📄 হস্তলিপি
হস্তলিপিতে মুসলমান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। আর তাকে এক উন্নত বিষয়ে উপনীত করে। ঐতিহাসিক আবুল ফজল বলেন, এটা এক ধরনের প্রতিচ্ছবি। এর আবিষ্কার এক যুগান্তকারী উদ্দীপনা উৎসাহ লাঘবের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এর চেয়ে আরও বিস্ময়কর কুরআন মজীদের বর্ণনা। যার অনেক উন্নত রীতিনীতি অবলম্বন করা হয়েছে। কুরআন মজীদ ছাড়াও এ বিষয়ে আবর কবি-সাহিত্যিক ও কিচ্ছা কাহিনী লিপিবদ্ধ করায় উল্লেখযোগ্য খ্যাতি অর্জন করেছে। ইসলামের সূচনা লগ্নে হীরা ও হাসীরাহ এলাকা হস্তলিপির ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল। পরবর্তীকালে হীরা কুফা নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ হয়।
ইসলামী যুগের প্রথম দিকে আরবী হস্তলিপিতে যে উন্নতি সাধন করা হয়, তা ছিল কুফার হস্তলিপি। হরব ইবনে উমাইয়া তা আরবে প্রসার করেন। কেননা হরব ইবনে উমাইয়া তা কুফা থেকে আরবে নিয়ে আসে। এ কারণে এ কুফী হস্তলিখন বলা হয়। উমাইয়াদের শাসনামলে উজির আব্দুল হামিদ দফতরিক কাজের সুবিদার্থে তাতে যৌক্তিক পরিবর্তন আনেন। আরববাসীদের শাসনামলে ইসহাক বিন হাম্মাদ একে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানোর জন্য সহজীকরণের উদ্দেশ্যে এটার বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।
📄 বই প্রনয়ন
নামফলক মসজিদ ও ইমারতের সামনে লেখার জন্য। রেজিষ্ট্রী মোহর গুরুত্বপূর্ণ সরকারী দলীল দস্তাবেজ সংরক্ষণ করার জন্য। কর্তব্য কাজ সরকারী ঘোষণাপত্র জারী করার জন্য।
কুফী পদ্ধতির লেখা সরল সোজা পদ্ধতিতে সমাধা করা হতো। এ কারণে সাধারণ প্রয়োজন পূরণ ও মানুষের স্বভাবের জন্য এ বাধ্যবাধকতা কঠোর ছিল। সুতরাং যেসব প্রয়োজন পূরনে মানুষ অক্ষম হত, তাতে পরিবর্তনের সূচনা দেখা দিয়েছে। কুফী হস্তলিপিকে বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে ২৭ ভাগে বিন্যাস করা হয়।
মুসলমানগণ গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশনার রীতিনীতিতে বিপুল পরিমাণে উন্নতি সাধন করে। এ কারণে তারা সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবনে লিপ্ত হন, কথিত আছে, যে, ইবনে মোকল্লাহ সহজ হস্তলিখন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। আর ঐ পদ্ধতিকে "মুহাকিক" নামকরণ করা হয়। তা থেকে এক তৃতীয়াংশ লেখা আবিষ্কৃত হয় বিশেষ পদ্ধতির লেখা প্রতিলিপির জনক ইবনে মোকাল্লাহ্। কথিত আছে, নসখ বা প্রতিলিপির এ কারণে এ নাম নির্ধারণ করা হয়। এটা নিয়মানুগ ও কার্যকরী লিখন পদ্ধতি ছিল। এর জন্য দ্বাদশ পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। যাতে সব লিখন পদ্ধতি বিধিত করা হয়।
কুরআন মজীদ ও অন্যান্য লিখন পদ্ধতির মাঝে বিশেষ পার্থক্য নিরূপনের জন্য নসখে বা প্রতিলিপির এক শাখা দস্তখত নামে জারী হয়। প্রতিলিপির রীতি অনুযায়ী যে বিশেষ লিখন পদ্ধতিতে ঘোষণা পত্র লিপিবদ্ধ করা হত, তা বিশেষ পদ্ধতি নামে খ্যাত হয়। হস্তলিখন পদ্ধতির ইতিহাসে ইবনে বাওয়াবের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রতিলিপির তৈরীর রীতিনীতিকে অতি সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করেন। এ হস্তলিখন পদ্ধতি কে সম্পাদিত করণ বলা হয়।
প্রতিলিপির বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে আরো এক লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়। এর নাম হলো সাদৃশ্যতা। এটাও প্রয়োজন সহজতর করার জন্য আবিষ্কৃত হয়। এটা এক মুক্তলিখন পদ্ধতি। এর বাহ্যিক মূলনীতি রহিত করা হয়। কিন্তু লিখনি স্বাধীন ভাবে এটাকে নিজের মূলনীতি বানিয়ে নেয়। কিন্তু এই রহিত করন প্রথমে উর্দু বর্ণলিপি থেকে বের হয়। তারপর ভংগ্ন আকৃতি ধারণ করে। উর্দু বর্ণলিপি এই রহিত করনকে দূর করে সৌন্দর্য্য বর্ধন করে আর ভগ্ন রূপ ধারন করে দ্রুততার সাথে অনিয়মিত ভাবে উপকৃত হয়। কিন্তু প্রচলিত হস্তলিখন পদ্ধতির রাস্তা পরিস্কার করে দেয়। প্রত্যেক লেখায় সাদৃশ্যতা এক বিশেষ আকৃতি লাভ করে। পাক-ভারত উপমহাদেশে এক বিশেষ সাদৃশ্যতা বিহার নামে খ্যাতি লাভ করে। আমীর তৈমুর গুরগানির যুগে খাজা আমীর আলী তাবরীজি নসখ ও উর্দু বর্ণলিপির সংমিশ্রণে নতুন এক লিখন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তা প্রথম প্রতিলিপি সাদৃশ্য নামে প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তি সময় সাদৃশ্যতা নামে পরিচিত হয়।
এ বিষয়ে খ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে সুলতান আলী মাশহাদী, মীর আলী আল কাতিব আলবেরুনী, মীর আহমাদ, আব্দুর রশিদ দাইলামী, আযহার জাফর তাবরিজি, মুহাম্মদ হুসাইন কাশ্মীরি, ইমাম দারওয়ারদী ও তাদের শীষ্যবর্গ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
📄 সৌন্দর্য মণ্ডিত করন
যেহেতু ইসলামের বুনিয়াদ ও মুসলমানদের মহব্বত ও আকীদার মূলভিত্তি হল কুরআন মজীদ। এ কারণে কুরআন মজীদ লিপিবদ্ধ করা মুসলমান সর্বদা উত্তম সাওয়াবের কাজ মনে করতেন। কুরআনের সম্মানের কারণে সর্বদা উন্নত লিখন পদ্ধতি ও যোতীচিহ্নের ব্যাপারে মুসলিম সমাজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কেননা উক্ত তিন পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে যে কোন গ্রন্থকে সুসজ্জিত করা যায়। এর উদ্ভব হয় হিজরী দ্বিতীয় শতক খ্রিষ্টিয় অষ্টম শতকে। প্রয়োজনের তাগিদে প্রথমে যোতীচিহ্নের উদ্ভাবন করা হয়। এর সাহায্যে আয়াতের সমাপ্তি নির্ধারণ করে এক আয়াত থেকে অপর আয়াতকে পৃথক করা হয়। এ জন্য বিভিন্ন ধরনের চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। কোন কোন সময় তিন বা অতিরিক্ত বিন্দু সাধারণতঃ সোনালী তৃতীয়াংশ আকৃতিতে বানিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অবস্থায় হস্তলিখন পদ্ধতি আরো বেশী সৌন্দর্য মণ্ডিত মনে হয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এ পদ্ধতি চালু হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন সূরাকে পরস্পরে পৃথক পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য লাল, নীল, সবুজ সোনালী রং এর রেখা টানা শুরু হয়। যা সাধারণতঃ পরস্পরে ভীষণ পেচানো হয়। কিন্তু কখনো তাতে ছোট ছোট অস্রাকারের মত বানিয়ে দেওয়া হত। ঐ সব রেখা সমূহের দ্বারা প্রত্যেক সূরার শুরুর পৃষ্ঠায় এক সূরার শুরু থেকে দ্বিতীয় সূরা পর্যন্ত টেনে দেওয়া হত।
প্রাথমিক অবস্থায় ঐ হস্তলিখন পদ্ধতি রেখা সমূহের মধ্যে সূরার নাম, আয়াত সংখ্যা, আর সূরা মক্কী না মাদানী কোন কিছুই উল্লেখ করা হত না। এটা দ্বারা কোন কোন সময় শুধু ছোট শূন্যস্থান পূরণ করা হত। হিজরী তৃতীয় শতক বা খ্রিস্টীয় নবম শতকে ঐ হস্তলিখন ধারার প্রস্ত মোটা করে দেওয়া হয়। ঐ রেখার সাথে বর্ণমালার সারি সমূহের সমান বরাবর লম্বা হত তাতে আরো এক নতুন পদ্ধতি সংযোজন করা হয়। সাধারণতঃ এ লিখন পদ্ধতি মাটির ঢেলা, ফুল পাতার এক জটিল দৃশ্য পরিলক্ষিত হত। যাতে সূরার লাইন সমূহ বের হয়ে পাদটীকা পর্যন্ত পৌঁছে যেত। পাদটীকার সজ্জা এ পদ্ধতি কুরআন মজীদে ব্যবহৃত সব পদ্ধতি থেকে বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য বলে স্বীকৃত হয়। পাদটীকার অতিরিক্ত অলংকরণে ফুলের নক্সা ও চৌকাঠ যুক্ত এক সজ্জা ধারন করে। এর মাধ্যমে কুরআন মজীদের বিভিন্ন অংশ তুলে ধরা হয়। আর আয়াতের নিদর্শন, সিজদার আয়াতও এ পদ্ধতির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। তখন রং আরো বেশী সোনালী হয়ে যায়।
হিজরী চতুর্থ শতক বা খিস্টীয় নবম শতকের শেষ ভাগে বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন মজীদ সুন্দর ডিজাইনে প্রকাশ শুরু হয়। বরং অধিকাংশ কিতাব বা তার অংশের সূচনা ও সমাপ্তিতে দুই পৃষ্ঠা রঙ্গীন করা হয়। অথচ অপর পৃষ্ঠায় দেখা যেত, ছোট দীর্ঘ আকৃতি ধারন করে। তাতে বিশেষ দীর্ঘ ও ক্ষুদ্র কাল্পনিক নকশা অংকন করা হতো। আর তাতে সাধারণতঃ কোন না কোন প্রকার জটিল পদ্ধতিতে লেখা হতো। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়নার আকৃতির নকশা অংকন করা হতো। যা গোলাকৃতির হতো। খ্রিষ্টীয় দশম শতকে বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ বিশেষ বিষয় ভিত্তিক পদ্ধতির সূচনা হতে শুরু হয়। ফলে বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থাবলী চমৎকার প্রকাশ হতে শুরু করে। ইয়ান এর বিরাট কেন্দ্রে পরিণত হয়। বিশেষ করে এ ব্যাপারে খোরাসান বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। ঐ সময় প্রায় সব পদ্ধতি সোনালী রংয়ের হতে শুরু করে। সময়ের প্রয়োজনে নকসা নমুনা ডিজাইনের ডাসা কালো রংয়ের তৈরি করা শুরু হয়। সুতরাং দৃশ্যের এক অংশ কালো রং দ্বারা চিহ্নিত করে দেওয়া হত। সোনালী রং পরিবর্তন করে অন্য রংয়ে রূপান্তর করা হয়। ঐ পদ্ধতি গ্রহণের ফলে কাগজের শুভ্রতা উজ্জ্বলতর হত।
লৌহ শলাকা এর উল্লেখযোগ্য ডিজাইনের উন্নতির সূচনা এ ভাবে শুরু হয়। সোনালী পাতের উপর পারস্পরিক জটিল বৃত্তাকৃতির এক সাজ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু একাদশ শতকের সূচনা লগ্নে এর স্থলে পুরো পৃষ্ঠা থেকে জটিল নকশা বিলুপ্ত করা শুরু হয়, তাতে ছোট ছোট জটিল নীল রংয়ের নক্ষত্রের আকৃতির সাজ শুরু হয়। আর ঐ নকশা দ্বারা পাদটীকার চার পাশ আবৃতি করে দেওয়া হয়। আর ঐ নক্ষত্রাকৃতির মধ্যে পৃষ্ঠার কোনের অলংকরনে আল্লাহ্, মুহাম্মদ অন্যান্য সংক্ষিপ্ত বাক্য তাসবীহ, তাহলীল নীল পাতে সোনালী বর্ণে লেখা হত। স্থান মোটা করার উদ্দেশ্যে সাধারণ গৃহীত পদ্ধতি ছিল, ঝুকে থাকা শাখা সমূহে আরবীয় নকসা অনুযায়ী ফুল পাতা প্রভৃতি বানিয়ে দেওয়া হত। এই নতুন পদ্ধতি হিজরী চতুর্থ শতক বা খ্রিস্টীয় দশম শতকের মধ্যবর্তী সময় শুরু হয়। আসল বর্ণনায় মধ্যবর্তী সারী সাজানোর উদ্দেশ্যে এইরূপ করা হয়। ঐ আসল বর্ণনায় ফুল ও মরিচের আকৃতিতে ডিজাইন করে কালো ও লাল রঙের সংমিশ্রণে বানানো হত। কিন্তু তা হালকা হয়ে যেত। এর দ্বারা মূল ভাষ্যের চার পাশ এমনভাবে সাজানো হত যে, তাতে সাদা রংয়ের এক ক্ষুদ্র স্থান খালি হত। যা এর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য ও মূল ভাষ্যের মাঝে পর্দার কাজ করত। এই ডিজাইন একাদশ ও দ্বাদশ শতকে উল্লেখ যোগ্য আকার ধারন করে। হিজরী পঞ্চ ও ষষ্ঠ শতক বা একাদশ ও দ্বাদশ খ্রিস্টাব্দে অমযহাবী বর্ণলিপি অতি সুন্দর রূপে সাজানো হয়। তা অতি উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে লেখা হয়। পাদটীকা লিখন পদ্ধতিতে স্বর্ণালী আরবী নকশাবলী ব্যবহার করা হয়।
ত্রয়োদশ শতকে পুরো ইসলামী বিশ্বে সোনালী প্রলেপ দেওয়ার ব্যাপক হয়। ইরানের নও মুসলিম ইলখানি বংশের সুলতান আল জাসুই খোদাবন্দাহ বড় বড় সাইজের কুরআন মজীদ লেখার আদেশ দেন। ঐ গুলির প্রতিটি ত্রিশ ত্রিশ খণ্ডে বিভক্ত ছিল। শুরুতে প্রথম পৃষ্ঠা সুন্দর নকশা করা হত, তাতে বড় আকৃতির বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন অংকন করা হত, আর তা আরবী নকশা অতি কঠিন পদ্ধতিতে আঁকা হত। এগুলোর মাঝে কখনো কখনো সংক্ষেপে পবিত্র বাক্য সমূহের এক তৃতীয়াঅংশ লিপিবদ্ধ করা হত, ডিজাইনে কোন কেন্দ্রীয় পদ্ধতিতে অংকন করা হত, অথবা পাড়ের উপর ফুল পাতা বুনন করা হত। আর ঐ ডিজাইনের চার পাশে এমন পাদটীকা লেখা হত, তার অলংকরণের সীমা পৃষ্ঠার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত এক সমান হত। আর পাদটীকা থেকে বের হওয়া রেখা সূর্যের আকৃতিতে বানানো হত। তাতে সোনালী রং ছাড়াও অন্যান্য রং ব্যবহার করা হত, ঐ যুগে লোহা ফলক বইতে সংযোজন করা হয়। সম্ভবতঃ তা বৃত্তাকার বা দীর্ঘ পাড়ের নকসা খোদাই করা হত, যা কিতাবের প্রথম পৃষ্ঠার ডান দিকে বানানো হত। তাতে নাম ও উপাদী লিপিবদ্ধ করা হত। যার সাহায্যে গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং সুবিন্যাস্ত করা হয়েছে। মামলুক সুলতানদের আদেশে কুরআনের কপি সমূহে সাধারণভাবে নক্ষত্রের ডিজাইন চালু করা হয়। তাতে চীনের শিল্পকর্মের আকৃতি ফুলের মত ছবি আঁকা হত।
হিজরী নবম শতক বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে গাঢ় নীল রঙের উপর সোনালী রংয়ের ফুল অংকনের সূচনা হয়। তা সম্পূর্ণ ডিজাইনের চার পাশ সোনালী রংয়ে সাজানো হত। তৈমুরী যুগে ইরানী পদ্ধতি সম্পূর্ণ রূপে পরিবর্তন করা হয়। ঐ যুগে লেখার ধরণ ছোট আকৃতির হতে শুরু করে। কিন্তু তা অতি পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন হত। আরবী ক্যালিওগ্রাফির নকশায় ভারতীয় আকৃতির সূচনা হয়। যেসব আরবণীতে এ সব ডিজাইন অংকন করা হত, সে সব ডিজাইন পাতে সজ্জিত করা হত। ঐ যুগে অংকিত বর্ণের ব্যাপক প্রচলন হয়। আরন কিতাব প্রণয়নের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। আর এর প্রতিক্রিয়া প্রলেপের উপরও প্রতিফলিত হয়। তার কেন্দ্রের মধ্যে কিতাব ও লেখকের নাম লিপিবদ্ধ করা হত। আর এর চার পাশে ডিজাইন বানানো হত জীব জন্তু, ফুল ও আরবী নকশা নমুনার সংমিশ্রণ থাকত, বিধর্মী লেখার পাদটীকায় মানুষ জীবজন্তু ও ফুলের সুন্দর সুন্দর ছবি অংকন করা হত। ঐ গুলোর সাথে মূল বর্ণনার সম্পৃক্ত হত না। তা শুধু সাজগোজের কাজে ব্যবহৃত হত।
হিজরী নবম শতক বা খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগে এ পদ্ধতিতেও পরিবর্তন সাধিত হয়। তখন প্রত্যেক বস্তুতে গোলাকার বৃত্ত অংকন বন্ধ হয়ে যায়। তাছাড়াও স্বাভাবিক ফুলদানীর শাখা-প্রশাখা তখন অনির্ধারিত ভাবে ডিজাইনের মাঝে দৃষ্টিগোচর হত। মাটির পাত সাদৃশ্য আকৃতি বেশীর ভাগ ডিজাইনে ব্যবহার করা হত। হিজরী দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষোড়শ দশকের শেষ ভগ থেকে এ মনোভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করে যে, পৃষ্ঠার দৈর্ঘের অংশে যেখান থেকে মূল বর্ণনা শুরু হত, তা খুব মোটা ও চওড়া আবরণী যুক্ত হত। ঐ যুগে আরো এক নতুনত্বের সূচনা হয় অর্থাৎ পৃষ্ঠার তিন দিকে রেখা টেনে দেওয়া হত। তা দৃশ্যতঃ স্বভাবিক আরবী নকশার আকৃতি ও ফুলের পাড়ের মত দেখা যেত। তা কখনো সোনালী বা রুপালী রং দিয়ে তৈরি করা হত। তাতে কিতাব বেশ সুন্দর দেখা যেত। তুর্কীদের বাঁধাই পদ্ধতি সম্পূর্ণ ইরানী ধারায় ছিল। কিন্তু তারা রেখা বন্ধনীতে কোন চিত্রাংকন করত না। যাতে দৃশ্যতঃ স্বাভাবিক আকৃতি পরিলক্ষিত হত। মোগল আমলেও ইরানী পদ্ধতির বাঁধাইয়ের প্রচলন ছিল।
📄 বাঁধাই পদ্ধতি
কিতাব লিখন, বাঁধাই ও অলংকরনে চামড়ার ব্যবহার খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কেননা তাতে কিতাব সংরক্ষণের দায়িত্ব চামড়ার উপর ন্যস্ত হয়। সাধারণতঃ মুসলমান কুরআন মজীদ বাঁধাইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষার দাবি শুধু কিতাব সুন্দর হবে। বরং তার বাঁধাই পদ্ধতিও সুন্দর ও মনোরম হতে হবে। প্রথম অবস্থায় কাঠের আবরণী দ্বারা বাঁধাই করা হত। এতদিন পর্যন্ত বাগ্মীতা ব্যবহারের সূচনা হয়নি। এর স্থলে হালকা চামড়ার আবরণী সামনে বাড়িয়ে তিন দিকের অংশ দাঁড় করিয়ে সিরিশ দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হত। চতুর্দিকে পুস্তানী লাগানো হত, এ অবস্থায় বাঁধাইয়ের পর সিন্দুকের আকৃতিতে দেখা যেত। ফলে খাড়া তিন দিক সমকোন লম্বা আকৃতিতে দেখা যেত। চামড়া ব্যবহারের পদ্ধতি স্বাভাবিক ভাবে এ ধরনের করা হত যে, তাতে বাহ্যিক রেখা ও আভ্যন্তরীন পাত এক বাটনের উপর রাখা হত। তাতে রেখার উপর সাদা সিধা অলংকরণ করা হত।
কিন্তু পাতের আভ্যন্তরীণ দিকে ক্রমান্বয়ে দুই তিন চরণ মোটা করে লেখা হত। লেখার পদ্ধতিও মোটা হত। সকল প্রকার অলংকরণ ও সাজসজ্জা একই ধাঁচে করা হত। কিন্তু তা স্বর্ণালী রং ছাড়াই করা হত। তার রীতি নীতি ও জ্যামিতিক নকশা নমুনা মিশরীয় কিবতী জ্যামিতির নকশা অংকন করা হত। কিন্তু ঐ দুধরনের বাঁধাই পদ্ধতির মাঝে পার্থক্য ছিল। বিশেষ করে ডিজাইনের গঠন প্রকৃতির মধ্যে পার্থক্য করা হত। মোটকথা, সিন্দুকের মত বাঁধাই এক দীর্ঘাকৃতির পরিলক্ষিত হত। মুসলমানগণ বাঁধাই শিল্পে প্রভূত উন্নতি সাধন করে।
হিজরী পঞ্চম শতক বা খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে জিলদ সমূহের নকশা অতি বেশী পেছানো হয়ে যায়। যদি তা প্রাথমিক অবস্থায় প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সংমিশ্রণে করা হয়। কিন্তু তাতে চামড়া পৃথক রাখা হয়। আর তা সাদাসিধে অলংকরণ মুক্ত হত। উক্ত শতকে গোলাকৃতির বাঁধাইয়ের সূচনা হয়। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে এ খণ্ড কিতাবের বুনিয়াদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শুধু তিউনিসিয়া, আল-জাজায়ের ও মরক্কো এ ধরনের বাঁধাই পদ্ধতির ব্যতিক্রম ছিল। এ সব অঞ্চলে কাঠের পাতের স্থান কাগজ দখল করে নেয়। মিশরে এর স্থলে হিমায়িত রদ্দি ব্যবহার করা শুরু করা হয় উন্নতির প্রথম স্তরে একটি পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়। যা নিচের দাবানো অংশের সাথে মিলিত হত, যা মিশরে আল মুয়ায়িদ শাসনের শেষ দিকে আল মারিনী বংশের রাজত্বের প্রথম দিকে জিলদের বৃত্তের সর্বদিকে তারকার নকশা বাড়তে বাড়তে পুরোপুরি ভারতীয় নকশার আকৃতি ধারন করে। বর্তমানেও এ ডিজাইন মিশর, তিউনেসিয়া, আল-জাজায়ের ও মরক্কোতে প্রচলিত আছে। যাতে চামড়ার কতিপয় নকশা অংকন করে দেওয়া হত। বিষয় হিসেবে বাঁধাই পদ্ধতি প্রভূত উন্নতি সাধন করে। এ পদ্ধতি ঐ সময় ও পরবর্তীতে পূর্বাঞ্চল বাঁধাই শিল্পের অংশে পরিণত হয়ে যায়।
মামলুক শাসনামলে অর্থাৎ হিজরী সপ্তম শতক থেকে নবম শতক বা খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতক থেকে পঞ্চদশ শতকে মিশরীয় বাঁধাই পদ্ধতি তিউনিসিয়া আল জাজায়ের ও মরক্কোর বাঁধাই শিল্পে বিপুল উন্নতি লাভ করে। ঐ সময় বাঁধাই শিল্পের অত্যাধুনিক কারখানা স্থাপিত হয়। আর তা প্রায় পৃথিবীর সর্বত্র বিস্তার লাভ করে। আর পুরো গেলাফ ভরতীয় নকশা দখল করে নেয়। আর প্রক্রিয়া জাত করার মাধ্যমে চামড়ায় স্বর্ণালী রং করা হয়। আর কোন জিলদে তুলির সাহায্যে গোলাপ ফুলের ছবি আঁকা হত। এভাবে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। কোন কোন জিলদে প্রতীক চিহ্নের আকৃতি বানানো হত। তা হাল্কা চামড়ার কাটা অংশ দিয়ে তৈরি করা হত। ঐ খণ্ড সমূহের রং গাঢ় করা হত। জিলদের আভ্যন্তরীণ ভাগ সাধারণতঃ আরবী পদ্ধতির নকশা সমূনা করা হত। তাতে কোন কোন সময় মোমের ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়। তৈমুরী শাসনামলে অধিকাংশ ইরানী জিলদ স্বকীয়তা লাভ করে। ঐ যুগের জিলদ সম্পর্কে বলা হয় যে, এ ছিল সর্বোত্তম বাঁধাই পদ্ধতি। সে যুগে বাঁধাই শিল্পের জন্য হীরাত প্রসিদ্ধ ছিল। তথাপি ইস্পাহান, সিরাজ ও ইয়াজদেও উন্নত মানের বাঁধাইয়ের কাজ হত। বিশেষ করে হীরাতে কাটিংয়ের কাজ বেশ উন্নতি লাভ করে। সেখানকার পাস্তুরিত চামড়া বাঁধাই শিল্পের জন্য অতি উত্তম হত। জিলদের বাইরের অংশে তুলির সাহায্যে বৈচিত্র আনা হত। ভেতরের অংশে নীল রংয়ের সুন্দর সুন্দর কারুকাজ করা হত। সাফুভী যুগে বিশেষ করে হিজরী দশম শতক বা খ্রিস্টীয় ষোড়ষ ও সপ্তদশ শতকে তৈমুরী যুগের বাঁধাইকে বহাল রাখা হয়। কিন্তু তা অনেকাংশে আধুনিকায়ন করা হয়। ঐ সময় থেকে মেশিনের সাহায্যে কাজ করার সূচনা হয়। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকে তুলনামূলকভাবে স্বর্ণালী রংয়ের ব্যাপক প্রচলন হয়। কোন জিলদের পুরো পৃষ্ঠা রঙ্গীন করা হত। কোন কোন জিলদের নকশা প্রতীক চিহ্ন বা চতুষ্কোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হত। কোন কোন জিলদ সমূহের বাইরের দিকে আরবী ক্যালিউগ্রাফির আকারে ডিজাইন করা হত। আর এর সাথে সাথে হালকা ফুল পাতা এবং চীনা পদ্ধতির বারিধারার চিত্র অংকন করা হত। ভেতরের অংশের চামড়ায় ফুলের চিত্রাঙ্কন করা হত। যার পাড় নীল গোলাপী ও সবুজ রংয়ের হত। কোন কোন জিলদের পুরো নকশা রং তুলির সাহায্যে অংকন করা হত। আর এর পাড়ে হিংস্রজীব-জন্তুর ছবি অংকন করা হত। শাহ তাহমাসপের রাজত্বকালে প্রথম নকশা করা হত তারপর এর উপর এক হাজার রং দেওয়া হত। প্রথমে জিলদে চামড়া ব্যবহার করা হত, তারপর চামড়ার পরিবর্তে তাতে কাগজের বোর্ড ব্যবহার করা শুরু হয়। প্রথমে এর উপর পাতলা আবরণী ব্যবহার করা হত। তারপর এর উপর হালকা এক হাজার আকৃতি জড়ানো হত। তারপর এর উপর আকাশী রংয়ের ছবি অংকন করা হত, আর তা হেফাযত করার উদ্দেশ্যে এর উপর এক হাজার আকৃতির কয়েক স্তর লাগিয়ে দেওয়া হত। ঐ সময় আয়নার মত ঝলমল করার এক প্রকার ধাতুর প্রচলন ছিল। হিজরী একাদশ ও দ্বাদশ শতক বা খ্রিস্টীয় সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতকে ডিজাইনে আরো অনেক উন্নতি আসে। তাতে তুর্কী ও মোগল শিল্পের নমুনা পরিলক্ষিত হতে শুরু করে।