📄 মহিলাদের অনুভূতি শক্তি
এর মাধ্যমে তারা সংঘটিতব্য অবস্থা ও ঘটনা অবগত হতে সক্ষম হয়। এক মহিলা মনস্তত্ববিদ বলেন, আমি ১৯৪০ সাল থেকে আমার স্বামী ডাক্তার জোসাফ বি রাহায়েনের সঙ্গে কাজ করছি। প্রতিদিনই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ বহু লোকদের অসংখ্য আলামত ও তত্ত্ব আমরা পেয়ে থাকি। তন্মধ্যে অনেক বিস্ময়কর ও বিরল ধরনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আজ পর্যন্ত আমরা মানসিক ব্যাধিগ্রস্থ আট হাজার মানুষের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছি। যার মাঝে প্রায় ছয় হাজার মহিলা রোগী ছিল।
আমাদের নিয়ম হল, যেসব ব্যাপারগুলো মস্তিষ্ক বিকৃত লোক বা মানসিক বিকারগ্রন্থ লোকদের মাঝে লক্ষ্য করেছি অথবা যেগুলোর অন্তরালে বিশেষ কোনও ঘটনা কাজ করে না, আমরা সেসব ব্যাপারে একদম ভ্রুক্ষেপ করি না। সম্প্রতি আমরা সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞাতা লাভ করেছি। গড়ে প্রত্যেহ এ ধরনের দুটি পত্র পাচ্ছি, যাতে এরূপ অভিজ্ঞতার বর্ণনা থাকে, যা সাধারণ মানুষের মাঝে দুঃপ্রাপ্য বরং কোন মানসিক বিকারগ্রস্থ লোকের দ্বারা হয়ে থাকে। আপনারা শুনে বিস্মিত হবেন যে, এসব অসাধারণ অভিজ্ঞতার বাহক কেবলমাত্র মহিলাগণ। এ পত্রগুলো বুদ্ধিমত্তা ও একাগ্রতায় থাকে পরিপূর্ণ এবং এতে হয়রানী, পেরেশানী ও দুশ্চিন্তার প্রতিক্রিয়া ঝড়ে পড়ে।
"আমার স্বামী মনে করে, আমি বড় মাতাল ও পাগল। অথচ..। আমি আজ পর্যন্ত একথা কাউকে বলার সুযোগ করতে পারিনি।"
"আমি এ ব্যাপারে আমার স্বামীর সাথেও আজ পর্যন্ত এক শব্দ বলতে পারিনি। প্রথমেই তিনি আমাকে উপহাস করেন। আমি কি করব...!"
"আমি প্রায়ই ভাবি- এটা কিভাবে সম্ভব হল....?"
এসব এবং এ জাতীয় আরও অসংখ্য পত্র প্রত্যেহ আমার দৃষ্টিগোচর হয়। এই তো কদিন পূর্বে সম্ভ্রান্ত এক মহিলা মারাত্মক দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবস্থায় আমাকে পত্র লিখছেন। তার সারসংক্ষেপ নিম্নে তুলে ধরছি।
এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম- কেউ আমাদের ঘরের দরজায় জোরে কড়াঘাত করছে। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি- এক যুবক সাজানো ফুলঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি মোটেও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হইনি। আমি তার কাছ থেকে ঐ ফুলঝুড়িটা নিয়ে রান্নাঘরে গেলাম। সেখানে গিয়ে ফুলঝুড়িটা আমি একটি তাকে রাখলাম এবং বিছানায় বসে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে লাগলাম। এই ছিল আমার স্বপ্ন। এ বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখার তিন সপ্তাহ পরে হঠাৎ করে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়ে যায়। তখন এ দুনিয়ায় আমি একা-নিঃস্ব হয়ে যাই। আমার স্বামীকে কাফন-দাফন করার একদিন পর আমার ঘরের দরজায় কড়াঘাত হয়। আমি বাইরে বেরিয়ে দেখি- এক যুবক ফুলঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ এ ফুল আমার কাছে কোন কাজেরই ছিল না। কেননা তা আমার প্রিয়জনের খেদমতে পেশ করতে পারব না। তদুপরি ফুল গ্রহণ করতে অস্বীকার করলাম না। আমি তার কাছ থেকে ফুলঝুড়িটা নিয়ে রান্নাঘরে একটি তাকে রেখে দিলাম এবং বাস্তবিকই ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। তখন আমার স্মরণ হল, হুবহু এ ঘটনাই আমি ক'দিন পূর্বে স্বপ্নে দেখেছিলাম।
আমাদের বাস্তব ঘটনাগুলো একটা আরেকটা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কখনও কখনও এক মহিলা একত্রে দুই তিনটি ঘটনার সমাধান চেয়ে পত্র লেখেন। একথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, পুরুষের তুলনায় মহিলাগণ মনস্তত্ত্বের প্রতি বেশী আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। একটি সাধারণ বংশের অবস্থা-পরিবেশে যেখানে মহিলারা মনস্তত্ত্বের কথা আমভাবে প্রকাশ করে, সেখানে পুরুষগণ সাধারণতঃ সন্দিহান মেজাযের হয়ে থাকে। এর কারণ হতে পারে পুরুষদের কাছে সাধারণতঃ তার দৈনন্দিনের কাজকর্মে অধিকতর সত্যাশ্রয়ী, সত্যান্বেষী ও যৌক্তিক হওয়ার আশা করা হয়। পুরুষদের অবস্থা ও পরিবেশ নিখুঁত বাস্তবতার প্রতি স্বীয় দৃষ্টি নিবন্ধ রাখার দাবী করে। তাদের এই বিবেক গ্রাহ্য বিষয় পছন্দ করা এবং মানসিক ও কর্মব্যস্ততা তাদেরকে মনস্তত্ত্বের প্রতি আগ্রহী হওয়ার সুযোগ দেয় না।
অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের দুচারটি অসাধারণ অভিজ্ঞতাও হয়। কিন্তু জীবনের অনিবার্য কর্মব্যস্ততা তাকে বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার মত এতটুকু সময়-সুযোগ দেয় না। তাহলে কোন অভিজ্ঞ মনস্তাত্ত্বিকের সাথে পরামর্শ করার সুযোগ তাদের কোথায়? কিন্তু স্ত্রীকে এধরনের কঠিন সমস্যা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় না। তার তো শুধুমাত্র গৃহস্থলির ছোট-খাট কাজকর্ম ও সাধারণ ঘরোয়া দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে হয়। তারা ঘরে বসে বড় আরামের সাথে নিজের বান্ধবীদের নিয়ে চা-কফির পেয়ালায় চুমুকে চুমুকে উচ্ছসিত হয়। নিজের খোশ-গল্প ও কিচ্ছা-কাহিনী বলতে পারে। সাথে সাথে নিজের যাবতীয় ধ্যান-ধারনা, আগ্রহ-উদ্দীপনা, ঘটনাবলী, অভিজ্ঞতা, পরিদর্শিতা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। কিন্তু বেচারা পুরুষের এতটুকু সুযোগ কোথায়? এখানের জীবন তো দূর্গম ঘাটির নাম।
মনস্তত্ত্বের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বড় বড় ঘটনাবলি এবং সমস্যার সাথেই সম্পৃক্ত থাকা জরুরী নয়। প্রায় সময় নগন্য ঘটনার সাথেই এর সম্পর্ক থাকে। যেগুলোকে আমাদের জীবনে বিশেষ কোনও গুরুত্ব দেই না।
অনেক মায়েদের জানা আছে যে, তার সন্তানদের মাঝে কোনও এক সন্তান বিশেষতঃ মেয়ে তার অবস্থা, অভিজ্ঞা ও রুচি-মর্জি বুঝার বেলায় অন্যের তুলনায় অধিক যোগ্যতা রাখে। সে মায়ের চেহারা, আকার-আকৃতি দেখে মুহূর্তেই প্রকৃত কারণ বুঝে ফেলে। কিন্তু অন্যের ধারণায়ও সে কথা আসে না। অথচ সকল সন্তানই মায়ের কাছে প্রিয়।
বর্তমানে আমার চারটি সন্তান রয়েছে। এক ছেলে আর তিন মেয়ে। আমার ভাল করে স্বরণ আছে, বাটসী তখনও ছোট্ট শিশু। যখন আমি বুঝতে পেরেছি, বাটসী অন্য সন্তানদের তুলনায় আমার অনেক বেশি প্রিয়। সে খুব সহজেই আমার মন-মানসিকতা বুঝে ফেলে। অনেক সময় তাঁর নিষ্পাপ মুখ থেকে তাই বেরিয়ে আসে, যা সবে মাত্র আমার মাথায় এসেছে।
এক সকালে নাশতার টেবিলে আমরা নাশতা করছিলাম, এক টুকরা টুস তখনও টেবিলে পড়ে ছিল। প্রথমে আমার মন চাচ্ছিল, ওটাও আমি খেয়ে নেই। কিন্তু তারপর ভাবলাম- আগে থেকেই আমার ওযন দিনি দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমি খাবার থেকে হাত গুটিয়ে নিলাম। ঠিক তখনই বাটসী বলে উঠল- মাম্মী, আজকাল তুমি আগের চেয়ে বেশি মোটা হয়ে যাচ্ছ, তাই না? আরেক দিন আমি বাটসীর চুলগুচ্ছ চিরনী করছিলাম। তখন আমার মাথা থেকে একটি সংবাদ একেবারে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, যা সংবাদপত্রে পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়েছিল, হিন্দুস্তানের কিছু এলাকায় কিভাবে প্রসূতি মায়েদেরকে পৃথক কামরায় ফেলে রাখা হয়। যেখানে তাকে দেখা-শোনারও কেউ থাকে না। হঠাৎ করেই বাটসী আমার চিন্তায় দখল নিয়ে বলল- মাম্মী! আমার মনে হচ্ছে, এ মুহূর্তে দুনিয়ার কোনও প্রান্তে কোনও নবজাতক বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে।
একজন গৃহিনী নারী ও মা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, অনেক মহিলা নিজের জীবনের কিছু কিছু অসাধারণ অবস্থা ও ঘটনাকে শুধুমাত্র সাময়িক ও আকস্মিক ভেবে অবহেলা করেন। আমার গবেষণাগারের ডাইরীতে এধরনের সাধারণ ঘটনার পরিমাণ অসংখ্য। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে তা থেকে এমন চিত্র স্পষ্ট ফুটে ওঠে, যা মানুষের মন-মানসের জন্য একটি খুবই অসাধারণ শক্তির দর্শন স্বরূপ।
আমার এক ঘটনা স্মরণ হচ্ছে। একবার এক নববধূ গাড়ীতে আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্বামীকে সীমাহীন অসন্তুষ্ট করে ফেলেছিল। সবেমাত্র তাদের বিবাহের দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। তারা বাড়ির বাইরে বহু দূরে হানিমুনে ছিল। তখন এ নবদম্পতি ছোট একটি রেল স্টেশনের প্লাট ফরমে দাঁড়ানো ছিল। স্বামীর হাতে ঐ গাড়ীর দুটি টিকেট। কিন্তু হঠাৎ করে স্ত্রী গাড়ীতে চড়তে অস্বীকার করল। এ অসঙ্গত আচরণের জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার মত কোনও ভাষাও তার জানা ছিল না। শুধু এতটুকু বলল- কোনও অদৃশ্য শক্তি আমাকে গাড়ীতে চড়তে বাঁধা দিচ্ছে। মোটকথা, তারা গাড়ীতে চড়তে পারল না। মাত্র দু' ঘণ্টা পরে প্রতিটি মানুষের মুখে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল যে, ঐ গাড়ি এক দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এতে বিশজনের সলীল সমাধি হয়েছে। আর আহত হয়েছে সহস্রাধিক।
অন্য এক দম্পতি একবার নর্থ লেকরোলেনার ছোট্ট এক আবাসিক হোটেলে রাত্র যাপনের জন্য অবস্থান নিল। শোয়া মাত্র স্ত্রী এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখল। সে চমকে ওঠে স্বামীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলল- আমি এইমাত্র একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছি, আমাদের হোটেল এক বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। অতঃপর সে স্বামীকে পীড়াপীড়ি শুরু করে এবং ঘোর অন্ধকারের মাঝে এ দম্পতি হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। আপনারা বিস্মিত শুনে হবেন যে, কিছুক্ষণ পরে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলা বারুদ ভর্তি এক ট্রাক রাতের আধারে এই হোটেলের সাথে সংঘর্ষ খায়। তাতে হোটেলের নাম নিশানা পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠ হতে মুছে যায়।
অনেক সময় এমন হয়েছে যে, খবরের পাতায় যেসব দূর্ঘটনা, রেল দূর্ঘটনা, প্লেন দুর্ঘটনা অথবা হত্যার যেসব সংবাদ ছাপা হয়েছে, বিশোর্ধ্ব চিঠিপত্র আমরা এমন পেয়েছি, যাতে দাবী করা হয়েছে যে, তাদের ঐ সব ঘটনা সম্পর্কে পূর্বেই ধারণা হয়েছিল।
আমার এবং আমার স্বামীর এ ধরনের অসাধারণ ঘটনাবলির ব্যাপারে তখনই আগ্রহ জাগে, যখন আমি শিকাগো ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলাম। স্বাভাবিক অবস্থায় দৃষ্ট স্বপ্নগুলো ছাড়াও ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী লোকদের পারদর্শিতা ব্যুৎপত্তি প্রচলিত ভাষায় যেগুলোকে তাসাওউফ, উইজদান, স্বভাব বহির্ভূত, আধ্যাত্মিকতা বলা হয়, সেসব আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখনও কোনও মনস্তাত্ত্বিক এর কোনও আদিঅন্ত নির্ণয় করতে পারেনি। কিন্তু একথা স্বীকার করতে হবে যে, আজ থেকে অনেক পূর্বেই মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, মানুষ শুধুমাত্র হাড়-মাংসের তৈরী এক দেহের নাম নয় বরং তার উপরও কিছু রয়েছে। মানুষের রূহানী শক্তির দৃষ্টিভঙ্গি আদিকাল থেকেই দুনিয়ায় বিদ্যমান।
যাই হোক। কথা চলছিল মহিলাদের অনুভূতি শক্তি সম্পর্কে। এ বিষয়ে আরও কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা লক্ষ্য করুন। যেগুলো আমি স্বীয় ফাইল থেকে নকল করেছি।
এক মহিলা স্বপ্ন দেখল- সেনা বাহিনীতে কর্মরত তার যুবক ছেলে পুনরায় দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা হয়ে গেছে। মা ঐ বাচ্চাকে একটি সমুদ্রে ডুবতে এবং তাঁর লাশ পানিতে ভাসতে দেখলেন। তার চুলগুচ্ছ শিশুকালের চুলের মতই উজ্জল ও কোকড়া ছিল। মা কয়েক দিন পর্যন্ত দুশ্চিন্তা ও পেরেশানীতে কাটান। তিনি মনে মনে আল্লাহর কাছে বারবার প্রিয় ছেলের মঙ্গলের জন্য দু'আ করেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ছেলের পত্র হস্তগত হয়। তাতে লেখা ছিল- সে সামরিক মহড়ার সময় সমুদ্রে পড়ে যায় এবং ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু অন্যান্য সাথী-সঙ্গীরা তাকে অনেক কষ্টে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে। এভাবে সে প্রাণে বেঁচে যায়। যে রাতে মা ঐ ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছিলেন, হুবহু ঐ রাতেই ছেলেটি এ ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে।
নৌ বাহিনীতে কর্মরত এক কমান্ডারের স্ত্রী বিগত বিশ্বযুদ্ধের সময় একাধারে চৌদ্দরাত পর্যন্ত একই স্বপ্ন দেখতে থাকে। সে দেখে- তাঁর স্বামী বাড়ি ফিরার উদ্দেশ্যে প্লেনে চড়েছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ ঐ প্লেন ধ্বংস হয়ে যায়। সকল যাত্রী নিহত হয়। এ স্বপ্ন দেখার কয়েক মাস পরও এ অফিসারের স্ত্রীর মাথা থেকে স্বপ্নের প্রতিক্রিয়া বিদূরীত হল না। কিছু দিন পর তার স্বামী ছুটি নেয় এবং স্ত্রীকে টেলিফোনে খবর দেয়, সে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বিমান যোগে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু ভীত-সন্ত্রস্ত স্ত্রী তাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে প্লেনে সফরের পরিবর্তে ট্রেনে সফর করার উপর রাজি করে ফেলে। স্বামী বাধ্য হয়েই প্লেনের বুক করা সীট বাতিল করে দেয়। অনন্তর মুহূর্তেই বনের আগুনের মত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, প্লেনটি এক স্থানে টক্কর খেয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর কোনও যাত্রীই বাঁচতে পারেনি। এ তো ছিল মহিলাদের অকস্মাৎ ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞাতা। এখন পুরুষদের কথাও কিছুটা শুনে নিন।
একবার এক সৈনিক হাজার মাইল দূরে বসে সকাল দশটায় স্ত্রীকে চিঠি লিখার সময় গোলাপ ফুলের সুগন্ধি অনুভব করে। সেদিন ছিল রবিবার। পরে স্ত্রীর কাছ থেকে সে যে চিঠি পায় তাতে এ রহস্যের জট খুলে যায়। ঠিক ঐ মুহূর্তে স্ত্রী স্বামীর হেফাজতের উদ্দেশ্যে মান্নত করে তাদের নির্দিষ্ট পাদ্রীকে ফুলগুচ্ছ উপহার দিয়েছিল।
এক ছেলে ব্যবসার কাজে অন্য শহরে গেল। এক দিন অকারণেই হঠাৎ করে প্রচণ্ড পেট ব্যাথা শুরু হলে সে ডাক্তারের শরণাপন্ন হল। কিন্তু পেট ব্যাথার কোনও কারণ নির্ণয় করা গেল না। দ্বিতীয় দিন সে মায়ের চিঠি পেল। তাতে জানা গেল যে, ছেলে যখন পেট ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিল, হুবহু ঐ সময়ই তার মা ডাক্তার দিয়ে তার মাঁড়ীর দাঁত অপারেশন করিয়ে ছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ঘটনা। জার্জিয়ার এক স্কুল শিক্ষিকা সকালে নাস্তা করতে বসল। মাত্র সে এক লোকমা খেয়েছে। হঠাৎ করে ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে সে চিৎকার করতে লাগল যে, আমার বাগদত্তা এ মুহূর্তে বড়ই বিপদে আছেন। মনে হচ্ছে তার জাহাজ ফেটে সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সে তৎক্ষণাত রেডিও খুলে। তখন সংবাদ প্রচার হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ঘোষণা হয়, এই মাত্র সংবাদ পাওয়া গেছে যে, এক সামুদ্রিক জাহাজ শত্রু কবলিত হয়ে সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হয়। জাহাজ ফেটে গেছে। তবে নাবিকদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঐ জাহাজেই শিক্ষিকার বাগদত্তা সফর করছিল। পরে শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসা করা হয়- এমন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তিনি কিভাবে তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন? তখন সন্তুষ্টজনক কোনও উত্তর তিনি দিতে পারেন নি। শুধু এতটুকু বললেন- কোনও অদৃশ্য শক্তি আমার মনে একথা ঢেলে দিয়েছে।
অনুরূপ এক ঘটনার সম্মুখীন হোন ওয়াশিংটনের এক মহিলা। ঘটনার দিন সে রাতের খাবার প্রস্তুত করছিল। হঠাৎ করেই সে বলে উঠল- আমার বাবা ইন্তেকাল করেছেন। আমি তাকে চেয়ারে বসা দেখেছি। ঘরের লোকেরা তাকে বুঝাল, তোমার খামোকা সংশয় হচ্ছে। কিন্তু এক ঘণ্টা পরেই ফোন আসে- তার বাবা চেয়ারে বসা অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন।
📄 সিদ্ধান্ত ক্ষমতা ও আধুনিক বিজ্ঞান
মুসলমান যখন দুনিয়াবী কিংবা আখেরাতের কোনও ইতিবাচক, স্থায়ী ও চিরন্তন কাজ করতে চায়, তখন সমাধা করে ফেলে। সে কখনও নিষ্ফল বা অকৃতকার্য হয় না। ইসলামী জীবনের হাজারও ঘটনা এর সত্যায়ন করে।
খয়বারের ইয়াহুদী দূর্গ বিজিত হচ্ছে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এর নেক দু'আ ও আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে হযরত আলী রাযি. চূড়ান্ত দৃঢ়তার সাথে ঐ দূর্গের ফটক উপড়িয়ে স্বজোরে নিক্ষেপ করেন। পরবর্তীতে তা চল্লিশজন মিলে উঠিয়ে এনে মেরামত করে। মারহাবের মত শক্তিশালী মানুষ প্রতিপক্ষ ছিল। যার খাবার কয়েক বকরি এবং অসংখ্য শক্তিশালী দ্রব্য আর অপর দিকে হযরত আলী রাযি. যিনি যথসামান্য খেতেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই বিজয় গৌরব অর্জন করেন।
একবার কাফির সৈন্যদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য হযরত হুযাইফা রাযি. কে রাসূলুল্লাহ গোয়েন্দা হিসেবে প্রেরণ করলেন। তখন বাইরে প্রচণ্ড শীত। অস্বচ্ছলতার কারণে পরিপূর্ণ কাপড়ও ছিল না। কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়তা, দুঃসাহস ও সিদ্ধান্তের সাথে তিনি অর্পিত দায়িত্ব পূর্ণ করে ফিরে আসেন। মুসলমানদের জীবনে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা কখনও হতাশা ও পরাজয়কে কাছে ভীড়তে দেননি।
১০৫ হিজরী সনে যখন মহামারী দেখা দিল তখন মুহাম্মদ বিন কাতাদাহ নামের সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল জনৈক ব্যক্তি যে বিস্ময়কর অভূতপূর্ব কাজ করলেন, সে সম্পর্কে জনৈক সমাজবিদ বলেন-
"চর্তুদিকে মহামারী ছড়িয়ে পড়লে প্রায় হাজারের কাছাকাছি লোক প্রাণ হারাতে বসে। গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যায়। তারপরও তিনি নিজের দৃঢ় মনোবল হারাননি বরং তিনি যথারীতি দুনিয়াবী কাজ কারবার করতে থাকেন। এমনকি রোগীদের সেবা-শুশ্রুষাকে নিজের দায়িত্ব মনে করে নিয়মিত মেহনত ও পরিশ্রম করে যান। অবশেষে যখন মহামারী দূর হয়ে যায় তখন গোটা হিজাযে কেবল তিনি একাই সম্পদশালী ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তার এ খ্যাতি ও সম্মান লাভের একমাত্র কারণ নতিস্বীকার না করা এবং পরাজয় মেনে না নেওয়া। নিজের মন-মানসকে কোনও সংকীর্ণতায় না ফেলা। যথারীতি মেহনত ও পরিশ্রম করে যাওয়া"। (মাহনামা-আলহাকীম)
📄 মীমাংসা কারী ঝোঁক শক্তি সৃষ্টি করে
"মীমাংসা কারী ঝোঁক" হল বাস্তবতার বিকাশ বা বিবরণ। জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের লক্ষ্যে যাকে উজ্জ্বল শক্তির পথ তৈরীর জন্য সতর্কতার সাথে ব্যবহার করা হয়। যে ব্যক্তি মনে করে আমি করতে পারব, সে-ই কিছু করতে পারে। দুনিয়া কেবল দৃঢ়চিত্ত মানুষের জন্য পথ খুলে দেয়। অন্যদের জন্য সে পথিমধ্যে এমন কাটা বিছিয়ে দেয়, যাতে সে পা ফসকে নির্মমভাবে নিপতিত হয়। ইমারসন বলেন- “দৃঢ় সংকল্প ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোনও গ্রহ-নক্ষত্রে পর্যন্ত পায়ে হেঁটে পৌছার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু যারা হীনমন্যতায় দ্বিধাদ্বন্ধে ঘুরপাক খায়, তারা কখনও উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে না। আত্মনির্ভরতা কর্মসম্পাদনের উৎসমূল। এতে যোগ্যতায় শক্তি সঞ্চার হয়। তা দৃঢ়তর হয় এবং মানসিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আপনার ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনার সতেজতা ও প্রখরতা শুধুমাত্র আপনার চিন্তা-চেতনা থেকেই লাভ হয়। আপনার দৃঢ়তা থেকেই তাতে ভারসাম্য আসে। আত্মবিশ্বাস থেকেই তাতে শক্তি সঞ্চার হয়। এ যোগ্যতা যদি দুর্বল থাকে, তবে আপনার চিন্তা-চেতনাও দুর্বল থাকবে। আর আপনার কাজকর্ম হবে বেকার। কেউ দৃঢ়চিত্ত ও বিচক্ষণ হলে তাকে রূখে রাখে কে? সে সর্বদিক দিয়ে উচ্চ শিখরে থাকে। যে কোন দিক থেকে পরিবর্তন হতে পারে। গঙ্গা গেলে তবে গঙ্গারাম, যমুনা গেলে যমুনাদাস। সে যদি কোনও পথ নির্ণয় করতে চায়, তাহলে তার এ ইচ্ছাও এতটাই দুর্বল হয় যে, প্রথম বাঁধা আসতেই সে হাতিয়ার ফেলে দেয়। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সে সর্বদা নিজের প্রতিপক্ষ এবং এমন লোকদের করুণার পাত্র হয়ে থাকে, যারা তার সাথে এক মত নয়। এমন মানুষ খুব দ্রুত বদলে যায়। তার উপর ভরসা করা যায় না। তার মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের শক্তি থাকে না। তার কোনও সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ সুচিন্তিত ও সুষ্ঠু হয় না।
যুবক যদি দৃঢ় সংকল্পের শক্তি বুঝে অর্থাৎ সে যা হতে চাচ্ছে, হতে পারবে। যে জন্য প্রচেষ্টা করে, তা সে করতে পারে। তাহলে তার জীবনে বিরাট এক বিপ্লব ঘটবে। সে নিজের মারাত্মক ক্ষয়-ক্ষতি এবং দুঃখ-কষ্ট থেকে বেঁচে যাবে। নীরব নিভৃতে বসে যে স্বপ্ন দেখত, জীবনের ঐ উচ্চাসনে সে পৌঁছে যাবে। আমরা সব সময় দৃঢ়চিত্ত, সংকল্প শক্তির কথা বলি। এটিই বাস্তবতায় এলে অটল সিদ্ধান্ত ক্ষমতার রূপ লাভ করে। ইচ্ছা কোন কাজ করার ব্যাপারে অটল সিদ্ধান্ত এবং কোন কাজ করার উপর নিজের যোগ্যতার ব্যাপারে দৃঢ়চিত্ততা একই কথা। কোন মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত কিছু করতে সক্ষম হয় না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার হাতে নেওয়া কাজের ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার উপর আস্থা-বিশ্বাস এবং সংকল্প না হবে। যাদের নিজের কাজকর্ম ও উদ্দেশ্যের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস আছে। মনে করে, আমার সামনে যে কাজ রয়েছে, তা আমি করতে পারব। যে সকল বাঁধা বিপত্তি আমার পথ রূখে দাঁড়াবে, অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হলেও তা অতিক্রম করার শক্তিবল আমার আছে। এসব মানুষের পিছপা হওয়া প্রায় অসম্ভব। সফলকাম হওয়ার যথারীতি ভরসা, সিদ্ধান্ত এবং আমাদের এমন দৃঢ় মনোবল আমাদেরকে যাবতীয় বিপদ থেকে উদ্ধার করে দূর্ভাগ্য নিয়ে মুচকি হাসে। কর্মসম্পাদনের যোগ্যতা সুদৃঢ় করে। আমাদের জন্মগত যোগ্যতা ও শক্তিকে শাণিত করে।
নিজের যোগ্যতা ও সিদ্ধান্ত ক্ষমতা দৃঢ় আস্থা বৃদ্ধি করে। মানুষ যখন অসঙ্গত কঠিন অবস্থায় পড়ে ঘাবড়ে যায় তখন যদি সে ভাবে, আমি এটা অবশ্যই করব, আমি তা করতে পারি তবে তার যোগ্যতা ও কার্যক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস তো বাড়বেই, সাথে সাথে সামনে দণ্ডায়মান বিরোধীশক্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে। যেসব জিনিস গঠনমূলক ইচ্ছাকে শক্তিশালী করে, সে সব জিনিস তার বিরোধী হতাশা ব্যঞ্জক বিষয়গুলোও দুর্বল করে দেয়।
কোনও মানুষ বড় বড় কাজ তখনই করতে পারে, যখন তার মন-মস্তিষ্ক নতুন আবিষ্কার ও সৃষ্টিশীলতার চিন্তায় আচ্ছন্ন থাকে। নিষ্প্রাণ ও নিষ্প্রভ লোক কখনও কিছুই করতে পারে না। ভরসাতেই বড় বড় কাজ হয়ে থাকে। সৃষ্টিশীলতা, পরিশ্রম, আক্রমাণাত্মক যোগ্যতাই আগে বাড়ানোর যোগ্যতা। এ যোগ্যতা ও শক্তি প্রয়োগের জন্য মন-মস্তিষ্কও তেমনই হওয়া বাঞ্ছনীয়। যার মাঝে এ যোগ্যতা নেই সে কখনও নেতা কিংবা স্বাধীন চেতা হতে পারে না। সে সব সময় অন্যের সেবাদাস ও লেজুড় হয়ে থাকবে। প্রতিছায়া ও পরাশ্রয় হয়ে জীবন-যাপন করবে। অনুকরণ করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মাধ্যমে পশ্চাদপদ হওয়ার পরিবর্তে সাহসিকতার সাথে সামনে অগ্রসর হওয়ার মত মানসিক অবস্থায় না পৌছাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার এ অবস্থাই বলবৎ থাকবে। এমতাবস্থায় মন-মগজ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারী ও আগ্রহী হতে পারে।
আপনি দুনিয়ায় কিছু হতে চাইলে এক মুহূর্তের জন্যও মনে এ ধারণা আসতে দেবেন না যে, আমি সংকীর্ণতায় বা চাপে পড়েছি। আমি অন্য লোকদের তুলনায় হতভাগ্য। পূর্ণশক্তির সাথে এমন ধ্যান-ধারণার মোকাবেলা করে চলুন। মনে যেন চিন্তা-ভাবনা উদয়ই না হতে পারে। নিজেকে এমনভাবে তৈরী করবেন, দুর্বলতা যাতে আপনার ধ্যান- ধারণার বিষয় বস্তুই হতে না পারে। আদৌ ভাববেন না যে, আমি অকর্মা; অন্যরা যে কাজ করতে পারে আমি তা করতে পারি না। আমার মাঝে কোনও শক্তি ও যোগ্যতা নেই। দুনিয়ায় আমাকে নিম্নস্তরে থেকেই প্রশান্ত ও পরিতৃপ্ত হতে হবে। সকল সংশয়-সন্দেহকে এমনভাবে পদদলিত করুন, যেরূপভাবে আপনার জীবনের হুমকিগুলো পদদলিত করে থাকেন। নিজের দরিদ্রতা বা দূর্ভাগ্যের কথা কখনও বলবেন না, ভাববেনও না এবং লিখবেও না। যেসব ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-ভাবনা আপনার জীবনকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে, নিস্তেজ করে দেয়, আপনাকে অন্ধকারে নিয়ে যায়, সেগুলোর মূলোৎপাটন করুন।
মৃত্যুর ভূত আছে। এর স্রষ্টা আপনি নিজেই। আল্লাহ তা'আলা এটা সৃষ্টি করেন নি। তার এমন কোনও শক্তিও নেই যে, তা এমনিতেই সৃষ্টি হবে। আপনার মনে প্রবেশ করবে এবং আপনাকে দুশ্চিন্তাগ্রন্থ করবে। আল্লাহ তা'আলা আপনাকে হাসি-খুশির জন্য সৃষ্টি করেছেন। আপনি তাঁর মহান সৃষ্টিজীব। অবস্থা ও পরিস্থিতির উপর বিজয় গৌরব অর্জন করার জন্য তিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। একথা ভালোভাবে বুঝে নিন এবং যথারীতি মনে মনে আওড়াতে থাকুন যে, কুদরত কাউকে তুচ্ছ, অযোগ্য এবং অসহায় বানায় নি। জীবন সংগ্রামে লড়ার জন্য আপনাকেও কারও থেকে কম সম্বল দেন নি। স্বয়ং আপনি নিজেকে কুণ্ঠাসা ও সীমাবদ্ধ করে রেখেছেন। এ নিখুঁত বাস্তবতা আপনাকে মনে গেঁথে নিতে হবে। সূর্যের সীমাহীন আলো আপনার জন্য খোলা পড়ে আছে। আপনি নিজেই ঘর বানিয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে রেখেছেন। মোটা কালো পর্দা ঝুলিয়ে রেখেছেন। একবার পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে দেখুন। আজই এ মুহূর্তে দৃঢ় সংকল্প করে নিন যে, আমি আশাবাদি হব। আমার ভিতর হতাশা নিরাশার নাম-চিহ্নও থাকবে না। সে ভাবনাও হবে না। বিশ্বাস রাখুন, অবশেষে ন্যায় ও ইনসাফেরই জয় হবে। বাহ্যতঃ ভিন্ন কিছু প্রকাশ পেলেও শেষ বিজয় তো সত্যেরই হয়। গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন! জানবেন, প্রতি মুহূর্তে ইনসাফ ও সত্যেরই বিজয় হচ্ছে।
এ নিখুঁত বাস্তবতা মনের ভেতর বদ্ধমূল করে নিন। বারবার ব্যক্ত করুন, আমি সৌভাগ্যশীল লোকদের একজন। নিজেকে মুবারকবাদ দিন যে, আপনি যথাসময় যথাস্থানে সৃষ্টি হয়েছেন। আপনার কাছে নির্ধারিত কাজ রয়েছে, তা অপর কেউ করতে পারে না। আপনি দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান ব্যক্তি। কেননা আপনি এ সময়-সুযোগ পেয়েছেন। এ সুস্থতা ও প্রশিক্ষণ আপনার আছে যে, কাজটি আপনি অবশ্যই সমাধা করতে পারবেন।
আপনি যদি বেকার ও দরিদ্র হোন তবে মনকে সাহস ও আগ্রহ-উদ্যমে ভরে দিন। হারানো ও হতদরিদ্রের যাবতীয় চিন্তা-ভাবনা ভেতর থেকে বাইরে নিক্ষেপ করুন। মনের কোনে ধনাট্যতা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ ও সব রকমের ভাল জিনিসের প্রতিচ্ছবি অংকন করুন। আপনার জন্য এসব জিনিস পেশ করা কুদরতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ধর্মীয় বই-পুস্তক অধ্যয়ণ করলে তাতে কুদরতের এই অভিপ্রায়ের আলোচনা পাবেন। আপনি দরিদ্রতার কারণে দুঃখী বা হতভাগ্য এ কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করুন। কেননা অকাট্য সত্য যে, আপনি ভাগ্যবান সম্পদশালী, সুখী-স্বাচ্ছন্দ, বিরাট ক্ষমতাধর। অবশ্যই আপনার সফলতা আসবে। নিঃসন্দেহে এসব আপনার জন্মগত অধিকার। এমন চিন্তা-ভাবনা জাগ্রত হতেই আপনি সফলকাম হবেন। আপনাকে বাঁধা দেওয়ার ক্ষমতা ও হিম্মত কার?
এ মানুষকে আল্লাহ তা'আলা নিজের কুদরতী রূপে বানিয়েছেন। হে বাহাদুর মানুষ! বারবার চিন্তা-ফিকির কর এবং বিশ্বাস রাখ, যে কুদরত তোমার মনে কিছু হওয়া বা করার আগ্রহ রেখেছেন, তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ বাসনাগুলো পূরণ করার যোগ্যতা এবং সুযোগও তোমাকে দান করেছেন। চক্ষু খুলে দেখ, তা সামনে, পেছনে, ডানে, বামে সর্বত্রই বিদ্যমান। কোথাও এর কমতি নেই। তা অসীম, অসংখ্য। প্রয়োজন শুধু তোমার সজাগ হওয়ার, দেখার, আত্মনির্ভর হওয়ার, কর্মঠ হওয়ার। যখন আপনি কাজে বের হবেন তখন চতুর্দিকে বিজয় গান শুরু হবে। আপনার ভেতর বাইর এমনভাবে তৈরী করুন, যেন তা সফলতার পয়গাম শোনায়। আপনার আচার আচরণ বলা-চলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ, একথায় আপনার প্রত্যেকটি কাজ সফলতার মুখ দেখবে। সফলতার শ্লোগানে মুখরিত হবে। নিজেকে নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশে আবদ্ধ রাখুন এবং নিয়মত্রান্ত্রিক জীবন যাপন করুন। আশা ও বিশ্বাস রাখবেন, আপনার বিস্ময়কর ফায়দা হবে। সকালে ঘর থেকে উঠলে সারা দিনের কাজকর্ম আপনার সামনে থাকবে। আপনার মন সফলতা, খুশি ও কাজকর্ম করার ইচ্ছায় পরিপূর্ণ থাকুক -এজন্য আপনি কোনও বাক্য বা কোন পয়গাম মনে মনে বারবার আবৃত্তি করতে কিংবা অন্য কোনও উপায়ও অবলম্বন করতে পারেন। আপনি যদি এভাবে দিনের সূচনা করেন, তাহলে দেখবেন, আপনি পূর্ণ দিনের কাজকর্মে কোন বাঁধা বিঘ্ন বা বিষ-বাষ্পের সম্মুখীন হবেন না। আর যে বাঁধা-বিঘ্ন আসবে, তাও আপনার কাজে সাহায্যকারী হয়ে যাবে। যদি কোনও বিশেষ কাজ করতে গিয়ে নিজের যোগ্যতা ও ক্ষমতার উপর সংশয় হয়, তাহলে নিজেকে সুশৃঙ্খল করবেন এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে আগ্রহকে যথারীতি বলবৎ রাখবেন।
সংশয়-সন্দেহ কেবলই মিথ্যা জিনিস এবং আপনার মনের দুর্বলতা মাত্র। একে দূরে নিক্ষেপ করুন। তখন আপনার নিজের যোগ্যতার উপর আস্থা এসে যাবে। নিজেকে চিনুন, বুঝুন। শক্তি ও ক্ষমতার বিরাট ভাণ্ডার আপনার মাঝে লুকিয়ে আছে। নিজের গুরুত্ব উপলব্ধি করুন। এর উপর যথারীতি দৃষ্টি নিবন্ধ রাখুন এবং সামনে অগ্রসর হতে থাকুন। আপনাকে কেউ দমাতে পারবে না। নিজের সুপ্ত শক্তি ও প্রতিভা চেনার নামই তা অর্জন করা। আড়মোড়া দিয়ে উঠুন, আপনি ক্ষমতাধর, শক্তিশালী, বীর বিক্রম। এসবের গুরুত্ব উপলব্ধি করুন, বিজয় আপনার পদচুম্বন করবে।
আপনার পরিস্কার অনুমিত হবে যে, এ ধ্যান-ধারণা, মানদণ্ড এবং অদম্য স্পৃহা আপনার জীবনের পুরো দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে। আপনি বিপদ-আপদ অতিক্রম করে নতুন আদর্শ ও তরীকা তৈরী করবেন। আপনার জীবনে নতুনত্ব আসবে। সব সময় এ ধরনের আগ্রহ-উদ্যম অবস্থা ও পরিস্থিতির সাথে পূর্ণাঙ্গ ভারসাম্য সৃষ্টি করে দেয়। অসঙ্গত কোনও দূরাবস্থা আর টিকে থাকে না। এ ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা বাস্তব সত্য বরং উপলব্ধি অপেক্ষাও শক্তিশালী। তা আপনাকে প্রশান্ত ও খুশি রাখবে। এটা সুস্থতাকে অধিকতর স্থায়ী করে। এর মাধ্যমে আপনার ব্যক্তিত্ব ও সত্ত্বা গঠনে সাহায্য পাবেন। আপনার মন-মস্তিস্ক সীমাহীন সতেজ ও প্রফুল্ল থাকবে। চিন্তা-ধারা তীক্ষ্ণ ও শক্তিশালী হবে। মন-মস্তিস্ক স্বচ্ছ, নির্মল রাখতে পারলে এমনিতেই উঁচু শক্তিশালী চিন্তা-চেতনা ও সঠিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায়। আপনার মাঝে যদি যোগ্যতার কোন ঘাটতি থাকে, তবে আপনি এ সীমাংসাকারী কীমিয়া বা রসায়নিক পদ্ধতি দ্বারা তা পূরণ করতে পারেন। যদি আপনার মেজাযে অলসতা থাকে (সাধারণতঃ অনেকেরই হয়ে থাকে) তাহলে নিজের যোগ্যতা ও আগ্রহকে শাণিত করতে পারেন। বারবার নিজের আত্মিক বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য করুন, তা সম্পূর্ণ স্বাধীন, আগ্রহ-উদ্দমী, তাকে কেউ ক্ষতি করতে পারে না। এ বাস্তবতা সব সময় দেখুন, মনে গেঁথে রাখুন এবং বারবার আবৃত্তি করুন। আপনি বিচক্ষণতার সাথে চিন্তা করলেই বুঝবেন, মানুষের ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ার কারণ হল, সে এ মহান কুদরতের অভিপ্রায় বিশ্বাস করে না। একবার চিন্তার সাথে ভাবলে নিজের ভয়ের উপর নিজেরই হাসি আসবে।
এ মহান কুদরতের উপর ভরসা রাখুন। এত বিশাল বিস্তৃত সীমাহীন জগতকে তিনি স্থির রেখেছেন। আর মানুষ তারই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি -এর উপর বিশ্বাস রাখুন। ভয়-ভীতি এমনিতেই উধাও হয়ে যাবে, এমনকি তা কাছেও আসতে পারবে না।
আপনি যদি এ বাস্তবতা ও নিখুঁত সত্য গ্রহণ করেন যে, এ সৃষ্টি জগত একটি বিশাল প্রকল্প। আর আপনি তার রূপকার, সাহসী সুযোগ্য কর্মচারী। তাহলে আপনি খুশি ও নিশ্চিন্ত অবাধ জীবনের পথে অগ্রসর হতে থাকবেন। আপনার মনে হবে, এ মহান প্রকল্প-প্লানের উল্টো যা কিছু রয়েছে সবই মিথ্যা, সংশয়-সন্দেহজনক, দুর্বল মনের ভাবনা। এ বাস্তবতা ঐ মিছে ভয় বিদূরীত করে দেয়। মানুষের ভেতর বিরাট সাহস, যোগ্যতা ও আগ্রহ সৃষ্টি করে। তাই মনে যখনই ভয়-ভীতি আসবে তখনই বলবেন- আমি বীর বাহাদুর। সম্পূর্ণ স্বনির্ভর মানুষ, আল্লাহ তা'আলার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ভয়-ভীতি একটি সংশয়-সন্দেহ মাত্র। ভয়ের কোনও কারণ নেই।
কেননা আল্লাহ তা'আলার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্তের বাইরে জগতে কিছুই হতে পারে না। একটি পাতাও নড়তে পারে না। কাজেই ভয়-ভীতি মিথ্যে। সংশয়-সন্দেহ অমূলক। ভয়-ভীতি অস্থিতিশীলতার উপর সীমাবদ্ধ। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে, বিশাল জগতের স্রষ্টা, কুদরত ও আল্লাহ তা'আলা তাকে নিজ হেফাজতে রেখেছেন। ভয়-ভীতির কোনও বাস্তবতা নেই। ইমারসন এ নিখুঁত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই বলেছেন- ইচ্ছা বা সংকল্পের দ্বার আমাকে যথারীতি শক্তি দিয়েছে। নিজের মনে এমন কোনও খেয়াল মুহূর্তের জন্যও আসতে দেবেন না, যা আপনার জীবন ও লক্ষ্য বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রাখে না। হতাশা, নেতিবাচক খেয়ালকে একেবারে মনে স্থান দিবেন না। এসব তুচ্ছ খেয়াল আপনার মনে এমনিতেই আসবে না, যদি আশাব্যঞ্জক বিশ্বাসের খেয়াল ও চিন্তা-চেতনায় মন পরিপূর্ণ থাকে এবং মুহূর্তের জন্যও তা থেকে খালি না থাকে। জযবা ও আগ্রহ ব্যঞ্জক ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনায় পরিপূর্ণ থাকলে অনীহা ও অনাগ্রহের চিন্তা-চেতনার স্থান ও সময়ই কোথায়? কাজেই নিজের মন সব সময় উত্তম ও ভালো চিন্তায় ভরে রাখুন। যাতে কোন ভ্রান্ত, খারাপ বা অনাগ্রহপূর্ণ কোনও খেয়ালই সেখানে প্রবেশ করতে না পারে বরং পুনঃফিরে আসে। যখন আগ্রহ হ্রাস পাবে তখন মহামনীষীদের জীবন কাহিনী মনে মনে আবৃত্তি করুন। মহিয়সী নারীদের বড়ত্বের দিকে নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখুন। তাহলে আগ্রহ-উদ্দীপনার আলোকরশ্মির বিশাল সমুদ্র তরঙ্গায়িত হতে থাকবে। জীবন অর্ধেক বিজয় তো শুধুমাত্র চিন্তা-চেতনা ও উপলব্ধির মাধ্যমেই হয়ে যায়। আর বাকী অর্ধেকের পূর্ণতার জন্য কাজ করতে হয়।
আপনার মনে বড় বড় স্বপ্ন থাকবে। কারও কারও মনে থাকে না। কুদরতের মহান সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ জীবের মনে স্বপ্ন থাকাই উচিৎ। ঐ স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহ তা'আলা এ জীবন দান করেছেন। কাজেই সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করুন। কিন্তু মেহনতের পূর্বে সুস্থ মন-মানসিকতা অতিব জরুরী। আর মন মানসিকতা তখনই সুস্থ থাকে, যখন মানুষের নিজের শারীরিক দক্ষতা অর্জন হয়ে যায়। মানুষ প্রতি মুহূর্ত যদি মনকে এ বাস্তবতার উপর অটল রাখে যে, আমার শক্তি অসীম, অফুরন্ত, সীমাহীন। প্রভাত হয়েছে, উঠুন। আজকের প্রোগ্রাম-পরিকল্পনা তৈরী করুন। কাজের পথে অগ্রসর হন, পথ সবার জন্য উন্মুক্ত। যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলবে, সে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। যে নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়ে থাকবে, সে ধুকে ধুকে মরবে।
হে মানুষ! উঠ। নিজেকে চিন। পথ দীর্ঘ। কিন্তু গন্তব্যে তোমার স্বপ্নের মনোরম শহর প্রস্তুত রয়েছে। যেখানে আছে সুখ। জীবনের পথে অগ্রসর হয়ে নিজের শক্তিশালী অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখ। তোমার কাছে আসবাবপত্রের কমতি নেই। আসবাব পত্রের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা করে কুদরত তোমার সাথেই আছে। বিশ্বাস রাখ। মেহনত কর। যদি তুমি নিজের অস্তিত্ব চিনতে পার তবে নিজের সুন্দর স্বপ্নগুলো এবং অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে সক্ষম হবে। বিরাট সুখ-স্বাচ্ছন্দের স্বাদ অনুভব করবে। এ বিশ্বাস প্রতিটি পদক্ষেপই বড় সুখকর করে দেবে।
📄 অন্যের উপর আত্মনির্ভরতার প্রভাব
আপনার ধ্যান-ধারণার মাধ্যমে ভাগ্যের উপর জয়লাভ করতে পারেন। যদি আপনি বুঝেন, মানুষের ভাগ্যগঠনের পিছনে শুধু মাত্রই চিন্তা-চেতনাই একটি মাধ্যম, তাহলে হাতে তরবারী নেওয়ার প্রয়োজন আপনার হবে না। চিন্তা যেমন হবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফলাফল তদানুরূপে হবে। আমাদের মাঝে কতটুকু আগ্রহপূর্ণ যোগ্যতা আছে, কতটুকু আত্মনির্ভরতা আছে, সফলতা এর মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যরা আমাদের উপর কতটুকু ভরসা করে এটা সফলতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু আমাদের উপর অন্যের আস্থা থাকা বিশেষভাবে আমাদের আত্মবিশ্বাসের সাথে জড়িত। তাদের উপর আমাদের ব্যক্তিত্বের প্রভাব রয়েছে। কাজেই আমাদের মনের গতিই এমন মাধ্যম, যার দ্বারা আমরা অন্যের আস্থা অর্জন করতে পারি। আপনার আগ্রহপূর্ণ স্বীয় যোগ্যতাই আক্রমণাত্মক। যাদের সাথে সম্পর্ক আছে, আপনার আগমন তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষতঃ তাদের উপর কর্তৃত্ববান হওয়া আপনার জন্য জরুরী। চাই উস্তাদরূপে বা বক্তারূপে বা এটর্নি বা সেলসম্যান রূপে বা আশাবাদী কিংবা অন্য কোনও রূপে।
আপনি যদি নিজের ব্যক্তিত্বের আত্মবিশ্বাসে পরিবেষ্টিত থাকেন তবে তা অন্যদের উপর যাদুর মত প্রভাব বিস্তার করবে। তাদেরকে যদি নিজের ভক্ত বানানোর চেষ্টা করেন তবে বিস্মিত হবেন যে, কত দ্রুত তা অন্যদের ভিতর প্রবেশ করে এবং আপনি যে কাজ হাতে নেন, তখন তাদের এ বিশ্বাস হয়ে যায় এবং চূড়ান্ত হয়ে যায় যে, আপনি তা সমাধা করতে পারবেন। এটাই ঐ যোগ্যতা, যার মাধ্যমে মানুষের ইজ্জত-সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্বস্ততা তৈরী হয়। যে ব্যক্তি কোনও কাজ হাতে নিলে তা সমাধান করার ব্যাপারে নিজ যোগ্যতার উপর বিশ্বাসী হয়ে যায়, সে মানুষ সৃষ্টিগত যোগ্যতা সম্পন্ন ও আদর্শ চরিত্র হয়ে যায়। যখন কোনও মানুষ কর্তৃত্বের জন্য অনুভব করে যে, এটা আমার দখলিত এলাকা, তখন তার কথাবার্তায় আত্মনির্ভরতা ফুটে ওঠে। তার ব্যক্তিত্বের বিশ্বাস ও মজবুত ইচ্ছার আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। অন্যের মনে সৃষ্ট সংশয়-সন্দেহের উপর সে জয়লাভ করে। কেননা তাদের উপর তার আত্মবিশ্বাসের প্রভাব পড়ে। তার মান-মর্যাদা, বড়ত্ব, ও মাহাত্ম দেখে অন্যদের বিশ্বাস হয়ে যায় যে, এ ব্যক্তির মাঝে সফলকাম হওয়ার যোগ্যতা আছে। মানুষেরা এ ব্যক্তির উপর ভরসা করে।
যে জড় এবং দ্বিধা-বিভক্ত হয় না, যে কাজ করে দেখায়, দুনিয়ার সব জিনিসেই তার সঙ্গ দেয়। সে জানে, যারা দুর্বল আত্মবিশ্বাসী লোকের বিরোধিতা করে তারা এমন লোকের পরিকল্পনায় সেচ্ছাসেবী হয়ে যায়। যেসব বিষয় সাধারণ আত্মবিশ্বাসী লোকদের আগ্রহ-উদ্যম হ্রাস করে দেয়, সেসব বিষয়েই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী লোকের উন্নতির পথে সহযোগী হয়। এ দুনিয়ায় মানুষ সাধারণতঃ উপরে আরোহী বা উন্নয়নশীল ব্যক্তির সাহায্য করে। তার বিজয়ে শ্লোগান তোলে। আর পরাস্ত ও অধঃপতিত লোকদেরকে খোঁচা দেয়। কোনও ব্যক্তির যদি নিজের উপর বিশ্বাস না থাকে, তবে দুনিয়াবাসীরও তার উপর আস্থা-বিশ্বাস থাকে না। নিজের উপর যার আস্থা ও বিশ্বাস আছে, আমরা তার প্রশংসা না করে পারি না। ঠাট্টা করে কথা বলে, ব্যঙ্গ করে কিংবা সমালোচনা করে তাকে নিচে নামানো যায় না। দরিদ্রতা তাকে হীন মনোবল করতে পারে না। দুর্ভাগ্য তাকে দ্বিধা-বিভক্ত করতে পারে না। বিপদ-আপদ, কষ্ট-ক্লেশ তাকে নিজের পথ থেকে বিন্দুমাত্র সরাতে পারে না।
মজবুত হিম্মতের মানুষ, ইস্পাত কঠিন সংকল্পের মানুষ তো আক্রমণ শুরু হওয়ার পূর্বেই অর্ধেক যুদ্ধ জয় করে ফেলে। আমি এমন এক ব্যক্তিকে চিনি, যে কোনও কাজ হাতে নিলে তা সমাধা করে ছাড়ে এবং সে প্রসংশাযোগ্য সফলকাম হতে থাকে। কেননা সে কখনও ইতঃস্ততা করে না পশ্চাদপদ হয় না। কোনও কাজ করার সময় তার নিজের যোগ্যতার উপর সংশয়-সন্দেহ হয় না। তার আত্মবিশ্বাস কখনও কখনও গোয়ার্তুমি পর্যন্ত চলে যায়। এতে কেউ কেউ অসন্তুষ্টও হয়। কিন্তু তারাও এ লোকের সামনে নিজেকে অক্ষম মনে করে। পক্ষান্তরে এ লোকের বিপরীত এমন কিছু লোকও দেখেছি, যারা খুব পড়াশোনা করেছে, অনেক চিন্তা-ফিকির করে, যাদের সামনে কোনও কাজ এলে লাভ লোকসানের বিরাট তালিকা তৈরী করে। তারা কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারে না। নানা সংশয় করতে থাকে। দ্বিধা-বিভক্ত হতে থাকে। আর ইত্যাবসরে আমার চেনা ঐ লোকটি তার কাজ সমাধা করে ফেলে। এমন মানুষ নিজের বিরোধীদেরকে তার যোগ্যতার উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে বাধ্য করে ছাড়ে। যদিও তাদের কাছে এসব বিশ্বাস না করার মত বাস্তব কারণও বিদ্যমান।
কারও যোগ্যতা যতই ঠুনকো হোক না কেন, পাশাপাশি যদি তার প্রখর আত্মবিশ্বাস থাকে তবে সে সারা দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে এবং প্রচুর কাজ করতে পারে। পক্ষান্তরে অপর এক ব্যক্তি যার মধ্যে অসাধারণ ও সীমাহীন যোগ্যতা রয়েছে, কিন্তু মন-মেজায ভীতু ও দ্বিধাবিভক্ত, এমন ব্যক্তি কখনও সফলকাম হতে পারে না। এমন একজন শিক্ষক, যার জ্ঞান-বিদ্যা খুবই সাধারণ, কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের অধিকারী; তিনি ঐ শিক্ষক অপেক্ষা অধিকতর সফলকাম হোন, যিনি বিরাট বড় ও বিজ্ঞ আলেম। কিন্তু নিজের ইল্ম-জ্ঞান অন্যের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম নয়। এমনকি প্রকাশও করতে পারে না যে, বিষয়টার উপর তার পূর্ণ দখল আছে। আমি জানি, উদাহরণের দৃষ্টিতে এটা ন্যায়সঙ্গত নয়। সাধারণতঃ অনেক বড় বেইনসাফও মনে হয়। কিন্তু দুনিয়ায় বস্তুতঃ এমনই হয়ে থাকে। এর প্রতিকার হল, যে ব্যক্তি প্রকৃতই যোগ্য, তিনি নিজের ভেতর এমন আত্মবিশ্বাস তৈরী করে নেন, যাতে অন্য লোকদেরকে প্রভাবিত করতে পারেন। আমরা যে কোন কাজকর্মে আমাদের প্রতি অন্যদের আস্থা-বিশ্বাসের ডোরে আবদ্ধ অর্থাৎ আমরা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারি, উন্নতমানের জিনিসপত্র তৈরি করতে পারি। কর্মচারীদের সুশৃঙ্খল রাখতে পারি এবং শত সহস্র কাজকর্মের মধ্য হতে মালিক ও জনসাধারণের চাহিদা মাফিক যে কোনও কাজ করতে পারি।
জীবন খুব সংক্ষীপ্ত আর দুনিয়া অসংখ্য কাজে ব্যস্ত। কোনও ব্যক্তি যে কাজের দাবী করে, সে তা আদৌ করতে পারে কি না -এটা সূক্ষ্মভাবে যাচাই করার মত এতটুকু সময়-সুযোগ কারও নেই। কোনও ব্যক্তি যদি কালো কোর্ট ও টাই ইত্যাদি পরে, তবে সারা দুনিয়াই মনে করে, সে উকিল। এ পেশার জন্য তা উপযুক্ত। তদ্রুপ কোনও ডাক্তারকে প্রত্যেক রোগীর সামনে প্রমাণ করতে হয় না যে, সে বিশেষ কোনও বই-পুস্তক পড়েছে এবং বিশেষ কোনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
কাজেই কোনও অযোগ্যতা মেনে নেওয়া এবং প্রাসঙ্গিক কোনও সংশয়ের পূর্বে পরাজয়কে মেনে নেওয়া ব্যর্থতাকে সাহায্য করারই নামান্তর। আমাদের জন্য মুহূর্তের জন্যও আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে হতে না দেওয়া উচিৎ। চাই পথ যতই অন্ধকারাচ্ছন্ন বা কণ্টকাকীর্ণ মনে হোক না কেন? অন্যের মনে আমাদের প্রতি যে আস্থা-বিশ্বাস আছে, তা অন্য কোনও জিনিস এত দ্রুত বিনষ্ট করে না, যত দ্রুত আমাদের মনের সংশয়-সন্দেহ তা বিনষ্ট করে দেয়। এ সংশয় আমাদের আশপাশের মানুষ খুব তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করে ফেলে। কিছু মানুষ শুধু এ কারণেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় যে, সে নিজের হীন মনোবল ও মন-মানসিকতা বিক্ষিপ্ত করে রাখে এবং চার পাশের মানুষের মনে তা পৌঁছে দেয়। আপনি যদি কোম্পানীর মালিক হোন, তবে আপনার কর্মচারীদেরকে সহজভাবে বলতে পারেন যে, আপনারা নিজেদের প্রত্যাহিক কাজে বিজয়ীবেশে, বিজয় ও আত্মবিশ্বাসের আগ্রহ নিয়ে অথবা একজন মার খাওয়া পরাস্ত মানুষের বেশে এসেছেন।
যে ব্যক্তি সংশয় ও হতাশায় নিমজ্জিত, সে আপনার চেহারা ও আচরণ দেখে বলতে পারে যে, আপনি আজ বিজয়ী হবেন না কি পরাস্ত হবেন? নিজের আত্মবিশ্বাস অন্যের মনে পৌঁছানোর প্রয়োজন সরবরাহ বিপনী থেকে অধিক অন্য কোথাও পড়ে না। এজেন্ট, সেলসম্যান ও দোকাদার প্রমুখের জন্য তা অনেক বেশী প্রয়োজন। এ ধরনের সরবরাহ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে এক বিশেষ ধরনের দক্ষতা ও মানসিক প্রভাব বিস্তারের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। সাধারণতঃ আস্থাহীন অবিশ্বাসী গ্রাহক ও ক্রেতার সাথেই পণ্য সরবরাহকারী ও দোকানদারের নিয়মিত কারবার হয়ে থাকে। এমন ক্রেতা দুই ধরনের চিন্তায় দোদুল্যমান থাকে। তখন সচেতন দোকানদার তাকে নিজ ইচ্ছায় প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে এবং একাধিক দ্রব্য থেকে মাত্র দুটিতে নিয়ে আসে। তারপর স্বীয় সিদ্ধান্ত ক্রেতার পক্ষে ধরে নিয়ে এবং ক্রেতা একটি পছন্দ করেছেন ভেবে তা প্যাকেট করতে আরম্ভ করে। দোকানদার প্রতিদিন যে হাজার হাজার পদ্ধতি অবলম্বন করে তন্মধ্যে এ-ও একটি। কিন্তু ব্যবসার এই নীতির সাথে দোকানদারের আচার-ব্যবহার এবং উপস্থাপনায় দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। একজন ট্রাভেলস্ এজেন্ট ও ফেরিওয়ালার আচার-ব্যবহারে ক্রেতা তৎক্ষণাত পণ্য দ্রব্য কেনার সিদ্ধান্ত করে ফেলে।
উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি ও মন-মানসিকতার বিকাশ একজন উস্তাদের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, অন্য কারও তেমন নয়। একজন ইতঃস্ততাকারী উস্তাদ বাচ্চাদের ভরপুর কামরা বিশৃঙ্খলায় ফেলে দেবে। অথচ দৃঢ়চিত্ত, শান্ত, নিয়ন্ত্রিত ও সুন্দর মনের উস্তাদ এ ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই ভাল কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন।
উস্তাদের জন্য ব্যক্তিগত যাবতীয় মতপার্থক্যের উপর বিজিত হওয়া অতিজরুরী। তাঁর কাজ হল, যারা সাধারণতঃ উদাসীন ও বেখেয়ালী জটিল বিষয়গুলো নিতান্তই ব্যক্তিগত ও আন্তরিকভাবে ছাত্র-ছাত্রীর দেমাগে গেঁথে দেওয়া। এতে শিশু-কিশোর ও যুবকদের মন তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হয়। তারা বুঝে, উস্তাদ বাস্তবিকই তাদের প্রতি আগ্রহী কিনা? তাদের সাহায্য করতে চাচ্ছেন কি না? তারা স্বার্থান্বেষী ও অসহযোগী মৃতপ্রায় উস্তাদের মেজাজ তাৎক্ষণাত উপলব্ধি করে ফেলে।