📄 আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
দুটো অনন্য-সাধারণ স্বভাব
[৬৮] হারিস ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ বসরার এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'কী ব্যাপার! আপনি কঙ্কর স্পর্শ করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'তা স্পর্শ করার মধ্যে কোনো প্রতিদান নেই এবং তা পরিহার করার মধ্যে কোনো গুনাহ নেই। তবে আমার মধ্যে দুটো স্বভাব রয়েছে—আমার সঙ্গী যখন আমার কাছ থেকে চলে যায় তখন আমি তার দোষচর্চা করি না এবং আমি কোনো সম্প্রদায়ের এমন বিষয়ে নাক গলাই না, যে বিষয়ে তারা আমাকে সাথে রাখেনি।”
অবসর সময়ে কুরআন পাঠ
[৬৯] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে আহনাফ ইবনু কায়সের গোলাম অবগত করেছে—আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ যখন একান্ত সময় পেতেন তখনই তাকে কুরআন মাজিদ দেওয়ার জন্য আহ্বান করতেন।”
অসাধারণ বিনয়
[৭০] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি সহনশীল নই। তবে আমি সহনশীলতার ভান করি।"
পিঁপড়াদের স্থান ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ
[৭১] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একবার পিঁপড়া অনেক বেড়ে গেল। পিঁপড়ারা আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে অনেক কষ্ট দিচ্ছিল। তখন তিনি একটি চেয়ার আনার নির্দেশ দিলেন। ফলে একটি চেয়ার এনে পিঁপড়ার গর্তের ওপর রাখা হলো। এরপর তিনি আল্লাহর তাআলার প্রশংসা ও তার গুণ বর্ণনা করলেন। এরপর বললেন, 'তোমরা তো আমাদের কষ্ট দিচ্ছ। সুতরাং তোমরা নিবৃত্ত হয়ে যাও, অন্যথায় আমরাও তোমাদের কষ্ট দেবো।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "এরপর পিঁপড়ারা নিবৃত্ত হলো এবং সেখান থেকে চলে গেল।"
কথা বলা থেকে বিরত থাকা
[৭২] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, বানু তামিম গোত্রের এক শাইখ বলেন, "আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, (আল্লাহর কাছে) জবাব দানের ভয় আমাকে অধিকাংশ সময় কথা বলা থেকে বিরত রাখে।"
কৃতজ্ঞতার সাজদা
[৭৩] জুবায়র ইবনু হাবিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “দু-ব্যক্তি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছাল যে, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেছেন। (এ কথা শুনে তিনি) তখন তিনি সাজদায় লুটিয়ে পড়লেন।”
বিনয়ী দুআ
[৭৪] মারওয়ান আল-আসগার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে শাস্তি দেন, তাহলে আমি তো শাস্তিরই উপযুক্ত। আর আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে আপনি তো তারও অধিকার রাখেন।"
উম্মাহর ধ্বংস মুনাফিকের হাতে
[৭৫] আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি একবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসা ছিলাম। সে সময় তিনি বললেন, 'এই উম্মাহর ধ্বংস জ্ঞানী মুনাফিকের দু-হাতের মধ্যে রয়েছে। আমি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। ফলে তোমার মধ্যে কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি। সুতরাং তুমি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ফিরে যাও। কারণ, তারা তোমার মতামত-সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না।"
আগুনের ওপর হাত রেখে অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা
[৭৬] সালামাহ ইবনু মানসুর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার বাবা একটি গোলাম কিনলেন। গোলামটি এককালে আহনাফের মালিকানায় ছিল। পরবর্তীকালে তিনি তাকে আজাদ করে দেন। আমি তাকে তার বৃদ্ধ বয়সে পেয়েছি। তিনি বর্ণনা করতেন, আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ-এর রাতের বেলার সাধারণ সালাত ছিল দুআ। তিনি নিজের কাছে প্রদীপ রাখতেন। এরপর তার ওপর হাত রেখে বলতেন, 'অনুভব করো হে আহনাফ, কোন জিনিস তোকে অমুক অমুক দিন এই এই (গোনাহের) কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল?”
বাসগৃহ হিসেবে কুঁড়েঘরই পছন্দনীয়
[৭৭] সাঈদ ইবনু মাসউদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে—তিনি ছিলেন নিজ গোত্রের নেতা—বলা হলো, 'আমরা কি আপনার জন্য কখনো একটি বেষ্টনী তৈরি করব না?' তিনি বললেন, 'আমি জাহান্নাম ছাড়া অন্য কোনো স্থানের বেষ্টনীর কথা জানি না। আল্লাহর কসম, আমার এখানে কোনো বেষ্টনী তৈরি করা হবে না।"
বর্ণনাকারী বলেন, “তার বাসস্থান চিরকাল বাঁশনির্মিত কুঁড়েঘরই ছিল, যতদিন না তিনি মহান আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।”
বার্ধক্যের দিনগুলোতেও অবিরাম সিয়াম পালন
[৭৮] সাঈদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'আপনি অনেক বয়োবৃদ্ধ। সিয়াম পালন আপনাকে দুর্বল করে ফেলবে।' তিনি বললেন, 'দীর্ঘ অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আমি এগুলোকে গণনা করে রাখছি।"
লৌকিকতা বর্জন করা
[৭৯] আবুজ জিনবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক যুবক আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে হাঁটত। একদিন তিনি তার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সেই যুবকটি তার সামনে লৌকিকতা প্রদর্শন করল। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি বোধ হয় প্রদর্শনকারীদের একজন!' সে তখন বলল, 'হে আবূ বাহর, প্রদর্শনকারী কী?' তিনি বললেন, 'যারা এমন বিষয়ে প্রশংসা করা পছন্দ করে, যা তারা করেনি। হে ভাতিজা, যখন তোমার সামনে হক প্রকাশিত হয় তখন তুমি তা গ্রহণ করার জন্য মনকে স্থির কোরো এবং তা ছাড়া অন্য সকল কিছু থেকে বিমুখ হোয়ো।”
তিন কাজে তাড়াহুড়ো করা
[৮০] আবদুল আযীয ইবনু কারিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবূ বাহর, আমরা আপনার চেয়ে অধিক ধীরস্থির কোনো ব্যক্তি দেখিনি।' তিনি বললেন, 'তিনটি বিষয়ে আমার তাড়াহুড়ো রয়েছে।' তারা জিজ্ঞেস করলেন, 'সেগুলো কী?' তিনি বললেন, 'সালাত—যখন তার ওয়াক্ত আসে, আর আমি যতক্ষণ না তা আদায় করি; কুমারী মেয়ে—যখন তার উপযুক্ত পাত্র (তাকে বিয়ের) প্রস্তাব দেয়, যতক্ষণ না আমি তাকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিই। এবং মৃত ব্যক্তি—যখন সে মুস্তাযাব করে, যতক্ষণ না আমি তাকে তার কবরে রেখে আসি (এ তিনটি বিষয়ে আমার তাড়াতাড়ি রয়েছে)।"
বিপদের কথা কারও নিকট উল্লেখ না করা
[৮১] মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ্-এর এক ভাতিজা তার কাছে দায়িত্বভার অভিযোগ করল। তখন আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ্ তাকে বললেন, ‘চল্লিশ বছর হলো আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে। আজও আমি এ কথা কারও সামনে উল্লেখ করিনি'।”
আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা
[৮২] ইবনু শওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি নিজেকে কুরআনের সামনে উপস্থাপন করলাম। তখন আমি নিজেকে এই আয়াতের থেকে অন্য কিছুর সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ পেলাম না :
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ
'আর কিছু লোক এমন, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা ভালো কাজের সাথে খারাপ কাজ মিশ্রিত করে ফেলেছিল। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন'।”[৪]
মিথ্যা বলার চেয়ে নীরব থাকা ভালো
[৮০] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “লোকেরা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মতবিনিময় করল। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ তখন নীরব ছিলেন। তাই মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'কী ব্যাপার, তুমি কিছু বলছ না যে!' তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি, যদি আমি মিথ্যা বলি। আর আমি তোমাদের ভয় করি, যদি আমি সত্য বলি'।”
সজ্জিত ঘরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকা
[৮৪] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ এক সফর থেকে ফিরলেন। এসে দেখলেন, লোকেরা তার ঘরের ছাদকে পরিবর্তন করে ফেলেছে (অন্য বর্ণনায় কথাটা এ বাক্যে এসেছে-ছাদে লাল-সবুজ রং করে ফেলেছে)। লোকেরা তাকে বলল, 'আপনার ঘরের ছাদ সম্পর্কে আপনার কী মন্তব্য?' তিনি বললেন, 'তোমাদের কাছে ওজর পেশ করছি। আমি এই ঘরে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রবেশ করব না, যতক্ষণ না তোমরা তাকে পূর্বের রূপে ফিরিয়ে আনো।”
দুনিয়াতে গুনাহগারের জন্য প্রশান্তি নেই
[৮৫] আবূ মুআবিয়া আল-গালাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বনু তামিম গোত্রের একজন লোক বর্ণনা করেছেন, 'আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—মিথ্যুকের কোনো ব্যক্তিত্ববোধ নেই। হিংসুকের কোনো প্রশান্তি নেই। কৃপণের কোনো অন্তরঙ্গতা নেই। দুশ্চরিত্রের কোনো সম্মান নেই। বিরক্ত ব্যক্তির কোনো ভ্রাতৃত্ব নেই।”
আত্মমর্যাদাবোধ
[৮৬] হাজানা ইবনু কাইস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'অপদস্থতার বিনিময়ে অসংখ্য লাল উটের অধিকারী হওয়াকেও আমি অপছন্দ করি।”
টিকাঃ
[৪] সূরা তাওবা, ৯:১০২
📄 খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
সৎ ঋণগ্রহীতার প্রতিদান
[৮৭] ইয়াহইয়া ইবনু আবদির রহমান আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী সাহবা বিনতু আউস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, খুলাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “যে বান্দা তার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে—এরপর মহামহিম আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে এবং তার ওপর ভরসা করে—আমানত গ্রহণ করে। অতঃপর অপচয় করা ছাড়া কোনো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে খরচ করে এবং তার আমানত পরিশোধের নিয়তও থাকে, অনন্তর তার এবং আমানত পরিশোধের মধ্যে মৃত্যু অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, এমতাবস্থায় মহামহিম আল্লাহ তার ব্যাপারে ফেরেশতাদের বলেন, 'আমার অমুক বান্দাকে তার প্রয়োজন বাধ্য করেছে, ফলে সে আমার ওপর বিশ্বাস রেখে এবং ভরসা করে তার আমানত গ্রহণ করেছে, অনন্তর অপচয় না করে প্রয়োজনীয় কোনো ক্ষেত্রে খরচ করেছে এবং তার মধ্যে ও তা পরিশোধ করার মধ্যে মৃত্যু অন্তরায় হয়েছে। হে আমার ফেরেশতারা, তোমাদের সাক্ষী রাখছি, আমি অমুককে তার হকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করে দিলাম এবং অমুককে ক্ষমা করে দিলাম।”
মুমিনের তিন কাজ
[৮৮] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনকে তুমি শুধু তিন কাজেই পাবে—সে মাসজিদ নির্মাণ করছে, অথবা ঘরে পর্দার ব্যবস্থা করছে, অথবা তার পার্থিব এমন কোনো কাজে রয়েছে, যা করাটা অবশ্যম্ভাবী।”
আল্লাহর সাক্ষাৎপ্রত্যাশীদের করণীয়
[৮৯] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ শুক্রবারে আসলেন। সে সময় তিনি দরজার চৌকাঠে হাত রেখে বললেন, 'হে ভাইয়েরা, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে তার প্রিয়ের সঙ্গে মিলিত হতে চায় না? শোনো, তবে তোমরা তোমাদের মহান প্রতিপালককে ভালোবাসো এবং তার পথে উত্তমভাবে চলো।”
[৯০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ নিজ কওমের মজলিসে ফজরের সালাত আদায় করতেন। এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার যিকরে রত থাকতেন। তারপর তিনি তাকে ঘরে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিতেন। তখন তাকে ওঠানো হতো। এবং তার জন্য দুটো বালিশ রাখা হতো। এরপর তিনি দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলতেন, 'আমার রবের ফেরেশতাদের সাদর সম্ভাষণ! আল্লাহর কসম, আমি আজ তোমাদের আমার ব্যাপারে উত্তমতার সাক্ষী রাখছি। তোমরা নাও বিসমিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।' তিনি এই অবস্থাতেই থাকতেন, যতক্ষণ না নিদ্রা তাকে পেয়ে বসত অথবা (সালাতের সময় হয়ে যেত আর) তিনি সালাতের জন্য বের হতেন।"
[৯১] মা'মার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “খুলাইদ রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলতেন:
فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ
'তারপর সে নিজে (জাহান্নামে) উঁকি মারবে। তখন সে তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মাঝখানে।' [৫]
তিনি বলেন, অর্থাৎ জাহান্নামের ঠিক মাঝখানে।
তিনি আরও বলেন, 'সে দেখবে, জাহান্নামবাসীদের করোটি ফুটছে। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠবে, আল্লাহর কসম, যদি মহামহিম আল্লাহ তাকে না চেনাতেন, তাহলে সে তাকে চিনতেই পারত না। তার দেহ এবং আবরণ তো বিবর্ণ হয়ে গেছে। তখন সে বলে উঠবে:
تَاللَّهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِين
'সে তাকে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে একেবারেই বরবাদ করে দিচ্ছিলে!'[৬]
তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, যখন সে উঁকি দেবে তখন সে তাদের করোটিকে ফুটন্ত অবস্থায় দেখতে পাবে।”
যিকরে সাহায্যকারীরা মাসজিদের শোভা
[৯২] উকবা ইবনু আবী শাবিব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই সকল জিনিসের শোভা রয়েছে। আর মাসজিদের শোভা হলো সে সকল লোক, যারা পরস্পর পরস্পরকে মহামহিম আল্লাহর যিকরে সাহায্য করে।"
মুমিনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য
[৯৩] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি মুমিনকে দেখবে সংযমী এবং অধিক প্রার্থনাকারী। তুমি মুমিনকে দেখবে আত্মমর্যাদাশীল এবং বাধ্যগত। তুমি মুমিনকে দেখবে মুখাপেক্ষী এবং অমুখাপেক্ষী। তুমি তাকে দেখবে মানুষের থেকে সংযমশীল এবং তার রবের কাছে অধিক প্রার্থনাকারী। তুমি তাকে দেখবে রবের জন্য একান্ত বাধ্যগত এবং নিজের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল। তুমি তাকে দেখবে মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষী এবং তার রবের দিকে একান্ত মুখাপেক্ষী।”
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এগুলোই হলো মুমিনদের বৈশিষ্ট্য। আর সে হলো, পরিচিতির দিক দিয়ে মানুষজনের মধ্যে সর্বোত্তম আর পার্থিব সামগ্রী সংগ্রহের বিবেচনায় সবচেয়ে সরল।”
পাখি ডাক শুনে আল্লাহকে স্মরণ করা
[৯৪] আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, “কাক যখন কা কা করে ডেকে ওঠে, তখন তিনি বলেন, اللَّهُمَّ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ 'হে আল্লাহ, আপনার পাখি ছাড়া অন্য কোনো পাখি নেই। আপনার কল্যাণ ছাড়া অন্য কোনো কল্যাণ নেই। এবং আপনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।”
টিকাঃ
[৫] সূরা আস-সাফফাত, ৩৭: ৫৫
[৬] সূরা আস-সাফফাত, ৩৭: ৫৬
📄 মুতারাফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা
[৯৫] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি-যদি আমার কাছে আমার মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে কোনো আগমনকারী আগমন করে এ দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো একটিকে পছন্দ করার স্বাধীনতা দেয় যে, আমি জান্নাতি অথবা জাহান্নামিদের একজন হব কিংবা মৃত্তিকায় পরিণত হব, তাহলে আমি মৃত্তিকায় পরিণত হওয়াকে গ্রহণ করব।”
জাহান্নামের ভয়
[৯৬] মু'আল্লা ইবনু জিয়াদ আল-ফিরদাউসি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাই তার কাছে ছিল। তখন তারা জান্নাতের আলোচনায় বিভোর হয়ে গেল। মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ তখন বললেন, “আমি জানি না, তোমরা এ অবস্থায় কী বলবে! আমার মধ্যে ও জান্নাতের মধ্যে জাহান্নামের স্মরণ অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
অফুরন্ত নিআমাতের সন্ধান
[৯৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “মৃত্যু নিআমাতপ্রাপ্তদের ওপর তাদের নিআমাত নষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং তোমরা এমন নিআমাতের অনুসন্ধান করো, যার ওপর কখনো মৃত্যু আসবে না।”
তিনি আরও বলতেন, “আল্লাহর কসম, যদি আমাদের এই মজলিস আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য পূর্বে যে কিতাব বরাদ্দ রেখেছেন তাতে লিপিবদ্ধ থেকে থাকে, তাহলে আমাদের জন্য পূর্বে কৃত ফায়সালা কতই-না উত্তম! যদি আল্লাহ আমাদের জন্য যা বণ্টন করে রেখেছেন তার অংশ হিসেবে এটা আমাদের দিয়ে থাকেন, তাহলে আমাদের জন্য কতই-না উত্তম বণ্টন তিনি করে রেখেছেন!”
বিশুদ্ধতা অর্জনের উপায়
[৯৮] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "অন্তরের বিশুদ্ধতা অর্জিত হয় আমলের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে, আর আমলের বিশুদ্ধতা অর্জিত হয় নিয়তের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে।"
আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা
[৯৯] গাইলان ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি মুতাররিফকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 'মহান আল্লাহর জন্য যারা পরস্পরকে ভালোবাসে তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো সে, যে সর্বাধিক ভালোবাসে।' তিনি বলেন, 'আমি হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে এটা উল্লেখ করলাম। তিনি (হাসান রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, সত্য বলেছেন।”
ঈমান আশা এবং ভীতির মাঝামাঝি
[১০০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যদি মুমিনের প্রত্যাশা ও ভীতিকে ওজন করা হয়, তাহলে একটি অপরটির ওপর প্রাধান্য পাবে না (অর্থাৎ দুটোই সমান সমান হবে)।”
উদাসীনভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা নিষ্ফল
[১০১] জারিরি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলেন, 'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।' তখন তিনি বললেন, 'সম্ভবত তুমি তা করছ না।”
ভেতরের চিত্র ও বাহিরের চিত্র অভিন্ন হওয়া
[১০২] আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন বান্দার গোপন এবং প্রকাশ্য অবস্থা সমান সমান হয়ে যায় তখন আল্লাহ বলেন, এ হলো আমার প্রকৃত বান্দা।”
জাহান্নামের ভয়ে জান্নাতের স্মরণ বিস্মৃত হয়ে যাওয়া
[১০৩] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর দরজায় বসা ছিলাম। তখন মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ আমাকে বললেন, 'আমার মধ্যে এবং আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করার মধ্যে—জাহান্নামের ভয় (অথবা তিনি বলেছেন স্মরণ) অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বর্ণনাকারী বলেন, “সেখানে উতবা নামীয় মদীনার একজন লোক ছিল। সে তখন বলল, 'আল্লাহ তার বান্দাদের থেকে এটা চান না।”
আল্লাহর ভয়
[১০৪] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যদি আল্লাহ আমাদের তার ভীতির দ্বারা মেরে ফেলতে চাইতেন, তাহলে আমরা এর সর্বাধিক উপযুক্ত ছিলাম। আমি জানি, আমার মহান রব এ ছাড়াই আমার ওপর সন্তুষ্ট।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি নকশাওয়ালা রেশমি চাদর পরিধান করতেন এবং ঘোড়ায় আরোহণ করতেন। এরপর আমি যখন তার অভিমুখী হতাম, তখন চোখের শীতলতারই অভিমুখী হতাম।”
সবচেয়ে কল্যাণকর গুণ
[১০৫] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি এমন গুণের সন্ধান করলাম, যার পুরোটাই হবে কল্যাণ, যাতে অকল্যাণের কোনো ছোঁয়াই থাকে না। অবশেষে আমি তা পেলাম, (সে গুণটি হলো)—বান্দা স্বস্তি পেয়ে রবের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।”
আল্লাহর ব্যাপারে বান্দা নিরেট নির্বোধ
[১০৬] সুলাইমান ইবনুল মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে নিজের এবং মহান রবের মধ্যকার বিষয়ে নির্বোধ নয়। তবে কতক নির্বোধ কতকের থেকে নিম্নস্তরের।”
মানুষের সুধারণার সময় আল্লাহর দিকে অভিমুখী হওয়া
[১০৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একদিন আমি মাজউরের সঙ্গে চলছিলাম। এমন সময় একজন লোক বলল, 'এই হলো দুজন জান্নাতি লোক।' তখন মাজউর তার দিকে তাকালেন। সে সময় তার চেহারায় বিতৃষ্ণা দেখা গেল। এরপর তিনি আকাশের দিকে তার দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জানেন এবং সে আমাদের জানে না। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জানেন এবং সে আমাদের জানে না।”
সন্তুষ্টি ও ক্ষমাপ্রার্থনা
[১০৮] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এক মজলিসে ছিলাম। তাতে মুতাররিফ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ, সাঈদ ইবনু আবিল হাসান রাহিমাহুল্লাহ এবং অমুক অমুক ছিলেন। তখন সাঈদ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।' তখন মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট না হন, তাহলে অন্তত আমাদের ক্ষমা করুন।”
কৃতজ্ঞ এবং ধৈর্যশীল বান্দা
[১০৯] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনিশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হলো কৃতজ্ঞ ও ধৈর্যশীল বান্দা; যখন সে পরীক্ষার সম্মুখীন হয় তখন সে ধৈর্যধারণ করে আর যখন সে নিআমাতপ্রাপ্ত হয় তখন সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।”
ইলমের আধিক্য ইবাদাতের আধিক্য থেকে উত্তম
[১১০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “আল্লাহর কাছে ইবাদাতের আধিক্য থেকে ইলমের আধিক্য অধিক পছন্দনীয়। আর তোমাদের দ্বীনদারির মধ্যে তাকওয়া হলো সর্বোৎকৃষ্ট।”
হারাম থেকে বেঁচে থাকা সর্বোত্তম আমল
[১১১] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'তুমি এমন দু-ব্যক্তির দেখা পাবে, যাদের একজন সালাত, সাওম এবং সদাকা অত্যধিক পরিমাণে করে; অথচ অপরজন (যে তার থেকে কম দান-সদাকা-সালাত-সাওম আদায় করে) তার থেকে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ।' তাকে বলা হলো, 'এটা কীভাবে?' তিনি বললেন, 'অপর ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে হারাম থেকে বেঁচে থাকার ব্যাপারে উভয়ের মধ্যে অগ্রগামী।”
মানুষের সামান্যতম ক্ষতির কারণও না হওয়া
[১১২] হাম্মাদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ এক ব্যক্তিকে দেখলেন, যে দেয়াল থেকে একমুষ্টি মাটি নিয়েছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি মনে করো না যে, যারা-ই এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে তাদের প্রত্যেকেই যদি একমুষ্টি করে মাটি নিয়ে যায়, তাহলে কওমের দেয়ালই বিলীন হয়ে যাবে?”
ইবাদাতের আগে ইলম অর্জন করা জরুরি
[১১৩] জাফর ইবনু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা ফিকহ অর্জন করো এবং ইবাদাত করা শেখো, এরপর (বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করে) ফিরে যাও।”
প্রকৃত নিআমাত
[১১৪] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এই মৃত্যু মানুষের নিআমাতকে নষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং তোমরা এমন নিআমাতের সন্ধান করো, যাতে মৃত্যু নেই।”
মানুষের প্রশংসা শুনে অস্থিরতা
[১১৫] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি যখন এমন কোনো মজলিসের পাশে গিয়েছি, যেখানে কাউকে আমার প্রশংসা করতে শুনেছি, তা-ই আমার ভেতরে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।”
ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার বৈশিষ্ট্য
[১১৬] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাআলার বাণী :
إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
'নিশ্চয়ই তাতে পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।'”[৭]
তিনি বলেন, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'পরম ধৈর্যশীল ও পরম কৃতজ্ঞ ব্যক্তি কত উত্তম বান্দা! সে যখন নিআমাতপ্রাপ্ত হয় তখন কৃতজ্ঞতা আদায় করে আর যখন পরীক্ষায় আক্রান্ত হয় তখন ধৈর্যধারণ করে।”
অনুতপ্ত বান্দা আত্মতৃপ্ত বান্দা থেকে উত্তম
[১১৭] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ঘুমন্ত অবস্থায় রাত যাপন করে অনুতপ্ত অবস্থায় সকালে জাগ্রত হওয়া আমার নিকট রাতভর ইবাদাত করে আত্মতৃপ্ত হয়ে ভোর করার থেকে অধিক পছন্দনীয়।”
আখিরাতের ফায়সালা জানার চাইতে শুষ্ক ছাইয়ে পরিণত হওয়াও অধিক পছন্দনীয়
[১১৮] ইসহাক ইবনু সুয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “যদি আমি জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে অবস্থান করতাম এবং আমাকে ডেকে বলা হতো, হে মুতাররিফ, তুমি কি খুশি হবে যে, আমি তোমাকে অবগত করাব জান্নাত বা জাহান্নামের কোনটিতে তোমার অবস্থান হবে? তাহলে আমার অবস্থানস্থল জানার চাইতে শুষ্ক ছাইয়ে পরিণত হওয়া আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় হতো।”
সকল কল্যাণের সমন্বয়ক
[১১৯] ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি অনেক চিন্তা করলাম, সকল কল্যাণের সমন্বয়ক কী। তখন দেখলাম, কল্যাণ হলো অধিক পরিমাণ সালাত এবং সিয়াম; অথচ তা হলো আল্লাহর হাতে। আর যা কিছু আল্লাহর হাতে, তার ব্যাপারে তুমি সক্ষম নও; তবে তুমি তার কাছে চাইতে পারো। তখন তিনি তোমাকে তা দেবেন। এরপর লক্ষ করলাম, কল্যাণের সমন্বয়ক হলো দুআ।”
দুআর আদব
[১২০] ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ এ কথা বলা অপছন্দ করতেন—হে আল্লাহ, আমাকে আপনি আপনার স্মরণ থেকে বিমুখ করবেন না এবং আমাকে আপনার কৌশল থেকে নির্ভয় করবেন না। তবে তিনি বলতেন—হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার স্মরণ থেকে বিমুখ করবেন না আর আমি আপনার কাছে আপনার কৌশলের ব্যাপারে নির্ভয় হওয়া থেকে পানাহ চাই, যতক্ষণ না আপনি আমাকে নির্ভয় বানান।”
ওজর এবং তিরস্কারের মাত্রা
[১২১] ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অধিক ওজর পেশকারীরা পাপাচারী। আর অধিক তিরস্কারকারীরা ক্রোধের শিকার।”
ঘরের আসবাবপত্রের তাসবিহ পাঠ
[১২২] সুলাইমান ইবনুল মুগিরাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন তার সাথে তার ঘরের আসবাবপত্র তাসবিহ পাঠ করত।"
একাকী থাকার চাইতে সৎ সঙ্গী উত্তম
[১২৩] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একাকিত্ব থেকে সৎ সঙ্গী উত্তম আর অসৎ সঙ্গীর থেকে একাকিত্ব উত্তম।”
চাবুকের প্রান্ত জ্বলে ওঠা
[১২৪] সাফিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর গোলাম- যে তার সঙ্গে থাকত—এর থেকে শুনেছি, সে বলেছে, ‘আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে এক অন্ধকার রাতে আসছিলাম। তখন গোলাম তাকে বলল, আমরা তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। তখন তার চাবুকের প্রান্তে প্রদীপের মতো আলো জ্বলে উঠল।”
দুনিয়ার অদ্ভুত চিত্র
[১২৫] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “তোমরা বিস্মিত হও তাদের ব্যাপারে, যারা ধ্বংস হয়েছে। আর আমি বিস্মিত হই তাদের ব্যাপারে, যারা মুক্তি পেয়েছে। নিশ্চয়ই আদম-সন্তান হলো প্রথম শ্লেষ্মা, যার থেকে সকল দুর্বলতা সৃষ্টি হয়েছে। আর দুনিয়াকে প্রবৃত্তির চাহিদা বানানো হয়েছে। আর অন্তরের কাছে উপস্থিত করা হয়েছে কৃপণতা এবং তাকে পরীক্ষায় ফেলা হয়েছে সুখ-দুঃখের দ্বারা। যদি সুখ আসে, তাহলে তা হয় বিপদ। আর যদি দুর্যোগ আসে, তাহলে তা-ও হয় পরীক্ষা। তার জন্য এমন শত্রু নির্ধারণ করা হয়, যে তাকে এমন স্থান থেকে প্রত্যক্ষ করে, যেখান থেকে সে তাকে প্রত্যক্ষ করে না।”
এরপর তিনি সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে আগমন করে বলেন, “আল্লাহর কসম, যদি তোমাদের কেউ শিকারের সন্ধানে এমন স্থান থেকে শিকারকে পর্যবেক্ষণ করে, যেখান থেকে শিকার তাকে দেখতে পায় না, তাহলে অবস্থা এই হবে যে, সে শিগগিরই তা ধরে ফেলবে।”
আল্লাহ যার দায়িত্ব ছেড়ে দেন সে ধ্বংস হবে
[১২৬] গাইলান ইবনু জারির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মানুষকে পেয়েছি আল্লাহর মাঝে এবং শয়তানের মাঝে নিক্ষিপ্ত। আল্লাহ যদি তার মধ্যে কল্যাণ দেখতে পান, তাহলে নিজের দিকে টেনে নেন। আর যদি তিনি তার মধ্যে কল্যাণ দেখতে না পান, তাহলে তাকে তার প্রবৃত্তির দিকেই ন্যস্ত করে দেন। আর তিনি যাকে প্রবৃত্তির দিকে ন্যস্ত করেন, সে تو ধ্বংস হয়ে যাবে।”
দ্বীনি ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা
[১২৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার নিকট আমার ভাইদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা থেকে অধিক পছন্দনীয়। আমার পরিবার আমাকে বলে, হে বাবা, হে বাবা। আর আমার ভাইয়েরা আমার জন্য আল্লাহর কাছে এমন দুআ করে, যাতে আমি কল্যাণের প্রত্যাশা রাখি।”
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ
[১২৮] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, বিপদে পতিত হয়ে সবর করা অপেক্ষা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।”
মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি কৃতজ্ঞতা এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত করলাম। তখন বুঝতে পারলাম এ দুয়ের মধ্যেই দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ নিহিত।”
অন্যদের প্রতি মন্দ ধারণার ক্ষেত্রে সতর্কতা
[১২৯] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মন্দ ধারণার মাধ্যমে তোমরা মানুষদের থেকে প্রহরা লাভ করো।"
পরকালের ফলাফল জানার সহজ পন্থা
[১৩০] গাইলান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি এটা পছন্দ করে যে, আল্লাহর কাছে তার জন্য কী (প্রতিদান) রয়েছে, সে যেন এর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তার কাছে আল্লাহর জন্য কী রয়েছে। (অর্থাৎ আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করার মতো কী কী নেক আমল করেছে)।”
আল্লাহর কাছে আশ্রয়প্রার্থনা
[১৩১] আমর ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি শাসকের অনিষ্ট থেকে এবং তাদের কলমের ফায়সালা থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি আপনার আনুগত্য-যাতে রয়েছে আপনার সন্তুষ্টি-এর ব্যাপারে এমন কোনো কথা বলা থেকে, যা দ্বারা আমি আপনার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছু সন্ধান করি। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি এমন কিছু রেখে যাওয়া থেকে, যা আমাকে আপনার কাছে লজ্জিত করবে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি—আপনি আমাকে যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন তার মাধ্যমে অন্য কেউ আমার চাইতে অধিক সৌভাগ্যবান হওয়া থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় হওয়া থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি আমার ওপর আপতিত কোনো বিপদের কারণে আপনার অবাধ্যতার জন্য প্রার্থনা করা থেকে।"
কৃতজ্ঞতা সবরের থেকেও উত্তম
[১৩২] মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাই আবুল আলা মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "আমার নিকট বিপদ থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহ তাআলার কৃতজ্ঞ হওয়া, বিপদে আক্রান্ত হয়ে সবর করার চেয়েও অধিক পছন্দনীয়। ঘুমিয়ে রাত যাপন করে অনুতপ্ত হয়ে ভোরে জাগ্রত হওয়া, সারা রাত ইবাদাতে কাটিয়ে আত্মতৃপ্ত হয়ে ভোর করার চেয়েও অধিক পছন্দনীয়।”
সবচেয়ে মন্দ আকাঙ্ক্ষা
[১৩৩] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "সবচেয়ে মন্দ আকাঙ্ক্ষা হলো, দুনিয়ার জন্য আখিরাতের আমল করা।”
মৃত্যুর আগে মৃত্যুর প্রস্তুতি
[১৩৪] সুফিয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর এক ছেলে অবহিত করেছে, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ তার নিজের জন্য বাড়ির ভেতর একটি কবর খুঁড়ে রেখেছিলেন। সেখানে তাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো, তিনি সেখানে কুরআন পাঠ করতেন। এরপর যখন তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, তাকে সেখানে দাফন করা হয়েছে। আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করুন।”
হারাম থেকে বেঁচে থাকার ফযীলত
[১৩৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন—তুমি এমন দু-ব্যক্তির দেখা পাবে, যাদের একজন সালাত সাওম ও সদাকা অত্যধিক পরিমাণে করেছে; অথচ অপরজন আল্লাহর নিকট মর্যাদায় তার থেকে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ। তারা বললেন, 'হে আবূ বাসার, এটা কীভাবে?' তিনি বললেন, 'অপর ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে হারাম থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে অনেক বেশি অগ্রগামী।'
আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না
[১৩৬] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এখানে কিছু লোক রয়েছে, যারা ধারণা করে—তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যদি চায় তাহলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, যদি তারা জাহান্নামে প্রবেশ করে।” এরপর মুতাররিফ আল্লাহর নামে তিনবার কসম করে বললেন, “কোনো বান্দা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে নিজ ইচ্ছায় জান্নাতে প্রবেশ করাতে চাইবেন।”
বস্তুত আল্লাহই আলো দেন
[১৩৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আদম-সন্তানের দৃষ্টান্ত হলো এই পাথরের মতো; যদি কোনো কিছু দ্বারা তা নাড়ানো হয়, তাহলে তা নড়ে ওঠে। নিশ্চয়ই তা জমিনে নিক্ষিপ্ত একটি পাথর মাত্র।' এরপর তিনি পাঠ করলেন:
وَمَن لَّمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِن نُّورٍ
'বস্তুত আল্লাহ যাকে আলো দেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।” [৮]
বিনয়ের প্রকৃষ্ট নমুনা
[১৩৮] আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান ইবনু আবিল হাসান ও মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ উমার ইবনু আবদিল আযীয রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে চিঠি লিখলেন। তাদের একজন লিখলেন—হামদ ও সালাতের পর। আপনি এমনভাবে জীবনযাপন করুন যেন আপনি দুনিয়ায় নেই, আপনি আখিরাতের একজন অধিবাসী হয়ে আছেন। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আর অপরজন লিখলেন—হামদ ও সালাতের পর। আপনি এমনভাবে জীবনযাপন করুন যাদের ব্যাপারে মৃত্যুর ফায়সালা লেখা হয়েছে, তাদের সর্বশেষ ব্যক্তিও যেন মৃত্যুবরণ করেছে। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
বর্ণনাকারী বলেন, “মুতাররিফ ও তার এক সঙ্গী মাওকিফে গেলেন। তখন তাদের একজন বললেন, 'এটা কত-না উত্তম মাওকিফ ছিল, যদি না তাতে আমি থাকতাম!' আর অপরজন বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি আমার কারণে তাদের ফিরিয়ে দেবেন না।"
উত্তম কথা আরশের চতুষ্পার্শ্বে থাকে
[১৩৯] আব্দুল্লাহ ইবনু রাবাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, কাব রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই উত্তম কথা আরশের চতুষ্পার্শ্বে থাকে। মৌমাছির গুঞ্জনের মতো তার গুঞ্জন রয়েছে। তা তার কথকের কথা স্মরণ করতে থাকে।"
আল্লাহর রহমত এবং আজাবের পরিমাণ
[১৪০] আলি ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে যখন এই আয়াত পাঠ করা হতো : وَإِنَّ رَبَّكَ لَذُو مَغْفِرَةٍ لِلنَّاسِ عَلَى ظُلْمِهِم 'এবং নিশ্চয়ই মানুষের সীমালঙ্ঘন সত্ত্বেও তোমার প্রতিপালক তাদের প্রতি ক্ষমাপ্রবণ।[৯]
তখন তিনি বলতেন, “যদি মানুষ আল্লাহর ক্ষমা, দয়া এবং মাফের পরিমাণ জানতে পারত, তাহলে তাদের চোখ শীতল হয়ে যেত। আর মানুষ যদি আল্লাহর আযাব, শাস্তি, প্রতাপ এবং তার প্রতিশোধের পরিমাণ জানত, তাহলে তাদের এক ফোঁটা অশ্রুও ওপরে উঠত না এবং তারা কোনো খাদ্য বা পানীয় দ্বারা উপকৃত হতো না।”
হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ-এর ওপর আস্থা
[১৪১] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি কারও দুআয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমীন বলি না, যতক্ষণ না শুনতে পাই সে কী বলছে। তবে হাসান রাহিমাহুল্লাহ-এর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।”
অলৌকিকতা অস্বীকারের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন
[১৪২] আতা রাহিমাহুল্লাহ থেকে তার পিতার সূত্রে বর্ণিত, “একদিন মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ তার গ্রাম থেকে বসরার দিকে ফিরছিলেন। তখন তার চাবুক আলোকিত হয়ে উঠল। এ দেখে তার ভাই তাকে বলল, 'আমরা যদি মানুষের কাছে এ বিষয়টি বর্ণনা করি, তাহলে তারা আমাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে।' তিনি বললেন, 'যে এটাকে অস্বীকার করবে, সে চরম মিথ্যাবাদী।”
বাতাসের গুরুত্ব
[১৪৩] মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “যদি মানুষের থেকে তিন দিন বাতাস আটকে রাখা হয়, তাহলে আকাশ এবং পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে সব দুর্গন্ধময় হয়ে যাবে।”
পবিত্র ভূমি নাপাক ভূমিকে পবিত্র করে দেবে
[১৪৪] জুরাইরি আব্বাস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ-কে বললাম, আমার মধ্যে এবং মাসজিদের মধ্যে কিছু ধ্বংসাবশেষ রয়েছে, যাতে শুকনো পায়খানা রয়েছে। আর তার সামনে রয়েছে পবিত্র ভূমি। তখন তিনি বললেন, 'পবিত্র ভূমি নাপাক ভূমিকে পবিত্র করে দেবে।"
সাহাবিরা ঈশার সালাত পড়ার আগ পর্যন্ত ঘুমাতেন না
[১৪৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে আল্লাহ তাআলার এই আয়াত প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে:
كَانُوا قَلِيلًا مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ
"তারা রাতে খুব কমই ঘুমাত।"
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তারা ঈশার সালাত পড়ার আগ পর্যন্ত ঘুমাতেন না। "[১০]
গাফিলতিও আল্লাহ তাআলার বিশেষ নিআমাত
[১৪৬] মুতাররিফ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আল্লাহ যে সকল নিআমাত দ্বারা বান্দাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি ইয়াকিনের সঙ্গে গাফিলতি দান করেছেন। যদি তিনি এর সঙ্গে ভীতি দান করতেন, তাহলে তারা কোনো কিছুর দ্বারাই উপকৃত হতে পারত না।"
আল্লাহ তাআলার বাণীর প্রতি নিখাদ বিশ্বাস
[১৪৭] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি দুনিয়া থেকে নিজেকে বিমুখ করে নিয়েছিলেন। অবশেষে তাকে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়েছিল। তখন মুতাররিফ সুন্দর কাপড় পরে সুগন্ধিযুক্ত তেল লাগিয়ে কওমের মাঝে বের হলেন। তখন তারা ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, আবদুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেছে আর সে সুগন্ধিযুক্ত তেল লাগিয়ে এমন সুন্দর পোশাক পরে বেরিয়েছে! মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'আমি তার জন্য নত হব, অথচ আমার রব তার ব্যাপারে তিনটি বিষয়ের ওয়াদা করেছেন; যার প্রতিটি বিষয় আমার কাছে সমগ্র দুনিয়া থেকে অধিক প্রিয়! মহামহিম আল্লাহ বলেছেন:
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“তারা হলো সেসব লোক, যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে ওঠে, আমরা সকলে আল্লাহরই এবং তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। এরাই তারা, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং তারাই হিদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।”[১১] এরপরও কি আমি তার জন্য নত হব!”
সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আখিরাতের যা কিছু আমি প্রাপ্ত হয়েছি, যদি তা এক মগ পানি পরিমাণও হয়, তার পরিবর্তে আমি কামনা করেছি, দুনিয়ায় আমার থেকে যেন তার বিনিময় নিয়ে নেওয়া হয়।”
আল্লাহর ভয়ে ভীত অন্তর
[১৪৮] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এক মজলিসে ছিলাম, যেখানে হাসান, মুতাররিফ ও আরও অনেকে ছিলেন। তখন সাঈদ ইবনু আবী হাসান রাহিমাহুল্লাহ কথা বললেন। তার যখন কথা শেষ হলো তখন তিনি তিনবার এই বলে দুআ করলেন, হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান।”
বর্ণনাকারী বলেন, “মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট না হন, তাহলে অন্তত আমাদের ক্ষমা করুন।' তার এই কথা শুনে সকলে কেঁদে ফেলল।”
জামাআতের গুরুত্ব
[১৪৯] আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুতাররিফ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “আমি বিধবা নারীর থেকেও জামাআতের দিকে অধিক মুখাপেক্ষী। আমি যখন জামাআতের মধ্যে থাকি তখন আমি আমার গুনাহ চিনতে পারি।"
শয়তানের জাল
[১৫০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ এক মজলিসে ছিলেন। তখন আবুল আলা ইয়াজিদ ইবনুশ শিখখির রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, আপনি কিছু বলুন। তখন তিনি বললেন, 'এখানে কি আমিই রয়েছি?' এরপর তিনি সবিস্তারে আলোচনা করলেন। সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'তার আলোচনা আমাকে মুগ্ধ করল।' এরপর হাসান রাহিমাহুল্লাহ আলোচনা করলেন। তখন তিনি বললেন, ‘আমাদের কে সেখানে রয়েছে? শয়তান কামনা করে, তোমরা তার থেকে তা গ্রহণ করো। তখন কেউ আর সৎ কাজের আদেশ করবে না এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে না।"
বান্দার ভালোবাসা আল্লাহর ভালোবাসার সোপান
[১৫১] আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি, যখন কোনো ব্যক্তি তার সম্প্রদায়ের কাছে আসে, আর তারা তাকে দেখে বলে—স্বাগতম; তো ওইদিন যদি সে তার প্রতিপালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তবে তাকে (আল্লাহর পক্ষ থেকেও) স্বাগতম জানানো হবে। আর যখন তারা তাকে দেখে বলে—দুর্ভোগ; তো সেদিন যদি সে তার প্রভুর সঙ্গে মিলিত হয়, তবে তার জন্য (আল্লাহর পক্ষ থেকে) দুর্ভোগের (ঘোষণা দেওয়া হবে)।"
জালিম খলীফার জন্য কল্যাণের দুআ করা যায়
[১৫২] আমর ইবনুল ফাজল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আবুল আলা রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম—তখন হাজ্জাজ আবা পরিহিত ছিলেন—হে আবুল আলা, আমি কি হাজ্জাজকে গালি দেবো?” তখন তিনি বললেন, “তুমি তার জন্য কল্যাণের দুআ করো। কেননা, তার কল্যাণ তোমার জন্য উত্তম।”
স্বপ্নে কবরবাসীদের সঙ্গে কথা বলা
[১৫৩] আবুত তাইয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “মুতাররিফ ইবনু আবদিল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বৃক্ষহীন প্রান্তরে যেতেন। জুমুআর রাতে তিনি রাতের বেলায় ঘোড়ায় চড়ে বের হতেন। তো অনেক সময় তার চাবুতে একধরনের আলো দৃশ্যমান থাকত।”
বর্ণনাকারী বলেন, “একরাতে তিনি বের হয়ে কবরসমূহের কাছে এলেন। তখন তিনি ঘোড়ার ওপরই তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। তিনি বলেন, ‘তখন আমি কবরবাসীদের দেখতে পেলাম। প্রত্যেক কবরবাসী নিজ নিজ কবরের ওপর বসা।’ তিনি বলেন, ‘যখন তারা আমাকে দেখল, তখন বলল, এই হলো মুতাররিফ, যে শুক্রবারে এসে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘তোমরা কি তোমাদের ওখানে জুমুআর দিনের কথাও জানতে পারো?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, এবং সেদিন পাখি কী বলে আমরা তা-ও জানি।’ তিনি বললেন, ‘পাখি কী বলে?’ তারা বলল, ‘পাখি বলে, সালাম, এক শুভ দিনকে সালাম।”
গোপনে দান-সদাকা
[১৫৪] হাবিব ইবনুশ শাহীদ রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, “ইয়াজিদ ইবনু আবিল আলা একখণ্ড কাপড় পরিধান করতেন, যার মূল্য এক শ বা তার চেয়ে বেশি। এরপর তিনি শুক্রবারে আসতেন আর তার আস্তিনে খণ্ড খণ্ড রুটি থাকত। তিনি সেগুলো গরিবদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।”
চারটি বিষয়ের উপদেশ
[১৫৫] গানিম ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "ইসলামের শুরুতে আমরা পরস্পর পরস্পরকে চারটি বিষয়ের উপদেশ দিতাম-অবসর মুহূর্তে ব্যস্ততার সময়ের জন্য আমল করো। সুস্থতার সময়ে অসুস্থতার সময়ের জন্য আমল করো। যৌবনে বার্ধক্যের জন্য আমল করো। তোমার জীবদ্দশায় মৃত্যুর জন্য আমল করো।”
কৃপণতা এবং দুশ্চরিত্রতা কোনো মুমিনের মধ্যে একীভূত হতে পারে না
[১৫৬] আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, "দুটো স্বভাব-কৃপণতা এবং দুশ্চরিত্রতা-কোনো মুমিনের মধ্যে একত্র হতে পারে না।"
কবর থেকে মিশকের সুঘ্রাণ
[১৫৭] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনু গালিব ইবনুল হাজজা রাহিমাহুল্লাহ-কে মুনাজাতে বলতে শুনেছি-হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে আমাদের তরুণদের নির্বুদ্ধিতা, আমাদের ইলমের স্বল্পতা, আমাদের মৃত্যুর নিকটবর্তিতা এবং আমাদের থেকে আমাদের পুণ্যবানদের চলে যাওয়ার অভিযোগ করছি।”
মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তার কবর থেকে মিশকের সুঘ্রাণ পাওয়া যেত।” তিনি বলেন, "চলে যাওয়ার সময় তার কবর থেকে এক চিলতে মাটি আমার থলেতে ভরে নিলাম। আমি তার থেকে মিশকের সুঘ্রাণ পেতেই থাকলাম।”
সালাতের মধ্যে মৃত্যু
[১৫৮] আবূ খাব্বাব কাসসাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "জুরারাহ ইবনু আওফা আমাদের নিয়ে ফজরের সালাত পড়লেন। তিনি তাতে 'ইয়া আইয়ুহাল মুদ্দাসসির' পাঠ করলেন। যখন তিনি 'ফা-ইযা নুকিরা ফিন নাকুর' আয়াতে পৌঁছলেন, তখন তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।"
[১৫৯] বাহার্জ ইবনু হাকিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "জুরারাহ ইবনু আওফা আল- কুরাশি বনু কুশায়রের সবচেয়ে বড় মাসজিদে সালাত পড়ালেন। যখন তিনি 'ফা-ইযা নুকিরা ফিন নাকুর' পাঠ করলেন তখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। এরপর তাকে তার ঘরে বহন করে নিয়ে যাওয়া হলো। যারা তাকে তার ঘরে বহন করে নিয়ে গিয়েছিল, আমি ছিলাম তাদের একজন। তিনি তার ঘরে আলোচনা করেছিলেন যে, হাজ্জাজ বসরায় এসেছে আর সে তার কথা তার ঘরে আলোচনা করছিল।”
সন্তানের ভালোবাসার ওপর আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রাধান্যদান
[১৬০] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা আবদুল্লাহ ইবনু গালিবের কাছে আসতাম। তখন তার কাছে তার কোনো এক শিশুসন্তান আসত। তিনি তখন বলতেন, 'বাবা, তুমি তোমার মায়ের কাছে থাকো। আমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ কোরো না।' এরপর তিনি আল্লাহর স্মরণে বিভোর হতেন।”
সর্বদা যিকরে বিভোর থাকা
[১৬১] সাঈদ ইবনু ইয়াজিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু গালিবকে হত্যা করা হয়েছে, তার কবরের ওপর নির্মাণ স্থাপনা করা হয়েছে এবং মাটি দিয়ে কবর সমান করে দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, "আমরা তার কবরের ওপর থেকে সকল সুগন্ধির চেয়ে উত্তম সুগন্ধির ঘ্রাণ পেলাম।” তিনি বলেন, "ইবনু গালিব সাধারণভাবে কথাই বলতে পারতেন না, তবে শুধু এই কালিমাগুলো বলতেন—সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া সল্লাল্লাহু আলা সায়্যিদিনা মুহাম্মাদ। যদি তাকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করা হতো, তাহলে তিনি তার জবাব দিতেন। এরপর আবার এই কালিমাগুলোতে ফিরে যেতেন।”
সন্তান হারানোর বেদনা
[১৬২] আবদুল্লাহ ইবনু গালিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “জারিফ মহামারি আমার ছেলেকে নিয়ে গেছে, অথচ আমি তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার পরিতৃপ্তিটুকুও এখনো পাইনি। দিনে পারিনি; কারণ তো তোমরা দেখছই।”
বর্ণনাকারী বলেন, “তিনি যোহর এবং আসরের মধ্যবর্তী সময়ে সালাত পড়তেন। আর মাগরিব এবং ঈশার মধ্যবর্তী সময়ে সর্বদা প্রচুর পরিমাণে তাসবিহ পাঠ করতেন। (আবদুল্লাহ ইবনু গালিব বলেন) রাতে আমি (সন্তানদের) বলতাম, তোমরা তোমাদের মায়ের সঙ্গে থাকো।"
সকল মনোযোগ সৃষ্টিকর্তার মধ্যেই নিবদ্ধ রাখা
[১৬৩] সাল্লাম ইবনু মিসকিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হাসান রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু গালিব রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। তখন হাসান রাহিমাহুল্লাহ তাকে বললেন, 'আপনি যদি একটু কোমল আচরণ করতেন!'”
বর্ণনাকারী বলেন, “তখন তিনি বললেন
كَلَّا لَا تُطِعْهُ وَاسْجُدْ وَاقْتَرِب
'কিছুতেই নয়, তুমি তার আনুগত্য করো না। তুমি সাজদা করো এবং নৈকট্য অর্জন করো।[১২]
এরপর তিনি উঠে সাজদাবনত হলেন।”
ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি
[১৬৪] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা এক ঈদুল ফিতরের দিন আবদুল্লাহ ইবনু গালিব রাহিমাহুল্লাহ-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন তিনি মিঠাই বের করে আমাদের সবাইকে একটা একটা করে মিঠাই দিলেন। আমাদের সবাই তা খেল। এরপর আমরা যাত্রা করলাম।"
পোশাকের অহংকার
[১৬৫] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতা মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, "যখন তুমি কোনো পোশাক পরিধান করবে এবং এই কথা ভাববে যে—সেই পোশাকে তোমাকে অন্যান্য পোশাকের চেয়ে উত্তম দেখাচ্ছে—তাহলে তা তোমার জন্য কতই-না নিকৃষ্ট পোশাক!”
টিকাঃ
[৭] সূরা ইবরাহীম, ১৪:৫
[৮] সূরা নূর, ২৪: ৪০
[৯] সূরা রাদ, ১৩: ৬
[১০] সূরা আয-যারিয়াত, ৫১: ১৭
[১১] সূরা বাকারাহ, ২: ১৫৬-১৫৭
[১২] সূরা আলাক, ৯৬ : ১৯
📄 মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রত্যাশা
[১৬৬] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ-কে সাজদারত অবস্থায় এই কথা বলতে দেখেছি—কখন আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব এমতাবস্থায় যে, আপনি আমার ওপর সন্তুষ্ট। এরপর তিনি দুআয় গিয়েও এ কথা বলতেন-কখন আমি আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব এমতাবস্থায় যে, আপনি আমার ওপর সন্তুষ্ট।”
ডান হাতে লজ্জাস্থান স্পর্শ করা অপছন্দনীয়
[১৬৭] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তার বাবা ডান হাতে লজ্জাস্থান স্পর্শ করাকে অপছন্দ করতেন। আর তিনি বলতেন, আমি প্রত্যাশা করি, ডান হাতে আমি আমার আমলনামা নেব।”
কখনো মাত্রাতিরিক্ত রাগ না করা
[১৬৮] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “তার বাবা (মুসলিম) যখন কোনো ব্যক্তির ওপর রাগ করতেন তখন বলতেন-আমার মধ্যে আর তোমার মধ্যে পার্থক্য করে দাও। এটাই ছিল তার সবচেয়ে কঠোর কথা।”
আবেদনপ্রার্থীকে খালি ফিরিয়ে না দেওয়া
[১৬৯] তালহা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ কোনো আবেদনপ্রার্থীকে (খালি হাতে) ফিরিয়ে দিতেন না।”
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা
[১৭০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি একবার প্রচণ্ড অসুস্থ হলাম। তখন আমি অন্তরে সেই মানুষগুলোর থেকে অধিক নির্ভরযোগ্য কাউকে পেলাম না, যাদের আমি ভালোবাসতাম। তাদের ভালোবাসতাম শুধুই মহান আল্লাহর জন্য।”
একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করা
[১৭১] মুতামির রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ নিজ পরিবারকে বলতেন, "যখন তোমাদের কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন তোমরা সেই সময়ে আমাকে তার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ো, যখন আমি সালাত পড়ি।”
কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সুন্নাতের অনুসরণ
[১৭২] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার জুতা পরিধান করে সালাত পড়ি, অথচ তা খুলে ফেলা আমার জন্য বেশি সহজ। আর এর দ্বারা আমার উদ্দেশ্য শুধু সুন্নাহর ওপর আমল করা।"
আল্লাহর প্রতি প্রত্যাশা
[১৭৩] ইসহাক ইবনু সুয়াইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি এক বছর মক্কার পথে মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর সান্নিধ্য পাই। আমি দেখেছি, তিনি পুরো পথে একটি শব্দও বলেননি, যতক্ষণ না আমরা জাতু ইরকে পৌঁছেছি। এরপর তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। তিনি বললেন, 'আমার কাছে এই মর্মে হাদীস পৌঁছেছে, কিয়ামাতের দিন বান্দাকে এনে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হবে। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা তার নেক আমলের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। তখন তারা (ফেরেশতারা) তার নেক আমলের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে। তার কোনো নেক আমলই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তখন আল্লাহ বলবেন, তোমরা তার গুনাহের প্রতি দৃষ্টিপাত করো। তখন তার প্রচুর গুনাহ পাওয়া যাবে। তখন তাকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেয়া হবে। সে বারবার পেছনে ফিরে তাকাবে। তখন আল্লাহ বলবেন, তাকে ফিরিয়ে আনো। তুমি কীসের দিকে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছ? তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক, এটা তো আমার ধারণা বা প্রত্যাশা ছিল না। আল্লাহ বলবেন, তুমি সত্য বলেছ। তখন তাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হবে।”
অসুস্থ অবস্থায়ও নেক আমলের সওয়াব লেখা হয়
[১৭৪] সুলাইমান ইবনুল মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমরা আমাদের এক অসুস্থ সঙ্গীর শুশ্রূষা করার জন্য আসলাম। তখন লোকেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল যে—যখন মানুষ অসুস্থতায় আটকা পড়ে যায় তখন সে সুস্থাবস্থায় যা যা আমল করত তা তার আমলনামায় উত্থিত হয়, যতক্ষণ না সে ইন্তেকাল করে। মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'এমনটা নয়। বরং আমরা শুনতাম, তার উত্তম আমলগুলো উত্থিত হয়, যতক্ষণ না সে ইন্তেকাল করে।”
আল্লাহর প্রশংসাসহ তার কাছে আশ্রয়প্রার্থনা
[১৭৫] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার বাবা আমাকে বলতে শুনলেন,
أَعُوذُ بِالسَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمِ
'আমি সর্বশ্রোতা সর্বজ্ঞানী সত্তার কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহই হলেন সর্বশ্রোতা এবং সর্বজ্ঞানী।”
আবদুল্লাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার বাবা আমাকে শিখিয়ে দিয়ে বললেন, 'তুমি এভাবে বলো।”
আল্লাহর প্রতি আশা ও ভয় রাখা
[১৭৬] মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গেলাম। আমার শরীরের কিছু অংশ তখন আড়াল করে রাখছিলাম। মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনি দীর্ঘ সাজদা করতেন বলে আমার কাছে মনে হলো। তখন তার সামনের দাঁতে রক্ত পড়ল। ফলে সে দুটো পড়ে গেল। তখন আমি সে দুটোকে লুকিয়ে ফেললাম। অতঃপর আমি বললাম, আমার কাছে বেশি আমল নেই। তবে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি এবং তাকে ভয় করি।”
তিনি বলেন, “তখন তিনি আতঙ্কিত ব্যক্তির মতো তার মাথা ওঠালেন। এবং তিনি আমাকে বললেন, 'তুমি কীভাবে বললে?' আমি বললাম, 'আমার কাছে বড় কোনো আমল নেই। তবে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি এবং তাকে ভয় করি।' তখন তিনি বললেন, 'মা শা আল্লাহ, মা শা আল্লাহ! যে ব্যক্তি কোনো জিনিসকে ভয় করে, সে তা থেকে সতর্কতা অবলম্বন করে। আর যে ব্যক্তি কোনো কিছু প্রত্যাশা করে, সে তার সন্ধান করে। আমি জানি না, এমন বান্দার ভয়ের অবস্থা কী, যার সামনে প্রবৃত্তির তাড়না প্রকাশ হওয়ার পর সে আশঙ্কাজনক বিষয়টির কারণে তা পরিহার করে না! অথবা কোনো বিপদে আক্রান্ত হওয়ার পর তখন সে যা প্রত্যাশা করে, তার দিকে তাকিয়ে সেই বিপদের ওপর ধৈর্যধারণ করে না!”
মুআবিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সে সময় আমি জেনেবুঝে নিজেকে নিজে সত্যায়ন করেছি।"
একাগ্রচিত্তে সালাত আদায় করা
[১৭৭] হাবিব ইবনুশ শাহিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ দাঁড়িয়ে সালাত পড়ছিলেন। তখন এক টুকরো আগুন তার পাশে এসে পড়ল। তিনি তা টেরই পেলেন না। একপর্যায়ে তা নিভে গেল।”
ঈমানদার হতে হলে আল্লাহর ভয়ে গুনাহ পরিত্যাগ করতে হবে
[১৭৮] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এমন বান্দার ঈমান আর কতটুকুই, যে মহান আল্লাহর অপছন্দ জিনিস পরিত্যাগ করে না।"
আল্লাহর জন্য ভালোবাসা নিখাদ হয়ে থাকে
[১৭৯] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার এমন কোনো আমল নেই, যাতে আমি এমন কোনো জিনিস অনুপ্রবেশের আশঙ্কা করি না, যা সেটাকে বরবাদ করে দেবে। তবে মহান আল্লাহর জন্য ভালোবাসার বিষয়টি ভিন্ন।”
নেক আমল এবং ভরসার নমুনা
[১৮০] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বললেন, “তুমি এমন ব্যক্তির আমলের মতো আমল করো, যাকে শুধু তার আমল মুক্তি দিতে পারে। এবং তুমি ভরসা করো এমন ব্যক্তির ভরসার মতো, যাকে আল্লাহ তার জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন, এ ছাড়া অন্য কিছুই তাকে আক্রান্ত করতে পারে না।”
বান্দা কখনো প্রতিপালককে পরীক্ষা করতে পারে না
[১৮১] ইবনু শিহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইবলীস ঈসা ইবনু মারইয়াম আলাইহিমাস সালাম-কে বলল, 'হে মারইয়াম তনয়, আল্লাহ তোমার জন্য যা কিছু লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কিছু তো তোমাকে আক্রান্ত করবে না!' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, হে আল্লাহর শত্রু!' সে বলল, 'তাহলে তুমি এই পাহাড়ে চড়ো। এরপর নিজেকে সেখান থেকে নিক্ষেপ করো। আমি দেখব, তুমি মরে যাবে।' ঈসা আলাইহিস সালাম বললেন, 'হে আল্লাহর শত্রু, কল্যাণ ও বরকতের আধার মহান আল্লাহ তার বান্দাকে পরীক্ষা করতে পারেন। কিন্তু বান্দা তো তার প্রতিপালককে পরীক্ষা করতে পারে না!"
বৃদ্ধ অবস্থাতেও জিহাদের তামান্না
[১৮২] সাবিত আল-বুনানি রাহিমাহুল্লাহ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, “আবু তালহা আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু সূরা তাওবা পাঠ করলেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছলেন: انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالَ 'জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়ো-হালকা অবস্থায় থাকো বা ভারী অবস্থায়।[১৩]
তখন বলে উঠলেন, 'আমি দেখছি, আমাদের প্রতিপালক আমাদের জিহাদের জন্য আহ্বান করছেন-আমরা বৃদ্ধ হই কিংবা যুবক হই। হে আমার ছেলেরা, তোমরা আমাকে যুদ্ধের সাজে সাজিয়ে দাও।' তখন তার ছেলেরা বলল, 'আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! আপনি আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, যতক্ষণ না তার ওয়াফাত হয়েছে। এরপর আবূ বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, যতদিন না তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এরপর উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গেও আপনি যুদ্ধ করেছেন। এখন আমরা আপনার পক্ষ থেকে যুদ্ধে লড়ব।' তিনি ছেলেদের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করলেন। অবশেষে (বাধ্য হয়ে) তারা তাকে যুদ্ধের সাজে সাজিয়ে দিলো। তিনি নৌযানে আরোহণ করে সমুদ্রযাত্রা করলেন। এরপর সেখানেই তার মৃত্যু হলো। সাত দিন পর্যন্ত সহযাত্রীরা তাকে দাফন করার জন্য কোনো দ্বীপ পাচ্ছিলেন না। সাত দিন পর তারা একটি দ্বীপ পেলেন। তখন পর্যন্ত তার লাশ মোটেও বিবর্ণ হয়নি। এরপর তারা সেখানে তাকে সমাহিত করলেন।"
আলিমের জন্য বিতর্কে জড়ানো অনুচিত
[১৮৩] মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াসি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তোমরা বিতর্ক করা থেকে বিরত থাকো। কারণ, তা (বিতর্কের সময়টা) আলিমের অজ্ঞে পরিণত হওয়ার সময়। আর এর দ্বারাই শয়তান তার পদস্খলন কামনা করে।"
সালাতে বিনয়াবনত থাকবে
[১৮৪] আবূ কিলাবা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তুমি আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান থাকবে তখন তুমি পছন্দ করবে-তিনি যেন তোমাকে বিনয়াবনত দেখেন-যাতে তোমার প্রয়োজন পূরণ হয়।” জিজ্ঞাসা করা হলো, "তাহলে সালাতে দৃষ্টির শেষ সীমা কোথায়?” তিনি বললেন, “শুধু সাজদার স্থান পর্যন্ত।”
মাসজিদ ভেঙে পড়লেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেননি
[১৮৫] মাইমুন ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, "আমি মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-কে কখনো সালাতে কোনো দিকে কম বা বেশি ঘুরে তাকাতে দেখিনি। একদিন মাসজিদের একপাশ ধসে পড়ল। তখন গোটা বাজারবাসী তার ধপাস শব্দে আতঙ্কিত হয়ে গেল। অথচ তিনি মাসজিদেই ছিলেন। তিনি সে দিকে ভ্রুক্ষেপই করেননি।"
দুনিয়ার প্রতি একেবারে উদাসীনতা
[১৮৬] মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর পুত্র বর্ণনা করেন, "ইবনুল আশআসের জামানায় শামবাসীরা যখন (বসরায়) প্রবেশ করে সেখানকার অধিবাসীদের পরাভূত করল সে সময় মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর পরিবারের সদস্যরা চিৎকার করে উঠেছিল। তখন তার উম্মে ওয়ালাদ [১৪] দাসী বলল, 'আপনি কি আওয়াজ শোনেননি?' তিনি বললেন, 'না তো, আমি কোনো আওয়াজ শুনিনি।”
মানুষের প্রশংসা শুনে আত্মপ্রবঞ্চিত না হওয়া
[১৮৭] জাফর ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, “মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে তার সালাতে দৃষ্টি ফেরানোর স্বল্পতার কথা উল্লেখ করা হলো। তিনি বললেন, 'তোমাদের কি জানা আছে, আমার অন্তর কোথায় থাকে?”
ইবাদাত এবং আল্লাহমুখিতা
[১৮৮] রাবি ইবনু সাবিহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মাকহুল রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি তোমাদের নেতাদের মধ্য থেকে একজন নেতাকে কাবায় প্রবেশ করতে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কে?' তিনি বললেন, 'মুসলিম ইবনু ইয়াসার।' আমি (মনে মনে) বললাম, তিনি কী করেন আমি দেখব। এরপর আমি দেখলাম, তিনি এক প্রান্তে দাঁড়ালেন। তারপর সামনে এগিয়ে শ্বেত মর্মর পাথরের দিকে মুখ করলেন। এরপর অতি উত্তমভাবে সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি সাজদা করলেন। আমি তার কিছুই বুঝলাম না। তবে তিনি সাজদায় বলছিলেন—হে আল্লাহ, আপনি আমার গুনাহসমূহকে এবং আমার দু-হাত যা কিছু অগ্রে প্রেরণ করেছে তা ক্ষমা করুন। এরপর তিনি কাঁদতে লাগলেন। একপর্যায়ে শ্বেত মর্মর পাথর অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল।”
সিদ্দিকের জন্য অভিশাপ দেওয়া শোভনীয় নয়
[১৮৯] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম ইবনি ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ নিজ পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি তাকে কখনো কোনো জিনিসকে অভিশাপ করতে শুনিনি। তিনি বলতেন, আমি যদি কোনো কিছুকে অভিশাপ দিতাম, তাহলে আর সেই জিনিসকে ঘরে রাখতাম না। তিনি বলতেন, কোনো সিদ্দিকের জন্য এটা সমীচীন নয় যে, সে অভিশাপদাতা হবে।”
কেউ সুস্থ হলে পাঠে করার দুআ
[১৯০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি যখন অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করত তখন তারা বলতেন, «لِيَهْنِكَ الظُّهْرُ» সুস্থতা তোমাকে আচ্ছাদিত করে নিক।”
মন্দ কথা বলার চাইতে নীরব থাকা উত্তম
[১৯১] আলি ইবনু আবী হামালাহ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “ইবনু আবী ইদরিস রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর কাছে তার পিতার ব্যাপারে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেন, 'হে আমার বাবা, আপনাকে কি আবূ আবদিল্লাহ অর্থাৎ মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর নীরবতার দীর্ঘতা আশ্চর্যান্বিত করে না?' তিনি বলেন, 'হে বৎস, হক কথা বলা সে ব্যাপারে নীরব থাকার চেয়ে অধিক উত্তম।' তখন ইবনু আবী ইদরিস রাহিমাহুল্লাহ মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে গিয়ে বললেন, 'হে আবূ আবদিল্লাহ, আমি আমার বাবাকে বলেছি, আপনাকে কি আবূ আবদিল্লাহর নীরবতার দীর্ঘতা বিস্মিত করে না? তখন তিনি আমাকে বলেছেন, হে বৎস, হক কথা বলা সে ব্যাপারে নীরব থাকার চেয়ে অধিক উত্তম।' তখন মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'মন্দ কথা বলার চেয়ে নীরব থাকা ঢের উত্তম।”
সালাতে দাঁড়িয়ে দুনিয়াকে ভুলে যাওয়া
[১৯২] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ যখন ঘরে প্রবেশ করতেন তখন পরিবারের সদস্যরা চুপ হয়ে যেত। সে সময় আর কারও কথাই শোনা যেত না। যখন তিনি সালাতে দাঁড়াতেন তখন তারা কথাবার্তা বলতেন এবং উচ্চৈঃস্বরে হাসাহাসি করতেন।"
[১৯৩] যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বসরার কতিপয় শাইখ থেকে বর্ণনা করেন, “মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ মাসজিদে সালাত আদায় করতেন।”
তিনি বলেন, “একদিন মাসজিদের একাংশ পতিত হলো। এতে মাসজিদের অনেক মুসল্লি আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তিনি বলেন, মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ তখন মাসজিদের এক প্রান্তে। তিনি মোটেও নড়াচড়া করেননি।”
সুস্থতার অবস্থায় সর্বদা দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করা
[১৯৪] আবদুল্লাহ ইবনু মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, মুসলিম ইবনু ইয়াসার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি এটা অপছন্দ করি যে, আমার প্রতিপালক আমাকে অসুস্থতা ছাড়াই বসা অবস্থায় সালাত আদায় করতে দেখবেন।”
টিকাঃ
[১৩] সূরা তাওবা, ৯:৪১
[১৪] উম্মে ওয়ালাদ বলা হয় এমন দাসীকে, যার গর্ভে মনিবের কোনো সন্তান জন্ম লাভ করেছে। এর প্রতিদানস্বরূপ মনিবের মৃত্যুর পর সে আর দাসী থাকে না; স্বাধীন নারী হয়ে যায়। এ ছাড়াও উম্মে ওয়ালাদ দাসীকে বিক্রি করা যায় না। কারণ, জীবিত থাকলে কিছুকাল পর তার মুক্তি সুনিশ্চিত।