📄 অন্যান্য গ্রহে প্রাণীর অস্তিত্ব
আপনি মনে করছেন, যদি অন্যান্য গ্রহের প্রাণী সামনে এসে যায়, তাহলে কি হবে? আমি বলব কিছুই হবে না। কুরআন-হাদীসে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, অন্য কোন গ্রহে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নেই বরং বিশ্বজাহানের পালনকর্তার মর্জি মাফিক যদি (এটা দুর্বল বর্ণনা হওয়া সত্ত্বেও) গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা হয়, যে সব বর্ণনায় অন্যান্য দুনিয়ার উল্লেখ করে বলা হয়েছে অর্থাৎ এ জগতের আদমের মত অন্য জগতে আদম রয়েছে। আর তোমাদের নবীর মত নবী রয়েছে। তার পরও এ কথা কোন মুসলমানের জন্য বিস্ময়কর হবে না, (কই এটা কি কারো ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে)। কোথায়ও কি কোন হিতাহিত জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী বিদ্যমান হয়ে গেছে, হতেও তো পারে। আল্লামা ইকবাল রহ. এ কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন-
"প্রত্যেক জগতে কোলাহল হয়। আমাদের জন্য বিশ্বজগতের রহমত।"
কেউ কেউ মনে করেছেন, বিভিন্ন গ্রহে প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর তারা তাদের জীবনকাল অতিবাহিত করে স্ব স্ব হাশর নশরের মনজিল অতিক্রম করে চলে গেছে। আর অনুরূপভাবে কোন কোন গ্রহে ভবিষ্যতে প্রাণীর অস্তিত্ব বিদ্যমান হবে। এটা এক অভিমত। এক অভিমত হল, খোদ ঐ জমিনের বুদ্ধিমান জীবদের জীবন যাপনের বর্তমান যুগ প্রথম যুগ নয়। এর পূর্বেও যুগ অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, এ সব হলো অনুমান।
এটাও প্রকাশ আছে যে, এ পর্যন্ত আমাদের এ সৌরজগতে অবস্থিত গ্রহ সমূহে নিশ্চিত মানব অস্তিত্বের কোনো চেরাগ বিদ্যমান পাওয়া যায়নি। এর বাইরের সৌরজগতে পৌছার জন্য এ মানব জীবন যথেষ্ট নয়। এর পরের সৌরজগতে পৌছার জন্য মানব জীবন যথেষ্ট নয়। মোটকথা যে দ্বীনদাররা নিজেদের চেয়ে কমপক্ষে আরো দু'প্রকার হিতাহিত জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী অর্থাৎ ফেরেশতা ও জ্বিনদের অস্তিত্ব পূর্বে স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের জন্য চতুর্থ আরেক এক প্রকার প্রাণীর অস্তিত্ব স্বীকার করা কঠিন কোন বিষয় নয়। আর তারা অন্য কোন প্রকার প্রাণীর আবির্ভাবে বিস্ময়ে হতবাক হবে কেন? এ ধরনের সৃষ্টিজীব তো তাঁদের খোদার শ্রেষ্ঠত্ব ও তাঁর অনাদি অনন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের এক নিদর্শন।
📄 মুসলমান সৈনিকের মর্যাদা
আমি এক পেশাদার সৈনিক পুত্র। আমার পিতা আমাকে শুধু দক্ষ সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলেননি বরং আমাকে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান শিক্ষা দান করেছেন। আমার শিক্ষার মূলভিত্তি ছিল কুরআনের মৌলিক শিক্ষার ওপর। যার কারণে পরবর্তী জীবনে আমি ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে সক্ষম হয়েছি। কুরআনের অনুশীলন আমাকে অনুধাবন করতে শিখিয়েছে যে, এ পবিত্র কিতাব মহান আল্লাহ তা'আলার মহা পয়গাম হিসেবে ঐ জাতির জন্য আবির্ভূত হয়েছে, যা কুফরের অসংখ্য শক্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর সৈনিক হয়ে বক্ষ উন্মুক্ত করে দিতে পারে। যাতে পৃথিবী থেকে ফেতনা-ফ্যাসাদ অশান্তি নিরাপত্তাহীনতা ও অন্যায়-অত্যাচার সমূলে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
আমি প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশের পক্ষে জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। জাপানীদের সাথে আমার কোন শত্রুতা ছিলো না, আর না আমার অন্তরে ব্রিটিশের জন্য কোন প্রেম-প্রীতি ভালবাসা ছিল যে, তার স্বার্থে আমি আমার ও আমার নও জওয়ানদের জীবন বার্মার প্রান্তরে ধ্বংস করে দেব। কিন্তু মুসলমান সৈনিকের যে কর্তব্য, তা আমাকে বাধ্য করেছে। কারণ, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা বা বিশ্বাসঘাতকতা করা মুসলমান সৈনিকের জন্য শোভনীয় নয়। অবশ্যই সন্দেহ ছিল, এ বাহিনী আমার নিজের নয়। আর এটা আমার স্বদেশও নয় যে, এটাকে আমি কুরআনের দেশ বলব। তদুপরি আমাকে ইংরেজ, শিখ, ডোগরা, হিন্দু, রাজপুত, জাঠ ও গুর্খা প্রভৃতি সৈনিকদের উপর প্রমাণ করতে হবে যে, মুসলমানের কর্তব্য কত সমুন্নত ও প্রসংশীত এবং অন্যান্য জাতি থেকে কতটা ব্যতীক্রম।
আমি মেজরের দায়িত্ব পালনে আমার ব্যাটিলিয়ানের এক কোম্পানীকে কমাণ্ড করছিলাম, আমার বিগ্রেড (১১৪ নং সপ্তম ইনফেন্টারী ডিবিশন) বার্মায় জাপানী বাহিনীর দুই বিগ্রেডের সীমানায় আটকা পড়ে যায়। সামনে অগ্রসর হওয়ার বা পেছনে সরে যাওয়ার সব রাস্তাই বন্ধ ছিল। আমি এক উঁচু পাহাড়ের টিলায় আমার কোম্পানীর পজিশন নির্ধারণ করি। তা ধ্বংস করার জন্য জাপানী বাহিনী পুরো বিগ্রেড দিয়ে আক্রমণ চালায়। যদি আমার বিগ্রেড ধ্বংস হয়ে যেত, তাহলে জাপানী বাহিনী আমার বিগ্রেডের হাড়মাংস পিষে ফেলত। আমি পুরো আট দিন আট রাত জাপানী বাহিনীর জন্য এ রাস্তা বন্ধ করে রাখি। আর তাদের আক্রমণ সফল হতে দেইনি। আমার বিগ্রেড ঘেরাও থেকে বের হয়ে আসে। এভাবে আমি অন্যান্য জাতির উপর মুসলমানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছি। এ জন্য আমাকে সামরিক তৃতীয় ক্লাস উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ পুরো উপাধিতে Battle of Box নাম করণ করা হয়।
অতঃপর আমরা নিজ দেশে নিজ বাহিনী গঠন করি। ১৯৪৭-৪৮ সালে আমি প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে যোগদান করি। কিন্তু তা ছিল বিরাট পরীক্ষার সময়। সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালের সকাল বেলা যখন কুফরের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা কুরআনের দেশকে ধ্বংস করার বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে আসছিল। পথে যেখানে সমূদ্র প্রতিবন্ধক ছিল তা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে আসছিল। কিন্তু এই কুফরী শক্তি কচু ক্ষেতের কয়েক গজ পথ অতিক্রম করে সামনে আসতে সক্ষম হয়নি। এটা মুসলমান সৈনিকের শক্তির মুজিযা ছিল যার রক্তে কুরআনের যুদ্ধবিদ্যা সচল করে রেখে ছিল, নতুবা এক লাখ বাহিনীর আক্রমণকে হাজারের কম সংখ্যক বাহিনীর পক্ষে কি করে তাদের দমিয়ে রাখা ও প্রতিরোধ করা কি করে সম্ভব? আমি সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালের সেই সকালের কথা কখনো ভুলতে পারব না।
কারণ, আমার সামনে মাটি ও খুনের এক মহা তাণ্ডব হয়ে গেছে। কুফরের এ ধ্বংসযজ্ঞ পাকিস্তানী মুসলমানদের জন্য বিরাট এক পয়শাম নিয়ে এসেছে। এটা এক কার্যকরী উপদেশ ছিলো, যা কুরআনের পবিত্র পৃষ্ঠাসমূহ আমাদের সামনে রাখা ছিল, আমি কুরআনে যা পাঠ করেছি, তা আমাকে আমার অফিসার ও নওজোয়ানদের বাস্তবায়ন করে দেখাতে হয়েছে।
জনৈক ইউরোপীয় দার্শনিক বলেছেন, "যুদ্ধ মানুষের জন্য ধ্বংসাত্মক অভিশাপ বয়ে আনে। কিন্তু কোন কোন জাতির জন্য এটা মহাকল্যাণকর প্রমাণ হয়। এর ধকল ছাড়া জাতি সমূহ নিজের কর্তব্য ভুলে গিয়ে তার সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। যুদ্ধ ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করে দেয়।" ৬ সেপ্টেম্বর সকালে যখন আমাদের তরবারী কাফিরদের তরবারীর সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। তখন আমি ঐ মুহূর্তকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করি। কেননা মিল্লাতে পাকিস্তানকে ডোল পিটিয়ে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলা কুফরের আক্রমণকে মাধ্যম বানিয়েছেন। আমি অঙ্গীকার করে বলছি, আমার অন্তরে আদৌ মৃত্যুর ভয় ছিলো না। অবশ্য এ ভয় ছিল যে, পাকিস্তানের মূল ভূ-খণ্ডে আঘাত হানার জন্য শত্রুরা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। আর আমি পাকিস্তানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছি। শত্রুর মোকাবিলায় আমার ডিভিশনের শক্তি এতো দুর্বল ছিল যে, একজন সৈনিককে শত্রুপক্ষের দশজনকে প্রতিরোধ করতে হয়েছে। আর একটি ট্রেংককে দশটি ট্রেংকের মুকাবিলা করতে হয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য এ একটা উপায় ছিল। আমার ভয় ছিল যে, আমাদের অফিসার ও সৈনিকদের এতো দিন পর্যন্ত শুধু যুদ্ধের অনুশীলন করতে হয়েছে। তাতে মৃত্যুর ভয় ছিল না, না জানি তারা জানের ভয়ে ভীত হয়ে পেছনে সরে পড়ে। কুরআনের ভূ-খণ্ডের ইজ্জত-সম্মান আমার ডিভিশনের উপর ন্যাস্ত ছিল। এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়ংকর দায়িত্ব। কিন্তু দুশমনের গোলার প্রথম আঘাতের জবাবে আমি আমার ডিভিশনের মোর্চাসমূহ থেকে নারায়ে তাকবীর-আল্লাহ আকবার ধ্বনি দিতে শুরু করি। আর ঘোষণা করতে থাকি যে, পাকিস্তানি ভাইয়েরা! আজ বে-ইজ্জতী হতে চাই না। তখনই আমার অন্তর থেকে সকল প্রকার ভয়ভীতি ও সন্দেহ দূর হয়ে যায়। ঐ তাকবীর ধ্বনীগুলো আমাকে কুরআনের এ আহবান শোনাতে শুরু করে যে,
قَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ
অর্থ: আর তাদের সাথে লড়াই করতে থাক, যাবত না কুফরী মিটে যায় আর পুরো দ্বীন আল্লাহ তা'আলার হয়ে যায়।
আল্লাহর সিপাহীরা ঐ কর্তব্য ও ঐ উদ্দীপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। যার উৎস হল, কুরআন মজীদের এ ঘোষণা, আল্লাহ তা'আলার সিপাহীরা কুরআনের এক একটি শব্দের জন্য শত শত রক্ত বিন্দু উৎসর্গ করেছিল। আমাদের সামনে ছিল কুরআনী শিক্ষা অর্থাৎ পাক বাহিনীর শিক্ষা ব্যবস্থা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হয়েছে। কিন্তু এ পরিবর্তনের মূল বুনিয়াদ হলো কুরআনের ঐ শিক্ষা, যা কুরআন ঘোষণা করেছে।
فَإِمَّا تَشْقَفَنَّهُمْ فِي الْحَرْبِ فَشَرِدُ بِهِم مَن لعلهم يذكرون
অর্থঃ সুতরাং যদি তোমরা তাদেরকে কোন যদ্ধে পেয়ে যাও, তবে তাদেরকে এমন ভাবে হত্যা করো, যা দ্বারা তাদের পশ্চাতে যারা আছে তাদেরকে বিতাড়িত করো, এ আশায় যে, হয়ত তাদের শিক্ষা হবে। (আনফাল -৫৭)
এ শ্বাশত ঘোষণা অনুযায়ী আমার দৃষ্টি ছিল দুশমনের পেছনের অংশের প্রতি। যেমন ছিল তাদের প্রথম অংশের প্রতি। আমার ধারণা ছিল, দুশমনের পেছনের অংশ ভীষণ ভারী ও শক্তি শালী হবে। আমি অনেক দূর থেকে গোলা নিক্ষেপ করি। আর পাক যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করা হয়। সর্বপ্রথম আমি যখন পাক যুদ্ধবিমানের সাহায্য চাই, তখন আমার ধারণা ছিল না যে, আমাদের এত ক্ষুদ্র বিমান বাহিনী দুশমনদের ঐ প্রচণ্ড বিমান হামলা প্রতিহত করতে পারবে। দুশমনের বিমান এবং অন্যান্য আস্তানায় ও আক্রমণ চালাতে হবে। আর পাক বাহিনীকে সহায়তা ও করতে হবে। তাদের সবকিছু দেখা শোনাও করতে সাহসী হবে। ভারতের বিশাল বিমান বাহিনীর আক্রমণও প্রতিহত করতে হবে। কিন্তু আমাদের সাহসী বোমারুদের প্রথম উড্ডয়নই কাজে আসে। তখনই বোমারুরা কুরআনের প্রশিক্ষণ পুরোপুরি দেখিয়ে দেয়।
আমাদের ঐ বোমারুরা আর দুরপাল্লার কামানের গোলা সমূহ দুশমনের পেছনের অংশ আর আমাদের জানবাজ অফিসার ও চৌকোস নওজওয়ানরা দুশমনদের দুর্বল করে দেয়। ঐ সময় কুরআন মজীদের এক ঘোষণার যুদ্ধের ময়দানে পুনরাবৃত্তি করা হয়। যা আমাদের রণকৌশলের প্রশিক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অত্যাবশ্যক অংশ ছিল। মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা হল,
وَالْعَادِيَاتِ ضَبْحًا فَالْمُورِيَاتِ قَدْحًا ....... فَوَسَطَنَ بِهِ جَمْعًا
অর্থঃ শপথ ঐ অশ্বসমূহের! যেগুলো দৌড়ে এমতাবস্থায় যে, সেগুলোর বুক থেকে আওয়াজ বের হয়। অতঃপর পাথর সমূহ থেকে আগুন বের করে খুরের আঘাতে মেরে। অতঃপর প্রভাত হতে লুঠতরাজ করে। অতঃপর ঐ সময় ধূলি উড়ায়। অতঃপর শত্রুর সৈন্যদলের মধ্যে প্রবেশ করে।
আমরা যুদ্ধের ময়দানের ধূলোবালি কাজে লাগিয়ে উপকৃত হই। এটা ৭/৮ সেপ্টেম্বরের রাতে প্রথম প্রহরের ঘটনা। আমি অবগত হয়েছিলাম, দুশমনের কোমর এ পর্যন্ত ভেংগে গেছে। তারা হতাশ ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছে। এমনকি প্রথম হামলায় যারা বেঁচে গেছে, তারা পুনরায় একত্রে সমবেত হয়ে আবার হামলা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। আমরা তখন ধূলাবালি ও ধোঁয়ার কারণে দুশমনদের শক্তি সঠিক আন্দাজ করতে পারিনি। অবশ্য আমাদের ধারণা ছিল তাদের তুলনায় আমাদের শক্তি ও জনবল অত্যন্ত কম। আমাদেরকে এ শক্তি দিয়েই লাহোরকে রক্ষা করতে হবে। আমি চিন্তা করি যে ভাবে ধূলাবালির কারণে যেভাবে দুশমনদের দেখা সম্ভব হচ্ছে না, এমতাবস্থায় আমাদের রণকৌশল কি হবে। আমি বিগ্রেডিয়ার কাইউম শের ও বিগ্রেড আফতাব আহমদকে উপদেশ দিলাম, তাদেরকে প্রতিরোধমূলক মোর্চাগুলোকে দুর্বল না করে নূন্যতম শক্তি দিয়ে রাতের অন্ধকারে দুশমনদের প্রতি যথাসম্ভব কঠিন আক্রমণ চালাতে হবে। আর এত পরিমাণ ধূলা উড়াবে যেন দুশমন আসল শক্তি ধারণা করতে না পারে। শুধু তড়িৎগতিতে কঠোর আক্রমণ করে দুশমনদের হতবিহ্বল করে তাদের ঘেরাও করে ফেলতে হবে।
৮ সেপ্টেম্বর সকালে আমাদের হাতেগোনা কয়েক জন যুবক। আর গুটি কয়েক ট্রেংক আরোহী চৌকস জানবাজ অফিসাররা কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী ধূলা উড়িয়ে শত্রু ব্যূহের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তাদেরকে এমনভাবে নির্মূল করে যে, শত্রু সীমা অতিক্রম করে কয়েক মাইল ভিতরে প্রবেশ করে নিজেদের ক্যাম্প স্থাপন করে। এটা ছিল পবিত্র সময় যখন আমাদের অফিসার ও জওয়ানরা নারায়ে তাকবীর ধ্বনী দিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে যে, আমরা পাকিস্তানের বক্ষকে কুফরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। আল্লাহর সিপাহীরা কুরআন মজীদের ঐ ঘোষণাও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে যে, যুদ্ধবন্দী ও অসহায় লোকদের প্রতি অস্ত্র তাক করবে না। যখন তোমরা কেউ দুশমনদের হাতে বন্দী হয়ে যাবে, তখন নিজেদের গোপনীয় রণকৌশলের কথা প্রকাশ করবে না। এখন আমি এক মজার ঘটনা পেশ করছি। ঘটনা হল, দুশমনদের কতিপয় ব্যক্তি যখন আমাদের হাতে বন্দী হয়ে যায়, তখন তারা কেঁদে কেঁদে বলছিল, আমদেরকে গুলি করে মেরে ফেলুন। কেননা আমাদের বলা হয়েছে, পাকবাহিনী হিন্দু সৈন্যদেরকে হিংস্র প্রাণীর মত জীবিত খেয়ে ফেলে। তখন আমাদের এক কোম্পানীর কমাণ্ডার মাহবুব মালিক জনৈক ভারতীয় বন্দী সৈনিককে জবাব দিলেন, আমার ভাইয়েরা! আমরা অবশ্যই গোশত খাই, তবে হালাল প্রাণীর।
বন্দী শত্রুদের সাথে পাকবাহিনী তাদের অলীক সন্দেহের বিপরীতে ভ্রাতিত্ব সুলভ আচরণ করে। আহতদের রক্ত দানের ব্যবস্থা করে। তাদেরকে তৃপ্তি সহকারে আহার দেওয়া হয়। আমাদের এক ব্যাটলিয়ান কমাণ্ডার তাসদিক হোসাইন ভারতের বিরাট এক এলাকা দখল করে নেয়, সেখানে হাজার হাজার হিন্দু, শিখ, বৃদ্ধ নারী ও শিশুরা ছিল। কর্নেল তাসদিক তাদের শুধু নিরাপত্তাই দেননি বরং তাদেরকে নিজেদের রেশন পর্যন্ত দিয়ে দেন। অথচ তার নিজের সৈনিকদের রেশনের বিপুল পরিমাণ ঘাটতি ছিল। আর ঐ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে শশা ও ক্ষিরা উৎপন্ন হত। তিনি তা ভালোভাবে দেখাশোনা করার জন্য কতিপয় নওজওয়ানকে নিয়োজিত করেন।
গোলাগুলি বন্ধ হওয়ার পর তিন চার জন ভারতীয় অফিসার, তাদের একজন হিন্দু সি.এইচ.পি. অফিসারও ছিল। তারা আমাদের ক্যাম্পে এসে বলে, এ গ্রামের লোকজন কর্নেল তাসাদিকের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর পদচুম্বন করতে চায়। তারা বলে মুসলমানদের আন্তরিক উদারতার কথা ইতিহাসে পড়েছি এবং শুনেছি, তা এখন স্বচোখে দেখতে চাই। এ ঘটনা হয়ত আপনারা সংবাদপত্রে পাঠ করেছেন। ভারতীয় সংসদ ভবনে প্রশ্নোত্তর আকারে উত্থাপিত হয়েছিল যে, পাক বাহিনীর দখল কৃত পূর্ব পাঞ্জাবের (ভারত) ঐ অঞ্চলে পাকবাহিনী কতজন নারীর সম্ভ্রমহানী করেছে। দুশমনরা সরকারীভাবে জবাব দিয়েছে, একজন নারীরও সম্ভ্রমহানী করা হয়নি। একজন মহিলাকেও অপদস্ত করা হয়নি।
শত্রুদের এক বন্দী অফিসার বন্দী বিনিময়ের সময় বলেছিল, পাকিস্তানী মুসলমান যুদ্ধের ময়দানে সিংহের আকৃতি ধারণ করে। কিন্তু অতিথি অবস্থায় (অর্থাৎ যখন তাদের হাতে বন্দী হয়ে যাবে) তখন তাদের অন্তর মোমের মত কোমল হয়ে যায়। আর তাদের পাত্র প্রশস্ত হয়ে যায়।
এ হচ্ছে আল্লাহ্ সৈনিকদের বৈশিষ্ট্য। যা দুশমনরা তাদের সংসদে আর বিদেশী সংবাদ সংগ্রহকারীদের সামনে অকপটে প্রকাশ করেছে।
যতদূর পর্যন্ত আমাদের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে জানা যায়, দেখা যায়, যারা দুশমনের হাতে বন্দী হয়েছে, আমরা অসংখ্য উদাহরণ পেশ করতে পারব যে, দুশমনরা তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করেছে। এমন কারো কারো জীবিত অবস্থায় পেট চিরে ফেলেছে। কিন্তু পাকিস্তানী সৈনিকরা নিজেদের গোপন কথা প্রকাশ করে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অমানবিক আচরণের দ্বারা এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, পাকিস্তানী সৈনিক দুশমনের হাতে বন্দী হওয়ার পরও গোপন কথা ফাশ করেনি। নতুবা তারা প্রথম দিনেই সমস্ত গোপন কথা প্রকাশ করে দিয়ে পরবর্তী দিনগুলো আরামে কাটাতে পারত। বলতে পারব না যে, আমি এ কথার সঠিক জবাব পেশ করতে পেরেছি কি পারিনি। আমার কথা হল, আল্লাহর সৈনিকদের কাজ কুরআনের আলো প্রজ্বলিত করা। মুসলমান সৈনিকদের কাজকে হিন্দু অফিসাররা সঠিকভাবে প্রকাশ করেছে। "যুদ্ধের ময়দানে হিংস্র হয়, আতিথিয়তায় কোমলপ্রাণ ও হাত উদার হয়ে যায়।"
ডক্টর আল্লামা ইকবাল রহ. মুমিনের প্রশংসায় বলেন, "বন্ধুদের মাঝে রেশমের মত কোমল, সত্য ও মিথ্যার ব্যাপার হলে মুমিন হয় ইস্পাত কঠিন।"
📄 দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের পথ নির্দেশনা
সূরা ফাতিহাতে আমাদের দু'আ শিখানো হয়েছে যে, হে আল্লাহ তা'আলা! আমাদিগকে সরল সঠিক পথের দিশা দাও। কুরআন মজীদে এর জবাব দেওয়া হয়েছে। এ সঠিক উদ্দেশ্য সঠিক জীবনযাপনের প্রতি পথপ্রদর্শন করে। আর ঐ পথে পরিচালিত হওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। আমার জানা মতে, পবিত্র কুরআন মজীদ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ও এভাবে পথ নির্দেশ না দেয়। যেমন, বড় বড় সমস্যার সম্মুখীন হলে আমরা দিক নির্দেশনা পাই। এরূপ নয় যে, কুরআন মজীদ দ্বারা শুভাশুভ নির্ণয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা কুরআন মজীদ দ্বারা এভাবে হিদায়াত লাভ করতে পারি। তা স্পষ্ট করার জন্য একাধিক ঘটনা উল্লেখ করছি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা শোনার পর গুরুদাসপুর ঐ দিকে চলে যায়। পিরোজপুর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ও অনুরূপ আরো অনেক এলাকা যা আমাদের পাওনা ছিলো। তাতে আমার ভীষণ দুঃখ হয়। আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব আমার সাথে সাক্ষাত করে। সবাই শোকাহত ছিল। এমতাবস্থায় এশার আযান দেওয়া হয়। আমরা সবাই জামাতে হাযির হই। ইমাম সাহেব নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতহের নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ পাঠ করেন, "নিশ্চয় আমি আপনার জন্য সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ আপনার কারণে পাপ ক্ষমা করে দেন আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের ও আপনার পরবর্তীদের এবং আমার নিয়ামত সমূহ আপনার উপর পরিপূর্ণ করে দেন। আর আপনাকে সোজা পথ দেখিয়ে দেন এবং আল্লাহ আপনাকে বড় ধরনের সাহায্য করেন।"
১৯৪৮ সালে আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাশ্মিরের রণাঙ্গনে যোগদান করার ইচ্ছা করি। ঐ দিন রাতে আমার মন হতোদ্যম ও ভীত হয়ে যাই। সকালে ফজরের নামাযের জামাতে হাজির হই। ইমাম সাহেব নামাযে সূরা আস্-সাফ, তিলাওয়াত করেন। যার অর্থ- "হে ঈমানদাররা! তা কেন বল, যা করো না, কেমন জঘন্য অপছন্দনীয় আল্লাহর নিকট সে কথা যে, তাই বলবে যা করবে না। নিশ্চই আল্লাহ ভালবাসেন তাদেরকে, যারা তাঁর পথে জিহাদ করে এমনই সারিবদ্ধ হয়ে যেন তারা সীসা ঢালা প্রাচীর।"
সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ভয়ভীতি এমনিতে দূর হয়ে গেল। আমি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ দিনই গন্তব্য স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।
একদিন আমার জনৈক বন্ধু বলল, তুমি অমুকের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছ। চলো, তার সাথে সাক্ষাত করে আসি। আমি বললাম আমি তার উপর অসন্তুষ্ট হইনি, কিন্তু আমি তার ওখানে যাবনা। কেননা সে এমন আচরণ করেছে। এমন সময় এশার নামাযের আযান হয়ে যায়। জামাতে হাযির হই। ইমাম সাহেব নামাযে যেসব আয়াতপাঠ করেন, তার অর্থ ছিল-
"আর ভালো-মন্দ এক সমান হতে পারে না। আত্মরক্ষা করো স্থায়ীভাবে যা হবে উত্তম। তারপর দেখবে ঐ ব্যক্তি যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল, সে এরূপ হয়ে যাবে, যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে। এটা লাভ করতে পারে না কিন্তু যে ধৈর্য্যশীল। আর এটা লাভ করতে পারে না, কিন্তু যে বড় সৌভাগ্যবান।"
নামায শেষ হওয়ার পর আমি আমার বন্ধুকে বললাম, চলো তার ওখানে চলো। ওখানে পৌছার পর সে আমাদের সাথে আন্তরিক হৃদ্যতার সাথে মিলিত হয়।
একবার কোন কারণে এক খান্দানের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নামাযে হাজির হলে ইমাম সাহেব সূরা বনী ইসরাইলের এ আয়াত পাঠ করেন।
"এবং অনেক সময় মানুষ (নিজের অমঙ্গল) কামনা করে, যেভাবে কল্যাণ প্রার্থনা করে"
আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলি। একবার কতিপয় ব্যক্তি আমার সাথে এমন আচরণ করে, তাতে আমি নিরূপায় হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করি। অতঃপর আমি নামাযে হাজির হলে নিম্নোক্ত আয়াত শুনি, "নিশ্চই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথী হন।" তারপর দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য্য ধারণ করি। আল্লাহর অনুগ্রহে পরিণতি অত্যন্ত শুভ হয়।
📄 ইসলাম প্রচারে মুসলিম নারীর ভূমিকা
জ্ঞানের প্রসারে মুসলমান পুরুষদের সাথে সাথে মুসলমান নারীদের নামও উল্লেখযোগ্য। যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে উচ্চাসনে আরোহন করেছেন।
মূসলমান নারীদের প্রথম যুগ সাহাবীদের যুগ। হযরত সাহাবায়ে কিরাম জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে যে স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তার ফলশ্রুতিতে তাফসীর ও হুযুর (সাঃ) হাদীস সমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সংরক্ষিত হয়েছে। তাঁদের সহায়তায় শিক্ষালাভ করে যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষক চিন্তাবিদ ইসলামের ইতিহাসে খ্যাতি অর্জণ করেছে। যে সকল মহিয়সী রমণীরা ইসলামের খেদমতে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলেন হযরত আয়েশা রাযি.। তিনি দার্শনিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। দ্বীনের মাসায়ালা, ইজাতিহাদ করা, ব্যবহারিক শাস্ত্র, ঘটনা বিবরণী সঠিকভাবে নির্ধারণ করা, সুস্থ সঠিক প্রামাণ্য অভিমত প্রকাশ করার যোগ্যতা সম্পন্ন নারী ছিলেন। তাঁর মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। হুযুর (সাঃ) মহিমান্বিত বাণী ও কাজ সমূহ তিনি যে আন্দাজে গ্রহণ করেছেন, তা বিশেষ ও সর্বসাধারন উভয়ের জন্য বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হত। ইসলামের প্রকৃত তত্ত্ব ও তথ্য বুঝার জন্য তিনি যে প্রজ্ঞাপূর্ণ অভিমত প্রকাশ করতেন, তা সত্যই মানুষের স্বভাবধর্মী হত।
বর্ণিত আছে, সূরা বাকারা ও সূরা নিসা যখন অবতীর্ণ হয়, তখন তিনি হুযুর (সাঃ) এর সান্নিধ্যে অবস্থান করার কারণে কুরআন মজীদের প্রতিটি আয়াতের বাচনভঙ্গী রীতিনীতি প্রামাণ্য দলীল ও সমস্যার সমাধান নিরসনের ব্যাপারে অভূতপূর্ব যোগ্যতার অধিকারিনী হয়েছেন, কুরআন মজীদের তাফসীর বর্ণনায় হযরত আয়েশা রাযি. আরববাসীদের প্রচলিত ভাষার প্রতি বিশেষ তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতেন।
হযরত আয়েশা রাযি. বিবাহের পর হুযুর (সাঃ) এর সবচেয়ে বেশী সান্নিধ্য লাভ করেন। সুতরাং তাঁর নিকট থেকে অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সহীহ বুখারী শরীফে ২২০টি হাদীস বর্ণিত আছে। অন্যান্য হাদীস গ্রন্থেও তার অসংখ্য হাদীস বর্ণিত আছে।
হযরত আয়েশা রাযি. খুব ভালো করে চিন্তা-ভাবনা করে ঘটনাবলী বর্ণনা করতেন। যদি তিনি নবীজীর কোন বাণী সঠিকভাবে অনুধাবন করতে না পারতেন, তাহলে তিনি বারবার আবেদন করে তা ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করতেন। তিনি কুরআন মজীদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। তাঁর স্বনামধন্য শীষ্য বর্ণনা করেছেন যে, ইতিহাস, সাহিত্য, ভাষণ ও কবিতা আবৃত্তি ও কাব্য রচনায় তিনি বিশেষ পাণ্ডিত্বের অধিকারিনী ছিলেন।
হযরত হিসাম ইবনে উরওয়া রাযি. বলেছেন, "আমি কুরআন ফরায়েয হালাল -হারাম (ফিকহা শাস্ত্রে) কাব্য ও কবিতার ক্ষেত্রে আরবের প্রাচীন ইতিহাস বংশধারা বর্ণনায় হযরত আয়েশা রাযি. বেশী জ্ঞানী আর কাউকে পাইনি।"
হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়াও হুযুর (সাঃ) এর যুগে অনেক মহিয়সী রমনী ছিলেন। তাঁরা ও জ্ঞানের প্রসারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলশ্রুতিতে কুরআন-হাদীস শাস্ত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। হযরত হাফসা রাযি. এর নিজে জ্ঞান শিক্ষা করা ও তা অন্যদের মাঝে প্রচার করায় বিশেষ উৎসাহ ছিল। পুরুষদের মধ্যে হযরত ইবনে উমর, হামযা ইবনে আবদুল্লাহ, হারেস ইবনে ওহাব, আবদুর রহমান ইবনে হারেস রাযি.। আর নারীদের মধ্যে হযরত হযরত সুফিয়া বিনতে আবি উবায়দা, উম্মে মোবাশ্বার আনসারী রাযি. প্রমুখ তাঁর শীষ্য ছিলেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৬০ টি। তিনি হুযুর (সাঃ) ও হযরত উমর রাযি. থেকে শ্রবণ করেছেন। হযরত উম্মে সালমাহ রাযি. থেকেও অনেক হাদীস বর্ণিত আছে। হাদীস কণ্ঠস্থ করায় হযরত আয়েশা ও হযরত উম্মে সালমাহ রাযি. উল্লেখযোগ্য মর্যাদার অধিকারিনী ছিলেন। অনুরূপভাবে উম্মুল মুমিনীন হযরত জুইয়ারিয়াহ রাযি. ও হুযুর (সাঃ) থেকে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত উম্মে হাবীবাহ রাযি. ও হাদীস শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৬৫ টি। তাঁর নিকট থেকে অনেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেছে। হযরত সুফিয়াহ রাযি. ও অন্যান্য উম্মুল মুমিনরা জ্ঞান শিক্ষায় বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। অনেকে তার নিকট মাসায়ালা জানার আবেদন করত। তিনি তাদেরকে সন্তোষজনক জবাব দিতেন। হযরতা সুফিয়া রাযি. থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তা হযরত ইমাম জয়নাল আবদীন, ইবনে ইসহাক, ইবনে হারিছ, মুসলিম ইবনে সাফওয়ান, কেননাহ ও ইয়াজিদ ইবনে মুসাইয়িব, রাযি. প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।
হযরত ফাতেমা রাযি. প্রভূত জ্ঞানের অধিকারিনী ছিলেন। তাঁর আমল তাঁর জ্ঞানে সঠিক নমুনা ছিল। হযরত ফাতেমা রাযি. এর কাব্য চর্চায় ভীষণ আগ্রহ ছিলেন। হযরত আলী রাযি. এর অনেক কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ ছিলো। বিশেষ বিশেষ ঘটনায় তিনি নিজেও কবিতা রচনা করতেন। হুযুর (সাঃ) সম্পর্কে তিনি এক শোক গাঁথা রচনা করেছেন বলে জানা যায়। হযরত আসমা রাযি. থেকে ৬০ টি হাদীস বর্ণিত আছে। ঐ সব হাদীসের বর্ণনা কারী হলেন হযরত আবদুল্লাহ বিন জায়াফী, ইবনে আব্বাস, কাশেম বিন মুহাম্মদ, উরওয়াহ ইবনে মুসাইয়িব, উম্মে মাউন বিনতে মুহাম্মদ বিন জাফর, ফাতেমা বিনতে আলী রাযি. প্রমুখ। হযরত আসমা রাযি. স্বপ্নের ব্যাখ্যা বর্ণনা করতেন। হযরত উমর রাযি. অনেক স্বপ্নের ব্যাখ্যা তাঁর নিকট থেকে অবগত হয়েছেন।
হযরত খানাসা রাযি. কবিতা পাঠের আসরে অংশ গ্রহণ করতেন। ঐ যুগে তিনি উচ্চ স্তরে শোকগাথা আবৃতিকারী হিসেবে খ্যাত ছিলেন। লোকজন তাঁর নিকট সমবেত হয়ে তাঁর কবিতা শোনার জন্য অপেক্ষা করত। তাঁর এরূপ মর্যাদা ছিল যে, তাঁর বাড়ীর আঙ্গিনায় "আরবের সবচেয়ে খ্যাতনামা শোকগাঁথা রচনাকারী" বলে বিশেষ এক পতাকা উড়ানো থাকত। তিনি কবিতা রচনায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। কবিতা আবৃতির চেয়ে কবিতা রচনা করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হযরত খানাসা রাযি. ঐ যুগের একমাত্র বিখ্যাত মহিলা, যার কবিতা গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয়েছে। তা পরে ১৮৮৮ সালে বৈরুতে থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮৮৯ সালে ফরাসী ভাষায় তার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অনুরূপভাবে হযরত সুফিয়াহ রাযি. কবিতা রচনায় বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন। তিনি রচনা করতেন। প্রতিশব্দ ও প্রাঞ্জল বাক্যে শোকগাঁথা রচনায়ও বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। তাঁর থেকে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাহাবায়ে কিরামের উল্লেখযোগ্য স্তরে উপনীত হয়েছে। অনুরূপভাবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি কল্পে তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। কেননা ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ইসলামের মূলভিত্তি বলে নির্ধারণ করে নারীদের জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী করেছে। আব্বাসীর যুগে মহিয়সী নারী জোবায়দা খাতুনের প্রশংসা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। তিনি ইসলামের উন্নতি বিধানে নিবেদিতা প্রাণ ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন মুক্ত হস্ত।
পাকভারত উপমহাদেশেও এ ধরনের বিখ্যাত মহিয়সী নারী জন্মগ্রহণ করেছেন। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে খ্যাতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেছেন। যেমন রাজিয়া সুলতানা ভারতের বিখ্যাত মহিলা সম্রাজ্ঞী ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক জ্ঞানে বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন। রাজনৈতিক বিষয় তিনি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি এ বিষয়ে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যে তিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। তিনি জ্ঞানীদের বিশেষ সমাদর করতেন। তিনি শরী'আতের কঠোর অনুসারী ছিলেন।
গুলবদন বেগম সম্রাট বাবরের দুহিতা ও হুমায়ুনের সহোদরা ও আকবরের ফুফু ছিলেন। তিনি ভীষণ বিদ্যানুরাগী ছিলেন। আকবরের তত্ত্বাবধানে গুলবদন বেগম ঐতিহাসিক "হুমায়ুন নামা" রচনা করেন। কাব্য রচনায় তিনি বিশেষ পারদর্শি ছিলেন। সাহিত্য কবিতা ও ইতিহাস শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত কবিতা বাস্তব নির্ভর হত। তিনি দুঃখ ও বিষাদকে কবিতায় বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম ছিলেন।
মীর্জা নূর উদ্দীনের কন্যা ও সম্রাট বাবরের পৌত্রী সালিমা সুলতানা বেগম কবি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি কাব্য চর্চা সম্রাট বাবর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হন। গণিত শাস্ত্র ও জ্যামিতিতেও তিনি বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। রাজনৈতি বিষয়েও তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। সম্রাট আকবর অধিকাংশ রাজনৈতিক বিষয়ে তার সাথে পরামর্শ করতেন। বহু ঐতিহাসিক তার প্রতিভার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। মাযদান ইরানের প্রসিদ্ধ একটি এলাকা। ঐ এলাকার এক শহর আমেল। ঐ শহরে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এক বংশ বিশেষ খ্যাত ছিল। সাতি আনিসা নামে ঐ বংশের এক মহিলা চিকিৎসা শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। তাই তিনি তৎকালীন সম্রাজ্ঞীর সুনজরে পড়ে। কবিতা আবৃতিতেও তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। ফার্সী সাহিত্যেও তাঁর বিশেষ উৎসাহ ছিল। সম্রাট শাহজাহানের দুহিতা জাহান আরা বেগম বিখ্যাত বিদুষিনী মহিলা ছিলেন। তিনি তর্ক শাস্ত্রে বিশেষ খ্যতির অধিকারিনী ছিলেন। তিনি হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী রহ. এর অনুসারী ছিলেন। তিনি "মাওনুসুল আরোহা" নামক গ্রন্থ রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থ ২৭ রমাযান ১০৪৯ হিঃ সমাপ্ত হয়। তা ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে বিশেষ সমাদৃত হয়। বেগম জাহান আরার বিভিন্ন সময় লিখিত চিঠি পত্রগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি জ্ঞানী গুনীদের বিশেষ সমাদর করতেন। তিনি কিরাত শাস্ত্র, ফিকহা, হাদীস, সংগীত, সাহিত্য ও চিকিৎসা বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিনী ছিলেন। তিনি কবি সাহিত্যিকদের বিশেষ সম্মান করতেন।
জিবুননেসা সম্রাট আলমগীরের বোন ছিল। তিনি শরী'আতের কঠোর অনুসারী ছিলেন। আটবছর বয়সে কুরআন মজীদ হিফয করেন। হস্তলিপি, আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্বের অধিকারীনী ছিলেন। উর্দু বর্ণলিপি, প্রবন্ধ রচনা, শোক প্রকাশে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। কাব্য-কবিতায় বিশেষ দক্ষতা ছিল। তিনি জ্ঞানী-গুনীদের বিশেষ সমাদর করতেন। জিবুননেসা স্বীয় জ্ঞান-প্রজ্ঞায় হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহ. এর তাফসীরে কবির ফার্সীতে অনুবাদ করেন। তাঁর জ্ঞানের সুখ্যাতিতে মুগ্ধ হয়ে ইরান তুরান আরব তুর্কিস্তান প্রভৃতি অঞ্চল থেকে জ্ঞানী গুনিরা দলে দলে পাক ভারত উপমহাদেশে আসতে শুরু করে। আর জবুন নেসা বেগম তাঁদের দ্বারা বিষয় ভিত্তিক গ্রন্থাবলী রচনা করান, সমাজের পক্ষ থেকে জ্ঞানীদের ভাতা দেওয়া হতো, আলমগীরি রচিয়তা বলেন, এযুগে তার লাইব্রেরী থেকে বৃহৎ কোন লাইব্রেরী ছিলো না। জিবুননেসার আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ দক্ষতা ছিল। কোন কোন গ্রন্থে তাঁর কবিতা লিপিবদ্ধ আছে। তবে বর্তমানে ঐ সব গ্রন্থ দুষ্প্রাপ্য।
আমাতুজ জোহরা বাহুবেগম নবাব মতমেনউদ্দৌলাহ মুহাম্মদ ইছহাক খাঁনের বোন ছিল। মুহাম্মদ ইছহাক মুহাম্মদ শাহী আমীরদের নিকট বিশেষ সম্মানের অধিকারী ছিল। মুহাম্মদ শাহের হাতে বাহু বেগমের লেখা পাড়া শুরু হয়। তিনি বিশেষ আদর-যত্নের সাথে বাহুবেগমকে শিক্ষা দান করেন। বাহু বেগম খুবই পাণ্ডিত্বের অধিকারী ছিলে। তাঁর পিতা প্রধান উজিরের দায়িত্ব পালনকালে তিনি জ্ঞান চর্চায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ঐ যুগের খ্যাত ব্যক্তিরা রাজদরবারের সাথে সম্পর্কিত হত। ঐ যুগের খ্যাতনামা ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষণারায়ণ লাহোরী বিশেষ সুখ্যাতির অধিকারী ছিল। তিনি আরবী ও ফার্সী সাহিত্যে বিশেষ পারদর্শি ছিলেন। মৌলভী মুহাম্মদ মনীর খ্যাতনামা জ্ঞানী ছিলেন। তিনি রাজকোষ থেকে ভাতা পেতেন। তিনি অতিমেধাবী হওয়ার কারণে অনেক গ্রন্থ তার কণ্ঠস্থ ছিল। মুহাম্মদ ফয়েয বখশকে বেগম সম্মানী প্রদান করতেন। তার রচিত গ্রন্থ "ফরহাবখশ ইতিহাস" বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে।
উক্ত গ্রন্থে বেগমের জীবনী উল্লেখ করা হয়। মুহাম্মদ খলিল আঠার পদ্ধতির হস্তলিপিতে পারদর্শি ছিলে। তিনি বেগমের সহায়তায় অনাথ শিশু ও দুস্থ মহিলাদের জন্য পুর্নবাসন কেন্দ্র ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। চাঁদনী বিবি হুসাইন নিযাম শাহ আহমদ নাগরীরর কন্যা ও আলী আদিল শাহের স্ত্রী ছিল। ঐ মহিয়সী মহিলা সংগীত, সাজ ও রাগ শাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতির অধিকারী ছিল। এছাড়াও আরো অসংখ্য মহিয়সী মহিলা জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশেষ খ্যাতি লাভ করে। এ বিষয় বেগম ভূপালের নামও বিশেষ উল্লেখযোগ্য।