📄 ভ্রমণ উৎসাহ
মুসলমানদের সর্বপ্রথম ভ্রমণ কাহিনী কুফাবাসী সুলাইমান ব্যবসায়ীর লিখিত। তা পাঠ করার পর জানা যায়, একজন আরববাসী আরব থেকে বের হয়ে কিভাবে চীন ও ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন। সাথে সাথে তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে সাংস্কৃতিক জীবন-যাপন, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিষয়াবলীও উল্লেখ করেছে, যাতে আরবের একজন পাঠক ঐ সব এলাকা সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়। মুসলমানদের এ উৎসাহ ও উদ্দীপনায় প্রভাবিত হয়ে প্রাচ্যের খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ সাংস্কৃতিক আরব ও ভারতীয় অমুসলিম লেখক এ অভিমত প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে যে, আরববাসীগণ গ্রীকদের ভুল-সংশোধন করে দিয়েছে। তারা যে ভ্রমণ কাহিনী রচনা করেছে। তাতে পৃথিবীর ঐ সব দেশের অবস্থা জানা সম্ভব হয়েছে, যা ইতোপূর্বে জানা সম্ভব হয়নি। অথচ ইউরোপ বাসীদের এ বিষয়ে আদৌ মনোযোগ ছিল।
সাংস্কৃতিক ইতিহাস অধ্যায়ণকারী ছাত্রের জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে এ প্রশ্ন অতিগুরুত্বপূর্ণ যে, কি কারণে আরবদেরকে মরুভূমি থেকে বের হয়ে সারা পৃথিবীর সাংস্কৃতিক দেশসমূহে ভ্রমণ করতে হয়েছে? একজন মুসলমান বিদ্যা অন্বেষীর জন্য এটা জটিল কোন প্রশ্ন নয়। কিন্তু একজন পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবি যখন এ প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে শুরু করে, তখন তার অবস্থা হয় এরূপ এক ব্যক্তির মত, যে অন্ধকারে হাত পা ছুঁড়ে মারে, কিন্তু সে গন্তব্যস্থলে পৌছতে পারে না। কারণ, পাশ্চাত্য গবেষকগণ নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গীতে এ জবাব দেয় যে, প্রত্যেক মানুষ ব্যক্তিগত চাহিদা, অর্থসম্পদ ও ভূ-খণ্ড দখলের উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। পক্ষান্তরে প্রকৃত ঘটনা হল, আরবরা শতাব্দিকাল পূর্ব থেকে উপদ্বীপের বাসিন্দা ছিল। তাদের জীবন-যাত্রায় যখন তখন পরিবর্তন দেখা যেত। কিন্তু যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তখন তারা সারা বিশ্বের ইমাম হয়ে যায়। এর দ্বারা আমরা প্রমাণ লাভ করতে পারি যে, আরবদের পিঠে মূলতঃ ইসলামের শক্তি ছিল, আর ঐ দ্বীনের মহব্বত তাদেরকে নিজেদের আবাস ভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। তাদের ভ্রমণের সবচেয়ে বড় উৎসাহ ও প্রেরনা ছিল নবীজীর ঐ হাদীস যাতে বিদ্যা শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভ্রমণকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ বলে ঘোষণা করেছেন। আর সফর অবস্থায় মৃত্যুকে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ বলে ঘোষণা করেছেন। এ লক্ষ্যে হযরত সাহাবায়ে কিরাম ও পরবর্তীতে মুসলিম উম্মাহ ঐ সৌভাগ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যাপক সফর করেছে। যখন যেখানে কোন উস্তাদ সম্পর্কে অবগত হতেন, তখনই আল্লাহর নামে যার খোঁজে বেরিয়ে পড়তেন। আর স্বীয় হৃদয় জ্ঞানে পরিপূর্ণ করে নিতেন। ইবনে খালদুনের মতে ঐ যুগে বিখ্যাত ওলামাদের সান্নিধ্য লাভ করা বিদ্যানুরাগীদের জন্য জরুরী ছিল। স্বয়ং ওলামাগণ নিজেদের বাসভূমি ত্যাগ করে দূরদুরান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েম করে শিক্ষা দান শুরু করে। যেমন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. মদীনাতে, হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. মক্কাতে, হযরত ইবনে মাসউদ রাযি. কুফাতে এবং হযরত আমর বিন আস রাযি. মিশরে শিক্ষা দানে রত থাকেন। হযরত সাহাবায়ে কিরাম রাযি. জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে দিনরাত ভ্রমণ করতে থাকেন। খোরাসানের জ্ঞান পিপাসুরা নিজেদেরকে তখন পর্যন্ত জ্ঞানী বলে ধারনা করত না, যাবত না সোরা সিরিয়া, মিশর, ইরাক ও হিজাজ অঞ্চলের খ্যাতনামা শিক্ষকদের নিকট শিক্ষা না করত। ভ্রমণের উন্নতি লাভে ভূ-গোল শাস্ত্রে মুসলমানদের বিরাট অবদান ছিল, মুসলমান ভূগোল বিশেষজ্ঞগণ ভৌগোলিক গবেষণার উদ্দেশ্যে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করতে বাধ্য হয়।
হযরত সাহাবায়ে কিরাম রাযি. এর পরবর্তীতে পঠন-পাঠনের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। সারা বিশ্বের জ্ঞান পিপাসুগণ দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতেন। যেমন, মক্কায় আতা বিন রিবাহ রাযি.। খোরাসানে আতা ইবনে আব্দুল্লাহ খোরাসানী, বসরায় আযম, আর ইয়ামানে তাউস রহ. ছিলেন। মুসলমানদের জ্ঞান অর্জন সম্পর্কে পাশ্চাত্যের খ্যাতনামা চিন্তাবিদ নিকলসন অতি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত পেশ করেছে। তিনি বলেন, এসব বিদ্যা শিক্ষার্থীগণ মৌমাছির মত বের হয়ে আসত আর মধু সংগ্রহ করে ফিরে যেত। ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞান অন্বেষণের অসংখ্য শাখা রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নে কতিপয় শাখার বিবরণ উল্লেখ করা হচ্ছে।
১। হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ মাদানী রহ. মিশরের বুযুর্গ আব্দুল্লাহ মিশরীর নিকট থেকে এক হাদীস শিক্ষার প্রয়োজন হয়। ফলে তিনি এক উট খরিদ করে হিজাজ থেকে মিশরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এ সফরে তাঁর দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। কিন্তু তিনি শুধু এক হাদীস শোনার উদ্দেশ্যে সফরের এ দীর্ঘ কষ্ট অকাতরে সহ্য করেন। খতীব তাবরীজির পূত্র তার নিজের গ্রন্থ পুনরায় পর্যবেক্ষণ করানোর উদ্দেশ্যে আবু আলী মিশরীর নিকট গমন করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তার নিজের কাছে অর্থ না থাকায়, পদব্রজে মিশরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। গন্তব্যস্থল পৌঁছে দেখেন, বগলের চেপে রাখা গ্রন্থের কপি ঘামে নষ্ট হয়ে গেছে। ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া পাশ্চাত্যের কর্ডোভা (ইউরোপের) অধিবাসী ছিলেন। তিনি পাশ্চাত্যের বিখ্যাত শিক্ষকদের নিকট জ্ঞান শিক্ষা সমাপ্ত করে প্রাচ্য অভিমুখে যাত্রা করেন। মদীনায় হযরত ইমাম মালিক রহ. এর নিকট জ্ঞান শিক্ষা করেন। মক্কায় সুফিয়ান বিন আলী, মিশরে আবদুর রহমানের নিকট বিদ্যা শিক্ষা সমাপ্ত করে স্পেনে ফিরে আসে।
হযরত ইমাম বুখারী রহ. হাদীস শিক্ষা করার উদ্যেশ্যে যে কষ্ট করেছেন। বর্তমান বিশ্বের মানুষ তা কল্পনাই করতে পারে না। তিনি হাদীস শিক্ষার উদ্দেশ্যে খোরাসান, মিশর, ইরাক ও ইরান প্রভৃতি এলাকা ভ্রমণ করেন। হযরত সোহাইল ইবনে আব্দুল্লাহ এক মাসায়ালা জানার জন্য তের বছর বয়সে ভ্রমণ শুরু করেন। এ মাসয়ালায়ে যে উস্তাদ সমাধা করে দিয়েছেন। সারা জীবন তাঁর খেদমত করেন। মুসলমানদের শেষ জ্ঞান অর্জনকারী মুহাম্মদ বিন ইসহাক এক হাজার সাত শত উস্তাদের নিকট জ্ঞানশিক্ষা করার পর যখন নিজ বাসস্থানে ফিরে আসেন। তখন চল্লিশ উটের বোঝা গ্রন্থ সাথে নিয়ে আসেন।
হযরত সুফীয়য়ে কিরাম আত্মশুদ্ধি ও মুর্শিদের সাথে সাক্ষাত ও বিদ্যা শিক্ষার উদ্দেশ্যে ব্যাপক সফর করেন। তারা পবিত্র কুরআনের নির্দেশ سِيرُوا فِي الاَرْضِ এর ঘোষণা অনুযায়ী একের পর এক দেশ ভ্রমণ করেন। পূর্ববর্তী জাতিসমূহের নির্দেশনাবলী দেখে উপদেশ গ্রহণ করতেন। খানকাহ্, মাকবারাহ, গ্রন্থাগার আল্লাহর ওলীদের সান্নিধ্য লাভের উৎসাহ ও আল্লাহর মারেফত লাভের উৎসাহ ও আগ্রহ তাদেরকে সুদূর চীনেও অবস্থান করতে দেয়নি। শাইখ আবু নছর আসসিরাজ (মৃত্যু ৩৭৮ হিঃ) ইসলামী রাষ্ট্র সমূহ ভ্রমণ করেন। তাঁর রচিত "আললুময়া" গ্রন্থে তিনি যেসব দেশ ভ্রমণ করেছেন, সে দেশ সম্পর্কে অনেক তথ্য উল্লেখ করেছেন। বসরা, বাগদাদ, আরমেলা, দামেশক, আনতিউখ কায়রো, বায়তুল মুকাদ্দাস, বোস্তাম, তশয, তাবরিজ, হিজাজ, ইরাক, ইরান, মিশর, ফিলিস্তিন, তারাবুলুস, ও এশিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে ভ্রমণের বিবরণ নিঃসন্দেহে উল্লেখ করেছেন। "কাশফুল মায়জুব" গ্রন্থের রচিয়তা শাইখ আলী ইবনে ওসমান হাজরুবী প্রসিদ্ধ দাতাগঞ্জ বখশ রাযি. ইসলামী বিশ্ব সিরিয়া থেকে তুর্কিস্থান, সিন্দু উপকূল ও কাম্পিয়ান সমুদ্র উপদ্বীপ পর্যন্ত ভ্রমন করেন। তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে।
হযরত শাইখ আবদুল কাদীর জিলানী রহ. (৪৭০ হিঃ) পঁচিশ বছর বয়স থেকে জনশূন্য এলাকায় এমন নির্জনাবাস শুরু করেন, যেন কোন মানুষের চেহারা পর্যন্ত দেখা না যায়। তাঁর এ ভ্রমণ ছিল আশ্চর্য্য ধরনের। তিনি মরুভূমি ও বন জংগলে ঘোরাফেরা করতেন। সৃষ্টিজগত সম্পর্কে গভীর ধ্যানে মগ্ন হত। দুনিয়া বাসীদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর হয়ে থাকতেন। হযরত ইমাম গাযালী রহ. নিয়মিত মুসলিম বিশ্ব ভ্রমণ করেন। তাঁর এ ভ্রমণ কাহিনী উপহার স্বরূপ তিনি "এহিয়াউল উলুম" গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন। নিম্নে কতিপয় মুসলমান পর্যটকের ভ্রমণ কাহিনী উল্লেখ করছি। তাঁরা তাঁদের জীবনের অতিমূল্যবান সময় মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত বিজন প্রান্তর ও সমুদ্রের মাঝে অতিবাহিত করেছেন। আর তারা তাদের বিভিন্ন প্রকার ভ্রমণ কাহিনীতে জ্ঞান বিজ্ঞান রীতি নীতি আচার-আচরণ সাংস্কৃতি, সামাজিক রূপরেখা অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে জন-সাধারণের সামনে তুলে ধরেছেন। যা পাঠে বেশ আনন্দ অনুভূত হয়।
১। আবু আব্দুল্লাহ আল ইদ্রিসী মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন ইদ্রিস (৫৬০-৫৯৩ হিঃ) বাস্তা নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন। কর্ডোভাতে বিদ্যাশিক্ষা করার পর বিভিন্ন দেশ সফর করার পর এক দীর্ঘ সময় পালরাম্ নামক স্থানে অবস্থান করেন এবং সুফিয়ার নরম্যান বাদশাহের দরবারে অবস্থান করেন। বাদশাহর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পর তিনি তার অঙ্কিত বিরাট এক রৌপ্যের উপর সৌরমণ্ডলের চিত্র নকশা প্রকাশ করেন, প্রথম ওলিমের জন্য আল ইদ্রিসি ভূগোল গ্রন্থ "রাওজাতুল উন্স ওয়া নজহাতুন নাফস" প্রণয়ন করেন।
২। ইবনে খারমাজুবাহ আবুল কাশেম ওবায়েদ উল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ ইরানী বংশধর বিখ্যাত সাহিত্যিক ও ভূগোলবিদ ছিলেন। (জন্ম ২২১ হিঃ)। জনৈক আব্বাসী যুবরাজের নির্দেশে "আল মাসালিক ওয়াল মামালিক" নামক ভূগোল গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে স্থানীয় ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব তথ্য সম্বলিত ছিল। তার পরবর্তী ভূগোলবিদ ও পর্যটক ইবনুল ফাকিরাহ ইবনু হাওল কুদ্দসী ও আল জীলানী উক্ত গ্রন্থ দ্বারা বিশেষ উপকৃত হয়।
৩। ইবনে কাফিয়াহ আরব ভূগোলবিদ ছিল। তার পুরো নাম আবু বকর আহমদ বিন মহাম্মদ বিন ইসহাক আল হামদানী (জন্ম ২৯০ হিঃ)। তিনি "কিতাবুল বুলদান” নামক ভূগোল বিশ্বকোষ রচনা করেন। তাঁর অধিকাংশ বিষয় ইয়াকুতী ও আল মুকাদ্দেসী তাদের গ্রন্থে উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেছে। বর্তমানে মূল গ্রন্থ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
৪। আল মুকাদ্দেসী (৯৪৬-১০০০ খ্রিঃ)। একজন বিখ্যাত পর্যটক ছিলেন। তিনি বিশ বছর বয়সে ভ্রমণ শুরু করেন। প্রায় পুরো মুসলিম সাম্রাজ্য ভ্রমণ করেন। আর ৯৮৬ খ্রিঃ "আহসানুত্ তাকসীম ফী মারিফাতিল ইসলাম" নামক এক অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি মুসলিম শিল্পকারিগরি, কৃষি, খনিজদ্রব্য ও শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে ব্যাপক আলোচনা করেন। ভূ-গোল শাস্ত্রে তাঁর রচিত গ্রন্থের স্থান ইবনে হাযকালের রচিত গ্রন্থের অনেক উর্ধে।
৫। আল মাসুদী ইসলামের ইতিহাস খ্যাত ঐতিহাসিক, ভূগোলবিদ, পর্যটক ও দার্শনিক ছিলেন।, জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে মাসুদী ইরান, মিশর, চীন, ভারতবর্ষ ভ্রমণ করে উমানের পথে আরবে প্রত্যাবর্তন করেন। তারপর মিশর পৌছেন। ওখানে ওফাত হয়। তাঁর পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ বৃত্তান্ত "মুরুরুজ জাহাব" ও "আখবারুজ জামান" গ্রন্থে বর্ণিত আছে। উক্ত গ্রন্থে তিনি চীন, স্পেন, রুশ, ভারত, সিরিয়া ও মিশরের জাতি সমূহের জীবন- জীবিকা, সভ্যতা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। মাসুদী মানব জাতিকে অতি বেশী ভালবাসতেন। এ কারণে তিনি মানব ইতিহাস রচনায় উৎসাহী হন। সম্ভবতঃ এর উপর ভিত্তি করে তাকে মুসলিম "হিরোডোটস" বলা হয়েছে।
৬। ইবনে মাজিদ শিহাব উদ্দীন হিজরী নবম শতক বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের এক আরব নাবিক ও "আল ফাওয়ায়িদ" নামক গ্রন্থের স্বার্থক রচিয়তা। তাঁর রচিত গ্রন্থে ভারত মহাসাগর লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, চীন সাগরের পশ্চিমা সম্মিলিত দ্বীপপুঞ্জে জাহাজ পরিচালনাকারী নাবিকদের সম্পর্কে পথ নির্দেশের উল্লেখ করেন। সাধারণতঃ এ ধরনের লোকদের পর্যটক বলাই হয় না। কিন্তু আমি এ সব লোকদের ভ্রমণ গুলোকে পর্যটন হিসেবে গণ্য করতে চাই। ভৌগলিক অভিজ্ঞতা সমবেত করা, সামুদ্রিক পথ সমূহ অবগত হওয়া, দ্বীপসমূহ অনুসন্ধান করা, উপকূলীয় অঞ্চল সম্পর্কে অভিজ্ঞা অর্জন করা, সামুদ্রিক ঝড় সম্পর্কে আগাম সতর্কবাণী লাভ করা এসব বিষয় মুসলিম পর্যটকদের ভ্রমণ কাহিনীতে আলোচিত হয়েছে। ইবনে মাজিদ ঐ ব্যক্তি যার সম্পর্কে প্রাচীন ভ্রমণ কাহিনী রচিয়তা ও সামুদ্রিক বিষয়ে গবেষকগণ বলেন, "আমি ভাস্কো-দা-গামা আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে পৌঁছার পর ইবনে মাজিদ আমাকে ওখান থেকে সরাসরি কলকাতা দক্ষিণ ভারতে পৌঁছে দেয়। ইবনে মাজিদ তাঁর রচিত "আল ফাওয়ায়িদ ফী উসুলী ইলমিল বাহারি ওয়াল কাওযায়িদ" গ্রন্থে জাহাজ পরিচালনার বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা করেন। দীর্ঘকাল পর্যন্ত উক্ত গ্রন্থ অতিমূল্যবান ছিল। ইংরেজ ও আরব নাবিকদের জন্য উক্ত গ্রন্থকে (Guid Book) নামে অভিহিত করা হয়েছে। আধুনিক নাবিকদের জাহাজ পরিচালনায় ইবনে মজিদ প্রাচীন ঐতিহাসিক বলে গণ্য। পালের জাহাজ পরিচালকদের জন্য যে পথনির্দেশনা উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ ইবনে মাজিদের বর্ণনা থেকে উত্তম তথ্য তো দূরের কথা তার সমান তথ্যও উল্লেখ করতে পারেনি। তিনি লোহিত সাগর সম্পর্কে অনেক তথ্য উল্লেখ করেছেন। ইবনে মাজিদের অভিজ্ঞতা এরূপ সনদ যে, তিনি তার ভ্রমণ কাহিনীতে বিভিন্ন দেশে ধীরে ধীরে প্রতিফলিত মৌসুম পরিবর্তনের উল্লেখ করেছেন।
৭। ইবনে হাইকাল (মৃত্যুঃ ৩৫০হিঃ), আবুল কাসিম মুহাম্মদ বিন হাইকাল আননাসিবী আল বাগদাদী খ্যাতিমান আরব ভূ-গোলবিদ ও পর্যটক ছিলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যের বিষয় হল, তাঁর জীবনী সম্পর্কে বেশী কিছু জানা সম্ভব হয়নি। অবশ্য তিনি তাঁর নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন, ২৩১ হিঃ রমাযান মাসে আমি বাগদাদ থেকে এ উদ্দেশ্যে যাত্রা করি, যাতে আমি মানুষের জীবন-যাপন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারি। এ সব অভিজ্ঞতার বিবরণ তিনি তাঁর রচিত "মূসাওয়ারাতিল আরয” নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সব মুসলিম রাষ্ট্র ভ্রমণ করেন। আর তার পূর্ববর্তী পর্যটকদের মধ্যে "আল জুহানী" ইবনে মারজুবা ও কুদামার রচিত গ্রন্থাবলী অধ্যয়ণ করেন। ইবনে হাইকাল তাঁর পর্যটনের সময়ে আল ইসতিখারীর সাথে সাক্ষাত করেন। আর তাঁর অংকিত চিত্র ও গ্রন্থ সমূহ সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে তিনি উক্ত গ্রন্থ সম্পূর্ণ নতুন ভাবে সংস্করন করে "ওয়াল মামালিক ওয়াল মামালিক" নামে নিজের নামে প্রকাশ করেন। ইবনে হাইকাল পঁচিশ বছর বয়সে ভ্রমণ শুরু করেন। দীর্ঘ পঁচিশ বছর পর স্বদেশে ফিরে আসেন। ঐ সময় তিনি আফ্রিকা, মিশর, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মক্কা নগরী ও চীন সফর করেন।
৮। আল ইসতিখারী নামে প্রসিদ্ধ আবু ইছহাক ইব্রাহীম বিন ফার্সীর মত এক আরব ভূগোলবিদ, যার জীবন ইতিহাস কোথায়ও বিদ্যমান পাওয়া যায়নি। তাকে "কিতাবুল মাসালিক ওয়াল মামালিকের প্রতি সম্পর্কিত করা হয়। ইসতিখারীর উক্ত গ্রন্থ মূলতঃ আবু জায়িদ আল বলখী রচিত একটি গ্রন্থের নতুন সংস্করণ। ইবনে হাইকালের জীবন ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসতিখারী চতুর্থ হিজরীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত জীবিত ছিল। আর ৩৪০ হিজরীতে ইবনে হাইকালের সাক্ষাত প্রমাণিত আছে।
৯। ইবনে যুবাইর যে সব ভ্রমণ কাহিনী উল্লেখ করেছেন। তা আরবী সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য অংশ হিসেবে প্রমাণ হয়েছে। তাঁর ঐ ভ্রমণ কাহিনী নামে উর্দু ভাষায় আহমদ আলী খাঁন শওক প্রকাশ করেছেন। উক্ত ভ্রমণ কাহিনীতে ইবনে যুবাইর সেসব দেশের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা, রীতিনীতি, আচার-আচরণ, চালচলন, স্বভাব-চরিত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয় প্রভৃতির বিশদ বিবরণ দিয়েছেন।
১০। ইবনে বতুতা ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত পর্যটক ও আলেম দ্বীন ছিল। তিনি আবুল মানান সুলতান ফাসের নির্দেশে ভ্রমণকাহিনী লিপিবদ্ধ করেন। এ বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থের নাম রাখা হয় 'তোহফাতুন নাজারাহ ফী গারায়িবিল আসফার'। ইউরোপবাসী উনবিংশ শতকে উক্ত গ্রন্থ সম্পর্কে অবগত হয়। অধ্যাপক গিব ১৯২৯ খ্রিঃ উক্ত গ্রন্থের কিছু অংশ ইংরেজীতে অনুবাদ করেন।
এছাড়াও আল-বেরুনী, নাসির খসরু, যাদের সম্পর্কে সাধারণ বর্ণনা বিদ্যমান পাওয়া যায়। তাঁরাও উল্লেখযোগ্য পর্যটক ছিল।
📄 জ্যোতির্বিজ্ঞান
পবিত্র কুরআন মজীদের অনেক অনেক আয়াতে আসমান ও আসমানের বহিঃপ্রকাশ সম্পর্কে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ সব বর্ণনাকে মহান আল্লাহ তা'আলা মোটামুটি অন্যান্য বিষয়ের সাথে তাঁর নিজের নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন এবং গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করার আহ্বান করেছেন। ইসলাম এ সৃষ্টিজগতকে পবিত্র কুরআনের উদ্ভাবন বলে উল্লেখ করেছে। অর্থাৎ কুরআন মজীদকে কুরআনের সংকলন নামে নামকরণ করেছেন। স্বয়ং কুরআন মজীদে স্বভাব প্রকৃতি ও প্রকৃতির বহিঃপ্রকাশ ধারাবহিকভাবে যত অধিক বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলার নিদর্শন সম্পর্কে ততো অধিক বর্ণনা হাদীস গ্রন্থাবলীতেও বিদ্যমান পাওয়া যায় না।
উপরিউক্ত প্রকৃত ও প্রকৃতির বহিঃপ্রকাশ সম্পর্কিত অধিকাংশ আয়াতে (সামাওয়াত) তথা "আসমান সমূহ” উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামের বুনিয়াদি উৎসের প্রতি এ অনুশীলন আসমান সমূহের সত্যায়ন করেছে। এর প্রতি মনোযোগের কারণে নক্ষত্র সমূহের পথপ্রদর্শনে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে প্রশস্তা অতিক্রমকারী আরব বেদুঈনরা পূর্বে বিদ্যমান ছিল। ইসলামী সংস্কৃতির সূচনা লগ্নে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক শক্তিালী উৎসাহ ও বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করে। তাছাড়াও নামাযের সময় নির্ধারণ ও বিভিন্ন স্থানে কিবলার সঠিক দিক নির্ণয়ে এ জ্ঞান ভীষণ জরুরী ছিল। সুতরাং এটাকে অতি মূল্যবান জ্ঞান বলে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। যা সে সব ওলামা ও ফিকহাবিদদের মধ্যে অনেকে অনুভূতিশীল জ্ঞানের বিরোধী ছিল, তাঁরাও জ্যোতির্বিজ্ঞানকে অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অনেকে উক্ত বিষয়কে অন্যান্য বিষয়ের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
📄 জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎস
জ্ঞানের অন্যান্য মত ইসলামের জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎস হল গ্রীক, ভারতীয় ও ইরানের সামানীদের রচিত গ্রন্থাবলী। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানের এ বৈশিষ্ট্য লাভের কারণ হল, এ বিষয় ইসলাম পূর্ববর্তী সময় আরবী ভাষায় এর বিস্তারিত বিবরণ বিদ্যমান পাওয়া যায়। ইসলামের আগমনের পর আরবদের মধ্যে আসমান সমূহ সম্পর্কে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। আরববাসীরা চাঁদের উদয়ের স্থানকে আটাশ ভাগে ভাগ করেছিল। ঐ নীতিকে পরবর্তীতে মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগন তাদের নিজে স্বনীতি হিসেবে বরণ করে নেয়। এর সাথে সাথে তাঁরা চাঁদের কক্ষপথ সমূহ ও প্রত্যেক কক্ষে প্রতিটি চন্দ্রমাস প্রকাশিত হওয়ার পূর্ণাঙ্গ বিষয় উদ্ভাবন করে। এর সাহায্যে তারা ঋতুর পরিবর্তন ও মহাকাশ সংক্রান্ত বিষয়ে অভিমত প্রকাশ করত। এ জ্ঞানকে "ইলমুন নাওয়া" নামে অভিহিত করে। এটা শুধু ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বরং ইবনে ফাইনা দানুবীর মত মুসলিম বিজ্ঞানী এর ব্যাপক উন্নতি সাধন করে। আজও ইবনে কানিয়ার রচিত "আল আনোয়া" নামক গ্রন্থ এ সংক্রান্ত আরবী ভাষায় রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আছে।
ইসলাম চাঁদকে অনুমান করে নিজেস্ব বলে উল্লেখ করেছে। সে অনুযায়ী আজ পর্যন্ত তাদের যাবতীয় ধর্মীয় বিধিবিধান পালিত হয়ে আসছে। মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ ধারণামূলক বিষয় সর্বদা চিত্তাকর্ষক করে নিয়েছে। এমন কি সালজুফী যুগের বিজ্ঞানীগণ যাদের মধ্যে উমর খৈয়ামও অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। তারা স্থায়ী প্রান্তরেখার আকৃতিতে দুনিয়াতে ঐ সৌর মণ্ডলকে স্থায়ীত্ব দান করেছেন, যা আজও কমবেশী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মুসলমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ কৃষক ও কৃষিকাজের জন্য কতিপয় সাধারণ গ্রহণযোগ্য রীতি নির্ধারণ করেছেন। তন্মধ্যে কডোভাতে কৃত রীতি অতি প্রসিদ্ধ। এ রীতি এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত পাশ্চাত্য জগতে কৃষকদের জন্য বর্ষপঞ্জি রূপে কাজ করে। পাশ্চাত্য জগতে এর জন্য ব্যবহৃত শব্দ “মুসতাআল আল মানাক” এর আরবী প্রতিশব্দ (المناخ )অর্থ - আবহাওয়া) হয়ে গঠিত হয়েছে।
আমরা প্রাথমিক যুগের বিজ্ঞানীদের যেসব গ্রন্থ বিদ্যমান পেয়েছি, তাতে মহাকাশ ও গ্রহ-নক্ষত্রের বিবরণ সম্পর্কিত বর্ণনা রয়েছে। হিজরী দ্বিতীয় শতক বা খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে সামানী গ্রন্থাবলী আরবীতে অনুবাদ করা হয়। সামানী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কিত জ্ঞান মূলতঃ গ্রীক ও ভারতীর উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধরা হয়। এ কারণে সামানী গ্রন্থের মৌলিকতা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এই মতবিরোধ এ কারণে আরো জটিল আকার ধারন করে যে, স্বয়ং ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞান গ্রহ-নক্ষত্র সম্পর্কিত জ্ঞান অনেক পূর্বে গ্রীক মতবাদে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়েছিল। তাই এ সব বিষয় গ্রীক ও ভারতীয়দের দৃষ্টিভঙ্গী চিন্তা-ভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। যখন পারস্য বা ইরান উভয় দেশের মাঝে অবস্থিত ছিল, তথাপি ও সামানী দৃষ্টিভঙ্গীতে এমন কতিপয় বিষয় রয়েছে, যা গ্রীক ও ভারতীয় প্রভাব মুক্ত ছিল। এটাকে ইরানী উপকরণ বলা বিদ্যমান থাকে। যেমন, বৃহস্পতি ও শনিগ্রহ রাতের অধাংশ থেকে দিনের সূচনা পর্যন্ত আর এ সব খোদায়ী কুদরত। হিজরী তৃতীয় শতক (খ্রিস্টীয় নবম শতক) গ্রীক জ্যামিতিবিদ বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্বিজ্ঞানী বাতালিমূসের গ্রন্থ প্রণয়ন নতুন তথ্যউপাত্যের সংযোজন করে। আর এভাবে ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পূর্ণ পৃথক এক বিষয়রূপে বুনিয়াদি স্বীকৃতি লাভ করে। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত বাতলিমূসের গ্রন্থসমূহ হুসাইন ইবনে ইছহাক ও সাবিত বিন কারয়াহর মত জ্ঞানী গুণীগণ একাধিক বার আরবীতে অনুবাদ করে। আর এ সব গ্রন্থ আজও পাশ্চাত্য জগতে আরবী "আল মাহবাত" নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। এছাড়াও বাতলিমূসের রচিত ভূগোল গ্রন্থ (তাতে জ্যোতির্বিজ্ঞান) সম্পর্কিত যেসব অধ্যায় রয়েছে, সেগুলো ও অন্যান্য গ্রন্থাবলী আরবী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। যতদূর পর্যন্ত অন্যান্য গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ অবগত হয়েছে, মুসলমান কখনো "গালা" আর জাজওয়া আফহারকুস, আরাসতার কুম জ্যাইমুনুস, আনতা লাকুস, সিউদাইহুম ইস্কালিন, সাইউন প্রমূখ গ্রীক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গ্রন্থাবলী দ্বারা উপকৃত হয়েছে। ফলে মুসলমান প্রাচীন ব্যবিলনী ও মিশরী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে ব্যাপক অবগতি লাভ করেছে。
📄 গ্রন্থ প্রকাশনা
ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে আরবী-ফার্সী ও অন্যান্য মুসলিম ভাষা। যেমন, তুর্কী ভাষায় রচিত গ্রন্থ ভাণ্ডার অত্যন্ত বিশাল। এমনকি দু'শতাব্দি পর্যন্ত অনুশীলন করার পরও পাশ্চাত্য গবেষকগণ বেশীর ভাগ উপকরণ পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হয়নি। তারা যেসব তথ্যউপাত্ত সম্পর্কে অবগত হয়েছে। তা-ও আংশিক কিছু বিষয় মাত্র। পুরোপুরি অবগত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ সমস্ত তথ্যাবলী বিভিন্ন বিষয় সম্বলিত ছিল। তন্মধ্যে কোন কোন গ্রন্থে বিজ্ঞানের নির্দিষ্ট বিষয় সম্বলিত ছিল। অথবা জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে বিশেষ যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত ছিল। কোন কোন গ্রন্থে জ্যামিতি সম্পর্কে বর্ণনা করা ছাড়াও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। হিজরী তৃতীয় শতকে (নবম শতাব্দী) আবু আব্বাস আহমদ আল ফারগানী "আল মাদখাল আল আলীম হাইয়্যাতি আফলাক" নামক গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থ ১১২৫ খ্রিস্টাব্দে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়। তিনি সূর্যতাপ মাপার ঘড়ি আবিষ্কার করেন। ঐ যুগে একাধিক সাপুর (ইরান) ও দামেশকে নকোথিয়েটার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। হিজরী চতুর্থ শতকে আব্দুর রহমান আসসুফী "সু আরুল আল কাওয়াকিব" নামক গ্রন্থ রচনা করেন। যা বর্তমানেও দীর্ঘ মেয়াদী পরিবর্তনশীল গ্রহ পরিমাপে কাজে আসছে। এ ধারাবাহিকতায় নাসীর উদ্দীন তুশির রচিত গ্রন্থও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উক্ত গ্রন্থে জ্যামিতিক ভাবধারা অনুসরণ করা হয়নি। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ এক অনন্য ধরনের ধারণা নির্ভর গ্রন্থ। তাতে কোন না কোন ভাবে অনুমানকৃত বা বর্ষপঞ্জি সম্পর্কে আলোচনা করে সময় নির্ধারিত বছরের মাঝে ঐ সব দিন সম্পর্কিত বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তারপরও এগুলো এমন গ্রন্থ, যেগুলোকে রাজমিস্ত্রির সূতার গ্রান্তরেখা বলা হয়। আর এগুলোতে স্বাভাবিক প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পরিনামের একক চিত্র বা প্রান্তরেখার চিত্র অংকন করা হয়েছে। সাথে সাথে ঐ সব গ্রন্থে জ্যামিতিক বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্র শুধু জ্যামিতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ অনেক মূল্যবান গ্রন্থ যেমন, হালীমীকে রাজমিস্ত্রির সূতা বলা হয়। জিদ আল খান্দ ও জিদ আলিপবেগ ঐ আকৃতির হয়েছে। অবশেষে সংক্ষেপে ঐ বিষয়ে আলোচনা করা জরুরী যে, এটা এক ইনসাইক্লোপিডি বা সমষ্টিগত বিষয় রূপে এর সকল শাখা সংযুক্ত করে নেয়। কিন্তু এটা বর্ণনা করার বিষয়ে নয় বরং পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতার সাথে সাথে ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে। যেমন, আল-বেরুনী রচিত “কানুনে মাসুদী” ও কুতুবুদ্দীন শিবাজীর অতি উত্তম চিন্তা-ভাবনা প্রভৃতি।