📄 অন্যের উপর আত্মনির্ভরতার প্রভাব
আপনার ধ্যান-ধারণার মাধ্যমে ভাগ্যের উপর জয়লাভ করতে পারেন। যদি আপনি বুঝেন, মানুষের ভাগ্যগঠনের পিছনে শুধু মাত্রই চিন্তা-চেতনাই একটি মাধ্যম, তাহলে হাতে তরবারী নেওয়ার প্রয়োজন আপনার হবে না। চিন্তা যেমন হবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফলাফল তদানুরূপে হবে। আমাদের মাঝে কতটুকু আগ্রহপূর্ণ যোগ্যতা আছে, কতটুকু আত্মনির্ভরতা আছে, সফলতা এর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যরা আমাদের উপর কতটুকু ভরসা করে এটা সফলতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু আমাদের উপর অন্যের আস্থা থাকা বিশেষভাবে আমাদের আত্মবিশ্বাসের সাথে জড়িত। তাদের উপর আমাদের ব্যক্তিত্বের প্রভাব রয়েছে। কাজেই আমাদের মনের গতিই এমন মাধ্যম, যার দ্বারা আমরা অন্যের আস্থা অর্জন করতে পারি। আপনার আগ্রহপূর্ণ স্বীয় যোগ্যতাই আক্রমণাত্মক। যাদের সাথে সম্পর্ক আছে, আপনার আগমন তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষতঃ তাদের উপর কর্তৃত্ববান হওয়া আপনার জন্য জরুরী। চাই উস্তাদরূপে বা বক্তারূপে বা এটর্নি বা সেলসম্যান রূপে বা আশাবাদী কিংবা অন্য কোনও রূপে।
আপনি যদি নিজের ব্যক্তিত্বের আত্মবিশ্বাসে পরিবেষ্টিত থাকেন তবে তা অন্যদের উপর যাদুর মত প্রভাব বিস্তার করবে। তাদেরকে যদি নিজের ভক্ত বানানোর চেষ্টা করেন তবে বিস্মিত হবেন যে, কত দ্রুত তা অন্যদের ভিতর প্রবেশ করে এবং আপনি যে কাজ হাতে নেন, তখন তাদের এ বিশ্বাস হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত হয়ে যায় যে, আপনি তা সমাধা করতে পারবেন। এটাই ঐ যোগ্যতা, যার মাধ্যমে মানুষের ইজ্জত-সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বস্ততা তৈরী হয়। যে ব্যক্তি কোনও কাজ হাতে নিলে তা সমাধান করার ব্যাপারে নিজ যোগ্যতার উপর বিশ্বাসী হয়ে যায়, সে মানুষ সৃষ্টিগত যোগ্যতা সম্পন্ন ও আদর্শ চরিত্র হয়ে যায়। যখন কোনও মানুষ কর্তৃত্বের জন্য অনুভব করে যে, এটা আমার দখলিত এলাকা, তখন তার কথাবার্তায় আত্মনির্ভরতা ফুটে ওঠে। তার ব্যক্তিত্বের বিশ্বাস ও মজবুত ইচ্ছার আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। অন্যের মনে সৃষ্ট সংশয়-সন্দেহের উপর সে জয়লাভ করে। কেননা তাদের উপর তার আত্মবিশ্বাসের প্রভাব পড়ে। তার মান-মর্যাদা, বড়ত্ব, ও মাহাত্ম দেখে অন্যদের বিশ্বাস হয়ে যায় যে, এ ব্যক্তির মাঝে সফলকাম হওয়ার যোগ্যতা আছে। মানুষেরা এ ব্যক্তির উপর ভরসা করে।
যে জড় এবং দ্বিধা-বিভক্ত হয় না, যে কাজ করে দেখায়, দুনিয়ার সব জিনিসেই তার সঙ্গ দেয়। সে জানে, যারা দুর্বল আত্মবিশ্বাসী লোকের বিরোধিতা করে তারা এমন লোকের পরিকল্পনায় সেচ্ছাসেবী হয়ে যায়। যেসব বিষয় সাধারণ আত্মবিশ্বাসী লোকদের আগ্রহ-উদ্যম হ্রাস করে দেয়, সেসব বিষয়েই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী লোকের উন্নতির পথে সহযোগী হয়। এ দুনিয়ায় মানুষ সাধারণতঃ উপরে আরোহী বা উন্নয়নশীল ব্যক্তির সাহায্য করে। তার বিজয়ে শ্লোগান তোলে। আর পরাস্ত ও অধঃপতিত লোকদেরকে খোঁচা দেয়। কোনও ব্যক্তির যদি নিজের উপর বিশ্বাস না থাকে, তবে দুনিয়াবাসীরও তার উপর আস্থা-বিশ্বাস থাকে না। নিজের উপর যার আস্থা ও বিশ্বাস আছে, আমরা তার প্রশংসা না করে পারি না। ঠাট্টা করে কথা বলে, ব্যঙ্গ করে কিংবা সমালোচনা করে তাকে নিচে নামানো যায় না। দরিদ্রতা তাকে হীন মনোবল করতে পারে না। দুর্ভাগ্য তাকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে পারে না। বিপদ-আপদ, কষ্ট-ক্লেশ তাকে নিজের পথ থেকে বিন্দুমাত্র সরাতে পারে না।
মজবুত হিম্মতের মানুষ, ইস্পাত কঠিন সংকল্পের মানুষ তো আক্রমণ শুরু হওয়ার পূর্বেই অর্ধেক যুদ্ধ জয় করে ফেলে। আমি এমন এক ব্যক্তিকে চিনি, যে কোনও কাজ হাতে নিলে তা সমাধা করে ছাড়ে এবং সে প্রসংশাযোগ্য সফলকাম হতে থাকে। কেননা সে কখনও ইতঃস্ততা করে না পশ্চাদপদ হয় না। কোনও কাজ করার সময় তার নিজের যোগ্যতার উপর সংশয়-সন্দেহ হয় না। তার আত্মবিশ্বাস কখনও কখনও গোয়ার্তুমি পর্যন্ত চলে যায়। এতে কেউ কেউ অসন্তুষ্টও হয়। কিন্তু তারাও এ লোকের সামনে নিজেকে অক্ষম মনে করে। পক্ষান্তরে এ লোকের বিপরীত এমন কিছু লোকও দেখেছি, যারা খুব পড়াশোনা করেছে, অনেক চিন্তা-ফিকির করে, যাদের সামনে কোনও কাজ এলে লাভ লোকসানের বিরাট তালিকা তৈরী করে। তারা কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারে না। নানা সংশয় করতে থাকে। দ্বিধা-বিভক্ত হতে থাকে। আর ইত্যাবসরে আমার চেনা ঐ লোকটি তার কাজ সমাধা করে ফেলে। এমন মানুষ নিজের বিরোধীদেরকে তার যোগ্যতার উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে বাধ্য করে ছাড়ে। যদিও তাদের কাছে এসব বিশ্বাস না করার মত বাস্তব কারণও বিদ্যমান।
কারও যোগ্যতা যতই ঠুনকো হোক না কেন, পাশাপাশি যদি তার প্রখর আত্মবিশ্বাস থাকে তবে সে সারা দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে এবং প্রচুর কাজ করতে পারে। পক্ষান্তরে অপর এক ব্যক্তি যার মধ্যে অসাধারণ ও সীমাহীন যোগ্যতা রয়েছে, কিন্তু মন-মেজায ভীতু ও দ্বিধাবিভক্ত, এমন ব্যক্তি কখনও সফলকাম হতে পারে না। এমন একজন শিক্ষক, যার জ্ঞান-বিদ্যা খুবই সাধারণ, কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের অধিকারী; তিনি ঐ শিক্ষক অপেক্ষা অধিকতর সফলকাম হোন, যিনি বিরাট বড় ও বিজ্ঞ আলেম। কিন্তু নিজের ইল্ম-জ্ঞান অন্যের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম নয়। এমনকি প্রকাশও করতে পারে না যে, বিষয়টার উপর তার পূর্ণ দখল আছে। আমি জানি, উদাহরণের দৃষ্টিতে এটা ন্যায়সঙ্গত নয়। সাধারণতঃ অনেক বড় বেইনসাফও মনে হয়। কিন্তু দুনিয়ায় বস্তুতঃ এমনই হয়ে থাকে। এর প্রতিকার হল, যে ব্যক্তি প্রকৃতই যোগ্য, তিনি নিজের ভেতর এমন আত্মবিশ্বাস তৈরী করে নেন, যাতে অন্য লোকদেরকে প্রভাবিত করতে পারেন। আমরা যে কোন কাজকর্মে আমাদের প্রতি অন্যদের আস্থা-বিশ্বাসের ডোরে আবদ্ধ অর্থাৎ আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারি, উন্নতমানের জিনিসপত্র তৈরি করতে পারি। কর্মচারীদের সুশৃঙ্খল রাখতে পারি এবং শত সহস্র কাজকর্মের মধ্য হতে মালিক ও জনসাধারণের চাহিদা মাফিক যে কোনও কাজ করতে পারি।
জীবন খুব সংক্ষীপ্ত আর দুনিয়া অসংখ্য কাজে ব্যস্ত। কোনও ব্যক্তি যে কাজের দাবী করে, সে তা আদৌ করতে পারে কি না -এটা সূক্ষ্মভাবে যাচাই করার মত এতটুকু সময়-সুযোগ কারও নেই। কোনও ব্যক্তি যদি কালো কোর্ট ও টাই ইত্যাদি পরে, তবে সারা দুনিয়াই মনে করে, সে উকিল। এ পেশার জন্য তা উপযুক্ত। তদ্রুপ কোনও ডাক্তারকে প্রত্যেক রোগীর সামনে প্রমাণ করতে হয় না যে, সে বিশেষ কোনও বই-পুস্তক পড়েছে এবং বিশেষ কোনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
কাজেই কোনও অযোগ্যতা মেনে নেওয়া এবং প্রাসঙ্গিক কোনও সংশয়ের পূর্বে পরাজয়কে মেনে নেওয়া ব্যর্থতাকে সাহায্য করারই নামান্তর। আমাদের জন্য মুহূর্তের জন্যও আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে হতে না দেওয়া উচিৎ। চাই পথ যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন বা কণ্টকাকীর্ণ মনে হোক না কেন? অন্যের মনে আমাদের প্রতি যে আস্থা-বিশ্বাস আছে, তা অন্য কোনও জিনিস এত দ্রুত বিনষ্ট করে না, যত দ্রুত আমাদের মনের সংশয়-সন্দেহ তা বিনষ্ট করে দেয়। এ সংশয় আমাদের আশপাশের মানুষ খুব তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করে ফেলে। কিছু মানুষ শুধু এ কারণেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় যে, সে নিজের হীন মনোবল ও মন-মানসিকতা বিক্ষিপ্ত করে রাখে এবং চার পাশের মানুষের মনে তা পৌঁছে দেয়। আপনি যদি কোম্পানীর মালিক হোন, তবে আপনার কর্মচারীদেরকে সহজভাবে বলতে পারেন যে, আপনারা নিজেদের প্রত্যাহিক কাজে বিজয়ীবেশে, বিজয় ও আত্মবিশ্বাসের আগ্রহ নিয়ে অথবা একজন মার খাওয়া পরাস্ত মানুষের বেশে এসেছেন।
যে ব্যক্তি সংশয় ও হতাশায় নিমজ্জিত, সে আপনার চেহারা ও আচরণ দেখে বলতে পারে যে, আপনি আজ বিজয়ী হবেন না কি পরাস্ত হবেন? নিজের আত্মবিশ্বাস অন্যের মনে পৌঁছানোর প্রয়োজন সরবরাহ বিপনী থেকে অধিক অন্য কোথাও পড়ে না। এজেন্ট, সেলসম্যান ও দোকাদার প্রমুখের জন্য তা অনেক বেশী প্রয়োজন। এ ধরনের সরবরাহ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে এক বিশেষ ধরনের দক্ষতা ও মানসিক প্রভাব বিস্তারের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সাধারণতঃ আস্থাহীন অবিশ্বাসী গ্রাহক ও ক্রেতার সাথেই পণ্য সরবরাহকারী ও দোকানদারের নিয়মিত কারবার হয়ে থাকে। এমন ক্রেতা দুই ধরনের চিন্তায় দোদুল্যমান থাকে। তখন সচেতন দোকানদার তাকে নিজ ইচ্ছায় প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে এবং একাধিক দ্রব্য থেকে মাত্র দুটিতে নিয়ে আসে। তারপর স্বীয় সিদ্ধান্ত ক্রেতার পক্ষে ধরে নিয়ে এবং ক্রেতা একটি পছন্দ করেছেন ভেবে তা প্যাকেট করতে আরম্ভ করে। দোকানদার প্রতিদিন যে হাজার হাজার পদ্ধতি অবলম্বন করে তন্মধ্যে এ-ও একটি। কিন্তু ব্যবসার এই নীতির সাথে দোকানদারের আচার-ব্যবহার এবং উপস্থাপনায় দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। একজন ট্রাভেলস্ এজেন্ট ও ফেরিওয়ালার আচার-ব্যবহারে ক্রেতা তৎক্ষণাত পণ্য দ্রব্য কেনার সিদ্ধান্ত করে ফেলে।
উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি ও মন-মানসিকতার বিকাশ একজন উস্তাদের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, অন্য কারও তেমন নয়। একজন ইতঃস্ততাকারী উস্তাদ বাচ্চাদের ভরপুর কামরা বিশৃঙ্খলায় ফেলে দেবে। অথচ দৃঢ়চিত্ত, শান্ত, নিয়ন্ত্রিত ও সুন্দর মনের উস্তাদ এ ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই ভাল কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন।
উস্তাদের জন্য ব্যক্তিগত যাবতীয় মতপার্থক্যের উপর বিজিত হওয়া অতিজরুরী। তাঁর কাজ হল, যারা সাধারণতঃ উদাসীন ও বেখেয়ালী জটিল বিষয়গুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত ও আন্তরিকভাবে ছাত্র-ছাত্রীর দেমাগে গেঁথে দেওয়া। এতে শিশু-কিশোর ও যুবকদের মন তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারা বুঝে, উস্তাদ বাস্তবিকই তাদের প্রতি আগ্রহী কিনা? তাদের সাহায্য করতে চাচ্ছেন কি না? তারা স্বার্থান্বেষী ও অসহযোগী মৃতপ্রায় উস্তাদের মেজাজ তাৎক্ষণাত উপলব্ধি করে ফেলে।
📄 ইউরোপীয় জীবন ব্যবস্থা বা পশ্চিমা সমাজতন্ত্রের শিক্ষা
বিশ্ব মানবতার হিতাকাঙ্খী জনাব রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামাজিক জীবন ও ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা অধ্যয়নের পর ইউরোপীয়গণ যে শিক্ষা সাধারণ মানুষদেরকে দিয়ে থাকে তা কি ইসলামী না ইউরোপীয় শিক্ষা তা অধ্যয়ন করুন এবং পরিমাপ করুন। ফায়সালা হবে স্বয়ং।
📄 নিজের অবস্থায় কিভাবে পরিবর্তন আনবেন ?
মানুষের মনের জোর সীমাহীন। মনের ধ্যান-ধারণা যেরূপ হবে ভাগ্যও তদ্রুপ হবে। আমরা জীবনে যা কিছু হতে চাই নিজের চিন্তাশক্তির মাধ্যমে হতে পারি। আমরা যে কোনও কাজ করতে চাইলে, তা করতে পারি। মনের শক্তি অপরাজেয়; পর্যুদস্ত করার মত নয়। এ শক্তি আমাদের চিন্তা-ধারণার মাঝে সীমাবদ্ধ। আমাদের চিন্তাধারা যদি আমাদের চাহিদা মাফিক হয়ে যায়, তবে আমরা কি না করতে পারি? আমাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করার মত যে আছে? স্বয়ং আমরাই কি নই? আমাদের জীবন গঠন কি আমাদের চিন্তাধারা মাফিক হয় না? আমরা যদি নিজেদেরকে চাহিদা মাফিক কাজে নিয়োজিত করি, তাহলে যেসব কাজ করার আকাঙ্খা আমাদের রয়েছে তাতে আমরা সফলতা লাভ করতে পারি। স্বীয় ভাগ্য গঠনের শক্তি যখন আমাদেরই তখন হতাশা বা নিরাশা কিসের?
মঞ্চে এসে যখন কোনও ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার কাজ করে, তখন সকলেই বলে, মঞ্চে আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি এসেছেন। দুনিয়ায়ও এমনই হয়। দুনিয়ার মঞ্চে এসে যদি আপনি ধনীর ভূমিকা পালন করেন, তবে আপনাকে ধনাঢ্য বলা হবে। দরিদ্রের ভূমিকা পালন করলে দরিদ্র বলা হবে। ঈমানদারের ভূমিকা রাখলে ঈমানদার বলা হবে। আবার বেঈমানের ভূমিকা রাখলে আপনাকে বেঈমানই বলা হবে। মঞ্চ অভিনেতার মনের অপরাজেয় শক্তির রহস্য আমরা ভালভাবে জানি। একবার এক অভিনেতা বলেন- আমি কখনও অসুস্থ হই না। কেননা আমার মনে কখনও কোনও খায়েশ হয় নি। আমার খায়েশ তো একটিই যে, কখন সময় হবে আর আমি মঞ্চে উঠে অভিনয় শুরু করব। হাজারও দর্শক যারা অধিক আগ্রহে আমার অভিনয়ের অপেক্ষায় থাকে, তাদের কারণে আমার ব্যক্তিত্ব, সাহস ও যোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
হেজী ইভার্নেগ প্রসিদ্ধ এক অভিনেতা ছিলেন। "দ্য বিলেন্স" চলচ্চিত্রে তার অভিনয় ছিল শীর্ষ চরিত্রের। তার ডাক্তার একবার তাকে চেকাপ করার পর বিশ্রামের পরামর্শ দেন। ডাক্তার আরও বলেন- যদি সে নিয়মিত অভিনয় করে যায় তবে তার জীবনের আশঙ্কা আছে। কিন্তু অভিনয়ের সময় হলে তাকে দমানো গেল না। মঞ্চে ওঠে গেল এবং অভিনয়ে এমনভাবে ডুবে গেল যে, নিজের স্বাস্থের ব্যাপারে একেবারে খেয়াল রইল না। তার অভিনয় পূর্বের মত কেবল ভাল হয়নি বরং ডাক্তারের ভবিষ্যদ্বাণীও মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। দর্শককূলের সাবাশ! সাবাশ! ধ্বনী এবং নিজের সফলতায় তার এত আনন্দ হল যে, তখুনি তার রোগ নিরাময় হয়ে গেল। এ হচ্ছে মনের জোরের প্রতিক্রিয়া। মনের জোর বিরাট ব্যাপার। দৃঢ় ইচ্ছা-শক্তি মানুষকে শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে মনপ্রাণ ও পূর্ণ যোগ্যতা দিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করতে বাধ্য করে।
এ মহান বিশ্বাসই মানুষের সমস্ত শারীরিক অযোগ্যতার উপর জয় লাভের যোগ্যতা অর্জন করে। মানুষ যখন মনে করে, তার পক্ষে চেষ্টা করা অসম্ভব, অমুক কাজ করা তার সাধ্যের বাইরে, তখনও এ মহান বিশ্বাস তাকে কাজের জন্য বাধ্য করে। ফলে কাজটা হয়েই যায়। কখনও কখনও আমরা ভাবি, এ কাজ তো আমরা আদৌও করতে পারব না। কিন্তু হঠাৎ ঢেউ ওঠে যায় আর আমরা ঐ কাজ করতে বাধ্য হই। তখন আমাদের সুপ্ত প্রতিভা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে। এ শক্তির জোরে আমরা কাজটি করতে থাকি।
অভিনেতা, খেলোয়াড়, রাজনীতিবিদ, গায়ক এবং কবি সাহিত্যিকদের সামনে যখন কোনও পরীক্ষা আসে, তখন তাদের ভেতর কঠিন শক্তির স্রোত উথলে ওঠে। তাদের আত্মশক্তি ও মনের জোর শারীরিক দুর্বলতার উপর বিজয় লাভ করে। তাদের যোগ্যতা এত তীক্ষ্ণ হয়ে যায় যে, তাদের দেহে বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে। ফলে তাদের শরীর অসুস্থ থাকলেও তখন সুস্থ হয়ে যায়। যদি সুস্থ থাকে তবে শক্তির রত্ন ভাণ্ডার হয়ে যায়।
আমেরিকায় যখন গৃহযুদ্ধ চলছিল এবং চরম যুদ্ধবস্থা বিরাজ করছিল, সে সময় জাতীয় সৈন্যবাহিনীর জেনারেল গ্র্যান্টের পায়ে অত্যধিক প্ররিশ্রমের কারণে ভীষণ ব্যথা ছিল। কাজেই রণক্ষেত্র সে নিজে গেল না। এক জায়গায় অবস্থান করে যুদ্ধ পরিচালনা করছিল। অবস্থা ছিল মারাত্মক। প্রতিপক্ষ সৈন্যবাহিনীর কমাণ্ডার রণক্ষেত্র দখল নিয়েছে। তাতে গ্র্যান্টের সৈন্যদের বিরাট ক্ষতি হয়। একদিন নিজের শরীরে কমাণ্ডার গ্র্যান্ট দেখলেন- বিদ্রোহী সৈন্যরা আপোষ মীসাংসার শুভ্র ঝাণ্ডা উড়িয়ে দিয়েছে। এ আকস্মিক ঘটনায় গ্র্যান্টের উপর এমন প্রভাব পড়ল যে, চরম আগ্রহোদ্যমে ইজি চেয়ার ছেড়ে ছুটতে থাকেন। বিজয় নেশা এতই প্রবল ছিল যে, তিনি পা ব্যথার কথা একেবারে ভুলে গেলেন।
সানফ্রান্সকুতে যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল, তখন কয়েকজন মুখ ঝলসানো রোগী মুহূর্তের মধ্যে সেরে গেল এবং জীবন বাঁচানোর প্রবল ইচ্ছা তাদের ভেতর এমন শক্তি সঞ্চার করল যে, তারা নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে ছুটে পালাতে লাগল। বস্তুতঃ মানুষ নিজের আভ্যন্তরীণ শক্তি সম্পর্কে অবগত নয়। সে আদৌ জানে না, তার মাঝে এত শক্তি-ক্ষমতা এবং যোগ্যতার অথৈ সমুদ্র তরঙ্গায়িত হচ্ছে। কিন্তু আকস্মাৎ স্রোত এসে গেলে শক্তির সাগর উত্তাল হতে থাকে। নিস্তেজ ঢেউগুলো জোয়ার ভাটা হয়ে মানুষের হেফাযতের জন্য, তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। কেউ জানে না, পূর্বে এ শক্তি কোথায় লুকায়িত ছিল? আসলে মানুষের হৃদয়ের গহীনে এ শক্তি স্বপ্ননিদ্রায় সব সময় বিদ্যমান থাকে। মানুষ নিজেই তা জানে না। হঠাৎ সময় আসে। অজানা মনোবল যেখানে ঢেউ তোলে, সেখানেই এই শক্তি তরঙ্গায়িত হতে থাকে। কখনও কখনও লজ্জাকর ও ভীতিজনক বিপদ-আপদও সুযোগ মত অসাধারণ বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে দেখা যায়। যে ব্যক্তি অন্ধকারে যেতে ভয় পায়, সে-ও কয়েকবার স্রোতধ্বনি শুনে হাসতে হাসতে জীবন বাজি লাগিয়ে দেয়।
হাজারো মহিলা নিজের শারীরিক কষ্ট-ক্লেশ উপেক্ষা করে গৃহস্থলির কাজকর্ম যথারীতি করে যায়। কেননা সে জানে, যদি সে খাট-পালঙ্কে বসে থাকে তবে ঘরের পুরা ব্যবস্থাপনা বিনষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য সে নিয়মিত কাজে লেগে থাকে। কাজের ব্যস্ততায় সে নিজের কষ্ট-ক্লেশ ভুলে যায়। আর বাস্তবিকই তার শারীরিক কষ্ট এমনিতেই দূর হয়ে যায়। সে বলে বেড়ায়, আরে ভাই! আমাদের রোগ-শোকের সময় কোথায়? চিন্তাশক্তির দৃঢ়তার কারণে তার সাধারণ ক্লান্তি-শ্রান্তি ও কষ্ট এমনিতেই দূর হয়ে যায়। এতই শক্তিশালী চিন্তাধারার প্রভাব।