📄 বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা ও মুসলমান
মুসলমান শুধু গ্রন্থ রচনা ও সংগ্রহ করেনি বরং তা দ্বারা পুরোপুরি উপকৃত হয়েছে। উক্ত তিন বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক বিভাগ ও বিষয় প্রতিষ্ঠিত করেছে। সাথে সাথে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী উন্নতি লাভ করেছে। এ এক স্বাভাবিক কাজ ছিল যে, যখন গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হত, তখনই তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় উন্নতি সাধিত হত। এটা কি বাস্তবতা নয় যে, গ্রন্থাবলী নকল করা আর এর দ্বারা বিভিন্ন প্রকার কাজ করা, বাঁধাই করা, পৃষ্ঠা সমূহ সুবিন্যাস্ত করা, প্রভৃতি সম্মানীত পেশা ও উত্তম আমদানী নির্ভর কাজে পরিণত হয়। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা যে বিষয়ের জন্য উদ্ভাবন হত তার উন্নতি করা অত্যাবশ্যক কাজে পরিণত হয়েছে। গ্রন্থাগারের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কোন বিষয় সম্পর্কে পৃথক ভাবে বিদ্যমান পাওয়া যায়।
১. ইলমু এমলা- আরবী বর্ণমালা লিখন পদ্ধতি
২. ইলমু তরকীব এশকাল বসায়িতিল হরুফ
৩. ইলমু আদওয়াতিল খাত্তি
৪. ইলমু খাতুল মাসাফ
৫. ইলমু মারফাতে রুসুমুল খাত্তি সাহিত্যিক গ্রন্থ
৬. ইলমু কাওয়ানুল কিতাবাতি
৭. ইলমু তারকীব আনোয়ায়িল মুদাদ
৮. ইলমু মাকহীফ
৯. ইলমু তাকাসীমুল উলুম
এ কথা সর্বস্বীকৃত যে, বাগদাদ নগরীতে (২৫২হিঃ) পর্যন্ত এ সব জ্ঞান বিজ্ঞান বিপুল উন্নতি লাভ করেছে। কেননা এর নিদর্শনাবলী পরবর্তী যুগে বিপুল পরিমাণে পাওয়া যায়। এ সব বিষয়ের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন গ্রন্থাবলী ছাড়াও এর সাথে সংশ্লিষ্ট যা উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে আমারা সপ্তম হিজরীর শেষ দিকের বদরুদ্দীন মুহম্মদ বিন ইব্রাহীম বিন সাদউল্লাহ বিন মাযয়াহর (৬৩৯-৭৩৩ হিঃ) রচিত "তাযকিরাতুস সামিয়ি ওয়াল মুতাকাল্লিম আদাবুল আলিম ওয়াল মুতাআলিম” গ্রন্থের চতুর্থ পর্ব দ্বারা বিশেষ উপকৃত হয়েছি। আবুল আব্বাস বিন আলী বিন আহমদ আল কাসিদের (৭৫৬-৮২৯ হিঃ) রচিত "সুবহুল আশী" ১ম খণ্ড ও দ্বিতীয় খণ্ড দোয়াত, কলম, কাগজ ও লেখার বিভিন্ন ধরন প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতার বিবরণ পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে উক্ত গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডের প্রথম অধ্যায় লেখা ও কলম সম্পর্কে অনেক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। কামাল উদ্দীন আবুল কাশেম আমর বিন আহমদ বিন হাইবাতুল্লাহ ইবনে নাদিম বিষয় ভিত্তিক এক গ্রন্থ রচনা করেন। আবু হাইয়্যান আত-তাওহিদী (মৃত্যু ৪১৪ হিঃ) এ বিষয় উন্নতি সাধনকারীদের মূল্যবান অভিজ্ঞতার উল্লেখ করেছেন।
অনুরূপভাবে মুহাম্মদ বিন আমরুদ্দীনের (৫০৯-৫৮১ হিঃ) রচিত "কলম ও দোয়াত" নামক গ্রন্থ মুসলমানদের জন্য উপকারী প্রমাণ হয়। তিনি বিভিন্ন ধরনের কলম ও কালি তৈরীর বিষয় উল্লেখ করেছেন। জনৈক অজ্ঞাত লিখকের ক্ষুদ্র এক গ্রন্থ "হুনরু মরদম" নামে প্রকাশ করা হয়। তাতেও বিভিন্ন ধরনের লেখা ও কালির বিবরণ পাওয়া যায়। আবু জাফর আলমাস (৩৩৮ হিঃ) 'সানায়াতুল কিতাব' নামক একগ্রন্থে রচনা করেন। তাতে গ্রন্থ প্রণয়নের উত্তম নিয়ামাবলীর উল্লেখ করা হয়। তাতে মুসলমানদের গ্রন্থ প্রণয়নের অনেক মূল্যবান তথ্য বিদ্যমান রয়েছে। মুসলমানগণ তাদের গ্রন্থাগার সমূহে অন্যান্য জাতির রচিত গ্রন্থাবলী তাদের নিজস্ব মাতৃভাষায় অনুবাদ করার জন্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করত, বাগদাদের ঐতিহাসিক "বায়তুল হিকমা" নামক গ্রন্থাগারে এর প্রাথমিক সূচনা করা হয়। অনুরূপভাবে বিভিন্ন গ্রন্থাগারে অজ্ঞাত ভাষায় রচিত গ্রন্থাবলী সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইবনুল আরাবী (মৃত্যুঃ৭৪৩ হিঃ) মারাগাহের নভোথিয়েটার গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন। তিনি তার পরিদর্শন বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন, আমি উক্ত গ্রন্থাগারে পৃথিবীর প্রসিদ্ধ ভাষা, যেমন চীনা, মোগল, সংস্কৃত, হীব্রু, আরবী, ফার্সী ইত্যাদি ভাষার অসংখ্য গ্রন্থ দেখেছি। কোন কোন গ্রন্থাগারে একই গ্রন্থের একাধিক অনেক কপি রাখা গৌরবের বিষয় মনে করা হত। গ্রন্থাবলী সংরক্ষণ করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হত। যাঁরা তাদের অর্থ-সম্পদ ও জীবনের প্রতিটি মূল্যবান মুহূর্তকে গ্রন্থ সংগ্রহের পেছনে ব্যয় করেছেন, তা তাদের নিকট তাদের প্রাণপ্রিয় ছিল। তারা সেটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। যারা নিজেদের গ্রন্থাগার সংরক্ষণ করতে সক্ষম হত না, তারা অন্যান্য গ্রন্থাগারে নিজেদের সংগ্রহ সমূহ দান করে দিতেন নিজের গ্রন্থাবলী অন্যের দ্বারা সংরক্ষণ করানোর এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যায়। গ্রন্থাবলীকে উইঁ ও অন্যান্য ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কীট নাশক ঔষধ ব্যবহার করার পদ্ধতিও চালু হয়।
গ্রন্থের স্তূপের মাঝে নিম পাতা ও বিষাক্ত ধোঁয়া দেওয়ার সাধারণ রীতি চালু ছিল। মুসলমান যুগের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাধুনিক গ্রন্থাগার তৈরী করতেন। আর তাতে পাঠকদের সুযোগ-সুবিধার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত। পাঠকদের চাহিদা মত যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ করত। অবশ্য প্রথম প্রথম বাসগৃহেই প্রন্থগার প্রতিষ্ঠা করা হত। তারপর মসজিদ ভিত্তিক গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। কিন্তু এরূপ অসংখ্য গ্রন্থাগার রয়েছে, যার জন্য বিশেষ ভবন তৈরির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শিরাজ নগরীর আজদুদ্দৌলার প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারের ভবন ও আলমিরা সম্পর্কে ঐতিহাসিক আল মুকাদ্দেসির উদ্ধৃত বিবরণ নিম্নরূপ।
"গ্রন্থাগারের ইমারত সমূহ ধারাবাহিক ভাবে লম্বা আকৃতির হত। কক্ষ সমূহ যথারীতি লম্বা আকৃতির হত। কক্ষ সমূহের দেওয়ালের সাথে গ্রন্থরাখার আলমিরা সমূহ সংযুক্ত করা হত। ঐ সুন্দর আলমিরা চতুষ্কোন দৈর্ঘে এক ব্যক্তির সমান উঁচু, তিন হাত পরিমান প্রস্থ হত। আর কপাট সমূহ উপর থেকে বন্ধ করা হত। তাক সমূহের উপর প্রত্যেক বিষয়ের গ্রন্থাবলি পৃথক পৃথক রাখা হত। এ সম্পর্কে স্পেনের ফাতেমী বংশের গ্রন্থাগার এক অদ্বিতীয় দৃষ্টান্ত। তার ইমারতের স্থাপত্যশিল্পও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দরজা জানালা এমনকি ছাদের রং সবুজ ছিল। অনুরূপভাবে এর আসবাবপত্র কার্পেট, পর্দা সবই সবুজ রংয়ের ছিল। দর্শকদের নিকট তা অতি চিত্তার্ষক মনে হত। মুসলমানগণ গ্রন্থাগার নির্মানে বিশেষ সতর্কতা গ্রহণ করতেন। ফাতেমীদের নির্মিত গ্রন্থাগার সমূহে বহিরাংশও বড় চমৎকার ছিল। গ্রন্থাগারের আলমিরার গ্রন্থসমূহ ফাঁকা ফাঁকা করে রাখার রীতি ছিল। সম্ভবতঃ এভাবে রাখার ফলে গ্রন্থগুলো দ্রুত নষ্ট হওয়া বা পৃষ্ঠায় ভাজ পড়া থেকে রক্ষা পেত। এভাবে গ্রন্থ চিহ্নিত করতেও বেগ পেতে হত না। কেননা নাম ও বিষয় বস্তু ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করা থাকত। গ্রন্থ সমূহকে নিয়মতান্ত্রিক বিন্যাস করার বিষয় বিপুল উন্নতি সাধিত হয়। এর দ্বারা প্রমাণ হয় যে, আলমিরার প্রথম স্তরে এ গ্রন্থ বেশী পরিমান রাখা হত। তাতে কুরআন ও হাদীস গ্রন্থ সমূহ এক বরাবর হত। লেখকদের মর্যাদা অনুযায়ী গ্রন্থরাজী সাজানো হত। যদি তাতেও এক সমান হত তাহলে প্রাচীন গ্রন্থাবলী প্রথমে রাখা হত। আর এর সাথে সাথে এ বিষয়ও বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি রাখা হত, যেসব গ্রন্থ শিক্ষার্থী ও পাঠকদের বেশী প্রয়োজন হত, সেগুলো প্রথমে রাখা হত। যদি এ বিষয় এক সমান প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হত, তাহলে নির্ভরযোগ্যতা হিসেবে গ্রন্থসমূহ বিন্যাস করা হত।
এ বিন্যাসের ক্ষেত্রেও মুসলমানগণ উল্লেখযোগ্য স্বাক্ষর রেখেছে। বিষয় ভিত্তিক অনেক গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে। গন্থাগারেও এভাবে বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ সমূহ রাখা হত। এ ক্ষেত্রে আবু নছর আল ফারাবি (২৬০-৩৩৯ হিঃ) সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করে সর্বপ্রথম মুসলমানদের মধ্যে বিলি করেন। আল ফারাবি ঐ গ্রন্থে উল্লেখিত বিষয়কে পাঁচ পর্বে ভাগ করেন। তারপর এর ভূমিকায় বিভিন্ন বিষয়ের সংজ্ঞার উল্লেখ করেন। এরই ভিত্তিতে পরবর্তী সময় জ্ঞানীগণ এ ক্ষেত্রে বিশেষ উন্নতি সাধন করেন। এমনকি ঐ গ্রন্থের বিষয় বিন্যাস ও ইউরোপে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এ ক্ষেত্রে নিম্নে বর্ণিত জ্ঞানীগণ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন।
১. আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আহমাদ বিন ইউসুফ আল খাওয়ারেজমী (মৃত্যুঃ ৩৮৭ হিঃ / ৯১৭ খ্রিঃ) "মাফাতিহুল উলূম" গ্রন্থ রচনা করেন, তাতে ফারাবি থেকে বেশী বিষয়ের বর্ণনা করেন।
২. ইবনে সিনা রহ. (মৃত্যু- ৪২৮ হিঃ / ১০৩৭ খ্রিঃ) রচিত "আশ শিফা" এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। অনুরূপভাবে তিনি যুক্তি-বিদ্যা সংক্রান্ত একটি গ্রন্থও রচনা করেন।
৩. শামসুদ্দীন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম বিন সাদ আকফানী (মৃত্যুঃ ৭৪৯ হিঃ / ১৩৪৮ খ্রিঃ) পূর্ববর্তীদের কীর্তিতে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন এবং বিপুল সংখ্যক নতুন নতুন গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি তাঁর রচিত "ইরশাদুল কাসিদ এলা আসনিয়াল মাকাসিদ" নামক গ্রন্থে অনেক বিষেয়ের সমাহার ঘটিয়েছেন। উক্ত গ্রন্থ এ বিষয়ে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. ইবনে খালদুন (মৃত্যুঃ ৭৮৪ হিঃ / ১৩৮৬খ্রিঃ) তিনি তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ "মুকাদ্দিমা" গ্রন্থে বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের ব্যাপক আলোচনা করেন।
৫. এ ময়দানে সবচেয়ে সমাধিক উল্লেখযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হল, তাশকবারী জাদাহ রচিত "মিফতাহুস সাদাত ও মিছবাহুস সিয়াদাহ" (মৃত্যুঃ৭৬৮ হিঃ / ১৫৬০ খ্রিঃ)। তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, উক্ত গ্রন্থে লেখক বিভিন্ন জ্ঞানের খ্যাতনামা লেখকদের গ্রন্থাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন। উক্ত গ্রন্থের এক শতাব্দি পর হাজি খলীফা (মৃত্যুঃ ১০৬৮ হিঃ / ১৬৫৮ খ্রিঃ) "কাশফুল যুনুন আন আসামিয়িল কুতুব ওয়াল ফুনুন" গ্রন্থ রচনা করেন, কিন্তু তিনি বিষয় ভিত্তিক জ্ঞান সম্পর্কে সাধারণ কোন আলোচনা করেন নি। বরং তা মিফতাহুস সাদাতের মত দৃষ্টিগোচর হয়। তবে তিনি তাশকবারী জাদাহ থেকে অনেক বেশী গ্রন্থের উল্লেখ করেন।
৭. বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের আলোচনা প্রসঙ্গ নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁন সম্পর্কে আলোচনা করলেই নয়। (মৃত্যুঃ ১৩০৭ হিঃ / ১৮৯৮ খ্রিঃ) তিনি সংখ্যানুযায়ী জ্ঞানের কয়েকটি বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেন নি বরং তিনি পরবর্তী লেখকগণের বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানকে সীমিত করে দিয়েছেন।
নিম্নে উল্লেখিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে এমন অনেক গ্রন্থ রয়েছে, সে সব গ্রন্থে বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের সাথে তিনি ঐ সব গ্রন্থের নামও উল্লেখ করেছেন। এমন চিন্তাশীল বরেণ্য ব্যক্তিও অতিবাহিত হয়েছে। যারা শুধু বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের সংজ্ঞা সম্পর্কে আলোচনা করে গ্রন্থ রচনা করেছেন।
১। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রাযি. (মৃত্যুঃ ৬০৬ হিঃ / ১২১০ খ্রিঃ) তিনি "খাদায়িফুল আনোয়ার ফী হাকায়িকিল আসরার" নমক গ্রন্থে ব্যতিক্রম ৬০ টি জ্ঞানের সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন।
২। জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ বিন আসাদ আওয়ানী 'আননুমজখ' এর শিরনামে এ ময়দানে গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি বিষয় সমূহকে বৃহৎ দশ অধ্যায়ে বিভক্ত করেন।
৪। শাইখ লুতফুল্লাহ বিন হাসান আত্ তাওকাতি (মৃত্যুঃ ৯০৪ হিঃ / ১৪৯৮ খ্রিঃ) একটি গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থে তিনি একাধিক বিষয়ের বর্ণনা করেছেন। তারপর এসব বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। ঐ গ্রন্থের নাম "আল মাতালিবুল এলাহীয়া"। উক্ত গ্রন্থ রচনার সুবাদে ঐ স্বনামধন্য লেখক ওসমানী খলীফা দ্বিতীয় বায়েজিদের (৮৮৬-৯১৮ হিঃ) গ্রন্থাগারের সহকারী লেখক মনোনীত হন।
৫। অনুরূপভাবে তাঁর সমসাময়িক জালাল উদ্দীন সুয়ূতি (৪৯০ হিঃ / ৯১১ খ্রিঃ) এ সংক্রান্ত বিষয় "আনিকায়া ওয়া এতমামুত দারীয়া" রচনা করেন।
৬। মুহাম্মদ আমীন ইবনে সদরউদ্দীন আশ্ শারাওয়ানী "আল ফাওয়ায়িদুল খাকানিয়া" নামে বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করে ওসমানী খলীফা প্রথম আহমদের দরবারে পেশ করেন।
গ্রন্থাগারে বিষয় ভিত্তিক পৃথক কক্ষ নির্ধারিত ছিল। মুসলমানগণ গ্রন্থাগারে বিষয় ভিত্তিক ক্যাটালগ বা তালিকা প্রস্তুত করার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। সে পদ্ধতির তালিকা বর্তমানে পাওয়া যায় না। বরং প্রাথমিক অবস্থায় এ তালিকা রেজিস্ট্রারে উল্লেখ করা থাকত। প্রত্যেক বিষয়ের স্বতন্ত্র তালিকা থাকত। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নাম তালিকায় উল্লেখ করা হত। এ পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রার কয়েক ভাগে বিভক্ত হত।
১. একই বিষয়ের গ্রন্থাবলীর অসংখ্য হত না। সে গুলোকে নির্দিষ্ট বিষয়ের অধীনে খোঁজা সহজ হত। সে বিষয়েই ওখানে সংখ্যা বৃদ্ধি করা হত।
২. ঐ গ্রন্থাগারের পুরো গ্রন্থের সংখ্যা একই তালিকাভুক্ত পাওয়া যেত। পাঠকগণ গ্রন্থাগারের গ্রন্থের সংখ্যা সহজে জানতে পারত।
৩. এ তালিকা ব্যবহারের জন্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা সহজ হত। প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা সহজতর হত। গ্রন্থাগারের তালিকা পরিবর্তনযোগ্য ছিল। আববাসী খলীফা মামুনুর রশীদ জগদ্বিখ্যাত "বায়তুল হিকমা" গ্রন্থাগারের তালিকা তলব করে তা এক স্থানে সংশোধন করে দেন।
গ্রন্থাগারের তালিকায় গ্রন্থের নাম, বিষয়বস্তু ও লেখকদের নাম উল্লেখ করার রীতির চালু করা হয়। এক যুগ তো মজুদ গ্রন্থের সাথে বেশী সংগতিপূর্ণ করার উদ্দেশ্যে বিন্যস্ত বিষয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ গ্রন্থাবলী একত্রে রাখার মনোভাব বৃদ্ধিলাভ করে। সুতরাং মিশরের ফাতেমীদের প্রতিষ্ঠিতি গ্রন্থাগারে গ্রন্থের তালিকা এমনভাবে সাজানো হত, প্রত্যেক বিষয়ের কক্ষের দরজায় ঐ বিষয়ের নাম ও গ্রন্থের তালিকা লিপিবদ্ধ থাকত। বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ সাজানোর ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন। এক্ষেত্রে সেসব জ্ঞানীদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যারা বিষয়ভিত্তিক গ্রন্থ রচনা করে তৎসঙ্গে ঐ সব বিষয়ের গ্রন্থ সমূহের সংখ্যা নিরূপন করে দিতেন। কিন্তু এ সময় আমরা শুধু এ তালিকার প্রতি আলোকপাত করার ইচ্ছা করছি, যেগুলো শুধু গ্রন্থাগারের রক্ষিত গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাতে এ ধারাবাহিকতায় চেষ্টা করার প্রমাণ পাওয়া যায়।
১. পূর্বে উল্লখ করা হয়েছে যে, আব্বাসী খলীফা আল-মামুন রাজকীয় গ্রন্থাগারের তালিকা তলব করে তা পর্যালোচনা করে তাতে ত্রুটি দেখতে পান। তাছাড়াও ইবনে নাদীম তাঁর রচিত "আল ফিরিস্থিত" নামক গ্রন্থও আল-মামুনের গ্রন্থাগারের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।
২. ইবনে সীনা (৩০-৪২৮ হিঃ) তাঁর আত্মজীবনীতে নূহ বিন মনসূর সামানীর গ্রন্থাগারের উল্লেখ করেছেন। সেখানকার গ্রন্থ তালিকা সম্পর্কে বলেন, আমি এই প্রথমে লোকদের গ্রন্থে লিখিত সূচীপত্র দেখেছি। তা দেখে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ তলব করা হত।
৩. ঐতিহাসিক ইয়াকুব হামাবী আবুল হাসান বায়হাকীর জীবনীতে উল্লেখ করেছেন, আবুল হাসান রায় নগরীর গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন। তিনি তাঁর পরিদর্শন বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন, "রায় নগরীতে বিদ্যমান গ্রন্থাগারের ছবি এখনো আমার চোখের সামনে ভাসছে, যা সুলতান মাহামুদ সবতগীন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। আমি ঐ গ্রন্থাগারের তালিকা পাঠ করে দেখেছি। ঐ তালিকা দশ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। এ গ্রন্থাগার মূলতঃ সাহেব বিন আববাদের (৬২৬-৩৮৫ হিঃ) প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল।
৪. আলী বিন তাউস হাল্লী (৫৮৯-৬৬৪ হিঃ) তাঁর গ্রন্থাগারের তালিকা সাদুস শউদের" শিরোনামের আলোকে প্রস্তুত করেন। এর পূর্বে তিনি তাঁর গ্রন্থাগারের জন্য আরেকটি তালিকা তৈরি করেন। যার শিরোনাম ছিলো কিতাব আল্ বানিয়াহ ফী মারিফাতি আসমায়ি কুতুবুল জুজিয়া"। এ তালিকাটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রথমোক্ত তালিকা সম্পর্কে বলা হয়, বিষয়ভিত্তিক তালিকা প্রণয়নের দিক থেকে এটাই প্রথম। তাতে ইবনে তাউসের রচিত গ্রন্থাবলীর পুর্ণাঙ্গ বিবরণ উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকাটি দেখলে যে কেউ তার সম্পর্কে সুধারনা পোষণ করত।
মোটকথা গ্রন্থাগারের জন্য একাধিক তালিকা তৈরি করা হয়। আর তা রীতিমত ব্যবহার করা হত। স্পেনের শাসক দ্বিতীয় হাকামের গ্রন্থাগারের তালিকা স্থূলতার দিক থেকে অনেক বড় মনে করা হত। খ্যাতনামা জ্ঞানী ব্যক্তিগণ এ পদে অধিষ্ঠিত হত। নাসিরউদ্দীন তুশি (৫৯৭-৬৭২হিঃ) এর মত অভিজ্ঞ জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মারগাহের নভোথিয়েটার কেন্দ্রের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর উপর নভোথিয়েটার কেন্দ্রের গ্রন্থাগারের দায়িত্বও ন্যস্ত ছিল। তাঁর সান্নিধ্যে থেকে ইবনে আলফাত্ততী (৬৪২-৭২৩ হিঃ) বিভিন্ন বিষয় জ্ঞান অর্জন গ্রন্থাগার পরিচালনার জ্ঞান অর্জন করেন। তারপর তিনি দীর্ঘ দিন "আর মুনতাসিরিয়ায়" গ্রন্থাগার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ইবনুল ফাত্তত বিখ্যাত জ্ঞানী ছিলেন। তাছাড়া তিনি কতিপয় গ্রন্থও রচনা করেন। আমলাদের মধ্যে যেসব ব্যক্তি যেমন দারোগা, গ্রন্থাগারের পরিচালক, পান্থরেখা প্রস্তুত কারক, সম্পাদক, ঘোষক, অনুবাদক, লেখক, মর্যাদাবান ব্যক্তি ধর্মীয় বিষয়ক নকশা তৈরীতে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, বই প্রকাশক এবং বাঁধাইকারী প্রমূখ প্রত্যেকে স্ব-স্ব বিষয়ে পারদর্শি ছিল। ঐ সব বিষয়ে শ্রেণীবিন্যাস বাঁধাইকারী দোকান সমূহে যথারীতি সরবরাহ করা হত। তাঁরা প্রত্যেকে স্ব স্ব বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করে একে অপরের উপর প্রাধান্য লাভের চেষ্টা করতেন।
বিখ্যাত জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের উপর গ্রন্থাগার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত করা হত। খ্যাতনামা জ্ঞানী ইবনে মাসকুরিয়া (মৃত্যুঃ ৪২১ হিঃ) দীর্ঘ দিন আজদুদ্দৌলার গ্রন্থাগার পরিচালনার দ্বায়িত্ব পালন করেন। নাসিরুদ্দীন তুশি মারাগাহে আগমনের পূর্বে হাসান বিন সাবাহার "ওয়াকিয়াতুল কালায়া” নামক গ্রন্থাগার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। খতীব আত্ তাবরীজি শুধু নিয়ামীয়া মাদ্রাসার শিক্ষকতার দায়িত্বই পালন করেন নি বরং উক্ত মাদ্রাসার গ্রন্থাগার পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন। মাসউদ সাদ সালমান (মৃত্যুঃ৫১৯ হিঃ) পাকভারত উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ ফার্সি কবি ছিলে। তিনি তৎকালীন মাসউদ বিন ইবরাহীম গজনবীর গ্রন্থাগারের কোষাধ্যক্ষ মনোনীত হন। ঐ সব গ্রন্থাগারের মাধ্যমে মানুষ যেভাবে উপকৃত হয়েছে, তাতে গ্রন্থাগারের উপর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। মুসলমানদের জ্ঞান বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। উপরিউক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় প্রমাণ হয়েছে যে, গ্রন্থ রচনা প্রকাশনা ও একাধিক অভিধান গ্রন্থের বর্ণনার উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে এ বিষয়ের জন্য চার শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন জরুরী। এ ক্ষেত্রে মুসলমানগণ পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। রশীদুদ্দীন ফযলুল্লাহ হামদানী, বাবে রশিদী নামক স্থানে শিক্ষকতা ও গ্রন্থরচনার দায়িত্ব পালন করেছেন।
📄 নামাযের সময় ও জ্যোতির্বিজ্ঞান
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রচলিত রীতি ভবিষ্যত বর্ণনা ও ঋতু পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত ছিল। ইসলামে সর্বপ্রথম এর কার্যকরী স্বরূপ বাস্তবায়ন করে। আর নামাযের সময়সূচী রমাযান ও ঈদের চাঁদ ইত্যাদি ছাড়াও নামাযের কিবলা নির্ধারণের প্রয়োজন অনুভূত হয়। যা জ্যোর্তিবিজ্ঞান পূর্ণাঙ্গ ভূমিকা পালন করে। খ্রিস্টীয় ষোল শতক পর্যন্ত ইসলামী নভোথিয়েটার সমূহে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে গবেষণা চলতে থাকে। ধর্মীয় স্বার্থে এটি তৈরি করা হয়। কুরআন ও হাদীসে নামায ও রোযার সময় চাঁদের উদয় ও সূর্যের উদায়াচল ও অস্তাচলের উপর নির্ভরশীল। কুরআনে বর্ণিত আয়াত সমূহ ও হাদীস সমূহে যদিও নামাযের সময়ের স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাছাড়া বিভিন্ন দেশের মানুষ বিভিন্ন সময় নামায সমূহ আদায় করছে। এ নামায সমূহের সময়ের যে ঐতিহাসিক বিবরণ আমরা বুখারী শরীফ থেকে লাভ করেছি, তা নিম্নরূপ।
📄 যোহরের নামায : আছরের নামায
যোহরের নামাযঃ ঐ সময় পড়া হয় যখন সূর্য তার চূড়ান্ত উচ্চতা স্পর্শ করে অস্তাচলের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
আসরের নামাযঃ ঐ সময় পড়া হত, যখন সূর্যের আলো হযরত আয়েশা রাযি. এর হুজরাতে প্রবেশ করত। আর তখন ছায়া থাকত না。
📄 মাগরিবের নামায : এশার নামায : ফজরের নামায
মাগরিবের নামায : ঐ সময় পড়তে হত, যখন নিজের নিক্ষিপ্ত বর্ণা দৃষ্টিগোচর হত।
এশার নামাযঃ রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর পড়া হত।
ফযরের নামাযঃ হুযুর এর যুগে অতি ভোরে পড়া হত। যখন আপন চেহারা স্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হত না।
ইসলামী জ্যোতির্বিজ্ঞানে তখনই মাসায়ালাটি অত্যন্ত গুরুত্ব লাভ করেছে যাতে নামায সমূহের সঠিক সময় নির্ধারণ করা হোক। এ সব বিষয় দু'শতাব্দি পর খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্ধারণ করা হয়। যখন আব্বাসী যুগের সূচনা হয়, আর তা কমবেশী একহাজার বছর কার্যকর থাকে। বছরের সব দিনের নামাযের সময়ের প্রান্তরেখা প্রায় হিজরী তৃতীয় শতক খ্রিস্টীয় নবম শতকে নির্ধারণ করা হয়। আর খ্রিস্টীয় নবম শতকে তা সংশোধন করা হয়। খ্রিস্টীয় পনের শতকে ওসমানী রাজত্বকালে বিশেষ ব্যবস্থায় এর উন্নতি সাধন করা হয়। আর বিভিন্ন প্রকার মাধ্যমে স্পষ্ট প্রান্তরেখা তৈরী করা হয়। ইসলামে সঠিক পরিমাণ নামাযের (ফযর ও মাগরীবের) সময় নির্ধারণ করা ভীষণ জরুরী ছিল। আর জ্যোতির্বিজ্ঞান এ বিষয় সবচেয়ে বেশী গুরুত্বারোপ করেছে যে, যাতে সকালের আলো ফুটে উঠার ও সন্ধ্যায় আসমান লালিমা স্পষ্ট হয়ে উঠা জানতে পারে। মুসলমান জানেন লালিমা ফুটার সূচনা কখন শুরু হয়। যখন সূর্য দিগন্ত থেকে আঠা ডিগ্রী নিচে নেমে যায়। আর রাতও তখন শুরু হয়, যখন সূর্য অস্তমিত হয়ে আঠার ডিগ্রী নিচে নেমে যায়। কিন্তু এ পার্থক্য বিষুব রেখার উপর দৃষ্টিগোচর হয়। আর আমরা যে যে পরিমাণ দূরে থাকব, সময়ও তত বেশী হয়ে যাবে। যদিও প্রাচীনকালের বিশেষজ্ঞগণ এ বিষয়ে অবগত ছিল। কিন্তু তাঁরা এক মধ্যম সময় বের করে নিয়েছেন। তা হল ২০ ডিগ্রী থেকে ১৬ ডিগ্রী পর্যন্ত। এটা সকল প্রান্তরেখার মধ্যম সময়ের উপর নির্ভর করে তৈরী করা হয়েছে। হাবশুল হাবিস (৮৫০ হিঃ), আর আত্ তারবিজি (১০০৭ হিঃ) সম্ভবতঃ প্রথম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিল। তাঁরা সর্বপ্রথম ১৮ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেন। আল বাত্তানী এ সম্পর্কে কোন চিন্তা-ভাবনা করেননি। তবে আল বেরুনী (১২০৫ হিঃ) "আল-কানুনল মাসউদী" নামক গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা করে বলেছেন-
সকালে আমরা প্রথমে আসমানে এক হাল্কা আলোর রাস্তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করি। এটাকে সুবহি কাযিব বলা হয়। শহর পরিবর্তনের সাথে সাথে ঐ সুবহি কাযিবের সময়ের পরিমাণও কম বেশী হতে থাকে। এটাকে "আসির জান" বা ভেড়ার লেজ বলা হয়। কেননা এটা অনুরূপ আকৃতিতে দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর পূর্ব দিগন্তে সাদা আলোর রেখা ফুটতে শুরু করে। এটাকে সুবহি সাদিক বলা হয়। এ সময় সকালের নামাযের ওয়াক্ত হয়। এরপর পূর্ব দিগন্ত লাল হয়ে যায়। সন্ধ্যায় এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা হয়। আল-বেরুনী এর জন্য ১৮ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেছেন। তথাপি তিনি ১৭ ডিগ্রীর পার্থক্যের উল্লেখ করেছেন। ইবনুল হাইছাম ও ১৮ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেছেন। এর দু'শতাব্দী পর আল মারাকেশী সুবহি কাযিব থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়কে ২০ ডিগ্রীতে নির্ধারণ করেন। আর সূর্যাস্তের পর রাত শুরু হওয়া পর্যন্ত সময়ের পার্থক্য ১৬ ডিগ্রী উল্লেখ করেন। এর দু'শতাব্দী পর ইবনে শাতির যথারীতি ১৯ ও ১৭ ডিগ্রীর পার্থক্য ব্যবহার করেন। তাঁর সমসাময়িক আল-হালিলী ঐ সময়কে তার নিজস্ব প্রান্তরেখা ব্যবহার করে। ওসমানী খিলাফতকালে নামাযের সময় নির্ধারণে ইবনে শাতিরের প্রান্তরেখা ব্যবহার করা হত। বর্তমান যুগেও বলা হয় তখন থেকেই সুবহি কাযিবের সূচনা হয়, যখন পর্যন্ত সূর্য দিগন্ত রেখা থেকে ১৯ ডিগ্রী নিচে অবস্থান করে। আর রাতের সূচনা হয় যখন সূর্য দিগন্ত থেকে ১৭ ডিগ্রী নিচে চলে যায়। বিভিন্ন ধরনের জটিল ও কঠিন ফরমূলার সাথে মুসলমানগণ কিবলার স্পষ্ট প্রান্তরেখা নির্ধারণ করে নিয়েছে। তাতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা কাজে লাগানো হয়েছে। আর সর্বত্র স্থান ও এলাকা থেকে কিবলার সঠিক দিক নির্ণয় করা যেতে পারে এই শর্তে যে, প্রথমে ঐ স্থানের ব্যপ্তির দৈর্ঘ ও প্রস্থ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে। আর মুসলমান বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ এ বিষয় ভালোভাবে অবগত থাকার কারণে তাদের নির্ধারিত প্রন্থরেখা কমবেশী চূড়ান্তভাবে পৃথিবীর সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। তুরস্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় বিষয় কম্পিউটারের সাহায্যে প্রতিটি গ্রামে কিবলার সঠিক দিক নির্ণয় করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর জন্য সামান্য পরিমাণ কমবেশী করতে হয়েছে।