📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


মানুষের আয়ু ও আশার দৃষ্টান্ত
[৬৯৪] রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন, “একদিন রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি চতুর্ভুজ আঁকলেন এবং এর মধ্যখানে একটি রেখা টানলেন, যা তার (চতুর্ভুজ) থেকে বের হয়ে গেল। তারপর দু-পাশ দিয়ে মধ্যের রেখার সঙ্গে ভেতরের দিকে কয়েকটা ছোট ছোট রেখা মিলালেন। অতঃপর বললেন, 'তোমরা কি জানো, এটা কী?' সাহাবারা বললেন, 'আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন।' রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এ মাঝের রেখাটা হলো মানুষ। আর এ চতুর্ভুজটি হলো তার আয়ু, যা বেষ্টন করে আছে। আর বাইরে বেরিয়ে যাওয়া রেখাটি হলো তার আশা। আর এ ছোট ছোট রেখাগুলো বাধা-বন্ধন। যদি সে এর একটা এড়িয়ে যায়, তবে আরেকটা তাকে দংশন করে। আর আরেকটি যদি এড়িয়ে যায় তবে আরেকটি তাকে দংশন করে।”

ভিক্ষুকদের প্রিয় জিনিস থেকে দান করা
[৬৯৫] বাশীরের সূত্রে আবদুর রহমান ইবনু আজলান বর্ণনা করেন, “একবার জনৈক ভিক্ষুক রবীর ঘরের দরজায় এসে ভিক্ষা চাইলে রবী তার স্ত্রীকে বললেন, 'তাকে মিষ্টান্ন দাও।' স্ত্রী জানালেন, 'সে তো আমাদের কাছে খাদ্যের ক্ষুদ্রাংশ চাচ্ছে।' রবী আবার বললেন, 'তাকে মিষ্টান্ন আহার করাও, কেননা রবী মিষ্টান্ন পছন্দ করে।”

সালাতে দাঁড়িয়ে ক্রন্দন করা
[৬৯৬] বাশীরের সূত্রে আবদুর রহমান ইবনু আজলান বর্ণনা করেন, “আমি এক রাতে রবীর সাথে ছিলাম। তিনি সালাতে দাঁড়ালেন। যখন নিম্নের আয়াতে পৌঁছলেন, তখন সারা রাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে তা বারবার তিলাওয়াত করতে থাকেন। এমনকি এভাবে সকাল হয়ে যায়:
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن تَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ تَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
'যারা খারাপ কাজ করেছে তারা কি এ ধারণা করে যে, আমরা তাদের সেই লোকদের সমান করে দেবো যারা ভালো কাজ করেছে? যাদের জীবন ও মরণ সমান। তারা কতই-না মন্দ সিদ্ধান্ত নেয়." [১৯]

পুরস্কার ঘোষণা
[৬৯৭] রবী ইবনু খাইসাম বলেন, "আদ জাতি ইয়ামান থেকে সিরিয়া পর্যন্ত ছড়ানো ছিটানো ছিল। তাদের মধ্য হতে কাউকে আমার কাছে যে নিয়ে আসবে তার জন্য এই এই পুরস্কার।”[১০০]

তিনি রাতভর ইবাদাত করতেন
[৬৯৮] হাম্মাদ আল-আসাম আল-হিম্মানি রাহিমাহুল্লাহ রবীর সঙ্গীদের কাছ থেকে বর্ণনা করেন, “প্রায়শ আমরা সন্ধ্যায় রবীর বাবরি চুল যেমন গোছানো দেখতাম, ভোরেও দেখতাম সেভাবেই চুলগুলো গোছানো। তখন আমরা নিশ্চিত হতাম যে, তিনি সারা রাত বিছানায় পিঠ লাগায়নি।”

আল্লাহর আলোচনা অধিক উত্তম
[৬৯৯] আবদুল্লাহ বলেন, “আমি বিশর ইবনু আল-হারিস এর নিজ হাতে লেখা গ্রন্থে পেয়েছি, তিনি বলেন, 'একবার রবী ইবনু খুসাইম-এর কাছে জনৈক ব্যক্তির কথা আলোচনা করা হলে তিনি বলেন-মানুষের আলোচনার চেয়ে আল্লাহর আলোচনা অধিক উত্তম।”

কবিতার প্রতি অনাগ্রহ
[৭০০] আবূ বাকর ইবনে আইয়্যাশ রাহিমাহুল্লাহ আসেম হতে বর্ণনা করেন, “তিনি বলেন, রবী ইবনু খুসাইমকে বলা হলো, আপনার সঙ্গী-সাথিদের অনেককে আমি কবিতার উদ্ধৃতি দিতে শুনেছি। আপনি কবিতা দ্বারা উদ্ধৃতি দেন না কেন? জবাবে রবী বললেন, 'যা কিছু তোমরা এখানে বলো, তা সবই লেখা হয়। আমি চাই না কিয়ামাত দিবসে আমার সামনে কবিতার পঙ্ক্তি আবৃত্তি করে শোনানো হোক।”

আগুন দেখে তিনি বেহুঁশ হলেন
[৭০১] বাকর ইবনু মায়িয বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সাথিদের নিয়ে ফুরাত নদীর তীর বেয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। এমন সময়ে কামারশালার আগুন দেখে রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে তুলে ধরে নিয়ে গেলেন। তিনি তখন বেহুঁশ। এরপর আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু লোকদের নিয়ে যোহর সালাত আদায় করেন। এরপর রবীর কাছে ফিরে এসে তাকে ডাকলেন, 'হে রবী, হে রবী।' কিন্তু সংজ্ঞাহীনতার কারণে তিনি কোনো জবাব দিলেন না। অতঃপর আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সাথিদের নিয়ে আসরের সালাত আদায় করে এসে ডাকলেন, 'হে রবী।' কিন্তু তখনো রবীর হুঁশ ফেরেনি। এভাবে মাগরিবও পেরিয়ে গেল, রবীর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। পরে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু লোকদের নিয়ে ঈশার সালাত আদায় করলেন। রবী এখনো আগের মতোই সংজ্ঞাহীন। অবশেষে ভোরের শীতলতায় রবীর হুঁশ ফিরে আসে।”

মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা
[৭০২] বাকর ইবনু মায়িয বলেন, “রবীকে যখন বলা হতো কেমন আছেন হে আবূ ইয়াজিদ? তখন তিনি বলতেন, 'দুর্বল পাপিষ্ঠ হিসেবে আছি। আমার ভাগের রিষ্ক ভক্ষণ করব আর মৃত্যুর অপেক্ষা করব'।”

মানুষ দু-প্রকার
[৭০৩] বাকর ইবনু মায়িয বলেন, “রবী বলতেন, 'মানুষ দু-প্রকার। মুমিন আর জাহিল। মুমিনদের আমরা কষ্ট দিই না, আর জাহিলদের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকি।”

সবাইকে একদিন মরতে হবে
[৭০৪] সুফইয়ান বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম প্যারালাইসিসের মতো কষ্টদায়ক রোগে আক্রান্ত হন। তাঁকে চিকিৎসা করার কথা বলা হলে তিনি বলতেন, 'আমি তোমাদের আদ, সামূদ ও আসহাবে রাস-এর জাতিগোষ্ঠীর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তাদের মধ্যবর্তী সময়ে আরও জাতিগোষ্ঠী বিদ্যমান ছিল। তাদের মধ্যে চিকিৎসকও ছিল। কিন্তু আজ না সেই চিকিৎসক বেঁচে আছে, আর না যাদের চিকিৎসা করা হয়েছে তারা বেঁচে আছে।”

নিজের কোট দান করা
[৭০৫] আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইদ বলেন, “একবার রবী ইবনু খুসাইমের কাছে এক ভিক্ষুক আসে। শীতের রাতে তিনি তার দিকে এগিয়ে যান। গিয়ে দেখেন সে ভীষণ শীতে ভুগছে। তিনি নিজের মাথাওয়ালা কোটটি ভিক্ষুককে পরিয়ে দেন। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন:
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ
'তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা যা কিছু ভালোবাসো তা থেকে খরচ না করো।” [১০১]

তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন
[৭০৬] আবূ ওয়ায়েল বলেন, "আমরা একবার রবী ইবনু খুসাইমের কাছে এলাম। তিনি বললেন, 'কী নিয়ে এলে?' আমরা বললাম, 'আমরা আল্লাহর প্রশংসা করতে এসেছি। আপনাকে নিয়ে আমরা আল্লাহর প্রশংসা করব। আল্লাহকে স্মরণ করতে এসেছি। আপনাকে নিয়ে আমরা আল্লাহকে স্মরণ করব।' এ কথা শুনে রবী বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা ওই আল্লাহর জন্য যিনি এমন লোকদের আমার কাছে নিয়ে আসেননি যারা বলে-আপনাকে সঙ্গে নিয়ে শরাব পান করতে এসেছি এবং আপনাকে সঙ্গে নিয়ে ব্যভিচার করতে এসেছি।”

চোরের জন্য দুআ
[৭০৭] আলা ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, “একবার রবীর ঘোড়াটি চুরি হয়ে যায়। এতে তার কাছের লোকজন বলতে লাগল, চোরের জন্য বদদুআ করুন। তিনি বললেন, 'না, বরং দুআ করব-হে আল্লাহ, যদি সে ধনী হয়ে থাকে, তবে তার ধন-সম্পদ আরও বাড়িয়ে দিন। আর যদি দরিদ্র হয়ে থাকে, তবে তাকে ধনী বানিয়ে দিন।”

খাদেমের সাথে কাজ ভাগাভাগি করে নেওয়া
[৭০৮] বাকর বলেন, “রবী তার খাদেমকে বলতেন, 'অর্ধেক কাজ তোমার আর অর্ধেক কাজ আমার। আবর্জনা ঝাড় দেওয়া আমার দায়িত্ব।”

মেয়েকে খেলতে যাওয়ার কথা বললেন না
[৭০৯] বাকর বলেন, “একবার রবীর ছোট মেয়ে তার কাছে আসে। সে সময় তার সাথিরা তার সঙ্গে ছিল। মেয়ে বলল, 'আব্বা, খেলতে যাব।' তিনি বললেন, 'না।' তার সাথিরা বলল, 'হে আবু ইয়াজিদ, মেয়েকে খেলার অনুমতি দিন।' তিনি বলতে লাগলেন, 'আমি চাই না আমার আমলনামায়-যাও, খেলো-এ কথা লেখা থাকুক। বরং আমি চাই, লেখা থাকুক—যাও, ভালো কথা বলো, ভালো কাজ করো।”

চোরের হেদায়াতের জন্য দুআ করলেন
[৭১০] বাকর ইবনু মায়িয বলেন, “রবী বলতেন, যা হবার তা হবেই। বাকর ইবনু মায়িয আরও বলেন, রবীকে ত্রিশ হাজার দিরহাম মূল্যের একটি ঘোড়া দেওয়া হয় বা তিনি সেটা ক্রয় করেন। তিনি সেটাতে আরোহণ করে লড়াই করেন। একবার ঘোড়ার ঘাস সংগ্রহ করতে খাদেমকে পাঠান এবং তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে যান। ঘোড়া তার পাশেই বেঁধে রাখেন। কিছুক্ষণ পর খাদেম এসে বলে, 'হে রবী, আপনার ঘোড়া কোথায়?' রবী বললেন, 'চুরি হয়ে গেছে, হে ইয়াসার।' খাদেম বলল, 'অথচ আপনি সেদিকে চেয়ে রয়েছিলেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, হে ইয়াসার। আমি আমার মহামহিম प्रतिপালকের কাছে মুনাজাত করছিলাম। এ সময় কিছুই আমার মনোযোগ বিঘ্ন করতে পারে না।' এরপর তিনি তিনবার আল্লাহর কাছে দুআ করে বলেন, 'হে আল্লাহ, সে আমাকে চুরি করেছে। আমি তাকে চুরি করতে দিইনি। হে আল্লাহ, সে যদি ধনী হয় তবে তাকে হেদায়াত দান করুন। আর যদি দরিদ্র হয় তবে তাকে ধনী বানিয়ে দিন।'”

যেসব বিষয়ে মঙ্গল রয়েছে
[৭১১] বাকর ইবনু মায়িয বলেন, “রবী বলতেন, অধিক কথায় মঙ্গল নেই। তবে নয়টি বিষয় ভিন্ন। যথা: আল্লাহর তাহলীল, তাকবীর, তাসবীহ, তাহমীদ, কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে দুআ করা, খারাপ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা, সৎ কাজে আদেশ, অসৎ কাজে বাধাদান ও কুরআন তিলাওয়াত।”

মানুষ যা পড়ে তার সবটুকু বোঝে না
[৭১২] মুনযির আস-সাওরি রবী ইবনু খুসাইম হতে বর্ণনা করেন, "আল্লাহ তাআলা তার নবির কাছে যা অবতীর্ণ করেছেন, তার সবটুকু অবশ্যই তোমরা জানো না। আর যা কিছু তোমরা পড়ছ অবশ্যই তার সবটুকু বোঝো না।”

তিনি কখনো মন্দ কিছু বলতেন না
[৭১৩] বিলাল ইবনুল মুনযির বলেন, “জনৈক ব্যক্তি বলল, আজ যদি রবীর মুখ থেকে কারও সম্পর্কে মন্দ কথা বের করতে না পারি, তাহলে জীবনে কখনো বের করতে পারব না। এ লক্ষ্যে তার কাছে গিয়ে বললাম, 'হে আবু ইয়াজিদ, হুসাইন ইবনু ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু নিহত হয়েছেন।' তিনি বললেন, 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
قُلِ اللَّهُمَّ فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِي مَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ
‘বলুন, হে আল্লাহ, সমস্ত আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী। আপনিই আপনার বান্দাদের মধ্যে ফায়সালা করবেন যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করত। [১০২]
লোকটি আরও বলে, ‘আমি বললাম, এ ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?’ রবী বললেন, 'আমি কী বলব? আল্লাহর কাছেই তাদের ফিরতে হবে এবং আল্লাহর কাছেই তাদের হিসেব দিতে হবে।”

তিনি সব আমল গোপনে করতেন
[৭১৪] সুফিয়ান বলেন, “রবী ইবনু খুসাইমের স্ত্রী আমাকে বলেছেন, 'রবী সব আমল গোপনে করতেন। তিনি হয়তো মাসহাফ হাতে কুরআন তিলাওয়াত করছেন, তখন হঠাৎ কোনো লোক এসে গেল। তিনি মাসহাফটি তাড়াতাড়ি কাপড়ের ভেতর লুকিয়ে ফেলতেন, যাতে আগন্তুক লোকটি তা দেখতে না পারে।”

দামি পোশাক পরিহিতকে উপদেশ
[৭১৫] রবী ইবনু খুসাইম থেকে বর্ণিত, “তিনি একটি সুম্বুলানী বস্ত্র পরিধান করলেন। যার মূল্য তিন বা চার দিরহাম। যখনই তিনি এর হাতা লম্বা করতেন, তা গিয়ে তার নখ পর্যন্ত পৌঁছত। আর যখন তা ঝুলিয়ে দিতেন, তখন তা তার বাহু পর্যন্ত পৌঁছে যেত। যখন তিনি শুভ্র পোশাকের কোনো আল্লাহর বান্দাকে দেখতেন, তখন তাকে বলতে (কিয়ামাতের সময়) পাহাড়কে উড়িয়ে দেওয়া হবে এবং তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে তখন তুমি কী করবে!”

আগুন দেখে বেহুঁশ হলেন
[৭১৬] সুলাইমান আবূ ওয়ায়েল হতে বর্ণনা করেন, “আমরা একদিন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে বের হলাম। আমাদের সাথে রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহও ছিলেন। আমরা একজন কামারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তো আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু আগুনে থাকা একটা লোহার খণ্ডের দিকে তাকালেন। রবীও সেদিকে তাকালেন। (এটা দেখে) তিনি পড়ে যাওয়ার মতো টলতে লাগলেন। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু চলতে লাগলেন। অবশেষে আমারা ফুরাত নদীর তীরে চুন বানানোর একটি ভাটির কাছে পৌঁছলাম عبدالله রাদিয়াল্লাহু আনহু তাতে টগবগে আগুন দেখে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
إِذَا رَأَتْهُم مِّن مَّكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقًا مُقَرَّنِينَ دَعَوْا هُنَالِكَ ثُبُورًا
'আগুন যখন দূর থেকে এদের দেখবে তখন এরা তার ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত চিৎকার শুনতে পাবে। আর যখন এরা শৃঙ্খলিত অবস্থায় তার মধ্যে একটি সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষিপ্ত হবে তখন নিজেদের মৃত্যুকে ডাকতে থাকবে।”[১০৩]
বর্ণনাকারী বলেন, “রবী তখন বেহুঁশ হয়ে পড়ে যান। আমরা তাঁকে বহন করে তার বাড়িতে নিয়ে আসি। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যোহর পর্যন্ত তার দেখাশোনা করেন, তখনো তার হুঁশ ফিরে আসেনি। এরপর আসর পর্যন্ত তার দেখাশোনা করেন, তখনো তার হুঁশ ফিরে আসেনি। মাগরিব পর্যন্তও এমন সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে থাকেন তিনি। অতঃপর তার হুঁশ ফিরে এলে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার পরিবারের কাছে ফিরে আসেন।"

তিনি ভাইয়ের কাছে চিঠি লিখলেন
[৭১৭] ইবনুল মুবারক বলেন, "রবী ইবনু খুসাইম তার ভাইয়ের কাছে চিঠি লেখেন : তোমার আসবাবপত্র তৈরি করে নাও। পাথেয় ঠিক করে নাও। নিজের নফসের অভিভাবক হয়ে যাও। মানুষকে নিজের অভিভাবক বানিয়ো না।”

তিনি কবরবাসীর সাথে কথা বলতেন
[৭১৮] ঈসা ইবনু ফররুখ বলেন, "রাতের বেলা রবী ইবনু খুসাইম যখন মানুষের গাফলতি দেখতেন, তখন তিনি কবরস্থানে চলে যেতেন। সেখানে গিয়ে তিনি কবরবাসীর সাথে কথা বলতেন। বলতেন, 'হে কবরবাসী, তোমরা আর আমরা একই জগতের বাসিন্দা ছিলাম।' যখন ভোর হতো, তখন তাঁকে কবর থেকে উত্থিত মানুষের মতো মনে হতো।”

তিনি সুসংবাদ পেলেন
[৭১৯] নুসাইর ইবনু যুলুক বলেন, "আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন রবী ইবনু খুসাইমকে দেখতেন, তখন বলতেন, 'ইবনু ইয়াজিদের জন্য সুসংবাদ। তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।”

জবানের ব্যাপারে সতর্কতা
[৭২০] বাকর ইবনু মায়িয বলেন, "রবী বলতেন, 'হে বাকর, নিজ জবানের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। কেননা, আমরা দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে অপবাদ দিয়ে থাকি।"

জ্ঞানবুদ্ধিতে বড় ছিলেন
[৭২১] সাঈদ ইবনু মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবু ওয়ায়েলকে বলা হলো, আপনি বড় নাকি রবী ইবনু খুসাইম বড়? তিনি বললেন, 'আমি তার চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু তিনি জ্ঞানবুদ্ধিতে আমার চেয়ে বড়।”

ছেলের মৃত্যুতে কবিতা
[৭২২] সুফিয়ান সাওরি বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু রবী ইবনু খুসাইমের এক ছেলে মারা গেলে তিনি কবিতা আবৃত্তি করলেন, 'আমি তার চিকিৎসার জন্য কোনো ডাক্তারকে ডাকিনি। তবে তোমাকে ডেকেছি হে বৃষ্টির ফোঁটা অবতরণকারী। যাতে করে আমার আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে তুমি আমাকে সবর করার তাওফিক দান করো। কর্ম সম্পাদনে আমাকে সুপথের পরিকল্পনা দান করো। আর আমি এ আশা করি যে, অজ্ঞাতসারে যেন এই বিপদ আমার প্রতিদান পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধাদানকারী না হয়।”

উন্মাদ প্রতিবেশীকে খাওয়ালেন
[৭২৩] মুনযির বলেন, “একবার রবী তার স্ত্রীকে খুবাইস (খেজুর ও ঘিমিশ্রিত একপ্রকার মিষ্টান্ন) তৈরি করতে বলেন। যেহেতু তিনি কখনো নিজের জন্য কোনো কিছুর আবদার করতেন না, এ কারণে তার স্ত্রী খুব যত্ন করে খবীস তৈরি করলেন। এরপর রবী সেগুলো তার এক উন্মাদ প্রতিবেশীকে দিয়ে দিলেন। উন্মাদ লোকটির মুখ থেকে সব সময় লালা ঝরত। সে খাবারগুলো চেটে খায়। তার লালা ঝরতে থাকে পাত্রে। এ অবস্থা দেখে স্ত্রী রবীকে বললেন, 'সে কি জানে সে কী খাচ্ছে?' রবী বললেন, 'কিন্তু আল্লাহ তো জানেন।”

ভালো মানুষের সন্ধান
[৭২৪] ইবনুল কাওয়্যা একবার রবী ইবনু খুসাইমের কাছে এসে জানতে চাইলেন, "আমাকে আপনার চেয়ে ভালো মানুষের সন্ধান দিন।" রবী বললেন, "হ্যাঁ, যে তার কথায় আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, সুস্থ অবস্থায় অধিক চিন্তা-ফিকির করে এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কালে গভীর অভিচিন্তনে মগ্ন থাকে, সে আমার চেয়ে উত্তম।"

আল্লাহকে ভয় করার পুরস্কার
[৭২৫] রবী ইবনুল মুনযির বর্ণনা করেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য সহজ পথ বের করে দেন’। [১০৪] এই আয়াতের ব্যখ্যায় রবী ইবনু খুসাইম বলতেন, ‘সবকিছু থেকে তিনি মুক্তি দেন। চাই তা মানুষের জন্য দুষ্কর হোক না কেন।”

দ্বীনের জ্ঞানার্জন আগে
[৭২৬] মুহাম্মাদ ইবনুন নাযর আল-হারিয়ি বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম বলেছেন, ‘আগে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করো, তারপর নিভৃতে অবস্থান করো।”

একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
[৭২৭] রবী ইবনু খুসাইম وَإِذَا الْعِشَارُ عُظِلَتْ “যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলোকে তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেয়া হবে।”[১০৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “এগুলোর প্রতিপালনকারীরা আর দুধ দোহন করতে পারবে না এবং এগুলোকে বেঁধে রাখতে পারবে না।"

ভাতার অতিরিক্ত অংশ দান করে ফেলা
[৭২৮] সাঈদ ইবনু রবী ইবনু খুসাইম বলেন, “আমার দাদি আমার কাছে রবী ইবনু খুসাইমের ব্যাপারে বলেছেন যে, তার ভাতা আসত, যার পরিমাণ ছিল দুই হাজার দিরহাম। তিনি খরচের জন্য এক হাজার দুই শ রেখে, বাকিটা দান করে দিতেন।”

ভালো লোকদের সাথে থাকার নাসীহাত
[৭২৯] সালিহ ইবনু আবদুল্লাহ আল-ইয়াযিদি বলেন, “আমি সাঈদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু রবী ইবনু খুসাইমের কাছে শুনেছি, তিনি প্রতিদিন সকালে বলতেন, 'তোমরা ভালো কাজ করো এবং ভালো লোকদের সাথে থাকো। এতে একটুও বিলম্ব করবে না, তাতে তোমার অন্তর কঠোর হয়ে যাবে। তাদের মতো হোয়ো না, যারা বলল-আমরা শুনেছি, অথচ তারা শোনে না।”

কিয়ামাতের মাঠের বিবরণ
[৭৩০] ইবরাহীম নাখয়ি রবী ইবনু খুসাইম হতে বর্ণনা করেন, “যখন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে তখন আল্লাহ ছাড়া আর কারও অস্তিত্ব থাকবে না, তখন মহান আল্লাহ সকলকে একত্র করে ঘোষণা করবেন, 'কোথায় বাদশাহরা? কোথায় সাম্রাজ্যের দাবিদাররা? কোথায় তারা আজ, যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকত? আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”

কখনো মিথ্যা বলতেন না তিনি
[৭৩১] আসিম আবু ওয়ায়েল হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি, কায়স ইবনু উসাইল, হাইয়্যা ইবনু উসাইল এবং আবদুর রহমান ইবনু সালামাহ মিলে রবী ইবনু খুসাইমের কাছে যাচ্ছিলাম। আমরা একটি সমাবেশ দেখে জিজ্ঞেস করলাম, রবী ইবনু খুসাইমের বাড়ি কোনটা? তারা আমাদের যথাসাধ্য পথ বাতলে দেয় এবং বলে, আপনারা এমন এক লোকের বাড়িতে যাচ্ছেন, যিনি কথা বললে মিথ্যা বলেন না। অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করেন না এবং তার কাছে কোনো কিছু আমানত রাখলে তার খেয়ানত করেন না। ওই যে দেখছেন, এটা তার বাড়ি।”
আবু ওয়ায়েল বলেন, “এরপর আমরা তার বাড়িতে গেলাম। ওই সময় তিনি মাসজিদে ছিলেন। আমরা বললাম, আমরা আপনার কাছে আল্লাহর কথা শুনতে এসেছি। সুতরাং আমাদের নিয়ে আপনি আল্লাহর কথা আলোচনা করুন। এরপর রবী দু-হাত তুলে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, নিশ্চয় এরা আপনার যিকর করতে এসেছে। তাঁরা আমার সাথে যিকর করবে। তারা ব্যভিচারের আশায় আমার কাছে আসেনি। আমাকে নিয়ে মদ্যপান করতে আসেনি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “অতঃপর তিনি আমাদের সাথে দ্বীনি আলোচনা করতে লাগলেন। বললেন, 'অধিক কথায় মঙ্গল নেই। তবে নয়টি বিষয় ভিন্ন, যথা: আল্লাহর তাহলীল, তাকবীর, তাসবীহ, তাহমীদ, কুরআন তিলাওয়াত, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে বাধাদান, কল্যাণ কামনা করে আল্লাহর কাছে দুআ করা এবং খারাপ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা।”

কোনো পাপই আল্লাহর অজানা নয়
[৭৩২] রবী ইবনু খুসাইম বলতেন, “যেসব গোপন পাপ মানুষের কাছে লুক্কায়িত, আল্লাহর কাছে তা ঠিকই প্রকাশিত; তোমরা সেগুলোর সমাধান তালাশ করো। সেগুলোর সমাধান হলো কেবল তার কাছে অনুতপ্ত হওয়া এবং (সেসব পাপের) পুনরাবৃত্তি না করা।”

আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা
[৭৩৩] সুফিয়ান বলেন, “এক জুমুআর দিন রবী ইবনু খুসাইমের এক প্রতিবেশী যুবক তাঁকে অনুসরণ করছিলেন। তা দেখে তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছে তোমার মন্দ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি'।”

ধ্বংসের কারণ
[৭৩৪] রবী ইবনু খুসাইম বলেন, “যেসব কাজ আল্লাহর জন্য করা হয় না, তা সবই ধ্বংসের কারণ।”

অন্তিম মুহূর্তে প্রদান করা স্বীকৃতি
[৭৩৫] মুনযির আস-সাওরি বলেন, “জীবনের অন্তিম মুহূর্তে রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ এ স্বীকৃতি দান করেন যে—আমি আমার নিজের ওপর আল্লাহকে সাক্ষী মানছি। তিনি তার নেক বান্দাদের জন্য সাক্ষ্য, তাদের প্রতিদান ও বদলা দানের জন্য যথেষ্ট। আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নবি ও রাসূল হিসেবে এবং ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট। আমি নিজের ও আমার অনুসারীদের জন্য এই ব্যাপারে সন্তুষ্ট যে, ইবাদাতকারীদের মধ্যে আমি তার (আল্লাহর) ইবাদাত করব। প্রশংসাকারীদের মধ্যে তার প্রশংসা করব এবং সকল মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করব।”

নবিজি তাকে দেখলে ভালোবাসতেন
[৭৩৬] সাঈদ ইবনু মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন রবী ইবনু খুসাইমকে দেখতেন, তখন বলতেন, 'রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে দেখলে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।”

তিনি সারা রাত সালাতে তিলাওয়াত করলেন
[৭৩৭] আবদুর রহমান ইবনু আজলান নুসাইর হতে বর্ণনা করেন, রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ সালাতে দাঁড়ালেন। যখন নিম্নের আয়াতে পৌঁছলেন, তখন তা বারবার তিলাওয়াত করতে লাগলেন:
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ تَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
'যারা খারাপ কাজ করেছে তারা কি এ ধারণা করে যে, আমরা তাদের সেই লোকদের সম্মান করে দেবো—যারা ভালো কাজ করেছে? যাদের জীবন ও মরণ সমান। তারা কতই-না মন্দ সিদ্ধান্ত নেয়।[১০৬] এরপর তিনি রুকু সাজদা করলেন। এভাবে সকাল হয়ে যায়।”

ভালো মানুষদের জন্য সুসংবাদ
[৭৩৮] সাঈদ ইবনু মাসরূক রবী ইবনু খুসাইম হতে বর্ণনা করেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার কাছে এসে বলতেন, ‘ভালো মানুষদের সুসংবাদ দাও’।”

তিনি দুনিয়াবি কথা বলতেন না
[৭৩৯] আবূ হাইয়্যান তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, “আমি রবী ইবনু খুসাইমের কাছে কখনো দুনিয়াবি কোনো কথা শুনিনি। কেবল একবার শুনেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের এলাকায় কয়টি মাসজিদ আছে?’”

অন্যের দোষচর্চা না করা
[৭৪০] মুফাযযাল ইবনু ইউনুস বলেন, “রবী ইবনু খুসাইমের কাছে জনৈক ব্যক্তির আলোচনা করা হলে তিনি বললেন, ‘আমি এখনো নিজের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারিনি। নিজের দোষ বাদ দিয়ে অন্যের দোষ নিয়ে আলোচনার সুযোগ কোথায়? মানুষ অন্যের পাপের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে, আর নিজের পাপের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকে।’”

মিথ্যার ওপর সত্যের আঘাত
[৭৪১] সুফিয়ান বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন : بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ ‘কিন্তু আমি তো মিথ্যার ওপর সত্যের আঘাত হানি, যা মিথ্যার মাথা গুঁড়িয়ে দেয় এবং সে দেখতে দেখতে নিশ্চিহ্ন হয়।’ [১০৭] এরপর বলেন, ‘এটি এমন এক ক্ষত, যা আপনি বাদে অন্য কেউ ঠিক করতে পারবে না।’”

পুরোটা রুটি দান করে দেওয়া
[৭৪২] রবীর স্ত্রী বলেন, “নিশ্চয় রবী রুটি দান করতেন। তিনি বলতেন, 'টুকরো বা ভগ্নাংশ দান করতে আমার লজ্জা হয়'।”

মৃত্যুকে পছন্দ করা
[৭৪৩] রবী ইবনু খুসাইমের স্ত্রী বলেন, “রবীর মৃত্যুশয্যায় তার মেয়ে ক্রন্দন করতে লাগল। তা দেখে রবী বললেন, 'হে আমার মেয়ে, কেঁদো না; বরং বলো, শুভদিন! আমার পিতার শুভদিন এসেছে'।”

তিনি সব সময় মাসজিদে উপস্থিত থাকতেন
[৭৪৪] নুসাইর বলেন, “আমি আমার জীবনে এক দিন ছাড়া কখনো রবীকে মাসজিদে অনুপস্থিত দেখিনি।”
তিনি আরও বলেন, "জনৈক ব্যক্তি রবীকে বলল, 'কুরআন থেকে আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' তিনি তার ছোট ছেলের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললেন,
وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَى بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ
'আত্মীয়-স্বজনরা একে অপরের তুলনায় অগ্রগণ্য, আল্লাহর কিতাবে।'” [১০৮]

তিনি হালুয়া পছন্দ করতেন
[৭৪৫] রবী ইবনু খুসাইমের স্ত্রী বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম হালুয়া খেতে খুব ভালোবাসতেন। তিনি আমাকে একবার হালুয়া তৈরি করতে বলেন। আমি প্রচুর পরিমাণে হালুয়া তৈরি করে নিয়ে এলাম। তিনি ফররুখ এবং আরও একজনকে ডেকে এনে নিজ হাতে খাওয়ালেন। প্রিয় পানীয়ও পান করালেন। তাঁকে বলা হলো, এরা দুজন কি জানে, তারা কী পানাহার করেছে? রবী জবাবে বললেন, 'কিন্তু আল্লাহ তো জানেন'।”

কীভাবে দুআ করতে হবে?
[৭৪৬] মুনযির আস-সাওরি বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম বলতেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ যেন এ রকম না বলে—হে আল্লাহ, আমি অতীতের গুনাহ ত্যাগ করে তোমার কাছে ফিরে আসছি। অতঃপর সত্যি যদি ফিরে না আসে, তাহলে সেটা হবে মিথ্যা ওয়াদার শামিল। বরং বলা উচিত—হে আল্লাহ, আমার তাওবা কবুল করো'।”

অধিক পরিমাণে কান্নাকাটি করা
[৭৪৭] নুসাইর ইবনু যুলুক বলেন, "রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ এত অধিক পরিমাণে কাঁদতেন যে, অশ্রুতে তাঁর দাড়ি ভিজে যেত।"

কথাবার্তায় সংযমী হওয়া
[৭৪৮] ইবরাহীম আত-তাইমি বলেন, "রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ-এর সাথে ২০ বছর কাটিয়েছেন এমন এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন—দীর্ঘ সময় এ সময়ে আমি তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত এমন কোনো কথা শুনিনি, যার সমালোচনা হতে পারে।"

মন্দ হতে আশ্রয় প্রার্থনা
[৭৪৯] নুসাইর হতে বর্ণিত, “তিনি যখন রবী ইবনু খুসাইমের কাছে আসতেন, রবী বলতেন, 'আমি আল্লাহর কাছে তোমার মন্দ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি'।”

পাপের ভয়
[৭৫০] জাফর বলেন, “আমাকে রবী ইবনু খুসাইমের মেয়ে বলেছেন, 'আমি আব্বাকে বলতাম, আব্বাজান, লোকজন ঘুমিয়ে গেছে। আপনি ঘুমাচ্ছেন না কেন?' তিনি বলতেন, 'হে মেয়ে, তোমার বাবা পাপকে ভয় করে'।”

কিছু অমূল্য নাসীহাত
[৭৫১] মুনযির সাওরি রবীর ব্যাপারে বলতেন, “যখন তাঁর কাছে কোনো লোক আসত তিনি বলতেন, 'ওহে আল্লাহর বান্দা। তুমি যেসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেছ, সেসব বিষয়ে আল্লাহকে (আল্লাহর পাকড়াওকে) ভয় করো; যে বিষয়ের জ্ঞান তোমাকে না দিয়ে অন্যকে দেওয়া হয়েছে, সেটি ওই জ্ঞানী ব্যক্তির কাছেই ন্যস্ত করো; তোমরা ভুলবশত বিভিন্ন কাজে জড়িত হবে বলে আমি যেটুকু আশঙ্কা করি, তার চেয়ে ঢের বেশি ভয় হচ্ছে যে, তোমরা জেনেবুঝে নানা (অন্যায়) কাজে লিপ্ত হবে; আজ তোমাদের মধ্যে যারা ভালো, তারা নিজগুণে ভালো নয়, তারা বরং তাদের চেয়ে অনেক নিকৃষ্টের তুলনায় ভালো; যেভাবে কল্যাণের পিছু নেওয়া দরকার, তোমরা সেভাবে তার পিছু নিচ্ছ না; মন্দ থেকে যেভাবে পালানো দরকার, সেভাবে পালাচ্ছ না; মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যা কিছু নাযিল হয়েছে, তার সবটুকু তোমরা আয়ত্ত করতে পারোনি; তোমরা যা পড়ছ, তার সবটুকু বোঝো না!' মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার সবটুকু তোমরা জানো না। যা কিছু তোমরা পড়ো, তার সবটুকু বোঝো না। যেসব গোপন পাপ মানুষের কাছে লুক্কায়িত, আল্লাহর কাছে তা ঠিকই প্রকাশিত। তোমরা সেগুলোর সমাধান তালাশ করো। সেগুলোর সমাধান হলো কেবল তার কাছে অনুতপ্ত হওয়া এবং (সেসব পাপ) পুনরায় না করা।"

নবিজির আনুগত্য মানে আল্লাহর আনুগত্য
[৭৫২] মুনযির বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম বলতেন, জাহিলি যুগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সালিস-বিচার নিয়ে যাওয়া হতো। ইসলামে এটা তার একক বৈশিষ্ট্য ছিল। রবী বলেন,
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
'যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল।' [১১০] এর প্রতিটি বর্ণ সত্য।”

জ্বলন্ত লোহা দেখে বেহুঁশ হয়ে যান
[৭৫৩] সুলাইমান আমাশ বলেন, "রবী ইবনু খুসাইম কামারশালার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি কামারের ভাটিতে জ্বলন্ত লোহা দেখে বেহুঁশ হয়ে যান।”
আমাশ বলেন, "আমিও অনুরূপ অভিজ্ঞতা নেয়ার জন্য কামারশালায় গেলাম। কিন্তু ভালো কিছু পেলাম না।”

রোগ, ওষুধ ও আরোগ্য সম্পর্কে
[৭৫৪] আবদুল মালিক ইস্পাহানি জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “রবী ইবনু খুসাইম তার সাথিদের বলতেন, 'রোগ, ওষুধ ও আরোগ্য সম্পর্কে তোমাদের কী ধারণা?' সাথিরা বললেন, 'জানি না।' তিনি বললেন, 'রোগ হচ্ছে পাপ। ওষুধ হচ্ছে ইস্তিগফার। আর আরোগ্য হচ্ছে এমন তাওবা, যার পর আর পাপ করা হয় না।”

প্রতিপালকের কাছে চাওয়ার পদ্ধতি
[৭৫৫] আবূ ইয়ালা বলেন, "রবী বলতেন, 'আমি বান্দাকে তার প্রতিপালকের কাছে এই বলে অনুরোধ করাকে পছন্দ করি না যে—হে আল্লাহ, আপনি অনুগ্রহ করাকে নিজের জন্য আবশ্যক করেছেন। আপনি নিজের জন্য এমনটা আবশ্যক করেছেন, যা (পেতে আমার) দেরি হচ্ছে। কাউকে আমি এমনটি বলতে শুনি না যে—হে আল্লাহ, আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছি, সুতরাং আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করুন।”

মৃত্যু সর্বাধিক উত্তম
[৭৫৬] সুফিয়ান তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, রবী বলতেন, “মুমিনের অদৃশ্য বিষয়গুলোর মধ্যে মৃত্যু সর্বাধিক উত্তম।”

কথার ভেতর আলো থাকে
[৭৫৭] বাকর ইবনু মায়িয রবী ইবনু খুসাইম হতে বর্ণনা করেন, “নিশ্চয় কথার ভেতর এমন আলো আছে, যা তোমরা দিবাকরের মতো চিনতে পারো। আর এই কথার মাঝেই এমন অন্ধকার আছে, যা রাতের অমানিশার মতো তোমরা অপছন্দ করো।”

পাশাখেলার প্রতি ঘৃণা
[৭৫৮] ইউসুফ ইবনু হাজ্জাজ বলেন, “আমি রবী ইবনু খুসাইমকে বলতে শুনেছি, পাশাখেলার গুটি হাতে ঘোরানোর চেয়ে শূকরের চর্বি হাতে মাখামাখি করা আমার কাছে অধিক প্রিয়।”

স্বপ্নের কুমন্ত্রণা
[৭৫৯] লাকিত বলেন, “জনৈক ব্যক্তি রবী ইবনু খুসাইমের কাছে এসে বলল, 'এক লোক (স্বপ্নে) আমার কাছে তিনবার এসে বলেছে যে—রবীকে বলবে, সে জাহান্নামী।' সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করল এবং বাঁ দিকে তিনবার থুতু নিক্ষেপ করল। পরদিন প্রত্যুষে সে আবার এসে বলল, 'আজ রাতে দেখলাম একজন আগমনকারী আমার কাছে এমন একটি কালো কুকুর নিয়ে এসেছে, যার গলায় তিনটি শিকল পরানো এবং মুখে তিনটি আঘাত।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, 'এসব হলো রবীর ব্যাপারে তোমাকে দেওয়া স্বপ্নের কুমন্ত্রণা।"

তাকে দেখলে বিনয়ী লোকদের কথা মনে হতো
[৭৬০] আবু উবায়দা বলেন, “রবী যখন আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে আসতেন, তখন তাদের আলোচনাকালে কেউ ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেত না। ইবনে מסعود রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি তোমাকে দেখতেন, দারুণ ভালোবাসতেন। আমি যখন তোমাকে দেখি, তখন আমার বিনয়ী লোকদের কথা স্মরণ হয়।”

নিজের কাজ নিজে করা
[৭৬১] মুনযির বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ নিজে টয়লেট পরিষ্কার করতেন। তাঁকে বলা হতো—এ কাজ আপনাকে করতে হবে না। তিনি বলতেন, 'আমি নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করি'।”

কাঁধে করে ধরে সালাতে নিয়ে যাওয়া
[৭৬২] মুগিরা বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ-এর দেহ প্যারালাইজড হয়ে গেলে, তাঁকে কাঁধে করে ধরে সালাতে নিয়ে যাওয়া হতো।"

নবিগণের রোগাক্রান্ত হওয়া
[৭৬৩] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে মাওকুফ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, “পক্ষাঘাত রোগে আম্বিয়ায়ে কেরামগণ আক্রান্ত হতেন।"

কষ্ট হলেও মাসজিদে যাওয়া
[৭৬৪] আবূ হাইয়্যান তার পিতার কথা বর্ণনা করেছেন, "রবী পঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেন। তবে সালাতের জন্য অন্যের সাহায্যে মাসজিদে যেতেন। লোকেরা বলত, আপনি তো এখন মাযূর। এ অবস্থায় ঘরে সালাত আদায়েরও অনুমতি আছে। তিনি জবাব দিতেন, 'সেটা আমি জানি। কিন্তু আমি হাইয়া আলাল ফালাহ শুনে ঘরে বসে থাকতে পারি না।"

যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত প্রতিবেশীকে সমাদর
[৭৬৫] আমর ইবনু মুররা বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম তার উম্মে ওয়ালাদের কাছে এসে বললেন, 'আমাদের জন্য খাবার তৈরি করো। ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুবাসিত করে রাখো। আমার এক ভাই আছে যাকে আমি অত্যন্ত ভালোবাসি। আমি তাকে নিমন্ত্রণ করতে চাই।' মহিলা ঘরদোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করল। বৈঠকখানা পরিপাটি করে সাজাল। উন্নত খাবার রান্না করল। সুগন্ধিতে মোহিত করে রাখল। অতঃপর বলল, 'আপনি আপনার ভাইকে নিয়ে আসুন।' তিনি গেলেন তার এক যক্ষ্মা রোগাক্রান্ত প্রতিবেশীর কাছে, যে ইতোমধ্যে তার দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। তাকে নিয়ে এসে তিনি উন্নত আসনে বসালেন। এরপর বললেন, 'তোমার খাবার নিয়ে এসো।' মহিলা বলল, 'আমি কি এসব খাবার এই লোকের জন্য তৈরি করেছি?' রবী বললেন, 'ধিক তোমাকে! আমি তোমাকে সত্য বলেছিলাম যে, সে আমার ভাই। আমি তাকে ভালোবাসি।' পরে সেই ব্যক্তি উষ্ণ আতিথেয়তা উপভোগ করল এবং উন্নত খাবার ভক্ষণ করল।"

আযান শুনলেই তিনি মাসজিদে যেতেন
[৭৬৬] আবূ হাইয়্যান তার পিতার কথা বর্ণনা করেছেন, “রবী পঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে চলাচলের শক্তি একেবারে হারিয়ে ফেলেন। তবে সালাতের জন্য হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে বা অন্যের সাহায্যে মাসজিদে যেতেন। আবদুল্লাহর সাথিরা বলত, 'হে আবূ ইয়াজিদ, আপনি তো এখন মাযূর। এ অবস্থায় ঘরে সালাত আদায়েরও অনুমতি আছে।' তিনি জবাব দিতেন, 'সেটা আমি জানি। কিন্তু আমি তো হাইয়া আলাল ফালাহ শুনতে পাই। এটি শোনার পর যতদূর সম্ভব সাড়া দেওয়া উচিত, তা সে হামাগুড়ি দিয়েই হোক না কেন।”

মৃত্যুসংবাদ কাউকে না জানানোর ওসিয়ত
[৭৬৭] আবূ হাইয়ান তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, “রবী ইবনু খুসাইম বলেন, 'আমার মৃত্যুর সংবাদ কাউকে জানাবে না। আমার জন্য আল্লাহর কাছে শান্তি প্রার্থনা করবে।"

জবাবদিহিতার ভয়
[৭৬৮] সুফিয়ান বলেন, “রবী ইবনু খুসাইমের মায়ের কাছ থেকে আমরা সংবাদপ্রাপ্ত হয়েছি, তিনি তার ছেলে রবীকে বলতেন, 'হে রবী, তুমি ঘুমাবে না?' তিনি বলতেন, 'মা, সেই ব্যক্তি কেমন করে রাতের অন্ধকারে ঘুমাতে পারে, যে জবাবদিহিতার ভয় করে?' রবী প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও যখন রাতের বেলা তার কান্নাকাটি থামত না, তখন তার মা বলতেন, 'হে আমার ছেলে, তোমার কী হয়েছে? মনে হচ্ছে তুমি কোনো অপরাধ করে বসেছ? কোনো মানুষকে খুন করেছ?' তিনি বলতেন, 'হ্যাঁ মা, আমি মানুষ খুন করেছি।' অস্থিরভাবে মা জানতে চাইতেন, 'বেটা! কাকে খুন করেছ? আমাকে বলো। তাহলে আমরা নিহত ব্যক্তির পরিবারের লোকদের খুশি করে ক্ষমা করিয়ে নিতে পারব। আল্লাহর শপথ! নিহতের পরিবারের লোকেরা যদি তোমার এ কান্নাকাটি ও রাত জাগার কথা জানতে পারে, তাহলে অবশ্যই তারা তোমার প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ দেখাবে।' রবী বললেন, 'মা, আমি আমার নিজেকে হত্যা করেছি।”

চোরের তাওবার জন্যে দুআ করা
[৭৬৯] রিযাম ইবনু সাঈদ তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ আমাদের মাসজিদে এসে তার সবজির থলেটি বাঁধলেন। এরপর মাসজিদে প্রবেশ করে সালাত পড়লেন। ইতোমধ্যে তার থলে হারিয়ে গেল। তিনি মাসজিদ থেকে বের হয়ে আমাদের থলের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আমরা বললাম, জানি না। আমরা বললাম, আপনি কি চোরের জন্য বদদুআ করবেন না? তিনি বললেন, ‘থাক, সে হয়তো এ পাপ থেকে ফিরে আসবে। আল্লাহ তার তাওবাহ কবুল করবেন এবং ভবিষ্যতে সে ভালো কাজ করবে।"

একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
[৭৭০] আবু রাযীন বর্ণনা করেন, فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا “তারা যেন কম হাসে।” [১১১] এই আয়াতের ব্যখ্যায় রবী ইবনু খুসাইম বলেন, “এখানে দুনিয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে।” এবং
وَلْيَبْكُوا كَثِيرًا “আর তারা যেন বেশি কাঁদে।” [১১২] আয়াতের এখানে আখিরাতের বিষয়ে বলা হয়েছে।

মৃত্যুকালীন বার্তা
[৭৭১] মুনযির আস-সাওরি রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণনা করেন, "আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :
فَأَمَّا إِن كَانَ مِنَ الْمُقَرَّبِينَ فَرَوْحُ وَرَيْحَانُ
'মৃত সেই ব্যক্তি যদি নৈকট্যপ্রাপ্তদের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার জন্য রয়েছে আরাম-আয়েশ ও উত্তম রিস্ক।" [১১৩]
এটা তার জন্য মৃত্যুকালীন বার্তা। আখিরাতে তো তার জন্য জান্নাত লুক্কায়িত আছেই। অন্যদিকে, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :
وَأَمَّا إِن كَانَ مِنَ الْمُكَذِّبِينَ الضَّالِّينَ فَنُزُلُ مِنْ حَمِيمٍ وَتَصْلِيَةُ جَحِيمٍ
'আর সে যদি অস্বীকারকারী পথভ্রষ্টদের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার সমাদরের জন্য রয়েছে ফুটন্ত গরম পানি এবং জাহান্নামের ঠেলে দেয়ার ব্যবস্থা।' [১১৪]
এটা তার জন্য মৃত্যুকালীন বার্তা। আখিরাতে তো তার জন্য জাহান্নাম লুক্কায়িত আছেই।”

ঠোঁট মিলিয়ে যিকর
[৭৭২] রবী বলেন, “নিশ্চয় বান্দা যখন চায়, তখনই তার প্রতিপালকের যিকর করতে পারে। দুই ঠোঁট মিলিত অবস্থায়ও তা সম্ভব।”

ঠোঁট নড়াচড়া ছাড়াও কুরআন পড়া
[৭৭৩] রবী ইবনু মুনযির তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, “আমি রবী ইবনু খুসাইমকে ঠোঁট নড়াচড়া ছাড়াও কুরআন পড়তে দেখেছি।”

ফকিরদের খাওয়ানো
[৭৭৪] মুনযির সাওরি হতে বর্ণিত, “রবী ইবনু খুসাইম রাহিমাহুল্লাহ তার স্ত্রীকে বললেন, 'খাবার তৈরি করো, আমি আমার বন্ধুদের দাওয়াত দিতে চাচ্ছি।' স্ত্রী খাবার তৈরি করলেন। রবী এলেন মাসজিদে। তিনি সমকালীন ফকিরদের সমবেত করে ঘরে নিয়ে এলেন এবং তৈরিকৃত খাবারগুলো তাদের খাওয়ালেন। স্ত্রী তাঁকে বললেন, 'এরাই আপনার বন্ধু?' রবী বললেন, 'হ্যাঁ, এরাই আমার বন্ধু।”

সাজদার আয়াত তিলাওয়াত করে সাজদা দেওয়া
[৭৭৫] মুনযির সাওরি থেকে বর্ণিত, “যখন রবী সূরা রাদে (সাজদার আয়াত তিলাওয়াত করে) সাজদা করতেন, বলতেন, 'হে রব, আমি স্বেচ্ছায় সাজদা দিলাম।”

সাজদার সময় বিনয় অবলম্বন করা
[৭৭৬] মুহাম্মাদ নামীয় আসলাম গোত্রের স্বল্পবয়সী ছেলে মাসজিদ থেকে এসে বলল, “রবী ইবনু খুসাইম যখন সাজদায় যেতেন, তখন তাঁকে দেখতে ছুড়ে ফেলা কাপড়ের মতো মনে হতো। চড়ুই পাখি এসে তার পিঠে বসে যেত।”

টিকাঃ
[১৯] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ২১
[১০০] অর্থাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদের এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন যে, তাদের কোনো বংশধর আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং জনশক্তির দম্ভ অর্থহীন। (দ্রষ্টব্য: সূরা হুদ ৬০; ইবরাহীম ৯; ফুসৃসিলাত ১৫; আন-নাজম ৫০; মারইয়াম ৯৮)
[১০১] সূরা আল ইমরান, ৩: ৯২
[১০২] সূরা যুমার, ৩৯:৪৬
[১০৩] সূরা ফুরকান, ২৫: ১২-১৩
[১০৪] সূরা তালাক, ৬৫: ০২
[১০৫] সূরা আত-তাকওয়ীর, ৮১ : ৪
[১০৬] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ২১
[১০৭] সূরা আম্বিয়া, ২১:১৮
[১০৮] সূরা আনফাল, ৮: ৭৫
[১০৯] এখানে মূলপাঠে ব্যবহৃত 'আমল' শব্দটি ভুল, এটি হবে 'আমাদ'।
[১১০] সূরা নিসা, ৪:৮০
[১১১] সূরা তাওবা, ৯: ৮২
[১১২] সূরা তাওবা, ৯: ৮২
[১১৩] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৮৮-৮৯
[১১৪] সূরা ওয়াকিয়া, ৫৬: ৯২-৯৪

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 উআইস কারনি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 উআইস কারনি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


তাকে দুটি কাপড় দান করলেন
[৭৭৭] কায়েস ইবনু উসাইর ইবনু আমর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, “আমি উআইস কারনিকে বস্ত্রহীনতার কারণে দুইটি কাপড় দান করেছি।”

নবিজির সুসংবাদ
[৭৭৮] মুহারিব ইবনু দীসার বলেছেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَأْتِيَ مَسْجِدَهُ أَوْ مُصَلَّاهُ مِنَ الْعُرْيِ، يَحْجِزُهُ إِيمَانُهُ أَنْ يَسْأَلَ النَّاسَ، مِنْهُمْ أُوَيْسُ الْقَرَنِيُّ وَفُرَاتُ بْنُ حَيَّانَ الْعِجْلِحُ
'নিশ্চয়ই আমার উম্মতের মধ্যে এমন ব্যক্তি আছে, যে মাসজিদে বা সালাতের জায়গায় বস্ত্রহীনতার কারণে আসতে পারবে না। তার ঈমান মানুষের কাছে (কিছু) চাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মধ্যে উআইস কারনি ও ফুরাত ইবনু হাইয়ান ইজলি রয়েছে." [১১৫]

উআইস কারনি রাহিমাহুল্লাহ-এর বিস্তারিত বিবরণ
[৭৭৯] উসাইর ইবনু জাবের বলেন, “তিনি কুফায় হাদীস বর্ণনা করতেন। একবার তিনি আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করা যখন শেষ করলেন তখন বললেন, 'তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল।' কিছু লোক রয়ে গেল তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি ছিল, সে এমন কথা বলছিল আমি কাউকে সে রকম কথা বলতে শুনিনি। তাই তার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মাল। আমি তাকে অগ্রসর করলাম। সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমরা কি লোকটিকে চেনো? যে আমাদের সাথে এমন এমন (জায়গায়) বসেছে?' তখন তাদের একজন বলল, 'হ্যাঁ, আমি তাকে চিনি। তিনি হলেন উআইস কারনি।' তিনি জানতে চাইলেন, 'তুমি কি তার ঘর চেনো?' সে বলল, 'জি, চিনি।' তিনি বলেন, তারপর আমি তার সাথে উনার ঘরে গেলাম। দরজায় ধাক্কা দেবার পর তিনি বের হয়ে এলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'হে ভাই, কিসে তোমাকে আমাদের কাছে আসা থেকে আটক রেখেছে?' তিনি জানালেন, 'বস্ত্রহীনতা।' তার সঙ্গীরা তাকে নিয়ে বিদ্রুপ করত এবং তাকে কষ্ট দিত। আমি বললাম, 'এই চাদরটি নিন এবং তা পরিধান করুন।' তিনি বললেন, 'এমনটি কোরো না। তারা যদি আমার গায়ে এই বস্ত্র দেখে, তো আমাকে কষ্ট দেবে।' আমি তার সঙ্গে থাকলাম যতক্ষণ না তিনি তা পরিধান করছেন। এরপর তিনি লোকদের সামনে বের হয়ে এলেন। তারা বলল, 'এই চাদরটি কার থেকে সে মেরে দিয়েছে বলে আপনাদের মনে হয়?' (এমন কথা শ্রবণ করে) তিনি ফিরে এসে তা খুলে ফেললেন এবং বললেন, দেখলেন তো?”
উসাইর বলেন, “আমি তখন মজলিসে উপস্থিত হলাম এবং (লোকদের উদ্দেশ্য করে) বললাম, তোমরা তার থেকে কী চাচ্ছ? তাকে কেন কষ্ট দিচ্ছ? লোকটি একসময় বস্ত্রহীন অবস্থায় থাকে, অন্য সময় তাকে কেউ বস্ত্র দিয়ে থাকে।” এভাবে আমি তাদের শক্ত ভাষায় কিছু কথা শুনিয়ে দিলাম।”
তারপর তিনি বলেছেন, “কুফাবাসী কিছু লোক একবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে আগমন করল। বিদ্রুপ করা হতো এমন এক ব্যক্তিও (তাদের সাথে) আগমন করল। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমাদের মধ্যে করন গোত্রের কেউ কি আছে?' (এই কথা শুনে) সেই লোকটি এগিয়ে এল। তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ رَجُلًا يَأْتِيكُمْ مِنَ الْيَمَنِ يُقَالُ لَهُ أُوَيْسٌ لَا يَدَعُ بِالْيَمَنِ غَيْرَ أُمَّ لَهُ وَقَدْ كَانَ بِهِ بَيَاضُ فَدَعَا اللَّهَ فَأَذْهَبَهُ إِلَّا مِثْلَ مَوْضِعِ الدِّينَارِ أَوِ الدِّرْهَمِ، فَمَنْ لَقِيَهُ مِنْكُمْ فَأْمُرُوهُ فَلْيَسْتَغْفِرْ لَكُمْ
'উআইস নামে এক ব্যক্তি ইয়ামান থেকে তোমাদের কাছে আগমন করবে। ইয়ামানে তার মাকে ছাড়া আর কোনো কিছু সে রেখে আসবে না। তার শ্বেতরোগ ছিল। সে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিল, তখন তিনি এক স্বর্ণমুদ্রা বা রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া অন্য সব ভালো করে দিলেন। তোমাদের মধ্য হতে যাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হবে তারা যেন তার কাছ থেকে ক্ষমার দুআ করিয়ে নেয়।' [১১৬]
উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি কোত্থেকে এসেছেন?' তিনি বললেন, 'ইয়ামান থেকে।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার নাম কী?' তিনি জানালেন, 'উআইস।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'ইয়ামানে আপনি কাকে রেখে এসেছেন?' তিনি বললেন, 'আমার মাকে।' তারপর জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কি শ্বেতরোগ ছিল? আল্লাহর কাছে দুআ করার ফলে যা তিনি ভালো করে দিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমার জন্য ক্ষমার দুআ করুন।' উআইস বললেন, 'আমার মতো ব্যক্তি আপনার মতো ব্যক্তির জন্য দুআ করবে হে আমিরুল মুমিনিন!' তারপর তিনি তার জন্য দুআ করলেন। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না হে ভাই।”
বর্ণনাকারী বলেন, “এক ব্যক্তি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলল, 'আমাদের মাঝে একজন ব্যক্তি আছেন হে আমিরুল মুমিনিন, যাকে উআইস বলে ডাকা হয়। আমরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে থাকি।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তার সাথে সাক্ষাৎ করো। তবে মনে হয় না তুমি তাকে গিয়ে পাবে।' তারপর সেই ব্যক্তি রওনা হয়ে পরিবারের কাছে পৌঁছার আগেই উআইসের দেখা পেল। উআইস তাকে বললেন, 'তোমার স্বভাব তো এমন নয়। কী হয়েছে বলো?' সে জানাল, 'আমি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তোমার ব্যাপারে এই এই বলতে শুনেছি। সুতরাং তুমি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো হে উআইস।' তিনি বললেন, 'আমি ততক্ষণ পর্যন্ত তা করব না, যতক্ষণ না তুমি অঙ্গীকার করবে যে, ভবিষ্যতে আমাকে নিয়ে আর হাসাহাসি করবে না। আর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে যা শুনেছ সে বিষয়ে কাউকে জানাবে না।' তারপর তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।"

সালাতের মধ্যে শয়তানের ধোঁকা
[৭৮০] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি বলেন, “উআইস এক ব্যক্তিকে দেখল সালাত আদায় করছে কেবল উঠে আর বসে। তিনি তাকে বললেন, 'কী ব্যাপার?' সে বলল, 'আমি দাঁড়ালে শয়তান আমার কাছে এসে বলে, তুমি তো আমাকে দেখেছ। সুতরাং বসে পড়ো। তারপর আমার মন সালাতের দিকে ধাবিত হলে আমি দাঁড়িয়ে যাই। তখন শয়তান আবার আমাকে বলে, তুমি তো আমাকে দেখেছ। সুতরাং বসে পড়ো।' তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি যখন নির্জনে থাকো তখনো কি এভাবে সালাত আদায় করো?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি তাকে বললেন, 'সালাত আদায় করে যেতে থাকো।' তারপর আমি আর তাকে দেখিনি।”

তার সুপারিশে বহু লোক জাহান্নাম থেকে বের হয়ে আসবে
[৭৮১] হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, "রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
لَيَخْرُجَنَّ مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَةِ رَجُلٍ مَا هُوَ نَبِيٌّ أَكْثَرُ مِنْ رَبِيعَةً وَمُضَرَ
'এক ব্যক্তির সুপারিশে-যিনি নবি নন-জাহান্নাম থেকে মুদার ও রবীআ গোত্রের চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ বের হয়ে আসবে।” [১১৭]
হাসান বলেন, সাহাবারা বলতেন, “সেই ব্যক্তি হয়তো উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু অথবা উআইস কারনি।”

তিনি ছিলেন করন গোত্রের
[৭৮২] সাসা বুন মুআবিয়া বলেন, “উআইস ইবনু আমের কারনি ছিলেন করন গোত্রের এক ব্যক্তি। তিনি তাবিয়ি ও কুফার অধিবাসী ছিলেন। তার শ্বেতরোগ হয়েছিল। তিনি তখন আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেছিলেন, যেন তার থেকে এই রোগ দূর করে দেন তিনি। ফলে আল্লাহ তা দূর করে দেন। তারপর দিনি দুআ করেন, হে আল্লাহ, আমার শরীরে এমন কিছু আলামত রেখে দাও, যার মাধ্যমে আমি আমাকে দেওয়া তোমার নিআমাতের কথা স্মরণ রাখতে পারি। তখন আল্লাহ তার শরীরে এমন কিছু বহাল রাখেন (সামান্য শ্বেত অংশ) যার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নিআমাতের কথা স্মরণ করতে পারেন। তিনি জামে মাসজিদে যাবার খুব পাবন্দি করতেন। তার একজন চাচাতো ভাই ছিল। সে সুলতানের সঙ্গে থাকত সব সময়। সে যখন তাকে ধনীদের সাথে দেখত তখন বলত, 'এ তো কেবল তাদের (সম্পদ) আত্মসাৎ করতে চায়।' আর যখন দরিদ্রদের সাথে দেখত তখন বলত, 'সে কেবল তাদের ধোঁকা দিতে চায়।' আর উআইস তার চাচাতো ভাইয়ের ব্যাপারে ভালো ভিন্ন অন্য কিছু বলতেন না। তিনি যখন তার পাশ দিয়ে যেতেন তখন নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। যাতে করে তার কারণে তাকে গুনাহে লিপ্ত হতে না হয়। উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফা থেকে গমনকারী দলকে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'তোমরা কি উআইস ইবনু আমের কারনিকে চেনো?' তারা বলল, 'না, চিনি না।' তারপর তার কাছে কুফা থেকে অন্য আরেকটা দল এল। যাদের মধ্যে উআইস কারনির সেই চাচাতো ভাই-ও ছিল। তিনি তাদেরও জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কি উআইস ইবনু আমের কারনিকে চেনো?' তার চাচাতো ভাই উত্তর দিলো, 'সে তো আমার চাচাতো ভাই। লোক সুবিধার না সে। তার বিষয়ে আপনি তেমন কিছুই জানেন না, হে আমিরুল মুমিনিন।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'তোমার ধ্বংস হোক! তুমি যখন তার কাছে যাবে, তখন তাকে আমার সালাম পৌঁছে দিয়ো। এবং তাকে বোলো, যেন তিনি আমার কাছে আগমন করেন।'
তার চাচাতো ভাই কুফায় এসেই সফরের জামা-কাপড় পাল্টানোর আগেই উআইসের কাছে গিয়ে দেখল তিনি মাসজিদে আছেন। সে তাকে বলল, 'চাচাতো ভাই, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন হে আমার চাচার সন্তান।' এবার সে-ও বলল, 'আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন হে উআইস ইবনু আমের। আমিরুল মুমিনিন আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।' তিনি জানতে চাইলেন, 'আমিরুল মুমিনিনকে আমার কথা কে জানাল?' সে বলল, 'তিনি আপনার কথা উল্লেখ করে আপনার কাছে সালাম পৌঁছানোর এবং তার কাছে আপনাকে আগমন করার জন্য বলতে বলেছেন।' তিনি বললেন, 'আমীরের আদেশ শিরোধার্য।' তারপর তিনি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আগমন করলেন। তার সামনে আসতেই তিনি তাকে বললেন, 'আপনিই কি উআইস ইবনু আমের কারনি?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনিই কি সেই ব্যক্তি, যার শ্বেতরোগ হয়েছিল, আর তা দূর করে দেবার দুআ করার পর আল্লাহ তা দূর করে দিয়েছিলেন, তারপর তিনি দুআ করেছিলেন এই বলে যে, হে আল্লাহ আমার শরীরে এমন কিছু আলামত রেখে দাও, যার মাধ্যমে আমি আমাকে দেওয়া তোমার নিআমাতের কথা স্মরণ রাখতে পারি? তিনি তখন তার শরীরে এমন কিছু বহাল রাখেন (সামান্য শ্বেত অংশ) যার মাধ্যমে সে তার নিআমাতের কথা স্মরণ করতে পারেন।' তিনি বললেন, 'এগুলো আপনাকে কে জানাল হে আমিরুল মুমিনিন? আল্লাহর কসম, কোনো মানুষের তো তা জানার কথা না।'
তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের জানিয়েছেন যে, তাবিয়িদের মধ্যে করন গোত্রের এক ব্যক্তি আছে, যার নাম হলো উআইস ইবনু আমের কারনি। তার শ্বেতরোগ হবে। সে তা দূর করে দেবার দুআ করার পর আল্লাহ তা দূর করে দেবেন। তারপর সে দুআ করবে এই বলে যে, হে আল্লাহ আমার শরীরে এমন কিছু আলামত রেখে দাও, যার মাধ্যমে আমি আমাকে দেওয়া তোমার নিআমাতের কথা স্মরণ রাখতে পারি। ফলে তিনি তার শরীরে এমন কিছু রেখে দেবেন (সামান্য শ্বেত অংশ) যার মাধ্যমে সে তার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের কথা মনে রাখতে পারবে। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি তার দেখা পায় আর তার মাধ্যমে নিজের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে, তবে সে যেন নিজের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিয়ে নেয়। সুতরাং হে উআইস ইবনু আমের, আপনি আমার জন্য ক্ষমার দুআ করুন।' উআইস তখন বলল, 'আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। হে আমিরুল মুমিনিন'। এবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন হে উআইস ইবনু আমের।'
যখন লোকেরা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যটি জানতে পারল তখন একেকজন বলতে লাগল, 'আমার জন্যও ক্ষমার দুআ করুন। আমার জন্যও ক্ষমার দুআ করুন হে উআইস।' যখন খুব বেশি মানুষ এমন করতে লাগল, তখন তিনি দ্রুত সেখান থেকে চলে গেলেন। তারপর কিছুকাল পর্যন্ত তাকে আর দেখা যায়নি।”
[৭৮৩] আসবাগ ইবনে যায়দ বলেছেন, “নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উআইসের আগমন করার পথে বাধা ছিল তার মায়ের সেবা করা।”

তার সুপারিশে অনেক মানুষ মুক্তি পাবে
[৭৮৪] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يَدْخُلُ الْجَنَّةَ بِشَفَاعَةِ رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَكْثَرُ مِنْ رَبِيعَةَ وَمُضَرَ
"আমার উম্মতের এক ব্যক্তির সুপারিশে জাহান্নাম থেকে মুদার ও রবীআ গোত্রের চেয়েও বেশিসংখ্যক মানুষ বের হয়ে আসবে।"
হিশাম বলেন, “হাসানের সূত্রে হাওশাব আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি হলেন উআইস কারনি।”
আবূ বাকর বলেন, “আমি উআইসের গোত্রের এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম, কীসের কারণে তিনি (এত উচ্চ মর্যাদায়) উপনীত হলেন? তিনি বললেন, 'এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা দান করেন।”
আবূ বাকর বলেন, “উআইস সিজিস্তানে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার সাথে কিছু কাফনের কাপড় পাওয়া যায়, যা আগে তার কাছে ছিল না।”

উআইস কারনির খোঁজে
[৭৮৫] হারিম ইবনু হাইয়ান আবদি বলেন, "আমি উআইস কারনির তালাশে বসরা থেকে রওনা হয়ে কুফায় আগমন করে সেথায় কিছুদিন অবস্থান করলাম। কিন্তু তার কোনো খোঁজ বা দেখা পাচ্ছিলাম না। একদিন প্রচণ্ড গরমের দিনের দুপুর বেলায় ফুরাত নদীর তীরে একজন গোধূম বর্ণের লোকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো, যার দাড়ি ছিল বেশ ঘন। দেখতে অতটা সুন্দর নয়। উষ্কখুষ্ক চুল। মাথা মুণ্ডানো নয়। তার গায়ে দুইটি কাপড় ছিল। আমার ধারণা তা পশমের তৈরি। তার একটা লুঙ্গি হিসেবে অন্যটা চাদর হিসেবে (তিনি ব্যবহার করতেন)। তিনি দুইটির কোনোটিই পানি দিয়ে ধৌত করতেন না। আমার ধারণা হলো, ইনিই হয়তো সেই ব্যক্তি। আমি তার কাছে গিয়ে মাথার পাশে দাঁড়ালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
سُبْحَانَ رَبِّنَا إِن كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا
'আমাদের রব মহা পবিত্র। আমাদের রবের অঙ্গীকার অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।' [১১৮]
তারপর বললেন, 'কে তোমাকে আমার খোঁজ বলে দিলো?' আমি বললাম, 'আল্লাহ তাআলা আমাকে আপনার খোঁজ বলে দিয়েছেন।' তারপর আমি আমার হাত তার দিকে প্রসারিত করলাম। কিন্তু তিনি তার হাত বাড়ালেন না। আমি জানি না, ঠিক কোন কারণে তিনি এমনটি করলেন। এই দৃশ্য দেখে আমি কেঁদে ফেললাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি কেমন আছো, হে হারিম ইবনু হাইয়ান? কেমন আছো তুমি, হে আমার ভাই?' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। কীভাবে আপনি জানলেন যে, আমি হারিম ইবনু হাইয়ান? অথচ আমরা পরস্পর কাউকে (এর আগে কখনো) দেখিনি।' তিনি বললেন, 'আমার মন তোমার মনকে চিনে নিয়েছে।'
তারপর তিনি আমার হাত ধরলেন এবং কেঁদে ফেললেন। আমিও তার সাথে কাঁদলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন, 'তোমার (আদি) পিতা আদম আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। নূহ আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। রহমানের বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। মূসা আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। খলীফাতুল মুসলিমীন আবূ বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মারা গেছেন হে হারিম ইবনু হাইয়ান। আমার বন্ধু ও একান্ত দোস্ত উমার ইবনু খাত্তাবও মারা গেছেন।' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, উমার তো এখনো মারা যাননি।' সেটা ছিল উমারের খেলাফতের শেষ সময়কাল। তারপর উআইস বললেন, 'আমি আর তুমিও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে আছি। যদি তুমি বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করতে হে হারিম! তোমার পিতাও মারা গেছেন। হয়তো তিনি জান্নাতে আছেন নয়তো জাহান্নামে।' আমি তাকে বললাম, 'আল্লাহ আপনাকে রহম করুন। আপনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা শুনেছেন, তা আমাকে শোনান।' তিনি বললেন, 'আমি তার থেকে কিছু শুনিনি। তবে যারা তার থেকে শুনেছে, আমি তাদের থেকে শুনেছি।' আমি তাকে বললাম, 'আমাকেও শোনান, আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।' তিনি বললেন, 'আমি বিচারক, মুফতি বা মুহাদ্দিস হওয়ার দরজা নিজের জন্য উন্মুক্ত করাকে অপছন্দ করি। আমি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি।' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আমাকে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাবারকা ওয়া তাআলার বাণীই সর্বোচ্চ সত্য কথা। তার বক্তব্যই সর্বোত্তম বক্তব্য, আর তার হাদীসই সবচেয়ে বিশুদ্ধ।'
তারপর তিনি আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা দুখানের শুরু থেকে ৪২ নং আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন এবং হিক্কা তুলে একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। আমি (মনে মনে) বললাম, 'উআইস তো মারা গেছেন!' আল্লাহর যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ পর তিনি (অজ্ঞান থাকার পর) জ্ঞান ফিরে পেয়ে বললেন, 'হে আমার ভাই, আমি খুব দুশ্চিন্তার ভেতরে ছিলাম। আমি ওই সকল মানুষের সাথে থাকতে পারি না। একাকিত্বই আমার কাছে বেশি ভালো লাগে। আজকের পরে আমার কাছে আর কোনো আবেদন কোরো না। তোমার কথা আমার মনে থাকবে। যদি তুমি বাড়ি ফিরে যাও তবে আমার কথা স্মরণ রেখো। আমিও তোমার কথা স্মরণ রাখব।' আমি বললাম, 'আমার জন্য কিছু দুআ করুন।' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহ, আমার এই ভাই মনে করে যে, সে তোমার খাতিরেই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছে। সে তোমার জন্যই আমাকে ভালোবাসে। সুতরাং তুমি তার সবকিছুর ব্যবস্থা করে দাও এবং তাকে শান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশ করাও।' তারপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে তার পথ ধরলেন। আমিও কাঁদতে থাকলাম। তারপর স্বপ্নে পরস্পর দেখা হওয়া ছাড়া তার সাথে আমার আর কখনো দেখা হয়নি।”

জামাকাপড় সব সদাকা করে দেওয়া
[৭৮৬] মুগীরা বলেন, "উআইস কারনি তার জামাকাপড় সব সদাকা করে দিয়েছিলেন। ফলে তিনি বস্ত্রহীন হয়ে পড়েছিলেন। জুমুআর সালাতে যাবার জন্যও কাপড় ছিল না তার।”

দাফনের পর তার কবরের চিহ্ন উধাও হয়ে যায়
[৭৮৭] আবদুল্লাহ ইবনু সালামা বলেন, "উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর যুগে আমরা আজারবাইজান অভিযানে বেরিয়েছিলাম। আমাদের সাথে উআইস কারনিও ছিলেন। আমরা যখন ফিরে আসি তখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমরা তাকে বহন করে নিই। কিন্তু তিনি ঠিক থাকতে পারেননি। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আমরা (এক জায়গায়) অবতরণ করি। সেখানে দেখি কবর খোঁড়া আছে। পানি ভরা আছে। কাফনের কাপড় এবং সুগন্ধি প্রস্তুত আছে। আমরা তাকে গোসল দিয়ে কাফন পরালাম। তার জানাযার সালাত আদায় করে তাকে দাফন করলাম। আমরা পরস্পর বলাবলি করলাম, 'যদি আমরা ফিরে গিয়ে তার কবরের (জায়গাটা অন্যদের) চিনিয়ে দিই, তাহলে তার জন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারব। এরপর ফিরে গিয়ে দেখি সেখানে কোনো কবর বা কবরের চিহ্নও নেই।”

উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর তাকে খোঁজা
[৭৮৮] উসাইর ইবনু জাবের বলেন, “উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু- এর কাছে যখন ইয়ামান থেকে কোনো দল আসত তিনি তাদের জিজ্ঞেস করতেন, 'তোমাদের মধ্যে উআইস ইবনু আমের কারনি নামে কেউ আছে?' অবশেষে তিনি উআইস কারনির দেখা পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি উআইস ইবনু আমের কারনি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনি মুরাদ গোত্রের করন শাখার লোক?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জানতে চাইলেন, 'আপনার শ্বেতরোগ ছিল। তারপর এক রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকি শ্বেতরোগ ভালো হয়ে যায়?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার মা কি আছেন?' তিনি বললেন, 'জি হ্যাঁ।' এবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,
يَأْتِي عَلَيْكُمْ أُوَيْسُ بْنُ عَامِرٍ مَعَ أَمْدَادِ أَهْلِ الْيَمَنِ مِنْ مُرَادٍ ثُمَّ مِنْ قَرَنٍ كَانَ بِهِ بَرَضٌ فَبَرَأَ مِنْهُ إِلَّا مَوْضِعَ دِرْهَمٍ، لَهُ وَالِدَةٌ هُوَ بِهَا بَرُّ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ لَأَبَرَّهُ فَإِنِ اسْتَطَعْتَ أَنْ يَسْتَغْفِرَ لَكَ فَافْعَلْ
'ইয়ামানবাসীর সাথে মুরাদ গোত্রের করন শাখার উআইস বিন আমির নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আগমন করবে। তার শ্বেতরোগ ছিল। এক রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকিটুকু ভালো হয়ে যায়। তার মায়ের সেবায় সে নিয়োজিত আছে। যদি সে আল্লাহর নামে কসম করে তবে তিনি তা পূর্ণ করেন। যদি তোমার নিজের জন্য তাকে দিয়ে ক্ষমার দুআ করিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা করিয়ে নিয়ো। [১১৯]
সুতরাং আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' তখন তিনি তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তারপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কোথায় যেতে চাচ্ছেন?' তিনি বললেন, 'কুফায় যেতে চাচ্ছি।' উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে প্রস্তাব করলেন, 'আমি কি আপনার জন্য কুফার গভর্নরের কাছে লিখে দিতে পারি না, যাতে তিনি আপনার প্রতি খেয়াল রাখেন?' উআইস উত্তর দিলেন, 'সাধারণ মানুষের কাতারে থাকা আমি বেশি পছন্দ করি।'
পরের বছর তাদের (গোত্রের) সম্ভ্রান্ত এক লোক হাজ্জ করতে এলে উমারের সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি তখন তাকে উআইসের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন যে, তাকে কেমন দেখে এসেছে। সে জানাল, 'জীর্ণশীর্ণ ঘরে, সামান্য আসবাব নিয়ে তিনি থাকেন।' তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ইয়ামানবাসীর সাথে মুরাদ গোত্রের করন শাখার উআইস নামক এক ব্যক্তি তোমাদের কাছে আগমন করবে। তার শ্বেতরোগ ছিল। এক রৌপ্যমুদ্রা সমপরিমাণ জায়গা ছাড়া বাকিটুকু ভালো হয়ে যায়। তার মায়ের সেবায় সে নিয়োজিত আছে। যদি সে আল্লাহর নামে কসম করে তবে তিনি তা পূর্ণ করেন। যদি তোমার নিজের জন্য তাকে দিয়ে ক্ষমার দুআ করিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তা করিয়ে নিয়ো।' সেই ব্যক্তি কুফায় ফিরে যাওয়ার পর উআইসের কাছে এসে বলল, 'আমার জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন।' তিনি বললেন, 'আপনি মাত্র একটি সুন্দর সফর শেষ করে এসেছেন। আপনিই আমার জন্য ক্ষমার প্রার্থনা করুন। আপনার সাথে কি উমারের দেখা হয়েছে?' সে বলল, 'হ্যাঁ, হয়েছে।' তারপর তিনি তার জন্য ক্ষমার প্রার্থনা করলেন। লোকজন (এই বিষয়টি জেনে) তার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠল। তিনি তখন নিজের মতো (সেখান থেকে) চলে গেলেন।”
উসাইর বলেন, "আমি তাকে একটি চাদর দিয়েছিলাম। যখন কোনো মানুষ তার গায়ে সেটা দেখত, জিজ্ঞেস করত—এই চাদর উআইস কোথায় পেয়েছে?”

লোকদের সহায়তায় তিনি হাজ্জে যান
[৭৮৯] আতা খোরাসানি বলেন, “লোকেরা হাজ্জের আলোচনা করছিল। তখন তারা উআইসকে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কি হাজ্জ করেননি?' তিনি বললেন, 'না, করিনি।' তারা জানতে চাইল, 'কেন করলেন না?' তিনি চুপ করে রইলেন। তখন তাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি বলল, 'আমার কাছে বাহন আছে।' অন্যজন বলল, 'আমার কাছে খরচপাতি আছে।' অন্য আরেকজন বলল, 'আমার কাছে পথখরচ আছে।' তিনি তখন তাদের থেকে সেগুলো গ্রহণ করে হাজ্জ করতে আসেন।”

টিকাঃ
[১১৫] হিলইয়াতুল আওলিয়া, ২/৭৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৫/৭৬
[১১৬] সহীহ, মুসলিম : ৬৩৭; মুস্তাদরাক হাকিম, ৩/৪৫৬
[১১৭] মুরসাল, অবশ্য তিরমিযিতে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সুপারিশের বিষয়ে বলা হয়েছে। (সুনান তিরমিযি: ২৪৩৯)
[১১৮] সূরা ইসরা, ১৭: ১০৮
[১১৯] সহীহ। এর তাহকীক পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আসওয়াদ ইবনু ইয়াযিদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


একাধিকবার হাজ্জ-উমরা আদায় করা
[৭৯০] আবূ ইসহাক বলেন, "আসওয়াদ আশিবারের মতো হাজ্জ-উমরা আদায় করেছেন।"
[৭৯১] আবদুল্লাহ বলেন, "আমার পিতা বলেছেন, 'আমর ইবনু মাইমুন ষাটবারের মতো হাজ্জ-উমরা করেছেন।”

ইবাদাতে চেষ্টা-সাধনা করা
[৭৯২] আবদুল্লাহ ইবনু বিশর বলেন, “আলকামা ইবনু কায়স ও আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ উভয়ে হাজ্জ করলেন। আসওয়াদ অনেক বেশি ইবাদাতগুজার ছিলেন। তো তিনি একদিন সাওম রাখলেন। দ্বিপ্রহরের সময় লোকেরা (যার যার অবস্থানস্থলে) ফিরে গেল। তার চেহারার বর্ণ তখন (গরমের কারণে) পরিবর্তন হয়ে এল। আলকামা তার কাছে এসে তার রানের ওপর আঘাত করে বললেন, 'হে আবূ উমার, তুমি কি নিজের শরীরের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না? তুমি কেন নিজের শরীরকে এত কষ্ট দিচ্ছ?' তখন আসওয়াদ উত্তর দিলেন, 'হে আবূ শিবল, আমি তো কেবল (যথাসাধ্য) চেষ্টা-সাধনা করছি।”

পরকালের শান্তির জন্য দুনিয়ায় কষ্ট করা
[৭৯৩] আলি ইবনু মুদরিক বলেন, “আলকামা আসওয়াদকে সাওম পালনকারী অবস্থায় পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কেন এই শরীরকে এতটা কষ্ট দিচ্ছেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি আসলে তার (পরকালের) শান্তির জন্যই এটা করছি।”
[৭৯৪] আবদুর রহমান ইবনু সুরদান আবূ কায়স আল-আউদি বলেন, “আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ সাওম ও ইবাদাতে নিজেকে খুব ব্যস্ত রাখতেন। যার ফলে তার শরীর শুকিয়ে গিয়েছিল এবং হলুদ বর্ণ ধারণ করেছিল। তিনি বলেন, 'আলকামা বলতেন, হায় রে, তুমি কেন যে এই শরীরকে এত কষ্ট দিচ্ছো!' তিনি উত্তর দিতেন, 'আসলে বিষয়টি হলো আমি পরিশ্রম করছি, আসলে বিষয়টি হলো আমি পরিশ্রম করছি।”

ইরাকের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি
[৭৯৫] আসওয়াদ থেকে বর্ণিত, আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন, “ইরাকে আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদের চেয়ে বেশি সম্মানিত কেউ নেই।”

অত্যধিক নফল সালাত পড়তেন
[৭৯৬] আবদুল্লাহ ইবনু ইদরীস বলেন, “আমি মালিক ইবনু মিগওয়ালকে বলতে শুনেছি, একদিন তাকে তখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, 'তোমার সালাতের কী অবশিষ্ট আছে?' তখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন, '(আগের তুলনায়) অর্ধেকটা। দুই শ পঞ্চাশ রাকাত।”[১২০]

তার কপালে সাজদার দাগ ছিল
[৭৯৭] আবদুল কারীম আল-আয়ামি বলেন, “আমরা মুররা হামদানীর কাছে আসলাম। তিনি বের হয়ে (আমাদের সামনে) এলেন। তখন আমরা তার কপালে, হাতের তালুতে, হাঁটুতে ও পায়ে সাজদার চিহ্ন দেখতে পেলাম। তিনি আমাদের কাছে কিছু সময় বসলেন। তারপর উঠে গেলেন। (কেমন যেন তিনি পুরোটা সময়) রুকু-সাজদাতেই ছিলেন।"

রাতে তারা তিলাওয়াত করতেন
[৭৯৮] আবুল আহওয়াস বলেছেন, যদি কোনো ব্যক্তি রাতে তাঁবুতে আগমন করত তবে মৌমাছির গুনগুন আওয়াজের ন্যায় তাঁবুতে অবস্থানকারীদের আওয়াজ শুনতে পেত। ইনারা তো নিরাপদ সেই শঙ্কা থেকে, যার আশঙ্কা উনারা করতেন।[১২১]

প্রত্যেক মানুষেরই ভুলত্রুটি থাকে
[৭৯৯] তালহা বললেন, “প্রত্যেক মানুষেরই দিনের ভুলত্রুটি থাকে।” তখন তার এক গোলাম তাকে বলল, “যদি এটাই আপনার কর্মপন্থা হয়, তাহলে আপনি দৃষ্টিশক্তি হারাবেন এবং নিজের জন্য একজন পথপ্রদর্শক আপনার প্রয়োজন হয়ে পড়বে।”

নবিজির সাথে প্রতিনিধিদলের সাক্ষাৎ
[৮৩৬] খলাফ ইবনু আয়ান বলেন, “যখন বাকর ইবনু ওয়ায়েলের প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসলেন, তখন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'কুস ইবনু সায়েদাহ আল-ইয়াদি কী করেছে?' তারা জানাল, 'সে তো মারা গেছে হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'আমি যেন উটের ওপর বসা উকাযের বাজারে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছি আর সে বলছে—হে লোকসকল, তোমরা একত্র হয়ে আমি যা বলছি শোনো এবং তা মনে রাখো। যে বেঁচে আছে সে মারা যাবে, আর যে মারা যাবে সে বঞ্চিত হবে। প্রত্যেক যা কিছু ঘটার তা ঘটবেই। বিছানা বিছানো হয়ে গেছে। ছাদ তুলে নেওয়া হয়েছে। তারকা ছুটোছুটি করছে। সমুদ্র আরও গভীর হচ্ছে। আসমানে আছে সংবাদ আর জমিনে আছে অনেক শিক্ষার উপকরণ। আল্লাহর কসম, তোমরা যে ধর্মে রয়েছে আল্লাহর তারচেয়ে বেশি পছন্দনীয় একটি দ্বীন রয়েছে।” [১২৯]
বর্ণনাকারী বলেন, “তারপর তিনি একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, তখন কওমের এক ব্যক্তি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি একটি কবিতা আবৃত্তি করব।' তারপর সে তাদের আবৃত্তি করে শোনাল,
فِي الذَّاهِبِينَ الْأَوَّلِينَ ... مِنَ الْقُرُونِ لَنَا بَصَائِرُ لَمَّا رَأَيْتُ مَوَارِدًا لِلْمَوْ ... تِ لَيْسَ لَهَا مَصَادِرُ لَا يَرْجِعُ الْمَاضِي إِلَى ... وَلَا مِنَ الْبَاقِينَ غَابِرُ أَيْقَنْتُ أَنِّي لَا مَحَالَةً ... حَيْثُ صَارَ الْقَوْمُ صَائِرُ
যুগে যুগে যারা গত হয়েছে তাদের থেকে আমাদের আছে অনেক কিছু শিখবার।
যখন আমি দেখতে পাচ্ছি যে, কোনো উপায় নেই মৃত্যুর পথ থেকে বাঁচবার। অতীত আমার কাছে ফিরে আসবে না কভু, বেঁচে রবে না বাদবাকি মানুষেরা। দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে আমার—অবশ্যই আমি উপনীত হব সেথায়, যেথায় গমন করেছে লোকেরা।”

অধিক সাজদাকারীদের চেহারা শুভ্র হবে
[৮৩৭] মুজাহিদ থেকে বর্ণিত,
سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ
“তাদের পরিচয় হলো তাদের চেহারায় সাজদা-চিহ্ন থাকে।” [১৩০] তিনি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “দুনিয়াতে বেশি বেশি সাজদা করার কারণে কিয়ামাতের দিন তাদের চেহারা শুভ্র হবে।”

সন্তানের জন্য দুআ
[৮৩৮] সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা বলেন, “যখন যর ইবনু উমার ইবনু যর মারা গেলেন তখন উমার ইবনু যর বললেন, ‘ওহে যার, তোমার শোকে আমরা এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, তোমার (কবরে কী হবে সেই) ব্যাপারে আমরা দুশ্চিন্তা করার সময় পাইনি। হায়! (কবরে) তুমি কী বলেছ, আর তোমাকে কী বলা হয়েছে তা যদি জানতে পারতাম! হে আল্লাহ, আমার অধিকার আদায় করতে গিয়ে যরের যেটুকু ঘাটতি হয়েছে, আমি তা তাকে দিয়ে দিলাম; তোমার দায়িত্ব পালনে তার যেটুকু ঘাটতি হয়েছে, তুমি তাকে সেটুকু মাফ করে দাও।
সুফিয়ান বলেন, উমার ইবনু যর আয়াতটি পড়তেন :
مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
“বিচারদিনের মালিক।” [১৩১]

সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে আফসোস করা
[৮৩৯] আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক থেকে বর্ণিত, উসমান ইবনু আবী দাহরাশ যখন ফজরের সময় আগত হতে দেখতেন, তখন ব্যথিত হতেন। (কারণ, জীবনের একটা দিন অতিবাহিত হয়ে গেল)। তিনি বলতেন, "আমি এখন মানুষের সাথে আছি। কিন্তু আমার জানা নেই নিজের জন্য আমি কী অর্জন করলাম।" 우স্মান ইবনু আবী দাহরাশ বলেন, “আমি প্রত্যেক সালাতের পরেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি-তাতে যে কমতি হয়েছে এর জন্য।”

মৃত্যুই যেন ইফতার হয়
[৮৪০] মুসলিম ইবনু জাফর বলেন, “আমি মুহাম্মাদ বিন বিশরকে বলতে শুনেছি যে-দুনিয়া থেকে সাওম রেখে (বিদায় গ্রহণ করো)। মৃত্যুই যেন হয় তোমার ইফতার। কষ্ট প্রলম্বিত হওয়ার ভয়ে ওষুধ খেতে থাকা আপন ক্ষতের চিকিৎসাকারীর ন্যায় হও। এর মাধ্যমে তুমি দীর্ঘ প্রশান্তি লাভ করবে।”[১৩২]

মৃত্যুর আলোচনা শুনে মারা গেলেন
[৮৪১] আবুল মুগীরা বলেন, “আমরা রমাদান মাসের কোনো এক রাতে উমার ইবনু যরের মজলিসে ছিলাম। যরের পুত্র তখন আলোচনা করল এবং মৃত্যুর উপস্থিত হওয়ার কথা এবং মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির কাছে আগমন করা রহমত ও আযাবের ফেরেশতার কথা আলোচনা করল। একজন যুবক (তা শুনে) লাফ দিয়ে উঠল এবং চিৎকার করতে করতে ও তড়পাতে তড়পাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।”

ভাড়াটে লোকের কান্না
[৮৪২] ইবনুস সাম্মাক বলেন, “যর তার পিতা উমার ইবনু যরকে বলল, 'আলোচকদের কী হলো যে, তারা আলোচনা করলে কেউ কাঁদে না। কিন্তু যখনই আপনি আলোচনা করেন তখন এখান-সেখান থেকে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে?' তিনি বললেন, 'হে আমার ছেলে, ভাড়াটে ক্রন্দনকারীর ক্রন্দন কখনো সন্তানহারা মায়ের ক্রন্দনের মতো হয় না।”

নিজের ব্যাপারে আশঙ্কা করা
[৮৪৩] আবূ হাইয়ান তাইমি বলেন, “আমি ইবরাহীম তাইমি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যখনই আমি আমার কথাকে কাজের সামনে পেশ করেছি, তখনই আশঙ্কা হয়েছে যে, আমি মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন হব।”

টিকাঃ
[১২০] অর্থাৎ তিনি যৌবনে পাঁচ শ রাকাত করে পড়তেন। এখন বৃদ্ধ হয়ে যাবার পর সালাতের পরিমাণটা কমে গেলেও এখনো অর্ধেকটা অবশিষ্ট আছে। যার পরিমাণ হলো দৈনিক দুই শ পঞ্চাশ রাকাত।- অনুবাদক
[১২১] অর্থাৎ যেখানে সাহাবি ও তাবিয়িরা তাঁবু ফেলে অবস্থান করতেন সেখানে যে রাতে আগমন করত সে তাদের রাত জেগে কুরআন তিলাওয়াত ও যিকর-আযকারের শব্দ শুনতে পেত। আবুল আহওয়াস তার বিস্ময় প্রকাশ করেন যে, তার সময়কার লোকেরা নিরাপদ হলেও তাদের পূর্ববর্তী মুজাহিদরা ঠিকই শত্রুর অনিষ্টতার আশঙ্কা করতেন। -অনুবাদক
[১২৯] সনদ যঈফ। বাইহাকি, দালায়িলুন নাবুওয়াতি, ২/১০১; ইবনু কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২/৬২৩
[১৩০] সূরা ফাতহ, ৪৮: ২৯
[১৩১] সূরা ফাতিহা, ১: ৩
[১৩২] অর্থাৎ দুনিয়াতে ইবাদাতের কষ্ট করে গেলে আখেরাতে জান্নাতে দীর্ঘ সুখ লাভ করবে।-অনুবাদক

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 মাসরুক রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 মাসরুক রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


যিকরে থাকা সালাতে থাকার মতোই
[৮০০] মাসরূক বলেন, “যতক্ষণ কারও অন্তর আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকে, ততক্ষণ সে সালাতের মধ্যে থাকে। যদিও তার অবস্থান বাজারের মধ্যে হয়।”

সাজদারত অবস্থায় ঘুমানো
[৮০১] আবূ ইসহাক বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ হাজ্জ করেছেন এমন অবস্থায় যে, যখনই তিনি ঘুমিয়েছেন তখনই কপালের ওপর সাজদারত অবস্থায় ছিলেন।”

সাজদা ছাড়া সবকিছুর জন্য দুঃখবোধ
[৮০২] সাঈদ ইবনু জুবায়ের বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তাআলাকে সাজদা করা ছাড়া, দুনিয়ার বাকি সবকিছুর জন্য আমার দুঃখবোধ হয়।”

কপালকে মাটিতে ধূসরিত করা
[৮০৩] সাঈদ ইবনু জুবায়ের বলেন, “একদিন মাসরূকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, 'হে আবূ সাঈদ, নিজেদের কপালকে ধুলোয় ধূসরিত করা ছাড়া আগ্রহান্বিত হওয়ার মতো আর কিছুই নেই।”

ইলম অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করা
[৮০৪] আবদুল্লাহ ইবনু মুররা বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, 'মানুষ তার ইলম অনুযায়ী আল্লাহকে ভয় করে এবং নিজের অজ্ঞতা অনুপাতে নিজের ইলমের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে।”

প্রতিটি পদক্ষেপে নেকি বা গুনাহ হয়
[৮০৫] সুলাইমান থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "মানুষ যখনই কোনো পদক্ষেপ নেয়, এর জন্য তার আমলনামায় একটি নেকি অথবা একটি গুনাহ হয়। বরাদ্দ হয়। (অর্থাৎ ভালো কাজের জন্য হলে নেকি বরাদ্দ হয় আর খারাপ কাজের জন্য হলে গুনাহ)।”

কবিতার প্রতি অনীহা
[৮০৬] মুসলিম থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ-কে একটা কবিতার পঙ্ক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, “আমি চাই না, আমার আমালনামায় কবিতার কোনো বিষয় থাকুক।”

রিযকের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস
[৮০৭] আবদুল্লাহ ইবনু মুররা থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'খাদিম যখন এসে বলে, আমাদের কাছে খাবারও নেই, পয়সাও নেই, তখন আমি রিযকের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস রাখতে পারি না!'

আল্লাহ তাআলাই দান করেন ও দান বন্ধ করেন
[৮০৮] মুসলিম থেকে বর্ণিত, وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا “যে আল্লাহকে ভয় করবে তিনি তার জন্য উপায় বের করে দেবেন।” [১২২] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "উপায় দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—এই কথা জানা যে, আল্লাহ তাআলাই দান করেন ও দান বন্ধ করেন।”

আল্লাহর ওপর ভরসা
[৮০৯] আল্লাহ তাআলা বলেছেন, وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করবে তিনি তার জন্য যথেষ্ট হবেন।”[১২৩] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তিই আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনি কি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান না? হ্যাঁ, যে তার ওপর ভরসা করে তিনি তার পাপ মোচন করেন এবং তার প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেন।"
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ "নিশ্চয়ই তিনি তার কাজ সমাধা করবেন।" [১২৪] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে তার ওপর ভরসা করে আর যে করে না, এখানে তাদের বিষয়ে বলা হয়েছে।”
আল্লাহ তাআলা বলেন, قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটা পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন।” [১২২] এই আয়াতের ব্যখ্যায় মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “পরিমাণ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—সময়সীমা।”

নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করা
[৮১০] মুসলিম থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মানুষ এই বিষয়ের উপযুক্ত যে, সে নির্জন মজলিসে উপস্থিত হয়ে নিজের গুনাহের কথা স্মরণ করবে এবং এর থেকে তাওবা করবে।”

দুনিয়া আমাদের নিচে
[৮১১] ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু মুনতাশির বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ প্রতি শুক্রবার একটি খচ্চরে আরোহণ করে আমাকে তার পেছনে চড়িয়ে নিতেন। তারপর জীযা নামক স্থানের একটি পুরাতন ইবাদাতখানায় এসে তাতে খচ্চরকে রেখে বলতেন, ‘দুনিয়া আমাদের নিচে।’”

কবরে থাকা মুমিনকে ঈর্ষা করা
[৮১২] খিফাফ ইবনু আবূ সারিয়া বলেন, “মাসরূক বলেছেন, ‘আমি সবচেয়ে বেশি ঈর্ষা করি কবরে থাকা সে মুমিনকে, যে শাস্তি থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে এবং দুনিয়া থেকে (বিদায় নেবার মাধ্যমে) প্রশান্তি লাভ করেছে।’”

লম্বা সালাত আদায়
[৮১৩] আনাস ইবনু সিরীন মাসরূকের স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন যে, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ এত লম্বা সালাত আদায় করতেন যে, তার উভয় পা ফুলে যেত। নিজের প্রতি করা এমন (কষ্টকর) কাজের কারণে, তার স্ত্রী বসে বসে কাঁদতেন।”

আল্লাহ তাআলা থেকে সতর্কতা অবলম্বন
[৮১৪] শাবি থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ চল্লিশ বছর বয়সে পৌঁছে, তখন সে যেন আল্লাহ তাআলা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করে।”

যে আল্লাহকে ভালোবাসে তাকেও ভালোবাসা
[৮১৫] এক ব্যক্তি মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ-কে বলল, “আমি আল্লাহর জন্য আপনাকে ভালোবাসি।” তিনি বললেন, “নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহকে ভালোবেসেছ, তাই যে আল্লাহকে ভালোবাসে তাকেও ভালোবাসো।”

তিনি চরিত্রবান ছিলেন
[৮১৬] আবূ ওয়ায়েল বলেন, “আমি মাসরূকের সাথে ছিলাম। তিনি তখন সিলসিলাহ এলাকাতে আমীর হিসেবে ছিলেন। আমি তার থেকে চরিত্রবান কাউকে দেখিনি। তিনি কেবল দজলা নদী থেকে পানি সংগ্রহ করতেন।”

এক যুবকের নাসীহাত
[৮১৭] শাবি বলেন, “মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ-কে জিয়াদ 'সিলসিলাহ' এলাকার কর্মকর্তারূপে পাঠালেন। যখন মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বের হলেন, তখন তার সাথে তাকে বিদায় জানানোর উদ্দেশ্যে কুফার কারিগণও বের হলেন। তাদের মধ্যে ঘোড়ায় চড়া এক যুবক ছিল। যখন তিনি ফিরে এলেন এবং নিজের কয়েকজন সঙ্গীর সাথে অবস্থান করছিলেন, তখন সেই যুবক তার নিকটবর্তী হয়ে তাকে বললেন, 'আপনি তো কুফার কারিদের প্রধান ও তাদের সর্দার। যদি জানতে চাওয়া হয়, তাদের মধ্যে কে সর্বশ্রেষ্ঠ? উত্তর আসবে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী কে? উত্তর আসবে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ। যদি প্রশ্ন করা হয়, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফকীহ কে? উত্তর আসবে, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ। আপনার সুনাম তাদেরই সুনাম। আপনার বদনাম তাদেরই বদনাম। আল্লাহর দোহাই দিয়ে আমি আপনাকে বলি, অথবা তিনি বলেছেন, আল্লাহর কাছে আমি আপনার ব্যাপারে পানাহ চাচ্ছি এই বিষয় থেকে যে—আপনি নিজের ব্যাপারে দরিদ্রতা বা দীর্ঘ আশা পোষণের কথা বলবেন।' তখন মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, "আমি যে অবস্থায় আছি, তুমি কি সে ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করবে না?' সে উত্তর দিলো, 'আল্লাহর কসম, আপনি যে অবস্থায় আছেন আমি তাতে মোটেও সন্তুষ্ট নই। সুতরাং আমি কী করে আপনাকে সহায়তা করব? আপনি চলে যান।' যুবক প্রস্থান করার পর মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'এই যুবকের নাসীহাত আমাকে যতটা স্পর্শ করেছে, কোনো নাসীহাত তা করেনি।' সুফিয়ান বলেন, 'যখন মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ তার সেই কাজ থেকে ফিরে এলেন, তখন তার কাছে আবুল ওয়ায়েল আগমন করলেন। মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'আমি এমন কোনো কাজ করিনি, যার ব্যাপারে আমি শঙ্কাবোধ করছি যে তা আমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে। তবে এই কাজটি ছিল এর ব্যতিক্রম। আমি এতে (অর্থাৎ কর্মকর্তা হয়ে সিলসিলাহ নামক এলাকায় গমন করার কাজে) কোনো মুসলিম বা চুক্তিবদ্ধ কাফিরের প্রতি জুলুম করিনি।”

কিয়ামাতের দিন আফসোস
[৮১৮] হারেস ইবনু উমাইরা থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “বিপদগ্রস্ত লোকেরা কিয়ামাতের দিন আফসোস করবে যে, যদি (দুনিয়াতে) তাদের চামড়াগুলো কাঁচি দিয়ে কাটা হতো!”[১২৬]
[৮১৯] তালহা থেকে বর্ণিত, মাসরূক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “দুনিয়াতে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিরা বিপদের অনুপাতে কিয়ামাতের দিন প্রতিদান পাবার সময় খুব আফসোস করবে। এমনকি কেউ কেউ আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে যে, যদি দুনিয়াতে তার চামড়া কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলা হতো!”

মাসজিদ আল্লাহর ঘর
[৮২০] আমর ইবনু মায়মুন বলেন, “মাসজিদ হলো আল্লাহর ঘর। আর যাকে দেখতে যাওয়া হয় তার দায়িত্ব হলো—দেখা করতে আসা ব্যক্তিকে সম্মান করা।”

কোনো মুসলিমকে ধোঁকা না দেওয়া
[৮২১] ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, “মায়মুন ইবনু আবী শাবীব কোনো জাল রৌপ্যমুদ্রা দেখলে তা ভেঙে ফেলতেন। তিনি বলতেন, ‘কোনো মুসলিম যাতে তোমার মাধ্যমে ধোঁকাগ্রস্ত না হয়।”

একজন ঘোষকের ঘোষণা
[৮২২] হাসান ইবনু হুর থেকে বর্ণিত, মায়মুন ইবনু আবী শাবীব বলেছেন, “হাজ্জাজের শাসনামেলে আমি একবার জুমুআর সালাতে যাবার ইচ্ছায় প্রস্তুতি নিলাম। তো (মনে মনে) বললাম, আমি কোথায় যাব? এর (হাজ্জাজের) পেছনে সালাত আদায় করব? তাই একবার ভাবলাম যাব। আবার ভাবলাম যাব না। শেষ পর্যন্ত যাওয়ার ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত স্থির করলাম। এমন সময় ঘরের পাশ থেকে একজন ঘোষক আমাকে ডাক দিয়ে বলল:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ
'হে ঈমানদারগণ, যখন জুমুআর দিন সালাতের জন্য আহ্বান জানানো হয়, তখন আল্লাহর স্মরণে দ্রুত এগিয়ে যাও।”[১২৭]
তিনি বলেন, “অতঃপর আমি গমন করলাম। একদিন আমি এক গ্রন্থ রচনায় হাত দিলাম। আমার সামনে এমন একটি বিষয় উপস্থিত হলো, যদি তা লিখি—তবে আমার গ্রন্থটি সৌন্দর্যমণ্ডিত হলেও—আমি নিজে মিথ্যাবাদী হয়ে যাই। আর যদি না লিখি—তবে আমি নিজে সত্যবাদী প্রতীয়মান হলেও—গ্রন্থটিতে কিছুটা অসৌন্দর্য চলে আসে। তাই একবার ভাবছিলাম, গ্রন্থটা লিখে ফেলি। আরেকবার ভাবছিলাম, নাহ থাক; লিখব না। শেষ পর্যন্ত না লেখার ব্যাপারেই সিদ্ধান্ত স্থির করলাম। তাই তা বাদ দিলাম। সে সময় ঘরের পাশ থেকে একজন ঘোষক আমাকে ডেকে বলল:
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ
‘আল্লাহ তাআলা মুমিনদের দুনিয়া-আখিরাতে সুদৃঢ় কথার মাধ্যমে দৃঢ়পদ রাখবেন।'”[১২৮]

টিকাঃ
[১২২] সূরা তালাক, ৬৫: ২
[১২৩] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[১২৪] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[১২৫] সূরা তালাক, ৬৫: ৩
[১২৬] অর্থাৎ দুনিয়াতে যার বিপদ যত বেশি হবে আখেরাতে তার প্রতিদান তত বেশি হবে। তাই বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি আফসোস করবে যে, দুনিয়াতে যদি তার বিপদ অনেক বেশি হতো, তাহলেই তো ভালো হতো। এর ফলে আখেরাতে এখন সে বেশি প্রতিদান পেত।-অনুবাদক
[১২৭] সূরা জুমুআ, ৬২: ৯
[১২৮] সূরা ইবরাহীম, ১৪: ২৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00