📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর চরিত্র মাধুর্য
• প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাস্যোজ্জল ও কোমলভাষী ছিলেন। রুক্ষ রূঢ় কর্কশ মেযাজ এবং কঠোর প্রাণ ছিলেন না। হৈ চৈ কোলাহল করতেন না। কোনও রূপ বাজে কথা মুখ থেকে বের করতেন না। কোনও কথা অপছন্দ হলে চুপ থাকতেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা থেকে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় একেবারে বের করে দিয়েছিলেন।
১. বহস-মোবাহাসা বা তর্ক-বির্তক।
২. অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলা।
৩. অনর্থক উদ্দেশ্যহীন কথা বলা।
অন্যের ব্যাপারেও তিনটি বিষয় থেকে বেঁচে থাকতেন।
১. কাউকে মন্দ বলতেন না।
২. কারও দোষচর্চা করতেন না।
৩. কারও পেছনে লাগতেন না।
• অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে পছন্দ করতেন না। অত্যন্ত উদারতা, সত্যবাদি, কোমলপ্রাণ এবং উত্তম সঙ্গী ছিলেন। যদি কেউ হঠাৎ করে সামনে এসে পড়ত তবে প্রভাবিত হয়ে যেতেন। কিন্তু যার সাথে ভিন্ন-পরিচয় হত, তারা তাঁকে ভালবাসতেন। (হযরত আলী রাযি.)
• তিনি ভেড়া-মেষকে নিজেই ঘাস-পানি দিতেন। ঘর-বাড়ী, বিছানা-পত্র ঝাড় দিতেন। বকরীর দুধ দোহন করতেন। খাদেমদের কাজে সহায়তা করতেন। তাদের সাথে বসে খানা খেতেন। বাজার থেকে সদাইপত্র আনতেন। গোলাম-মনীব, হাবশী-তুর্কী কারও মধ্যে পার্থক্য করতেন না। রাত্র দিন একই পোশাকে থাকতেন। তাঁকে যত নগন্য লোকই দাওয়াত করত, তৎক্ষণাত কবুল করে নিতেন। যে খাবার সামনে দেওয়া হত, তাই খেয়ে নিতেন। সকালের খানা রাতের জন্য আর আর রাতের খানা সকালের জন্য রেখে দিতেন না। ভাল মেজাজ কোমলভাব, প্রশস্ত মন, হাস্যোজ্জল মুখের অধিকারী ছিলেন। কখনও উচ্চ শব্দে হাসতেন না। অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। কিন্তু অপব্যয়কারী ছিলেন না। (ইমাম গাযালী)
সহধর্মীনী এবং খাদেমদের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল ছিলেন। মুখে কখনও অশ্লীল কথা বা গালমন্দ উচ্চারণ করতেন না। কাউকে অভিশাপ দিতেন না। কেউ কষ্ট দিলে, তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন। সহধর্মিনী এবং উম্মতের সংশোধনের প্রতি খুব বেশি লক্ষ্য রাখতেন। প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রত্যেক জিনিসের মান-মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ও সর্তক ছিলেন। আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির প্রতি সব সময় অন্তর্দৃষ্টি নিবন্ধ রাখতেন। তাঁর বাড়ী-ঘর খুবই সাধারণ ও দরিদ্র লোকদের মত ছিল। তাঁর সাধারণ খাবার ছিল যবের রুটি ও পানি। তাঁর চুলায় মাসের পর মাস আগুন জ্বলত না। তিনি নিজ হাতে জুতা সেলাই করতেন। কাপড়-চোপড়ে তালি লাগাতেন। দুনিয়ার কোনও বাদশাহর এত অনুকরণ করা হয়নি, যতটা আনুগত্য ও অনুকরণ এ মহান ব্যক্তির করা হয়েছে। তিনি নিজ হাতে সেলাই করা জামা পরিধান করতেন।
📄 নবীজীর সামাজিক জীবন ও আধুনিক বিজ্ঞান
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামাজিক জীবন তার পুতঃপবিত্র চরিত্র-মাধুরীর এক উজ্জ্বল অধ্যায়। কেননা বনী আদমের মঙ্গলকামিতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং জনসেবার যে শিক্ষা আমরা তার বাণীতে পাই, তার বাস্তব দৃষ্টান্ত রহমাতুল লিল আলামীনের পবিত্র চরিত্র মাধুরীতে স্থানে স্থানে চমকাতে দেখি। দুনিয়া বস্তুতঃ চেষ্টা শ্রম ও উপায় অবলম্বন গ্রহণের ময়দান। যেখানে সকল মানুষ পরস্পর সহযোগিতার মাধ্যমে নিজ নিজ পথ গ্রহণ করে থাকে। প্রত্যেককেই অপরের দুঃখ কষ্ট ও আরামের প্রতি লক্ষ্য করতে হয়। কেননা মানুষের সাথে জীবনের পথ চলতে নিশ্চিত অনকে কষ্ট-যাতনার শিকার হতে হয়। কাজেই যে ব্যক্তি সামাজিক জীবনের কষ্ট-সংকটে ঘাবড়িয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শুধুমাত্র নিজের বোঝা কাঁধে নিয়ে চলে, সে দুনিয়ার যুদ্ধ ক্ষেত্রে বা জীবন সংগ্রামে একজন কাপুরুষ সৈনিক। নবীজীর পবিত্র বাণী এবং পুতঃপবিত্র চরিত্র মাধুরীর বৈচিত্রময় ঘটনাবলির আঙ্গিকে তার সামাজিক জীবনের কতিপয় দৃষ্টিভঙ্গি, বিশেষ ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে আলোকপাত করা হচ্ছে।
কর্মব্যস্ত মানুষগণ সাধারণতঃ গণসংযোগের জন্য সময় বের করতে পারেন না এবং সব দিকে লক্ষ্য করতে পারেন না। কেউ কেউ নির্জনতা পছন্দ করেন। আবার কেউ দম্ভ-অহংকারের শিকার হয়ে নিজের জন্য বিপদজনক পৃথিবী তৈরি করে ফেলেন। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে এবং ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মত কীর্তি স্থাপন করেও সাধারণ স্বভাব-চরিত্রে সম্পূর্ণরূপে অলংকৃত ছিলেন। সমাজের সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। দম্ভ-অহংকারের লেশ মাত্র তাঁর মধ্যে ছিল না। বস্তুতঃ তিনি মানুষের যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়ে তুলেছিলেন, তার দাবী ও বৈশিষ্ট্য ছিল, মানুষ পরস্পর যার পর নাই আন্তরিক হবে, একে অপরের সহযোগিতা করবে। এক কথায় নবীজীকে সাধারণ সামাজিক সম্পর্কের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে দেখা যায়।
নবীজীর নিয়ম ছিল, চলার পথে কেউ সামনে পড়লে তাকে তিনি আগে সালাম দিতেন। কাউকে কোনও সংবাদ পাঠালে অবশ্যই তাকে সালাম বলে পাঠাতেন। কেউ সালাম পাঠালে তখন সালাম প্রেরণকারী এবং সালাম বাহক উভয়কে পৃথক পৃথকভাবে সালাম করতেন। ছোট বালক-বালিকাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি তাদের সালাম করেন। মহিলাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি তাদেরও সালাম করেন। ঘরে প্রবেশ করার সময় এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সালাম করতেন। শুভাকাঙ্খী ও প্রিয়জনদের সাথে মু'আনাকা-মুসাফাহাও করতেন। মুসাফাহা করার সময় নিজের হাত ততক্ষণ পর্যন্ত টেনে নিতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত অপরজন নিজের হাত টেনে না নিত।
• কোন সভা-সেমিনারে গেলে সাহাবায়ে কিরাম তাঁর সম্মানে দণ্ডায়মান হওয়া পছন্দ করতেন না। মজলিসের এক কিনারায় বসে যেতেন। মানুষের কাঁধের উপর দিয়ে মাঝখানে যাওয়া থেকে বেঁচে থাকতেন। তিনি বলতেন- "আমি এমনভাবে উঠা-বসা করতে চাই, যেমন কোন গোলাম উঠা-বসা করে।" সাথীদের থেকে সামনে নিজের পা বাড়িয়ে বসতেন না। কেউ আসলে তার সম্মানার্থে নিজের চাদর বিছিয়ে দিতেন। আগত মেহমান যতক্ষণ মজলিস থেকে না উঠত ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি উঠতেন না।
• উপস্থিত লোকের কথার মধ্যে হস্তক্ষেপ করতেন না বা ব্যাঘাত দিতেন না কিংবা চলমান কথার মাঝে অন্য কথা ঢুকিয়ে দিতেন না। বরং যে কথা চলতে থাকত তাতেই শরীক হয়ে যেতেন। ফজরের নামাযের পর নিয়মিত মজলিস হত। সেখানে সাহাবায়ে কিরামের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হত। জাহিলিয়্যাতের সময়ের কথা উঠত এবং তা নিয়ে হাসাহাসিও হত। সাহাবায়ে কিরাম কবিতা আবৃতি করতেন। মজলিসের সকলের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন, যাতে কারও এ ধারণা না হয় যে, তিনি কাউকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কথার মাঝে যদি অপ্রাসঙ্গিক কোনও প্রশ্ন কেউ ছুড়ে দিত তাহলে সে দিকে লক্ষ্য না করে কথাবার্তা অব্যাহত রাখতেন এবং প্রসঙ্গ শেষ করে সে দিকে দৃষ্টি দিতেন।
বক্তব্য প্রদানকারীর দিক থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের মুখ ফেরাতেন না, যাবৎ না সে নিজের মুখ ফিরাত। কানেকানে কেউ কিছু বলতে থাকলে তার কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সে দিকেই মাথা ঝুকিয়ে রাখতেন। কারও কথা কাটতেন না। তবে হক পরিপন্থী হলে তিনি তার প্রতিবাদ করতেন। এমনকি চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত। অসন্তুষ্টির স্পষ্ট ছাপ দেখা যেত। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলতে থাকাকে তিনি অপছন্দ করতেন। অপছন্দনীয় কথা থেকে বিমুখ হতেন কিংবা তাকে সংশোধনের সাধারণ পদ্ধতি ছিল, সোজাসুজি তার নাম উল্লেখ করতেন না বরং ব্যাপকভাবে আলোচনা করতেন অথবা নসীহত করে দিতেন। মারাত্মক অসন্তুষ্টির সময় হিতাকাঙ্খী ও প্রিয়জনদের অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য বেশি থেকে বেশি ঐ ব্যক্তি এলে সালাম গ্রহণ করতেন না অথবা তার প্রতি উদাসীনতা দেখাতেন। অপছন্দনীয় মানুষ আসলেও হাস্যোজ্জল অবস্থায় মিলিত হতেন। সুতরাং একবার এমন কেউ আসল, যাকে নিজের দলের খারাপ লোক মনে করতেন। কিন্তু তিনি তার সাথে লৌকিকতা ছাড়াই কথাবার্তা বললেন। এতে হযরত আয়েশা রাযি. বিস্মিত হলেন। তখন নবীজী বললেন- শপথ আল্লাহর। কিয়ামত দিবসে আল্লাহর দরবারে ঐ ব্যক্তি সর্বাধিক নিকৃষ্ট বলে প্রমাণিত হবে, যার সাথে মানুষ তার অসদাচরণের কারণে মেলা-মেশা বর্জন করে।
• কারও সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গেলে তিনি তার দরজার ডান পাশে বা বাম পাশে দাঁড়িয়ে খবর জানাতেন এবং অনুমতির জন্য তিন সালাম জানাতেন। জবাব না পেলে কোনও প্রকার অসন্তুষ্টি বা কষ্ট অনুভব না করে ফিরে আসতেন। রাতের বেলায় কারও সাথে সাক্ষাতের জন্য গেলে তিনি এতটুকু জোরে সালাম করতেন, যদি সে ব্যক্তি জাগ্রত থাকে তাহলে যেন শুনতে পায় আর ঘুমন্ত হলে যেন তার ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটে।
• শরীর মোবারক বা পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে কেউ যদি ময়লা, ধূলি-বালি সরিয়ে দিত তাহলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে বলতেন- "আল্লাহ তা'আলা ঐ সকল বন্ধু তোমার থেকে বিদূরীত করে দিন, যা তোমার কাছে খারাপ লাগে।" হাদিয়া কবুল করতেন এবং তার সম্মানে তাকেও হাদিয়া দেওয়ার খেয়াল রাখতেন। হঠাৎ কেউ কোন কষ্ট পেলে তাকে প্রতিশোধ নেওয়ার অধিকার দিতেন। আবার কখনও এর বিনিময়ে হাদিয়া দিতেন। নতুন পোশাক পরে কেউ সামনে আসলে বলতেন- সুন্দর। দীর্ঘ সময় পরিধান কর, পুরাতন কর।" অসদ্ব্যবহারের পরিবর্তে অসদ্ব্যবহার বা খারাপ আচরণ করতেন না বরং ক্ষমা ও সহনশীলতার সাথে কাজ করতেন। কেউ যদি ডাকত সে ঘরের মানুষ হোক চাই বন্ধুদেরই কেউ হোক সব সময় লাব্বাইক (উপস্থিত আছি) বলতেন।
• কেউ সফর শেষে ফিরে এসে নবীজীর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি তার সাথে মু'আনাকা করতেন। কখনও কখনও কপালে চুমু খেতেন। কাউকে সফরের উদ্দেশ্যে বিদায় জানালে বলতেন- ভাই। নিজের দু'আয় আমাদেরকে স্মরণ রেখ। ভালোবাসা ও হৃদ্যতাপূর্ণ বে-তাকাল্লুফ (লৌকিকতা মুক্ত) অবস্থায় প্রিয়জনদের নাম সংক্ষেপ করেও ডাকতেন। যেমন, হে আবু হুরাইরা এর স্থলে আবা হুর...।" হযরত আয়েশা রাযি. কে কখনও কখনও "আয়েশ" বলেও ডাকতেন।
• শিশুদের প্রতি খুব মনোযোগ ছিল। শিশুদের মাথায় হাত বুলাতেন। স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। দু'আ করতেন। নবজাতক বা কচি শিশুদের নিয়ে আসা হলে তাদেরকে কোলে নিতেন। তাদেরকে ভোলানোর জন্য বিস্ময়কর বাক্য বলতেন- আখেরাকা খারেকা ফী আইনি কুল্লি বাক্কাহ। এক নিষ্পাপ শিশুকে চুমু দিতে দিতে বললেন- এ শিশু তো আল্লাহ তা'আলার বাগিচার ফুল। শিশুদের সুন্দর নাম রাখতেন। শিশুদের মাঠে জমা করে দৌড় প্রতিযোগিতা লাগাতেন- দেখব কে আমাকে প্রথমে ছুঁতে পারে। শিশুরা দৌড়ে এসে কেউ নবীজীর বুকের উপর, কেউ পেটের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ত। সফর থেকে ফিরে আসার সময়, চলার পথে যে শিশুকে পেতেন তাকে নিজের সাওয়ারীর (যানবাহনের) উপর বসিয়ে নিতেন। ছোট হলে সামনে আর বড় হলে পেছনে বসাতেন। উৎপন্ন ফসল প্রথমবার হাদিয়া আসলে তাতে বরকতের দু'আ করে বাচ্চাদের বিলিয়ে দিতেন। নবীজীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, এ নূতন চারাই (শিশু-কিশোর) ভবিষ্যতে ইসলামী সংগ্রামের অগ্রসেনানী হবে।
• বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বীদের খুব সম্মান করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযি. আশীতিপর পিতা যার দৃষ্টিশক্তি অকেজো হয়ে গিয়েছিল, তাকে ইসলামের বাই'আত গ্রহণের জন্য নবীজীর দরবারে নিয়ে এলেন। তখন নবীজী বলেন- তাঁকে কেন কষ্ট দিলেন, আমি নিজেই তার কাছে চলে যেতাম। পারিবারিক জীবনে নবীজীর উন্নত ও উত্তম আচরণের সুন্দর প্রতিচ্ছবি হযরত আনাস রাযি. এঁকেছেন। তিনি বলেন- আমি নবীজীর খেদমতে দশ বছর অতিবাহিত করেছি। এ সুদীর্ঘ দশ বছরের মধ্যে তিনি কখনও আমাকে উফ শব্দটি পর্যন্ত বলেননি। কোনও কাজ যেমনই করেছি, তিনি বলেননি- এমনটি কেন করলে? আর কোনও কাজ না করলে বলেননি- কেন করলে না। সব সময় এ আচরণই তাঁর দাস-দাসীদের সাথে ছিল। তিনি তাদের কাউকেও কখনও প্রহার করেননি। হযরত আয়েশা রাযি. এ কথাই সত্যায়ণ করে বলেন- স্ত্রীগণ এবং দাস-দাসীদের কাউকে তিনি কখনও প্রহার করেননি। কারও উপর ক্রোধ ঢালেনি বা প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় জিহাদ করা অথবা কানূনে এলাহী তথা আল্লাহর বিধানের নিমিত্ত্বে তারই নির্ধারিত হালাল-হারাম মর্যাদা সংরক্ষণের অভিষ্ট লক্ষ্যে সংগ্রাম করা ব্যতীত।
📄 জনসেবা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় হচ্ছে জনসেবা। তিনি যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে ইসলামের শাশ্বত পয়গাম প্রচার-প্রসারের নবুওয়াতী দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। এর গ্রহণ যোগ্যতার ক্ষেত্রে এমনি তো ঐ পয়গামের সত্যতা যথার্থতা, এর মুহকাম উসূল এ এলাহী শিক্ষার প্রভাবের বিরাট দখল রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁর স্বতন্ত্র কার্যক্রম বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং পদমর্যাদা ও অবস্থানেরও বিরাট দখল রয়েছে, যা তাঁকে স্বজাতির কাছে আল-আমীন (বিশ্বাসী) এবং সাদিক (সতবাদি) এর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। এছাড়া ব্যাপকভাবে সহমর্মিতা, খেদমত, সেবা, মানবতা ও সম্প্রীতির ঐ চূড়ান্ত বৈশিষ্ট্যও তাঁর ঐ শাশ্বত পয়গাম প্রচার-প্রসারের কারণ হয়, যা তাঁর দ্বিতীয় সহজাত স্বভাব ছিল। জনসেবাই নবীজীর ঐ মহান খেদমত ছিল, যা তাকে বিশ্বমানবতার এক বিরাট দলের মাঝে স্থায়িত্ব ও মর্যাদার সুউচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর আনিত পয়গামের জন্য তাদের অন্তঃকরণে স্থান করে দিয়েছে।
• মদীনা মুনাওয়ারায় এক মহিলা ছিল। (যার মস্তিষ্ক কিছুটা বিকৃত ছিল) নবীজীর খেদমতে হাযির হয়ে বলল- মুহাম্মদ। তোমার সাথে আমার কিছু কাজ আছে। নবীজী বললেন- যেখানে বলবে নিয়ে যেতে পার। সে তাঁকে একটি গলিতে নিয়ে গেল এবং সেখানেই বসে পড়ল। নবীজীও তার সাথে বসে গেলেন এবং তার কাজটি সমাধা করে দিলেন।
• একবার নবীজী নামাযের জন্য দাঁড়ালেন। এক অসভ্য লোক এসে তাঁর জামার আচল ধরে বলল- মুহাম্মদ। আমার সামান্য কাজ বাকি রয়েছে। এমন যেন না হয়, আমি তা ভুলে যাই। প্রথমে তা পূর্ণ করে দাও। তিনি তৎক্ষণাত তার সাথে মসজিদের বাইরে তাশরীফ নিয়ে গেলেন এবং তার কাজ সমাধা করে দিয়ে নামায আদায় করলেন।
• খাব্বাব বিন আরত রাযি. কে নবীজী কোনও এক যুদ্ধে প্রেরণ করলেন। খাব্বাব রাযি. এর ঘরে কোনও পুরুষ ছিল না। মহিলারা দুধ দোহন করতে পারত না। কাজেই প্রতিদিন নবীজী তার ঘরে গিয়ে দুধ দোহন করে দিয়ে আসতেন। মদীনার অদূরেই কিছু ইয়াতিম ছেলে পেলে বসবাস করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বকরীগুলোরও দুধ দোহন করে দিয়ে আসতেন।
• মদীনা শরীফের দাসীরা নবীজীর খেদমতে হাযির হত এবং বলত, আল্লাহর রাসূল। আমার ঐ কাজ রয়েছে। নবীজী তৎক্ষণাত ওঠে দাঁড়াতেন এবং তাদের কাজ করে দিতেন।
• এক সফরে সাহাবায়ে কিরাম রাযি. বকরী যবাই করলেন। নবীজী বললেন- জঙ্গল থেকে জ্বালানী কাঠ আমি সংগ্রহ করব। সাহাবায়ে কিরাম আপত্তি করলেন। তিনি বললেন- আমি স্বতন্ত্রতা বা পার্থক্য পছন্দ করি না।
• নির্দেশ জারি ছিল, কোন ঋণগ্রস্থ মুসলমান ইন্তেকাল করলে আমাকে অবগত করবে। আমি তার ঋণ পরিশোধ করে দেব। আর মিরাস বা মরণোত্তর যে সম্পদ রেখে যাবে, তা উত্তরাধিকারদের হক ও প্রাপ্য। তাতে আমার কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই।
• বুখারী শরীফে আছে, নবীজীর কাছে যখন ভিক্ষুক এবং সমস্যায় পতিত লোক আসত তখন তিনি সাহাবায়ে কিরামকে বলতেন- তোমরা সুপারিশ কর। তাহলে তোমরাও সাওয়াব পাবে।
একবার তিনি ইরশাদ করলেন- যদি আর কিছু না-ই সম্ভব হয়, তবে অসহায়-অভাবী ব্যক্তিকে সাহায্য কর। আরও বলেন- আত্মভোলা বা পথভোলা এবং অন্ধ ব্যক্তিকে পথ দেখানোও সদকা। অন্যত্র বলেন- যে ব্যক্তি চলার পথে কোনও কাঁটা বা কষ্টদায়ক জিনিস রাস্তা থেকে সরিয়ে দিবে, আল্লাহ তা'আলা তার কাজের যথার্থ মূল্যায়ণ করেন এবং তার পাপ মোচন করেন। গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আরও বলেন- আল্লাহ পাক তার বান্দার সাহায্য ততক্ষণ নিয়োজিত থাকেন, যতক্ষণ সে তার সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।
📄 উত্তম চরিত্র
সাধারণভাবে কাফির-মুসলিম, শত্রু-মিত্র, প্রিয়জন ও অপরিচিতের মাঝে কোনও তফাৎ ছিল না। তাঁর রহমতের বারিধারা সকলের উপর সমানভাবে বর্ষিত হত। ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের সাথে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যে কঠোর বিরোধীতা ও শত্রুতা ছিল, গযওয়ায়ে খায়বার পর্যন্ত প্রত্যেকটি ঘটনায় এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু নবীজীর কর্মধারা শেষ পর্যন্ত এমনই ছিল, যে সব বিষয়ে পৃথকভাবে কোনও হুকুম অবতীর্ণ না হত, তিনি সে সব বিষয়ে তাদেরকে ছাড় দিতেন।