📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 অন্ধকার থেকে আলোর পথে

📄 অন্ধকার থেকে আলোর পথে


মাহমুদ বে-মিশরী বলেছেন-

আমি কয়েক বছর যাবত ফ্রান্সে বসবাস করছি। আমার সঙ্গী সাথীদের নিকট ফ্রান্সবাসী এক ডাক্তারের গুণাবলী ও প্রশংশা শুনতে শুনতে আমার কান ঝালা পালা হয়ে গেছে। কেউ বলত, ডাক্তার ফিরিশতা। কেউ বলত, সততার মূর্ত প্রতীক। কেউ বলত, ডাক্তারের মানবতা অদ্বিতীয়-অতুলনীয়। ভদ্রতা, সততা, উন্নত ধ্যান-ধারনা, উষ্ণ আতেথিয়তা, একাগ্রতা, অমায়িক আচরণ, উদার মন-মানসিকতা মোটকথা এমন কোন মানবীয় গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য নেই, যা তার মধ্যে ছিল না। যার সাথে আমার সাক্ষাতে এরূপ সম্পর্ক হতে পারে না। আমি বুঝলাম, অতিথিদের প্রতি তার ব্যাপক অনুগ্রহ হতে পারে বরং আশ্চর্য্যের ব্যাপার হল, রুগ্ন ব্যক্তিদের চেয়ে সুস্থ লোকেরা তার প্রশংসার ব্যাধির শিকার হয়েছে অনেক বেশী।

ঐ ডাক্তারের নাম ছিল শারীয়ানা। তিনি ফ্রান্সের সংসদ সদস্যও ছিলেন। আর এটা তার জনপ্রিয়তার অপর এক বিরাট প্রমাণ। কারণ, স্বাধীন রাষ্ট্রের সংসদের একজন সদস্যের দায়িত্ব পালন এবং জাতির প্রতিনিধিত্ব করা এমন এক ইজ্জত ও সম্মানের কাজ, যা সেখানকার খ্যাতনামা ও নির্বাচিত ব্যক্তিই লাভ করতে পারে। কিন্তু তার সম্পর্কে লোকজন বলত, ডাক্তারের সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠা এ সম্মান থেকেও এত বেশী ছিল যেন জমিন থেকে আসমান সমতূল্য। সাহযোগিতা হক আদায় তিনি সত্যের ও জনসেবার উদ্দেশ্যে সংসদে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু তিনি সেখানে সব মানুষকেই সততা ন্যায়-নিষ্ঠার অবমাননা করতে, দেখেছেন সেখানে সততা ও সত্যতাকে গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে। অসহায় গরীব দুঃখীদের রক্ত মাংস বেচা কেনা করা হচ্ছে। অত্যাচারীত ও উৎপীড়ীতের রক্ত মূল্যহীন, শান্তি ও নিরাপত্তার নামে দাসত্ব ও ফাসাদের বীজ বপন করা হচ্ছে।

সংসদ ভবনে মানবতা সত্য ও ন্যায়ের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করছে। কিন্তু তার শোক ও দুঃখ প্রকাশের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ কারী কেউ নেই। সৎ মনের ডাক্তার এ চিত্র দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। তিনি সংসদকে উন্নতি ও মুক্ত চিন্তা ভাবনার স্বর্গ মনে করে সংসদে যোগদান করেছিল। কিন্তু তিনি দেখেন যে, এখানে চিত্তাকর্ষক ও মনভুলানো ভাষণের অন্তরালে যুদ্ধ-বিগ্রহ হানাহানী, মারামারী, সংঘর্ষ, হিংসা, ঘৃণা, ধ্বংস, লোভ লালসার নরক প্রজ্জলিত করা হচ্ছে। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যহীনতার সাথে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। তিনি সংসদের সম্মানের তোয়াক্কা করলেন না। তিনি এসব বিষয়কে এবং স্বীয় ইজ্জত-সম্মান, অর্থ-সম্পদ ও ভবিষ্যত উন্নতি-সুখ্যাতিকে বে-পরোয়াভাবে দূরে নিক্ষেপ করে। তিনি সংসদের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেন। শুধু সংসদের সাথে নয় বরং প্যারিসের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফ্রান্সের কোলাহল মুক্ত নামমাত্র এক গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং জন জীবের সেবায় মনোনিবেশ করেন।

মাহমুদ বে-মিশরী বলেন, আমি যখন তার অবস্থা সম্পর্কে অবগত হই, তখন আমার মনে হয়, ফ্রান্সের ঐ খ্যাতনামা মহৎ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাই আমি তার সাথে একাকী নিভৃতে সাক্ষাত করার ইচ্ছা করি। অন্তত তার নিকট ইসলাম গ্রহণ করার কারণ জানার আশা পোষণ করি।

আমি তার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে প্যারিসের ঐ নিভৃত পল্লিতে অভিমূখে যাত্রা করি, যেখানে ঐ স্বনামধন্য ব্যক্তি বসবাস করছেন। আমি গ্রামে প্রবেশ করে লোকজনকে ডাক্তার অসহায়ত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে শুরু করি। যাকে জিজ্ঞেস করি সেই তার ডাক্তারেনর প্রতি অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধার অবনত হয়ে যেত। আর অত্যন্ত হাসি-খুশি ও স্বানন্দে আমার প্রশ্নের জবাব দিত। শহর বাসিরা সকলেই ডাক্তারের প্রসংশায় মঞ্চমুখ ছিল। আমার মনে হয়, শহরের অধিবাসীশা সকলে ডাক্তারের অনুগ্রহ প্রকাশার্থে মস্তক অবনত করে দিয়েছে। শহরে এমন কোন লোক ছিল না, যে ডাক্তারের প্রশংসা, ইজ্জত-সম্মান ও ভদ্রতার কথা বর্ণনা করেনি। সে শিশুদের জন্য ছিল ইজ্জত ও সম্মানের বার্তাবাহক। অনাথ শিশু ও বিধবা মহিলাদের নিরাপত্তার প্রতীক। শহরের দেওয়াল সমূহে তার নামে পোষ্টার লাগানো ছিল না। কিন্তু আমি দেখেছি, প্রত্যেক ব্যক্তির কপালে তার ইজ্জত-সম্মানের সাইন বোর্ড ঝুলানো আছে। আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি জীবের অন্তরে তার আন্তরিকতা ও অনুগ্রহের বৃষ্টিধারা কামানের মত ঝুঁকে রয়েছে। আমি অতি দ্রুত ডাক্তারের নিকট পৌছি। তার ললাটে স্নেহ ও মহানুভবতার নিষ্পাপ নক্ষত্র খেলা করছিল। তিনি অত্যন্ত হৃদ্যতার সাথে আমার সাথে সাক্ষাত করেন। তার এ হৃদ্যতা পূর্ণ উষ্ণতা দেখে মনে হয়, সেই ইসলামী ভ্রাতৃত্ব পূনর্জীবিত হয়েছে। তিনি নিজ কাজ থেকে অবসর হওয়ার পর আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি।

ডাক্তার সাহেব আপনার ইসলাম গ্রহণের কারণ কি? ডাক্তার দরদভরা কণ্ঠে জবাবে বললেন, কুরআনের শুধু একটি আয়াত।

মাহমুদ বে জিজ্ঞেস করলেন। "তাহলে কি আপনি কোন মুসলমান আলেমের নিকট কুরআন শিখেছেন? আর ঐ এক আয়াত আপনার উপর কি প্রতিক্রিয়া করেছে? ডাক্তার সাহেব বললেন-না, এ পর্যন্ত আমার সাথে কোন মুসলমানের সাক্ষাত হয় নি।

মাহমুদ বে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কুরআনের কোন তাফসীর অধ্যয়ন করেছেন?

ডাক্তার সাহেব বললেন- না, আমি এ পর্যন্ত কোন তাফসীর গ্রন্থ পাঠ করিনি। তাহলে এ ঘটনা কি ভাবে সংঘটিতি হয়েছে?

ডাক্তার সাহেব বললেন, আমার যৌবনকাল আমি সমূদ্র ভ্রমণে অতিবাহিত করেছি। সমূদ্রের মনোরম দৃশ্যাবলী উপভোগ করা, সমূদ্র ভ্রমণ আমার এতো প্রিয় ছিল, যেন আমি এক সামুদ্রিক প্রাণী হয়ে গিয়েছিলাম। আমি দিবা রাত্রি পানি ও আসমানের মাঝে অতিবাহিত করেছি। আর তাতে এত আনন্দ উপভোগ করতাম, যেন আমার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। ঐ সময় কুরআন মজীদের ফরাসী মুসীওসাকারীর লিখিত অনুবাদের একটি কপি আমার হস্তগত হয়। আমি তা খোলার সাথে সাথে সূরা নূরে বর্ণিত এক আয়াত আমার সামনে আসে। তাতে সমূদ্রের দৃশ্যাবলীর অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছিল। আমি উক্ত আয়াত অত্যন্ত গভীর মনোযোগের সাথে পাঠ করি। উক্ত আয়াতে কোন এক ব্যক্তির অবস্থার এক বিস্ময়কর উদাহরণ পেশ করা হয়েছে। তাতে লেখা ছিল, পথভ্রষ্ট এক ব্যক্তি বাস্তবতা অস্বীকারে এরূপ উন্মাদন হয়ে হাত পা ছুঁড়ে মারছে, যেন এক ব্যক্তি অন্ধকার রাতে যখন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে সমূদ্রের ঢেউয়ের নিচে হাত পা ছুঁড়ে মারছে।"

ডাক্তার শারীয়ানা ঐ ঘটনা এ ভাবে বর্ণনা করেছেন যে, তার অন্তর উদাহরনের সম্মানে প্রকম্পিত হচ্ছিল। তাঁর বর্ণনা মতে ঐ উদাহরণের নির্ভরযোগ্যতা, অন্তরে অধিষ্ঠিত হওয়া, ইসলামের সত্যতা ও সততার এক অতি উল্লেখযোগ্য পূর্ণাঙ্গ দলীল হয়েছে। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের বক্তব্যে আমার অন্তর প্রশান্তি লাভ করেনি। আমি জিজ্ঞেস করি, ডাক্তার সাহেব। এর পর কি ঘটনা ঘটেছে?

ডাক্তার সাহেব বললেন, উক্ত আয়াতের অনুবাদ হচ্ছে,
"অথবা যেমন অন্ধকার রাশি কোন সমূদ্রের গভীর জলাশয়ের মধ্যে, তার উপর ঢেউ, ঢেউয়ের উপর আরো ঢেউ, তার উপর মেঘমালা, অন্ধকার পূঞ্জ রয়েছে একের উপর এক। যখন আপন হাত বের করে তখন তা দেখা যাওয়ার আদৌ সম্ভাবনা নেই এবং যাকে আল্লাহ আলো দান করেন না তার জন্য কোথাও আলো নেই।"

আমি যখন উক্ত আয়াত পাঠ করি, তখন আমার অন্তর উদাহরণের নির্ভরযোগ্যতা ও বর্ণনার বাচনভঙ্গীতে অত্যাধিক প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এমন সত্ত্বা হবেন। যাঁর রাত দিন আমার মত সমুদ্রে অতিবাহিত হয়েছে। তদুপরি আমার অন্তরে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না। আর আল্লাহর রাসূল (সঃ) তার সৌভাগ্যের নিদর্শন ছিলেন যে, তিনি পথ ভ্রষ্টতা ও লাম্পট্যতা। এবং তাদের শ্রম সাধনার অবস্থাকে কিভাবে সংক্ষিপ্ত শব্দে বর্ণনা করেছেন। যেন তিনি স্বয়ং ঐ রাতের অন্ধকারাচ্ছন্নতা, বৃষ্টির অন্ধকার আর প্রবল ঢেউয়ের মহাতাণ্ডবে এক জাহাজের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আর এক ব্যক্তিকে অসহায়ভাবে নিমোজ্জিত হতে দেখছেন। আমি ভাবলাম, সামুদ্রিক বিপদ সম্পর্কে কোন বিশেষজ্ঞ থেকে মহা বিশেষজ্ঞ এত সামান্য শব্দের মাধ্যমে সামুদ্রিক ঝড়ের এতোধিক ভয়ংকর অবস্থা পূর্ণাঙ্গ ও সঠিকভাবে বর্ণনা করতে পারবে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আমার অন্তর আলো উদ্ভাসিত হয়ে যায়। তখন আমার মনে হয় এটা মুহাম্মদ (সঃ) এর বাণী নয় বরং ঐ খোদার বাণী, যিনি রাতের অন্ধকারের প্রতিটি অসহায় নিমোজ্জিত ব্যক্তিকে দেখছেন। আমি আমার হাত দ্বারা কুরআন আঁকড়ে ধরি। এর আয়াত সমূহের প্রতি গভীর মনোযোগের সাথে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করি। কয়েক দিনের মধ্যে আমি মুসলমান হয়ে যাই।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 ইসলাম ও পরিবেশগত সংকট

📄 ইসলাম ও পরিবেশগত সংকট


উন্নতি লাভের অসংখ্য উপকরণ থাকার পরও বিংশ শতাব্দির উদ্ভূত সমস্যা সমূহের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল পরিবেশ বিপর্যয়। বিশেষ করে বিগত অর্ধ শতাব্দির মধ্যে ভূ-পৃষ্ঠকে দূর্গন্ধ, বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, ধূলি-ময়লা, আবর্জনা ও বিভিন্ন ধরনের অপরিচ্ছন্নতায় আচ্ছাদিত করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নব আবিষ্কৃত মানব বিধ্বংসী সমরাস্ত্রসমূহ এবং অতিদ্রুত ক্ষেত্রে বিস্তার লাভকারী বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক দ্রুতগতি সম্পন্ন যান-বাহনই দায়ী। এসবই আমাদের চারপাশ আবদ্ধ করে রেখেছে। সারা পৃথিবী জুড়ে বিজ্ঞানী জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবি ব্যক্তি স্বীয় সুন্দর স্বচ্ছ অমলিন পৃথিবীর পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার এ ধ্বংসলীলা দেখে বিলাপ করছেন। তথাপি ময়লা-আবর্জনা অপরিচ্ছন্নতা দ্রুতগতিতে বেড়েই চলেছে।

এ সম্পর্কে কুরআন মজীদের শ্বাশত ঘোষণা হল,
ظهر الفساد في البر والبحر بما كسبت ايد الناس الخ
“ছড়িয়ে পড়েছে অশান্তি স্থলে ও জলে, ঐ সব কুকর্মের জন্য যে গুলো মানুষের হাত গুলো অর্জন করেছে। (সূরা রূম)

জল, স্থল আর প্রশস্ত খোলা মাঠ সবই মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার। আর অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আগামী কিছুদিনের মধ্যে শুধু মানুষ ও জীব জন্তুর জন্য নয় বৃক্ষরাজীর জন্যও পরিস্কার নির্মল স্বচ্ছ বায়ুর বিলুপ্তির কারণে নিঃশ্বাস নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে।

কোন কোন বিজ্ঞানীর মতে পুরোপুরি পরিবেশ ধ্বংসের অর্থাৎ তাদের মতে কিয়ামত আসার শুধু অতিরিক্ত একশ' বছর প্রয়োজন হবে। বরং কর্মব্যস্ততা ও পরিবেশ দূষণ দ্রুত গতিতে যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে ঐ মহাপ্রলয় আসতে শুধু পঞ্চাশ বছর সময় লাগবে। ঐ কর্মব্যস্ততার পরিণতি হল, পৃথিবীর তাপমাত্রা অতি দ্রুত বেড়ে চলে যাচ্ছে। আর উভয় মেরুর বরফের স্তর অতি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে সামুদ্রিক জলোচ্ছাসের মারাত্মক আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এ মহা বিপদ সংকেত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হল ভূ-পৃষ্ঠ ও এর আশ-পাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। তার উপরের অংশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। আর তার উপরে বসবাসকারীদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা এবং এ মহাপ্রলয়ংকারী এটমবোম বিষ্ফারিত হওয়ার পূর্বেই কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এখন প্রশ্ন হল পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপার কি শুধু পৃথিবীর ঘনবসতি যোগাযোগ মাধ্যম, তৈল, পেট্রোল থেকে উৎপাদিত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া এবং ভূ-পৃষ্ঠে উৎপাদিত ময়লা-আবর্জনা থেকে আত্মরক্ষা চেষ্টা না করা নাকি দ্বীন-ধর্মের আহকাম ও চারিত্রিক ভূমিকা উপেক্ষা করাও দায়ী। বিশ্ববাসীর নিকট এ সমস্যা উত্তরণের কোন প্রতিকার বিদ্যমান আছে কি? আর ইসলাম যে সকল বিপদ, বিপর্যয়, সন্ত্রাস নির্মূল করার চুড়ান্ত আহবান জানিয়েছে, তা আমাদেরকে কোন পথ নির্দেশনা দান করতে পারে কি?

ব্যারিস্টার আখতার উদ্দীন আহমদ তাঁর রচিত চমৎকার Islam and Environmental Crisis নামক গ্রন্থে এ প্রশ্নের উত্তর দানে অত্যাধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি পরিবেশ বিজ্ঞানীদেরকে উৎপাদিত ময়লা আবর্জনার সাথে সাথে চারিত্রিক ও নৈতিক অপবিত্রতা থেকে মুক্তি লাভের ব্যাপারে গভীর মনোযোগের সাথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর অভিমত প্রকাশ করেছেন। তার মতে অতি জটিল ও দ্রুত বিস্তার লাভকারী এ ব্যাধির চিকিৎসা একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ইয়াহুদীবাদ খ্রিস্টবাদের সাথে সাথে অগ্নিপুজক বৌদ্ধ মতবাদ, হিন্দু মতবাদ, শিখ মতবাদের শিক্ষার মূল্যায়ন করেছেন। অবশেষে প্রাণী বিজ্ঞানী, সমাজ বিজ্ঞানী জনপদের পরিবেশ ও তাতে উৎপাদিত সামাজিক ময়লা আবর্জনা দূর করার বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে অতি প্রজ্ঞাপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। তার মতে কুরআন মজীদে কমপক্ষে একশ' আয়াতে পরিবেশ বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে হুযুর (সাঃ) এর অসংখ্য হাদীস বর্ণিত আছে। পরিবেশ কী? পরিবেশ দূষণ কাকে বলা হয়? গুরুত্বপূর্ণ ময়লা-আবর্জনা, বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য পদার্থ, যানবাহন থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, কাঠ ও কয়লার বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, কেমিক্যাল বর্জ্যপদার্থ, পানি দূষিত হওয়া, আর সামুদ্রিক নীতি মালা ভংগ, বায়ু দূষণ, ভূ-পৃষ্ঠ দূষিত হওয়া। তাতে নির্বিঘ্নে বনাঞ্চল উজাড় করাও অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। নীরব নিস্তব্দ মাদক দ্রব্যের ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া, অগ্নিবৃষ্টি, ওজনের স্তর হ্রাস পাওয়া, কেমিক্যাল বর্জ্য পদার্থ, কৃষি জমি অনাবাদ পড়ে থাকাও পরিবেশ দূষণের মারাত্মক বড় কারণ। শিল্প কারখানার দ্রুত বিস্তার লাভ, আধুনিক কৃষি পদ্ধতিতে কীটনাশক রাসায়নিক বিষাক্ত উপকরণ ব্যবহার করা, অস্বাভাবিক ধূলাময়লা, ভ্রমণ বিলাসিতা, আধুনিক মারনাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার, ধুমপান, মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্যাদির ব্যাবহার, অধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ। দ্বীনী-উলামায়ে কিরাম ও বিশেষজ্ঞ নীতি নির্ধারকদের চিন্তা-ভাবনা মতে ইয়াহুদীবাদ, খ্রিস্টবাদ, অগ্নিপূজক, বৌদ্ধ মতবাদ, নৈতিক ও চারিত্রিক একাত্মতা, পরিবেশ সম্পর্কিত ইসলামের নির্দেশনাবলী, কার্যকরী পদক্ষেপ, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও আকাঈদ, আন্তর্জাতিক আইন-কানুন, ইসলামের মৌলিক মূলনীতি কুরআন-হাদীসের আলোকে দেখা হলে প্রমাণ হবে যে, পৃথিবীকে সুন্দর, সুস্থ, পরিপাটি রাখার দায়িত্ব মানুষের উপর অর্পিত হয়েছে।

আর এর জন্য সৃষ্টি জগতের সব উপায় উপকরণ ও মাধ্যম জমা করে দেওয়া হয়েছে। কেননা এ জিম্মাদারী স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর সোপর্দ করেছেন। সুতরাং সৃষ্টি জীবের সমস্যা সমাধানের পথনির্দেশনা ও উপদেশও সৃষ্টিকর্তার আহকামের দ্বারা অর্জিত হয়েছে। এ কারণে দৈহিক ও বাহ্যিকতা ছাড়াও রূহ এর আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা লাভ করা অত্যাবশক ঘোষণা করা হয়েছে।

এ কারণে ইসলামের অনুসারীদের কথা ও কাজের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে এর বাস্তবতাকে ব্যাপক আকারে প্রচার করতে হবে যে, ইসলাম শুধু কতিপয় আনুষ্ঠানিকতার নাম নয় বরং এটা এক পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। যা আল্লাহ তা'আলার ইবাদত আনুগত্যের স্বাভাবিক পরিণতি স্বরূপ পরিবেশ সুন্দর, নির্মল পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার জিম্মাদারীও বান্দার উপর ন্যস্ত করেছে। বস্তুতঃ ইসলাম স্বভাবধর্ম হওয়ায় সকল প্রকার দুর্নীতি, ফিতনা-ফ্যাসাদ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, অসদাচরণ, বর্বরতা, দুষ্কৃতি, নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ করা, দুর্গন্ধ যুক্ত ময়লা-আবর্জনা, অপরিচ্ছন্নতা সর্বনাশা কাজ থেকে বিরত হওয়া। আর এ সব কিছু নির্মূলকারী। কিন্তু এ বিশাল পৃথিবীতে নিছক মানুষই বাস করে না। এখানে অগণিত অসংখ্য প্রাণী, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত রয়েছে। এ সবমিলে আমাদের পরিবেশ ঘটিত হয়েছে। আল্লাহ্ তা'আলা একত্ববাদ ও প্রভৃত্বের বহিঃপ্রকাশ সর্বত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাই মহান সৃষ্টিকর্তার এ বিশাল সৃষ্টিজগতকে ধ্বংস ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

পাশ্চাত্য জগতের লোক তাদের নতুন হাজার শতাব্দীর অপেক্ষায় বসে আছে। কিন্তু তাদের বিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা পরিবেশ বিপর্যয়ে মানুষের কৃতকর্মের প্রমাণ মাত্র কয়েকদিন পূর্বে অবগত হয়েছে। তাই তারা এখন চিন্তিত ও হতবাক হয়ে আছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের এ সূচনা ধারা বনাঞ্চল রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের সৎব্যবহার ও বংশ বিস্তারকে বাক্স বন্দি করে দেওয়া। তারা অনুভব করতে সক্ষম হয়েছে যে, আমাদের নিজেদের মানবীয় কৃতকর্মের কারণে ভূ-পৃষ্ঠের ওজনের স্তর পেয়ে ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত হয়েছে। যদি মানব জাতি নিজেদের কৃত কর্মের ভাল-মন্দ সঠিকভাবে চিহ্নিত না করে, তাহলে দ্রুত ক্রমাগত এ মহাপ্রলয়ের ধ্বংসলীলার শেষ সময়ের আর বেশী বিলম্ব হবে না। পরিবেশ দূষণের ব্যাপক বিস্তৃতি আমাদের পুরো ভূ-পৃষ্ঠকে করাল গ্রাস করবে।

কিন্তু সমস্যা মারাত্মক আকার ধারন করা সত্ত্বেও পরিবেশ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে লম্বা লম্বা বক্তৃতা ছাড়া এ পর্যন্ত কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি শুধু এর মৌলিক প্রয়োজন উপেক্ষা করা হচ্ছে। আসবাব পত্র, অসংখ্য মানুষ ও জড়জগত জীবজগত, বরং জমিন ও আসমান গ্রহ-নক্ষত্র এক কথায় পুরো সৃষ্টিজগতের "সৃষ্টিকর্তা" কে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি স্ব স্থানে গুরুত্ববহ বটে। কিন্তু মহান সৃষ্টিকর্তার আহকাম ও পথনির্দেশনা মান্য করা সকলের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। সুতরাং বিজ্ঞানীদের মধ্যে অধিক সংখ্যক কোন কোন ধর্মীয় মতবাদে বিশ্বাসী।

মোটকথা তাদের কেউ অধর্মে বিশ্বাসী নয়। সাধারণ মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণে দ্বীন-ধর্মের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। আসমানী ওহী ও বিশেষ করে ইসলামের পবিত্র হিদায়াতের মধ্যে এ সমস্যার বিশ্বব্যপী সমাধানের কার্যকরী ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষা লাভের পর প্রমাণ হয়েছে যে, পরিবেশ ও পরিবেশ দুষণকারী উপাদান ও উপকরণ সম্পর্কে ইসলাম অতি কার্যকরী সহজসরলপূর্ণাঙ্গ বাস্তবসম্মত কর্মকৌশল প্রণয়ন করে, তা বাস্তবায়নের উপর ভীষণ গুরুত্বারোপ করেছে। সমুদ্রের পানি, বৃষ্টির পানি জমিন বা জমিনে উৎপাদিত দ্রব্যাদি পানাহার করা জীবজন্তু, পাখি, খোলা মাঠ, বায়ু প্রভৃতি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপার হোক, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা, চন্দ্র, সূর্য গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদির বিষয় হোক, জমিনে উৎপাদিত ফসলাদী হোক বা জমিনের মাঝে লুকায়িত খনিজ দ্রব্যাদি হোক, ইসলামী শরী'আত এ সব কিছুর সঠিক ব্যবহারের নীতিমালা ও সংরক্ষণ সমৃদ্ধির আদর্শিক পথনির্দেশনা দিয়েছে। পবিত্র কুরআন মজীদে ও হুযুর (সাঃ) এর বর্ণিত হাদীস সমূহে এ সৃষ্টি জগতের সকল জীবের জন্য এক চমৎকার সময়োপযোগী যৌক্তিক ও বাস্তব সম্মত বুনিয়াদের ভিত্তি বিদ্যমান পাওয়া যায়। আর এ সব কিছু ঐ খিলাফত ও আমানতের এক উল্লেখযোগ্য অংশ যা আমরা মানুষের উপর ন্যস্ত করেছে। ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার পতাকাবাহক। কাজেই আমারা এ বিশাল সৃষ্টি জগতকে এক সংরক্ষিত ও নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠার মুখাপেক্ষি হয়েছি। ইসলামের পয়গম্বর বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সত্য সঠিক পয়গাম সমস্ত বিশ্ববাসীকে এক সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করে শান্তি, নিরাপত্তা বিধান, উন্নতি ও সুখী সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে। ইসলামের শিক্ষার আলোকে দেখা যায়, এ ভূ-পৃষ্ঠ মানুষের স্থায়ী আবাস স্থল নয়। এটা সাময়িক বাসস্থান। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে আগত অনন্ত কালের সুখী সুন্দর ও স্থায়ী জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। মানুষ শুধু দেহের নাম নয়। তার একটি আত্মাও রয়েছে।

সুতরাং আমাদের দেখতে হবে যে, ইসলাম এ যোগসূত্রে পরিবেশ সম্পর্কে কি অভিমত প্রকাশ করেছে। মহান আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি জগতের স্থায়ীত্বের জন্য কতিপয় বিধিবিধান নির্ধারণ করে রেখেছেন। তন্মধ্যে সমতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মূলনীতি। সততা সত্যবাদীতা সৃষ্টি জগতের নিয়ম শৃংখলার জিম্মাদার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব অস্বীকার করার যৌক্তিকতা নেই। তবে এ গুলোকে প্রভূ ও অভিভাবকের মর্যাদা দেওয়া যাবে না। এ সবই তো মানুষের উন্নতি ও সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। ইসলামের বিধান অনুযায়ী জীবন যাপনের উদ্দেশ্য হল, মানুষ নিজের চার পাশের পরিবেশকে সুখী ও সমৃদ্ধ সুস্বাদ নির্মল রাখা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এ জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক। সুতরাং পরিবেশ পুঁতি দুর্গন্ধময় ও দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা, আর খোদায়ী আহকামের আমানতদার হওয়ার কারণে সমস্ত সৃষ্টিজীবের কল্যাণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 যুদ্ধের ময়দানে কুরআনের কপি

📄 যুদ্ধের ময়দানে কুরআনের কপি


সেপ্টেম্বর যুদ্ধের সময় বেলুচ রেজিমেন্ট এক ড্রাইভার গোলাবারুদ ভর্তি এক ট্রাক যুদ্ধের ময়দানে সামনের কোন মোর্চার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধের ময়দানে তখন টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। নিজ ও শত্রুর মোর্চাসমূহের পরিচয় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পাক বাহিনীর ঐ ট্রাক চালক ধূলাবালি, ধোঁয়া উপেক্ষা করে দুশমনদের সীমানায় ঢুকে যায়। দুশমনরা তাকে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন ঐ জানবাজ ট্রাক চালক গোলাকারুদ ভর্তি ট্রাককে দুশমনের হাতে ন্যস্ত করার স্থলে জীবনবাজী রেখে ট্রাক ঘুরিয়ে নেয়। দুশমনরা তাকে চার দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। কিন্তু পাক ফৌজের এই দুসাহসী ট্রাকচালক গোলাবারুদ ভর্তি ট্রাককে উচু নীচু জমিন ও টিলা টংগরের উপর দিয়ে চালিয়ে দুশমনের ঘেরাও থেকে বের করার চেষ্টা করতে থাকে। শত্রু বাহিনী তার উপর বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষন করতে থাকে। আল্লাহ ছাড়া কারো জানার উপায় ছিল না যে, সে আহত হয়েছে না অক্ষত রয়েছে। কিন্তু শত্রু বাহিনীর এক শিখ অফিসারের বর্ণনা মতে সে ঐ ট্রাককে নিজের মোর্চার দিকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। অবশেষে তার উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। ফলে গোলা-বারুদ ভর্তি ট্রাক বিস্ফোরিত হয়ে যায়। আগুন নিভে যাওয়ার পর এক শিখ মেজর পবিত্র কুরআন মজীদের এক কপি সসম্মানে উঠিয়ে নিয়ে আমাদের অফিসারদের সাথে সাক্ষাত করে বলে যে, ঐ ট্রাক জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ড্রাইভারের পোড়া কয়েকটি হাড় ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যায়নি। কিন্তু পুড়ে যাওয়া ঐ ট্রাকের ফুটের ভেতরে দুই কপি কুরআন মজীদ অক্ষত পাওয়া যায়। শিখ বলেছিল, এক কপি অনুবাদ কৃত ছিল, তা আমি আমার নিজের জন্য রেখে দিয়েছি। আমি তা প্রতি শব্দে শব্দে পাঠ করব। আমি কুরআন মজীদের শ্রেষ্ঠত্ব ও অলৌকিকতায় বিশ্বাসী হয়ে গেছি। এ দ্বিতীয় কপি অনুবাদহীন, এটা আপনাদের সামনে পেশ করার জন্য নিয়ে এসেছি। ঐ কপি বর্তমানে লাহোর শাহী মসজিদের যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তা ১১ নং বেলুচ রেজিমন্টে পেশ করেছিল।

📘 সুন্নতে রাসূল সাঃ ও আধুনিক বিজ্ঞান > 📄 কুরআন ও চন্দ্র অবতরণ

📄 কুরআন ও চন্দ্র অবতরণ


জনাব! আপনি এযুগে কুরআনে নম্বর খুঁজছেন। অথচ মানুষ মহাশূন্যের বক্ষ ভেদ করে চাঁদে জ্ঞানের উন্নতির পতাকা উড্ডিন করে এসেছে। আর আপনি কুরআনের পতাকা বাহী হয়ে না রাজনৈতিক দিক থেকে সুস্থ আছেন, না অর্থনৈতিক দিক থেকে সুখে শান্তিতে স্বচ্ছল জীবন যাপন করছেন, না সত্ত্বাগত দিক থেকে উন্নতি লাভ করছেন, না আত্মরক্ষার দিক থেকে নিজে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়েছেন। না আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দাবার গুটির চালে বিচক্ষণতা লাভের স্থলে অসহায় হয়ে অন্যের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছেন। আর পরস্পরে আপোষে মনের সুখে লড়াই করছেন। একে অন্যের রক্ত ঝরাচ্ছেন। আর বিভিন্ন স্থানে বোমার লক্ষ্যবস্তু পরিণত হচ্ছেন, কুরআনের অনুসারীরা বর্তমানে এমন এক গাড়ীতে পরিণত হয়েছে। যার চাকা নষ্ট হয়ে গেছে। তার ইঞ্জিন বলে দিয়েছে যে, এর পার্টস (দ্রুত) অকেজো হয়ে গেছে। কিছু বুদ্ধিমান আরোহী এ গাড়ী ত্যাগ করে চলে গেছে। কিছু লোক দুঃখিত ও ব্যথিত হয়ে আছে। আর কিছু সৌভাগ্যবানও রয়েছে। যারা এ নিয়ে কবিতার সুরে আশার আলো দেখাচ্ছে যে, এ বাস কখনো একাকী কোন অলৌকিক মুজিজা দেখাবে, এবং গাড়ী চলতে শুরু করবে। সামাজিক জীবনের এক অত্যাবশ্যক কর্তব্য হল, একতা। কিন্তু এ ঐক্য ও একতা মুসলিম বিশ্বের নেতাদের মধ্যে তো দূরের কথা, আপনি আপনার দেশের ধর্মীয় নেতাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাদের মধ্যে একতা আছে কি না।

? আরব বিশ্ব ইসরাইলের হাতে তিন তিন বার মার খাবার পরও প্রকৃত অর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ঠিক এমনই সংকটময় মুহূর্তে সিরিয়া, ইরাক-ইয়ামানের মধ্যে যা হচ্ছে, তা চোখের সামনে আছে। আপনি আরও দেখবেন, বহুস্থানে একদিকে প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীরা বলছে, তারা সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু অন্য দলের মধ্যে অন্তদ্বন্ধও চলছে। সম্ভবতঃ আপনার স্মরণ না থাকার কথা, ১৯৫১ সালে ওলামাদের যে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়েছে, তখনও দু'দলের অনুসারীরা স্ব স্ব দল নিয়ে পৃথক পৃথক জামাতে নামায আদায় করেছে। তবে আমি বলতে চাই, চাঁদে মানুষের পৌছার ফলে একদিকে তো চাঁদের সৌন্দর্যের যাদু লণ্ডবণ্ড হয়েছে। আমাদের কবি সাহিত্যিকদের পুঁজি ও ভাষা অলংকরণের রত্নভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে গেছে। যেমন, আকবর এলাহাবাদী বলেছেন,

مغرب نے دوربین سے کمر انکی دیکه لی مشرق کی شاعری کا مزه کر کرا هوا !

"পাশ্চাত্য জগত দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তাদের কোমর পর্যন্ত দেখে নিয়েছে। প্রাচ্য জগতের কবি সাহিত্যিকদের কাব্য রচনার মজা বিলীন হয়ে গেছে।" অপরদিকে সত্য কথা হল, মযহাবের মাথাও ঝুকে পড়েছে। সামান্য অগ্রসর হয়ে অন্য এক জগতের জীবন যাপন ও বিশেষ করে বুদ্ধিমান জীবের অস্তিত্ব প্রকাশ হয়ে যাবে। তখন এ সন্দেহও দূর হয়ে যাবে যে, আমাদের এই কচি জমিনে সুরখাবের বিশেষ কোন পালক পড়েছে। যার কারণে সমস্ত বিশ্বজগতের জন্য রাহমাতুল্লিল আলামীন (সাঃ) এর মহান সত্ত্বাকে এর উপর প্রেরণ করা হয়েছে। আর বাকী সব সৃষ্টিজগত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হযরত জিবরাঈল আ. কেও শুধু এ জগতের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আসমানী অহী ও এলহামের জন্যও এ জগতকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আপনি কুরআনের আলোকে নিছক এ কথাই বলুন যে, চাঁদে নামায আদায় করা হবে কিভাবে? সময়ের নিয়মানুবর্তীতা নির্ধারণ করা হবে কিভাবে? নামাযী কা'বা মুখী হবে কি উপায়ে? হজ্জ সমাপন করা হবে কিভাবে? আর খোদ বিমানের আরোহীরা নামাযের কি ব্যবস্থা করবে? শরী'আতের সববিধি-বিধানই তো এক দিকে বাঁকিয়ে রেখে দিয়েছেন। আপনি অথবা আপনার হযরত ওলামারা কুরআনের সূরা আর-রাহমানের প্রসিদ্ধ আয়াত পাঠ করে বলবেন, মানুষ জমিন ছেড়ে মহাশূন্যে কখনো পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু এ ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেছে। এখন কি হবে? এখন আপনি দেখবেন ঐ ওলামারা দু'দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক দল যারা বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা অবগত। তারা নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন এর থেকে বের হওয়া যেতে পারে। তবে শর্ত হল বাদশাহী লাভ করা। কিন্তু ঐ দ্বিতীয় দল অতীতে রয়ে গেছে। তারা নিজের একঘুয়েমীতে অনড়। তারা বলে, চাঁদে পৌঁছার সব খবর মিথ্যা। এমন ছবি বানানো হয়েছে। আর টেলিভিশনে তা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এ সবই এক মিথ্য বানওয়াট কিচ্ছা কাহিনী। একটু পর্যালোচনা করে দেখুন। এরা হল, আপনাদের প্রতিষ্ঠিত ওলামায়ে কিরাম, আর শরীয়াতের সুদৃঢ় ব্যাখ্যাকারী।

পশ্চাৎবর্তী দলের কথা ছেড়ে দিন। আমি অগ্রবর্তী দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তি উজির সাহেবের ধ্যান-ধারনা ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। তার অধ্যাবসায়ের সারমর্ম হল, পৃথিবীতে যা কিছু হচ্ছে, তা নিছক কাঙ্খিত দ্বীন। আর তা কুরআন উপযোগী। তারা কুরআনকে পরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের মতবাদের সাথে এমনভাবে যুশোপযোগী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছে। আর যেভাবে উপরে আরোহনের মতবাদ থেকে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক দর্শন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়কে কুরআনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে।

তা দেখে সত্যই আমার গর্ব হয় যে, এ ভাবে হাত কান ধরা থেকে হাজার গুন আমাদের মতো জ্ঞানপাপীদের থেকে উত্তম, যারা জ্ঞানের প্রশস্ততাকে সমর্থন করে এ যথার্থতা গ্রহণ করেছেন যে, ওহী ও এলহামের ব্যাপার যতদূর চলে চলবে। অতীত যুগে যখন মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি অপ্রর্যাপ্ত ও পরাধীন ছিল। তখন যেভাবে ছিল সেভাবে চলেছে। এখন মুক্তবুদ্ধির যুগ। আমরা সরল-সোজা ভাবে ঈমান এনেছি। তখন আমাদেরকে এত গোলক ধাঁধার চক্করে পড়া হয়নি। ঈমান আনার পূর্বে নিত্যনতুন দর্শন ও বৈজ্ঞানিক মতবাদের মুকাবিলা করতে হয়নি। তারপর কুরআন মজীদে এর সমর্থনে আয়াত খোঁজ করতে হয়নি। তারপরও যদি কাজ না হয় তাহলে কুরআন মজীদের শব্দাবলীর নতুন অর্থ বের করতেও হয়নি। যদি ডারউইন, নিউটন, ফ্রয়েড ও মার্কসের অভিমত চিন্তা-ভাবনা করে পছন্দ করতেছি যে, তার পর এর কি প্রয়োজন রয়েছে আমাদের কে তাদের অভিমতের সাথে কুরআনকে মিলিয়ে দেখতে হবে। আমাদের কাজ তো হল কুরআনকে চুমু দিয়ে সুন্দর করে তাকের উপর রেখে দেওয়া।

অনুরূপভাবে আমরা ঐ মনীষীদের সুদৃঢ় সাহসিকতার প্রতিদান দিচ্ছি যে, এই যুগেও আপনারা খোদার উপর ঈমান আনার ব্যাপারে সুদৃঢ় আছেন। তাই বিখ্যাত কবি গালিব বলেছেন-
وفاداری بشرط استواری اصل ایمان ہے
দৃঢ়তার সাথে প্রতিজ্ঞাপূর্ণ করাই আসল ঈমান।

আমাদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে, এ পরিবর্তনশীল পৃথিবী ও পরিবর্তনশীল বাহ্যিক জ্ঞানের মাঝে আবর্তিত হওয়ার পর আমরা সূচনা থেকে প্রতিজ্ঞার বুনিয়াদকে আবৃত করে দিয়েছি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00