📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 মুতারাফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 মুতারাফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা
[৯৫] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি-যদি আমার কাছে আমার মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে কোনো আগমনকারী আগমন করে এ দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটিকে পছন্দ করার স্বাধীনতা দেয় যে, আমি জান্নাতি অথবা জাহান্নামিদের একজন হব কিংবা মৃত্তিকায় পরিণত হব, তাহলে আমি মৃত্তিকায় পরিণত হওয়াকে গ্রহণ করব।”

জাহান্নামের ভয়
[৯৬] মু'আল্লা ইবনু জিয়াদ আল-ফিরদাউসি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাই তার কাছে ছিল। তখন তারা জান্নাতের আলোচনায় বিভোর হয়ে গেল। মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ তখন বললেন, “আমি জানি না, তোমরা এ অবস্থায় কী বলবে! আমার মধ্যে ও জান্নাতের মধ্যে জাহান্নামের স্মরণ অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

অফুরন্ত নিআমাতের সন্ধান
[৯৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “মৃত্যু নিআমাতপ্রাপ্তদের ওপর তাদের নিআমাত নষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং তোমরা এমন নিআমাতের অনুসন্ধান করো, যার ওপর কখনো মৃত্যু আসবে না।”
তিনি আরও বলতেন, “আল্লাহর কসম, যদি আমাদের এই মজলিস আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য পূর্বে যে কিতাব বরাদ্দ রেখেছেন তাতে লিপিবদ্ধ থেকে থাকে, তাহলে আমাদের জন্য পূর্বে কৃত ফায়সালা কতই-না উত্তম! যদি আল্লাহ আমাদের জন্য যা বণ্টন করে রেখেছেন তার অংশ হিসেবে এটা আমাদের দিয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের জন্য কতই-না উত্তম বণ্টন তিনি করে রেখেছেন!”

বিশুদ্ধতা অর্জনের উপায়
[৯৮] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "অন্তরের বিশুদ্ধতা অর্জিত হয় আমলের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে, আর আমলের বিশুদ্ধতা অর্জিত হয় নিয়তের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে।"

আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা
[৯৯] গাইলان ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি মুতাররিফকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'মহান আল্লাহর জন্য যারা পরস্পরকে ভালোবাসে তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো সে, যে সর্বাধিক ভালোবাসে।' তিনি বলেন, 'আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে এটা উল্লেখ করলাম। তিনি (হাসান রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, সত্য বলেছেন।”

ঈমান আশা এবং ভীতির মাঝামাঝি
[১০০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যদি মুমিনের প্রত্যাশা ও ভীতিকে ওজন করা হয়, তাহলে একটি অপরটির ওপর প্রাধান্য পাবে না (অর্থাৎ দুটোই সমান সমান হবে)।”

উদাসীনভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা নিষ্ফল
[১০১] জারিরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, 'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।' তখন তিনি বললেন, 'সম্ভবত তুমি তা করছ না।”

ভেতরের চিত্র ও বাহিরের চিত্র অভিন্ন হওয়া
[১০২] আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন বান্দার গোপন এবং প্রকাশ্য অবস্থা সমান সমান হয়ে যায় তখন আল্লাহ বলেন, এ হলো আমার প্রকৃত বান্দা।”

জাহান্নামের ভয়ে জান্নাতের স্মরণ বিস্মৃত হয়ে যাওয়া
[১০৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দরজায় বসা ছিলাম। তখন মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, 'আমার মধ্যে এবং আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করার মধ্যে—জাহান্নামের ভয় (অথবা তিনি বলেছেন স্মরণ) অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “সেখানে উতবা নামীয় মদীনার একজন লোক ছিল। সে তখন বলল, 'আল্লাহ তার বান্দাদের থেকে এটা চান না।”

আল্লাহর ভয়
[১০৪] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যদি আল্লাহ আমাদের তার ভীতির দ্বারা মেরে ফেলতে চাইতেন, তাহলে আমরা এর সর্বাধিক উপযুক্ত ছিলাম। আমি জানি, আমার মহান রব এ ছাড়াই আমার ওপর সন্তুষ্ট।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি নকশাওয়ালা রেশমি চাদর পরিধান করতেন এবং ঘোড়ায় আরোহণ করতেন। এরপর আমি যখন তার অভিমুখী হতাম, তখন চোখের শীতলতারই অভিমুখী হতাম।”

সবচেয়ে কল্যাণকর গুণ
[১০৫] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি এমন গুণের সন্ধান করলাম, যার পুরোটাই হবে কল্যাণ, যাতে অকল্যাণের কোনো ছোঁয়াই থাকে না। অবশেষে আমি তা পেলাম, (সে গুণটি হলো)—বান্দা স্বস্তি পেয়ে রবের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।”

আল্লাহর ব্যাপারে বান্দা নিরেট নির্বোধ
[১০৬] সুলাইমান ইবনুল মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে নিজের এবং মহান রবের মধ্যকার বিষয়ে নির্বোধ নয়। তবে কতক নির্বোধ কতকের থেকে নিম্নস্তরের।”

মানুষের সুধারণার সময় আল্লাহর দিকে অভিমুখী হওয়া
[১০৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একদিন আমি মাজউরের সঙ্গে চলছিলাম। এমন সময় একজন লোক বলল, 'এই হলো দুজন জান্নাতি লোক।' তখন মাজউর তার দিকে তাকালেন। সে সময় তার চেহারায় বিতৃষ্ণা দেখা গেল। এরপর তিনি আকাশের দিকে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জানেন এবং সে আমাদের জানে না। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জানেন এবং সে আমাদের জানে না।”

সন্তুষ্টি ও ক্ষমাপ্রার্থনা
[১০৮] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এক মজলিসে ছিলাম। তাতে মুতাররিফ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ, সাঈদ ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ এবং অমুক অমুক ছিলেন। তখন সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।' তখন মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট না হন, তাহলে অন্তত আমাদের ক্ষমা করুন।”

কৃতজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল বান্দা
[১০৯] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনিশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হলো কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দা; যখন সে পরীক্ষার সম্মুখীন হয় তখন সে ধৈর্যধারণ করে আর যখন সে নিআমাতপ্রাপ্ত হয় তখন সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”

ইলমের আধিক্য ইবাদাতের আধিক্য থেকে উত্তম
[১১০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “আল্লাহর কাছে ইবাদাতের আধিক্য থেকে ইলমের আধিক্য অধিক পছন্দনীয়। আর তোমাদের দ্বীনদারির মধ্যে তাকওয়া হলো সর্বোৎকৃষ্ট।”

হারাম থেকে বেঁচে থাকা সর্বোত্তম আমল
[১১১] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'তুমি এমন দু-ব্যক্তির দেখা পাবে, যাদের একজন সালাত, সাওম এবং সদাকা অত্যধিক পরিমাণে করে; অথচ অপরজন (যে তার থেকে কম দান-সদাকা-সালাত-সাওম আদায় করে) তার থেকে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।' তাকে বলা হলো, 'এটা কীভাবে?' তিনি বললেন, 'অপর ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে হারাম থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে অগ্রগামী।”

মানুষের সামান্যতম ক্ষতির কারণও না হওয়া
[১১২] হাম্মাদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তিকে দেখলেন, যে দেয়াল থেকে একমুষ্টি মাটি নিয়েছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি মনে করো না যে, যারা-ই এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের প্রত্যেকেই যদি একমুষ্টি করে মাটি নিয়ে যায়, তাহলে কওমের দেয়ালই বিলীন হয়ে যাবে?”

ইবাদাতের আগে ইলম অর্জন করা জরুরি
[১১৩] জাফর ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা ফিকহ অর্জন করো এবং ইবাদাত করা শেখো, এরপর (বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে) ফিরে যাও।”

প্রকৃত নিআমাত
[১১৪] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এই মৃত্যু মানুষের নিআমাতকে নষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং তোমরা এমন নিআমাতের সন্ধান করো, যাতে মৃত্যু নেই।”

মানুষের প্রশংসা শুনে অস্থিরতা
[১১৫] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি যখন এমন কোনো মজলিসের পাশে গিয়েছি, যেখানে কাউকে আমার প্রশংসা করতে শুনেছি, তা-ই আমার ভেতরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।”

ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য
[১১৬] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলার বাণী :
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
'নিশ্চয়ই তাতে পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।'”[৭]
তিনি বলেন, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তি কত উত্তম বান্দা! সে যখন নিআমাতপ্রাপ্ত হয় তখন কৃতজ্ঞতা আদায় করে আর যখন পরীক্ষায় আক্রান্ত হয় তখন ধৈর্যধারণ করে।”

অনুতপ্ত বান্দা আত্মতৃপ্ত বান্দা থেকে উত্তম
[১১৭] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ঘুমন্ত অবস্থায় রাত যাপন করে অনুতপ্ত অবস্থায় সকালে জাগ্রত হওয়া আমার নিকট রাতভর ইবাদাত করে আত্মতৃপ্ত হয়ে ভোর করার থেকে অধিক পছন্দনীয়।”

আখিরাতের ফায়সালা জানার চাইতে শুষ্ক ছাইয়ে পরিণত হওয়াও অধিক পছন্দনীয়
[১১৮] ইসহাক ইবনু সুয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “যদি আমি জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে অবস্থান করতাম এবং আমাকে ডেকে বলা হতো, হে মুতাররিফ, তুমি কি খুশি হবে যে, আমি তোমাকে অবগত করাব জান্নাত বা জাহান্নামের কোনটিতে তোমার অবস্থান হবে? তাহলে আমার অবস্থানস্থল জানার চাইতে শুষ্ক ছাইয়ে পরিণত হওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় হতো।”

সকল কল্যাণের সমন্বয়ক
[১১৯] ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি অনেক চিন্তা করলাম, সকল কল্যাণের সমন্বয়ক কী। তখন দেখলাম, কল্যাণ হলো অধিক পরিমাণ সালাত এবং সিয়াম; অথচ তা হলো আল্লাহর হাতে। আর যা কিছু আল্লাহর হাতে, তার ব্যাপারে তুমি সক্ষম নও; তবে তুমি তার কাছে চাইতে পারো। তখন তিনি তোমাকে তা দেবেন। এরপর লক্ষ করলাম, কল্যাণের সমন্বয়ক হলো দুআ।”

দুআর আদব
[১২০] ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ এ কথা বলা অপছন্দ করতেন—হে আল্লাহ, আমাকে আপনি আপনার স্মরণ থেকে বিমুখ করবেন না এবং আমাকে আপনার কৌশল থেকে নির্ভয় করবেন না। তবে তিনি বলতেন—হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার স্মরণ থেকে বিমুখ করবেন না আর আমি আপনার কাছে আপনার কৌশলের ব্যাপারে নির্ভয় হওয়া থেকে পানাহ চাই, যতক্ষণ না আপনি আমাকে নির্ভয় বানান।”

ওজর এবং তিরস্কারের মাত্রা
[১২১] ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অধিক ওজর পেশকারীরা পাপাচারী। আর অধিক তিরস্কারকারীরা ক্রোধের শিকার।”

ঘরের আসবাবপত্রের তাসবিহ পাঠ
[১২২] সুলাইমান ইবনুল মুগিরাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন তার সাথে তার ঘরের আসবাবপত্র তাসবিহ পাঠ করত।"

একাকী থাকার চাইতে সৎ সঙ্গী উত্তম
[১২৩] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একাকিত্ব থেকে সৎ সঙ্গী উত্তম আর অসৎ সঙ্গীর থেকে একাকিত্ব উত্তম।”

চাবুকের প্রান্ত জ্বলে ওঠা
[১২৪] সাফিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর গোলাম- যে তার সঙ্গে থাকত—এর থেকে শুনেছি, সে বলেছে, ‘আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে এক অন্ধকার রাতে আসছিলাম। তখন গোলাম তাকে বলল, আমরা তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তখন তার চাবুকের প্রান্তে প্রদীপের মতো আলো জ্বলে উঠল।”

দুনিয়ার অদ্ভুত চিত্র
[১২৫] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা বিস্মিত হও তাদের ব্যাপারে, যারা ধ্বংস হয়েছে। আর আমি বিস্মিত হই তাদের ব্যাপারে, যারা মুক্তি পেয়েছে। নিশ্চয়ই আদম-সন্তান হলো প্রথম শ্লেষ্মা, যার থেকে সকল দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে। আর দুনিয়াকে প্রবৃত্তির চাহিদা বানানো হয়েছে। আর অন্তরের কাছে উপস্থিত করা হয়েছে কৃপণতা এবং তাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে সুখ-দুঃখের দ্বারা। যদি সুখ আসে, তাহলে তা হয় বিপদ। আর যদি দুর্যোগ আসে, তাহলে তা-ও হয় পরীক্ষা। তার জন্য এমন শত্রু নির্ধারণ করা হয়, যে তাকে এমন স্থান থেকে প্রত্যক্ষ করে, যেখান থেকে সে তাকে প্রত্যক্ষ করে না।”
এরপর তিনি সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে আগমন করে বলেন, “আল্লাহর কসম, যদি তোমাদের কেউ শিকারের সন্ধানে এমন স্থান থেকে শিকারকে পর্যবেক্ষণ করে, যেখান থেকে শিকার তাকে দেখতে পায় না, তাহলে অবস্থা এই হবে যে, সে শিগগিরই তা ধরে ফেলবে।”

আল্লাহ যার দায়িত্ব ছেড়ে দেন সে ধ্বংস হবে
[১২৬] গাইলান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মানুষকে পেয়েছি আল্লাহর মাঝে এবং শয়তানের মাঝে নিক্ষিপ্ত। আল্লাহ যদি তার মধ্যে কল্যাণ দেখতে পান, তাহলে নিজের দিকে টেনে নেন। আর যদি তিনি তার মধ্যে কল্যাণ দেখতে না পান, তাহলে তাকে তার প্রবৃত্তির দিকেই ন্যস্ত করে দেন। আর তিনি যাকে প্রবৃত্তির দিকে ন্যস্ত করেন, সে تو ধ্বংস হয়ে যাবে।”

দ্বীনি ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা
[১২৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার নিকট আমার ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে অধিক পছন্দনীয়। আমার পরিবার আমাকে বলে, হে বাবা, হে বাবা। আর আমার ভাইয়েরা আমার জন্য আল্লাহর কাছে এমন দুআ করে, যাতে আমি কল্যাণের প্রত্যাশা রাখি।”

দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ
[১২৮] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, বিপদে পতিত হয়ে সবর করা অপেক্ষা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।”
মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি কৃতজ্ঞতা এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করলাম। তখন বুঝতে পারলাম এ দুয়ের মধ্যেই দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ নিহিত।”

অন্যদের প্রতি মন্দ ধারণার ক্ষেত্রে সতর্কতা
[১২৯] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মন্দ ধারণার মাধ্যমে তোমরা মানুষদের থেকে প্রহরা লাভ করো।"

পরকালের ফলাফল জানার সহজ পন্থা
[১৩০] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, আল্লাহর কাছে তার জন্য কী (প্রতিদান) রয়েছে, সে যেন এর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তার কাছে আল্লাহর জন্য কী রয়েছে। (অর্থাৎ আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করার মতো কী কী নেক আমল করেছে)।”

আল্লাহর কাছে আশ্রয়প্রার্থনা
[১৩১] আমর ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি শাসকের অনিষ্ট থেকে এবং তাদের কলমের ফায়সালা থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি আপনার আনুগত্য-যাতে রয়েছে আপনার সন্তুষ্টি-এর ব্যাপারে এমন কোনো কথা বলা থেকে, যা দ্বারা আমি আপনার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছু সন্ধান করি। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি এমন কিছু রেখে যাওয়া থেকে, যা আমাকে আপনার কাছে লজ্জিত করবে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি—আপনি আমাকে যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন তার মাধ্যমে অন্য কেউ আমার চাইতে অধিক সৌভাগ্যবান হওয়া থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় হওয়া থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার ওপর আপতিত কোনো বিপদের কারণে আপনার অবাধ্যতার জন্য প্রার্থনা করা থেকে।"

কৃতজ্ঞতা সবরের থেকেও উত্তম
[১৩২] মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাই আবুল আলা মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আমার নিকট বিপদ থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞ হওয়া, বিপদে আক্রান্ত হয়ে সবর করার চেয়েও অধিক পছন্দনীয়। ঘুমিয়ে রাত যাপন করে অনুতপ্ত হয়ে ভোরে জাগ্রত হওয়া, সারা রাত ইবাদাতে কাটিয়ে আত্মতৃপ্ত হয়ে ভোর করার চেয়েও অধিক পছন্দনীয়।”

সবচেয়ে মন্দ আকাঙ্ক্ষা
[১৩৩] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "সবচেয়ে মন্দ আকাঙ্ক্ষা হলো, দুনিয়ার জন্য আখিরাতের আমল করা।”

মৃত্যুর আগে মৃত্যুর প্রস্তুতি
[১৩৪] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর এক ছেলে অবহিত করেছে, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ তার নিজের জন্য বাড়ির ভেতর একটি কবর খুঁড়ে রেখেছিলেন। সেখানে তাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো, তিনি সেখানে কুরআন পাঠ করতেন। এরপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, তাকে সেখানে দাফন করা হয়েছে। আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করুন।”

হারাম থেকে বেঁচে থাকার ফযীলত
[১৩৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন—তুমি এমন দু-ব্যক্তির দেখা পাবে, যাদের একজন সালাত সাওম ও সদাকা অত্যধিক পরিমাণে করেছে; অথচ অপরজন আল্লাহর নিকট মর্যাদায় তার থেকে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ। তারা বললেন, 'হে আবূ বাসার, এটা কীভাবে?' তিনি বললেন, 'অপর ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে হারাম থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে অনেক বেশি অগ্রগামী।'

আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না
[১৩৬] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এখানে কিছু লোক রয়েছে, যারা ধারণা করে—তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যদি চায় তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, যদি তারা জাহান্নামে প্রবেশ করে।” এরপর মুতাররিফ আল্লাহর নামে তিনবার কসম করে বললেন, “কোনো বান্দা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে নিজ ইচ্ছায় জান্নাতে প্রবেশ করাতে চাইবেন।”

বস্তুত আল্লাহই আলো দেন
[১৩৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আদম-সন্তানের দৃষ্টান্ত হলো এই পাথরের মতো; যদি কোনো কিছু দ্বারা তা নাড়ানো হয়, তাহলে তা নড়ে ওঠে। নিশ্চয়ই তা জমিনে নিক্ষিপ্ত একটি পাথর মাত্র।' এরপর তিনি পাঠ করলেন:
وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ
'বস্তুত আল্লাহ যাকে আলো দেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।” [৮]

বিনয়ের প্রকৃষ্ট নমুনা
[১৩৮] আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান ইবনু আবিল হাসান ও মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ উমার ইবনু আবদিল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে চিঠি লিখলেন। তাদের একজন লিখলেন—হামদ ও সালাতের পর। আপনি এমনভাবে জীবনযাপন করুন যেন আপনি দুনিয়ায় নেই, আপনি আখিরাতের একজন অধিবাসী হয়ে আছেন। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর অপরজন লিখলেন—হামদ ও সালাতের পর। আপনি এমনভাবে জীবনযাপন করুন যাদের ব্যাপারে মৃত্যুর ফায়সালা লেখা হয়েছে, তাদের সর্বশেষ ব্যক্তিও যেন মৃত্যুবরণ করেছে। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
বর্ণনাকারী বলেন, “মুতাররিফ ও তার এক সঙ্গী মাওকিফে গেলেন। তখন তাদের একজন বললেন, 'এটা কত-না উত্তম মাওকিফ ছিল, যদি না তাতে আমি থাকতাম!' আর অপরজন বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমার কারণে তাদের ফিরিয়ে দেবেন না।"

উত্তম কথা আরশের চতুষ্পার্শ্বে থাকে
[১৩৯] আব্দুল্লাহ ইবনু রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কাব রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই উত্তম কথা আরশের চতুষ্পার্শ্বে থাকে। মৌমাছির গুঞ্জনের মতো তার গুঞ্জন রয়েছে। তা তার কথকের কথা স্মরণ করতে থাকে।"

আল্লাহর রহমত এবং আজাবের পরিমাণ
[১৪০] আলি ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে যখন এই আয়াত পাঠ করা হতো : وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِم 'এবং নিশ্চয়ই মানুষের সীমালঙ্ঘন সত্ত্বেও তোমার প্রতিপালক তাদের প্রতি ক্ষমাপ্রবণ।[৯]
তখন তিনি বলতেন, “যদি মানুষ আল্লাহর ক্ষমা, দয়া এবং মাফের পরিমাণ জানতে পারত, তাহলে তাদের চোখ শীতল হয়ে যেত। আর মানুষ যদি আল্লাহর আযাব, শাস্তি, প্রতাপ এবং তার প্রতিশোধের পরিমাণ জানত, তাহলে তাদের এক ফোঁটা অশ্রুও ওপরে উঠত না এবং তারা কোনো খাদ্য বা পানীয় দ্বারা উপকৃত হতো না।”

হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর ওপর আস্থা
[১৪১] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি কারও দুআয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমীন বলি না, যতক্ষণ না শুনতে পাই সে কী বলছে। তবে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।”

অলৌকিকতা অস্বীকারের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন
[১৪২] আতা রাহিমাহুল্লাহ থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত, “একদিন মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ তার গ্রাম থেকে বসরার দিকে ফিরছিলেন। তখন তার চাবুক আলোকিত হয়ে উঠল। এ দেখে তার ভাই তাকে বলল, 'আমরা যদি মানুষের কাছে এ বিষয়টি বর্ণনা করি, তাহলে তারা আমাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে।' তিনি বললেন, 'যে এটাকে অস্বীকার করবে, সে চরম মিথ্যাবাদী।”

বাতাসের গুরুত্ব
[১৪৩] মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “যদি মানুষের থেকে তিন দিন বাতাস আটকে রাখা হয়, তাহলে আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে সব দুর্গন্ধময় হয়ে যাবে।”

পবিত্র ভূমি নাপাক ভূমিকে পবিত্র করে দেবে
[১৪৪] জুরাইরি আব্বাস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, আমার মধ্যে এবং মাসজিদের মধ্যে কিছু ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যাতে শুকনো পায়খানা রয়েছে। আর তার সামনে রয়েছে পবিত্র ভূমি। তখন তিনি বললেন, 'পবিত্র ভূমি নাপাক ভূমিকে পবিত্র করে দেবে।"

সাহাবিরা ঈশার সালাত পড়ার আগ পর্যন্ত ঘুমাতেন না
[১৪৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে:
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ
"তারা রাতে খুব কমই ঘুমাত।"
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা ঈশার সালাত পড়ার আগ পর্যন্ত ঘুমাতেন না। "[১০]

গাফিলতিও আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিআমাত
[১৪৬] মুতাররিফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহ যে সকল নিআমাত দ্বারা বান্দাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি ইয়াকিনের সঙ্গে গাফিলতি দান করেছেন। যদি তিনি এর সঙ্গে ভীতি দান করতেন, তাহলে তারা কোনো কিছুর দ্বারাই উপকৃত হতে পারত না।"

আল্লাহ তাআলার বাণীর প্রতি নিখাদ বিশ্বাস
[১৪৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি দুনিয়া থেকে নিজেকে বিমুখ করে নিয়েছিলেন। অবশেষে তাকে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল। তখন মুতাররিফ সুন্দর কাপড় পরে সুগন্ধিযুক্ত তেল লাগিয়ে কওমের মাঝে বের হলেন। তখন তারা ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, আবদুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেছে আর সে সুগন্ধিযুক্ত তেল লাগিয়ে এমন সুন্দর পোশাক পরে বেরিয়েছে! মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আমি তার জন্য নত হব, অথচ আমার রব তার ব্যাপারে তিনটি বিষয়ের ওয়াদা করেছেন; যার প্রতিটি বিষয় আমার কাছে সমগ্র দুনিয়া থেকে অধিক প্রিয়! মহামহিম আল্লাহ বলেছেন:
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“তারা হলো সেসব লোক, যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে ওঠে, আমরা সকলে আল্লাহরই এবং তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং তারাই হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”[১১] এরপরও কি আমি তার জন্য নত হব!”
সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আখিরাতের যা কিছু আমি প্রাপ্ত হয়েছি, যদি তা এক মগ পানি পরিমাণও হয়, তার পরিবর্তে আমি কামনা করেছি, দুনিয়ায় আমার থেকে যেন তার বিনিময় নিয়ে নেওয়া হয়।”

আল্লাহর ভয়ে ভীত অন্তর
[১৪৮] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এক মজলিসে ছিলাম, যেখানে হাসান, মুতাররিফ ও আরও অনেকে ছিলেন। তখন সাঈদ ইবনু আবী হাসান রাহিমাহুল্লাহ কথা বললেন। তার যখন কথা শেষ হলো তখন তিনি তিনবার এই বলে দুআ করলেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।”
বর্ণনাকারী বলেন, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট না হন, তাহলে অন্তত আমাদের ক্ষমা করুন।' তার এই কথা শুনে সকলে কেঁদে ফেলল।”

জামাআতের গুরুত্ব
[১৪৯] আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “আমি বিধবা নারীর থেকেও জামাআতের দিকে অধিক মুখাপেক্ষী। আমি যখন জামাআতের মধ্যে থাকি তখন আমি আমার গুনাহ চিনতে পারি।"

শয়তানের জাল
[১৫০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ এক মজলিসে ছিলেন। তখন আবুল আলা ইয়াজিদ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, আপনি কিছু বলুন। তখন তিনি বললেন, 'এখানে কি আমিই রয়েছি?' এরপর তিনি সবিস্তারে আলোচনা করলেন। সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তার আলোচনা আমাকে মুগ্ধ করল।' এরপর হাসান রাহিমাহুল্লাহ আলোচনা করলেন। তখন তিনি বললেন, ‘আমাদের কে সেখানে রয়েছে? শয়তান কামনা করে, তোমরা তার থেকে তা গ্রহণ করো। তখন কেউ আর সৎ কাজের আদেশ করবে না এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে না।"

বান্দার ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার সোপান
[১৫১] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যখন কোনো ব্যক্তি তার সম্প্রদায়ের কাছে আসে, আর তারা তাকে দেখে বলে—স্বাগতম; তো ওইদিন যদি সে তার প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তবে তাকে (আল্লাহর পক্ষ থেকেও) স্বাগতম জানানো হবে। আর যখন তারা তাকে দেখে বলে—দুর্ভোগ; তো সেদিন যদি সে তার প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়, তবে তার জন্য (আল্লাহর পক্ষ থেকে) দুর্ভোগের (ঘোষণা দেওয়া হবে)।"

জালিম খলীফার জন্য কল্যাণের দুআ করা যায়
[১৫২] আমর ইবনুল ফাজল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম—তখন হাজ্জাজ আবা পরিহিত ছিলেন—হে আবুল আলা, আমি কি হাজ্জাজকে গালি দেবো?” তখন তিনি বললেন, “তুমি তার জন্য কল্যাণের দুআ করো। কেননা, তার কল্যাণ তোমার জন্য উত্তম।”

স্বপ্নে কবরবাসীদের সঙ্গে কথা বলা
[১৫৩] আবুত তাইয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বৃক্ষহীন প্রান্তরে যেতেন। জুমুআর রাতে তিনি রাতের বেলায় ঘোড়ায় চড়ে বের হতেন। তো অনেক সময় তার চাবুতে একধরনের আলো দৃশ্যমান থাকত।”
বর্ণনাকারী বলেন, “একরাতে তিনি বের হয়ে কবরসমূহের কাছে এলেন। তখন তিনি ঘোড়ার ওপরই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমি কবরবাসীদের দেখতে পেলাম। প্রত্যেক কবরবাসী নিজ নিজ কবরের ওপর বসা।’ তিনি বলেন, ‘যখন তারা আমাকে দেখল, তখন বলল, এই হলো মুতাররিফ, যে শুক্রবারে এসে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘তোমরা কি তোমাদের ওখানে জুমুআর দিনের কথাও জানতে পারো?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, এবং সেদিন পাখি কী বলে আমরা তা-ও জানি।’ তিনি বললেন, ‘পাখি কী বলে?’ তারা বলল, ‘পাখি বলে, সালাম, এক শুভ দিনকে সালাম।”

গোপনে দান-সদাকা
[১৫৪] হাবিব ইবনুশ শাহীদ রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, “ইয়াজিদ ইবনু আবিল আলা একখণ্ড কাপড় পরিধান করতেন, যার মূল্য এক শ বা তার চেয়ে বেশি। এরপর তিনি শুক্রবারে আসতেন আর তার আস্তিনে খণ্ড খণ্ড রুটি থাকত। তিনি সেগুলো গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।”

চারটি বিষয়ের উপদেশ
[১৫৫] গানিম ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "ইসলামের শুরুতে আমরা পরস্পর পরস্পরকে চারটি বিষয়ের উপদেশ দিতাম-অবসর মুহূর্তে ব্যস্ততার সময়ের জন্য আমল করো। সুস্থতার সময়ে অসুস্থতার সময়ের জন্য আমল করো। যৌবনে বার্ধক্যের জন্য আমল করো। তোমার জীবদ্দশায় মৃত্যুর জন্য আমল করো।”

কৃপণতা এবং দুশ্চরিত্রতা কোনো মুমিনের মধ্যে একীভূত হতে পারে না
[১৫৬] আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "দুটো স্বভাব-কৃপণতা এবং দুশ্চরিত্রতা-কোনো মুমিনের মধ্যে একত্র হতে পারে না।"

কবর থেকে মিশকের সুঘ্রাণ
[১৫৭] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনু গালিব ইবনুল হাজজা রাহিমাহুল্লাহ-কে মুনাজাতে বলতে শুনেছি-হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আমাদের তরুণদের নির্বুদ্ধিতা, আমাদের ইলমের স্বল্পতা, আমাদের মৃত্যুর নিকটবর্তিতা এবং আমাদের থেকে আমাদের পুণ্যবানদের চলে যাওয়ার অভিযোগ করছি।”
মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তার কবর থেকে মিশকের সুঘ্রাণ পাওয়া যেত।” তিনি বলেন, "চলে যাওয়ার সময় তার কবর থেকে এক চিলতে মাটি আমার থলেতে ভরে নিলাম। আমি তার থেকে মিশকের সুঘ্রাণ পেতেই থাকলাম।”

সালাতের মধ্যে মৃত্যু
[১৫৮] আবূ খাব্বাব কাসসাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "জুরারাহ ইবনু আওফা আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত পড়লেন। তিনি তাতে 'ইয়া আইয়ুহাল মুদ্দাসসির' পাঠ করলেন। যখন তিনি 'ফা-ইযা নুকিরা ফিন নাকুর' আয়াতে পৌঁছলেন, তখন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।"
[১৫৯] বাহার্জ ইবনু হাকিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "জুরারাহ ইবনু আওফা আল- কুরাশি বনু কুশায়রের সবচেয়ে বড় মাসজিদে সালাত পড়ালেন। যখন তিনি 'ফা-ইযা নুকিরা ফিন নাকুর' পাঠ করলেন তখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। এরপর তাকে তার ঘরে বহন করে নিয়ে যাওয়া হলো। যারা তাকে তার ঘরে বহন করে নিয়ে গিয়েছিল, আমি ছিলাম তাদের একজন। তিনি তার ঘরে আলোচনা করেছিলেন যে, হাজ্জাজ বসরায় এসেছে আর সে তার কথা তার ঘরে আলোচনা করছিল।”

সন্তানের ভালোবাসার ওপর আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রাধান্যদান
[১৬০] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা আবদুল্লাহ ইবনু গালিবের কাছে আসতাম। তখন তার কাছে তার কোনো এক শিশুসন্তান আসত। তিনি তখন বলতেন, 'বাবা, তুমি তোমার মায়ের কাছে থাকো। আমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ কোরো না।' এরপর তিনি আল্লাহর স্মরণে বিভোর হতেন।”

সর্বদা যিকরে বিভোর থাকা
[১৬১] সাঈদ ইবনু ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু গালিবকে হত্যা করা হয়েছে, তার কবরের ওপর নির্মাণ স্থাপনা করা হয়েছে এবং মাটি দিয়ে কবর সমান করে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, "আমরা তার কবরের ওপর থেকে সকল সুগন্ধির চেয়ে উত্তম সুগন্ধির ঘ্রাণ পেলাম।” তিনি বলেন, "ইবনু গালিব সাধারণভাবে কথাই বলতে পারতেন না, তবে শুধু এই কালিমাগুলো বলতেন—সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া সল্লাল্লাহু আলা সায়্যিদিনা মুহাম্মাদ। যদি তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা হতো, তাহলে তিনি তার জবাব দিতেন। এরপর আবার এই কালিমাগুলোতে ফিরে যেতেন।”

সন্তান হারানোর বেদনা
[১৬২] আবদুল্লাহ ইবনু গালিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জারিফ মহামারি আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, অথচ আমি তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পরিতৃপ্তিটুকুও এখনো পাইনি। দিনে পারিনি; কারণ তো তোমরা দেখছই।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি যোহর এবং আসরের মধ্যবর্তী সময়ে সালাত পড়তেন। আর মাগরিব এবং ঈশার মধ্যবর্তী সময়ে সর্বদা প্রচুর পরিমাণে তাসবিহ পাঠ করতেন। (আবদুল্লাহ ইবনু গালিব বলেন) রাতে আমি (সন্তানদের) বলতাম, তোমরা তোমাদের মায়ের সঙ্গে থাকো।"

সকল মনোযোগ সৃষ্টিকর্তার মধ্যেই নিবদ্ধ রাখা
[১৬৩] সাল্লাম ইবনু মিসকিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু গালিব রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'আপনি যদি একটু কোমল আচরণ করতেন!'”
বর্ণনাকারী বলেন, “তখন তিনি বললেন
كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِب
'কিছুতেই নয়, তুমি তার আনুগত্য করো না। তুমি সাজদা করো এবং নৈকট্য অর্জন করো।[১২]
এরপর তিনি উঠে সাজদাবনত হলেন।”

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি
[১৬৪] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা এক ঈদুল ফিতরের দিন আবদুল্লাহ ইবনু গালিব রাহিমাহুল্লাহ-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন তিনি মিঠাই বের করে আমাদের সবাইকে একটা একটা করে মিঠাই দিলেন। আমাদের সবাই তা খেল। এরপর আমরা যাত্রা করলাম।"

পোশাকের অহংকার
[১৬৫] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতা মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "যখন তুমি কোনো পোশাক পরিধান করবে এবং এই কথা ভাববে যে—সেই পোশাকে তোমাকে অন্যান্য পোশাকের চেয়ে উত্তম দেখাচ্ছে—তাহলে তা তোমার জন্য কতই-না নিকৃষ্ট পোশাক!”

টিকাঃ
[৭] সূরা ইবরাহীম, ১৪:৫
[৮] সূরা নূর, ২৪: ৪০
[৯] সূরা রাদ, ১৩: ৬
[১০] সূরা আয-যারিয়াত, ৫১: ১৭
[১১] সূরা বাকারাহ, ২: ১৫৬-১৫৭
[১২] সূরা আলাক, ৯৬ : ১৯

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা
[১৬৬] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ-কে সাজদারত অবস্থায় এই কথা বলতে দেখেছি—কখন আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব এমতাবস্থায় যে, আপনি আমার ওপর সন্তুষ্ট। এরপর তিনি দুআয় গিয়েও এ কথা বলতেন-কখন আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব এমতাবস্থায় যে, আপনি আমার ওপর সন্তুষ্ট।”

ডান হাতে লজ্জাস্থান স্পর্শ করা অপছন্দনীয়
[১৬৭] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তার বাবা ডান হাতে লজ্জাস্থান স্পর্শ করাকে অপছন্দ করতেন। আর তিনি বলতেন, আমি প্রত্যাশা করি, ডান হাতে আমি আমার আমলনামা নেব।”

কখনো মাত্রাতিরিক্ত রাগ না করা
[১৬৮] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তার বাবা (মুসলিম) যখন কোনো ব্যক্তির ওপর রাগ করতেন তখন বলতেন-আমার মধ্যে আর তোমার মধ্যে পার্থক্য করে দাও। এটাই ছিল তার সবচেয়ে কঠোর কথা।”

আবেদনপ্রার্থীকে খালি ফিরিয়ে না দেওয়া
[১৬৯] তালহা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ কোনো আবেদনপ্রার্থীকে (খালি হাতে) ফিরিয়ে দিতেন না।”

আল্লাহর জন্য ভালোবাসা
[১৭০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি একবার প্রচণ্ড অসুস্থ হলাম। তখন আমি অন্তরে সেই মানুষগুলোর থেকে অধিক নির্ভরযোগ্য কাউকে পেলাম না, যাদের আমি ভালোবাসতাম। তাদের ভালোবাসতাম শুধুই মহান আল্লাহর জন্য।”

একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করা
[১৭১] মুতামির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ নিজ পরিবারকে বলতেন, "যখন তোমাদের কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তোমরা সেই সময়ে আমাকে তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ো, যখন আমি সালাত পড়ি।”

কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সুন্নাতের অনুসরণ
[১৭২] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার জুতা পরিধান করে সালাত পড়ি, অথচ তা খুলে ফেলা আমার জন্য বেশি সহজ। আর এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য শুধু সুন্নাহর ওপর আমল করা।"

আল্লাহর প্রতি প্রত্যাশা
[১৭৩] ইসহাক ইবনু সুয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এক বছর মক্কার পথে মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর সান্নিধ্য পাই। আমি দেখেছি, তিনি পুরো পথে একটি শব্দও বলেননি, যতক্ষণ না আমরা জাতু ইরকে পৌঁছেছি। এরপর তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। তিনি বললেন, 'আমার কাছে এই মর্মে হাদীস পৌঁছেছে, কিয়ামাতের দিন বান্দাকে এনে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হবে। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা তার নেক আমলের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। তখন তারা (ফেরেশতারা) তার নেক আমলের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে। তার কোনো নেক আমলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা তার গুনাহের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। তখন তার প্রচুর গুনাহ পাওয়া যাবে। তখন তাকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হবে। সে বারবার পেছনে ফিরে তাকাবে। তখন আল্লাহ বলবেন, তাকে ফিরিয়ে আনো। তুমি কীসের দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছ? তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, এটা তো আমার ধারণা বা প্রত্যাশা ছিল না। আল্লাহ বলবেন, তুমি সত্য বলেছ। তখন তাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে।”

অসুস্থ অবস্থায়ও নেক আমলের সওয়াব লেখা হয়
[১৭৪] সুলাইমান ইবনুল মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমরা আমাদের এক অসুস্থ সঙ্গীর শুশ্রূষা করার জন্য আসলাম। তখন লোকেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল যে—যখন মানুষ অসুস্থতায় আটকা পড়ে যায় তখন সে সুস্থাবস্থায় যা যা আমল করত তা তার আমলনামায় উত্থিত হয়, যতক্ষণ না সে ইন্তেকাল করে। মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'এমনটা নয়। বরং আমরা শুনতাম, তার উত্তম আমলগুলো উত্থিত হয়, যতক্ষণ না সে ইন্তেকাল করে।”

আল্লাহর প্রশংসাসহ তার কাছে আশ্রয়প্রার্থনা
[১৭৫] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার বাবা আমাকে বলতে শুনলেন,
أَعُوذُ بِالسَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمِ
'আমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞানী সত্তার কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহই হলেন সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞানী।”
আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার বাবা আমাকে শিখিয়ে দিয়ে বললেন, 'তুমি এভাবে বলো।”

আল্লাহর প্রতি আশা ও ভয় রাখা
[১৭৬] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। আমার শরীরের কিছু অংশ তখন আড়াল করে রাখছিলাম। মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি দীর্ঘ সাজদা করতেন বলে আমার কাছে মনে হলো। তখন তার সামনের দাঁতে রক্ত পড়ল। ফলে সে দুটো পড়ে গেল। তখন আমি সে দুটোকে লুকিয়ে ফেললাম। অতঃপর আমি বললাম, আমার কাছে বেশি আমল নেই। তবে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি এবং তাকে ভয় করি।”
তিনি বলেন, “তখন তিনি আতঙ্কিত ব্যক্তির মতো তার মাথা ওঠালেন। এবং তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি কীভাবে বললে?' আমি বললাম, 'আমার কাছে বড় কোনো আমল নেই। তবে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি এবং তাকে ভয় করি।' তখন তিনি বললেন, 'মা শা আল্লাহ, মা শা আল্লাহ! যে ব্যক্তি কোনো জিনিসকে ভয় করে, সে তা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করে। আর যে ব্যক্তি কোনো কিছু প্রত্যাশা করে, সে তার সন্ধান করে। আমি জানি না, এমন বান্দার ভয়ের অবস্থা কী, যার সামনে প্রবৃত্তির তাড়না প্রকাশ হওয়ার পর সে আশঙ্কাজনক বিষয়টির কারণে তা পরিহার করে না! অথবা কোনো বিপদে আক্রান্ত হওয়ার পর তখন সে যা প্রত্যাশা করে, তার দিকে তাকিয়ে সেই বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ করে না!”
মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সে সময় আমি জেনেবুঝে নিজেকে নিজে সত্যায়ন করেছি।"

একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করা
[১৭৭] হাবিব ইবনুশ শাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ দাঁড়িয়ে সালাত পড়ছিলেন। তখন এক টুকরো আগুন তার পাশে এসে পড়ল। তিনি তা টেরই পেলেন না। একপর্যায়ে তা নিভে গেল।”

ঈমানদার হতে হলে আল্লাহর ভয়ে গুনাহ পরিত্যাগ করতে হবে
[১৭৮] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এমন বান্দার ঈমান আর কতটুকুই, যে মহান আল্লাহর অপছন্দ জিনিস পরিত্যাগ করে না।"

আল্লাহর জন্য ভালোবাসা নিখাদ হয়ে থাকে
[১৭৯] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার এমন কোনো আমল নেই, যাতে আমি এমন কোনো জিনিস অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করি না, যা সেটাকে বরবাদ করে দেবে। তবে মহান আল্লাহর জন্য ভালোবাসার বিষয়টি ভিন্ন।”

নেক আমল এবং ভরসার নমুনা
[১৮০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “তুমি এমন ব্যক্তির আমলের মতো আমল করো, যাকে শুধু তার আমল মুক্তি দিতে পারে। এবং তুমি ভরসা করো এমন ব্যক্তির ভরসার মতো, যাকে আল্লাহ তার জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন, এ ছাড়া অন্য কিছুই তাকে আক্রান্ত করতে পারে না।”

বান্দা কখনো প্রতিপালককে পরীক্ষা করতে পারে না
[১৮১] ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইবলীস ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম-কে বলল, 'হে মারইয়াম তনয়, আল্লাহ তোমার জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কিছু তো তোমাকে আক্রান্ত করবে না!' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর শত্রু!' সে বলল, 'তাহলে তুমি এই পাহাড়ে চড়ো। এরপর নিজেকে সেখান থেকে নিক্ষেপ করো। আমি দেখব, তুমি মরে যাবে।' ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'হে আল্লাহর শত্রু, কল্যাণ ও বরকতের আধার মহান আল্লাহ তার বান্দাকে পরীক্ষা করতে পারেন। কিন্তু বান্দা তো তার প্রতিপালককে পরীক্ষা করতে পারে না!"

বৃদ্ধ অবস্থাতেও জিহাদের তামান্না
[১৮২] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, “আবু তালহা আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু সূরা তাওবা পাঠ করলেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন: انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالَ 'জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়ো-হালকা অবস্থায় থাকো বা ভারী অবস্থায়।[১৩]
তখন বলে উঠলেন, 'আমি দেখছি, আমাদের প্রতিপালক আমাদের জিহাদের জন্য আহ্বান করছেন-আমরা বৃদ্ধ হই কিংবা যুবক হই। হে আমার ছেলেরা, তোমরা আমাকে যুদ্ধের সাজে সাজিয়ে দাও।' তখন তার ছেলেরা বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! আপনি আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, যতক্ষণ না তার ওয়াফাত হয়েছে। এরপর আবূ বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, যতদিন না তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গেও আপনি যুদ্ধ করেছেন। এখন আমরা আপনার পক্ষ থেকে যুদ্ধে লড়ব।' তিনি ছেলেদের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অবশেষে (বাধ্য হয়ে) তারা তাকে যুদ্ধের সাজে সাজিয়ে দিলো। তিনি নৌযানে আরোহণ করে সমুদ্রযাত্রা করলেন। এরপর সেখানেই তার মৃত্যু হলো। সাত দিন পর্যন্ত সহযাত্রীরা তাকে দাফন করার জন্য কোনো দ্বীপ পাচ্ছিলেন না। সাত দিন পর তারা একটি দ্বীপ পেলেন। তখন পর্যন্ত তার লাশ মোটেও বিবর্ণ হয়নি। এরপর তারা সেখানে তাকে সমাহিত করলেন।"

আলিমের জন্য বিতর্কে জড়ানো অনুচিত
[১৮৩] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা বিতর্ক করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, তা (বিতর্কের সময়টা) আলিমের অজ্ঞে পরিণত হওয়ার সময়। আর এর দ্বারাই শয়তান তার পদস্খলন কামনা করে।"

সালাতে বিনয়াবনত থাকবে
[১৮৪] আবূ কিলাবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তুমি আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকবে তখন তুমি পছন্দ করবে-তিনি যেন তোমাকে বিনয়াবনত দেখেন-যাতে তোমার প্রয়োজন পূরণ হয়।” জিজ্ঞাসা করা হলো, "তাহলে সালাতে দৃষ্টির শেষ সীমা কোথায়?” তিনি বললেন, “শুধু সাজদার স্থান পর্যন্ত।”

মাসজিদ ভেঙে পড়লেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি
[১৮৫] মাইমুন ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "আমি মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-কে কখনো সালাতে কোনো দিকে কম বা বেশি ঘুরে তাকাতে দেখিনি। একদিন মাসজিদের একপাশ ধসে পড়ল। তখন গোটা বাজারবাসী তার ধপাস শব্দে আতঙ্কিত হয়ে গেল। অথচ তিনি মাসজিদেই ছিলেন। তিনি সে দিকে ভ্রুক্ষেপই করেননি।"

দুনিয়ার প্রতি একেবারে উদাসীনতা
[১৮৬] মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর পুত্র বর্ণনা করেন, "ইবনুল আশআসের জামানায় শামবাসীরা যখন (বসরায়) প্রবেশ করে সেখানকার অধিবাসীদের পরাভূত করল সে সময় মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর পরিবারের সদস্যরা চিৎকার করে উঠেছিল। তখন তার উম্মে ওয়ালাদ [১৪] দাসী বলল, 'আপনি কি আওয়াজ শোনেননি?' তিনি বললেন, 'না তো, আমি কোনো আওয়াজ শুনিনি।”

মানুষের প্রশংসা শুনে আত্মপ্রবঞ্চিত না হওয়া
[১৮৭] জাফর ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে তার সালাতে দৃষ্টি ফেরানোর স্বল্পতার কথা উল্লেখ করা হলো। তিনি বললেন, 'তোমাদের কি জানা আছে, আমার অন্তর কোথায় থাকে?”

ইবাদাত এবং আল্লাহমুখিতা
[১৮৮] রাবি ইবনু সাবিহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মাকহুল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি তোমাদের নেতাদের মধ্য থেকে একজন নেতাকে কাবায় প্রবেশ করতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কে?' তিনি বললেন, 'মুসলিম ইবনু ইয়াসার।' আমি (মনে মনে) বললাম, তিনি কী করেন আমি দেখব। এরপর আমি দেখলাম, তিনি এক প্রান্তে দাঁড়ালেন। তারপর সামনে এগিয়ে শ্বেত মর্মর পাথরের দিকে মুখ করলেন। এরপর অতি উত্তমভাবে সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি সাজদা করলেন। আমি তার কিছুই বুঝলাম না। তবে তিনি সাজদায় বলছিলেন—হে আল্লাহ, আপনি আমার গুনাহসমূহকে এবং আমার দু-হাত যা কিছু অগ্রে প্রেরণ করেছে তা ক্ষমা করুন। এরপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। একপর্যায়ে শ্বেত মর্মর পাথর অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল।”

সিদ্দিকের জন্য অভিশাপ দেওয়া শোভনীয় নয়
[১৮৯] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম ইবনি ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি তাকে কখনো কোনো জিনিসকে অভিশাপ করতে শুনিনি। তিনি বলতেন, আমি যদি কোনো কিছুকে অভিশাপ দিতাম, তাহলে আর সেই জিনিসকে ঘরে রাখতাম না। তিনি বলতেন, কোনো সিদ্দিকের জন্য এটা সমীচীন নয় যে, সে অভিশাপদাতা হবে।”

কেউ সুস্থ হলে পাঠে করার দুআ
[১৯০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি যখন অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করত তখন তারা বলতেন, «لِيَهْنِكَ الظُّهْرُ» সুস্থতা তোমাকে আচ্ছাদিত করে নিক।”

মন্দ কথা বলার চাইতে নীরব থাকা উত্তম
[১৯১] আলি ইবনু আবী হামালাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “ইবনু আবী ইদরিস রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর কাছে তার পিতার ব্যাপারে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেন, 'হে আমার বাবা, আপনাকে কি আবূ আবদিল্লাহ অর্থাৎ মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর নীরবতার দীর্ঘতা আশ্চর্যান্বিত করে না?' তিনি বলেন, 'হে বৎস, হক কথা বলা সে ব্যাপারে নীরব থাকার চেয়ে অধিক উত্তম।' তখন ইবনু আবী ইদরিস রাহিমাহুল্লাহ মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গিয়ে বললেন, 'হে আবূ আবদিল্লাহ, আমি আমার বাবাকে বলেছি, আপনাকে কি আবূ আবদিল্লাহর নীরবতার দীর্ঘতা বিস্মিত করে না? তখন তিনি আমাকে বলেছেন, হে বৎস, হক কথা বলা সে ব্যাপারে নীরব থাকার চেয়ে অধিক উত্তম।' তখন মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'মন্দ কথা বলার চেয়ে নীরব থাকা ঢের উত্তম।”

সালাতে দাঁড়িয়ে দুনিয়াকে ভুলে যাওয়া
[১৯২] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন পরিবারের সদস্যরা চুপ হয়ে যেত। সে সময় আর কারও কথাই শোনা যেত না। যখন তিনি সালাতে দাঁড়াতেন তখন তারা কথাবার্তা বলতেন এবং উচ্চৈঃস্বরে হাসাহাসি করতেন।"
[১৯৩] যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বসরার কতিপয় শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, “মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে সালাত আদায় করতেন।”
তিনি বলেন, “একদিন মাসজিদের একাংশ পতিত হলো। এতে মাসজিদের অনেক মুসল্লি আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তিনি বলেন, মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ তখন মাসজিদের এক প্রান্তে। তিনি মোটেও নড়াচড়া করেননি।”

সুস্থতার অবস্থায় সর্বদা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা
[১৯৪] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এটা অপছন্দ করি যে, আমার প্রতিপালক আমাকে অসুস্থতা ছাড়াই বসা অবস্থায় সালাত আদায় করতে দেখবেন।”

টিকাঃ
[১৩] সূরা তাওবা, ৯:৪১
[১৪] উম্মে ওয়ালাদ বলা হয় এমন দাসীকে, যার গর্ভে মনিবের কোনো সন্তান জন্ম লাভ করেছে। এর প্রতিদানস্বরূপ মনিবের মৃত্যুর পর সে আর দাসী থাকে না; স্বাধীন নারী হয়ে যায়। এ ছাড়াও উম্মে ওয়ালাদ দাসীকে বিক্রি করা যায় না। কারণ, জীবিত থাকলে কিছুকাল পর তার মুক্তি সুনিশ্চিত।

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 আতা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 আতা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


পৃথিবীতে বসে জান্নাতের সুসংবাদ
[১৯৫] জাফর রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “আমি মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, তিনি হিশাম ইবনু জিয়াদ আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-কে এই ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিলেন। সেদিন তা নিয়েই আমাদের মধ্যে আলোচনা হলো। হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সিরিয়ার একজন লোক হাজ্জের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা করল। পথিমধ্যে সে এক জায়গায় ঘুমিয়ে পড়ল। তখন স্বপ্নে একজন আগন্তুক তার কাছে এসে বলল, তুমি ইরাক গমন করো। এরপর বসরায় গমন করো। এরপর বনু আদিতে গমন করো। সেখানে গিয়ে আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গমন করো। তিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। তুমি গিয়ে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। সে তখন বলল, স্বপ্ন তো স্বপ্নই! যখন দ্বিতীয় রাত হলো আর সে শয়ন করল, তখন একজন আগন্তুক এসে তাকে পূর্বের মতো বলল, তুমি কি ইরাকে গমন করবে না? এরপর বসরায় গমন করবে না? তারপর পূর্বের দিনের অনুরূপ কথাই বলল। এরপর যখন তৃতীয় রাত হলো তখন সেই আগন্তুক তার কাছে শাস্তি প্রদানের হুমকিসহ এল। এরপর বলল, তুমি কি ইরাকে গমন করবে না? এরপর বসরায় গমন করবে না? এরপর বানু আদিতে গমন করবে না? এরপর আলা ইবনু জিয়াদের কাছে যাবে না? তিনি মাঝারি গড়নবিশিষ্ট সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ। তুমি তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
তিনি বলেন, “সকালে উঠে সামানাপত্র নিয়ে সে ইরাকের পথ ধরল। যখন সে এলাকা থেকে বের হয়ে গেল, তখন আচমকা সেই ব্যক্তিকে দেখতে পেল, যাকে সে স্বপ্নে দেখেছিল। সে যে দিকেই চলছিল, সে দিকেই তাকে দেখতে লাগল। যখন সে যাত্রাবিরতি করত, তখন তাকে হারিয়ে ফেলত। এভাবে চলতে চলতে সে কুফা নগরীতে এসে পৌঁছল। তখন সেই আগন্তুককেও হারিয়ে ফেলল। কুফা থেকে সামানাপত্র নিয়ে যখন প্রস্তুত হয়ে যাত্রা করল, তখন সেই আগন্তুককে সামনে সামনে চলন্ত অবস্থায় দেখতে পেল। এভাবে তারা বসরায় এসে পৌঁছল। এরপর বনু আদিতে এসে আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর বাড়িতে প্রবেশ করল। তখন সেই লোকটি আলা রাহিমাহুল্লাহ-এর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো।”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি তখন তার উদ্দেশে বের হলাম। তখন সে আমাকে বলল, আপনি 'আলা ইবনু জিয়াদ?' আমি বললাম, 'না, তবে আপনি বসুন। আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি আপনার মালপত্র রাখুন। আসবাবপত্র নামিয়ে রাখুন।' তিনি বললেন, 'না, আলা ইবনু জিয়াদ কোথায়?' আমি বললাম, 'তিনি মাসজিদে। তিনি দুআ-দুরুদ পড়ছেন এবং আলোচনা করছেন।”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “তখন আমি আলা রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আসলাম। তিনি তার আলোচনা হালকা করে ফেললেন এবং দু-রাকাত সালাত আদায় করলেন। এরপর আসলেন। যখন আলা তাকে দেখলেন তখন তিনি মৃদু হাসলেন। এমনকি তার সামনের দাঁত দুটিও প্রকাশিত হয়ে পড়ল। তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, এ হলো আমার সঙ্গী। তুমি ভদ্রলোকের মালসামানা নামিয়ে আনলে না কেন? কেন তা নামালে না?” তিনি বললেন, "আমি তাকে বলেছিলাম। কিন্তু তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তখন আলা রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তুমি নামিয়ে আনো। আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তখন সে বলল, 'আমাকে যেতে দিন।” তিনি বলেন, “তখন আলা নিজ গৃহে প্রবেশ করে বললেন, 'হে আসমা, তুমি অন্য ঘরে যাও।' তখন সে অন্য ঘরে চলে গেল এবং ভদ্রলোক গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। এরপর তাকে স্বপ্নে দেখা সুসংবাদের কথা জানাল। এরপর সে বের হয়ে নিজ বাহনে আরোহণ করল। অতঃপর আলা রাহিমাহুল্লাহ তখন উঠে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর তিনি তিন দিন বা সাত দিন শুধু কাঁদলেন। এই দিনগুলোতে কোনো খাবার বা পানীয়ের স্বাদ আস্বাদন করেননি এবং তার দরজা খুলেননি।”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি তাকে তার কান্নার মাঝে বলতে শুনেছি- 'আমি! আমি!' তার ঘরের দরজা খুলতেও আমাদের সাহসে কুলাচ্ছিল না। আবার আমরা তার মরে যাওয়ার আশঙ্কাও করছিলাম। তখন আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে পুরো ঘটনা আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলাম। আমি বললাম, আমি তো তাকে কাঁদতে কাঁদতে মরণাপন্ন অবস্থায় দেখতে পাচ্ছি। তিনি কোনো খাবার ও পানীয় ছুঁয়েও দেখছেন না। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ এসে তার দরজায় করাঘাত করে বললেন, 'দরজা খোলো, হে আমার ভাই।' যখন তিনি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কথা শুনতে পেলেন তখন উঠে এসে দরজা খুলে দিলেন। সে সময় তার ওপর এমন সাংঘাতিক হালত চেপে ছিল, যার ব্যাপারে আল্লাহই ভালো জানেন। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। পরিশেষে তিনি বললেন, 'আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন। আল্লাহ যদি চান তুমি হবে জান্নাতবাসীদের একজন। তুমি কি নিজেই নিজেকে মেরে ফেলবে?”
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “আলা রাহিমাহুল্লাহ আমাকে এবং হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে স্বপ্নের বিবরণ জানালেন আর বলে দিলেন, যতদিন আমি জীবিত থাকি, এই স্বপ্নের কথা কাউকে জানাবে না।”

সাবিত রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রশংসা
[১৯৬] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “নিশ্চয়ই কল্যাণের অনেক চাবি রয়েছে। আর সাবিত হলেন কল্যাণের চাবিসমূহের মধ্য থেকে একটি চাবি।”

মানুষ শয়তানের ধোঁকায় আখিরাতকে ভুলে যায়
[১৯৭] উবায়দুল্লাহ ইবনু শুমায়ত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, 'আদম-সন্তানের জন্য বিস্ময়! অনেক সময় তার অন্তর থাকে আখিরাতে। অনন্তর বুরগুছ[১৫] তাকে চুলকায়। ফলে সে আখিরাতকে ভুলে যায়।”

মানুষের শরীর হলো আল্লাহর পথের বাহন
[১৯৮] উবায়দুল্লাহ ইবনু শুমায়ত এবং জাফর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তারা বলেন, “আমরা শুমায়ত ইবনু আজলান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহর কসম, আমি মনে করি, তোমাদের শরীরগুলো হলো তোমাদের প্রতিপালকের পথে বাহন। তাই তোমরা মহান আল্লাহর আনুগত্যের জন্য তা প্রস্তুত করো। আল্লাহ তোমাদের মধ্যে বরকত দান করুন।”

কিয়ামাত দিবসের ব্যাপারে দুআ
[১৯৯] আবদুল মালিক ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি আবুল আহওয়াস রাহিমাহুল্লাহ-কে তার দুআয় বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে কিয়ামাত দিবসে ছায়া, বরকতপূর্ণ পানি এবং নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।”

ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ-এর উপদেশ
[২০০] আবু সিনান আল-কাসমালি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একদিন ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ আতা আল খুরাসানি রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আগমন করে বললেন, 'তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! আমি কি অবগত করিনি যে, তুমি তোমার ইলমকে রাজা-বাদশাহ এবং দুনিয়াদারদের দুয়ারে দুয়ারে বয়ে বেড়াচ্ছ! তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! তুমি এমন ব্যক্তির কাছে গমন করছ, যে তোমার থেকে তার দুয়ার রুদ্ধ রাখে, তোমার সামনে তার দারিদ্র্য প্রদর্শন করে এবং তোমার থেকে তার সচ্ছলতা আড়াল করে। আর যারা তোমার জন্য তাদের দুয়ার খুলে রাখে, তোমার সামনে নিজেদের সচ্ছল অবস্থা প্রকাশ করে এবং বলে যে, আমাকে আহ্বান করো, আমি তোমার আহ্বানে সাড়া দেবো, তুমি তাদের ত্যাগ করছ! তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! হিকমাহ অর্জিত হলে দুনিয়ার তুচ্ছ পরিমাণ নিয়েই তুমি সন্তুষ্ট থেকো। আর দুনিয়া লাভ করে তুচ্ছ পরিমাণ হিকমাহ নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট হোয়ো না। তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায় এই পরিমাণ সম্পদ যদি তোমাকে সচ্ছল না করে, তাহলে দুনিয়ার কোনো জিনিসই তোমাকে আর সচ্ছল করতে পারবে না। তোমার জন্য আফসোস, হে আতা! নিশ্চয়ই তোমার উদর সমুদ্রসমূহের মধ্য থেকে একটি সমুদ্র এবং উপত্যকাগুলোর মধ্য থেকে একটি উপত্যকা। মাটি ছাড়া অন্য কিছুই তা পূর্ণ করতে পারবে না।”

শয়তানের উপহাস
[২০১] মাখলাদ ইবনুল হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-কে এক ব্যক্তি বলল, 'তোমার জন্য আফসোস, আমি তোমাকে জান্নাতে দেখলাম!' তিনি বললেন, 'শয়তান কি আমি এবং তুমি ছাড়া আর কাউকে পেল না, যাকে নিয়ে সে উপহাস করবে?”

আল্লাহভীরু বান্দাদের দিকে সৃষ্টিকুলকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া হয়
[২০২] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক লোক লৌকিকতার উদ্দেশ্যে আমল করত। সে কেরাত পাঠের সময় কাপড় গুটিয়ে নিত এবং কণ্ঠস্বর উঁচু করত। সে সময় সে যার কাছেই আসত, সে-ই তাকে গালাগাল করত এবং অভিশাপ দিত। এরপর আল্লাহ তাকে কিছু ইখলাস দান করলেন। তখন সে নিম্ন আওয়াজে কেরাত পাঠ করত এবং তার সালাতকে নিজের মাঝে এবং মহান আল্লাহর মাঝে সীমাবদ্ধ রাখত। এরপর থেকে লোকটি যার কাছেই গমন করত, সে-ই তার জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করত এবং 'আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন' বলে দুআ করত।"

ইবাদাতের মধ্য দিয়ে রাত্রি জাগরণ
[২০৩] জাফর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমাদের মজলিসে আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাই হিশাম ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ আগমন করলেন। তখন মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'তুমি তাদের তোমার ভাইয়ের ঘটনা শোনাও।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, আমার ভাই আলা ইবনু জিয়াদ প্রতি শুক্রবার রাত্রি জাগরণে কাটাতেন। এক রাতে তিনি এসে তার স্ত্রী আসমা রাহিমাহাল্লাহ-কে বললেন, হে আসমা, আজকের রাতে খুব অবসন্নতা বোধ করছি। রাতের এই পরিমাণ অংশ অতিক্রান্ত হলে তুমি আমাকে জাগিয়ে দিয়ো। তিনি বলেন, যখন নির্ধারিত সময় হলো তিনি আতঙ্কিত হয়ে জেগে উঠলেন। এরপর বললেন, আমার কাছে এক আগন্তুক এসে আমার মাথার অগ্রভাগ ধরে বলল, হে জিয়াদের সন্তান, ওঠো, মহান আল্লাহকে স্মরণ করো, তিনি তোমাকে স্মরণ করবেন।'"
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, তার চেহারার সম্মুখভাগে সেই চুলগুলো দাঁড়ানো অবস্থায় ছিল— যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, এমনকি তার মৃত্যুর পরও তা সেভাবেই ছিল। আমরা তাকে গোসল দিয়েছি, তখনো সেগুলো দাঁড়ানো অবস্থাতেই ছিল— স্বাভাবিকতায় ফেরেনি।”

কোনো নারীর চাদরের দিকেও দৃষ্টিপাত কোরো না
[২০৪] ইসহাক ইবনু সুয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো নারীর চাদরের দিকেও তোমার দৃষ্টিকে অনুগামী কোরো না। কারণ, দৃষ্টি অন্তরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে।”

দুনিয়ার রূপ
[২০৫] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি ঘুমের মধ্যে দেখলাম, মানুষেরা কোনো কিছুর পেছনে পেছনে যাচ্ছে। তখন আমিও তাদের অনুসরণ করলাম। অকস্মাৎ এক গাঢ় কালো কানা বুড়িকে দেখা গেল। যার শরীরে সর্বপ্রকার পোশাকাদি এবং সৌন্দর্যের উপকরণ ছিল। তখন আমি তাকে বললাম, তুমি কী? সে বলল, আমি দুনিয়া। আমি বললাম, আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাকে আমার শত্রুতে পরিণত করেন। সে বলল, হ্যাঁ, যদি মুদ্রার সঙ্গে শত্রুতা রাখতে পারো।"

মৃত্যুর কথা চিন্তা করা
[২০৬] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজেকে এই অবস্থায় একবার ভেবে দেখে যে, সে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। তারপর সে আল্লাহর কাছে অব্যাহতি চাইল, আর আল্লাহ তাকে অব্যাহতি দিলেন। সুতরাং সে যেন মহামহিম আল্লাহর আদেশমতো আমল করে।"

আল্লাহ না চাইলে কেউই জাহান্নাম থেকে বেরুতে পারবে না
[২০৭] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমরা এমন সম্প্রদায়, যারা নিজেদের জাহান্নামে রেখেছি। যদি আল্লাহ আমাদের তা থেকে বের করতে চান, তাহলে আমরা বের হব।"

আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা
[২০৮] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا مِنْ دَعْوَةٍ أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ عَبْدِهِ أَنْ يَسْأَلَهُ الْمُعَافَاةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
'আল্লাহর কাছে এরচেয়ে অধিক পছন্দনীয় কোনো দুআ নেই যে, বান্দা তার কাছে দুনিয়া-আখিরাতের নিরাপত্তা চাইবে।'”[১৬]

এ পর্যন্তই বেদনার পরিসমাপ্তি
[২০৯] জাবির বিন আবদুল্লাহ আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, যখন আমি একাকী সালাত আদায় করি তখন আমি আমার সালাত উপলব্ধি করতে পারি না। তিনি বললেন, 'তুমি সুসংবাদ গ্রহণ করো। কারণ, তা কল্যাণের অন্তর্ভুক্ত একটি জ্ঞান। তুমি কি দেখোনি যে, চোরেরা পতিত বাড়ির পাশ দিয়ে অতিক্রম করলে সে দিকে ঘাড় ফিরিয়েও তাকায় না। যখন তারা এমন ঘরের পাশ দিয়ে যায়, যেখানে আসবাবপত্র রয়েছে, তখন তারা তার সঙ্গে লেগে থাকে যাতে সেখান থেকে কোনো জিনিস লাভ করতে পারে।' এবং তিনি (আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'মাসজিদের থেকে আমার ঘরের নিকটবর্তী হওয়া আমার কাছে খারাপ লাগে।' অর্থাৎ তিনি এটা পছন্দ করতেন যে, তার ঘর যেন মাসজিদ থেকে দূরবর্তী হয়, যাতে মাসজিদের দিকে তার পদক্ষেপ অধিক হয়।”
আমার কাছে আরও বর্ণনা পৌঁছেছে যে, হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সাথে আলা ইবনু জিয়াদ আল-আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আসলাম, তিনি তখন খুব চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। তার একটি বোন ছিল, যে সকাল-সন্ধ্যা তার তুলো ধুনে দিত। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, ‘হে আলা, আপনি কেমন আছেন?’ তিনি বললেন, ‘হায়, চিন্তার ওপর চিন্তা।’ তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তোমরা ওঠো। আল্লাহর কসম, এ পর্যন্তই বেদনার পরিসমাপ্তি।”

গুনাহের জন্য নেক আমল অপেক্ষা উত্তম সংশোধনী নেই
[২১০] আসিম ইবনু কুলায়ব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ফুজায়ল ইবনু জিয়াদ রিকাশি রাহিমাহুল্লাহ—যিনি উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধ করেছেন—বলেন, 'মানুষেরা যেন তোমাকে নিজের ব্যাপারে উদাসীন না করে ফেলে। কারণ, ফায়সালা তোমার ওপরই আপতিত হবে; তাদের ওপর নয়। এমন-ওমন বলে দিন কাটিও না। কারণ, তুমি যা কিছু বলবে, সব তোমার আমলনামায় সংরক্ষিত থাকবে। তুমি সংঘটিত গুনাহের জন্য পরবর্তীকালে কৃত নেক আমলের চেয়ে উত্তম কোনো অনুসন্ধানকারী এবং সত্বর পাকড়াওকারী পাবে না।”

সকাল-সন্ধ্যার গুরুত্ব
[২১১] গাইলান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসআস ইবনু সালামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “তোমরা অবিচলতার সঙ্গে রাতের কিছু অংশসহ সকাল-সন্ধ্যার (সময়ের) ব্যাপারে গুরুত্ব দাও।”

কিয়ামাত দিবসে সচ্চরিত্রদের জন্য সচ্ছলতার ঝান্ডা উঁচু করা হবে
[২১২] জুহায়র আস-সালুলি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আসআস ইবনু সালামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিয়ামাত দিবসে সচ্চরিত্রদের জন্য সচ্ছলতার ঝান্ডা উঁচু করা হবে, যা তার সামনে সামনে চলতে থাকবে, যতক্ষণ না সে জান্নাতে প্রবেশ করে।”

দুআর মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্তি
[২১৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সাফওয়ান ইবনু মুহরিজ আল-মাজিনি রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাতিজা আবদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ গ্রেফতার হলেন। মানুষেরা তার ব্যাপারে সুপারিশের দায়িত্ব নিল। এমন কেউই বাকি থাকেনি, যে তার ব্যাপারে কথা বলেনি। এতৎসত্ত্বেও তিনি তার প্রয়োজন পূরণের পথ দেখতে পাননি।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি তার রাত জায়নামাযেই সালাতরত অবস্থায় কাটালেন। ফলে সালাতের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন। যখন তিনি ঘুমালেন তখন স্বপ্নে একজন আগন্তুক তার কাছে এসে বলল, 'হে সাফওয়ান, ওঠো। সামনের দিক থেকে তোমার প্রয়োজনগুলো প্রার্থনা করো।' তিনি বললেন, 'করছি।' তিনি উঠলেন। পানি দিয়ে ওজু করলেন। সালাত আদায় করলেন এবং দুআ করলেন।”
তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, “তখন সাফওয়ানের প্রয়োজনের কথা ইবনু জিয়াদকে অবগত করা হলো।”
তিনি (বর্ণনাকারী) বলেন, “তখন প্রহরী এবং পুলিশ আগুন নিয়ে এল। কারাগারের গেইটসমূহ খোলা হলো এবং সাফওয়ান রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাতিজাকে বের করে আনা হলো। তাকে ইবনু জিয়াদের কাছে নিয়ে আসা হলো। তিনি বললেন, 'তুমি সাফওয়ানের ভাতিজা?' সে বলল, 'জি হ্যাঁ।' তখন সে তাকে পাঠিয়ে দিলো। এরপর সাফওয়ান রাহিমাহুল্লাহ কিছু টের পাওয়ার আগেই দরজায় করাঘাত পড়ল। তিনি বললেন, 'কে এখানে?' সে বলল, 'আমি অমুক।' একরাতে আমিরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রহরী এবং পুলিশ আগুন নিয়ে এল এবং কারাগারের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হলো। এরপর আমাকে জামানত গ্রহণ করে মুক্তি দিয়ে দেওয়া হলো।”

দুনিয়ায় কষ্ট পাওয়া আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে উত্তম
[২১৪] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, "আমি এবং হাসান সাফওয়ান ইবনু মুহরিজ-এর কাছে তার শুশ্রূষা করার জন্য গমন করলাম। তখন দেখা গেল, তিনি কাত হয়ে যাওয়া বাঁশের কুটিরে রয়েছেন। সে সময় তার ছেলে বেরিয়ে আমাদের কাছে এসে বলল, তিনি প্রচণ্ড পেটের পীড়ায় ভুগছেন। আপনারা তার কাছে যেতে পারবেন না। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি তোমার বাবার রক্ত এবং গোশত (ব্যথায় আক্রান্ত হওয়ার দরুন) তার গুনাহসমূহকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তবে তা তার পূর্ণ দেহ নিয়ে মৃত্যুবরণ করার পর তা মাটিতে খেয়ে ফেলা ও প্রতিদানপ্রাপ্ত না হওয়ার তুলনায় উত্তম।”

আগামীকাল আমি মরে যাব
[২১৫] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “সাফওয়ান ইবনু মুহরিজ রাহিমাহুল্লাহ-এর একটি কুটির ছিল। যাতে ছিল একটি কড়িকাঠ। একদিন সেই কড়িকাঠটি ভেঙে গেল। তখন তাকে বলা হলো, 'আপনি কি এটা ঠিক করবেন না?' তিনি বললেন, 'থাক, বাদ দাও। আগামীকাল আমি মরে যাব।”

আমি মানুষের মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত নই
[২১৬] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ বাকর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, "আবু তামিমা রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবূ তামিমা, আপনি কেমন আছেন?' তিনি বললেন, 'আমি দুটো নিআমাতের মাঝে আছি। আমি আবৃত গুনাহের মাঝে আছি, যে গুনাহগুলোর কথা এ সকল মানুষের জ্ঞানে নেই। এবং আমি এমন এক উচ্চ অবস্থানের মাঝে রয়েছি, যে অবস্থানে তারা আমাকে উত্তীর্ণ করে রেখেছে, আর তা এই মানুষগুলোর মুখে জারি রয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি এই অবস্থানে পৌঁছতে পারিনি, এমনকি তার ধারেকাছেও নেই।”

তুমি কি মৃতদের কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাও?
[২১৭] আইনা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আবুল খাল্লাল রাহিমাহুল্লাহ এক কামরার ওপর ছিলেন। তিনি তার দরজার কাছে এলেন। এরপর পল্লির এক দিকে মুখ করে ডাক দিলেন, 'হে অমুক, হে তমুক।' এরপর আরেক প্রান্তে উঁকি দিয়ে বললেন, 'হে অমুক, হে তমুক।' এরপর অন্য এক প্রান্তে উঁকি দিলেন। এভাবে চার দিক দিয়ে এলেন। অতঃপর তিনি বললেন,
﴿هَلْ تُحِسُّ مِنْهُم مِّنْ أَحَدٍ أَوْ تَسْمَعُ لَهُمْ رِكْزًا
'(তাদের আগে আমি কত মানবগোষ্ঠীকেই ধ্বংস করেছি।) তুমি কি তাদের কারও সন্ধান পাও কিংবা তুমি কি তাদের কোনো সাড়াশব্দ শুনতে পাও?' [১৭] তারপর তিনি সালাতে দাঁড়ালেন ও মৃত্যুবরণ করলেন। যেদিন তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, সেদিন তার বয়স ছিল এক শ বিশ বছর।”

কুরআন ঘুম কেড়ে নিয়েছে
[২১৮] ওয়াহহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তিকে বলা হলো, 'আপনি কি ঘুমান না?' তিনি বললেন, 'নিশ্চয় কুরআনের বিস্ময়কর বিষয়গুলো আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।"

পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর যিকর করা
[২১৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা (সাহাবিগণ) পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর যিকর করতে ভালোবাসতেন।"

টিকাঃ
[১৫] পাখাবিহীন একপ্রকার কীট
[১৬] সনদ সহীহ মাওকুফ। ইবনু মাজাহ: ২/৪৩৫
[১৭] সূরা মারইয়াম, ১৯: ৯৮

📘 তাবিয়িদের চোখে দুনিয়া > 📄 হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া

📄 হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া


কিয়ামাতের ভয়
[২২০] হুমাইদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রজব মাসের কোনো এক দিনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে ছিলেন। তিনি তখন পানিতে চুমুক দিচ্ছিলেন, আবার তা মুখ থেকে ফেলছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি দীর্ঘশ্বাস নিলেন। এরপর কেঁদে ফেললেন। এমনকি তার দুকাঁধ কেঁপে উঠল। তারপর তিনি বললেন, 'হায়, অন্তরে যদি প্রাণ থাকত! হায়, অন্তরের যদি যোগ্যতা থাকত, তাহলে আমি তোমাদের সে দিনের ব্যাপারে কান্না করাতাম, যার ভোর হবে কিয়ামাত দিবস। নিশ্চয়ই তা এমন রাত, যা প্রচণ্ডভাবে প্রকম্পিত হয়ে কিয়ামাত দিবসের ভোর উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। সৃষ্টিজীব এমন কোনো দিনের কথা শোনেনি, কিয়ামাত দিবস অপেক্ষা যেদিন অধিক পরিমাণ লজ্জাস্থান প্রকাশিত থাকবে এবং অধিক পরিমাণ চোখ কান্নারত থাকবে।”

দুশ্চিন্তার সময়
[২২১] আওন ইবনু জুহায়ফা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ভালো জিনিসগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে আর মন্দ জিনিসগুলো অবশিষ্ট রয়ে গেছে। মুসলমানদের মধ্যে এখন যারা বাকি রয়ে গেছে, তারা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।”

দুঃখের ভেতর মুমিনের দিনাতিপাত
[২২২] শুমাইত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় মুমিন ভোর করে দুঃখিত অবস্থায় এবং সন্ধ্যাও যাপন করে দুঃখিত অবস্থায়। সে বিশ্বাস নিয়ে দুঃখের ভেতর ঘুরপাক খায়। একজন মুমিনের জন্য তা-ই যথেষ্ট, একজন বিপদাক্রান্ত মানুষের জন্য যা যথেষ্ট হয়—একমুষ্ঠি খেজুর এবং সামান্য পরিমাণ পানি।”

মৃত্যু পৃথিবীকে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে
[২২৩] ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি—নিশ্চয় মৃত্যু পৃথিবীকে নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। সে আর জ্ঞানবান ব্যক্তির জন্য খুশির কোনো উপকরণ বাকি রাখেনি।”

দুঃখ
[২২৪] ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে অধিকতর দুঃখিত ব্যক্তি আর কাউকে দেখিনি। আমি যখনই তাকে দেখেছি, তখনই তাকে সদ্য বিপদাক্রান্ত ব্যক্তির মতো মনে হয়েছে।”

অন্তর কেন বিগলিত হয় না?
[২২৫] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে মানুষ, কীভাবে তোমার অন্তর বিগলিত হবে, অথচ তোমার চিন্তা অন্য জিনিসের মধ্যে ডুবে আছে!”

মানুষের ব্যস্ততার উপকরণ
[২২৬] মালিক ইবনু মিগওয়াল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “প্রত্যেক ব্যক্তি সে জিনিস নিয়েই সময় ক্ষেপণ করে, যা তাকে চিন্তাগ্রস্ত করে। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস নিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়, সে অধিক পরিমাণে তা স্মরণ করে। যার আখিরাত নেই, তার তো দুনিয়াও নেই। যে তার দুনিয়াকে আখিরাতের ওপর প্রাধান্য দিলো, তার দুনিয়াও নেই, আখিরাতও নেই। আর যে উত্তম কথা বলে, কিন্তু মন্দ কাজ করে, সে হয়...।” [১৮]

সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত
[২২৭] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন ইবাদাতটি সবচেয়ে কঠিন? তখন আমাদের মধ্য থেকে একজন বলে ফেলল, সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত হলো আল্লাহর পথে জিহাদ। অপর একজন বলল, সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত হলো সালাত। আরেকজন বলল, সবচেয়ে কঠিন ইবাদাত হলো যাকাত। আবার আরেকজন বলল, সাওম। তখন আমি মনে মনে বললাম, এ ব্যাপারটি নিয়ে আমি তার সঙ্গে কথা বলব। তারপর আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে লক্ষ্য করে বললাম, হে আবূ সাঈদ [১৯], আমি ইবাদাতের মধ্যে তাকওয়া অপেক্ষা কঠিন কোনো কিছু পাইনি। তখন তিনি বললেন, ‘ধিক তোমাকে, তাকওয়া ছাড়া এ সকল ইবাদাতের একটিও কি আদৌ কোনো উপকারে আসে?’ তারপর হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘নিশ্চয় আমি ইবাদাতের মধ্যে রাতের গভীরে সালাত আদায় অপেক্ষা কঠিন কিছু পাইনি।”

দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার
[২২৮] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে আল্লাহর নামে কসম করে বলতে শুনেছি-আল্লাহর কসম, হে আদম-সন্তান, যদি তুমি কুরআন পাঠ করে তার ওপর ঈমান আনয়ন করো, তাহলে দুনিয়ায় তোমার দুঃখ দীর্ঘায়িত হবে। দুনিয়ায় তোমার ভয় প্রচণ্ড হবে এবং দুনিয়ায় তোমার কান্না বৃদ্ধি পাবে।”

কোন আলিম উত্তম?
[২২৯] আলা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, 'হে আবু সাঈদ, এমন কিছু আলিমদের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে, যারা আমাদের উপদেশ দেন এবং ভীতি প্রদর্শন করেন। তাদের আলোচনার মাধ্যমে তারা যেন আমাদের চিত্তকে আকর্ষিত করে ফেলেন। আর এমন কিছু আলিমের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়েছে, যাদের আলোচনায় সহজতা রয়েছে।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, যে তোমাকে এখানে অভয় দেয় আর পরিশেষে (আখিরাতে) তুমি ভীতির সম্মুখীন হও-তার চাইতে তো ওই ব্যক্তিই উত্তম, যে তোমাকে ভীতির কথা শোনায়, আর পরিণামে (আখিরাতে) তুমি নিরাপত্তা লাভ করো।”

দুনিয়াপ্রীতির কারণেই মূর্তিপূজার সূচনা
[২৩০] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহর কসম, বানী ইসরাঈল রহমানের ইবাদাত করার পর মূর্তির উপাসনা করেছে শুধুমাত্র দুনিয়াপ্রীতির কারণে।”

সালাফগণের দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ
[২৩১] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহর কসম, আমি এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কারও জন্য কখনো কাপড় গোটানো হয়নি। যাদের কেউ নিজ পরিবারে কখনো খাবার তৈরি করার আদেশ দেননি। তাদের কেউ নিজের মধ্যে এবং জমিনের মধ্যে কোনো জিনিসকে অন্তরায় বানাননি। যদিও তাদের একেকজন বলতেন, আমার ইচ্ছা হয় যদি এমন হতো যে, আমি সামান্য খাবার খেতাম, আর তা আমার পেটে গিয়ে ইটের মতো আকৃতি লাভ করত। তিনি বলতেন, আমাদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, ইট [২০] পানিতে তিন শ বছর টিকে থাকে।'”

উপদেশ দেওয়ার আগে নিজে আমল করা
[২৩২] আবু কাব আজদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যদি তুমি সৎ কাজের আদেশকারী হও, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম তা গ্রহণকারী হোয়ো; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তুমি অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী হও, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সেসব কাজকে সর্বাধিক অপছন্দকারী হও; অন্যথায় তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।”

দুনিয়াদারদের পরিণাম
[২৩৩] ইবরাহীম ইবনু ঈসা ইয়াশকুরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে দুনিয়াদারের কথা আলোচনা করা হতো তখন আমি তাকে বলতে শুনতাম—আল্লাহর কসম, দুনিয়া তার জন্য অবশিষ্ট থাকেনি, আর সেও দুনিয়ার জন্য বাকি থাকেনি। সে দুনিয়ার অনুসরণ, অনিষ্ট ও হিসেব থেকেও নিরাপদ হতে পারেনি। অথচ দুনিয়া থেকে তাকে বের করা হয়েছে মাত্র একখণ্ড বস্ত্রের ভেতর মুড়িয়ে।”

পূর্বসূরিদের দুনিয়াবিমুখতা
[২৩৪] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি—আল্লাহর কসম, আমরা এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের একেকজন বিপুল পরিমাণ সম্পদের উত্তরাধিকারী হতেন। আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই তারা ছিলেন প্রচণ্ড দুর্দশা-কষ্টে আক্রান্ত। তারা সেই উত্তরাধিকার লাভ করার পর নিজেদের ভাইদের বলতেন, হে আমার ভাই, নিশ্চয়ই আমি জানি এ হলো উত্তরাধিকার। আর তা হালাল। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয়, না জানি তা আমার অন্তর এবং আমলকে বিনষ্ট করে দেয়। তাই এগুলো তোমার। আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। ফলে তাদের পক্ষ থেকে কখনো কাউকে সামান্যতম অংশ থেকেও বঞ্চিত করা হতো না। অথচ বাস্তবে তারা ছিলেন প্রচণ্ড দুর্দশা-কষ্টে আক্রান্ত। হাসান রাহিমাহুল্লাহ আরও বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, আল্লাহ তোমাদের ওপর যা কিছু হারাম করেছেন সে ব্যাপারে তোমরা যতটা অনাগ্রহী, আল্লাহ তাদের ওপর যা কিছু হালাল করেছেন সে ব্যাপারে তারা এর চাইতে অধিক অনাগ্রহী ছিলেন। তোমরা নিজেদের গোনাহের কারণে পাকড়াও হওয়ার ব্যাপারে যতটা ভীত, তারা তাদের থেকে নিজেদের নেক আমলগুলো কবুল হওয়ার ব্যাপারে এরচেয়ে অধিক ভীত ছিলেন।”

জান্নাত প্রার্থনা না করা
[২৩৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ লাভ করেছি এবং এমন কিছু মানুষের সাহচর্য পেয়েছি—যাদের অনেকে সারা জীবন এভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন যে, কখনো আল্লাহর প্রতি লজ্জাবশত তার কাছে জান্নাত চাননি।”

কোনো প্রার্থীকে খালি হাতে না ফেরানো
[২৩৬] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষদের যুগ লাভ করেছি, যারা কোনো প্রার্থীকে কিছু না দিয়ে ফেরাতেন না। তাদের কেউ বাইরে বেরোলে পরিবারের লোকদের আদেশ দিয়ে যেতেন, তারা যেন কোনো প্রার্থীকে খালি হাতে না ফেরায়।”

দুনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কহীনতা
[২৩৭] আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কারও ওপর দিয়ে সত্তর বছর সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও তারা পরিবারের জন্য খাবারের চাহিদাই অনুভব করতেন না। আমি এমন মানুষদের সাক্ষাৎ লাভ করেছি, যাদের ওপর দিয়ে সত্তর বছর সময় অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পরও তারা কোনো বালিশ গ্রহণ করতেন না। তাদের কেউ একমুঠো খাবার খেলে, তা যেন পেটে পাথর হয়ে থেকে যায়—এই কামনা করতেন।”

ইলম অন্বেষণকারীর চিত্র
[২৩৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “(আমাদের সময়ে) ইলম অন্বেষণকারী ব্যক্তি এমনভাবে বসবাস করত যে, ইলম অন্বেষণের চিত্র তার বিনয়ে, আদর্শে, জিহ্বায়, চোখে এবং নেক কাজসমূহে ফুটে উঠত।”

জমিনের ওপর নম্রভাবে বিচরণ করা
[২৩৯] ইয়াহইয়া ইবনু মূসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا “যারা জমিনের ওপর নম্রভাবে বিচরণ করে।”[২১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা হচ্ছে সহনশীলগণ।”
এবং فَإِنَّهُ كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا “যারা (আল্লাহর দিকে) বারবার ফিরে আসে, নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি অধিক ক্ষমাশীল।"[২২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যারা অন্তর এবং আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করে।”

মুসলিম ভাইয়ের ওপর আস্থা
[২৪০] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কেউ কেউ তার ভাইকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত নিজ পরিবারে দায়িত্বশীল হিসেবে রেখে যেত।”

একেবারেই সাদামাটা চালচলন
[২৪১] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এমন সব মানুষের দেখা পেয়েছি, যাদের কেউ কোনো সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে বসলে তারা মনে করত—তিনি একজন অক্ষম ব্যক্তি, অথচ তার কোনো অক্ষমতা ছিল না। বরং তিনি তো ছিলেন একজন মুসলিম ফকীহ। (কিন্তু তার চালচলন এতটাই সাদাসিধে ছিল যে, তাঁকে অক্ষম ব্যক্তির মতো মনে হতো)।”

ইলমে অর্জনের মর্যাদা
[২৪২] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি ইলমের অধ্যায়সমূহ থেকে কোনো অধ্যায় শুনে তা শিখে নেয় এবং তার ওপর আমল করে—এটা পুরো দুনিয়া তার হয়ে যাওয়া এবং তা আখিরাতের কাজে ব্যয় করার চাইতে অধিক উত্তম।”

কুকুরের জন্য খাবার ছুড়ে দেওয়া পরিতৃপ্ত অবস্থায় আহার করার চাইতে উত্তম
[২৪৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহকে বলতে শুনেছি—আল্লাহর কসম, আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের জন্য কখনো কাপড় গোটানো হয়নি। তাদের কখনো নিজের মাঝে এবং জমিনের মাঝে কোনো জিনিসকে অন্তরায় বানাননি। যাদের কেউ নিজ পরিবারে কোনো খাবার তৈরি করার আদেশ দেননি। তাদের কেউ খাবার খেলে কখনো এ অবস্থার উপক্রম হতো না যে, তাদের পরিতৃপ্তি আসবে। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কসম, কুকুরের জন্য খাবার ছুড়ে দেওয়া পরিতৃপ্ত অবস্থায় আহার করার চাইতে উত্তম।’”

মুসলমান ভাইয়ের হক আদায় করা
[২৪৪] ইমরান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি বলে ওঠে, আমি হাজ্জ করব, আমি হাজ্জ করব। অথচ তুমি তো (ফরজ) হাজ্জ করে ফেলেছ। সুতরাং (এখন অন্যান্য ফরজ দায়িত্ব যেমন :) আত্মীয়তার সম্পর্ক (এবং অন্যান্য দায়িত্ব) পালন করো। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ব্যক্তির দুশ্চিন্তা দূর করো। প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করো।”

খ্যাতির প্রতি অনীহা
[২৪৫] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “অনেক সময় এমন হতো যে, কোনো ফকীহ কিছু মানুষের সাথে বসে থাকা অবস্থায় কেউ কেউ ভাবত যে, তিনি অক্ষম। অথচ তার কোনো অক্ষমতা নেই; তার শুধু প্রসিদ্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতি অনাগ্রহ।”

দুটো দুআ
[২৪৬] সুফিয়ান ইবনু হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ এ দুটো বাক্য খুব বেশি পরিমাণে পাঠ করতেন,
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى حِلْمِكَ بَعْدَ عِلْمِكَ وَلَكَ الْحَمْدُ عَلَى عَفْوِكَ بَعْدَ قُدْرَتِكَ
'হে আল্লাহ, তোমার প্রশংসা—ইলম থাকার পরও সহনশীল আচরণ করার জন্য। তোমার প্রশংসা—কুদরত থাকার পরও ক্ষমা করার জন্য।”

সুরক্ষিত আমল হলো গোপন আমল
[২৪৭] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আমি এমন সব মানুষের সময়কাল লাভ করেছি, যাদের কেউ একান্ত আমল গোপন রাখতে না পারলে তবেই তা প্রকাশ করতেন। তারা জানতেন, শয়তান থেকে অধিক সুরক্ষিত আমল হলো গোপন আমল। তাদের কারও কাছে মেহমান থাকলে তারা গৃহের পেছনে গিয়ে সালাত পড়ে নিতেন, যা মেহমান টের পেত না।”

আলিমের মৃত্যু
[২৪৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আলিমের মৃত্যু ইসলামে একটি ছিদ্রসদৃশ। যত রাত-দিন আবর্তিত হবে কোনো জিনিসই আর সেই ছিদ্রকে বন্ধ করতে পারবে না।”

মৃত্যুর স্মরণ
[২৪৯] আতা আলা আজরাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি এক ব্যক্তিকে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে জিজ্ঞেস করতে শুনলাম, 'আপনি কেমন আছেন? আপনার কী অবস্থা?' তিনি জবাব দিলেন, 'সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। ওই ব্যক্তির আর কী অবস্থা হবে, যে মৃত্যুর অপেক্ষায় সকাল-সন্ধ্যা যাপন করে। অথচ সে জানে না, আল্লাহ তার সঙ্গে কী আচরণ করবেন। (তাকে জান্নাত দেবেন নাকি জাহান্নাম দেবেন।)

মুমিনের চিত্র
[২৫০] আবূ কাব আলা আজদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মুমিন দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো। সে নিজের অপমানে অস্থির হয় না, নিজের সম্মান দেখলেও প্রীত হয় না। সকল মানুষের থাকে এক ধরনের অবস্থা, আর তার থাকে আরেক ধরনের অবস্থা। তোমরা এ সকল অনর্থক বিষয় সে দিকেই সরিয়ে রাখো, আল্লাহ এগুলো যে দিকে সরিয়ে রেখেছেন।"

বান্দার হকের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব
[২৫১] ইমরান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিয়ামাতের দিন কিছু মানুষ পাহাড় পরিমাণ আমল নিয়ে উপস্থিত হবে। তারা যাদের ওপর জুলুম করেছে, সে সকল মাজলুমের জন্য তাদের থেকে আমল নেওয়া হতে থাকবে; অবশেষে তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে। ফলে তাদের প্যাঁচিয়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।"

উপদেশ প্রত্যাখ্যান
[২৫২] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনেক মানুষ এমন আছে যে, কোনো মজলিসে বসার পর শিক্ষণীয় বিষয় তার সামনে উদ্ভাসিত হয়, কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে। অবশেষে যদি (শিক্ষনীয় বিষয় যদি তার প্রবৃত্তির) অগ্রগামী হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করে, তাহলে মজলিস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।”

সম্পদ থাকার ক্ষতি
[২৫৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন সব মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি, যাদের কেউ হালাল পন্থায় ধন-সম্পদ অর্জন করতে চাইলে তা অর্জন করতে পারতেন। তাদের বলা হতো, আপনারা কি এই সম্পদের মধ্যে আপনাদের যে অংশ রয়েছে, তা নেবেন না? তাতে হালাল উপায়ে আপনারা তা অর্জন করতে পারতেন। তখন তারা বলতেন, না, আমাদের আশঙ্কা হয়, এই সম্পদ গ্রহণ আমাদের অন্তর বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণ হবে।”

আল্লাহর বিধানকে মর্যাদাবান রাখা
[২৫৪] আবূ কাব আলা আজদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “জনৈক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললেন, 'আমি সফর করতে চাই। সুতরাং আমাকে পাথেয় দান করুন।' তিনি বললেন, 'ভাতিজা, তুমি আল্লাহর বিধানকে সেসব ব্যাপারে মর্যাদাবান রেখো, যেসব ব্যাপারে আল্লাহ তা মর্যাদাবান রেখেছেন।”

তারা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষিত হতেন না
[২৫৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষদের দেখা পেয়েছি, তাদের কাছে দুনিয়ার যা-ই আসুক না কেন তারা এতে খুশি হতেন না। আর দুনিয়ার যা কিছুই তাদের হাতছাড়া হোক না কেন, তারা এতে হা-হুতাশ করতেন না।”

বাবা-মায়ের চেহারার দিকে তাকানো ইবাদাত
[২৫৬] আম্মার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, পুণ্য কী?' তিনি বললেন, '(ধন-সম্পদ) বিলিয়ে দেওয়া এবং কোমল হওয়া।' আমি বললাম, 'তাহলে অবাধ্যতা কী?' তিনি বললেন, 'দুটো থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং তা পরিত্যাগ করা।' তিনি বললেন, 'তুমি কি জানো না যে, তোমার বাবা-মা অথবা তোমার মায়ের চেহারার দিকে তাকানোও ইবাদাত?”

রাতের ইবাদাত সাহাবিগণের বৈশিষ্ট্য
[২৫৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ “তারা রাতের খুব কম অংশই শয়ন করত।”[২০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "তারা রাতের খুব কম অংশই শয়ন করত।” এবং وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ “আর তারা সাহরির সময় ক্ষমা প্রার্থনা করত।”[২১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, "তারা তাদের সালাতকে সাহরির সময় পর্যন্ত দীর্ঘ করত। এরপর তারা দুআ করত এবং কাকুতি-মিনতি করত।”

ঈমানের পরিচয়
[২৫৮] যাকারিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বলা হতো-ঈমান অলংকৃত হওয়ার নাম নয় এবং আকাঙ্ক্ষারও নাম নয়। ঈমান হলো ওই জিনিস, যা অন্তরে স্থির হয়ে বসে এবং আমল তার সত্যায়ন করে।"

কোন আমল সর্বোত্তম?
[২৫৯] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “লোকেরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে আলোচনা করল, কোন আমল সর্বোত্তম? তারা মনে মনে তাহাজ্জুদের সালাতের কথা ভাবছিল। আমি বললাম, হারাম ত্যাগ করা। এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'বিষয় পূর্ণ হয়ে গেছে। বিষয় পূর্ণ হয়ে গেছে।”

দ্বীনের পথে চালিতকারী কিংবা দেখার মতো দৃষ্টিশক্তি
[২৬০] সাবিত বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তখন তার উদ্দেশে এক অভাবী ব্যক্তি উঠে এল, যার চোখে সমস্যা ছিল। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা এমন ব্যক্তিকে সাদকা দাও-যার এমন কোনো চালক নেই যে তাকে চালাবে, আবার এমন চোখও নেই, যা তাকে পথ দেখাবে।' এরপর তিনি তার পেছনে থাকা তার এক প্রতিবেশী আবদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ-এর দিকে ইশারা করে বললেন, 'ইনি এই বাড়ির মালিক। তার পুরো পরিজনের মধ্যে এমন কোনো চালক নেই, যে তাকে কল্যাণের পথে চালিত করবে এবং তাকে কল্যাণকর্মের পরামর্শ দেবে। তার নিজেরও দৃষ্টিশক্তি নেই, যা দিয়ে সে দেখবে এবং উপকৃত হবে।”

ঈমানের দুর্বলতা
[২৬১] ইয়াস ইবনু আবী তামিমা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "আল্লাহর কসম, তোমাদের জন্য যদি আখিরাতকে উঠিয়ে নেওয়া হতো, তাহলে তোমরা ইনসাফ করতে না এবং (আল্লাহর দিকে) ঝুঁকতে না।”

সাধনার অসারতা
[২৬২] রাওহ ইবনুল কাসিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তার পরিবারের এক ব্যক্তি তাপস-জীবন যাপন করা শুরু করল। এমনকি সে বলে বসল, আমি খাবিসা। (কিংবা সে বলেছিল, ফালুদা) হালাল মনে করি না। কারণ, আমি তার কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি না।" [২৫]
রাওহ ইবনুল কাসিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলে আমি তার সামনে এ ঘটনা আলোচনা করলাম। তখন তিনি বললেন, 'এ তো নির্বোধ লোক। সে তো শীতল পানির কৃতজ্ঞতা প্রকাশেও সক্ষম নয়।”

মুসলিমের মর্যাদা
[২৬৩] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মাড়ির দাঁত উঠিয়ে দিলো। তখন তিনি তাকে এক দিরহাম দিলেন। লোকেরা বলল, তা অর্ধ দিরহামের বিনিময়। তিনি বললেন, 'তোমরা তাকে এক দিরহাম দিয়ে দাও। কারণ, কোনো মুসলিম অপর মুসলিমকে এক দিরহাম ভাগ করে দিতে পারে না।”

তিনি সাহাবিদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতেন
[২৬৪] আবূ ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখতেন।"

চার জিনিসের অনন্যতা
[২৬৫] কুলসুম ইবনু জাবর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “বসরা শহরে তাইমি রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'হাসানের ফিকহ, মুসলিম ইবনু ইয়াসার ইলম, ইবনু সিরিনের তাকওয়া এবং তালক ইবনু হাবিবের ইবাদাত (ঈর্ষা করার মতো।)”

কুপ্রবৃত্তির জঘন্যতা
[২৬৬] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “কুপ্রবৃত্তি হলো অন্তরের সঙ্গে সংমিশ্রিত সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যাধি।”

দূরত্ব বৃদ্ধি
[২৬৭] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “সালাত যখন অশ্লীলতা ও অন্যায় কর্ম থেকে বিরত না রাখবে, তখন তা শুধু (বান্দার থেকে আল্লাহর) দূরত্বই বৃদ্ধি করবে।”

দুটো নিআমাতের ব্যাপারে উদাসীনতা
[২৬৮] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “সুস্থতা ও অবসর এমন দুটো নিআমাত, যে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয় (অর্থাৎ এর যথাযথ ব্যবহার করে না।)।"

পোশাক মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে না
[২৬৯] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ্ প্রচুর পরিমাণে এ কথা বলতেন, “বাকরের তাইলাসান।”
একদিন হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “আপনি বাকরের তাইলাসানের [২৬] কথাটা খুব বেশি বলে ফেলেছেন। আমি বাকরকে তার তাইলাসানির মধ্যে যতটুকু ভয় করি, আপনাকে আপনার আবা’ -র মধ্যে তারচেয়ে অধিক ভয় করি।” [২৭]

খাবার নিয়ে আপত্তি না তোলা
[২৭০] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান এবং ফারকাদ সানজি কোনো এক ওলিমায় এক দস্তরখানের ওপর একত্র হলেন। তাদের সঙ্গে তখন একজন পেটুক লোক ছিল। ফলে অন্যান্য মানুষজন তাদের হাত গুটিয়ে নিল আর লোকটি খেতে থাকল। তখন ফারকাদ তাকে বললেন, 'হে অমুক, শুধু টুকরো আর টুকরো অন্য কোনো কাজকারবার নেই!' এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ ক্রোধান্বিত হলেন। তিনি তার দিকে ফিরে বললেন, 'কী ব্যাপার তোমার? আল্লাহ তোমাকে পাকড়াও করুন, বিপদাক্রান্ত করুন! তুমি একজন ব্যক্তিকে খাবার খেতে দিচ্ছ না! আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে—তুমি বলো, আমার ইচ্ছা হয়, ছাই যদি আমাদের জন্য খাদ্য হতো! আল্লাহ তোমার জন্য ছাইকেই খাদ্য বানিয়ে দিন।”

মুমিন এবং মুনাফিকের বিশ্বাসের পার্থক্য
[২৭১] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, কোনো বান্দা জাহান্নামকে সত্য বলে বিশ্বাস করলে ভূমি প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে যাবে (অর্থাৎ তাকে অধিক পরিমাণে কষ্টের মুখোমুখি হতে হবে)। পক্ষান্তরে মুনাফিক—আগুন যদি এই দেয়ালেরও পেছনে থাকে, সে তা সত্য বলে স্বীকার করবে না, যতক্ষণ না সে তাতে পতিত হয়।”

প্রত্যাশা এবং ভীতি মুমিনের দুই বাহন
[২৭২] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "প্রত্যাশা এবং ভীতি মুমিনের দুই বাহন।"

আলিমের শাস্তি
[২৭৩] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'আলিমের শাস্তি কী?' তিনি বললেন, 'অন্তরের মৃত্যু।' আমি বললাম, 'অন্তরের মৃত্যু কী?' তিনি বললেন, 'আখিরাতের আমলের দ্বারা দুনিয়া কামনা।"

দুনিয়ার পেছনে না পড়া
[২৭৪] জারির ইবনু হাজিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এমন মানুষদের দেখেছি, যাদের সামনে দুনিয়াকে হালালভাবে উপস্থাপন করা হলেও তারা তার পেছনে পড়তেন না। তারা বলতেন, আমরা জানি না, দুনিয়া পেয়ে আমাদের অবস্থা কী হবে! (আমি কি দুনিয়ার ফিতনায় নিপতিত হব, নাকি দুনিয়াকে উত্তম কাজে ব্যবহার করতে পারব।)”

সর্বোত্তম ইলমের বৈশিষ্ট্য
[২৭৫] রুবাইয়ি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সর্বোত্তম ইলম হলো তাকওয়া এবং তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা)।”

আকাশ ও পৃথিবীর আনুগত্য
[২৭৬] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, أَحْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا “তোমরা এসে যাও স্বেচ্ছায় কিংবা জোরপূর্বক।”[২৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যদি তারা তার অবাধ্য হতো, তাহলে তিনি তাদের এমন শাস্তি দিতেন, যার স্বাদ তারা অনুভব করত।”

শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়
[২৭৭] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى “যারা তাওবা করে, ঈমান আনে, নেক আমল করে, এরপর সঠিক পথে চলে, নিশ্চয়ই আমি তাদের জন্য ক্ষমাশীল।”[২৯]
এই আয়াত তিলাওয়াত করে হাসান রাহিমাহুল্লাহ নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, “হে নির্বোধ, আমি তোমার জন্য এখানে কোনো কিছু পাচ্ছি না। (না তুমি যথাযথ তাওবা করেছ, আর না নেক আমলের মাধ্যমে সঠিক পথে চলার চেষ্টা করছ।) ”

অতিথিকে যত্ন করা
[২৭৮] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুহাম্মাদ ইবনু সিরিন রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে তার দ্বীনি ভাইয়েরা আসত। তখন তিনি সবাইকে বলতেন, 'তোমরা খেয়ে নাও।' হাসান ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, খাবার ভাগ করে খাওয়াটাই অধিক উপযোগী।”
বর্ণনাকারী বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন আত্মগোপনে ছিলেন তখন আমরা তার কাছে গমন করতাম। তিনি খাবার পরিবেশন করতে বলতেন। তখন এক দল এসে প্রবেশ করত। এরপর আরেক দল আসত। তিনি আবার খাবার পরিবেশন করতে বলতেন।...? [৩০] তখন তিনি বলতেন, 'আল্লাহর কসম, তোমরা খাবে। আল্লাহর কসম, তোমরা খাবে।' এর কিছুক্ষণ পর আরেক সম্প্রদায় এলে তিনি পুনরায় খাবার পরিবেশন করতে বলতেন। দাসী তখন বলত, 'আমাদের কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।' তিনি তখন বলতেন, 'ছাতু নিয়ে আসো।”

গোনাহের ওপর মৃত্যু
[২৭৯] সালিহ ইবনু রুসতুম রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, وَأَحَاطَتْ بِهِ خَطِيئَتُهُ “এবং তার গোনাহ তাকে বেষ্টন করে ফেলেছে।” [৩১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “গোনাহের ওপর তার মৃত্যু হয়েছে।”

আমল কবুল না হওয়ার ভয়
[২৮০] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে দীর্ঘতর দুঃখী কাউকে দেখিনি। তিনি বলতেন, 'আমরা হাসি, অথচ হতে পারে যে, আল্লাহ আমাদের আমলের ব্যাপারে অবগত হয়ে বলে দিয়েছেন, আমি তোমাদের থেকে কোনো কিছুই কবুল করব না।”

ইবলীস কি ঘুমায়?
[২৮১] সাল্লাম ইবনু মিসকিন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'হে আবু সাঈদ, ইবলীস কি ঘুমায়?' তিনি বললেন, 'যদি সে ঘুমাত, তাহলে তো আমরা প্রশান্তি পেতাম।”

অহমিকা ধ্বংসের দিকে নিজে যায়
[২৮২] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আদম-সন্তানের প্রতিটা কথা যদি সত্য হতো এবং প্রতিটা কাজ সঠিক হতো, তাহলে সে পাগল হয়ে যেত।”
বর্ণনাকারী হাজাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি সাঈদ ইবনু আঈমান রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, 'তার কথা দ্বারা তিনি কী বোঝালেন?' তিনি বললেন, 'অর্থাৎ তাহলে মানুষ অহমিকায় ভুগত।”

হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কারামাত
[২৮৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, হে আবূ সাঈদ, আমি আপনাকে স্বপ্নে দেখেছি, আপনি কবিতা বলছেন। তিনি তখন সেই কবিতার অংশবিশেষ বলে উঠলেন,
وَأَيُّ الرِّجَالِ الْمُهَذَّبُ
'অতঃপর কোন ব্যক্তিটি বিনয়ী?”

মৃত্যুর আগে তাওবা
[২৮৪] আবূ আবাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ 'এরপর তারা কাছাকাছি সময়ে তাওবা করবে। [৩২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার আগে।”

অন্তরের কাঠিন্যের আরোগ্য
[২৮৫] মুয়াল্লা ইবনু ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলল, 'হে আবু সাঈদ, আমি আপনার কাছে আমার অন্তর কঠিন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করছি।' তিনি বললেন, 'অন্তর যাকে স্মরণ করে, তুমি তাকে তার নিকটবর্তী করো।"

ভক্তকুলের দেওয়া উপহার গ্রহণের ক্ষতি
[২৮৬] ইউনুস ইবনু উবাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তুমি মানুষের কাছে সম্মানিত থাকবে, মানুষ তোমাকে সম্মান দিতে থাকবে যতক্ষণ না তুমি তাদের হাতে যা কিছু আছে তা গ্রহণ করবে। যখন তুমি এটা করে ফেলবে, তখন তারা তোমাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে। তোমার আলোচনা অপছন্দ করবে এবং তোমাকে ঘৃণা করবে।”

অন্তরের অবস্থা
[২৮৭] উকবা ইবনু খালিদ আল-আবাদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই অন্তর মৃত্যুবরণ করে এবং জীবন্ত হয়। অন্তর যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তাকে ফরজ বিধানগুলোর প্রতি ধাবিত করো। আর যখন তা জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তাকে নফল ইবাদাতের মাধ্যমে শিষ্টাচার শেখাও।”

সত্যিকার ফকীহ-এর পরিচয়
[২৮৮] ইমরান আল-কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তিকে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বলতে শুনলাম-আমি এক ফকীহকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তখন তিনি (হাসান রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, 'তুমি কখনো কোনো ফকীহকে দেখেছ? ধিক তোমাকে! ফকীহ তো হলো ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, গোনাহের প্রতি লক্ষকারী, নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে সর্বদা অধ্যবসায়ী।”

পৃথিবী তো ধোঁকার রাজ্য!
[২৮৯] ইবরাহীম ইবনু হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "অনুগ্রহ লাভ করে কত মানুষ ধীরে ধীরে পাকড়াও হয়েছে! প্রশংসা পেয়ে কতজন মুফতি সেজেছে! অপরাধ আবৃত থাকায় কতজন প্রবঞ্চিত হয়েছে!”

হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য
[২৯০] মারজুক আল-আজালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমাকে আবু কাতাদা আদাওয়ি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তুমি এই শাইখকে—অর্থাৎ হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে—আঁকড়ে থাকো এবং তার থেকে ইলম গ্রহণ করো। আল্লাহর কসম, উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শিষ্টাচারের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যবান তার চাইতে আমি আর কাউকে দেখিনি।”

ফকীহ-এর গুণাবলি
[২৯১] ইমরান আল-কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে তাকে কিছু মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি সেগুলোর উত্তর দিলেন। তখন লোকটি বলল, 'হে আবূ সাঈদ, ফকীহরা তো এমন এমন বলে।' এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'তুমি নিজ চোখে কখনো কোনো ফকীহকে দেখেছ? ফকীহ তো ওই ব্যক্তি, যে দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, আখিরাতের ব্যাপারে আগ্রহী, গোনাহের প্রতি লক্ষকারী, নিজ প্রতিপালকের ইবাদাতে সর্বদা অধ্যবসায়ী।”

তাকওয়া কাপড়ে নয়
[২৯২] খালিদ ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি ফারকাদ সিবখি রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখলাম। তার পরনে তখন একটি পশমের জুব্বা ছিল। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার জুব্বা ধরে দুবার বা তিনবার বললেন, 'হে ইবনু ফারকাদ, তাকওয়া তো এ কাপড়ের মধ্যে নয়। তাকওয়া হলো তা, যা অন্তরে স্থির হয়ে আছে আর আমল ও কাজ তা সত্যায়ন করে।”

মৃত্যু বাহু প্রসারণকারী
[২৯৩] আবূ রাজা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلَّا تَحْوِيفًا “কেবল ভীতিপ্রদর্শনের জন্যই আমি নিদর্শন পাঠাই।”[৩৩] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মৃত্যু হলো বাহু প্রসারণকারী।”
[২৯৪] সাহল সিরাজ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَتَبَثَّلْ إِلَيْهِ تَبْتِيلًا “তুমি একাগ্রচিত্তে তার প্রতি নিমগ্ন হও।” এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি তার প্রতি পরিপূর্ণ একনিষ্ঠ হও।”

ইলমের প্রচার-প্রসার আলিমের দায়িত্ব
[২৯৫] শাইবান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বানুশ শিখখির গোত্রের একজনকে বললেন, 'হে বালক, আমাদের হাদীস বর্ণনা করে শোনাও।' তখন সে বলল, 'হে আবূ সাঈদ, নিশ্চয়ই আমরা এ স্তরে পৌঁছিনি।' এ কথা শুনে হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আমাদের কেই-বা এ স্তরে পৌঁছেছে? শয়তান কামনা করে, সে যদি এ ব্যাপারে সক্ষমতা লাভ করত![৩৪] আল্লাহর কসম, আল্লাহ যদি আলিমগণের ওপর দায়িত্ব বেঁধে না দিতেন, তাহলে আমরা মুখই খুলতাম না।”

ইলম শেখার গুরুত্ব
[২৯৬] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমার শিক্ষা করা ইলমের একটি পরিচ্ছেদ, আমার কাছে দুনিয়া ও দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু আছে, তার চাইতে উত্তম।”

ইলমের মাধ্যমে বিবেকের স্থায়িত্ব
[২৯৭] ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাজ্জের সময় ওয়াহহব ইবনু মুনাব্বিহ রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। তিনি আমাকে বললেন, 'হাসান ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে কি আপনার পরিচয় আছে?' আমি বললাম, 'হ্যাঁ।' ওয়াহহব রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আপনারা কি তার বিবেকের ব্যাপারে কোনো ধরনের আপত্তি করেছেন?' তিনি বললেন, 'না।' 'আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে অথবা বলেছেন, আমরা কিতাবে পেয়েছি, কোনো বান্দা ইলমপ্রাপ্ত হওয়ার পর যদি তা হিদায়াতের পথে তাকে পরিচালিত করে, তাহলে আল্লাহ কখনো তার বিবেককে কেড়ে নেন না।”

মুমিন পেট ভরে আহার করে না
[২৯৮] উকবা আর-রাসিবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। গিয়ে তাকে রুটি এবং গোশত আহাররত অবস্থায় পেলাম। তিনি বললেন, 'স্বাধীন ব্যক্তিদের খাবারে বসে পড়ো।' তখন আমি বললাম, 'আমি খেয়েছি। আর খেতে পারব না।' এ কথা শুনে তিনি বললেন, 'সুবহানাল্লাহ, মুমিন এভাবেও খায় যে, সে আর খেতে পারে না!”

মুমিন আল্লাহর থেকে উত্তম আদব গ্রহণ করেছে
[২৯৯] আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, “নিশ্চয়ই মুমিন আল্লাহর থেকে উত্তম আদব গ্রহণ করেন। যখন তিনি তাকে সচ্ছলতা দান করেন তখন সে-ও অন্যদের প্রতি সদয় হয়। আর যখন তিনি তার ওপর (দুনিয়া) সংকুচিত করেন, তখন সে-ও সংকুচিত করে।”

আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা
[৩০০] আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে দুনিয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে, তখন তুমি তার সঙ্গে আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করো।”

জাহান্নামীদের শাস্তি
[৩০১] মুহাম্মাদ ইবনু আব্বাদ মাক্কি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি ফুজাইল ইবনু ইয়াজ রাহিমাহুল্লাহ-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে দেখেছি:
كُلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنَاهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا
'যখনই তাদের চামড়াগুলো পুড়ে যাবে, তখনই আমি সেগুলোকে অন্য চামড়া দ্বারা পাল্টে দেবো।” [৩৫]
হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'আগুন তাকে সত্তর হাজার বার খাবে। যখনই তাকে খাবে এবং পুড়িয়ে ফেলবে, তখন তাদের বলা হবে, তোমরা আগের মতো হয়ে যাও। তখন তারা ঠিক যেমন ছিল, তেমন হয়ে যাবে।”

মুমিনের বিষণ্ণতা
[৩০২] আবূ মূসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মুমিনের কোনো গোনাহ হলে, জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে (গোনাহের শাস্তির আশঙ্কায়) বিষণ্ণ থাকে।”

বিশ্বাসের ছাপ কাজে প্রকাশ পায়
[৩০৩] হাশিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো বান্দা অধিক পরিমাণ মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে, এর ছাপ তার আমলে দেখা যায়। আর কোনো বান্দার প্রত্যাশা বৃদ্ধি পেলে সে মন্দ আমল করতে থাকে।”

শোক প্রকাশের আদর্শ পন্থা
[৩০৪] আসমা বিন আবদ রাহিমাহাল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মুসলমানদের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তির কাছে তার কোনো ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছলে সে বলে, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তন করব। আল্লাহর কসম, আমিই তো হতে পারতাম জান-কবজকৃত মানুষটি, আল্লাহ এর মাধ্যমে তার পরিশ্রম এবং অধ্যবসায়কে বৃদ্ধি করেন।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ এ কথাটি একাধিকবার বললেন— আল্লাহর কসম, সে এ অবস্থায় থাকে। অবশেষে বুদ্ধিমান হিসেবে তার মৃত্যু হয়।”

অনুসরণের মাপকাঠি
[৩০৫] আবূ আহমাদ জুবাইরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি-এমন ব্যক্তিকে অনুসরণ করা যাবে না, যার পরিবার রয়েছে, (আর নিজেকে সর্বদা পারিবারিক ঝামেলায় ব্যস্ত রেখেছে)।”
সারি ইবনু ইয়াহইয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বছরে আইয়ামে সাওম রাখতেন।” [৩৬] [৩৭]

শত্রুতা ও মিত্রতায় ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্ব
[৩০৬] ইয়াহইয়া ইবনু মুখতার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তোমরা অল্প ভালোবাসো। অল্প ঘৃণা করো। কারণ, কোনো এক সম্প্রদায় ভালোবাসার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করেছে, ফলে তারা ধ্বংস হয়েছে। আর কোনো সম্প্রদায় অপর কারও ঘৃণায় সীমালঙ্ঘন করেছে, ফলে তারাও ধ্বংস হয়েছে। তুমি ভালোবাসায় সীমালঙ্ঘন কোরো না এবং ঘৃণা পোষণেও সীমালঙ্ঘন কোরো না। (বরং মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো।)"

জাহান্নামের আজাবের বর্ণনা
[৩০৭] ইবনু উয়ায়না ইবনুল গুসন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, إِذِ الْأَغْلَالُ فِي أَعْنَاقِهِمْ وَالسَّلَاسِلُ يُسْحَبُونَ "যখন তাদের গলদেশে বেড়ি ও শেকল থাকবে। তাদের টেনে নিয়ে যাওয়া হবে।” [৩৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের অবগত করা হয়েছে, জাহান্নামবাসীদের গলদেশে বেড়ি এবং শেকল এ জন্য পরানো হয়নি যে, তারা আল্লাহ তাআলাকে অক্ষম করে দিয়েছে। কিন্তু যখন অগ্নিশিখা তাদের ভাসিয়ে ফেলবে, তখন আগুন তাদের স্থির করে দেবে।” এ কথা বলার পর হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে অজ্ঞান অবস্থায় সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হলো।

মৃত্যুর বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে মৃত্যুপ্রস্তুতি গ্রহণ করা
[৩০৮] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক ব্যক্তি তার (অসুস্থ) ভাইয়ের শুশ্রুষা করার জন্য উপস্থিত হলো। ঘটনাক্রমে তার (অসুস্থ ভাইয়ের) মৃত্যু হয়ে গেল। তখন মৃত্যুর বিভীষিকা এবং প্রাণত্যাগের ভয়াবহ দৃশ্য তার দৃষ্টিগোচর হলো। এরপর সে পরিবারের কাছে ফিরল। পরিবারের লোক তার সামনে দুপুরের খাবার পরিবেশন করল। তখন সে বলল, 'হে পরিজন, তোমাদের খাবার তোমরা খাও।' তারা বলল, 'হে অমুক, সহায়-সম্পদ?' জবাবে সে বলল, 'হে পরিজন, তোমাদের সহায়-সম্পদ তোমরা আঁকড়ে রাখো। আল্লাহর কসম, আমি এমন মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছি, যার জন্য আমি আমল করে যাব; যতক্ষণ না আমি তার সামনে উপস্থিত হই।"

দুপুরবেলার নিদ্রা
[৩০৯] আবূ সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বাজারের শোরগোল শুনে বললেন, "এরা কি দুপুরবেলা ঘুমায় না? আমি এদের রাতকে মন্দ রাতই মনে করি।"

মুদ্রার লোভ লাঞ্ছনা টেনে আনে
[৩১০] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর শপথ করে বলেন, "কেউ যদি দিরহামকে মর্যাদা দেয়, তো আল্লাহ তাকে লাঞ্ছিত করেন।"

পৃথিবী আপন গতিতে ছুটে চলছে
[৩১১] ওলীদ মিসমায়ি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, ছুরি ধার দেওয়া হচ্ছে, দুম্বাকে তৃণলতা খাওয়ানো হচ্ছে, আর চুলাকে উত্তপ্ত করা হচ্ছে।”

ধন-সম্পদ ব্যয়ের মূলনীতি
[৩১২] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে একটি জিজ্ঞাসা-প্রসঙ্গে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, একজন ব্যক্তি-আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেছেন, সে তা থেকে হাজ্জ করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে এবং দান করে—তার জন্য কি সেই সম্পদ অবলম্বন করে সুখী জীবনযাপন করার সুযোগ রয়েছে?' হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'না, সমগ্র দুনিয়াও যদি তার হয়ে যায়, তবুও তার জন্য কেবল যথেষ্ট পরিমাণ ভোগ করারই সুযোগ রয়েছে। আর এর অতিরিক্ত অংশ সে তার দারিদ্র্য এবং অভাবের দিনের জন্য অগ্রে প্রেরণ করে রাখবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিগণের মধ্য থেকে যারা ছিলেন তার একাগ্র অনুসারী এবং তাবিয়িগণের মধ্য থেকে যারা তাদের থেকে আদর্শ গ্রহণ করেছেন, তারা এই আশঙ্কায় প্রাসাদ এবং ধন-সম্পদ গ্রহণকে অপছন্দ করতেন, পাছে না তারা সেগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং তাদের পিঠ শক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাদের যে জীবনোপকরণ দান করেছেন, তারা তা থেকে কেবল পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্রহণ করতেন। আর তারা এর অতিরিক্ত অংশকে তাদের দারিদ্র্য এবং অভাবের দিনের জন্য অগ্রে প্রেরণ করে রাখতেন। এরপর তাদের দ্বীনি এবং দুনিয়াবি বিষয়ের প্রয়োজনাদি তাদের মধ্যে এবং আল্লাহ তাআলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত।"

আত্মপ্রবঞ্চিত হওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি
[৩১৩] আবূ আমির আল-খাররাজ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ এমন ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে (তার মজলিসে) মানুষের আধিক্য দেখে প্রবঞ্চিত হয়নি। হে আদম-সন্তান, তুমি একাকী মরবে। একাকী কবরে যাবে। একাকী পুনরুত্থিত হবে। একাকী হিসাবের সম্মুখীন হবে। হে আদম-সন্তান, তুমিই অভীষ্ট, তোমাকেই চাওয়া হচ্ছে।”

জিহ্বা নিয়ন্ত্রণে রাখা
[৩১৪] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তাঁরা বলতেন, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির জিহ্বা থাকে তার অন্তরের পেছনে। যখন সে কিছু বলতে চায়, তখন অন্তরের দ্বারস্থ হয়। যদি বিষয়টা তার জন্য উপকারী হয়, তাহলে সে তা বলে। আর যদি বিষয়টা ক্ষতিকর কিছু হয়, তাহলে সে বিরত থাকে। আর নিশ্চয় জাহিল ব্যক্তির অন্তর থাকে তার জিহ্বার প্রান্তে। সে তার অন্তরের দ্বারস্থ হয় না। তার জিহ্বায় যা আসে, সে তা-ই বলে বসে।"
আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ-এর বর্ণনায় এ কথাও এসেছে- “তাঁরা বলতেন, যে তার জিহ্বা নিয়ন্ত্রণ করে না, তার দ্বীনদারি বোধগম্য নয়।"

প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে দুজন ফেরেশতা রয়েছে
[৩১৫] জিয়াদ আবূ উমার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “প্রত্যেক মুমিন জানে তার সঙ্গে দুজন ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে, যারা তার কথা এবং কাজ সংরক্ষণ করে। সে তাদের সঙ্গে এমন চুক্তিতে আবদ্ধ যা তাকে রাতের পরিশ্রম দিনের পরিশ্রম থেকে এবং দিনের পরিশ্রম রাতের পরিশ্রম থেকে তাদের ফেরায় না।”

আল্লাহকে স্বল্পই স্মরণ করার অর্থ
[৩১৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَا يَذْكُرُونَ اللَّهَ إِلَّا قَلِيلًا "তারা আল্লাহকে স্বল্পই স্মরণ করে।” [৩৯] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তাদের স্মরণের পরিমাণ স্বল্প হয়েছে। কারণ, তা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য ছিল।"

ইবাদাতের মর্যাদা হালাল উপার্জনের চাইতে বেশি
[৩১৭] মুআল্লা ইবনু জিয়াদ আল-ফিরদাউসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'দুজন ব্যক্তি—এর মধ্যে একজন ইবাদাতের জন্য অবসর হলো, আর অপরজন পরিবারের জন্য উপার্জনের চেষ্টায় রত থাকল—তাদের মধ্যে কে উত্তম?' তিনি বললেন, 'যে ইবাদাতের জন্য অবসর হলো, সে উত্তম।"

শুধু জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে
[৩১৮] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “প্রকৃত ঈমান হলো ওই ব্যক্তির ঈমান, সে আল্লাহকে অদৃশ্যভাবে ভয় করে। যে তা-ই প্রত্যাশা করে, যা আল্লাহ প্রত্যাশা করেন। আর সে এমন সব জিনিস পরিত্যাগ করে, যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।” এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন: كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ “অনুরূপভাবে নিশ্চয় বান্দাদের মধ্য থেকে শুধু জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে।” [৪০]

মুমিনের কথা এবং কাজ সবই আল্লাহর জন্য
[৩১৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا “তিনি তো ওই সত্তা, যিনি রাত এবং দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন। এতে উপদেশ রয়েছে তাদের জন্য, যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায় কিংবা যারা কৃতজ্ঞ হতে চায়।”[৪১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি রাতে (আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে) পারল না, তার জন্য দিনে সন্তুষ্টি কামনা করার সুযোগ রয়েছে। আর যে ব্যক্তি দিনে পারল না, তার জন্য রাতে সন্তুষ্টি কামনা করার সুযোগ রয়েছে। বান্দা ততক্ষণ কল্যাণের মধ্যে থাকে যতক্ষণ সে যা বলে, আল্লাহর জন্য বলে এবং যত আমল করে, আল্লাহর জন্যই করে।”

আমলহীন আলোচকের আলোচনা উপকারী নয়
[৩২০] আবূ আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে প্রবেশ করলেন। তার সঙ্গে ছিলেন ফারকাদ রাহিমাহুল্লাহ। তারা এক মজলিসের পাশে বসলেন, যারা কথা বলছিল। তিনি তাদের কথা শোনার জন্য চুপ থাকলেন। এরপর ফারকাদ রাহিমাহুল্লাহ-এর দিকে ফিরে বললেন, 'হে ফারকাদ, আল্লাহর কসম, এরা হলো এমন সম্প্রদায় যারা ইবাদাতকে বিরক্তিকর মনে করেছে। তারা নিজেদের ওপর আমলের থেকে কথাকে সহজ পেয়েছে। তাদের তাকওয়া হ্রাস পেয়েছে। তাই তারা কথাবার্তায় লিপ্ত হয়েছে।”

দ্বীন নিয়ে চিন্তা-ফিকির করার ফযীলত
[৩২১] আলা ইবনু মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'সামান্য সময়ের (দ্বীন নিয়ে) চিন্তা-ভাবনা রাতভর সালাত আদায় অপেক্ষা উত্তম।"

আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
[৩২২] জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "কিছু মানুষ (আমলের) ধারাবাহিকতার গুরুত্বকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহর কসম, মুমিন তো সে নয়, যে এক মাস, দুমাস, এক বছর বা দু-বছর আমল করে। না, আল্লাহর কসম, আল্লাহ মৃত্যু ছাড়া মুমিনের আমল (সমাপ্ত করার) অন্য কোনো মেয়াদ রাখেননি।”

চূড়ান্ত বিদায়ের প্রস্তুতি
[৩২৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ সকাল এবং সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের তিনবার করে বলতেন—তোমাদের মধ্যে অবস্থানকাল স্বল্প।”

মুমিন এবং মুনাফিকের পার্থক্য
[৩২৪] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি মুমিনকে দেখবে মলিন আর মুনাফিককে দেখবে হাস্যোজ্জ্বল।”

দ্বীনের ব্যাপারে মনগড়া ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়
[৩২৫] আওফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তোমরা তোমাদের সিদ্ধান্ত এবং খেয়ালখুশিকে অভিযুক্ত করো। আর নিজেদের জীবন এবং দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহর কিতাবকে উপদেশ হিসেবে গ্রহণ করো।"

উত্তম খাবার
[৩২৬] ইয়াজিদ ইবনু ইবরাহীম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, উত্তম খাবার হলো সেই দু-ব্যক্তির খাবার, যাদের একজন নিজ হাতে কাজ করে (জীবিকা নির্বাহ করে)। আর অপরজন হলো সে, যে তার পিঠে বোঝা বহন করে (জীবিকা নির্বাহ করে)।”

প্রয়োজনাতিরিক্ত ভবন নির্মাণের শাস্তি
[৩২৭] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের জন্য যতটুকু যথেষ্ট তার চেয়ে অধিক ভবন বানায়, কিয়ামাতের দিন তার ওপর সাত তবক জমিন চাপিয়ে দেওয়া হবে।"

দুনিয়াত্যাগী বান্দা সর্বোত্তম
[৩২৮] রাওহ ইবনু সাওর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'দুজন ব্যক্তির একজন হালাল পন্থায় দুনিয়া অন্বেষণ করল, সে তা পেয়েও গেল। পাশাপাশি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করল এবং সম্পদের কিছু অংশ আখিরাতের জন্যও অগ্রে প্রেরণ করল। আর অপর ব্যক্তি (সম্পূর্ণরূপে এই) দুনিয়া বর্জন করল—এ দুজনের মধ্যে কে উত্তম?' তিনি বললেন, 'এ দুজনের মধ্যে আমার কাছে ওই ব্যক্তি প্রিয়, যে দুনিয়া বর্জন করেছে।”
তিনি (রাওহ ইবনু সাওর রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, “হে আবূ সাঈদ, একজন হালাল পন্থায় দুনিয়া অন্বেষণ করল, সে তা পেয়েও গেল। পাশাপাশি সে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করল এবং সম্পদের কিছু অংশ নিজের আখিরাতের জন্যও অগ্রে প্রেরণ করল (সে কি উত্তম নয়?)।” তিনি (হাসান রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, “এ দুজনের মধ্যে আমার কাছে ওই ব্যক্তি প্রিয়, যে দুনিয়া বর্জন করেছে।"

দুনিয়ায় মুমিনের অবস্থা
[৩২৯] আবূ কাব আবদু রাব্বিহি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, নিশ্চয়ই মুমিন দুনিয়ায় মুসাফিরের মতো। সে নিজের অপমানে অস্থির হয় না। তার সম্মান নিয়ে তার পরিবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় না। মানুষ তার ব্যাপারে স্বস্তিতে থাকে। আর সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ততার মধ্যে থাকে। সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য, যে উত্তম বস্তু উপার্জন করেছে এবং অতিরিক্ত জিনিস তার দারিদ্র্য এবং অসহায়ত্বের দিনের জন্য অগ্রে প্রেরণ করেছে। তোমরা এই শ্রেষ্ঠত্বকে সে দিকে অভিমুখী করো, যে দিকে আল্লাহ তা অভিমুখী করেছেন। এখানে তোমরা তাকে এমন কিছুর মধ্যে নিক্ষেপ কোরো না, যা তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

সালাতের সঙ্গে মুনাফিকের আচরণ
[৩৩০] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ "যারা লৌকিকতা করে।”[৪২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "যদি সে সালাত পড়ে, তাহলে লৌকিকতাস্বরূপ (লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে) পড়ে। আর যদি সে সালাত না পড়ে, তবে এতে কোনো পরোয়া করে না।"

সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নবোদ্ভাবিত বিষয়সমূহ
[৩৩১] ইবনু আবী শুরাআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তোমরা মুহাজিরদের তাদের শ্রেষ্ঠত্ব-সহকারে চিনে নাও এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। আর মানুষেরা নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে যা কিছু নতুন করে উদ্ভাবন করে, তোমরা সেগুলো থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নবোদ্ভাবিত বিষয়সমূহ।”

মজলিস চলাকালে শয়তানের ধোঁকা
[৩৩২] আবদুল কারীম ইবনু রাশীদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মজলিসে ছিলাম। তখন একজন লোক কাঁদতে লাগল। তার স্বর উঁচু হয়ে গেল। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'নিশ্চয় শয়তান এখন একে কাঁদাচ্ছে।”

কাজের মাধ্যমে উপদেশ দেওয়া
[৩৩৩] ইবনু আবী হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তুমি তোমার কাজের মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ দাও, তোমার কথার মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ দিয়ো না।”

খরচে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা
[৩৩৪] মুআল্লা ইবনু জিয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর নামে কসম করে বলেন-মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী ব্যক্তি কখনো নিঃস্ব হয়নি।”

তুমি কার জন্য দুনিয়া সঞ্চয় করছ?
[৩৩৫] হাইসাম রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ নিজ সঙ্গীদের উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে আদম-সন্তান, কতকাল পর্যন্ত এসব বলতে থাকবে-হে পরিবারের লোকেরা, আমাকে মধ্যাহ্নভোজ করাও? হে পরিবারের লোকেরা, আমাকে নৈশভোজ করাও? আল্লাহর কসম, শীঘ্রই তোমাকে মধ্যাহ্নভোজ করানো হবে। আল্লাহর কসম, শীঘ্রই তোমাকে নৈশভোজ করানো হবে। এ তো শুধুই খাওয়া, গলাধঃকরণ করা আর শর্তের পর শর্ত আরোপ করতে থাকা। গর্দভ, তুমি তোমার সম্পদ সঞ্চয় করছ এমন নারীর জন্য, যে তা নিয়ে অন্য স্বামীর ঘরে যাবে; অথবা এমন পুরুষের জন্য, যে তা নিয়ে তার স্ত্রীর কাছে গমন করবে? যদি তুমি তিন শ্রেণির মধ্যে সর্বোচ্চ ক্ষতির অধিকারী না হয়ে পারো, তাহলে তা-ই করো।” বর্ণনাকারী বলেন, “আমি হাসান রাহিমahullah-কে আরও বলতে শুনেছি, হে আদম-সন্তান, আমার সম্পদ! আমার সম্পদ! তোমার সম্পদের মধ্যে তুমি যা নিজে খেয়ে নিঃশেষ করেছ, যা পরে জীর্ণ করেছ কিংবা যা দান করে কার্যকর রেখেছ—শুধু এগুলো ছাড়া তোমার জন্য কি আর কোনো অংশ রয়েছে?”

মুসলিম ভ্রাতৃত্বের প্রকৃষ্ট নমুনা
[৩৩৬] মালিক দারি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু চার শ দীনার নিয়ে সেটাকে একটা থলের ভেতর রাখলেন। এরপর গোলামকে বললেন, 'তুমি এটা নিয়ে আবূ উবায়দা ইবনুল জাররাহ-এর কাছে যাও। এরপর তার ঘরে কিছুক্ষণ অবস্থান করো, যাতে তুমি লক্ষ করতে পারো, সে (এই দীনার দিয়ে) কী করে।' গোলাম তার কাছে গিয়ে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন আপনার উদ্দেশে বলেছেন, এই অর্থ আপনার প্রয়োজনমতো খরচ করুন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাকে ভালোবাসুন।' এবং তিনি বললেন, 'হে দাসী, তুমি এই সাত দীনার এবং এই পাঁচ দীনার নিয়ে অমুকের কাছে যাও, আর এই পাঁচ দীনার নিয়ে তমুকের কাছে যাও।' এভাবে তিনি পুরোটা বিলিয়ে দিলেন। গোলাম উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে তাকে অবগত করল। সে এসে দেখল, তিনি অনুরূপ অর্থ মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্যও প্রস্তুত করেছেন। তিনি বললেন, 'তুমি এটা নিয়ে মুয়াজ ইবনু জাবাল-এর কাছে নিয়ে যাও। এরপর তার ঘরে কিছুক্ষণ অবস্থান করো, যাতে তুমি দেখতে পারো, সে কী করে।' সে তা নিয়ে মুয়াজ ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে গিয়ে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন আপনার উদ্দেশে বলেছেন, এই অর্থ আপনার প্রয়োজনমতো ব্যয় করুন।' তখন তিনি বললেন, 'আল্লাহ তাকে ভালোবাসুন এবং তার প্রতি রহম করুন। হে দাসী, তুমি এদিকে আসো। তুমি এটা নিয়ে অমুকের ঘরে যাও।' তখন মুয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী ব্যাপারটা জেনে গেল। সে বলল, 'আল্লাহর কসম, আমরা তো নিঃস্ব। সুতরাং আপনি আমাদের দিন।' সে সময় বস্ত্রখণ্ডের ভেতর কেবল দুই দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। তিনি তার দিকে তা-ই ছুড়ে মারলেন। গোলাম উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে ফিরে তাকে অবগত করল। তিনি এসব শুনে আনন্দিত হলেন এবং বললেন, 'নিশ্চয় তারা পরস্পর ভাই ভাই। একজন অপরজনের সুহৃদ। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন।”

সত্যবাদী সঙ্গীর দৃষ্টান্ত
[৩৩৭] আসিম আহওয়াল সাদুস গোত্রের জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, আবূ মূসা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সত্যবাদী সঙ্গী আতর বিক্রেতার মতো। তা যদি তোমার গায়ে না-ও লাগে, তবুও নিজ সুগন্ধি দ্বারা সে তোমাকে সুরভিত করবে।”

যে কাঁদতে চায়, সে যেন কেঁদে নেয়
[৩৩৮] রাবিয়া ইবনু জাযান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ঈসা ইবনু জাযান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "মানুষের ওপর এমন কাল আসছে, যখন শয়তান মানুষের চোখে বসবাস করবে (ফলে মানুষ আল্লাহর ভয়ে কাঁদাকে তুচ্ছ মনে করবে)। সুতরাং যে কাঁদতে চায়, সে যেন এখনই কেঁদে নেয়...।"

মানুষের হিংসা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা
[৩৩৯] সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুহারিব ইবনু দিসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই এই আশঙ্কায় আমি নতুন কাপড় পরিধান থেকে বিরত থাকি যে, তা আমার প্রতিবেশীর মনে নতুন করে হিংসা সৃষ্টি করবে। ফলে সে মন্তব্য করবে, তার এই কাপড় আবার কোত্থেকে এল? (চুরিটুরি করল নাকি?)"

সাওমের কথা গোপন রাখা
[৩৪০] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি বিশর রাহিমাহুল্লাহ-এর স্বহস্তে লিখিত পত্রে পেয়েছি, তিনি বলেছেন, 'আমি মুয়াফি রাহিমাহুল্লাহ-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যে সাওম অবস্থায় তার (দ্বীনি) ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে এটা অপছন্দ করে যে, তার ভাইয়েরা তার সাওমের কথা জেনে যাক। আবার সে পছন্দ করে যে, তারা তার কাছে খাবার খাক। এর কোনটিতে শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে? তাদের খাবারের জন্য আহ্বান না করার মধ্যে?' তিনি বললেন, 'তাদের খাওয়ানো আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। সে যদি চায়, তাহলে সে যেন তাদের সঙ্গে অবস্থান করে এবং বলে—আমার খাওয়া হয়ে গেছে।"
সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'সে বলবে—আমি আগেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছি' এর দ্বারা কী বিগত দিনের দুপুর উদ্দেশ্য হবে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”

মাসে তিন দিন সাওম রাখার ফযীলত
[৩৪১] আবদুল্লাহ ইবনু শাকিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে খাবারের জন্য ডাকা হলো। তিনি বললেন, 'আমি সাওম রেখেছি।' দিন শেষে তাকে খেতে দেখা গেল। তখন তাকে বিষয়টি বলা হলে তিনি বললেন, 'আমি প্রতিমাসে তিন দিন সাওম রাখি। এটাই সিয়ামুদ দাহর (পুরো মাসের সাওম সমতুল্য)।”
আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি বিশর রাহিমাহুল্লাহ-এর পত্রে লিখিত পেয়েছি, তিনি বলেছেন, আমি এ ব্যাপারে ওয়াকি রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করেছি। তিনি বলেছেন, 'যখন সে সেই হাদীস উদ্দেশ্য নেবে যা তিন দিনের সাওমের ব্যাপারে এসেছে, তখন তুমি দেখবে তার জন্য এ কথা বলা যথেষ্ট হবে যে—আমি সাওম পালনকারী। অথচ বাস্তবে সে সাওম পালনকারী নয়।' তিনি বলেন, 'যখন সে নিয়তকে নিয়ন্ত্রণ রাখবে, তখন আর সমস্যা নেই।”
তিনি বলেন, “আমি মুআফি রাহিমাহুল্লাহ-কে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম, যে এমন মানুষজনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল, যারা পাশা খেলছিল। আপনি কী মনে করেন, সে কি তাদের সালাম দেবে? তিনি বললেন, 'না।' আমি বললাম, 'সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ তো বলতেন, সে সালাম দেবে এবং তাদের (হারام খেলা বাদ দেওয়ার ব্যাপারে) আদেশ করবে।' মুআফি রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'যদি আদেশ না করে, তবে সালাম দেবে না।”

কার সঙ্গে সম্প্রীতির বন্ধন রাখা সমীচীন নয়?
[৩৪২] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি বিশর রাহিমাহুল্লাহ-এর পত্রে লিখিত পেয়েছি, তিনি বলেছেন, 'আমি মুআফি রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করেছি, সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ কি এ কথা বলতেন—তুমি যে ব্যক্তির ব্যাপারে এই আশঙ্কা করবে যে, তার খাবার তোমার অন্তরকে অপবিত্র করে ফেলবে, তবে তার দাওয়াতে সাড়া দেবে না।' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।”

কল্যাণমূলক কথার ওপর আমল
[৩৪৩] আবূ খালিদ আহমার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আমর ইবনু কায়স মালায়ি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তুমি কোনো কল্যাণমূলক কাজের কথা শুনবে, তৎক্ষণাৎ তার ওপর আমল করে নেবে। অন্তত একবার হলেও তুমি তার ওপর আমলকারী হয়ে যাবে।”

আল্লাহর অবাধ্যতার কথা যারা শোনেনি কখনো
[৩৪৪] নূহ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আওন ইবনু শাদ্দাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা সূর্যাস্তের ভূমিতে এক শুভ্রোজ্জ্বল জমিন সৃষ্টি করেছেন। সূর্যের আলো হলো তার শুভ্রতা। তাতে এমন সম্প্রদায় রয়েছে, যারা জানেনি, কখনো আল্লাহর অবাধ্যতা হয়েছে।”

অহমিকা ইবাদাত বিনষ্ট করে দেয়
[৩৪৫] হারিস ইবনু নাবহান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনলাম, 'হায় সঙ্গী! আমার সঙ্গীরা চলে গেছে।' আমি বললাম, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। এমন কিছু যুবক কি গড়ে ওঠেনি, যারা কুরআন পড়ে, রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করে, দিনে সাওম রাখে, হাজ্জ করে এবং জিহাদ করে?' তিনি তখন থুতু ফেললেন। এরপর বললেন, 'অহমিকা তাদের নষ্ট করে দিয়েছে।"

আখিরাতের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া
[৩৪৬] মুরজি ইবনু ওয়াদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আইয়ুব ইবনু ওয়িল রাসিবি বলেন, হে প্রত্যাশা সৃষ্টিকারী, তুমি দুনিয়ার ব্যাপারে যত্নবান হোয়ো না। তুমি আখিরাতের ব্যাপারে যত্নবান হও। কারণ, তোমার সঙ্গীদের মধ্যে একজন এমন ছিল, যাকে ভীষণ প্রয়োজন আক্রান্ত করেছিল। এক রাতে সে বের হলো। তখন আকাশ থেকে তার ওপর একটা দিরহামের থলে নিক্ষেপ করা হলো। তা তার কাঁধের ওপর পড়ল। সে দীর্ঘকাল তা থেকে খরচ করে যাচ্ছিল। এমনকি কখনো কখনো সে (এত অলসতা প্রদর্শন করেছিল যে) বিছানায় এপিঠ-ওপিঠ করে করে পার্শ্ব ব্যথা করে ফেলছিল।"

আল্লাহওয়ালাদের দারিদ্র্যপীড়িত অবস্থা
[৩৪৭] তালিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি ইয়াজিদ জববি রাহিমাহুল্লাহ-কে মোটা রুটি এবং লবণ খেতে দেখলাম। আমি এ নিয়ে তাকে বললে তিনি জবাব দিলেন, হে আমার ইলাহ, আমি আপনার উদ্দেশে প্রশংসা করছি। কারণ, আমার কাছে আপনার এরূপ এরূপ নিআমাত এসেছে। এ ছাড়া আমার তো আর কোনো খাবার নেই।"

ঋণ পরিশোধে দুশ্চিন্তা
[৩৪৮] তালিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইয়াজিদ জববি রাহিমাহুল্লাহ একদিন তার ওয়াজ শেষ করে আমাকে দেখতে পেলেন। তখন তিনি বললেন, 'হে আবদুল্লাহ, কেমন দিন যাপন করলে? কী ব্যাপার, আমি তোমাকে দুঃখিত দেখছি কেন?' আমি বললাম, 'আমার ওপর অবধারিত ঋণের কারণে।' তিনি বললেন, 'ঋণের পরিমাণ কত?' আমি বললাম, 'পঞ্চাশ দিরহাম।' তিনি বললেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আমি তোমার প্রশংসা করি। (আবদুল্লাহ) যদি তোমার ভাইয়ের কাছে অর্থ থাকত, তাহলে সে তোমার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দিত।' এরপর তিনি বললেন, 'তুমি পঞ্চাশ দিরহাম নিয়েই দুঃখিত হচ্ছ, অথচ আমার ওপর ঋণ রয়েছে দু-হাজার দিরহাম; যা পরিশোধের আপাতত কোনো পথ নেই।' তাকে বলা হলো, 'হে আবূ মাউদুদ, আশা করা যায় কি, তা আপনার জন্য উত্তম হবে?' তিনি বললেন, 'কীভাবে?' আমি বললাম, 'কারণ, তা আপনার প্রচণ্ড দুঃখ এবং অধিক কাকুতি-মিনতির জন্য কারণ হচ্ছে।' তিনি বললেন, 'আমি আশা করি।' এরপর ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ মারা গেলেন। তার মৃত্যুর পর তার পক্ষ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া হলো।”

প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য বিজয়ের সুসংবাদ
[৩৪৯] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমার উম্মাহর দ্বারা জমিনের প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য বিজিত হবে। জেনে রেখো, উম্মাহর পাশ্চাত্য গভর্নররা জাহান্নামে যাবে। তবে যে আল্লাহকে ভয় করে এবং আমানত আদায় করে, তার বিষয় ভিন্ন।”

আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি এবং ক্রোধের নিদর্শন
[৩৫০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মূসা ইবনু ইমরান আলাইহিস সালাম বলেন, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি ঊর্ধ্বাকাশে আর আমরা পৃথিবীতে। তো আপনার সন্তুষ্টির নিদর্শন কী এবং আপনার ক্রোধের নিদর্শন কী?' তিনি (আল্লাহ) বললেন, 'যখন আমি তোমাদের ওপর তোমাদের উত্তম ব্যক্তিদের প্রশাসক নিযুক্ত করি, তা হয় আমার সন্তুষ্টির নিদর্শন। আর যখন আমি তোমাদের ওপর তোমাদের নিকৃষ্ট ব্যক্তিদের প্রশাসক নিযুক্ত করি, তা হয় আমার ক্রোধের নিদর্শন।”

এক ব্যক্তির ঘটনা
[৩৫১] আবূ আবদির রহমান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "আবদুল্লাহ ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এক ব্যক্তি এল। তখন তার ব্যাপারে তাকে বলা হলো, তিনি তো...। তিনি তো...। এসব শুনে তিনি তার দিকে তাকালেন। এরপর নীরব থাকলেন। তারপর ওই ব্যক্তি চলে গেল। সে যাওয়ার পর তাকে বলা হলো, এই ব্যক্তির অবস্থা হলো..., তার অবস্থা হলো...। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা যেমন বললে, সে যদি তেমন যাহিদ-ই (দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী) হয়ে থাকে, তাহলে সে আমার কাছে কী করে?"

উত্তম কথা বলা
[৩৫২] সুফিয়ান ইবনু উয়ায়না রাহিমাহুল্লাহ জনৈক বসরি শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আল্লাহ এমন বান্দার প্রতি রহম করুন-যে (ভালো কথা) বলে, ফলে সাফল্য লাভ করে; কিংবা (মন্দ বলা থেকে) নীরব থাকে, ফলে নিরাপদ থাকে।”

মৃত্যু বাহু প্রসারণকারী
[৩৫৩] আবূ রাজা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلَّا تَخْوِيفًا “কেবল ভীতিপ্রদর্শনের জন্যই আমি নিদর্শন পাঠাই।"[৪৩] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মৃত্যু হলো বাহু প্রসারণকারী।”

অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিআমাত
[৩৫৪] ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ব্যথার কথা আলোচনা করা হলে তিনি বলেন, “আল্লাহর কসম, তা কি মুমিনের সহজতম আনন্দের দিন নয়? তা তো এমন দিন, যখন তার মৃত্যু নিকটবর্তী করা হয়েছে, সে তার পুনরুত্থানের যে ব্যাপার ভুলে গিয়েছিল, তা স্মরণ করেছে, ফলে এর মাধ্যমে তার পাপরাশি মোচন করা হয়েছে।”

মুমিন গোনাহের ব্যাপারে জান্নাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভীত থাকে
[৩৫৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই (মুমিন) ব্যক্তি কৃত গোনাহের কথা ভুলে যায় না। জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত সে তার (গোনাহের) ব্যাপারে ভীত থাকে।"

রহমানের বান্দাদের একটি বৈশিষ্ট্য
[৩৫৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا “রহমানের বান্দা তারা, যারা জমিনে নম্রভাবে বিচরণ করে।”[৪৪] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা সহনশীল, তাই ভুলে যায় না। আর যদি ভুলেও যায়, তাহলে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়।"

হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর দান
[৩৫৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর ব্যাপারে বলেন, “যখন তার ভাতা আসত তখন তিনি অমুকের পরিবারের জন্য, তমুকের পরিবারের জন্য হাত খুলে বিতরণ করতেন; যতক্ষণ না তার ছেলে তাকে বলত যে, আপনারও পরিজন রয়েছে। (তার ছেলের কথা শোনার পর) তিনি যা অবশিষ্ট থাকত, তা তাদের জন্য ছুঁড়ে দিতেন।"

হকের ওপর চলতে পারে শুধুই বিশ্বাসীরা
[৩৫৮] মাতার ওয়াররাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এসে বললাম, হে আবূ সাঈদ, আল্লাহর কসম, আমি আপনার কাছে এসেছি। কিন্তু মনে হচ্ছিল যে, পায়ের নিচে কাদামাটির এবং মাথার ওপর ক্লান্তিকর বোঝার ভারের কারণে আমি আপনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব। হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে মাতার, নিশ্চয়ই এই হক ভারী। তা মানুষকে পরিশ্রান্ত করে রেখেছে এবং তাদের মাঝে ও তাদের অধিকাংশ কুপ্রবৃত্তির মাঝে অন্তরায় হয়ে থেকেছে। আল্লাহর কসম, এই হকের ওপর শুধু সে-ই চলতে পারে, যে তার শ্রেষ্ঠত্ব জেনেছে এবং তার পরিণাম প্রত্যাশা করেছে।”

মৃত্যু নিকটবর্তী
[৩৫৯] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবু সাঈদ, আপনি কি আপনার কাপড় ধৌত করবেন না?' তিনি বললেন, 'আমি (চূড়ান্ত) বিষয় (মৃত্যু) কে এর চাইতেও নিকটবর্তী মনে করি।”

সময়ের মৃত্যু জীবনের মৃত্যু
[৩৬০] আলি ইবনু সাবিত রাহিমাহুল্লাহ খোরাসানের জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "হে আদম-সন্তান, তুমি তো কতক দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন চলে গেল, তখন তোমার একটি অংশ চলে গেল।”

অল্পেতুষ্টি আল্লাহর বিশেষ দান
[৩৬১] আলি ইবনু সাবিত রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বলেন, فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً “আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব।”[৪৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি তাকে দান করব অল্পেতুষ্টি। (অর্থাৎ সে অল্পতেই তুষ্ট থাকবে)।”

লেনদেনের ব্যাপারে সতর্কতা
[৩৬২] মানসুর রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন (তার কওমের সাথে) সফরে বেরোতেন এবং লোকেরা তাদের খরচের অর্থ বের করত, সাথে সাথে তিনিও তারা যে পরিমাণ খরচ করে, তার অনুরূপ অর্থ বের করতেন। এরপর তিনি খরচকারীর কাছে তাদের যা দিয়েছিলেন, এ ছাড়াও আলাদা কিছু অর্থ দিয়ে দিতেন।”

মিথ্যা হলো নিফাকের সমন্বায়ক
[৩৬৩] আবদুল্লাহ বিন আইজার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মিথ্যা হলো নিফাকের সমন্বায়ক।”

আমল বিনষ্টকারী বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা
[৩৬৪] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একজন ব্যক্তি যতক্ষণ আমল বিনষ্টকারী বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে, (ততক্ষণ) সে কল্যাণের মধ্যে থাকে”
ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তাদের মধ্যে কিছু মানুষ এমন, যাদের ওপর কুপ্রবৃত্তি বিজয় লাভ করে। আর কিছু মানুষ হলো এমন, যারা মনে করে যে তারা সত্যের ওপর রয়েছে।”

ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য
[৩৬৫] সুফিয়ান সাওরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালামা ইবনু কুহাইল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আতা, তাউস এবং মুজাহিদ রাহিমাহুমুল্লাহ—এ তিনজন ছাড়া আমি এমন কাউকে দেখিনি, যে তার ইলমের মাধ্যমে সেরেফ আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করে।”

মুমিনের সময় কাটে চিন্তান্বিত অন্তরে
[৩৬৬] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই মুমিন চিন্তিত অবস্থায় ভোর করে এবং চিন্তিত অবস্থায়ই সন্ধ্যা যাপন করে।”
ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর অবস্থা এমন ছিল, তুমি যখনই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করো, মনে হবে তিনি একজন বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তি।”

উচ্চৈঃস্বরে হাসি একধরনের উদাসীনতা
[৩৬৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনের উচ্চৈঃস্বরের হাসি একধরনের উদাসীনতা।”

মুমিন ভীতির সঙ্গে দিনাতিপাত করে
[৩৬৮] সুফিয়ান ইবনু সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই মুমিন ভীত অবস্থায় ভোর করে। তার জন্য এ ছাড়া অন্য কিছু সংগতও নয়। কারণ, সে দু-ধরনের গোনাহের মধ্যে রয়েছে-অতীতে কৃত গোনাহ, যে ব্যাপারে সে জানে না, আল্লাহ তার সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন। আর ভবিষ্যতে সংঘটিত অপরাপর গোনাহ-যে ব্যাপারে সে জানে না, তার পক্ষে কী ফায়সালা হয়ে আছে।”

মুমিনের কিছু বৈশিষ্ট্য
[৩৬৯] ইয়াজিদ ইবনু তাওবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে নিজ প্রতিপালককে চিনল, সে তাকে ভালোবাসল। যে দুনিয়ার স্বরূপ প্রত্যক্ষ করেছে, সে তার ব্যাপারে নির্মোহ থেকেছে। মুমিন কখনো উদাসীন হয় না যে, শেষাবধি সে গাফিলে পরিণত হবে। যখন সে চিন্তা করে, তখন সে (নিজের বদ আমলের কথা স্মরণ করে) দুঃখিত হয়।”

হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর ওসিয়ত
[৩৭০] আবু উবায়দা নাজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর অসুস্থতার সময় তার শুশ্রূষার উদ্দেশ্যে তার কাছে গেলাম। তিনি বললেন, 'তোমাদের স্বাগতম ও অভিনন্দন। আল্লাহ তোমাদের শান্তির জীবন দান করুন। আমাদের এবং তোমাদের শান্তির আবাসস্থলে অবতরণ করুন। এটা প্রকাশ্য পুণ্য। যদি তোমরা সবর করো এবং সত্যবাদী হও, আমি কসম করছি, তাহলে এই হাদীসের ব্যাপারে তোমাদের হিস্যা শুধু এই হবে না যে, তোমরা তা এ কান দিয়ে শুনবে, তারপর তা কান থেকেই বেরিয়ে যাবে। কারণ, যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে দেখল, সে তো প্রত্যুষে আগমনকারী এবং বিকেলে আগমনকারী সত্তাকেই দেখল। কোনো ইটের ওপর ইট রাখা হয়নি। কোনো বাঁশের ওপর বাঁশ রাখা হয়নি। কিন্তু তার জন্য পতাকা উঁচু করা হয়েছে।' এরপর তিনি নিজের দিকে অভিমুখী হয়ে বললেন, 'ওহি, ওহি। এরপর মুক্তি, এরপর মুক্তি। তোমরা কীসের ওপর অবস্থান করছ? কাবার রবের শপথ, তোমরা এসেছ। যেন তোমরা এবং (চূড়ান্ত) বিষয় একই সঙ্গে ঘটবে।”

গোনাহ পরিত্যাগ করা
[৩৭১] হাসান ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, গোনাহ পরিত্যাগ করা তাওবা অন্বেষণ করার চাইতে অধিক সহজ।”

বিনয়ের পরিচয়
[৩৭২] হিশাম ইবনু হাসসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “মানুষেরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে বিনয় প্রসঙ্গে আলোচনা করল। তিনি তখন নীরব ছিলেন। এ প্রসঙ্গে যখন তারা অধিক পরিমাণ কথাবার্তা বলে ফেলল তখন তিনি তাদের বললেন, 'আমি দেখছি, তোমরা বিনয় প্রসঙ্গে অধিক পরিমাণ কথাবার্তা বলে ফেলেছ।' তারা বলল, 'হে আবূ সাঈদ, বিনয় কী?' তিনি বললেন, '(বিনয় হলো) একজন বান্দা ঘর থেকে বের হওয়ার পর যে মুসলিমের সঙ্গেই তার সাক্ষাৎ হয়, সে মনে করে, ওই ব্যক্তি তার থেকে উত্তম।”

ফকীহ-এর পরিচয়
[৩৭৩] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে একটি মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে ফতোয়া দিলেন। সে বলল, 'হে আবূ সাঈদ, ফকীহ কে?' তিনি বললেন, 'যে দুনিয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহী, আখিরাতের ব্যাপারে আগ্রহী, দ্বীনের ব্যাপারে চক্ষুষ্মান, ইবাদাতে অধ্যবসায়ী। তিনিই ফকীহ।”

মানুষের প্রত্যাশা
[৩৭৪] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মানুষ জ্বরের প্রতিদানে অতীতে কৃত সব গোনাহের কাফফারা প্রত্যাশা করে।”

মন্দ সঙ্গীর দ্বারা প্রবঞ্চিত হওয়া
[৩৭৫] আবূ উবায়দা আবদুল মুমিন ইবনু উবায়দিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনেক অধ্যবসায়ী অনুগত বান্দা বাতিলের ভেতর স্থানচ্যুত হয়। সে এমন জিনিসের জন্য অধ্যবসায় করতে থাকে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। আবার মন্দ সঙ্গীর দ্বারা অনেকে প্রবঞ্চিত হয়।”

সর্বদা স্ত্রীর আনুগত্যের ভয়াবহতা
[৩৭৬] হাওশাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, কোনো ব্যক্তি (সর্বদা) তার স্ত্রীর আনুগত্য করতে থাকলে আল্লাহ তাকে অধোমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।”

নিয়ত আমলের চাইতে অধিক কার্যকরী
[৩৭৭] আবূ উবায়দা আবদুল মুমিন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিয়ত আমলের চাইতে অধিক কার্যকরী।”

সারা রাত কেঁদে কাটালেন
[৩৭৮] আলি ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ এক রাতে আমাদের কাছে থাকলেন। তিনি সারা রাত কেঁদে কাটালেন। সকাল হলে আমি বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, আপনি তো গত রাতে আমাদের পরিবারের সবাইকে কাঁদিয়েছেন।' তিনি বললেন, 'হে আলি, আমি রাতে নিজেকে সম্বোধন করে বলেছি-হে হাসান, আল্লাহ হয়তো তোমার কোনো দুর্দশার দিকে তাকিয়ে বলেছেন, তুমি যা ইচ্ছা করো। আমি তোমার থেকে আর কিছুই গ্রহণ করব না। (অর্থাৎ কোনো নেক আমলই কবুল করব না।)”

মুমিনের আচরণ
[৩৭৯] খালিদ ইবনু রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিন যখন কোনো প্রয়োজন অনুসন্ধান করে, যদি তা তার জন্য সহজ হয়, তবে সে আল্লাহর পক্ষ থেকে সহজ পন্থায় তা গ্রহণ করে নেয় এবং তার ওপর আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যদি সহজ না হয়, তাহলে সে তা ছেড়ে দেয় এবং নিজেকে তার অনুগামী করে না।”

সাজদারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়া
[৩৮০] সাল্লাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বান্দা যখন সাজদারত অবস্থায় ঘুমায়, তখন আল্লাহ তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে গর্ব করেন। তিনি বলেন—আমার বান্দাকে দেখো, সে আমার ইবাদাত করছে। আর তার রুহ আমার কাছে, আর সে সাজদারত অবস্থায় রয়েছে।”

হতভাগারা মৃত
[৩৮১] আসিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে ইতঃপূর্বে এ কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুনেছি,
لَيْسَ مَنْ مَاتَ فَاسْتَرَاحَ بِمَيِّتٍ ... إِنَّمَا الْمَيِّتُ مَيِّتُ الْأَحْيَاءِ
'যে মৃত্যুবরণ করে বিশ্রাম লাভ করল, সে তো মৃত নয়। জীবিতদের মধ্যে যে মৃত, মৃত তো সে-ই হয়।'
এরপর তিনি বললেন, “আল্লাহর কসম, কবি সত্য বলেছে। সে ব্যক্তি হয় জীবিত শরীর আর মৃত অন্তরের অধিকারী।”

মাবাদ জুহানির স্বীকৃতি
[৩৮২] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার সঙ্গে মাবাদ জুহানির দেখা হলো। আমি তখন বাহনের পিঠে আরোহী ছিলাম, তিনিও তখন বাহনের পিঠে আরোহী ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে মালিক, আমি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করেছি। অনেক মানুষ দেখেছি। আমি হাসান ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মতো আর কাউকে দেখিনি। হায়, আমি যদি তার আনুগত্য করতাম! হায়, আমি যদি তার আনুগত্য করতাম!”

মুমিনের স্বভাব
[৩৮৩] সাঈদ জারিরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, ব্যক্তি পাপ করে, এরপর তাওবা করে, এরপর পাপ করে, এরপর তাওবা করে, এরপর পাপ করে, এরপর তাওবা করে, এরপর পাপ করে, এরপর তাওবা করে। এভাবে কতকাল পর্যন্ত?' তিনি বললেন, 'আমি এমন অবস্থা মুমিনের স্বভাব হিসেবেই জানি।”

তাওবাকৃত গোনাহের কারণে লজ্জা না দেওয়া
[৩৮৪] সালিহ মিররি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, আমাদের কাছে এ মর্মে হাদীস বর্ণনা করা হতো— যে ব্যক্তি তার ভাইকে এমন গোনাহের কারণে লজ্জা দেয় যা থেকে সে তাওবা করেছে, আল্লাহ তাকে সে গোনাহে আক্রান্ত করেন।"

ধনীদের কাছে গমনের ব্যাপারে নির্দেশনা
[৩৮৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিন ব্যক্তি কোনো স্থানে গমন করে, কোনো মজলিসে বসে, কোনো খাবার খায়—এসব কিছুর প্রভাবে তার অন্তর পরিবর্তিত হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা ধনীদের কাছে গমন করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, তাদের কাছে গমন করা মুমিন ব্যক্তির অন্তর পরিবর্তন করে দেয়। তখন সে নিজের কাছে থাকা নিআমাতের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হয়ে যায়।”

নিকৃষ্ট কাজ
[৩৮৬] আমাশ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “উত্তম কাজ হলো একটি স্বভাব আর নিকৃষ্ট কাজ হলো গোয়ার্তুমি।”

মুমিন আল্লাহর স্মরণে বিভোর থাকে
[৩৮৭] জারির ইবনু হাজিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে ছিলাম। তখন তার পুত্র বলল, 'আপনারা বয়স্ক ব্যক্তির সাহায্য করুন। তিনি এখনো খাননি; অথচ অর্ধদিবস হয়ে গেছে।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ তখন তাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'চুপ করো। তাদের ছেড়ে দাও। আল্লাহর কসম, মুসলিম তার ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, এরপর তারা দুজন আলোচনা করতে থাকে এবং মহান প্রতিপালককে স্মরণ করতে থাকে; যতক্ষণ না দ্বিপ্রহরের নিদ্রা তাদের বাধাগ্রস্ত করে।"
রাবিয়া ইবনু কুলসুম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গমন করলাম। তিনি তখন তার দাঁতের অনুযোগ করছিলেন। তিনি বলছিলেন :
رَبِّ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
'হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে। আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু।'” [৪৬]
ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কসম, তোমরা সবর করবে, নতুবা ধ্বংস হবে। আল্লাহর কসম, নিশ্চয়ই তিনি সুকঠিন শাস্তিদাতা।”

নিজ অন্তরের ব্যাপারে মুমিনের অবস্থা
[৩৮৮] কুররা ইবনু খালিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ الدَّوَّامَةِ “আর আমি নিন্দাকারী অন্তরের শপথ করছি।” [৪৭] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই তুমি দেখবে, মুমিন তার অন্তরের নিন্দা করে। সে বলে, আমি আমার কথার দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিলাম। সে বলে, আমি আমার খাবারের দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিলাম। আমি আমার পরিকল্পনার দ্বারা কী উদ্দেশ্য নিলাম। তুমি তাকে দেখবে, সে ভর্ৎসনা করেই যাচ্ছে। আর পাপাচারী ব্যক্তি সম্মুখেই এগিয়ে যেতে থাকে। তাই সে অন্তরের নিন্দা করে না।"

বিশ্বাসই মুক্তির সোপান
[৩৮৯] জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ এবং তার রাসূল সত্য বলেছেন। বিশ্বাসের মাধ্যমে জান্নাত কামনা করা হয়েছে। বিশ্বাসের মাধ্যমে জাহান্নام থেকে পলায়ন করা হয়েছে। বিশ্বাসের মাধ্যমে সত্যের ওপর ধৈর্যধারণ করা হয়েছে। আর আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে প্রচুর কল্যাণ রয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি দেখেছি, নিরাপত্তার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে স্তরবিন্যাস রয়েছে। তবে যখন বিপদ অবতীর্ণ হয় তখন সকলে সমান হয়ে যায়।”

আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনরত চোখ
[৩৯০] আলা ইবনুল মুসাইয়িব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে হাসান, এমন চোখ, যা রাতের গভীরে আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে! (সে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে।)”

মুমিনের ভেতর ও বাহির
[৩৯১] আওফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম- সন্তান, তোমার রয়েছে কথা ও কাজ, গোপন ও প্রকাশ্য। তোমার কাজ কথার চাইতে তোমার জন্য অধিকতর অনুকূল। আর তোমার গোপন অবস্থা প্রকাশ্য অবস্থার চাইতে তোমার জন্য অধিকতর অনুকূল।”

তোমরা এই দুনিয়াকে অপমানিত করো
[৩৯২] সাল্লাম ইবনু মিসকিন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা এই দুনিয়াকে অপমানিত করো। কারণ, আল্লাহর কসম...।” [৪৮]

হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ অবসর সময় যিকরে কাটাতেন
[৩৯৩] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন কাউকে পেতেন না এবং নিজেও ব্যস্ত থাকতেন না তখন তিনি বলতেন—সুবহানাল্লাহি ওয়া বি হামদিহি। সুবহানাল্লাহি ওয়া বি হামদিহি (আমি প্রশংসাসহ আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি)।”

মাজলুমের প্রতি দয়া
[৩৯৪] সালিহ মিররি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে নিঃস্ব ব্যক্তিকে দানকারী, তুমি তার প্রতি দয়া করছ! তুমি যাদের ওপর জুলুম করেছ, তাদের প্রতি দয়া করো।” [৪৯]

হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর অনন্যতা
[৩৯৫] হাম্মাদ ইবনু সালামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “লোকেরা মুতাররিফের আকল, ইবনু সিরিনের তাকওয়া, মুসলিম ইবনু ইয়াসারের ইবাদাত এবং হাসানের যুহদের আলোচনা করেছে। ইউনুস ইবনু উবায়দ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'এ সবগুলো বৈশিষ্ট্যই হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর মধ্যে একত্রীভূত হয়েছে।”

বিপদ আসে গোনাহের কারণে
[৩৯৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিন ব্যক্তি বিপদে আক্রান্ত হলে সে বলে—নিশ্চয়ই আমি জানি, তুমি গুনাহের কারণে (আপতিত হয়েছ হে বিপদ)। আমার মহান রব আমার ওপর জুলুম করেননি।”

দ্বীন প্রান্তিকতামুক্ত
[৩৯৭] আওফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর দ্বীনকে রাখা হয়েছে বাড়াবাড়িমুক্ত ও খণ্ডবিখণ্ড করার ওপরে (সীমালঙ্ঘনের নিচে এবং শিথিলতার ওপরে)।”

জান্নাত ছাড়া অন্য কোথাও জীবন সুখকর হবে না
[৩৯৮] আওফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةٌ "আমি তাকে উত্তম জীবন দান করব।”[৫০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জান্নাত ছাড়া অন্য কোথাও কারও জন্য জীবন সুখকর হবে না।”

মুমিনের দ্বীনই তার অস্তিত্বের মূল
[৩৯৯] কাসিম ইবনু ফায়িদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, তোমার দ্বীন তোমার দ্বীন। তা তো তোমার গোশত এবং রক্ত। যদি তোমার জন্য তোমার দ্বীন নিরাপদ থাকে, তাহলে তোমার জন্য তোমার দেহ এবং গোশতও নিরাপদ থাকবে। আর যদি অপরটি হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ, তা আগুন, যা নির্বাপিত হয় না। তা দেহ, যা নিঃশেষ হয় না। তা জীবন, যা মৃত্যুবরণ করে না।”

বক্তার জন্য উপহার গ্রহণ করা সমীচীন নয়
[৪০০] সাঈদ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ যখন আলোচনা করতে বসলেন তখন তাকে উপহার দেওয়া হলো। তিনি তা ফিরিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'এই স্থানে যে বসবে, এরপর হাদিয়া গ্রহণ করবে, আল্লাহর কাছে তার জন্য কোনো অংশ নেই। অথবা বলেছেন, তার কোনো অংশ নেই।”

সালাতে শিথিলতা না করা
[৪০১] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, দ্বীনের কোন অংশ তোমার কাছে মর্যাদাবান থাকবে, যখন সালাতই তোমার কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে? আর যখন তোমার কাছে সালাত তুচ্ছ হয়ে যাবে, তখন তোমার অস্তিত্ব আল্লাহর কাছে আরও অধিক তুচ্ছ হবে।”

প্রথম দৃষ্টি
[৪০২] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মানুষ বলে, প্রথম দৃষ্টির ব্যাপারে অপারগতা থাকে। তাহলে আখিরাতের কী অবস্থা হবে?”

দৃষ্টির খারাপ পরিণাম
[৪০৩] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনেক দৃষ্টি দৃষ্টিদাতার অন্তরে কুপ্রবৃত্তি জাগায়। আর অনেক কুপ্রবৃত্তি ব্যক্তির ভেতর দীর্ঘ দুশ্চিন্তার সৃষ্টি করে।”

দস্তরখানে বসে আহার
[৪০৪] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ তার সঙ্গীদের সঙ্গে এক দস্তরখানে বসলেন। তখন এক ব্যক্তি বলল, ‘এই দস্তরখান... এখন।’ হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘কিছুতেই নয়, তা তো এমনই!’”

আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করা
[৪০৫] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন তুমি মানুষকে দুনিয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করতে দেখবে তখন তুমি তাদের সঙ্গে আখিরাতের ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করো। কারণ, তাদের দুনিয়া বিলুপ্ত হয়ে যাবে আর আখিরাত বাকি থেকে যাবে।”

অসুস্থতার সময় তাওয়াক্কুল
[৪০৬] আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এখানে একজন শাইখ ছিলেন, তিনি বলেছেন-আমি আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর হাতে পাঁচড়া দেখলাম। তাই আমি ওষুধ এনে তাকে বললাম, ‘এটা ওই পাঁচড়ার ওপর লাগান।’ তিনি তা নিলেন, এর পরক্ষণেই আবার ফিরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, ‘আপনি এটা ফিরিয়ে দিলেন কেন?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা...।’”[৫১]

শুধু আশা করা থেকে বিরত থাকা
[৪০৭] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন। তোমরা এ সকল আশা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, আশার কারণে কাউকে উত্তম কিছু দেওয়া হয় না—না দুনিয়ায়, আর না আখিরাতে।”

[৪০৮] মুবারক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনের জন্য দুনিয়া কত উত্তম বাসস্থল। আর তা এভাবে যে, সে আমল করে স্বল্প আর এ থেকে জান্নাতের পাথেয় নিয়ে নেয়। কাফির এবং মুনাফিকের জন্য তা কত নিকৃষ্ট আবাসস্থল। আর তা এভাবে যে, সে কয়েক রাত ভোগ করে আর তার গন্তব্য হয় জাহান্নামের দিকে।”

মুমিনরা আমল করে ভীতির সঙ্গে
[৪০৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ﴿الَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوا وَّقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ﴾ “তারা হলো ওই সব লোক, যারা যা দান করেছে, তা এমতাবস্থায় দান করে যে, তাদের অন্তর থাকে ভীত।”[৫২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা তাদের পুণ্যকর্মগুলো এমন অবস্থায় করত যে, তাদের অন্তর সর্বদা এই ভয়ে ভীত থাকত— হয়তো আল্লাহ তাদের শাস্তি থেকে মুক্তি দেবেন না।”

চিন্তা করাটাও ইবাদাত
[৪১০] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি বলেন, চিন্তার ন্যায় অন্য কোনো জিনিস দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত করা হয়নি।”

জাহান্নামের স্মরণে খাবার ছেড়ে দেওয়া
[৪১১] খুলাইদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সালিহ ইবনু হাসসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ একদিন সাওম রাখলেন। ইফতারের সময় আমি তার কাছে খাবার নিয়ে আসলাম। যখন তার সামনে খাবার পরিবেশন করা হলো, তখন তার সামনে এই আয়াত উপস্থাপিত হলো:
﴿إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالاً وَجَحِيمًا وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا﴾
'নিশ্চয়ই আমার নিকট রয়েছে শিকলসমূহ ও প্রজ্বলিত আগুন এবং কাঁটাযুক্ত খাদ্য ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।'[৫৩]
তখন তিনি তা থেকে হাত সরিয়ে নিলেন। তিনি বললেন, 'তোমরা উঠিয়ে নাও।' আমরা উঠিয়ে নিলাম। তিনি পরের দিন সাওম রাখলেন। যখন তিনি ইফতার করতে চাইলেন তখন এই আয়াত স্মরণ হলো। তখনো অনুরূপ করলেন। তৃতীয় দিন এরূপ হলে তার ছেলে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর কয়েকজন শাগরিদ—সাবিত বুনানি, ইয়াহইয়া বাক্কা এবং অন্যদের কাছে গিয়ে বললেন, 'আমার বাবাকে ধরুন। কারণ, তিনি তিন দিন ধরে কোনো খাবারের স্বাদ আস্বাদন করেননি।' যখনই আমরা তার সামনে খাবার পরিবেশন করেছি, তখনই তিনি এই আয়াত স্মরণ করেছেন :
إِنَّ لَدَيْنَا أَنكَالًا وَجَحِيمًا ( وَطَعَامًا ذَا غُصَّةٍ وَعَذَابًا أَلِيمًا )
‘নিশ্চয়ই আমার নিকট রয়েছে শিকলসমূহ ও প্রজ্বলিত আগুন এবং কাঁটাযুক্ত খাদ্য ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’। [৫৪]
তখন তারা এসে দীর্ঘ সময় বুঝিয়ে অবশেষে জোর করে এক চুমুক ছাতু পান করালেন।"

বিপদে ইন্নালিল্লাহ পড়া
[৪১২] ইউনুস ইবনু উবায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় ন্যুব্জ হয়ে এসেছিলেন তখন বলেছিলেন-ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তারই নিকট প্রত্যাবর্তন করব। তিনি এটা শেষ করলেন। তখন তার পুত্র আবদুল্লাহ তার ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, 'হে বাবা, কী হয়েছে আপনার? আপনি তো আমাদের ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। আপনি কি কিছু দেখেছেন?' তিনি বললেন, 'আমি আমার নিজের ওপর ইন্নালিল্লাহ পড়েছি। আমি এ ধরনের অবস্থায় ইতঃপূর্বে কখনো আক্রান্ত হইনি।”

অহংকারের পথ খোলা রাখা সমীচীন নয়
[৪১৩] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বসরার জনৈক ব্যক্তির সূত্রে হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, “লোকেরা তার পেছনে হাঁটল। তিনি তাদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন। এটা কোনো দুর্বল মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়।"

তোমরা আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রত্যাশায় থাকো
[৪১৪] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি এমন মানুষদের সময়কাল লাভ করেছি—যাদের একদল এভাবে জীবন কাটিয়েছেন যে—তারা দুনিয়ার কোনো জিনিস হাতে এলে এতে খুশি হতেন না, আর দুনিয়ার কোনো জিনিস হাতছাড়া হলে হতাশ হতেন না। তাদের কাছে দুনিয়াটা ছিল এই মাটির থেকেও তুচ্ছ। তাদের একেকজন পঞ্চাশ বছর জীবন কাটিয়ে দিতেন, অথচ কখনো তাদের জন্য কাপড় গোটানো হতো না, তাদের জন্য পাতিল চড়ানো হতো না। তারা নিজের মাঝে এবং পৃথিবীর মাঝে কোনো জিনিসকে অন্তরায় বানাতেন না। কখনো ঘরে কোনো খাবার তৈরি করতে বলতেন না। যখন রাত হতো, তখন তারা নিজেদের পায়ের ওপর দণ্ডায়মান থেকে সালাত আদায় করতেন। তারা চেহারা এমনভাবে বিছিয়ে রাখতেন যার ফলে অশ্রু গণ্ডদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যেত। তারা নিজেদের মুক্তির জন্য প্রতিপালকের কাছে মিনতিভরে প্রার্থনা করতেন। তারা যখন নেক আমল করতেন তখন তারা তার কৃতজ্ঞতায় অধ্যবসায়ী হতেন। তারা আল্লাহর কাছে চাইতেন, তিনি যেন তা কবুল করে নেন। আর যখন তারা কোনো মন্দ আমল করতেন, তখন তা তাদের বেদনাহত করত। তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, তিনি যেন তা ক্ষমা করে দেন। তারা এ অবস্থার ওপরই এরূপভাবে থাকতেন। আল্লাহর কসম, তারা গোনাহ থেকে সুরক্ষিত ছিলেন না। আর তারা ক্ষমা ছাড়া মুক্তিপ্রাপ্তও ছিলেন না। আর তোমরা সংক্ষিপ্ত মেয়াদে দিনাতিপাত করছ। আর (বান্দার) আমল সুসংরক্ষিত। আল্লাহর কসম, মৃত্যু তোমাদের ঘাড়ের ওপর। আগুন তোমাদের সামনে। সুতরাং তোমরা প্রতিটি দিনে এবং রাতে আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রত্যাশায় থাকো।”

ফিকহের অনেক বাহক ফকীহ নয়
[৪১৫] মানসুর সুলামি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি কুরআন পড়ো, যতক্ষণ তা তোমাকে নিষিদ্ধ কাজ থেকে বারণ করে। যখন তা তোমাকে বারণ করবে না, তখন তুমি তা পাঠই করছ না। ফিকহের অনেক বাহক ফকীহ নয়। যার ইলম তার উপকারে আসেনি, তার অজ্ঞতা তার ক্ষতি করেছে।”

তাকদির অস্বীকার করা কুফরি
[৪১৬] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি তাকদির অস্বীকার করল, সে কুফরি করল।”

তালিবুল ইলমের চিত্র
[৪১৭] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি ইলম অন্বেষণ করত; সে এমনভাবে বাস করত যে, তার বিনয়ে, আদর্শে, জিহ্বায়, চোখে এবং হাতে ইলম অন্বেষণের চিত্র ফুটে উঠত।”

মুমিন এবং মুনাফিকের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য
[৪১৮] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “নিশ্চয়ই মুমিন সুধারণা করে, তাই উত্তম আমল করে। আর নিশ্চয়ই মুনাফিক মন্দ ধারণা করে, ফলে মন্দ আমল করে। আল্লাহ কারও জন্য দুনিয়া বিস্তৃত করে দিলে সে ধোঁকার শিকার হয়। আর পৃথিবী কারও থেকে সরিয়ে রাখা হলে সে তাকিয়ে থাকে।”

শাসক এবং ধনী সম্প্রদায়ের বিশেষ দায়িত্ব
[৪১৯] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, তুমি তোমার ভাইয়ের চোখে ময়লা দেখতে পাও। আর তুমি নিজের চোখে খুশির আভা ফুটিয়ে রাখো। নিশ্চয়ই কল্যাণের জন্য কিছু লোক রয়েছে আর অকল্যাণের জন্য কিছু লোক রয়েছে। যে ব্যক্তি কোনো জিনিস ত্যাগ করে, তা তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। বান্দাদের মধ্য থেকে আল্লাহর কাছে সেসব বান্দা সবচেয়ে প্রিয়, যারা আল্লাহকে বান্দাদের কাছে প্রিয় করে তোলে এবং মানুষের মধ্যে উপদেশ প্রদানের দায়িত্ব পালন করে। তিনি আরও বলেন, কিয়ামাত দিবসে শাসক এবং ধনীদের একত্র করা হবে। তখন তিনি তাদের বলবেন—তোমরা ছিলে মুসলমানদের শাসক এবং ধনী সম্প্রদায়। তোমাদের কাছেই ছিল আমার দাবি।"

বান্দার কল্যাণের সূচক
[৪২০] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “(আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমি যতটুকু জানি, তিনি এটাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দিকে সম্পৃক্ত করে বলেছেন) 'আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান তখন তার অন্তরে সচ্ছলতা সৃষ্টি করেন আর তার সহায়-সম্পদ তার ওপরই গুটিয়ে রাখেন। আর যখন তিনি কোনো বান্দার অকল্যাণ চান তখন তার দু-চোখের মাঝে দারিদ্র্য সৃষ্টি করেন আর তার সহায়-সম্পদ তার ওপর প্রকাশিত রাখেন।"

কোন আমল সর্বোত্তম
[৪২১] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হাসান, মুআবিয়া ইবনু কুররাহ এবং অনুরূপ কয়েকজন একত্র হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা করলেন, কোন আমল সর্বোত্তম। মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমি তাদের ভিন্নমতের ওপর একত্র হলাম।' হাসান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদের পর বান্দা রাত্রি জাগরণের চাইতে উত্তম কোনো আমল করেনি।' মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তাকওয়া?' তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, 'তাকওয়া ছাড়া কি ওসব হয়?'"

যিকরের মজলিসে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয়
[৪২২] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক সম্প্রদায় আল্লাহর যিকরে রত ছিল। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে তাদের সঙ্গে বসে যায়। সে সময় রহমত অবতীর্ণ হয়। এরপর তা উঠে যায়। ফেরেশতারা বলে, 'হে প্রতিপালক, তাদের মধ্যে তো আপনার অমুক বান্দা রয়েছে!' তখন তিনি (আল্লাহ) বলেন, 'আমার রহমতে তাদের আচ্ছাদিত করে দাও। তারা এমন সম্প্রদায়, যাদের সঙ্গী দুর্ভাগা হয় না।”

পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের পার্থক্য
[৪২৩] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমরা এমন সম্প্রদায়ের মাঝে ছিলাম, যারা নিজেদের জিহ্বাকে সংযত রাখতেন এবং নিজেদের কাগজ ছড়িয়ে দিতেন। এরপর আমরা এমন সম্প্রদায়ের মাঝে অবশিষ্ট রয়ে গেলাম, যারা নিজেদের কাগজকে সঞ্চিত করে এবং নিজেদের জিহ্বা নিয়োজিত রাখে।”

সচ্ছলতা ছাড়া নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করা
[৪২৪] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَأَمَّا مَنْ بَخِلَ وَاسْتَغْنَى “আর যে ব্যক্তি কার্পণ্য করেছে এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেছে...।”[৫৫] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সে যা অবশিষ্ট থাকেনি, তা নিয়ে কার্পণ্য করেছে। আর সচ্ছলতা ছাড়া নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে।”

কয়েকটি আয়াতের তাফসীর
[৪২৫] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانَ لِلْأَوَّابِينَ غَفُورًا “তিনি ক্ষমাশীল তাদের জন্য, যারা বারবার তার দিকে ফিরে আসে।”[৫৬] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর দিকে অন্তর এবং আমলের মাধ্যমে ফিরে আসে।” يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ “তারা যা দান করেছে, তারা তা দান করে এমতাবস্থায় যে, তাদের অন্তর থাকে ভীত।”[৫৭] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা যে সকল নেক আমল করতেন, তারা সেসব করতেন এই আশঙ্কার সঙ্গে যে, তা তাদের আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি দেবে না।”
وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا “আর যখন মূর্খরা তাদের সম্বোধন করে কিছু বলে, তখন তারা বলে—সালাম।”[৫৮] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা সহনশীল। যদি তাদের সঙ্গে মূর্খতাসুলভ আচরণ করা হয়, তাহলে তারা মূর্খতাসুলভ আচরণ করে না। এটা তাদের দিনের ঘটনা, যখন তারা জনমানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।”
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا “আর যারা রাত যাপন করে নিজেদের প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সাজদা ও দাঁড়ানো অবস্থায়।”[৫৯] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এটা তাদের রাতের অবস্থা, যখন তারা নিজেদের প্রতিপালকের সঙ্গে একান্ত হয়。”
إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا “নিশ্চয়ই তার শাস্তি হলো বিনাশ।”[৬০] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা জানে, প্রত্যেক পক্ষ তার প্রতিপক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে; শুধু জাহান্নামের শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ছাড়া।”

সালাত সর্বোত্তম বিষয়
[৪২৬] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সালাত সর্বোত্তম বিষয়। সুতরাং যে চায়, সে যেন তা স্বল্প করে। আর যে চায়, সে যেন তা অধিক করে।”

তাকওয়া ও পরিশুদ্ধির দুআ
[৪২৭] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে অধিক পরিমাণ এই দুআ করতে শুনেছি,
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا
'হে আল্লাহ, আপনি আমার অন্তরে তাকওয়া দান করুন। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন। আপনি অন্তরের সর্বোত্তম পরিশুদ্ধকারী। আপনি অন্তরের অভিভাবক এবং তত্ত্বাবধায়ক।”
আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা বলতেন, মুমিনের সর্বোত্তম চরিত্র হলো ক্ষমা।”

মানুষ কীভাবে অহংকার করে?
[৪২৮] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আদম-সন্তান, তুমি কীভাবে অহংকার করো, অথচ তুমি দুবার প্রস্রাবের অঙ্গ থেকে বেরিয়েছ!”

অন্তর মরে যায় ও জীবিত হয়
[৪২৯] উকবা ইবনু খালিদ আবাদি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় অন্তর মরে যায় এবং জীবিত হয়। যখন তা মরে যায়, তখন অন্তরকে ফরজ বিধানের ওপর ওঠাও। আর যখন তা জীবিত থাকে, তখন নফল আমলের মাধ্যমে তাকে শিষ্টাচার শেখাও।”

সত্যের পরিণতি
[৪৩০] আবদুল্লাহ ইবনু বাকর মুজানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এই সত্য মানুষকে পরিশ্রান্ত রেখেছে এবং তাদের মাঝে ও তাদের কুপ্রবৃত্তির মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে এই সত্যের শ্রেষ্ঠত্ব জেনেছে এবং তার পরিণাম প্রত্যাশা করেছে, সে-ই এর ওপর ধৈর্যধারণ করেছে। নিশ্চয় মানুষের মাঝে এমন কিছু মানুষ রয়েছে, যারা কুরআন পড়ে এবং অপকর্ম থেকে বিরত থাকে। এই কুরআনের ব্যাপারে সবচেয়ে অধিক হকদার সে, যে আমলের মাধ্যমে তার অনুসরণ করেছে; যদিও সে তা পড়েনি। তুমি মানুষকে একরকম চিনবে, যতক্ষণ তারা স্বস্তি ও নিরাপত্তার ভেতর থাকবে। যখন বিপদ অবতীর্ণ হবে, তখন প্রত্যেক মানুষ তার মূলের দিকে ফিরে যাবে। মুমিন ফিরে যাবে তার ঈমানের দিকে আর মুনাফিক ফিরে যাবে তার নিফাকের দিকে।”

উপহারের বিনিময় প্রদান
[৪৩১] শাবীব ইবনু শাইবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “এক ব্যক্তি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে নয় ঝুড়ি মিষ্টান্ন এবং একটি মুক্তাদানা উপহার দিলো, যার ভেতর দশ হাজার রৌপ্যমুদ্রা ছিল। তিনি দশ হাজার রৌপ্যমুদ্রা ফেরত দিয়ে বললেন, 'আমি এর বিনিময় দেওয়ার সক্ষমতা রাখি না। আর তিনি নয় ঝুড়ি মিষ্টান্ন গ্রহণ করে নিলেন।”

প্রত্যেক মানুষের কর্ম তার ঘাড়ে সংযুক্ত
[৪৩২] আব্বাদ ইবনু রাশিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَكُلُّ إِنْسَانِ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ "আর আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি।"[৬১] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অবশ্যই তিনি তোমার ওপর ইনসাফ করেছেন, যিনি তোমার নিজেকে নিজের হিসাব-সংরক্ষক বানিয়েছেন।"

মৃত্যুর মধ্যে প্রশান্তি, শান্তি এবং স্বস্তি
[৪৩৩] ইবনু আওন রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “সাঈদ ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ এভাবে কথা বলতেন, এভাবে দুআ করতেন। তার দুআর শেষে এ প্রার্থনা থাকত,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ لَنَا فِي الْمَوْتِ رَاحَةً وَرَوْحًا وَمُعَافَاةً
'হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জন্য মৃত্যুর মধ্যে প্রশান্তি, শান্তি এবং স্বস্তি রাখুন।"

সমুদ্র জাহান্নামের স্তর
[৪৩৪] সাঈদ ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "সমুদ্র জাহান্নামের স্তর।”

জাহান্নামে এক যুগ সত্তর হাজার বছর
[৪৩৫] হিশাম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, لَابِثِينَ فِيهَا أَحْقَابًا "তারা সেখানে যুগ-যুগান্তর অবস্থান করবে।”[৬২] এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যুগ-যুগান্তরের ধরাবাঁধা কোনো মেয়াদ নেই জাহান্নামে চিরস্থায়ী হওয়া ছাড়া। তবে তারা বলেছেন, (জাহান্নামে) এক যুগ হলো সত্তর হাজার বছর। আর সেই সত্তর হাজার বছরের প্রতিদিন তোমরা যেসব দিন গণনা করো, তার এক হাজার দিনের সমপরিমাণ।”

তিন শ্রেণির মানুষের সমালোচনা করা যায়
[৪৩৬] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তিন শ্রেণির মানুষ এমন, যাদের (সম্পর্কে মুখ খোলায়) কোনো গীবত নেই। খেয়ানতকারী শাসক; এমন প্রবৃত্তিপূজারি, যে তার প্রবৃত্তির দিকে দাওয়াত দেয়; এবং এমন পাপাচারী, যে তার পাপাচার প্রকাশ্যে করে।”

ইলম ছাড়া আমলের পরিণাম
[৪৩৭] উমার ইবনু আবী সালামা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা এ বিষয়টি অনুসন্ধান করেছি এবং লক্ষ করেছি, আমরা এমন কাউকে পাইনি, যে ইলম ছাড়া আমল করে, ফলে যা সংশোধন করে, তারচেয়ে অধিক নষ্ট করে না।"

বাজারের লোকদের মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই
[৪৩৮] জুবায়র হানজালি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবু সাঈদ, আপনি সালাত পড়ে নিয়েছেন?' তিনি বললেন, 'না।' আমি বললাম, 'বাজারবাসীরা তো সালাত পড়ে ফেলেছে।' তিনি বললেন, 'নিশ্চয় বাজারবাসীর মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই। আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে, তাদের একেকজন তার ভাইকে দিরহাম পেতে বাধাগ্রস্ত করে।”

হরে ইনের পরিচয়
[৪৩৯] আব্বাদ ইবনু আমর আবাদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবূ সাঈদ, হুরে ইন কী?' তিনি বললেন, 'তারা হলো এমন বিস্ময়কর সৃষ্টি...।[৬৩] আল্লাহ তাদের ভিন্ন সৃষ্টি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।' ইয়াজিদ ইবনু মারইয়াম সালুলি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হে আবূ সাঈদ, এটা আপনার কাছে কে বর্ণনা করেছে?' তখন হুসাইন রাহিমাহুল্লাহ তার জামার আস্তিন সরিয়ে বললেন, 'আমার কাছে এটা বর্ণনা করেছে অমুকের পুত্র অমুক মুহাজির সাহাবি, তমুকের পুত্র তমুক আনসারি সাহাবি...।' এভাবে তিনি পাঁচজন মুহাজির সাহাবি এবং চারজন আনসারি সাহাবি (কিংবা তিনি বলেছেন, চারজন মুহাজির সাহাবি এবং পাঁচজন আনসারি সাহাবি)-এর নাম উল্লেখ করলেন।”

ঘুষ গ্রহণের ক্ষতি
[৪৪০] সুলাইমান ইবনুর রাবি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ঘুষ যখন দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, আমানত তখন ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে যায়।”

ফিতনার ভয়াবহতা
[৪৪১] আবদুল ওয়াহিদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, 'হে আবু সাঈদ, আপনি আমাকে এমন ব্যক্তি সম্পর্কে অবহিত করুন, যিনি ইবনুল মুহাল্লাবের ফিতনা প্রত্যক্ষ করেছেন। আর তিনি মুখে সে-জাতীয় কথা উচ্চারণ করলেও তার অন্তর প্রশান্ত ছিল।' তিনি বললেন, 'হে ভাতিজা, কয় হাত উট বধ করেছে?' আমি বললাম, 'এক হাত। সম্প্রদায়ের সবাই কি তাদের সন্তুষ্টি ও সম্মতির কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়নি?'”

রাতে ক্রন্দনরত এবং দিনে হাস্যোজ্জ্বল
[৪৪২] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কে আমাকে এমন ব্যক্তিকে দেখিয়ে দেবে, যিনি রাতে ক্রন্দনরত এবং দিনে হাস্যোজ্জ্বল?”

মানুষ তার প্রত্যাশিত জিনিসের সন্ধানে রত থাকে
[৪৪৩] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তিনি এবং একজন তাবিয়ি এক জায়গায় বসে আলোচনা করছিলেন। তাদের একজন বললেন, আমি প্রত্যাশা রাখি এবং ভয় করি। অপরজন বলল, যে ব্যক্তি কোনো জিনিসের প্রত্যাশা রাখে, সে তার সন্ধানে রত থাকে। আর যে ব্যক্তি কোনো কিছুকে ভয় করে, সে তা থেকে পলায়ন করে বেড়ায়। আমি মনে করি না যে এমন কোনো মানুষ রয়েছে, যে কোনো জিনিস প্রত্যাশা করে, তবে তা অনুসন্ধান করে না। আর আমি মনে করি না যে এমন কোনো মানুষ রয়েছে, যে কিছুকে ভয় করে, তবে তা থেকে পলায়ন করে না।”

টিকাঃ
[১৮] মূল পাণ্ডুলিপিতে বাক্যটি অসম্পূর্ণই আছে।
[১৯] হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর উপনাম।
[২০] মুসলিম আস সাকাফি
[২১] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[২২] সূরা ইসরা, ১৬:২৫
[২৫] খেজুর এবং ঘিয়ের মিশ্রণে প্রস্তুতকৃত খাবারবিশেষ।
[২৬] বুজুর্গ ব্যক্তিদের পরিধেয় পোশাকবিশেষ।
[২৭] একপ্রকার ঢিলেঢালা পোশাক, যা খতিব সাহেবগণ ঈদ ও জুমআর সালাতের দিন মূল জামার ওপর পরিধান করে থাকেন।
[২৮] সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ১১
[২৯] সূরা তহা, ২০: ৮২
[৩০] বর্ণনার এর পরের অংশ মূল পাণ্ডুলিপিতেই সংরক্ষিত নেই।
[৩১] সূরা বাকারাহ, ২:৮১
[৩২] সূরা নিসা, ৪:১৭
[৩৩] সূরা ইসরা, ১৭:৫৯
[৩৪] যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যাপারে মানুষের পরস্পরের উপদেশ দেওয়ার প্রবণতা।
[৩৫] সূরা নিসা, ৪ : ৫৬
[৩৬] চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ।
[৩৭] যিলকদ, যিলহাজ্জ, মুহাররম এবং রজব —এই চার মাসকে সম্মানিত মাসসমূহ বলা হয়।
[৩৮] সূরা গাফির, ৪০:৭১
[৩৯] সূরা নিসা, ৪ : ১৪২
[৪০] সূরা ফাতির, ৩৫: ২৮
[৪১] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬২
[৪২] সূরা মাউন, ১০৭:৬
[৪৩] সূরা ইসরা, ১৭:৫৯
[৪৪] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৪৫] সূরা নাহল, ১৬: ৯৮
[৪৬] সূরা আম্বিয়া, ২১:৮৩
[৪৭] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫: ২
[৪৮] মূল পাণ্ডুলিপিতে বাক্যটা সম্পূর্ণই আছে।
[৪৯] অর্থাৎ জুলুম থেকে বিরত থাকা সদাকা করা থেকে উত্তম।
[৫০] সূরা নাহল, ১৬:৯৭
[৫১] মূল পাণ্ডুলিপিতে বাক্যটা সম্পূর্ণই আছে।
[৫২] সূরা মুমিনুন, ২৩:৬০
[৫৩] সূরা মুজ্জাম্মিল, ৭৩: ১২-১৩
[৫৪] সূরা মুজ্জাম্মিল, ৭৩:১২-১৩
[৫৫] সূরা লাইল, ৯২ : ৮
[৫৬] সূরা ইসরা, ১৭ : ২৫
[৫৭] সূরা মুমিনুন, ২৩: ৬০
[৫৮] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৫৯] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৪
[৬০] সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩
[৬১] সূরা ইসরা, ১৭: ১৩
[৬২] সূরা নাবা, ৭৮: ২৩
[৬৩] এর পরের অংশ মূল পাণ্ডুলিপিতেই নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00