📄 মুক্তির পথ
প্রশ্ন হয়, আমরা এসব চিন্তা-ভাবনা থেকে কিভাবে মুক্তি পেতে পারি? এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষপূর্ণ অনুভূতির কারণগুলো অনুসন্ধান করতে হবে। জানতে হবে, এগুলো আমাদের চিন্তা-ভাবনায় কখন কোথা থেকে কিভাবে স্থান করে নিয়েছে। তাহলে আমরা অতি দ্রুত বুঝতে পারব যে, ভুল ও অন্যায় মূলতঃ আমাদের নিজেদেরই ছিল। কিন্তু মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতেও প্রস্তুত নয়। সে সব সময় উদর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টায় মত্ত থাকে।
সুমার সট মাহিম বলেন- একি আশ্চার্যের বিষয় নয় যে, আমরা নিজের বড় বড় হাতিয়ারকে অন্যের সামন্য ও তুচ্ছ হাতিয়ারের মুকাবিলায় কত কম বিপদজনক মনে করি। এর কারণ সুস্পষ্ট। আমরা নিজের হাতিয়ারকে আত্মরক্ষামূলক ভাবি। ফলে এ ব্যাপারে কোনও অভিযোগ তুলি না। কিন্তু অন্যের হাতিয়ারকে আমাদের জন্য ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক ভাবি। ফলে তা একদম বরদাশ করি না। দ্বিতীয়তঃ নিজেদের মধ্যে দূর্ঘটনাগুলোকে একেবারে ভুলে যাওয়ার যোগ্যতা তৈরি করা জরুরী।
জনৈক সাহিত্যিক এক দম্পতির ঘটনা প্রসঙ্গে লিখেন- তাদের পালক পুত্র এক যুদ্ধে মারা যায়। ছেলেটি ঐ দম্পতির কাছে জীবনের চেয়ে অধিক প্রিয় ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, মাতম-মার্সিয়া করে ছেলেটির সুন্দর অতীতকে কষ্ট ও যন্ত্রনাদগ্ধ করব না বরং তারা ছেলেটির স্মৃতি চারণে নিজ খরচে এক মাদরাসা খুলে দিল। মাদ্রাসার নাম রাখল ছেলেটির নামে। সেখানে যুদ্ধে নিহত লোকদের সন্তান-সন্তাতিদের শিক্ষা-দিক্ষার ব্যবস্থা করল। শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে কণ্ঠনালী পবিত্র রাখাই যথেষ্ট নয় বরং এ জযবাকে উজ্জ্বল ভবিষ্যত গঠনের পেছনে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমতা ও বিচক্ষণতার দাবী। জীবন সৌন্দর্য ও সৌকর্যের প্রতিচ্ছবি।
যেভাবে ভালবাসা থেকে ভালবাসা জন্ম নেয়, তদ্রুপ বিদ্বেষ থেকে বিদ্বেষ জন্ম নেয় এবং তা লালন করে। আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, সময়-সুযোগ ও চিন্তা-শক্তিকে শত্রুতা-বিদ্বেষ লালনে নষ্ট না করা। আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও জীবনের সৌন্দর্যের স্বাদ উপভোগ করার মত যোগ্যতা আমাদের ভেতর থাকতে হবে। এ কেমন জীবন যে, সূর্য উদয় হয় আবার অস্ত যায় আর আমরা নিজের বাজে চিন্তা-ভাবনাই ডুবে থাকি। পাখি ডাকে, আমরা শুনি না। ফুল ফুটে, পাপড়ি মেলে, আমরা চোখ খুলে তাকাই না। নিজেকে নিয়েই আচ্ছন্ন থাকি। জীবন বড় সুন্দর ও মনোহর। তবু কেন আমরা নিজেদের শত্রুতা-বিদ্বেষ ভুলে জীবনের স্বাদ গ্রহণ করি না। নিজের দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনাগুলো কেন অজানা অতল গহ্বরে দাফন করি না। তবেই তো আমরা জীবন তরী তার শেষ ঠিকানায় নঙ্গর করার পূর্বে জীবনের সৌন্দর্য ও সৌকর্যে অভিভূত হতে পারব।
(ইজদেওয়াজী নফসিয়াত)
📄 মহিলাদের অনুভূতি শক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞান
• স্বামীর উপর স্ত্রীর তদ্রুপ অধিকার রয়েছে, যেরূপ অধিকার স্ত্রীর উপর স্বামীর রয়েছে। স্ত্রীদের অধিকার পূরণ করা স্বামীর আবশ্যক কর্তব্য। (সূরা বাকারা- ২২৮)
• স্বামীর যদি কয়েক জন স্ত্রী থাকে, তাহলে তাকে সকলের সাথে সমতা রক্ষা করতে হবে। যদি সমতা রক্ষা করার ব্যাপারে আশঙ্কা হয় তাহলে এক স্ত্রী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। (সূরা নিসা)
• স্ত্রীর সার্বিক তত্ত্ববধায়ন করা স্বামীর কর্তব্য। (বুখারী, মেশকাত)
• স্বামীর উচিৎ যখন সে খাবে তখন স্ত্রীকেও খাওয়াবে। যখন পরবে তখন স্ত্রীকেও পরাবে। (মুসনাদে আহমাদ)
ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় স্ত্রীর অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়নি, তাকে ঠকানো হয়নি বরং জায়েয ও বৈধ অধিকার তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ দেওয়া হয়েছে। তবে মহিলাদের স্থান পুরুষদের পরেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি তাদের মাঝে যোগ্যতা আছে বলেই ক্ষেত্র বিশেষে তাদের সাক্ষ্য অর্ধেক গণ্য করা হয়েছে। নতুবা শপথের কোনও মূল্যায়ণ করা হত না। তদুপরি মহিলাদের মাঝে বিপদ-বিপর্যয় বা জুট-ঝামেলা সৃষ্টির যোগ্যতা বিস্তর। নিম্নের এ সংক্রান্ত গবেষণামূলক আলোচনা লক্ষ্য করুন।
📄 মহিলাদের অনুভূতি শক্তি
এর মাধ্যমে তারা সংঘটিতব্য অবস্থা ও ঘটনা অবগত হতে সক্ষম হয়। এক মহিলা মনস্তত্ববিদ বলেন, আমি ১৯৪০ সাল থেকে আমার স্বামী ডাক্তার জোসাফ বি রাহায়েনের সঙ্গে কাজ করছি। প্রতিদিনই দুশ্চিন্তাগ্রস্থ বহু লোকদের অসংখ্য আলামত ও তত্ত্ব আমরা পেয়ে থাকি। তন্মধ্যে অনেক বিস্ময়কর ও বিরল ধরনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। আজ পর্যন্ত আমরা মানসিক ব্যাধিগ্রস্থ আট হাজার মানুষের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করেছি। যার মাঝে প্রায় ছয় হাজার মহিলা রোগী ছিল।
আমাদের নিয়ম হল, যেসব ব্যাপারগুলো মস্তিষ্ক বিকৃত লোক বা মানসিক বিকারগ্রন্থ লোকদের মাঝে লক্ষ্য করেছি অথবা যেগুলোর অন্তরালে বিশেষ কোনও ঘটনা কাজ করে না, আমরা সেসব ব্যাপারে একদম ভ্রুক্ষেপ করি না। সম্প্রতি আমরা সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞাতা লাভ করেছি। গড়ে প্রত্যেহ এ ধরনের দুটি পত্র পাচ্ছি, যাতে এরূপ অভিজ্ঞতার বর্ণনা থাকে, যা সাধারণ মানুষের মাঝে দুঃপ্রাপ্য বরং কোন মানসিক বিকারগ্রস্থ লোকের দ্বারা হয়ে থাকে। আপনারা শুনে বিস্মিত হবেন যে, এসব অসাধারণ অভিজ্ঞতার বাহক কেবলমাত্র মহিলাগণ। এ পত্রগুলো বুদ্ধিমত্তা ও একাগ্রতায় থাকে পরিপূর্ণ এবং এতে হয়রানী, পেরেশানী ও দুশ্চিন্তার প্রতিক্রিয়া ঝড়ে পড়ে।
"আমার স্বামী মনে করে, আমি বড় মাতাল ও পাগল। অথচ..। আমি আজ পর্যন্ত একথা কাউকে বলার সুযোগ করতে পারিনি।"
"আমি এ ব্যাপারে আমার স্বামীর সাথেও আজ পর্যন্ত এক শব্দ বলতে পারিনি। প্রথমেই তিনি আমাকে উপহাস করেন। আমি কি করব...!"
"আমি প্রায়ই ভাবি- এটা কিভাবে সম্ভব হল....?"
এসব এবং এ জাতীয় আরও অসংখ্য পত্র প্রত্যেহ আমার দৃষ্টিগোচর হয়। এই তো কদিন পূর্বে সম্ভ্রান্ত এক মহিলা মারাত্মক দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অবস্থায় আমাকে পত্র লিখছেন। তার সারসংক্ষেপ নিম্নে তুলে ধরছি।
এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম- কেউ আমাদের ঘরের দরজায় জোরে কড়াঘাত করছে। আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখি- এক যুবক সাজানো ফুলঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি মোটেও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হইনি। আমি তার কাছ থেকে ঐ ফুলঝুড়িটা নিয়ে রান্নাঘরে গেলাম। সেখানে গিয়ে ফুলঝুড়িটা আমি একটি তাকে রাখলাম এবং বিছানায় বসে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে লাগলাম। এই ছিল আমার স্বপ্ন। এ বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখার তিন সপ্তাহ পরে হঠাৎ করে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়ে যায়। তখন এ দুনিয়ায় আমি একা-নিঃস্ব হয়ে যাই। আমার স্বামীকে কাফন-দাফন করার একদিন পর আমার ঘরের দরজায় কড়াঘাত হয়। আমি বাইরে বেরিয়ে দেখি- এক যুবক ফুলঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু আজ এ ফুল আমার কাছে কোন কাজেরই ছিল না। কেননা তা আমার প্রিয়জনের খেদমতে পেশ করতে পারব না। তদুপরি ফুল গ্রহণ করতে অস্বীকার করলাম না। আমি তার কাছ থেকে ফুলঝুড়িটা নিয়ে রান্নাঘরে একটি তাকে রেখে দিলাম এবং বাস্তবিকই ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে শুরু করলাম। তখন আমার স্মরণ হল, হুবহু এ ঘটনাই আমি ক'দিন পূর্বে স্বপ্নে দেখেছিলাম।
আমাদের বাস্তব ঘটনাগুলো একটা আরেকটা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কখনও কখনও এক মহিলা একত্রে দুই তিনটি ঘটনার সমাধান চেয়ে পত্র লেখেন। একথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, পুরুষের তুলনায় মহিলাগণ মনস্তত্ত্বের প্রতি বেশী আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। একটি সাধারণ বংশের অবস্থা-পরিবেশে যেখানে মহিলারা মনস্তত্ত্বের কথা আমভাবে প্রকাশ করে, সেখানে পুরুষগণ সাধারণতঃ সন্দিহান মেজাযের হয়ে থাকে। এর কারণ হতে পারে পুরুষদের কাছে সাধারণতঃ তার দৈনন্দিনের কাজকর্মে অধিকতর সত্যাশ্রয়ী, সত্যান্বেষী ও যৌক্তিক হওয়ার আশা করা হয়। পুরুষদের অবস্থা ও পরিবেশ নিখুঁত বাস্তবতার প্রতি স্বীয় দৃষ্টি নিবন্ধ রাখার দাবী করে। তাদের এই বিবেক গ্রাহ্য বিষয় পছন্দ করা এবং মানসিক ও কর্মব্যস্ততা তাদেরকে মনস্তত্ত্বের প্রতি আগ্রহী হওয়ার সুযোগ দেয় না।
অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের দুচারটি অসাধারণ অভিজ্ঞতাও হয়। কিন্তু জীবনের অনিবার্য কর্মব্যস্ততা তাকে বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করার মত এতটুকু সময়-সুযোগ দেয় না। তাহলে কোন অভিজ্ঞ মনস্তাত্ত্বিকের সাথে পরামর্শ করার সুযোগ তাদের কোথায়? কিন্তু স্ত্রীকে এধরনের কঠিন সমস্যা এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় না। তার তো শুধুমাত্র গৃহস্থলির ছোট-খাট কাজকর্ম ও সাধারণ ঘরোয়া দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে হয়। তারা ঘরে বসে বড় আরামের সাথে নিজের বান্ধবীদের নিয়ে চা-কফির পেয়ালায় চুমুকে চুমুকে উচ্ছসিত হয়। নিজের খোশ-গল্প ও কিচ্ছা-কাহিনী বলতে পারে। সাথে সাথে নিজের যাবতীয় ধ্যান-ধারনা, আগ্রহ-উদ্দীপনা, ঘটনাবলী, অভিজ্ঞতা, পরিদর্শিতা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করতে পারে। কিন্তু বেচারা পুরুষের এতটুকু সুযোগ কোথায়? এখানের জীবন তো দূর্গম ঘাটির নাম।
মনস্তত্ত্বের অভিজ্ঞতা ও গবেষণা বড় বড় ঘটনাবলি এবং সমস্যার সাথেই সম্পৃক্ত থাকা জরুরী নয়। প্রায় সময় নগন্য ঘটনার সাথেই এর সম্পর্ক থাকে। যেগুলোকে আমাদের জীবনে বিশেষ কোনও গুরুত্ব দেই না।
অনেক মায়েদের জানা আছে যে, তার সন্তানদের মাঝে কোনও এক সন্তান বিশেষতঃ মেয়ে তার অবস্থা, অভিজ্ঞা ও রুচি-মর্জি বুঝার বেলায় অন্যের তুলনায় অধিক যোগ্যতা রাখে। সে মায়ের চেহারা, আকার-আকৃতি দেখে মুহূর্তেই প্রকৃত কারণ বুঝে ফেলে। কিন্তু অন্যের ধারণায়ও সে কথা আসে না। অথচ সকল সন্তানই মায়ের কাছে প্রিয়।
বর্তমানে আমার চারটি সন্তান রয়েছে। এক ছেলে আর তিন মেয়ে। আমার ভাল করে স্বরণ আছে, বাটসী তখনও ছোট্ট শিশু। যখন আমি বুঝতে পেরেছি, বাটসী অন্য সন্তানদের তুলনায় আমার অনেক বেশি প্রিয়। সে খুব সহজেই আমার মন-মানসিকতা বুঝে ফেলে। অনেক সময় তাঁর নিষ্পাপ মুখ থেকে তাই বেরিয়ে আসে, যা সবে মাত্র আমার মাথায় এসেছে।
এক সকালে নাশতার টেবিলে আমরা নাশতা করছিলাম, এক টুকরা টুস তখনও টেবিলে পড়ে ছিল। প্রথমে আমার মন চাচ্ছিল, ওটাও আমি খেয়ে নেই। কিন্তু তারপর ভাবলাম- আগে থেকেই আমার ওযন দিনি দিন বেড়ে যাচ্ছে। আমি খাবার থেকে হাত গুটিয়ে নিলাম। ঠিক তখনই বাটসী বলে উঠল- মাম্মী, আজকাল তুমি আগের চেয়ে বেশি মোটা হয়ে যাচ্ছ, তাই না? আরেক দিন আমি বাটসীর চুলগুচ্ছ চিরনী করছিলাম। তখন আমার মাথা থেকে একটি সংবাদ একেবারে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, যা সংবাদপত্রে পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়েছিল, হিন্দুস্তানের কিছু এলাকায় কিভাবে প্রসূতি মায়েদেরকে পৃথক কামরায় ফেলে রাখা হয়। যেখানে তাকে দেখা-শোনারও কেউ থাকে না। হঠাৎ করেই বাটসী আমার চিন্তায় দখল নিয়ে বলল- মাম্মী! আমার মনে হচ্ছে, এ মুহূর্তে দুনিয়ার কোনও প্রান্তে কোনও নবজাতক বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে।
একজন গৃহিনী নারী ও মা হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, অনেক মহিলা নিজের জীবনের কিছু কিছু অসাধারণ অবস্থা ও ঘটনাকে শুধুমাত্র সাময়িক ও আকস্মিক ভেবে অবহেলা করেন। আমার গবেষণাগারের ডাইরীতে এধরনের সাধারণ ঘটনার পরিমাণ অসংখ্য। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে তা থেকে এমন চিত্র স্পষ্ট ফুটে ওঠে, যা মানুষের মন-মানসের জন্য একটি খুবই অসাধারণ শক্তির দর্শন স্বরূপ।
আমার এক ঘটনা স্মরণ হচ্ছে। একবার এক নববধূ গাড়ীতে আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্বামীকে সীমাহীন অসন্তুষ্ট করে ফেলেছিল। সবেমাত্র তাদের বিবাহের দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। তারা বাড়ির বাইরে বহু দূরে হানিমুনে ছিল। তখন এ নবদম্পতি ছোট একটি রেল স্টেশনের প্লাট ফরমে দাঁড়ানো ছিল। স্বামীর হাতে ঐ গাড়ীর দুটি টিকেট। কিন্তু হঠাৎ করে স্ত্রী গাড়ীতে চড়তে অস্বীকার করল। এ অসঙ্গত আচরণের জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার মত কোনও ভাষাও তার জানা ছিল না। শুধু এতটুকু বলল- কোনও অদৃশ্য শক্তি আমাকে গাড়ীতে চড়তে বাঁধা দিচ্ছে। মোটকথা, তারা গাড়ীতে চড়তে পারল না। মাত্র দু' ঘণ্টা পরে প্রতিটি মানুষের মুখে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল যে, ঐ গাড়ি এক দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এতে বিশজনের সলীল সমাধি হয়েছে। আর আহত হয়েছে সহস্রাধিক।
অন্য এক দম্পতি একবার নর্থ লেকরোলেনার ছোট্ট এক আবাসিক হোটেলে রাত্র যাপনের জন্য অবস্থান নিল। শোয়া মাত্র স্ত্রী এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখল। সে চমকে ওঠে স্বামীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলল- আমি এইমাত্র একটি দুঃস্বপ্ন দেখেছি, আমাদের হোটেল এক বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। অতঃপর সে স্বামীকে পীড়াপীড়ি শুরু করে এবং ঘোর অন্ধকারের মাঝে এ দম্পতি হোটেল থেকে বেরিয়ে আসে। আপনারা বিস্মিত শুনে হবেন যে, কিছুক্ষণ পরে আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলা বারুদ ভর্তি এক ট্রাক রাতের আধারে এই হোটেলের সাথে সংঘর্ষ খায়। তাতে হোটেলের নাম নিশানা পর্যন্ত ভূ-পৃষ্ঠ হতে মুছে যায়।
অনেক সময় এমন হয়েছে যে, খবরের পাতায় যেসব দূর্ঘটনা, রেল দূর্ঘটনা, প্লেন দুর্ঘটনা অথবা হত্যার যেসব সংবাদ ছাপা হয়েছে, বিশোর্ধ্ব চিঠিপত্র আমরা এমন পেয়েছি, যাতে দাবী করা হয়েছে যে, তাদের ঐ সব ঘটনা সম্পর্কে পূর্বেই ধারণা হয়েছিল।
আমার এবং আমার স্বামীর এ ধরনের অসাধারণ ঘটনাবলির ব্যাপারে তখনই আগ্রহ জাগে, যখন আমি শিকাগো ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলাম। স্বাভাবিক অবস্থায় দৃষ্ট স্বপ্নগুলো ছাড়াও ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী লোকদের পারদর্শিতা ব্যুৎপত্তি প্রচলিত ভাষায় যেগুলোকে তাসাওউফ, উইজদান, স্বভাব বহির্ভূত, আধ্যাত্মিকতা বলা হয়, সেসব আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখনও কোনও মনস্তাত্ত্বিক এর কোনও আদিঅন্ত নির্ণয় করতে পারেনি। কিন্তু একথা স্বীকার করতে হবে যে, আজ থেকে অনেক পূর্বেই মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, মানুষ শুধুমাত্র হাড়-মাংসের তৈরী এক দেহের নাম নয় বরং তার উপরও কিছু রয়েছে। মানুষের রূহানী শক্তির দৃষ্টিভঙ্গি আদিকাল থেকেই দুনিয়ায় বিদ্যমান।
যাই হোক। কথা চলছিল মহিলাদের অনুভূতি শক্তি সম্পর্কে। এ বিষয়ে আরও কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা লক্ষ্য করুন। যেগুলো আমি স্বীয় ফাইল থেকে নকল করেছি।
এক মহিলা স্বপ্ন দেখল- সেনা বাহিনীতে কর্মরত তার যুবক ছেলে পুনরায় দুগ্ধপোষ্য বাচ্চা হয়ে গেছে। মা ঐ বাচ্চাকে একটি সমুদ্রে ডুবতে এবং তাঁর লাশ পানিতে ভাসতে দেখলেন। তার চুলগুচ্ছ শিশুকালের চুলের মতই উজ্জল ও কোকড়া ছিল। মা কয়েক দিন পর্যন্ত দুশ্চিন্তা ও পেরেশানীতে কাটান। তিনি মনে মনে আল্লাহর কাছে বারবার প্রিয় ছেলের মঙ্গলের জন্য দু'আ করেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ছেলের পত্র হস্তগত হয়। তাতে লেখা ছিল- সে সামরিক মহড়ার সময় সমুদ্রে পড়ে যায় এবং ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু অন্যান্য সাথী-সঙ্গীরা তাকে অনেক কষ্টে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে। এভাবে সে প্রাণে বেঁচে যায়। যে রাতে মা ঐ ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছিলেন, হুবহু ঐ রাতেই ছেলেটি এ ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে।
নৌ বাহিনীতে কর্মরত এক কমান্ডারের স্ত্রী বিগত বিশ্বযুদ্ধের সময় একাধারে চৌদ্দরাত পর্যন্ত একই স্বপ্ন দেখতে থাকে। সে দেখে- তাঁর স্বামী বাড়ি ফিরার উদ্দেশ্যে প্লেনে চড়েছে। দুর্ভাগ্যবশতঃ ঐ প্লেন ধ্বংস হয়ে যায়। সকল যাত্রী নিহত হয়। এ স্বপ্ন দেখার কয়েক মাস পরও এ অফিসারের স্ত্রীর মাথা থেকে স্বপ্নের প্রতিক্রিয়া বিদূরীত হল না। কিছু দিন পর তার স্বামী ছুটি নেয় এবং স্ত্রীকে টেলিফোনে খবর দেয়, সে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে বিমান যোগে বাড়ি ফিরছে। কিন্তু ভীত-সন্ত্রস্ত স্ত্রী তাকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে প্লেনে সফরের পরিবর্তে ট্রেনে সফর করার উপর রাজি করে ফেলে। স্বামী বাধ্য হয়েই প্লেনের বুক করা সীট বাতিল করে দেয়। অনন্তর মুহূর্তেই বনের আগুনের মত সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, প্লেনটি এক স্থানে টক্কর খেয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে। এর কোনও যাত্রীই বাঁচতে পারেনি। এ তো ছিল মহিলাদের অকস্মাৎ ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞাতা। এখন পুরুষদের কথাও কিছুটা শুনে নিন।
একবার এক সৈনিক হাজার মাইল দূরে বসে সকাল দশটায় স্ত্রীকে চিঠি লিখার সময় গোলাপ ফুলের সুগন্ধি অনুভব করে। সেদিন ছিল রবিবার। পরে স্ত্রীর কাছ থেকে সে যে চিঠি পায় তাতে এ রহস্যের জট খুলে যায়। ঠিক ঐ মুহূর্তে স্ত্রী স্বামীর হেফাজতের উদ্দেশ্যে মান্নত করে তাদের নির্দিষ্ট পাদ্রীকে ফুলগুচ্ছ উপহার দিয়েছিল।
এক ছেলে ব্যবসার কাজে অন্য শহরে গেল। এক দিন অকারণেই হঠাৎ করে প্রচণ্ড পেট ব্যাথা শুরু হলে সে ডাক্তারের শরণাপন্ন হল। কিন্তু পেট ব্যাথার কোনও কারণ নির্ণয় করা গেল না। দ্বিতীয় দিন সে মায়ের চিঠি পেল। তাতে জানা গেল যে, ছেলে যখন পেট ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিল, হুবহু ঐ সময়ই তার মা ডাক্তার দিয়ে তার মাঁড়ীর দাঁত অপারেশন করিয়ে ছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের ঘটনা। জার্জিয়ার এক স্কুল শিক্ষিকা সকালে নাস্তা করতে বসল। মাত্র সে এক লোকমা খেয়েছে। হঠাৎ করে ভীত সন্ত্রস্ত্র হয়ে সে চিৎকার করতে লাগল যে, আমার বাগদত্তা এ মুহূর্তে বড়ই বিপদে আছেন। মনে হচ্ছে তার জাহাজ ফেটে সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সে তৎক্ষণাত রেডিও খুলে। তখন সংবাদ প্রচার হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর ঘোষণা হয়, এই মাত্র সংবাদ পাওয়া গেছে যে, এক সামুদ্রিক জাহাজ শত্রু কবলিত হয়ে সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার উপক্রম হয়। জাহাজ ফেটে গেছে। তবে নাবিকদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঐ জাহাজেই শিক্ষিকার বাগদত্তা সফর করছিল। পরে শিক্ষিকাকে জিজ্ঞাসা করা হয়- এমন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তিনি কিভাবে তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন? তখন সন্তুষ্টজনক কোনও উত্তর তিনি দিতে পারেন নি। শুধু এতটুকু বললেন- কোনও অদৃশ্য শক্তি আমার মনে একথা ঢেলে দিয়েছে।
অনুরূপ এক ঘটনার সম্মুখীন হোন ওয়াশিংটনের এক মহিলা। ঘটনার দিন সে রাতের খাবার প্রস্তুত করছিল। হঠাৎ করেই সে বলে উঠল- আমার বাবা ইন্তেকাল করেছেন। আমি তাকে চেয়ারে বসা দেখেছি। ঘরের লোকেরা তাকে বুঝাল, তোমার খামোকা সংশয় হচ্ছে। কিন্তু এক ঘণ্টা পরেই ফোন আসে- তার বাবা চেয়ারে বসা অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেছেন।
📄 সিদ্ধান্ত ক্ষমতা ও আধুনিক বিজ্ঞান
মুসলমান যখন দুনিয়াবী কিংবা আখেরাতের কোনও ইতিবাচক, স্থায়ী ও চিরন্তন কাজ করতে চায়, তখন সমাধা করে ফেলে। সে কখনও নিষ্ফল বা অকৃতকার্য হয় না। ইসলামী জীবনের হাজারও ঘটনা এর সত্যায়ন করে।
খয়বারের ইয়াহুদী দূর্গ বিজিত হচ্ছে না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এর নেক দু'আ ও আল্লাহ তা'আলার সাহায্যে হযরত আলী রাযি. চূড়ান্ত দৃঢ়তার সাথে ঐ দূর্গের ফটক উপড়িয়ে স্বজোরে নিক্ষেপ করেন। পরবর্তীতে তা চল্লিশজন মিলে উঠিয়ে এনে মেরামত করে। মারহাবের মত শক্তিশালী মানুষ প্রতিপক্ষ ছিল। যার খাবার কয়েক বকরি এবং অসংখ্য শক্তিশালী দ্রব্য আর অপর দিকে হযরত আলী রাযি. যিনি যথসামান্য খেতেন। শেষ পর্যন্ত তিনিই বিজয় গৌরব অর্জন করেন।
একবার কাফির সৈন্যদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য হযরত হুযাইফা রাযি. কে রাসূলুল্লাহ গোয়েন্দা হিসেবে প্রেরণ করলেন। তখন বাইরে প্রচণ্ড শীত। অস্বচ্ছলতার কারণে পরিপূর্ণ কাপড়ও ছিল না। কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়তা, দুঃসাহস ও সিদ্ধান্তের সাথে তিনি অর্পিত দায়িত্ব পূর্ণ করে ফিরে আসেন। মুসলমানদের জীবনে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, তারা কখনও হতাশা ও পরাজয়কে কাছে ভীড়তে দেননি।
১০৫ হিজরী সনে যখন মহামারী দেখা দিল তখন মুহাম্মদ বিন কাতাদাহ নামের সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল জনৈক ব্যক্তি যে বিস্ময়কর অভূতপূর্ব কাজ করলেন, সে সম্পর্কে জনৈক সমাজবিদ বলেন-
"চর্তুদিকে মহামারী ছড়িয়ে পড়লে প্রায় হাজারের কাছাকাছি লোক প্রাণ হারাতে বসে। গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যায়। তারপরও তিনি নিজের দৃঢ় মনোবল হারাননি বরং তিনি যথারীতি দুনিয়াবী কাজ কারবার করতে থাকেন। এমনকি রোগীদের সেবা-শুশ্রুষাকে নিজের দায়িত্ব মনে করে নিয়মিত মেহনত ও পরিশ্রম করে যান। অবশেষে যখন মহামারী দূর হয়ে যায় তখন গোটা হিজাযে কেবল তিনি একাই সম্পদশালী ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। তার এ খ্যাতি ও সম্মান লাভের একমাত্র কারণ নতিস্বীকার না করা এবং পরাজয় মেনে না নেওয়া। নিজের মন-মানসকে কোনও সংকীর্ণতায় না ফেলা। যথারীতি মেহনত ও পরিশ্রম করে যাওয়া"। (মাহনামা-আলহাকীম)