📄 আতা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
পৃথিবীতে বসে জান্নাতের সুসংবাদ
[১৯৫] জাফর রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “আমি মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি হিশাম ইবনু জিয়াদ আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-কে এই ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। সেদিন তা নিয়েই আমাদের মধ্যে আলোচনা হলো। হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সিরিয়ার একজন লোক হাজ্জের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা করল। পথিমধ্যে সে এক জায়গায় ঘুমিয়ে পড়ল। তখন স্বপ্নে একজন আগন্তুক তার কাছে এসে বলল, তুমি ইরাক গমন করো। এরপর বসরায় গমন করো। এরপর বনু আদিতে গমন করো। সেখানে গিয়ে আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গমন করো। তিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। তুমি গিয়ে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। সে তখন বলল, স্বপ্ন তো স্বপ্নই! যখন দ্বিতীয় রাত হলো আর সে শয়ন করল, তখন একজন আগন্তুক এসে তাকে পূর্বের মতো বলল, তুমি কি ইরাকে গমন করবে না? এরপর বসরায় গমন করবে না? তারপর পূর্বের দিনের অনুরূপ কথাই বলল। এরপর যখন তৃতীয় রাত হলো তখন সেই আগন্তুক তার কাছে শাস্তি প্রদানের হুমকিসহ এল। এরপর বলল, তুমি কি ইরাকে গমন করবে না? এরপর বসরায় গমন করবে না? এরপর বানু আদিতে গমন করবে না? এরপর আলা ইবনু জিয়াদের কাছে যাবে না? তিনি মাঝারি গড়নবিশিষ্ট সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। তুমি তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
তিনি বলেন, “সকালে উঠে সামানাপত্র নিয়ে সে ইরাকের পথ ধরল। যখন সে এলাকা থেকে বের হয়ে গেল, তখন আচমকা সেই ব্যক্তিকে দেখতে পেল, যাকে সে স্বপ্নে দেখেছিল। সে যে দিকেই চলছিল, সে দিকেই তাকে দেখতে লাগল। যখন সে যাত্রাবিরতি করত, তখন তাকে হারিয়ে ফেলত। এভাবে চলতে চলতে সে কুফা নগরীতে এসে পৌঁছল। তখন সেই আগন্তুককেও হারিয়ে ফেলল। কুফা থেকে সামানাপত্র নিয়ে যখন প্রস্তুত হয়ে যাত্রা করল, তখন সেই আগন্তুককে সামনে সামনে চলন্ত অবস্থায় দেখতে পেল। এভাবে তারা বসরায় এসে পৌঁছল। এরপর বনু আদিতে এসে আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর বাড়িতে প্রবেশ করল। তখন সেই লোকটি আলা রাহিমাহুল্লাহ-এর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো।”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি তখন তার উদ্দেশে বের হলাম। তখন সে আমাকে বলল, আপনি 'আলা ইবনু জিয়াদ?' আমি বললাম, 'না, তবে আপনি বসুন। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি আপনার মালপত্র রাখুন। আসবাবপত্র নামিয়ে রাখুন।' তিনি বললেন, 'না, আলা ইবনু জিয়াদ কোথায়?' আমি বললাম, 'তিনি মাসজিদে। তিনি দুআ-দুরুদ পড়ছেন এবং আলোচনা করছেন।”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “তখন আমি আলা রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আসলাম। তিনি তার আলোচনা হালকা করে ফেললেন এবং দু-রাকাত সালাত আদায় করলেন। এরপর আসলেন। যখন আলা তাকে দেখলেন তখন তিনি মৃদু হাসলেন। এমনকি তার সামনের দাঁত দুটিও প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, এ হলো আমার সঙ্গী। তুমি ভদ্রলোকের মালসামানা নামিয়ে আনলে না কেন? কেন তা নামালে না?” তিনি বললেন, "আমি তাকে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তখন আলা রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তুমি নামিয়ে আনো। আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তখন সে বলল, 'আমাকে যেতে দিন।” তিনি বলেন, “তখন আলা নিজ গৃহে প্রবেশ করে বললেন, 'হে আসমা, তুমি অন্য ঘরে যাও।' তখন সে অন্য ঘরে চলে গেল এবং ভদ্রলোক গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। এরপর তাকে স্বপ্নে দেখা সুসংবাদের কথা জানাল। এরপর সে বের হয়ে নিজ বাহনে আরোহণ করল। অতঃপর আলা রাহিমাহুল্লাহ তখন উঠে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর তিনি তিন দিন বা সাত দিন শুধু কাঁদলেন। এই দিনগুলোতে কোনো খাবার বা পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করেননি এবং তার দরজা খুলেননি।”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি তাকে তার কান্নার মাঝে বলতে শুনেছি- 'আমি! আমি!' তার ঘরের দরজা খুলতেও আমাদের সাহসে কুলাচ্ছিল না। আবার আমরা তার মরে যাওয়ার আশঙ্কাও করছিলাম। তখন আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে পুরো ঘটনা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলাম। আমি বললাম, আমি তো তাকে কাঁদতে কাঁদতে মরণাপন্ন অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। তিনি কোনো খাবার ও পানীয় ছুঁয়েও দেখছেন না। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ এসে তার দরজায় করাঘাত করে বললেন, 'দরজা খোলো, হে আমার ভাই।' যখন তিনি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা শুনতে পেলেন তখন উঠে এসে দরজা খুলে দিলেন। সে সময় তার ওপর এমন সাংঘাতিক হালত চেপে ছিল, যার ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। পরিশেষে তিনি বললেন, 'আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। আল্লাহ যদি চান তুমি হবে জান্নাতবাসীদের একজন। তুমি কি নিজেই নিজেকে মেরে ফেলবে?”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “আলা রাহিমাহুল্লাহ আমাকে এবং হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে স্বপ্নের বিবরণ জানালেন আর বলে দিলেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি, এই স্বপ্নের কথা কাউকে জানাবে না।”
সাবিত রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রশংসা
[১৯৬] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “নিশ্চয়ই কল্যাণের অনেক চাবি রয়েছে। আর সাবিত হলেন কল্যাণের চাবিসমূহের মধ্য থেকে একটি চাবি।”
মানুষ শয়তানের ধোঁকায় আখিরাতকে ভুলে যায়
[১৯৭] উবায়দুল্লাহ ইবনু শুমায়ত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, 'আদম-সন্তানের জন্য বিস্ময়! অনেক সময় তার অন্তর থাকে আখিরাতে। অনন্তর বুরগুছ[১৫] তাকে চুলকায়। ফলে সে আখিরাতকে ভুলে যায়।”
মানুষের শরীর হলো আল্লাহর পথের বাহন
[১৯৮] উবায়দুল্লাহ ইবনু শুমায়ত এবং জাফর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, “আমরা শুমায়ত ইবনু আজলান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহর কসম, আমি মনে করি, তোমাদের শরীরগুলো হলো তোমাদের প্রতিপালকের পথে বাহন। তাই তোমরা মহান আল্লাহর আনুগত্যের জন্য তা প্রস্তুত করো। আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বরকত দান করুন।”
কিয়ামাত দিবসের ব্যাপারে দুআ
[১৯৯] আবদুল মালিক ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি আবুল আহওয়াস রাহিমাহুল্লাহ-কে তার দুআয় বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কিয়ামাত দিবসে ছায়া, বরকতপূর্ণ পানি এবং নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।”
ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ-এর উপদেশ
[২০০] আবু সিনান আল-কাসমালি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একদিন ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ আতা আল খুরাসানি রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আগমন করে বললেন, 'তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! আমি কি অবগত করিনি যে, তুমি তোমার ইলমকে রাজা-বাদশাহ এবং দুনিয়াদারদের দুয়ারে দুয়ারে বয়ে বেড়াচ্ছ! তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! তুমি এমন ব্যক্তির কাছে গমন করছ, যে তোমার থেকে তার দুয়ার রুদ্ধ রাখে, তোমার সামনে তার দারিদ্র্য প্রদর্শন করে এবং তোমার থেকে তার সচ্ছলতা আড়াল করে। আর যারা তোমার জন্য তাদের দুয়ার খুলে রাখে, তোমার সামনে নিজেদের সচ্ছল অবস্থা প্রকাশ করে এবং বলে যে, আমাকে আহ্বান করো, আমি তোমার আহ্বানে সাড়া দেবো, তুমি তাদের ত্যাগ করছ! তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! হিকমাহ অর্জিত হলে দুনিয়ার তুচ্ছ পরিমাণ নিয়েই তুমি সন্তুষ্ট থেকো। আর দুনিয়া লাভ করে তুচ্ছ পরিমাণ হিকমাহ নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট হোয়ো না। তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় এই পরিমাণ সম্পদ যদি তোমাকে সচ্ছল না করে, তাহলে দুনিয়ার কোনো জিনিসই তোমাকে আর সচ্ছল করতে পারবে না। তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! নিশ্চয়ই তোমার উদর সমুদ্রসমূহের মধ্য থেকে একটি সমুদ্র এবং উপত্যকাগুলোর মধ্য থেকে একটি উপত্যকা। মাটি ছাড়া অন্য কিছুই তা পূর্ণ করতে পারবে না।”
শয়তানের উপহাস
[২০১] মাখলাদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-কে এক ব্যক্তি বলল, 'তোমার জন্য আফসোস, আমি তোমাকে জান্নাতে দেখলাম!' তিনি বললেন, 'শয়তান কি আমি এবং তুমি ছাড়া আর কাউকে পেল না, যাকে নিয়ে সে উপহাস করবে?”
আল্লাহভীরু বান্দাদের দিকে সৃষ্টিকুলকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া হয়
[২০২] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক লোক লৌকিকতার উদ্দেশ্যে আমল করত। সে কেরাত পাঠের সময় কাপড় গুটিয়ে নিত এবং কণ্ঠস্বর উঁচু করত। সে সময় সে যার কাছেই আসত, সে-ই তাকে গালাগাল করত এবং অভিশাপ দিত। এরপর আল্লাহ তাকে কিছু ইখলাস দান করলেন। তখন সে নিম্ন আওয়াজে কেরাত পাঠ করত এবং তার সালাতকে নিজের মাঝে এবং মহান আল্লাহর মাঝে সীমাবদ্ধ রাখত। এরপর থেকে লোকটি যার কাছেই গমন করত, সে-ই তার জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করত এবং 'আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন' বলে দুআ করত।"
ইবাদাতের মধ্য দিয়ে রাত্রি জাগরণ
[২০৩] জাফর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমাদের মজলিসে আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাই হিশাম ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ আগমন করলেন। তখন মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'তুমি তাদের তোমার ভাইয়ের ঘটনা শোনাও।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমার ভাই আলা ইবনু জিয়াদ প্রতি শুক্রবার রাত্রি জাগরণে কাটাতেন। এক রাতে তিনি এসে তার স্ত্রী আসমা রাহিমাহাল্লাহ-কে বললেন, হে আসমা, আজকের রাতে খুব অবসন্নতা বোধ করছি। রাতের এই পরিমাণ অংশ অতিক্রান্ত হলে তুমি আমাকে জাগিয়ে দিয়ো। তিনি বলেন, যখন নির্ধারিত সময় হলো তিনি আতঙ্কিত হয়ে জেগে উঠলেন। এরপর বললেন, আমার কাছে এক আগন্তুক এসে আমার মাথার অগ্রভাগ ধরে বলল, হে জিয়াদের সন্তান, ওঠো, মহান আল্লাহকে স্মরণ করো, তিনি তোমাকে স্মরণ করবেন।'"
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, তার চেহারার সম্মুখভাগে সেই চুলগুলো দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল— যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, এমনকি তার মৃত্যুর পরও তা সেভাবেই ছিল। আমরা তাকে গোসল দিয়েছি, তখনো সেগুলো দাঁড়ানো অবস্থাতেই ছিল— স্বাভাবিকতায় ফেরেনি।”
কোনো নারীর চাদরের দিকেও দৃষ্টিপাত কোরো না
[২০৪] ইসহাক ইবনু সুয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো নারীর চাদরের দিকেও তোমার দৃষ্টিকে অনুগামী কোরো না। কারণ, দৃষ্টি অন্তরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।”
দুনিয়ার রূপ
[২০৫] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি ঘুমের মধ্যে দেখলাম, মানুষেরা কোনো কিছুর পেছনে পেছনে যাচ্ছে। তখন আমিও তাদের অনুসরণ করলাম। অকস্মাৎ এক গাঢ় কালো কানা বুড়িকে দেখা গেল। যার শরীরে সর্বপ্রকার পোশাকাদি এবং সৌন্দর্যের উপকরণ ছিল। তখন আমি তাকে বললাম, তুমি কী? সে বলল, আমি দুনিয়া। আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাকে আমার শত্রুতে পরিণত করেন। সে বলল, হ্যাঁ, যদি মুদ্রার সঙ্গে শত্রুতা রাখতে পারো।"
মৃত্যুর কথা চিন্তা করা
[২০৬] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজেকে এই অবস্থায় একবার ভেবে দেখে যে, সে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। তারপর সে আল্লাহর কাছে অব্যাহতি চাইল, আর আল্লাহ তাকে অব্যাহতি দিলেন। সুতরাং সে যেন মহামহিম আল্লাহর আদেশমতো আমল করে।"
আল্লাহ না চাইলে কেউই জাহান্নাম থেকে বেরুতে পারবে না
[২০৭] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমরা এমন সম্প্রদায়, যারা নিজেদের জাহান্নামে রেখেছি। যদি আল্লাহ আমাদের তা থেকে বের করতে চান, তাহলে আমরা বের হব।"
আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা
[২০৮] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ دَعْوَةٍ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ عَبْدِهِ أَنْ يَسْأَلَهُ الْمُعَافَاةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
'আল্লাহর কাছে এরচেয়ে অধিক পছন্দনীয় কোনো দুআ নেই যে, বান্দা তার কাছে দুনিয়া-আখিরাতের নিরাপত্তা চাইবে।'”[১৬]
এ পর্যন্তই বেদনার পরিসমাপ্তি
[২০৯] জাবির বিন আবদুল্লাহ আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, যখন আমি একাকী সালাত আদায় করি তখন আমি আমার সালাত উপলব্ধি করতে পারি না। তিনি বললেন, 'তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো। কারণ, তা কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত একটি জ্ঞান। তুমি কি দেখোনি যে, চোরেরা পতিত বাড়ির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে সে দিকে ঘাড় ফিরিয়েও তাকায় না। যখন তারা এমন ঘরের পাশ দিয়ে যায়, যেখানে আসবাবপত্র রয়েছে, তখন তারা তার সঙ্গে লেগে থাকে যাতে সেখান থেকে কোনো জিনিস লাভ করতে পারে।' এবং তিনি (আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'মাসজিদের থেকে আমার ঘরের নিকটবর্তী হওয়া আমার কাছে খারাপ লাগে।' অর্থাৎ তিনি এটা পছন্দ করতেন যে, তার ঘর যেন মাসজিদ থেকে দূরবর্তী হয়, যাতে মাসজিদের দিকে তার পদক্ষেপ অধিক হয়।”
আমার কাছে আরও বর্ণনা পৌঁছেছে যে, হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সাথে আলা ইবনু জিয়াদ আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আসলাম, তিনি তখন খুব চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তার একটি বোন ছিল, যে সকাল-সন্ধ্যা তার তুলো ধুনে দিত। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, ‘হে আলা, আপনি কেমন আছেন?’ তিনি বললেন, ‘হায়, চিন্তার ওপর চিন্তা।’ তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তোমরা ওঠো। আল্লাহর কসম, এ পর্যন্তই বেদনার পরিসমাপ্তি।”
গুনাহের জন্য নেক আমল অপেক্ষা উত্তম সংশোধনী নেই
[২১০] আসিম ইবনু কুলায়ব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফুজায়ল ইবনু জিয়াদ রিকাশি রাহিমাহুল্লাহ—যিনি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধ করেছেন—বলেন, 'মানুষেরা যেন তোমাকে নিজের ব্যাপারে উদাসীন না করে ফেলে। কারণ, ফায়সালা তোমার ওপরই আপতিত হবে; তাদের ওপর নয়। এমন-ওমন বলে দিন কাটিও না। কারণ, তুমি যা কিছু বলবে, সব তোমার আমলনামায় সংরক্ষিত থাকবে। তুমি সংঘটিত গুনাহের জন্য পরবর্তীকালে কৃত নেক আমলের চেয়ে উত্তম কোনো অনুসন্ধানকারী এবং সত্বর পাকড়াওকারী পাবে না।”
সকাল-সন্ধ্যার গুরুত্ব
[২১১] গাইলান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসআস ইবনু সালামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “তোমরা অবিচলতার সঙ্গে রাতের কিছু অংশসহ সকাল-সন্ধ্যার (সময়ের) ব্যাপারে গুরুত্ব দাও।”
কিয়ামাত দিবসে সচ্চরিত্রদের জন্য সচ্ছলতার ঝান্ডা উঁচু করা হবে
[২১২] জুহায়র আস-সালুলি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসআস ইবনু সালামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিয়ামাত দিবসে সচ্চরিত্রদের জন্য সচ্ছলতার ঝান্ডা উঁচু করা হবে, যা তার সামনে সামনে চলতে থাকবে, যতক্ষণ না সে জান্নাতে প্রবেশ করে।”
দুআর মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্তি
[২১৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সাফওয়ান ইবনু মুহরিজ আল-মাজিনি রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাতিজা আবদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ গ্রেফতার হলেন। মানুষেরা তার ব্যাপারে সুপারিশের দায়িত্ব নিল। এমন কেউই বাকি থাকেনি, যে তার ব্যাপারে কথা বলেনি। এতৎসত্ত্বেও তিনি তার প্রয়োজন পূরণের পথ দেখতে পাননি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি তার রাত জায়নামাযেই সালাতরত অবস্থায় কাটালেন। ফলে সালাতের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন। যখন তিনি ঘুমালেন তখন স্বপ্নে একজন আগন্তুক তার কাছে এসে বলল, 'হে সাফওয়ান, ওঠো। সামনের দিক থেকে তোমার প্রয়োজনগুলো প্রার্থনা করো।' তিনি বললেন, 'করছি।' তিনি উঠলেন। পানি দিয়ে ওজু করলেন। সালাত আদায় করলেন এবং দুআ করলেন।”
তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, “তখন সাফওয়ানের প্রয়োজনের কথা ইবনু জিয়াদকে অবগত করা হলো।”
তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, “তখন প্রহরী এবং পুলিশ আগুন নিয়ে এল। কারাগারের গেইটসমূহ খোলা হলো এবং সাফওয়ান রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাতিজাকে বের করে আনা হলো। তাকে ইবনু জিয়াদের কাছে নিয়ে আসা হলো। তিনি বললেন, 'তুমি সাফওয়ানের ভাতিজা?' সে বলল, 'জি হ্যাঁ।' তখন সে তাকে পাঠিয়ে দিলো। এরপর সাফওয়ান রাহিমাহুল্লাহ কিছু টের পাওয়ার আগেই দরজায় করাঘাত পড়ল। তিনি বললেন, 'কে এখানে?' সে বলল, 'আমি অমুক।' একরাতে আমিরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রহরী এবং পুলিশ আগুন নিয়ে এল এবং কারাগারের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হলো। এরপর আমাকে জামানত গ্রহণ করে মুক্তি দিয়ে দেওয়া হলো।”
দুনিয়ায় কষ্ট পাওয়া আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে উত্তম
[২১৪] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, "আমি এবং হাসান সাফওয়ান ইবনু মুহরিজ-এর কাছে তার শুশ্রূষা করার জন্য গমন করলাম। তখন দেখা গেল, তিনি কাত হয়ে যাওয়া বাঁশের কুটিরে রয়েছেন। সে সময় তার ছেলে বেরিয়ে আমাদের কাছে এসে বলল, তিনি প্রচণ্ড পেটের পীড়ায় ভুগছেন। আপনারা তার কাছে যেতে পারবেন না। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি তোমার বাবার রক্ত এবং গোশত (ব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার দরুন) তার গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তবে তা তার পূর্ণ দেহ নিয়ে মৃত্যুবরণ করার পর তা মাটিতে খেয়ে ফেলা ও প্রতিদানপ্রাপ্ত না হওয়ার তুলনায় উত্তম।”
আগামীকাল আমি মরে যাব
[২১৫] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “সাফওয়ান ইবনু মুহরিজ রাহিমাহুল্লাহ-এর একটি কুটির ছিল। যাতে ছিল একটি কড়িকাঠ। একদিন সেই কড়িকাঠটি ভেঙে গেল। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কি এটা ঠিক করবেন না?' তিনি বললেন, 'থাক, বাদ দাও। আগামীকাল আমি মরে যাব।”
আমি মানুষের মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত নই
[২১৬] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ বাকর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, "আবু তামিমা রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবূ তামিমা, আপনি কেমন আছেন?' তিনি বললেন, 'আমি দুটো নিআমাতের মাঝে আছি। আমি আবৃত গুনাহের মাঝে আছি, যে গুনাহগুলোর কথা এ সকল মানুষের জ্ঞানে নেই। এবং আমি এমন এক উচ্চ অবস্থানের মাঝে রয়েছি, যে অবস্থানে তারা আমাকে উত্তীর্ণ করে রেখেছে, আর তা এই মানুষগুলোর মুখে জারি রয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি এই অবস্থানে পৌঁছতে পারিনি, এমনকি তার ধারেকাছেও নেই।”
তুমি কি মৃতদের কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাও?
[২১৭] আইনা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আবুল খাল্লাল রাহিমাহুল্লাহ এক কামরার ওপর ছিলেন। তিনি তার দরজার কাছে এলেন। এরপর পল্লির এক দিকে মুখ করে ডাক দিলেন, 'হে অমুক, হে তমুক।' এরপর আরেক প্রান্তে উঁকি দিয়ে বললেন, 'হে অমুক, হে তমুক।' এরপর অন্য এক প্রান্তে উঁকি দিলেন। এভাবে চার দিক দিয়ে এলেন। অতঃপর তিনি বললেন,
﴿هَلْ تُحِسُّ مِنْهُم مِّنْ أَحَدٍ أَوْ تَسْمَعُ لَهُمْ رِكْزًا
'(তাদের আগে আমি কত মানবগোষ্ঠীকেই ধ্বংস করেছি।) তুমি কি তাদের কারও সন্ধান পাও কিংবা তুমি কি তাদের কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাও?' [১৭] তারপর তিনি সালাতে দাঁড়ালেন ও মৃত্যুবরণ করলেন। যেদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, সেদিন তার বয়স ছিল এক শ বিশ বছর।”
কুরআন ঘুম কেড়ে নিয়েছে
[২১৮] ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তিকে বলা হলো, 'আপনি কি ঘুমান না?' তিনি বললেন, 'নিশ্চয় কুরআনের বিস্ময়কর বিষয়গুলো আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।"
পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর যিকর করা
[২১৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা (সাহাবিগণ) পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর যিকর করতে ভালোবাসতেন।"
টিকাঃ
[১৫] পাখাবিহীন একপ্রকার কীট
[১৬] সনদ সহীহ মাওকুফ। ইবনু মাজাহ: ২/৪৩৫
[১৭] সূরা মারইয়াম, ১৯: ৯৮
📄 হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
কিয়ামাতের ভয়
[২২০] হুমাইদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রজব মাসের কোনো এক দিনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে ছিলেন। তিনি তখন পানিতে চুমুক দিচ্ছিলেন, আবার তা মুখ থেকে ফেলছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি দীর্ঘশ্বাস নিলেন। এরপর কেঁদে ফেললেন। এমনকি তার দুকাঁধ কেঁপে উঠল। তারপর তিনি বললেন, 'হায়, অন্তরে যদি প্রাণ থাকত! হায়, অন্তরের যদি যোগ্যতা থাকত, তাহলে আমি তোমাদের সে দিনের ব্যাপারে কান্না করাতাম, যার ভোর হবে কিয়ামাত দিবস। নিশ্চয়ই তা এমন রাত, যা প্রচণ্ডভাবে প্রকম্পিত হয়ে কিয়ামাত দিবসের ভোর উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সৃষ্টিজীব এমন কোনো দিনের কথা শোনেনি, কিয়ামাত দিবস অপেক্ষা যেদিন অধিক পরিমাণ লজ্জাস্থান প্রকাশিত থাকবে এবং অধিক পরিমাণ চোখ কান্নারত থাকবে।”
দুশ্চিন্তার সময়
[২২১] আওন ইবনু জুহায়ফা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ভালো জিনিসগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে আর মন্দ জিনিসগুলো অবশিষ্ট রয়ে গেছে। মুসলমানদের মধ্যে এখন যারা বাকি রয়ে গেছে, তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।”
দুঃখের ভেতর মুমিনের দিনাতিপাত
[২২২] শুমাইত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় মুমিন ভোর করে দুঃখিত অবস্থায় এবং সন্ধ্যাও যাপন করে দুঃখিত অবস্থায়। সে বিশ্বাস নিয়ে দুঃখের ভেতর ঘুরপাক খায়। একজন মুমিনের জন্য তা-ই যথেষ্ট, একজন বিপদাক্রান্ত মানুষের জন্য যা যথেষ্ট হয়—একমুষ্ঠি খেজুর এবং সামান্য পরিমাণ পানি।”
মৃত্যু পৃথিবীকে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে
[২২৩] ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি—নিশ্চয় মৃত্যু পৃথিবীকে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। সে আর জ্ঞানবান ব্যক্তির জন্য খুশির কোনো উপকরণ বাকি রাখেনি।”
দুঃখ
[২২৪] ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে অধিকতর দুঃখিত ব্যক্তি আর কাউকে দেখিনি। আমি যখনই তাকে দেখেছি, তখনই তাকে সদ্য বিপদাক্রান্ত ব্যক্তির মতো মনে হয়েছে।”
অন্তর কেন বিগলিত হয় না?
[২২৫] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে মানুষ, কীভাবে তোমার অন্তর বিগলিত হবে, অথচ তোমার চিন্তা অন্য জিনিসের মধ্যে ডুবে আছে!”
মানুষের ব্যস্ততার উপকরণ
[২২৬] মালিক ইবনু মিগওয়াল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “প্রত্যেক ব্যক্তি সে জিনিস নিয়েই সময় ক্ষেপণ করে, যা তাকে চিন্তাগ্রস্ত করে। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়, সে অধিক পরিমাণে তা স্মরণ করে। যার আখিরাত নেই, তার তো দুনিয়াও নেই। যে তার দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দিলো, তার দুনিয়াও নেই, আখিরাতও নেই। আর যে উত্তম কথা বলে, কিন্তু মন্দ কাজ করে, সে হয়...।” [১৮]
সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত
[২২৭] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন ইবাদাতটি সবচেয়ে কঠিন? তখন আমাদের মধ্য থেকে একজন বলে ফেলল, সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত হলো আল্লাহর পথে জিহাদ। অপর একজন বলল, সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত হলো সালাত। আরেকজন বলল, সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত হলো যাকাত। আবার আরেকজন বলল, সাওম। তখন আমি মনে মনে বললাম, এ ব্যাপারটি নিয়ে আমি তার সঙ্গে কথা বলব। তারপর আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে লক্ষ্য করে বললাম, হে আবূ সাঈদ [১৯], আমি ইবাদাতের মধ্যে তাকওয়া অপেক্ষা কঠিন কোনো কিছু পাইনি। তখন তিনি বললেন, ‘ধিক তোমাকে, তাকওয়া ছাড়া এ সকল ইবাদাতের একটিও কি আদৌ কোনো উপকারে আসে?’ তারপর হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘নিশ্চয় আমি ইবাদাতের মধ্যে রাতের গভীরে সালাত আদায় অপেক্ষা কঠিন কিছু পাইনি।”
দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার
[২২৮] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে আল্লাহর নামে কসম করে বলতে শুনেছি-আল্লাহর কসম, হে আদম-সন্তান, যদি তুমি কুরআন পাঠ করে তার ওপর ঈমান আনয়ন করো, তাহলে দুনিয়ায় তোমার দুঃখ দীর্ঘায়িত হবে। দুনিয়ায় তোমার ভয় প্রচণ্ড হবে এবং দুনিয়ায় তোমার কান্না বৃদ্ধি পাবে।”
কোন আলিম উত্তম?
[২২৯] আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আবু সাঈদ, এমন কিছু আলিমদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে, যারা আমাদের উপদেশ দেন এবং ভীতি প্রদর্শন করেন। তাদের আলোচনার মাধ্যমে তারা যেন আমাদের চিত্তকে আকর্ষিত করে ফেলেন। আর এমন কিছু আলিমের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়েছে, যাদের আলোচনায় সহজতা রয়েছে।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, যে তোমাকে এখানে অভয় দেয় আর পরিশেষে (আখিরাতে) তুমি ভীতির সম্মুখীন হও-তার চাইতে তো ওই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাকে ভীতির কথা শোনায়, আর পরিণামে (আখিরাতে) তুমি নিরাপত্তা লাভ করো।”
দুনিয়াপ্রীতির কারণেই মূর্তিপূজার সূচনা
[২৩০] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহর কসম, বানী ইসরাঈল রহমানের ইবাদাত করার পর মূর্তির উপাসনা করেছে শুধুমাত্র দুনিয়াপ্রীতির কারণে।”
সালাফগণের দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ
[২৩১] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহর কসম, আমি এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কারও জন্য কখনো কাপড় গোটানো হয়নি। যাদের কেউ নিজ পরিবারে কখনো খাবার তৈরি করার আদেশ দেননি। তাদের কেউ নিজের মধ্যে এবং জমিনের মধ্যে কোনো জিনিসকে অন্তরায় বানাননি। যদিও তাদের একেকজন বলতেন, আমার ইচ্ছা হয় যদি এমন হতো যে, আমি সামান্য খাবার খেতাম, আর তা আমার পেটে গিয়ে ইটের মতো আকৃতি লাভ করত। তিনি বলতেন, আমাদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, ইট [২০] পানিতে তিন শ বছর টিকে থাকে।'”
উপদেশ দেওয়ার আগে নিজে আমল করা
[২৩২] আবু কাব আজদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যদি তুমি সৎ কাজের আদেশকারী হও, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম তা গ্রহণকারী হোয়ো; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তুমি অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী হও, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সেসব কাজকে সর্বাধিক অপছন্দকারী হও; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।”
দুনিয়াদারদের পরিণাম
[২৩৩] ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে দুনিয়াদারের কথা আলোচনা করা হতো তখন আমি তাকে বলতে শুনতাম—আল্লাহর কসম, দুনিয়া তার জন্য অবশিষ্ট থাকেনি, আর সেও দুনিয়ার জন্য বাকি থাকেনি। সে দুনিয়ার অনুসরণ, অনিষ্ট ও হিসেব থেকেও নিরাপদ হতে পারেনি। অথচ দুনিয়া থেকে তাকে বের করা হয়েছে মাত্র একখণ্ড বস্ত্রের ভেতর মুড়িয়ে।”
পূর্বসূরিদের দুনিয়াবিমুখতা
[২৩৪] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি—আল্লাহর কসম, আমরা এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের একেকজন বিপুল পরিমাণ সম্পদের উত্তরাধিকারী হতেন। আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই তারা ছিলেন প্রচণ্ড দুর্দশা-কষ্টে আক্রান্ত। তারা সেই উত্তরাধিকার লাভ করার পর নিজেদের ভাইদের বলতেন, হে আমার ভাই, নিশ্চয়ই আমি জানি এ হলো উত্তরাধিকার। আর তা হালাল। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, না জানি তা আমার অন্তর এবং আমলকে বিনষ্ট করে দেয়। তাই এগুলো তোমার। আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। ফলে তাদের পক্ষ থেকে কখনো কাউকে সামান্যতম অংশ থেকেও বঞ্চিত করা হতো না। অথচ বাস্তবে তারা ছিলেন প্রচণ্ড দুর্দশা-কষ্টে আক্রান্ত। হাসান রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, আল্লাহ তোমাদের ওপর যা কিছু হারাম করেছেন সে ব্যাপারে তোমরা যতটা অনাগ্রহী, আল্লাহ তাদের ওপর যা কিছু হালাল করেছেন সে ব্যাপারে তারা এর চাইতে অধিক অনাগ্রহী ছিলেন। তোমরা নিজেদের গোনাহের কারণে পাকড়াও হওয়ার ব্যাপারে যতটা ভীত, তারা তাদের থেকে নিজেদের নেক আমলগুলো কবুল হওয়ার ব্যাপারে এরচেয়ে অধিক ভীত ছিলেন।”
জান্নাত প্রার্থনা না করা
[২৩৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ লাভ করেছি এবং এমন কিছু মানুষের সাহচর্য পেয়েছি—যাদের অনেকে সারা জীবন এভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন যে, কখনো আল্লাহর প্রতি লজ্জাবশত তার কাছে জান্নাত চাননি।”
কোনো প্রার্থীকে খালি হাতে না ফেরানো
[২৩৬] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষদের যুগ লাভ করেছি, যারা কোনো প্রার্থীকে কিছু না দিয়ে ফেরাতেন না। তাদের কেউ বাইরে বেরোলে পরিবারের লোকদের আদেশ দিয়ে যেতেন, তারা যেন কোনো প্রার্থীকে খালি হাতে না ফেরায়।”
দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীনতা
[২৩৭] আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কারও ওপর দিয়ে সত্তর বছর সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও তারা পরিবারের জন্য খাবারের চাহিদাই অনুভব করতেন না। আমি এমন মানুষদের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, যাদের ওপর দিয়ে সত্তর বছর সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরও তারা কোনো বালিশ গ্রহণ করতেন না। তাদের কেউ একমুঠো খাবার খেলে, তা যেন পেটে পাথর হয়ে থেকে যায়—এই কামনা করতেন।”
ইলম অন্বেষণকারীর চিত্র
[২৩৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “(আমাদের সময়ে) ইলম অন্বেষণকারী ব্যক্তি এমনভাবে বসবাস করত যে, ইলম অন্বেষণের চিত্র তার বিনয়ে, আদর্শে, জিহ্বায়, চোখে এবং নেক কাজসমূহে ফুটে উঠত।”
জমিনের ওপর নম্রভাবে বিচরণ করা
[২৩৯] ইয়াহইয়া ইবনু মূসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا “যারা জমিনের ওপর নম্রভাবে বিচরণ করে।”[২১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা হচ্ছে সহনশীলগণ।”
এবং فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا “যারা (আল্লাহর দিকে) বারবার ফিরে আসে, নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি অধিক ক্ষমাশীল।"[২২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যারা অন্তর এবং আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করে।”
মুসলিম ভাইয়ের ওপর আস্থা
[২৪০] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কেউ কেউ তার ভাইকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত নিজ পরিবারে দায়িত্বশীল হিসেবে রেখে যেত।”
একেবারেই সাদামাটা চালচলন
[২৪১] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কেউ কোনো সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে বসলে তারা মনে করত—তিনি একজন অক্ষম ব্যক্তি, অথচ তার কোনো অক্ষমতা ছিল না। বরং তিনি তো ছিলেন একজন মুসলিম ফকীহ। (কিন্তু তার চালচলন এতটাই সাদাসিধে ছিল যে, তাঁকে অক্ষম ব্যক্তির মতো মনে হতো)।”
ইলমে অর্জনের মর্যাদা
[২৪২] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি ইলমের অধ্যায়সমূহ থেকে কোনো অধ্যায় শুনে তা শিখে নেয় এবং তার ওপর আমল করে—এটা পুরো দুনিয়া তার হয়ে যাওয়া এবং তা আখিরাতের কাজে ব্যয় করার চাইতে অধিক উত্তম।”
কুকুরের জন্য খাবার ছুড়ে দেওয়া পরিতৃপ্ত অবস্থায় আহার করার চাইতে উত্তম
[২৪৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি—আল্লাহর কসম, আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের জন্য কখনো কাপড় গোটানো হয়নি। তাদের কখনো নিজের মাঝে এবং জমিনের মাঝে কোনো জিনিসকে অন্তরায় বানাননি। যাদের কেউ নিজ পরিবারে কোনো খাবার তৈরি করার আদেশ দেননি। তাদের কেউ খাবার খেলে কখনো এ অবস্থার উপক্রম হতো না যে, তাদের পরিতৃপ্তি আসবে। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কসম, কুকুরের জন্য খাবার ছুড়ে দেওয়া পরিতৃপ্ত অবস্থায় আহার করার চাইতে উত্তম।’”
মুসলমান ভাইয়ের হক আদায় করা
[২৪৪] ইমরান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি বলে ওঠে, আমি হাজ্জ করব, আমি হাজ্জ করব। অথচ তুমি তো (ফরজ) হাজ্জ করে ফেলেছ। সুতরাং (এখন অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব যেমন :) আত্মীয়তার সম্পর্ক (এবং অন্যান্য দায়িত্ব) পালন করো। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তির দুশ্চিন্তা দূর করো। প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করো।”
খ্যাতির প্রতি অনীহা
[২৪৫] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “অনেক সময় এমন হতো যে, কোনো ফকীহ কিছু মানুষের সাথে বসে থাকা অবস্থায় কেউ কেউ ভাবত যে, তিনি অক্ষম। অথচ তার কোনো অক্ষমতা নেই; তার শুধু প্রসিদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতি অনাগ্রহ।”
দুটো দুআ
[২৪৬] সুফিয়ান ইবনু হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ এ দুটো বাক্য খুব বেশি পরিমাণে পাঠ করতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى حِلْمِكَ بَعْدَ عِلْمِكَ وَلَكَ الْحَمْدُ عَلَى عَفْوِكَ بَعْدَ قُدْرَتِكَ
'হে আল্লাহ, তোমার প্রশংসা—ইলম থাকার পরও সহনশীল আচরণ করার জন্য। তোমার প্রশংসা—কুদরত থাকার পরও ক্ষমা করার জন্য।”
সুরক্ষিত আমল হলো গোপন আমল
[২৪৭] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আমি এমন সব মানুষের সময়কাল লাভ করেছি, যাদের কেউ একান্ত আমল গোপন রাখতে না পারলে তবেই তা প্রকাশ করতেন। তারা জানতেন, শয়তান থেকে অধিক সুরক্ষিত আমল হলো গোপন আমল। তাদের কারও কাছে মেহমান থাকলে তারা গৃহের পেছনে গিয়ে সালাত পড়ে নিতেন, যা মেহমান টের পেত না।”
আলিমের মৃত্যু
[২৪৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আলিমের মৃত্যু ইসলামে একটি ছিদ্রসদৃশ। যত রাত-দিন আবর্তিত হবে কোনো জিনিসই আর সেই ছিদ্রকে বন্ধ করতে পারবে না।”
মৃত্যুর স্মরণ
[২৪৯] আতা আলা আজরাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি এক ব্যক্তিকে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে জিজ্ঞেস করতে শুনলাম, 'আপনি কেমন আছেন? আপনার কী অবস্থা?' তিনি জবাব দিলেন, 'সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। ওই ব্যক্তির আর কী অবস্থা হবে, যে মৃত্যুর অপেক্ষায় সকাল-সন্ধ্যা যাপন করে। অথচ সে জানে না, আল্লাহ তার সঙ্গে কী আচরণ করবেন। (তাকে জান্নাত দেবেন নাকি জাহান্নাম দেবেন।)
মুমিনের চিত্র
[২৫০] আবূ কাব আলা আজদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মুমিন দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো। সে নিজের অপমানে অস্থির হয় না, নিজের সম্মান দেখলেও প্রীত হয় না। সকল মানুষের থাকে এক ধরনের অবস্থা, আর তার থাকে আরেক ধরনের অবস্থা। তোমরা এ সকল অনর্থক বিষয় সে দিকেই সরিয়ে রাখো, আল্লাহ এগুলো যে দিকে সরিয়ে রেখেছেন।"
বান্দার হকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব
[২৫১] ইমরান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিয়ামাতের দিন কিছু মানুষ পাহাড় পরিমাণ আমল নিয়ে উপস্থিত হবে। তারা যাদের ওপর জুলুম করেছে, সে সকল মাজলুমের জন্য তাদের থেকে আমল নেওয়া হতে থাকবে; অবশেষে তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। ফলে তাদের প্যাঁচিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।"
উপদেশ প্রত্যাখ্যান
[২৫২] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনেক মানুষ এমন আছে যে, কোনো মজলিসে বসার পর শিক্ষণীয় বিষয় তার সামনে উদ্ভাসিত হয়, কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে যদি (শিক্ষনীয় বিষয় যদি তার প্রবৃত্তির) অগ্রগামী হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করে, তাহলে মজলিস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।”
সম্পদ থাকার ক্ষতি
[২৫৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের কেউ হালাল পন্থায় ধন-সম্পদ অর্জন করতে চাইলে তা অর্জন করতে পারতেন। তাদের বলা হতো, আপনারা কি এই সম্পদের মধ্যে আপনাদের যে অংশ রয়েছে, তা নেবেন না? তাতে হালাল উপায়ে আপনারা তা অর্জন করতে পারতেন। তখন তারা বলতেন, না, আমাদের আশঙ্কা হয়, এই সম্পদ গ্রহণ আমাদের অন্তর বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ হবে।”
আল্লাহর বিধানকে মর্যাদাবান রাখা
[২৫৪] আবূ কাব আলা আজদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “জনৈক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, 'আমি সফর করতে চাই। সুতরাং আমাকে পাথেয় দান করুন।' তিনি বললেন, 'ভাতিজা, তুমি আল্লাহর বিধানকে সেসব ব্যাপারে মর্যাদাবান রেখো, যেসব ব্যাপারে আল্লাহ তা মর্যাদাবান রেখেছেন।”
তারা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষিত হতেন না
[২৫৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষদের দেখা পেয়েছি, তাদের কাছে দুনিয়ার যা-ই আসুক না কেন তারা এতে খুশি হতেন না। আর দুনিয়ার যা কিছুই তাদের হাতছাড়া হোক না কেন, তারা এতে হা-হুতাশ করতেন না।”
বাবা-মায়ের চেহারার দিকে তাকানো ইবাদাত
[২৫৬] আম্মার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, পুণ্য কী?' তিনি বললেন, '(ধন-সম্পদ) বিলিয়ে দেওয়া এবং কোমল হওয়া।' আমি বললাম, 'তাহলে অবাধ্যতা কী?' তিনি বললেন, 'দুটো থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং তা পরিত্যাগ করা।' তিনি বললেন, 'তুমি কি জানো না যে, তোমার বাবা-মা অথবা তোমার মায়ের চেহারার দিকে তাকানোও ইবাদাত?”
রাতের ইবাদাত সাহাবিগণের বৈশিষ্ট্য
[২৫৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ “তারা রাতের খুব কম অংশই শয়ন করত।”[২০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "তারা রাতের খুব কম অংশই শয়ন করত।” এবং وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ “আর তারা সাহরির সময় ক্ষমা প্রার্থনা করত।”[২১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, "তারা তাদের সালাতকে সাহরির সময় পর্যন্ত দীর্ঘ করত। এরপর তারা দুআ করত এবং কাকুতি-মিনতি করত।”
ঈমানের পরিচয়
[২৫৮] যাকারিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বলা হতো-ঈমান অলংকৃত হওয়ার নাম নয় এবং আকাঙ্ক্ষারও নাম নয়। ঈমান হলো ওই জিনিস, যা অন্তরে স্থির হয়ে বসে এবং আমল তার সত্যায়ন করে।"
কোন আমল সর্বোত্তম?
[২৫৯] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “লোকেরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আলোচনা করল, কোন আমল সর্বোত্তম? তারা মনে মনে তাহাজ্জুদের সালাতের কথা ভাবছিল। আমি বললাম, হারাম ত্যাগ করা। এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'বিষয় পূর্ণ হয়ে গেছে। বিষয় পূর্ণ হয়ে গেছে।”
দ্বীনের পথে চালিতকারী কিংবা দেখার মতো দৃষ্টিশক্তি
[২৬০] সাবিত বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তখন তার উদ্দেশে এক অভাবী ব্যক্তি উঠে এল, যার চোখে সমস্যা ছিল। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা এমন ব্যক্তিকে সাদকা দাও-যার এমন কোনো চালক নেই যে তাকে চালাবে, আবার এমন চোখও নেই, যা তাকে পথ দেখাবে।' এরপর তিনি তার পেছনে থাকা তার এক প্রতিবেশী আবদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ-এর দিকে ইশারা করে বললেন, 'ইনি এই বাড়ির মালিক। তার পুরো পরিজনের মধ্যে এমন কোনো চালক নেই, যে তাকে কল্যাণের পথে চালিত করবে এবং তাকে কল্যাণকর্মের পরামর্শ দেবে। তার নিজেরও দৃষ্টিশক্তি নেই, যা দিয়ে সে দেখবে এবং উপকৃত হবে।”
ঈমানের দুর্বলতা
[২৬১] ইয়াস ইবনু আবী তামিমা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহর কসম, তোমাদের জন্য যদি আখিরাতকে উঠিয়ে নেওয়া হতো, তাহলে তোমরা ইনসাফ করতে না এবং (আল্লাহর দিকে) ঝুঁকতে না।”
সাধনার অসারতা
[২৬২] রাওহ ইবনুল কাসিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তার পরিবারের এক ব্যক্তি তাপস-জীবন যাপন করা শুরু করল। এমনকি সে বলে বসল, আমি খাবিসা। (কিংবা সে বলেছিল, ফালুদা) হালাল মনে করি না। কারণ, আমি তার কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি না।" [২৫]
রাওহ ইবনুল কাসিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলে আমি তার সামনে এ ঘটনা আলোচনা করলাম। তখন তিনি বললেন, 'এ তো নির্বোধ লোক। সে তো শীতল পানির কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও সক্ষম নয়।”
মুসলিমের মর্যাদা
[২৬৩] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মাড়ির দাঁত উঠিয়ে দিলো। তখন তিনি তাকে এক দিরহাম দিলেন। লোকেরা বলল, তা অর্ধ দিরহামের বিনিময়। তিনি বললেন, 'তোমরা তাকে এক দিরহাম দিয়ে দাও। কারণ, কোনো মুসলিম অপর মুসলিমকে এক দিরহাম ভাগ করে দিতে পারে না।”
তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতেন
[২৬৪] আবূ ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতেন।"
চার জিনিসের অনন্যতা
[২৬৫] কুলসুম ইবনু জাবর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “বসরা শহরে তাইমি রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'হাসানের ফিকহ, মুসলিম ইবনু ইয়াসার ইলম, ইবনু সিরিনের তাকওয়া এবং তালক ইবনু হাবিবের ইবাদাত (ঈর্ষা করার মতো।)”
কুপ্রবৃত্তির জঘন্যতা
[২৬৬] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “কুপ্রবৃত্তি হলো অন্তরের সঙ্গে সংমিশ্রিত সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাধি।”
দূরত্ব বৃদ্ধি
[২৬৭] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “সালাত যখন অশ্লীলতা ও অন্যায় কর্ম থেকে বিরত না রাখবে, তখন তা শুধু (বান্দার থেকে আল্লাহর) দূরত্বই বৃদ্ধি করবে।”
দুটো নিআমাতের ব্যাপারে উদাসীনতা
[২৬৮] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “সুস্থতা ও অবসর এমন দুটো নিআমাত, যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয় (অর্থাৎ এর যথাযথ ব্যবহার করে না।)।"
পোশাক মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে না
[২৬৯] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ্ প্রচুর পরিমাণে এ কথা বলতেন, “বাকরের তাইলাসান।”
একদিন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “আপনি বাকরের তাইলাসানের [২৬] কথাটা খুব বেশি বলে ফেলেছেন। আমি বাকরকে তার তাইলাসানির মধ্যে যতটুকু ভয় করি, আপনাকে আপনার আবা’ -র মধ্যে তারচেয়ে অধিক ভয় করি।” [২৭]
খাবার নিয়ে আপত্তি না তোলা
[২৭০] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান এবং ফারকাদ সানজি কোনো এক ওলিমায় এক দস্তরখানের ওপর একত্র হলেন। তাদের সঙ্গে তখন একজন পেটুক লোক ছিল। ফলে অন্যান্য মানুষজন তাদের হাত গুটিয়ে নিল আর লোকটি খেতে থাকল। তখন ফারকাদ তাকে বললেন, 'হে অমুক, শুধু টুকরো আর টুকরো অন্য কোনো কাজকারবার নেই!' এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি তার দিকে ফিরে বললেন, 'কী ব্যাপার তোমার? আল্লাহ তোমাকে পাকড়াও করুন, বিপদাক্রান্ত করুন! তুমি একজন ব্যক্তিকে খাবার খেতে দিচ্ছ না! আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে—তুমি বলো, আমার ইচ্ছা হয়, ছাই যদি আমাদের জন্য খাদ্য হতো! আল্লাহ তোমার জন্য ছাইকেই খাদ্য বানিয়ে দিন।”
মুমিন এবং মুনাফিকের বিশ্বাসের পার্থক্য
[২৭১] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, কোনো বান্দা জাহান্নামকে সত্য বলে বিশ্বাস করলে ভূমি প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যাবে (অর্থাৎ তাকে অধিক পরিমাণে কষ্টের মুখোমুখি হতে হবে)। পক্ষান্তরে মুনাফিক—আগুন যদি এই দেয়ালেরও পেছনে থাকে, সে তা সত্য বলে স্বীকার করবে না, যতক্ষণ না সে তাতে পতিত হয়।”
প্রত্যাশা এবং ভীতি মুমিনের দুই বাহন
[২৭২] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "প্রত্যাশা এবং ভীতি মুমিনের দুই বাহন।"
আলিমের শাস্তি
[২৭৩] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'আলিমের শাস্তি কী?' তিনি বললেন, 'অন্তরের মৃত্যু।' আমি বললাম, 'অন্তরের মৃত্যু কী?' তিনি বললেন, 'আখিরাতের আমলের দ্বারা দুনিয়া কামনা।"
দুনিয়ার পেছনে না পড়া
[২৭৪] জারির ইবনু হাজিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষদের দেখেছি, যাদের সামনে দুনিয়াকে হালালভাবে উপস্থাপন করা হলেও তারা তার পেছনে পড়তেন না। তারা বলতেন, আমরা জানি না, দুনিয়া পেয়ে আমাদের অবস্থা কী হবে! (আমি কি দুনিয়ার ফিতনায় নিপতিত হব, নাকি দুনিয়াকে উত্তম কাজে ব্যবহার করতে পারব।)”
সর্বোত্তম ইলমের বৈশিষ্ট্য
[২৭৫] রুবাইয়ি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সর্বোত্তম ইলম হলো তাকওয়া এবং তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা)।”
আকাশ ও পৃথিবীর আনুগত্য
[২৭৬] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, أَحْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا “তোমরা এসে যাও স্বেচ্ছায় কিংবা জোরপূর্বক।”[২৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যদি তারা তার অবাধ্য হতো, তাহলে তিনি তাদের এমন শাস্তি দিতেন, যার স্বাদ তারা অনুভব করত।”
শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়
[২৭৭] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى “যারা তাওবা করে, ঈমান আনে, নেক আমল করে, এরপর সঠিক পথে চলে, নিশ্চয়ই আমি তাদের জন্য ক্ষমাশীল।”[২৯]
এই আয়াত তিলাওয়াত করে হাসান রাহিমাহুল্লাহ নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, “হে নির্বোধ, আমি তোমার জন্য এখানে কোনো কিছু পাচ্ছি না। (না তুমি যথাযথ তাওবা করেছ, আর না নেক আমলের মাধ্যমে সঠিক পথে চলার চেষ্টা করছ।) ”
অতিথিকে যত্ন করা
[২৭৮] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুহাম্মাদ ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে তার দ্বীনি ভাইয়েরা আসত। তখন তিনি সবাইকে বলতেন, 'তোমরা খেয়ে নাও।' হাসান ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, খাবার ভাগ করে খাওয়াটাই অধিক উপযোগী।”
বর্ণনাকারী বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন আত্মগোপনে ছিলেন তখন আমরা তার কাছে গমন করতাম। তিনি খাবার পরিবেশন করতে বলতেন। তখন এক দল এসে প্রবেশ করত। এরপর আরেক দল আসত। তিনি আবার খাবার পরিবেশন করতে বলতেন।...? [৩০] তখন তিনি বলতেন, 'আল্লাহর কসম, তোমরা খাবে। আল্লাহর কসম, তোমরা খাবে।' এর কিছুক্ষণ পর আরেক সম্প্রদায় এলে তিনি পুনরায় খাবার পরিবেশন করতে বলতেন। দাসী তখন বলত, 'আমাদের কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।' তিনি তখন বলতেন, 'ছাতু নিয়ে আসো।”
গোনাহের ওপর মৃত্যু
[২৭৯] সালিহ ইবনু রুসতুম রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ “এবং তার গোনাহ তাকে বেষ্টন করে ফেলেছে।” [৩১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “গোনাহের ওপর তার মৃত্যু হয়েছে।”
আমল কবুল না হওয়ার ভয়
[২৮০] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে দীর্ঘতর দুঃখী কাউকে দেখিনি। তিনি বলতেন, 'আমরা হাসি, অথচ হতে পারে যে, আল্লাহ আমাদের আমলের ব্যাপারে অবগত হয়ে বলে দিয়েছেন, আমি তোমাদের থেকে কোনো কিছুই কবুল করব না।”
ইবলীস কি ঘুমায়?
[২৮১] সাল্লাম ইবনু মিসকিন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আবু সাঈদ, ইবলীস কি ঘুমায়?' তিনি বললেন, 'যদি সে ঘুমাত, তাহলে তো আমরা প্রশান্তি পেতাম।”
অহমিকা ধ্বংসের দিকে নিজে যায়
[২৮২] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আদম-সন্তানের প্রতিটা কথা যদি সত্য হতো এবং প্রতিটা কাজ সঠিক হতো, তাহলে সে পাগল হয়ে যেত।”
বর্ণনাকারী হাজাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি সাঈদ ইবনু আঈমান রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'তার কথা দ্বারা তিনি কী বোঝালেন?' তিনি বললেন, 'অর্থাৎ তাহলে মানুষ অহমিকায় ভুগত।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কারামাত
[২৮৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, হে আবূ সাঈদ, আমি আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি, আপনি কবিতা বলছেন। তিনি তখন সেই কবিতার অংশবিশেষ বলে উঠলেন,
وَأَيُّ الرِّجَالِ الْمُهَذَّبُ
'অতঃপর কোন ব্যক্তিটি বিনয়ী?”
মৃত্যুর আগে তাওবা
[২৮৪] আবূ আবাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ 'এরপর তারা কাছাকাছি সময়ে তাওবা করবে। [৩২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার আগে।”
অন্তরের কাঠিন্যের আরোগ্য
[২৮৫] মুয়াল্লা ইবনু ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলল, 'হে আবু সাঈদ, আমি আপনার কাছে আমার অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করছি।' তিনি বললেন, 'অন্তর যাকে স্মরণ করে, তুমি তাকে তার নিকটবর্তী করো।"
ভক্তকুলের দেওয়া উপহার গ্রহণের ক্ষতি
[২৮৬] ইউনুস ইবনু উবাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তুমি মানুষের কাছে সম্মানিত থাকবে, মানুষ তোমাকে সম্মান দিতে থাকবে যতক্ষণ না তুমি তাদের হাতে যা কিছু আছে তা গ্রহণ করবে। যখন তুমি এটা করে ফেলবে, তখন তারা তোমাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে। তোমার আলোচনা অপছন্দ করবে এবং তোমাকে ঘৃণা করবে।”
অন্তরের অবস্থা
[২৮৭] উকবা ইবনু খালিদ আল-আবাদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই অন্তর মৃত্যুবরণ করে এবং জীবন্ত হয়। অন্তর যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তাকে ফরজ বিধানগুলোর প্রতি ধাবিত করো। আর যখন তা জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তাকে নফল ইবাদাতের মাধ্যমে শিষ্টাচার শেখাও।”
সত্যিকার ফকীহ-এর পরিচয়
[২৮৮] ইমরান আল-কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তিকে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বলতে শুনলাম-আমি এক ফকীহকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তখন তিনি (হাসান রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'তুমি কখনো কোনো ফকীহকে দেখেছ? ধিক তোমাকে! ফকীহ তো হলো ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, গোনাহের প্রতি লক্ষকারী, নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে সর্বদা অধ্যবসায়ী।”
পৃথিবী তো ধোঁকার রাজ্য!
[২৮৯] ইবরাহীম ইবনু হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "অনুগ্রহ লাভ করে কত মানুষ ধীরে ধীরে পাকড়াও হয়েছে! প্রশংসা পেয়ে কতজন মুফতি সেজেছে! অপরাধ আবৃত থাকায় কতজন প্রবঞ্চিত হয়েছে!”
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য
[২৯০] মারজুক আল-আজালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমাকে আবু কাতাদা আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তুমি এই শাইখকে—অর্থাৎ হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে—আঁকড়ে থাকো এবং তার থেকে ইলম গ্রহণ করো। আল্লাহর কসম, উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শিষ্টাচারের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যবান তার চাইতে আমি আর কাউকে দেখিনি।”
ফকীহ-এর গুণাবলি
[২৯১] ইমরান আল-কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে তাকে কিছু মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি সেগুলোর উত্তর দিলেন। তখন লোকটি বলল, 'হে আবূ সাঈদ, ফকীহরা তো এমন এমন বলে।' এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'তুমি নিজ চোখে কখনো কোনো ফকীহকে দেখেছ? ফকীহ তো ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, আখিরাতের ব্যাপারে আগ্রহী, গোনাহের প্রতি লক্ষকারী, নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে সর্বদা অধ্যবসায়ী।”
তাকওয়া কাপড়ে নয়
[২৯২] খালিদ ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি ফারকাদ সিবখি রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখলাম। তার পরনে তখন একটি পশমের জুব্বা ছিল। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার জুব্বা ধরে দুবার বা তিনবার বললেন, 'হে ইবনু ফারকাদ, তাকওয়া তো এ কাপড়ের মধ্যে নয়। তাকওয়া হলো তা, যা অন্তরে স্থির হয়ে আছে আর আমল ও কাজ তা সত্যায়ন করে।”
মৃত্যু বাহু প্রসারণকারী
[২৯৩] আবূ রাজা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلَّا تَحْوِيفًا “কেবল ভীতিপ্রদর্শনের জন্যই আমি নিদর্শন পাঠাই।”[৩৩] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মৃত্যু হলো বাহু প্রসারণকারী।”
[২৯৪] সাহল সিরাজ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَتَبَثَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا “তুমি একাগ্রচিত্তে তার প্রতি নিমগ্ন হও।” এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি তার প্রতি পরিপূর্ণ একনিষ্ঠ হও।”
ইলমের প্রচার-প্রসার আলিমের দায়িত্ব
[২৯৫] শাইবান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বানুশ শিখখির গোত্রের একজনকে বললেন, 'হে বালক, আমাদের হাদীস বর্ণনা করে শোনাও।' তখন সে বলল, 'হে আবূ সাঈদ, নিশ্চয়ই আমরা এ স্তরে পৌঁছিনি।' এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আমাদের কেই-বা এ স্তরে পৌঁছেছে? শয়তান কামনা করে, সে যদি এ ব্যাপারে সক্ষমতা লাভ করত![৩৪] আল্লাহর কসম, আল্লাহ যদি আলিমগণের ওপর দায়িত্ব বেঁধে না দিতেন, তাহলে আমরা মুখই খুলতাম না।”
ইলম শেখার গুরুত্ব
[২৯৬] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমার শিক্ষা করা ইলমের একটি পরিচ্ছেদ, আমার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চাইতে উত্তম।”
ইলমের মাধ্যমে বিবেকের স্থায়িত্ব
[২৯৭] ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাজ্জের সময় ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে বললেন, 'হাসান ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে কি আপনার পরিচয় আছে?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' ওয়াহহব রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আপনারা কি তার বিবেকের ব্যাপারে কোনো ধরনের আপত্তি করেছেন?' তিনি বললেন, 'না।' 'আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে অথবা বলেছেন, আমরা কিতাবে পেয়েছি, কোনো বান্দা ইলমপ্রাপ্ত হওয়ার পর যদি তা হিদায়াতের পথে তাকে পরিচালিত করে, তাহলে আল্লাহ কখনো তার বিবেককে কেড়ে নেন না।”
মুমিন পেট ভরে আহার করে না
[২৯৮] উকবা আর-রাসিবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। গিয়ে তাকে রুটি এবং গোশত আহাররত অবস্থায় পেলাম। তিনি বললেন, 'স্বাধীন ব্যক্তিদের খাবারে বসে পড়ো।' তখন আমি বললাম, 'আমি খেয়েছি। আর খেতে পারব না।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ, মুমিন এভাবেও খায় যে, সে আর খেতে পারে না!”
মুমিন আল্লাহর থেকে উত্তম আদব গ্রহণ করেছে
[২৯৯] আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “নিশ্চয়ই মুমিন আল্লাহর থেকে উত্তম আদব গ্রহণ করেন। যখন তিনি তাকে সচ্ছলতা দান করেন তখন সে-ও অন্যদের প্রতি সদয় হয়। আর যখন তিনি তার ওপর (দুনিয়া) সংকুচিত করেন, তখন সে-ও সংকুচিত করে।”
আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা
[৩০০] আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে দুনিয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে, তখন তুমি তার সঙ্গে আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করো।”
জাহান্নামীদের শাস্তি
[৩০১] মুহাম্মাদ ইবনু আব্বাদ মাক্কি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি ফুজাইল ইবনু ইয়াজ রাহিমাহুল্লাহ-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে দেখেছি:
كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا
'যখনই তাদের চামড়াগুলো পুড়ে যাবে, তখনই আমি সেগুলোকে অন্য চামড়া দ্বারা পাল্টে দেবো।” [৩৫]
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আগুন তাকে সত্তর হাজার বার খাবে। যখনই তাকে খাবে এবং পুড়িয়ে ফেলবে, তখন তাদের বলা হবে, তোমরা আগের মতো হয়ে যাও। তখন তারা ঠিক যেমন ছিল, তেমন হয়ে যাবে।”
মুমিনের বিষণ্ণতা
[৩০২] আবূ মূসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মুমিনের কোনো গোনাহ হলে, জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে (গোনাহের শাস্তির আশঙ্কায়) বিষণ্ণ থাকে।”
বিশ্বাসের ছাপ কাজে প্রকাশ পায়
[৩০৩] হাশিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো বান্দা অধিক পরিমাণ মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে, এর ছাপ তার আমলে দেখা যায়। আর কোনো বান্দার প্রত্যাশা বৃদ্ধি পেলে সে মন্দ আমল করতে থাকে।”
শোক প্রকাশের আদর্শ পন্থা
[৩০৪] আসমা বিন আবদ রাহিমাহাল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মুসলমানদের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তির কাছে তার কোনো ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছলে সে বলে, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তন করব। আল্লাহর কসম, আমিই তো হতে পারতাম জান-কবজকৃত মানুষটি, আল্লাহ এর মাধ্যমে তার পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়কে বৃদ্ধি করেন।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ এ কথাটি একাধিকবার বললেন— আল্লাহর কসম, সে এ অবস্থায় থাকে। অবশেষে বুদ্ধিমান হিসেবে তার মৃত্যু হয়।”
অনুসরণের মাপকাঠি
[৩০৫] আবূ আহমাদ জুবাইরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি-এমন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা যাবে না, যার পরিবার রয়েছে, (আর নিজেকে সর্বদা পারিবারিক ঝামেলায় ব্যস্ত রেখেছে)।”
সারি ইবনু ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বছরে আইয়ামে সাওম রাখতেন।” [৩৬] [৩৭]
শত্রুতা ও মিত্রতায় ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব
[৩০৬] ইয়াহইয়া ইবনু মুখতার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তোমরা অল্প ভালোবাসো। অল্প ঘৃণা করো। কারণ, কোনো এক সম্প্রদায় ভালোবাসার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেছে, ফলে তারা ধ্বংস হয়েছে। আর কোনো সম্প্রদায় অপর কারও ঘৃণায় সীমালঙ্ঘন করেছে, ফলে তারাও ধ্বংস হয়েছে। তুমি ভালোবাসায় সীমালঙ্ঘন কোরো না এবং ঘৃণা পোষণেও সীমালঙ্ঘন কোরো না। (বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো।)"
জাহান্নামের আজাবের বর্ণনা
[৩০৭] ইবনু উয়ায়না ইবনুল গুসন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, إِذِ الْأَغْلَالُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَاسِلُ يُسْحَبُونَ "যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শেকল থাকবে। তাদের টেনে নিয়ে যাওয়া হবে।” [৩৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের অবগত করা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের গলদেশে বেড়ি এবং শেকল এ জন্য পরানো হয়নি যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে অক্ষম করে দিয়েছে। কিন্তু যখন অগ্নিশিখা তাদের ভাসিয়ে ফেলবে, তখন আগুন তাদের স্থির করে দেবে।” এ কথা বলার পর হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে অজ্ঞান অবস্থায় সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো।
মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে মৃত্যুপ্রস্তুতি গ্রহণ করা
[৩০৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তি তার (অসুস্থ) ভাইয়ের শুশ্রুষা করার জন্য উপস্থিত হলো। ঘটনাক্রমে তার (অসুস্থ ভাইয়ের) মৃত্যু হয়ে গেল। তখন মৃত্যুর বিভীষিকা এবং প্রাণত্যাগের ভয়াবহ দৃশ্য তার দৃষ্টিগোচর হলো। এরপর সে পরিবারের কাছে ফিরল। পরিবারের লোক তার সামনে দুপুরের খাবার পরিবেশন করল। তখন সে বলল, 'হে পরিজন, তোমাদের খাবার তোমরা খাও।' তারা বলল, 'হে অমুক, সহায়-সম্পদ?' জবাবে সে বলল, 'হে পরিজন, তোমাদের সহায়-সম্পদ তোমরা আঁকড়ে রাখো। আল্লাহর কসম, আমি এমন মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছি, যার জন্য আমি আমল করে যাব; যতক্ষণ না আমি তার সামনে উপস্থিত হই।"
দুপুরবেলার নিদ্রা
[৩০৯] আবূ সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বাজারের শোরগোল শুনে বললেন, "এরা কি দুপুরবেলা ঘুমায় না? আমি এদের রাতকে মন্দ রাতই মনে করি।"
মুদ্রার লোভ লাঞ্ছনা টেনে আনে
[৩১০] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর শপথ করে বলেন, "কেউ যদি দিরহামকে মর্যাদা দেয়, তো আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন।"
পৃথিবী আপন গতিতে ছুটে চলছে
[৩১১] ওলীদ মিসমায়ি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, ছুরি ধার দেওয়া হচ্ছে, দুম্বাকে তৃণলতা খাওয়ানো হচ্ছে, আর চুলাকে উত্তপ্ত করা হচ্ছে।”
ধন-সম্পদ ব্যয়ের মূলনীতি
[৩১২] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে একটি জিজ্ঞাসা-প্রসঙ্গে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, একজন ব্যক্তি-আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেছেন, সে তা থেকে হাজ্জ করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে এবং দান করে—তার জন্য কি সেই সম্পদ অবলম্বন করে সুখী জীবনযাপন করার সুযোগ রয়েছে?' হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'না, সমগ্র দুনিয়াও যদি তার হয়ে যায়, তবুও তার জন্য কেবল যথেষ্ট পরিমাণ ভোগ করারই সুযোগ রয়েছে। আর এর অতিরিক্ত অংশ সে তার দারিদ্র্য এবং অভাবের দিনের জন্য অগ্রে প্রেরণ করে রাখবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণের মধ্য থেকে যারা ছিলেন তার একাগ্র অনুসারী এবং তাবিয়িগণের মধ্য থেকে যারা তাদের থেকে আদর্শ গ্রহণ করেছেন, তারা এই আশঙ্কায় প্রাসাদ এবং ধন-সম্পদ গ্রহণকে অপছন্দ করতেন, পাছে না তারা সেগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাদের পিঠ শক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাদের যে জীবনোপকরণ দান করেছেন, তারা তা থেকে কেবল পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্রহণ করতেন। আর তারা এর অতিরিক্ত অংশকে তাদের দারিদ্র্য এবং অভাবের দিনের জন্য অগ্রে প্রেরণ করে রাখতেন। এরপর তাদের দ্বীনি এবং দুনিয়াবি বিষয়ের প্রয়োজনাদি তাদের মধ্যে এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।"
আত্মপ্রবঞ্চিত হওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি
[৩১৩] আবূ আমির আল-খাররাজ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে (তার মজলিসে) মানুষের আধিক্য দেখে প্রবঞ্চিত হয়নি। হে আদম-সন্তান, তুমি একাকী মরবে। একাকী কবরে যাবে। একাকী পুনরুত্থিত হবে। একাকী হিসাবের সম্মুখীন হবে। হে আদম-সন্তান, তুমিই অভীষ্ট, তোমাকেই চাওয়া হচ্ছে।”
জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখা
[৩১৪] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তাঁরা বলতেন, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির জিহ্বা থাকে তার অন্তরের পেছনে। যখন সে কিছু বলতে চায়, তখন অন্তরের দ্বারস্থ হয়। যদি বিষয়টা তার জন্য উপকারী হয়, তাহলে সে তা বলে। আর যদি বিষয়টা ক্ষতিকর কিছু হয়, তাহলে সে বিরত থাকে। আর নিশ্চয় জাহিল ব্যক্তির অন্তর থাকে তার জিহ্বার প্রান্তে। সে তার অন্তরের দ্বারস্থ হয় না। তার জিহ্বায় যা আসে, সে তা-ই বলে বসে।"
আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ-এর বর্ণনায় এ কথাও এসেছে- “তাঁরা বলতেন, যে তার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করে না, তার দ্বীনদারি বোধগম্য নয়।"
প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে দুজন ফেরেশতা রয়েছে
[৩১৫] জিয়াদ আবূ উমার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “প্রত্যেক মুমিন জানে তার সঙ্গে দুজন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে, যারা তার কথা এবং কাজ সংরক্ষণ করে। সে তাদের সঙ্গে এমন চুক্তিতে আবদ্ধ যা তাকে রাতের পরিশ্রম দিনের পরিশ্রম থেকে এবং দিনের পরিশ্রম রাতের পরিশ্রম থেকে তাদের ফেরায় না।”
আল্লাহকে স্বল্পই স্মরণ করার অর্থ
[৩১৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا "তারা আল্লাহকে স্বল্পই স্মরণ করে।” [৩৯] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তাদের স্মরণের পরিমাণ স্বল্প হয়েছে। কারণ, তা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য ছিল।"
ইবাদাতের মর্যাদা হালাল উপার্জনের চাইতে বেশি
[৩১৭] মুআল্লা ইবনু জিয়াদ আল-ফিরদাউসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'দুজন ব্যক্তি—এর মধ্যে একজন ইবাদাতের জন্য অবসর হলো, আর অপরজন পরিবারের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় রত থাকল—তাদের মধ্যে কে উত্তম?' তিনি বললেন, 'যে ইবাদাতের জন্য অবসর হলো, সে উত্তম।"
শুধু জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে
[৩১৮] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “প্রকৃত ঈমান হলো ওই ব্যক্তির ঈমান, সে আল্লাহকে অদৃশ্যভাবে ভয় করে। যে তা-ই প্রত্যাশা করে, যা আল্লাহ প্রত্যাশা করেন। আর সে এমন সব জিনিস পরিত্যাগ করে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।” এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ “অনুরূপভাবে নিশ্চয় বান্দাদের মধ্য থেকে শুধু জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।” [৪০]
মুমিনের কথা এবং কাজ সবই আল্লাহর জন্য
[৩১৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا “তিনি তো ওই সত্তা, যিনি রাত এবং দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন। এতে উপদেশ রয়েছে তাদের জন্য, যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায় কিংবা যারা কৃতজ্ঞ হতে চায়।”[৪১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রাতে (আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে) পারল না, তার জন্য দিনে সন্তুষ্টি কামনা করার সুযোগ রয়েছে। আর যে ব্যক্তি দিনে পারল না, তার জন্য রাতে সন্তুষ্টি কামনা করার সুযোগ রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ কল্যাণের মধ্যে থাকে যতক্ষণ সে যা বলে, আল্লাহর জন্য বলে এবং যত আমল করে, আল্লাহর জন্যই করে।”
আমলহীন আলোচকের আলোচনা উপকারী নয়
[৩২০] আবূ আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে প্রবেশ করলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ফারকাদ রাহিমাহুল্লাহ। তারা এক মজলিসের পাশে বসলেন, যারা কথা বলছিল। তিনি তাদের কথা শোনার জন্য চুপ থাকলেন। এরপর ফারকাদ রাহিমাহুল্লাহ-এর দিকে ফিরে বললেন, 'হে ফারকাদ, আল্লাহর কসম, এরা হলো এমন সম্প্রদায় যারা ইবাদাতকে বিরক্তিকর মনে করেছে। তারা নিজেদের ওপর আমলের থেকে কথাকে সহজ পেয়েছে। তাদের তাকওয়া হ্রাস পেয়েছে। তাই তারা কথাবার্তায় লিপ্ত হয়েছে।”
দ্বীন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করার ফযীলত
[৩২১] আলা ইবনু মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'সামান্য সময়ের (দ্বীন নিয়ে) চিন্তা-ভাবনা রাতভর সালাত আদায় অপেক্ষা উত্তম।"
আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
[৩২২] জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "কিছু মানুষ (আমলের) ধারাবাহিকতার গুরুত্বকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহর কসম, মুমিন তো সে নয়, যে এক মাস, দুমাস, এক বছর বা দু-বছর আমল করে। না, আল্লাহর কসম, আল্লাহ মৃত্যু ছাড়া মুমিনের আমল (সমাপ্ত করার) অন্য কোনো মেয়াদ রাখেননি।”
চূড়ান্ত বিদায়ের প্রস্তুতি
[৩২৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ সকাল এবং সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের তিনবার করে বলতেন—তোমাদের মধ্যে অবস্থানকাল স্বল্প।”
মুমিন এবং মুনাফিকের পার্থক্য
[৩২৪] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি মুমিনকে দেখবে মলিন আর মুনাফিককে দেখবে হাস্যোজ্জ্বল।”
দ্বীনের ব্যাপারে মনগড়া ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়
[৩২৫] আওফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্ত এবং খেয়ালখুশিকে অভিযুক্ত করো। আর নিজেদের জীবন এবং দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবকে উপদেশ হিসেবে গ্রহণ করো।"
উত্তম খাবার
[৩২৬] ইয়াজিদ ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, উত্তম খাবার হলো সেই দু-ব্যক্তির খাবার, যাদের একজন নিজ হাতে কাজ করে (জীবিকা নির্বাহ করে)। আর অপরজন হলো সে, যে তার পিঠে বোঝা বহন করে (জীবিকা নির্বাহ করে)।”
প্রয়োজনাতিরিক্ত ভবন নির্মাণের শাস্তি
[৩২৭] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের জন্য যতটুকু যথেষ্ট তার চেয়ে অধিক ভবন বানায়, কিয়ামাতের দিন তার ওপর সাত তবক জমিন চাপিয়ে দেওয়া হবে।"
দুনিয়াত্যাগী বান্দা সর্বোত্তম
[৩২৮] রাওহ ইবনু সাওর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'দুজন ব্যক্তির একজন হালাল পন্থায় দুনিয়া অন্বেষণ করল, সে তা পেয়েও গেল। পাশাপাশি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করল এবং সম্পদের কিছু অংশ আখিরাতের জন্যও অগ্রে প্রেরণ করল। আর অপর ব্যক্তি (সম্পূর্ণরূপে এই) দুনিয়া বর্জন করল—এ দুজনের মধ্যে কে উত্তম?' তিনি বললেন, 'এ দুজনের মধ্যে আমার কাছে ওই ব্যক্তি প্রিয়, যে দুনিয়া বর্জন করেছে।”
তিনি (রাওহ ইবনু সাওর রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, “হে আবূ সাঈদ, একজন হালাল পন্থায় দুনিয়া অন্বেষণ করল, সে তা পেয়েও গেল। পাশাপাশি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করল এবং সম্পদের কিছু অংশ নিজের আখিরাতের জন্যও অগ্রে প্রেরণ করল (সে কি উত্তম নয়?)।” তিনি (হাসান রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, “এ দুজনের মধ্যে আমার কাছে ওই ব্যক্তি প্রিয়, যে দুনিয়া বর্জন করেছে।"
দুনিয়ায় মুমিনের অবস্থা
[৩২৯] আবূ কাব আবদু রাব্বিহি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই মুমিন দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো। সে নিজের অপমানে অস্থির হয় না। তার সম্মান নিয়ে তার পরিবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় না। মানুষ তার ব্যাপারে স্বস্তিতে থাকে। আর সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে থাকে। সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে উত্তম বস্তু উপার্জন করেছে এবং অতিরিক্ত জিনিস তার দারিদ্র্য এবং অসহায়ত্বের দিনের জন্য অগ্রে প্রেরণ করেছে। তোমরা এই শ্রেষ্ঠত্বকে সে দিকে অভিমুখী করো, যে দিকে আল্লাহ তা অভিমুখী করেছেন। এখানে তোমরা তাকে এমন কিছুর মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না, যা তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”
সালাতের সঙ্গে মুনাফিকের আচরণ
[৩৩০] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ "যারা লৌকিকতা করে।”[৪২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "যদি সে সালাত পড়ে, তাহলে লৌকিকতাস্বরূপ (লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে) পড়ে। আর যদি সে সালাত না পড়ে, তবে এতে কোনো পরোয়া করে না।"
সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নবোদ্ভাবিত বিষয়সমূহ
[৩৩১] ইবনু আবী শুরাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তোমরা মুহাজিরদের তাদের শ্রেষ্ঠত্ব-সহকারে চিনে নাও এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। আর মানুষেরা নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে যা কিছু নতুন করে উদ্ভাবন করে, তোমরা সেগুলো থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নবোদ্ভাবিত বিষয়সমূহ।”
মজলিস চলাকালে শয়তানের ধোঁকা
[৩৩২] আবদুল কারীম ইবনু রাশীদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মজলিসে ছিলাম। তখন একজন লোক কাঁদতে লাগল। তার স্বর উঁচু হয়ে গেল। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'নিশ্চয় শয়তান এখন একে কাঁদাচ্ছে।”
কাজের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া
[৩৩৩] ইবনু আবী হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তুমি তোমার কাজের মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ দাও, তোমার কথার মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ দিয়ো না।”
খরচে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা
[৩৩৪] মুআল্লা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর নামে কসম করে বলেন-মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী ব্যক্তি কখনো নিঃস্ব হয়নি।”
তুমি কার জন্য দুনিয়া সঞ্চয় করছ?
[৩৩৫] হাইসাম রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ নিজ সঙ্গীদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে আদম-সন্তান, কতকাল পর্যন্ত এসব বলতে থাকবে-হে পরিবারের লোকেরা, আমাকে মধ্যাহ্নভোজ করাও? হে পরিবারের লোকেরা, আমাকে নৈশভোজ করাও? আল্লাহর কসম, শীঘ্রই তোমাকে মধ্যাহ্নভোজ করানো হবে। আল্লাহর কসম, শীঘ্রই তোমাকে নৈশভোজ করানো হবে। এ তো শুধুই খাওয়া, গলাধঃকরণ করা আর শর্তের পর শর্ত আরোপ করতে থাকা। গর্দভ, তুমি তোমার সম্পদ সঞ্চয় করছ এমন নারীর জন্য, যে তা নিয়ে অন্য স্বামীর ঘরে যাবে; অথবা এমন পুরুষের জন্য, যে তা নিয়ে তার স্ত্রীর কাছে গমন করবে? যদি তুমি তিন শ্রেণির মধ্যে সর্বোচ্চ ক্ষতির অধিকারী না হয়ে পারো, তাহলে তা-ই করো।” বর্ণনাকারী বলেন, “আমি হাসান রাহিমahullah-কে আরও বলতে শুনেছি, হে আদম-সন্তান, আমার সম্পদ! আমার সম্পদ! তোমার সম্পদের মধ্যে তুমি যা নিজে খেয়ে নিঃশেষ করেছ, যা পরে জীর্ণ করেছ কিংবা যা দান করে কার্যকর রেখেছ—শুধু এগুলো ছাড়া তোমার জন্য কি আর কোনো অংশ রয়েছে?”
মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রকৃষ্ট নমুনা
[৩৩৬] মালিক দারি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু চার শ দীনার নিয়ে সেটাকে একটা থলের ভেতর রাখলেন। এরপর গোলামকে বললেন, 'তুমি এটা নিয়ে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ-এর কাছে যাও। এরপর তার ঘরে কিছুক্ষণ অবস্থান করো, যাতে তুমি লক্ষ করতে পারো, সে (এই দীনার দিয়ে) কী করে।' গোলাম তার কাছে গিয়ে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন আপনার উদ্দেশে বলেছেন, এই অর্থ আপনার প্রয়োজনমতো খরচ করুন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাকে ভালোবাসুন।' এবং তিনি বললেন, 'হে দাসী, তুমি এই সাত দীনার এবং এই পাঁচ দীনার নিয়ে অমুকের কাছে যাও, আর এই পাঁচ দীনার নিয়ে তমুকের কাছে যাও।' এভাবে তিনি পুরোটা বিলিয়ে দিলেন। গোলাম উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে তাকে অবগত করল। সে এসে দেখল, তিনি অনুরূপ অর্থ মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্যও প্রস্তুত করেছেন। তিনি বললেন, 'তুমি এটা নিয়ে মুয়াজ ইবনু জাবাল-এর কাছে নিয়ে যাও। এরপর তার ঘরে কিছুক্ষণ অবস্থান করো, যাতে তুমি দেখতে পারো, সে কী করে।' সে তা নিয়ে মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন আপনার উদ্দেশে বলেছেন, এই অর্থ আপনার প্রয়োজনমতো ব্যয় করুন।' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাকে ভালোবাসুন এবং তার প্রতি রহম করুন। হে দাসী, তুমি এদিকে আসো। তুমি এটা নিয়ে অমুকের ঘরে যাও।' তখন মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী ব্যাপারটা জেনে গেল। সে বলল, 'আল্লাহর কসম, আমরা তো নিঃস্ব। সুতরাং আপনি আমাদের দিন।' সে সময় বস্ত্রখণ্ডের ভেতর কেবল দুই দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। তিনি তার দিকে তা-ই ছুড়ে মারলেন। গোলাম উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ফিরে তাকে অবগত করল। তিনি এসব শুনে আনন্দিত হলেন এবং বললেন, 'নিশ্চয় তারা পরস্পর ভাই ভাই। একজন অপরজনের সুহৃদ। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।”
সত্যবাদী সঙ্গীর দৃষ্টান্ত
[৩৩৭] আসিম আহওয়াল সাদুস গোত্রের জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, আবূ মূসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সত্যবাদী সঙ্গী আতর বিক্রেতার মতো। তা যদি তোমার গায়ে না-ও লাগে, তবুও নিজ সুগন্ধি দ্বারা সে তোমাকে সুরভিত করবে।”
যে কাঁদতে চায়, সে যেন কেঁদে নেয়
[৩৩৮] রাবিয়া ইবনু জাযান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ঈসা ইবনু জাযান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "মানুষের ওপর এমন কাল আসছে, যখন শয়তান মানুষের চোখে বসবাস করবে (ফলে মানুষ আল্লাহর ভয়ে কাঁদাকে তুচ্ছ মনে করবে)। সুতরাং যে কাঁদতে চায়, সে যেন এখনই কেঁদে নেয়...।"
মানুষের হিংসা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
[৩৩৯] সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহারিব ইবনু দিসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই এই আশঙ্কায় আমি নতুন কাপড় পরিধান থেকে বিরত থাকি যে, তা আমার প্রতিবেশীর মনে নতুন করে হিংসা সৃষ্টি করবে। ফলে সে মন্তব্য করবে, তার এই কাপড় আবার কোত্থেকে এল? (চুরিটুরি করল নাকি?)"
সাওমের কথা গোপন রাখা
[৩৪০] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি বিশর রাহিমাহুল্লাহ-এর স্বহস্তে লিখিত পত্রে পেয়েছি, তিনি বলেছেন, 'আমি মুয়াফি রাহিমাহুল্লাহ-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যে সাওম অবস্থায় তার (দ্বীনি) ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে এটা অপছন্দ করে যে, তার ভাইয়েরা তার সাওমের কথা জেনে যাক। আবার সে পছন্দ করে যে, তারা তার কাছে খাবার খাক। এর কোনটিতে শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে? তাদের খাবারের জন্য আহ্বান না করার মধ্যে?' তিনি বললেন, 'তাদের খাওয়ানো আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। সে যদি চায়, তাহলে সে যেন তাদের সঙ্গে অবস্থান করে এবং বলে—আমার খাওয়া হয়ে গেছে।"
সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'সে বলবে—আমি আগেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছি' এর দ্বারা কী বিগত দিনের দুপুর উদ্দেশ্য হবে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”
মাসে তিন দিন সাওম রাখার ফযীলত
[৩৪১] আবদুল্লাহ ইবনু শাকিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে খাবারের জন্য ডাকা হলো। তিনি বললেন, 'আমি সাওম রেখেছি।' দিন শেষে তাকে খেতে দেখা গেল। তখন তাকে বিষয়টি বলা হলে তিনি বললেন, 'আমি প্রতিমাসে তিন দিন সাওম রাখি। এটাই সিয়ামুদ দাহর (পুরো মাসের সাওম সমতুল্য)।”
আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি বিশর রাহিমাহুল্লাহ-এর পত্রে লিখিত পেয়েছি, তিনি বলেছেন, আমি এ ব্যাপারে ওয়াকি রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন, 'যখন সে সেই হাদীস উদ্দেশ্য নেবে যা তিন দিনের সাওমের ব্যাপারে এসেছে, তখন তুমি দেখবে তার জন্য এ কথা বলা যথেষ্ট হবে যে—আমি সাওম পালনকারী। অথচ বাস্তবে সে সাওম পালনকারী নয়।' তিনি বলেন, 'যখন সে নিয়তকে নিয়ন্ত্রণ রাখবে, তখন আর সমস্যা নেই।”
তিনি বলেন, “আমি মুআফি রাহিমাহুল্লাহ-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যে এমন মানুষজনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল, যারা পাশা খেলছিল। আপনি কী মনে করেন, সে কি তাদের সালাম দেবে? তিনি বললেন, 'না।' আমি বললাম, 'সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ তো বলতেন, সে সালাম দেবে এবং তাদের (হারام খেলা বাদ দেওয়ার ব্যাপারে) আদেশ করবে।' মুআফি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি আদেশ না করে, তবে সালাম দেবে না।”
কার সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধন রাখা সমীচীন নয়?
[৩৪২] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি বিশর রাহিমাহুল্লাহ-এর পত্রে লিখিত পেয়েছি, তিনি বলেছেন, 'আমি মুআফি রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করেছি, সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ কি এ কথা বলতেন—তুমি যে ব্যক্তির ব্যাপারে এই আশঙ্কা করবে যে, তার খাবার তোমার অন্তরকে অপবিত্র করে ফেলবে, তবে তার দাওয়াতে সাড়া দেবে না।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।”
কল্যাণমূলক কথার ওপর আমল
[৩৪৩] আবূ খালিদ আহমার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমর ইবনু কায়স মালায়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তুমি কোনো কল্যাণমূলক কাজের কথা শুনবে, তৎক্ষণাৎ তার ওপর আমল করে নেবে। অন্তত একবার হলেও তুমি তার ওপর আমলকারী হয়ে যাবে।”
আল্লাহর অবাধ্যতার কথা যারা শোনেনি কখনো
[৩৪৪] নূহ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আওন ইবনু শাদ্দাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের ভূমিতে এক শুভ্রোজ্জ্বল জমিন সৃষ্টি করেছেন। সূর্যের আলো হলো তার শুভ্রতা। তাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে, যারা জানেনি, কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা হয়েছে।”
অহমিকা ইবাদাত বিনষ্ট করে দেয়
[৩৪৫] হারিস ইবনু নাবহান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনলাম, 'হায় সঙ্গী! আমার সঙ্গীরা চলে গেছে।' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। এমন কিছু যুবক কি গড়ে ওঠেনি, যারা কুরআন পড়ে, রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করে, দিনে সাওম রাখে, হাজ্জ করে এবং জিহাদ করে?' তিনি তখন থুতু ফেললেন। এরপর বললেন, 'অহমিকা তাদের নষ্ট করে দিয়েছে।"
আখিরাতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া
[৩৪৬] মুরজি ইবনু ওয়াদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আইয়ুব ইবনু ওয়িল রাসিবি বলেন, হে প্রত্যাশা সৃষ্টিকারী, তুমি দুনিয়ার ব্যাপারে যত্নবান হোয়ো না। তুমি আখিরাতের ব্যাপারে যত্নবান হও। কারণ, তোমার সঙ্গীদের মধ্যে একজন এমন ছিল, যাকে ভীষণ প্রয়োজন আক্রান্ত করেছিল। এক রাতে সে বের হলো। তখন আকাশ থেকে তার ওপর একটা দিরহামের থলে নিক্ষেপ করা হলো। তা তার কাঁধের ওপর পড়ল। সে দীর্ঘকাল তা থেকে খরচ করে যাচ্ছিল। এমনকি কখনো কখনো সে (এত অলসতা প্রদর্শন করেছিল যে) বিছানায় এপিঠ-ওপিঠ করে করে পার্শ্ব ব্যথা করে ফেলছিল।"
আল্লাহওয়ালাদের দারিদ্র্যপীড়িত অবস্থা
[৩৪৭] তালিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি ইয়াজিদ জববি রাহিমাহুল্লাহ-কে মোটা রুটি এবং লবণ খেতে দেখলাম। আমি এ নিয়ে তাকে বললে তিনি জবাব দিলেন, হে আমার ইলাহ, আমি আপনার উদ্দেশে প্রশংসা করছি। কারণ, আমার কাছে আপনার এরূপ এরূপ নিআমাত এসেছে। এ ছাড়া আমার তো আর কোনো খাবার নেই।"
ঋণ পরিশোধে দুশ্চিন্তা
[৩৪৮] তালিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইয়াজিদ জববি রাহিমাহুল্লাহ একদিন তার ওয়াজ শেষ করে আমাকে দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, 'হে আবদুল্লাহ, কেমন দিন যাপন করলে? কী ব্যাপার, আমি তোমাকে দুঃখিত দেখছি কেন?' আমি বললাম, 'আমার ওপর অবধারিত ঋণের কারণে।' তিনি বললেন, 'ঋণের পরিমাণ কত?' আমি বললাম, 'পঞ্চাশ দিরহাম।' তিনি বললেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আমি তোমার প্রশংসা করি। (আবদুল্লাহ) যদি তোমার ভাইয়ের কাছে অর্থ থাকত, তাহলে সে তোমার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দিত।' এরপর তিনি বললেন, 'তুমি পঞ্চাশ দিরহাম নিয়েই দুঃখিত হচ্ছ, অথচ আমার ওপর ঋণ রয়েছে দু-হাজার দিরহাম; যা পরিশোধের আপাতত কোনো পথ নেই।' তাকে বলা হলো, 'হে আবূ মাউদুদ, আশা করা যায় কি, তা আপনার জন্য উত্তম হবে?' তিনি বললেন, 'কীভাবে?' আমি বললাম, 'কারণ, তা আপনার প্রচণ্ড দুঃখ এবং অধিক কাকুতি-মিনতির জন্য কারণ হচ্ছে।' তিনি বললেন, 'আমি আশা করি।' এরপর ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ মারা গেলেন। তার মৃত্যুর পর তার পক্ষ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া হলো।”
প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য বিজয়ের সুসংবাদ
[৩৪৯] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মাহর দ্বারা জমিনের প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য বিজিত হবে। জেনে রেখো, উম্মাহর পাশ্চাত্য গভর্নররা জাহান্নামে যাবে। তবে যে আল্লাহকে ভয় করে এবং আমানত আদায় করে, তার বিষয় ভিন্ন।”
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি এবং ক্রোধের নিদর্শন
[৩৫০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মূসা ইবনু ইমরান আলাইহিস সালাম বলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি ঊর্ধ্বাকাশে আর আমরা পৃথিবীতে। তো আপনার সন্তুষ্টির নিদর্শন কী এবং আপনার ক্রোধের নিদর্শন কী?' তিনি (আল্লাহ) বললেন, 'যখন আমি তোমাদের ওপর তোমাদের উত্তম ব্যক্তিদের প্রশাসক নিযুক্ত করি, তা হয় আমার সন্তুষ্টির নিদর্শন। আর যখন আমি তোমাদের ওপর তোমাদের নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের প্রশাসক নিযুক্ত করি, তা হয় আমার ক্রোধের নিদর্শন।”
এক ব্যক্তির ঘটনা
[৩৫১] আবূ আবদির রহমান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "আবদুল্লাহ ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এক ব্যক্তি এল। তখন তার ব্যাপারে তাকে বলা হলো, তিনি তো...। তিনি তো...। এসব শুনে তিনি তার দিকে তাকালেন। এরপর নীরব থাকলেন। তারপর ওই ব্যক্তি চলে গেল। সে যাওয়ার পর তাকে বলা হলো, এই ব্যক্তির অবস্থা হলো..., তার অবস্থা হলো...। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা যেমন বললে, সে যদি তেমন যাহিদ-ই (দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী) হয়ে থাকে, তাহলে সে আমার কাছে কী করে?"
উত্তম কথা বলা
[৩৫২] সুফিয়ান ইবনু উয়ায়না রাহিমাহুল্লাহ জনৈক বসরি শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আল্লাহ এমন বান্দার প্রতি রহম করুন-যে (ভালো কথা) বলে, ফলে সাফল্য লাভ করে; কিংবা (মন্দ বলা থেকে) নীরব থাকে, ফলে নিরাপদ থাকে।”
মৃত্যু বাহু প্রসারণকারী
[৩৫৩] আবূ রাজা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلَّا تَخْوِيفًا “কেবল ভীতিপ্রদর্শনের জন্যই আমি নিদর্শন পাঠাই।"[৪৩] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মৃত্যু হলো বাহু প্রসারণকারী।”
অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমাত
[৩৫৪] ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ব্যথার কথা আলোচনা করা হলে তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, তা কি মুমিনের সহজতম আনন্দের দিন নয়? তা তো এমন দিন, যখন তার মৃত্যু নিকটবর্তী করা হয়েছে, সে তার পুনরুত্থানের যে ব্যাপার ভুলে গিয়েছিল, তা স্মরণ করেছে, ফলে এর মাধ্যমে তার পাপরাশি মোচন করা হয়েছে।”
মুমিন গোনাহের ব্যাপারে জান্নাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভীত থাকে
[৩৫৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই (মুমিন) ব্যক্তি কৃত গোনাহের কথা ভুলে যায় না। জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত সে তার (গোনাহের) ব্যাপারে ভীত থাকে।"
রহমানের বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য
[৩৫৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا “রহমানের বান্দা তারা, যারা জমিনে নম্রভাবে বিচরণ করে।”[৪৪] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা সহনশীল, তাই ভুলে যায় না। আর যদি ভুলেও যায়, তাহলে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়।"
হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর দান
[৩৫৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর ব্যাপারে বলেন, “যখন তার ভাতা আসত তখন তিনি অমুকের পরিবারের জন্য, তমুকের পরিবারের জন্য হাত খুলে বিতরণ করতেন; যতক্ষণ না তার ছেলে তাকে বলত যে, আপনারও পরিজন রয়েছে। (তার ছেলের কথা শোনার পর) তিনি যা অবশিষ্ট থাকত, তা তাদের জন্য ছুঁড়ে দিতেন।"
হকের ওপর চলতে পারে শুধুই বিশ্বাসীরা
[৩৫৮] মাতার ওয়াররাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে বললাম, হে আবূ সাঈদ, আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে এসেছি। কিন্তু মনে হচ্ছিল যে, পায়ের নিচে কাদামাটির এবং মাথার ওপর ক্লান্তিকর বোঝার ভারের কারণে আমি আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে মাতার, নিশ্চয়ই এই হক ভারী। তা মানুষকে পরিশ্রান্ত করে রেখেছে এবং তাদের মাঝে ও তাদের অধিকাংশ কুপ্রবৃত্তির মাঝে অন্তরায় হয়ে থেকেছে। আল্লাহর কসম, এই হকের ওপর শুধু সে-ই চলতে পারে, যে তার শ্রেষ্ঠত্ব জেনেছে এবং তার পরিণাম প্রত্যাশা করেছে।”
মৃত্যু নিকটবর্তী
[৩৫৯] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবু সাঈদ, আপনি কি আপনার কাপড় ধৌত করবেন না?' তিনি বললেন, 'আমি (চূড়ান্ত) বিষয় (মৃত্যু) কে এর চাইতেও নিকটবর্তী মনে করি।”
সময়ের মৃত্যু জীবনের মৃত্যু
[৩৬০] আলি ইবনু সাবিত রাহিমাহুল্লাহ খোরাসানের জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "হে আদম-সন্তান, তুমি তো কতক দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন চলে গেল, তখন তোমার একটি অংশ চলে গেল।”
অল্পেতুষ্টি আল্লাহর বিশেষ দান
[৩৬১] আলি ইবনু সাবিত রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বলেন, فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً “আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব।”[৪৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি তাকে দান করব অল্পেতুষ্টি। (অর্থাৎ সে অল্পতেই তুষ্ট থাকবে)।”
লেনদেনের ব্যাপারে সতর্কতা
[৩৬২] মানসুর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন (তার কওমের সাথে) সফরে বেরোতেন এবং লোকেরা তাদের খরচের অর্থ বের করত, সাথে সাথে তিনিও তারা যে পরিমাণ খরচ করে, তার অনুরূপ অর্থ বের করতেন। এরপর তিনি খরচকারীর কাছে তাদের যা দিয়েছিলেন, এ ছাড়াও আলাদা কিছু অর্থ দিয়ে দিতেন।”
মিথ্যা হলো নিফাকের সমন্বায়ক
[৩৬৩] আবদুল্লাহ বিন আইজার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মিথ্যা হলো নিফাকের সমন্বায়ক।”
আমল বিনষ্টকারী বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা
[৩৬৪] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একজন ব্যক্তি যতক্ষণ আমল বিনষ্টকারী বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে, (ততক্ষণ) সে কল্যাণের মধ্যে থাকে”
ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাদের মধ্যে কিছু মানুষ এমন, যাদের ওপর কুপ্রবৃত্তি বিজয় লাভ করে। আর কিছু মানুষ হলো এমন, যারা মনে করে যে তারা সত্যের ওপর রয়েছে।”
ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য
[৩৬৫] সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালামা ইবনু কুহাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আতা, তাউস এবং মুজাহিদ রাহিমাহুমুল্লাহ—এ তিনজন ছাড়া আমি এমন কাউকে দেখিনি, যে তার ইলমের মাধ্যমে সেরেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে।”
মুমিনের সময় কাটে চিন্তান্বিত অন্তরে
[৩৬৬] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই মুমিন চিন্তিত অবস্থায় ভোর করে এবং চিন্তিত অবস্থায়ই সন্ধ্যা যাপন করে।”
ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর অবস্থা এমন ছিল, তুমি যখনই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করো, মনে হবে তিনি একজন বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তি।”
উচ্চৈঃস্বরে হাসি একধরনের উদাসীনতা
[৩৬৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনের উচ্চৈঃস্বরের হাসি একধরনের উদাসীনতা।”
মুমিন ভীতির সঙ্গে দিনাতিপাত করে
[৩৬৮] সুফিয়ান ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিন ভীত অবস্থায় ভোর করে। তার জন্য এ ছাড়া অন্য কিছু সংগতও নয়। কারণ, সে দু-ধরনের গোনাহের মধ্যে রয়েছে-অতীতে কৃত গোনাহ, যে ব্যাপারে সে জানে না, আল্লাহ তার সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন। আর ভবিষ্যতে সংঘটিত অপরাপর গোনাহ-যে ব্যাপারে সে জানে না, তার পক্ষে কী ফায়সালা হয়ে আছে।”
মুমিনের কিছু বৈশিষ্ট্য
[৩৬৯] ইয়াজিদ ইবনু তাওবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে নিজ প্রতিপালককে চিনল, সে তাকে ভালোবাসল। যে দুনিয়ার স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছে, সে তার ব্যাপারে নির্মোহ থেকেছে। মুমিন কখনো উদাসীন হয় না যে, শেষাবধি সে গাফিলে পরিণত হবে। যখন সে চিন্তা করে, তখন সে (নিজের বদ আমলের কথা স্মরণ করে) দুঃখিত হয়।”
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর ওসিয়ত
[৩৭০] আবু উবায়দা নাজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর অসুস্থতার সময় তার শুশ্রূষার উদ্দেশ্যে তার কাছে গেলাম। তিনি বললেন, 'তোমাদের স্বাগতম ও অভিনন্দন। আল্লাহ তোমাদের শান্তির জীবন দান করুন। আমাদের এবং তোমাদের শান্তির আবাসস্থলে অবতরণ করুন। এটা প্রকাশ্য পুণ্য। যদি তোমরা সবর করো এবং সত্যবাদী হও, আমি কসম করছি, তাহলে এই হাদীসের ব্যাপারে তোমাদের হিস্যা শুধু এই হবে না যে, তোমরা তা এ কান দিয়ে শুনবে, তারপর তা কান থেকেই বেরিয়ে যাবে। কারণ, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখল, সে তো প্রত্যুষে আগমনকারী এবং বিকেলে আগমনকারী সত্তাকেই দেখল। কোনো ইটের ওপর ইট রাখা হয়নি। কোনো বাঁশের ওপর বাঁশ রাখা হয়নি। কিন্তু তার জন্য পতাকা উঁচু করা হয়েছে।' এরপর তিনি নিজের দিকে অভিমুখী হয়ে বললেন, 'ওহি, ওহি। এরপর মুক্তি, এরপর মুক্তি। তোমরা কীসের ওপর অবস্থান করছ? কাবার রবের শপথ, তোমরা এসেছ। যেন তোমরা এবং (চূড়ান্ত) বিষয় একই সঙ্গে ঘটবে।”
গোনাহ পরিত্যাগ করা
[৩৭১] হাসান ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, গোনাহ পরিত্যাগ করা তাওবা অন্বেষণ করার চাইতে অধিক সহজ।”
বিনয়ের পরিচয়
[৩৭২] হিশাম ইবনু হাসসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মানুষেরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বিনয় প্রসঙ্গে আলোচনা করল। তিনি তখন নীরব ছিলেন। এ প্রসঙ্গে যখন তারা অধিক পরিমাণ কথাবার্তা বলে ফেলল তখন তিনি তাদের বললেন, 'আমি দেখছি, তোমরা বিনয় প্রসঙ্গে অধিক পরিমাণ কথাবার্তা বলে ফেলেছ।' তারা বলল, 'হে আবূ সাঈদ, বিনয় কী?' তিনি বললেন, '(বিনয় হলো) একজন বান্দা ঘর থেকে বের হওয়ার পর যে মুসলিমের সঙ্গেই তার সাক্ষাৎ হয়, সে মনে করে, ওই ব্যক্তি তার থেকে উত্তম।”
ফকীহ-এর পরিচয়
[৩৭৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে ফতোয়া দিলেন। সে বলল, 'হে আবূ সাঈদ, ফকীহ কে?' তিনি বললেন, 'যে দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, আখিরাতের ব্যাপারে আগ্রহী, দ্বীনের ব্যাপারে চক্ষুষ্মান, ইবাদাতে অধ্যবসায়ী। তিনিই ফকীহ।”
মানুষের প্রত্যাশা
[৩৭৪] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মানুষ জ্বরের প্রতিদানে অতীতে কৃত সব গোনাহের কাফফারা প্রত্যাশা করে।”
মন্দ সঙ্গীর দ্বারা প্রবঞ্চিত হওয়া
[৩৭৫] আবূ উবায়দা আবদুল মুমিন ইবনু উবায়দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনেক অধ্যবসায়ী অনুগত বান্দা বাতিলের ভেতর স্থানচ্যুত হয়। সে এমন জিনিসের জন্য অধ্যবসায় করতে থাকে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। আবার মন্দ সঙ্গীর দ্বারা অনেকে প্রবঞ্চিত হয়।”
সর্বদা স্ত্রীর আনুগত্যের ভয়াবহতা
[৩৭৬] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, কোনো ব্যক্তি (সর্বদা) তার স্ত্রীর আনুগত্য করতে থাকলে আল্লাহ তাকে অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।”
নিয়ত আমলের চাইতে অধিক কার্যকরী
[৩৭৭] আবূ উবায়দা আবদুল মুমিন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিয়ত আমলের চাইতে অধিক কার্যকরী।”
সারা রাত কেঁদে কাটালেন
[৩৭৮] আলি ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ এক রাতে আমাদের কাছে থাকলেন। তিনি সারা রাত কেঁদে কাটালেন। সকাল হলে আমি বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, আপনি তো গত রাতে আমাদের পরিবারের সবাইকে কাঁদিয়েছেন।' তিনি বললেন, 'হে আলি, আমি রাতে নিজেকে সম্বোধন করে বলেছি-হে হাসান, আল্লাহ হয়তো তোমার কোনো দুর্দশার দিকে তাকিয়ে বলেছেন, তুমি যা ইচ্ছা করো। আমি তোমার থেকে আর কিছুই গ্রহণ করব না। (অর্থাৎ কোনো নেক আমলই কবুল করব না।)”
মুমিনের আচরণ
[৩৭৯] খালিদ ইবনু রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিন যখন কোনো প্রয়োজন অনুসন্ধান করে, যদি তা তার জন্য সহজ হয়, তবে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজ পন্থায় তা গ্রহণ করে নেয় এবং তার ওপর আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যদি সহজ না হয়, তাহলে সে তা ছেড়ে দেয় এবং নিজেকে তার অনুগামী করে না।”
সাজদারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া
[৩৮০] সাল্লাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বান্দা যখন সাজদারত অবস্থায় ঘুমায়, তখন আল্লাহ তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করেন। তিনি বলেন—আমার বান্দাকে দেখো, সে আমার ইবাদাত করছে। আর তার রুহ আমার কাছে, আর সে সাজদারত অবস্থায় রয়েছে।”
হতভাগারা মৃত
[৩৮১] আসিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে ইতঃপূর্বে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুনেছি,
لَيْسَ مَنْ مَاتَ فَاسْتَرَاحَ بِمَيِّتٍ ... إِنَّمَا الْمَيِّتُ مَيِّتُ الْأَحْيَاءِ
'যে মৃত্যুবরণ করে বিশ্রাম লাভ করল, সে তো মৃত নয়। জীবিতদের মধ্যে যে মৃত, মৃত তো সে-ই হয়।'
এরপর তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, কবি সত্য বলেছে। সে ব্যক্তি হয় জীবিত শরীর আর মৃত অন্তরের অধিকারী।”
মাবাদ জুহানির স্বীকৃতি
[৩৮২] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার সঙ্গে মাবাদ জুহানির দেখা হলো। আমি তখন বাহনের পিঠে আরোহী ছিলাম, তিনিও তখন বাহনের পিঠে আরোহী ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে মালিক, আমি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করেছি। অনেক মানুষ দেখেছি। আমি হাসান ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মতো আর কাউকে দেখিনি। হায়, আমি যদি তার আনুগত্য করতাম! হায়, আমি যদি তার আনুগত্য করতাম!”
মুমিনের স্বভাব
[৩৮৩] সাঈদ জারিরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, ব্যক্তি পাপ করে, এরপর তাওবা করে, এরপর পাপ করে, এরপর তাওবা করে, এরপর পাপ করে, এরপর তাওবা করে, এরপর পাপ করে, এরপর তাওবা করে। এভাবে কতকাল পর্যন্ত?' তিনি বললেন, 'আমি এমন অবস্থা মুমিনের স্বভাব হিসেবেই জানি।”
তাওবাকৃত গোনাহের কারণে লজ্জা না দেওয়া
[৩৮৪] সালিহ মিররি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আমাদের কাছে এ মর্মে হাদীস বর্ণনা করা হতো— যে ব্যক্তি তার ভাইকে এমন গোনাহের কারণে লজ্জা দেয় যা থেকে সে তাওবা করেছে, আল্লাহ তাকে সে গোনাহে আক্রান্ত করেন।"
ধনীদের কাছে গমনের ব্যাপারে নির্দেশনা
[৩৮৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিন ব্যক্তি কোনো স্থানে গমন করে, কোনো মজলিসে বসে, কোনো খাবার খায়—এসব কিছুর প্রভাবে তার অন্তর পরিবর্তিত হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা ধনীদের কাছে গমন করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, তাদের কাছে গমন করা মুমিন ব্যক্তির অন্তর পরিবর্তন করে দেয়। তখন সে নিজের কাছে থাকা নিআমাতের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হয়ে যায়।”
নিকৃষ্ট কাজ
[৩৮৬] আমাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “উত্তম কাজ হলো একটি স্বভাব আর নিকৃষ্ট কাজ হলো গোয়ার্তুমি।”
মুমিন আল্লাহর স্মরণে বিভোর থাকে
[৩৮৭] জারির ইবনু হাজিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তখন তার পুত্র বলল, 'আপনারা বয়স্ক ব্যক্তির সাহায্য করুন। তিনি এখনো খাননি; অথচ অর্ধদিবস হয়ে গেছে।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ তখন তাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'চুপ করো। তাদের ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম, মুসলিম তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, এরপর তারা দুজন আলোচনা করতে থাকে এবং মহান প্রতিপালককে স্মরণ করতে থাকে; যতক্ষণ না দ্বিপ্রহরের নিদ্রা তাদের বাধাগ্রস্ত করে।"
রাবিয়া ইবনু কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গমন করলাম। তিনি তখন তার দাঁতের অনুযোগ করছিলেন। তিনি বলছিলেন :
رَبِّ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে। আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।'” [৪৬]
ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা সবর করবে, নতুবা ধ্বংস হবে। আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই তিনি সুকঠিন শাস্তিদাতা।”
নিজ অন্তরের ব্যাপারে মুমিনের অবস্থা
[৩৮৮] কুররা ইবনু খালিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ الدَّوَّامَةِ “আর আমি নিন্দাকারী অন্তরের শপথ করছি।” [৪৭] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই তুমি দেখবে, মুমিন তার অন্তরের নিন্দা করে। সে বলে, আমি আমার কথার দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিলাম। সে বলে, আমি আমার খাবারের দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিলাম। আমি আমার পরিকল্পনার দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিলাম। তুমি তাকে দেখবে, সে ভর্ৎসনা করেই যাচ্ছে। আর পাপাচারী ব্যক্তি সম্মুখেই এগিয়ে যেতে থাকে। তাই সে অন্তরের নিন্দা করে না।"
বিশ্বাসই মুক্তির সোপান
[৩৮৯] জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ এবং তার রাসূল সত্য বলেছেন। বিশ্বাসের মাধ্যমে জান্নাত কামনা করা হয়েছে। বিশ্বাসের মাধ্যমে জাহান্নام থেকে পলায়ন করা হয়েছে। বিশ্বাসের মাধ্যমে সত্যের ওপর ধৈর্যধারণ করা হয়েছে। আর আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে প্রচুর কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি দেখেছি, নিরাপত্তার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে স্তরবিন্যাস রয়েছে। তবে যখন বিপদ অবতীর্ণ হয় তখন সকলে সমান হয়ে যায়।”
আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনরত চোখ
[৩৯০] আলা ইবনুল মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে হাসান, এমন চোখ, যা রাতের গভীরে আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে! (সে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে।)”
মুমিনের ভেতর ও বাহির
[৩৯১] আওফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম- সন্তান, তোমার রয়েছে কথা ও কাজ, গোপন ও প্রকাশ্য। তোমার কাজ কথার চাইতে তোমার জন্য অধিকতর অনুকূল। আর তোমার গোপন অবস্থা প্রকাশ্য অবস্থার চাইতে তোমার জন্য অধিকতর অনুকূল।”
তোমরা এই দুনিয়াকে অপমানিত করো
[৩৯২] সাল্লাম ইবনু মিসকিন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা এই দুনিয়াকে অপমানিত করো। কারণ, আল্লাহর কসম...।” [৪৮]
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ অবসর সময় যিকরে কাটাতেন
[৩৯৩] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন কাউকে পেতেন না এবং নিজেও ব্যস্ত থাকতেন না তখন তিনি বলতেন—সুবহানাল্লাহি ওয়া বি হামদিহি। সুবহানাল্লাহি ওয়া বি হামদিহি (আমি প্রশংসাসহ আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি)।”
মাজলুমের প্রতি দয়া
[৩৯৪] সালিহ মিররি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে নিঃস্ব ব্যক্তিকে দানকারী, তুমি তার প্রতি দয়া করছ! তুমি যাদের ওপর জুলুম করেছ, তাদের প্রতি দয়া করো।” [৪৯]
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর অনন্যতা
[৩৯৫] হাম্মাদ ইবনু সালামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “লোকেরা মুতাররিফের আকল, ইবনু সিরিনের তাকওয়া, মুসলিম ইবনু ইয়াসারের ইবাদাত এবং হাসানের যুহদের আলোচনা করেছে। ইউনুস ইবনু উবায়দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এ সবগুলো বৈশিষ্ট্যই হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মধ্যে একত্রীভূত হয়েছে।”
বিপদ আসে গোনাহের কারণে
[৩৯৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিন ব্যক্তি বিপদে আক্রান্ত হলে সে বলে—নিশ্চয়ই আমি জানি, তুমি গুনাহের কারণে (আপতিত হয়েছ হে বিপদ)। আমার মহান রব আমার ওপর জুলুম করেননি।”
দ্বীন প্রান্তিকতামুক্ত
[৩৯৭] আওফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর দ্বীনকে রাখা হয়েছে বাড়াবাড়িমুক্ত ও খণ্ডবিখণ্ড করার ওপরে (সীমালঙ্ঘনের নিচে এবং শিথিলতার ওপরে)।”
জান্নাত ছাড়া অন্য কোথাও জীবন সুখকর হবে না
[৩৯৮] আওফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةٌ "আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব।”[৫০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জান্নাত ছাড়া অন্য কোথাও কারও জন্য জীবন সুখকর হবে না।”
মুমিনের দ্বীনই তার অস্তিত্বের মূল
[৩৯৯] কাসিম ইবনু ফায়িদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, তোমার দ্বীন তোমার দ্বীন। তা তো তোমার গোশত এবং রক্ত। যদি তোমার জন্য তোমার দ্বীন নিরাপদ থাকে, তাহলে তোমার জন্য তোমার দেহ এবং গোশতও নিরাপদ থাকবে। আর যদি অপরটি হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ, তা আগুন, যা নির্বাপিত হয় না। তা দেহ, যা নিঃশেষ হয় না। তা জীবন, যা মৃত্যুবরণ করে না।”
বক্তার জন্য উপহার গ্রহণ করা সমীচীন নয়
[৪০০] সাঈদ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন আলোচনা করতে বসলেন তখন তাকে উপহার দেওয়া হলো। তিনি তা ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'এই স্থানে যে বসবে, এরপর হাদিয়া গ্রহণ করবে, আল্লাহর কাছে তার জন্য কোনো অংশ নেই। অথবা বলেছেন, তার কোনো অংশ নেই।”
সালাতে শিথিলতা না করা
[৪০১] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, দ্বীনের কোন অংশ তোমার কাছে মর্যাদাবান থাকবে, যখন সালাতই তোমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে? আর যখন তোমার কাছে সালাত তুচ্ছ হয়ে যাবে, তখন তোমার অস্তিত্ব আল্লাহর কাছে আরও অধিক তুচ্ছ হবে।”
প্রথম দৃষ্টি
[৪০২] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মানুষ বলে, প্রথম দৃষ্টির ব্যাপারে অপারগতা থাকে। তাহলে আখিরাতের কী অবস্থা হবে?”
দৃষ্টির খারাপ পরিণাম
[৪০৩] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনেক দৃষ্টি দৃষ্টিদাতার অন্তরে কুপ্রবৃত্তি জাগায়। আর অনেক কুপ্রবৃত্তি ব্যক্তির ভেতর দীর্ঘ দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করে।”
দস্তরখানে বসে আহার
[৪০৪] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার সঙ্গীদের সঙ্গে এক দস্তরখানে বসলেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘এই দস্তরখান... এখন।’ হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘কিছুতেই নয়, তা তো এমনই!’”
আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করা
[৪০৫] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন তুমি মানুষকে দুনিয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে তখন তুমি তাদের সঙ্গে আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করো। কারণ, তাদের দুনিয়া বিলুপ্ত হয়ে যাবে আর আখিরাত বাকি থেকে যাবে।”
অসুস্থতার সময় তাওয়াক্কুল
[৪০৬] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এখানে একজন শাইখ ছিলেন, তিনি বলেছেন-আমি আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর হাতে পাঁচড়া দেখলাম। তাই আমি ওষুধ এনে তাকে বললাম, ‘এটা ওই পাঁচড়ার ওপর লাগান।’ তিনি তা নিলেন, এর পরক্ষণেই আবার ফিরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, ‘আপনি এটা ফিরিয়ে দিলেন কেন?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা...।’”[৫১]
শুধু আশা করা থেকে বিরত থাকা
[৪০৭] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন। তোমরা এ সকল আশা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, আশার কারণে কাউকে উত্তম কিছু দেওয়া হয় না—না দুনিয়ায়, আর না আখিরাতে।”
[৪০৮] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনের জন্য দুনিয়া কত উত্তম বাসস্থল। আর তা এভাবে যে, সে আমল করে স্বল্প আর এ থেকে জান্নাতের পাথেয় নিয়ে নেয়। কাফির এবং মুনাফিকের জন্য তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল। আর তা এভাবে যে, সে কয়েক রাত ভোগ করে আর তার গন্তব্য হয় জাহান্নামের দিকে।”
মুমিনরা আমল করে ভীতির সঙ্গে
[৪০৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ﴿الَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَّقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ﴾ “তারা হলো ওই সব লোক, যারা যা দান করেছে, তা এমতাবস্থায় দান করে যে, তাদের অন্তর থাকে ভীত।”[৫২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা তাদের পুণ্যকর্মগুলো এমন অবস্থায় করত যে, তাদের অন্তর সর্বদা এই ভয়ে ভীত থাকত— হয়তো আল্লাহ তাদের শাস্তি থেকে মুক্তি দেবেন না।”
চিন্তা করাটাও ইবাদাত
[৪১০] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি বলেন, চিন্তার ন্যায় অন্য কোনো জিনিস দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করা হয়নি।”
জাহান্নামের স্মরণে খাবার ছেড়ে দেওয়া
[৪১১] খুলাইদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালিহ ইবনু হাসসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ একদিন সাওম রাখলেন। ইফতারের সময় আমি তার কাছে খাবার নিয়ে আসলাম। যখন তার সামনে খাবার পরিবেশন করা হলো, তখন তার সামনে এই আয়াত উপস্থাপিত হলো:
﴿إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالاً وَجَحِيمًا وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا﴾
'নিশ্চয়ই আমার নিকট রয়েছে শিকলসমূহ ও প্রজ্বলিত আগুন এবং কাঁটাযুক্ত খাদ্য ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।'[৫৩]
তখন তিনি তা থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা উঠিয়ে নাও।' আমরা উঠিয়ে নিলাম। তিনি পরের দিন সাওম রাখলেন। যখন তিনি ইফতার করতে চাইলেন তখন এই আয়াত স্মরণ হলো। তখনো অনুরূপ করলেন। তৃতীয় দিন এরূপ হলে তার ছেলে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কয়েকজন শাগরিদ—সাবিত বুনানি, ইয়াহইয়া বাক্কা এবং অন্যদের কাছে গিয়ে বললেন, 'আমার বাবাকে ধরুন। কারণ, তিনি তিন দিন ধরে কোনো খাবারের স্বাদ আস্বাদন করেননি।' যখনই আমরা তার সামনে খাবার পরিবেশন করেছি, তখনই তিনি এই আয়াত স্মরণ করেছেন :
إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا ( وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا )
‘নিশ্চয়ই আমার নিকট রয়েছে শিকলসমূহ ও প্রজ্বলিত আগুন এবং কাঁটাযুক্ত খাদ্য ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’। [৫৪]
তখন তারা এসে দীর্ঘ সময় বুঝিয়ে অবশেষে জোর করে এক চুমুক ছাতু পান করালেন।"
বিপদে ইন্নালিল্লাহ পড়া
[৪১২] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় ন্যুব্জ হয়ে এসেছিলেন তখন বলেছিলেন-ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তন করব। তিনি এটা শেষ করলেন। তখন তার পুত্র আবদুল্লাহ তার ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, 'হে বাবা, কী হয়েছে আপনার? আপনি তো আমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। আপনি কি কিছু দেখেছেন?' তিনি বললেন, 'আমি আমার নিজের ওপর ইন্নালিল্লাহ পড়েছি। আমি এ ধরনের অবস্থায় ইতঃপূর্বে কখনো আক্রান্ত হইনি।”
অহংকারের পথ খোলা রাখা সমীচীন নয়
[৪১৩] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বসরার জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “লোকেরা তার পেছনে হাঁটল। তিনি তাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন। এটা কোনো দুর্বল মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়।"
তোমরা আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রত্যাশায় থাকো
[৪১৪] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি এমন মানুষদের সময়কাল লাভ করেছি—যাদের একদল এভাবে জীবন কাটিয়েছেন যে—তারা দুনিয়ার কোনো জিনিস হাতে এলে এতে খুশি হতেন না, আর দুনিয়ার কোনো জিনিস হাতছাড়া হলে হতাশ হতেন না। তাদের কাছে দুনিয়াটা ছিল এই মাটির থেকেও তুচ্ছ। তাদের একেকজন পঞ্চাশ বছর জীবন কাটিয়ে দিতেন, অথচ কখনো তাদের জন্য কাপড় গোটানো হতো না, তাদের জন্য পাতিল চড়ানো হতো না। তারা নিজের মাঝে এবং পৃথিবীর মাঝে কোনো জিনিসকে অন্তরায় বানাতেন না। কখনো ঘরে কোনো খাবার তৈরি করতে বলতেন না। যখন রাত হতো, তখন তারা নিজেদের পায়ের ওপর দণ্ডায়মান থেকে সালাত আদায় করতেন। তারা চেহারা এমনভাবে বিছিয়ে রাখতেন যার ফলে অশ্রু গণ্ডদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যেত। তারা নিজেদের মুক্তির জন্য প্রতিপালকের কাছে মিনতিভরে প্রার্থনা করতেন। তারা যখন নেক আমল করতেন তখন তারা তার কৃতজ্ঞতায় অধ্যবসায়ী হতেন। তারা আল্লাহর কাছে চাইতেন, তিনি যেন তা কবুল করে নেন। আর যখন তারা কোনো মন্দ আমল করতেন, তখন তা তাদের বেদনাহত করত। তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, তিনি যেন তা ক্ষমা করে দেন। তারা এ অবস্থার ওপরই এরূপভাবে থাকতেন। আল্লাহর কসম, তারা গোনাহ থেকে সুরক্ষিত ছিলেন না। আর তারা ক্ষমা ছাড়া মুক্তিপ্রাপ্তও ছিলেন না। আর তোমরা সংক্ষিপ্ত মেয়াদে দিনাতিপাত করছ। আর (বান্দার) আমল সুসংরক্ষিত। আল্লাহর কসম, মৃত্যু তোমাদের ঘাড়ের ওপর। আগুন তোমাদের সামনে। সুতরাং তোমরা প্রতিটি দিনে এবং রাতে আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রত্যাশায় থাকো।”
ফিকহের অনেক বাহক ফকীহ নয়
[৪১৫] মানসুর সুলামি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি কুরআন পড়ো, যতক্ষণ তা তোমাকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ করে। যখন তা তোমাকে বারণ করবে না, তখন তুমি তা পাঠই করছ না। ফিকহের অনেক বাহক ফকীহ নয়। যার ইলম তার উপকারে আসেনি, তার অজ্ঞতা তার ক্ষতি করেছে।”
তাকদির অস্বীকার করা কুফরি
[৪১৬] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি তাকদির অস্বীকার করল, সে কুফরি করল।”
তালিবুল ইলমের চিত্র
[৪১৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করত; সে এমনভাবে বাস করত যে, তার বিনয়ে, আদর্শে, জিহ্বায়, চোখে এবং হাতে ইলম অন্বেষণের চিত্র ফুটে উঠত।”
মুমিন এবং মুনাফিকের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য
[৪১৮] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “নিশ্চয়ই মুমিন সুধারণা করে, তাই উত্তম আমল করে। আর নিশ্চয়ই মুনাফিক মন্দ ধারণা করে, ফলে মন্দ আমল করে। আল্লাহ কারও জন্য দুনিয়া বিস্তৃত করে দিলে সে ধোঁকার শিকার হয়। আর পৃথিবী কারও থেকে সরিয়ে রাখা হলে সে তাকিয়ে থাকে।”
শাসক এবং ধনী সম্প্রদায়ের বিশেষ দায়িত্ব
[৪১৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, তুমি তোমার ভাইয়ের চোখে ময়লা দেখতে পাও। আর তুমি নিজের চোখে খুশির আভা ফুটিয়ে রাখো। নিশ্চয়ই কল্যাণের জন্য কিছু লোক রয়েছে আর অকল্যাণের জন্য কিছু লোক রয়েছে। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস ত্যাগ করে, তা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। বান্দাদের মধ্য থেকে আল্লাহর কাছে সেসব বান্দা সবচেয়ে প্রিয়, যারা আল্লাহকে বান্দাদের কাছে প্রিয় করে তোলে এবং মানুষের মধ্যে উপদেশ প্রদানের দায়িত্ব পালন করে। তিনি আরও বলেন, কিয়ামাত দিবসে শাসক এবং ধনীদের একত্র করা হবে। তখন তিনি তাদের বলবেন—তোমরা ছিলে মুসলমানদের শাসক এবং ধনী সম্প্রদায়। তোমাদের কাছেই ছিল আমার দাবি।"
বান্দার কল্যাণের সূচক
[৪২০] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “(আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি যতটুকু জানি, তিনি এটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে সম্পৃক্ত করে বলেছেন) 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান তখন তার অন্তরে সচ্ছলতা সৃষ্টি করেন আর তার সহায়-সম্পদ তার ওপরই গুটিয়ে রাখেন। আর যখন তিনি কোনো বান্দার অকল্যাণ চান তখন তার দু-চোখের মাঝে দারিদ্র্য সৃষ্টি করেন আর তার সহায়-সম্পদ তার ওপর প্রকাশিত রাখেন।"
কোন আমল সর্বোত্তম
[৪২১] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান, মুআবিয়া ইবনু কুররাহ এবং অনুরূপ কয়েকজন একত্র হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করলেন, কোন আমল সর্বোত্তম। মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি তাদের ভিন্নমতের ওপর একত্র হলাম।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদের পর বান্দা রাত্রি জাগরণের চাইতে উত্তম কোনো আমল করেনি।' মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তাকওয়া?' তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, 'তাকওয়া ছাড়া কি ওসব হয়?'"
যিকরের মজলিসে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়
[৪২২] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক সম্প্রদায় আল্লাহর যিকরে রত ছিল। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে তাদের সঙ্গে বসে যায়। সে সময় রহমত অবতীর্ণ হয়। এরপর তা উঠে যায়। ফেরেশতারা বলে, 'হে প্রতিপালক, তাদের মধ্যে তো আপনার অমুক বান্দা রয়েছে!' তখন তিনি (আল্লাহ) বলেন, 'আমার রহমতে তাদের আচ্ছাদিত করে দাও। তারা এমন সম্প্রদায়, যাদের সঙ্গী দুর্ভাগা হয় না।”
পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের পার্থক্য
[৪২৩] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমরা এমন সম্প্রদায়ের মাঝে ছিলাম, যারা নিজেদের জিহ্বাকে সংযত রাখতেন এবং নিজেদের কাগজ ছড়িয়ে দিতেন। এরপর আমরা এমন সম্প্রদায়ের মাঝে অবশিষ্ট রয়ে গেলাম, যারা নিজেদের কাগজকে সঞ্চিত করে এবং নিজেদের জিহ্বা নিয়োজিত রাখে।”
সচ্ছলতা ছাড়া নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা
[৪২৪] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى “আর যে ব্যক্তি কার্পণ্য করেছে এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেছে...।”[৫৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সে যা অবশিষ্ট থাকেনি, তা নিয়ে কার্পণ্য করেছে। আর সচ্ছলতা ছাড়া নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে।”
কয়েকটি আয়াতের তাফসীর
[৪২৫] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا “তিনি ক্ষমাশীল তাদের জন্য, যারা বারবার তার দিকে ফিরে আসে।”[৫৬] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর দিকে অন্তর এবং আমলের মাধ্যমে ফিরে আসে।” يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ “তারা যা দান করেছে, তারা তা দান করে এমতাবস্থায় যে, তাদের অন্তর থাকে ভীত।”[৫৭] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা যে সকল নেক আমল করতেন, তারা সেসব করতেন এই আশঙ্কার সঙ্গে যে, তা তাদের আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি দেবে না।”
وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا “আর যখন মূর্খরা তাদের সম্বোধন করে কিছু বলে, তখন তারা বলে—সালাম।”[৫৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা সহনশীল। যদি তাদের সঙ্গে মূর্খতাসুলভ আচরণ করা হয়, তাহলে তারা মূর্খতাসুলভ আচরণ করে না। এটা তাদের দিনের ঘটনা, যখন তারা জনমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।”
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا “আর যারা রাত যাপন করে নিজেদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সাজদা ও দাঁড়ানো অবস্থায়।”[৫৯] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এটা তাদের রাতের অবস্থা, যখন তারা নিজেদের প্রতিপালকের সঙ্গে একান্ত হয়。”
إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا “নিশ্চয়ই তার শাস্তি হলো বিনাশ।”[৬০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা জানে, প্রত্যেক পক্ষ তার প্রতিপক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে; শুধু জাহান্নামের শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়া।”
সালাত সর্বোত্তম বিষয়
[৪২৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সালাত সর্বোত্তম বিষয়। সুতরাং যে চায়, সে যেন তা স্বল্প করে। আর যে চায়, সে যেন তা অধিক করে।”
তাকওয়া ও পরিশুদ্ধির দুআ
[৪২৭] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে অধিক পরিমাণ এই দুআ করতে শুনেছি,
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
'হে আল্লাহ, আপনি আমার অন্তরে তাকওয়া দান করুন। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনি অন্তরের সর্বোত্তম পরিশুদ্ধকারী। আপনি অন্তরের অভিভাবক এবং তত্ত্বাবধায়ক।”
আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা বলতেন, মুমিনের সর্বোত্তম চরিত্র হলো ক্ষমা।”
মানুষ কীভাবে অহংকার করে?
[৪২৮] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, তুমি কীভাবে অহংকার করো, অথচ তুমি দুবার প্রস্রাবের অঙ্গ থেকে বেরিয়েছ!”
অন্তর মরে যায় ও জীবিত হয়
[৪২৯] উকবা ইবনু খালিদ আবাদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় অন্তর মরে যায় এবং জীবিত হয়। যখন তা মরে যায়, তখন অন্তরকে ফরজ বিধানের ওপর ওঠাও। আর যখন তা জীবিত থাকে, তখন নফল আমলের মাধ্যমে তাকে শিষ্টাচার শেখাও।”
সত্যের পরিণতি
[৪৩০] আবদুল্লাহ ইবনু বাকর মুজানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এই সত্য মানুষকে পরিশ্রান্ত রেখেছে এবং তাদের মাঝে ও তাদের কুপ্রবৃত্তির মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে এই সত্যের শ্রেষ্ঠত্ব জেনেছে এবং তার পরিণাম প্রত্যাশা করেছে, সে-ই এর ওপর ধৈর্যধারণ করেছে। নিশ্চয় মানুষের মাঝে এমন কিছু মানুষ রয়েছে, যারা কুরআন পড়ে এবং অপকর্ম থেকে বিরত থাকে। এই কুরআনের ব্যাপারে সবচেয়ে অধিক হকদার সে, যে আমলের মাধ্যমে তার অনুসরণ করেছে; যদিও সে তা পড়েনি। তুমি মানুষকে একরকম চিনবে, যতক্ষণ তারা স্বস্তি ও নিরাপত্তার ভেতর থাকবে। যখন বিপদ অবতীর্ণ হবে, তখন প্রত্যেক মানুষ তার মূলের দিকে ফিরে যাবে। মুমিন ফিরে যাবে তার ঈমানের দিকে আর মুনাফিক ফিরে যাবে তার নিফাকের দিকে।”
উপহারের বিনিময় প্রদান
[৪৩১] শাবীব ইবনু শাইবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে নয় ঝুড়ি মিষ্টান্ন এবং একটি মুক্তাদানা উপহার দিলো, যার ভেতর দশ হাজার রৌপ্যমুদ্রা ছিল। তিনি দশ হাজার রৌপ্যমুদ্রা ফেরত দিয়ে বললেন, 'আমি এর বিনিময় দেওয়ার সক্ষমতা রাখি না। আর তিনি নয় ঝুড়ি মিষ্টান্ন গ্রহণ করে নিলেন।”
প্রত্যেক মানুষের কর্ম তার ঘাড়ে সংযুক্ত
[৪৩২] আব্বাদ ইবনু রাশিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَكُلُّ إِنْسَانِ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ "আর আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি।"[৬১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অবশ্যই তিনি তোমার ওপর ইনসাফ করেছেন, যিনি তোমার নিজেকে নিজের হিসাব-সংরক্ষক বানিয়েছেন।"
মৃত্যুর মধ্যে প্রশান্তি, শান্তি এবং স্বস্তি
[৪৩৩] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “সাঈদ ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ এভাবে কথা বলতেন, এভাবে দুআ করতেন। তার দুআর শেষে এ প্রার্থনা থাকত,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ لَنَا فِي الْمَوْتِ رَاحَةً وَرَوْحًا وَمُعَافَاةً
'হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জন্য মৃত্যুর মধ্যে প্রশান্তি, শান্তি এবং স্বস্তি রাখুন।"
সমুদ্র জাহান্নামের স্তর
[৪৩৪] সাঈদ ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "সমুদ্র জাহান্নামের স্তর।”
জাহান্নামে এক যুগ সত্তর হাজার বছর
[৪৩৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَابِثِينَ فِيهَا أَحْقَابًا "তারা সেখানে যুগ-যুগান্তর অবস্থান করবে।”[৬২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যুগ-যুগান্তরের ধরাবাঁধা কোনো মেয়াদ নেই জাহান্নামে চিরস্থায়ী হওয়া ছাড়া। তবে তারা বলেছেন, (জাহান্নামে) এক যুগ হলো সত্তর হাজার বছর। আর সেই সত্তর হাজার বছরের প্রতিদিন তোমরা যেসব দিন গণনা করো, তার এক হাজার দিনের সমপরিমাণ।”
তিন শ্রেণির মানুষের সমালোচনা করা যায়
[৪৩৬] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তিন শ্রেণির মানুষ এমন, যাদের (সম্পর্কে মুখ খোলায়) কোনো গীবত নেই। খেয়ানতকারী শাসক; এমন প্রবৃত্তিপূজারি, যে তার প্রবৃত্তির দিকে দাওয়াত দেয়; এবং এমন পাপাচারী, যে তার পাপাচার প্রকাশ্যে করে।”
ইলম ছাড়া আমলের পরিণাম
[৪৩৭] উমার ইবনু আবী সালামা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা এ বিষয়টি অনুসন্ধান করেছি এবং লক্ষ করেছি, আমরা এমন কাউকে পাইনি, যে ইলম ছাড়া আমল করে, ফলে যা সংশোধন করে, তারচেয়ে অধিক নষ্ট করে না।"
বাজারের লোকদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই
[৪৩৮] জুবায়র হানজালি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবু সাঈদ, আপনি সালাত পড়ে নিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'না।' আমি বললাম, 'বাজারবাসীরা তো সালাত পড়ে ফেলেছে।' তিনি বললেন, 'নিশ্চয় বাজারবাসীর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, তাদের একেকজন তার ভাইকে দিরহাম পেতে বাধাগ্রস্ত করে।”
হরে ইনের পরিচয়
[৪৩৯] আব্বাদ ইবনু আমর আবাদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, হুরে ইন কী?' তিনি বললেন, 'তারা হলো এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি...।[৬৩] আল্লাহ তাদের ভিন্ন সৃষ্টি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।' ইয়াজিদ ইবনু মারইয়াম সালুলি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হে আবূ সাঈদ, এটা আপনার কাছে কে বর্ণনা করেছে?' তখন হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ তার জামার আস্তিন সরিয়ে বললেন, 'আমার কাছে এটা বর্ণনা করেছে অমুকের পুত্র অমুক মুহাজির সাহাবি, তমুকের পুত্র তমুক আনসারি সাহাবি...।' এভাবে তিনি পাঁচজন মুহাজির সাহাবি এবং চারজন আনসারি সাহাবি (কিংবা তিনি বলেছেন, চারজন মুহাজির সাহাবি এবং পাঁচজন আনসারি সাহাবি)-এর নাম উল্লেখ করলেন।”
ঘুষ গ্রহণের ক্ষতি
[৪৪০] সুলাইমান ইবনুর রাবি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ঘুষ যখন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, আমানত তখন ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে যায়।”
ফিতনার ভয়াবহতা
[৪৪১] আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবু সাঈদ, আপনি আমাকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করুন, যিনি ইবনুল মুহাল্লাবের ফিতনা প্রত্যক্ষ করেছেন। আর তিনি মুখে সে-জাতীয় কথা উচ্চারণ করলেও তার অন্তর প্রশান্ত ছিল।' তিনি বললেন, 'হে ভাতিজা, কয় হাত উট বধ করেছে?' আমি বললাম, 'এক হাত। সম্প্রদায়ের সবাই কি তাদের সন্তুষ্টি ও সম্মতির কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি?'”
রাতে ক্রন্দনরত এবং দিনে হাস্যোজ্জ্বল
[৪৪২] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কে আমাকে এমন ব্যক্তিকে দেখিয়ে দেবে, যিনি রাতে ক্রন্দনরত এবং দিনে হাস্যোজ্জ্বল?”
মানুষ তার প্রত্যাশিত জিনিসের সন্ধানে রত থাকে
[৪৪৩] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তিনি এবং একজন তাবিয়ি এক জায়গায় বসে আলোচনা করছিলেন। তাদের একজন বললেন, আমি প্রত্যাশা রাখি এবং ভয় করি। অপরজন বলল, যে ব্যক্তি কোনো জিনিসের প্রত্যাশা রাখে, সে তার সন্ধানে রত থাকে। আর যে ব্যক্তি কোনো কিছুকে ভয় করে, সে তা থেকে পলায়ন করে বেড়ায়। আমি মনে করি না যে এমন কোনো মানুষ রয়েছে, যে কোনো জিনিস প্রত্যাশা করে, তবে তা অনুসন্ধান করে না। আর আমি মনে করি না যে এমন কোনো মানুষ রয়েছে, যে কিছুকে ভয় করে, তবে তা থেকে পলায়ন করে না।”
টিকাঃ
[১৮] মূল পাণ্ডুলিপিতে বাক্যটি অসম্পূর্ণই আছে।
[১৯] হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর উপনাম।
[২০] মুসলিম আস সাকাফি
[২১] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[২২] সূরা ইসরা, ১৬:২৫
[২৫] খেজুর এবং ঘিয়ের মিশ্রণে প্রস্তুতকৃত খাবারবিশেষ।
[২৬] বুজুর্গ ব্যক্তিদের পরিধেয় পোশাকবিশেষ।
[২৭] একপ্রকার ঢিলেঢালা পোশাক, যা খতিব সাহেবগণ ঈদ ও জুমআর সালাতের দিন মূল জামার ওপর পরিধান করে থাকেন।
[২৮] সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ১১
[২৯] সূরা তহা, ২০: ৮২
[৩০] বর্ণনার এর পরের অংশ মূল পাণ্ডুলিপিতেই সংরক্ষিত নেই।
[৩১] সূরা বাকারাহ, ২:৮১
[৩২] সূরা নিসা, ৪:১৭
[৩৩] সূরা ইসরা, ১৭:৫৯
[৩৪] যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যাপারে মানুষের পরস্পরের উপদেশ দেওয়ার প্রবণতা।
[৩৫] সূরা নিসা, ৪ : ৫৬
[৩৬] চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ।
[৩৭] যিলকদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম এবং রজব —এই চার মাসকে সম্মানিত মাসসমূহ বলা হয়।
[৩৮] সূরা গাফির, ৪০:৭১
[৩৯] সূরা নিসা, ৪ : ১৪২
[৪০] সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮
[৪১] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬২
[৪২] সূরা মাউন, ১০৭:৬
[৪৩] সূরা ইসরা, ১৭:৫৯
[৪৪] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৪৫] সূরা নাহল, ১৬: ৯৮
[৪৬] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[৪৭] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫: ২
[৪৮] মূল পাণ্ডুলিপিতে বাক্যটা সম্পূর্ণই আছে।
[৪৯] অর্থাৎ জুলুম থেকে বিরত থাকা সদাকা করা থেকে উত্তম।
[৫০] সূরা নাহল, ১৬:৯৭
[৫১] মূল পাণ্ডুলিপিতে বাক্যটা সম্পূর্ণই আছে।
[৫২] সূরা মুমিনুন, ২৩:৬০
[৫৩] সূরা মুজ্জাম্মিল, ৭৩: ১২-১৩
[৫৪] সূরা মুজ্জাম্মিল, ৭৩:১২-১৩
[৫৫] সূরা লাইল, ৯২ : ৮
[৫৬] সূরা ইসরা, ১৭ : ২৫
[৫৭] সূরা মুমিনুন, ২৩: ৬০
[৫৮] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৫৯] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৪
[৬০] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৬১] সূরা ইসরা, ১৭: ১৩
[৬২] সূরা নাবা, ৭৮: ২৩
[৬৩] এর পরের অংশ মূল পাণ্ডুলিপিতেই নেই।
📄 উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
সর্বোত্তম দ্বীনদারি
[৪৮৪] উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ্ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করা হলো, “কীরূপ দ্বীনদারি সর্বোত্তম?” তিনি বলেন,
الْحَنِيفِيَّةُ السَّمْحَةُ
“সরল-সঠিক অনাবশ্যক দ্বীনদারি।”[৬৪]
বিপদের সময় পড়ার দু‘আ
[৪৮৫] আবদুল্লাহ ইবনু জা‘ফর থেকে উমার ইবনু আবদুল আযীয বর্ণনা করেন, “তাঁর (আবদুল্লাহ্র) মা আসমা বিনতে উমাইস বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এমন কিছু কালিমা শিক্ষা দিয়েছেন, যেগুলো আমি বিপদের সময় পড়ে থাকি। তা হলো,
اللهُ رَبِّيْ لَا أُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا
‘আল্লাহ আমার রব, আমি তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করি না।’”[৬৫]
কেবল নিজের মুক্তির চেষ্টায় থাকা গোমরাহি
[৪৮৬] আওযা‘য়ী বলেন, উমার ইবনু আবদুল আযীয বলেছেন, “যখন দেখবে লোকেরা দ্বীনের বিষয়ে সাধারণ মানুষদের বাদ দিয়ে কেবল নিজেরা মুক্তি পাওয়ার চেষ্টায় আছে, তাহলে ধরে নিয়ো তারা গোমরাহিতে আছে।”
তিনি ন্যায়বিচারক হবেন
[৪৪৭] উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, নাফে বলেন, “আমি ইবনু উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বহুবার বলতে শুনেছি—যদি আমি জানতাম যে উমারের বংশের সেই সন্তানটি কে হবে, যার চেহারায় এমন আলামত রয়েছে যে সে ন্যায়বিচারে পুরো পৃথিবী ভরিয়ে ফেলবে!”
আল্লাহর পথে লড়াই করার তামান্না
[৪৪৮] হাকীম ইবনু কাসীর বলেন, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “হায় আমার বাড়ি যদি কাযবীন হতো এবং অবশেষে (সেখানেই) আমার মৃত্যু হতো। অর্থাৎ আল্লাহর পথে লড়াই করে।”
গ্রাম্য লোকদের জমি ফিরিয়ে দিলেন
[৪৪৯] সুলাইমান ইবনু মূসা বলেন, “তিনি জানতে পেরেছেন যে, কিছু গ্রাম্য লোক উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর নিকট বনু মারওয়ানের অন্য কিছু লোকের বিরুদ্ধে একটি জমি নিয়ে মামলা করল। যেটি ছিল সেই গ্রাম্য লোকদের। তারা সেটি চাষাবাদ করেছিল। অতঃপর ওলীদ ইবনু আবদুল মালিক তা ছিনিয়ে নিয়ে তার পরিবারস্থ কিছু লোককে দিয়েছিল। তখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
الْبِلَادُ بِلَادُ اللَّهِ وَالْعِبَادُ عِبَادُ اللَّهِ مَنْ أَحْيَا أَرْضًا مَيِّتَةً فَهِيَ لَهُ 'ভূমিসমূহ আল্লাহর। বান্দারাও আল্লাহর। যে ব্যক্তি কোনো অনাবাদি ভূমি আবাদ করল সেই ভূমি তার হয়ে যাবে।' [৬৬] তারপর তিনি তাদের (গ্রাম্য লোকদের) সেই জমি ফিরিয়ে দিলেন।”
তিনি সাজগোজ পছন্দ করতেন না
[৪৫০] ইবনু শাওযাব বলেন, “একদিন মাহালিবা গোত্রের এক মহিলা উমার ইবনু আবদুল আযীযের স্ত্রী ফাতেমার কাছে এসে যখন তাকে ও তার অবস্থা অবলোকন করলেন তখন তাকে বললেন, 'আপনি তো আমিরুল মুমিনিনের স্ত্রী। আপনি কি তার জন্য সেজেগুজে থাকতে পারেন না?' যখন এই কথাগুলো তাকে অনেক বেশি বলল তখন তিনি বললেন, 'স্ত্রীর তো সে রকম সাজগোজ করেই থাকা উচিত যা তার স্বামী পছন্দ করে, তাই না?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'তিনি আমার থেকে এমনটাই পছন্দ করেন।'
শ্রবণ অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করা
[৪৫১] মুহাম্মাদ ইবনু কাব থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, “যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় যে, তুমি যা শ্রবণ করেছো, সে বিষয়ে অন্যকেউ তোমার থেকে বেশি সৌভাগ্যবান না হয় তবে তুমি তাই করো।”[৬৭]
উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর দুআ
[৪৫২] হুসাইন আল-জুফি বলেন, আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহের (প্রতিদান) বৃদ্ধি করে দিন। এবং অন্যায়কারীকে তাওবা করার সুযোগ দিন। অন্যদের দয়া দ্বারা বেষ্টন করে রাখুন।”
তিনি হেদায়াতের ইমাম ছিলেন
[৪৫৩] আবুল আব্বাস বলেন, “আমি খালিদ ইবনু ইয়াজিদ ইবনু মুআবিয়ার সাথে বাইতুল মুকাদ্দাসের বারান্দায় ছিলাম। তখন একজন যুবক এসে খালিদকে সালাম করল। খালিদ সেই যুবকের দিকে ফিরলে সে তাকে জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের কোনো পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে কি?' আমি খালিদের আগেই উত্তর দিলাম, 'হ্যাঁ, তোমাদের ওপর আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন পর্যবেক্ষণকারী রয়েছে, যে (সবকিছু) শ্রবণ করে ও দেখে।” এটা শুনে যুবকের চক্ষু কোটরাগত হলো। সে তার হাত খালিদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রস্থান করল। আমি খালিদের কাছে জানতে চাইলাম, “সে কে?” তিনি বললেন, সে উমার ইবনু আবদুল আযীয। আমিরুল মুমিনিনের ভাতিজা। যদি তার ও তোমার হায়াত লম্বা হয় তবে তোমরা তাকে হেদায়াতের ইমামরূপে দেখতে পাবে।”
অনেক সময় কথা বলা পাপের কারণ হয়
[৪৫৪] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে তার (অনর্থক) কথা বলাকে পাপের কারণ মনে করে না, তার পাপ বৃদ্ধি পায়।”
মাসজিদের সবাই হেসে দিলো
[৪৫৫] আবদুল্লাহ ইবনু ঈসা বলেন, “আমরা উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তিনি জুমুআর দিন মানুষের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। একজন খ্রিষ্টান তার কাছে দাঁড়িয়ে বলল, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আমি গ্রাম্য লোকদের থেকে আল্লাহর কাছে (নিজেকে) মুক্ত ঘোষণা করছি।' তখন মাসজিদের সবাই হেসে দিলো।”
বর্ণনাকারী বলেন, "আমি যেন এখনো তাকে দেখতে পাচ্ছি।"
মৃত্যুকে সহজ করার দুআ
[৪৫৬] সুফিয়ান ইবনু উআইনা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—হে আল্লাহ, মৃত্যুকে আমার জন্য সহজ করো।”
কেবল নিজের মুক্তি চাওয়া গোমরাহি
[৪৫৭] আওযায়ি জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, যার থেকে তিনি শুনেছেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—যে ব্যক্তিরা দ্বীনের ক্ষেত্রে সবাইকে বাদ দিয়ে কেবল নিজেরা মুক্তি পেতে চায় তারা গোমরাহিতে আছে।”
সিদ্ধ রসুন ও যাইতুন
[৪৫৮] নুআইম ইবনু সালামাহ বলেন, "আমি উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে গিয়ে তাকে দেখতে পেয়েছি, তিনি সিদ্ধ রসুন ও একজাতীয় তৃণ ও যাইতুন খাচ্ছেন।”
কান্নার কারণে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরা
[৪৫৯] আওযায়ি বলেন, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ এত কেঁদেছেন যে, একপর্যায়ে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরেছে।”
নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কাছে টানলেন
[৪৬০] হাসান বলেন, “আমি আইয়ুবের মজলিসে ছিলাম। তিনি একজনকে স্বপ্নে দেখার কথা বললেন। তার নাম নেওয়ার পর সবাই চিনল যে, তিনি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি আবূ বাকর ও উমারের মধ্যখানে বসা ছিলেন। ইত্যবসরে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ আগমন করলে তিনি তাকে ডান দিকে তার ও আবূ বাকরের মাঝে বসার জন্য ইঙ্গিত করলেন। আবূ বাকর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি মনে করি না আপনি আমার ও আপনার মাঝে অন্য কাউকে বসাবেন।' এবার তিনি তাকে উমারের পাশে ইঙ্গিত করলেন। যেন তার ও উমারের মাঝে এসে তিনি বসেন। তখন উমারও আবূ বাকরের মতো বললেন। অবশেষে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে নিজের সামনেই বসালেন।”
তিনি ন্যায়পরায়ণ বিচারক ছিলেন
[৪৬১] মুআয ইবনু ফুদালা বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ জাযিরার গির্জায় একজন পাদরির কাছে অবস্থান করলেন। যেখানে সেই পাদরি বহুকাল কাটিয়েছেন। তার দিকে কিতাবের ইলমকে সম্বন্ধিত করা হতো। সেই পাদরি তার কাছে নেমে আসলেন। এমনটা তাকে আগে কখনো করতে দেখা যায়নি। আবদুল্লাহকে বলা হলো, 'আপনি কি জানেন, কেন তিনি নেমে এসেছেন আপনার কাছে?' তিনি বললেন, 'না।' বলা হলো, আপনার বাবার খাতিরে। আমরা তাকে ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে পেয়েছি। যেমন রজব মাসের সাথে হারাম মাসসমূহের সম্পর্ক।”
বর্ণনাকারী বলেন, “আইয়ুব ইবনু সুআইদ এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন- (হারام মাসসমূহের মধ্যে ধারাবাহিক তিন মাস যিলকদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররম (দ্বারা ইঙ্গিত হলো ধারাবাহিক তিন খলীফা) আবূ বাকর, উমার ও উসমান। আর রজব হলো আলাদা (অর্থাৎ এর দ্বারা ইঙ্গিত হলো উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ)।”
আল্লাহর বিধান প্রয়োগে দেরি করা অপছন্দনীয়
[৪৬২] আওযায়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কর্মকর্তাদের মধ্যে তার সাথে সবচেয়ে বেশি মিল হলো আমর ইবনু উবাইদ ইবনু তালহা আল-আনসারির। তিনি তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত ওমান অঞ্চলের কর্মকর্তা ছিলেন। তার সম্পর্কে জানা যায় যে, একবার ঈশার পর এমন এক ব্যক্তিকে তার কাছে নিয়ে আসা হলো, যার ওপর হদ্দ প্রয়োগ আবশ্যক হয়ে পড়েছিল। তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর বিধান প্রয়োগকে সকাল পর্যন্ত বিলম্ব করাকে অপছন্দ করি। তারপর রাতেই তার ওপর তা প্রয়োগ করেন।"
তিনি বিবাদমুক্ত খলীফা ছিলেন
[৪৬৩] হাবীব ইবনু হিন্দ আসলামি বলেন, “আরাফা অবস্থানকালে সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, '(বিবাদমুক্ত) খলীফা হলেন তিনজন।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'খলীফা কারা?' তিনি বললেন, 'আবূ বাকর, উমার ও উমার।' আমি জানতে চাইলাম, 'আবূ বাকর ও উমারকে তো চিনলাম। কিন্তু আরেকজন উমার কে?' তিনি বললেন, 'যদি তুমি বেঁচে থাকো তবে তার দেখা পাবে। আর যদি মারা যাও তবে তিনি তোমার পরে আসবেন।"
নতুন মুদ্রা তৈরি
[৪৬৪] মুখতার ইবনু ফুলফুল বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর জন্য কিছু মুদ্রা তৈরি করলাম। সেখানে লেখা ছিল-উমার অঙ্গীকার পূর্ণ করার ও ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বললেন, 'এগুলো ভেঙে ফেলে (নতুন করে মুদ্রা তৈরি করে তার মধ্যে) লেখো—আল্লাহ অঙ্গীকার পূর্ণ করার ও ন্যায়পরায়ণতার আদেশ দিয়েছেন।"
বুঝ হবার পর থেকে কখনো মিথ্যা বলেননি
[৪৬৫] ইবনু উআইনা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ ওলীদের সাথে কোনো একটি বিষয় নিয়ে কথা বললে তিনি (ওলীদ) তাকে বললেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ।' তখন উমার তাকে বললেন, 'যখন থেকে আমি জেনেছি মিথ্যা মিথ্যাবাদীর ক্ষতি করে থাকে তখন থেকে কখনো মিথ্যা বলিনি।”
সবার কাছে হক পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা
[৪৬৬] উমার ইবনু যর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সুলাইমানের জানাযা থেকে ফিরে এসে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর আযাদকৃত দাস তাকে জিজ্ঞেস করল, 'কী ব্যাপার, আপনাকে চিন্তিত দেখছি যে!' তিনি বললেন, 'চিন্তিত হবার মতো বিষয়ের কারণেই চিন্তিত হচ্ছি। (কেউ তার প্রয়োজনে) আমার কাছে পত্র লেখা বা আবেদন করার আগেই পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত যত উম্মতে মুহাম্মাদি আছে, সবার কাছে আমি তাদের হক পৌঁছে দিতে চাই।”
গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের জ্ঞানের শেষ স্তর
[৪৬৭] উমার ইবনু উসমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি-কুরআনের ব্যাখ্যায় গভীর জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিরা জ্ঞানের শেষ পর্যায়ে এসে এই কথা বলে: آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِندِ رَبِّنَا 'আমরা এর প্রতি ঈমান রাখি। পুরোটাই আমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে।”[৬৮]
মেহমানকে কাজে না খাটানো
[৪৬৮] রজা ইবনু হায়ওয়া বলেন, "আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ- এর সাথে এক রাত জাগ্রত ছিলাম। বাতির তেল ফুরিয়ে গিয়েছিল। আমি বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি গোলামকে আদেশ করলেই তো পারেন যাতে সে বাতিতে তেল ভরে দেয়!' তিনি জানালেন, 'সে সারা দিন খুব পরিশ্রম করে এইমাত্র ঘুমিয়েছে।' আমি বললাম, তাহলে আমিই উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে আনি?' তিনি বললেন, 'না।' এরপর তিনি নিজেই উঠে গিয়ে বাতিতে তেল ভরে এনে আমাকে বললেন, 'দেখো, আমি যখন উঠে যাই তখনো যেমন উমার ইবনু আবদুল আযীয ছিলাম, ফিরে আসার পরও তেমনই উমার ইবনু আবদুল আযীযই আছি। হে রজা, মেহমানকে কাজে খাটানো মানুষের ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না।'"
ধৈর্য মুমিনের অবলম্বন
[৪৬৯] উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “(সর্বক্ষেত্রে) সন্তুষ্টি অল্পই পাওয়া যায়। তাই ধৈর্যধারণ করাই মুমিনের অবলম্বন।”
সন্তানের প্রতি উপদেশ
[৪৭০] আবদু রব্বিহ ইবনু হিলাল বলেন, “আবদুল মালিক ইবনু আবদুল আযীয তার পিতা বিশ্রাম নিতে গেলে তাকে (অর্থাৎ পিতাকে) বললেন, 'বাবা, আপনি কীভাবে বিশ্রাম নিচ্ছেন, অথচ আপনার ওপর অবিচার দূর করার দায়িত্ব রয়েছে। হতে পারে ঘুমের ভেতরই মৃত্যু আপনাকে এমতাবস্থায় পাকড়াও করে নিল যে, আপনার কাছে আসা বিষয়গুলো আপনি প্রতিকার করে সারতে পারেননি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “সে বিষয়গুলো খুব জোর দিয়ে বলল। দ্বিতীয় দিনও সে এমন কাজ করল। উমার বললেন, 'হে আমার ছেলে, আত্মা হলো আমার বাহন। যদি আমি তার প্রতি দয়াপরবশ না হই, তাহলে সে আমাকে (গন্তব্যে) পৌঁছে দেবে না। হে আমার ছেলে, আল্লাহ তাআলা যদি পুরো কুরআনকে একসাথে অবতীর্ণ করতে চাইতেন, তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এক এক আয়াত করে অবতীর্ণ করেছেন। যাতে তা লোকদের অন্তরে গেঁথে যায়। হে আমার ছেলে, কোনো ক্লান্তিই ফলাফলের দিকে নিয়ে যায় না।"
তিনি অধিক আল্লাহভীরু বান্দা ছিলেন
[৪৭১] উমার ইবনু যর বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয়কারী কাউকে আমি পাইনি।”
এক ইয়াহুদির সতর্কতা
[৪৭২] ওলীদ ইবনু হিশাম বলেন, “এক ইয়াহুদির সাথে আমার সাক্ষাৎ হলে সে জানাল যে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ শীঘ্রই শাসন-দায়িত্ব পাবেন এবং ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করবেন। আমি উমারের সাথে দেখা হলে ইয়াহুদির কথা তাকে জানালাম। উমার খেলাফতের দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই ইয়াহুদির সাথে আমার আবার সাক্ষাৎ হলে সে আমাকে বলল, 'আমি কি তোমাকে জানাইনি যে, তোমার এই সঙ্গী অচিরেই শাসন দায়িত্ব পাবে?' তারপর সে বলল, 'তোমার এই সঙ্গীকে (বিষ) পান করানো হয়েছে। সে যেন এর প্রতিকার করে।' উমারের সাথে আমার সাক্ষাৎ হবার পর তাকে বললাম, 'যে ইয়াহুদির সাথে আমার সাক্ষাৎ হবার পর জানিয়েছিল যে, আপনি অচিরেই শাসনকার্যের দায়িত্ব পাবেন এবং ন্যায়পরায়ণতা রক্ষা করবেন। সে আমাকে জানাল, আপনাকে (বিষ) পান করানো হয়েছে। সে আপনাকে নিজের প্রতিকার করার কথা বলেছে।' তিনি তখন বললেন, 'সে তোমাকে যা জানিয়েছে, সে জন্য আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন। যে সময় আমাকে (বিষ) পান করানো হয়েছে সে সময়ের ব্যাপারে আমি জানি। যদি কানের লতি ধরাটা আমার চিকিৎসা হতো অথবা নাকের কাছে ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য কোনো সুগন্ধি আমাকে দেওয়া হতো, তবুও আমি তা করতাম না।'”[৬৯]
তিনি খাবার ফিরিয়ে দিলেন
[৪৭৩] আবদুল্লাহ বিন আওন আনসারি থেকে বর্ণিত, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ অনারবদের একটি মঠে অবতরণ করলেন। সে মঠের লোক তার কাছে একটা পাত্রে করে প্রথম ফল নিয়ে উপস্থিত হয়ে সেটা তার সামনে রাখল। তার কাছে তখন ওলীদ ইবনু হিশাম ও হুসাইন ইবনু রুস্তম বসা ছিল। ওলীদ ইবনু হিশাম তাকে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন, খানা শুরু করুন এবং তাকে এর দ্বিগুণ মূল্য দিন।' হুসাইন ইবনু রুস্তম বলল, 'এটি খেয়ে নিন হে আমিরুল মুমিনিন। কারণ, আপনার চেয়ে যিনি উত্তম তিনিও তা খেয়েছেন।' তিনি উত্তরে বললেন, 'তোমার ধ্বংস হোক হে ইবনু রুস্তম। তখন তো সেটা হাদিয়া ছিল। আর আজকে এটা ঘুষ।' তারপর তিনি তা খেতে অস্বীকার করে ফিরিয়ে দিলেন।”
প্রকাশ্যে পাপাচারের কারণে সবাই শাস্তি পায়
[৪৭৪] ইসমাঈল ইবনু হাকীম উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছেন, “বিশেষ ব্যক্তিদের পাপের কারণে আল্লাহ তাআলা সাধারণ মানুষদের শাস্তি দেন না। তবে যখন প্রকাশ্যে পাপাচার হতে থাকে তখন তখন সবাই শাস্তিযোগ্য হয়ে যায়।"
তিনি সর্বোত্তম ব্যক্তি ছিলেন
[৪৭৫] হিশাম বলেন, যখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ মারা গেলেন তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “সর্বোত্তম ব্যক্তিটি মারা গেল।”
খলীফা হবার পর বাড়িতে আসতেন না তেমন
[৪৭৬] হিশাম ইবনু হাসসান বলেন, "আবদুল মালিকের কন্যা ফাতিমা রজা ইবনু হায়ওয়া-এর কাছে এই মর্মে সংবাদ পাঠাল যে-আমিরুল মুমিনিন এমন এমন কিছু করছেন, যা ধর্মসম্মত নয় বলেই আমি মনে করি। তিনি জানতে চাইলেন, 'কী সেটা?' তিনি জানালেন, 'তিনি খলীফা হবার পর থেকে (ঠিকঠাক) বাড়িতে আসেন না।' তখন রজা ইবনু হায়ওয়া তার কাছে এসে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি এমন কিছু করছেন, যা ধর্মসম্মত নয় বলেই আমি মনে করি।' এ কথা শুনে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে রজা, কী সেটা?' তিনি বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার পরিবারেরও তো আপনার ওপর কিছু হক রয়েছে।' (এ কথা শুনে) তার চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, 'হে রজা, যার ঘাড়ে মুসলিম ও চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদের এমন দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, যে বিষয়ে কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করবেন-তিনি কী করে প্রফুল্ল থাকতে পারেন!"
নিকৃষ্ট মানুষ সম্পর্কে সংবাদ
[৪৭৭] মুহাম্মাদ ইবনু কাব কুরাযি বলেন, “যখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ খলীফা, তখন আমি মদীনাতে ছিলাম। তিনি আমার কাছে সংবাদ পাঠালেন। আমি তার কাছে উপস্থিত হয়ে এমনভাবে আশ্চর্যজনক দৃষ্টি হেনে তাকাচ্ছিলাম যে, দৃষ্টি সরাতে পারছিলাম না। তিনি জানতে চাইলেন, 'হে ইবনু কাব, তুমি এমনভাবে তাকাচ্ছ! আগে তো কখনো এভাবে তোমাকে তাকাতে দেখিনি!' আমি বললাম, 'আশ্চর্য হয়েছি তো তাই।' তিনি জানতে চাইলেন, 'কিসে তোমাকে আশ্চর্যান্বিত করল?' আমি বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনার (দেহের) রঙের যে অবস্থা হয়েছে আর শরীর যেভাবে ভেঙে পড়েছে এবং চুল যেভাবে পড়ে গেছে, তা দেখে আশ্চর্য হয়েছি।' তিনি বললেন, 'কেমন হতো যদি তুমি আমাকে কবরে রেখে আসার তিন দিন পর দেখতে এমতাবস্থায় যে, আমার চক্ষুগোলক গলে গণ্ডদেশ বেয়ে পড়ছে আর আমার নাকের ছিদ্র পুঁজ ও কীটে মাখামাখি হয়ে আছে। তখন নিশ্চয়ই আমাকে আরও বীভৎস দেখাত! একটা হাদীস শোনাও, যা আমরা ইবনু আব্বাস থেকে মুখস্থ করেছি।' আমি বললাম, 'ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন,
إِنَّ مِنْ أَشْرَفِ الْمَجَالِسِ مَا اسْتُقْبِلَ بِهِ الْقِبْلَةَ وَلَا تُصَلُّوا خَلْفَ نَائِمٍ وَلَا مُتَحَدِّثٍ وَلَا تَشْتَرُوا الْحُرَرَ بِالرِّيَابِ وَاقْتُلُوا الْحَيَّةَ وَالْعَقْرَبَ وَإِنْ كُنْتُمْ فِي صَلَاتِكُمْ، وَمَنْ نَظَرَ فِي كِتَابِ أَخِيهِ بِغَيْرِ إِذْنِهِ فَإِنَّمَا يَنْظُرُ فِي النَّارِ
'সর্বোত্তম মজলিস হলো সেটা, যাতে কেবলার দিকে মুখ করা হয়। তোমরা ঘুমন্ত অথবা আলাপরত ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় কোরো না। (সাধারণ) কাপড়ের বিনিময়ে রেশম ক্রয় কোরো না। সাপ-বিচ্ছুকে হত্যা করো। যদিও সালাতের মধ্যে থাকো। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের লেখার দিকে অনুমতি ছাড়া তাকাল, সে যেন জাহান্নামের দিকেই তাকাল।”[৭০]
তিনি আরও বলেছেন, 'সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ হওয়া যাকে আনন্দিত করে, সে যেন আল্লাহর ওপর ভরসা করে। সবচেয়ে সম্মানিত হওয়া যাকে আনন্দিত করে, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। সবচেয়ে বিত্তশালী হওয়া যাকে আনন্দিত করে, সে যেন আল্লাহ প্রদত্ত রিযককে যথেষ্ট মনে করে।' তারপর তিনি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি কি তোমাদের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যে একাকী অবতরণ করে, ভাগ্যকে অস্বীকার করে (বিনা কারণে) গোলামকে প্রহার করে।' তারপর তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাদের এর চেয়ে আরও নিকৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যে মানুষকে ঘৃণা করে আর মানুষেরাও তাকে ঘৃণা করে।' তারপর তিনি বললেন, 'আমি কি এর চেয়ে আরও নিকৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যে মানুষের ভুল ক্ষমা করে না, নিজের ভুলের কারণে ক্ষমা চায় না এবং অন্যদের ওজর গ্রহণ করে না।' তারপর তিনি বললেন, 'আমি কি তোমাদের এর চেয়ে আরও নিকৃষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে জানাব না?' আমরা বললাম, 'নিশ্চয়ই হে আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন, 'যার অকল্যাণের আশঙ্কা করা হয় এবং কল্যাণের আশা করা হয় না। ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিস সালাম বানী ইসরাঈলের মাঝে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন—হে বানী ইসরাঈল, মূর্খদের সামনে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বোলো না, তাহলে এটা হিকমতের প্রতি অবিচার হবে। আর যে এর যোগ্য তাকে এর থেকে বঞ্চিত কোরো না, তাহলে তাদের প্রতি জুলুম হবে। কোনো জালেমকে তার জুলুমের কারণে শাস্তি দিয়ো না। তাহলে তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব (অর্জনের মাধ্যম) নষ্ট হয়ে যাবে। বিষয়সমূহ তিন ধরনের হতে পারে। এক. এমন বিষয়, যার সঠিকতা তোমার কাছে সুস্পষ্ট। তুমি এর অনুগামী হও। দুই. এমন বিষয়, যার ভ্রষ্টতা তোমার কাছে পরিষ্কার। তুমি এর থেকে দূরে থাকো। তিন. এমন বিষয়, যা নিয়ে মতানৈক্য আছে, তা তুমি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করো।”
কথা ও আমলের অন্তর্গত
[৪৭৮] আলি ইবনু যায়দ জুদআনি থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করবে সে অল্পতে তুষ্ট থাকবে। আর যে ব্যক্তি জানবে যে তার কথা বলাটাও আমলের অন্তর্গত, সে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে (কথা বলা থেকে) বিরত থাকবে।”
কর্মকর্তার কাছে লিখিত পত্র
[৪৭৯] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, "উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ তার কোনো এক কর্মকর্তার কাছে এই মর্মে লিখে পাঠালেন—আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহের অনুসরণ করবে। পরবর্তীকালে বিদআতীরা যেসব বিদআত আবিষ্কার করেছে, (সুন্নাহর পরিবর্তে) সেগুলো পরিহার করবে। জেনে রাখো, কোনো মানুষ যখন কোনো বিদআত চালু করে তখন এর বিপক্ষে অবশ্যই কোনো-না-কোনো দলিল থাকে। সুতরাং সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা তোমাদের কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ চাহে তো তা তোমার রক্ষাকবচ হবে। জেনে রাখো, যে ব্যক্তি এমন রীতিনীতি চালু করল যার বিপরীতে থাকা ভুল, স্খলন, গভীরতা, নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে সে অবগত; তবে (শুনে রাখো) পূর্ববর্তীরা এমন জ্ঞান থেকে বিরত থেকেছেন, ছিদ্রান্বেষী দৃষ্টি দেওয়া থেকে বেঁচে রয়েছেন। যদি তারা আলোচনা করতে চাইতেন তবে এই বিষয়ে তাদের অধিক সক্ষমতা ছিল।”
তিনটি উপদেশ
[৪৮০] ইবনুল আইযার বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ শামে মাটির তৈরি মিম্বরে দাঁড়িয়ে আমাদের সম্মুখে খুতবা দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তার স্তুতি গাইলেন। তারপর তিনটি কথা বললেন :
এক. হে লোকসকল, তোমরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সংশোধন করো, তাহলে তোমাদের প্রকাশ্য বিষয়গুলো সংশোধন হয়ে যাবে।
দুই. পরকালের জন্য আমল করো, দুনিয়া তোমাদের জন্য যথেষ্ট হবে।
তিন. জেনে রাখো, একজন ব্যক্তি—যার ও আদম আলাইহিস সালাম-এর মাঝে কোনো পিতা নেই—মৃত্যু তার জন্য ঘাম বের হওয়ার মতো (কষ্টকর)।”
ফরজ আদায় করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা
[৪৮১] আলি ইবনু আবূ যায়েদা বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ খুনাসিরা নামক স্থানে আমাদের সম্মুখে খুতবা দিতে গিয়ে বলেছিলেন—জেনে রাখো, ইবাদাত হলো ফরজগুলো আদায় করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।”
বর্মের মাধ্যমে শাফাআতের আশা করা
[৪৮২] শুবা ইবনু যিয়াদাহ আল-উমাবি বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে আবদুল্লাহ ইবনু হাসানের একটি বর্ম ধরে ইশারা করে বলতে দেখেছি—আমি কিয়ামতের দিন এর মাধ্যমে শাফাআতের আশা করি।”
পাদরির ভবিষ্যদ্বাণী
[৪৮৩] ওলীদ ইবনু হিশাম বলেন, “আমরা অমুক অমুক জায়গায় অবতরণ করলাম। তখন এক ব্যক্তি বলল, 'আপনি কি শুনছেন না, এই পাদরি কী বলছে? সে বলছে, আমিরুল মুমিনিন সুলাইমান মৃত্যুবরণ করেছেন।' তিনি বললেন, 'তার পরে কে খলীফা হয়েছেন?' সে জানাল, 'উমার ইবনু আবদুল আযীয।' তারপর যখন আমরা শামে এলাম দেখলাম তার কথাই ঠিক হয়েছে। চতুর্থ বছরে আমরা আবার সেই জায়গায় অবতরণ করলাম। তখন সেই ব্যক্তি পাদরির কাছে এসে বলল, 'হে পাদরি, আপনি যেমনটা বলেছেন আমরা তেমনটাই দেখতে পেয়েছি।' সে বলল, 'আল্লাহর শপথ, উমারকে বিষ পান করানো হয়েছে।' আমি উমারের কাছে ফিরে এসে তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, যদি তুমি চাও তবে তোমাকে আমি ঠিক সে সময়ের কথা জানাতে পারব, যখন আমাকে বিষ পান করানো হয়েছে।' আমি বললাম, 'আপনি কি এর প্রতিকার করবেন না?' তিনি বললেন, 'চিকিৎসার জন্য কান ঘষাও আমার অপছন্দ।'
আল্লাহর পছন্দের বিরোধিতা না করা
[৪৮৪] রজা ইবনু আবূ সালামাহ বলেন, “যখন উমার ইবনু আবদুল আযীযের ছেলে আবদুল মালিক মারা গেলেন, তখন তিনি বিভিন্ন শহরে লিখিত নির্দেশ পাঠালেন যাতে তার জন্য বিলাপ করা না হয়। তিনি আরও লেখেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাকে মৃত্যু দিতে পছন্দ করেছেন। আর আমি তার পছন্দের বিরোধিতা করা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।”
দুজন শাসনকর্তাকে ধমক দেওয়া
[৪৮৫] ইবনু শাওযাব বলেন, “সালেহ ইবনু আবদুর রহমান এবং তার একজন সঙ্গীকে উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ ইরাকের কিছু জায়গার শাসনকার্যের দায়িত্ব দিলেন। তখন তারা উমারের কাছে এই মর্মে পত্র লিখল যে, মানুষদের কেবল তরবারিই সংশোধন করতে পারে। তিনি তখন তাদের কাছে ফিরতি পত্রে লেখলেন, তোমরা দুজন নিকৃষ্ট ও অপদার্থ। আমার কাছে মুসলিমদের রক্তকে উপেক্ষা করার কথা বলছ! মানুষদের মধ্যে তোমাদের দুজনের রক্তই আমার কাছে বেশি গুরুত্বহীন।”
তার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দেওয়ার দুআ
[৪৮৬] আবদুল কারীম বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, ‘আল্লাহ আপনাকে ইসলামের পক্ষে উত্তম প্রতিদান দিন।’ তিনি বললেন, ‘বরং আল্লাহ ইসলামকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
নেককারদের সাথে মৃত্যুবরণ করার আকাঙ্ক্ষা
[৪৮৭] তালহা ইবনু ইয়াহইয়া বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বসা ছিলাম। তখন তার নিকট এক ব্যক্তি এসে বলল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, যত দিন আপনার বেঁচে থাকা কল্যাণকর হয় তত দিন আল্লাহ আপনাকে বাঁচিয়ে রাখুন।’ তিনি বললেন, ‘এমনটা আগেও বলা হয়েছে। তুমি বরং বলো, আল্লাহ আপনাকে উত্তম হায়াত দান করুন এবং নেককারদের সাথে মৃত্যু দিন।”
মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ না হওয়ার ইচ্ছা
[৪৮৮] আওযায়ি থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমার জন্য মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ হোক তা আমি চাই না। কারণ, এটিই সর্বশেষ বস্তু, যার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির পাপমোচন করা হয়।”
জুমুআর দিন গোসল করা
[৪৮৯] আওযায়ি থেকে বর্ণিত, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ জুমুআর দিন তার স্ত্রী ও কন্যাদের গোসল করার আদেশ করতেন।”
ইবলীস শয়তানকে অভিসম্পাত
[৪৯০] মুসআব ইবনু আবী আইয়ুব বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-কে মিম্বরের ওপর বলতে শুনেছি—আল্লাহ যদি চাইতেন তার অবাধ্যতা না হোক, তবে তিনি ইবলীস শয়তানকে সৃষ্টি করতেন না। আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করুন।"
নিজেই চেরাগে তেল ভরলেন
[৪৯১] আবদুল আযীয ইবনু উমার বলেন, “আমাকে রজা ইবনু হায়ওয়া বললেন, 'তোমার পিতার থেকে বেশি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানের অধিকারী কাউকে আমি দেখিনি। আমি একবার রাতে তার কাছে ছিলাম। চেরাগ নিভে গেলে তিনি আমাকে বললেন, 'রজা, চেরাগ তো নিভে গেল। ভৃত্য পাশেই ঘুমিয়ে আছে।' আমি বললাম, 'তাকে কি ডাক দেবো?' তিনি বললেন, 'সে তো ঘুমিয়ে গেছে।' আমি বললাম, 'আমি উঠে গিয়ে তা ঠিক করে আনি?' তিনি বললেন, 'মেহমানকে কাজে লাগানো ব্যক্তিত্বের কাতারে পড়ে না।' তারপর তিনি মাথায় পাগড়ি পরে চেরাগের কাছে গিয়ে সলতা বের করলেন এবং বোতল খুলে তার থেকে চেরাগে (তেল) ঢাললেন। তারপর ফিরে এসে বললেন, 'যখন উঠেছিলাম তখনো আমি যেমন উমার ইবনু আবদুল আযীয ছিলাম আর এখন ফিরে আসার পরও আমি উমার ইবনু আবদুল আযীযই রয়ে গেছি।”
তার দৈনিক খরচ ছিল মাত্র দুই দিরহাম
[৪৯২] আমর ইবনু মুহাজির বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর দৈনিক খরচ ছিল মাত্র দুই দিরহাম।”
কথাকে আমলের অন্তর্ভুক্ত মনে করা
[৪৯৩] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার কথাকে আমলের অন্তর্ভুক্ত মনে করে না, তার পাপ বৃদ্ধি পায়।”
সারা রাত কান্নাকাটি করা
[৪৯৪] মুগীরা ইবনু হাকীম বলেন, “আবদুল মালিকের কন্যা ও উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী ফাতেমা বলল, 'হে মুগীরা, আমি জানি মানুষের মাঝে এমন লোক থাকতে পারে, যে উমারের থেকে বেশি সালাত আদায় করে ও সিয়াম পালন করে। তবে উমারের চেয়ে বেশি এমন কাউকে আমি দেখিনি, যে আল্লাহকে প্রচন্ড ভয় করে। কারণ, আমি দেখেছি, তিনি যখনই ঈশার সালাত আদায় করতেন, তখন সাজদার জায়গাতেই অবস্থান করে দুআ করতেন এবং কান্নাকাটি করতেন। অবশেষে একসময় তার চোখ লেগে আসত। তারপর যখন আবার জাগ্রত হতেন তখন দুআ ও কান্নাকাটিতে লিপ্ত হতেন যতক্ষণ না চোখ লেগে আসে। সকাল হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবেই করতে থাকতেন।”
খরচের টাকা থেকে দান করা
[৪৯৫] জিয়াদ ইবনু আবী জিয়াদ বলেন, “ইবনু আইয়াশ ইবনু আবী রবিআ আমাকে উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে কিছু প্রয়োজনে পাঠালেন। আমি তার কাছে এলাম। তখন তার কাছে একজন লেখক লিখছিলেন। তাকে বললাম, 'আসসালামু আলাইকুম।' তিনি বললেন, 'ওয়ালাইকুমুস সালাম।' তারপর আমি থেমে আবার বললাম, 'আসসালামু আলাইকা ইয়া আমিরুল মুমিনিন।' তিনি বললেন, 'হে ইবনু জিয়াদ, তুমি প্রথমবার যেটা বলেছ সেটা আমরা অপছন্দ করিনি।' লেখক তাকে বসরা থেকে আগত কিছু অনাচারের অভিযোগ পড়ে শোনাচ্ছিল। তিনি আমাকে বললেন, 'বসো।' আমি দরজার চৌকাঠের ওপর বসলাম। লেখক তাকে পড়ে পড়ে শোনাচ্ছিলেন আর তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছিলেন। ফারেগ হওয়ার পর ঘরে যারা ছিল সবাইকে তিনি বের করে দিলেন। এমনকি ঘরে যে পরিচারক ছিল তাকেও বের করে দিলেন। তারপর আমার দিকে হেঁটে এসে আমার সামনে বসলেন এবং দুই হাত আমার হাঁটুর ওপর রেখে বললেন, 'হে ইবনু আবী জিয়াদ, তুমি কি তোমার এই মোটা পোশাক দিয়ে উষ্ণতা গ্রহণ করছ? এবং আমরা যে অবস্থায় আছি তা থেকে আরাম নিচ্ছ?' তখন আমার গায়ে একটি মোটা পশমের পোশাক ছিল। তারপর তিনি আমাকে মদীনার ভালো নারী- পুরুষদের খোঁজখবর জিজ্ঞাসা করলেন। তাদের কারও কথাই তিনি বাদ দিলেন না, সবার কথাই জানতে চাইলেন। এমন কিছু বিষয় সম্পর্কেও জানতে চাইলেন, মদীনাতে যার ব্যাপারে তিনি নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। আমি তাকে সেই বিষয়ে অবগত করালাম। তারপর তিনি বললেন, 'হে ইবনু আবী জিয়াদ, দেখছ না আমি কেমন অবস্থায় নিপতিত হয়েছি?' আমি বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আমি আপনার জন্য কল্যাণের আশা রাখি।' তিনি বললেন, 'তা কতই-না সুদূরপরাহত!' তারপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। আমি তাকে বললাম, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি এমন কিছু করছেন যে, আমি আপনার জন্য কল্যাণের প্রত্যাশা রাখি।' তিনি বললেন, 'কতই-না সুদূরপরাহত! আমি বকাঝকা করি কিন্তু আমাকে তো বকাঝকা করা হয় না। আমি মারধর করি কিন্তু আমাকে তো মারধর করা হয় না। আমি কষ্ট দিই কিন্তু আমাকে কষ্ট দেওয়া হয় না।' তারপর তিনি আবার কাঁদলেন। আমি উঠে গেলাম। তিনি নিজের প্রয়োজন সারলেন এবং আমার মনিবের কাছে পত্র লেখলেন তার থেকে আমাকে কিনে নেওয়ার জন্য। তারপর বিছানার নিচ থেকে বিশ স্বর্ণমুদ্রা বের করে বললেন, 'এগুলো দিয়ে (নিজেকে মুক্ত করার ব্যাপারে) সাহায্য নাও। কারণ, যদি ফাইয়ের মালের ক্ষেত্রে তোমার হক থাকত তবে আমি তোমাকে তা দিতাম। কিন্তু তুমি তো দাস।' আমি তা নিতে অস্বীকার করলাম। তিনি বললেন, 'এগুলো আমার খরচের টাকা থেকে।' আমি তা গ্রহণ করা পর্যন্ত তিনি আমার পিছু ছাড়লেন না। তারপর আমার মনিবের কাছে তার থেকে আমাকে কিনে নেওয়ার জন্য পত্র লিখলেন। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। আমাকে এমনিতেই মুক্ত করে দিলেন।"
শান্তির জন্য দুআ
[৪৯৬] আইয়াশ ইবনু উকবা বলেন, “আমি জানতে পেরেছি যে, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বেশি বেশি এটা বলতেন—হে আল্লাহ, শান্তি দাও শান্তি দাও।”
সর্দার নিজেকে নিয়ে বড়াই করে না
[৪৯৭] মালিক থেকে বর্ণিত, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কওমের সর্দার কে?’ সে বলল, ‘আমি।’ তিনি বললেন, ‘যদি তুমি তেমন হতে তবে তা এভাবে বলতে না।”
রাগের মুহূর্তে শাস্তি স্থগিত করা
[৪৯৮] ইবরাহীম ইবনু আবী আবলাহ বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ একবার এক ব্যক্তির ওপর প্রচণ্ড রাগ করলেন। তিনি তার কাছে সংবাদ পাঠালেন। সে এলে তাকে জামা খুলে রশি দিয়ে বাঁধলেন। তারপর একটা চাবুক চেয়ে নিলেন। অবশেষে যখন আমরা বলাবলি শুরু করলাম, তিনি এখনই তাকে প্রহার করবেন তখন তিনি বললেন, ‘তাকে মুক্ত করে দাও। যদি তার অপকর্মের কারণে আমি রাগান্বিত না হতাম তবে কি আর তাকে আনা হতো!’ তারপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন :
وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
‘যারা ক্রোধদমনকারী ও মানুষকে ক্ষমাকারী। এবং আল্লাহ তাআলা সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’”[৭১]
কড়াকড়ির আগে মানুষকে সংশোধন করা
[৪৯৯] মায়মুন ইবনু মিহরান থেকে বর্ণিত, “আবদুল আযীযের পুত্র আবদুল মালিক তাকে বললেন, ‘বাবা, আপনি যে ন্যায়-ইনসাফের ইচ্ছা করেন তা বাস্তবায়নে কিসে আপনাকে বাধা দেয়? আল্লাহর কসম, আমি কোনো ভ্রুক্ষেপ করতাম না। যদিও এই কারণে আপনাকে ও আমাকে নিয়ে (কিছু লোকের ক্রোধের) ডেগ টগবগ করত।’ তিনি বললেন, ‘হে আমার আদরের সন্তান, আমি মানুষের জন্য কষ্টের বাগান তৈরি করছি। আমি ন্যায়-পরিপন্থী কোনো আদেশ জারি করতে চাই না। তবে আমি তাদের দুনিয়ার প্রতি লোভী হওয়া থেকে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত এটাকে বিলম্বিত করছি। নয়তো এটাকে তারা ঘৃণা করবে ও এভাবেই জীবন কাটাবে।”
এক পরিবারের তিনজন উত্তম ব্যক্তি
[৫০০] মায়মুন ইবনু মিহরان বলেন, “আমি উমার ইবনু আবদুল আযীয, তার ছেলে আবদুল মালিক এবং তার আযাদকৃত গোলাম মুযাহিম থেকে উত্তম এক পরিবারের তিনজনকে দেখিনি।"
নিজ সন্তানকে কবরস্থ করার পর প্রার্থনা
[৫০১] ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম ইবনু জিয়াদ ইবনু আবী হাসসান থেকে বর্ণিত, “তিনি উমার ইবনু আবদুল আযীযের কাছে উপস্থিত ছিলেন, যখন তিনি তার ছেলে আবদুল মালিককে দাফন করেছেন। তিনি তাকে কবরস্থ করে তার ওপর মাটি দিয়ে সমান করে দিলেন। লোকেরাও জমিনের সাথে তার কবরকে সমান করে দিলো এবং যাইতুন গাছের দুইটি কাষ্ঠখণ্ড তার কাছে রাখল। একটা মাথার কাছে, অপরটা দুই পায়ের কাছে। তারপর তার কবরকে নিজের ও কেবলার মাঝে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। লোকেরাও তাকে ঘিরে দাঁড়াল। তিনি বললেন, 'হে আমার পুত্র, আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। তুমি তোমার পিতার প্রতি সদাচারী ছিলে। আল্লাহর কসম, তিনি তোমাকে উপহারস্বরূপ দান করার পর আমি তোমার প্রতি সব সময়ই খুশি ছিলাম। আল্লাহর কসম, আমি কখনো তোমার প্রতি কঠোর ছিলাম না। আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। তিনি তোমার পাপরাশি ক্ষমা করুন। তোমার কর্মের উত্তম প্রতিফল দান করুন। প্রত্যেক উপস্থিত ও অনুপস্থিত যারাই তোমার জন্য কল্যাণের সুপারিশ করবে তাদের প্রতিও আল্লাহ রহম করুন। আল্লাহর ফায়সালার প্রতি আমরা সন্তুষ্ট। তার সিদ্ধান্তকে মাথা পেতে নিয়েছি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার।' তারপর তিনি প্রস্থান করলেন।”
অহংকারের আশঙ্কায় বহু কথা পরিহার করা
[৫০২] হুমাইদ থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয বলেছেন, "আমি জাঁকজমক ও অহংকারের আশঙ্কায় বহু কথা পরিহার করেছি।”
পুত্রের প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকা
[৫০৩] যমরা বর্ণনা করেন, "আবদুল মালিক ইবনু উমার ইবনু আবদুল আযীয মারা গেলে হাফস ইবনু উমার তার প্রশংসা করে যা বলার বললেন। তখন মাসলামা তাকে বললেন, 'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনিও কিছু বলুন।' তিনি বললেন, 'না, আমি বলব না।' মাসলামা জানতে চাইলেন, 'কেন আপনি তার প্রশংসা করতে চাচ্ছেন না?' তিনি বললেন, 'আমার আশঙ্কা হয় যে, পিতার চোখে পুত্রের সব ভালো লাগার বিষয়টি আমার ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।”
তার থেকে শিখে আসা
[৫০৪] মুজাহিদ বলেন, “আমরা তাকে শেখাতে গিয়ে নিজেরাই তার থেকে শিখে আসলাম।” অর্থাৎ উমার ইবনু আবদুল আযীযের কথা বললেন তিনি।
খলীফা হবার পর সব ধরনের বিলাসিতা পরিহার
[৫০৫] রজা ইবনু হায়ওয়া বলেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি ব্যবহারকারী, সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরিধানকারী ও সবচেয়ে সুন্দর চলনের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু খলীফা হবার পর লোকেরা তার পোশাককে মাত্র বারো দিরহাম মূল্য নির্ধারণ করল, যা ছিল মিসরি। সেগুলো হলো : টুপি, পাগড়ি, জামা, আলখিল্লা, মোজা এবং চাদর।”
দিরহামের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল না
[৫০৬] হুমাইদ থেকে বর্ণিত, “যখন উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ খলীফা হলেন তখন কেঁদেছেন এবং বলেছেন, ‘হে আবূ কিলাবা, তুমি কি আমার ব্যাপারে আশঙ্কা করো?’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘দিরহামের প্রতি আপনার ভালোবাসা কেমন?’ তিনি বললেন, ‘আমি তা ভালোবাসি না।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে তো ভয়ের কিছুই নেই। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আপনাকে সাহায্য করবেন।’”
ইলম ছাড়া আমল করার পরিণতি
[৫০৭] সুফিয়ান থেকে বর্ণিত, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া আমল করে, সে সংশোধনের চেয়ে বিনষ্ট বেশি করে।”
সালেম ইবনু উমারের কাছে প্রেরণ করা পত্র
[৫০৮] জাফর ইবনু বুরকান বলেছেন, “উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ সালেম ইবনু উমারের কাছে পত্র লিখেলেন—পরসমাচার হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমাকে এই কাজের (খেলাফতের দায়িত্ব) মাধ্যমে যে পরীক্ষায় ফেলার, সে পরীক্ষায় ফেলেছেন, কোনোরূপ পরামর্শ বা আবেদন করা ছাড়াই। কিন্তু আল্লাহ যা চূড়ান্ত করেন, তা-ই হয়। সুতরাং যে আল্লাহ আমাকে এই পরীক্ষায় ফেললেন তার কাছে আমি প্রার্থনা করছি, যেন তিনি আমাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করেন। তোমার কাছে আমার এই পত্র পৌঁছলে তুমি উমার ইবনু খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর চিঠিপত্র, সিদ্ধান্তাবলি এবং মুসলিম রাষ্ট্রের চুক্তিবদ্ধ ও যিম্মি নাগরিকদের ব্যাপারে তার কর্মপন্থা আমার কাছে প্রেরণ করবে। কারণ, আমি তার পদাঙ্ক অনুসরণ করব ও তার দেখানো পথে চলব। যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে সাহায্য করেন। ওয়াসসালাম।
তখন সালেম তার কাছে লেখলেন—আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। আপনি বলেছেন, কোনো পরামর্শ বা আপনার পক্ষ থেকে কোনো আবেদন ব্যতিরেকে আল্লাহ আপনাকে এই কাজে (শাসনভারের) যে পরীক্ষায় ফেলার, সে পরীক্ষায় ফেলেছেন। আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা-ই হয়েছে। সুতরাং যে আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষায় ফেলেছেন তার কাছে আমি প্রার্থনা করি, তিনি যেন এই ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করেন। কারণ, আপনি উমারের যুগে নন। আর আপনার কাছে উমারের ব্যক্তিবর্গও (যারা তাকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিত) নেই। সুতরাং যদি আপনি হকের অভিলাষী হন, তাহলে আল্লাহ তাআলা আপনাকে সাহায্য করবেন। আপনার জন্য বিভিন্ন কর্মচারীর ব্যবস্থা করে দেবেন। এবং তাদের মাধ্যমে এমন বিষয় দান করবেন, যা আপনার কল্পনাতেও ছিল না। কারণ, আল্লাহর সাহায্য নিয়ত অনুসারে হয়ে থাকে। কল্যাণের কাজে যার নিয়ত পরিপূর্ণ হয়ে থাকে, সে আল্লাহর পরিপূর্ণ সাহায্য পেয়ে থাকে। আর যার নিয়ত অপূর্ণাঙ্গ থাকে তার অপূর্ণাঙ্গতা অনুপাতে সাহায্যেও হ্রাস ঘটে। ওয়াসসালাম।”
দ্বীনকে ঝগড়া-বিবাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষতি
[৫০৯] ইউনুস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমাকে জানানো হয়েছে যে, উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দ্বীনকে ঝগড়া-বিবাদের লক্ষ্যবস্তু বানায়, তার (দ্বীন থেকে) সরে যাওয়ার (আশঙ্কা) বৃদ্ধি পায়।”
তার মৃত্যুতে আকাশও কেঁদেছে
[৫১০] খালেদ রবঈ বলেন, “তাওরাত বা অন্য কোনো কিতাবে আছে, আকাশ চল্লিশ বছর উমার ইবনু আবদুল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর জন্য দুঃখের কাঁদা কেঁদেছে।”
টিকাঃ
[৬৪] সনদ সহীহ : আল-আদাবুল মুফরাদ : ৩৯৭; মুসনাদ আহমাদ : ২৩০৮
[৬৫] সনদ সহীহ : আবূ দাউদ : ১৫২৫; ইবনু মাজাহ : ৩৮৮২
[৬৬] সনদ যঈফ। যঈফুল জামি: ২৩৮১
[৬৭] অর্থাৎ, তুমি যা শ্রবণ করেছো সে অনুযায়ী আমল করো। এমন যেন না হয় যে, তুমি শুনলে কিন্তু আমল করলে না। ফলে অন্যরা তা আমল করার মাধ্যমে তোমার থেকে বেশি সৌভাগ্যবান হয়ে গেলো। -অনুবাদক
[৬৮] সূরা আল ইমরান, ০৩: ৭
[৬৯] কারণ তিনি বলেছেন, "আমার জন্য মৃত্যুযন্ত্রণা সহজ হোক তা আমি চাই না। কারণ, এটিই সর্বশেষ বস্তু, যার মাধ্যমে মুসলিম ব্যক্তির পাপমোচন করা হয়।" (হাদীস: ৪৮৮)
[৭০] সনদ যঈফ। 'সর্বোত্তম মজলিস হলো সেটা, যাতে কেবলার দিকে মুখ করা হয়'-এই অংশটুকু তাবারানির, এতে একজন মাতরূক রাবী আছেন। (আল-মাজমা: ৮/৫৯) 'তোমরা ঘুমন্ত অথবা আলাপরত ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় কোরো না।' এই অংশটুকু বর্ণিত আছে যেসব গ্রন্থে তার কয়েকটি হলো, আবূ দাউদ: ৬৯৪, সহীহুল জামি: ৭৩৪৯; ইরওয়াউল গলীল: ৩৭৫
[৭১] সূরা আল ইমরান, ৩ : ১৩৪
📄 আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
এক সময় মানুষ কুরআন বিমুখ হয়ে যাবে
[৫১১] জাফর থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এমন একটা সময় আসবে যখন মানুষের অন্তর কুরআন থেকে বিমুখ হয়ে যাবে। তারা কুরআনের মিষ্টতা ও স্বাদ পাবে না। তারা তাদের প্রতি আদিষ্ট বিষয়ে অলসতা প্রদর্শন করার সময় বলবে—নিশ্চয়ই আল্লাহ অসীম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। আর নিষিদ্ধ কাজ করার সময় বলবে—আমরা তো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করিনি। তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। তাদের ব্যাপারটা পুরোই লোকদেখানো। সেখানে সত্যের লেশমাত্র নেই। তারা নেকড়ে-অন্তরের ওপর বকরির চামড়া চড়িয়ে থাকে। (অর্থাৎ প্রকৃত সত্যকে ঢেকে রাখে। প্রকাশ হতে দেয় না।) তাদের মধ্যে তোষামোদকারী ব্যক্তিকে দ্বীনদারিতে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ (মনে করা হবে)।"
বাড়তি আয়োজন করতে তিনি নিষেধ করলেন
[৫১২] শুআইব ইবনু হাজ্জাব বলেন, “একদিন আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ আমাদের ঘরে আমাদের কাছে আসলেন। তখন আমরা কিছুটা বাড়তি আয়োজন করতে চাইলে তিনি বললেন, 'আমাকে ঘরে থাকা খাবারই দাও। বাড়তি আয়োজন কোরো না।”
সাওম পালনকারী ব্যক্তি ইবাদাতের ভেতর থাকে
[৫১৩] হিশাব ইবনু হাফসা থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সাওম পালনকারী ব্যক্তি ইবাদাতের ভেতর থাকে, যতক্ষণ না সে গীবতে লিপ্ত হয়। যদিও সে আপন বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে।”
ঘরের লোকেরাই ঘরের অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত
[৫১৪] শুআইব থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি কোনো কওমের কাছে যাবার পর যখন তারা তোমার দিকে কিছু এগিয়ে দেয়, তখন ঠিক সেখানেই বসো যেখানে তোমার জন্য বালিশ বিছানো হয়েছে। কারণ, ঘরের লোকেরাই তাদের ঘরের অবস্থা সম্পর্কে অধিক অবগত।”
ইবাদাতে মগ্ন থাকার নাসীহাত
[৫১৫] রবী থেকে বর্ণিত, আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইবাদাতে মগ্ন থাকো এবং যে ইবাদাতে মগ্ন থাকে, তাকে ভালোবাসো। আর পাপাচার থেকে দূরে থাকো এবং যে পাপাচারে লিপ্ত হয়, তার বিরুদ্ধাচরণ করো। আল্লাহ যদি চান তবে পাপীদের শাস্তি দেবেন। অথবা চাইলে তিনি তাদের ক্ষমাও করে দিতে পারেন।”
কুরআন শিখে তা তিলাওয়াত না করা অপরাধ
[৫১৬] আবূ খালদাহ আবুল আলিয়া রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “আমরা যে পাপকে সবচেয়ে মারাত্মক মনে করতাম তা হলো, কোনো ব্যক্তির কুরআন শিখে তা তিলাওয়াত না করে ঘুমিয়ে থাকা।”
[৫১৭] খালিদ ইবনু দীনার বলেন, “আমি আবুল আলিয়াকে বলতে শুনেছি— কুরআন শিক্ষা করে তা তিলাওয়াত না ঘুমিয়ে থাকা এবং একপর্যায়ে তা ভুলে যাওয়াকে আমরা সবচেয়ে জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য করতাম।”