📄 মালিক ইবনু আবদিল্লাহ আল-খাসআমি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
ষাট বছর সাওম রাখা
[৩৯] হাসান ইবনু আবদিল আযীয রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার কাছে যামরা রাহিমাহুল্লাহ রাজা ইবনু আবী সালামা রাহিমাহুল্লাহ-এর সূত্রে লিখে পাঠালেন যে-মালিক ইবনু আবদিল্লাহ আল-খাসআমি রাহিমাহুল্লাহ-এর সারাজীবনের সাওম গণনা করা হলো। তখন দেখা গেল এর পরিমাণ ষাট বছরের সমতুল্য।”
লোক দেখানোর জন্য কান্না
[৪০] ইবরাহীম ইবনু আবদিল্লাহ আল-কাত্তানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমার কাছে এ মর্মে বর্ণনা পৌঁছেছে যে, কান্নার দশটা অংশ রয়েছে; যার নয় অংশ লৌকিকতা আর এক অংশ মহামহিম আল্লাহর জন্য। বছরে যদি একবার সেই কান্না আসে-যা আল্লাহর জন্য হয়ে থাকে-তাহলে তা-ই বেশি।”
ভালো কাজে মানুষের তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করা
[৪১] সালিহ ইবনু খালিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তুমি কোনো ভালো কাজ করতে চাইবে, তখন মানুষদের গরুর পর্যায়ে গণ্য করবে। তবে তুমি তাদের তাচ্ছিল্য করবে না।"
সহনশীলতা বিবেকের চেয়েও বেশি দামি
[৪২] রাজা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সহনশীলতা আকল (যুক্তি, বুদ্ধি) থেকে সুউচ্চ। কারণ, মহামহিম আল্লাহ নিজেকে সেই নামেই অভিহিত করেছেন।”
সর্বাবস্থায় তাসবিহ পাঠ করতে থাকা
[৪৩] আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা আব্বাজানের সাথে চলছিলাম। তখন তিনি আমাদের বললেন, 'যতক্ষণ না ওই গাছ পর্যন্ত গমন করবে, ততক্ষণ তাসবিহ পাঠ করতে থাকো।' আমরা সেই গাছের নিকট পৌঁছা পর্যন্ত তাসবিহ পাঠ করতে থাকলাম। যখন আমাদের দৃষ্টির সীমায় অন্য একটি গাছ এল তখন তিনি বললেন, 'তোমরা তাকবির পাঠ করতে থাকো, যতক্ষণ না ওই গাছের কাছে পৌঁছো।' তখন আমরা তাকবির পাঠ করতে থাকলাম। তিনি (প্রত্যেক সফরে) আমাদের সঙ্গে এরূপ করতেন।"
পাপের ব্যাপারে সন্তুষ্টি বঞ্চনার কারণ
[৪৪] আবদুল্লাহ ইবনু শুমায়ত রাহিমাহুল্লাহ তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলতেন, “যে ব্যক্তি পাপাচারের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলো, সে পাপাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো। যে আল্লাহর অবাধ্যতার প্রতি সন্তষ্ট হলো, তার কোনো নেক আমল ওপরে উঠবে না (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না)।”
আবদুল্লাহ ইবনু শুমায়ত রাহিমাহুল্লাহ তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন, "আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি—মুমিনের মূল পুঁজি হলো তার দ্বীন। সে যেখানে যায়, তার সঙ্গে তার দ্বীনও সেখানে যায়। সে তা ঘরে রেখে যেতে পারে না এবং লোকদের থেকে তার ব্যাপারে নিরাপত্তা বোধ করে না।”
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শেষ রাতের আমল
[৪৫] আবূ সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের বেলায় যখন উঠতেন, তখন তার দুহাত উত্তোলন করতেন এবং আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতেন। এরপর তিনবার বলতেন,
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ، اللَّهُ أَكْبَرُ
'হে আল্লাহ, আপনার প্রশংসাসহ বড়ত্ব ঘোষণা করছি। আপনার নাম বরকতপূর্ণ এবং সমুন্নত। এবং আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ সর্বাধিক বড়।' এরপর তিনবার বলতেন,
لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
'আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।'
এরপর তিনবার বলতেন,
أَعُوذُ بِاللهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْثِهِ وَنَفْخِهِ
'সর্বজ্ঞানী সর্বশ্রোতা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি বিতাড়িত শয়তান থেকে—তার খোঁচা, ফুঁক ও কুমন্ত্রণা থেকে।”
মুমিনের পদস্খলনে উল্লাস কোরো না
[৪৬] ইয়াজিদ ইবনু মাইসারা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনের (ক্রোধের) আগুনকে ভয় করো, যেন তা তোমাকে পোড়াতে না পারে। কারণ, সে যদি দিনে সাতবারও হোঁচট খায়, তথাপি তার হাত মহামহিম আল্লাহর হাতেই থাকে। তিনি যখন চাইবেন, তাকে উঠিয়ে দেবেন।”
লেনদেনের ক্ষেত্রে সতর্কতা
[৪৭] ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আইয়ুব রাহিমাহুল্লাহ নেওয়ার সময় কমিয়ে নিতেন, আর দেওয়ার সময় ওজন করে দিতেন।”
বিদায়ের সময় সালামের ফযীলত
[৪৮] ইয়াহইয়া ইবনু রাশিদ আল-জারিরি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের কাছে মুআবিয়া ইবনু কুররাহ রাহিমাহুল্লাহ আসলেন। তিনি তার পরিধেয় বস্ত্র খুলে রাখলেন। এরপর তার ওপর ভর দিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ পর মজলিস ত্যাগ করার জন্য উঠলেন। তখন তিনি সালাম দিলেন এবং বললেন, 'আমার কাছে এ মর্মে বর্ণনা পৌঁছেছে—যে ব্যক্তি কোনো কওমের মজলিসে বসবে, আর তাদের কাছ থেকে উঠে যাওয়ার সময় সময় সালাম দেবে, তবে সে (ব্যক্তি) উঠে যাওয়ার পরও লোকেরা যত ভালো কাজ করবে, সে তার সাওয়াবে অংশীদার থাকবে। (অর্থাৎ তাদের নেক আমলেরও বদলা পাবে)।"
হাজ্জাজের কারাগারে বন্দীদের আধিক্য
[৪৯] সালিহ ইবনু আবদির রহমান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সুলায়মানের শাসনামলে আমরা হাজ্জাজের কারাগারে থাকা বন্দীদের সংখ্যা গণনা করেছি। তখন আমরা তাদের সংখ্যা পেয়েছি তেত্রিশ হাজার। (আর এই তেত্রিশ হাজার ছিল শুধু সেসব বন্দী) যাদের ওপর তখন পর্যন্ত কোনো অঙ্গ কর্তন কিংবা শূলে চড়ানোর ফায়সালা আরোপিত হয়নি।"
কাসিম ইবনু মুখাইমিরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো মুসলিমের কবর মাড়ানোর থেকেও আগুন নিভে যাওয়া পর্যন্ত অঙ্গারের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা বিঁধে যাওয়া পর্যন্ত বর্শার ফলার ওপর পা রাখা—আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।”
ইয়াহইয়া ইবনু আবী আমর আশ-শাইবানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “রাজা ইবনু হাইওয়া রাহিমাহুল্লাহ আসরের সালাত বিলম্বে পড়াকে উত্তম মনে করতেন এবং তিনি যোহর ও আসরের মধ্যবর্তী সময়ে সালাত পড়তেন।”
আলি ইবনু আবী হামলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনু আবদিল মালিক আমাকে তার সান্নিধ্যে রাখার ইচ্ছা করলেন। আমি এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনু আবী যাকারিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে পরামর্শ করলাম। তিনি বললেন, তুমি স্বাধীন মানুষ। নিজেকে কিনা এখন দাস বানাতে চাচ্ছ!”
বাইতুল মাকদিসে ইবাদাতের ফযীলত
[৫০] আবদুল আযীয ইবনু আবী রাওয়াদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “ইলয়াস এবং খাজির (আলাইহিমাস সালাম) রমাদান মাসে বাইতুল মাকদিসে সিয়াম পালন করতেন এবং প্রতিবছর সময় পূরণ করতেন।”
সুলাইমান ইবনু কাইসান আবী ঈসা খুরাসানি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি বাইতুল মাকদিসে জামাতের সঙ্গে ফরজ সালাত আদায় করবে, তাকে পঁচিশ হাজার সালাতের সওয়াব দেওয়া হবে। আর যে একাকী সালাত আদায় করবে, তাকে এক হাজার সালাতের প্রতিদান দেওয়া হবে।”
জান্নাতে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না
[৫১] আবদুল কারীম ইবনু রশিদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন জান্নাতিরা জান্নাতের দরজার কাছে এসে পৌঁছবে, তখন তারা পরস্পরের দিকে ষাঁড়ের (ন্যায় হিংস্র) দৃষ্টিতে তাকাবে। এরপর যখন তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরের সব হিংসা দূর করে দেবেন। ফলে তারা ভাই ভাই হয়ে যাবে।”
📄 হারিম ইবনু হাইয়্যান রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
আখিরাতের কথা স্মরণ
[৫২] মাতার আল-ওয়াররাক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হারিম আল-আবদি রাহিমাহুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবি হুমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে রাত যাপন করলেন। সে রাত পুরোটাই হুমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে কেঁদে কাটালেন। এভাবেই ভোর হলো। ভোর হওয়ার পর হারিম রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'হে হুমামাহ, কোন জিনিস আপনাকে কাঁদাল?' তিনি বললেন, 'আমার সেই রাতের কথা স্মরণ এসেছে-যার ভোর হবে এমন-যাতে কবরগুলো উন্মোচিত হবে, এরপর তার (কবরের) অধিবাসীদের বের করে আনা হবে।' এরপর একদিন হুমামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হারিম রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে রাত যাপন করলেন। সে রাতও তিনি কেঁদে কেঁদে কাটালেন। অবশেষে ভোর হলো। ভোরে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কীসের স্মরণ আপনাকে কাঁদাল?' তিনি বললেন, 'আমার সেই রাতের কথা স্মরণে এসেছে, যার ভোরে আকাশের তারকাগুলো খসে পড়বে-এ বিষয়টি আমাকে কাঁদিয়েছে।' কখনো তারা দিনের বেলা একসাথে বের হয়ে 'রায়হান' (সুগন্ধ ফুল)-এর বাজারে আসতেন। সেখানে আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করতেন এবং এ ছাড়া আরও অনেক দুআ করতেন। তারপর তারা কামারদের কাছে এসে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। অবশেষে তারা আলাদা (পথ) ধরে নিজ নিজ বাড়ির দিকে যাত্রা করতেন।”
ফিতনা থেকে পানাহ চাওয়া
[৫৩] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, আমি আল্লাহর কাছে এমন কালে পৌঁছা থেকে পানাহ চাই-যাতে প্রবীণরা দীর্ঘ জীবনের স্বপ্ন দেখবে, নবীনরা অবাধ্য হয়ে যাবে, আর সে সময় মৃত্যু তাদের নিকটবর্তী হবে।"
পবিত্র বারিধায় সিক্ত সমাধি
[৫৪] আওন ইবনু আবী শাদ্দাদ রাহিমাহুল্লাহ জনৈক ব্যক্তি থেকে বর্ণনা করেন, “তিনি তার পিতার সূত্রে বলেন, আমি হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ-কে দেখেছি। এক গ্রীষ্মের দিনে তাকে দাফন করা হয়েছে। তখন একখণ্ড মেঘ এসে তার কবর এবং কবরের চতুষ্পার্শ্বে পানি বর্ষণ করেছে। পানি বর্ষণ শেষে সেই মেঘখণ্ড সরে গেছে।”
মৃত্যুকালীন ওসিয়ত
[৫৫] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের ইলমি মজলিসে আলোচনা হয়েছে, হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তাকে বলা হলো, আপনি ওসিয়ত করুন। তিনি বললেন, 'আমি জানি না, আমি কী ওসিয়ত করব। তবে তোমরা আমার বর্ম বিক্রি করে আমার ঋণ পরিশোধ করে দিয়ো। যদি এতে পুরোপুরি পরিশোধ (করা সম্ভব) না হয়, তাহলে আমার গোলামকেও বিক্রি করে দিয়ো। আর আমি তোমাদের সূরা নাহলের শেষের দিকের আয়াতগুলোর ওসিয়ত করছি,
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ 'আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমাত এবং সদুপদেশের মাধ্যমে।”[২]
জান্নাত-জাহান্নাম প্রত্যাশীদের হতাশাব্যঞ্জক চিত্র
[৫৬] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি জাহান্নামের মতো এমন কিছু দেখিনি, যা থেকে পলায়নপর ব্যক্তি উদাসীনতায় মত্ত থাকে। আর আমি জান্নাতের মতো এমন কিছু দেখিনি, যার সন্ধানী নিদ্রায় বিভোর থাকে।”
অন্যায় কাজ থেকে বারণ না করার কারণে তিরস্কার
[৫৭] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ কোনো এক যুদ্ধে ছিলেন। সে সময় এক ব্যক্তি তার কাছে অনুমতি চাইল। তিনি ভাবলেন, সে হয়তো কোনো ব্যক্তিগত প্রয়োজন সারার জন্য অনুমতি চাচ্ছে। (তাই তিনি তাকে অনুমতি দিলেন।) সে ব্যক্তিটি বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে এল। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি (এতকাল) কোথায় ছিলে?' সে বলল, 'আমি অমুক দিন আপনার কাছে অনুমতি চেয়েছিলাম। আপনিও অনুমতি দিয়েছিলেন।' তিনি বললেন, 'তুমি তাহলে সেই অনুমতির দ্বারা এটা উদ্দেশ্য নিয়েছিলে?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আবুল আশহাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি তখন সেই ব্যক্তিটিকে অনেক শক্ত কথা বললেন। এ দেখে তার সঙ্গীদের কেউ আর তার সঙ্গে কথা বলেনি। কারণ, তারা তাকে রাগ করতে এবং এক মুসলিম ভাইকে শক্ত কথা বলতে দেখে (চুপ ছিল)।' তিনি বলেন, 'এরপর হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ সঙ্গীদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের ভাগ্যে মন্দ সাথি জুটুক। তোমরা দেখেছ, আমি আমার ভাইকে কী কথা বলেছি। এরপরেও তোমাদের কেউ আমাকে তা থেকে বারণ করলে না! হে আল্লাহ, আপনি মন্দ লোকদের মন্দ যুগের জন্য রেখে দিন।”
আল্লাহর অভিমুখী বান্দার পুরস্কার
[৫৮] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমাদের ইলমি মজলিসে আলোচনা হয়েছে যে, হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, কোনো বান্দা যদি আন্তরিকভাবে আল্লাহমুখী হয়, তবে আল্লাহর মুমিনদের অন্তর তার অভিমুখী করে দেন। তিনি তাকে বান্দাদের ভালোবাসা এবং সহমর্মিতা দান করেন।"
শেষ রাতে কাব্যচর্চার কারণে নিন্দা জ্ঞাপন
[৫৯] মুহাম্মাদ বিন নাফি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমরা হারিম ইবনু হাইয়ানের সঙ্গে খোরাসান থেকে ফিরছিলাম। যখন আমরা মাঝপথে ছিলাম তখন এক রাতের শেষ প্রহরে আমি কবিতার একটি পঙ্ক্তি আবৃত্তি করছিলাম। তখন হারিম রাহিমাহুল্লাহ চাবুক উঠিয়ে আমার পিঠে একটা আঘাত করলেন। আমি তখন (কবিতা আবৃতি করা থেকে নিজেকে) গুটিয়ে নিলাম। তিনি আমাকে বলেন, 'যে সময় রহমান (দুনিয়ার আকাশে) নেমে আসেন এবং যে সময় দুআ কবুল করা হয়, তুমি সে সময়ে কবিতা আবৃত্তি করছ!”
অন্য বর্ণনায় কথাটা এভাবে এসেছে, “যে সময়ে দুআ কবুল হয় এবং রহমত নেমে আসে (তুমি সে সময়ে কবিতা আবৃত্তি করছ!)।”
পাপাচারী আলিম থেকে দূরে থাকা
[৬০] হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "তোমরা পাপাচারী আলিম থেকে দূরে থাকো। কথাটি উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে পৌঁছল। তিনি এতে উদ্বিগ্ন হয়ে তার কাছে পত্র লিখলেন—পাপাচারী আলিমের স্বরূপ কী? তার পত্রের জবাবে হারিম রাহিমাহুল্লাহ লিখে পাঠালেন—আল্লাহর কসম হে আমিরুল মুমিনিন, আমি এর দ্বারা মন্দ কিছু উদ্দেশ্য নিইনি। একজন আলিম এমন ইমাম হয়, যে মানুষদের ইলমের কথা বলে আবার নিজে পাপাচারেও লিপ্ত থাকে। তখন জনসাধারণের কাছে বিষয়টা অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে তারা বিভ্রান্ত হয়।”
অপ্রয়োজনীয় মেলামেশা থেকে দূরে থাকা
[৬১] মালিক ইবনু দীনার রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ-কে গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। তিনি বলেন, তখন তার ধারণা হলো—সম্প্রদায়ের লোকেরা তার কাছে যাতায়াত করবে। তাই তিনি অগ্নি প্রজ্বালনের নির্দেশ দিলেন। তার নির্দেশে তার বাসস্থান এবং তার সাক্ষাৎ-প্রত্যাশীদের মধ্যবর্তী স্থানে অগ্নি প্রজ্বালিত করা হলো। এরপর সম্প্রদায়ের লোকেরা তার কাছে এসে দূর থেকে সালাম দিলো। তখন তিনি বললেন, 'আমার সম্প্রদায়ের লোকদের স্বাগতম! আপনারা কাছে আসুন।' তখন তারা বলল, 'আল্লাহর কসম, আমরা আপনার কাছে আসতে পারব না। আগুন আমাদের এবং আপনার মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বললেন, আপনারা তো এর চেয়ে ভয়াবহ আগুন—জাহান্নামের আগুনে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান!'" বর্ণনাকারী বলেন, “তখন তারা ফিরে গেল।”
মৃত্যুকালীন উপদেশ
[৬২] আবু কাজআ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ মৃত্যুকালে ওসিয়ত করলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সূরা নাহলের শেষের দিকের আয়াতগুলোর ওসিয়ত করছি, ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ 'আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমাত এবং সদুপদেশের মাধ্যমে।'
জান্নাতের তাঁবু
[৬৩] খুলাইদ আল-উমারি রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমার কাছে বর্ণনা পৌঁছেছে যে, (জান্নাতের) তাঁবু হবে শূন্যগর্ভ মুক্তো (-নির্মিত); যার সত্তরটি কপাটই মোতির থাকবে।”
আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়
[৬৪] হুমায়দ ইবনু হিলাল রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হারিম ইবনু হাইয়ান ও আবদুল্লাহ ইবনু আমির (রাহিমাহুমাল্লাহ) হাজ্জের উদ্দেশ্যে বেরোলেন। পথ চলতে চলতে তাদের উষ্ট্রীবাহনের সামনে সিল্লিয়ানা[৩] পড়ল। এ দেখে তাদের উভয়ের উষ্ট্রীই সেদিকে দ্রুত ছুটে গেল। এরপর তাদের একজনের উষ্ট্রী তা খেয়ে ফেলল। তখন হারিম রাহিমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনু আমিরকে বললেন, 'তোমাকে কি এ বিষয়টি আনন্দ দেবে যে, তুমি এই সিল্লিয়ানা হবে আর এ ধরনের কোনো পশু এসে তোমাকে খেয়ে চলে যাবে?' তিনি বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, আমি তার রহমতের প্রত্যাশা রাখি, প্রত্যাশা রাখি এবং প্রত্যাশা রাখি।' তখন হারিম বললেন, 'কিন্তু আল্লাহর কসম আমি এটা ভালোবাসি যে, আমি এই সিল্লিয়ানা হব আর এ ধরনের কোনো পশু এসে আমাকে খেয়ে চলে যাবে। এরপর আমার আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।"
[৬৫] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "হারিম ইবনু হাইয়ান এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আমির (রাহিমাহুমাল্লাহ) হিজায ভূমির উদ্দেশে বের হলেন। তারা নিজ নিজ উষ্ট্রীর ওপর চড়ে পথ চলছিলেন। একপর্যায়ে তারা এমন স্থান দিয়ে অতিক্রম করলেন যেখানে ঘাস, তৃণ ও লতাগুল্ম রয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন, তখন তাদের উভয়ের উষ্ট্রী সেই লতাগাছ নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলো। ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'হে ইবনু আমির, তোমাকে কি এ বিষয়টি আনন্দ দেবে যে, তুমি এই গাছগুলোর মধ্য থেকে একটি গাছ হবে, আর এমন কোনো উষ্ট্রী এসে তোমাকে খেয়ে যাবে, এরপর তোমাকে মলরূপে ত্যাগ করবে, ফলে তুমি মলরূপে গৃহীত হবে।' আবদুল্লাহ ইবনু আমির রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, আমি মহান আল্লাহর থেকে যে রহমতের প্রত্যাশা রাখি, তা এর থেকে অনেক উত্তম।' তখন হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি এটা ভালোবাসি যে, আমি এই গাছগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি গাছ হব। আর এমন কোনো উষ্ট্রী এসে আমাকে খেয়ে মলরূপে ত্যাগ করে চলে যাবে। এরপর আমি পশুর মল হিসেবে গৃহীত হব। আর কিয়ামাত দিবসে আমাকে আর হিসাবের কষ্ট—হয়তো জান্নাত অভিমুখে কিংবা জাহান্নামের দিকে—ভোগ করতে হবে না। হে ইবনু আমির, আফসোস তোমার জন্য! আমি তো মহাদুর্যোগের আশঙ্কা করি।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তিনি ছিলেন তাদের উভয়ের মধ্যে মহান আল্লাহর ব্যাপারে অধিক ফিকহ এবং ইলমের অধিকারী।”
জাহান্নাম নিশ্চিত হয়ে গেলেও আমল পরিত্যাগ না করা
[৬৬] জামরাহ ইবনু শাওযাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, হারিম ইবনু হাইয়ান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে যদি বলা হয়, আমি জাহান্নামীদের একজন তাহলে আমি আমল পরিত্যাগ করব না, যাতে আমার নফস আমাকে এই বলে তিরস্কার না করে যে, কেন করলে না! কেন করলে না!”
বৃষ্টি এসে তার কবরকে সিক্ত করে দিয়ে গেল
[৬৭] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “হারিম রাহিমাহুল্লাহ এক গ্রীষ্মের দিনে কোনো এক যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন। যখন তার দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়, তখন একখণ্ড মেঘ এসে তার কবরকে সিক্ত করে দিয়ে যায়। তবে একফোঁটা পানিও কবরকে অতিক্রম করেনি (অর্থাৎ কবরের ভেতরে প্রবেশ করেনি)। এরপর সে (মেঘ) যেখান থেকে এসেছে, সেখানেই হারিয়ে যায়।”
টিকাঃ
[২] وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُمْ بِهِ وَلَبِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ “এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন উৎকৃষ্ট পন্থায়। নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক তাদের সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন, যারা তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি তাদের সম্পর্কেও পরিপূর্ণ জ্ঞাত, যারা সৎপথে প্রতিষ্ঠিত। তোমরা যদি প্রতিশোধ নাও, তবে ঠিক ততটুকুই নেবে, যতটুকু জুলুম তোমাদের ওপর করা হয়েছে। আর যদি সবর করতে পারো তবে সবর অবলম্বনকারীদের পক্ষে তা-ই কল্যাণকর।" (সূরা নাহল, ১৬: ১২৫-১২৬)
[৩] পশুর খাদ্যবিশেষ।
📄 আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
দুটো অনন্য-সাধারণ স্বভাব
[৬৮] হারিস ইবনু উমায়র রাহিমাহুল্লাহ বসরার এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'কী ব্যাপার! আপনি কঙ্কর স্পর্শ করেন না কেন?' তিনি বললেন, 'তা স্পর্শ করার মধ্যে কোনো প্রতিদান নেই এবং তা পরিহার করার মধ্যে কোনো গুনাহ নেই। তবে আমার মধ্যে দুটো স্বভাব রয়েছে—আমার সঙ্গী যখন আমার কাছ থেকে চলে যায় তখন আমি তার দোষচর্চা করি না এবং আমি কোনো সম্প্রদায়ের এমন বিষয়ে নাক গলাই না, যে বিষয়ে তারা আমাকে সাথে রাখেনি।”
অবসর সময়ে কুরআন পাঠ
[৬৯] ইউনুস রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাকে আহনাফ ইবনু কায়সের গোলাম অবগত করেছে—আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ যখন একান্ত সময় পেতেন তখনই তাকে কুরআন মাজিদ দেওয়ার জন্য আহ্বান করতেন।”
অসাধারণ বিনয়
[৭০] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি সহনশীল নই। তবে আমি সহনশীলতার ভান করি।"
পিঁপড়াদের স্থান ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ
[৭১] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “একবার পিঁপড়া অনেক বেড়ে গেল। পিঁপড়ারা আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে অনেক কষ্ট দিচ্ছিল। তখন তিনি একটি চেয়ার আনার নির্দেশ দিলেন। ফলে একটি চেয়ার এনে পিঁপড়ার গর্তের ওপর রাখা হলো। এরপর তিনি আল্লাহর তাআলার প্রশংসা ও তার গুণ বর্ণনা করলেন। এরপর বললেন, 'তোমরা তো আমাদের কষ্ট দিচ্ছ। সুতরাং তোমরা নিবৃত্ত হয়ে যাও, অন্যথায় আমরাও তোমাদের কষ্ট দেবো।”
হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "এরপর পিঁপড়ারা নিবৃত্ত হলো এবং সেখান থেকে চলে গেল।"
কথা বলা থেকে বিরত থাকা
[৭২] হাম্মাদ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, বানু তামিম গোত্রের এক শাইখ বলেন, "আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, (আল্লাহর কাছে) জবাব দানের ভয় আমাকে অধিকাংশ সময় কথা বলা থেকে বিরত রাখে।"
কৃতজ্ঞতার সাজদা
[৭৩] জুবায়র ইবনু হাবিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “দু-ব্যক্তি আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছাল যে, নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য দুআ করেছেন। (এ কথা শুনে তিনি) তখন তিনি সাজদায় লুটিয়ে পড়লেন।”
বিনয়ী দুআ
[৭৪] মারওয়ান আল-আসগার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে শাস্তি দেন, তাহলে আমি তো শাস্তিরই উপযুক্ত। আর আপনি যদি আমাকে ক্ষমা করেন, তাহলে আপনি তো তারও অধিকার রাখেন।"
উম্মাহর ধ্বংস মুনাফিকের হাতে
[৭৫] আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমি একবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বসা ছিলাম। সে সময় তিনি বললেন, 'এই উম্মাহর ধ্বংস জ্ঞানী মুনাফিকের দু-হাতের মধ্যে রয়েছে। আমি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। ফলে তোমার মধ্যে কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি। সুতরাং তুমি তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ফিরে যাও। কারণ, তারা তোমার মতামত-সিদ্ধান্ত থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না।"
আগুনের ওপর হাত রেখে অতীত কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা
[৭৬] সালামাহ ইবনু মানসুর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আমার বাবা একটি গোলাম কিনলেন। গোলামটি এককালে আহনাফের মালিকানায় ছিল। পরবর্তীকালে তিনি তাকে আজাদ করে দেন। আমি তাকে তার বৃদ্ধ বয়সে পেয়েছি। তিনি বর্ণনা করতেন, আহনাফ রাহিমাহুল্লাহ-এর রাতের বেলার সাধারণ সালাত ছিল দুআ। তিনি নিজের কাছে প্রদীপ রাখতেন। এরপর তার ওপর হাত রেখে বলতেন, 'অনুভব করো হে আহনাফ, কোন জিনিস তোকে অমুক অমুক দিন এই এই (গোনাহের) কাজ করতে প্ররোচিত করেছিল?”
বাসগৃহ হিসেবে কুঁড়েঘরই পছন্দনীয়
[৭৭] সাঈদ ইবনু মাসউদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে—তিনি ছিলেন নিজ গোত্রের নেতা—বলা হলো, 'আমরা কি আপনার জন্য কখনো একটি বেষ্টনী তৈরি করব না?' তিনি বললেন, 'আমি জাহান্নাম ছাড়া অন্য কোনো স্থানের বেষ্টনীর কথা জানি না। আল্লাহর কসম, আমার এখানে কোনো বেষ্টনী তৈরি করা হবে না।"
বর্ণনাকারী বলেন, “তার বাসস্থান চিরকাল বাঁশনির্মিত কুঁড়েঘরই ছিল, যতদিন না তিনি মহান আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন।”
বার্ধক্যের দিনগুলোতেও অবিরাম সিয়াম পালন
[৭৮] সাঈদ ইবনু যায়দ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'আপনি অনেক বয়োবৃদ্ধ। সিয়াম পালন আপনাকে দুর্বল করে ফেলবে।' তিনি বললেন, 'দীর্ঘ অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আমি এগুলোকে গণনা করে রাখছি।"
লৌকিকতা বর্জন করা
[৭৯] আবুজ জিনবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এক যুবক আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-এর সঙ্গে হাঁটত। একদিন তিনি তার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সেই যুবকটি তার সামনে লৌকিকতা প্রদর্শন করল। তখন তিনি তাকে বললেন, 'তুমি বোধ হয় প্রদর্শনকারীদের একজন!' সে তখন বলল, 'হে আবূ বাহর, প্রদর্শনকারী কী?' তিনি বললেন, 'যারা এমন বিষয়ে প্রশংসা করা পছন্দ করে, যা তারা করেনি। হে ভাতিজা, যখন তোমার সামনে হক প্রকাশিত হয় তখন তুমি তা গ্রহণ করার জন্য মনকে স্থির কোরো এবং তা ছাড়া অন্য সকল কিছু থেকে বিমুখ হোয়ো।”
তিন কাজে তাড়াহুড়ো করা
[৮০] আবদুল আযীয ইবনু কারিব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ-কে বলা হলো, 'হে আবূ বাহর, আমরা আপনার চেয়ে অধিক ধীরস্থির কোনো ব্যক্তি দেখিনি।' তিনি বললেন, 'তিনটি বিষয়ে আমার তাড়াহুড়ো রয়েছে।' তারা জিজ্ঞেস করলেন, 'সেগুলো কী?' তিনি বললেন, 'সালাত—যখন তার ওয়াক্ত আসে, আর আমি যতক্ষণ না তা আদায় করি; কুমারী মেয়ে—যখন তার উপযুক্ত পাত্র (তাকে বিয়ের) প্রস্তাব দেয়, যতক্ষণ না আমি তাকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দিই। এবং মৃত ব্যক্তি—যখন সে মুস্তাযাব করে, যতক্ষণ না আমি তাকে তার কবরে রেখে আসি (এ তিনটি বিষয়ে আমার তাড়াতাড়ি রয়েছে)।"
বিপদের কথা কারও নিকট উল্লেখ না করা
[৮১] মুগিরা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ্-এর এক ভাতিজা তার কাছে দায়িত্বভার অভিযোগ করল। তখন আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ্ তাকে বললেন, ‘চল্লিশ বছর হলো আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গেছে। আজও আমি এ কথা কারও সামনে উল্লেখ করিনি'।”
আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা
[৮২] ইবনু শওযাব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আমি নিজেকে কুরআনের সামনে উপস্থাপন করলাম। তখন আমি নিজেকে এই আয়াতের থেকে অন্য কিছুর সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ পেলাম না :
وَآخَرُونَ اعْتَرَفُوا بِذُنُوبِهِمْ خَلَطُوا عَمَلًا صَالِحًا وَآخَرَ سَيِّئًا عَسَى اللَّهُ أَن يَتُوبَ عَلَيْهِمْ
'আর কিছু লোক এমন, যারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা ভালো কাজের সাথে খারাপ কাজ মিশ্রিত করে ফেলেছিল। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন'।”[৪]
মিথ্যা বলার চেয়ে নীরব থাকা ভালো
[৮০] হাসান রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “লোকেরা মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মতবিনিময় করল। আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ তখন নীরব ছিলেন। তাই মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'কী ব্যাপার, তুমি কিছু বলছ না যে!' তিনি বললেন, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি, যদি আমি মিথ্যা বলি। আর আমি তোমাদের ভয় করি, যদি আমি সত্য বলি'।”
সজ্জিত ঘরে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকা
[৮৪] হাসান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ এক সফর থেকে ফিরলেন। এসে দেখলেন, লোকেরা তার ঘরের ছাদকে পরিবর্তন করে ফেলেছে (অন্য বর্ণনায় কথাটা এ বাক্যে এসেছে-ছাদে লাল-সবুজ রং করে ফেলেছে)। লোকেরা তাকে বলল, 'আপনার ঘরের ছাদ সম্পর্কে আপনার কী মন্তব্য?' তিনি বললেন, 'তোমাদের কাছে ওজর পেশ করছি। আমি এই ঘরে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রবেশ করব না, যতক্ষণ না তোমরা তাকে পূর্বের রূপে ফিরিয়ে আনো।”
দুনিয়াতে গুনাহগারের জন্য প্রশান্তি নেই
[৮৫] আবূ মুআবিয়া আল-গালাবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “বনু তামিম গোত্রের একজন লোক বর্ণনা করেছেন, 'আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন—মিথ্যুকের কোনো ব্যক্তিত্ববোধ নেই। হিংসুকের কোনো প্রশান্তি নেই। কৃপণের কোনো অন্তরঙ্গতা নেই। দুশ্চরিত্রের কোনো সম্মান নেই। বিরক্ত ব্যক্তির কোনো ভ্রাতৃত্ব নেই।”
আত্মমর্যাদাবোধ
[৮৬] হাজানা ইবনু কাইস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আহনাফ ইবনু কায়স রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'অপদস্থতার বিনিময়ে অসংখ্য লাল উটের অধিকারী হওয়াকেও আমি অপছন্দ করি।”
টিকাঃ
[৪] সূরা তাওবা, ৯:১০২
📄 খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ-এর চোখে দুনিয়া
সৎ ঋণগ্রহীতার প্রতিদান
[৮৭] ইয়াহইয়া ইবনু আবদির রহমান আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ-এর স্ত্রী সাহবা বিনতু আউস রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, খুলাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলতেন, “যে বান্দা তার প্রয়োজনে বাধ্য হয়ে—এরপর মহামহিম আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে এবং তার ওপর ভরসা করে—আমানত গ্রহণ করে। অতঃপর অপচয় করা ছাড়া কোনো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে খরচ করে এবং তার আমানত পরিশোধের নিয়তও থাকে, অনন্তর তার এবং আমানত পরিশোধের মধ্যে মৃত্যু অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, এমতাবস্থায় মহামহিম আল্লাহ তার ব্যাপারে ফেরেশতাদের বলেন, 'আমার অমুক বান্দাকে তার প্রয়োজন বাধ্য করেছে, ফলে সে আমার ওপর বিশ্বাস রেখে এবং ভরসা করে তার আমানত গ্রহণ করেছে, অনন্তর অপচয় না করে প্রয়োজনীয় কোনো ক্ষেত্রে খরচ করেছে এবং তার মধ্যে ও তা পরিশোধ করার মধ্যে মৃত্যু অন্তরায় হয়েছে। হে আমার ফেরেশতারা, তোমাদের সাক্ষী রাখছি, আমি অমুককে তার হকের ব্যাপারে সন্তুষ্ট করে দিলাম এবং অমুককে ক্ষমা করে দিলাম।”
মুমিনের তিন কাজ
[৮৮] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন, খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “মুমিনকে তুমি শুধু তিন কাজেই পাবে—সে মাসজিদ নির্মাণ করছে, অথবা ঘরে পর্দার ব্যবস্থা করছে, অথবা তার পার্থিব এমন কোনো কাজে রয়েছে, যা করাটা অবশ্যম্ভাবী।”
আল্লাহর সাক্ষাৎপ্রত্যাশীদের করণীয়
[৮৯] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ শুক্রবারে আসলেন। সে সময় তিনি দরজার চৌকাঠে হাত রেখে বললেন, 'হে ভাইয়েরা, তোমাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে তার প্রিয়ের সঙ্গে মিলিত হতে চায় না? শোনো, তবে তোমরা তোমাদের মহান প্রতিপালককে ভালোবাসো এবং তার পথে উত্তমভাবে চলো।”
[৯০] সাবিত রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ নিজ কওমের মজলিসে ফজরের সালাত আদায় করতেন। এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার যিকরে রত থাকতেন। তারপর তিনি তাকে ঘরে নিয়ে যাবার নির্দেশ দিতেন। তখন তাকে ওঠানো হতো। এবং তার জন্য দুটো বালিশ রাখা হতো। এরপর তিনি দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলতেন, 'আমার রবের ফেরেশতাদের সাদর সম্ভাষণ! আল্লাহর কসম, আমি আজ তোমাদের আমার ব্যাপারে উত্তমতার সাক্ষী রাখছি। তোমরা নাও বিসমিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার।' তিনি এই অবস্থাতেই থাকতেন, যতক্ষণ না নিদ্রা তাকে পেয়ে বসত অথবা (সালাতের সময় হয়ে যেত আর) তিনি সালাতের জন্য বের হতেন।"
[৯১] মা'মার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “খুলাইদ রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তাআলার এই আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলতেন:
فَاطَّلَعَ فَرَآهُ فِي سَوَاءِ الْجَحِيمِ
'তারপর সে নিজে (জাহান্নামে) উঁকি মারবে। তখন সে তাকে দেখতে পাবে জাহান্নামের মাঝখানে।' [৫]
তিনি বলেন, অর্থাৎ জাহান্নামের ঠিক মাঝখানে।
তিনি আরও বলেন, 'সে দেখবে, জাহান্নামবাসীদের করোটি ফুটছে। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠবে, আল্লাহর কসম, যদি মহামহিম আল্লাহ তাকে না চেনাতেন, তাহলে সে তাকে চিনতেই পারত না। তার দেহ এবং আবরণ তো বিবর্ণ হয়ে গেছে। তখন সে বলে উঠবে:
تَاللَّهِ إِنْ كِدْتَ لَتُرْدِين
'সে তাকে বলবে, আল্লাহর কসম, তুমি তো আমাকে একেবারেই বরবাদ করে দিচ্ছিলে!'[৬]
তিনি বলেন, 'আমাদের কাছে এই মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে, যখন সে উঁকি দেবে তখন সে তাদের করোটিকে ফুটন্ত অবস্থায় দেখতে পাবে।”
যিকরে সাহায্যকারীরা মাসজিদের শোভা
[৯২] উকবা ইবনু আবী শাবিব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই সকল জিনিসের শোভা রয়েছে। আর মাসজিদের শোভা হলো সে সকল লোক, যারা পরস্পর পরস্পরকে মহামহিম আল্লাহর যিকরে সাহায্য করে।"
মুমিনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য
[৯৩] কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, খুলাইদ আল-আসারি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তুমি মুমিনকে দেখবে সংযমী এবং অধিক প্রার্থনাকারী। তুমি মুমিনকে দেখবে আত্মমর্যাদাশীল এবং বাধ্যগত। তুমি মুমিনকে দেখবে মুখাপেক্ষী এবং অমুখাপেক্ষী। তুমি তাকে দেখবে মানুষের থেকে সংযমশীল এবং তার রবের কাছে অধিক প্রার্থনাকারী। তুমি তাকে দেখবে রবের জন্য একান্ত বাধ্যগত এবং নিজের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল। তুমি তাকে দেখবে মানুষের থেকে অমুখাপেক্ষী এবং তার রবের দিকে একান্ত মুখাপেক্ষী।”
কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “এগুলোই হলো মুমিনদের বৈশিষ্ট্য। আর সে হলো, পরিচিতির দিক দিয়ে মানুষজনের মধ্যে সর্বোত্তম আর পার্থিব সামগ্রী সংগ্রহের বিবেচনায় সবচেয়ে সরল।”
পাখি ডাক শুনে আল্লাহকে স্মরণ করা
[৯৪] আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, “কাক যখন কা কা করে ডেকে ওঠে, তখন তিনি বলেন, اللَّهُمَّ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ 'হে আল্লাহ, আপনার পাখি ছাড়া অন্য কোনো পাখি নেই। আপনার কল্যাণ ছাড়া অন্য কোনো কল্যাণ নেই। এবং আপনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।”
টিকাঃ
[৫] সূরা আস-সাফফাত, ৩৭: ৫৫
[৬] সূরা আস-সাফফাত, ৩৭: ৫৬