📄 ইসলামী জীবন ব্যবস্থা
একমাত্র ইসলামই এমন জীবন ব্যবস্থা, যা তার অনুসারীদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি শাখায়, প্রতিটি অংশে শান্তি-নিরাপত্তা, ন্যায়-নিষ্ঠা, মধ্যমপন্থা, সততা, সহানুভূতি, পরস্পর মঙ্গলকামিতা ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ এবং সৌন্দর্য ও সৌকর্যের মনোরম দৃশ্যপট সৃষ্টির যোগ্যতায় সম্পূর্ণরূপে সুসজ্জিত। আর তা হবেই না বা কেন? এ-ই তো সেই আমলের মিষ্টতা, যা এ বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক ও স্রষ্টা নিজের বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষের সভ্যতা-সংস্কৃতির উন্নতি-সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সড়ক, বিশ্বরোডের কতটা গুরুত্ব রয়েছে, তা বিজ্ঞমহল মাত্রই বুঝেন। এ রাস্তা, সড়ক, বিশ্বরোড ও অলী-গলী শুধুমাত্র আসা যাওয়ারই মাধ্যম নয় বরং এগুলোর অবস্থা-ধরন তাতে চলাফেরাকারীদের চিন্তা-ধারা, কার্যক্রম, তাদের স্বভাব-চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের আন্দায, তাদের সামাজিকতা, জীবনযাত্রা উন্নত মনোভাবে এবং আগ্রহ-উদ্দীপনার প্রমাণও বটে। একারণেই ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পথ-ঘাটের সকল প্রতিবন্ধকতা ও অসুবিধাকে অপছন্দনীয় বলে অভিহিত করেছেন। এগুলোকে বিদূরীত করা প্রশাসনের যিম্মাদারী বলে সাব্যস্ত করেছেন। যাতে করে মা'রুফ তথা ভাল ও মঙ্গলের প্রসার এবং অমঙ্গল ও অপছন্দনীয় তথা অপ্রীতিকর বিষয়সমূহের মূলোৎপাটন হয়।
আমরা এখানে মহান আমীর সাইয়িদ আলী হামদানী রহ. এর রচিত "সহীফাতুস সুলুক" গ্রন্থ থেকে পথ-প্রান্তর ও রাস্তা-ঘাটের অপছন্দনীয় কাজ-কর্মের বিবরণ উল্লেখ করছিঃ
১. রাস্তায় এমন খুঁটি, খাম্বা দাঁড় করানো কিংবা বৃক্ষ রোপন করা, যাতে রাস্তাঘাট সংকীর্ণ হয়ে যায়।
২. রাস্তায় বসার জন্য এমন আসন নির্মাণ করা, যাতে পথচারীদের কষ্ট হয়।
৩. নিষ্কাশন-নল বা পাইপ লাইন এমনভাবে স্থাপন করা, যার ফলে ময়লা পানি মানুষ চলাচলের স্থানে গড়িয়ে পড়ে এবং পথচারীদের জামা-কাপড় নষ্ট হয়ে যায়।
৪. সংকীর্ণ গলিপথে বসে খাদ্যদ্রব্য বেচাকেনা করা। কেননা এতে চলাচলের স্থান সংকীর্ণ হয় এবং পথচারীদের কষ্ট হয়।
৫. সংকীর্ণ পথে ভেড়া-বকরী, গরু-মহিষ বাঁধা। অবশ্য কেবল প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তা জায়েয, যদি সেই গরু-মহিষ বাহনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
৬. রাস্তায় কোনও মালপত্র খালাস করা হলে তবে শুধুমাত্র এতটুকু সময়ের জন্য অনুমতি দেওয়া যেতে পারে যে, তা উঠিয়ে ঘর বা অন্য কোথাও স্থানান্তর করা যায়।
৭. সংকীর্ণ পথে এবং চলাচলের স্থানে জীব-জন্তু এবং ঘোড়া বাঁধা। এ স্থানে শুধুমাত্র প্রয়োজনের তাগিদে জীব-জন্তু আনা যেতে পারে।
৮. রাস্তায় যবাই-খানা (পশু যবাইয়ের স্থান), ভাগাড় কিংবা ডাস্টবিন বানানো বা যবাইকৃত জীব-জন্তুর নাড়ি-ভূঁড়ী, রক্ত ও অন্যান্য ময়লা-আবর্জনা ফেলা। যার ফলে মানুষের মন-মেজাজ বিকৃত হয় ও মানুষ কষ্ট পায়। কসাইয়ের জন্য আবশ্যক হল, জীব-জন্তু এমন স্থানে যবাই করা, যাতে সাধারণ লোকদের দৃষ্টিগোচর না হয়।
৯. অলী-গলীতে দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী জিনিস যেমন ময়লা-আবর্জনা, ছাই, ফল-মূল, সবজী ইত্যাদির খোসা ফেলা। কিছু কিছু ফলের খোসায় তো মানুষের পা পিছলে পড়ার আশঙ্কাও আছে।
১০. রাস্তায় দুর্গন্ধযুক্ত মৃত কিছু ফেলা, যার দুর্গন্ধে পথচারীদের কষ্ট হয়।
১১. সাধারণ রাস্তার পাশে অবস্থিত বাড়ি-ঘরে পাগলা কুকুর পালন করা।
উপরিউক্ত প্রতিটি বিষয়ের উপর একবার দৃষ্টিপাত করলেই এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এসব বিষয় আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের কঠিন কষ্ট-যাতনা ও ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাজেই এসব বিষয়কে মুনকারাত বা অপছন্দনীয় সাব্যস্ত করা হয়েছে। এগুলোকে অপসারণ করা গ্রাম-গঞ্জ ও শহর-নগরের স্থানীয় প্রশাসন ও ইসলামী হুকুমতের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব।
কেননা ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় এ ধরনের অপছন্দনীয় গর্হিত কাজ-কর্ম মুহূর্তের জন্যও বরদাশ করা যায় না, যেগুলো জনসাধারণের পেরেশানী, দুশ্চিন্তা ও কষ্টের কারণ হয়। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি মুমিন নারী পুরুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, তারা এক বড় অপবাদ এবং সুস্পষ্ট গোনাহের বোঝা নিজের মাথায় নিল। (সূরা আহযাব: ৫৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের চরিত্র বর্ণনা করে বলেন- প্রকৃত মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যার মুখ এবং হাত থেকে অপর মুসলমান নিরাপদে থাকে। (মিশকাত)
📄 আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও আদর্শ চালচলন
প্রত্যেক মুসলমানই ইসলামী সভ্যতার উজ্জ্বল নমুনা। কাজেই একজন মুসলমান যখন কোনও রাস্তাঘাটে চলা-ফেরা করবে, তখন অবশ্যই তার চলা-ফেরার ধরনও এমন হওয়া উচিত, যা তার ধর্ম-সভ্যতার দিক নির্দেশনা অনুযায়ী হবে। মহান আল্লাহ তাঁর পছন্দনীয় বান্দাদের চলাফেরার ধরন ব্যাখ্যা করে বলেন- "রহমানের (দয়ালুর) প্রকৃত বান্দা ঐ ব্যক্তি, যে যমীনে বিনীতভাবে চলাফেরা করে।" (সূরা ফুরকান) নরমভাবে চলার অর্থ হল, তার চলা-ফেরায় অহমিকা, দাম্ভিকতা থাকবে না। কৃত্রিমতা বা লৌকিক দরিদ্রতা, দৈন্যতা তথা ভিক্ষবৃত্তি থাকবে না। তার পদক্ষেপ এমন ঢিলা ও আলসে হবে না, যাতে লোকেরা তাকে রোগাক্রান্ত ভেবে পথেই তার রোগের কারণে ছিঃ ছিঃ বলতে শুরু করে। দুজাহানের সরদার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পথ চলতেন, লম্বা লম্বা কদম দিতেন। পা টেনে হেঁচড়ে কখনও চলতেন না।
📄 দম্ভভরে চলা ফেরা থেকে বেঁচে থাকা
প্রতারণা ও অহংকার এমনই নিন্দিত ও নিকৃষ্ট স্বভাব, যে মনের ভেতর তা স্থান নেয়, সেখানে ঈমান ও ইবাদত থাকা অসম্ভব। কাজেই ইসলামী সমাজ এটা আদৌ পছন্দ করে না যে, তার চলার পথে দম্ভ-অহংকারের বহিঃপ্রকাশ হোক। পবিত্র কুরআনে প্রজ্ঞাপূর্ণ ও প্রভাবময় ভঙ্গিতে দাম্ভিক চালচলনের নিন্দাবাদ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে হাকীমে ইরশাদ হচ্ছে- তোমরা জমীনে দম্ভভরে চলাফেরা কর না। তোমরা জমীন বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং চূড়ায়ও পৌঁছুতে পারবে না। (সূরা বনী ইসরাঈল)
এ ধরনের চলাফেরা সম্পর্কে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন- জমীনে দম্ভভরে চল না। আল্লাহ তা'আলা আত্মম্ভরী, আত্ম-পছন্দকারী ও আত্মপ্রশংসাকারীকে পছন্দ করেন না। (সূরা লুকমান)
📄 স্বতন্ত্রতা প্রকাশ থেকে বেঁচে থাকা
কেউ কেউ আত্মম্ভরিতা এবং আত্মঅহমিকা নিয়ে নিজেকে বড় মনে করে চলার চেষ্টা করে। এ ধরনের ব্যক্তি নিজের সঙ্গী-সাথীদের সামনে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করতে চায়। এ জন্য সে কখনও সবার আগে আগে চলে। কখনও স্বকীয়তা প্রকাশের জন্য কত অঙ্গ-ভঙ্গি অবলম্বন করে। কিন্তু দুজাহানের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের সঙ্গীদের মাঝে অনুসৃত ও নেতা হওয়ার কারণে বিরাট স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি চলার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের স্বতন্ত্রতা দেখাতেন না। ইতিহাস, জীবনী ও হাদীসের মাধ্যমে নবীজীর কর্মধারা যেভাবে উম্মতের কাছে পৌঁছেছে, তার সারকথা হচ্ছে, নবীজী সঙ্গী-সাথীদের সাথে চলার সময় কখনও স্বতন্ত্রভাব প্রকাশ হতে দিতেন না। অধিকাংশ সময় সাহাবায়ে কিরামের পিছনে চলতেন। কখনও কখনও দ্বিধাহীন চিত্তে সঙ্গী-সাথীদের হাত ধরে চলতেন।