📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 গঠন মূলক পরিকল্পনা ও ধ্বংসাত্মক চিন্তা ভাবনা

📄 গঠন মূলক পরিকল্পনা ও ধ্বংসাত্মক চিন্তা ভাবনা


অপরাধীরা প্রথমে মনে মনে অপরাধ করে। শারীরিক অঙ্গ-প্রতঙ্গ দ্বারা কৃত অপরাধ তাদের মনের ঐ চিন্তা-ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন মাত্র। বিভিন্ন অপরাধ ও অন্যায় কর্মকাণ্ডের কারণে এক ব্যক্তি পঁচিশ বছর পর্যন্ত কারা ভোগ করেছে। একদিন সে বলল- কোনও অন্যায়-অপরাধ সে জেনে বুঝে করেনি। শৈশব থেকেই তাকে এমন এক আগ্রহ তাড়া করেছে যে, আমার এমন এমন কাজ করতে হবে, যা অন্য লোকদের পক্ষে অসম্ভব। ব্যাস, মনের টানে যত ধরনের অপরাধকর্ম মাথায় এসেছে, সব কটার বাস্তবায়নে সে বাধ্য হয়েছে। নিশিথ জীবনে নানা জায়গায় প্রবেশ করার নানা পদ্ধতি নিয়ে সে ভাবত। কামরায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জেগে না যায় এবং সমস্ত আসবাবপত্র ও মালামাল লুট করে নিরাপদে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায় -বছরের পর বছর সে এ প্লান তৈরি করেছে। বড় হয়ে সে যখন একাধিক ঘরে চুরি করেছে, তখন নিজের সফলতার উপর তার বিরাট আনন্দ অনুভব হয়েছে। কারণ, বাস্তবিকই তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে।

সে আরও বলেছিল, টাকা-পয়সার মোহে সে চুরি করত না বরং বছরের পর বছর যে প্রবল আগ্রহ ও চিন্তা-ভাবনা সে মনের ভেতর লালন করে আসছিল, সে কারণে এসব অপরাধ কর্মে, খারাপ কাজে, বিপদজনক ও ভয়ঙ্কর কাজে প্রশান্তি ও স্থিরতা লাভ করত অর্থাৎ এতে তার ঐ দীর্ঘ দিনের প্রবল আগ্রহ-জযবা কিছুটা হ্রাস পেত। আর তাই সে চুরি করত। প্রথমবার যখন সে ধরা পড়ল, তখন তার অনুভূতি ছিল না যে, সে একজন অপরাধী। মোটকথা, মনের মধ্যে কোনও অন্যায়-অপরাধের পরিকল্পনা স্থান দেওয়া বড় বিপদজনক। এসব পরিকল্পনা আমাদের মনের বরং আমাদেরই একাংশ হয়ে যায়। আর আমাদের চিন্তাধারা যেমন হয়, আমরাও তেমনই হয়ে যাই।

বিখ্যাত এক চোর তার জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিল, চুরি করার পূর্বে আমি একাধিকবার মনেমনে চুরি করেছি। আমি সর্বদা ভাবতাম- কি কি পদ্ধতিতে চুরি করে মালামাল নিয়ে নিরাপদে চলে আসা যায়? কিভাবে পুলিশের হাত থেকে বাঁচা যায়? দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমি এ অপরাধমূলক আবেগের হাতের খেলনা হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তার মধ্যে এ অনুভূতিটুকু ছিল না যে, অপরাধমূলক চিন্তা-ভাবনাকে মনের মধ্যে স্থান দিয়ে সত্যি-সত্যি সে একদিন অপরাধী হতে যাচ্ছে। বস্তুতঃ যখন সে অপরাধ করাকে বৈধ মনে করেছে, তখনই সে অপরাধ করে বসেছে। এ স্বভাব বিলম্বে হলেও তার অভ্যাস (মানসিকভাবে) হয়ে গিয়ে ছিল। মনের ভেতর পুষে রাখা অন্যায়-অপরাধের আবেগ তার শরীরের রন্দ্রে রন্দ্রে মিশে গিয়েছিল। যেদিন সে নিজেকে জেলখানায় দেখতে পেল, তখন তার অনুভূতি জাগল, সে একজন অপরাধী। সেখানে অপরাধীদের মধ্যে কিছু লোক এমনও ছিল, যাদের বস্তুতঃ শারীরিকভাবে অপরাধ করার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছা ছিল না। তারা তো কেবল অন্যায়-অপরাধের চিন্তায় উন্মাদ ও মাতাল ছিল। কিন্তু কল্পিত সে অন্যায়-অপরাধেরই উচ্চমূল্য দিতে হয়েছে তাকে। ঐ কল্পনা তাকে বাস্তবিকই অপরাধী বানিয়ে ছেড়েছে।

অজান্তেই মানুষ অন্যায়-অপরাধের চিন্তা মনে স্থান দেয়। সামান্য অসতর্কতার কারণে যে কোনও মানুষের মনে অন্যায়-অপরাধের চিন্তা-ভাবনা জাগ্রত হতে পারে। একাধিকবার অপরাধ চিন্তাই সরলপ্রাণ লোকের জীবনও অপরাধী বানিয়ে দেয় এবং তার সমোজ্জল ভবিষ্যত বরবাদ করে দেয়। কখনও কখনও মনিব অকারণে চাকরের উপর বেইমানীর সন্দেহ করে বসে। এ সন্দেহই চাকরকে একাধিকবার বেইমান বানিয়ে ছাড়ে। যাকে অহেতুক দোষারোপ করতে থাকেন, অকারণে সব সময় নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকেন, তার মনে আপনার দেওয়া চিন্তা-ভাবনা বদ্ধমূল হয়ে যায়। ফলে বাস্তবিকই সে অপরাধের প্রতি ঝুঁকে যায়। কারও অপরাধী হওয়ার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ হস্তগত হওয়া পর্যন্ত তার উপর সন্দেহ পোষণ করা নিতান্তই বাড়াবাড়ি। একাধিকবার আপনার সন্দেহেই তার আচরণকে অপরাধী প্রমাণ করে।

অনেক লোক ভয়-ভীতির খেয়াল বিস্তার করে। কেউ কেউ ভয়-ভীতির অনুভূতি বিস্তার করে। কেউ কেউ ব্যর্থতার চিন্তাধারা বিস্তার করে। মানুষের মন-মানসিকতা সতর্ক ও সচেতন না হলে, তার মধ্যে এসব চিন্তাধারার ছোঁয়া দ্রুত লেগে যায়। মানুষের আনন্দ-প্রফুল্লতা, আত্মবিশ্বাস ও সফলতার চিন্তাধারা প্রশস্ত করা জরুরী। অপরাধমূলক চিন্তাধারার যাদুতে মানুষ অনেক সময় দুর্ঘটনা, দুঃখ-যাতনা কিংবা ব্যর্থতার অরণ্যে ফেঁসে যায়। যারা আপনার মনে ভয়-ভীতি সন্দেহ প্রবণতা ও ব্যর্থতার চিন্তা-ভাবনা অনুপ্রবেশ করায়, তাদের কথাবার্তার চৌকসে প্রভাবিত হয়ে একসময় বাস্তবিকই আপনি ভীত সন্ত্রস্ত, সন্দেহ প্রবণ ও ব্যর্থ হয়ে যাবেন। যেসব লোক নানা ধরনের ভুল-ভ্রান্তি করে অথবা প্রকৃতপক্ষেই যারা অপরাধী, তাদের নিয়ে নীরবে চিন্তা করার সময় আসছে। কেননা অন্য লোকের দ্বারা বিস্তৃত চিন্তাধারার কারণে মানুষের অন্তর কিরূপ প্রভাবিত হয়, মনস্তত্ত্বের উপর সূক্ষ্ম গবেষণার দ্বারা তা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

অসংখ্য যুবক যাদেরকে তুচ্ছ অপরাধের কারণে জেলখানায় আটক করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই সেখান থেকে দক্ষ ও পেশাদার অপরাধী হয়ে বেরিয়ে আসে। কেননা কারাগারে তাকে সর্বক্ষণ অপরাধীদের সাথেই থাকতে হয়। ভাল লোকদের চলাফেরা ও কথাবার্তা বলার দ্বারা আমাদের মনে সুচিন্তা আসে। আর অপরাধমূলক চিন্তাধারার লোকদের সাথে কথাবার্তা বলে আমরাও অপরাধমূলক চিন্তাধারা গ্রহণ করি। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই সচেতন ও হুঁশিয়ার হই, তাহলে স্বীয় প্রমাণাদি ও মজবুত চিন্তাধারার প্রভাবে ঐ সব অপরাধমূলক চিন্তাধারার অবসান ঘটাতে পারি। সুচিন্তার অধিকারী হওয়ার জন্য ভাল ভাল বই-পুস্তক অধ্যয়ণ করাও অনেক উপকারী। ভাল চিন্তাধারা ও ভাল বই-পুস্তক একজন সৎ ও ভাল বন্ধুর মতই পরামর্শ দেয়। সাহস যোগায়, যোগ্যতা তৈরি করে। হতাশায় আশা সঞ্চার করে। মোরাল বা মেধা-মনন দুর্বল হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং নেতিবাচক আগ্রহ অবদমিত রাখে।

প্রথমবার অপরাধকারী লোকদেরকে যদি পেশাদার অপরাধীদের সাথে না রেখে বড় কোনও ফার্মে তাদের রাখা হয়, যেখানে আল্লাহ্‌ তা'আলার কুদরতের সৌন্দর্য তাদের উপর যাদুময় প্রভাব বিস্তার করবে, যেখানে পাহাড়-পর্বত, ঘাটি উপত্যকা, বিল-ঝিল, ঝর্ণা স্পট, সবুজ ঘাস, পত্র-পল্লব ও পুষ্পরাজি মনকে আন্দোলিত করবে, যেখানে অনুগ্রহশীল, সহানুভূতিশীল লোক থাকবে, যারা অপরাধকে ঘৃণার চোখে দেখবে; অপরাধীকে নয়। তাহলে প্রথমবার অপরাধকারী লোকদেরকে প্রকৃতপক্ষেই সংশোধন করা সম্ভব হতে পারে। এ ধরনের সংশোধন কেন্দ্র প্রত্যেক দেশেই থাকা জরুরী।

আমরা সুবোধ সৃষ্টি। যেমন পিতা-মাতা, উস্তাদ প্রতিবেশি অভিজ্ঞ মহল, বন্ধু-বান্ধব সবার নিকট থেকে বুঝ গ্রহণ করি। এ বুঝ-জ্ঞান আমরা সংবাদপত্র, বই-পুস্তক, রেডিও ইত্যাদি থেকেও পেয়ে থাকি। আমাদের চতুর্পাশ্বের পরিবেশ অসংখ্য ধৃষ্টতায় ভরা। আমরা এসব ধৃষ্টতাই যথারীতি গ্রহণ করে থাকি। অন্য কথায় আমাদের চরিত্রের বহুলাংশই ঐ সব ধৃষ্টতার ধাঁচে গড়ে ওঠে। আমরা ভালভাবেই জানি, কোনও শক্তিশালী চলচ্চিত্র অথবা নভেল ম্যাগজিনের কতটুকু গভীর প্রভাব আমাদের উপর পতিত হয়। গান্ধা-পঁচা ও পর্ন বই-পুস্তক অধ্যায়ণের কারণে চরিত্রের অধঃপতন হয়। রহস্যময় গোয়েন্দা কাহিনী পড়ার কারণে অপরাধ প্রবণতা জাগ্রত হয়। এ ধরনের বই-পুস্তক পড়ার বদঅভ্যাস হয়ে গেলে নারী-পুরুষের অধঃপতন বিলম্বিত হয় না। তাহলে কচি-কাঁচা শিশু-কিশোরদের নরম কোমল প্রাণে ঐ সবের কত বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অবশ্যই তা সহজেই অনুমেয়।

কিছু হতাশভাগ্য এমনও পাওয়া যাবে, যারা রাগ ও ক্রোধের শিকার হয়ে নিজের স্বাধীনতা-স্বকীয়তা বিনষ্ট করে দেয়। তাদের এ ক্রোধ ছিল মুহূর্তকাল মাত্র। অথচ তার গোটা জীবনটাই বরবাদ করে দিয়েছে। চরিত্র কলুষিত হয়ে গেছে। ক্রোধের মুহূর্তে খামোখাই বন্দুকের ট্রিগার চাপল। গুলি বের হল। কিন্তু যার গায়ে লাগল সে চিরকালের জন্য দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেল। এখন যে অপরাধের অভ্যাস হল, তা আর কখনও দূরীভূত হতে পারে না। ক্রোধের মুহূর্তে রক্ত গরম হয়ে গেলে মানুষ কী অপরাধ না করতে পারে। ক্রোধের এক ধাক্কায় কত মানুষ নিজের উচ্চ মর্যাদা হারিয়ে ফেলে অথবা উচ্চ মর্যাদার পৌছার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। মানুষ ক্রোধান্বিত হয়ে এক মুহূর্তেই বহু বছরের কীর্তি, মেহনত ও গবেষণার ফসল ছুড়ে ফেলে।

একজন অভিজ্ঞ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ইতোমধ্যে কয়েকটা সংবাদপত্রের চীফ এডিটর হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন বড়ই দয়াবান, সুহৃদ ও উদার মনের মানুষ। প্রয়োজনে তিনি যে কোন মানুষের সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকতেন। কিন্তু ক্ষণেক্ষণে তার রক্ত গরম হয়ে যেত। ক্রোধ-উত্তেজনাায় তার বক্ষ স্ফীত হয়ে যেত। মুহূর্তের মধ্যে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলে তিনি তৎক্ষণাত স্বীয় চাকুরী থেকে ইস্তেফা দিয়ে দিতেন। ঐ পদমর্যাদা হাসিল করার জন্য তাকে বছরের পর বছর মেহনত করতে হত। কিন্তু এক মুহূর্তেই এ সকল মেহনত বেকার হয়ে যেত। কেননা তিনি ক্রোধ ও গোস্বার নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ তার মাঝে এমন যোগ্যতা ছিল, যা সাধারণতঃ খুব কম লোকের মাঝেই থাকে। তদুপরি তাকে আজ কোথাও কাল কোথাও, সব সময়ই কাজের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ধর্ণা দিতে হত। পরিবারের সদস্যদের জীবনও কাটত খুব কষ্টে। এভাবে সে রাগ ও ক্রোধের গোলাম হয়ে যেত।

(ওয়ার্ল্ড ম্যান এও ডায়মণ্ড)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00