📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 কায়া কিভাবে পাল্টাবে?

📄 কায়া কিভাবে পাল্টাবে?


প্রত্যেকটি জযবা ও ধ্যান ধারণারই বিরাট প্রভাব আমাদের মন-মস্তিষ্কে পতিত হয়। চিন্তা ধারার তীক্ষ্ণতা অনুযায়ীই আমাদের মন-মস্তিষ্কে রেখাপাত করে। প্রফেসর গিবেন্সর গবেষণা অনুযায়ী সুস্পষ্ট কথা হল, নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনার কারণে মানব দেহে এমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যার ফলে শরীরের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়ে পড়ে। খারাপ চিন্তা-ভাবনার বিষক্রিয়া সর্বাধিক পতিত হয় পাকস্থলি ও খাদ্যনালীতে। মনে যখন খারাপ চিন্তা-ভাবনা উদয় হয়, তখনই শরীরের ভেতর ক্যামিকেল কম্পাউন্ডের বিরাট পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এতে স্বাস্থের উপর বিরাট ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। সকল চিন্তা-ভাবনার বিষক্রিয়া বা মন্দ প্রভাব যেহেতু বেশী ভাগ শরীরের উপরই পতিত হয়, বিধায় দুশ্চিন্তা অতিদ্রুত আমাদের শরীর দুর্বল ও রোগাক্রান্ত করে দেয়।

যদি প্রত্যেক ব্যক্তি দৈনন্দিন নূন্যতম এক ঘণ্টা মনোজগৎ বিনির্মাণ ও গঠনে ব্যয় করে এবং আনন্দদায়ক স্মৃতিচারণ ও খুশি-প্রফুল্লতার চিন্তা-ভাবনায় মন ব্যস্ত রাখে, তাহলে তার জীবন ধারাই বদলে যেতে পারে। আনন্দদায়ক চিন্তা-ভাবনায় ব্যাপক সফলতা এবং অবাধ সুষ্ঠু জীবন লাভ করা যায়। এতে যথারীতি মন ব্যস্ত রাখলে মানব জীবনে বিস্ময়কর পরিবর্তন আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তামাক সেবন, মদ বা শরাব পান, লাম্পট্য করে বেড়ানো ছাড়াও শরীর-স্বাস্থ্য ধ্বংস করার আরও অনেক পন্থা আছে। যেমন ক্রোধ আমাদের জোড়া বা গ্রন্থিগুলোর ক্যামিক্যালে পরিবর্তন সৃষ্টি করে। ক্রোধের কারণে এমন বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়, যা জীবনের জন্য বিরাট ক্ষতিকারক। এতে শুধু মন-মস্তিষ্ক দুর্বলই হয় না বরং এ কারণে উন্মাদনা বা পাগলামীসহ মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। ধরে নিন, একই কক্ষে কয়েকজন ব্যক্তি রয়েছে। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন দেখে মনোবিজ্ঞানে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বলতে পারবেন, কার মনের ভেতর ক্রোধ রয়েছে, কার মনের ভেতর হিংসা-বিদ্বেষ রয়েছে। কার মনে প্রফুল্লতা রয়েছে। কার মনে কৃতকার্যতা ও সফলতা রয়েছে। এ তত্ত্ব এতই বিশ্বাসযোগ্য যে, এর মাধ্যমে ইতিবাচক ও সুস্পষ্ট ফলাফল বের করা যায়। ভয়-ভীতির কারণে শরীর দুর্বল ও ব্যধিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। অথচ সাহস ও ধৈর্যের মাধ্যমে শারীরিক শক্তিতে পরিপূর্ণতা আসে।

ক্রোধের কারণে দুগ্ধপান কারিনী মায়ের দুধ বিষাক্ত হয়ে যায়। তার বাচ্চা তাৎক্ষণিকভাবে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। প্রসিদ্ধ এক ঘোড়াপালক বলেন, ঘোড়ার রাগ প্রকাশ করার কারণে ঘোড়ার নাড়ির গতি দশগুণ বেড়ে যায়। কুকুরের উপর এ পরীক্ষা চালানোর পরও একই ধরনের ফলাফল লক্ষ্য করা গেছে।

প্রাণীদের উপর যখন ক্রোধের এতটা প্রতিক্রিয়া হয়, তখন মানুষের উপর এর প্রভাব কি পরিমাণ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। পরপর কয়েকবার অতিমাত্রায় রাগান্বিত ও আতঙ্কিত হওয়ার কারণে মানুষের বমি এসে যায়। খুব বেশি রাগ ও ভয়ের কারণে হার্টের রোগ দেখা দেয়। কঠিন ক্রোধের কারণে আবার কয়েক বার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হতে দেখা যায়। আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির সেরা মানুষকে দুর্বল হওয়া কিংবা অতিআগ্রহের গোলাম হওয়ার জন্য সৃষ্টি করেন নি। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি-ক্ষমতা আমাদের ভিতরে আছে। আমাদের কাজ হল, সাহস ও শক্তি প্রয়োগ করে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা।

যে ব্যক্তি নিজের মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়, নিজের ইচ্ছা আকাঙ্খা ও মন-মানসিকতা নির্মাণ করতে সক্ষম হয়, নিজের চিন্তাধারা ও আবেগের উপর সম্পূর্ণরূপে রাজত্ব করতে পারে, সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থে সেই মানুষ। সে নিজের প্রবল ইচ্ছার ও শক্ত চিন্তাধারায় সৃষ্ট কাজকর্মের মোকাবেলায় সফলকাম হয়। খারাপ খেয়াল ও বাজে চিন্তার স্থলে তৎক্ষণাত ভাল খেয়াল সুচিন্তা আনয়ণ করতে পারে। অনুরূপভাবে যেমন রসায়ন শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এসিডের বিষক্রিয়া দূর করার জন্য এসিড ব্যবহার করতে সক্ষম। কিন্তু আনাড়ী ব্যক্তির পক্ষে সমূহ সম্ভাবনা আছে, সে এসিড এমনভাবে ব্যবহারে করে বসবে, যাতে শরীর আরও বেশি জ্বলে যাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি জানে, শরীরে এসিড পড়ার পরে বিশেষ এসিড ব্যবহার করাই উচিৎ ও যুক্তিযুক্ত। সে এসিড-এর মাধ্যমে পূর্বের এসিডের বিষক্রিয়া দূর করতে সক্ষম হবে।

অনুরূপভাবে প্রত্যেক সুচিন্তার অধিকারী ব্যক্তি যাবতীয় বাজে চিন্তার পরিবর্তে সৎ ও ভাল চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে মোকাবেলা করে এবং ক্ষতি পূরণ করে নেয়। উদাহরণ স্বরূপ সে জানে, হতাশাব্যঞ্জক চিন্তা-ভাবনার কারণে শরীর ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে। কাজেই তা দূরীভূত করার জন্য সে ধৈর্য ও আশাব্যঞ্জক চিন্তা-ভাবনা করে। সে রোগ-ব্যাধির খেয়াল আসলে সুস্থতা, ঘৃণার খেয়াল আসলে প্রেম-ভালোবাসার, হিংসা-বিদ্বেষের খেয়াল আসলে ভাল জিনিসের চিন্তা-ভাবনা করে নিজের মনকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচিয়ে নেয়। এমন ব্যক্তি রোগ-ব্যাধির প্রতিষেধক মনের ভেতরেই সঞ্চিত রাখে। যখনই সে কোনও মানসিক বিপর্যয় দেখে, তৎক্ষণাত সেই প্রতিষেধক ব্যবহার করে মনকে পুনরায় সুস্থ-সবল করে তোলে।

যেরূপভাবে ছেলে-মেয়েদেরকে রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক জ্ঞান দেওয়া হয়, অনুরূপভাবে তাদেরকে যদি মনোস্তাত্ত্বিক রসায়নেরও জ্ঞান দেওয়া হয় তাহলে সে হতাশা, হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ ও মানসিক প্রতিবন্ধকতাগুলো থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে সফলকাম হতে পারবে। তখন আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে কখনও অপরাধী, হতাশাগ্রস্থ এবং অকৃতকার্য পরিলক্ষিত হবে না। মনোস্তাত্ত্বিক এ রসায়ন জ্ঞান না থাকার কারণে বহু লোক নিজের মনকে বিপদমুক্ত রাখতে সক্ষম হয় না। আমরা নিজেরাই নিজের মনকে বিষাক্ত করে ফেলি। অতঃপর নিজেই যন্ত্রণা ভোগ করি। এ বিষাক্ত চিন্তা-ভাবনা আমাদের মনে উদয় হওয়ার পর আমাদের শরীরে এমন রসায়নিক ক্রিয়া বাড়তে থাকে ফলে আমাদের পক্ষে সুস্থ্য থাকাই দুরূহ হয়ে পড়ে।

ঘৃণা, হিংসা এবং বিদ্রোহের প্রভাব পড়া মাত্র মানবদেহের শক্তি-সামর্থ অকেজো হয়ে পড়ে। সে নিথর নিস্তেজ হয়ে যায়। পূর্বোক্ত আবেগের আক্রমণে পতিত ব্যক্তি অবসাদ, উদাসীনতা, অলসতা ও হতাশার শিকার হয়ে যায়। ফলে সে অকালে বুড়ো হয়ে যায়। তবে আমরা চাইলে মানসিক বিষবাষ্পকে খুব সহজেই প্রতিরোধ করতে পারি। এর বিষক্রিয়া দূরীভূত করার প্রতিষেধক আমাদের মনেই আছে। আমরা যদি ঘৃণার বিষক্রিয়ার চিকিৎসা ভালোবাসার মাধ্যমে করি, তাহলে আমরা ঘৃণার বিষক্রিয়ায় শরীরে হয়ে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি থেকে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হব। পানির কোনও আবর্জনা এমন নেই, যা রসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে দূরীভূত করা না যায়। অনুরূপভাবে মনের এমন কোনও ত্রুটি-বিচ্যুতি বা কলুষতা নেই, যা ভালো চিন্তা-ভাবনার রসায়নিক ক্রিয়ার দ্বারা দূরীভূত করা যায় না। বাজে চিন্তাধারার বিষবাষ্পে কত মূল্যবান জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। যদি এ আবেগের শিকার লোকের প্রতিবেশিরা ঐ সব আবেগের চিকিৎসা জানত এবং সময় মত চিকিৎসা করত, তবে ঐ সব মূল্যবান জীবন বাঁচানো সম্ভব হত। আমরা যদি জানি, কোন ধরনের বাজে চিন্তার চিকিৎসা কোন ধরনের সুচিন্তা, তাহলে মানসিক প্রতিবন্ধকতার চিকিৎসা করা আমাদের পক্ষে সহজসাধ্য হয়ে যেত। প্রত্যেক বাজে চিন্তার বিপরীতে ভাল ও সুচিন্তা আনয়ণ করে তৎক্ষণাত মনকে সুস্থ করে নিতে সক্ষম হতাম।

আপনি যদি বুঝতে পারেন, আপনার মনকে অকেজো করার জন্য দুর্বলতা এগিয়ে আসছে, তাহলে তৎক্ষণাত সচেতন চিন্তাধারার প্রবল জোয়ারে মনকে এত শক্তিশালী করে নেওয়া যাবে ফলে দুর্বলতার কোনও প্রতিক্রিয়াই পড়বে না। ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষ বহু অন্তরায় দূর করতে পারে। এতে লোভ-লালসা এবং স্বার্থপরতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণার শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। প্রতিশোধের নেশা, অপরাধ প্রবণতা এবং মনের অন্যান্য অন্তরায়ও দূরীভূত হয়ে যায়।

আমরা অনেকেই তো মন থেকে বাজে চিন্তা দূরীভূত করতে চাই। কিন্তু ঔষধ ব্যবহার করতে চাই না। মন থেকে ঘৃণা বিতাড়িত করতে চাই। কিন্তু মনের ভেতর ভালোবাসা স্থান দিতে চাই না। মন-মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনুন। প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার জযবা মনে স্থান দিন। সকলকেই নিজের ভালোবাসার পাত্র মনে করুন, যাকে ঘৃণা করেন তার প্রতিও ভালোবাসা রাখুন। তারপর দেখবেন, আপনার মাঝে কেমন পরিবর্তন আসে। যখনই ক্লান্তি-অবসাদ, সংশয়-সন্দেহ, ভয়-ভীতি প্রভৃতির নেতিবাচক প্রভাব আপনাকে কষ্ট দেবে, তখন এসবের বিপরীত জিনিসগুলো চিন্তা করুন। ভ্রাতৃত্ববোধ, আস্থা-বিশ্বাস ও দুঃসাহসের জযবা মনে জাগ্রত করুন। যেরূপভাবে সূর্যের আলোর মাঝে অন্ধকার থাকতে পারে না, তদ্রূপ গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনার সাথে খারাপ ও বাজে চিন্তাধারা থাকতে পারে না।

মানুষের সব চেয়ে বড় কর্তব্য হল, নিজের পূর্ণাঙ্গ শারীরিক রত্নভাণ্ডার দ্বারা জীবনকে উত্তম অবস্থায় রাখা। তাহলে সে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ, সবল, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে এবং প্রফুল্ল থাকতে পারে। আর তখনই সে সঠিক কাজ করতে সক্ষম হয়। সৎ আচরণ করতে পারে। ঈমানদার ও কৃতজ্ঞ থাকতে পারে। হতে পারে একজন আদর্শ মানুষ।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 গঠন মূলক পরিকল্পনা ও ধ্বংসাত্মক চিন্তা ভাবনা

📄 গঠন মূলক পরিকল্পনা ও ধ্বংসাত্মক চিন্তা ভাবনা


অপরাধীরা প্রথমে মনে মনে অপরাধ করে। শারীরিক অঙ্গ-প্রতঙ্গ দ্বারা কৃত অপরাধ তাদের মনের ঐ চিন্তা-ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন মাত্র। বিভিন্ন অপরাধ ও অন্যায় কর্মকাণ্ডের কারণে এক ব্যক্তি পঁচিশ বছর পর্যন্ত কারা ভোগ করেছে। একদিন সে বলল- কোনও অন্যায়-অপরাধ সে জেনে বুঝে করেনি। শৈশব থেকেই তাকে এমন এক আগ্রহ তাড়া করেছে যে, আমার এমন এমন কাজ করতে হবে, যা অন্য লোকদের পক্ষে অসম্ভব। ব্যাস, মনের টানে যত ধরনের অপরাধকর্ম মাথায় এসেছে, সব কটার বাস্তবায়নে সে বাধ্য হয়েছে। নিশিথ জীবনে নানা জায়গায় প্রবেশ করার নানা পদ্ধতি নিয়ে সে ভাবত। কামরায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জেগে না যায় এবং সমস্ত আসবাবপত্র ও মালামাল লুট করে নিরাপদে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায় -বছরের পর বছর সে এ প্লান তৈরি করেছে। বড় হয়ে সে যখন একাধিক ঘরে চুরি করেছে, তখন নিজের সফলতার উপর তার বিরাট আনন্দ অনুভব হয়েছে। কারণ, বাস্তবিকই তার পরিকল্পনা সফল হয়েছে।

সে আরও বলেছিল, টাকা-পয়সার মোহে সে চুরি করত না বরং বছরের পর বছর যে প্রবল আগ্রহ ও চিন্তা-ভাবনা সে মনের ভেতর লালন করে আসছিল, সে কারণে এসব অপরাধ কর্মে, খারাপ কাজে, বিপদজনক ও ভয়ঙ্কর কাজে প্রশান্তি ও স্থিরতা লাভ করত অর্থাৎ এতে তার ঐ দীর্ঘ দিনের প্রবল আগ্রহ-জযবা কিছুটা হ্রাস পেত। আর তাই সে চুরি করত। প্রথমবার যখন সে ধরা পড়ল, তখন তার অনুভূতি ছিল না যে, সে একজন অপরাধী। মোটকথা, মনের মধ্যে কোনও অন্যায়-অপরাধের পরিকল্পনা স্থান দেওয়া বড় বিপদজনক। এসব পরিকল্পনা আমাদের মনের বরং আমাদেরই একাংশ হয়ে যায়। আর আমাদের চিন্তাধারা যেমন হয়, আমরাও তেমনই হয়ে যাই।

বিখ্যাত এক চোর তার জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিল, চুরি করার পূর্বে আমি একাধিকবার মনেমনে চুরি করেছি। আমি সর্বদা ভাবতাম- কি কি পদ্ধতিতে চুরি করে মালামাল নিয়ে নিরাপদে চলে আসা যায়? কিভাবে পুলিশের হাত থেকে বাঁচা যায়? দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমি এ অপরাধমূলক আবেগের হাতের খেলনা হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তার মধ্যে এ অনুভূতিটুকু ছিল না যে, অপরাধমূলক চিন্তা-ভাবনাকে মনের মধ্যে স্থান দিয়ে সত্যি-সত্যি সে একদিন অপরাধী হতে যাচ্ছে। বস্তুতঃ যখন সে অপরাধ করাকে বৈধ মনে করেছে, তখনই সে অপরাধ করে বসেছে। এ স্বভাব বিলম্বে হলেও তার অভ্যাস (মানসিকভাবে) হয়ে গিয়ে ছিল। মনের ভেতর পুষে রাখা অন্যায়-অপরাধের আবেগ তার শরীরের রন্দ্রে রন্দ্রে মিশে গিয়েছিল। যেদিন সে নিজেকে জেলখানায় দেখতে পেল, তখন তার অনুভূতি জাগল, সে একজন অপরাধী। সেখানে অপরাধীদের মধ্যে কিছু লোক এমনও ছিল, যাদের বস্তুতঃ শারীরিকভাবে অপরাধ করার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছা ছিল না। তারা তো কেবল অন্যায়-অপরাধের চিন্তায় উন্মাদ ও মাতাল ছিল। কিন্তু কল্পিত সে অন্যায়-অপরাধেরই উচ্চমূল্য দিতে হয়েছে তাকে। ঐ কল্পনা তাকে বাস্তবিকই অপরাধী বানিয়ে ছেড়েছে।

অজান্তেই মানুষ অন্যায়-অপরাধের চিন্তা মনে স্থান দেয়। সামান্য অসতর্কতার কারণে যে কোনও মানুষের মনে অন্যায়-অপরাধের চিন্তা-ভাবনা জাগ্রত হতে পারে। একাধিকবার অপরাধ চিন্তাই সরলপ্রাণ লোকের জীবনও অপরাধী বানিয়ে দেয় এবং তার সমোজ্জল ভবিষ্যত বরবাদ করে দেয়। কখনও কখনও মনিব অকারণে চাকরের উপর বেইমানীর সন্দেহ করে বসে। এ সন্দেহই চাকরকে একাধিকবার বেইমান বানিয়ে ছাড়ে। যাকে অহেতুক দোষারোপ করতে থাকেন, অকারণে সব সময় নিজেকে অপরাধী ভাবতে থাকেন, তার মনে আপনার দেওয়া চিন্তা-ভাবনা বদ্ধমূল হয়ে যায়। ফলে বাস্তবিকই সে অপরাধের প্রতি ঝুঁকে যায়। কারও অপরাধী হওয়ার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ হস্তগত হওয়া পর্যন্ত তার উপর সন্দেহ পোষণ করা নিতান্তই বাড়াবাড়ি। একাধিকবার আপনার সন্দেহেই তার আচরণকে অপরাধী প্রমাণ করে।

অনেক লোক ভয়-ভীতির খেয়াল বিস্তার করে। কেউ কেউ ভয়-ভীতির অনুভূতি বিস্তার করে। কেউ কেউ ব্যর্থতার চিন্তাধারা বিস্তার করে। মানুষের মন-মানসিকতা সতর্ক ও সচেতন না হলে, তার মধ্যে এসব চিন্তাধারার ছোঁয়া দ্রুত লেগে যায়। মানুষের আনন্দ-প্রফুল্লতা, আত্মবিশ্বাস ও সফলতার চিন্তাধারা প্রশস্ত করা জরুরী। অপরাধমূলক চিন্তাধারার যাদুতে মানুষ অনেক সময় দুর্ঘটনা, দুঃখ-যাতনা কিংবা ব্যর্থতার অরণ্যে ফেঁসে যায়। যারা আপনার মনে ভয়-ভীতি সন্দেহ প্রবণতা ও ব্যর্থতার চিন্তা-ভাবনা অনুপ্রবেশ করায়, তাদের কথাবার্তার চৌকসে প্রভাবিত হয়ে একসময় বাস্তবিকই আপনি ভীত সন্ত্রস্ত, সন্দেহ প্রবণ ও ব্যর্থ হয়ে যাবেন। যেসব লোক নানা ধরনের ভুল-ভ্রান্তি করে অথবা প্রকৃতপক্ষেই যারা অপরাধী, তাদের নিয়ে নীরবে চিন্তা করার সময় আসছে। কেননা অন্য লোকের দ্বারা বিস্তৃত চিন্তাধারার কারণে মানুষের অন্তর কিরূপ প্রভাবিত হয়, মনস্তত্ত্বের উপর সূক্ষ্ম গবেষণার দ্বারা তা আমাদের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।

অসংখ্য যুবক যাদেরকে তুচ্ছ অপরাধের কারণে জেলখানায় আটক করা হয়েছিল, তাদের অনেকেই সেখান থেকে দক্ষ ও পেশাদার অপরাধী হয়ে বেরিয়ে আসে। কেননা কারাগারে তাকে সর্বক্ষণ অপরাধীদের সাথেই থাকতে হয়। ভাল লোকদের চলাফেরা ও কথাবার্তা বলার দ্বারা আমাদের মনে সুচিন্তা আসে। আর অপরাধমূলক চিন্তাধারার লোকদের সাথে কথাবার্তা বলে আমরাও অপরাধমূলক চিন্তাধারা গ্রহণ করি। কিন্তু আমরা যদি প্রকৃতপক্ষেই সচেতন ও হুঁশিয়ার হই, তাহলে স্বীয় প্রমাণাদি ও মজবুত চিন্তাধারার প্রভাবে ঐ সব অপরাধমূলক চিন্তাধারার অবসান ঘটাতে পারি। সুচিন্তার অধিকারী হওয়ার জন্য ভাল ভাল বই-পুস্তক অধ্যয়ণ করাও অনেক উপকারী। ভাল চিন্তাধারা ও ভাল বই-পুস্তক একজন সৎ ও ভাল বন্ধুর মতই পরামর্শ দেয়। সাহস যোগায়, যোগ্যতা তৈরি করে। হতাশায় আশা সঞ্চার করে। মোরাল বা মেধা-মনন দুর্বল হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং নেতিবাচক আগ্রহ অবদমিত রাখে।

প্রথমবার অপরাধকারী লোকদেরকে যদি পেশাদার অপরাধীদের সাথে না রেখে বড় কোনও ফার্মে তাদের রাখা হয়, যেখানে আল্লাহ্‌ তা'আলার কুদরতের সৌন্দর্য তাদের উপর যাদুময় প্রভাব বিস্তার করবে, যেখানে পাহাড়-পর্বত, ঘাটি উপত্যকা, বিল-ঝিল, ঝর্ণা স্পট, সবুজ ঘাস, পত্র-পল্লব ও পুষ্পরাজি মনকে আন্দোলিত করবে, যেখানে অনুগ্রহশীল, সহানুভূতিশীল লোক থাকবে, যারা অপরাধকে ঘৃণার চোখে দেখবে; অপরাধীকে নয়। তাহলে প্রথমবার অপরাধকারী লোকদেরকে প্রকৃতপক্ষেই সংশোধন করা সম্ভব হতে পারে। এ ধরনের সংশোধন কেন্দ্র প্রত্যেক দেশেই থাকা জরুরী।

আমরা সুবোধ সৃষ্টি। যেমন পিতা-মাতা, উস্তাদ প্রতিবেশি অভিজ্ঞ মহল, বন্ধু-বান্ধব সবার নিকট থেকে বুঝ গ্রহণ করি। এ বুঝ-জ্ঞান আমরা সংবাদপত্র, বই-পুস্তক, রেডিও ইত্যাদি থেকেও পেয়ে থাকি। আমাদের চতুর্পাশ্বের পরিবেশ অসংখ্য ধৃষ্টতায় ভরা। আমরা এসব ধৃষ্টতাই যথারীতি গ্রহণ করে থাকি। অন্য কথায় আমাদের চরিত্রের বহুলাংশই ঐ সব ধৃষ্টতার ধাঁচে গড়ে ওঠে। আমরা ভালভাবেই জানি, কোনও শক্তিশালী চলচ্চিত্র অথবা নভেল ম্যাগজিনের কতটুকু গভীর প্রভাব আমাদের উপর পতিত হয়। গান্ধা-পঁচা ও পর্ন বই-পুস্তক অধ্যায়ণের কারণে চরিত্রের অধঃপতন হয়। রহস্যময় গোয়েন্দা কাহিনী পড়ার কারণে অপরাধ প্রবণতা জাগ্রত হয়। এ ধরনের বই-পুস্তক পড়ার বদঅভ্যাস হয়ে গেলে নারী-পুরুষের অধঃপতন বিলম্বিত হয় না। তাহলে কচি-কাঁচা শিশু-কিশোরদের নরম কোমল প্রাণে ঐ সবের কত বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অবশ্যই তা সহজেই অনুমেয়।

কিছু হতাশভাগ্য এমনও পাওয়া যাবে, যারা রাগ ও ক্রোধের শিকার হয়ে নিজের স্বাধীনতা-স্বকীয়তা বিনষ্ট করে দেয়। তাদের এ ক্রোধ ছিল মুহূর্তকাল মাত্র। অথচ তার গোটা জীবনটাই বরবাদ করে দিয়েছে। চরিত্র কলুষিত হয়ে গেছে। ক্রোধের মুহূর্তে খামোখাই বন্দুকের ট্রিগার চাপল। গুলি বের হল। কিন্তু যার গায়ে লাগল সে চিরকালের জন্য দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেল। এখন যে অপরাধের অভ্যাস হল, তা আর কখনও দূরীভূত হতে পারে না। ক্রোধের মুহূর্তে রক্ত গরম হয়ে গেলে মানুষ কী অপরাধ না করতে পারে। ক্রোধের এক ধাক্কায় কত মানুষ নিজের উচ্চ মর্যাদা হারিয়ে ফেলে অথবা উচ্চ মর্যাদার পৌছার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। মানুষ ক্রোধান্বিত হয়ে এক মুহূর্তেই বহু বছরের কীর্তি, মেহনত ও গবেষণার ফসল ছুড়ে ফেলে।

একজন অভিজ্ঞ সম্পাদক ছিলেন। তিনি ইতোমধ্যে কয়েকটা সংবাদপত্রের চীফ এডিটর হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন বড়ই দয়াবান, সুহৃদ ও উদার মনের মানুষ। প্রয়োজনে তিনি যে কোন মানুষের সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকতেন। কিন্তু ক্ষণেক্ষণে তার রক্ত গরম হয়ে যেত। ক্রোধ-উত্তেজনাায় তার বক্ষ স্ফীত হয়ে যেত। মুহূর্তের মধ্যে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠলে তিনি তৎক্ষণাত স্বীয় চাকুরী থেকে ইস্তেফা দিয়ে দিতেন। ঐ পদমর্যাদা হাসিল করার জন্য তাকে বছরের পর বছর মেহনত করতে হত। কিন্তু এক মুহূর্তেই এ সকল মেহনত বেকার হয়ে যেত। কেননা তিনি ক্রোধ ও গোস্বার নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ তার মাঝে এমন যোগ্যতা ছিল, যা সাধারণতঃ খুব কম লোকের মাঝেই থাকে। তদুপরি তাকে আজ কোথাও কাল কোথাও, সব সময়ই কাজের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ধর্ণা দিতে হত। পরিবারের সদস্যদের জীবনও কাটত খুব কষ্টে। এভাবে সে রাগ ও ক্রোধের গোলাম হয়ে যেত।

(ওয়ার্ল্ড ম্যান এও ডায়মণ্ড)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00