📄 খ্যাতিনামা কার্যাবলী
মুসলমান জ্যেতির্বিজ্ঞানীদের অবদান সঠিকভাবে পরিসংখ্যান করা অসম্ভব। এটা এমন এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি, যা এক হাজার বছর পূর্বে থেকে চলে আসছে। দ্বিতীয়তঃ এরই ধারাবাহিকতায় এ বিজ্ঞান ভারত উপমহাদেশে বিস্তৃতি লাভ করে। তৃতীয়তঃ মুসলমানদের প্রণীত অসংখ্য গ্রন্থ পৃথিবীর বিভিন্ন গ্রন্থাগারের স্থান দখল করে নিয়ে পৃথিবীর অধিবাসীদের চোখ খুলে দেয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রন্থাবলীর আলোচনার প্রশ্নই আসে না। কুতুব উদ্দীন সিরাজীর মত খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর অনেক গ্রন্থ অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়নি। তথাপি বিগত দুই শতকের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ফলশ্রুতিতে (যাতে পাশ্চাত্য ও মুসলামন বিজ্ঞানীগণ অন্তর্ভূক্ত রয়েছে) এমন মূল্যবান গ্রন্থাবলী ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে কমবেশী ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রকৃত নমুনার প্রতিফলন হয়েছে।
ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উল্লেখযোগ্য কৃতি আসমানের অস্তিত্ব ও মহাকাশের অস্তিত্ব সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ বিরাট ভাণ্ডার মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ এ বিষয় যে পরিমাণ গবেষণা করেছেন, তা গ্রীক বিজ্ঞানীদের গবেষণার তুলনায় অনেক ব্যাপক। মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এ গবেষণা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ সব দিক থেকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। এ বিষয় পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কৃর্তি হলো এই যে, মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নতুন নতুন পদ্ধতিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। এ কারণে তাদের নিজেস্ব পরিমাপ সমূহ অন্যান্যদের পরিমাপের তুলনায় অনেক বেশী নির্ভুল ও সঠিক প্রমাণ হয়েছে। তাঁর এ বিষয়ে সাফল্যের শীর্ষে আরোহন করেছে। তাঁরা গ্রহ নক্ষত্রের কম্পন ও আবর্তণের বিষয়ে এমন এমন অসংখ্য পদ্ধতি ও সূত্রর উদ্ভাবন করেছেন, যা ইতোপূর্বে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ বাতলিমূসের জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বাতিল ও ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দেয়। মুসমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ দিনের আবর্তনের ব্যাখ্যায় নয় আসমানের সংযোজন করেছেন। আর ঐ বৃত্তকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে, যা বাতলিমূস প্রত্যেক আসমানের দৈনিক আবর্তনের সংযোগস্থল বলে দেখিয়েছে। কিন্তু বাতলিমূসের জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতবাদ শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পর্যন্ত সীমিত ছিল না। তা এক দিকে এরিষ্টটলের সৃষ্টি জগত সম্পর্কিত ধ্যান-ধারনার সমর্থন করে বাতলিমূসের মতবাদ বাতিলকে ভ্রান্ত বানিয়ে দেয়। অপর দিকে তুশি ও তাঁর বন্ধুগণ এ দর্শনের উপর হাতুড়ির আঘাত হেনেছে। যতদূর পর্যন্ত এই মতবাদ বাতিল করা হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে কোন জ্যামিতিক মডেল বা নকশা অস্তিত্ব লাভ করতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে এমন কতিপয় মডেল অস্তিত্বে এসেছে। এ রূপ হওয়া সত্ত্বেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ করে ষষ্ঠদশ শতকে ইউরোপ জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্বর্গরাজ্যের ভূমিকা পালন করে, তাদের প্রবর্তিত মতবাদের আলোকে উভয় প্রকার মতবাদ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞান সৃষ্টিজগতের ব্যাপকতা পরিমাপের জন্য যে শ্রম সাধনা করেছে। তা অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ঐ নীতির আলোকে দেখা যায় যে, সৃষ্টি জগতের কোন কিছুই বেকার নয়। সুতরাং প্রত্যেক বৃত্ত বাহ্যিক সীমা রেখা অপর বৃত্তের আভ্যন্তরিণ সীমারেখা স্পর্শ করে। তাছাড়াও গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ যথা পিসাগুরুষ মারাতুমতারিজ ও বাতলিমুস যে, পরিমাপ করেছে। তা থেকে উপকৃত হয়ে মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নক্ষত্র সমূহের ব্যবধানের চিত্র অংকন করেছে। ঐ প্রান্তরেখার মধ্যে আল ফারজানী ও আল-বেরুনীর প্রান্তরেখা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। আল ফারজানীর প্রস্তরেখা সমূহ কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত পাশ্চাত্য গবেষকদের প্রভাবান্বিত করে রেখেছে। কিন্তু মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কৃর্তি হল তারা বাতলিমূসের বৃত্ত সমূহকে শুধু জ্যামিতিক মডেল সমূহের উপরে উঠিয়ে স্বাভাবিক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে দিয়েছে। ইবনে হাইছাম তাঁর রচিত "জ্যোতির্বিজ্ঞানের সারমর্ম" নামক গ্রন্থে (যা বর্তমানে ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষায অনূদিত হয়েছে) আসমান সমূহের স্বভাবিক মডেল পেশ করেছে। পূর্বাঞ্চলে তুশি ও আরো কতিপয় খ্যাতিনামা বিজ্ঞানী তা অনুসরণ করেছেন। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীগণ ও তা অনুসরণ করেছে। এ পর্যন্ত মধ্যযুগ থেকে ইউপরোপের নব জাগরণের বা আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কুদরতীভাবে এ ধারনা ছিল যে, বিজ্ঞানের লক্ষ্য স্থল ও এর যথার্থতার কোন না কোন বিষয় অনুসন্ধান করেছে। এমনকি যখন নিউটন, গ্যালিলিও, বাতলিনূসের জ্যোতির্বিজ্ঞান এরিষ্টটলের মতবাদকে বাতিল করে দিয়েছে। তাই তাদেরও সঠিক বিশ্বাস ছিল তারা প্রত্যেক বিষয়ে যথার্থতার প্রতিটি দিকে গবেষণায় নিয়োজিত ছিল। সমাপ্ত