📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ

📄 বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ


হিজরী দ্বিতীয় শতকে (অষ্টম শতাব্দি) ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের যে ভিত রচিত হয়, সে ক্রমধারায় পরবর্তী হিজরী তৃতীয় শতকে (নবম শতাব্দি) জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব হয়। তাদের মধ্যে বেশীর ভাগ বিজ্ঞানী স্বপ্নপূরী বাগদাদের অধিবাসী ছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ হারানের অধিবাসীও ছিল। জুইয়া সাবী আকীদায় বিশ্বাসী ছিল। তিনি জীবনের শেষ ভাগে ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি বিজ্ঞানের প্রাথমিক আবিষ্কার প্রান্তরেখা সমূহ সম্পর্কে পর্যালোচনা ও গবেষণা করেন। নির্ভুল সঠিক করার কাজে নিয়োজিত ছিল। তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আল হাবাশ। তাঁর ব্যক্তিত্ব আরব খলীফা আল মামুনের সমমর্যাদায় ছিল। হিজরী তৃতীয় শতকে (নবম শতাব্দি) মনোযোগ বিশেষভাবে নিবন্ধ ছিল। শেষ দিকে তার সমসাময়িক আবু আব্দুল্লাহ আল বাত্তানির উল্লেখ করা জরুরী। তিনি আলসাবী নামক রাজমিস্ত্রির সূতা প্রনয়ন করেন। এ রাজমিস্ত্রির সূতা ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রত্যক্ষ করার জ্যামিতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান উভয়ের উন্নতিতে দিকনির্দেশনা দান করেন। আল বাত্তানী তার নিজেদের গভীর অভিজ্ঞতার বদৌলতে এটা অবগত হয়েছে যে, বাতলিমূসের যুগ থেকে শুরু করে তাঁর যুগ পর্যন্ত জমিন থেকে সূর্যের দূরত্ব কত পরিমাণ বৃদ্ধি লাভ করেছে। তিনি জমিনের মেরুদণ্ডে ঝুকে পড়া ও পরিমাপ করেন। তিনি চন্দ ও সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

তার অনুশীলন অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত ইউরোপ প্রচলিত ছিল। হিজরী চতুর্থ শতকে (দশম শতাব্দি) ও মুসলমানগণ জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে গবেষণা বহাল রাখে। ঐ যুগের উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতি লাভ করেন আবু সোহেল কুহি। তিনি শাহ শরফুদ্দৌলার দরবারের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁর সাথে আব্দুর রহমান সুফীর নামও উল্লেখযোগ্য। তিনি সিরাজ নগরীতে দিনের দৈর্ঘ সঠিকভাবে পরিমাপ করেন। তাঁর রচিত "সুওয়ারুল কাওয়াকিব" গ্রন্থকে জ্যোতির্বিজ্ঞানর অপূর্ব গ্রন্থবলে গণ্য করা হয়। "সুওয়ারুল কাওয়াকিব" প্রণয়নের সাথে সাথে ওটা ইসলামী বিশ্বে স্বীয় বিষয নির্ভরশীল উৎসের মর্যাদা লাভ করে। আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঐ গ্রন্থে বিভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ করা হয়। স্পেনের বাদশাহ আল ফাসমুদহাম উক্ত গ্রন্থ রোমান ভাষায় অনুবাদ করেন। অনুরূপভাবে "সুওয়ারুল কাওয়াকিব” পশ্চিমা জগতে কাওয়াকিব নামটি বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঐ যুগের আরেক বিখ্যাত ইরানী বংশোদ্ভূত জ্যামিতিবিদ আবু ওফা জুরজানী। তিনিও খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন, তিনি শহরের দৈর্ঘ্যের সাথে চাঁদের অনুপস্থিতি এক সমান না হওয়ার যে অভিমত প্রকাশ করেন। উনবিংশ শতকে এল, ই, স্যাইভুডিট তা গভীরভাবে অধ্যায়ন করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সে মতে জুরজানী চাঁদের তৃতীয় অনুপস্থিতির একসমান না হওয়ার বিষয় আবিষ্কার করেছেন। এটা ঐ আবিষ্কার, যার খ্যাতি এ পর্যন্ত টাইকোবরাহির মস্তক বন্ধ করা হচ্ছে। আবুল ওফা জুরজানির সমসাময়িক অন্যান্য খ্যাতনামা লেখকগণও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন।

পূর্বাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে এমন কতিপয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন, যারা অতি উৎসাহ উদ্দীপনা ও মনোযোগের সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের মধ্যে আবু মাহমুদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি সমকালের সবচেয়ে বড় ভিত্তির ষষ্টাংশ তৈরী করেন। ওটাকে তাঁদের গৌরবের বিষয় বলা হয়। এ ষষ্টাংশ সূর্যের মধ্যবর্তী রেখা অতিক্রম করা প্রত্যক্ষ করার জন্য বানানো হয়েছে। কিন্তু এসব উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে আল-বেরুনীও ছিলেন। তাঁর রচিত “কানুনে মাসুদী” ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানে ঐ স্থান ও মর্যাদা লাভ করেছে, যে ইবনেসীনা কর্তৃক রচিত “আল কানুন” চিকিৎসা বিজ্ঞানে মর্যাদা লাভ করেছে। উক্ত গ্রন্থ আল-বেরুনীর যুগ পর্যন্ত ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত প্রাথমিক অনেক তথ্যের উল্লেখ করেন। এ বিরাট গ্রন্থ যদি একদিকে বিশেষ বিশেষ্যত্বের অধিকারী। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ আজও উক্ত গ্রন্থ পুরোপুরি অধ্যায়ন করা হয়নি। কানুনে মাসুদী বিরাট গ্রন্থ হওয়া সত্ত্বেও আল-বেরুনী জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ আলোকপাত করেন। এ বিষয়ে আনুমান করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। তিনি আত্ তাফহীম শিরোনামে জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কিত বিষয় সাধারণভাবে আলোকপাত করেন। উক্ত গ্রন্থ এদিক থেকে অতিগুরুত্বপূর্ণ যে, আল-বেরুনী উক্ত গ্রন্থ আরবী ও ফার্সী উভয় ভাষায় সংকলন করেন। অনুরূপভাবে উক্ত গ্রন্থ ফার্সী ভাষায় জ্যামিতিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত প্রাথমিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করেছেন। এক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

সে যুগে কাহেরাও জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। ঐ শহরে খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে ইউনুস ২৯৭ হিজরীতে (দশম শতাব্দি) সূতার প্রস্থরেখা আল-হাকেমী আবিষ্কার করেন। ইবনে ইউনুসের এ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ওখান থেকে অনেক একক দিক কে নতুন করে পরিমাপ করা হয়। আর জ্যোতির্বিজ্ঞানের সমস্যা সমাধানের জন্য ত্রিকোনামিতিক সূত্র অধিক মাত্রায় ব্যবহার করা শুরু হয়। ইবনে ইউনুসের আরেক খ্যাতিও ছিল। তিনি ছিলেন নোঙ্গরের পান্ডুলিনের কম্পন উত্তমরূপে অনুধাবনকারী প্রথম বিজ্ঞানী। তাঁর এ অনুশীলনই অবশেষে স্থানীয় গোলক আবিষ্কারের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। কাহেরাত ইবনে ইউনুসের সমসাময়িক ইবনে হ্যায়সাম যদিও একজন স্বভাব ধর্মীয় বিজ্ঞানী ও অভিজ্ঞ প্রর্যবেক্ষক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য করা যায় না। ইবনে হ্যাইসাম আসমানের অস্তিত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। তিনি যাওয়াই বৃত্তের উচ্চতা সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি হাওযাই বৃত্তের উচ্চতা পরিমাপ করেন। আর জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত নিদর্শনাবলী বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

হিজরী পঞ্চম শতকের (একাদশ শতাব্দী) শেষ ভাগে এবং হিজরী ষষ্ঠ শতকে (দ্বাদশ শতাব্দি) ইসলামী রাষ্ট্র শারকীয়াতে ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। কিন্তু পাশ্চাত্য বিশ্ব বিশেষ করে স্পেন ঐ সময় এক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতিলাভ করে। পূর্বাঞ্চলে ঐ সময় সাধারণতঃ যে সব গ্রন্থ প্রণীত হয়, তাহল সামজারীর মত তা আব্দুর রহমান খাজিনি প্রনয়ণ করেন। আর ঐ বিষয়ের আলোকে জালালী অনুমান বলে উল্লেখ করা যায়। কিন্তু পশ্চিমা জগতের কতিপয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করে। তন্মধ্যে আল জোরকানীর নাম সকলের শীর্ষে। আবু জোরকানী তালতালীসূতা তৈরি করা ছাড়াও জমিন থেকে সূর্যের দূরবর্তী স্থানের গতিকে নক্ষত্রের সাথে সম্পর্কিত বলে প্রমাণ করেন। ঐ যুগে স্পেনের দার্শনিকদের মধ্যে বাতলিমূসের সূর্যের গতি সম্পর্কিত মতবাদ বিশেষ এক বিতর্কের সূচনা করে। আর তখন তিনি এরিষ্টটলের কেন্দ্রীয় নীতির ওকালতি শুরু করেন। তিনি এ মনোভাব আবু বকর ইবনে তোফাইল থেকে গ্রহণ করেন। তা তার শীষ্য নূরুদ্দীন আল বারজুজী পর্যন্ত পৌঁছে। তিনি দূরবর্তী কম্পন ও চক্রায়িত কম্পনের অভিমত প্রকাশ করে। আর এ অভিমতকে পশ্চিমা ইসলামী দেশে বাতলিমূসের জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য বলে মনে করা হয়।

হিজরী সপ্তম শতকে (ত্রয়োদশ শতাব্দি) ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের নব জীবনের সূচনা হয়। যখন নাসির উদ্দীন তুশি মারগানায় খ্যাতনামা প্রসিদ্ধ নভোথিয়েটার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। এভাবে ওখানে তার যুগের খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদেরকে সমবেত করে, তাঁদের মধ্যে কুতুবউদ্দীন সিরাজী, মুঈদউদ্দীন আল আরদী মহিউদ্দীন আল মাগবেরী ও চীনের খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফাউমুনচী বিশেষ উল্লেখযোগ্য। হিজরী অষ্টম শতকে (চতুর্দশ শতাব্দি) ও হিজরী নবম শতকে (পঞ্চদশ শতাব্দি) তখন এক দিকে দামেশকের ইবনে শাতিরের মত বিজ্ঞানী এককভাবে তুশি ও সিরাজীর সূর্যের নতুন অভিজ্ঞতার প্রচলন করে। অপর দিকে সমরকন্দে আলগব্যাগ মারগানার নমুনায় এক নভোথিয়েটার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করো। আলগব্যাগে শাসন ক্ষমতা দখল করার সাথে সাথে নিজেও একজন খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিল। কিন্তু সমরকন্দে এর আলোকে এ বিষয় গবেষণাকারী বিজ্ঞানীদের মধ্যে খ্যাতনামা ব্যক্তি ছিলো গিয়াস উদ্দীন জমশিদ আল কাশিনী। তিনি একই সাথে খ্যাতনামা জ্যামিতিবিদ এবং একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি খাকানী সূতা প্রনয়ন করেন। সমরকন্দে অবস্থানকালে আলাগব্যাগ বিচারক পুত্র রোমী ও কতিপয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সহায়তায় সূতা প্রতিষ্ঠা করেন। তা স্ব-স্থানে জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তারা গ্রহ নক্ষত্র গবেষণায় ও উল্লেখযোগ্য প্রশংসা অর্জন করে। হিজরী দশম শতকে (ষষ্ঠদশ শতাব্দি) ইস্তানবুলে তাকিউদ্দীনের সংক্ষিপ্ত গবেষণায় পশ্চিমাঞ্চলে বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের পৃথক পৃথক গবেষণায় জ্যোতির্বিজ্ঞান ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 সূর্যের উচ্চতার ভিত্তি নিরূপন

📄 সূর্যের উচ্চতার ভিত্তি নিরূপন


আল বাত্তানীর যুগে মুসলমানগণ বাতলিমুসের মতবাদ অনুসরণ করতে থাকে। পূর্ববর্তী দু তিন শতাব্দি পর্যন্ত মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ বাতলি সূরে সূর্যের উচ্চতা পরিমাপ ও তার সূর্যের আবর্তণ সম্পর্কিত কর্ম বিন্যাসে ব্যস্ত ছিল। কেননা তিনি যেসব ব্যতিক্রম চিত্র অংকন করেছেন, তা সংশোধন করতে থাকে এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে সঠিকভাবে হিসাব করতে শুরু করেন। তারা বতলিমূলের অভিমত সম্পর্কেও উদাসীন হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বাতলিমূসী মতবাদ ব্যতিক্রম দু'প্রকার অভিমত প্রকাশ করে। যা হিজরী ষষ্ঠ শতক (দ্বাদশ শতাব্দি) ও হিজরী সপ্তম শতকে (ত্রয়োদশ শতাব্দি) ইসলামী বিশ্বের অন্যান্য স্থানে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে প্রকাশ হয়।

কেননা পশ্চিমাঞ্চলে এরিস্ট্রটলের দৃষ্টিভঙ্গী পূর্বাঞ্চলের তুলনায় বেশী সমাদৃত হয়। এ কারণে হিজরী ষষ্ঠ শতকে (দ্বাদশ শতকে) বাতলিমূসের বিপক্ষে এরিস্ট্রটলের মতবাদের স্বপক্ষে জোরালো সমর্থন প্রকাশ হয়। যদিও পূর্বাঞ্চলের বিজ্ঞানীগণ তাঁর সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিল। উদাহরণতঃ ইবনে সীনা "শিফা" গ্রন্থে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু স্পেনে এ বিষয়ে বিশেষভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয় যে, এরিস্টটলের অংকিত নমুনা অনুযায়ী নকশা প্রনয়ন করা হোক। যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য সহায়ক হয়। আর বাতলিমূসের দৃষ্টিভঙ্গীকে সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা হয়। বিশেষ করে এভাবে তার মতবাদ জমিনকে সৃষ্টিজীবের মধ্যবর্তী স্থানে কেন্দ্রীয় স্থান দেওয়ার স্থলে অন্য এক অনুল্লেখযোগ্য অবস্থায় পৌছে দেয়। আল-বেরুনী পাশ্চাত্যে বাতলিমূসের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন ব্যাপকভাবে প্রচার করতে শুরু করে। তথাপি এ আন্দোলন গুরুত্বের দিক থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে কম গুরুত্বপূর্ণ ও দর্শন শাস্ত্র সম্পর্কে বেশী উপাদেয় মনে হয়।

ইরানে বাতলিমূসের অভিমত সম্পর্কে যে, মতবাদ প্রচার করে। তা স্পেনের দর্শন সম্পর্কিত মতবাদ থেকে অনেক বেশী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত গুরুত্বের ধারক বাহক ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিখ্যাত অবদানের সমালোচনায় নাসির উদ্দীন তুশি বাতলিমুসের ভিত্তি নির্ভর করে নকশাকে অত্যন্ত অকাট্যভাবে অংকন করে। তাঁর শীষ্য ও বন্ধু কুতুব উদ্দীন শিরাজী স্বীয় উস্তাদের পদাঙ্ক অনুসরন করে নকশার দুর্বলতা কঠোর ভাবে প্রকাশ করে। তখন দামশকে ইবনে শাতির ঐ নতুন অভিমতকে চাঁদের উপর প্রয়োগ করে চাঁদের নতুন এক মডেল তৈরি করে। পরবর্তীতে এর সাদৃশ্য কোপার নিকাস আরেক মডেল তৈরি করে। কুতুব উদ্দীন সিরাজী ও ইবনে শাতির জ্যামিতিক উপায়ে যে সিয়ারগানীর মডেল উদ্ভাবন করেন, তা মূলতঃ নাসির উদ্দীন তুশির উদ্ভাবিত মডেল ছিল। এ কারণে এ বিষয়ে গবেষণা কারী বিশেষজ্ঞ এ.এইচ. ক্যানেডি ওটাকে তুশি জোড়া সংখ্যা নামে অভিহিত করেন। এটা এমন এক মডেল, যা শুধু একক চক্রায়িত স্পন্দনের কজে লাগানো হয়। আধুনিক জ্যামিতির ভাষায় এটা বলা যায় যে, তাতে এক রেখা ধারক বাহক হয়। অপর এক দ্বিতীয় রেখার ধারক বাহক হয়。

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 খ্যাতিনামা কার্যাবলী

📄 খ্যাতিনামা কার্যাবলী


মুসলমান জ্যেতির্বিজ্ঞানীদের অবদান সঠিকভাবে পরিসংখ্যান করা অসম্ভব। এটা এমন এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি, যা এক হাজার বছর পূর্বে থেকে চলে আসছে। দ্বিতীয়তঃ এরই ধারাবাহিকতায় এ বিজ্ঞান ভারত উপমহাদেশে বিস্তৃতি লাভ করে। তৃতীয়তঃ মুসলমানদের প্রণীত অসংখ্য গ্রন্থ পৃথিবীর বিভিন্ন গ্রন্থাগারের স্থান দখল করে নিয়ে পৃথিবীর অধিবাসীদের চোখ খুলে দেয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রন্থাবলীর আলোচনার প্রশ্নই আসে না। কুতুব উদ্দীন সিরাজীর মত খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর অনেক গ্রন্থ অদ্যাবধি প্রকাশিত হয়নি। তথাপি বিগত দুই শতকের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ফলশ্রুতিতে (যাতে পাশ্চাত্য ও মুসলামন বিজ্ঞানীগণ অন্তর্ভূক্ত রয়েছে) এমন মূল্যবান গ্রন্থাবলী ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে কমবেশী ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রকৃত নমুনার প্রতিফলন হয়েছে।

ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের উল্লেখযোগ্য কৃতি আসমানের অস্তিত্ব ও মহাকাশের অস্তিত্ব সম্পর্কিত প্রত্যক্ষ বিরাট ভাণ্ডার মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ এ বিষয় যে পরিমাণ গবেষণা করেছেন, তা গ্রীক বিজ্ঞানীদের গবেষণার তুলনায় অনেক ব্যাপক। মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এ গবেষণা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ সব দিক থেকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। এ বিষয় পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কৃর্তি হলো এই যে, মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নতুন নতুন পদ্ধতিতে জ্যোতিষশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেন। এ কারণে তাদের নিজেস্ব পরিমাপ সমূহ অন্যান্যদের পরিমাপের তুলনায় অনেক বেশী নির্ভুল ও সঠিক প্রমাণ হয়েছে। তাঁর এ বিষয়ে সাফল্যের শীর্ষে আরোহন করেছে। তাঁরা গ্রহ নক্ষত্রের কম্পন ও আবর্তণের বিষয়ে এমন এমন অসংখ্য পদ্ধতি ও সূত্রর উদ্ভাবন করেছেন, যা ইতোপূর্বে কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ বাতলিমূসের জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বাতিল ও ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দেয়। মুসমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ দিনের আবর্তনের ব্যাখ্যায় নয় আসমানের সংযোজন করেছেন। আর ঐ বৃত্তকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে, যা বাতলিমূস প্রত্যেক আসমানের দৈনিক আবর্তনের সংযোগস্থল বলে দেখিয়েছে। কিন্তু বাতলিমূসের জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতবাদ শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পর্যন্ত সীমিত ছিল না। তা এক দিকে এরিষ্টটলের সৃষ্টি জগত সম্পর্কিত ধ্যান-ধারনার সমর্থন করে বাতলিমূসের মতবাদ বাতিলকে ভ্রান্ত বানিয়ে দেয়। অপর দিকে তুশি ও তাঁর বন্ধুগণ এ দর্শনের উপর হাতুড়ির আঘাত হেনেছে। যতদূর পর্যন্ত এই মতবাদ বাতিল করা হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে কোন জ্যামিতিক মডেল বা নকশা অস্তিত্ব লাভ করতে পারেনি। ফলশ্রুতিতে এমন কতিপয় মডেল অস্তিত্বে এসেছে। এ রূপ হওয়া সত্ত্বেও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ করে ষষ্ঠদশ শতকে ইউরোপ জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্বর্গরাজ্যের ভূমিকা পালন করে, তাদের প্রবর্তিত মতবাদের আলোকে উভয় প্রকার মতবাদ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞান সৃষ্টিজগতের ব্যাপকতা পরিমাপের জন্য যে শ্রম সাধনা করেছে। তা অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। ঐ নীতির আলোকে দেখা যায় যে, সৃষ্টি জগতের কোন কিছুই বেকার নয়। সুতরাং প্রত্যেক বৃত্ত বাহ্যিক সীমা রেখা অপর বৃত্তের আভ্যন্তরিণ সীমারেখা স্পর্শ করে। তাছাড়াও গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ যথা পিসাগুরুষ মারাতুমতারিজ ও বাতলিমুস যে, পরিমাপ করেছে। তা থেকে উপকৃত হয়ে মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ নক্ষত্র সমূহের ব্যবধানের চিত্র অংকন করেছে। ঐ প্রান্তরেখার মধ্যে আল ফারজানী ও আল-বেরুনীর প্রান্তরেখা বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। আল ফারজানীর প্রস্তরেখা সমূহ কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত পাশ্চাত্য গবেষকদের প্রভাবান্বিত করে রেখেছে। কিন্তু মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কৃর্তি হল তারা বাতলিমূসের বৃত্ত সমূহকে শুধু জ্যামিতিক মডেল সমূহের উপরে উঠিয়ে স্বাভাবিক মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে দিয়েছে। ইবনে হাইছাম তাঁর রচিত "জ্যোতির্বিজ্ঞানের সারমর্ম" নামক গ্রন্থে (যা বর্তমানে ল্যাটিন ও হিব্রু ভাষায অনূদিত হয়েছে) আসমান সমূহের স্বভাবিক মডেল পেশ করেছে। পূর্বাঞ্চলে তুশি ও আরো কতিপয় খ্যাতিনামা বিজ্ঞানী তা অনুসরণ করেছেন। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীগণ ও তা অনুসরণ করেছে। এ পর্যন্ত মধ্যযুগ থেকে ইউপরোপের নব জাগরণের বা আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কুদরতীভাবে এ ধারনা ছিল যে, বিজ্ঞানের লক্ষ্য স্থল ও এর যথার্থতার কোন না কোন বিষয় অনুসন্ধান করেছে। এমনকি যখন নিউটন, গ্যালিলিও, বাতলিনূসের জ্যোতির্বিজ্ঞান এরিষ্টটলের মতবাদকে বাতিল করে দিয়েছে। তাই তাদেরও সঠিক বিশ্বাস ছিল তারা প্রত্যেক বিষয়ে যথার্থতার প্রতিটি দিকে গবেষণায় নিয়োজিত ছিল। সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00