📄 দরিদ্রতার কারণ মনের দুর্বলতা
মানব জীবনের ভয়ঙ্কর অভিশাপ হচ্ছে দরিদ্রতা।
"পয়সা বিনে মাও বলে, বৎস তুমি নির্বিকার।
আপন ভাইও করবে তোমায় লক্ষ আঘাত নির্বিচার।"
যে দরিদ্র, তার চিন্তাধারা দারিদ্র হওয়ার কারণেই সে দরিদ্র। মনে যদি দরিদ্রতা বিরাজ করে তবে আপনি ধনী হবেন কিভাবে? দরিদ্রতার চিন্তা যদি আপনার মনে গেঁথে যায়, তবে আপনি নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কাজ করবেন কিভাবে?
দরিদ্রতা মূলতঃ মানুষের কুদরতী অবস্থা নয়। মানব জাতির সৃষ্টি দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল থাকার জন্য নয়। একটু চিন্তা করুন, আল্লাহ তা'আলা কি নিজের সেরা সৃষ্টিজীব মানুষকে হতদরিদ্র ও অভাব অনটনে জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন? না, তা কখনই হতে পারে না। মানব দেহ সৃষ্টির মাঝে এমন একটি আলামতও নেই, যাতে বুঝা যায়, তাদের কাউকে দরিদ্রতায় জীবন কাটানোর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের ভেতর বিশেষ কিছু মহাশক্তি ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সে যেমন চাইবে তেমনিই হতে পারবে। মানুষ শুধুমাত্র দরিদ্রতার দাসত্ব গ্রহণ করে বলেই সে হতদরিদ্র ও কাঙ্গাল হয়ে থাকে। সে দরিদ্র থাকতে অস্বীকার করুক, নিজের চিন্তাধারা ও নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় সংকল্প করুক এবং আপ্রাণ প্রচেষ্টায় লেগে যাক, তবে সে কি না করতে পারে?
কোনও মানুষ যদি মনে করে, সে ছোট্ট বাচ্চা, অক্ষম, দরিদ্র, হতভাগা এবং সবসময় অন্যের অনুগ্রহ-অনুকম্পার মোখাপেক্ষী, সে কখনও নিজের দরিদ্রতা বিদূরীত করতে পারবে না। নিজেই নিজেকে চিনুন, জানুন। নিজের শক্তি ও যোগ্যতাকে অনুধাবন করুন। আড়মোড়া দিয়ে উঠুন এবং নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় সংকল্প করুন।
যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার দুবেলার ডাল-ভাতের চিন্তা রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি স্বাধীন হলেন কিভাবে? ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি বহুমুখী কাজ কিভাবে করতে পারেন? আপনার চিন্তাধারাকে স্বাধীনভাবে কিভাবে ব্যক্ত করতে পাবেন? কিভাবে নিজের ব্যক্তিগত কথাবার্তা, দলীল প্রমাণের দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করতে পারেন? স্বয়ং আপনি যখন কোনও ভাল স্থানে থাকতে পারেন না, ভাল পোশাক পরতে পারেন না, সুস্থ থাকতে পারেন না তখন অন্যান্য মানুষ আপনার কথা মানার জন্য কিভাবে প্রস্তুত হতে পারে?
সীমাহীন দরিদ্রতার কারণে মানুষ সংকীর্ণমনা, ছোট লোক, তুচ্ছ, ঝোলা, দুর্বল ও তার চাহিদা হ্রাস হয়ে যায়। দরিদ্রতা এক অভিশাপ। যে এ অভিশাপ গ্রহণ করে নেয়, সে এর বিরোধীতা করে না। সে তা বিদূরীত করার কোনও সমাধান জানে না। কাজেই সে বড় কোনও কাজ করবে- এ আশা অবান্তর। তার ভবিষ্যত নিশ্চিত "ঘোর তমাসাচ্ছন" বলা যায়। দরিদ্রতা ভালোবাসার শত্রু।
দু'জন একে অপরকে খুব ভালোবাসা সত্ত্বেও টাকা-পয়সার সংকটের কারণে পরস্পর শত্রু হয়ে যায়। কেননা দরিদ্রতা মানুষের মনের বাসনা এবং উত্তম আগ্রহ-উদ্যমকে হত্যা করে ফেলে। ক্ষুধার্থ ব্যক্তি সব অন্যায়ই করতে পারে। দরিদ্রতার মাঝে কোনও মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। দরিদ্রতার শিকার কোনও পুরুষ প্রকৃত পুরুষ হতে পারে না। কোনও নারী প্রকৃত নারী হতে পারে না। পয়সা-পয়সা করে দৌড়-ঝাপকারী লোকের মাঝে উত্তম আদর্শ ও ভাল জিনিস থাকার স্থানই হয় কোথায়? কেননা দরিদ্রতার ফলে মানুষ অস্থির, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ, আতঙ্কিত, হীনমন্য ও শোচনীয়হাল হয়ে যায়। সে দশ টাকার কাজ এক টাকায় করতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। ফলে তার দরিদ্রতা, অক্ষমতা ও অপারগতা আরও বেড়ে যায়। দরিদ্রতার কারণে মানুষ নির্লজ্জ-বেশরম হয়ে যায়। এতে তার ভাব মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, প্রভাব প্রতিপত্তি নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে তার ধন-সম্পদ উপার্জন ক্ষমতা আরও হ্রাস পায়। দরিদ্রকে দুঃখ দানকারী, পেষণকারী, পৃষ্টকারী প্রতিক্রিয়া সর্বক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হতে পারে। যে ব্যক্তি দৈনন্দিনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না- সে মানুষ, বংশ, সমাজ, রাষ্ট্র ও দুনিয়ার কি মঙ্গল করতে পারে?
দরিদ্রতার কারণে মানুষ অকাল বৃদ্ধ হয়ে যায়। তার চেহারার লাবণ্যতা ও উজ্জ্বলতা বিনষ্ট হয়ে যায়। দরিদ্রতার কারণে যুবক আর যুবক থাকে না। শিশু শিশু থাকে না। দরিদ্রতা চেহারাকে, খসখসে, মলিন, পাষাণ ও হীন করে দেয়। দরিদ্রতার কারণে মানুষের উন্নত মন-মানসিকতা উচ্চাকাঙ্খা নিঃশেষ হয়ে যায়। সে তুচ্ছ, নগন্য, নিচু ও হেয় হয়ে যায়। দরিদ্রতা অভিশাপ। যে এর প্রসংসা করে বস্তুতঃ সে ভুল করে। প্রত্যেক যুবকের অন্তঃকরণে এ জযবা ও আগ্রহ বদ্ধমূল করা উচিৎ যে, সে দরিদ্রতার ভয়ানক পরিণতির কথা বুঝবে, জানবে। একে নির্লজ্জতা ও লাঞ্ছনা মনে করবে। দরিদ্রতা যখন বিদূরীত করা যায়, তখন তা বরদাশত করা হবে কেন? এ দরিদ্রতার দরুন অনিবার্য দুঃখ-কষ্ট অস্থিরতা, পেরেশানী এবং সংকটের প্রতিক্রিয়াগুলো কেন সহ্য করা হবে?
যারা রোগাক্রান্ত, দুর্বল, অপারগ, সহায়-সম্বলহীন, তাদের মাজবুরী ও অক্ষমতা আছে। তাদের উপর দরিদ্রতা চেপে গেছে। কাজেই তাদের দরিদ্রতায় লজ্জার কিছু নেই। কিন্তু বিস্ময় তো তাদের উপর হয়, যারা তনু-মন সব দিক দিয়ে সুস্থ-সবল হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্রতার জুলুম বরদাশ করে। শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ সবল থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা দরিদ্রতা বিদূরীত করার চেষ্টা-সাধনা না করি, তাহলে বস্তুতঃ এই হবে আমাদের চরম লজ্জা ও লাঞ্ছনা। প্রত্যেক যুবকেরই জানা উচিৎ যে, দরিদ্রতা কত ভয়ানক ও শোচনীয় পরিস্থিতির নাম। এটা কত বড় লজ্জাজনক অবস্থা।
যে ব্যক্তির ভেতরে দরিদ্রতা দূর করার যোগ্যতা আছে, সে দরিদ্র হলে এর কারণ সে নিজেই। দরিদ্রতা সাধারণতঃ মানুষের দুর্বলতা ও নীচুতা প্রকাশ করে। কেউ কেউ বলে- আমরা গরীব বংশের জন্ম নিয়েছি, আমরা কী করতে পারি? কিন্তু আমি বলি- আপনি লেখাপড়া শূন্য, অশিক্ষিতও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন আপনি চলতেও পারতেন না। উত্তরাধিকার পেলেন। আপনি দরিদ্রতার কারণে হীনমন্য ও কুণ্ঠাসা। কিন্তু আপনি শৈশবের দুর্বলতায় তো আর কুণ্ঠাসা ছিলেন না। যখন আপনি উঠান-আঙ্গিনায় হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন। আপনার চিন্তা-ধারা যদি উচুস্তরের হয়, আপনার সংকল্প মজবুত হয়, ইচ্ছা মহৎ, চেষ্টা সত্য হবে। আপনার জীবন গুনাহে জর্জরিত, ক্লান্ত-অবিশ্রান্ত, দুর্ভাগ্য ও ভুল ত্রুটিতে পরিপূর্ণ থাকে, তাহলে আপনিই তো নিজের হতদরিদ্রতা বিদূরীত করতে চান না।
কেউ যদি সব সময় দরিদ্র-অভাবী থাকে তাহলে এতে এ কথাই প্রতিয়মান হয় যে, সে কখনও নিজের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা সাধনা করেনি। কেননা চেষ্টাকে কখনও ফলাফল থেকে পৃথক করা যায় না। আপনি আত্মপ্রচেষ্টা চালানোর পরও আপনার অবস্থা অপরিবর্তিত থাকার কারণ হল, আপনি সুচিন্তিত ভাবে চেষ্টা-তদবীর করেন নি। অলসতা ও গাফলতী ছেড়ে করেন নি অনিয়ম ছেড়ে সুশৃঙ্খল ও নিয়মত্রান্ত্রিকভাবে করেন নি। বস্তুতঃ নীচুতার অনুভূতির কারণেই মানুষ দরিদ্র থাকে। নীচুতার কুপ্রভাবই তাকে দরিদ্র বানিয়ে রাখে। যে সর্বদা নিজেকে গরীব ও হতদরিদ্র মনে করে এবং দরিদ্র বলে। সে ধনী হয় কি করে?
ধনাঢ্যতার চিন্তা-চেতনার কারণে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা জন্ম নেয়। আত্মবিশ্বাসই সার্বিক দিক থেকে স্বচ্ছল থাকার মূলমন্ত্র। যে লোক সব সময় নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে, সে দরিদ্রতা গ্রহণ করে। সে দরিদ্রতার বিরোধীতা করে না। দরিদ্রতার মায়াকান্নাই কাঁদে। দরিদ্রতাকে দূরীভূত করার কোনও চেষ্টা-তদবীরই করে না। যার মন-মানসিকতা দুর্বল, তার দেহ এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়। "মনের পরাজয়ই পরাজয়"। তেমন কাজই সে করে। "মনের বিজয়ই বিজয়"। তেমন ফলই তার মিলে। কাজেই সর্বপ্রথম মন থেকে দরিদ্রতার চিন্তাধারা মূলোৎপাটন করুন।
ভিখারীর মত ধ্যান-ধারণার লোক ভিখারীই হয়ে যায়। সব সময় নিজের ব্যর্থতার কাহিনী আবৃত্তিকারী লোক ভবিষ্যতেও কোন কাজকর্ম করার চেষ্টা-তদবীর করে না। দরিদ্রতার দরুন মানুষ সব সময় গরীব, হতদরিদ্র এবং অস্থির থাকে। এ অস্থিরতার কারণে মনের মধ্যে হাজারও দুঃখ-কষ্ট ও মসীবতের প্রতিচ্ছবি এঁকে নেয়। বর্তমান সময়ের নিঃসঙ্গতা ও সাহায্য শূন্যতা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার তরবারী সব সময় তার মাথার উপর ঝুলতে থাকে। ফলে মানুষ নিজের মানসিক ও শারীরিক সব ধরনের ভারসাম্যতা হারিয়ে ফেলে।
মানুষ যখন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তখন তার সফলতার সকল যোগ্যতা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তার সঙ্গী-সাথী ছুটে যায়। তার জীবন এক চাকার নিচে পৃষ্ঠ হতে থাকে। সেই চাকা হারানোর চাকা। তখন তার উচ্চ আকাঙ্খা, তার শক্তি-সামর্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। সে নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা, চেহারা-সুরত, লেবাস-পোশাক, চুল-দাঁড়ি ইত্যাদি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার ব্যাপারেও উদাসীন হয়ে যায়। সে কোনও কাজকর্মে সতর্কতা অবলম্বন কিংবা গুরুত্বারোপ করে না। সে তার কাজে যথোপযুক্ত নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার প্রতি খেয়াল করে না, বড় ধরনের ভুল-ভ্রান্তি করতে থাকে। তার মাঝে দরিদ্রতার উপর জয়লাভ করার ক্ষমতা থাকে না।
দরিদ্র ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশীর মত জীবন যাপন করতে পারে না। সে নিরাশ ও হতাশ হয়ে যায়। তখন সে নিজের যোগ্যতা অনুপাতে সঠিক কাজ করার যোগ্যও থাকে না। ফলে তার কাজকর্ম পূর্বের তুলনায় নীচু মানের হয়ে যায়। আগের চেয়ে অধিক দুর্বলতার কারণে তার দৈন্যতা ও দরিদ্রতা আরও প্রকট হতে থাকে। যার মাঝে যোগ্যতা ও সাহসের অভাব রয়েছে, সে কখনও সুস্থ অবস্থায় বা সঠিক স্থানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে না। সে ইতঃস্ততা করে চলে। সে ঘাবড়িয়ে এবং ভয়ে ভয়ে সামনে অগ্রসর হয়। এমন ব্যক্তি কিভাবে সফলকাম হতে পারে? হতাশার কারণে মানুষ সব কাজে ব্যর্থ হয়। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে পারে না। কাজেই তার উন্নতি ও সমৃদ্ধির ক্ষমতা হ্রাস পায়। অনিবার্য পরিস্থিতি বদলানোর যোগ্যতা নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন সে নিজের অবস্থার সাথে সমোঝোতা করে নেয়। অর্থাৎ সে দৈন্যতা ও দরিদ্রতা নীরবে সহ্য করতে থাকে। আর সকল অভিযোগ ও আপত্তি চাপিয়ে দেয়, ভাগ্যের উপর সে নিজের অবস্থার উন্নতিকে স্বভাব ও স্বাধ্যের বাইরে মনে করতে থাকে।
দৈন্যতা ও দরিদ্রতার জযবা যতটা জঘন্য, দৈন্যতা ততোটা জঘন্য নয়। আমি হতদরিদ্র এবং নিশ্চিত দরিদ্রই থাকব -এ বিশ্বাস সীমাহীন ক্ষতিকর। আমি দরিদ্র, কখনও ধনী হতে পারব না -মনের এ খেয়াল খুব ক্ষতিকারক। সর্বপ্রথম এসব নিজের মন থেকে দূরীভূত করতে হবে। দৈন্যতা ও দরিদ্রতার সাথে যে সমোঝোতা করে নেয়, সে কখনও তা থেকে বিমুখ হয় না। দূরে সরানোর চেষ্টা-তদবীরও করে না। সে হাত-পা ছেড়ে পতিত ও ঘুমন্ত ব্যক্তির মত অবস্থা গ্রহণ করে নেয়। দৈন্যতা দূর করার জন্য যতটুকু চেষ্টা-তদবীর করা প্রয়োজন, তা তার জন্মের উপর দৃঢ় সংকল্প করার দ্বারা পূর্ণ হয়। আর এ সংকল্প ও ইচ্ছা কখনও পিছু হটতে, নিস্তব্ধ হতে কিংবা পরাস্ত হতে জানে না।
অন্ধকার, হতাশা ও উদাসীনতার প্রতি দেখতে থাকলে আপনি আলো, আশা ও যোগ্যতা কিভাবে অর্জন করতে পারবেন? আপনি ভুলভ্রান্তির দিকে নিজের দৃষ্টি নিবন্ধ রাখছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের চতুর্পাশে দৈন্যতার চিন্তাধারা প্রকাশ করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ধন-সম্পদ আপনার কাছে কিভাবে আসতে পারে? কেননা দৈন্যতা ও দরিদ্রতার চিন্তাধারা আপনার শক্তি-সামর্থকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
দৈন্যতাকে যদি সালাম করেন, ভয় পান। বুড়া কালে অর্থ-সংকটে আমার কি হবে ভেবে যদি আপনি কেঁপে উঠেন, তাহলে এ ধরনের ভয়-ভীতির কারণে আপনার বর্তমান শক্তি-ক্ষমতাও হ্রাস পাবে। আপনার যোগ্যতায় দুর্বলতা এসে যাবে। আপনার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাবে। তখন আপনার এ অবস্থা নিয়ে চেষ্টা-তদবীর করার ক্ষেত্রে পূর্বের চেয়েও যোগ্যতা হ্রাস পাবে।
চৌম্বক লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে; কাঠকে কখনও আকর্ষণ করে না। নিজের মনকে এমন আশাবাদি চৌম্বক বানাবেন যে, ধন-দৌলত ও নেতৃত্বকে আপনার দিকে আকর্ষণ করেও টেনে আনে। পক্ষান্তরে আপনি যদি আপনার মনকে এমন চৌম্বক মনে করেন, যে সব সময় দৈন্যতা, দরিদ্রতা, দুর্বলতা ব্যর্থতাকে আপনার দিকে টেনে আনে, তাহলে আপনি নিজের অবস্থার উন্নতি ও পরিবর্তন কিভাবে করতে পারেন?
আপনার যে দিকে যাওয়ার ইচ্ছে সে দিকেই মুখ করেন, সে দিকেই পা বাড়ান। এটা কিভাবে হয় যে, আপনি যাবেন পূর্ব দিকে আর মুখ ফিরাবেন পশ্চিম দিকে? তদ্রুপ আপনি যদি সব সময় দৈন্যতা ও দরিদ্রতার দিকে খেয়াল রাখেন, তাহলে ধন-সম্পদের ভাণ্ডার কিভাবে আপনার পদচুম্বন করতে পারে? আপনি নিজেই যখন প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যর্থতার পথে বাড়াচ্ছেন, তাহলে সফলতার প্রাসাদ পর্যন্ত আপনি কিভাবে পৌঁছুতে পারেন? তখন আপনার লক্ষ্যবস্তু পাওয়ার আশাই কিভাবে করতে পারেন?
আমরা যদি নিজের মনের দৈন্যতার উপর বিজয় লাভ করতে পারি, তখন বাহ্যিক অবস্থার উপর জয়লাভ করা কঠিন বা কষ্টসাধ্য হয় না। যখন মনের অবস্থা ও গতি পাল্টিয়ে ফেলি, তখন আমাদের শরীরিক অবস্থাও বদলে যায়। তারপর ঘরের অবস্থা পাল্টাতেও দেরী হয় না।
আমরা মনের ভেতর দৈন্যতার চিন্তা গেঁথে রাখি। ফলে আমাদের সম্পর্ক দরিদ্র ও দৈন্যতার সাথেই জড়িয়ে থাকে। আমরা তাদেরই সংস্পর্শে যাই, যারা দৈন্যতার চিন্তা করে, দৈন্যতার কথা বলে, হতদরিদ্র জীবন কাটায়! এ সংস্পর্শের কারণে আমাদের মনমানসিকতাও তেমনি থাকে।
যে ব্যক্তি নিজের মন-মগজ সব সময় দরিদ্রতার চিন্তায় আচ্ছন্ন রাখে, যে যথারীতি নিজের দুর্ভাগ্যের কাহিনী বলে বেড়ায়, যে ব্যক্তি নিজের ব্যর্থতার গান গাইতে থাকে, সে উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়া, ধন-সম্পদ অর্জন করা, ভাগ্য পরিবর্তন করা এবং কোন কাজে সফলকাম হওয়ার আশা কিরূপে করতে পারে? যে দিকে ধনভাণ্ডার, সে দিকে যে ব্যক্তি মুখই ফিরাল না, সে পথে পা বাড়াল না, তারপরও ধন-ভাণ্ডারের কাছে সে পৌঁছুবে কিভাবে?
মানব জীবনের ভয়ঙ্কর অভিশাপ হচ্ছে দরিদ্রতা।
"পয়সা বিনে মাও বলে, বৎস তুমি নির্বিকার।
আপন ভাইও করবে তোমায় লক্ষ আঘাত নির্বিচার।"
যে দরিদ্র, তার চিন্তাধারা দারিদ্র হওয়ার কারণেই সে দরিদ্র। মনে যদি দরিদ্রতা বিরাজ করে তবে আপনি ধনী হবেন কিভাবে? দরিদ্রতার চিন্তা যদি আপনার মনে গেঁথে যায়, তবে আপনি নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কাজ করবেন কিভাবে?
দরিদ্রতা মূলতঃ মানুষের কুদরতী অবস্থা নয়। মানব জাতির সৃষ্টি দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল থাকার জন্য নয়। একটু চিন্তা করুন, আল্লাহ তা'আলা কি নিজের সেরা সৃষ্টিজীব মানুষকে হতদরিদ্র ও অভাব অনটনে জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন? না, তা কখনই হতে পারে না। মানব দেহ সৃষ্টির মাঝে এমন একটি আলামতও নেই, যাতে বুঝা যায়, তাদের কাউকে দরিদ্রতায় জীবন কাটানোর জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষের ভেতর বিশেষ কিছু মহাশক্তি ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সে যেমন চাইবে তেমনিই হতে পারবে। মানুষ শুধুমাত্র দরিদ্রতার দাসত্ব গ্রহণ করে বলেই সে হতদরিদ্র ও কাঙ্গাল হয়ে থাকে। সে দরিদ্র থাকতে অস্বীকার করুক, নিজের চিন্তাধারা ও নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় সংকল্প করুক এবং আপ্রাণ প্রচেষ্টায় লেগে যাক, তবে সে কি না করতে পারে?
কোনও মানুষ যদি মনে করে, সে ছোট্ট বাচ্চা, অক্ষম, দরিদ্র, হতভাগা এবং সবসময় অন্যের অনুগ্রহ-অনুকম্পার মোখাপেক্ষী, সে কখনও নিজের দরিদ্রতা বিদূরীত করতে পারবে না। নিজেই নিজেকে চিনুন, জানুন। নিজের শক্তি ও যোগ্যতাকে অনুধাবন করুন। আড়মোড়া দিয়ে উঠুন এবং নিজের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় সংকল্প করুন।
যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার দুবেলার ডাল-ভাতের চিন্তা রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি স্বাধীন হলেন কিভাবে? ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি বহুমুখী কাজ কিভাবে করতে পারেন? আপনার চিন্তাধারাকে স্বাধীনভাবে কিভাবে ব্যক্ত করতে পাবেন? কিভাবে নিজের ব্যক্তিগত কথাবার্তা, দলীল প্রমাণের দ্বারা অন্যকে প্রভাবিত করতে পারেন? স্বয়ং আপনি যখন কোনও ভাল স্থানে থাকতে পারেন না, ভাল পোশাক পরতে পারেন না, সুস্থ থাকতে পারেন না তখন অন্যান্য মানুষ আপনার কথা মানার জন্য কিভাবে প্রস্তুত হতে পারে?
সীমাহীন দরিদ্রতার কারণে মানুষ সংকীর্ণমনা, ছোট লোক, তুচ্ছ, ঝোলা, দুর্বল ও তার চাহিদা হ্রাস হয়ে যায়। দরিদ্রতা এক অভিশাপ। যে এ অভিশাপ গ্রহণ করে নেয়, সে এর বিরোধীতা করে না। সে তা বিদূরীত করার কোনও সমাধান জানে না। কাজেই সে বড় কোনও কাজ করবে- এ আশা অবান্তর। তার ভবিষ্যত নিশ্চিত "ঘোর তমাসাচ্ছন" বলা যায়। দরিদ্রতা ভালোবাসার শত্রু।
দু'জন একে অপরকে খুব ভালোবাসা সত্ত্বেও টাকা-পয়সার সংকটের কারণে পরস্পর শত্রু হয়ে যায়। কেননা দরিদ্রতা মানুষের মনের বাসনা এবং উত্তম আগ্রহ-উদ্যমকে হত্যা করে ফেলে। ক্ষুধার্থ ব্যক্তি সব অন্যায়ই করতে পারে। দরিদ্রতার মাঝে কোনও মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। দরিদ্রতার শিকার কোনও পুরুষ প্রকৃত পুরুষ হতে পারে না। কোনও নারী প্রকৃত নারী হতে পারে না। পয়সা-পয়সা করে দৌড়-ঝাপকারী লোকের মাঝে উত্তম আদর্শ ও ভাল জিনিস থাকার স্থানই হয় কোথায়? কেননা দরিদ্রতার ফলে মানুষ অস্থির, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ, আতঙ্কিত, হীনমন্য ও শোচনীয়হাল হয়ে যায়। সে দশ টাকার কাজ এক টাকায় করতেও প্রস্তুত হয়ে যায়। ফলে তার দরিদ্রতা, অক্ষমতা ও অপারগতা আরও বেড়ে যায়। দরিদ্রতার কারণে মানুষ নির্লজ্জ-বেশরম হয়ে যায়। এতে তার ভাব মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়, প্রভাব প্রতিপত্তি নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে তার ধন-সম্পদ উপার্জন ক্ষমতা আরও হ্রাস পায়। দরিদ্রকে দুঃখ দানকারী, পেষণকারী, পৃষ্টকারী প্রতিক্রিয়া সর্বক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হতে পারে। যে ব্যক্তি দৈনন্দিনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না- সে মানুষ, বংশ, সমাজ, রাষ্ট্র ও দুনিয়ার কি মঙ্গল করতে পারে?
দরিদ্রতার কারণে মানুষ অকাল বৃদ্ধ হয়ে যায়। তার চেহারার লাবণ্যতা ও উজ্জ্বলতা বিনষ্ট হয়ে যায়। দরিদ্রতার কারণে যুবক আর যুবক থাকে না। শিশু শিশু থাকে না। দরিদ্রতা চেহারাকে, খসখসে, মলিন, পাষাণ ও হীন করে দেয়। দরিদ্রতার কারণে মানুষের উন্নত মন-মানসিকতা উচ্চাকাঙ্খা নিঃশেষ হয়ে যায়। সে তুচ্ছ, নগন্য, নিচু ও হেয় হয়ে যায়। দরিদ্রতা অভিশাপ। যে এর প্রসংসা করে বস্তুতঃ সে ভুল করে। প্রত্যেক যুবকের অন্তঃকরণে এ জযবা ও আগ্রহ বদ্ধমূল করা উচিৎ যে, সে দরিদ্রতার ভয়ানক পরিণতির কথা বুঝবে, জানবে। একে নির্লজ্জতা ও লাঞ্ছনা মনে করবে। দরিদ্রতা যখন বিদূরীত করা যায়, তখন তা বরদাশত করা হবে কেন? এ দরিদ্রতার দরুন অনিবার্য দুঃখ-কষ্ট অস্থিরতা, পেরেশানী এবং সংকটের প্রতিক্রিয়াগুলো কেন সহ্য করা হবে?
যারা রোগাক্রান্ত, দুর্বল, অপারগ, সহায়-সম্বলহীন, তাদের মাজবুরী ও অক্ষমতা আছে। তাদের উপর দরিদ্রতা চেপে গেছে। কাজেই তাদের দরিদ্রতায় লজ্জার কিছু নেই। কিন্তু বিস্ময় তো তাদের উপর হয়, যারা তনু-মন সব দিক দিয়ে সুস্থ-সবল হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্রতার জুলুম বরদাশ করে। শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ সবল থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা দরিদ্রতা বিদূরীত করার চেষ্টা-সাধনা না করি, তাহলে বস্তুতঃ এই হবে আমাদের চরম লজ্জা ও লাঞ্ছনা। প্রত্যেক যুবকেরই জানা উচিৎ যে, দরিদ্রতা কত ভয়ানক ও শোচনীয় পরিস্থিতির নাম। এটা কত বড় লজ্জাজনক অবস্থা।
যে ব্যক্তির ভেতরে দরিদ্রতা দূর করার যোগ্যতা আছে, সে দরিদ্র হলে এর কারণ সে নিজেই। দরিদ্রতা সাধারণতঃ মানুষের দুর্বলতা ও নীচুতা প্রকাশ করে। কেউ কেউ বলে- আমরা গরীব বংশের জন্ম নিয়েছি, আমরা কী করতে পারি? কিন্তু আমি বলি- আপনি লেখাপড়া শূন্য, অশিক্ষিতও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন আপনি চলতেও পারতেন না। উত্তরাধিকার পেলেন। আপনি দরিদ্রতার কারণে হীনমন্য ও কুণ্ঠাসা। কিন্তু আপনি শৈশবের দুর্বলতায় তো আর কুণ্ঠাসা ছিলেন না। যখন আপনি উঠান-আঙ্গিনায় হাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলতেন। আপনার চিন্তা-ধারা যদি উচুস্তরের হয়, আপনার সংকল্প মজবুত হয়, ইচ্ছা মহৎ, চেষ্টা সত্য হবে। আপনার জীবন গুনাহে জর্জরিত, ক্লান্ত-অবিশ্রান্ত, দুর্ভাগ্য ও ভুল ত্রুটিতে পরিপূর্ণ থাকে, তাহলে আপনিই তো নিজের হতদরিদ্রতা বিদূরীত করতে চান না।
কেউ যদি সব সময় দরিদ্র-অভাবী থাকে তাহলে এতে এ কথাই প্রতিয়মান হয় যে, সে কখনও নিজের অবস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা সাধনা করেনি। কেননা চেষ্টাকে কখনও ফলাফল থেকে পৃথক করা যায় না। আপনি আত্মপ্রচেষ্টা চালানোর পরও আপনার অবস্থা অপরিবর্তিত থাকার কারণ হল, আপনি সুচিন্তিত ভাবে চেষ্টা-তদবীর করেন নি। অলসতা ও গাফলতী ছেড়ে করেন নি অনিয়ম ছেড়ে সুশৃঙ্খল ও নিয়মত্রান্ত্রিকভাবে করেন নি। বস্তুতঃ নীচুতার অনুভূতির কারণেই মানুষ দরিদ্র থাকে। নীচুতার কুপ্রভাবই তাকে দরিদ্র বানিয়ে রাখে। যে সর্বদা নিজেকে গরীব ও হতদরিদ্র মনে করে এবং দরিদ্র বলে। সে ধনী হয় কি করে?
ধনাঢ্যতার চিন্তা-চেতনার কারণে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা জন্ম নেয়। আত্মবিশ্বাসই সার্বিক দিক থেকে স্বচ্ছল থাকার মূলমন্ত্র। যে লোক সব সময় নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করে, সে দরিদ্রতা গ্রহণ করে। সে দরিদ্রতার বিরোধীতা করে না। দরিদ্রতার মায়াকান্নাই কাঁদে। দরিদ্রতাকে দূরীভূত করার কোনও চেষ্টা-তদবীরই করে না। যার মন-মানসিকতা দুর্বল, তার দেহ এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়। "মনের পরাজয়ই পরাজয়"। তেমন কাজই সে করে। "মনের বিজয়ই বিজয়"। তেমন ফলই তার মিলে। কাজেই সর্বপ্রথম মন থেকে দরিদ্রতার চিন্তাধারা মূলোৎপাটন করুন।
ভিখারীর মত ধ্যান-ধারণার লোক ভিখারীই হয়ে যায়। সব সময় নিজের ব্যর্থতার কাহিনী আবৃত্তিকারী লোক ভবিষ্যতেও কোন কাজকর্ম করার চেষ্টা-তদবীর করে না। দরিদ্রতার দরুন মানুষ সব সময় গরীব, হতদরিদ্র এবং অস্থির থাকে। এ অস্থিরতার কারণে মনের মধ্যে হাজারও দুঃখ-কষ্ট ও মসীবতের প্রতিচ্ছবি এঁকে নেয়। বর্তমান সময়ের নিঃসঙ্গতা ও সাহায্য শূন্যতা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার তরবারী সব সময় তার মাথার উপর ঝুলতে থাকে। ফলে মানুষ নিজের মানসিক ও শারীরিক সব ধরনের ভারসাম্যতা হারিয়ে ফেলে।
মানুষ যখন আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে তখন তার সফলতার সকল যোগ্যতা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তার সঙ্গী-সাথী ছুটে যায়। তার জীবন এক চাকার নিচে পৃষ্ঠ হতে থাকে। সেই চাকা হারানোর চাকা। তখন তার উচ্চ আকাঙ্খা, তার শক্তি-সামর্থ নিঃশেষ হয়ে যায়। সে নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা, চেহারা-সুরত, লেবাস-পোশাক, চুল-দাঁড়ি ইত্যাদি সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার ব্যাপারেও উদাসীন হয়ে যায়। সে কোনও কাজকর্মে সতর্কতা অবলম্বন কিংবা গুরুত্বারোপ করে না। সে তার কাজে যথোপযুক্ত নিয়মনীতি ও শৃঙ্খলার প্রতি খেয়াল করে না, বড় ধরনের ভুল-ভ্রান্তি করতে থাকে। তার মাঝে দরিদ্রতার উপর জয়লাভ করার ক্ষমতা থাকে না।
দরিদ্র ব্যক্তি নিজের প্রতিবেশীর মত জীবন যাপন করতে পারে না। সে নিরাশ ও হতাশ হয়ে যায়। তখন সে নিজের যোগ্যতা অনুপাতে সঠিক কাজ করার যোগ্যও থাকে না। ফলে তার কাজকর্ম পূর্বের তুলনায় নীচু মানের হয়ে যায়। আগের চেয়ে অধিক দুর্বলতার কারণে তার দৈন্যতা ও দরিদ্রতা আরও প্রকট হতে থাকে। যার মাঝে যোগ্যতা ও সাহসের অভাব রয়েছে, সে কখনও সুস্থ অবস্থায় বা সঠিক স্থানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে না। সে ইতঃস্ততা করে চলে। সে ঘাবড়িয়ে এবং ভয়ে ভয়ে সামনে অগ্রসর হয়। এমন ব্যক্তি কিভাবে সফলকাম হতে পারে? হতাশার কারণে মানুষ সব কাজে ব্যর্থ হয়। সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করতে পারে না। কাজেই তার উন্নতি ও সমৃদ্ধির ক্ষমতা হ্রাস পায়। অনিবার্য পরিস্থিতি বদলানোর যোগ্যতা নিঃশেষ হয়ে যায়। তখন সে নিজের অবস্থার সাথে সমোঝোতা করে নেয়। অর্থাৎ সে দৈন্যতা ও দরিদ্রতা নীরবে সহ্য করতে থাকে। আর সকল অভিযোগ ও আপত্তি চাপিয়ে দেয়, ভাগ্যের উপর সে নিজের অবস্থার উন্নতিকে স্বভাব ও স্বাধ্যের বাইরে মনে করতে থাকে।
দৈন্যতা ও দরিদ্রতার জযবা যতটা জঘন্য, দৈন্যতা ততোটা জঘন্য নয়। আমি হতদরিদ্র এবং নিশ্চিত দরিদ্রই থাকব -এ বিশ্বাস সীমাহীন ক্ষতিকর। আমি দরিদ্র, কখনও ধনী হতে পারব না -মনের এ খেয়াল খুব ক্ষতিকারক। সর্বপ্রথম এসব নিজের মন থেকে দূরীভূত করতে হবে। দৈন্যতা ও দরিদ্রতার সাথে যে সমোঝোতা করে নেয়, সে কখনও তা থেকে বিমুখ হয় না। দূরে সরানোর চেষ্টা-তদবীরও করে না। সে হাত-পা ছেড়ে পতিত ও ঘুমন্ত ব্যক্তির মত অবস্থা গ্রহণ করে নেয়। দৈন্যতা দূর করার জন্য যতটুকু চেষ্টা-তদবীর করা প্রয়োজন, তা তার জন্মের উপর দৃঢ় সংকল্প করার দ্বারা পূর্ণ হয়। আর এ সংকল্প ও ইচ্ছা কখনও পিছু হটতে, নিস্তব্ধ হতে কিংবা পরাস্ত হতে জানে না।
অন্ধকার, হতাশা ও উদাসীনতার প্রতি দেখতে থাকলে আপনি আলো, আশা ও যোগ্যতা কিভাবে অর্জন করতে পারবেন? আপনি ভুলভ্রান্তির দিকে নিজের দৃষ্টি নিবন্ধ রাখছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের চতুর্পাশে দৈন্যতার চিন্তাধারা প্রকাশ করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত ধন-সম্পদ আপনার কাছে কিভাবে আসতে পারে? কেননা দৈন্যতা ও দরিদ্রতার চিন্তাধারা আপনার শক্তি-সামর্থকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
দৈন্যতাকে যদি সালাম করেন, ভয় পান। বুড়া কালে অর্থ-সংকটে আমার কি হবে ভেবে যদি আপনি কেঁপে উঠেন, তাহলে এ ধরনের ভয়-ভীতির কারণে আপনার বর্তমান শক্তি-ক্ষমতাও হ্রাস পাবে। আপনার যোগ্যতায় দুর্বলতা এসে যাবে। আপনার আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাবে। তখন আপনার এ অবস্থা নিয়ে চেষ্টা-তদবীর করার ক্ষেত্রে পূর্বের চেয়েও যোগ্যতা হ্রাস পাবে।
চৌম্বক লোহাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে; কাঠকে কখনও আকর্ষণ করে না। নিজের মনকে এমন আশাবাদি চৌম্বক বানাবেন যে, ধন-দৌলত ও নেতৃত্বকে আপনার দিকে আকর্ষণ করেও টেনে আনে। পক্ষান্তরে আপনি যদি আপনার মনকে এমন চৌম্বক মনে করেন, যে সব সময় দৈন্যতা, দরিদ্রতা, দুর্বলতা ব্যর্থতাকে আপনার দিকে টেনে আনে, তাহলে আপনি নিজের অবস্থার উন্নতি ও পরিবর্তন কিভাবে করতে পারেন?
আপনার যে দিকে যাওয়ার ইচ্ছে সে দিকেই মুখ করেন, সে দিকেই পা বাড়ান। এটা কিভাবে হয় যে, আপনি যাবেন পূর্ব দিকে আর মুখ ফিরাবেন পশ্চিম দিকে? তদ্রুপ আপনি যদি সব সময় দৈন্যতা ও দরিদ্রতার দিকে খেয়াল রাখেন, তাহলে ধন-সম্পদের ভাণ্ডার কিভাবে আপনার পদচুম্বন করতে পারে? আপনি নিজেই যখন প্রতিটি পদক্ষেপ ব্যর্থতার পথে বাড়াচ্ছেন, তাহলে সফলতার প্রাসাদ পর্যন্ত আপনি কিভাবে পৌঁছুতে পারেন? তখন আপনার লক্ষ্যবস্তু পাওয়ার আশাই কিভাবে করতে পারেন?
আমরা যদি নিজের মনের দৈন্যতার উপর বিজয় লাভ করতে পারি, তখন বাহ্যিক অবস্থার উপর জয়লাভ করা কঠিন বা কষ্টসাধ্য হয় না। যখন মনের অবস্থা ও গতি পাল্টিয়ে ফেলি, তখন আমাদের শরীরিক অবস্থাও বদলে যায়। তারপর ঘরের অবস্থা পাল্টাতেও দেরী হয় না।
আমরা মনের ভেতর দৈন্যতার চিন্তা গেঁথে রাখি। ফলে আমাদের সম্পর্ক দরিদ্র ও দৈন্যতার সাথেই জড়িয়ে থাকে। আমরা তাদেরই সংস্পর্শে যাই, যারা দৈন্যতার চিন্তা করে, দৈন্যতার কথা বলে, হতদরিদ্র জীবন কাটায়! এ সংস্পর্শের কারণে আমাদের মনমানসিকতাও তেমনি থাকে।
যে ব্যক্তি নিজের মন-মগজ সব সময় দরিদ্রতার চিন্তায় আচ্ছন্ন রাখে, যে যথারীতি নিজের দুর্ভাগ্যের কাহিনী বলে বেড়ায়, যে ব্যক্তি নিজের ব্যর্থতার গান গাইতে থাকে, সে উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়া, ধন-সম্পদ অর্জন করা, ভাগ্য পরিবর্তন করা এবং কোন কাজে সফলকাম হওয়ার আশা কিরূপে করতে পারে? যে দিকে ধনভাণ্ডার, সে দিকে যে ব্যক্তি মুখই ফিরাল না, সে পথে পা বাড়াল না, তারপরও ধন-ভাণ্ডারের কাছে সে পৌঁছুবে কিভাবে?
📄 ধনাঢ্যতা, ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান
ইসলামের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদ দোষণীয় কিছু নয়। কিন্তু ঐ সময় দোষণীয় হয়, যখন তা মানুষকে আল্লাহ তা'আলার স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং আখেরাতের চিন্তা ফিকির নিঃশেষ হয়ে যায়।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আরয করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আমি চাই আমার পোশাক অত্যন্ত দামী হোক, মাথায় তৈল লাগানো থাক, জুতাও উন্নত মানের হোক, আমার লাঠি ভাল ধরনের হোক। নবীজী বললেন- এ সব কটিই পছন্দনীয় এবং আল্লাহ তা'আলা এ সুন্দর রুচীকে ভাল দৃষ্টিতে দেখেন। (মুসতাদরাকে হাকেম)
ইসলামের দৃষ্টিতে ধন-সম্পদ দোষণীয় কিছু নয়। কিন্তু ঐ সময় দোষণীয় হয়, যখন তা মানুষকে আল্লাহ তা'আলার স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং আখেরাতের চিন্তা ফিকির নিঃশেষ হয়ে যায়।
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আরয করলেন- হে আল্লাহর রাসূল! আমি চাই আমার পোশাক অত্যন্ত দামী হোক, মাথায় তৈল লাগানো থাক, জুতাও উন্নত মানের হোক, আমার লাঠি ভাল ধরনের হোক। নবীজী বললেন- এ সব কটিই পছন্দনীয় এবং আল্লাহ তা'আলা এ সুন্দর রুচীকে ভাল দৃষ্টিতে দেখেন। (মুসতাদরাকে হাকেম)
📄 সম্পদ শালী হবেন কিভাবে?
ধনাঢ্যতার চিন্তাধারার কারণেই ধন-সম্পদ হাসিল হয়। দুনিয়ায় কোনও জিনিসের স্বল্পতা আছে এ ধারণাই ভ্রান্ত। যে মনে করে দুনিয়ায় এত এত ধন-ভাণ্ডার পড়ে আছে, সেই ধনী হয়, আমীর হয়। যে ধন-সম্পদের আশা রাখে, সেই ধনবান হয়। সে দরিদ্রতা-দৈন্যতাকে অস্বীকার করে। দরিদ্রতার কাছে নত স্বীকার করে না। তার উদ্দেশ্য বাস্তবিকই "ধন-দৌলত" হয়। নিজের এ অভিষ্ট লক্ষ্য সফল করার জন্য সে সব সময় মনে এ চিন্তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে।
যথারীতি নিজের মনকে বলতে থাকে- আমার পিতা আমাকে যা কিছু দিয়েছেন, সবই আমার। তার উপর আমার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এ চিন্তা সব সময় তাকে উৎসাহ দিতে থাকে যে, কিছু কর, কিছু হও। সে নিজের এ অভিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিটি কদম ফেলে। যে ব্যক্তি নিজের সকল চিন্তাধারাকে একই উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদের উপর নিবন্ধ রাখে, তার চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন থাকে না। তার কাছে নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই কেবল ফুটে উঠে। কাজেই সে নিজের সঠিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যস্থির করার ক্ষেত্রে সফলকাম হয়। এ সঠিক উদ্দেশ্যের জন্য মনের একাগ্রতা একান্ত জরুরী ও আবশ্যক।
যার চিন্তাধারা এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত থাকে, সে বেকারত্বের অস্থিরতায় নিজের সময় নষ্ট করে। সে নিজের মাকসাদ ও উদ্দেশ্য সফল করার জন্য নিজের সমস্ত চেষ্টা-তদবীর ব্যয় করে না। কাজেই সে সফলতা অর্জন করতে পারে না। আপনার উদ্দেশ্য যদি সুস্পষ্ট হয়, তা যদি সব সময় মনের ভেতর থাকে এবং সফলতা লাভের জন্য নতুনভাবে চিন্তা-ফিকির করতে থাকেন, আপনার নিয়মিত সে অনুপাতে কাজ করার আগ্রহ, চেষ্টা-তদবীর ও চিন্তা-ভাবনার দ্বারা লক্ষ্যবস্তু আপনার কাছে আসতে থাকে। আপনি সজাগ দৃষ্টিতে ও সচেতনভাবে বড় বড় চেষ্টা-তদবীর করবেন। নিজের কাজ সমাধা করার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যায় পড়বেন না। আপনি সজাগ থেকে সফলতার কোনও লাভজনক ও উপযুক্ত সময় নষ্ট করবেন না।
এ জগতের কোন সীমা নেই। কুদরতের ভাণ্ডারে কোনও জিনিসের স্বল্পতা নেই। এ ধন-সম্পদ একক কারও উত্তরাধিকার নয়। এতে কারও পূর্ব অধিকার নেই। এ ধন-সম্পদ অর্জন করার ক্ষমতাও আমাদের মাঝে প্রচুর। কিন্তু যখন আমরা আল্লাহ তা'আলার অপার শক্তি থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে রাখি, তখন আমরা তুচ্ছ, নগন্য নিরিহ ও অযোগ্য হয়ে যাই। যে নালার সম্পর্ক সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাতে পানি আসবে কোত্থেকে? আল্লাহ তা'আলার বিশাল ঝর্ণার সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখার দ্বারাই আমার মাঝে বিরাট শক্তির স্রোত এসে যায়। মানুষ যখন নিজেকে আল্লাহ তা'আলার থেকে দূরে এবং পৃথক করে রাখে, তখন সে দুর্বল হয়ে যায়। নিজেকে যখন জাগতিক শক্তির একাংশ মনে করে সে চলে, তখন বরাবরই তার অনুভব হয়, কুদরতের সমূহ শক্তিই আমার আছে, তখন সে সমুদ্রের মত গভীর, পাহাড়ের মত অটল ও বিশাল হয়ে যায়। অতঃপর দৈন্যতার বিরুদ্ধে চেষ্টা-তদবীর করার ক্ষেত্রে সে আর একাকী থাকে না। সে বন্ধু-বান্ধব ও সাহায্যকারী বিহীন অসহায় থাকে না। যে নিজেকে দৈন্যতা থেকে ভিন্ন মনে করে চলে, কুদরত তার সাহায্য করে দেখিয়ে দেয়। তাতে মানুষের মাঝে এমন আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয় যে, সে অফুরন্ত ধন-সম্পদ, মান-সম্মান, সৌন্দর্য ও সফলতা লাভের হকদার হয়ে যায়।
কিছু লোক বলে থাকে- দুনিয়ার সৃষ্টি এমনভাবে হয়েছে, এখানে কিছু লোক আমীর ও ধনাঢ্য থাকবে। আর বাকি লোক তাদের অনুগ্রহ-অনুকম্পা নিয়ে বেঁচে থাকবে। দুনিয়ার সুখ-শান্তির মাধ্যম সীমীত। কাজেই সব লোক এক রকম আমীর ও ধনী হতে পারে না। যে ব্যক্তি চেষ্টা-তদবীর করে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে পারে, সেই ধন-সম্পদ অর্জন করে সুখ-শান্তিতে জীবন কাটাতে পারে। বাকী লোকদের জন্য শুধু দুঃখ আর দুঃখই রয়েছে।
এসব চিন্তাধারাই ভুল। এসব শুধু সন্দেহ-সংশয়। নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার কথা। আল্লাহ তা'আলা কাউকে বড় কিংবা ছোট বানান নি। এটা তো মানুষেরই কাজ। যে ব্যক্তি ধন-দৌলত দখল করে আছে, তার এতটুকু অন্যায় নেই বরং তার অন্যায়ই বেশি যে ব্যক্তি এ অবস্থা সহ্য করে। আপনি যখন প্রচুর অর্থ-সম্পদ উপার্জন করা নিজের ইচ্ছাধীনই মনে করেন না, তখন অঢেল ধন-সম্পদ পাওয়ার জন্য আপনি চেষ্টা-তদবীরই কিভাবে করতে পারেন?
আল্লাহ তা'আলা কি দুর্বল? যত মানুষ তিনি সৃষ্টি করলেন, তাদের জীবন ধারনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসসমূহ বন্দোবস্ত করার কথা কি তার জানা নেই? বাস্তবিকই আল্লাহ তা'আলা সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দ্বারা দুনিয়া ভরে রেখেছেন। মানব জীবনের সমূহ প্রয়োজন মেটানোর জিনিসপত্র এ দুনিয়ায় রয়েছে। কিন্তু মানুষ নিজের কারণেই তা থেকে বঞ্চিত থাকে।
জীবন ধারণের জন্য সর্বাধিক প্রয়োজনীয় জিনিস তরিতরকারী। মানুষ বলে- তরিতরকারির অভাব। কিন্তু অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ এ ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছেন। তারা বলেন- দুনিয়ার অনেক জায়গা এমনও রয়েছে, যেখানে চাষাবাদ করা হয়নি। তন্মধ্যে অনেক জমি খুবই উর্বর, তাতে কুদরতি উর্বরতা এখনও রক্ষিত রয়েছে যা এ পর্যন্ত খরচ হয়নি। এ জমির যদি সঠিক ব্যবহার হয় তবে উৎপাদন দ্বিগুণ নয় অবশ্যই আরও বহুগুণ বেশি হবে। আর পৃথিবীর আবাদ জমিগুলোও উত্তম পরিচর্যা এবং বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদের মাধ্যমে এমন এমন অবস্থায় উন্নীত করা যায়, যার দ্বারা জমির চেহারাই পাল্টে যাবে আর ফলনও বাড়বে প্রচুর।
প্রাচীন যুগে ঘরে আলো পাওয়ার জন্য চর্বি ব্যবহার করা হত। সমুদ্রে যখন তিমি মাছের অভাব দেখা দিল, তখন চরম তৈল সংকট সৃষ্টি হল। কিন্তু কেরোসিন তৈলের সন্ধান পাওয়ায় আলোর সমস্যা কেটে গেল। কিছু দিন পর বিজ্ঞানীরা বললেন- ভূ-গর্ভে খনিজ তেলের অভাব দেখা দিয়েছে, তখন মানুষ ঘাবড়ে গেল। কিন্তু এখন গ্যাস-বিদ্যুতের সাহায্যে অনেক কাজ সমাধা হচ্ছে। প্রয়োজন হল সকল আবিষ্কারের মা। বিদ্যুৎ উদপাদন ও বৈদ্যুতিক জিনিসের স্বল্পতার কারণে ভবিষ্যতে এটমিক শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনাময় সন্ধান পাওয়া গেছে। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে, মানুষ যদি নিজের মেধার সঠিক ব্যবহার করে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার অবিনশ্বর ভাণ্ডার থেকে মানুষ নিজের জন্য কল্যাণকর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লুফে নিতে পারে। মানুষ যদি চিন্তাশীল, সচেতন, যোগ্য ও পরিশ্রমী হয়, তাহলে তার কোনও জিনিসের অভাব থাকে না। আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী ভাণ্ডারের সীমাহীন ও বিস্তর ধন-সম্পদ পড়ে আছে। এখনও তার একাংশের উপর মানুষ জয় লাভ করেনি। মহান বিজ্ঞানী 'নারায়ণ' দুনিয়ার প্রশস্ততার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন-
"আমি তো বিশাল অথৈসমুদ্রের তীরে দণ্ডায়মান এক শিশুর মত দোলা খাচ্ছি। এ পৃথিবী সীমাহীন। এ প্রশস্ত প্রান্তরের সীমানা নেই। আল্লাহ তা'আলার কত ভাণ্ডার না জানি এখনও লুকিয়ে আছে। যাতে মানুষের আশা-আকাঙ্খা পূরণের বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক ধরনের সম্পদ গচ্ছিত রয়েছে। মানুষের কাজ হল, এ সব মাধ্যম ও উসীলা সন্ধান করা, অফুরন্ত ধন-সম্পদ অর্জন করা এবং যথাস্থানে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মানুষ নিজের মেধা, বুদ্ধি, যোগ্যতা ও চিন্তা-চেতনা প্রয়োগ করবে। সে যদি নিজের ভিতরের শক্তি ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের চেষ্টা-তদবীর করে, তাহলে বিজয়-সফলতা তারই পদচুম্বন করবে। সফলতা সব সময়ই চেষ্টা-তদবীরের দাস।"
(ওয়ার্ল্ড ম্যান এন্ড ডায়মণ্ড)
ধনাঢ্যতার চিন্তাধারার কারণেই ধন-সম্পদ হাসিল হয়। দুনিয়ায় কোনও জিনিসের স্বল্পতা আছে এ ধারণাই ভ্রান্ত। যে মনে করে দুনিয়ায় এত এত ধন-ভাণ্ডার পড়ে আছে, সেই ধনী হয়, আমীর হয়। যে ধন-সম্পদের আশা রাখে, সেই ধনবান হয়। সে দরিদ্রতা-দৈন্যতাকে অস্বীকার করে। দরিদ্রতার কাছে নত স্বীকার করে না। তার উদ্দেশ্য বাস্তবিকই "ধন-দৌলত" হয়। নিজের এ অভিষ্ট লক্ষ্য সফল করার জন্য সে সব সময় মনে এ চিন্তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে।
যথারীতি নিজের মনকে বলতে থাকে- আমার পিতা আমাকে যা কিছু দিয়েছেন, সবই আমার। তার উপর আমার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। এ চিন্তা সব সময় তাকে উৎসাহ দিতে থাকে যে, কিছু কর, কিছু হও। সে নিজের এ অভিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে প্রতিটি কদম ফেলে। যে ব্যক্তি নিজের সকল চিন্তাধারাকে একই উদ্দেশ্যে ধন-সম্পদের উপর নিবন্ধ রাখে, তার চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন থাকে না। তার কাছে নিজের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই কেবল ফুটে উঠে। কাজেই সে নিজের সঠিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যস্থির করার ক্ষেত্রে সফলকাম হয়। এ সঠিক উদ্দেশ্যের জন্য মনের একাগ্রতা একান্ত জরুরী ও আবশ্যক।
যার চিন্তাধারা এদিক-ওদিক বিক্ষিপ্ত থাকে, সে বেকারত্বের অস্থিরতায় নিজের সময় নষ্ট করে। সে নিজের মাকসাদ ও উদ্দেশ্য সফল করার জন্য নিজের সমস্ত চেষ্টা-তদবীর ব্যয় করে না। কাজেই সে সফলতা অর্জন করতে পারে না। আপনার উদ্দেশ্য যদি সুস্পষ্ট হয়, তা যদি সব সময় মনের ভেতর থাকে এবং সফলতা লাভের জন্য নতুনভাবে চিন্তা-ফিকির করতে থাকেন, আপনার নিয়মিত সে অনুপাতে কাজ করার আগ্রহ, চেষ্টা-তদবীর ও চিন্তা-ভাবনার দ্বারা লক্ষ্যবস্তু আপনার কাছে আসতে থাকে। আপনি সজাগ দৃষ্টিতে ও সচেতনভাবে বড় বড় চেষ্টা-তদবীর করবেন। নিজের কাজ সমাধা করার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যায় পড়বেন না। আপনি সজাগ থেকে সফলতার কোনও লাভজনক ও উপযুক্ত সময় নষ্ট করবেন না।
এ জগতের কোন সীমা নেই। কুদরতের ভাণ্ডারে কোনও জিনিসের স্বল্পতা নেই। এ ধন-সম্পদ একক কারও উত্তরাধিকার নয়। এতে কারও পূর্ব অধিকার নেই। এ ধন-সম্পদ অর্জন করার ক্ষমতাও আমাদের মাঝে প্রচুর। কিন্তু যখন আমরা আল্লাহ তা'আলার অপার শক্তি থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে রাখি, তখন আমরা তুচ্ছ, নগন্য নিরিহ ও অযোগ্য হয়ে যাই। যে নালার সম্পর্ক সমুদ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাতে পানি আসবে কোত্থেকে? আল্লাহ তা'আলার বিশাল ঝর্ণার সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখার দ্বারাই আমার মাঝে বিরাট শক্তির স্রোত এসে যায়। মানুষ যখন নিজেকে আল্লাহ তা'আলার থেকে দূরে এবং পৃথক করে রাখে, তখন সে দুর্বল হয়ে যায়। নিজেকে যখন জাগতিক শক্তির একাংশ মনে করে সে চলে, তখন বরাবরই তার অনুভব হয়, কুদরতের সমূহ শক্তিই আমার আছে, তখন সে সমুদ্রের মত গভীর, পাহাড়ের মত অটল ও বিশাল হয়ে যায়। অতঃপর দৈন্যতার বিরুদ্ধে চেষ্টা-তদবীর করার ক্ষেত্রে সে আর একাকী থাকে না। সে বন্ধু-বান্ধব ও সাহায্যকারী বিহীন অসহায় থাকে না। যে নিজেকে দৈন্যতা থেকে ভিন্ন মনে করে চলে, কুদরত তার সাহায্য করে দেখিয়ে দেয়। তাতে মানুষের মাঝে এমন আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয় যে, সে অফুরন্ত ধন-সম্পদ, মান-সম্মান, সৌন্দর্য ও সফলতা লাভের হকদার হয়ে যায়।
কিছু লোক বলে থাকে- দুনিয়ার সৃষ্টি এমনভাবে হয়েছে, এখানে কিছু লোক আমীর ও ধনাঢ্য থাকবে। আর বাকি লোক তাদের অনুগ্রহ-অনুকম্পা নিয়ে বেঁচে থাকবে। দুনিয়ার সুখ-শান্তির মাধ্যম সীমীত। কাজেই সব লোক এক রকম আমীর ও ধনী হতে পারে না। যে ব্যক্তি চেষ্টা-তদবীর করে প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হতে পারে, সেই ধন-সম্পদ অর্জন করে সুখ-শান্তিতে জীবন কাটাতে পারে। বাকী লোকদের জন্য শুধু দুঃখ আর দুঃখই রয়েছে।
এসব চিন্তাধারাই ভুল। এসব শুধু সন্দেহ-সংশয়। নিজেকে ধোঁকা দেওয়ার কথা। আল্লাহ তা'আলা কাউকে বড় কিংবা ছোট বানান নি। এটা তো মানুষেরই কাজ। যে ব্যক্তি ধন-দৌলত দখল করে আছে, তার এতটুকু অন্যায় নেই বরং তার অন্যায়ই বেশি যে ব্যক্তি এ অবস্থা সহ্য করে। আপনি যখন প্রচুর অর্থ-সম্পদ উপার্জন করা নিজের ইচ্ছাধীনই মনে করেন না, তখন অঢেল ধন-সম্পদ পাওয়ার জন্য আপনি চেষ্টা-তদবীরই কিভাবে করতে পারেন?
আল্লাহ তা'আলা কি দুর্বল? যত মানুষ তিনি সৃষ্টি করলেন, তাদের জীবন ধারনের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসসমূহ বন্দোবস্ত করার কথা কি তার জানা নেই? বাস্তবিকই আল্লাহ তা'আলা সব ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দ্বারা দুনিয়া ভরে রেখেছেন। মানব জীবনের সমূহ প্রয়োজন মেটানোর জিনিসপত্র এ দুনিয়ায় রয়েছে। কিন্তু মানুষ নিজের কারণেই তা থেকে বঞ্চিত থাকে।
জীবন ধারণের জন্য সর্বাধিক প্রয়োজনীয় জিনিস তরিতরকারী। মানুষ বলে- তরিতরকারির অভাব। কিন্তু অর্থনীতি বিশেষজ্ঞগণ এ ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছেন। তারা বলেন- দুনিয়ার অনেক জায়গা এমনও রয়েছে, যেখানে চাষাবাদ করা হয়নি। তন্মধ্যে অনেক জমি খুবই উর্বর, তাতে কুদরতি উর্বরতা এখনও রক্ষিত রয়েছে যা এ পর্যন্ত খরচ হয়নি। এ জমির যদি সঠিক ব্যবহার হয় তবে উৎপাদন দ্বিগুণ নয় অবশ্যই আরও বহুগুণ বেশি হবে। আর পৃথিবীর আবাদ জমিগুলোও উত্তম পরিচর্যা এবং বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদের মাধ্যমে এমন এমন অবস্থায় উন্নীত করা যায়, যার দ্বারা জমির চেহারাই পাল্টে যাবে আর ফলনও বাড়বে প্রচুর।
প্রাচীন যুগে ঘরে আলো পাওয়ার জন্য চর্বি ব্যবহার করা হত। সমুদ্রে যখন তিমি মাছের অভাব দেখা দিল, তখন চরম তৈল সংকট সৃষ্টি হল। কিন্তু কেরোসিন তৈলের সন্ধান পাওয়ায় আলোর সমস্যা কেটে গেল। কিছু দিন পর বিজ্ঞানীরা বললেন- ভূ-গর্ভে খনিজ তেলের অভাব দেখা দিয়েছে, তখন মানুষ ঘাবড়ে গেল। কিন্তু এখন গ্যাস-বিদ্যুতের সাহায্যে অনেক কাজ সমাধা হচ্ছে। প্রয়োজন হল সকল আবিষ্কারের মা। বিদ্যুৎ উদপাদন ও বৈদ্যুতিক জিনিসের স্বল্পতার কারণে ভবিষ্যতে এটমিক শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনাময় সন্ধান পাওয়া গেছে। সুতরাং একথা সুস্পষ্ট যে, মানুষ যদি নিজের মেধার সঠিক ব্যবহার করে, তাহলে আল্লাহ তা'আলার অবিনশ্বর ভাণ্ডার থেকে মানুষ নিজের জন্য কল্যাণকর ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লুফে নিতে পারে। মানুষ যদি চিন্তাশীল, সচেতন, যোগ্য ও পরিশ্রমী হয়, তাহলে তার কোনও জিনিসের অভাব থাকে না। আল্লাহ তা'আলার চিরস্থায়ী ভাণ্ডারের সীমাহীন ও বিস্তর ধন-সম্পদ পড়ে আছে। এখনও তার একাংশের উপর মানুষ জয় লাভ করেনি। মহান বিজ্ঞানী 'নারায়ণ' দুনিয়ার প্রশস্ততার কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন-
"আমি তো বিশাল অথৈসমুদ্রের তীরে দণ্ডায়মান এক শিশুর মত দোলা খাচ্ছি। এ পৃথিবী সীমাহীন। এ প্রশস্ত প্রান্তরের সীমানা নেই। আল্লাহ তা'আলার কত ভাণ্ডার না জানি এখনও লুকিয়ে আছে। যাতে মানুষের আশা-আকাঙ্খা পূরণের বিস্ময়কর ও অস্বাভাবিক ধরনের সম্পদ গচ্ছিত রয়েছে। মানুষের কাজ হল, এ সব মাধ্যম ও উসীলা সন্ধান করা, অফুরন্ত ধন-সম্পদ অর্জন করা এবং যথাস্থানে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মানুষ নিজের মেধা, বুদ্ধি, যোগ্যতা ও চিন্তা-চেতনা প্রয়োগ করবে। সে যদি নিজের ভিতরের শক্তি ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের চেষ্টা-তদবীর করে, তাহলে বিজয়-সফলতা তারই পদচুম্বন করবে। সফলতা সব সময়ই চেষ্টা-তদবীরের দাস।"
(ওয়ার্ল্ড ম্যান এন্ড ডায়মণ্ড)