📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের পথ নির্দেশনা

📄 দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের পথ নির্দেশনা


সূরা ফাতিহাতে আমাদের দু'আ শিখানো হয়েছে যে, হে আল্লাহ তা'আলা! আমাদিগকে সরল সঠিক পথের দিশা দাও। কুরআন মজীদে এর জবাব দেওয়া হয়েছে। এ সঠিক উদ্দেশ্য সঠিক জীবনযাপনের প্রতি পথপ্রদর্শন করে। আর ঐ পথে পরিচালিত হওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। আমার জানা মতে, পবিত্র কুরআন মজীদ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ও এভাবে পথ নির্দেশ না দেয়। যেমন, বড় বড় সমস্যার সম্মুখীন হলে আমরা দিক নির্দেশনা পাই। এরূপ নয় যে, কুরআন মজীদ দ্বারা শুভাশুভ নির্ণয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা কুরআন মজীদ দ্বারা এভাবে হিদায়াত লাভ করতে পারি। তা স্পষ্ট করার জন্য একাধিক ঘটনা উল্লেখ করছি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা শোনার পর গুরুদাসপুর ঐ দিকে চলে যায়। পিরোজপুর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ও অনুরূপ আরো অনেক এলাকা যা আমাদের পাওনা ছিলো। তাতে আমার ভীষণ দুঃখ হয়। আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব আমার সাথে সাক্ষাত করে। সবাই শোকাহত ছিল। এমতাবস্থায় এশার আযান দেওয়া হয়। আমরা সবাই জামাতে হাযির হই। ইমাম সাহেব নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতহের নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ পাঠ করেন, "নিশ্চয় আমি আপনার জন্য সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ আপনার কারণে পাপ ক্ষমা করে দেন আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের ও আপনার পরবর্তীদের এবং আমার নিয়ামত সমূহ আপনার উপর পরিপূর্ণ করে দেন। আর আপনাকে সোজা পথ দেখিয়ে দেন এবং আল্লাহ আপনাকে বড় ধরনের সাহায্য করেন।"

১৯৪৮ সালে আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাশ্মিরের রণাঙ্গনে যোগদান করার ইচ্ছা করি। ঐ দিন রাতে আমার মন হতোদ্যম ও ভীত হয়ে যাই। সকালে ফজরের নামাযের জামাতে হাজির হই। ইমাম সাহেব নামাযে সূরা আস্-সাফ, তিলাওয়াত করেন। যার অর্থ- "হে ঈমানদাররা! তা কেন বল, যা করো না, কেমন জঘন্য অপছন্দনীয় আল্লাহর নিকট সে কথা যে, তাই বলবে যা করবে না। নিশ্চই আল্লাহ ভালবাসেন তাদেরকে, যারা তাঁর পথে জিহাদ করে এমনই সারিবদ্ধ হয়ে যেন তারা সীসা ঢালা প্রাচীর।"

সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ভয়ভীতি এমনিতে দূর হয়ে গেল। আমি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ দিনই গন্তব্য স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।

একদিন আমার জনৈক বন্ধু বলল, তুমি অমুকের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছ। চলো, তার সাথে সাক্ষাত করে আসি। আমি বললাম আমি তার উপর অসন্তুষ্ট হইনি, কিন্তু আমি তার ওখানে যাবনা। কেননা সে এমন আচরণ করেছে। এমন সময় এশার নামাযের আযান হয়ে যায়। জামাতে হাযির হই। ইমাম সাহেব নামাযে যেসব আয়াতপাঠ করেন, তার অর্থ ছিল-

"আর ভালো-মন্দ এক সমান হতে পারে না। আত্মরক্ষা করো স্থায়ীভাবে যা হবে উত্তম। তারপর দেখবে ঐ ব্যক্তি যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল, সে এরূপ হয়ে যাবে, যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে। এটা লাভ করতে পারে না কিন্তু যে ধৈর্য্যশীল। আর এটা লাভ করতে পারে না, কিন্তু যে বড় সৌভাগ্যবান।"

নামায শেষ হওয়ার পর আমি আমার বন্ধুকে বললাম, চলো তার ওখানে চলো। ওখানে পৌছার পর সে আমাদের সাথে আন্তরিক হৃদ্যতার সাথে মিলিত হয়।

একবার কোন কারণে এক খান্দানের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নামাযে হাজির হলে ইমাম সাহেব সূরা বনী ইসরাইলের এ আয়াত পাঠ করেন।
"এবং অনেক সময় মানুষ (নিজের অমঙ্গল) কামনা করে, যেভাবে কল্যাণ প্রার্থনা করে"

আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলি। একবার কতিপয় ব্যক্তি আমার সাথে এমন আচরণ করে, তাতে আমি নিরূপায় হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করি। অতঃপর আমি নামাযে হাজির হলে নিম্নোক্ত আয়াত শুনি, "নিশ্চই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথী হন।" তারপর দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য্য ধারণ করি। আল্লাহর অনুগ্রহে পরিণতি অত্যন্ত শুভ হয়।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ইসলাম প্রচারে মুসলিম নারীর ভূমিকা

📄 ইসলাম প্রচারে মুসলিম নারীর ভূমিকা


জ্ঞানের প্রসারে মুসলমান পুরুষদের সাথে সাথে মুসলমান নারীদের নামও উল্লেখযোগ্য। যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে উচ্চাসনে আরোহন করেছেন।

মূসলমান নারীদের প্রথম যুগ সাহাবীদের যুগ। হযরত সাহাবায়ে কিরাম জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে যে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তার ফলশ্রুতিতে তাফসীর ও হুযুর (সাঃ) হাদীস সমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁদের সহায়তায় শিক্ষালাভ করে যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষক চিন্তাবিদ ইসলামের ইতিহাসে খ্যাতি অর্জণ করেছে। যে সকল মহিয়সী রমণীরা ইসলামের খেদমতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন হযরত আয়েশা রাযি.। তিনি দার্শনিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। দ্বীনের মাসায়ালা, ইজাতিহাদ করা, ব্যবহারিক শাস্ত্র, ঘটনা বিবরণী সঠিকভাবে নির্ধারণ করা, সুস্থ সঠিক প্রামাণ্য অভিমত প্রকাশ করার যোগ্যতা সম্পন্ন নারী ছিলেন। তাঁর মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। হুযুর (সাঃ) মহিমান্বিত বাণী ও কাজ সমূহ তিনি যে আন্দাজে গ্রহণ করেছেন, তা বিশেষ ও সর্বসাধারন উভয়ের জন্য বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হত। ইসলামের প্রকৃত তত্ত্ব ও তথ্য বুঝার জন্য তিনি যে প্রজ্ঞাপূর্ণ অভিমত প্রকাশ করতেন, তা সত্যই মানুষের স্বভাবধর্মী হত।

বর্ণিত আছে, সূরা বাকারা ও সূরা নিসা যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি হুযুর (সাঃ) এর সান্নিধ্যে অবস্থান করার কারণে কুরআন মজীদের প্রতিটি আয়াতের বাচনভঙ্গী রীতিনীতি প্রামাণ্য দলীল ও সমস্যার সমাধান নিরসনের ব্যাপারে অভূতপূর্ব যোগ্যতার অধিকারিনী হয়েছেন, কুরআন মজীদের তাফসীর বর্ণনায় হযরত আয়েশা রাযি. আরববাসীদের প্রচলিত ভাষার প্রতি বিশেষ তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতেন।

হযরত আয়েশা রাযি. বিবাহের পর হুযুর (সাঃ) এর সবচেয়ে বেশী সান্নিধ্য লাভ করেন। সুতরাং তাঁর নিকট থেকে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে ২২০টি হাদীস বর্ণিত আছে। অন্যান্য হাদীস গ্রন্থেও তার অসংখ্য হাদীস বর্ণিত আছে।

হযরত আয়েশা রাযি. খুব ভালো করে চিন্তা-ভাবনা করে ঘটনাবলী বর্ণনা করতেন। যদি তিনি নবীজীর কোন বাণী সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারতেন, তাহলে তিনি বারবার আবেদন করে তা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতেন। তিনি কুরআন মজীদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। তাঁর স্বনামধন্য শীষ্য বর্ণনা করেছেন যে, ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষণ ও কবিতা আবৃত্তি ও কাব্য রচনায় তিনি বিশেষ পাণ্ডিত্বের অধিকারিনী ছিলেন।

হযরত হিসাম ইবনে উরওয়া রাযি. বলেছেন, "আমি কুরআন ফরায়েয হালাল -হারাম (ফিকহা শাস্ত্রে) কাব্য ও কবিতার ক্ষেত্রে আরবের প্রাচীন ইতিহাস বংশধারা বর্ণনায় হযরত আয়েশা রাযি. বেশী জ্ঞানী আর কাউকে পাইনি।"

হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়াও হুযুর (সাঃ) এর যুগে অনেক মহিয়সী রমনী ছিলেন। তাঁরা ও জ্ঞানের প্রসারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলশ্রুতিতে কুরআন-হাদীস শাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। হযরত হাফসা রাযি. এর নিজে জ্ঞান শিক্ষা করা ও তা অন্যদের মাঝে প্রচার করায় বিশেষ উৎসাহ ছিল। পুরুষদের মধ্যে হযরত ইবনে উমর, হামযা ইবনে আবদুল্লাহ, হারেস ইবনে ওহাব, আবদুর রহমান ইবনে হারেস রাযি.। আর নারীদের মধ্যে হযরত হযরত সুফিয়া বিনতে আবি উবায়দা, উম্মে মোবাশ্বার আনসারী রাযি. প্রমুখ তাঁর শীষ্য ছিলেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৬০ টি। তিনি হুযুর (সাঃ) ও হযরত উমর রাযি. থেকে শ্রবণ করেছেন। হযরত উম্মে সালমাহ রাযি. থেকেও অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। হাদীস কণ্ঠস্থ করায় হযরত আয়েশা ও হযরত উম্মে সালমাহ রাযি. উল্লেখযোগ্য মর্যাদার অধিকারিনী ছিলেন। অনুরূপভাবে উম্মুল মুমিনীন হযরত জুইয়ারিয়াহ রাযি. ও হুযুর (সাঃ) থেকে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত উম্মে হাবীবাহ রাযি. ও হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৬৫ টি। তাঁর নিকট থেকে অনেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেছে। হযরত সুফিয়াহ রাযি. ও অন্যান্য উম্মুল মুমিনরা জ্ঞান শিক্ষায় বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। অনেকে তার নিকট মাসায়ালা জানার আবেদন করত। তিনি তাদেরকে সন্তোষজনক জবাব দিতেন। হযরতা সুফিয়া রাযি. থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তা হযরত ইমাম জয়নাল আবদীন, ইবনে ইসহাক, ইবনে হারিছ, মুসলিম ইবনে সাফওয়ান, কেননাহ ও ইয়াজিদ ইবনে মুসাইয়িব, রাযি. প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।

হযরত ফাতেমা রাযি. প্রভূত জ্ঞানের অধিকারিনী ছিলেন। তাঁর আমল তাঁর জ্ঞানে সঠিক নমুনা ছিল। হযরত ফাতেমা রাযি. এর কাব্য চর্চায় ভীষণ আগ্রহ ছিলেন। হযরত আলী রাযি. এর অনেক কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিলো। বিশেষ বিশেষ ঘটনায় তিনি নিজেও কবিতা রচনা করতেন। হুযুর (সাঃ) সম্পর্কে তিনি এক শোক গাঁথা রচনা করেছেন বলে জানা যায়। হযরত আসমা রাযি. থেকে ৬০ টি হাদীস বর্ণিত আছে। ঐ সব হাদীসের বর্ণনা কারী হলেন হযরত আবদুল্লাহ বিন জায়াফী, ইবনে আব্বাস, কাশেম বিন মুহাম্মদ, উরওয়াহ ইবনে মুসাইয়িব, উম্মে মাউন বিনতে মুহাম্মদ বিন জাফর, ফাতেমা বিনতে আলী রাযি. প্রমুখ। হযরত আসমা রাযি. স্বপ্নের ব্যাখ্যা বর্ণনা করতেন। হযরত উমর রাযি. অনেক স্বপ্নের ব্যাখ্যা তাঁর নিকট থেকে অবগত হয়েছেন।

হযরত খানাসা রাযি. কবিতা পাঠের আসরে অংশ গ্রহণ করতেন। ঐ যুগে তিনি উচ্চ স্তরে শোকগাথা আবৃতিকারী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। লোকজন তাঁর নিকট সমবেত হয়ে তাঁর কবিতা শোনার জন্য অপেক্ষা করত। তাঁর এরূপ মর্যাদা ছিল যে, তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় "আরবের সবচেয়ে খ্যাতনামা শোকগাঁথা রচনাকারী" বলে বিশেষ এক পতাকা উড়ানো থাকত। তিনি কবিতা রচনায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। কবিতা আবৃতির চেয়ে কবিতা রচনা করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হযরত খানাসা রাযি. ঐ যুগের একমাত্র বিখ্যাত মহিলা, যার কবিতা গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়েছে। তা পরে ১৮৮৮ সালে বৈরুতে থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮৮৯ সালে ফরাসী ভাষায় তার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুরূপভাবে হযরত সুফিয়াহ রাযি. কবিতা রচনায় বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন। তিনি রচনা করতেন। প্রতিশব্দ ও প্রাঞ্জল বাক্যে শোকগাঁথা রচনায়ও বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর থেকে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাহাবায়ে কিরামের উল্লেখযোগ্য স্তরে উপনীত হয়েছে। অনুরূপভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি কল্পে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। কেননা ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ইসলামের মূলভিত্তি বলে নির্ধারণ করে নারীদের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করেছে। আব্বাসীর যুগে মহিয়সী নারী জোবায়দা খাতুনের প্রশংসা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। তিনি ইসলামের উন্নতি বিধানে নিবেদিতা প্রাণ ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মুক্ত হস্ত।

পাকভারত উপমহাদেশেও এ ধরনের বিখ্যাত মহিয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেছেন। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে খ্যাতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেছেন। যেমন রাজিয়া সুলতানা ভারতের বিখ্যাত মহিলা সম্রাজ্ঞী ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক জ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন। রাজনৈতিক বিষয় তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি এ বিষয়ে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যে তিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। তিনি জ্ঞানীদের বিশেষ সমাদর করতেন। তিনি শরী'আতের কঠোর অনুসারী ছিলেন।

গুলবদন বেগম সম্রাট বাবরের দুহিতা ও হুমায়ুনের সহোদরা ও আকবরের ফুফু ছিলেন। তিনি ভীষণ বিদ্যানুরাগী ছিলেন। আকবরের তত্ত্বাবধানে গুলবদন বেগম ঐতিহাসিক "হুমায়ুন নামা" রচনা করেন। কাব্য রচনায় তিনি বিশেষ পারদর্শি ছিলেন। সাহিত্য কবিতা ও ইতিহাস শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত কবিতা বাস্তব নির্ভর হত। তিনি দুঃখ ও বিষাদকে কবিতায় বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম ছিলেন।

মীর্জা নূর উদ্দীনের কন্যা ও সম্রাট বাবরের পৌত্রী সালিমা সুলতানা বেগম কবি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি কাব্য চর্চা সম্রাট বাবর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন। গণিত শাস্ত্র ও জ্যামিতিতেও তিনি বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। রাজনৈতি বিষয়েও তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। সম্রাট আকবর অধিকাংশ রাজনৈতিক বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করতেন। বহু ঐতিহাসিক তার প্রতিভার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। মাযদান ইরানের প্রসিদ্ধ একটি এলাকা। ঐ এলাকার এক শহর আমেল। ঐ শহরে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এক বংশ বিশেষ খ্যাত ছিল। সাতি আনিসা নামে ঐ বংশের এক মহিলা চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। তাই তিনি তৎকালীন সম্রাজ্ঞীর সুনজরে পড়ে। কবিতা আবৃতিতেও তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। ফার্সী সাহিত্যেও তাঁর বিশেষ উৎসাহ ছিল। সম্রাট শাহজাহানের দুহিতা জাহান আরা বেগম বিখ্যাত বিদুষিনী মহিলা ছিলেন। তিনি তর্ক শাস্ত্রে বিশেষ খ্যতির অধিকারিনী ছিলেন। তিনি হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী রহ. এর অনুসারী ছিলেন। তিনি "মাওনুসুল আরোহা" নামক গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থ ২৭ রমাযান ১০৪৯ হিঃ সমাপ্ত হয়। তা ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে বিশেষ সমাদৃত হয়। বেগম জাহান আরার বিভিন্ন সময় লিখিত চিঠি পত্রগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জ্ঞানী গুনীদের বিশেষ সমাদর করতেন। তিনি কিরাত শাস্ত্র, ফিকহা, হাদীস, সংগীত, সাহিত্য ও চিকিৎসা বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন। তিনি কবি সাহিত্যিকদের বিশেষ সম্মান করতেন।

জিবুননেসা সম্রাট আলমগীরের বোন ছিল। তিনি শরী'আতের কঠোর অনুসারী ছিলেন। আটবছর বয়সে কুরআন মজীদ হিফয করেন। হস্তলিপি, আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্বের অধিকারীনী ছিলেন। উর্দু বর্ণলিপি, প্রবন্ধ রচনা, শোক প্রকাশে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কাব্য-কবিতায় বিশেষ দক্ষতা ছিল। তিনি জ্ঞানী-গুনীদের বিশেষ সমাদর করতেন। জিবুননেসা স্বীয় জ্ঞান-প্রজ্ঞায় হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. এর তাফসীরে কবির ফার্সীতে অনুবাদ করেন। তাঁর জ্ঞানের সুখ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে ইরান তুরান আরব তুর্কিস্তান প্রভৃতি অঞ্চল থেকে জ্ঞানী গুনিরা দলে দলে পাক ভারত উপমহাদেশে আসতে শুরু করে। আর জবুন নেসা বেগম তাঁদের দ্বারা বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থাবলী রচনা করান, সমাজের পক্ষ থেকে জ্ঞানীদের ভাতা দেওয়া হতো, আলমগীরি রচিয়তা বলেন, এযুগে তার লাইব্রেরী থেকে বৃহৎ কোন লাইব্রেরী ছিলো না। জিবুননেসার আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ দক্ষতা ছিল। কোন কোন গ্রন্থে তাঁর কবিতা লিপিবদ্ধ আছে। তবে বর্তমানে ঐ সব গ্রন্থ দুষ্প্রাপ্য।

আমাতুজ জোহরা বাহুবেগম নবাব মতমেনউদ্দৌলাহ মুহাম্মদ ইছহাক খাঁনের বোন ছিল। মুহাম্মদ ইছহাক মুহাম্মদ শাহী আমীরদের নিকট বিশেষ সম্মানের অধিকারী ছিল। মুহাম্মদ শাহের হাতে বাহু বেগমের লেখা পাড়া শুরু হয়। তিনি বিশেষ আদর-যত্নের সাথে বাহুবেগমকে শিক্ষা দান করেন। বাহু বেগম খুবই পাণ্ডিত্বের অধিকারী ছিলে। তাঁর পিতা প্রধান উজিরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি জ্ঞান চর্চায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ঐ যুগের খ্যাত ব্যক্তিরা রাজদরবারের সাথে সম্পর্কিত হত। ঐ যুগের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষণারায়ণ লাহোরী বিশেষ সুখ্যাতির অধিকারী ছিল। তিনি আরবী ও ফার্সী সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শি ছিলেন। মৌলভী মুহাম্মদ মনীর খ্যাতনামা জ্ঞানী ছিলেন। তিনি রাজকোষ থেকে ভাতা পেতেন। তিনি অতিমেধাবী হওয়ার কারণে অনেক গ্রন্থ তার কণ্ঠস্থ ছিল। মুহাম্মদ ফয়েয বখশকে বেগম সম্মানী প্রদান করতেন। তার রচিত গ্রন্থ "ফরহাবখশ ইতিহাস" বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে।

উক্ত গ্রন্থে বেগমের জীবনী উল্লেখ করা হয়। মুহাম্মদ খলিল আঠার পদ্ধতির হস্তলিপিতে পারদর্শি ছিলে। তিনি বেগমের সহায়তায় অনাথ শিশু ও দুস্থ মহিলাদের জন্য পুর্নবাসন কেন্দ্র ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। চাঁদনী বিবি হুসাইন নিযাম শাহ আহমদ নাগরীরর কন্যা ও আলী আদিল শাহের স্ত্রী ছিল। ঐ মহিয়সী মহিলা সংগীত, সাজ ও রাগ শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতির অধিকারী ছিল। এছাড়াও আরো অসংখ্য মহিয়সী মহিলা জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। এ বিষয় বেগম ভূপালের নামও বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 প্রত্যক্ষ ঘটনাবলী আমার সৈনিক জীবনের অবিস্মরণীয় ঘটনাসভন

📄 প্রত্যক্ষ ঘটনাবলী আমার সৈনিক জীবনের অবিস্মরণীয় ঘটনাসভন


জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে নানা ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। যদি আমরা চোখ কান খোলা রেখে, আর যা কিছু দেখি বা শুনি, তা সহজ সরল ভাষায় অন্যের নিকট পৌছে দিলে ভালোভাবে বিবাদ দূর হয়ে যায়। কথিত ঘটনাবলীর চেয়ে বাস্তব ঘটনাবলী বেশী প্রাঞ্জল ও হৃদয়গ্রাহী হয়। আমি যে ঘটনার উল্লেখ করছি, তা আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় উক্ত ঘটনা যেন গতকাল সংঘটিত হয়েছে। ১৯৪৩ সালের আগষ্ট মাসের ঘটনা। ঐ সময় আমি উত্তর দেওনালি এক নম্বর ট্রান্সপোর্টেগ কেন্দ্রের এ্যাডজুটেন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। তখন বেলা প্রায় দশটা হবে। আমার কমান্ডিং অফিসার কর্নেল ক্যরিংয়ের নিকট কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্বাক্ষর করাচ্ছিলাম। ইত্যাবসরে এমন আওয়াজ আসতে শুরু হয়, যেন অনেক লোক একত্রিত হয়ে নারায়ে তকবীর ধ্বনি দিচ্ছে। ধীরে ধীরে এ আওয়াজ আরো নিকটবর্তী হতে শুরু করে। ক্যারিং আমাকে প্রশ্ন করল, ক্যাপটেন গাওহার কিসের হৈচৈ শোনা যাচ্ছে?

আমি জবাব দিলাম, স্যার! মনে হয়, কোন ড্রাফট ষ্টেশনে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে যখন কোন ড্রাফট যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠানো হত, তখন তা ষ্টেশনে পৌঁছার পর এ ধরনের উচ্চস্বরে তকবীর ধ্বনী দেওয়া হত। অভিজ্ঞ বয়োজ্যেষ্ঠ কর্নেল আমার কথা শুনে অস্বীকার করে মাথা নেড়ে বলতে শুরু করে, গাওহার এটা কোন ড্রাফট পৌঁছার তকবীরে ধ্বনী হতে পারে না। তাদের তকবীর বিদ্রোহ ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে। এ কথা বলে তিনি আমাকে আদেশ করেন, আমার জীপ নিয়ে দেখো, তারা কে এবং কোথায় যাচ্ছে? আর কি জন্য তকবীর ধ্বনী দিচ্ছে? আমি জীপ নিয়ে বের হয়ে এসে দেখি, পাহাড় থেকে আগত উত্তর ও দক্ষিণ দিকের সংযোগ সড়কে ছয় সাত শ' সৈনিকের এক অতিবিশৃংখল দল অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় এদিকে আসছে। তারা সবাই মুসলমান সৈনিক। তাদের মধ্যে সাধারণ সৈনিক, কতিপয় পদবী ধারী ও আর কতিপয় কমাণ্ডার রয়েছেন। তারা সবাই উন্মাদ অবস্থায় বক্ষ চাপটিয়ে চুল ছিড়তে ছিড়তে তকবীর ধ্বনী দিচ্ছে, প্রত্যেক সৈনিকের গলায় কুরআন মজীদ ঝুলছে। আর শোভাযাত্রার সম্মুখে রয়েছে এক ফৌজী রেশমী গিলাফে মোড়ানো মাথার উপর কুরআন মজীদ।

আমার জীপ নিয়ে তাদের নিকট পৌছা মাত্র জীপ থামিয়ে তাদের মুখোমুখি হতে চাই। কিন্তু তারা আমার কথা না শুনে পূর্বের মত তকবীর দিতে দিতে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। শোভা যাত্রার সবচেয়ে পিছনে এক সৈনিকের স্বীয় ব্যক্তিগত পোশাক দেখে আমার ধারণা হয় সে, পদবীধারী বা কমাণ্ডার হবে। হয়ত। আমি তাকে বাঁধা দিলে সে থেমে যায়। সে তাদের ব্যাটিলিয়ান সুবেদার ছিল। প্রথম কথা হল, স্বয়ং সে-ও এ শোভা যাত্রায় অংশ গ্রহণ করেছে। তারপর বলল, সরবরাহ কেন্দ্রের কর্নেল সাকাট সাহেব আজ সকালে এক সৈনিকের হাত থেকে কুরআন শরীফ ছিনিয়ে নিয়ে আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এ ঘটনা বর্ণনা করার সময় সুবেদার সাহেবের চোখ দিয়ে অশ্রু নির্গত হতে শুরু করে। আর তার কণ্ঠস্বরও ক্ষীণ হয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে যায়। সে অনেক কষ্টে কথা বলছিল, তার অবয়ব এত বিষণ্ণ ও মলিন ছিলে যে, মনে হয় যেন এ মাত্র তার কোন আপনজনকে দাফন করে এসেছে। সুবেদার সাহেবের আলোচনায় অবস্থার শোচনীয়তা অনুভূত হয়। স্বয়ং আমার মনের অবস্থাও বিচলিত হয়ে উঠে। বুঝতে পারি, আমার অন্তরও বিগলিত হয়ে যাচ্ছে। ক্ষোভে দুঃখে সারা শরীর জ্বরে পুড়ে অংশার হয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু সুবেদার সাহেবকে এ কথা বলছিলাম যে, সুবেদার সাহেব! আমি একজন মুসলমান। এ ব্যাপারে আমার যা করনীয় আমি তাই করব। আর যদি আমি কিছু নাও করতে পারি, তাহলে আপনার সাথে একাত্ম হয়ে যাব।

তাকে এ কথা বলে আমি জীপ ঘুরিয়ে অতি দ্রুত গতিতে আমার ক্যাম্পে গিয়ে পৌঁছি। কর্নেল সাহেব অত্যন্ত ধৈর্য্যহীন অবস্থায় ক্যাম্পের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষা করছিলেন। আমি তাকে অবস্থা অবগত করাই। তিনি আমাকে সাথে যাওয়ার জন্য ইঙ্গিত করে স্বীয় দফতরের দিকে যাত্রা করেন।

তার দফতরে পৌছে তিনি এরিয়া কমাণ্ডার বিগ্রেডিয়ার আইউলিনকে টেলিফোনে সব খবর অবিহিত করেন। বিগ্রেডিয়ার সাহেব ঘটনা বিস্তারিত ভাবে জানার আগ্রহ প্রকাশ করায় তিনি টেলিফোনের রিসিভার আমার হাতে দিয়ে বললেন, ধরুন! টেলিফোন ধরুন! আপনি ক্যাপটেন গাওহারের সাথে কথা বলুন। বিগ্রেডিয়ার সাহেব ভীত হয়ে আমাকে অতি দ্রুত জিজ্ঞেস করেন। আমি যা দেখেছি তা তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিই। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আমাকে জিজ্ঞেস করেন, শোভাযাত্রা কত সময় পর সাব এলাকায় পৌছে যাবে। আমি তাকে বললাম, শোভাযাত্রা এখনো তিন মাইল দূরে আছে। সুতরাং তাদের সাব এলাকায় পৌছাতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগবে। তারপর তিনি এক মিনিট নীরব থাকার পর পুনঃরায় আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার ধর্ম কী? আমি জবাবে বললাম, আমি মুসলমান, কুরআন আমার ধর্ম গ্রন্থ। এ কথা শুনে তিনি আমাকে আদেশ করেন, আমি যেন এক্ষুনি সাব এরিয়া হেড কোয়াটারে চলে যাই। বলতে পারব না যে, এ খবর শোনার পর মন কি যে খুশি হয়েছে। আমি জানতাম, সাব এরিয়া হেড কোয়াটারে এক শিখ মেজর আর এক ইংরেজ অফিসার ব্যতীত আর কোন ভারতীয় মুসলমান অফিসার নেই। উত্তম হল, জনাব সম্বোধন করে টেলিফোন বন্ধ করে দেই। আর আমি কর্নেলকে বললাম, বিগ্রেডিয়ার সাহেব আমাকে সাব এরিয়া হেডকোয়াটারে তলব করেছেন। কর্নেল সাহেব বললেন, এক্ষুণি চলে যাও। তিনি আমাকে এ আদেশ করে কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বললেন, এটা তোমার কঠিন পরীক্ষার সময়। নিজের আত্মসম্মান ও নিজের ব্যাটেলিয়ানের সুনাম রক্ষার প্রতি বিশেষ ভাবে খেয়াল রাখবে। যাও, আল্লাহ তোমাকে কৃতকার্য করুন। আমি অন্য রাস্তায় যখন সাব এরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি এবং পনের মিনিটের মধ্যে ওখানে পৌছে যাই। গিয়ে দেখি সাব এরিয়া ডিফেন্সে প্লাটুন যাতে বেশীর ভাগ হিন্দু ও শিখ সৈনিক ছিল। পেরক কাটার বেল্ট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্লাটুন কমাণ্ডার ছিল এক শিখ জমাদার। তার সাথে পূর্বে আমার পরিচয় ছিল। আমি যখন জীপ থেকে নিচে নামি, তখনই সে আমার নিকট এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, কি ব্যাপার? আমি এলোমেলো জবাব দিয়ে তাকে কাবু করে ফেলি। আর সে নিজে আমাকে সাব এরিয়া কমাণ্ডারদের সাথে সাক্ষাত করানোর উদ্দেশ্যে তার কক্ষে নিয়ে যায়। তার কক্ষের সামনে দাঁড়ানো মাত্রই ভেতর থেকে বলা হয়, ভেতরে চলে এসো।

কক্ষে সাব এরিয়া কমাণ্ডার বিগ্রেডিয়ার ইউনুল সাহেব ছাড়াও দু'তিন জন ইংরেজ অফিসার মেজরের চার পাশে চেয়ারে বসা ছিল। দু'জন মেজর ও এক কর্নেল। মেজর দুজন আমার পূর্ব পরিচিত ছিল। কিন্তু কর্নেল সাহেবের সাথে আমার পরিচয় ছিল না। ইতোপূর্বে তাকে আমি আর কখনো দেখিনি।

আমি বিগ্রেডিয়ার সাহেবকে সামরিক কায়দায় সালাম দিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে যাই। বিগ্রেডিয়ার সাহেব কর্নেল সাহেবের প্রতি ইংগিত করে বললেন, ইনি কর্নেল সাকাট সাহেব। সরবরাহ কেন্দ্রের কমান্ডিং অফিসার। আমি তখন পর্যন্ত তার সাথে এ সংকটময় পরিস্থিতি সম্পর্কে কোন আলাপ করিনি। আমার ইচ্ছা ছিল, যা কথা হবে তা তার সামনে হোক। এখন তুমি নিজে তাকে জিজ্ঞেস করো। এ কথা বলে তিনি আমাকে ইংগীতে চেয়ারে বসার অনুমতি দেন। আমি চেয়ারে বসতে বসতে কর্নেল সাকাটের প্রতি তাকিয়ে বলি, স্যার! বলুন, কি ঘটনা ঘটেছে?

পাঠক! কর্নেল সাহেবের অভিমত তার নিজের ভাষায় শুনুন! আজ সকাল পাঁচটায় আমি কেন্দ্রের রাউন্ডে বের হই। ঐ সময় হালকা হালকা আলো ছিল। আমি যখন পেট্রোল ডিপোর নিকট পৌঁছি, তখন দেখলাম, ডিপোর এক সেন্ট্রী এক পেট্রোলের ড্রামের উপর বসে ছোট এক গ্রন্থ পাঠ করছে। সে ঐ গ্রন্থ পাঠে এত মগ্ন ছিল যে, তার আশপাশ সম্পর্কে তার কোন খবরই ছিল না। আমি এক সেন্ট্রীকে এরূপ অসতর্ক দেখে ভীষণ রাগ এসে যায়। তাই আমি তার হাত থেকে গ্রন্থটি ছিনিয়ে নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করি। আমি স্বীয় ইজ্জতের শপথ করে বলছি, আমার একদম ধারনাই ছিল না যে, এ ক্ষুদ্র গ্রন্থটি তার ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআন হতে পারে। আমি যতদূর জানি যে, কুরআন মস্তবড় গ্রন্থ। আর তা রেশমী গিলাফে মুড়িয়ে মসজিদে রাখা হয়। অতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে ওখানে পাঠ করা হয়। ঐ ছোট গ্রন্থ যা ঐ সৈনিক পেট্রোলের ড্রামের উপর বসে পাঠ করছে, তা কুরআন হতে পারে না। সে যাই হোক, যদি আমার অজ্ঞাতে আমার দ্বারা কোন ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে। তার জন্য আমি ভীষণ অনুতপ্ত ও লজ্জিত। আর আমার কেন্দ্রের সৈনিকদের নিকট সাধারণ মজলিশে ক্ষমা প্রার্থনা করতে প্রস্তুত আছি।

এ পর্যন্ত বলে কর্নেল সাকাট মাথা নিচু করে নীরব হয়ে যায়। তিনি এত বুদ্ধিমত্তার সাথে জবাব দেন যে, তা শুনে আমার ধারণা হয়, অনেক চিন্তা-ভাবনা করে এ জবাব তৈরি করা হয়েছে। আর কর্নেল তার স্বেচ্চাচারীতার উপর পর্দা আবৃত করে নিয়েছে। প্রকাশ্যে কুরআন মজীদের এ অসম্মান ও অবমাননার বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে। পূর্ণ তদন্ত ব্যতীত এ বিষয় এমন কোন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না। যেন পরে আমার মন ও ঈমানের জন্য বোঝা হয়ে না যায়। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করি, এ মুহূর্তে আমার কি করা উচিত? কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর আমি সিদ্ধান্তে নিলাম, খুব সম্ভব কর্নেল সাকাট সত্য কথা বলেছেন। তারপর আমি অন্তরকে শান্ত করে নেওয়া জরুরী বলে স্থির করি।

আমি চেয়ার থেকে উঠে সাব এরিয়া কমান্ডার সাহেবকে সামরিক কায়দায় সালাম করার পর বলি, স্যার আমি নিজে একজন মুসলমান অফিসার। আর যে পবিত্র কিতাবকে অপমান করা হয়েছে, তা আমার নিকটও এতো প্রিয়। তারা যা মাথার উপর রেখে দশ মিনিটের মধ্যে আপনার নিকট ফরিয়াদ নিয়ে আসছে।

সুতরাং এ বিষয়ে কোন পরামর্শ দেওয়া বা কোন ব্যবস্থা গ্রহণে অংশ নেওয়ার পূর্বে আমার মনে হয়, প্রথম মনকে ধীর স্থির শান্ত করে নেওয়া উচিত। কর্নেল সাকাট পবিত্র বাইবেলের উপর শপথ করে তার অভিমতের পুনরাবৃত্তি করে, তাহলে আমার অন্তর শান্ত হয়ে যাবে। আমি তখন শান্ত মনে পরামর্শ দেব। জনতার এ ঝড় থামানোর জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তা করব। আমি দৃঢ় আশাবাদী যে, আমি অসন্তুষ্টি ও বিক্ষোভ উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হব।

আমার এ কথা শোনার পর কমাণ্ডার সাহেব তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে পবিত্র বাইবেল বের করে কর্নেল সাকাটের হাতে তুলে দেন। কর্নেল সাকাট পবিত্র বাইবেল হাতে নিয়ে চুমা দেয়, চোখে ও বক্ষে লাগায়। তারপর তা হাতে নিয়ে শপথ করে বলে, আমি কর্নেল সাকাট মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলার শপথ করে বলছি, আমি যা বলব সত্যই বলব। সব সত্যই বলব, সত্য বৈ মিথ্যা কিছুই বলব না।

এ কথা বলে তিনি তার পূর্বের অভিমতের পূনরাবৃত্তি করেন। পুনরায় পবিত্র বাইবেলকে চুমু দিয়ে, চোখে ও বক্ষে লাগিয়ে টেবিলের উপরে রেখে দেন। আমি প্রথমে কমান্ডার সাহেব ও পরে কর্নেল সাকাটকে সামরিক কায়দায় সালাম করি। তারপর কর্নেল সাকাটের সাথে হাত মিলিয়ে কর্নেল সাকাটকে উদ্দেশ্য করে বলি, কর্নেল সাহেব! এখন আমার অন্তর প্রশান্ত হয়ে গেছে। আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, আপনার অজ্ঞাতে আপনার দ্বারা এ ভুল হয়ে গেছে। এখন এ ব্যাপারে আমার যা কিছু করনীয় আমি তা করব।

আমি বিগ্রেডিয়ার সাহেবকে বললাম, স্যার! আমার জিম্মাদারীতে ডিফেন্স প্লাটুন সমূহকে ফিরিয়ে দিয়ে আসি। যারা আপনার নিকট অভিযোগ পেশ করার জন্য আসছে, তারা এখন বিশ্রাম নিচ্ছে। তারা কোন অসৎ উদ্দেশ্য দিয়ে আসেন নি। বরং একজন আবেদনকারী হিসেবে আপনার নিকট আসছে। ডিফেন্স প্লাটুনদের উপস্থিতি উৎসাহ উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত করে দেবে।

বিগ্রেডিয়ার সাহেব তার (G.S.O.) জি.এস.ও. কে নির্দেশ দেন, যেন ঐ প্লাটুন সমূহকে হেড কোয়াটারে পেছনে কোথাও সরিয়ে নিয়ে যায়। জি.এস.ও ঐ নির্দেশ কার্যকর করার জন্য চলে যায়। তিনি প্লাটুনে পৌছার পর দু'তিন মিনিট হয়েছে। ইত্যাবসরে সৈনিক যুবকরা নারায়ে তকবীর ধ্বনী দিতে দিতে হেড কোয়াটারের চত্তরে এসে উপস্থিত হয়।

উত্তেজিত সিপাহীদের ক্ষোভ ও উত্তেজনা উন্মাদনার সীমা ছড়িয়ে যায়। ছয় সাত শ' সিপাহী যে অবস্থায় ছুটে এসেছে। কেউ কেউ পুরো ইউনিফরম পরিহিত অবস্থায় ছিল। আর কেউ ছিল কেউ শুধু সাধারণ পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছিল। কেউ কেউ সম্পূর্ণ খালি পায়ে ছিল, যারা শুধু পায়জামা ও জামা পরা ছিল। তাদের দেখলে সম্পূর্ণ পাগল মনে হত। যেন তারা এ মাত্র কোন পাগলা গারদ থেকে মুক্ত হয়ে এসেছে।

শোভাযাত্রীদল নারায়ে তকবীর দিয়ে এরিয়া কমান্ডারদের সাথে সাক্ষাত করতে ইচ্ছুক ছিলো। তারা ধারণা করেছিল, কর্নেল সাকাট সাব এরিয়া কমান্ডে পৌঁছে গেছে। কিছু লোক ধ্বনী দিতেই ছিল যে, কর্নেল সাকাটকে আমাদের হাতে ন্যস্ত করা হোক। তখন বিক্ষোভকারীরা হেড কোয়াটারে পৌঁছতে সামান্য বাকী। ইত্যাবসরে বিগ্রেডিয়ার ইউনুস জি,এস, এবং আমি স্বয়ং সামনে এসে পৌছি। তার সামনে বিক্ষোভকারীদের মিছিল চলছে। কমাণ্ডার সাহেবকে দেখে বিক্ষোভকারীরা নীরব হয়ে যায়। বিগ্রেডিয়ার সাহেব হাতে ইশারা করে মিছিল কারীদেরকে তার নিকট ডেকে নিয়ে বসার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মতে সব লোক নীরবে বসে যায়। ঐ নীরবতা পালন অবস্থায় বিলাপের সুরে ক্রন্দন রোল ভেসে আসে।

ইউনুল সাহেব বৃটিশ ইউনিটের অফিসার ছিলেন। না তাতে তার করণীয় কিছু ছিল। আর না তার সৈনিক জীবনে তিনি এরূপ কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। তারপরও তিনি সৈনিকদের দুঃখ-বেদনা ও ভারাক্রান্ত মন দেখে ভীষণ প্রভাবান্বিত হয়ে উঠেন। চেহারায় মনের অবস্থা ফুটে উঠে। তা দেখা কঠিন কাজ ছিল না।

জি.এস.ও. মেজর হেনীন হিন্দুস্থানী সৈনিকদের সাথে সম্পৃক্ত ছিলে। আর তিনি বিশুদ্ধ উর্দু ভাষায় পারদর্শী ছিলে। কমাণ্ডার সাহেব তাকে নির্দেশ দিলেন, দু'জন সৈনিককে সম্বোধন করে বলুন, তিনি ঘটনা অবগত হয়েছেন। আর এ জন্য তিনি এক মুসলমানকে আহবান করেন, যাতে সে আপনাদের দাবী পয়গাম কমাণ্ডার সাহেব পর্যন্ত এবং কমান্ডার সাহেবের পয়গাম আপনাদের নিকট পৌছতে পারে। আর কমান্ডার সাহেব কার্যকরী পরামর্শ দিতে পারেন। ঐ মুসলমান অফিসারের নিকটও কুরআন এতো প্রিয় ও সম্মানিত, যা আপনার নিকট প্রিয় ও সম্মানিত। আপনারা দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, তিনি কোন পক্ষপাতিত্ব বা নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে।

যখন মেজর হেনান সাহেব এ কথা বলেন। তখন কমান্ডার আমার প্রতি ইশারা করে, আমি যেন সৈনিকদের জিজ্ঞেস করি, তারা কমান্ডার সাহেবের সাথে কোন কথা বলবে কি না। আমি মিছিল কারীদের সম্বোধন করে বলি, যদি প্রত্যেকে কথা বলতে চান তাহলে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়ে যাবে। আর তাতে আপনাদের অভিযোগ সঠিকভাবে কমাণ্ডার সাহেব পর্যন্ত পৌছবে না। এ কারণে যুক্তিসংগত হল, আপনারা প্রথমে আপনাদের দায়ীত্বশীল কর্মকর্তাদের তার নিকট পাঠান। তাহলে তারা আপনাদের পক্ষ হয়ে কথা বলতে পারবে। এখানে লক্ষণীয় হল, সৈনিকদের রীতি হলো পদবীধারী সৈনিকরা সর্বদা এই চেষ্টা করে যে, কোন ব্যাপারে যেন তাদেরকে সামনাসামনি হতে না হয়। তাহলে সব দায়িত্ব তাদের উপর ন্যস্ত করে দেওয়া হবে। আর কোন সৈনিকের বিদ্রোহ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির শাস্তি অত্যন্ত কঠোর হয়। আর এ সমস্যা তো মারাত্মক বিদ্রোহের সূচনা করতে পারে।

এটা হলো মুসলমানদের ঈমানের দাবী ও কুরআনের প্রতি আগাধ ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ। যেমন, আমি বলছি, পদবীধারী কর্মকর্তারা আগে যাবে। তখন এক মিনিট অপেক্ষা না করে দু' জমাদার ও দু'জন সুবেদার সামনে এগিয়ে গিয়ে সালাম করে নীরবে দাঁড়িয়ে যায়। তখন আমি যুক্তিসংগত মনে করি যে, কিছু নিম্ন পদস্ত কর্মকর্তাকেও সামনে এগিয়ে দেওয়া হোক। আমি বললাম, আপনারা আরো ক'জন সামনে এগিয়ে যান। আমার নির্দেশ শুনে দশ পনের জন হালদার ও নায়েক সামনে এগিয়ে যায়। এন, সি.ও সুবেদার সাহেবকে বললাম, তারা আপনার নিকট তাদের অভিযোগ পেশ করতে চায়, সুবেদার সাহেব প্রায় পূর্বের কথা পুণরাবৃত্তি করে, যা কর্নেল সাকাট বলেছিল।

তিনি অবস্থা বর্ণনা করার পর বললেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই যে, কর্নেল সাহেব নিয়মানুবর্তীতার কঠোর অনুসারী। আর আমরা লিডার ও পদবীধারীরাও নিয়মানুবর্তীতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য পুরোপুরি তাদের সাহায্য করতে প্রস্তুত। কিন্তু আক্ষেপের সাথে বলতে হয়, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কর্নেল সাহেব নিজে নিজের নিয়মানুবর্তীতাকে ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। কর্নেল সাহেবের জন্য উচিত ছিল, সৈনিককে চার্জসিট করে দফতরে ডেকে এনে তাকে জবাবদিহী করা। একান্তই প্রয়োজন হলে তাকে শাস্তি দানের ব্যবস্থা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি উত্তেজিত হয়ে ঐ যুবকের হাত থেকে পবিত্র কুরআন মজীদ ছিনিয়ে নিয়ে অপমান করেছেন। আপনারা সকল কর্মকর্তা ভালো করেই অবগত আছেন যে, আমাদের সব সৈনিক শিক্ষিত না হলে সকাল বেলায় কোন অঘটন ঘটার প্রশ্ন দেখা দিত না। এটাও আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অপূর্ব মুজিজা যে, সম্পূর্ণ অজ্ঞ অশিক্ষিত লোকও শিশুকালে তা পাঠ করে নেয়। তারপর তা সারা জীবন ধারাবাহিকভাবে পাঠ করতে থাকে। কর্নেল সাকাট সাহেব ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তাদের অন্তর টুকরো টুকরো করে দিয়েছেন। নিয়মানুবর্তীতা রক্ষার উদ্দেশ্যে আমি আপনি সবাই নিজ নিজ পরিবারের জীবন উৎসর্গ করে তা রক্ষা করতে সদা প্রস্তুত। কিন্তু কোন বিষয় আল্লাহ-রাসূল ও কুরআনের সাথে সম্পর্কিত হলে, তাতে আমরা নিয়মানুবর্তীতার পরোয়া করব না। যদি সাকাট সাহেব আমাদের সামনে আমাদের সন্তানদের হত্যা করে ফেলত, তাহলেও আমরা নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ হতে দিতাম না। কিন্তু তিনি আমাদের পবিত্র গ্রন্থের অপমান করেছেন। আমরা তা কোন ভাবে সহ্য করতে পারছি না।

কেননা আমাদের নিকট কুরআন মজীদ সারা পৃথিবী থেকেও মহামূল্যবান ও প্রিয়। আমরা আমাদের সর্বস্ব ত্যাগের বিনিময়েও এ গ্রন্থের সম্মান সর্বোচ্চ রাখতে প্রস্তুত। আমরা ভাল করেই জানি, বিদ্রোহের শাস্তি বিশেষ করে যুদ্ধের সময় মৃত্যুর চেয়ে কম নয়। কিন্তু এ পবিত্র গ্রন্থের সম্মান রক্ষায় যদি আমাদের গুলি করে চালনীর মত ছিদ্র করে দেওয়া হয়, যদি আমাদের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, তাহলেও আমরা একটু উহ আহঃ পর্যন্ত করব না। আমরা বিদ্রোহী হয়ে কমাণ্ডার সাহেবের নিকট আসিনি বরং আমরা আবেদনকারী হিসেবে আগমন করেছি। আমরা চাই যে, কমাণ্ডার সাহেব আমাদের ক্ষত বিক্ষত অন্তরে ব্যাণ্ডেজ লাগিয়ে দিন।

আর তা শুধু এভাবে সম্ভব হতে পারে যে, কর্নে সাকাট সাহেবকে তার জঘন্যতম অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া হোক। আমরা আরও স্পষ্ট করে বলতে চাই, যদি তাকে তার অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া না হয়, তাহলে আমরা প্রতিটি লোক এর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি যে, ঐ সাকাট সাহেব যেখানে থাকুক তাকে খুঁজে বের করে এনে তার ঘাড় ছিড়ে ফেলব। যদি এর জন্য আমাদেরকে গুলির লক্ষ্য স্থল নির্ধারণ করা হয়, তাহলে আমরা তা গ্রহণ করার জন্য স্বেচ্ছায় বক্ষ উন্মুক্ত করে দেব। আমরা সবাই এর জন্য প্রস্তুত। সুবেদার সাহেবের এ তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণের প্রতিটি শব্দ কমাণ্ডার সাহেবকে ইংরেজী ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তিনি এতে ভীষণ প্রভাবান্বিত ও হতবিহ্বল হয়ে যান। তিনি এ ঘটনার শেষ পরিণতি ভালো ভাবে অবগত ছিলেন। সৈনিকদের বিদ্রোহ এক জিনিস। তা যুদ্ধ কালিন সংকটময় পরিস্থিতির চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমি যুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তেও তত বিচলিত হইনি। আমি নীরব হয়ে তার উপদেশের অপেক্ষা করতে থাকি। তিনি কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আমাকে বললেন, তুমি তাদেরকে কি জবাব দিতে চাইছ, তা তুমি ভালো করে চিন্তাভাবনা করে ঠিক করে নাও।

সত্য কথা বলতে কি এ সম্পর্কে আমার কোন প্রস্তুতিই ছিল না। কিন্তু হাকিমের হুকুম আকস্মিক মৃত্যু সমতুল্য। আমাকে উপস্থিত কিছু বলতে হয়েছে। সাকাট সাহেবের শপথ আমার অন্তরের বোঝা হালকা করে দিয়েছে। আমি চাই পরিস্থিতি ভালোভাবে নিরসন হোক। কমাণ্ডার সাহেব তাতে যতো প্রভাবন্বিত হোক না কেন। কিন্তু ঐ স্পষ্ট বিদ্রোহ কোন ভাবে সহ্য করা যায় না। আর সম্ভবতঃ যদি তিনি এ ধরনের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যাতে ঐ সর্দার পদবীধারী ও সাধারণ সৈনিকদের কোন ক্ষতি হয়ে যায়। এ কথা চিন্তা করে আমি এ চেষ্টা করতে থাকি যে, পরিস্থিতি যেন কোন ভাবে আরো সংকটময় না হয়ে যায়। আমি উপস্থিত সকলকে সম্বোধন করে বলি,

হে সর্দার ও পদবীধারী ও সৈনিক জওয়ানরা! আজ এক মুসলমান অফিসার হিসেবে গর্বে আমার মাথা উঁচু হয়ে যায়। আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছি যে, আপনারা কুরআন মজীদের সম্মান রক্ষায় নিজেদের মাথা হাতে নিয়ে এসে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছেন, তার কারণ, এ পবিত্র কিতাব আমাদের সকলের নিকট দুনিয়ার সবকিছু থেকে অতিপ্রিয়। আমি মুসলমান অফিসার হওয়ার কারণে কমাণ্ডার সাহেব আমাকে এখানে আসার আহবান জানিয়েছেন, যাতে আপনাদের আবেদন পূর্ণ করা সম্ভব হয়। যদি আমার কথা আপনাদের বিশ্বাস না হয় তাহলে কমাণ্ডার সাহেবকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। এখনো দশ মিনিট সময় আছে। এ দশ মিনিট আমি এ সম্পর্কে আপনাদের সাথে আর কোন কথা বলতে চাই না। যাবত না আমার মন শান্ত হয়। আমি আপনাদেরকে পুনরায় নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার অন্তর শান্ত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি নীরবতা পালনার্থে কোন কথা বলতে চাই না।

কিন্তু যা হওয়ার তা যুক্তিসংগত ও বাস্তব হতে হবে। উত্তেজিত অবস্থায় কোন সমাধান বের হয়ে আসবে না। এ কাজেই আমি আপনাদের নিকট আবেদন করছি, আপনারা সুশৃঙ্খল অবস্থায় প্রত্যেকে স্ব স্ব ইউনিটে ফিরে চলে যান। আজ সন্ধ্যা পাঁচটায় আপনাদের ইউনিট লাইনে কমাণ্ডার সাহেব সরাসরি বৈঠক আহবান করবেন। ঐ বৈঠকে কর্নেল সাকাট সাহেবকে আপনাদের সামনে হাযির করা হবে। আর ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার পর কমাণ্ডার সাহেব কর্নেল সাকাটের বিরুদ্ধে যে, ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন তা আপনাদের সামনে পেশ করা হবে। আর আমি ও চেষ্টা করবো যে, কোন মর্যাদাবান, জ্ঞানী, যোগ্য, আলেম, যার সেনা বাহিনীর সাথে কোন সম্পর্ক নেই, এমন ধরনের একজন যোগ্য আলেমকে কমাণ্ডার সাহেবকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য হাযির করবো। আমি একজন মুসলমান অফিসার হিসেবে আমার উপর আপনাদের আস্থা রয়েছে। তথাপি আপনাদের পূর্ণ নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আপনাদের অভিযোগের পুরোপুরি সন্তোষজনক মীমাংসা করা হবে। আর তাতে কোন প্রকার পক্ষপাতিত্ব করা হবে না যে, আল্লাহ-রাসূল ও শ্বাশত পবিত্র কিতাবের বিপরীত হবে, এ ব্যাপারে আপনাদের আমার উপর আস্থা আছে তো? আমি আশাবাদী যে, আপনারা আমার উপর আস্থা রেখে নীরবে স্ব স্ব ইউনিটে ফিরে যাবেন? তখন সকলে এ যোগে বলে উঠে, হ্যাঁ আমরা আপনার উপর পূর্ণ আস্থাশীল।

আমি তাদের এ হ্যাঁ সূচক জবাব শুনে ভীষণ খুশি হই। আর তাৎক্ষণিকভাবে সৈনিকদের অফিসার হয়ে যাই। ফৌজি আন্দাজে আমি আদেশ করি, Fallin অর্থাৎ সারীবদ্ধ হয়ে যাও। আমার আদেশ শুনে সৈনিক জওয়ানরা তাৎক্ষণিকভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আমি পুনরায় বললাম, সুবেদার সাহেব Talk over the Parade অর্থাৎ সুবেদার সাহেব আপনার প্যারেড বুঝে নিন। সুবেদার সাহেব তাৎক্ষণিকভাবে প্যারেডের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। আমি মার্চ করার আদেশ দিলাম।

সাব এরিয়া কমান্ডার সাহেব আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ক্যাপটিন গাওহার আমি চাই না যে, এরা সবাই মার্চ করতে করতে সাত মাইল ফেরৎ যাক। সুবেদার সাহেবকে আদেশ দিন। তিনি যেন তাদের সবাইকে গ্যারিসন প্রেক্ষাগৃহের পাশে নিয়ে যায়। ওখানে আধা ঘণ্টার মধ্যে ফৌজি ট্রাকের কনভয় পৌঁছে যাবে। আর তদেরকে স্ব স্ব ইউনিটে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে তাদেরকে ঠাণ্ডা শরবতের ব্যবস্থা করে দেবেন।

এটা হল এক অনভিজ্ঞ ক্যপ্টেন আর এক বয়োবৃদ্ধ অভিজ্ঞ বিগ্রেডিয়ারের চিন্তা-ধারার পার্থক্য। ঐ ক্লান্ত পরিশ্রান্ত গোঁজামিলের পোশাক পরিহিত অস্ত্রশস্ত্রহীন সেপাহীগণ কোন ভাবেই মার্চ করে সাত মাইল দূরে স্ব স্ব ইউনিটে পৌঁছতে রাজী ছিল না। আমি সুবেদার সাহেবকে বললাম, আপনি প্যারেডকে গ্যারিসন প্রেক্ষাগৃহ পর্যন্ত নিয়ে যান। ওখানে পৌছার পূর্বে প্রেক্ষাগৃহে তাদেরকে পান করার জন্য ঠাণ্ডা শরবত দেওয়া হবে।

এ কথা শুনে সৈনিক জওয়ান খুব খুশি হয়ে যায়। সকলেই এরিয়া কমাণ্ডার জিন্দাবাদ ধ্বনী দিতে শুরু করে। আত্মভোলা সিপাহীরা কীভাবে অতি দ্রুত খুশি হয়ে যায়। যদি তাদের ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত করে উত্তেজিত করা না হয়, তাহলে তাদের আনুগত্য যত বড় ধরনের বিপদই হোক বিনষ্ট করতে পারবে না。

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 বিষয় ভিত্তিক প্রশ্নরচনা

📄 বিষয় ভিত্তিক প্রশ্নরচনা


বিদ্যা অর্জন প্রচার ও প্রসার মুসলমানদের জন্য ধর্মীয় অবশ্য কর্তব্য। জ্ঞানের প্রসার ও প্রচারের প্রকৃত মাধ্যম হল লেখনী। সুতরাং হুযুর (সাঃ) এর উপর অবতীর্ন সর্বপ্রথম ওহীতে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন,
"পড়ুন। এবং আপনার প্রভূ সর্বাপেক্ষা বড় দাতা। যিনি কলম দ্বারা লেখা শিক্ষা দিয়েছেন।"

কিতাবের অস্তিত্ব বিদ্যমান না হলে জ্ঞানের বিস্তার লাভ কোন মতেই সম্ভব হতো না। কেবল মুসলমানগণই বিষয় ভিত্তিক মহামূল্যবান গ্রন্থাবলী রচনা করে, শুধু তাই নয় বরং অন্যান্য ভাষায় গ্রন্থাবলীও অনুবাদ করে তাদের জ্ঞান প্রচারের সূচনা করে। মূদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পূর্বে বিষয় ভিত্তিকগ্রন্থসমূহ এভাবে বিদ্যমান রাখা হত যখনই কোন গ্রন্থ রচনা সমাপ্ত হত, তখন এর হাতে লেখা বিশুদ্ধ কপি অতি সযত্নে তৈরি করে বাজারে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হত। গ্রন্থ প্রস্তুতির পদ্ধতিতে কাগজ প্রস্তুত, লিখন পদ্ধতি, রঙ্গীন সাজগোজ ও বাঁধাই করার বিষয় উদ্ভাবন করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00