📄 অভিসম্পাত ও মেজর গোবানীর প্রতিক্রিয়া
তিনি এমন এক নওমুসলিম যিনি মনোস্তত্ত্ব ও আধ্যাত্মিকতার উপর অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। অসংখ্য মাসআলা-মাসায়েলের সমাধান ও থিউরী আবিষ্কারে সাহায্য করেছেন। লানত সম্পর্কে মেজর গিবানী বলেন,
ইতোপূর্বে আমি যখন অমুসলিম ছিলাম, তখন লানত সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না। কেননা লানতের সর্ম্পক শুধুমাত্র আত্মার সাথে। আমি যখন এ নিয়ে গবেষণা করলাম, তখন একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এ লানত সম্পর্কে চিন্তা করলেই আমার শরীর শিহরিয়ে ওঠেছে। এ অবস্থায় যদি আরও একটু বেশি চিন্তা করেছি, তখন আমি মারাত্মক বিপাকে পড়েছি। অবস্থার অবনতি হতে হতে শেষ পর্যন্ত এ শব্দের কারণে আমার এলার্জি হয়ে গেছে।
আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম, শেষ পর্যন্ত এ শব্দের প্রতি আমার এত ঘৃণা জন্মালো কেন? ইতোমধ্যে এর স্বরূপ সম্পর্কে অভিজ্ঞ জনৈক মুসলমানের সাক্ষাত ঘটে। তিনি আমাকে এমন কথা শোনালেন, যা আমার জন্য সান্ত্বনার বাণী হয়। তিনি বলেন, মানুষের মন-দিল মুমিন। এটা যত স্বচ্ছ-নির্মল হতে থাকবে তত বেশি পাপ ও গুনাহের অনুভূতি জাগ্রত হবে। কিন্তু যেহেতু তা স্বচ্ছ-নির্মল, তাই গুনাহের বিক্রিয়ায় পতিত হবে না এবং সহজেই গুনাহ হবে না। অথচ এই অন্তরে ঈমানের নূর থাকে আর লানত আল্লাহ তা'আলার কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজ, এ গর্হিত ও জঘন্য কাজটি আপনার অন্তরে মন্দ প্রতিক্রিয়া করে থাকে। এ কারণেই আপনি লানত শুনে বিরাট এক বোঝা মনে করেন। (কুরআনুল করীম)
📄 বিংশ শতাব্দী বিস্ময়কর কাহিনী
প্রসিদ্ধ নগরী বাগদাদ থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে অবস্থিত সালমান। বর্তমানে প্রায় ছোট ছোট পাঁচশত পরিবারের বসবাস এখানে। এটা সেই পূণ্যভূমি, যেখানে গভর্নরের পদমর্যাদায় বহু সাহাবায়ে কিরাম অবস্থান করেছিলেন। যা দীর্ঘদিন প্রাচীন ইরাকের রাজধানী ছিল। শহরটি দজলা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত।
হযরত উমর ফারুক রাযি. এর শাসনামলে হযরত সা'দ বিন আবি ওয়াককাস রাযি. এর সেনাবাহিনী দজলা নদীর ডান প্রান্তে লোহিত সাগরের তীরে এসে পৌছেন। যা মূলতঃ মাদায়েনের ডান দিকের অংশ ছিল। তখন দজলা নদী পাড়ি দিয়ে মাদায়েনে আক্রমন করা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। জানা যায় ইয়াজদে গির্দের নির্দেশে সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পুল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ইরানী সীমান্ত রক্ষিরা নৌযানে করে মাদায়েনে পালিয়ে যায়। যাতে করে দজলা নদীর গুপ্তচোরা উত্তাল তরঙ্গ এক কুদরতী দূর্গের কাজে আসে। ইসলামের সহায়-সম্বলহীন মর্দে মুজাহিদগণ দজলা নদীর তীরে এসে থমকে দাঁড়ালেন। তাদের চোখের সামনেই ছিল মাদায়েনের বিশাল বৈচিত্রময় শহরটি। রাতের অষ্টপ্রহর কেটে যাওয়ার পর এই সৈন্যবাহিনী সেখানে গিয়ে পৌঁছায়। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ তাদের পথ রুখে দাঁড়াল। অপর তীরে বাদশা নওশে রওয়ার দূর্গ আঁধার রাতের তারকারাজির মত চমকাচ্ছিল। আরবের বেদুইনরা ইতোপূর্বে এমন প্রাসাদ আর কখনও দেখেনি।
অনেক ইতঃস্ততা ও চিন্তা-ভাবনার পর সেনাপতি হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াককাস রাযি. আল্লাহ তা'আলার নুসরত ও সাহয্যের উপর পরিপূর্ণ ভরসা করে আল্লাহর কাছে দু'আ করলেন। এরপর সৈন্যবাহিনীসহ দজলা নদীতে নেমে পড়েন। সমুদ্রের বুক তৎক্ষণাত মাটিতে মিলিয়ে যায়। সমুদ্রে যতদূর দৃষ্টি গোচর হয়েছে, ততদূর পর্যন্ত ঘোড়া আর মানুষই দেখা যাচ্ছিল। বিন্দু পরিমাণ পানিও তাদের পদযুগলে দেখা যায় নি। শুকনা ভূমিতে যেভাবে মানুষ কথা বলে পথ চলে, তদ্রুপ স্বাভাবিক গতিতেই দজলা নদী পাড়ি দিয়ে মুসলিম সেনাবাহিনী উপরে চলে যায়। সেখানে হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াককাসের রাযি এর সাথে হযরত সালমান ফারসী রাযি ও ছিলেন। হযরত সাদ রাযি বললেন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তা'আলা নিঃসন্দেহে এ দ্বীনের জয় দান করবেন। দ্বীনের শত্রুদের পরাস্ত করবেন। তবে এমন কোনও গুনাহ না হতে হবে, যা নেক আমল বরবাদ করে দেয়। হযরত সালমান ফারাসী রাযি জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ!
মুসলমানদের জন্য জমীনের মত সমুদ্রকেও পদানত করে দেওয়া হয়েছে। শপথ! ঐ সত্তার, যার হাতে সালমানের জীবন। আমরা সমুদ্রে যেভাবে নামলাম, তদ্রুপ ভালো ও সুস্থাবস্থায়ই সমুদ্র পাড়ি দেব। আর হয়েছেও তাই।
পুরা সৈন্যবাহিনী সুস্থ সবল অবস্থায়ই সমুদ্র পাড় হয়ে গেলেন। ইরানিরা এমন দৃশ্য অদ্যাবধি দেখেনি। ফলে তারা হতভম্ব হয়ে গেল এবং 'দৈত্য-দানব আসছে' 'দৈত্য দানব আসছে' বলে আর্তচিৎকারে পালিয়ে গেল। এভাবে মাদায়েনে মুসলমানদের সুখ-সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।
মাদায়েনের এই ঐতিহাসিক শহরের অবস্থা অবনতি হতে হতে বর্তমানে ছোট একটি শহর আছে। সম্রাট নওশেরওয়ার রাজ-প্রাসাদের ধবংসাবশেষ, কেসরার শেষ স্মৃতিটুকুই রয়েছে, যা দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পর্যটক ও দশনার্থীরা দেখার জন্য ভীড় জমায় সেখানে। এখানে কয়েকটি সরাইখানাও রয়েছে। আছে একটি আড়ম্বর কবরস্থান যার মিনারার নিচে হযরত সলাইমান আ. এর মাযার অবস্থিত। পৃথক পৃথক কক্ষে মনোরোম আকৃতিতে হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান ও জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী রাযি. এর মাযার রয়েছে। ডান দিকে অনতি দূরে খুবই মোহনীয় দৃশ্যে বয়ে চলেছে দজলা নদী।
সাহাবায়ে কিরামের মাযারটি নির্মান করা হয় বাদশাহ ফায়সাল প্রথম এর যুগে দ্বিতীয়বার তাদের দাফনের পর। পূর্বে উক্ত সাহাবায়ে কিরামের মাযার ছিল পবিত্র নগরী সালমান থেকে দুই মাইল দূরে এক অজোপাড়া গাঁয়ে। সম্ভবতঃ কখনও কারও ফাতেহা পাঠের ইচ্ছা হলেই কেউ সেখানে যেত। ঐ দুই সাহাবার মাযার যিয়ারত এবং ফাতেহা পাঠের জন্য লোকদেরকে বিন্দুমাত্র তাগিদ করা হত না। যদি কারও খুব বেশি আগ্রহ হত তাহলে পবিত্র নগরী সালমান থেকেই ফাতেহা পাঠ করে দু'আ করে নিত। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা বাগদাদের অধিবাসি। ঐ মহান সাহাবান্বয় রাযি. কে পুরনো মাযার থেকে স্থানান্তরিত করে পবিত্র নগরী সালমানে দাফন করেছি। আমরা ছাড়াও লক্ষ কোটি মানুষ এ ঘটনার প্রত্যক্ষ্য সাক্ষী। ইসলামের সত্যতার জীবন্ত সাক্ষী। ঘটনা হচ্ছে, হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রাযি স্বপ্নযোগে ইরাকের সম্রাট বাদশা ফয়সালের কাছে আরযি পেশ করলেন, আমাদের দুজনকে বর্তমান কবরস্থান থেকে স্থানান্তরিত করে দাজলা নদীর কাছাকাছি এনে দাফন করা হোক। কেননা আমার কবরে পানি আর জাবের রাযি. এর কবরে লবণ আসতে শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় কর্মব্যস্ততার কারণে বাদশা ফায়সাল দিনের বেলায় এই স্বপ্নের কথা একেবারেই ভুলে বসেন। দ্বিতীয় রাতে আবারও তিনি একই স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু পরদিন সকালে আবারও স্বপ্নের কথা ভুলে যান।
তৃতীয় রাতে হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রাযি. ইরাকের মুফতীয়ে আযমকে স্বপ্নযোগে ঐ একই কথা বলেন। আরও বলেন, আমি ইতোপূর্বে দুইরাতে বাদশাকে স্বপ্নযোগে একথা বলেছি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্মব্যস্তায় তিনি তা ভুলে যান। এখন এব্যাপারে তাকে সচেতন করা তোমার কর্তব্য। তাকে বলে আমাদের বর্তমান কবরস্থান থেকে স্থানান্তরিত করার বন্দোবস্ত কর। মুফতীয়ে আযম রহ. পরদিন খুব সকাল সকাল প্রধান মন্ত্রী নূর সাইয়িদকে ফোন করে বললেন, আমি আপনার সাথে সাক্ষাত করতে চাই। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সাইয়িদের সাথে সাক্ষাত করে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন। নূর সাইয়িদ সাহেব তৎক্ষণাত বাদশার সাথে মুফতী সাহেবের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিলেন। তিনি নিজেও সাথে গেলেন। মুফতী সাহেব নিজের স্বপ্নের কথা স্ববিস্তর তুলে ধরলেন। তখন বাদশা ফায়সাল বললেন, নিঃসন্দেহে আমি পরপর দুরাতে স্বপ্নযোগে তাকে রাযি. দেখেছি এবং প্রতিবারই তিনি আমাকে একথাই নির্দেশ দিয়েছেন।
আমি পেরেশান ছিলাম যে, এটা কেমন আজব স্বপ্ন। এখন আপনিও যখন চলে এলেন, আপনিই বলুন- এখন কি করা উচিৎ? মুফতী আযম সাহেব রহ. বলেন, তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, আমাদের দুজনকে এই কবরস্থান থেকে স্থানান্তরিত করে দজলা নদীর একটু দূরে কোথাও দাফন করে দাও। এখন এর চেয়ে অধিকতর সুস্পষ্ট কথা আর কি হতে পারে। বাদশা বললেন, আমার খেয়াল হচেছ সতর্কতা হিসেবে প্রথম এর সত্যতা যাচাই করে নেওয়া হোক যে, এখনও সেখানে নদীর পানি আছে কি না। মুফতীয়ে আযম সাহেব এতে একমত হলেন।
তারপর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চীফ ইঞ্জিনিয়ারে প্রতি এই মর্মে নিদের্শ জারী করলেন যে, দজলা নদী অভিমুখে বিশ ফিট পর্যন্ত বোরিং করে দেখা হোক যে, নদীর পানি সে দিকে চুষে চুষে আসছে কি না এবং সন্ধ্যা নাগাদ এর রিপোর্ট পেশ করা হোক। এরপর সারাদিন স্থানে স্থানে খনন কাজে করা হয়। কিন্তু পানি তো দূরের কথা; মাটিতে সামান্য আদ্রতাও ছিল না।
মুফতীয়ে আযম সারাদিন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন এবং গোটা কার্যক্রম স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। তিনি খুবই হতাশ হোন। সন্ধ্যায় এ সংবাদ বাদশাকে জানানো হয়।
ঐ রাতে হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রাযি বাদশাকে জোর তাগিদ করেন যে, আমাদেরকে স্থানান্তরিত কর এবং দ্রুত কর। সমুদ্রের পানি আমাদের কবরে জমা হতে শুরু করেছে। বাদশা যেহেতু রিপোর্ট পেয়েছিলেন, তাই তিনি স্বপ্নের কথা ভ্রুক্ষেপ করলেন না। পরদিন হুয়াইফাতুল ইয়ামান রাযি স্বপ্নযোগে মুফতী সাহেবের কাছে তাশরীফ নিলেন এবং কঠোরভাবে বললেন, আমাদেরকে এখান থেকে অতি দ্রুত স্থানান্তরিত করো। পানি আমাদের কবরে ঢুকে পড়েছে। মুফতী সাহেব পরদিন সকাল সকাল অত্যন্ত পেরেশানীসহ রাজদরবারে উপস্থিত হলেন এবং বাদশাকে নিজের স্বপ্নের কথা বললেন।
বাদশা চেচিয়ে উঠে বললেন, মাওলানা সাহেব! আপনি নিজেই চিন্তা করুন, আমি কি করতে পারি? সেখানে আপনি সারাদিন উপস্থিত ছিলেন। খনন কাজ আপনার সামনেই হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক রিপোর্ট এসেছে- সেখানে পানি তো দূরের কথা আর্দ্রতাও নেই। কাজেই আমাকে পেরেশান করা এবং নিজে পেরেশান হওয়ার মাঝে আপনার লাভ কি? আসুন, আরাম করুন। মুফতী আযম রহ. বললেন, নিঃসন্দেহে গোটা পরিকল্পনা আমার সামনে হয়েছে আর যে রিপোর্ট এসেছে, তাও আমার জানা আছে। কিন্তু আপনার এবং আমার উপর নিয়মিত একই নির্দেশ হচ্ছে। কাজেই আপনি মাযার দুটো লাশ স্থানান্তারিত করে দিন। ইরাকের বাদশা বললেন, বেশ আপনি ফতোয়া দিয়ে দিন।
এরপর মুফতী আযম রহ. সাহাবায়ে কিরামের কবর খনন করা এবং তাদের মৃতদেহ স্থানান্তরিত করার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ফতোয়া লিখে দিলেন। মুফতী সাহেবের এ ফতোয়া এবং ইরাকের বাদশাহর নিদের্শ সংবাদপত্রে প্রকাশিত করা হয়। বলা হয়- কুরবানীর ঈদের দিন বাদ যুহর অমুক অমুক সাহাবায়ে কিরামের কবর খোলা হবে।
সংবাদপত্রে এ খবর পেয়ে সর্বস্তরের জনসাধারনের মাঝে উৎসাহ-উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে যায়। একে একে ঐ সংবাদ গোটা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে হজ্বের মৌসুমে সারা বিশ্বের মুসলমানগণ মক্কা শরীফে এসে সমবেত হয়। তারা আগ্রহ প্রকাশ করে যে, কুরবানির ঈদের কয়েক দিন পরে কবর খোলা হোক যাতে এতে আমরাও অংশগ্রহণ করতে পারি। এদিকে ইরান, তুর্কিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, হিজায, বুলগেরিয়া উত্তর আফ্রিকাসহ হিন্দুস্তান থেকে বরাবর ইরাকের বাদশার নিকট ফোন যেতে লাগল যে, আমরাও তাদের জানাযায় অংশগ্রহণ করতে চাই, অনুগ্রহপূর্বক কিছুদিন সময় দেওয়া হোক।
এক দিকে গোটা মুসলিম বিশ্বের অব্যাহত পীড়াপীড়ি আর অপর দিকে স্বপ্নক্ষণে দ্রুত কাজ সম্পাদনের নির্দেশ। কাজেই প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, বাস্তবিকই যদি কবর দুটিতে পানি প্রবেশ করে থাকে, তাহলে এই আনুষ্ঠানিকতা বিলম্বিত করলে কবর দুটি যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায়। সুতরাং মুফতী সাহেব পরামর্শ দিলেন, সমুদ্রের দিক হেত ১০ ফিট দূরত্ব পর্যন্ত সতকর্তা হিসেবে একটি দীর্ঘ ও গভীর পরিখা খনন করে সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হোক। সাথে সথে দ্বিতীয় নির্দেশ জারি করা হল যে, গোটা মুসলিম বিশ্বের গভীর উৎসাহ-উদ্বেগের কারণে এ আনুষ্ঠানিকতা কুরবানির ঈদের দশ দিন পরে পালন করা হবে।
মাদায়েনের মত ছোট একটি অনাবাদ নগরী মাত্র দশ দিনেই আবাদ হয়ে যায় এবং সৌন্দর্য ও সৌকর্যের দিক দিয়ে দ্বিতীয় বাগদাদে পরণিত হয়। এলাকার অতিথি পরায়ন প্রত্যেকটি ঘর মুসলমান মেহমানে মুহূর্তেই ভরে যায়। অলিগলি, বাজার-বন্দরে এত ভীড় ছিল যে, ধীরে ধীরে ঠেলে ঠেলে সামনে অগ্রসর হতে হত। মাঠ প্রান্তর দূর দূরান্ত পর্যন্ত তাবুতে ভরে গেল। স্থানে স্থানে সফর বিরতী বিশ্রামাগার, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মুসাফির খানাসহ সরকারী লঙ্গরখানা চালু করা হল। তখন ইরাক সরকার কাষ্টমের নির্দেশ তুলে নেন। পার্সপোর্টের কড়াকড়িও বহাল রাখেন নি। এক সরকারী ঘোষণায় বলে দেন, বহিরাগত সকল মুসলমান শুধুমাত্র নিজের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনুমতিপত্র নেবে। তথাপি মাদায়েনে আগতদের মধ্যে হাজী সাহেবদের আধিক্য ছিল, যাদের কাছে যথারীতি পাসপোর্টও ছিল।
তাছাড়া তুর্কিস্তান ও মিসর থেকে বিশেষভাবে সরকারী প্রতিনিধিদল আসে। সাহাবায়ে কিরামদের সালাম পেশ করার উদ্দেশ্য তাদের সাথে নিজ নিজ সরকারী শিল্পী গোষ্ঠীও আসে। মুস্তফা কামাল ও তুর্কী সরকারের পক্ষ থেকে সকলের মনোনীত মন্ত্রী প্রতিনিধিত্ব করেন। আর মিসরীয় দলে উলাময়ে কিরাম ও মন্ত্রিবর্গ ছাড়াও সমকালের বুযুর্গরাও ছিলেন। সাবেক শাহ ফারুক মিসরের অধিপতি ছিলেন। তিনি দলের প্রতিনিধিত্ব করেন।
উভয় কবরের আশপাশে বহুদূর পর্যন্ত আগেই খোদাই করে রাখা হয়েছিল। কবরের এক দিকে সিমেন্টের ঢালাই করা ছিল। যেন ঢালাইয়ের দিক থেকে খোদাই করে পবিত্র লাশ মাঠির উপরে উঠিয়ে নেওয়া যায়। ক্রেন ফুলের উপর পূর্ব হতেই তাপ মাত্র নিয়ন্ত্রণ করে রেখে ছিলেন, যাতে মোবারক লাশ দুটিকে সহজেই কফিনে বয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
মাদায়েনে চূড়ান্ত পরিসংখ্যান হিসেবে তখন পাচ লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়। যেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্র, ধর্ম-বর্ণ প্রত্যেক দল বিভিন্ন আকীদা-বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার লোকজন অন্তর্ভূক্ত ছিল। পরিশেষ প্রতিক্ষিত দিনও এসে গেল। সে দিন অত্যন্ত আগ্রহ-উৎসাহ নিয়ে মুসলমানগণ পবিত্র নগরী সালমানে সমবেত হয়েছিলেন। সোমবার দিন বেলা বারোটার সময় লাখো জনতার উপস্থিতিতে কবর দুটি খোলা হয়।
হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রাযি. এর কবরে বাস্তবেই কিছু পানি এসে গিয়েছিল। আর জাবের রাযি এর কবরে কাদা সৃষ্ট হয়ে গিয়ে ছিল অথচ কবর ও দজলা নদীর মাঝে দুই ফার্লং দূরত্ব ছিল।
বহিরাগত সুধীজন, ইরাক সরকারের সদস্য বৃন্দ এবং বাদশা ফায়সালের উপস্থিততে প্রথমে হযরত হুযাইফা রাযি এর মোবরক লাশ ক্রেনের সাহায্যে এমনভাবে উঠানো হয় যে, খুব স্বাভাবিক ভাবেই স্ট্রেচারে এসে পড়ে। এরপর ক্রেন থেকে স্ট্রেচার পৃথক করে বাদশা ফায়সাল মুফতী আযম তুর্কী সরকারের মনোনীত মন্ত্রী এবং যুবরাজ সমসাময়িক ওয়ালীয়ে মিসর ফারুক এর কাঁধে দেওয়া হয়। অত্যন্ত আদব ও সম্মানের সাথে এক সীসার বাক্সে রাখা হয়।
এরপর এভাবেই হযরত জাবের রাযি. এর লাশ মোবারক কবর থেকে উঠানো হয়। উভয় লাশ মোবারকের কাফন এমন কি দাড়ি-পশম মোবারক পর্যন্ত সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সুরক্ষিত ছিল। লাশ দেখে বিন্দুমাত্র ধারণা আসে নি যে, এ লাশ দুটি প্রায় তেরশ বছর পূর্বের বরং মনে হচ্ছিল, হয়ত তারা রাযি. মাত্র দু তিন ঘণ্টা পূর্বে সমাহিত হয়েছেন। এর বেশি নয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, দুজনেরই চক্ষুদ্বয় খোলা ছিল আর তা এতই চমকাচ্ছিল যে, বহু লোকেই তাদের চোখে চোখ রেখে দেখতে চাচ্ছিলেন।
কিন্তু তাদের চোখের উজ্জলতার সামনে কারও দৃষ্টি শক্তি স্থির হচ্ছিল না। স্থির কিভাবে হতে পারে? বড় বড় অভিজ্ঞ ডাক্তার পর্যন্ত তা দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। জার্মানের এক চক্ষু বিশেষজ্ঞ এই ঘটনা অত্যন্ত আনন্দের সাথে উপভোগ করছিলেন। তিনি এ দৃশ্য দেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই রইলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি এতই অভিভূত হয়েছিলেন যে, এগিয়ে এসে মুফতী সাহেবের হাত ধরে বলতে লাগলেন, আপনাদের মাযহাব এবং ইসলামের হক্কানিয়্যাত, সত্যতা এবং সাহাবায়ে কিরামের বুযুর্গীর ব্যাপারে এর চেয়ে বড় আর কি প্রমাণ হতে পারে? মুফতী সাহেব! অনুগ্রহ করে আপনার হাত দুখানা বাড়ান। আমি মুসলমান হব।
মোটকথা, লাশ দুটি বের করে সীসানির্মিত অত্যন্ত চমকদার দুটি বাক্সে রাখা হয় এবং চেহেরা মোবারক থেকে কাফনের কাপড় সরিয়ে দেওয়া হয়। যাতে মানুষ তাদের পবিত্র মুখখানি দেখতে পারে। ইরাকের সেনাবাহিনী যথারীতি সালাম পেশ করে। কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়। এরপর সমবেত লোকজন জানাযার নামায পড়েন। বাদশা এবং উলামায়ে কিরামের কাঁধে কফিন উঠানো হয়। কয়েক কদম পর্যন্ত সুধী জনরা কাঁধে করে নেন। অতঃপর উচ্চপদস্থ লোকেরা এই গৌরব লাভ করে। এরপর একে একে উপস্থিত সকলেই এই সৌভাগ্য লাভ করেন। এ সুযোগে জার্মানের এক ফ্লিম নির্মাতা কোম্পানী বড় লাভবান হয় বরং দূর দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের উপর তারা বড় অনুগ্রহ করেছেন। তারা ইরাক সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে নিজ খরচে কবরের ঠিক বরাবর উপর দুশত ফিট উচুতে কয়েকটি স্ক্রীন লাগিয়ে দেয়। ফলে প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে বা বসে কবর খোলা থেকে নিয়ে যাবতীয় কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত দেখতে পারে। যিয়ারতের জন্য কাউকে কোনও দুর্ভোগ পোহাতে হয় নি। এভাবে অনেকেই আকস্মাৎ মৃত্যু থেকে বেঁচে যায়। নারী পুরুষ শিশু সকলেই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে পুরো আনুষ্ঠানিকতা দেখতে সক্ষম হয়।
যখন এই পবিত্র জানাযা পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন প্লেন চক্কর দিয়ে সালাম জানায়। তাদের উপর ফুল ছিটায়। যখন পুরুষগণ কাঁধে করে নিচ্ছিলেন তখন মহিলাদেরকেও দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। মহিলারা জায়গায় জায়গায় তাদের উপর রকমারি ফুল ছিটায়। মোটকথা, এ লক্ষ্যে পথিমধ্যে কয়েক স্থানে কয়েক বার বাক্স রাখা হয়। এভাবে চার ঘণ্টা পর যখন লাশের কফিন পবিত্র নগরী সালমানের কবরস্থানে নেওয়া হয়, তখন উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাগণ তাদেরকে গার্ড অব অর্ণার পেশ করেন। অতঃপর সুধীজনেরা ফুল ছিটায়। অতঃপর উচ্চ পদস্থ লোক যারা পবিত্র লাশ সর্বপ্রথম ক্রেন থেকে নামিয়ে ছিলেন, তারা পূর্ণ আদব ও সম্মানের সাথে নতুন কবরস্থানে রাখেন। তখন কামানের গোলা নিক্ষেপ করা হয়। বিউগলের সুর বাজানো হয়। আল্লাহু আকবার এর সুমহান শ্লোগানের মধ্যে দিয়ে এই জীবন্ত শহীদদ্বয়ের লাশ মোবারক পুনরায় সমাহিত করা হয়। আজ পর্যন্ত বুযুর্গদের মুখে শুনেছি এবং বড় বড় বই পুস্তকে পড়েছি, অমুক ব্যক্তির এমন ওয়ায-নসীহতে এত এত লোক মুসলমান হয়েছি। অমুক বুযুর্গ ব্যক্তি মোনাযারায় এমন পরাদর্শিতা দেখিয়েছেন যে, অসংখ্য ইয়াহুদী-খ্রিস্টান ঈমানের দৌলতে ধনবান হয়ে গেছে। কিন্তু আমি নিজেই এই গুনাহগারের চোখে দেখেছি, এ ঘটনার পর পর বিস্ময়করভাবে বাগদাদের অবস্থা বদলে যায়। অসংখ্য ইয়াহুদী-খ্রিস্টান কোনও প্রকার জবরদস্তি ছাড়াই নিজেদের মুর্খতার উপর আফসুস করে এবং নিজেদের গুনাহের উপর লজ্জিত হয়ে কেঁদে কেঁদে শিহরিত হয়। অত্যন্ত উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে মসজিদে এসে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমবেত হতে থাকে এবং আান্তরিক প্রশান্তি ও উৎফুল্লাতা নিয়ে ফিরে যায়। এ ঘটনায় ইসলামের দৌলতে সৌভাগ্যশীলদের সংখ্যা এতই ব্যাপক ছিল যে, তার পরিসংখ্যান আদৌ সম্ভব নয়।
(উর্দু ডাইজেস্ট জুন ৮৪ খ্রিঃ)
📄 প্রফুল্ল মনের মানুষ ক্যান্সার মুক্ত থাকে
ডাক্তার ইউয়ানেজ রচিত "সারাতান কা নফসিয়াত মুতালা'আ" গ্রন্থের দশম অনুচ্ছেদ থেকে নিম্নোক্ত আলোচনা সংকলন করা হয়ছে। (ক্যান্সারের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রকাশ হয় না, এমন কোনও সাপ্তাহ নেই। ক্যান্সার সম্পর্কে গবেষণা কেন্দ্রের অক্লান্ত প্ররিশ্রম এবং প্রচুর অর্থ ব্যয় করে অসংখ্য ছোট প্রাণী যেমন, ইঁদুরকে টিকা লাগিয়ে অত্যন্ত সৃক্ষভাবে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরিক্ষা চলছে। ঔষধপত্র ব্যবহার করে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। তথাপি অদ্যাবধি এর মূল কারণ কিংবা নির্ভরযোগ্য প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাশাস্ত্রে কেবল এ রোগের শারীরিক দিক লক্ষ্য করা হয়ে থাকে। অত্যাধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে গতানুগতিক ধারায় পরীক্ষ-নিরিক্ষা করা হচ্ছে কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক তথ্য-উপাত্তের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় না। অবশ্য কেউ কেউ মনোবিজ্ঞানের দু' একটি বই-পুস্তক পড়ে এ ব্যাপারে কিছুটা প্রদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু তারা কিছুদূর এগিয়ে আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন। এখানে আলোচ্য দৃষ্টিভঙ্গিগুলো আমার ঐ গবেষণার ফসল, যা আমি ক্যান্সার আক্রান্ত মানসিক রোগিদের উপর করেছি। আমি তাদের মানসিক অবস্থায় বিশেষ অন্তর্মিল দেখেছি। তারা সকলেই একই প্রকৃতির লোক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যদিও শত মানুষ সংখ্যায় অনেক নয়। তথাপি এসব রোগীদের স্বভাব-চরিত্রে বিরাট অন্তর্মিল রয়েছে। যে কারণে বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ও প্রাঞ্জল হয়ে ওঠেছে।
বছরের পর বছর স্নায়ুতন্ত্রের রোগীদের চিকিৎসা করে আমি এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ব্রেন বিক্রিয়ার কারণে অসংখ্য শারীরিক রোগ-ব্যাধি সৃষ্টি হয়। একজন ডাক্তারের কাছেও আমি এ অভিমত ব্যক্ত করেছি। তিনি আমার সাথে একমত পোষণ করেছেন। তবে বলেছেন- এ দৃষ্টিভঙ্গি জনসমক্ষে প্রকাশ করা খুবই বিপদজনক। কথাও তাই। ডাক্তারগণ কোনও রোগের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সাধারণ লোকদের জানাতে চান না। বিশেষতঃ ক্যান্সার সম্পর্কে তাদের ধারণা হল, ক্যান্সারের বিস্তারিত তথ্য জনসাধারণকে জানালে ক্যান্সার সম্পর্কে তাদের অহেতুক বরং ক্ষতিকারক আশঙ্কা সৃষ্টি হবে।
অর্থাৎ যেভাবে মানুষের মাঝে ক্ষয়-জ্বর, জলাতঙ্ক এবং হৃদরোগের সন্দেহ বিস্তার লাভ করেছে, তদ্রুপ ক্যান্সারের সংশয়ও সৃষ্টি হবে। স্বয়ং চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্ররাও এ সংশয়ে আক্রান্ত, সাধারণ মানুষ কেন আক্রান্ত হবে না? বার বছর আগে আমেরিকার ছোট্ট একটি চিকিৎসকদল ক্যান্সার প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে। লক্ষ্য ছিল, এই ধ্বংসাত্মক ব্যাধি সম্পর্কে যে অজ্ঞতা প্রচলিত আছে, তা দূরীভূত করা। কেননা জ্ঞান অর্জন ছাড়া কোনও রোগ-ব্যাধির উপর কেউ জয় লাভ করতে পারে না। কিন্তু আক্ষেপ হল, এ সংগঠন ক্যান্সারের আলামত ও সেকেলে ইচ্ছাগুলোর বিশ্লেষণ না করে শুধুমাত্র এ উপদেশ দেয় যে, দ্রুত অপারেশন করাবেন।
মূলত: ক্যান্সার রোগীর মানসিক, মানবিক ও শারিরিক শৃংখলা বিকৃত হওয়ারই প্রমাণ কাজেই তাকে তৎক্ষণাত কোনও সংশোধনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেসব ছাত্ররা আফ্রিকার মরুভূমি ও বনাঞ্চলে চিকিৎসারত রয়েছে, তারা বলেন, সেখানকার রুচিশীল সভ্য লোকজন খুব কমই এ ধ্বংসাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। জার্মানী ডাক্তার কেওন হাইমের গবেষণায় জানা যায়, স্থূলদেহী মানুষ অপেক্ষা জীর্ণকায় লোক খুব কম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। অর্থাৎ ধনী সম্পদশালী ও অধিক ভোজনকারী ব্যক্তিদের তুলনায় দরিদ্র-অনাহারী, অর্ধাহারী লোকদের এ রোগ কম হয়। তবে ডাক্তার ইউয়ানেজ স্বীয় গ্রন্থে নিম্নোক্ত বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন।
জনৈক ইংরেজ লেখক দাবী করেছিলেন, তিনি এ রোগের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে ফেলেছেন। তার মতে হজমশক্তির দুর্বলতা অনুপ্রবেশের কারণে সৃষ্ট বিষ, এমনকি খাবারে ভিটামিনের অভাব এর প্রকৃত কারণ। লেখক তার বিশাল গ্রন্থে অসংখ্য উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের দাবী প্রমাণের চেষ্টা করেছেন।
ডাক্তার ইউয়ানেজের উক্ত গবেষণাকর্মের সারকথা হল, ক্যান্সার একটি শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি। অর্থাৎ কোনও খোঁচ-পাঁচড়া বা কোনও সূক্ষ্ম জ্বালা-যন্ত্রণা কিংবা অন্য কোনও কারণে যদি শরীরের কল-কব্জা যখম ও আহত হয়, তাহলে মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এখানে অন্য কোনও কারণ দ্বারা এই মানসিক যন্ত্রণাই উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে তিনি স্বীয় গ্রন্থে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বিদগ্ধ গবেষক প্রখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক ডাক্তার জংগের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, মানুষ যখন কোনও স্নায়ুতন্ত্রের রোগের কারণে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, হতভম্ব ও পেরেশান হয়ে যায় কিংবা তার ইজ্জত-সম্মানে আঘাত লাগে, তখন সে শারীরিকভাবেও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তার জংগের নিম্নোক্ত বক্তব্য আমাদের দাবীকে আরও সুস্পষ্ট করে দেয়।
তিনি বলেন- সাহসী ব্যক্তি মাত্রই নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণের পেছনে ডুবে থাকে। ক্যন্সার আক্রান্ত রোগীদের মাঝে এ মোহ ও বাস্তবতা এত বেশি হয়ে থাকে যে, সকলেই তা অনুভব করতে পারে। তার মৌলিক চাহিদাগুলো কিংবা জীবনের লক্ষ্য-উদ্যেশ্য তার মনের গভীরে স্থান করে নেয়। সাধারণতঃ ক্যান্সার আক্রান্তদের দেখা যায়, মৌলিক চাহিদা বা মুহব্বতের ক্ষেত্রে জীবনের বাজি ধরে এবং প্রাণপনে ঝুকে পড়ে। সে নিজের লক্ষ্য বস্তু কিংবা নির্ধারিত কর্তব্যে এমনভাবে ডুবে যায় যে, তাছাড়া তার জীবনটাই নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়।
উপরিউক্ত গ্রন্থে জনৈকা চাকরানীর ঘটনা রয়েছে। এ চাকরানী কোনও ইবাদত খানায় নিয়মিত ঝাড়ু দিত। তার দায়িত্ববোধ থাকা সত্ত্বেও একদিন এক উর্ধ্বতন অফিসার তাকে বরখাস্ত করে দেয়। ফলে তার রিযিকের এপথ বন্ধ হয়ে যায়। এ বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট তার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সে ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মাত্র কদিনের ভেতর সে ধুকে ধুকে মারা যায়।
ক্যান্সারের আক্রমণ অতিসূক্ষ্ম ও রহস্যজনকভাবে এর সংক্রমণ ঘটে। এর কোনও নিয়ম-নীতি নেই। সহসা আক্রান্ত ব্যক্তির পূর্বের সরল-সাধারণ জীবন যাত্রা ও স্বভাব-চরিত্র পাল্টে যায়। কেননা যে জিনিসের প্রতি তার আগ্রহ ছিল, সেটা তাকে প্রতারিত করেছে। এ ব্যর্থতার কষ্ট জীবনের চালিকা শক্তিটাই বিনষ্ট করে দেয়। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর উপর মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা করে জানা গেছে, তাদের প্রত্যেকের মাঝেই একটি কারণ ধরা পড়েছিল যে, রোগী ইতোপূর্বে কোনও না কোন মানসিক আঘাত পেয়েছিল। ফলে তার আশা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মানুষ স্বভাবতই কোনও উদ্দেশ্য পূরণের মানসে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত থাকে। এতে যখন বিঘ্ন ঘটে তখন নানা ধরনের স্নায়ুতান্ত্রিক সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। সে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কিংবা উন্মাদ হয়ে পড়ে অথবা শিশুসূলভ আচরণ করতে থাকে।
মানুষ নিশ্চিতভাবে কিছু একটা করা অর্থাৎ কোনও উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই দুনিয়ায় এসেছে। মানুষ কি, প্রত্যেক বৃক্ষরাজি ও উদ্ভিদেরও কোনও উদ্দেশ্য রয়েছে। তা ফলমূল, ফুল বা বীজ প্রভৃতি উৎপন্ন করে।
ডাক্তার ইউয়ানেজের অভিমত হচ্ছে, যেসব লোক কোনও সৃষ্টিশীলতা বা আবিষ্কারের কাজে নিয়োজিত, তাদের যদি কোনরূপ আঘাত লাগে তবে তাদের উপর এতটা প্রভাব পড়ে না, যতটা প্রভাব পড়ে ব্যর্থ ও উদ্দেশ্যহীন জীবন যাপনকারী লোকদের উপর। উদ্ভিদ, জড়পদার্থ এবং অন্য প্রাণীজগতের চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে ব্যর্থতা পছন্দ ও সহ্য করে না। ব্যর্থতা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন তার বিভৎস পরিণতি ঢেকে আনে। ক্যান্সার আক্রান্তদের উপর গবেষণা করে জানা গেছে যে, তারা প্রথমে সুস্থ সবল ছিল পরবর্তি জীবনে এমন কোন ঘটনা ঘটেছে, যাতে সে লক্ষ্যস্থলে পৌছতে পারে নি এবং উদ্দেশ্য সাধন করতে পারেনি। সে নিজের প্রিয় জিনিস অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তার হৃদয় অন্দরে বয়ে যাওয়া এ মানসিক ঝড় সম্পর্কে প্রিয়জন ও বন্ধু বান্ধবদের কি ক্যান্সার হতে পারে?
যে ব্যক্তি কোনও কারণে নিজের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয় কিংবা যারা স্ত্রীর তিক্ত আচরণ ও ভাষার হাতুড়ী পেটার কারণে মানসিক অশান্তিতে থাকে, সে যখন নিজের প্রশান্তির উদ্দেশ্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ প্রত্যাশা করে কিংবা আনন্দ উল্লসের আশায় থাকে সাধারণতঃ তখনই এসব লোক পাকস্থলীর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। স্ত্রী সন্তান না থাকা, দাম্পত্য জীবনে অমিল, সামঞ্জস্যহীন বিবাহ-শাদী কিংবা বিলাসিতার কারণেও মানুষ অতি দ্রুত ক্যন্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় বারবার এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, মানুষ মনে চরম আঘাত পেলে, মাহরুম বা বঞ্চিত হলে অথবা উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হলে কিংবা আশা-আকাঙ্খা হতাশায় পরিণত হলে মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
📄 ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্টার পেছনে ইসলামী নীতি
মনোবিজ্ঞানের প্রতি প্রথম যে আগ্রহ ছিল। এ বিষয়ে আমি পশ্চিমা লেখকদের অনেক বই-পুস্তক পড়েছি। সাথে সাথে ইসলামী বই-পুস্তকও প্রচুর অধ্যয়ন করেছি। তবে এসব বই অধ্যয়নকালে একটি বিষয় আমাকে বিস্মিত করেছে। তা হল, স্বাচ্ছান্দ্যময় সফল জীবন যাপনের উদ্দেশ্য পশ্চিম জগতের মনস্তত্ত্বিকগণ যেসব মূলনীতি ও থিউরী উপহার দিয়েছেন, তা মূলত কোনও নতুন বিষয় নয় বরং চৌদ্দশত বছর পূর্বেই বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানব জাতিকে এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
কোনও জিনিসের স্রষ্টা বা আবিষ্কারকই তার যাবতীয় পার্স বা অংশ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকেন। মানবদেহ এবং জান সৃষ্টিকারী সত্ত্বাও এত উত্তমরূপে মানুষের মনোজগৎ সম্পর্কে নিজের আম্বিয়ায়ে কিরামের মাধ্যমে আমাদেরকে অবহিত করেছেন, এটা তার স্রষ্টা হওয়ারই অকাট্য প্রমাণ। আজ আমরা আল্লাহর কিতাবকে তাক-আলমারী ইত্যাদির সৌন্দর্য বানিয়েছি। আর নবীজীর শিক্ষা ছেড়ে যেভাবে পশ্চিমা শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকে পড়েছি, এটা আমাদের চরম দুর্ভাগ্যই বলতে হয়। অথচ কুরআনে কারীম এবং নবীজীর শিক্ষা-দীক্ষার উপর আমল করলে আমরা অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সফল জীবন লাভ করতে পারি।
সভা-সেমিনারে আমরা প্রায়ই দেখি, দু একজন ব্যক্তি পুরো মাহফিলে ছায়া হয়ে আছেন এবং সর্বাধিক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেছেন। তাকে দেখে আমাদের অন্তরেও আগ্রহ জাগে, আহ! আমি যদি এ মাহফিলের প্রধান আকর্ষণ হতে পারতাম। আর সব সময় ভক্ত-অনুরক্ত ও প্রিয়জনেরা আমাকে ঘিরে রাখত। বাস্তবিকই আপনি যদি একজন প্রিয় ব্যক্তিত্ব হতে চান তবে নিম্নোক্ত ইলহামী মূলনীতিগুলো মনেপ্রাণে গ্রহণ করুন। অল্প কদিনেই আপনার শুভাকাঙ্খী ও ভক্ত-অনুরক্তের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে।