📄 অনেচ্ছিক আচরণ
কিছু কিছু রোগীদের থেকে হাস্যকর আচরণ প্রকাশ পায় সত্য। কিন্তু ঐ কাজে লিপ্ত হওয়ার পেছনে তার ইচ্ছার কোনও দখল থাকে না। অর্থাৎ সেচ্ছায় সে ঐ কাজে লিপ্ত হয় না।
উদাহরণ স্বরূপ কারও হাত ধোয়ার রোগ আছে। কারও সাথে সে হাত মিলায় বা মুসাফাহা করে তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত সাবান দ্বারা ভালমত তার হাত না ধৌত করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ হাত স্বশরীরে লাগাবে না। এমনভাবে পৃথক ঝুলিয়ে রাখবে, যেন তা তার শরীরেরই অংশ নয়। বেবি-টক্সেী ইত্যাদিতে বসার প্রয়োজন হলে সর্বদা একাকী বসবে। যেন অবাঞ্ছিত কিছু লেগে হাত দুর্গন্ধযুক্ত না হয়ে যায়।
আরেক ব্যক্তি ঝুটা পানিকে ঘৃণা করে। একবার জনৈক ব্যক্তি তার টিউব ওয়েলে মুখ লাগিয়ে পানি পান করেছিল। ব্যাস, কি আর করা! সে লোকটি পুরো পাম্প উঠিয়ে ফেলে এবং নিজে উপস্থিত থেকে তা ভালভাবে পরিষ্কার করে পুনরায় বসিয়ে নেয়। অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তির পা ধোয়ার পাগলামী রয়েছে। অযু করতে বসলে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত সে পা ধৌত করতে থাকে। কোনও সাবান বা ব্রাশ দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে তা নয় বরং বসে শুধু পানি ঢালতে থাকে এবং হাতে ঘষতে থাকে। কয়েক বার এমন হয়েছে যে, বসে তার পা ধুতে ধুতেই নামাযের জামাআত শেষ।
আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক আছেন। তার ঘরে যদি কেউ অসুস্থ হয়ে সুস্থতা লাভ করে, তবে তার বাচ্চা-কাচ্চারা বাকি ঔষধ পথ্য সেবন করে ফেলে। ওগুলে ফেলে রেখে নষ্ট করা আদৌ পছন্দ করে না। এমন লোকও পাওয়া যায়, যারা রাতে ঘুমানোর পূর্বে ঘরের বাইরের দরজায় তালা ঝুলিয়ে রাখে। তারপর রাতে তিন চার বার ওঠে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখে আসে, বাস্তবিকই তালা লাগানো আছে কি নেই?
📄 অযৌক্তিক ভয় ভীতি
সন্দেহ প্রবণ লোক একেবারে খামোখা বিষয়েও ভয় পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পর্যায়ে রণক্ষেত্র ভারি উত্তপ্ত ছিল। নিরাপদ ক্যাম্পে বসেও এক সিপাহী প্রচণ্ড রকমের ভীত সন্ত্রস্ত ছিল। তাই সে গোলা বর্ষণের মুহূর্তেই সেখান থেকে পালিয়ে আসে। তার উপর মনোস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায় যে, শৈশবে একবার সে বাবার ঘড়ি চুরি করেছিল। তা বিক্রি করে যখন ঘরে ফিরছিল। পথিমধ্যে এক চাপা গলিতে পাগলা কুকুর দেখতে পায়। তাকে দেখেই ঐ কুকুর জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। তাতে সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ঘটনাটি তার কাছে বিরাট পীড়াদায়ক ছিল। এতে তার মন ভীষণ আতঙ্কে উঠে, সংকীর্ণ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে আসল ঘটনা তো তার ব্রেণ থেকে মুছে গেছে। কিন্তু এখনও সে সংকীর্ণ ও বিপদসংকুল স্থানে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে যায়।
তেলাপোকা খুবই ক্ষুদ্র ও অক্ষতিকারক একটি পোকা। কিন্তু এক মহিলা এটাকে মারাত্মক ভয় করে। ঘরে যখন কোনও তেলাপোকা দেখতে পায়, তখন সে চেঁচাতে চেঁচাতে টেলিফোনের দিকে দৌড়ায় এবং তাকে তেলাপোকার কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য স্বীয় স্বামীকে অফিস ফেলে তৎক্ষণাত বাড়ী আসার জন্য তাগাদা দেয়। কয়েকবার তো এমন হয়েছে যে, স্বামী বেচারা জরুরী কাজে দূর শহরে ব্যস্ত ছিল। আর সে মহিলা জরুরী ভিত্তিতে তাকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে ফোনে ডাকতে থাকে। এ ধরনের আহমকী ও মূর্খতাজনিত ভয়-ভীতি কয়েক প্রকারের হতে পারে। উচ্চস্থানের ভয়, প্রশস্ত বা খোলা ময়দানে ভয়, আবদ্ধ জাগার ভয়, ক্ষুদ্র জীবাণুর ভয়, ভীড় বা মানুষের ভয়, বিষ প্রয়োগের আতংক, জীব-জন্তুর আতঙ্ক ও ভয়ের ভয় অর্থাৎ এমন আতঙ্ক যে, আমি ভয় পাব। বাহ্যতঃ এসব ভয় ভীতি নিতান্তই অযৌক্তিক ও দূর্বোধ্য মনে হয়। কিন্তু যদি এর গোঁড়ায় পৌছার চেষ্টা করা হয়, তবে দেখা যাবে- এসব ভয়-ভীতি একেবারে অমূলক নয়। এর পেছনে অবশ্যই কোনও কারণ রয়েছে।
📄 সন্দেহ রোগ
কিছু কিছু লোক সব সময় নিজের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। ডাক্তারী মতে সে সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল মানুষ। তদুপরি সে কখনও ক্লান্তি অবসানের অভিযোগ করে, কখনও অনিদ্রার কথা বলে, কখনও ক্ষুধামন্দার কথা বলে ইত্যাদি। যখন-তখন ডাক্তারের কাছে দৌড়ায়। একের পর এক ডাক্তার বদলাতে থাকে। কিন্তু রোগ নিরাময়ের নামও নেয় না। কেউ যদি ভুলেও বলে ফেলে, আপনাকে সুস্থ-সবল মনে হচ্ছে, তবে সে খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। এক কথায় সে রোগাক্রান্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করে। এমনই রোগাক্রান্ত এক যুবক চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ হাই পাওয়ারের ঔষধ সেবন করে বসে। এতে তার শরীরে মারাত্মক বিক্রিয়া ঘটে। শেষ পর্যন্ত কোন প্রস্তুতি ছাড়াই তাকে দুটি পরীক্ষা দিতে হয়। চিন্তা করলে দেখা যাবে সন্দেহ রোগও একেবারে অকারণে হয় না। এতে অনেক উপকার আছে। এ যুবকের কথাই ধরুন। সে তো সম্পূর্ণ সুস্থ-সবল ছিল। কিন্তু সে জানত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ভীষণ কঠিন। এখানে ভাল ভাল আশাবাদি লোকও হেরে যায়। পরাস্ত হলে মান-ইজ্জতে আঘাত লাগার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় কি এটাই উত্তম নয় যে, মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে যাবে। আর ব্যর্থতার দায়ভার অসুস্থতার চাপিয়ে স্বয়ং দায়মুক্ত হয়ে যাবে! এমতাবস্থায় মানুষের সংকল্প ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন পড়ে না। অজান্তে অনিচ্ছায় ব্যাপারটা স্বয়ং সঠিক দিকে মোড় নেয়।
📄 দুশ্চিন্তা
যে কোনও সাধারণ মানুষের জীবনে সময় সময় দুশ্চিন্তা এসে থাকে। কিন্তু সন্দেহ প্রবণ লোকদের সব সময় কোনও না কোনও ব্যাপারে মারাত্মক দুশ্চিন্তা পীড়িত করতে থাকে। কারও ধন-সম্পদ ছিনতাই হওয়ার আতঙ্ক হয়। কারও চাকুরি চলে যাওয়ার আশঙ্কা হয়। কারও কারও নিজের হুঁশ-বুদ্ধি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হয় কিংবা কারও পরীক্ষায় ফেল হওয়া কিংবা নাম্বার কম পাওয়ার দুশ্চিন্তা হয়ে থাকে। এ ধরনের লোক নিজেকে হেফাযত করা এবং সান্ত্বনা দেওয়ার লক্ষ্যে নানা ধরনের পদ্ধতি ও পন্থা অবলম্বন করে। তন্মধ্যে নিম্নে কিছু প্রদত্ত হল।
ক. বিনয়-নম্রতা ও আনুগত্য অবলম্বন করে। কেননা তার ধারণা মতে কোন মানুষ বাধ্যগত ব্যক্তিকে কষ্ট বা বিপদে ফেলে না।
খ. নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করে। যাতে সহজে কেউ তার ক্ষতি সাধনে সফলকাম হতে না পারে।
গ. পিছ পা হওয়ার মাঝেই মুক্তি মনে করে। জীবনের সংগ্রাম ও মারদাঙ্গা থেকে পালিয়ে ঘরকুণো হয়ে বসে।
ঘ. নিজের চিন্তা-ধারা ও হতবুদ্ধিতার বোঝাকে লাঘব করার চেষ্টা করে।
ঙ. সীমাতিরিক্ত খাওয়া বা পরিশ্রমে শরীর বিনষ্ট করে নিজের ভুল পেরেশানীতে ডুবে থাকে।
উপরিউক্ত আলোচনা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, সন্দেহ প্রবণ লোক কমবেশি স্বাভাবিক জীবন যাপন করে। পক্ষান্তরে মাজনুন বা পাগল লোক সম্পূর্ণ এর বিপরীত। সে যথারীতি রোগাক্রান্ত থাকে। তার চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত সেবা শুশ্রুষা ও তত্ত্বাবধান জরুরী হয়ে পড়ে। পাগলামীর বাহ্যিক আলামতগুলো হল-
১. দুনিয়া ছেড়ে চিন্তা জগতে ডুবে যায়।
২. বিস্ময়কর ও নির্বোধের মত আচরণ করে।
৩. অবাস্তব শব্দ শুনে আর কাল্পনিক ছবি দেখে।
৪. বাচ্চাদের মত আচরণ করে। যেমন, উল্টো দিকে চলে। বিছানায় প্রস্রাব পায়খানা করে দেয় ইত্যাদি।
৫. রোগী সকল মানুষের প্রতি খারাপ ধারণা করে। সব সময় মনে করে যে, লোকজন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
৬. কোনও কোনও রোগী নিজে নিজে ধোঁকা খায়। তার কাছে মনে হয়, সে কোনও বড় ব্যক্তিত্ব বা রাজা-বাদশা কিংবা খোদা।
৭. কোনও কোনও রোগী মোমের মত হয়ে থাকে। তার পুরা দেহটা জড়পদার্থের মত যে দিকে খুশি ঘুরানো যায়।
৮. এ রোগী অধিকাংশ সময় উত্তেজিত থাকে। কোনও প্রশ্নের জবাব দু তিন মিনিটের পূর্বে দিতে পারে না। অকারণেই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কাঁদতে থাকে।
৯. রোগী সব সময় পেরেশান ও চিন্তিত থাকে। কখনও কখনও আত্মহননের উপরও উদ্বুদ্ধ হয়ে যায়।
- সাইন্স ম্যাগাজিন