📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 কুরআন ও চন্দ্র অবতরণ

📄 কুরআন ও চন্দ্র অবতরণ


জনাব! আপনি এযুগে কুরআনে নম্বর খুঁজছেন। অথচ মানুষ মহাশূন্যের বক্ষ ভেদ করে চাঁদে জ্ঞানের উন্নতির পতাকা উড্ডিন করে এসেছে। আর আপনি কুরআনের পতাকা বাহী হয়ে না রাজনৈতিক দিক থেকে সুস্থ আছেন, না অর্থনৈতিক দিক থেকে সুখে শান্তিতে স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন, না সত্ত্বাগত দিক থেকে উন্নতি লাভ করছেন, না আত্মরক্ষার দিক থেকে নিজে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়েছেন। না আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দাবার গুটির চালে বিচক্ষণতা লাভের স্থলে অসহায় হয়ে অন্যের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন। আর পরস্পরে আপোষে মনের সুখে লড়াই করছেন। একে অন্যের রক্ত ঝরাচ্ছেন। আর বিভিন্ন স্থানে বোমার লক্ষ্যবস্তু পরিণত হচ্ছেন, কুরআনের অনুসারীরা বর্তমানে এমন এক গাড়ীতে পরিণত হয়েছে। যার চাকা নষ্ট হয়ে গেছে। তার ইঞ্জিন বলে দিয়েছে যে, এর পার্টস (দ্রুত) অকেজো হয়ে গেছে। কিছু বুদ্ধিমান আরোহী এ গাড়ী ত্যাগ করে চলে গেছে। কিছু লোক দুঃখিত ও ব্যথিত হয়ে আছে। আর কিছু সৌভাগ্যবানও রয়েছে। যারা এ নিয়ে কবিতার সুরে আশার আলো দেখাচ্ছে যে, এ বাস কখনো একাকী কোন অলৌকিক মুজিজা দেখাবে, এবং গাড়ী চলতে শুরু করবে। সামাজিক জীবনের এক অত্যাবশ্যক কর্তব্য হল, একতা। কিন্তু এ ঐক্য ও একতা মুসলিম বিশ্বের নেতাদের মধ্যে তো দূরের কথা, আপনি আপনার দেশের ধর্মীয় নেতাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের মধ্যে একতা আছে কি না।

? আরব বিশ্ব ইসরাইলের হাতে তিন তিন বার মার খাবার পরও প্রকৃত অর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ঠিক এমনই সংকটময় মুহূর্তে সিরিয়া, ইরাক-ইয়ামানের মধ্যে যা হচ্ছে, তা চোখের সামনে আছে। আপনি আরও দেখবেন, বহুস্থানে একদিকে প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীরা বলছে, তারা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু অন্য দলের মধ্যে অন্তদ্বন্ধও চলছে। সম্ভবতঃ আপনার স্মরণ না থাকার কথা, ১৯৫১ সালে ওলামাদের যে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়েছে, তখনও দু'দলের অনুসারীরা স্ব স্ব দল নিয়ে পৃথক পৃথক জামাতে নামায আদায় করেছে। তবে আমি বলতে চাই, চাঁদে মানুষের পৌছার ফলে একদিকে তো চাঁদের সৌন্দর্যের যাদু লণ্ডবণ্ড হয়েছে। আমাদের কবি সাহিত্যিকদের পুঁজি ও ভাষা অলংকরণের রত্নভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন, আকবর এলাহাবাদী বলেছেন,

مغرب نے دوربین سے کمر انکی دیکه لی مشرق کی شاعری کا مزه کر کرا هوا !

"পাশ্চাত্য জগত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তাদের কোমর পর্যন্ত দেখে নিয়েছে। প্রাচ্য জগতের কবি সাহিত্যিকদের কাব্য রচনার মজা বিলীন হয়ে গেছে।" অপরদিকে সত্য কথা হল, মযহাবের মাথাও ঝুকে পড়েছে। সামান্য অগ্রসর হয়ে অন্য এক জগতের জীবন যাপন ও বিশেষ করে বুদ্ধিমান জীবের অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে যাবে। তখন এ সন্দেহও দূর হয়ে যাবে যে, আমাদের এই কচি জমিনে সুরখাবের বিশেষ কোন পালক পড়েছে। যার কারণে সমস্ত বিশ্বজগতের জন্য রাহমাতুল্লিল আলামীন (সাঃ) এর মহান সত্ত্বাকে এর উপর প্রেরণ করা হয়েছে। আর বাকী সব সৃষ্টিজগত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হযরত জিবরাঈল আ. কেও শুধু এ জগতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আসমানী অহী ও এলহামের জন্যও এ জগতকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আপনি কুরআনের আলোকে নিছক এ কথাই বলুন যে, চাঁদে নামায আদায় করা হবে কিভাবে? সময়ের নিয়মানুবর্তীতা নির্ধারণ করা হবে কিভাবে? নামাযী কা'বা মুখী হবে কি উপায়ে? হজ্জ সমাপন করা হবে কিভাবে? আর খোদ বিমানের আরোহীরা নামাযের কি ব্যবস্থা করবে? শরী'আতের সববিধি-বিধানই তো এক দিকে বাঁকিয়ে রেখে দিয়েছেন। আপনি অথবা আপনার হযরত ওলামারা কুরআনের সূরা আর-রাহমানের প্রসিদ্ধ আয়াত পাঠ করে বলবেন, মানুষ জমিন ছেড়ে মহাশূন্যে কখনো পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু এ ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেছে। এখন কি হবে? এখন আপনি দেখবেন ঐ ওলামারা দু'দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক দল যারা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা অবগত। তারা নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন এর থেকে বের হওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হল বাদশাহী লাভ করা। কিন্তু ঐ দ্বিতীয় দল অতীতে রয়ে গেছে। তারা নিজের একঘুয়েমীতে অনড়। তারা বলে, চাঁদে পৌঁছার সব খবর মিথ্যা। এমন ছবি বানানো হয়েছে। আর টেলিভিশনে তা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এ সবই এক মিথ্য বানওয়াট কিচ্ছা কাহিনী। একটু পর্যালোচনা করে দেখুন। এরা হল, আপনাদের প্রতিষ্ঠিত ওলামায়ে কিরাম, আর শরীয়াতের সুদৃঢ় ব্যাখ্যাকারী।

পশ্চাৎবর্তী দলের কথা ছেড়ে দিন। আমি অগ্রবর্তী দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তি উজির সাহেবের ধ্যান-ধারনা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। তার অধ্যাবসায়ের সারমর্ম হল, পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে, তা নিছক কাঙ্খিত দ্বীন। আর তা কুরআন উপযোগী। তারা কুরআনকে পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের মতবাদের সাথে এমনভাবে যুশোপযোগী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে। আর যেভাবে উপরে আরোহনের মতবাদ থেকে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক দর্শন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়কে কুরআনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে।

তা দেখে সত্যই আমার গর্ব হয় যে, এ ভাবে হাত কান ধরা থেকে হাজার গুন আমাদের মতো জ্ঞানপাপীদের থেকে উত্তম, যারা জ্ঞানের প্রশস্ততাকে সমর্থন করে এ যথার্থতা গ্রহণ করেছেন যে, ওহী ও এলহামের ব্যাপার যতদূর চলে চলবে। অতীত যুগে যখন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অপ্রর্যাপ্ত ও পরাধীন ছিল। তখন যেভাবে ছিল সেভাবে চলেছে। এখন মুক্তবুদ্ধির যুগ। আমরা সরল-সোজা ভাবে ঈমান এনেছি। তখন আমাদেরকে এত গোলক ধাঁধার চক্করে পড়া হয়নি। ঈমান আনার পূর্বে নিত্যনতুন দর্শন ও বৈজ্ঞানিক মতবাদের মুকাবিলা করতে হয়নি। তারপর কুরআন মজীদে এর সমর্থনে আয়াত খোঁজ করতে হয়নি। তারপরও যদি কাজ না হয় তাহলে কুরআন মজীদের শব্দাবলীর নতুন অর্থ বের করতেও হয়নি। যদি ডারউইন, নিউটন, ফ্রয়েড ও মার্কসের অভিমত চিন্তা-ভাবনা করে পছন্দ করতেছি যে, তার পর এর কি প্রয়োজন রয়েছে আমাদের কে তাদের অভিমতের সাথে কুরআনকে মিলিয়ে দেখতে হবে। আমাদের কাজ তো হল কুরআনকে চুমু দিয়ে সুন্দর করে তাকের উপর রেখে দেওয়া।

অনুরূপভাবে আমরা ঐ মনীষীদের সুদৃঢ় সাহসিকতার প্রতিদান দিচ্ছি যে, এই যুগেও আপনারা খোদার উপর ঈমান আনার ব্যাপারে সুদৃঢ় আছেন। তাই বিখ্যাত কবি গালিব বলেছেন-
وفاداری بشرط استواری اصل ایمان ہے
দৃঢ়তার সাথে প্রতিজ্ঞাপূর্ণ করাই আসল ঈমান।

আমাদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে, এ পরিবর্তনশীল পৃথিবী ও পরিবর্তনশীল বাহ্যিক জ্ঞানের মাঝে আবর্তিত হওয়ার পর আমরা সূচনা থেকে প্রতিজ্ঞার বুনিয়াদকে আবৃত করে দিয়েছি।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 চিত্রাকর্ষক এক পত্রের জবাব

📄 চিত্রাকর্ষক এক পত্রের জবাব


জনাব! আপনি এযুগে কুরআনে নম্বর খুঁজছেন। অথচ মানুষ মহাশূন্যের বক্ষ ভেদ করে চাঁদে জ্ঞানের উন্নতির পতাকা উড্ডিন করে এসেছে। আর আপনি কুরআনের পতাকা বাহী হয়ে না রাজনৈতিক দিক থেকে সুস্থ আছেন, না অর্থনৈতিক দিক থেকে সুখে শান্তিতে স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন, না সত্ত্বাগত দিক থেকে উন্নতি লাভ করছেন, না আত্মরক্ষার দিক থেকে নিজে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়েছেন। না আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দাবার গুটির চালে বিচক্ষণতা লাভের স্থলে অসহায় হয়ে অন্যের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন। আর পরস্পরে আপোষে মনের সুখে লড়াই করছেন। একে অন্যের রক্ত ঝরাচ্ছেন। আর বিভিন্ন স্থানে বোমার লক্ষ্যবস্তু পরিণত হচ্ছেন, কুরআনের অনুসারীরা বর্তমানে এমন এক গাড়ীতে পরিণত হয়েছে। যার চাকা নষ্ট হয়ে গেছে। তার ইঞ্জিন বলে দিয়েছে যে, এর পার্টস (দ্রুত) অকেজো হয়ে গেছে। কিছু বুদ্ধিমান আরোহী এ গাড়ী ত্যাগ করে চলে গেছে। কিছু লোক দুঃখিত ও ব্যথিত হয়ে আছে। আর কিছু সৌভাগ্যবানও রয়েছে। যারা এ নিয়ে কবিতার সুরে আশার আলো দেখাচ্ছে যে, এ বাস কখনো একাকী কোন অলৌকিক মুজিজা দেখাবে, এবং গাড়ী চলতে শুরু করবে। সামাজিক জীবনের এক অত্যাবশ্যক কর্তব্য হল, একতা। কিন্তু এ ঐক্য ও একতা মুসলিম বিশ্বের নেতাদের মধ্যে তো দূরের কথা, আপনি আপনার দেশের ধর্মীয় নেতাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের মধ্যে একতা আছে কি না।

? আরব বিশ্ব ইসরাইলের হাতে তিন তিন বার মার খাবার পরও প্রকৃত অর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ঠিক এমনই সংকটময় মুহূর্তে সিরিয়া, ইরাক-ইয়ামানের মধ্যে যা হচ্ছে, তা চোখের সামনে আছে। আপনি আরও দেখবেন, বহুস্থানে একদিকে প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীরা বলছে, তারা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু অন্য দলের মধ্যে অন্তদ্বন্ধও চলছে। সম্ভবতঃ আপনার স্মরণ না থাকার কথা, ১৯৫১ সালে ওলামাদের যে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়েছে, তখনও দু'দলের অনুসারীরা স্ব স্ব দল নিয়ে পৃথক পৃথক জামাতে নামায আদায় করেছে। তবে আমি বলতে চাই, চাঁদে মানুষের পৌছার ফলে একদিকে তো চাঁদের সৌন্দর্যের যাদু লণ্ডবণ্ড হয়েছে। আমাদের কবি সাহিত্যিকদের পুঁজি ও ভাষা অলংকরণের রত্নভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন, আকবর এলাহাবাদী বলেছেন,

مغرب نے دوربین سے کمر انکی دیکه لی مشرق کی شاعری کا مزه کر کرا هوا !

"পাশ্চাত্য জগত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তাদের কোমর পর্যন্ত দেখে নিয়েছে। প্রাচ্য জগতের কবি সাহিত্যিকদের কাব্য রচনার মজা বিলীন হয়ে গেছে।" অপরদিকে সত্য কথা হল, মযহাবের মাথাও ঝুকে পড়েছে। সামান্য অগ্রসর হয়ে অন্য এক জগতের জীবন যাপন ও বিশেষ করে বুদ্ধিমান জীবের অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে যাবে। তখন এ সন্দেহও দূর হয়ে যাবে যে, আমাদের এই কচি জমিনে সুরখাবের বিশেষ কোন পালক পড়েছে। যার কারণে সমস্ত বিশ্বজগতের জন্য রাহমাতুল্লিল আলামীন (সাঃ) এর মহান সত্ত্বাকে এর উপর প্রেরণ করা হয়েছে। আর বাকী সব সৃষ্টিজগত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হযরত জিবরাঈল আ. কেও শুধু এ জগতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আসমানী অহী ও এলহামের জন্যও এ জগতকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আপনি কুরআনের আলোকে নিছক এ কথাই বলুন যে, চাঁদে নামায আদায় করা হবে কিভাবে? সময়ের নিয়মানুবর্তীতা নির্ধারণ করা হবে কিভাবে? নামাযী কা'বা মুখী হবে কি উপায়ে? হজ্জ সমাপন করা হবে কিভাবে? আর খোদ বিমানের আরোহীরা নামাযের কি ব্যবস্থা করবে? শরী'আতের সববিধি-বিধানই তো এক দিকে বাঁকিয়ে রেখে দিয়েছেন। আপনি অথবা আপনার হযরত ওলামারা কুরআনের সূরা আর-রাহমানের প্রসিদ্ধ আয়াত পাঠ করে বলবেন, মানুষ জমিন ছেড়ে মহাশূন্যে কখনো পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু এ ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেছে। এখন কি হবে? এখন আপনি দেখবেন ঐ ওলামারা দু'দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক দল যারা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা অবগত। তারা নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন এর থেকে বের হওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হল বাদশাহী লাভ করা। কিন্তু ঐ দ্বিতীয় দল অতীতে রয়ে গেছে। তারা নিজের একঘুয়েমীতে অনড়। তারা বলে, চাঁদে পৌঁছার সব খবর মিথ্যা। এমন ছবি বানানো হয়েছে। আর টেলিভিশনে তা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এ সবই এক মিথ্য বানওয়াট কিচ্ছা কাহিনী। একটু পর্যালোচনা করে দেখুন। এরা হল, আপনাদের প্রতিষ্ঠিত ওলামায়ে কিরাম, আর শরীয়াতের সুদৃঢ় ব্যাখ্যাকারী।

পশ্চাৎবর্তী দলের কথা ছেড়ে দিন। আমি অগ্রবর্তী দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তি উজির সাহেবের ধ্যান-ধারনা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। তার অধ্যাবসায়ের সারমর্ম হল, পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে, তা নিছক কাঙ্খিত দ্বীন। আর তা কুরআন উপযোগী। তারা কুরআনকে পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের মতবাদের সাথে এমনভাবে যুশোপযোগী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে। আর যেভাবে উপরে আরোহনের মতবাদ থেকে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক দর্শন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়কে কুরআনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে।

তা দেখে সত্যই আমার গর্ব হয় যে, এ ভাবে হাত কান ধরা থেকে হাজার গুন আমাদের মতো জ্ঞানপাপীদের থেকে উত্তম, যারা জ্ঞানের প্রশস্ততাকে সমর্থন করে এ যথার্থতা গ্রহণ করেছেন যে, ওহী ও এলহামের ব্যাপার যতদূর চলে চলবে। অতীত যুগে যখন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অপ্রর্যাপ্ত ও পরাধীন ছিল। তখন যেভাবে ছিল সেভাবে চলেছে। এখন মুক্তবুদ্ধির যুগ। আমরা সরল-সোজা ভাবে ঈমান এনেছি। তখন আমাদেরকে এত গোলক ধাঁধার চক্করে পড়া হয়নি। ঈমান আনার পূর্বে নিত্যনতুন দর্শন ও বৈজ্ঞানিক মতবাদের মুকাবিলা করতে হয়নি। তারপর কুরআন মজীদে এর সমর্থনে আয়াত খোঁজ করতে হয়নি। তারপরও যদি কাজ না হয় তাহলে কুরআন মজীদের শব্দাবলীর নতুন অর্থ বের করতেও হয়নি। যদি ডারউইন, নিউটন, ফ্রয়েড ও মার্কসের অভিমত চিন্তা-ভাবনা করে পছন্দ করতেছি যে, তার পর এর কি প্রয়োজন রয়েছে আমাদের কে তাদের অভিমতের সাথে কুরআনকে মিলিয়ে দেখতে হবে। আমাদের কাজ তো হল কুরআনকে চুমু দিয়ে সুন্দর করে তাকের উপর রেখে দেওয়া।

অনুরূপভাবে আমরা ঐ মনীষীদের সুদৃঢ় সাহসিকতার প্রতিদান দিচ্ছি যে, এই যুগেও আপনারা খোদার উপর ঈমান আনার ব্যাপারে সুদৃঢ় আছেন। তাই বিখ্যাত কবি গালিব বলেছেন-
وفاداری بشرط استواری اصل ایمان ہے
দৃঢ়তার সাথে প্রতিজ্ঞাপূর্ণ করাই আসল ঈমান।

আমাদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে, এ পরিবর্তনশীল পৃথিবী ও পরিবর্তনশীল বাহ্যিক জ্ঞানের মাঝে আবর্তিত হওয়ার পর আমরা সূচনা থেকে প্রতিজ্ঞার বুনিয়াদকে আবৃত করে দিয়েছি।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 আলমাস খান, চার সদাহ

📄 আলমাস খান, চার সদাহ


ভাই আপনার পত্র অতি চিত্তাকর্ষক ও চমৎকার। পত্রের ব্যাপারে কি আর বলব। অধিকন্তু যেসব কথা আপনার মনে জাগে, তাকে কি ভাবে এদিক সেদিক না করে শূন্য গর্ত বলে দেব। বেস। আপনি এক দুর্বলতা দেখিয়েছেন যে, আপনার নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। ঠিক আছে। মনে হয় এর যুক্তিসংগত কোন কারণ রয়েছে। আমি আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কাজ করব না। মোটকথা, আমি স্বানন্দে আপনাকে আলমাস বানিয়ে দিয়েছি।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 পত্রের জবাব

📄 পত্রের জবাব


যথাযোগ্য অনুগ্রহকারী ব্যক্তি

কুরআনের নম্বর সংকলন ও প্রকাশে আমার সবচেয়ে মূখ্য উদ্দেশ্য হল, আধুনিক মুক্ত জ্ঞানের ক্ষমতা মানুষকে চারিত্রিক যে গহীন জংগলে আবদ্ধ করে বিপদোন্মুখ করে দিয়েছে। তাতে অনন্ত সততার আলো পৌছতে পারে। বিশ্ব মানবতা মুক্তির কোন পথ পেয়ে যেতে পারে। আপনি তো শিল্পকারখানা যানবাহন এটমবোম, কম্পিউটার, মহাশূন্যযান প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার স্বচোখে দেখছেন। কিন্তু আপনি কি এর মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। নাকি বিজ্ঞানের আবিষ্কারের বেড়াজালে আটকা পড়ে জ্ঞানপাপী মানুষের কি যে বিপদজনক অবস্থা হয়েছে, সে সম্পর্কে একটু গভীর চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছেন?

মানুষ বিজ্ঞান, অর্থ-সম্পদ, আবিষ্কার ও উপায়-উপকরণের উপর আরোহন করার স্থলে ঐ নব উদ্ভাবিত শক্তি সমূহের আরোহী হয়ে গেছে বরং সে তামা-ধাতু কারিগরি শক্তির সামনে প্রায় এমন হয়ে গেছে, মনিবের সামনে গোলামের যে অবস্থা যেমন হয়। তারা উন্নত জ্ঞান-বুদ্ধি, উপায়-উপকরণ প্রভৃতির প্রাচুর্যতা সত্ত্বেও প্রথম থেকে অত্যন্ত উদাসীন ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে আছে। পূর্বের তুলনায় বর্তমানে অন্যায়, অত্যাচার নির্যাতনের শিকার বেশী হচ্ছে। যুদ্ধ ও রক্তপাতের শিকার বেশী হচ্ছে। এখন বেশী পরিমাণে পরামর্শ ও কুচক্রান্ত ও জোর জবরদস্তির সামনে নিরুপায় ও অসহায় হয়ে আছে। আরো বেশী নিগৃহীত হচ্ছে। আরো বেশী প্রতারণার ছলে মিথ্যা বলা, মিথ্যার প্রচার প্রসার মিথ্যায় লিপ্ততা ও মিথ্যা কার্যকরী করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে পারিবারিক অশান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছে। বর্তমানে বেশী ভীত-সন্ত্রস্ত। হতাশা, নৈরাশ্যতা অনুভূতিহীনতা ও অন্যান্য মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।

জ্ঞানের পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা লাভ করা
জনাব আলমাস সাহেব। এ সবই কি জ্ঞানের চাকা। এটা হলো সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা। বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে পরিচালিত ব্যক্তি পৃথিবীতে খোদার ইবাদত থেকে মুক্ত হয়ে যাওয়ার পতাকাবাহী হয়ে যায়। ঐ উন্নত জ্ঞানের অধিকারীদের অবস্থা হল, তারা অর্থ উপার্জন, যৌনাচার, প্রতিচিত্র দেখে এবং স্বীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কামনা-বাসনা ছাড়াও সময়ের আলোকে প্রাধান্য বিস্তার করা, ক্ষমতা দখল করা, বিশেষ করে বীরত্বের অমৃতের পূজা-পার্বনে মগ্ন। তারা ধ্বংসশীল মানুষের স্তুতি গায়। তাদের ছবি সমূহের পূজা করছে। তাদেরকে মহাজ্ঞানী জ্ঞাপন করছে। আর তাদের মৃত্যুর পর তাদের জড় লাশ ও তাদের কবর পূজা করছে। তাদের কবরের উপর ফুলের অর্ঘ্য দিচ্ছে। বেস! এটাই হল তাদের হালুয়া-রুটি। আপনার জ্ঞানের পরিধির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবতা।

এটা হলো সমস্ত জ্ঞানের বিজ্ঞান ও বস্তুবাদের উপর ব্যয় করার পরিণতি। আর জেন্দেগীর রূহানী ও চারিত্রিক চাহিদা সমূহের প্রতি তাকিয়ে দেখুন। সাংস্কৃতিক ভারসাম্যকে এমনভাবে ধ্বংস করার পর শান্তি ও নিরাপত্তা, আভিজাত্য ও নৈতিকতার বিষয়ে কি প্রশ্ন করা হবে? ঐ ভারসাম্যহীনতাকে নির্মূল করে ইনসাফভিত্তিক সাংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছে।

চাঁদের সৌন্দর্য
আপনার বক্তব্য অতি চিত্তাকর্ষক ও প্রাঞ্জল। সাথে সাথে অত্যধিক বিস্ময়করও বটে। অনেক মজা উপভোগ করেছি। মহাশূন্যযান চাঁদে অবতরণ করার পর চাঁদের সৌন্দর্য মলিন হল কি ভাবে? আর পরিভাষার ভাণ্ডার ধ্বংস হল কেন, এতো বড় ঘটনা কখন কি ভাবে ঘটে গেল?

এখন প্রশ্ন হল, যদি মানব দেহের সত্ত্বাগত বাস্তবতা ও তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও কর্মকাণ্ড ও তার চামড়ার নিচের অবস্থা সামনে আসার পরও তার সৌন্দর্য্য নষ্ট হয় না। দাম্পত্য জীবন থেকে শুরু করে প্রেম-প্রীতি পর্যন্ত সব আনন্দ আহলাদ জারী থাকে। তদ্রুপ যদি উদ্ভিদ জগতের প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক বাস্তবতা উন্মুক্ত করার কারণে ফুলের সৌন্দর্য্য বিনষ্ট না হয়, যদি তাজা ফুলের সৌন্দর্য্য বিলুপ্ত না হয় তাহলে এক সরল প্রকৃতি চাঁদই কি অপরাধ করেছে যে, তার সম্পর্কে একাধিক মৌলিকতা সামনে আসায় তার মান সম্মান সবই ধূলায় মিশ্রিত হয়ে গেছে। জনাব আলমাস! স্বয়ং হীরা ও আলমাসের বৈজ্ঞানিক সংমিশ্রণ কয়লাকে মিলিত করে দিয়েছে। তারপরও কি বাজারে তার মূল্য হ্রাস পেয়ে গেছে। প্রাকৃতিক গণ্ডিতে সৌন্দর্য্যের নাম হলো ভালো অবস্থা, যা আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের অনুভূতির মাধ্যমে স্মৃতিতে ভেসে উঠে। বিজ্ঞানের এই সৌন্দর্য্য গবেষণা না ফুল ও প্রজাপতি সমূহ ছিনিয়ে নিতে পারে, আর না চাঁদকে তা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

ইসলাম নিরাপদ রয়েছে
এখন বাকী রইল ধর্মীয় বিষয়। এ পৃথিবীতে এরূপ মতবাদ হবে যার বুনিয়াদ সমূহ চাঁদে অবতরণের কারণে বিশাল গর্তে পরিণত হয়ে গেছে। আর আপনি এর ফলে খুশি হয়েছেন। আমার সমবেদনা অনুভূত হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম না কোন মতবাদ, আর না ইসলামের কোন ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতির সম্মুখীন তো হয় ঐ অকেজো ধ্যান-ধারণা, যা কুরআনের এক আয়াতের সাথে চালু হয়েছে। প্রয়োজন হল, ঐ আয়াতকে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা। প্রসঙ্গতঃ আলোচনা শেষ প্রান্তে উল্লেখ করা হচ্ছে। ইসলাম, হিন্দু মতবাদ বা খ্রিস্টবাদের (আকৃতি বিদ্যমান) মত বস্তু নয়। এটা সুদৃঢ় দ্বীন। আপনার চিন্তার কিছুই নেই। ইসলাম সম্পূর্ণ নিরাপদ রয়েছে।

আমার এ দাবী হয়ত আপনার নিকট বিস্ময়কর মনে হবে যে, মানুষের চন্দ্রে অবতরণ করা মহান আল্লাহ্ তা'আলার সত্ত্বা ও তাঁর দ্বীনের সত্যতার পক্ষে সততার দলীল হয়েছে। বিন্দুমাত্রও এর বিপরীত হয়নি। বস্তুতঃ চাঁদে পৌছা যদি সম্ভব হয়ে থাকে তাহলে স্বাভাবিক নিয়ম রীতির মধ্যে হয়েছে। গ্রহ-নক্ষত্রের জগত আল্লাহ তা'আলার বিধানের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের কারণে হয়েছে।

গ্রহ-নক্ষত্রের দৈহিক স্থূলতা আর তাদের আবর্তনের ব্যবধান ও তাদের গতির দ্রুততার সঠিক হিসাব মতে সময়ের দিক থেকে তাতে কয়েক সেকেণ্ডের বেশী পার্থক্য ধরা পড়ে না। আর না স্থানের দিক থেকে কয়েক ফুটের বেশী গড়বড় হয়। এ শৃঙ্খলা বিশ্বের ঐ দাঁড়ি পাল্লার সাক্ষী, যা খোদায়ী বিধানের প্রতিফল। ঐ দাঁড়িপাল্লাকে দেখে এক খোদার ইবাদতকারী পৃথিবীর যে কোন অবিশ্বাসীদের সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করছে, "যদি বিশ্বজগত চূড়ান্ত পরিমাপের বিধানে বাঁধা না হত আর যদি গ্রহ-নক্ষত্রের উদয়াচল ও গতিধারা পরিবর্তন হতে থাকত তাহলে মহাশূন্য আলোকিত হত কি ভাবে?

সুতরাং যদি অপরিবর্তনীয় বিধানাবলীর অস্তিত্ব প্রমাণ হয়। তাহলে আইন প্রণয়নকারী মহান সত্ত্বার অস্তিত্বও প্রমাণ হয়েছে। তাছাড়া বাস্তবিক পক্ষেই সৃষ্টি জগতের সকল ভারসাম্যতা খোদায়ী শ্বাশত বিধানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, এমন কি স্বয়ং মানুষের বিবেক-বুদ্ধির সঠিক ব্যবহারকারী মানুষকে এ পথনির্দেশনা দেয় যে, স্বয়ং তার জীবনের ভারসাম্য, তার সুস্থতা, তার নিয়ম পদ্ধতি ও তার নিরাপদ লালন পালনও খোদায়ী বিধানের মাধ্যমে সম্ভব। সৃষ্টিজগত যে মহান শক্তির সামনে একত্ববাদী হয়ে অবনতমস্তকে চমৎকার শৃঙ্খলার সাথে চলছে, ঐ সৃষ্টিজগতে বসবাসকারী মানুষ জীবনের সংশোধন ও কল্যাণের এ লক্ষ্যে তাদেরকে ঐ মহান শক্তির অনুগত ও আজ্ঞাবহ থাকতে হবে।

সুতরাং মানুষের চাঁদে অবতরণের ঘটনা ইসলামের সততা ও সত্যতার জন্য ক্ষতিকর কোন বিষয়ই নয়। যদি আপনি একটু পেছনের কথা চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন, যে দিন মানুষ প্রথম কোন উঁচু গাছে আরোহন করেছে, ঐ দিন সে-ও প্রত্যক্ষ দর্শীদের মাঝে চাঁদে অবতরণকারীদের থেকে কম ছিল না। তারপর যে দিন মানুষ প্রথম শূন্যে উড়েছে বা যে দিন মানুষ সর্বপ্রথম উড়োজাহাজকে শূন্যে উড়তে দেখেছে, ঐ দিন মানুষের জ্ঞান বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেছে। কিন্তু সে দিন সে প্রথম ঘটনায় না খোদাকে অস্বীকার করেছে, না খোদার দ্বীনকে অস্বীকার করেছে। অনুরূপভাবে চাঁদে পৌঁছার ঘটনা বা তার পরবর্তীতে অন্য গ্রহে পৌঁছার ঘটনাও খোদার খোদায়ী ও তাঁর শ্বাশত দ্বীনের সত্যতায় ক্ষতিকর কোন প্রভাব ফেলবে না।

অন্যান্য গ্রহে প্রাণীর অস্তিত্ব
আপনি মনে করছেন, যদি অন্যান্য গ্রহের প্রাণী সামনে এসে যায়, তাহলে কি হবে? আমি বলব কিছুই হবে না। কুরআন-হাদীসে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, অন্য কোন গ্রহে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নেই বরং বিশ্বজাহানের পালনকর্তার মর্জি মাফিক যদি (এটা দুর্বল বর্ণনা হওয়া সত্ত্বেও) গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা হয়, যে সব বর্ণনায় অন্যান্য দুনিয়ার উল্লেখ করে বলা হয়েছে অর্থাৎ এ জগতের আদমের মত অন্য জগতে আদম রয়েছে। আর তোমাদের নবীর মত নবী রয়েছে। তার পরও এ কথা কোন মুসলমানের জন্য বিস্ময়কর হবে না, (কই এটা কি কারো ঈমানের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে)। কোথায়ও কি কোন হিতাহিত জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী বিদ্যমান হয়ে গেছে, হতেও তো পারে। আল্লামা ইকবাল রহ. এ কথা এভাবে বর্ণনা করেছেন-
"প্রত্যেক জগতে কোলাহল হয়। আমাদের জন্য বিশ্বজগতের রহমত।"

কেউ কেউ মনে করেছেন, বিভিন্ন গ্রহে প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। আর তারা তাদের জীবনকাল অতিবাহিত করে স্ব স্ব হাশর নশরের মনজিল অতিক্রম করে চলে গেছে। আর অনুরূপভাবে কোন কোন গ্রহে ভবিষ্যতে প্রাণীর অস্তিত্ব বিদ্যমান হবে। এটা এক অভিমত। এক অভিমত হল, খোদ ঐ জমিনের বুদ্ধিমান জীবদের জীবন যাপনের বর্তমান যুগ প্রথম যুগ নয়। এর পূর্বেও যুগ অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশ থাকে যে, এ সব হলো অনুমান।

এটাও প্রকাশ আছে যে, এ পর্যন্ত আমাদের এ সৌরজগতে অবস্থিত গ্রহ সমূহে নিশ্চিত মানব অস্তিত্বের কোনো চেরাগ বিদ্যমান পাওয়া যায়নি। এর বাইরের সৌরজগতে পৌঁছার জন্য এ মানব জীবন যথেষ্ট নয়। এর পরের সৌরজগতে পৌঁছার জন্য মানব জীবন যথেষ্ট নয়। মোটকথা যে দ্বীনদাররা নিজেদের চেয়ে কমপক্ষে আরো দু'প্রকার হিতাহিত জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী অর্থাৎ ফেরেশতা ও জ্বিনদের অস্তিত্ব পূর্বে স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের জন্য চতুর্থ আরেক এক প্রকার প্রাণীর অস্তিত্ব স্বীকার করা কঠিন কোন বিষয় নয়। আর তারা অন্য কোন প্রকার প্রাণীর আবির্ভাবে বিস্ময়ে হতবাক হবে কেন? এ ধরনের সৃষ্টিজীব তো তাঁদের খোদার শ্রেষ্ঠত্ব ও তাঁর অনাদি অনন্ত বিশাল সাম্রাজ্যের এক নিদর্শন।

মুসলমান সৈনিকের মর্যাদা
আমি এক পেশাদার সৈনিক পুত্র। আমার পিতা আমাকে শুধু দক্ষ সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলেননি বরং আমাকে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান শিক্ষা দান করেছেন। আমার শিক্ষার মূলভিত্তি ছিল কুরআনের মৌলিক শিক্ষার ওপর। যার কারণে পরবর্তী জীবনে আমি ভাল-মন্দের পার্থক্য নিরূপণ করতে সক্ষম হয়েছি। কুরআনের অনুশীলন আমাকে অনুধাবন করতে শিখিয়েছে যে, এ পবিত্র কিতাব মহান আল্লাহ তা'আলার মহা পয়গাম হিসেবে ঐ জাতির জন্য আবির্ভূত হয়েছে, যা কুফরের অসংখ্য শক্তির বিরুদ্ধে আল্লাহর সৈনিক হয়ে বক্ষ উন্মুক্ত করে দিতে পারে। যাতে পৃথিবী থেকে ফেতনা-ফ্যাসাদ অশান্তি নিরাপত্তাহীনতা ও অন্যায়-অত্যাচার সমূলে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

আমি প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশের পক্ষে জাপানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। জাপানীদের সাথে আমার কোন শত্রুতা ছিলো না, আর না আমার অন্তরে ব্রিটিশের জন্য কোন প্রেম-প্রীতি ভালবাসা ছিল যে, তার স্বার্থে আমি আমার ও আমার নও জওয়ানদের জীবন বার্মার প্রান্তরে ধ্বংস করে দেব। কিন্তু মুসলমান সৈনিকের যে কর্তব্য, তা আমাকে বাধ্য করেছে। কারণ, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা বা বিশ্বাসঘাতকতা করা মুসলমান সৈনিকের জন্য শোভনীয় নয়। অবশ্যই সন্দেহ ছিল, এ বাহিনী আমার নিজের নয়। আর এটা আমার স্বদেশও নয় যে, এটাকে আমি কুরআনের দেশ বলব। তদুপরি আমাকে ইংরেজ, শিখ, ডোগরা, হিন্দু, রাজপুত, জাঠ ও গুর্খা প্রভৃতি সৈনিকদের উপর প্রমাণ করতে হবে যে, মুসলমানের কর্তব্য কত সমুন্নত ও প্রসংশীত এবং অন্যান্য জাতি থেকে কতটা ব্যতীক্রম।

আমি মেজরের দায়িত্ব পালনে আমার ব্যাটিলিয়ানের এক কোম্পানীকে কমাণ্ড করছিলাম, আমার বিগ্রেড (১১৪ নং সপ্তম ইনফেন্টারী ডিবিশন) বার্মায় জাপানী বাহিনীর দুই বিগ্রেডের সীমানায় আটকা পড়ে যায়। সামনে অগ্রসর হওয়ার বা পেছনে সরে যাওয়ার সব রাস্তাই বন্ধ ছিল। আমি এক উঁচু পাহাড়ের টিলায় আমার কোম্পানীর পজিশন নির্ধারণ করি। তা ধ্বংস করার জন্য জাপানী বাহিনী পুরো বিগ্রেড দিয়ে আক্রমণ চালায়। যদি আমার বিগ্রেড ধ্বংস হয়ে যেত, তাহলে জাপানী বাহিনী আমার বিগ্রেডের হাড়মাংস পিষে ফেলত। আমি পুরো আট দিন আট রাত জাপানী বাহিনীর জন্য এ রাস্তা বন্ধ করে রাখি। আর তাদের আক্রমণ সফল হতে দেইনি। আমার বিগ্রেড ঘেরাও থেকে বের হয়ে আসে। এভাবে আমি অন্যান্য জাতির উপর মুসলমানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছি। এ জন্য আমাকে সামরিক তৃতীয় ক্লাস উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এ পুরো উপাধিতে Battle of Box নাম করণ করা হয়।

অতঃপর আমরা নিজ দেশে নিজ বাহিনী গঠন করি। ১৯৪৭-৪৮ সালে আমি প্রথম কাশ্মীর যুদ্ধে যোগদান করি। কিন্তু তা ছিল বিরাট পরীক্ষার সময়। সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালের সকাল বেলা যখন কুফরের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা কুরআনের দেশকে ধ্বংস করার বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এগিয়ে আসছিল। পথে যেখানে সমূদ্র প্রতিবন্ধক ছিল তা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে আসছিল। কিন্তু এই কুফরী শক্তি কচু ক্ষেতের কয়েক গজ পথ অতিক্রম করে সামনে আসতে সক্ষম হয়নি। এটা মুসলমান সৈনিকের শক্তির মুজিযা ছিল যার রক্তে কুরআনের যুদ্ধবিদ্যা সচল করে রেখে ছিল, নতুবা এক লাখ বাহিনীর আক্রমণকে হাজারের কম সংখ্যক বাহিনীর পক্ষে কি করে তাদের দমিয়ে রাখা ও প্রতিরোধ করা কি করে সম্ভব? আমি সেপ্টেম্বর ১৯৬৫ সালের সেই সকালের কথা কখনো ভুলতে পারব না।

কারণ, আমার সামনে মাটি ও খুনের এক মহা তাণ্ডব হয়ে গেছে। কুফরের এ ধ্বংসযজ্ঞ পাকিস্তানী মুসলমানদের জন্য বিরাট এক পয়শাম নিয়ে এসেছে। এটা এক কার্যকরী উপদেশ ছিলো, যা কুরআনের পবিত্র পৃষ্ঠাসমূহ আমাদের সামনে রাখা ছিল, আমি কুরআনে যা পাঠ করেছি, তা আমাকে আমার অফিসার ও নওজোয়ানদের বাস্তবায়ন করে দেখাতে হয়েছে।

জনৈক ইউরোপীয় দার্শনিক বলেছেন, "যুদ্ধ মানুষের জন্য ধ্বংসাত্মক অভিশাপ বয়ে আনে। কিন্তু কোন কোন জাতির জন্য এটা মহাকল্যাণকর প্রমাণ হয়। এর ধকল ছাড়া জাতি সমূহ নিজের কর্তব্য ভুলে গিয়ে তার সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। যুদ্ধ ঘুমন্ত জাতিকে জাগ্রত করে দেয়।" ৬ সেপ্টেম্বর সকালে যখন আমাদের তরবারী কাফিরদের তরবারীর সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। তখন আমি ঐ মুহূর্তকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করি। কেননা মিল্লাতে পাকিস্তানকে ডোল পিটিয়ে ঘুম থেকে জাগানোর জন্য মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলা কুফরের আক্রমণকে মাধ্যম বানিয়েছেন। আমি অঙ্গীকার করে বলছি, আমার অন্তরে আদৌ মৃত্যুর ভয় ছিলো না। অবশ্য এ ভয় ছিল যে, পাকিস্তানের মূল ভূ-খণ্ডে আঘাত হানার জন্য শত্রুরা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। আর আমি পাকিস্তানে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করছি। শত্রুর মোকাবিলায় আমার ডিভিশনের শক্তি এতো দুর্বল ছিল যে, একজন সৈনিককে শত্রুপক্ষের দশজনকে প্রতিরোধ করতে হয়েছে। আর একটি ট্রেংককে দশটি ট্রেংকের মুকাবিলা করতে হয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য এ একটা উপায় ছিল। আমার ভয় ছিল যে, আমাদের অফিসার ও সৈনিকদের এতো দিন পর্যন্ত শুধু যুদ্ধের অনুশীলন করতে হয়েছে। তাতে মৃত্যুর ভয় ছিল না, না জানি তারা জানের ভয়ে ভীত হয়ে পেছনে সরে পড়ে। কুরআনের ভূ-খণ্ডের ইজ্জত-সম্মান আমার ডিভিশনের উপর ন্যাস্ত ছিল। এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ও ভয়ংকর দায়িত্ব। কিন্তু দুশমনের গোলার প্রথম আঘাতের জবাবে আমি আমার ডিভিশনের মোর্চাসমূহ থেকে নারায়ে তাকবীর-আল্লাহ আকবার ধ্বনি দিতে শুরু করি। আর ঘোষণা করতে থাকি যে, পাকিস্তানি ভাইয়েরা! আজ বে-ইজ্জতী হতে চাই না। তখনই আমার অন্তর থেকে সকল প্রকার ভয়ভীতি ও সন্দেহ দূর হয়ে যায়। ঐ তাকবীর ধ্বনীগুলো আমাকে কুরআনের এ আহবান শোনাতে শুরু করে যে,
قَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ

অর্থ: আর তাদের সাথে লড়াই করতে থাক, যাবত না কুফরী মিটে যায় আর পুরো দ্বীন আল্লাহ তা'আলার হয়ে যায়।

আল্লাহর সিপাহীরা ঐ কর্তব্য ও ঐ উদ্দীপনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিল। যার উৎস হল, কুরআন মজীদের এ ঘোষণা, আল্লাহ তা'আলার সিপাহীরা কুরআনের এক একটি শব্দের জন্য শত শত রক্ত বিন্দু উৎসর্গ করেছিল। আমাদের সামনে ছিল কুরআনী শিক্ষা অর্থাৎ পাক বাহিনীর শিক্ষা ব্যবস্থা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করা হয়েছে। কিন্তু এ পরিবর্তনের মূল বুনিয়াদ হলো কুরআনের ঐ শিক্ষা, যা কুরআন ঘোষণা করেছে।

فَإِمَّا تَشْقَفَنَّهُمْ فِي الْحَرْبِ فَشَرِدُ بِهِم مَن لعلهم يذكرون
অর্থঃ সুতরাং যদি তোমরা তাদেরকে কোন যদ্ধে পেয়ে যাও, তবে তাদেরকে এমন ভাবে হত্যা করো, যা দ্বারা তাদের পশ্চাতে যারা আছে তাদেরকে বিতাড়িত করো, এ আশায় যে, হয়ত তাদের শিক্ষা হবে। (আনফাল -৫৭)

এ শ্বাশত ঘোষণা অনুযায়ী আমার দৃষ্টি ছিল দুশমনের পেছনের অংশের প্রতি। যেমন ছিল তাদের প্রথম অংশের প্রতি। আমার ধারণা ছিল, দুশমনের পেছনের অংশ ভীষণ ভারী ও শক্তি শালী হবে। আমি অনেক দূর থেকে গোলা নিক্ষেপ করি। আর পাক যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করা হয়। সর্বপ্রথম আমি যখন পাক যুদ্ধবিমানের সাহায্য চাই, তখন আমার ধারণা ছিল না যে, আমাদের এত ক্ষুদ্র বিমান বাহিনী দুশমনদের ঐ প্রচণ্ড বিমান হামলা প্রতিহত করতে পারবে। দুশমনের বিমান এবং অন্যান্য আস্তানায় ও আক্রমণ চালাতে হবে। আর পাক বাহিনীকে সহায়তা ও করতে হবে। তাদের সবকিছু দেখা শোনাও করতে সাহসী হবে। ভারতের বিশাল বিমান বাহিনীর আক্রমণও প্রতিহত করতে হবে। কিন্তু আমাদের সাহসী বোমারুদের প্রথম উড্ডয়নই কাজে আসে। তখনই বোমারুরা কুরআনের প্রশিক্ষণ পুরোপুরি দেখিয়ে দেয়।

আমাদের ঐ বোমারুরা আর দুরপাল্লার কামানের গোলা সমূহ দুশমনের পেছনের অংশ আর আমাদের জানবাজ অফিসার ও চৌকোস নওজওয়ানরা দুশমনদের দুর্বল করে দেয়। ঐ সময় কুরআন মজীদের এক ঘোষণার যুদ্ধের ময়দানে পুনরাবৃত্তি করা হয়। যা আমাদের রণকৌশলের প্রশিক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অত্যাবশ্যক অংশ ছিল। মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তা'আলার ঘোষণা হল,
وَالْعَادِيَاتِ ضَبْحًا فَالْمُورِيَاتِ قَدْحًا ....... فَوَسَطَنَ بِهِ جَمْعًا
অর্থঃ শপথ ঐ অশ্বসমূহের! যেগুলো দৌড়ে এমতাবস্থায় যে, সেগুলোর বুক থেকে আওয়াজ বের হয়। অতঃপর পাথর সমূহ থেকে আগুন বের করে খুরের আঘাতে মেরে। অতঃপর প্রভাত হতে লুঠতরাজ করে। অতঃপর ঐ সময় ধূলি উড়ায়। অতঃপর শত্রুর সৈন্যদলের মধ্যে প্রবেশ করে।

আমরা যুদ্ধের ময়দানের ধূলোবালি কাজে লাগিয়ে উপকৃত হই। এটা ৭/৮ সেপ্টেম্বরের রাতে প্রথম প্রহরের ঘটনা। আমি অবগত হয়েছিলাম, দুশমনের কোমর এ পর্যন্ত ভেংগে গেছে। তারা হতাশ ও নিরুৎসাহ হয়ে পড়েছে। এমনকি প্রথম হামলায় যারা বেঁচে গেছে, তারা পুনরায় একত্রে সমবেত হয়ে আবার হামলা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। আমরা তখন ধূলাবালি ও ধোঁয়ার কারণে দুশমনদের শক্তি সঠিক আন্দাজ করতে পারিনি। অবশ্য আমাদের ধারণা ছিল তাদের তুলনায় আমাদের শক্তি ও জনবল অত্যন্ত কম। আমাদেরকে এ শক্তি দিয়েই লাহোরকে রক্ষা করতে হবে। আমি চিন্তা করি যে ভাবে ধূলাবালির কারণে যেভাবে দুশমনদের দেখা সম্ভব হচ্ছে না, এমতাবস্থায় আমাদের রণকৌশল কি হবে। আমি বিগ্রেডিয়ার কাইউম শের ও বিগ্রেড আফতাব আহমদকে উপদেশ দিলাম, তাদেরকে প্রতিরোধমূলক মোর্চাগুলোকে দুর্বল না করে নূন্যতম শক্তি দিয়ে রাতের অন্ধকারে দুশমনদের প্রতি যথাসম্ভব কঠিন আক্রমণ চালাতে হবে। আর এত পরিমাণ ধূলা উড়াবে যেন দুশমন আসল শক্তি ধারণা করতে না পারে। শুধু তড়িৎগতিতে কঠোর আক্রমণ করে দুশমনদের হতবিহ্বল করে তাদের ঘেরাও করে ফেলতে হবে।

৮ সেপ্টেম্বর সকালে আমাদের হাতেগোনা কয়েক জন যুবক। আর গুটি কয়েক ট্রেংক আরোহী চৌকস জানবাজ অফিসাররা কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী ধূলা উড়িয়ে শত্রু ব্যূহের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তাদেরকে এমনভাবে নির্মূল করে যে, শত্রু সীমা অতিক্রম করে কয়েক মাইল ভিতরে প্রবেশ করে নিজেদের ক্যাম্প স্থাপন করে। এটা ছিল পবিত্র সময় যখন আমাদের অফিসার ও জওয়ানরা নারায়ে তাকবীর ধ্বনী দিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে যে, আমরা পাকিস্তানের বক্ষকে কুফরের আঘাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। আল্লাহর সিপাহীরা কুরআন মজীদের ঐ ঘোষণাও পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেছে যে, যুদ্ধবন্দী ও অসহায় লোকদের প্রতি অস্ত্র তাক করবে না। যখন তোমরা কেউ দুশমনদের হাতে বন্দী হয়ে যাবে, তখন নিজেদের গোপনীয় রণকৌশলের কথা প্রকাশ করবে না। এখন আমি এক মজার ঘটনা পেশ করছি। ঘটনা হল, দুশমনদের কতিপয় ব্যক্তি যখন আমাদের হাতে বন্দী হয়ে যায়, তখন তারা কেঁদে কেঁদে বলছিল, আমদেরকে গুলি করে মেরে ফেলুন। কেননা আমাদের বলা হয়েছে, পাকবাহিনী হিন্দু সৈন্যদেরকে হিংস্র প্রাণীর মত জীবিত খেয়ে ফেলে। তখন আমাদের এক কোম্পানীর কমাণ্ডার মাহবুব মালিক জনৈক ভারতীয় বন্দী সৈনিককে জবাব দিলেন, আমার ভাইয়েরা! আমরা অবশ্যই গোশত খাই, তবে হালাল প্রাণীর।

বন্দী শত্রুদের সাথে পাকবাহিনী তাদের অলীক সন্দেহের বিপরীতে ভ্রাতিত্ব সুলভ আচরণ করে। আহতদের রক্ত দানের ব্যবস্থা করে। তাদেরকে তৃপ্তি সহকারে আহার দেওয়া হয়। আমাদের এক ব্যাটলিয়ান কমাণ্ডার তাসদিক হোসাইন ভারতের বিরাট এক এলাকা দখল করে নেয়, সেখানে হাজার হাজার হিন্দু, শিখ, বৃদ্ধ নারী ও শিশুরা ছিল। কর্নেল তাসদিক তাদের শুধু নিরাপত্তাই দেননি বরং তাদেরকে নিজেদের রেশন পর্যন্ত দিয়ে দেন। অথচ তার নিজের সৈনিকদের রেশনের বিপুল পরিমাণ ঘাটতি ছিল। আর ঐ এলাকায় প্রচুর পরিমাণে শশা ও ক্ষিরা উৎপন্ন হত। তিনি তা ভালোভাবে দেখাশোনা করার জন্য কতিপয় নওজওয়ানকে নিয়োজিত করেন।

গোলাগুলি বন্ধ হওয়ার পর তিন চার জন ভারতীয় অফিসার, তাদের একজন হিন্দু সি.এইচ.পি. অফিসারও ছিল। তারা আমাদের ক্যাম্পে এসে বলে, এ গ্রামের লোকজন কর্নেল তাসাদিকের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর পদচুম্বন করতে চায়। তারা বলে মুসলমানদের আন্তরিক উদারতার কথা ইতিহাসে পড়েছি এবং শুনেছি, তা এখন স্বচোখে দেখতে চাই। এ ঘটনা হয়ত আপনারা সংবাদপত্রে পাঠ করেছেন। ভারতীয় সংসদ ভবনে প্রশ্নোত্তর আকারে উত্থাপিত হয়েছিল যে, পাক বাহিনীর দখল কৃত পূর্ব পাঞ্জাবের (ভারত) ঐ অঞ্চলে পাকবাহিনী কতজন নারীর সম্ভ্রমহানী করেছে। দুশমনরা সরকারীভাবে জবাব দিয়েছে, একজন নারীরও সম্ভ্রমহানী করা হয়নি। একজন মহিলাকেও অপদস্ত করা হয়নি।

শত্রুদের এক বন্দী অফিসার বন্দী বিনিময়ের সময় বলেছিল, পাকিস্তানী মুসলমান যুদ্ধের ময়দানে সিংহের আকৃতি ধারণ করে। কিন্তু অতিথি অবস্থায় (অর্থাৎ যখন তাদের হাতে বন্দী হয়ে যাবে) তখন তাদের অন্তর মোমের মত কোমল হয়ে যায়। আর তাদের পাত্র প্রশস্ত হয়ে যায়।

এ হচ্ছে আল্লাহ্ সৈনিকদের বৈশিষ্ট্য। যা দুশমনরা তাদের সংসদে আর বিদেশী সংবাদ সংগ্রহকারীদের সামনে অকপটে প্রকাশ করেছে।

যতদূর পর্যন্ত আমাদের যুদ্ধবন্দীদের সম্পর্কে জানা যায়, দেখা যায়, যারা দুশমনের হাতে বন্দী হয়েছে, আমরা অসংখ্য উদাহরণ পেশ করতে পারব যে, দুশমনরা তাদের সাথে অমানবিক আচরণ করেছে। এমন কারো কারো জীবিত অবস্থায় পেট চিরে ফেলেছে। কিন্তু পাকিস্তানী সৈনিকরা নিজেদের গোপন কথা প্রকাশ করে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। অমানবিক আচরণের দ্বারা এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়েছে যে, পাকিস্তানী সৈনিক দুশমনের হাতে বন্দী হওয়ার পরও গোপন কথা ফাশ করেনি। নতুবা তারা প্রথম দিনেই সমস্ত গোপন কথা প্রকাশ করে দিয়ে পরবর্তী দিনগুলো আরামে কাটাতে পারত। বলতে পারব না যে, আমি এ কথার সঠিক জবাব পেশ করতে পেরেছি কি পারিনি। আমার কথা হল, আল্লাহর সৈনিকদের কাজ কুরআনের আলো প্রজ্বলিত করা। মুসলমান সৈনিকদের কাজকে হিন্দু অফিসাররা সঠিকভাবে প্রকাশ করেছে। "যুদ্ধের ময়দানে হিংস্র হয়, আতিথিয়তায় কোমলপ্রাণ ও হাত উদার হয়ে যায়।"

ডক্টর আল্লামা ইকবাল রহ. মুমিনের প্রশংসায় বলেন, "বন্ধুদের মাঝে রেশমের মত কোমল, সত্য ও মিথ্যার ব্যাপার হলে মুমিন হয় ইস্পাত কঠিন।"

দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের পথ নির্দেশনাঃ
সূরা ফাতিহাতে আমাদের দু'আ শিখানো হয়েছে যে, হে আল্লাহ তা'আলা! আমাদিগকে সরল সঠিক পথের দিশা দাও। কুরআন মজীদে এর জবাব দেওয়া হয়েছে। এ সঠিক উদ্দেশ্য সঠিক জীবনযাপনের প্রতি পথপ্রদর্শন করে। আর ঐ পথে পরিচালিত হওয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়। আমার জানা মতে, পবিত্র কুরআন মজীদ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ও এভাবে পথ নির্দেশ না দেয়। যেমন, বড় বড় সমস্যার সম্মুখীন হলে আমরা দিক নির্দেশনা পাই। এরূপ নয় যে, কুরআন মজীদ দ্বারা শুভাশুভ নির্ণয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। আমরা কুরআন মজীদ দ্বারা এভাবে হিদায়াত লাভ করতে পারি। তা স্পষ্ট করার জন্য একাধিক ঘটনা উল্লেখ করছি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা শোনার পর গুরুদাসপুর ঐ দিকে চলে যায়। পিরোজপুর মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ও অনুরূপ আরো অনেক এলাকা যা আমাদের পাওনা ছিলো। তাতে আমার ভীষণ দুঃখ হয়। আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব আমার সাথে সাক্ষাত করে। সবাই শোকাহত ছিল। এমতাবস্থায় এশার আযান দেওয়া হয়। আমরা সবাই জামাতে হাযির হই। ইমাম সাহেব নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতহের নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ পাঠ করেন, "নিশ্চয় আমি আপনার জন্য সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। যাতে আল্লাহ আপনার কারণে পাপ ক্ষমা করে দেন আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের ও আপনার পরবর্তীদের এবং আমার নিয়ামত সমূহ আপনার উপর পরিপূর্ণ করে দেন। আর আপনাকে সোজা পথ দেখিয়ে দেন এবং আল্লাহ আপনাকে বড় ধরনের সাহায্য করেন।"

১৯৪৮ সালে আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাশ্মিরের রণাঙ্গনে যোগদান করার ইচ্ছা করি। ঐ দিন রাতে আমার মন হতোদ্যম ও ভীত হয়ে যাই। সকালে ফজরের নামাযের জামাতে হাজির হই। ইমাম সাহেব নামাযে সূরা আস্-সাফ, তিলাওয়াত করেন। যার অর্থ- "হে ঈমানদাররা! তা কেন বল, যা করো না, কেমন জঘন্য অপছন্দনীয় আল্লাহর নিকট সে কথা যে, তাই বলবে যা করবে না। নিশ্চই আল্লাহ ভালবাসেন তাদেরকে, যারা তাঁর পথে জিহাদ করে এমনই সারিবদ্ধ হয়ে যেন তারা সীসা ঢালা প্রাচীর।"

সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও ভয়ভীতি এমনিতে দূর হয়ে গেল। আমি পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ দিনই গন্তব্য স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।

একদিন আমার জনৈক বন্ধু বলল, তুমি অমুকের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছ। চলো, তার সাথে সাক্ষাত করে আসি। আমি বললাম আমি তার উপর অসন্তুষ্ট হইনি, কিন্তু আমি তার ওখানে যাবনা। কেননা সে এমন আচরণ করেছে। এমন সময় এশার নামাযের আযান হয়ে যায়। জামাতে হাযির হই। ইমাম সাহেব নামাযে যেসব আয়াতপাঠ করেন, তার অর্থ ছিল-

"আর ভালো-মন্দ এক সমান হতে পারে না। আত্মরক্ষা করো স্থায়ীভাবে যা হবে উত্তম। তারপর দেখবে ঐ ব্যক্তি যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল, সে এরূপ হয়ে যাবে, যেন সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে। এটা লাভ করতে পারে না কিন্তু যে ধৈর্য্যশীল। আর এটা লাভ করতে পারে না, কিন্তু যে বড় সৌভাগ্যবান।"

নামায শেষ হওয়ার পর আমি আমার বন্ধুকে বললাম, চলো তার ওখানে চলো। ওখানে পৌছার পর সে আমাদের সাথে আন্তরিক হৃদ্যতার সাথে মিলিত হয়।

একবার কোন কারণে এক খান্দানের সাথে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। নামাযে হাজির হলে ইমাম সাহেব সূরা বনী ইসরাইলের এ আয়াত পাঠ করেন।
"এবং অনেক সময় মানুষ (নিজের অমঙ্গল) কামনা করে, যেভাবে কল্যাণ প্রার্থনা করে"

আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলি। একবার কতিপয় ব্যক্তি আমার সাথে এমন আচরণ করে, তাতে আমি নিরূপায় হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করি। অতঃপর আমি নামাযে হাজির হলে নিম্নোক্ত আয়াত শুনি, "নিশ্চই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথী হন।" তারপর দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য্য ধারণ করি। আল্লাহর অনুগ্রহে পরিণতি অত্যন্ত শুভ হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00