📄 চিন্তা ধারা ও আগ্রহের মাধ্যমে কিভাবে ফলতা আসে?
মহা শক্তিশালী লোকও নিজের চেয়ার থেকে নড়তে পারবে না, যদি বেঁধে দেওয়া হয়। বাঁধন খুলে দেওয়ার পরই সে নড়তে পারবে। যদি কোনও দুর্বল মহিলাকে কারও জান অবশ্যই বাঁচাতে হয় তবে সে অগ্নিকুণ্ড বা প্রবল স্রোত থেকে ভারি ব্যক্তিকেও কাঁধে উঠিয়ে বের করে নিয়ে আসবে। এমতাবস্থায় চূড়ান্ত ফলাফল মানসিক অবস্থার উপর নির্ভর করে; শারীরিক শক্তির উপর নয়। জীবনের বেশির ভাগ কাজকর্ম ও সফলতা সাধারণভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে মানসিক অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। আমরা যদি এই নিগুঢ় বাস্তবতা নিয়ে গবেষণা করি, তাহলে আমাদের চিন্তাধারা ও মেধার গুরুত্ব ভালভাবে বুঝে আসবে। রণাঙ্গনে, ব্যবসা-বাণিজ্য অথবা চারিত্রিক উন্নয়নে যারা সফল হয়েছেন, তারা মানসিক অবস্থায় উন্নতি করার কারণেই সফলকাম হয়েছেন।
আমি পূর্ণ জোর দিয়ে যুবকদের মনে একথা গেঁথে দিতে চাই (আল্লাহ তা'আলার কাছে মুনাজাত করি যে, তিনি যেন আমাকে শক্তি ও সাহস দেন। সফলতা হাসিল করার বেলায় সঠিক পদ্ধতিতে চিন্তা করার গুরুত্ব মাহাত্ম লিখে শেষ হবে না। যুবসমাজ! ওঠ। বাস্তবতার কথা স্মরণ রেখে সামনে চল। তোমরা শক্তিশালী, বিরাট বিরাট কাজ করার প্রচুর শক্তি তোমাদের ভিতর সুপ্ত রয়েছে। এ বাস্তবতা ভালভাবে বুঝে নাও যে, তোমাদের জন্ম বিজয় ও সফলতার জন্য। অন্যথায় তোমরা নিজেরাই আল্লাহ তা'আলার পরিকল্পনাকে বিকৃত করে দিলে, যা মারাত্মক গুনাহের কাজ, নিজের স্রষ্টা সম্পর্কে বিরাট বড় ধোঁকা, তাঁর মহত্ব ও বড়ত্বের অস্বীকৃতি। যদি এ বাস্তবতাকে ভালভাবে বুঝেনিতে পার, তাহলে জীবনে বিশাল বড় বিপ্লব এসে যাবে এবং তোমাদের অত্যধিক কষ্ট-যাতনা, পেরেশানী ও অস্থিরতা দূরীভূত হয়ে যাবে।
📄 আমাদের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার শক্তি কেন হ্রাস পায়?
যারা মনে করে আমাদের শক্তি সীমীত, যাদের মনে গেঁথে আছে- আমরা পরিস্থিতির শিকার, এ অবস্থা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারব না, তারাই জনম দুঃখী। তাদের এ চিন্তা-ভাবনাই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার শক্তি-সাহসকে কমিয়ে দিয়েছে। চিন্তাধারাকে বাস্তবরূপ দানের যোগ্যতা নিঃশেষ করে দিয়েছে। কাজেই তাদেরকে বর্ণনাতীত দুঃখকষ্টের মধ্যে জীবন কাটাতে হয়। হায় দুর্ভাগ্য! ইত্যাদি ভেবে আফসূস, বিস্ময় ও ঘৃণায় তাদের মন ভরে যায়। যেন তারা দুর্ভাগ্য নিজেই দাওয়াত করে এনেছে।
নিজেকে দুর্বল মনে করা অমূলক। এটা মনের রোগ। এর ফল খারাপ হয়। মানুষ বাদশা হওয়ার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। এ পদমর্যাদা তার জন্মগত অধিকার। কিন্তু সে এ থেকে হাত গুটিয়ে দুর্বলতার এক সীমানায় আবদ্ধ হয়ে গেছে। কোন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত নিজের দুর্ভাগ্য থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারে, যতক্ষণ সে ভাবে- আমি এ কাজ করতে পারব না, মানুষ উপরে না তাকিয়ে উপরে ওঠে যাবে, এমন কোনও পদ্ধতিও কি আছে? মানুষ সব সময় ব্যর্থতা ও পরাজয় নিয়ে ভাববে, বলবে, শ্বাস-প্রশ্বাস নিবে আবার সফলকামও হবে -এমন কোনও রাস্তাও কি আছে? কোনও মানুষ দুই বিপরীত দিকে যেতে পারে না। যেখানে সন্দেহ থাকে, সেখানে নিশ্চিত বিশ্বাস থাকে না। যাবৎ না আপনি নিজের অভিধান থেকে 'ভাগ্য' শব্দটা বের করে না দিবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি সফল হতে পারবেন না।
যতক্ষণ পর্যন্ত মনে গেঁথে থাকবে- আমি দুর্বল, আমি বেকার, অকৃতকার্য এবং চব্বিশঘণ্টাই এ হীন মন্যতা ও দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি শক্তিশালী হতে পারেন না। আপনার মনে যদি দুঃখ-যাতনা, দুর্ভাগ্য বিরাজ করে তবে কখনও আপনি সুখী-সমৃদ্ধশালী হতে পারবেন না কোন মানুষ সব সময় নিজের ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, মানুষের সাথে আলোচনা করে। আর বলে, আমি কখনও সুস্থ হতে পারব, সে আশা আমার নেই এমন ব্যক্তির কাছে কি আশা করা যায়- সে কখনও সুস্থ হবে? অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি নিজের হাতে নেওয়া কাজের ব্যাপারে সব সময় চিন্তা করে, এ কাজের যোগ্যতা আমার মাঝে নেই। এমন সন্দেহ পরায়ণ লোকের কার্যক্ষম ও কর্মতৎপর হওয়ার ব্যাপারে কিভাবে আশাবাদি হওয়া যায়। মনকে ততধিক দূর্বলকারী কথা দুনিয়ায় আর নেই। মোটকথা, এসব চিন্তা ভাবনা মনকে সম্পূর্ণরূপে অকেজো করে দেয়, সে কোন ভাল চিন্তাই করতে পারে না মানুষ যথারীতি নিজের কাজকর্ম পূর্ণ করার যোগ্যতার ব্যাপারে সংশয় করে। নিজের দুর্বলতার কথা বলতে থাকে।
বেশির ভাগ লোক যারা অকৃতকার্য ও ব্যর্থ হয়, তার কারণ হল, যে কাজই সে হাতে নেয়, তা শুরু করতে গিয়ে সে নিজের যোগ্যতার উপর সংশয় করে। জীবনের যে কাজই শুরু করার সময় যে মুহূর্তে কোনও যুবক মনে মনে কোনও প্রকার সংশয়-সন্দেহ পোষণ করল, বুঝে নিতে হবে তখনই সে নিজের ক্যাম্প ও দূর্গে শত্রু ঢুকিয়ে দিল, এমন গুপ্তচোর যে তোমার সাথে ধোঁকাবাজি করবে। সংশয়-সন্দেহ হল, অকৃতকার্য্য বা "ব্যর্থবংশের" মুখপাত্র। তাকে আমাদের ঘরে ঢুকতে দিলে, সে তার বংশের অন্য সদস্যদেরও ডেকে আনবে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, "জনাব! আরামের সাথে কাজ করুন জনাব! কাজের মধ্যে সমস্যা বা জটিলতা সৃষ্টি হলে ছেড়ে দিন। জনাব! অপেক্ষা করুন ইত্যাদি।
আর এ বংশের আরও কয়েক মেম্বার যখন একত্রে মনে ঢুকে যায়, তখন সে নিজের মতই কয়েকটা দিক টেনে আনে এবং মানুষের গুরুত্বপূর্ণ ইচ্ছা-আকাঙ্খা সম্পূর্ণরূপে বরবাদ করে দেয়। এভাবে আপনার সুখ-সাচ্ছন্দের আশা, বিজয় ও সফলতার তীব্র ইচ্ছা, সবই নিরর্থক হয়ে যাবে। আপনি যখন অলস, উদাসীনতা, অকৃতকার্যতা এবং ব্যর্থ ও পরান্তদের সমবেত করে নিবেন, তারা আপনার সকল কার্যক্ষমতা ও কর্মতৎপরতাকে ধ্বংস করে দিবে। সফলতার দিকে অগ্রসর হওয়ার শক্তিসমূহ নিঃশেষ করে দিবে। দ্রুতগতিতে আপনার মন-মগজ ও কাজকর্মে ব্যর্থতা ও পরাজয় বাড়াতে থাকবে।
যখনই আপনি দুর্বলতাকে মনে আসতে দিলেন, পরাজয় বরণ করলেন, আপনি নিঃশেষ হয়ে গেলেন, কিছুই থাকল না। এমন মানুষের কোনও আশা-ভরসা নেই, যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে ধ্বংস করে দিল, যে ব্যক্তি চেষ্টা-তদবীর ছেড়ে দিল। এমন মানুষের দ্বারা কিছুই হয় না। দুনিয়াতে যদি রাগ করার মত কোন লোক থাকে, তবে সে-ই আছে যে ব্যক্তি পরাজয় মেনে নিল, কাজকর্ম ছেড়ে বসে রইল। যে ব্যক্তি বলে- আমি করতে পারব না। এতে কোনও লাভ নেই, দুনিয়া আমার বিরোধী। আমার ভাগ্য আমার সঙ্গ দিচ্ছে না। মনের ভেতর সব সময় এ খেয়াল পুষে রাখলেন যে, আমি নীচু লোক। উপরে উঠতে পারব না। সফলতা অন্যদের জন্য; আমার জন্য নয়। তবে আপনি ভাগ্যবান কিভাবে হতে পারেন, যখন আপনি সব সময় দুর্ভাগ্যের কথাই বলেন, মনে করেন, আপনি মাটির তৈরী দ্বীন-দুঃখী এবং করুনার মোহতাজ।
আপনার চিন্তা-ধারা যেমন আপনি তেমনই থাকবেন। উপরে উঠতে পারবেন না। নিজের সম্পর্কে যেমন ধারণা রাখবেন, তার ব্যতিক্রম হতে পারবেন না। আপনার ভেতরে যদি অতুষ্টি, অসন্তুষ্টি, দুর্ভাগ্য, দুঃখ-যাতনা এবং করুনার ভিখারী হওয়া ইত্যাদি স্বভাব বিরাজ করে, তবে আপনি তেমনই হয়ে যাবেন। দুনিয়াতে এমন বনজী বা মহৌষধ নেই, যে আপনাকে এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারে। আপনার চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসা পর্যন্ত এ অবস্থায়ই থাকবেন। চিন্তাধারার পরিবর্তন শরীর ও ভাগ্যের পরিবর্তন আনবে। একথা চন্দ্র-সূর্য এবং বৃষ্টিতে গোলাপের কলি ফোটার মতই সত্য। এতে কোনও গোপন রহস্য নেই। এটা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক কথা।
📄 তারিক বিন যিয়াদের ভূমিকা
কঠিন পরিশ্রম ও কৃতত্বকে ধরে রাখার জন্য মহাবীর তারিক বিন যিয়াদ স্পেনে যাওয়ার পর সকল নৌযান জ্বালিয়ে দিয়ে নিম্নোক্ত ভাষণ দেন। যার প্রতিটি শব্দই দৃঢ়সংকল্প স্বাধীনতা, এমনকি কঠিন পরিশ্রমের সবক দেয়।
আমার বন্ধুগণ! সমুদ্র তোমাদের পেছনে আর শত্রু বাহিনী তোমাদের সামনে। আজ বিশ্ব মানবতার দৃষ্টি তোমাদের উপর নিবন্ধ। ইচ্ছে করলে তোমরা ইসলাম ও মুসলমানদের পরাজয়ের কারণ হতে পার, ইচ্ছে করলে তোমরা বিশ্বের বুকে ইসলামের বিজয়পতাকা উড্ডীন করতে পার।
স্মরন রেখো! তোমাদের মা তোমাদেরকে আজকের দিনের জন্যই প্রসব করেছেন। মাতৃকূলের ইজ্জত-শরম রেখো। এ হালাল রক্তের সম্মান রক্ষা কর। তোমাদের দায়িত্ব যা প্রথম দিনই তোমাদের উপর অর্পিত হয়েছে। শত্রু বাহিনী আজ তোমাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু তোমরা শত্রুবাহিনীকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাচ্ছ। তোমরা শত্রু বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়। পেছনে ফিরে যাওয়ার পথ তোমাদের জন্য বন্ধ। (মুসলমান ফাতেহীন)
উপরিউক্ত ভাষণের প্রতিটি শব্দে দৃঢ়তা এবং শত্রুর প্রতি এক হুংকার ছিল। যার ফলে ইসলামের শির চিরউন্নত এবং শত্রুবাহিনীর চরম পরাজয় সাধিত হয়।
📄 ইবনে যোবায়েরের অভিব্যক্তি
আমি ইয়ামানের শহর সান'আতে ছিলাম। আমি উপলব্দি করলাম, সেখানকার প্রতিটি নাগরিক চেষ্টা-তদবীর ও মেহনতে অগ্রগামী হওয়ার সংগ্রাম করছে। এ চেষ্টাই তাদের সফলতার কারণ ছিল। তারা প্রত্যেক কাজকর্মে এমনই সফলতা লাভ করেছেন, যাতে কোনও ব্যর্থতা নেই।