📄 হাস্যোজলতা ও আকাংখা পূজা
কতনা ভাল হত যদি অতীত স্মৃতিগুলো ভুলার ক্ষমতা আমাদের থাকত। যেসব ঘটনা ও কথা যেগুলো স্মরণ হওয়া মাত্রই আমাদের মন-প্রাণ চিন্তায়-অস্থিরতায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়, এ সব চিন্তাধারা আমাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য অন্ধ করে দেয়। তা ভুলে যাওয়াই ভবিষ্যতের জন্য শ্রেয়। ক্ষতিকারক কথা ও স্মৃতিসমূহ ভুলে যান। কাপুরুষতায় কি উপকার আছে? ভবিষ্যতের ফিকির করুন।
আমাদের মধ্যে যদি এ শক্তি থাকে তথা মনকে কেবল মাত্র ভালভাল চিন্তা-ভাবনায় শোভিত রাখা, যাতে আমাদের চেতনা বাড়ে। স্বতন্ত্রতা বাড়ে। জীবনের কাজকর্মে সফলতা বাড়ে। তাহলে কতই না ভাল হত। দুর্ভাগ্যবশতঃ কিছু লোকের জন্ম স্বভাবতই কি এমন হয়, যারা হাসি-খুশির ঘটনাগুলি স্মরণ করতে ব্যর্থ হয়? কারও সাথে দেখা সাক্ষাত হলে স্বভাবতঃ তারা নিজের দুঃখ-দুর্দশা বা কষ্ট যাতনার কথা বলবে কিংবা ভবিষ্যতের দুঃখের কথা বলবে। কিছু শোনালে দুর্ঘটনার কথা শোনাবে, আহ! কত বড় বিপদ ছিল। তারা নিজের সুখের দিনগুলির অথবা আনন্দঘন মুহূর্ত গুলোর কথা কখনও শুনাবে না। তারা নেতিবাচক কথাবার্তাই বলে বেড়ায়। কষ্টের দিনগুলো তাদের মনে এমন রেখাপাত করেছে যে, সব সময় ভাবতে থাকে আহ' আমাকে দুঃখ-দুর্দশা ঘিরে রেখেছে।
পক্ষান্তরে কিছু লোক এমন আছে, যারা সব সময় সুন্দর ও ভাল জিনিসের কথা বলে। শুভ-সুন্দর দিনগুলোকে স্মরণ করে। আনন্দের ঘটনাবলী স্মরণ করে মনকে প্রফুল্ল করে। আমি এ ধরনের কতিপয় ব্যক্তি সম্পর্কে জানি। তাদের জীবনে বিভিন্ন ধরনের ঝড় এসেছে। তাদের ধন-সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। কষ্ট-যাতনা ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু খুব কমই তারা এসব কথা আলোচনা করেছে। এমনকি তাদের পাশে বসেও বুঝতে পারবেন না যে, কখনও তাদের উপর কষ্ট-যাতনা ও ঝড়-ঝাপটা এসেছিল। আপনি ভাববেন, সম্ভবত এ লোকের আদৌ কোন শত্রু ছিল না। সকলেই ছিল তাদের প্রতি দয়াবান। এরাই ঐ মহান ব্যক্তি, যারা আমাদেরকে নিজেদের পথে ডাকেন আর আমরা তাদের ভালোবাসি। নিজের প্রফুল্লচিত্ততার তোহফা ঐ ব্যক্তি বণ্টন করতে পারে, যে ব্যক্তি উদারচিত্ত হয় এবং মানবতা-প্রেমী হয়, যাদের মন-মগজ সব সময় প্রফুল্লতার চিন্তায় পরিপূর্ণ থাকে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বদমেজাজী হয়, সে ব্যক্তি নিন্দাবাদ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অভিসম্পাত ছাড়া কথাই বলে না।
কিছু কিছু লোকের মস্তিষ্ক কাঁটা-ময়লা স্তূপের মত। তাদের মাথায় কোন নিয়ম-শৃংখলা থাকে না। তাদের চিন্তাধারা বিক্ষিপ্ত থাকে। কিন্তু আমরা যেভাবে দৈনন্দিন বাড়ীঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার প্রয়োজন অনুভব করি, অনুরূপভাবে দৈনন্দিন আমাদের মন-মস্তিষ্ক পরিচ্ছন্ন করা কর্তব্য। মস্তিষ্ক থেকে ময়লা বের করে দিন। অপ্রয়োজনীয় বেকার অনর্থক চিন্তা-ভাবনা দেমাগে ঢুকিয়ে রাখার দ্বারা কি লাভ? আবরণ কেটে দিলে যেভাবে নিচের ঝিলের পানি স্পষ্ট দেখা যায়, তদ্রূপভাবে বেকার অনর্থক চিন্তাভাবনা বিদূরীত করে দিলে চিন্তাধারা স্পষ্ট নির্মল, উন্নত ও আনন্দঘন হয়ে যায়।
এক জায়গায় আমরা এমন কিছু লোকের সাক্ষাত পেয়েছি, যারা প্রায় কুণ্ঠাসা। অনায়াসে যাদের কোন কাজ করা হয় না। কারণ, তারা নিজেদের খেয়ালকেই দেমাগ থেকে বাইরে ফেলতে প্রস্তুত হয় না। তারা ঐ সব গৃহিনীর মত যারা নিজের ঘর থেকে তুচ্ছ জিনিস সমূহও বাইরে ফেলতে অপ্রস্তুত বরং চিন্তা করে 'কখনও কাজে লেগে যাবে।' কিন্তু স্মরণ রাখবেন, ময়লা-আবর্জনা বাইরে ফেলে দেওয়া ঘরের সৌন্দর্যের জন্য আবশ্যক। অনুরূপভাবে বেকার ও বাজে চিন্তা দেমাগ থেকে বিদূরীত করা এবং মুছে ফেলা বড় এক সৌন্দর্য ও যোগ্যতা। কখনও কখনও এমন লোকেরও দেখা পাই, যাদের মন সাধারণ লোকের মত। যেমন ঘাত্রীবাহী সাধারণ বাসে সুন্দর ও ভাল ভাল মহিলা-পুরুষও বসে থাকেন। কখনও কখনও মদ্যপ-জুয়াড়িও বসে থাকে। বাসের কন্ট্রাক্টর ঐ ব্যক্তিকেই সিটে বসিয়ে দেন, যে আগে আসে। অনুরূপভাবে এ লোকও ঐ ব্যক্তির চিন্তা ধারাই গ্রহণ করে, যে প্রথমে তার সাথে সাক্ষাৎ করে। তার নিজস্ব কোনও জ্ঞান-বুদ্ধি থাকে না। এ লোক সব ধরনের খেয়াল-চিন্তা মনে গেঁথে নেয়। চাই চিন্তাকারী ভাল কিংবা খারাপ হোক। ভাল-মন্দের মাঝে পার্থক্য জ্ঞান তার থাকে না। তার দেমাগ ক্যামেরার মত হয়ে থাকে। যে বিষয়ই ক্যামেরার সামনে আসে, তাই গ্রহণ করে নেয়। এ ধরনের মানুষ নিজের মন-মস্তিষ্ক স্বচ্ছ নির্মল রাখতে সক্ষম হয় না। মন্দ চিন্তা-ভাবনা দূরে রাখতে ব্যর্থ হয়। তার ভেতর পরস্পর বিরোধী চিন্তা-ধারার তৎপরতা সব সময় বহাল থাকে। চিন্তাধারার ভার সাম্যতা তার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। ভাল লোকের সাথে থাকলে ভাল কাজ করবে আর খারাপ লোকের সাথে থাকলে খারাপ কাজ করবে। তাদের মাঝে ভাল-মন্দের পার্থক্য জ্ঞান থাকে না।
সর্বোন্নত চরিত্রের একটি আলামত হল, মানুষের মধ্যে এতটুকু যোগ্যতা থাকবে যে, সে কাজকর্মে ভাল-মন্দ ও মঙ্গল-অমঙ্গলের পার্থক্য করতে সক্ষম হবে। কল্যাণকর চিন্তা-ধারার মাধ্যমে অকল্যাণকর দুশমন চিন্তাধারাকে আলাদা করতে সক্ষম হবে। জীবন বিপন্নকারী চিন্তাধারা যে ব্যক্তি নিজের মন-মস্তিস্ক থেকে বিদূরীত করতে সক্ষম হবে, সে ব্যক্তিই অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লোক। কারও মন যতক্ষণ পর্যন্ত নেতিবাচক ঘটনাবলি স্মরণ এবং খারাপ চিন্তাধার আচ্ছন্ন থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে কোনও ভাল কাজ করতে পারে না। মস্তিষ্ক সক্রিয় ও সুস্থ থাকা আবশ্যক। তখনই তার মধ্যে চেতনা, প্রফুল্লতা, খোশমেযাজী, অলোকরশ্মি এবং কার্যক্ষমতা বা কাজের যোগ্যতার চমক পরিস্ফুটিত হয়।
📄 বলবে যেমন ফলবে তেমন
সুচিন্তা ভাগ্যেরই অপর নাম। এখন আপনিই নিজের ভাগ্য নির্ণয় করে নিন। চেতনার সাথে সফলতার অপেক্ষা করুন। ভালোবাসার মাধ্যমে ভালবাসা পাবেন; ঘৃণায় জন্মাবে ঘৃণা। ভালবাসায় সফলতা ও ধন-সম্পদ লাভ হবে। ঘৃণায় ব্যর্থতা ও দৈন্যতাই জুটবে।
উন্নত চিন্তাধারা, গৌরবময় আচার-ব্যবহার এবং উদারতা একটি অপরটির বিপরীত। এ সবের পরস্পরিক সম্পর্ক প্রফুল্লচিত্ততা ও খোশ-মেযাজীর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটা সতঃসিদ্ধ কথা যে, 'যেমন রোপন করবে তেমই ফলন পাবে।' কারণ, এমনটি আদৌ সম্ভব নয় যে, মানুষ রোপর করবে বড়ই বিচি আর ফলন ধরবে আম। কিন্তু একথা জানা সত্ত্বেও মানুষ কাৰ্য্য ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ ভুলে যায়। কি আশ্চর্য। মনের লালিত কাজটি করতে গিয়ে মানুষ ঐ নিগুঢ় বাস্তবতা থেকে চোখ এড়িয়ে যায় যে, ফল তেমনই হবে, যেমন বীজ রোপন করবে। আমরা আনন্দ-খুশি, সুখ-স্বাচ্ছন্দ এবং প্রশান্তির ফসল কিভাবে আশা করতে পারি? কয়েক বছর যাবত আমরা নিজের যে চিন্তধারায় আচ্ছন্ন, এর বিপরীত ফসলের আশা আমরা কিরূপে করতে পারি? আমরা যখন নিজের মনে রোগ-ব্যাধির চিন্তাধারা রোপন করছি, তাহলে সুস্থতার কিভাবে আস্বাদন করতে পারি? আমরা ঐ কৃষককে অবশ্যই উন্মাদ ও পাগল বলব, যে কণ্টকাকীর্ণ ঝোপ থেকে যা কাটাদার বীজ রোপন করে তা থেকে গম পাওয়ার আশা করে। অথচ আমরা মনের মাঝে ভয়-ভীতির বীজ বপন করি, পেরেশানী-অস্থিরতার বীজ রোপন করি, দুশ্চিন্তার বীজ রোপন করি আর যখন বীজ অনুযায়ী ফল হয়, বিস্মিত হয়ে যাই। ধানের বীজে কেবল ধানই উৎপাদন হতে পারে আর গমের বীজে গম। ফসলের মত মানুষের সফলতা এক প্রকার বীজ। মেহনত, পরিচর্যা, পানি ইত্যাদির ভিত্তিতেই পরিপক্ক হয়। বীজ ভাল না হলে ফসলও ভাল হতে পারে না। বীজ ভাল হল কিন্তু দুর্বল বা নিম্নমানের হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ উৎপাদন হবে না।
যে ব্যক্তি অকৃতকার্য ও ব্যর্থ চিন্তা-ভাবনার বীজ নিজের মনে রোপন করে, সে কখনও সফলতার ফসল হাসিল করতে পারে না। সে যদি প্রবৃত্তিপুজার বীজ রোপন করে, ভারসাম্যতার সাথে সুস্থতার বীজ রোপন করে, পবিত্রতার বীজ রোপন করে, সততার বীজ রোপন করে, ধনাঢ্যতার বীজ রোপন করে তাহলে সে ঐ রকম ফসলই পাবে।
একতা ও মিত্রতার প্রেরণা একপ্রকার শক্তি। আর বিরোধিতা ও বিচ্ছিন্নতার জযবা হল দুর্বলতা। সব সময় হতাশাগ্রস্থ থাকার জযবা ঐ সব আগাছার মত যেগুলো উৎপন্ন হলে ফসল দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। আমাদের জীবনকর্ম অতি সহজ হয়ে যাবে, যদি আমরা বুঝতে সক্ষম হই যে, মনের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি ঠিক তদ্রুপ কাজ করে, যেরূপভাবে কাজ করে বৈজ্ঞানিক নীতিমালা অথবা শরীর সংক্রান্ত নীতিমালা। মন-মস্তিষ্কে উদিত সকল চিন্তা-ভাবনাই একপ্রকার বীজ। যার ফসল নিম্নমানের হয়ে থাকে। চাই সে বীজ বরই বীজ হোক বা গোলাপ বীজ হোক বা আমের বীজই হোক।
আমরা যে ধান্দা বা পেশা গ্রহণ করেছি, তা আমাদের মানসিক বীজের বাস্তব দৃষ্টান্ত। আমরা যদি নিজের মনের ভেতর ধন-সম্পদ উপার্জনের বীজ রোপন করি, তাহলে আমরা অবশ্যই তা হাসিল করব। আর যদি হীন চিন্তা-ধারার বীজ রোপন করি, তাহলে ব্যর্থতাই আমাদের হস্তগত হবে। যদি দৈন্যতা ও দরিদ্রতার চিন্তা-ভাবনা গেঁথে রাখি তাহলে বাস্তবিকই আমরা হতদরিদ্র হয়ে যাব।
জীবনের ফসল চিন্তা-ধারার বীজ অনুযায়ীই উৎপাদন হয়। আমরা কোনও স্বার্থপর মানুষ দেখলে মুখ ফিরিয়ে নেই। আমরা জানি তার লাঞ্ছনা মিশ্রিত চেহারা স্বার্থপরতার জযবার ফসল। পক্ষান্তরে আমরা যখন কোন স্থির শান্ত প্রকৃতির সচেতন সফল লোক দেখি, তখন আমাদের বুঝ হয়ে যায় যে, এ ব্যক্তি উন্নত চিন্তাধারা, কল্যাণ ও সফলতার ফসল রোপন করেছে। কোনও ব্যক্তি যদি চাকু দিয়ে নিজের গোশত কাটতে আরম্ভ করে, তাহলে গোশত কেটে রক্ত ঝরা ও ব্যথা অনুভব হওয়ার উপর তার বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। কেননা সে কাজই এমন করেছে। তদুপরি ফলের উপর বিস্ময় কেন? অনুরূপ কোন মানুষ যদি ক্রোধ ও রাগের বশবর্তি হয়ে অপর কাউকে আক্রামাত্মক কথা বলে, তাহলে তাকেও ক্রোধে ভরা আক্রমণাত্মক কথা শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
আপনি যদি নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসাবে প্রষ্ঠিত করতে চান, নিজের মধ্যে গাম্ভীর্যতা আনতে চান কিংবা এমন শক্তি অর্জন করতে চান, যাতে গোলামীর জিঞ্জির ছিঁড়ে স্বাধীনতার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হতে পারেন, যদি নিজের ব্যক্তিত্বে আমূল পরিবর্তন আনতে চান, তাহলে আজ এখন থেকেই নিজের ভেতর উচ্চ আশা-আকাঙ্খা, প্রফুল্লতচিত্ততা, খোশমেযাজী, সচেতনতা, মেহনত, ধৈর্য, বন্ধুত্ব, হৃদ্যতা, কামিয়াবী ও সফলতার বীজ রোপন করুন। নিজের মনকে সৃষ্টিশীল কর্মঠ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বানান, তাহলে আপনার জীবনে বিস্ময়কর পরিবর্তন আসবে এবং আপনার যাবতীয় উচ্চাকাঙ্খা ও স্বপ্ন আশা পূরণ হবে।
📄 বদ অভ্যাস সম্পদের শত্রু ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান
ইসলাম সব সময় বদঅভ্যাসের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
• তোমরা দুটি থেকে দূরে থাক। একটি হল, কাপুরুষতা; অপরটি হল অলসতা। কেননা কাপুরুষ হলে হক-সত্য বরদাশত করতে পারবে না আর অলস-উদাস হলে হক আদায় করতে পারবে না। • খারাপ-অসৎ বন্ধুদের থেকে বাঁচো। কেননা সে তোমার পরিচয় হয়ে যাবে। • কৃপণতা অপেক্ষা খারাপ কোন রোগ নেই। • অনর্থক অহেতুক কথাবার্তা থেকে বেঁচে থাক। শুধু যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কথা বল। এ সব বদঅভ্যাসও মানুষকে ধনবান হওয়া থেকে বিরত রাখে, বাঁধা সৃষ্টি করে।
📄 বদ অভ্যাস ও আধুনিক বিজ্ঞান
আমি আজ থেকে মুক্তি পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমার ভবিষ্যত যে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দিয়েছে, আমাকে তার কবল থেকে যে কোন মূল্যে মুক্তি পেতে হবে। আমাকে নিজের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে। সমস্যা যদি পুরনো হয় তবে মনে মনে বলুন, 'আমার জীবনকে বিষিয়ে তোলা ও আযাব বানানোর যত এর চেয়ে খারাপ কথা আর কিছুই নেই। আমি নিজের ভবিষ্যতের সুখ-স্বাচ্ছন্দ ও খুশি-আনন্দ স্বয়ং আমিই বরবাদ করছি। এতে আমার সন্তানদের ভবিষ্যত অন্ধকার করছি। এ ছাড়া আমার মাঝে এমন কোন দুর্বলতা নেই, যা আমার মনুষত্যের দুশমন।
এ বদঅভ্যাস আমার গৌরবগাঁথা, আত্মবিশ্বাস ও সৎসিদ্ধান্তসমূহকে বরবাদ করে দেয়। জীবনের মূল্যবান সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাভবান হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে। আমি নিজের কাছে হীন হয়ে গেছি। ভবিষ্যত জীবনে আমাকে অনুতাপের আগুনে জ্বলে পুড়ে পোস্তাতে হবে। আমি কোন কাজে সফলতার মুখ দেখি না। আমি এখন আর বিপদ বাড়াতে চাই না। কোনও ঘটনা এমন হবে না, যার মধ্যে দিয়ে আমার এ অভ্যাস বিদূরীত হবে। এ মুহূর্তে এ বদঅভ্যাস ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি। হে আমার মনের রোগ। বিদূরীত হও। বিদূরীত হও।'
আপনি যখনই একাকী নিভৃতে থাকেন, মনে মনে এ ধরনের কথাবার্তা বলুন। নিজের বদঅভ্যাস ত্যাগ করার অঙ্গীকার বারবার পুনরাবৃতি করতে থাকুন। আপনার সিদ্ধান্ত ক্ষমতা এত বেশি মজবুত শক্তিশালী হবে যে, আপনার ঐ দুর্বলতা সমূলে উপড়ে যাবে। যেখানে আপনি শক্তিশালী হবেন, সেখানে আপনার বদঅভ্যাসগুলো দুর্বল হয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। রচনা ও নিজে কথা বলার সময় আপনাকে নিজের সিদ্ধান্তের উপর অটল থাকার অঙ্গীকার করতে হবে। নিজের অযোগ্যতা ও দুর্বলতার উপর জয়লাভ করার ব্যক্তিগত যোগ্যতার উপর চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। তা আরও সমধিক সুযোগ্য বানানোর চেষ্টা করতে হবে। নিজের শক্তির উপর চিন্তা করুন। নিজের যোগ্যতার ধ্যান করুন। ঐ দুর্বলতা ও বদ অভ্যাসে কি ক্ষমতা আছে যা আপনাকে কাবু-কুণ্ঠাসা করে রেখেছে? বিলম্ব শুধু তা খতম করার জন্য আপনার বেড়া উঠানোর। কখনও বলবে না- 'এ বদঅভ্যাস গাঢ় হয়ে গেছে। ছাড়তে পারব না।'
সব সময় মনে মনে মজবুত ভাষায় অঙ্গীকার করুন যে, আমি শক্তিশালী মানুষ। যেমন চাইব তেমনই গড়ে উঠবে। আমি ওসব বদঅভ্যাস আজ থেকে নয় বরং এ মুহূর্তে থেকে ছেড়ে দিলাম। ব্যাস! তা আর আমার কাছে ভীড়তে পারে না। হ্যাঁ, অবশ্যই। নিজের বদঅভ্যাসের উপর আমি জয় লাভ করে ফেলেছি। আমার জন্ম এ জন্য নয় যে, আমার দুর্নাম ছড়াবে, আমাকে দুরাচারী, পাপী বলা হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ জন্য সৃষ্টি করেন নি যে, আমি একজন জঘন্য, নিকৃষ্ট, গান্ধা মানুষ হব। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি এসব বদঅভ্যাস ও দূরাচারে লিপ্ত থাকতে নিজের যোগ্যতার সর্বোচ্চ ফায়দা হাসিল করতে পারব না। কখনও উপরে উঠার যোগ্য হতে পারব না। আমার ইজ্জত-আক্র অতিমূল্যবান। আমি নিজের ব্যক্তিত্বও আত্মবিশ্বাস হেফাযত করব। বদঅভ্যাসের দাস হব না।
বাকী জীবনে এ বদঅভ্যাস আমার দ্বারে কাছে আসতে পারবে না। আজই আমি এর মূলোৎপাটন করে দিলাম। ব্যাস। এ আর কখনও নয় আর কখনও নয়।
এভাবে নিজে নিজে মনের সাথে বোঝাপড়া করে দেখবেন, আপনার তাহলে শারীরিক অবস্থায় কিভাবে পরিবর্তন এসে গেছে। কিভাবে আপনার কাজ কর্ম বদলে গেছে। কিভাবে আপনার কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন এসে গেছে। নিজের বিজয়ের উপর সুখ লাগবে। আপনার মনের মত উন্নতি-সমৃদ্ধি কামিয়াবী লাভ হবে। প্রথম প্রথম নিজে নিজে কথা বলা মূর্খতা মনে হবে। এমনিতেই এর গুরুত্ব আপনি জানতে পারবেন না। কিন্তু যখন আপনি জানবেন, এ কাজের দ্বারা আপনার ভেতর দিনদিন কিভাবে শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে তখন নিয়মিত এ চর্চার পুনরাবৃতি করতে থাকবেন।
আপনার সমস্যা জটিল হোক বা সাধারণই হোক, ছোট বা গুরতরই হোক এভাবে নিজে নিজে কথা বলার দ্বারা তা বিদূরীত করা যেতে পারে। মনে করুন আপনি সন্দেহপরায়ণ স্বভাবের লোক জনসম্মুখে যেতে লজ্জাবোধ করেন। আপনার নিজের যোগ্যতার উপর পূর্ণ আস্থা নেই, আপনার কোনও বদ অভ্যাস হয়ে গেছে এসব থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সর্বোত্তম পন্থা হল, খোদ কালামী অর্থ্যাৎ একাকী নিজে নিজে আত্মসমালোচনা ও আত্মপর্যালোচনা করা।
মানব জাতির জন্ম হয়েছে গৌরবময় কাজকর্ম করার জন্য। তার মেরুদণ্ড মজবুত হতে হবে। তার পা অটল অবিচল হতে হবে। তার দৃষ্টি প্রশস্ত হতে হবে। মানুষের জন্ম ক্লেদ-আবর্জনায় নিপতিত হওয়ার জন্য নয়। তোড়ন-পোড়ন বা লজ্জাবোধ করার জন্য নয়। অসৎ-খারাপ জীবন যাপনের জন্য নয়। অনবরত ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকার জন্য নয়। অপমান, লাঞ্ছনা সহ্য করার জন্য নয়। দুর্বল, অলস-উদাস খ্যাত হওয়ার জন্য নয়। আপনার মাঝে যদি কাজ শুরু করার যোগ্যতা না থাকে তবু মনেমনে দৃঢ়ভাবে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। আপনি কাজ শুরু করবেন। কাজ যখন আরম্ভ করবেন, দৃঢ়ভাবে এ অঙ্গীকার করুন, তা পূর্ণ করেই ক্ষ্যান্ত হব। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ঝাঁপিয়ে পড়ুন। কাজকে ভাল থেকে ভাল বানানোর চেষ্টা করুন। নিজের সমূহ শক্তি ও কর্মদক্ষতা তাতে প্রয়োগ করবেন। একাগ্রচিত্তে যথারীতি মেহনত করবেন। তারপর দেখবেনা- কেমন বিজয় সফলতার ফুল ফোঁটে।
আপনি যদি ইতঃস্ততাকারী মেযাজের লোক হোন, বন্ধু বানানোর পদ্ধতি জানেন না, নিজেকে হেয় নগন্য মনে করেন। ভাবেন, 'অন্য মানুষ যতটুকু ভাল আমি ততটুকু ভাল নই।' তাহলে সংকল্প করুন, নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনবেন। নিজের সাথে বোঝাপড়া করে আপনি ঐ শক্তি হাসিল করবেন। যা আপনার যাবতীয় ত্রুটি বিচ্যুতি ও খারাবী দূষীভূত করে দিবে। মনে কখনও একথা উদয় হতে দিবেন না, আপনাকে মানুষ ঈর্ষা করছে, আপনাক বিদ্রূপ করছে। নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভেবে বিশেষ ধরনের আচরণ করবেন। তার পরেও মানুষের কি সাধ্য আপনাকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করবে।
'আমি বিশেষ ব্যক্তি, আমি যুবরাজ, শাহজাদা, আমি কুদরতের স্বতন্ত্র সৃষ্টি, তারপরও আমি নিজেকে কেন হীন মনে করব। আমি কোন দিক দিয়ে কম? আমি ঐ সকল কাজকর্ম করার যোগ্য ব্যক্তি, যা অন্য মানুষও করতে পারে। আমার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে, মানুষ হওয়া। সকল পরিস্থিতির মোকাবেলা করার ক্ষমতা শক্তি আমার মাঝে আছে। তারপরও কেন পরাজয় মেনে নেব?' আপনি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম না হোন, আপনার যদি সব সময় চিন্তা-ভাবনায় নিমজ্জিত, ইতঃস্ততায় পড়ে থাকা কিংবা দ্বিধা-দ্বন্দে ডুবে থাকার অভ্যাস হয়ে থাকে, তাহলে একাকী নিভৃতে নিজে নিজেকে শক্ত ভাষায় প্রজ্বলিত করুন, হে মন' দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত করে নাও। সংকল্প করুন। আপনি কাজকে এত গতি সম্পন্ন করবেন, যাতে আপনার অথবা অন্য কোনও ব্যক্তির মনে আপনার সফলতা নিয়ে বিন্দু মাত্রও সন্দেহ না থাকে।
মনে মনে বলবেন- কাজ না করার চেয়ে তো কাজ করাই উত্তম। চাই এতে কিছুটা ভুল-ভ্রান্তিই হোক। ভুল-ভ্রান্তি থেকে মানুষ শিক্ষা লাভ করে। আপনি যদি কঠিন কাজের প্রতিযোগীতা করেন, যা অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু তা করার দায়িত্ব আপনার উপর আসে, তাহলে নির্জন কোথাও চলে যান। নিজের সাথে বোঝাপড়া শুরু করুন। এমনভাবে কথা বলুন, যেমন প্রিয় বন্ধুর সাথে কথা হয়। যার মাঝে কাজের যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা আছে ঠিক কিন্তু হিম্মত নেই, সে এ কথাবার্তার মধ্যে নিজের সিদ্ধান্তের অঙ্গীকারও আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করবে। বিজয়ী এবং পূর্ণ চেতনা ও আগ্রহের সাথে কাজ করে দিবে। এভাবে খোদ কালামী বা নিজে নিজে কথা বলার সময় নিজের ব্যাপারে ঈমানদার থাকবেন। যদি দৃঢ়তার সাথে নিজের ইচ্ছার পুত্রাবৃত্তি করেন, নিজের ইচ্ছাকে চূড়ান্ত, অটুট, অক্ষুণ্ণ ও অপরিবর্তনশীল বলে মেনে নেন, তাহলে আপনারই বিস্ময় হবে- এ কাজটি সহজ হয়ে গেল।
আপনার শক্তি বিরাট হয়ে গেছে। আপনার চেতনা জ্ঞান বেড়ে গেছে। ফলে আপনার চেতনা বোধ বাড়বে, আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী হবে, চিন্তা-ভাবনা কার্যকর করার যোগ্যতাও বৃহৎ হয়ে যাবে। আমি এক যুবককে চিনি। সে জ্ঞানি লোকদের সাথে মিলিত হতে ভয় পেত তার সামনে যদি কেউ এসে কথাবার্তা শুরু করত তখন মনে মনে ইতস্ততা বোধ করত সে নিজেকে অযোগ্য ও নীচু মনে করত। কেউ তাকে খোদকালামীর পরামর্শ দেন। সুতরাং মনের সাথে কথাবার্তা বলার অভ্যাস করার মাধ্যমে ঐ যুবক নিজের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে এখন তাকে দেখে কারও মনে হয় না এই সেই যুবক। যে সকলের সামনে লজ্জা বোধ করত। আত্মবিশ্বাসের কারণে তার ব্যক্তিত্বের এমন উন্নতি হয়েছে সে যেখানে যায় সেখানে ছেয়ে যায় কথা বললে ফুল ফুটে। তার সত্য সুন্দর কথাবার্তায় ততক্ষণাত প্রভাব পড়ে।
উপরিউক্ত যুবক একদিন আমাকে বলল- 'সে গায়ের দিকে চলে যেত। ক্ষেত থামাবের পাশে (আইলে) বসে দুলেদুলে নিজের মনের সাথে কথাবার্তা বলত আর্থার তোমার মাঝে কি কোন যোগ্যতা আছে? যদি কোনও মাধুর্য থাকে তবে তা খুঁজে বের কর। বেকুফ হয়ো না। তুমিও তার মত ভাল মানুষ হও, যেমন অমুক হয়েছে। নিজের শির উচু কর। প্রকৃত মানুষ হও। কারও সাথে কথা বলার সময় ভয়-ভীতি ছেড়ে দাও। মানুষের সাথে মিলে মিশে থাক। তাদের সাথে কথা বল। নিজেকে হীন মনে কর না। ভাল ও সুখী মনের মানুষ হও। তুমি কুদরতের সৃষ্টি। এ দুনিয়ায় তোমরও ততটুকু অধিকার রয়েছে, কোন বড় থেকে বড় মানুষের যতটুকু রয়েছে। ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে কারও সামনে যেও না।'
সে আরও বলে- নিজের যোগ্যতা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার পর সে ওগুলোর প্রশংসা শুরু করে। ঐ সব মাধুর্যগুলো অন্যের সামনে প্রকাশ করে এমন কারেশমা দেখায়, ফলে লোকেরা তাকে প্রশংসার চোখে দেখতে থাকে। তারপর সে নির্জনে নিজেকে বলত- 'আর্থার বেশ! বেশ! তুমি আজ খুব ভাল কাজ করেছ। এটা বাস্তবিকই গৌরবের বিষয়। এতে প্রমাণ হয় তুমি সুযোগ্য। এভাবেই সামনে অগ্রসর হয়ে নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাও। মানুষ তোমার প্রশংসা করছে। তুমিও দুনিয়ায় কিছু হতে পার।'
যে কুণ্ঠাসা, অধিক লাজুক, তার অবস্থার উন্নতির জন্য নিজের মনের সাথে কথোপকথোনের মত অন্য কোন উত্তম আর পদ্ধতি নেই। যে ব্যক্তি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে, তার জন্য সর্বোত্তম পন্থা খোদকালামী। মানুষ যখন নিজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে, তখন সে নিচে থেকে উপরে উঠে আসে। সে হীন জঘন্য থাকে না। আম-সাধারণ থাকে না। যখন নিজের মাধুর্য ও যোগ্যতার জ্ঞান তার হয়ে যায়, তখন সে আর ধূলায় ধূসরিত থাকে না বরং অনেক উর্ধ্বে চলে যায়। উচ্চ মর্যাদা লাভ করে।
আপনি যেসব জিনিসের আকাঙ্খা করেন, সেগুলো নিজের আয়ত্বে আনার অঙ্গীকার করুন। যেসব মাধুর্য ও যোগ্যতা নিজের মাঝে আনার তামান্না রাখেন, সেগুলো হাসিল করার জন্য সুদৃঢ় সংকল্প করুন। নিজের উদ্দেশ্যের পেছনে মনকে নিবিষ্ট করবেন পুরোপুরি। তার নিনম্নমানের আশা-আকাংখা বিদূরীত করে লক্ষ্য বস্তুর উপর সম্পূর্ণ উন্নত চিন্তা-ধারা লিও রাখবে। তবে আপনার মনের একান্ত চাওয়াগুলো অবশ্যই পূর্ণ হবে।