📄 নিজের উপর ইনসাফ করুন
সৃষ্টি জগতের সকল কাজ মহান আল্লাহ তা'আলার মর্জি ও আদেশেই সমাধা হয়। তারপরও আমাকে-আপনাকে যে কোন কাজের জন্য পেরেশান হওয়ার কি প্রয়োজন? আমজাদের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে। কোন ব্যাপারে মালিকের সাথে ঝগড়া হয়েছে। যাতে তিক্ততা দেখা দিয়েছে। কথা বলা শুরু করার পর আমজাদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা ক্ষোভ ফেটে পড়ে। তারা মানবতা ও ইনসাফের সকল নীতি পেছনে ফেলে দিয়েছে। প্রতি কদমে কদমে বে-ইনসাফী ও হক নষ্ট করা আমার সহ্য হয় না। কয়েক সপ্তাহ পর উভয় দ্বিতীয় বার মুখোমুখি হয়। তখনও তার কথার কর্কশতা ও বে-ইনসাফীর অভিযোগ মানুষের অন্তরে বিদ্যমান ছিল। এ ঘটনা বানানো নয়, আমাদের সকলের জীবনে কোন না কোন সময় লোকদের সাথে এ ধরনের বাড়াবাড়ী ও বে-ইনসাফীর সমস্যা দেখা দেয়।
কঠোর অনুভূতিহীনতার চাপে পরিপূর্ণ এ পৃথিবী সঠিক সহমর্মিতা প্রদর্শন কারী ও দুঃখ প্রকাশ কারী থেকে খালি দৃষ্টি গোচর হয়। আর তখন মনে হয় যেন আমাদের অস্তিত্ব এক অসহায় অক্ষম কাকের মত হয়ে আছে যে ভাবে চতুর্দিকে বে-ইনসাফীর ঢেউ তীব্র স্রোতের আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। আর আমাদের সকলকে অন্ধকারে নিমোজ্জিত করছে। পৃথিবীর রঙ্গ মঞ্চে আমাদের অবস্থা যেন কাঠের পুতুলের মত। প্রত্যেকে অপরের হক নষ্ট করে নিজের ভাগ্য গড়ার চিন্তায় আচ্ছন্ন। তথাপি আমি অতি ধীরস্থিরে ঠাণ্ডা মাথায় অবস্থা পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করছি। তাই এক প্রতিচ্ছবির রূপ সামনে উপস্থিত হয়েছে। মানুষের মধ্যে অসংখ্য নিচুতা, আত্মতৃপ্তি, স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রতারণা বিস্তৃত। কিন্তু তারপরও নিশ্চিত দৃঢ় বিশ্বাস করুন যে, পৃথিবী এখনো সৎ ও ভালো মানুষ আছে। খোঁজ করলে এখনো এ ধরনের অসংখ্য মানুষ পাওয়া যাবে, যাদের মধ্যে মানবতা, ভদ্রতা, আতিথেয়তা ও ন্যায় পরায়নতা অতি উত্তমরূপে বিদ্যমান।
অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীগণ মানুষের মন-মানসিকতায় এ ধরনের বিভ্রান্তি, অনুভূতিহীনতা, বঞ্চনা, শঠতা, অন্যের হক নষ্ট করা, ন্যায়নীতি বিসর্জন দেওয়ার একাধিক কারণ চিহ্নিত করেছেন। তথাপি তাদের সাথে আমরা সকলে ঐক্যমতে উপনীত হয়েছি যে, যত নষ্টের মূল হল এ পৃথিবী। দ্বিতীয় আর কোন মানুষ হতে পারে না বরং স্বয়ং মানুষের আপন সত্ত্বার ও এক বিরাট বড় অংশকে এর জিম্মাদার নির্ধারণ করা হয়েছে। বস্তুতঃ নিজের সমপর্যায়ের ব্যক্তি ও বন্ধু-বান্ধবদের সামনে মানুষ তার অভিযোগ সম্পর্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ-আলোচনা করে মনের বোঝা হালকা করে নেয়। কিন্তু যখন আপনার চেয়ে পদমর্যাদার কোন ব্যক্তি বা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উঠে বা দুঃখকষ্ট আঘাত হানে তা আপনি আমি প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনা করতে ঘৃণাবোধ করি। আমরা অধিকাংশ সময় একথা সেকথা বলে নিজের অভিযোগকে গলাটিপে ধরে হত্যা করে ফেলি। বলি কে শুনবে আমার অভিযোগ? তাই সে এ বিষয় কারো নিকট মুখ খুলতে রাজি হয় না। যদি এ ধরনের অবস্থা নিয়মিত চলতে থাকে, তাহলে অতি দ্রুত মানুষের মন-মানসিকতায় এ ধরনের অনুভূতির বঞ্চনা সহনীয় হয়ে যায়। যা অবশেষে তাকে অনুভূতিহীনতার শিকার বানিয়ে দেয়। অবশেষে সে তা অনুভবই করতে পারে না। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হতে পারে, মানুষকে যে লোক ব্যক্তিগতভাবে কোন দুঃখ কষ্ট দেয়, সে তার সাথে সরাসরি কথা বলতে ঘৃণা বোধ করে কেন? সে তার সাথে কৃত বাড়াবাড়ী বা বে-ইনসাফীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করার স্থলে নিজে নিজে অন্তরে জ্বলে পুড়ে মরতে রাজী হয় কেন? এর জবাব অতি সহজ ও সরল।
অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানীগণ এ ধরনের ব্যথিত লোকদের মানসিক বিপর্যয় সম্পর্কে গবেষণা করার পর যে ফলাফল উপস্থাপন করেছে, তাতে এ বাস্তবতা উপস্থিত হয়েছে যে, এ ধরনের ব্যক্তি সাধারণতঃ স্মরণশক্তির উৎসাহ উদ্দীপনার ব্যাপারে অপরিপক্ক ও অপ্রাপ্ত হয়। উপরিউক্ত ধরনের লোক সঠিক সময়ের পূর্বে স্বীয় অন্তরে এ ধরনের সমস্যা কবলিত হয় যে, তাদের অস্তিত্ব অকর্মন্য হয়ে পড়ে। অন্যদের সাথে নিজের অবস্থান মিলিয়ে নেওয়ার কোন বাঁধা বিপত্তি থাকতে পারে। এ ধরনের অনুভূতির শেকড় অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত থাকে।
অধিকাংশ সময় বাল্যকালে এ অবস্থার সূচনা হয়ে থাকে। সাধারণতঃ দেখা যায় যে, মাতা-পিতা সন্তানকে সময় অসময় অনেক বেশী আদর স্নেহ করেন। কিন্তু যদি কোন সন্তান স্বেচ্ছায় তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার বা আদর-স্নেহ লাভ করার ইচ্ছা করে, তখন তাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ধমক দিয়ে নিবৃত করা হয়। এ ধরনের কাজ কোন সময়ই সুফল বয়ে আনে না। এর ফলে শিশুদের সাধারণ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও লালন-পালনে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাতে শিশু নিজের উপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে আর তখন তার উপর সর্বদা এক অজানা ভয়-ভীতি বিরাজ করে। একবার এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হয়ে গেলে পরে সারা জীবনেও তা থেকে মুক্তি লাভ করা দুরূহ হয়ে যায়। বঞ্চনা ও স্বীয় সত্ত্বার কম আকর্ষণের ফলে এ ভয়ানক অনুভূতি বয়স বাড়ার সাথে সাথে কঠিন রূপ ধারণ করে। অবশেষে এমন অবস্থায় উপনীত হয় যে, মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে।
অতএব অবসর সময়ে নিজের লাভ ক্ষতির হিসাব মিলিয়ে নিন। তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আপনি শিশুকালে যেভাবে মাতাপিতার ধমকি শুনে নীরব হয়ে যেতেন, আপনার অনুভূতি শক্তিই বিলুপ্ত হয়ে যেত, ঠিক অনুরূপভাবে আজ যখন আপনার কর্মজীবনে মনিব বা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দ্বারা আপনি কষ্টপান বা উৎপীড়িত হন, অনুভূতিহীনতার ঐ ভয় ও ভীতির শিকার হয়ে যেতে থাকেন শৈশবকাল যার অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছিল। কেননা এতদুভয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নিশ্চিত বিশ্বাস করুন যে, আজও আপনি স্মরণশক্তি ও উৎসাহের দিক থেকে এক ভীত সন্ত্রস্ত ও ব্যথা বেদনা সহনীয় শিশুর মত জীবন-যাপন করছেন। তবে এতদুভয়ের মাঝে পার্থক্য এই যে ঐ মনিব বা উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আপনার মাতা-পিতার স্থান দখল করে নিয়েছেন।
অনুভূতিহীনতার বঞ্চনা ও অন্যায়ের শিকার ব্যক্তির সব চেয়ে বড় যন্ত্রণা হল, তারা জীবনের শুরু থেকেই স্বীয় অস্তিত্বকে অকর্মন্য বলে মেনে নিয়েছে। পরিণামে তাদের মধ্যে হতাশা ও নৈরাশ্যতা সৃষ্টি হতে থাকে। কেননা যদি এরূপ কোন ব্যক্তি কোন সময় স্বীয় অনুভূতি হীনতার কারণে নিজের গা বাঁচানোর চেষ্টা করে তাহলে তুলনামূলক তাকে আরো বেশী দুঃখ-কষ্টের মোকাবিলা করতে হবে। এমতাবস্থায় সফলতার সাথে গুরুত্বপূর্ণ পদে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের চিন্তাভাবনায় নীতিগত পরিবর্তন জরুরী। আপনি একজন দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তি। তা থেকে বিরত থাকা আপনার জন্য সমীচীন নয়।
জীবনের বাস্তবতাকে গ্রহণ করে স্বীয় পদমর্যাদা অনুযায়ী বড়দের সাথে নির্মল ও সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন। আপনার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ বা মালিক কোন আসমানী সৃষ্ট জীব নয়। তিনিও আপনার মত রক্তমাংসে গড়া এক মানুষ। আপনি শুধু কতিপয় মনগড়া মূলনীতির কারণে আপনার ও তাদের মাঝে ভয়ভীতির এক অহেতুক বাঁধা দাঁড় করে রেখেছেন। এসব বাঁধা-বিপত্তিকে দূর করে আপনার অভিযোগ ও আবেদন নিবেদন তাদের নিকট পেশ করার যে, আপনার মনগড়া সব বাঁধা বিপত্তি ভুল ও ভিত্তিহীন ছিল। এভাবে অন্যায় ও বাড়াবাড়ী সম্পর্কে আপনার সব ওজর আপত্তি এমনিতে খতম হয়ে যাবে।
এ বাস্তবতাকে যথাযথভাবে মনে বদ্ধমূল করে নিন যে, পৃথিবীতে আপনার মত অসংখ্য মানুষ বসবাস করছে। আপনি নিজেকে তাদের চেয়ে বড় মনে করে তাদেরকে অবমাননা বা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন না। নতুবা সর্বদা তাদের সাহায্য ও সহানুভতি থেকে বঞ্চিত থেকে যাবেন। আর তাদের এ অসহযোগীতার পরিণামে আপনার স্বীয় উদ্দ্যেশ্য ও লক্ষ্যে পৌঁছা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। জীবনে প্রতিটি মানুষ উচ্চ পদে উপনীত হয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির অধিকারী হওয়ার সোনালী স্বপ্ন দেখে। আর তার জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বর্তমানে এ ধরনের লোক কোন বাঁধা অথবা অন্য কোন অসহনীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে ঐ উদ্দেশ্য লাভে ব্যর্থ থেকে যায়। তারা তখন স্মৃতিশক্তির অনুভূতি নষ্ট করে দেয়। আর ব্রেণ সন্দেহের (Persecution Complex) শিকারে পরিণত। নিশ্চিত বিশ্বাস করুন, অন্যান্য মানসিক ব্যাধির মত এ ব্যাধিও মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক হয়। এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া মাত্র এক দীর্ঘ মেয়াদী হতোদ্যম অবস্থার সূচনা হয়। ফলে মানুষ সারা জীবনের জন্য ব্যর্থতা ও হতাশার হয়ে যায়। পক্ষান্তরে নিজেকে অন্যান্যদের তুলনায় অতি নগন্য ও হীন মনে করা আদৌ সমীচীন হতে পারে না। এ অবস্থায়ও মানুষ হতাশা, উদাসীনতা ও দুঃশ্চিন্তার শিকার হয়ে যেতে পারে। আর তার খোদা প্রদত্ত যোগ্যতা সমূহ বিলুপ্ত হতে শুরু করে। জীবনে সফলতা ও লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা সর্বোত্তম পন্থা। অনুভূতির উন্নতির সাথে সাথে নিজের স্মৃতিপটে এটা সংরক্ষণ করে নিন যে, আপনিই সব কিছু নন।
আপনার চেয়ে অনেক উত্তম লোক রয়েছে। অন্যদিকে অনুভূতিহীনতার সাথে সাথে এ ব্যাপারেও নিশ্চিত দৃঢ় বিশ্বাসী হন যে, আমি সব কিছু সহ্যকারী নই। তথাপি অবশ্যই আমি কিছু না কিছু হয়েছি। ডেল কার্নেগী এক গ্রন্থে হেনরী ফোর্ডের সাথে তার সাক্ষাতের বিষয় উল্লেখ করে লিখেছেন, ঐ সময় হেনরী ফোর্ডের বয়স ছিল ৭৫ বছর। সারা জীবন তাকে কঠোর অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করার কারণে এ বৃদ্ধ ব্যক্তি অবশ্যই পরিশ্রান্ত ও অবসন্নতার শিকারে পরিণত হয়ে পড়েছে। আর তার অবয়বে দুঃশ্চিন্তা ও হতাশার অসংখ্য সালামের নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তার সাথে সাক্ষাত হওয়ার পর তাকে নবীন যুবকদের মতো সুস্থ সবল কর্মচঞ্চল প্রশান্ত দেখি। তখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত স্বস্থির থাকতে পারিনি। আপনি জীবনে কখনো পেরেশানির শিকার হয়েছেন কি? হেনরী ফোর্ড তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেন, "আমি একচ্ছত্র সার্বভৌম ক্ষমতাধরের উপর পূর্ণ বিশ্বাসী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, সৃষ্টি জগতের প্রতিটি কাজ তাঁর মর্জি ও আদেশে সমাধা হয়। এ সম্পর্কে আমার কারো সাথে পরামর্শ করার কোন প্রয়োজন নেই। এখন আপনি বলুন তো! আমার কোন কাজ সম্পর্কে পেরেশান হওয়ার কোন প্রয়োজন আছে কি?"
ফ্রান্সেস বেকন বলেছিল, দর্শনের অস্পষ্ট জ্ঞান মানুষকে নাস্তিকতার প্রতি ধাবিত করে। কিন্তু এর গভীরতা ও আবেষ্টন মানুষকে ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করে। স্মরণ রাখুন, যদি আপনি অনুভূতির বঞ্চনা ও অন্যায়ের শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে ধর্ম আপনার জন্য উত্তম সহায় ও আশ্রয় স্থল।
আধুনিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ বর্তমানে এটা অনুভব করতে শুরু করছেন যে, সঠিক ধর্মীয় আকীদা, ছহীহ্ আমল মানুষকে ব্যক্তিগত হতাশা পেরেশানী, দুঃখ-কষ্ট, ব্যাথা বেদনা ভয়ভীতি ও দৈহিক দুঃখ কষ্টের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভে বেশী সাহায্যকারী।
খ্যাতনামা আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ডাক্তার এম.এ. ব্যারন বলেছেন, সঠিক অর্থে ধর্মীয় বিধান সমূহ অনুসরণ ও পালনকারী ব্যক্তি কখনো দৈহিক ও মানসিক ব্যাধির শিকার হয় না। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ও সংশয় নেই। মূলতঃ ব্যর্থতা ও বাড়াবাড়ী মানুষের অন্তরকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আর তখন সে হাত পা ছুঁড়ে ভাগ্যকে গালি দিতে শুরু করে। কিন্তু যদি আপনি একক অদ্বিতীয় অংশীদার ও সমকক্ষহীন সত্ত্বার উপর দৃঢ় বিশ্বাসী ও নির্ভরশীল হন, তখন নিশ্চিত দৃঢ় চিত্ত হন যে, ভাগ্যের এ সাময়িক অসহযোগীতা আপনার নিকট গুরুত্বহীন ও তুচ্ছ। ধর্মের প্রতি দৃঢ়তা মানুষের মাঝে দৃঢ় প্রত্যয়ত উচ্চাকাঙ্খা স্বভাবের দৃঢ়তা মূল্যবান বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে দেয়। আর এর বদৌলতে সে আন্তরিক প্রশান্তি, মানসিক স্বস্তি ও নিরাপত্তা বোধ করার এক বিস্ময়কর অনুভূতি ও আনন্দ লাভ করে।
এ ধর্মীয় আকাঈদের অনুসরণ অনুকরণ করে ব্যাপক বিস্তৃতি ও অনাদী অনন্ত বাস্তবতার উপর নিজের কর্তৃত্ব মজবুত করার চেষ্টা করুন, তাহলে পৃথিবীর স্বাভাবিক বাড়াবাড়ী ও বে-ইনসাফীর অনুভূতি এমনিতে দূর হয়ে যাবে।
📄 কুরআন ও আধুনিক গবেষণা
কুরআন মজিদ মহান আল্লাহ তা'আলার শাশ্বত চিরন্তন বাণী আর সৃষ্টি জগত মহান আল্লাহ তা'আলার কর্মলীলা। এ সৃষ্টি জগতের মূলনীতিগুলো সত্ত্বাগতভাবে বুঝার নাম হল বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের সঠিক ও স্বীকৃত বস্তুসমূহ ও কুরআন মজীদে সহীহ শুদ্ধ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সাথে মতবিরোধের কোন প্রশ্নই উদ্ভাবন হতে পারে না। কেননা মহান আল্লাহ তা'আলার কর্মলীলা ও শ্বাশত বাণীর মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে না। মতবিরোধ ও ভুল ধারণা তখন সৃষ্টি হয়, যখন দেখা যায় আমাদের জ্ঞান স্বল্প ও সীমিত। তাই কুরআন মজীদ বিশুদ্ধ উপায়ে বুঝার ব্যাপারে আমাদের জ্ঞানের স্বল্পতা বিভিন্নভাবে হতে পারে। কখনো পূর্ববর্তী অভিমত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
অথবা পুর্ণাঙ্গরূপে তাদের অভিমত সঠিকভাবে বুঝতে না পারা, কখনো সহীহ শুদ্ধ ও ত্রুটিপূর্ণ বর্ণনা সমূহের সঠিক পার্থক্য নিরূপণ করতে না পারা। আর এ পার্থক্য নিরূপণে বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান-প্রজ্ঞার সাহায্য না নেওয়া। এ সব কারণে আমরা মহান আল্লাহ তা'আলার শ্বাশত বাণী আল-কুরআনের গোপন তত্ত্ব ও তথ্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারি না। তাই কোন কোন সময় একগুঁয়েমী ও ধৃষ্ঠতা প্রদর্শন বা স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির উদ্দেশ্য কতিপয় ব্যক্তি উল্টাপাল্টা মনগড়া তাফসীর করা শুরু করে দেয়।
📄 এক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ইসলামী আইনী উপকারীতা
কখনো কখনো কোন বিষয়ে মানবিক অজ্ঞতা বা প্রকৃত যথার্থতা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতার কারণেও ভুল ভ্রান্তি, মতবিরোধ দেখা দেয়। যেমন খমর বা নেশা জাতিয় দ্রব্যাদি সম্পর্কে হযরত ইমাম আবু ইউসুফ রহ. শুধু আংগুরের রস থেকে উৎপাদিত রসকে নেশা ধর্তব্য মনে করেন। অন্যান্য ইমামগণ এর সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমত প্রকাশ করেছেন। এমন কি হযরত ইমাম মুহাম্মদ রহ. আংগুর ছাড়া ফল ও ফল জাতীয় দ্রব্যাদির রস থেকে উৎপাদিত শরাবকেও খমর বা নেশার অন্তর্ভূক্ত গণ্য করেছেন। অবশেষে আধুনিক বিজ্ঞান এ মত বিরোধ চিরদিনের জন্য নিষ্পন্ন করে দিয়েছে। সব ফল ও ফল জাতীয় দ্রব্যাদির রস থেকে উৎপাদিত শরাব যাতে নেশা ও ইথাইল এ্যালকোহলের (Ethyl Alcohol) উপাদান বিদ্যমান পাওয়া যায়, তা শরাবের অন্তর্ভূক্ত হবে। কিন্তু অন্যান্য উৎপাদিত দ্রব্যাদি যাতে নেশা ও এ্যালকোহলের উপাদান বিদ্যমান হবে, ঐ সব বিষয়ের সমাধান ব্যতিক্রম ও পৃথক হবে। যথা ভাং-আফিম প্রভৃতির শুধু এক বিন্দু বা তার সাদৃশ্যতা (অর্থাৎ নেশা না হওয়ার পরিমাণ) হারাম হবে না। বরং অবৈধতা শুধু নেশা হওয়ার অবস্থায় অত্যাবশ্যক হবে। কিন্তু এ্যালকোহলের এক ফোঁটাও ব্যবহার করা হারাম হবে। চাই কার্যতঃ নেশা সৃষ্টি না করুক। এটা এমন এক উদাহরণ যাতে বিজ্ঞানের এক ব্যাখ্যা ফিকাহ বিশেষজ্ঞগণের উপকারী প্রমাণ হয়েছে। কিন্তু যে আলেমগণ নিয়মিত ভাবে বিজ্ঞানের গ্রন্থাবলী পাঠ করে না অথবা শুধু শোনা কথা বা অসমাপ্ত জ্ঞান রাখেন। তারা বিভিন্ন বিষয় অভিমত প্রকাশ করে ভুলভ্রান্তিতে পতিত হয়。
📄 এক অকৃতকার্য প্রচেষ্টা
বিজ্ঞান মূলতঃ সত্ত্বাগত বাস্তবতা সমূহ অনুসন্ধান করার এক সকল প্রচেষ্টা ও ধারাবাহিক পথ অতিক্রম করার নাম। বিজ্ঞানের সামনে যখন কোন সমস্যা সমাধানের পর্যাপ্ত পরিমাণ উপকরণ সমবেত হয় এবং কোন বিষয়ের বাস্তবতা অনুমান করার ঝলক অনুভূত হতে থাকে, তখন যুক্তিপ্রয়োগ বা কল্পনা প্রসূত নমুনা পরিলক্ষিত হয়, তারপর যখন একাধিক বিজ্ঞানী তা সমর্থন করে, তখন তার অতিরিক্ত প্রমাণ বিদ্যমান হয়। তখন ওটাকে মতবাদ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে যখন এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঐ মতবাদের ঘোষণা ধারাবাহিকভাবে পৃথিবীর আনাচে কানাচে পৌঁছে যায় আর সকল বিজ্ঞানী এ সম্পর্কে ঐক্যমতে উপনীত হয়, তখন ঐ মতবাদকে আইনের মর্যাদা দেওয়া হয়। নীতিগতভাবে তা আইনে পরিণত হওয়ার পর ঐ মতবাদে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন না হওয়াই উচিত। কিন্তু কি করা যাবে। মানবীয় জ্ঞান-প্রজ্ঞা এত সংকীর্ণ ও অসমাপ্ত যে আইনে পরিণত হওয়ার পরও পরিবর্তন হওয়ার অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। এক যুগে আইন পরিবর্তনের উর্ধে মনে করা হত। কিন্তু বিজ্ঞানী আইনেষ্টাইন এসে এটাকেও অসমাপ্ত ঘোষণা করে তাতে পরিবর্তন এনে দেন। স্যার জেমসজীনের মতে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার আইনেষ্টাইনের এ থিউরি বা মতবাদ। মজার ব্যাপার হল, মতবাদ আইনকে দূর করে দিয়েছে। পক্ষান্তরে মতবাদ আইন থেকে দুর্বল হয়। প্রকাশ থাকে যে, মতবাদের সম্পর্ককে এ পর্যন্ত আইনের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এভাবে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে বাস্তবতা অনুসন্ধানের পথে নিয়োজিত রয়েছে।