📄 হিংসা-বিদ্বেষ এক সংক্রামক ব্যাধি
ফ্রান্সের বিখ্যাত লেখক বুলযার্ক নিজের প্রাথমিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা অত্যন্ত ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে স্বরচিত গ্রন্থাবলিতে তুলে ধরেছেন। তিনি স্বরচিত "ইজদেওয়াজে নফসিয়াত" গ্রন্থে লিখেছেন- আমার বয়স যখন এগার বছর তখন আমার এক মাত্র বোন ছাড়া কোনও নিবিড় বন্ধু ও সঙ্গী ছিল না। সে বয়সে আমার চেয়ে এক বছরের কিছু বেশি ছোট ছিল। আমরা দুজন একত্রে পানাহার করতাম। একত্রে খেলাধূলা করতাম। একত্রে ঘুমাতাম। অনেক সময় আমি নিজেকে প্রশ্ন করতাম- আমার কোনও বন্ধু নেই কেন? কি কারণে অমুক আমাকে খেলায় শরীক করে না। আশ্চর্যের কথা হল, যখন সে সাধারণ গণিত ও বীজগণীত কোনও সমস্যায় পড়ত তখন সাহায্যের জন্য আমার কাছে ছুটে আসত। কিন্তু যখন খেলাধূলার সময় হয়, তখন আমাকে একেবারে ভুলে যায়। লেখক বুলযার্ক নিজের শৈশবকালের আরও একটি ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন-
শীতের এক রাতে আমি ঘরের জানালার পাশে বসে ছিলাম। বাইরে বরফপাত হচ্ছিল। মহাল্লার ছেলেরা বরফ নিয়ে খেলা করছিল। তারা বরফের স্তূপ বানাচ্ছিল। তোৎসঙ্গে তারা খুশিতে গানও গাচ্ছিল। কিন্তু আমি নিঃসঙ্গতার আগুনে জ্বলছিলাম। মনে বড় বিষাদ ছিল যে, তাদের মধ্যে কেউই আমাকে ডাকার প্রয়োজন অনুভব করছে না। হঠাৎ আমি মায়ের শব্দ শুনতে পাই। তিনি পাশে দাঁড়িয়ে আমার চেহারায় হাত বুলাচ্ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মহব্বতের সাথে জিজ্ঞাসা করলেন- বাবা! কি ভাবছ একা বসে? প্রত্যুত্তরে আমি বললাম- অমুক আমাকে পছন্দ করে না। আমি তার উপর প্রতিশোধ নেব। সে যদি আবার আমার কাছে কোনও কিছু জিজ্ঞাসা করতে আসে তাহলে আমি শক্ত জবাব দিব। অতঃপর আমি জানালার কাছে থেকে সরে আসলাম এবং আমার আদরের ছোট বোনকে খুঁজতে লাগলাম।
সে নিজের খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলা করছিল। আমি তার পাশে বসে গেলাম এবং খেলাধূলায় তার মন ভরিয়ে দিলাম। কার জীবনে শৈশবকাল আসে না। আমাদের মধ্যে কজন আছে, যারা বুলযার্কের মত ভাবে না? বুলযার্ক বছরের পর বছর মানুষের মনোজগৎ, স্বভাব-চরিত্রে উপর গভীর ভাবে অধ্যায়ণ ও পড়াশোনা করেছেন। তারপর এক পর্যায়ে শত্রুতা, হিংসা-বিদ্বেষ এবং অন্যান্য কষ্টদায়ক চিন্তা-ভাবনা থেকে তিনি রেহায় পেয়েছেন। যেগুলো তার জীবন বিষিয়ে তুলেছিল।
বুলযার্ক শুধুমাত্র শৈশবের বন্ধুদের সাথেই বিদ্বেষ রাখতেন না বরং আপন মা সম্পর্কেও তার খারাপ ধারণা ছিল। তিনি স্বীয় সন্তানকে এতটুকু আদর-স্নেহ, মায়া-মমতা ও ভালবাসা দেননি, যতটুকু প্রত্যেক শিশুরই জন্মগত ও স্বভাবসূলভ দাবী থাকে। এর কারণ তার মায়ের শৈশবকালেই স্বীয় পিতা-মাতা ও ভাগ্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। অধিকন্তু তার বিয়ে হয় এমন এক ব্যক্তির সাথে, যে বয়সে তার চেয়ে ত্রিশ বছরের বড় ছিল। এ থেকে বুলযার্ক তথ্য বের করেছেন- শত্রুতা-বিদ্বেষ এক সংক্রামক ব্যাধি। বংশের কারও মধ্যে যদি বিদ্বেষ থাকে তাহলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পুরো বংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ বাস্তব হল, আমাদের চতুর্পাশে শত্রুতা-বিদ্বেষের উত্তাল ঢেউ তরঙ্গায়িত হচ্ছে। অথবা বলা যায়, আজকের পৃথিবী শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ আক্রান্ত এক শাবকী।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মাঝে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের জীবাণু কখন এবং কেন সৃষ্টি হয়?
আমাদের ভাগ্য যখন আমাদের আশা-আকাঙ্খার সঙ্গ দেয় না, জীবন সংগ্রামে আমরা যখন অন্যের তুলনায় পিছনে পড়ে যাই অথবা উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করতে না পারি, অপর কেউ যোগ্য হোক চাই না হোক, যখন একের পর এক উন্নতির সিঁড়ি অতিক্রম করতে থাকে, আমরা ও আমাদের সন্তান-সন্ততি যখন অন্যের সমান আয়-রোজগার ও ব্যয় করতে সক্ষম না হই, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজন আমাদের সাথে খারাপ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ব্যবহার করে এবং পেছনে পেছনে নিন্দা ও ক্ষতি করতে থাকে, তখন আমাদের ভেতর এ আগুন জ্বলে ওঠে। আমরা বিছানায় ঘুমাতে গেলে এ অগ্নিশিখা আরও তীব্র হয়ে উঠে। ঘুম আমাদের দুচোখ থেকে শত-সহস্র মাইল দূরে চলে যায়। এমতাবস্থায় আমরা ঐ আগুনে জ্বলতে জ্বলতে নানা চিন্তা-ভাবনায় নিমজ্জিত হয়ে যাই। এমনকি সময় সময় সারা রাত বিনিদ্র পার হয়ে যায়।
এ অবস্থা সৃষ্টির মূলে হল, আমাদের মাঝে ধৈর্য, ক্ষমা ও সহানুভূতির প্রচুর অভাব। যেমন, একটি মেয়ের স্বীয় ভাই-ভাবী সম্পর্কে কঠিন অভিযোগ ছিল। সে তাদের সাথে থাকার ব্যাপারে ছিল অপারগ। তার পিতা-মাতা মারা গিয়েছিল আগেই। ভাই ছাড়া তার চিন্তা-ভাবনা করার দ্বিতীয় কেউ ছিল না। কিন্তু সমস্যা ছিল, ভাবী তাকে এ ঘরে দেখতে চাচ্ছিল না। সে ননদিনীর সাথে খারাপ ব্যবহার করত প্রতিনিয়ত। ননদিনী তার ভাবীর কটুকথায় বিতৃষ্ণ হয়ে গিয়েছিল। একবার ভাবী ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে গিয়ে বলছিল- সে দিনের কথা আমি ভুলিনি। আমার জন্ম বার্ষিকি ছিল। আর ভাই-ভাবীর সাথে শহরের বাইরে পিকনিকের আনন্দে মেতে ছিল। কিন্তু তাদের কেউ আমাকে জন্ম দিনের শুভেচ্ছা পর্যন্ত জানাননি।
নিয়তির কারনেই মেয়েটির পিতা-মাতা তার বিবাহের পূর্বে মারা যান। বাধ্য হয়েই তাকে ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকতে হত। কিন্তু সে যদি অবস্থার উন্নতি চাইত তবে আত্মবিশ্বাসের সাথে আলাদাভাবে জীবন যাপন করত। এভাবে তার ভাই-ভাবীর ব্যাপারে কোনও অভিযোগ থাকত না। তাছাড়া তার মাঝে পরিস্থিতির মোকাবেলা করার মত কোনও যোগ্যতা ছিল না। এজন্য তার শত্রুতা-বিদ্বেষ আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল।
📄 শত্রুতা ও তালাক
মনোবিজ্ঞানীগণ বলেন, আমরা যখন এমন কোনও ঘটনাকে সামনে রাখি, যা আমাদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনার কারণ ছিল এবং তা ব্রেন থেকে মুছে না ফেলি, তাহলে ব্রেন এমন সবকাজে নিমজ্জিত হয়ে যায়, যা আমাদের জানা মতে শত্রুতা-বিদ্বেষ লালনের মূল কারণ। কাজেই আমরা আশপাশের সব জিনিসের উপরই নাক ছিটকাই, ঘৃণা করি। এসব মনস্তাত্ত্বিকগণ তালাকের কারণ অনুসন্ধান করলে একথাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, অর্ধেকের বেশি তালাকের ঘটনার পেছনে কারণ ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে সাধারণ ব্যাপার নিয়ে মতপার্থক্য। এ মতবিরোধের কারণ বিদূরীত করা সম্ভব ছিল। কিন্তু স্ত্রী পেছনের ঘটনা ভুলতে চাইত না অথবা স্বামী পেছনের ঘটনা মাটিচাপা দিতে প্রস্তুত ছিল না। অবশেষে ঘটনা তালাক পর্যন্ত গড়িয়েছে।
আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, অতীতের ঘটনা ও সমস্যা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় না করা বরং সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অতীতকে স্মৃতির পাতা এমনভাবে মুড়িয়ে রাখা উচিৎ যেভাবে আমরা বই-পুস্তক পড়ে বন্ধ করে রাখি। ফেল-সূফ উর্দুন বলেন- আমরা অযথাই শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষের আগুনে জ্বলে পুড়ে নিজেকে ধ্বংস করে দেই। আমরা অতীতের দুঃখ-কষ্টের উপর অশ্রু ফেলে আমাদের যে মহান চিন্তা চেতনা বিনষ্ট করি, তা যদি ঐ সব অবস্থা ও পটপরিবর্তন এবং শুধরানোর কাজে ব্যয় করতাম, যা আমাদের জন্য কষ্ট-যাতণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাহলে নিশ্চিতভাবে বিকৃত অবস্থা ও শত্রুতা-বিদ্বেষের মূল কারণ মিটিয়ে দিতে আমরা সফলকাম হব।
📄 একটি জ্বলন্ত উপমা
জনৈক ইংরেজ জর্জ এক বন্দীর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সে বন্দী ষোল বছর যাবৎ বিনা অপরাধে জেলখানায় পুড়ে মরছিল। তার উপর হত্যার অভিযোগ ছিল। প্রকৃত হত্যাকারী ছিল তার চাচা। সে সবসময় অপরাধের কথা অস্বীকার করত। ফলে চাচার পাপের শাস্তি ভাতিজাকে ভোগ করতে হয়। অবশেষে সে জেল থেকে মুক্তি পেল, তবে প্রতিশোধের জন্য নয় বরং নতুন জীবন শুরু করার লক্ষ্যে। চল্লিশ বছর বয়সে সে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। যাতে ওয়ায-নসীহতের তরীকা শিখতে পারে এবং ফিরে গিয়ে কারাগারের পাশে নেক ও নেক কাজের তাবলীগ করতে পারে। যার মধ্যে তাদের কল্যাণ নিহিত ছিল। পবিত্র কুরআন ও হাদীসে ক্ষমা ও সহানুভূতির ব্যাপারে সীমাহীন উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি গোম্বা ও রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং ক্ষমা ও সহানুভূতির সাথে কাজ করে, তাকে বিরাট কল্যাণের রূপকার সাব্যস্ত করা হয়েছে। অধুনা বিশ্বের ডাক্তার-কবিরাজগণও আমাদেরকে ক্ষমা ও সহানুভূতির উপদেশ দিয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, ৮০% মাথা ব্যথা, বদহজমী, রক্তশূন্যতা, ব্লাড পেশার এবং পাকস্থলীর রোগ-ব্যাধির মূল কারণ স্থায়ী দুঃশ্চিন্তা ও দুঃখ-কষ্ট এবং জীবনের তিক্ততা নিয়ে দুর্ভাবনা। এমনকি এতে হৃদরোগ পর্যন্ত হয়ে যায়। এটা কেবল তাদের বেলায়ই ক্ষতিকর নয়, যারা নিজের শক্তি সামর্থের চেয়ে বেশি কাজ করে বরং যারা সুখ-স্বাচ্ছন্দেও জীবন যাপন করে তাদের পক্ষেও খারাপ।
📄 নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনার কারণ
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, শতকরা চল্লিশভাগ মর্মান্তিক ঘটনার কারণ হয়ত চালকদের মানসিক অবস্থা অথবা যাত্রীদের ব্যক্তিগত জটিলতা, এলোমেলো ও দুশ্চিন্তাই দায়ী। যেগুলো মাথায় চেপে তাদেরকে আকস্মিক দূর্ঘটনা সম্পর্কে উদাসীন করে দিয়েছে। ঘরের আঙ্গিনায় মহিলাদের সামনে যেসব ঘটনা ঘটে থাকে, তার অধিকাংশের পেছনে এই মানসিক বিকারগ্রস্থতা ও উদাসীনতাই কাজ করে। তেল বা গ্যাসের চুলা কিংবা হিটার জ্বলছে কিন্তু মহিলার মাথায় নিজের ভাগ্যের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা চেপে বসেছে তখনই তার কাপড়ে আগুন ধরে যায়। সে অগ্নি দগ্ধ হয়।
অফিস, কল-কারখানায় দূর্ঘটনা ঘটার কারণও তাই। অফিসারদের মাত্রাতিরিক্ত কঠোরতা আরোপের কারণে কর্মচারীরা ভিতরে ভিতরে যন্ত্রনাদগ্ধ হতে থাকে। আর প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সুচারুরূপে আঞ্জাম দেওয়ার পরিবর্তে কাজটি তারা বিকৃত ও বিনষ্ট করে ফেলে।