📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 সৌন্দর্য মণ্ডিত করন

📄 সৌন্দর্য মণ্ডিত করন


যেহেতু ইসলামের বুনিয়াদ ও মুসলমানদের মহব্বত ও আকীদার মূলভিত্তি হল কুরআন মজীদ। এ কারণে কুরআন মজীদ লিপিবদ্ধ করা মুসলমান সর্বদা উত্তম সাওয়াবের কাজ মনে করতেন। কুরআনের সম্মানের কারণে সর্বদা উন্নত লিখন পদ্ধতি ও যোতীচিহ্নের ব্যাপারে মুসলিম সমাজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কেননা উক্ত তিন পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে যে কোন গ্রন্থকে সুসজ্জিত করা যায়। এর উদ্ভব হয় হিজরী দ্বিতীয় শতক খ্রিষ্টিয় অষ্টম শতকে। প্রয়োজনের তাগিদে প্রথমে যোতীচিহ্নের উদ্ভাবন করা হয়। এর সাহায্যে আয়াতের সমাপ্তি নির্ধারণ করে এক আয়াত থেকে অপর আয়াতকে পৃথক করা হয়। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। কোন কোন সময় তিন বা অতিরিক্ত বিন্দু সাধারণতঃ সোনালী তৃতীয়াংশ আকৃতিতে বানিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অবস্থায় হস্তলিখন পদ্ধতি আরো বেশী সৌন্দর্য মণ্ডিত মনে হয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এ পদ্ধতি চালু হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন সূরাকে পরস্পরে পৃথক পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য লাল, নীল, সবুজ সোনালী রং এর রেখা টানা শুরু হয়। যা সাধারণতঃ পরস্পরে ভীষণ পেচানো হয়। কিন্তু কখনো তাতে ছোট ছোট অস্রাকারের মত বানিয়ে দেওয়া হত। ঐ সব রেখা সমূহের দ্বারা প্রত্যেক সূরার শুরুর পৃষ্ঠায় এক সূরার শুরু থেকে দ্বিতীয় সূরা পর্যন্ত টেনে দেওয়া হত।

প্রাথমিক অবস্থায় ঐ হস্তলিখন পদ্ধতি রেখা সমূহের মধ্যে সূরার নাম, আয়াত সংখ্যা, আর সূরা মক্কী না মাদানী কোন কিছুই উল্লেখ করা হত না। এটা দ্বারা কোন কোন সময় শুধু ছোট শূন্যস্থান পূরণ করা হত। হিজরী তৃতীয় শতক বা খ্রিস্টীয় নবম শতকে ঐ হস্তলিখন ধারার প্রস্ত মোটা করে দেওয়া হয়। ঐ রেখার সাথে বর্ণমালার সারি সমূহের সমান বরাবর লম্বা হত তাতে আরো এক নতুন পদ্ধতি সংযোজন করা হয়। সাধারণতঃ এ লিখন পদ্ধতি মাটির ঢেলা, ফুল পাতার এক জটিল দৃশ্য পরিলক্ষিত হত। যাতে সূরার লাইন সমূহ বের হয়ে পাদটীকা পর্যন্ত পৌঁছে যেত। পাদটীকার সজ্জা এ পদ্ধতি কুরআন মজীদে ব্যবহৃত সব পদ্ধতি থেকে বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য বলে স্বীকৃত হয়। পাদটীকার অতিরিক্ত অলংকরণে ফুলের নক্সা ও চৌকাঠ যুক্ত এক সজ্জা ধারন করে। এর মাধ্যমে কুরআন মজীদের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরা হয়। আর আয়াতের নিদর্শন, সিজদার আয়াতও এ পদ্ধতির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। তখন রং আরো বেশী সোনালী হয়ে যায়।

হিজরী চতুর্থ শতক বা খিস্টীয় নবম শতকের শেষ ভাগে বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন মজীদ সুন্দর ডিজাইনে প্রকাশ শুরু হয়। বরং অধিকাংশ কিতাব বা তার অংশের সূচনা ও সমাপ্তিতে দুই পৃষ্ঠা রঙ্গীন করা হয়। অথচ অপর পৃষ্ঠায় দেখা যেত, ছোট দীর্ঘ আকৃতি ধারন করে। তাতে বিশেষ দীর্ঘ ও ক্ষুদ্র কাল্পনিক নকশা অংকন করা হতো। আর তাতে সাধারণতঃ কোন না কোন প্রকার জটিল পদ্ধতিতে লেখা হতো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়নার আকৃতির নকশা অংকন করা হতো। যা গোলাকৃতির হতো। খ্রিষ্টীয় দশম শতকে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ বিশেষ বিষয় ভিত্তিক পদ্ধতির সূচনা হতে শুরু হয়। ফলে বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থাবলী চমৎকার প্রকাশ হতে শুরু করে। ইয়ান এর বিরাট কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে এ ব্যাপারে খোরাসান বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। ঐ সময় প্রায় সব পদ্ধতি সোনালী রংয়ের হতে শুরু করে। সময়ের প্রয়োজনে নকসা নমুনা ডিজাইনের ডাসা কালো রংয়ের তৈরি করা শুরু হয়। সুতরাং দৃশ্যের এক অংশ কালো রং দ্বারা চিহ্নিত করে দেওয়া হত। সোনালী রং পরিবর্তন করে অন্য রংয়ে রূপান্তর করা হয়। ঐ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে কাগজের শুভ্রতা উজ্জ্বলতর হত।

লৌহ শলাকা এর উল্লেখযোগ্য ডিজাইনের উন্নতির সূচনা এ ভাবে শুরু হয়। সোনালী পাতের উপর পারস্পরিক জটিল বৃত্তাকৃতির এক সাজ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু একাদশ শতকের সূচনা লগ্নে এর স্থলে পুরো পৃষ্ঠা থেকে জটিল নকশা বিলুপ্ত করা শুরু হয়, তাতে ছোট ছোট জটিল নীল রংয়ের নক্ষত্রের আকৃতির সাজ শুরু হয়। আর ঐ নকশা দ্বারা পাদটীকার চার পাশ আবৃতি করে দেওয়া হয়। আর ঐ নক্ষত্রাকৃতির মধ্যে পৃষ্ঠার কোনের অলংকরনে আল্লাহ্, মুহাম্মদ অন্যান্য সংক্ষিপ্ত বাক্য তাসবীহ, তাহলীল নীল পাতে সোনালী বর্ণে লেখা হত। স্থান মোটা করার উদ্দেশ্যে সাধারণ গৃহীত পদ্ধতি ছিল, ঝুকে থাকা শাখা সমূহে আরবীয় নকসা অনুযায়ী ফুল পাতা প্রভৃতি বানিয়ে দেওয়া হত। এই নতুন পদ্ধতি হিজরী চতুর্থ শতক বা খ্রিস্টীয় দশম শতকের মধ্যবর্তী সময় শুরু হয়। আসল বর্ণনায় মধ্যবর্তী সারী সাজানোর উদ্দেশ্যে এইরূপ করা হয়। ঐ আসল বর্ণনায় ফুল ও মরিচের আকৃতিতে ডিজাইন করে কালো ও লাল রঙের সংমিশ্রণে বানানো হত। কিন্তু তা হালকা হয়ে যেত। এর দ্বারা মূল ভাষ্যের চার পাশ এমনভাবে সাজানো হত যে, তাতে সাদা রংয়ের এক ক্ষুদ্র স্থান খালি হত। যা এর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য ও মূল ভাষ্যের মাঝে পর্দার কাজ করত। এই ডিজাইন একাদশ ও দ্বাদশ শতকে উল্লেখ যোগ্য আকার ধারন করে। হিজরী পঞ্চ ও ষষ্ঠ শতক বা একাদশ ও দ্বাদশ খ্রিস্টাব্দে অমযহাবী বর্ণলিপি অতি সুন্দর রূপে সাজানো হয়। তা অতি উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে লেখা হয়। পাদটীকা লিখন পদ্ধতিতে স্বর্ণালী আরবী নকশাবলী ব্যবহার করা হয়।

ত্রয়োদশ শতকে পুরো ইসলামী বিশ্বে সোনালী প্রলেপ দেওয়ার ব্যাপক হয়। ইরানের নও মুসলিম ইলখানি বংশের সুলতান আল জাসুই খোদাবন্দাহ বড় বড় সাইজের কুরআন মজীদ লেখার আদেশ দেন। ঐ গুলির প্রতিটি ত্রিশ ত্রিশ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। শুরুতে প্রথম পৃষ্ঠা সুন্দর নকশা করা হত, তাতে বড় আকৃতির বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন অংকন করা হত, আর তা আরবী নকশা অতি কঠিন পদ্ধতিতে আঁকা হত। এগুলোর মাঝে কখনো কখনো সংক্ষেপে পবিত্র বাক্য সমূহের এক তৃতীয়াঅংশ লিপিবদ্ধ করা হত, ডিজাইনে কোন কেন্দ্রীয় পদ্ধতিতে অংকন করা হত, অথবা পাড়ের উপর ফুল পাতা বুনন করা হত। আর ঐ ডিজাইনের চার পাশে এমন পাদটীকা লেখা হত, তার অলংকরণের সীমা পৃষ্ঠার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এক সমান হত। আর পাদটীকা থেকে বের হওয়া রেখা সূর্যের আকৃতিতে বানানো হত। তাতে সোনালী রং ছাড়াও অন্যান্য রং ব্যবহার করা হত, ঐ যুগে লোহা ফলক বইতে সংযোজন করা হয়। সম্ভবতঃ তা বৃত্তাকার বা দীর্ঘ পাড়ের নকসা খোদাই করা হত, যা কিতাবের প্রথম পৃষ্ঠার ডান দিকে বানানো হত। তাতে নাম ও উপাদী লিপিবদ্ধ করা হত। যার সাহায্যে গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং সুবিন্যাস্ত করা হয়েছে। মামলুক সুলতানদের আদেশে কুরআনের কপি সমূহে সাধারণভাবে নক্ষত্রের ডিজাইন চালু করা হয়। তাতে চীনের শিল্পকর্মের আকৃতি ফুলের মত ছবি আঁকা হত।

হিজরী নবম শতক বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে গাঢ় নীল রঙের উপর সোনালী রংয়ের ফুল অংকনের সূচনা হয়। তা সম্পূর্ণ ডিজাইনের চার পাশ সোনালী রংয়ে সাজানো হত। তৈমুরী যুগে ইরানী পদ্ধতি সম্পূর্ণ রূপে পরিবর্তন করা হয়। ঐ যুগে লেখার ধরণ ছোট আকৃতির হতে শুরু করে। কিন্তু তা অতি পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন হত। আরবী ক্যালিওগ্রাফির নকশায় ভারতীয় আকৃতির সূচনা হয়। যেসব আরবণীতে এ সব ডিজাইন অংকন করা হত, সে সব ডিজাইন পাতে সজ্জিত করা হত। ঐ যুগে অংকিত বর্ণের ব্যাপক প্রচলন হয়। আরন কিতাব প্রণয়নের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। আর এর প্রতিক্রিয়া প্রলেপের উপরও প্রতিফলিত হয়। তার কেন্দ্রের মধ্যে কিতাব ও লেখকের নাম লিপিবদ্ধ করা হত। আর এর চার পাশে ডিজাইন বানানো হত জীব জন্তু, ফুল ও আরবী নকশা নমুনার সংমিশ্রণ থাকত, বিধর্মী লেখার পাদটীকায় মানুষ জীবজন্তু ও ফুলের সুন্দর সুন্দর ছবি অংকন করা হত। ঐ গুলোর সাথে মূল বর্ণনার সম্পৃক্ত হত না। তা শুধু সাজগোজের কাজে ব্যবহৃত হত।

হিজরী নবম শতক বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগে এ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন প্রত্যেক বস্তুতে গোলাকার বৃত্ত অংকন বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়াও স্বাভাবিক ফুলদানীর শাখা-প্রশাখা তখন অনির্ধারিত ভাবে ডিজাইনের মাঝে দৃষ্টিগোচর হত। মাটির পাত সাদৃশ্য আকৃতি বেশীর ভাগ ডিজাইনে ব্যবহার করা হত। হিজরী দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষোড়শ দশকের শেষ ভগ থেকে এ মনোভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করে যে, পৃষ্ঠার দৈর্ঘের অংশে যেখান থেকে মূল বর্ণনা শুরু হত, তা খুব মোটা ও চওড়া আবরণী যুক্ত হত। ঐ যুগে আরো এক নতুনত্বের সূচনা হয় অর্থাৎ পৃষ্ঠার তিন দিকে রেখা টেনে দেওয়া হত। তা দৃশ্যতঃ স্বভাবিক আরবী নকশার আকৃতি ও ফুলের পাড়ের মত দেখা যেত। তা কখনো সোনালী বা রুপালী রং দিয়ে তৈরি করা হত। তাতে কিতাব বেশ সুন্দর দেখা যেত। তুর্কীদের বাঁধাই পদ্ধতি সম্পূর্ণ ইরানী ধারায় ছিল। কিন্তু তারা রেখা বন্ধনীতে কোন চিত্রাংকন করত না। যাতে দৃশ্যতঃ স্বাভাবিক আকৃতি পরিলক্ষিত হত। মোগল আমলেও ইরানী পদ্ধতির বাঁধাইয়ের প্রচলন ছিল।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 বাঁধাই পদ্ধতি

📄 বাঁধাই পদ্ধতি


কিতাব লিখন, বাঁধাই ও অলংকরনে চামড়ার ব্যবহার খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কেননা তাতে কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব চামড়ার উপর ন্যস্ত হয়। সাধারণতঃ মুসলমান কুরআন মজীদ বাঁধাইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার দাবি শুধু কিতাব সুন্দর হবে। বরং তার বাঁধাই পদ্ধতিও সুন্দর ও মনোরম হতে হবে। প্রথম অবস্থায় কাঠের আবরণী দ্বারা বাঁধাই করা হত। এতদিন পর্যন্ত বাগ্মীতা ব্যবহারের সূচনা হয়নি। এর স্থলে হালকা চামড়ার আবরণী সামনে বাড়িয়ে তিন দিকের অংশ দাঁড় করিয়ে সিরিশ দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হত। চতুর্দিকে পুস্তানী লাগানো হত, এ অবস্থায় বাঁধাইয়ের পর সিন্দুকের আকৃতিতে দেখা যেত। ফলে খাড়া তিন দিক সমকোন লম্বা আকৃতিতে দেখা যেত। চামড়া ব্যবহারের পদ্ধতি স্বাভাবিক ভাবে এ ধরনের করা হত যে, তাতে বাহ্যিক রেখা ও আভ্যন্তরীন পাত এক বাটনের উপর রাখা হত। তাতে রেখার উপর সাদা সিধা অলংকরণ করা হত।

কিন্তু পাতের আভ্যন্তরীণ দিকে ক্রমান্বয়ে দুই তিন চরণ মোটা করে লেখা হত। লেখার পদ্ধতিও মোটা হত। সকল প্রকার অলংকরণ ও সাজসজ্জা একই ধাঁচে করা হত। কিন্তু তা স্বর্ণালী রং ছাড়াই করা হত। তার রীতি নীতি ও জ্যামিতিক নকশা নমুনা মিশরীয় কিবতী জ্যামিতির নকশা অংকন করা হত। কিন্তু ঐ দুধরনের বাঁধাই পদ্ধতির মাঝে পার্থক্য ছিল। বিশেষ করে ডিজাইনের গঠন প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য করা হত। মোটকথা, সিন্দুকের মত বাঁধাই এক দীর্ঘাকৃতির পরিলক্ষিত হত। মুসলমানগণ বাঁধাই শিল্পে প্রভূত উন্নতি সাধন করে।

হিজরী পঞ্চম শতক বা খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে জিলদ সমূহের নকশা অতি বেশী পেছানো হয়ে যায়। যদি তা প্রাথমিক অবস্থায় প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সংমিশ্রণে করা হয়। কিন্তু তাতে চামড়া পৃথক রাখা হয়। আর তা সাদাসিধে অলংকরণ মুক্ত হত। উক্ত শতকে গোলাকৃতির বাঁধাইয়ের সূচনা হয়। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে এ খণ্ড কিতাবের বুনিয়াদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শুধু তিউনিসিয়া, আল-জাজায়ের ও মরক্কো এ ধরনের বাঁধাই পদ্ধতির ব্যতিক্রম ছিল। এ সব অঞ্চলে কাঠের পাতের স্থান কাগজ দখল করে নেয়। মিশরে এর স্থলে হিমায়িত রদ্দি ব্যবহার করা শুরু করা হয় উন্নতির প্রথম স্তরে একটি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। যা নিচের দাবানো অংশের সাথে মিলিত হত, যা মিশরে আল মুয়ায়িদ শাসনের শেষ দিকে আল মারিনী বংশের রাজত্বের প্রথম দিকে জিলদের বৃত্তের সর্বদিকে তারকার নকশা বাড়তে বাড়তে পুরোপুরি ভারতীয় নকশার আকৃতি ধারন করে। বর্তমানেও এ ডিজাইন মিশর, তিউনেসিয়া, আল-জাজায়ের ও মরক্কোতে প্রচলিত আছে। যাতে চামড়ার কতিপয় নকশা অংকন করে দেওয়া হত। বিষয় হিসেবে বাঁধাই পদ্ধতি প্রভূত উন্নতি সাধন করে। এ পদ্ধতি ঐ সময় ও পরবর্তীতে পূর্বাঞ্চল বাঁধাই শিল্পের অংশে পরিণত হয়ে যায়।

মামলুক শাসনামলে অর্থাৎ হিজরী সপ্তম শতক থেকে নবম শতক বা খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক থেকে পঞ্চদশ শতকে মিশরীয় বাঁধাই পদ্ধতি তিউনিসিয়া আল জাজায়ের ও মরক্কোর বাঁধাই শিল্পে বিপুল উন্নতি লাভ করে। ঐ সময় বাঁধাই শিল্পের অত্যাধুনিক কারখানা স্থাপিত হয়। আর তা প্রায় পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তার লাভ করে। আর পুরো গেলাফ ভরতীয় নকশা দখল করে নেয়। আর প্রক্রিয়া জাত করার মাধ্যমে চামড়ায় স্বর্ণালী রং করা হয়। আর কোন জিলদে তুলির সাহায্যে গোলাপ ফুলের ছবি আঁকা হত। এভাবে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। কোন কোন জিলদে প্রতীক চিহ্নের আকৃতি বানানো হত। তা হাল্কা চামড়ার কাটা অংশ দিয়ে তৈরি করা হত। ঐ খণ্ড সমূহের রং গাঢ় করা হত। জিলদের আভ্যন্তরীণ ভাগ সাধারণতঃ আরবী পদ্ধতির নকশা সমূনা করা হত। তাতে কোন কোন সময় মোমের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়। তৈমুরী শাসনামলে অধিকাংশ ইরানী জিলদ স্বকীয়তা লাভ করে। ঐ যুগের জিলদ সম্পর্কে বলা হয় যে, এ ছিল সর্বোত্তম বাঁধাই পদ্ধতি। সে যুগে বাঁধাই শিল্পের জন্য হীরাত প্রসিদ্ধ ছিল। তথাপি ইস্পাহান, সিরাজ ও ইয়াজদেও উন্নত মানের বাঁধাইয়ের কাজ হত। বিশেষ করে হীরাতে কাটিংয়ের কাজ বেশ উন্নতি লাভ করে। সেখানকার পাস্তুরিত চামড়া বাঁধাই শিল্পের জন্য অতি উত্তম হত। জিলদের বাইরের অংশে তুলির সাহায্যে বৈচিত্র আনা হত। ভেতরের অংশে নীল রংয়ের সুন্দর সুন্দর কারুকাজ করা হত। সাফুভী যুগে বিশেষ করে হিজরী দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষোড়ষ ও সপ্তদশ শতকে তৈমুরী যুগের বাঁধাইকে বহাল রাখা হয়। কিন্তু তা অনেকাংশে আধুনিকায়ন করা হয়। ঐ সময় থেকে মেশিনের সাহায্যে কাজ করার সূচনা হয়। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে তুলনামূলকভাবে স্বর্ণালী রংয়ের ব্যাপক প্রচলন হয়। কোন জিলদের পুরো পৃষ্ঠা রঙ্গীন করা হত। কোন কোন জিলদের নকশা প্রতীক চিহ্ন বা চতুষ্কোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হত। কোন কোন জিলদ সমূহের বাইরের দিকে আরবী ক্যালিউগ্রাফির আকারে ডিজাইন করা হত। আর এর সাথে সাথে হালকা ফুল পাতা এবং চীনা পদ্ধতির বারিধারার চিত্র অংকন করা হত। ভেতরের অংশের চামড়ায় ফুলের চিত্রাঙ্কন করা হত। যার পাড় নীল গোলাপী ও সবুজ রংয়ের হত। কোন কোন জিলদের পুরো নকশা রং তুলির সাহায্যে অংকন করা হত। আর এর পাড়ে হিংস্রজীব-জন্তুর ছবি অংকন করা হত। শাহ তাহমাসপের রাজত্বকালে প্রথম নকশা করা হত তারপর এর উপর এক হাজার রং দেওয়া হত। প্রথমে জিলদে চামড়া ব্যবহার করা হত, তারপর চামড়ার পরিবর্তে তাতে কাগজের বোর্ড ব্যবহার করা শুরু হয়। প্রথমে এর উপর পাতলা আবরণী ব্যবহার করা হত। তারপর এর উপর হালকা এক হাজার আকৃতি জড়ানো হত। তারপর এর উপর আকাশী রংয়ের ছবি অংকন করা হত, আর তা হেফাযত করার উদ্দেশ্যে এর উপর এক হাজার আকৃতির কয়েক স্তর লাগিয়ে দেওয়া হত। ঐ সময় আয়নার মত ঝলমল করার এক প্রকার ধাতুর প্রচলন ছিল। হিজরী একাদশ ও দ্বাদশ শতক বা খ্রিস্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতকে ডিজাইনে আরো অনেক উন্নতি আসে। তাতে তুর্কী ও মোগল শিল্পের নমুনা পরিলক্ষিত হতে শুরু করে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ডাই-য়িং হাউজের গবেষণার বিবরণ

📄 ডাই-য়িং হাউজের গবেষণার বিবরণ


ইসলামী শিল্পকারখানায় চামড়ার ব্যাপক ব্যবহার হয়। তাতে দু'টি বিষয় সংযোজিত হয়। এক চামড়া কাটা দুই চামড়ার উপর রং করার বিষয়ে কোন জাতি মুসমানদের উপর খ্যাতি লাভ করতে সক্ষম হয়নি। মামলুক ও তাবরীজ শাসনামলে চামড়া শিল্পে বৈপ্লবিক উন্নতি সাধিত হয়। আজ পর্যন্ত কোন মানুষ তাতে উন্নতি সাধন করতে সক্ষম হয়নি। মুসলমানদের চামড়া শিল্পের উন্নতি লাভের প্রভাব ইউরোপেও প্রতিফলিত হয়। এ সম্পর্কে এ.এইচ. পারসিটির অভিমত হল, মুসলমান শুধু কাগজ শিল্পে নয়, এর জন্য সমসাময়িক যুগের শাসকগন মুসলমানদের নিকট চির স্মরণীয় হয়ে আছে। হিজরী অষ্টম শতক বা খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে যখন অনিস আটে মুসলমানগণ বিভিন্ন পেশা অতি উৎসাহের সাথে শিখে, তা বিদেশে রপ্তানী করা শুরু করে। ইতালীতে প্রণীত কিতাব সমূহের জিলদ সম্পূর্ণরূপে প্রাচ্য দেশীয় রীতিনীতি গ্রহণ করে। তা স্বাবাবিকভাবে মুসলমানদের প্রণীত কিতাব সমূহে বিদ্যমান পাওয়া যেত, এটা হলো ভাষা বা জিহ্বা। এক অনন্য আবিষ্কার। যা মুসলমানদের কাজে প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করেছে আর চামড়ার জিলদ সমূহকে সম্পূর্ণ রূপে সাজাতে শুরু করে।

মধ্যযুগে ইউরোপীয় অধিকাংশ চামড়ার জিলদ সমূহের উপর ধাতব পাতের ছাপ দিয়ে সুসজ্জিত করা হত। তাতে রং-তুলির সাহায্যে যে সকল নকশা করা হত, তার উপর কাজ হত। এমন কি প্রাচ্য দেশীয় শিল্পিগণ প্রোথিত অংশ সমূহে স্বর্ণালী তৈল ব্যবহার করতে শুরু করে। এই পদ্ধতি অনিসে বসবাসকারী মুসলমানদের জিলদ বাঁধাই ইউরোপকে আলোকিত করে দেয়। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে এ পদ্ধতির স্থান অন্য এক পদ্ধতি দখল করে নেয়। তাতে স্বর্ণালী পাত ব্যবহার করে তাতো তাপ দিয়ে বিভিন্ন উপকরণ দ্বারা পুনরায় ছাপ দেওয়া হত, প্রোথিত অংশে স্বর্ণালী রং মোটা করে লাগিয়ে দেওয়া হত। এটা দেখতে এমন হতো যে, এ নতুন পদ্ধতি প্রথমে কর্ডোভাতে উদ্ভাবিত হয়।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 গ্রন্থ ও গ্রন্থ প্রনয়নের আস্বাদন

📄 গ্রন্থ ও গ্রন্থ প্রনয়নের আস্বাদন


ইসলাম কিতাব রচনার পূর্বে আরববাসীগণ কিতাব বলতে কি বুঝত? কিতাব শব্দটি কুরআন মজীদে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এর বেশীর ভাগ ব্যবহারে কুরআন মজীদকে বুঝানো হয়েছে। প্রাচীন আরববাসীগণ প্রচলিত ভাষায় 'কিতাব' অর্থে শুধু লেখা বুঝত। কিতাব শব্দকে আসল কিতাবের অর্থে প্রাচীন কবিগণ তাঁদের কবিতায় উল্লেখ করেছে। ইসলামে সর্বপ্রথম কিতাব আকারে যা সুবিন্যস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত আল্লাহর কিতাব আল-কুরআন। এরপর কাসিদা ও আল হাদীসের গ্রন্থ সমূহ প্রণীত হয়। সুতরাং প্রাচ্য বিশেষজ্ঞ কারনিকোর অভিমত হল,
"আমি স্বীকার করছি যে, সর্বপ্রথম কুরআন মজীদ প্রন্থাকারে সংকলতি হয়। এর কিছুদিন পর কাসিদার গ্রন্থাবলী প্রণীত হয়। এর পূর্বে অন্যান্য গ্রন্থাবলী কাগজ বা চামড়ায় লিপিবদ্ধ করা হত। তবে একথা সঠিক যে, আরববা কোন ধরনের কিতাব সর্বপ্রথম প্রনয়ন করেছে।"

সর্বসাধারনের ধারনা হল, হিজরী দ্বিতীয় শতকে হযরত সাঈদ বিন আবী আরুবা রাযি. (১৫২হিঃ) হযরত আনাস বিন মালিক রাযি. হাদীস গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তন্মধ্যে সবশেষে উল্লেখিত মোয়াত্তা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান আছে। বাকী গ্রন্থ সমূহের নাম পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এ অভিমত সঠিক নয়। কেননা গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশনার সূচনা হয় হিজরী প্রথম শতকে। অনুরূপভাবে এ অভিমত ও সঠিক নয় যে, সর্বপ্রথম হাদীস গ্রন্থের প্রণেত হযরত ইমাম ইবনে শিহাব জহুরী রহ. বরং তাঁর অনেক পূর্বে হযরত আলী রাযি. 'কিতাবুল কুজাআ' ও হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. এর হাদীস সমূহ গ্রন্থাকারে প্রণয়ন করা হয়। কোন কোন সাহাবী হুযুর এর যুগে হাদীস সমূহ লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন। সুতরাং হযরত আমর বিন আস রাযি. হুযুর থেকে যে হাদীস শুনতে তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, হুযুর এর সাহাবাগণের মধ্যে আমার চেয়ে বেশী হাদীস কারো নিকট জমা নেই। একমাত্র হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. ব্যতীত কেননা তিনি সব হাদীস লিপিবদ্ধ করে রাখতেন, তাঁর লিখিত হাদীসের সংখ্যা এক হাজার। তিনি তা আস-সাদিকা নামে অভিহিত করেন। এ ছাড়াও তিনি অন্যান্য সহাবায়ে কিরাম রাযি. থেকে ও হাদীস সংগ্রহ করেছেন। সুতরাং হযরত সাদ বিন উবাইদা, ইবনে আবি আত্তফা, ও হোমাম ইবনে মোনাবাহ রাযি. প্রমুখের সংকলিত হাদীস সমূহ হাদীস গ্রন্থাবলীতে বর্ণিত আছে। ৬০ হিজরীতে তাফসীর তাজবীদ, ও সীরাত গ্রন্থাবলী রচিত হয়। সুতরাং ইবনে নাদিম জায়িদ বিন কোদামাহ ৬০০ হিজরীতে রচিত গ্রন্থ সমূহে কিতাবুস সুনান, কিতাবুল কিরাত, কিতাবুত তাফসীর কিতাবুল যুহুদ, ও কিতাবুল মানাকিবের উল্লেখ করেছেন। অনুরূপভাবে হিজরী প্রথম শতকের শেষ ভাগের পূর্বে সম্মানিত খ্যাতনামা কবি লবীদের দাস্তান সমূহ লিখিত আকারে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থ প্রণয়ন যথা "আখবার" ও "আসার" লেখার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তা এর পূর্বে শুরু হয় বরং একদিক থেকে দেখলে প্রমাণ হয় যে, ইসলামের পূর্বেও যেসব অভিজাত শহর যেমন ইয়ামান, হীরাত ও হিজাজ অঞ্চলের কোন কোন শহরে এর প্রচলন দেখা যায়।

হিমাইরীয়গণ তাদের ইতিহাস ও ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করেছে। আর তা পাথরে খোদাই করে রাখা হত। যেমন প্রাচীন নিদর্শনাবলী থেকে এটা প্রকাশ পেয়েছে। অনুরূপভাবে হুযুর সুয়াইদ ইবনে সামাতের নিকট হযরত লোকমান আ. এর লিখিত গ্রন্থ বিদ্যমান দেখেছেন। যা "হুকমে লোকমান" নামেও খ্যাত ছিল। এই দিক থেকে দেখা যায়, গ্রন্থ প্রকাশনা অনেক আগেই শুরু হয়েছে। এটাকে গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশনার প্রথম পদক্ষেপ বলা হয়। ঐ যুগে হাদীসগ্রন্থ প্রণয়নের সাথে সাথে সীরাত গ্রন্থাবলী রচনা শুরু হয়। সর্বপ্রথম মদীনার প্রসিদ্ধ ফকীহ ও মুহাদ্দিস হযরত উরওয়া ইবনে যুবাইর রাযি. মৃত্যু (৩৪হিঃ) সীরাতগ্রন্থ রচনা করেন। অনুরূপভাবে আবান ইবনে আফফান রাযি. (মৃত্যু-১০৫খ্রিঃ) এর শীষ্য হযরত আব্দুর রহমান ইবনে মুগীরা রাযি. (মৃত্যু-১২৫খ্রিঃ) তিনি এক সীরাতগ্রন্থ রচনা করেন। তারপর হযরত ওহাব ইবনে মুনাববাহ রাযি. (১১০-৩৪হিঃ) হযরত ইবনে শিহাব যুহরী রাযি. (১২৪-৫১হিঃ), আর হযরত ওব্বা ইবনে মূসা রাযি. (মৃত্যুঃ৪১হিঃ) "মাগাযী" অর্থাৎ- হুযুর যুদ্ধ সমূহের ঐতিহাসিক অবস্থা লিপিবদ্ধ করেন। তন্মধ্যে সর্বশেষে উল্লেখিত গ্রন্থের এক খণ্ড-১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ঐ যুগে (প্রথম শতকে) উবাইদা ইবনে শারীয়াহ যুরহামী তিনি হযরত মুয়াবিয়া রাযি. এর সমবয়সী ছিলেন। তিনি হুযুর এর যুগ পেয়েছেন। হযরত মুয়াবিয়া রাযি. এর আহবানে ইয়ামানের সানা থেকে আগমন করেন এবং আরব-অনারবের প্রাচীন রাজা-বাদশাহগণের অবস্থা ভাষার পরিবর্তন ও বিভিন্ন অঞ্চলে অধিবাসীদের সম্পর্কে হযরত মুয়াবিয়া রাযি. তাকে জিজ্ঞেস করেন। এর প্রতি উত্তরে উবাইদা যে জবাব দেন, তা লিপিবদ্ধ করা হয়। তার রচনা থেকে "কিতাবুল আমছাল" ওয়া আখবারিল মাজিয়ীয়া" নামে অভিহিত হয়। হযরত মুয়াবিয়া রাযি. এর যুগে সাহারাল আবদী নামে এক খারিজি ছিল। তিনি খ্যাতনামা বক্তা ও বংশধারা জ্ঞাত ছিল। তার থেকে হুযুর এর দু'তিনটি হাদীস বর্ণিত আছে। তার রচিত গ্রন্থ "কিতাবুল আমছাল"।

প্রথম যুগে প্রণীত ও প্রকাশিত কিতাবের প্রমাণ স্বরূপ বলা যায়, ইবনে নাদীম নতুন বাগদাদে মুহাম্মদ বিন হুসাইন বনাম ইবনে আবী বাআরাহের প্রসিদ্ধ অদ্বিতীয় গ্রন্থাগারে নাহু ও প্রাচীন আরবী সাহিত্যের কিতাব বিদ্যমান দেখেছেন। তাতে এক সিন্দুক ছিল। উক্ত সিন্দুকে প্রায় তিনশ রতল ওজনের কিতাব, ছাপার কাগজপত্র ও চামড়ায় লিখিত পৃষ্ঠা ছিল। তন্মধ্যে আরবদের শোকগাঁথার একক কবিতা ও বহু ঘটনাবলী ইতিহাস, নাম, বংশ ইত্যাদি সম্পর্কিত আরবদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ ছিল। তার প্রতি পৃষ্ঠায় ওলামাদের চিঠির ঘটনাবলী লিখিত ছিল। হযরত আলী রাযি. এর ছাত্র হযরত খালিদ বিন বাবী আল হ্যায়জ রাযি. এর হাতে লেখা এক কপি কুরআন মজীদ পাওয়া যায়। উক্ত কুরআন মজীদে হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন রাযি. এর হাতের লেখাও পাওয়া যায়। হযরত আলী রাযি. ছাড়াও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম রাযি. এর লিখিত পত্রাবলীতে আমানত ও প্রতিশ্রুতির দলীল দস্তাবেজ সংরক্ষিত ছিল। তাছাড়াও ওলামাদের লিখিত নাহু, অভিধান লিখিতাকারে পাওয়া যায়। যেমন, আবু আমর বিন আল-আলা, আবু আমর আশ-শায়বানী রাযি. প্রমুখ। তাদের মধ্যে ইবনে নাদিমের মতে, নাহু শাস্ত্রের জনক হলেন আবুল আসওয়াদ দুয়ালী রহ. বলে প্রমাণিত আছে। কেননা তা চীনের তৈরী চতুষ্কোন কাগজে লিপিবদ্ধ করা হয় ৬৯ হিজরীতে, তাতে কর্তা ও কর্মের উল্লেখ পাওয়া যায়

আবুল আসওয়াদ রহ. মুহাম্মদ ইয়াহিয়া বিন আমর আবুল আসওয়াদ, ওফাত লাভ করেন। এর দ্বারা স্পষ্টভাবে গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশের সূচনা হয়। এর পরে ইসলাম যতই পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করতে থাকে এবং বিভিন্ন অভিজাত জাতি সমূহ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে তখন দিনে দিনে সংস্কৃতিক ও আভিজাত্যের প্রয়োজনীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। সুতরাং এর সাথে সাথে গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশনার চাহিদাও বেড়ে যায়। ফলে গ্রন্থাবলীর আধিক্যের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিরাট বিরাট গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। হিজরী প্রথম শতকের শেষ ভাগে ও দ্বিতীয় শতকের মধ্যবর্তী সময় গ্রন্থাবলীর এভাবে পরিসংখ্যান করা হয়। আবু আমর বিন আল-আলা (১৫-৫৭হিঃ) যিনি বিখ্যাত সাত কারীদের একজন। হযরত আলী রাযি. এর পরবর্তী চতুর্থ স্তরের নাহুর ইমাম ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনে খালকানের অভিমত হল, তিনি আরব সাহিত্যে যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন, তার পরিমাণ এতো বেশী ছিল যে, তাতে তার গৃহের ছাদ পর্যন্ত স্তুপ হয়ে যায়। অনুরূপভাবে ইমাম ইবনে যুহরী রহ. ও (মৃত্যুঃ১৪০ হিঃ) অসংখ্য গ্রন্থরচনা করেছেন। এ সব উদাহরণ হল উমাইয়াদের যুগের। যদিও এ সব বিবরণে কিছু সন্দেহ হতে পারে, তথাপি এর দ্বারা নূন্যতম এটা প্রমাণ হয় যে, গ্রন্থ প্রণয়নের সূচনা আরববাসীদের যুগে শুরু হয়নি বরং তার অনেক পূর্বে গ্রন্থ প্রণয়নের সূচনা হয়েছে। অবশ্য ঐ সব গ্রন্থের কিছুমাত্র আমাদের হস্তগত হয়েছে। যা দ্বারা বাহ্যিক বর্ণনায় প্রমাণ হয়েছে। উমাইয়া যুগে প্রণীত কোন কোন গ্রন্থ আববাসীয় যুগে বিদ্যমান ছিল। যেমন ইবনে নাদিমের বর্ণনায় প্রমাণ হয়েছে। তিনি আবুল আসওয়াদ ও ওবাইদা বিন শারীয়ার গ্রন্থাবলী দেখেছেন। ঐতিহাসিক ইবনে খালকানের অভিমত হল, তিনি হযরত ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ রহ. লিখিত ইতিহাস গ্রন্থ ইয়ামানে দেখেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00