📄 প্রফুল্ল মনের মানুষ ক্যান্সার মুক্ত থাকে
ডাক্তার ইউয়ানেজ রচিত "সারাতান কা নফসিয়াত মুতালা'আ" গ্রন্থের দশম অনুচ্ছেদ থেকে নিম্নোক্ত আলোচনা সংকলন করা হয়ছে। (ক্যান্সারের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রকাশ হয় না, এমন কোনও সাপ্তাহ নেই। ক্যান্সার সম্পর্কে গবেষণা কেন্দ্রের অক্লান্ত প্ররিশ্রম এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করে অসংখ্য ছোট প্রাণী যেমন, ইঁদুরকে টিকা লাগিয়ে অত্যন্ত সৃক্ষভাবে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরিক্ষা চলছে। ঔষধপত্র ব্যবহার করে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। তথাপি অদ্যাবধি এর মূল কারণ কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাশাস্ত্রে কেবল এ রোগের শারীরিক দিক লক্ষ্য করা হয়ে থাকে। অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে গতানুগতিক ধারায় পরীক্ষ-নিরিক্ষা করা হচ্ছে কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্তের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। অবশ্য কেউ কেউ মনোবিজ্ঞানের দু' একটি বই-পুস্তক পড়ে এ ব্যাপারে কিছুটা প্রদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা কিছুদূর এগিয়ে আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন। এখানে আলোচ্য দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আমার ঐ গবেষণার ফসল, যা আমি ক্যান্সার আক্রান্ত মানসিক রোগিদের উপর করেছি। আমি তাদের মানসিক অবস্থায় বিশেষ অন্তর্মিল দেখেছি। তারা সকলেই একই প্রকৃতির লোক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যদিও শত মানুষ সংখ্যায় অনেক নয়। তথাপি এসব রোগীদের স্বভাব-চরিত্রে বিরাট অন্তর্মিল রয়েছে। যে কারণে বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল হয়ে ওঠেছে।
বছরের পর বছর স্নায়ুতন্ত্রের রোগীদের চিকিৎসা করে আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ব্রেন বিক্রিয়ার কারণে অসংখ্য শারীরিক রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয়। একজন ডাক্তারের কাছেও আমি এ অভিমত ব্যক্ত করেছি। তিনি আমার সাথে একমত পোষণ করেছেন। তবে বলেছেন- এ দৃষ্টিভঙ্গি জনসমক্ষে প্রকাশ করা খুবই বিপদজনক। কথাও তাই। ডাক্তারগণ কোনও রোগের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সাধারণ লোকদের জানাতে চান না। বিশেষতঃ ক্যান্সার সম্পর্কে তাদের ধারণা হল, ক্যান্সারের বিস্তারিত তথ্য জনসাধারণকে জানালে ক্যান্সার সম্পর্কে তাদের অহেতুক বরং ক্ষতিকারক আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।
অর্থাৎ যেভাবে মানুষের মাঝে ক্ষয়-জ্বর, জলাতঙ্ক এবং হৃদরোগের সন্দেহ বিস্তার লাভ করেছে, তদ্রুপ ক্যান্সারের সংশয়ও সৃষ্টি হবে। স্বয়ং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্ররাও এ সংশয়ে আক্রান্ত, সাধারণ মানুষ কেন আক্রান্ত হবে না? বার বছর আগে আমেরিকার ছোট্ট একটি চিকিৎসকদল ক্যান্সার প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে। লক্ষ্য ছিল, এই ধ্বংসাত্মক ব্যাধি সম্পর্কে যে অজ্ঞতা প্রচলিত আছে, তা দূরীভূত করা। কেননা জ্ঞান অর্জন ছাড়া কোনও রোগ-ব্যাধির উপর কেউ জয় লাভ করতে পারে না। কিন্তু আক্ষেপ হল, এ সংগঠন ক্যান্সারের আলামত ও সেকেলে ইচ্ছাগুলোর বিশ্লেষণ না করে শুধুমাত্র এ উপদেশ দেয় যে, দ্রুত অপারেশন করাবেন।
মূলত: ক্যান্সার রোগীর মানসিক, মানবিক ও শারিরিক শৃংখলা বিকৃত হওয়ারই প্রমাণ কাজেই তাকে তৎক্ষণাত কোনও সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেসব ছাত্ররা আফ্রিকার মরুভূমি ও বনাঞ্চলে চিকিৎসারত রয়েছে, তারা বলেন, সেখানকার রুচিশীল সভ্য লোকজন খুব কমই এ ধ্বংসাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। জার্মানী ডাক্তার কেওন হাইমের গবেষণায় জানা যায়, স্থূলদেহী মানুষ অপেক্ষা জীর্ণকায় লোক খুব কম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ ধনী সম্পদশালী ও অধিক ভোজনকারী ব্যক্তিদের তুলনায় দরিদ্র-অনাহারী, অর্ধাহারী লোকদের এ রোগ কম হয়। তবে ডাক্তার ইউয়ানেজ স্বীয় গ্রন্থে নিম্নোক্ত বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন।
জনৈক ইংরেজ লেখক দাবী করেছিলেন, তিনি এ রোগের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে ফেলেছেন। তার মতে হজমশক্তির দুর্বলতা অনুপ্রবেশের কারণে সৃষ্ট বিষ, এমনকি খাবারে ভিটামিনের অভাব এর প্রকৃত কারণ। লেখক তার বিশাল গ্রন্থে অসংখ্য উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের দাবী প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
ডাক্তার ইউয়ানেজের উক্ত গবেষণাকর্মের সারকথা হল, ক্যান্সার একটি শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি। অর্থাৎ কোনও খোঁচ-পাঁচড়া বা কোনও সূক্ষ্ম জ্বালা-যন্ত্রণা কিংবা অন্য কোনও কারণে যদি শরীরের কল-কব্জা যখম ও আহত হয়, তাহলে মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এখানে অন্য কোনও কারণ দ্বারা এই মানসিক যন্ত্রণাই উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে তিনি স্বীয় গ্রন্থে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বিদগ্ধ গবেষক প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক ডাক্তার জংগের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, মানুষ যখন কোনও স্নায়ুতন্ত্রের রোগের কারণে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব ও পেরেশান হয়ে যায় কিংবা তার ইজ্জত-সম্মানে আঘাত লাগে, তখন সে শারীরিকভাবেও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তার জংগের নিম্নোক্ত বক্তব্য আমাদের দাবীকে আরও সুস্পষ্ট করে দেয়।
তিনি বলেন- সাহসী ব্যক্তি মাত্রই নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণের পেছনে ডুবে থাকে। ক্যন্সার আক্রান্ত রোগীদের মাঝে এ মোহ ও বাস্তবতা এত বেশি হয়ে থাকে যে, সকলেই তা অনুভব করতে পারে। তার মৌলিক চাহিদাগুলো কিংবা জীবনের লক্ষ্য-উদ্যেশ্য তার মনের গভীরে স্থান করে নেয়। সাধারণতঃ ক্যান্সার আক্রান্তদের দেখা যায়, মৌলিক চাহিদা বা মুহব্বতের ক্ষেত্রে জীবনের বাজি ধরে এবং প্রাণপনে ঝুকে পড়ে। সে নিজের লক্ষ্য বস্তু কিংবা নির্ধারিত কর্তব্যে এমনভাবে ডুবে যায় যে, তাছাড়া তার জীবনটাই নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়।
উপরিউক্ত গ্রন্থে জনৈকা চাকরানীর ঘটনা রয়েছে। এ চাকরানী কোনও ইবাদত খানায় নিয়মিত ঝাড়ু দিত। তার দায়িত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও একদিন এক উর্ধ্বতন অফিসার তাকে বরখাস্ত করে দেয়। ফলে তার রিযিকের এপথ বন্ধ হয়ে যায়। এ বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সে ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মাত্র কদিনের ভেতর সে ধুকে ধুকে মারা যায়।
ক্যান্সারের আক্রমণ অতিসূক্ষ্ম ও রহস্যজনকভাবে এর সংক্রমণ ঘটে। এর কোনও নিয়ম-নীতি নেই। সহসা আক্রান্ত ব্যক্তির পূর্বের সরল-সাধারণ জীবন যাত্রা ও স্বভাব-চরিত্র পাল্টে যায়। কেননা যে জিনিসের প্রতি তার আগ্রহ ছিল, সেটা তাকে প্রতারিত করেছে। এ ব্যর্থতার কষ্ট জীবনের চালিকা শক্তিটাই বিনষ্ট করে দেয়। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর উপর মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা করে জানা গেছে, তাদের প্রত্যেকের মাঝেই একটি কারণ ধরা পড়েছিল যে, রোগী ইতোপূর্বে কোনও না কোন মানসিক আঘাত পেয়েছিল। ফলে তার আশা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ স্বভাবতই কোনও উদ্দেশ্য পূরণের মানসে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত থাকে। এতে যখন বিঘ্ন ঘটে তখন নানা ধরনের স্নায়ুতান্ত্রিক সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। সে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কিংবা উন্মাদ হয়ে পড়ে অথবা শিশুসূলভ আচরণ করতে থাকে।
মানুষ নিশ্চিতভাবে কিছু একটা করা অর্থাৎ কোনও উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই দুনিয়ায় এসেছে। মানুষ কি, প্রত্যেক বৃক্ষরাজি ও উদ্ভিদেরও কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে। তা ফলমূল, ফুল বা বীজ প্রভৃতি উৎপন্ন করে।
ডাক্তার ইউয়ানেজের অভিমত হচ্ছে, যেসব লোক কোনও সৃষ্টিশীলতা বা আবিষ্কারের কাজে নিয়োজিত, তাদের যদি কোনরূপ আঘাত লাগে তবে তাদের উপর এতটা প্রভাব পড়ে না, যতটা প্রভাব পড়ে ব্যর্থ ও উদ্দেশ্যহীন জীবন যাপনকারী লোকদের উপর। উদ্ভিদ, জড়পদার্থ এবং অন্য প্রাণীজগতের চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে ব্যর্থতা পছন্দ ও সহ্য করে না। ব্যর্থতা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন তার বিভৎস পরিণতি ঢেকে আনে। ক্যান্সার আক্রান্তদের উপর গবেষণা করে জানা গেছে যে, তারা প্রথমে সুস্থ সবল ছিল পরবর্তি জীবনে এমন কোন ঘটনা ঘটেছে, যাতে সে লক্ষ্যস্থলে পৌছতে পারে নি এবং উদ্দেশ্য সাধন করতে পারেনি। সে নিজের প্রিয় জিনিস অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তার হৃদয় অন্দরে বয়ে যাওয়া এ মানসিক ঝড় সম্পর্কে প্রিয়জন ও বন্ধু বান্ধবদের কি ক্যান্সার হতে পারে?
যে ব্যক্তি কোনও কারণে নিজের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয় কিংবা যারা স্ত্রীর তিক্ত আচরণ ও ভাষার হাতুড়ী পেটার কারণে মানসিক অশান্তিতে থাকে, সে যখন নিজের প্রশান্তির উদ্দেশ্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ প্রত্যাশা করে কিংবা আনন্দ উল্লসের আশায় থাকে সাধারণতঃ তখনই এসব লোক পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। স্ত্রী সন্তান না থাকা, দাম্পত্য জীবনে অমিল, সামঞ্জস্যহীন বিবাহ-শাদী কিংবা বিলাসিতার কারণেও মানুষ অতি দ্রুত ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় বারবার এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ মনে চরম আঘাত পেলে, মাহরুম বা বঞ্চিত হলে অথবা উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলে কিংবা আশা-আকাঙ্খা হতাশায় পরিণত হলে মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
📄 ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্টার পেছনে ইসলামী নীতি
মনোবিজ্ঞানের প্রতি প্রথম যে আগ্রহ ছিল। এ বিষয়ে আমি পশ্চিমা লেখকদের অনেক বই-পুস্তক পড়েছি। সাথে সাথে ইসলামী বই-পুস্তকও প্রচুর অধ্যয়ন করেছি। তবে এসব বই অধ্যয়নকালে একটি বিষয় আমাকে বিস্মিত করেছে। তা হল, স্বাচ্ছান্দ্যময় সফল জীবন যাপনের উদ্দেশ্য পশ্চিম জগতের মনস্তত্ত্বিকগণ যেসব মূলনীতি ও থিউরী উপহার দিয়েছেন, তা মূলত কোনও নতুন বিষয় নয় বরং চৌদ্দশত বছর পূর্বেই বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানব জাতিকে এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
কোনও জিনিসের স্রষ্টা বা আবিষ্কারকই তার যাবতীয় পার্স বা অংশ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকেন। মানবদেহ এবং জান সৃষ্টিকারী সত্ত্বাও এত উত্তমরূপে মানুষের মনোজগৎ সম্পর্কে নিজের আম্বিয়ায়ে কিরামের মাধ্যমে আমাদেরকে অবহিত করেছেন, এটা তার স্রষ্টা হওয়ারই অকাট্য প্রমাণ। আজ আমরা আল্লাহর কিতাবকে তাক-আলমারী ইত্যাদির সৌন্দর্য বানিয়েছি। আর নবীজীর শিক্ষা ছেড়ে যেভাবে পশ্চিমা শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে পড়েছি, এটা আমাদের চরম দুর্ভাগ্যই বলতে হয়। অথচ কুরআনে কারীম এবং নবীজীর শিক্ষা-দীক্ষার উপর আমল করলে আমরা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সফল জীবন লাভ করতে পারি।
সভা-সেমিনারে আমরা প্রায়ই দেখি, দু একজন ব্যক্তি পুরো মাহফিলে ছায়া হয়ে আছেন এবং সর্বাধিক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছেন। তাকে দেখে আমাদের অন্তরেও আগ্রহ জাগে, আহ! আমি যদি এ মাহফিলের প্রধান আকর্ষণ হতে পারতাম। আর সব সময় ভক্ত-অনুরক্ত ও প্রিয়জনেরা আমাকে ঘিরে রাখত। বাস্তবিকই আপনি যদি একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব হতে চান তবে নিম্নোক্ত ইলহামী মূলনীতিগুলো মনেপ্রাণে গ্রহণ করুন। অল্প কদিনেই আপনার শুভাকাঙ্খী ও ভক্ত-অনুরক্তের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে।