনিন আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।' তিনি জানতে চাইলেন, 'আমিরুল মুমিনিনকে আমার কথা কে জানাল?' সে বলল, 'তিনি আপনার কথা উল্লেখ করে আপনার কাছে সালাম পৌঁছানোর এবং তার কাছে আপনাকে আগমন করার জন্য বলতে বলেছেন।' তিনি বললেন, 'আমীরের আদেশ শিরোধার্য।' তারপর তিনি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আগমন করলেন। তার সামনে আসতেই তিনি তাকে বললেন, 'আপনিই কি উআইস ইবনু আমের কারনি?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনিই কি সেই ব্যক্তি, যার শ্বেতরোগ হয়েছিল, আর তা দূর করে দেবার দুআ করার পর আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছিলেন, তারপর তিনি দুআ করেছিলেন এই বলে যে, হে আল্লাহ আমার শরীরে এমন কিছু আলামত রেখে দাও, যার মাধ্যমে আমি আমাকে দেওয়া তোমার নিআমাতের কথা স্মরণ রাখতে পারি? তিনি তখন তার শরীরে এমন কিছু বহাল রাখেন (সামান্য শ্বেত অংশ) যার মাধ্যমে সে তার নিআমাতের কথা স্মরণ করতে পারেন।' তিনি বললেন, 'এগুলো আপনাকে কে জানাল হে আমিরুল মুমিনিন? আল্লাহর কসম, কোনো মানুষের তো তা জানার কথা না।'
তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে, তাবিয়িদের মধ্যে করন গোত্রের এক ব্যক্তি আছে, যার নাম হলো উআইস ইবনু আমের কারনি। তার শ্বেতরোগ হবে। সে তা দূর করে দেবার দুআ করার পর আল্লাহ তা দূর করে দেবেন। তারপর সে দুআ করবে এই বলে যে, হে আল্লাহ আমার শরীরে এমন কিছু আলামত রেখে দাও, যার মাধ্যমে আমি আমাকে দেওয়া তোমার নিআমাতের কথা স্মরণ রাখতে পারি। ফলে তিনি তার শরীরে এমন কিছু রেখে দেবেন (সামান্য শ্বেত অংশ) যার মাধ্যমে সে তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা মনে রাখতে পারবে। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার দেখা পায় আর তার মাধ্যমে নিজের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নেয়। সুতরাং হে উআইস ইবনু আমের, আপনি আমার জন্য ক্ষমার দুআ করুন।' উআইস তখন বলল, 'আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। হে আমিরুল মুমিনিন'। এবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন হে উআইস ইবনু আমের।'
যখন লোকেরা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যটি জানতে পারল তখন একেকজন বলতে লাগল, 'আমার জন্যও ক্ষমার দুআ করুন। আমার জন্যও ক্ষমার দুআ করুন হে উআইস।' যখন খুব বেশি মানুষ এমন করতে লাগল, তখন তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে গেলেন। তারপর কিছুকাল পর্যন্ত তাকে আর দেখা যায়নি।”
[৭৮৩] আসবাগ ইবনে যায়দ বলেছেন, “নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উআইসের আগমন করার পথে বাধা ছিল তার মায়ের সেবা করা।”

তার সুপারিশে অনেক মানুষ মুক্তি পাবে
[৭৮৪] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَدْخُلُ الْجَنَّةَ بِشَفَاعَةِ رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَكْثَرُ مِنْ رَبِيعَةَ وَمُضَرَ
"আমার উম্মতের এক ব্যক্তির সুপারিশে জাহান্নাম থেকে মুদার ও রবীআ গোত্রের চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ বের হয়ে আসবে।"
হিশাম বলেন, “হাসানের সূত্রে হাওশাব আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি হলেন উআইস কারনি।”
আবূ বাকর বলেন, “আমি উআইসের গোত্রের এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম, কীসের কারণে তিনি (এত উচ্চ মর্যাদায়) উপনীত হলেন? তিনি বললেন, 'এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন।”
আবূ বাকর বলেন, “উআইস সিজিস্তানে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার সাথে কিছু কাফনের কাপড় পাওয়া যায়, যা আগে তার কাছে ছিল না।”

উআইস কারনির খোঁজে
[৭৮৫] হারিম ইবনু হাইয়ান আবদি বলেন, "আমি উআইস কারনির তালাশে বসরা থেকে রওনা হয়ে কুফায় আগমন করে সেথায় কিছুদিন অবস্থান করলাম। কিন্তু তার কোনো খোঁজ বা দেখা পাচ্ছিলাম না। একদিন প্রচণ্ড গরমের দিনের দুপুর বেলায় ফুরাত নদীর তীরে একজন গোধূম বর্ণের লোকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো, যার দাড়ি ছিল বেশ ঘন। দেখতে অতটা সুন্দর নয়। উষ্কখুষ্ক চুল। মাথা মুণ্ডানো নয়। তার গায়ে দুইটি কাপড় ছিল। আমার ধারণা তা পশমের তৈরি। তার একটা লুঙ্গি হিসেবে অন্যটা চাদর হিসেবে (তিনি ব্যবহার করতেন)। তিনি দুইটির কোনোটিই পানি দিয়ে ধৌত করতেন না। আমার ধারণা হলো, ইনিই হয়তো সেই ব্যক্তি। আমি তার কাছে গিয়ে মাথার পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
سُبْحَانَ رَبِّنَا إِن كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا
'আমাদের রব মহা পবিত্র। আমাদের রবের অঙ্গীকার অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।' [১১৮]
তারপর বললেন, 'কে তোমাকে আমার খোঁজ বলে দিলো?' আমি বললাম, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনার খোঁজ বলে দিয়েছেন।' তারপর আমি আমার হাত তার দিকে প্রসারিত করলাম। কিন্তু তিনি তার হাত বাড়ালেন না। আমি জানি না, ঠিক কোন কারণে তিনি এমনটি করলেন। এই দৃশ্য দেখে আমি কেঁদে ফেললাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি কেমন আছো, হে হারিম ইবনু হাইয়ান? কেমন আছো তুমি, হে আমার ভাই?' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। কীভাবে আপনি জানলেন যে, আমি হারিম ইবনু হাইয়ান? অথচ আমরা পরস্পর কাউকে (এর আগে কখনো) দেখিনি।' তিনি বললেন, 'আমার মন তোমার মনকে চিনে নিয়েছে।'
তারপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং কেঁদে ফেললেন। আমিও তার সাথে কাঁদলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন, 'তোমার (আদি) পিতা আদম আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। নূহ আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। রহমানের বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। মূসা আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। খলীফাতুল মুসলিমীন আবূ বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। আমার বন্ধু ও একান্ত দোস্ত উমার ইবনু খাত্তাবও মারা গেছেন।' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, উমার তো এখনো মারা যাননি।' সেটা ছিল উমারের খেলাফতের শেষ সময়কাল। তারপর উআইস বললেন, 'আমি আর তুমিও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে আছি। যদি তুমি বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে হে হারিম! তোমার পিতাও মারা গেছেন। হয়তো তিনি জান্নাতে আছেন নয়তো জাহান্নামে।' আমি তাকে বললাম, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আপনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা শুনেছেন, তা আমাকে শোনান।' তিনি বললেন, 'আমি তার থেকে কিছু শুনিনি। তবে যারা তার থেকে শুনেছে, আমি তাদের থেকে শুনেছি।' আমি তাকে বললাম, 'আমাকেও শোনান, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।' তিনি বললেন, 'আমি বিচারক, মুফতি বা মুহাদ্দিস হওয়ার দরজা নিজের জন্য উন্মুক্ত করাকে অপছন্দ করি। আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি।' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আমাকে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাবারকা ওয়া তাআলার বাণীই সর্বোচ্চ সত্য কথা। তার বক্তব্যই সর্বোত্তম বক্তব্য, আর তার হাদীসই সবচেয়ে বিশুদ্ধ।'
তারপর তিনি আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা দুখানের শুরু থেকে ৪২ নং আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন এবং হিক্কা তুলে একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। আমি (মনে মনে) বললাম, 'উআইস তো মারা গেছেন!' আল্লাহর যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ পর তিনি (অজ্ঞান থাকার পর) জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, 'হে আমার ভাই, আমি খুব দুশ্চিন্তার ভেতরে ছিলাম। আমি ওই সকল মানুষের সাথে থাকতে পারি না। একাকিত্বই আমার কাছে বেশি ভালো লাগে। আজকের পরে আমার কাছে আর কোনো আবেদন কোরো না। তোমার কথা আমার মনে থাকবে। যদি তুমি বাড়ি ফিরে যাও তবে আমার কথা স্মরণ রেখো। আমিও তোমার কথা স্মরণ রাখব।' আমি বললাম, 'আমার জন্য কিছু দুআ করুন।' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ, আমার এই ভাই মনে করে যে, সে তোমার খাতিরেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। সে তোমার জন্যই আমাকে ভালোবাসে। সুতরাং তুমি তার সবকিছুর ব্যবস্থা করে দাও এবং তাকে শান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশ করাও।' তারপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে তার পথ ধরলেন। আমিও কাঁদতে থাকলাম। তারপর স্বপ্নে পরস্পর দেখা হওয়া ছাড়া তার সাথে আমার আর কখনো দেখা হয়নি।”

জামাকাপড় সব সদাকা করে দেওয়া
[৭৮৬] মুগীরা বলেন, "উআইস কারনি তার জামাকাপড় সব সদাকা করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি বস্ত্রহীন হয়ে পড়েছিলেন। জুমুআর সালাতে যাবার জন্যও কাপড় ছিল না তার।”

দাফনের পর তার কবরের চিহ্ন উধাও হয়ে যায়
[৭৮৭] আবদুল্লাহ ইবনু সালামা বলেন, "উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে আমরা আজারবাইজান অভিযানে বেরিয়েছিলাম। আমাদের সাথে উআইস কারনিও ছিলেন। আমরা যখন ফিরে আসি তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা তাকে বহন করে নিই। কিন্তু তিনি ঠিক থাকতে পারেননি। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আমরা (এক জায়গায়) অবতরণ করি। সেখানে দেখি কবর খোঁড়া আছে। পানি ভরা আছে। কাফনের কাপড় এবং সুগন্ধি প্রস্তুত আছে। আমরা তাকে গোসল দিয়ে কাফন পরালাম। তার জানাযার সালাত আদায় করে তাকে দাফন করলাম। আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম, 'যদি আমরা ফিরে গিয়ে তার কবরের (জায়গাটা অন্যদের) চিনিয়ে দিই, তাহলে তার জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারব। এরপর ফিরে গিয়ে দেখি সেখানে কোনো কবর বা কবরের চিহ্নও নেই।”

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর তাকে খোঁজা
[৭৮৮] উসাইর ইবনু জাবের বলেন, “উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে যখন ইয়ামান থেকে কোনো দল আসত তিনি তাদের জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমাদের মধ্যে উআইস ইবনু আমের কারনি নামে কেউ আছে?' অবশেষে তিনি উআইস কারনির দেখা পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি উআইস ইবনু আমের কারনি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনি মুরাদ গোত্রের করন শাখার লোক?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জানতে চাইলেন, 'আপনার শ্বেতরোগ ছিল। তারপর এক রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকি শ্বেতরোগ ভালো হয়ে যায়?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার মা কি আছেন?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' এবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,
يَأْتِي عَلَيْكُمْ أُوَيْسُ بْنُ عَامِرٍ مَعَ أَمْدَادِ أَهْلِ الْيَمَنِ مِنْ مُرَادٍ ثُمَّ مِنْ قَرَنٍ كَانَ بِهِ بَرَضٌ فَبَرَأَ مِنْهُ إِلَّا مَوْضِعَ دِرْهَمٍ، لَهُ وَالِدَةٌ هُوَ بِهَا بَرُّ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ فَافْعَلْ
'ইয়ামানবাসীর সাথে মুরাদ গোত্রের করন শাখার উআইস বিন আমির নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আগমন করবে। তার শ্বেতরোগ ছিল। এক রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকিটুকু ভালো হয়ে যায়। তার মায়ের সেবায় সে নিয়োজিত আছে। যদি সে আল্লাহর নামে কসম করে তবে তিনি তা পূর্ণ করেন। যদি তোমার নিজের জন্য তাকে দিয়ে ক্ষমার দুআ করিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা করিয়ে নিয়ো। [১১৯]
সুতরাং আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' তখন তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তারপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কোথায় যেতে চাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'কুফায় যেতে চাচ্ছি।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে প্রস্তাব করলেন, 'আমি কি আপনার জন্য কুফার গভর্নরের কাছে লিখে দিতে পারি না, যাতে তিনি আপনার প্রতি খেয়াল রাখেন?' উআইস উত্তর দিলেন, 'সাধারণ মানুষের কাতারে থাকা আমি বেশি পছন্দ করি।'
পরের বছর তাদের (গোত্রের) সম্ভ্রান্ত এক লোক হাজ্জ করতে এলে উমারের সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি তখন তাকে উআইসের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন যে, তাকে কেমন দেখে এসেছে। সে জানাল, 'জীর্ণশীর্ণ ঘরে, সামান্য আসবাব নিয়ে তিনি থাকেন।' তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ইয়ামানবাসীর সাথে মুরাদ গোত্রের করন শাখার উআইস নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আগমন করবে। তার শ্বেতরোগ ছিল। এক রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকিটুকু ভালো হয়ে যায়। তার মায়ের সেবায় সে নিয়োজিত আছে। যদি সে আল্লাহর নামে কসম করে তবে তিনি তা পূর্ণ করেন। যদি তোমার নিজের জন্য তাকে দিয়ে ক্ষমার দুআ করিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা করিয়ে নিয়ো।' সেই ব্যক্তি কুফায় ফিরে যাওয়ার পর উআইসের কাছে এসে বলল, 'আমার জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' তিনি বললেন, 'আপনি মাত্র একটি সুন্দর সফর শেষ করে এসেছেন। আপনিই আমার জন্য ক্ষমার প্রার্থনা করুন। আপনার সাথে কি উমারের দেখা হয়েছে?' সে বলল, 'হ্যাঁ, হয়েছে।' তারপর তিনি তার জন্য ক্ষমার প্রার্থনা করলেন। লোকজন (এই বিষয়টি জেনে) তার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠল। তিনি তখন নিজের মতো (সেখান থেকে) চলে গেলেন।”
উসাইর বলেন, "আমি তাকে একটি চাদর দিয়েছিলাম। যখন কোনো মানুষ তার গায়ে সেটা দেখত, জিজ্ঞেস করত—এই চাদর উআইস কোথায় পেয়েছে?”

লোকদের সহায়তায় তিনি হাজ্জে যান
[৭৮৯] আতা খোরাসানি বলেন, “লোকেরা হাজ্জের আলোচনা করছিল। তখন তারা উআইসকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি হাজ্জ করেননি?' তিনি বললেন, 'না, করিনি।' তারা জানতে চাইল, 'কেন করলেন না?' তিনি চুপ করে রইলেন। তখন তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলল, 'আমার কাছে বাহন আছে।' অন্যজন বলল, 'আমার কাছে খরচপাতি আছে।' অন্য আরেকজন বলল, 'আমার কাছে পথখরচ আছে।' তিনি তখন তাদের থেকে সেগুলো গ্রহণ করে হাজ্জ করতে আসেন।”

টিকাঃ
[১১৫] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ২/৭৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৭৬
[১১৬] সহীহ, মুসলিম : ৬৩৭; মুস্তাদরাক হাকিম, ৩/৪৫৬
[১১৭] মুরসাল, অবশ্য তিরমিযিতে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সুপারিশের বিষয়ে বলা হয়েছে। (সুনান তিরমিযি: ২৪৩৯)
[১১৮] সূরা ইসরা, ১৭: ১০৮
[১১৯] সহীহ। এর তাহকীক পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


একাধিকবার হাজ্জ-উমরা আদায় করা
[৭৯০] আবূ ইসহাক বলেন, "আসওয়াদ আশিবারের মতো হাজ্জ-উমরা আদায় করেছেন।"
[৭৯১] আবদুল্লাহ বলেন, "আমার পিতা বলেছেন, 'আমর ইবনু মাইমুন ষাটবারের মতো হাজ্জ-উমরা করেছেন।”

ইবাদাতে চেষ্টা-সাধনা করা
[৭৯২] আবদুল্লাহ ইবনু বিশর বলেন, “আলকামা ইবনু কায়স ও আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ উভয়ে হাজ্জ করলেন। আসওয়াদ অনেক বেশি ইবাদাতগুজার ছিলেন। তো তিনি একদিন সাওম রাখলেন। দ্বিপ্রহরের সময় লোকেরা (যার যার অবস্থানস্থলে) ফিরে গেল। তার চেহারার বর্ণ তখন (গরমের কারণে) পরিবর্তন হয়ে এল। আলকামা তার কাছে এসে তার রানের ওপর আঘাত করে বললেন, 'হে আবূ উমার, তুমি কি নিজের শরীরের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না? তুমি কেন নিজের শরীরকে এত কষ্ট দিচ্ছ?' তখন আসওয়াদ উত্তর দিলেন, 'হে আবূ শিবল, আমি তো কেবল (যথাসাধ্য) চেষ্টা-সাধনা করছি।”

পরকালের শান্তির জন্য দুনিয়ায় কষ্ট করা
[৭৯৩] আলি ইবনু মুদরিক বলেন, “আলকামা আসওয়াদকে সাওম পালনকারী অবস্থায় পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কেন এই শরীরকে এতটা কষ্ট দিচ্ছেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি আসলে তার (পরকালের) শান্তির জন্যই এটা করছি।”
[৭৯৪] আবদুর রহমান ইবনু সুরদান আবূ কায়স আল-আউদি বলেন, “আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ সাওম ও ইবাদাতে নিজেকে খুব ব্যস্ত রাখতেন। যার ফলে তার শরীর শুকিয়ে গিয়েছিল এবং হলুদ বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি বলেন, 'আলকামা বলতেন, হায় রে, তুমি কেন যে এই শরীরকে এত কষ্ট দিচ্ছো!' তিনি উত্তর দিতেন, 'আসলে বিষয়টি হলো আমি পরিশ্রম করছি, আসলে বিষয়টি হলো আমি পরিশ্রম করছি।”

ইরাকের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি
[৭৯৫] আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, “ইরাকে আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদের চেয়ে বেশি সম্মানিত কেউ নেই।”

অত্যধিক নফল সালাত পড়তেন
[৭৯৬] আবদুল্লাহ ইবনু ইদরীস বলেন, “আমি মালিক ইবনু মিগওয়ালকে বলতে শুনেছি, একদিন তাকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'তোমার সালাতের কী অবশিষ্ট আছে?' তখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, '(আগের তুলনায়) অর্ধেকটা। দুই শ পঞ্চাশ রাকাত।”[১২০]

তার কপালে সাজদার দাগ ছিল
[৭৯৭] আবদুল কারীম আল-আয়ামি বলেন, “আমরা মুররা হামদানীর কাছে আসলাম। তিনি বের হয়ে (আমাদের সামনে) এলেন। তখন আমরা তার কপালে, হাতের তালুতে, হাঁটুতে ও পায়ে সাজদার চিহ্ন দেখতে পেলাম। তিনি আমাদের কাছে কিছু সময় বসলেন। তারপর উঠে গেলেন। (কেমন যেন তিনি পুরোটা সময়) রুকু-সাজদাতেই ছিলেন।"

রাতে তারা তিলাওয়াত করতেন
[৭৯৮] আবুল আহওয়াস বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি রাতে তাঁবুতে আগমন করত তবে মৌমাছির গুনগুন আওয়াজের ন্যায় তাঁবুতে অবস্থানকারীদের আওয়াজ শুনতে পেত। ইনারা তো নিরাপদ সেই শঙ্কা থেকে, যার আশঙ্কা উনারা করতেন।[১২১]

প্রত্যেক মানুষেরই ভুলত্রুটি থাকে
[৭৯৯] তালহা বললেন, “প্রত্যেক মানুষেরই দিনের ভুলত্রুটি থাকে।” তখন তার এক গোলাম তাকে বলল, “যদি এটাই আপনার কর্মপন্থা হয়, তাহলে আপনি দৃষ্টিশক্তি হারাবেন এবং নিজের জন্য একজন পথপ্রদর্শক আপনার প্রয়োজন হয়ে পড়বে।”

নবিজির সাথে প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ
[৮৩৬] খলাফ ইবনু আয়ান বলেন, “যখন বাকর ইবনু ওয়ায়েলের প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'কুস ইবনু সায়েদাহ আল-ইয়াদি কী করেছে?' তারা জানাল, 'সে তো মারা গেছে হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'আমি যেন উটের ওপর বসা উকাযের বাজারে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছি আর সে বলছে—হে লোকসকল, তোমরা একত্র হয়ে আমি যা বলছি শোনো এবং তা মনে রাখো। যে বেঁচে আছে সে মারা যাবে, আর যে মারা যাবে সে বঞ্চিত হবে। প্রত্যেক যা কিছু ঘটার তা ঘটবেই। বিছানা বিছানো হয়ে গেছে। ছাদ তুলে নেওয়া হয়েছে। তারকা ছুটোছুটি করছে। সমুদ্র আরও গভীর হচ্ছে। আসমানে আছে সংবাদ আর জমিনে আছে অনেক শিক্ষার উপকরণ। আল্লাহর কসম, তোমরা যে ধর্মে রয়েছে আল্লাহর তারচেয়ে বেশি পছন্দনীয় একটি দ্বীন রয়েছে।” [১২৯]
বর্ণনাকারী বলেন, “তারপর তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, তখন কওমের এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি একটি কবিতা আবৃত্তি করব।' তারপর সে তাদের আবৃত্তি করে শোনাল,
فِي الذَّاهِبِينَ الْأَوَّلِينَ ... مِنَ الْقُرُونِ لَنَا بَصَائِرُ لَمَّا رَأَيْتُ مَوَارِدًا لِلْمَوْ ... تِ لَيْسَ لَهَا مَصَادِرُ لَا يَرْجِعُ الْمَاضِي إِلَى ... وَلَا مِنَ الْبَاقِينَ غَابِرُ أَيْقَنْتُ أَنِّي لَا مَحَالَةً ... حَيْثُ صَارَ الْقَوْمُ صَائِرُ
যুগে যুগে যারা গত হয়েছে তাদের থেকে আমাদের আছে অনেক কিছু শিখবার।
যখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, কোনো উপায় নেই মৃত্যুর পথ থেকে বাঁচবার। অতীত আমার কাছে ফিরে আসবে না কভু, বেঁচে রবে না বাদবাকি মানুষেরা। দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে আমার—অবশ্যই আমি উপনীত হব সেথায়, যেথায় গমন করেছে লোকেরা।”

অধিক সাজদাকারীদের চেহারা শুভ্র হবে
[৮৩৭] মুজাহিদ থেকে বর্ণিত,
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ
“তাদের পরিচয় হলো তাদের চেহারায় সাজদা-চিহ্ন থাকে।” [১৩০] তিনি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “দুনিয়াতে বেশি বেশি সাজদা করার কারণে কিয়ামাতের দিন তাদের চেহারা শুভ্র হবে।”

সন্তানের জন্য দুআ
[৮৩৮] সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা বলেন, “যখন যর ইবনু উমার ইবনু যর মারা গেলেন তখন উমার ইবনু যর বললেন, ‘ওহে যার, তোমার শোকে আমরা এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, তোমার (কবরে কী হবে সেই) ব্যাপারে আমরা দুশ্চিন্তা করার সময় পাইনি। হায়! (কবরে) তুমি কী বলেছ, আর তোমাকে কী বলা হয়েছে তা যদি জানতে পারতাম! হে আল্লাহ, আমার অধিকার আদায় করতে গিয়ে যরের যেটুকু ঘাটতি হয়েছে, আমি তা তাকে দিয়ে দিলাম; তোমার দায়িত্ব পালনে তার যেটুকু ঘাটতি হয়েছে, তুমি তাকে সেটুকু মাফ করে দাও।
সুফিয়ান বলেন, উমার ইবনু যর আয়াতটি পড়তেন :
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
“বিচারদিনের মালিক।” [১৩১]

সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে আফসোস করা
[৮৩৯] আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু আবী দাহরাশ যখন ফজরের সময় আগত হতে দেখতেন, তখন ব্যথিত হতেন। (কারণ, জীবনের একটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেল)। তিনি বলতেন, "আমি এখন মানুষের সাথে আছি। কিন্তু আমার জানা নেই নিজের জন্য আমি কী অর্জন করলাম।" 우স্মান ইবনু আবী দাহরাশ বলেন, “আমি প্রত্যেক সালাতের পরেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি-তাতে যে কমতি হয়েছে এর জন্য।”

মৃত্যুই যেন ইফতার হয়
[৮৪০] মুসলিম ইবনু জাফর বলেন, “আমি মুহাম্মাদ বিন বিশরকে বলতে শুনেছি যে-দুনিয়া থেকে সাওম রেখে (বিদায় গ্রহণ করো)। মৃত্যুই যেন হয় তোমার ইফতার। কষ্ট প্রলম্বিত হওয়ার ভয়ে ওষুধ খেতে থাকা আপন ক্ষতের চিকিৎসাকারীর ন্যায় হও। এর মাধ্যমে তুমি দীর্ঘ প্রশান্তি লাভ করবে।”[১৩২]

মৃত্যুর আলোচনা শুনে মারা গেলেন
[৮৪১] আবুল মুগীরা বলেন, “আমরা রমাদান মাসের কোনো এক রাতে উমার ইবনু যরের মজলিসে ছিলাম। যরের পুত্র তখন আলোচনা করল এবং মৃত্যুর উপস্থিত হওয়ার কথা এবং মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির কাছে আগমন করা রহমত ও আযাবের ফেরেশতার কথা আলোচনা করল। একজন যুবক (তা শুনে) লাফ দিয়ে উঠল এবং চিৎকার করতে করতে ও তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।”

ভাড়াটে লোকের কান্না
[৮৪২] ইবনুস সাম্মাক বলেন, “যর তার পিতা উমার ইবনু যরকে বলল, 'আলোচকদের কী হলো যে, তারা আলোচনা করলে কেউ কাঁদে না। কিন্তু যখনই আপনি আলোচনা করেন তখন এখান-সেখান থেকে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে?' তিনি বললেন, 'হে আমার ছেলে, ভাড়াটে ক্রন্দনকারীর ক্রন্দন কখনো সন্তানহারা মায়ের ক্রন্দনের মতো হয় না।”

নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করা
[৮৪৩] আবূ হাইয়ান তাইমি বলেন, “আমি ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যখনই আমি আমার কথাকে কাজের সামনে পেশ করেছি, তখনই আশঙ্কা হয়েছে যে, আমি মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন হব।”

টিকাঃ
[১২০] অর্থাৎ তিনি যৌবনে পাঁচ শ রাকাত করে পড়তেন। এখন বৃদ্ধ হয়ে যাবার পর সালাতের পরিমাণটা কমে গেলেও এখনো অর্ধেকটা অবশিষ্ট আছে। যার পরিমাণ হলো দৈনিক দুই শ পঞ্চাশ রাকাত।- অনুবাদক
[১২১] অর্থাৎ যেখানে সাহাবি ও তাবিয়িরা তাঁবু ফেলে অবস্থান করতেন সেখানে যে রাতে আগমন করত সে তাদের রাত জেগে কুরআন তিলাওয়াত ও যিকর-আযকারের শব্দ শুনতে পেত। আবুল আহওয়াস তার বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, তার সময়কার লোকেরা নিরাপদ হলেও তাদের পূর্ববর্তী মুজাহিদরা ঠিকই শত্রুর অনিষ্টতার আশঙ্কা করতেন। -অনুবাদক
[১২৯] সনদ যঈফ। বাইহাকি, দালায়িলুন নাবুওয়াতি, ২/১০১; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/৬২৩
[১৩০] সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৯
[১৩১] সূরা ফাতিহা, ১: ৩
[১৩২] অর্থাৎ দুনিয়াতে ইবাদাতের কষ্ট করে গেলে আখেরাতে জান্নাতে দীর্ঘ সুখ লাভ করবে।-অনুবাদক

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 মাসরুক রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 মাসরুক রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


যিকরে থাকা সালাতে থাকার মতোই
[৮০০] মাসরূক বলেন, “যতক্ষণ কারও অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকে, ততক্ষণ সে সালাতের মধ্যে থাকে। যদিও তার অবস্থান বাজারের মধ্যে হয়।”

সাজদারত অবস্থায় ঘুমানো
[৮০১] আবূ ইসহাক বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ হাজ্জ করেছেন এমন অবস্থায় যে, যখনই তিনি ঘুমিয়েছেন তখনই কপালের ওপর সাজদারত অবস্থায় ছিলেন।”

সাজদা ছাড়া সবকিছুর জন্য দুঃখবোধ
[৮০২] সাঈদ ইবনু জুবায়ের বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলাকে সাজদা করা ছাড়া, দুনিয়ার বাকি সবকিছুর জন্য আমার দুঃখবোধ হয়।”

কপালকে মাটিতে ধূসরিত করা
[৮০৩] সাঈদ ইবনু জুবায়ের বলেন, “একদিন মাসরূকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, 'হে আবূ সাঈদ, নিজেদের কপালকে ধুলোয় ধূসরিত করা ছাড়া আগ্রহান্বিত হওয়ার মতো আর কিছুই নেই।”

ইলম অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করা
[৮০৪] আবদুল্লাহ ইবনু মুররা বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'মানুষ তার ইলম অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করে এবং নিজের অজ্ঞতা অনুপাতে নিজের ইলমের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে।”

প্রতিটি পদক্ষেপে নেকি বা গুনাহ হয়
[৮০৫] সুলাইমান থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "মানুষ যখনই কোনো পদক্ষেপ নেয়, এর জন্য তার আমলনামায় একটি নেকি অথবা একটি গুনাহ হয়। বরাদ্দ হয়। (অর্থাৎ ভালো কাজের জন্য হলে নেকি বরাদ্দ হয় আর খারাপ কাজের জন্য হলে গুনাহ)।”

কবিতার প্রতি অনীহা
[৮০৬] মুসলিম থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ-কে একটা কবিতার পঙ্ক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “আমি চাই না, আমার আমালনামায় কবিতার কোনো বিষয় থাকুক।”

রিযকের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস
[৮০৭] আবদুল্লাহ ইবনু মুররা থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'খাদিম যখন এসে বলে, আমাদের কাছে খাবারও নেই, পয়সাও নেই, তখন আমি রিযকের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস রাখতে পারি না!'

আল্লাহ তাআলাই দান করেন ও দান বন্ধ করেন
[৮০৮] মুসলিম থেকে বর্ণিত, وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا “যে আল্লাহকে ভয় করবে তিনি তার জন্য উপায় বের করে দেবেন।” [১২২] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "উপায় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—এই কথা জানা যে, আল্লাহ তাআলাই দান করেন ও দান বন্ধ করেন।”

আল্লাহর ওপর ভরসা
[৮০৯] আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে তিনি তার জন্য যথেষ্ট হবেন।”[১২৩] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তিই আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনি কি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান না? হ্যাঁ, যে তার ওপর ভরসা করে তিনি তার পাপ মোচন করেন এবং তার প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেন।"
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ "নিশ্চয়ই তিনি তার কাজ সমাধা করবেন।" [১২৪] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে তার ওপর ভরসা করে আর যে করে না, এখানে তাদের বিষয়ে বলা হয়েছে।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটা পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।” [১২২] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “পরিমাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—সময়সীমা।”

নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করা
[৮১০] মুসলিম থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মানুষ এই বিষয়ের উপযুক্ত যে, সে নির্জন মজলিসে উপস্থিত হয়ে নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করবে এবং এর থেকে তাওবা করবে।”

দুনিয়া আমাদের নিচে
[৮১১] ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু মুনতাশির বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ প্রতি শুক্রবার একটি খচ্চরে আরোহণ করে আমাকে তার পেছনে চড়িয়ে নিতেন। তারপর জীযা নামক স্থানের একটি পুরাতন ইবাদাতখানায় এসে তাতে খচ্চরকে রেখে বলতেন, ‘দুনিয়া আমাদের নিচে।’”

কবরে থাকা মুমিনকে ঈর্ষা করা
[৮১২] খিফাফ ইবনু আবূ সারিয়া বলেন, “মাসরূক বলেছেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করি কবরে থাকা সে মুমিনকে, যে শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে এবং দুনিয়া থেকে (বিদায় নেবার মাধ্যমে) প্রশান্তি লাভ করেছে।’”

লম্বা সালাত আদায়
[৮১৩] আনাস ইবনু সিরীন মাসরূকের স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন যে, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ এত লম্বা সালাত আদায় করতেন যে, তার উভয় পা ফুলে যেত। নিজের প্রতি করা এমন (কষ্টকর) কাজের কারণে, তার স্ত্রী বসে বসে কাঁদতেন।”

আল্লাহ তাআলা থেকে সতর্কতা অবলম্বন
[৮১৪] শাবি থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে, তখন সে যেন আল্লাহ তাআলা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করে।”

যে আল্লাহকে ভালোবাসে তাকেও ভালোবাসা
[৮১৫] এক ব্যক্তি মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ-কে বলল, “আমি আল্লাহর জন্য আপনাকে ভালোবাসি।” তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহকে ভালোবেসেছ, তাই যে আল্লাহকে ভালোবাসে তাকেও ভালোবাসো।”

তিনি চরিত্রবান ছিলেন
[৮১৬] আবূ ওয়ায়েল বলেন, “আমি মাসরূকের সাথে ছিলাম। তিনি তখন সিলসিলাহ এলাকাতে আমীর হিসেবে ছিলেন। আমি তার থেকে চরিত্রবান কাউকে দেখিনি। তিনি কেবল দজলা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করতেন।”

এক যুবকের নাসীহাত
[৮১৭] শাবি বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ-কে জিয়াদ 'সিলসিলাহ' এলাকার কর্মকর্তারূপে পাঠালেন। যখন মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বের হলেন, তখন তার সাথে তাকে বিদায় জানানোর উদ্দেশ্যে কুফার কারিগণও বের হলেন। তাদের মধ্যে ঘোড়ায় চড়া এক যুবক ছিল। যখন তিনি ফিরে এলেন এবং নিজের কয়েকজন সঙ্গীর সাথে অবস্থান করছিলেন, তখন সেই যুবক তার নিকটবর্তী হয়ে তাকে বললেন, 'আপনি তো কুফার কারিদের প্রধান ও তাদের সর্দার। যদি জানতে চাওয়া হয়, তাদের মধ্যে কে সর্বশ্রেষ্ঠ? উত্তর আসবে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী কে? উত্তর আসবে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ। যদি প্রশ্ন করা হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ কে? উত্তর আসবে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ। আপনার সুনাম তাদেরই সুনাম। আপনার বদনাম তাদেরই বদনাম। আল্লাহর দোহাই দিয়ে আমি আপনাকে বলি, অথবা তিনি বলেছেন, আল্লাহর কাছে আমি আপনার ব্যাপারে পানাহ চাচ্ছি এই বিষয় থেকে যে—আপনি নিজের ব্যাপারে দরিদ্রতা বা দীর্ঘ আশা পোষণের কথা বলবেন।' তখন মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, "আমি যে অবস্থায় আছি, তুমি কি সে ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করবে না?' সে উত্তর দিলো, 'আল্লাহর কসম, আপনি যে অবস্থায় আছেন আমি তাতে মোটেও সন্তুষ্ট নই। সুতরাং আমি কী করে আপনাকে সহায়তা করব? আপনি চলে যান।' যুবক প্রস্থান করার পর মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'এই যুবকের নাসীহাত আমাকে যতটা স্পর্শ করেছে, কোনো নাসীহাত তা করেনি।' সুফিয়ান বলেন, 'যখন মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ তার সেই কাজ থেকে ফিরে এলেন, তখন তার কাছে আবুল ওয়ায়েল আগমন করলেন। মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'আমি এমন কোনো কাজ করিনি, যার ব্যাপারে আমি শঙ্কাবোধ করছি যে তা আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তবে এই কাজটি ছিল এর ব্যতিক্রম। আমি এতে (অর্থাৎ কর্মকর্তা হয়ে সিলসিলাহ নামক এলাকায় গমন করার কাজে) কোনো মুসলিম বা চুক্তিবদ্ধ কাফিরের প্রতি জুলুম করিনি।”

কিয়ামাতের দিন আফসোস
[৮১৮] হারেস ইবনু উমাইরা থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “বিপদগ্রস্ত লোকেরা কিয়ামাতের দিন আফসোস করবে যে, যদি (দুনিয়াতে) তাদের চামড়াগুলো কাঁচি দিয়ে কাটা হতো!”[১২৬]
[৮১৯] তালহা থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “দুনিয়াতে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিরা বিপদের অনুপাতে কিয়ামাতের দিন প্রতিদান পাবার সময় খুব আফসোস করবে। এমনকি কেউ কেউ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, যদি দুনিয়াতে তার চামড়া কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা হতো!”

মাসজিদ আল্লাহর ঘর
[৮২০] আমর ইবনু মায়মুন বলেন, “মাসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। আর যাকে দেখতে যাওয়া হয় তার দায়িত্ব হলো—দেখা করতে আসা ব্যক্তিকে সম্মান করা।”

কোনো মুসলিমকে ধোঁকা না দেওয়া
[৮২১] ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, “মায়মুন ইবনু আবী শাবীব কোনো জাল রৌপ্যমুদ্রা দেখলে তা ভেঙে ফেলতেন। তিনি বলতেন, ‘কোনো মুসলিম যাতে তোমার মাধ্যমে ধোঁকাগ্রস্ত না হয়।”

একজন ঘোষকের ঘোষণা
[৮২২] হাসান ইবনু হুর থেকে বর্ণিত, মায়মুন ইবনু আবী শাবীব বলেছেন, “হাজ্জাজের শাসনামেলে আমি একবার জুমুআর সালাতে যাবার ইচ্ছায় প্রস্তুতি নিলাম। তো (মনে মনে) বললাম, আমি কোথায় যাব? এর (হাজ্জাজের) পেছনে সালাত আদায় করব? তাই একবার ভাবলাম যাব। আবার ভাবলাম যাব না। শেষ পর্যন্ত যাওয়ার ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত স্থির করলাম। এমন সময় ঘরের পাশ থেকে একজন ঘোষক আমাকে ডাক দিয়ে বলল:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ
'হে ঈমানদারগণ, যখন জুমুআর দিন সালাতের জন্য আহ্বান জানানো হয়, তখন আল্লাহর স্মরণে দ্রুত এগিয়ে যাও।”[১২৭]
তিনি বলেন, “অতঃপর আমি গমন করলাম। একদিন আমি এক গ্রন্থ রচনায় হাত দিলাম। আমার সামনে এমন একটি বিষয় উপস্থিত হলো, যদি তা লিখি—তবে আমার গ্রন্থটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হলেও—আমি নিজে মিথ্যাবাদী হয়ে যাই। আর যদি না লিখি—তবে আমি নিজে সত্যবাদী প্রতীয়মান হলেও—গ্রন্থটিতে কিছুটা অসৌন্দর্য চলে আসে। তাই একবার ভাবছিলাম, গ্রন্থটা লিখে ফেলি। আরেকবার ভাবছিলাম, নাহ থাক; লিখব না। শেষ পর্যন্ত না লেখার ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত স্থির করলাম। তাই তা বাদ দিলাম। সে সময় ঘরের পাশ থেকে একজন ঘোষক আমাকে ডেকে বলল:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
‘আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দুনিয়া-আখিরাতে সুদৃঢ় কথার মাধ্যমে দৃঢ়পদ রাখবেন।'”[১২৮]

টিকাঃ
[১২২] সূরা তালাক, ৬৫: ২
[১২৩] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[১২৪] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[১২৫] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[১২৬] অর্থাৎ দুনিয়াতে যার বিপদ যত বেশি হবে আখেরাতে তার প্রতিদান তত বেশি হবে। তাই বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি আফসোস করবে যে, দুনিয়াতে যদি তার বিপদ অনেক বেশি হতো, তাহলেই তো ভালো হতো। এর ফলে আখেরাতে এখন সে বেশি প্রতিদান পেত।-অনুবাদক
[১২৭] সূরা জুমুআ, ৬২: ৯
[১২৮] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ২৭

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আমর ইবনু উতবা রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আমর ইবনু উতবা রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


শহীদের প্রতি ভালোবাসা
[৮২৩] আলকামা বলেন, "আমরা একবার যুদ্ধে বের হলাম। তখন আমাদের সাথে ছিল আসওয়াদ, আমর ইবনু উতবাহ, মিদাদ। যখন আমরা সীদানের পানির স্থানে আসলাম-আমাদের আমীর ছিলেন উতবাহ ইবনু ফারকাদ-তখন তার ছেলে আমর ইবনু উতবাহ বললেন, 'যদি আপনারা তার কাছে অবতরণ করেন, তবে সে আপনাদের আতিথেয়তার ব্যবস্থা করবে। হতে পারে (আতিথেয়তা করতে গিয়ে) সে কারও ওপর জুলুম করে ফেলবে। তাই যদি আপনারা চান, তবে আমরা এই গাছের ছায়াতেই বিশ্রাম নেব এবং নিজেদের রুটির খণ্ডিত টুকরো থেকে ভক্ষণ করব।' অতঃপর আমরা ফিরে এলাম এবং (তার কথা অনুযায়ী) করলাম। যখন আমরা ভূমিতে আসলাম, তখন আমর ইবনু উতবা একটি সাদা জুব্বা ছিঁড়ে গায়ে দিলো। তারপর বলল, 'আল্লাহর কসম, এর ওপর রক্ত গড়িয়ে পড়া বেশি সুন্দর (দেখাবে)।' তারপর তার প্রতি (তির) নিক্ষিপ্ত হলো। আমি দেখলাম সে যে জায়গা ধরে রেখেছে, সেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। এরপর সে মৃত্যুবরণ করল। পরবর্তী দিন আমরা ভোরের শীতলতার মধ্যে রওনা হলাম। আমি মিদাদকে আমার চাদর দিয়ে দিলাম। সে তা পরে নিল। ইবনুল দাওরাকি বলেন, 'সে তা পাগড়ি হিসেবে পরিধান করল। তারপর তার প্রতিও (তির) নিক্ষিপ্ত হলো। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, এটা অনেক ছোট। আর আল্লাহ তাআলা ছোট জিনিসের মধ্যে বরকত দান করেন।' সেই আঘাতের কারণে তারও মৃত্যু হলো। পরবর্তীকালে আলকামা সেই চাদর পরিধান করে বলতেন, 'এতে মিদাদের রক্ত দেখে তার প্রতি আমার ভালোবাসা আরও বৃদ্ধি পায়।”

জিহাদের জন্য কেনা ঘোড়ার প্রতি কদমে নেকি
[৮২৪] আমাশ বলেন, “আলকামা ইবনু কায়েস, আমর ইবনু উতবা ও মিদাদ বালানযার অভিযানে বের হলেন। তখন আমর ইবনু উতবা (জিহাদের জন্য) চার হাজার দিরহাম দিয়ে একটা ঘোড়া কিনলেন। অন্যরা তাকে বলল, 'তুমি খুব বেশি দাম দিয়ে ফেলেছ।' তিনি বললেন, 'আমি চাই যে, সে প্রতি কদম উঠাবে ও ফেলবে তার বিনিময়ে আমাকে এক দিরহাম এক দিরহাম করে দেওয়া হবে।”

সাজদা করা এবং নৈকট্যবান হওয়া
[৮২৫] উতবা ইবনু ফারকাদ আবদুল্লাহ ইবনু রবীআকে বললেন, “হে আবদুল্লাহ, তুমি কি আমাকে—তোমার ভাতিজার ব্যাপারে আমি যে কাজ করছি—তাতে সহায়তা করবে না?” আবদুল্লাহ বললেন, “হে আমর, তুমি আপন পিতার আনুগত্য করো।” তারপর তিনি মিদাদের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি তাদের সাথে বসে আছেন। তখন তাকে বললেন, “তুমি তাদের অনুগত হোয়ো না। সাজদা করো এবং নৈকট্যবান হও। আমাশ কেন সাজদা করেননি?” আমর বললেন, "হে আমার পিতা, আমি একজন গোলাম। যে কিনা নিজের মুক্তির জন্য কাজ করে।” তখন উতবা কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, “হে আমার ছেলে, আমি তোমাকে দুভাবে ভালোবাসি। একটা হলো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। অন্যটা হলো পুত্রের প্রতি পিতার ভালোবাসা।” আমর বলল, “হে আমার পিতা, আপনি আমার কাছে এত সম্পদ নিয়ে এসেছেন, যা সত্তর হাজারের মতো হবে। যদি আপনি তা আমার কাছে চান, তবে তা-ই হবে। আপনি তা গ্রহণ করে নিন। অন্যথায় আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমি তা খরচ করব।” বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি সবটুকু খরচ করেছিলেন। এমনকি একটা দিরহামও আর বাকি থাকেনি।”

বিয়ের প্রতি অনীহা
[৮২৬] সিরীন থেকে বর্ণিত, “উতবা ইবনু ফারকাদ তার ছেলে আমরের কাছে বিবাহের প্রস্তাব পেশ করল। সে তা নাকচ করে দিলো। তখন তিনি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে গিয়ে অভিযোগ জানালেন। উসমান তার ছেলে আমর ইবনু উতবার কাছে এই মর্মে লিখে পাঠালেন, যেন সে যাতে তার কাছে উপস্থিত হয়। (উপস্থিত হবার পর) উসমান তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাকে বিবাহ করতে কিসে বারণ করল? অথচ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবূ বাকর ও উমার বিবাহ করেছেন। এবং আমরাও তাদের থেকে যা (উপকার) পাবার পাচ্ছি।' আমর তাকে উত্তর দিলো, 'হে আমিরুল মুমিনিন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমলের মতো এবং আবূ বাকর, উমার ও আপনার আমলের মতো আমল কে করতে পারবে?' সে যখন তাকে এই কথা বলল তখন তিনি তাকে বললেন, 'ঠিক আছে তুমি চলে যাও। যদি তোমার মন চায় তবে বিয়ে কোরো। আর যদি মন না চায় তবে কোরো না।”

কবরের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি
[৮২৭] ঈসা ইবনু উমার বলেন, "আমর ইবনু উতবা ইবনু ফারকাদ রাতের বেলায় তার ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন। তারপর কয়েকটি কবরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে কবরবাসী, আমলনামা গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমল তুলে নেওয়া হয়েছে।' তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং সকাল হওয়া পর্যন্ত দুই পা সোজা করে অবস্থান করলেন। এরপর ফিরে গিয়ে ফজরের সালাতে অংশগ্রহণ করলেন।”

মেঘমালা তাকে ছায়া দিত
[৮২৮] আলি ইবনু সালেহ বলেন, “আমর ইবনু উতবা তার সঙ্গীদের বাহনগুলো চরাতেন আর মেঘমালা তাকে ছায়া দিত।”

হিংস্র প্রাণী তাকে পাহারা দিত
[৮২৯] আলি ইবনু সালেহ বলেন, “আমর ইবনু উতবা সালাত আদায় করতেন আর হিংস্র প্রাণী তাকে পাহারা দিত।”

আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করতেন না
[৮৩০] আমর ইবনু উতবার একজন আযাদকৃত দাস বলেন, “একদিন গরমের সময়ে আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠে আমর ইবনু উতবাকে খুঁজতে খুঁজতে পাহাড়ের ওপর তার দেখা পেলাম। তখন তিনি সাজদারত ছিলেন আর মেঘ তাকে ছায়া দিচ্ছিল। আমরা যখন যুদ্ধে বের হতাম, তখন তার সালাতের আধিক্যতার কারণে আমাদের পাহারা দিতে হতো না। (কারণ, রাত জেগে তিনি সালাত আদায় করতেন।) একরাতে তাকে দেখলাম সালাত আদায় করছেন। তখন আমরা সিংহের গর্জন শুনে পালিয়ে গেলাম। কিন্তু তিনি সরে না গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে থাকেন। আমরা তাকে বললাম, ‘আপনি কি সিংহকে ভয় করেন না?’ তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহকে বাদ দিয়ে সিংহকে ভয় পেতে লজ্জাবোধ করি।”

তিনটি প্রার্থনা
[৮৩১] আমাশ থেকে বর্ণিত, আমর ইবনু উতবা ইবনু ফারকাদ বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে তিনটা জিনিস চেয়েছি। তিনি আমাকে দুটা দিয়েছেন, আমি এখন তৃতীয়টা পাওয়ার অপেক্ষা করছি। তার কাছে আমি প্রার্থনা করেছি, যাতে করে তিনি আমাকে দুনিয়াবিমুখ বানিয়ে দেন। তাই দুনিয়ার কী এল আর কী গেল, তাতে আমি ভ্রুক্ষেপ করি না। তার কাছে আমি আবেদন করেছিলাম—যাতে তিনি আমাকে সালাতে দণ্ডায়মান থাকার মতো শক্তি দান করেন। তিনি আমাকে তা দিয়েছেন। আরেকটা হলো আমি তার কাছে শহীদ হওয়ার নিবেদন করেছি। এখন তারই প্রতীক্ষায় আছি।”

সিংহও তাকে সমীহ করত
[৮৩২] মুহাম্মাদ বলেন, “আমি যাদের সাহচর্যে থেকেছি তাদের মধ্যে আমর ইবনু উতবা এমন ব্যক্তি, যে সব সময়ই অনুসরণীয়। এক রাতে তিনি তাঁবুতে সালাত আদায় করছিলেন আর তার সঙ্গী তাঁবুর বাইরে সালাত আদায় করছিল। ইত্যবসরে একটি সিংহ এসে তার সঙ্গীর কেবলার সামনে দিয়ে অতিক্রম করে গেল। কিন্তু সে সরে যায়নি। এরপর সিংহটি তাঁবুর কাছে এসে আমরের পায়ের কাছে গুটিয়ে বসল। যখন তিনি সাজদা করতে চাইলেন, তখন সিংহটি সরে গিয়ে তার সাজদার স্থানে এসে জড়সড় হয়ে বসল। তখন তিনি (ওই অবস্থায়) সাজদা করলেন। অথবা বর্ণনাকারী বলেছেন, তিনি গলা খাঁকারি দিলেন। সন্দেহটা হয়েছে বর্ণনাকারী বিশরের। তারপর সকাল হলে আমরের সঙ্গী তার কাছে এসে জানাল যে, তার সামনে দিয়ে সিংহটি অতিক্রম করেছিল কিন্তু সে সরে যায়নি। সে ভেবেছিল সিংহটি হয়তো কিছু একটা করে বসবে। তখন আমরও তার পায়ে থাকা সিংহটির চিহ্ন তাকে দেখালেন এবং সিংহটি যা করেছে সে বিষয়ে তাকে জানালেন।”

মেঘ তাকে ছায়া দিত
[৮৩৩] হাওত ইবনু রাফে থেকে বর্ণিত, আমর ইবনু উতবাহ তার সঙ্গীদের কাছে শর্ত করলেন যে, তিনি তাদের খাদেম হবেন। বর্ণনাকারী বলেন, "একদিন গরমের ভেতর তিনি চারণভূমিতে বের হলেন। তখন তার একজন সঙ্গী তার কাছে আগমন করে দেখতে পেল যে, মেঘমালা তাকে ছায়া দিচ্ছে আর তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তখন বিশর বললেন, 'হে আমর।' তারপর আমর তাকে ধরলেন, যেন তিনি এই বিষয়ে কাউকে কিছু না জানান।"

বিবাহের প্রতি অনাগ্রহ
[৮৩৪] মুহাম্মাদ ইবনু আমর ইবনু উতবাহ ইবনু ফারকাদ থেকে বর্ণিত, একবার তার পিতামাতা তাকে বিবাহ দেওয়ার ইচ্ছা করলেন, কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। তখন তারা উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সহায়তা নিলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার, তুমি বিয়ে করতে চাচ্ছ না কেন? অথচ নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে করেছেন, আবূ বাকর, উমার বিয়ে করেছেন। আমি নিজে বিয়ে করেছি।” তিনি উত্তর দিলেন, “আপনাদের মতো আমল করার সাধ্য কি আর আমার আছে!” উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!” তারপর তিনি তার চেহারা ঘুরিয়ে হাত দিয়ে ঢেকে ফেললেন। ঠিক যেভাবে কেউ অপছন্দনীয় কিছু দেখলে করে থাকে। (এভাবেই) বর্ণনাকারী উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতিক্রিয়ার অবস্থা ব্যক্ত করেছেন। যখন তারা তাকে খুব পীড়াপীড়ি করল তখন তিনি বললেন, “ঠিক আছে, আমি বিয়ে করব।” জারীরের কন্যাকে তার বিয়ের প্রস্তাব জানানো হলো। তিনি বললেন, "আমি মেয়ের সাথে কথা না বলে বিয়ে করব না।” তারা বলল, “ঠিক আছে তা-ই হোক।”
আবুল হাসান বলেন, “এই ঘটনার ব্যাপারে আমাকে ফাহদ ইবনু আওফ বর্ণনা করেছেন বিশর ইবনু মুফাদদলের সূত্রে, তিনি সালামা ইবনু আলকামা থেকে, তিনি মুহাম্মাদ থেকে। অতঃপর তারা জারীরের কন্যাকে নিয়ে এল। তিনি তাকে বললেন, 'দেখো, আমার তো স্ত্রীর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার পিতামাতা বিয়ের জন্য খুব পীড়াপীড়ি করছেন। তো তাদের কাছে তোমার চাহিদা অনুপাতে খাদ্য-বস্ত্র তুমি পাবে।' মেয়ে বলল, 'ঠিক আছে আমি সন্তুষ্ট।'”
বর্ণনাকারী বলেন, “যখন তারা (বিয়ের পর মেয়েকে) নিয়ে রাতের বেলা তার কাছে এল, তখন তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। মেয়েটিও তার পেছনে দাঁড়িয়ে সকাল হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করতে লাগল। (পরের দিন) সকালটা তিনি শুরু করলেন সাওম পালনকারী অবস্থায়। তো স্ত্রীও তা-ই করল।”
বর্ণনাকারী বলেন, “আমর বললেন, 'যদি আমি সময় নেই, তবে তার অবস্থা আমার জন্য (বেশি পরিমাণে ইবাদাতের ক্ষেত্রে) বাধা হয়ে দাঁড়াবে।' তখন তার পিতামাতা তাকে বললেন, 'আমরা সন্তানের আশায় তোমাকে বিয়ে দিয়েছি, এসবের জন্য নয়। সুতরাং তুমি তাকে তালাক দাও।' তিনি তাকে তালাক দিলেন। তারপর আরেকটি মেয়ের জন্য তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া হলো। তিনি বললেন, 'আমি কথা না বলে কোনো মেয়েকে বিবাহ করব না।' পিতামাতা মেয়েকে তার কাছে নিয়ে এলেন। তাকেও তিনি সে রকম কথা বললেন, যা জারীরের মেয়েকে বলেছিলেন। তারপর কিছুকাল অতিবাহিত হলো। একদিন তিনি শুয়ে ছিলেন। দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ঘুমে। পরিবারের একজন মহিলা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, 'হে অমুক, কী ব্যাপার তোমার এখনো সন্তান হচ্ছে না। তুমি অক্ষম নাকি?' সে উত্তর দিলো, 'স্বামীহীনা কারও কি সন্তান হয়?' এই কথা শুনতে পেয়ে আমর তাকে তালাক দিয়ে দিলেন এবং তার পিতামাতা তাকে বিদায় দিলেন।"

শাহাদাতের তামান্না কবুল হওয়া
[৮৩৫] সুদ্দী বলেন, “আমর ইবনু উতবার চাচাতো ভাই আমার কাছে বর্ণনা করে বলেছেন যে, আমরা (জিহাদে বের হয়ে) একটি চমৎকার উদ্যানে অবতরণ করলাম। তখন আমর ইবনু উতবা বলল, 'এই উদ্যানটি কত সুন্দর! এখানের সময়টা কতই-না চমৎকার হতো যদি কোনো আহ্বানকারী আহ্বান করে বলত, 'হে আল্লাহর ঘোড়সওয়ারি, তুমি আরোহণ করো।' অতঃপর এই কথা বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। সর্বপ্রথম তারই মৃত্যু হয়। মৃত অবস্থায় তাকে পেয়ে নিয়ে আসা হলো এবং সেই স্থানে তাকে দাফন করা হলো”

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00